এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  অন্যান্য

  • জলছবি

    Jhil
    অন্যান্য | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ | ৩৬০৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • Arpan | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২০:২৯728840
  • কিসের ছবি? কোথাকার জল? কোথায় গড়ালো? গড়িয়ে যাবার পথে কাকে কাকে রাঙালো?
  • dd | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২০:৩০728851
  • বোধহয় wash painting

    অবন ঠাকুর কত্তেন। অনেক ধোবারাও করে থাকেন।
  • pipi | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২০:৩১728862
  • নদীটা ওদের ডাকে। ছুটকুনকে ডাকে, ফুল্লরাকে ডাকে, অপু অলি ওদেরও ডাকে। এত বছর ধরে - প্রতিদিন কাপড় মেলতে, চুরি করে আচার খেতে কি কবাডি খেলতে, পায়রার খোপে ডিম ফোটা ছানা দেখতে কিম্বা শুধুই হাওয়া খেতে যখনই ওরা ছাতে এসেছে নদীটা তখনই ওদের ডেকেছে। দেখব না দেখব না করেও ওদের চোখ ঠিক গেছে নদীর দিকে। ওরা দেখেছে যতদূর চোখ যায় সামনে সবুজ ধানের ক্ষেত। গড়িয়ে গড়িয়ে শস্যক্ষেত দিকচক্রবালে নদীকে ছুঁয়েছে। নদীর বুকে নৌকো যায় পাল তুলে, ছানাকাটা দুধের মত মেঘফাটা রোদ্দুরে রাঙা তার রঙ.....নদীর থেকে উঠে আসা নোনা হাওয়া কচি ধানের শরীরে হিল্লোল তুলে অপু অলি ছুটকুন ফুলির খেলা শেষের ঘামে ভেজা মুখগুলোতে আঙুল বুলিয়ে যায়। নদীর ডাক শোনে ওরা। স্বপ্নের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছয় সে ডাক, শুনেছে ওরা, হয়তো বোঝেনি কিম্বা বুঝলেও মুখ ফুটে কেউ বলতে পারেনি নদীর কাছে যাব। কেন? কে জানে।

    ইচ্ছের শুঁয়োপোকাটা সেদিন গুটি কেটে বেরিয়েই এল ডানা মেলা প্রজাপতি হয়ে।
    চিলেকোঠার জানলা দিয়ে ঢুকে দামাল হাওয়া যখন ফুলির ঝুঁটিটা নাড়িয়ে দিলো, উল্টে দিলো ছুটকুনের বইয়ের পাতা আর দুলিয়ে দিল অলির ফ্রকের কোণাটা; অলস চোখে নদীটা দেখতে দেখতে ঘুমঘুম সুরে ফুলি বললো -'নদীটা বড্ড সুন্দর, তাই না রে ছুটকুন?' ছুটকুন, বাড়ির মধ্যে যার কিনা একমাত্র ও একচ্ছত্র আধিপত্য আছে ফুলির কথায় ভেটো দেবার অথবা সমর্থনের, হ্যাঁ বলবে না না বলবে এই দোলাচলে দুলতে দুলতে হঠাৎ মুখ ফসকে বলেই ফেললো - যাবি নদীর কাছে?
    ফুলি চমকাল, অপু চমকাল, ঠ্যাঙ ছড়িয়ে একরাশ তেঁতুলবিচি নিয়ে খেলতে বসা অলিও চমকাল। ইচ্ছে গাছের কুঁড়িটা তখন ফুল হয়ে ফুটে সবার চোখের সামনে দুলছে। ফুলির মুখের দিকে উৎসুক চোখে চেয়ে অপু বলল - বেশ অ্যাটভেঞ্চার হবে তাই না রে দিদি? দেওয়ালের টিকটিকি বলল ঠিকঠিক।

    বাড়ির আর কেউ জানল না অ্যাটভেঞ্চারের কথা, জানল শুধু সাজোয়ান সনাতন মুনিষ; সাদা ঝকঝকে দাঁতে কালো মুখ আলো করা একগাল হাসি হেসে বলল - লদির কাচ্চে যাব্বে তো পথ চিনো?
    চোদ্দো বছরের ছুটকুন, প্রবল আত্মবিশ্বাসী ছুটকুন, দলের নেতা ছুটকুন বুক ফুলিয়ে বলল - ও আর এমন কি, ঐ তো নদী দেখা যাচ্ছে, এই রাস্তা ধরে সোজা গেলেই নদী পড়বে। কথা কটা বলে একটু গর্বের সাথে দলের বাকি সদস্যদের মুখের উপর চোখ বোলায় ছুটকুন। সনাতন আরো চওড়া একখানা হাসি হেসে বলে - তা যাও তব্বে আকাশ্যার দিকে লজর রেকো।
    আধখাওয়া বিড়ি মাটিতে চেপে নিভিয়ে কানের উপর গুঁজে জাবনার জন্য খড় কাটতে চলে গেল সনাতন। ছুটকুনের পিছনে দাঁড়িয়ে মিনমিন করে ফুলি - সনাতনদাকে সঙ্গে নিলে হত না রে ছুটকুন? মানে ও মনে হয় রাস্তা চেনে।
    - তুই চুপ কর তো ফাটা কাঁসি, সবেতেই ইয়ে। ঐতো নদী দেখতে পাচ্ছিস, কট্টুকু দূর আর হবে? আর এই সিধে রাস্তা ধরে চললেই হোলো। বলছি যখন নিয়ে যাবো তখন ঠিক নিয়ে যাবো, তোদের খালি ইয়ে।

    ফাটা কাঁসির ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করা যাক। ছুটকুন, ফুল্লরা, অপু, অলি সবারই একটা ইস্কুলের নাম আছে, একটা করে ডাকনামও আছে। তবু অনেক ভাবনা চিন্তা করে বহুৎ মাথা খাটিয়ে আরো একদফা নামকরণ ওদের হয়েছে শুধু মজাটা হোলো যে সে নামগুলো ইস্কুলের খাতায় নেই, বন্ধুদের জিভে নেই কিম্বা বাড়ির লোকেরও জানার কথা নেই অবশ্য কিভাবে যেন বাড়ির বড়রা সেগুলো জেনে গেছে কিন্তু দুপক্ষই ভান করে যেন তারা কিছু জানে না। ছুটকুন সবার বড় তাই দাদাগিরিতে তার, কেবলমাত্র এবং শুধুই তার অবিসম্বাদীত অধিকার, একথা বাড়ির ভুলু কুকুরেও অস্বীকার করে না। অতএব সে হল 'গাঁট' যদিও ছুটকুনকে সরাসরি এই নামে ডাকার ক্ষমতা কেউই আজ অবধি অর্জন করতে পারে নি (মাঝেসাঝে ফুলির প্রক্ষিপ্ত চেষ্টা ছাড়া)। ঝাঁটাকাঠির মাথায় আলুর দম মার্কা বডি আর রিনরিনে সুর নিয়ে ছুটকুনের সাথে প্রায় চুইংগামের মত সেঁটে পিঠোপিঠি বেড়ে ওঠা পাব্লিক হল ফুলি। ছুটকুন যাকে তুলে ধুনে দিলেও গলা দিয়ে রা বেরোয় না ওদিকে ছুটকুনের বিনা অনুমতিতে কেউ ফুলির ফ্রকাগ্র স্পর্শ করলেও ছুটকুন তার মাথা ফাটাতে দৌড়োয়। ছুটকুন আর ফুলি - ঠিক যেমন ঢাকের সাথে কাঁসি অতএব সে কাঁসি। বার বছরেই তাল ঢ্যাঙা অপু হল তবলা কারণ উত্তেজিত হলেই সে তবলা লহরার স্পীডে কথা বলে। একমাথা ঝুমুর ঝুমুর চুল নিয়ে দশ বছরের অলি হল ডুগি, সে কিনা তবলার বোন তায় পুরো ফুটবলের মত গোল তাই।

    গোটা বাড়ি ঘুমে নিঝঝুম তাও পা টিপে টিপে সদর দরজার দিকে চলল গাঁট, কাঁসি, ডুগি আর তবলা। দরজার কাছে........ কি চিত্তির!!!!!! সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে আট বছরের কলি ওরফে ভেঁপু। সে মোট্টেও ঘুমোয় নি, সনাতনদা তাকে বলেছে আজ ওরা নদী দেখতে যাবে তাহলে তাকেও নিতে হবে নইলে (পুরো ভিলেনের কায়দায় ডায়লগ দেয়) সে একখুনি সব্বাইকে বলে দেবে। ছুটকুন দাঁত কিড়মিড় করে, ফুলি ঠোঁট চাপে, অলি চোখ সরু করে, অপু উদাস নয়নে বাইরে দেখে কিন্তু কেউই ভেঁপুকে ঘাঁটাতে সাহস করে না কারণ ভেঁপুর কাংস্যনিন্দিত সুরে হাঁকাড় দিয়ে কান্না আর তার অবধারিত ফল সম্পর্কে তারা সম্যক সচেতন। অতএব ভেঁপুও সঙ্গী। অপু একবার উদাস স্বরে বলে - তালে ভুলুকেই বা আর রেখে যাওয়া কেন?
    রেগে গেলে তুতলে যাওয়া ছুটকুন দাঁতমুখ খিঁচিয়ে অপুকে বলে যুযুযুদিষ্টির কোথাকারে।
    বাইরে তখন গ্রীষ্মের শেষ দুপুর, গেট খুলে মাটির রাস্তায় পা রাখে পাঁচ মূর্তি।
  • pipi | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২০:৩২728873
  • তাদের বাড়িটাই ইঁট বাঁধানো পাকা রাস্তার শেষ সীমানা। তারপর থেকে কাঁচা মাটির রাস্তা এঁকেবেঁকে ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে, কখনো গেরস্ত বাড়ির উঠোনের উপর দিয়ে হেলেদুলে দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে। কোথায় গেছে, সেটাই তারা দেখবে আজ। ধান বোঝাই গরুর গাড়ি গিয়ে গিয়ে রাস্তা এবড়োখেবড়ো। বৃষ্টি হলে এ রাস্তায় চলা দায় অবশ্য টানা কদিন খটখটে রোদ্দুরের কারণে এখন শুধু পায়ে পায়ে মিহি পাউডারের মত সাদা ধূলো ওড়ে, চটি ফটফটিয়ে আস্তেসুস্তে তার মধ্যে হাঁটা লাগায় পাঁচজনা....... অ্যাটভেঞ্চার।

    সবার আগে টাট্টু ঘোড়ার মত খপখপ করে পা ফেলে চলে ছুটকুন, পিছনে পিছনে প্রায় ছুটকুনের ল্যাজ ধরে ল্যাগব্যাগ করতে করতে চলে তালঢ্যাঙা অপু, মধ্যে অলস মন্থর গতিতে জাবর কাটতে কাটতে চলে অলি; জঠরের আগুন যার কখনই নেভে না তাই তার অক্লান্ত চোয়াল কামারশালার হাপরের মত সদাই ওঠে আর নামে। খাবারের ঝুলির কর্তৃত্ব অন্তত তার নয় সেটা আন্দাজ করেই পথের ও পেটের ক্লান্তি ভুলতে একপ্যাকেট পপিন্স সঙ্গে নিতে সে ভোলে নি। আপাতত তারই একটি মুখে দিয়ে মাঝেমাঝেই জিভের ডগাটুকু বের করে লাল হল কিনা একমনে তাই দেখতে দেখতে পথ হাঁটে সে। জলপিপির মত নাচতে নাচতে চলে ভেঁপু। ফুত্তি আজ তার এতই প্রবল যে থেকেই থেকেই সে যে মুখে আঙুল পুরে চোষে আজ সেটাই সে ভুলে গেছে। আর ছানার পিছনে মুরগীর মত ভেঁপুর পিছন পিছন ইতিউতি চাইতে চাইতে হোঁচট খেতে খেতে চলে টিঙটিঙে ফুলি।

    ইঁটের পাকা রাস্তা যেখানে শেষ পাকা বাড়িও সেখানেই শেষ, কাঁচা রাস্তার সাথে গলা জড়াজড়ি করে থাকে কাঁচা মাটির বাড়ি। বেশিরভাগই একইরকম। শন কিম্বা খড়ে ছাওয়া, জমি থেকে দুহাত উঁচু দাওয়া, চাল এত নীচু কুঁজো হয়ে দাওয়ায় উঠতে হয়, দাওয়ার বাঁশের খুঁটির মাথায় চালের বাতায় সংসারের টুকিটাকি সাতসতেরো গোঁজা, উঁচু উঁচু চৌকাঠ তার এককোণে আবছা হয়ে আসা লক্ষীর পা, দিনের বেলাতেও ঘরের মধ্যে অমাবস্যের হীমহীম অন্ধকার আর ঘরের কোণে ইঁদুরের গর্ত, ঘরের পিছনে পানা ভরা ডোবা, শ্যাওলা ধরা গাছের গুঁড়ি ফেলা ঘাট, ঘাটের পাশে একচালা চটের দেওয়াল ঘেরা গোয়ালঘর - চোখ কান বুজেও এসব বলে দিতে পারে ডুগি, তবলা, ভেঁপু কাঁসিরা। এদিকের বেশিরভাগ ঘরের উঠোনেই তুলসী মঞ্চ। বৈশাখ মাস, ঝারার জল টুপিয়ে টুপিয়ে তুলসীর তেষ্টা মেটায়; উঠোনে লঙ্কা শুকায় ধান শুকায় জেলেবাড়ি হলে মাছও। দড়িতে মেলা মাছধরা জালও শুকায়। জেলেবাড়ি হোক বা না হোক এদিকের সব ঘরেই ছিপ, বঁড়শি, ফাতনা, গুলি সুতো, খেপলা জাল, বড় জাল মজুত কারণ ধানক্ষেতে খালে বিলে নয়ানজলিতে মাছ মন্দ মেলে না। আর শ্যাওলা ধরা ঘাটের কিনারে মেলে গেঁড়ি গুগলী শামুক চিতি কাঁকড়া। গাঁট কাঁসিদের বাড়িতে অবশ্য ওসব খায় না, বলে নাকি ওসব ছোটলোকে খায়। এই ব্যাপারটা নিয়ে ফুলি অবশ্য একটু ধন্দে আছে। ছোটলোকে খায় - ওরা খায় না - তার মানে তো ওরা বড়লোক কিন্তু তবে যে জ্যাঠাইমা বলল না ওরা বড়লোক নয়, ওরা নাকি 'মোদ্দোবিত্ত'। ছুটকুন বলল ওর মানে হল মাঝারি। তা মাঝারি মানে তো এপাশেরও খানিক, ওপাশেরও খানিক তারমানে রোজ রোজ না হলেও মাঝে সাঝে গেঁড়ির ঝাল তো খাওয়াই যায়, নয়?
    অলির কাছে ছোটলোক বড়লোকের ডেপিনিশন খুব সোজা। যারা জ্যাঠাই বাবা কাকাইয়ের কমবয়সী তারা সবাই তো ছোটলোক বটেই। সেইজন্যেই তো সনাতন মুনিষও ছোটলোক। আর তার বন্ধু জানা বাড়ীর গৌরীও। যে কিনা লুকিয়ে অলিকে গুগলীর ঝোল খাওয়ায়। অলিও ছোটলোক। ব্যাস। অবশ্য জানা বাড়ীর খাবার খায় জানতে পাল্লে পিঠে তার আস্ত চ্যালাকাঠ ভাঙ্গবে মা সেটা ভালমতই জানে অলি, তারা নাকি বামুন আর গৌরীরা 'মাইসসো'। মাইসসো কি সেটা ঠিক জানে না অলি। মোষ কি? কিন্তু কই গৌরী তো কেমন ফস্‌সা। মোষের মতন কালুকুলুটি নয় তো। বামুন মানে কি সে নিয়ে অলি ফুলি কারোর কোন সন্দো নেই। বামুন মানে হল ছাড়া কাপড় কাচা কাপড় এঁটো বাসি সকড়ি শনি মঙ্গল বেস্পতি বার পাঁজি পুঁথি লাউ কদু ভক্ষণ অভক্ষণ হাঁচি কাশি টিকটিকি রান্নাঘর ঠাকুরঘর নিত্যদিন দুইবেলা ভোগ কাঁসর ঘন্টা আরতি হোম ছোঁয়াছুঁয়ি গোবরছড়া গঙ্গাজল একাদশী দ্বাদশী অমাবশ্যে পুন্নিমে উপোস কাপাস বার তিনেক চান আর ঠাকুমার ন্যাড়া মাথা সাদা থান। আর বামুনের ছেলেমেয়েরা খালি বামুন বিয়ে করে আর তাদের বামুন ছেলেপুলে হয় আর তারাও বামুন বিয়ে করে না হলেই মুনিয়াদির অবস্থা হয়। সে কিনা বামুন বিয়ে করে নি তাই তার বাড়িতে ঢোকা মানা। সে তাই আর তার মা বাবাই কাকাই জ্যাঠাই ভাই বোন কাউকে দেখতে আসতে পারে না, কথাও বলতে পারে না। ভেঁপুর ধারনা বামুন বিয়ে না করলে নিশ্চয়ই তার গায়ে ঐ হাম কিম্বা বসন্তের মতন গুটি বেরোয় তবে এই গুটিগুলো বোধহয় কখনো সারে না তাই তাকে আলাদা করে দেয় যাতে অন্যদের ছোঁয়াচ না লাগে। বেচারা ভেঁপুর গেলবার চিকেন পক্স হয়েছিল, একটিমাস মা বাদে আর কাউকে সে দেখতে পায় নি। উফ ঐ একমাসেই তার কি হালত কাউকে না দেখে আর মুনিয়াদির না জানি তালে কি হয়। বাবাগো।

    পাঁচরকমের ভাবনা নিয়ে পাঁচমূর্তি আপাতত হেলেদুলে নদীর পথে। পড়ন্ত দুপুর বাড়ন্ত রোদ। দিনের এই সময়টা সবচাইতে ভাল লাগে ডুগি তবলাদের। কেমন মিঠে হাওয়া, কচি ধানের শিসের দোলদুলুনি, বাবলা গাছতলায় গাং শালিকের কিচিরমিচির, গাছের ছাওয়ায় চোখ বুজে জাবর কাটা গরু ছাগলের আরেকপ্রস্থ খুঁটে খাওয়া, কাছে পিঠে কোথাও ঢেঁকির পাড়ের আওয়াজ। চিড়ে কুটছে বোধহয়। ঢেঁকির গান শুনতে খুব ভাল লাগে ফুলির। ঐ যখন পাড়ার বৌরা ওদের বাড়ি চাল কি চিড়ে কুটতে আসে ফুলি তখন ঢেঁকিঘর থেকে নটনড়নচড়ন। দুজন করে ঢেঁকিতে পাড় দেয় আর আরেকজন ঢেঁকির খোঁদল থেকে কি জলদি জলদি কোটা চাল সরায়। প্রতিবারেই ফুলির ভয় করে - যদি হাতে এসে পড়ে? তবু ভয়টয় ভুলে হাঁ করে বসে থাকে ঐ গান শুনবে বলে। ঢেঁকির পাড়ের তালে তালে কেমন ওরা গান গায় - এ এ এ ধান ভানি রে ঢেঁকিতে পা দিয়্যা ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়াদুলিয়া.....

    'ঈঈঈক' !!!- বাসরে ! অলির চীৎকারে চারমূর্তি ঠিকরে ছিটকে ওঠে আর কি। কি? না পথের পাশে ঝাঁকড়া সাঁইবাবলা গাছটার তলায় বেশ খানিক সাঁইবাবলা পড়ে আছে। তাই দেখে ডুগীর ফুত্তি হবে না? অমন টাটকা রসালো সাঁইবাবলা দেখেও? একি মুড়ি না মুড়কি যে হরদিন খেতে পাও? তা চিল্লানিটা ডুগীর গলা দিয়ে বেরোলেও কাজের বেলায় দেখা গেল সাঁইবাবলার সদ্ব্যাবহারে কেউ কম যায় না। ভেঁপু বেচারী একদমে বেশি খেতে পারে না, খায়ও সে আস্তেধীরে। বুদ্ধি করে সে তাই যত না খেতে পারবে তার ডবল ফ্রকের কোঁচড়ে ভরে চলল চিবোতে চিবোতে। সেই দেখে গাঁট দিল এক দাবড়া। - 'ওকি! ওকি! তোর পেন্টু দেখা যাচ্ছে। নামা। নামা শিগগির।' কিন্তু ভেঁপু শোনার পাত্রী নয়। পেন্টুই দেখা যাক কি পেট তাই বলে সে সাধের বাবলাগুলো ফেলে দেবে নাকি। নাকি ছুটকুনের হাফপেন্টুলের পকেটে দেবে। হু: অত্ত বোকা সে নয়। সে অমনি করেই যাবে।
    একটা রীতিমত গোলমালের সূত্রপাত হল। ছুটকুন ছাড়বে না ভেঁপুও শুনবে না। অতএব ফুলিকে মধ্যস্থতা করতেই হয়। অপুর কাঁধের খাবারের ব্যাগের মধ্যে থেকে বেরোল একখানা খবরের কাগজের টুকরো তাতে কলা রাখা ছিল, আপাতত তাইতে বাবলাকটি মুড়ে ভেঁপুর হাতে দিয়ে ওম শান্তি জপল সবাই।

    এ দেশটায় খালি নারকেল সুপারির বন। যেদিকে দেখ খালি ঐ। তার মাঝে মাঝে ফুলও হয় ভাল। তা বলে কি আর গোলাপ রজনীগন্ধা। তা নয় তবে প্রায় সব বাড়ীতে দেখো সীমানা ঘিরে চারপাঁচ খানা চাঁপা কি কল্কে লঙ্কাজবা আর অতসী তো আছেই, ঢোকার মুখে অপরাজিতা আর বেড়ার ধার বরাবর ঐ লাল ফুল সবুজ পাতাওলা কঞ্চিমত দেখতে ঝোপগুলো যাকে ওরা বলে কঞ্চিফুল। আর শীতকাল হলে গাঁদা। বেশ লাগে ফুলির। এপাশের কোন একটা বাড়িতে সাদা কাঞ্চন ফুলের গাছ আছে জানে সে। সেই আগে আগে যখন দাদুর সাথে ভোরবেলায় সাজি হাতে ফুল তুলতে আসত সে তখন দেখেছিল। কি অদ্ভুত সাদা। অমন চমৎকার সাদা রঙ সে আর কখনো কিছুতে দেখে নি। দেখলেই কেমন মন ভাল হয়ে যেত। দাদুরও বোধহয় খুব ভাল লাগত ঐ ফুল। কি যে সব ভারী ভারী সংস্কৃত শ্লোক বলত ফুলি তো কিছুই বুঝত না। একবার বলে কি আমরা সবাই নাকি কালো আমাদের নাকি ঐ কাঞ্চন ফুলের মত সাদা হতে হবে তবেই মুক্তি। দাদু বলে কি!! শোনার পরে দাদুর মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে দেখেছিল ফুলি। কই দাদু তো কেমন টকটকে ফরসা, ঠাকমা তো আরো। নিজের হাতপাগুলো ও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছিল। কালো তো মনে হয় নি। কালো তো সনাতন দাদা। বাববা। ঠাকমা বলে এল বসল তো ঘর আঁধার হয়ে গেল। দাদুর কথা মনে হলেই কেমন মন ভারী হয়ে যায়। তিন বছর আগে হাউয়ের মত হুশ করে কেমন মরে গেল। উঁহু মরে গেল বলতে নেই, চলে গেল। চলে গেল।

    - "কোথাকে যাবা গো দিদিরা?'
    হেগোর কাকীর খনখন গলা দুপুরের বাতাস চিরে দেয়। বলে নেওয়া ভাল প্রাইমারী ইস্কুলে পড়তে একবার প্যান্ট হলদে করে ফেলার পর থেকে হেগো, হেগো হয়ে গেছে। তার নিজের এ ব্যাপারে আপত্তি কত কি ছিল সে অবশ্য সবিশেষ জানা যায় নি। তার কাকী এখন দাওয়ায় পা মেলে আদুড় গায়ে কোলেরটাকে মাই দিচ্ছে। মাঝেমাঝে দোলাটায় দোল দেয় যাতে শুয়ে ওপরেরটা। তার ওপরেরটা পাশের মাদুরে চিৎপাত। এর উপরেও আরেকটা আছে। ঠাকমা বলে হেগোর কাকী নাকি বছরবিয়ুনি। মানে জানতে চাইলে মা রাগ করে। বাবা এলে গজগজ করে - 'যত বয়স হচ্ছে মা'র ভিমরতি বাড়ছে। বাচ্চাগুলো বড় হচ্ছে, তাদের সামনে এসব না বললেই নয়? আমাদের কালে যা পেরেছেন করেছেন এখন যদি না একটু সামলে চলেন......'।
    বাবা একটু নিভে গিয়ে মিনমিন করে বলে - "জানই তো। মা'র মুখটা বরাবরই....। আচ্ছা আমি কথা বলবখন'।
    সে কথা বলা অবশ্য কোনদিনই হয়ে ওঠে না ফুলি জানে। ঠাকুমার মুখের উপর কথা বলবে? এ বাড়িতে এমন বুকের পাটা আছে কারোর? অমন যে জ্যাঠাই, এজলাশে নাকি যার দাপটে জজসাহেবও থম মেরে থাকে সেই জ্যাঠাই ঠাকুমাকে দেখলেই কেঁচো। হি হি হি হি।
    জ্যাঠাইকে কেঁচো ভাবতে গেলেই ফুলির ভীষণ হাসি পেয়ে যায়। যাহ, অমন ভাবতে নেই। তাছাড়া জ্যাঠাই ফুলিকে খুব ভালবাসে, জ্যাঠাইমাও। বাকি সব্বাই খালি অলিকে বাসে। আর আর ঠাকুমা? ঠাকুমা তো তার দুই নাতি ছাড়া আর কাউকে চোখে দেখতেই পায় না। দুধের কড়াই চেঁছে চাঁচি খাবে কে? ছুটকুন আর অপু। ঠাকুরঘর থেকে প্রসাদ বাইরে এলে সবার আগে ঠাকুমা কাকে খাওয়াবে? ছুটকুন আর অপু। ঠাকুমার আচারের হাঁড়ি থেকে আচার নেবে কে? ছুটকুন আর অপুই।
    ফুলি অবশ্য এসব নিয়ে ভাবে না। বিশেষত ছুটকুনকে কেউ ভালবাসলে ফুলিরও তাকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করে। ছুটকুন কি আর খেলো ছেলে? কি সুন্দর দেখতে ছুটকুনকে, কত কত বই পড়ে, আর ছুটকুন জানে না এমন জিনিস নেই। এমন ছেলেকে কেউ ভালবাসবে না হয় কখনো? তাছাড়া ছুটকুন আর অপু তো ছেলে, ওরা তো বংশের বাতি, ঠাকুমা তো তাই বলে। তা তাদের ভাল না বেসে থাকা যায়?
    মা টা যে কি না। এসব বোঝে না। খালি খালি বাবার কাছে গজগজ করে। আর বাবার মুখটা ছোট্ট থেকে আরো ছোট্টো হয়ে যায়। ফুলির যে তখন কি কষ্ট হয়। এমনিতেই তার শান্ত বাবাটার পিছনে সবাই যে কত কথাই বলে। তার বাবার নাকি সাংসারিক বুদ্ধি নেই, নাকি বোকা। এইসব শুনলেই ফুলির কান্না পায় আর মনে হয় তার ছোট্ট ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে বাবাকে শক্ত করে ঘিরে রাখে। বাবার নাকি বুদ্ধি নেই! হু: বললেই হল? অঙ্ক যখন কষে তখন তো দেখ নি। আর কে না জানে যে যারা অঙ্কে ভাল তারা খুব বুদ্ধিমান?
    কিন্তু মোদ্দা কথা হল তাদের সব্বাইকে বাড়ির কেউ না কেউ ভালবাসে কিন্তু ভেঁপুকে বোধহয় কেউ বাসে না। ও যে ভীষণ কালো। বলে হাসপাতালে নিশ্চয়ই বদলে গেছিল। ওর তো নামও ছিল না। সবাই ডাকত কালিন্দী বলে। ফুলিই না তাই নিয়ে কত কান্নাকাটি করেছিল? তা কাঁদবে না? সে ফুল্লরা-ফুলি, তার পর অপালা-অলি আর তার পরের বোন কি করে কালিন্দী হয়? মিলটা কেটে যাবে না? আর মিল না থাকলে কি করে ভালবাসা হবে? খালি বাবা-ই না সে কথা বুঝে ওর নাম রেখেছিল কৃষ্ণকলি? তাই নিয়ে ঠাকুমার সে কি রাগ। বলে ঐ কেলেকুষ্টি মেয়ে নিয়ে আদিখ্যেতা কত। ছোটকাকিমণিও তো কেঁদে বাবাকে বলেছিল, মেজদা নামটা বদলে রাখুন। তা বাবা কারোর কথাই শুনল না, ঠাকুমারও না। ফুলির তখন খুব গর্ব হয়েছিল বাবাকে নিয়ে। দেখ দেখ, বোকা লোক হলে এমন পারে? জ্যাঠাই অবধি ঠাকুমার মুখের উপর কথা বলতে পারে না আর তার বোকা বাবা? করে দেখাল তো?
    ছোটকাকিমণি তাও এখনো লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। ফুলি দেখেছে। আর কাঁদলেই ছোটমণি ধরা পড়ে যায়। বড় বড় টানা চোখ দুটো, ফরসা নাকের ডগা, কপালের মাঝখান, সব লাল হয়ে যায়। উহ ছোটমণি কি ফরসা আর কি সুন্দর দেখতে। বাড়ির মধ্যে সবচে সুন্দর। ঠাকুমা তো বলে - বেছে বেছে অপ্সরি বৌ আনলুম আর কপালে জুটল পোড়া হাঁড়ি। তা সত্যি, ভেঁপুটা যে কেন এমন কালো। ফুলিদের বাড়ির কেউ কালো না। ঠাকুমা নাকি সেইজন্যই বেছে বেছে সব ফরসা সুন্দর বৌ এনেছিল যাতে নাতিপুতিরা দেখতে ভালো হয়। তো খুব স্বাভাবিক যে কলিকে দেখলেই ঠাকুমা রেগে যায়। ছোটমণি তো ভয়ে ঠাকুমার সামনে কলিকে আদরও করে না, আসতেও দেয় না। কলির নাকি ভাইবোন হবে। ঠাকুমা ছোটমণিকে নারকেলের জল, জাফরান দেওয়া দুধ আরো কি কি সব খাওয়াবার জন্য সর্বক্ষণ বকাবকি করে। আর ছোটমণি আজকাল দিনরাত ঠাকুরঘরে মাথা কোটে। কেন কে জানে?
    আহা কলির ভাইবোন হলে কলিকে আর কেউ পুঁছবে? কলিকে তাই সে খুউব ভালবাসে। ছুটকুনকে যতটা বাসে ততটা নয় অবশ্য তবে অনেকটাই। কেন যে সবার ভালবাসা কিতকিত খেলার ঘরের মত এমন খোপ খোপ কাটা কাটা..........

    (ক্রমশ.......)
  • dd | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২০:৩৪728874
  • অ পি। অ পিপি

    গুরুচন্ডালি দশে দ্যাও।
  • pipi | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২০:৪৬728875
  • ডিডিদাদার যেমন কথা। দশে লিখবে পিপি?? আপনিও যেমন। সকাল থেকে বহুত ঝগড়াঝাঁটি অশান্তি করে কোন কাজ না করে গুম হয়ে বসে থেকে দুম করে এইটুকু লিখে ফেলেছে আর কাজ না পেয়ে। মনে হয় না এর পরে আর গাড়ি নড়বে। লিখবে পিপি!!
  • Arjit | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২০:৪৯728876
  • পিপি চাইলে লিখতেই পারে - পিপি চায় না - পিপি বেজায় কুঁড়ে।
  • omnath | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২১:০০728877
  • পিপির এট্টা কুটকচা৯ লেখার ছিল। দুগ্গাপুজোর সময় থেকে। পিপি সেটায় ও ফাঁকি দিইছে।

    বড়রা কান মলে দ্যাও।
  • I | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২২:০০728878
  • পিপির পিঠে গুমগুম করে কিল দ্যাও।
  • Arjit | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২২:১১728841
  • পিপিরে দেকিয়ে দেকিয়ে ডিম খাও আর মিষ্টি খাও।
  • pipi | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২২:১৬728842
  • কি মুশকিল!! আরে পিপি দোষটা কি করেছে সেটা বলবে তো? সবাই মিলে এমন শাস্তি দেবার কথা বলছে কেন?
  • Du | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ০৩:৪৩728843
  • ও পিপি, তারপর তারপর ?
  • ® | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ০৯:৪৪728844
  • পিপি,কত্তদিন পর তোমার লেখা পড়ছি। একখুনি বাকিটা চাই।
  • pipi | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২১:০৯728845
  • যাক গে। হচ্ছিল হেগোর কাকীর কথা। কাকী প্রথমে ছুটকুনকে খেয়াল করে নি। করা মাত্রই তাড়াতাড়ি গায়ে কাপড় টানে আর তাই না দেখে ফুলির জোর হাসি পেয়ে যায়। ন্যাংটো বয়েসে এই কাকীই তাকে আর ছুটকুনকে কত কোলেপিঠে করেছে। ভেঁপু হবার পরে আঁতুড়েও তো ছিল আর এখন ছুটকুনকে দেখে লজ্জা পাচ্ছে দেখ।
    কাকীও বোধহয় বুঝেছিল যে লজ্জাটা একটু বেশিই পাওয়া হয়ে গেছে। বাঁ হাত দিয়ে দুম করে দোলাটায় একটা দোল দিয়ে কোলেরটাকে দুধ ছাড়া করে কাঁধে ফেলে দুটো ছোট ছোট চাপড় দিয়ে উঠে আসতে আসতে আবার বলে - কোথাকে যাবা গো?
    এর উত্তরে ছুটকুন ছোট করে একটু গলা খাঁকারি দেয় মানে উত্তর দেবার জন্য সে রেডি হচ্ছে। বেচারা ছুটকুনের হয়েছে মুশকিল। বয়সের এমন একটা গেরোয় সে পড়েছে যেখানে ছেলেমানুষী স্বর না কচি ছেলে না জোয়ান মানুষ কোনটাতেই পড়তে না পেরে কোন গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়। এই জ্বালার উপর যখন ফুলি নুন ছিটায় - তোর গলা দিয়ে না সপ্তসুর একসাথে বেরোচ্ছে রে ছুটকুন, তুই ওস্তাদেরও ওস্তাদ।
    সহ্য হয়? গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করা ছাড়া উপায় কি।
    নদীর পাড়ে যাবে শুনে হেগোর কাকীর একগাল মাছি।
    - সে তো অনেক দূর গো। রাস্তা চিনো?
    বাকীরা সবাই ছুটকুনের দিকে তাকায়। আড়চোখে একবার ফুলিকে দেখে নিয়ে ছুটকুন লম্বা করে ঘাড় কাত করে। খুব চেনে সে।
    সবকটা মুখের উপর চোখ বুলিয়ে কাকী জিজ্ঞাসা করে
    - ডাব খাবা? বলুর বাপে আরবেলা পেড়েচ্ছে।
    শোনামাত্রই ছুটকুন না না করে জোরে জোরে ঘাড় নেড়ে দেয়। অগত্যা বাকীরাও.....
    - ওকি মিঠা তেঁতুল নাকি কাকি? না টোকা?
    উঠোনের এক কোণায় চটের উপর একরাশ তেঁতুল শুকোচ্ছে তা আর কেউ না দেখুক অলির চোখ এড়াতে পারে নি।
    - মিঠা। খাবা?
    বলার আগেই অলি হাত পেতে দেয়। দেখাদেখি ভেঁপুও, ছুটকুনের ঘনঘন ইশারা উপেক্ষা করে।
  • pipi | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২১:১১728846
  • কাকীর বাড়ি পেরিয়ে এসে জোর বকা দেয় ছুটকুন।
    - ঘরে খেখেতে পাস না? ববললেই খেতে হবে? এত হ্যাহ্যাংলা তোরা? ছ্যা ছ্যা।
    যাদের উদ্দেশ্যে বলা তারা নির্বিকার চিত্তে তেঁতুল চুষতে থাকে। খানিকটা ফুলির দিকে বাড়িয়ে ভেঁপু বলে - খাবি বড়দি?
    খেতে ফুলির খুব একটা অনিচ্ছে ছিল না কিন্তু ছুটকুনকে রাগাতে সাহস হয় না। তাছাড়া নুন ছাড়া তেঁতুল, হোক না মিষ্টি, সে খেতে পারবে না। তা কাকীরও কাপড় না কেচে রান্নাঘরে ঢুকে নুনের মালায় হাত দেওয়া সম্ভব ছিল না। মরুকগে। ভারী তো তেঁতুল। কাঁচা আম হলেও না হয় একটা কথা ছিল। কাঁচা আম বলতেই মনে পড়ল। কলেজবাড়ির পিছন দিকের রাস্তাটা ধরে এগিয়ে গেলে জেলেপাড়ার কাছ ঘেঁষে যে আমগাছটা আছে কি আমটাই না হয় তাতে। আর এই অ্যাতো বড় বড়। সেই আম ছেঁচে তেল নুন লঙ্কা দিয়ে নারকোল মালায় মেখে টাকনা দিয়ে খেতে কি সুখ কি সুখ। কিন্তু জেলেপাড়ার ছেলেগুলো বড় মারকুটে। বড্ড ঢিল মারে। আর এ তল্লাটে আর কোথাও আম গাছ নেই। যা দু একটা আছে তাতে ফল ধরে না। বাজারে অবশ্য বিক্রি হয়। তা বাজারের কেনা আমে কি আর সেই মজা থাকে? ধুস..

    বাজারের কাঁচা আম খেতে ভাল লাগুক না লাগুক বাজার যেতে তাদের সবারই বেজায় ভাল লাগে। বাজার অবশ্য বাড়ির কাছে না। ওদের পাড়া ছাড়িয়ে, ডিপ টিউকল রিফিউজি পাড়া হাসপাতাল সব পেরিয়ে তারপর মোনামুনির খাল পেরোলে বাসস্ট্যাণ্ড। সেই বাস স্ট্যাণ্ডের ডাইনে বাঁয়ে দোকান বাজার। ঐ মাছের বাজারেই অপু অলিদের যত আকর্ষণ। ইয়া ইয়া চিংড়ির লাশ, চকচকে ভেটকি, লাল রং করা মাটির নাদায় তার চেয়েও লাল এই বড় বড় দাঁড়াওলা কাঁকড়া আর চাই কি তেমন তেমন দিনে ঝুড়ি করে কাছিমও বিক্রি হয়।
    এইসব কাউঠা কাছিম ধান ক্ষেতেই বেশি লুকিয়ে থাকে যেমন থাকে গোসাপ। ধান কাটার সময়ে খুব ধরা পড়ে। বেচারারা পালাতেও জানে না। তাদের ক্ষেত থেকে অনেকবার কাউঠা ধরেছে সনাতন দা। বাড়িতে কাউঠা এলে হৈচৈ পড়ে যায়। আর গরম জলে চুবিয়ে কাছিম মারার সময়ে সনাতনদার মুখটা কেমন বদলে যায়। কালো মুখে ঝকঝকে দাঁতে অ্যাতোখানি চওড়া হাসিতে সনাতনদাকে তখন মহিষাসুর মনে হয়। ফুলি চোখ বন্ধ করে ফেলে। ভেঁপু ফুলির পিছনে লুকায়, অলি পালিয়ে যায়। বাজার থেকে কিনলে অবশ্য এত ঝামেলা করতে হয় না। জোড়ের মুখে সাঁট করে ছুরি চালিয়ে কিভাবে যেন ওরা খোলটাকে আলাদা করে ফেলে। ব্যাস। কেল্লা ফতে।
    মাঝে মাঝে বাড়ির পুকুর থেকেই মেলে সমুদ্রের কাঁকড়া। কেন, সেই যে বার ছুটকুন পুকুরে চান করতে নেমেই ফুলিকে বলল দৌড়ে গিয়ে রান্নাঘর থেকে বড় সাঁড়াশিটা আনতে? ফুলি তো ভেবেই মরছিল যে সাঁড়াশি দিয়ে ছুটকুন চান করতে নেমে কি করবে। তারপর ছুটকুন যা খেল দেখাল।
    ঘাটের কোণায় অতবড় লাল কাঁকড়াটা যে বুড়বুড়ি কাটছে সে কি আর ফুলি দেখতে পেয়েছিল? নিশ্চয়ই গুগলী শামুক খেতে এসেছিল। আর কি বোকা কি বোকা। ছুটকুন যেই সাঁড়াশি দিয়ে খোঁচা দিয়েছে অমনি সে ব্যাটা তার দুই দাঁড়া দিয়ে সাঁড়াশিটাকেই চিপকে ধরেছে একদম। মোট্টে ছাড়ে না। ছুটকুনকে কিছুই করতে হল না। কাঁকড়া নিজেই নেচে নেচে সাঁড়াশি কামড়ে হেঁসেলে ঢুকল। উহ একচোট হাসাহাসি হয়েছিল বটে সেদিন। হাঁড়ির মধ্যে রাখার পরে বোধহয় বুঝতে পেরেছিল। ফুলি অনেকক্ষণ ধরে হাঁড়ির কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে দেখছিল ওটাকে। কাঁকড়াটাও দেখছিল তাকে নিশ্চয়ই কিন্তু খানিকক্ষণ খড়মড় করার পরে নিÖপ্রাণ হয়ে ঝিমিয়ে গেছিল বেচারা। কেমন একটা কষ্ট হয়েছিল ফুলির, কাঁকড়ার ঝাল খেতে পারে নি সেদিন সে।
  • pipi | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২১:১২728847
  • এ দেশটায় হাতের রেখার মত কটাকুটি করে ছেয়ে আছে খালবিল নদীনালা পুকুর আর ভেড়ি। সব নোনা। সমুদ্র কাছেই। মাটি নোনা, জল নোনা, নারকেলের জল নোনা এমনকি ছুটকুন বলে গরুর দুধও নাকি নোনা। তার মামাবাড়ি মেদিনীপুরে কাঁথিতে। বলে নাকি সেখানকার দুধ মিষ্টি, নারকেলের জল মিষ্টি, ভাত ডাল সব মিষ্টি। এই নোনা মাটি নোনা পানির কারণেই নাকি বন থেকে বাঘ বেরিয়ে মানুষ ধরে খায়। মানুষের রক্ত নাকি মিষ্টি। ছুটকুন কোথায় নাকি পড়েছে সে কথা। ছুটকুন বললে সে কথা বিশ্বাস করতেই হয়। ও অনেক জানে যে।
    তবে এ সবে ফুলিদের কিছু যায় আসে না। বাঘ এখানে আসে না। আসবে কি করে, সুঁদরী গাছের সে গহীন জঙ্গল এখান থেকে দূরে। মাঝে অনেক নালা খাল বিল; অতসব উজিয়ে বাঘ আসে না। মাছখেকো কামট, কাঁকড়া আর ইলিশ আসে অবশ্য। এখানেও বন আছে বৈকি। বন আছে,
    বনবাংলো আছে, তাতে পিকনিক করতে লরী গাড়ি ভরে লোক আসে ৩১শে ডিসেম্বরের সময়। সে সময় বাজারে সব জিনিসের দাম চড়ে যায়। জ্যাঠাই বিরক্ত হয়ে শহুরে লোকেদের আদেখলাপনা আর হ্যাংলামি নিয়ে কদিন যাকে পায় তাকেই ধরে লেকচার দেয়।

    ফুলিদের অবশ্য খারাপ লাগে না। একে তো সেসময় ইস্কুল পাঠশাল ছুটি তার উপর বাজার গেলেই চকচকে জামাকাপড় পরা ঝকঝকে নতুন নতুন লোক দেখতে পায়। তারা কথায় কথায় হাসে, জোরে জোরে কথা বলে, তাদের কথায় এখানকার টান নেই, তারা গান বাজিয়ে নাচে, জোর হৈ হল্লা করে - সব মিলিয়ে যাত্রা সার্কাসের থেকেও বেশি আমোদ।

    একবার তো চার পাঁচজন তাদের বাড়িতে হঠাৎ ঢুকে পড়েছিল ঘুরতে ঘুরতে। বলে বাড়ি দেখবে। ভাগ্যি সে সময় জ্যাঠাই আর ঠাকুমা ছিল না। তা তারা ঘুরে ঘুরে দালানকোঠা, চণ্ডীমণ্ডপ ফুলের বাগান সব দেখল। পুকুর দেখে দুজন মহিলা হঠাৎ ধরে বসলেন তাঁরা চান করবেন। নতুন গামছা শাড়ি সব দেওয়া হল। তারা ঘাটে বসে জলে পা ডুবিয়ে গলা খুলে গানও গাইল। সবই হল কিন্তু পুকুরে দুজনার কেউই আর নামে না, ডুবও দেয় না। রকমসকম দেখে ফুলিরা তো হাঁ। তারপর তারা সবাই ধরাধরি করে দুজনকে পুকুরে নামালে পরে দুজনে কোমরজলে দাঁড়িয়ে মগ দিয়ে জল তুলে মাথায় ঢেলে চান করল। দেখে ফুলিরা তো হেসে কুটিকুটি।

    আর বাকীরা পুকুর পাড়ে খেজুর গাছে ভাঁড় বাঁধা দেখে বলে রস খাব। আরে দুপুর বেলা রস থাকে কখনো। সে তো শিউলি কোন সকালে এসে রস নিয়ে গেছে। তা লোক পাঠিয়ে গ্রাম থেকে শিউলিকে আনা হল। সাথে দু তিন ভাঁড় রস। বাবুরা আবার ভাঁড়ে করে খেতে পারে না। তাই তাদের গেলাসে ঢেলে দেওয়া হল। সকালের রস দুপুরে কি আর ভাল থাকে। টকে যায়। তাই খেয়ে শহরের লোকেরা কি খুশি। খালি মেয়েরা খেল না। মুখ বেঁকিয়ে বলল 'গন্ধ'।
    পরে অবশ্য আসনে বসে কাঁসার বড় বগি থালায় গন্ধসরু চালের ভাত, গাওয়া ঘি, ক্ষেতের সব্জী, পুকুরের জ্যান্ত মাছের ঝোল আর শেষপাতে ক্ষীর চেটেপুটে সবাই খেল। তারপর খিলি পান মুখে দিয়ে বাড়িশুদ্ধু সবার মায় চাঁদি গাইয়ের ফোটো তুলে তারা বিদায় হল। আর তারা যাবার পরে বাড়িতে সেকি হাসির ধূম।
    ছুটকুনের মামাবাড়ির দেশে হয় নাকি এত মজা। নোনা মাটির নোনা পানির এ দেশই ভাল।
  • bozo | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২৩:৩৫728848
  • হুঁ।
  • bhabuk | ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২৩:১৪728849
  • তাপ্পর? পিপি,কোথাকে গ্যালে?
  • Parolin | ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২১:৪০728850
  • অ পিপি, ল্যাদ কাটিয়ে জাঁপিয়ে পড়ে বাকীটুকু লিখেই ফেল না।
  • kd | ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২২:০৫728852
  • বলি অ পিপি, বাইরে বরপ পড়চে, নেপ্‌মুড়ি দিয়ে জানলার পাশে বসে বাকিটুকু নিকে ফ্যালো দিকিনি।
  • pipi | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ০০:২১728853
  • - আচ্ছা বড়দি?
    - হুঁউউ?
    - তুই বাঘ দেখেছিস?
    ভেঁপুর সরল প্রশ্ন।
    - হ্যাঁ অনেক দেখেছি।
    - অ অনে এক? কোথায় দেখলি?
    - কেন? বইতে, ছবিতে, সিনেমায়
    - না না। সেরম না। তুই সামনাসামনি বাঘ দেখেছিস?
    - তোর মাথাটা না ভূষিভরা। বাঘ আমার সামনে এলে কি আর এখন তোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম?
    ভেঁপু অপ্রস্তুতে পড়ে যায়।
    - না মানে সেই যে তোদের ইস্কুল থেকে বাঘ দেখাতে নিয়ে গেছিল সজনেখালি?
    - দূর সেটা তো কুমীর প্রকল্প। বাঘ দেখা অত সোজা নাকি।
    এর উত্তরে ভেঁপু বুক ফুলিয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে এর উপরে আর কোন কথাই চলে না এমন একটা ভঙ্গী করে বলে
    - সনাতনদা বাঘ দেখেছে। ওদের গ্রামে বাঘ খুব আসে।
    - ব্যাস তাহলে তো আর কথাই নেই। ভেঁপুর সনাতনদা দেখেছে। - প্রচ্ছন্ন ব্যাঙ্গের সুরে অলি বলে।
    ওপাশ থেকে অপু ফুট কাটে
    - রাতের বেলায় সনাতনদা অমন অনেক কিছু দেখে রে ভেঁপু।
    হা হা হি হি হো হো-র রে রে পড়ে যায়। সনাতনের খালি ভূতের ভয়। ঐ ভয়ের চোটেই না সে চিলেকোঠার ঘরে থাকতে রাজি হয় নি। সেইটা এখন ছুটকুনের পড়ার ঘর। ঠাকুমা তো বলে - বাঘের ভয়ে ঘর ছাড়লি সনাতন, ভূতের ভয় তোকে দুনিয়া না ছাড়া করায়।
    এদিকে যুগপৎ আক্রমণে দিশাহারা ভেঁপু কি করবে ভেবে না পেয়ে তার একমাত্র অস্ত্র প্রয়োগ করে। ভ্যাঁ আ আ আ আ....
    তার সনাতনদাকে নিয়ে এমন মশকরা!! একি সহ্য হয়!! ওরা তো জানে না সনাতনদা কি বীর!
    জানবে কি করে। সনাতনদা ওদের বলেছে নাকি। কেমন করে অবহেলায় খরিশ সাপ ধরে পিটিয়ে লম্বা করেছিল, কেমন করে লগি ঠেলে নদী নালার কাটাকুটি পেরিয়ে আঁধার রাতে বাদা বন পেরিয়ে এসেছিল, কেমন করে সড়কির এক ঘায়ে ফুঁড়ে ফেলেছিল মদ্দা হরিণটাকে - এসব খালি সেই জানে। আর সনাতনদার এত বুকের জোর এত গায়ের জোর সব মা বনবিবির দয়ায়। মা বনবিবি যার সহায় আর গাজি সাহেবের মাদুলি যার আছে তার চুলের ডগাটুকুও কেউ ছুঁতে পারবে না। সনাতনদা বলেছে যখন সে ঘর যাবে তখন ভেঁপুর জন্য একটা মাদুলি নিয়ে আসবে। কিন্তু সনাতনদাটা যে কি না। কক্ষনো ঘর যায় না, ভেঁপুরও তাই আর মাদুলি পাওয়া হয় না। অথচ মাদুলি না পেলে ভেঁপুর বুকের জোর বাড়বে কি করে? সবার সাথে লড়বে কি করে ভেঁপু? আর লড়তে না পারলে মা-র কষ্ট কি করে যাবে? ঐ মাদুলি তার চাই-ই চাই। কিন্তু সনাতনদাদা ঘর যায় না। পৌষের শেষে বনবিবি পূজোর সময়েও না।
    - তোমার ঘর নাই সনাতনদা?
    - হু, উই ঝড়খালির উদিকে।
    - তাহলে তুমি ঘর যাও না কেন?
    উত্তরে সনাতন মিটিমিটি হাসে।
    - তোমার ঘরে কেউ নাই?
    হাসতে হাসতেই সনাতন উঠে চলে যায়। সন্ধ্যেবেলায় গোয়ালে সাঁজাল দিয়ে ডাবায় জাবনা ভরে গরু তুলে গোয়ালের দরজা এঁটে সাতসতেরো কাজ সেরে বিড়ি নিয়ে ঘাটের রানায় বসে সনাতন। সন্ধ্যের বাতাস পড়ে আসে। মাথার উপর মশার ঝাঁক ফিকে হয়, রাত ঘনায়, কামিনীর গন্ধে নেশা ধরে, আন্ধারে খালি একটুকরো লাল আগুন ধিকিধিকি জ্বলে। আর জ্বলে সনাতনের বুক।
    তোমার ঘরে কেউ নাই সনাতন? তোমার কেউ নাই? কেউ আছিল না? ঝড়খালি, বিদ্যেধরী, খালপাড়ে সেই হোগলা ছাওয়া ঘর, বনবিবির থান, চাকভাঙার দল - সে সব কি তার স্বপ্নে আছিল?
    দেশ গাঁ ঘর সবই তো আছিল তাদের - সাতক্ষীরায়। দেশটাই যখন দু টুকরা হল চারিপাশের ঠেলা আর গুঁতা খেতে খেতে বাদা বনে ঠাঁই নেওয়া। এ এক আজিব দেশ। এখানে গাছের শিকড় মাটির উপরে উঠে, মাছে গাছ বায়, বাঘে মানুষ নেয়, নদীতে জমি খায়। সব উল্টা। তারাও উল্টাল। ছিল চাষা হল মৌলি। তিনপুরুষের মৌলি তারা। তাদের হাত না পড়লে বাদা বনের চাকে মৌ জমে না। সেই সোনালী মৌয়ের চাকে রক্তের ছাপ থাকে। কে বা দেখে। সেই মৌ খায় বাবুরা। মোম মাখে বিবিরা। মৌ বেচার ট্যাকা খায় ফড়েরা। মৌলিরে খায় বাঘে। মৌলিদের ঘরের মেয়ে বৌরা চুপড়ি জাল নিয়ে কোমরজলে নেমে মাছমারানি হয়। মৌ বেচা অন্নে কয় মাস গুজার করে তারাও জাল নিয়ে বৈঠা ঠেলে ভেসে পড়ে মাতলা বিদ্যেধরী রায়নার শুঁড়িপথে। চুপিসাড়ে বাদাবনে হামলায় কাঠকুটো হরিণের লোভে। পেট বড় বালাই। আর এসবের মাঝে গোলা ভরা ধানের স্মৃতি, লক্ষীর পায়ের ছাপ ঝাপসা হতে হতে শেষমেষ কোথায় মিলিয়ে যায়।
    সনাতনের ক্ষেত্রেই বা ছবিটা উল্টা হবে কেন। তার বাপ দাদারে মামায় নিল। প্রতিবারেই নেয়। হিসাব কে রাখে। মামায় নেয় ১৯, সরকার ল্যাখে ৯। মানুষের জীবণ এখানে বিকায় কানাকড়ির দামে।
    বাপ দাদারে বাদায় খেল। আড়কাঠি নিয়ে গেল বোনটারে। একটুকরা জমি ছিল - জবরদখল বলে সরকার নিল চিংড়ি চাষের জন্য। পাঁচ মাসের পোয়াতি বৌটারে নিল সাপে। থাকার মধ্যে আর ছিল ঘরখানা। প্রতিদিন রাতে শুয়ে শুয়ে সনাতন শুনতে পেত পা পা করে গাংয়ের এগিয়ে আসা। ঘরখানা নেবে।
    ছোট ভাইডা চালাক ছিল। গায়ে বাদার হাওয়া লাগতেই দিল না। লায়েক হতে না হতেই ঘর ছেড়ে পালাল। এখন শুনতে পায় রাক্ষসখালিতে কোন ইঁটভাটায় কাজ করে। বিয়াও করেছে। ভাল। ভাল থাক। বেঁচে থাক ব্যাটা। খালি সে, সনাতন মৌলি আউলাপারা হয়ে বাদার হাওয়ায় বয়ে গেল।
    তারপর এ গাং সে গাং ভেসে ভেসে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া বেয়ে শেষমেষ এই ঠাঁয়ে।
    এখানে ক্ষেত নিড়ায় সনাতন, মাটি কোপায়, বীজধান রোয়, ধানকাটুনিদের সাথে লেগে পড়ে। তার কাজ নয় - তবু করে। মাটি তারে শান্তি দেয়। মাটির পরশ তার ভাল লাগে। গাং পারে যেতে তার মন লাগে না। চিলেকোঠার ঘরে গাং তারে হাতছানি দিয়া ডাকত। গাংয়ের ভূত। ভয় না পেয়ে উপায় কি। পাণিতে তার ডর লাগে। এ লাটের দেশ, লাটের মাটি তারে শক্ত মুঠায় বান্ধন দিছে। বেশ লাগে সনাতনের।

    শুধু কামিনীর গন্ধে মাতাল সাঁঝের বাতাস যখন ফিসফিস করে - ঘর কোথায় সনাতন? কেউ নাই তুমার? কেউ আছিল না? - সনাতন মৌলি তখন বাউরি হয়ে যায়। ঝাঁপ ঠেলে বাজারের এককোণের ঠেকটায় ঢোকে। বেদম গিলে মাটিতে উল্টে পড়ে থাকে সারারাত পরদিন ঠাকমাবুড়ি গোবর গোলা জলে তার চোদ্দোগুষ্টি উদ্ধার করবে জেনেও।
    সনাতন কোনার... সনাতন মৌলি... সনাতন মুনিষ.... সবাই একে দেহে লীন হয়ে যায়। শুধু ছোট্টো ভেঁপুর আশ্চর্য্যসুন্দর চোখ দুটো প্রশ্ন হয়ে জেগে থাকে - তুমার কেউ নাই সনাতন? কেউ আছিল না?
  • Du | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ০০:৩০728854
  • ও পিপি, এই লেখা তো মলাট খুলে পড়ার গো। অসম্ভব, অসম্ভব ভালো। just বলতে পারছি না কত।
  • bhabuk | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ০০:৪৪728855
  • পাগল করে দে মা - কাগজ কুড়িয়ে খাই। পাগলা - পাগলা- কোনো কথা হবেনা।তাপ্পর?
  • pipi | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ০১:১২728856
  • থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু দু। থ্যাঙ্কু ভাবুক। ভাল বলার জইন্য না, পড়ার জইন্য। বাদার কথা লাটের কথা উঠলি পরে মন হু হু করে আর সেসব কথা কেউ মন দিয়া পড়ছে জানলে... চক্ষে পানি।

    ধন্যযোগ। ছিরিয়াছলি।
  • Sh | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ০৪:১৮728857
  • ভীষন ভীষন ভালো হচ্ছে। খুউউব ভালো লাগছে।
  • arunava | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ১৯:২১728858
  • অদ্ভুত সুন্দর। ভীষণ সুন্দর। মাতাল করে। কামিনীর গন্ধে নেশার চেয়ে কিছু কম নয়।
  • dd | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২১:০৪728859
  • বা: বা:।
  • Santanu | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ০৯:৫৩728860
  • ভীষন ভালো।
  • B | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২০:৩৯728861
  • না লিখে চুপচাপ উদাসমনে বসে থাকতে পারলুম না....

    বড্ড মমতায় মাখা মন আপনার ........, বড় মায়া ভরা কলম........ গাং, নদী, খালের শিরশিরে কোলে টলটলে জলের আয়নায় মানুষগুলোকে সবার হাতে ধরিয়ে দেওয়ার, সবার মধ্যে কখন একটা আস্ত ফুলি, কখন একটা আস্ত ভেঁপু........, আর ছোট্টবেলার রোদ্দুরে আকাশ হারানোর বোবাকান্নার বোতলে চুর হয়ে হারানোর ব্যথায় ডুবে যাওয়া আরেক সনাতনকে জাগিয়ে দেওয়া .......

    রোববারের বিকেল থেকে সন্ধে গড়িয়ে গেলো......, কতবার পড়লুম, শহুরে লজ্জায় চোখের জল লুকোতে লুকোতে কতবার খেই হারালুম, আর যে কাছের মানুষটাকে পড়ে শোনাচ্ছিলুম, সেও কতবার ধরা গলায়...... প্রতিবারই.... অনেক পরে পরে বললে... কি হোলো গো, তারপর.........

    ও মায়াকলম!! শুনলেন........

    তারপর........
  • B | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ ২১:২৫728863
  • কি হোল ? পিপি র লেখা কি বন্ধ হয়ে গেল.....?
  • পাতা :
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন