এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  পড়াবই  মনে রবে

  • ধারাবাহিক মিলান কুন্দেরা

    চিত্রলেখা চক্রবর্তী
    পড়াবই | মনে রবে | ২৩ জুলাই ২০২৩ | ১০৫২ বার পঠিত
  • (১)
    দড়িখেলা দোলন


    মিলান কুন্দেরার মত তকতকে স্বচ্ছতার সাথে খুব কম ঔপন্যাসিককে পড়া যায়। তাঁর গদ্য জলের মত পাতলা, স্পষ্ট, সহজবোধ্য, সহজপাঠ্য। তাঁর তীক্ষ্ণ, কড়া, অব্যাহতিহীন সুশৃঙ্খল বুদ্ধিমত্তা পাঠককে একইসাথে উত্তেজিত এবং উত্যক্ত করে। কুন্দেরার ন্যারেটিভ ভয়েস মনোরমভাবে অন্তরঙ্গ, কখনও আবার স্বীকারোক্তিমূলক, হামেশাই আনন্দ ছলনা সম্মোহিনী প্রতারণা প্রবণ — প্রলোভিত করে। কুন্দেরা শহুরে, কুন্দেরা রুচিশীল, যুক্তিসঙ্গত। পরিশীলিত সতর্ক বিদ্রূপে তাঁর গুরু গাম্ভীর্য কম, সঙ্গে নাস্তিবাদের হতাশার প্রান্তে ঘোরাফেরা করা চিন্তা — গল্পকার হিসেবে এ এক অমোঘ অবদান।

    দ্য আর্ট অফ দ্য নভেল প্রবন্ধে মিলান কুন্দেরা ফ্লবেয়ারকে সম্মতি জানিয়ে বলেছেন: "যিনি তার বর্ণনার অন্তরালে উধাও হতে চান, তিনি-ই ঔপন্যাসিক"। পরে একই প্রবন্ধে তিনি বলছেন: "ঔপন্যাসিক কারোর তো ছেড়েই দিন নিজের-ও মুখপাত্র নন" । আর এই হল কুন্দেরার 'টার্মিনাল প্যারাডক্স' — চরম আপাতবিরোধ — তিনি কোনো সু-নির্দিষ্ট বার্তা দেন না। তাঁর গল্প পড়ে সুরাহা হবে না — পাঠক বরং ঘেঁটে যেতে পারেন।

    কুন্দেরার বাচন ভঙ্গি কৌশল পাঠককে তাঁর সাথে ন্যারেটিভে একটি ছদ্ম-সক্রেটিক সংলাপে অংশীদার করে তোলে। তিনি পাঠকের হয়ে প্রশ্ন করেন। তারপর সেইসব প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তরগুলি এবং সেই উত্তরগুলির বিপক্ষের অনুমেয় আপত্তিগুলি শুকনো, রুক্ষ, অতি-যুক্তিযুক্ত গদ্যে তুলে ধরেন। যেমন ধরুন, দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং-এর এই অনুচ্ছেদটি যেখানে জেদেনা-র কান্না নিয়ে মিরেক ভাবছে:

    “Could that really have happened?
    Isn't it merely his present-day hatred that has invented those tears over Masturbov's death?
    No, it had certainly happened.
    But, of course, it's true that the immediate circumstances which had made these tears real and believable baffled him now, and that the memory had become as implausible as a caricature.”


    একই গল্পে আরটু এগিয়ে মিরেক ভাবছে তার পূর্ব প্রেমিকা নিয়ে:

    “But just why was he so horribly ashamed of her?
    The easiest explanation is this: Mirek is among those who very soon joined in pursuit of their own act, whereas Zdena has always been loyal to the garden where nightingales sing. Lately she was among the two percent of the nation who joyfully welcomed the arrival of the Russian tanks.
    Yes, that's true, but I don't consider this explanation convincing.
    If her rejoicing at the arrival of the Russian tanks were the only reason, he would have attacked her loudly and publicly, and not denied he knew her. No, Zdena was guilty of something differently serious. She was ugly.
    But why did her ugliness matter, when he hadn't made love to her in twenty years?
    It mattered: even from afar, Zdena's big nose cast a shadow on his life.”


    দুটি অনুচ্ছেদেই কুন্দেরার সম্মোহিনী যুক্তির জোরালো আবেদন নজর করার মত। পাঠকের সঙ্গে ইন্টারেক্টিভ অন্তরঙ্গ হবার ভঙ্গিতে লেখক তাঁর নিজের সিদ্ধান্তকে নাকচ করতে করতে এগিয়ে চলেন এক ঝরঝরে উপসংহারের দিকে। মিরেক ও জেদেনার মত চরিত্রগুলোকে একে অপরের বিরোধী পক্ষে স্থাপন করতে থাকেন। থমকে দাঁড়ান। আবার এগোন। প্রশ্নোত্তরে পুনরুক্তি অবশ্যম্ভাবী হয়, ডিসল্ভের মত কাজ করে। বারংবার গল্পে আসতে থাকে —— "Now let me repeat", "Let me give an example", "Yes, it’s true", "Now don’t misunderstand me"। পুনরুক্তিতে গল্পে ঢুকে যান লেখক ও তাঁর ন্যারেটিভ ভয়েস।

    (২)
    মানে না কার্য কারণ


    উপন্যাস বিষয়ে কুন্দেরা সবসময় ভেবে এসেছেন এর ন্যারেটিভ সম্ভাবনাগুলির পরিসর বাড়ানো যায় কি করে। তখনো উপন্যাসের অনেক সম্ভাবনা 'মিসিং' ছিল বলে তিনি মনে করতেন। সহজাতভাবেই, পাশ্চাত্যে বাইনারি-প্রধান দ্বৈততার নিউটনিয়ান/কার্তেসিয়ান ঘরানায় [either-or mind/body, good/evil, nature/culture] কথাসাহিত্য কথা বলা শিখে এসেছে। দ্য আর্ট অফ দ্য নভেল প্রবন্ধে কুন্দেরা বলছেন:

    “Once elevated by Descartes to "master and proprietor of nature," man has now become a mere thing to the forces (of technology, of politics, of history) that bypass him, surpass him, possess him. To those forces, man's concrete being, his "world of life", has neither value nor interest: it is eclipsed, forgotten from the start.”

    কুন্দেরা তাই বিকল্প খুঁজলেন। সচেতন সিদ্ধান্ত। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে রুশো নয় বেছে নিলেন দীদেরো, লরেন্স স্টার্ন, সার্ভেন্তেস — কারণ ‘almost all novels ever written are much too obedient to the rules of unity of action … that at their core is one single chain of causally related acts and events’ (ইমমর্টালিটি)। যাঁরা হাস্যকর বহুরৈখিক ন্যারেটিভ লিখে গেলেন সেই দীদেরো, সার্ভেন্তেস, লরেন্স স্টার্ন — সচেতনভাবে পূর্বসূরি নির্বাচন। খুলে গেল নভেলের 'মিসিং' সম্ভাবনা পরিসর। বাস্তববাদী, অভিজ্ঞতা প্রয়োগবাদী মোডের বিকল্পে এলো মানব অস্তিত্বের বৈচিত্র্য মানচিত্র — এলো সন্দেহ, সংশয়, ডাউট । একবগ্গা কার্য-কারণ-নিয়তি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে উপন্যাস হাঁফ ছাড়ল অনিশ্চয়ে।

    কুন্দেরা তাঁর কথাসাহিত্যে বৈজ্ঞানিক উপমাদি ব্যবহার করেছেন। উপন্যাস এক নৃতাত্ত্বিক গবেষণাগার — 'It Must Be' থেকে 'Must it be?'-র দিকে যাত্রা। যেমন লাফ্যবল্ লাভস্-এর সিম্পোজিয়াম গল্পে নার্স এলিজাবেথের আত্মহত্যার চেষ্টার পিছনে নানান সম্ভাবনা অনুমান করা হয় নানান চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে। ডক্টর হাভেল থেকে ফ্লাইশম্যান — সবাই অনুমান করছে আর প্রত্যেকের অনুমানে গল্প পাল্টে পাল্টে এগোচ্ছে। গল্পটি দৃষ্টিভঙ্গির সিরিজ হয়ে ওঠে। ট্র্যাজেডি হয়ে ওঠে পাঁচ অঙ্কের প্রহসন। প্লটের উপর ব্যাপক জোর দেওয়া হয়, মিশিয়ে দেওয়া হয় আচম্বিত আচানক ঘটনা। পুরো উপন্যাসটা সন্দেহজনক ভাবে হাস্যকর, রিডিকিউলাস ভাবে নাটকীয় প্রহসন।

    এ গল্পে জনৈক অসহনীয় ঢ্যামনা ডক্টর হাভেল তার স্বাধীন চয়েস হিসাবে এলিজাবেথ-কে প্রত্যাখ্যান করে। ডক্টর হাভেল তার এই সিদ্ধান্ত সহকর্মীদের ব্যাখ্যা করেন এইভাবে:

    “If I'm going to be frank, then I don't know why I don't take Elisabet. I've slept with women more hideous, more provocative, and older. From this it follows that I should necessarily sleep with her too. That's what the statisticians would say. All the cybernetic machines would draw the same conclusion. And you see, perhaps for those very reasons, I don't take her. Perhaps I want to resist necessity. To trip up causality. To throw off the dismal predictability of the world's course by means of the free will of caprice."

    একবগ্গা কার্য-কারণ-নিয়তি সম্পর্কে হোঁচট খাওয়া, ছেদ টানা — To trip up causality। কুন্দেরার ডক্টর হাভেল যত বড়ই চিকিৎসক হোন, স্বগৌরবী রাডিক্যাল হোন — বীর তিনি নন। এলিজাবেথের সুন্দর শরীরে বিশ্রী মুখ — সামঞ্জস্যহীন, পরিপূর্ণতার অভাব। চিকিৎসক হাভেল, বৈজ্ঞানিক মানুষ, তার কাজের যুক্তি যোগায় যুক্তির বিরুদ্ধে যাবার জন্য। আচানক একটা এমন অসম্ভব গল্প তৈরি হয় যে গল্পটা অসম্ভব-কেই বেঁছে নেয়! সম্ভাবনার জরুরত থেকে আজাদ হতে থাকে গল্প।

    কুন্দেরা স্মরণ করেছেন মানুষ প্রথমে হিজড়া ছিল। তারপর ঈশ্বর তাকে দুইভাগ করেন। এখন দুইখানি অর্ধেক একে অপরের খোঁজে পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছে । যুক্তি চুক্তি নয় — প্রেম, ভালোবাসা অনিশ্চিত জ্ঞানে সেই হারিয়ে যাওয়া নিজের আদ্ধেককে খোঁজা।

    (৩)
    শুধু যাওয়া আসা, এপাশ/ওপাশ, সীমানা লঙ্ঘন


    দ্য আনবেয়ারেবল্ লাইটনেস অফ বিয়িং এক যাত্রা, সীমান্ত অতিক্রম — শারীরিক, ভৌগোলিক, মানসিক। একটি ছোট্ট শহর থেকে অত্যাধুনিক প্রাগে আসে তেরেজা। অপ্রয়োজনীয় সীমানা অতিক্রম করে চেকোস্লোভাকিয়ার ভালো চেয়ে খারাপ করে ফেলে রাশিয়ান সেনাবাহিনী। এ গল্পে চরিত্ররা যেভাবে ঘুরতে থাকে তাতে নিৎসের ইটারনাল রিটার্ন মনে পড়ে। নিৎসের ইটারনাল রিটার্ন হল গোল গোল ঘোরা — প্রগতিহীন এক পূর্বনির্ধারিত বৃত্তে অস্তিত্বের ভার। তার চক্করে মানুষ-মাত্র ক্রুশবিদ্ধ, শরশয্যায়। ঠিক এর বিপরীতে কুন্দেরার লঘুতা, লাইটনেস। ইটারনাল রিটার্ন অসম্ভব তাই জীবন যাপন হালকা, ভারহীন, ফুরফুরে। গল্পের শুরুতে প্রি-সক্রেটিক পারমেনিডেস্-এর বাইনারি বাড়াবাড়ি স্মরণ করেন কুন্দেরা। বাইনারি — একজোড়া বিপরীত — ঠিক/ভুল, আলো/অন্ধকার, পেলব/খসখস, হালকা/ভারী, ইতি/নেতি। এমনি বাইনারির এপাশ ওপাশে চেক গ্রামজমিন আর শহুরে রাশিয়ান প্রাগ। কিন্তু বাইনারি এদিক ওদিক হয়ে যায় যখন টমাস এক ছোট রিসোর্ট-শহরে গিয়ে দেখে তার রাস্তা, হোটেল সবকিছুর নাম রাশিয়ান হয়ে গেছে আজ। এই শহরের পূর্বতন স্মৃতি বাজেয়াপ্ত হয়েছে, রয়েছে বাইনারির দু’দিকের স্থান পরিবর্তনের আওয়াজ।

    প্রাগ স্প্রিং শুরু হলে টমাস ও তেরেজা সুইৎজারল্যান্ড চলে যায়। সুন্দরী পেইন্টার সাবিনা-ও পাড়ি দেয়। জুরিখে বসে বেরোজগার তেরেজা আবার প্রাগে ফেরে। ক'দিনপর টমাস-ও। এদিকে জনৈক অধ্যাপক ফ্রাঞ্জ-এর বিবাহ পীড়াপীড়িতে বিরক্ত সাবিনা জেনেভা ছেড়ে পাড়ি দেয় প্যারিস ও তারপর আমেরিকা। আর ফ্রাঞ্জ মারা যাওয়ার পর তার সমাধি স্তম্ভে লেখা ছিল: "A return after long wanderings".

    সাবিনা চিত্রশিল্পী — পৃথিবী থেকে তার চরম বিচ্ছিন্নতা। টমাসের দ্বৈততা তার নজর এড়ায়নি। টমাস ইদানীং তেরেজাপ্রেমী হলেও বহুগামী তার স্বাধীন হৃদয়। ছেড়ে আসা স্ত্রী ও পুত্রসন্তানের কথা মনেও পড়ে না তার। স্বাধীন থাকার ইচ্ছায় একপ্রকার বেইমানি আঁকড়ে ধরে তাকে। সাবিনা বলে:

    “(Tomas is) turning into the theme of my paintings … The meeting of two worlds. A double exposure. Showing through the outline of Tomas the libertine, incredibly, the face of a romantic lover. Or the other way, through a Tristan, always thinking of his Tereza, I see the beautiful, betrayed world of the libertine”.

    মানুষের প্রতিটি পছন্দ অন্য সম্ভাবনার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। দ্বৈততা। অ-পরিপূর্ণতা। টমাস আর তেরেজার জীবনযাপন লঘু থেকে ক্রমশ গুরুতর হয়ে ওঠে — এদিকে সাবিনার উল্টোপথে যাত্রা। জীবন তার কাছে হালকা। ওপরের অনুচ্ছেদের শেষ লাইনে betrayed শব্দটা গুরুত্বপূর্ণ। সাবিনা জানে বিশ্বাসঘাতকতার প্রয়োজনীয়তা। যে পৃথিবী উদ্দেশ্যহীন, অনির্ধারিত, এলোমেলো, আকস্মিক, যেখানে কোন চিরন্তন প্রত্যাবর্তন নেই — সেখানে অস্তিত্বের অনিবার্য শর্ত-ই হল বিশ্বাসঘাতকতা। মানুষের প্রতিটি পছন্দ অন্য সম্ভাবনার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। দ্বৈততা। অ-পরিপূর্ণতা। অধ্যাপক ফ্রাঞ্জ-এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেই সাবিনা জেনেভা ছাড়ে। শত্রু হাতে তুলে দিতে জেসাসকে চুম্বন করেছিল জুডাস ইস্ক্যারিয়ট।
    দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং-এ কুন্দেরা বলেন:

    It takes so little, so infinitely little, for a person to cross the border beyond which everything loses meaning: love, convictions, faith, history. Human life - and herein lies its secret - takes place in the immediate proximity of that border, even in direct contact with it; it is not miles away, but a fraction of an inch.

    ইমমর্টালিটি-তে এগনেস উপলব্ধি করেছিল:

    The world is at some sort of border; if it is crossed everything will turn to madness: people will walk the streets holding forget-me-nots or kill one another on sight ... There is a certain quantitative border that must not be crossed, yet no one stands guard over it and perhaps no one even realizes that it exists.

    হেরাক্লিটাস নাকি বলেছিলেন কেউ একই নদীতে দুবার পা রাখতে পারে না। কুন্দেরার গল্পগাত্রে মূল্যবোধ পরিবর্তিত হতে থাকে — বাইনারি বিপরীতগুলি ক্রমাগত অর্থ পরিবর্তন করতে থাকে । কুন্দেরা জানেন, যে-কোনো কিছুর কিনারায় রয়েছে স্বার্থ — স্বার্থ এমনি এক মৌলিকত্ব যাকে ভাঙলে একইপ্রকার স্বার্থ পাওয়া যায়। কিনারা বদল অর্থাৎ স্বার্থ বদল — শারীরিক, ভৌগোলিক, মানসিক।

    (৪)
    হাসিতে কমে যায় ওজন



    ১৯৬৮ সালের ৫-ই জানুয়ারি কমিউনিস্ট পার্টি অফ চেকোশ্লোভাকিয়ার কার্যনির্বাহক সচিব হন আলেকজান্ডার ডুবচেক। শুরু হয় প্রাগ স্প্রিং আন্দোলন। কুন্দেরাও প্রাগ স্প্রিং আন্দোলনের সাথে মোটামুটি জড়িত ছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের দাপাদাপি থামাতে অগাস্টের মধ্যেই রাশিয়া তার ওয়ারশ চুক্তির বন্ধুদের সাথে মিলিত হয়ে চেক দমন শুরু করে। কুন্দেরার বই ব্যান করা হয়। কুন্দেরা প্রথমবার পারিস যান, বন্ধুত্ব হয় ক্লদ গ্যালিমার্ডের সাথে। পরবর্তীতে, এই ক্লদ গ্যালিমার্ডের আশকারাতেই কুন্দেরা ১৯৭৫ সালে পাকাপাকিভাবে ফ্রান্স চলে যান।

    যাইহোক, ফিরে যাই ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে। রাশিয়ার দমন চূড়ান্তে। শোনা যায়, চেক রাস্তা-ঘাটে রাশিয়ান গিজগিজ করছিল — আর রাশিয়ান গুপ্তচররা তো ছিল বটেই। ভোল্টাভা নদীর ধারে একটি স্যনাতে অবতীর্ণ হন তিন প্রবাদপ্রতিম লাতিন লেখক: মার্কেজ, কোর্তাজার, ফুয়েন্তেস। তাঁদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কুন্দেরা — রাশিয়ার চলতি দমন চাক্ষুষ করার জন্য। পরে ফুয়েন্তেস বলেন কুন্দেরা স্যনাতে ডেকেছিলেন কারণ স্যনার দেয়ালের কান নাই। তারও কিছু মাস পরে মার্কেজ জানতে পারেন যে, যে-নিষিদ্ধ ম্যানুস্ক্রিপ্ট কুন্দেরা চেক থেকে 'স্মাগল' করে ফ্রান্সে নিয়ে গেছিলেন সেই বইটি আর একশো বছরের নিঃসঙ্গতা ফ্রান্সের সেরা বিদেশী বই হবার প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বী। গার্সিয়া মার্কেজ বলেন প্রাইজটি কুন্দেরার-ই প্রাপ্য কারণ মানুষটি এমন এক “… unleashed madman who explained to us the problems of his country first at 120 degrees above zero and then at 20 degrees below zero.”

    কুন্দেরার ঠাট্টা (দ্য জোক) নামক নভেলে লুডভিক কট্টর কমিউনিস্ট। বাকী খালি তার একটাই দোষ — হিউমার, ফান, হালকা মেজাজ, রঙ্গ, কৌতুক। গরমের ছুটিতে লুডভিক-কে পাত্তা না দিয়ে পলিটিকাল ক্যাম্পে গেছে তার গোঁড়া প্রেমিকা মার্কেতা। লুডভিকের মনটা আনচান করছে। এমন সময় তার প্রেমিকা তাকে লিখছে: “আমি ক্যাম্পে ভালোই আছি। ক্যাম্পের আলো, হাওয়া, জল সবই ভালো”। আর লুডভিক-কে একটু ঠেস দিয়ে মার্কেতা বলে যে “মার্ক্সিজমের তবিয়ৎ বহাল রাখতে ক্যাম্পে প্রচুর আশাবাদী যুবক ভিড় করেছে”। ব্যস, আর কি? লুডভিকের মনটা আরো আনচান করে ওঠে। "ও! আমি এখানে, আর তুমি ওখানে একা একা ভালোই আছো? একটু তামাশা তো করতেই পারি, নাকি?" কমিউনিস্ট ইন্টেলেকচুয়াল লুডভিক ফসফস করে লিখে বসে: “Optimism is the opium of the people! A healthy atmosphere stinks of stupidity! Long live Trotsky! Ludvik.” শুধু লেখে না, খামে করে পাঠিয়ে দেয় প্রেমিকার কাছে ক্যাম্পের ঠিকানায়। আর যায় কোথায়! এই একখানি চিরকুট চুটকি-র জন্য তরুণ তরতাজা কমিউনিস্ট লুডভিক চরম ফেঁসে যায়। পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে খনি-শ্রমিক হিসাবে নির্বাসিত হয় অস্ত্রাভায়।

    কুন্দেরা কখনো হাসাতে ভোলেন না। অট্টহাস্য নয়, মুচকি হাস্য। কুন্দেরা বলছেন দ্য জোক গল্পের প্লট নিজেই একটি ঠাট্টা। এবং শুধুমাত্র এর প্লট নয়, এর দর্শনেও ঠাট্টা। মানুষ রসিকতার ফাঁদে পড়ে — ব্যক্তিগত বিপর্যয় টেনে আনে। "হোমো হোমিনি লুপাস" — মানুষেরা পরস্পর নেকড়ে বাঘ। একে অপরের প্রতি বর্বর। বাইরে থেকে দেখে সেসব হাস্যকর লাগে। লুডভিকের ট্র্যাজেডি এইখানে যে কৌতুক তাকে ট্র্যাজেডির অধিকার থেকে-ও বঞ্চিত করেছে। ট্র্যাজেডিতে সান্ত্বনা আছে। ট্র্যাজেডি আত্ম অহং, মমত্ত্ব ও গুরুত্ব বিভ্রম। যাদের জীবন ট্র্যাজেডিহীন, পাঁশুটে কৌতুক — তারা নিজের সম্পর্কে মোহগ্রস্ত নয়। লুডভিকের অপ্রত্যাশিত মহানতাহীন পতনে তাই ট্র্যাজেডি তৈরি হয় না। মহান ট্র্যাজিক নায়ক সে নয়। লুডভিক ভেবেছিল: “পশ্চিম ইউরোপে বিপ্লব আসন্ন। সে তো ঠিক কথা। কিন্তু প্রেমের কি হবে?” তাই লুডভিক খিল্লি করেছিল — যার মাশুল গুনছে আজ। এতটাই তুচ্ছ ছিল তার জোক্ যে তার পরিণতি-ও সাদামাটা মামুলি হয়ে যায়।

    এদিকে মার্কেতার মারাত্মক সিরিয়াস আদব-কায়দায় হাসাহাসির জায়গা কম। জীবন তার কাছে গুরুতর গুরুগম্ভীর ব্যাপার । মার্কেতা কি তবে তার সময় অনুকূল আত্মা? সে ভাগ্যের বিশ্বস্ততায় সহজে বিশ্বাস করে — নতুবা "আচ্ছে দিন" আনতে চায় কেনো! সিরিয়াসনেস কি তাহলে সিরিয়াস ধরনের মূর্খতা? তবে কি কুন্দেরা তাঁর নভেলকে সিরিয়াস বলতে চাইবেন? আর আপনারা?


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • পড়াবই | ২৩ জুলাই ২০২৩ | ১০৫২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সর্বাণী দাশগুপ্ত | 45.124.168.37 | ২৩ জুলাই ২০২৩ ২১:১৮521624
  •  ভীষণ ভালো।  চিত্রলেখা চক্রবর্তীর সম্পূর্ন ধারাবাহিক লেখাটি পড়বার জন্যে উৎসুক থাকলাম।
     
  • নন্দিতা বোস বারিক | 103.101.213.58 | ২৩ জুলাই ২০২৩ ২১:৩৭521630
  • অচ্ছে দিনের মাসুল গুনছি আমরাও। দারুণ ঝকঝকে একটা লেখা পড়লাম। অপেক্ষায় রইলাম আরও লেখা পড়ার।
  • Chitralekha Chakraborty | ২৪ জুলাই ২০২৩ ০৯:২৪521642
  • আরে ধন্যবাদ ...
  • Sandipan Majumder | ২৪ জুলাই ২০২৩ ১৮:২৭521652
  • ভালো  লিখেছেন।  লেখাগুলিকে আবার পুনর্যাপন করলাম।
  • Chitralekha Chakraborty | ২৫ জুলাই ২০২৩ ০৯:৪৪521706
  • ধন্যবাদ দাদা 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় প্রতিক্রিয়া দিন