• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • ব্ল্যাকডেথ-দুর্ভিক্ষাদি কারণে ১৪শ শতকে ইউরোপের বিপর্যয় ও এর ফলে সৃষ্ট পরিবর্তনসমূহ

    Sumit Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৩ অক্টোবর ২০২০ | ৪১৮ বার পঠিত
  • ৫/৫ (৩ জন)
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • ভূমিকা

    ইউরােপের ইতিহাসে ১৪শ শতাব্দী হল সামগ্রিক সংকটের কাল। এই সংকটই ১৫শ শতকের রেনেশাঁসের পটভূমিকা তৈরি করে দিয়েছিল। এই পর্বে ইউরােপের বিস্তার ব্যহত হয়েছিল, অর্থনীতিতে গতিহীনতা দেখা দিয়েছিল। বিশেষভাবে অর্থনীতির প্রসঙ্গ টানলে ১৩শ শতকের শেষ দুই দশক থেকে ১৫শ শতকের শেষার্ধ পর্যন্ত ইউরােপীয় অথনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কোনও সাধারণ সিদ্ধান্তে আসা কঠিন, কারণ এই পর্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শিল্পোন্নতি অব্যাহত থাকলেও মাঝে মাঝে ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার হয়ে উঠেছে অধােমুখী।

    একাধিক ঘটনা এই অধ্যায়ের রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত ও আঘাত করেছিল। এদের মধ্যে আছে পূর্ব ইউরোপে তুর্কিদের প্রবেশ ও এর ফলে ইউরোপের বাণিজ্যব্যবস্থার পতন, পতনোন্মুখ সামন্ততন্ত্রে উত্থিত নগরসভ্যতায় সাধারণ নাগরিকদের বৈষম্যপূর্ণ ও হীন জীবনধারা, কৃষকদের উপর প্রভূত করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া, ১৩শ শতকের শেষ দশকে এবং ১৪শ শতকের দ্বিতীয় দশকের দুর্ভিক্ষ, ১৩৪৮ সালের ‘ব্লাকডেথ’ নামক ভয়াবহ মহামারীর আবির্ভাব ও পরবর্তীকালে মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে মহামারীর ধ্বংসলীলা, বিভিন্ন যুদ্ধ-বিগ্রহ, বিদ্রোহ, সামাজিক অস্থিরতা ইত্যাদি।

    এই সময়ে ম্যানরকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে যায়, ভূস্বামী ও কৃষকের সম্পর্কে পরিবর্তন দেখা যায়, নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে বিদ্রোহী মনােভাব দেখা যায়, তবে প্রভূত ক্ষয়ক্ষতির পরও অনেকের মত এই সময়ে রাজন্যবর্গ, ভূস্বামী ও যাজকতন্ত্রকে শক্তিশালী হতে দেখা যায়। সামাজিক স্তরবিন্যাসেও, অর্থাৎ অভিজাততন্ত্র, যাজকতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের সামাজিক অবস্থানে বড়াে রকমের রদ-বদল হয়নি। স্বাভাবিক অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য হল স্বয়ংসম্পূর্ণতা, কৃষিনির্ভরতা, সামান্য বাণিজ্য, অল্প বিনিময়, শিল্পায়নে অনগ্রসরতা এবং শহরের অনগ্রসরতা। অনেক ঐতিহাসিকের মতে এসময় স্বাভাবিক অর্থনীতিই বিরাজ করছিল। তখনও অভিজাতরা শাসন ও যুদ্ধ বিগ্রহ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, যাজকরা আধ্যাত্মিকতা নিয়ে থাকত, চার্চগুলি পরিচালনা করত। তখনও সাধারণ মানুষ উৎপাদন করত, তাদের উৎপাদনের উদ্ধৃত্তে প্রথম দুই শ্রেণীর ভরণ-পােষণ চলত।

    কিন্তু আপাতভাবে সেই সময়ের অনেক কিছুকেই স্বাভাবিক ও অপরিবর্তনীয় বলে মনে হলেও গভীরভাবে দেখলে সমাজের একটি ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছিল। এই সময়ে বাণিজ্য ও শিল্পে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়, কৃষিতেও আসে বিপর্যয়, সংঘটিত হয় বিভিন্ন কৃষক-বিদ্রোহের, তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল সামন্ততন্ত্রে। আধুনিক যুগের উদ্ভবের সাথে সাথে ধীরে ধীরেই সামন্ততন্ত্রের পতন হচ্ছিল, কিন্তু ১৪শ শতকের বিপর্যয় সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার পতনকে ত্বরান্বিত করে। এই শতকের শেষের দিকেও দেখে মনে হয় সামাজিক ব্যবস্থা এখনও ঠিক আছে, কিন্তু এর অভ্যন্তরে যে পরিবর্তন ঘটে গেছে তা অনুভূত হয় পরের শতকগুলোতেই, বিশেষ করে যখন পরবর্তী শতকেই পশ্চিম ইউরোপের সামন্ততন্ত্র মৃতপ্রায় হয়ে যায়, রেনেসাঁর আগমন হয়, শিল্প-বাণিজ্য-ব্যাঙ্কিং সেক্টরে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়, ধর্মসংস্কার আন্দোলন – বৈজ্ঞানিক বিপ্লব দেখা যায় তখন।

    বিপর্যয়ের স্বরূপ

    ১৩শ-১৪শ শতকে নগরজীবনের উত্থান ও সাধারণ নগরবাসীর করুণাবস্থা

    ইউরােপে ১৩শ-১৪শ শতকে ধীরে ধীরে নগরজীবনের উৎপত্তি ও প্রসার ঘটতে থাকে। পূর্বে মধ্যযুগীয় ইউরােপের অর্থনৈতিক জীবনের মূল কেন্দ্র ছিল ম্যানর এবং ম্যানরভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা। সেই সময়ে নানা আকৃতির ও জনসংখ্যা বিশিষ্ট শহর ও নগর গড়ে উঠতে থাকে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি নগরীতে যেমন মাত্র ৫০০/৬০০ বসবাসকারী পরিবার ছিল, আবার কয়েকটিতে বড়াে বড়াে শিল্প ও বাণিজ্য কেন্দ্রও ছিল, যেমন কলােন, ভেনিস, ফ্লোরেন্স, নেপলস, মিলান, ব্রাসেলস্, ভিয়েনা প্রভৃতি।

    সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতি ও ম্যানরগুলোর অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে নগরের শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। কাজের সন্ধানে এবং উন্নততর জীবনযাপনের প্রত্যাশায় অসংখ্য মানুষ শহরে চলে আসতে থাকে। নগরজীবনের সামাজিক ভিত্তি এবং শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রেও নানা পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এখানে ক্রমশ অভিজাতদের পরিবর্তে বণিক সম্প্রদায়ের প্রাধান্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষত মিলান বা ফ্রাঙ্কফুর্টের মতাে নগরীতে অধিকাংশ সম্পদশালী মানুষ ব্যবসায়ী শ্রেণিভুক্ত ছিলেন। এরা বণিকসভা বা গিল্ডের মাধ্যমে শিল্প ও ব্যাবসাবাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ করতেন।

    তবে এইসব শহরের ইতিকথার অন্য একটি চিত্র চোখে পড়ে, সেখানকার তীব্র শ্রেণি-বৈষম্য ও সম্পদের অসম বণ্টন। নগরজীবনের যাবতীয় সুখস্বাচ্ছন্দ্যের থেকে নিম্ন শ্রেণিভুক্ত মানুষ বঞ্চিত ছিল। দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও খাদ্যাভাবে এরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হত। ইপ্রের মতাে শহরে মােট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ এবং ব্রদের প্রায় ৬ শতাংশ অনাহারে বা খাদ্যাভাবে প্রাণ হারিয়েছিল।

    মহামারি ও ব্ল্যাকডেথের সূত্রপাত ও প্রাদুর্ভাব

    খাদ্যাভাব-দুর্ভিক্ষ ছাড়াও এই সময়ে নগরজীবনের সংকটের অন্যতম কারণ ছিল মহামারি। ১৪শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সমস্ত ইউরােপের মানুষ যে ভয়ঙ্কর এবং দীর্ঘস্থায়ী মহামারীর কবলে পড়েছিল (‘ব্ল্যাক ডেথ’) শুধুমাত্র তাই ইউরােপের সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী ছিল এ মত অতিরঞ্জিত হলেও, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কথা অস্বীকার করা যায় না। প্রধানত প্লেগের প্রাদুর্ভাবের ফলে এই মহামারি ঘটেছিল।

    ১৪শ শতকের ইউরােপে যে কটি রােগ মহামারীর আকারে দেখা দিয়েছিল প্লেগ ছিল তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে ভয়াবহতম। ইউরােপে প্লেগ একেবারে অজানা ছিল না, থুকিডিডিস তার পেলােপনেন্দীয় যুদ্ধের ইতিহাসে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে এথেন্সে ভয়ংকর প্লেগের আক্রমণের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি প্লেগ রােগের যেসব উপসর্গের কথা বলেছেন আধুনিক প্লেগের সঙ্গে তা মিলে যায়। প্লেগ সাধারণত হয় দুধরনের—বিউবােনিক ও নিউমােনিক। বিউবােনিক প্লেগ তলপেটের কাছে ফেঁড়া থেকে শুরু হয়ে রােগীর জীবন বিপন্ন করে তােলে। ফোঁড়া থেকে পচন শুরু হয়, রােগীর মৃত্যু হয়। অন্যদিকে নিউমােনিক প্লেগের আক্রমণ হয় ফুসফুসে, আক্রান্ত রােগীর যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হয়। নিউমােনিক প্লেগের রােগীর গাত্রবর্ণ কালাে হয়ে যায়, এজন্য প্লেগ রােগের নাম হয়ে যায় ব্ল্যাক ডেথ। চতুর্দশ শতকের ইউরােপে প্লেগ মারাত্মক মহামারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এ-সময়ে যে প্লেগের আক্রমণ হয় তা ছিল মিশ্র ধরনের, পরে বিউবােনিক বা পুরাে নিউমােনিক নয়। অষ্টম শতকের ইউরােপে প্রথম বিউবােনিক প্লেগের আক্রমণ দেখা যায়, একাদশ শতকে এসে নিউমােনিক প্লেগ আক্রমণের নজির পাওয়া যায়।

    ১৪শ শতকে বিশেষ করে ১৩৪৭-৪৮ খ্রি. থেকে, প্লেগ মহামারী রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সাধারণভাবে মনে করা হত যে নিকট প্রাচ্য – মধ্য এশিয়ার ইদুররা এই রােগের ভাইরাস বহনকারী। চতুর্দশ শতকে ‘সিল্ক রুট’ দিয়ে পশ্চিমগামী মঙ্গোল বাহিনী ও বণিকদের মাধ্যমে ইউরােপে অনুপ্রবেশ করেছিল এই রােগের ভাইরাস। বলা হয়েছে যে মােঙ্গল হানাদাররা শত্রুর প্রতিরােধ ভাঙার জন্য প্লেগের শব ছুড়ে দিয়ে সংক্রমণ ছড়িয়েছিল। আবার অনেকে এই প্রসঙ্গে ১৩৪৭ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসের একটি ঘটনা (বা দুর্ঘটনার) প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ওই সময় কাফা থেকে পালিয়ে আসা কয়েকটি জেনােয়ার বাণিজ্যতরি মেসিনা বন্দরে এসে নােঙর ফেলেছিল। ওই জাহাজগুলির অধিকাংশ নাবিককে হয় মৃত নতুবা গুরুতর রূপে প্লেগ রােগাক্রান্ত দেখা গিয়েছিল। খুব সম্ভবত ঐ জাহাজগুলিতে প্লেগ জীবাণু বহনকারী ইঁদুর ও মাছি ছিল। কিছুকাল পরে জাহাজগুলিতে দুবৃত্তরা লুঠপাট চালায়। ততদিনে বাকি নাবিকগুলি মারা গিয়েছে। ১৩৪৭-৪৮ সাল নাগাদ এই জাহাজ থেকেই (অর্থাৎ দুবৃত্তদের স্পর্শ ও লুঠের মাল থেকে) প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছিল জেনােয়া ও ভেনিস নগরীতে। এভাবে প্লেগের জীবানু ইঁদুর মারফত ইউরােপের বন্দরগুলোতে আসে। বন্দর থেকে এই জীবানু ইউরােপের দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। আবার আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে প্লেগের জীবানু ইউরােপের দেশগুলিতে আগে থেকেই ছিল। সাধারণত প্লেগের জীবানু সুপ্ত অবস্থায় থাকে, মাঝে মাঝে তেজি হয়ে উঠে সংক্রমণ ছড়ায়।

    পরবর্তীকালে এই প্লেগ ব্যাপক মহামারির রূপ ধারণ করে প্রায় সমগ্র ইউরােপে ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য পােল্যান্ড ও বেলজিয়ামের কয়েকটি অঞ্চল প্লেগের প্রভাবমুক্ত ছিল। এই মারাত্মক ব্যাধি উত্তর ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা (এই রোগের ছোঁয়ায় শরীরে কালাে কালাে দাগ দেখা দিত বলে) এর নাম দিয়েছিল ব্ল্যাকডেথ। ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, দক্ষিণ ইংল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ড ও মধ্য ইউরােপে প্লেগ ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করে। সমকালীন সাহিত্যে প্লেগের ধ্বংসলীলার উল্লেখ পাওয়া যায়।

    প্লেগ রােগের আক্রমণ প্রথম দেখা দেয় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। তারপর ধীরে ধীরে এই আক্রমণ ইউরােপের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিল। ১৩৪৭ খ্রি. সিসিলিতে প্লেগের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল। ১৩৪৮ খ্রি. উত্তর আফ্রিকা, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স ও ইংলন্ডে প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৩৪৯ খ্রি. অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও নেদারল্যান্ড আক্রান্ত হয়েছিল। ১৩৫০ খ্রি. উত্তর ইউরােপের স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও বাল্টিক অঞ্চলে প্লেগ মহামারীর আকারে দেখা দিয়েছিল। প্লেগ ওখানেই শেষ হয়ে যায়নি। চতুর্দশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ১৩৬০-৬৩, ১৩৭১-৭৪ ও ১৩৮১-৮৪ খ্রি. সময়কালে ইউরােপ প্লেগের আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়েছিল। ইউরােপের সর্বত্র এই মারণ রােগের শিকারের সংখ্যা সমান ছিল না। মিলান ও ফ্ল্যান্ডার্স অঞ্চল অল্পেতে রেহাই পেয়েছিল, কিন্তু কাস্তিল, অ্যারাগন, কাটালােনিয়া ও ল্যাংদক সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়ে যায়।

    প্লেগের সঙ্গে ছিল ম্যালেরিয়া মহামারী। প্লেগ রােগের সমস্যা হল এই রােগ খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে, সংক্রমণ ছড়ায় রােগীর শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে। রােগীর পােশাক-পরিচ্ছদ ও শবদেহ থেকেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। মুখােশ পরেও চিকিৎসক, নার্স বা কবর খননকারীরা রেহাই পায় না। প্লেগের আরেক সমস্যা হল এই রােগ আক্রান্ত অঞ্চলে আতঙ্ক ও ত্রাসের সৃষ্টি করে। আক্রান্ত অঞ্চলের মানুষ দলে দলে স্থান ত্যাগ করে চলে যায়। ইউরােপের অনেক শহর প্লেগের আক্রমণে উজাড় হয়ে গিয়েছিল। ইউরােপের মানুষ প্লেগের সংক্রমণের বিরুদ্ধে তেমন কার্যকর প্রতিরােধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। সেজন্য প্লেগ মহামারীর আকারে বারবার দেখা দিয়েছিল। পঞ্চদশ ও ষােড়শ শতকে ইউরােপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষিপ্তভাবে প্লেগের আক্রমণ চলেছিল, প্লেগের আক্রমণে লন্ডন শহর কয়েকবার জনশূন্য হয়ে পড়েছিল।

    এরকম একটি ভয়াবহ মহামারী ইউরােপের আর্থ-সামাজিক জীবনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছিল। সামাগ্রিকভাবে ইউরােপের জনসংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পাওয়ার ফলে কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যে কৃষক, শিল্পী, কারিগর ও শ্রমিকের সরবরাহ কমেছিল, উৎপাদন হ্রাস পেয়েছিল। কৃষকের অভাবে ইউরােপের বহু কৃষিজমি অনাবাদী হয়ে পড়েছিল। শিল্পে কারিগর ও শ্রমিকের সরবরাহ কমেছিল, উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার জন্য জিনিসের দাম বেড়েছিল। অভ্যন্তরীন ও দূর পাল্লার বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যােগাযােগ ও পরিবহণের ওপরও প্লেগের প্রভাব পড়েছিল। স্বাভাবিক কাজকর্ম ও জনজীবন ব্যহত হয়।

    প্লেগ মহামারির পেছনে জলবায়ুর প্রভাব

    ইউরোপে ব্ল্যাকডেথের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার একাধিকবার পুনরাগমন ঘটেছিল, আর সম্ভবত একাধিকবার ইউরোপে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেই এটা হয়েছিল। যাকে মহামারীর ইতিহাসের অন্যতম সেরা খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তা হয়তো আদতে একটি মিথ্যা অভিযোগ মাত্র। দীর্ঘ দিন যাবৎ ঐতিহাসিক ও বিশেষজ্ঞগণ ইঁদুরকেই প্লেগ রোগের জন্য দায়ী করে আসছেন, কিন্ত ২০১৫ সালের একটি গবেষণায় প্রাপ্ত নতুন প্রমাণ দেখাচ্ছে যে এই রোগ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইঁদুরের মধ্যে লুকিয়ে ছিল না। বরং, সম্ভবত এশীয় জলবায়ু ঘটনাসমূহের (Asian climate events) পরপরই ইউরোপে এই রোগের একাধিকবার পুনরাগমন ঘটেছে।

    ১৩৪৭ থেকে ১৩৫৩ সালের মধ্যে ইউরোপ জুড়ে ব্ল্যাক ডেথ ছড়িয়ে পড়ে, ইউরোপে প্রায় ২৫ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়, এশিয়া ও আফ্রিকায় আরও ২৫ মিলিয়ন লোক মারা যায়। এটি দ্বিতীয় প্লেগ মহামারী নামে পরিচিত, যা ইউরোপে শত শত বছর ধরে চলতে থাকা প্লেগ মহামারীর ধারাবাহিকতার একটি অংশ ছিল। কিন্তু ইউরোপে প্রাকৃতিকভাবে প্লেগ হয়না। এই রোগটি আসলে এশিয়ার এনডেমিক রোগ, যেখানে ব্যাকটেরিয়া Yersinia pestis কে সকল ছোট প্রাণী এবং এদের শরীরের ফ্লি এর মধ্যে পাওয়া যায় (ফ্লি হচ্ছে একরকম ক্ষুদ্র সাইফনেপ্টেরা বর্গের পতঙ্গ, এটি স্তন্যপায়ী ও পাখির শরীরে পরজীবী হিসেবে বাস করে)। প্রচলিত কাহিনীটি হচ্ছে যে ১৪শ শতকে এই রোগটি ইউরোপে প্রবেশ করার পর Y. pestis ব্যাক্টেরিয়াটি ইউরোপ মহাদেশের ইঁদুর বা অন্যান্য বন্যপ্রাণীর মধ্যে নিজেদের আশ্রয় খুঁজে পায়, আর এই প্রাণীগুলোর দ্বারাই মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটে।

    ইঁদুরকে প্লেগ রোগের কারণ ধরলে একটা সমস্যা আছে। ইঁদুর সহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী ইউরোপ থেকে বিলুপ্ত হয়নি, ১৯শ শতকে তো অবশ্যই হয়নি। তাদের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু তারপরও ততদিনে ককেশাসের কাছে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ ছাড়া ইউরোপে আর কোথাও মহামারী ছিলনা। ইঁদুর যদি মহামারির কারণ হয় তাহলে ইঁদুরের উপস্থিতির পরেও পরবর্তীতে এই মহামারী কেন অদৃশ্য হয়ে গেল? চিকিৎসা ব্যবস্থার অগ্রগতি এর একটা উত্তর হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিদ্যার কাজ রোগ হবার পর রোগীকে সুস্থ করা। পশু থেকে মানুষের মধ্যে প্রাথমিকভাবে রোগের বিস্তার ঘটার পর চিকিৎসাটা হবে। চিকিৎসাবিদ্যা পশু থেকে মানুষের মধ্যে রোগের প্রাথমিক বিস্তারটাকে আটকাতে পারবে না। বর্তমানে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের নগর বা গ্রামগুলোতে ইঁদুরের মত প্রাণীরা যাতে রোগ ছড়াতে না পারে সেই ব্যবস্থা নেয়া গেছে। কিন্তু ১৪শ শতক ও ১৯শ শতকে মানুষ ও ইঁদুরের মত প্রাণীগুলোর সম্পর্ক বলতে গেলে একই রকম ছিল। ১৪শ শতকে ইঁদুরেরা যেরকম মানুষের মধ্যে রোগের বিস্তার ঘটাতে সক্ষম ছিল, ১৯শ শতকেও তাই ছিল। তাহলে প্রশ্ন আসেই যে, কেন ইঁদুরের কারণে ১৪শ শতকেই মহামারী হল, কিন্তু পরে আর মহামারী হল না, আর ১৯শ শতকে ককেশাস ছাড়া এই মহামারী ইউরোপ থেকে উঠে গেল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি বা অন্যান্য কোন কারণ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনা। অবশ্যই এর পেছনে ইঁদুর ভিন্ন অন্য কোন ফ্যাক্টর লুকিয়ে আছে।

    আর শুধু ইঁদুর বা বন্যপ্রাণীর দ্বারাই যে প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায়না। ইঁদুরের তত্ত্ব ছাড়া অন্য সম্ভাবনার ক্ষেত্রে অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিল্‌স স্টেনসেথ বলছেন, “মহামারী মানুষের দ্বারাও ছড়িয়ে থাকতে পারে, এবং ড্রপলেটের দ্বারা একজনের থেকে অন্যের উপর সংক্রমন ঘটে থাকতে পারে। আবার এটি এটা মানুষের কাপড়ে লুকিয়ে থাকা ফ্লি এর দ্বারাও ছড়িয়ে থাকতে পারে।”

    যেখানে প্রাকৃতিকভাবে প্লেগের আগমন ঘটে, সেখানকার বন্য রোডেন্টদের মধ্যে, যেমন গারবিলের মধ্যে ইয়েরসেনিয়া পেস্টিস নামক প্লেগের জন্য দায়ী ব্যাক্টেরিয়া খুব পাওয়া যায় (রোডেনশিয়া নামক বর্গের প্রাণীগুলোকে রোডেন্ট বলে, এরা সবাই ইঁদুর জাতীয়)। বেশিরভাগ সময়, ইঁদুর ও তার শরীরে থাকা ফ্লিদেরকে পোষক দেহ হিসেবে পেতে এই ব্যাক্টেরিয়ার কোন সমস্যা হয়না। কিন্তু জলবায়ু তুলনামূলকভাবে উষ্ণ ও আর্দ্র হয়ে গেলে ইঁদুরের সংখ্যা কমে যায়, তাই তার শরীরের পরজীবী ফ্লিগুলো একটি বিকল্প পোষক দেহকে বেছে নেয়, যা হচ্ছে গৃহপালিত পশু ও মানুষ। আজও এই উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু এশিয়ায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটায়।

    ২০১৫ সালে গবেষক স্টেনসেথ ও তার কলিগেরা প্রোসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেস জার্নালে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে তারা ট্রি রিং ডেটা এর সাহায্যে ইউরোপ ও এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনকে পরীক্ষা করেন, এবং এর সাথে ৭,৭০০ এরও বেশি ঐতিহাসিক প্লেগ প্রাদুর্ভাবের ডেটাসমূহের সমন্বয় করেন।

    তারা ইউরোপীয় জলবায়ু এবং প্লেগ রোগের মধ্যে কোন যোগসূত্র খুঁজে পাননি, কিন্তু ১২৫০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে উত্তর পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার জলবায়ুর পরিবর্তন এবং ইউরোপীয় বন্দর শহরে প্লেগ মহামারীর মধ্যে কিছু কৌতূহলজনক সম্পর্ক খুঁজে পান। যেবারই এই পর্বতের পাহাড়ী ইঁদুরগুলোর জন্য জলবায়ু প্রতিকূল হয়ে যায়, ঠিক প্রায় ১৫ বছর পর পর ইউরোপীয় বন্দরগুলোতে প্লেগ এসে হাজির হয়।

    ১৫ বছরকে অনেক দীর্ঘ সময় বলে মনে হতে পারে, কিন্তু আধুনিক সমাজের কথা বিবেচনায় নিলেই এই সময়টা আসলে দীর্ঘ। কিন্তু অতীত কালের মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর ধীর স্থানান্তর বিবেচনায় ১৫ বছর সময়কাল মোটেও খুব একটা দীর্ঘ নয়। শুষ্ক পর্যায়ের পর ইঁদুরের সংখ্যা কমে যেতে ও তার শরীরের ফ্লিগুলোর এশিয়ার জনসংখ্যার সংস্পর্শে আসতে আসতে এক থেকে দুই বছর লেগে যাবে। এরপর এশিয়া থেকে ইউরোপে যেতে এই রোগকে প্রায় ২,৫০০ মাইল অতিক্রম করতে হবে, যেখানে প্রতি বছর এটি ২০০ থেকে ২৫০ মাইল অব্দি অতিক্রম করতে পারবে।

    প্লেগ রোগের এশিয়া থেকে ইউরোপে যাবার গতিবেগ অতীতের মহামারীগুলোর সময়কার প্লেগের ছড়িয়ে পড়া গতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি চীনে সংঘটিত ৩য় মহামারীর চেয়ে দ্রুত গতির, কিন্তু ব্ল্যাক ডেথের সময়কার ইউরোপে প্লেগের ছড়িয়ে পড়ার গতির চেয়ে ধীর। গবেষকদের দলটি জানাচ্ছে, এশিয়া জুড়ে বাণিজ্য পথ বরাবর ভ্রমণকারী কাফেলাগুলো প্লেগ পরিবহন করে থাকতে পারে, যার ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ জনবসতিহীন অঞ্চল থাকার পরও এশিয়ার রোগ ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এশিয়া থেকে ইউরোপে ভ্রমণের সময়ের শেষ বছরটিতে ইউরোপের বন্দর শহরগুলোতে প্লেগ এসে পৌঁছয়, এবং তারপর সমগ্র ইউরোপে তা ছড়িয়ে পড়ে।

    ইউরোপে প্লেগের পুনঃপ্রবর্তনের জন্য এশিয়ার জলবায়ুই দায়ী তা প্রমাণ করার জন্য বিজ্ঞানীদের আরও তথ্যের প্রয়োজন হবে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপে বিভিন্ন সময়ে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া লোকেদের থেকে নেয়া প্লেগ ডিএনএ-কে বিশ্লেষণ এই রোগের প্রাদুর্ভাব ও জলবায়ুর মধ্যকার সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে। স্টেনসেথ বলেন, “যদি আমাদের এই জলভায়ু ভিত্তিক প্লেগের পুনঃপ্রবর্তনের তত্ত্বটি সঠিক হয়, তাহলে আমরা বিভিন্ন সময়ের প্লেগে মৃত ব্যক্তির মধ্যকার প্লেগ ডিএনএগুলোতে জেনেটিক ব্যাক্টেরিয়াল ভেরিয়েশন বা বৈচিত্র পাব। যদি এই ব্যাক্টেরিয়া একটি একক উৎস্য থেকে আসে, তাহলে প্লেগে আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিরা বিভিন্ন স্থান ও সময়ের হলেও তাদের প্যাথোজেনের ডিএনএ-তে জিনগত বৈচিত্র্য কম হবে।”

    এই নতুন তত্ত্বটি প্লেগের কাহিনী থেকে ইঁদুরকে বাদ দিয়ে দেয়না। গবেষকগণ বলছেন, ইঁদুরেরা সম্ভবত সমুদ্রের জাহাজে এবং বন্দরে বন্দরে প্লেগ ছড়িয়ে দেবার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে। ১৪শ শতকের ব্ল্যাকডেথের প্রতিক্রিয়ায় জাহাজকে কোয়ারেন্টাইন করার রীতি শুরু হয়। এটা যদি ব্ল্যাকডেথের সময় করা হত তাহলে অন্তত কিছু বন্ধর নগরকে এই সময়ে বাঁচানো সম্ভব হত।

    মহামারিতে মৃত্যু ও জনসংখ্যা হ্রাসের চিত্র

    এই মহামারীতে সব দেশেই বহু মানুষের মত্যু হয়েছিল, কোনও কোনও অঞ্চলে মত্যুর হার ছিল ভয়াবহ, বিভিন্ন ইউরােপীয় দেশগুলোর জনসংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেয়েছিল, ইংল্যান্ড, জার্মানি সহ ইউরােপের বহু দেশে অসংখ্য গ্রাম সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। তবে ১৪শ শতকের ইউরােপে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত census বা জনগণনা অথবা demographic disaster বা মারাত্মক জনসংখ্যা হ্রাস সংক্রান্ত ধ্যানধারণা ও পদ্ধতি কার্যত অজানা ছিল বলে প্লেগজনিত ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ বিবরণ পাওয়া কঠিন, কয়েকটি নগর ছাড়া ইউরােপীয় দেশগুলির জনসংখ্যার মােটামুটি সন্তোষজনক হিসেব পাওয়া দুরূহ। ঐ সময়ে করদাতাদের তালিকা, যেমন ইংল্যান্ডে (poll tax lists) বা এই ধরনের ‘return’ এর উপর নির্ভর করে বা ডায়ােসিস-এর রেজিস্টার থেকে এলাকা বিশেষে জনসংখ্যার একটা অনুমানিক তালিকা তৈরি হতো। এই তালিকা থেকে অল্প-বয়স্ক শিশু এবং ভবঘুরেদের সংখ্যার কোনও হিসেব পাওয়া যাবে না।

    ১৩৪৮ সালে ইংল্যান্ডে প্রায় ৭০ লক্ষ লােকের বাস ছিল এবং ব্ল্যাকডেথের ফলে ঐ দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লােকের মৃত্যু হয়েছিল এবং ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়স্কদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় এক-পঞ্চমাংশ লােকের। জীবিতদের মধ্যে বহু মানুষই আবার সংসার-ধর্ম পালন করে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি জন্মানাের ফলে পূর্বের সাংঘাতিক মত্যুর হারের অল্প কিছু পরিবর্তন ঘটে। ১৩৬১ সালে এই মহামারীর পুনরাবির্ভাবের ফলে শিশুমৃত্যুর হারই বেশি হয় এবং ১৩৭৫ সালে দুবার এই ভয়াবহ ব্যাধির ফলে হ্রাসপ্রাপ্ত জনসংখ্যার উপর নতুন করে আঘাত আসে। মহাদেশের (ইংল্যান্ড ছাড়া ইউরোপের বাকি অংশে) বিভিন্ন অঞ্চলেও মত্যুর হার ছিল সাংঘাতিক এবং এই মহামারী সমস্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনীশক্তিও নষ্ট করে দিয়েছিল। সমকালের যে তথ্য সংরক্ষিত হয়েছে তাতে দেখা যায় মধ্য ইতালির শহরগুলির ৬৬ শতাংশ লোক এই রােগের শিকার হয়, লম্বার্ডি উত্তর স্পেন, ফ্রান্স ও ইংলতে ২৫-৬৬ শতাংশ মানুষ এই রােগে প্রাণ হারিয়েছিল। লিও, রাইমস, ইপ্রে ও ফ্রোরেন্সে প্রায় ২৫-৩৫ শতাংশ মানুষ প্লেগের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিল। টুলােজ ও ব্রুজ শহরের ৫০ শতাংশ মানুষ প্লেগের শিকার হয়। গবেষকদের অনুমান হচ্ছে, সেই সময় ইউরােপের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮০ মিলিয়ন, তার মধ্যে ২৫ মিলিয়ন মানুষ ব্ল্যাকডেথের আক্রমণে মারা যায়। অর্থাৎ ইউরোপের জনসংখ্যার হিসেবেও এর প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। প্লেগের আক্রমণে জনসংখ্যা এমন হ্রাস পেয়েছিল যে তা পূরণ করতে ইউরােপের দেড়শাে বছর লেগে যায়। ১৩৪৮-এর পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে যেতে ইউরােপীয় জনসংখ্যা সময় নিয়েছিল ১৫০ বছরের বেশি। প্লেগের কারণে বহু মানুষ বসতি ছেড়ে সিয়েনা, পিসা, নার্বোন, ইগেমাের্ত ও গ্রিনল্যান্ডে পালিয়েছিল।

    ব্ল্যাকডেথের প্রসার ছিল ব্যাপক কিন্তু গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে এর প্রকোপ ছিল অনেক বেশি। জীবিকার সন্ধানে অসংখ্য মানুষের গ্রাম থেকে শহরে চলে আসার ফলে শহরের পানীয় জল, আবর্জনা ও জল নিকাশি ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য পরিষেবা প্রায় ভেঙে পড়েছিল। এরকম একটি পরিস্থিতিতে এখানে মহামারির প্রকোপ অত্যন্ত ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। অনেক শহরবাসী ভয়ে গ্রামে পালিয়ে গিয়েছিল, গ্রামের চেয়ে শহরে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াত। এছাড়া মহামারির চোখে উচ্চ-নীচ, ধনী-নির্ধন প্রভেদ না থাকলেও নিম্ন (দরিদ্র) শ্রেণির মানুষই বেশি সংখ্যায় এর করাল গ্রাসে আক্রান্ত হয়েছিল। সমাজের অন্তেবাসী মানুষজন ছিল অপুষ্টির শিকার, বাসস্থানগুলিও স্বাস্থ্যসম্মত ছিল না, এরাই প্লেগের আক্রমণে বেশি সংখ্যায় মারা যেত। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো। এই রোগে প্রাপ্ত বয়স্করা প্রথমে আক্রান্ত হত, পরে শিশু ও শারীরিকভাবে অসমর্থ পুরুষ ও নারী এই রােগের শিকার হত। শীতকালে এই রােগের অন্যতম ভাইরাস বহনকারী প্রাণী মাছির সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় ১৩৪৮ খ্রিস্টাব্দের শীতকালে এই মারাত্মক ব্যাধির প্রকোপ কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু শীতের পর বসন্তে এই রােগ আবার ইউরােপে ফিরে আসত।

    ফ্লোরেন্সের ঐতিহাসিক ভিলানি লিখছেন, “অসংখ্য জমি, জনপদ ও নগর (এই মহামারির ফলে) ফাঁকা হয়ে গেল। আর প্লেগের তাণ্ডব চলেছিল..”। লক্ষণীয় তিনি তার বিবরণীর অন্তিমে কিছুটা শূন্যস্থান রেখেছিলেন। হয়তাে ভেবেছিলেন মহামারির প্রকোপের পরিসমাপ্তি ঘটলে তিনি শূন্যস্থান পূরণ করে সেখানে সন-তারিখ বসিয়ে দেবেন। তার মন্দ কপাল। ওই প্লেগেই তার মৃত্যু হল (১৩৪৮)।

    ইউরোপে এই বিপর্যয়ের ফলে ক্ষয়ক্ষতি

    ১২শ ও ১৩শ শতকের তুলনায় ১৪শ শতকে নতুন নগর পত্তনের ঘটনা বিরল। জনসংখ্যা হ্রাস পেয়ে অনেক নগরের আয়তনও সঙ্কুচিত হয়ে যায়। ১৩৪৬-১৪৪০-৭০ এই সময়ের মধ্যে ইল্‌ দ্য ফ্রান্সের জনসংখ্যা অর্ধেক হয়ে যায়। কেবলমাত্র তুলুস-এ ১৩৩৫ সালে যে জনসংখ্যা ছিল ৩০,০০০, ১৩৮৫ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় ২৬,০০০-এ, ১৩৯৮ সালে ২০,৭০০-তে এবং ১৪৩০ সালে ৮০০০-তে। উত্তর ও মধ্য ইতালীতে মহামারীর প্রকোপ তীব্র না হওয়ায় এই এলাকায় জনসংখ্যায় খুব তারতম্য হয়নি। প্লেগ সত্ত্বেও ইতালীর টাইরল-এ জনসংখ্যা প্রায় ৫০% বদ্ধি পায় কারণ এই নগরে শিল্পোৎপাদনে বহু বহিরাগত অংশ নিতে এসেছিল। ইংলণ্ডের সাসেক্স এবং ফ্রান্সের ওদোফিনে (Haut Dauphine) অঞ্চলে এই সময়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে নতুন বসতি স্থাপনের উদ্যোগ থেকে অনুমান হয় যে মহামারীর আঘাত এখানে তেমন প্রচণ্ড হয়নি। স্বাভাবিক কারণে ঘনবসতিপূর্ণ জনপদে এবং অল্পবিত্তদের মধ্যে মত্যুর হার সর্বত্র ছিল বেশি।

    পশ্চিম ইউরােপে জমির খণ্ডীকরণ এবং হল্যাণ্ডে জলাভূমিকে কর্ষণ-উপযােগী করার কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। জনগণের সংখ্যাল্পতার জন্য পূর্বাঞ্চলে নতুন বসতি স্থাপনের সকল প্রকার উদ্যোগও থেমে গিয়েছিল। ১৪শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে বহু পরিত্যক্ত, সম্পূর্ণ জনহীন গ্রামের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, অবশ্য মহামারীতে সমস্ত গ্রামবাসীর মৃত্যু হওয়ার জন্য এমন হয়নি, সম্ভবত শঙ্কিত ভীত গ্রামবাসীদের গ্রাম ত্যাগ করাই এর কারণ। জার্মানির এল্‌ব নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল, পূর্ব ইংলন্ড ও দক্ষিণ ইতালিতে জনসংখ্যা হ্রাসের ঘটনা ছিল চোখে পড়ার মতাে। পূর্ব ইউরােপের সদ্যস্থাপিত উপনিবেশগুলোর কৃষকেরা পশ্চিমাদের বাজারে অস্বাভাবিক মন্দার জন্য অতিরিক্ত শস্যোৎপাদনের কোনও প্রেরণা অনুভব করেনি দীর্ঘকাল। আর সমগ্র পশ্চিম ইউরােপে জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার জন্য নিবিড়ভাবে কৃষিকাজ করার প্রয়ােজনও অনুভূত হয়নি বহুদিন।

    মহামারীর ফলে পশ্চিম ইউরােপের সর্বত্র গ্রামীণ সমাজের চেহারা একেবারেই পাল্টে গিয়েছিল। গ্রামাঞ্চলে এবং কৃষিব্যবস্থার ওপর নিদারুণভাবে মহামারীর প্রভাব অনুভূত হয়েছিল। বিস্তীর্ণ কৃষিক্ষেত্র এবং অসংখ্য গ্রাম পরিত্যক্ত হয়েছিল। সীমিত সংখ্যক জীবিতরা খােলা আকাশের নীচে খাঁ খাঁ করা রিক্ত, নিঃস্ব, প্রেতপুরি-সদৃশ জনপদে আর থাকতে না পেরে অন্যত্র পাড়ি দিয়েছিল। পঞ্চদশ শতকের সূচনায় নরওয়ের নাবিকরা গ্রিনল্যান্ডে ফিরে গিয়ে অনুরূপ জনশূন্য, পরিত্যক্ত গ্রাম দেখেছিল। সেখানে চরে খাচ্ছিল বন্য গবাদি প্রাণী (feral), যারা কোনাে এক কালে গৃহপালিত ছিল। ইংল্যান্ডে এরকম ১৫০০ গ্রামের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, জার্মানীতে ১৩০০ সালের জনবহুল গ্রামগুলোর অধিকাংশ দুশো বছরের মধ্যে বিরল-বসতি, প্রায়-পরিত্যক্ত, জীবন-স্পন্দনরহিত গ্রামে পরিণত হয়েছিল। অবশ্য মৃত্যুই এর একমাত্র কারণ ছিল না, সেইসময় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের অসংখ্য গ্রামবাসীকে স্থানান্তরে যেতে প্রলুব্ধ করেছিল।

    অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ইউরোপে এই বিপর্যয়ের ফলে অনেক ক্ষতি হয়। ১৩৫০-১৪৪০ খ্রিস্টাব্দের এই পর্বকে অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদগণ নানাভাবে বর্ণনা করেছে। কারাের মতে এই প্রক্রিয়া ছিল ‘থেমে যাওয়া’, কেউ মনে করেন এটা ছিল স্থগিত থাকা। কেউ ‘মন্দা’ শব্দটি ব্যবহারের পক্ষপাতী। লােপেজ একে ‘সংকোচন’ আখ্যা দিয়েছেন। এই শতকে এক ভয়াবহ মহামারির (Plague বা Black Death) ফলে ইউরােপের জনসংখ্যা ভীষণভাবে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়েছিল এবং এর বিরূপ প্রভাব অনুভূত হয়েছিল চাষবাস ও শিল্পে। এর আনুষঙ্গিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে দেখা দিয়েছিল কৃষকদের ওপর অভিজাতদের প্রভাব হ্রাস, চার্চ ও রাজন্যবর্গের প্রতিষ্ঠা ও মানমর্যাদার হানি এবং অসংখ্য দরিদ্র নিম্নবর্গের মানুষের বিদ্রোহ।

    এই ক্ষয়ক্ষতির জন্য মহামারি একমাত্র দায়ী নয়

    ১৩৪৮ সালে আবির্ভূত এই মহামারীর ধ্বংসলীলার ব্যাপকতা অনস্বীকার্য, কিন্তু মধ্যযুগের অন্তিম লগ্নে ইউরােপীয় সমাজের সমস্ত ক্ষয়ক্ষতির জন্য একমাত্র এই দুর্ঘটনাকেই দায়ী করা ঠিক নয়। অনেকে প্লেগের চেয়েও বেশি দায়ী করেছেন আবহাওয়াকে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ও এর ফলে তৈরি হওয়া দুর্ভিক্ষকে যা মহামারীরও কয়েক দশক পূর্বেই শুরু হয়েছিল। আবার কেউ কেউ দায়ী করেছেন করব্যবস্থাকে (অর্থাৎ এর কঠোরতাকে)। জেরাল্ড হজেটের মতে, একাদশ শতাব্দী থেকে ইউরােপে অকস্মাৎ যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি শুরু হয়েছিল প্লেগের প্রাদুর্ভাবের আগেই তা থেমে গিয়েছিল। ইংল্যাণ্ডে ম্যানরগুলির সমীক্ষা করে বিশেষ করে মঠের অধীন ভূসম্পত্তিগুলির সঙ্গে ‘ডুমসডে বুকের’ (Domsday Book) তুলনামূলক পর্যালোচনা করে জানা যায় যে চতুর্দশ শতকের প্রারম্ভেই ইংল্যাণ্ডে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রীতিমতাে কমতে শুরু করেছিল। হজেটের মতে এই কথাটি পশ্চিম ইউরােপের অন্যান্য অঞ্চল সম্পর্কেও প্রযােজ্য। হয়তাে ১৩১৪ থেকে ১৩১৭ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে পর পর তিনটি ভয়াবহ অজন্মাই এর কারণ। তাছাড়া চতুর্দশ শতকের তৃতীয় দশকেই শিল্পােৎপাদন এবং ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রেও প্রচণ্ড মন্দা দেখা যায়। ১৩২৫ সালের পর খাদ্যশস্যের চাহিদা কোথাও আর বিশেষ বৃদ্ধি পায়নি। ক্ষেতখামার এবং শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রেও শ্রমিকের অভাব প্রচণ্ডভাবে অনুভূত হচ্ছিল ব্ল্যাকডেথের বহু আগে থেকেই। একমাত্র সুইডেন এবং কাতালুনিয়াতে ১৩৪৮ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। কিন্তু অন্য জায়গাগুলোতে জনসংখ্যা হ্রাস এবং কৃষি-উৎপাদনে শ্লথতা মহামারীর আগের যুগের ঘটনা। এই সময়েই ভূস্বামীরা তাদের ক্ষেতখামার সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন। সমস্ত ১৩শ শতক ধরে একরের পর একর যুক্ত করে আপন আপন খাসজমিকে বর্ধিত করার যে প্রয়াস চলছিল তাও প্রায় সর্বত্র থেমে গিয়েছিল।

    যুজনস্কি মনে করেন যে জনসংখ্যা কমে যাওয়া বা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে আলােচ্য পর্বের মন্দার কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থনৈতিক মন্দা প্লেগের বহু আগেই শুরু হয়েছিল। সিপােলা মনে করেন যে ব্ল্যাক ডেথ ছিল শাপে বর, কারণ এর ফলে জমির ওপর অস্বাভাবিক রকম চাপ অনেক কমে গিয়েছিল। আবার ডব বা সুইজি মনে করেন যে চোদ্দো শতক ছিল যথার্থই সংকটের যুগ। নিরপেক্ষ বিচারে মানতেই হবে যে এইসময় ছিল এক গভীর সংকটের যুগ এবং এর মূলে ছিল ব্ল্যাক ডেথ। ১৫শ শতকের প্রথমার্ধে ইউরােপীয় বাণিজ্য ইউরােপের ভৌগােলিক সীমা অতিক্রম করে আটলান্টিকের দিকে পাড়ি দিলে আলােচ্য সংকট ও মন্দার অবসান ঘটেছিল।

    মহামারির পূর্বেই কৃষকের উপর শোষণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রতিকুল জলবায়ুর কারণে ১৪শ শতকের দুর্ভিক্ষ

    ১৩৪৮ সালে শুরু হওয়া মহামারীর পূর্বেই ১৪শ শতকের প্রথমার্ধে ইউরােপের বেশির ভাগ এলাকায় মাথাপিচু কৃষকের জমির পরিমাণ এতাে হ্রাস পায় যে সমগ্র পরিবারের ভরণপােষণের পক্ষে তা পর্যাপ্ত ছিল না। কোথাও কোথাও কৃষকদের পক্ষে শিপােৎপাদনের ক্ষেত্রে বাড়তি কাজ সংগ্রহ সম্ভবপর হলেও ফ্লাঁদরের বা ফ্লেন্ডার্সের মতাে এক সময়কার শিল্পােন্নত স্থানেও তা আর সম্ভবপর ছিল না। ১৩১৫-১৭ সালের মধ্যে ইউরােপে প্রচণ্ড খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছিল। একে Great Famine of 1315–1317 বলা হয়। তদকালীন ইউরোপে এরকম দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতির পেছনে দুটি কারণকে সামনে আনা হয় – কৃষকদের উপর বাড়তি করের বোঝা ও শোষণ, এবং জলবায়ু পরিস্থিতির অবনতি।

    ইউরােপের সমাজ ছিল সামন্তপ্রথা নির্ভর। সামন্তদের খাস জমি (demesne) ছিল, ম্যানর প্রথার মাধ্যমে উৎপাদন হত; সচ্ছল স্বাধীন চাষীরাও ছিল। সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। কৃষক পরিবার ছিল কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার প্রাথমিক একক। ১২শ শতকের শেষে ইউরােপের কৃষি পরিণতরূপ লাভ করেছিল, সমাজের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানাে সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ভূমিদাসরা অনাবাদী, পতিত, জঙ্গল জমি চাষের আওতায় আনলে ১৩শ শতক থেকে কৃষি উৎপাদনে অবনতি দেখা যায়। তখন জনসংখ্যা অনেক বেড়ে যায়, ফলে কৃষি উৎপাদন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্র ও সামন্তপ্রভুরা কৃষকদের কাছ থেকে জবরদস্তি করে কর ও শ্রম আদায় করতে থাকে, ফলে কৃষকদের উপর শোষণের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। সামন্তপ্রভুরা কৃষকের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ চাপিয়ে নিজেদের আধিপত্য ও শােষণ বজায় রাখার প্রয়াস চালায়। কৃষি অর্থনীতিতে যে সংকট চলেছিল তা দুর্ভিক্ষের আকারে আত্মপ্রকাশ করে।

    অনেকে মনে করেন যে ১৪শ শতকের ইউরােপের অর্থনৈতিক জীবনের এই স্তিমিত অবস্থার জন্য ঐ সময়কার জলবায়ুর অবনতি কিছু পরিমাণে দায়ী। প্রকৃতির কৃপণতা বা আক্রোশ বহুক্ষেত্রেই ফসল উৎপাদনের অন্তরায় হয়ে উঠেছিল, কোথাও কোথাও খাদ্যশস্য উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আবহাওয়ার গতি-প্রকৃতির বা জলবায়ুর উন্নতি-অবনতির বিবরণ সংরক্ষণের প্রথা সে সময়ে ছিল না। কিন্তু সমসাময়িককালের বিবরণ, কাহিনী এবং চিঠিপত্র থেকে জানা যায় যে এই সময়ে গ্রীষ্মকালে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কৃপণ সূর্যালােক ও অতিবর্ষণের ফলে কৃষিকাজ খুবই বিঘ্নিত হতো। ফলে দক্ষিণ-ইংল্যান্ড ও উত্তর-জার্মানীতে আঙ্গুর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিকুল আবহাওয়া যে গম উৎপাদনের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে উঠেছিল তা বার্লি, রাই বা ওটের তুলনায় গমের দামের ওঠানামা থেকেই বােঝা যায়। তবে বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানীর সুবিধা থাকায় সমুদ্রোপকূলবর্তী অঞ্চলে ফসলের দামের বিশেষ ওঠানামা হয়নি। প্রতিকূল জলবায়ুর কারণে ১৩১৪-১৬ সাল পর্যন্ত কৃষিজ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শস্য উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছিল, খাদ্যশস্যের দাম বেড়েছিল। মানুষ প্রয়ােজনীয় খাদ্যশস্য সংগ্রহ করতে পারেনি। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, জার্মানি, ইংল্যান্ড ও উত্তরের দেশগুলিতে দুর্ভিক্ষের ফলে বহুলােক মারা যায়। বেলজিয়ামের ইপ্রে অঞ্চলে মাত্র ছ’মাসের মধ্যে জনসংখ্যার প্রায় দশ শতাংশ মারা গিয়েছিল।

    এই পরিস্থিতিতে ফ্লেন্ডার্সের মত অনেক শহরের শিল্পোৎপাদনের অবনতি ঘটলেও অনেকেই সেই পরিস্থিতিতে অর্থসমাগমের ভিন্ন উপায় গ্রহণ করে নেয়। রাষ্ট্রগুলো অর্থাভাবে পতিত হয় বলে তাদের ঋণের প্রয়োজন হয়। তাই সেই সময়ে ঋণ ব্যবসায়ী বা ব্যাঙ্ক মালিকরা প্রচুর বিত্তশালী হয়। নগরের জনসংখ্যা প্রচুর পরিমাণে হ্রাস পাওয়ার ফলে যারা বেঁচে ছিল তাদের মাথাপিচু আয় বাড়ে, গিল্ডগুলো দক্ষ কারিগর তৈরিতে মন দেয়, ফলে শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি হয়। দক্ষ কারিগরদের কারণে আবার পরবর্তীতে শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এসব কারণে একদিক দিয়ে যেমন ফ্লেন্ডার্সের মত পুরনো উন্নত শহরের ক্ষতি হয়, তেমনি ফোরেজ (Forez) এর মন্টব্রিসনের মতাে স্বল্পখ্যাত স্থানেও বিত্তশালী মানুষের বিস্ময়কর সংখ্যা বৃদ্ধির কথা জানা যায়।

    আধুনিক গবেষণায় দেখা যায় ১৪শ শতকের প্রথমার্ধের দুর্ভিক্ষ, বিশেষ করে ১৩১৫-১৩১৭ সালের মহান দুর্ভিক্ষের সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই দুর্ভিক্ষগুলোর সময়কাল মেডিয়েভাল ওয়ার্ম পিরিয়ড বা মধ্যযুগীয় উষ্ণ পর্যায়ের সমাপ্তিকালের সাথে মিলে যায়। উষ্ণ পর্যায়ের সমাপ্তিকালের জন্যই এই সময়ে উত্তর ইউরোপ খুবই প্রতিকুল জলবায়ুর সম্মুখীন হয়। দীর্ঘদিন যাবৎ জলবায়ুর এই অবস্থা বর্তমান থাকে। এই পর্যায়ে শীতকাল খুব রুক্ষ ছিল, আর গ্রীষ্মকাল ছিল ঠাণ্ডা ও বৃষ্টিবহুল। এই পরিবেশে ভাল ফসল পাওয়া সম্ভব নয়। অনুকুল জলবায়ুতে প্রতি একটি শস্যবীজের বিনিময়ে সেই সময়ে ৭টি শস্যদানা পাওয়া যেত। কিন্তু এই প্রতিকূল পরিবেশে একটি শস্যবীজের বিনিময়ে পাওয়া যেত ২টি শস্য। অর্থাৎ তখন কৃষকদেরকে অর্ধেক নিজেদের খাদ্যের জন্য রেখে বাকি অর্ধেক রাখতে হত পরের বছরে ফসল ফলানোর জন্য। অর্থাৎ খাজনা দেয়ার জন্য কিছুই ছিল না, আর খাজনা দিলে নিজেদের খাওয়ার জন্য কিছু থাকে না। উল্লেখ্য আজকের দিনে প্রতি একটি শস্যবীজে গড়ে ৩০টি শস্যদানা পাওয়া যায়। সুতরাং দুর্ভিক্ষের পেছনে জলবায়ুর পরিবর্তনের হাত ছিল। আবার প্লেগ মহামারীর পেছনেও রয়েছে জলবায়ুর পরিবর্তনই। সেটাও আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যেই জানা গেছে। এছাড়া সেই সময় পূর্ব ইউরোপে তুর্কি আক্রমণ ও তাদের শাসনের ফলে ইউরোপের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তুর্কিদের সেই জয়ের পেছনেও ছিল দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর ফলে বাইজান্টাইন রাজ্যের জনসংখ্যা ও সেনাদলের পরিমাণ কমে যাওয়া। সর্বোপরি, ১৪শ শতকের ইউরোপের বিপর্যয়ের মূলে ছিল সেই সময়ের জলবায়ুর পরিবর্তন।

    কৃষিতে বিপর্যয় ও পতনোন্মুখ সামন্ততন্ত্র

    জনসংখ্যার হ্রাসের ফলে কৃষিব্যবস্থায় পরিবর্তন

    জনসংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি একটি দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়। বিপর্যয়ের পূর্বে ১২শ ও ১৩শ শতকে ইউরোপের বাণিজ্য ও উৎপাদন বেড়ে গিয়েছিল, তাই ইউরোপে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রান্তিক জমিতে চাষ বসানাে হয়, কিন্তু সেখানে উৎপাদন কম হয়। এদিকে জনসংখ্যা বাড়লেও খাদ্যশস্য ও চাষজমির যােগান তেমন না বাড়ায়, এদের চাহিদা বেড়ে যায়, আর তার ফলে পশ্চিম ইউরোপে বাড়ে খাদ্যশস্যের দাম। খাদ্য শস্যের পরিমাণ কমে যাওয়ায় লাভ তুলে নিতে সামন্তপ্রভুরা খাজনা বাড়ায়, কৃষকের কাঁধে অনেক কর চাপায়, কৃষকদেরকে বাধ্যতামূলক শ্রম দান করতে হত। এসবের ফলে কৃষকের অবস্থার অবনমন ঘটে, অধিক খাজনা নিয়ে সামন্তপ্রভুদের অবস্থার উন্নয়ন ঘটে।

    কিন্তু ১৪শ শতকে এই ধারার পরিবর্তন হওয়া শুরু করে। দুর্ভিক্ষ ও প্লেগের বিপর্যয়ে বহু লােক মারা গেলে ইউরোপের জনসংখ্যা হ্রাস পায়। তদকালীন সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার অন্যতম উপকরণ ছিল ভূমিদাস কৃষক, বিপর্যয়ের ফলে প্রচুর ভূমিদাস মারা গেলে, অর্থাৎ উৎপাদনের এই অন্যতম উপকরণের সরবরাহ কমে গেলে কৃষিক্ষেত্রে মন্দা দেখা যায়। এর ফলে কৃষিজমি ও খাদ্যশস্যের চাহিদা কমে, তাই এগুলোর দামও কমে। এর ফলে খাজনার পরিমাণও যায় কমে। এদিকে কৃষিজমির তুলনায় ভূমিদাসের পরিমাণ অনেক কমে গেলে ভূমিদাস বা শ্রমের চাহিদা বেড়ে যায়, অর্থাৎ ভূমিদাসের শ্রমের দাম বা মজুরি বেড়ে যায়। শ্রমের দাম বাড়ায় ভূমিদাসের আয় বাড়ে, ফলে কৃষকদের স্বাধীনতাও বেড়ে যায়। তাই কৃষকের অবস্থার উন্নয়ন হয়। কৃষকের স্বাধীনতা তদকালীন ভূমিদাসপ্রথা ও সামন্ততন্ত্রে একরকম আঘাত সৃষ্টি করে। ভূমিদাসদের শ্রমের মজুরি বাড়ে, কিন্তু খাজনা বাড়েনি। এর ফলে ভূস্বামীরা সংকটে পড়েন, রাজস্বের পরিমাণ কমে যায়, রাজকোষে টান পড়ে। তাছাড়া ভূস্বামীদের আয় কমে যাওয়ার সাথে সাথে তাদের মধ্যে সংঘাত, যুদ্ধবিগ্রহ বৃদ্ধি পায়, ফলে তাদের ব্যয়ও বেড়ে যায়।

    পশ্চিম ইউরােপের ভূস্বামীদের মুনাফা কমে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই তাদেরকে এই সময়ে ক্রীতদাস দিয়ে চাষ করিয়ে মুনাফার পরিমাণ বজায় রাখার চেষ্টা করতে দেখা যায়। পর্তুগাল ও স্পেনের ভূস্বামীরা ক্রীতদাস দিয়ে চাষবাস শুরু করেছিল। আবার যেখানে ভূমিদাসদের মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অধিক, সেখানে ভূস্বামীরা তাদের কৃষিজমিকে বাধ্য হয়ে পশুচারণ জমিতে পরিণত করে মেষপালন শুরু করেন। এর কারণ ছিল দুটি – প্রথমত, রাজস্ব অনেক কমে গেছে, খাদ্যশস্যের দামও পড়ে গেছে, তাই কৃষিকাজের চেয়ে মেষপালনে লাভের সম্ভাবনা বেশি, দ্বিতীয়ত মেষপালনে কৃষিকার্যের চেয়ে কম শ্রমিক লাগে, জনসংখ্যা কম হয়ে যাওয়ায় তাই স্বল্পসংখ্যক শ্রমিক দিয়ে পশুপালনই সুবিধাজনক ছিল।

    জনসংখ্যা হ্রাসের ফলে মজুরি বৃদ্ধি ও খাদ্যশস্যের দাম কমে আসায় লাভ কমে যাওয়ায়, এবং উৎপাদন কমে আসায় ভূস্বামীরা ভূমিহীন কৃষক দিয়ে অথবা পরে যারা খুব ছােটখাটো ক্ষেতখামারে কাজ করতে বাধ্য ছিল এমন কৃষকদের সাহায্যে কৃষি উৎপাদন চালু রাখতে সচেষ্ট হন। কিন্তু বারবার মহামারীর প্রকোপে এই সব কৃষকদের মধ্যেও মত্যুর হার বৃদ্ধি পেতে থাকলে ভূস্বামীরা পুনরায় বিপদে পড়েন। শর্তাধীন-কৃষি-উৎপাদন বহু অঞ্চলেই বন্ধ হয়ে যায় এবং জমির মালিকেরা অতি অল্প বার্ষিক খাজনার বিনিময়ে সেই সব জমিতে শস্য উৎপন্ন করতে আগ্রহান্বিত হয়ে ওঠেন। অবশ্য ব্ল্যাকডেথের আগেও কোথাও কোথাও বার্ষিক খাজনার বিনিময়ে জমির বন্দোবস্তের কথা জানা যায়। বেলিফরা প্রায়ই খাস-সম্পত্তির অবস্থা অনুযায়ী এই ব্যবস্থা নিতেন আর এই প্রথা আইন-সঙ্গতও ছিল। কিন্তু ব্ল্যাকডেথের পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলেও কৃষকদের এই সব সুবিধাগলি বাতিল করা কঠিন হয়ে যায়।

    যাই হোক, ভূস্বামীরা সংকটে পড়লে ও তাদের আয় কমে এলে তারা বাধ্য হয়ে তাদের খাস জমি অর্থের বিনিময়ে কৃষকদেরকে লিজ বা ইজারা দান করে। আগেই অর্থনৈতিক মন্দার কারনে রাজস্ব কমে গিয়েছিল, জমি ইজারা দানের ফলে তা আরও কমে যায়। রাজস্ব কমে যাওয়ায় ও রাজকোষে টান পড়লে কৃষকদের উপর নতুন করে অনেক করারোপ ও শোষণ করা শুরু করে। কিন্তু কৃষকরা তা আর মানতে চায়নি, পূর্বের অবস্থায় ফিরতে চায়নি। ফলে অসন্তোষ দানা বাঁধে, অনেকে পালিয়ে নগরে গিয়ে কারিগরি পেশা বেছে নেয়, আবার অনেক কৃষক একত্রে মিলে কৃষক-বিদ্রোহের সূচনা করে। অনেক ক্ষেত্রে এইসব বিষয় তদকালীন সমাজে কৃষকের অবস্থা, ভূস্বামীদের অবস্থায় পরিবর্তন সৃষ্টি করে, সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় ফাঁটল ধরায়।

    শোষণের ফলে ভূমিদাসদের ম্যানর ত্যাগ ও ১৪শ শতকে বাণিজ্যের প্রসারের ফলে শহরে জীবিকার বিকল্প উপায়

    ১২শ-১৩শ শতকে কৃষকদের উপর ভূস্বামীদের শোষণের মাত্রা অনেক বেড়ে গেলে তাদের অনেকেই ম্যানর ত্যাগ করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু পালিয়ে গিয়ে বেঁচে থাকার জন্য বিকল্প পেশার প্রয়োজন হয়। যতদিন না পর্যন্ত ইউরোপে ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার এবং ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য নগরের পত্তন তাদের জীবিকা নির্বাহের একটি বিকল্প ব্যবস্থা করে দিয়েছিল ততদিন পলাতক-ভূমিদাসসহ সংখ্যা উল্লেখযােগ্য হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ১৪শ শতকে ইউরোপে শক্তিশালী মুদ্রা ব্যবস্থা, বিনিময় অর্থনীতি ও বাণিজ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, বিভিন্ন শিল্প সমিতি বা গিল্ড গড়ে ওঠে, দক্ষ কারিগরের প্রয়োজন অনেক বেড়ে যায়। ১৪শ শতকে জনসংখ্যা হ্রাসের ফলে শ্রমিকের চাহিদা ও মজুরি উভয়ই অনেক বেড়ে যায়। এতে গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা কৃষকদের বিকল্প কাজের উপায় সৃষ্টি হয়। অনেক কৃষক শহরে এসে নতুন পেশায় প্রবেশ করে। তাই হেনরি পিরেন মনে করেন যে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটায় শহর গড়ে উঠলে ম্যানরীয় উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর তার প্রভাব পড়েছিল। আর এটা সামন্ততন্ত্রের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

    প্রাচীন ম্যানরীয় সংগঠনগুলি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় অঞ্চলে ভােগ করা হত, আমদানি-রপ্তানি খুব কম ছিল। ১৪শ ও ১৫শ শতকে ইউরােপে অনেক শহর গড়ে উঠেছিল, এই সব শহরে শিল্প-বাণিজ্য, ব্যাঙ্কিং আর্থিক লেনদেন নির্ভর বুর্জোয়া শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে। নব-প্রতিষ্ঠিত শহরগুলোর শিল্প ও ব্যাবসা-বাণিজ্যের উন্নতির মূলে ছিল বুর্জোয়া শ্রেণি। এই বুর্জোয়া শ্রেণী পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের খাদ্যশস্য ও ভােগ্যপণ্যের ওপর ছিল নির্ভরশীল। শহরে বণিকদের তত্ত্বাবধানে শিল্প পণ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা হয়েছিল, শিল্প পণ্য বিক্রি ও খাদ্যশস্য বেচাকেনার অনেক বাজার গড়ে উঠেছিল। সামন্তপ্রভুর জাঁকজমকপূর্ণ বিলাসবহুল জীবনের জন্য প্রয়ােজন ছিল প্রচুর অর্থের। সামন্তপ্রভুরা ভূমিদাসদের মুক্তি দিয়ে এই অর্থের একাংশ সংগ্রহ করেছিল।

    এই শহরগুলোতে শিল্পজাত পণ্যের সাথে সাথে খাদ্যশস্যেরও কেনাবেচা চলত। ব্যাবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটলে ও ইউরােপের বিভিন্ন দেশে নগর গড়ে উঠলে, উন্নত ও মুক্ত জীবনের আশায় বহু ভূমিদাস মানব থেকে পলায়ন করে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল এবং এক্ষেত্রে তারা নিরাশ হয়নি। ১৪শ শতকে এটি একটি সাধারণ প্রবণতায় পরিণত হয়েছিল।

    নগরগুলোর মধ্যে মুক্তির সঙ্গে জীবনধারণের উপযােগী কাজকর্মের প্রতুলতা, সামাজিক মর্যাদালাভের স্থির আশ্বাস ভূমিদাসদেরকে পুরােনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করতে উৎসাহিত করে। আর দ্রুত গড়ে-ওঠা বাণিজ্যকেন্দ্র ও জনপদগুলোতেও যথেষ্ট পরিমাণ শ্রমিক, কারিগর এবং সৈন্যসামন্তের প্রয়ােজন থাকায় নগরকতৃপক্ষগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিদাসদের ম্যানর পরিত্যাগে উৎসাহিত করতেন। এর ফলে ম্যানরগুলোতে অশেষ ক্ষতি হয়।

    ভূস্বামীদের দূরবস্থা, কৃষকদেরকে ব্যাপকহারে ইজারা দান ও রাজস্ব হ্রাস

    বিভিন্ন শ্রেণীর ভূস্বামীদের উপরে ব্ল্যাকডেথের প্রভাব সমানভাবে পড়েনি। শত শত ম্যানরের প্রভু, প্রচণ্ড পরাক্রান্ত ভূস্বামীরা (ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাস্টার বা দ্য লেসির মতাে) ছােটখাটো ভূসম্পত্তির মালিকদের মতাে (যাদের খাস-জমির পরিমাণ ৪০-১২০ হেক্টরের মতাে ছিল) বিপর্যস্ত হননি। বড়-ভূস্বামীরা বহু আগে থেকেই রাজস্ব, ইজারা, বিচার ব্যবস্থা থেকে বিভিন্ন খাতে আয় ছাড়াও শুল্ক, বিবিধ ফিউড্যাল কর বাবদ প্রভূত অর্থ সংগ্রহ করে আসছিলেন।

    কিন্তু অপেক্ষাকৃত দীন ভূস্বামীরা জীবিকানির্বাহের জন্য খাস-জমিজাত আয়ের উপরই নির্ভর করতেন। রাজস্ব, জরিমানা থেকে তাদের আয়ের পরিমাণ ছিল অনুল্লেখ্য। ধনী-ভূস্বামীরা ১৩৭০ সালের পর রাজস্ব-হ্রাসের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন, আর সাধারণ জমিদাররা খাস-জমিতে কৃষিকাজ করার মতাে কৃষকের স্বল্পতাজনিত বা শ্রমিকের মজুরীবৃদ্ধিজনিত সমস্যার দ্বারা পীড়িত হতে শুরু করেন। সাধারণ ভূস্বামীরা জীবিকানির্বাহের জন্য খাস-জমিজাত আয়ের উপরই নির্ভর করতেন বলে তাদের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয়ে ওঠে। প্রধানত ভূস্বামীদের স্বার্থের দিকে তাকিয়েই ইংল্যান্ডে মজুরীর হ্রাসবৃদ্ধি রােধের জন্য আইন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জনসংখ্যা হ্রাসের ফলে শ্রমের মজুরি এতই বেড়ে যায় ও খাজনা এতই কমে যায় যে এইসব আইন দিয়েও বড়-ভূস্বামীদের ভূসম্পত্তির একটা উল্লেখযােগ্য অংশ অনাবাদী থেকে যায়, ছোট ভূস্বামীদের সংকট ছিল আরও বেশি। এই সময়ে বহু অঞ্চলে ক্ষেত-খামারের কাজ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়।

    বড় ভূস্বামীদের প্রচুর কৃষি জমি অনাবাদী থাকায় ১৩৭০ সাল থেকে তারা লোভনীয় শর্তে ব্যাপকভাবে কৃষকদেরকে জমি ইজারা দেয়া শুরু করেন। ইজারার শর্তগুলো সর্বক্ষেত্রেই কৃষকদের অনুকূলে ছিল। এর আগে থেকেই অনেক ভূস্বামী তাদের জমি লিজ দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করেন। (র‍্যামসে মঠের সমস্ত ভূসম্পত্তি ১৩০৩ সালের মধ্যে এভাবেই বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়েছিল)।

    ভূস্বামীরা তাদের খাস জমি ইজারা দান করছেন, এর অর্থ হল সেখান থেকে তারা আর খাজনা আদায় করতে পারবেন না। ফলে অনিবার্যভাবেই রাজস্ব আরও হ্রাস পেল। ১৩৯০ সালে ল্যাঙ্কাস্টারের কাউন্সিল যে অনুসন্ধান পরিচালনা করে তার বিবরণী থেকে জানা যায় যে ১৪০৮-৭৭ সালের মধ্যে এক চতুর্থাংশ রাজস্ব কমে যায়। ধীরে ধীরে ইজারা নেওয়ার মতাে কৃষকেরও অভাব দেখা যায়, মানে আগে যদিওবা কৃষকদেরকে জমি লিজ দিয়ে কিছু টাকা পাওয়া যেত, এবারে সেই উপায়ও বন্ধ হয়ে এলো। ১২, ২০, এমনকি ৪০ বছরের জন্য ইজারা দিয়েও কৃষকদের আকর্ষণ করা দুরূহ হয়ে পড়েছিল, খাস-জমি বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকলে অবস্থা আরও শোচনীয়।

    ভূস্বামীদের অবনয়ন ও কৃষক সমাজের উন্নয়নের মধ্য দিয়ে সামন্ততন্ত্রের পতন

    ভূস্বামীরা নিজেদের খাস জমিতে চাষ-বাস তুলে দিয়ে কৃষকদের নির্দিষ্ট খাজনায় জমি ইজারা দেয়ায় কৃষকদের ওপর সামন্তপ্রভূদের যে আধিপত্য ছিল তার অবসান ঘটে ও পশ্চিম ইউরােপে সামন্ততন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চল ও জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলে এ ধরনের ভূমি বন্দোবস্ত গড়ে উঠেছিল। কৃষি অর্থনীতিতে পরিবর্তনের ফলে সচ্ছল কৃষক শ্রেণীর আবির্ভাব হয়, গ্রামীণ করিগরদের উৎপন্ন পণ্যের চাহিদা বেড়েছিল, তাদের অবস্থার উন্নতি হয়। ভূমিদাস প্রথা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ইতালির উত্তরাঞ্চলে ভূমিদাস প্রথার অবসান ঘটে। ভূমির মালিকরা নির্দিষ্ট খাজনায় ভূমি বন্দোবস্ত করেছিল বা ভাগচাষী দিয়ে চাষের ব্যবস্থা করেছিল। জমির মালিকানারও হস্তান্তর হয়, অভিজাতরা আর ভূমির একচেটিয়া মালিক ছিল না, বণিক, যাজক ও সচ্ছল কৃষক জমির মালিক হয়ে বসেছিল।

    ১৪শ শতকের মধ্যে ব্ল্যাকডেথের কারণে পরিবর্তিত অথনৈতিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানে অসমর্থ বহু ভূস্বামীর পতন ঘটে ও নতুন এক ভূস্বামী শ্রেণীর উত্থান হয়। এর ফলে কৃষক সম্প্রদায় উপকৃত হয়। লঘু শর্তে জমি লাভ করে, ইজারা মারফৎ ক্ষেতখামারের মালিক হয়ে বহু উদ্যোগী কৃষক এই সময় নিজেদের অবস্থা ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। তাই অল্পকালের মধ্যে কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যেও একটা সুষ্পষ্ট শ্রেণী-বৈষম্য দেখা যায়। বহু কৃষিজীবী প্রয়োজনীয়, পুরােনাে ক্ষেতটুকু রেখে বাকি অংশ আবার অন্যদের ইজারা দেয়। এভাবেও অনেকের ভাগ্য পরিবর্তিত হয়। পরিশ্রমী, চতুর এই কৃষক সম্প্রদায় ভূমিহীন কৃষকদের অল্প মজুরীতে নিয়ােগ করে বহু ক্ষেত্রে কৃষি উৎপাদন মারফৎ প্রভূত অর্থের অধিকারী হন। মধ্যযুগের এই ‘কুলাক’ (Kulak)-রাই ১৫শ/১৬শ শতকে সম্ভ্রান্ত শ্রেণীতে উন্নীত হওয়ার ফলে সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসে একটা বড়াে রকমের পরিবর্তন সূচিত হয়।

    দরিদ্রতর কৃষক, খুব ছােট ক্ষেতের মালিক, এমনকি ভূমিহীন কৃষকেরাও প্রায় সর্বত্র লাভবান হয়েছিলেন। ২৫ হেক্টরের কম জমি যাদের ছিল তারা অনায়াসে বেশি জমি সংগ্রহ করতে পেরেছিল, ভূমিহীনেরা বর্ধিত হারে মজুরী, কোনও কোনও ক্ষেত্রে জমিও পেয়েছিল। ইংল্যান্ডে ১৩৪৮/৫০ সালের পর হঠাৎ শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। ১৩৫১ সালে আইন করে সর্বোচ্চ মজুরীর পরিমাণ নির্ধারণের চেষ্টা হয়। ১৪৯৬/৯৭ সালে খাদ্যশস্যের দামও কমতে থাকায় ( ১৪০১-১০ খ্রীঃ খাদ্যশস্যের দাম গড়পড়তা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গিয়েছিল) সাধারণ মানুষের পক্ষে জীবনযাত্রার মান উন্নততর করা সহজ হয়ে গেলে এই প্রচেষ্টা আবার দেখা গিয়েছিল। একজন শকট-চালকের উপার্জন তার স্ত্রী-পুত্রের উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত হলে মােট যে আয় হতাে তার পরিমাণ ছিল ৮ হেক্টর জমিতে কৃষি উৎপাদনজাত আয়ের সমান।

    পশ্চিম ইউরােপের বহু স্থানে ভূসম্পত্তির পরিচালনার ক্ষেত্রেও উল্লেখযােগ্য পরিবর্তন ঘটে। বহু দেশে ম্যানর অবলুপ্ত হয়ে যায়, ইজারাদার বা সমদ্ধ কৃষক এবং ম্যানর-প্রভূর স্থলাভিষিক্ত হয়। আবার এদের অনেকে বিভিন্ন ব্যবসা বা শিল্পোৎপাদনে অর্থ বিনিয়ােগ করে রীতিমতাে ধনী হয়ে ওঠে। অভিজাত ভূস্বামীরা, অন্তত ইংল্যান্ডের গ্রামাঞ্চলে, দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বলে আর বিবেচিত হতেন না। জার্মানীর Schansen অঞ্চলে গ্রামীণ সমিতিগুলি কর আদায়, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এসেছিল। মধ্যযুগের অন্তিম পর্বে জার্মানীতে Dorfgemeinschaft যে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল তাও সন্দেহাতীত। কিন্তু এই সব পরিবর্তন সত্ত্বেও বহু এলাকায় ভূস্বামীদের স্থানচ্যুত করা যায় নি। এমনকি যেখানে ভূস্বামীরা তাদের খাস-জমির সবটাই ইজারা দিয়েছিলেন, তারাও তাদের বৈধ অধিকার, বিচারালয়-থেকে-প্রাপ্য-আয় ইত্যাদি ভােগ করেছিলেন। তাছাড়া পরবতীকালে তাদের বংশধররা তাদের বৈধ অধিকার বলে বহুক্ষেত্রে জমির উপর দখল পুনরুদ্ধার করতেও সক্ষম হয়েছিলেন।

    তবে পূর্ব ইউরােপের অবস্থা ছিল অন্য ধরনের। সেখানেও জনসংখ্যা হ্রাসের ঘটনা ঘটেছিল। সেখানকার ভূমির মালিক সামন্তপ্রভুরা বিশাল বিশাল খামার স্থাপন করে ভূমিদাস দিয়ে কৃষি উৎপাদনের ব্যবস্থা করেছিল। পূর্ব ইউরােপে দ্বিতীয় ভূমিদাসত্বের যুগের সূচনা হয়েছিল। নানা আইন পাশ করে রাষ্ট্র এই ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থা সম্ভব করেছিল। ভূমিদাসদের গতিবিধির ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করা হয়, কৃষকদের ব্যক্তিগত অধিকার ও মজুরির হার নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। পূর্ব ইউরােপ শিল্পোৎপাদনে পিছিয়ে ছিল, পশ্চিম ইউরােপের কিছু অঞ্চলে কৃষি-নির্ভর ও শিল্প-নির্ভর স্বতন্ত্র বিকাশের ধারাও লক্ষ্য করা যায়।

    (সামন্ততন্ত্রের এই পতন সম্পর্কে এখানে খুব কম কথাই লেখা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে চাইলে বলবেন।)

    রাজকোষের উপর চাপ, বর্ধিত করাদায় ও ঋণের উপর নির্ভরশীলতা

    রাজকোষে টান পড়লে জনগণের উপর বিভিন্ন রকম করের বোঝা চাপানো হয়। ইউরােপের প্রায় সব দেশেই রাজস্বে ঘাটতি হয়, আর তার ফলে সব দেশেই বিভিন্ন প্রকারের নতুন করের প্রবর্তন করা হয়। প্রধানত যুদ্ধবিগ্রহের সংখ্যাবৃদ্ধির জন্য ভূস্বামীদের ‘ভারাটে যােদ্ধদল’ (bastard feudalism) এবং অস্ত্রশস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হতাে। বহুক্ষেত্রে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বাড়তি অর্থ আর তাদের থাকতাে না। আর এই কারণেই প্রজাদের উপর নানা শ্রেণীর কর প্রবর্তনে তারা বাধ্য হতেন। যাজক সম্প্রদায়ও এই বাড়তি করের বােঝা থেকে অব্যাহতি পাননি।

    রাষ্ট্র ছাড়াও ১৪শ শতাব্দীতে পােপও নানা অজুহাতে কৃষকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতেন। জাতীয় ব্যয়বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক শােষণের ফলে ভূসম্পত্তির সম্প্রসারণ বা উন্নতি বিধানে ভূস্বামী শ্রেণীর একটা ঔদাসীন্য লক্ষ্য করা যায়। এই ঔদাসীন্যও তাদের খাস জমির ইজারা দেবার একটি অন্যতম কারণ।

    ১৪শ শতকের ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনীতির উপর এই বর্ধিত করভারের প্রভাব খুব গভীর হয়ে ওঠে। নিত্যব্যবহার্য পণ্যের মুল্যবদ্ধি, শাসন বিভাগের সম্প্রসারণ, বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করানাের ব্যবস্থার অবলুপ্তি রাজকোষের উপর ভীষণ চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং রাজস্ব বাবদ আয় আর প্রায় কোন দেশেই শাসন পরিচালনার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। ইংল্যান্ডে এই কারণে শুল্ক স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। ইংল্যান্ডে ১২৭৫ সালে পশম, চামড়া ইত্যাদির উপর শুল্ক প্রবর্তন করা হয় এবং ১২০৩ সাল থেকে বিদেশী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত আমদানী ও রপ্তানী শুল্ক আদায়ও শুরু হয়ে গিয়েছিল। ক্রমে এই অতিরিক্ত কর/শুল্কের পরিমাণ প্রচলিত কর/শুল্কের পরিমাণের থেকে বেশি হয়ে দাড়ায়। ১৩৪৭-৭৫ সালে দেখা যায় রাজা তৃতীয় এডোয়ার্ড নিয়মিত রাজস্ব খাতে পেয়েছিলেন ২২০০০ পাউন্ড আর অতিরিক্ত খাতে ৮২,০০০ পাউন্ড। ফ্রান্সেও পঞ্চম চার্লস (১৩৬৪-৮০) এমন কতকগুলি অথনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন যা পরবর্তীকালে ফরাসী অথনৈতিক ব্যবস্থার উল্লেখযােগ্য পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। তার সময় থেকেই স্টেটস জেনারেল-এর সম্মতি ছাড়াই তেই (taille-আয়কর ), এ্যাদ (aid বা ভােগ্যদ্রব্যের উপর কর), গাবেলা (gabelle-লবণকর) প্রবর্তিত হয়। এই সমস্ত করের বিরুদ্ধে অভিজাতদের বিক্ষোভ জানানাের কোনও দরকার ছিল না কেননা অভিজাত এবং যাজক সম্প্রদায় এই সব কর-দানের দায় থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন।

    ১৩শ শতক থেকে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে অত্যধিক কর প্রবর্তনের ফলে বহু এলাকায় (যেমন নরমাঁদিতে) জমির দামও কমতে শুরু করে। ১৪শ শতকে পশ্চিম ইউরােপের অথনৈতিক মন্দার পেছনে বিভিন্ন রাজ্যের এই বর্ধিত করের রাজস্ব-ব্যবস্থা কিছুটা হলেও দায়ী ছিল।

    ১৩শ – ১৪শ শতকের এই সব নতুন কর প্রবর্তন সত্ত্বেও রাজকোষে অর্থাভাব থেকেই গিয়েছিল। ফলে বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করে ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা প্রায় সব দেশেই চালু হয়ে যায়। ইতালীয় ব্যাঙ্কাররা (বিশেষ করে Riccardi এবং Frescobaldi), বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (যেমন the Templars), বহু সমৃদ্ধ নগর এবং বেশ কিছু ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বহু দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের ঋণ দিতে থাকেন। ব্রুজ-এর এক বণিক Jacques Coeur এভাবেই ১৫শ শতকের প্রথমার্ধে ফ্রান্সের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। কিন্তু ১৪শ শতকের শেষের দিকে ঋণদানেচ্ছুদের সংখ্যাও কমতে থাকে। ফলে কয়েকটি দেশে, বিশেষ করে ফ্রান্সে, জবরদস্তি ঋণ আদায়ের সূত্রপাত হয়। জবরদস্তি-ঋণের ফলে উৎপাদনের ক্ষেত্রে মূলধন বিনিয়ােগ বা ভূসম্পত্তির সম্প্রসারণও উল্লেখযােগ্য রূপে কমে গিয়েছিল।

    কৃষকদের অসন্তোষ, বিদ্রোহ ও পরিবর্তন

    এই সময় বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের অবস্থার তুলনামূল উন্নয়ন দেখা গেলেও কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ ও কৃষকবিদ্রোহও লক্ষ্য করা যায়। এর একাধিক কারণ ছিল। প্রথমত, কৃষিব্যবস্থার পরিবর্তন কৃষকদেরকে তাদের শ্রমের মূল্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। শর্ত বা জমির বিলিবন্দোবস্ত পছন্দ না হলে স্থানান্তরে অধিকতর সুবিধাজনক শর্তসাপেক্ষে তারা ক্ষেত-খামারে কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকতো। বহু অঞ্চলে ভূস্বামীরা এই প্রতিকূল পরিস্থিতি রাজশক্তির সাহায্যে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করেছিল। ইংল্যান্ডে ১৩৪৯ সালে শ্রমিক-সংক্রান্ত এক আইনের সাহায্যে মজুরী স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা হয়। কয়েক বছর পরে ফরাসীরাজ দ্বিতীয় জনও অনুরূপ এক বিধান জারী করেন। কিন্তু মহামারীর ফলে উদ্ভুত নতুন অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি কৃষকদের সামনে যে বাড়তি সুযােগ-সুবিধা এনে দিয়েছিল আইনের সাহায্যে তাকে নষ্ট বা হ্রাস করার চেষ্টা তাদের অসন্তোষ বৃদ্ধি করেছিল মাত্র। জনসংখ্যা হ্রাসের ফলে অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি হলে ও ভূস্বামীরা সংকটে পড়লে তারা কৃষকদের খুব কম বার্ষিক খাজনার শর্তে কাজ করিয়ে উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে চায়। তারা আর শর্তহীনভাবে বেগার খাটত না। বিপর্যয়ের অবস্থার পরিবর্তনের পর তারা আর পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে চায়নি।

    দ্বিতীয়ত, গ্রামাঞ্চলে কৃষি শ্রমিকদের সংখ্যা উল্লেখযােগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় অনেক সামন্তপ্রভু কৃষি-শ্রমিক এবং সার্ফদের মুক্তিদান কার্যত স্থগিত রেখেছিলেন, কারণ তারা যেনতেন প্রকারে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে চাইছিলেন। কিন্তু এর জন্য তারা যথােপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে পারতেন না। তাদের মজুরি দেওয়ার সামর্থ্যই ছিল না। ভূমিদাসরা একে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নেয়নি, তারা বিদ্রোহ করেছিল।

    তৃতীয়ত, ইউরােপের জনসংখ্যা কমলেও অনেক ক্ষেত্রেই অভিজাততন্ত্র এই পরিস্থিতিতে তাদের করের হার ও নিয়ন্ত্রণ কমায়নি। কিন্তু কৃষকদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাদের কাছ থেকে আগের হারে ভূমিরাজস্ব ও অন্যান্য কর আদায় করা সম্ভব হয়নি। সেসময় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে কৃষকের অভাব বাড়ায় যেমন মজুরি বৃদ্ধি পায়, তেমনি অভিজাততন্ত্রের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছিল। অভিজাতরা তাই আয় বাড়ানাের জন্য কৃষকদের ওপর মজুরি হ্রাস ও বাড়তি করের চাপ দেয়। ফলে ইউরােপের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল।

    ১৪শ শতকের ইউরােপের কয়েকটি দেশে কৃষক বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছিল। এই বিদ্রোহগুলোর মধ্যে কয়েকটি ছিল বেশ উল্লেখযােগ্য ঘটনা। কৃষক বিদ্রোহগুলোর মধ্যে তিনটি খুব বিখ্যাত। প্রথমটি হল ১৩২৩-২৮ সালের মধ্যে সংঘটিত ফ্ল্যান্ডার্সের কৃষক বিদ্রোহ। ফ্ল্যান্ডার্স বা ফ্লাঁদর ছিল কৃষি ও শিল্পে উন্নত, এখানকার কৃষকদের ওপর শােষণ বাড়লে তারা বিদ্রোহ করেছিল। ১৩৫৭-৫৮ সালের ফ্রান্সের কৃষকরা বর্ধিত কৃষিকরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, তাদের সঙ্গে যােগ দিয়েছিল বণিক ও শিল্প-কারিগররা। এই কৃষক বিদ্রোহ ফ্রান্সে জ্যাকারি নামে পরিচিত। এই জ্যাকারি ছিল রক্তক্ষয়ী, কয়েক জন ভূস্বামী নিহত হন,বাড়িঘর লুণ্ঠিত হয়, সরকার শক্তি প্রয়ােগ করে এই বিদ্রোহ দমন করেছিল। ১৩৭৮ সালে ফ্লোরেন্সের কৃষকরা বিদ্রোহ করেছিল, ১৩৭৮-৮২ এর মধ্যে ঘেন্ট ও ব্রুজের তাঁতিরা বিদ্রোহ করেছিল। ঐতিহাসিকরা অনুমান করেছেন মধ্য ১৪শ শতকের এসব বিদ্রোহের ওপর মহামারীর প্রভাব ছিল। সামাজিক অস্থিরতা ও অশান্তি তখনাে শেষ হয়নি। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অপশাসন ও কর-ভার কৃষকদের বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ১৪শ শতকের সবচেয়ে বড়াে কৃষক বিদ্রোহ হল ইংলন্ডের ১৩৮১ সালের কৃষক বিদ্রোহ। এই কৃষক বিদ্রোহ ছিল ব্যাপক ও রক্তক্ষয়ী। কৃষকদের ওপর উচ্চহারে ভূমিকর বসানাে হলে কৃষকরা বিদ্রোহ করেছিল। সমকালীন মানুষ এই বিদ্রোহের বর্ণনা রেখে গেছেন। ভূস্বামীরা বাড়তি কর যেমন আদায় করেছিল, কৃষকদের ওপর পুরনাে অধিকার বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল। কৃষকরা ভূমিদাসত্ব ও করভারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল, মজুরি বৃদ্ধি করতে বলেছিল। এই কৃষক বিদ্রোহগুলোর মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের সামাজিক দুর্বলতার প্রকাশ ঘটেছিল। বিদ্রোহগুলো তাদের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি, কিন্তু সামন্ত ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তার অবসান দাবি করেছিল। জার্মানিতেও কৃষক অভ্যুত্থান ঘটেছিল। ১৩৯৫ সালের কাটালোনিয়ার কৃষক-বিদ্রোহও গুরুত্বপূর্ণ।

    কিছু আঞ্চলিক ও প্রকৃতিগত বৈচিত্র্য থাকলেও এগুলির সাধারণ দাবিগুলো ছিল মজুরির অঙ্ক বৃদ্ধি, বেগার শ্রমের অবসান প্রভৃতি। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের দাবিদাওয়া সরকার কখনােই সহানুভূতির চোখে দেখেনি। ১৩৮০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের সরকার পনেরাে বছরের ঊর্ধ্বে প্রায় সবার ওপর সমহারে কর ধার্য করলে গরিব মানুষের দুর্দশা চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌছােয়। এছাড়া ভূস্বামী শ্রেণির চাপের সামনে নতিস্বীকার করে সরকার Statute of Labour প্রণয়ন করে। এই আইনের দ্বারা তারা স্বল্প মাইনে দেওয়ার অধিকার অর্জন করে।

    কৃষক বিদ্রোহগুলো এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিল যে কৃষকেরা ব্ল্যাকডেথের পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে রাজি ছিল না। আর ভূস্বামীরাও এই বাস্তব সত্যটা মেনে নিতে বাধ্য হন যে তাদের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলির সমাধান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই হতে পারে। ম্যানর-প্রভুর ক্ষেতখামারে বেগার-খাটুনীর বিনিময়ে অর্থ দিয়ে অব্যাহতি পাওয়ার রেওয়াজ আগেই শুরু হয়েছিল, ব্ল্যাকডেথের পর তা সার্বজনীন হয়ে ওঠে। আর এই সময় থেকেই ব্যাপকভাবে বার্ষিক খাজনা দানের শর্তে কৃষকদের মধ্যে জমির বন্দোবস্ত করাও শুরু হয়ে যায়। ইংল্যান্ড, এবং ইল্‌ দ্য ফ্রান্স, নরমাঁদি সহ পশ্চিম ইউরােপের বহু দেশে ‘ভিল্যান টেনিওর’ (Villen tenure) প্রায় অবলুপ্ত হয়ে যায়।

    ভূস্বামী শ্রেণি পরবর্তীতে এই বিদ্রোহী কৃষকদের পুরােপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এবং কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে তারা চাষিদের সঙ্গে একটা সমঝােতায় এসেছিল। যেমন উত্তর ইতালিতে তারা ভাগচাষ প্রথা চালু করেছিল। একে বলা হত ‘মেজাড্রিয়া’ (Mezzadria)। ইউরােপের কোনাে কোনাে দেশে আবার ভূস্বামীদের প্রাধান্য কিছুটা ক্ষুন্ন হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস প্রভৃতির কথা বলা যায়। এইসব দেশগুলিতে কৃষক কিছুটা সুবিধা আদায় করতে পেরেছিল। পূর্ব ইউরােপের পরিস্থিতি অবশ্য অন্যরকম ছিল। সেখানে সামন্ততন্ত্র বা Serfdom কোনােটাই দুর্বল হয়নি। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে পূর্ব ইউরােপ ছিল অনগ্রসর এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন।

    কৃষকদের চেতনায় পরিবর্তন

    কৃষক সহ সাধারণ মানুষের আয় বেড়ে গিয়েছিল, কিন্তু বর্ধিত আয় সাধারণ মানুষ কিভাবে খরচ করত, বা নতুন কর ব্যবস্থা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উপর কি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল তা বলা কঠিন। অবশ্য এই বর্ধিত আয় সত্ত্বেও কিংবা এই কারণেই মধ্যযুগের কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা অতৃপ্তির লক্ষণ ফুটে ওঠে। ইউরােপের একটা বিশাল অংশ সামন্ততান্ত্রিক বিধিনিষেধের থেকে মুক্তি পেলেও তাদের সামাজিক মর্যাদার হেরফের হয়নি। এমন বহু কর ছিল যেগুলো কেবল তাদেরই দিতে হতাে, অথবা কৃষক পরিবারের কেউ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যােগ দিতে ইচ্ছুক হলে চার্চের অনুমতি লাভের জন্য যে কর তাকে দিতে হতাে তা সব সময়ে তাকে মনে করিয়ে দিত যে দাসত্বের কিছু কিছু চিহ্ন তখনও তার শরীরে আছে। এই সব বাধ্যতামূলক কর আরও অসহনীয় বলে বিবেচিত হতাে কেননা ২/১ কিঃ মিঃ দূরত্বের ব্যবধানেও এই সমস্ত প্রথা বা বিধিনিষেধের প্রকারভেদ ছিল। ফ্রান্সে শ্যাম্পেন, বার্গান্ডির অংশ বিশেষে এবং ফ্রাঁসকঁত (Frenche Compte) এবং নিভরেন (Nivernais)-তে ভূমিদাস প্রথা ছিলনা, অথচ সে সময় সন্নিহিত মােদক (Medoc)-এ তার অস্তিত্ব ছিল। এই সামাজিক অসাম্য অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে ইউরােপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ ঘনীভূত করে দিয়েছিল। জন বল (John Ball ) এর ‘ইগালিটেরিয়ান’ মতবাদ, (তার সেই প্রসিদ্ধ জিজ্ঞাসা ‘When Adam delved and Eve span, who was then gentleman?’ এ প্রসঙ্গে স্মতব্য) কৃষিজীবিদের মধ্যে যে এ জাতীয় মনােভাব তীব্র করেছিল তা সন্দেহাতীত। মাত্র কয়েক শতাব্দী আগেও দুর্দিনে প্রভুর আশ্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণের বিনিময়ে ভ্যাসালরা বিনা বাক্যব্যয়ে বহু দায়দায়িত্ব বহন করেছিল। কিন্তু ১৫শ শতকে এই অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। স্বাচ্ছন্দ্য ও সচ্ছলতার মধ্যে ‘লর্ড’-কে আর কেউ ত্রাতার ভূমিকায় দেখতে রাজি ছিল না। বিশেষ করে যে সব দেশে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেখানে কৃষক সম্প্রদায় এ সত্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছিলেন যে প্রভুরা কৃপা যতটা করতেন সে তুলনায় আদায় করতেন অনেক বেশি। কৃষক-সমাজ আর বিশেষ কোথাও মূঢ়, বা মুক ছিল না, তাকে বহু দেশেই প্রতিবাদ মুখর, দুরবস্থা মােচনে বদ্ধপরিকর এবং অধিকার অর্জনে উৎসুক হতে দেখা যাচ্ছিল।

    এখানে একটা বিষয় উল্লেখ্য। কৃষকদের অবস্থার এই পরিবর্তন কেবল পশ্চিম ইউরোপের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। পূর্ব ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের পতন হয়নি, বরং এই সময়ে সামন্ততন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটে। পূর্ব ইউরোপে বাণিজ্যের প্রসারের ফলে সেখানকার মানুষের ক্রমশ শিল্পোৎপাদনে মন দেয়, কারণ সেটাই বেশি লাভজনক ছিল। এর ফলে খাদ্যশস্যের পরিমাণ কমে আসে। পশ্চিম ইউরোপের অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে তারা নিজেরা খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়িয়ে এই অভাব পুরণ না করে পূর্ব ইউরোপ থেকে খাদ্যশস্য আমদানী করা শুরু করে। পূর্ব ইউরোপে তাই খাদ্যশস্যের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়, তারফলে সেখানে ম্যানরভিত্তিক সামন্ততন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটে। পশ্চিম ইউরোপের মত সেখানে বাণিজ্যিক শহর প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় ভূমিদাসদের পালিয়ে যাবার কোন জায়গা ছিল না। ভূস্বামীরা তাদেরকে বরং জমির সাথে বেঁধে ফেলেছিল, এবং অনেক ভাবেই তারা করারোপ ও শোষণ করা শুরু করে।

    (তদকালীন পূর্ব ইউরোপের কৃষকদের অবস্থা নিয়ে এখানে খুব কম কথাই লেখা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে চাইলে বলবেন)

    শিল্পোৎপাদন ও বাণিজ্যব্যবস্থায় বিপর্যয়ের প্রভাব

    ১২শ-১৩শ শতকে ইউরোপে বাণিজ্য বিপ্লবের পর ১৪শ শতকে আর্থিক সংকট ও বাণিজ্যের অধােগতি

    ১২শ ও ১৩শ শতকের ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধগুলো ইউরােপীয় নগর অর্থনীতির ব্যাপক প্রসার ও উন্নয়নে সহায়ক হয়েছিল, বিশেষ করে ১৩শ শতক থেকে ইউরােপের অর্থনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছিল। ধর্মযুদ্ধের যুগে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল উন্মুক্ত হওয়ায় পশ্চিম ইউরােপীয় দেশগুলোর ব্যাবসাবাণিজ্যের পরিমাণ উল্লেখযােগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই যুগে ক্রুসেডাররা বাইজান্টাইনদের পরাজিত করে ও সেলজুক তুর্কিদের অধিকার থেকে লেভান্ট (Levant) অর্থাৎ ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত গ্রিস, ইজিপ্টের উপকূলভাগ, আনাতােলিয়া ও সিরিয়াকে মুক্ত করে। এর ফলে পশ্চিম ইউরােপীয় দেশগুলোর ব্যাবসাবাণিজ্যের পরিধি উল্লেখযােগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ার অনিবার্য ফলশ্রুতি ছিল আরও অধিক সংখ্যক শহর, অধিকতর ট্রান্সেকশন বা লেনদেন, ব্যাপক মার্কেট ইকোনমি বা বাজার অর্থনীতির বিকাশ এবং সামন্ততন্ত্রের অবক্ষয়। আর একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এই পর্বে অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে সহায়তা করেছিল, সেটি হচ্ছে মধ্য এশিয়ায় মঙ্গোল আক্রমণের ফলে চিন-ভারত ও ইউরােপের মধ্যে সংযােগরক্ষাকারী বাণিজ্যপথ ‘রেশম পথ’ (Silk Route) বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রধানত এই কারণে কৃষ্ণসাগর অঞ্চল থেকে নতুন স্থল ও জলপথ আবিষ্কার করা হয় এবং এই আবিষ্কার ইউরােপীয় বাণিজ্যিক শ্রীবৃদ্ধির অন্যতম কারণ ছিল।

    ক্রুসেডের শেষ দিক থেকে অভিজাতরা শহর ও বাজার বসিয়ে আয়ের ব্যবস্থা করেছিল। ক্রুসেডের পর পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য বেড়েছিল, ইতালির নগর-রাষ্ট্র মিলান, ভেনিস, ফ্লোরেন্স ও পিসা এজন্য লাভবান হয়েছিল। বাণিজ্য বৃদ্ধি অর্থনীতিতে অনেকগুলি পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। এর ফলে পশ্চিম ইউরােপে বাজার-অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা হয়, মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে, নগরায়ণ সম্প্রসারিত হয়। এতে ইউরােপের মানুষের মনােজগতের সংকীর্ণতা দূর হয়ে যায়। এরফলে ১৪শ শতকের আগেকার স্বয়ম্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে মুদ্রাঅর্থনীতি চালু হয়, ইউরােপের অর্থনৈতিক জীবনে পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। মধ্যযুগের বাণিজ্য বিপ্লবের ফলে ইতালির নগর-রাষ্ট্রগুলো লাভবান হয়েছিল। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের যুগে ভেনিস পূর্ব ইউরােপে ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড়াে অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ফ্লোরেন্সের স্বর্ণমুদ্রা প্রাচ্যের আরবদের স্বর্ণমুদ্রা দিনারের স্থান নিয়েছিল। ইউরােপের বাণিজ্যিক লেন-দেনে ফ্লোরেন্সের মুদ্রা গ্রহণ করা হত। ১৩শ শতকে ভেনিস নিজের স্বর্ণমুদ্রা চালু করেছিল। ক্রুসেডের সময় দক্ষিণ ইতালির নগর রাষ্ট্রগুলি সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। ক্রুসেডের পরিবহন, রসদ, সমর সম্ভার, অস্ত্রশস্ত্র ইতালির নগর-রাষ্ট্রগুলো সরবরাহ করেছিল। জেনােয়া ও ভেনিস প্রাচ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কুঠি স্থাপন করেছিল।

    নতুন এবং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ‘বাণিজ্য বিপ্লব’ (commercial revolution) সৃষ্টিতে সহায়তা করেছিল। মার্ক ব্লখ তার Feudal Society গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে ‘The Economic Revolution of the Second Feudal Age’ বা ‘দ্বিতীয় সামন্তযুগের অর্থনৈতিক বিপ্লব’ আখ্যা দিয়েছেন। এই আর্থিক অগ্রগতির চিত্র Robert S. Lopez-এর The Birth of Europe-এ বর্ণিত হয়েছে। লােপেজ অবশ্য ‘বিপ্লব’ কথাটি ব্যবহারের পক্ষপাতী নন। কিন্তু ইউরােপীয় জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি দেখা দিয়েছিল, তার প্রভাব তিনি পুরােপুরি অস্বীকার করেননি। এই যুগে ফ্লোরেন্স, লুকা, জেনােয়া, মিলান প্রভৃতি নগরগুলি অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র রূপে গড়ে উঠেছিল। ব্যাবসাবাণিজ্য ছাড়া শিল্পোৎপাদন এবং উৎসাহী উদ্যমী পুঁজিপতিদের নিয়ে ইতালির উপরােক্ত বর্ধিষ্ণু নগরগুলো এক বিশিষ্ট রীতির রাজনৈতিক কাঠামো সৃষ্টি করেছিল, এই কাঠামাে ছিল নগররাষ্ট্র কেন্দ্রিক প্রজাতন্ত্র। শিল্পবাণিজ্যজাত এই নগর জীবনে সমৃদ্ধি রেনেসাঁসের উদ্ভব ও বিকাশে সহায়তা করেছিল।

    তবে নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে এই ‘বাণিজ্য বিপ্লব’ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ১৩শ শতকের অন্তিম পর্ব থেকে যে আর্থিক অধােগতির সূচনা হয়, ১৪শ শতকে তার অবক্ষয়ী রূপ অত্যন্ত প্রকট হয়ে ওঠে। আর্থিক বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির মতাে এই আর্থিক সংকটের একটি অন্যতম কারণ হিসেবেও ছিল ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ। যে ধর্মীয় উন্মাদনা ক্রুসেড এবং বাণিজ্যিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছিল (একটি অপরটির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল) ক্রুসেডের অবসানে সেই উন্মাদনা স্তিমিত হয়েছিল – আর্থিক বাণিজ্যিক অধােগতির সূচনাও তখনই। শুধু তাই নয় ক্রুসেডের পরবর্তীকালে মুসলমানদের পালটা অভিযান শুরু হলে ও তারা সাফল্য অর্জন করলে আর্থিক সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। এই পর্বে ইউরােপীয়রা পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৪৫৩ সালে মুসলমানদের হাতে পদানত হয় কনস্টানটিনােপল যার নতুন নামকরণ হয় ইস্তাম্বুল।

    ১৪শ শতকে ইতালির নগররাষ্ট্রগুলোর বাণিজ্য ছেড়ে শিল্পোৎপাদনে মনোনিবেশ

    বাণিজ্যের অধোগতির সূচনা হলে ১৪শ শতকে এসে ইতালির নগর-রাষ্ট্রগুলো শুধু বাণিজ্য নিয়ে আর সন্তুষ্ট থাকলো না। তারা শিল্প পণ্য উৎপাদনের কাজে অর্থ বিনিয়ােগ করা শুরু করল। রেশম শিল্প ও রঙ শিল্পের জন্য ফ্লোরেন্স খ্যাতি অর্জন করেছিল। লুকাতে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট রেশম উৎপন্ন হত, বােলন্যা ছিল জুতা তৈরির জন্য বিখ্যাত, ক্রিমােনা ও ব্রেসসিয়া তুলা ও পশমের মিশ্র পােষাক ও অস্ত্র-শস্ত্র তৈরি করত। ভেনিস পরিবহনে খুব উন্নতি করেছিল, তার পণ্যতরী স্যালি যেত কৃষ্ণসাগর, ইজিয়ান সাগর, প্যালেস্টাইন, আলেকজান্দ্রিয়া, মাদ্রিদ, মার্সেই, বার্সিলােনা, লন্ডন ও ব্রুজেসের বন্দরে। পশ্চিম ইউরােপে মশলা ও সুতিবস্ত্রের চাহিদা ছিল। ফ্লোরেন্সের মেদিচি পরিবার ব্যাঙ্কিং কাজকর্ম ও ব্যবসা সারা ইউরােপে ছড়িয়ে দিয়েছিল। ১৪শ শতকে জনসংখ্যা হ্রাসের ফলে রাজস্ব ও রাজকোষে টান পড়লে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে, তারা ক্রমশ ঋণ-নির্ভরশীল হয়। এতে ঋণের বাজার, ব্যাঙ্কিং খাত বিকশিত হয়। আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং কারবারে ইতালির নগর-রাষ্ট্রগুলোর বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল। তবে অন্যান্য দেশ, যেমন জার্মানি ও হল্যান্ডের কয়েকটি পরিবার, একই সঙ্গে ব্যাঙ্কিং ও বাণিজ্যের কাজ করত। ফ্লোরেন্স শিল্পের চেয়ে ব্যাঙ্কিং-এর ওপর বেশি নির্ভর করেছিল। উত্তর ইউরােপের সঙ্গে ইতালির বণিকদের তেমন যােগাযােগ ছিল না, এই বাণিজ্যে প্রাধান্য ছিল জার্মানির হান্‌স বণিক বা হান্সিয়াটিক লীগের (Hanseatic League)। এটি ছিল জার্মান বণিকদের একটি শিথিল সংগঠন। বণিকরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে চলত, লন্ডন থেকে মস্কোভি পর্যন্ত এদের কাজকর্ম প্রসারিত ছিল। এদের বাণিজ্যিক পণ্যের মধ্যে ছিল রাশিয়ার পশম, প্রাশিয়ার শস্য, বাল্টিক অঞ্চলের কাঠ, উত্তরের হেরিং মাছ, ফরাসি মদ, লবণ এবং ইংলন্ড ও ফ্রান্ডার্সের বস্ত্র। ১৪শ শতকে হান্‌স বণিকদের বাণিজ্য অব্যাহত গতিতে চলেছিল।

    ১৪শ শতকে বড়াে পশম শিল্প ছিল ফ্লান্ডার্স অঞ্চলে, ইংল্যান্ড থেকে পশম এখানে রপ্তানি হত। ইপ্রে, মেসিন, ব্রুজ ছিল এখানকার শিল্পাঞ্চল। পশম ছাড়া ছিল কাঠ শিল্প, মােটা কাপড়, মাস্তুলের কাপড় ও খাদ্যশস্য উৎপন্ন হত। উত্তর থেকে ফ্লান্ডার্স হয়ে ভূমধ্যসাগর ও উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত একটি বাণিজ্যিক বৃত্ত তৈরি হয়েছিল, এর পশ্চিমে ছিল মধ্য এশিয়া, পূর্বে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ। এই অর্থনৈতিক বৃত্তের মধ্যে ছিল আইরিশ সাগর, ইংলিশ চ্যানেল, উত্তর সাগর, বাল্টিক সাগর, কৃষ্ণ সাগর ও ভূমধ্যসাগর। ১৩শ শতকে এসব অঞ্চলে ভাল ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল। ফ্ল্যান্ডার্স ও শ্যামপেনের মেলায় বণিকরা সমবেত হয়ে বেচাকেনা করত। প্রতি দুমাস অন্তর শ্যামপেনের মেলা বসত, উত্তর ও দক্ষিণ থেকে বণিকরা এসে নমুনা দেখে পণ্য কেনার ব্যবস্থা করত। ইতালির বিভিন্ন থাকা ব্যাঙ্কিং ও স্টক এস্কচেঞ্জ মুলধনের জোগান দিত। শ্যামপেনের বাণিজ্য প্রমাণ করে যে বাণিজ্য বিক্ষিপ্তভাবে পরিচালিত হত না, সমগ্র ইউরােপ ও মধ্য-এশিয়া জুড়ে নানা ধরনের পণ্যের বিনিময় ছিল। ১৩শ শতকের বাণিজ্য বিপ্লব মূলধন, পরিবহণ ও লেনদেনের ব্যবস্থা করেছিল। জার্মানি ও অস্ট্রিয়া থেকে রূপা ও তামার নিষ্কাশন শুরু হলে বণিকরা সমাজে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল, এতে সামন্তদের আধিপত্য কমেছিল। ১৩শ শতকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য অবক্ষয়ের মুখে পড়লে ভেনিস লাভবান হয়। মােঙ্গলরা মধ্য এশিয়ায় আধিপত্য স্থাপন করলে কৃষ্ণসাগর থেকে জল ও স্থলপথে প্রাচ্যের সঙ্গে যােগাযােগ স্থাপিত হয়।

    বাণিজ্যে অবক্ষয় ও অস্থিতিশীলতা

    ১৪শ শতকের ইউরােপের এই নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না, অল্প আঘাতে তার বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা ছিল। মুসলিম বিশ্ব, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ও পশ্চিম ইউরােপের মধ্যে সংঘাত এই সদ্য প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারত। ১৩শ শতকের শেষদিকে এমন একটি বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। ক্রুসেড বন্ধ হয়েছিল, প্রাচ্যের আক্রে খ্রিস্টানদের হাতছাড়া হয়ে যায়, ইউরােপ কার্যত পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। মধ্য এশিয়ার রেশম পথ মোগল আক্রমণের জন্য অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। ১৪শ শতকের গােড়াতে শ্যামপেনের মেলার পতন শুরু হয়েছিল।

    এসময় চাহিদা ও সরবরাহের মৌলিক নিয়ম অনুযায়ী খাদ্যশস্যের দাম বৃদ্ধি পায়নি, বরং পূর্ব ইউরােপ থেকে প্রচুর আমদানির ফলে বিভিন্ন খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কৃষিজীবীরা লাভের আশায় আরাে বেশি পরিমাণ কৃষিপণ্য বাজারজাত করায় চাহিদা ও সরবরাহের অসঙ্গতি ক্রমবর্ধমান হতে থাকে। অন্যান্য নিত্যব্যবহার্য পণ্য, গৃহস্থালীর দ্রব্যাদি, আসবাবপত্র, কাঠ ও ধাতুর দ্রব্য সম্ভার এবং গৃহনির্মাণ শিল্পের ওপর ব্ল্যাকডেথের প্রক্রিয়ার সঠিক পরিমাপ করা দুঃসাধ্য।

    এই সময়ে ফ্লাঁদর বা ফ্ল্যান্ডার্সের বস্ত্রশিল্পের মন্দা ও ইংল্যান্ডের এই শিল্পের উন্নতি যে কিছু পরিমাণে সমতা রক্ষায় সাহায্য করেছিল তা নিশ্চিত। ১৪৫১ থেকে ১৪৮০ সাল পর্যন্ত তিন দশকের ব্যতিক্রম সত্ত্বেও ইংল্যান্ডে উৎপন্ন বস্ত্র ও উলের দাম হ্রাস পায়নি, রপ্তানীতেও উল্লেখযােগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। ডেভন ও কনওয়ালের টিন উৎপাদনও হ্রাস পায়নি। কিন্তু ইউরোপের সর্বত্র দামী ধাতুর, বিশেষ করে রপাের সরবরাহে ঘাটতি দেখা গিয়েছিল, আর এই কারণেই বিভিন্ন অঞ্চলে মুদ্রা-ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

    ১২শ শতক থেকেই ইউরোপের অর্থনৈতিক অবস্থা যে সমৃদ্ধ রূপ নিয়েছিল ১৪শ শতক অতিক্রান্ত হবার আগেই তার চরিত্র এবং প্রবণতা পাল্টে যায়। মধ্যযুগের শেষের দিকে ইংল্যান্ডের বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশে হল্যান্ড, ব্রাবাল্ট-এর ক্রমাবনতি লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছিল। ফ্ল্যান্ডার্স এবং ইতালীর কোনও কোনও বাণিজ্যকেন্দ্রের গৌরবের দিন যে শেষ তাও বােঝা কঠিন ছিল না। এই দুত পরিবর্তনশীলতার পেছনে একাধিক কারণ সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। কখনও কখনও চাহিদার পরিবর্তনের ফলে, কখনও বা রপ্তানীর ক্ষেত্রে হেরফের বাণিজ্যিক ধারাবাহিকতা ক্ষয় করে দিয়েছিল। কখনও বা রাজনৈতিক কারণকে বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর উল্লেখযােগ্য উত্থান-পতনের সূচনা করতে দেখা যায়। ব্রুজ-এর বিরদ্ধে অ্যান্টোয়ার্পকে সমর্থন করে বার্গণ্ডির ডিউক ঐ প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্রটির প্রভূত ক্ষতিসাধন করেছিলেন। আরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছিল তৈমুরলঙ্‌ -এর সমরাভিযানের ফলে।

    আবার এই পর্বে ইউরােপের অভ্যন্তরে এক অংশের সঙ্গে অন্য অংশের খাদ্যশস্য উল, কাঠ, মদ্য, সূতী ও পশমীবস্ত্র ইত্যাদি পণ্যের আমদানী-রপ্তানীর উৎস এবং ক্ষেত্রের আমূল পরিবর্তনও সূচিত হয়েছিল। ১৪শ শতকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিলাস দ্রব্যাদি, রেশমী বস্ত্র-সম্ভার ও মশলার আমদানী-রপ্তানী মুখ্য স্থান নেয় এবং নুরেমবার্গ, র‍্যাভেন্‌সবার্গ সহ দক্ষিণ জার্মানীর কয়েকটি নগর, সেভিল, কাস্টিল এবং ইংল্যান্ডের বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো এই ব্যবসায় ইতালীর বাণিজ্যকেন্দ্রগুলি ও হান্সিয়াটিক লীগের একাধিপত্য নষ্ট করে দেয়।

    হান্সিয়াটিক লীগের দুর্বল হয়ে পড়া ইউরােপে মন্দার একটি অন্যতম কারণ, এদের পতন আসন্ন ছিল। এদের বাণিজ্যে লাভ কম হত, মূলধনের সরবরাহ ছিল অপ্রতুল, ইতালির নগর-রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে এরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি। উত্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে এদের বাণিজ্য কমেছিল, ব্রুজের উত্থান হান্স লিগের পতনের কারণ হয়েছিল।

    ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার পরিবর্তে সচলতা, প্রতিযােগিতা, দ্রুত পট-পরিবর্তন এ সময়ের বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে, যদিও আগের যুগের তুলনায় আমদানী-রপ্তানীর সামগ্রিক পরিমাণের বিশেষ হেরফের হয়নি।

    শিল্পোৎপাদনে অধোগতি ও বাণিজ্যে রক্ষণশীল প্রবণতা

    সমস্ত ১৪শ শতক ধরে লোকসংখ্যা হ্রাস অব্যাহত ছিল, ফলে শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, শিপােৎপাদনের ক্ষেত্রেও মন্দার ভাব প্রকট হয়ে ওঠে। জনসংখ্যা হ্রাসের প্রবণতা অক্ষুন্ন থাকায় শিল্পোৎপাদন উল্লেখযােগ্যভাবে হ্রাস পায়। পরবর্তী শতাব্দীর ইউরােপের পক্ষে ১৩৪৮ সালের আগের অর্থনৈতিক জীবনের তৎপরতার মধ্যে ফিরে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি। এইপর্বে ইউরােপে বহু গৃহ, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি নির্মাণ প্রকল্প পরিত্যক্ত হয়েছিল।

    এই সময় ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক-সংস্থা ছিল গিল্ডগুলো। জনসংখ্যা হ্রাসের ফলে কারিগর ও কর্মীর অভাবে গিল্ডগুলোর আর্থিক ক্রিয়াকলাপ প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায়। সমকালীন ইউরােপে যেসব ছােটোখাটো কলকারখানা ছিল তাও শ্রমিকের অভাবে কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। যন্ত্রপাতি মেরামতির লােক পাওয়া যেত না। সেই যুগের কাগজ মাঝে মাঝেই মজুর বা মেরামতির কারিগর চেয়ে বিজ্ঞাপন দিত, এতে উপযুক্ত বা মােটা অঙ্কের পারিশ্রমিকের প্রতিশ্রুতি থাকত, কিন্তু তা সত্ত্বেও লোক পাওয়া যেত না।

    এই সময়ে গিল্ডগুলোকে পণ্য উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে অতি সতর্ক, নবাগতকে গ্রহণের ব্যাপারে অতি কৃপণ দেখা যায়। পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়ার ব্যাপারেও গিল্ডগুলো তৎপর হয়ে উঠেছিল। এ ব্যবস্থা খরিদ্দারের স্বার্থে গ্রহণ করা হলেও কখনও কখনও উৎপাদকের লাভের দিকে দৃষ্টি রেখে তা পরিচালিত হতো।

    দ্বিতীয় রিচার্ডের আমল থেকেই ইংল্যান্ডে মার্কেন্টাইল মতবাদের সূচনা লক্ষ্য করা যায় এবং আমদানী যথাসম্ভব কম রেখে রপ্তানী বৃদ্ধির জন্য বণিকরা উৎসাহিত হন। ১৫শ শতকে বিদেশী বণিকদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টাও শুরু হয়ে যায়। জার্মানীতে হান্সিয়াটিক লীগের সদস্যবর্গ কর্তৃক বাল্টিক সাগরীয় বাণিজ্য থেকে ইংরেজ বণিকদের বিচ্ছিন্ন করার অসফল প্রচেষ্টাও ছিল এই মনােভাব-প্ৰসূত।

    কিছু ইতিবাচক দিক, কয়েকটি শহরে অর্থনৈতিক বিকাশ ও অর্থনীতির কেন্দ্র ব্রুজ

    এই সময়ের শিল্প ও বাণিজ্যে অবক্ষয় ও রক্ষণশীলতা থাকলেও সেটাই শিল্প-বাণিজ্যের সামগ্রিক দিক নয়। মনে রাখতে হবে, ১৪শ শতকে ইউরােপের জনসংখ্যা ৩০ থেকে ৫০% হ্রাস পেয়ে গিয়েছিল এবং ইউরােপের বাণিজ্যের উত্থান-পতন সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আলোচনা করা উচিত। বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে বাণিজ্যের আধােগতি ছিল ঠিক। কিন্তু ভূস্বামীদের আয় হ্রাস ও মজুরির পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে এইসময়ে কৃষক-শ্রমিকদের আয় বেড়ে যায়, ফলে পশ্চিম ইউরোপে আর্থিক বৈষম্য হ্রাস পায় ও মাথাপিচু আয় বৃদ্ধি পায়। কৃষক ও শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে, তারা অধিক পরিমাণে পণ্য কিনতে সক্ষম হলে বাণিজ্য ও শিল্পোৎপাদন পুনরায় শক্তিশালী হতে শুরু করে, যা ১৫শ শতকে দেখা যায়।

    কাঁচামাল রপ্তানী কমিয়ে দিয়ে ১৩শ শতক থেকে ইংল্যান্ড যে তৈরি বা আধা-তৈরি পণ্য রপ্তানী শুরু করেছিল তাতে ইংরেজ বণিকদের এবং এই শিল্পে নিযুক্ত সকলেরই লাভের মাত্রার উল্লেখযােগ্য বৃদ্ধি হয়। আবার ফ্লেমিশ নগরগুলোর বস্ত্র-উৎপাদক, ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলের যুদ্ধবিগ্রহে-বিপর্যস্ত-কৃষক সম্প্রদায় এবং পূর্ব ইউরােপের সার্ফদের জীবনযাত্রার মানের প্রায় কোনও উন্নতি হয়নি। কিন্তু এই দৃষ্টান্তগলো দিয়ে সমগ্র মহাদেশ সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্তে আসা উচিত হবে না।

    ১৪শ শতকের ইউরােপে কয়েকটি শহরকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কাজকর্মের বিকাশ ঘটেছিল। উত্তর ইতালি, দক্ষিণ জার্মানি, উত্তর ফ্রান্স, ফান্ডার্স ও দক্ষিণ ইংল্যান্ড হল সমৃদ্ধ অঞ্চল, এসব অঞ্চলের শহরগুলোতে শিল্প পণ্য উৎপন্ন হত, বাণিজ্যও চলত। ফ্লান্ডার্স অঞ্চলে ইপ্রে (Ypres), ঘেন্ট, ব্রুজ, লিজ ছিল শিল্প শহর। উত্তর ফ্রান্সে ছিল তাম্র শিল্প, রাইনল্যন্ড ও দক্ষিণ জার্মানিতে ছিল বস্ত্র ও ধাতু শিল্প, ইউট্রেক্ট, কোলন, মেজ ও ওয়ার্মস ছিল শিল্প শহর।

    শ্যামপেনের অবক্ষয় দেখা দিলে ফ্লান্ডার্স অঞ্চলে ব্রুজ (Bruges) ছিল ইউরােপীয় অর্থনীতির একটি প্রধান কেন্দ্র, মধ্য ইউরােপ ও দক্ষিণ জার্মানির গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল। ভূমধ্যসাগর ও ফ্রান্ডার্সের মধ্যে প্রত্যক্ষ যােগাযােগ ব্যবস্থা স্থাপিত হয়। ব্রুজ ছিল বস্ত্র শিল্পের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত, এখানে বস্ত্র রঙ করার শিল্প ছিল। ইংল্যান্ড থেকে এখানে বস্ত্র রঙ করার জন্য পাঠানাে হত। ব্রুজ সব ধরনের পণ্যের বাণিজ্য করত, কাঠ, শস্য, বস্ত্র ও মদ ছিল প্রধান। ইতালির বণিকরা এখানে ভূমধ্যসাগরীয় পণ্য, মদ, অলিভ তেল, ফল, লবণ, প্রাচ্যের বস্ত্র ও মশলা নিয়ে আসত। ফ্লোরেন্স ব্রুজ শহরে প্রথম স্টক এক্সচেঞ্জ (১৩০৯) গড়ে তুলেছিল। এই ব্যবস্থার ফলে মূলধনের জোগান ও বিনিময় অব্যাহত গতিতে চলেছিল।

    শ্রমিক শ্রেণীর উন্নতি ও শিল্পোৎপাদনে দক্ষ কারিগরের ব্যবহার

    রাজস্ব সঙ্কুচিত হওয়ায় ভূস্বামী শ্রেণীর আয় হ্রাস পায় এবং মজুরী বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ঘটে। এর ফলে আগের শতাব্দিগুলোর থেকে ১৫শ শতকে জাতীয় আয় অধিকতর সমভাবে বন্টিত হতে শুরু করে। এর সূচনা ১৪শ শতক থেকেই দেখা গিয়েছিল, আর ১৪শ শতকের পরিবর্তনগুলোর ফলেই পশ্চিম ইউরোপে এই আর্থিক বৈষম্য হ্রাস ও শ্রমিকদের অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব হয়েছিল।

    জনসংখ্যার অভাবের ফলে শহরগুলোতে শিল্পোৎপাদনের জন্য শ্রমিকের অভাব সৃষ্টি হলে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি পায়। এছাড়া মৃত্যুর হার অনেক বেশি হওয়ায় অনেক পন্য অবিক্রীত অবস্থায় থেকে গেছিল, অর্থাৎ পণ্যদ্রব্যের জোগান বৃদ্ধি পেয়েছিল, ফলে জিনিসপত্রের দাম যথেষ্ট কমেছিল। এসব কারণেই যেসব শ্রমিক বেঁচে ছিল মজুরি বৃদ্ধির ফলে আয় বৃদ্ধি ও পণ্যের দাম কমায় তাদের ব্যয় হ্রাসের ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান অপেক্ষাকৃত উন্নত হয়েছিল।

    ১৪শ শতকের মহামারীর ফলে তিনটি কারণে পশ্চিম ইউরােপের সর্বত্র শ্রমিক বা কারিগর শ্রেণীর অবস্থার উন্নতি ঘটেছিল – মৃত কারিগরদের যন্ত্রপাতি সহজে ও সুলভে হৃতাবশিষ্টের হাতে এসে যাওয়া, মজুরি বৃদ্ধির এবং খাদ্যশস্যের মূল্য হ্রাস পাওয়া। বিশেষ করে দক্ষ কারিগর জীবনযাপনের মানােন্নয়ন অভাবিত বলে মনে হয়। জার্মানীতে প্রতিটি নগর নিজেদের বীয়ার এবং সসেজ-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও সহজলভ্যতার প্রমাণ দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সাদা রুটি ও মদ্য শ্রমিক শ্রেণীর নাগালের মধ্যে আসে। অবশ্য বিপজ্জনক ব্যাধির প্রতিরােধের মতাে শারীরিক পুষ্টি তখনও সাধারণের অনায়ত্ত ছিল। ফলে যে কোনও রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে রােগাক্রান্তের সংখ্যা অতি দ্রুত স্ফীত হওয়ায় এবং নীরােগের প্রাণভয়ে গ্রামাঞ্চলে আশ্রয় নেওয়ার জন্য নগরের স্বাভাবিক কাজকর্ম প্রায়ই স্তব্ধ হয়ে যেতাে।

    এই সময়েই শিল্পোৎপাদনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক শিক্ষানবিশী ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়। যে সমস্ত কারিগরী-বিদ্যা আয়ত্ত করতে ২/৩ বছরের বেশি লাগবার কথা নয় তার জন্যেও ৭ বছর শিক্ষানবিশীর কাল ধার্য করা হয়েছিল। এই শিক্ষানবিশদের কাজে লাগিয়ে দক্ষ কারিগর, মজুরীবদ্ধির সময়েও, সস্তায় শিল্পোৎপাদন করতে সফল হতেন।

    এসময়ে কারিগরদের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ঘটলেও এদের মধ্যে সামন্তপ্রথা অটুট ছিল। শিল্পে তিন ধরনের কারিগর ছিল – মাস্টার, জানিম্যান ও অ্যাপ্রেন্টিস। মাস্টারের সঙ্গে অ্যাপ্রেন্টিসের প্রায় সামন্ত সম্পর্ক ছিল, তবে গ্রামের ভূমিদাস কাজের সন্ধানে শহরে মাস্টারের কাছে গিয়ে হাজির হত।

    গিল্ড ও শ্রমিকদের বিদ্রোহ

    ইউরােপে শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গিল্ডগুলো বিশেষ শিল্পের স্বার্থরক্ষা করত। শিল্প পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ, মূল্য ইত্যাদির ওপর গিল্ডগুলো প্রাধান্য স্থাপন করেছিল। শহরের শিল্প সংস্থাগুলো সামন্ততান্ত্রিক অভিজাত নিয়ন্ত্রিত শহর কাউন্সিলগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করত, শহরের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মূলধন, ঋণ সব অভিজাত ও ধনী বণিকরা নিয়ন্ত্রণ করত, শহর কাউন্সিলে এরাই ছিল সর্বেসর্বা। শহর কাউন্সিলে গিল্ডগুলো অধিক প্রতিনিধিত্বের দাবি তুলেছিল। ফ্ল্যান্ডার্স, রাইনল্যান্ড ও ইতালিতে শিল্প গিল্ডগুলো শহর কাউন্সিলগুলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, শিল্প থেকে প্রতিনিধিত্ব বাড়ানাে হয়েছিল। ইউট্রেক্ট ও কোলনেও এই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। ঐতিহাসিকরা ১৪শ শতকের শিল্পী-কাবিগরদের এই বিদ্রোহকে শ্রেণীসংগ্ৰাম বলেছেন। অনেকের মতে, এই বিদ্রোহ ছিল গণতান্ত্রিক বিপ্লব, তথ্য দিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানাে যায় না। গিল্ডগুলোর মধ্যেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটত। শ্রমিকরা বণিকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিল, ইতালি, ফ্লান্ডার্স ও ফ্রান্সে গিল্ডগুলো ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নেমেছিল।

    প্লেগের পটভূমিকায় উৎপাদন কমলে শ্রমিক ছাঁটাই হয়। শ্রমিকরা নতুন করে শ্রমিক নিয়ােগ ও মজুরি বৃদ্ধির দাবি নিয়ে আন্দোলন করে। উৎপাদক ও শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ ছিল। এসব শ্রমিক ছিল গ্রামের ভূমিহীন কৃষক, ১৪শ শতকে শহরেও এরা জীবনের নিরাপত্তা পায়নি, তাদের মধ্যে বিক্ষোভ গড়ে ওঠা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা।

    ধর্মবিশ্বাস, কুসংস্কার, ভয় ও ইহুদি নির্যাতন

    কিন্তু আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটলেও সমাজ-জীবনের অন্যান্য দিকগুলি ১৪শ শতকের মহামারীর ফলে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মত্যুর এই যথেচ্ছ বিচরণ সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসে প্রচণ্ড ঘা দিয়েছিল। ধর্ম বিশ্বাসের স্থান নিয়েছিল বিচিত্র, অগণিত কুসংস্কার। জীবনের চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার সংখ্যাতীত দৃষ্টান্ত, মৃত্যু সম্পর্কে অস্বাস্থ্যকর ভাবনা মানুষকে আচ্ছন্ন করেছিল। ইউরােপের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু চার্চে এবং সমাধিফলকে এই নৈরাশ্য বিধৃত হয়ে আছে। গীর্জা ও মঠগুলির বহিরঙ্গের অলঙ্করণ থেকে দিব্য জীবনানন্দের প্রকাশ, পুণ্যের দীপ্তির প্রস্ফুটন বিদায় নিয়েছিল, আর তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল নরক-যন্ত্রণার বিভিন্ন ভয়াবহ দৃশ্য, শেষের সে-ভয়ঙ্কর-দিনের-কথা অহরহ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। চার্চগুলিতে তালা ঝুলতে লাগল, confessions বন্ধ হয়ে গেল। কে কাকে শােনাবে? নৈরাশ্য আর হতাশায় ছেয়ে গিয়েছিল সমকালীন জনমানস। ঈশ্বর কেন মানবজাতিকে এমন ভয়ংকর শাস্তি দিলেন? কোন্ অপরাধে তারা আজ এত বিপর্যস্ত এবং বিপন্ন? – এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বহু মানুষ এই সিদ্ধান্তে এসেছিল যে মহাপ্রলয় এবং পৃথিবীর (সভ্যতার) অবসান আসন্ন।

    সমকালীন শিল্পে, স্থাপত্যে, ভাস্কর্যে এবং সাহিত্যে এই হতাশা ও ভয়াবহতা প্রকট হয়ে উঠেছে। পিসার ক্যাম্পো শান্তোর (Campo Santo) ফ্রেস্কোগুলি আঁকার সময় জীবনের অনিত্যতা চিত্রণ ছাড়া মহত্তর কোনও অনুভূতি দ্বারা উদ্দীপিত হননি শিল্পী। বলিষ্ঠ জীবনবােধ হারিয়ে মানুষ যে স্বাভাবিকতার দিকে ঝুঁকেছিল, তার অভ্রান্ত প্রমাণ পাওয়া যায় চতুর্দশ শতকের শেষার্ধে এবং গােটা পঞ্চদশ শতকের ফ্লাজিলান্ট (Flagellant) আন্দোলনের মধ্যে। অনুতাপ প্রকাশ এবং প্রায়শ্চিত্ত করার এই বিকৃত আতিশয্যকে কোথাও কোথাও (যেমন দক্ষিণ জার্মনীতে) ইহুদী নির্যাতনের রূপ নিতেও দেখা গিয়েছিল।

    মানসিক সুস্থতার এই অভাবের জন্য, এবং সেবা ও সাহায্য আর অনুসরণযােগ্য সামাজিক-ধর্ম বলে বিবেচিত হচ্ছিল না বলেই হয়তো ইউরােপের বিভিন্ন অঞ্চলের দাতব্য ও সেবা প্রতিষ্ঠানের উৎসগুলো সঙ্কীর্ণতর হতে থাকে এই সময় থেকে। মহামারীর সময়ে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। শােনা যায়, কেম্ব্রিজের ৪০জন অধ্যাপকের মধ্যে প্রায় ১৬ জন প্লেগাক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন।

    অন্যান্য অবস্থাসমূহ

    দর্শনশাস্ত্রের অবস্থা

    ইউরােপের চিন্ময় জগতেও এই অধ্যায়ে যে আত্মতৃপ্তির ভাব ফুটে উঠেছিল তা নিঃস্বতারই নামান্তর, ফুরিয়ে যাওয়ার বহিঃপ্রকাশ। দর্শনের ক্ষেত্রে অবরােহী পদ্ধতির (deductive) সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ওখামের উইলিয়ম (William of Okham) (১৩৪৯ খ্রি.) সচেতন হলেও মানসিক দিগবলয় প্রসারিত করার কোনও নতুন পথ তিনি খুঁজে পাননি। মুদ্রণ যন্ত্র তখনও অনুদ্ভাবিত থাকায় পুঁথিপত্র দুর্লভ হয়ে উঠেছিল এবং বিশাল ধ্রুপদী সাহিত্যের অন্তর্গত বহু গ্রন্থ তখনও অনাবিষ্কৃত ও অনালোচিত থেকে যাওয়ায় ১৫শ শতকে স্কলাস্টিসিজম অর্থহীন ও বন্ধ্যা পুনরাবৃত্তিতেই আবদ্ধ হয়েছিল। প্রগতির লক্ষণ ফুটে উঠেছিল একমাত্র কনসিলিয়ার (Conciliar) আন্দোলনের মধ্যে, আর মৌলিকতায় ভাস্বর হয়েছিলেন পারী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যারসনের মতো অল্প কয়েকজন চিন্তানায়ক। ধর্মচারণকে যুগােপযােগী করে তােলার চেষ্টাও একমাত্র ‘Brethreu of the Common Life’ প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ‘ব্ল্যাকডেথের’ অব্যবহিত পরে যে ইউরােপের পরিচয় পাওয়া যায় তা একটি পরিশ্রান্ত, স্থবির, হতােদ্যম মহাদেশের।

    রাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধবিগ্রহের সাথে বিপর্যয়ের সম্পর্ক

    গােটা ১৪শ শতক ধরে একটি অন্যতম সমস্যা হল যুদ্ধ। সামন্তপ্রভুরা পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। সামন্তপ্রভুদের যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর প্রকোপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। রাজারা রাজতন্ত্র গঠনের কাজে নিযুক্ত ছিল, রাজ্য বিস্তারের জন্য আগ্রাসী যুদ্ধ চলেছিল। এই পর্বে শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ (১৩৩৮-১৪৫৩) শুরু হয়েছিল, ফ্রান্স ও ইংলন্ডের মধ্যে একশাে বছরের অধিকাল ধরে এই যুদ্ধ চলেছিল। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ওপর এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাব পড়েছিল, দুই দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছিল। অন্যান্য ইউরােপীয় দেশে রাজনৈতিক অশান্তি ও দ্বন্দ্ব চলেছিল। ১৪৬২-৭২ পর্যন্ত স্পেনের ক্যাটালােনিয়া প্রদেশে গৃহযুদ্ধ চলেছিল। সারা চতুর্দশ শতাব্দী ধরে ইতালিতে রাজনৈতিক সংঘাত ছিল। নগর-রাষ্ট্রগুলি আধিপত্য লাভের আশায় সংঘাতের পথ ধরেছিল। দক্ষিণ ইতালি, আইবেরীয় উপদ্বীপ অঞ্চল ও বাকি অঞ্চলে রাজন্যবর্গ ও সামন্তপ্রভুদের লড়াই ছিল, যুদ্ধ, মহামারী ও দুর্ভিক্ষ ছিল ইউরােপীয় জীবনের অচ্ছেদ্য অঙ্গ। এভাবে যুদ্ধ-বিগ্রহ এই বিপর্যয় সৃষ্টিতে অবদান রাখে। আবার বিপর্যয় সেই সময় ইউরোপের যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সংঘাতকে প্রভাবিত করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং আর্থিক অনগ্রসরতা নানা প্রকার বিশৃঙ্খলা এবং সংঘাতের জন্ম দিয়েছিল। বাল্টিক অঞ্চল, দক্ষিণ ইতালি এবং আইবেরীয় উপদ্বীপে রাজা ও সামন্তের সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে।

    যুদ্ধবিগ্রহ ব্যতীত অন্যান্য রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও মহামারীর প্রভাব অনুভূত হয়েছিল। এই মহামারির ফলে একমাত্র কাস্তিলের একাদশ আলফনসাে ছাড়া আর কোনাে ইউরােপীয় রাজন্যের মৃত্যু হয়নি। অন্যান্য কিছু অভিজাত মানুষের অবশ্য মৃত্যু হয়েছিল। এরা পদমর্যাদায় কিছু নীচে অবস্থান করতেন, যেমন ফ্রান্স ও আরাগঁর রানি এবং বাইজানটাইন যুবরাজ। প্লেগ ব্যাপক আকার ধারণ করলে পার্লামেন্টের অধিবেশন মুলতুবি রাখা হত। সৈন্যদের মধ্যে মৃত্যুর হার অত্যন্ত ব্যাপকরূপ ধারণ করলে ১৩৪৮-এ শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটানাে হয়েছিল। স্থানীয় স্তরে এই মহামারির প্রভাব আরও মারাত্মক হয়েছিল।

    প্রশাসনিক ও বিচারসংক্রান্ত কাজে প্রভাব

    বহু শহরে অসংখ্য সদস্যের মৃত্যুর ফলে কাউন্সিলগুলি কার্যত অচল হয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় অভিজাতশ্রেণির সমগ্র পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। আদালত বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। এমনকি উইল প্রোবেট বা নথিভুক্ত করার মতাে জরুরি কাজ স্থগিত রাখতে হয়েছিল।

    পরবর্তীকালে অবশ্য নতুন আদালত গঠন করা হয়েছিল। অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর ফলে যে আইনগত জটিলতা ও অচলাবস্থা দেখা দিয়েছিল, তা শেষপর্যন্ত দূর করা সম্ভব হয়েছিল। রাজনৈতিক জীবনের চলমানতা আবার ফিরে এসেছিল। কিন্তু জনমানসে প্লেগের প্রভাব পুরােপুরি মুছে যায়নি। শুধু প্লেগের সংক্রমণের আশঙ্কায় কোনাে একটি বিশেষ দুর্গের অবরােধ তুলে নেওয়া হত বা কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে ব্ল্যাক ডেথের ফলে স্থানীয় শাসক বা প্রিন্সের মৃত্যুতে সেখানকার প্রতিরক্ষা ব্যুহ দুর্বল হয়ে পড়ত।

    নতুন যুগের আভাস ও রেনেশাঁসের উদ্ভব

    ১৪শ শতকের এই শ্রান্তি ও নিরুৎসাহ যে নিতান্তই সাময়িক, আচ্ছন্নতার এই মােহবন্ধন ঘুচিয়ে অদূর ভবিষ্যতে ইউরােপের প্রচণ্ড প্রাণশক্তির যে নিত্যনব প্রকাশ ঘটবে তার প্রমাণ পেতেও দেরি হয়নি। ১৫শ শতকের শেষ দশকে ইউরােপ ক্ষণস্থায়ী এবং বাভাবিক এই নিরুদ্যমতা কাটিয়ে উঠে বহির্জগতের সঙ্গে প্রত্যক্ষতর সংযােগ স্থাপনে উৎসুক হয়ে ওঠে। ইউরােপের নাবিক ও বণিকদের ইতালী থেকে ইংল্যান্ড ও ফ্ল্যান্ডার্স, উত্তর জার্মানী থেকে বাল্টিক সাগর ও ক্যাণ্ডিনেভিয়া, ইতালী থেকে কৃষ্ণসাগর আর ভূমধ্যসাগরের উপকূলের অতি পরিচিত, অতি পুরােনাে পথ ধরে ক্লান্ত যাওয়া-আসার আর কোনও বাসনা ছিল না। পর্তুগাল, স্পেন, ইংলণ্ড প্রভৃতি দেশের মানুষকে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরের অপরিচিত, ভয়াল জলরাশি আকর্ষণ করেছিল। সামুদ্রিক অভিযানের এক দুঃসাহসী নেশায় মত্ত হয়ে তারা স্বল্পকালের মধ্যে নতুন সমুদ্রপথ, পণ্যের নতুন এবং বিশালতর বাজার এবং কাঁচামালের অফুরন্ত উৎস খুঁজে বের করেন। নতুন এক মহাদেশের অবগুণ্ঠন উন্মােচিত হয়।

    ১৫শ শতকের আপাত-সুপ্তির মধ্যেই যে অসীম সম্ভাবনার বহর লুকিয়ে ছিল মুদ্রাযন্ত্র আবিষ্কার, বারুদ কামানের উদ্ভাবনে এবং কম্পাসের ব্যাপক ও কুশল ব্যবহারে তারও প্রমাণ পাওয়া গেল। মহাদেশের জাতি ও দেশগুলোর বিন্যাস এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অভাবিত পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠেছিল। হােয়েনস্টফেন রাজবংশের পতনের পর খ্রিস্টীয় জগতের যে ঐক্য বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং রােমান চার্চ বহু অনায়াসে যাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিল তাও অবলুপ্ত হয়। ভাষাভিত্তিক জাতীয় রাষ্ট্রগুলির অভ্যুত্থানে ৮০০-১৪০০ সালে মধ্য-ইংল্যান্ডের একজন নাইটের সঙ্গে উত্তর ফ্রান্স বা দক্ষিণ জার্মানীর একজন নাইটের জীবনযাত্রা-পদ্ধতির কোনও পার্থক্য ছিল না, হামবুর্গ বা ব্রুজ-এর একজন বণিকের দৃষ্টিভঙ্গী ভেনিসের একজন বণিকের মনােভাবের সমগােত্রীয় ছিল, লিঁয়র সার্ফদের জীবনের ইতিহাস মধ্য ইতালী বা দক্ষিণ ইংলণ্ডের সার্ফদের জীবনের কাহিনী থেকে বিশেষ পৃথক ছিল না। কিন্তু ১৫শ শতক থেকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বৈসাদৃশ্যের, ভিন্নতার পাঁচিল উঠতে লাগলো বিভিন্ন দেশগুলির মধ্যে। এই বহুবিধ পরিবর্তনের স্রোতে চঞ্চল, সদ্য অন্তর্হিত মহামারীর কবলমুক্ত ইউরােপের মর্মেই প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল রেনেসাঁস এবং রিফরমেশন।

    ১৪শ শতক সংকটের কাল হলেও এই সময়ে ইতালিতে রেনেশাঁস শুরু হয়েছিল। সংকটের সময়ে রেনেশাঁসের উদ্ভব হয় না বলে অনেকে মনে করেন। সংকট ছিল সাময়িক, অল্প সময়ের মধ্যে ইউরােপ এই সংকট থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতির পথ ধরেছিল। প্লেগের পর কাঠামােগত পরিবর্তন ঘটিয়ে ইতালি অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল। ১৫শ শতকে রেনেশাঁস ইউরােপ ভৌগােলিক আবিষ্কার, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, ধর্মযুদ্ধ, প্রটেস্ট্যান্ট নৈতিকতা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সমগ্র পৃথিবীর ওপর আধিপত্য স্থাপনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। এর পটভূমিতে ছিল অস্থির অশান্ত ১৪শ শতক। কৃষি, শিল্প-বাণিজ্য, ব্যাঙ্কিং, কৃষক বিদ্রোহ, শ্রমিক অসন্তোষ ইত্যাদির মধ্য দিয়েই রেনেশাঁসের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৪শ শতক হচ্ছে মধ্যযুগের সেই শেষ অবস্থা যার ফলশ্রুতিতেই আগমন ঘটে আধুনিক যুগের। শুধু ইউরোপ নয়, সমগ্র মানবেতিহাসেই এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, নানান বিপর্যয়কে ধারণ করেই এটি ইউরোপের ভবিতব্যকে পাল্টে দেয়, আরও স্পষ্ট করে বললে, বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে পাল্টে দেয়।

    তথ্যঋণ

    ১। মধ্যযুগের ইউরোপ – ২য় খণ্ড, নির্মলচন্দ্র দত্ত
    ২। আধুনিক ইউরোপের আদিপর্বের রূপান্তর (১৪০০ – ১৭৮৯), সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়
    ৩। আধুনিক ইউরোপের বিবর্তন : মধ্য পঞ্চদশ থেকে মধ্য অষ্টাদশ শতক, বাসবেন্দ্র বসু
    ৪। উইকিপিডিয়া নিবন্ধ – Great Famine of 1315–1317
    ৫। স্টেনসেথ এট আল এর গবেষণা নিবন্ধ –
    Stenseth N. C. et al. (2015) Climate-driven introduction of the Black Death and successive plague reintroductions into Europe, PNAS March 10, 2015 112 (10) 3020-3025
    (https://www.pnas.org/content/112/10/3020)

  • বিভাগ : ব্লগ | ১৩ অক্টোবর ২০২০ | ৪১৮ বার পঠিত
  • ৫/৫ (৩ জন)
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Sumit Roy | ১৩ অক্টোবর ২০২০ ১৭:৩৪98415
  • পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

  • দারুণ | 151.197.225.87 | ১৩ অক্টোবর ২০২০ ২৩:০৭98427
  • বাঃ বাঃ এ তো দারুণ ব্যাপার। 

    লোকজনের নজর দেওয়া উচিত। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন