• খেরোর খাতা

  • রমানাথ রায় সম্পর্কে দু-একটি কথা যা আমি জানি (২)

    ভাষা ভাষা লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৫ এপ্রিল ২০২১ | ৫৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  •  

     

     

     

    অনেক অনেক দিনের টালবাহনার পর তিথির মা একদিন আমায় সত্যিই ডেকে পাঠালেন। সে একটা সময় ছিল, যখন আমি প্রায় রোজই ভাবতাম — আজ না হলে কাল বা বড়জোর পরশু কাকিমা আমায় ডাকবেনই ডাকবেন। তারপর ঘটনার গতিপ্রকৃতি এমন দিকে মোড় নিতে থাকল যে একসময় একরকম বাধ্য হয়েই সে আশা ত্যাগ করলাম। তারপর একসময় প্রায় ভুলেই যেতে বসেছিলাম। না, তিথিকে নয়। তিথির মা’কে। মানে তিথির মায়ের ডাকের কথা। ঠিক এমন সময়েই একদিন ডাক এল। যখন আমি ভাবিইনি যে এরকম কোনও ডাকের কোনো সম্ভাবনা আর বেঁচে আছে!

    আসলে এ ঘটনার যা গড়নপিটন, চলন-বলন, ওঠা-বসা, তাতে তিথি তো নয়ই, তিথির মা’কেও কোনোভাবেই দায়ী করা যায় না। এ কথা অনস্বীকার্য যে সব দায় আমারই!

    আমি তখন কলকাতার বাইরে। তিথি কলকাতায় রাস্তা পার হচ্ছিল। ঠিক এমন সময়েই আমার ফোন। তিথি ফোনটা না ধরলেই পারত, কিন্তু তার আগে তিন-তিনবার কথা শুরু হতে না হতেই কেটে গেছে, বস্তুতঃ সকাল থেকেই লাইনে গণ্ডগোল; কানেকশন হতে না হতেই কেটে যাচ্ছে। সে হিসেব ধরলে গোটা বিশ-বাইশ তো হবেই! সেই কারণেই সম্ভবতঃ রাস্তা পার হওয়ার মাঝেই ফোনটা ধরে ফেলেছিল তিথি আর যথারীতি যা হওয়ার তাই হল — এক ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্ট। মারা যায়নি ঠিকই কিংবা সারা জীবনের মতো পঙ্গুও হয়ে যায়নি তবে ছ’মাসের জন্য শয্যাশায়ী আর তার প্রথম দু’মাস হাসপাতালে।

    আপনারা যে জানেন, তা আমি জানি বা যাঁরা জানেন না তাঁরাও ঠিকই অনুমান করেছেন, অফিসে কাজের চাপে আমি আসতে পারিনি। একদিন-দু’দিন বা দিন তিনেক নয়, এমনকি ওই বেডরিডেন ছ’মাসের মধ্যেও নয়, ঘটনার পাক্কা আট মাস পর এবং সব মিলিয়ে ধরলে ন’মাস চোদ্দ দিন বাদে তিথির সাথে আমার দেখা হয়!

    গোড়ার দিকে তিথি বুঝতে পারেনি, জ্ঞান ফেরার পরই ডাক্তারের কাছে এই কুলাঙ্গারের নাম করলে, ডাক্তারবাবু আমার সাথে কথা বলিয়ে দেন। তিথির ধারণা ছিল আমি নার্সিংহোমেই আছি, কিন্তু যেহেতু বাইরের লোকের সাথে তখনও দেখা করতে দিচ্ছে না বা দিলেও তিথি সব মনে রাখতে পারছে না, তাই বুঝি যতটুকু যোগাযোগ ওই মোবাইলেই হচ্ছে। তারপর তিথির বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবরা একে একে দৃশ্যমান হতে থাকলে, গোটা পরিস্থিতিটা বুঝে, তিথি আমার ফোন ধরা বন্ধ করে দেয়।

    যদিও তিথিকে নার্সিংহোমে ভর্তি করা, ডাক্তার ঠিক করা, ডাক্তারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, প্রতিনিয়ত যে কোনও প্রয়োজনেই লোক-লস্কর মজুত রাখা, তিথির অফিসে ছুটির বন্দোবস্ত করা সবই করেছি দূর থেকে, কিন্তু শত চেষ্টাতেও একবারের জন্যও কলকাতায় আসতে পারিনি। কাজের পর কাজ, একের পর এক কাজ এবং কোনোটাই আমাকে ছাড়া কিছুতেই করা যাবে না।

    তিথির ফোন-না-ধরা পর্বটা চলল ঘটনাটা ঘটার মাস চারেক পর্যন্ত। ওই ন’মাস চোদ্দ দিনের চার মাস তেইশ দিনের মাথায় আমাদের সম্পর্কের আট বছর পূর্ণ হয়ে গেল। সেটা নিশ্চয়ই কম কিছু নয়! এ নিয়ে দ্বিতীয়বার সেই বিশেষ দিনটিতে দেখা হল না! খারাপ তো লেগেছিলই! যেমন আমার, তেমন ওরও। তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময় তো এরকম একটা চরম পরিস্থিতিতে আমার নাগাড়ে অনুপস্থিতি! তার কৌতূহলনিরসনও তো একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। অন্যদের মতো ‘এই-সময়েও-যার-ভূমিকা এরকম নৃশংস তাকে ভিলেন (মতান্তরে অমানুষ) ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় না’ — ভাবা তো আর তিথির পক্ষে সম্ভব নয়! তাই চার মাস পর থেকে ফোনটা ধরতে থাকল। প্রথম প্রথম একটা-দু’টো হুঁ-হা ছাড়া একটা কথাও বলত না, শুধু শুনত। আর মাঝে মাঝে তো তা-ও নয়, ধন্দ লাগত অন্য কেউ ধরেনি তো! তবে নিঃশ্বাসের ওঠাপড়া, দীর্ঘশ্বাসের দৈর্ঘে তিথিকে চিনে নিতে বিশেষ অসুবিধে হত না। আমার না আসতে পারার কারণগুলো শুনল, কিন্তু কোনও মন্তব্য করল না। পুরোপুরি বোঝা তো সম্ভব নয়, তবু একসময় অভিমানের বিরাট বাধা পার করে মেনে নিল৷ আর কী-ই বা করার ছিল? ধীরে ধীরে, একসময়, ফোনে অন্তত সম্পর্কটা অনেক স্বাভাবিক হয়ে এল৷

    তারপর এল সেই দীর্ঘ প্রতিক্ষিত ন’মাস চোদ্দ দিন পরবর্তী সন্ধেটা৷ তিথির মা তো গোড়াতে দেখা করতে দিতে রাজিই হচ্ছিলেন না৷ মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিচ্ছিলেন প্রায়৷ ওই অবস্থাতেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তিথিকে ফোন করছি দেখে ঢুকতে দিলেন; যদিও তিথির ঘরে যাওয়ার অনুমতি তখনই দিলেন না৷ তিথির বাবা-মা মানে কাকু-কাকিমা জেরা করে করে জেরবার করে দিলেন৷ ঘন্টা দু’য়েকের কাঠখড় পুড়িয়ে পাঁচ মিনিটের জন্য দেখা করার অনুমতি পাওয়া গেল৷ সেটা যে শেষ পর্যন্ত ঘন্টা চারেকে গিয়ে দাঁড়াল, সে অন্য কথা৷ রাত বারোটাতেও যে ইতি টানা গেল, বলা বাহুল্য তা একরকম জোর করেই৷

    দীর্ঘমেয়াদী অভিমান পর্ব শেষে রাগ-অনুরাগের দড়ি টানাটানিতে যে অনুরাগের পাল্লাই ভারী পড়বে, তা বোধহয় ওনারা ভাবতেও পারেন নি৷ তবে মেয়ের জন্য ওঁদের চিন্তা হওয়াটা স্বাভাবিক৷ এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন জামাইয়ের হাতে মেয়ের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিতে যে-কেউ-ই যে উদ্বিগ্ন বোধ করবেন তাতে কোনও ভুল নেই৷

    তিথি এবং তিথির বাবার উপস্থিতিতেই কাকিমা জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি তিথিকে সত্যিই ভালবাসো?”³

    এটা কি কোনও একটা কথা হল কাকিমা? আমি খানিকটা জোরের সাথেই বলি। তিথির দেওয়া ওই চারটে ঘন্টা আমাকে একে একে খোলস ছেড়ে বের করে এনেছে।

     তার নমুনা তো ভালই দেখলাম। এবার ন’মাস পর এলে, এর পর হয়তো ন’বছর পর আসবে। কী ভরসায় তোমার হাতে মেয়েকে তুলে দেব বলো তো!” শেষের দিকে কাকিমার গলা ধরে আসে আর তাতে পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে।

    পরিস্থিতি একটু সহজ হলে বলি, “সে কাকিমা, আপনার মেয়ের ভরসাতেই আপনার মেয়ের বিয়ে দিতে হবে! আমি তো অন্ততঃ আপনার মেয়ের ভরসাতেই বিয়ে করব।”

    ওই সব চালাকি মার্কা কথা ছাড়ো। তুমি আমার মেয়েকে ভালবাসো বললে তো?” নিজেকে সামলে নিয়ে বেশ ফোঁস করেই ওঠেন কাকিমা। আমাকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বলেন, “তুমি যে এখনও আমার মেয়েকে ভালবাসো, তার প্রমাণ দিতে হবে।”

    “ভালবাসার আবার প্রমাণ হয় নাকি?”

    “কেন হবে না? এরকম কত উদাহরণ আছে।”

    “ভালবাসার অনেক উদাহরণ আছে জানি, কিন্তু তা বলে ভালবাসার প্রমাণের ব্যাপারে তো কিছু জানি না! ঠিক আছে বলুন, আপনি কী বলতে চাইছেন।”

    “তোমার জন্য আমার মেয়ের পা ভেঙেছে। ঠিক?”

    “হ্যাঁ। মানে ঠিক ওই সময়টাতেই আমি ফোনটা করেছিলাম, সেটা ঠিক।”

    “শোনো, ব্যাথায় কাতরাতে কাতরাতে, যমে-মানুষে টানাটানিতে ছ’মাস যখন বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়, তখন ওই সব পলিটিক্যালি কারেক্ট কথাবার্তা শোনার ধৈর্য কারও থাকে না।”

    “হ্যাঁ, তো কী করতে হবে বলুন?” আমি আর কথা বাড়াই না।

    “তোমার ডান হাতটা ভাঙতে হবে।”

    “অ্যা! কী?” শুধু আমিই না, তিথি তো বটেই, কাকুও বোধহয় — কোরাসে একটা আর্তনাদ ওঠে।

    তবে কাকিমা অবিচল।

    “দেখো, আমার মেয়ের কোমর আর পা — দু’টো পা-ই ভেঙেছিল। সে তুলনায় আমি তো শুধু তোমার ডান হাতের কথা বলেছি।”

    “ওটা তো অ্যাক্সিডেন্ট ছিল! কিন্তু তা বলে নিজের হাত নিজে ভাঙি কী করে বলুন তো!”

    “সে আ্রমি জানি না। কোনটা দুর্ঘটনা আর কোনটা নয়, বলা অত সহজ নয়! অনেক সময়ই স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিকের মধ্যে এক সুতোর ব্যবধানও থাকে না। সুতরাং ভাঙতে তোমাকে হবেই! হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙে ফেলো।”

    কাকিমার সিরিয়াসনেসে আমরা তিনজনই কমবেশি ঘাবড়ে যাই! তা বলাই বাহুল্য। কাকু আর তিথি দু’জনেই, ততক্ষণে যে রাত একটা বেজে গেছে সংবাদটা দিতে চেয়েছিল। এক ধমকে চুপ করে গেছে।

    “একটা পরিবার যার মাজা ইতিমধ্যেই ভাঙা, পা-ও নড়বড় করছে, আদৌ উঠে দাঁড়াতে পারবে কিনা সন্দেহ, তার ওপর কাজের হাত যদি এভাবে চক্রান্তের হাতে পড়ে আরও দুর্বল হয়ে যায়, তবে সে ফ্যামিলি গড়ে উঠবে কী করে বলুন তো!”

    “ওসব ন্যাকা কান্না কেঁদে লাভ নেই! ভালবাসার প্রমাণ দিতে হবে।”

    “ভালবাসা যথেষ্ট নয়?”

    “প্রমাণ আরও বেশি জরুরি।”

      

    ²বলাই বাহুল্য নিজের হাত নিজে ভাঙতে পারিনি। তিথিও বারণ করেছিল। গত প্রায় আড়াই বছর আমার আর তিথিদের বাড়ি যাওয়া হয়নি।

    প্রথমে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, তারপর ভালবাসার প্রমাণ না দিতে পারা – তিথির মা’র ডাক না পাওয়ার অনেক কারণ আছে। আর প্রত্যেকটাই বেশ যুৎসই।

    আর শেষ পর্যন্ত যে আমায় ডেকে পাঠালেন, তার কারণও নিশ্চিতভাবে আমিই। তা বলে আমার কোনও সক্রিয়তা নয়, বরং অতি-নিষ্ক্রিয়তাই তার কারণ। দিনের পর দিন কিছুই না করে উঠতে পারা! উনি বোধহয় চারিদিকে প্রেমের প্রমাণস্বরূপ মেয়েদের ওপর গায়ে পড়া ছেলেই কিঞ্চিৎ বেশি দেখে থাকবেন, সেই নিরিখে আমার মতো হীরের টুকরো আর ক’জন!

    এখানে না বললেও চলত, তবু বলে রাখি — যদি আমি আমার হাত নিজে বা লোক দিয়ে ভাঙতে বা ভাঙাতে সক্ষমও হতাম, তবুও সে প্রমাণ তখনই দাখিল করতে পারতাম না। তার পর পরই আমায় চলে যেতে হল জঙ্গলমহল। ওখান থেকে ছবি তুলে পাঠাতেই পারতাম, কিন্তু কাকিমাকে বিশ্বাস করানো যেত বলে মনে হয় না। উনি স্থির প্রত্যয়ে জানতেন, এ নিশ্চয় কোনও টলিউডি মেক-আপ ম্যানের কেরামতি।

    তিথির সাথে যোগাযোগ ফোনে যে নিয়মিতই ছিল, তা বোধহয় না বললেও চলত।

    তো সে সব কথা থাক। কাকিমার ডাক যে শেষ পর্যন্ত এল আর আড়াই বছর পর ছুটি ম্যানেজ করে চলে আসতে পারলাম, সেটাই আসল কথা।

    কাকিমাঃ²

    তাহলে তুমি এই চাকরিই করে যাবে?

    আমিঃ

    কেন? চাকরিটা খারাপ?

    কাকিমাঃ

    আহা! চাকরি খারাপ হতে যাবে কেন?

    আমিঃ

    সরকারি চাকরি! কত কষ্ট করে রাত জেগে পড়াশুনো করে, বাঘা বাঘা ইন্টারভিউ টপকে তবে চাকরিটা বাগিয়েছি।

    কাকিমাঃ

    কথা সেটা নয়। চাকরি চাকরির মতো। সব চাকরিতেই নিজস্ব কিছু ঝামেলা আছে। তোমাদের চাকরিটা একটু বেশি ঝামেলার হতে পারে, তা বলে এরকম কখনই হতে পারে না যে প্রেমিকা মরমর, তা-ও ছুটি জোগাড় করা যায় না। তুমি পড়াশুনোয় ভাল হতে পার, বাট ইউ আর নট ফিট ফর দ্য জব।

    আমিঃ

    আপনি বলে দিলেন, নট ফিট ফর দ্য জব! জানেন চাকরিতে ঢোকা থেকে প্রত্যেক বছর আমার সি.আর. মানে কনফিডেন্টশিয়াল রিপোর্ট-এ আমার গ্রেডিং আউটস্ট্যান্ডিং।

    কাকিমাঃ

    সে আর বলতে! সরকারি চাকরিতে একমাত্র বিশ্ব ক্যালানেদেরই বছরের পর বছর আউটস্ট্যান্ডিং সি.আর. হয়। এ আর নতুন কী?

    আমিঃ

    আপনি শাশুড়ি স্থানীয় একজন হয়ে এরকম বলতে পারলেন!

    কাকিমাঃ

    তার কারণ আর শাশুড়ি স্থানীয় হয়ে থাকলেই চলছে না, এবার মনে হচ্ছে শাশুড়ি হওয়া ব্যাপারটা সত্যি সত্যিই মিটিয়ে ফেলতে হবে আর তাই বাধ্য হয়েই এরকম বলতে হচ্ছে।

    আমিঃ

    তবু তারও তো একটা রকম সকম আছে!

    কাকিমাঃ

    শোনো! আগে মেয়ের বাবা হও, তখন বুঝবে কী জ্বালা! দেখবে ভাষা এমনিই বদলাতে শুরু করেছে।

    আমিঃ

    তা বলে এই!

    কাকিমাঃ

    এ সব কথা ছাড়ো। আচ্ছা! বলোতো এই যে লোকে বলে স্টেট গভমেন্টের চাকরিতে মাইনে তেমন নেই, ডি.এ. বলতে গেলে বাড়েই না, তবে ছুটি আছে! মানে একটু বেশিই ছুটি আছে। কিন্তু কোথায় কী? তোমার তো কোনও ছুটিই নেই!

    আমিঃ

    তাহলে দেখছেন তো কীরকম অপপ্রচার!

    কাকিমাঃ

    অপপ্রচার হতে যাবে কেন? তিথিকে দেখছি না! বারো মাসে তেরো পার্বণ আর ছ’মাসই ছুটি।

    আমিঃ

    কিন্তু আমার তো দেখছেন! ছুটির ‘ছ’-ও নেই। স্টেট গভমেন্টের চাকরি মানেই ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট, তা যে মোটেই নয়, সেটা তো মিডিয়া বলবে না! সব চাকরিই তো আর এক নয়!

    কাকিমাঃ

    ওই সব মিডিয়া টিডিয়া দেখিও না মাই ডিয়ার। আর চাকরি এক নয় মানে? তুমি স্টেট গভমেন্টের চাকুরে হলে আমার মেয়ে রাজ্য সরকারি কর্মচারী — তফাত তো বড়জোর এইটুকু! একই সরকারের আন্ডারে চাকরি — ছুটি তো আলাদা হতে পারে না! বলো তুমি ক্যা..., এই কী যেন, ক্যাবলা, তাই ম্যানেজ করতে পার না।

    আমিঃ

    আই রিফিউজ টু টক্।

    কাকিমাঃ

    এ্যাঃ! আড়াই বছর বাদে উদয় হয়ে, রিফিউজ টু টক্! সাহস কত! ইস্! আমার মেয়েটার কত শখ ছিল — ছুটির সরকারে চাকরি করি, কত দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াব। আর এখন স্বামীর দেখা পেতেই হা পিত্যেশ করে মরতে হবে। আর আত্মীয়-স্বজনদের সামনেও মুখ দেখাতে পারি না। তিথিটা যে কত বড় গাম্বাট, ডায়রেক্টলি না বললেও ঠারে ঠারে ঠিক বুঝিয়ে দেয়।

    আমিঃ

    তা ঠিক। আপনার মতো ডায়রেক্টলি আর ক’জন বলতে পারে? এই যে শোনালেন, এটাও ডায়রেক্টলি না ঠারে ঠারে, তা-ই বা কে বলে দেবে!

    কাকিমাঃ

    তা বাপু বেশির ভাগ সময়ই যে তোমার টিকি দেখা যায় না, সে তো মিথ্যে নয়!

    আমিঃ

    কিন্তু টিভিতে তো প্রায়ই দেখা যায়! টিকি, মুখ দু’টোই।

    কাকিমাঃ

    সেই কথাই তো মেয়েকে বোঝাই, তোর ঘরে আরও একটা টিভি বসিয়ে দিই, তুই সেই টিভিটাকেই বিয়ে কর, তার সাথেই ঘর কর।

    আমিঃ

    আপনি দেখছেন তো কাকিমা, টিভিতে তো প্রায়ই দেখায়, কত কাজ করতে হয় আমাদের সেটা তো বলবেন।

    কাকিমাঃ

    কাজ? কাজ কোথায়? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তো শুধু হাত কচলাও। আমার এক বন্ধু, শম্পা – ওর বর গোপাল, তারপর ধরো আমার মাসতুতো বোনের হাসবেন্ড সুবোধ, যাকেই টিভিতে দেখায়, দেখি নাগাড়ে হাত কচলে যাচ্ছে।

    আমিঃ

    দেখুন, বসের সামনে হাত কচলানোটা এমন কিছু নতুন ব্যাপার নয়। এ তো আবহমান কাল ধরে চলে আসছে।

    কাকিমাঃ

    তা বলে দরজা হাট করে খুলে, দুনিয়ার লোকের সামনে দাঁত বার করে... থাক থাক বাবা! কী বলতে কী বলে দেব।

    আমিঃ

    এটাই তো গণতন্ত্র। এটাই তো স্বচ্ছতা। নো রাখঢাক। আর তাই তো হওয়া উচিৎ৷ আর তাছাড়া বস্-এর কখনও ভুল হয় না। বস্ ইজ অলওয়েজ রাইট।

    কাকিমাঃ

    ²বস্ ইজ অলওয়েজ রাইট? তোমার সত্যি মনে হয়? আবার জোর গলায় বলছ। উফ্! তিথি রে! এ কার পাল্লায় পড়লি?

    আমিঃ

    আহা! কাকিমা! একটা জিনিস ভুল করছেন। এ অনেকটা ‘ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্য করেন’ টাইপের ব্যাপার। আপনার চরম ক্ষতি হয়ে গেলেও তা আপনার মঙ্গলেরই জন্য।

    আর তাছাড়া বসের নির্দেশেই তো আপনাকে সব কাজ করতে হবে। তার আবার ঠিক-ভুল কী? নিজেরা জীবনে যারা কোনও কাজ, মানে পাবলিক ওয়ার্ক করেছে, তারা জানে আর্মচেয়ার ক্রিটিক হওয়া, যারা কাজ করছে তাদের ভুল ধরা অনেক সোজা, কিন্তু...

    কাকিমাঃ

    ²আচ্ছা বাবা আচ্ছা! তুমি দেখছি খোঁচা খেয়ে বড্ড সিরিয়াস হয়ে উঠেছ। আমি শুধু আমার দুঃখের কথা বলছিলাম। এখন দেখো জামাইষষ্ঠীতেও হাফ ছুটি! কিন্তু মেয়ে-জামাইকে নিয়ে যে আনন্দ করব সে উপায় কোথায়?

    আমিঃ

    বরং ভালই তো হবে। এই সব ষষ্ঠী-টষ্ঠীর মতো প্রাগৈতিহাসিক জিনিসের পিছনে আপনার ফালতু খরচ বেঁচে যাবে। ²

    কাকিমাঃ

    ²বাঁচবে না হাতি! তখন দেখা যাবে হয়তো খুনিয়া মোড় পার করে শয়তানখোলা না কী, তার উদ্দেশে দৌড়চ্ছি।

    এতক্ষণে প্রথম হেসে ফেলি। বলি — সুনতালেখোলা। শয়তানখোলা নয়।

    কাকিমাও হেসে ফেলেন। সে রাতে প্রথম। বলেন, তাহলে কী দাঁড়াল। এই পচা চাকরি তুমি ছাড়ছ না। তাই তো? ²

    আমিঃ

    প্রশ্নই ওঠে না।

    কাকিমাঃ

    না হে! তুমি একটা বিয়েই করে ফেলো।

    আমিঃ

    আমি তো তখন থেকে তাই বলতে চাইছি।

    আমার আর তিথির বিয়ে হয়ে গেল। লগ্ন ছিল অনেক রাত করে। শেষ হতে হতে প্রায় ভোর। সারা রাতব্যাপী ভুল সংস্কৃতের সাংস্কৃতিক ঝড়ের পর এখন ঠাকুরমশাই আর আমি সিগারেট ফুকছি। থরে থরে সাজানো, উপহারে উপহারে ভরে ওঠা বিয়েবাড়িতে একজনকে দেখেই মনে হচ্ছে যেন রাজেন্দ্রানী — তিনি আর কেউ নন, কাকিমা। থুড়ি মতান্তরে সেদিন থেকে হয়ে ওঠা আমার শাশুড়ি। শেষ পর্যন্ত যে, কোনও ভারচুয়াল বিয়ে না হয়ে সত্যি সত্যিই একটা বিয়ে হল আর তা আমারই সাথে, তাতেই ভদ্রমহিলা খুশি। আনন্দে মাটিতে পা পড়ছে না। যেন উড়ে বেড়াচ্ছেন। নিমন্ত্রিতদের একটা আস্ত জামাই বাস্তবে দেখাতে পেরে। সত্যিই ভদ্রমহিলা চাপে ছিলেন। পাঁজা পাঁজা বাসি ফুলের গন্ধে চারদিক ম ম করছে এমত পরিস্থিতিতে বাসি বিয়ের দিকে নিজেকে এগিয়ে দিতে দিতে ভাবি, সত্যি সত্যিই তো একসময় নিজের ওপর সন্দেহ হতে শুরু করেছিল আদৌ নিজের বিয়েতে সময়মতো পৌঁছতে পারব তো! 

     

     

    ডলি আর আমার প্রেম মহাকাব্যিক। সেই সময়টায় ডলি আর আমাকে যখন তখন যত্রতত্র যেভাবে দেখা যাচ্ছিল, তাতে এ ঘটনা ঘটারই কথা! ওরকম একে অপরের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকা, তা-ও যেখানে সেখানে। ঠিক ভাবে বলতে গেলে কোথায় নয়? নন্দন চত্ত্বরে, সিটি সেন্টারে, শুধু অরিজিনালেই নয়, এমনকী টু-তেও। সেন্ট্রাল পার্ক, রবীন্দ্র সরোবর লেক, বাসেতে-ট্যাক্সিতে, অনীকভাষায় বললে মল-মূত্র সর্বত্র কোথায় নয়? ওই নিষ্পলক! অপলকও! এদিক ওদিক টেনেটুনে দেখলে কি আর অন্য কিছুও নয়? নিশ্চয় আছে আরও কিছু, তবে তা আপাতত সেন্সারাচ্ছন্নই থাক।

     

     (ক্রমশঃ)

  • ১৫ এপ্রিল ২০২১ | ৫৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
কবিতা  - Suvankar Gain
আরও পড়ুন
মা  - Mousumi GhoshDas
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন