• বুলবুলভাজা  আলোচনা  সমাজ

  • ঔপনিবেশিক আমলে গাঁজা -- জ্ঞানচর্চার নির্মাণ

    অমিতরঞ্জন বসু
    আলোচনা | সমাজ | ১৭ নভেম্বর ২০২০ | ৭০০ বার পঠিত | ৪.৮/৫ (৪ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • গাঁজা বিষয়ে আজ যে দৃষ্টিভঙ্গি তার সূত্রপাত হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। এর সাথে মধ্যযুগে ও প্রাচীন সময়ের একটা স্পষ্ট ছেদ দেখতে পাওয়া যায়। সরকারি নিয়ন্ত্রণে আসার সাথে সাথেই এবিষয়ে অনুসন্ধান এবং একটা নতুন নির্মাণও গড়ে উঠতে থাকে যা ভবিষ্যতে গাঁজাকে একটা নিষিদ্ধ মাদকে পরিণত করে।
    গাঁজা নিয়ে ঔপনিবেশিক কর্তাদের চিন্তাভাবনার সূত্রপাত লুনাটিক অ্যাসাইলাম বা ‘পাগলাগারদ’ (এই নামেই লোকমুখে বাংলায় অ্যাসাইলামগুলি পরিচিত হয়ে উঠেছিল) সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। আধুনিক মনশ্চিকিৎসার জ্ঞানচর্চার সূত্রপাতও ঘটেছিল এভাবেই। রোগের বর্ণনার আর বর্গীকরণের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল ‘গাঁজা ইন্স্যানিটির’ও তত্ত্ব। যেসব মানসিক রোগাবস্থার ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যেত না, তখন যদি গাঁজা ব্যবহারের তথ্য রোগীর থেকে পাওয়া যেত তখনই ধরে নেওয়া হত এ অবস্থা গাঁজার জন্যই হয়েছে। ‘গাঁজা-ইন্স্যানিটির’ তত্ত্ব, যার বর্তমান বৈজ্ঞানিক নামকরণ ‘ক্যানাবিস সাইকোসিস’ হয়েছে, শুরু হচ্ছে পাগলাগারদে ভর্তি মানুষদের গাঁজা খাওয়ার পরিসংখ্যান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।
    অথচ এ সময়ে কিন্তু ব্রিটেনে ক্যানাবিস (গাঁজার বৈজ্ঞানিক নাম) ব্যবহার নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না। বরং শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে মদ আর আফিম খাওয়া বেড়ে যাওয়া নিয়েই বিস্তর উদ্বেগ দেখা যায়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি পেপারস এর ৬৬ খণ্ডে (১৮৯৩-৪) “পেপারস রিলেটেড টু দ্য কনজাম্পসন অফ গাঁজা অ্যান্ড আদার ড্রাগস ইন ইন্ডিয়া”তে লেখা আছে: সেই ১৮৭১ সালেই ভারত সরকার গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মরত অফিসার, ডাক্তার এবং সৈনিকদের কাছে তথ্যসংগ্রহ করতে বলেছেন যে গাঁজার ব্যবহার পাগলামি বা অন্য কোনো ধরণের বিপজ্জনক প্রভাব ফেলেছে কিনা। ১৮৯৩ সালে সাংসদ উইলিয়াম কেইন এ বিষয়ে হাউস অফ কমনস এ প্রশ্ন তোলেন এবং ঐ বছরেই এপ্রিল মাসে গঠন করা হয় ইন্ডিয়ান হেম্প ড্রাগস কমিশন। কমিশনকে বলা হয় বাংলায় গাঁজা চাষের ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে হবে, এর ব্যবহারের জন্য জনসাধারণের সামাজিক ও নৈতিক অবস্থার ওপর কী কী প্রভাব পড়ছে, এবং গাঁজার ও সমধর্মী ভেষজগুলির উৎপাদন ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা বসানো আকাঙ্খিত কিনা?
    ইন্ডিয়ান হেম্প ড্রাগস কমিশন উনবিংশ শতকের শেষে গাঁজা, চরস ও ভাং বা সিদ্ধির ওপর সব থেকে বড় সমীক্ষা করেন। ঐ সময়ে পৃথিবীতে অন্য কোনো রাষ্ট্রে এ বিষয়ে, এই রকমের কোনো সমীক্ষার খবর আমি এখনও পাইনি। যদিও গাঁজার গাছ বা হেম্প-ট্রী পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই পাওয়া গেছে, এমনকি বিলেতেও। এর থেকে দড়ি, বস্তা, কাপড় এসব তৈরি হত। গাঁজার বিচি ছিল পাখির খাদ্য। কিন্তু ভারতের মত একটা বিশাল দেশে মাত্র একবছরের মধ্যে একহাজারেরও বেশি লোকেদের সাক্ষ্যগ্রহণ করার মত জরিপ সত্যিই উল্লেখজনক। ঔপনিবেশিক কর্তারা যে গাঁজার ব্যবহারের ওপর নজর রাখছিল সেটা পাগলাগারদ বিষয়ক বার্ষিক রিপোর্টগুলি ছাড়া অন্যান্য নানা লেখার মধ্য দিয়েও বোঝা যায়। ১৮২৬ সালেই হোয়াইটল এইন্সলি লন্ডন থেকে প্রকাশ করেছিলেন ভারতীয় ভেষজ-এর ওপর বই ‘মেটিরিয়া ইন্ডিকা’। সেখানে লেখা আছে ডায়ারিয়াতে এবং ঝুলে পড়া অর্শতে (পোরট্রুডেড পাইলস) গাঁজা কীভাবে কাজ করে। ১৮৩০ নাগাদ ডাব্লু. বি. ও’শনেসী কলকাতায় গাঁজা নিয়ে অনেকগুলি পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছিলেন কুকুর ও মানুষ দুয়েরই ওপর। তার ফলাফল তিনি ট্রানজাকশন অফ দ্য মেডিকাল অ্যান্ড ফিজিকাল সোসাইটি অফ বেঙ্গল, ১৮৩৮-৪০ এ প্রকাশ করেন। তাঁর মনে হয়েছিল যে ‘কুকুরের মুখের চেহারা এক অসহায় মদ্যপের মতন দেখাচ্ছে।‘
    গাঁজা-ভাং নিয়ে সাহেবদের এই কৌতূহলের কারণ অনেকদিনের। প্রথমত এর ব্যাপক ব্যবহারের সঙ্গে নেটিভদের বুঝতে না পারা আচরণগুলিকে সম্পর্কিত করে একটা ব্যাখ্যা তৈরিতে আগ্রহ দেখা যায়। যেমন ভারতীয়দের সমস্ত “অসঙ্গত” এবং “কুসংস্কারগ্রস্ত” কার্যকলাপের সঙ্গে গাঁজা-ভাং এর যোগাযোগ দেখার চেষ্টা, এবং গাঁজা-ভাং-চরসের সঙ্গে যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি, কিংবা বিদ্রোহ করার মানসিকতা জড়িয়ে আছে বলে সন্দেহ করা। ফলে গাঁজা-ভাং বিষয়ক এক সার্বিক তথ্য সংগ্রহের মধ্য দিয়ে যে জ্ঞান উৎপাদন করা হবে, সেই জ্ঞানই বলে দেবে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা কোথায় কতটা। এই জ্ঞান উৎপাদনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িয়ে পড়বেন – সেই সব সাক্ষীদের অনুমোদনই গড়ে তুলবে নিয়ন্ত্রণের এক অদৃশ্য জালিকা, যা আইনকে ছাপিয়ে কার্যকরী থাকে। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বলে যার প্রসার ঘটবে সরকারি রিপোর্ট থেকে পত্রিকার পাতায়, আর হুতোম থেকে শিবনাথ শাস্ত্রী পর্যন্ত বাংলার সমাজ সংস্কারকদের রচনায়।
    হেম্প কমিশন মোট সত্তরটি প্রশ্নের এক দীর্ঘ প্রশ্নপত্র তৈরি করেছিল। প্রশ্নপত্রটি সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত: ১) ভূমিকা, ২) হেম্প এর বৃদ্ধি ও চাষ (ক্যানাবিস স্যাটাইভা), ৩) প্রস্তুতি বা তৈরি করা, ৪) বাণিজ্য, ৫) ভোগকরা বা ব্যবহার, ৬) প্রভাব, এবং ৭) প্রশাসন-কর প্রয়োগ : নিয়ন্ত্রণ।
    এই সাতটি অধ্যায়ের মধ্যে পঞ্চম আর ষষ্ঠ অধ্যায়েই ছিল বেশি প্রশ্ন, মোট ছত্রিশটি। সব প্রশ্নগুলি খুঁটিয়ে পড়লে এটা বুঝতে অসুবিধা হয়না কয়েকটা বিশেষ ধরণের উত্তরের আশা করেই যেন এগুলি করা। যেমন ধরা যাক পঞ্চম অধ্যায়ের দ্বিতীয় প্রশ্নটি : ‘What classes and what proportion of the people smoke ganja and charas respectively? and in what localities?’ এখানে ঝোঁক কিন্তু নিম্ন শ্রেণির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের এবং কোন জায়গা বা পাড়ায় গাঁজার আড্ডা বিখ্যাত সেটা নির্ণয় করার। এই অধ্যায়ের শেষে ৩৬ নং প্রশ্নটি পরিষ্কার :
    (a)Would it be feasible to prohibit the use of any or all of these drugs?
    (b)Would the drug be consumed illicitly?
    (c)How could the prohibition be enforced?
    (d)Would the prohibiton occassion serious discontent among the consumers?
    (e)Would such discontent amount to a political danger?
    (f)Would the prohibitions be followed by recourse to (a) alcoholic stimulus or (b) other drugs?
    গাঁজা-ভাং এর ওপর নিয়ন্ত্রণ আনার পরিকল্পনাটি কার্যকরী করার জন্যই কিন্তু এ বিষয়ে আগাম জেনে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে প্রধানত বাণিজ্য ও আবগারি বিষয়ক আয় বাড়ানোর দিক থেকে। যদি এর কুপ্রভাবগুলি সামনে আনা যায় তাহলে হয়ত নিয়ন্ত্রণের যুক্তিটি সহজে গৃহীত হতে পারে। তাই এই ধরণের প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছিল:
    45 (a) Does the habitual moderate use of any of these drugs produce any noxious effect – physical, mental or moral?
    (b) Does it impair the constitution in any way?
    (c) Does it injure the digestion or cause loss of appetite?
    (d) Does it cause dysentery, bronchitis of asthma?
    (e) Does it impair the moral sense or induce laziness or habits of immorality and debauchery?
    (f) Does it deaden the intellect or produce insanity?
    এগুলি সবই closed question, অর্থাৎ, হ্যাঁ, অথবা না তে উত্তর দিতে হবে। জানতে হবে যে এর কোনো যৌনবর্ধক ক্ষমতা আছে কিনা এবং বেশ্যারা কি এটা সেইজন্যই ব্যবহার করে থাকে? এই দীর্ঘ প্রশ্নমালার বিশ্লেষণে আমি যাব না। উৎসাহী গবেষক শুধু এটা নিয়েই অনেক আলোচনা করে ফেলতে পারেন। আমি শুধু বলতে চাইছি যে, প্রশ্নমালাটি যত্ন করে তৈরি করা হয়েছিল এ বিষয়ে জ্ঞান উৎপাদনের জন্য, যে জ্ঞান অনুশাসন করার জন্য প্রয়োজনীয়। বিজ্ঞান আর মুক্ত-মতামতের লেবেল মারা এই কমিশন কিন্তু এই বিস্তারিত জ্ঞানের বস্তুগুলিকে সাজিয়েই তর্ক করবে কেন গাঁজা-চরসের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো দরকার।
    বাংলা থেকে মোট ২৫১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছিল এই প্রশ্নগুলির ভিত্তিতে। লিখিত এবং মৌখিক দু ধরণের উত্তরই সংগ্রহ করা হয়েছিল। উনবিংশ শতকের শেষের বাংলা কিন্তু বেশ বড়। ফলে বাংলা ছাড়া অন্যান্য ভাষায়ও হয়ত অনেকে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। তার অনুবাদ কিভাবে হল বোঝা মুশকিল। আন্দাজ করা যায় আদালতের দোভাষী কর্মচারীদের কাজে লাগানো হয়েছিল। ফলে অনুবাদেও বেশ কিছু রূপান্তর ঘটেছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই বয়ানগুলি সংক্ষিপ্ত এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিবেদনের মত। কাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছিল ঔপনিবেশিক বাংলায় এই গাঁজা-সমীক্ষায়? ম্যাজিস্ট্রেট, কালেক্টর, শুল্ক বিভাগের কমিশনার, পুলিশের বড় কর্তা, সিভিল সার্জন, মেডিকাল কলেজের শিক্ষক, আর পাগলাগারদের সুপারিন্টেনডেন্টদের মত বড়ো-বড়ো আমলাদের সংখ্যা ছিল একশোরও বেশি। এরপর ছোট-আমলাদের স্তর, যেখানে গাঁজা চাষের সুপারভাইজারের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে শুরু করে রিটায়ার্ড এক্সাইজ দারোগা, মুন্সেফ ইন্সপেক্টর এই ধরণের মানুষদের সাক্ষ্য। এঁদের সংখ্যা কুড়ি-পঁচিশের মত। ‘মেডিকাল প্র্যাকটিশনার’ এই বর্গে ঢুকেছে ছাব্বিশ জনের নাম যাদের মাত্র ছ-সাতজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক ছিলেন এবং ইউনানি বা সিদ্ধার কেউ ছিলেন না। পঁয়ত্রিশ জন ‘জমিদার’-এর সাক্ষ্যও নেওয়া হয়েছিল, ছিলেন বেশ কিছু উকিলও। তালিকা দেখে কাউকেই ঠিক সাধারণ বা নিম্নবর্গের লোকজন বলে মনে হয় না, দু একটি সন্দেহজনক বর্গ ছাড়া যেমন: ‘এক্সাইজ ভেন্ডর’, ‘হোলসেল অ্যান্ড রিটেইল ভেন্ডার অফ গাঁজা অ্যান্ড ভাং’, ‘ভাং কনট্রাক্টরস গোমস্তা’।
    অর্থাৎ, এক অর্থে গাঁজা-ভাং-চরস ব্যবহারকারী লোকজনের সাক্ষ্য বাদ দিয়ে, যারা প্রধানত এর বিরোধী (ঔপনিবেশিক কর্তাদের সাক্ষ্যই পঞ্চাশভাগের ওপরে), তাঁদেরই মতামত বিশ্লেষণ করে জ্ঞানের বস্তুকে সংগঠিত করা হল। কমিশনের রিপোর্টে গাঁজা ও তার গাছ থেকে প্রস্তুত সমস্ত বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার প্রস্তাব রাখা হল। যদিও সাক্ষীদের মধ্যে গাঁজার প্রভাব নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত ছিল আর সামগ্রিকভাবে, অল্পস্বল্প থেকে মাঝারি পর্যায়ের ব্যবহার নিয়ে সাক্ষীদের খুব একটা বিরোধিতা ছিল না।
    মেডিকাল কলেজে মেটিরিয়া মেডিকার প্রফেসর ম্যাক্কনেল মৌখিক ও লিখিত দুই ধরণের বয়ানই দিয়েছিলেন। তেইশ বছর ধরে ভারতবাসের সবটাই তিনি কলকাতায় কাটিয়েছেন মেডিকাল কলেজ হাসপাতালের সংস্পর্শে। মেটিরিয়া মেডিকা ছাড়াও তিনি দশ বছর প্যাথোলজি পড়িয়েছেন। তিনি বলছেন:
    I do not know of any literature regarding the pathological effects of hemp drugs... I never examined any brains of ganja-smokers at the College while professor of Pathology... I am the author of a catalogue of pathological preparations in the museum of the Medical College, Calcutta. There is no mention of any ganja-smoker’s brain.
    ডাঃ কৈলাশ চন্দ্র বোস ১৮৭৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এল. এম. এস. ডিগ্রি নিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বছর পাঁচেক পর, বাবার মৃত্যুর জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় প্র্যাকটিস শুরু করেন। তাঁর পসার বেশ ভালই হয়েছিল বিশেষ করে সম্ভ্রান্ত মাড়ওয়ারি পরিবারের মধ্যে। ডাঃ বোসের সাক্ষ্যটি কিন্তু উল্লেখজনক কারণ বেশ কিছু বিষয়ে তিনি সাহেবদের ধারণার সাথে একমত হন নি। সাক্ষ্যটি পড়লে বোঝা যায় এ বিষয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ বেশ গভীর এবং গাঁজাকে অতটা খারাপ চোখে তিনে দেখতে নারাজ। গোড়াতেই তাঁর লিখিত বয়ানে তিনি বলেছেন :
    Poverty brought on by the consumption of alcohol has driven many a hard drinker to moderate the ration of alcohol and to take recourse to ganja and bhang as chief ingredients for intoxication.
    চাষের ব্যাপারেও দেখছি তিনি ওয়াকিবহাল, এবং জানাচ্ছেন যে চরস নেপাল ও অমৃতসর থেকে কলকাতায় আসে। তাঁর পর্যবেক্ষণ রাজশাহী জেলার মধ্যবিত্ত বাঙালিরা, যারা কৃষিজীবী, গাঁজা তৈরি করেন। ভাং সাধারণত তৈরি করে থাকেন মথুরার চৌবেরা আর মধ্যবিত্ত হিন্দুস্থানিরা। গাঁজা-চরস চাষের বিশেষ পদ্ধতি আছে এবং বুনো বা চাষছাড়া গজানো গাছ থেকে তৈরি গাঁজা মানুষের জন্য ভাল নাও হতে পারে।
    ডাঃ বোসের মতে গাঁজা টানেন হিন্দু-মুসলমান – দু ধরণের সম্প্রদায়েরই মানুষ। এছাড়া চৌবেরা, বাঙালি বাবুরা, সাধু এবং ফকিররাও গাঁজা টেনে থাকেন। ‘ডিসরেপিউটেবল’ নারীরাও গাঁজা টেনে থাকেন। চরস খুব অল্প পরিমাণে সীমিত সংখ্যক পুরুষেরা টানেন। একশ জনের মধ্যে ৯৫ জন গাঁজা এবং ৫ জন চরস টানার লোক পাওয়া যাবে। খুব অল্প সংখ্যক লোককে তিনি গাঁজা চিবিয়ে জল দিয়ে গিলে খেতে দেখেছেন। বড়বাজারের মাড়ওয়ারিদের নিম্নস্তরের কিছু লোক এইরকম করে গাঁজা খেত। তাঁর ধারণায় বাঙালি ও মুসলমানরা ভাং প্রায় খেতেনই না বলা চলে। প্রধানত অবাঙালি গোষ্ঠীর লোকেরা যেমন মাড়ওয়ারি, চৌবে, শিখ এবং বিকানিরের লোকেরা ভাং খেতেন বা সরবৎ করে পান করতেন।
    ডাঃ বোস বেশ জোরের সঙ্গে বলেছেন যে গাঁজা টানেন এবং ভাং পান করেন কলকাতা শহরের জনসংখ্যার প্রায় একের আট ভাগ মানুষ। যে সমস্ত শ্রমজীবীরা হাড়ভাঙা খাটুনির ক্লান্তি দূর করতে গাঁজা-ভাং ব্যবহার করেন, কিংবা জলবহনকারী ভিস্তির দল ও বাড়ির চাকরেরা, তাঁদের প্রতি খুবই অবিচার হবে যদি তাঁদের গাঁজা- ভাং বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাই কোনোরকমেই নিষেধাজ্ঞা একটা বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারেনা। শুধু যে এতে মদের ব্যবহার বেড়ে যাবে তাই নয়, রাজনৈতিক অসন্তোষও ধূমায়িত হতে পারে। তাঁর চিকিৎসক জীবনে তিনি মোট তিরিশটা ইন্স্যানিটির কেস দেখেছেন কিন্তু কোনোটারই কারণ গাঁজা-ভাং ব্যবহারের জন্য নয়। গাঁজা-ভাং ব্যবহারে উন্মাদ রোগ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন নি। তবে তিনি উল্লেখ করেছেন চিৎপুর রোড আর বড়তলা স্ট্রিটে একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত গাঁজা-ভাঙের দোকানের মালিক ছেলেপুলেদের বিনা পয়সায় গাঁজা খাওয়াত।
    কৈলাশ চন্দ্র বোস মহাশয়ের সাক্ষ্যটি, এই ধরণের আরও অনেক বিবরণীর মধ্যে একটি। গোটা নমুনার অনুপাতে হয়ত এ ধরণের বিবরণীর সংখ্যা কম, কিন্তু উল্লেখজনক অবশ্যই। জমিদারদের একাংশও ডাঃ বোসের মতন ভেবেছেন।
    আবার ইন্ডিয়ান রিলিফ সোসাইটির মত সংস্থার সাক্ষ্য অত্যন্ত জোরালোভাবে গাঁজা-চরস-ভাং পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সপক্ষে যুক্তি ও তথ্য হাজির করেছে। সাতাশ জন কবিরাজ, নৈয়ায়িক, আর তর্কালঙ্কারদের সাক্ষর করা বিবৃতি জুড়ে দিয়েছে তারা, যেখানে সাক্ষরকারীরা বলেছেন যে, হাল আমলের গাঁজা-ভাং ব্যবহারের সঙ্গে বৈদিক শাস্ত্র ও আয়ুর্বেদের কোনো যোগাযোগ নেই।
    এই সমীক্ষার মধ্য দিয়ে যে সূত্রপাত হল (যা আগের ইতিহাস থেকে একটা ছেদ বলে আমি মনে করি) সেটা হল গাঁজা-চরস-ভাং বিষয়ক নতুন এক ‘বৈজ্ঞানিক’ জ্ঞানচর্চার প্রসার যেখানে গাঁজার সঙ্গে মানসিক রোগের বিষয়টি জড়িয়ে যাবে। এবং গাঁজা ব্যবহারের সংস্কৃতি একটি অস্বাস্থ্যকর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, আধুনিক জীবনের অনুপযোগী, ছোটলোকদের অভ্যাস হিসাবে প্রমাণিত হতে থাকবে।
    একটা লক্ষ্য করার বিষয় হল যে, ঔপনিবেশিক কর্তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রনে প্রকাশিত পত্রিকায় যখন গাঁজাকে ক্রমাগত মানসিক রোগ এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস হিসাবে দেখানোর চেষ্টা চলেছে, তখন কিন্তু বাংলা স্বাস্থ্যবিষয়ক পত্র-পত্রিকায় গাঁজা-চরসের কুপ্রভাব নিয়ে লেখা এখনও দেখতে পাই নি আমি। সেখানে নেশা বিষয়ক লেখাগুলি বেশিরভাগই আফিম, কোকেন, তামাক, এবং মদ নিয়ে রচিত।
    কিন্তু গোটা ঔপনিবেশিক সময় জুড়ে, গাঁজা-চরস-ভাং নিয়ে যে জ্ঞানচর্চা গড়ে উঠলো, আর নানা বিন্যাস সমাজে গড়ে উঠল, তাতে পক্ষি-সমাজের গাঁজা গৌরব অনেকটাই কালিমালিপ্ত হল। নগরসভ্যতার সংস্কৃতিতে কিছু সংখ্যক ভারতীয়দের মধ্যে মদের প্রচলন যেমন একটা আভিজাত্যের অনুষঙ্গ আনলো, তেমনিই গাঁজা-চরসের সাথে জুড়ে গেল ছোটলোক সংস্কৃতির অনুষঙ্গ। আধুনিক নগরসভ্যতায় গাঁজার সংস্কৃতি মধ্যবিত্ত আর অভিজাতদের মধ্য থেকে মুছে গেল। সিদ্ধি রয়ে গেল বিজয়া, দোল এইসব উৎসবের সীমিত প্রয়োগে আর উত্তরপ্রদেশীয়, বিহারী ও অন্যকিছু অবাঙালি গোষ্ঠীদের দৈনন্দিন ব্যবহারে। গরিব-গুরবো, মুটেমজুর, আর সাধু ফকির ছাড়া প্রকাশ্যে গাঁজা টানার চল প্রায় উঠেই গেল। কবিগান, আখড়াই আর হাফ-আখড়াই ঐতিহাসিক উপাদানে পরিণত হল।
    এই জ্ঞানচর্চাই কিন্তু আজ গাঁজা ব্যবহারের প্রতি যে নিচু দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবহারকারীকে একজন অপরাধীর মতন দেখার আইন সৃষ্টি করেছে সেই নির্মাণের ভিত্তি। এমনকি মানসিক রোগের যে বর্গ নির্মিত হয়েছে, যা কিনা আজও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়, সে সবের জন্ম এখানেই লুকিয়ে আছে।
  • বিভাগ : আলোচনা | ১৭ নভেম্বর ২০২০ | ৭০০ বার পঠিত | ৪.৮/৫ (৪ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Prativa Sarker | ১৭ নভেম্বর ২০২০ ২১:১৮100384
  • খুব ইন্টারেস্টিং আলোচনা! 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন