গুরুচণ্ডালীতে ধারাবাহিক ভাবে আমার ইহুদি রসিকতা যখন প্রকাশিত হচ্ছিল, সেটি পড়ে আমেরিকার একটি শহরের রামকৃষ্ণ মিশন আমাকে এক অনুরোধ জানান – ইহুদি রসিকতা বইতে যেমন কথাচ্ছলে ইহুদি জীবন, ধর্ম, রীতি নীতির সঙ্গে পরিচয় করানোর কাজ করে চলেছিলাম, ঠিক তেমন ভাবে কি ইহুদি ধর্ম শিক্ষার কয়েকটি মডিউল বানিয়ে দিতে পারি ? তাঁরা মিশনে নানান ধর্মের সঙ্গে আপামর জনতার, যাকে বলে লে ম্যান, তাদের পরিচয় করিয়ে থাকেন, ক্লাসরুম স্টাইলে। বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলির মূল বাণীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য ব্রিটেনের স্কুলে আবশ্যিক ধর্মশিক্ষার ক্লাস হয় ( রিলিজিয়াস এডুকেশন )। বরানগরের স্কুলে হতো না। ইহুদি রসিকতা লেখা সময়ে এবং পরে জুডাইজমের মডিউল তৈরি করার সময়ে যেমন জেনেছি, শিখেছি অনেক, তেমনি আমার মনে কিছু প্রশ্ন জেগেছিল : আব্রাহাম ইহুদির আদি পিতা, ঈশ্বরের আদেশে নতুন বাসস্থান হেবরন অবধি পৌঁছুলেন, ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করার জন্য টেম্পল মাউনটে আপন পুত্র আইসাককে বলি দিতে প্রস্তুত হলেন ( হিব্রু পেশাত, বিশ্বাসের পরীক্ষা )। কিন্তু তাঁর ধর্মাচরণের বিধি কি ছিল ? আব্রাহামের অনেক বছর বাদে, মোজেসের দশ আদেশ পাওয়ার আগে পর্যন্ত ইহুদির ধর্ম আচরণের রেওয়াজ কি ছিল? হিব্রু বাইবেলে যার উল্লেখ আছে, টেন কমান্ডমেনটস ছবিতে সিনাই পাহাড়ের নিচে যাদের সোনার বাছুর পুজো করতে দেখেছি, তাঁরাও তো আব্রাহামের বংশধর ! জানতাম এক দল মানুষ সিনাই পাহাড়ের নিচে মোজেসের বাণী শুনে ইহুদি হলো, পৃথিবীতে এমন ঘটনা নাকি আগে বা পরে কখনো ঘটেনি। এর সত্যতা মেনে নেওয়া শক্ত। আমরা জানি তাঁদের লম্বা নাক নিয়ে যতোই ঠাট্টা চালু থাকুক না কেন, ইহুদি কোন বিশেষ জাতি নয়, তাঁদের নানা বর্ণ, চেহারা। ইসরায়েলে ইথিওপিয়ান, ভারতীয় ইহুদির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। এঁদের পূর্ব পুরুষ কি সিনাই পাহাড়ের পাদদেশে ছিলেন যেদিন মোজেস দশ আদেশ পাঠ করছিলেন ? তা নিশ্চয় নয়, কালে কালে এই ধর্ম প্রসারিত প্রচারিত হয়েছে, সেটা কি ধর্মান্তকরণের বলে ? রোড টু দামাস্কাস, সলের (পরে পল) ধর্মান্তকরণের ফেবল আমাদের জানা, কিন্তু জুডাইজমে কনভার্শনের গল্প কোথায়? মোজেসকে ইহুদিরা হত্যা করেছিলেন কিনা সেটি তর্ক সাপেক্ষ কিন্তু হিব্রু বাইবেল এটা তো মানে যে নিতান্ত সুস্থ দেহের একজন বলশালী নেতা কানানের দুয়োর অবধি এসে অকস্মাৎ মারা গেলেন – কেস অফ রিজনেবল ডাউট ? অনুতাপ থেকেই কি সেই গুরুর শিক্ষা মাথায় তুলে নেওয়া হলো ? শিলারের ভাষায়, কোন চিরন্তন সঙ্গীত প্রথমে গভীর জলে ডুবে যায়, তাকে আমরা হারিয়ে ফেলি, পরে খুঁজে পেয়ে মাথায় করে রাখি ? কেন ক্রিস্টিয়ান হোলি কমিউনিয়নে রুটি ও লাল মদ, প্রভুর দেহ ও রক্ত – কীসের প্রতীক ? গুরুহত্যার? নিরাকার একেশ্বরবাদের উত্তরসূরি ক্রিস্টিয়ান ধর্মে কেন এতো মূর্তি, ছবি, আচার আচরণ, প্রতীকের ছড়াছড়ি ? অথচ পরবর্তী আব্রাহামিক ধর্ম, ইসলাম সে সব এমন ভাবে বর্জন করেছে যে ফ্রয়েড তাকে জুডাইজমের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ বলেছেন। মনে হয় আমার কৌতূহলের কিছু উত্তর এবং তাঁর সঙ্গে ভাবনার খোরাক মোজেস ও একেশ্বরবাদ এই বইতে পেয়েছি। ... ...
•আব্রাহাম থেকে মোজেস অবধি ইহুদি একাধিক দেবতার পুজো করেছে। দশ আদেশের পয়লা নম্বর - “তোমার সামনে আমি বাদে কোন ঈশ্বরের স্থান নেই”। এই প্রথম একেশ্বরবাদের পাঠ। বাইবেলকে মাথায় রেখে ফ্রয়েড বলছেন, “ বিশ্বাসী মানুষেরা দুঃখ পাবেন এই ভাবনার বশে ধর্ম পুরাণ আখ্যান রচয়িতারা তার্কিক যৌক্তিকতা থেকে অনেক দূর দিয়ে হেঁটেছেন : উদাহরণ – পারস্পরিক আচার আচরণ ও দায়িত্ব বেঁধে দিয়ে উর গ্রামে পাত্রিয়ারক আব্রাহামের সঙ্গে ঈশ্বরের যে মৌখিক চুক্তি (কভেনানট ) হয়েছিল তার কয়েকশ বছর বাদে কেন সিনাই পাহাড়ে তাঁকে আবার আত্মপ্রকাশ করে নতুন বিধান দিতে হলো ? সেটি তো বহুদিন আগেই আব্রাহামকে দিয়েছিলেন! সোনার বাছুর পুজো দেখে কেন মোজেসকে ঈশ্বরের আদেশের ট্যাবলেট ভেঙ্গে দিয়ে বলতে হলো, তোমরা ঈশ্বরের আইন ভেঙ্গেছ! ... ...
ফ্রয়েড মেনে নিচ্ছেন এ অবধি তাঁর অনুমানের সপক্ষে কোন শিলালিপি অথবা লৌহ স্তম্ভ খুঁজে পাওয়া যায় নি। যাকে আমরা সম্ভাবনা মনে করি সেটা যেমন সব সময় সত্য নয় তেমনি যেটা সত্য সেটাকে কখনো সম্ভাবনা মাত্র মনে করা হয়ে থাকে। তোরার পাঁচটি বই ( পেন্তেতয়খ )-জেনেসিস, একসোডাস, লেভিতিকুস, নাম্বারস, দয়ত্রনোমি – প্রথম পাঁচশ বছরে একাধিকবার সম্পাদকের টেবিল ঘুরে হিব্রু বাইবেলে স্থান পেয়েছে। তালমুদের প্রণেতাদের মধ্যে সত্যিকারের ঐতিহাসিক অনুসন্ধিৎসা ছিলে কিনা সে প্রশ্নও ফ্রয়েড তোলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অগুনতি উদাহরণ আছে যেখানে কোন জাতি বা জনতার বিশাল উদ্যোগের পুরোভাগে দেখা দিয়েছেন একজন বিশেষ মানুষ যাকে সকলে মান্য করেছেন। আমরা ধরে নিচ্ছি মিশরীয় মোজেস সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন- একটি জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন, তাঁদের দেবেন জীবন যাপনের নিয়মাবলী, আইন। ... ...
চির চেনা প্যারিসের অন্য রূপ মনে রেখে দেবো। ভোরের আলোয় আইফেল টাওয়ারের সাময়িক স্টেডিয়াম ঘিরে ৩৫ কিলো মিটার পথ চলার প্রতিযোগিতা – রেলিঙের পাশে সারা পৃথিবীর মানুষের মুখ! এতো রকমের এতো রঙের যে পতাকা আছে ! মায়ের কোলে বসে স্প্যানিশ পতাকা হাতে শিশু, জানলা দিয়ে বিশাল ফরাসি পতাকা দোলাচ্ছেন এক মহিলা, সবার শেষে যে স্লোভাক চলা শেষ করলেন তাঁকে সম্বর্ধনা জানালেন হাজার মানুষ। স্টেডিয়ামের ভেতরে জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সমবেত জনতা গাইছেন- লা মারসেইস, অকস্মাৎ অজস্র আইরিশ কণ্ঠে বাজে ওরান না ভিঅন – সৈনিকের গান, ও কানাডা, আইনিগকাইট উনড রেখট উনড ফ্রাইহাইট, অ্যাডভানস অস্ট্রেলিয়া ফেয়ার ! হার বা জিত যাই হোক না কেন, আপন পতাকা গায়ে জড়িয়ে চলে নানান দেশের মানুষের মিছিল। পথে শুনি সারা ইউরোপের, বাকি পৃথিবীর চেনা অচেনা ভাষা। এই প্যারিস আজ আমাদের। ... ...
পাঁচ ঘর এক উঠোন অবারিত অবশ্যই কিন্তু ওপাড়ার যদু মধুদের জন্যে নয়। তারা থাকুক দূরে। শেঙ্গেন চুক্তি ইউরোপীয় সাধারণ বাজারের সর্ব সম্মতি ক্রমে স্বাক্ষরিত হয় নি – এটি ছিল বেলজিয়াম নেদারল্যান্ড লুকসেমবুরগ ফ্রান্স ও জার্মানির পারস্পরিক বোঝাপড়া ; এই পাঁচটি দেশের সীমানা আছে একে অপরের সঙ্গে। অন্য সদস্যরা যেমন ইতালি, গ্রিস, ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড, ব্রিটেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ... ...
ঢাকা এয়ারপোর্টে প্রতীক্ষা কক্ষের সোফায় আধো ঘুমে আচ্ছন্ন ছেলে মেয়ে জেগে উঠে যখন দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল মনে হল সমস্ত দিনের শেষে সেটাই আমার সেরা পাওনা ! প্রায় পাঁচ দশকের নিরন্তর ভ্রমণে আমার পাসপোর্টগুলি ভরে গেছে নানান দূতাবাসের অজস্র ভিসার ছাপে। আজ মনে হয় ৩৪ বছর আগে অন্য কোথা নয়, অন্য কোনো দেশে নয়, এই কলকাতায়, আলিপুরে শীতের স্তব্ধ দুপুরে সুপ্রাচীন হর্ম্য মণ্ডিত অট্টালিকায় নির্জন বিদেশি কনসুলেট অফিসে দয়াময়ী এক জার্মান মহিলার স্বাক্ষরিত বিনামূল্যের এই ট্রানজিট ভিসাটি আমার সবচেয়ে মহার্ঘ্য সঞ্চয়। ... ...
জীবনের হাল না ভেঙ্গে যে নাবিক সঠিক দিশায় উপনীত হয়ে নৌকো বা জাহাজ থেকে নেমে কোন বন্দর অতিক্রম করেন, সেই অভিযানকে ইতালিয়ানে বলা হয়েছিল – পেরিয়ে বন্দর বা ‘ পাসে পোরত’ যা থেকে পাসপোর্ট কথাটা এসেছে। ফরাসিরাও অবশ্য এ শব্দের পিতৃত্ব দাবি করে থাকেন বলে শোনা যায়। জার্মান সহ বহু ইউরোপীয় ভাষায় তার নাম শুধু ‘পাস’- অতিক্রম। ... ...
সিটি ব্যাঙ্কে আমার বস জো ম্যাকেভিতসের বাড়ি গেছি হল্যান্ড পার্কে।। তাঁর স্ত্রী কিম, কোরিয়ান; তিনি বান্ধবী লিনের সঙ্গে হ্যারডসে শপিঙের গল্প বলছিলেন। সব কিছুর দাম যথারীতি উচ্চাঙ্গের। বস্তুটি যাই হোক না দোকানটার নাম যে হ্যারডস। তা তিনি অগ্নি মূল্যের একটি বিছানার চাদরের সেট নিয়ে সেলস কাউনটারের মহিলাকে বলেছেন, আপনি দামটা চার পার সেন্ট কম করুন। এমন প্রশ্ন সে মহিলা কখনো শোনেন নি - জ্ঞান হারানোর আগে বলেছেন, সেকি ? দাম যা লেখা আছে সেটাই তো দেবেন। কিম তাঁকে বলেছেন, ক্রেডিট কার্ডে কিনলে আপনাদের তিন চার পার সেন্ট কমিশন দিতে হয়। আমি ক্যাশ দেবো, ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিকে যা দিতেন তার চেয়ে নয় এক পার সেন্ট কম ডিসকাউনট দেবেন। বারগেনিং বা দর দস্তুরের মক্কা, জেরুসালেম, বারাণসী দেখেছি। তার নাম ইস্তানবুলের গ্র্যান্ড বাজার ( কাপালচারসি – ঢাকা বাজার ), তিরিশ হাজার বর্গ মিটার ব্যাপী পাঁচশ বছরের পুরনো দুনিয়ার প্রথম শপিং মল। তার শাখা প্রশাখা দেখেছি সারায়েভো, তিউনিস - কোথায় নয়। দিনে তিন লক্ষ মানুষের ‘ফুট ফল’ হয়; এ হেন জিনিস নেই যা আপনি এখানে পাবেন না। তার চেয়েও বড়ো কথা আপনি যা কিনতে আসেন নি, যার অস্তিত্ব সম্বন্ধে আধ ঘণ্টা আগেও আপনার কোন জ্ঞান গম্মি ছিল না প্রচুর দরাদরি করে সেই রকম কিছু একটা কিনে দাঁও মেরেছেন ভেবে আপনি বীর দর্পে গ্র্যান্ড বাজার পরিত্যাগ করে গালাতা ব্রিজের দিকে যাবেন। ... ...
গাড়ির ড্যাশ বোর্ডের স্পিডোমিটার দেখলে জানা যায় তাঁর উচ্চতম গতি বেগ ঘণ্টায় দুশো কিলোমিটার। এই সব মূল্যবান তথ্য জানিয়ে বিক্রেতারা মহার্ঘ্য গাড়ি বিক্রি করেন। গাড়ির শো রুম থেকে বেরুলেই চোখে পড়ে নোটিস - শহরের ভেতরে গাড়ির গতির উচ্চসীমা ঘণ্টায় বিশ মাইল, একটু দূরে গেলে তিরিশ। মোটরওয়েতে ৭০ মাইল ( ১১২ কিমি ) গতি অনুমোদিত। সেখানে কদিন যাই ? যেখানে আমার নিত্যিদিনের ঘোরাঘুরি - হাটে বাজারে, বন্ধু সন্দর্শনে সেখানে আমার গাড়ির টিকিটি বাঁধা আছে তিরিশ বা বড়জোর পঞ্চাশ মাইল বেগে। প্রয়াত ভাস্করদার ( ভাস্কর দত্ত, সুনীলদার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু) পুত্র অর্ণবের বাড়ি থেকে কিছু সঞ্চিত বই সংগ্রহের জন্য উত্তর লন্ডনের স্টোক নিউইংটন গেলাম গত রবিবার - এককালের সেই বিখ্যাত ওয়েস্টওয়ে আকীর্ণ হয়ে আছে অজস্র ক্যামেরায়, ওয়েম্বলি, হ্যামারস্মিথ থেকে কিংস ক্রস ছাড়িয়ে গাড়ি চলে ধীরে মন্দ গতিতে, আইন বাঁচিয়ে। ... ...
সকাল থেকে অন্ধকার হয়ে আছে আকাশ। কে বলবে এটা মে মাস ? বুথের ভেতরে ছ জন কর্মী, হলে আমরা চারজন। শুধু ভোটার কম পড়িয়াছে ! অনেকদিন আগে দেশে দেখা একটা ছবি মনে পড়ে গেল – আই এস জোহরের একটা কলাম ছিল ফিল্ম ফেয়ারে, তাতে কার্টুন :ফার্স্ট ক্লাস কামরায় একজন যাত্রী বসে আছেন তাঁকে ঘিরে কন্ডাক্টর, চা ওলা সহ আরও কয়েকজন। নিচে মন্তব্য - উই অলওয়েজ হ্যাভ মোর পিপল সারভিং ওয়ান কাসটমার !সারা দেশের ভোট গণনা শেষ হতে সকাল। প্রিসাইডিঙ অফিসার একেক বার মাইক দখল করে ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড ফলাফল ঘোষণা করেন। দশটি আসনের ন’টিতে লিব ডেম বিজয়ী। সবচেয়ে বড়ো সাফল্য- বারো বছরের সিটিং কাউন্সিলর ন্যাপহিলের পোস্ট মাষ্টার সাজ হুসেনকে হারালেন স্থানীয় রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নতুন চেহারা জন পিয়ারস। তিনি ও আমি একত্রে জন গণেশের দুয়ার প্রদক্ষিণ করেছি কিন্তু ভাবতে পারি নি ষাট পেরুনো এক রিটায়ার্ড আই টি এঞ্জিনিয়ার সমাজে পরিচিত মুখ এক পোস্ট মাষ্টারকে দুশো ভোটের ব্যবধানে তাঁর আসন থেকে সরাতে পারবেন ! বোধহয় লেবার প্রধান মন্ত্রী হ্যারলড উইলসন বলেছিলেন, এ উইক ইজ এ লং টাইম ইন পলিটিক্স। ... ...