• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক

    Share
  • সিদ্দির নৌকো - পর্ব ১

    তুষ্টি ভট্টাচার্য লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ০২ জুন ২০১৯ | ১৪২ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • প্রথম পর্ব

    ১)

      ঘড়িতে এখন প্রায় ন’টা। ডিনার সেরে ক্যামি এখন আয়নার সামনে নাইট ক্রিম ঘষছে। স্টাডি থেকে যদিও এই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না, তবুও কর্নেল জানে, এটাই ঘটছে। যতদিন ক্যামি বেঁচে থাকবে, ততদিন এমন কোন রাত নেই যে, ওর নাইটক্রিম লাগাতে ভুল হবে। শুধু যেবার হসপিটালে ছিল বারো দিন, সেই বারো দিন ও নাইট ক্রিম মিস করেছে। একটু সুস্থ হয়ে ওঠার পরে প্রত্যেক বিকেলে কর্নেলকে বলে গেছে, ‘কাল আমার নাইট ক্রিমটা নিয়ে এস।‘ আর কর্নেল যথারীতি প্রত্যেকদিন ভুলে গেছে নাইট ক্রিম নিয়ে যেতে। আসলে সেই সময়ে জন ভাবেইনি যে, ক্যামি আবার বেঁচে ফিরবে। সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাক, ডাক্তাররাও আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রায়…এত ভেঙে পড়েছিল সে, যে এই সব তুচ্ছ সাজগোজের জিনিসের কথা মাথাতেই রাখতে পারত না। একটু একটু করে সেরে উঠছিল ক্যামি, যদিও স্থিমিত দেখাত ওকে, অনেকটা যেন ঝরে গেছিল ওই সময়েই ওর চেহারার জৌলুস। বাড়ি ফিরে ক্যামি সুস্থ হয়ে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু এক ঝাপ্টায় বুড়ো হয়ে গেছিল অনেকটা। আয়নায় নিজেকে দেখত আর জনকে দোষারোপ করত তখন রোজ। বলত, ‘এই তোমার জন্য, আজ আমার এই হাল হয়েছে। তুমি জান না, বোঝই না আসলে এই নাইট ক্রিমের স্কেডিউল চেঞ্জ করলেই এমনটা হয়। কতখানি সিরিয়াস যে এই বিষয়টা, তা তুমি গুরুত্ব দিয়েই দেখনি। আর কবেই বা আমাকে ইম্পর্ট্যান্স দিয়েছ তুমি? কর্নেল হয়ে এখানে এসে আমাকে বিয়ে করে নিয়ে গেলে সেই এক অন্ধকার কূপের মত দেশে। যেখানে শুধু কালোকুলো গাঁইয়া লোকজন আর গ্রামের পর ধূধূ গ্রাম। ওই সব নেটিভদের মাঝে আমাকে একা রেখে তুমি সারাদিন নিজের কাজে ব্যস্ত থাকতে। কেন জন, কেন? আমার যৌবন, আমার শরীর, আমার মন ক্ষুধার্ত থেকে যেত, তুমি কোনদিন আমার কথা ভাবইনি।‘ এক লহমায় জন যেন পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে গেছে। সেই ইন্ডিয়ার বাংলোর ছবিটা চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে। অফিসরুমে মহা ব্যস্ত তখন সে, কত লোকজন, কত অভিযোগ, কত জরুরী মিটিং, আর কী প্রতাপ তখন তার! মর্যাদা দিতে পারত বটে ওখানকার লোকেরা। বাবুগুলো এত ভাল কাজ জানত যে, ওকে প্রায়ই বুদ্ধি পরামর্শ নিতে হত তাদের থেকে। হ্যাঁ, সেই নেটিভদেরই থেকে। আর সেই সময় সুন্দরী যুবতী ক্যামিলা জন ওয়েলেসলি কী করত? কী করে সময় কাটত তার? কিটি পার্টি তো আছেই, সিগারেটের নেশা তখনই পুরোমাত্রায় ধরে ফেলেছিল। সারাদিন ওয়াইন আর সন্ধে থেকে স্কচ। আর বিকেলটা ছিল ক্যামির সব থেকে সুখের আর আনন্দের সময়। যেন ওই দু এক ঘন্টার জন্যই সে সারাদিন, সারারাত উন্মুখ হয়ে থাকত। বিকেল হলেই একটা ফিটন এসে দাঁড়াত ক্যামির বাংলোর সামনে। তখন ওই গরমের দেশেও সূর্যটা যেন তাপ কমাত একটু। আর এক অদ্ভুত রঙের খেলা আকাশ জুড়ে, যাকে নেটিভরা বলত, ‘গোধূলি’। হ্যাঁ, কর্নেলও বাংলা শিখেছিল কিছুটা। রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত পড়েছিল বাংলায়। গোরা পড়ে তাকেই তো খড়গহস্ত হতে হয়েছিল! সে অবশ্য অন্য গল্প।

      ফিটন থেকে সেই বিকেলে নেমে আসত এক সুপুরুষ ইংরেজ যুবা। সেও সদ্য এসেছে এদেশে। ব্যাচেলর। কোন এক উইক এন্ড পার্টিতে ক্যামির ওপর তার চোখ পড়ে। নেহাত আমার অনেকটা জুনিয়র, তাই খুব অর্থোডক্স ভাবেই ক্যামির হাত ধরেছিল, বল-এ কয়েক কদম নেচেছিলও ওরা। জনকে ঘিরে তখন প্রচুর লোকজন। তবুও সে খেয়াল করেছিল এক ঝলক যে, ক্যামি আর সেই ছেলে, হ্যারি যার নাম, খিলখিল করে হাসছে। সমস্ত অভ্যাগতরা আড়চোখে দেখছিল ওদের এই বাল্যখিল্য আচরণ। ক্যামির ওপর বাংলোয় এসে খুব রাগ দেখিয়েছিল জন। সমস্ত এটিকেট ভুলে গেছিল নাকি ও?

       ক্যামির এখন নাইট ক্রিম ঘষা শেষ। নাতি আর নাতনির সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে গুডনাইট জানানোর সময় হয়েছে এবার ওর। এই স্টাডি থেকে ওর হালকা স্বর শোনা যাচ্ছে। এই ভাঙা গলার ক্যামি, সেই সময়ে কেমন সুরেলা রিনরিন করে বাজত! সত্যিই খুব অবহেলা করেছে ও সারাজীবন ক্যামিকে। জীবনের গোল্ডেন টাইম শুধু কাজ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। তবে সেই যে হার্ট অ্যাটাক হল ওর, সেই থেকে জন ক্যামিকে কাছছাড়া করে না আর! সেই থেকে ক্যামিও সিগারেট ছেড়েছে পুরোপুরি। এতদিনকার অভ্যেস যে মেয়ে ছেড়ে দিতে পারে, তার মনের জোরের কাছে আবারও একবার নত হয়েছে কর্নেল। যেমন আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও একদিন নত হয়েছিল জন। ঘড়িতে এখন সাড়ে ন’টা। স্টাডি ছেড়ে বেরিয়ে এল কর্নেল। আজকাল বসা থেকে উঠলে ডান পায়ে টান ধরে প্রাথমিক ভাবে। একটু হাঁটাহাঁটি করলে ঠিক হয়ে যায়। মর্নিং ওয়াকে তো নিয়মিত যায় সে, তবুও এই সমস্যাটা ভোগাচ্ছে। ডাক্তার বলল, ও কিছু না। দীর্ঘদিন বসে কাজ করলে এমনটা হয় বয়সকালে। ‘বয়সকাল’ শব্দটা এখনও কানে লেগে আছে! সত্যিই তো, নয় নয় করে সত্তর পেরলো জনের। ইন্ডিয়ায় বলত, ‘বাহাত্তুরে বুড়ো’। এইসব মজার টার্মগুলো এখনও উপভোগ করে সে। সারাদিন স্মৃতি রোমন্থন আর এই স্টাডিতে বসে বসে জাবর কাটা আর বইপত্র ওলটানো ছাড়া কাজ তো কিছু নেই এখন। মাঝেমাঝে তবু হেনরি আসে। হেনরির সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব চাকরিতে ঢোকার শুরু শুরুতে। এই লন্ডনের মাটিতেই। দুজনেই রানীর চাকর হিসেবে একই র‍্যাঙ্ক-এ নিয়োগপত্র পেয়েছিল। বয়স কম থাকায় দুজনের বন্ধুত্ব তৈরি হতে সময় লাগেনি। সে এক দিন ছিল বটে ওদের। শুক্রবার সারা রাত ক্লাব আর পার্টি। দুজনেরই স্টেডি কোন বান্ধবী ছিল না। ফলে প্রত্যেক সপ্তাহে নতুন বান্ধবী। কত যে ডলার নষ্ট করেছে মেয়েদের পেছনে সেই সময়, এখন ভাবলে নিজের ওপর খুব রাগ হয়। এরকমই এক রাতের ক্লাবে ক্যামিলার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল ওর। হেনরি আর জন তখন প্রায় মাতাল। বোর্ডে বারবার ভুল থ্রো করছিল আর হেরে যাচ্ছিল ক্রমাগত। একসময়ে ওদের পয়সা শেষ হয়ে যায়। তবুও অনর্থক হৈহল্লা করছিল বলে ম্যানেজার ওদের বের করে দেয় বার থেকে। কেন কে জানে ক্যামিলা ওদের ট্যাক্সি ডেকে নিজের পয়সায় ভাড়া মিটিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল সেদিন। পরে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে কল করেছিল ক্যামিলাকে জন। তারপরেও অবশ্য ওদের কোন স্টেডি রিলেশন তৈরি হয়নি। সম্পর্কর শুরুটা যে কবে হয়েছিল, জনের খেয়াল নেই আর এতদিনে। ক্যামিলা শুনলেই বলবে, ‘আসলে তুমি কোনদিন নোটিশই করনি আমাকে!’ কথাটা যে খুব মিথ্যে বলে ও, তাও না! জন এরকমই।

      যথারীতি ক্যামি নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। কম্বলটা গায়ে ছড়িয়ে দিতে দিয়ে জন ভাবল, একটু বাদেই তো গায়ের চাপা ফেলে দেবে ও। তবুও কেন যে রোজ ওকে কম্বল গায়ে দিয়ে দেয় জন! সবই অভ্যাস। জনের ঘুম আসে না এত সহজে। ওর দুটো স্কচের কোটা শেষ হয়ে গেছে। তবুও আরেকটা নেবে আজ। আজ হেনরির বইটা পড়তে হবে। কোথা থেকে এক বই জোগাড় করেছে নাকি, খুব ইন্টারেস্টিং আর জনের নাকি পছন্দ হবে বলে নিয়ে এসেছে। অদ্ভুত পাগল রয়ে গেছে এখনও। আর এই শনিবার এসে যদি শোনে বইটা ছুঁয়েও দেখেনি ও, কিছু বলবে না মুখে। কিন্তু অভিমানে গাল ফুলিয়ে বসে থাকবে। এই লোকটা যে কী করে এত এনার্জি পায় এখনও। নিজের সংসার নেই, তবু কাজের শেষে কত কী কাজ খুঁজে নিয়ে যে নিজেকে ব্যস্ত রাখে! হয়ত ওর বিয়েটা টিকে গেলে, এই বয়সে একটা সঙ্গী থাকলে, এই পাগলামো গুলো আর থাকত না। হেনরির সঙ্গে মার্থার বিয়ের খবর শুনেছিল যখন, তখন ও ইন্ডিয়ায় পোস্টেড। ওরাও ইন্ডিয়ায় চলে এল একসময়ে। কয়েকবছর বাদে ফিরেও গেল। ফেরার এক বছরের মধ্যেই ওদের ডিভোর্স। যেটুকু বুঝেছে জন, হেনরির ক্ষ্যাপামো মার্থার মত মেটিরিয়ালিস্টিক মেয়ের মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এই বিয়ে ভাঙার বছর পাঁচেক বাদে হেনরি আবারও এক সম্পর্কে জড়ায়। কিন্তু বিয়ের আগেই সে সম্পর্কও ভেঙে যায়। এও শোনা কথা অবশ্য। সেই থেকে ও একাই বিনদাস আছে।

       কিন্তু বইটা কোথায় গেল? সামনেই থাকার কথা। কী সর্বনাশ! হারিয়ে গেল নাকি! তাহলে আর রক্ষে নেই এযাত্রা। কিন্তু বইটা হারানোর কোন প্রশ্নই নেই। এ ঘরে ক্যামি ছাড়া কেউ আসে না। তাও সপ্তাহে এক আধদিন, ডাস্টিং করতে। আর বই ও ছুঁয়ে দেখে না আজকাল। তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকল জন। পায়ের ব্যথা নিয়েও মই বেয়ে স্টাডির একেবার ওপরের র‍্যাক পর্যন্ত খুঁজে ফেলল। নাহ্‌, কোথাও নেই বইটা। হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিল ও। আজ আর ঘুম আসবে না। তবুও বিছানায় গিয়ে টান হওয়া যাক, এই ভেবে বেডরুমে গেল জন। বেড ল্যাম্পটা নেভাতে গিয়ে হঠাতই চোখে পড়ল, সাইড টেবিলে বইটা পড়ে আছে। সে তো এখানে আনেনি বইটা! তাহলে কি ক্যামি? আশ্চর্য! প্রচণ্ড এক অভিমানে বই না ছোঁয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিল ও, আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ  বছর আগে। যে ছিল বইপোকা, লিখতও কিছু কিছু। সে একদিন এক ঘটনা বা দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই ভীষ্মের প্রতজ্ঞা করে বসেছিল। আজ এতদিন বাদে আবার সে নিজে থেকে বইয়ে হাত দিয়েছে দেখে যেমন অবাক হল, খুশিও হল খুব। চোখ থেকে জল উপছে যাচ্ছে ওর। দুঃখ তো নয়ই, আনন্দাশ্রুও নয় এই কান্না। এ হল কর্নেলের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত, যা থেকে ওকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ দিল না ক্যামিলা। নিজে থেকেই মুক্ত করে দিল ওকে। মৃত্যুর আগে অন্তত পাপবোধ থেকে মুক্তি পেল সে। এই অপরাধবোধে সে দীর্ঘজীবন কাটিয়েছে। একসময়ে নিজেও বইয়ে হাত দিত না। তারপর যেন ক্যামির হয়ে ও নিজেই পড়ার অভ্যাস তৈরি করেছে। নিজের পাপ বুনে রেখেছে বইয়ের পাতায় পাতায়। 

    ২)

      সুলতানা এখন মগ্ন। না, রাজকার্যে নয়। নিজস্ব মহলের টানা বারান্দা থেকে বাঁদীদের বিদায় করেছেন। আত্মমগ্ন হয়ে আছেন দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে। আসলে কিছুই দেখছেন না। দরবার নির্দিষ্ট সময়ের আগে মুলতুবি রেখে, এই গোধূলি বেলায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্থির হয়ে। খুব অস্থির ছিলেন তিনি আজ, দরবারের এক বিচার সভার কোন ফয়সালা না করেই ফিরে এসেছেন। সকলে মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। এ কী হল সুলতানার! কর্তব্য কর্মে ফাঁকি তো তিনি দেন না! আরাম, আয়েস থেকে দূরে থাকেন। তবে কি অসুস্থ তিনি? রাজদরবারের হাকিম কুশল জিজ্ঞাসা করতে গেছিলেন। খুব বিরক্ত হয়ে তাঁকে সুক্রিয়া জানিয়ে বিদায় করেছেন। বাঁদীমহলেও গুঞ্জন। কী হল সুলতানার আজ? 
       রাজিয়া নামে একজন তাকে ডাকতে সাহস করেছে। এক কালো সিদ্দি দাস আদপে সে। আজ নিজগুণে, স্বীয় অর্জিত পাণ্ডিত্যে সে বিদ্বান। রাজিয়াকে শের সায়রি শোনায়, কাহানী, ইতিহাসের সলুক জানায়। সেই লোক আজ অনুপস্থিত ছিল দরবারে। কেন কেন? এত হিম্মত তাকে কে দিয়েছে? রাজিয়াকে অমান্য করার সাহস এক হাবসির বংশধর পায় কী করে!! লাহোরের তুর্কি বাদশা শের শিং সংকর, যদি না এই সিদ্দি জামালুদ্দিন ইয়াকুতকে এখানে পাঠাত, তাহলে এই সমস্যায় আমায় পড়তে হত না। যদিও এখন মাঝেমাঝে আমার সন্দেহ হয় যে, এই ইয়াকুতকে আমার পিছনে নজরদারি করার জন্য পাঠায়নি তো! কিন্তু এত কিছু আশঙ্কা সত্ত্বেও কেন যে আমি এই হাবসিটার ওপর দুর্বল হয়ে পড়ছি, নিজেই জানি না। সে একদিন না আসতেই পারে, কাল হয়ত দাখিলনামা পেশ করবে এসে। এত হয়রান হওয়ার কিছু তো নেই। ইয়া আল্লা! রহেম কর আলী! আজ যদি আব্বা বেঁচে থাকত, আমাকে দেখেই আমার সমস্যা বুঝে যেত। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলত, ধীরয রাখ বিটিয়ারাজা! আমাকে আব্বা কখনই রানী বলেনি। রাজার মতই মানুষ করেছে। আমার অপদার্থ দু ভাই, না মুরাদ সব, সারাদিন আয়েস, আরামের জীবন কাটাতে শিখেছে শুধু। না শিখল লেখাপড়া, না ধরতে শিখল অস্ত্র। আজ ওরা আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না হিংসায়। এখন যদি নাসিরুদ্দিন মাহমুদ বেঁচে থাকত, তবে না জানি কত শান্তিতে, আরামে, আয়েসে সেও জীবন কাটাতে পারত। আমার সে দাদাটিই ছিল একমাত্র যোগ্য এই মসনদের জন্য। আল্লাহ তাকে কেড়ে নিল অসময়ে। আর তাই আমার এই হয়রানি। আজ মন বড় অস্থির। আব্বার কাছে গিয়ে বসলে হয়ত একটু শান্তি পাব। এই ভেবে বাঁদীকে ডেকে তার ঘোড়া আনতে বললেন। সুলতানা রাজিয়া ঘোড়ায় চেপে চললেন কুতুব মিনারের পাশের গোরস্থানে। যেখানে বাদশা ইলতুত্‌মিস কবরে ঘুমিয়ে আছেন। লোকলস্করকে তফাতে যেতে বললেন রাজিয়া। তলোয়ার খুলে রেখে একা বাবার কবরের পাশে গিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ বাদে আকাশ দেখল, কবরের ঘাস দেখল, সুলতানা নয়, এক লাডলি বেটি তার আব্বার কবরে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘কেন তুমি আমায় এত কিছু শেখালে? কেন ইরান থেকে, তুর্কী থেকে তুমি পণ্ডিতদের, কবিদের নিয়ে এলে? না আমি শিখতাম শের শায়রি, না পড়তাম মোটা মোটা কিতাব, আর না শিখতাম অস্ত্র চালনা! আমি রাজিয়া হয়েই থাকতাম নাহয়। সুলতানা বানিয়ে তুমি শুধু আমাকে শত্রু উপহার দিয়ে গেলে! কেউ আমাকে পছন্দ করে না, ঈর্ষার চোখে দেখে, ঘৃণার চোখে দেখে। আমার সিংহাসন কেড়ে নেওয়ার মতলব এঁটে রেখেছে ওই শের শিং, আর আমার নিজের ভাইরা। এরকম আরও কতজন যে আছে, আমি হয়ত নিজেই জানি না! আর এই ইয়াকুত এসে আমার বিদ্যা, আমার ধী-কে উসকে দিচ্ছে ক্রমাগত। আমি ওই কালো চিতার মত শরীরের সুপুরুষ অথচ বিদ্বান, বিনয়ী মানুষটাকে ভুলতে পারছি না কিছুতেই। আমি সুলতানা। আমার কি একজন সিদ্দি হাবশীর প্রেমে পড়া সাজে? হে আল্লা, এ আমাকে কী দ্বিধায় ফেললে? আমাকে পথ দেখাও আব্বা। আমাকে রাহ দেখাও! আমি আর পারছি না।‘ রাজিয়ার এই সমস্ত প্রলাপের পর মনে হল, যেন এক ঝড়ের পর পৃথিবী হঠাতই ভীষণ রকম শান্ত হয়ে এসেছে। চোখ মুছে সে উঠে দাঁড়াল। মুখে এক অপার শান্তি। চোখে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। যেন তার বাবা তাকে সত্যিই পথ দেখিয়ে দিয়েছে। রাজিয়ার কানে কানে যেন ইলতুতমিস বলে গেলেন, ‘বেশি ভাবিস না বেটি। দুঃখ করিস না। মন যা চায়, তাই কর। ভুলিস না, আমিও একজন দাস ছিলাম!’ তলোয়ার নিয়ে আবার ঘোড়ায় উঠল রাজিয়া। 

       জামালুদ্দিন ইয়াকুতকে শের শিং চর হিসেবে পাঠিয়েছিলেন রাজিয়ার কাছে – এই সত্য জানত শের শিং আর ইয়াকুত। ইয়াকুতের কাছে দূত আসত সপ্তাহান্তে। রাতের অন্ধকারে সেই চর গোপনে এসে দাঁড়াত ইয়াকুতের দরজায়। ইয়াকুত নিঃশব্দে সঙ্কেতে লেখা একটি পত্র ধরিয়ে দিত সেই দূতের হাতে। সেই পত্রের অর্থোদ্ধার করতে পারবে কেবল শের শিং। কারণ প্রতিটি শব্দের সামনে পেছনে কিছু অর্থহীন চিহ্ন প্রবেশ করিয়ে এই চিঠি লেখা হয়েছে। আর স্বয়ং লেখক নিজেই এই পত্রের অন্তর্নিহিত গূঢ় কৌশল শিখিয়ে এসেছেন শের শিং-কে। আজও যেমন সেই রাত। ইয়াকুত পেঁচার মত জানলা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে। কখন এক বিন্দু আলোর ইশারা আর এক বল্লমের মাথায় বাঁধা ঘুঙুরের শব্দ তার কানে এসে পৌঁছয়। আজকের এই পত্রে রাজিয়ার দরবারের খুঁটিনাটি ঘটনা আর তার গতিবিধি সম্বন্ধে জানানো আছে। তবে তার কেন জানি মনে হচ্ছে, ইতিমধ্যে বুদ্ধিমতী রাজিয়া তার উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেছেন। তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। যদিও রাজিয়া নিজে ইয়াকুতকে ভীষণ রকম গুরুত্ব দেন প্রকাশ্যে। তার কাছে দরবারের পরে নিভৃত পাঠ শিক্ষার হুকুম করেছেন। আর এই হুকুম অমান্য করার কোন ইচ্ছেও তার নেই। বাধ্যত সে রাজিয়ার খিদমৎ খাটতেই এসেছে, তাকে পাঠানো হয়েছে সেই কারণেই। কিন্তু এমন খুবসুরৎ সুলতানা, তাঁর বুদ্ধিমত্তা, তাঁর ব্যক্তিত্ব ওকে মুগ্ধ করেছে। ফলে এ কাজ করতে সে বাধ্য নয়, বরং প্রচণ্ড উৎসুক। সুলতানাকে নিভৃতে পাওয়া যাবে, মুখোমুখি তাঁর সঙ্গে বাক্যালাপ হবে ভাবলেই তার উত্তেজনা আসছে। অথচ এই উত্তেজনা, এই আবেগকে সামলে রেখেছে প্রাণপণে। নিজের ধৃষ্টতা প্রকাশ করতে সে চায় না কোন মতেই। আর শুধু নিজেকে লুকোবে বলে, সামলাবে বলে সে আজ এক গুস্তাগি করে ফেলেছে। আজ দরবারে যায়নি। কাল গিয়ে অসুস্থতার অজুহাত দেওয়া যাবে। এরপরও তাকে এই সুলতানার সমস্ত খবরাখবর লিখে পৌঁছে দিতে হবে দূতের হাতে। এই বেইমানী তাকেই করতে হবে আর তাও কিনা তার প্রিয় সুলতানাকে ঘিরেই। আবার সে যদি খবর না পাঠায়, শের শিং-এর সঙ্গে বেইমানি করা হবে। এই রকম বিচ্ছিন্ন ভাবনায় সে আজ সারাদিন খানখান হয়ে চলেছে। বেইমানি আর ইমানদারির সংজ্ঞা তার কাছে আজ দুর্বোদ্ধ হয়ে ধরা দিচ্ছে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় তার অন্তরাত্মা কুঁকড়ে গেছে। সে খালি বিছানায় শুয়ে ভেবেই চলেছে, ভেবেই চলেছে। এই দ্বৈরথ থেকে মুক্ত হতে পারেনি। একসময়ে উঠে বসে তাকেই আবার পত্র লিখতে হয়েছে সঙ্কেত মিশিয়ে।

        আজ তার মনে হচ্ছে এই সমস্ত অর্জিত জ্ঞান, এই পাণ্ডিত্য তার কোন কাজে লাগবে? একজন সাধারণ হাবসি, একজন পরিশ্রমী গায়েগতরে খাটা, যুদ্ধে যাওয়া সিদ্দি হলেই ভাল হত। সুলতানার সেবা করত মুখ বুজে। তাঁর ধী, তার ব্যক্তিত্বে আকর্ষিত হত না। সুলতানাও তাকে অতটা গুরুত্ব দিতেন না। সে কি মেয়েদের চোখের ভাষা পড়েনি কখনও? শুধু গ্রন্থকীট হয়ে থেকে যেতে চাইলেও তার সুন্দর আর আকর্ষণীয় শরীরের লোভে অনেক ফুল এসে আছড়ে পড়েছে গায়ে। তাদের মধ্যে তুর্কীও যেমন ছিল, নিজেদের কউমের মেয়েরাও ছিল। বিয়ে করার কথা ভাবেনি কখনও। কারণ আর কিছুই না, বিয়ে করতে গেলে নিয়মমত তাকে সিদ্দি সম্প্রদায়ের মেয়েকেই বিয়ে করতে হত। আর তাদের কউমের মেয়েরা শরীরে পটু হলেও বুদ্ধির ধার ধারে না। শিক্ষার জগত তাদের টানে না। স্বভাবতই সেই মেয়েরা তাকে সেই জন্য টানেনি। তবে নেহাতই একটি মেয়ের নিবেদন সে উপেক্ষা করতে পারেনি। শুধুমাত্র শরীর পাওয়ার জন্য মেয়েটি এতটাই আকুল ছিল যে, নেহাতই মায়ার বশে তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে কিছুদিন। হ্যাঁ, ভাল যে লাগেনি, তাও নয়। উপভোগ করেছিল, আকন্ঠ যৌনতায় ডুবেছিল সেই কয়েকটা মাস। তারপর মোহ ভঙ্গ হয়েছে। মেয়েটিকে ছেড়ে আসতে খুব বেগ পেতে হয়েছিল তার সেযাত্রা। কারণ, সে মেয়ে তাকে স্বামী রূপে প্রার্থনা করেছিল। সন্তান চেয়েছিল। যদিও পূর্বশর্ত অনুযায়ী এরকম কিছু সে চাইবে না আগেই বলে রেখেছিল ইয়াকুত। কিন্তু কার্যত মেয়েটি নারীজন্মের বৈশিষ্ঠানুসারী হয়ে বাঁধা পড়তে চেয়েছিল। আবেগের আতিশয্য সামলাতে পারেনি। চলে আসার সময় সে খুব কেঁদেছিল। সেই কান্না তাকে আজও বিদ্ধ করে। যদিও সে শর্ত রেখেছিল আগেই, কথার খেলাপ করেছে, বেইমানি করেছে, এমন অভিযোগের তির তার দিকে কেউ হানবে না। তবু মন কি শর্ত মানে সবসময়ে? মেয়েটিও মানতে পারেনি। নির্লিপ্ত হতে পারেনি। সে পেরেছিল। যেমন আর এক শর্তানুযায়ী নির্লিপ্ত থাকার কথা ছিল তারও। কিন্তু সুলতানাকে সামনে থেকে দেখে, তাঁকে অনুভব করে, সে কিছুতেই নির্লিপ্ত থাকতে পারছে না। তার অওকাত ভুলে সে আবেগপরায়ণ হয়ে পড়ছে। রাজিয়ার খবর পাচার করতে গিয়ে গ্লানি আর অপরাধবোধে ভুগছে ক্রমাগত। মাঝরাত পার হল। প্রহরী হেঁকে চলে গেল। আর ঘন্টাখানেক বাদেই দূত আসবে। আহ! কর্তব্য করতেই হবে তাকে। মনে হচ্ছে এই সমস্ত থেকে দূরে পালিয়ে যায় আজ। কিন্তু পালাবে কোথায়? শের শিং-এর পেয়াদারা তাকে ঠিক খুঁজে এনে কতল করবে। সে কি মরতে ভয় পায় তাহলে? মরেই যদি যায় আজ...... জানলা থেকে এক বিন্ধু আলোর দূরত্ব ক্রমশ কমে আসছে। তার স্নায়ু সজাগ হয়ে উঠল একটা শব্দ শোনার অপেক্ষায়।

    ৩)

      ভোরবেলা কখন যে চোখ লেগে গেছিল কর্নেল নিজেই বোঝেনি। ক্যামির ডাকে চোখ খুলল। কফি এনেছে। আজ বেশ রোদেলা দিন। একটুও কুয়াশা নেই কোথাও। ঠিক যেন ইন্ডিয়ার শরৎ। সোনালী রোদ আর নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। বেঙ্গলের মানুষগুলো এমন দিনে দুর্গাপুজোর জন্য প্রস্তুতি শুরু করে। যদিও এখন সময়ের হিসেবে শরৎ নয়। এ আমাদের বহু প্রতীক্ষিত সামার। এমন দিনে মন ভাল হয়ে যায়। ক্যামিও বেশ ফ্রেশ মুডে আছে। কফির মাগে চুমুক দিয়ে জন জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘পড়লে বইটা?’ ক্যামি যেন একটু লজ্জা পেল। টিন এজারদের মত হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, দেখছিলাম উল্টেপাল্টে একটু। ইন্টারেস্টিং বই। হেনরি দিয়েছে বুঝি?’ হেনরির বইটা সত্যি দেখাই হল না এতদিনে। হাতে নিয়ে দেখল একটু। কভারে কয়েকজন কালো আফ্রিকান মানুষের ছবি। বান্টু সম্প্রদায় নিয়ে লেখা একটা বই, নাম- ‘সিদ্দি’স ভেসেল’। খুব একটা মোটা না, পাতলা বই। প্রিন্ট বা কাগজ বা গেট-আপ খুব একটা মনোহারী নয়। লেখকের নামে অনেকজনের নাম লেখা আছে, যাঁরা সম্পাদনা করেছেন এই বইটির। ভূমিকায় লেখকরা বই সম্বন্ধে লিখেছেন কিছু কথা। তাতে যা বোঝা গেল, আফ্রিকান হাবশি বা সিদ্দিরা ইন্ডিয়ায় প্রাথমিক ভাবে দাস হিসেবে গিয়ে কীভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করল এবং পাকাপাকিভাবে ওখানকার বাসিন্দা হল, এই নিয়েই এই বই। বিষয়টা সত্যিই অন্যরকম। পড়ে দেখতে হবে। এখন আপাতত রোদ খাই একটু ক্যামির সঙ্গে। ক্যামি জানলার পাশের চেয়ারে বসে আছে, গায়ে একফালি রোদ এসে পড়েছে, তাতে যেন ওর জৌলুস বেড়েছে কিছুটা। বেশ প্রসন্ন মনে সে উলকাঁটা নিয়ে ব্যস্ত। এই এক নেশা ওর। নাতি, নাতনীরা কতরকম ফ্যাশন স্টেটমেন্ট জেনে গেছে, ফলে এই হাতে বোনা পুলওভার বা টুপি ওরা কেউ ছুঁয়েও দেখে না। আর আমি এক বৃদ্ধ মানুষ। কত আর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরব একগাদা সোয়েটার! তবু ওর বোনা চাই। নেশায় বোনে, সময় কাটাতে বোনে। কিছু একটা নিয়ে যতক্ষণ বেশি সময় কাটানো যায়, আমাদের এখন সেই টার্গেট। আগে যৌবনে ভাবতাম, সময় কেন আরও দীর্ঘ হল না। ক্যামির হাত চলছে দ্রুত, চোখ জানলার বাইরে...মুখ থেকে ভেসে আসা একটা হাল্কা সুর খেলা করছে ঘরে। সুরটা খুব চেনা, কিন্তু ধরতে পারছে না, পাছে ক্যামির গানের মৌজ ভেঙে যায়, তাই জিজ্ঞেসও করতে পারছে না। কিন্তু সুরটা ভীষণ চেনা ঠেকছে যে কেন...কোথায় শুনেছে, কোথায় শুনেছে...পেটে আসছে, মুখে আসছে না অবস্থা এখন কর্নেলের। কর্নেল কি গান শুনেছে কোনদিন তেমন ভাবে? গানে ভেসেছে তার তরী? কূল হারিয়েছে কখনও? কেমন যেন উদাস হয়ে যাচ্ছে তার মনটা আজ। কিছুই করা হল না এ জীবনে। শুধু সরকারী চাকরির দায় সামলাতে সামলাতে কখন যে বুড়ো হয়ে গেল সে, নিজেই টের পেল না।

      তার নিজস্ব রকিং চেয়ারে বসে সে আকাশ পাতাল ভাবতে শুরু করল। সেই দিগন্তলাল শর্মা বাবুর কথা মনে পড়ে গেল। বাবুটি বেশ বিদ্বান ছিল, ইংরেজি সাহিত্য গুলে খাওয়া, ব্রাহ্ম সম্প্রদায়ের। তাকে খুব একটা অশ্রদ্ধা তাই দেখাতে পারেনি, যদিও নিজের পদের জেরে, সাদা চামড়ার দাপটে নিজেকে উচ্চ স্থানীয় ভেবে নিতে তার কোন অসুবিধে হয়নি সেদিন। আজ বোঝে, সত্যিকারের শিক্ষাদীক্ষায় সে অনেক পিছিয়ে ছিল সেই বাবুর থেকে। সেই বাবু তার দপ্তরে এসেছিল এক পিটিশন নিয়ে। বিষয় ছিল, স্বদেশী টাইপের কিছু। সম্ভবত ওদের তৈরি হাতে বানানো জিনিসপত্র নিয়ে একটা প্রদর্শনী করার পারমিশন চাইতে এসেছিল। সেখানে জমায়েত হবার কথা ছিল দু তিনশো মানুষের। এই দু-তিনশো মানুষের কথা শুনেই ওর ভ্রূ জোড়া কুঁচকে উঠেছিল সন্দেহে। এত লোক জমায়েত হবে কেন? কোন বিদ্রোহ করতে চাইছে নাকি এরা? সেদিন দরখাস্ত জমা দিয়ে তিনদিন বাদে তাকে আসতে বলেছিল। বাবু চলে যাওয়ার পরে দরখাস্ত হাতে নিয়ে দেখল, সুন্দর হস্তাক্ষরে নির্ভুল এবং শুদ্ধ ইংরেজিতে খুব গুছিয়ে লেখা সেটি। লোকটির সঙ্গে কথা বলেও বুঝেছিল চোস্ত বৃটিশ ইংরেজি ও উচ্চারণ ছিল তার। পরে খবর নিয়ে জেনেছে, এই লোক নাকি লন্ডনে তিন বছর ওকালতি পড়ে এসেছে। ফলে একটু যে সম্ভ্রম জন্মায়নি তাও না। পারমিশন দেওয়া নিয়ে ভাবল দুদিন। তিনদিনের মাথায় বাবু এলে, তাকে সাফ জানিয়ে দিল, পারমিশন মিলবে, কিন্তু পঞ্চাশ জনের বেশি মানুষের জমায়েত যেন না হয়। তাহলে পুলিশ অ্যাকশনে নামবে আর সবাইকে গ্রেপ্তার করা হবে। লোকটি একটু অখুশি হয়েই চলে গেছিল সেদিন। যাওয়ার আগে তাকে ইনভাইট করেছিল খুব বিনীত ভাবে। যেদিন অনুষ্ঠান হওয়ার কথা, কর্নেল কী মনে করে রওনা হয়েছিল ওই হলের দিকে। খবর পেয়ে গেছিল ওরা। হলের বাইরে থেকে তাকে আপ্যায়ন করে নিয়ে বসিয়েছিল সামনের সারিতে। তার কয়েকটি চেয়ারের পরেই ওখানে বসেছিলেন এক শাড়ি পরা বাঙালি লেডি। অনুষ্ঠান শেষে সেই দিগন্ত বাবু এসে ওই লেডির সঙ্গে তার আলাপ করে দিয়েছিল। ভদ্রমহিলা ওর স্ত্রী। এবং সেও খুব ভদ্র ও মার্জিত। ওর সঙ্গে কথা বলেছিল কুন্ঠাহীন ভাবেই স্পষ্ট ইংরেজিতে। ঘন কালো এক জোড়া চোখ তাকে সেদিন মোহাবিষ্ট করেছিল, যদিও সে ছিল দু দশমিনিটের ঘটনা। সে ঘটনা ওখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঘটনাচক্রে তা হল না। দিগন্তবাবুর সঙ্গে মাঝেমাঝেই তার দেখা সাক্ষাৎ হতে থাকল। একবার দুর্গাপুজোর কয়েকদিন বাদে দিগন্তবাবু এল তার দপ্তরে। এবং ওর বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে বসল। এবং আমন্ত্রণ ছিল সস্ত্রীক যাওয়ার। কী একটা উপলক্ষ্যে ওর বাড়িতে মান্যগণ্যরা আসবেন, আমাদের দেশীয় পদস্থরাও আসবেন শুনলাম। ক্যামিকে বলেছিলাম এই ইনভিটেশনের কথা। ও যেতে রাজী হয়নি। বলেছিল, ‘ওই নেটিভদের কালচার আমার ভাল লাগে না। বোর হয়ে যাব। তুমিই যাও’।  

       ক্যামির আসলে ব্রাহ্মদের কালচার সম্বন্ধে কোন ধারণা ছিল না। জনেরও যে ছিল, তা নয়, তবে শুনেছিল এরা অন্যরকম। আজ প্রত্যক্ষ করল। পাশ্চাত্য ভাবধারাতেই এরা চলে অনেকটা, কিছুটা নিজস্বতা আছে তারই মধ্যে। ধনী পরিবার দেখেই বোঝা যাচ্ছে। বিরাট তিনতলা বাড়ি, বাইরের বাড়ি পেরিয়ে অন্দরমহল। তিনতলার প্রতি তলাতেই টানা বারান্দা দেওয়া। উঁচু সিলিং-এ টানা পাখা লাগানো, চেয়ার টেবিল, সোফা, কাউচ, ডিভান…সুদৃশ্য হাতের কাজ করা মেহগেনি কাঠের আসবাব। পায়ের নীচে সাদা মার্বেলের মেঝে। এককথায় মনোরম পরিবেশ। অতিথি অভ্যাগতরা একে একে এসে পৌঁছলে, তাদের হাতে হাতে বেয়ারা ঠান্ডা শরবৎ পরিবেশন করে যাচ্ছে। সঙ্গে মিষ্টি, শিঙাড়া, কচুরি জাতীয় খাবারও রয়েছে। এরই মধ্যে ঘরের কোণে রাখা পিয়ানোতে বসে একজন স্যুট, টাই পরা বাদক, মৃদু সুর বাজিয়ে চলেছেন একের পর এক। খুব সুন্দর পরিবেশ এক কথায়। জন খুব উপভোগ করছিল এই পরিবেশ। কিন্তু চোখ খুঁজে চলছিল তাকে। এক সময় সে এল। হাল্কা রঙের তসরের শাড়ি, ঘাড়ে একটা খোঁপা নুয়ে আছে, কপালে মেরুন টিপ, হাতে চুড়ি বেশ কয়েকটা, কানে গলায়ও কিছু অলঙ্কার। চোখ ফেরাতে পারছিল না জন। এক বাদামী রঙের নারীর যে এত বাহার হতে পারে, এমনটা আগে কখনও দেখেনি সে। মুগ্ধতার রেশ কাটেনি তার, এমন সময় সে এল সামনে। মৃদু হেসে কুশল জিজ্ঞাসা করল। তার নামটি জেনেছিল আগেরবার। কিন্তু এখন ভুলে গেছে। মিসেস শর্মা বলেই সম্বোধন করল তাকে আর হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্য। জনের জানা ছিল আগে থেকেই যে, এই ভারতীয় নারীরা নিজের স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষকে স্পর্শ করে না, এমনকি ব্রাহ্মরা ছাড়া আর অন্য নারীরা এরকম কোন অনুষ্ঠানে বেরয় না পর্যন্ত। বাড়িতে কোন গান বা যাত্রার দল এলে মেয়েদের বসার ব্যবস্থা থাকে চিকের আড়ালে। এই ব্রাহ্মরা যেহেতু পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এবং অনেক উদার মনস্ক, তাই মেয়েরা প্রকাশ্যে বেরতে পারে। আর তাই ভাগ্যগুণে তার সঙ্গে দেখা হল। হ্যান্ডশেক করার দুর্বুদ্ধি তার জেগে উঠেছিল সহসা। একটু তার হাত ছোঁয়ার লোভ সে সামলাতে পারেনি। মুহূর্ত কয়েক অপেক্ষার পর, তার বাড়ানো হাতে এক নরম হাতের আলতো স্পর্শ পেল জন। হাতের ভেতরে সেই হাত ধরে থাকল আরও কয়েক মুহূর্ত। তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল যেন একটু লজ্জার আভা সেখানে। এবার সম্বিত ফিরে এল বুঝি দুজনেরই। হাত ছেড়ে দিয়ে সে অন্য দিকে চলে গেল। আর তার কিছুক্ষণ বাদেই গৃহকর্তা ঘোষণা করলেন, এবারে পিয়ানো বাজাবেন শ্রীমতি নীরজা শর্মা। হ্যাঁ, জনের মনে পড়ে গেল এবার তার নাম। এরপর পিয়ানোয় সুর তুলল নীরজা। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনল ঘর ভর্তি মানুষজন। সেই সুর এখনও কানে লেগে আছে জনের। আর তাই ক্যামির গুনগুন শুনে আজ সব মনে পড়ে গেল জনের। কিন্তু ক্যামি কী করে এই সুর শিখল? হয়ত কোন কমন গানের সুর, তাই জেনে থাকবে। এ নিয়ে অযথা ভেবে লাভ নেই।   

      এবার বইটা নিয়ে বসতে হবে। বুড়ো বয়সের এই সমস্যা। যত পুরনো কাসুন্দি মনে চেপে বসে থেকে থেকে। ক্যামি কখন উঠে চলে গেছে কে জানে! স্টাডিতে গিয়ে দেখে ক্যামি সেখানে বসে! খুব অবাক হল প্রথমে। তারপর খুশিতে ক্যামির কপালে চুমু খেল একটা। ক্যামি আদর পেয়ে যেন উচ্ছল হল একটু। বলল, জন তুমি আমার উল্টোদিকের চেয়ারে বস। আমি এই বইটা থেকে তোমাকে পড়ে শোনাই। জন তো এক পায়ে রাজী! এমন দিন যে কখনও আসবে জন বা ক্যামি কেউই বোধহয় ভাবেনি। এইটুকু সুখের সন্ধান তারা যদি আগে পেত, অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হত না তাদের। ক্যামি শুরু করল- ভারতের ভারুচ বন্দর দিয়ে প্রথম সিদ্দিরা আসে ৬২৮ খ্রীস্টাব্দে। এরপর আরবের মুসলমান সম্প্রদায়রা এই উপমহাদেশকে আবিষ্কার করার পরে এদের হাত ধরে আরও এক দল সিদ্দি এসে পড়ে ভারতে ৭১২ খ্রীস্টাব্দে। এরপরের দল সম্ভবত এসেছিল মহম্মদ বিন কাসিমের সৈন্য রূপে, যাদের জাঞ্জিস বলা হত। এর অনেক পরে দক্ষিণ প্রান্তের আফ্রিকা থেকে বান্টু সম্প্রদায়রা সিদ্দির দলভুক্ত হয় আর ভারতে এসে পাকাপাকি ভাবে বাস করতে থাকে। প্রাথমিক ভাবে এই বান্টুদের ভারতে দাস হিসেবে নিয়ে আসা হয়। এই সিদ্দিদের বেশিরভাগই মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হলেও সামান্য কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত হয় হিন্দু ধর্মে। এই দাসেদের মধ্যে কিছু অংশ পালিয়ে চলে যায় প্রত্যন্ত দ্বীপে। সেখানে তারা নিজেদের মত বসতি গড়ে তোলে। আর জাঞ্জিসদের মধ্যে কিছু অংশ নিজেদের একটা পৃথক রাজ্যই গড়ে তোলে ধীরে ধীরে, যাকে বলা হত জাঞ্জিরা রাজ্য বা জাঞ্জিরা দ্বীপ। এভাবেই বারশো খ্রীস্টাব্দে কাঠিওয়ারে জাফারাবাদ রাজ্যটি গড়ে ওঠে। এই জাঞ্জিরা রাজ্যকে আবার হাবশান বা হাবশিদের রাজ্যও বলা হত। দিল্লীতে মুঘলদের উত্থানের সময় জামালুদ্দিন ইয়াকুত নামের এক সিদ্দি্র নাম খুব শোনা যেত, যে কিনা দাস থেকে রাজকর্মচারী হয়ে উঠেছিলেন। রাজিয়া সুলতানার সময়ে(১২০৫ থেকে ১২৪০সাল পর্যন্ত) সে রাজিয়ার খুব ঘনিষ্ট হয়ে উঠেছিল। লোকশ্রুতি বলে সে আসলে রাজিয়ার প্রেমিক ছিল। এই পর্যন্ত বলে রাজিয়া উঠে চলে গেল দুম করে। খুব রাগ হয়ে গেল জনের। বাচ্চাদের মত নিজের মনে বলে উঠল, ‘হুঁহ, কী ভেবেছেটা কী ও? ও না পড়ে দিলে যেন আমি নিজে পড়তে পারব না!’ এই বলে নিজের মনে গজগজ করতে করতে বইয়ের পাতা উলটোতে থাকল। কিন্তু পড়ায় সত্যিই মন দিতে পারল না। তারপর ধুত্তেরি বলে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০২ জুন ২০১৯ | ১৪২ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত