• খেরোর খাতা

  •  ‘এক দেশ এক কার্ড’ এর জন্য কতটা স্বাস্থ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ আমরা ?  

    দীপালোক ভট্টাচার্য লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৭০ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • অতিমারী পরবর্তী পর্বে  বেসরকারি হাসপাতালে বেলাগাম চিকিৎসার খরচ নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি সেই উদ্বিগ্ন জনতার একাংশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে একটা খবরে। কেন্দ্রীয় সরকার ‘এক দেশ এক কার্ড’ নীতি প্রণয়ন করতে চলেছে অদূর ভবিষ্যতে। রক্তের শর্করা পরিমাণ থেকে নানাবিধ রক্তপরীক্ষার রিপোর্ট, ডাক্তারী পরিভাষায় লেখা রোগের বিবরণ থেকে প্রাত্যহিক অসুধের তালিকা – সবটাই লিখিত থাকবে থাকবে প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত কার্ডে। এতে করে নাকি, বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা – সবটাই হয়ে উঠবে সহজতর। রোগীর কার্ড এর নাম্বার দিয়েই এক ক্লিকেই মনিটরে ভেসে উঠবে যাবতীয় ঠিকুজি কুষ্ঠি।

    তবে এই খুশীর খবরের বিপ্রতীপে ইতিউতি ওঠা কিছু বুদ্বুদ আমাদের চিন্তায় ফেলে দেয় দেয় বৈকি; বিশেষত যখন অন্তর্জালে ‘কোভিট চিকিৎসা প্রদানকারী স্বাস্থ্যবীমা তালিকা’ বা এধরনের তথ্য খোঁজার হিড়িকের পাশাপাশি সাধারনের চিকিৎসাব্যবস্থার হাড়জিরজিরে দশা আমাদের পীড়িত করে যা ‘এক দেশ এক কার্ড’ নীতির সঠিক বাস্তবায়ন ও রূপায়নের সামনে একটা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন রাস্তা অবরোধ করে দাঁড়ায়।

    ধরা যাক আপনার রোগব্যাধির বিপুল তথ্য ঠাসা কার্ড আপনি নিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে। এখন প্রশ্ন হল ডাক্তারবাবু কত সময় আপনার পেছনে ব্যায় করবেন?  বি এম জি শীর্ষক সংস্থা থেকে প্রকাশিত মেডিকেল জার্নাল বলছে, এ দেশের ডাক্তারবাবুরা রোগী পিছু দু মিনিটেরও কম সময় ব্যায় করে। অন্যদিকে প্রথম বিশ্বের সুইডেন, আমেরিকা, নরওয়ের মতন দেশে রোগী পিছু ডাক্তারের দেওয়া গড় সময় প্রায় কুড়ি মিনিট। এখানেই শেষ নয়, তথ্য বলছে, বিশ্বের আঠারোটি দেশে, যেখানে সারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেক লোক বাস করে, রোগী পিছু ব্যায় করা সময় পাঁচ মিনিট বা তারও কম।  

    তবে এ ব্যাপারে ডাক্তারবাবুদের মুন্ডুপাত করার চেনা একরৈখিক মনোভাব ছেড়ে আমাদের প্রয়োজন আরো নিবিড় তথ্যানুসন্ধান। যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি এক হাজার জনসংখ্যা পিছু অন্তত একজন ডাক্তারের পক্ষে সওয়াল করেছে, তখন এদেশে সেই অনুপাতটি হল ১ : ১৪৪৫। মেডিকেল কলেজের আসনবৃদ্ধি, নতুন নতুন মেডিল কলেজ স্থাপন – কোনো কিছু দিয়েই এই জনসংখ্যা পিছু ডাক্তারের অনুপাতকে একটা স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। আরো যেটা উল্লেখ করার, এই অনুপাতটি সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে গ্রাম শহর নির্বিশেষের সাংখ্যমান। এবারে যদি গ্রামাঞ্চল তথা  আর্থ-সামাজিক ভাবে ভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নিরিখে ডাক্তারের সংখ্যা নিয়ে পর্যালোচনা করা যায়, তাহলে অবস্থাটা কোথায় দাঁড়ায় সেটা সহজেই অনুমেয়। ইউকিপিডিয়া জানাচ্ছে, এদেশের মোট ডাক্তারের ৭৪ শতাংশ শহর কিংবা মহানগরগুলিতে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ২৮ শতাংশকে চিকিৎসা পরিষেবা দানের কাজে নিয়োজিত। তাহলে দেশের বাকি ৭২ শতাংশের সাধারন অসুখ বিশুখে কি অবস্থা হয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর গুরুতর রোগবালাই , যেমন হাইপারটেনশন, হৃদরোগ, মধুমেহ এসবের চিকিৎসার ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের দৃষ্টিকটু রকম প্রভেদ চোখে পরে। সমীক্ষা রিপোর্ট (Desai et al)  বলছে, যেখানে শহরাঞ্চলের মাত্র ৩ শতাংশ গুরুতর রুগী চিকিৎসা পরিষেবা পায় না, সেখানে  গ্রামাঞ্চলের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ শতাংশেএবারে যদি জাতিগত মাপকাঠির নিরিখে তথ্যানুসন্ধান করা যায়, তাহলে দেখা যাবে প্রতি পাঁচজন তপশীলি উপজাতি সম্প্রদায় ভুক্ত গুরুতর রোগীর একজন কোনো চিকিৎসা পরিসেবাই পায় না। বেঁচে থাকাটাই নিয়তি নির্ভর ধরে নেওয়া এই সব মানুষের কাছে ‘এক দেশ এক কার্ড’ এর মত সরকারী পরিষেবা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে সেটা ভবিষ্যতের গর্ভেই তোলা থাক।   

    এবারে আসা যাক জনসংখ্যা পিছু হাসপাতাল শয্যার বিশ্বওয়ারী হিসেবে। প্রতি এক হাজার জনসংখ্যার নিরিখে হাসপাতাল শয্যার সংখ্যা যেখানে জাপানে ১৩.৪, ইতালীতে ৩.৪ , ফ্রান্সে ৬.৫ , আমারিকা যুক্তরাষ্ট্রে ২.৯ এবং ইংল্যান্ডে ২.৮ টি, সেখানে ভারতে এই সংখ্যা ০.৭, অর্থাৎ কিনা প্রতি হাজারে একটিরো কম। তার সাথে যদি প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের বাড়ির সবচেয়ে কাছের হাসপাতালের দূরত্ব, রোগীকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার মত ন্যূনতম বন্দোবস্ত এসব সূচক ধরা হয়, তাহলে এদেশের সাধারনের সরকারী চিকিৎসা ব্যবস্থার যে ছবিটা উঠে আসবে, সেটা মোটেই সুখকর হবে না।

    জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির (২০১৭) দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল ও প্রযুক্তি নির্ভর করে তোলার উদ্যোগকে (আ বা প, ১৭ ই অগাষ্ট, ২০২০) সাধুবাদ জানিয়েও স্বাস্থ্যখাতে সরকারী ব্যায়বরাদ্দের  চিত্র আমাদেরকে ভাবনায় ফেলে দেয়। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ দপ্তর বাজেটে  স্বাস্থ্যখাতে ব্যায়বরাদ্দ ২০১৭ আর্থিক বর্ষে ৩৭,০৬১ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে বর্তমান আর্থিক বর্ষে ৬০,০০১ কোটি টাকা করায় বিভিন্ন মহল থেকে সন্তোষ প্রকাশ করা হলেও গোটা বিশ্বের নিরিখে জি ডি পি র কত শতাংশ অর্থ বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ব্যায় করা হয়, এ হিসেব নিলে হাততালির আওয়াজ অতটা জোরালো হবে না। স্বস্থ্যে খরচ করা  জিটিপির শতাং হার নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৬ সালে বিশ্বের ১৮৮ টি দেশের যে তালিকা প্রকাশ করে, সেখানে ভারতের অবাস্থান ১৭০। মানে প্রতিযোগিতায় একেবারে পেছনের আসনে বসা একটি দেশ। জিডিপির নিরিখে স্বাস্থ্য খাতে ব্যায় বরাদ্দের বিশ্বের গড় যেখানে ৮.৮ শতাংশ , সেখানে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এই সাংখ্যমান মাত্র ৩.৬ শতাংশ। প্রথম বিশ্বের দেশগুলি, যেমন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র (১৬.৯%), জার্মানী (১১.২%), কিংবা ফ্রান্সের (১১.২%) কথা যদি ছেড়ে দেই, আমাদের প্রতিবেশী চিন বা দক্ষিন আফ্রিকা, ব্রাজিলের ক্ষেত্রে জিডিপির নিরিখে এই ব্যায়ের পরিমাণ যথাক্রমে ৫%, ৮.১% এবং ৯.২%।

    স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ব্যাক্তিগত তথ্যভান্ডারের ডিজিটালকরন যেমন প্রয়োজন, তার চেয়েও বেশী দরকার সাধারনের চিকিৎসাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। বেসরকারি ও কর্পোরেট হাসপাতালের লাগামছাড়া চিকিৎসার খরচ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ উগড়ে দেওয়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের মৌলিক দাবিটুকু জানানোর সময় এসেছে। কেন নাগরিক পিছু স্বাস্থ্যখাতে সরকারী ব্যায় সতেরশো টাকারো কম – সময় এসেছে এ নিয়ে ফিসফিস করে হলেও দাবী জানানো। হয়ত এই ফিসফিসগুলোই হয়ত কোনো একদিন সমবেত হয়ে কলরবের চেহারা নেবে।

  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৭০ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন