এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • ভাষার শক্তিশেল> শ্রমিক বর্গের উল্লাস> টের পাই, এখনো মরিনি আমি

    রোমেল রহমান লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৬ মার্চ ২০২৩ | ৫৯০ বার পঠিত
  • দোল পুন্নিমার চান্দে লালন সাঁইজির ধামে যাবার বাঞ্ছা মনের মধ্যে উসুক দিচ্ছে।  অবয়ব দর্শনের একটা লোভ মনে ঘুরপাক খায়।  আমি তো দেখে যাবার খেলার এক খেলনা যে নিজেকে নিয়েই মেলার মাঠে একা এবং একলা খেলে যায়! ফলে সাধু গুরুদের ঐ অবয়ব দেখার একটা পিপাসা আমার আছে।  বেশরা মনের প্রচলিত লেজ মাথা নেই।  মক্তবে মণ্ডপে ঠাই তার চাই না।  আছে সুরে ভেসে যাবার এক আদিম প্রবণতা, যার জাতফাত নেই।  ফলে ‘একবার এসে প্রাণ বন্ধু দেখা দাও মোরে’ গানটা এই যে কানে এসে পড়লো আমার মধ্যে ঘোরের ঘূর্ণি তুলে চলে গেলো।  আমি জানি দয়াল চাঁদের হাটে আমার কেনা-বেচার কারবার নেই।  তবু আজ বাড়ির পেছনের সেই যে পুকুরটা, যার বুকে একটা হেলে পরা কদম গাছ তার পাশের মাঠটায় একটা বিয়ের উল্লাস মঞ্চ বানিয়েছে পাড়ার নিম্ন আয়ের এক গোত্র।  খোঁজ নিয়ে জানা গেলো রেস্তরাঁর মেসিয়ার এক ছেলে প্রযুক্তির আশীর্বাদের কিংবা নিজের হৃদয়ের দৌলতে এক বণিক কন্যাকে ভাগিয়ে এনেছে।  তাদের জীয়লের আঠা টাইপ প্রেমের ফলে কন্যার বণিক পিতা বন্দুক ফেলে মেনে নেয়ায়, পুত্রের দরিদ্র পিতা সুদে টাকা ধার নিয়ে সামাজিকতার চরম করার প্রায়াসে জাহির হতেই আমরা যারা অপ্রয়োজনীয় এই উৎসবে কিংবা মহল্লার এদিক সেদিক বসবাস করি তাদেরকে উচ্চশব্দে গান বাজিয়ে তার পুত্রের সাফল্যের ভাগীদার করবার ভাগ্য দান করছেন।  ফলে গতকাল থেকে আজ পটকা কিংবা হল্লার পর আজ সন্ধ্যা থেকে গায়ে হলুদের উছিলায়, আশপাশের এক আধ কিলোমিটার এলাকাকে ঝাঁঝরা করে ফেলার মতন সাউন্ড সিস্টেম বসিয়ে উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষার গানের এক সমারোহ নাজিল করে ইংরেজদের এটা বুঝিয়ে দিয়েছেন, ইংরেজিটা মূলত তথাকথিত শিক্ষিতদের কারবারের ভাষা।  উপনিবেশিক শাসকদের এই পরাজয় পুনরায় টের পায়িয়ে দেয়, মামাতো ভাই ভাই হইলেও মায়ের পেটের ভাই না! ফলে অহরহ, বাংলা, হিন্দি, পাঞ্জবাবি, তামিল ভাষার গানের ঝাঁঝালো আক্রমণে সামান্য পরিমাণের নাগরিক গেরিলা মনটা কেমন একটা পুলক অনুভব করলো।  কিন্তু গানের এই তীব্র আক্রমণের স্রোতে ডিজে/ মাসালা/ আইটেম সং বিচিত্র শিরোনামের ককটেল গানের ক্রমাগত প্রয়োগের ফাঁকে এক দুই মিনিটের যেই ছেঁদ, তখন আমি টের পাচ্ছিলাম বুকটা খালি খালি লাগছে যেন!! কিংবা বেচারা লক্ষ্মণকে ফিল হচ্ছিলো শক্তিশেলের আঘাতে তার অবস্থাটা কল্পনা করে! ব্যারাছ্যারা লেগে যাওয়া আমার বাড়ি বা প্রতিবেশীদের বাড়ির জানালা লাগিয়ে ঘোপে ঢুকে যাওয়া থেকে অন্তত আমি দুলতে দুলতে অনুভব করি ভাষার শক্তি! আমরা যারা ঘোমটা দিয়ে লিখিটিখি কিংবা ভাষার শুদ্ধতার চাপরাশি হিসেবে নিজেদের কায়েম করেছি রুটি রুজি বা মনের ফরমায়েশে! তাদেরকে সহসা ল্যাথ্রা লাগে আমার! ক্রমাগত বাজতে থাকা এইসব গানের মধ্যে হঠাৎ আমার কান সচেতন হয়ে ওঠে বা আমার কানে পানি যায় যখন শুনি একটা গানের লাইন এমন, ‘ মরে যাবো.. মরে যাবো.. মরে যাবো রে...পিরিতের পিপাসায় মরে যাবো রে...’ , কিংবা ‘ জড়িয়ে ধরো আমার কোমরটারে...’ অথবা, ‘আমার দিলের বিলে লিখে দেবো যার নাম রে... সে আমার পেয়ারি লাল রে...’ প্রতিটা গানের সঙ্গে তীব্র উল্লাসে ফেটে যাচ্ছে জমিন! এক সময় টের পাই আমার রক্তের মধ্যে নাচ তরঙ্গ তুলতে চাইছে।  নিজেকে সামাল দিলেও টের পেতে অসুবিধা হয় না যে এই গান আমারও মন চায়।  চিরায়ত প্রচুর গান নতুন সঙ্গিতায়জনে সাজিয়ে শুনে যাচ্ছে এই সময়।  মমতাজের কণ্ঠে যখন ‘ আমার ঘুম ভাঙাইয়া গেলো রে মরার কোকিলে’ শুনে সবাই চিৎকার দিচ্ছে তখন মনে হবে এইসব ফাল্গুন ফেব্রুয়ারির আগুণ! কিংবা ‘ নান্টু ঘটকের কথা শুইনা, অল্প বয়সে করলাম বিয়া’ কিংবা আচানক , ‘এক দো তিন চার পাঁচ ছ্যে...’ বা ‘নাগিন নাগিন’ আবার, ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া’ ঠেলে পাঞ্জাবি কোন গান অথবা দক্ষিনি সিনেমার জনপ্রিয় কোন গান।  আবার হুড়মুড়িয়ে এর মধ্যে, ‘বোকাভোলা... কোকাকোলা... ওয়াহরে বাবা তু যে ভোলা কোকাকোলা...’ থেকে , ‘ডিংকাচিকা ডিংকাচিকা...’ বা, ‘নাচ আমার ময়না তুই পয়সা পাবি রে...’, আবার, ‘জ্বালাইয়া গেলা মনের আগুন নিভাইয়া গেলা না’ এর সঙ্গে নাচের মত্ততা দর্শনে আমার প্রিয়তমা হয়তো হতাশ হয়ে পড়ত কারণ, এরোবিক্সের ক্লাসে শরীর সুন্দর রাখার যেসব কসরত মুদ্রা শেখানো বা অনুশীলন করানো হয় উচ্চ বিনিময় মূল্যে তা একদম খেলো লাগতো এই নাচ দেখবার পর।  যেমনটা একবার মতুয়াদের মচ্ছব দেখতে গিয়ে আমার সুপণ্ডিত/ সুবোধ চলচিত্র নির্মাতা বন্ধুদের হয়েছিলো যে, মতুয়া নারীদের ডঙ্কা পেটানো এবং তালে তালে কোমর দোলানো দেখবার পর ফ্রিজ হয়ে থাকা ক্যামেরা হাতে হা মেরে থাকা তাদেরকে দেখি মত্ত পুরুষদের খোঁপা খোলা চুলের সঙ্গে অসুর কাটিঙয়ের দোলানো মাথার ঘোরে মাতোয়ারা হয়ে একজন বলে ওঠে, হচ্ছেটা কি? আমি বললাম, কেবল শুরু দেখে যা! ফলে একটা সময় মচ্ছবের দামামার মধ্যে কারবালার শোকের মাতম যেন খুঁজে পেয়ে একজনকে দেখি লুটিয়ে পরা মানুষের মধ্যে বিলিন হয়ে যায় গড়াতে গড়াতে। জ্ঞান ফেরার পর জানতে চেয়েছিলাম সে কেন ওভাবে পড়ে গেলো? সে শুধু বলেছিল, থাকা গেলো না আর! ফলে রক্তের মধ্যে যেই নাচ! যেই কল্লোল তাকে ঠেকাবেন কি করে? মাঝেমধ্যে মনে হয় পরম শ্রদ্ধেয় দেবদাস মিস্ত্রি ঠিকই বলেছিলেন, ‘সংগীত দিয়ে, সুর দিয়ে লড়াই করবো। ’ আজ কেন যেন মনে হচ্ছিলো যারা জঙ্গি বা কট্টরপন্থী হিসেবে সব কিছুকে চুরমার করে দিতে খাড়া! তাদেরকে এই গানের আস্তানায় ছেড়ে দিলে শেষমেশ ফানা হয়ে যাবে হয়তো! অন্তত অনুভব হয়, এতে এক আদিম সুবাস আছে যা আমাদের সকলের মধ্যে নিহিত ; যা ঐ মচ্ছব দেখে উচ্চমার্গবাসী কেউ কেউ নাক সিটকায় তেমন। ভাষার যে লালিত্যের ঘর নিয়ে আমরা যেখানে সংসার পেতেছি তার পাশেই আরও বড় বংশ নিয়ে সহজ বা সরাসরি নিজেকে প্রকাশ করার গান নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমারই জ্ঞাতি, যাকে আমি নিম্ন আয়ের, নিম্ন বর্গের ইত্যাদি ট্যাগে ফেলে নিজেকে এগিয়ে রেখেছি বাজার সরকারের ভূমিকায়।  অন্তত এই তীব্র তীক্ষ্ণ ভাষার গানের মধ্যে দিয়েও জীবনকে উৎযাপনের যে আয়োজন, তাকে অস্বীকার করার ভাষা আমার থাকতে পারে তবে অধিকার নেই।  কেনোনা বাজারমূল্যের সংখ্যায় ওর শ্রোতা বেশি।  তাই আজ অনেকদিন পর দূরবীন শাহ্‌ পদ মনে ওঠে-

      ‘ মারিয়া ভুজঙ্গ তীর, কলিজা করিলো   চৌচির
      কেমন শিকারি তীর মারিল গো।
      বিষ মাখায়া তীরের মুখে মারিল তীর   আমার বুকে
      (আরে) দেহ থুয়া প্রাণটা লয়া যায়।
      আমার অন্তরায়, আমার কলিজায়।
      প্রেম শেল বিন্ধিলো বুকে মরি হায় হায়।।‘

    শিল্পের তো মূল্য দেয়া যায় না।  তাই মনের মূল্যে আমি নিজেকে আটকাতে পারি না বলেই টের পাই জ্যান্ত আছি! অন্তত গোঁড়া পাদ্রীর মতো বিস্ময়হীন একটা কাঠামো হয়ে যাইনি! রক্তের নাচ জানান দিচ্ছে আমাদের ব্যাকুলতার ঐক্য! কার্ল মার্ক্স কি জেনেছিলেন মানুষ একটা যায়গায় এক? অভাবের মিলনে তারা ভাই বোন।  আর আমাদের অভাবের ভাষা ঐ তো এখন প্রকাশিত হচ্ছে বিচিত্র সুরে নানান ভাষায় একাকার হয়ে রক্তে হাড়ে মজ্জায় তরঙ্গ তুলে।  

    ০৩।  ০৩। ২০২৩
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ০৬ মার্চ ২০২৩ | ৫৯০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল প্রতিক্রিয়া দিন