এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা  অর্থনীতি

  • ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ? (১)

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | অর্থনীতি | ১৩ মার্চ ২০২৩ | ৬২৩ বার পঠিত
  • ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ? (১)

    [ আজকাল বড্ড ফিসক্যাল ডিসিপ্লিন নিয়ে কথা শোনা যাচ্ছে। বিত্তমন্ত্রী বলছেন – এই বাজেট কালে আমাদের ফিসক্যাল ডেফিসিট ৬ থেকে নেমে ৪ এবং ৫ এর মাঝে ঘোরাঘুরি করবে। আর ভারত সরকার ৮০ কোটি জনতাকে বেশ কিছুদিন ফ্রি রেশন দিচ্ছে। প্রবন্ধটি ২০২০ সালে কোভিড মহামারীর প্রারম্ভিক দিনের। তবু আজ এই লেখাটি একটু প্রাসংগিক মনে হচ্ছে। হয়ত কিছু প্রশ্ন উঠবে, বিতর্ক হবে—এই আশায়। ]

    ভার্চুয়াল আড্ডা এবং ‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন’

    সরকার যে কেন গরীবদের জন্যে আর্থিক প্যাকেজ দিচ্ছে না বোঝা মুশকিল।

    দেবে কোত্থেকে? সরকারের ভাঁড়ে মা-ভবানী। সব সরকার এখন বাজার সরকার।

    গুপ্ত ফর্মে এলেন —অ ! তোমার এই লকডাউনের বাজারে গরীবদের জন্যে, বিশেষ করে কাজ হারিয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে লটকে থাকা গরীবদের আর্থিক প্যাকেজ দেওয়া অন্যায্য মনে হচ্ছে?
    --কোন অভিজিৎ? জাঙ্গিপাড়ার? মানে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির ছেলে?
    --না না; অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি।
    --ওহো, নোবেল-অভিজিৎ !  
    উনি বলছেন – এই অবস্থায় সরকারের উচিত মনিটারি বা ফিস্কাল ডিসিপ্লিন নিয়ে  বেশি চাপ না নিয়ে সোজা নোট ছাপিয়ে গরীবদের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়া। (টেলিগ্রাফ, ২৫/০৪/২০)।
    সেকী? নোবেল প্রাইজ পাওয়া অধ্যাপক এমন কথা বলেছেন? এ তো তুঘলকি ফরমান!

    উনি বাজেট পেশ করার আগে একটি প্রেস কনফারেন্স করে বলেছিলেন উনি এই অবস্থায় সরকারের ‘ফিস্কাল টাইটেনিং’ বা হাতের মুঠো চেপে রাখার ওকালতি করবেন না। বরং সরকার এই অবস্থায় দরাজ হাত করলে ভালো হয়। সরকার যতই ৩% এর কাছাকাছি রাজকোষীয় ঘাটা ধরে রাখার কথা বলুন না কেন, বাস্তবে সেটা অনেক আগেই উপে গেছে। আরেকটু ঢিলে হলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। ( বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এবং এ এন আই, ১১ জানুয়ারি, ২০২০)।

    হাজার হোক বাঙালী তো! ইলিশ মাছ একহাজার টাকা কিলো হলেও কেনা চাই। খাঁটি বাঙালী হল চার্বাক পন্থীঃ ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ।

    নোট ছাপাতে হলে সরকার আসলে কী করে?

    রিজার্ভ ব্যাংককে বলে – আমি তোমাকে বন্ড দিচ্ছি যাতে লেখা থাকবে এত টাকা অমুক সুদের হারে তোমাকে অমুক তারিখে ফেরৎ দেব। বদলে তুমি আজ আমাকে এত টাকা ধার দাও; অর্থাৎ টাকা ছাপিয়ে আমার কোষাগারে জমা কর।

    বন্ড কেন?

    আরে বিনা কোন কোল্যাটারাল, কোন সিকিউরিটি কেউ ধার দেয় নাকি? আগে মহাজনেরা জমি, বসতবাটি, বা সোনাদানা বন্ধক রাখত না? আজকাল ব্যাংক কী করে? নিদেন পক্ষে পোস্ট-ডেটেড চেক ছাড়া কিছু লোন দেয় কি? সরকারের বন্ড ধরে নাও পোস্ট ডেটেড চেক, সুদ শুদ্ধু।

    আগে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড বা আমেরিকার ফেডারাল ব্যাংককেও সোনা জমা রেখেই পাউন্ড বা ডলার ছাপাতে হত। বিগত সত্তরের দশক থেকে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তার জায়গায় আমেরিকা শুরু করল সরকারের আশ্বাসবাণী বা বন্ডের সিকিউরিটির ভিত্তিতে নোট ছাপানো। ব্যস, সারা দুনিয়া মোড়লমশাইয়ের পথে চলল। ডলার এর সঙ্গে বিনিময় মূল্য বাড়ছে নাকি কমছে তা দিয়ে কোন দেশের টাকার সম্মান বা দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি মাপা হওয়া শুরু হল।

    আমি জানতে চাই যে সরকারকে নোট ছাপাতে হয় কেন?

    যখন সরকারের বাজেটে অপেক্ষিত আয় থেকে ব্যয় বেশি হয় তখন সেই ফাঁকটা পুরণ করতে সরকার নোট ছাপায়; একে টেকনিক্যালি বলা হয় ‘মনিটাইজিং দ্য ডেফিসিট’।

    অন্য কোন রাস্তা নেই ?

    আছে; পাবলিকের ঘাড়ে নতুন কোন কর চাপানো। কি, চলবে তো?

    ওরে বাবা!

    তা খরচা কম করলেই হয়! নোট ছাপানোর কী দরকার? মহাজনেরা বলে গেছেন না কাট ইয়োর কোট, একর্ডিং টু ইয়োর ক্লোথ?

    আরে আগামী বছরের বাজেট তো কিছু বাস্তব এবং কিছু ভবিষ্যতের ট্রেন্ড সব ধরেই তৈরি হয়। তাই বাজেটের আগে রিজার্ভ ব্যাংক একটা আর্থিক সমীক্ষা বের করে — তাতে গত বাজেটে যা আশা করা হয়েছিল বিভিন্ন আর্থিক প্যারামিটারে তার কতটুকু পূর্ণ হয়েছে বা হয়নি তার বিশ্লেষণ থাকে। এটাই বাজেটে নতুন প্রেক্ষিতে নতুন আশার গল্প তৈরি করে। কথায় বলে না — আশায় বাঁচে চাষা! তাই আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে খরচ বাড়ে, ফলে বাজেটে ঘাটতি বাড়ে। মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যায়, পা ঢাকলে মাথা।

    গুপ্ত ইদানীং বামভক্ত থেকে রামভক্ত হয়েছেন। মনে করিয়ে দিলেন যে মহাভারতে যক্ষ যুধিষ্ঠিরকে বেশ কিছু প্রশ্ন করেছিলেন, তাতে একটি ছিলঃ কশ্চ মোদতে? মানে ‘কে সুখেতে রয়েছে, সুখেতে থাকুক’ কেস। উত্তরে যুধিষ্ঠির যা বলেছিলেন তাতে নেসাসারি কন্ডিশন ছিল সক্কালে কাজে বেরিয়ে গেলেও বিকেলের মধ্যে ঘরে ফিরে বৌয়ের রান্না শাকভাত খাওয়া। আর সাফিশিয়েন্ট কন্ডিশন? ‘অঋণী অপ্রবাসীচ স বারিচর মোদতে’।

    অর্থাৎ বিরিয়ানি পোলাও না জুটুক বৌয়ের রান্না শাকভাতই না হয় খাক, কিন্তু যদি প্রবাসী না হয় এবং কোথাও ধারদেনা না থাকে তাহলেঃ
    “তথাপি সেজন সুখী সংসার ভিতর।
    বারিচর শুন তব প্রশ্নের উত্তর”।। ( কাশীরাম দাসী মহাভারত, বনপর্ব)

    বিপ্লব গলা তোলেন — “রাখুন আপনার যক্ষপ্রশ্ন। সেসব দিয়ে আজকের অর্থনীতির সংকটের সমাধান হবে নাকি? তখন কি করোনা ভাইরাস-২ ছিল? রাজকর্মচারিদের মাগ্যিভাতা দিতে হত? আর যুধিষ্ঠির? নিজের বৌকে বাজি রেখে যে লোকটা জুয়ো খেলেছিল তার বুদ্ধিতে দেশ চলবে? সোজা কথা সোজা ভাবে বুঝুন। ১৫ হাজার টাকা দিয়ে  ফ্রীজ কিনবেন? পকেটে রয়েছে তিনহাজার টাকা। তাহলে দুটো পথ খোলা আছে। হয় যুধিষ্ঠিরের কথা শুনে মাসে মাসে একহাজার টাকা করে ব্যাংকের রেকারিং ডিপোজিটে জমাতে থাকুন । একবছর পরে বারোহাজার টাকা হলে ফ্রিজ কিনুন, নগদ পনেরো হাজার টাকায়, একদম ঝক্কাস!”

    নয় ফ্রিজের দোকানে একহাজার টাকার বারোটা পোস্ট ডেটেড চেক এবং তিনহাজার নগদ জমা করে আজই ফ্রিজটা তুলে আনুন, এবং ঠান্ডা জল আইসক্রিম খেতে থাকুন। রিজার্ভ ব্যাংককে

    অভিজিত দ্বিতীয় পথটি নিতে বলছেন।

    আমি প্রথম পথের পথিক। লোভ দমন করব। আগামী বৈশাখে ফ্রিজ আনব।

    অ! আগামী বাজেটে যদি ফ্রিজের দাম বেড়ে যায় ?

    হাওয়া গরম হচ্ছে দেখে আমি কথা ঘোরাই।

    আচ্ছা, ইদানীং কালে কোন আধুনিক দেশ এই নোট ছাপানো কেস করেছে?

    সদ্য রিটায়ার করা অধ্যাপক মিত্তির আসরে নামেন।

    এটা কোন শিব ঠাকুরের আপন দেশে গোছের ব্যাপার নয়। ২০০৭-০৮ সালে আম্রিকার লেম্যান ব্রাদার্স ফেল মারা থেকে যে আর্থিক সংকট শুরু হল তাতে একের পর এক আমেরিকান ব্যাংক ও ফান্ডিং এজেন্সি ফেল মারতে শুরু করল। এর ফলে আর্থিক বাজারে যে ব্যাপক মন্দা শুরু হল তা ক্রমশঃ সমস্ত উন্নত দেশে ছড়িয়ে পড়ল। তখন ওয়েলফেয়ার স্টেট তার দায়িত্ব পালন করতে ব্যাঙ্কগুলোতে টাকা ঢালা এবং বেকার ভাতায় বৃদ্ধি শুরু করল। তারপর টাকার ঘাটতি মেটাতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের অল্পকালীন বন্ড কিনে সরকারকে টাকা ধার দিল, অর্থাৎ নোট ছাপাল, ফলে বাজারে টাকার যোগান বাড়ল। যেমন ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড ২০০৯ সালে দু’দফায় ১৬৫ এবং ১৭৫ বিলিয়ন পাউন্ড সরকারি বন্ড কিনল মানে, বদলে সরকারকে নতুন নোট দিল। আমেরিকার ফেডারেল ব্যাঙ্ক, ইউরোপের অন্যান্য ব্যাংক এবং জাপানও পিছিয়ে ছিল না। আরে এই সেদিনও করোনা-১৯ এর ঠেলা সামলাতে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড এই বছরের এপ্রিলের ৯ তারিখে সরকারকে সাহায্য করতে বণ্ড নিয়ে নোট ছাপাতে রাজি বলে প্রস্তাব পাশ করেছে। যদিও ব্যাংকের গভর্নর এন্ড্রু বেইলি শেষ মুহুর্ত পর্য্যন্ত এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করে গেছেন। (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৫ এপ্রিল ২০২০; উদিত মিশ্রের প্রবন্ধ)

    সবাই স্বাধীন এ বিপুল ভবে, ভারত শুধুই ঘুমায়ে রয়!

    তো সবাই এতসব করল কিন্তু ভারত কি এতদিন শুধু সুবোধ বালক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে? আমাদের দেশ কখনও নোট ছাপানোর লোভে পড়েনি মিত্তিরদা?

    পড়েনি আবার! আমাদের সবই তো বৃটিশের কাছ থেকে নেওয়া। এই ডেফিসিট ফাইনান্স তত্ত্বের গুরুদেব হলেন বৃটেনের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বিত্তমন্ত্রী লর্ড জন মেনার্ড কেইন্স। দেশ স্বাধীন হবার পর নেহেরুজী ভারতে মিশ্র অর্থনীতির ভিত তৈরি করতে কেম্ব্রিজ থেকে অধ্যাপক ক্যালডোরকে নিয়ে এলেন পরামর্শদাতা হিসেবে। ভারতের তৎকালীন করনীতি, সরকারের বাজেট পরিকল্পনা সবেতেই অধ্যাপক ক্যালডোরের প্রভাব রয়েছে। আর উনি হলেন খাঁটি কেইন্সপন্থী যারা মনে করেন অনুন্নত দেশের জন্যে ঘাটতি বাজেট এবং সেটা সামলাতে ডেফিসিট ফাইনান্স বা দরকার মত রিজার্ভ ব্যাংককে দিয়ে নোট ছাপানো কোন পাপ নয়, বরং উন্নয়নের হাতিয়ার।

    ব্যস, সেই গোড়া থেকেই সরকারের বাজেটের রাজকোষীয় ঘাটতি বা ফিস্ক্যাল ডেফিসিট ‘অটোমেটিক্যালি মনিটাইজড’ বা নোট ছাপিয়ে পূর্ণ হতে লাগল। কিন্তু ১৯৯১ সালে লাগাতার বছর বছর নোট ছাপানোর কুফল বিষফোঁড়ার মত দ্যাখা দিল। ফলে ১৯৯৪ সালে ডঃ মনমোহন সিং (প্রাক্তন রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর এবং তৎকালীন বিত্তমন্ত্রী) এবং সি রঙ্গরাজন (তৎকালীন রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর) এই ‘অটোমেটিক্যালি’ ব্যাপারটাকে ১৯৯৭ থেকে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আজ বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে এরাই আবার ফিসক্যাল ডেফিসিটকে ‘মারো গোলি’ বলে নোট ছাপিয়ে বাজারে অতিরিক্ত টাকা যোগানোর এবং উন্নয়নমূলক কাজ চালিয়ে যাবার পরামর্শ দিচ্ছেন। (২৪ এপ্রিল, ২০২০; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)

    মহাজনেরা কী বলে গেছেন?

    হতভম্ব হয়ে জিগাই — ইকনমিক্স কি এইসব শেখায় নাকি? যখন ইচ্ছে তখন নোট ছাপিয়ে দেশ চালানো? পিতামহ অ্যাডাম স্মিথ কী বলে গেছেন? আর মার্ক্স?

    প্রাক্তন ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী বিজন উৎসাহিত।

    কার্ল মার্ক্স নিশ্চয়ই জনগণের স্বার্থে সরকারের নোট ছাপানোকে সমর্থন করেছেন। তবে তাঁর সমসাময়িক সরকারগুলো ভারি প্রতিক্রিয়াশীল ছিল; গোটা বিশ্বে ওয়েলফেয়ার স্টেটের ধারণা পোক্ত হয়েছে রুশ বিপ্লবের পরে, সোভিয়েৎ সরকারকে দেখে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ওদের কাজকর্ম দেখে খুব প্রভাবিত হয়েছিলেন সেটা নিশ্চয়ই মানবেন?

    -- শুনুন। অ্যাডাম স্মিথ (১৭২৩-৯০) একেবারেই সরকারের ঋণ করে ঘি খাওয়ার পক্ষে ছিলেন না। মার্ক্সও না। দুজনেই ডেফিসিট ফাইনান্সিংকে তেড়ে গাল দিয়েছেন। আলাদা আলাদা প্রেক্ষিতে (টমাস পিকেটি, “ক্যাপিটাল ইন দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি”; পৃঃ ১৬০-১৬৬)।\

    খাব খাব, কোথায় পাব? ধার কর না! শুধবে কে? লবডংকা!

    অ্যাডাম স্মিথ এর সময়ে সরকার ঋণ করত মূলতঃ যুদ্ধবিগ্রহের খরচা মেটাতে। ফ্রান্সের সঙ্গে এবং ইউরোপের অন্যদেশের সঙ্গে ব্রিটেনের যুদ্ধ লেগেই থাকত। দুটো সরকারই তেড়ে বন্ড ছেড়ে পাবলিকের থেকে ধার করত। অভিজাত এবং সম্পন্ন বর্গের লোকজন সেটা কিনতেন কারণ তাতে সুদের হার চড়া ছিল। তখন নব্য বণিকতন্ত্রের (মার্কেন্টাইল ক্যাপিটালিজম) বোলবোলাও। ওদের যুক্তি ছিল সরকার এভাবে ঋণ করলে দেশের কোন ক্ষতি নেই। ধার দিচ্ছে দেশের কিছু লোক, নিচ্ছে এবং খরচ করছে ও সুদ দিচ্ছে দেশের সরকার। ‘এক হাত থেকে আরেক হাতে যাচ্ছে-দেশের বাইরে তো যাচ্ছে না’!

    অ্যাডাম স্মিথ তাঁর ম্যাগনাম ওপাস ‘ওয়েলথ অফ নেশন্স’ (১৭৭৬) এর দ্বিতীয় ভল্যুমে এই লাইনের যুক্তির কড়া সমালোচনা করেছেন — মূলতঃ দুটো দিক থেকে।

    এক, সম্পত্তি দেশের বাইরে যাচ্ছে না – কথাটা ঠিক নয়। খোলা বাজারে বন্ড বিদেশিরাও কিনছে -- যেমন ওলন্দাজ বণিক বা ভূস্বামীরা।

    দুই, যদি বিদেশীদের আটকানো হয় এবং খালি স্বদেশীরাই সরকারকে ধার দেয়, তাহলেও এটা নৈতিক ভাবে অনুচিত। কারণ এতে দেশের সম্পত্তি শান্তিপূর্ণ উৎপাদক কাজ থেকে সরে যুদ্ধের জন্যে খরচ হয়। এর পরিশোধ হয়  আগামী দিনে দীর্ঘসময় ধরে। ফলে জনসাধারণের মনে যুদ্ধের আসল খরচ চাপা পড়ে, মনে হয় যুদ্ধ বোধহয় তত ব্যয়বহুল ব্যাপার নয়। এভাবে অর্থনীতি ‘বিকৃত’ হয়। এছাড়া সরকারী ঋণ দেশের সম্পত্তির মালিকানা “উৎপাদক শ্রেণী”র হাত থেকে নিয়ে “বসে বসে খাওয়া” শ্রেণীর হাতে চালান করে এবং মিলিটারি এই টাকায় যুদ্ধে নামে, পরিণামে জীবন ও সম্পত্তি নষ্ট হয়।

    উরিত্তারা! স্মিথ দেখছি মহাগুরু! আর আরেক গুরুদেব মার্ক্স? তাঁর কীসে আপত্তি?

    শুধু মার্ক্স কেন? উনিশ শতকের প্রায় সব সমাজবাদীরাই ধার করে দেশ চালানোর বিরুদ্ধে ছিলেন। তাঁদের চোখে এটা ব্যক্তি-পুঁজির আধিপত্য জমানোর একটা কল মাত্র। মার্ক্স তাঁর  “ক্লাস স্ট্রাগল ইন ফ্রান্স” – ১৮৪৯-৫০ সালে লেখা — বইয়ে সরকারি বন্ডের ওপর ভূস্বামীদের পাওনা মেটাতে নেপোলিয়নের বিত্তমন্ত্রীর হঠাৎ করে মদের উপর ট্যাক্স বাড়ানোর কঠোর সমালোচনা করেছিলেন ( পিকেটি; ঐ, পৃঃ ১৬৪)।

    কিচ্ছু বুঝলাম না। একটু ঝেড়ে কাশুন।

    সে যুগে বিনিয়োগকারীদের উঁচুহারে সুদ দেওয়া হত। ১৭৯৭ সালের বিপ্লবী সরকারের সরকারী লোন বাতিল করা একটি ব্যতিক্রম মাত্র। তাই বালজাক বা জেন অস্টেনের নভেলের ভূস্বামীদের সরকারী বন্ডে লগ্নিকরা টাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা ছিল না। বলা দরকার যে  ইংল্যান্ডে একশ’ বছর ধরে (১৮১৫—১৯১৪) ইনফ্লেশন প্রায় স্থির ছিল এবং সরকারী বন্ডের উপর সুদ ( ৪% থেকে ৫%)  সময়মত দেওয়া হত। মজার ব্যাপার হল বৃটেনের সরকারি ঋণ ১৭৭০ সালে জাতীয় আয়ের ১০০% প্রতিশত এবং ১৮১০ সাল নাগাদ ২০০% ছুঁয়েছিল। এবং বৃটেন এই ধার একশ’ বছর ধরে শোধ করেছিল, বেশির ভাগ সময় শুধু সুদ দিয়ে। ফলে উচ্চবর্গের কাছে খামোকা সরকারকে ট্যাক্স দেওয়ার বদলে ধার দিয়ে সুদ কামানো অনেক বেশি আকর্ষণীয় ছিল। (পিকেটি; ঐ, পৃঃ ১৬১ - ১৬৩)

    বিপ্লব অনেকক্ষণ ধরে উশখুশ করছিলেন। এবার ফুট কাটলেন -- বর্তমান ভারতে সরকারি ঋণের বোঝা জিডিপির ৭০% এর আশেপাশে।

    গুপ্তবাবু হাঁ-হাঁ করে উঠলেন।
    কীসে আর কীসে! দুটো আলাদা দেশ, আলাদা সময়; আপেল এবং কমলালেবুর তুলনা করা ঠিক নয়।

    কিন্তু দেড়শ বছর পরে কি ইকনমিস্টদের চিন্তা বদলে গেছে? নইলে হরদম ফিসক্যাল ডেফিসিট কড়া হাতে সামলানো নিয়ে এত উপদেশের পাশাপাশি ডেফিসিট ফাইনান্স বা সরকারের ধার করে খরচ করা নিয়ে এত মতভেদ এত বিতর্ক কেন ?

    এনিয়ে এই শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি কী বলছেন শুনুন।

    “ বিংশ শতাব্দীতে পাবলিক ডেট বা সরকারের ঋণ নিয়ে একেবারে অন্যরকম কথা শোনা যেতে লাগল। মনে করা হল যে এই ঋণ নীতিগত ভাবে সরকারের উন্নয়নমূলক ব্যয় বাড়িয়ে সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অংশের পক্ষে দেশের সম্পত্তি পুনর্বণ্টনে সহায়ক হতে পারে”।

    উনি আরও বলছেন যে এই দুটো দৃষ্টিকোণের মধ্যে ফারাক বেশ সরল ও স্পষ্ট। উনবিংশ শতাব্দীতে উত্তমর্ণদের (উচ্চবর্গ এবং ভূস্বামী) থেকে ধার নেওয়া টাকা ফেরত দেবার সময় রাষ্ট্র (খাতক) সুদে-আসলে ভাল করে পুষিয়ে দিত। ফলে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ফুলে ফেঁপে উঠত। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে মুদ্রাস্ফীতির (ইনফ্লেশন) ঘায়ে ধার নেওয়া টাকার মূল্য কমে যেত, এবং ফেরত দেওয়া হত মূল্য কমে যাওয়া টাকায়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯১৩ সালে ফ্রান্সের সরকার যখন বাজারে বন্ড ছেড়ে পাবলিক থেকে টাকা তুলল, তখন তার মূল্য অটল এবং অপরিবর্তিত থাকবে এমনটাই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫০ সালে বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মূদ্রাস্ফীতির চোটে সেই বন্ডগুলোর ক্রয়ক্ষমতা আগের একশ’ ভাগের একভাগে নেমে এল। ফলে সুদের টাকায় আরামের জীবনযাপনে অভ্যস্ত শ্রেণীর নাতিপুতিরা বাস্তবে হাতে কিছুই পেল না। এভাবে রাষ্ট্র বাজেটের ঘাটতি হলে নতুন কর না বসিয়ে উত্তমর্ণদের টাকায় ঘাটতি পূরণ করে দেশ চালাতে শুরু করল। পাবলিক ডেট বা সরকারি ঋণ নিয়ে এই কথিত ‘প্রগতিশীল’ বিচার এখনও বেশ প্রভাবশীল, যদিও মুদ্রাস্ফীতির হার ক্রমশঃ এক শতাব্দীর আগের কাছাকাছি, এবং এভাবে সম্পত্তির পুনর্বন্টন বাস্তবে কতটুকু হয় তা নিয়েও সন্দেহ আছে। (পিকেটি, ঐ; পৃঃ ১৬৪-৬৫)

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে বৃটিশ সরকারের ঋণ বেড়ে ১৯৫০ নাগাদ জিডিপি’র ২০০% ছাড়িয়ে গেল। তবে ১৯৫০ সালের ইনফ্লেশন (৫%) এবং ১৯৭০ সালের (১৫%) এটা কমিয়ে জিডিপি’র ৫০% এ নামিয়ে আনল (পিকেটি, ঐ; পৃঃ

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালোবাজারি ইত্যাদিঃ

    পিকেটি দেখিয়েছেন যে মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে সম্পত্তির পুনর্বন্টন সমাজের একটা ছোট অংশের জন্যেই খাটে। আমরা কোলকাতা এবং বঙ্গে বিশ্বযুদ্ধের সময় দুটো জিনিস দেখেছি।

    এক, বিয়াল্লিশের ভয়ংকর মন্বন্তর। চাল বৃটিশ ফৌজের জন্যে বাজেয়াপ্ত হচ্ছে এবং মজুতদাররা লুকিয়ে ফেলে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছে। ফলে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ এবং অনাহারে মৃত্যু।

    দুই, একশ্রেণীর মানুষেরা যুদ্ধের আবশ্যকীয় জিনিসপত্রের সরবরাহ এবং কালোবাজারি করে রাতারাতি ছিরু পাল থেকে শ্রীহরি ঘোষ হয়ে যাচ্ছে। এরা সম্পত্তি কিনছে ভবানীপুর, বালিগঞ্জ এবং ঢাকুরিয়ার রেললাইনের এপারে। আর এই কালোবাজারি অর্থনীতিকে খানিকটা চালু রাখে বটে!

    বিজন ও বিপ্লব আমার এই কথায় ভয়ানক চটে যান।

    সেতো হিটলারও বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়ে বেকার সমস্যার সমাধান করেছিল। যুদ্ধপ্রচেষ্টায় থাইসেন-ক্রুপের ইস্পাত কারখানা বিশাল অর্ডার পেল। ফৌজে বেকার তরুণেরা দলে দলে ভর্তি হল।
    আরে হিটলার তো ক্ষমতায় এল ওই লোভ দেখিয়ে, খালি অপমানিত জার্মান জাতির হৃত-গৌরব ফিরে পাওয়ার কথা বলে নয়। ভাইমার রিপাবলিকের সময় বেকারত্ব খুব বেড়ে গেছল।

    এবার আমি হাতজোড় করি।

    উঃ, এবার ক্ষ্যামা দিন। মাথা তাঝঝিম-মাঝঝিম করছে। এত সব নতুন শব্দ ! – ফিসক্যাল ডেফিসিট, জিডিপি, মনিটাইজেশন, পিকেটি! এসব কালকে বোঝাবেন, কেমন?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন