• খেরোর খাতা

  •  বাসা বদল 

    ভাষা ভাষা লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৮ জুলাই ২০২১ | ১৫৯ বার পঠিত
  • না। না। আমি জানি সবারই দু’টো করে নাম হয়! আমার খুব ইচ্ছে আমারও দু'টো নাম থাকুক।
    দু’টো করে নাম?
    হ্যাঁ। ডাকনাম আর ভালোনাম।
    সে আবার কী? ডাকনাম আর ভালোনাম? নাম তো একটাই হয় আর তাই দিয়েই তো চলে যায়, আবার দু’টো নামের কী দরকার?
    ডাকনাম মানে তো ডাকনাম, যে নামে তোকে ডাকা হয় আর আরেকটা নাম মানে ভালোনাম, স্কুলে ভর্তি হতে গেলে যে নাম লাগে!
    তুই স্কুলে ভর্তি হবি?
    না, তা হয়তো হব না! তবু বলা তো যায় না, যদি কোনোদিন সেরকম কোনও সুযোগ আসে আর ভালোনামের অভাবে যদি মিস্ হয়ে যায়!
    তখন যা হোক একটা দিয়ে দেওয়া যাবে না?
    আগে থেকে রেডি থাকাটা ভাল না?
    তা তুই এতসব জানলি কী করে? ডাকনাম? ভালোনাম? স্কুলে ভর্তি হতে গেলে ভালনামের দরকার হয়! এতসব?

    একটা বাড়িতে একবার কাজে লেগেছিলাম। অবশ্য টিকেছিলাম মোটে তিন দিন। সে কথা থাক। তো সেই বাড়িতে ঠিক আমাদের বয়সী একটা ছেলে ছিল। ওখানেই জানলাম ওইসব। বাড়িতে তোতন আর স্কুলে অঙ্কুষ না কী একটা যেন! ডাকনাম, ভালোনাম।

    সেদিন আমার মনটা খুবই খারাপ। সেটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। মন, খারাপই থাকে। চাকরি পাচ্ছি না একেবারে, তা নয়, তবে ধরে রাখতে পারছি না। সবই ছোটখাট। যৎকিঞ্চিৎ। বড় চাকরি পাওয়ার মতো যোগ্যতা হয়তো আমার নেই-ই। কিন্তু সেই ছোট চাকরিগুলোই কেমন আসে আবার হাত থেকে বেরিয়েও যায়! আর বেশির ভাগই মাইনে পাওয়ার আগেই। বেশ কিছুদিন বেগার খাটানোর পর একদিন বলে আর দরকার নেই। কেউ কেউ অবশ্য দেয়! সে বহুদিন পরে। তাও অনেক সময় দু-তিনবারে।

    তো সেদিন এক জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরছি। চাকরিটা হবে না, সেটা কোনও কথাই নয়, কথা যেটা হচ্ছে যে প্রায় অপমান করে তাড়িয়েই দিল। মন খারাপ নিয়ে তক্ষুনি বাড়ি ফিরে যাব? যাই, গঙ্গার ধারে খানিকক্ষণ বসেই যাই!

    আর গঙ্গার পাড়ে বসেই শুনি ওই কথোপকথন। বসার সময় চারপাশটা তো একবার দেখে নিয়েই বসে মানুষ। পর পর কয়েক জোড়া প্রেমিক যুগলকে পার করে বসে ছিল ওই বাচ্চা দু’টো ছেলে। সাত-আট কি আট-নয়! বা আরেকটু এদিক ওদিক। স্ট্রিট আরচিন। ভালোনামে পথশিশু। অবশ্য একেবারে শিশু তো আর নেই, তাই ডাকনামে রাস্তার ছেলে। ওদেরও পার করে বসি, আমি। ব্যর্থ। পরাজিত। দিনের পর দিন। প্রতিদিন। হতাশও। হয়তো। হয়তো কেন? নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ ধরেই কথা বলছিল ওরা। আমার কানে ঢোকে ঠিক ওইখান থেকেই। ওই দু’টো করে নামের বিস্ময়কর অবতারণায়!

    অবশ্য এটা ঠিকই, ওদের সব কথা যে আমি শুনতে পেয়েছি, তা হলফ করে বলতে পারি না। কিছু নদীর হাওয়ায় এলোমেলো ছড়িয়ে গেছে, আর কিছু গেছে গাড়ির হর্নের তলায় চাপা পড়ে। আর কিছু হয়তো আমি অবধি পৌঁছয়নি! আর পৌঁছলেও যে সব আমার বোধগম্যতার আওতায় এসেছে তা তো নিশ্চিত বলা যায় না! তাই বেশ কিছু শূন্যস্থান আমায় পূরণ করতে হয়েছে, ওদের কথাবার্তাকে অর্থবহ করে তুলতে! তাতে সব অর্থই যে ঠিকঠাক বহন করা গেছে তা মোটেই নয়। হারিয়ে গেছে ওদের বাচনভঙ্গি, ক্ষীণ হয়ে গেছে প্রস্বর, মুছে গেছে ওদের ভাষাশৈলী। বদলে এ হয়তো হয়ে উঠেছে একান্ত আমারই ভাষ্য। টিকাটিপ্পনি সমেত। ভাষার আগ্রাসন সহ। অর্থবহতার সাথে সাথে হয়তো মিলিয়ে গেছে ওদের নিজস্ব স্বতঃস্ফুর্ততা। তবে স্কুল, মিস্ বা রেডি যে ওদের মুখেই শুনেছিলাম তাতে ভুল নেই। তাতেই যতটুকু সাবলীলতা।

    ওটাই প্রথম দিন। ডাকনাম আর ভালোনাম। ওদের আবিষ্কারের দিন। এরপর থেকে বসার আগে চারপাশ দেখে নেওয়া বলতে ওদেরই খুঁজে নেওয়া। কোনও কোনও দিন পাওয়া যায় জায়গা। শূন্যস্থান। ঠিক ওদেরই পাশটায়। কথা কানে ঢোকার দূরত্বে। আবার কোনোদিন দূর থেকে ওদের দেখেই চলে আসতে হয়। কাছেই যাওয়া যায় না। এত ভিড়। অবশ্য দেখাটা, তা-ও দূর থেকে, সেটাও দিনে দিনে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। দু’জনের বন্ধুত্ব আমায় মুগ্ধ করে। একে অপরের মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার ওই অনন্যতা আমায় আবিষ্ট করে রাখে। একসময় আমারও শুভ, শঙ্খর সাথে এরকম মন কেমন করা এক অন্তরঙ্গতা ছিল। একদিন-দু’দিনের অদর্শনও কেমন অস্থির করে রাখত সারাটা দিন। আর এখন বড়জোর শনি কী রবি। ওরা সকাল সকাল বেরোয় আর ফিরতে ফিরতে সন্ধে পার করে রাতের দিক। ওদের পাকা চাকরিতে আমার নিরন্তর চলে যাওয়া চাকরির হীনমন্যতার নৈরাশ্য চেপে বসছিল।

    সে সব কথা এখন থাক। এমনও হয়েছে প্রায় ঘন্টা খানেক কাটালাম ওখানে অথচ ওদের দেখাই পেলাম না। ওরা যে ঠিক কোথায় থাকে, তা তো জানি না। ওদের সংসার যদি আদৌ থেকেও থাকে তা ওই গঙ্গার পাড়েই কিনা, তাও নিশ্চিত নই।

    সেদিনও কোথ্থাও ওদের চোখে পড়ল না। একসময় ভাবলাম কোথাও বোধহয় গেছে। এমন সময়ই দেখি দুই মক্কেল হুটোপাটি গঙ্গাস্নান করছে। এই সময়ে? এত বিকেলে? গরমকালের রোদ অবশ্য তখনও পুরোপুরি পড়েনি। তবু প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজতে চলল। এই সময় কোনোদিনও নদীতে দেখিনি। বস্তুত নদীতে স্নানরত সেই প্রথম। এই গলা-জল তো তারপরই ডুব-সাঁতারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, কোথায় গিয়ে যে উঠছে খুঁজে বার করাই মুশকিল। আর গঙ্গায় তো ওরা দু’জনই শুধু স্নান করছে তা নয়! তাই দৃষ্টির ধাঁধাঁ কাটিয়ে চিনে নিতে খানিক অসুবিধা যে হয় তা অস্বীকার করা যায় না। তবে মানুষকে তো মানুষ সবসময় মুখ দেখেই চেনে তা নয় আর এতটা দূর থেকে মুখ খুব একটা স্পষ্টও নয়! আর সূর্যও অস্ত যাচ্ছে ওদের পেছনে। সিলুয়েটে তো আলোর চেয়ে আঁধারই বেশি। তাই আলোই সব নয়। প্রতিটা মানুষের যে নিজস্ব এক ভঙ্গি, স্বতন্ত্র এক হাবভাব, হাত-পা নাড়া সেই সব দিয়েও তো চিনে নেওয়া এক একজনকে। পর্যবেক্ষণে তো দেখাটাই আসল। অবশ্য তা বলে শ্রবণটাকে যে হেলাফেলা করা যায় না মোটেই, তা নিয়ে তো আলাদা করে আর বলার কিছু থাকতে পারে না!

    এই সময়েই নজরে আসে, একটা লাল গোলা ওদের দু’জনের মাঝে। এই স্থির হতে চায় তো আবার মিলিয়ে যায়। জলে হাত দিয়ে থাবড়ালে মনে হয় বুঝি রক্ত চলকে পড়ল এর ওর গায়ে। ওরা হয়তো বুঝতেও পারে না, একটা রক্তপিণ্ড নিয়ে ওয়াটারপোলো খেলছে দু’জনে। লাল একটা আভা ভেজা শরীরে পিছলে ওপর দিকে উঠে গেছে আর মুখ দু’টোকে করে তুলেছে শোণিত এক বাতুলতা। অনির্বচনীয় এক ঔজ্জ্বল্যে! তবে দৃষ্টিপথে নদীর অনেক আগে, এই পারেই ওই যে তেল চকচকে চর্বিওয়ালা এক উপুড় করা তাল আর তাকে দলাই মলাই করতে থাকা এক মালিশওয়ালা, সত্যিই মনে হয় যেন একের পর এক আঘাতে একটা খুনের দৃশ্যই দেখছি। খুন মানে যে খারাপই, থকথকে এক রক্তাভ পর্দার আড়ালে তখন তা মনেই হয় না। অবশ্য সেই দৃশ্যের আয়ু আর কত? মেরে কেটে তিন মিনিট! কী বড়জোর সাড়ে তিন। তাতেই মায়া, তাতেই কুহক!

    এমন সময়ে তীক্ষ্ণ আর্তনাদসম এক থেমে যাওয়ায় শুধু একটা গাড়িই না, সম্ভবত থেমে যায় আরও কিছু, মনযোগ সেদিকে যায় ঠিকই, তবে বেশিদূর এগোবার সাহস হয় না। কী দেখতে কী দেখব! তার চেয়ে থাক! মুহূর্তের উন্মাদনা অগোছালো করে দেয় আশপাশ। খানিক্ষণ আগের দৃশ্য যে কোথায় হারিয়ে যায়, বর্তমানের দৃশ্যমানতায় তার কোনও চিহ্ণই থাকে না। হারিয়ে ফেলি ছেলে দু’টোকেও। কিছুতেই আর খুঁজে পাই না।

    শুধু সেদিনই নয়, তারপর পর পর দু’দিন ওদের দেখা পাই না। নৈরাশ্য আর দীর্ঘশ্বাসকে বুকে চেপে আর কাঁহাতক বহু-দু’জনের ঘনিষ্ঠতা দেখা যায়! মনে হয় যেন উৎসাহও হারিয়ে ফেলছি। চাকরির খোঁজ, টাকা-পয়সার অভাব, প্রায় সব কিছুতেই নিরুৎসাহ কিছুদিন আমাকে গঙ্গার ঘাট থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

    তারপর একদিন জীবনের নিয়মেই আবার ফিরিয়েও আনে। ওইসব এই দ্বার থেকে সেই দ্বার, টুক টাক কিছু এদিক ওদিক, আজকাল কোনও কাজকেই উঞ্ছবৃত্তি মনে হয় না যদিও—তবু তাও যে সবসময় জোটে না, সে আলাদা কথা—তো সেই সব এতোল বেতোল, অকাজ-সহ বেশির ভাগ দিন দুপুরের মধ্যেই মিটে যায় আর সেরকমই এক পড়ন্ত দুপুরে পুনর্মূষিকো ভব।

    ওরা সাধারণত কোনও বেঞ্চে বসে না। কিছু বাঁধানো চাতাল কিংবা সেখানে ভিড় থাকলে ঘাটের ধারের পাঁচিলে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। সেদিন দেখি, কী কারণে জানি না একটু বেশি ফাঁকা থাকাতেই সম্ভবত ওরা বেঞ্চে। বলতে বলতেই মনে পড়ছে, সেদিন বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল। আজকাল বেশির ভাগ সময়ই মেলে, তবে মাঝে মাঝে এই না-মেলাগুলোতেই তো নিজেদের দিকে আরও একবার ফিরে তাকায় মানুষ! এত কথার মাঝে আসল কথা তো সেই খুনখারাবি আলোর শেষে হারিয়ে ফেলার পর এই প্রথম ওদের খুঁজে পাওয়া।

    ওদের লক্ষ্য করতে করতেই আমার খেয়াল হয়, এক-নাম, দুই-নাম-এর ধাঁধাঁয় ওদের আমার আবিষ্কার, অথচ এখনও আমি ওদের নামই জানি না। পরিচয় থাকুক না থাকুক, কিছু একটা ভাবতে গেলেও তো একটা নাম থাকলে সুবিধে হয়। কোনও নামেই ওরা পরস্পরকে কখনও ডাকেনি তা নিশ্চয়ই নয়, আমি বুঝতে পারিনি। ওই হাওয়ায় হারানো বা হর্নে চাপা পড়া বা অন্য কিছুতে। মোট কথা ওদের নাম আমি জানি না।

    যে একটু লম্বা তাকে লম্বু আর যে বেঁটে তাকে বাঁটকুল বললেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু অত সহজে চুকিয়েও দিতে পারি না। আরও অনেক আকাশ-পাতাল পেরিয়ে তুলনায় রোগা ছেলেটার নাম রাখি অনিকেত। এমনকী মজুমদারও। সেদিনই যে অফিসে ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম, সেই অফিসের একটা দরজার নেমপ্লেটে নামটা দেখেছি। আর অন্য ছেলেটার? একই অনুষঙ্গে ওই অফিসে খুঁজতে গিয়ে কোনও নাম মনে পড়ে না। তবে খানিকক্ষণ ভাবার পর একটা নাম মাথায় আসে। ওই অফিস প্রসঙ্গেই। ইন্টারভিউ চলাকালীনই অফিসার বেল বাজিয়ে এক পিওনকে বলেছিল সুব্রতকে ডেকে দিতে। তো তাই অনিকেত মজুমদার যেমন চোখে ভেসেছিল তেমনই কানে ভেসে ওঠে, সুব্রত। উল্লেখে পদবী ছিল না। তাই আরেকটি ছেলে — শুধুই সুব্রত। অনিকেত আর সুব্রত। আর হবি তো হ ঠিক এমন সময়ই একটা নারী কণ্ঠে হাঁক শোনা যায় — এ্যাই প্যাংলা, ওই গোপলা। আদৌ ওদের দু’জনেরই কেউ প্যাংলা কিংবা গোপলা কিনা গোড়ায় বোঝা যায় না। দ্বিতীয় বা তৃতীয় ডাকে একজন মানে সুব্রত হাত তুলে সাড়া দেয়, তবে তাতে কে যে প্যাংলা আর কে যে গোপলা সে ধন্দ কাটে না। ওদিক থেকে কে যে ডাকছে দেখাই যায় না! কোন আড়াল থেকে যে ডাকটা আসছে ডাকের উৎস ধরে অনুসন্ধানেও বোঝা যায় না। তবে আসল ধন্দের সমাধান তখনই হয়ে যায়। সুব্রতর শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়ে ‘প্যাংলাকেও নিয়ে আসব’ জিজ্ঞাসায় মুহূর্তেই ও গোপলায় থিতু হয়।

    ওরা উঠে পড়ে। মা, মাসি বা অন্য কেউ, যেই হোক তার ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে যায়। ওদের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে মনে হয় কেমন দিব্য এক সমাধান হয়ে গেল! ওদের অজান্তেই ডাকনামের সাথে ভালোনাম একরকম জুড়ে তো গেল! প্যাংলা-অনিকেত আর সুব্রত-গোপলায়।

    তারপর যখনই গেছি ওদের সাথে দেখা যে হয়েছেই তা বলতে পারি না। অবশ্য দেখা বলতে সে দেখা তো নয়! এক পক্ষের দেখা অন্য পক্ষের অজান্তে। তবু সেই ‘এক পক্ষের দেখা’-ও হয় না বেশ কয়েকবার। মাঝে একবার দেখেছিলাম, ওই নদীর ধারেই, চাতালে। জনা তিনেক পুলিশ, কে জানে কী ব্যাপার, ওদের কিছু জিজ্ঞেস করছে। মুখে তো আছেই আবার সাথে আঙুলের বিভিন্ন কসরতেও। কী ব্যাপার না, ওখানে একটা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তাই ওই ছানভিন। তাই ওই পুছতাছ। অবশ্য পুলিশ বেশি সময় নষ্ট করে না। মনে হয় সেরকম জোরালো কোনও খবর নেই। পুলিশ ওদের ছেড়ে এগিয়ে যায়। তবে মনে হয় সুব্রত-অনিকেত এখনও অতটা পোক্ত হয়নি। ইশারাস্পৃষ্ট নিজস্ব এক বাঙ্ময় চাহনিতে ওরা স্থানত্যাগ করে আর তাই ওদের শোনা হয় না। ছিনতাইয়ের কথাটাও শুনি ওরা চলে যাওয়ার পর এক বাদামওয়ালার মুখে।

    তবে সেটাও অনেক না-দেখার মাঝে — এক অপরাহ্ণে। ওই টুকুই।

    তারপর যেদিন দেখা হল, সেদিন দেখা হওয়ার আগে শুনলাম ওদের গলা। বেশ উত্তেজিত। হয়তো অ্যানিমেটেড বললে ভাল বোঝানো যায়। দু’টো নামের মতো দু’টো ভাষায় যা দাঁড়ায় আর কী! প্রাণচঞ্চল, প্রাণবন্ত দুই কণ্ঠস্বর। পারদ বেশ উচ্চস্বরে বাঁধা তা শ্রবণেই মালুম হয়। আগে যে কী হয়েছে নিশ্চিত বোঝা যায় না বটে তবে যা শুনি তা থেকে একেবারে যে কিছুই ধরা যায় না তাও নয়।

    - হতেই পারে না।
    - হতে পারে না?
    - না হতে পারে না। মা কখনও নিজের বাচ্চাকে ফেলে চলে যেতে পারে?

    আমার এতদিনের অভ্যস্ততায় বুঝি এ প্যাংলা-অনিকেতের আকুতি। তখনও ওদের দেখতে পাইনি। দেখা পেলাম ঠিক এর পরে।

    - পারে না?
    - না পারে না।
    - কীভাবে বলছিস?

    গোপলা-সুব্রত এখানে একটা অদ্ভুত কথা বলেছিল। অনেক ভাবলাম, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলাম না। খুব সুন্দর করে বলেছিল আর কচি গলায় মনে হয়েছিল অপার্থিব আর সেটাই কিনা ভুলে গেলাম! বদলে দিলাম অক্ষম, সবচেয়ে স্বাভাবিক এক ভাবনা।

    - কীভাবে বলছিস?

    - বলছি কারণ কোনও মা নিজের বাচ্চাকে ফেলে যেতে পারে না। আমার মনে হয় কী জানিস, আমার জন্মের পর পরই বা কিছুদিনের মধ্যেই আমার মা মরে গিয়েছিল। না হলে আমার মা আমায় ছেড়ে চলে যাবে, এ আমি ভাবতেই পারি না। বাবা কারও থাকে না, সে কথা হচ্ছেও না...

    আরও কিছু বলছিল অনিকেত, কিন্তু সুব্রতর বাধায় শেষ করতে পারে না।

    - কেন? কাজলের তো মা-বাবা দু’জনই আছে।
    - ওই কাজলেরই শুধু আছে। সে কমলা মাসি আর কাত্তিক মেসোর কথা আলাদা। তোরও দেখ। দুগ্গা মাসি একাই তো তোকে বড় করছে! তোর বাবা কে তুই কি জানিস? এরকমই হয়! তাই বলছি মা কখনও নিজের বাচ্চাকে ফেলে যেতে পারে না।

    গোপলা কেমন চুপ করে যায়। মাথা নিচু করে কী যেন ভাবতে থাকে। বাবার ভাবনা কী? জন্মাতে গেলে একটা বাবা লাগে, ওরা জানে কী? কে জানে! তবে এ-ও ঠিক প্যাংলা ওকে ভাবতে দেয়। ভাবার সময়টা দেয়। যা আমি প্রথমে ভাবিইনি। ওদের অপেক্ষার, ওদের ধৈর্যের সীমা এতটা? এতটা পরিশীলিত? হ্যাঁ, পরিশীলিত শব্দটাই মাথায় এসেছিল। তারপরই মনে হয় অনুভূতি একটা সহজাত প্রবৃত্তি। অনুশীলনে, ঘষামাজায় অনেক কিছু হয় ঠিকই, তবু স্বভাবগত বলে কিছু তো একটা আছেই!

    - তুই অনেক জায়গায় ছিলি না?

    - কী করব? যার মা নেই, তাকে লাথি ঝ্যাঁটা খেয়ে এ-ঘাট থেকে ও-ঘাট, এভাবেই তো ঘুরতে হয়। দুবরাজপুরের নামটা মনে আছে আর বীরভূম। রতনকাকু। ওখানেই অনেকগুলো জায়গায় ঘুরে শেষে গেলাম সেইখানে, যেখানে ওই তোতন। অঙ্কুষ না কী যেন! ডাকনাম আর ভালোনাম।

    বললে বিশ্বাস হবে না পেছন দিয়ে যে বাসটা বেরিয়ে যেতে দেখি, সেটা দুবরাজপুরের। নাহলে দুবরাজপুর-টা ঠিক শুনেছিলাম কিনা বলা মুশকিল! আর ওই বাসের হর্নের মধ্যেই শুনি তোতন, অঙ্কুষ, ডাকনাম, ভালোনাম। এইসব। আর মনে হয় এক অদ্ভুত উচ্চারণে যেন ময়ূরাক্ষী আর দামোদরটাও শুনি।

    - তবে ওটাই শেষ। তার আগে কোথায় কোথায় ছিলাম মনে নেই। মানে জায়গার নাম মনে নেই। তবে ঘটনা অনেক মনে আছে। অবশ্য ঘটনা বলতে তো সেই একই! খালি খিস্তি আর মার। মার আর খিস্তি। খালি পেটে থাকাই বলতে গেলে। খুব বেশি হলে আধপেটা। ওখান থেকে মানে তোতনদের বাড়ি থেকে পালিয়ে এখান থেকে সেখান, সেখান থেকে ওখান ধাক্কা খেতে খেতে এসে পৌঁছলাম এখানে।

    গোপলা কোনও কথা বলে না। মাথা নিচু করে বসে থাকে। সেদিন ওরা একটা বিশাল বট গাছ ঘিরে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো এক বেদীতে বসেছে। গাছের শেকড় নিজের কাজ ঠিকই করে চলে। ছড়িয়ে যেতে যেতে কংক্রিটের বাধা অবলীলায় অতিক্রম করে বাঁধানো চাতাল জায়গায় জায়গায় ফাটিয়ে দিয়েও দিব্য বিস্তার করে চলে নিজেকে। আমি ওদের পেছনে বসে। ওরা আমাকে দেখতে পায় না। অবশ্য বৃত্তাকার এক বসার জায়গায় সবাই সবার পেছনে। আবার সবাই সবার সামনে। কেউই কাউকে দেখতে পায় না। নেহাত আমি ওদের কোনও ধরনের দেখাশোনা না করেও ওদের দেখতে চাই, শুনতে চাই বলেই দেখছি। শুনছিও। সুব্রত মাথা নিচু করে থাকে বলে বোঝা যায় না ওর চোখে কোনও মেঘ জমেছে কিনা, তবে মনে যে জমেছে বুঝতে অসুবিধে হয় না। ডানদিকে বসা প্যাংলার কাঁধে নিজের ডান হাতটা রাখে আর তাতে দু’টো শরীরই সমূলে কেঁপে ওঠে।

    একটা সময়, তা মিনিট দশেক পর তো হবেই, মাথা তোলে প্যাংলা। নদীর অনন্ত বয়ে যাওয়ার দিকে উদাস তাকায়। সুব্রত অনিকেতের দিকে নির্নিমেষ চেয়ে থাকে। এমন সময় অনিকেত একবার গাছ, গাছেরই তলায় বসে যতটা দেখা যায়, আর একবার সুব্রত, এভাবে একবার গাছ আর একবার গোপলা করতে করতে কেমন যেন দিশেহারার মতো বলে ওঠে, “জানিস আমার মনে হয়”, দিগভ্রান্ত, তবু স্বরটা ক্রমশ স্বপ্নালু হয়ে ওঠে। একটু থামে আবার বলে, “আমি যেখানে জন্মেছি এই গাছের শিকড়টা সেই অবধি চলে গেছে। এই গাছের শিকড়টা ধরে রাস্তা চিনে নিতে নিতে যদি যাওয়া যায় তবে হয়তো জানতে পারব আমি কোথায় জন্মেছি। তার থেকে হয়তো আরও কিছু। জানিস এই গাছটাকে ছেড়ে কোনোদিন আমি কোথাও যাব না। এই গাছটাই আমার মা।” প্যাংলা থামে আর বিস্ফারিত গোপলার দিকে একবার তাকায়। একটা যেন ঘোর, তার মধ্যেই বলে যায়, “এই গাছটাকে মা না ভাবলে না আমার কিছুতেই ঘুম আসে না। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও আমার ঘুম আসে না। কিছুতেই আসতে চায় না। রাত যত বাড়তে থাকে আমার তত মনে হতে থাকে আমার কেউ নেই। এই পৃথিবীতে আমার কেউ নেই। আমি একেবারে একা। তখন এই গাছটার কথা ভাবি। তারপর একসময় ঠিক গাছটা মায়ের মতো আমায় ঘুম পাড়িয়ে দেয়।” ঢেউয়ের মতো উথলে ওঠে অনিকেত। সেই প্রথম দু’জনকে একসঙ্গে ভেঙে পড়তে দেখি। যত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে থাকে তত আঁকড়ে ধরে একে অপরকে। ওদের শৈশবহীন জীবনের কাঠিন্যের চাদরটা এক টানে সরে গিয়ে দুই শিশু বেরিয়ে পড়ে। রাস্তায় পড়ে থাকা অবহেলায়, অযত্নে বেড়ে ওঠা দুই বেওয়ারিশ আবর্জনাকে মনে হয় নিজের শরীরের ওমে বাঁচিয়ে তুলি। ইতস্তত এলোমেলো ছড়িয়ে যাওয়া জীবনটাকে খানিক গুছিয়ে দিই।

    কেন আমার মা তো রয়েছে। অত ভাবছিস কেন? আমার মা কি তোরও মা নয়! এরকম কিছু সুব্রত আদৌ বলেছিল কিনা নিশ্চিত বলতে পারব না। ঠিক তখনই উঠল ঝড়টা। আর উঠল মানে মনে হল যেন সব উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে। ধুলো, মানুষের আলগোছে ফেলে দেওয়া টুকটাক, গাছের পাতা সব মিলিয়ে যে কাণ্ড, যে লণ্ডভণ্ডটা শুরু হয়, তা চোখ খুলে দেখার কোনও উপায় থাকে না। এমনই তার তেজ, এমনই তার রুদ্ররোষ। অবশ্য ঝড় শেষে বৃষ্টি নামে কিছুক্ষণের মধ্যেই। তখন চোখ মেললে কিছু দেখা যায়। নজরে যা আসে তাতে বিস্মিতই হতে হয়। গোটা চত্ত্বর জুড়ে শুধু আমরা তিনজনই। নাগাড়ে ভিজে চলেছি সেই তখন থেকেই। ভাবি এবার ওদের কিছু একটা বলা উচিৎ। কিন্তু পেরে উঠি না। ওরা তখনও একে অপরের বাহুডোরে।

    পরের দিনই দৌড়ই, তার পরের দিনও, তারও পরের দিন। কিন্তু কোনোদিনই দেখা মেলে না। তারপর আরও অনেকবার গিয়েও দেখা না মিললে ভাবি কাউকে জিজ্ঞেস করা যায় কিনা! একমাসের ওপর হয়ে গেল! এত ঘন ঘন এসেও দেখা হচ্ছে না। আবার ভাবি কাউকে জিজ্ঞস করলে সে যদি ভাবে নিশ্চয়ই আমার কোনও উদ্দেশ্য আছে! আর প্যাংলা-গোপলার সেরকম কিছু হয়ে থাকলে ভাববে আমি নিশ্চয়ই কিছু না কিছু জানি। তখন আবার আর এক ঝামেলা। আরও মাস খানেক বাদে, না ওদের কোনও খবর নেই, এবার জিজ্ঞেস করা উচিত না অনুচিত ভাবনার মাঝে আমার সেই বাদামওয়ালাকে জিজ্ঞেসই করে ফেলি। মানে জিজ্ঞেস ঠিক করিনি, প্রশ্নটা ভাবনার মাঝেই মুখ থেকে বেরিয়ে যায়।

    - কোন ছেলে দু’টো?
    - আরে ওই যে দু’টো ছেলে সবসময় একসাথে থাকত।

    ওদের খানিক বর্ণনা দিই। বোঝানোর চেষ্টা করি, একেবারে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার।

    - এরকম দু’টো-ছেলে অনেকই তো আছে। এখানে হাজার হাজার ছেলে আছে। মেয়েও আছে। সব ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেমন ইচ্ছে পয়দা হচ্ছে, তেমন ইচ্ছে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জন্মের পর থেকেই তো সব ছাড়া গরু। বাছুরও বলতে পারেন। আর রোগা প্যাকাটি বলছেন, সবারই তো রোগা প্যাংলা চেহারা।

    এই কথায় আমি খানিক ধরতাই মতো পাই। বলি, ওদের একজনের নাম প্যাংলা আর আরেকজন গোপলা।

    - এখানে তো সবারই নাম—প্যাংলা। নয়তো গোপলা! এর বাইরে তো আর কোনও নাম নেই! হাজার হাজার প্যাংলা। হাজার হাজার গোপলা।

    এবার আমি বেশ ঘাবড়েই যাই। নিজের মধ্যে নিজেকে খানিক গুটিয়ে ফেলি। অনিকেত আর সুব্রত প্রায় মুখ থেকে বেরিয়েই আসছিল। কোনোমতে সামলে নিই। একটা কথাই বোরায়, ‘ও’।

    এখনও মাঝে মাঝে আসি এখানে। তবে ওদের দেখা পাওয়ার আশা একরকম ছেড়েই দিয়েছি। সেই অবিশ্রান্ত বৃষ্টিতে কাকভেজা দুই ছিন্নমূল। একে অপরকে সর্বস্ব দিয়ে জড়িয়ে ধরে ভিজছে। বাইরে। ভেতরেও। সেই ছবিটাই চিরস্থায়ী থেকে যায়। মাস ছয়েক বাদে মনে হয় সত্যিই উবে গেছে। কোথাও যেন কোনও অস্তিত্বই নেই!

    সেদিন গঙ্গার ধারে বসে এসবই ভাবছি। প্যাংলা-গোপলা দু’জনেরই জলজ্যান্ত মুখ দু’টো ভেসে ওঠে। আর ভেসে ওঠে ফর্মটার একের পর এক জিজ্ঞাস্য। গতকালই দুই ভদ্রমহিলা বাড়িতে এসে বাবা-মা সহ আমাদের তিনজনকে দিয়ে ফর্ম ভরিয়ে নিয়ে গেল। আমি ওই বটগাছের নীচে বসে প্যাংলাকে দিয়ে ফর্মটা ভরাতে থাকি।

    নাম। প্যাংলা। লিখলে কি গ্রাহ্য হবে? আর নিজের নাম যে অনিকেত, সেটাই তো জানে না প্যাংলা!

    বাবার নাম। মা’র নাম। বাড়ির কর্তার সঙ্গে সম্পর্ক। রিলেশনশিপ টু হেড অফ হাউসহোল্ড। কী লিখবে প্যাংলা?

    জন্মতারিখ? জন্মস্থান? ডেট অফ বার্থ? প্লেস অফ বার্থ?

    বর্তমান ঠিকানা। স্থায়িত্ব। ডিউরেশন অফ স্টে অ্যাট প্রেসেন্ট অ্যাড্রেস। স্থায়ী ঠিকানা। পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস।

    প্যাংলা-গোপলার অসহায় মুখ দু’টো ভেসে ওঠে। ওদের না-করা বা আমার না-শোনা ওদের চিৎকার আমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়।

    কী লিখবে? ফুটপাত? রাস্তা? রেল স্টেশন? প্ল্যাটফর্ম? বাড়ির রক্? ওভার ব্রিজের সিঁড়ি? অর্ধবৃত্তাকারে বাঁচা পাইপ জীবন?

    গ্রাম ভাঙে। শহর গড়ে।

    শহর বাড়ে। গ্রাম মোছে।

    একের উন্নয়নে আরেকের জমি যায়। অভাবে যায়। বাঁধে যায়। দলাদলিতে যায়। দাঙ্গায় যায়। যায়, যায় আর যায়। গৃহহীনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। নিজের দেশেই সে তখন উদ্বাস্তু। শহরে ঢল নামে শরণার্থীর। বস্তিতে স্থান হলে তবু এক রকম, নাহলে ওই খোলা আকাশ আর তার উদোম-নীচ। রোদ আর বৃষ্টি। ভিজতে থাকে। পুড়তে থাকে। আর সংখ্যায় প্রতিদিন বাড়তেই থাকে।

    প্রথমে বাস্তু যায়, তারপরে সংসার, তারপরে মানুষ একেবারে একলা হয়ে যায়। পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে, বিশেষত বয়স্ক আর পঙ্গু, সব একলা মানুষে ভরা এই নীল আকাশের নীচের পৃথিবী। হয়তো একটা গোটা জীবন একলাই কাটাতে হয়! বন্ধুহীন এই পৃথিবীতে নির্বান্ধব সব একাকী লড়াই।

    আর প্যাংলার মতো একলা বাচ্চা তো আছেই। যাদের জীবন গোড়া থেকেই অনিশ্চিত, বেলাইন, স্বপ্নচ্যুত। স্বপ্নহীন। সি.ই.ডি.সি.। চিলড্রেন ইন এস্পেশালি ডিফিকাল্ট সারকামস্টেনশেস্। রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত এক ভাবনাবন্ধ। কিন্তু তা দিয়ে ওরা কী করবে? প্রত্যেক পূর্ণবয়স্ককে তো বটেই, এমনকী প্রতিটি বাচ্চাকেও নিজের খাবার নিজেকেই জোগাড় করতে হবে। ভাবি প্যাংলার শুরুর শুরুতেও কি কোনও ভালোবাসা, কোনও স্বপ্ন কিছুই ছিল না? সবই মুহূর্তের ভুল? নাকি এক পক্ষের জোর?

    চেষ্টা যে একেবারে করি না তা তো নয়, কিন্তু প্যাংলাকে দিয়ে কিছুতেই ন্যাশানাল পপুলেশন রেজিস্টার, এন.পি.আর.-এর ফর্মটার একটা অংশও ভরাতে পারি না। প্রশ্ন আসে। প্রশ্ন চলে যায়। কিন্তু উত্তর একটারও মেলে না।

    আমি প্যাংলা-গোপলাদের খিদে দেখিনি, খাওয়া দেখিনি, খাবার জোগাড় করা দেখিনি, আড়ষ্টতা দেখিনি, গোপনীয়তা দেখিনি। ওদের নগ্নতা, ঘুম, ক্লেদ কিচ্ছু দেখিনি। বস্তুত ওদের জীবনের রাত দেখিনি, দেখিনি রাতের হিংস্রতা। নিষ্ঠুর যৌনতা কিংবা অন্য কোনও নৃশংসতা। কোনোটাই। ওদের ভোর দেখিনি, দেখিনি ওদের আলস্য আর তার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা। দেখেছি শুধু দুপুর-বিকেল মিলিয়ে দুই কি বড়জোর ঘন্টা তিনেকের বাঁচা আর তাকেই ভেবেছি ওদের জীবন।

    বরং ওরা চলে যেতে যেন আরও বেশি করে ওদের জীবনটা দেখতে পাই। ওদের ভোর। খাবার জোগাড়ের লড়াই। ওদের দুপুর। ভাগ বাটোয়ারা করে খাওয়ার লড়াই। ওদের রাত। হিংস্র অন্ধকারে বাঁচার লড়াই।

    না। আর কোনোদিনই ওদের দেখা পাইনি। গাছটা ঠিক সেরকমই আছে। শুধু ওরা দু’জনই নেই। গাছে এখনও পাখি এসে বসে। সূর্যাস্তের সময় ওদের কলকাকলিতে ভরে ওঠে চারপাশ। সেই বাঁধানো চত্ত্বরে বসে কত স্বপ্নের জন্ম হয় আজও। খালি ওরাই যে কোথায় হারিয়ে গেল বরাবরের মতো! তাতে অবশ্য একটা ব্যাপার হয়, নতুন করে আর নাগরিক পঞ্জি থেকে হারিয়ে যেতে হয় না ওদের।
    ---------------------
    আরও পড়ুন
    রণছোড় - Chayan Samaddar

  • বিভাগ : অন্যান্য | ১৮ জুলাই ২০২১ | ১৫৯ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Kajari Roychowdhury | ২২ জুলাই ২০২১ ১৬:২৩495992
  • বাসা বদল পড়লাম। লেখার মুন্সিয়ানা আছে। বেশ ভালো লাগলো।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন