এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • হারিয়ে যাওয়া মানুষ ২

    Eman Bhasha লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ০৮ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৪৬ বার পঠিত
  • প্রদীপ আর নেই জানেন?
    কোন প্রদীপ?
    কত প্রদীপকেই তো চিনি।
    প্রথম প্রদীপ যমজ ভাই। আমাদের পাশের বোড়া গ্রামের অশোক আর প্রদীপ। দুরন্ত দুই ফুটবলার। পড়াশোনায় তেমন ভালো নয়, কিন্তু ফুটবল কথা বলে তাদের পায়ে। একজন ডান পা একজন বাঁ পাকে কথা বলায়।
    ক্লাসে দু ভাইকে আলাদা করতে পারতেন না স্যাররা। 
    আমরাও।
    কিন্তু টিফিনে ফুটবল পায়ে পড়লেই দুই ভাত চেনা জলভাত।
    একজন বাঁ পায়ের চারু প্রদর্শনীতে শূন্যে ভেসে বল ছুঁড়ে দেয় গোলে আরেকজন ডানপায়ের জাদুকর।
     
    সে-কালে এক ক্লাসের বড়কে গাঁয়ে কেউ দাদা বলতাম না।
    নাম ধরে রাখতাম।
    সেহারাবাজার স্কুলে গিয়েও এক প্রথা।
    বর্ধমান শহরে এসে উল্টে গেল।
    এক কেলাসের বড়-- দাদা বলতে হবে? লে হালুয়া।
    দ্বিতীয় প্রদীপ চেনা এক মৃত মানুষকে।
    আমাদের গ্রামের এক শান্তশিষ্ট ছেলে কলকাতা শহরে এসে ভিড়ে গেল এমন এক দলে, যেখানে বোমা পিস্তল গুলি হাতের পাঁচ।
    শিয়ালদহ  রেল ইয়ার্ড এলাকায় এদের রাজত্ব।
    ভোটের বাজারে বোমা গুলি বন্দুকে স্বচ্ছন্দ।

    রেল পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা যায় প্রদীপ।
    তার ছবি টাঙানো থাকতো গ্রামের দাদাটির ঘরে। এই দাদাটি অসম্ভব পরোপকারী।
    লোকের বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাহায্য করে।
    এবং এই মানুষটির পরিবারের মতো এত শান্তি আমি কোনো পরিবারে দেখিনি।
    বাবা মা ছেলে মেয়ে--সবাই সুখী ও খুশি --আজকের বিষণ্ণ বিষাদময় পৃথিবীতে এক শিক্ষণীয় বিষয়।
    টানা তিন মাস ছিলাম এই পরিবারে, একদিনও ঝগড়া কথা কাটাকাটি বিরক্তি দেখিনি।
    প্রণাম এঁদের সবাইকে।
    বর্ধমান শহরে এসে কত প্রদীপ।
    প্রদীপ সংঘ।
    সাড়া জাগানো ফুটবল ক্লাব।
    সত্তর দশকে নাকি সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর।
    বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল স্কুলে পেলাম প্রদীপ কেজরিওয়ালকে।
    মাড়োয়ারি পরিবারের ছেলে। ও পড়তে আসত বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর থেকে। 
    আমরা ৪৭ জন ছেলে গ্রাম মফস্বলের ৪৫ টি বিদ্যালয়ের ফার্স্ট বয় আর দুজন সেকেন্ড বয় আরো ভালো স্কুল ও শিক্ষকের সন্ধানে হাজির হয়েছিলাম বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল স্কুলে।
    সেখানে পিছনের দিকে এক প্রায় লুকানো সিঁড়িতে প্রদীপের সঙ্গে আলাপ।
    তিনজন ছেলে তিন মুখ করে মাথা নীচু করে টিফিন খাচ্ছে। তিনজনেই রুটি খাচ্ছে।
    রুটি খাওয়া আমার কাছে গরিবি ও লজ্জার চিহ্ন ছিল তখনো‌।
    চোখে জল এনে রুটি আর সরু সরু করে কাটা আলু ভাজা চেবাচ্ছি‌। আর ডিম ভাজা মাঝে মাঝে।
    তখনো ডিম ভাজির নাম ওমলেট/মামলেট হয় নি।
    হঠাৎ একজন বলল, কী খাচ্ছো ভাই? ডিম ভাজি? দাও তো। আর পায়েস নাও।
    আরেকজন মুখ ঘুরিয়ে বলল, আমাকেও দাও। বাড়িতে তো ডিম খেতে দেওয়া দূরে থাক ঢুকতেও দেয় না।
    বাকি দুজনের নাম ছিল প্রদীপ।
    প্রদীপের মা অসাধারণ পায়েস বানাতেন, তেঘরিয়ার লোকনাথ বাবার মন্দির ছাড়া এতো ভালো পায়েস আমি আর খাইনি।
    তখন তুমি থেকে তুই হতে তিন সেকেন্ড লাগার সময়।
    বন্ধুর ভালো নিজের ভালো ভাবার সময়। ঈর্ষায় বুক টনটন নয় বুক বাজিয়ে বন্ধুর সাফল্য বলার সময়। যেন নিজেই করেছি ওটা।
     
    বন্ধুর খাবার নিজের খাবার।
    তিন বন্ধু ভাগাভাগি করে খাই। এক টিফিন বক্সে রুটি ডুবিয়ে পায়েস বা ডিম ভাজি বা আলু ভাজি। 
    আলু ভাজা বা ডিম ভাজা বলতাম না তখনো।
    শহর অনেক কিছু কেড়ে নেয়।
    শব্দ ভাষা ভালোবাসা।
    কোনটা ভালোবাসা আর কোনটা সৌজন্য-- আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলতেন, বুঝতেই শহরে চলে যায়, ছয় বছর।
    বর্ধমান শহরে ১১ বছর আর কলকাতায় ৩০ বছর কাটিয়েও কি বুঝতে শিখেছি? কে জানে! 
     
    প্রদীপ কেজরিওয়াল কোথায় হারিয়ে গেল সেটাই বা কে জানে!
    ২০১১ তে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নাম পড়ে প্রদীপের পদবী কেজরিওয়াল ছিল মনে পড়ে গেল।
    কেজরিওয়ালকে কত খুঁজছি।
    কেউ পেলে জানাবেন?
     
    কলেজে কত প্রদীপ।
    কলকাতায় বাংলা ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে আলাপ হল এক প্রদীপের সঙ্গে ‌। প্রদীপ ভট্টাচার্য।
    হাতিবাগানে কাপড় জামার ব্যবসা।
    তবলা বাজানো শখ।
    ১৯৯৯-এর পয়লা বৈশাখে তবলা বাজালেন আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে মেহগনিতলায়। আমরা বলতাম, মেহগনিতলা। পরে মেহগনি মরে যাওয়ার পর একাধিক ছাতিম গাছ লাগাই। নাম দিই  মেহগনি ছাতিমতলা। ২০০৯ থেকে যার পোশাকি নাম রাণুচ্ছায়া মঞ্চ। ২০১৩ পর্যন্ত আমরা মেহগনি ছাতিমতলাই বলেছি। ২০১৩-র পর লোকের নজর পড়ল ওখানে সভা করার। আগে ভাষা ছাড়া ও চেতনা সমিতি ছাড়া কেউ সভা করতেন না। শুধু নজরুল জয়ন্তীর দিন আব্দুর রব ভাইরা।
    আমাদের অনুষ্ঠান ছাড়া বাকি সময় ওই জায়গা ছিল মদ মাতাল নেশারু পাতারুদের আড্ডা।
    অন্ধকার আলোছায়ায় আরো কত কী চলতো। ২০১১তে মহানাগরিক শোভন চট্টোপাধ্যায় আমাদের কথায় পাকা করে বাঁধিয়ে দিলেন। 
    যাক, প্রদীপদা আসতেন এক বন্ধুকে নিয়ে।
    তাদের সঙ্গে বেলেঘাটার সবুজ শাড়ি পরা এক গানের দল। গলায় লাল উত্তরীয়।
    পরে বুঝেছি কারণটা---সবুজ লাল মানে বাংলাদেশ।
    এই মুহূর্তে গানের দলের নাম মনে পড়ছে না। দশম বাংলাদেশ বইমেলার কারণে ভালো ঘুম হচ্ছে না। চিন্তায় ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে মাঝরাতে।
    তাই এই লেখা লিখতেও পারছি।
    বাংলাদেশ বইমেলায় দ্বিতীয় দিনে অমিতাভদা বললেন, প্রদীপ আর নেই।
    কোন প্রদীপ?। 
    হাতিবাগানে কাপড়ের দোকান ছিল যার!
    এক ঝলক।
    কত কথা মনে পড়ে।
    আজ মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল প্রদীপদার কথায়।
    হাতিবাগানে করোনার সময়  জামা কিনতে ঢুকেছি--প্রদীপদা।
    আপনি শপিং মল ছেড়ে হাতিবাগানে এখনো জামা কেনেন?
    কিনি তো! 
    খুব ভালো। চলুন চা খাবেন। ও আপনি তো আবার চা খান না। 
    একটু থেমে বললেন, আমি এখনকার বাজার সমিতির সম্পাদক জানেন তো।
    পুড়িয়ে দিল সেবার, তুলতে পারেনি। পারবেও না। আমি মুক্তিযুদ্ধের সেনানী।
    আপনি? কত বয়স আপনার?
    আপনার চেয়ে একটু বেশি।
    ওই দশ বছর বয়সে বোমা বন্দুক শিখেছি।
    ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর পর ষোলো বছরের ছেলে টাইগার সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গোপন দল করে লড়েছি বোমা বন্দুক শুধু নয় গ্রেনেড মেশিন গান হাতে।
    বাকি কথাগুলো শুনেছিলাম আগেই।
    এক ১৫ আগস্টে বাংলাদেশ দূতাবাসের পদযাত্রায়।
    এই যে দেখছেন ১৮-২০ জন।
    সব ১৯৭৫-র একসঙ্গে গোপন লড়াই লড়েছি। অনেক নেতা আত্মসমর্পণ করলেও আমরা করিনি। সশস্ত্র বাহিনী গড়ে আবার বঙ্গবন্ধুর দলকে ক্ষমতায় আনতে চেয়েছি। পারি নি। পালিয়ে আসতে হয়েছে।
    প্রচুর অত্যাচার করেছে।
    কিন্তু কারো নাম বলিনি কেউ। প্রতি 
    ১৫ আগস্টে আসি দূতাবাসে।
     
    প্রতি বছর বাংলাদেশ বইমেলায় দেখা হতো।
    বলতেন, ফিরে যেতে খুব ইচ্ছে করে, বাংলাদেশে।
    খুব।
     
    প্রদীপদা এখন কি আপনি বাংলাদেশে?
    চোখের জলে ভাসছি প্রদীপদার।
     
    হৃদরোগ ছিল আপনার? ছিল না তো।
    হঠাৎ স্ট্রোকে চলে গেলেন? 
    কেন? কেন? কেন? 
     
    ভাষা আন্দোলনের লড়াকু নেতা পরে শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন আমাদের ২০ ফেব্রুয়ারি সারারাত বাংলাভাষা উৎসবে।

    আনতেন খুঁজে খুঁজে দ্যাশের মানুষদের।
     
    কারা আনবে আর?
    শান্তিদা চলে গেছেন কবেই? 
    চাকদহের শুভ্রাদি/ শেফালিদি।
    আপনিও!  
     
     
  • ধারাবাহিক | ০৮ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৪৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Jayati roy | 97.115.105.184 | ১৪ ডিসেম্বর ২০২২ ০৯:১৪514539
  • ভীষন ভালো লাগল
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন