এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  সিনেমা

  • মলয়ের লেখাপত্তর

    মলয় রায়চৌধুরী
    সিনেমা | ০৭ এপ্রিল ২০২০ | ১৩৬৪৯২ বার পঠিত
  • গোদার-এর মাওবাদী পর্ব : একটি সমালোচনা
    [ মাওইস্ট ইনটারন্যাশানালিস্ট মুভমেন্ট পত্রিকার ২৬ জানুয়ারি ২০০৪ সংখ্যায় প্রকাশিত ]

    ‘চীনা, বা বরং, চীনা পদ্ধতিতে: ফিল্ম নির্মাণ’, সাধারণত ‘ল্যা চিনোয়া’ নামে পরিচিত, যা ১৯৬৭ সালের ফরাসি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসেবে জাঁ-লুক গোদার পরিচালনা করেছিলেন।
    ১. লা চিনোয়া [ চীনা], পরিচালক জাঁ-লুক গোদার, ১৯৬৭
    ২. লে ভনদে [ পুর্ব দিকের বাতাস ], পরিচালক জাঁ-লুক গোদার, ১৯৬৯
    ৩. তু ভা বিয়ঁ [ সব ঠিক আছে ], পরিচালক জাঁ-লুক গোদার, ১৯৭২

    ২০০৪ সালে এই ফিল্মগুলো দেখে আমরা একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই এবং তা হল গোদার সিরিয়াস ছিলেন কি না। আজ আমরা যখন দেখি পশ্চিমে মাওয়ের ইমেজ অভিনব বিজ্ঞাপনের সাথে মিশে গেছে, তা আসলে মাওকে বিদ্রূপ করার কৌশল এবং তার মাধ্যমে সংস্কৃতিগুলোতে ভোক্তা আবেশের শক্তি প্রদর্শন করা হয়, এমনকি চীন থেকে দূরে থাকলেও। সর্বোপরি, আজ মাওয়ের ইমেজ মূল স্রোতোধারায় ব্যবহারটি বিপরীতমুখী, কারণ এটি চীনে দুর্দান্ত বিজ্ঞাপন প্রচারের গুরুত্ব পায় আর সবাই জানেন যে মাও একজন কমিউনিস্ট ছিলেন। বিপরীতে, সংস্কৃতি বিপ্লবের (১৯৭৬ সালে) সময় গোদার একজন উন্নত চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে মাওয়ের ইমেজগুলো পুরোপুরি গুরুত্ব সহকারে ব্যবহার করেছিলেন -- এবং এমনকি মাওয়ের জন্য একটা জিংগল তৈরি করেছিলেন। আমরা বলতে পারি যে এই ফিল্মগুলোতে যাথার্থ্য আছে, মাওবাদী রাজনীতি, তত্ত্ব এবং পদ্ধতির বোঝাপড়া আছে।

    ১৯৬৭ সালে "লা চিনোয়া" মুক্তি পেয়েছিল দেখে অবাক হতে হয়। গোদার যে কেবল মাও আর সোভিয়েত সংশোধনবাদী নেতাদের মাঝে ভাঙনকে ধরতে পেরেছেন তা-ই নয়, গোদার সেই ভাঙনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।তিনি ছিলেন সময়োচিত। "লা চিনোয়া" এবং "উইন্ড ফ্রম দ্য ইস্ট" -এ গোদার সোভিয়েত সংশোধনবাদ, ফরাসী "কমিউনিস্ট পার্টি", সামাজিক-গণতন্ত্র এবং শ্রমিক আমলাতন্ত্রের নিন্দা করেছেন।

    "পূর্ব দিকের বাতাস" ফিল্মে প্রচুর আকর্ষণীয় বিষয় রয়েছে তবে ফিল্মের সবচেয়ে বড়ো অবদান এবং তর্কসাপেক্ষভাবে গোদারের সামগ্রিক অবদানগুলি চলচ্চিত্র নির্মাণ-তত্ত্বের অন্তর্গত কারণ "পূর্ব দিকের বাতাস" এবং "লা চিনোয়া" ফিল্মগুলো সম্পর্কে গোদার জানান যে তিনি ঠিক কোন কারণে মাওবাদীদের বিশ্বাস করেন এবং কেমন করে ফিল্ম তৈরি করা উচিত। গোদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন তা হল প্রলেতারিয়েত কীভাবে সংগ্রাম করবে এবং ফিল্মের দ্বারা কীভাবে সর্বহারা শ্রেণীর পক্ষে উপকার পাওয়া যায়, যদিও বর্তমানে আমরা যে সমস্ত ফিল্ম দেখি তাতে বেশিরভাগ উপস্থাপনা এবং পদ্ধতিগুলি শাসকদের উপকার করে।

    মাও-যুগের গোদার বলেছিলেন যে, সর্বহারা শ্রেণীর অবস্হা নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক চলচ্চিত্রগুলো যদি সংঘর্ষের চিত্রণ বাদ দেয় তবে তারা কার্যকর হয় না।শ্রমিকদের ভয়াবহ অবস্থা প্রকাশের ফলে হতাশা ঘটবে কিন্ত পাশাপাশি কর্মকাণ্ডও ঘটতে পারে, সুতরাং কীভাবে বিদ্রোহ করা যায় তা ফিল্মে দেখানো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

    রাজনৈতিকভাবে এই ফিল্মগুলোতে এমন কিছু ব্যাপার আছে যা আমাদের পছন্দ নয়, বিশেষত "তু ভাঁ বিয়ঁ"[ সব ঠিক আছে] ফিল্মটি, যা মূলত একটি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রকে ফরাসী কর্মীদল কর্তৃক অধিগ্রহণ সম্পর্কে। ফ্রান্সে গোদারের সময়ের ঘটনাগুলো আজকের দিনে যেমন, তার তুলনায় সেই সময়ের সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিকদের অবস্হা আরও ঘোলাটে ছিল।
    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, ফরাসিদের তাদের অর্থনীতৈক অবস্হা পুনর্গঠন করতে হয়েছিল এবং এমনকি বুদ্ধিজীবীরাও ভেবেছিলেন যে সাম্রাজ্যবাদী ঝোল টানা ভালো, কেননা তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছানোর পক্ষে সহায়ক হওয়া যাবে আর মার্কিন জীবনের মানদণ্ডে পৌঁছোনো যাবে।

    গোদার তাঁর সময়ের অন্যান্য অনেকের মতো ভেবেছিলেন যে তিনি সম্ভবত এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন যেখানে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতে ফরাসিদের দেখাদেখি সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আসবে। যদি এটা সত্য হতো যে ফরাসি শ্রমিকরা শোষিত হচ্ছিল, তবে তাদের সম্পর্কে গোদারের দৃষ্টিভঙ্গি মাওবাদী মানদণ্ড দ্বারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক হতো। অন্যান্য বেশিরভাগ ব্যাপারে গোদার সঠিক হলেও এই একটি ব্যাপারে তিনি ভুল।

    ২০০৪ সালের সুবিধাজনক অবস্হান থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ১৯৬৮ সালের মে মাসে সংঘর্ষময় ধর্মঘটে বিজয়ের দরুন বেতন অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছিল যা কিনা ফ্রান্সে সাম্রাজ্যবাদী পরজীবিতার হাতকে শক্তিশালী করে তুলেছিল। "তু ভাঁ বিয়ঁ"[ সব ঠিক আছে]-এর মাংস-প্রক্রিয়াকরণ কারখানার মহিলা শ্রমিকের চরিত্র যা বলে তার চেয়ে বেশি কিছু প্রমাণ করার দরকার হয়নি, যে কিনা অলঙ্কৃত উক্তিতে জানায় যে, বস যদি এক ডলার দেয় তবে শ্রমিকরা প্রত্যেকে এক হাজার ডলার চায় -- যেন সেই পারিমাপের মান কোথাও থেকে উড়ে আসে। ফিল্মের শেষে একদল তরুণ একটি সুপার-মার্কেটে "ভাঙচুর" ধরণের গোলমালের আয়োজন করে যেখানে লোকেরা টাকাকড়ি না দিয়ে ঠেলা ভরে-ভরে জিনিসপত্র নিয়ে পালায়।

    অবশ্যই এটি একটি ভাল প্রসঙ্গ যে কেনই বা লোকেরা সুপার মার্কেটের দোকানগুলোকে টাকা দেবে, যখন সমাজ অর্থ যোগাতে পারে না, কিন্তু ফিল্মটির পুরো সুরটি সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবির দিকে খুব বেশি ঝুঁকে ছিল - সাম্রাজ্যবাদীরা কীভাবে নিজের এবং তাদের দালালদের সুবিধার জন্য তৃতীয় বিশ্বকে শোষণ করে তা দেখানোর পরও গোদার সামাজিক-গণতন্ত্র এবং সংশোধনবাদ থেকে নিজেকে পৃথক রাখতে পেরেছিলেন।

    ফরাসী শ্রমিকদের প্রতি গোদারের বিশ্বাসকে বাদ দিয়েও, যাদের শোষণ করা হচ্ছে এবং তাদের সমর্থন করার উপযুক্ত কারণ আছে, এই চলচ্চিত্রগুলোর সাথে আমাদের খুব কমই দ্বিমত রয়েছে। একথা বলা একটা কঠিন শর্তের মতো মনে হতে পারে, তবে বাস্তবে, গোদার তাঁর চলচ্চিত্রগুলোয় চিন্তা করার পদ্ধতিগুলো শেখান। "লা চিনোয়া" দর্শকদের বোঝাবার চেষ্টা করে যে তাঁর সময়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ কীভাবে বিজ্ঞান ছিল। অতএব অর্থনৈতিক জীবনের তথ্যগুলি পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু সত্যে পৌঁছানোর কয়েকটি প্রাথমিক পদ্ধতি বদলায় না। এই কারণেই আমরা এখনও গোদারের মাওবাদী পর্বকে, ফরাসি শ্রমিকদের প্রকৃতির সাথে তাঁর সঙ্গে আমাদের মতবিরোধ সত্ত্বেও তরতাজা হিসেবে দেখি। ফ্রান্স সম্পূর্ণরূপে একটি পরজীবী জাতিতে পরিণত হয়েছিল, তবে গোদার এই ফিল্মগুলোতে যা বলেছিলেন তার বেশিরভাগ আজও বর্তমান।

    “পূর্ব দিকের বাতাস” ফিল্মে যখন গোদার তত্বনির্মাণকে ফিল্ম প্রোডাকশনের মূল কাজ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, তখন তাঁর সময়ে ফরাসি কর্মীদের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কী তার গুরুত্ব ছিল না। চলচ্চিত্রের প্রধান দায়িত্বের প্রশ্নটি এখনও অবধি অনুত্তরিত রয়ে গেছে। আরও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ফরাসি কর্মীদের সম্পর্কে তাঁর ধারণা ভুল ছিল, তবে মূল কাজটি নিয়ে প্রশ্ন এখনও থেকে গেছে।

    প্রধান দায়িত্বের বিষয়ে গোদারের সঙ্গে আমরা একমত নই, কারণ আমরা একে বলি, "জনগণের মতামত সৃষ্টি এবং ক্ষমতা দখলের জন্য নিপীড়িতদের স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান নির্মাণ"। আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, "লা চিনোয়া"-র চেয়ে "ম্যাট্রিক্স" এর অবদান বেশি। তবে, আমরা যদি গোদারের মাপকাঠিকে গ্রহণ করি তবে বলতে পারি যে "লা চিনোয়া" ফিল্মটা "ম্যাট্রিক্স" এর চেয়ে বড় অবদান রেখেছে, কারণ "লা চিনোয়া" সাংস্কৃতিক বিপ্লবে উৎপন্ন মাওবাদী পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট তত্ত্বগুলিকে সরাসরি সামলায়। বিপরীতে, "ম্যাট্রিক্স" সম্ভবত বাইরের ভারী হস্তক্ষেপ ছাড়া মাওবাদের গুরুত্বর বিবেচনা করতে পারে না। এর মধ্য দিয়ে আমাদের এই প্রশ্নটি উত্থাপনের অর্থ হল যে, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণি এবং এর সাম্রাজ্যবাদী দেশ বিশেষত মিত্রদের, আসলে কী প্রয়োজন। তত্ব নির্মাণ বা আরও দ্রুত এবং বিস্তৃত আবেদন সহ এমন কোনও কিছুর মধ্যে আমাদের বেছে নিতে হবে। এটিও একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন - মূল কাজটি সম্পর্কে আমরা অথবা গোদার সঠিক কিনা। হয় এক বা অন্য দৃষ্টিভঙ্গি বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করবে।

    কেউ কেউ বলতে পারেন যে এই ফিল্মগুলো উপদেশ দেবার মতো "ডাইডাকটিক", তবে বাস্তবে গোদার দর্শকদের বিভিন্ন শিবিরের পার্থক্য করার চেষ্টা করেছেন: ১) পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শিবির ; ২) ব্রেজনেভের সোভিয়েত সহ সামাজিক-গণতান্ত্রিক / সংশোধনবাদী ও শ্রম আমলা শিবির ইউনিয়ন ; ৩) সর্বহারা শিবির। প্রতিটি শিবির এই সিনেমাগুলিতে তার বক্তব্য রাখে এবং গোদার দেখান যে প্রথম দুটি একটি আরেকটির সঙ্গে যুক্ত। মানুষ এই সংঘর্ষগুলোর দিকগুলো আলাদা করতে পারার সময়, গোদার সম্ভবত "ডাইডাকটিক" চলচ্চিত্রটিকে বুর্জোয়া চলচ্চিত্র হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন, সংঘর্ষ ছাড়াই উপস্থাপনা করেছিলেন।

    গোদারের তত্ত্ব নির্মাণের প্রধান কাজটা, দর্শকদের আর অর্থ-বিনিয়োগকারীদের এড়াবার খাতিরে চলচ্চিত্র পরিচালকদের উপর একটি ভারী বোঝা চাপিয়ে দেয়। সম্ভবত তাঁর কাজের অনুরণনটির বেশিরভাগ অংশই "শৈল্পিক বিশ্বস্ততা"র প্রশ্নে মাথা গলানো থেকে উদ্ভূত, এটা এমন একটা প্রশ্ন যা যে-কোনও শৈল্পিক পাতি-বুর্জোয়াকে ক্ষুব্ধ করে। তত্ব নির্মাণের দায়টা গোদারের জনপ্রিয় "আর্টসি" বা "হাই ব্রাউ" ভাবমূর্তির সঙ্গে খাপ খায়।

    ওনার এই ফিল্মগুলোর সাথে আমাদের উপরোক্ত কয়েকটি মতবিরোধ সত্ত্বেও, আমাদের এও বিশ্লেষণ করা উচিত যে গোদারের মাওবাদী পর্বটি সঠিক ছিল কিনা। সোভিয়েত সংশোধনবাদকে বারবার মারাত্মকভাবে আক্রমণ করাটা সোভিয়েত ইউনিয়ন আর ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির মতন উপগ্রহ দলগুলোর দেউলিয়াপনা প্রমাণ করেছে। কেবলমাত্র সবচেয়ে বিভ্রান্ত রুশপ্রেমীগুলোই বিশ্বাস করত যে খ্রুশ্চেভ / ব্রেজনেভ যুগটি ছিল "সমাজতন্ত্র"।

    "পূর্ব দিকের বাতাস"-এ দেখা যায় ফিল্মটি স্ট্যালিনকে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছে। তখনকার দিনে এবং আজকালও একটা জনপ্রিয় চর্চা হল - স্টালিনের কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক পদ্ধতির বিপরীতে "স্বায়ত্তশাসন"। গোদার "স্বায়ত্তশাসন" আন্দোলনের ইতিহাসে আলোকপাত করে দেখিয়েছেন, কীভাবে তা সর্বহারা শ্রেণিকে অবহেলা করে পাশ কাটিয়েছে।গোদার স্টালিনের সময়কার শিল্পকে দোষারোপ করার সময় স্ট্যালিনের অধীনে সমস্ত শিল্পীদের তার জন্য দায়ি করেছিলেন -- এমনকি তখন থেকে ট্রটস্কির অত্যধিক শৈল্পিক প্রভাব লক্ষ করে ব্রেস্ট-লিটোভস্কের সন্ধি হওয়ার পরেও লেনিনকে খোঁচা দিয়েছেন - “স্বায়ত্বশাসনের” প্রশ্নে গোদার পুরোপুরি স্ট্যালিনের পক্ষ নিয়েছেন এবং টিটোর যুগোস্লাভিয়ায় "স্বায়ত্তশাসন" এর আদর্শগত অভিব্যক্তি প্রদর্শন করেছেন। মাও ১৯৬৩ সালে তাঁর প্রবন্ধে শ্রমিক আভিজাত্য, শ্রমিক আমলাতন্ত্র এবং সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নগুলিকে একসাথে যুক্ত বলে প্রতিপাদন করে কড়া জবাব দিয়েছিলেন। গোদার সম্ভবত " যুগোস্লাভিয়া কি সমাজতান্ত্রিক দেশ? " প্রবন্ধটা পড়েছিলেন।

    ১৯৬০ এর দশক থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত প্রতিবিপ্লবীরা মার্কস ও লেনিনের অনুগামীদের মতামতকে সরিয়ে যুগোস্লাভিয়াকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন যাতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ থেকে পুঁজিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে এমন লোকদের মাঝ-পথের ঘর হিসাবে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। যুগোস্লাভিয়া ছিল “স্বায়ত্বশাসিত উদ্যোগের” সঙ্গে "বাজার সমাজতন্ত্র "। লক্ষণীয়ভাবে অনুপস্থিত ছিল মাও বা স্ট্যালিন ধাঁচের কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক শক্তি।তবু যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে স্ট্যালিনের প্রভাব শেষ হয়ে গিয়েছিল আর গর্বাচভ/ইয়েল্তসিন বুর্জোয়াজি খোলাখুলি আবির্ভুত হল, তখন সবচেয়ে হিংস্রভাবে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গেল। সেই গণহত্যার সন্ত্রাস আমাদের মতন মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিন এবং মাওয়ের অনুসারীদের অবাক করেনি, কারণ যুগোস্লাভিয়ার জনগণের বৈষয়িক ভিত্তি এবং পথনির্দেশক ছিল স্হানীয় স্তরে। "বিশ্বব্যাপী চিন্তাভাবনা করুন, স্থানীয়ভাবে কাজ করুন" স্লোগানের এটা একটা গভীর ভুলের উদাহরণ হতে পারে। অর্থনৈতিক "স্বায়ত্তশাসন" যা করেছিল তা হ'ল প্রদেশগুলোকে একে অপরের ঘাড়ে চাপতে উৎসাহিত করেছিল। সেটাই সংকীর্ণ প্রাদেশিক যুদ্ধের বৈষয়িক ভিত্তি তৈরি করেছিল।

    "স্বায়ত্তশাসন" প্রিয় যুগোস্লাভিয়ার ভয়ংকর পতন প্রমাণ করে যে পুঁজিবাদের পর তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি হল কেন্দ্রিয় সমাজতন্ত্র এবং তা সম্পর্কে মার্কস এবং এঙ্গেলসের তত্ত্বগুলি একেবারে সঠিক। সর্বহারা শ্রেণীর সংহতি ভঙ্গ করার জন্য "স্বায়ত্তশাসন" আরেকটি শব্দ। "স্বায়ত্তশাসন" আসলে সর্বহারা ও পুঁজিবাদী শ্রেণীর উভয়ের ওপরে লাঠি ঘোরাতে চাইছে এমন পাতি-বুর্জোয়া শ্রেণীর শব্দ। নারীদের প্রশ্নের ক্ষেত্রেও একই কথা। অবশ্য, জেনডার ব্যাপারটা শ্রেণীর প্রশ্ন থেকে তুলনামূলকভাবে স্বায়ত্তশাসিত, কারণ সমস্ত নারীই শ্রমিক নন, তবে একথা সত্য যে স্বায়ত্তশাসন এবং জেন্ডার প্রশ্নে ব্যক্তিবাদ নিপীড়িত ও শোষিতদের একতা ভঙ্গ করে। নারীর এগিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক গোষ্ঠী-স্তরের উত্তর খুঁজে বের করার বিকল্প নেই। এটা ব্যক্তির স্বতন্ত্র অনুভূতি, বা স্বতন্ত্র ক্ষমতা বা এমনকি বিকেন্দ্রীকরণের প্রশ্ন নয়।

    মার্কসের মূল্যের শ্রম তত্ত্ব জোর দিয়েছিল যে শ্রমিকরা কীভাবে একটি নিরপেক্ষ প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে - অর্থাৎ যা তাদের নিজস্ব শ্রম। কারা শোষিত এবং কারা নয় সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপায় না থাকলে সর্বহারা ঐক্যের ক্ষতি হবে। শোষণ এবং ক্ষতিপূরণের প্রশ্নগুলিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে তা না হলে এর পরিণতি হবে গণহত্যার যুদ্ধ যেমন যুগোস্লাভিয়ায় দেখা গিয়েছিল। কেবলমাত্র তাদের কারখানা বা প্রদেশে নয় পুরো দেশ এবং পুরো পৃথিবীর অন্যান্য শ্রমিকদের সাথে কীভাবে চলতে হবে তা শেখা শ্রমিকদের একটি মূল কাজ। "স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে" শোষিতদের "মূল্যমানের শ্রম তত্ত্ব" প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই একে অপরের পরিস্থিতি দৃঢ়ভাবে জানতে সহায়তা করতে সফল হতে হবে। শ্রমিকরা যদি একে অপরের বস্তুগত অবস্থা দৃঢ়ভাবে অনুভব করতে অক্ষম হয়, তবে তারা পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ হতে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য স্তরে ব্যর্থ হবে। একটি কেন্দ্রিয় অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে শ্রমিকরা একে অপরের মধ্যে তাদের সম্পর্কগুলোর সামঞ্জস্য করতে পারে। সেই ক্ষমতা না থাকলে যুগোস্লাভিয়া-ধরণের পরিস্থিতি তৈরি হতে বাধ্য।

    এই ফিল্মগুলোর সংলাপসমূহের শব্দাবলী মাও-যুগের গোদারের চলচ্চিত্রগুলিতে অগ্রগতির প্রধান বোঝা বহন করে। দ্বিতীয়ত, গোদার সীমাবদ্ধ ক্রিয়া ব্যবহার করেন, রক্ত-লাল রঙ নিক্ষেপ করে এবং চরিত্রগুলোকে রক্তাক্ত করে তুলে ফিল্মে তুলে ধরা তাঁর পরিচিত ক্রিয়া। তৃতীয়ত, গোদার এছাড়াও দর্শকদের বোঝাবার জন্য ব্যবহার করেছেন এবং দেখিয়েছেন ফটোগ্রাফি বা ফিল্মের ছবিগুলো কীভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির পক্ষে সহজেই কাজে লাগানো যেতে পারে। ”তু ভাঁ বিয়ঁ" ফিল্মের শেষে, গোদার ফ্রান্সের এমন ফুটেজ দেখিয়েছেন যার পটভূমিতে নির্বোধ ট্যুরিজম বা ফরাসী জাতীয়তাবাদী জিংগলগুলো বাজিয়ে শুনিয়েছেন। "পূর্ব দিকের বাতাস" ফিল্মে গোদার সাধারণ ফুটেজ ব্যবহার করে বুর্জোয়া চলচ্চিত্র নির্মাণকারী দুটি চরিত্রের অভিনয় উপস্হাপন করেছেন। আমরা দুর্দান্ত মেক-আপ, প্রপস এবং ম্লান আলো দিয়ে একটি কংকুইস্তাদর ফিল্মের ভাবনা কল্পনা করে নিই, তবে গোদার আমাদের দেখিয়েছেন একজন লোক একজন বন্দীকে, প্রকাশ্য দিনের আলোয়, বিশেষ ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই টেনে নিয়ে চলেছে --যা প্রকৃত অভিনেতারা দেখতে পায় কোনোরকম প্রপস ছাড়াই --- যা বেশ সাদামাটা। বুর্জোয়ারা যখন কিনা দর্শকদের দুর্দান্ত পটভূমির সৌন্দর্য দেখায়, তাঁর মাওবাদী পর্বে গোদার আমাদের দেখান যে সৌন্দর্য আসলে থাকে সংগ্রামে।
    [ ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মলয় রায়চৌধুরী ]
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মলয় রায়চৌধুরী | ৩১ জুলাই ২০২১ ১৯:৪৭734797
  • মীজানুর রহমান : হাংরি কিংবদন্তীর চরিতকথা

    এই গাঁটছড়ার পুরোহিত শিবনারায়ণ বাবুর ‘জিজ্ঞাসা’-এর ১৯৮৫ কি ১৯৮৬ এর কোনও এক সংখ্যায় ‘হাংরি জেনারেশন’ মানে ‘ক্ষুৎকাতর আন্দোলনের’ ওপর একটা লেখা বেরিয়েছিল। পড়তে-পড়তে ষাটের দশকের দোরগোড়ায় চলে গেলুম। মাঝেমধ্যেই কলকাতার কতিপয় ক্ষিপ্ত যুবকের তীব্র ক্ষিধের খবর ঢাকয় এসে পৌঁছোত। সবকিছু তছনছ করে দেয়ার, শেকড় উপড়ে ফেলার মোচ্ছব। ওরা মনে করত ঘেয়ো সমাজটার সঙ্গে তাদের দুতিন হাজার বছরের জেনারেশন গ্যাপ, কাজেই ঘা দাও বিংশ শতাব্দীর পাতে বসা ঘেয়ো এই রেয়ো ভাটদের, র‌্যাঁদা বুলিয়ে দাও — চৈতন ফক্কাদের বুঝিয়ে দাও চুচকো নই আমরা, আমরা সবকিছু “ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাবো/শিল্পের জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দেবো।”


     

    কিন্তু উড়ুক্কু খবর, চই চইয়ে কাজ দেয় না। কিছু ছিটেফোঁটা ছাড়া জানা যায় না ওরা কী লিখছে বা ভাবছে বা করছে। শুধু জানলুম তারাশঙ্কর, আবু সয়ীদ আইয়ুবসহ তাবৎ কবি সাহিত্যিক এবং তা বড় সব কাগজগুলা ও গোটা এসট্যাবলিশমেন্ট এসব ত্যাঁদোড়দের খুব করে ডেঁটে দিয়েও যখন ঢিট করতে পারলে না, তখন এক বগ্গামলয়কে পুরে দিলে জেলে। যাদের ছোট ভেবে কাজটা করলে তারা কিন্তু আর ছোট রইল না — খবরটা মস্ত হয়ে গেল যখন মার্কিন মুলুকের ‘টাইম’ হাতে এল, India বিভাগে The Hungry Generation শিরোনামে। চমকে উঠলাম। আরেকবার চমকে উঠেছিলাম ওই ষাটের যুগেই ‘টাইম’-এর Letters কলামে জনৈক ভারতবাসীর রোমান হরফে লেখা হিন্দি ভাষায় আদ্যোপান্ত এক পর্নো চিঠি দেখে। আজ আর মনে নেই, তবে চিঠিতে শিশ্নাদির নানা কামোত্তেজক প্রয়োগের কথা ছিল। পরবর্তী সংখ্যায় ভাষার অজ্ঞতার (?) সাফাই গেয়ে পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে সম্পাদকীয় মন্তব্য বেরুলেও কম তোলপাড় হয়নি এ নিয়ে। ইংরেজি কাগজে ভিন ভাষার চিঠি ছাপলেই বা কেন তোমরা ? ব্যাপারটা ভারতীয়দের হেয় করার চক্রান্ত বলে মনে হয়েছিল আমার সেদিন। কিন্তু ওটা ছিল অর্বাচীন এক ব্যক্তিবিশেষকে ঘিরে। এবার টাইমের লেখনীতে ভারতে পত্রিকার প্রতিনিধি লুই ক্রার যখন ‘হাংরি জেনারেশন’ -এর পরিচয় দিতে গিয়ে লেখেন : Born in 1962, with an inspirational assist from visiting US Beatnik Allen Ginsberg, Calcutta’s Hungry Generation is a growing band of young Bengali with tiger in their tanks. Somewhat unoriginally they insist that only in immediate physical pleasure do they find any meaning in life and they blame modern society for their emptiness…’ তখন, আমাদের ওই যুবাকালে ‘হাংরি জেনারেশন’ সম্বন্ধে জানবার বুঝবার ভারি আগ্রহ হয়েছিল। এ যে দেখছি সেই প্লেটোর নীতিবাগিশের দল, যাঁরা মনে করতেন — যে-মানুষ ইন্দ্রিয়সুখ অন্বেষণ করে না, সে অবশ্যি সমস্ত সুখ এড়িয়ে চলে। কিংবা এভাবে বলা চলে — একজন মানুষের জীবনযাপনের কোনও অর্থই হয় না, যার কোনও সুখানুভূত নেই এবং শারীরিক সুখে যার কোনও অংশগ্রহণ নেই।


     

    কন্তু জানবার আগ্রহ থাকলেই বা, তখন পাকিস্তান আমল — খবরের কাগজে খবর হতে পারে ওই ‘সর্বনেশে ক্ষুৎকাতরদের’ কথা। ‘যোনিকেশরে কাচের টুকরোর মতো ঘামের সুস্হতা’ বিষয়ে ঢাকা তখনও প্রস্তুত ছিল না। আমরা জানতে পারিনি মলয়ের দুঃসাহসী সব কবিতার কথা, হারাধন ধাড়া তথা দেবী রায়, সুবিমল বসাক, ফালগুনী রায়, ত্রিদিব মিত্র, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, বাসুদেব দাশগুপ্ত এবং সর্বোপরি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ — এই সব সারি সারি উজ্জ্বল নক্ষত্রের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্তির কথা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিশ্বাসঘাতকতার কথা। উৎপলের হৈচৈ ফেলা ‘পোপের সমাধি’-ও পড়া হয়নি আমাদের। পড়া হয়নি ‘হাংরি বুলেটিন’, ‘জেব্রা’ প্রভৃতি অসংখ্য ছোটো জেদি কাগজ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ক্ষুৎকাতর মলয় রায়চৌধুরীকে তাঁর কর্মকাণ্ড দেখে ‘মনে হয় খুব একটা সর্টকাট খ্যাতি পাবার লোভ তোমার’ — এ ধরনের যে মন্তব্য করেছিলেন, তার খবরও রাখিনে। অ্যালেন গিন্সবার্গ মলয়ের হয়ে যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতে জ্যোতি দত্ত, খুশবন্ত সিং প্রমুখ সাহায্যের হাত বাড়ালেও আবু সয়ীদ চটে গিয়ে চিঠিতে জানালেন : I do not agree with you that it is the prime task of the Indian Committee for Cultural Freedom to take up the cause of these immature imitators of American Beatnik Poetry’– এ সবও কি জানতুম আমরা ? হঠাৎ করেই ‘জিজ্ঞাসা’র প্রবন্ধটি পড়ে যোগাযোগ করলুম ওঁর লখনউ-এর ঠিকানায়। আর্জি ছিল একটা লেখা দেবার, মানে সুন্দরীভবনে জমাপড়া মহাফেজখানা থেকে ধুলো ঝেড়ে ছয়ের দশকে যা আঘাত দিয়েছিল সমাজকে, বহু কিছু পালটে যাওয়ার পর আজকের নিরিখে যা ডালভাত, সেই ঝড়ো দিনগুলোর একটা পূর্ণাঙ্গ হিসেব-নিকেশের আর্জি আর কি।


     

    প্রথমে রাজি হননি। কীরকম দাঁড়াবে না-দাঁড়াবে,উপরন্তু আমার পছন্দ-অপছন্দ। কিছু কবিতা পাঠালেন, ছাপলুম। ভবি ভুলবার নয়। বোঝালুম, একটা ডাকাবুকো আন্দোলনের ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ধোঁয়াটে হয়ে থাকবে, এটা ভাবা যায় না। একটা সময় আসবে যখন ডিঙি মেরেও ওপাশটার কিছু আঁচ করা যাবে না। কাজেই, সব কিছু গোড়া থেকে শেষ অব্দি, ঢাকের বাঁয়া সমেত চাই যে। জবাবে মলয় জানালেন, এক কিস্তি গেল, যদি পছন্দ হয়, তাহলে পরের কিস্তিতে হাত দেব। এসে গেল পাণ্ডুলিপি। ফুলস্কেপ সাইজে রুলটানা কাগজে মুক্তোর হরফে কোনও কাটাছাঁটা নেই — নদীর মতো অবিরল। আর ভাষার শরীরে সেকালের, সেই ক্ষুধিত কালের কোকেন এলএসডি মারিহুয়ানা চরস খাওয়া চেহারাটা কিনা জ্বলজ্বল করছে। ধারালো গতিময় শব্দের কী তেজ। খুব ভাল লাগল। আমার কাগজের এপ্রিল-জুন ( ১৯৮৬ ) সংখ্যায় ছাপা হতেই খুব হৈচৈ পড়ে গেল। তখন কলকাতায় আমার কাগজ নিয়মিত বিক্রি হত — পাতিরামে। মলয়ের সুবাদে ‘দেশ’ পত্রিকায় ফি-হপ্তা বিজ্ঞাপন বেরুতো। ‘কিংবদন্তি’ পড়ে শক্তি-তারাপদ-সুনীল খুব চটেছেন — কলকাতা থেকে এমন উড়ো খবর পাচ্ছিলাম। অথচ মজা কী আন্দোলনের গোড়ায় শক্তিই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ‘হাংরি বুলেটিনে’ তাঁর দুঃসাহসী কবিতা ‘কেউ নেই যে এসে পেচ্ছাব করবে, উখে/জানে কামড়ে দেবো…’, এমন ব্যানাল পদ্যও লিখেছিলেন তো ! তাই বলি, কোন মন্ত্রবলে শক্তি শুধু আন্দোলনের বিরোধিতাই করেননি, রাজসাক্ষী পর্যন্ত হয়েছিলেন, তা আজও রহস্য হয়ে আছে। বোধ করি সেকালের সমাজ সচেতন সনাতনীদের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন বলেই এমনটা ঘটতে পেরেছে। কিন্তু তাঁর জীবনাচরণ বলে অন্য কথা। হাংরিকে তুচ্ছ জ্ঞানে খোলোস ত্যাগ ? হবে। ঔপন্যাসিক মাহমুদুল হকের সুবাদে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয়। সামান্যই মিত্রতা। একবারই লিখেছিলেন আমার কাগজে। নজরুলের মতো ‘দরজা বন্ধ’ করে হকের বাড়িতে ( আমার অসুখ, ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ১৯৮৩ )। অনুজ ইফতিকার আহমেদের চেনাজানা তারাপদ রায়ও একবারই লিখেছিলেন ( বিদায় জানাতে জানাতে, ২য় বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, ১৯৮৪ )। বোধ করি লেখা দিয়ে আমার প্রতি সদয় হওয়া সত্ত্বেও, আমারই কাগজে তাঁদের ওপর বিরূপ লেখাজোখা বেরোচ্ছে, এই বিবেচনায় আমার ওপর খাপ্পা হয়ে থাকবেন। আমার কবি বন্ধুবান্ধবদের দিয়ে ( শামসুর রাহমান ), যাতে ‘হাংরি কিংবদন্তি’ প্রকাশনা বন্ধ রাখা হয় এমন পরোক্ষ অনুরোধও আসে ওঁদের তরফ থেকে। খোঁজখবর নিয়ে জানলুম শক্তি-তারাপদ চটেছেন ঠিক, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ব্যাপারটা একেবারেই মিথ্যে। তিনি বলেছেন, কে কোথায় কী লিখছে তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। থাকবে কেন, মলয়ের মামলায় সাক্ষী দিতে গিয়ে তিনি ওঁর পক্ষেই সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ‘কবিতাটি ( প্রচণ্ড বৈদ্যুতক ছুতার ) কি অবসিন ?’ — উকিলের এই জেরায় সুনীল জবাব দিয়েছেন : না: ইট কনটেইনস নো অবসিনিটি। ইট ইজ অ্যান এক্সপ্রেশন অব অ্যান ইমপরট্যান্ট পোয়েট। ’ মলয়কে লেখা ওঁর চিঠিপত্রেও হাংরি সম্পর্কে ওঁর মতামত দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। মলয় আমার কাগজে যা লিখেছেন সে-ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র বলার কিছুই নেই। মলয় লিখতেই পারে — যে স্বাধীনতা তাঁর রয়েছে, সম্পাদক তা ছাপতেই পারেন, সে স্বাধীনতাও তাঁর রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমার কাগজের ৪র্থ বর্ষ ২য় সংখ্যা, ১৯৮৬তে ‘হাংরি কিংবদন্তি’ শিরোনামে সম্পাদকের কড়চায় লিখলুম:


     

    “স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে মলয়বাবু তাঁর লেখায় যে অবাধ স্বাধীনতা গ্রহণ করেছেন তাতে আমি ইচ্ছে করেই কলম চালাইনি। কোনও লেখকের রচনায় অনাহুত প্রবেশ কাম্য নয়। এই স্মৃতিচারণায় অনেকের প্রতি কটাক্ষ আছে, কটুক্তি আছে, মর্মঘাতী ভাষাতেই আছে, ভবিষ্যতেও হয়তো থাকবে। এঁদের মধ্যে আছেন লব্ধপ্রতিষ্ঠ কবি ও সাহিত্যিক। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ বন্ধু না হতে পারেন, ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিচত বটে। সকলেই আমার শুভানুধ্যায়ী, আমি নিজেও গুণমুগ্ধ তাঁদের। আঘাত দেয়াযেমন আমার স্বভাব নয়, আঘাত পাওয়াটাও কাম্য নয়। হাংরি কিংবদন্তি’ সম্পর্কে কিছু বলার পূর্ণ অধিকার তো তাঁদের থাকলই। তাঁরাও বলবেন তাঁদের কথা, তাঁদের মতো করেই। মাঝে তাঁরা যদি আমায় ভুল না বোঝেন তাহলেই আমি খুশি। ”


     

    কিন্তু না কেউ এগিয়ে আসেননি, না শক্তিবাবু, না তারাপদবাবু। লেখা শেষ হবার পরে বা আগে ককনও নয়। — এভাবেই ‘হাংরি কিংবদন্তি’ জন্ম নিল।


     

    ( মলয় রায়চৌধুরীর ‘হাংরি কিংবদন্তি’ গ্রন্হটি প্রথমে ঢাকায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘মীজানুর রহমানের ত্রেমাসিক পত্রিকায়’। কলকাতায় গ্রন্হাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। পরে আবার আন্দোলনকালীন ফোটো ইত্যাদিসহ কলকাতার ‘সোনার বাংলা’ সংবাদপত্রে ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল ১০.৩.১৯৯৬ থেকে ৩১.৮.১৯৯৭ পর্যন্ত)


     


  • মলয় রায়চৌধুরী | ৩১ জুলাই ২০২১ ১৯:৫০734798
  • মলয় রায়চৌধুরীর কবিতার বই : মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো

    [ রচনাকাল : ২০১৫ - ২০১৬ ]


     

    উৎসর্গ, আমার পূর্বপুরুষদের, বংশলতিকা অনুযায়ী

    শৌভরী উপাধ্যায়, বেদগর্ভ ( ৯৮০ খৃ ), হলায়ুধ, গুণাই, হরি, সুবিক্রম, বিশাই, বলাই, হেরম্ব, শৌরী, পীতাম্বর, কুলপতি, শিশু, গদাধর, হলধর, আয়ুরাম, বিনায়ক, শিবজীয়, পরমেশ্বর, পঞ্চানন বা পাঁচু শক্তি খান, শম্ভূপতি, জিয়া গঙ্গোপাধ্যায় ( কামদেব ব্রহ্মচারী ), লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরী, জগদীশ, রত্নেশ্বর ( উত্তরপাড়ার প্রতিষ্ঠাতা ), চণ্ডীচরণ, জয়গোপাল, যদুনাথ, লক্ষ্মীনারায়ণ, রঞ্জিত রায়চৌধুরী ( আমার বাবা )।


     

    সুচিপত্র

    মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো

    ডেথমেটাল : অবন্তিকার জন্য প্রেমের কবিতা

    ক্ষুধার জন্য প্রেমের কবিতা

    নারীর বুকের জন্য প্রেমের কবিতা

    ইন্দ্রানী মুখোপাধ্যায়ের জন্য প্রেমের কবিতা

    সিঙাড়ার জন্য প্রেমের কবিতা

    সোনালী মিত্রে’র জন্য প্রেমের কবিতা

    কৃতি ঘোষ-এর জন্য প্রেমের কবিতা

    কালো বিধবার জন্য প্রেমের কবিতা

    উপমা অগাস্টিন খেয়ার জন্য প্রেমের কবিতা

    অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য প্রেমের কবিতা

    রাষ্ট্রবিরোধিতার জন্য প্রেমের কবিতা

    তানিয়া চক্রবর্তীর জন্য প্রেমের কবিতা

    ম্যাডেলিন করিয়েটের জন্য প্রেমের কবিতা

    সোনালী চক্রবর্তীর জন্য প্রেমের কবিতা

    সেতারা মাহবুব-এর জন্য প্রেমের কবিতা

    ব্লাড লিরিক : অবন্তিকার জন্য প্রেমের কবিতা

    মহেঞ্জোদরোর মেটেল কিশোরীর জন্য প্রেমের কবিতা

    শরীরের জন্য প্রেমের কবিতা

    খালাসিটোলার জন্য প্রেমের কবিতা

    নীরার জন্য প্রেমের কবিতা

    মেরেলিন মনরোর জন্য প্রেমের কবিতা

    স্বচ্ছ দেওয়াল : প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য প্রেমের কবিতা

    আমার স্বদেশ : বাঙলা ভাষার জন্য প্রেমের কবিতা

    আধুনিকতার স্মৃতি : পার্সি বউটির জন্য প্রেমের কবিতা

    জোকারদের জন্য প্রেমের কবিতা

    বাঘিনীর জন্য প্রেমের কবিতা

    জুতোর জন্য প্রেমের কবিতা

    নেভো মোম নেভো : লেডি ম্যাকবেথের জন্য প্রেমের কবিতা

    মনকেমনের জন্য প্রেমের কবিতা

    উর্বশীর ডেথ সার্টিফিকেট : উর্বশীর জন্য প্রেমের কবিতা

    অবন্তিকার শতনামের জন্য প্রেমের কবিতা

    শবদেহ’র জন্য প্রেমের কবিতা

    কাতুকুতুর জন্য প্রেমের কবিতা

    ব্রহ্মাণ্ডের একটিমাত্র নারীর জন্য প্রেমের কবিতা

    চিতল হরিণীর জন্য প্রেমের কবিতা

    ধুমাবতীর জন্য প্রেমের কবিতা

    জন্মচেতনার জন্য প্রেমের কবিতা

    শরৎকালের জন্য প্রেমের কবিতা

    ডটপেনের জন্য প্রেমের কবিতা

    ইনসমনিয়া : স্বপ্নের জন্য প্রেমের কবিতা

    যুদ্ধের জন্য প্রেমের কবিতা

    নিষ্ঠুরতা : সৌন্দর্যের জন্য প্রেমের কবিতা

    ন্যাংটো তন্বীর জন্য প্রেমের কবিতা

    সাবর্ণভিলার জন্য প্রেমের কবিতা

    লিঙ্গুইস্টিক্সের জন্য প্রেমের কবিতা

    জোচ্চোরবৃন্দের জন্য প্রেমের কবিতা

    সোনাগাছির জন্য প্রেমের কবিতা

    চারু মজুমদার : কাজের মাসির জন্য প্রেমের কবিতা

    মেরি ম্যাগডালেনের জন্য প্রেমের কবিতা

    ঠাকুমা অপূর্বময়ীর জন্য প্রেমের কবিতা

    প্রেমের কবিতা : কাননদেবীরে বুঝি নাই সুচিত্রা সেনরে বুঝি নাই

    শাশুড়ির জন্য প্রেমের কবিতা

    সেঁকোবিষের চোলাইকারীর প্রেমের কবিতা

    বজ্জাতির জন্য প্রেমের কবিতা

    জুতোর জন্য প্রেমের কবিতা


     

     

     

     

     

    মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো

    মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো

    মুখ দেখে ভালোবেসে বলেছিলে, ‘চলুন পালাই’

    ভিতু বলে সাহস যোগাতে পারিনি সেই দিন, তাই

    নিজের মাথা কেটে পাঠালুম, আজকে ভ্যালেনটাইনের দিন

    ভালো করে গিফ্টপ্যাক করা আছে, ‘ভালোবাসি’ লেখা কার্ডসহ

    সব পাবে যা-যা চেয়েছিলে, ঘাম-লালা-অশ্রুজল, ফাটাফুটো ঠোঁট

    তুমি ঝড় তুলেছিলে, বিদ্যুৎ খেলিয়েছিলে, জাহাজ ডুবিয়েছিলে

    তার সব চিহ্ণ পাবে কাটা মাথাটায়, চুলে শ্যাম্পু করে পাঠিয়েছি

    উলঙ্গ দেখার আতঙ্কে মিছে ভুগতে হবে না

    গৌড়ীয় লবণাক্ত লিঙ্গ দেখবার কোনো স্কোপ আর নেই

    চোখ খোলা আছে, তোমাকে দেখার জন্য সবসময়, আই ড্রপ দিও

    গিফ্টপ্যাক আলতো করে খুলো, মুখ হাঁ করাই আছে

    আমার পছন্দের ননভেজ, সন্ধ্যায় সিঙ্গল মল্ট, খাওয়াতে ভুলো না

    মাথাকে কোলেতে রেখে কথা বোলো, গিটার বাজিয়ে গান গেও

    ছ’মাস অন্তর ফেশিয়াল করিয়ে দিও, চন্দনের পাইডার মাখিও

    ভোর বেলা উঠে আর ঘুমোতে যাবার আগে চুমু খেও ঠোঁটে

    রাত হলে দু’চোখের পাতা বন্ধ করে দিও, জানো তো আলোতে ঘুমোতে পারি না

    কানে-কানে বোলো, “আজও উন্মাদের মতো ভালোবাসি”

    মাথা কেটে পাঠালুম, প্রাপ্তি জানিও, ফোন নং কার্ডে লেখা আছে


     

    ডেথমেটাল : অবন্তিকার জন্য প্রেমের কবিতা

    মুখপুড়ি অবন্তিকা, চুমু খেয়ে টিশ্যু দিয়ে ঠোঁট পুঁছে নিলি ?

    শ্বাসে ভ্যাপসা চোখের তলায় যুদ্ধচিহ্ণ এঁকে ডেথমেটাল মাথা দোলাচ্ছিস

    চামড়া জ্যাকট উপচে লাল-নীল থঙ গলায় পেতল-বোতাম চোকার

    ঝাপটাচ্ছিস সেক্যুইন গ্ল্যাম-রকার খোলা চুলে কোমরে বুলেট-বেল্ট

    বেশ বুঝতে পারছি তোকে গান ভর করেছে যেন লুঠের খেলা

    স্ক্রিমিং আর চেঁচানি-গান তোর কার জন্য কিলিউ কিলিউ কিল

    ইউ, লাভিউ লাভিউ লাভ ইউ, কাঁসার ব্যাজ-পিন কবজি-বেল্ট

    কুঁচকিতে হাত চাপড়ে আগুনের মধুর কথা বলছিস বারবার

    আমি তো বোলতিবন্ধ থ, তুই কি কালচে ত্বকের সেই বাঙালি মেয়েটা ?

    কোথায় লুকোলি হ্যাঁরে কৈশোরের ভিজেচুল রবীন্দ্রনাথের স্বরলিপি

    কবে থেকে নব্বুই নাকি শূন্য দশকে ঘটল তোর এই পালটি রূপ !

    পাইরেট বুট-পা দুদিকে রেখে ঝাবড়া চুলে হেড ব্যাং হেড ব্যাং হেড ব্যাং

    ঝাঁকাচ্ছিস রঙিন পাথরমালা বুকের খাঁজেতে কাঁকড়া এঁকে --

    পাগলির অদৃশ্য মুকুট পরে দানব-ব্লেড বেজ গিটারে গাইছিস

    বোলাও যেখানে চাই হাত দাও প্রেম-জন্তুকে মারো অ্যানথ্র্যাক্স বিষে

    মেরে ফ্যালো মেরে ফ্যালো মেরে ফ্যালো কিল হিম কিল হিম কিল

    কিন্তু কাকে বলছিস তুই বাহুতে করোটি-উল্কি : আমাকে ?

    নাকি আমাদের সবাইকে যারা তোকে লাই দিয়ে ঝড়েতে তুলেছে ?

    যে-আলো দুঃস্বপ্নের আনন্দ ভেঙে জলের ফোঁটাকে চেরে

    জাপটে ধরছিস তার ধাতব বুকের তাপ মাইক নিংড়ে তুলে

    ড্রামবিটে লুকোনো আগুনে শীতে পুড়ছিস পোড়াচ্ছিস

    দেয়াল পাঁজিতে লিখে গিয়েছিলি ‘ফেরারি জারজ লোক’

    ভাঙাচোরা ফাটা বাক্যে লালা-শ্বাস ভাষার ভেতরে দীপ্ত

    নিজেরই লেখা গানে মার্টিনা অ্যাসটর নাকি ‘চরমশত্রু দলে’

    অ্যানজেলা গস কিংবা টারজা ট্যুরম্যান

    লিটা ফোর্ড, মরগ্যান ল্যানডার, অ্যামি লি’র বাঙালি বিচ্ছু তুই

    লাল-নীল-বেগুনি লেজার আলো ঘুরে ঘুরে বলেই চলেছে

    তোরই প্রেমিককে কিল হিম লাভ হিম কিল হিম লাভ হিম লাভ

    হিম আর ঝাঁকাচ্ছিস ঝাবড়া বাদামি চুল দোলাচ্ছিস উন্মাদ দু’হাত


     

    ক্ষুধার জন্য প্রেমের কবিতা

    অনেকেই স্যার স্যার করে, অথচ ইশকুলে ছাত্র ঠ্যাঙা্‌ইনি কখনও

    তারপর জানতে চায়, “এখনও ক্ষুধার্ত আপনি ? স্যার ?”

    বলি, মরলেও জল দিতে হয়, জানিস না তোরা ? পুড়িয়ে

    ফেরার পর, দিনকতক পরে পিণ্ডদান, তখন ক্ষুধার্ত পূর্বপুরুষেরা

    নেমে আসেন দশ একশো দুশো বছর পর। পুরুত জানতে চান

    নাম বলুন, নাম বলুন, নাকি অমুক দেবশর্মনঃ করে দিই ?

    পূর্বপুরুষেরা বিখ্যাত নিমপুরুষ ছিলেন, ভাগ্যিস লেখাজোখা আছে--

    স্বর্গ বা নরক থেকে খালি পেটে নেমে এসে কাঁঠালি কলার সঙ্গে

    চটকানো গোবিন্দভোগ গাওয়া ঘি মধু মেখে গপাগপ সেঁটে ফিরে যান।

    অপেক্ষা করেন ওঁরা আবার কে সটকাবে, তখন আবার নামবেন

    ক্ষুধা মেটাবার জন্য। প্রজন্ম প্রজন্ম ধরে ক্ষুধার শাখা প্রশাখায়

    মায়ের ও বাবার উর্ধ্বতন পুরুষেরা অশরীরি ক্ষুধার্ত পেটে

    বংশ রক্ষার জন্য হাঁ-করে হাওয়ায় বসবাস করে চলেছেন

    প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে পড়বে কিছু চাল-কলা-দই-মধু আর এভাবেই

    ক্ষুধার জন্ম হয় ক্ষুধার মৃত্যুর পাশাপাশি। যদি পিতৃদোষ থাকে

    সাতজন্ম আর মায়ের দিকের মাতৃদোষে নয় প্রজন্ম অব্দি

    ওনারা ক্ষুধার্ত থাকেন। মরে গিয়ে কেটে পড়া অতো সোজা নয়।

    বংশে বাচ্চা হলে, প্রতিবার জমিয়ে রাখবেন ক্ষুধা, যেমন দশরথ

    ফল্গুর তীরে দেয়া সীতার বালির পিণ্ড খেয়ে রথে বসে ঢেঁকুর

    তুলতে তুলতে স্বর্গে গেলেন। কুরুক্ষেত্রে অর্জুনের নিহত স্বজনেরা

    পেয়েছিল পাণ্ডবের দেয়া অন্ন আসন শয্যা জল ও বাহন

    যাদের এখনও ক্ষত্রিয়েরা খাইয়ে চলেছে। ফল্গু নদীর তীরে গয়াসুর

    ওৎ পেতে দ্যাখে ফি-বছর হাজার-লক্ষ লোক মাথা ন্যাড়া করে

    দিয়ে যাচ্ছে খাবার পানীয় তাদের নামহীন স্বজন জ্ঞাতিকে।


     

    আমার সমস্যা হল, আমি তো হিন্দু-নাস্তিক, আমার সন্তানেরা

    আমার চেয়েও বেশি সংস্কৃতির বাইরে চলে গেছে। আমাকে

    সেজন্য, চাল-কলা-দই-মধু তিল-জল খাওয়াবার লোক

    থাকবেনা ; একদিক থেকে ভালো, কেননা পাঠক

    পাঠিকা থাকবে, যাতে আমি চিরকাল নরকে বসেও ক্ষুধার্ত থাকি


     

    নারীর বুকের জন্য প্রেমের কবিতা

    ম্যাডেলিন বলেছিল : প্রেমিকের শরীরের সবকিছু মুখস্হ হয়ে গেলে

    অন্য প্রেমিকের প্রয়োজন হয় ; তারপর বুড়ো হলে জীবনের সব মিথ্যা

    সত্য হয়ে উঁকি মারে বলিরেখা জুড়ে--

    প্রতিটি যুগের নিজস্ব মিথ্যা হয়--

    সমস্ত জীবনভর যতো ছায়া মাটিতে ফেলেছো

    তাদের একত্র করে শেষ প্রেমিকার বুকে মাথা গুঁজো--

    শেষতম নারী, দু’বুকের মাঝখানে ইনসমনিয়া সারাবার

    ব্যবস্হা করবেই ; সেখানে ঘুমের জন্মান্ধ উত্তমপুরুষ

    কবিতার অদৃশ্য খাতা খুলে কয়েক দশক বসে আছে


     

    ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়-এর জন্য প্রেমের কবিতা

    অসহ্য সুন্দরী, আমার নিজের আলো ছিল না

    তোর আলো চুরি করে অন্ধকারে তোরই ছায়া হয়ে থাকি

    তোর আর তোর বরের মাঝে শ্বাসের ইনফ্যাচুয়েশানে

    অসহ্য সুন্দরী, বেহালার কোন তারে তোর জ্বর তা জানিস ?

    জানি না কেমন করে রেমব্রাঁর তুলি থেকে পিকাসোর তুলিতে চলে গেলি

    তোর মাতৃতান্ত্রিক ইতিহাসের চেতনায়

    তিনশো বছর পড়ে আছি সমুদ্রের গভীরতম জলে ভাঙা জাহাজে শেকলবাঁধা

    সময়কালকে যে স্বরলিপিতে বেঁধে ফেলিস তা বলেছিস তোর বরকে ?

    বলেছিস পরস্ত্রীকাতর প্রেমিককে মগজে চাকর করে রেখেছিস ?

    সাঁতারু যেমন জলে সহজ তেমন তুই সময়কালে

    অসহ্য সুন্দরী, আমাকে গড়ে নিয়েছিস ভয় যন্ত্রণা আনন্দের মিশেলে

    অ্যানার্কিস্ট করে দিয়েছিস আমাকে

    মনে রাখি যে ব্যথা আর দুঃখই আগুন, হে অসহ্য সুন্দরী

    তোর আর তোর বরের মাঝে পরস্ত্রীকাতরতার শ্বাস

    শুনতে পাচ্ছিস ? শোন, কান পেতে শোন…


     

    সিঙাড়ার জন্য প্রেমের কবিতা

    আহা, অদ্য একটি তরতাজা সিঙাড়া খাইলাম

    ভিতরে গুলাবিরাঙা চিনাবাদাম, কেবলই একটি --

    ফুলকপি ছিল ; ইহা যে ছেৎরানো ফুলকপির ঋতু

    জানি না কেন যে সিঙাড়া প্রস্তুতকারক মহারাজ

    একদিকে আকর্ষক একটি ছিদ্র রাখিয়াছিলেন--

    অঙ্গুলি দিয়া সিঙাড়ার ভিতরের চিনাবাদামখানি

    অনুভব করি, জিহ্বাগ্র প্রবেশকরতঃ স্বাদ লই

    দধিমধু লবণাক্ত, বিজ্ঞানীরা কহিয়াছেন

    লবণাক্ত হইবার কারণ রজঃরসে ইউরিয়া থাকে--

    জীবনানন্দ সভাগৃহে কবিতা শুনিবার তরে

    আসিয়াছিলাম ; কোনো এক মিহিকন্ঠী-কবি

    কবিতা পড়িতেছিলেন ; আমি তাঁকে ধন্যবাদ

    মনে-মনে দিই, অহো, বড়োই সুস্বাদু আপনার

    তপ্ত সিঙাড়াখানি, সোমালিয়া নিষিদ্ধ করিয়েছে--

    আহা, এই প্রথম নারীবাদী সিঙাড়ার আস্বাদ লই


     

     

    সোনালী মিত্রে’র জন্য প্রেমের কবিতা

    পুরাণের সংস্কৃত গন্ধ থেকে নেমে এসে তুইই শিখিয়েছিলিস

    কবির লেখকের গণ্ডারের চামড়াখানা খুলে রাস্তার ভিড়েতে মিশে যেতে

    তার আগে নিজেকে বড়ো উন্নাসিক কাদার সুপারম্যান ভেবে

    হাতঘড়ির কলকব্জায় ঝড়ের মেটাফরগুলো চালুনিতে চেলে

    ভেবেছি পিস্তল পাশে নেই বলে আত্মহত্যা করিনি এখনও

    দিল্লির নিম্নচাপে চোখ এঁকে ফিরিয়েছিলিস শব্দ-ভিজুয়াল

    তরোয়ালে আইনি ঝলকে লিপ্সটিকে ছাপা অটোগ্রাফ দিয়ে বলেছিলি

    প্রতিটি বিপ্লবের দাম হয়, বদলের বাজারও তো বসে

    জুলিয়াস সিজারের গম্ভীর শেক্ষপিয়ারি সাহিত্যের গমগমা ছেড়ে

    সাধারণ মানুষের মতো ক্যাবলা চাউনি মেলি তোর কথা মেনে

    বুড়ো বলে সক্রেটিস সাজবার সত্যই দরকার ছিল নাকি

    গ্রিসের গাধার ওপরে বসে আথেন্স বা কলকাতার পচাগ্যাঞ্জামে

    ধুতি পরে ? কাঁধে উত্তরীয় ? সাহিত্য সভায় ? নাকের বক্তিমে ঝেড়ে !

    ভুলে যায় লোকে। মজার এ মরে যাওয়া। গন ফট। খাল্লাস।

    সোনালী প্রেমিকা ! তুইই বুঝিয়েছিলিস : হুদো হুদো বই লিখে

    বিদ্বানের নাকফোলা সাজপোশাক খুলে দেখাও তো দিকি

    কালো জিভ কালো শ্লেষ্মা কালো বীর্য কালো হাততালি

    উলঙ্গ নাচোতো দেখি তাণ্ডবের আঙ্গিকবর্জিত তালে তালে

    চুমুর পুনঃচুমু পুনঃপুনঃচুমু দিল্লির নিম্নচাপ মেঘে


     

    এই দ্যাখ গণ্ডারের শিব-সত্য-সুন্দরের চামড়া ফেলে দিয়ে

    কেমন পেয়েছি নখে সোনালীর চুলের জীবাশ্ম


     

    কৃতি ঘোষ-এর জন্য প্রেমের কবিতা

    এই সেই গালফোলা যুবতী, যাকে তার বাবা ডাকে ডাবলিউ

    রোদের সঙ্গে ষড় করে যে, আমার ছায়াকে ভাঙেচোরে সে

    সিগ্রেট ফোঁকে বলে চুমু ওর, খাওয়া এক পিনহীন এটিএম

    পিন ওর দুই চোখে মিচকায়, ইস্তিরি করা মোর ভজনা

    আমি ছিনু সতেরোশো শতকে, ও রয়েছে বাইশের কোঠাতে

    যা নিয়েছি ফেরত দেয়া যাবে না, উকুনের সাথে চুলে পুষেছি

    মৎস্যবালিকা যার বুকে আঁশ, ও আমার দেয়ালের পোস্টার

    নদী ওর ঘাম ছাড়া বয় না, প্রেমিকেরা ঘুমচোখে বন্ধ

    ফোলাগাল ছুঁই ফেসবুকে রোজ, চুমু খাই সিগ্রেটি ঠোঁটে ওর

    আমার কানদুটো কুমিরের, গিটার বাজিয়ে ডাকে আয় আয়

    ও আমায় নিলামেতে কিনেছে. একটাকা পঁয়ত্রিশ পয়সায়

    চেন বেঁধে পথেঘাটে নিয়ে ঘোরে, তবু বলে তুতুতুতু আয় আয়


     

    কালো বিধবার জন্য প্রেমের কবিতা

    উঁহু, কালো বিধবার ডাক ফিরাতে পারি না

    সঙ্গম করার কালে মনোরম মৃত্যু চাহিয়াছি

    যেমত পুংমাকড়ের হয় ; স্ত্রীংমাকড়ানি

    থুতুর ঝুলন্ত রেশমে বাঁধি আহ্বান করিবে

    আষ্টেপৃষ্টে সবুজ পাতার উপরে ল’য়া গিয়া

    মোর পালপাসখানি যোনিদ্বারে লইবে টানিয়া

    দশ বাহুর আলিঙ্গনে শুষিবে লক্ষ শুক্রানু

    দ্বিবাদ্বিপ্রহরে নিশিডাকে আক্রান্ত থরহরি

    ব্যকরণ বিন্যাস গণিত শিখাবে দশ নখে

    আমি ক্লান্ত হলে পর ক্রমশ খাইতে থাকিবে

    সঙ্গম চলাকালে চাখিবে সুস্বাদু ঝুরিভাজা

    উইপোকাসম লিঙ্গখানি কুরিবে প্রথমে

    প্রেমিকার উদরে প্রবেশ করিয়া কী আনন্দ

    বুঝাইব কেমনে, সমগ্র দেহ যে গান গায়--

    আহ্লাদের কর্কটরোগ তোমরা বুঝিবে না


     

    উপমা অগাস্টিন খেয়া’র জন্য প্রেমের কবিতা

    আমাদের দু’জনের মাঝে একটা নারীচুলের কাঁটাতারের সীমান্ত

    চুলের কাঁটাতারের তোর দিকে তিরিশ মিনিট আগে শুকতারা ওঠে

    মনের মতন উপমাকে পেতে সারা জীবন লেগে গেল, জানি পাবো না

    পুরুষদের কাটা মাথার আবর্জনায় আমার মুখ তুই চিনতে পারিসনি

    কবিতারা কেন যে উপমাকে বাদ দিতে শকুন কলোনিতে ঢোকে

    আকাশে পাক ধরেছে, দেখতে পায় না

    প্রেমের ময়াল প্যাঁচ, ভালোবাসা আমার পেশা

    আগুনে পোড়ানো ছায়া পাঠিয়ে দিয়েছি চুলের কাঁটাতারের ওই পারে

    ঝিঁঝিপোকাদের কোরাস ভেবে তুই এড়িয়ে গেলি

    অথচ আমিই তো সেইন্ট অগাস্টিন, ভালোবাসা আমার পেশা

    মগজের ভেতরে তোর কন্ঠস্বরের ফাঁদপাতা মাকড়সার জাল

    বর্ষার ফোঁসফোঁসানি মেশানো তোর হাঁ-মুখের ইলশেগুঁড়ি

    ঘুমোতে ঘুমোতে এক রাতে চুলের কাঁটাতার ছিড়ে পৌঁছে যাবো

    দেখবো খেয়ার ঠোঁট বিদেশ চোখ বিদেশ থুতনি বিদেশ চুল বিদেশ

    হাত বিদেশ নাভি বিদেশ বুক বিদেশ ঘাম বিদেশ

    গোলাপি পূর্ণিমার বিছানায় জন্মেছিলিস

    তোর আব্বু আমায় আফ্রিকার মানুষ মনে করেছিলেন

    কেননা তোর দিকে চাইলেই আমার দুই কাঁধ নেচে ওঠে

    অথচ আমি সেইন্ট অগাস্টিন, ভালোবাসা আমার পেশা


     

    অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর জন্য প্রেমের কবিতা

    মনে থাকে যেন, রাজি হয়েছিস তুই, হাত ধরে নিয়ে যাবি নরকের খাদে

    রাবণের কর্ণের ভীষ্মের, দুর্যোধনের আর আমার করোটি

    হাজার বছর ধরে পুড়ছে অক্ষরে, বাক্যে, ব্যকরণে, বিদ্যার ঘৃণায়

    মনে থাকে যেন, শর্ত দিয়েছিস, আমার সবকটা কালোচুল বেছে দিবি

    তিন-বুকের আধাবিদেশিনি, দুইটি বাঙালি বুক, একটি রেডিণ্ডিয়ান

    সফেদ বৃন্ত দুটো পুরুষের নামে কেন ? প্ল্যাটো ও সক্রেটিস ? বল অ্যানা--

    অ্যানা দি র‌্যাভেন শাদাকাক, ঠোঁটে রক্ত, উসিমুসি বুক ! তৃতীয় কি টেকুমেন চিফ ?

    যিনি বলেছেন, “কোয়াও-বোচি-ওয়ে-আউ-ফি ( এই সুন্দর পৃথিবী )

    বুৎ-ওয়া-তে ওয়া ( হায় ) ওয়াও-কোয়ন-অগ ( স্বর্গ )

    সবকিছু নষ্ট করে দিচ্ছে এই শাদা লোকগুলো

    ওদের জীবনে কোনো প্রেম নেই, শুধু হিংসা হত্যা লোভ

    অ্যানা, হাত ধরে নিয়ে চল রেডিণ্ডিয়ান প্রেমিকের তাঁবুর সুগন্ধে

    মনে থাকে যেন, রাজি হয়েছিস তুই, উসিমুসি বুক, অনামিকা

    সবক’টা কালোচুল বেছে দিবি কোলে মাথা নিয়ে, অ্যানা, অনামিকা

    আবার তোর সঙ্গে কবে দেখা হবে ? ক্যামেরা মুখের কাছে এনে

    তোর হাঁ-মুখের দেখাবি চটুল বিশ্বরূপ ! অ্যানা দি র‌্যাভেন শাদাকাক ?

    বদনাম হবার জন্য তৈরি হ। চল তোকে কুখ্যাত কুসঙ্গে নিয়ে যাই

    তোর ও-বিদেশি স্বর্গে ছেটাই খানিক এই ছোটোলোক প্রেমিকের করোটির ছাই


     

    রাষ্ট্রবিরোধিতার জন্য প্রেমের কবিতা

    জ্ঞান ফিরিবার পর দেখিলাম, চতুস্পার্শে ছয় ইঞ্চি ক্ষুদ্র যুবতীরা--

    দেড়শো বৎসর পর ফিরিয়া আসিল জ্ঞান, ততোদিনে

    অতিউন্নত বাকচর্চা প্রয়োগকরতঃ ছয় ইঞ্চির হইয়া গিয়াছে মানুষেরা

    সুতা দিয়া আমাকে চতুর্দিক হইতে বাঁধিয়া ফেলিয়াছে--

    শুইয়া আছি ঘাসের উপরে, কথাবার্তা শুনিয়া বুঝিলাম ইহা বঙ্গদেশ

    উলঙ্গ উহারা, কেহ বুকের উপরে কেহ পেটে কেহ উরুতে হাঁটিতেছে

    উহাদের কথোপকথন হইতে বুঝিলাম এখন এ-রাজ্যের নাম লিলিপুট

    কখনও বাকবিপ্লব ঘটিয়াছিল, তাই, মানুষেরা ক্ষুদ্র ও উদার হইয়া গিয়াছে--

    বেঘোরে যা কহিয়াছিলাম তাহা উহাদের মতে অশ্লীল ও রাষ্ট্রবিরোধী--

    জানিতে চাহিলাম, তাহাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোন কর্ম করিয়াছি আমি ?

    আমার কুঁচকির ভাঁজে জনৈকা যুবতী হয়তো খুঁজিতেছিল স্বর্ণভাণ্ডার--

    জঙ্গলের বাহিরে আসিয়া যুবতীটি চিৎকার করিয়া সবারে কহিলা

    “এই দৈত্যের চাড্ডির ভিতরে ছাগু দেখা যায়, ইহা রাষ্ট্রবিরোধী”


     

    তানিয়া চক্রবর্তীর জন্য প্রেমের কবিতা

    কী নেই তোর ? মরুভূমির ওপর আকাশে পাখিদের তরল জ্যামিতি

    প্রতিবাদ -- বিপদের ঝুঁকি -- সম্ভাব্যতা-বিরোধ -- সমাক্ষরেখা --

    আমি তো লাল-ল্যাঙোট সাধু, আমি বাস্তব তুই বাস্তবিকা

    কুলু-মানালির পাইন থেকে ঝরাচ্ছিলিস সবুজ ছুঁচের গোছা

    ক্ষান্তি -- পূর্বপক্ষ -- ধাঁধা -- গূঢ়গুণ -- শিল্পবর্ম -- মেজাজ -- সন্দেহ

    আমি তো ছায়াফোঁকা সাধু, তুই যতোদিন আছিস, মরব না

    এক মিনিট দাঁড়া : “কোনো কিছু প্রিয় নয়”, মানে ?

    জানি রে জানি, অঙ্কুরের বোধ তার বীজে, অয়ি স্পন্দনসমঙ্গ

    আমি তো সীমাভাঙুনে সাধু, তোর রহস্য দখল করে দাম চুকিয়েছি

    চাপাতি দিয়ে কেটে যেসব মেঘ নামিয়েছিলিস, অক্ষরগুলোর শ্বাস

    বানান ভুলে যায়, ফি-সেকেন্ডে নাড়িঘাতের হার বাড়িয়ে দিস

    আমি তো বুনোপ্রেমিক সাধু, আমার প্রেম বদনাম করবে তোকে

    প্রাণচঞ্চল বাদামি পাথরের কাঁপুনি, অনুরণন, অয়ি প্ররোচনাময়ী

    অ্যানার্কি -- হাই ভোল্টেজ উল্কি -- ক্রিয়াপদ না বিশেষ্য বুঝতে পারি না

    আমি তো মাটিতে-পোঁতা সাধু, তুই খুঁড়ে তুলবি বিপদে পড়বি

    আমি ভাটিয়ালি গেয়ে বেড়াই, নৌকোর দাঁড় বাইনি কখনও

    আসলে গান তো নৌকোর, দাঁড়ের, নদীর স্রোতের, ভাটার টানের

    আমি তো তোকে-চাই-মার্কা সাধু, বাক্যদের উত্তেজিত কোন ম্যাজিকে করিস

    এক মিনিট দাঁড়া : “কাউকে ভালোবাসিনি” মানে ?

    অয়ি ফাঁদগর্ভা, যখন কাঁটাগাছের দিকে জিরাফের জিভ নিয়ে যাস

    আমি তো ভাঙা-গড়ার সাধু, পথ গুটিয়ে পাথর করে দিস

    পৃথিবী থেকে ছবি খুঁটে-খুঁটে নিজের ব্র্যাণ্ডের ছাপছোপ দিস

    টের পাই, কালো বিশ্ববীক্ষায় আমার নামের স্হায়ীত্ব নেই

    আমি তো সাধুপ্রেমিক তোর, পৃথিবীর কোনো নাম দিসনি কেন

    অয়ি শব্দমোহিনী, না-পড়েই উল্টে যাচ্ছি পাতার পর পাতা

    অস্হির কৌতূহলে এই কবিতাটা এগোচ্ছে, আর তোকে শুনতে পাচ্ছে

    আমি তো বাকমোহন সাধু, লিখিসনি তো প্রেম কেন ভিজে এবং গরম

    আসলে জীবন নষ্ট করার কায়দা সকলে জানে না, অয়ি দৃশ্যজীবিনী

    ঘুম থেকে উঠে হাই তুলিস, তোর রামধনু আলজিভ দেখি

    আমি তো খুনির খুনি সাধু, যথেচ্ছ খরচ করিস শব্দ-রজঃ-টাকা

    ম্যাডক্স স্কোয়্যারের কুঁজো পুরুতের ঢঙে তোর আরতি করি

    তোর ইঙ্গুজের বেদনা যন্ত্রণা ব্যথা কষ্ট প্যানিক দিয়ে

    আমি তো হাজারঠ্যাং সাধু, গাছেদের ঝোড়ো চিৎকার

    এক মিনিট দাঁড়া : “ব্যথা ছাড়া জীবনে আর কিছু নেই”, মানে ?

    তোর কথার হাঁফ-আকুলতা আমার হৃদরোগের কারণ

    আমি তো ২৪x৭ সাধু, ফলো করি ফলো করি ফলো করি

    মৃত্যু মানেই তো প্রতিশোধ, মানুষের হোক বা প্রেমের

    দেখেছিস তো যতো রাগি ঘুর্ণিঝড়, ততো সে দেশদ্রোহী

    আমি তো ল্যাঙোটখোলা সাধু, দেখি অনুভবকে আঙ্গিক দিচ্ছিস

    সঙ্গীত যেভাবে গানকে বিষাক্ত করে, আমার কপালে খুনির বলিরেখা

    ইটারনাল ব্লিস, রেড ওয়াইনে চোবানো তোর ছবির ঝুরো


     

    ম্যাডেলিন করিয়েট-এর জন্য প্রেমের কবিতা

    খামে-ভরা তোমার স্মৃতিকে ভাসানের জগঝম্প ভিড়ে

    জুহুর সমুদ্রের ঢেউয়ে শেষ চুমু খেয়ে

    বিসর্জন দিয়েলুম ম্যাডি, ম্যাডেলিন করিয়েট

    তিরিশ বছরের বেশি অফিসের কলিগেরা

    খামের ভেতরের স্মৃতি দেখে যা-যা বলেছি ওনাদের

    বিশ্বাস করেছে নির্দ্বিধায়, হা-হা, হা-হা, ম্যাডেলিন

    বাঘিনীর লোম মনে করে হাতে নিয়ে গালে চেপে

    মাথার ওপরে ভবিষ্যত উন্নত করবে বলে ঠেকিয়েছে

    ভেবে দ্যাখো ম্যাডেলিন, কত্তোজনের সমাদর পেলো

    গোলাপি তুলোট যোনি থেকে সংগ্রহ-করা

    সোনালি ঘুঙুরালি বালগুলো, জয় হোক, জয় হোক

    তোমার অক্লান্ত প্রেমের, নেশালগ্নে নিশাসঙ্গমের

    সিংহের বাঘের টিকটিকি কুমিরের দৈব-আঙ্গিকে


     

    সোনালী চক্রবর্তীর জন্য প্রেমের কবিতা

    ব্যথা জখমকে ভালোবাসে -- মাংসকে ভালোবাসে ব্যথা

    সাধু হয়ে গেছি তো, নিভিয়ার মাস্ক-পাউডার ছাই

    বাড়িতে ল্যাংটো ঘুরে বেড়াই -- পোড়ানো পাণ্ডুলিপির গন্ধ মেখে

    ভালোবাসাকে ভালোবাসি -- অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ --

    সুরের নোনতা খসড়া বাঁধি -- স্মৃতি দাও -- স্মৃতি দাও --

    উজবুক তাকাই ঈশ্বরীর ডিজিটাল অনুপস্হিতির ফ্রেমে

    নিকেলিত পূর্ণিমা, বেচারি ঈশ্বরী কেন এতো সুন্দরী !

    অবচেতনার খলিফার ফতোয়া -- আস্তিক হয়ে যা শিগ্গিরি --

    হায় -- ঈশ্বরী তো নিজেই নাস্তিক --

    বোকা নাকি -- সোনার হরিণ কেই বা চায় --

    লাভার ফুটন্ত বিছানায় -- খদিরচুল রূপসী -- নিঃসঙ্গতা আর বঞ্চনা --

    আব্রাহামের তিন ছেলের রক্ত আমার গায়ে কেন ?

    আমি তো ল্যাংটো খলিফা -- নিভিয়ার মাস্ক পাউডার ছাই

    পঞ্চবটির হাইপাররিয়াল জঙ্গল তোকে ঘিরে

    ভবঘুরে -- কুঁজোশঠ -- নুলো -- টোটোবেকার -- খোচর --

    নাঙবুড়ো -- লোফার -- নেশুড়ে -- মিথ্যুক -- জুয়াড়ি -- বেয়াদপ --

    রাজনর্তক -- জ্যোতিষী তোর বাঁ-হাত কখন থেকে ধরে রেখেছে --

    তুই তো এই শহর -- রাজপথ -- রাস্তা -- লেন -- বাইলেন --

    শেষই হতে চাস না শেষই হতে চাস না শেষই হতে চাস না

    ব্যথায় ঢালাই নিজেরই গড়া আদল -- সেই যুবক তো ? চিনি আমি !

    সেও তোর মাংসে ব্যথার মতন আঁকড়ে থাকেনি -- যেমন আমি --

    যখন সময় আসবে -- গায়ের সমস্ত পালক -- মখমল -- স্টিলেটো --

    ভুরু কোঁচকানো জাদু -- তোর হাতে বটল ওপনার কেন ?

    আমি তো সাধু হয়ে গেছি -- নিভিয়ার মাস্ক পাউডার ছাই --

    বাড়িতে ল্যাংটো ঘুরে বেড়াই -- প্রতিবেশিনীদের প্রিয় উন্মাদ --

    সত্যের দপদপানিতে ঘায়েল -- চোখ বুজি -- একদিন তো সব যাবেই --

    এখন নয় কেন ? খদিরচুল রূপসী ? তুই চাস নাকি সোনার হরিণ ?

    বিশ্বাস করিসনি -- ভয় পাসনি -- যা হয়নি তা তোর নাগালে -- চেষ্টা ছাড়িসনি

    ব্যথা মাংসকে ভালোবাসে -- আঘাতকে ভালোবাসে ব্যথা --


     

    সেতারা মাহবুব-এর জন্য প্রেমের কবিতা

    উত্তর-সত্যের এই গূঢ় জগতসংসারে

    শুভ-অশুভের বাইরে গোপন সুড়ঙ্গ এই প্রেমের কবিতা--

    প্রেম ? প্রেম তো সর্বনাশী খুনোখুনি যুদ্ধ হানাহানি রক্তপাত

    তার চেয়ে প্রেমের কবিতা চুপিসাড়ে সরকারি নথিপত্র ছাড়া পার হয়

    এ-সুড়ঙ্গে বহুযুগ ধর্মের চাপাতি-ত্রিশূলধারীরা মরে পড়ে আছে

    এ-সুড়ঙ্গে মতাদর্শের একনায়কেরা কখনও ঢুকতে পারে না

    এ-সুড়ঙ্গে নিকৃষ্ট পোশাক পরে হাঁটে না ক্যাটওয়াকের পেত্নীরা

    এ-সুড়ঙ্গে আমাদের অনুপস্হিতি হাত ধরাধরি করে এপার-ওপার প্রতিরাতে

    সীমার কাঁটাতার চেকপোস্ট এপার-ওপার ঘুষ এ-সুড়ঙ্গে নেই ; প্রেমের কবিতা

    রান্নাঘরে ঢুকে ফিসফিসে স্বরে বলবে তোমাকে, “সেতারা মাহবুব

    চলো, কেনই বা আমরা দু’জনে এই তাচ্ছ্ল্যঠাশা পৃথিবীর মনোরঞ্জনে

    জীবন নষ্ট করি ?” প্রভাবিত হওয়া কি আতঙ্কজনক ? ওয়েদিপাউসের

    ভুত এসে ঘাড়ে চেপে বলবে কি ইন্দ্রিয়ের বিলাসিতা থেকে

    বোধবুদ্ধি নির্বাসন দাও, বলো, বলো সেতারা মাহবুব, কী রেঁধেছ ?

    তোমাদের দেশে যাইনি কখনও, তাই, এখন সহজে কবিতার সুড়ঙ্গ দিয়ে

    পৌঁছে দেখছি, রেঁধেছ আমার জন্য মূলা দিয়ে দেশি কইমাছ,

    পাঙাশ মাছের ঝোল, চিংড়ি করলা দিয়ে, পাবদা-বেগুন,

    ইলিশ-খিচুড়ি, চাপিলা মাছের ফ্রাই, লইট্যা মাছের ঝুরো, কাচকি-টোম্যাটো

    এতো পদ আমার জন্য তুমি রাঁধো, খেতে তো ডাকোনি কোনোদিন --

    আমি তাকালেও, তুমি তো আমার দিকে চেয়েও দ্যাখোনি,

    তোমার বাড়ির পথ ভুলে যাই, দেখি ফুটপাথ জুড়ে কুয়াশা বিক্রি হয় --

    গলিগুলো সরু থেকে আরও সরু, রাস্তার থামের আলো

    সন্ধ্যা হলে নিজের ছায়াকে নিয়ে পাক খায়, উত্তর-সত্যের পৃথিবীতে

    চলে এসো চুপিচুপি, সেতারা মাহবুব, প্রতিটি মহাকাব্যে এভাবেই

    দু’জনের পালাবার সত্য লেখা আছে, ট্রয়ের জাহাজ ভেসে যাক, দেখা যাবে…


     

    ব্লাড লিরিক : অবন্তিকার জন্য প্রেমের কবিতা

    অবন্তিকা, তোর খোঁজে মাঝরাতে বাড়ি সার্চ হলো

    এর মতো ওর মতো তার মতো কারো মতো নয়

    যেন এমন যেন অমন যেন তেন নয়


     

    কী করেছি কবিতার জন্য আগ্নেয়গিরিতে নেমে ?

    একি একি ! কী বেরোচ্ছে বাড়ি সার্চ করে

    কবিতায় ? বাবার আলমারি ভেঙে ব্রোমাইড সেপিয়া খুকিরা

    কবিতায়। হাতুড়ির বাড়ি মেরে মায়ের তরঙ্গে ছেঁড়ে বিয়ের সুগন্ধী বেনারসি

    কবিতায়। সিজার লিস্টে শ্বাস নথি করা আছে

    কবিতায়। কী বেরোলো ? কী বেরোলো ? দেখান দেখান

    কবিতায়। ছি ছি ছি ছি, যুবতীর আধচাটা যুবা। মরো তুমি মরো

    কবিতায়। সমুদ্রের নীলগোছা ঢেউ চিরে হাড়মাস চেবাচ্ছে হাঙর

    কবিতায়। পাকানো ক্ষুদ্রান্ত্র খুলে এবি নেগেটিভ সূর্য

    কবিতায়। অস্হিরতা ধরে রাখা পদচিহ্ণে দমবন্ধ গতি

    কবিতায়। লকআপে পেচ্ছাপে ভাসছে কচি-বেশ্যা-দেখা আলো

    কবিতায়। বোলতার কাঁটা-পায়ে সরিষা-ফুলের বীর্যরেণু

    কবিতায়। নুনে সাদা ফাটা মাঠে মেটেল ল্যাঙোটে ভুখা চাষি

    কবিতায়। লাশভূক শকুনের পচারক্ত কিংখাবি গলার পালকে

    কবিতায়। কুঁদুলে গুমোট ভিড়ে চটা-ওঠা ভ্যাপসা শতক

    কবিতায়। হাড়িকাঠে ধী-সত্তার কালো-কালো মড়া চিৎকার

    কবিতায়। মরো তুমি মরো তুমি মরলে না কেন

    কবিতায়। মুখে আগুন মুখে আগুন মুখে আগুন হোক

    কবিতায়। মরো তুমি মরো তুমি মরো তুমি মরো তুমি মরো

    কবিতায়। এর মতো ওর মতো তার মতো কারো মতো নয়

    কবিতায়। যেন এমন যেন অমন যেন তেমন নয়

    কবিতায়। অবন্তিকা, তোর খোঁজে সার্চ হলো, তোকে কই নিয়ে গেলো না তো !.


     

    মহেঞ্জোদারোর মেটেল কিশোরীর জন্য প্রেমের কবিতা

    কী গণিত কী গণিত মাথা ঝাঁঝা করে তোকে দেখে

    ঝুঁকে আছিস টেবিলের ওপরে আলফা গামা পাই ফাই

    কস থিটা জেড মাইনাস এক্স ইনটু আর কিছু নাই

    অনন্তে রয়েছে বটে ধুমকেতুর জলে তোর আলোময় মুখ

    প্রতিবিম্ব ঠিকরে এসে ঝরে যাচ্ছে রকেটের ফুলঝুরি জ্বেলে

    কী জ্যামিতি কী জ্যামিতি ওরে ওরে ইউক্লিডিনী কবি

    নিঃশ্বাসের তাপ দিয়ে লিখছিস মঙ্গল থেকে অমঙ্গল

    মোটেই আলাদা নয় কী রে বাবা ত্রিকোণমিতির জটিলতা

    মারো গুলি প্রেম-ফেম, নাঃ, ফেমকে গুলি নয়, ওটার জন্যই

    ঘামের ফসফরাস ওড়াচ্ছিস ব্রহ্মাণ্ড নিখিলে গুণ ভাগ যোগ

    আর নিশ্ছিদ্র বিয়োগে প্রবলেম বলে কিছু নেই সবই সমাধান

    জাস্ট তুমি পিক আপ করে নাও কোন প্রবলেমটাকে

    সবচেয়ে কঠিন আর সমস্যাতীত বলে মনে হয়, ব্যাস

    ঝুঁকে পড়ো খোলা চুল লিপ্সটিকহীন হাসি কপালেতে ভাঁজ

    গ্যাজেটের গর্ভ চিরে তুলে নিবি হরপ্পা-সিলের সেই বার্তাখানা

    হাজার বছর আগে তোর সে পুরুষ প্রেমপত্র লিখে রেখে গেছে

    মহেঞ্জোদরোর লিপি দিয়ে ; এখন উদ্ধার তোকে করতে হবেই

    বহতা অংশুমালী, পড় পড়, পড়ে বল, ঠিক কী লিখেছিলুম তোকে--

    অমরত্ব অমরত্ব ! বহতা অংশুমালী, বাদবাকি সবকিছু ভুলে গিয়ে

    আমার চিঠির বার্তা তাড়াতাড়ি উদ্ধার করে তুই আমাকে জানাস


     

    শরীরের জন্য প্রেমের কবিতা

    সমস্ত শরীর জুড়ে ভালোবাসবার জন্য যতো ত্বক আছে

    প্রতিটি একই সাথে অত্যাচার করার উপযুক্ত এলাকা

    যেখানে পালক দিয়ে আদর করলে পরে আনন্দ হয়

    সেখানে ছুরির তীক্ষ্ণ খোঁচানি অসহ্য যাতনা দিতে পারে


     

    খালাসিটোলার জন্য প্রেমের কবিতা

    খেয়েছেন ? এবার বুঝতে পারছেন, কতো ক্ষতিকর সময় ব্যাপারটা ?

    এর সংজ্ঞা হলো ‘নেই’। সময় নেমে যাচ্ছে গলার ভেতর দিয়ে, স্রেফ

    অভিকর্ষের খেলা, না থাকতো যদি, তাহলে বাংলা মদ

    নামতে পারতো না। মদের অধঃপতন মানে আপনার নয়।

    বাংলা মদ হলো অস্তিত্বের শীঘ্রপতন, কবিতার ছোটোছেলে

    ঢিল ছুঁড়ে যতোই মারুন, উনি শব্দ বাক্য অক্ষরের ড্রাগলর্ড

    হ্যাঙোভারে উন্মাদের অ্যানথেম মগজে গাইছেন, পানুসুন্দরী

    স্লোমোশান আনবিক মাশরুম, খালাসিটোলার সেই হিসি-গরম

    বোতল থেকে ঢোল-তাশার পার্টি, সময় চলিয়া যায়, এবং

    গোঁফ দাড়ি গজায় যা প্রেমিকার গালে ফোটে, উফ, শালা

    কামাতে পারিস না ! তখন শিশুর পোঁদে চুমু খাবার মতো স্বর্গ হয় না !

    ব্রেকফাস্টে সালামি আর বিফস্টিক, শালারা কান্না চোলাই করে বিক্রি করে।

    হে কালীয়দমন নীলঠ্যাঙ ধান্যেশ্বর, আপনার দেহখানা রাখলেন কোথায় ?

    দেহহীন পায়ের শব্দহীন পায়চারি, এর সংজ্ঞা হলো ‘নেই’--

    কেননা কখন সূর্য ওঠে তা জানা খুবই কঠিন, সূর্যও কামিনা কোথাকার--

    সূর্য তো মাথার ওপরে ওঠে, যখন ছায়ায় পা রেখে দাঁড়িয়ে মাতালেরা--

    কাকেরা কি কাকভোরে ওঠে ? তাহলেই বুঝতে পারছেন

    সময় ব্যাপারটা কতো ক্ষতিকর। বুঝতে বাধ্য করে যে আপনার

    রয়েছে মদ্যপের প্রতিভা ; পৃথিবীর কিনার ওব্দি গড়িয়ে যাবার--

    আচ্ছা জোকার তো ! বেশ্যা বলে কি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবে না !

    যতো তরল তোতলামি আপনার, মাইনে-করা সন্ধ্যা চাকরানি নাকি

    বললেই নক্ষত্র ছড়িয়ে দেবে ? বাংলা মদের প্রাণ খুবই গোপন, বুঝলেন

    বলতে পারেন অপ্সরার যোনির মতন, কখনও দেখার সুযোগ হবে না

    অথচ, ধান্যেশ্বর হয়ে সেখানে চুমু খেতে পারবেন। জয় হো।


     

     

    নীরা’র জন্য প্রেমের কবিতা

    উনি আমাকে পছন্দ করতে বারণ করেছিলেন

    আপনি কেন পছন্দ করছেন, নীরা ?

    আমি আজও শুঁয়াপোকা-ঠাশা ঈশান-মেঘে চিৎ-সাঁতার দিই

    উনি পঞ্চাশ বছর আমার কাছে কবিতা চাননি

    আপনি কেন চাইছেন, নীরা ?

    আমি আজও জলের দশ-পা গভীরে বরফের লাঠি চালাই

    উনি আমার সাবজুডিস মামলায় খোঁচা দিয়ে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন

    আপনি সম্পাদক হয়ে কেন লেখা চাইছেন, নীরা ?

    আমি আজও স্মোকড পেংগুইনের চর্বির পরোটা খেতে ভালোবাসি

    উনি আমার কবিতার বইয়ের প্রকাশক হয়েও স্বীকার করেননি

    আপনি কেন স্বীকৃতি দিচ্ছেন, নীরা ?

    আমি আজও দুপুর-গেরস্তের হাঁমুখে সেঁদিয়ে ফ্যামিলিপ্যাক হাই তুলি

    উনি আমার নাম উচ্চারণ করতে চাইতেন না

    আপনি কেন তরুণদের কাছে করছেন, নীরা ?

    আমি রক্তঘোলা জলে টাইগার শার্কদের সঙ্গে বলিউডি নাচে গান গাই

    উনি বলেছিলেন ওর মধ্যে সত্যিকার লেখকের কোনো ব্যাপার নেই

    আপনি কেন মনে করছেন আছে, নীরা ?

    আমি ইমলিতলায় জানতুম কাঠকয়লা ছাড়া ইঁদুরপোড়ায় স্বাদ হয় না

    উনি বলেছিলেন ওর কোনো ক্রিয়েটিভ দিক নেই

    আপনি কেন মনে করছেন আছে, নীরা ?

    আমি অন্তত ৫০০০ কোটি টাকার ব্যাঙ্কনোট পুড়িয়ে মড়ার গন্ধ পেতুম

    উনি বলেছিলেন ওর দ্বারা কোনোদিন কবিতা লেখা হবে না

    আপনি কেন মনে করছেন হয়েছে, নীরা ?

    আমি আমস্টারডামের খালপাড়ে হাঁ-করা বুড়োদের লিরিক শুনেছি

    উনি সেসময়ে দুঃখ থেকে রাগ আর রাগ থেকে বিতৃষ্ণায় উঠেছেন

    আপনি এতো উদার কেন, নীরা ?

    আমার ঠাকুমাকে যেন প্লিজ বলবেন না।


     

    মেরেলিন মনরো’র জন্য প্রেমের কবিতা

    মুম্বাই বিমানবন্দরে আপনার হাতে সাড়ে সাত মিনিট সময় ছিল

    আরনেস্তো কার্দেনাল, কথা বলার জন্য, হ্যাণ্ডশেক করার, জড়িয়ে ধরার--

    গ্রাসিয়াস সেনর, গ্রাসিয়াস সেনর, শুনে বুঝে গেলেন, এবার ইংরেজিতে

    সরকারি অতিথি আপনি, আমার এনসিসি’র বেরে-টুপিটা দিলুম

    আপনি মাথায় পরে হাসলেন, আপনার সান্দিনিস্তা হাতে কড়া পড়েনি, নরম

    মেরেলিন মনরোকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন, বললুম, জানেন, আমি একবার

    চুমু খেয়েছিলুম মেরেলিন মনরোকে, টিভির কাচে ওর ঠোঁটের ওপর

    মুর্গির কাঁচা মাংস রেখে, চোখ বুজে, যেমন আপনি বিমানবন্দরে পোপের সামনে

    নতজানু হয়েছিলেন, আমিও টিভির সামনে হাঁটু গেড়ে, অ্যানার্কিস্ট

    বংশের দোষ, আমার দাদুর বাবাও অ্যানার্কিস্ট ছিলেন, বিধবা বিয়ে করেছিলেন

    আপনার হাতে চুমু খেলুম, মুর্গির মাংসের মতন ঠাণ্ডা, আপনি একজন মন্ত্রী,

    পাদ্রি, কবি, মেরেলিন মনরোকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, আপনার দাড়ি যখনই

    চোখের সামনে ভেসে ওঠে, মেরেলিন মনরোকে চুমু খাবার স্মৃতি, আহ,

    ঠাণ্ডা, নরম, অ্যানার্কিস্টদের চুমু খাবারও জ্ঞানগম্যি নেই,

    চোখ বুজে মেরেলিনের যোনি দেখি, অপরিবর্তনীয়া অপরিবর্তনীয়া

    অপরিবর্তনীয়া অপরিবর্তনীয়া, অ্যানার্কিস্ট ঠোঁটের লালা, আরনেস্তো,

    শেষ পর্যন্ত সান্দিনিস্তাদের সম্পর্ক ঘুচিয়ে দিলেন, পোপ আপনাকে

    ক্ষমা করে দিয়েছেন, আমি কিন্তু মেরিলিনের চুমুকে ত্যাগ করিনি


     

    স্বচ্ছ দেওয়াল, তরুণ-তরুণীর জন্য প্রেমের কবিতা

    সে দেওয়াল কেমন দেখতে জানে না

    দেওয়ালটা যার সেও কখনও জানেনি

    সে কেবল জানে রয়েছে দেওয়ালখানা

    বাঁচিয়ে রাখছে সেই যুবকের জন্য

    যাকে সে ভাঙতে দেবে

    যুবকেরা তবু গলদঘর্ম হয়

    স্বচ্ছ একটা পাতলা দেওয়াল ভাঙতে

    হাজার-হাজার বছর যাবত চলছে দেওয়াল ভাঙা

    রক্তের সাথে রসের তৈরি সেই দেওয়াল

    যার ভাঙে তার গর্ব ধরে না

    যে ভাঙছে তারও অহমিকা নাচে ঘামে

    রসের নাগর খেতাব মিলেছে প্রেমিকের

    প্রেমিকা দেখাবে চাদরে রক্ত লেগে

    অধ্যবসায়ে সময়ের সাথে লড়ে

    দেওয়াল ভাঙার সেকি আনন্দ দুজনেরই

    যে ভাঙল আর যার ভাঙা হলো সেলোফেন ফিনফিনে

    দেওয়াল না ভেঙে মানুষ জন্মাবে না, তাই

    সব দেওয়ালই স্বচ্ছ মাংসে গড়া, সেলোফেনে হোক

    কিংবা লোহার ইঁটের অদৃশ্য সীমারেখার

    প্রেমের ঘামেতে ভিজিয়ে সেটাকে ভেঙে ফেলা দরকার


     

    আমার স্বদেশ, বাংলা ভাষার জন্য প্রেমের কবিতা

    আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে আদিবাড়ি উত্তরপাড়া আমার দেশ নয়

    জানি গঙ্গায় অপরিচিতজনের চোখ খোবলানো লাশ ভেসে আসে

    আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে পিসিমার আহিরিটোলা আমার দেশ নয়

    জানি পাশেই সোনাগাছি পাড়ায় প্রতিদিন তুলে আনা কিশোরীদের বেঁধে রাখা হয়

    আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে মামারবাড়ি পাণিহাটি আমার দেশ নয়

    জানি কোন পাড়ায় দিনদুপুরে কাদের খুন করা হয়েছে

    আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে শৈশবের কোন্নোগর আমার দেশ নয়

    জানি কারা কাদের দিয়ে গলা কেটে মারতে পাঠায়

    আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে যৌবনের কলকাতা আমার দেশ নয়

    জানি কারা কাদের বোমা মারে বাসে-ট্রামে আগুন লাগায়

    আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে পশ্চিমবঙ্গ আমার দেশ নয়


     

    এদেশের লকআপে পিটুনি খেয়ে থেঁতলে মরার অধিকার আমার আছে

    এদেশের চা-বাগানে না খেতে পেয়ে দড়িদঙ্কা হবার অধিকার আমার আছে

    এদেশের চটকলে গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলার অধিকার আমার আছে

    এদেশের দলগুণ্ডাদের পোঁতা মাটির তলায় হাড় হবার অধিকার আমার আছে

    এদেশের ধনীদের ফাঁদে ফেঁসে সর্বস্বান্ত হবার অধিকার আমার আছে

    এদেশের শাসকদের বাঁধা লিউকোপ্লাস্ট মুখে বোবা থাকার অধিকার আমার আছে

    এদেশের নেতাদের ফোঁপরা বক্তৃতা আর গালমন্দ শোনার অধিকার আমার আছে

    এদেশের অবরোধকারীদের আটকানো পথে অ্যাম্বুলেন্সে হার্টফেল করার অধিকার আমার আছে

    আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে বাংলা ভাষা আমার স্বদেশ নয়


     

    আধুনিকতার স্মৃতি, পার্সি বউটির জন্য প্রেমের কবিতা

    যুবক শিমুল, শকুনেরা হেগে-মুতে স্মৃতিহীন করেছিল তোকে

    হাড়গিলে শিড়িঙ্গে একলা দাঁড়িয়েছিলিস, গাছের মুমূর্ষু কঙ্কাল

    কোনো পাখি গান গেয়ে তোকে ভালোবাসতো না --

    শকুনেরা বংশহীন হলো আর দ্যাখ, স্মৃতি ফিরে পেলি তুই

    সবুজ পাতায়, ফুলে-ফলে ফাল্গুনের উড়ন্ত রোঁয়ায় --

    পার্শি বধুটির শব শুয়ে আছে সেজে, আজকে পার্শি নওরোজ


     

    জোকারদের জন্য প্রেমের কবিতা

    যা ইচ্ছা লিখুন আপনারা, গালমন্দ, খিল্লি, খিস্তোনি

    আমি চাই, শুধু, ব্যাস, লেখা হোক, কিছু লেখা হোক

    লিখে যান, আশ মেটান, কিছুটা কুখ্যাতির অংশ

    বিলিয়ে তো যাই, নিন, নিন, হাত পাতুন, কিংবা মাথাটা

    কলমে বা কমপিউটারে ঝেড়ে দিন সুযোগ পেলেই

    আমি জানতে চাইব না, কে আপনার বাবা ছিল

    কে ছিল পাথরে বীর্য থেকে জন্মানো দুর্বাসার কাগুজে বিদ্বান

    পঞ্চাশ বছরের বেশি লিখে তো যাচ্ছেন, এখনো আপনারা

    তার আগে আপনার বাবা মেসো পিসে কাকা খেঁকুরে দাদারা

    এভাবে চলুক, যতো যুগ আপনারা চালিয়ে যাবেন

    আরও পঞ্চাশ, আরও একশো, আরও কয়েকশো বছর

    বাংলা সাহিত্য আপনার বংশে যখন আর কেউ পড়বে না

    তবুও আপনার বংশধরেরা আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন

    খিস্তিয়ে, গালমন্দ করে, খিল্লি উড়িয়ে, এইটাই চাই

    ব্যাস, আমি চাই চলতে থাকুক, চলতে থাকুক, চলুক, চলুক

    সার্কাস জোকারদের রঙ্গতামাশা


     

    বাঘিনীর জন্য প্রেমের কবিতা

    বাঁশে চার-থাবা বাঁধা মরা-বাঘিনীর ঘুষঘুষে বুকে

    উপুড় শুয়ে পড়ি পূর্ণিমার শিশির-ভেজা রাতে

    আমার উলঙ্গ ঘ্যামা স্খলিত সত্তা মুড়ে

    বাঘিনীর মাইয়ের বোঁটা মুখে কান্না পেয়ে গেল

    দুধহীন চুযি আর বেহেড ফোঁপাতে থাকি

    ক্রমে লিঙ্গ জেগে ওঠে, কান্না বন্ধ হয়

    বাগিনীর যোনিতে মুখ রেখে বলি, ভালোবাসি তোকে

    অবন্তিকা, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি


     

    জুতোর জন্য প্রেমের কবিতা

    জুতো পরে হাঁটছিলুম

    যাতে পায়ে কিছু না ফোটে--

    আর হাঁটতে পারছি না

    জুতোর ভেতরের পেরেক ফুটছে


     

    নেভো মোম নেভো, লেডি ম্যাকবেথের জন্য প্রেমের কবিতা

    আপনি আমার প্রিয় নারী, যদিও শুধুই শুনেছি ঘুমন্ত কন্ঠের কালো

    ফিল্মে দেখেছি, আগুন-নগ্নিকা, বুক দুটো অতো ছোটো কেন

    দুঃখ হয় না কি ? আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল বুক ছোটো বলে

    হত্যা করতে গিয়ে কিছুটা ঝুঁকলেন নয়তো বুক উঁচু করে বলতেন

    যা করি তা করি প্রেত তোর তাতে কি তুই কি ঘুমের ইন্দ্রজালে

    শুধু বুক খুঁজে বেড়াস নাকি ! সত্যিই তাই, আপনার ঘুমে ঢুকে

    তাছাড়া কি খুঁজবো বলুন, ফেরার ট্যাক্সিভাড়া ? গ্যাসের রসিদ ?

    যা ইচ্ছে করুন আপনি, জেনে নেবো, চলন্ত গাছেরা বলে দেবে,

    না জানলেও আকাশ তো ভেঙে পড়ছে না, আপনি আমার প্রিয় নারী

    মন খারাপ করে দিলেন আজকে বৃষ্টির দিনে, ছাতাও আনিনি

    আপনার পাশ দিয়ে যেতে যেতে ছাতার আড়াল থেকে আপনার

    ছোট্টো দুটো বুক জরিপ করে নিতে পারি, ব্র্যাঙ্কোর প্রেত আমি

    ছোরাদুটো নিলেন দুহাতে তুলে, মনে হয়েছিল বুকের গরবিনি, হত্যা

    নেহাতই অযুহাত, কেউ তো আর মনে রাখবে না, উনিও জানেন

    তোমাকে দেখেই চুমু খেতে ইচ্ছে করেছিল, না না, হাঁমুখের ঠোঁটে নয়

    পাছার দু-ঠোঁটে, আহা কি মসৃণ হতো রাজরানি হওয়া, যেন ইস্কাপন

    নষ্ট করে নেচে উঠছে বিদ্যুতের খ্যাতি, যার অস্তিত্বে আমি বিশ্বাস করি না

    খুলে বলি আপনাকে, আমি কিরকমভাবে নারীকে খুঁজি তা বলছি শুনুন.

    যেমন ঘোড়দৌড়ের জুয়াড়িরা ঘোড়ার রেসবই খুঁটে-খুঁটে পড়ে

    আমার ভেতরে সেরকমই পোষা আছে অভিজাত কয়েকটা অসুখ

    বুঝলেন, যখন প্রথম পড়ি প্রেমে পড়ে গিসলুম নগ্ন আপনার !

    লেডি ম্যাকবেথ ! আহা কি শঙ্খিনী নারী, কি ডাগর রক্তময়ী চোখ

    ঘুমন্ত হেঁটে যাচ্ছো মৃত্যুর মসলিনে সম্পূর্ণ পোশাকহীন কোনো খেয়াল নেই

    চেয়েছি জড়িয়ে ধরতে, বলতে চেয়েছি, লেডি, লেডি, নগ্ন পশ্চিমে

    একটা চুমু শেষবার দাও, পুরস্কার নিয়ে ডাইনিরা দাঁড়িয়ে রয়েছে

    রক্তাক্ত ছোরার সঙ্গে কথা বলো, বুকের নির্দয় ওঠা-নামা, লেডি

    ম্যাকবেথ, ওই যিনি ছোটো বুকে মনটা খারাপ করে ফিরছেন বাড়ি

    ওনাকে উৎসাহিত করো, বলো, আরবের সমস্ত আতর ধুতে পারবে না

    হত্যার মিষ্টি গন্ধ, যেমনই লোক হোক সে তো তার নিজস্ব দৈত্যের সৃষ্টি

    তেমন নারীও, আত্মজীবনীতে লিখবেন কিন্তু প্রথম হস্তমৈথুনের স্বাহা

    ক্লিটোরিসে অঙ্গুলিবাজনার মৃদু উগরে তোলা ঝর্ণাঝংকার

    আপনার নগ্নতার ব্যক্তিগত ছন্দ লেডি ম্যাকবেথের মতো হাঁটছেন

    কলকাতার রাস্তা দিয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ, আমাকে চিনতে পেরেছেন ?

    আমি ব্যাঙ্কোর প্রেত, প্রতিটি হত্যাদৃশ্যে উপস্হিত থেকে

    বুকের বর্তুলতা মাপি, যবে থেকে স্কুলপাঠ্য বইয়ে দুরূহ লেগেছিল

    লেডি ম্যাকবেথের লোভ সিংহাসনে রাজমহিষীর মতো উঁচু বুকে

    বসে আছো, স্কুল ফেরত সম্পূর্ণ উলঙ্গ তুমি হাঁটছো পাশাপাশি

    ঘুমন্তকে নয় ঘুমকে খুন করেছিলে তুমি, চিৎকার করছিলে

    “কে জানতো বুড়ো লোকটার গায়ে এতো রক্ত এতো রক্ত ছিল !”

    এসবই আপনার নারীত্বের রক্ত ছোট্টো দুটো বুকের দুঃখের

    ভাববেন না বেশি, যৌবন ফুরোবার সঙ্গে এই দুঃখ চলে যাবে

    তখন দেখবেন ক্লিটোরিস সাড়া দিচ্ছে না, রসশাস্ত্রহীন দেহ

    আদিরস প্রথমে লোপাট, ঘুমন্ত হাঁটবার আহ্লাদ নামছে দুঃস্বপ্নে

    আপনার ছোটো বুক ছোট্টোই থেকে যাবে যতোই উদার হোন

    ভিখিরি দেখলেই বটুয়াতে কয়েনের ওজন কমান, লেডি ম্যাকবেথ

    ছাড়বে না, উচ্চাশার কি দুর্দশা, হাতে রক্ত, নেভো মোম নেভো


     

    মনকেমনের জন্য প্রেমের কবিতা

    কেমন করে বেঁচে থাকতে হবে শেখা বেশ কঠিন, শেখা মানে ‘চলে যাচ্ছে

    টাইপ’ নয়, যা বলতে চাইছি, অভ্যস্ত হতে সময় লাগে, তাছাড়া

    গর্ত দেখলেই কান পাততে ইচ্ছে করে

    ঘটনার, জিনিসের, কথার মানেগুলোকে একজায়গায় জড়ো করে

    প্রাসঙ্গিক মানুষদের বুঝতে পারা আরও কঠিন, আমি চেষ্টা করি

    লেগিংস-পরা মেছোবক, এই কপাৎ, ঢুকেছে কি ? কষ্ট হল?

    দেখেছি, গাঁজা-চরস ফোঁকা ছেড়ে দেবার পর বেশ কিছুকাল শোকে

    আক্রান্ত ছিলুম, তার কারণ নিজেকে খারাপ প্রমাণ করা আর

    বাইশ শতকের চুমু এরকমই শামুকের নিঃশর্ত লালা

    প্রমাণ করার পর তার প্রভাবকে সহ্য করা সহজ ছিল না, গোপনীয়তা

    কাউকে বলার মতন নয়, যাবতীয় ভোগান্তি একার, যেমন ধরুন

    ইংরেজিতে ‘পুসি’ শুনতে ভাল্লাগে বাংলায় বড্ডো অশ্লীল

    যে কমিউনিস্টরা রুবলের লোভে রাশিয়ায় গিয়ে ডেরা বেঁধেছিল

    আধপেগ ভোদকা চুইয়ে চেটে দেখেছেন নাকি

    বাবা তাদের কাউকে ক্ষমা করতে পারেননি, বলতেন লেনিনখোসা

    অথচ বাবা জানতেন আমি উপন্যাস লিখছি আর বানানো চরিত্রে

    বেমালুম ঢুকে পড়ছি, চরিত্রগুলো জানতে পারছে না, রেগে

    বিশেখুড়োর তোলা কাকিমার নগ্নিকা ফোটোর অ্যালবামে

    যাওয়ায় আনন্দ আছে, অলৌকিক ক্ষিপ্তাবস্হাকে ন্যায্য মনে হয়, নয় কি

    যে পরিবারগুলো নিজেদের মার্জিত গুণের মালিক মনে করতো

    এমন ডবকাগুদো পাৎলিকোমর যাকে নিয়ে ছেলেরা লড়ে না

    মা তাদের পছন্দ করতেন না, বলতেন, ওদের সঙ্গে মিশিসনি, আমার

    বাবা-মা বেশ রাশভারি ছিলেন, সৎ থাকার কথা বলতেন, আমি

    লেসবিয়ান কমিউনিস্টের প্রেমে পড়লুম, যখন ২০-৩০ বছরে

    এখনকার মতন এসকর্টস আর হাইফাই মডেল যৌনকর্মীর উড়ুক্কু

    চল শুরু হয়নি, আমার লুঙ্গি-রুমমেট করিম গ্যাসের উনুনে

    মুর্গিটা পুড়িয়ে তারপর রাঁধতো যাতে আগুন রক্ত খেয়ে নেয়

    পাঁঠা কিনে আনলে জলে ভিজিয়ে রাখতো, যাতে রক্ত জলে মিশে যায়

    মইনুদ্দিন মৌলবি বলেছিলেন, অমন নির্দেশ কোথাও নেই, স্বাদ

    শেষকালে বিকেলের কন্ঠস্বর কাঁকুরে হয়ে যাবে, স্বপ্নেরা বিমূর্ত

    ওইখানে ঠোঁট রেখে দপদপ ধ্বনি খাই ওগো মাংসল আওয়াজ বেজে ওঠো

    নিয়ানডারথাল চুলে ঢাকা মাসান্তে চুনির নদী পোখরাজি অবরেসবরে

    ফেঁপে কেঁদে ওঠো জয়-মা আঠাকালী বাইসাইকেল দেহ

    এক টনের আঠারো ডিগ্রি শীতে ডিউ ডেটের আগে পিল খেতে হবে

    দেহের টাইমফ্রেম সাকুল্লে তিরিশ বছর ধরো

    কতোজন পুরুষের মাংসখণ্ড এলো আর গেলো ভেবেছো কখনো ?

    চব্বিশকে ছয় দিয়ে গুণ করুন আর তাকে তিরিশ দিয়ে এটা মিনিমাম


     

    উর্বশীর ডেথ সার্টিফিকেট, উর্বশীর জন্য প্রেমের কবিতা

    বললুম...হ্যাঁ...পুরো শরীরটাই দেখতে চাই...চাদর সরিয়ে দিন...ডোম বলল ‘তার জন্য টাকা লাগবে’...লাশ চিনতে পুরো শরীর দেখার দরকার হয় না...আমার দরকার আছে, বললুম...মুখ তো বহুবার দেখেছি...শরীর দেখতে দেয়নি...বুকও নয়...আর ইয়ে...মহিলা ডাক্তার বলল, কান্টও নয়, তাইতো...লজ্জা পাচ্ছেন মর্গে ঢুকেও...কেমন প্রেমিক আপনারা...বললুম, নাহ, আমি প্রেমিক বই...ভেতরের জামা পরত না ইজের পরত না জানি...নিজে গান গাইতো না...শুনে-শুনে নাচতো...ঘামতো বলে লনজারি পরতো না...ত্বকে র‌্যাশের ভয়ে...কুড়িজন মরা মানুষের গন্ধ...পাঁঠা কিনতে এসেছি যেন...তাহলে আপনি ওনার কে হন...আমি ওনার মাছরাঙা ফিঙেফড়িং দাঁড়কাক পলাশফুল পানকৌড়ি যা ইচ্ছে লিখতে পারেন...যমালয়ের দুর্গন্ধ...উনি নিজের নাম উর্বশীতে দুটো ব ব্যবহার করতেন না একটা...পদবী বন্দ্যোপাধ্যায়ে য-ফলা দিতেন কিনা জানেন...ভালোবাসার ন্যারেটিভে এগুলো কি অবান্তর প্রশ্ন নয়...শহুরে লজ্জা ঢাকতে হিপ-পকেট থেকে রুপোর নিপ বের করে এক ঢোঁক...শ্বাসের স্মৃতি বলতে ওর ‘না’ বলবার প্রতিভা ছিল...নিজেকে এড়াতে আয়না দেখতো না...পোস্টমর্টেমের সময়ে যোনির আর বগলের চুল কাইন্ডলি শেভ করে আমায় দেবেন...ডেথ সার্টিফিকেটের সঙ্গে রেখে দেবো...এটুকুতো অন্তত প্রাপ্য...এই কবিতাটা কোথায় গিয়ে থামবে...সুন্দরবনের মোহনায়...ছাই ভাসুক...ছাই ভাসুক...ভেসে যাক কুমিরের ঝাঁকে...


     

    অবন্তিকার শতনামের জন্য প্রেমের কবিতা

    আমি অবন্তিকার দুটো মাইয়ের নাম দিয়েছি কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া --- বাঁদিকেরটা আদর করলেই গোলাপি হয়ে যায় --- ডানদিকেরটা আদর করলেই হলদেটে রঙ ধরে --- বাঁদিকের বোঁটার নামকরণ করেছি কুন্দনন্দিনী --- বঙ্কিমের বিষবৃক্ষ তখন ও পড়ছিল চিৎ শুয়ে --- ডানদিকের বোঁটার নাম ও নিজেই রেখেছে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার সে লোকটা সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের ডিটেকটিভ --- ডিটেকটিভ বই পড়তে ওর জুড়ি নেই --- ছুঁলেই কাঁটা দিয়ে ওঠে তাই --- পল গঁগার আঁকা তিনকোনা মাই ওর পছন্দ নয় --- মধুবালার মতন গোলাপি মাই ওর পছন্দ নয় --- পেইনটিঙের নাম রাখা গেল না --- যোনির কি নাম রাখবো চিন্তা করছিলুম --- অবন্তিকা চেঁচিয়ে উঠল পিকাসো পিকাসো পিকাসো --- পিকাসোর যোনির কোনো আদল-আদরা নেই --- কখনও বাদামি চুল কখনও কালো কখনও কিউবিক রহস্য --- তাহলে ভগাঙ্কুরের --- ও বলল সেটা আবার কি জিনিস --- ওর হাত দিয়েই ছুঁইয়ে দিতে বলল অমঅমঅমঅম কি দেয়া যায় বলোতো --- পান্তুয়া চলেবে --- ধ্যুৎ --- রস মানেই পান্তুয়া নাকি আরও কতোরকমের মিষ্টি হয় --- ছানার পায়েস --- নারকেল নাড়ু --- রসমালাই --- নকশি পিঠা --- রাজভোগ--- লবঙ্গলতিকা --- হলদিরামে ভালো লবঙ্গলতিকা পাওয়া যায় --- আমি বললুম স্বাদটা কিছুটা নোনতা --- ও বলল দুর ছাই আমি নিজে টেস্ট করেছি নাকি যাকগে বাদ দে --- হ্যাঁ --- এগোই --- পাছার কি দুটো নাম হবে --- ডিসাইড কর --- ডিসাইড কর --- তুই কর আমি তো দেখতে পাচ্ছি না --- না না ফের ফের --- লাবিয়া নোনতা হলেও ওটার নাম দিলুম গোলাপসুন্দরী --- পারফেক্ট হয়েছে --- তাহলে পাছার একটাই নাম দিই নরম-নরম কোনো নাম --- পাসওয়র্ড --- ঠিক --- এর নাম দেয়া যাক পাসওয়র্ড --- ধ্যাৎ --- পুরো রোম্যানটিক আবহাওয়া ফর্দাফাঁই করে দিচ্ছিস --- গ্যাস পাস হয় বলে পাসওয়র্ড হতে যাবে কেন --- ছিঃ --- তাহলে এর নাম হোক গরমের ছুটি --- গরমে বেশ ভাল্লাগে পাউডার মাখিয়ে পাছায় হাত বোলাতে --- ওকে --- তারপর --- ঘুমোবো কখন --- বাঁ-উরুর নাম দিই ককেশিয়া --- ডান-উরুর নাম দিই লিথুয়ানিয়া --- রাশিয়ানদের উরু দারুণ হয় বিশেষ করে শীতকালে যখন ওরা চান করে না --- ভোদকা খেয়ে ভরভরিয়ে প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে গন্ধ ছাড়ে --- শুয়েছিস নাকি কখনও রাশিয়ান মেয়ের সঙ্গে --- না কল্পনার যুবতীদের ইচ্ছেমতন হ্যাণ্ডল করা যায় --- ছাড় ছাড় --- এগো --- মানে --- নামতে থাক --- তাড়াতাড়ি কর নইলে গাধার দুলাত্তি দেবো --- তাহলে পায়ের নাম রাখছি জিরাফ --- বামপন্হী জিরাফ আর দক্ষিণপন্হী জিরাফ --- এবার ওপরে আয় --- মুখে --- ঠোঁট ? --- ঠোঁটের নাম দিই আফ্রিকান সাফারি --- আচ্ছা ! ঠোঁটের নাম আফ্রিকান সাফারি ? --- ব্লোজবে খণ্ড-খণ্ড মাংস ছিঁড়ে খাবো --- খাস --- থুতনিতে সেকেন্ড চিন ! পিৎজা-কোক খাওয়া থামা --- থুতনির নাম দিই গোলাপজাম --- কেন কেন কেন --- পরে বলব --- এখন দুচোখের নাম দিই --- শতনাম হলো না তো --- চোখ বোজ চোখ বোজ --- তুই তো একশোসমগ্র আবার শতনামের কি দরকার --- তাহলে আয় --- আজ তুই ওপরে না নিচে?


     

    শবদেহ’র জন্য প্রেমের কবিতা

    এলোচুল ছড়িয়ে শব হয়ে বেঁচে আছো লিরোচকা তুমি

    দু’দিকে বিপ্লবী দু হাত ছড়িয়ে, কোনো আঙুলে নখ নেই শ্বেতাঙ্গীর চেয়েও শাদা

    পায়ের হাতের বিচ্ছিন্ন আঙুলগুলো তোমার পাশেই ভাসছে

    ইনেসা তখন তুমি যুবতী, পোশাক কোথায়, গায়ে সারাফান আর মাথায় কোকোশনিক

    পায়ে শীতে পরেছিলে ভালেনকি জুতো, জলে নামি

    কুবোচকার হাঁ-মুখে শ্বাস দিয়ে’ বাঁচাবার চেষ্টা করি

    লাশের পচা ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো, আমার ঠোঁট আটকে ধরে

    দাঁতের পাটি ভয়াবহ হাসিমুখে খুলে বেরিয়ে আসে

    অ্যাপোলোনারিয়া য়াকুবোভা, ঢেউয়ের কয়েকটা কামড়

    গিলে ফেলতে গিয়ে, রক্তহীন রক্তহীন সব রক্ত জল হয়ে গেছে

    শবের বাঁদিকের ধবধবে বুক হাঁমুখে চলে আসে জলের স্পন্দন নাকি স্তনের

    একে কি স্তন বলা চলে যার খাঁজ হারিয়ে গিয়েছে

    বোঁটা খসে মুখের ভেতরে কি পচা ওহ কি তেতো মাংস

    বেঁচে ওঠো মনকেমন, তোমাকে কি ভালোবেসেছিলুম

    হৃদয়ের কোটরে কাঁকড়া পরিবারের বাসা

    ফুসফুস দেহ থেকে আলাদা, তোমার নাতিপুতিরা পচিয়ে দিয়েছে

    রক্তখোর হয়ে গেছে তোমার ছেলেপুলেরা, ভালোবাসার অপলকা বিপ্লব ?

    অপলকা বিপ্লবের ভালোবাসা ? বিপ্লবের অপলকা ভালোবাসা ?

    অপলকা ভালোবাসার বিপ্লব ? প্যারিসে তোমার সঙ্গে ফুটপাতে পাশাপাশি

    সেই বাড়ির জানালাগুলো আজ বন্ধ, শাদাকালো ফোটো

    কুঁচকি থেকে উরু খসে আসে জড়িয়ে ধরি, পচা উরু আলিঙ্গনে ছিৎরে খুলে এলো

    কলকাতার সেই কবেকার আঁধিয়ারি, খোলা জানালার স্মৃতি খড়খড়ি-তোলা

    চোখদুটো খুলে হাতের তেলোতে তুলে নিই, আকাশে সূর্য খুঁজছ তো


     

    ঢাকা পড়ে গেছে তোমার বংশধরদের ফুঁয়ে, যোনিকে যোনি বলা যাবে না

    মাছেরা খুবলেছে ওদেরও পছন্দ তোমার যোনি, শাদা হেজে গেছে পূঁজ বইছে

    যাদের বিইয়েছিলে লাখ-লাখ কোটি-কোটি, তাদের লাশের পচা পোঁদে

    তোমার স্লোগান গোঁজা, জড়িয়ে ধরতে চেষ্টা করি তোমাকে

    কঙ্কালের হাড়গুলো গাঁটে-গাঁটে খুলে আলাদা হয়ে গেল


     

    কাতুকুতুর জন্য প্রেমের কবিতা

    প্রেমিকার হাসি খেতে আমার ভালো লাগে, সব প্রেমিকারই

    কোমরে দু’দিক থেকে আচমকা, তর্জনী টিপে দিতেই

    যেই হাসতে আরম্ভ করে, তখনই ওর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে

    আমি ওর হাসি খেতে থাকি, হাঁ-মুখ থেকে পাহাড়ি নদী বইতে থাকে

    উড়ন্ত সারসের ঝাঁক, শরৎকালের রাতের আকাশের তারাগুলো

    হাইওয়ে দিয়ে মোটরগাড়ির সারি, ধান রুইতে ঝুঁকে আছে বউরা

    ওর কোমরে আঙুলের খোঁচা বজায় রাখি, কতো রহস্য ওর মুখের ভেতরে

    ওর কাতুকুতু আর চুমু একই সাথে খেতে ভালো লাগে

    আমি আরও হাসাই, হাসাতেই থাকি, চুমু খেতে-খেতে দেখি

    উত্তর মেরুর শাদা ভাল্লুক আফ্রিকার গোরিলারা, হাতির পাল, সুন্দরবনের ঝড়

    বুঝতে পারি কেন প্রথম প্রেমিকার সঙ্গে পরের প্রেমিকাদের হাসির মিল নেই


     

    ব্রহ্মাণ্ডের একটিমাত্র নারীর জন্য প্রেমের কবিতা

    কী রোদ্দুর ! কী রোদ্দুর ! মসৃণ তুলতুলে মাংসের পাহাড়

    কালো লতানে কুচকুচে স্বর্ণলতা ধরে ওপরে উঠি, চড়াই-উৎরাই

    একটু হাঁটার পর টের পাই এটা নারীদেহ, হাঁটছি সিঁথির মাঝখানে

    কপালে পা রাখি, দুই পা তুলে দেখি পায়ের তলায় সিঁদুর লেগে গেল

    কী বিশাল নারীদেহ, এইভাবে কেন শুয়ে আছে চোখ বুজে

    অন্তত ১০০ মিটার দীর্ঘ, বিশাল বাঁ-স্তনের চিকন ত্বক বেয়ে

    ফুটবল মাপের বোঁটা, দুধ গড়াচ্ছিল, চেটে, তেষ্টা মিটিয়ে, নেমে,

    আরেকটু এগোতে, পিছলে নেমে যেতে থাকি। আরে, নাভি, যুবতীর নাভি

    পুকুরের মাপে, নিঃশ্বাসে উঠছে-নামছে, ঘুমোচ্ছে বোধয়, ঘুমোক, ঘুমোক

    ততোক্ষণ দেহজুড়ে খানিক বেড়িয়ে নিই, এতো বড়ো নারীদেহ

    পুরুষেরা সামলায় কেমন করে, দূরে-দূরে কোথ্থাও পুরুষ বা অন্য নারী

    এরকম বিরাট বা আমার মাপের মতো, কই, দেখতে পাচ্ছি না

    সমস্ত জগতসংসারে এই একটিমাত্র নারী, জানি না কেমন করে তাকে

    ভালোবাসা যাবে ; ওগো নারী, উঠো না, উঠো না, ঘুমিয়েই থাকো--

    আরেকটু ঘুরে দেখি তোমার শরীর, আরেকটু এগিয়ে, কী জঙ্গল, কী জঙ্গল

    ত্রিকোণ গরম কুণ্ড, হৃৎস্পন্দনের সঙ্গে কাঁপছে চুপিচুপি,

    ভেতরে ঢোকার ইচ্ছে হয়, গোলাপি রঙের হয়তো বা কোনো জাদুটোনা খেলা

    কিন্তু হারিয়ে যাই যদি, সাধারণ মানুষীর মতো কাতুকুতু দিই একে ?

    এর গোলাপি বনানীতে নেমে ? যদি ঘুম ভাঙে, বলব ওগো নারী

    তোমাকে ভালোবাসতে হলে যতো বড়ো হয়ে উঠতে হবে

    আমি তো সেরকম নই, আমি তো নেহাতই ক্ষুদ্র সামান্য ইতিহাস

    পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি। পড়ে থাকো, চিৎ হয়ে, উলঙ্গ ঘুমোও, আমি

    তোমার দুই স্তনের মাঝে, যাই গিয়ে শুয়ে পড়ি, বুকের কাঁপুনির কাছে

    ঘুম থেকে জেগে উঠে আমাকে মুঠোয় তুলে নিও, দেখো চোখ মেলে

    কবিরা কেমন নগণ্য হয়, দেহের বিশাল জ্যামিতি, সমস্যা বলে মনে করে

    সমস্তজীবন ধরে খুঁজে চলে অসেতুসম্ভব সেতুগুলো..


     

    চিতল হরিণীর জন্য প্রেমের কবিতা

    তোকে ছুঁই, কি মসৃণ তোর দেহের করুণা, দয়া আর চাউনির কৃপা

    জানিস সৌন্দর্য তোর কিসে ? বিলোবার ক্ষমতা ও কৃতজ্ঞতায়

    যখন আঁকড়ে ধরি গলাখানা তোর, মুখে মুখ ঘষে তুই আদর করিস

    সৌন্দর্য মানেই যেন আত্মবলিদান, কী করে শিখলি এই ভালোবাসা ?

    চিতল হরিণী তোর চোখের গভীর থেকে ধর্মাধর্ম শুরু হয়েছিল ;

    বনের চঞ্চলা দেবী, লোভ দেখাস, জাগতিক বস্তুফাঁদ ছেড়ে থেকে যাই

    হাজারিবাগের এই ঘন জঙ্গলে ; সমাজ-সভ্যতা থেকে দূর ইন্দ্রজালে

    প্রতিদিন আদায় করিস তোর জিভ দিয়ে পৌরুষের উদ্বৃত্তনির্যাস--

    প্রথম-প্রথম কাতুকুতু লাগত খসখসে জিভের রহস্য-প্রণয়ে,

    এখন নেশা ধরে গেছে ; কখন ফিরবি তুই বনভোজন সেরে সন্ধ্যায়

    অপেক্ষায় থাকি। জন্মউলঙ্গ তুই, আমি তো ইনফিডেল, তোর কাছে

    শিখলুম নগ্ন থাকার ইনোসেন্স ; বিশ্বজগতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার রতি


     

    ধূমাবতীর জন্য প্রেমের কবিতা

    এক বিঘত মাটি খুঁড়লেই মরা বউ-বাচ্চার বুড়ো-বুড়ির কান্না শুনতে পাই

    মতের মিল না হতে সূর্যরশ্মির দখল নিতে জ্যান্ত পুঁতে দিয়েছিল

    তারা হাত-পা ছুঁড়েছিল, পোঁতার সময়কার তাদের আর্তনাদ আর গোঁঙানি

    রয়ে গেছে ফসলের শেকড়ে, চাষি লাঙল দ্যায় ফসল কাটে

    মাটির তলা থেকে বাঁচাও-বাঁচাও শুনতে পায়

    লাঙলের ফলা দিয়ে কুচি-কুচি হয়ে যায় কান্না আর চিৎকার

    এমন নয় যে যারা পুঁতেছে তারা কেউটের দলে

    এমনও নয় যে যাদের পুঁতেছে তারা বেঁজির দলে

    মানুষের জঙ্গলে সাপ কখনও বেঁজি হয় বেঁজিরা কখনও সাপ

    কল্পজগতে সাপেরা চিরকাল সাপ আর বেঁজিরা চিরকাল বেঁজি

    মানুষের জঙ্গলে শাশ্বত টাকমাথা সাপ, মণি ফিরে গেছে খুকুদের গল্পে

    বেঁজির ল্যাজের লোম দিয়ে পেইনটিঙ এঁকেছেন রাজদরবারের ফোকলা শিল্পী

    পেইনটিঙের ড্র্যাগন মাঝরাতে আগুনের চেরাজিভ ওড়ায়

    সে আগুনেও কান্নার রোল ক্যানারি পাখির বিদেশি গান

    নয়তো দরবারের লোকেদের ঘুমের মৌতাত হয় না

    আসলে ধোঁয়া নিজের নাগরিক ধর্ম মেনে চলে, মানুষের ঘাম দেখে হাসে

    কান্নারাও হাতজোড় করে ক্ষমাঘেন্না করে দিতে বলে

    ডান-নাকে বুড়ো আঙুল টিপে, পেটের ভেতর থেকে কান্নারা জানতে চায়

    ভিক্টোরিয়ার সিক্রেট কী : মাকড়সার কাছে শত্রুতা শেখা উচিত

    শোত্তুরের মুখে থুতু ছিটিয়ে কতো বিশাল ফাঁদ পেতে

    গলা টিপে মারে অথচ কান্না শোনা যায় না

    কেউই বলতে পারছে না “কোথায়” জায়গাটা ঠিক কোথায় মাটির তলায়

    মা-শীতলাকে জিগ্যেস করো। মা-মনসাকে জিগ্যেস করো।

    মা পর্ণশর্বরীকে জিগ্যেস করো। মায়েরা কেন রোগের দেবী ? কান্নার দেবী ?

    পুরুষ কেন চিকিৎসার দেবতা ? অশ্বিনী যমজভাইরা কেন ডাক্তার ?

    ধন্বন্তরী কেন ডাক্তার ? বলুন মা-ধূমাবতী কতোকাল আর কান্নাকাটি শুনবো--

    মাটি খুঁড়লেই এক বিঘত তলায় !


     

    জন্মচেতনার জন্য প্রেমের কবিতা

    দেখি সবকিছু, জানি অদৃশ্য তারা, তবু দেখতে পাই

    ম্যাডেলিন করিয়েট তোর মুখমেহনের শব্দ দেখতে পাই

    খালাসিটোলার ঘেমো গন্ধ দেখতে পাই, শত্রুতার ক্রুরতা দেখতে পাই

    দেখতে পাই কফিহাউসের জটলায় ইড়া-পিঙ্গলার ঘষটান

    ব্যাঙ্কশাল কোর্টের খুনি তরুণীর শ্লেষ দেখতে পাই

    দেখি তার ফাটা ঠোঁটের বাসি আর ফ্যাকাশে ছোঁয়া

    জালের খাঁচায় বন্ধ দাগি আসামির হলকা দেখতে পাই

    তাদের শিকনির আর গুটকার পিকের দুঃখ দেখতে পাই

    রাজকমলের সঙ্গে ছিন্নমস্তার থানে মহিষরক্তের ডাক দেখতে পাই

    প্রথম স্বমেহনের নারীহীন কাম দেখতে পাই

    প্রথম সঙ্গমে পাওয়া একশো টাকার চুমু দেখতে পাই

    বন্ধুর মারা ইঁটে ফাটা-কপালের আয়োডিন দেখতে পাই

    রাস্তায় অজ্ঞান পড়ে গিয়ে জুতো শোঁকবার দুর্গন্ধ দেখতে পাই

    গোলাপি কাগজে লেখা প্রেমিকার ইউ ডি কোলোন জুয়া দেখতে পাই

    মায়ের যোনি থেকে জন্মাবার সময়ে ওনার অশেষ যন্ত্রণা দেখতে পাই

    জানি কবিরা মৃত্যুচেতনায় ভোগে আমি ভুগি জন্মচেতনায়


     

    শরৎকালের জন্য প্রেমের কবিতা

    শরৎকাল এসে গেছি নাকি ? কই, বলেনিতো কেউ !

    বাড়িতে বাংলা ক্যালেন্ডার নেই, পাঁজি নেই, জানি না কখন কোন ঋতু

    আসে আর চলে যায় ; যৎসামান্য শরতের উঁকি মারা টের পাই

    যখন সংবাদে শুনি, চাষিরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে

    শরৎকে নেমন্তন্ন করে আনছে। বর্ষায় বৃষ্টি তো হয়নি ;

    যেখানে হয়েছে সেখানেও এতো বেশি, ডুবে গেছে খেত --

    খরা আর বানভাসি মিলে শরতের টুঁটি টিপে চাষিকেই শুধু নয়,

    দালাল ও আড়তদারদেরও বিপদে ফেলেছে।

    শরতের আকাশের কথা বাল্যে যা পড়েছিলুম, তার কোনোকিছু

    দেখিনা আকাশে-হাওয়ায়। শুধু ডিজেলের গুঁড়ো

    কুয়াশার বদলে নীলচে ধোঁয়ায় ঢাকা কসমোপলিস।

    রাতে হয়তো চাঁদ কোনো চল্লিশতলার ছাদে নেমেও নামে না

    রেভ পার্টি চলছে সেখানে অর্ধেক উদোম নেশারিনীদের

    অ্যাসিড রকের সাথে মেটালিক বাজনায় চলছে নাচানাচি।

    বোনাসের টাকা নিয়ে মধ্যবিত্তের দল নেমেছে বাজারে

    শরতকে কিনে বাড়ি নিয়ে যাবে বলে।

    কিন্তু শরৎ তো উধাও, কেবল বাজার পড়ে আছে তার

    ধুন্ধুমার উৎসবের ফাটা ঢোল নিয়ে।


     

    ডটপেন-এর জন্য প্রেমের কবিতা

    এই বেশ ভালো আছি বাঁয়া-দাঁয়া ছেড়ে

    রিডহিন বেহালায় কান্নাকাটি নেই

    যা আছে তা বাজনার হাঁ-মুখের শব্দ সে

    ভেলকি নিঙড়ে লালা-ঝরা উসতুন


     

    মধুঘুমে নিপাতিত। ধচাপচা জলে

    ভাসিয়ে রাখার কোনো দরকার নেই

    আর, মিশে গিয়ে প্রতিকারকের মোহে

    ছায়া ফেলে বেঁচে থাকা ; কোমল অনীহা

    দিয়ে গুটিপোকা নিজেকে সবুজ করে

    জংলি ঝোপ কুরে খেয়ে ঠিকই তেমন

    এই বেশ জমাটি মাধ্যম। পলিগ্যামি।

    বললে বলতে হয় ডটপেন তাই-ই।


     

    ইনসমনিয়া : স্বপ্নের জন্য প্রেমের কবিতা

    লেখা পায়। লিখি। ।

    খিদে পায়। খাই। ।

    প্রেম পায়। করি। ।

    জ্বালা পায়। জ্বলি। ।

    নেশা পায়। গিলি। ।

    হাসি পায়। হাসি। ।

    ছোঁয়া পায়। ছুঁই। ।

    দেখা পায়। দেখি। ।

    রান্না পায়। রাঁধি। ।

    দান পায়। থুই। ।

    পড়া পায়। পড়ি। ।

    শোয়া পায়। শুই। ।

    হিসি পায়। মুতি। ।

    হাই পায়। তুলি। ।

    ঘৃণা পায়। করি। ।

    হাগা পায়। হাগি। ।

    হাঁচি পায়। হাঁচি। ।

    ব্যথা পায়। কাঁদি। ।

    পাদ পায়। পাদি। ।

    নাচ পায়। নাচি। ।

    গান পায়। গাই। ।

    শ্বাস পায়। হই। ।


     

    ঘুম পায় না।

    স্বপ্ন হয় না। ।


     

    যুদ্ধের জন্য প্রেমের কবিতা

    খেতে বসে সুনীলদা, মানে সুনীল গাঙ্গুলি

    মুগের ডালের সাথে ভাত মেখে

    শ্লেষ-ঠোঁটে জানতে চাইলেন :

    “গণ্ডুষ করছ দেখছি, মন্ত্র কি জানো ?”


     

    থালার ডানদিকে মাখাভাত বড়ি দিয়ে, গাই

    “জিঙ্গল বেল জিঙ্গল বেল জিঙ্গল অল দি ওয়ে…”


     

    আজ থেকে যুদ্ধ শুরু হলো।


     

    নিষ্ঠুরতা : সৌন্দর্যের জন্য প্রেমের কবিতা

    কিছুই করার নেই তোর, চিরকাল এরকমই বর্বরতার যুগ চলে আসছে

    তুই যে সুন্দরী, কতো নোংরা স্বপ্নে যে তোকে নায়িকা-মাংসের ভূমিকায়

    পেড়ে ফেলবে যুবকেরা প্রৌঢ়রা বুড়োরা তার ইয়ত্তা নেই

    স্বপ্নের বাইরেও থাকবি তুই অন্যের বিদ্বিষ্ট ঈর্ষায়, ভার্জিনিটি নিয়ে

    তারা কেন তোর মতো সুন্দরী নয় ; ভার্জিনিটি রিপেয়ার হয়তো করাবে

    নারীর সৌন্দর্য এক বিপজ্জনক সুখ, যাতে তোকে ভুগতে হবেই --

    বিপজ্জনক গর্ব -- নিজস্ব জীবন তোর ব্যক্তিগত থাকবে না

    চিরকালই নোংরা না হলে মানুষের আহ্লাদ হয় না

    শৈশব থেকে পাঁকে ও কাদায় দাপাদাপি করার অভ্যাস ভোলা অসম্ভব

    সারাটা জীবন তারা অত্যাচারের খেলা খেলতে থাকবেই

    তাদের স্বপ্নে তুই অত্যাচারিত হবি, রক্তাক্ত ধর্ষিত হবি। বাস্তবেও

    যুদ্ধে আক্রান্ত দেশে প্রতিটি নারীই সুন্দরী, নিলামের বাজারে দাঁড়ায়

    তখন স্বপ্নে নয়, শেকলেতে বেঁধে কিংবা অন্ধকার ঘরে মুখ চাপা দিয়ে

    পারাপারি ধর্ষিত হোস, কামড়ে-আঁচড়ে ফালাফালা, তারপর মরে গেলে

    সেখানেই ফেলে চলে যাবে লোকগুলো। নিষ্ঠুরতা মানেই উৎসব।


     

    ন্যাংটো তন্বীর জন্য প্রেমের কবিতা

    কুচকুচে চকচকে পুংঘোড়ায় বসে আছো ন্যাংটো বিপ্লবী তন্বী

    তোমার কুলকুচি করা সুধা পান করে পৃথিবীর নেশা ধরে গেছে

    তার ফল এদান্তি ফলছে রসেবশে দক্ষিণী ধোঁয়ায় কান্নায়

    চুলেতে যে লঙমার্চ বুনোফুল গুঁজেছিলে বিপ্লবী শতকে

    তাই থেকে পালটালো দেঙজিয়াও পিঙ্গের বিড়ালের রঙ

    মারামারি খুনোখুনি শেষে সেই পুরুষ ময়নার ক্লান্ত ঝাঁক

    মাওবাদী বনপ্রান্তে কুঞ্জমাঝে খসখসে কন্ঠস্বরে হেঁকে গায়

    চুলে গিঁট পড়ে গেলে কোনো চিন্তা নেই, স্বর্গ-নরক-মর্ত্য

    সর্বত্রই চিরুনি রয়েছে, আছে চিরুনি তল্লাশ

    এক পা সামনে আর দুই পা পেছনে, সেই গ্রেট লাফ দিয়ে

    সামনে আঁৎকে দেখলে চারিদিকে রক্তমাখা পচা লাশ

    শুধু ওরা দুচোখের পাতা রাঙঝালে মুড়ে চলে গেছে

    সাংস্কৃতিক বিপ্লবের হল্লাবাজ লোকগুলো আজ থুথ্থুড়ে

    অনেকে দুর্ভিক্ষে মরে মাটির তলায় তারা সংশ্লেষিত হাড়

    শেষে কিনা বিপ্লব আর প্রতিবিপ্লবের ফারাক রইলো না

    কুচকুচে চকচকে পুংঘোড়া হাঁকিয়ে ন্যাংটো বিপ্লবী তন্বী

    দুর্বপাক ডেকে আনছো ঝুলে পড়া তামসিক গোলার্ধ দুটোয়


     

    সাবর্ণভিলার জন্য প্রেমের কবিতা

    উত্তরপাড়ার নোনাঝুরো খণ্ডহর

    আত্মহত্যা করে নিলো আজ

    কাছারিবাড়ির তিনশো বছরের সোঁদা নীল অন্ধকারে

    ঝুলছে নিঃসঙ্গ একা নতুনকাকার মেয়ে পুটি

    বাঁধাগিঁটে জামদানি শাড়ি


     

    লিঙ্গুইস্টিক্সের জন্য প্রেমের কবিতা

    নিজেকে কীভাবে মুক্ত আমার কবিতা থেকে করি !

    না হয় উজিয়ে যাই বঙ্কিম চাটুজ্জে থেকে ফ্যাতাড়ু কাঙালে

    মগজে-মজ্জায় ছিঁড়ি হাতির পায়েতে বাঁধা মদনা-শেকল

    ক্যাকটাসি স্মৃতি থেকে ছেঁটে ফেলি রিরিদেহী প্রেম

    গঙ্গায় চুবিয়ে মারি পেটমোটা ব্যাকরণ অভিধান নথি

    যে-সব জিওলকথা ওৎপেতে মুখিয়ে উঠেছে ডটপেনে

    তাদের কস্তাপেড়ে রামগিঁটে টুঁটি টিপে বেরহম বেঁধে

    তেতোলগ্নে ফেলে আসি ধাপার অরগ্যানিক ঘুমে


     

    যতোবার ভাষা ভেঙে পালাবার ছক কষি, আয়নার পারা

    পাকড়াও করে এনে চিহ্ণের গারদে পুরে ন্যাড়া করে দ্যায়


     

    জোচ্চোরবৃন্দের জন্য প্রেমের কবিতা

    ওই দলে দাড়িয়াল কবি আছে, এই দলে গালফুলো কবি

    দুদল একই সঙ্গে বাঁধাধরা বুকনি ভেঁজে চলে

    কার দলে মোটরসাইকেল গ্যাঙ ধর্ষণের রেকর্ড করেছে

    কটা লাশ ফেলে গেছে ফসলের খেতে--

    আমরা ফ্যালফেলে ড্যাবডেবে, বড়োছোটো কাগজে ওনাদের

    জ্ঞানবাক্যি পড়ি আর ভাবি, বেড়ে এই কাগুজে জোচ্চোর

    কোথা দিয়ে এনাদের কথাগুলো বের হয়

    কোন হাতে সরকারি-বেসরকারি পুরস্কার নিয়ে

    লিখে যাচ্ছে হুদোম্যাদা তেলালো ছাইপাঁশ


     

    সোনাগাছির জন্য প্রেমের কবিতা

    পাকানো সিঁড়ির শেষে, তিনতলার বাঁকে, বলল পিসতুতো দাদা

    ‘এই হলো সোনাগাছি, শহরের রানি, ভেবে দ্যাখ, মৌজমস্তিতে নষ্ট

    কতো-শত মহান পুরুষ-নারী, জন্মাবার আগেই খাল্লাস,

    ওই যে গুটকাঠোঁট মাসি, ওকে বললেই যাকে চাই নিস

    এখন তো চুলখোলা মেয়েদের নধর দুপুর, সকলেই ফাঁকা

    হাফরেটে সুন্দরীতমাকে পেয়ে যাবি ; কাজ আছে, আমি চললুম। ’


     

    ঘরে নয়, বিছানায় নয়, চলো না কালবৈশাখিতে ভিজে

    প্রেমিকার অভাব মেটাই, বলি কালো মেয়েটিকে।

    চুড়িদার শ্যামলিমা আর আমি কোমর জড়িয়ে

    আহিরিটোলার ঘাটে ঝোড়োজল গঙ্গায় নামি--

    ও হয় ফোলানো পালের নৌকো, চিৎসাঁতার দোল খায়

    আমি হই লগিঠেলা ভাটিয়াল মাঝি।


     

    “আবার এসো কিন্তু, অ্যাঁ, প্রেমিকা ভেবেই চলে এসো

    যেদিন পড়বে বৃষ্টি ; ভেতরে তো ভিজছি না

    বাইরের ভেজবার রোগটুকু দিয়ে চলে যেও


     

    চারু মজুমদার : কাজের মাসি’র জন্য প্রেমের কবিতা

    “সি. এম. জিন্দাবাদ”, নিশিডাক দিনের বেলায়।

    পেছন ফিরতেই, চিৎকারকারী কিশোরদের একজন

    সাবর্ণভিলার ছায়াছেঁদা সিংদরোজার চৌকাঠে

    ছোরাটা ঢুকিয়ে দিল খুড়তুতো ভাইয়ের পেটে !

    “সি. এম.?” সি. এম.?” গলিটা দৌড়োয় দুদ্দাড়--

    ‘না, না, মুখ্যমন্ত্রীর জয় চায়নিগো, পালাও, পালাও’

    ছলকানো আতঙ্কের ঘড়া ফেলে খাওয়া-পরা মাসি

    লেংচে ছুটতে গিয়ে খালি পেটে বমি করে তলপেট চেপে--

    যাবতীয় তত্বের সস্তাপেড়ে থুথু : অস্ত্র কি মিসানথ্রপিস্ট ?

    গামছামুখো ছুরি ছোরা ন্যাপালা ভোজালি বোমা বন্দুক--

    উৎকন্ঠ পেলুম টের, উর্ধ্বশ্বাস বুক থেকে নয়। চিতাবাঘ গতি

    ঘিলুর জীবাশ্ম সেজে আলোর গণিত হয়ে টুঁটি টিপে নামে--

    “সি. এম. তো চারু মজুমদার !”


     

    মেরি ম্যাগডালেনের জন্য প্রেমের কবিতা

    যে ছাগলেরা ঘাসের সঙ্গে দুপুরের রোদটুকুও চিবিয়ে সবুজ করে তোলে

    তারা উইপোকাদের ধর্মে দীক্ষিত হবার পর

    লোমকামানো ভেড়াদের দলে মিশে যেতে চেয়েছিল

    কিন্তু নদীতে ঝাঁপ-দেয়া ট্রেন থেকে খুবলে বের-করা

    হিউমিড গন্ধের

    রক্তমাংসের পপ হিরোকে দেখে

    তার প্রেমিকা সেপিয়া কন্ঠস্বরে বেশ কেঁদেছিল

    তা অনেকটা রেলের জানালায় দৌড়ুতে-থাকা

    হাইতোলার চৈত্র-সেলের ঋতুতে চোবানো

    যিশুখ্রিস্টের দেয়া রবিবারের আত্মার রঙিন সহচরী মেরি ম্যাগডালেন

    আই রিয়্যালি লাভ হার

    তবু তিনি আমার শরীর থেকে প্রেম তাড়াবার সোনার ধুনুচি হাতে

    সি এফ এল আলোর দুধে-ধোয়া ফিনফিনে নীলচে

    ধোঁয়ায় ড্রিমগার্ল নাচাচ্ছিলেন

    বিশ্বাস করুন আই রিয়্যালি লাভড হার

    ফলে আমায় তখন অসুখি বিষাদগ্রস্ত হবার নেশায় ধরেছে

    মাঝরাতে কব্জির শিরা কেটে আশ্চর্য থাকার সীমা পেরিয়ে

    রক্তফোঁটায় গঙ্গাফড়িং ওড়াচ্ছিলুম

    মগজে ছেয়ে গিয়েছিল বেহিসাবি রুলেট-গুলির জুয়াড়ি-আতঙ্ক

    মনে হচ্ছিল ও তখন মুকুট-পরা ন্যাংটো সম্রাজ্ঞির জাহাজে দাঁড়িয়ে

    বাতাস ছিঁড়ে-ছিঁড়ে নামা বৃষ্টিতে

    আরিব্বাস

    ব্রহ্মচর্যের পর রজঃডিম্ব খুনোখুনির বর্ণাশ্রমে ঢুকতে চলেছি

    ভালো সম্পর্কেও তখন অসহ্য

    হাসিতে এক চিলতে ক্রুরতা নিয়ে ও

    মাফ করবেন

    আই রিয়্যালি লাভ হার

    আমাদের সম্পর্ক তো মাংসের

    রক্তের নয়

    স্রেফ ধুলো আর বালির সম্পর্ক

    যে সম্পর্ক ছুটন্ত অশ্বখুরকে শব্দহীন করার গর্বে লুকিয়ে রাখে


     

    ঠাকুমা অপূর্বময়ীর জন্য প্রেমের কবিতা

    ঠাকমা বল্লে, ‘শুনিচিস নাকি ? আবার কুরুণ্ডেতাড়ুনি মুড়োঝাঁটার

    বাড়ি যেতে নেগেচে গয়লাপাড়ার সেপাই-লস্কর। তা বেলেতের

    বাঁদরমুকোরা কবেই জাহাজে চেপে ঝুরোবরফের বেন্দাবনে

    ফিরে গেসলো, বলেছেল তোর জ্যাটা। তাপ্পর তো গুয়ের ডাবা

    উটেছেল গবা মেতরের মাতায় ; কত্তো-কত্তো বড়ো জনমনিষ

    গবা ম্যাতরের মাতা ঠেঙে কাঁচাসোনা নিতে দৌড়ুলে---

    সে আর কি বলব বাপু, ওই যে খাবার চগলেট হয়, অ্যাঁ,

    শুনচিস তো, পাদলা চগলেট ভেবে তারা চটকানি দিয়ে খেলে

    আর দ্যাকো, সব্বাই পাতর হয়ে গেল গা, মুকে রা কাড়ার

    জিব-আলজিব অ্যাগবারে গু-মুখ নদীর পাতর ; কত্তো লোকের

    পাকাধান পুড়েছেল, বউড়িরা খুন হলো মাটিতে চুন হলো গা

    খপরের কাগচ পড়ে শুন্যেছেল তোর বাপ। কিন্তু গবা মেতর

    বিষ খেয়ে গেঁজলে পচে সগগে গেল, তাপ্পর আবার কী হলো র‌্যা--

    চাদ্দিকে রোল উটেচে, নড়া ধরে ভোঁচকানি দাও আচ্ছা করে ?’


     

    আমি বল্লুম, ‘ঠাকমা, গবা ম্যাতরের ডাবা এখুন এগজন

    লোকদ্যাকানে নিজের মাতায় তুলে নেত্ত কত্তে নেগেচে গো ;

    তাব্বড় দাড়িয়াল ধুতিয়াল শাড়িয়াল থেটারউলি পোদ্দুরে-গোপ্পুড়ে

    এগই চগলেট খেয়ে আদমরন্ত আদঘুমন্ত নিশিডাকে বোবাকালা

    হ্যানবিভীষণ ত্যানবিভীষণ চোগাচাপকান চাঁদিপয়জার…

    মাজরাতে ঠগির দল পাট্টে দ্যায় কচিকাঁচাদের গলা কাটতে ;

    রোল উটেচে, ম্যাতরের দরকার নেই, ডোবাও ডাবাকেই।’

    ঠাকমা বল্লে, ‘থালে তোরা বর্গিতাড়ানে আওয়াজ তোল সবাই মিলে

    নড়া ধরে ভোঁচকানি দাও আচ্ছা করে চাবির থোলো কাড়ো

    হোককলরব হোককলরব হোককলরব হোককলরব হোককলরব !’


     

    প্রেমের কবিতা : কাননদেবীরে বুঝি নাই, সুচিত্রা সেনরে বুঝি নাই

    Alfred Newton : Poetry is a kind of ingenious nonsense.

    বহু কিছু বুঝি নাই, বহু লেখাজোখা, আঁকজোক, নক্ষত্ররাজি

    আমার গ্রন্হ যাহাঁরা কোনোদিন হস্তে লন নাই, তাহাঁরাও

    আমাকে পছন্দ কখনও করেন নাই, এমনও দেখিয়াছি--

    আমিও চাহি নাই তাহাঁদের পছন্দের তালিকায় আমার

    কুনামখানি ঘাপটি মারিয়া থাকে, তাহাঁদের রোগগ্রস্ত করে--

    জিজ্ঞাসা করিবার মতো কেহ নাই ; কেই বা বলিয়া দিবে

    সাতাশ নক্ষত্র হতে কী কারণে একটি নক্ষত্রের নাম বাছিলেন--

    সেইটি চব্বিশতম, নক্ষত্রগণের ক্রীড়া কভূ বুঝি নাই

    কাননদেবীরে বুঝি নাই, সুচিত্রা সেনরে বুঝি নাই

    অহো, সে কি নক্ষত্রের জ্যোতি তাহাঁদের বায়োস্কোপের

    গবাক্ষগুলিতে তাহাঁদের আলো দেখিবার জন্য জনসমুদায়

    কাড়াকাড়ি মারামারি করিতেছে, ক্রমে বৃদ্ধাবৃদ্ধ, তাহাঁদের পক্ককেশে

    শেষ আলো কোথায় হারায়ে গেছে, তাহাঁরা কেহ কভূ

    জানিতে পারেন নাই ; অহো, কেমনে একটি রকেট চাঁদে যায়

    ফিরিয়া চলিয়া আসে পুনরায় ! কেহ কেহ রকেট-বিজ্ঞানাশ্রিত কবিতায়

    চুপিসাড়ে কোয়ান্টাম বাস্তবের ফাঁদখানি পাতিয়া অপেক্ষা করেন

    যেমন বিষ্ণু দে, তাহাঁর পংক্তিগুলি রকেটগণিতে কেন যে আক্রান্ত

    বুঝি নাই ; আমি যোগেন চৌধুরী বুঝিয়াছি, গাইতোণ্ডে বুঝি নাই --

    কুড়ি কোটি টঙ্কায় তাহাঁর তৈলচিত্র বৈভবশালীগণ ক্রয়ের গৌরবে

    নিজ-নিজ নাম টঙ্কাক্ষরে লিপিবদ্ধ করিবার ক্রীড়ায় মাতেন

    অহো, অহো, আমি অলোকরঞ্জন বুঝিয়াছি, আলোক সরকার বুঝি নাই

    তিন দিনে এক পংক্তি লিখিবার পর আরেক পংক্তি আঠাহীন

    নিম্নের সিঁড়ির ধাপে স্হান লয় ; প্রথম পংক্তির ন্যায় সেটিও কবিতা--

    বুঝি নাই প্রতিটি পংক্তি যদি কবিতার রূপ লয়

    তাহারা কি বিচ্ছিন্ন সমাপতনের অষ্টমগর্ভের সন্তান !

    যেনবা কঙ্গনা রানৌতের কটিদেশ, আলিয়া ভাটের বেবি ঠোঁটের ফুলেল--

    অমিয় চক্রবর্তীর কুহকবিহীন নিরাসক্ত হাহাকারহীন স্বপ্নহীন ঢঙে

    অনুসরণের পথে দেখি আলোক সরকার ; ছোটোলোকপাড়ার যুবা আমি

    সদ্য দাড়ি গজাইবার আনন্দে হাত বুলাই, অচিন্ত্যনীয় চিন্তা করি

    “উতল নির্জন” হইলা কেমনে ! “নির্জন” তো জীবানানন্দীয়,

    যাহাঁর কবিতার বিপুল ঝঞ্জা কৃষ্ণচশমায় করিয়াছিলেন রুদ্ধ ?

    “আমার তো জানা নেই সহসা এ রঙ্গের প্রণয়” -- বুঝি নাই আমি --

    “আমাকে তা দেওয়া কেন যা আমার নয়” -- বুঝি নাই আমি --

    খ্রিস্টিয় ইংরাজগণ লইয়া আসিয়াছিল তাই, ফরাসি কবিতা বাংলায়

    মধ্যবিত্ত বাঙালির আধুনিকতাবাদী ধুম্রজালে আলোক সরকার

    পংক্তি ধরিবার জন্য অন্যদিগের হতে কী করিয়া দূরত্ব গড়িয়া তোলা যায়

    তাহা প্রতিটি পংক্তির জন্য নিবেশ করিয়াছেন চিত্রের অনৈক্যের খাতে

    বয়সের সাথে-সাথে পংক্তিসমূহ পারস্পরিক জুয়া খেলিয়াছে

    আধুনিকতাবাদী মহাআধুনিক কবি মহাশয়, গবাক্ষটি মালার্মের ছিল --

    অথবা সপ্তদশ শতকের ঝঁ লা ফনতা, উনিশ শতকের আলফসেঁ দ্য লামার্তিন

    কেন কেন আপনাকে ডাডাবাদী রাইজোম্যাটিক বলিবে না--

    পংক্তির পরের পংক্তির মাঝে আঠা নাই ! রজঃ বা বীর্যের আঠা ?

    কখনো বা ঠাটা গদ্যে স্বগতসংলাপ কবির নামের ওজনে উঠে যায় !

    অতিসংহতির কূপে ইহাও কি “নিরাশাকরোজ্জ্বল চেতনার” ঢেউ নহে ?

    আলোক-অলোক-দীপংকরের কন্ঠ শুনিয়াছি বালিগঞ্জের ধনীগৃহে--

    শুনিয়াছি ঢেউগুলি স্ব-স্ব দেহে সাবান মাখিবার পর ফেনাখেলা করে--

    বাক্যগুলি অবজেকটিভ প্রতিস্ব লয়ে যাত্রা করে এবং সাবজেকটিভিটি

    কাঁধের উপরে লয় “আলোকিত সমন্বয়” ; উহা কি প্রকৃতই সমন্বয় ছিল ?

    তাহাঁদের বঙ্গীয় চাহনিতে কলিকাতা নাই কেন ? বাস্তব কলিকাতা !

    ঘরের বাহিরে চাহিয়া দ্যাখেন নাই আপুনি ও আপনারা --

    নিজ গৃহকোণকেই ঐতিহ্যপীড়িত “বিশুদ্ধ অরণ্য” রূপে মস্তিষ্কের কোষে

    বোদল্যারি “শাণিত বিষাদ” নিপূণ বিন্যাসী বিলাসিতা পায়, অথচ শহর নাই

    দেহের ভিতরে “দুই পাশে সবুজ ঘাসের স্বাভাবিক” ! রিয়্যালি ? স্বাভাবিক ?

    “কোনো পদচিহ্ণ নাই”, আমরা যাহারা ছোটোলোক, দেখিতেছি

    অজস্র মানুষ, হাজার লক্ষ পদচিহ্ণ প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্তে কোথায় হারায়ে যায়

    এইসব মানুষের কোনোরূপ “আশ্রয়ের বহির্গৃহ” নাই ; আপুনার আছে--

    আপনাদিগের, আলোক-অলোক-দীপংকর মহাশয়দের…


     

    শাশুড়ির জন্য প্রেমের কবিতা

    শাশুড়িদের ভিড়ের ভেতরে হাটতে-হাটতে আমি

    আমার শাশুড়িহীন জীবনের অভাব মেটাবার চেষ্টায়

    বাঁশদ্রোণী বাজারে ভারিভরকম এক শাশুড়িকে বলি, দিন থলেটা পৌঁছে দিচ্ছি

    উনি বলেন, না, আমার ড্রাইভার আছে

    একজন শাশুড়ির কাছে কি তাহলে ড্রাইভারের গুরুত্ব বেশি !

    বোঝা উচিত ছিল, কেননা ওনার শাড়ি থেকে

    বিদেশি পারফিউমের সুগন্ধ পাচ্ছিলুম

    আরেকজন শাশুড়ির কাছে গিয়ে অভাব মেটাবার জন্য যেতে

    কিছু বলার আগেই উনি বলে ওঠেন

    ও বাবা একটু মাছটা টাটকা কিনা দেখে দাও তো

    আমার জামাই চিতল মুইঠা খেতে ভালোবাসে

    শাশুড়ি ছিল না বলে আমি চিতল মুইঠা খাইনি কখনও

    তবু বলি, চিতল এরকমই হয়, তেমন টাটকা তো পাবেন না--

    বাজারে এসে আজ মনে হচ্ছে পুরো জগতসংসারই

    শাশুড়িময়, শুধু আমার ভাগ্যেই শাশুড়ি পেলুম না

    জানতে পারলুম না জামাইষষ্ঠীতে জামাইয়ের সঙ্গে শাশুড়ির সম্পর্ক

    শাশুড়িরা সেদিন জামাইকে মেয়ের চেয়েও বেশি

    আদর করেন আর কেমনভাবে কি-কি করেন

    আমার শাশুড়ি থাকলে আমি তাঁকে প্রণাম করবার জন্য

    ঠোঁটে একটা চুমু খেতুম

    উনি আমায় জড়িয়ে ধরে সকলের সামনে আদর করতেন

    আমি ওনাকে সালমান খানের ফিল্ম দেখাতে নিয়ে যেতুম

    ম্যাকডোনাল্ড কে এফ সি ডমিনোজ পিৎজায় নিয়ে যেতুম

    ব্ল্যাক ফরেস্ট আইসক্রিম খাওয়াতুম

    সারা বাঁশদ্রোণী বাজার আজ ছেয়ে গেছে শাশুড়িতে

    এনাদের অনেকের ঠোঁটেই চুমু খাওয়া যায়

    ভিড়ের ভেতরে আমি জামাইহীন শাশুড়ির খোঁজ করি

    শেষে পেয়ে যাই একজনকে, উনি বলেন

    ওনার ভাগ্য বড়ো খারাপ, ছেলেও হয়নি, মেয়েও হয়নি--

    আর দ্যাখো শাশুড়িগুলোর ঢঙ

    আমি বলি তাহলে চলুন বাজার করে দিচ্ছি

    আমারও শশুর নেই, শাশুড়িও নেই

    কিন্তু আপনার ঠোঁট দুটো খুবই সুন্দর

    এই বয়সেও মেইনটেইন করেছেন --

    উনি বলেন, না করলে আর পথজামাইদের

    ধরব কেমন করে !


     

    সেঁকোবিষের চোলাইকারীর প্রেমের কবিতা

    সারাজীবন বেঁচে থাকতে চাইছিলুম, জানি তো যখনই মারা যাই না কেন

    যুবাবস্হায় মারা যাবো

    জানি না কেন গেরুয়া পাঞ্জাবি আর কোরা-ধুতি লোকেদের

    বিশ্বাস করতে পারি না, আরেকটা ব্যাপার বড্ডো বিদকুটে

    অন্ধকার রাস্তায় মাঝরাতে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো নারীকে

    “কতো চার্জ করো” জিগ্যেস করা

    এদিকে আমার তো বিশ্বাস ব্যাপারটা নেই, প্রত্যয় আছে

    প্রেমের জন্য আজীবন আকুপাকু করি, একটু ইশারা পেলেই ভালোবেসে ফেলি

    আমার কবিতার কথা জানতে চাইছেন, তাহলে বলি

    এক ঝাপটা রক্ত আপনার মুখে ছুঁড়ে মেরেই বলি

    আমি আসলে সেঁকোবিষের চোলাইকারী

    আপনারা সেই বিষকেই মনে করছেন কবিতা

    ভাবছেন আপনার অণ্ডকোষের ব্যাঙাচিরা চিলচিল করছে কেন

    তার কারণ আনন্দ যে জাস্ট একটা আলোর কণা

    তা আপনি জানেন না

    বেঁচে থাকার মধ্যে অনিশ্চয়তার ভয় থাকা জরুরি

    তাছাড়া কৌতূহলে যেটুকু নোংরামি তা অনৈতিক অবৈধ

    কেননা আপনারা জোয়ারের সঙ্গে আসেন আর ভাটার টানে ফিরে যান


     

    বজ্জাতির জন্য প্রেমের কবিতা

    রক্ত তৈরি হচ্ছে তোর দেহে, শুনতে পাই মিহিন আওয়াজ

    সাহিত্যিক ক্রিমিনাল আমি, ইচ্ছেমতন শব্দদের ভাঙি

    প্রথম চুমুর স্মৃতি আছে, প্রজাপতি উড়েছিল পেটে

    কার শবএ সুগন্ধ ছিল বল, র‌্যাঁবো না রবিঠাকুরের

    যতো শিগ্গিরি পারি মানেদের, মুছে ফেলে অন্য মানে দিই

    ব্যকরণ এমন শয়তান, অথচ মূর্ছা যায় আমি ছুঁলে

    ব্যাখ্যাদের তুলে নিয়ে গিয়ে, ধাপার জঞ্জালে ফেলে দিই

    মর্ত্য যে যক্ষ্মায় ভুগছে, পালাবার পথ কারো নেই

    শ্রেষ্ঠ দুঃস্বপ্ন সুসৃজন, কবিতা খোঁচাতে জানে ডোম

    ক্যালেণ্ডারে কবে ঢুকবে ভেবে, মধ্যবিত্ত হিমশিম খাক

    পয়লা জানুয়ারি আর বৈশাখ, জন্মমৃত্যুর মাঝে ডুবে

    মজার ব্যাপার হলো এই, আমরা মানুষ এখনও

    হায় নরহত্যার অভিলাষ, সকলে মেটাতে পারে কই

    এরা বলে আমি ফেরাউন, ওরা ডাকে আমি মালাউন

    আমার নির্দিষ্ট বাড়ি নেই, শহর থেকে শহরে বেড়াই

    রক্ত তোর তৈরি হচ্ছে দেহে, তাতে শ্রম পুরোটা আমার


     

    জুতোর জন্য প্রেমের কবিতা

    জুতো পরে হাঁটছিলুম

    যাতে পায়ে কিছু না ফোটে--

    আর হাঁটতে পারছি না

    জুতোর ভেতরের পেরেক ফুটছে


     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

  • মলয় রায়চৌধুরী | ৩১ জুলাই ২০২১ ১৯:৫২734799
  • মলয় রায়চৌধুরীর কাব্যনাট্য

    যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের

    পাত্রপাত্রী :

    ১. কাশ্যপ ফিকির ; বৃদ্ধ : শবের বাগানের কেয়ারটেকার। ২. বদ্যিনাথ ; যুবক : কাশ্যপ ফিকিরের ছেলে। ৩.বিভূতিসুন্দর ; প্রৌঢ় : ষষ্ঠ শতকের সম্রাট হর্ষবর্ধনের গুপ্তচর। ৪. দেবযানী : আঠারো শতকের যুবতী। ৫. চিনু হাঁসদা ; প্রৌঢ় ; নীলচাষি : ১৮৬০ এর বিদ্রোহে নিহত। ৬. হাঁদু লস্কর ; যুবা ; নীলচাষি : ১৮৬০ এর বিদ্রোহে নিহত। ৭. পাঁচটি শেয়াল ; ২১ শতকের রাজনৈতিক দলচারী। ৮. তিনটি শুয়োর ; ১২ শতকের রাজদরবারের কর্মী। ৯. খুনির দল ; বর্তমান যুগের ভাড়াটে গুণ্ডা।


     

    মঞ্চদৃশ্য :

    [ বিঠোফেনকৃত ওড টু জয় সঙ্গীতে

    ছেয়ে আছে পরিদৃশ্য শবের বাগান।

    গাছপালা ঝোপঝাড়ে ঘেরা অন্ধকার

    গোরস্তান। লোপাটের জন্য নির্ধারিত

    এটি ; শাসকের দ্বারা যারা কুচিহ্ণিত

    এবং যাদের মেরে ফ্যালা হয়েছিল

    আর সেই সাথে এ-হুকুম ছিল, এরা

    মাটির তলায় জ্যান্ত লাশ হয়ে পোঁতা

    থাক চিরকাল ; টিকে থাক অবহেলা

    ভুগে। শশাঙ্কের দিনকাল থেকে এই

    গোরস্তান দেখাশোনা করছে ফিকির

    বংশের প্রথম ছেলে পরম্পরা মেনে।

    হয়তো সম্রাট অশোকের হত্যাকৃত

    ভাইরাও আছে এই শবের বাগানে।

    এখন যে কেয়ারটেকার তার নাম

    কাশ্যপ ফিকির। সন্ধ্যা হতে ভোর ওব্দি

    দেখাশোনা কোরে বাড়ি ফেরে সূর্যোদয়ে।

    আজ তার সাথে যুবা ছেলে বদ্যিনাথ

    এসেছে বাবার কাছে। কজন মানুষ

    প্রতিরাতে কবরের পাথরটা তুলে

    কেমন বেরিয়ে আসে দেখতে চাইছে।

    প্রতিটি কবরে আছে নামের ফলক ;

    পালি ব্রাহ্মি নাগরি বাংলায় নাম লেখা।

    যুগ অনুযায়ী গোরেতে গ্রাফিতি আঁকা। ]


     

    কাশ্যপ। ।

    কাল ঝড় হয়ে গেছে অথচ বৃষ্টির

    দেখা নেই ; যতই বা পরিষ্কার করি

    চির-গোরস্তান ; সত্যি চিরকেলে এই

    মড়াদের জমায়েত মাটির তলায় ;

    অনেকে বিভ্রম ছাড়া দিব্বি বেঁচে থাকে।

    শসাঙ্ক রাজার দিনকাল থেকে বা তারও

    আগে থেকে বেঁচে আছে লোপাটের লাশ ;

    শুনেছে কি কেউ অন্য সমাজে বা দেশে

    মরার পরও জলচল চলবে না

    এরকম রীতি ? শুধুই এ পোড়ামুখো

    লোকগুলোদের তৈরি সমাজে রয়েছে ;

    এদেশ শাসন করে কাকতাড়ুয়ারা।

    কত ঝড় বয়ে গেল কত রাজা এলো

    আর চলে গেলো, অথচ এ-গোরস্তানে

    বেঁচে আছে সেইসব মানুষেরা যারা

    অকারণে মরে যেতে বাধ্য হয়েছিল ;

    মহারাজ অশোকের ভাইয়েরা আছে–

    কেবল মৃতের থাকে বিভ্রমী বাস্তব।


     

    বদ্যিনাথ। ।

    মৃত্যু তো কারোর বাসি স্মৃতির ছত্রাক ;

    আমার মস্তিষ্কে কেন একজন নারী

    বারবার মৃত্যুর ওপার থেকে ডাকে,

    সে কোন রহস্যময়ী আছে এইখানে

    যে আমার শরীরের গন্ধে জেগে ওঠে ?


     

    কাশ্যপ। ।

    কী ভাবে মরণ এলো সেটা জীবিতের

    বাঁচার সমস্যা ; মরার সময়ে ওটা

    অবান্তর প্রশ্ন বলে আমি মনে করি;

    জন্মাবার মতো মৃত্যুর পথেও ভিড়।


     

    বদ্যিনাথ। ।

    কিন্তু বাবা ছোটোবেলা থেকে গোরস্তানে

    দেখছি চাকরি করে রোজগার করো,

    এখানে না এলে তোমার মনটা কষ্ট

    পায় বলে প্রতিরাতে ঝড়বৃষ্টি অনাছিস্টি

    যা-ই হোক আসা চাই দেখি ; কী যে কাজ

    তাও তো বুঝি না, শুধু পরিষ্কার রাখা,

    কতটুকু সময় বা লাগে, বড়োজোর

    এক থেকে দেঢ় ঘন্টা, তবু সারারাত

    কাটাও এখানে ! কারা এরা ? মরে বেঁচে

    রয়েছে তোমার চোখে, এদের আত্মীয়

    ধারেকাছে আসে না এখানে কোনোদিন ?

    হয়তো এখানে পাবো স্বপ্নে-দেখা নারী

    যে আমার পপতিতি প্রশ্বাসে উচ্চারিত।


     

    কাশ্যপ। ।

    ঘৃণাকে অর্জন সকলের কম্মো নয়।

    গুণ্ডা-লেঠেলরা শাসকের কথা মেনে

    গুমখুন করে লাশ পুঁতেছে এখানে ;

    এদের বাড়ির লোক কাঁদেনিকো তবু।

    পাতালে রয়েছে জেনে চুপ মেরে গেছে।

    লাশেদের চিনি আমি, দাদুর সময়

    থেকে দেখছি এদের, তবে দূর থেকে,

    আড়ালে নিজেকে ঢেকে। দেখবি কেমন

    এক-এক করে কেউ-কেউ বের হবে

    আর নিজেদের মধ্যে কইবে কত যে

    কথা, তার ঠিক নেই। তার আগে আয়

    তাড়িতে ভিজিয়ে রুটি আর মাংস খাই।

    মাটির তলায় গিয়ে সকলেই বাংলা

    কথা বলে, ঠিক যেন আজকের লোক।

    পোঁদে বাঁশ না খেলে সত্য অজানা থাকে

    একমাত্র মড়ারাই জানে মরে গেলে।

    [ কাঁধের তাড়ির হাঁড়ি ঘাসের ওপর

    রেখে, বাপ আর ছেলে তাড়িতে চুবিয়ে

    এক মনে রুটি খায়। এত গাছপালা,

    চাঁদের রুপালি আলো ঢুকতে চায় না।

    রাত ঘন হলে গাছের আড়ালে গিয়ে

    বসে দুইজনে। বহুক্ষণ চুপচাপ।

    একটি কবর থেকে হর্ষবর্ধনের

    চর, বিভূতিসুন্দর, শশাঙ্কের বিষে

    মরেছিল, বেরোয় জরির মেরজাই

    পরে, আর আড়মোড়া ভাঙে। আরেকটি

    কবরের চাপা তুলে বেরোয় সুন্দরী

    প্রাক-আধুনিকা, শরীরে সেকেলে শাড়ি,

    কোমর পর্যন্ত চুল ; রাজধর্ষণের

    পর, সামন্ত-চামচাদের গতি-করা। ]


     

    কাশ্যপ। ।

    লোকটার নাম নাকি বিভূতিসুন্দর,

    গুপ্তচর ছিল রাজা হর্ষবর্ধনের।

    মেয়েতাকে দেখছিস, নাম দেবযানী,

    কোনো এক প্রেমিকের জন্য বসে থাকে।

    ওই দ্যাখ বেরোলো দুজন জাতচাষি,

    নীলকর সায়েবরা দে-মার দে-মার

    দিয়ে, সপরিবারে পুঁতেছে থ্যাঁতা লাশ।

    আওয়াজ করিসনি যেন একেবারে

    নয়তো সবাই এরা ধোঁয়ার কুণ্ডলী

    হয়ে ঢুকে যাবে যে-যার চিহ্ণিত গোরে ;

    চুপচাপ শোন, মৃত্যু কেমন মজার,

    শুনে আটখানা হবি এদের কথায় ;

    শবের সমস্যা হল তার গান নেই।


     

    বিভূতিসুন্দর। ।

    কি গো দেবকন্যা, এখনো কি দেহজুড়ে

    মর্ষকামী শাকসের দুর্গন্ধ রয়েছে

    তোর দেহে ? জানলুম শশাঙ্কের দেশ

    দুরাচারী মিথ্যাচারী অসাধু মানুষে

    ছেয়ে গেছে, কয়েক শতাব্দী কেটে গেল

    আরো অবনতি হয়েই চলেছে দেখি।

    বেড়ে গেছে হায়নাগুলোর অত্যাচার ;

    গরিবের সংখ্যা দেখি বেড়েই চলেছে,

    অথচ হামবড়াই শুনি বিপ্লবের–

    গোরের ভেতরে শুয়ে, বড়-বড় কথা

    রাজনেতাদের কন্ঠে, কী যে আহামরি,

    চিৎকার চেঁচামেচি কুচুটে শ্লোগানে।

    একদা অশোক নাকি অহিংসার বাণী

    লিখেছিল কুঁদে-কুঁদে পাথরে-শিলায়,

    সে-সব লোপাট হয়ে যাদিঘরে রাখা।

    তারপর, তোর কথা বল। কই তোর

    যুবা সে-পুরুষ এলো না তো আজকেও !


     

    দেবযানী। ।

    প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকি পথ চেয়ে ;

    কিছুই যায় না ভোলা। হত্যাকারীদের

    স্মৃতিগন্ধ দেহ থেকে যাবে না কখনো।

    কর্তা যায় কর্তা আসে, ভ্রষ্টগণ থাকে

    এদেশি সমাজে, চেহারা বদল করে,

    কেননা খুনিরা ছাড়া চলে না শাসন ;

    নাঋই হয়ে নারী থাকা সবচে কঠিন

    আজকের দিনে ; বহু নারী গোরস্তানে

    এনে পুঁতে দিচ্ছে শাসকের পেয়াদারা ;

    কোনোই বদল তো এদেশে দেখছি না ;

    গর্ধভেরা চিরকাল শাসক হয়েছে।

    নীলচাষি চিনু হাঁসদা। ।

    নীলচাষ হয়নাকো আর শুনি বটে

    কেবল হত্যার চাষ হয় আজকাল ;

    সবচে উত্তম শিল্প শবকে সাজানো।

    ফোঁপানি-মাখানো গান ভেসে-ভেসে আসে

    কবরের নিরিবিলি শান্তিভঙ্গ কোরে।

    মরেও নিস্তার নেই এই পোড়া দেশে।

    দেবযানী তোমার প্রেমিক এলোনা তো ?


     

    নীলচাষি হাঁদু লস্কর। ।

    শাসকের মোসাহেব নিকৃষ্ট লোকেরা

    শাসকের দিকে যারা তারা জল্লাদের

    দিকে থাকে, তাছাড়া উপায়-পথ নেই।

    যে যুদ্ধ গোষণা করে সে নিজে মরে না।

    দেবযানী তোমার পুরুষ এলোনা তো ?


     

    কাশ্যপ। ।

    ওই দ্যাখ তিনটে শুয়োর বের হল,

    কুকাজ করেছিল রাজার আমলে

    তাই হুকুম-বরদারের গনগনে

    লোহার শাবল পেটে নিয়ে মরেছিল।

    আসলে তখন ওরা শুয়োর ছিল না ;

    কবরের মধ্যে ঢুকে শুয়োর হয়েছে

    জানিনাকো কোন জাদুমন্তরের বলে !

    এ এক আজব মাটি ; কখনো শুয়োর

    পায় মানুষের রূপ, আবার কখনো

    মানুষেরা শুয়োরের মাথা পেয়ে যায়।


     

    বদ্যিনাথ। ।

    আমরা কুমাংস খাচ্চি হবে না তো কিছু ?


     

    কাশ্যপ। ।

    কুকাজ কুকথা বলে আর কিছু নেই,

    গণিত-বর্জিত দেশে বৃত্ত গোল নয়–

    তথ্য বলে কিছু নেই, শুধুই ঘটনা;

    এখন তো যা ইচ্ছে খাবার দিনকাল

    যা ইচ্ছে করার বলবার পচাযুগ,

    কয়েকটা লাশ আসে প্রতিদিন গোরে

    যেকানে জায়গা পাই ঠুসে দিই মড়া

    আদিতে যারই নাম কবরে থাকুক

    তাছাড়া উপায় নেই, বড্ডো স্হানাভাব;

    দিনের বেলায় তাই বোবা সেজে থাকি।


     

    বদ্যিনাথ। ।

    তোমার তুলনা নেই, বাপ বটে তুমি।

    দেবযানী নামে ওই যুবতিকে দেবে ?

    লাস তো তোমার কেয়ারে চিরকাল।

    একবার ভালোবাসা যথেষ্টের বেশি ;

    আমার নামটা ওর মুখের ভেতরে

    ফেলে, দেখবো কী হয় শবে মেয়েটির !

    আমি যে আমিই তার প্রমাণ তো পাবো।

    মনে হয় বহুযুগ ওই নারীটির

    অপেক্ষায়, কাটিয়ে এসেছি আজ এই

    শবতীর্থে ; এখানে মিলব দুইজনে।

    হয়তো আমিই ওর প্রেমিক ছিলুম !


     

    কাশ্যপ। ।

    মাথামুণ্ডু নেই তোর ভাবনা-চিন্তার।

    কেউই বাস্তব নয়, অন্য জগতের।

    এলাকার মানুষেরা এটাকে নরক

    বলে মনে কোরে আড়চোখে চলে যায় ;

    আমাকেও ভুত ভাবে, দেখেছিস নিজে।

    অবাস্তব ও জগতে কেবল মড়ারা

    বেঁচে থাকে। তুই তো বাস্তবে রয়েছিস।

    তোর চেয়ে তিনশত বছরের বড়ো।

    ভালোবাসা হয়নাকো আঘাতবিহীন,

    রক্ত না ঝরলে প্রেম অসম্পূর্ণ থাকে ;

    মেয়েটি কুমারী নয় বলে রাখি তোকে।


     

    বদ্যিনাথ।।

    বাস্তব জগতে আছি আধপেটা খেয়ে,

    বেকার যুবক আমি। তুমি মরে গেলে

    এ-চাকরি পাবো, যা আমার ভাল্লাগে না।

    ওই মেয়েটিকে বড়ো ভালো লেগে গেছে

    ওকেই বিবাহ করে বাড়ি নিয়ে যাব,

    নয়তো সংসার পাতি ওরই কবরে

    ঢুকে, থেকে যাব চিরকাল ওর সাথে।

    যাকে তুমি ভালোবাসো আর যে তোমাকে

    ভালোবাসে, জানি তারা সতত পৃথক।

    কী হবে কৌমার্য নিয়ে ? চাই তো প্রেমিকা !


     

    কাশ্যপ। ।

    বিপথে হারিয়ে গেলে ছুটে যেতে হবে।

    যদি প্রত্যাখ্যাত হোস নষ্ট হয়ে যাবি।


     

    বদ্যিনাথ। ।

    বিপথে না গেলে রাস্তা খোঁজা অসম্ভব।

    প্রেম নিবেদন কোরে প্রত্যাখ্যাত হবো।


     

    কাশ্যপ। ।

    দরবারি দলচারী দেবে তোকে জেলে।


     

    বদ্যিনাথ।।

    পালাবো সেকান থেকে। কয়েদিরা জানে

    জেল মাত্রে পলায়নকারীদের স্বর্গ।

    প্রেমিককে বেঁধে রাখা জেনি অসম্ভব।


     

    কাশ্যপ। ।

    মেয়েটি বিধর্মী হতে পারে বলে রাখি।


     

    বদ্যিনাথ।।

    নারীর হয় না ধর্ম। ওটা পুরুষেরা

    নিজেদের জননাঙ্গ ঘিরে বানিয়েছে।

    তাছাড়া মৃত্যুর কোনো ধর্মাধর্ম নেই।

    প্রেমেরও কোনো ধর্মাধর্ম হয়নাকো।

    মৃতদেহ দেখে কে বোঝে কী গল্প ছিল ?


     

    কাশ্যপ। ।

    সৌন্দর্য দুর্বল করে। বেশ ক্ষতিকর।


     

    বদ্যিনাথ। ।

    ভালোবাসা পেয়ে নারী সুন্দরী হয়েছে।


     

    কাশ্যপ। ।

    সৌন্দর্য যে সন্ত্রাস তা জানিস কি তুই ?


     

    বদ্যিনাথ। ।

    সৌন্দর্য মাংসে নেই। অনপনেয় তবু ;

    সুন্দরীর ভালো-মন্দ বলে কিছু নেই। ।

    ওকে ভালোবেসে আমি মরে যেতে পারি।


     

    কাশ্যপ। ।

    তাড়ি টেনে মগজের মধ্যে তোর যম

    ডাকছে বোধয়। যা চাই তা কর গিয়ে,

    কেয়ারটেকারি বংশ ধুচবে অন্তত,

    অন্য লোকেদের পাপে ভুগতে হবে না ;

    হতে পারে তোরই অপেক্ষা করে আছে

    আবেগকে খেয়ে ফেলা সবচেয়ে ভালো।

    মৃতেরা যৌনতা হীন মনে থাকে যেন।


     

    বদ্যিনাথ। ।

    যৌনতা কী বস্তু ? উঁচুনিচু মাপজোক

    প্রতিরাতে পা ছড়িয়ে মিনিট কয়েক

    প্রেম কি পায়ের ফাঁকে মিনিট পনেরো

    মাংসে-মাংসে তরলতা আদান-প্রদান ?

    [ একটি কবর থেকে পাঁচটা শেয়াল

    পতাকা উঁচিয়ে বের হয়ে চিৎকার

    ধ্বনিতে জানায়, “গোরস্তান মুর্দাবাদ ;

    নয়তো মানুষজন্ম ফিরে দিতে হবে,

    চাকুরি-বঞ্চিত হয়ে আর থাকব না। ”

    তাদের চেঁচানি শুনে অন্যেরা কবরে

    ঢুকে পড়ে তাড়াতাড়ি। নিঃশব্দ কবরে

    বাজে বব ডিলানের ‘ব্লাড অন ট্র্যাক্স’।

    শুয়োরেরা শেয়ালেরা গোরে ঢুকে যায়। ]


     

    কাশ্যপ। ।

    ওরা সব রাজনীতি-করিয়ের ঝাঁক,

    জানিনাকো কোন দলে ছিল, রোজ দেখি

    আজকে এ-চেঁচানি, কালকে অন্য কথা।

    আজকে শেয়াল বটে কাল হবে কাক

    তারপর দেখা দেবে হায়েনার রূপে

    অথবা হয়তো হবে বুড়োটে শকুন।

    এদেশে প্রেমের আর স্হান নেই কোনো।


     

    বদ্যিনাথ। ।

    যারা রাজনীতি করে প্রেমিক হয় না।

    পাগল উন্মাদ যত নচ্ছার বজ্জাত

    ব্যাটারা মরেও পালটায়নি দেখছি,

    এদেরই জন্যে দেশ রসাতলে গেল।

    নীল শেয়ালেতে আজ ছেয়ে গেছে দেশ।

    নীল শেয়ালেরা লাল রঙে পালটায়

    অথবা সবুজ রঙ নিয়ে শাসকের

    সিংহাসন ঘিরে ল্যাজ দুবেলা নাড়ায়।

    কেন যে এদের রক্তে ভালোবাসা নেই ;

    শবেদের ওব্দি এরা কলুষে মুড়েছে।

    তাই তো চাইছি ওই সুন্দরীর পায়ে

    পড়ে বলি, ‘নিন না আমাকে, আপনার

    নাম লেখা গোরে দুজনে বাঁধব জুটি

    স্বর্গ-নরকের ; আমি এই নরকের

    নর, আপনি স্বর্গের লাশরূপী হুরি।


     

    কাশ্যপ। ।

    তার চেয়ে তুই চেষ্টা কর যাতে মেয়ে

    জ্যান্ত হয়ে ফিরে আসে আমাদের মাঝে ;

    লাশ থেকে নারী হয়ে স্বর্গ হতে নামে।

    কী করে সম্ভব হবে তা জানি না, তবু

    প্রয়াস করতে ক্ষতি নেই ; একজন

    মানুষীকে বাঁচার সুযোগ করে দেয়া

    যাবে, হলেই বা দেশটা মরার পথে

    এগিয়ে চলেছে, তার মধ্যে বেঁচে নেয়া,

    যতটুকু সুখ মেলে নরকে থেকেও।

    [ আবার কবর থেকে বের হয় হাঁদু,

    চিনু চাষি, বিভূতিসুন্দর, দেবযানী। ]


     

    বিভূতিসুন্দর। ।

    সাহসিনী নারী, প্রতিশোধ নিতে হবে

    তোমাকে আমাকে, গুমখুনে মৃত যারা

    কাটাচ্ছি সময় এই মাটির তলায়।

    ভিন্নরূপে মানব-সমাজে যেতে হবে।

    হয়তো তোমার প্রেমিককে পেয়ে যাবে।


     

    চাষি হাঁদু লস্কর। ।

    কিন্তু সায়েবসুবোরা চলে গেছে শুনি

    নিজেদের দেশে গিয়ে খাবার জোটে না

    লুটের উপায় পালটে যুদ্ধ লড়ে মরে।

    সত্যি কি প্রেমিক আছে মানব-সংসারে ?


     

    চাষি চিনু হাঁসদা। ।

    উপায় পাল্টায় শুধু। ভবিরা ভোলে না।

    প্রতিশোধ নিতে হলে শত্রু পেতে হবে

    না্লে মাস্তানি ঢঙে করো খুনোখুনি

    আত্মীয়-স্বজনদের কচুকাটা করো।

    তার চেয়ে ভালো গোরে আরামে কাটাও।

    মনে হয় প্রেমিকেরা পৃথিবীতে নেই।


     

    চাষি হাঁদু লস্কর। ।

    গন্ধ পাচ্ছি মনে হল কীরকম যেন

    কুমাংস খাবার, হাড় চেবানোর শব্দ।

    জীবিতেরা রক্তমজ্জা চুষে দেশটাকে

    ওঠালো বোধয় লাটে, তার শব্দ পাই।


     

    দেবযানী। ।

    মাংস নয়, জীবিত মানুষ কেউ আছে

    কাছেপিঠে, তারই শ্বাসের সুরাভাস

    থেকে মোদো মরদের গন্ধ ছড়িয়েছে ;

    তবে তারা হত্যাকারী নয় মনে করি

    কেননা খুনির ঘাম-গন্ধ আমি চিনি।


     

    বিভূতিসুন্দর। ।

    তা্লে কি গন্ধ পাল্টাপাল্টি হয়ে গেছে

    জীবন-মৃত্যুর ? গোরস্তানে জীবিতেরা !

    সমাজের মাঝে মরা লাশগুলো আজ !


     

    চাষি হাঁদু লস্কর। ।

    আমাদের কালে কোনো সমাজ ছিল না ;

    মোড়লেরা ছিল, হয়তো এখনো আছে

    তাদের মোড়ুলি, ভিন্ন চেহারায় সেজে ;

    পোশাক তো দেখি আর সেরকম নেই;

    কবরে ঢুকেও বকবক থামেনাকো।


     

    বিভূতিসুন্দর। ।

    হয়তো তোমার কথা ঠিক। প্রতিদিন

    যারা আসে, অশ্লীল পোশাক পরে ঢোকে।

    হয়তো সেজন্য তারা শুয়োর শেয়াল

    হয়ে রূপ বদলায় মাটির তলায়।


     

    চাষি চিনু হাঁসদা। ।

    আমার তো মনে হয় গুমখুন করা

    বলে, শবাচার ঘটেনিকো, তাই ওরা

    অমন পোশাক পরে গোরে গিয়ে ঢোকে।

    কিন্তু জীবিতে গন্ধ আছে কাছেপিঠে,

    সেই গন্ধ কবরের বুড়োটার নয়,

    যে-বুড়োটা প্রতিরাতে ঝাড়পোঁছ করে।


     

    দেবযানী। ।

    আমিও তোমার সঙ্গে একমত। তার

    দেহ গতানুগতিক শ্রমে ভিজে থাকে।

    এ-গন্ধ পুরুষ্টু যুবকের তা নিশ্চিত

    বলে দিতে পারি; ভয় করে এই গন্ধ।

    এই গন্ধ আমার প্রেমিক প্রতিরাতে

    নিজের ঘর্মাক্ত দেহে আনতো লুকিয়ে।

    আমাদের দুজনকে কোটালের চর

    খুঁজে বের কোরে, আমাকে ধর্ষণ আর

    আমার যুবক প্রেমিককে খুন কোরে

    তার দেহ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভাসিয়েছে

    রূপনারাণের স্রোতে বহু যুগ আগে।


     

    কাশ্যপ। ।

    ওফ ! অবিস্মরণীয় দুর্ঘটনা ! আমি তোকে

    রূপনারাণের তীরে কুড়িয়ে পেয়েছি

    বদ্যিনাথ। ওরে আমি অপৌরুষ লোক,

    বংশলিপ হয়ে যাবে ভেবে নদী থেকে

    তোকে তুলে এনেছি আমার পরিবারে ;

    বিবাহ করিনি তাই তোর মুখ চেয়ে।

    যা নারীকে আনতুম সে তো চলে যেতো

    জেনে আমি অপৌরুষ বীর্যথলিহীন।

    যা তুই, চলে যা, শবরূপী প্রেমিকার

    কাছে, মুক্তি পাক অন্ধকার দেহ থেকে।

    নিয়ার ফেরত ওকে পৃথিবীর ঘামে,

    সংগ্রাম সংঘর্ষে ঘেরা জর্জরিত দেশে।

    অন্তত মৃত্যুর চেয়ে শ্রেয় বেঁচে থাকা

    জগতের কুবাতাসে নোংরা দ্বন্দ্ব দ্বেষে।


     

    বদ্যিনাথ। ।

    তুমি যদি বীর্যহীন, গণিকার ঘরে

    যাও কেন ? কী করো তাদের বাড়ি গিয়ে ?


     

    কাশ্যপ। ।

    যন্ত্রণা সংঘর্ষ পরাজয় মেনে নিতে

    জীবিতের শরীরের তাপ পেতে যাই।

    নাঋ-সঙ্গমের জন্য যাই না সেখানে।

    নারীটির বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকি,

    জানিস কখন ? হা-হা, দিবা দ্বিপ্রহরে

    পা গুটিয়ে শিশুর মতন, দুধহীন

    গণিকার স্তন থেকে স্নেহসুধা খাই।

    এবার সমাপ্তি চাই এই জীবনের।

    শব-সমাজের থেকে মুক্তি পেতে চাই।

    তুই যা নিয়ায় গিয়ে মেয়েটিকে ঘরে

    বা২চিয়ে আনতে যদি পারা যায় ভালো ;

    অন্তত একটি প্রাণী ফিরবে জীবনে

    নতুবা এদেশ যাবে শবের কবরে।

    ওর গর্ভ ধেকে যদি নতুন মানুষ

    জন্ম নেয়, তাহলে বাঁচাবে দেশটাকে।

    নতুবা কবরে ঢুকে আত্মহত্যা কর ;

    হরপ্পা-হরফে লেখ মৃত্যু চিরকুট,

    মৃত্যুর বয়ান মৃত ভাষাতেই ভালো।


     

    বদ্যিনাথ। ।

    তাই সই, আত্মহত্যা করি, মেয়েতির

    পায়ে সঁপে এ-জীবন যা প্রেমে বঞ্চিত ;

    উন্মাদ কবিত্ব থাকে মৃত্যুর হৃদয়ে,

    জানি না কী হবে তার ফল ; দেবযানী

    যদি প্রত্যাখ্যান করে তবু মেনে নেবো।

    কিছুই নিশ্চিত নয়, না জন্ম, না মৃত্যু,

    পঁচাত্তর বচরের বুড়োর দুঠোঁট

    দেখে, কেউ বোঝে কি সে খেয়েছিল চুমু ?

    [ বদ্যিনাথ ছুটে গিয়ে মেবেতির দেহ

    দুহাতে জড়িয়ে ধরে। ফলে হতবাক

    দেবযানী ছাড়া অন্যান্য সবাই নিজ

    আদল পালটে ফেলে ধোঁয়ার কুন্ডলি

    হয়ে যা যার কবরে ঢুকে যায়। মৃদু

    ‘ব্লাড অন ট্র্যাক্স’-এর স্হানে বেজে চলে

    বিঠোফেনকৃত ‘ওড টু জয়’ সঙ্গীত। ]


     

    দেবযানী। ।

    জানতুম একদিন আসবেই তুমি,

    আমার প্রেমের ডাকে ফিরে। আছো

    এখানেই আমি জানতে পারছিলুম

    তোমার দেহের সেই পরিচিত গন্ধে।

    মনে আছে ? সেই সন্ধ্যা ? রূপনারাণের

    তীরে ? আদান-প্রদান করতুম ছোঁয়া ?

    বালির ওপরে শুয়ে বিকেলের প্রেম ?


     

    বদ্যিনাথ। ।

    ভালোবাসি, ব্যাস এতটুকু আমি জানি

    তিনশ বছর ধরে তাই হেথা-সেথা

    খুঁজেছি তোমায় দেবযানী প্রিয়তমা।

    যদি বলো তোমার কবরে বাসা বাঁধি

    দুইজনে ; নতুবা আমার সঙ্গে চলো

    মাটির কুটিরে গিয়ে সংসার পাতি।


     

    দেবযানী। ।

    কত কথা বলা বাকি আছে বদ্যিনাথ

    তিনশ বছর একা ভাবতে কি পারো

    স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে অপেক্ষায় আমি

    চুপচাপ শুয়ে আছি আলিঙ্গনহীন

    পুরুষের ছোঁয়া ও আদরহীন দেহে ?


     

    বদ্যিনাথ। ।

    জানি সব জানি আমি যুবতি আমার

    তাইতো এসেছি নিয়ে যেতে কুঁড়েঘরে

    বাঁধব দুজনে বাসা স্বপ্নের সংসার।

    [ বদ্যিনাথ চুমু খায় উন্মদের ঢঙে

    ক্রমশ শাড়ির পাক খুলে চুমু খায়

    দেহের সর্বত্র যা অপেক্ষা করে ছিল। ]


     

    দেবযানী। ।

    যে-সঙ্গম অসম্পূর্ণ ছিল, এসো আজ

    তাকে পরিপূর্ণ করি প্রিয় বদ্যিনাথ।

    [ দেবযানী-বদ্যিনাথ ঘাসে আলিঙ্গনে

    পরস্পর মগ্ন যখন, ওদের ঘিরে

    ফ্যালে জনাকয় লেঠেল-মাস্তান-খুনি। ]


     

    খুনির দল। ।

    মার-মার মেরে ফ্যাল মেরে ফ্যাল মার

    মেরে ফ্যাল মার-মার মেরে ফ্যাল মার

    মার-মার মার-মার মেরে ফ্যাল মার।

    [ তারা কেউ কবরের ডালা খুলে

    আবার কেউবা নিকটের গ্রাম থেকে

    একযোগে মর্ত্য-পাতালের লোক মিলে

    ছোরাছুরি তরোয়াল নিয়ে আক্রমণ

    করে ; প্রেমিক ও প্রেমিকার ছিন্নভিন্ন

    দেহ ঘাসের ওপরে ফেলে অট্টহাস্যে

    গাছে-বসা পাখিদের ওড়ায় আকাশে।

    অর্ধেক কবরে ঢোকে বাদবাকি লোক

    নাচতে-নাচতে অন্ধকারে মিসে যায়।

    পুনরায় শোনা যায় ‘ব্লাড অন ট্র্যাক্স’।

    কাশ্যপ দাঁড়ায় গিয়ে সদ্য খুন-করা

    ছেলে আর যুবতীর শবের নিকটে। ]


     

    কাশ্যপ। ।

    সঙ্গম করার কালে মৃত্যুর মতন

    স্বর্গীয় সুষমা নেই, তাও গোরস্তানে।

    নেশা কোরে সত্য বলেছিল বদ্যিনাথ :

    মৃত্যুর হৃদয়ে থাকে উন্মাদ প্রেমিক।

    [ ভোর হয়ে আসে আর মৃদু বাজনায়

    শোনা যায় পুনরায় বিঠোফেনকৃত

    ‘ওড টু জয়’। প্রেমিক-প্রেমিকার দেহ

    ধোঁয়ার নীলাভ আলো হয়ে উড়ে যায়। ]

  • মলয় রায়চৌধুরী | ৩১ জুলাই ২০২১ ১৯:৫৫734800
  • মলয় রায়চৌধুরীর কাব্যনাট্য

    সুর্পনখা – বাল্মীকি সংবাদ

    সুর্পনখা। ।

    খুবই জঘন্য কাজ হয়েছে তোমার আদি কবি

    এভাবে আমাকে পাঁকের মৃণ্ময়ীরূপে মহাকাব্যে

    হেয় করা। তাই অনুরোধ করি আমাকে পাঠিয়ে

    দাও, মহাভারতের গল্পে। ব্যাস আমাকে নিশ্চিত

    আমার মনের মতো সুপুরুষ পাইয়ে দেবেন।

    বাল্মীকি। ।

    কী যে বলছিস তুই স্পষ্ট করে বল সুর্পনখা ;

    মহাভারতের গল্পে পাঠালে আমার রামায়ণ

    টিকবে কী করে ? কেনই বা ওই ভিড়ে চাস যেতে

    গল্পের ভেতরে গল্পে কেউ তোকে খুঁজেই পাবে না।

    ইতিহাসে তুই একমাত্র অসেতুসম্ভব সেতু —

    ভুললি কী করে সৌন্দর্যের মূল হল অমরত্ব

    তা তো পেয়েছিস তুই, আবার কিসের এঁড়ে-গোঁসা ?

    সুর্পনখা। ।

    ব্যাসদেব তোমার মতন উইপোকা ঢাকা পড়ে

    কাটাননি জীবন। নারীর আবেগ-আকাঙ্খা উনি

    অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছেন। কুতসিৎ হিড়িম্বীও

    রূপসীর ভেক ধরে, কুন্তির নির্দেশে, আলিঙ্গনে

    পেয়েছে ভীমকে। উলুপী তো ছিল জলের তলায়,

    চিত্রাঙ্গদা ছিল দূরদেশে ; তারপর সুভদ্রার

    আদরের দাবি মেটাবার জন্য গেলেন অর্জুন

    তার আগে স্বয়ম্বরে জিতে এনেছেন দ্রৌপদীকে;

    দ্রোপদী তো কালো চকচকে-ত্বক সৈরন্ধ্রী ছিলেন।

    একসাথে পাঁচজন পুরুষকে ভালোবেসেছেন।

    এতজন পুরুষকে-নারীকে যে ভালোবাসা যায়

    তা তুমি কখনো কবি পারোনি করতে অনুমান।

    বাল্মীকি। ।

    বোকার মরণ, জানিস না আমি আদি কবি কেন ?

    ঘরে ঘরে আমার বইকে লোকে পুজো করে আজো

    কিন্তু ঝগড়ার ভয়ে কেউই রাখে না ব্যাসদেব।

    সুর্পনখা। ।

    জানি বলেই তো তাজ্জব লেগেছে। প্রেমিক পাখিকে

    ব্যাধ তীরবিদ্ধ করেছিল বলে কেঁদে ফেলেছিলে,

    সেই শোকে রক্তে জবজবে হল তোমার লেখনি

    আর তুমি তৈরি করে ছেড়ে দিলে এমন দুজন

    বনবাসী, যারা অন্যের প্রেমের ডাকে সাড়া দিতে

    ভয় পায়। রাম ও লক্ষ্মণ ওরা অর্জুনের পাশে

    একেবারে হালকা নিষ্প্রভ। ঘুমিয়েছে লক্ষ্মণের

    উর্মিলা চোদ্দটি বৎসর। কেন ? পাছে সেও কোনো

    যুবকের প্রেমে পড়ে ; তাকে তুমি মাদকের চেয়ে

    কড়া ভ্রমে রেখেছ ভুলিয়ে। রামও কেমন লোক ?

    রামভিতু শব্দটার জন্মে তো ওরই অবদান

    অগ্নিপরীক্ষার তাপে ঠেলে দিল নিজের বউকে।

    ঘরে তাই রামায়ণ রাখে না এদেশি পরিবার–

    কোথায় রামের জন্ম তাই নিয়ে চলে খুনোখুনি।

    বাল্মীকি। ।

    আমার স্মৃতির কেন্দ্র তুই ও কৈকেয়ী দুইজন ;

    স্মৃতি মানে ইতিহাস, চাইলেও বদলানো অসম্ভব

    রাম-রাবণের মাঝে অসেতুসম্ভব-সেতু তুই।

    সুর্পনখা। ।

    কী যে দোহাই পাড়ছ। স্মৃতি মুছে যায় কালক্রমে।

    আমি কি জানি না ইতিহাস বানানো কাহিনি মাত্র

    যে বসে সিংহাসনে তার কথা শোনে ইতিহাস

    ঘটনার চক্র থেকে খুঁটে তোলা লেখনি-বিভ্রম।

    যাই হোক আমাকে তোমার স্মৃতি থেকে মুছে ফ্যালো

    আর যেতে দাও মহাভারতের মায়াবী জগতে।

    আমাকে হতশ্রী না করলে কি ইতিহাস অশুদ্ধ

    হতো ? সুন্দরী হতুম যদি হরিণের পিছে নয়

    আমার পিছনে ছুটে চলে আসত লক্ষ্মণ-রাম

    তাহলে তোমার গল্পে যুদ্ধ ঘটাতে পারতে নাকো।

    জানি না কি বিশ্বামিত্র মেনকাকে দেখে ধ্যান ভেঙে

    কী-কী করলেন ! আর পুরূরবা উর্বশীর প্রেমে

    হননি কি উত্তাপে সরেস ? দেখেচ তো বিশ্বকর্মা

    তিলে-তিলে গড়লেন তিলোত্তমা, যার প্রেমে শিব

    আর ইন্দ্র দুজনেই লুকোতে পারেনি জ্বরতাপ ?

    শিবের গজালো মাথা দশদিকে, ইন্দ্রের শরীর

    জুড়ে চোখ, স্রেফ তিলোত্তমা দর্শনের অভিলাষে !

    ভোল পালটিয়ে ইন্দ্র অহল্যাকে করেছে সঙ্গম !

    আমি যদি ভালোবেসে থাকি তাতে দোষটা কোথায় ?

    বাল্মীকি। ।

    তুই হলি ত্রেতাযুগী রাক্ষসী বিধবা। অর্জুনেরা

    দ্বাপর যুগের। যত যুগ এগোতে থাকবি তত

    পাবি মূল্যবোধহীন লোকেদের। যদি বর্তমান

    যুগে যাস তাহলে দেখবি যত কলি-কালখণ্ড

    কেলেঙ্কারি। দুষ্টবুদ্ধির সঙ্গে ছিলিস তো ভালোই ;

    নিতে গেল সিংহাসন, শেষে ডোবালো তোকেও।

    জানিস তো দ্বাপরেই সতীপ্রথা শুরু হয়েছিল

    মহাভারতের গল্পে চিতার আগুনে পুড়তিস।

    আমার স্মৃতিতে শুধু অঙ্গহানি হয়েছিল তোর।

    সুর্পনখা। ।

    ওটাও তোমার কাজ ; আমার বরের নামে দুষ্ট

    যোগ করা। যাই হোক, এবার আমাকে ছাড়ো।

    যেতে দাও দ্বাপরের বিস্ময় জগতে। প্রেমিককে

    পেতে হলে মূল্যবোধ নয়, প্রেম চাই, প্রেম, তা তো

    ব্যাসদেব নিজে শুরুতেই করে দেখিয়ে গেছেন।

    ওসব তোমার কর্ম নয়। রামও কেমন লোক ?

    সোনার হরিণ দেখে তার পিছে-পিছে ছুটে গেল

    আমার প্রেমের চেয়ে কুড়ি কিলো সোনা যেন দামি !

    লক্ষ্মণই বা কেমনতরো ? নারীকে বিকৃত করে ?

    তুমি কুতসিৎ করে তুললেও আমার বাবা মা

    আমাকে মীনাক্ষী নামে অপরূপা করে তুলেছেন

    তাই মীনাক্ষী হয়েই যাবো মহাভারতের গল্পে।

    বাল্মীকি। ।

    তোকে ছাড়া মুশকিল কেননা যুদ্ধের তো ওজর

    দরকার। যদিও এদান্তি অকারণে খেলাচ্ছলে

    বারুদ মকসো করে যুদ্ধ শুরু হয়। ঠিক আছে।

    পরবর্তি সংস্করণে স্মৃতিকে শুধরে নিতে হবে ;

    তবে আমি হলেও বা রাজি, রামভক্ত লোকজন

    চটে যেতে পারে এই ভেবে যে অমরত্বের লোভে

    একটা গল্পের নারী অন্য ইতিহাসে ঢুকে গেল।

    রাম তো যুদ্ধের পর বাড়ি ফিরে গেছে। অতএব

    আমার স্মৃতিতে তোর দরকার নেই সুর্পনখা–

    লক্ষ্মণের কাটা অঙ্গ আমার কুটিরে রেখে আয়

    দেখি যদি অন্য কোনো চরিত্রের কাজে যায় লেগে।

    সুর্পনখা। ।

    তোমার কাহিনি বৌদ্ধ জৈন থাই ব্রহ্মদেশে গিয়ে

    পাঠান্তর নিয়েছিল। কৃত্তিবাস তোমার ছায়ায়

    তুলসীদাস রামচরিতমানসের কাহিনিতে

    নিরক্ষর মগজের লোকেদের ভুল বোঝালেন

    আমাকে সবার কাছে চরিত্রহীন করে দিয়ে।

    তাই চাই মহাভারতের গল্পে গিয়ে, অর্জুনকে

    প্রেম নিবেদন করি মীনাক্ষীর আসক্ত আঙ্গিকে।

    বাল্মীকি। ।

    তবে তাই কর। আমার স্মৃতিতে যেমন হঠাৎ

    তুই গল্প থেকে চলে গিয়েছিলি, রা কাড়েনি কেউ

    তেমনি ওখানে গিয়ে কুরুক্ষেত্র শেষে তোকে নিয়ে

    চিন্তার সময় কারোরই থাকবে না। সেসময়ে

    এসে তোর কাটা অঙ্গগুলো নিয়ে যাস যদি চাস।

    সুর্পনখা। ।

    না আমার প্রয়োজন নেই। যেটুকু নারীত্ব আছে

    তাই নিয়ে যুগে-যুগে আসব প্রেমের কবিতায়

    গল্পে-নাটকে-নভেলে। জানবে সবাই, কুতসিৎ

    মেয়েরাও প্রেম নিবেদন করে প্রেমিককে পায় ;

    হলেই বা পাঁকের মৃণ্ময়ী, কোলে কালি ছোটো-চোখ

    পেছন থেকেও বুক দেখা যায় বলে লোকে হাসে

    নিমপাতা মাখা গন্ধে মাছিরা বাসর পাতে দেহে

    চুলও উকুনে রুক্ষ পূতিগন্ধময় পুরু ঠোঁট–

    কিন্তু জানি যেকোনো পুরুষ যদু বাহুবদ্ধ করি

    তরল বিদ্যুৎ বয়ে যাবে তার উত্তপ্ত শিরায়

    প্রেম যে কীভাবে দেহে খেলা করে তুমি তা জানো না।

    তার জন্য কবিকে প্রথমে প্রেমে প্লুত হতে হবে।

    ভালোবাসার উৎসব

    পরিদৃশ্য

    পায়রোটেকনিকে তোলা রঙিন ঝড় ( গাঢ় লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, বেগুনি এবং গোলাপি। রঙগুলো প্রতিটি নারীর ভাবকল্প )। সাত রঙের ঝোড়ো আলো ( যে রসায়নে আলো গড়ে উঠেছে : লিথিয়াম ক্লোরাইড, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম ক্লোরাইড, কপার সালফেট, কপার ক্লোরাইড, পটাশিয়াম সালফেট এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইড)।

    পাত্রপাত্রী

    ১. কুলসুম বানু ( ১৪ বছর, কালো, মোটা, সলমা-সিতারার কাজকরা গাঢ় লাল সস্তা চুড়িদার ), ২. নন্দিতা সিনহা (১৯ বছরের তরুণী, ফর্সা, সুন্দরী, ঢ্যাঙা, অভিমানী, কমলা রঙের কটন শাড়ি ), ৩. ভূবনমনমোহিনী রাণা ( ২১ বছরের নেপালি যুবতী, সুশিক্ষিতা, হলুদ কাঞ্জিভরম ), ৪. চিত্রাঙ্গদা বসু ( ৩৫ বছরের বাঙালি যুবতী, যৌনকর্মী, সবুজ সিনথেটিক শাড়ি ), ৫. ক্যারল নোভাক ( ২৬ বচরের মার্কিন যুবতী, মাদকাসক্ত, নীল টপ ও ফেডেড জিন্স ), ৬. অবন্তিকা রায় ( ৩০ বছরের বাঙালি যুবতী, প্রেমে উন্মাদ, বেগুনি কল্কার জামদানি শাড়ি ), ৭. শ্রীমন্তিনী সেনগুপ্ত ( ২৭ বছরের বাঙালি যুবতী, হলুদ টপ ও জিন্সপরা, পিঠে ছড়ানো কালো চুল ), ৮. চারজন বৃদ্ধের দল ( ধুতি ও গেরুয়া পাঞ্জাবি পরা ; পায়ে কথ্থক নাচের ঘুঙুর এবং প্রতি সংলাপে কথ্থকনাচের ভঙ্গীতে পাক খান ও গোড়ালি ঠোকেন। দৃশ্যকেন্দ্রে তাঁরা শবের দান দিকে সার বেঁধে দাঁড়ান ), ৯. চারজন বৃদ্ধার দল ( লাল পেড়ে শাড়ি ও ব্লাউজ। প্রতি সংলাপে ভারতনাট্যমের মুদ্রায় হাত নাচান; সেসময়ে মৃদঙ্গ বাজে। দৃশ্যকেন্দ্রে তাঁরা শবের বাঁদিকে সার বেঁধে দাঁড়ান। ), ১০. একজন টাকমাথা আউলবাবু ( প্যান্টশার্ট পরা, কাঁধে ঝোলা, কথা বলার সময়ে হিপহপ নাচেন ; হিপহপ নাচের সময়ে নেপথ্যে বাজতে শোনা যায় গিটার, ভায়োলিন, পিয়ানো, বাস ওড্রাম ), ১১. একজন যোদ্ধা।

    [ ধুলিকণাদের নিয়ে ঝড় ওঠে, প্রতিটি রঙিন

    বালু, তাদের সাতটি আলোকণা একযোগে দৃশ্যকেন্দ্রে ছুটে

    যায়, ঘূর্ণিকেন্দ্রে গিয়ে মানব আকার মেলে ধরে

    উলঙ্গ যোদ্ধার, অবিন্যস্ত চুল তার, শ্বেতশুভ্র দাড়িগোঁফ,

    ঋজু-ফর্সা। আচমকা চারিদিক থেকে ছয়জন

    কিশোরী-তরুণী আবির্ভূত হন, ঘিরে ধরে বৃদ্ধটিকে খুন

    করে ছোরাছুরি তরোয়াল দিয়ে আর

    উধাও একইভাবে হন। তারপর চারিদিকে শব্দহীন ঝিঁঝিডাক।

    যোদ্ধাটির শব পড়ে থাকে বহুক্ষণ। মৃতদেহ থেকে ওঠে

    ছয়রঙা ধোঁয়া ; কিছিক্ষণ পর নারীর আকার পায় তারা—

    সেই নারীদের, যারা লোকটিকে খুন করে চলে গিয়েছিল।

    এ-সময়টুকুতে সরোদে রাগ দুর্গার আরোহ শোনা যায়। ]

    কুলসুম ( উবু হয়ে যোদ্ধার হাত নিজের দুহাতে নিয়ে )। ।

    আমি এই বালকের হাতদুটি কেটে নিয়ে যাব

    আমিই দিয়েছি একে প্রথম ছোঁয়ার নিরাময়

    এই দুটি হাত দিয়ে আমার তাপিত তাড়নায়

    শান্তি দিয়েছিল এ-বালক, অন্ধকারে হাঁস ও মুর্গির মাঝে

    যখন দুজনে মিলে নিজেদের কৌতূহলী-উমে শিখিয়েছি

    কীভাবে প্রেম পেলে দুধখোর প্রাণীর জন্ম হয়।

    এর হাত আমারই দ্বারা প্রভাবিত।

    এর হাত কখনো কচলায়নি গিয়ে নন্দনের বনানীতে

    এতই ভার্জিন এর হস্তরেখাগুলো। ( চপার দিয়ে

    বাঁ হাত কাটতে উদ্যোগী হয়। বৃদ্ধদলের প্রবেশ )

    বৃদ্ধদল ( কোরাস, কুলসুমের দিকে তাকিয়ে )। ।

    নিচ্ছ যদি ছোঁয়াচ নিও

    শুধুই নিজের ছোঁয়াচ নিও

    অন্য নারীর ছোঁয়াচগুলো

    হাতেই রেখে যেমন ছিল

    তোমার তাতে নেই অধিকার

    তাদের নিও যারা তোমার

    গোপন-গলি চরতে এলো

    প্রভাব নিয়ে গুলে খেলো !

    [ নাচতে-নাচতে ঢোকে আউলবাবু নামে এক লোক।

    লাশের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে কাঁধের ঝোলা থেকে

    পেন ও ডায়রি সঙ্গোপনে বের করে ]

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    প্রশ্ন হল এ কি যুদ্ধক্ষেত্র ধেকে পালিয়ে এসেছে ?

    যতদূর জানি ব্যাটা তো মেটিং গেমের ওস্তাদ

    সব্দে-শব্দে মেটিং করে বাক্যে-বাক্যে মেটিং করায়;

    অথচ ছিল না এর বেঘো-মা বাপ-হেলিকোপ্টারি !

    [ বৃদ্ধলের প্রস্হান ও বৃদ্ধাদলের প্রবেশ ]

    বৃদ্ধাদল ( কোরাস, কুলসুমের দিকে তাকিয়ে )। ।

    তারপর তুই যাদের ছুঁলি

    তারা কেন বঞ্চিত রে

    তাদের হকে দেয়াল তুলে

    একলষেঁড়ে বায়না ধরে

    বাসি প্রেমের টাটকা বুলি

    ঝাড়িস কিসের জন্য রে ?

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    তবে বুঝতে পারছি যোদ্ধা ছিল অতীব অশ্লীল !

    নয়তো এমন ল্যাংটো পড়ে থাকে কেউ ?

    পার্টি-অ্যানিমাল ছিল দলছুট বাঙালি-পুঙ্গব।

    [ বৃদ্ধাদলের প্রস্হান ]

    কুলসুম ( চলে যেতে-থাকা বৃদ্ধাদলের উদ্দেশে )। ।

    কী হবে ওসব শুনে ? কাঁচা কৌমার্যের আরক্তিম

    যা ছিল প্রথম রঙ তা তো আমারই অবদান

    তাই আমি হাত দুটো নেবো ; বলুক যার যা ইচ্ছা

    এর হাত আমার দ্বারাই প্রভাবিত।

    [ বৃদ্ধদল ও বৃদ্ধাদলের প্রবেশ। ]

    বৃদ্ধদল ( কোরাস, বৃদ্ধাদলের উদ্দেশে )। ।

    তা না হয় হল, কিন্তু কী হল শেষকালে ?

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    কিন্তু যোদ্ধা লোকটা কি দ্রোহী না বিপ্লবী ?

    রাষ্ট্রের মালিকদের জানিয়ে রাখার প্রয়োজন

    বলা তো যায় না ; শবেরাও আইনশৃঙ্খলা ভাঙে এইদেশে।

    বৃদ্ধাদল ( কোরাস, বৃদ্ধদলের উদ্দেশে )। ।

    তা না হয় হল, কিন্তু কী হবে শেষকালে ?

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    বদনাম লড়াকুর পচা লাশ নেবে কি দেশের ইতিহাস ?

    হতেই পারে না ; সামলাবে আমাদের পোষা খাদিম-মুন্সিরা ;

    জলজ্যান্ত মাটিতে পোঁতার আগে টেঁসে গেল শালা।

    [বৃদ্ধদল ও বৃদ্ধাদলের প্রস্হান ]

    নন্দিতা ( ১৪ বছরের কিশোরীটির দিকে তাকিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে

    আর চপারসুদ্ধ হাত ধরে তাকে দাঁড় করায় )। ।

    কে রে তুই কচিখুকি ? এ আবার বালক কোথায় ?

    মৃত তবু কত লোভনীয়-দেহ তরতাজা টাটকা যুবক।

    নিজের চেহারা দ্যাক আর এ পুরুষ্টু লোকটাকে

    কোথাও কি কোনো মিল আছে ? ছোটোলোকি

    কালো মোটা বদগন্ধ বেঢপ আদল তোর ! এই

    সুপুরুষ যুবা ককখনো ভুলেও ছোঁবে না তোর

    টোপ-ফেলা গোপন নোংরামি। শুধু দুটি হাত নয়

    এর দুটি ঠোঁটও আমার। স্বাদও দিয়েছি

    আমি, বুকের সুগন্ধী গামে বনপ্রান্তে মাদুরের

    গ্রীষ্মাবকাশের ঘাসে, আমারই অধিকার এর

    নোনতা অধরে ; রক্তহীন কেটে নিচ্ছি

    এর ঠোঁট আমারই দ্বারা প্রভাবিত;

    আজ অব্দি যে কথা বলেছে সব আমারই প্রভাবে।

    [ ছুরি বের করে কাটতে ঝোঁকে। বৃদ্ধদলের প্রবেশ। ]

    বৃদ্ধদল ( কোরাস, নন্দিতার উদ্দেশে )। ।

    নিচ্ছ যদি চুমুই নিও

    ওই ঠোঁটে তো আরও অনেক

    নারীর মোহের কান্না-হিসেব

    গরিব-ধনী গৌরী-শ্যামা

    ঘূনপোকাদের দেখা খোয়াব

    বাঁচিয়ে নিজের হিসসা নিও।

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    এ-ব্যাটা জিততো যদি আমাদের চাকরি খেয়ে নিতো !

    ভাগ্যিস এমন লোক বারবার আসে বটে তবে মারা পড়ে

    এদের সাকিন-নাম বাসি নথি-খাতা ছাড়া কোথাও থাকে না।

    আকাশের মেঘ খেতো ডায়নোসর তারাও আজকে হাপিস।

    [বৃদ্ধদলের প্রস্হান ও বৃদ্ধাদলের প্রবেশ ]

    বৃদ্ধাদল ( কোরাস, নন্দিতার উদ্দেশে )। ।

    তারপরে তুই চুমলি যাদের

    ভুললি কেন তাদের ছুঁড়ি

    কোথায় সেসব ঠোঁট রেখেছিস

    একেই কেন চাইরে বুড়ি

    এর ভেতরে কী পেয়েছিস

    মাঞ্জা-দেয়া উড়োন-ঘুড়ি ?

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    তবে এই লাশটাকে কোটালের হেপাজতে দেয়াটাই ঠিক

    ভ্যান রিকশায় তুলে ফেলবে ভাগাড়ে নিয়ে গিয়ে ;

    সেজেছিল প্রেমিক লড়াকু বানচোত

    জানতো না প্রেম আর বিরোধিতা জলে তেলে মেশার মতন।

    [ বৃদ্ধাদলের প্রস্হান ]

    নন্দিতা ( চলে যেতে থাকা বৃদ্ধাদলের উদ্দেশে )। ।

    ঋতুর গোপন গন্ধে মহিষের চেয়ে দৃঢ়-ঋজু এ-যুবক

    খুরের ধুলোব গুঁড়িয়েছে ভুতগ্রস্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাধা

    তারপর যা ঘটেছে ইতিহাসে লেখা যাবেনাকো

    শিং-ভাঙা পুং-ছাগলেরা পড়ে আছে প্রতিষ্ঠানের হাড়িকাঠে

    তাই আমি নিতে চাই যা আমার যা দিয়ে তৈরি করেছি একে।

    কখনও দুটিঠোঁট শিশুর মতন ইনি রাখতেন বুকে

    কিংবা হাঙরের ঢঙে দুই ঠোঁট মেলেছে দেহের অলিগলি

    কত কাতুকুতু জমে আছে শরীরের স্মৃতি-বিজড়িত ঘরে।

    এর ঠোঁট আমারই দ্বারা প্রভাবিত।

    [ বৃদ্ধদল ও বৃদ্ধাদলের প্রবেশ ]

    বৃদ্ধদল ( কোরাস, বৃদ্ধাদলের উদ্দেশে )। ।

    তা না হয় হল, কিন্তু শেষকালে কী হল ?

    বৃদ্ধাদল ( কোরাস, বৃদ্ধদলের উদ্দেশে )। ।

    তা না হয় হল, কিন্তু শেষকালে কী হল ?

    [ বৃদ্ধদল ও বৃদ্ধাদলের প্রস্হান ]

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    যোদ্ধাদের কাজ হল টেঁসে যাওয়া, সেকাজ করেছে লোকটা,

    হেঁ হেঁ, প্রেমপন্হা ভাঙবেন ইনি ? গানডুটা চেনেনি রাষ্ট্রকে–

    যে-লোকই বসুক চেয়ারে তার মগজে বদল ঘটবেই।

    ভূবনমোহিনী ( কুলসুম ও নন্দিতার মাঝে দাঁড়িয়ে )। ।

    কী করছ কী বলছ যাতা তোমরা দুজনে মিলে,

    দাঁড়াও, সবার আগে আমি জিভটুকু কেটে নিই

    লেহন করেছে কতদিন নেকড়ের

    ঢঙে, যে-অঙ্গে চেয়েছি হসটেলে সঙ্গে ছিল মিহিন সঙ্গীত যা আমার

    দেহে আজো ঝিরিঝিরি রিমিজিমি বেজেই চলেছে ;

    এর জিভ আমারই দ্বারা প্রভাবিত।

    শব্দ বলো বাক্য বলো যে-কোনো অভিধা, আমার প্রভাব তাতে

    ব্যকরণে বিন্যাসে বিশেষ্যে বিশেষণে আমার প্রভাব পাবে।

    [ জিভ কাটতে ঝোঁকে। বৃদ্ধদলের প্রবেশ ]

    বৃদ্ধদল ( কোরাস, ভূবনমোহিনীর দিকে তাকিয়ে )। ।

    নিচ্ছ যদি স্বাদই নিও,

    স্পর্শ নয় গন্ধ নয়

    শ্বাসে ভিজে গানও নয়,

    তুই তো দেখি ছিলিস-মার্কা

    জিভখানা এর ইলিশ-মার্কা,

    কেমন করে মিল যে হয় !

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    কিন্তু এ সত্যই যুদ্ধ করেছিল কিনা তার কী প্রমাণ আছে ?

    প্রমাণ থাকেও যদি ক্ষতি নেই আমাদের লোক আছে সর্বত্র ছড়ানো

    লড়ায়ের ইতিহাস মিথ্যামঙ্গল লিখব তো আমরাই

    সরকারি অনুদানে প্রকাশিত পড়বে খোকারা ইশকুলে।

    [ বৃদ্ধদলের প্রস্হান ও বৃদ্ধাদলের প্রবেশ ]

    বৃদ্ধাদল ( কোরাস, ভূবনমোহিনীর দিকে তাকিয়ে )। ।

    তারপরে এ চাটলো যাদের

    সকাল সন্ধে বিকেল দুপুর

    মরল শেষে বিষে তাদের

    আদর-খেকো মুখের মুকুর

    জানিস সেসব দীর্ঘশ্বাসই

    আটকে আছে এনার লাশে ?

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    তবে একটা খটকা আছে কোথায় এনার ঢাল-তরোয়াল !

    না হয় লোকটা যুদ্ধে গিয়ে মরল লড়ে, ওপড়ালো কী বাল ?

    [ বৃদ্ধাদলের প্রস্হান ]

    ভূবনমোহিনী ( চলে যেতে থাকা বৃদ্ধাদলের উদ্দেশে )। ।

    জঙ্গল-নেকড়ে ছিলেন না ইনি ; বিশ্ববিদ্যালয়ে

    সিংহীদের পাল এক গর্জনে এনার আওতায় আসলেও

    আমিই ছিলুম এঁর নিজস্ব সিংহিনী, কথাটা রিপিট করি–

    এখনো আমার লোমে আছে এঁর প্রেমসিক্ত লালা

    তাহলে পাব না কেন জিভটুকু আমি ?

    এঁর জিভ আমারই দ্বারা প্রভাবিত।

    [ বৃদ্ধদল ও বৃদ্ধাদলের প্রবেশ ]

    বৃদ্ধদল ( কোরাস, বৃদ্ধাদলের উদ্দেশে )। ।

    তা না হয় হল কিন্তু শেষকালে কী হল ?

    বৃদ্ধাদল ( কোরাস, বৃদ্ধদলের উদ্দেশে )। ।

    তা না হয় হল কিন্তু শেষকালে কী হল ?

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    অনেক করেও একে জালে-ফাঁদে ফাঁসানো গেল না !

    মেয়েরা ফাঁসালো একে, তার কোনো রুলবুক হয়তো বা হবে ;

    এরকম রুলবুক তৈরি করতে পারত হেডকোয়ার্টার।

    [ বৃদ্ধদল ও বৃদ্ধাদলের প্রস্হান ]

    চিত্রাঙ্গদা ( সবায়ের দিকে এক-এক করে তাকিয়ে )। ।

    যখনই দুঃখ গ্লানি ক্ষোভ দ্বেষে যুঝেছে লোকটা

    এসেছে আমার কাছে, আমাদের কাছে ; চিত্রাঙ্গদা নাম নিয়ে

    যে গেছে এনার কাছে ইনি তাকে হাতির তরল মস্তিসহ

    রাতভর ডলেমলেছেন। আমি এঁর লিঙ্গটুকু নিতে চাই।

    আমাদের প্রেমের চত্ত্বরে ঠাঁই হবে ; পূজার্চনা দেব রোজ।

    এঁর লিঙ্গ আমারই দ্বারা প্রভাবিত।

    [ লিঙ্গ কাটতে ঝোঁকে। বৃদ্ধদলের প্রবেশ ]

    বৃদ্ধদল ( কোরাস, চিত্রাঙ্গদার উদ্দেশে )। ।

    নিচ্ছ যদি বীর্য নিও

    ঘাম পাবে না নাম পাবে না

    অন্য বাবুর সঙ্গে মিশেল

    করলে কিন্তু ভাগ পাবে না

    এর বীর্য তুলনাহীন

    বংশবিহীন দুকূলহীন।

    [ নিজেরা আপসে ফিসফিস আলোচনা করেন বৃদ্ধেরা ]

    বলেছিল বটে এর কথা মহাকরণের সেই ভৌগলিক

    সাতবাষ্টে তেলচিটে টাকার বাণ্ডিল নিতে-নিতে।

    আউলবাবু ( বৃদ্ধদলের উদ্দেশে, নাচতে-নাচতে )। ।

    মোটেই আমরা ভেড়ুয়া নই আমরা হলাম সেবকদেশি

    বইপত্র দেয়াললিখন দেখতে পারেন আমরা কেমন

    গুরুবাবা চিন্তা করেন ভাবের ঘরে লাগিয়ে এসি

    মাঙনা আমরা কাজ করি না যখন যিনি তখন তেমন।

    [বৃদ্ধদলের প্রস্হান। বৃদ্ধাদলের প্রবেশ ]

    বৃদ্ধাদল ( কোরাস, চিত্রাঙ্গদার উদ্দেশে )। ।

    ভিনশহরে দেশ-বিদেশে

    ভাষার বীর্য ভাষায় মিশে

    লিঙ্গ এনার একলেকটিক

    চলবে না তা পুজোর ঘরে

    দশক-দশক ওসব ক্লিশে

    বাক-তাড়ুয়ার ঠিক-বেঠিক।

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    সন্দেহ যে বুকের পাটা কি এর পেটালোহা যুদ্ধার মতন ?

    দেখলে তো মনে হয় রোদে পোড়া খ্যাংরাটে চাষি

    লাশটাকে দেখেও তো মনে হচ্ছে ছাতাপড়া বাসি।

    [ বৃদ্ধাদলের প্রস্হান ]

    চিত্রাঙ্গদা ( সকলের উদ্দেশে )। ।

    আরে ছাড়ো তোমাদের তর্ক। মনে হয়

    জোয়ান উন্মত্ত হাতি রসে এলে কতটা উন্মাদ

    হতে পারে, কোনোই ধারনা নেই তার

    কেবল যোনির শান্তি তাকে প্রভাবিত করে দেবে ;

    আমরাও ওভাবেই প্রভাবিত করেছি এনাকে।

    এঁর লিঙ্গ আমাদের দ্বারা প্রভাবিত।

    [ বৃদ্ধদল ও বৃদ্ধাদলের প্রবেশ ]

    বৃদ্ধদল ( কোরাস, বৃদ্ধাদলের উদ্দেশে )। ।

    তা না হয় হল কিন্তু শেষকালে কী হল ?

    বৃদ্ধাদল ( কোরাস, বৃদ্ধদলের উদ্দেশে )। ।

    তা না হয় হল কিন্তু শেষকালে কী হল ?

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    চুলোয়-যাওয়া মানুষটা কি সত্যিকারে যোদ্ধা ?

    অর্জুন প্রতাপাদিত্য নাকি সেই পোর্তুগিজ রোদ্দা ?

    প্রতাপাদিত্যের মতো মরে গেল খাঁচায় সফরে দরবারে ;

    ভাবতে পারিনি হবে লাশটার দাবিদার এতজন নারী !

    [ বৃদ্ধদল ও বৃদ্ধাদলের প্রস্হান ]

    ক্যারল নোভাক ( ক্রুদ্ধভাবে মাথার সোনালি চুল ঝাঁকিয়ে )। ।

    তোমরা ভেবেছ বুঝি আমার কোনও দাবি নেই !

    আমি এঁকে মাদকের যৌনতার যাবতীয় নিষিদ্ধের সাথে

    করিয়েছি পরিচয় ; যাকে ইনি পতনের পাঁক ভেবে ছিলেন চিন্তিত

    আমি ওঁকে সেই স্বর্গে নিয়ে গেছি। অন্ত্র পাকস্হলি ফুসফুস

    আমার সংগ্রহে নিয়ে যেতে চাই ; নীলকন্ঠ থাকবে বয়ামে

    অতিথিরা এলে দেখবেন অচেনাকে ভালোবাসা কাকে বলে

    বিদেশি প্রভাবে আমি প্রভাবিত করেছি এনাকে।

    বিশ্বাস না হয় যদি আউলবাবুর কাছে জেনে নিতে পারো।

    বৃদ্ধদল ( কোরাস, ক্যারলের উদ্দেশে )। ।

    পাঁক নিবি তো পাঁকই নে না

    নিষেধগুলো পতনগুলো

    চাইলে কি হয় লেনা-দেনা

    আঠা তো সব পোস্ত কুঁড়ির

    তোর তাতে কী বল অবদান ?

    নোস তো তুই রেডিন্ডিয়ান !

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    না বাবা না, আমি ওনার ওসব জিনিস দেখতে যাব কেন ?

    শুধুই খপর দেয়া আমার কাজের মধ্যে পড়ে।

    মনে হয় এইবার মানেমানে কেটে পড়াটাই ঠিক হবে।

    [ বৃদ্ধদলের প্রস্হান। বৃদ্ধাদলের প্রবেশ। ]

    বৃদ্ধাদল ( কোরাস, ক্যারলের উদ্দেশে )। ।

    ববাম গো তোর বহুজাতিক;

    যা ভাসবে তার পতন কোথায়

    জোড় বাঁধলে স্বর্গ দেখিস

    মাদক নেবার মজায় বোধ হয়

    বড্ডো তোদের পতন নিয়ে

    চুল-গামানো ফোকাস-বাতিক।

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে নাচতে )। ।

    যুদ্ধ করে মরবে লোকে এ-কথা তো সবাই জানে !

    চোকার যা তা চুকেই গেছে, এখন একে লোপাট করো দিকি

    আস্ত কিংবা টুকরো করে সরাও একে আঁস্তাকুড়ে

    তারপর তো গপ্পো বুনে নথিবাবা লিখবে পুঁথি।

    ক্যারল নোভাক ( সবায়ের উদ্দেশে )। ।

    জিরাফের উঁচু-মাথা, সাদা ভাল্লিকের তুষারের শুভ্রতায়

    একা-একা গর্বোদ্ধত শিকারের খেলা

    গোরিলার আদিগন্ধ বুক থাবড়ানো

    তোমাদের রাজনীতি-সংস্কৃতির নয়

    স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে নেশাগ্রস্ত আমিই দিয়েছি

    সেসব বিদেশি আরণ্যকতার হাল-হকিকত

    বিশ্বাস না হলে এঁকে লাশকাটা ঘরে ফেলে কেটেকুটে দ্যাখো

    এঁর অন্ত্র আমারই দ্বারা প্রভাবিত

    ফুসফুসে আমারই ঘনিষ্ঠ প্রভাব

    পাকস্হলিতেও পাবে প্রভাব আমার।

    [ বৃদ্ধদল ও বৃদ্ধাদলের প্রবেশ ]

    বৃদ্ধদল ( কোরাস, বৃদ্ধাদলের উদ্দেশে )। ।

    তা না হয় হল কিন্তু শেষকালে কী হল ?

    বৃদ্ধাদল ( কোরাস, বৃদ্ধদলের উদ্দেশে )। ।

    তা না হয় হল কিন্তু শেষকালে কী হল ?

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    কী করে শিখল যুদ্ধ প্রেমিক প্রবর পচামড়া ?

    মেটিং কলও দেখি হয়ে গেল যুদ্ধ-হুঙ্কার !

    [ বৃদ্ধদল ও বৃদ্ধাদলের প্রস্হান। ]

    অবন্তিকা ( শান্ত কন্ঠে )। ।

    তোমাদের যার যা নেবার কেটেকুটে নিয়ে যাও

    অবশেষ যা থাকবে তা আমার, কেননা এ-যুবা চিরকাল

    ঠকিয়েছে ভুলভাল কথা বলে অস্তি-নাস্তি করেছে ভণ্ডুল–

    শেয়াল শকুন কিংবা হাঙরের মুখে এর অবশেষ দিলে

    তবেই সোয়াস্তি পাবে হাড়কাটা গলি।

    [ বৃদ্ধদলের প্রবেশ। ]

    বৃদ্ধদল ( কোরাস, অবন্তিকার উদ্দেশে )। ।

    কে বললে তুই শান্তি পাবি

    অস্তি-নাস্তি ঘূর্ণিতে

    পাবার হলে আগেই পেতিস

    যখন প্রেমের দাম নিতে

    ঝাঁপাই ঝুড়ে গুণছ খাবি

    শরৎ বর্ষা আর শীতে।

    [ বৃদ্ধদলের প্রস্হান ও বৃদ্ধাদলের প্রবেশ। ]

    বৃদ্ধাদল ( কোরাস, অবন্তিকার উদ্দেশে )। ।

    কেন এঁটো লাশ নেবে শেয়াল-শকুন

    ফেলে গেছে যাকে বেওয়ারিশ

    তোদের ভাষার চামুকুন,

    হতেই পারে না এ হাঙরের ডিশ

    দ্যাখ যুদ্ধক্ষেত্র চেড়ে বেপাত্তা সবাই

    রাজার কোঁচড়ে কিংবা রানির আঁচলে

    ব্যাঙরা এ-দল ছেড়ে গিয়েছে ও-দলে,

    ইংরেজের হাতে-গড়া ব্যাঙ ওরা

    টিভি দপতরে গিয়ে বাতেলা ঝাড়ছে ঘাড় নেড়ে।

    আউলবাবু ( স্বগতসংলাপ, নাচতে-নাচতে )। ।

    এ তো দেখছি কিংবদন্তি মেতিং গেম থেকে ফিরে

    আলফা পুরুষ টেসটোসটেরনে টানে যদিও জানতুম

    যাই বাবা কেটে পড়ি নথিবাবাদের দপতরে।

    ( কলম ও ডায়রি ঝোলায় পুরে দৌড়ে পালায় আউলবাবু, নাচতে-নাচতে। )

    [ ধুলিকণাদের ঝড় ফিরে আসে আরো বেগে ; পুরুষের শবটিকে ঘিরে

    রঙিন ঘূর্ণির নৃত্যে সমবেত যুবতীকে চোখ ঢাকা দিতে বাধ্য করে।

    শবটির চারিধারে বসে পড়ে তারা। ঝড় থামে।

    যুবতীরা চোখ খোলে ঝিরিঝিরি নম্র বাজনায়। সকলেই ঝুঁকে পড়ে

    চিৎকার কোরে পুরুষের নির্ধারিত অঙ্গগুলো দেখতে না পেয়ে

    ওপরে দুহাত তুলে যুবতীরা হাহুতাশ করে…

    নেপথ্যে সরোদে তিলক কামোদ রাগে অবরোহ শোনা যায় ]

    কুলসুম ( উঠে দাঁড়ায় )।।

    এ কি ? কে এই পুরুষ ? হাত দেখছি না ! নিশ্চই নিয়েছ কেউ।

    নন্দিতা ( উঠে দাঁড়ায় )। ।

    সত্যি তো ! ঠোঁট দেখছি না ? ওফ কী বিভৎস মুখ !

    কী হবে তাহলে ? গর্ভে ওর কুলবীজ থেকে গেল–

    পরের প্রজন্মগুলো চলে গেল ওর আওতায় !

    ভূবনমোহিনী ( উঠে দাঁড়ায় )।।

    হাঁ-মুখে জিভও নেই ; দুর্গন্ধিত পোকারা চলছে !

    আমারও জরায়ুতে ওর ধাতুরস গড়ছে সন্তান জানি।

    চিত্রাঙ্গদা ( উঠে দাঁড়ায় )।।

    এ-সব লুচ্চা প্রেমিকদের শেষকালে এই দশা কতোই দেখেছি,

    সে-কথা ভেবেই আমি ওর জনন-ইন্দ্রিয় ভাবলুম পাবো ; কে জানতো

    ওই মাংসখণ্ডটাও জালজোচ্চুরির বীজে ভরা !

    প্রভাবের বীজ ফেলে চলে গেছে সবকটি প্রেমিকার দেহে।

    ক্যারল নোভাক ( উঠে দাঁড়ায় )।।

    ফুসফুস পাকস্হলি অন্ত্র বৃক্ক কিছুই তো নেই ; বুক থেকে তলপেট

    খাঁ-খাঁ করছে দেখছি। সন্দেহে ভুগছি এই ভেবে, ছিল কি কখনও

    নাকি সব মাদকের ভ্রমে গড়া ছবিগুলো ভেঙেছে লোকটা চুপিসাড়ে

    আমাদের সবাইকে নিজের নাস্তিকজালে ফেলে রেখে সটকে পড়েছে !

    উল্টে আমাকেই প্রভাবিত করে গেল

    গর্ভে রেখে চলে গেল নিজের বিজয়ী ঝলকানি।

    অবন্তিকা ( উঠে দাঁড়ায় )।।

    জানতুম, জানতুম, মরেও ঠকাবে এই লোক ;

    পুরো প্রকৃতিকে, মেঘ রোদ ঝড় রঙসুদ্ধ দখল করেছে

    ভাষাকে লাগাতো কাজে যখন তরুণ আর ডাকাবুকো ছিল

    শব্দ-বাক্যে ফাঁদ পেতে আমাদের অযৌক্তিক আত্মীয় করেছে

    হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক, ইরর‌্যাশানাল সম্পর্কের মনোমুগ্ধকর টোপ

    উফ যা উপেক্ষা করা ছিল অসম্ভব।

    প্রভাব রেখে গেল শরীরে আমাদের। অক্ষরের সন্তানেরা,

    তারা নিশ্চয় এর যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে আঘাত হানবে মনোমত।

    [ অসহায় তরুণীরা মৃতদেহ ঘিরে বসে পড়ে। ঠিক তখনিই ঝড়

    পুনর্বার আগুনের ধুলো নিয়ে দৃশ্যকেন্দ্রে আবির্ভূত হয় ;

    টের পাওয়া যায় না কী ঘটছে লাশটিকে ঘিরে,

    ছেয়ে যায় চারিদিক দুচোখ ধাঁধানো ঘন নীলাভ আলোয় ;

    দৃশ্যকেন্দ্রে শ্রীমন্তিনী আবির্ভূত হন, হলুদ টপ ও জিন্স-পরা। ]

    শ্রীমন্তিনী। ।

    কিছুই পাইনি আমি এই পুরুষের কাছ থেকে

    যদিও আমিও তোমাদের মত এর ভালোবাসা পেতে কত

    দিন রাত্রি সপ্তাহ বছর মাস চেষ্টা করে গেছি

    তবে জানি আমি এঁর মস্তিষ্কের প্রত্যেকটি কোষে

    শব্দ-বাক্য চিহ্ণ-ছবি হয়ে আছি রেমব্রাঁর ইহুদি দম্পতি

    যেভাবে রয়েছি আমি অজন্তার মোহিনী ম্যুরালে

    কোণারক খাজুরাহো মহাবলিপুরমের সম্ভ্রান্ত অর্জুনে

    চিনের পোড়ানো মাটি-যোদ্ধাদের রহস্যতে মিশে

    সান্তো দোমিঙ্গোর সিংহে ইরানের আর্দাবেল জাজিম-বুনোটে

    জ্যাকসন পোলকের একত্রিশে আর ভ্যান গঘের কেদারায়।

    দেখতে পাচ্ছ না ? তোমাদের সবকিচু দিয়ে দিয়েছেন ;

    কী করবে মৃতদেহ থেকে মাত্র তোমার প্রণয়ে তৃপ্ত অঙ্গখানা নিয়ে ?

    ঠিক করে চেয়ে দ্যাখো প্রতিটি অঙ্গই এঁর দেহে বর্তমান।

    এনার শবটি নিয়ে আমরা সবাই মিলে চলো এক উৎসব করি

    জীবনের যাপনের বিজয়ের মহা-উৎসব।

    কুলসুম। ।

    ঠিকই বলেছ তুমি ; ভালোবাসাবাসি নিয়ে উৎসব করি।

    চিত্রাঙ্গদা। ।

    মনে হয় আমরাও উৎসবে মাতি সকলেই।

    ক্যারল নোভাক। ।

    চলুন তাহলে। মৃতদেহ ঘিরে সমবেত উৎসব হোক।

    [ আরেকবার ঝড় ওঠে, এইবার সাতরঙা ঝড়। যুবতীরা

    সকলে একত্রে শবদেহটিকে তুলে অন্তরালে চলে যান।

    আড়ালে বাজতে থাকে মৃদু ইগর স্ত্রাভিন্সকির কনচের্তো বেহালায় ;

    শোনা যায় যুবতীগণের উল্লাস—

    দৃশ্যকেন্দ্রে আরো বেশি আলোকিত হয়ে ওঠে রঙের মিশ্রণ। ]

    ভরসন্ধ্যা

    [ একটি কদমগাছ ছেয়ে আছে ফুলে ;

    গাছটির চারিপাশে উবু হয়ে বসে

    উনত্রিশজন বুড়োবুড়ি আর জনা

    ছয় যুবক-যুবতী। সকলেই তারা

    ওপরে তাকিয়ে আছে কদমগাছের

    পানে ; বোঝা যায় তারা অপেক্ষা করছে

    গাছটির অন্ধকার থেকে একজন

    অতিমানুষের আগমন। লোকগুলো

    এসেছে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এ-আশায়

    কদম গাছটি নাকি সেই গল্পতরু

    যার গন্ধে লুকিয়ে আছেন অবতার–

    নেমে আসবেন মর্ত্যে নেতৃত্ব দেবেন।

    লোকগুলোদের দেশে নেতা নেই বলে

    কদম গাছের কাছে ভিক্ষা চাইছেন

    যাতে একজন অতি-আধুনিক কেউ

    মানুষের মঙ্গলের জন্যে আবির্ভূত

    হন। অথচ গাছটি নিরুত্তর আজো। ]

    বুড়োবুড়ি ( কোরাস )। ।

    কবে থেকে বসে আছি হাপিত্তেশ করে

    কদমের গাছ ওগো দাওনা পাঠিয়ে

    কোনো লোক, যাকে কাঁধে তুলে আমাদের

    মসনদে বসাবো সকলের ভালোর

    জন্য। উচিত মানুষ নেই কবে থেকে।

    অন্য জগৎ চাইছি, ভিন্ন ইতিহাস।

    বদল মানে কি স্রেফ নাচের আঙ্গিক ?

    পাড়াতুতো নেতা-নেতি দেশটাকে ছিঁড়ে

    সোনাদানা রাখছে বিদেশে নিয়ে গিয়ে ;

    নয়তো নিজেরা নিজেদের ছিঁড়েফেড়ে

    নাচন-কোদন করে জুয়া খেলছেন।

    কারো মুখ যেন লাল বাঁদরের পাছা

    আবার কারোর ঘাড়ে শুয়োরের মাথা

    কেউ ঝোলে ডালে ল্যাজ ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে

    অনেকের জন্ম তো গুয়েরই আঁতুড়ে

    পথই নজরে আসছে না আমাদের

    কীভাবে পাল্টাবো এই বেজন্মাগুলোকে

    যেনাদের কথা থেকে মানেরা লোপাট !

    যুবকেরা ( কোরাস )। ।

    খুবই খারাপ যাচ্ছে দিনকাল ; শান্তি

    নেই, কোনো দিশা-নির্দেশটুকুও নেই

    লেগে আছে খুনোখুনি ধর্ষণ ডাকাতি

    রাহাজানি বোমাবাজি কিশোরী পাচার

    আর এই সবেতেই যারা দায়ি তারা

    দখল করেছে মসনদ কোষাগার

    আমাদের সার্কাসে আছে চক্রী ভাঁড়েরা,

    বড়ই অভাব এক সৎ মানুষের।

    ভয়ে কেউ স্বপ্ন দেখতেও চাইছে না

    সব ডানা রয়ে গেছে ডিমের ভেতরে

    বাধ্য হয়ে বাছাই করতে হচ্ছে ভাঁড় ;

    উপায় না খুঁজে পেয়ে জঙ্গলে ঢুকেছে

    রেগে গিয়ে অনেকেই ধরেছে বন্দুক।

    বানচোতে বানচোতে ভরে গেছে দেশ।

    যুবতীরা ( কোরাস )। ।

    আমরা আরও গন্দা গাল দিতে চাই ;

    মনে হয় মাসিকের কানি গুঁজে দিই

    ধরে ধরে ওগুলোর মুখের ভেতরে।

    তাই চাই একজন বিশুদ্ধ মানুষ।

    এই সব লুচ্চা-লাফাঙ্গায় ছেয়ে থাকা

    বৈভবী বাছাই থেকে মুক্ত হতে চাই।

    কদমগাছ ( নারীকন্ঠে কোরাস )। ।

    রয়েছে আমার স্টকে পাঁচ মহাজন

    একে একে গুণাগুণ শোনো ওনাদের

    তারপর ভেবেচিন্তে নির্ণয় নেবার

    পালা তোমাদের ; নিয়ে যেও যাকে চাও।

    অনেকেই সৎ নয় কেউ কেউ চোর

    সকলেই কচু নয় কেউ কেউ ওল

    অনেকেই স্নব নয় কেউ কেউ খুনি

    সকলেই সাপ নয় কেউ কেউ ব্যাঙ

    অনেকেই বোকা নয় কেউ কেউ ছুঁচো

    সমস্যা হল যে তারা সবাই মানুষ।

    [ হাততালি বাজালেন কদমের গাছ।

    খচ্চর খুরের ধ্বনি শোনা যায়, কেউ

    আসছে মিউলে চেপে এইদিক পানে।

    ভিড়ের ভেতরে এসে ঘোড়া থেকে নেমে

    তাকায় সবার দিকে ; বেঁটে-ঘোড়া বাঁধে

    কদম গাছেতে। লোকটির খালি গায়ে

    চামড়ার শায়া, হাতে বর্শা পিঠে তীর

    একটা শুয়োর মরা কাঁধের ওপর ;

    তার আগমনে দুর্গন্ধ ছড়ায় এত

    সকলেই বাধ্য হয় নাক চাপা দিতে।

    লোকটি নিজের পরিচয় নিজে দেয় ;

    একই পোশাকে ঢোকে সাঙ্গপাঙ্গদল। ]

    আত্তিলা। ।

    আমি হুন আৎতিলা, দেবতার হাতে

    গড়া, শান্তি-শৃঙ্খলার ভয়াল মানুষ

    দেখছ আমাকে ? বহু দেশ জয় করে

    সেখানের লোকেদের কবজায় আনা

    কঠিন ছিল না। ছুটিয়েছি সেনাদের

    তাদের ওপর দিয়ে থেঁতলে গুঁড়িয়ে

    জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে। মেয়েদের

    তুলে এনে বিলিয়েছি সেনাদের মাঝে।

    রা কাড়েনি কেউ। ইতিহাস দেখে নাও।

    যে যেমন আছে তেমন থাকায় রপ্ত

    হয়েছে সবাই রোম থেকে দানিয়ুব

    থেকে বালটিক সমুদ্রের নোনাঢেউ–

    আসেনিকো আমার মতন বারোয়ারি।

    সোনাদানা কিছুই আমরা নিয়ে গিয়ে

    রাখিনি বিদেশি ব্যাঙ্কে অথবা বাড়িতে ;

    বাড়ি-ফাড়ি নেই আমাদের, যেথা ইচ্ছা

    সেখানেই ডেরা বাঁধি, আর সে-জায়গা

    হয়ে ওঠে আমাদের থাকার স্বদেশ।

    নিষ্ঠুর হিংস্রতা ছাড়া আনন্দ ঘটে না:

    হৃদয়ী নায়কমাত্রে ঘোর ইডিয়ট

    কেননা পাবলিক হল নির্মিত প্রাণী।

    সাঙ্গপাঙ্গদল। ।

    আত্তিলা মাস্তান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ

    পাবলিক মানেই তো ভেড়াদের পাল

    জন্মসিদ্ধ অধিকার কান্নাকাটি করা।

    আত্তিলার খচ্চর ( নারীকন্ঠে )। ।

    চলুন সম্রাট এটা হাঘরের গ্রাম

    ঘাসও তো দেখতে পাচ্ছি না কোনোখানে

    উঁহু, পুং ঘোড়াদের দেশ এটা নয়

    এখানে বুকনিই পায় বক্তাকে খুঁজে

    বর্তমান এলে লোকে অতীতকে খায়

    স্মৃতির জোচ্চুরি নিয়ে সমাজটা চলে

    ভাবছে ম্যাজিক হবে হাপিত্তেশ করে।

    কদমগাছ ( পুরুষকন্ঠে কোরাস )। ।

    সত্য বলছে আত্তিলা, কিন্তু মনে রেখো

    উনি আর ওনার লোকেরা কাঁচা মাংস

    খেতে ভালোবাসে। স্নান করবার প্রথা

    এমনকী গরমেও ছোঁচাবার প্রথা

    ওনার রাজত্বে নেই। জলের অভাব

    আছে তোমাদের দেশে ; তার সমাধান

    এতে হবে। খাবার সুরাহা হবে। বিয়ে

    দিতে হবেনাকো মেয়েদের। পোশাকের

    খরচ বাঁচবে। জনসংখ্যা কমে যাবে।

    এনার শিরায় বয় কংসের পুঁজ।

    আত্তিলা। ।

    পারছ বুঝতে তো আমার খচ্চরও

    তোমাদের চেয়ে কত জ্ঞানী ও বিদ্বান !

    বুড়োরা ( কোরাস )। ।

    উঁহু চলবে না ; অমন জোকারচাঁদ

    আছে আমাদের ভূঁয়ে প্রদেশে-প্রদেশে ;

    তাদের সামনে খোকা তুমি চুনোপুঁটি।

    তারাও ধর্ষণ রাহাজানি লুটপাট

    করতে ওস্তাদ বলে আমরা বিরক্ত ;

    তাছাড়া সবাই ওরা সংবিধান মেনে

    তাবৎ জোকারি করে দিব্বি পার পায়

    রাসকেলে ঘুষখোরে ডান-বাম নেই

    ঘাপলার অন্ত নেই, কোটি-কোটি টাকা

    নামিদামিদের পেনটিং সোনাদানা

    সুইজারল্যাণ্ডে ভল্টে লুকিয়ে রেখেছে।

    ফুসলিয়ে মেয়েদের বাজারে চালান করে।

    তুমি চাপো ঘোড়ার ওপরে। তারা চাপে

    দেঁতো হেসে সরকারি মোটরগাড়িতে

    এই যা তফাত, তাছাড়া সবই এক

    প্রতিদ্বন্দ্বী খচ্চরে-গুণ্ডায় দেশ ছয়লাপ।

    আত্তিলা। ।

    ওরা সব আমারই দত্তক সন্তান ;

    আনন্দ পেলাম শুনে করে খাচ্ছে ওরা।

    যাই, আরো গণতন্ত্রে আছে আমন্ত্রণ।

    [ ঘোড়ার পিঠেতে চেপে উধাও হলেন

    মাতিতে থুতুর দলা ফেলে আৎতিলা।

    সাঙ্গপাঙ্গদল তাঁর পেছন-পেছন

    তামাকের পিচ কদমের গাছে ফেলে।

    হাততালি বাজালেন কদমের গাছ ;

    বেজে ওঠে পাঙ্ক রক শীৎকারসহ।

    আবির্ভূত হল রোমের সম্রাট বুড়ো

    ক্যালিগুলা নাচতে-নাচতে শিস দিয়ে

    সঙ্গে তাঁর বুকখোলা যুবতীর দল

    আর দুটি চেনে-বাঁধা কালো জাগুয়ার। ]

    ক্যালিগুলা। ।

    কী বলছিল আত্তিলা ব্যাটা নরাধম ?

    আমার রাজত্বে গিয়ে জেনে নিতে পারো

    সেখানে আমার মূর্তি হারকিউলিস

    অ্যাপোলো মার্কুরি রূপে পুজো করে লোকে।

    সবাইকে চোখ বুজে দেখি, এমনকী

    আমার ঘোড়াকে রাজদূত মর্যাদায়

    প্রোমোট করেছি। ভাইবোন ভেদাভেদ

    নেই বলে নিজের বোনের সঙ্গে শুতে

    কোনো বাধা নেই। অজাচার অনাচার

    আইনসঙ্গত কেননা যে আইনই

    আমি। টুসকি বাজালে গলা কাটা যায়,

    জেলে দিই আমার কার্টুন যদি আঁকে।

    তা এমন শান্তিস্বস্তি কেউ পারবে না

    দিতে তোমাদের। আমি মহা-ধুরন্ধর।

    পাবলিক ব্যাপারটা স্রেফ জুয়াচুরি।

    জাগুয়ারজোড়া ( পুরুষকন্ঠে )। ।

    পাবলিক ব্যাপারটা স্রেফ পাঁয়তাড়া ;

    জীবের জগত মুছে ফেলবার ট্রিক

    অপরাধহীন কোনো রাজনীতি নেই

    আবিষ্কার করতে শেখাও মহাভয়

    বাঁচবে কী করে প্রাণী কুবলে না খেলে !

    কদমগাছ ( নারীকন্ঠে কোরাস )। ।

    সত্য বলছেন উনি কিন্তু মনে রেখো

    ক্যালিগুলা মগজবিহীন কালজয়ী ;

    ওনার রাজত্বে যদি অশান্তির খোঁজ

    করো, তা তোমরা পাবেনাকো। একেবারে

    যাকে বলে শ্মশানের শান্তি সারাক্ষণ

    অলিখিত সংবিধান ওনার জিভেতে

    যে জিভ চোবানো থাকে যোনিতে মাদকে ;

    অন্যের বউকে এনে ধর্ষণ করার

    বিশ্ব রেকর্ড রয়েছে এই শাসকের ;

    ওর হাঁ-এ বকাসুরী বাঁকা দাঁত আছে।

    ক্যালিগুলা। ।

    কারেক্ট বলেছে কদমের গাছ। আমি

    যা বলি তা সংবিধান। তাই সমস্যাই

    নেই কোনো আমার রাজত্বে। যোনি-লিঙ্গে

    বসিয়েছি সারভিস ট্যাক্স। ইতিহাস

    লেখকরা ওব্দি জানে না আমার গল্প

    এত রকমের চর দরবারে আছে ;

    দলের কাজের লোক তারা ফি-প্রহর

    কেননা আমিই দল আমি সংবিধান

    বানাই যখন ইচ্ছা কিংবা পালটাই ;

    তোমাদের মতো জাতিপ্রথা-মার্কা নয়।

    মিডিয়া আমার থুতু চেটে মজা পায়

    ভয়ে নাগরিকগুলো টুঁশব্দ করে না।

    এই তো দেখতে পাচ্ছ কত যুবতীরা

    আমার নেশায় থাকে পুরো দিলখুশ।

    পাবলিক জিনিসটা চরসের ধোঁয়া।

    জাগুয়ারজোড়া ( নারীকন্ঠে )। ।

    আমরা এদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান

    এদের নিয়তি হল হাপিত্তেশে মরা।

    কদমগাছ ( পুরুষকন্ঠে কোরাস )। ।

    সঙ্গে নিয়ে যেতে পারো তোমরা ওনাকে

    অন্য কোনো প্রতিযোগী নেতা থাকবে না

    ছিঁচকে চামচা-নেতা দেবে দে-চম্পট।

    কনেদের জন্যে বর খুঁজতে হবে না।

    বুড়িরা ( কোরাস )। ।

    না মা, অমন নেতার কোনো প্রয়োজন

    নেই। আমরা অতিষ্ঠ তেএঁটে পাগলে,

    মা-বোনের সঙ্গে শোয় এইসব নেতা

    পেয়ে। খুনি ধর্ষক ডাকাত দাঙ্গাবাজ

    ওরাই তো মসনদে বসে কলকাঠি

    নাড়ে, দু-চারটে প্রদেশে। পাথর-মূর্তি

    নিজের ও চোদ্দপুরুষের মোড়ে-পার্কে

    পাঁচতলা বাড়ির সমান কাটাউট

    বসিয়ে তারাও অন্ন ধ্বংস করে যাচ্ছে ;

    শ্বশুর ধর্ষণ করে ছেলের বউকে

    পুলিশ ধর্ষণ করে লকাপে ঢুকিয়ে

    যার ফলে হারামি বিয়োয় ফি-বছর।

    সেসব হারামি একজন আরেকের

    পোঁদে বাঁশ কোরে, কুকুর-কুরি ঢঙে

    ঘেউ-ঘেউ চিৎকারে সমাবেশ করে

    কখনো রাস্তার মোড়ে গেটে ময়দানে।

    আমরা তো শান্তি চাই, দুইবেলা পেট

    ভরে খেয়ে-পরে আরাম শৃঙ্খলা চাই।

    ক্যালিগুলা। ।

    ওরা সব আমারই জারজ সন্তান ;

    আনন্দ পেলাম শুনে করে খাচ্ছে ওরা।

    চলি, আরো গণতম্ত্রে বহু কাজ আছে।

    [ নাচতে-নাচতে শিস দিয়ে হাফ-ল্যাংটো

    মেয়েদের কোমর জড়িয়ে অন্তর্ধান

    করলেন ক্যালিগুলা। কদমের গাছ

    হাততালি দিলেন এবার জোরে-জোরে।

    গলায় খুলির মালা পরে কয়েকটা

    হাড়গিলে মানুষকে হাতকড়া বেঁধে

    প্রবেশ করল পলপট, জলপাই

    রঙের পোশাকে। সামরিক বাজনার

    জগঝম্প হইচই ওঠে চারিদিকে। ]

    পলপট। ।

    দেখলুম ক্যালিগুলা উন্মাদ কাঁহিকা

    গেল ওইদিকে কোনো মাগির ধান্দায় ;

    তা তোমরা খুঁজছ এমন একজন

    যে কিনা শৃঙ্খলা শান্তি সুখ এনে দেবে।

    আমি জোকার-সন্তান। সমাজের তলা

    থেকে উঠে গরিব ভাগাও অন্দোলন

    করে শহরের সবকটা মানুষকে

    লাগিয়েছি ধান চাষে। গ্রাম-শহরের

    পালটা-পালটি হয়ে গেছে, যেকারণে

    কারোর মনেই কোনো ঈর্ষা-দ্বেষ নেই ;

    প্রতিটি শহর দ্যাখো হয়ে গেছে গ্রাম,

    ধানশীষে মধু হয় গোরু দ্যায় ডিম

    গোবরের পোকা খেয়ে সোনা হাগে লোকে

    সকলেই ভাই-ভাই নয়তো যে-যার

    নিজের কবর খুঁড়ে মাটির তলায়

    রাতেও সবাই খাটে বলে পাবলিক

    বাড়বার কোনো সুযোগ-সুলুক নেই

    মিছিল-মিটিঙ করা নিষিদ্ধ করেছি

    কেরানিরা দিন-রাত চাষ করে মাঠে

    খবরের পত্রিকা ছাপতে দিইনাকো

    সুতরাং কোনো গুলতানি উঠবে না।

    আমার রাজত্বে পাবলিক বলে কিছু নেই ;

    মাটিই মানুষ তাই মানুষও মাটি।

    জমির মালিক জমি নিজে, বুঝলে হে

    পরিবার ব্যাপারটা লোপাট করেছি

    কেননা আমিই সকলের পরিবার।

    কদমগাছ ( নারীকন্ঠে কোরাস )। ।

    হ্যাঁ, ইনি ইস্কুলে বারবার ফেল-করা

    মহাসাম্যবাদী। প্রজারা এনাকে বলে

    এক নম্বরের দাদা। কারোর তুলনা

    এঁর সঙ্গে করা চলবে না ; তা সে ইদি

    চেঙ্গিজ পিনোশে যে-ই হোন। করলেই

    ধড়টা লোপাট। অতএব পল পট

    যদি তোমাদের নেতা হন, পড়াশোনা

    করতে হবে না বলে বাবা-মা-সন্তান

    সবাই চাষের কাজে খেতচাষি হবে ;

    শিল্পের ধান্দায় দেশ হবে না বিনষ্ট

    অসাম্য লোপাট হবে সর্বত্র সমাজে।

    মাত্র তিনটি বছরে উনি কুড়ি লক্ষ

    পাবলিক কমিয়ে ছিলেন। তোমাদের

    দেশ জনসংখ্যা বৃদ্ধি থেকে মুক্ত হবে

    জমির স্বামীত্ব নিয়ে গোল বাধবে না।

    প্রতিবাদ করার হবে না দরকার।

    যুবকেরা ( কোরাস )। ।

    আরে ওরকম ফেলমারা গানডুতে

    আমাদের রাজনীতি পচে একাকার।

    এদেশেও জনগণ বলে কিছু নেই।

    কর্তারা যখন যাকে ইচ্ছে তুলে নিয়ে

    বেমালুম মাটিতে মেশাতে এক্সপার্ট।

    জঙ্গল দখল কোরে আদিবাসীদের

    তাড়িয়ে মাটির তলা থেকে খেয়ে নিচ্ছে

    সোনাদানা লোহাতামা ম্যাংগানিজ ধাতু।

    ভিখারিরা ধনী হল রাজনীতি করে

    কেরানিরা পার্টিবাজি করে জমিদার।

    পলপট। ।

    ওরা সব আমারই বেজন্মা সন্তান

    আনন্দ পেলুম শুনে করে খাচ্ছে ওরা।

    টাটা বাই, অন্য কোনো গণতন্ত্রে যাই।

    [ পলপট কয়েদিরা বিদায় নিলেন।

    কদমের গাছ পুনরায় হাততালি

    দিতে, ট্যাপডান্সে কুচকাওয়াজ কোরে

    মুঠোর সেলামসহ ঢোকে হিটলার

    সঙ্গের দেহরক্ষীরা নাচতেই থাকে

    ট্যাপডান্স। কদমের গাছ হাততালি

    দিলে বন্ধ হয় সবায়ের নাচানাচি। ]

    হিটলার। ।

    দেখলুম, কেটে পড়ল অনার্যগুলো

    আরে ওরা আমার চুলের যুগ্যি নয়

    নেতা হতে হলে চাই বিশুদ্ধ মা-বাবা ;

    এমন দানব যার কথা আত্মহারা

    করে দেবে সবাইকে খোকা থেকে বুড়ো

    সমাজ চলবে শুধু নেতার কথায় ;

    যত বেশি মতামত ততো গণ্ডোগোল

    তাকিয়ে দেখলে টের পাবে, অশান্তির

    প্রধান কারণ চারিদিকে, স্বাধীনতা

    পেয়ে কাজকর্ম করতে চায় না কেউ।

    দেশকে টাইট দিতে হবে সারাক্ষণ

    যাতে কেউ একটুও একান্ত নিজের

    সময় না পায়। জনগণ ব্যাপারটা

    চটকে মিশিয়ে দিলে ব্যাস কেল্লা ফতে।

    ভিন্নমত দেখলেই পোড়াও বিষাক্ত

    গ্যাসে, তাদের নিশ্চিহ্ণ করো একেবারে।

    আমার টোটকা হল লেবেনস্রাউম,

    জবরদখল করে ঝাণ্ডা পুঁতে দাও।

    যুবতীরা ( কোরাস )। ।

    আরে দাদু, অমন ভেড়ুয়া মাসতান

    রয়েছে প্রতিটি রাজনীতিকের স্টকে

    যাদের কাজই হল সকাল-বিকাল

    একে-তাকে পোঁদে বাঁশ করে টাকা তোলা ;

    অন্য মত শুনতে পেলেই পুঁতে দেবে

    জলজ্যান্ত মাটির একশো হাত নিচে।

    আপনারি ঢঙে সেলাম ঠুকতে হয়

    পাড়ার সিনডিকেট মাথারা এলেই ;

    দেয়ালের পোস্টারের কথাও ফতোয়া।

    পোঁদেতে পার্টির ছাপ পেলেই সে নেতা।

    লেবেনস্রাউম ছাড়া কিছুই বোঝে না

    আমাদের পার্টিবাজ জোকার বংশজ।

    দেয়াল দখল শুধু নয়, বউ-মেয়ে

    বাড়িও দখল হচ্ছে দিনের আলোয়।

    কদমগাছ ( পুরুষকন্ঠে কোরাস )। ।

    আরেকবার ভেবে দ্যাখো, এনার মতন

    দিগ্বিজয়ী দানব আসেনি কখনও ;

    ইনি হ্যামেলিনের সেই বাঁশিওয়ালা

    মানুষকে ইঁদুরে পালটে দিতে ওঁর

    জুড়ি জন্মায়নি এখনও কোনো দেশে।

    অসন্তোষ থেকে উনি পৌঁছোন পোগ্রোমে।

    শত্রু মার্কা দিয়ে করেন নিকেশ উনি ;

    ফলে নিমেষেই সারা দেশ শত্রুহীন

    তারপর শ্বাসরোধী শান্তির ফোয়ারা।

    বুড়োরা ( কোরাস )। ।

    আরে নানা। সবকটা দলেই তো আছে

    এই টাইপের অতিবজ্জাত জোকার

    যারা জবরদখল করে দেশটাকে

    উইপোকা হয়ে কুরে শেষ করে দিল ;

    জনগণ ভয়ে মুখ খুলতে চায় না।

    কখন যে কোন লোক ইঁদুরে পালটে

    যাবে, কারো জানা নেই। তাইতো চাইছি

    আসুক এমন কোনো বিশুদ্ধ মানুষ

    যার গায়ে গুয়ের কসমেটিক নেই—

    মসনদটাকে সে ময়লা করবে না।

    হিটলার। ।

    কারেক্ট বলেছে গাছ কদমের। যদি

    ইঁদুরে পালটে যাও তাহলে সহজে

    দেশে হবে মহামৌলবাদী জমপেশ

    অন্যদের ঘৃণা করে কাটবে সময় ;

    নিজেদের দুঃখ কষ্ট ভাবতে হবে না।

    যে তোমার মতাদর্শে নেই তাকে মারো

    মৃত্যুর নেশায় থাকো মশগুল হয়ে

    আত্মাহুতি দিয়ে সব ধ্বংস করে দাও।

    কদমগাছ ( নারীকন্ঠে কোরাস )। ।

    ওঁর মন্ত্রে তোমরা সবাই এককাট্টা

    হয়ে, ভুলে যাবে যাবতীয় দুঃখ কষ্ট

    একে আরেকের দিকে নজর ঘুরিয়ে

    আড়চোখে চরগিরি করতে পারবে ;

    সময় আপনা থেকে হু-হু কেটে যাবে

    মৌলবাদ বড়ই মধুর সেঁকো বিষ

    যত মজে থাকা যায় তত তার মজা।

    যুবকেরা ( কোরাস )। ।

    মৌলবাদীদের হাতে ধাতানি-প্যাঁদানি

    খেয়ে আমরা রক্তাক্ত বোবা আধমরা–

    চাই না একলষেঁড়ে ওরকম জ্ঞান।

    ওই রাজনীতি করিয়েতে ছেয়ে গেছে

    যারা শুধু চায় তাদের কথাই মানো

    এমনকী শিশুদের দুধে তা মেশাও।

    চলবে না আত্মঘাতী বিশ্ববীক্ষা বিষ ;

    পৃথিবীর কুষ্ঠরোগ ওই লোকগুলো

    মৌলবাদীদের চেয়ে ক্ষতিকর নেই।

    হিটলার। ।

    ওরা সব আমারই ঔরসে জন্মেছে

    আনন্দ পেলুম শুনে করে খাচ্ছে ওরা।

    ওরাই গেস্টাপো হয়ে আসে বারবার।

    [ বডিগার্ড নিয়ে হিটলার ট্যাপডান্স

    করতে-করতে চলে যায়। হাততালি

    দেন কদমের গাছ। শিকারি ব্রিচেসে

    কোমরে টাইট বেল্ট দু-হাতে চাবুক

    মাথায় কোঁকড়াচুল দোহারা মহিলা

    প্রবেশ করেন ; চাবুক পটকে তিনি

    দাঁড়ান পা ফাঁক করে। কদমের গাছ

    এইভাবে মেয়েটির পরিচয় দেয়। ]

    কদমগাছ ( পুরুষকন্ঠে কোরাস )। ।

    ইনি হান্টারওয়ালি ; হিন্দি সিনেমার

    বিখ্যাত নায়িকা। যেখানে বজ্জাত পান

    দেশের ভিলেনদের একা সামলান ;

    দু-হাতে রিভলভার চালাতে-চালাতে

    শত্রুহীন করে দেন গ্রাম ও শহর–

    ফুল পাখি নদী চাঁদ ওঁর গান গায়।

    তোমাদের আর পরবর্তী প্রজন্মকে

    হান্টার চালিয়ে উনি রক্ষা করবেন।

    সিনেমা-নায়িকা বলে উনি তো অমর

    পোঁদেতে চাবুক মেরে ঠান্ডা করবেন

    বেয়াড়াগুলোকে, যারা টাকা গেঁড়িয়েছে,

    রেখেছে বিদেশে কোনো গোপন লকারে ;

    মাটি থেকে ধাতু তুলে পাচার করছে

    ছাপছে নকল টাকা চালাচ্ছে ধর্ষণ ;

    একা হাতে সামলান হান্টারওয়ালি।

    বুড়িরা ( কোরাস )। ।

    আরে ! সেই মাদারি মামণি বাতেলানি !

    হা কপাল, শেষে এই ফিলমি নায়িকা !

    জীবনকে সিনেমায় আটক করার

    শিল্প-শিল্প খেলা খেলে বুদ্ধিজীবিগণ–

    নিজেরা তো বোকা সেজেছেন, আমাদেরো

    বুঝিয়েছিলেন, সমাজ পালটে যাবে

    কবিতা সিনেমা গল্প আঁকাআঁকি দিয়ে

    নাচের নাটক গেয়ে বাজনা বাজিয়ে

    দেশের দশের আয় বেড়ে শতগুণ !

    সবই ফালতু প্রমাণিত হয়ে গেছে।

    আমরা বাস্তব চাই প্রকৃত বাস্তব।

    ধোঁয়াটে সুন্দরী দিয়ে কাজ চলবে না।

    হান্টারওয়ালি। ।

    বাস্তব জগতে বাস করো বলে ভোগো

    তোমরা সবাই। বিভ্রমনিবাসী হও

    সারাক্ষণ কুয়াশায় বুঁদ হতে শেখো

    মনে-মনে নিজেদের সুখি ভেবে নাও–

    টানো নয়তো কোকেন চরস গঞ্জিকা ল

    স্বপনে মিলতে পারে উদ্ধারের নেতা।

    যাক আমি চললাম, শুটিঙ রয়েছে।

    কদমগাছ ( নারীকন্ঠে কোরাস )। ।

    আমার স্টকের সব মহাজন শেষ।

    গাছে আর কতই বা অবতার ফলে !

    [ দেখা যায় মোষের ওপরে চেপে

    নীলদেহ যমরাজ আসরে এলেন

    সঙ্গে হালখাতা হাতে চিত্রগুপ্ত-বুড়ো ;

    আগে-পিছে দুইজন বাঁটকুল চাষি। ]

    চিত্রগুপ্ত। ।

    এঁদের কারোর তো হয়নি ডিউ ডেট !

    এত ভিড়ভাড় কেন ? কিসের জটলা ?

    প্রবলেম যে কী তা-ই তো টের পাচ্ছি না।

    সকলেই দিব্বি সুস্হ তবু মনমরা !

    তা মনখারাপ থাকলেই ডিউ ডেট

    দিই না কখনো। মন ভালো করবার

    যে যার তোমাদের নিজেদের দায়িত্ব।

    কদমগাছ ( পুরুষকন্ঠে কোরাস )। ।

    এনাদের দেশে কোনো সৎ নেতা নেই

    চাইছেন কাউকে পাঠিয়ে দিই আমি

    অন্ধকার গন্ধ থেকে চাগিয়ে উঠুক

    সৎ ও সুজন দেশ-রক্ষাকারী লোক

    যমরাজের মোষ ( শিশুকন্ঠে )

    তোমরা যা চাইছ তা বাতুলে বোকামি।

    সমাজ বদল করে গুবরে পোকারা–

    নেতারা গোবর ভেবে ঠেলে নিয়ে যাও

    গড়িয়ে-গড়িয়ে সেই তাল বড়ো হলে

    আপনা থেকেই পাবে মহা-জননেতা

    ইতিহাসে চিরকাল এমনই ঘটে

    গোবর খসলে তার রূপ ধরা পড়ে

    ঠিক যেরকম দেখা গেল এতক্ষণ

    ওরা মহাজন হয়ে মসনদে ছিল

    হেগেমুতে স্বদেশকে নষ্ট করে গেছে।

    কদমগাছ ( নারীকন্ঠে কোরাস )। ।

    অতএব ফিরা যাও যে যার মুলুকে

    যেমন চলছে সব তেমন চলুক

    তোমাদের মুরোদের বড়ই অভাব

    ক্রোধ ছাড়া আস্ফালন গোসাপের বিষ।

    তবে, বার্তাহীন ক্রোধে বদল আসে না–

    সুখ শান্তি পেতে হলে বিপদকে ডাকো

    সাহস তো মানুষের বাঁচার আঙ্গিক

    মসনদ কোনোকালে নিজেই পড়ে না।

    চিত্রগুপ্ত। ।

    ফিরে যাও তারপর উঠেপড়ে লাগো।

    কোনো নেতা বদল ঘটাতে আসবে না ;

    নিজেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে মসনদ ভাঙো।

    প্রিপন করতে পারি কয়েকটা ডেট

    বড়োজোর। বাকি সব কাজ তোমাদের।

    [ সমবেত বুড়োবুড়ি যুবক-যুবতি

    সবাই দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করে

    তারা সব নানাদিকে ছুটে চলে যায়। ]


     



     

  • মলয় রায়চৌধুরী | ৩১ জুলাই ২০২১ ১৯:৫৬734801
  • মাতৃত্বের সংজ্ঞায় কুয়াশা

    মলয় রায়চৌধুরী

    মুম্বাইয়ে প্রতিদিনই সংবাদপত্রে পড়ি, একটি নবজাতককে সমুদ্রের ধারে বা ট্রেনলাইনের পাশে বা বাইপাসের ভেতরে, যে জায়গাগুলো রাতের বেলায় অন্ধকার, কাপড়ে মোড়া পাওয়া গেছে।

    এক বা দুই দিনের সেই শিশু ছেলেও হতে পারে বা মেয়েও হতে পারে।

    চিনের মতন বা বহু খ্রিস্টধর্মী দেশের গির্জার মতন, আমাদের দেশে অবাঞ্ছিত, অপ্রার্থিত, অনাবশ্যক সন্তানকে লুকিয়ে রেখে যাবার বন্দোবস্ত নেই, যে সন্তানটিকে রাষ্ট্র বা গীর্জা পালন করার দায়িত্ব নেবে।

    সন্তান প্রসব করার পরেই মা, এবং তার পরিবারের লোকেরা বা যে পুরুষ তার গর্ভে বাচ্চা আনার জন্য দায়ি, সে ফেলে পালিয়েছে। কোথাও কোথাও সিসিটিভি দেখে পুলিশ শিশুটির মাকে খুঁজে পেলেও, মা অস্বীকার করেন যে শিশুটি তাঁর ; ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন মনে করে না পুলিশ কতৃপক্ষ, তার জন্য টাকা আর সময়ের অপচয় মনে করে, তাই শিশুটির জায়গা হয় অনাথালায়ে ; একটু বড়ো হলে সে যায় অ্যাডপশান সেন্টারে।

    সংবাদপত্রে আরেক ধরণের খবরও প্রায়ই পড়ি। সরকারি হাসপাতাল থেকে সদ্যপ্রসূত শিশু চুরি, সে শিশু ছেলেও হতে পারে আবার মেয়েও হতে পারে। কখনও-কখনও, যারা চুরি করে, তাদের পুলিশ ধরে জানতে পারে যে বন্ধ্যা কোনো নারীর জন্যে চুরি করা হয়েছে, শিশুটিকে বিক্রি করা হবে।

    যে মায়েরা শিশু ফেলে পালায় আর যে নারীরা শিশুর খোঁজে চোরেদের কাজে লাগায় তাদের যোগাযোগের কোনো ব্যবস্হা নেই, অ্যাডপশানের নানা আইনি কড়াকড়ি আছে, সেগুলো পুরো করা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়, আবার তারা এমনই গরিব যে গর্ভ ভাড়া করার আর্থিক সামর্থ নেই। পুলিশ দেখেছে যে কয়েকটা ক্ষেত্রে ধর্মের বাধ্যবাধকতার জন্য শিশু চুরি করানো হয়েছে, যেহেতু ধর্মে গর্ভ ভাড়া করার অনুমোদন নেই। সে ক্ষেত্রে হিন্দু মায়ের শিশু চলে যায় কোনো মুসলমান পরিবারে ; মুসলমান শিশু চলে যায় ক্যাথলিক পরিবারে। সমাজের তলায় সত্যিই মনমোহন দেশাইয়ের ফিল্ম কাজ করতে থাকে, তবে ফিল্মের মতন হারিয়ে যাওয়া শিশুদের সাধারণত পাওয়া আর যায় না।

    গর্ভনিরোধের ওষুধের কারণে মা হতে চান না অনেকে, যাঁরা উঁচু পদে চাকরি করেন বলে সময় নেই, কিংবা দেহের কাঠামো খারাপ হয়ে যাবার ভয়ে। রাতে সঙ্গম সকালে বড়ি ওষুধের কারণে, একাধিক পুরুষের সঙ্গে সেক্স করার সুবিধা হয়ে গেছে, মাতৃত্বের চেয়ে সেক্স করাটা বেশি আনন্দদায়ক তাঁদের কাছে। তামিলনাডুতে এই ওষুধ নিষিদ্ধ বলে যুবতীরা প্রথম মাসিক বন্ধ হলেই গর্ভপাতের ওষুধ খেয়ে নিচ্ছেন আর জরায়ুর জটিল রোগ ডেকে আনছেন যা সারাবার জন্য শল্যচিকিৎসার প্রয়োজন হচ্ছে, তাঁরা মা হতে চান না, যৌনতা উপভোগ করতে চান। আঠারো-উনিশ শতকে দম্পতিদের আট-দশটা করে সন্তান হতো, তাও যৌনতা উপভোগের দরুণ, মাতৃত্ব বা পিতৃত্ব ফলাবার জন্য নয়।


     

    দুই

    আধুনিক জীবনের খাওয়া-দাওয়া ও জীবনযাত্রার কারণে, বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকায়, অথবা জন্মগত কারণে কোনো-কোনো দম্পতি একবছর অবিরাম সঙ্গমের পরও যদি সন্তান পেতে অক্ষম হন তাহলে দুজনের একজনের শারীরিক সমস্যার কারণে তা ঘটে । সাধারণত স্বামীর শুক্রাণু যথেষ্ঠ সংখ্যায় না থাকলে এই সমস্যা দেখা দ্যায়। সে ক্ষেত্রে স্বামীর শুক্রাণু আর স্ত্রীর ডিম্বাণুকে স্ত্রীর দেহের বাইরে নিষেকের মাধ্যমে ভ্রূণ তৈরি করে স্ত্রীর জরায়ুতে স্হাপন করা হয়। স্বামীর শুক্রাণু যদি সন্তান উৎপাদনের উপযোগী না হয় তাহলে ফার্টিলিটি ব্যাংকে অন্যের জমা দেয়া শুক্রাণুকে স্ত্রীর ডিম্বাণুর সঙ্গে নিষেক করে স্ত্রীর জরায়ুতে স্হাপন করা হয়। এমন নয় যা একবার স্হাপন করলেই তা সফল হবে, সাধারণত কয়েকবার প্রয়াস করার পর সফলতা আসে। প্রতিবারের জন্য লাখ থেকে দুলাখ টাকা খরচ হয়।

    এই প্রক্রিয়াটি, ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশান নামে খ্যাত, ভারতে যাকে বলে হয় টেস্ট টিউব বেবি প্রক্রিয়া, ১৯৭৮ সালে এর সূত্রপাত, লুইজি ব্রাউন নামে একটি শিশুর জন্মে। ভারতেও ওই একই বছরে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুর জন্ম হয়েছিল। দম্পতিদের মাঝে স্ত্রীর শরীরে জরায়ুর সমস্যা না থাকলে আইভিএফ সন্তান পেতে অসুবিধা হয় না। ভারতে দেখা গেছে এই ধরণের ক্ষেত্রে পুরুষের মনে প্রভাব পড়ে, শিশুটির সঙ্গে দূরত্ব গড়ে ওঠে ; স্ত্রীকে অবস্হার সামাল দিতে হয়।

    টেস্ট টিউবে ভ্রুণ তৈরি করা আইভিএফ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অথবা গর্ভ ভাড়া করে সন্তান পাওয়া, যাকে ইংরেজিতে বলা হয়েছে, সারোগেসি, তার খরচ প্রচুর, তা যোগানো গরিবদের পক্ষে সম্ভব নয়। কতো রকমের মাতৃত্বের দেখা পাচ্ছি আমরা। এক মা তার সদ্যপ্রসূত বাচ্চাকে ফেলে দিয়ে মাতৃত্বের সব দায় থেকে মুক্ত হতে চাইছেন, হয়তো বিয়ে করে নতুন জীবন চান কিংবা আর সন্তানের খরচ পোষাবার মতন আর্থিক অবস্হা নয়। এক মা বাচ্চা চুরি করিয়ে মা হতে চাইছেন। আরেক হবু মা বাচ্চা পাবার জন্যে বিদেশ থেকে পাড়ি মারছেন ভারতে কিংবা ফিলিপিনসে।


     

    তিন

    জরায়ু না থাকলে বা জরায়ু ত্রুটিগ্রস্ত হলে অন্যের গর্ভে ভ্রুণ স্হাপন করে নয় মাস বড়ো করাকে বলা হবেছে সারোগেসি। সারোগেসির জন্য প্রয়োজন একজন সক্ষম যুবতীর সুস্হ ত্রুটিহীন জরায়ু। স্বামী-স্ত্রীর দেহের বাইরে তাদের শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুকে ফাটফিলাইজ করে স্ত্রীর গর্ভে স্হাপন করা হয়, তাকে বলে হয়েছে ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশান পদ্ধতি। আরেকটি পদ্ধতি হল ইনট্রা ইউটেরাইন পদ্ধতি, স্ত্রীর দেহে যখন ডিম্বাণু তৈরি হচ্ছে কিংবা স্ত্রীর জরায়ু যদি ত্রুটিযুক্ত হয় তাহলে অন্য কোনো নারীর দেহে ডিম্বাণু গড়ে ওঠার সময়ে চিকিৎসকরা স্বামীর শুক্রাণু বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় প্রবিষ্ট করান। দুটি ক্ষেত্রেই, তৃতীয় একজন নারীর গর্ভ ব্যবহার করলে তা সারোগেসি হয়ে দাঁড়ায়।

    যিনি ডিম্বাণু দিচ্ছেন তিনি সন্তানের জেনেটিক মা। যাঁর দেহে সন্তান নয় মাস বড়ো হচ্ছে তিনি সন্তানের বায়োলজিকাল মা। শুক্রাণু প্রদানকারী হলেন সন্তানটির জেনেটিক বাবা। যে সন্তান জন্ম নিলো সে জেনেটিক মায়ের ডিম্বাণু ছাড়া অন্য কোনো দেহিক সংস্পর্শ পায় না। জন্মের পরই তাকে সারোগেট মায়ের পাশ থেকে সরিয়ে নেয়া হয় যাতে কোনোরকম আবেগি মাতৃত্বের টান না গড়ে ওঠে।

    এই নতুন মা এসেছেন নতুন সংজ্ঞা নিয়ে। শিশুটি তাঁর গর্ভজাত নয়, সে সারোগেট শিশু, শিশুটিকে গর্ভে ধারণ করেছেন ভাড়া-করা মা, বা সারোগেট মা। শিশুটিকে তিনি নিজের দুধও খাওয়াবেন না। সারোগেট মা বলতে প্রতিটি ক্ষেত্রে টাকার লেনদেন বোঝায় না। নিজের মেয়ের যদি বাচ্চা না হয় তাহলে তার বাচ্চার জন্যে মেয়ের মা নিজের গর্ভ ব্যবহার করতে পারেন, অন্য আত্মীয়ারা পারেন, বান্ধবীরা পারেন। তাই দেখা যায় যে ষাট বছর বয়সেও মা হচ্ছেন কেউ-কেউ।

    সমকামের স্বীকৃতির পর দুজন পুরুষ একটি শিশুর মা হতে পারেন, দুজনের মধ্যে একজনের শুক্রকে ডিম্বাণু ব্যাংকে জমা রাখা ডিম্বাণুর সঙ্গে নিষেক করে। দুজন সমকামী মা একইভাবে একজনের ডিম্বাণুর সঙ্গে শুক্রাণু ব্যাংকে জমা রাখা শুক্রাণুর সঙ্গে নিষেক করে শিশু পেতে পারেন একটি ভাড়া করা গর্ভে।

    ভিকি ডোনার ফিল্মে দেখানো হয়েছে শুক্রাণু বিক্রির ঘটনা। একইভাবে ডিম্বাণুও বিক্রি হয়। শুক্রাণু বিক্রি হয় কম দামে, বর্তমানে ভারতে যারা শুক্রাণু বিক্রি করে তারা হাজার-দুহাজার টাকা পায় প্রতিবারের জন্য। কিন্তু ডিম্বাণু যাঁরা বিক্রি করেন তাঁরা প্রতিবারের জন্য কুড়ি থেকে তিরিশ হাজার টাকা পান ; ডিম্বাণুকে বের করে আনতে হয়, এবং প্রতিবার একটিই ডিম্বাণু পাওয়া যায়, শুক্রাণুর মতন লক্ষ-লক্ষ নয়। তারা ডিম্বাণু বের করার প্রক্রিয়াটি, যিনি ডিম্বাণু দিচ্ছেন, তাঁর পক্ষে শারীরিকভাবে বেশ যন্ত্রণাদায়ক, পুরুষের মতন তা আনন্দদায়ক ব্যাপার নয়।

    মাতৃত্ব নিয়ে যে আবেগি কথাবার্তা এতোকাল বলা হয়েছে, লেখা হয়েছে, সেই পরিচিতিতে ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছে বিজ্ঞান।


     

    চার

    ভারতবর্ষে সারোগেসির বেশ বড়ো বাজার ছিল, কিছুদিন আগে পর্যন্ত, বিশেষ করে গুজরাটের আনন্দ শহরে, যেখানে ‘আমুল’ দুধ সমবায় সমিতির জন্ম ও বিস্তার। ক্ষেত্রসমীক্ষকদের ধারণা যে দুধ সমবায় সমিতির উপস্হিতির কারণে আনন্দের নারীরা গোরুর আর মোষের কৃত্রিম গর্ভসঞ্চারের সঙ্গে বহুকাল পরিচিত, এবং ব্যাপারটি প্রায় তাঁদের সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গিয়েছে ; সেকারণে মানুষের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি ততো আকস্মিক হয়ে দেখা দেয়নি আনন্দ শহরে, যেমনটা অন্যান্য শহরে দেখা দিয়েছে। আনন্দ শহরের গরিব পরিবারের পুরুষরা দুধ সমবায়ের কাজে ব্যস্ত থাকেন ও তা থেকে যৎসামান্য রোজগার করেন ; দরিদ্র পরিবারে পুরুষদের সঙ্গে মহিলারাও আয় বৃদ্ধির জন্যে গর্ভ ভাড়া দেয়া আরম্ভ করেছিলেন। আনন্দ শহরে সেকারণে সারোগেসি ক্লিনিকের আধিক্য। হিন্দু সংবাদপত্রের সমীক্ষকদের পোয়াতি মায়েরা বলেছেন যে তাঁরা একবার সারোগেট মা হয়ে যা রোজগার করেন, তাঁদের স্বামীরা সারা জীবন কাজ করেও তা রোজগার করতে পারবেন না।

    সারোগেসি ক্লিনিকরা পনেরো থেকে কুড়ি লাখ টাকা চার্জ করে যা থেকে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা দেয়া হয় সারোগেট মাকে। সারোগেট মায়ের নয়মাসের চিকিৎসা ও খাওয়া-দাওয়ার খরচও ক্লিনিকই দ্যায়। ক্লিনিকগুলো সারোগেট মায়েদের জন্য পৃথক বাড়ি ভাড়া করে সেখানে তাদের রাখে। বাচ্চা হবার পর যাতে তাদের মনে মাতৃত্বের যাদু কাজ না করে তাই অবিরাম তারা মনস্তাত্বিকদের চিকিৎসাধীন থাকে।

    ২০১৫ সালের নভেম্বরে ভারতের সুপীম কোর্ট একটি আদেশ জারি করে বলেছে যে কেবল ভারতীয় দম্পতি এবং কোনো দম্পতির একজন যদি ভারতীয় হন, তাহালে তাঁরাই কেবল গর্ভ ভাড়া করতে পারবেন। এই সারোগেট মায়েরা এবং সারোগেট ক্লিনিকগুলির সংস্হা সুপীম কোর্টকে অনুরোধ করেছে আদেশটি পুনরায় খতিয়ে দেখার জন্য, এবং তাঁদের বক্তব্য শোনার জন্য। ভারতের পার্লিয়ামেন্টে ২০১০ সাল থেকে এই বিষয়টি নিয়ে অ্যাসিসটেড রিপ্রোডাকটিভ টেকনোলজি বিল বিতর্কের অপেক্ষায় ঝুলে আছে। ঝুলে থাকার কারণ সারোগেসি বাণিজ্য থেকে গুজরাটের রাজনীতিকদেরও আয় হচ্ছে।

    ভারতে সারোগাসি বাণিজ্য ২০০২ সালে আরম্ভ হবার পর তা এখন ২.৩ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার পর থেকে সারা ভারতে, বিশেষ করে গুজরাটে, গায়নোকলোজিস্ট ডাকতাররা সারোগেসি ক্লিনিক খোলাকে বেশি রোজগারের সুযোগ মনে করে ভারতে ছড়িয়ে পড়তে থাকেন। ভারতে সারোগেসি অত্যন্ত সস্তা এবং চিকিৎসার বন্দোবস্তও ভালো বলে বিদেশি দম্পতিরা ভারতে আসা আরম্ভ করেন। ক্লিনিকগুলোও অন্যান্য দেশে এ-ব্যাপারে গ্রাহক দম্পতি যোগাড় করার জন্য বিজ্ঞাপন দেয়া আরম্ভ করে। দেখা যায় যে সারোগেট মায়ের গর্ভ যাঁরা ভাড়া করছেন, তাঁদের শতকরা ৪৮% বিদেশী।

    ২০১০ সালে গর্ভ ভাড়া দেয়া নিয়ে বিতর্ক ভারতে আরম্ভ হয়েছিল বেবি মানজি য়ামাদার মামলার কারণে। যে জাপানি দম্পতি গর্ভ ভাড়া করেছিলেন তাঁরা শিশুটি জন্মাবার আগেই ডিভোর্স করে আলাদা হয়ে যান এবং জাপানি মহিলাটি বাচ্চাটিকে নিতে অস্বীকার করেন। শেষে বাচ্চাটিকে গ্রহণ করে জাপানে নিয়ে যান বাচ্চাটির ঠাকুমা।

    ২০০৮ সালে সারোগেট বাচ্চার নাগরিকতা নিয়ে গুজরাত হাইকোর্টে জান বালাজ মামলায় হাইকোর্ট জানায় যে এই বিষয়ে একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ভারত দ্বৈত নাগরিকতা স্বীকার করে না। জান বালাজ মামলায় এক দম্পতির জন্য জার্মাণ শুক্রাণুর সাহায্যে গুজরাতে একজন সারোগেট মা যমজ বাচ্চা প্রসব করেন। জার্মানিতে সারোগেট বাচ্চার নাগরিকতা স্বীকৃত নয়। শেষে জার্মানির সরকার ও ভারত সরকার বিষয়টি আলোচনা করে বাচ্চা দুটিকে জার্মানিতে যেতে/আনতে সন্মত হয়। প্রথমে বাচ্চা দুটিকে ভারত ‘ওভারসিজ সিটিজেন’ হিসাবে স্বীকৃতি দ্যায়। জার্মান দম্পতি জানান যে বাচ্চা দুটিকে তাঁরা দত্তক নেবেন।

    সংসদে বিতর্কের পর আইনটি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা-ই এখন দেখার। যতোদিন তা পাশ না হচ্ছে ততোদিন সুপ্রিম কোর্টের নভেম্বর ২০১৫-এর আদেশ বহাল থাকবে।


     

    পাঁচ

    ২০০৯ সালে ভারতীয় আইন কমিশন সারোগেসি বিষয়ক একটি নির্দেশিকা জারি করেছে, তার প্রধান বিন্দুগুলো এরকম :

    ১) শিশুর জন্মের জন্য যাঁর গর্ভ ভাড়া করা হবে তাঁর সঙ্গে একটি আইনি চুক্তি সই হবে, শিশু পেতে ইচ্ছুক দম্পতি ও ফারটিলিটি ক্লিনিকের। যে মহিলা গর্ভ ভাড়া দিচ্ছেন, তাঁর স্বামীকে এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সেই চুক্তিটিকে মেনে নিতে হবে। কৃত্রিম গর্ভসঞ্চারের জন্য এবং যতোদিন না শিশুটি ভূমিষ্ঠ হচ্ছে, চিকিৎসার যাবতীয় খরচ সারোগেট মাকে সন্তান পেতে ইচ্ছুক দম্পতিরা দেবেন। সন্তান, এক হোক বা একাধিক, সারোগেট মা ইচ্ছুক দম্পতির হাতে তুলে দেবেন। এই ব্যবস্হাটি কিন্তু বাণিজ্য করার দৃষ্টিকোণ থেকে হবে না।

    ২) যে আইনি চুক্তি হবে তাতে সারোগেট মায়ের সন্তান প্রসবের আগে ইচ্ছুক দম্পতিদের দুজনের বা একজনের মৃত্যু হলে, বা ডিভোর্স হলে, অথবা সন্তানটিকে তাঁরা নিতে অস্বীকার করলে, সারোগেট প্রক্রিয়ায় জন্মানো শিশুটির লালন-পালনের খরচ ওই দম্পতিকে দিতে হবে, তা জানিয়ে সাক্ষর করবেন ইচ্ছুক দম্পতি।

    ৩ ) আইনি চুক্তিটিতে সারোগেট মায়ের জীবন বীমা করানো সম্পর্কিত তথ্য দিতে হবে। বীমা অবশ্যই করাতে হবে এবং তার প্রিমিয়াম ইচ্ছুক দম্পতি দেবেন না ফার্টিলিটি ক্লিনিক দেবে তা স্পষ্ট করে দিতে হবে।

    ৪) দম্পতিদের দুজনের মধ্যে একজনকে ডিম্বাণু বা শুক্রাণু দিতে হবে, কেননা দুজনের একজনের সঙ্গে জৈবিক সম্পর্ক থাকলে শিশুটির প্রতি ভালোবাসা ও শিশুটির সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। অবিবাহিত অথবা দম্পতির একজন মৃত এমন অবস্হায় একজন নারী বা পুরুষ যদি সারোগেট শিশু চান, তাহলে তাঁকে নিজের ডিম্বাণু বা শুক্রাণু দিতে হবে, নয়তো শিশু অ্যাডপ্ট করা ছাড়া অন্য উপায় তাঁর নেই।

    ৫) সারোগেট শিশুটি যে ইচ্ছুক দম্পতির বৈধ সন্তান তার জন্য আইনি অনুমোদন থাকতে হবে।

    ৬) সারোগেট শিশুটির বার্থ সার্টিফিকেটে ইচ্ছুক দম্পতির দুজনের নামই থাকবে। অন্য কারো নাম থাকবে না।

    ৭) যিনি শুক্রাণু বা ডিম্বাণু দিচ্ছেন তাঁর এবং সারোগেট মায়ের পরিচয় গোপন রাখতে হবে।

    ৮) ছেলে শিশু চাই না মেয়ে শিশু চাই এরকম দাবি ইচ্ছুক দম্পতিরা করবেন না।

    ৯) স্বাস্হ্যের জটিলতার কারণে গর্ভপাতের প্রয়োজন দেখা দিলে তা করা হবে ১৯৭১ সালের মেডিকাল টারমিনেশান অফ প্রেগনেনসি আইনের আওতায়।


     

    ছয়

    এখন দেখার যে এই সন্তানেরা যুবক-যুবতী হবার পর কেমন আচরণ করে, সমাজ তার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক গড়ে তোলে, তার চরিত্রে কোনো প্রভাব পড়ে কিনা, সে তার জেনেটিক মায়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে কিনা। এখন তো সারোগেট শিশুরা ভারতে বয়ঃসন্ধির বেড়া পেরিয়ে যৌবনে পৌঁছোয়নি।


     

     

  • মলয় রায়চৌধুরী | ৩১ জুলাই ২০২১ ১৯:৫৮734802
  • মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস : গহ্বরতীর্থের কুশীলব

    খাজুরাহো মন্দিরের দেয়াল থেকে মাটিতে লাফাবার সময়, ঘুরঘুরে পোকার মুখে পাঠানো আদেশ তামিল করার জন্যে, বাতাসের মাঝপথে, নিজেকে পাষাণ মূর্তি থেকে রক্তমাংসের মানুষে পালটে নিয়েছিল কুশাশ্ব দেবনাথ নামে স্বাস্হ্যবান যুবকটি, যে কিনা হাজার বছরেরও বেশি চাণ্ডেলাবাড়ির একজন গতরি, ভারি-পাছা, ঢাউসবুক উলঙ্গ দাসীর ঠোঁটে ঠোঁট, যোনিতে লিঙ্গ, আর স্তনে মুঠো দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়েছিল।

    এতকাল কত রোদ রোদিয়েছে, কত মেঘ মেঘিয়েছে, কত শীত শীতিয়েছে, কত বৃষ্টি বৃষ্টিয়েছে, কত ঝড় ঝড়িয়েছে, কত ধুলো ধুলিয়েছে, তার গোনাগুনতি নেই।

    —-অ্যাই, তোকে তফতরে ডেকে পাঠিয়েছে। অমাবস্যার রাতে কানের ওপর এসে, হুকুম শোনাবার মতন হেঁড়ে গলায়, বলেছিল কেঁদো কালো ঘুরঘুরে পোকাটা।

    হাজার বছরেরও বেশি অমন পোজ দিয়ে থাকার দরুণ শরীর আড়ষ্ট হয়ে থাকলেও, গায়ে কিন্তু একদম ব্যাথা নেই কুশাশ্ব দেবনাথের। আড়ষ্টতা কাটাবার জন্যে একটু ওঠবোস লাফালাফি ছুটোছুটি করে নিল। পাথর হয়ে সঙ্গমরত থাকলেও, ‘দফতর’ শুনে ছাঁৎ করে উঠেছিল নিরেট বুক। মাটিতে দাঁড়িয়ে, রক্তমাংসের দেহে, যদিও উলঠ্গ, ছাঁৎ-ছাঁতানিটা কাটতে সময় লাগল।

    —-এভাবে যাওয়া অ্যালাউড? জিগ্যেস করল কুশাশ্ব।

    —-নিজেকে নগন্য করে নে, তিন-চার সেন্টিমিটারের মতন, তাহলে প্রবলেম হবে না। মাপ না বাড়লে লোক-লজ্জার ভয় নেই। কন্ঠস্বরে আদেশ মিশিয়ে বলল ঘুরঘুরে পোকাটা, যার ঠাকুমা আদর করে ওর নাম রেখেছিলেন পচা; আর এখন তো পচাঞ্জন সরদার নামে পুরো গোভারতে বিখ্যাত। এক দুর্গন্ধে সবাই চেনে।

    —-যাব কী করে? শরীরের পেশিগুলো ম্যাসাজ করতে-করতে, যাতে একটু ঢিলে-ঢালা হয়, জানতে চাইল কুশাশ্ব।

    —-তোর সেই জলফড়িং বন্ধুটা কোথায়? তার তো বেশ হাওয়াইজাহাজের মতন বডি, চার ডানার ইনজিন, চাদ্দিকে দেখার মত ডুমো-ডুমো চোখ। ওটার ওপর বসে চলে যা।

    মনে পড়ল কুশাশ্বর। পতঙ্গিনী ধরিত্রীকন্যা নামে এক জলফড়িং এসে প্রতিদিন নাকের ডগার ওপর বসে ডানা ঝাপটানির আদর দিচ্ছে মাসখানেক যাবত। পতঙ্গিনীও বলছিল, মন্দিরের গা থেকে নেমে, জলজ্যান্ত মানুষ হয়ে দেশঅদেশ দেখতে, ভালমন্দ খেতে, রক্তমাংসের মেয়ের আহ্লাদ নিতে। পতঙ্গিনীর পরিবার নাকি কয়লাযুগের সময় থেকে রয়েছে। তখন ওরা অনেক অবস্হাপন্ন ছিল। এত অবস্হাপন্ন যে ওর পূর্বপুরুষদের বলা হত দৈত্যফড়িং, আর সময়টাকে লোকে বলত রেনেসঁস।

    রেনেসঁসের সময়ে ছিলেন ফোরোরাকোস, টিরানোসরাস, ডিপলোডোকাস, ইগুয়ানাডন, ট্রাইসেরাটপাস, মাস্টোডোনসরাস, স্টেগোসরাস, রয়ামোফোরিনকাস, টেরানোডন, ব্লনটোসরাস, আরকিওপটেরিক্স, ট্রাকোডোন, মোসোসৌর প্রমুখ মহান ব্যক্তিত্ব; একদিন বিকেলবেলায় বলেছিল পতঙ্গিনী, যখন বিকেলেরচ সোনারঙআ হাওয়া ওর স্বচ্ছ চারটে ডানাকে ফরফরিয়ে হাওয়াতে চাইছিল। কয়লা-উৎপাদী বনজঙ্গল যখন ফেলে-ছড়িয়ে চারপাশ জংলাচ্ছে, তখন জলে অভিভূত জলায়-জলায় ডানাবাজনার প্রবচন শুনিয়ে সংস্কারের কাজ করতেন ওর তিন ফিট লম্বা পূর্বপুরুষরা।

    আর এখন? পতঙ্গিনী ধরিত্রীকন্যা বলে, এখন সবই খুদে-খুদে। ছয়ফুটকি কাঁচপোকা, গোবরঠেলা গুবরে, ডোরাকাটা তেলাপোকা, কালীঝিঁঝি, গন্ধকীট, কেঁচো, কির্মি, মঃকুন, বল্মীক, কিটিভ, জালিক, উচ্চিঙ্গে, ডেঁয়ো, পুতিকা, লুমবিষ, শলভ, শুঙ্গা, কেঁদরাই, জলৌকা, ঘুণ আর চুলচেরারা সমাজ চালায়।

    অচেনাসুলভ অচেনাদের একটা জমঘত আছে যাকে খুদেরা বলে দফতর। যারা ইনজিরি ভাষা জানে তারা বলে পার্টি- ঘর। ওই দফতরে হাজির হতে বলেছে ঘুরঘুরে। আদেশ দিয়ে, গায়ের ঢাকনা তুলে, গোপন ডানা বের করে, মুখের সামনে কালাশনিকভ উঁচিয়ে চলে গেল স্পেশাল রিজার্ভ ফোর্সের ঘুরঘুরে কমান্ডার।

    পতঙ্গিনী বলেছিল, কাঁচপাখনার খুনসুটিমার্কা কাঁপন তুলে, দফতরের অছিসিংহাসনের মালকিনির সামনের দিকটা সুয়োরানি আর পেছনদিকটা দুয়োরানি; কিন্তু তুমি টেরটি পাবে না কোনটি সুয়ো আর কোনটি দুয়ো।

    —-সে কি? আমাদের মন্দিরের গায়ে যে উলঙ্গ যুবতীরা অমর হয়ে রয়েছে তাদের তো সামনে দিক আর পেছনদিক একেবারে আলাদা, অথচ সুয়ো-দুয়োর ব্যাপার নেই।

    —-তোমার মন্দিরে যা আছে তা হল স্হপতি আর ভাস্করের কল্পনা। আমি রূঢ় বাস্তবের কথা বলছি ভায়া। কখনও যদি দফতর শহরে যাও, নিজের চোখে দেখতে পাবে।

    —-শুধু চোখ কেন আমি তো সব অঙ্গ দিয়েই দেখব। চোখ দিয়ে সবকটা ডাইমেনশান ধরা যায় না। তাছাড়া তোমার মতন চোখ তো আমার নেই।

    দফতরের ডাকে সে-কারণেই সাড়া দিল কুশাশ্ব দেবনাথ।

    এদিকে অমাবস্যার অমিয় অন্ধকার, তারায় তেরিয়ে আকাশ, শীতে শীতোচ্ছে ঝোপঝাড়, বাঁশিয়ে রয়েছে বাঁশবন, হিমে হিমোচ্ছে হালকা হাওয়া; কখন দুজোড়া ডানার কপাট খুলে পতঙ্গিনীর ঘুম ভাঙবে কে জানে।

    নগণ্য হবার আগে একবার জঘন্য হয়ে দেখা যাক, ভাবল কুশাশ্ব। বলা তো আর যায় না। যদি দফতর শহরের কাজে লাগে। যদি অছি-সিংহাসনের কাজে লাগে। যদি মালকিনির সুয়ো দ৮ইকের কাজে লাগে। যদি মালকিনির দুয়ো দিকের কাজে লাগে।

    যামন ভাবা তেমনি কাজ।

    সারা গায়ে চুল আর শুঁড়োলো মুখ দিয়ে দাঁত বেরোনো শাকাহারী ম্যমথ হয়ে গেল কুশাশ্ব। গাছে-গাছে গেছো পাখিদের চেঁচামেচিতে লজ্জা পেয়ে আবার ফিরে এলো নিজের চেহারায়। ট্রায়ালটা দিয়ে অবশ্য ফুরফুরে প্রাণে ফুরসত এলো।

    সকালে, পতঙ্গিনী এসে যখন রক্তমাংসের কুশাশ্বকে দেখল, ওর তো হেসে-হেসে ডানা ব্যথা হবার যোগাড়। সব শুনে বলল, নগণ্য-জঘন্য বা ধন্যধন্য যা-ই হও, অত দূরে ফ্লাই করার প্রযুক্তি আমার নেই ভায়া। অত এভিয়েশান ফুয়েলও ক্যারি করতে পারি না।

    —-তাহলে কী হবে? কেমন করে যাব?

    তুমি নগণ্য হয়ে আমার পিঠে দুপাশে পা ঝুলিয়ে বসো, আমো কোনো শঙ্খচিলের পিঠে বসিয়ে দেবো তোমায়। ওরা কেউ-কেউ দফতর-শহরের দিকে যায়।

    নগণ্য হয়ে, উঠে বসার সময়ে পিছলে যাচ্ছিল কুশাশ্ব। ভোর-ভোর পরাগ মাখাবার ডিউটিতে বেরিয়েছিল পতঙ্গিনী, যাতে বেশি-বেশি হাইব্রিড জন্মায়।

    —-হাইব্রিড? জানতে চাইল কুশাশ্ব। অচেনাসুলভ অচেনা?

    হ্যাঁ, হাল আমলে আমরা ফড়িংরা অনেক ধরনের হাইব্রিড তৈরিতে সফল হয়েছি।

    —-তাই বুঝি?

    —-হ্যাঁ তো! গান্ধির পরাগের সঙ্গে মার্কসের পরাগ, গান্ধির পারাগের সঙ্গে রজনিশের, মাও-এর সঙ্গে মোরারজির, মার্কিনের সঙ্গে চিনা, জেহাদের সঙ্গে সাম্যবাদ, লাউ-এর সঙ্গে লঙ্কার, রবারের টুপির সঙ্গে চামড়ার টুপি; সে-সব হাইব্রিড তুমি দফতর শহরে গেলেই দেখতে পাবে।

    —-হাফ-চেনার সঙ্গে উড়ুক্কু হাফ-চেনা মিশিয়ে পুরো একখানা অচেনাসুলভ অচেনা? পিঠের ওপর যুৎ করে বসে বলল কুশাশ্ব। এভাবেই ঘোড়ায় চাপত হাজার বছর আগে।

    ঝিলের ঝিলমিলে কিনারায় যে শঙ্খচিলটা বসেছিল তাকে, জলে পোঁতা কঞ্চিতে বসে জিগ্যেস করল পতঙ্গিনী, একজনকে দফতর-শহরে নিয়ে যাবেন? ওর ডাক পড়েছে, খুব জরুরি।

    ঠোঁটে শুকনো ঘাসের নুটি নিয়ে পেতলের একটা ছোট মূর্তি ঘষেমেজে ফর্সা করছিল শঙ্খচিল, এক মনে, মাথা নিচু করে। বলল, গোপালের এই তো সবে ঘুম ভাঙল। দাঁত মাজিয়ে, চান করিয়ে, ব্রেকফাস্ট করিয়ে, তারপর ওকে নিয়ে একটু বেরোব।

    —-আপনি যতটা যাবেন অন্তত ততদূর পৌঁছে দেবেন নাহয়। তারপর কোনো যানবাহনে চাপিয়ে পাঠিয়ে দেবেন। প্রস্তাব দিল পতঙ্গিনী।

    —-ঠিকি আছে, আগে গোপালের সেবাটা করে নিই। এক হাতে গোপালকে, অন্য হাতে তোমার অতিথিকে ধরে নিয়ে যাবো।

    শঙ্খচিলের পায়ের কাছে কুশাশ্বকে নামিয়ে, টা-টা করে চলে গেল পতঙ্গিনী। কুশাশ্ব দেখল গোপাল একটা পুতুল, হাতে নাড়ু নিয়ে বসে আছে। ও নিজে ছিল পাথরের আর নাড়ুগোপাল নিরেট পেতলের।

    শঙ্খচিলের পরামর্শ মেনে, যে-হাতে গোপালকে আঁকড়ে ধরল পাখিটা, সেই হাতটা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল কুশাশ্ব। একটা হাত আমার খালি থাকা দরকার, নয়তো নামার সময়ে অসুবিধা হবে, বলেছিল শঙ্খচিল।

    দু-তিনবার পাক খেয়েই আকাশের চেয়ে উঁচু আকাশে উঠে পড়ে শঙ্খচিল যখন ফুল স্পিড নিয়েছে, ধাতব হাসি হেসে পেতলের মূর্তিটা ফিসফিস করে কুশাশ্বকে বলল, এত নিচু স্বরে যাতে শঙ্খচিল শুনতে না পায়, এই নিন, নাড়ু খান, আপনার তো মনে হচ্ছে সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি।

    সত্যিই বেশ জোরে খিদে পেয়ে গিয়েছিল। বাঁ-হাতে নাড়ুটা নিয়ে খেয়ে নিল কুশাশ্ব। এমন খিদে পেয়েছিল যে প্রশ্ন করার মানে হয় না, গোপাল ছোকরাটার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় না হওয়া সত্বেও।

    খেয়ে নিলে, গোপাল বলল, আরো নিচু স্বরে, দফতর থেকে আমারও ডাক পড়েছে, কিন্তু আমার সেবাইত তো ছাড়তেই চায় না, সব সময়ে সঙ্গে থাকে, এমনকি রাত্তিরে ঘন্টা বাজিয়ে মশারি টাঙিয়ে, আমাকে ঘুম পাড়ায় আর নিজে আমার সামনে মাটিতে শুয়ে মশার কামড় খায়।

    এরকম উজাড় করে সেবা করছে লোকটা, অথচ আপনি দফতরের ডাকে সাড়া দিতে চাইছেন? কুশাশ্ব বিস্মিত। গলায় নাড়ুর চুরো আটকে আরেকটু হলেই জোরে কেশে ফেলত। সূর্য উঠে গিয়ে থাকলে কী হবে, আকাশ ব্যাপারটাই একেবারে ঠান্ডা, পাথরিনী চান্ডেলা দাসীর চেয়েও। তার ওপর খুচরো মেয়েলি মেঘগুলো মাঝে-মধ্যে সুড়সুড়ি দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।

    বন্দী জীবন কাটাচ্ছি, বুঝলেন, চব্বিশ ঘন্টা নজরে-নজরে, একেবারে একপাখিতন্ত্রী যাপন। বলল গোপাল। তারপর যোগ করল, একটু পরেই আমার সেবাইত ছোঁ মেরে নাড়ু তোলার জন্যে একজায়গায় নামবে, তখন কিছুক্ষণের জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে যাবে। বাঁ হাতটা তাই ফাঁকা রেখেছে। মাটির কাছাকাছি যেই নামবে, আপনি ওর হাতের বগলে কাতুকুতু দিয়ে মাটিতে ঝাঁপ দেবেন, আমিও দেবো সেই সঙ্গে।

    কিন্তু পতঙ্গিনী তো বলেছিল ও-ই দফতরে যাবার গাড়িতে তুলে দেবে।

    প্রশ্ন করবেন না। সেবাইতদের বলা যায় না। কিছু না পেলে আপনাকেই টুক করে খেয়ে ফেলতে পারে। আমি তো পেতলের, আমায় খেতে পারে না। হয়ত আমি ধাতুর বলেই আমার সেবাইত হয়ে রয়েছে।

    দোটানায় পড়ল কুশাশ্ব।শঙ্কচিল গোঁতা মেরে নামা আরম্ভ করেছিল নিচে। ভাবার আর সময় ছিল না। হালুইকরের বাড়ির ছাদে নাড়ুর থালার কাছাকাছি হতেই কাতুকুতু দিয়ে লাফ মারল কুশাশ্ব। গোপাল নাড়ু মাখার পাত্রের মধ্যে পড়ল। তুলে নেবার জন্যে শঙ্খচিল পেছনে বাঁক নিয়ে নেমে এসেছিল বটে, হালুইকরের মা একটা লাঠি নিয়ে ‘এই পালা এই পালা’ চেঁচিয়ে তাড়াল পাখিটাকে। না পালিয়ে ওপরে চক্কোর মারছে দেখে হালুইকরের মা লোকজন ডেকে নাড়ুর থাল, যার ফাঁকে কুশাশ্ব লুকিয়ে, আর নাড়ু মাখার বিরাট পাত্রটা, যার মধ্যে গোপাল লুকিয়ে, মাথায় তুলে নিচের তলার ভাঁড়ার ঘরে গিয়ে রাখল।

    কর্মীরা বাইরে বেরিয়ে গেলে, কুশাশ্ব স্তম্ভিত হয়ে দেখল, গোপাল প্রমাণমাপের মানুষের চেহারা নিয়ে ফেলেছে।

    —-করছ কী? করছ কী? ধরা পড়ে গেলে ভীষণ কেলেংকারি হবে। আমার মতন খুদে হয়ে যাও না। পরে সুযোগ পেলে কেটে পড়ব। আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল কুশাশ্ব।

    গোপাল বলল, আমি নগণ্য হতে পারি না। সে-ক্ষমতা আমার নেই। আমি যে ঈশ্বর। আমি কেবল বড়, আরও বড়, তার থেকেও বড় হতে পারি। বা ধাতু, কাঠ, মাটি, পাথরের।

    মনে হল এ-ঘরে কেউ আসছে। পায়ের শব্দ শোনা গেল। দ্রুত শুয়ে থাকা পেতলে রূপান্তরিত হল গোপাল। উত্তেজনায় কুশাশ্ব নিজের ছয়ফিট দীর্ঘ প্রকৃত চেহারা নিয়ে ফেলল। হাতে, বাহুতে, পায়ে, গলায় স্বর্ণালঙ্কার সুদ্ধ। কিন্তু দেহে যে পোষাক নেই। খাজুরাহো মন্দিরের দেয়ালে ওভাবে পোশাকহীনই ছিল হাজার বছর।

    যে যুবতী-বধু ঘরে ঢুকেছিল, সে তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিল ভেতর থেকে, আর ঝাঁপিয়ে পড়ল কুশাশ্বর ওপর। টাল সামলাতে না পেরে, ডািঁ-করা মিষ্টির পাহাড়ের ওপর পড়ল দুজনে। তাই আওয়াজ গেল না বাইরে।

    সকাল থেকে আমার বিশেষ কিছু খাওয়া হয়নি। সম্বিত ফিরে না পেলেও বলল কুশাশ্ব।

    বাঁ হাত দিয়ে কুশাশ্বর মুখে চোখে নাকে মিষ্টি গুঁজে দিতে লাগল যুবতী, আর দান হাতে খুলতে লাগল নিজের পোশাক। মিষ্টির নানা রকম ঢিবির ওপর চলল ওদের দুজনের স্বয়ংক্রিয় সৃজন-কম্মের হুটোপাটি। মিষ্টির বিছানায় ওদের খেলা স্তিমিত হয়ে এলে, কুশাশ্ব বলল, দফতর শহরে যাবার জন্যে ওকে সাহাজ্য করতে। গোপালের কথাটা চেপে গেল, কেননা এরাও যদি গোপালকে বন্দী করে ফ্যালে তাহলে মুশকিল। বলা যায় না; হয়ত ক্যাশ-বাক্সের ওপর রেখে এরাও গোপালের সেবাইত হতে চাইবে।

    মেয়েটি কুশাশ্বর জন্যে একটা থলে, ফুলপ্যান্ট, শার্ট, জুতো আর সোনার এক হাজার সরকারি মুদ্রা এনে দিতে, কুশাশ্ব নিজের সবকটা অলঙ্কার দিয়ে দিল খুলে, স্মৃতিচিহ্ণ হিসাবে। যুবতী যখন দেখতে গেল খিড়কি দরজার দিক ফাঁকা আছে কিনা, গোপালকে তুলে ঝোলায় পুরে নিল কুশাশ্ব।

    পেছনের খিড়কি দরজা দিয়ে বেরিয়ে ওপরে তাকিয়ে দেখল, তখনও আকাশে চক্কোর দিচ্ছে শঙ্খচিল। ঝোলা থেকে গোপালকে বের করলে ও-ও প্রমাণ মাপের মানুষের চেহারা নিল, আর মাথা থেকে ময়ূরের পালকটা খুলে ফেলে দিল ছুঁড়ে।

    ঈশ্বর হয়েও আপনি নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি? আমার নগণতার সুযোগ নিতে হল? গাড়ি-ঘোড়ার খোঁজে হাঁটতে-হাঁটতে গোপালের দিকে প্রশ্ন দুটো ছুঁড়ে দিল কুশাশ্ব।

    ঈশ্বরদের অনেক হ্যাপা, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল গোপাল। ঈশ্বররা পাওয়ার শেয়ারিঙে বিশ্বাস করে না, আকাশে উড়ন্ত শঙ্খচিলের দিকে তাকিয়ে বলল গোপাল। তারপর যোগ করল, ঈশ্বররা ভক্তদের দিয়ে অপরাধ করাতে বাধ্য হয়, কেননা তারা নিজেরা নিজেদের হাতে অপরাধ তুলে নিলে ঈশ্বরগিরি হারাবে। গোপিকাদের নিয়ে লীলে খেলায় আমি তো অনেক বেশি অভিঞ্জ। এমন কি যতই যাই করি কৌমার্য অটুট থাকে। তবু ওই যুবতীকে সন্মোহনে ডেকে পাঠালুম যাতে ওর বাঁজা বরের বদনাম ঘোচাবার অপরাধটা আপনি করেন, আর সেই সঙ্গে যুবতীটি আমাদের পালাবার সুযোগ করে দ্যান।

    —-ঈশ্বর হওয়া দেখছি বেশ ঝকমারি!

    হ্যাঁ, যে ঈশ্বরই হোন না কেন, যে সম্প্রদায়ের বা যে দেশেরই হোন না কেন, এই বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি নেই। নিরাকার হয়েও পার পাওয়া যায় না।

    —-তার চেয়ে তো না হওয়াই ভাল।

    —-সেই জন্যেই তো পচাঞ্জন সরদারের কথামতন দফতর শহরে যাচ্ছি।

    —-পচাঞ্জন কি আপনার সঙ্গেও তুইতোকারি করেছে?

    —-হ্যাঁ, কেন বলুন তো? গায়ের রঙ কালো, উস্কোখুস্কো চুল আর হাটুরে ধুতি দেখে ওনারা তো এমনিতেই তুইতোকারি করেন। কেনই বা আমায় বিশেষ ছাড় দেয়া হবে?

    অসহায় গোপালের দিকে তাকাল কুশাশ্ব। পথে, রেডিমেড জামাকাপড়ের প্রথম দোকানটা থেকে দুজনের জন্যে এক সেট করে ট্রাউজার, টি শার্ট আর ট্যাংক জাঙিয়া কিনল। গাময় মিষ্টির রস লেগে চটচটে, স্নান করে পোশাক পালটাতে হবে। নাড়ুঅলার খিড়কি দরজা ছাড়ার সময় থেকে একদল কীর্টনীয়া মাছি ডানার খঞ্জনি বাজিয়ে একঘেয়ে গেয়ে যাচ্ছিল, ‘জামাটা খোল না রে রসিক নাগর, দেহসুধা পান করি…’।

    এসব মিষ্টিখোর মাছিদের জানা আছে কুশাশ্বর। এরা ঘোড়া মাছি, এদের ড্যাবডেবে নেশা-করা চোখ দুটো এমন যে মাথা খুঁজে পাওয়া যায় না। মাদিগুলো রক্ত খায়। যখন পাথর হয়ে মন্দিরের গায়ে স্হায়ি সঙ্গমকারীর চাকরিতে ছিল, মরদগুলো লিঙ্গের ওপর বসে মধুরস খাবার তালে থাকত; মাদিগুলো এসে বসত পোঁদের ওপর। কিছু না পেয়ে, ভুল বুঝতে পেরে, কাঁচা খিস্তি দিতে-দিতে উড়ে যেত।

    তিতকুটে-সবুজ বনবাদাড়ে ঘেরা একটা ঝলমলে-টলমলে সোমথ্থ ঝিলের কাছে পৌঁছলে, গোপাল বলল, আমি নিজেকে একটু লাঘব করে আসছি, আপনি ততক্ষণ স্নানটা সেরে ফেলুন।

    হ্যাঁ, হয়ে আসুন, বলল কুশাশ্ব। তারপর খটকা লাগল, ঈশ্বররা কি হাগেন-মোতেন! কে জানে, হয়ত অমন অবিনশ্বর সমস্যার কারণেই ওনারা হয় নিরাকার হয়ে যান, বা পাথর-মাটি-ধাতু-বরফ কোনো আধারকে আশ্রয় করেন। এও কম ঝকমারি নয়। ও নিজেও যখন পাথর ছিল, তখন হাগা-মোতার সমস্যা ছিল না। পান-ভোজনের দরকার হত না তো মলের প্রশ্নই উঠত না।

    জামা-প্যান্ট খুলে ঝিলকিনারায় রাখার পর, ওর পোশাক নিয়ে যখন কীর্তনীয়া মাছিরা ‘মিছা মায়া মধুরসে, বন্দী হয়্যা মায়াপাশে, হরিপদে না রহে ভকতি’ গাইতে-গাইতে কাড়াকাড়ি করছে নিজেদের মধ্যে, ওদিকে খেয়াল দিতে গিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়েছিল, ব্যাস, সেই ফাঁকে একটা চিকনচাম ঠান্ডাবদন ময়ালসাপ ওকে জড়িয়ে বলে উঠল, এইবার বাগে পেয়েছি তোমায়, আর কোথাও যেতে দেব না, তুমি আমায় শেখাবে কী ভাবে বহুক্ষণ নিজের ল্যাজের ডগায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

    —-আঃ ছাড়ুন ছাড়ুন, কাতরে উঠল কুশাশ্ব, আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আপনার অশ্লীল আলিঙ্গনের চাপে।

    —-ছাড়বই যদি তো এই সাড়ে তিন পাকে ধরেছি কেন? জিভ দিয়ে কুশাশ্বর গাল চাটনির মতন চেটে নিয়ে বলল দাগড়া পোশাকের রয়াল বেঙ্গল ময়াল, মুখ দিয়ে বোটকা গন্ধ বেরোচ্ছে পালকসুদ্ধ দেশি মুর্গি খাবার।

    —-আরে, অদ্ভুত মশাই, চিনি না জানি না, গলা টিপে ধরে এ কেমন প্রস্তাব! টু-পিস জিমনাস্টদের কাছে যান না শেখার জন্যে। গোপালের এসে পড়ার প্রত্যাশায় এদিক-ওদিক তাকেয়ে, গলার জাপট ছাড়ারাবার চেষ্টা করতে-করতে বলল কুশাশ্ব। দাঁড়াতে শিখে করবেনটাই বা কী? এই তো বেশ আছেন, সারা জীবন কেবল শুয়ে থেকেই চালিয়ে দ্যান।

    —-জানিস না মানে? আমার পেটে যাবার আগে শ্বেতকেষ্ট সিংহ নামের শঙ্কচিলটা বলছিল যে তুই হাজার বছর ধরে অশ্লীল ঢঙে দাঁড়িয়েছিলিস, তুইই ওকে ঠকিয়ে ওর সোনার গোপাল হাতিয়ে পালিয়েছিলিস; সেইটে খোঁজার জন্যে ও মাঠে এসে নেমেছিল, আর আমি ওকে খপ করে ধরে গপ করে খেয়ে টপ করে হজম করলুম, যাতে ইয়ে করার আগে গায়ে একটু গত্তি লাগে।

    —-তার মানে তো আমি আপনার উপকার করেছি।

    —-আমাকে ভড়কি দিসনি। আমার নাম স্বপ্ননীল বাজারি, বুঝলি। সব বাজারের সব্বাই আমাকে এক হাঁকে চেনে। এখন ঘন্টার পর ঘন্টা ঠায় দাঁড়িয়ে প্রেম করার তরকিবটা বল।

    গায়ে মিষ্টি রস লেগে থাকের দরুণ স্বপ্ননীল বাজারির জাপটটা যে পিছলে যাচ্ছে তা টের পাচ্ছিল কুশাশ্ব। এ-ব্যাটার সাড়ে তিন পাক থেকে ছাড়ান পাবার একটাই উপায়। সেটাই করল ও। আচমকা নগণ্যা হয়ে গেল। ফলে আলিঙ্গনের প্যাঁচ ফসকে টুপুস করে পড়ল গিয়ে ঝিলের জলে।

    আশেপাশে কিলবিলে চেঁচামেচি শুনে বুঝতে পারল যে নীলচেসবুজ ব্যাঙাচিদের জলহুল্লোড়ে গিয়ে ও, কুশাশ্ব, পড়েছে। আমাদের উত্তমকুমার, আমাদের সৌমিত্তির, আমাদের বুম্বাদা, আমাদের জিৎ, আমাদের শারুখ, আমাদের সালমান, আমাদের আমির, আমাদের অভিষেক, আমাদের ইমরান, আমাদের শাহিদ, আমাদের রণবীর বলে-বলে লুকুচিগান করতে লাগল মারমেইড ব্যাঙাচিবৃন্দ।

    শিতকালে ব্যাঙাচি! বিস্মিত হল কুশাশ্ব। স্বপ্ননীল বাজারীরও তো শীতে কম্বল চাপা দিয়ে গর্তের পালঙ্কে বা ঝাড়ের দোলনায় ঘুমোবার কথা। ঋতুগুলো হয়ত সবাইকে বোকা বানিয়ে ক্যালেন্ডারে জায়গা বদল করে নিয়েছে।

    ভাগ্যিস ময়ালের স্টকে ছোবল নেই। নইলে আর দেখতে হত না। জলেতে এক কোপ ছলাৎ মেরে কপাৎ দিলেই তো এক ঝাঁক ভারজিন মারমেইড ব্যাঙাচিদের সঙ্গে স্বপ্ননীল বাজারির এসি মার্কেটে, যেখানে মাথায় রেডইন্ডিয়ানদের মতন পালকের মুকুট পরে রাঙাচোখো শঙ্খচিলটা, শ্বেতকেষ্ট সিংহ, রেগে হালুয়া হয়ে বসে আছে।

    ব্যাঙাচি মারমেইডগুলো হাত-ধরাধরি করে নগণ্য কুশাশ্বকে বৃত্তাকারে ঘিরে ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ গাইতে থাকে পানা-বীথিকার সবুজ টলটলে ছায়ায়। গানটার এমনই অলস নিশিডাক যে ব্যাঙাচি মারমেইডদের বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাসমান কুশাশ্বর হাতদুটো একবার বাঁদিকে উঁচু হয়ে ঢেউ খেলায় তো একবার ডানদিকে উঁচু হয়ে ঢেউ খেলায়। ভালই চলছিল ওর জলনাট্য। একটা দশ কিলো কাৎলা ওকে বিনা বঁড়শির টোপ মনে করে মুখে ঢুকিয়েই ফেলে দিল, থু-থু করে; বলল, শালা তেতো মনুষের বাচ্চা কোথাকার! এদিকে বিনা নোটিসে অমন ঝপাং তোলায় মারমেইডরা যে যার ল্যাজ-লজ্জা বাঁচিয়ে ছত্রভঙ্গ।

    থু-থু করে দূরে ছোঁড়ার ফলে কুশাশ্ব পড়বি তো পড় একটা গর্তের একেবারে ভেতরে। ভয়ে কাঁটা। ভাবল, নিশ্চই কোনো ছোবলধারী সাপের বা দাঁতবের-করা শেয়ালের আড্ডায় গিয়ে পড়েছে, আর সে-ব্যাটা দাঁত বের করে জব্বর ঘুম দিচ্ছে। যে-দিক থেকে আলো আসছিল, সেদিক দিয়েই বেরোবার পথ আঁচ করে ল্যাংটো পোঁদে পড়িমরি দেদ্দৌড় লাগাল। ছুটছে তো ছুটছেই, ছুটছে তো ছুটছেই, ছুটছে তো ছুটছেই; শুনতে পেল লোকজনের কথা বলার ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে আসছে, ওই দিকেই গমগম করছে আলো।

    গর্তটা হয়ত কোনো বদলি-হওয়া সরকারি বা বেসরকসরি প্রাণির। কিংবা ভুতুড়ে ছমছমিয়া টানেল মনে করে একমাংসবর্তী জীবরা ছেড়ে চলে গেছে নতুন নিকোনো গর্তে। কিংবা সুন্দরী লুমলুমে শেয়ালনির সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া যুবরাজ শেয়ালের। কিংবা পুলিশ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত গিরগিটির, যে সন্ন্যাসী হয়ে খাইবার পাসের পাথুরে ডেরায় ছররা-মালা জপতে গেছে। যাই হোক, গর্ত থেকে মাথা বের করে কুশাশ্ব দেখল যে ওপরে জায়গাটায় মেলা বসেছে, আর গর্তের হাঁ-মুখের এপাশে-ওপাশে-চারিপাশে নানা রকমের নানা রঙের নানা মাপের খেলনা সাজানো, বেশির ভাগই একটা পেল্লাই-ভুঁড়ি টাকমাথা লোকের ছোট-ছোট চেহারা।

    সবকটা মূর্তিতেই চিকনা-টেকোটা গাল ফুলিয়ে হাসছে। দু-হাত ওপরে তুলে নিতাই-গৌর হয়ে, পাশবালিশে হাঁটু রেখে বসে, বাবু হয়ে ভুঁড়ি ঝুলিয়ে বসে, তা সে যত রকমের পোজ হতে পারে তেমন করে, কায়দা করে গাল ফুলিয়ে হাসছে ভুঁড়িদাস থলথলে টাকলুটা। হাসছে তো হাসছেই।

    কেউ ওকে দেখতে পাচ্ছে কি না জানার জন্যে বুক পর্যন্ত গর্ত থেকে বেরিয়ে ইতিউতি দেখছিল কুশাশ্ব। ভেবেছিল কারোর নজর না পড়লে বেরিয়েই পৌ২পা ছুট মেরে গিয়ে লুকোবে সামনের টিপ নখপালিশ লিপস্টিক শ্যাম্পু ডেওডোরেন্ট ময়েশ্চারাইজার বিক্রির মেয়েভুলোনো দোকানটায়। তারপর এক ফাঁকে কোনো দোকানে লুঙ্গি বা পাজামা বা নিদেন একটা হাফপ্যান্ট যোগাড় করে প্রমাণ-মাপের মানুষ হয়ে মেলার ভিড়ে মিশে যাবে।

    তা আর হল না। কাছাকাছি যে টেকো গালফোলা ভুঁড়িদাস খেলনাটা ছিল সেটা খপ করে ধরে ফেলল কুশাশ্বকে। আর ও, কুশাশ্ব, ভয়ে কেলিয়ে গিয়ে, ভৎ করে নিজেকে আবার গর্তের মধ্যে লুকিয়ে ফেলল। তার ফলে যা হল তা বললে কেউ বিশ্বাস করবে না।

    গালফোলা হাসিমুখ টেকোটা, যে কুশাশ্বর চুলের মুঠি ধরেছিল, ডিগবাজি খেয়ে সরুসুড়ঙ্গে পড়ল গিয়ে কুশাশ্বর ঘাড়ের ওপর। দুজনে গড়াতে-গড়াতে বেশ খানিকটা ঢুকে গেল টানেলেরভেতর। গড়ানো থামলে, কুশাশ্ব শুনতে পেল টেকোটা অট্টহাসি হাসছে। সে কী জোরে-জোরে হাসি। গমগম করতে লাগল গর্তপথ। হাসছে তো হাসছেই। হাসছে তো হাসছেই।

    কুশাশ্ব প্রথমে ভেবেছিল যে ও উদোম ল্যাংটো বলে ভুঁড়িদাসটা বসে-বসে হাসছে। কিন্তু আবছা আলোয় লক্ষ করল যে টেকোটার গায়েও এক চিলতে কাপড় নেই। কেবল ঝোলা ভুঁড়িতে ওর লেংটুটা ঢাকা পড়ে গেছে।

    —-আপনি কে? আমাকে বেরোতে দিলেন না কেন? কোনো মানে হয় এ রকম আচরণের? বিরক্ত কুশাশ্ব জবাবদিহি চাইল।

    জবাব দেবার বদলে লোকটা নিজের অট্টহাসি বজায় রাখল।

    —-আচ্ছা লোক তো মশাই আপনি। আমি কথা বলছি আর আপনি শুধু বোকার মতন এনামেল হাসি হাসছেন।

    —-হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-আরে। কী মুশকিল। এরকম হাসাহাসির আবার কী ব্যাপার হল?

    —-হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-দেখুন, আপনার মাওসেতুঙি হাসিটা এবার থামান। আপনি কে মশাই? আমাকে বিপদে ফেলে হাসছেন। আপনার তো দাঁতও নেই দেখছি যে বলব দাঁত বের করে হাসছেন।

    —-হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    কুশাশ্ব ভাবল হাসছে হাসুকগে। এক সময় তো চোয়াল ব্যাথা হয়ে থামবে। মাটির দেয়ালে ঠেসান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসল। ফোকলাটার হাসি থামার নাম নেই। দশ মিনিট, পনেরো মিনিট, কুড়ি মিনিট, তিরিশ মিনিট, চল্লিশ মিনিট, পঞ্চাশ মিনিট, কতক্ষণ ধরে টেকোটা টানা হেসে গেল কে জানে।

    —-চুপ করুন, ফুলকো হাসি থামান। ধৈর্য রাখতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠল কুশাশ্ব।

    জোরে-জোরে হাসি থামাল বটে লোকটা, কিন্তু ফিকফিকে মেটেল হাসি বজায় রাখল গাল ফুলিয়ে।

    —-আপনি কে? কী চান? সরাসরি জানতে চাইল কুশাশ্ব।

    —-লাঃ ফিং বু ঢ ঢো ঢা। লোকটা এমনভাবে দমফাটা হাসি মিশিয়ে কথাগুলো বলল যে কী বলছে মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারল না কুশাশ্ব।

    —-বুঢঢা বুঢঢো, কী বলছেন বুঝতে পারছি না।

    —-ইয়েস ইয়েস, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-বুঢঢো? বুদ্ধ? না বুঢঢা?

    —-ইয়েস ইয়েস, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-গৌতম বুদ্ধ?

    —-ইয়েস ইয়েস, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-বামিয়ান বুদ্ধ?

    —-ইয়েস ইয়েস, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-হীনযানের বুদ্ধ?

    —-ইয়েস ইয়েস, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-মহাযানের বুদ্ধ?

    —-ইয়েস ইয়েস, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-শাক্যমুনি বুদ্ধ?

    —-ইয়েস ইয়েস, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-এই যে বললেন লাফিং বুঢঢা?

    —-ইয়েস ইয়েস, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-লাফিং বুঢঢাই শিওর তো?

    —-ইয়েস ইয়েস, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-একশো ভাগ নিশ্চিত?

    —-ইয়েস ইয়েস, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-আমাকে আটকে দিলেন কেন?

    —-গোপাল এই পথ দিয়ে যাবার সময় বললেন আপনি এই গর্ত দিয়ে বেরোবেন। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-তাতে কী? আমি বেরোতে চাইছিলুম। আপনি অযথা বাগড়া দিলেন।

    —-আমাকেও দফতরে ডেকে পাঠিয়েছে। পচাঞ্জন সরদার হুকুম জানিয়ে গেছে। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ….

    —-আপনাকেও? স্তম্ভিত কুশাশ্ব চেঁচিয়ে জিগ্যেস করে ফ্যালে। এখন বের হব কেমন করে? পোশাকই বা যোগাড় হবে কী ভাবে? আপনি তো এমন থপথপে যে আপনার দ্বারা কিছু হবে বলে মনে হয় না।

    পাকা সন্ধ্যার থকথকে অন্ধকার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। হাসি বজায় রেখে বলল লাফিং বুঢঢা। তারপর মেঝেয় শুয়ে, বাহুতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। নাক ডাকতে লাগল। নাক ডাকা শুনে ভয় হল কুশাশ্বর। ব্যাঙাচিগুলোর মা-মাসি-পিসিরা আবার মেটিং-কল মনে করে না হপহপ ফপফপ করতে-করতে চলে আসে।

    এক সময়ে কুশাশ্বও ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম ভাঙল যখন, তখন একটা মেঠো মাদি ইঁদুর পায়ে চিমটি কেটে বলল, এই আপনারা এভাবে যাতায়াতের রাস্তা ব্লক করে রেখেছেন কেন? আর এটা তো দেখছি অকম্মের ঢেঁকি লাফিং বুঢ়ুয়া, ও আবার এখানে কী করতে এসেছে? তারপর কুটিপাটি ইঁদুরদেঁতো হাসি হাসল। হাসতে হাসতেই বলল, আজকে তো যতদুর জানি দফতর থেকে অবরোধের হুকুম জারি হয়নি, রাস্তায়-রাস্তায় তাহলে তো ক্লাবের ছেলেরা ঝান্ডার ডান্ডা নিয়ে জনমনিষ প্যাঁদাতে বেরোত!

    ইঁদুরের পেছন-পেছন ওরা দুজন গর্তের মুখ পর্যন্ত গিয়ে দেখল মেলাচত্বর ভোঁভাঁ, বাইরে শীত-রাতের শীতে কাহিল আঁধিয়ারি অন্ধকার ঘুটুরঘুটুর করছে। ঝিঁঝিরা বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঝিঁঝিট-রাগে খেয়াল গাইছে। বাইরে বেরিয়ে দুজনেই একসঙ্গে প্রমাণ মাপের মানুষ হয়ে উঠতে, ‘তাজ্জব ব্যাপার’ বলে চলে গেল মাদি ইঁদুরটা, কেননা মানুষের শরীর থেকে ইঁদুরলিঙ্গহীন ইঁদুর ঝুলতে ও-ও নিজের এত বছরের ধান চুরির অভিজ্ঞতায় দেখেনি।

    দূরে দপদপে অথচ টিকিসটিকিস আলো জ্বলতে দেখে, ভৌতিক অন্ধকারের মেঠো সুযোগ নিয়ে, দুজনে সন্তর্পণে সেই দিকে এগোল। আলো জ্বলতে-থাকা প্রথম ঘরের জানলা দিয়ে ডেখল, একটা লোক খাটের ওপর দলীয় পতাকা বিছিয়ে আঙুলে মুচকি-হাসি মাখিয়ে নোটের থাক সাজাচ্ছে। এবাড়িতে খাওয়া-পরা-থাকার যোগাড়-যন্তর করা মুশকিল। পোশাক হাতানোটাও কঠিন।

    পরের বাড়িটায় পৌঁছে জানলা দিয়ে দেখল, এক প্রৌঢ় দম্পতি সান্ধ্য-সঙ্গমে মশগুল। সঙ্গমকালীন পরিবেশ গড়ার জন্যে আলোও টিমটিমে লিকলিকে। জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে, দম্পতির খুলে-রাখা পোশাক টেনে নিল ওরা। প্রৌঢ় দম্পতির লীলেখেলা দেখে লাফিং বুঢঢা মুখে না হেসে কেবল ভুঁড়ি নাচিয়ে হাসছিল। শার্ট-প্যান্ট-সোয়েটার পরে নিল কুশাশ্ব। মহিলার শাড়ি লুঙ্গির মতন করে পরে গায়ে আলোয়ান চাপা দিয়ে নিল লাফিং বুঢঢা। তারপর যেদিক থেকে ভারি ট্রাক চলাচলের শব্দ আসছিল সেদিকে রওনা দিল দুজনে।

    পৌঁছল জাতীয় সড়কে, কে জানে কত নম্বর, যাচ্ছে আসছে যানবাহন। সরকারি গাড়ি প্রায়ভেট গাড়ি। টেম্পো ট্রেকার জিপ। ডিজেল পেট্রল সিএনজি। কিন্তু কোন দিকে দফতর শহর? হাত দেখানো সত্বেও থামছে না কোনো গাড়ি। হেড লাইটের আলোয় ওদের দেখতে পেয়ে গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাতের বেলায় গণতন্ত্র আরও বেশি গণতন্ত্র হয়ে যায়। রাস্তার অন্য পারে গিয়ে হাত দেখিয়েও কোনো কাজ হল না।

    —-দাঁড়ান, কোন দিকে হাঁটতে হবে আমি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে নির্ণয় দিচ্ছি, হাসতে-হাসতে কথা কটা বলে আবার হাসতে-হাসতেই এই ফরমুলাটা বলল লাফিং বুঢঢ: ‘আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি, যদুর মাস্টার শ্বশুরবাড়ি, রেল কম ঝমাঝম, পা পিছলে আলুর দম’। তারপর নির্ণয় নিল, এই দিকে গেলে পা পিছলে আলুর দম হবে, তাই আমাদের হাঁটতে হবে উল্টো দিকে।

    যেমন বলা তেমনি কাজ। বজ্রবাঁটুল বিজ্ঞের বৈজ্ঞানিক বাতেলা বলে বাক্যি। ঢং-ঢাঙাতিদের থেকে বাঁচতে হলে বিজ্ঞানের আশ্রয় নেয়া ছাড়া উপায় নেই। কম্ম কেয়াল করতে হবে তো! অতএব বাগড়া-বাগড়ি না করাই ভাল। দুজনেই তো এখন সোঁতের শ্যাওলা। আরম্ভ হল হাঁটা দেয়া।

    হাঁটছে তো হাঁটছেই। হাঁটছে তো হাঁটছেই। হাঁটছে তো হাঁটছেই। কোনদিকে দফতর শহর তার নির্দেশবোর্ড নেই কোথ্থাও। খানিক পরে-পরে কেবল মাইলপাথর।তার ওপর যৌনরোগ সারাবার পোস্টার, যার দরুন কী লেখা পড়া কঠিন। যেটুকু বা পড়া গেল কয়েকটায় তাতে অচেনাসুলভ অচেনা জায়গার নাম। আরও হন্টন। লাফিং বুঢঢা রাস্তার পাশে বসে পড়ে বলল, আর পারছি না গো, আপনি বরং এগোন, আমার ভুঁড়ি আর ওজন বইতে পারছে না। মুখে গালফোলা অটুট, কিন্তু হাসি উধাও। ইচ্ছে তো কুশাশ্বরও হচ্ছিল বসে পড়তে। লাফিং বুঢঢার দেখাদেখি ও-ও বসে পড়ল। একটু পরে রাস্তার ধারে শুয়ে পড়ল দুজনে।

    লাফিং বুঢঢা সতর্ক করল কুশাশ্বকে, ঘুমিয়ে পড়বেন না যেন, শেষে জন্তু-জানোয়ার টেনে নিয়ে যাবে। বরং গল্প করা যাক, কী বলেন। আমি একটা গল্প বলছি। হয়ত গল্প শুনতে-শুনতে জেগে থাকবেন। রসিয়ে-রসিয়ে গল্প বলা আরম্ভ করল লাফিং বুঢঢা।

    অনেক অনেক অনেকদিন আগেকার কথা। আমাদের দেশে এক নেতার চারটে ছেলে ছিল। তারা ছিল পরস্পরের জিগরি দোস্ত। সবসময় মিলে-মিশে থাকে। মলে যায়, মাল্টিপ্লেক্সে যায়, ডিসকোথেকে যায়, নাইট ক্লাবে যায়, বেশ্যালয়ে যায়, ভোট দিতে যায়, পিকনিকে যায়, বাজি পোড়াতে যায়, চিনা রেস্তোরাঁয় যায়, লং ড্রাইভে যায়, সালসা নাচতে যায়, সর্বত্র এক সঙ্গে যায়।

    ওদেরও নেতা বানাবার আগে ওদের বাপ ট্রেনিঙে পাঠাল। নেতা বাপ দেশের টাকাকড়ি-সোনাদানা মেরে লুকিয়ে রেখেছিল; আর সব নেতারা যা করে এই নেতাও সেই সব কুকম্ম করে জীবনে উন্নতি করেছিল। তাই ভাবল ছেলেদের এবার পথ দেখানো দরকার। তাহলেই তো দপতর শহরে গদির আলো পাবে; নয়তো থাকতে হবে অন্ধকারে। ছেলেদের পাঠিয়ে দিল নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী।

    যেতে যেতে, যেতে যেতে, যেতে যেতে, এক জায়গায় ছেলেগুলো দেখতে পেল জটায় শ্যাম্পু, গলায় মুক্তা-পান্না-চুনীর হার, গায়ে সিল্কের আলখাল্লা, মেট্রোসেক্সুয়াল পারফিউম মেখে, একজন লোক মাইক বাজিয়ে শিষ্য যোগাড় করছে। উপস্হিত শিষ্যরা জানাল যে উনি সিদ্ধযোগী।

    চারজন প্রণামী দিয়ে বলল, মহারাজ, আপনি তো গুরু লোক, অনেককে পার পাইয়ে দিয়েছেন। আমারাও আমাদের বাপের মতন নেতা হয়ে নেম-ফেম-ব্লেম-শেম কামাতে চাই। আপনি একটু ট্রিকগুলো বাতলে দিন। গডম্যান সন্তুষ্ট হয়ে ওদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে টর্চ দিবে বলল, তোরা এক কাজ কর। চারজনে দফতর শহরের দিকে এগিয়ে যা। যেখানে যার টর্চের ব্যাটারি ফুরিয়ে যাবে, সেখানে সে খোঁজ করলেই অঢেল লুকোনো টাকাকড়ি-সোনাদানা পাবে। ব্ল্যাক থেকে হোয়াইট করার টাকার পাহাড়।

    গডম্যানের কথামতন চারজন মিলে যাত্রা আরম্ভ করল। তিন যায় রাত যায়, হাঁটে। দিন যায় রাত যায়, হাঁটে। দিন যায় রাত যায়, হাঁটে। দিন যায় রাত যায়, হাঁটে। এক জায়গায় একজনের ব্যাটারি ফুরিয়ে গেল। সেখানে মাটি খুঁড়ে নতুন-পুরানো অঢেল তামার কয়েন পাওয়া গেল। সে অন্য ভাইদের বলল, চল, তামার কয়েনের এই স্টক নিয়েই দেশে ফেরা যাক। নতুন-পুরানো তামা বেচে প্রচুর মাল কামানো যাবে।

    অন্য ভাইরা বলল, তুই এসব ফালতু তামার কয়েন নিয়েই থাক। আমরা দেখি আরও দামি জিনিস পাওয়া যায় কিনা। যে তামার কয়েন পেয়েছিল, সে সেগুলো ট্রাক বোঝাই করে বাড়ি ফিরে গেল।

    বাদবাকি তিন ভাই এগিয়ে চলল। বেশ কিছুটা হাঁটার পর আরেকজনের টর্চের ব্যাটারি ফুরিয়ে গেল। সে সেখানে পেল রূপোর গয়না আর কয়েনের অঢেল স্টক। সে বলল, ভালই হল রে, চল রূপোর কয়েন গয়না আর বাসনকোসন ট্রাকে লোড করে দেশে ফিরি। অন্য দুই ভাই বলল, দূর বোকা, তোর যাবার হয় যা, আমরা আরও বেশি মালকড়ির জন্য এগোচ্ছি। দ্বিতীয় ভাই একাই ফিরে গেল গোটাকতক ট্রাকে লোড করে।

    আরও কিছুটা যাবার পর তৃতীয় ভাইয়ের টর্চের ব্যাটারি ফুরিয়ে গেল। সে জায় গাটা খুঁড়াখুঁড়ি করে পেল সোনার অজস্র কয়েন আর অলংকার। চতুর্থ ভাইকে সে বলল, চল, আর কি, এ-জিনিস তো মালামাল করে দেবে আমাদের, নেতাগিরিতে ফেল মারলেও ক্ষতি নেই। চার নম্বর ভাই বলল, তুই ফিরে যা, এরকম এক-এক করে পাচ্ছি যখন তার মানে আরও দামি-দামি হীরে-জহরত ঘয়নাগাটি পাবো। তৃতীয় ভাই ফিরে গেল ট্রাক লোড করে।

    চার নম্বর ভাই একলা এগিয়ে চলল টর্চ হাতে। অনেক দূর চলে গেল। টর্চ নেভার নাম নেই। শেষে টর্চ যখন নিভু-নিভু, দেখতে পেল বিটকেল চেহারার একজন লোক তার সামনে পথ অবরোধ করে দাঁড়িয়ে। লোকটার মাথার ওপর একটা নীল রঙের চাকা, যাতে স্পোক রয়েছে, আর তা লোকটার মাথার ওপর বাঁই-বাঁই করে আপনা থেকে ঘুরছে। চতুর্থ ভাই অবাক। জিগ্যেস করল, মশাই আপনি কে? আপনার মাথার ওপর আপনা থেকে ঘুরছে ওটা কী? চার নম্বর ভাইয়ের প্রশ্ন শেষ হবার আগেই লোকটার মাথা থেকে চাকাটা ছুটে এসে ওর মাথার ওপর বনবন করে ঘুরতে লাগল।

    মাথার ওপর অসহ্য চাপ বরদাস্ত করতে না পেরে আর্তনাদ করে উঠল চার নম্বর ভাই, ওরেব্বাপ, এতো ভিষণ ভারি,মাথা ফেটে যাচ্ছে ব্যথায়, গা গুলোচ্ছে, সইতে পারছি না।

    লোকটা বলল, আমার কিছু করার নেই, তোমার আদর্শবাদী সর্বনাশ তুমি নিজেই ডেকে এনেছ। আমিও এককালে তোমার মতন টর্চ হাতে আদর্শের নেশায় এখান অব্দি এসেছিলুম। এবার বাঁচা গেল। আমার জায়গাটা তুমি পেলে। এখন মাথার ওপর ওই চক্র নিয়ে মজা করো। যদ্দিন না কোনো রাজনৈতিক আদর্শবাদী এসে তোমার কাছ থেকে চক্রটা নিজের মাথায় তুলে নিচ্ছে, তদ্দিন ওখানে দাঁড়িয়ে দুঃখকষ্ট জ্বালাযন্ত্রণা আত্মগ্লানি ভোগ করো। আমি চললুম, টা-টা, বাই-বাই।

    গল্প শেষ হতে চারিদিক থেকে ঝিঁঝিপোকাদের সুরেলা গান ভেসে আসতে লাগল, ‘ঘুমঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা এই মায়ায়ায়াবি রাত….’। ঘুমিয়ে পড়ল কুশাশ্ব। পরের দিন রোদ যখন রোদাতে-রোদাতে ওর গায়ে এসে ছিস করে ঠেকল, তখন ওর ঘুম ভাঙল। উঠে বসল। এদিক-ওদিক চেয়ে দেখল। লাফিং বুঢঢা আবার কোথায় গেল। ও-ও কি হাগতে বেরোল গোপালের মতন? ধাতু বা চিনামাটির স্হায়ীত্বের মল বলে কথা, এঁটে এঁটেল হয়ে গিয়ে থাকবে। কিন্তু রাস্তার দুপাশ তো ফাঁকা। খেতগুলোয় কোথাও আড়াল করার মতন ঝোপজঙ্গল নেই। হঠাৎ নজর গেল পায়ের কাছে পড়ে থাকা চারটে পেনসিল টর্চ ব্যাটারির দিকে। তুলে দেখে চারটে বিভিন্ন কোম্পানির ব্যাটারি, এক্সপায়ার করে গেছে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আগেই, তলার দিকটা সবকটার গলে গেছে।

    জুতো-চটি কিছু নেই পায়ে। শীতকাল হলে কী হবে, চলার পথ তেতে গেছে এর মধ্যে। কয়েক-পা হাঁটল কুশাশ্ব। বেশ গরম। হাঁটা মুশকিল। কী করা যায়! খিদেও পাচ্ছে। সড়কের পাশ দিয়ে ধুলোর ওপর হেঁটে এগোল যতটা পারা যায়। বহুদূর থেকে কিছু আসছে দেখে দাঁড়িয়ে থাকল। কাছাকাছি হলে টের পেল, দশ-বারোটা উট নিয়ে এদিকেই আসছে একটা লোক, পরনে নোংরাটে মেটরঙা ধুতি আত কোঁচদেয়া হাফ-পাঞ্জাবি, মাথায় হলদে রঙের পাকানো কাপড়ের পাগড়ি।

    উটগুলোকে আর লোকটাকে হাত দেখিয়ে থামাল কুশাশ্ব। জিগ্যেস করল, আচ্ছা আপনি কি একজন টাকমাথা গালফোলা ভুঁড়িদাস বেঁটেমতন ফর্সা লোককে দেখেছেন?

    উটমালিক এমনভাবে মাথা নাড়ল যে বোঝা গেল না হ্যাঁ বলছে, না, না বলছে।

    বছর কুড়ির একটা অতিবৃদ্ধা উট যার পিঠে দুটো কুঁজ, বলল, বাবু, আমাদের এখানে সবাই পাগড়ি পরে, কারোর টাক দেখার উপায় নেই, পাগড়ি হল টাকের অন্তর্বাস।

    উদ্বিগ্ন কুশাশ্ব জিগ্যেস করল, দফতর শহরটা কোন দিকে বলতে পারেন? ওই দিকে যাবো, না, এদিকটায়?

    উটমালিক এমনভাবে মাথা নাড়ল যার মানে জানে না হতে পারে, আবার জানেও হতে পারে।

    দুকুঁজো উট বলল, বাবু আমি দফতর শহরটা জানি না, কিন্তু দফতর শহরের দেশটা জানি। একবার আমায় চুরি করে ওই দেশে তাড়িপার করাতে নিয়ে গিয়েছিল।

    —-তাড়িপার?

    —-হ্যাঁ বাবু, আমাদের তাড়িয়ে-তাড়িয়ে ওই পারে পাঠাচ্ছিল, ওই পারের লোকেরা পরবের দিন খাবে বলে। কিন্তু গোপনে খবর পেয়ে পুলিসে আমাদের আর সেই সঙ্গে আরও সাতজন উটকুমারীকে বর্ডারের ব্রথেল থেকে উদ্ধার করেছিল।

    —-উটের মাংস খাওয়া যায় নাকি? ও তো ছিবড়ে হবে।

    —-না বাবু, উটের মাংস সুস্বাদু আর নরম। উটের দুধও কনডেন্সড মিল্কের মতন।

    —-উটের দুধ খাওয়া যায়?

    —-হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি ওই সোমথ্থ উটনির থনে মুখ লাগিয়ে দেখুন না।

    মুখ টিপে হেসে সোমথ্থ উটনি বলল, ধ্যাৎ, আমার লজ্জা করে। বাবু আপনি চোখ বুজে খাবেন, আমার মুখের দিকে তাকাবেন না। লোকখিটি।

    ছুটে গিয়ে ঠোঁটব্যাকুল বাঁট মুখে পুরে চুষতে-চুষতে পাথরজীবনের কথা মনে পড়ে যাওয়ায়, যেন ঠোঁট চুষছে, পেট ভরে দুধ খেল কুশাশ্ব। কখন কোথায় খাবার-দাবার পাওয়া যাবে তার ঠিক নেই।

    ঢেঁকুর তুলে উটমালিককে কুশাশ্ব বলল, আমার পায়ে জুতো নেই, আমি কি কোনো উটের পিঠে বসতে পারি? পথে যে গঞ্জ হাট শহর গ্রাম স্টেশান খেয়াঘাট বা বাস ডিপো পড়বে সেখানে নামিয়ে দেবেন।

    উটমালিক এমনভাবে মাথা নাড়ল যার মানে হ্যাঁ-ও হয়, আবার না-ও হয়।

    দু-কুঁজো উট মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে বলল, বাবু আসুন, আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে জুতোর দোকান আছে। আপনি সেখান থেকে নানা জায়গায় যাবার গাড়ি পাবেন।

    দুটো কুঁজের মাঝখানে বসে, সামনের কুঁজ আঁকড়ে ধরে, ধন্যবাদ জানাতে, দু-কুঁজো জিগ্যেস করল, বানুর কী করা হয়?

    কুশাশ্ব: প্রেম করি।

    দু-কুঁজো: প্রেম…

    কুশাশ্ব: হ্যাঁ, অষ্টপ্রহর প্রেম।

    দু-কুঁজো: এখন কী প্রেম করতেই যাচ্ছেন?

    কুশাশ্ব: না, অমন প্ল্যান করে প্রেম হয় না, হঠাৎ-হঠাৎ হয়ে যায়..

    দু-কুঁজো: আমরা তো দিনকতকের জন্যে হিটে আসি, তখনই প্রেম করি। প্রেমের ঋতু হয়।

    কুশাশ্ব: আমার প্রতিদিনের প্রতিমুহূর্তে প্রেমের ঋতু।

    উটের কাফিলা পৌঁছোল এক গঞ্জ-শহরে। জুতোর দোকান দেখতে পেয়ে নেমে পড়ল কুশাশ্ব। একজোড়া নাগরা জুতো কিনল, শুঁড়তোলা। তারপর, নানা লোককে জিগ্যেস করেও যখন দফতর শহরের হদিশ পেল না, তখন দাঁড়াল গিয়ে ডিপোর ছাউনিতে। লাফিং বুঢঢার ফরমুলা অনুযায়ী যে-দিকটা পা পিছলে আলুর দম হল তার উল্টো দিকে যাবার গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।

    ট্রাক আসে, যায়। বাস আসে, যায়। অটো আসে যায়।ট্যাক্সি আসে, যায়।টেম্পো আসে, যায়। রিকশা আসে, যায়। টাঙ্গা আসে, যায়। সবই পা পিছলে আলুর দমের দিকে। একবার কুশাশ্বর মনে হল, চলে যাই শালা আলুর দমের দিকেই। পরক্ষণেই মনে হল, বিজ্ঞানের নির্দেশিকা অমান্য করা অমানুষের কাজ।

    একজন রোগা ডিগডিগে লোক এসে দাঁড়াল কুশাশ্বর পাশে। সাড়ে-পাঁচ ফিট লম্বা হবে।শাদা ফুল শার্ট কালো প্যান্ট। এত রোগা যে মনে হচ্ছিল লোকটার চেহারার শুধু দুটো ডাইমেনশান। সামনে আর পেছন। ঠিক যেন তালপাতার সেপাই। পুতুলনাচের পুতুলের মত অঙ্গভঙ্গী। মাইকেল জয়াকসন বা প্রভু দেবা নাচের সময় যে-ভাবে হাত-পা নাড়ায়। কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল। এর কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যাবে ভেবে আলাপ শুরু করতে চাইল কুশাশ্ব।

    —-আপনি কোথায় যাবেন?

    —-আপনার তাতে দরকার?

    —-না, মানে, আমি দফতর শহরে যাবো তো, তাই।

    —-তা যান না, কে বারণ করেছে?

    —-আসলে কেউ বলতে পারছে না।

    —-আমি তাতে কী করব?

    —-আপনি যদি একটু বলেন।

    —-জানলে তো বলব।

    —-এরকম রুষ্ট হচ্ছেন কেন?

    —-আপনি বিরক্ত করছেন বলে।

    —-আমি কিন্তু একজন প্রেমিক। আমার নাম কুশাশ্ব দেবনাথ। গুপ্তহাসি হেসে ও বলল।

    —-আমার নাম গিলগামেশ। আমি দুই-তৃতীয়াংশ দৈব আর এক তৃতীয়াংশ নশ্বর। ইচ্ছেমতন ছোট-বড় হই।

    কথাটা শুনে কুশাশ্ব স্তম্ভিত। লোকটা তো ওর চেয়েও দেড় হাজার বছর আগের। কিন্তু এই কি গিলগামেশের চেহারা, যে কিনা খালি হাতে সিংহ মেরে বগলদাবা করে নিয়ে যেত। সারাজীবন বেঁচে থাকার জন্যে কত কত কত অ্যাডভেঞ্চার করেছে গিলগামেশ; ম্যাজিক-ছোঁয়ানো লতাপাতা খুঁজে বের করেছিল, অমর হয়েছিল, অনেক টাকাকড়ি করেছিল। অথচ গিলগামেশ আসলে কাগুজে ল্যাংপ্যাঙে টিংটিঙে, দু-অবিনশ্বর ফুরিয়ে এর অবিনশ্বরে ঠেকেছে।

    —-আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভাল লাগল। আপনার অ্যাডভেঞ্চারের কথা অনেক শুনেছি। গিলগামেশকে প্রীত করার জন্যে ঠৌঁট টিপে হেসে বলল কুশাশ্ব।

    মনে হল তেল লাগানোটা কাজে দিয়েছে। দাঁতখিঁচুনির বদলে দেঁতো হাসি হেসে গিলগামেশ বলল, দফতর শহরে আমারও কাজ আছে, সেখানেই যাব, কিন্তু কিসে চেপে কী ভাবে যাব জানি না।

    আপনাকে কি পচাঞ্জন সরদার যেতে বলেছে? নৈকত্য বাড়াবার চেষ্টা করল কুশাশ্ব।

    হ্যাঁ, আপনি কী করে জানলেন? সিংহ-মারা তেজ বাদ দিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল গিলগামেশ।

    আমাকেও হুকুম করেছে। আপনার সঙ্গেও কি তুই-তোকারি করেছে?

    হ্যাঁ, ওনারা দলতন্ত্রের অধিকার প্রয়োগ করছেন। অপহসিত হাসি হেসে বলল গিলগামেশ।

    অবাক হল কুশাশ্ব। গিলগামেশ বলে কথা। যে কিনা খালি হাতে সিংহ মারে। তার সঙ্গেও তুইতোকারি। কত ক্ষমতা অছিসিংহাসনের, বাপরে বাপ, ওই ক্ষমতার জোরে কালো-কেল্টে ঘুরঘুরে পোকাও রোয়াব ঝাড়ছে।

    কুশাশ্ব নিজের ফরমুলা শুনিয়ে কোনদিকে যেতে হবে সে-বিষয়ে মতামত জানাল। গিলগামেশ বলল, ও-ও ওই দিকটাই নিজের বৈজ্ঞানিক ফরমুলা প্রয়োগ করে বাছাই করেছে, যেটা ও সিংহ শিকারের আগে পরীক্ষা করে নিত। ফরমুলাটা হল, ‘গোদা নাটাটা পা ফাটাটা অড়ল বনের ধারে কুচুৎ করে কানটি কেটে নুনের ভাঁড়ে পোরে।’ আলুর দম আর ভাঁড়ে পোরা একটিই দিক নির্দেশ করছিল। সেদিকে যাবার একটা জিপ-ট্যাক্সি এসে থামল, প্যাসেঞ্জারে এমন গাদাগাদি যে কার মুখ কোথায় আর ঠ্যাঙ কোথায় টের পাবার উপায় নেই।

    ওরা দুজনে পেছন থেকে ডাইভ দেবার ঢঙে গোঁতা মেরে জোরজবরদস্তি ঢুকল জিপ-ট্যাক্সির ভেতরের ঠাসাঠাসি ভিড়ে। হাফশয়নম-হাফপতিতম অবস্হা। ধাতস্হ হতে টের পেল, এটা মহিলাদের স্পেশাল ট্যাক্সি। ততক্ষণে কিল-চড়-থাপ্পড়-ঘুষি-লাথি আরম্ভ হয়ে গেছে। গিলগামেশ কানেকানে কুশাশ্বকে বলল, দেবনাথবাবু, যেতে তো হবেই, দফতরের হুকুমের টালাবাহানা করার যে কি বিপদ তা তো জানেন। তাই বলে মহিলাদের হাতে প্যাঁদানি খেলে ইতিহাস আমায় আস্ত রাখবেনা; আমার খালি হাতে সিংহ মারার খ্যাতি সব জলে যাবে। এমনিতেই ইতিহাসকাররা আমাকে কুরে-কুরে গবেষণা করে এরকম রোগাপাৎলা করে দিয়েছেন।

    জুতো খুলে, গিলগামেশের কব্জি শক্ত করে ধরে কুশাশ্ব পরামর্শ দিল, আমি এক দুই তিন গুনছি। তিনের মাথায় একসঙ্গে ছোট্ট হয়ে যাবো দুজনে। ওকে? রেডি, এক…দুই…তিন।

    নিমেষে ছোট্ট হয়েই, খোলা স্প্রিঙের মতন বিঘত খানেক লাফিয়ে এক যুবতীর দুই স্তনের মাঝখানে দুজনে হাত ধরাধরি করে পিছলে পড়ল। কাতুকুতু হেসে যুবতীটি পাশের মেয়েটিকে বলল, অ্যাই, ভালো হবে না বলছি। পাশের মেয়েটা বলল, ওমা, আমি আবার কী করেছি!

    স্প্যাঘেটি-স্ট্র্যাপ টপের ভেতরে পড়ে দুজনে পিছলে নেমে আটকে গিয়েছিল পুশ-আপ ব্রাতে। টপের কাপড় ধরে ঝুলতে-ঝুলতে ওরা উঠে বাঁধুনি আঁকড়ে শুনতে লাগল যুবতীদের কথাবার্তা। দেখতেও পাচ্ছিল যুবতীদের, উঁকি দেয়ে। বোধহয় স্নাতকোত্তর ছাত্রী। কিংবা মডেল-মেয়ের দল চলেছে কোনো হোটেলে র‌্যাম্পের ওপর বিল্লিহাঁটন দিতে।

    —-জলজ্যান্ত দু-দুটো মরদ, বেমালুম উবে গেল যে রে। বলল, হল্টারনেক।

    —-এরা দুজনে মিলে কিলোচ্ছিল-লাথাচ্ছিল। অভিযুগ তুলল সি-থ্রু আকাশি ব্লাউজ।

    —-কিলোব না তো কি! লেডিজ স্পেশালে ঢুকবে আর পার পেয়ে যাবে! আবদার নাকি? বলল বাদামি ডাংগারি।

    —-কারেক্ট। পিটিয়েছি, ঠিক করেছি। বিকটহাসি হেসে বলল জরিরকাজ শিফনশাড়ি।

    —-দ্যাখ, তোরা দুজনে লেসবিয়ান-সতীত্ব ফলাসনি। বলল স্প্যাঘেটি-স্ট্র্যাপ। বুক দোল খাওয়ায় কুশাশ্বর হাত আরেকটু হলেই ফস্কে যাচ্ছিল।

    —-ভালো বলেছিস, লেসবিয়ান-সতীত্ব! বাঁকা হাসি হেসে বলল প্লেনটপ সোয়ারস্কি জিনস।

    —-সঁতীত্বেঁর শ্বেঁতপদ্ম। সামীচন্দ্র লীলাবতী। বলল ব্যাকলেস-চোলি।

    —-সত্যি! দু-দুজন জোয়ান, দুরকম টাইপের জোয়ান, হাতছাড়া হয়ে গেল। একটু ফস্টামি-নষ্টামি তো করা যেত রাস্তার বোরডাম কাটাতে। একগাল হেসে বলল ডিপ-নেক অরগ্যান্ডি।

    খুব জোর বেঁচেছি, বলল গিলগামেশ। তারপর যোগ করল, আমি যতরকম অ্যাডভেঞ্চার সম্ভব করেছি কিন্তু কখনও নারীগর্ভে ঢুকে অ্যাডভেঞ্চার করিনি। দেবনাথবাবু, এক কাজ করুন। দুজনে এক-একজন লেসবিয়ান সতীর গর্ভে ঢুকি। কী বলেন?

    মনের মতন প্রস্তাব পেল কুশাশ্ব। বলল, আপনি ওই জরিরকাজ শিফনশাড়িতে আশ্রয় নিন। আমি যাচ্ছি বাদামি ডাংগারির ভেতরে। দুজনের একজন অন্তত তো যাবে দফতর শহরের দিকে।

    চিলতে কাগজের মতন নিজেকে গুটিয়ে গিলগামেশ চলে গেল নিজের বাছাই করা সলোমান মাইন্সে অ্যাডভেঞ্চার করতে। পায়ের ধুলো ঝেড়ে, গুটিপোকার কায়দায় তিড়িকিনাচন দিয়ে কয়েক লাফে কুশাশ্ব পোঁছোল তীর্থক্ষেত্রের দরজায়।

    খিলখিল হেসে জরিরকাজ শিফনশাড়ি বাদামি ডাংগারিকে: অ্যাই স্যাবি, করছিস কি?

    দেয়ালা হাসি হেসে বাদামি ডাংগারি জরিরকাজ শিফনশাড়িকে: আমি আবার কী করলুম? আমি তো ভাবছিলুম তুই বুঝি আমাকে কিছু করছিস।

    রগড়হাসি হেসে ব্যাকলেস চোলি: সাবিত্রী শীল আর কুন্তি সাহা, তোরা দুজনে কি সকাল থেকেই স্ম্যাক নিস? মডেলিঙের লাইনটাকে বদনাম করে দিলি তোরা।

    প্যারাসাইট হিসাবে অনুপ্রবেশ শুরু করে দিয়েছিল কুশাশ্ব, তাই যুবতীদের পরবর্তী শ্লেষবচন কথাবার্তা, ঝগড়ারঙ্গ, খুচরো ছেকোক্তি, কেলিমুখ খেয়োখেয়ি আর কানে গেল না। তবে স্যাবি নামটা ওর ভালো লাগল। মিষ্টি।

    ভেতরটা, ঢুকেই, স্নিগ্ধ ভিন্নাঞ্জনপ্রভায় আলোকিত দুটো রাস্তা দুদিকে চলে গেছে। আইকম বাইকম ফরমুলা প্রয়োগ করে নির্ণয় নিল কুশাশ্ব। লেসবিয়ান সতীর টানেলও এরকম শ্লেষ্মা-পেছল হবে আশা করেনি। গুটি মেরে-মেরে এগোতে হচ্ছিল। স্যাবি যে বহুক্ষণ পেচ্ছাপ চেপে রেখেছে তা স্ফিংকটারের হালত থেকে টের পাওয়া গেল।

    তেষ্টা পেয়েছিল বলে ফলিকিউলের শরবত খেল কুশাশ্ব। ডিম দেখতে পেয়ে সেটাও কপ করে গিলে নিল। ডিমটা টাতকা। ভালই হ।। মাসের শেষে মেয়াদি রক্তপড়া শুরু হচ্ছে না দেখে দৌড়বে ডাক্তারের বাড়ি আর রিপোর্ট পেয়ে আঁৎকে উঠবে।

    ঝালরদেয়া পর্দা সরিয়ে জরায়ুঘরে ঢুকল কুশাশ্বল বেশ ওয়েল ফার্নিশড। বোঝা যাচ্ছে গৃহপ্রবেশ হয়নি। ক্লান্ত কুশাশ্ব ওভালরুমের পালঙ্কে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙতে বুঝতে পারল স্যাবি কোথাও এঁকেবেঁকে হাঁটছে, বোধহয় মডেলিঙের শোতে বিল্লিহাঁটন দিচ্ছে। নিজেকে ফুলিয়ে একটু বড় করল কুশাশ্ব। কান পেতে শোনার চেষ্টা করল বাইরের চেঁচামেচি। ক্ষীণ ভেসে এলো, অনেকে একসঙ্গে জানতে চাইছে, স্যাবি আর ইউ প্রেগন্যান্ট? আর ইউ প্রেগন্যান্ট?

    স্যাবি ছুটে কোথাও গিয়ে বসল, অনুমান করতে পারল কুশাশ্ব। কেউ একজন বলল, গো টু টয়লেট, এই নাও, আমার প্রেগন্যান্সি কিট নিয়ে যাও। স্যাবি উঠল। হাঁটছে। স্ফিংকটার ঢিলে করছে। স্যাবির হাসি আর শরীরের হাসি-কাঁপুনি বোঝা যাচ্ছে। কুশাশ্ব আরেকটু ফোলাল নিজেকে। কেউ ওকে বলল, স্যাবি তুই কিছুদিনের জন্যে বাবা-মায়ের কাছ থেকে ঘুরে আয়।

    স্যাবি উঠল। বোধহয় কোনো মোটরগাড়িতে বসল। নামল। বিছানায় লাফিয়ে শুল। কাঁদছে। শরীর কাঁপছে। কুশাশ্ব নগণ্য করে ফেলল নিজেকে। কাঁপন থামল। কুশাশ্ব ওভালরুমে অ্যারোবিক্স করল। এত ছোট পরিসর যে ব্যায়াম করে শরীরটা ঠিক রাখতে হবে।

    অনেকক্ষণ কেটে গেছে। বা হয়ত কয়েকদিন কেটে গেছে। রাত না দিন বোঝার উপায় নেই। পানভোজন আর ঘুমে টাইমপাস হচ্ছে কুশাশ্বর। স্যাবি বোধহয় অন্য কোথাও চলে এসেছে। ওভালরুমের দেয়ালে কান পাতল কুশাশ্ব। হ্যাঁ। সম্ভবত স্যাবির মা। অভয় দেয়া কন্ঠস্বর। শুনে, নিজেকে একটু বড় করল কুশাশ্ব। আতঙ্কিত চিৎকার চেঁচামেচি শুনে চুপসে নগন্য হয়ে গেল।

    ওভালরুম থেকে বেরিয়ে, আস্তে-আস্তে পিছলে, বাইরে মুখ বের করে সাবিত্রী শীলের কন্ঠস্বর স্পষ্টভাবে শুনতে পেল কুশাশ্ব, ডক্টর শাশ্বতী, তাহলে কোনো প্রবলেম ক্লিনিকালি পাননি তো? আমি এবারে কাজে ফিরে যেতে পারি? আমার কালকের ফ্লাইট বুক করা আছে।

    ঠিকই। ডাক্তার দেখাতে এসেছে স্যাবি। কুশাশ্ব টুক করে লাফিয়ে, স্যাবির দুই পায়ের মাঝ দিয়ে হেঁটে পায়ের পাতার কাছে মুখ বের করল। মহিলা ডাক্তার কিছু লিখতে মগন। ঘরে আর কেউ নেই। ও ঘুটিপোকা লাফ দিয়ে ডাক্তারের টেবিলে রাখা কাঠের গ্রিক মূর্তিটার পেছনের ফুটো দিয়ে ঢুকে চুপচাপ বসে রইল। শুনতে পেল হাসতে-হাসতে ফিরছে স্যাবি।

    ঘর অন্ধকার হয়ে গেলে ফুটো দিয়ে বাইরে বেরিয়ে টেবিলে নেমে একটু ছোটাছুটি করে যেই টেবিল থেকে নিচে লাফাবার জন্যে ঝুঁকেছে, কেউ গমগমে কন্ঠে বলল, এখন যাবেন না; বাইরে ডাক্তারের স্বামী আর কমপাউন্ডার বসে টাকা গুনছে।

    এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না কুশাশ্ব। কন্ঠস্বর আবার বলল, ওরা চলে গেলে বলব। ওপরদিকে তাকিয়ে সাউন্ডবক্স বা ক্লোজ সার্কিট টিভি দেখা গেলনা। ধন্দে পড়ে টেবিলে পা ঝুলিয়ে বসল অগত্যা।

    হঠাৎ কুশাশ্বর মনে হল উদপালিশ-করা কাঠের গ্রিক মূর্তিটা নয়তো, কেননা এর আগে পেতলের গোপাল আর চিনামাটির লাফিং বুঢঢা প্রথম পরিচয়ের সময়ে অমন ছোট মাপের ছিল। টেবিলের ওপর দিয়ে হেঁটে এসে দাঁড়াল কাঠের মূর্তিটার সামনে। সুপুরুষ সুঠাম স্বাস্হ্যবান যুবক, একেবার গ্রিক চোখ-মুখ-নাক। ও যখন পাথরের ছিল তখন গ্রিস থেকে প্রতিবছর লোকজন এসে ওর ফোটো তুলে নিয়ে যেত। ওদের দেশে অনেক মূর্তিটুর্তি থাকলেও আমার দেয়া পোজের মতন মূর্তি ওদের ভাস্কররা কল্পনাতেও আনতে পারেনি। চুমু খাবার কথাই জানত না ওদের দেশের লোকেরা। এদেশ থেকে শিখে তারপর নিজেদের সমাজে শুরু করেছে।

    মেহগনি কাঠের মূর্তির ঠোঁট নড়ে উঠল। গমগমে কন্ঠে বলল, আপনি আমাকে চিনবেন না, আমার নাম ওডিসাস, এককালে ইথাকায় অনেক জমিজমা ছিল; পরে, আমি যখন প্রবাসে, তখন সেখানকার দফতরের খুনেরা সেসব জমিজমা খাস ঘোষণা করে হড়পে নিয়েছিল। তবে অনেকে আমাকে ইউলিসিস বলে জানে।

    ইউলিসিস? আপনি তো মশাই বিখ্যাত লোক, এক ডাকে সবাই চেনে, বিশেষ করে যারা কাব্যি-টাব্যি করে। আপনি তো আরবদের রাজা গিলগামেশের চেয়ে বেশি অ্যাডভেঞ্চার করেছেন। উত্তেজিত হয়ে বলল কুশাশ্ব। ঈর্ষণীয় ছিল আপনার রাজনৈতিক মাগিবাজি; এদেশের মন্ত্রী-আমলা-ফিল্ম প্রযোজকরাও আপনার মাগিবাজির কাছে নস্যি।

    গিলগামেশ? ওনার সঙ্গে পরিচয় হয়নি। উনি বোধহয় ট্রয়-যুদ্ধে আসেননি। আমার তো অনেক স্পাই মোহোল্লা কমিটি, লোকাল কমিটি, জেলা কমিটি, জোনাল কমিটি, রাজ্য কমিটি ইত্যাদি নানা ঘাঁতঘোঁতে ছিল; কিন্তু ওনার খবর কখনও কারোর মুখে পাইনি। কাষ্ঠহাসি হেসে বলল কাঠের ইউলিসিস।

    আপনার বাবা সিসিফাসের লাইফলং পাথর ঠেলার ব্যাপারটা শুনে খুব খারাপ লেগেছিল। চৌকো পেপারও্য়েটের ওপর আরাম করে বসে বলল কুশাশ্ব।

    আরে কারা সব ওসব গাঁজাখুরি গপপো লিখেছে। এসব বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। আমার বাবা ছিলেন লেরতস আর মা অ্যান্তিক্লিয়া। ক্ষুব্ধ ইউলিসিস বলল।

    কুশাশ্ব আর বলল না যে অ্যান্তিক্লিয়াকে ধর্ষণ করেছিল সিসিফাস, তাই সিসিফাসই তো আসল বাবা, আর আপনি তো হাইব্রিড। হাইব্রিড না হলে কেউ কি আর অমন জগতখ্যাত নায়ক হয়! তার বদলে কুশাশ্ব বলল, ট্রয় থেকে অত যুবতী লুটে নিয়ে গিয়েছিলেন, তো আপনার স্ত্রী পেনিলোপি রাগারাগি করেননি?

    সব তো আমি রাখিনি; পার্টির নিয়মতন্ত্র অনুযায়ী বিভিন্ন কমিটির সদস্যদের মধ্যে বিলি-ব্যবস্হা করে দিয়েছিলাম। সবাই তো আর আমার মতন যুদ্ধ করতে চায় না। অনেকে গুমখুন, সুপারি কিলিং, অপহরণ, বাসলুঠ, চাঁদাখেঁচাই, তোলাবাজি, মাস্তানি, গুন্ডামি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতন দিশি আর ছেঁদো কাজকারবার করে, বলল কাঠের মূর্তি।

    কুশাশ্ব প্রসঙ্গ বদলে বলল, আচ্ছা পদ্মফুলের ফলফুল খেয়ে কি সত্যিই আপনার ফেলো-ট্র্যাভেলার সঙ্গীদের স্মৃতি লোপাট হয়ে গিয়েছিল? আর তারা নাকি কাজকর্ম করার ইচ্ছে হারিয়ে কেবল পা দুলিয়ে সময় কাটাচ্ছিল? যখন পাথরের মানুষ ছিলুম এদেশের লোকেদের আলোচনা থেকে টের পেতুম যে এখানে পদ্মফুলের ফলফুল না খেয়েই নিষ্কর্মা হয়ে থাকতে চায়, তা তাদের আপনি যতই বোনাস দিন না কেন, খেলে না জানি কী হবে!

    হাঃ হাঃ, মুচকি হাসি হাসল কাঠের মূর্তি, তারপর বলল, তাইতো ওদের ভাগিয়ে নিয়ে গেলুম সাইক্লোপদের দেশে, যেখানে ওদের জোড়ায়-জোড়ায় খেয়ে ফেলছিল পলিফেমাস, যাকে আমি বলেছিলুম যে আমার নাম হল ‘কেউ না’। আপনি আপনার দেশের যাদের কথা বলছেন, তারা মনে হচ্ছে দল বেঁধে ‘কেউ না’ হয়ে গেছে। বাশির ভাগই তো ভাগানো ভাগেড়া নয়তো তাড়িপার।

    কী আর করা যাবে! আপনার সঙ্গীরা যেমন এওলাসের দেয়া ঝড়ভর্তি চামড়ার থলের মুখের বাঁধন খুলে লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল, এখানেও তাই। কত রকমের থলের মুখ খুলে কত রকমের যে ঝড়তি-পড়তি মাল হাওয়ায় ছেড়েছে তার ঠিক-ঠিকানা নেই। নৌকো একেবারে টালমাটাল, এই ডোবে কি সেই ডোবে। বলল কুশাশ্ব।

    আমরা ঝড়ফড় তোয়াক্কা না করে উত্তাল সমুদ্রে ভেসে পড়েছিলাম। স্মিত হেসে বলল ইউলিসিস।

    তা আপনার সঙ্গীরা এইয়াইয়া পৌঁছে সার্সির ছোঁয়ায় যেমন পশুতে পাল্টে গিয়েছিল, এখানেও তাই। সাংস্কৃতিক খোঁয়াড়-আস্তাবল ভরে গেছে মানুষপ্রতিম আজ্ঞাকারী জন্তু-জানোয়ারে।

    —-আমায় ওসব গোলমাল অনেককাল পোয়াতে হয়েছে।

    —-জানি। তারপর তো আপনার একেবারে ভিখিরির মতন ফাটিচার হাল। খিড়কি দরজা দিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। যাকগে। এবার তাহলে আমি চলি। ওনারা টাকার বান্ডিল বানিয়ে নিয়ে এতক্ষণে চলে গেছেন নিশ্চই।

    —-আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভাল লাগল। দেখনহাসি হেসে বলল ইউলিসিস।

    —-আচ্ছা, আপনি বলতে পারেন কি দফতর শহরটা কোথায়?

    —-আরে মশাই এটাই তো দফতর শহর। পথে বেরোলে যে কেউ বলে দেবে দফতর-পাট কোথায়।

    —-ও কে, গুড নাইট, শুভরাত্রি, শব্বা খ্যায়ের।

    —-গুড নাইট।

    জানলার গ্রিল গলে রাস্তায় লাফ মারল কুশাশ্ব। ঘাড় ঘুরিয়ে চারিদিক দেখল। বেশ ফাঁকা। নিজেকে প্রমাণ মাপের মানুষে পাল্টে ফেলে ঝলমলে আলোর দিকে হনহন করে হাঁটা আরম্ভ করল। ব্যাস বিপত্তি।

    খনখনে গলায় কেউ বলল, এই গান্ডু, দেখে চলতে পারিস না? আরেকজন চিঁ-চিঁ কন্ঠে বলে উঠল, দে বাঞ্চোৎটাকে ধোলাই। তৃতীয়জন ঘড়ঘড়ে স্বরে, দুই-চাইরডা লাথি দিয়া ছাইড়া দে। কুশাশ্ব নিচু হয়ে দেখল উইপোকা; ওই উইপোকাগুলোই ওকে হুমকি দেচ্ছে। চারিদিকে নজর ঘুরিয়ে দেখল, সারাটা পথে হাইব্রিড ইউপোকার জাল বেছানো; এমন যে না মাড়িয়ে এগোনো যাবে না। কুশাশ্ব, ওহ সরি স্যার, ভেরি সরি বলতে, চতুর্থ উইপোকা ফ্যাসফেসে গলায় বলল, ঠিক আছে, যাঃ, ফের এ-পাড়ায় ঢুকবি তো তোর বাপের আসবাব আস্ত রাখব না। নিজেকে নগণ্যতর করে, যাতে মাড়াতে না হয়, পোঁ পাঁ পিট্টান দিল কুশাশ্ব।

    তেমাথায়, যেখানে উইপোকাদের পথদখল শেষ হয়েছে, উঁচু বেদির ওপর একটা ফুটদশেক ভাস্কর্য, কালো রোমশ ব্রোঞ্জ গোরিলার, দু-হাতে বুক চাপড়াচ্ছে। বেদির নামপট্টে হয়ত পথ-নির্দেশিকা থাকবে, ভেবে, পড়ে দেখতে চাইল ও, কুশাশ্ব। লেখা রয়েছে ‘চেনাসুলভ চেনা সংস্কৃতির প্রাণপুরুষ অবিরাম ঢং’। গোরিলাদের উইপোকা খেতে ভাললাগে বটে, কিন্তু তাদের দোরগোড়ায় এমন বিশাল মূর্তি কেন? থ পেল না কুশাশ্ব। নগন্য আর প্রমাণ মাপের মাঝামাঝি করে তুলল নিজেকে।

    দফতরপাট বা অছিসিংহাসনের পথনির্দেশ খুঁজতে-খুঁজতে এগোচ্ছিল কুশাশ্ব। অলিগলি সুনসান। দেখল একটা ফুলস্পিড ছুটন্ত ভাল্লুকের পিঠে বসে চারটে বেবুন এদিকেই আসছে। ওদের জিগ্যেস করে দেখা যাক। হাত দেখানো সত্বেও থামল না বাদামি ভাল্লুকটা। উল্টে একটা বেবুন ওর মাথায় জোরে চাঁটি কষালো, আর সবকটা খিঁখিঁ-খিঁখিঁ হাসতে-হাসতে উধাও হল।

    বাঁ-দিকের রাস্তায় কিছুটা হাঁটার পর গুবরেদের নাইটক্লাব নজরে এলো কুশাশ্বর। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল, জোড়ায়-জোড়ায় নাচছে বা গোবরমদ খাচ্ছে বাঘাগুবরে, লম্বাশিং-গুবরে, মেহিকানগুবরে, সবুজমাটি-গুবরে, গণ্ডারগুবরে, পরাগগুবরে, হার্লেকুইন-গুবরে, ক্লিক-গুবরে, খামার-গুবরে নারী-পুরুষ। দু-দাঁড়া গুবরে দারোয়ানটাকে দফতরপাটে যাবার রাস্তা জিগ্যেস করল কুশাশ্ব। জবাব দিল না গম্ভীর গুঁফো দারোয়ান।

    এক-জোড়া পরাগগুবরে ছোকরাছুকরি নেচেকুদে বেরিয়ে যাচ্ছিল। ছোকরাটা বলল, প্রথমে বাঁদিকে যান, তারপর ডানদিকে যান, তারপর সোজা, তারপর ডানদিক, আবার ডানদিক, বুঝলেন তো? হাসতে-হাসতে জড়াজড়ি করে গোবরমদে মাতাল দুজনে চলে গেল।

    কুশাশ্ব বিমূঢ়। ওরা ঠিক-ঠিক বলল কিনা খটকা লাগল। হয়ত ওকে বিপথগামী করতে চেয়ে অমন পথনির্দেশ দিল ছোকরাটা। আবার না-ও করে থাকতে পারে। ওদের কথামতন না গিয়ে কুশাশ্ব এগোলো পা পিছলে আলুর দম বৈজ্ঞানিক ফরমুলা প্রয়োগ করতে-করতে। ‘আদর্শ ল্যাজকাটা হোটেল’ বোর্ড দেখে ভেতরে ঢুকে একটা ঘর চাইতে রিসেপশানে বসে হাই তুলতে-থাকা যুবতী বেবুন ওকে জেরা শুরু করল।

    —-আপনার ল্যাজ যে কাটা তার প্রমাণ আছে?

    —-হ্যাঁ। লজ্জার ল্যাজ খেয়ে পেছন ফিরে প্যান্ট নামিয়ে দেখাল কুশাশ্ব।

    —-বাইরে থেকে আপনার প্রজাতির মেয়েমানুষ আনা যাবে না। এখানকার রেগুলার বা স্পেশাল স্টক থেকে নিতে হবে। মানবেন তো? নয়ত—

    —-মানে?

    —-রেগুলারগুলোকে আমরা বাইরে পাঠাই খদ্দের ধরে আনার জন্যে। স্পেশালগুলো নেতাদের জন্যে।

    —-আমি তো নেতা নই।

    —-নো প্রবলেম। স্পেশালরা আপনাকে নেতৃত্ব শিখিয়ে দেবে। ভেজ না ননভেজ?

    —-ননভেজে আজকে কী আছে?

    —-ল্যাজযুক্ত সমস্ত স্তন্যপায়ীর থন আছে।

    —-রুমটা একটু দেখব।

    —-নিজেই চলে-ফিরে দেখে আসুন না। কেবল কারোর কাজে ইন্টারফিয়ার করবেন না। মানবেন তো? নয়ত—

    লাউঞ্জে ঢুকে কুশাশ্ব দেখল একটা টেবিল ঘিরে কয়েকটা ল্যাজকাটা হায়েনা ওয়াইনগ্লাসে চুমুক দিয়ে রক্ত-মার্টিনি খাচ্ছে; একটা টেবিল ঘিরে তাস নিয়ে বসেছে ল্যাজহীন ওরাংওটাংরা; ব্যাক-টু-ব্যাক হবার আগে সোফায় হেলান দিয়ে চুমু খাচ্ছে ল্যাজকাটা কুকুর-কুকুরী; একটা টেবিলে ছুরিছোরা রেখে গ্যাঁজাচ্ছে ল্যাজকাটা মেরিনো ভেড়া কারাকুল ভেড়া আর কানঝোলা ভেড়া। জায়গাটা সুবিধের নয় মনে হল কুশাশ্বর। রিসেপশানের বেবুনকে, যে কিনা ঘুমিয়ে পড়েছিল, ‘বড্ডো কনজেসটেড’ বলে বেরিয়ে এলো রাস্তায়।

    গায়ে ‘কুইক সাকসেসের গারেন্টি’ লেখা একটা দু-শিং গন্ডার হেলতে-দুলতে যাচ্ছিল। কুশাশ্ব নিজেকে আরেকটু ছোট করে ফেলে গন্ডারকে বলল, স্যার, রাতটা কি আপনার পিঠে ঘুমিয়ে কাটাতে পারি? দিনের বেলায় তো কতশত পাখি পিঠে নিয়ে আপনি বেড়ান; সকাল হলেই চলে যাব। গন্ডার রাজি হয়ে গেলে, তার পিঠে শুয়ে কুশাশ্ব জিগ্যেস করল, আপনি কি করেন স্যার? গন্ডার বলল, আমি কোচিং-ক্লাসে পড়াই, সারা জগতে আমার শাখা-প্রশাখা আছে।

    রোদ উঠে পরের দিন রোদাচ্ছে দিকবিদিক, ঘুমন্ত গন্ডারের পিঠে শুয়ে মহিলা জলহস্তির রাজনৈতিক বক্তৃতার বাজখাঁই শুনে ঘুম ভেঙে গেল কুশাশ্ব দেবনাথের। দেখল, জলহস্তির দুই পাশে বেশ কিছু ব্যাজারমুখো ছোট-ছোট জলহস্তি। মহিলা জলহস্তি হাঁ-মুখ খুলে ঘামতে-ঘামতে বলছে — “মানুষ চাইছে, মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, মানুষ কাঁদছে, মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে, মানুষ হাই তুলতে পারছে না, মানুষ নাক খুঁটতে পারছে না, মানুষ কুলকুচি করতে পারছে না, মানুষ কান চুলকোতে পারছে না, মানুষের গোঁফদাড়ি বেড়ে যাচ্ছে, মানুষের দাঁতে খাবার আটকে যাচ্ছে, মানুষ খোঁপা বাঁধতে পারছে না, মানুষকে এই দিতে হবে, মানুষকে সেই দিতে হবে, মানুষকে অমুক দাও, মানুষকে তমুক দাও………..”

    গোরু বাছুর মোষ শেয়াল বেড়াল ভোঁদড় প্যাঙ্গোলিন ছাগল হাঁস মুর্গি কাক শালিখ পায়রা চড়ুই বাদুড় চামচিকে নীলগাই হরিণ বেঁজি ইঁদুর ছুঁচো কচ্ছপ খরগোশ মিলিয়ে ভিড় বাড়তে লাগল। বিরক্ত গন্ডার জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও যাবার উদ্দেশ্যে চার ঠ্যাঙ বাড়াতে, কুশাশ্ব প্রমাণ মাপের মানুষ হয়ে গেল। ও-ই একমাত্র অন্যরকম প্রাণী হওয়ায় পুরো ভিড়টা হঠাৎ ওর দিকে মুখ ফেরালো। ‘মার ব্যাটাকে’ বলতে-বলতে ধেয়ে এলো।

    ভয়ে দৌড় লাগাল কুশাশ্ব। ওর পেছনে ভিড়। ও দৌড় লাগায়। ওর পেছনে ভিড়ও দৌড়োয়। দৌড়োতে-দৌড়োতে একটা বিরাট পোড়ো বাড়িতে ঢুকে গেল কুশাশ্ব। বাইরে থেকে ভেসে আসছে ভিড়ের গালাগাল, হুমকি, বিদপূপ, ধিক্কার, দুয়ো, খলোক্তি, ধাতানি, শাপান্ত-বাপান্ত, টিটকিরি– সব রকম জন্তু জানোয়ারের ভাষায়। প্যাডানির আতঙ্কে বাড়িটার সামনের ঘরগুলো পেরিয়ে একটা প্রায়ান্ধকার ঘরে গিয়ে লুকোল কুশাশ্ব।

    অন্ধকার চোখসহা হলে, ঘরের উঁচু সিলিঙের দিকে তাকিয়ে ভাঙা ঝাড়লন্ঠন, ছেঁড়া ট্যাপেস্ট্রি দেখে কুশাশ্ব অনুমান করল যে এই খন্ডহরের মালিকদের এককালে প্রতিপত্তি ছিল। পরের আরও অন্ধকার ঘরটায় ঢুকল। দেয়ালময় ফোটো টাঙানো। কাছে গিয়ে দেখল সেগুলো সবই কংকালের। সম্ভবত যখন ফোটোগুলো টাঙানো হয়েছিল তখন স্বাভাবিক রূপ ছিল; কালের করাল গ্রাসে ফোটোগুলো কংকালে পালটে ফেলেছে। যার কংকাল তার নাম, জন্মদিন আর মৃত্যুদিন বছরসহ লেখা রয়েছে। ঘরটা ছেড়ে তাড়াতাড়ি পরের আরও বেশি অন্ধকার ঘরে ঢুকল কুশাশ্ব।

    এই ঘরটা একেবারে কালোয় কালো অন্ধকার। হঠাৎ কেউ একজন বলে উঠল, আসুন কুশাশ্ব দেবনাথ, আপনার জন্যে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করছি আমরা। আপনার অভাবে সভার কোরাম পুরো হয়নি। পরিচিত, শোনা, কন্ঠস্বর মনে হল।

    গলার আওয়াজটা যেদিক থেকে ভেসে এসেছিল, সেই দিকে এগোল কুশাশ্ব। পুরোনো ভাঙাচোরা গোল টেবিল ঘিরে কয়েকজন বসেছিল। কুশাশ্ব তাদের কাছে যেতে, তাড়া উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে হাততালি দিতে লাগল। এবার চিনতে পারল কুশাশ্ব। পেতলের গোপাল, চিনামাটির লাফিং বুঢঢা, তালপাতার গিলগামেশ, কাঠের ইউলিসিস। এদের সামনে টেবিলে একটা করে টর্চ রাখা। আর টেবিলের মাঝখানে নীলরঙের একটা ভাঙা চাকা আর তার দোমড়ানো জংধরা স্পোকগুলো। সিংহাসনের মতন নকশাকাটা চেয়ারে এক জন মহিলা, যার দেহে এক দিকে সাবিত্রী শীলের মুখ, আর বিপরীত দিকে হালুইকরের বাড়ির সেই গৃহবধুর মুখ-বুক।

    ফাঁকা চেয়ারটায় গিয়ে বসল কুশাশ্ব দেবনাথ।

  • মলয় রায়চৌধুরী | ৩১ জুলাই ২০২১ ২০:০৩734803
  • ভ্যান গগের কান : মলয় রায়চৌধুরীর রহস্যোপন্যাস

    পিচ্চির রোজনামচার খাতায় এসিপি রিমা খান যা পেয়েছেন, খুঁটিয়ে পড়ছেন, নোট নিয়ে রাখছেন, যুবকটা কেমন করে কবে কোথায় হারিয়ে গেল, নাকি খুন হল, তা তাঁর আন্ডারে গোবরঘাট থানা ইনভেস্টিগেট করছে, এখনও নির্ভরযোগ্য ক্লু পায়নি অনুসন্ধানকারী অফিসার ভোম্বোল সোম, যাকে উনি ভোমসো বলে ডাকেন।

    রিমা খানের বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে, চুল তেমনই বয়কাট, তবে নুনমরিচের ছোঁয়া, কোনো গয়না পরেন না, কেবল ডান হাতে একটা স্টেনলেস স্টিলের অমৃতসরি নোয়া, অপরাধীদের থেকে কবুলতি আদায়ের জন্য। সিগারেট ফোঁকা ছাড়তে পারেননি, দিনে কুড়িটা। সিভিল ড্রেসে থাকলে জিনস আর টপ, শীতকালে রাতের বেলায় হুডি। পুরোনো বুলেট মোটর সাইকেলটা, যেটায় চেপে নোংরা পরি নামে পপুলার কুখ্যাতি পেয়েছিলেন, দান করে দিয়েছেন রজত মণ্ডলকে, যে তাঁর সাকরেদ কন্সটেবল ছিল, যখন তিনি এক অপরাধীকে পেঁদিয়ে মেরে ফালার দায়ে সাসপেণ্ডেড ছিলেন। এখন চোখে রে ব্যানের গগলস পরে অফিসের জিপ ব্যবহার করেন। ওনার পা দুটো কোমরের ওপরের অংশের চেয়ে দীর্ঘ, তাই দুই পা ছড়িয়ে বসেন, ডিসিপি, সিপির সঙ্গে মিটিঙেও অমন করে বসেন বলে অধস্তন অফিসাররা ওনার যৌনতা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে, তা উনি জানেন। এক পায়ের ওপরে আরেক পা রেখে উনি বসতে পারেন না। যখন দাঁড়ান, বুকের ওপরে দুই হাত ক্রস করে থাকেন।

    এক দুই তিন নম্বর দেয়া খাতাগুলো তেমনভাবেই পড়া আরম্ভ করলেন, ক্রম অনুযায়ী। হাতের লেখা দেখে টের পাওয়া যায় যে ছেলেটা বাংলা মিডিয়ামে পড়েনি, তাছাড়া ন্যারেটিভ হয়ে দাঁড়িয়েছে ম্যাশআপ, কার কথা, কে বলছে, কাকে বলছে, উদ্ধৃতি নাকি নিজের বক্তব্য, কোথায় শুরু, কোনটা কল্পনা, কোনটা সত্য ঘটনা, কিছু ঠিক করে বোঝার উপায় রাখেনি, অনুমান করে এগোচ্ছেন রিমা খান।

    “মিছিল, র‌্যালি, সমাবেশ, মহাসমাবেশ, গেটসভা, মোড়সভা, মোহোল্লাসভা, লোকসভা, ভোজসভা, শোকসভা থেকে মানুষজন ফেরার পর, নানা রকমের বক্তৃতা শোনার পর, দর্শনে আপ্লুত হবার পর, তাদের মাথা, মানে কাঁধের ওপরে তাদের মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরার ক্ষমতা আয়ত্ব করে ফেলেছে ; তারা যাদের ছুঁয়েছে, যাদের সঙ্গে কথা বলেছে, যাদের নিয়ে ভেবেছে, স্বপ্নে যাদের দেখেছে, সবায়ের মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরার ক্ষমতা পেয়ে গেছে, তা সে মানুষ-মানুষীরা গণ্ডমূর্খ হোক বা মহাজ্ঞানী, মার্কসবাদি-গাঁটকাটা, লেনিনবাদি-ডাকাত, হিন্দুত্ববাদী-দাঙ্গাবাজ, সন্ত্রাসবাদী-সালাফিস্ট, মাওবাদি-পকেটমার, গান্ধিবাদি-স্মাগলার, জাতীয়তাবাদী-লেঠেল, বর্ণবাদী-দেওবন্দি, যুক্তিবাদী-কুচুটে, মানবতাবাদী-জোচ্চোর, উপযোগবাদী-কিপটে, বিজ্ঞানবাদী-মাদুলিঅলা, ব্যক্তিবাদী-দলবাজ, দৃষ্টবাদী-বহূরূপী, ডারউইনবাদী-ধর্মগুরু, সমাজবাদী-জোতদার, তিনি যেই হোন না কেন । ”

    পিচ্চির রোজনামচায় এসিপি রিমা খান যা পেয়েছেন, অ্যসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার, যাঁকে পাবলিক আর মিডিয়া এককালে নাম দিয়েছিল ‘নোংরা পরি’, তখন তিনি পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন, দাগি অপরাধীরাও ভয় পেতো। সেই সময়ে তিনি জেমস বণ্ডের মতন নিজের পরিচয় দিতেন, “রিমা, রিমা খান”। তাঁর অধীনে এক থানায় মিসিং ডায়রি করেছিলেন পিচ্চির বাবার অ্যাডভোকেট, তাকেই এফ আই আর হিসেবে দায়ের করেছে থানার ওসি, পিচ্চি নামের এই যুবকের লোপাট হবার এক সপ্তাহ পরে।

    অনুসন্ধান চালাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট থানার ইন্সপেক্টর ভোম্বোল সোম, সংক্ষেপে ভোমসো। খাতাটা উল্টেপাল্টে, ভোমসোকে, যে রিমা খানের টেবিলের উল্টোদিকে বসেছিল, বললেন, দেখি বাকি খাতাগুলো পড়ে। আমার তো মনে হচ্ছে এই ছোঁড়াটা ইনসেন। সেই জন্যেই বোধহয় ওদের অ্যাডভোকেট ওর লোপাট হবার দিনই মিসিং ডায়রি করেছেন, আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে পারতেন। আঠেরো বছরের তরুণ, এসে যাবে দিনকতক পর। এর মা-বাবাও একে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ; হয়তো তাঁদের খোঁজে ভারতভ্রমণে বেরিয়েছে ছেলেটা। তুমি এর আর এর মা-বাপের ফোটো সব থানায় পাঠিয়ে দিয়েছ তো ? দেখি সব কয়টা খাতা এক এক করে পড়ে । ভোমসো উঠে চলে গেলে, চেয়ারে ছারপোকা থাকায় পোঁদ চুলকোতে-চুলকোতে, হাতের সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে রিমা খান পড়ায় মনোযোগ দিলেন।

    “যারা ভাষণ দিয়েছে সেইসব গ্যাঞ্জামে, ঘাম পুঁছতে-পুঁছতে, তারাও অনেকসময়ে পিঠের দিকটা পাবলিকের সামনে রেখেছে, যাতে জনগণকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিজেদের জালে ফাঁসিয়ে তোলা যায়। ফলে, তাদের সামনে দিক আর পেছন দিক বলে কোনো ব্যাপার নেই। তার আগে তারা পিঠের দিকে মুখ করে হাঁটতে পারতো না, বাঁ-দিক বা ডান-দিকে মুখ করে হাঁটতে পারতো না। তাদের দেহের বাদবাকি অঙ্গ তেমনই আছে, কেবল মুণ্ডুটা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরার ক্ষমতা তারা পেয়ে গেছে। তারা পিঠের দিকে মুখ করে ছলছলে চোখে প্রগতির উদ্দেশে এগিয়ে যেতে পারে, চোখের পাতা নামিয়ে চুমু খেতে পারে, জুলজুলে চোখে শুভদৃষ্টি করতে পারে, মুসলমান হলে বিয়ের সময়ে ঝিকিমিকে চোখে ‘কবুল’ বলতে পারে বা বি্যে ভাঙার জন্যে চকচকে চোখে ‘তালাক’ বলতে পারে, দলবেঁধে গোলগোল চোখে ‘ইনক্লাব জিন্দাবাদ’ বলতে পারে, শবদেহের অনুগামী হয়ে জলসজল চোখে গান গাইতে পারে, শ্মশানে মোদোমাতাল হয়ে ঘোলাটে চোখে নাচতে পারে, পিটপিটে চোখে ক্রিকেট আর ফুটবল মিটমিটে চোখে লাট্টু আর ড্যাঙ্গুলি টেরাচোখে আর টেনিস ব্যাডমিন্টন আড়চোখে চুকিতকিত অস্হির চোখে লুডো আর দাবা খেলতে পারে। মোবাইল, ল্যাপটপ, আর নানা গ্যাজেট নিয়ে চোখ কুঁচকে কাজ করতে পারে, ড্যাবড্যাবে চোখে গাড়ি আর বিমান চালাতে পারে, এক চোখ বুজে বন্দুক আর দুই চোখ খুলে কামান চালাতে পারে, দীপ্ত চোখে ধানের আঁটি পুঁততে পারে, উদ্ভাসিত চোখে নারকেল বা তালগাছে উঠতে পারে, বঙ্কিম কটাক্ষে ভিনযৌনতার দেহের দিকে তাকাতে পারে। ”

    পিচ্চির রোজনামচায় এসিপি রিমা খান যা পেয়েছেন :

    “বাচ্চারা জন্মাবার সময়ে তিনশো ষাট ডিগ্রি মাথা ঘুরিয়ে চারিদিক দেখে নিয়ে জন্মায়। আমাদের বাংলাভাষী দেশে আরম্ভ হয়ে এই মেরুক্ষমতা সারা পৃথিবীতে মহামারীর মতন ছড়িয়ে পড়েছে। সেই কে একজন বলেছিলেন, বাঙালি আজ যা করে অন্যেরা তা পরে করে, ব্যাপারটা তাইই ঘটেছে। বাঙালি গাড্ডায় পড়লে সারা দেশ গাড্ডায় ; বাঙালি নেতা গাড়ল হলে সারাদেশে সারা জগতে গাড়লদের নেতৃত্ব। ”

    পিচ্চির রোজনামচায় এসিপি যা পেয়েছেন আর পড়ে অবাক হয়েছেন :

    “শুধু পিচ্চির তা হয়নি, আমি নিজের চোখে দেখেছি । ও যেমনভাবে জন্মেছিল, তেমনই আছে। ওর মা-বাবা ওকে তেমনটা না বোঝালেও, তিনশো ষাট ডিগ্রি মাথা ঘোরাবার মেরুক্ষমতা ও পায়নি। ওর মা-বাবা কিন্তু সেই মেরুক্ষমতা পেয়েছিল। পিচ্চিদের বাড়ি ; সে যে কি পেল্লাই একখানা বাড়ি বর্ণনা করতে পারব না, যখন আমি কিনা একজন লেখক, বর্ণনা বিক্রি করে-করে ফুটানি মারি। তিনশো ষাট ডিগ্রি মাথা ঘোরাতে পারার মেরুক্ষমতার কারণে পিচ্চির মা আর ধনী মহিলারা গলায় দু সেট হার পরেন, একটা পিঠের দিকে আরেকটা বুকের দিকে, এও আমার নিজের চোখে দেখা, সোনার দোকান থেকে পিঠের দিকে মাথা করে বুক-পিঠ আলোয় আলো করে নামছেন, দেখেছি। বিজ্ঞাপন দেখেছি সোনার দোকানের সাইনবোর্ডে, “দুপুরবেলা পিঠের কিনুন, সামনে সন্ধ্যাবেলা, বোকা বরকে গেঁথে তুলুন, বলুন এটা র‌্যালা”।বিজ্ঞাপন তো আসলে কথার ব্যবসা, অথচ যারা বিজ্ঞাপনের ব্যবসায় আছে, সেই লোকগুলো বিশেষ পড়াশোনা করেনি, বলতে গেলে মুকখু। তারা বিজ্ঞাপন লিখতে পারে না, তারা অন্ধ, বোবা, কালা, তা সে মেয়ে হোক বা ছেলে। বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষের ব্যক্তিসত্তা গড়ার চেষ্টা হয়, যা চাই না, তা যোগাবার শোষণকাঠি পোঁদে গোঁজার কারিগরি। যে জিনিসের বিজ্ঞাপন সেই জিনিশের গুণের কথা বলা হয় না, শুধু ব্যক্তিসত্তা গড়ার স্বপ্ন তৈরির চেষ্টা, যেন সেই জিনিশটা পেলেই কেউকেটা হওয়া যাবে, সফল, দেখতে-সুন্দর, ঈর্ষা জাগাতে সক্ষম -- গাণ্ডুকে পাণ্ডুরঙ করে তোলার তিকড়ম। ”

    পিচ্চির রোজনামচায় এসিপি রিমা খান যা পেয়েছেন, যেন অন্য কেউ লিখেছে, অথচ পিচ্চিরই লেখা, বাংলা মিডিয়ামে পড়েনি এমন কারোর হাতের লেখা এক নজরে টের পাওয়া যায়, তবে বাংলা গালমন্দ ভালোই রপ্ত করে ফেলেছে ।

    “পিচ্চির দুর্ভোগ, যা বয়সের সঙ্গে কিছুটা সহ্য হয়ে গেছে, থ্যাঁতলানো এক দুর্ঘটনার স্মৃতি, যখন-তখন দুর্ঘটনায় চটকানো মানুষের মাংস দেখতে পেলেই মনে হয়, ওই দুজন ওর মা-বাবা হলে ভালো হতো, বৈশাখের সকালবৃষ্টির দরুন জমে থাকা শহরের নোংরায় দাঁড়িয়ে, পেঁকো জলের গন্ধের খোঁয়ারির মাঝে, দেয়ালপোস্টারের অভিনেত্রীর হাসিমুখ মাইয়ের ওপরে ফেলা পানের পিকের তলায়, দেখছিল ও, ঘিরে থাকা ভিজে ভিড়ে, সেদিন ছিল ওর জন্ম-তারিখ, আর জন্মদিন মানেই কারোর লাশ বা কয়েকজনের লাশ। ভাই-বোন নাকি বর-বউ নাকি বন্ধু-বন্ধুনি নাকি মাগি-মরদ কে জানে কাদের মাংসের ঘ্যাঁট ; মা-বাবা হলে ওনাদের সম্পর্কে পিচ্চির আর কিছু মনে থাকতো না। বৃষ্টিতে রক্তের ধারা পিচ্চির স্পোর্টস শু ভেজানো আরম্ভ করলে, ও টের পেলো, প্রতিবার রক্ত দেখলে যা হয়, তাই হতে চলেছে ; কেন যে প্রতিটি জন্মদিনে আঘাতের রক্তের মুখোমুখি হতে হয়। জন্মাবার সময়ের রক্ত ওর সঙ্গ ছাড়েনি। অজ্ঞান অবস্হার মগজের কুয়াশায় ও টের পায়, এই সময়টা ঝুরঝুরে সংবেদনের, মিলমিশ মনকেমনের, আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেয়া নকলকারির আর বাছবিচারহীন ফালতু যৌনসম্ভোগের, যে সময়ে বাঙালির ঐতিহ্যের মূল্যবোধের গভীরতার বৈশিষ্ট্য, আসঞ্জন, মর্মার্থ, মৌলিকতা আর প্রামাণিকতা উবে গেছে কিংবা ফাঁকা ইশারার ঘুর্ণিতে পাক খেয়ে ডুবে গেছে, জনগণের মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরার মেরুক্ষমতার কারণে। ”

    “পিচ্চি আবছা শুনতে পেলো, ভিড়ের একজন বলছে, ‘এ ছোঁড়াকে মিরগি রোগে পেয়েচে, অজ্ঞান হয়েও বিড়বিড় করছে, মাথাটা ঘোরান দিকি, মুখ দেখা যাচ্ছে না। ’ কোটি-কোটি লোক প্রত্যেক বছর মরে যায়, প্রতি ঘণ্টায় দশ হাজার মরে, প্রতি মিনিটে একশোজন। কার কিই বা আসে যায় তাতে ? কিন্তু যখন কোনো এক জায়গায় একসঙ্গে অনেক লোক মরে যায়, ঝড়ে, ভূমিকম্পে, সুনামিতে, যুদ্ধে, আত্মঘাতী বোমায়, তখন সবাই অবাক হয়, রেগে যায়, সামনের বাতাসের চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করে। ”

    পিচ্চির রোজনামচার খাতায় আবার প্রথমপুরুষে লেখা পড়লেন এসিপি রিমা খান :

    “ পিচ্চির মাথা নিজেদের দিকে ঘোরাবার চেষ্টা করে আরেকজন সুপুরুষ, যার দাড়িতে মৌমাছির চাকের মতন মোমমধুর রঙ, বললে, ‘নাঃ, এ তো দেখছি এই যুগের মানুষ নয়, প্রাগৈতিহাসিক, মাথা পাক খায় না ; যাকগে শালা, মরুকগে, নিশ্চয়ই অতিমানব, সুপারখোকা। ’ যখন জ্ঞান ফিরলো, শহরের নাগরিকরা ওকে ফুটপাতে শুইয়ে যে যার কাজে-অকাজে চলে গেছে, হাতঘড়ি, মোবাইল, পার্স পকেট থেকে হাতিয়ে ; এইভাবে, অনেকবার দুর্ঘটনা দেখে, রাস্তায় অজ্ঞান হবার আর ঘড়ি, মোবাইল, পার্স এমনকি ল্যাপটপ হারাবার অভ্যাস হয়ে গেছে ওর। পিচ্চি অনেকবার পাঁয়তাড়া ভেঁজেছে, এইরকম একটা লোককে ধরে পেটে ছুরি বসিয়ে দেয়, ঘ্যাচাঙ, কাউকে না কাউকে তো একদিন খুন করতেই হবে, নয় তো বেঁচে থেকে কীই বা লাভ ? উঠে বসে পিচ্চির মনে পড়ল, বাবা একবার বলেছিলেন, ‘সত্তর-আশির দশকে আমাদের সংস্কৃতি যা হারিয়েছে তা বজায় ছিল উনিশ শতকের আভাঁগার্দ মনীষীদের সময়ে-- নবজাগরণের লোকজনের মধ্যে রামমোহন রায়, ভি ডিরোজিও ও তাঁর বিপ্লবী শিষ্যবৃন্দ, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর অনুসারীরা, অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ-- এক-একজন আভাঁগার্দ সংস্কৃতির মশাল। মানুষের চুলের মুঠি ধরে ঘুম থেকে টেনে তুলেছিলেন। কী ছিল না ওনাদের ? আদর্শ, আত্মবিশ্বাস, কর্মোন্মাদনা, সমাজকে নতুন মোড়ে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার ঝোঁক, আর যা সবচেয়ে বড়ো তা হলো যে শিল্পের ধারণা, অনাগ্রহী অভিজাত দৃষ্টিতে, জরুরি রূপক ব্যবহার করে সংস্কৃতিকে এমনভাবে পালটে দিচ্ছিলেন যাতে স্বদেশী পাবলিক বুঝতে পারে। ওনাদের কারোর মাথাই তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরতো না, যেমন পিচ্চির ঘোরে না। তারপর এইযুগ এলো, তিনশো ষাট ডিগ্রি মাথা ঘোরার যুগ। গাঁড়ল, আঁড়ল, বাঁড়ল, চাঁড়ল, ষাঁড়ল নেতাদের যুগ। ”

    “এই যুগের ট্র্যাজেডি হলো যে কেউই সুখি নয়, তা সে লোকটা সময়ে আটকে থাকুক, দুঃখে বা আনন্দে, কেননা সকলেই এই জগতে একা ; আগেকার দিনগুলোকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। কেউ আটকে গেলে সে একাই আটকে থেকে যাবে। মানুষকে চেষ্টা করতে হয় এই ট্র্যাজেডি থেকে বেরিয়ে কেটে পড়ার সুযোগের সদ্ব্যাবহার করার। শহরের লোকগুলো যদি তোমাকে না চায়, তোমার কাছের লোকেরা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, বেশির ভাগ মানুষ যদি অকর্মণ্য হয়, সেই শহরে থাকার কোনো মানে হয় না। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই জমায়েতকে পেছনে ফেলে কেটে পড়া দরকার। কেবল চুতিয়া আর গাণ্ডুরা বলে বেড়ায় যে আমি অমুক শহরকে ভালোবাসি, তারপর দেয়ালে মোতে, বমি করে, পানের পিক ফ্যালে, ভুল বানানে স্লোগান লেখে। যারা পিচ্চিকে ঘিরে ধরেছিল তারা ওই সার্বজনীন তিনশো ষাট ডিগ্রি মাথা ঘোরানো পাবলিকেরই অ্যাণ্ডা-বাচ্চা, পিচ্চির সন্দেহ নেই, নিশ্চয়ই দোআঁসলা গাঁড়লদের বংশধর। ”

    “হেঁটে চার কিলোমিটার দূরে ওর বাবার বন্ধু অ্যাডভোকেটের অফিসে পৌঁছোলে, যে অ্যাডভোকেট পিঠের দিকে মুখ করে একজন মক্কেল তরুণীকে সলিসিট করছিলেন, ঠোঁটের কোনায় থুতুর ফেনা, তলাকার ঠোঁট চেবাতে-চেবাতে, ওনার কাছ থেকে বাড়ি যাবার ট্যাক্সিভাড়া নিয়ে ফিরেছিল পিচ্চি, আধ-ফাঁকা বাড়িতে, যার মালিক ও, পিচ্চি, ইকোল মণ্ডিয়ালের ছাত্র ছিল। সেই স্কুলেও একমাত্র ওর মাথা ঘুরতো না। মা-বাবা বাড়ি ছাড়ার আগে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে গেছেন অ্যাডভোকেট মশায়কে, ফলে পিচ্চির মজা, টাকা খরচ করার, উচ্ছন্নে যাবার, সীমা ভাঙার আর অন্য কারোর চাপানো বাধানিষেধ নেই, পিচ্চির নিজের অ্যাকাউন্টেও অঢেল। ”

    “আমি নিজের চোখে দেখেছি। ”

    পিচ্চির রোজনামচায় সেই একই ঢঙে লেখা, ভ্রু কুঁচকে পড়তে লাগলেন এসিপি রিমা খান, টেবিলের তলায় দুই পা দুদিকে ছড়িয়ে।

    “ পিচ্চির বাবা আর মা একদিন রাতে কোথায় উধাও হয়ে গেছেন ; পিচ্চিকে লেখা চিঠিতে জানিয়ে গেছেন, পিচ্চি যেন খোঁজ না করে, কাউকে না জানায়, ওর জন্যে দুজনেই অঢেল টাকাকড়ি রেখে যাচ্ছেন, পিচ্চি ইচ্ছেমতন খরচ করতে পারে। তখন পিচ্চির বয়স এগারো। তারপর তো ও নাইটফলের বয়সে পৌঁছোলো। ওর স্বপ্নে যুবতীরা এসে নাইটফল ঘটায় না, পুরুষরা আসে, নানান বয়সের, যাদের মুখ পিচ্চি দেখতে পায় না, কেবল পোঁদটুকু দেখতে পায় ; পোঁদের মসৃণতা বা চুল দেখে ও টের পায় এটা কোন রাজনৈতিক প্রতিভা যাকে ও টিভিতে দেখেছিল, যে কোনো কুতর্কে চেঁচাচ্ছিল। ও নির্ণয় নিয়েছে যে ডে-ফল ঘটাতে হলে কোনো যুবতীর অনুমতি নিয়ে তার গর্ভের দরোজায় ফেলবে, গরমকাল হলে এসি চালিয়ে, শীতকাল হলে লেপ চাপা দিয়ে। ”

    “বিছানায় তোয়ালে পেতে রাখতে হয়েছে। কেননা যে হাউসক্লিনিং কোম্পানিকে ওদের বাড়ি পরিষ্কার করার আর গুছোনোর চুক্তি দেয়া আছে, তাদের এক বুড়ো সদস্য বলেছিল, ‘আপনার যা বয়স, বিছানায় তোয়ালে বা রাবারক্লথ পেতে শোয়া অভ্যাস করুন, এই দাগ তোলবার কেমিকাল এখনও এখানকার বাজারে আসেনি, আমরা অর্ডার দিয়েছি, থাইল্যাণ্ড থেকে শিগ্গির এসে যাবে”।

    পিচ্চির রোজনামচায় দুর্ঘটনার বয়ান পড়ছিলেন এসিপি রিমা খান, অথচ পুলিশের রেকর্ডে এই দুর্ঘটনার নথি করা হয়নি কেন ? পড়ে ভাবছিলেন রিমা খান।

    “রাস্তার ধারে মাংসের জড়াজড়ি ঘ্যাঁট দেখে কালটে চেহারার এক ঢ্যাঙাকাত্তিক লোক কাঁদো-গলায় বলে ফেলেছিল, ‘দেখুন, কতো ভালোবাসতেন একজন আরেকজনকে, চেনার উপায় নেই কে কোন জন’, মনে আছে লোকটার চামগাদড় চেহারার জন্যে। বলাবলি মনে আছে পিচ্চির, লোকগুলোর ছিদাম মনে নেই।

    ----প্রকৃতির কী লীলা দ্যাখেন, বরের বুকের ওপরে বউয়ের বুকদুটো চলে এয়েচে।

    ----বউয়ের হাতের জায়গায় বরের ঠ্যাঙ।

    ----মানুষের মাংস বড্ডো অসহায়।

    “মর্গ থেকে মাংসের ঘ্যাঁট শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ইনসিনারেটরে, দুজনের আধার কার্ড আত্মীয়ের হাতে, ডিজিটাল-নথি থেকে হাপিশ করে দেবার খাতিরে। পিচ্চি গিয়েছিল শ্মশানে, যদি ওই দুজন ওর মা-বাবা হয়, কোনও ঠিক নেই আজকালকার দিনে, সাংবাদিকরা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে প্রমাণ করে দিতে পারে কে কার বাবা কে কার দলের কে কোন কোম্পানির।”

    রোজনামচায় পাগলদের নিয়ে পিচ্চির বক্তব্য পড়ে এসিপি রিমা খান অবাক হলেন, এই ছোঁড়াটার পরিবারে ইনস্যানিটির দোষ ছিল সম্ভবত। কেমনতর তা বলা কঠিন ; হয়তো উদ্বেগজনিত ব্যাধি, মুডের বিশৃঙ্খলা, স্কিৎসোফ্রেনিয়া কিংবা সাইকোটিক সমস্যা, ডিমেনশিয়া, দায়িত্ব নেবার ভয়।

    “এখানে কে পাগল নয় বলা মুশকিল। কেউ দ্রোহী, কেউ খাপ খায় না, কেউ গণ্ডোগোল পাকায়, আসল গর্ত না জেনেই জবরদস্তি করে, কেউ কেউ বিষয়গুলোকে অন্যভাবে দেখতে চায়। তারা নিয়মনীতি জানে না। সমঝোতা কাকে বলে জানে না। স্হিতাবস্হাকে শ্রদ্ধা করে না। তারা মুখিয়ে থাকে পাল্টাপাল্টি করে ফেলার জন্যে। তারা মানবজাতটাকে ঠেলেঠুলে চালিয়ে নিয়ে যায়। বাবা হয়তো এই কারণেই গাড়ি কেনেননি, চিরকাল ট্যাক্সি। কিন্তু বলেছিলেন, ‘তুমি যতোই যাই করো, সময়টা হয়ে গেছে শয়তানদের ঘুর্ণিপাঁক, তোমার ঘাড় না ঘুরলেও, ঘুরিয়ে মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হবে কোনো বিদেশি উদ্গীরণ, বা আরও খারাপ, তুমি যাই বলো না কেন, প্রাসঙ্গিকতা সত্বেও, লোকে বলবে সেটা এই সময়ের জন্যে জরুরি। সময় বেশ বিপজ্জনক, সময় থেকেই পালাতে হবে, অথচ জানি যে পালানো কঠিন, পালাবার চেষ্টাকে ঠাট্টা করবে।’”

    এই প্যারাটা রোজনাচায় পড়ে এসিপি রিমা খানের মনে হল, পিচ্চি নিজেই আত্মহত্যার কিংবা মার্ডারের ক্লু রেখে গেছে।

    “ছোটোবেলা থেকে, কারোর গা থেকে রক্ত বেরোতে দেখলে তাকে নিজের আত্মীয় মনে হয় পিচ্চির, কান্না পেয়ে যায়, বেশি রক্ত দেখলে ও অজ্ঞান হয়ে যায়, ডেঙ্গু হয়েছে কিনা জানার জন্য প্যাথলজিস্টের সামনে বসে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে, নয়তো নিজের রক্ত দেখে নিজেই অজ্ঞান হয়ে যাবে। বেশিরভাগ দেবী-দেবতাকেই মনে হয় রক্তখোর, মানুষকে আগাম না জানিয়ে বিপদে ঠেলে দেয়। এরাই সব দেশের নেতা-নেতি। তারা রক্ত না পেলে পাবলিককে টাইট করে দেবে। তারা রক্ত খাচ্ছে না দেখে পাবলিক তাদের শ্রদ্ধা করবে না। পাবলিক যতো বেশি যন্ত্রণায় ভুগবে ততো বেশি আনন্দ পাবে মাংসের দেবী-দেবতারা। মানুষকে ভয় পাইয়ে রাখা তাদের ধর্ম। বাবা বলতেন চাকরের সঙ্গে গিয়ে মাছ মুরগি কিনে আনাটা শিখে নিতে, পিচ্চি কখনও যায়নি। বলেছে, চাকরের কাজ চাকর করবে, আমি কেন তার শ্রম কেড়ে নেবো, তাছাড়া চাকরদের মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরে, আমার ঘোরে না। তখন পিচ্চির বয়স দশ। বাবা যে চিঠিটা লিখে গিয়েছিলেন তা পিচ্চি গত কয়েক বছরে বহুবার পড়েছে ; বারবার পড়লে ছিঁড়ে যেতে পারে অনুমান করে স্ক্যান করে স্মার্টফোনে তুলে রেখেছে :

    ডিয়ার পিচ্চি,

    আমার খোঁজ কোনোদিন কোরো না, আই লাভ ইউ, কিন্তু ইদানিং আমি একটা পলিঅ্যামোরাস গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছি, ছয়জনের, সবাই আমার মতন লেনিনবাদী নয়, তিনজন যুবক মার্কসবাদী আর তিনজন যুবতী মাওবাদী, যুবকদের মধ্যে আমিই একমাত্র, তুমি নিশ্চয়ই মানবে যে আমি একজন যুবক, বয়স মাত্র চৌঁত্রিশ, প্রেম করে বিয়ে করেছিলুম বলে তুমি আমার আর তোমার মায়ের কম বয়সেই জন্মেছিলে। এবারে প্রেম-ভালোবাসা থেকে মুক্তি। অভিধানে পলিঅ্যামোরাসের মানে দেয়া আছে কিনা জানি না, তুমি তো টেক স্যাভি, গুগল সার্চ করে মানে জেনে নিও। আমি এই গেঁয়ো শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি, আর কখনও ফেরার ইচ্ছে নেই, তা এইজন্যে নয় যে আমি নিজের বাড়ি আর তোমাদের ভালোবাসিনি, বরং এইজন্যে যে মনের ভেতরে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়াটা অনেককাল যাবৎ পোষা ছিল। ছেড়ে যাওয়া আমার জীবনের উদ্দেশ্য, জানতুম শৈশব থেকে, এটা একটা আইডিয়া, একজন মানুষ হিসেবে লালন করা আইডিয়া, যতো বড়ো শহর তাতে ততো বেশি নিজেকে হারিয়ে ফেলবার সুযোগ, যতো কংক্রিটের আকাশ ছোঁয়া বাড়ি, ততো তার গলিঘুঁজির উল্টোপাল্টা লোকজন, জঞ্জালের বিশাল পাহাড়। চিন্তা কোরো না, অ্যাডভোকেট মশায়কে বললেই উনি গাইড করবেন, মিসগাইডও করতে পারেন, তবে মনে রাখা দরকার যে মিসগাইড করার উপদেশগুলো বেশি কার্যকরী, তা আমি আমার বাবার মিসগাইডেন্স থেকে শিখেছি। লাভ ইউ। বাবা।”

    যাক পিচ্চি নিজের জন্মদিন লিখে রেখেছে রোজনামচায়। আশ্বস্ত হলেন এসিপি রিমা খান। আর তো কোনও কাগজপত্র বাড়িতে পাওয়া যায়নি। মা-বাবার খোঁজে বেরোবার সময়ে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে থাকবে।

    “বামিয়ানের বুদ্ধকে আফগানিস্তানের দাড়িয়ালরা বোমা মেরে উড়িয়ে দেবার দিন পিচ্চি জন্মেছিল, মার্চ মাসে, ২০০১ সালে তাই বাবা নাম রেখেছিলেন পিচ্চি, ওনার মতে তালিবানরা জন্মায় পিচ্চি হয়ে মরে পিচ্চি হয়ে আর সারাজীবন পিচ্চির মতন বেপরোয়া জীবন কাটায়। কিন্তু বুদ্ধকে আবার নবায়িত করা হয়েছে। তালিবানরা আবার আসবে, আবার বুদ্ধর মূর্তি বোমা মেরে ওড়াবে, নিজের-নিজের বোরখাপরা বেগমদের শেকলে বেঁধে নিয়ে যাবে, হুকুম না শুনলে গুলি করে মারবে যাতে আরেকটা টাটকা বউ পাওয়া যায়, কচি কুচুরমুচুর বউ। ”

    পিচ্চির রোজনামচার পাতায় নিজের সম্পর্কে লিখেছে, পড়ে আনমনা হলেন এসিপি রিমা খান :

    “মায়ের লেখা চিঠিটাও স্মার্টফোনে স্ক্যান করে তুলে রেখেছে পিচ্চি। মা-বাবা দুজনের মূল চিঠি ব্যাংকের লকারে রাখা আছে, আর তো কিছু নেই লকারে রাখার, তাই, বছরে একবার গিয়ে চিঠি দুটোর গন্ধ শুঁকে রেখে দ্যায়, ভাঁজ খুলে পড়ে না। দুজনেই বৈশাখ মাসে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন, দুজনের চিঠিতেই কোনো তারিখ দেয়া নেই। মায়ের চিঠিতে যা লেখা :

    স্নেহের পিচ্চি

    আমার খোঁজ কোনোদিন করিবে না, আমি তোমায় খুবই ভালোবাসি, প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি, তুমি জানো, তুমি আমার একমাত্র সন্তান, তোমার যাহাতে কোনও অসুবিধা না হয়, আমার অ্যাকাউন্টে তোমাকে সঙ্গে লইয়া গিয়া তোমার নাম যোগ করিয়া দিয়াছিলাম, যাবতীয় গহনা বিক্রয় করিয়া দিয়াছি ও সেই অর্থ সঙ্গে লইয়া যাইতেছি। তোমার অ্যাকাউন্টের টাকা, তুমি যথেচ্ছ নয়ছয় করিতে পারিবে, কুন্ঠিত বোধ করিও না, জীবনের আনন্দ লইও, তবে কখনও দুঃখশোকের কবিতা পড়িও না। প্রেমের কবিতা পড়িবে ও তদনুসার প্রেম করিবে, একাধিক করিবে। এই কবিতাখানি পড়িয়া বুঝিতে পারিবে আমি কি ইশারা করিতেছি।


     

    ঘুরিয়ে গলার বাঁক ওঠো বুনো হংসিনী আমার

    পালক উদাম করে দাও উষ্ণ অঙ্গের আরাম,

    নিসর্গ নমিত করে যায় দিন, পুলকের দ্বার

    মুক্ত করে দেবে এই সব্দবিদ কোবিদের নাম।

    কক্কার শব্দের শর আরণ্যক আত্মার আদেশ

    আঠারোটি ডাক দেয় কান পেতে শোনো অষ্টাদশী,

    আঙুলে লুলিত করো বন্ধবেণী, সাপিনী বিশেষ

    সুনীল চাদরে এসো দুই তৃষ্ণা নগ্ন হয়ে বসি।

    ক্ষুধার্ত নদীর মতো তীব্র দুটি জলের আওয়াজ--

    তুলে মিশে যাই চলো অকর্ষিত উপত্যকায়

    চরের মাটির মতো খুলে দাও শরীরের ভাঁজ

    উগোল মাছের মাংস তৃপ্ত হোক তোমার কাদায়,

    ঠোঁটের এ-লাক্ষারসে সিক্ত করো নর্ম কারুকাজ

    দ্রুত ডুবে যাই এসো ঘুর্ণমান রক্তের ধাঁধায়।


     

    পড়াশুনায় তুমি ভালো, প্রতি বছর প্রথম হও, তোমার শিক্ষার ব্যাপারে সেহেতু আমার চিন্তা নাই। তোমার দাদুর ব্যক্তিগত পাঠাগারে প্রচুর গ্রন্হ আছে, পড়িয়া সময় কাটাইতে অসুবিধা হইবে না। কখনও পরামর্শের প্রয়োজন হইলে তুমি অ্যাডভোকেট মহাশয়ের সহিত আলোচনা করিতে পারো। গৃহত্যাগের চেয়ে উচ্চতর কিছুই নাই, সবচেয়ে দয়নীয় হইল গৃহত্যাগ মনের ভিতর পোষণ করিয়া বাঁচিয়া থাকা। আমি কাহাকেও আঘাত দিতে চাহি নাই, সেই হেতু তোমাকে পূর্বাহ্ণে বলি নাই যে গৃহত্যাগ করিতেছি। অতঃপর জীবনে যাহা ঘটিবে তাহা ঘটিতে দিব, কোনও দুশ্চিন্তা নাই। জীবন নিজের স্বকীয় ইচ্ছানুযায়ী অতিবাহিত করিবে। আমার সস্নেহ আশীর্বাদসহ -- মা। ”

    পিচ্চির রোজনামচায় পরের পাতায় গেলেন এসিপি রিমা খান, হাতের লেখা ডান দিকে বেঁকেছে, কিন্তু কেন, ভাবলেন উনি :

    “বাবা আর মা চলে যাবার পর ঠাকুর্দার লাইব্রেরির বই ঘেঁটে পিচ্চির মনে হয়েছিল, উনি বহুপন্হী ছিলেন এবং সেকারণে প্রচুর টাকাকড়ি রোজগার করতে পেরেছিলেন, দেশ-বিদেশ ঘুরতে পেরেছিলেন ; ওনার মিসগাইডেন্সের সবচেয়ে আলোচিত টপিক, যা বাবা প্রায়ই বলতেন, তা হলো জীবন কাটাতে হলে রবীন্দ্রনাথের দাদুর মতন কাটাও -- খাও, পিও, জমিজিরেত কেনো, বিদেশে যাও, বিদেশিনীদের সঙ্গে মৌজমস্তি করো। তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ, দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ–সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।”

    “পিচ্চি যখন স্বপ্ন দ্যাখে তখন স্বপ্নের মধ্যে ও বামপন্হী হিসেবে নিজেকে চিনতে পারে। ঘুম ভেঙে গেলে আর বামপন্হী থাকতে পারে না। বহুপন্হী হয়ে যায়, আর সবায়ের মতন, জনগণের মতন।”

    “দিনের বেলা ওর মনে হয়, এখনকার বহুপন্হী ভাবুকরা যুক্তি, বিজ্ঞান, অবজেকটিভ বাস্তবকে ফুঃ বলে উড়িয়ে দেয় আর দাবি করে যে সবকিছুই সাংস্কৃতিক স্তরে আপেক্ষিক। বহুপন্হীরা বিজ্ঞান আর যুক্তিবাদকে ঘেন্না করে কেননা ওরা কোনো-কোনো বিশ্বাসকে সত্য বলে দেগে দ্যায়, মানে সেগুলো সফল আর উঁচুস্তরের আবার কোনো-কোনো বিশ্বাসকে মিথ্যা মনে করে, তারা নিকৃষ্ট, পরাজিত। হীনতা সম্পর্কে বহুপন্হীদের ধারণা এতো গভীর যে ওরা বহু ব্যাপারকে অন্যের চেয়ে সফল আর উচ্চতর মনে করতে পারে না। মানসিক বিকারকে ওরা ফালতু মনে করে। ওরা মানুষের ক্ষমতার জিনগত ব্যাখ্যা বরদাস্ত করতে পারে না। অমন ব্যাখ্যা মেনে নিলে ওদের মেনে নিতে হবে যে সবাই সমান নয়। একজন মানুষের গুণ বা দোষত্রুটির দায় ওরা চাপিয়ে দ্যায় সমাজের ওপরে। মানে, নিকৃষ্ট হওয়াটা তার দোষ নয়, সমাজের দোষ, সমাজ নাকি তাকে উচ্চতর হবার সুযোগ দেয়নি। ”

    “স্বপ্নের মধ্যে পিচ্চি নিজেকে কোনো রাতে স্তালিন হিসাবে দেখতে পায়, কোনো রাতে লেনিন, কোনো রাতে মাও, কোনো রাতে ফিদেল কাস্ত্রো, কোনো রাতে চে গ্বেভারা, কোনো রাতে ট্রটস্কি, কোনো রাতে হুগো চাভেজ, কোনো রাতে হো চি মিন, কোনো রাতে পল পট। অসুবিধা একটাই, বিছানায় ও ল্যাংটো হয়ে শোয়, নয়তো ঘুম আসে না, কিন্তু কোনো বই পড়ে জানতে পারেনি যে এনারা কেউ ল্যাংটো হয়ে শুতেন কিনা। ”

    “স্বপ্নের মধ্যে পিচ্চি মা আর বাবার প্রিয় গানগুলো শুনতে পায়। ”

    “বাবা নিজের দোতলার দক্ষিণ দিকের ঘরে বেতের ইজিচেয়ারে বসে, বরফে চোবানো ব্লু লেবেলের গ্লাস হাতে, যে ঘরের দেয়াল নীলাভ, শুনতে পেতেন না মা একতলায় নিজের অ্যান্টিক পালঙ্কে সবুজ মখমলের চাদরে চোখ বুজে বসে, শিমুল তুলোর কোলবালিশ জড়িয়ে, কোন গান শুনছেন। মা শুনতে পেতেন না বাবা কোন গান বাজাচ্ছেন। ”

    “ গ্যারেজের ওপরে ওর খেলবার মেজানাইন ঘরে বসে পিচ্চি দুজনের বাজানো গানই শুনতে পেতো, ওর তো গানের সুরও প্রায় একই রকম মনে হতো। ”

    “এই শহরে যে বাড়িতে পিচ্চি জন্মেছিল সেখানে এখন মাল্টিপ্লেক্স, মাইয়ের খাঁজ দেখানো ফিল্মিমাইয়ার পোস্টার ; প্রথম প্রি-প্রাইমারি স্কুলটা ভেঙে উঠে গেছে তিরিশতলা, ভেতরটা দেখা যায় না এমন আয়না-কাচে মোড়া, ক্রিকেট খেলার মাঠটায় ফ্লাইওভারের থাম ; এই শহরে ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার আগেই উবে যায়, মগজে পুষে রাখা বিটকেল চিন্তা দিয়ে নাগরিকরা বানিয়ে চলেছে স্হাপত্য ভাস্কর্য পেইনটিং নগ্নিকার আঁস্তাকুড়। পিচ্চিকে তাই একোল মণ্ডিয়ালে গিয়ে পড়তে হয়েছিল, তারপর আর ভাল্লাগেনি, মনে হয়েছে সবই তো ওর জানা। ”

    রোজনামচার একটা খাতা শেষ করে পরের খাতাটা তুলে নিলেন রিমা খান ; নানা রকমের ডুডল, খাতার প্রথম দিকের কয়েকটা পাতায়, মনে হয় চোখ আঁকার চেষ্টা করেছে, কার চোখ কে জানে, যেন কোনো রাক্ষসের।


     

    দুই


     

    “ পিচ্চির নিজের ভালো লাগে মেটাল গান, হেভি মেটাল, তাতে ওর ঝাঁকড়া চুলে হেড ব্যাং করতে সুবিধে হয়। দরোজা জানালা বন্ধ করে এসি চালিয়ে পিচ্চি উলঙ্গ দাঁড়িয়ে গান শোনে আর হেড ব্যাং করে। ”

    রিমা খান নোট নিয়ে রাখলেন। এই অ্যাডভোকেটই মিসিং ডায়রি করেছে, ভোমসোকে জিগ্যেস করতে হবে ওনার এলাবোরেট স্টেটমেন্ট নিয়েছে কিনা।

    “পিচ্চির অছি, অ্যাডভোকেট মশায় বলেছিলেন, তলাকার ঠোঁট দাঁত দিয়ে চিবোতে-চিবোতে, বাঁ হাত দিয়ে গান্ধিমার্কা চশমা টেবিলের ধুলোট কাগজের ডাঁইয়ের ওপর রেখে, আর বাঁ হাতে ধরা সিগারেটের ছাইকে টুসকি মেরে, বুঝেছ পিচ্চি, তোমাদের সংসারে আসল গোলমাল তৈরি হয়েছে ওই বিশাল বাড়ির জন্যে, তিনজন মোটে মানুষ, তোমাকে যদি হাফ ধরি তাহলে আড়াইজনের জন্য অতোবড়ো বাড়ির দরকার ছিল না। দশ হাজার স্কোয়ার ফিট, বাগান নিয়ে কুড়ি হাজার স্কোয়ার ফিট। রবি ঠাকুরের বাবা জানতেন তাঁদের বিরাট বাড়ির জন্যে অনেক ছেলেপুলে দরকার, কেউ যদি তার বউদির সঙ্গে প্রেম করে তাহলে অন্যেরা জানতে পারবে না। তোমার যদি কয়েকটা দাদা থাকতো তাহলে কোনো একজন বউদির সঙ্গে প্রেম করতে পারতে। অতো বড়ো বাড়ির জন্যেই তোমার আর ভাইবোন হলো না, তোমার ঠাকুর্দারও হয়নি, এই যদি বস্তির কুঁড়ে ঘরে থাকতে, কিংবা অজ পাড়াগাঁয়ে, তাহলে লালু যাদবের ছেলেপিলের মতন তোমারও গাদাগুচ্ছের জেঠা-কাকা ভাই-বোন হতো, বাড়িটা গমগম করতো, মা-বাবাও বাড়ি থেকে পালাতেন না। আমাদের ছোটোবেলায় ছেলেছোকরারা বকুনি খাবার ভয়ে কিংবা বাঁধন ছেঁড়ার জন্য বাড়ি থেকে পালাতো। তোমার মা-বাবা বাড়ি থেকে পালালেন, আজব যুক্তি দিয়ে, এরকম ঘটনা আমি আমার কোনো মক্কেলের জীবনে ঘটেছে বলে শুনিনি, আজ দশ বছর হতে চলল প্র্যাকটিস করছি। কতোবার তোমার বাবাকে বলেছি একতলাটা ভাড়া দিয়ে দাও, লোকজনের আসা যাওয়া থাকবে, দিনে গোরস্তান রাতে চোরবাগান মনে হবে না, তা তোমার বাবার সেই এক কথা, যা তোমার ঠাকুর্দাও বলতেন, আর টাকাকড়ি চাই না, যা আছে তাইই যথেষ্ট, তার ওপর যাদের ভাড়া দেবো তারা কেমন ধরনের মানুষ তা তো আগে থেকে জানা যাবে না, হয়তো রোজই ঝগড়াঝাঁটি করবে নিজেদের মধ্যে, আর আমাদের শান্তি নষ্ট করবে, তামাক খেয়ে থুতু ফেলবে, মাল টেনে বউকে পেটাবে, জোরে টিভি চালাবে, বাগানে পেচ্ছাপ করবে। ”

    “অ্যাডভোকেট মশায়ের মুখের দিকে তাকালে মন খারাপ হয়ে যায় পিচ্চির ; ওনার মেয়ে হয়নি, পাঁচটাই ছেলে, ছয় নম্বর পয়দা করতে-করতে ওনার বউ মারা গেলেন, ছয় নম্বরও কয়েকদিন মোটে টিকেছিল। পাঁচটা ছেলেই অপগণ্ড, কেউ ক্লাস এইট, কেউ ক্লাস সেভেন, আর এগোতে পারেনি, গণিত আর ইংরেজিতে বারবার গাড্ডুস খেয়েছে, একটা ছেলে তো স্কিৎসোফ্রেনিয়ার রোগি। অ্যাডভোকেট নিজে কতো পড়াশোনা করেছেন, গরিব মা-বাপের মুখে রোশনাই ফুটিয়েছেন, বস্তি ছেড়ে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকেন, অথচ ওনার ছেলেগুলো ওনার মুখময় অন্ধকার মাখিয়ে দিয়েছে। কোনো মানে হয় না। কোনো ছেলে ওনার দপতরে ঢুকলে মুখ এমন বিকৃত করেন যেন হুপ শব্দ করে গাছ থেকে ল্যাজ তুলে লাফাবেন। ”

    “পিচ্চির অছি, অ্যাডভোকেট মশায় বললেন, তলাকার ঠৌঁট চেবাতে-চেবাতে, তোমার জন্যে আমি দুজন প্রেমিকা খুঁজে রেখেছি, কনে আর কইন্যা, যদিও বয়েস তোমার চেয়ে দুজনেরই বেশি, তোমায় প্রেমিকের করণীয় বিষয়ে ভালো গাইড করতে পারবে। তুমি হয়তো তাদের জন্য প্রথম নও, শেষও নও, একমাত্র নও ; তারা আগে প্রেম করে থাকতে পারে, পরেও আবার করবে। কিন্তু এখন তো তোমাকে ভালোবাসবে, সেটাই যথেষ্ট, নয়কি ? মেয়ে দুটি সুন্দরীতমা নয়, নিখুঁত নয়, পাছা পর্যন্ত চুল নেই, ঢাউস বুক নেই -- তা তোমার শরীরেও তো কতো খুঁত আছে, মাসকুলার নও, একটু মোটা, চুল ঝাঁকড়া, রোজ স্নান করো না, পোশাক পালটাও না ; যাকে বাছবে, দুজনে মিলেও নিখুঁত হবে না বটে, তাতে কি ? তোমাকে হাসিখুশি রাখে যদি, যদি মেনে নেয় যে জীবনে ভুলভাল কাজ করে ফেলেছে, তোমাকে নতুনভাবে চিন্তা করতে শেখাবে, তোমাকে তার একটা অংশ দিতে গররাজি হবে না, যদিও তুমি হয়তো বিশ্বাস ভেঙে ফেলতে পারো, সেও তোমার সেই জিনিশটা ভেঙে ফেলতে পারে, আই মিন ইয়োর হার্ট। তুমি তাকে আঘাত দেবে না, সেও তোমাকে আঘাত দেবে না, তুমি তাকে পালটাতে চেষ্টা কোরো না, সেও তোমাকে পালটাতে চেষ্টা করবে না। তোমাকে আনন্দ দিলে হাসবে আর তাকেও আনন্দ দেবে। বুঝলে?”

    “প্রেমিকা ? পিচ্চি নিজেকে চুপচাপ বলল, ‘আমি তো প্রেম করতে চাই না, খুন করতে চাই, এমনভাবে খুন করতে চাই যে কেউই টের পাবে না। অ্যাডভোকেটকে শুনিয়ে বলল, আমি দুজনের সঙ্গেই, কনে আর কইন্যার, একসঙ্গে প্রেম করতে চাই, রাঁধুনিকে বলে দেব ওদের যার যা পছন্দ তেমন ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ আর ডিনার রাঁধতে।”

    “সেই দিন থেকে জীবন হয়ে উঠল ঘনঘোর কালো, কুচকুচে কালো, আকাশ কালো, বাতাস কালো, গাছপালা কালো, বৃষ্টি কালো, ফুলগুলো কালো, ঘরের আলোও কালো, জানালার বাইরে কেবল কালোয় কালো অথচ তা অন্ধকার নয়। প্রেমের অর্থ অন্ধকার নয়, প্রেমের মানে কালো সুরঙ্গে সেঁদোনো, হাতড়ানো। কালো যে কতো আকর্ষক তা দুজন তরুণী, কনে আর কইন্যা, শিখিয়ে দিল পিচ্চিকে, তার আগে পিচ্চি কোনো তরুণীর সামনে উলঙ্গ হয়নি।”

    “দুই কানে উড়ন্ত চুল আছে, তাই যেকোনো ছুতোয় গোরিলাদের প্রসঙ্গ এসে যায় পিচ্চির অছি অ্যাডভোকেট মশায়ের মগজে। বললেন, তোমার তো মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরে না, বুকের চুল লেজার দিয়ে কামিয়ে নিও। মেয়ে দুটি, কনে আর কইন্যা, তেমন প্রেমিকই চেয়েছে। তোমাদের বাড়িটা ওদের দুজনকে ভাড়া দিয়েছি, তুমি অনুমোদন করে দিও, ওই দুজনের মধ্যে একটি মেয়েকে তোমার প্রেমিকা হিসাবে চুজ কোরো, কনেকে বা কইন্যাকে। কে তোমার প্রেমিকা তা তোমাকে বুঝে নিতে হবে। দুই মেয়েরই মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরার মেরুক্ষমতাসম্পন্ন। ”

    “পিচ্চি বলল, জানি, আমি বলি কি, ব্যাপারটা বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্যে ঘটেছে ; মা-বাবাও বাড়ি ছেড়েছেন উষ্ণায়নের প্রভাবে, আমি উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে লড়ব কনে আর কইন্যা দুই প্রেমিকাকে দুই পাশে রেখে, ওদের কাঁধে হাত রেখে উড়ব, ওদের শিখিয়ে দেবো কেমন করে ড্র্যাগনদের ট্রেনিং দিতে হয়। ”

    “পিচ্চির অছি, অ্যাডভোকেটের পরামর্শে, নিচের তলাটা পার্টিশান করে কনে আর কইন্যাকে ভাড়া দিয়েছে পিচ্চি, সাজানো ঘরগুলো, সব আসবাবই আছে। কেননা ও যখন বাড়ির বাইরে থাকে তখন কাউকে তো থাকতে হবে, নয়তো যা চোর-ছ্যাঁচোড়ের আর পার্টিবাজির যুগ, বাবা-মায়ের স্মৃতিই চুরি করে নিয়ে চলে যাবে, রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারের মেডেলই চুরি হয়ে গেল, আর পাওয়া গেল না, চোরেদের পাওয়া গেল না, মেডেলও পাওয়া গেল না। ”

    “অছি অ্যাডভোকেটের দেখাদেখি পিচ্চিও দুটি মেয়েকে ফর্সা আধুনিকা কইন্যা আর কালো অধুনান্তিক কনেতে বর্গীকরণ করে ফেলেছে, তাদের গায়ের রঙ অনুযায়ী, যদিও কালো কনেই গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে নিজের মোটর গাড়ি রাখে ; একজন যুবতী চারজন বসবার জায়গায় করেটা কী। দুই তরুণীকে পিচ্চির বর্গীকরণ : কনে দক্ষিণ আমেরিকা আর কইন্যা উত্তর আমেরিকা। এই দুই তরুণী ওর প্রেমিকা হবে, সলিসিটর মশায়ের ঠোঁট-চেবানো প্রস্তাব। ফর্সা কইন্যা বলেছে ও এম এ পড়ছে, কালো কনে এম এস সি, ওদের দাবি তাইই, অ্যাডভোকেট মশায়ের তথ্য অনুযায়ী। দুজনেই সঙ্গে এনেছে দুটো করে ঢাউস সুটকেস, আর কিটব্যাগ। ”

    “পিচ্চি ভেবেছিল, যখন সত্যিকার কোনো সুন্দরী তরুণীর সঙ্গে আলাপ হবে, তাকে বলব, যে, যদি সে রাতটা আমার সঙ্গে কাটায়, তাহলে তাকে নিয়ে উপন্যাস লিখব। সলিসিটার বলেছিলেন যে এই ট্রিকটা কাজে দেয়, বিশেষ করে তার নামে যদি উপন্যাসের নামকরণ হয় ; তারপর মিষ্টি রাতটা কাটানো হয়ে গেলে, মেয়েটি টা-টা করে চলে গেলে, মনের মধ্যে একটা কষ্ট বাসা বাঁধবে, লিখতে বসে সেই কষ্টের কথা এসে যাবে, মেয়েটির কথা আসবে না। তাই তোমার এমন প্রেমিকা চাই যে টা-টা করবে না, বা করলেও তোমার সঞ্চয়ে একজন বিকল্প প্রেমিকা থাকবে। তা সত্বেও কষ্ট কমাবার জন্য তোমায় একটা-কিছু লিখে ফেলতে হবে, নয়তো তার স্মৃতি মগজ থেকে নামাতে পারবে না। কিন্তু সে তোমার স্মৃতিতে থেকে যাবে। তাকে মগজ থেকে মুছে ফেলার জন্যে হয়তো তাকেই খুন করতে হবে। পিচ্চি সে কথা মনে রেখে এই খাতায় নিজের স্মৃতি অন্য লোকের ডটপেন দিয়ে লিখে রাখছে। ”

    অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার রিমা খান আরেকটা সিগারেট ধরালেন, ধোঁয়া টেনে ওপরের দিকে ছাড়লেন, আর নোট নিলেন, মেয়েগুলোকে জেরা করে ভোমসো কোনো তথ্য পেয়েছে কিনা জানতে হবে ; হঠাৎই দুটি মেয়ে একা-একা একটা বাড়িতে থাকতে চলে এলো প্রেমিক পাবার স্বার্থে, নাকি ছোঁড়াটাকে বিয়ে করে সম্পত্তির মালকিন হবার গোপন ইচ্ছেতে। ছোঁড়াটা আগে সেক্স করেছে কিনা তার আভাস দেয়নি। যাক পড়তে থাকা যাক, ভাবলেন রিমা খান।

    “ফর্সা কইন্যা কালো কনের আগে এসে সংসার গুছিয়ে ফেলেছে ; কিনতে হয়নি কিছুই কেননা সবই তো মজুত, গুছিয়ে নেয়া মানে ওয়ার্ডরোবে স্কার্ট-টপ-লনজারি-শাড়ি-ব্লাউজ-বডিস-পুলওভার-সোয়েটারের রঙিন কাতার। খাবার জন্যে নিজেদের রাঁধতে হবে না, রাঁধুনিকে বললেই হল। ফর্সা কইন্যার একটা গোলাপি স্কুটি আছে, বাইরেই রাখে, গাছের তলায়। বেরোবার সময়ে সিটের ওপর থেকে পাখির গু সেই দিনের সংবাদপত্রের রাশিফলের পাতা দিয়ে পুঁছে নেয়। চুড়িদার বা শাড়ি নয়, চেরা স্কার্ট পরে, মিনি-মিডি-ম্যাক্সি, উরু দেখে ভাল্লাগে, ভাল্লাগাটাই বোধহয় প্রেম করার প্রথম ধাপ। যে তরুণীরা উরু-দেখানো পোশাক পরে তারা বিজ্ঞাপন কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে উরুতে তেল সাবান বেবিফুড শ্যাম্পু এইসবের প্রচার করতে পারে। ”

    “পিচ্চি ওর অছি অ্যাডভোকেটকে বলেছিল, থ্যাঙ্কস ফর ইয়োর মিসগাইডেন্স স্যার, আপনার কথা মতো লাইন মারামারি শুরু হয়েছে, কিন্তু আমি মারছি না কনে-কইন্যারা মারছে তা খোলশা হয়নি এখনও, তবে দুজনেই বেশ টানছে। ”

    “কালো কনে যেদিন নতুন গাড়ি এনে গ্যারেজে ঢোকালো, কালীঘাটে পুজো দিয়ে, ওয়াইপারে গ্যাঁদাফুলের মালা পরিয়ে, সেদিনকেও পিচ্চি অজ্ঞান হয়েছিল, যথারীতি ওর জন্মদিনে, বারান্দায় ওঠার মুখে মার্বেলপাথরের সিঁড়ির কাছে একটা স্যানিটারি ন্যাপকিন দেখে, তখনও টাটকা রক্ত লেগে। ”

    রিমা খান নোট নিলেন, স্কুটি আর মোটরগাড়ির রেজিস্ট্রেশান পার্টকুলার্স সংগ্রহ করতে বলবেন ভোমসোকে। হ্যাঁ, সত্যিই গাড়ি কেনার মতন টাকাকড়ি থাকতে, একা বসবাস করতে এলো কেন কনেটা ?

    “ফর্সা কইন্যা ওকে অজ্ঞান হতে দেখে হাতে-ধরা মিনারাল ওয়াটারের ছিটে দিয়ে জ্ঞান ফেরাতে, জিভে ঠোঁট বুলিয়ে পিচ্চি বলে উঠেছিল, এটা কী জিনিস, এতো রক্ত, কে ফেলে গেছে, কারোর অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে নাকি?”

    “পিচ্চির কথা শুনে, ওকে হাত ধরে টেনে তুলে ফর্সা কইন্যা বলল, ‘স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে গেছে মস্তিষ্কে চুন-সুরকি ভরা খণ্ডহর, বহুকাল থেকে, হিউম্যানিটিজের ছাত্ররা, যারা স্বাধীন চিন্তা করতে পারে, পড়াশুনোয় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, অনেকে ছেড়ে চলে গেছে, বলা যায় তাদের তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

    টিকে থাকার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাথায় হাওয়া-ভরা বোকা দার্শনিকদের সামনে মাথা হেঁট করে তাদের কথা আওড়ানো, নামও সব বিটকেল, দেরিদা, লাকাঁ, ফুকো, আর্নেস্তো লাক্লাউ, জিলে দেল্যুজ, স্লাভো জিজেক, লুই আলথুজার, হ্যানো-ত্যানো। আসলে, ব্যাপারটা হলো দর্শনশাস্ত্রের পীড়ন বা অত্যাচার। আমাদের দেশের অধ্যাপকগুলো ওদের গোবরগণেশ দর্শনের রথে চেপে কেরিয়ার গুছিয়ে নিচ্ছে। তোমারও সেই দশা, মেয়েদের যৌবনে পোঁছোনো সম্পর্কে না জেনে প্রেমিক হবার জন্য তৈরি হয়ে গেলে।”

    “পিচ্চি থ্যাঙ্কস দেবার হ্যাণ্ডশেকের জন্য ডান হাত বাড়িয়েছিল, কইন্যা, যার সারা শরীর যেন কাঁচা ঘুমে ডুবে কুয়াশায় ভরা, বলল, আজকাল কেউ ব্রিটিশদের মতন হ্যাণ্ডশেক করে না, এখন হাগিঙ করতে হয়, আমেরিকানদের মতন, বলে ওলেঙ্কা পিচ্চিকে জড়িয়ে হাগ করতে, পিচ্চি জিগ্যেস করলে, এই প্রথা কি প্রতিবার দেখা হলে করতে হয় ? তোমার গায়ের গন্ধ কিন্তু বেশ ফুলেল !”

    রিমা খান নিজেকে বললেন, ওঃ, মেয়েটা দেখছি এই সমস্ত নাম আউড়ে ছোঁড়াটাকে ইমপ্রেস করতে চাইছে ; এখন ইমপ্রেস করার এটাই চল, শরীরের ভঙ্গি আর জ্ঞানের লেঙ্গি।

    “কেউই এসব কথা বলে না, উচ্চারণ করে না, এটা পাগলাগারদের সভাঘর। কারোর হয়তো মাথার ঠিক নেই আবার কেউ এটাকে রোমান্টিক বলে মনে করে, রোমান্টিকরাও এক ধরণের পাগল, যাদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই আর যা চায় তাই করতে পারে। ”

    “পিচ্চি ফর্সা কইন্যার সামনে অবাক চাউনি মেলে বুঝিয়ে দিলে যে ও মেয়েটির কথা কিছুই বোঝেনি।”

    “তুমি ওই একোল মণ্ডিয়াল স্কুলে পড়েছিলে তো, নানা ব্যাপারে জ্ঞান হয়নি। একে বলে স্যানিটারি প্যাড বা ন্যাপকিন, মেয়েরা মাসে একবার ভ্যাজাইনায় বাঁধে, তাদের ওভুলেশান হয়, ডিম বাসি হয়ে গেলে তা রক্তের সঙ্গে বেরিয়ে যায়, ওই ডিম থেকেই তো ছেলেপুলে হয়, জানো না, এতো বয়স হতে চলল, ওই ডিমের সঙ্গে স্পার্মের প্রেম হলে গর্ভে ভ্রুণ তৈরি হয়, ফিটাস, ফিটাস। তোমার মরা স্পার্মও তো নাইটফলে বেরিয়ে যায়, যদি ম্যাস্টারবেট না করো। মেয়েদের ম্যাস্টারবেশনের সঙ্গে অবশ্য ডিম মরার সম্পর্ক নেই। বললে কইন্যা উত্তর আমেরিকা, দুই পা ফাঁক করে কোমরে হাত রেখে ; আমার ভ্যাজাইনা ওই কয়দিন বেশ রেগে থাকে, আদারওয়াইজ আমার ভ্যজাইনা বেশ খুশমেজাজী। ”

    “এতো রক্ত ? তাহলে তো প্রত্যেক মাসে হাসপাতালে গিয়ে ব্লাড নিতে হয় তাদের ? তোমাকেও নিতে হয় নিশ্চয়ই। তুমি তো আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়ো, স্কার্ট পরে থাকো, এখনই রক্ত বেরোনো আরম্ভ হয়ে গেছে? ফর্সা কইন্যার কথাগুলো শুনে পিচ্চির মগজে ঝড়ে গাছ পড়ার, বিতর্কে টেবিল চাপড়াবার, গাড়ির ব্রেক মারার তীক্ষ্ণ আওয়াজ, বরফের ওপর হাঁটার শিহরণ সব একসঙ্গে ঘটে গেল।

    “হ্যাঁ, বারো বছর বয়স থেকে হয়েছে। তোমার চেয়ে আমি বয়সে বেশ বড়ো, স্নাতকোত্তরে দর্শন পড়ি, আর অধ্যাপকদের অ্যাবিউজ করি। তুমি নাকি আমার প্রেমিক হবে বলে ধার্য করা হয়েছে, বেবি বয়? ওই দিকের কালো কৃষ্ণকলিও নাকি তোমার প্রেমিকা হবার জন্য ধার্য। ওই কালো মেয়ের বয়স কিন্তু আমার চেয়ে বেশি। ”

    “ বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য বোধহয়, তাড়াতাড়ি আরম্ভ হয়ে গেছে। তো মাঝরাস্তায় ফেলেছো কেন ?”

    “আরে বাড়ির মালিক খোকা, ওটা আমার ফেলা নয়, আমার পিরিয়ডের দেরি আছে । পিরিয়ডের রক্ত বেরিয়ে যায় বলে রক্ত নিতে হয় না, আপনা থেকেই রক্ত তৈরি হয়ে যায়, অনেককে অবশ্য আয়রন ট্যাবলেট খেতে হয়। তিন-চার দিন রক্ত বেরোয়, টানা। ওইটাই সেফ পিরিয়ড সেক্স করার। তুমি এখনও সেক্স করোনি, বুঝতে পারছি ?”

    “না, করিনি, পিচ্চি বলল, ভ্যাজাইনাই দেখিনি এখনও, ওই কালো কনের ভ্যাজাইনা বোধহয় খুশমাজেজী নয়, তাই রক্তমাখা প্যাডটা এখানে ফেলে গেছে।”

    “ ইনডিয়ান স্কুলে না পড়লে ছেলেরা যে মুকখু হয়, তা তোমাকে দেখে বুঝতে পারছি ; তোমরা শুধু শিট ফাক আসহোল মাদারফাকার বিগ-ও কান্ট ডিক পুসি সাকার লিকার প্রিক স্টিক-টু-আস এইসব বলতে শেখো, কোমরে হাত রাখাই আছে কইন্যার।”

    “মাসে এক লিটার রক্ত দেখতে হলে আমার আর সেক্স করা হবে না। রক্ত দেখলে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। পিচ্চি নিজেকে নিঃশব্দে বলল, অনেকটা কাশফুলের দোল খাবার মতন করে, কাউকে হত্যা না করলে রক্তের ভয় থেকে আমার মুক্তি নেই, নিজেকে রক্তের পুকুরে চুবিয়ে তবে হয়তো নিষ্কৃতি পাবো।”

    “সবচেয়ে ফালতুগুলোই এখানে, এই জগতে, এসে জুটেছে। ইচ্ছে করলেই তারা যে কাউকে মেরে ফেলতে পারে, মেরে ফেলার নির্দেশ দিতে পারে, তার জন্যে তাদের পাপবোধ হয় না, অপরাধবোধ নেই। নিজের কথা ছাড়া তারা আর কিছু ভাবে না, তাই অন্যের দুঃখকষ্টের কথা তাদের মাথায় ঢোকে না, পৃথিবীর রাস্তায় গলিতে রাজপথে মাঠে কাতরাবার জন্যে আধমরা করে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। মানুষ না খেতে পেয়ে মরলেও তাদের কিছু যায়-আসে না। মাথামোটা এইসব গাঁড়ল আঁড়ল চাঁড়ল ষাঁড়ল, বাঁড়লগুলোর জন্যে এই জগত ছাড়া আর অন্য জগত নেই, এটাকেই তারা শান্তি মনে করে, তারা ভাবে পাবলিক তাদের এইজন্যে পছন্দ করে, এমনকি ভালোবাসে। ”

    “জিভে ঠোঁট বুলিয়ে ফর্সা কইন্যা বলল, আমাকে পেতে হলে, আমি তোমাকে সম্পূর্ণ নেবো, ইন্সটলমেন্টে নয়, টপ টু বটম ইন ওয়ান পিস, আমি তোমাকে আমার ভেতরে অনুভব করতে চাই, আমার গভীরতার উষ্ণায়নে, তুমি বলো কবে কখন যাবো তোমার ঘরে, তোমার শ্বাসের সঙ্গে আমার শ্বাস মেশাবো, আমার নাম করে তুমি নদীর ঢেউ হয়ে উঠবে আর নামবে। রক্তের জন্যে ভয় পেও না। প্রত্যেকদিন রক্ত বেরোয় না, ওই কয়েকদিন বেরোয়, বেশ কষ্টকর সেই কয়েক দিন, মনে হয় যাকে পাই তার মাথায় মুগুর বসিয়ে দিই। তুমি অবশ্য বাড়ির মালিক, চুমু বসাবো, ঠোঁটের ওপরে দাঁত চেপে বলল কইন্যা। ”

    “তুমি এতোকিছু জানো, তুমি কি কোনো পলিঅ্যামোরাস গোষ্ঠীর মেম্বার ? আমার বাবা অমন একটা গোষ্ঠীতে যোগ দেবার জন্যে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছেন। এই দ্যাখো ওনার চিঠি “।

    “ইনটারেসটিং চিঠি, বলল ফর্সারানি, তারপর যোগ করল, যে জগতসংসার নিখুঁত, সেখানে বসবাস করে তুমি কাউকে নিজের হৃদয় না দিয়েও, ফাক করতে পারো। প্রত্যেকটা আঠালো চুমু আর মাংসে প্রতিবার ফোটানো নখের কাচের টুকরো, তোমাকে তোমার হৃদয় থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে, বেবি বয়, তাইই হল প্রেম, ভালোবাসা পিরীতি হোয়াটএভার। গোয়ায় রাশিয়ানদের আর হিমাচল প্রদেশে ইজরাইলিদের পলিঅ্যামোরাস গোষ্ঠীরা থাকে বলে শুনেছি, গোপন ডেরায় কান্ট-কক ফেসটিভাল করে। ”

    “পিচ্চি বলল, তাহলে, আমি বলি কি, যে রাতে ইচ্ছে চলে এসো, আমি ওই ওপরের মেজানাইন ফ্লোরের ঘরটায় থাকি, কালো কনেকেও বলব আসতে, তিনজনে মিলে পোশাক খুলে বাথটাবের জলে শুয়ে থাকব।”

    “ফর্সা কইন্যা ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে বললে, জানি, দেখেছি, ল্যাংটো হয়ে ঘোরাঘুরি করছ ; বডিটা ভালোই, লোভনীয়। কিন্তু তিনজন একসঙ্গে হলে গোলমাল হবে তো, কাড়াকাড়ি, টানাটানি, ধস্তাধস্তি। বোধহয় তুমি একটু গোলমেলে। তোমার মাও তো তোমাকে ছেড়ে পালিয়েছেন শুনেছি। এমন তো নয় যে তোমার জন্যই ওনারা চলে গেলেন, ছেলেপুলে হলে হাজারটা ঝামেলা, যাতে পোয়াতে না হয়, তাই পালিয়েছেন। ”

    “হতে পারে। একে রক্ত তায় আবার সেই রক্তের সঙ্গে আপোষ করে সেক্স। আমার দ্বারা কিছুই হবে না দেখছি। তারপর নিজেকে শুনিয়ে নিঃশব্দে বলল, উপায় ওই একটাই, কাউকে খুন করে তার রক্তে সাঁতার কাটা। ফর্সা কইন্যার অজন্তামার্কা চোখে চোখ রেখে পিচ্চি বলল, কিন্তু তোমার আর ওই কালো কনের ফিগার বেশ অ্যাট্র্যাক্টিভ, কোমর কতো সরু, কেমন করে বজায় রেখেছো, টিভির পর্দায় তো বাঙালি মেয়েদের দেখি বুক পেট পাছা সব একই মাপের। ”

    “ওরা দুবেলা ভাত-মাছ না খেয়ে থাকতে পারে না, ফাস্টফুড খায় স্টুডিওতে, পিৎজা, পাস্তা, ম্যাগি, বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ক্রাঞ্চি ট্র্যাফো, হুপার, ফ্রস্টি, কোলা এটসেটরা। তুমি তো হোমো হয়ে যেতে পারতে। পুরুষে-পুরুষে সেক্স। ”

    “অ্যাঃ, খালি গায়ে পুরুষদের সারা দেহে চুল দেখলে আমার বমি পায়, স্বপ্নে অবশ্য ওনাদের ব্যাকসাইড বেশ লোভনীয় মনে হয়, আঁড়ল গাঁড়ল চাঁড়ল ষাঁড়ল বাঁড়লদের ব্যাকসাইড সারা পৃথিবীতে একই রকম, লোভনীয়। কিন্তু ঘুম ভাঙলেই তারা শিম্পাঞ্জি, গোরিলা বা বেবুন। তুমি যাও না কোনো গোরিলার সঙ্গে সেক্স করতে। ”

    “ওফ, দারুণ হবে, নেয়ানডারথালের সঙ্গে সেক্স করে কতো গুহামানবী ওই কালো কনের মতন ফ্যামিলি পয়দা করেছে। ”

    “তুমি ওদের হিংসে করো ?”

    “ইউ মিন ঈর্ষা ? অনেককে অনেক কারণে ঈর্ষা করি, তা কি আর ছাই মনে থাকে ! তোমাকেই তো ঈর্ষা করি এই এতো বিশাল বাড়ির মালিক হবার কারণে। একদিন দেখেছিলুম কালো কনেকে তুমি লাইন মারছিলে ; মেয়েটা এমনভাবে হাঁটছিল যেন সারা শরীর থেকে লিবার্টি ইকুয়ালিটি ফ্র্যাটারনিটির সোনার গুঁড়ো ঝরে পড়ছে, যেন এক্ষুনি বেরিয়ে এসেছে ফরাসি বিপ্লব আর নভেম্বর বিপ্লবের খুনোখুনি সেরে।”

    “পিচ্চি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ওঃ, যদি থাকতে পারতুম ওই বিপ্লবগুলোতে ! শবের ওপর দিয়ে ঝাণ্ডা নিয়ে দৌড়োতুম, বিপ্লবের জয়গান গাইতে গাইতে, সবার জন্য স্বাধীনতা, স্বাধীনতা সাম্য শান্তি, স্বাধীনতা সাম্য ভ্রাতৃত্ব, সাম্য শৃঙ্খলা শান্তি । ”

    “ওকে শুনিয়ে ফর্সা কইন্যা বলছে, শুনতে পেল পিচ্চি, ওর দিকে পিঠ আর মুখ করে, যাতে পিচ্চি মেয়েটার পাছার ভাঁজ দেখে নির্ণয় নিতে পারে, কালোকে টানবে নাকি এই ধলাকে ? ফর্সা কইন্যা বলছিল, আমরা সবাই একা, সেক্স করার সময়েও একা, জন্মাই একা, মারা যাই একা, বুড়ো বয়সে দেখবে যে নানা মানুষের সঙ্গে মেলামেশা সত্ত্বেও, আমরা সারাদিন একা, তাই তো মানুষ নিজেকে শ্রদ্ধা করে, অন্যের হৃদয়ে ঢুকে একাকীত্ব শেষ করা যায় না, সেখানে আনন্দ খুঁজতে যাওয়া বোকামি।”

    “আমি বলি কি, কালো কনে সোনার গুঁড়ো ঝরায়নি, কলেজের নির্বাচনে ভোট দিয়ে ফিরছিল, পায়ে তাই নাচ লেগেছিল। ”

    “ফর্সা কইন্যা, জিভে ঠোঁট বুলিয়ে বলল, কলেজের নির্বাচন, ও তো আগে থাকতেই সদস্যরা নির্বাচিত, নির্বাচনের আগেই। এ তো একোল মণ্ডিয়াল নয়, দেশি কলেজে নতুন সদস্যদের অনেক হ্যাপা, মেয়ে সদস্য হলে যা হয় তা মেয়েরাই বলতে পারে, বেবি বয়। ”

    রিমা খান নোট নিলেন, এই ছোঁড়ার পরিবারে কেউ লেখক-টেখক ছিল কিনা তার খোঁজ নিতে বলতে হবে ভোমসোকে ; খাতায় রোজনামচার বদলে উপন্যাস লিখছে যেন। কিংবা রেকর্ড রাখছে কোনও কারণে। কিন্তু কারোর মার্ডারের এফ আই আর তো হয়নি ; হয়েছে তিনজনের উধাও হবার, পিচ্চি আর ওর মা-বাপের।

    “ভোট ? তোমার তো এখনও ভোট দেয়া হয়নি ? যাকগে, তোমার ঘরে চলো, তোমাকে আমার নেকেডনেস দেখাবো, তুমি দেখবে, তোমাকে আমি দেখাব যে সব সময়ে রক্ত বেরোয় না। তুমি যে গানগুলো বাজাও আমি তা গাইতে পারি। চলো, শোনাবো তোমাকে। দুজনে মিলে নাচাও যেতে পারে গানের তালে তালে। ”

    “পিচ্চির মনে পড়ল, অ্যাডভোকেট মশায় সাবধান করে দিয়েছেন, যেন ভাড়াটে কনে আর কইন্যা ওকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে না দেয় ; প্রেম আর প্রেমের জাল দুটো আলাদা ব্যাপার -- প্রেমের জাল মানে সেক্স করে প্রেগনেন্ট হয়ে সম্পত্তির দাবিদার হবার চেষ্টা। বাড়ির লোভে ফাঁসাতে পারে ; কালো কনেও একই প্রোপোজাল দিয়েছে। ফাঁসাকগে, নিজেকে নিঃশব্দে বলল পিচ্চি, দুজন একই সঙ্গে প্রেগন্যান্ট হলে সুবিধে।”

    “তুমি কি আমাকে তোমার প্রেমের জালে ফাঁসাতে চাইছ, জিগ্যেস করল পিচ্চি, কইন্যার চোখের দিকে কাছ থেকে তাকিয়ে। ফর্সা তখন মাথা ঘুরিয়ে পিচ্চির দিকে বুক এনেছে, কাছাকাছি। ”

    রিমা খান নোট নিলেন, এই তিনশো ষাট ডিগ্রি মাথা ঘোরাবার গল্পটা কেন ঢোকাচ্ছে বারবার, কোনো ইশারা দিতে চাইছে কি ছোঁড়াটা ?

    “হ্যাঁ, ধরে নাও চাইছি, স্কার্ট-ইজের পরা বউ আর তার ট্রাউজার-স্কুলশার্ট ইউনিফর্ম পরা স্বামী, বেশ মানাবে কিন্তু, তোমার টাকায় উদয়পুরের হোটেলে গিয়ে বিয়ের পার্টি দেয়া যাবে। ”

    “তোমার নাম কি, পিচ্চি জিগ্যেস করলো কইন্যাটিকে। ”

    “আমার নাম ওলেঙ্কা, জিভে ঠোঁট বুলিয়ে বলল কইন্যা, কোমরে দুই হাত রেখে, পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে। ”

    “কালো কনের নাম বিন্নি, বলে, পিচ্চি জিগ্যেস করল, আচ্ছা উলঙ্গ হবার কি কোনো রঙ হয় ? কালো বলে তার নগ্নতার রঙ কালো হবে এমন তো কোনো তর্ক হতে পারে না ! তোমার নেকেডনেসের রঙের সঙ্গে ওই কালো কনের নেকেডনেসের পার্থক্য হয়তো নেই। ”

    “তা ঠিক, বলল ওলেঙ্কা, নগ্নতার রঙ হয় না। যারা কখনও কোনো নগ্নদেহকে নিজের দেহ দিয়ে ঢাকেনি বা অন্যের দেহ দিয়ে নিজের নগ্নতাকে ঢাকেনি, তাদের কাছে নগ্নতার রঙ থাকতে পারে। ”

    “ওলেঙ্কা ? আরে, আমার বেডরুমের ভেতর দিয়ে ইকোল মণ্ডিয়ালে পৌঁছোবার যে রাস্তা আছে, তার শেষে যে বিশাল নদী, নদীতে নৌকো বাঁধা আছে, তাতে যে দুটো মেয়ে আমাকে ডাক দেয়, দেখতে উবহু তোমার আর বিন্নির মতন, তাদের নামও ওলেঙ্কা আর বিন্নি, কিন্তু তাদের দেশে মেয়েরা বুক খোলা রাখে। ”

    “পিচ্চি সত্যি কথাই বলেছে। আমি ওর পেছন-পেছন গিয়ে নিজের চোখে দেখেছি। আমি তো লেখক, লেখকের কাজ উন্মচিত করা কিংবা দেখা, তাই দেখতেই হয়েছে। লিখতে হলে সৎ হতে হয়, এমনকিছু লিখে ফেলতে হয় যা কেউ কখনও পড়বে না, নিজের জীবন সম্পর্কে যা ভাবছো তা কাউকে জানতে দেবে না, অন্যদের জীবনকে পড়তে হবে, তাদের ছাপা-জীবন নয়, সামনে থেকে দেখা জীবন, লিখে যেতে হবে যাহোক আবোল তাবোল, রোজ একটু, এক চিলতে যা কেউ কখনও জানবে না। আমি তাই সবায়ের দিকে নজর রাখি। নিজের চোখে দেখি আর লিখি। ”

    রিমা খান নোট নিয়ে রাখলেন, ভোমসোকে সঙ্গে নিয়ে পিচ্চির ঘরটা ইনভেসটিগেট করতে হবে আর পিচ্চি কেন একজন লেখকের কথা উল্লেখ করছে সেটাও রহস্য।

    “ জিভে ঠোট বুলিয়ে কইন্যা ওলেঙ্কা বলল, চলো তাহলে, যাওয়া যাক সেই দেশে, আমি বুক খুলে রাখব। স্নানের ঘরে আয়নার সামনে রোজ খুলি, আজ তোমার চোখের সামনে খুলে রাখব, দেখবো তোমার চোখের তারায় রিফলেকশান পড়ে কিনা। দেহের স্বাধীনতাবোধ হলো ভার্জিন যুবকের সামনে উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ানো, বা যুবকের পক্ষে ভার্জিন যুবতীর সামনে ল্যাঙটো হয়ে দাঁড়ানো, কোনোরকম প্রতিদানের আশা ছাড়াই, কোনো লাভের আনন্দ বা ক্ষতির আতঙ্ক ছাড়াই। তখনই স্বাধীনতা ভরে উঠবে কানায় কানায়, যাতে উপুড় করে ভরে দেয়া যায়, ভরে নেয়া যায়। ”

    “আমি তোমাকে, যখন তুমি বুক খুলে রাখবে, মা বলে ডাকব, বিন্নি এলে তাকেও মা বলে ডাকবো। তোমাদের তো দুধ নেই, তবু যা পাই তাইই খাবো, হাওয়া খাবো, পারফিউম খাবো, ঘামের নুন খাবো। ”

    “সেটাই তো হওয়া উচিত। তুমি যখন পোশাক পরে নেবে তখন তোমাকে বাবা বলে ডাকব, কেমন ? ওনাদের অ্যাবসেন্স এইভাবেই মিটুক। ”

    “ইয়েস, লেট দি সিনার্স টেক ওভার দি ওয়র্লড। ”

    “তাই হবে। জন্মে অবধি আমার ইচ্ছে করেছে পুরুষ হবার। তোমার বাবা ডাকে সেই আশ মিটিয়ে নেবো। ইনসেশচুয়াস সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলবো ; এটাই একমাত্র সাম্যবাদী সম্পর্ক, অ্যাডাম আর ইভের সম্পর্ক। ”

    “ জিভে ঠোঁট বুলিয়ে কইন্যা ওলেঙ্কা বলল, এই দ্যাখো, আমার কব্জিতে এই কাটার দাগ, আমি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলাম একবার, লাইফ বড়ো বোরিঙ হয়ে গিয়েছিল। আমার ধারণা ছিল না যে বাবার ক্ষুর কব্জির ওপরে চালিয়ে জীবনের ধারাটাই বদলে যাবে, বাড়ির লোকেরা সবাই আমাকে ভালোবাসবে, প্রতিবেশিরা দেখা হলে মুচকি হেসে জানতে চাইবে কেমন আছি। তারপরেও তো দিব্বি বেঁচে আছি, বেঁচে থাকতে মজা লাগছে, ভাগ্যিস কব্জিটা কেটেছিলাম। এইভাবে তুমি নিজের ভেতরের চাপ বের করে দিতে পারো, তুমি নিজেকে পালটে ফেলতে পারবে, এই যেমন এখন আমি ভালো দেখতে যুবকের সঙ্গে এক রাতের জন্য শুতে ইতস্তত করি না, নিজের মুড তো নিজেই গড়ছি, হেলাফেলায় যৌবনটা কাটিয়ে ফেলতে হবে, বুঝলে, বেবি বয় !”

    “আমি বলি কি, বেবি বয়, কেন ?”

    “তোমার কানে তো ছ্যাঁদা রয়েছে, দাঁড়াও, আমার টপ দুটো তোমার কানে পরিয়ে দিই, তাহলে ম্যাচো মনে হবে”। ওলেঙ্কা নিজের কান থেকে খুলে স্ফটিকের টপ দুটো পরিয়ে দিল পিচ্চিকে। কাছাকাছি আসার দরুন, ওলেঙ্কার শ্বাসের গন্ধে পিচ্চির লিঙ্গ দাঁড়িয়ে পড়েছিল আর বিঁধছিল ওলেঙ্কার উরুতে। ওলেঙ্কা উরু সরিয়ে বলল, “দাড়াও, সবুর করো, সবুরে মেওয়া ফলে। ”

    “পিচ্চির কানে টপ দুটো পরিয়ে দিয়ে কইন্যা ওলেঙ্কা পিচ্চিকে ঘিরে নাচতে আরম্ভ করল, আর গাইতে লাগল। পিচ্চিও কইন্যা ওলেঙ্কার হাত ধরে ওর গানের তালে হেড ব্যাং করে নাচতে লাগল। মেয়েটা বেশ চটচটে, ঝুরঝুরে, ফুলকো, তুলোট, শিরশিরে, ভুরভুরে, চুলবুলে।


     

    অনেক ভাগ্যের ফলে চাঁদ কেউ দেখিতে পায়।

    অমাবস্যা নেই সে চাঁদে দ্বিদলে তার বারাম উদয়।।

    যেথা রে সে চন্দ্র-ভুবন

    দিবারাত্রি নাই আলাপন

    কোটি চন্দ্র জিনি কিরণ

    বিজলি চঞ্চলা সদায়।।

    বিন্দুনালে সিন্ধু-বারি

    মাঝখানে তার স্বর্ণগিরি

    অধর চাঁদের স্বর্গপুরী

    সেহি তো তিনি প্রমাণ জায়গায়।।

    দরশনে দুঃখ হরে

    পরশনে সোনা করে

    এমনি মহিমা সে চাঁদের

    লালন ডুবে ডোবে না তায়।।


     

    রিমা খান নোট নিয়ে রাখলেন, এই ওলেঙ্কা আর বিন্নি কইন্যা-কনে দুটোকে জেরা করে ওদের চরিত্র বুঝতে হবে, সমাজ পারমিসিভ হয়ে গেছে বটে, হরমোনের ট্যাবলেট আর প্রেগনেন্সি কিট বাজারে আসার দরুণ মেয়েরা নিজের বডি সম্পর্কে নির্ণয় নিচ্ছে, কিন্তু এই মেয়েটা তো বড়োই সাহসী, নাকি পিচ্চি নামে ছোঁড়াটার গাঁজাখুরি কল্পনা ! পলিঅ্যামোরাস গোষ্ঠীর খোঁজে পিচ্চি গোয়া কিংবা হিমাচল প্রদেশে বাপের সন্ধানে চলে গিয়ে থাকতে পারে, ভোমসোকে বলতে হবে ওই দুই রাজ্যে পিচ্চির ফোটো পাঠিয়ে খোঁজ নিতে বলতে হবে পুলিশ বিভাগকে। রিমা খান এবার তিন নম্বর খাতা পড়া আরম্ভ করলেন।


     

    “বাবার অঢেল টাকার মালিক আজ পিচ্চি। গার্জেন আছেন, অছি, বাবা ওনার টেঁটিয়া বন্ধু অ্যাডভোকেটকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে পিচ্চির টঙে বসিয়েছেন। গার্জেন রবিঠাকুরের গানের ভক্ত, দাড়ি গোঁফ আলখাল্লা রবিঠাকুরের, গলার আওয়াজও, শুধু চশমাটা গান্ধির। পিচ্চি জানে উনি বিয়ে করে অপগণ্ড অশিক্ষিত ছেলে পয়দা করেছেন, তারা কোনো কাজের নয় ; বউ মরে যাবার পর বিয়েও করেননি, করলেই পারতেন, আদালতের কচি এক মেয়ে-উকিল তো ওনার অ্যাসিস্ট্যাণ্ট। বেচারা অ্যাডভোকেট মন খারাপ হলে রেড লাইট এরিয়ায় গিয়ে মৌজমস্তি করেন ; অনেক সময়ে বড়ো ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে যান, তার যাতে খুঁতখুঁতুনি রোগ না হয়, মেজ না সেজ একটা ছেলের তো স্কিৎসোফ্রেনিয়া ; ওই অপগণ্ডদের জন্য বিয়ের কনে পাওয়াও কঠিন, একবার একজন কাজের মেয়েকে বড়ো ছেলের বউ হবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সে কাজ ছেড়ে যাবার সময়ে গাছকোমর বেঁধে থুতনি তুলে বলে গিয়েছিল, ‘বিছানার লগে পাত্রী খুজতেসেন তো, আগে পোলারে চাকরি করানোর লগে পাঠান, পরে বিছানায় তুইল্যা কাজের মেয়ের শশুর হয়েন।”

    “পিচ্চি অ্যাডভোকেটের কথা দুবার কিংবা তিনবার শোনার আগে চোখ কুঁচকে বলে ওঠে, আজ্ঞে, আমি বলি কি, কী বললেন, আরেকবার শুনতে পেলে ভালো হয়। ”

    “পিচ্চিকে অন্য শহরে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ডুপলিকেট রবীন্দ্রনাথ, মানে পিচ্চির অছিবাবু। সম্ভবত যাতে ওনার সামনেই পিচ্চির ভাঙা গলা গমগমে না হয়ে ওঠে, বুকে-গোঁফে চুল দেখার আগেই, দেরাদুন, মুসৌরি, দার্জিলিঙ, আজমের, পিলানি, কোথাও বোর্ডিঙ কলেজে । বাড়ুক সেখানে। ”

    “পিচ্চির ঘরের ভেতর দিয়ে জঙ্গল পেরিয়ে নদীর পারের স্কুলের কথা জানেন না অ্যাডভোকেট মশায় ; পিচ্চি জানায়নি ওনাকে ; জানালে উনি নির্ঘাত সঙ্গে যেতে চাইবেন। ”

    “ পিচ্চির মাথায় কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল, সেলুনের নাপিতদের কাটতে বেশ অসুবিধা হয়, তাই ও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের চুল ছাঁটে। ”

    “রবিঠাকুরের একটা গান শোন, বলে, রবিঠাকুরীয় গলায় রামধুনের সুরে গেয়ে ওঠেন অ্যাডভোকেট। পিচ্চি শোনে খোনাকন্ঠী গান।”

    “টেবিলের উল্টোদিকে এক মক্কেল মুণ্ডু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বসে-বসে হাই তুলছিল, হাই মাঝখানে থামিয়ে বলে উঠল, ‘রবিঠাকুরের গানে তাড়ি আনলেন কোথ্থেকে ?’ এগান রবিবাবুর নয়, বোধ হয় কোনো আধুনিক কবির, কিংবা আপনার ছেলেদের কারোর, ওরা শুনলুম তাড়ি ধরেছে। ”

    “তুমি যদি জানতে পারো যে কী ঘটতে চলেছে, যদি জেনে যাও নিকট ভবিষ্যতে পরপর কী ঘটবে, তোমার কৃতকর্মের ফল যদি জেনে যাও, তাহলেই ভরাডুবি। তুমি হয়ে যাবে শিবের মতন চিৎ, খড় বেরিয়ে আসবে ভাসানের পর, কালীঠাকুরের পা তখন ভেসে সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। তোমার খাওয়া দাওয়া সব বন্ধ হয়ে যাবে, হাসাহাসি মুখ থেকে মিলিয়ে যাবে, কাউকে কখনও নিজের করে নিতে পারবে না, তা সে ওলেঙ্কা হোক বা বিন্নি বা কইন্যা-কনে দুজনেই। ”

    “অ্যাডভোকেটের কেরানি বললে, ‘স্যার আমার মনে হয়, আধুনিক সরকারি কোনো কবির, গান লিখতেন কিনা জানি না, নামটা আজকাল প্রায়ই ছেলে-ছোকরাদের মুখে শুনি কিনা; ওই যে ছোকরাগুলো দাড়ি-গোঁফ রাখে, চোখে পিচুটি, কাঁধে ঝোলা, দাঁত মাজে না, ল্যাটিন কোয়ার্টারে গিয়ে দিশি মদ খায়। ”

    “মক্কেল আদালতে মামলা লড়ছে, হারতে রাজি নয়, বললে, ‘তাহলে সেই কবি, যিনি গাছপালা নদীটদি নিয়ে লিখে গেছেন, হয়তো ছন্দের খাতিরে তাড়ি এসে গেছে।”

    “অ্যাডভোকেটের ফাইনাল নির্ণয়, ‘রবিঠাকুরের গানের সুরে গাওয়া যেকোনো গানই রবীন্দ্রসঙ্গীত। কোনো দাড়ি-গোঁফ ছেলে-ছোকরার লেখা হলেও ক্ষতি নেই ; আমার মেজ ছেলের দাড়ি আছে।’”

    “পিচ্চি বিরক্ত, হেড ব্যাং করছিল, বললে, ‘আমি বলি কি, নিজে একটা গ্র্যাজুয়েট হবার সংস্হায় ভর্তি হয়ে যাবো। ”

    “পিচ্চি জানে, রবীন্দ্রনাথ আঁকা পশ্চিমবঙ্গের উইখাওয়া মানচিত্র আঁকার চেয়ে সহজ, চুলের গোছা পেলেই হল। গান শুনে পিচ্চিও মাথা নাড়ায়, তবে রবিঠাকুরের নয়, মগজে বাজতে-থাকা মেটালগান, হেভিমেটাল, ডেথমেটাল, হোয়াইট মেটাল, জোম্বি, গোজিরা। সেই মাথা নাড়ানোকে বলে হেড ব্যাং, মাথার ভেতরে যে ব্যাঙগুলো থাকে তারা বর্ষাকাল এসে গেছে মনে করে নাচে। ”

    “টয়লেটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ল্যাংটো পোঁদে হেড ব্যাং করে পিচ্চি, যখনই ঢোকে “।

    “অ্যাডভোকেট গান্ধিছাপ চশমা টেবিলের ওপর থেকে তুলে অপ্রস্তুত কাশি কেশে নিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন, ঠোঁট চেবাতে-চেবাতে, তোমাকে একোল মণ্ডিয়াল স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়েছিল। দিশি স্কুলে তোমার বখে যাবার চান্স ছিল। এখন বলো, কোন মেয়েটাকে তোমার ভালো লাগছে, কইন্যাকে না কনেকে ? দুজনকেই নিশ্চয়ই ? তা তুমি দুজনের সঙ্গেই সম্পর্ক চালিয়ে যাও, দুজনকেই খেপে-খেপে ভালোবাসতে থাকো, ওয়ান অ্যাট এ টাইম অর বোথ টুগেদার অ্যাট দি সেম টাইম, বাসতে-বাসতে জানতে পারবে কাকে ভালোবাসা বলে, আমি তাই আইডিয়াল বডির ভাড়াটে সেলেক্ট করেছি তোমার জন্যে, নইলে তো দুটো ছোঁড়াকেও ভাড়া দেয়া যেতে পারতো। ”

    “শুনতে বিদকুটে মনে হলেও, বিপ্লবী হতে হলে প্রেমিকের রসে বুক আর অণ্ডকোষ ভরা থাকা উচিত, এই দুটো বৈশিষ্ট্য ছাড়া আসল বিপ্লবী হতে পারবে না। প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে ধ্রুবসত্য লুকিয়ে থাকে, তা বাজে হোক বা ভালো। পরিস্হিতি যতোই জটিল হোক না কেন, বাইরে থেকে লোকে তোমাকে যেভাবে ইচ্ছে যাচাই করুক না কেন, সত্যের গভীরতা এক ইঞ্চি হোক বা ডিপ টিউবওয়েলের মতন অনেক তলায়, একবার যদি হৃদয়ের ভাঙা টুকরোগুলো সেলাই করে নাও, দেখবে যে প্রথম সঙ্গমের ধাতুরসের ফোয়ারার মতন সত্যের ঝর্ণায় তুমি স্নান করছ। জীবনে সবচেয়ে আনন্দদায়ক ভাবনা হলো যে, কেউ তোমাকে ভালোবাসছে। নিজেকে ভালোবাসো, বুঝতে পারবে কাকে বলে ভালোবাসা। ”

    “ পিচ্চি বলল, চেষ্টা করছি, আধুনিক যুগের বাঙালিসমাজে বিশ্বরেকর্ড করার জন্য, ফ্রক-ইজের পরা ব্রাইড আর হাফপ্যান্ট-স্কুলড্রেস পরা গ্রুম। উদয়পুরের হোটেলে গ্র্যাণ্ড পার্টি। নয়তো লেহেঙ্গা-শাড়িতে কালো বিন্নি আর আমি লালধুতি-সবুজ পাঞ্জাবিতে, কোনো হোমস্টেতে, পাহাড়ি গ্রামে। কিন্তু কোনো মন্তর বা পুরুতের ব্যাপার থাকবে না, জাস্ট ফুলশয্যা, মানে জাস্ট শয্যা, শয্যাটাই আসল।”

    “আরে বিয়ে করতে হবে না, দুজনের সঙ্গে লিভ টুগেদার করো, বললেন অ্যাডভোকেট।”

    “জানি, আপনাকে বলতে হবে না।”

    “বই পড়ে-পড়ে, আর বাবা মা দুজনেরই চোখ খারাপ ছিল বলে পিচ্চিরও চার বছর বয়স থেকে চশমা পরতে হচ্ছে, যদিও চোখের ডাক্তার বলেছেন যে কয়েক বছরে ওর চোখের দৃষ্টি ঠিক হয়ে যাবে, তবে ও যেন নাকের ডগায় বই ঠেকিয়ে পড়ার অভ্যাস ছাড়ে, ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক, হিসট্রি চ্যানেল ও অ্যানিমাল প্ল্যানেট যেন রাত জেগে ঘর অন্ধকার করে না দ্যাখে ; পিচ্চি দিনের বেলায় অন্যের সামনে চশমা পরে না। ’

    “জ্ঞানই ক্ষমতার উৎস, খারাপ কাজ করার ক্ষমতা ; পিচ্চি জানে, ম্যাস্টারবেশন করে জেনেছে, ওর গা থেকে সেই সময়ে এক রকমের গন্ধ বেরোয়, ক্ষমতার গন্ধ, মানুষের দেহের গন্ধ নয়, অতিমানবের গন্ধ, রাক্ষসের বা দানবের বা দেবতাদের শরীরের সুগন্ধ, তা এমনই শুভ আর জৈব যে, তার কাছাকাছি হলে যে কোনো তরুণী সেই গন্ধে মোহিত হয়ে ওকে ভালোবাসতে বাধ্য হবে। ’

    “অ্যাডভোকেট বললেন, মেয়ে দুটোকে পাশে বসিয়ে ট্রিপল এক্স অ্যাডাল্ট ফিল্মও দেখতে পারো তোমার কমপিউটারে, তবে তোমার মতন বয়সে বোধহয় শরীরে সাড়া জাগে না আমাদের দিনকালের মতন, তখন কম বয়সে বিয়ে হতো, সাড়া জাগতো। অ্যাডাল্ট হও, তখন নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করতে পারবে, অ্যাডাল্ট লাইফ লিড করতে পারবে। এখন যদি কিছু করি অবশ্যই প্রিকশান নেবে। কনে আর কইন্যাকেও বলে দিয়েছি প্রিকশান নিতে, ওরা অবশ্য তা জানে, কলেজ ইউনিয়ানের সদস্য হতে হলে প্রিকশান নেয়া শিখতে হয়। ”

    “স্যার আমি বলি কি, বেশ কিছুকাল ম্যাস্টারবেট করি, তার আগে নাইটফল হতো, স্বপ্নে পলিটিশিয়ানদের পোঁদ দেখতুম আর কিছু করার আগেই নাইটফল হতো, হয় এখনও, পিচ্চি বলল অ্যাডভোকেটকে। শুনে উনি অবাক হলেন না, কেননা এই উত্তরটাই চাইছিলেন। পিচ্চি বলল, এখন আমার বয়স আঠারো, রাইপ ফর অ্যাডভেঞ্চার্স, আপনি তো রেড লাইট এরিয়ায় যান নাইট শিফ্ট করতে, বড়ো ছেলেকে নিয়ে, আমাকেও নিয়ে চলুন একদিন, আই মিন একরাতে। ”

    “অ্যাডভোকেটকে পিচ্চি মিস্টার মউসিয়ান বলে ডাকতো, ওনার গান গাইবার দোষ আর ইরানি উঁচু নাকের কারণে তো বটেই, আর ছেলের সঙ্গে রেড লাইট এরিয়া ভিজিটের কারণে ; কিন্তু বাবা উধাও হবার পর ওই নামটা আর ব্যবহার করে না। তবে পিচ্চি ভাবে যে ওনার নাক ইরানি অথচ ওনার ছেলেদের নাক মোঙ্গোলিয়ান কেন । ”

    “নিশ্চয়ই নিয়ে যাবো, ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট চিবিয়ে বললেন অ্যাডভোকেট, তার আগে কনে আর কইন্যার কাছে ট্রেনিঙ নিয়ে নাও।”

    “যখন কোনো লোক তোমার সঙ্গে কথা বলার সময়ে চোখের দিকে সরাসরি তাকায়, তার মানে তোমার কথাবার্তায় তার আগ্রহ আছে। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকলে তা ভয় দেখানোর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু চোখ সরিয়ে নিলে, অনবরত অন্য দিকে তাকাতে থাকলে বুঝতে হবে লোকটার তোমার প্রতি আগ্রহ নেই কিংবা বিব্রত বোধ করছে কিংবা নিজের আসল অনুভূতি লুকোতে চাইছে। ”

    “লাল রঙের টিশার্ট পরতে পিচ্চির ভালো লাগে, বুকে চে গ্বেভারার মুখ, আর গাঢ় নীল রঙের প্যান্ট, ও জানে, এই রঙে ভিড়ের ভেতরেও বাবা ওকে খুঁজে বের করতে পারতেন। ”

    “বুঝতে পারছেন তো ! আমরা সব্বাই পলাতক, কোথা থেকে পালাচ্ছি তা নিজেরা জানি না, কিংবা জানি যে নানা কারণে পালাচ্ছি, একে আরেকের সঙ্গে ধাক্কা লাগছে, তাকে ঠেলে এগিয়ে চলেছি, কোথায় তা জানি না, যে আরাম নিজের বাইরের জগত থেকে পাই, যে ক্ষমতা যোগাড় করি, নিজের জন্যেই করি, সব ক্ষমতাই নিজের জন্যে, কিন্তু অমন ক্ষমতাবোধও ফালতু, কেননা অমন ক্ষমতা থেকে লোকে নিজেকে খারাপ করে তুলেও তা জানতে পারে না। সব্বাই এই ক্ষমতাটাই চায়। খারাপ হবার আর অন্যের ক্ষতি করার ক্ষমতা। ”

    “পিচ্চির শাদা প্রাসাদবাড়িতে ওর নিজের আলাদা কয়েকটা ঘর আছে, তাতে গ্যাজেট আর বই বেশি। বাবা বিদেশে গেলেই বই আর সিডি কিনে আনতেন। পিচ্চির দাদুও জার্মানি থেকে অনেক বই আর সিডি পাঠাতেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের। এখন পুরো দোতলা পিচ্চির, ওর ভাল্লাগে না, গ্যারাজের ওপরের ঘরই ভালো । কইন্যা ওলেঙ্কা আর কনে বিন্নি সঙ্গে থাকলে তিনজনে মিলে হেড ব্যাং করে পুরো দোতলা একশো ডেসিবালে ফাটিয়ে দিতে পারবে।”

    “পিচ্চির বাবা মিউজিয়ামের কিউরেটর ছিলেন, মানে জাদুঘরের তত্বাবধায়ক, জাদুঘরে উনি সকলের ওপরে, জাদুঘরের দেখাশোনার ভার ওনাকে দিয়েছিল সরকার। বেশি পড়াশুনা করে ফেলে তাকে কাজে লাগাবার চাকরি, টাইম পাস, দাদু বারণ করেছিলেন, তবুও। তাহলে কি মিউজিয়ামই ওনাকে প্রাগৈতিহাসিক জীবনে ফিরে যাবার ডাক দিয়েছে ? হয়তো আফ্রিকায় বা লাতিন আমেরিকায় গিয়ে গুহামানবের পলিঅ্যামোরাস জীবন কাটাচ্ছেন।”

    “অ্যাডভোকেট মশায় বলেছিলেন একদিন, গান্ধিছাপ চশমা টেবিলের ওপরে রেখে, ঠোঁট চেবাতে-চেবাতে, মানুষমাত্রেই ফিরে যেতে চায় গুহার জীবনে, স্বাধীনতায়, স্বেচ্ছাচারিতায়, তাই তো অ্যাটম বোমা নামের আগুন আবিষ্কার, নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড নামের চাকা আবিষ্কার, ডিজিটাল টেকনোলজি নামের অক্ষর আবিষ্কার, পলিঅ্যামোরাস নামের গুহাসেক্স এসেছে, আমিও ফিরে যেতে চাইছি আফ্রিকার প্রাগৈতিহাসিক জীবনে, কিন্তু ছেলেগুলোই লায়াবিলিটি হয়ে দাঁড়িয়েছে, লোকে বলে ভাগ্যবানের বউ মরে, কিন্তু আমার বউ মারা যাওয়া সত্বেও ভাগ্যবান হতে পারলুম না।”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা আর কনে বিন্নিকে হাসাতে ভালো লাগে পিচ্চির ; ওরা যখন হাসে পিচ্চি ওদের বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে, দুজনের কারোর বুকই নাচে না। যখন পিচ্চির ঘরে গিয়ে ডেথমেটালের তালে নাচে, তখন ওদের বুকও নাচে, তার কারণ ওরা দুজনে পোশাক খুলে পিচ্চির সঙ্গে নাচে। ওরা যে আগে থাকতেই নাচ জানে, ডিসকো-ফিসকোয় গিয়ে নাচানাচি করেছে তা বুঝে ফেলেছে পিচ্চি। তিনজনে মিলে শাওয়ারের তলায় নাচে।”

    “বিন্নি বলছিল, ঠোঁটের ওপর বাঁহাত চাপা দিয়ে, ওফ তোমার নাচ দেখে এতো হাসি পায় যে গিগলিঙ ছাড়া আর কিছু করতে পারি না, কেননা তোমার ফ্যামিলি জিউয়েলও গিগল করতে থাকে নাচের সঙ্গে, যেন আমাদের দুজনকে সেলাম করছে, আমি তো হাসতে হাসতে আইসক্রিমের মতন গলে গলে ভিজে যেতে থাকি। বিন্নি মেয়েটা বেশ স্বাদু, ভেষজ, আঙটাখোলা, নাগালকাতর, মিঠুমিঠু, দোলমেজাজী, শরবতীয়া, ঝিনুকখোলা, হৃষ্টবদন। ”

    “আমিও ভিজে যাই, বুকের ওপরে দুই হাত ক্রস করে, জিভে ঠোঁট বুলিয়ে বলেছিল ওলেঙ্কা। “


     

    ভোমসোকে ওর থানায় ফোন করে এসিপি রিমা খান বললেন, ভোমসো, তুমি এই মেয়ে দুটোর পেছনে শ্যাডো লাগিয়ে খোঁজখবর নাও, এরা ছাত্রী নয় বলে মনে হয়, পিচ্চির খাতা পড়ে এটা আমাকেও স্ট্রাইক করল যে দুজনের বডি মডেলদের মতন বালিঘড়ি টাইপ কেন, আটপৌরে বাঙালি মেয়েদের মতন ঢেপসি নয় তো।

    ভোমসো বলল, খোঁজ নিয়েছি ম্যাডাম, সরি, স্যার, ওদের গাড়ি আর স্কুটি নিজেদের নামেই। তবু, আমার মনে হয় ওদের নাম ওলেঙ্কা আর বিন্নি নয়। ওরা কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় না। সম্ভবত ওরা মিস ইণ্ডিয়া প্রতিযোগীতায় যোগ দিয়ে মডেল হবার জন্য শহরে এসেছিল, তারপর যা হয়, বিজ্ঞাপন বা অ্যাসাইনমেন্ট না পেয়ে ডেটিং র‌্যাকেটে ঢুকুছে, যদিও হানড্রেড পারসেন্ট শিয়োর নই।

    রিমা খান নির্দেশ দিলেন, তুমি মোটর গাড়িটার ভেতরে কোনো ক্লু পাও কিনা দেখো, হয়তো গাড়িটা সেক্সুয়াল ফুর্তিফার্তার কাজে লাগানো হয়। কিন্তু কেনই বা দুটো মডেলকে ভাড়াটে হিসাবে আনবে অ্যাডভোকেট লোকটা। ওই লোকটার পেছনেও শ্যাডো লাগিও।

    ভোমসো বলল, স্যার, মোটরগাড়িতে আমাদের ডগ স্কোয়াডের মিলি কোনো ক্লু পায়নি, মানে পিচ্চি তাতে কখনও বেড়াতে বেরোয়নি বলেই মনে হয়, ড্রাগের ট্রেসও পায়নি। পিচ্চি লোপাট হবার পর মেয়ে দুটোকে দেখে মনে হয় বেশ ভেঙে পড়েছে। ওরা গাইনাকের কাছেও গিয়েছিল, জানি না রোগ-টোগ আছে কিনা, আমি গাইনাকের ফোন নম্বর দেবো, আপনি একটু খোঁজ নেবেন, আপনার নাম শুনে তথ্য দিতে ইতস্তত করবেন না বলেই মনে হয়।

    রিমা খান বললেন ওদের মোবাইলের সিডিআর যোগাড় করে দেখতে হবে কাদের সঙ্গে ওদের যোগাযোগ আছে।

    হ্যাঁ, স্যার, তাই করব, বলল ভোমসো। কিন্তু ওরা মোবাইল ব্যবহার করে কিনা ঠিক জানি না, মালি আর দারোয়ান ওদের মোবাইল ব্যবহার করতে দেখেনি, পিচ্চি থাকতে ল্যাণ্ড-লাইন ব্যবহার করত। আর স্যার, পিচ্চির ব্যাঙ্কের লকার ভাঙতে হয়েছিল ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ নিয়ে, তাতে ওর বাবা-মায়ের চিঠি তো পাওয়া যায়নি, যেদুটো চিঠি পাওয়া গেছে আপনাকে ইমেল করে পাঠিয়েছি, ল্যাপটপে পড়ে দেখে যদি নির্দেশ দেন তো সেই পথে এগোই, আমি তো কোনো পথ দেখতে পাচ্ছি না।

    এসিপি রিমা খান ল্যাপটপ খুলে চিঠি পড়া আরম্ভ করলেন, কেমন যেন আগেকার দিনকালের ভাষা-মাখানো চিঠিটা:

    স্নেহের সুহৃদপপতিম,

    গত রবিবারে তুমি লাতিন কোয়ার্টারে শুনিলাম আসিয়াছিলে। আশ্চর্য সেই দিনটিতেই বহু কাল পরে আমার কামাই হইল। ইহাতে আমি খুবই কষ্ট পাইয়াছি। তুমি অনেককাল পর অথচ আসিলে ইহাকেই বলে কপাল ! কবে আবার তুমি আসিতে পারিবে জানাইও

    ইদানিং কালে কাহারও সহিত বড় একটা দেখা হয় না, তাহার মধ্যে একজনকে মিস করা বড় কষ্টের। ইতিমধ্যে একদিন লর্ড চ্যাটার্লির সহিত সাক্ষাৎ হয়, সে তাহার নব-প্রকাশিত পঞ্জিকা আমাকে দিল -- এইটি তোমার বই। আমি তাহাকে বলিলাম সুহৃদপ্রতিম এইসব কি লেখে, জেনো, পাঠক হিসাবে আমরা বলিতে পারি। তখন সে আমায়-আমাদের ( কেননা সেখানে মসিয়ঁ লাহিড়ি ও অন্যান্য ) তোমার প্রগতি পরায়ণতা বিষয়ক অনেক কথা বলিল একথা আমি কহিলাম ( আমাদের ঝাড়া ৩ -৪৫ হইতে ৭ -৩০ অবধি কোন কথা কহিতে দেয় নাই ) -- দেখ, দারিদ্র্য দুঃখ উচ্চবর্ণেরা মনে রাখে -- আর নিম্নরা ভোগে -- আর কবিতা পদ্য লেখাই একটা বিদ্রোহ -- আবার তাহার বিষয় রূপে এইসব হইবে এ আমার মোটা বুদ্ধিতে মনে হয় না ! সে তখন বহু বিষয়ে আমাদের তত্ত্ব ( তথ্য না ) বলিতে লাগিল আমরা খুবই আকর্ষিত হই ( আকৃষ্ট নহে ) মাঝে-মাঝে ( অবশ্য এখন ) মনে হইতেছিল -- হয়ত তাহার চমৎকার কন্ঠস্বরই আমাদের ভাল লাগিতেছিল। ইহাও ধ্রুব তাহার দৃষ্টিভঙ্গী যারপরনাই তীক্ষ্ণ ! তবে সে দেখিলাম আর কথা সূত্রে বড় বেশী পারসিকিউশনে ভুগিতেছে -- জানি না, ইহা তাহার লেখার বিষয়ও হইতে পারে।

    যাহা হউক এখন তোমার দিনক্ষয় -- কেমনে হইয়া থাকে। আমি ত লোকের সহিত ঝগড়া করিতে করিতে গেলাম, লুই ফিলিপে যিনি অগতির গতি ( তাই ভাবি লুই ফিলিপে, তুমি তোমরা না থাকিলে কবে শালা নিশ্চিহ্ণ হইয়া যাইতাম ) তিনি আলপস পর্বতে গিয়াছিলেন। গত পরশ্ব তাহার সহিত সাক্ষাৎ হয়। । সে বড় ধরিয়াছিল -- যদি তাহার সহিত লাতিন কোয়ার্টার যাই ! লাতিন কোয়ার্টারে ইদানিং রাত্রে যাওয়া বড় ভাবনার -- মারপিঠ রোজ করা যায় না। ও ভারী মজার কথা বলি -- তুমি মসিয়ঁ লাগুলুকে চেন কি ? ইনিও বুর্জোয়া-যম। নিজে লা ফিগারো কাগজের প্রতিপত্তিশালী কর্মী, একজন অভিমানী ! চেহারায় উচ্চবর্ণ : ফ্রেঞ্চ রিভলিউশানেতে যেমন পরচুলা ফেলিয়া দিলেই যে কোন ভদ্র, ছোটলোকদের সহিত প্রাণভয়ে কোনরূপ মিশিয়া যাইত -- ইঁহার সে উপায় নাই ( গাত্রত্বক হস্তিদন্ত মার্জিত ) ইনি কেমনভাবে -- ধরণী রক্তাক্ত হইবে -- তাহার ছবি মন্ত্রবলে জাগাইলেন। ( রাজনীতি কম্যুনিজম আছে বলিয়া আর কাহাকেও পারভার্স অ্যাবনর্মাল বলিতে হয় না ) -- অবশেষে কহিলেন আত্মস্তূতিতে -- যে আগে আমি পাঁঠা ছিলাম তাই ( মৎলিখিত ) পুস্তকই আপনাকে ঐ অবস্হা হইতে ইদানীংকার অবস্হায় আনিয়াছে। ঐ অভিমানী ব্যক্তি স্বীকার করিলেন। বিশেষে তর্ক হইত। কিন্তু আমাকে উঠিতে হয় -- আমি ভাবিয়া দেখিয়াছি -- ঠাকুর আমাকে বড় ঘরে জন্ম দিয়াছেন ফলে এই সব বাজে ব্যাপারে আমার ভাববার দরকার নাই সমষ্টিভাবে বাঁচিবার মত আমার - শালা গোয়ার্ত্তুমি নাম - পূর্ব্বজন্মকৃত পাপও নাই।

    ঠাকুর করুন তুমি ভাল থাক !

    ইতি দাদু


     

    চিঠিটা পড়ার পর এসিপি রিমা খান নোট নিলেন যে এটা অন্য কোনো দাদু অন্য কোনো নাতিকে লিখেছিল, হয়তো তা নিলামে কেনা হয়ে থাকবে। তাই ব্যাঙ্কের লকারে যত্ন করে রাখা হয়েছে। পরের চিঠিটা পড়ায় মন দিলেন রিমা খান।


     

    সুহৃদপ্রতিমেষু,

    আমি রাতে দাঁত মাজি। দাঁত মাজতে মাজতে ভাবছিলাম তোমাকে কী লিখব। চমৎকার বাড়ি পেয়েছি লণ্ডনে, ইলেকট্রিসিটি আছে, আজকাল এখানে খুব ঠাণ্ডা পড়েছে এ-সবই লেখা উচিত, কিন্তু কী দরকার। একটু আগে লেনটিল-রাইস খেলাম -- টম্যাটো কড়াইশুঁটি ডিম ইত্যাদির --- ওয়ান অব দি মাইটিয়েস্ট ডিশেস আই এভার হ্যাড -- দরকার আছে ? না। বেশ, আমি সুখী নই -- অসুখী। জীবনে কখনো সুখী বোধ করিনি। আমার অসুখী থাকার একটা অধিকারবোধও এতদিনে জন্মে গেছে -- আমি জানি -- আই হ্যাভ এভরি রাইট টু বি আনহ্যাপি, একথা বলারও দরকার নেই। কেবল আনাড়িকেই বলা যেতে পারে যে ঐ ডেলিকেট ডিশ সত্ত্বেও, সুন্দরী স্ত্রী সত্ত্বেও, নরম বিছানা, অতি উষ্ণ লেপ ও তার ধবধবে শাদা ওয়াড় সত্ত্বেও -- আরো কী কী সব সুন্দর চমৎকার যার-পর-নেই আশাতীত সত্ত্বেও -- ইত্যাদি -- যে আমি অসুখী। আমি ভালো নেই -- এ নিশ্চয়ই প্রিন্স হ্যামলেটের পোশাকেও আমাকে বোঝা যাবে।

    তোমাকে হাসতে হাসতে বলেছিলাম আমাদের মধ্যে কে আগে সুইসাইড করবে আমি জানি না। টিনাকে দেখিয়ে বলেছিলাম। বাস্তবিক আমি জানি। শুধু টিনা ও আমার মধ্যে নয় -- আই শ্যাল বি দ্য লাস্ট পার্সন টু কমিট সুইসাইড ; নট দ্যাট আই শ্যাল নট। আই শ্যাল বি দ্য লাস্ট পার্সন আই সে। কারণ আমি কাওয়ার্ড এবং এ কাওয়ার্ড ডাজ নট গিভ ইন ভেরি ইজিলি। বলাবাহুল্য সুহৃদপ্রতিম, আমি পুলিশকে ভয় করি না। আমিও অনিশ্চয়তাকে ভয় করি। যে দিকে দেখি, দেখি কিছুই ঠিক নেই। আগে ভাবতুম মানুষ ভুল জীবন কাটাচ্ছে। তা সংশোধন করে দেওয়া দরকার -- নিজের ত্রুটি ও শিক্ষার কথা লিখে। সে বালখিল্যতা কেটে গেল যথাসময়ে। এখন দেখি প্রত্যেকটি লোক নির্ভুল ও ঠিক জীবন কাটাচ্ছে। যে জন্য বিলডুংসরোমান ( যাকে বলা হয় আত্মজীবনীমূলক ) লেখার আর প্রয়োজন দেখি না। এ-কথা ঠিক যে কেউ কারো কথা শোনে না, কেউ কারো চিঠি পড়ে না। সকলেই, প্রত্যেকটি নরনারী, অ্যাডাল্ট ও অভিজ্ঞ, শিক্ষায় সম্পূর্ণ, কেউ নিউজ ছাড়া আর কিছু পড়ে না। তোমাকে যদি লিখতে পারতুম, স্নান করে এসে দেখলুম টিনা ঘরে নেই, তারপর অপেক্ষা করতে লাগলুম, বিকেলেও বসে রইলুম, বুঝতেই পারলুম প্যারিসে চলে যায়নি রাতে, প্রেতিনীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য কিনা দরজা জানলা অমন নিখুঁতভাবে বন্ধ করলুম ! রাত্রেও খেলুম না, এপাশ-ওপাশ করলুম, ভয় তো পাবোই, প্রকৃত ভয়, আমূল ভয় -- নিজের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় এমন প্রকৃত ভয় তো পাবেই, কারণ এ তো আর হিউগোর চাকরি হারাবার কি ভেরলেনের পুলিশের ভয় নয়। হায়, এ অন্য ভয়। শেষ রাত্রের দিকে একটু ঘুমিয়েও পড়লুম। পরদিন লণ্ডনময় গুঞ্জন -- পিঁপড়ের মতন সার দিয়ে লোক আসছে -- লোকে লোকারণ্য -- আমি নিজে গিয়ে সত্তর ফিট নিচে কুয়োর মধ্যে ভেসে ওঠা টিনার সবুজ স্কার্ট-পরা লাশ দেখে এলুম।

    কথার কথা বলছি। এ হতো খবর। হাজার হাজার লোক ইনটারেসটেড হতো। বন্ধুবান্ধব টিনার আত্মীয়স্বজন দাঁতে দাঁত চেপে বলত -- হারামজাদা ! আমার আত্মীয়স্বজন কিন্তু তা বলতে পারত না। তারা আমাকে জানে। জানে, আমি যা করছি তা স্বাভাবিক। আমার জন্য একটি মেয়ের জীবন নষ্ট হওয়া এমন নিষ্ঠুরতা -- এ স্বাভাবিক কারণে তারা জানে আমি অসুখী এবং একজন অসুখী লোকের যে-ভাবে বাঁচা উচিত আমি তেমনি স্বাভাবিক, ঠিক বা নির্ভুলভাবে আমি বেঁচে যাচ্ছি। বাড়ির কাছে আমার এতো কৃতজ্ঞতা সুহৃদপ্রতিম ! কত ক্ষমাহীন অন্যায় করেছি কত ব্যভিচার করেছি মা-দাদা-দিদি-বড়দা -- বিশেষত এমন কী বাবার ওপর -- বাবা ছাড়া আমাদের বাড়ির সকলেই আমাকে কখনো দোষ দেয়নি, সহ্য করেছে ও আবার তা করার সুযোগ দিয়েছেও -- এখন বিয়ের পর সবচেয়ে বেশি সুযোগ করে দেয়।

    যাক। শোনো। কেমন আছো ? হিউগো বড় বেশি নিন্দে করছে তো আমার ! সুহৃদপ্রতিম, আমার হিউগোর নিন্দে করার সুযোগ নেই। বলতে পারি না হিউগো আপনার সম্পর্কে অমুক বলেছিল বা তমুক বলেছিল। আমার ডিগনিটি নষ্ট করতে পারছি না। ভেরলেনের সম্পর্কে আপনি আমেরিকা থেকে আসার পর ও-রকম বলার জন্য আমি দুঃখিত ও লজ্জিত। তার কোনো দরকার ছিল না। আমি কাপুরুষ -- জীবন আমার কাছে আর দুর্বোধ্য নয়, এজন্য আমি ভীত। আমার পুলিশের ভয় নেই। চাকরি হারালে আমি কিছুই হারাব না । আমি সম্পূর্ণ পরাজিত ও ব্যর্থ। কমপ্লিটলি ফ্রাসট্রেটেড অ্যাণ্ড অ্যাবসলিউটলি ডিস্লিউশন্ড বউ দিন আগে থেকেই। কোনো কাজ শুরু করার আগে আমি কখনো কোনো উৎসাহ বোধ করিনি। ব্যর্থ হব জানতাম বলেই এমনভাবে ব্যর্থ হলাম -- নইলে সব হিশেবেই আমি সব দিক থেকে সার্থক হয়েছি। আমার জিবনে এত আশা পূর্ণ হয়েছে -- যা সচরাচর কারো হয় না। বস্তুত আমার জীবনের ‘প্রত্যেকটি’ আশা পূর্ণ হয়েছে।

    শেষ পর্যন্ত কিনা হিউগোও আমার ওপর চটে গেল সুহৃদপ্রতিম, যার প্রতি জীবনে অজ্ঞানতও আমি নিশ্চিত কোনো অন্যায় করিনি। হিউগো সম্পর্কে আমি যে একেবারে নিশ্চিত ! প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য তাকে বেছে নিতে হল দলের মধ্যে কাওয়ার্ডটিকে, বেশ, কিন্তু সে কি মনে করে আমার মুখে চোখে যে ভয়, তা পুলিশের, তা মারধোর খাবার ! হিউগো নিশ্চয় তা ভাবে।

    ইতি আপনার হিংসুটে প্রতিপক্ষ

    লর্ড চ্যাটার্লি


     

    রিমা খান একটা সিগারেট ধরিয়ে মনে করার চেষ্টা করলেন এই দ্বিতীয় চিঠির চরিত্রগুলোকে তিনিই ধরেছিলেন কিনা, নামগুলো, ক্রিমিনালরা যেমন গোপন করে, তেমন কিনা, আসল নাম হয়তো অন্য। তবে এই ক্রিমিনাল গ্যাঙটা বেশ বড়ো ছিল মনে হচ্ছে। তিনিই বোধহয় এদের ববিটাইজ করার ভয় দেখিয়েছিলেন, কয়েকজন ববিটাইজ হবার ভয়ে মুচলেকা দিয়েছিল। চিঠিতে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ফোন তুলে ভোমসোকে জিগ্যেস করলেন, তুমি এই সুহৃদপ্রতিম লোকটার খোঁজ নিয়েছ ?

    ভোমসো বলল, আজ্ঞে স্যার, অ্যাডভোকেটের নামই তো সুহৃদপ্রতিম, দারুন নাম একখানা, তিনি সুহৃদ নন, সুহৃদের মতন। চিঠি দুটো পিচ্চির লকারে পাওয়া গেছে তার কারণ সুহৃদপ্রতিমই তো ওনাদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি হোলডার। রিমা খান জিগ্যেস করলেন, তোমার শ্যাডোরা কোনো খবর যোগাড় করতে পেরেছে ? ভোমসো জানালো, আজ্ঞে হ্যাঁ, মেয়ে দুটোকে অ্যাডভোকেট পেয়েছেন ডেটিঙ অ্যাপ থেকে। সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে রিমা খান বললেন, তুমি অ্যাডভোকেটের পেছনে যে শ্যাডো লাগিয়েছো, তা চব্বিশ ঘণ্টার করে দাও, দুজন বা তিনজনকে লাগাও লোকটার পেছনে। পিচ্চির বাবা আর মায়ের হ্যাণ্ড রাইটিঙ যোগাড় করেছ ? চিঠিগুলো ওনাদের লেখা নয় বলেই তো এখন মনে হচ্ছে। ভোমসো জবাবে জানালো, না স্যার, ওনাদের হাতের লেখার স্যাম্পল ওনাদের বাড়িতে পাইনি। আমার মনে হয় অ্যাডভোকেটের দপতরে সার্চ করলে হাতের লেখার নমুনা পাওয়া যাবে, তর জন্যে সার্চ ওয়ারেন্ট চাই। রিমা খান বললেন, তাড়াহুড়ো কোরো না, আগে কোর্টে প্রমাণযোগ্য তথ্য কালেক্ট করো। পিচ্চিদের বাড়ির সামনে আর অ্যাডভোকেটের বাড়ির সামনে সরকারি বা বেসরকারি সিসিটিভি নেই, খোঁজ নিয়েছি।

    রিমা খান ভাবছিলেন, তাঁর বিয়ে করা হয়ে উঠল না তার কারণ তিনি চাকরির শুরু থেকেই মার্ডারারদের ভালোবেসে ফেলেছেন, ভালোবেসে ফেলার দরুন উঠেপড়ে লেগেছেন তাদের ফাঁসিকাঠে ঝোলাবার প্রচেষ্টায় মেতে থাকতে, লোকটা যে হত্যাকারী তা প্রমাণ না করা পর্যন্ত, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ না করা পর্যন্ত তিনি শান্তি পাননি। খুনিকে ফাঁসির অর্ডার যখন আদালত দ্যায়, রিমা খান লক্ষ করেছেন, তখনই তাঁর অরগ্যাজম হয়, আর তা প্রতিবার হয়েছে। হত্যাকারীকে ফাঁসির হুকুম পাওয়ালে তবেই তাঁর মন ও শরীর শীতল হয়। হত্যাকারীদের এক ধরণের কারিশমা থাকে, আত্মবিশ্বাসী ক্যারিশমা, তাকে ছিঁড়ে হত্যাকারীর মুখের চামড়া তুলে ফেলতে চান উনি। যখন সাব ইন্সপেক্টর ছিলেন, তখন সব অপরাধীকে হাজতে পুরে ববিটাইজ করার হুমকি দিতেন। এক ব্যাটাকে এমন পিটিয়েছিলেন যে সে ব্যাটা মরে গেল আর উনি চাকরি থেকে সাসপেণ্ড হয়ে রইলেন বেশ কয়েক বছর। মার্ডার হওয়া একজন পুরুষের কঙ্কালের হত্যাকারীকে খুঁজে তবে চাকরি ফেরত পেয়েছিলেন। কোনো পুরুষ যদি তাঁকে আকৃষ্ট করে তাঁর মনে হয় এ লোকটা নিশ্চয়ই খুনি কিংবা ভবিষ্যতে কাউকে খুন করবে।

    রমা খান চটে গেলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না, লাথিয়ে জুতিয়ে ব্যাটন ঢুকিয়ে শায়েস্তা করার অভ্যাস তাঁর যায়নি। তাতে সমস্যা আরও বেড়ে যায় জানেন তিনি, তাঁর ওপরের অফিসাররা তাঁকে সামলাতে হিমশিম খান অথচ তাঁর এই ক্ষমতাকে ব্যবহারও করতে চান, নিজেরা তা পারেন না বলে, পুরুষ হয়েও পারেন না, তাঁদের নেকনজর কেবল ঘুষের দিকে, কালো টাকা রোজগারের দিকে। নিজের হিংস্রতাকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন রিমা খান, তাঁর মা-ও বলতেন যে মেয়েমানুষের অতো রাগ-দাপট ভালো নয়, কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাটাই নেই রিমা খানের। কতো মার্ডারারকে তিনি যাবজ্জীবন দিইয়েছেন, ফাঁসিকাঠের মাচান পর্যন্ত পাঠিয়েছেন, কিন্তু কেন তিনি ক্রোধোদ্দীপন সম্পর্কে চরমপন্হী, তার হদিশ পেলেন না। মনোবিদের কাছে কখনও নিজেকে সোপর্দ করতে চাননি, কেননা তা জানাজানি হলে আবার হয়তো চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে।


     

     

    চার নম্বর খাতায় মন দিলেন রিমা খান। মাত্র দুপাতা।

    “কেউ যদি জানতে চায়, ‘বাবা কী করতেন’, পিচ্চি তক্ষুনি মিউজিয়ামের কিউরেটার কথাটা তো বলেই, তাছাড়া, ও মনে করে যে বেশির ভাগ লোক তো বোকার হদ্দ, জাদুঘর বলতে কী বোঝায় তা জানে না, তাই গড়গড় করে বলতে আরম্ভ করে, মাঝে-মাঝে দুহাত ওপরে তুলে ইনভার্টেড কমার ইঙ্গিত করে। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা আর কনে বিন্নিকেও তেমন করে বোঝাতে লাগল পিচ্চি, নিজের ঘরে বিশাল পালঙ্কে বসে। ওরা দুজনে সোফায়, দুজনের হাতে বিয়ারের টিন, নিজেরা কিনে এনেছে, পিচ্চিকেও খাইয়েছে।”

    “জাদুঘর বা সংগ্রহালয় বলতে বোঝায় এমন একটি ভবন বা প্রতিষ্ঠান যেখানে পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের সংগ্রহ সংরক্ষিত থাকে। জাদুঘরে বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বস্তুসমূহ সংগ্রহ করে সংরক্ষিত করা হয় এবং সেগুলি প্রদর্শ আধার বা ডিসপ্লে কেসের মধ্যে রেখে স্থায়ী অথবা অস্থায়ীভাবে জনসাধারণের সমক্ষে প্রদর্শন করা হয়। বিশ্বের অধিকাংশ বড়ো জাদুঘরই প্রধান শহরগুলিতে রয়েছে। অবশ্য ছোটো শহর, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলেও স্থানীয় জাদুঘর গড়ে উঠতে দেখা যায়।

    অতীতকালে জাদুঘরগুলো গড়ে উঠত ধনী লোকদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উদ্যোগে কিংবা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে। এই সব জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকত শিল্পকর্ম, দুষ্প্রাপ্য ও আশ্চর্যজনক প্রাকৃতিক বস্তু বা পুরাবস্তু। সারা বিশ্বেই জাদুঘর দেখা যায়। প্রাচীনকালে গড়ে ওঠা আলেকজান্দ্রিয়ার জাদুঘর ছিল আধুনিককালের স্নাতক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতন। বিশিষ্ট অভিধানকার জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাশের মতে, বাংলায় "জাদুঘর" কথাটি আরবি আজায়ব্ ঘর বা আজায়ব্ খানা শব্দটি থেকে এসেছে। বাংলায় "জাদুঘর" কথাটির অর্থ হল, "যে গৃহে অদ্ভুত অদ্ভুত পদার্থসমূহের সংগ্রহ আছে এবং যা দেখিয়া মন্ত্রমুগ্ধবৎ হ’তে হয়। অভিধান মতে, "জাদুঘর" শব্দের অর্থ, "যে-ঘরে নানা অত্যাশ্চর্য জিনিস বা প্রাচীন জিনিস সংরক্ষিত থাকে।" ইংরেজি মিউজিয়াম শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ থেকে। শব্দটির মূল উৎস গ্রিক শব্দ মউজিয়ন ; যার মানে গ্রিক পুরাণের শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক মিউজদের মন্দির। প্রাচীন গ্রিসে এই জাতীয় মন্দিরগুলোকে কেন্দ্র করে লাইব্রেরি এবং শিল্প পুরাকীর্তির সংগ্রহশালাও গড়ে উঠতে দেখা যেত। ২৮০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই জাতীয় একটি জাদুঘর। অ্যাথেন্সে প্লেটো প্রথম একটি মিউজিয়াম গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছিলেন। যদিও পসেনিয়াসের রচনায় অন্য একটি স্থানকে মিউজিয়াম বলে অভিহিত করা হয়েছে। এটি হল ধ্রুপদি অ্যাথেন্সে অ্যাক্রোপোলিসের উল্টো দিকে একটা ছোটো পাহাড়, আমি দেখে এসেছি। লিজেণ্ড হল যে, মউসিয়াস নামে একজন লোক এই পাহাড়ে বসে গান গাইতেন। বুড়ো বয়সে তিনি সেখানেই মারা যান আর সেই পাহাড়েই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর নামানুসারে পাহাড়টির নামকরণ হয়েছিল মউসিয়ন। ”

    “মুখস্ত বুলি ফুরোলে পিচ্চি ছুটে গিয়ে নিজের ল্যাপটপ এনে দেখালো কইন্যা ওলেঙ্কা আর কনে বিন্নিকে, গ্রিসে, মিশরে, কোথায় কোথায় ও গিয়েছিল মা-বাবার সঙ্গে। ”

    “পিচ্চির মা বিয়ের আগে কলেজে ইংরেজি পড়াতেন ; পিচ্চি হবার পর চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। বলতেন, ইংলিশ হলো টয়লেট পেপার কালচারের ভাষা। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা আর কনে বিন্নি দুজনেই চেঁচিয়ে উঠল, নো নো, আই ডোন্ট অ্যাগ্রি।”

    “আমার মা টয়লেট পেপার ইউজ করতেন ; তোমরাও পোঁদ পোঁছো কাগজে, আমি কিন্তু জল দিয়ে ছুঁচোই, আমার বাবাও জল দিয়ে ছোঁচাতেন। মা ছিলেন খ্রিস্টান আর বাবা ছিলেন হিন্দু। ছিলেন বলছি কেননা ওনারা কোনো ধর্ম মানতেন না। আমারও কোনো ধর্ম নেই, তবে জন্মের পর আমাকে সুন্নত করে দেয়া হয়েছিল, বাবার নির্দেশে, যাতে প্রেম করতে সুবিধে হয়। আচ্ছা, তোমরা তখন দেখিয়েছিলে, আমি ভেবেছিলুম জিগ্যেস করব, কিন্তু ভুলে গেছি, তোমরা দুজনেই ওখানকার চুল কামিয়ে ফেলেছো কেন ?”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা বলল, কামিয়ে ফেলিনি, লোমনাশক মাখিয়ে নিকেশ করি, তাতে তোমাদের মতন প্রেমিকদের আনন্দ হবে, জায়গাটাও হ্যাপি থাকবে, আর আমরাও স্যানিটারি ন্যাপকিন বাঁধার সময়ে পরিষ্কার থাকবো, নয়তো চুলে-রক্তে একাকার জবজবে হয়ে গেলে বসতে অসুবিধা হবে।”

    “তাহলে রিজিয়া সুলতানা, নুরজাহান, মুমতাজ মহল, ওনারা সিংহাসনে বসতেন কেমন করে?”

    “তা ঠিক, এই বিষয়ে হিস্টরিয়ানরা কিছু লিখে যাননি, ভবিষ্যতে কেউ লিখবেন হয়তো, এখন পিএইচডি না করলে প্রফেসারি পাওয়া কঠিন, আর বিষয়বস্তুও কমে আসছে। বলল পিচ্চি।”

    “পিচ্চির কী মজার ছোটোবেলা ছিল, ওর মায়ের শেষ বাবা একজন জার্মান সাহেব। মায়ের বাঙালি বাবা মারা যাবার পর পিচ্চির দিদিমা একজন জার্মান ডাক্তারকে বিয়ে করে জার্মানির বার্লিন শহরে থাকেন।”

    “পিচ্চির জার্মান দাদু বেড়াতে এলে ওর জন্যে অনেক গিফ্ট আনতেন ; একবার উনি একটা ঢিল উপহার দিয়েছিলেন, বার্লিনে যে উঁচু দেয়াল ছিল দুই জার্মানিকে দুভাগ করে, সেটা ভাঙা হলে অনেকে ইতিহাস হিসাবে পাঁচিলের টুকরো নিজেদের বাড়িতে রেখেছে। ”

    “পিচ্চি ভেবে রেখেছে যে দুই বাংলা যখন এক হয়ে যাবে তখন সীমান্তের কাঁটাতারের টুকরো ও সংগ্রহ করে রাখবে, সুযোগ পেলেই নেতাদের পোঁদে ফোটাবে ; ওর অবাক লাগে যে মানুষের পেট আর পোঁদ নেতা হলেই কেন ফুলে ফেঁপে পচা মোষের মতন হয়ে যায়। ”

    “কনে বিন্নি হাসতে হাসতে, মুখে বাঁহাত চাপা দিয়ে, ডান হাতে নিজের পেছন দিকে হাত বুলিয়ে বলল, নেতা হলে পুরুষদের পোঁদ পোয়াতি বউদের মতন ফুলে ওঠে, টাকাও ফি-বছর ফুলে ফেঁপে দেশের গোদ হয়ে যায়, প্রতিবারের নির্বাচনে নেতাদের টাকাকড়ি চার-পাঁচ গুণ বেড়ে যায়, অথচ ইনকাম ট্যাক্স ওদের পোঁদে বাঁশ করার ঝাড় খুঁজে পায় না।”

    “পিচ্চির মা অবশ্য বলেছিলেন যে আর জোড়া লাগবে না দুই বাংলা, ছিঁড়ে-ছিঁড়ে আরও দূরে সরে যাচ্ছি আমরা। সুন্দরবন ভাগাভাগি হয়ে গেছে, এক দেশের বাঘ আরেক দেশের বাঘিনীর সঙ্গে প্রেম করে না, বাঘেদের গুরু ফতোয়া জারি করেছে, পুর্ব সুন্দরবনে বাঘ-বাঘিনীর আরবি নাম রাখতে হবে। বাঁদরের দলও সীমানা অনুযায়ী গোষ্ঠী তৈরি করে ফেলেছে, সীমা টপকে অন্য দল থেকে ফুসলিয়ে মাদি বাঁদর আনতে চায় না, আনলেই দলবেঁধে খামচা-খামচি খেয়োখেয়ি রক্তারক্তি বাঁদুরে দাঙ্গা শুরু হয়ে যাবে। নিজেদের দেশেই হিন্দু মুসলমান বিয়ে হলে দাঙ্গা বাধে কিংবা এক পক্ষের লোকের হাতে আরেক পক্ষ খুন হয়, সেই অবস্হায় তুই ভাবছিস দুটো দেশের বিয়ে হবে, জার্মানির হয়েছে কেননা ওদের দেশে জাঠতুতো-খুড়তুতোতে বিয়ে হয়। ”

    “জার্মান হলেও পিচ্চির সঙ্গে ভাঙা-ভাঙা বাংলায় কথা বলতেন জার্মান দাদু, আর পিচ্চি ভুল ধরিয়ে দিতো। দাদু বলতেন মানুষের ভাষা সবচেয়ে নোংরা আর ক্ষতিকর জিনিশ, মানুষের উচিত হাতিদের কাছে ভাষা শিখে নেয়া। পিচ্চি তা জানে, নইলে মানুষের মুখে থুতু থাকবে কেন ! মানুষ যদি জন্তু-জানোয়ারের মতন হতো, নিজেদের কোনো ভাষা না থাকতো, তাহলে পৃথিবীতে এতো লড়াই দাঙ্গা যুদ্ধ মারকাট খুনোখুনি হতো না। ”

    “বাবা বলেছিলেন, ভাষা যদি না থাকতো তাহলে কোনো ধর্মের বই লেখা হতো না, বুঝলি। যত্তো নষ্টের মূল হলো বই আর লেখালিখি। ককখনো বই লিখতে যাসনি, ওসব গুরুঠাকুরদেরই ভালো মানায়, কিংবা আকাশ থেকে পড়া কোনো শকুন ডিমের। আমি জানি, আমাদের যদি লড়াই করতে হয়, তাহলে সবকয়টা ধর্মের ছাদে বসে থাকা হাওয়াটার সঙ্গে লড়তে হবে। যদি ইতিহাসে খুঁজিস তাহলে দেখবি, ওই হাওয়ায় গড়া জীব পুরো মানবজাতটাকে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছে, এক দলের সঙ্গে আরেক দলের মারামারি বাধায়, স্বাভাবিক প্রেরণাকে নষ্ট করে দ্যায়। টঙের হাওয়ায় গড়া জীবটা তাইই করে, আর সবকয়টা ছাদের হাওয়া তাইই করে, নিয়ন্ত্রণ, ধ্বংস, মুছে ফ্যালা আর শুভবোধকে খতম করা। ব্যাপারটা যুথের, মানব-ভেড়ার, আর এই মানব-ভেড়াগুলো কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ছাদ থেকে ওই বদ হাওয়ায় গড়া জীবটাকে নিকেশ করো, দেখবে যে মানব-ভেড়ারা অন্য বদ হাওয়ায় গড়া জীব ছাদে এনে ফেলেছে। ”

    “বাবার জাদুঘরের সিনিয়র কেরানি বলেছিল, ‘অবোকখয়, অবোকখয়, ভাষা হল অবকখয়ের সাপের বাসা। ওনার কাছ থেকেই পিচ্চি শিখেছে আঁড়ল গাঁড়ল বাঁড়ল ষাঁড়ল চাঁড়ল শব্দগুলো।’

    “পিচ্চি মায়ের ন্যাওটা ছিল বলে মা যেভাবে কথা বলতেন, পিচ্চিও সেইভাবে বলে। কারোর সঙ্গে কথা বলার আগে বা কারোর প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে পিচ্চি ওর মায়ের মতনই বলে, “আমি বলি কি”, বলে, তারপর নিজের কথাটা বলে। ”


     

    রিমা খানের সিগারেট ফুরিয়ে গিয়েছিল, আরেকটা ধরিয়ে নোট নিলেন, পিচ্চিদের বাড়ির রাস্তায় আর সলিসিটারের বাড়ির সামনে যদি সিসিটিভি থাকতো তাহলে পিচ্চি লোপাট হবার দিনের রেকর্ড দেখতে পাওয়া যেতো। যাক, পিচ্চির ল্যাপটপে ওর বাবা-মায়ের বিভিন্ন সময়ে বিদেশ ভ্রমণের ফোটো আছে। ভোমসোকে বলতে হবে পিচ্চির জার্মান দাদু আর দিদিমার ঠিকানা যোগাড় করতে।

    নিজের সম্পর্কে রিমা খানের মনে হয়, তিনি মরুভূমিতে একটা ক্যাকটাস গাছ, সেই গাছের ফুলও তো কুসুমিত হয়। তাঁর পুলিশ জীবনের প্রতিটি সফলতা হলো ক্যাকটাসের কুসুমিত হওয়া।


     

     

    “কনে বিন্নি, কইন্যা ওলেঙ্কা আর পিচ্চি ঘরের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে জঙ্গল এসে গেল। গাছে-গাছে বারান্দা।”

    “বাগানে, পাকাচুল কুঁজো মালির কাছ থেকে গাছে জল দেবার সবুজ পাইপ নিয়ে তিনজনে ভেজাভিজি খেলা আরম্ভ করল, হ্যা-হ্যা-হি-হি-হুহু, শাড়ি ভেজে, স্কার্ট-টপ ভেজে, ট্রাউজার ভেজে। উদয়পদ্ম, কলকে ফুল, কাঁঠালি চাঁপা, কেলি কদম, ছাগল কুঁড়ি, জংলি ঝুমকো, জবা, দাঁতরাঙা, দোপাটি, পাহাড়ি কাশ, বনচণ্ডাল, বেলি ফুল, বৈঁচি, মহুয়া, মাধবীলতা। ”

    “কাজ ভালো করতেন বলে শহরের ছোটো মিউজিয়াম থেকে বড়ো মিউজিয়ামে বদলি হয়ে গিয়েছিলেন পিচ্চির বাবা, একেবারে দুহাজার কিলোমিটার দূরের সমুদ্রের ধারের ওনার নিজের শহরে। শহরে এতো গাড়ি যে রাতের বেলায় লাল রঙের যাওয়া আর হলদে রঙের আসা দেখতে পায় পিচ্চি, বারান্দায় দাঁড়িয়ে। বিন্নি-ওলেঙ্কাকে সঙ্গে নিয়ে দাঁড়ালো একটা বারান্দায়। বিন্নি বলল, তোমার সঙ্গে থাকতে-থাকতে আমি জানোয়ারের মতন তোমার পোষা হয়ে যাচ্ছি, মনে হচ্ছে আমি ফাঁদে ধরা পড়ে গেছি আর তুমি আমার মগজে বসন্তঋতু ভরে দিচ্ছ, আমাকে ভিজিয়ে ফেলছো আমারই শরীরের রসে, উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছি কখন তুমি প্রথম কামড়টা বসাবে। ”

    “পিচ্চি বলল, সেটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে গো, কাকে আগে কামড় দেবো, আই অ্যাম স্পয়েলড বাই চয়েসেস।”

    “ওলেঙ্কা পিচ্চিকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে বলল, তুমি ডার্টি টক পারো না ? ডার্টি টক শুনলে আমি ভিজে যাই, প্রেমিকের নোংরা কথাবার্তা না শুনলে বড়ো ম্যাজমেজে লাগে। শব্দের ভেতরে যে নোংরামি থাকে তা আসলে নোংরা নয়। শরীর যদি সাড়া না দেয় তাহলে তা নোংরা। ”

    “নোংরা মানে আই লাভ ইয়োর পুসি, আই শ্যাল মেক ইউ খুশি, হোয়েন ইউ আর জুইসি, এইসব তো? অনেক জানি। হ্যাঁ, মানছি, ডার্টি টকের কাজ হলো শরীরকে তাতিয়ে তোলা। আমি বলি কি, আমাদের গরমের দেশে শরীর তো আগে থাকতেই তেতে থাকে।”

    “ গরমের ছুটিতে বাবার সঙ্গে মাঝে-মাঝে মিউজিয়ামে গিয়ে ঘরে-ঘরে একা বেড়াতে-বেড়াতে জাদুঘরের নানা জিনিস দেখতো পিচ্চি, কী লেখা আছে পড়তো, একটা মমি আর একটা ডায়নোসরের বিশাল কঙ্কালকে পিচ্চির ভালো লাগতো। আশেপাশে কোনো দর্শক না থাকলে, মুখের ব্যাণ্ডেজ খুলে মমিটা তিন হাজার বছরের ভাষায় ওর সঙ্গে কথা বলতো, কোনো রানির মমি বোধহয়, কেননা একদিন চোখ মেরে ইশারা করেছিল, মমিও লজ্জা পেতো, কোনোদিন বুকের ব্যাণ্ডেজ খুলে দেখায়নি।”

    “ওর বাবা জাদুঘরের তত্ববধায়ক ছিলেন, তাই জাদুঘরে ঢুকতে পিচ্চির কোনো টিকিট লাগতো না, হাফটিকিটও নয়। ”

    “ পিচ্চি জানে, আর সেই কথাই ও বিন্নি-ওলেঙ্কাকে বোঝাতে আরম্ভ করল, “মানুষ বললে যেমন সব রকমের মানুষ বোঝায়, চীনা, আফ্রিকানিবাসী, আরবদেশের, ইউরোপ-আমেরিকার, ব্রাজিলের রেডইনডিয়ান, ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ, তেমনই ডায়নোসর বললে পাহাড়ের মাপের সব ধরণের গিরগিটিকে বোঝায়, যেমন চারপেয়ে ব্রন্টোসরাস, ডিপলোডকাস আর ব্রাকিওসরাস, যারা গাছের পাতা আর ফলমূল খেতো, সরু গলার অনেক উঁচু ছিল তারা, যাতে তখনকার আকাশ-ছোঁয়া গাছের মগডালের পাতা আর ফল খেতে পারতো। চারপেয়ে ছোটোমাপের, ঘাসপাতা খেয়ে থাকতো যেগুলো তারা হলো স্টেগোসরাস আর অ্যাঙ্কিলোসরাস, তাদের শিরদাঁড়ার ওপরে কিংবা গায়ে গণ্ডারের বা কুমিরের চামড়ার মতন শক্ত আঁশ থাকতো। কেউই জানে না তাদের কোনো ভাষা ছিল কিনা। আমার মনে হয়, নিশ্চই ওদেরও ভাষা ছিল, তাই ওরা হাপিশ হয়ে গিয়েছে। ”

    “মানুষও একদিন পৃথিবী থেকে লোপাট হয়ে যাবে, কোনো সন্দেহ নেই পিচ্চির, ভাষা মানুষকে লোপাট করে দেবে, ভাষার মতন ক্ষতিকর বিষ আর নেই। ”

    “পিচ্চি যখন কনে বিন্নির কাঁধে ডান হাত আর কইন্যা ওলেঙ্কার কাঁধে বাঁ হাত রাখল, বিন্নি-ওলেঙ্কা প্রতিবাদ করেনি, দুজনেই পিচ্চির কোমর জড়িয়ে ওর কথা শুনতে লাগল। যেগুলো মাংসখোর ছিল তারা অতো উঁচু হোতো না, তাদের তো গাছের মগডালের পাতা খাবার দরকার ছিল না, কাছেপিঠে কোনো প্রাণী দেখলে তার ওপর গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার মাংস খেয়ে নিতো, মাংস খাবার জন্য ওদের দাঁতও ছিল বেশ বড়ো-বড়ো আর ধারালো, তারা ছিল দুপেয়ে, কিন্তু ছোটো-ছোটো হাত ছিল তাদের, শরীরের হেলদোল বজায় রাখার জন্য, তাদের মধ্যে নামকরাগুলো ছিল চকোলেট রঙের টিরানোসরাস রেক্স যাদের বামপেলাত জুরাসিক পার্ক ফিল্মে দেখেছিল মাংস খাবার জন্য মানুষের পেছনে দৌড়োচ্ছে ; জুরাসিক পার্ক তো একটা বানানো গল্প, তখনকার কালে তো আর মানুষ ছিল না, বামপেলাতকে বোকা বানাবার আর জায়গা পায়নি ফিল্মঅলারা, পিচ্চির কথা ফুরোবার আগেই দুজনে জিগ্যেস করল, একসঙ্গে, তা ওদের সেক্স অর্গান সম্পর্কে কিছু জানো না?”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা জিভে ঠোঁট বুলিয়ে বললে, হ্যাঁ, ফিল্মঅলারা ভেবেছিল ডায়নোসরগুলো কোনো ভাষা জানে না, আর যতো ভাষা তা শুধু মানুষরাই জানে। টাকাকড়ি রোজগারের জন্যেও তো ভাষারই দরকার, টাকাকড়িও যতো গণ্ডোগোলের কারণ, টাকার ওপর কতো টাকা লেখা না থাকলে মানুষের উপকার হতো।”

    “ না ফিল্মে তো কোনো অর্গান দেখায়নি, কোনটা মেল কোনটা ফিমেল বোঝার উপায় ছিল না। অন্য মাংসখোরগুলো ছিল ফিকে সবুজ রঙের ভেলোসিরাপটার, স্লেট রঙের অ্যালোসরাস, স্পাইনোসরাস, ডেইনোনিকাস, আর সবুজ কারনোটরাস। পিচ্চি ভেবে পায় না এমন শক্ত-শক্ত নাম রাখার কী দরকার ছিল ! বিজ্ঞানীরাও অদ্ভুত মানুষ। সব সময়ে শক্ত শক্ত নাম রাখবে যাতে পড়া মুখস্হ করতে কষ্ট হয়। ”

    “মজার ব্যাপার হলো, পিচ্চির বাবা বলেছিলেন ওকে, ডায়নোসরদের গা সাপ আর কুমিরদের মতন ছিল ঠাণ্ডা। কুমির যেমন গা গরম করার জন্য রোদ পোয়ায়, ডায়নোসররাও গা গরম করার জন্য রোদ পোয়াতো। তখনকার সূর্যর রোদ আরও গরম ছিল। ”

    “ডায়নোসরদের সবকটা জাত লোপাট হবার দরুন পিচ্চির মন খারাপ হয়ে যায়। কেন লোপাট হল তার গল্প বাবার কাছে শুনেছে পিচ্চি, কিন্তু বিশ্বাস হয়নি। বাবা বলেছিলেন যে, একটা ধুমকেতু এসে মেকসিকোর সমুদ্রে এমন ধাক্কা মেরেছিল যে সারা পৃথিবী তার ধুলোয় ছেয়ে গিয়েছিল, সূর্য ঢাকা পড়ে পৃথিবী অনেককাল অন্ধকারে ঢাকা ছিল, অন্ধকার ছিল বলে গাছপালা রোদের আলো পায়নি, ডায়নোসররাও ঠিকমতন শ্বাস নিতে পারেনি, গাছপালা মরে যেতে থাকলে খাবার জিনিস না পেয়ে রোগা ডায়নোসররা মারা যেতে লাগলো, যে ডায়নোসররা অন্য ডায়নোসরের মাংস খেয়ে থাকতো তারা আর মাংস পেলো না, শেষে একটা-একটা করে সব ডায়নোসর পৃথিবী থেকে গায়েব হয়ে গেল, পড়ে রইলো তাদের পাথর হয়ে যাওয়া জীবাশ্ম, যাকে ভালো বাংলায় বলে ফসিল। ”

    “পিচ্চির বিশ্বাস ওরা লোপাট হয়ে গিয়েছিল ভাষা আবিষ্কারের দরুন, হয়তো এক-এক জাতের ডায়নোসরের এক-এক রকম ভাষা ছিল, যেমন আছে মানুষের বেলায়। ওরা নিশ্চই জ্ঞানী-গুণী ছিল, নয়তো নির্ঘাৎ ধর্মের বই লিখে ফেলতো। ”

    “মিউজিয়ামের মমিটা মিশর থেকে আনা, মিশরের পিরামিডে ছিল, ইংরেজরা এনেছিল, তখন নতুন জাদুঘর সাজাবার জন্য ইংরেজরা নানা দেশ থেকে নানা জিনিস লুটপাট করে এনে সাজিয়েছিল জাদুঘরকে। পিচ্চি পিরামিড দেখেছে, কিন্তু তখন ওর বয়স মোটে সাড়ে চার বছর ছিল বলে সবকিছু ততো ভালো করে মনে নেই। মমির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে পিচ্চির মনে হতো ও হয়তো হাজার-হাজার বছর আগে পিচ্চিদেরর আত্মীয় ছিল, কেননা ও শুনেছে আর পড়েছে যে সব মানুষই আফ্রিকা থেকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। ”

    “মিশর তো আফ্রিকাতেই, তাই না ? আফ্রিকার মানুষদের মতন পিচ্চির স্বাস্হ নয় বলে ওর হিংসে হয় ওদের দেখলে। ”

    “কনে বিন্নি, বাঁ হাত দিয়ে হাসি চেপে, বলল, না না, তুমি এইরকমই বেশ, আমার কালো বেডফেলো চাই না । ”

    “শুধু মমিই নয়, পিচ্চির মনে হয় পৃথিবীতে যতো রকমের প্রাণী আছে, যতো রকমের গাছপালা আছে, সকলেই ওর আত্মীয়। আগের শহরে ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময়ে স্কুলের টিচার ডারউইন নামে একজন সাহেবের আবিষ্কারের গল্প শুনিয়েছিলেন, বোর্ডে ছবি এঁকে দেখিয়েছিলেন, গল্পটার নাম বিবর্তন। ডারউইন সাহেবের আগে বিলেতের লোকে নাকি বিশ্বাস করতো যে ভগবান সাতদিনে পৃথিবী তৈরি করেছিলেন। ডারউইন সাহেব এমন বই লিখলেন যে যারা অমন বিশ্বাস করতো তারা বেজায় চটে গিয়েছিল। কিন্তু ডারউইন সাহেব প্রমাণ করে দিলেন যে যতো রকমের প্রাণী পৃথিবীতে আছে সবাই জন্মেছে ধাপে-ধাপে, কোটি-কোটি বছর ধরে, একটা প্রাণের জন্ম থেকে বাদবাকি সব প্রাণের জন্ম হয়েছে। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা জিভে ঠোট বুলিয়ে বললে, বাইবেলের গল্পটা আমি জানি, অ্যাডাম আর ইভের বাচ্চাদের থেকে মানুষ জন্মেছে, অ্যাডাম আপেল খেয়ে পাপ করেছিল বলে, কেমনধারা গল্প বল, অ্যাঁ ? অ্যাডাম আর ইভের ছেলে-মেয়েরা তো আপন ভাইবোন, তারা সেক্স করে জগতজুড়ে এতো মানুষের জন্ম দিলে ? আর এখন ভাইবোনরা ভাইফোঁটার দিন সেক্স করলে পুলিশে ধরবে, কোনো মানে হয়, অ্যাঁ !”

    “বিন্নি বলল, শোনো শোনো হে জগৎবাসী, একদিন গড মাটি থেকে ধুলোবালি তুলে নিয়ে একজন মানুষ তৈরী করলেন আর তার নাকে ফুঁ দিয়ে প্রাণবাযু প্রবেশ করালেন যার ফলে মানুষটা জীবন্ত হয়ে উঠল, এরপর গড পূবদিকে একখানা বাগান বানালেন আর বাগানটার নাম দিলেন ইডেন আর গড তাঁর সৃষ্টি করা মানুষটাকে সেই বাগানে রাখলেন, আর সেই বাগানে গড সবরকমের সুন্দর গাছ আর ফলমূলের গাছ পুঁতলেন, বাগানের মাঝখানে গড একটা জীবনগাছ পুঁতলেন যা ভাল আর মন্দ বিষয়ে জ্ঞান দেয়, গড মানুষটিাকে বললেন বাগানের য়ে কোনও গাছের ফল তুমি খেতে পারো কিন্তু য়ে গাছ ভালো আর মন্দ বিষযে জ্ঞান দেয সেই গাছের ফল কখনও খেও না, তারপরে গড বললেন, মানুষের নিঃসঙ্গ থাকা ভালো নয়, আমি তোমাকে সঙ্গদান করার জন্যে তোমার মতন আর একজন মানুষ তৈরী করব, গড পৃথিবীর ওপরে সমস্ত পশু আর আকাশের সমস্ত পাখি তৈরি করবার জন্য ধুলোবালি ব্যবহার করলেন, গড ওই সমস্ত পশুপাখিকে লোকটার কাছে নিয়ে এলেন আর লোকটা তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নাম দিল, লোকটা অসংখ্য পশু পাখি দেখল কিন্তু সে তার সঙ্গদানকারী কাউকে দেখতে পেল না, তখন গড সেই মানুষটাকে গাঢ় ঘুম পাড়িয়ে রাখলেন, লোকটা যখন ঘুমোচ্ছিল তখন গড তার পাঁজরের একটা হাড় বের করে নিলেন, গড সেই লোকটার পাঁজরের হাড় দিয়ে তৈরি করলেন একজন মেয়েমানুষ, আর তাকে লোকটার সামনে নিয়ে এলেন। ব্যাস শুরু হয়ে গেল আমাদের পাপ করার স্বাধীনতা।”

    “আরে, ওটা তো ধর্মের বই, ইহুদিদের ভাষা দিয়ে লেখা, ওই গল্পটাই পরে অন্য ভাষায় লেখা হয়েছে, এখন এক ভাষার মানুষ আরেকভাষার লোকের পোঁদে বোমা মারে, অথচ গল্প ওই একটা বই থেকে নেয়া, সেই অ্যাডাম আর সেই ইভের ছেলেপুলে, উত্তরে পিচ্চি বলল, গড নিজে অথচ হাওয়া। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে, দু হাতে পিচ্চিকে জড়িয়ে বলতে লাগল, খোলো খোলো দ্বার, রাখিয়ো না আর বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে, দাও সাড়া দাও, এই দিকে চাও, এসো দুই বাহু বাড়ায়ে।”

    ‘কনে বিন্নি বলল, ওলেঙ্কা, দ্বার তো তোর, তুই তো খুলবি, পিচ্চি সেই ঘরে যাবে।”

    “প্রথম যেদিন ডারউইন সাহেবের গল্পটা পিচ্চি শুনেছিল, ওর মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। পিচ্চির মনে হয়েছিল যে ও কেন আগেই জন্মায়নি, ডারউইন সাহেবের আগে, তাহলে ওর নামই লোকে জানতে পারতো, পিচ্চিও তো একই কথা ভাবে, প্রমাণ যোগাড়ের জন্য ডারউইন সাহেবের মতন ও-ও বাঁদুরে টুপি পরে কম্বল মুড়ি দিয়ে, দক্ষিণ আমেরিকার সমুদ্রতীরে, পাহাড়ে, সেখানকার আদিবাসিদের সঙ্গে মেলামেশা করতো। যাকগে, ডারউইন সাহেব না বললেও ও জানে সব প্রাণী আর গাছপালা একই দানা থেকে জন্মেছে, কিন্তু সেই দানার জায়গাটা দুই পায়ের মাঝখানে কেমন করে হল, তা বুঝতে পারে না পিচ্চি, ও তো রোজই আপেল খায়।”

    “ডায়নোসরদের নিয়ে ইংরেজি জুরাসিক পার্ক ফিল্মগুলো দেখেছে পিচ্চি। ডায়নোসরদের খারাপ, মাংসখেকো দেখতে ওর ভালো লাগেনি। ডায়নোসররা খারাপ হতে যাবে কেন। মানুষ তো ডায়নোসর দেখেনি, শুধু তাদের দেহ, ঠ্যাঙ, মুখের জীবাশ্ম যোগাড় করে, দাঁতের জীবাশ্ম যোগাড় করে, ডিমের জীবাশ্ম যোগাড় করে, অনুমান করে নিয়েছে দাঁতালো ডায়নোসররা খারাপ আর মাংসাশী। মানুষরা নিজেদের মধ্যে ফালতু মারামারি করে বলে ডায়নোসরদেরও মনে করেছে নিজেদের মধ্যে মারামারি করতো। পিচ্চি যদি গাছের মতন উঁচু একটা ডায়নোসর পেতো তাহলে তাকে পুষতো, তার পিঠে বসে, ঘোড়ায় বসার মতন করে, নানা জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো। দেখতো গাছের মগডালগুলো কেমন হয়, মগডালে জুরাসিক আমলের পাখিগুলোর বাসায় ডিমগুলো কতো বড়ো। ”

    “পিচ্চি ঘোড়ায় চেপেছে ; ওর বাবা ওকে জার্মান দাদুর বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে ঘোড়ায় চাপিয়েছিলেন, সেই ধরণের ঘোড়াকে বলে ট্রাকেহনের, চকচকে বাদামি পিঠ, আর কেমন ঘাড় নাড়ে। তার আগে পিচ্চি জানতো না যে ঘোড়াও অনেকরকম হয়। পিচ্চি ভেবেছিল যে ঘোড়া তো ঘোড়াই, তার আবার চেহারা আর চরিত্র আলাদা হবে কেন। জার্মান দাদু একটা বই উপহার দিয়েছেন ওকে, তাতে কতো রকমের ঘোড়ার ছবি আর নাম দেয়া আছে ; দাদু কানে-কানে বলে দিয়েছিলেন যে পিঠে গদি না রেখে ঘোড়ায় চাপলে নাইটফলের মতনই ডেটাইম ফলে প্যাণ্ট ভিজে যাবে, ঘষটানি লেগে।”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা জিগ্যেস করলে, কোমরে দুই হাত রেখে,ঘোড়া কতোরকমের হয় গো ? আমরা বিয়ে করে জংলি ঘোড়ার দেশে যাবো, কী বলো, মোঙ্গোলিয়ায় আছে বোধহয়, চেঙ্গিজ খান ওই ঘোড়ায় বসে পৃথিবী জয় করেছিল, মানে বর্বরের দল মেয়েদের তুলে নিয়ে যেতো নিজেদের দেশে। ”

    “কনে বিন্নি পিচ্চির কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বললে, বাবর তো আরবি ঘোড়া ছুটিয়ে এসেছিল আর তাতে চেপে যুদ্ধ করেছিল বলে লড়াই জিতে গিয়েছিল। তুমি আমার ওপর আরবি ঘোড়া ছোটানোর মতন চাপো। কনে বিন্নি ফোলা বুক আরও ফুলিয়ে, পিচ্চিকে বিছানায় নিয়ে গিয়ে আরম্ভ করল:

    জন সমুদ্রে নেমেছে জোয়ার,

    হৃদয় আমার চড়া

    চোরাবালি আমি দূর দিগন্তে ডাকি—

    কোথায় ঘোড়সওয়ার?

    দীপ্ত বিশ্ববিজয়ী! বর্শা তোলো

    কোন ভয়? কেন বীরের ভরসা ভোলো?

    নয়নে ঘনায় বারে বারে ওঠাপড়া?

    চোরাবালি আমি দূর দিগন্তে ডাকি?হৃদয় আমার চড়া?

    অঙ্গে রাখিনা কারোই অঙ্গিকার?

    চাঁদের আলোয় চাঁচর বালির চড়া

    এখানে কখনো বাসর হয় না গড়া?

    মৃগতৃষ্ণিকা দূর দিগন্তে ডাকি?

    আত্মাহুতি কি চিরকাল থাকে বাকি?

    জনসমুদ্রে উন্মথি’ কোলাহল

    ললাটে তিলক টানো

    সাগরের শিরে উদ্বেল নোনা জল,

    হৃদয়ে আধির চড়া

    চোরাবালি ডাকি দূর দিগন্তে,

    কোথায় পুরুষকার?

    হে প্রিয় আমার, প্রিয়তম মোর!

    আযোজন কাঁপে কামনার ঘোর

    অঙ্গে আমার দেবে না অঙ্গীকার?

    হালকা হাওয়ায় বল্লম উঁচু ধরো

    সাত সমুদ্র চৌদ্দ নদীর পার—

    হালকা হাওয়ায় হৃদয় দু-হাতে ভরো,

    হঠকারিতায় ভেঙে দাও ভীরু দ্বার

    পাহাড় এখানে হালকা হওয়ায় বোনে

    হিম শিলাপাত ঝঞ্ঝার আশা মনে

    আমার কামনা ছায়ামূর্তির বেশে

    পায়-পায় চলে তোমার শরীর ঘেঁষে

    কাঁপে তনু বায়ু কামনায় থরথর

    কামনার টানে সংহত গ্লেসিয়ার

    হালকা হাওয়ায় হৃদয় আমার ধরো,

    হে দূর দেশের বিশ্ববিজয়ী দীপ্ত ঘোরসাওয়ার!

    সূর্য তোমার ললাটে তিলক হানে

    বিশ্বাস কেন বহিতেও ভয় মানে!

    তরঙ্গ তব বৈতরণী পার

    পায়-পায় চলে তোমার শরীর ঘেঁষে

    আমার কামনা প্রেতচ্ছায়ার বেশে

    চেয়ে দেখ ঐ পিতৃলোকের দ্বার!

    জনসমুদ্রে নেমেছে জোয়ার—

    মেরুচূড়া জনহীন—

    হালকা হওয়ায় কেটে গেছে কবে

    লোক নিন্দার দিন

    হে প্রিয় আমার, প্রিয়তম মোর,

    আযোজন কাঁপে কামনার ঘোর

    কোথায় পুরুষকার?

    অঙ্গে আমার দেবে না অঙ্গিকার?”

    “ পিচ্চি বলল, দেবো, দেবো, এখন তো ছাড়ো, দাও বললেই দেয়া যায় নাকি ?”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে, কোমরে দুই হাত রেখে বলল, আমি সেকেন্ড ফিডল হতে রাজি নই। ”

     

         
       
          
           
           
           
          

    “হেঁই মারো মারো টান”

    “হেঁইও”

    “টগবগটগবগ”

    “হেঁইও”

    “ পিচ্চি, রেলস্টেশনের ঘোষকের কন্ঠে জানালো, অ্যাডভোকেট তোমাদের বলেছেন, আমাকে তোমরা ট্রেনিঙ দেবে, সে কথা ভুলে যাচ্ছ কেন ? তোমার সঙ্গে প্রেম করছি, স্টক ফুরিয়ে যাবে না তো ? ওলেঙ্কার জন্য কিছু স্টক বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ও অবশ্য বলেছে, ওর অঙ্গটা সব সময় খুশমেজাজী।

    “কইন্যা ওলেঙ্কা পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে, বুকের ওপরে দুই হাত ক্রস করে, থুতনি ওপরে তুলে বলল, জিভে ঠোঁট বুলিয়ে, আই অ্যাম দি ফার্স্ট টেন্যান্ট, বেবি বয়, আমার চান্স মিস হলো, ঠিক আছে জিরিয়ে নাও। ”

    “কনে বিন্নিও বলল, মুখে বাঁ হাত চাপা দিয়ে, আমিও, আই অ্যাম দ্য ফার্স্ট, তাই প্রেমটা সেরে ফেললুম। বিন্নি তখনও ভাইব্রেশান মোডে, শ্বাসের উল্লম্ফন চলছে, টলনমলন জারি। ”

    “পিচ্চি, পালঙ্ক থেকে উঠে, একবার বিন্নি আরেকবার ওলেঙ্কার দিকে মুখ করে জানতে চাইল, আচ্ছা, ঘোড়াদের পেনিস কত্তো লম্বা হয়, গাধা জেব্রা হাতিদেরও কতো বড়ো হয় ? সিনেমায় ডায়নোসরের ডিককে ছোটো দেখিয়েছে কেন ? ডিক তো হাড়ের তৈরি নয়, তাই জীবাশ্ম পায়নি বলে মানুষেরা ভেবেছে ডায়নোসরদের ডিকও দুচার ইঞ্চির। ব্যাটারা বোকার হদ্দ। আমার এখন নাইটফলের বয়স, তবু আমার ডিক ডায়নোসরদের চেয়ে বড়ো।

    “কই দেখাও, বলে উঠলো কইন্যা ওলেঙ্কা। ”

    “দেখে, হাতে নিয়ে, কইন্যা ওলেঙ্কা বলল, অ্যাডাল্ট হলে অ্যাডাল্ট ফিল্মের লোকগুলোর মতন হবে তোমার ডিক, তখন একে আর ডিক বলা যাবে না, সুন্নত করার ফলে এটাকে অন্য নামে ডাকতে হবে। ”

    “তোমরা ট্রিপল এক্স ফিল্ম দেখো, অ্যাডভোকেট বলেছে তোমাদের সঙ্গে বসে একসঙ্গে দেখতে।”

    “তাতে কী হয়েছে, সেক্স করার আগে দেখে আনন্দ নিই, দেখতে দেখতে যে বুক ধড়ফড় করে, সেইটেই ভাল্লাগে, বলল কনে কনে বিন্নি । ”

    “যেখানে ভাল্লাগে তাকে কী বলে জানো ?”

    “মারবো মুখে একলাথি, বলল কইন্যা ওলেঙ্কা।”

    “তুমি যেই লাথি মারার জন্যে পা তুলবে, আমি চট করে বসে তোমার তাঁবুতে মাথা ঢুকিয়ে আফরিকার ম্যাপ দেখবো। ”

    “সত্যি লাথাবো কিন্তু, বাড়ির মালিক বলে ভেবো না ছাড় পেয়ে যাবে। কইন্যা ওলেঙ্কার কথা শুনে কনে বিন্নি বলল, তুই তাহলে চাইছিস যে পিচ্চি তোর তাঁবুতে ঢুকে ম্যাপ দেখুক। ”

    “পিচ্চি বিন্নি-ওলেঙ্কাকে বোঝাতে আরম্ভ করল, মানুষের বেলায় লিঙ্গ-যোনিও ভাষার জনক। তাই বিপজ্জনক। ধর্ম জানবার জন্যে যুদ্ধের সময় জার্মানরা আর দেশভাগের সময়ে দুদেশের লোকেরা লিঙ্গ দেখে যাচাই করেছিল কে কেন দলে। এখনও দাঙ্গা-ফ্যাসাদের সময়ে নুনুর ভাষা যাচাই করে মারমুখি পাবলিক। নুনুর জন্যেই তো দেশভাগ হয়েছিল। ”

    “চোখে বিস্ময় জড়ো করে কইন্যা ওলেঙ্কা বললে, তুমি কত্তো জানো বেবি বয়। আচ্ছা, অ্যানিমাল প্ল্যানেটে দেখেছি, সেক্স করার সময়ে মাদি হাতি, মাদি ঘোড়া, মাদি গাধা, ওরা তো কই আহ উহ, ওঃ করে না, কেন?”

    “পিচ্চি বলল, ওদের ভাষায় অব্যয় নেই, তাই। সেক্সে অব্যয় এনেছে আমেরিকানরা। চণ্ডীদাস, জয়দেব, ভারতচন্দ্র, আল মাহমুদে, কই অব্যয় নেই তো। ”

    “কনে বিন্নি বলল, সে যাই হোক, আমি কিন্তু রসে থইথই অব্যয় ইউজ করতে ভালোবাসি, এখন যেমন করলুম ; সেক্স মোটেই প্রায়ভেট কাজ নয়, নয়, নয়, নয়,নয়, কাজটা সামাজিক। মরদ আর মাদি যখন একজন আরেকজনের জাপটে নিজেদের ধরা দেয়, তখন মরদটা হয়ে ওঠে শিকারজীবী আর মাদিটা নিজের আনন্দের জন্য সবরকম ফন্দি খাটায়, সে তখন পরোয়া করে না কিচ্ছু। তারা দুজনে একজন হয়ে ওঠে, বিছানার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দ্যায় আত্মনিয়ন্ত্রণ, তখন শুধু ভালোবাসা, ভালোবাসা, ভালোবাসা, ভালোবাসা, আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, একবারে নয়, অনেক বারের অভিজ্ঞতা। ”

    “ওফ, তুমি একখানা চিজ বটে, বলল কইন্যা ওলেঙ্কা।”

    “ইংরেজরা যখন এদেশে ছিল, সেই সময়ে ইংরেজরাই হতো কিউরেটর বা তত্ববধায়ক। পিচ্চির বাবা প্রাচীন ইতিহাস আর প্রত্নতত্ব নিয়ে অনেক পড়াশুনা করেছিলেন বলে উনি এই চাকরিটা পেয়েছিলেন। ”

    “জঙ্গলের অনেক ভেতরে ওরা চলে গিয়েছিল, জড়াজড়ি খেলতে-খেলতে। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা, ঘাসে শুয়ে, পিচ্চির হাত ধরে টান মেরে বলল, এসো, ঘাসের ওপরেই আমার ভাল্লাগে, সেই গুহামনবীর অভিজ্ঞতা পাবো। পিচ্চি টান সমালাতে না পেরে পড়ল কইন্যার বুকের ওপরে, তারপর যা হয়, তাই হলো, ওর স্টক নবীকরণ হয়ে গিয়েছিল। ”

    “এই জঙ্গলে ঢোকার সুবিধের জন্যেই তোমাদের ফোরফাদার এই বাড়িটা তৈরি করিয়েছিলেন, দক্ষিণখোলা, কী হাওয়া একেবারে, বলল বিন্নি। ”

    “পিচ্চির স্কুলে কেউ বলতে পারেনি কেন দক্ষিণখোলা বাড়িই চাই, কেননা সব বাড়ি তো আর অমনভাবে তৈরি হয় না, একটা ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি হয়, তাতে যে ফ্ল্যাটগুলো থাকে সেগুলোর তো চারটে দিক থাকবেই, সবাই তো দক্ষিণমুখো বাড়ি পেতে পারে না। পিচ্চি নিজেই বুঝতে পেরেছিল যে আসলে দক্ষিণ দিকে থেকে এয়ারকাণ্ডিশানের মতন হাওয়া আসে, তাই সকলেই দক্ষিণখোলা ফ্ল্যাট কিংবা বাসা চায়।

    “দক্ষিণ দিকে কী আছে যে এতো হাওয়া আসে ওই দিক থেকে ! বাবার অফিসের লোকেদের প্রশ্ন করার পর পিচ্চি জানতে পেরেছিল যে দক্ষিণ দিকে সমুদ্র আছে ; সমুদ্রের খোলা হাওয়া এসে শহরটাকে ঠাণ্ডা করে তোলে। ওই দিক থেকে বৈশাখ মাসে আকাশ কালো করে যে বৃষ্টিঝড় ওঠে তাকে বলে কালবৈশাখি। ”

    “আরও দক্ষিণে হাঁটছি আমরা, কিছুক্ষণেই লাতিন আমেরিকায় পৌঁছোবো, বলল পিচ্চি। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কা চেঁচিয়ে উঠল, পাগল না কি তুমি, কোথায় তোমাদের বাড়ি আর কোথায় ব্রাজিল পেরু ভেনেজুয়েলা আরজেনটিনা !”

    “আরে দ্যাখোই না তোমরা। আমি তো স্কুলে ভর্তি হবার সময়ে এই রাস্তা দিয়েই গিয়েছি। তোমরা তোমাদের নিজেদের গল্প বল তো, তখন থেকে আমার গল্প শুনছ। কোথায় আগে তোমরা ছিলে ? তোমাদের বাবা নিশ্চয়ই ভালো রোজগার করেন, এতো টাকা দিয়ে ভাড়া নিলেন। আমি তো সলিসিটারমশায়কে একটা মিনিমাম ভাড়ার কথা বলেছিলুম যাতে কেউ না আসে। সে জায়গায় দু-দুটো ডাগর যুবতী চলে এলো, তাও আবার গাঁজা পাতার নেশুড়ে। ”

    “কনে বিন্নি বলল, পিচ্চির গলা জড়িয়ে, যখন তুমি নেশা করবে, তখন একজন কালো সুন্দরী পরী তার কালো জ্যোতিতে তোমাকে মুড়ে ফেলবে, তোমার ভেতরে অনুভব করবে সেই কালো কুচকুচে শক্তিটা, কালী ঠাকুরের মতন, তুমি তার পায়ের তলায় শুয়ে পড়লেও সে জিভ বের করে থামবে না, তোমাকে যতো পেড়ে ফেলতে থাকবে তুমি ততো তার জাপটানিতে ধরা দেবে, যেমন কবিরা কবিতার নেশায় ধরা দেয়, নেশাড়ুরা নেশায়, জুয়াড়িরা জুয়ায়, তোমার আত্মা কালো হয়ে উঠবে, জীবনযাপন কালো হয়ে উঠবে, তুমি কালোর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। তুমি আর তুমি থাকবে না। তোমার চেহারা, তোমার কন্ঠস্বর, তোমার আদবকায়দা এতো কালো হয়ে যাবে যে তুমি চিনতেই পারবে না তুমি পিচ্চি না কালো আগুনের সূর্য।”

    “কনে বিন্নির কোমর জড়িয়ে পিচ্চি বলল, তাহলে তাই হোক। শিগগিরই হোক। যোগাড়-যন্তর করো আমার ভেতরটা কালো কুচকুচে করবার, এখন যেটুকু করেছ, তাতে তো কালো হয়নি, রোজ কালো হওয়া অভ্যাস করতে হবে।”


     

    রিমা খান খাতাটা বন্ধ করে নিজেকে বললেন, নাঃ, কিছুই নেই এই খাতায়, কেবল গাঁজাখুরি কাহিনি, হয়তো মেয়ে দুটো পিচ্চিকে ড্রাগ অ্যাডিক্ট করে তুলে থাকবে, নয়তো এই সব বিদকুটে জ্ঞানের সালতামামি লিখবে কেন। মা-বাপ সম্পর্কে কোনো উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না, ওনারা কোথায় গেলেন, কেন গেলেন। ভোমসাকে আরেকটা ফোন করতে হবে বা ওর থানায় একটা সাডন ট্রিপ দিতে হবে। আর অ্যান্টি নারকোটিক্সে জিগ্যেস করতে হবে মেয়ে দুটো সম্পর্কে ওদের কাছে কী ধরণের তথ্য আছে। পিচ্চির বাড়িতে অ্যান্টি নার্কটিক্সের লোক পাঠিয়ে দেখতে হবে ওরা ড্রাগ নিতো কিনা, নিলেও কোন ড্রাগ নিতো।


     

    ছয় নম্বর খাতায় মন দিলেন রিমা খান।

    “পিচ্চি কইন্যা ওলেঙ্কাকে জড়িয়ে বলল, তোমার গল্প বলো এবার ওলেঙ্কা। ”

    “ওলেঙ্কা নিজের গল্প শোনানো শুরু করল, ওর গল্পতে কালো কুচকুচে হয়ে ওঠার মতন মশলা নেই।”

    “নতুন যে শহরে ওলেঙ্কার বাবা বদলি হয়ে গিয়েছিলেন, যেখান থেকে এখন ওনারা এসেছেন পিচ্চির শহরে, সেখানে বাড়ি ভাড়া নেবার জন্য অনেক টাকা লাগতো, মায়ের মুখে শুনেছিল ওলেঙ্কা, সহজে ফ্ল্যাট পাওয়া যায় না, বাবার অফিস থেকে অনেক দূরে-দূরে বাড়ি ভাড়া পাওয়া যেতো। ”

    “পঞ্চাশ তলা, সত্তর তলা, উঁচু-উঁচু বিলডিঙে ছোটো-ছোটো ফ্ল্যাট আর তার ভাড়াও অনেক, একতলায় ফাঁকা জায়গায় গাড়ি রাখবার জন্যও ভাড়া গুণতে হতো, যদিও ওলেঙ্কার বাবার গাড়িটা ছোটো ছিল, আসার আগে বেচে দিয়েছেন। বাবা ছোটো গাড়িই কিনেছিলেন, ওরা তো মোটে তিনজন, বড়ো গাড়ি কিনে কীই বা হবে, বলেছিলেন মা। ”

    “এখানে হোস্টেলে থাকার সুবিধার জন্যে, ওলেঙ্কার জন্য স্কুটি কিনে দিয়েছেন, হোস্টেল ছেড়ে পিচ্চিদের বাড়িতে থাকতে এসেছে এতো সস্তায় বেশ কয়েকটা ঘর পাবার দরুন, আর স্বাধীনভাবে থাকার সুবিধের জন্যে, তার সঙ্গে ফাউ ভালোবাসার তরতাজা মানুষ।”

    “নতুন শহরে পৌঁছে, শুধু নিজের অফিসের কথা নয়, ওলেঙ্কাকে একটা ভালো কলেজে ভর্তির কথাও ভাবতে হয়েছিল বাবাকে। সেই কলেজের কাছাকাছি যাতে ফ্ল্যাট পাওয়া যায়। কাছাকাছি না হলেও, অন্তত বাসে করে যাতে যেতে পারে, নিজস্ব গাড়ি বা স্কুটার থাকা আজকাল খুবই দরকার, জানতো ওলেঙ্কা, কেননা চারিদিকে মেয়েদের ধর্ষণের সংস্কৃতি আরম্ভ হয়েছে। ওলেঙ্কা চায় নিজের ইচ্ছেমতন ইনটারকোর্স করতে, যাকে পছন্দ হবে তার সঙ্গে, কলেজে মেয়েরা তো তাইই করছে। গাঁজাপাতা ফোঁকাও কলেজে শিখেছে, রেভ পার্টিতে যাওয়া শিখেছে কলেজের বন্ধুদের থেকে। সাড্ডল্য হয়ে উঠেছে শহরের সংস্কৃতি অনুযায়ী।”

    “বাবার সঙ্গে ফ্ল্যাটের খোঁজে গিয়ে ওলেঙ্কা দেখেছিল ওই শহরে লোকে যদি দক্ষিণমুখো ফ্ল্যাট কিনেছে কিংবা ভাড়া নিয়েছে, তাহলে দরোজার ওপরে ঝাড়ফুঁকের ফকির কিংবা ফাঙ সুইয়ের ওঝাকে দিয়ে নানা জিনিস বা ছবি লাগাতো, যাতে বাড়ির লোকে প্রতিবেশি ডাইনিদের কুনজরে না পড়ে, বাড়ির লোকেরা অসুখে-বিসুখে না পড়ে, বাড়ির লোকেদের টাকা-পয়সা নিয়ে টানাটানি না হয়, বাড়ির লোকেদের ঘাড়ে মামদো-ভুতে এসে না চাপে। ”

    “একটা ফ্ল্যাট দেখতে গিয়ে ওলেঙ্কা আর ওর বাবার চোখে পড়েছিল একজন আলখাল্লা-পরা লোক হাতের মালসায় ধুনো জ্বালিয়ে নেচে-নেচে ময়ূরের পালকের ঝাড়ু দিয়ে দক্ষিণমুখো দরোজা থেকে ভুতপ্রেতজিন তাড়াচ্ছেন। দক্ষিণমুখো ফ্ল্যাটের দরোজায় তারা প্রত্যেক দিন সকালে গ্যাঁদাফুলের মালা ঝোলায়, পাতিলেবুর সঙ্গে পাঁচটা কাঁচা লঙ্কা বেঁধে ঝোলায়, সেই মালা আর লেবু-লঙ্কা পরের দিন কর্পোরেশানের আঁস্তাকুড়ে গিয়ে ফেলে দ্যায়। ওলেঙ্কা জানতে পেরেছিল, সেই শহরের লোকে বড়ো বেশি শাস্ত্রে বিশ্বাস করে ; বাড়ি বানাবার আর বাড়িতে থাকার শাস্ত্রকে বলে বাস্তুশাস্ত্র, যেমন সেক্সের শাস্ত্রকে বলে কোকশাস্ত্র। ওলেঙ্কা ওর বড়োমামুর মুখে বাস্তুঘুঘুর কথা শুনেছিল, ওই শহরে বাস্তুশাস্ত্রের কথা জানতে পারলো। ওলেঙ্কা বাস্তুঘুঘু কথাটা শুনে মনে করেছিল এমন ঘুঘুপাখি, যেগুলো গাছের ডালে বাসা বাঁধে না, মানুষের বাড়িতে এসে এখানে-সেখানে ডিম পাড়ে, পায়রাদের মতন ; ঘুঘুপাখি ওলেঙ্কা দেখেছে, পায়রার মতন দেখতে, কিন্তু গায়ের রঙটা ক্যাডবারির মিল্ক চকোলেটের মতন। কেউ-কেউ পায়রার মাংস খায় অথচ ঘুঘুপাখির মাংস খায় না, বোধহয় ঘুঘুপাখির মাংস বিটার চকোলেটের চেয়েও বিটার, করলার মতন তেতো। বড়োমামু বুঝিয়েছিলেন যে বাস্তুঘুঘু পাখিদের বলে না, মানুষদের বলে। যে আত্মীয়রা কারোর বাড়িতে গিয়ে সহজে যেতে চায় না, তাদের বলে বাস্তুঘুঘু। ওলেঙ্কার মনে হয়, সেই লোকগুলোকে খারাপ মনে করা উচিত নয়। ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কাদের বাড়িতে যদি একজন বাস্তুঘুঘু থাকতো তাহলে তার সঙ্গে ও গল্প-সল্প করতে পারতো। বাড়িতে তো মা আর বাবা ছাড়া কেউ নেই। যে বউটা বাসন মাজতে আর ঘর পুঁছতে আসে, তার সঙ্গে বেশি কথা বললে সে বলতো অতোশতো জানিনে বাপু, এখুন আমার এক্কেবারে সময় নেই, আরও পাঁচটা বাড়িতে কাজ সারতে হবে। অন্য যে বউটা সকালে আর সন্ধ্যায় রান্না করতে আসতো, তার সঙ্গে ওলেঙ্কা যদি রান্না ঘরে গিয়ে কথা বলতে চাইতো, সে বলে উঠতো, এই দেখলে তো, তোমার জন্য লঙ্কা বেশি পড়ে গেল, এখন তুমিই বলবে এতো ঝাল খেতে পারিনে, কিংবা বলবে, ওহ তোমার কথায় কান দিতে গিয়ে নুন দিতে ভুলে গেছি। যারা ওই শহরে দক্ষিণমুখো ফ্ল্যাট কিনতে বাধ্য হয়, তারা বাস্তুশাস্ত্রের ইঞ্জিনিয়ারকে ডেকে দরোজা ভেঙে আরেকটু পশ্চিম-দক্ষিণ কিংবা উত্তর-পশ্চিমের দিকে সরিয়ে নেয়। সেই ইঞ্জিনিয়ারের উপদেশ মেনে ফ্ল্যাটের ভেতরেও নানা রকমের অদলবদল করে। পায়খানার দরোজা যদি রান্নাঘরের দিকে মুখ করে হয় তাহলে পায়খানার দরোজায় বিরাট আয়না লাগিয়ে নেয়, যাতে মনে হবে রান্নাঘরের সামনে বুঝি আরেকটা রান্না ঘর রয়েছে। ওলেঙ্কার ইচ্ছা ছিল বাবা অমনই একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিন যার রান্নাঘরের সামনে পায়খানার দরোজায় বিরাট আয়না বসানো আছে ; ও তাহলে নিজেকে পুরোটা আয়নায় দেখতে পেতো, রোজ আয়নার ওলেঙ্কার সঙ্গে গল্প করতো, কলেজে যাবার সময়ে তাকে টাটা করে যেতে পারতো। ”

    “অনেক ঘোরাঘুরির পর ওলেঙ্কার বাবা একটা চল্লিশতলা বিলডিঙের একত্রিশ তলায় ফ্ল্যাট পেলেন। সেই ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওলেঙ্কা নিজেকে বলেছিল, কী বোকা এখানকার লোকগুলো ; এতো উঁচুতে যদি ফ্ল্যাট হয়, তাহলে তার মুখ যেদিকেই হোক খোলা হাওয়া পাবেই, এমনকি দক্ষিণখোলা ফ্ল্যাটও ঝড় উঠলে সামলাতে পারবে না, বন্ধ কর বন্ধ কর বলে-বলে জানলা বন্ধ করতে থাকবে। এতো উঁচুতে ফ্ল্যাট, মশাও আসে না, মশাদের ডানায় ব্যথা করে এতো উঁচুতে উড়ে আসতে। চল্লিশতলা বিল্ডিং বলে সব ফ্ল্যাটেই বিশাল-বিশাল জানালা আর তাতে কাচ বসানো, কাচের রঙ কালচে, যাতে রোদের আলো এসে গায়ে জ্বালা না ধরায়, ল্যাঙটো হয়ে থাকলে কেউ দেখতে না পায়। যারা চাইবে তারা জানলা খুলে রোদ পোয়াতে পারবে। সকালের রোদের আলোয় নাকি ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, বাবা ওকে বুঝিয়েছিলেন একবার, যখন ওরা আগের শহরে থাকতো, আর সেখানে রবিবারের দুপুরে শীতের সময় বাবা গায়ে সর্ষের তেল মাখতেন। নতুন শহরে ফ্ল্যাটগুলো এতো উঁচুতে যে আগের শহরের মতন জানালায় গ্রিল বসানো নেই, চোরে অতো ওপরে উঠতেই পারবে না, ওঠেও যদি, নামতে পারবে না, নামেও যদি, গেটের ওয়াচম্যানের সিসিটিভিতে ধরা পড়ে যাবে। সেখানের পুলিশ ঘুষ নিয়ে ছাড়ার আগে বেদম পিটুনি দেয়, জানতে চায় কোন নেতার আণ্ডারে কাজ করে। ”

    “সেই শহরে শীতঋতু বলে কিছু আসেনা। লোকেরা বলে সেই শহরে চার মাস বর্ষাকাল আর আটমাস বসন্তকাল। ওলেঙ্কার বাবার আর সর্ষের তেল মাখা হতো না, লুকিয়ে মায়ের ময়েশ্চারাইজার মেখে নিতেন, জানে ও, বাবার গা থেকে সুগন্ধ বেরোয় স্নান করে বেরোলে। বাবা অবশ্য বিদেশি ডেওডোরেন্ট মাখতে ভালোবাসেন, বলেন না মাখলে, ভিড়ের দুর্গন্ধ গায়ে চেপে বসবে। সর্ষের তেল মাখার অভ্যাস ছাড়তে হয়েছে বাবাকে, তাতে মায়ের আনন্দ, মায়ের একেবারে পছন্দ ছিল না শীতকালে গায়ে সর্ষের তেল মাখা। ওলেঙ্কার বাবা বাস্তুর ইঞ্জিনিয়ারদের কথাবার্তা বিশ্বাস করেন না, আবার অবিশ্বাস করতেও ভয় পান। উনি বলতেন যে হরপ্পা আর মহেঞ্জোদারো তো বাস্তুর ইঞ্জিনিয়ারদের পরামর্শে তৈরি হয়েছিল, সেগুলো ধ্বংস হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল কেন, লোকে এখনও পর্যন্ত সেই সময়ের মানুষদের ভাষা আজও বুঝে উঠতে পারলো না। যিশুখ্রিস্টের জন্মের তিনচার হাজার আগের ব্যাপার-স্যাপার। ”

    “পিচ্চির দিকে তাকিয়ে কইন্যা ওলেঙ্কা বলল, তুমি ঠিকই বলেছিলে, ভাষা হলো যতো নষ্টের গোড়া, তখন নিশ্চয়ই বুড়োরা বসে বসে চারটে বেদ লিখেছিল, মনু লিখেছিল মনুস্মৃতি। ভেবে দ্যাখ, মনুস্মৃতি না লিখলে ইণ্ডিয়ায় এতো হ্যাঙ্গাম হতো না জাতপাত নিয়ে, রোহিত ভেমুলা আত্মহত্যা করতো না, গোবিন্দ পানসারে, গৌরী লঙ্কেশ আর নরেন্দ্র ধাবোলকর খুন হতো না, গোরুর চামড়া ছাড়াবার জন্যে দলিতদের প্যাঁদানি খেয়ে মরতে হতো না, এখন যারা নিজেদের বলে বামুন, তারাই গোরুর চামড়া ছাড়াতো, জুতো তৈরি করতো, বিফ স্টিক খেতো, অশ্বমেধের পর ঘোড়ার মাংসের কাবাব খেতো। খুঁজে বের করেছিল কিন্তু সাহেবরা, বলেছিলেন ওলেঙ্কার বাবা, জেমস ফারগুসন নামে নীলকুঠির মালিক আর অযোধ্যার রাজার সেনাবাহিনির প্রধান আলেকজাণ্ডার কানিংহাম। অনেক সোনাদানা লুটপাটের পর ওদের হাতে আর কিছু করার ছিল না, তাই ভাঙাচোরা প্রাসাদ আর ধ্বংসাবশেষের বিষয়ে বই লিখতে গিয়ে যা যা মনে হয়েছিল ওদের, লিখে গেছে। এখনকার বাস্তুর ইঞ্জিনিয়াররা ওদের দেয়া জ্ঞান বিক্রি করে দিব্বি বড়োলোক হয়ে যাচ্ছে, কানে হিরে আর কাঁধে গেরুয়া চাদর রেখে বুকনি বিক্রি করে ব্যাটারা। ওলেঙ্কার অবশ্য ইচ্ছে ছিল যে বড়ো হয়ে ওও বাস্তুর টিচার হবে, কার বাড়ির ভেতরটা কেমন হওয়া উচিত, কোথায় কী রাখা উচিত, কোন দিকে মাথা করে শোয়া উচিত, এই সব জ্ঞান দিয়ে মোটাটাকা রোজগার করবে, পড়তে-লিখতে জানলেই হলো। কিন্তু ওলেঙ্কারর বাবা চেয়েছিলেন যে ও বড়ো হয়ে ডাক্তার হোক কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হোক ; ওলেঙ্কার তাই একেবারেই ইচ্ছা করে না বড়ো হতে, বারো বছর বয়সেই আটকে থাকতে চায়, স্যানিটারি ন্যাপকিন বাঁধতে হতো না, তিন-চারদিন ব্যথায় কাতরাতে হতো না, অথচ পুরোনো শহর থেকে নতুন শহরে আসতে-আসতেই ও এগারো থেকে বারো বছরের হয়ে গেল, হঠাৎই পিরিয়ড আরম্ভ হয়ে গেল । ”

    “কইন্যা ওলেঙ্কার বাবা ওকে বুঝিয়েছিলেন কলেজে গিয়ে ভর্তি হবার জন্য কি-কি করতে হবে, কেননা সেই বছর থেকে সরকারি নিয়ম হয়েছিল যে ছাত্র-ছাত্রী নিজেই যাবে ভর্তি হবার জন্য, বাবা-মা বা অন্য কোনো অভিভাবকের সঙ্গে আসার দরকার নেই। ”


     

    রিমা খান নিশ্চিত হলেন যে পুরো গল্পটা বানিয়ে বলেছে ওলেঙ্কা, ওর নাম ওলেঙ্কা নিশ্চয়ই নয়। পিচ্চি যা লিখে রেখেছে, তা থেকে মনে হয় যে সেও তেমন বিশ্বাস করতে পারেনি। মেয়ে দুটোকে এবার কাস্টডিতে নিতে হবে। ভোমসোকে বলতে হবে আদালতে তোলার জন্যে প্রমাণ যোগাড় করে রাখতে তার আগে, নয়তো জামিন পেয়ে গেলে উকিল ওদের গড়েপিটে মিথ্যের ঝুড়ি করে দেবে।


     

    “নিজের জীবনকে কাহিনি হিসাবে পর্যালোচনা করা আর সেই কাহিনি অন্যদের জানানোটাই মানুষকে করে তোলে মানুষ। জীবনের মানে খোঁজার জন্যেই লোকে কাহিনি ব্যবহার করে, বোঝার জন্যে, যে আমরা কে, সেই কাহিনি দিয়ে বাস্তবকে গড়ে নেয়া হয়। এই হয়েছিল, তাই ঘটেছিল, তারপর সেই ঘটনা, আমি সেখানে ছিলুম, আমি লোকটা অমুক। কাহিনি দিয়ে স্বপ্ন তৈরি করে ফেলা হয়, বর্ণনা করা হয় রোজকার সালতামামি, স্মৃতিকে বিলিয়ে দেয়া হয়, সকলের স্মৃতিই কমবেশি প্রায় একই ধরনের। তা সত্বেও নিজের জীবনের ঘটনা বর্ণনা করা সহজ নয় ; নিজের অভিজ্ঞতা আর বিশ্বাসকে মিথ্যের মধ্যে দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে হয়, কাহিনির চরিত্ররা বর্ণনার শিকার, কাহিনিকারের লুকিয়ে রাখা জগতকে মিথ্যে দিয়ে মুড়ে রাখার চেষ্টা। যে বলছে বা লিখছে সে তা সচেতনভাবেই করে, নিজেকে ভুলতে পারে না, কাহিনি বর্ণনা করার সময়ে। ব্যাপারটা কঠিন কঠিন কঠিন কঠিন। ”


     

    পরের দিন সকালে এসে প্রথমে পিচ্চির সাত নম্বর খাতা পড়তে লাগলেন রিমা খান, যথারীতি সিগারেট ধরিয়ে, টেবিলের তলায় দুই পা দুদিকে ছড়িয়ে। ওনার মনে হল যে পিচ্চি নিজেও বোধহয় অবিশ্বাস থেকে মেয়ে দুটো সম্পর্কে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

    “পিচ্চি কনে বিন্নিকে বলল, তোমার জীবনের গল্প বলো, নিশ্চয়ই গামবেটে হবে, যা একখানা বোম্বেটে মেয়ে তুমি, আমাকেই রক্তাক্ত করে দিয়েছ।”

    “কনে বিন্নিদের বিলডিঙের কাছাকাছি ‘গার্লস ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কলেজ’ সবচেয়ে নামকরা ; কলেজে দরখাস্ত দিয়েছিলেন বাবা, নিজের অফিসের বেসরকারি প্যাডে। কলেজ থেকে চিঠি এসেছিল যে বিন্নি যেন আগামি মাসের তেরো তারিখে দশটা বেজে একুশ মিনিটে কলেজের মেইন গেটে এসে হাজির হয়ে যায়, গেট থেকে বিশেষ গাইড ওকে কলেজের দপতরে পৌঁছে দেবে। এই কিছুকাল আগে পর্যন্ত বাবা-মাকে গিয়ে ধরাধরি করতে হতো, ফর্ম তুলতে হতো। এখন কলেজ ইউনিয়ানের সচিবের কাছে ছাত্রীকে নিজেই ইনটারভিউ দিতে হয়, ফর্ম তোলার জন্যে ক্যাশ পেমেন্ট করতে হতো। দেখা গেলো যে অনেক ছেলে-মেয়ের বাবা-মা নিজেরা কখনও কলেজে পড়েননি, তাই বাবা-মায়ের ইনটারভিউ প্রথা বন্ধ করে দিয়েছে সরকার-অনুমোদিত ছাত্র ইউনিয়ান। বিন্নির মনে হয়েছিল, বাবা-মায়ের ইনটারভিউ হলে ভালো হতো, ওর বাবা-মা তো লেখাপড়া শেখা, স্কুলে আর কলেজে পড়াশুনায় মেডেল পেয়েছিলেন দুজনেই, ভালো ইংরেজি বলতে পারেন। ছাত্র ইউনিয়ানের সচিব বিন্নির কানে কানে বলেছিল যে ওর সঙ্গে এক রাত শুলে অ্যাডমিশানের কোনো সমস্যা হবে না। বিন্নি তক্ষুনি রাজি হয়ে গিয়েছিল, শোবার অভ্যাস ওর আছে, অচেনা কারোর সঙ্গে শোবার আনন্দই আলাদা, তবে বিছানা নরম হওয়া দরকার। ঘাসে, সিমেন্টের ওপর, গাড়ির সিটে, কাঠের খাটে চলবে না, মোটেই চলবে না। তার আগে বিন্নি একা কেমন করে ইনটারভিউ দেবে ও বুঝে উঠতে পারছিল না। ওকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে মানুষের মাথার চুল প্রতিমাসে কয় সেন্টিমিটার বাড়ে, ও উত্তর দিতে পারবে না। ”

    “অথচ নতুন নিয়ম হয়েছে যে কোনো অভিভাবককে, যদি কলেজের গেটের কাছেও দেখা যায়, তাহলে ছাত্রীটিকে তক্ষুনি বিদায় করে দেয়া হবে, আর তার নাম ছাত্র ইউনিয়ানের কালো তালিকায় লিখে রাখা হবে, যাতে ভবিষ্যতে সে কলেজে ভর্তি হতে না পারে, কেবল এই কলেজে নয়, শহরের কোনো কলেজেই তার দাখিলা নেয়া হবে না। শহরের সব কয়টা কলেজ কর্তৃপক্ষ নিজেদের পাহারাদারদের পাকা সড়ক পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে রেখেছেন যাতে তারা নজর রাখতে পারে যে, ভর্তির সময়ে কেউ ছাত্রীর সঙ্গে আসছে কিনা, দূর থেকে পথ দেখিয়ে চলে যাচ্ছে কিনা। অমন কয়েকটা কেস ধরা পড়ার পরে সেই সমস্ত হবু ছাত্রীদের নাম কালো তালিকায় লিখে রাখা হয়েছে, তারা বাধ্য হয়ে শহর ছেড়ে বহু দূরের কোনো শহরে চলে গেছে যেখানে এই শহরের ছাত্র ইউনিয়ানের কালো তালিকাকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। ”

    “কোনো কোনো বাবা-মা মাঝরাতে লুকিয়ে নিজেদের ছেলে মেয়েকে কলেজের পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন যাতে তারা রাস্তা হারিয়ে না ফেলে। বিন্নিকে ওর বাবা রাত দুটোর সময় কলেজের গরমের ছুটিতে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিয়ে এসেছেন গেটটা, বেশ দূর থেকে, যাতে কলেজে ইউনিয়ানের পাহারাদাররা ওনাকে আর বিন্নিকে দেখতে না পায়। বাবা জিগ্যেস করেছিলেন, কী, নিজে চলে আসতে পারবি তো ? বিন্নি ঘাড় নেড়ে জানিয়েছিল যে পারবে। তবু ওর ভয় ছিল, রাস্তায় যদি ধর্ষকরা ওৎ পেতে থাকে, যদি কুড়িজন মিলে ওকে গণধর্ষন করে, সরকার তো বলবে এরকম কোনো ঘটনা আদপে ঘটেনি, কিংবা বলবে অমন ঘটনা তো কতোই হয়, কিন্তু ও কী করবে, তারপর বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য পালটে যাবে, যা এখন হয়েছে। ”

    “বাড়িতে বাবা বিন্নির পরীক্ষা নিয়েছেন যাতে ও কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে নিজেই ফর্ম ভরতে পারে, বাবার নাম, মায়ের নাম, ঠিকানা, ল্যাণ্ড লাইন নম্বর, মোবাইল নম্বর, ইমেল আইডি, উচ্চতা, বুকের ঘের, কোমরের ঘের, পাছার ঘের, পায়ের জুতোর মাপ, বডিসের সাইজ, স্যানিটারি ন্যাপকিনের মাপ, চশমার পাওয়ার, ফর্মের খোপে-খোপে ঠিকমতন ভরতে পারে। ফর্মটা কেমন তা ওর বাবা নিজে দেখেননি, তবু আন্দাজে ওকে বুঝিয়েছেন। বাবা ঘড়িতে দেখে নিয়েছেন ও প্রায় এক ঘণ্টায় ফর্ম ভরে নিতে পারে। প্রথম দিকে বিন্নির ভুল হতো, বারবার প্র্যাকটিস করে নির্ভুল ভরতে শিখে গিয়েছিল। ”

    “ফর্ম ভর্তি ছাড়াও যদি অঙ্কের ইংরেজির সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা নেয়, তাই বিন্নির বাবা বাড়িতে মোবেইল ফোনে অ্যালার্ম লাগিয়ে পরীক্ষা নিয়েছেন। প্রায় মাস খানেক লেগেছে শিখতে। তারপর সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা নিয়েছেন বাবা, যেমন পৃথিবী যে গোল তাহা কী করিয়া প্রমাণ করিবে, সূর্যের চারিধারে পৃথিবী ঘোরে নাকি পৃথিবীর চারিধারে সূর্য ঘোরে, পূর্ণিমা ও অমাবস্যা কেন হয়, গ্রহণ কেন হয়, শীতকাল ও গ্রীষ্মকাল কেন হয়, পৃথিবী কোন দিকে ঘোরে, জোয়ার-ভাটা কেন হয়, এইসব। ”

    “কলেজে যাবার আগের দিন বাবা-মা বললেন, ভালো করে ঘুমিয়ে নে, বেশি চিন্তাভাবনা করিসনি, যাবার রাস্তা তোকে দেখিয়ে দিয়েছি, মোড়ে গিয়ে ছেড়ে দেবো, সোজা কলেজে চলে যাবি। বিন্নির ঘরে এয়ারকাণ্ডিশান চালিয়ে, ওর গায়ে কম্বল চাপা দিয়ে, ঘুমোতে বললেন মা। মোবাইলে অ্যালার্ম লাগিয়ে মাথার শিয়রে রেখে দিলেন। দুপাশে ওর প্রিয় সফ্ট টয়, তিন ফিটের কাঙারু আর দুই ফিটের ইগুয়ানা নিয়ে, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ও ঘুমিয়ে পড়লো। ”

    “দশটা বেজে একুশ মিনিটে স্কুলের গেটে পৌঁছে গেল বিন্নি, ওর হাতে ঘড়ি ছিল, কাঁটায় কাঁটায় মিলিয়ে ও পৌঁছে গিয়েছিল কলেজের গেটে। কলেজে পৌঁছে ও দেখলো, গেটটা সোনালি রঙের, ও হাত বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল যে সেটা লোহার ওপরে সোনালি রঙ করা নাকি সত্যিই সোনার। গেটে কোনো দারোয়ান ছিল না বা ওয়াচম্যান, যেমন ওর আগের কলেজে ছিল। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো সিসিটিভি আছে কিনা যা দেখে ইউনিয়ানের নেতারা বুঝতে পারে গেটে কারা এসে দাঁড়িয়েছে, দেখলো কিছুই নেই, কেবল উঁচু গাছের সবুজ অন্ধকার জঙ্গল, গাছগুলোও অনেক-অনেক ঘেঁষাঘেঁযি, লতারা নির্লজ্জের মতন তাদের জড়িয়ে টঙে পৌঁছে গেছে। ”

    “ব্রাজিলের জঙ্গলের ক্যাসেটে ও দেখেছে এই রকমের গাছ, ওর জ্ঞান-বিজ্ঞানের বইতে এই ধরণের গাছের উল্লেখ আছে, ছবিও আছে। ওই তো তালগাছের মতন দেখতে ব্যারিগোনা, নারকেলগাছের মতন দেখতে হুয়াসাই, রবার গাছ, ব্রাজিল বাদাম -- বাদাম হয়ে আছে ডালে ডালে, উইমবাগাছ -- কি বিশাল আর কতো ওপরে উঠে গেছে, এই গাছগুলোই অন্ধকার করে দিয়েছে কলেজে ঢোকার রাস্তাটা, রেডইন্ডিয়ানরা ভাগ্যিস নেই এই শহরে, ওরা তো মনে করে এই গাছে ভুতপ্রেত থাকে, ফিকাসগাছ -- শেকড়গুলো যেন মাদুরের মতন এলানো। আর, ওহ, কতোরকমের ফুল, কতোরকমের অর্কিড, কতোরকমের প্যাশান ফ্লাওয়ার, লাল টকটকেগুলো নজরে পড়ছে বেশি। বিন্নি একটা ফুল তুলে নিজের খোঁপায় চুলে গুঁজে নিলে, বিন্নি এমন নাচতে আরম্ভ করল যেন ওর গা থেকে লিবার্টি ইকুয়্যালিটি ফ্র্যাটারনিটির সোনার গুঁড়ো ঝরে ঝরে পড়ছে, যেন ও এক্ষুনি ফরাসি বিপ্লব আর নভেম্বর বিপ্লবের পতাকা উড়িয়ে ফিরছে। ”

    “গেটে হাত দিয়ে বিন্নি বোঝার চেষ্টা করছিল সোনার কিনা, কোনো অজ্ঞাত কন্ঠস্বর লাউডস্পিকারে বলল, হ্যাঁ, মিস বিন্নি, অ্যাজ ইউ প্লিজ ওয়ান্টেড টু বি কল্ড, তুমি যথার্থ অনুমান করেছ, স্কুলের গেট সোনায় তৈরি। বিন্নি মনে-মনে নিজেকে বলল, সোনার ? কিন্তু ডাকাতরা এখনও তুলে নিয়ে যায়নি ? এদেশে কি চোর-ডাকাত-বাটপাড় নেই ! বিন্নি শুনতে পেলো কেউ বলছে, লাউডস্পিকারের মতন কন্ঠে, আপনি যথার্থ অনুমান করেছেন মিস বিন্নি, কোনো চোর-ডাকাত-বাটপাড়ের সাহস হয়নি গেট খুলে নিয়ে যাবার, তারা জানে সোনার গেট খুলে নিয়ে গেলে তাদের কেমনতর দশা হবে। ”

    বিন্নি ভাবছিল, আর কোনো ছাত্র-ছাত্রী আসেনি কেন ভর্তি হবার জন্য ! ও শুনতে পেলো কেউ ওকে নির্দেশ করে বললো, মিস বিন্নি, আপনি গেটের মধ্যে যে ছোটো গেট রয়েছে, তার ভেতর দিয়ে সোজা চলে আসুন, আপনার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ অপেক্ষা করছেন। আজকে কেবল আপনাকে ডাকা হয়েছে, প্রতিদিন একজনকে ভর্তি করার জন্য ডাকা হয়। গেটের ছোটো ফোকোর দিয়ে ঢুকে ও দেখলো, বিশাল জঙ্গল, সুন্দরবনের চেয়েও ঘন জঙ্গল, বিশাল বিশাল উঁচু গাছ, যেগুলোকে ও চিনতে পারলো না, কিন্তু শুনতে পেলো কোথাও করাত দিয়ে গাছ কাটা হচ্ছে আর গাছগুলো সশব্দে পড়ে যাচ্ছে।

    ওর বুক ঢিপ-ঢিপ করতে লাগলো, যদি কলেজ ইউনিয়ানের সচিব বা সহসচিব এই গাছগুলোর নাম জানতে চায়, ও তো সঠিক উত্তর দিতে পারবে না। শালপাতার চেয়েও বড়ো-বড়ো পাতা, উঠে গেছে অনেক ওপরে, যেন ও ব্রাজিলের অ্যামাজন জঙ্গলে চলে এসেছে। গাছের ডালে-ডালে নানা রঙের ম্যাকাও পাখি দেখে বিন্নির অবাক লাগলো যে এই পাখিরা ও শহরে কোথা থেকে এলো, ওরাও কি পালকের রঙ অনুযায়ী এক-একটা ইউনিয়ান খুলেছে ! ওকে দেখে ম্যাকাও পাখিগুলোর কী আনন্দ, যেন কতোকাল থেকে চেনে। কতো রকমের রঙবেরঙের ম্যাকাও টিয়াপাখি, সবকয়টা একসাথে গাইছিল, ওয়েলকাম বিন্নি। নীল আর সোনালি রঙের ম্যাকাওপাখি, প্রায় তিন ফিট লম্বা, বড্ডো চেঁচায়। সবুজডানা লাল রঙের ম্যাকাও, ওদের ট্রেনিঙ দিলে মানুষের বন্ধু হয়ে ওঠে, কলেজ থেকে ফেরার সময় একটা এরকম ম্যাকাও বাড়িতে নিয়ে যাবে, কথা বলার মতন অন্তত কাউকে তো পাবে, যে মানুষ হয়ে জন্মায়নি। ছোট্টো হাহনের ম্যাকাও, সবুজ রঙের, ট্রেনিঙ দিলে তাড়াতাড়ি সবকিছু শিখে নিতে পারে, টিয়া পাখির মতন, কথা বলতে পারে। কালো রঙের হায়াসিন্হ ম্যাকাও, এদের পোষ মানানো বেশ কঠিন, সব সময় চায় যে ওদের খেয়াল রাখা হোক।

    পাখিগুলো বিন্নিকে পর্তুগিজ বা স্প্যানিশ ভাষায় স্বাগতম না জানিয়ে পরিষ্কার বাংলায় ওর নাম করে চেঁচাচ্ছিল, স্বাগতম মিস বিন্নি। দুটো পাখি এসে ওর কাঁধের ওপর বসে বললো, চলুন মিস বিন্নি, আপনাকে কলেজের অফিসঘরে নিয়ে যাই, আপনি তো পথ চিনে যেতে পারবেন না এই গভীর জঙ্গলে। চিন্তা করবেন না, বললো একটা ম্যাকাও পাখি, এই জঙ্গলে বিচুটিঝোপ নেই, সাপ-গিরগিটি আছে বটে, তা সেগুলো আমাদের দলের কেউ কেউ খেতে ভালোবাসে, নজর রাখে। বিন্নি জিগ্যেস করল, তা আপনাদের দেখতে এতো সুন্দর কিন্তু এরকম কর্কশকন্ঠ কেন ? লালসবুজ ম্যাকাও সবায়ের হয়ে উত্তর দিলো, আসলে কি জানেন, যাদের যতো সুন্দর দেখতে তাদের কন্ঠস্বর ততো কর্কশ হয়। বিন্নি বলল, ভুল ভুল ভুল, আমাকে দেখতে কতো সুন্দর, আমার কন্ঠস্বরও মাদার মেরির মতন, সুচিত্রা সেনের মতন, মধুবালার মতন, মাধুরী দীক্ষিতের মতন, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতন, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতন।

    বিন্নি জিগ্যেস করল, অফিসঘরটা কোথায়, দেখতে পাচ্ছি না, ইউনিয়ানের সচিব বলেছিলেন তাঁর সঙ্গে শুতে, তা তিনি কোথায় ? নীল-সোনালী ম্যাকাও পাখি সবায়ের হয়ে উত্তর দিলো, ভেতরের ভেতরের ভেতরের ভেতরের ভেতরে। বিন্নি বলল, অতো ভেতরে, আচ্ছা ! এই ঘন জঙ্গলের ভেতরে কলেজের অফিস জেনে ভালো লাগলো বিন্নির। বিন্নিরর আগের শহরের কলেজে ইঁট আর সিমেন্টের অফিসঘরে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে লাইন দিয়ে কেরানিবাবুকে প্রশ্ন করে সবকিছু জানতে হতো, সিলিঙ ফ্যানের ক্যাঁচোর ক্যাঁচোর আওয়াজের তলায় দাঁড়িয়ে। এই কলেজটা কী সুন্দর, কতো হাওয়া, মনে হয় যেন কাছে কোনো নদী বইছে, অ্যামাজন নদীর কোনো ধারা গঙ্গার সঙ্গে মিশে এতোদূর পর্যন্ত চলে এসেছে, অবাক হয় বিন্নি। পাখিরা একজন আরেকজনের হাতে হাই ফাইভ করে বলে গুড লাক।

    অ্যামাজন নদী তো বিশাল, তার জন্যেই পঞ্চান্ন লক্ষ কিলোমিটার জুড়ে আর্দ্র জলবায়ুর অরণ্য, ষোলো হাজার রকমের গাছ আছে, ব্রাজিল ছাড়াও পেরু, কলোমবিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর, বোলিভিয়া, গায়ানা, সুরিনাম আর ফরাসি গায়ানায় ছড়িয়ে। পৃথিবীর শতকরা কুড়ি ভাগ অক্সিজেন আসে অ্যামাজনের জঙ্গল থেকে, তিনশোর বেশি রেডইন্ডিয়ান উপজাতি এখনও থাকে জঙ্গলের ভেতরে --- আরও উপজাতি ছিল, স্পেন আর পর্তুগালের সাহেবরা এসে তাদের মেরে ফেলেছিল, এখন গাছ কেটে-কেটে সাহেবরা জঙ্গলটাকে ছোটো করে ফেলছে। আর গঙ্গার ধারে হেগে হেগে ভারতীয়রা শিবের মাথার ঝর্ণায় গুয়ের গন্ধ পৌঁছে দিয়েছে।

    অ্যামাজন জঙ্গল না থাকলে কোথায় যাবে পঁয়তাল্লিশ লক্ষ প্রজাতির পোকামাকড়, চারশো আঠাশ প্রজাতির উভচর, তিনশো আটাত্তর ধরণের সাপখোপ-গিরগিটি, চারশো সাতাশ ধরণের স্তন্যপায়ী প্রাণী, নদীর তিন হাজার রকমের মাছ আর জলজ প্রাণী ! বিন্নির কাছে জানতে চাইলে ও কিছুই বলতে পারবে না ; হয়তো ছাত্র ইউনিয়ানের সচিব বলতে পারবে। আগে যে শহরে বিন্নি পড়তো সেই কলেজে তো একটাও গাছ ছিল না, খেলবার মাঠে ঘাসও ছিল না, ছাত্ররা ধুলোয় ক্রিকেট আর ফুটবল খেলতো। বিন্নির শাড়ি রোজই ময়লা হয়ে যেতো। আর এই কলেজে কেবল গাছ নয়, কতো রকমের রঙিন পাখি, কতো রকমের ফুল আর ফল।

    একটা ম্যাকাওপাখি বলল, সাবধানে পা ফেলবেন, বুনো পিঁপড়ের ঝাঁক, ট্যারানটুলা মাকড়সার বাসা, বিষাক্ত ব্যাঙ, সোয়াঁপোকা থাকতে পারে। কলেজে প্রবেশের মুখে ছাত্রীদের বুদ্ধি আর প্রত্যুৎপন্নতা পরীক্ষার জন্য এই ব্যবস্হা রাখা হয়েছে, কিন্তু আপনি আমাদের প্রিয় বলে আগেই সাবধান করে দিচ্ছি।

    শুনে ভয় করতে লাগলো বিন্নির। এ কেমন কলেজ, আর তাদের এ কেমন পরীক্ষা। প্রশ্ন করে পরীক্ষা নেবার বদলে ভয় দেখিয়ে পরীক্ষা নিচ্ছে। কিন্তু ফিরে যাওয়া যাবে না। বাবা বলবেন তুই কতো ভিতু রে ; সামান্য পিঁপড়ে, মাকড়সা, ব্যাঙ, সোয়াঁপোকার কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলি !

    ম্যাকাও দুটোকে কাঁধে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিন্নি পৌঁছোলো একটা ঘোলাটে নদীর পাড়ে, সেখানে কয়েকটা ডিঙিনৌকা বাঁধা রয়েছে, তাতে রেডইন্ডিয়ান উপজাতি মাঝিরা বসে। সব কয়টা মাঝিই চেঁচাতে লাগলো, স্পষ্ট বাংলায়, শ্রীমতি বিন্নি আমার নৌকায় আসুন, কলেজে যাবেন তো, আসুন আমি সন্ধ্যা হবার আগেই পৌঁছে দেবো, কিছুক্ষণেই বৃষ্টি আসবে, আমার নৌকায় ছাউনি আছে, ভিজবেন না। এরা বোধহয় ব্রাজিল বা পেরুর উপজাতি, এরাও বাংলায় কথা বলছে, বেশ আনন্দ হলো বিন্নির। তোমরা বাংলায় কথা বলতে পারো ? অবাক বিন্নি জিগ্যেস করলো মাঝিদের।

    একজন মাঝি, যার গলায় রঙবেরঙের পুঁতির হার, বেঁটে আর মোটা, কাঁধ পর্যন্ত চুল, চোখ দুটো তুলনামূলক ভাবে ছোটো, বলল, কেন পারব না, এখন তো বাংলা ভাষা পৃথিবীর ভাষা হয়ে গেছে, এরকম মিষ্টি ভাষায় সকলেই কথা বলতে চায়, দেখলেন তো পাখিগুলোও বাংলায় কথা বলছিল। ম্যাকাওপাখিরা উড়ে ফেরত চলে গিয়েছিল। বিন্নি মাঝিদের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো, কলেজটা কোথায়, নৌকো করে কোথায় যাবো ? আমি তো ভেবেছিলুম গেট দিয়ে ঢুকলেই কলেজের দপতর, সেখানে ইউনিয়ানের দেয়া ফর্ম ভরে ভর্তি হয়ে যাবো। বিন্নিকে নিজের নৌকোয় নেবার জন্য একজন জিনস-আর টিশার্ট পরা মাঝি আরেকজন মাঝির দিকে হাত দেখিয়ে বলল, মিস বিন্নি, ওর নৌকোয় উঠবেন না, ওর গায়ে গনজালো পিজারোর রক্ত আছে। ব্যাস দুজন মাঝির মধ্যে হাতাহাতি আরম্ভ হয়ে গেল।

    সেই ফাঁকে যে মাঝির গলায় পুঁতির মালা আর ডিঙিতে ছাউনি ছিল, সে বিন্নিকে কোলে তুলে নিয়ে নিজের ডিঙিতে বসিয়ে বলল, আপনার কোনো চিন্তা নেই বিন্নি, এখানে কোনো অঘটন ঘটে না, আপনি নিশ্চিন্তে কলেজে পৌঁছে যাবেন, রাতের ভেতরেই ভর্তিও হয়ে যেতে পারবেন। বিন্নি দেখলো ডিঙিতে ওর বয়সী বা ওর থেকে কয়েক বছর বড়ো একটা মেয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ফিক-ফিক করে হাসছিল, মেয়েটার গায়ে একগাদা প্রজাপতি এসে বসছিল আর উড়ে যাচ্ছিল। ডিঙিতে ওঠার আগে খালি-গা মাঝির গায়েও অমন প্রজাপতির দল এসে কিছুক্ষণ বসছিল আর উড়ে যাচ্ছিল।

    বিন্নি মেয়েটার পাশে গিয়ে বসল, ছাউনিতে বসার জায়গা ওই পাটাতনেই। বিন্নির শহরে তো এই বয়সী মেয়েরা খালি গায়ে থাকে না। বিন্নি মেয়েটাকে জিগ্যেস করলো তোমার আর তোমার বাবার গায়ে এরকম প্রজাপতিরা এসে বসছে কেন? মেয়েটা জবাবে বলল, উনি আমার বাবা নন, আমার দাদু, বাবার বাবা। বলে, টুক করে বিন্নির ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকিয়ে চুমু খেলো। বিন্নির বেশ ভালো লাগলো, ভালো লাগার দরুন ওর সন্দেহ হল, ও নিজে বোধহয় লেসবিয়ান, এরকম ভালো তো আগে লাগেনি, স্কুলে পড়ার সময়ে কতো ছেলেকে চুমু খেয়েছিল।

    মেয়েটা আবার বিন্নির গালে ঠোঁট ঠেকালো, তারপর বলল, তুমি বেশ বোকা, কী করে ভর্তি হবে কলেজে। এই প্রজাপতিরা আমাদের ঘাম থেকে নুন খাবার জন্য আসে। তুমি পোশাক খুলে বোসো, তুমি তো বেশ ঘেমে গেছো, দ্যাখো প্রজাপতিরা তোমার গায়ে এসে বসে নুন খাবে। বিন্নি মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি বোকা নাকি, জানো না গায়ে প্রজাপতি বসলে বিয়ে হয়। মেয়েটা এবার জোরে হেসে বলল, প্রজাপতি না বসলেও বিয়ে হয়। আমাদের দেশে সকলেরই বিয়ে হয়। তারপর জানতে চাইলো, তোমার নাম কী ?

    বিন্নি বলল, আমার নাম বিন্নি। মেয়েটা বলল, আমার দাদুর নাম আলভারেজ, এক ডাকে সবাই দাদুকে চেনে আমাদের গ্রামে। বিন্নি জানতে চাইলো, তোমাদের গ্রাম কোথায়, অনেক দূরে ?

    এই ছোটো নদীটা গিয়ে মিশেছে উরুবাম্বা নদীতে, সেই উরুবাম্বা নদীর তীরে আমাদের গ্রাম, একটু ভেতরে যেতে হয়, নয়তো বর্ষায় উরুবাম্বার জল ভাসিয়ে দেবে গ্রামকে। বিন্নি মাঝির দিকে তাকিয়ে বলল, কলেজ কি রাতেও খোলা থাকে? আমার আগের কলেজে মর্নিং শিফ্ট তো দুপুর বেলাতেই ছুটি হয়ে যেতো। তার পরের শিফ্ট ছয়টায় ছুটি হয়ে যেতো। সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছি, দুপুরে কোথায় কী খাবো, সন্ধ্যা হলে কী খাবো, আমার তো যখন-তখন খিদে পেয়ে যায়।

    মাঝি জলে নেমে নৌকো ভাসিয়ে দিয়ে বলল, বাহ, খোলা থাকবে না কেন, কলেজ মানে তো শিক্ষা, আর শিক্ষা তো চব্বিশ ঘণ্টার ব্যাপার। যতো শিখবেন ততো শিক্ষিত হয়ে উঠবেন। আর খাবার চিন্তা করবেন না, ওই তো দেখুন ওই পারে কতো আনারস হয়ে রয়েছে, ব্রাজিল নাট হয়ে রয়েছে। আমার ডিঙিতেও পাকা কলা আছে, পেঁপে আছে। আপনি যদি মাছ খেতে ভালোবাসেন তাহলে আমি নদী থেকে মাছধরে খাওয়াবো আপনাকে, আমার নাতনি মাছ ধরতে পারে। বিন্নি বলল, মাছ ? মাছ কেমন করে ধরবে, তোমার ডিঙিতে তো জালও নেই, ছিপও নেই, আর রাঁধবেই বা কোথায়।

    দাঁড়ান দেখাচ্ছি, বলে মাঝি উঠে দাঁড়িয়ে, নৌকোয় রাখা একটা সড়কি তুলে জলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে, নাতনিকে বলল, এই নে, দেখিয়ে দে মিস বিন্নিকে। মেয়েটা ডান হাতে শড়কি নিয়ে জলের দিকে ঝুঁকে ছুঁড়ে মারলো, একটা মাছকে গিঁথে তুলে আনলো। শড়কি থেকে মাছটাকে বের করে নখ দিয়ে আঁশ ছাড়িয়ে ফেললো। বিন্নি বুঝতে পারলো যে মেয়েটা কিছুক্ষণ আগেই মাছ খেয়ে থাকবে, তাই গালে চুমো খাবার সময়ে আঁশটে গন্ধ বেরোচ্ছিল।

    মাঝি বললো, এবার এটাকে পাতায় মুড়ে পোড়াবো আর ফ্রেশ মাছ খাওয়াবো আপনাকে। মেয়েটা মাছটাকে একটা টিনের ওপরে রেখে কাঠের আগুনে পুড়িয়ে বিন্নিকে খেতে দিলে, বিন্নি এক টুকরো খেয়ে বলে উঠলো, আরে এ তো স্মোকড বিফের মতন, আগে এই মাছ খাইনি কখনও। মাঝি বলল, এর পর আপনাকে পিরানহা মাছ খাওয়াবো। বিন্নি আতঙ্কিত, বলল, পিরানহা খায় নাকি ? পিরানহারাই তো মানুষ খায়।

    মাঝি বলল, পিরানহা অনেক স্বাদু মাছ, একবার খেলে বার-বার খেতে চাইবেন। এই দেখুন, আমার গলায় যে মালা পরে আছি, তাতে এই লকেটটা পিরানহা মাছের দাঁত। আমাকে একটা অমন মালা দিও তো, বাড়ি ফেরার সময়ে নিয়ে যাবো, বলল বিন্নি। মাঝি নিজের গলা থেকে মালাটা খুলে বিন্নির গলায় পরিয়ে বলল, আপনি এটাই নিয়ে যান না, আমার বাড়িতে অমন অনেক মালা আমার বউ তৈরি করে রেখেছে।

    কিছুটা যাবার পর নদীতে বড়ো-বড়ো ঢেউ উঠছে দেখে আলভারেজ বলল, নৌকোটা কিছুক্ষণের জন্যে কিনারায় লাগিয়ে নিই, ডায়নোসরের পাল বোধহয় নদী পার হচ্ছে, ওই পারের জঙ্গল অনেক ঘন তো, মগডালের কচি পাতা আর ফুল খেতে ওরা ভালোবাসে। বিন্নি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, বলল, ডায়নোসররা আর আছে নাকি, কোটি-কোটি বছর আগে সব রকমের ডায়নোসর মরে গেছে, এখন কেবল তাদের জীবাশ্ম, মানে ফসিল, পাওয়া যায়। বিন্নির কথায় মেয়েটা ওর গায়ে ঢলে পড়ে হাসতে লাগলো। বললো, তুমি তো দেখছি কিছুই জানো না, জুরাসিক পার্ক ফিল্ম দ্যাখোনি, এখানেই তো তার শুটিং হয়েছিল, এখানকার সবরকমের ডায়নোসররা তাতে অভিনয় করেছিল।

    শুনে ভয় করতে লাগলো বিন্নির, বলল, টির‌্যানোসরাস রেক্সরা এখনও বেঁচে আছে, তাহলে তো আমাদের সবাইকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। মেয়েটা বিন্নির গায়ে নিজের খোলা বুক চেপে বলল,, তুমি তো আচ্ছা পাগল দেখছি। এদেশের ইতিহাস পড়োনি। স্পেন আর পর্তুগালের লোকেরা যখন প্রথম এসেছিল তখন ওরা টির‌্যানোসরাস রেক্সের মাংসই তো খেতো। ওরা টির‌্যানোসরাস রেক্সদের খেয়ে-খেয়ে নিশ্চিহ্ণ করে দিয়েছে, যে কয়টা বেঁচে আছে তাদের পোষ মানিয়ে নেয়া হয়েছে, তারাই ফিল্মে অভিনয় করেছিল। অন্য মাংসাশী ডায়নোসরদেরও পোষ মানিয়ে নেয়া হয়েছে। এখন যে ডায়নোসররা জঙ্গলে বেঁচে আছে, তারা শাকাহারি, আমরা মাঝে-মাঝে তাদের ডিম যোগাড় করে খাই, খুবই পুষ্টিকর, একটা ডিমের অমলেটে বাড়ির সবাইকার পেটপুরে খাওয়া হয়ে যায়।

    নৌকোটা জোরে-জোরে দোলা আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। আলভারেজ বলল, নাতনি, ছইয়ের ভেতরে ব্রন্টোসরাস ডায়নোসরের একটা ডিম রাখা আছে, দেখা, বিন্নিকে দেখা। ছইয়ের পাটাতনে রাখা একটা ফুটবলের মাপের ডিমের দিকে আঙুল দেখিয়ে মেয়েটা বলল, ওই যে। নৌকো বেশ দুলছিল বলে নিজের জায়গা ছেড়ে ডিমটা হাত দিয়ে দেখার সাহস হলো না বিন্নির। পরে দেখবে। এখন ও উৎসুক সত্যিকারের ডায়নোসরের দল দেখবার জন্য। নাতনি হাততালি দিয়ে উঠতে বিন্নি চেয়ে দেখলো সত্যিই একদল চারপেয়ে উঁচুগলা ফিকে সবুজ রঙের ডায়নোসরের দল, অন্তত কুড়িটা হবে, বড়ো ছোটো মিলিয়ে, এতো গভীর নদী হেঁটে পার হচ্ছে, যে ডায়নোসরটা সবচেয়ে ছোটো তারও পুরো পা নদীর জলে ডুবছে না। মাঝির নাতনির হাততালি শুনে সবচেয়ে বড়ো ডায়নোসরটা ওদের নৌকোর কাছে মাথা নামিয়ে যেন চেনার চেষ্টা করল।

    ভয়ে বিন্নির বুক ওঠা-নামা আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, কি বিরাট মাথা, নাতনি ডায়নোসরের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করছে দেখে বিন্নিরও হাত বোলাবার সাহস হলো। হ্যাঁ, ঠাণ্ডা, একটু খসখসে। ভোঁষ-ভোঁষ করে মোষের মতন শ্বাস ফেলছে। বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। মোবাইল ফোনটা সঙ্গে রাখলে ডায়নোসরের সঙ্গে, নাতনির সঙ্গে, অ্যালভারেজের সঙ্গে অনেকগুলো সেলফি তুলে নিতে পারতো। আনতে পারেনি, কলেজে নিষিদ্ধ বলে। ডায়নোসরগুলো ওই পারে চলে গেলে অ্যালভারেজ আবার নৌকো চালানো আরম্ভ করল।

    নাতনি কলার কাঁদি বিন্নির সামনে এনে রাখলে কয়েকটা খেয়ে মনে হলো পেট ভরে গেছে। নাতনি তবু একটা আনারস ছাড়িয়ে কিছুটা বিন্নিকে খাবার জন্য দিলো। কী মিষ্টি। বিন্নিকে ঠেলে ওলেঙ্কা চেঁচিয়ে উঠলো, ওই দ্যাখো, ওই দ্যাখো, এর আগে দেখেছো এই সাপ? বিন্নি দেখেছিল, ভেবেছিল জঙ্গলের বাঁশ জলে পড়ে কালো হয়ে গেছে আর ভাসতে ভাসতে চলেছে। মাঝির নাতনি বলল, ওটা অ্যানাকোণ্ডা সাপ। এই সাপ নিয়েও গাঁজাখুরি ফিল্ম হয়েছে। সাপগুলো অমন নয়। যেসব সাপ জড়িয়ে ধরে শিকারকে মেরে খায়, এই সাপও তেমনি। তবে এই সাপেরা ফিল্মে অভিনয় করেনি। ফিল্মে রবারের সাপ বানিয়ে দেখানো হয়েছে। আমাদের গ্রামে এসেই তো শুটিঙ হয়েছিল। জবাবে বিন্নি বলল, আমি ফিল্ম দেখিনি, অ্যানিমাল প্ল্যানেট আর ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে টিভিতে দেখেছি। আমার মা বলেন ফিল্ম দেখে কোনো জ্ঞান হয় না, সব বানানো গল্প, তার চেয়ে যা সত্যি সেগুলোই দেখা আর পড়া ভালো। বিন্নি জিগ্যেস করল, মাঝির নাতনি, তুমি সারাদিন দাদুর সঙ্গে নৌকোয় ভেসে বেড়াও? বাড়িতে চিন্তা করেন না মা-বাবা ?

    মাঝি অ্যালভারেজ দাঁড় বাইতে-বাইতে বলল, আমিই ওকে সঙ্গে নিয়ে আসি, আটজন নাতির পরে আমার এই এক নাতনি, আমার তিনটে ছেলের সকলেরই ছেলে। ছোটো ছেলেটার এই এক মেয়ে। ওকে বাড়িতে রেখে আসলে সবাই মিলে নানা কাজ করায়, তাই আমি সকালে বেরোবার সময়ে সঙ্গে আনি। আমার নিজের তো মেয়ে ছিল না। বংশে এই এক মেয়ে। সব সময় নজরে-নজরে রাখি। বিন্নি বলল, ওকে জামা পরিয়ে আনো না কেন ? আমাদের শহরে এই বয়সে মেয়েরা সবাই সব সময় জামা পরে থাকে। নাতনি বলল, আমার বড্ডো গরম লাগে, জামা পরে বেশিক্ষণ থাকতে পারি না। তাছাড়া জামা পরে না থাকলে কতো প্রজাপতি এসে বসে আমার গায়ে, আদর করে, ডানার বাতাস দেয়।

    বিন্নি বলল, ধ্যুৎ, ওটা কোনো যুক্তি হলো না। এখন মাঝনদীতে তো আর প্রজাপতিরা এসে বসছে না তোমার গায়ে নুন বা চিনি খাবার জন্য। নাতনি বলল, চিনি নয় মশায়, নুন, নুন, তুমি দেখো না জিভ দিয়ে নোনতা কিনা।

    ইউনিয়ানের সচিব বলল, বিন্নি, হয়ে গেছে, এবার চোখ খোলো, তুমি ভর্তি হয়ে গেছ কলেজে, আর কোনো চিন্তা নেই, প্রতিদিন ক্লাস না করলেও চলবে, পারসেন্টেজের ভাবনা ভাবতে হবে না, সব ম্যানেজ হয়ে যাবে, তুমি আজ থেকে আমাদের ইউনিয়ানের মেম্বার, এই নাও আই-পিল, এটা খেলে গর্ভগোলমাল হবে না।

    ব্যাস, সব ম্যানেজ করতে শিখে গেছি তারপর থেকে, পিচ্চিকে বলল বিন্নি। আমার গল্প এইটুকুই।

    কোনো প্রতিরোধ আমাকে অনুৎসাহ করতে পারেনা, যে মেয়ে বেঁচে থাকার শিল্পকে করায়াত্ত করেছে, কোনো অসুবিধা তাকে হতাশ করতে পারে না, প্রতিবন্ধকতা হল দ্বন্দ্বের সন্মুখীন হওয়ার চাবিকাঠি, বাধাবিপত্তি, তোমার কাজ করার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ, তা তোমাকে সাহস আর তেজ দেবে, প্রতিটি প্রতিবন্ধকতার পরে তুমি নিজেকে আরও বেশি সফল প্রমাণ করতে পারবে।


     

    প্রেস সেকশান প্রতিদিন তাঁর কাছে সেই দিনকার সংবাদপত্রের জরুরি কাটিংগুলো ফাইল করে, সঙ্গের কাগজে কোন থানার এলাকা আর সম্ভাব্য পন্হা সম্পর্কে নোট লিখে রিমা খানের কাছে পাঠায় ; রিমা খান নিজের মতামত দিয়ে ডিসিপিকে পাঠান। আজকে প্রথম কাটিং পড়েই রিমা খানের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। যে পত্রিকায় সংবাদ বেরিয়েছে তার বাজার ভালো। রিমা খান প্রেস সেকশনের ইনচার্জকে ডেকে পাঠালেন। সে এলে, বললেন, এটা কী ? এই সংবাদপত্রে সাহিত্যিকদের জারজগুলো চাকরি করে জানি, কিন্তু এটা কেমন খবর, আর কোন থানার ওসি এই খবরটা চাউর হতে দিয়েছে ?

    সংবাদের শিরোনাম, “ভিনসেন্ট ভ্যানগগের কান পাওয়া গেছে এই শহরের ম্যানহোলে”। সঙ্গে যে দুটো ফোটো তার একটা স্হানীয় একজন দলিত সাফাই কর্মচারীর হাতের তালুতে একটা কান, কানে হীরে বা নকল হীরের টপ, দ্বিতীয় ছবিটা কানে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা ভ্যান গগের পেইনটিঙ। আসল সংবাদের আগে ভ্যানগগের কান কাটার কাহিনি। সাংবাদিকটা কখনও নেদারল্যাণ্ডস যায়নি নিশ্চয়ই, ভ্যান গগ মিউজিয়ামও দ্যাখেনি। খবরটা এইভাবে ফেনানো হয়েছে :

    চিঠি হাতে পোস্টম্যান বা ডাকপিয়ন জোসেফ রঁলা।। তুলির সুচারু টানে আর জ্ঞানে ও এখন অমর। বেদনায় ফুটে ওঠে অন্য রূপ। বললেন ভিনসেন্ট- কী ব্যাপার? আমার চিঠি? হাসিমুখে চিঠি দেন জোসেফ রঁলা।। চিঠি খোলেন ভিনসেন্ট। পল গঁগা চিঠি লিখেছেন। বলেছেন- তোমার সঙ্গে আমি কিছু সময় কাটাতে চাই। খুব তাড়াতাড়ি আসছি। ভিনসেন্ট তখনই বসে যান পল গঁগাকে চিঠি লিখতে :

    আর্লস ১৭ অক্টোবর ১৮৮৮

    প্রিয় গঁগা,

    তোমার চিঠির জন্য ধন্যবাদ। তুমি লিখেছো, 'শপথ করে বলছি আমি তোমার কাছে আসবই। এই মাসের কুড়ি তারিখের পরে যে কোনো একদিন।' মনে রেখো পল, ট্রেন জার্নিটা হয়তো একটু কষ্টদায়ক কিন্তু যখন আসতে আসতে পথের দু'পাশের দৃশ্য দেখবে, কষ্টের কথা তোমার মনে থাকবে না। অপূর্ব সব দৃশ্য। আমি যখন এসেছিলাম সেই সব দৃশ্য আমাকে পাগল করে তুলেছিল। একটু ঈর্ষা হচ্ছে তুমি সে দৃশ্য দেখবে। আমার মনে হয়েছিল জাপানের নিসর্গের কথা। শীত পড়বে কিছুদিন পরেই। যখন এখানে মিসত্রাল বয় তখন সময়টা কঠিন, এ ছাড়া অন্য সময় বেশ ভালো। তুমি আর আমি ছবি আঁকবো মিসত্রালের ফাঁকে ফাঁকে। আমার বাড়িটা তেমন সাজানো-গোছানো নয় বন্ধু। একজন গরিব শিল্পীর বাড়ি যেমন হয়। একটু একটু করে ভালো হবে, তা নিয়ে ভেবো না। দু'জনের সঙ্গে দু'জনের দেখা হবে, সেটাই হলো আসল খবর।

    তোমার চিরকালের বন্ধু ভিনসেন্ট


     

    অক্টোবরে এক ঝড়ের দুপুরে ঝড়ের কাকের মতো এসে উপস্থিত হলেন পল গঁগা। ফ্রান্সের এক নির্জন, নিঃসঙ্গ জায়গা। ছোটো জনবসতি। ভাবতেই পারিনি পল, তুমি আসবে। বা, বলেছিলাম না; আসব।পথে কোনো কষ্ট হয়নি তো তোমার? তোমার কথাই ঠিক। পথের কষ্ট কষ্টই নয়, যেসব ছবির মতো দৃশ্যের ভেতর দিয়ে ট্রেন এসেছে।চল, বাড়িটা দেখ। পাশের ঘরটা তোমার। নতুন বিছানা, নতুন সবকিছু। টাকা পেলে কোথায়?সে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। থিও আছে না?

    বোঝা গেল পল গঁগা এমন বাড়ি দেখে মোটামুটি খুশি। এক সময় বলে গঁগা বললে, তা বন্ধু, এখানে কোনো ল্যাটিন কোয়ার্টার নেই ? একেবারে নিরামিষ? ভিনসেন্ট বললেন, প্যারিসের পিগালে এখানে নেই, কিন্তু যা আছে সেটাও বা মন্দ কী? নানা বয়সে নারী। আজ তো টায়ার্ড। কালকে যাওয়া যাবে।পল গঁগা প্রশ্ন করেন, প্যারিসের পিগালেতে গ্যাবি নামে একটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তোমার, তাই না? ওকে দেখতেই তো যেতে। তারপর কী হলো? সতেরো বছরের একটা মেয়ে নতুন নেমেছে বাজারে। ও এখন কোথায়? শুনেছি, ও নাকি আর্লস এসে ব্যবসা শুরু করেছে। তুমিও তো এখানে। দেখা হয় না? ভ্যান গগ বললেন, গাব্রিয়েলা এখানেই।

    মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছেন ভিনসেন্ট ! সারাজীবন কাউকে গভীর করে ভালোবাসার জন্য হৃদয় ছিল উন্মুখ। এক ধরনের বন্যতা ছিল মেয়েটার চরিত্রে। প্রথম যাকে ভ্যান গগ ভালোবেসেছিলেন সেই 'কে' নামের মেয়েটা প্রত্যাখ্যান করে চলে গেছে। এর পর চলে গিয়েছিল নেদারল্যান্ডসের নিউনুনে। ভিকার বা যাজক হয়ে। সেখানেই শুরু হয়েছিল তার 'পোটাটো ইটার' বা 'আলুখেকো গরিব' মানুষের ছবি আঁকার সিরিজ। শুরু হয়েছিল প্রতিভার বিস্ময়কর বিকাশ। গ্যাবির সঙ্গে দেখা পরে। গ্যাবি যখন আর্লসে চলে গেল, ভিসসেন্টও চলে এলেন আর্লস। প্রেম পড়ে গেলেন সূর্যমুখী ফুলের আর গ্যাব্রিয়েলার।

    বিকেলের পরে আঁকতে বসেছেন। তার আগে ভিনসেন্টের ছবিগুলো দেখা আর ভালো-মন্দ বলা। বিশেষ করে বুলফাইট নিয়ে আঁকা ছবিটা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন পল গঁগা। ষাঁড় যখন হেরে গিয়ে মাটিতে পড়ে যায়- ওর কানটা কেটে নিয়ে ম্যাটাডর সমবেত দর্শকদের দেখায়, ষাঁড়ের কান। রক্ত ঝরতে ঝরতে পরাজিত ষাঁড় যখন মরতে বসে, তখন তলোয়ারের এক কোপে ওর মাথাটা কেটে ফেলা হয়।

    এত কিছু যদি জানো তাহলে বুলফাইটের ছবি আঁকা কেন? কেন নয়? তুমি বল ছবিটা কেমন হয়েছে?

    ছবি ঠিক আছে। আমি কখনও এ বিষয়ে ছবি আঁকবো না। কী নিয়ে আঁকবে? কোনো এক দূর দ্বীপে চলে যাব আপন মনে ছবি আঁকতে। কী যে হবে তখন কে বলতে পারে!

    ভিনসেন্ট বুঝতে পারেন, দু'জন শিল্পী হলেও দু'জনের দেখার চোখ এক নয়। তাই আলো চলে যাওয়া মুহূর্তে যখন ছবি আঁকতে বসেছেন পল গঁগা, ভিনসেন্ট বলেন, এই অল্প আলোতে এমন ম্যাটমেটে ছবি কেন আঁকছো? শুরু হলো তর্কবিতর্ক। পল অনেক দিন থাকতে এসেছিলেন। দ্বিতীয় দিনেই বুঝতে পারেন- বেশি দিন থাকা যাবে না। ভিনসেন্ট ঝগড়া করতে করতে বলেন, তুমি আবার ফট করে চলে যাবে না তো ?

    একা থাকার দুঃসহ ভার থেকে মুক্তি চান তিনি। গগাঁ কোনো উত্তর দেন না। ভিনসেন্ট বলেন, এই তো আবার থিওর টাকা এলো বলে। তখন প্রাণভরে যত ইচ্ছা আবসাঁথ টানা যাবে।

    সন্ধ্যার পর দুই বন্ধু চলে গেলেন রেডলাইট এরিয়ায়। ভিনসেন্ট সোজা গ্যাবির ঘরে। বলেন, দেখ এদের মধ্যে কোন মেয়ে তোমার পছন্দ। পল বলেন, তোমার গ্যাবির সঙ্গে অন্তত একবার শুতে পারবো না? অমন চিন্তা কখনও করবে না। ও কি ভার্জিন ? ফালতু বোকো না। হাতাহাতি আরম্ভ হবার যোগাড়। কোনোমতে ওদের সামলায় অন্য মেয়েরা। পল গঁগা ওদের একজনকে পছন্দ করেন। কিংবা বলা যায় ওদের একজন এই ভবঘুরে আঁকিয়েকে পছন্দ করে। নারীসঙ্গম ছাড়া শিল্পীরা মনের মতন কাজ করতে পারেন না। দু'জন শিল্পী নেশায় চুর হয়ে বাড়ি ফেরেন। পরের দিন সকালে আবার হাতাহাতি হবার যোগাড়।

    একদিন ভিনসেন্টের তেড়ে জ্বর এলো। পল ভাবলেন এবার কেটে পড়া ভালো, কেননা আবহ আর ছবি আঁকার মতন নেই। ভিনসেন্টকে বললেন, তুমি শুয়ে বিশ্রাম কর; আমি একটু বেড়িয়ে আসি।ভিনসেন্ট বললেন, আচ্ছা। কিন্তু এক সময় তাঁর আশঙ্কা হলো, গগাঁ এখনও আসছে না কেন? ও নির্ঘাত সুযোগ পেয়ে গ্যাবির কাছে গেছে। ভাবতে ভাবতে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। অনুপস্হিত গগাঁর উদ্দেশে বললেন, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা।

    রেড লাইট এরিয়ায় গিয়ে দ্যাখেন, গ্যাবির ঘর থেকে বের হচ্ছেন পল গঁগা। তরোয়াল বের করে পলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করেন ভিনসেন্ট। পল গঁগাও তলোয়ার হাতে তার নিজের জিনিসপত্রের জন্য কোনো মায়া না করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সোজা তাহিতি দ্বীপে।

    একাকিত্ব, বিষাদ, অসহায়তা ভ্যান গগকে পাগল করে দেয়। ভিনসেন্টে নিজের কানের পেছন ক্ষুরের টানে কানকে মাথা থেকে কেটে আলাদা করেন। কাগজে মুড়ে কানটা গ্যাব্রিয়েলার হাতে দিয়ে বলেন একটা মূল্যবান জিনিস, তুমি বলেছিলে তোমার খুব পছন্দ এটা। ভালো করে রেখে দিও।

    গ্যাব্রিয়েলা ভ্যান গগের কান নিয়ে কী করেছিল কে জানে! ডাক্তারের কথামতো প্রথমে ভ্যান গগ যান সাধারণ হাসপাতালে। কানে বড় ব্যান্ডেজ বাঁধা ভিনসেন্ট সেখানে আট দিন ছিলেন। সাধারণ হাসপাতাল থেকে বের হয়ে কিছুদিন একা ছিলেন। পরে গ্রামবাসীরা পিটিশন করে জানায়, এই পাগলটাকে আমাদের এলাকা থেকে তাড়াও। ও একজন বেশ বিপজ্জনক লোক। এর পর ভ্যান গগের ভাই তাঁকে ভর্তি করে দেন সেইন্ট পল ডি মুসো নামের অ্যাসাইলামে। কান কাটার ঘটনা ঘটেছিল ২৩ ডিসেম্বর ১৯৮৮ সালে। নতুন বছরের কোনো একদিনে চুপ করে গ্যাব্রিয়েলা দেখা করতে এসেছিল তার সঙ্গে। গ্যাব্রিয়েলা জিগ্যেস করেছিল কেন এমন করলে? উত্তর দেননি ভ্যান গগ। কেবল গ্যাবিকে প্রশ্ন করেছিলেন, এটা আমার বিজয়, না পরাজয়ের ট্রফি? তুমি বল, আমি জিতে গেছি, না হেরে গেছি? গ্যাব্রিয়েলা বলেছিল, তুমি একজন মহান শিল্পী, কেউ তোমাকে হারাতে পারবে না। কখনও ছবি আঁকা ছাড়বে না। তোমার গ্যাবি তোমাকে চিরকাল ভালোবাসবে।

    এই শহরের ম্যানহোলে যে কান পাওয়া গেছে তা নিশ্চয়ই কোনো স্হানীয় শিল্পীর, নিজের গ্যাব্রিবেলাকে উপহার দিয়েছিলেন, সেই তরুণী প্রেমিকা তা বাড়ির নর্দমায় বা টয়লেটে ফেলে দিয়ে থাকবেন, বাড়ির অভিভাবকদের ভয়ে। থানার ওসি জানিয়েছেন তাঁরা এই শহরের ভ্যান গগ ও তাঁর গ্যাব্রিয়েলা দুজনকেই খুঁজছেন। হাসপাতালগুলো থেকে তাঁরা কানহীন কোনো রোগীর সংবাদ পাননি, কিন্তু আশা করছেন শীগ্রই শিল্পী ও তাঁর গ্যাব্রিয়েলার খোঁজ পাবেন এবং জেরা করে প্রকৃত তথ্য জানতে পারবেন।


     

    প্রেস সেকশনের ইনচার্জকে সামনের চেয়ারে বসতে বলে রিমা খান জানতে চাইলেন, এটা কোন থানার আনডারের ঘটনা, আর থানার ওসি কে ? ওসিকে বলো আমার সঙ্গে এক্ষুনি দেখা করতে আর কানটা যদি বরফে না রেখে থাকে তাহলে বরফে রেখে নিয়ে আসতে।

    প্রেস সেকশনের ইনচার্জ বলল, সেই ওসি তো আপনার সঙ্গে কাজ করেছে, যখন আপনি কঙ্কাল প্রেমিক মার্ডার কেস ইনভেসিগেট করছিলেন।

    কে ? সুমন মিশ্র ? নাকি রমেন বসু ? ওরা তো রিটায়ার করে গেছে। তাহলে কে ? ওহ ওই ইডিয়টটা, রজত মণ্ডল, আসছে বছর রিটায়ার করবে, এখন টাকা কামাবার ধান্দায় সব খবর চাউর করে মালদার আসামী পাকড়াও করার সুযোগ খোঁজে। ডেকে পাঠাও, ডেকে পাঠাও, রাইট নাও, লাঞ্চ করে আসছি টাইপের কথাবার্তা বললে বোলো যে এক্ষুনি না এলে আজকেই সাসপেণ্ড হয়ে যেতে পারে। নেতাদের বিচি ধরে ঝুলছে বলে মনে করে কেউ ওর পোঁদে বাঁশ করতে পারবে না। বলো যে ওর প্রিয় নেতার বিচি কেটে ওর মুখে পুরে দেবার ঘাঁতঘোঁত জানা আছে আমার, সেই সঙ্গে ওর বিচি কেটেও মালখানায় রাখার ব্যবস্হা করে দিয়ে যাবো। এতো করে গড়েপিটে তৈরি করার চেষ্টা করলুম রজতটাকে, তবু ওর টাকা কামাবার ছোঁকছোঁক গেল না, মিডিয়ার কাছ থেকেও টাকা খায়। ডেকে পাঠাও, ডেকে পাঠাও।

    রিমা খানের চেঁচামেচি শুনে মণ্ডলের শুভানুধ্যায়ী কোনো কন্সটেবল ফোন করে দিয়ে থাকবে রজতকে, মিনিট পনেরোয় মুখের ভয় আর ঘাম রুমালে পুঁছতে পুঁছতে ঢুকল এসিপির চেম্বারে। রিমা খান বললেন, বোসো, এই যে কানটা তুমি বাজেয়াপ্ত করেছ, এতে যে টপ দেখা যাচ্ছে, তা সেই গয়নাটা কোথায় হাপিশ করলে, স্যাকরার কাছে বেচতে গিয়ে জানতে পেরেছো ওটা কোনো মণিরত্ন নয়, নেহাতই ঝুটো, তা কানটা এনেছো ? ব্যাপারটা ইনভেসটিগেট করার আগেই সংবাদপত্রে নিজের নাম দেখার লোভ তোমার গেল না, কতো টাকা দিয়েছে ওই মিডিয়া এমপায়ার ? কান টানলে মাথা আসে কথাটা জানো তো ? এই মাথাটাই ভোমসো খুঁজে বেড়াচ্ছে বেশ কিছু দিন ধরে, এখনও কোনো হদিশ পায়নি। অমন তানজানিয়ার শিমপাঞ্জিদের মতন দাঁত বের করে হেসো না। ম্যানহোলটা কারা পরিষ্কার করাচ্ছিল, করপোরেশান না কোনো প্রা্য়ভেট পার্টি ?

    রজত মন্ডলের দেঁতো হাসি বন্ধ হল, বলল, স্যার, তা তো জানি না, কানটা পাবার পর দুজন সাফাইকর্মী পাড়ার ক্লাবের সচিবের কাছে কানটা দিয়ে সেখান থেকে কেটে পড়েছে, কেউ বলতে পারছে না, কারা পরিষ্কার করাচ্ছিল, করপোরেশনের স্হানীয় কর্মীরা জানিয়েছে, ওরা কোনো আদেশ-নির্দেশ দেয়নি, ওদের কাছে কোনো কমপ্লেন আসেনি।

    ----কানটা বরফে কখন রাখলে ? দেখে মনে হচ্ছে, আজকে রেখেছো, কালকে সারা রাত তোমার থানায় পচেছে, তার আগে নর্দমার পাঁকে পচেছে। ফ্লাস্কে করে এনেছো, ভালোই করেছ, যাও এটা ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে জমা দেবার ব্যবস্হা করো, আমি ওদের বলে দিচ্ছি কি করতে হবে। কানে যে টপটা পরানো সেটাও ওদের কাছে জমা দিয়ে নথি করিও।

    ---হ্যাঁ, স্যার, তাই করছি, বলে, দ্রুত কেটে পড়তে যাচ্ছিল রজত মণ্ডল।

    ---আমাকে বিকেলের মধ্যে রিপোর্ট দাও, কারা নর্দমা পরিষ্কার করানোর জন্যে সাফাইকর্মী দুটোকে কাজে লাগিয়েছিল, আর সাফাইকর্মী দুটোকে খুঁজে বের করে ওদের আশ্বস্ত করো যে ওদের কিছু করা হবে না।

    ---ওদের কাস্টডিতে নেবো না ?

    ---না। ওরা আমাদের সাহায্য করবে, এই গিঁট খোলবার। আর কোনো মিডিয়াকে ইনটারভিউ দিও না। রিটায়ার করার পর যা করার কোরো, তখন নাচের দল তৈরি করে নন্দনে গিয়ে পোঁদ তুলে নেচো।

    রজত মণ্ডল চলে গেলে ভোমসোকে ডেকে পাঠালেন রিমা খান।

    ভোমসো ঘরে ঢুকে বলল, আপনি খবরের কাগজের ওই ভ্যান গগের কান নিয়ে ভাবছেন তো? যদিও থানাটা আমার আণ্ডারে নয়, আমি বেশ কিছু তথ্য যোগাড় করে ফেলেছি। কানের ছবিটা কাগজে পড়ে ওলেঙ্কা নামের মেয়েটা আমার কাছে এসেছিল, ভয়ে মুখ চুপসে গেছে, কাঁদছিল, ও জানালো যে কানের টপদুটো ও পিচ্চিকে পরিয়ে দিয়েছিল, নিজের কান থেকে খুলে। অন্য মেয়েটা, বিন্নি, সেও কাঁদছিল, বলল যে পিচ্চি ওদের দুজনকে ওর ওপর এতো নির্ভরশীল করে তুলেছিল যে ওরা জীবনের সব সমস্যা ভুলে গিয়ে বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিল। বিন্নিও মনে করে, কানটা পিচ্চির। আমি আমার এক শ্যাডোকে বলেছি ম্যানহোলটার দিকে নজর রাখতে। পরিষ্কার করাচ্ছিল কে জানেন ? শুনলে অবাক হবেন। আমি সাফাইকর্মী দুজনকে লোকেট করেছি, ওদের সঙ্গে এনেছি, বাইরে বসে আছে, বলেছি ওদের সাক্ষ্য দিতে হবে, তার জন্যে সরকারের কাছ থেকে টাকা বরাদ্দ আছে।

    রিমা খান, সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বললেন, জানি। তুমি এখনই ওয়ারেন্ট ইশ্যু করিয়ে বাপ আর বড়োছেলেকে গ্রেপ্তার করার ব্যবস্হা করো। আর সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে লোকটার বাড়ি সিল করে দাও। আমি নিশ্চিত, লোকটার সেপটিক ট্যাঙ্কে তুমি তিনটে পুরোনো কঙ্কাল বা হয়তো লাশ আর একটা টাটকা কঙ্কাল পাবে। টাটকা কঙ্কাল এই জন্যে অনুমান করছি যে দেহকে টুকরো-টুকরো করা হয়েছে, পায়খানার পথে মাংসখণ্ডগুলো ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল, যার ফলে জ্যাম হয়ে গেছে নর্দমা, সম্ভবত পুরো পাড়ার নর্দমা। আর পিচ্চির ঘর থেকে কয়েকটা নিজস্ব জিনিশ যোগাড় কোরো, ওর ট্রুথব্রাশ, চিরুনিতে যদি চুল লেগে থাকে বা অন্য কোনো বস্তু যা থেকে ডিএনএ নিয়ে কানটার সঙ্গে আর লাশ বা কঙ্কাল পেলে তার সঙ্গে ম্যাচ করা যায়। হয়তো ওর বিছানার চাদরে আর তোয়ালেতে তুমি নাইটফলের বা মেয়ে দুজনের সঙ্গে সেক্স করার সিমেনের ট্রেসও পেতে পারো।

    ভোম্বোল সোম অ্যাডভোকেট আর তার বড়ো ছেলের নামে ম্যাজিস্ট্রেটের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা লিখিয়ে লোকটার বাড়ি-কাম-দপতরে গিয়ে সার্চ করা আরম্ভ করল। রিমা খান যেমন বলেছিলেন, ফ্লাশ পায়খানার সেপটিক ট্যাঙ্কের ওপর থেকে সিমেন্টের স্ল্যাব সরিয়ে তার মধ্যে পাওয়া গেল তিনটে কঙ্কাল, দুটো ক্ষয়ে এসেছে আর একটা টাটকা। টাটকার গায়ে তখনও মাংস লেগে। বাড়ির ভেতরে একতলার টয়লেটে ভোম্বোল সোম পেলেন মার্বল স্ল্যাব কাটার দশটা ডিস্কব্লেড, একশো সাতাশ এমএমের বশ কোম্পানির ইলেকট্রিক হ্যাণ্ডসেট, তার ওয়ারেন্টি অ্যাডভোকেটের নামে।


     

    অ্যাডভোকেট আর তার বড়ো ছেলেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ কাস্টডিতে রাখার আদেশ যোগাড় করে ফেলেছে ভোম্বল সোম। রিমা খানের ঘরে মুখ নিচু করে বসেছিলেন অ্যাডভোকেট আর তাঁর বড়োছেলে। রিমা খান জিগ্যেস করলেন আপনি এটা করলেন কেন ? আপনি করেননি, অন্যেরা করেছে, তাও বলতে পারবেন না, যাবতীয় এভিডেন্স আপনার বাড়ি থেকে পাওয়া গেছে। আপনি এতোই নিষ্ঠুর আর নির্দয় যে মার্বল কাটারের ডিস্কব্লেড দিয়ে শরীর থেকে মাংস কুরে কুরে ফ্লাশ করে দিতেন। যে পরিবার আপনাকে এতো বিশ্বাস করতো তাদের সদস্যদের আপনি কেবল খুন করেননি, তাদের মাংসও গুয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। তার কারণ আমি জানি। আপনার সব কয়টা ছেলে অশিক্ষিত অপগণ্ড, তাদের জন্যে আপনি অন্যের সম্পত্তি দখল করে ভোগ করতে চাইছিলেন। ভেবেছিলেন গান্ধিমার্কা অ্যালুমিনিয়ামের চশমা নাকের ডগায় ঝুলিয়ে, মহাত্মার চেহারা আয়ত্ব করে ফেলবেন। আপনার বড়ো ছেলেকে থার্ড ডিগ্রির সামান্য ডোজ দিতেই কাঁদতে-কাঁদতে সবকিছু ফাঁস করে দিয়েছে।

    পিচ্চিকে ভালোবাসার ফাঁদে ফেলার দরকার ছিল না তো ? আপনি ভেবেছিলেন যে মেয়ে দুটোকে হত্যার দায়ে ফাঁসিয়ে নিজে ক্লিন বেরিয়ে যাবেন। কিন্তু দেখুন, ওলেঙ্কা, এখনও জানি না ওর নাম ওলেঙ্কা কিনা, পিচ্চিকে ভালোবেসে নিজের কান থেকে খুলে টপ দুটো পরিয়ে দিয়েছিল, সেই টপের কারণেই আপনাকে সন্দেহ করা আরম্ভ করলেন ইনভেস্টিগেটিঙ অফিসার। পুলিশে আমার একটা বদনাম আছে। কোনো আসামীকে ফাঁসির মাচানে পৌঁছে দিয়ে আমি শারিরীক আর মানসিক আনন্দ পাই। তিনটে হত্যাই যে রেয়ারেস্ট অব রেয়ার, তা আপনার ব্যবহার করা মার্বল কাটিং মেশিন আর ডিস্ক-ব্লেডের সেট প্রমাণ করবে। আপনি এতোই নিশ্চিন্ত ছিলেন যে কাটার ডিস্কগুলো থেকে রক্ত ধোবারও প্রয়োজন মনে করেননি, মেশিন থেকে আপনার আর আপনার বড়ো ছেলের আঙুলের ছাপ মোছার চেষ্টা করেননি। ওগুলো দিব্বি আপনার টয়লেটে রেখে আয়েস করছিলেন। আপনি জানতেন ওই তিনজনকে কিডন্যাপ করার অভিযোগ আপনার বিরুদ্ধে কেউ করবে না, ওনারা নিজেরাই আপনার বাড়ি-কাম-অফিসে যাতায়াত করতেন, আপনি আর আপনার বড়ো ছেলে তাঁদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে গিয়ে ভালো খাবার-দাবার খাইয়ে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করলেন। আপনি বোধহয় জানেন না যে পিচ্চি এক ধরণের রোজনামচা লিখতো, তা থেকে আভাসে-ইঙ্গিতে যথেষ্ট পথনির্দেশ পাওয়া গিয়েছে। ব্যাঙ্কের লকারে পিচ্চির বাবা-মায়ের চিঠি রাখা আছে, এটা কেন পিচ্চিকে বলেছিলেন বলুন তো ? তার বদলে দুটো অন্য চিঠি রেখে পিচ্চিকে বিপথে চালাবার চেষ্টা করেছিলেন। আর চিঠিগুলো আপনার মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেটাকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন, তার ঘরে চিঠিগুলোর খসড়া পাওয়া গেছে, উপন্যাস কবিতা নাটকের বই পড়িয়ে তাকে বাগে আনতে পারেননি, সে নিজেই জানিয়েছে যে চিঠিগুলো তার লেখা।

    রুল দিয়ে অ্যাডভোকেটের থুতনি ওপরে তুলে রিমা খান বললেন, আরেকটা কথা, শুনে আপনার ক্রিমিনাল মাথা আরও খারাপ হয়ে যাবে, কানটা যে পিচ্চির তা প্রমাণ হয়ে গেলে, বিন্নি আর ওলেঙ্কার পেটে যে বাচ্চাগুলো এখন কয়েক মাসের ভ্রুণ, তারা যে পিচ্চির সন্তান, তা প্রমাণ হয়ে যাবে। যে দুটো মেয়েকে ফাঁসাবার চেষ্টা করেছিলেন, তাদের কোলে ওই বিরাট সম্পত্তির উত্তরাধিকারী দিয়ে যাবার ব্যবস্হা করে গেছে পিচ্চি। মেয়ে দুজনও নিশ্চয়ই চেয়েছে যে তারা পিচ্চির বাচ্চার মা হতে পারলে জীবনে আর কিছু করার দরকার নেই, সম্পত্তির অর্ধেক তো পাবে, তাইই যথেষ্ট।

    কিছুক্ষণ থেমে রিমা খান বললেন, পিচ্চির জার্মান দাদু আর দিদিমাকে খবর পাঠানো হয়েছে, ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে ; তাঁরা এই দুই তরুণীর আর পিচ্চির বাচ্চাদের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছেন। ওনাদের দেশে এইভাবে অবিবাহিত তরুণীদের বাচ্চা হওয়াটাকে সমাজ আর খারাপ মনে করে না।

    রিমা খানের কথাগুলো শুনতে-শুনতে অ্যাডভোকেট বোধহয় ফাঁসির মঞ্চটা প্রত্যক্ষ করছিলেন। সেই মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে রিমা খান বললেন, আপনার এখন কী হচ্ছে বলুন তো ? আপশোষ বলব না। আপনার হচ্ছে ক্রোধ। বোঝা যাচ্ছে আপনার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে, ব্লাড প্রেশার শুট আপ করেছে, অ্যাড্রেনালিন অ্যাবনর্মাল হয়ে যাচ্ছে, মাথা কাজ করছে না, শরীরের কোথাও কোথাও ব্যথা অনুভব করছেন, ভ্রু নেমে এসেছে, ঠোঁট চেপে আছেন, চোখ কিছুটা ঠেলে বেরোচ্ছে। তার সঙ্গে আপনার ভয়ও করছে, ভয় করলে মানুষ সেখান থেকে পালাতে চায়, এড়াতে চায়, আপনি চেয়ারের হাতল দুহাতে আঁকড়ে আছেন, সেটা আপনার ভয়ের লক্ষণ। ধরা পড়ে গেছেন বলে অবাক হচ্ছেন, কেননা আপনি নিশ্চিত ছিলেন যে ফাঁসলে মেয়ে দুটো ফাঁসবে, আপনার অন্য অপগণ্ড সন্তানরাও জানে না তাদের বাবা তাদের জন্য কেমন ঝুঁকি নিয়েছিল, তাদের চোখে আপনি খুনি প্রমাণিত হলেন, সেই ভাবনা আপনাকে কুরে খাচ্ছে। চোয়াল ঝুলে এসেছে তাই। ধরা পড়ে গিয়ে বিষণ্ণ হয়ে পড়েছেন, হেরে যাবার বোধ কাজ করছে আপনার মধ্যে, অসহায়তা, প্রতিবাদ করতে পারছেন না আমার কোনো কথার, চুপ মেরে গেছেন, মিজারেবল অবস্হা, জীবনে আনন্দের মুড আর ফিরবে না আপনার, দেখুন না ঠোঁটের দুই কোন ঝুলে পড়েছে। যান, আপনি তো এতোকাল উকিলগিরি করলেন, এবার হাজতে বসে নিজের আর বড়োছেলের বাঁচার উপায় বের করতে পারেন কিনা দেখুন। আমরা কিন্তু আপনাকে ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত নিয়ে যাবোই।

    মিলটনের প্যারাডাইস লস্ট-এর একটা লাইন আপনাকে দেখে মনে পড়ছে, “অ্যাওয়েক, অ্যারাইজ অর বি ফর এভার ফলন। ”


     

     

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০১ আগস্ট ২০২১ ১২:২১734808
  • বর্তমান দুনিয়ায় মার্ক্সবাদের প্রাসঙ্গিকতা

    মলয় রায়চৌধুরী

    মার্ক্সবাদ শুনলেই পশ্চিমবাংলার পেটমোটা নাড়ুগোপাল টাইপের নেতাদের মুখ ভেসে ওঠে, গ্রামে তিনতলা আধুনিক বাড়ি, শহরে ছেলের জন্যে নার্সিং হোম, মেয়ের জন্যে ইশকুল করে দিয়েছেন জনগণের গ্যাঁড়ানো টাকায় ; সেই সঙ্গে সাঁইবাড়ি হত্যা, মরিচঝাঁপি গণহত্যা, আনন্দমার্গীদের জ্যান্ত পোড়ানো, নানুর গণহত্যা, নন্দীগ্রাম গণহত্যা আর আরও নানান কেলোর কীর্তি। কিংবা সেই সব গালফুলো নেউলে লেখকদের মুখ ভেসে ওঠে যারা রাতারাতি জার্সি পালটে বামপন্হী শাসকদের লেজ ধরে পুরস্কার বা কুর্সি হাতিয়ে ফালতু বইকেও বেস্টসেলার করে ফেলেছিল। অথচ মার্ক্সবাদ বলতে যা বোঝায় তার সঙ্গে সংসদীয় গণতন্ত্রের কবলে আটক এই লোকগুলোর রাজনৈতিক কাজকারবারের কোনো সম্পর্ক ছিল না।

    সেই কারণেই এই বছর মার্ক্সের দ্বিজন্মশতবার্ষিকীতে, যতোটা বিশ্বকর্মা বা শেতলা পুজো নিয়ে হইচই হলো, মার্ক্সকে নিয়ে বিশেষ তক্কাতক্কি দেখা গেল না। পশ্চিমবাংলার বাঙালির মন থেকে মার্ক্সকে মুছে ফেলতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে সেই লোকগুলো যারা নিজেদের মার্ক্সবাদী বলে চালাবার চেষ্টা করেছে, যেমন বামপন্হী দলগুলো, যেমন নকশালপন্হী নেতারা, যেমন জঙ্গলে বিপ্লব করার জন্য লুকিয়ে থাকা মাওবাদীরা। জানি না চারু মজুমদার কেমন করে অনুমান করেছিলেন যে পশ্চিমবাংলায় বিপ্লব হলে তা বহুত্ববাদী গোঁড়া-ধর্ম, কট্টর মৌলবাদ, জাতিপ্রথা ও বিচিত্র-বিশ্বাস এবং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে থাকা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়বে ; মাওয়ের চিনের স্প্রিং থাণ্ডার শুনে অনেকের মতো উনিও রোমাঞ্চিত হয়েছিলেন, যদিও তার আগেই চিন ভারতের আকসাই চিন আর তিব্বত দখল করে নিয়েছিল। মাঝখান থেকে উনি পশ্চিমবাংলার কিশোর-তরুণদের ক্রিমি লেয়ারকে লোপাট করতে এমন সাহায্য করলেন যে বাঙালি মধ্যবিত্তের একটা পুরো প্রজন্ম নষ্ট হয়ে গেল। আর পশ্চিমবাংলার পিছিয়ে পড়ার সেটাই প্রধান কারণ। মার্ক্সের চালু করা বামপন্হীদের প্রিয় অভিধা অর্থাৎ প্রলেতারিয়েত আর বুর্জোয়ার মাঝে একটা বিরাট মধ্যবিত্ত বাফার শ্রেণি সব দেশেই গড়ে উঠেছে, যাদের আবির্ভাবের কথা মার্ক্স অনুমান করতে পারেননি, আর তারা বেশিরভাগই, যাকে বলে সার্ভিস ইনডাসট্রি, তা থেকে মোটা টাকা রোজগার করে, নিজেদের শ্রমিক বলে মনে করে না। এদের, যাদের বলা হয় মিলেনিয়াম জেনারেশন, তারা মার্ক্স পড়েনি, পড়ার আগ্রহও নেই।

    মার্ক্সবাদীরাই মার্ক্সবাদের সবচেয়ে বড়ো অপপ্রচারকারী হয়ে দেখা দিয়েছে ; তারা সেই ১৮-১৯ শতকেই আটকে আছে ; তার কারণ তারা মার্ক্সের নয়, লেনিনের এবং মাওয়ের ভক্ত। আর স্তালিন যা পেয়েছিলেন লেনিনের কাছ থেকে সেই অর্থনৈতিক মতাদর্শ কমিউনিস্ট দেশগুলোয় কমিনটার্নের মাধ্যমে চাউর করতে চেয়েছিলেন। ট্রটস্কিদের সব কমিউনিস্ট দেশেই খুন করা হয়েছে। মার্ক্স তো খুনোখুনির কথা বলে যাননি যা কাচিনের জঙ্গলে স্তালিন করেছিলেন, মাও করেছিলেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে, পলপট করেছিলেন দেশের খোলনলচে পালটে ফেলার জন্যে। মার্ক্স বলেছিলেন ডিকটেটরশিপ অফ দি প্রলেতারিয়েতের কথা, কিন্তু তথাকথিত কমিউনিস্ট দেশগুলোয় দেখা দিল এক-একজন মানুষ একনায়ক, যেন প্রলেতারিয়েত বলতে তাকেই বোঝায়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তারা ডিকটেটরি করে গেছে ; কুর্সিতে বসে থাকার জন্য নাগরিকদের পেছনে এমন গোয়েন্দা লাগিয়েছিল যে কেউ ভয়ে ট্যাঁ-ফোঁ করতো না।

    নিজেদের মার্ক্সবাদী বলে দাবি করা একনায়কেরা বিভিন্ন সময়ে উৎপীড়কের ভূমিকা নিয়ে মার্ক্সের সুখ্যাতিকে সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ; যদিও মার্ক্স নিজে কখনো এসব খুনোখুনি, গুলাগ আর্কিপেলাগোর নিষ্ঠুর র্বরতা, লাশ লোপাট, লেখালিখির বিরোধিতা, কবিদের গুমখুন ইত্যাদির কথা বলেছেন বলে কোথাও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সোভিয়েত আর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো এবং মাও-শাসিত চীনে সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়ার মূল কারণ হলো সেখানকার সরকার জনগণকে আশানুরূপ জীবনব্যবস্থা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে টেক্কা দিতে পারার মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা লেনিনবাদ-স্তালিনবাদ-মাওবাদ গড়তে পারেনি। ভেনেজুয়েলার মতন একটা ধনী দেশকেও ডুবিয়ে ফেললে আধা-লেনিনবাদী উগো চাভেজ যেটি ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ। চাভেজের শাসনাধীনে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির তেলের মূল্য অনেক বেড়ে যায়। একে পুঁজি করে তিনি দেশে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক আবাসন খাতে বিশেষ সাফল্য দেখাতে সক্ষম হন। তেলের অর্থে দরিদ্র জনগণের জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসুবিধা নিশ্চিত করে সাধারণ ভেনেজুয়েলাবাসীদের কাছে জনপ্রিয় নেতা হয়েছিলেন চাভেজ। তবে গরিবদের জন্য কাজ করলেও গরিব-ধনীর বৈষম্য কমিয়ে আনতে পারেননি। আবার তাঁর সময়েই অপরাধ, দুর্নীতি ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল যে তাঁর শিষ্য নিকোলাস মাদুরো দেশটাকে সামলাতে পারছেন না। আশ্চর্য যে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি ভেনেজুয়েলা সম্পর্কে তেমন উৎসাহ দেখায় না।

    মার্ক্সবাদ শুনলেই কমিউনিস্ট দেশ, কমিউনিস্ট সরকার, কমিউনিস্ট পার্টির কথা এসে যায়। কিন্তু স্তালিন, মাও, পলপট, পূর্ব ইউরপের চোসেস্কুদের মতন একনায়কদের কথা তো বলেননি মার্ক্স, যারা জনগণকে পেঁদিয়ে, সাইবেরিয়ায় পাঠিয়ে, জেলে ঢুকিয়ে, মাটির তলায় পুঁতে, এলাকা-ছাড়া করে, জলচল বন্ধ করে, সমাজ আর রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করবে, সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেবে ; মার্ক্স যা বলে গেছেন তার বদলে নিজেদের মতামতকে কমিউনিজমের নামে চালাবে ! ওই একনায়কদের নকল করতে গিয়ে, তাঁবেদার স্কুল-শিক্ষক নিয়োগ করে আর পাড়ার ক্লাবের মোহোল্লা কমিটির মাধ্যমে স্তালিনি নেটওয়র্ক বসিয়ে, প্রতিটি পরিবারে ব্যক্তিগত সমস্যায় নাক গলিয়ে পশ্চিমবাংলায় জনগণকে পেঁদানোর খেলায় মেতে ছিল বাঙালি কমিউনিস্টরা, আর সমাজকে সাজিয়ে তোলার সবচেয়ে ভালো সুযোগটা হারালো, যেমন আফগানিস্তানে ঢুকে কমিউনিস্ট সরকারকে সিংহাসনে বসাবার জন্যে সোভিয়েত দেশ আত্মহত্যার রাস্তায় এগিয়ে গিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রমাণ করেছে, বেসরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বিলুপ্ত করলেই মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাব পরিবর্তন হয় না। বেশির ভাগ মানুষই স্বভাবজাত কারণে সর্বজনীন কল্যাণের দিকে নিজেকে সঁপে দেওয়ার বদলে নিজের হাতে ক্ষমতা ও অগ্রাধিকার চায়, অন্যদের চেয়ে বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে চায়। মজার বিষয় হলো এখনো যে দেশগুলো নিজেদের মার্ক্সবাদের অনুসারী বলে দাবি করে, সে দেশগুলোর ইতিহাস বলছে, সেখানে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সম্পদের প্রবাহ যৌথ মালিকানাভিত্তিক সম্পদ প্রবাহের চেয়ে অনেক জোরালো ছিল।

    মার্ক্স বলেননি যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি আর ব্যবসাকে ধ্বংস করে দিয়ে তা রাষ্ট্রের আয়ত্বে আনতে হবে। তিনি কিছু-কিছু শিল্পের রাষ্ট্রিয়করণের কথা বলেছিলেন যা আমাদের দেশে নেহেরু আর অন্য পুঁজিবাদী দেশের নেতারা করে দেখেছেন তার ফল কেমন হয়। মার্ক্স বলেননি যে সকলের টাকাকড়ি সোনাদানা কেড়ে নিয়ে তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে আর জনগণের মধ্যে পুনর্বণ্টন করতে হবে ; তিনি বলেছিলেন ধাপে-ধাপে বাড়ানো আয়করের কথা, যা এখন বহু দেশে মান্য করা হয়। মার্ক্স ব্যক্তিগত পরার্থবাদীতার কথা বলেননি, যে লোকে নির্দেশ ছাড়াই কাজ করে যাবে ; তিনি বলেছিলেন যে সবাই নিজের সৃজনক্ষমতা অনুযায়ী শ্রম করবে। সবাইকে খেতমজুর, মিলমজুর কিংবা কারিগর হতে হবে এমন কথা তিনি বলেননি, যা চকচকে সোভিয়েত পত্রিকাগুলো এককালে প্রচার করতো আর হবু বাঙালি কমিউনিস্টরা খেতো ; পলপট তাকে চালু করতে গিয়ে দেশে খুলি আর কঙ্কালের মিউজিয়াম তৈরি করে ফেলেছিল। মার্কস বরং শ্রমিকদের তাদের সৃজনক্ষমতা অনুযায়ী মজুরি দেবার কথা বলেছিলেন।

    কমিউনিজম বলতে বামপন্হীরা যা বোঝানোর চেষ্টা করেন, তা মার্ক্সবাদ নয়, তা লেনিনবাদ আর মাওবাদ। সোভিয়েত রাষ্ট্র কিংবা মাওয়ের চিন, মার্ক্স-কথিত কমিউনিস্ট দেশ ছিল না। সবচেয়ে মজার যে নব্যপুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী দেশ চিন তার একমাত্র দলটাকে বলে কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়না। কমিউনিস্ট পার্টি বলতে কী বোঝায় তা লেনিন বাতলে দিয়ে গিয়েছিলেন, তাই আমাদের দেশের মার্ক্সবাদীরা চোখ খুলে দেখেনি যে জাতিপ্রথা কেমন ভয়ঙ্কর চেহারায় এখানে সক্রিয়। চিনও চেষ্টা করছে জিনজিয়াং প্রদেশে হালাল-প্রথা বন্ধ করতে, নামাজ পড়া বন্ধ করতে ; যারা করছে তাদের পাঠানো হচ্ছে সংশোধনাগারে -- এই সমস্ত সংশোধনের কথা মার্ক্স বলে যাননি। তিব্বতে হানদের পাঠিয়ে তিব্বতি তরুণীদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে সেখানকার ডেমোগ্রাফি আর সংস্কৃতিকে বদলে ফেলতে চাইছে।

    মার্ক্সের সময়ে কারখানাগুলোর মালিকানা ছিল পারিবারিক, পুরো শহর জুড়ে কারখানার মালিক কোনো বিশেষ পরিবার, সেই কারখানাগুলোয় কিশোররাও কাজ করতো যাদের পড়াশুনোর কোনো ব্যবস্হা ছিল না। এইরকম কারখানা-শহর ইউরোপেও এখন চিন্তা করা যায় না। কোনো কারখানা-শহরে স্কুল থাকলে মালিকরা তাদের পড়াশোনার ব্যবস্হা করে বিনা মজুরিতে কারখানায় খাটিয়ে নিতো। তবুও মার্ক্স প্রাসঙ্গিক, কিন্তু লেনিনবাদ আর মাওবাদ প্রাসঙ্গিক নয়। এই জন্যে প্রাসঙ্গিক যে পৃথিবীতে গরিব আর ধনীর মধ্যে আয়ের পার্থক্য অনেক বেড়ে গেছে, এমনকী বর্তমান চিনেও। চিনে গ্রাম ঘিরে ফেলে গ্রামবাসীদের উৎখাত করে অন্য কোথাও বসবাস করতে পাঠানো হয় যাতে সেখানে কারখানা বসানো যায়। চিনে মজুরি অনেক কম দেয়া হয় যাতে চিনের তৈরি জিনিসপত্র পৃথিবীর বাজারে সবচেয়ে কম দামে বেচা যায়, এমনকী ভারতের সস্তা দামের জিনিসপত্রের বাজারও চিন দখল করে ফেলেছে চিনা শ্রমিকদের ঘামের বদলে। ব্যক্তিমানুষ যেমন আর্থিকভাবে ওপরে ওঠার তাল করে তেমন চিনও করছে।

    সোভিয়েত ব্যবস্হার পতন, বার্লিনের দেয়াল ভেঙে পড়া, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর রাজনৈতিক চরিত্রের পরিবর্তন, পশ্চিমবাংলা আর ত্রিপুরায় বামপন্হীদের কুর্সিছাড়ার সঙ্গে মার্ক্সবাদের প্রাসঙ্গিকতা জুড়লে বুঝতে গোলমাল হবে। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা মার্ক্সে বিশেষ আগ্রহী নয় ; যারা বিপ্লব করে সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখছে তারা লেনিনবাদী বা মাওবাদী। মার্ক্সবাদ যুক্তি দিয়েছিল যে একটা জাতির উৎপাদন সম্পর্ক জাতিটির 'অবকাঠামো' নির্ধারণ করে, যা সর্বহারা শ্রেণী এবং পুঁজিবাদীদের দ্বারা চিহ্ণিত, যেখানে শ্রম শোষণের জন্য একটি প্রবণতা নিয়ে বিরোধ ছিল। এই সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য 'সুপারস্ট্রাকচার' তৈরি করা হয়েছিল এবং এটি ছিল রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠান। পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের (সর্বহারা শ্রেণীর) কাছ থেকে আরো শ্রমের চাহিদা বাড়াচ্ছিলেন, এটি কোনও নির্ণায়কে পৌছায় না ; তখন বিদ্রোহ হবে এবং প্রাক্তন বাহিনী উধাও হয়ে যাবে। সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কতন্ত্র হবে, যার মাধ্যমে জনসাধারণ দেশ শাসন করবে। যাইহোক, যেমন সিস্টেমের মধ্যে সাধারণত ঘটে, নতুন এলিট সম্প্রদায় তৈরি হলো এবং সব ঝোল তারা নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করতে লাগলো। সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের বদলে একজন মানুষ একনায়ক হয়ে দেখা দিল, এবং প্রতি ক্ষেত্রেই তারা সৈন্যবাহিনীর পুরুষ।

    মাও সে-তুংয়ের আমলে চিনের বেশির ভাগ মানুষ গরিব ছিল। মাওয়ের পর ১৯৭৮ সালে তাঁর উত্তরসূরি দেং জিয়াওপিং (যিনি বলেছিলেন ‘বিড়াল সাদা কি কালো সেটা বড় কথা নয়, সেটি ইঁদুর ধরছে কি না, সেটাই বড় কথা’) ক্ষমতায় বসার পর চিনের অর্থনীতি দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে। এর কারণ হলো দেং জিয়াওপিং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎপাদন অনুমোদন করেছিলেন। তাঁর এই সংস্কারের কারণেই চিনের আশি কোটি গরিব মানুষের অবস্হা ফিরেছে, যারা মাওয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবে না খেয়ে মরছিল। মাওয়ের রাস্তা ছেড়ে দিয়ে এই নতুন রদবদলের দরুণ চিন ইউরোপের বহু দেশের চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক সাম্য আনতে পেরেছে। যদিও চীন এখনো বলে যাচ্ছে তারাকমুনিস্ট পার্টি অফ চায়নার নির্দেশে চলে আর তারা ‘চীনের নিজস্ব আদলের সমাজতন্ত্র’ গড়ে তুলছে। যদিও সেই সমাজতন্ত্রের সঙ্গে মার্ক্সের সমাজতন্ত্রের কোনও মিল নেই। ভারতদের সংসদীয় গণতন্ত্রের তুলনায় অনেক এগিয়ে গেছে চিন যা ভারতের সংসদীয় বামপন্হীদের নজরে পড়ে না। চিন এখন আফরিকার দেশগুলোকেও আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে যেমনটা এককালে ইউরোপের দেশগুলো দিতো।

    চিন যদি মার্ক্সের চিন্তাভাবনার দ্বারা এখন আর প্রভাবিত না হয়, তাহলে আমরা এই উপসংহারে আসতে পারি যে চিনের অর্থনীতির মতো রাজনীতিতেও মার্ক্স এখন আর প্রাসঙ্গিক নন, তা সে দেশের পার্টির নাম কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়না হলেও। তারপরও কিন্তু মার্ক্সের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব রয়েই গেছে। ইতিহাস সম্পর্কে দেওয়া তাঁর বস্তুবাদী তত্ত্ব আমাদের মানবসমাজের চালিকাশক্তির গতি-প্রকৃতি বুঝতে কিঞ্চিদধিক সাহায্য করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে মার্ক্সের প্রাসঙ্গিকতা একেবারে ফুরিয়ে যায়নি।


     

  • তপন মণ্ডল | ০১ আগস্ট ২০২১ ১২:২৩734809
  • মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তপন মণ্ডল অলফণি


     

    তপন: কেমন আছেন ? এই ৭৮টি ক্যালেণ্ডারের পাতা ওল্টানোর পর ?

    মলয় : ভালো নেই হে। নানা ব্যারাম ধরেছে বুড়ো বয়সে। তার ওপর স্ত্রীও অসুস্হ থাকে বেশির ভাগ সময়। সাহায্য করার কেউ নেই। ছেলে আর মেয়ে বিদেশে, নমাসে-ছমাসে অবশ্য আসে কিন্তু ওদের খাবার-দাবারের সঙ্গে আমাদের পরিপাক শক্তি খাপ খায় না। কাজের বউরা মারাঠি এখানে, ওদের হাতের রান্নার গন্ধ আর স্বাদ একেবারে আলাদা, মিষ্টি জলের মাছ রাঁধতে পারে না, চার্জও অনেক, তাই নিজেরাই যাহোক করে চালাই বুড়ো-বুড়ি মিলে। যেদিন ক্লান্ত বোধ করি সেদিন চিনা, পাঞ্জাবি বা মোগলাই হোটেলে অর্ডার দিয়ে খাবার আনাই। ডেইলি হোম ডেলিভারির খাবারে এতো তেল-মশলা থাকে যে অম্বল হয় । নাকতলার তিনতলার ফ্ল্যাটটা বেচার সময়ে দাদাকে বলেছিলুম, তোমার ওপরতলাটা ভাড়া দাও। তা বউদি বললেন, কোথাও একতলা ভাড়া করে থাকগে যাও। ছেলের এই ফ্ল্যাটটা ফাঁকা পড়েছিল মুম্বাইতে, চলে এলুম। বউদি পরে নিজের জামাইকে বলেছিলেন, “মলয়দের ভাড়া দিলে পরে প্রবলেম হতো”। কী প্রবলেম হতো কে জানে ! আমি তো পাটনার বাড়ির ভাগ চাইনি, সবকিছু ছেড়েছুড়ে চলে এসেছিলুম।


     

    তপন : ১৯৩৯ সালে বিহারে পাটনায় জন্ম, তারপর কোলকাতা, এখন মুম্বাই। এই চরাচর কি কবিতার টানে না কর্মসূত্রে ?

    মলয় : পাটনায় জন্মালেও, শৈশবে থেকেছি আদিবাড়ি উত্তরপাড়ায়, মামার বাড়ি পাণিহাটি, মাসিমার বাড়ি নিমতা, পিসিমার বাড়ি আহিরিটোলা আর বড়োজেঠিমার বাড়ি কোন্নগরে, কেননা পাটনায় ইমলিতলার বাড়িতে আমার বড্ডো শরীর খারাপ হতো, ডিগডিগে ছিলুম, পাড়ার গরিব ছন্নছাড়া শিয়া মুসলমান আর বিহারি অন্ত্যজদের সঙ্গে খেলতুম, তাড়ি খেতুম, তাদের দেখাদেখি নর্দমা থেকে বল, লাট্টু, ড্যাংগুলি, বেলুন কুড়োতুম, আর শরীর খারাপ হতো। আমার শৈশবস্মৃতি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” পড়লে জানতে পারবে। হাংরি আন্দোলন মামলার পর পাটনায় রিজার্ভ ব্যাংকের চাকরি থেকে লখনউ চলে গিয়েছিলুম এআরডিসিতে সিনিয়ার অ্যানালিস্ট হিসাবে, লখনউ থেকে মুম্বাই নাবার্ডে গ্রামীণ উন্নয়ন অফিসার হয়ে, তখন বোম্বে ছিল, তারপর কলকাতা অফিসে ডেপুটি জেনেরাল ম্যানেজার, আর অবসর নিয়ে মুম্বাই, মূলত চিকিৎসার সুবিধার জন্য আর সাহিত্যিক দলাদলি এড়াবার জন্য, হাঁপানি সারাবার জন্য, চিকিৎসার খরচ মুম্বাইতে কাৎ করে দেয়। কবিতা লেখার টানে কখনও আস্তানা পালটাইনি, যদিও একবার যে বাড়ি ছেড়েছি সেখানে আর দ্বিতীয়বার ফিরে যাইনি। সারা দেশ ঘুরেছি অফিসের কাজে, প্রচুর অভিজ্ঞতা হয়েছে, লেখার কাজে লাগিয়েছি সেসব।


     

    তপন : কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, অনুবাদক, সাংবাদিকতা -- এর থেকে যদি বলি সবচেয়ে প্রিয় গোলাপটা তুলতে, কোনটা তুলবেন এবং কেন ? অর্থাৎ ভালোলাগার কারণ কী ?

    মলয় : কবিতা ভালো লাগে, কবিতা দিয়েই তো লেখালিখি শুরু করেছিলুম। কবিতা ভাল্লাগে কেননা লিখে কাউকে পড়াবার তাগিদ থাকে না, নিজেই পড়ে মশগুল থাকা যায়, যা লিখি তা না ছাপতে দিলেও চলে। অন্যান্য জনারগুলোর জন্য পাঠক দরকার। প্রবন্ধ তো চিরকাল সম্পাদকদের অনুরোধে লিখেছি। প্রথম উপন্যাসও লিখেছিলুম দাদা সমীর রায়চৌধুরীর অনুরোধে। উনি বলেছিলেন নিজের জীবনের যে নৈরাজ্যমূলক সময় কাটিয়েছিলিস, সেই সময়কার বিহারের বন্ধুদের আর ঘটনাগুলো নিয়ে একটা উপন্যাস লিখতে। “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” লিখেছিলুম, সেই কাহিনিই পরপর এগিয়ে নিয়ে গেলুম ‘জলাঞ্জলি’, ‘নামগন্ধ’, ‘ঔরস’ আর ‘প্রাকার পরিখা’ উপন্যাসে। তবে গোলাপ আমার তেমন পছন্দ নয় ; আমার ভালো লাগে কাঁঠালিচাঁপা।


     

    তপন : সাহিত্যচর্চায় কেন এলেন যেখানে আপনার বাবা শ্রদ্ধেয় রঞ্জিত রায়চৌধুরী একজন গুণী চিত্রশিল্পী এবং আপনার ঠাকুরদা ভারতবর্ষের প্রথম ভ্রাম্যমান আলোকচিত্রশিল্পী ছিলেন ?

    মলয় : বাবা চাইলে আমাকে ছবি আঁকা শিখতে পাঠাতে পারতেন, ম্যাট্রিক পাশ করার পর। পাটনায় ছবি আঁকা শেখার তেমন সুবিধা ছিল না। সেই জন্য হয়তো। উনি ছিলেন স্বশিক্ষিত ; ফোটো তুলে বিহারের জমিদারবাড়ির লোকজনদের পেইনটিঙ আঁকতেন। বড়োজ্যাঠাও প্রচুর পেইনটিঙ এঁকেছিলেন, দাদার ছেলেরা সেসব ফেলে দিয়েছে। আমার মনে হয় বাবা নিজের হাড়ভাঙা খাটুনির অভিজ্ঞতার দরুন আমাকে বা দাদাকে ছবি আঁকার লাইনে পাঠাননি। অত্যধিক খাটুনির জন্য ওনার প্লুরিসি হয়ে গিয়েছিল, কুড়িজনের সংসার একা সামলাতে হতো। সাহিত্য চর্চায় কেন এলুম তার কারণ সম্ভবত ব্রাহ্ম স্কুলের পার্টটাইম গ্রন্হাগারিক উঁচু ক্লাসের ছাত্রী নমিতা চক্রবর্তীর টানে, ওনার গালে টোল পড়ত, পাতলা গোলাপি ঠোঁট, ক্রাশ ডেভেলাপ করে ফেলেছিলুম, উনি কবি-লেখকদের বই নিজে বাছাই করে পড়তে দিতেন, বেশির ভাগই ব্রা্হ্ম লেখক-কবিদের, ব্যাস, আপনা থেকেই কবিতা লিখতে আরম্ভ করলুম, তারপর অন্য জনারগুলোয় আকৃষ্ট হলুম। কলেজে থাকতে ইংরেজি বই বেশি পড়তুম, কেননা প্রাইমারি স্তরে ক্যাথলিক কনভেন্টে পড়েছিলুম। আর ষাটের দশকে জগতজুড়ে তরুণ-যুবক ছাত্ররা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল, সেসব খবর পাচ্ছিলুম। ঠাকুরদাকেও প্রচুর খাটতে হতো, কম বয়সে মারা যান, আট ছেলে-মেয়েকে পথে বসিয়ে। টাকার অভাবে ঠিক সময়ে সারানো হয়নি বলে উত্তরপাড়ার বারো-ঘর চার-সিঁড়ির আদিবাড়ি রূপান্তরিত হয়েছিল খণ্ডহরে ; এখন সেটা আবাসন হয়ে গেছে, আমি আমার অংশ বেচে দিয়েছি।


     

    তপন : আপনি তো ষাটের দশক থেকে সাহিত্যজগতে এসেছেন ; সেই সময়ের কবিতাভাবনা কেমন ছিল আর এখন কী কী পরিবর্তন লক্ষ্য করেন ?

    মলয় : ষাটের দশকে কোনো একটিমাত্র কবিতার ধারা ছিল না, কেননা আমাদের হাংরি আন্দোলনের কনফেশানাল ও প্রোটেস্ট এবং ডিসেন্টিং পোয়েট্রির পাশাপাশি শ্রুতি আর নিমসাহিত্য আন্দোলনের কবিরা নিরীক্ষামূলক কবিতে লিখতেন, বিশেষ করে শ্রুতির মৃণাল বসুচৌধুরী, পুষ্কর দাশগুপ্ত, পরেশ মণ্ডল, সজল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। নিমসাহিত্যের রবীন্দ্র গুহ, মৃণাল বণিক, বিমান, ওনারাও নিজেদের একটা ভাবনার এলাকা চিহ্ণিত করে ফেলেছিলেন। ক্রমশ সাত, আট, নয়, শুন্য দশকের কবিরা নানা রকম আঙ্গিক আর ভাঙন নিয়ে এলেন, কবিতাকে রাইজোম্যাটিক করে তুললেন। শম্ভু রক্ষিত আর বারীন ঘোষাল তো বিপ্লব ঘটিয়ে গেছেন। পরে অলোক বিশ্বাস, ধীমান চক্রবর্তী কবিতাকে যে আদল দিলেন তা এক বাক্যে বোঝানো কঠিন। অনুপম মুখোপাধ্যায় নতুন ধরণের কবিতা লেখার চেষ্টা করছেন, যাকে উনি বলছেন ‘পুনরাধুনিক’, নিজের একটা আলাদা এলাকা গড়ার জন্য ; জয়িতা ভট্টাচার্যও ‘পুনরাধুনিক’ আদল-আদরায় লিখছেন। সোনালী মিত্র নারীবাদের এলাকা ডিঙিয়ে চলে গেছেন যোনিজ কবিতার দিকে, বলা যায় তা একটা চ্যালেঞ্জ। এখনকার কবিতায় লেভেল জাম্পং, লজিকাল ক্র্যাক, কাইনেটিক ইমেজারিজ বেশি, লাইনের ফ্লাক্সও বেশি।


     

    তপন : ষাটের দশকের কোন কোন কবির কবিতা আজও আপনাকে টানে ?

    উত্তর : আর তো পড়িই না বলা চলে। স্মৃতিতে রয়ে গেছে কিছু ছাপ, তা থেকে মনে আসে ফালগুনী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, অরুণেশ ঘোষ, শামসের আনোয়ার, কেদার ভাদুড়ি, সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম।


     

    তপন : ষাটের দশকের থেকে এসময় দীর্ঘদিন কবিতাযাপন কবিতার মধ্যে কী পরিবর্তন ঘটেছে ?

    মলয়:: আমার কবিতার কথা বলছ ? আমি তো কোনো নিয়মনীতি মেনে লিখি না। লিখতে বসে যথেচ্ছাচার করি, ভাঙচুর করে এগোই। সমাজ এখন এমন অবস্হায় পৌঁছেচে যে যারা দায়ি তাদের আক্রমণ না করে থাকতে পারি না। ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’ আর ‘ফিল-গুড’ হাট্টিমাটিম টিম কবিতা আমি লিখতে পারি না। তাছাড়া আর্থাইটিসের আক্রমণে আঙুল অকেজো হয়ে যাবার ফলে ২০০৫ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত কিছু লিখতেই পারিনি, তখন পড়েছি প্রচুর কবিতা। কমপিউটারে টাইপ করা শেখার পরে যখন আবার কবিতা লেখা আরম্ভ করলুম, ইমেলের বডিতে কিংবা গুগল ড্রাইভে লিখে রেখে দিই। কবিতা কেউ চাইলেই পাঠিয়ে দিই, কোনো দলাদলি করি না। উপন্যাস আর প্রবন্ধও গুগল ড্রাইভে লিখে রাখি। একটা ব্যাপার তোমায় বলি, বয়স হবার দরুণ আজকাল স্মৃতি গোলমাল হতে থাকে।


     

    তপন : আজ কি সাহিত্যিক মলয় রায়চৌধুরীর খবর কেউ নেয় ?

    মলয় : আমার ব্লগের পাঠক-সংখ্যা থেকে তো মনে হয় অনেকেই নেয়, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকায় বেশি। বিদেশে যে এতো বাঙালি সাহিত্যানুরাগি আছেন তা আগে জানতুম না। তাছাড়া ২০০৭ সাল থেকে বেশ কয়েকজন পিএইচডি আর এমফিল গবেষণা করেছেন-করছেন এদেশে-বিদেশে ; হিদেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করছেন ড্যানিয়েলা লিমোনেলা, বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎকার নিয়ে গেছেন। অনেকে দেখা করতে আসেন; বিবিসিতে দুটো অনুষ্ঠান হয়েছে। একটা ইংরেজি উপন্যাসে সংলাপে দেখলুম আমার নাম উল্লেখ করে আলোচনা করছে চরিত্ররা। জিৎ থাইল ওনার ‘চকোলেট সেইন্টস’ আধা-ফিকশানে আমাকেও ঢুকিয়ে দিয়েছেন। পুজোর সময়ে বিদেশের নামকরা প্রকাশনী থেকে ইংরেজিতে ‘ দি হাংরিয়ালিস্টস’ নামে একটা বইও বেরোবে এক ফিকশান রাইটারের লেখা, যাতে আমি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কলকাতার এক দম্পতি একটি বই লিখছেন আমাদের আন্দোলন নিয়ে, ইংরেজিতে, পরের বছর বেরোবে, তাতে আমাদের সবায়ের লেখার অনুবাদও থাকবে, সবায়ের মানে সব্বায়ের। তাছাড়া ফেসবুকে আমার দুটো প্রোফাইলে দশ হাজার বন্ধু আর পনেরো হাজার ফলোয়ার হয়ে গেছে, তাদের মধ্যে অন্তত কিছু “বন্ধু” আমার সাহিত্যিক পরিচয় জানে বলেই মনে হয়, তবে বন্ধুদের চেয়ে আমার বান্ধবীর সংখ্যা এই বুড়ো বয়সেও বেশি। আমার তো মনে হয় একশো পাঠক পেলেই যথেষ্ট, যখন কিনা আমি কমার্শিয়াল পত্রিকায় লিখি না। সাধারণ পাবলিক হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে জেনেছে সৃজিৎ -এর ‘বাইশে শ্রাবণ’ ফিল্ম থেকে, যাতে গৌতম ঘোষ একজন হাংরি আন্দোলনকারীর অভিনয় করেছিলেন, যে কিনা কবিতা ছাপাবার জন্য হন্যে হয়ে পাগলামি করে, আর বইমেলায় আগুন ধরিয়েছিল। গৌতম এরকম ইডিয়টিক ভূমিকায় অভিনয় করতে রাজি হলেন কেন জানি না, ওনার সঙ্গে তো সুবিমল বসাকের আলাপ ছিল, আমাদের বইটইও পড়েছিলেন। তবে ফিল্মটায় লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক এক টেকো খোচর দেখানো হয়েছে, সেটা কারেক্ট, কেননা পবিত্র বল্লভ নামে অমন এক টেকো খোচর কফিহাউস থেকে আমাদের বুলেটিন আর পত্রিকা নিয়ে গিয়ে লালবাজারে প্রেস সেকশানে জমা দিত, আমার বিরুদ্ধে ভুয়ো সাক্ষীও হয়েছিল, শুনেছি ওর সঙ্গে বাসুদেব দাশগুপ্তর দহরম-মহরম ছিল, অথচ বাসুদেব কখনও আমাকে সতর্ক করেনি।


     

    তপন : আপনি দীর্ঘ কর্মজীবনে ভারতবর্ষের বিভিন্ন গ্রামীণ চাষি, তাঁতি, জেলে, হস্তশিল্পীদের মধ্যে কাটিয়েছেন। কখনও কি মনে হয়েছে এই মানুষগুলোর মধ্যে কবিতা লুকিয়ে আছে ?

    মলয় : আরে, বেশির ভাগ পরিবারের এমন দুরাবস্হা যে একবেলা খেয়ে থাকতে হয়। বহু গ্রামে গিয়ে আখের খেতে, নদীর ধারে, ঢিবির আড়ালে বসে হাগতে হয়েছে। অবুঝমাঢ়ে তো গাছের ফল, জংলি জানোয়ার, পোকা আর মাদক খেয়ে জীবন কাটাতে দেখেছি। বাঙালি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন দেয়া হয়েছিল হিমালয়ের তরাইতে আর দণ্ডকারন্যে, তাদের মাতৃভাষা বলে কিছু বাকি নেই, খিচুড়ি। আমি তো ধনীদের বা মধ্যবিত্তদের জন্য গ্রামেগঞ্জে যেতুম না। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামেগঞ্জে গেলে স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে যেতুম যাতে ও রান্নাঘরে ঢুকে সঠিক পরিস্হিতির খবর দিতে পারে। অনেক বাড়িতে রাতে রান্নাই হয় না। একটা আদিবাসী গ্রামে আমাদের আতিথেয়তা করা হয়েছিল বেগুনপোড়া খাইয়ে। তাদের নিয়ে কবিতা আমিই লিখেছি। তবে কেরালায় মাছ-ধরিয়ে পরিবারের এক মালায়ালি যুবক কেমন করে জানতে পেরেছিল আমি লেখালিখি করি, সে আমায় তার মালায়ালাম কবিতা শুনিয়েছিল, নিজেই তার ইংরেজি অনুবাদ করে শুনিয়েছিল। কেরালা রাজ্যের প্রকৃতি দেখে মনে হয় সত্যিই “গডস ওন কান্ট্রি”। ইউরোপে চাষিদের দেখে মনে হয়েছিল ওদের খেতখামারে গরিব আর নেই, কতো আধুনিক ওদের চাষবাস।


     

    তপন : আপনার সাহিত্যভাবনার মধ্যে ধরা পড়ে চিরাচরিত ধারণার অনুশাসনের বিরুদ্ধাচারণ। এই যে আগল ভাঙার লড়াই -- এই ধারণা আপনার মনে ঠিক কোন কারণে এলো ?

    মলয় : তাই বলছিলুম যে “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” ব্‌ইটা পড়তে। অত্যন্ত গরিবদের যে ইমলিতলা পাড়ায় থাকতুম, তারা চুরি ডাকাতি পকেটমারি করলেও, ছিল বেপরোয়া। আমার মেজদা, যাকে বড়োজেঠা দেড়শো টাকা দিয়ে এক বেশ্যার কাছ থেকে কিনেছিলেন, সেও ছিল বেপরোয়া। একটু আগে নমিতাদির কথা বলেছি, উনি ছিলেন মার্কসবাদী, তাঁর প্রভাব অস্বীকার করব না, কেননা আমি কখনও প্রত্যক্ষ রাজনীতি করিনি। বস্তুত কবি-লেখকদের তা করা উচিত নয়, বেলাইনে চলে যাবার সম্ভাবনা, এখন যেমন কবিদের দেখা যাচ্ছে সরকারে ঢুকে চাষিদের টাকা-মেরে দেয়া পনজি স্কিম নিয়ে মুখ খুলতে পারছে না, তেমন ছিল সিপিএমের সময়ে, হাংরি আন্দোলনের সুভাষ ঘোষ সিপিএমে যোগ দিয়ে মুখ খুলতো না, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ঘুরতেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পেছন-পেছন, কখনও মুখ খোলেননি। আমি “নখদন্ত” আর “নামগন্ধ” উপন্যাসে সরকারকে তুলোধনা করেছি, পড়লে টের পাবে। উৎপলকুমার বসু লিখেছিলেন যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার বৈশিষ্ট্য আমি পেয়েছি কলকাতার বাইরে বেশির ভাগ সময় কাটাবার দরুন। আমার বাবা-মা কখনও স্কুলে পড়াশুনা করেননি। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বা বিজন ভট্টাচার্যের মতন শিক্ষিত বাবা আর মহাশ্বেতা দেবী কিংবা কুসুমকুমারী দাশের মতন মা তো আমি পাইনি। জীবনের পথনির্দেশ আমাকে লেখালিখিরও পথনির্দেশ দিয়েছে। শৈলেশ্বর ঘোষের মতন আমি শঙ্খ ঘোষের চাকরের চাকরি করতে চাইনি, শৈলেশ্বর কবিতা লিখেছে অসাধারণ কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি, অথচ অরুণেশ ঘোষ বামপন্হী প্রতিষ্ঠানকে ফর্দাফাঁই করে গালাগাল দিয়ে দারুণ সব কবিতা লিখেছে। আমি, আমিই, ভেবেচিন্তে অনুশাসনের বিরুদ্ধাচারণ করতে হয়নি, ওটা আমার ডিএনএতে রয়েছে।


     

    তপন : আপনার দাদা বাংলা সাহিত্যের একজন বিতর্কিত কবি। আর আপনার মধ্যেও সেই বিতর্কিত তকমা। বাংলা সাহিত্যের কোন দিক আপনাকে এতো বিতর্কিত হতে বাধ্য করল ?

    মলয়: হ্যাঁ, দাদা চিরকাল নতুন-নতুন ভাবনা ভেবেছেন, প্রচুর পড়াশুনা করতেন। মামার বাড়িতে থেকে সিটি কলেজে পড়ার সময়ে ছোটোমামার প্রভাবে মার্কসবাদে আকৃষ্ট হন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তো লিখেছেন যে দাদা চিরকাল নতুন ভাবনা ভাবতেন ; প্রথম দিকে দাদা দুই বছর কৃত্তিবাস পত্রিকা প্রকাশের টাকা যুগিয়েছিলেন, সুনীলের ‘একা এবং কয়েকজন’ বইটা নিজের টাকায় প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু কৃত্তিবাসে ওনার লেখা ছাপা যখন বন্ধ হয়ে গেল তখন কোনো প্রতিবাদ করেননি বন্ধুত্বের খাতিরে। দাদা বা আমি কেউই বিতর্কিত হবার জন্য লেখালিখি করিনি। যা ভেবেছি, যা মনে হয়েছে বাস্তব অবস্হা, তাকেই বিশ্লেষণ করার প্রয়াস করেছি। এর জন্য কেবল সাহিত্যিক জ্ঞান এবং গভীর পড়াশুনা যথেষ্ট নয়। সমাজ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ্য অভিজ্ঞতা দরকার। দাদা তো মিশতেন জেলেদের সঙ্গে, বেশ কিছুকাল কাটিয়েছিলেন সমুদ্রে জাহাজে-জাহাজে। আমি ছিলুম অর্থনীতির ছাত্র, তাই দেশের অবস্হা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। দাদার কলেজের বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন অর্থনীতির ছাত্র, কিন্তু তিনি দেশের অবস্হা বিশ্লেষণের বদলে মধ্যবিত্ত আর পরে উচ্চবিত্তদের নিয়ে পড়ে রইলেন।


     

    তপন: যে প্রশ্নটা না করলেই নয়, ১৯৬১ সালে আপনার জীবন তথা বাংলা সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য দিক বলে আমার মনে হয়। বর্তমান প্রজন্মে অনেকেই বোধহয় জানে না হাংরি আন্দোলন কী। তাই বর্তমান প্রজন্মকে যদি বলেন হাংরি আন্দোলন কী এবং কেন তাহলে অনেকের সুবিধা হবে।

    মলয় : না জানলে আর কীই বা করা যায় ! যারা আগ্রহী তারা জানে। যারা জানে না তাদের বলব প্রতিভাস প্রকাশনী প্রকাশিত প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “হাংরি আন্দোলন : তথ্য, তত্ব ও ইতিহাস” বইটা পড়ে দেখতে। ইনটারনেটেও প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। একটু নড়েচড়ে বসলেই জানতে পারবে।


     

    তপন : কখন ভাবলেন এই আন্দোলনের কথা ?

    মলয় : ১৯৫৯-৬০ নাগাদ ‘বিংশ শতাব্দী’ পত্রিকায় ‘ইতিহাসের দর্শন’ নামে একটা ধারাবাহিক লিখেছিলুম, সেসময়ে অসওয়াল্ড স্পেংলারের ‘দি ডিক্লাইন অফ দি ওয়েস্ট’-এর সমাজ-সংস্কৃতি বিষয়ক দর্শনের বনেদটা দেখি যে আমাদের দেশভাগোত্তর অবস্হার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সেসময়ে তুমি যদি শেয়ালদায় উদ্বাস্তুদের জমায়েত দেখতে তো তোমারও মনে যে দায়ি লোকগুলোর কাঁধে চেপে বসি। স্পেংলার সংস্কৃতির আত্মসাৎ প্রক্রিয়ার কথা লিখেছিলেন, আমি এই প্রক্রিয়াকে জিওফ্রে চসারের কবিতার ‘সাওয়ার হাংরি টাইম’-এর সঙ্গে মেলাতে পারলুম। হাংরি শব্দটা পেয়ে যাবার পর আন্দোলনের কথা ভাবলুম। দাদা, আমি শক্তি আর হারাধন ধাড়া মিলে প্রথম আওয়াজটা তুললুম, পাটনায় বুলেটিন ছাপিয়ে, তারপর অনেকে দলে যোগ দিয়েছিল, মামলা দায়ের হতেই বেশির ভাগ সদস্য দে পিট্টান।


     

    তপন : সেই সময়ে এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যজগত দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এটা নিছক আত্মকেন্দ্রিকতার জন্য না অন্য কোনো কারণে ?

    মলয় : না না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ভেবেছিলেন ওনার কৃত্তিবাস গোষ্ঠী ভেঙে ফেলার জন্য এই আন্দোলন শুরু করা হয়েছে। এই বিষয়ে উনি সন্দীপন, উৎপল, শক্তিকে চিঠিও লিখেছিলেন, প্রায় হুমকি দিয়ে। ওনারা আনন্দবাজারে যোগ দিলেন। কলকাতার এলিট লেখকরা আমাদের বিরুদ্ধে অবিরাম পুলিশের কাছে নালিশ করতে লাগলো। শক্তি তো দলবল নিয়ে কফিহাউসের কাছে সুবিমল বসাককে ঘিরে ধরে মারধর করতে নেমে পড়েছিলেন। সুবিমলের তখন মারকুটে মাস্তানের চেহারা ছিল, ওর হিন্দি আর বাঙালভাষার গালমন্দতে সবাই পালিয়ে যায়। কিন্তু শক্তির দলটা প্রেসগুলোতে গিয়ে আর পাতিরামকে হুমকি দিয়ে আমাদের টাইট দিতে চেয়াছিল। সফল হলো না বলে শেষে পুলিশ আমাদের গ্রেপ্তার করে হেনস্হা আরম্ভ করলে। ব্যাপারটা আত্মকেন্দ্রিকতার নয়। সেটা ছিল শ্রেণিযুদ্ধ, ছোটোলোক আর ভদ্রলোকের যুদ্ধ।


     

    তপন : সালটি ১৯৬৪-৬৭ ; একটি কবিতা “প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার”। একটা কবিতা নিয়ে আদালত, সাজা ও মুক্তি। সেদিন কি কখনও মনে হয়েছিল মানুষের বাক-স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হচ্ছে ?

    মলয় : না না। তা মনে হয়নি। ওই সময়েই তো সাপ্তাহিক, মাসিক, দৈনিক এমনকি কবিতা ঘণ্টিকি নামে ঘণ্টায় ঘণ্টায় কবিতার পত্রিকা বেরোনো আরম্ভ হয়েছিল, আমাদের বুলেটিনের দেখাদেখি। বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেবার প্যাঁচপয়জার বরং আমাদের আন্দোলনের পর থেকে শুরু হয়েছে। এখন লেখকরা মনের মতন লিখতে পারে না, কার্টুন আঁকতে পারে না, রাজনৈতিক দলগুলোর মাস্তানদের ভয় পায়, তার ওপর আরম্ভ হয়েছে রাম-হনুমানের কুটকচালি। ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা নিয়ে মামলা চলার সময়েও কবিতাটা খালাসিটোলায়, হাওড়া স্টেশানে, মধুসূদনের সমাধিতে পড়েছি। হিন্দি, গুজরাতি, জার্মান, স্প্যানিশ আর ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে সেই সময়েই। কবিতা নিয়ে লড়াইটা ছিল আমার একার, হাংরি আন্দোলনের বন্ধুরা তো আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়েছিল। একা লড়েছিলুম, আর তা আমি শেষ পর্যন্ত জিতেছিলুম।


     

    তপন : কিন্তু যখন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত Modern and Postmodern Poetry of the Millenium সংকলনে জেরোম রোদেনবার্গ বলেন যে দক্ষিণ এশিয়ার একটিমাত্র কবিতা স্হান দিলেন, তখন কি মনে হয়নি বাংলা সাহিত্যের সেদিনের সেই অবিচারের যোগ্য জবাব দিল বিদেশি সাহিত্য ?

    মলয় : কবিতাটা প্রকাশিত হয়েছে জেনে ভালো লেগেছিল বটে, কিন্তু অবিচারের যোগ্য জবাব ধরণের ব্যাপার মনে হয়নি। মামলার সময়েই তো কবিতাটা লরেন্স ফেরলিংঘেট্টির ‘সিটি লাইটস জার্নাল’, জর্জ বাওয়ারিঙের ‘ইমেজো’, অ্যালান ডি লোচের ‘ইনট্রেপিড’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ডিক বাকেন একটা বিশেষ সংখ্যাই প্রকাশ করেছিলেন ওনার ‘সলটেড ফেদার্স’ পত্রিকার। হিন্দিতে আর গুজরাতিতেও অনুবাদ হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। কলকাতাতেও আনন্দ বাগচি ওনার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘প্রথম সাড়া-জাগানো কবিতা’ সংকলনে কবিতাটা অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। কলকাতা আর ঢাকা থেকে কবিতার কতো সংকলন প্রকাশিত হয়, তার জন্য আমার কাছ থেকে কবিতা চাওয়া হয় না ; আমি তাকে মোটেই অবিচার মনে করি না।


     

    তপন : আজ হাংরি আন্দোলন সংক্রান্ত তথ্য লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত, ঢাকা অ্যাকাডেমিতে সংরক্ষিত, আমেরিকার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে সংরক্ষিত। এই আন্দোলন নিয়ে আইআইটি খড়গপুর, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি জায়গায় অনেকে এনিয়ে পিএইচডি করেছেন। এই সাফল্য আজ কি আপনাকে আত্মতুষ্টি দিচ্ছে ? নাকি এসবের মাঝে মলয় রায়চৌধুরী অন্ধকারের আবর্তে চলে যাচ্ছেন ?

    মলয় : পঁচিশ-তিরিশ বছর বয়সে হয়তো আত্মতুষ্টি হতো। এখন আর হয় না। তবে মনে হয় হাংরি আন্দোলনকারীদের নিয়ে একটা ফিল্ম হলে ভালো হতো, যেমন বিট কবিদের নিয়ে ‘হাউল’ আর ‘কিল ইওর ডারলিংস’,, র‌্যাঁবো-ভেরলেনদের নিয়ে, ডাডাবাদী-পরাবাস্তববাদীদের নিয়ে হয়েছে, সিলভিয়া প্লাথকে নিয়ে, কিটসকে নিয়ে ‘ব্রাইট স্টার’, এলিয়টকে নিয়ে ‘টম অ্যাণ্ড ভিভ’, সেজার ভালেহোকে নিয়ে ‘সংস ফ্রম দি সেকেণ্ড ফ্লোর’ইত্যাদি। সম্ভবত আমাদের আন্দোলন নিয়ে ইংরেজিতে বই বেরোবার পর হতে পারে। অন্ধকারের আবর্তে সব কবি-লেখকদেরই এক সময়ে হারিয়ে যেতে হয়, যেমন এখন হয়েছেন ‘ইউসুফ-জোলেখা’র কবি, মঙ্গলকাব্যের আর পদাবলীর কবিরা। তাই সেসব আমার চিন্তার আওতায় পড়ে না।


     

    তপন : কলকাতার এতোদিনের সাহিত্যচর্চা ছেড়ে মুম্বাইয়ে এই নির্বাসন কেন ?

    মলয় : এর উত্তর তো দিলুম একটু আগে। তার সঙ্গে যোগ করি যে এখন এই বয়সে আমার একাকীত্ব ভালো লাগে, লোকজন হই-হট্টোগোল ভালো লাগে না।


     

    তপন : বাংলা ভাষায় বিদেশি সাহিত্যের যেভাবে অনুবাদ হয়েছে, বাংলা সাহিত্যের সেভাবে অনুবাদ হয়নি। তবে কি বাংলা সাহিত্যের মান বিদেশি সাহিত্যের তুলনায় কম ? আপনার কী মনে হয় ?

    মলয় : কে অনুবাদ করবে ? বামফ্রণ্টের সময়ে প্রাইমারি স্তরে ইংরেজি তুলে দেবার ফলে আমরা কেবল ইংরেজি-ইল্লিটারেট প্রজন্ম পেয়েছি। যারা ভালো ইংরেজি জানে তারা ইংরেজি মিডিয়ামের ছাত্র, ফলে ভালো বাংলা জানে না। অনুবাদক নেই, তাই অনুবাদ হয়না। যাদের অনুবাদ হয়েছে, যেমন শংকর, সুনীল প্রমুখ, তাঁদের লেখা নিয়ে ফিল্ম হতে পারে, কিন্তু তাকে মার্কেজ বা রুশডির মতন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গদ্যের কাজ বলা যায় না। সন্দীপনের উপন্যাস হতে পারতো, কিন্তু সেই একই সমস্যা, অনুবাদক নেই। আর কবিতার অনুবাদের কথা তো ছেড়েই দাও। যে কয়জন অনুবাদ করেন তাঁরা কেউই কলকাতায় থাকেন না। রুদ্র কিংশুকের কবিতা বিদেশে বিখ্যাত পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত হয়, ওর নিজের করা অনুবাদ, কিন্তু কলকাতার সাহিত্য এসট্যাবলিশমেন্ট ওকে গুরুত্ব দেয় না।


     

    তপন : ২০০৩ সালে দেওয়া সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারসহ বহু লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন কেন ?

    মলয় : যে বা যারা পুরস্কার দেয় তাদের নিজস্ব নোংরা মূল্যবোধ ওই পুরস্কারের সঙ্গে চাপিয়ে দেয়। বামফ্রণ্টের সময়ে বাংলা অ্যাকাডেমির একটা কমিটি ছিল। নতুন সরকার এসে তাদের বিদায় করে দিলে। কেন ? নিজেদের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। লক্ষ্য করলে দেখবে যে নানা সাংস্কৃতিক ঘাঁটিতে বিজেপি নিজের ঘুঁটিদের বসিয়ে দিচ্ছে, ফলে তাদের দেয়া পুরস্কারে তাদের মূল্যবোধ থাকবে। আমি এই নোংরামির ভেতরে গিয়ে নিজের গায়ে গু মাখতে চাইনি। যাদের মাখতে ভালো লাগে তারা মাখুক।


     

    তপন : আপনার শেষ কাব্যগ্রন্হের নাম কী ? সে সম্বন্ধে কিছু বলুন।

    মলয় : শেষ কাব্যগ্রন্হের নাম “মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো”। না পড়লে বুঝতে পারবে না কেন মাথা কেটে পাঠাচ্ছি আর কাকে বা কাদের পাঠাচ্ছি।


     

    তপন : কবিতায় যৌনতা নিয়ে আপত্তি করেন অনেকে, কিন্তু চিত্রশিল্পে যৌনতা গ্রহনীয়। এ সম্পর্কে আপনার কী মত ?

    মলয় : কবিতায় যৌন শব্দ নিয়ে আপত্তি করেন সাধারণত গ্রাম্য সম্পাদক আর আলোচকরা। মেট্রোপলিটান সম্পাদক আর আলোচকরা করেন না। এখনকার ছবি আঁকা যেমন মেট্রোপলিটান, গ্রামে বসে সাধারণত কেউ আর পেইনটিঙ করে না। তাই পেইনটিঙে যৌনতা বহুকাল যাবৎ স্বীকৃত। পিকাসো তো কতো রকমের যোনি আর স্তন এঁকেছেন তার ইয়ত্তা নেই, সেসব পেইনটিঙ এখন মিলিয়ান ডলারে বিকোয়। কলকাতায় প্রকাশ কর্মকার আর যোগেন চৌধুরীর পেইনটিঙেও পাবে, সেগুলোও লক্ষ-কোটি টাকায় বিক্রি হয়, বৈভবশালীরা কেনে, লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক-আলোচকরা নয়।


     

    তপন : শরীর, যৌনতা, এসব তো সমাজের একটা অঙ্গ হয়ে গেছে, ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে, তাহলে কবিতায় যৌনতার শব্দ এলে এতো তারস্বর কেন ?

    মলয় : তুমি যখন নিজেই ‘ভাইরাস’ শব্দটা প্রয়োগ করছ তখন বুঝতে হবে তোমার অবচেতনে এই প্রয়োগগুলো নিয়ে দ্বিধা আছে। এখন প্রযুক্তি এতো দ্রুত পালটে যাচ্ছে আর সকলের আয়ত্তে এসে যাচ্ছে যে কবিতায় যারা আপত্তি করছে বুঝতে হবে তারা এই পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। হিন্দি ফিল্মে দ্যাখো, তেলুগু-তামিল ফিল্মে দ্যাখো, তার দেখাদেখি বাংলা ফিল্মেও দ্যাখো, বিজেপির পহলাজ নিহলানি আপত্তি করতো, এখন রাজনৈতিক দলের পাণ্ডা নেই বলে করে না। প্রযুক্তি সবাইকেই সাধের লাউ খাইয়ে বৈরাগি বানিয়ে দিয়েছে। স্কুলের ছেলেদের হাতেও স্মার্টফোন, টিপলেই গুগল এনে দেবে বিবসনা সুন্দরীদের, তাদের যৌনকর্মের। এক্ষুনি যা বললুম, গ্রাম্য সম্পাদক আর আলোচকরাই তারস্বর হন, পহলাজ নিহলানির মতন।


     

    তপন : আপনার কি কখনও মনে হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের কবিরা ভিনদেশি কবি আর কবিতা নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে আদপে বাংলা সাহিত্যজগতের ক্ষতি করেছে ?

    মলয় : না, তা মনে হয় না। সাহিত্যজগতের ক্ষতি বলে কিছু নেই। আর বিদেশি বলতে তো হাতে গোনা কয়েকজন ইউরোপের লেখক আর কবি। তাদের নিয়ে কখনও-সখনও পত্রিকারা সংখ্যা বের করে বা ইনটারভিউ-সংকলন বের করে, তাকে মাতামাতি বলা যায় না। এখন কবিতা অ্যাকাডেমি হবার পর আশা করা যায় ইউরোপের বাইরে যেসব দেশ রয়েছে সেখানকার কবিদের পরিচয় আমরা পাবো। কোথায় কেমন কবিতা লেখা হচ্ছে তার খোঁজখবর রাখা দরকার।


     

    তপন : বাংলা সাহিত্যজগতের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতা। এর ফলে অনেক ভালো লেখার মূল্য হারিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দল আর সাহিত্যজগত এক হয়ে যাচ্ছে। এ সম্পর্কে আপনি কী বলবেন ?

    মলয় : আমি আর কী বলব ! সমস্যাটা আরম্ভ করেছিল ‘দেশ’ পত্রিকা, যখন থেকে কবিতার জন্য আলাদা সম্পাদক রাখতে আরম্ভ করল, আর সেই সম্পাদকরা নিজেদের চারপাশে স্তাবক গোষ্ঠী পুষতে লাগলো। ফলে কবিতার লিটল ম্যাগাজিনরা নিজেরা গোষ্ঠী গড়ে আলাদা প্ল্যাটফর্ম বানাতে চাইলো। এখন একদল তরুণ সুশিক্ষিত আলোচক-অধ্যাপক এসেছেন যাঁরা গোষ্ঠীকে গুরুত্ব না দিয়ে কবিতার অনন্যতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। জহর সেনমজুমদার অনন্যধারার কবিতা লিখছেন ; তাঁকে কেউ গুরুত্ব দিক বা না দিক কিছু যায়-আসে না। আমার মনে হয় ‘দেশ’ পত্রিকার মৌরসী পাট্টা ভাঙার জন্য সুবোধ সরকার বাংলা অ্যাকাডেমি পত্তন করেছেন, কিছুকাল গেলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। এবার যে কবিরা পুরস্কৃত হয়েছে তারা দেশ-গোষ্ঠীর বাইরের বলেই মনে হয়। ‘দেশ’ পত্রিকাকে টেক্কা দিয়ে ‘মাসিক কৃত্তিবাস’ এসেছে, ওরা পত্রিকা-গোষ্ঠীগুলোকে ভেঙে ফেলতে চাইছে, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়।


     

    তপন : তরুণ কবিদের কবিতা পড়তে কেমন লাগে ? তরুণদের কী বার্তা দেবেন ?

    মলয় : আমি নিয়মিত পড়ি না। বলা চলে অ্যাট র‌্যাণ্ডাম পড়ি। অনেকে কবিতা ইনবক্স করেন, বই পাঠান, সেগুলো পড়ি, সময় পেলে। পড়তে কেমন লাগবে ভেবে পড়ি না। আজকাল কেমন লেখা হচ্ছে জানার জন্য পড়ি। তরুণদের বলব, নিজের ইচ্ছেমতন লেখো, কোনো গুরুঠাকুর ধরার প্রয়োজন নেই। লিখে নিজের আনন্দ হওয়াটাই আসল।


     

    তপন : কবিতার ভাষা কেমন হওয়া উচিত ? দুর্বোধ্য না সরল ?

    মলয় : কবিতা-বিশেষ দুর্বোধ্য না সরল তা পাঠকের গ্রহণ করার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। পাঠক কবিতা বুঝতে পারছে না বলে তাকে দুর্বোধ্য তকমা দেয়া যায় না। আমি তো “ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচ্যুড’ দ্বিতীয়বার পড়েছি, প্রথমবার বুঝতে পারিনি বলে। এখনও ‘হ্যামলেট’ পড়ে বোঝার চেষ্টা করি। সরল না দুর্বোধ্য তা পাঠকের নির্ণয়ের ওপর নির্ভর করে।


     

    তপন : আপনি আজ কতোটা নিঃসঙ্গ ?

    মলয় : একটু আগেই বলেছি যে একাকীত্ব আমার ভালো লাগে। বর্তমান স্হিতিকে নিঃসঙ্গতা বলব না, কেননা বাজারে যখন বেরোই এর তার সঙ্গে দুচারটে কথা বলে নিই। সামনের রাস্তায় একটু দাঁড়ালে এখনকার তরুণ-তরুণীদের আচরণ, কথাবার্তা, পারস্পারিকতা, সাজসজ্জা, পারফিউম, যৌন আবেদনের প্রয়াস, নিজেকে ভালোবাসবার দর্শন, টের পাই। দাঁড়িয়ে গ্যাঁজাতে আমার ভালো লাগে না। সাহিত্যসভা বা কবিতার আড্ডাও ভালো লাগে না। সন্ধ্যায় সিঙ্গল মল্ট খাই আর রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনি। সিঙ্গল মল্ট ছাড়া আমি অন্য কোনো মদ আর খাই না। মদও চিরকাল একা খেতে পছন্দ করি।

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০১ আগস্ট ২০২১ ১২:২৮734810
  • আমার ফোটোগ্রাফার পূর্বপুরুষদের গল্প

    মলয় রায়চৌধুরী


     

    আমার ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী (জন্ম: জানুয়ারি ১১, ১৮৬৬ - মৃত্যু: নভেম্বর ৮, ১৯৩৩) ভারত উপমহাদেশের প্রথম ‘ভ্রাম্যমান’ পেশাদার আলোকচিত্রী-চিত্রকরদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। দাদু ১৮৬৬ সালে, বর্তমানে যা পাকিস্তান, সেখানে রায়চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি - ফোটোগ্রাফার্স অ্যাণ্ড আর্টিস্টস নামে একটা ‘ভ্রাম্যমান’ সংস্হা আরম্ভ করেছিলেন ; সংস্হা বলতে তিনি আর তাঁর যুবক-তরুণ ছেলেরা, কেননা কোনো নির্দিষ্ট দোকান উনি প্রথমে খোলেননি, যাঁরা ফোটো তোলাতে চাইতেন, বেশির ভাগই রাজ-ঘরানা বা ধনী পরিবারের সদস্যরা, তাঁদের বাড়ি গিয়ে ফোটো তুলে কিংবা সেই ফোটো থেকে পেইনটিঙ এঁকে ডেলিভারি দিতে হতো, ফলে শহরে-গঞ্জে ঘুরে-ঘুরে ফোটো তুলতে হতো ওনাকে। নবাব বা রাজাদের ঘোড়ার বা উটের গাড়ি এসে ওনাকে নিয়ে যেতো। এখনকার পাকিস্তানের প্রায় সমস্ত শহরে উনি ফোটো তুলতে যেতেন। সবই আমার ঠাকুমা এবং বড়োজেঠা ও বাবার মুখে শোনা। মহারাজা রঞ্জিত সিংহ সম্পর্কে গালগল্পে প্রভাবিত হয়ে ঠাকুমা বাবার নাম রেখেছিলেন রঞ্জিত।


     

    ১৯৩৩ সালে দাদা সমীর রায়চৌধুরীর জন্মের কয়েকদিন পরেই দাদু মারা যান। দাদু মারা যাবার পর প্রথমে আমার বাবা রঞ্জিত রায়চৌধুরী, আর এখন দাদা সমীর রায়চৌধুরীর বড়ো ছেলে হৃদয়েশ ( টোটোন ) সংস্হাটাকে চালান। দাদুর সময় থেকে তাঁর ছেলের পৌত্র হৃদয়েশ রায়চৌধুরীর ফোটোগ্রাফির প্রযুক্তিগত কাজ এতো পালটে গিয়েছে বলেই শিরোনামে গল্প শব্দটা ব্যবহার করেছি। দাদু কেমন করে ফোটোগ্রাফির ব্যবসায় ঢুকলেন, তাও এক গল্প, কেননা সেসময়ে ইংরেজরাই এই কাজটা দখল করে রেখেছিল। আর রাজা দীন দয়াল।


     

    লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী সাবর্ণ রায়চৌধুরী বংশের উত্তরপাড়া-কোতরং শাখার রত্নেশ্বর রায়চৌধুরীর ( ১৬৭০ - ১৭২০ ) পরিবারে জন্মেছিলেন। উত্তরপাড়া শহরটা রত্নেশ্বরের প্রতিষ্ঠা করা। শেওড়াফুলির রাজা মনোহর রায়ের কাছ থেকে তাঁর উত্তরদিকের চকবালির অংশ ১৭০৯ সালে রত্নেশ্বর কিনেছিলেন, সেই থেকে জায়গাটার নাম উত্তরপাড়া। যে বাড়িটায় থাকতেন তার নাম ছিল “সাবর্ণ ভিলা”, এখন তা ভেঙে ফেলে বিলডারের মায়ের নামে ‘মেনকা আবাসন’ হয়ে গেছে। দাদুর শৈশব থেকেই অযত্নে “সাবর্ণ ভিলা” খণ্ডহরের চেহারা নিতে আরম্ভ করেছিল। দাদুর বাবার নাম যদুনাথ এবং মা মাতঙ্গিনী। যদুনাথের তিন ছেলের তিনি ছিলেন কনিষ্ঠ। তাঁর দুই ভাইয়ের নাম হরিনারায়ণ এবং বৈকুন্ঠনারায়ণ। সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা ব্রাহ্মণ, তখনকার দিনের অকুলীন, মানে কলকাতার ব্রা্হ্মণদের সঙ্গে এক পাতে খাবার অধিকার ছিল না, পিরালিদের মতনই হয়তো। ১৮০০ সালে পৌঁছে রত্নেশ্বরের তিন স্ত্রীর মাধ্যমে উত্তরপাড়া শাখার সদস্য সংখ্যা একশো ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এখন সারা পৃথিবীতে বেহালা-বড়িশা, নিমতা, হালিশহর, উত্তরপাড়া ইত্যাদি জায়গার প্রায় কুড়ি হাজার সাবর্ণ চৌধুরী ছড়িয়ে পড়েছেন, কেউ কমিউনিস্ট হয়ে রাশিয়ার যুবতীকে বিয়ে করে সেখানে থেকে গিয়েছেন, আবার কেউ পুঁজিবাদের প্রকোপে উত্তরপাড়ায় রিক্সা চালান কিংবা কলকাতায় মিষ্টি বিক্রি করেন।


     

    রায়চৌধুরী পদবি সম্রাট আকবর আর জাহাঙ্গীরের দেয়া, একবার রায় আর একবার চৌধুরী। ১৬৯৮ সালে সাবর্ণ রায়চৌধুরীরদের থেকে কলকাতা, সুতানুটি আর গোবিন্দপুরের ইজারা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হাতবদল করার পর তাঁদের আর্থিক অবস্হা খারাপ হয়ে যায়। তাঁরা ব্রিটিশদের সমর্থন করার বদলে সিরাজউদ্দৌলাকে সমর্থন করার দরুন ইংরেজদের নেকনজর থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। সম্রাটের দেয়া সোনার গিনি আর রূপোর টাকা খরচ হয়ে যাবার পর আঠারো শতক থেকে পরিবারের সদস্যরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জীবিকার খোঁজে ছড়িয়ে পড়েন। আসলে শরিকের সংখ্যাও বেশ বেড়ে যাচ্ছিল, কেননা অনেক সদস্য একাধিক বিয়ে করছিলেন।


     

    দাদুর বাবা ষোলো বছর বয়সে লক্ষ্মীনারাণের বিয়ে তেরো বছর বয়সী কলকাতার পটলডাঙা নিবাসী মুখোপাধ্যায় পরিবারের অপূর্বময়ীর সঙ্গে দেবার পর, শশুরের দাক্ষিণ্যে লক্ষ্মীনারায়ণ কলকাতার তখনকার বুদ্ধিজীবী সমাজের সদস্যদের সঙ্গে পরিচিত হন, যাঁরা বেশিরভাগই ছিলেন ব্রাহ্ম, এবং তাঁদের সান্নিধ্যে ভালো ছবি আঁকতে শেখেন। ব্রাহ্মদের সঙ্গে মেশা অনুমোদন করেননি লক্ষ্মীনারায়ণের মা-বাবা। লেখক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন অপূর্বময়ীর জেঠামশায়ের ছেলে। বাবার সংসারে বাবার দেয়া হাতখরচে, স্ত্রীকে নিয়ে থাকতে লক্ষ্মীনারায়ণের আত্মসম্মানে লাগছিল বলে তিনি ছবি আঁকার মাধ্যমে রোজগারের প্রয়াস আরম্ভ করেন। ত্রৈলোক্যনাথ যখন কলকাতা মিউজিয়ামের অ্যাসিস্ট্যান্ট কিউরেটার ছিলেন, তখন তাঁর সুপারিশে আমার বড়োজেঠা পাটনা মিউজিয়ামে চতুর্থশ্রেনির কর্মীর চাকরি পান, মূর্তি আর ছবি ঝাড়পোঁছ করার ; স্বাধীনতার পর বড়োজেঠার পদের নাম হয়েছিল ‘কিপার অফ পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার’, মাইনে একশো টাকা। আরম্ভ করেছিলেন দশ টাকায়। আমি শৈশবে গরমের ছুটিতে বড়োজেঠার সাইকেলের পেছনের সিটে বসে মিউজিয়ামে যেতুম আর ঘরে-ঘরে ঘুরে বেড়াতুম ; সে অভিজ্ঞতা আমার লেখালিখিতে কাজে দিয়েছে।


     

    ব্যবসার কাজে সে সময়ে বাহওয়ালপুরের (বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত) আমিরের প্রতিনিধি কলকাতায় ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, এবং তাঁর সঙ্গে লক্ষ্মীনারায়ণের পরিচয়ের সুযোগ হয়। আমিরের প্রতিনিধি লক্ষ্মীনারায়ণের আঁকবার প্রতিভায় মুগ্ধ হন, এবং দাদুকে বাহাওলপুর রাজ্যে রাজপরিবারের সদস্যদের স্কেচ আর তা থেকে পেইনটিঙ আঁকার জন্য সস্ত্রীক অতিথি হিসাবে যাবার আমন্ত্রণ জানান। লক্ষ্মীনারায়ণ ছয় মাস পর বাহাওলপুর পৌঁছান; আমির তাঁর আঁকা প্রতিকৃতি দেখে লক্ষ্মীনারায়ণেকে প্রশংসার চিঠি দিয়েছিলেন যাতে তিনি চিত্রাল, হুনজা, ফুলরা, মাকরান ইত্যাদি রাজপরিবারে গিয়েও ছবি এঁকে রোজগার করতে পারেন। বড়োজেঠা বলেছিলেন যে বাহাওলপুরের দুটি ডাকটিকিটের ড্রইং লক্ষ্মীনারায়ণের আঁকা, তাতে সেখানকার আমিরের মুখাবয়ব ছিল। পাকিস্তানে এখন যেমন সামন্তবাদের রমরমা, তখন আরও বেশি ছিল, তাঁরা এমনকি কেনা গোলাম আর বাঁদি রাখতেন। বড়োজেঠার মুখে শুনেছি যে, যারা হাজার-হাজার একরের মালিক ছিল তাদের বলা হতো তালুকদার, মনসবদার, মাহের, নবাব, নবাবজাদা, চৌধারি, খান, জাগিরদার, সরদার, মাহালওয়ার ইত্যাদি --- এদের কাছ থেকে দাদু ফোটো তোলার জন্য ডাক পেতেন।


     

    বিভিন্ন রাজপরিবারের সদস্যদের মুখাকৃতি আঁকার সূত্রে লক্ষ্মীনারায়ণ আফাগানিস্তানের রাজপরিষদের সদস্যদের ছবি আঁকার আমন্ত্রণও পেয়েছিলেন। অন্যান্য সামন্তপ্রধান অথবা শিয়া ধর্মগুরুদের দরবারে আতিথ্যের সময়ে তাঁর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হন এবং লক্ষ্মীনারায়ণ লাহোর শহরে কিছুদিনের জন্য বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকা আরম্ভ করেন। লাহোর শহরে রোজগেরে কাজের খোঁজে তিনি তখনকার মেয়ো কলেজ অফ আর্টসের ( বর্তমানে পাকিস্তানের ন্যাশানাল কলেজ অফ আর্টস ) অধ্যক্ষ জন লকউড কিপলিংয়ের স্টুডিওয় কর্মচারীর চাকুরি পান। জন লকউড কিপলিং পরে লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটার হন। ইনি ছিলেন রুডিয়ার্ড কিপলিঙের বাবা।


     

    জন লকউড কিপলিংয়ের বাড়িতে ও দপতরে কাজ করার সময়ে লক্ষ্মীনারায়ণ পরিচিত হন নতুন উদ্ভাবিত ফোটো তোলার ক্যামেরার সঙ্গে। ১৮৩০ সালে লুই ড্যাগোরো ক্যামরা আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু সেটিতে একবারে কেবল একটিই ফোটো তোলা যেত, সেই ফোটোকে নুনজলে চুবিয়ে স্হায়ীত্ব দেয়া হতো, কিন্তু তা কিছুকাল পরেই হলদেটে হয়ে যেতো। ১৮৪১ সালে ফক্স ট্যালবট আবিষ্কার করেন ক্যালোটাইপ প্রক্রিয়া। ক্যালোটাইপের মাধ্যমে একাধিক ফোটো প্রিন্ট করা সম্ভব হতে লাগলো, কিন্তু তখনও কাগজে। ১৮৮০ নাগাদ ভারতে জিলেটিন প্রক্রিয়ায় ফোটো তৈরির কৌশল এসে পৌঁছোয়, প্রধানত ব্রিটিশ ফোটোগ্রাফারদের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়ায় কোলোডিয়ান প্রক্রিয়ার বদলে জিলেটিনের শুকনো প্লেট ব্যবহার করা হতো— কাচের প্লেটের উপর লাগানো সিলভার হ্যালিডেসের ফোটোর রসায়ন। নতুন বেলোলেন্স ক্যামেরাও এই সময়ে আবিষ্কার হয়। হারমোনিয়ামের যেমন বেলো হয়, বেলোলেন্স ক্যামেরাতেও তেমন বন্ধ আর খোলার ব্যবস্হা ছিল।


     

    দাদু ফোটোগ্রাফি শিখতে লাগলেন, কিন্তু নতুন কাজের জন্য ডার্করুমের দরকার পড়ল। লক্ষ্মীনারায়ণ একটি বেলোলেন্স ক্যামরা, ক্যামেরার তিন-ঠেঙে স্ট্যাণ্ড কিনে ১৮৮৬ সালে লাহোরে স্হায়ী ব্যবসা আরম্ভ করলেন। বাড়িতে একটি ছোটো ঘরকে ডার্করুম হিসাবে ব্যবহার করতেন, জানলাগুলো কালো কাপড়ে ঢাকা দিয়ে। মুসলমান পরিবারের বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন, পর্দাপ্রথার কারণে ঘরগুলোয় জানালা একটি বা দুটি ছিল । ব্যবসায়িক সংস্হার নাম রাখলেন রায়চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি - ফোটোগ্রাফার্স অ্যাণ্ড আর্টিস্টস। বাবা যখন পাটনায় দোকান করেন তখন এই নামই বজায় রাখেন। আমার ভাইপো হৃদয়েশ. নামটা পালটে ফেলেছে, যাতে অন্য শরিকরা গিয়ে ব্যবসার অংশ না দাবি করে ; তাছাড়া বাবা নিজের পুঁজিতে ব্যবসা চালাতেন, তখন খদ্দেররা বক্স ক্যামেরা আর ভিউ ফাইন্ডার ক্যামেরা কিনতো যা পনেরো টাকা থেকে সাতশো টাকায় পাওয়া যেতো।


     

    ভাইপো যে ক্যামেরা বিক্রি করা আরম্ভ করেছে তা এক লাখ-দুই লাখ টাকা দামের, যার পুঁজিনিবেশ ক্যামেরা কোম্পানিরাই করেছে, তারাই দোকানের ভোল মাঝে-মাঝে পালটে দিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে থাকে। ক্যানন, নিকন-এর বিশাল বোর্ডের পাশে ছোটো করে লেখা থাকে ‘রায়চৌধুরী ফোটোগ্রাফার্স’। অ্যানালগ ফোটোগ্রাফি পৌঁছেচে ডিজিটাল ফোটোগ্রাফিতে। স্টুডিও আর নেই, পুরো দোকানবাড়ি নানারকম ক্যামেরা, কমপিউটার আর যন্ত্রপাতিতে ভরা। বক্স ক্যামেরা আর ভিউফাইন্ডার ক্যামেরায় ফিলমের রোল লাগাতে হতো, বাইরে লাল আর ভেতরে কালো কাগজের রোলের কালো দিকে কাঁচকড়ার লম্বা ফিল্ম, ক্যামেরার সাইজ অনুযায়ী বারোটা বা ষোলোটা উঠতো, ফিলমের সাইজ সম্ভবত ছিল ১২০ ; এই সাইজে কম ফোটো হতো বলে ৩৫ এমএম ফিল্ম বাজারে আসে যাতে ৩৫/৩৬টা ফোটো তোলা যেতো। বাবা এই ফিল্মগুলো ডেভেলাপ করে একটা তারে ক্লিপ দিয়ে ঝুলিয়ে ফ্যান চালিয়ে দিতেন। এখন আমার ভাইপোর দোকানবাড়িতে প্রতিটি ঘরে এয়ারকাণ্ডিশান বসাতে হয়েছে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি বলে বিখ্যাত কোডাক কোম্পানি প্রায় উঠে যেতে বসেছে। লেন্স জিনিসটা এখন সর্বত্র, বাড়িতে, রাস্তায়, রকেটে, আকাশযানে, যুদ্ধাস্ত্রে, লুকোনো ছোট্ট গ্যাজেটে। বাবার বেলোলেন্স ক্যামেরার লেন্স কোনো কাজে লাগাতে না পেরে দাদা সেটা উৎসব চট্টোপাধ্যায়কে দান করেছিলেন। উৎসব আমার মুখের একটা পেনসিল স্কেচ আর ‘জখম’ কাব্যগ্রন্হের কভার এঁকে দিয়েছিল।


     

    ইতোপূর্বে মুখাকৃতি এঁকে তা থেকে দাদু তৈলচিত্র তৈরি করতেন। রাজপরিবারের সদস্যদের বেশ কিছুক্ষণ ঠায় তাঁর সামনে বসে থাকতে হতো এবং সেকারণে তাঁরা বিরক্ত হতেন। পর্দাপ্রথার কারণে রাজপরিবারগুলোতে মহিলাসদস্যদের পেইনটিঙ আঁকতে লক্ষ্মীনারায়ণের অসুবিধা হতো। ক্যামেরা কেনার পর আর তাঁর সামনে বসে থাকার সমস্যা রইল না। অন্যান্য রাজঘরানা ও ধনীদের ফোটোতোলারও সুযোগ পেলেন তিনি। বড়ো ছেলে প্রমোদের পর লাহোরে সুশীল, রঞ্জিত, অনিল, সুনীল, বিশ্বনাথ এবং একমাত্র কন্যাসন্তান কমলার জন্ম হয়। উত্তর-পশ্চিম ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ফোটো তোলার আমন্ত্রণ পেলে সেই সমস্ত মহারাজা, রাজা, রাজে, দেশমুখ, নবাব, বেগ, খান প্রমুখ পরিবারের সদস্যদের ফোটো তুলতে যেতেন। যানবাহনের ব্যবস্হা তাঁরাই করতেন।


     

     

    দ্বারভাঙ্গা মহারাজের ডাকে তিনি সপরিবারে পাটনা পৌঁছোন। অত্যধিক খাটুনি আর পাকিস্তানের চর্বিঠাসা মাংস খেয়ে-খেয়ে পাটনা শহরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লক্ষ্মীনারায়ণ ৮ই নভেম্বর ১৯৩৩ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে ঠাকুমা আর জেঠা-বাবা-কাকারা দিশাহারা হয়ে যান, কেননা ব্যবসায়ের জন্য যোগাযোগ পদ্ধতি ও বৈভবশালী ক্রেতাদের সঙ্গে আদান-প্রদানের কৌশল তখনও দাদুর ছেলেরা রপ্ত করতে পারেননি। আর্থিক অবস্হাও ভালো ছিল না। তাঁরা একটা চালাবাড়ি ভাড়া নিয়ে পাটনার বাজাজা নামে এক পাড়ায় বসবাস আরম্ভ করেন ; এই বাড়িটা ১৯৩৪ সালে পাটনার ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়েছিল। বাড়ির বউদের গয়না বিক্রি করে বড়োজেঠা পাটনার অন্ত্যজ বিহারি ও অত্যন্ত গরিব মুসলমান অধ্যুষিত পাড়া ইমলিতলায় একটা বাড়ি কেনেন। এই ইমলিতলার নানা ঘটনা আছে আমার বাল্যস্মৃতি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” বইতে।


     

    মেজজেঠা সুশীল, মেজজেঠিমা করুণা আর দুই মেয়ে ডলি আর মনুকে নিয়ে বিহারের ছাপরায় একটি শাখা খুলেছিলেন, কিন্তু প্রথমত চালাতে পারলেন না, আর দ্বিতীয়ত মেজজেঠিমা যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হলেন, তাই মেজজেঠাকেও পাটনায় চলে আসতে হলো। উত্তরপাড়ার দোকান চালাতে না পেরে নকাকা অনিলও পাটনায় ফিরে যান। বাবা তখন পাটনায় বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে একটা ছোট্ট বাড়ি ভাড়া নিয়ে নিচের তলায় দোকান আর ওপরতলায় স্টুডিও স্হাপন করেন। মেজজেঠা আর নকাকার ওপর ফোটো থেকে পেইনটিঙ তৈরির কাজ বর্তায়। সকলের সংসার চালানোর দায় বাবার ওপর এসে পড়ে।


     

    বড়োজেঠা পোরট্রেট আঁকতে পারতেন না, উনি প্রাকৃতিক দৃশ্য আর গ্রিক থাম, বাড়ি, প্রাসাদ ইত্যাদি পেইন্ট করতে পারতেন। স্টুডিওর পেছনের দেয়ালে বড়োজেঠা প্রাকৃতিক দৃশ্য এঁকে দিতেন আর একটা গুটোনো ক্যানভাস রোলে প্রাসাদ ইত্যাদি এঁকে দিতেন। যে খদ্দের যেমন ব্যাকগ্রাউন্ড চাইতো তার জন্য তেমন ব্যবস্হা করা হতো। জমিদার বাড়ির হলে কড়িকাঠের কাছে গুটিয়ে ওঠানো ক্যানভাসটা নামানো হতো। সেই সময়ে স্টুডিওতে ফোটো তোলার আলোর জন্য কুঁজোর মাপের বিরাট-বিরাট বালব উঁচুতে কড়িকাঠের কাছে লাগানো থাকতো, এক হাজার আর দুহাজার ওয়াটের। ভোলটেজ ফ্লাকচুয়েশানের কারণে বালবগুলো প্রায়ই ফিউজ হতো, কেননা তখনকার দিনে ভোলটেজ ফ্লাকচুয়েশান নিয়ন্ত্রণ করার যন্ত্র আসেনি। ফোটো তোলার সময়ে বাবা দোকানের সব আলো আর ফ্যান নিভিয়ে দিতেন।


     

    অনেক খদ্দের তাঁদের মা বা স্ত্রীর পুরোনো ফোটো আনতেন, যাতে কেবল তাঁদের মুখটুকুই আবছা দেখা যায়। এই মুখকে আরেকটি ফোটোর কাঁধে বসিয়ে একটা সম্পূর্ণ ছবি তৈরি করা হতো। মহিলার কাঠামো অনুযায়ী মা কিংবা জেঠিমা মডেলের কাজ করতেন। খদ্দেরের ইচ্ছে অনুযায়ী, পুজোয় বসেছেন বা জমিদারের অ্যাণ্টিক চেয়ারে বসে আছেন, তেমন ফোটো তৈরি করার জন্য মা কিংবা বড়োজেঠিমা পোজ দিতেন আর তাঁদের মুখ সরিয়ে কাঁধের ওপর খদ্দেরের দেয়া মুখ বসিয়ে দেয়া হতো। মা ছিলেন একহারা, জেঠিমা একটু মোটার দিকে। এখন ডিজিটাল ফোটোশপিঙের যুগে এসবই অবিশ্বাস্য মনে হবে।


     

    দাদুর ফোটোগ্রাফি ছিল সংসারের জন্য টাকা রোজগারের ব্যাপার। তিনি জানতেন যে তাঁর আগে পেশাদার ফোটোগ্রাফাররা ‘শিল্প’ হিসাবে পেশাটাকে বেছে নিয়েছেন, যেমন স্যামুয়েল বোর্ন হিমালয়ের ফোটোসংগ্রহ গড়ে তুলছিলেন, ফেলিস বিটো তুলছিলেন মহাবিদ্রোহের ফোটো, লিনিয়াস ট্রাইপ দক্ষিণ ভারতের ভাস্কর্য ও স্হাপত্যের কাজ ধরে রাখছিলেন ক্যামেরায়, মেজর গিল তুলছিলেন অজন্তা-ইলোরার ফোটো, প্রত্নতত্ব বিভাগের জে ডি বেগলার এবং হেনরি হার্ডি কোল পুরাতাত্বিক সংগ্রহগুলোর ছবি তুলছিলেন, কলকাতা শহরকে ক্যামেরায় ধরে রাখছিলেন ফ্রেডরিক ফিবিগ। কিন্তু তাঁরা ক্যামেরার মাধ্যমে যা করছিলেন তা উপনিবেশের প্রসারণ, তাঁরা ভারতবর্ষকে দখল করছিলেন ছবির মাধ্যমে। ব্রিটেন থেকে খ্রিষ্টধর্মের প্রচারকরা ভারতে এসে তাঁদের কাজ সম্পর্কে ব্রিটেনে সংবাদ পাঠাতেন ফোটোর মাধ্যমে, যাতে বৈভবশালীরা তাঁদের আর্থিক সাহায্য করেন।


     

    উপরোক্ত প্রসঙ্গে বিট আন্দোলনের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের কথা বলে নিই। গিন্সবার্গ কলকাতা, বেনারস, পাটনা যেখানেই গেছেন ফোটো তুলেছেন মূলত নুলো, খোঁড়া, অন্ধ, ফুটপাতে আধমরা, নিঃস্ব উদ্বাস্তু, ল্যাংটো সাধু ইত্যাদির। গিন্সবার্গ আমার বাবাকে একটা ফিল্ম ডেভেলাপ করতে দিলে, নেগেটিভটা সম্পূর্ণ দেখে বাবা গিন্সবার্গকে বলেছিলেন, “ তোমরা বিদেশিরা কবি হও বা ট্যুরিস্ট, ভারতে এসে ভালো কিছু দেখতে পাও না, কেবল এই সবই দেখতে পাও।” বস্তুত গিন্সবার্গ তাঁর নিজের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী লেন্সের দৃষ্টির মাধ্যমে একটি থার্ড ওয়ার্ল্ড তুলে ধরতে চাইছিলেন তার “ইনডিয়া জার্নালস”-এ, যাকে এডওয়ার্ড সাঈদ বলেছেন “ওরিয়েন্টালিজম”। উনিশ শতকে ব্রিটিশদের উপনিবেশবাদী ফোটোগ্রাফিও ছিল “ওরিয়েন্টালিস্ট”। বোর্ন অ্যাণ্ড শেফার্ড এবং জনস্টন অ্যান্ড হফম্যান কোম্পানিগুলোর ফোটোগ্রাফিও ছিল উপনিবেশবাদের প্রসার।


     

    ব্রিটিশ দৃষ্টিকোণকে টক্কর দেবার উদ্দেশে ১৮৬২ সালে জয়পুরের মহারাজা দ্বিতীয় সওয়াই মান সিং একটা ক্যামেরা কিনেছিলেন, তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শৌর্য ধরে রাখার জন্য। ব্রিটিশ শাসকদের অনুকরণ করে রাজা-মহারাজা-নবাবরাও বাঘ বা হরিণ মেরে তার ওপর পা রেখে ফোটো তোলাতে লাগলেন। ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য উনিশ শতকের মাঝামাঝি একটা ডাগেরোটাইপ ক্যামেরা কিনে রাজকীয় শখ হিসাবে ফোটো তোলা আরম্ভ করেন। তাঁর ছেলে বড়ঠাকুর সমরেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মণ বাবার হবিকে গুরুত্ব দিয়ে ব্রিটিশ পেশাদার ফোটোগ্রাফারদের সঙ্গে প্রতিযোগীতায় নামেন। লখনউ শহরের ফোটো ভারতীয় চোখে ধরে রাখার দায়িত্ব নেন শৌখিন ফোটোগ্রাফার আহমদ আলি খান আর হাজি আব্বাস আলি, দুজনেই শিয়া মুসলমান, যাঁদের নবাবি ব্রিটিশদের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।


     

    ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা বা “ওরিয়েন্টালিজম” এবং দেশজ দৃষ্টিভঙ্গী বা “অকসিডেন্টালিজম” এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য গড়ার কাজটি করেন রাজা দীন দয়াল ( ১৮৪৪ - ১৯০৫ ), যিনি হায়দ্রাবাদের নবাবের আনুকূল্য পেয়ে ভারতীয় অভিজাত সমাজ ও ব্রিটিশ শাসকদের মাঝে ফোটোগ্রাফির একটি সেতু গড়তে পেরেছিলেন এবং তাকে কাজে লাগিয়ে অঢেল টাকাকড়ি করতে পেরেছিলেন। তিনিও তাঁর দুই ছেলেকে ফোটোগ্রাফির ব্যবসায় লাগিয়েছিলেন ; দুর্ভাগ্যবশত তাঁর দুই ছেলে তাঁর আগেই মারা যান। ১৮৭৪ সাল থেকে রাজা দীন দয়াল ফোটো তোলা আরম্ভ করেন। লর্ড নর্থব্রুক এবং প্রিন্স অফ ওয়েল্সের সফরের ফোটো তুলে দীন দয়াল নিজের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সফল হন। তারপর সাঁচি স্তুপে প্রত্নতত্বের সংরক্ষণকর্ম আর মহুতে ব্রিটিশ ফৌজি মহড়ার ফোটো তুলে শাসকদের নেকনজরে পড়েন।


     

    ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার ব্রিটিশ কর্মচারীদের পরামর্শ দিয়েছিল যে ফোটোগ্রাফি হল সবচেয়ে সস্তা মাধ্যম যার সাহায্যে তাদের শাসন সম্পর্কে ব্রিটেনে বার্তা পৌঁছে দেয়া যায়, এবং ফোটোগুলো দেখে ব্রিটিশ যুবক যুবতীরা ভারতবর্ষে আসতে আগ্রহী হয়। ব্রিটেনের রাজার শাসন কায়েম হলে, ওরিয়েন্টালিজমের প্রসার হিসাবে ভারতে নতুন ধরণের স্হাপত্য দেখা দেয়, যেমন ভিকটোরিয় গথিক, নিও ক্লাসিকাল, প্যালাডিয়ান স্টাইল ইত্যাদি। এই নতুন স্হাপত্য্‌ও শাসক ধরে রাখতে চাইছিল ভবিষ্যতের জন্য। ভারতীয়দের সতীপ্রথা, শবদাহ, সাধু-সন্ন্যাসীদের ছবিও তুলে ব্রিটেনে পাঠানো হচ্ছিল। আমি অ্যামস্টারডামের ‘রিকস মিউজিয়ামে’ দেখেছি, ঢুকেই যাতে চোখে পড়ে তাই সতীদাহের একটা পেইনটিঙ, যিনি এঁকেছিলেন, তিনি বিশেষ নামকরা নন, ওই মিউজিয়ামে দর্শকরা প্রধানত রেমব্রাঁর আঁকা পেইনটিঙ দেখতে যান।


     

    দীন দয়ালের প্রসঙ্গে তুললুম আমার দাদুর সঙ্গে তুলনার জন্য। দাদু ফারসি, আরবি আর উর্দু পড়তে-লিখতে জানতেন, কিন্তু ইংরেজি ভালো বলতে আর লিখতে পারতেন না, কোনো স্কুলে কখনও যাননি, ওনার ট্যুরের কাজের দরুন ওনার ছেলেরাও কেউ স্কুলে পড়াশুনা করেননি। দীন দয়াল পড়াশুনা করেছিলেন রুড়কির টমসন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ; সেখান থেকে পাশ করে ইন্দোর পূর্তবিভাগে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি পান। তিনি ভালো ইংরেজি এবং হিন্দি বলতে, লিখতে ও পড়তে পারতেন। ইন্দোরের মহারাজা দ্বিতীয় তুকোজি রাওয়ের দৃষ্টি আকর্ষণে সফল হন, যার দরুন তিনি হায়দ্রাবাদের ষষ্ঠ নিজাম মেহবুব আলি খানের সংস্পর্শে যেতে সক্ষম হন ; এরপর ব্রিটিশ ভাইসরয় এবং ইংরেজ উচ্চ আধিকারিকদের কাছাকাছি যেতে তাঁর অসুবিধা হয়নি, এবং তাঁর তোলা ফোটোর সংরক্ষণ ব্যবস্হারও অবহেলা হয়নি। দেশিয় আর ব্রিটিশ শাসকরা রাজা দীন দয়ালকে ঘিরে একটি ‘মিথ’ গড়ার প্রয়াস করেছিলেন যাতে তাঁদের চাকর-বাকররা যে উপেক্ষিত হয়েছে তা চাপা পড়ে যায়। দীন দয়াল তাঁর দোকানে ব্রিটিশ কর্মচারী রাখতেন, শাসকদের মাঝে প্রচারের উদ্দেশে।


     

    বর্তমান পাকিস্তান অঞ্চলে দাদু গিয়েছিলেন মূলত ভারতীয় ও ব্রিটিশ পেশাদার ফোটোগ্রাফারদের সঙ্গে যাতে তাঁকে পাল্লা দিতে না হয়। অঞ্চলটি ছিল মুসলমান অধ্যুষিত এবং তাঁর ফারসি, আরবি ও উর্দু প্রয়োগ করার জন্য উপযুক্ত। সাবর্ণ চৌধুরীদের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের নবাবদের নৈকট্যের কারণে তাঁরা সতেরো শতক থেকে বংশানুক্রমিকভাবে ফারসি, আরবি এবং উর্দু শিখতেন। রাজা দীন দয়াল এবং ব্রিটিশ ফোটোগ্রাফারদের যে ইতিহাসবোধ ছিল, তা দাদুর ছিল না, তিনি কিছুই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন মনে করেননি। কেবল দাদু নয়, আমি আর দাদা, আমাদের ছেলে-মেয়েরা, কারোর মনে ইতিহাসবোধ কাজ করেনি। দাদুর সম্পর্কে তাই কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না দীপালি দেওয়ান, ডেবোরা হাটন, জুডিথ গিটম্যান, নরেন্দ্র লুথার, সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রমুখের বইতে। এনারা সকলেই কলকাতা, মুম্বাই, মাদ্রাজ কেন্দ্রিক তথ্য সংগ্রহ করে বই লিখেছেন।

    দাদু, লকউড কিপলিঙ, রুডিয়ার্ড কিপলিঙ এবং রাজা, মহারাজা, নবাবদের ফোটো তো সংরক্ষণ করেনইনি, তাঁদের সঙ্গে নিজের ফোটোও তুলিয়ে রাখেননি। আমি আর দাদা কখনও ভাবিনি যে ওকতাভিও পাজ, আরনেস্তো কার্দেনাল, অ্যালেন গিন্সবার্গ, ডেইজি অ্যালডান, কমলকুমার মজুমদার, নিসিম এজেকিয়েল, ধর্মবীর ভারতী, খুশওয়ন্ত সিং, পুপুল জয়াকর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, সন্তোষকুমার ঘোষ. প্রকাশ কর্মকার, যোগেন চৌধুরী, ফণীশ্বরনাথ রেণু, রামধারী সিং দিনকর, রাজকমল চৌধুরী, পারিজাত প্রমুখের সঙ্গে ফোটো তুলিয়ে রাখা দরকার, যেমনটা বিট আন্দোলনের কবি-লেখকরা করেছেন। এমনকি হাংরি আন্দোলনে যাঁরা ছিলেন তাঁদের সঙ্গে গ্রুপ ফোটো তুলিয়ে রাখিনি, যেমনটা গিন্সবার্গ-ফেরলিংঘেট্টি করেছেন। যে দুটো গ্রুপ ফোটো হাংরিদের আছে তার একটা টাইম ম্যাগাজিনের রিপোর্টারের নেয়া, অন্যটা হিন্দি জ্ঞানোদয় পত্রিকার সম্পাদক শরদ দেওড়ার আগ্রহে তোলা। একশোর বেশি হাংরি বুলেটিন, কার্ড, পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছিল, সেগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন মনে হয়নি।


     

    দাদা সমীর রায়চৌধুরীর ছেলেদের মনে ইতিহাসবোধ একেবারেই কাজ করেনি ; বাবা মারা যেতেই দেয়াল থেকে ঠাকুমা, জেঠিমা, নকাকিমার পোরট্রেট নামিয়ে ফেলে দিয়ে দোকানকে বিশাল-বিশাল কাচে মুড়ে ঝকঝকে আধুনিক করে তুলেছে। চিলেকোঠার ঘরে বাবা প্রায় হাজার পাঁচেক তোলা-ফোটোর কাচের প্লেট রেখেছিলেন, বছর অনুযায়ী সাজিয়ে। সেগুলো কাচের দরে বেচে দিয়েছে, অথচ সেগুলো ছিল উনিশ শতকের শেষ দিকে যাঁরা ফোটো তুলিয়েছিলেন, তাঁদের প্লেট।


     

    ইতিহাসবোধ বোধহয় বাঙালির মনে বিদেশিদের মতন কাজ করে না। হেদোতে আমার পিসেমশায়ের সাঁতার জেতার একাধিক ফোটো ছিল, সেগুলো ফেলে দেয়া হয়েছে। যাঁরা পানিহাটি কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে আমার দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন অন্যতম, কিন্তু আশির দশকে গিয়ে দেখলুম তাঁর ফোটো দেয়াল থেকে নামিয়ে ফেলে দেয়া হয়েছে স্টোর রুমে, আমি সেই ফোটোর একটা ফোটো তুলে এনেছিলুম চুপি-চুপি, যদিও তা ভালো ওঠেনি। দাদামশায় সম্পর্কে একটা প্রবন্ধ লিখতে বলেছিলেন এক লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক, তাই ফোটোটা দরকার ছিল। কিশোরীমোহন ছিলেন রোনাল্ড রসের সহকারী ; রোনাল্ড রস নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন আর দাদামশায় পেয়েছিলেন ব্রিটেনের রাজা সপ্তম এডোয়ার্ডের দেয়া সোনার মেডেল ও সার্টিফিকেট।


     

    ১৯৫০ নাগাদ বাবার দোকানের বাড়িঅলা ( বি এন কলেজের সামনে ) বাড়ি ছেড়ে দেবার নোটিস দিলে বেশ কিছুকাল মামলা-মোকদ্দমা চলেছিল। শেষ পর্যন্ত বাবা মামলায় হেরে যান। হেরে যাবেন আঁচ করে উনি পাটনার দরিয়াপুরে একটা জমি কিনে সেখানে দোকান করার মতন একফালি বাড়ি তৈরি করান, একতলায় বেশ বড়ো স্টুডিও, রিটাচ করার জায়গা, ফোটোর ওপর মুখে নল লাগিয়ে স্প্রে করার জায়গা, ফোটো ডেভেলাপ, এনলার্জ, প্রিন্ট, করার জায়গা, অনেক বড়ো প্রিন্ট হলে তাকে বহুক্ষণ জলে ডুবিয়ে রাখার জায়গা, তার জন্য জলের চৌবাচ্চা, রসায়নে চুবিয়ে সিপিয়া ফোটো বহুক্ষণ ধোবার জায়গা, প্রিন্ট কাটবার টেবিল, নেগেটিভের রোল শুকোবার জায়গা, মেজজেঠা আর নকাকা যাতে একান্তে পোরট্রেট পেইনটিঙ করতে পারেন তার জায়গা করিয়েছিলেন বাড়িটায়। ফোটো প্রিন্ট করা হতো দু’রকম : ম্যাট আর গ্লেজড। প্রিন্টকে চকচকে বা গ্লেজ দেবার জন্য আয়নার মতন ধাতুর বোর্ডে শুকোনো হতো। বাবার দোকানে প্রায় দশটা অমন গ্লেজিং বোর্ড ছিল।


     

    এখন ফোটোকে সেপিয়া করে তোলার জন্য ফিলটার প্রয়োগ করা হয়। দাদুর সময়ে তা করা হতো মাছের তেল থেকে তৈরি সালফাইডের সাহায্যে। সাদা-কালো ফোটোর টোনিং আরম্ভ করেছিলেন হ্যামিলটন স্মিথ এবং মাছের তেলের সালফাইড প্রয়োগ করার চল ছিল ১৮৬০ থেকে ১৯২০ সালের মাঝে। রসায়নের বোতলে লেখা থাকতো কাটল ফিশ সেপিয়া কেমিকাল। পটাশিয়াম ফেরিসায়ানাইডে ধুয়ে স্হায়ীত্ব দিতে হতো সেপিয়াকে। তিন রকমের সেপিয়ার চল ছিল। সোডিয়াম সালফাইডে রাঙানো, থিয়োইউরিয়ায় রাঙানো আর পলিসালফাইডে রাঙানো। স্মার্টফোনে এখন এতো ধরণের ফিলটার থাকে যে ফোটোগ্রাফারদের সেই সময়ের শ্রমকে অবিশ্বাস্য মনে হয়। সেপিয়ার বিপরীত ছিল মোনোক্রোম ফোটো, অর্থাৎ সাদা-কালো ফোটো।


     

    দরিয়াপুরের স্টুডিও বেশ বড়ো ছিল, যাতে কুড়িজনের গ্রুপ ফোটো ফিল্ড ক্যামেরায় তোলা যেতো। স্টুডিও অনেক বড়ো ছিল বলে কুঁজো মাপের বালবও এক হাজার-দুহাজার ওয়াটের ছিল। আমরা ওপরতলায় থাকতুম। একবার কাজের মাসি বাটনা বাটার সময়ে নোড়া ঠুকে হলুদ ভাঙতে গেলে একটা বালব ফিউজ হয়ে গিয়েছিল, বাবা সেসময়ে ফোটো তুলছিলেন। তারপর থেকে বাবা চেঁচিয়ে জানিয়ে দিতেন যে ফোটো তোলা হচ্ছে, কোনোরকম মশলাবাটা বা লাফালাফি যেন না হয়। বাবা যখন বাইরে গ্রুপ ফোটো তুলতে যেতেন, তখন বেলোলেন্স ক্যামেরার বাক্স দোকানের কাজের লোক রামখেলওয়ন সিং ডাবরের কাঁধে চাপিয়ে, নিজে তিনঠেঙে স্ট্যাণ্ড আর মাথায় ঢাকা দেবার কালো কাঁথা নিয়ে যেতেন। তখন গ্রুপ ফোটো তোলার জন্য ফ্ল্যাশ লাইটের ব্যবস্হা ছিল না। ডাবর দুটো ম্যাগনেশিয়াম তারের বাণ্ডিলে আগুন ধরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো যাতে ফোটো তোলার সময়ে দিনের মতন আলো হয়। এই কাজটা দাদা আর আমিও করেছি, যখন ডাবর ধান কাটার ঋতুতে নিজের গ্রামে যেতো।


     

    ইতিহাসবোধ কাজ করেনি উত্তরপাড়ার বাড়িতেও। দোকানের কাজের দরুন বাবা উত্তরপাড়ায় যেতে পারতেন না, কেবল বাড়ির ট্যাক্স পাঠিয়ে দিতেন। একটা বিরাট সিন্দুকে সেকালের পুঁথি ছিল, ফার্সি দলিল ছিল, ঝাড়-লন্ঠন ছিল। সেগুলো ছোটোকাকা অর্থাৎ বিশে খুড়ো বিক্রি করে দিয়েছিলেন। বিশেখুড়ো বাবার দোকানে কোনো কাজে আগ্রহ দেখাননি, হঠাৎই একদিন নিঃসন্তান স্ত্রীকে নিয়ে বাবার কেনা কোতরঙের জমিতে গিয়ে কালীর মন্দির তৈরি করে, রামকৃষ্ণদেব এসেছিলেন জানিয়ে বুকলেট ছাপিয়ে রোজগারের ধান্দা করেন। বাজারে গিয়ে কালীর নামে আনাজ আর চাল-ডাল সংগ্রহ করতেন। পাটনা থেকে যাবার সময়ে বাবার সংগ্রহে জাহাঙ্গির, আওরঙ্গজেব প্রমুখের সময়ের রুপো আর তামার মুদ্রা নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। পয়সার টানাটানি আরম্ভ হলে মন্দির ভেঙে বিল্ডারকে জমিজমা বেচে বালির কাছে থাকতে চলে যান।


     

    ছোটোকাকা অর্থাৎ বিশেখুড়ো দরিয়াপুর থেকে চলে যাবার অনেকদিন পর ওনার ছেড়ে-যাওয়া একটা বাক্সে আমি আর পিসতুতো দাদা সেন্টুদা ছোটোকাকিমার প্রচুর নগ্ন ফোটো পেয়েছিলুম। গুরুজনের নগ্ন ফোটো, এই ভয়ে আমরা সেগুলো নষ্ট করে ফেলেছিলুম। এখন মনে হয় যে ইতিহাসবোধ ছিল না বলে নষ্ট করে ফেলেছিলুম। বিদেশি নগ্নিকাদের পেইনটিঙ আর গ্রিসের নগ্নিকাদের আদলে ফোটোগুলো তুলেছিলেন ছোটোকাকা। ছোটোকাকিমা নিঃসন্তান ছিলেন এবং ওনার ফিগার ছিল এখনকার মডেলদের চেয়ে ঈর্ষনীয় আর ফোটোগুলোয় উনি বিভিন্ন পোজও দিয়েছিলেন সেইভাবে। ছোটোকাকা আর ছোটোকাকিমা নিজেরা স্টুডিওতে রাতের বেলায় শোবার দাবি করতেন, বলতেন প্রচুর জায়গা, গরমকালেও ঠাণ্ডা থাকে ইত্যাদি। নগ্নিকাগুলো পাবার পর বুঝতে পারি কেন উনি স্টুডিওতে শুতে চাইতেন।


     

    একটু আগেই বলেছি, সেসময়ে মেয়ো স্কুল অফ আর্টসের অধ্যক্ষ এবং লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটার ছিলেন রাডিয়ার্ড কিপলিঙের বাবা জন লকউড কিপলিঙ, যাঁর সঙ্গে পরিচয়ের ও তাঁর অধীনে কাজ করার সূত্রে তাঁর কাছ থেকেই দাদু ফোটো তোলা শেখেন। ফোটো তোলা হতো সরাসরি ব্রোমাইড পেপারে। পরে, কাচের প্লেটে নেগেটিভ ফিল্ম তোলা হতো, সেই নেগেটিভকে রসায়নে চুবিয়ে রেখে ফোটো গড়ে উঠত; তারপর সেই প্লেটের ওপর ফোটোর কাগজ রেখে, ডার্করুমে প্রয়োজনীয় আলো দেখিয়ে ফোটো প্রিন্ট করা হতো, আর সেই প্রিন্টকে রসায়নে চুবিয়ে, শুকিয়ে, স্হায়ীত্ব দেয়া হতো।


     

    বেলোলেন্স ক্যামেরা ছিল বেশ ভারি ; বাইরে গিয়ে ফোটো তুলতে হলে তাকে বয়ে নিয়ে যাবার লোক দরকার হতো। বাইরে তোলা হচ্ছে বলে একসঙ্গে অনেকগুলো তুলে যেটা ভালো হল সেটা থেকে ফোটো তৈরি করা হতো। ফোটো তোলা হতো তিন ঠেঙে ক্যামেরা স্ট্যাণ্ডের ওপরে ক্যামেরা রেখে। ফোটো তোলার সময়ে হাত দিয়ে লেন্সের ঢাকনা খুলে, ‘স্মাইল প্লিজ’ বলে দু’এক সেকেণ্ডে আবার লেন্স পরিয়ে দেয়া হতো। স্টুডিওতে ফোটো তুলতে হলে প্রথম দিকে কুঁজোর মাপের হাজার-দুহাজার ওয়াটের বাল্বের আলোয় ফোটো তুলতে হতো, পরে অবশ্য বাল্বের মাপ ছোটো হয়। এখন প্রযুক্তির এত উন্নতি হয়েছে যে বেলোলেন্স ক্যামেরাকে ঝঞ্ঝাটকে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক। সেসময়ে প্রতিবিম্বও উল্টো দেখা যেতো। বাবা ডিজিটাল প্রযুক্তি দেখে যেতে পারলেন না। শৈশবে তাঁকে দেখতুম শহরের বাইরে ফোটো তুলতে যাচ্ছেন কাজের লোক রামখেলাওন সিংহের কাঁধে ক্যামেরার বাক্স চাপিয়ে, নিজে ক্যামেরার তিন-ঠেঙে স্ট্যান্ড আর মাথায় চাপা দেবার কালো মোটা কাপড় নিয়েছেন। দাদুর অমন ঘোরাঘুরির কারণে বড়জেঠা, মেজজেঠা, বাবা, পিসিমা আর নকাকার স্কুলে পড়া হয়ে ওঠেনি। জেঠাকাকাদের যেটুকু পড়াশোনা হয়েছিল তা রাজদরবারগুলোর শিক্ষকদের অবদান।


     

    দাদু বিভিন্ন সময়ে আফগানিস্তানের কাবুল-কান্দাহার এবং পাকিস্তানের বাহাওলপুর, চিত্রাল, হুনজা, ফুলরা, মাকরান ও লাহোরে ছিলেন। আফগানিস্তানে ব্রিটিশদের যুদ্ধ আরম্ভ হবার পর লাহোরে চলে যান। ওই অঞ্চলের ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদির মাংস আর শুঁটকিমাংস খাওয়ার সঙ্গে বাবার ভাইরা নিজেদের মানিয়ে নিলেও বাবা পারেননি, এবং তিনি সারা জীবন শাকাহারী হয়ে যান। বাবার মুখে শুনেছি যে বাজারে ঝোলানো গোরু, মোষ, ইয়াক আর কাটা উটের মাংস দেখার পর উনি আর মাংস খেতে পারতেন না, তাই নিরামিশাষী হয়ে যান। দুম্বা একরকমের ভেড়া যার ল্যজের জায়গায় বাড়তি মাংস গজায়, আর বাড়তি লেজের মাংস, বড়জেঠার বক্তব্য অনুযায়ী, ছিল খুবই সুস্বাদু ।

    ফোটোগ্রাফির সূত্রেই দাদুর সঙ্গে উত্তর চব্বিশ পরগণার পাণিহাটি-নিবাসী আমার দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচয় হয়েছিল। কিশোরীমোহন ছিলেন ম্যালেরিয়া রোগের উৎস আবিষ্কারক রোনাল্ড রসের সহগবেষক। রোনাল্ড রস স্বদেশে ফিরে যাবার পর কিশোরীমোহন ম্যালেরিয়া রোগের কারন ও তা প্রতিরোধ করার জন্য গ্রামে-গঞ্জে ম্যাজিক লন্ঠনে স্লাইড দেখিয়ে প্রচার করতেন। এই স্লাইডগুলো তৈরি করে দিয়েছিলেন দাদু, সাদা-কালো কাচের প্লেটের ওপর তুলি দিয়ে স্বচ্ছ রঙ করা হতো। কিশোরীমোহন তাঁর বড় মেয়ে অমিতার সঙ্গে বাবার বিয়ে দেন। বিয়ের সময়ে মায়ের বয়স ছিল ১৪ বছর আর বাবার ১৮ বছর। কিশোরীমোহন সম্পর্কে উইকিপেডিয়া আর নেটে অন্যত্র তথ্য আছে। বাবা নিজে শাকাহারী হলেও মাকে বাধ্য করেননি তাঁর আহারের রুচি অনুসরণ করতে ; আমি আর দাদা দুজনেই আমিষাশী আর যাবতীয় সীমালঙ্ঘনকারী । দাদু প্রতি বছর দুর্গা পুজোর সময়ে উত্তরপাড়া ফিরে যেতেন ; ছেলেদের বিয়ে দেয়ার কাজটাও সেরে নিতেন সেই সময়টুকুর মধ্যে।

    ছোটোবেলায় ছুটির দিনে আমি মিউজিয়ামের এক থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে বেড়াতুম, চৌকাঠ ডিঙোতেই প্রাগৈতিহাসিক থেকে মহেঞ্জোদরোয়, সেখান থেকে অশোকের রাজত্বে !

    দাদু মারা যেতে, ঠাকুমা উত্তরপাড়ার বসতবাড়িতে, যা অবহেলায় খণ্ডহরের চেহারা নিয়ে ফেলেছিল, থাকতে চলে গেলে, পরিবারের আর্থিক ভার পুরোপুরি এসে পড়েছিল বাবার কাঁধে। ঠাকুমা ছেলেদের আর তাদের বোউদের বলে দিয়ে যান যে আমার মা সংসারটাকে সামলাবেন। যেকোনো কারণেই হোক মেজজেঠা, নকাকা আর কাকাবাবুর স্বভাব আর আচরণ এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে আমরা শৈশবে শুনতুম যে এঁরা কিছুটা অপ্রকৃতিস্হ। দোকানের কাজে তাঁদের তেমন আগ্রহ ছিল না ; তাঁরা প্রকৃতই শিল্পীচরিত্রের বিপন্ন বিস্ময়ে আক্রান্ত অস্বাভাবিকতা পেয়েছিলেন। মেজজেঠা ঘুম থেকে উঠতেন দুপুরবেলা, তারপর জলখাবার খেতেন কোনো দোকান থেকে লুচি আলুর তরকারি কিনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কখনও চুল আঁচড়াতেন না, বাড়ি ফিরে দাঁত মেজে স্নান করে বিকেলের দিকে ধুতি-ফতুয়া পরে দোকানে পৌঁছোতেন, এবং একটি ফোটোর সামনে বসে তাকে মাসখানেকে আঁকা অপূর্ব ছবিতে দাঁড় করাতেন। নকাকা অনেক ভোরে উঠতেন, সবাইকে, শিশুদেরও ‘আপনি’ সম্বোধন করতেন, স্ত্রীর সঙ্গে বিশেষ কথা বলতেন না, জুতো পরার অভ্যাস ছিল না, কোরা ধুতি পরতেন, নিজের ধুতি-শার্ট নিজেই কাচতেন, কোনো এক ফাঁকে দোকানে গিয়ে বাড়িতে করার জন্য বাবার কাছ থেকে ‘কাজ’ চেয়ে আনতেন। ছোটোকাকা মাঝরাতে নিজের ঘরে ছোটোকাকিমার নানা আঙ্গিকের পোশাকহীন ফোটো তুলতেন আর দোকানে গিয়ে বাবাকে সাহায্য করার নাম করে ডার্করুমে ঢুকে সেই ‘অপ্সরা’ ফোটোগুলো প্রিন্ট করে নিতেন। উনি যখন উত্তরপাড়ায় পাকাপাকি চলে গেলেন তখন তাড়াহুড়োয় অ্যালবামগুলো নিয়ে যেতে ভুলে যান। ছোটোকাকা ৯০ বছর বয়সে মারা যান, নিঃসন্তান ; উত্তরপাড়ার বাড়ির অংশ ছোটো শালার প্রথম পক্ষের মেয়েকে দিয়ে গেছেন।

    বিহারের ভূমিকম্পে চালাবাড়ি ধ্বসে পড়ার পর বড়জেঠা ঠাকুমার আর বউদের গয়নাগাটি বেচে ইমলিতলা নামে একটি নিম্নবর্গ ও গরিব শিয়া মুসলমান অধ্যুষিত পাড়ায় বাড়ি কেনেন। তখন নিম্নবর্গের লোকেদের বলা হতো অস্পৃশ্য, আর সেকারণেই দুসাধ-মুসহর-কাহার-ডোম-চামার পরিবার অধ্যুষিত ঘিঞ্জি নিচুচালা-বস্তির সস্তা এলাকায় বাড়ি কেনা সহজ হয়। তেঁতুলগাছটা দাদার শৈশবে ছিল, আমি দেখিনি, কেননা তেঁতুলগাছটা কেটে সেই জায়গায় জলের কল আর গ্যাসবাতির থাম বসিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। পাটনার অন্যান্য বাঙালিরা ইমলিতলাকে বলতেন ছোটোলোকদের পাড়া। সেকারণে আমাদের পরিবারের সদস্যদের ওপর ওই ছোটোলোক ছাপ্পা পড়ে গিয়েছিল। পাটনার শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান বাঙালিরা ওই সরু গলির ভেতরে ঢুকে দিনের বেলাতেও আমাদের বাড়ি আসতেন না। বড়জেঠা যেতেন তাদের বাড়ি, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য। আমি যখন স্কুলে ঢুকলুম তখন স্কুলের বন্ধুরাও ইমলিতলা শুনে আমাদের বাড়ি আসতে চাইত না ; অনেকে নাম শুনেই ভয় পেত, অঞ্চলের কুখ্যাত নিবাসীদের কাজকর্মের দরুন। মেজদা, যাকে শিশু অবস্হায় এক বেশ্যার কাছ থেকে বড়জেঠা কিনেছিলেন, পাড়ার চাপ এড়াতে না পেরে পুলিশের নথিতে গুণ্ডা হয়ে গিয়েছিল, মাদকের দরুন কম বয়সে মারা গিয়েছিল।

    বাবা ভোরবেলা বেরিয়ে যেতেন আর ফিরতেন বেশ রাত করে। ফোটো তোলা, জিনিসপত্র বিক্রি আর ডার্করুমের কাজ তাঁকে একা করতে হত বলে ভোরবেলা জলখাবার খেয়ে সোজা গিয়ে ডার্করুমে ঢুকতেন, তারপর রাতে দোকান বন্ধ করার পর আবার ঢুকতেন ডার্করুমে। বিহারে সেসময় তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না, তাই কাজ পেতে অসুবিধা হতো না। মা আর বাবা দুজনের চরিত্রেই যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তা হল সবায়ের সঙ্গে মানিয়ে চলা। বাবা বাড়ির প্রধান রোজগেরে হলেও নিজের ভাইদের আর তাদের ছেলে-মেয়েদের, মানে আমাদের জাঠতুতো খুড়তুতো ভাইবোনদের, সমান চোখে দেখতেন। বড়জেঠা ইমলিতলা বাড়ির ট্যাক্স আর সবজি কিনতেন, বাবা বাদবাকি সমস্ত খরচ করতেন, ঠাকুমাকে টাকা পাঠাতেন, উত্তরপাড়ার বাড়ির ট্যাক্স দিতেন। চালগমের দোকানদারকে মাসে একবার, মায়ের তৈরি ফিরিস্তির কাগজ, দোকানে যাবার পথে বাবা দিয়ে যেতেন আর সে ইমলিতলার বাড়িতে পাঠিয়ে দিত। পরিবারের সদস্যদের পোশাকের জন্য বাবা দর্জিকে বলে রেখেছিলেন, তার দোকানে গিয়ে মাপ দিয়ে দিতে হতো, সে তৈরি করে বাড়ি পাঠিয়ে দিত। একইভাবে ছিল জুতোর দোকানের সঙ্গে বন্দোবস্ত। চুল কাটার জন্য মাসে একবার নাপিত আসত, পরে বাবার কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে নিত।

    ইমলিতলার বাড়িতে বাবা-মা-দাদা-আমি যে ঘরটায় থাকতুম সেটাই ছিল বাড়ির সবচেয়ে ছোটো ঘর। লন্ঠনের আলোয় পড়াশুনা করতে হতো। চেয়ার-টেবিল ছিল না, দোকানের মালপত্র যে প্যাকিংবাক্সতে আসত তার ওপর চাদর পেতে বই রাখার ব্যবস্হা ছিল। পাড়ার কুসঙ্গ-কুখ্যাতির প্রভাব দাদার ওপর পড়তে পারে অনুমান করে ম্যাট্রিক পাশের পর ১৯৪৯ সালে দাদাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল পাণিহাটিতে থেকে কলকাতায় পড়াশোনা করার জন্য। কলকাতায় দাদা সিটি কলেজে ভর্তি হন। কলেজে বন্ধু হিসেবে পান সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, আনন্দ বাগচী প্রমুখ তরুণ কবিদের। দাদা বিহার সরকারের মৎস্য বিভাগে চাকরি পেলে তাঁর পোস্টিঙের জায়গায় বন্ধুরা একা বা দলবল নিয়ে পৌঁছোতেন। ছোটোবেলায় আমি একবার তাড়ি খেয়েছিলুম, মানে পাড়ার এক সর্বজনীন দাদু খাইয়ে দিয়েছিল। মুখে তাড়ির গন্ধ পেয়ে মা আমায় আমাদের ঘরে শেকল তুলে বন্ধ করে দিয়েছিলেন ; বাবা রাতে বাড়ি ফিরলে শেকল খোলা হয়। মায়ের সব সময় আশঙ্কা ছিল যে আমরা দুই ভাইও মেজদার মতন অসামাজিক চরিত্রের মানুষ হয়ে যেতে পারি। পাড়ায় মেলামেশায় কোনো নিষেধাজ্ঞা কিন্তু ছিল না। ছোটোবেলায় চোর-পুলিশ খেলতে গিয়ে অনেকের শোবার ঘরে ঢুকে খাটের তলায় লুকোবার স্মৃতি আছে।

    ইমলিতলার বাড়িতে জলের কল ছিল না ; বড়জেঠা তো অফিস চলে যেতেন, জল ভরে এনে দেবার লোক না এলে দুপুরে বাবা যখন দোকান থেকে আসতেন, অনেক সময়ে নিজের স্নান করার জল নিজেই কল থেকে ভরে আনতেন। শীতকালেও ঠাণ্ডা জলে স্নান করতেন। দাদা আর আমি ইমলিতলায় রাস্তার কল থেকে জল ভরে এনেছি, রাস্তার কলে স্নান করেছি। বাবার নির্দেশ ছিল যে বাড়ির সব কাজ আমাদেরও করতে হবে, প্রয়োজনে কয়লা ভাঙা আর উনোন পরিষ্কার, জঞ্জাল ফেলে আসাও। বাবা রাস্তার কলে স্নান করতে লজ্জা পেতেন। ২০০৫ - ২০০৮ নাগাদ আমি কলকাতার রাস্তা থেকেও খাবার জল ভরে আনতুম পেপসির বোতলে করে, কেননা তিন তলায় কোনো ভারি জলের টিন নিয়ে বা মিনারাল ওয়াটারের বড়ো বোতল নিয়ে রিকশাঅলা উঠতে চাইত না। মাঝে-মাঝে দাদার বাড়ি গিয়ে দুটো থলেতে পেপসির বোতলে জল ভরে আমি আর আমার স্ত্রী সলিলা রিকশা করে নিয়ে আসতুম নাকতলার বাড়িতে। এই সমস্ত অসুবিধার জন্যেই নাকতলার ফ্ল্যাটটা বেচে মুম্বাইতে একরুমের ফ্ল্যাটে চলে আসতে হয়েছে।

    বাবা চিরকাল শাদা পাঞ্জাবি, ধুতি আর পায়ে পামশু পরতেন। তাঁর ভাইয়েরা শাদা ছাড়া অন্যান্য রঙের শার্ট বা পাঞ্জাবি পরলেও বাবার পোশাকের অন্যথা হতো না, শীতকাল ছাড়া, যখন উনি নস্যি রঙের শাল গায়ে দিতেন, বা ওই রঙের উলের পাঞ্জাবি পরতেন। দোকানে যাবার তাড়ায় বাবার দ্রুত হাঁটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। ইমলিতলায় থাকতে দুবার ওনার পা দোকানে যাবার পথে ভেঙে গিয়েছিল ; বাবার পা ভাঙা মানে আর্থিক দিক থেকে বেশ বিপজ্জনক অবস্হা ; দাদাকে গিয়ে দোকানে বসতে হত। উত্তরপাড়া থেকে চাকুরিহীন কোনো জ্ঞাতির ছেলেকে নিয়ে এলেও তাদের অবাঙালি পরিবেশে মানিয়ে নিতে এতই অসুবিধা হত যে কয়েক দিনেই তারা ফেরত চলে যেত। পরে দরিয়াপুরে গিয়ে বাবার যখন আরেকবার পা ভেঙেছিল তখন আমি দোকানদারি করেছি। গরিব হলে যা হয়, গতি কেবল সরকারি হাসপাতাল, সেখানে কিউ, কেননা প্রায়ভেটে কোনো নার্সিং হোম ছিল না সেসময়ে ; এখন তো প্রতিটি রাস্তায় একজন করে হাড়ের ডাক্তার। বড়জেঠির এক বান্ধবীর স্বামী ছিল ছুতোর ; ওনার পা ভেঙে যেতে, জেঠিমার বান্ধবীর কথামতো বাবার পায়ে বসাবার জন্য ছুতোরকে দিয়ে কাঠের খাপ তৈরি করিয়ে পায়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্হা হয়েছিল। প্রথমবার বানিয়ে দেয়া খাপটা দ্বিতীয়বার কাজে লেগে গিয়েছিল।

    দরিয়াপুরে যখন দোকান তৈরি হচ্ছিল তখন আমি ওই বাড়িতে একা থাকতুম, কেননা ইমলিতলার প্রাত্যহিক মাতালদের চেঁচামেচি আর ঝগড়াঝাঁটির দরুন পড়তে বসে বেশ অসুবিধা হত। তাছাড়া দরিয়াপুরে ইলেকট্রিসিটি ছিল, কলের জল ছিল। ছোটোদের হাতখরচের জন্য বাবা টাকা দিতেন না ; বলতেন যার যা চাই জানিয়ে দাও, কিনে এনে দেব। স্কুলের বাৎসরিক ফলাফলের রিপোর্টে বাবা কখনও কাউকে ‘গুড’ দিতেন না। নব্বুইয়ের কোঠায় মার্কস পেলেও দিতেন না ; বলতেন আরও বেশি পেতে হবে। দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকলে আমার চরিত্রদূষণ ঘটতে পারে অনুমান করে বছরখানেক পরে মা আর বাবা রাতে শুতে আসতেন। মা টিফিন ক্যারিয়ারে করে রাতের খাবার আনতেন। দিনের বেলা ইমলিতলায় গিয়ে খেতে হতো। দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকার সময়ে বন্ধুদের নিয়ে কিঞ্চিদধিক চরিত্রদূষণ যে ঘটত না তা বলা যাবে না।

    বাবা আর মা দুজনেই মন্দিরে গিয়ে পুজো দেয়া বা তীর্থকর্ম করা ইত্যাদিতে আগ্রহী ছিলেন না ; আমার মনে হয় কাজের চাপে আর সময়ের অভাবে ওনারা সংস্কারমুক্ত করে ফেলেছিলেন নিজেদের। আমি কখনও তাঁদের তীর্থক্ষেত্রে বেড়াতে যেতে দেখিনি। জেঠা-কাকারাও কেউ আগ্রহী ছিলেন না, তাছাড়া টাকা-পয়সারও টানাটানি ছিল ; পাটনার বাইরে যেতে হলে তাঁরা যেতেন কেবল দেশের বাড়ি, অর্থাৎ উত্তরপাড়ায়। তবে বাবা নিয়মিত পৈতে বদলাতেন, একাদশীর দিন লুচি খেতেন। কালীঘাটের কালী আমাদের পারিবারিক দেবতা, যেহেতু তা আমাদের কোনো পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত, সেকারণে বাড়িতে পারিবারিক দেবতা আর তার সেবাযত্ন করার প্রয়োজন হতো না। পৈতে পরতেন বড়জেঠা আর ছোটোকাকা, যদিও খাওয়ার কোনো নিষেধ মানতেন না, মেজজেঠা কখনও পৈতে পরতেন আবার কখনও কুলুঙ্গিতে তুলে রেখে দিতেন। দাদার আর আমার ছোটোবেলায় পৈতে হয়েছিল বটে কিন্তু আমরা স্বরূপে এসে জলাঞ্জলি দিয়েছিলুম। পৈতেহীন হবার কারণে বাবা ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন বলে মনে হয় না ; এই প্রসঙ্গে কখনও কোনো কথা তোলেননি।

    মা, বাবা এবং শিক্ষক, যে তিনজন মানুষ ব্যক্তিজীবনের অভিমুখ গড়ে দেয়, আমার জীবনে মা আর বাবার ভূমিকাই প্রধান। প্রকৃত অর্থে আমি কোনো শিক্ষক সেই সময়ে পাইনি যখন তা জরুরি ছিল। প্রাইমারি স্তরে ক্যাথলিক কনভেন্টে পেয়েছিলুম সিসটার আইরিনকে আর যাযক ফাদার হিলম্যানকে। শৈশবের বইতে বর্ণিত সমস্ত জিনিস যাতে নিজের চোখে দেখে যাচাই করতে পারি তার দিকে খেয়াল রাখতেন সিসটার আইরিন আর স্বদেশ আয়ারল্যাণ্ডে গেলে অনেককিছু সংগ্রহ করে আনতেন, স্কুল সংল্গন ফার্মে নিয়ে গিয়ে ফল, ফুল, গাছ, জন্তুতের চাক্ষুষ করাতেন। ফাদার হিলম্যানের সৌজন্যে আমি কনভেন্টে ভর্তি হয়েছিলুম ; উনি ফোটো তুলতে ভালোবাসতেন আর বাবার সঙ্গে ওনার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল, আমাকে দোকানে দেখতে পেয়ে সাড়ে তিন বছর বয়সে নিয়ে গিয়ে ট্রানজিশান ক্লাসে ভর্তি করে দেন; সপ্তাহে একদিন চার্চে বাইবেল ক্লাসে নিয়ে গিয়ে ওল্ড আর নিউ টেস্টামেন্টের কাহিনি শোনাতেন। পরে যখন ব্রাহ্ম স্কুল রামমোহন সেমিনারিতে ক্লাস সিক্সে গিয়ে ভর্তি হলুম, কোনো শিক্ষকের সঙ্গে নৈকট্য গড়ে উঠল না ; এই স্কুলে যিনি আমাকে বাংলা সাহিত্যে আগ্রহী করলেন, তিনি গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তী, আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসের সুমিতাদি।

    মা আর বাবার কাছ থেকে যা পেয়েছি তা হল সততা, নিজের বিশ্বাসের সমর্থনে একক লড়াই করার চারিত্র্য। বাবা দোকানদার হয়েও সৎ ছিলেন, যা আজকের দিনে অকল্পনীয়। কেবল সৎ নয়, তাঁর ছিল সৎসাহস। হাংরি আন্দোলনের সময়ে আদালতের মামলায় বন্ধুরা যখন আমার বিরুদ্ধে মুচলেকা লিখে রাজসাক্ষী হয়ে গেল, আর লড়াইটা আমার একক হয়ে দাঁড়াল, তখন আমি আমার চরিত্রগঠনে মা আর বাবার অবদানের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলুম। বাবা কলকাতায় লালবাজারে গিয়ে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে তর্ক করেছিলেন যে অমন মকদ্দমা কেন করা হয়েছে আর তখনই জানা যায় যে কলকাতার কয়েকজন সমাজকর্তা-বুদ্ধিজীবীর নালিশ কাজ করেছে এর পেছনে, যাদের বলা হয় এসট্যাবলিশমেন্টের ধারক-বাহক। মকদ্দমা চলার সময়ে বাবা কয়েকবার পাটনা থেকে দুএক দিনের জন্য দোকান বন্ধ করে কলকাতার ব্যাংকশাল কোর্টে আসতেন। যারা আমার সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছিল আর চামড়া বাঁচাবার জন্য রাজসাক্ষী বা সরকার পক্ষের সাক্ষী হয়ে গেল তাদের পরিবারের কাউকে কোনো দিন আসতে দেখিনি কোর্টে ; অর্থাৎ তাঁরা তাঁদের ছেলের সাহিত্যকর্মকে সমর্থন করতে পারেননি।

    বাবা আমাদের বাড়ির ক্ষমতাকেন্দ্র হলেও ছোটোদের কাউকে শাসন করতেন না। তাঁর কাছে অভিযোগ জানালে তিনি বলতেন, “অ, ও শুধরে নেবে। ” তারপর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকে বলতেন, “কী, শুধরে নিবি তো ? বড় হয়েছিস, শুধরে নিতে শেখ।” বড়জেঠা শাসন করতেন, নিজে থেকে নয়, জেঠিমা-কাকিমারা অভিযোগ করলে, কিন্তু অভিযোগ করলে তিনি বিরক্ত হতেন। বড়জেঠার দুই মেয়ের বিয়ে আমার শৈশবেই হয়ে গিয়েছিল। মেজজেঠা আর কাকাদের মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্হা করেন বাবা, তাঁদের শৈল্পিক উদাসীনতায় ওদের বয়স বেড়ে যাচ্ছিল ; তাছাড়া বিয়ের খরচের ব্যাপারটাও ছিল। মেজজেঠার এক মেয়ে মীনাক্ষী একজন বিহারি ছেলেকে বিয়ে করতে চাইলে মেজজেঠা অমত জানান ; মেজজেঠার অমত হওয়ায় বাবা তাঁকে বোঝালেও তিনি রাজি হননি। বাবা তাঁর বিরুদ্ধতা করে মেজজেঠাকে অপমানিত করতে চাননি। শেষে আমাকে টাকাকড়ি দিয়ে বলেন যে ওরা কোথায় গিয়ে বিয়ে করতে চাইছে সেখানে গিয়ে সম্প্রদান করে আয়। আমার ছোটোশালী এক যুবককে বিয়ে করতে চাইলে নাগপুরে অভিভাবকরা রাজি হলেন না, তখন তার বিয়েও দরিয়াপুরের বাড়ি থেকে হল।

    দাদা যখন চাইবাসায় পোস্টেড ছিলেন সেখানে সুধীর চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে বেলার সঙ্গে পরিচয় হয়, আর দাদা পাটনায় গিয়ে বাবাকে বিয়ের কথা জানাতে তিনি তক্ষুনি রাজি হয়ে যান। আমি অফিসের কাজে নাগপুরে গিয়ে কয়েকদিনের পরিচয়ের পরই রাজ্যস্তরের হকি খেলোয়াড় আর সহকর্মী সলিলা মুখোপাধ্যায়কে বিয়ের প্রস্তাব দিতে ওর অভিভাবকরা সেদিনেই সায় দেন। বাবাও টেলিগ্রামে অনুমোদন জানিয়ে দেন। কয়েকদিনের পরিচয়ের পরই এই বিয়েকে মা আর বাবা বলতেন, “তোদেরটা বৈপ্লবিক বিয়ে, পরিবারদের মাথা গলাতে হল না, হপ্তার পর হপ্তা রোদ-বৃষ্টি ঠেঙিয়ে প্রেম করতে হল না, ব্যাস, একজন আরেকজনকে বললি বিয়ে করব, করে ফেললি। ”

    আমি লেখালিখির চেষ্টা করছি, মায়ের কাছে সেকথা জানতে পেরে ১৯৫৮ সালে বাবা আগফা-গেভার্ট কোম্পানির একটা দামি ডায়েরি দিয়েছিলেন, আর তাতেই আমি কবিতা মকসো করা শুরু করেছিলুম। বাড়িতে ইংরেজি ভাষার পছন্দের বইয়ের সংগ্রহ গড়তে চাই জানতে পেরে বাবা বলতেন বইয়ের তালিকা তৈরি করে দিতে। বইয়ের দোকানে গিয়ে বই পছন্দ করে নিতুম আর পেয়ে যেতুম। বাংলা বই, বিশেষ করে কবিতার বই দাদা কলকাতা থেকে নিয়ে আসতেন। পরে বিদেশি বন্ধুদের কাছ থেকেও প্রচুর বই আর পত্রিকা পেতুম। হাংরি আন্দোলনের সময়ে কলকাতার পুলিশ আমায় গ্রেপ্তার করতে এসে আমার বইগুলো নিয়ে সারা ঘরে ছুঁড়ে-ছুঁড়ে ফেলেছিল। বাবার দোকানের কাচের আলমারি ভেঙে দিয়েছিল। মায়ের বিয়ের তোরঙ্গ ভেঙে লণ্ডভণ্ড করার সময়ে ওনার বিয়ের পুরোনো বেনারসি ভাঁজ থেকে ছিঁড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমাকে যখন কোমরে দড়ি বেঁধে, হাতে হাতকড়া পরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাটিয়ে নিয়ে গেল পুলিশ তখন বাবাকে বেশ বিচলিত দেখেছিলুম, যা উনি সচরাচর হতেন না। ছোটোবেলায় আমি বাড়ি থেকে বেশ কয়েকবার পালিয়েছি ; ফিরে এসে মনে হয়নি যে বাবা বিচলিত ; উনি আমাকে এই প্রসঙ্গে কোনো কথা জিজ্ঞাসাও করতেন না। পরে, আমার মেয়ের কাছে গল্প করেছিলেন যে আমি ওনাদের না জানিয়ে বাড়ি থেকে পালাতুম।

    আমি প্রথম চাকরিটা পাই পাটনাতে, রিজার্ভ ব্যাঙ্কে পচা-গলা-তেলচিটে নোট পুড়িয়ে নষ্ট করার কাজ, নোটের পাহাড়, দুর্গন্ধে শরীর খারাপ হয়ে যেতো ; নোট পোড়া থেকে মড়া পোড়ানোর গন্ধ বেরোতো। তারপর ১৯৭৯ নাগাদ অ্যাগ্রিকালচারাল রিফাইনান্স অ্যাণ্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনে গ্রামোন্নয়নের চাকরি পেয়ে স্ত্রী আর ছেলে-মেয়েকে নিয়ে চলে যাই লখনউ, আরম্ভ হয় সারাজীবনের জন্য ট্যুরের চাকরি। দাদা সপরিবারে পাটনা ফেরার পর মা আর বাবা আমার কাছে লখনউ চলে আসেন। লখনউতে ১৯৮২ সালের ১৮ই নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মা মারা যান। মা মারা যেতে বাবা বেশ একা বোধ করতেন, কেননা আমি আর সলিলা দুজনেই অফিসে চলে যেতুম আর ছেলে-মেয়ে চলে যেতে স্কুলে। দাদা তাই বাবাকে পাটনায় নিয়ে যান। লখনউ থেকে আমি ১৯৮৭ সালে বদলি হয়ে মুম্বাই চলে যাই। বাবাকে তখন মুম্বাই নিয়ে গেলে ভালো হতো ; মুম্বাইতে চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা পাটনার চেয়ে উন্নত। ১৯৯১ সালের ৮ই অক্টোবর বাবা পাটনায় মারা যান। কলকাতায় ফিরি ১৯৯৪ সালে। সাহিত্যজগতের নোংরামি, কাদাছোঁড়াছুঁড়ি, পুরস্কারের লোভ আর দলাদলি দেখে কলকাতা ছেড়ে পালাই ২০০৭ সালে।

    [ রচনাকাল : এপ্রিল - মে ২০১৮ ]


     

     

     

     

     
     
     
     
     
       

     

     
     
     
     
     
     

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০১ আগস্ট ২০২১ ১২:৩৩734811
  • নামগন্ধ : মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস

    এক

    লোহার ভারি কালো চপারটা রোগা লোকটার ঘাড়ের ওপর পেছন থেকে সজোরে পড়তেই, চার ইঞ্চির আঘাতের রেখা-বরাবর, ময়লা চামড়ার তলা থেকে উথলে ওঠে সাদা গোলাপি নরম মাংস, টুটসি সমর সেনার হাসির ঠোঁতের মতন দুফাঁক কাটা জায়গাটা থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে গলগলে গরম তাজা রক্তের নিটোল ছররা। বাতাসের ছোঁয়ায় গলে গড়িয়ে পড়ে ছররাগুনো। আক্রান্ত রোগা প্রৌঢ়ের শ্বাসনালিকায় প্রশ্বাস মোচড় দিয়ে ওঠে, বাঁদিকে হেলে পড়ে মাথা, আর দুলদুলে ঘাড় নিয়ে জীবনে শেষ দ্রুততম দৌড়ের নিশিডাক ওকে পেয়ে বসে।

    শ্বাস-ফুরন্ত লোকটা দৌড়োয়, সামান্য ঝুঁকে ভীত রাজহাঁসের মতন পা ফেলে পা ফেলে, সাদা টেরিকটের শার্ট জবজবে লাল, দৌড়োয়, দৌড়োতে থাকে, ছোটে, ছুটতে থাকে, পালাতে থাকে। পারে না আর। মৃগি রুগির মতন পড়ে যায় ভোটবাগানে জয়বিবি রোডের ধুলোর ওপর, চিৎ, হাত-পা ছড়িয়ে, সসব্দে, মাঝপথের প্রাচীন ধুলো উড়িয়ে। মুখে ছিট কাপড়ের রুমালবাঁধা আরও দুজন আক্রমণকারী, অপেক্ষারত, বাজারের নাইলন-থলে থেকে বের করে আরও ভারি, কালো, হাড়কাটার চপার। লোকটার ধূসর ট্রাউজার-পরা ঠ্যাং-ছেতরানো দেহে খিঁচুনি উঠে স্হির হয়ে যেতে, রক্ত-চিটচিটে চপার থলের মধ্যে পুরে, তিন দিকে পালাল স্বাস্হ্যবান যুবক খুনিরা।

    কয়েক মুহূর্তের দর্শক, শ্লথ পথচারীরা, প্রথমটায় থ, বিমূঢ়, তারপর ঘটনাস্হল থেকে পালাতে শুরু করে আতঙ্কে। সবাই মুক্ত হতে চাইছিল ঘটনা থেকে খ ঘটনা থেকে বিচ্যূত হবার আরামপ্রদ স্মৃতিতে ফিরে যাবে গলির নাগরিক। এই খুনের চেয়েও তারা ভীত হত্যা-পরবর্তী রাষ্ট্রযন্ত্রের আস্ফালন-নকশায়। ঠেকগুলোর ঝাঁপ বন্ধ করার উদ্বিগ্ন তাড়াহুড়ো, দোকানগুলোর শাটার নাবাবার ঘড়ঘড়, পথের কিনারা থেকে ভিকিরিদের পয়সা তুলে দৌড়ুবার সুশৃঙ্খল বিশৃঙ্খলায় ফাঁকা হয়ে যায় জয়বিবি রোড। শুনশান লাশ, একা, চিৎ, পড়ে আছে। হাওয়ায় ফুরফুর করছিল ওর কোঁকড়া কাঁচাপাকা চুল।

    অপঘাতে মরার সময়টাতে মানুষের একা অসহায় দেহ কেমন ন্যালবেলে, হেলে সাপের মতন হয়ে যায়, নিজের চোখে তা দেখল অরিন্দম, অরিন্দম মুখোপাধ্যায়, দেখল হত্যা, আততায়ী, আক্রান্তকে, চাক্ষুষ, আর গা গুলিয়ে তলপেট থেকে শ্বাসহীনতার ঘূর্ণিবাতাস পেঁচিয়ে উঠে এল কন্ঠনালি ওব্দি, কিন্তু বমি হল না। হাতের চেটোয়, কপালে, ঘাম। অথচ ওই লোকগুলোর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই ওর, অরিন্দমের। ঘটনাটার এ এক জবরদস্তি।

    বছর পঁয়তাল্লিশের সদ্যখুন দড়ি-পাকানো লোকটা, ওইখানে, জয়বিবি রোডে, রক্তেভেজা, ধুলোর ওপরে যে এখুন হাত-পা ছড়িয়ে স্হির পড়ে আছে, হাঁ-মুখ আর দুচোখ খোলা, অরিন্দমের সামনে দিয়েই একটু আগে টেলিফোন বুথটায় ঢুকতে যাচ্ছিল, দেয়ালে সাইকেল দাঁড় করিয়ে, ঠিক তখুনই, ওফ, লোকটার গলা আর ঘাড়ের মাঝে পেছন দিক থেকে সজোরে কোপ মেরেছিল সবুজ টিশার্ট পরা ষণ্ডা ছেলেটা। চপারের ওপরে ওঠা, বাতাস ভেদ করে নাবা, গদ আওয়াজ, নরম তাঁবাটে চামড়া কেটে মাংসে ঢুকে যাওয়া আর উথলে বেরিয়ে আসা রক্তের ভলক, থমথমে দৃশ্যের ভয়াবহতা, ঘিরে ধরে ওকে। অননুভেদ্য জোঁকেরা ছড়িয়ে পড়ে মর্মস্নায়ুর রক্তজালিকায়।

    সবুজ টিশার্টের বুকে সাদা হরফে লেখা স্লোগানটাও, আততায়ী যখুন চপার হাতে এদিকে ফিরেছিল, দেখে ফেলেছিল অরিন্দম : ‘ভ্রুপল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে’।

    ওর কবজিতে টান পড়তে, চমকে উঠল অরিন্দম। হুঁশ ফিরে এলো যখুন আদিত্য বারিক ওর হাতে টান মেরে দৌড়ুতে-দৌড়ুতে দাঁতে দাঁত যত আস্তে সম্ভব চেঁচিয়ে জানায়, এখানে দাঁড়ানো ঠিক নয় অরিন্দমদা, চলুন চলুন, ওই ভদ্দরলোক বালি পুরসভার কমিশনার শামিম মহম্মদ খান। তখুনই আদিত্যের নির্দেশের গুরুত্ব টের পায় অরিন্দম। পর পর চারটে বোমা ফাটার শব্দ হল আর পেছন ফিরে দেখতে পেল অরিন্দম, গন্ধকের নীলাভ-ধূসর ধোঁয়ায় জয়বিবি রোড ধোঁয়াক্কার, আকাশ থেকে বারুদের গন্ধ মেখে নেবে এসেছে ভীতির মশারি। পাঁচ মিনিট আগের গ্যাঞ্জাম রাস্তাটা, অকালপ্রয়াত নদীর মতন উষর। বালি থানার অধীন দুপুরের রোদ্দুর ততক্ষুনে, ওইটুকু সময়ের মধ্যে, সরে গেছে উত্তরপাড়া থানার এলাকায়।

    ভোটবাগানের ভুলভুলাইয়ায়, গলির তলপেটের ঘিঞ্জি গলির ছমছমে অজানায় হনহনিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে, বড়ো রাস্তায় পৌঁছোবার পথ খুঁজে পায় না ওরা, আদিত্য আর অরিন্দম, খুঁজে পায় না শহরের নির্লিপ্ত নাগরিকতায় মিশে যাবার দরোজাটাকে। টাকরা শুকিয়ে গেছে অনভ্যস্ত অরিন্দমের। পা চালানোর ফাঁকে ডান দিকে, এস কে চ্যাটার্জি লেন লেখা রাস্তাটায়, দেখতে পেল গোটা তিরিশেক লোকের মাথা-গিজগিজে ভিড়, চলেছে ঝাড়পিটের তুমুল। ভিড় চিরে বছর আঠারোর রক্তাক্ত সুঠাম তরুণ ছিটকে বেরোয়, ওদেরচ দুজনের পাশ কাটিয়ে কয়েকপা এগোয় গণপ্রহারে থ্যাঁতলানো দেহ বজায় রেখে, মুখ থুবড়ে পড়ে গেল রাস্তার ওপর।

    থ্যাঁতলানো তরুণকে অনুসরণকারী নাগরিকরা, তরোয়াল, ভোজালি, লাঠি, রড, শেকল, বর্শা হাতে ওদের দিকে ছুটে আসতে দেখে, ওরা দুজনে শাটার-বন্ধ দোকানের সিঁড়িতে উঠে পড়ে। সশস্ত্র নাগরিকরা ওদের সামনে দিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় মাটিতে কাতরাতে থাকা ছোকরার কাছে। ঝুঁকে দাঁড়ানো মানুষের কালো-কালো মাথার ওদিকে, লাঠি আর তরোয়াল উঠছে-নাবছে দেখতে পায় অরিন্দম। হিন্দি গালাগাল। অরিন্দমের হাতের তালু ঠাণ্ডা আর কপালে বিনবিনিয়ে ঘান ফিরে আসছে। অজ্ঞান হয়ে পড়ার মতন অনুভূতি হয়, কিন্তু গা গুলিয়ে ঢলে পড়া থেকে ওকে সামলায় আদিত্য। ছেলেটা মরে গেছে নিশ্চই। তবু ওকে পিটিয়ে যাচ্ছে। মৃতদেহকে পিটিয়ে তার জীবন্ত অতীতের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষা খুঁজছে লোকগুনো। অরিন্দম পড়ে গেছে সেই ভাষার সন্ত্রাসের খপ্পরে।

    তরুণের ন্যালবেলে দেহটা ধরে টানতে-টানতে ওদের সামনে দিয়ে নিয়ে যায় লোকগুনো। পেট ধেকে নাড়িভুঁড়ি ঝুলে বেরিয়ে আছে। এখুনও বোধয় প্রাণ আছে খিঁচোতে থাকা নাড়িভুঁড়িতে। আদিত্য যখুন বলল, এর নাম শেখ হিরা, শামিম খানের বিরোধী দলটার গুণ্ডা, তখুনও অরিন্দম শরীরের অসুস্হতা কাটিয়ে ওঠেনি। ঠোঁটের ওপর থেকে নিজের ম্লান হাসিটুকু জিভ দিয়ে চেটে নিয়ে জানায়, ইউটোপিয়ার স্বপ্ন বিক্কিরির জন্যে দুর্বৃত্তের দরকার হয়।

    বড়ো রাস্তার বাসস্টপে পৌঁছে, বাসে চেপে, বসার জায়গা মিনিট পনেরো পরে পেয়ে, বি-বা-দী বাগে নাবার পরও, অরিন্দমের গলায় শ্লেষ্মার দুঃস্বপ্ন আটকে ছিল। অফিস পাড়ার রাষ্ট্রীয় অভয়দানকারী বহুতলগুলোর ছায়ানম্র চত্ত্বরে দাঁড়িয়ে, বেশ কিছুক্ষুণ দাঁড়িয়ে, স্বাভাবিকতার আভাস অনুভূত হলে আদিত্যকে বলল অরিন্দম, তুমি পুলিশের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টার হয়ে পালালে ? তোমার কাজ তো আইন বজায় রাখা, প্রতিরোধ করা, নাগরিকদের আগলানো। ছ্যাঃ, অন্তত কাছাকাছি থানাটাকে খবর দেওয়া উচিত ছিল।

    অরিন্দমদা আপনি তো পুলিশে চাকরি করেন না, তাই উপদেশ ঝাড়াটা সোজা। বিজ্ঞের ধাতস্হ মন্তব্য আদিত্যর। চাকরির এই ক’বছরেই সরকারি অভিজ্ঞতা ওকে মনুষ্যজনোচিত যুক্তিবাদীতে পালটে ফেলেছে। এরকুম হলেও বোধয় একজন লোক মানুষ থেকে ঞানব হয়ে যায়। মানব সন্তান। কলকাতা শহরটা দেশভাগের পর মানব উৎপাদনের কারখানা হয়ে গেছে।

    অভিজ্ঞতা এক ভয়ঙ্কর চিজ, গলার স্বর বদল করে বলল আদিত্য, যত নষ্টের গোড়া।

    ছ-ফিট, দোহারা ময়লা, থ্যাবড়া, আদিত্য বারিকের সঙ্গে অরিন্দমের পরিচয় পাটনা থেকে কলকাতায় অরিন্দমের বদলি হয়ে আসার পর। সাম্প্রতিক জলবসন্তে ওর, আদিত্যর, চেহারা এখুনও খানাখন্দময়। মাদার ডেয়ারির দুধের সরের মতন একপোঁচ হাসি লেগে থাকে পুরুষ্টু ঠোঁটে। গুঁড়ো দুধের জলগোলা হাসি, কথা বলার সময়। ময়লা হলেও জানে আদিত্য, ওর দিদি আর ছোটোবোন ওর গায়ের রঙকে ঈর্ষা করে। অরিন্দমের অফিসে আগে কাজ করত আদিত্য, ক্যাশ ডিপার্টমেন্টে, আরও শ’চারেক কর্মীর মতন কয়েক নোট এগজামিনার। শুনতেই যা রমরমে। আসলে মজুর আর কেরানি মেশানো দোআঁশলা চাকরি। কলারের বাঁদিকটা নীল, ডান দিকটা সাদা। সে চাকরিতে বেশি মাইনে কম কাজ সত্ত্বেও, আত্মসন্মানবোধের পরিসর, ক্ষমতা অপব্যবহারের সুযোগ, আর জীবনকে উদ্দেশ্যহীন করা কাঁচা টাকার তাড়ার গাঁট উপরি হিসাবে পাবার সুযোগ-সুলুক না থাকায়, সুযোগ পেতেই আদিত্য পালিয়েছে মনের মতন চাকরির আশ্রয়ে, পুলিশে। ওর আদর্শ রুণু গুহনিয়োগী নামে এক প্রাক্তন অফিসার, যদিও তাঁর সঙ্গে আদিত্যর পরিচয় নেই, কিংবদন্তি শুনেছে, কাগজে পড়েছে, আদালতে গিয়ে দেখেছে সহকর্মীদের সঙ্গে, জয়ধ্বনি করেছে, যখুন অযথা বিচার চলছিল নায়কোচিত লোকটার। কর্মজীবি মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ওব্দি রুণু স্যারের কদর করে পদোন্নতির ধাপ একের পর এক এগিয়ে দিয়েছিলেন ওনার সক্ষম পায়ের দিকে।

    কয়েন-নোট এগজামিনারের চাকরিতে ওর কাজ ছিল খুচরো ্জন করানো, চটের নানান মাপের বস্তার প্যাকেট তৈরি, থলের মুখ বেঁধে গরম গালার সিলমোহর। চটের রোঁয়া অস্বাস্হ্যকর, নোংরা আর দাম বেশি বলে মোটা পলিথিন চাদরের স্বচ্ছ থলে পরে-পরে চটের জায়গা নিয়েছিল। কেউ যদি পাঁচ-দশ হাজার টাকার এক টাকা বা পঞ্চাশ পয়সা চায়, দিন কাবার হয়ে যাবে গুনে দিতে-দিতে। তাই ওজন করে আগে থাকতে গাঁটরি বেঁধে রাখার ব্যবস্হা। দু-পয়সা পাঁচ-পয়সা উঠে গিয়ে নিশ্চিন্দি। হালকা পয়সাগুনোর জন্যে বড়ো-বড়ো থলেতে একশো টাকা করে খুচরো ভরে রাখতে হতো। অনেজক খদ্দের বাড়ি নিয়ে গিয়ে একটা-একটা করে গুনে ফিরে এসে চেঁচাত, চারটে কম, সাতটা কম, তিনটে কম, আর তাই নিয়ে ফয়সালাহীন নিত্যিদিনের খিস্তি খেউড়। যে রেটে টাকার দাম পড়ছে, দশ কুড়ি পঁচিশ পয়সা আর এক দুই পাঁচ টাকার কয়েন তুলে দিতে হবে বছরকতক পর। হলদে কুড়ি পয়সা তো পাবলিক গলিয়ে অন্য কাজে লাগিয়ে ফেললে। কুড়ি পয়সার কয়েনটাই এক টাকায় বিকোতো। সময় ব্যাপারটা যথেষ্ট হিসেবি।

    কাগজ আর ছাপার খরচ বেড়ে যাওয়ায়, এক দুই পাঁচ টাকার নোট বন্ধ করে ছাড়া হয়েছে কয়েন। কয়েন নেবার পাবলিকের ভিড় তাই এদান্তি বেড়ে গেছে কাউন্টারে। পাবলিকের চাকর হওয়া আর সরকারের চাকর হওয়া যে দুটো এক্কেবারে আলাদা ব্যাপার, তা জেনেছিল আগের খুচরো-গোনার চাকরিতে। তার ওপর প্রথম দিকে চটের রোঁয়ায় কফের, আর পরে পলিথিনের জন্যে চামড়ায়, রোগের অ্যালার্জি হয়ে গিয়েছিল দোহারা আদিত্যর। দিনের পর দিন পাঁচমিশালি-অ্যালুমিনিয়াম মুদ্রার পর্ণমোচী জঙ্গলে ধাতব গন্ধের মাঝে হাঁপিয়ে উঠেছিল ওই চাকরিতে। মাখা ভাতে ওব্দি দোআঁশ ধাতুর অম্লকষায় স্বাদ চারিয়ে যেত হাতের তালু থেকে। যখুন ওই চাকরিতে ঢুকেছিল, তখুন সত্যিসত্যি বিশাল ওজনপাল্লায় কিলি-দশকিলোর বাটখারা চাপিয়ে মাপা হতো কয়েনের থলে। পরে এসেছিল ওজনের ইলেকট্রনিক মেশিন। আদিত্যর মনে হতো, অর্থনীতিতে স্নাতক হবার এই-ই পরিণাম। অমন বিতিকিচ্ছিরি কায়িক শ্রম করাবার জন্যে ওই অফিসটা চেয়েছিল অর্থনীতি গণিত কমার্সে ভালো নম্বর-প্রাপক স্নাতক। অসাধারণ স্হাপত্যের বহুতলগুনোয়, সারা দেশজুড়ে, স্নাতকরা এমনতর মাশুল গুনে যাচ্ছে পড়াশুনোয় ভালো বা অন্ত্যজ হবার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে। ইশকুল-কলেজের জ্ঞান বোধয় কারুরই বিশেষ কাজে লাগে না।

    কয়েন বিভাগে কাজ করার আগে নোট বিভাগেও কিছুকাল ছিল আদিত্য। সে আরও ভয়ঙ্কর। মাথা-খারাপ হবার যোগাড়। কাজ ছিল টাটকা নোট আর পচা নোট আলাদা করার, একশোটা ভালো আর একশোটা পচা নোটের প্যাকেট তৈরি, দশ প্যাকেটের বাণ্ডিল, ভালোর আলাদা পচার আলাদা, পচা নোটে গোল-গোল চাকতির মতন মেশিনে ফেলে কয়েকটা ছ্যাঁদা করানো, ভালো নোটগুনোকে জনগণের ব্যবহারের জন্যে আবার পাঠানো, আর ছ্যাঁদা করা নোট চটের বস্তায় সিলবন্দি করে চুল্লিতে পোড়াবার জন্যে তুলে রাখা। পরে অবশ্য নোট কুচোবার আর তা থেকে মণ্ড বানাবার যন্ত্র এসেছিল বিদেশ থেকে। এক-দুই-পাঁচ টাকার নোট উঠে গিয়ে রেহাই হয়েছে। ওফ, ওই ছোটো নোংরা হিলহিলে স্যাঁতসেতে ছাতাপড়া নোট গোনা, শেষই হতে চাইত না।

    একটা পচা নোট কাছে থাকলে সেটা লোকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুক্তি পেতে চায়। যাহোক-তাহোক খরচ করে ফেলতে চায়। দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক নষ্ট করে। দেশের যে অঞ্চল যত গরিব, সে অঞ্চলে চলে তত পচা নোট, নানা কায়দায় জোড়া নোট। কেমন নোট চলছে দেখে একটা অঞ্চলের আর্থিক অবস্হা টের পাওয়া যায়। অর্থনীতির সিলেবাসে পড়ানো হয়নি এসব। অভিজ্ঞতার লাথি খেয়ে শিখেছে।

    সেরকম অজস্র নোটের মাঝে বসে যৌবন খরচের চাকরি। আকাশে তখুন হয়তো বসন্ত ঋতুর স্নেহভাজন বকদম্পতিরা বেরিয়ে পড়েছে বাৎসরিক আমোদের জোড়ে-জোড়ে ; লালদিঘিতে পরকীয়া জলে ভাসছে বংশ-গৌরবহীন মাছ-যুবক, বা মহাকরণের চূড়োয় রাগতস্বরে আরম্ভ হয়ে গেছে বৃষ্টি, ছাড়া পেয়েছে ক্রিকেটশেষ ইডেনের সবজান্তা গড্ডলিকা, কিংবা গাড়ি পার্ক করার এলাকায় চলছে ঝড়ে গাছেদের হাওয়ার সঙ্গে ধ্বস্তাধস্তি, কিংবা কাঠকয়লার আঁচের পাশে ঞাঝে-মাঝে টুসকি বাজিয়ে ফেলছে তাম্রশ্মশ্রু ভুট্টা। প্রকৃতি সুযোগ পেলেই শহরকে গপঅমে পালটে ফেলতে চায়। চারশো যুবক-যুবতির দেখা হয় না কিছুই।

    ওই বিভাগে বয়স্ক কাউকে দেখেনিকো আদিত্য। সবাই তরতাজা যুবক-যুবতি। পচা, হিলহিলে, স্যাঁতসেতে, ছাতাপড়া, তেলচিটে, নোংরা নোট গুনে চলেছে আনকোরা ধোপদোরস্ত যুবক-যুবতি, সুদর্শন ও সুশ্রি যুবক-যুবতি, মাথা নিচু করে, প্রাব চুপচাপ, দিনের পর দিন, দুপুরের পর দুপুর। আর কোনো কাজ নেই তাদের। ঘাড় গুঁজে নোটের দিকে তাকিয়ে কাজ করে যাওয়া, ধান রোয়ার মতন। একটা বিরাট অট্টালিকার মধ্যে তারা হাসি মুখে টিফিনের ডিবে হাতে প্রায় নাচতে-নাচতে ঢুকছে, নোট গুনছে বাণ্ডিলের পর বাণ্ডিল, বেরিয়ে আসছে গোমড়া কীটদষ্ট চেহারায়, বাড়ি যাচ্ছে কালকে আবার একই ঘানিতে পাক খাবে বলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো-ভালো সব স্নাতক। ইশকুলে অনেকে প্রথম-দ্বিতীয় হয়েছিল রাত জেগে, বাড়ি থেকে জ্যোতি ছড়িয়ে হয়তো আহ্লাদিত করেছিল সারাটা পাড়া।

    এখুন তারা কেবল গণছোঁয়ায় বিরক্ত নোট মুখ বুজে গুনে যায়। মাঝে-সাঝে নিশি পাওয়া অবস্হায় তারা বেরিয়ে পড়ে দলবেঁধে পথসভা গেটসভা ঘেরাও ধর্না হরতাল ধিরেচলো বয়কট কর্মবিরতি অবস্হান অবরোধের ডাকে। প্রশ্ন তোলার জাগরুকতা আর নেই। পরের দিন থেকে ফিরে গেছে তারা স্বয়ংক্রিয় কাজে। পুরো ব্যাপারটা আদিত্যর মনে হয়েছিল ভুতুড়ে। ভালো মাইনে দিয়ে ভুত বানাবার কারখানা।

    পচা ছ্যাতলা-পড়া নোটের বদগন্ধের কী রমরমা। যত কম টাকার নোট, তত তার বদগন্ধ। পৃথিবীতে এরকুম গন্ধ যে জন্মাতে পারে, মানুষের হাতে-হাতে ঘুরে-ঘুরে যোগাড়-করা দুর্গন্ধ, অমন চাকরি না করলে অজানা থেকে যেত। একটা পচা নোট আলাদা করে শুঁকলে ওই গন্ধটা পাওয়া যায় না। অথচ কয়েক হাজার পচা নোট একজোট হলেই প্রকাশিত হয়, দেশটার পীড়ার অভিব্যক্তি, হেমন্তের শুকনো পাতার সঙ্গে মেশানো গুয়ের গন্ধ। দেশটার সংস্কৃতি কতটা পচেছে তা বোধয় ওই গন্ধ থেকে টের পাওয়া যায়। মুমূর্ষ গন্ধটা থেকে ছাড়ান পাবার জন্যে আদিত্য তখুন বুশশার্টের বগলে বিদেশি পারফিউম লাগাত।

    আড়াই লক্ষ স্নাতকের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আদিত্যকে নিয়ে আরও উনিশজন ওই চাকরিটার পরীক্ষায় সফল হয়েছিল। অথচ সেই চাকরিতে তিতিবিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেছে ও। শালা বেনের আড়তে চাল ডাল গম আটা ওজন করার মতন ভারি-ভারি বাটখারা চাপিয়ে চকচকে মুদ্রা ওজন করানোর চাকরি। প্রতিদিন প্রতিদিন প্রতিদিন প্রতিদিন প্রতিদিন রোজরোজ রোজরোজ রোজরোজ, ছ্যাঃ। এখুন না হয় ইলেকট্রনিক যন্ত্রে ওজন হয়। কিন্তু তখুন তো ঝুল-চাকরিতে জান একেবারে শ্মশানকয়লা হয়ে গিয়েছিল।

    অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টারের চাকরি পেয়ে নিজেকে সুগন্ধিত করে তোলার অভ্যাসে কিছুটা রদবদল করেছে ও, আদিত্য। এখুন ও জনসনের বেবি পাউডার, বাচ্চাদের সাবান-শ্যাম্পু, শিশুদের ক্রিম আর অলিভ অয়েল ব্যবহার করে। আগেকার এক আই জি, এখুন অবসরপ্রাপ্ত, দুটো কারখানার মালিক, শিখিয়েছিলেন জীবনদর্শনটা। নিষ্পাপ থাকার নিজস্ব গন্ধ আছে, বুঝলে হে, পুলিশ অফিসারের উচিত সেই গন্ধটাকে সবচে আগে দখল করা। ফি-বছর পুজোয় অধস্তন অফিসারদের জন্যে শিশুদের ব্যবহার্য সাবান পাউডার ক্রিম শ্যাম্পুর সারা বছরের কোটা উপহার পাবার ব্যবস্হা করে দিতেন উনি। ওঁর বাবা তো এসেছিলেন উদ্বাস্তু হয়ে, কিন্তু কত উন্নতি করেছেন। রিজেন্ট পার্কে জবরদখল-করা জমিতে প্রোমোটারকে দিয়ে কী পেল্লাই এক-একখানা ফ্ল্যাট পেয়েছেন ওনারা তিন ভাই। প্রায় সব উদ্বাস্তু নেতারাই আজ কোটিপতি। উদ্বাস্তু হওয়া ভালো, গরিব হওয়া ভালো, সর্বহারা হওয়া ভালো, এই এলেম বেচেই লালে লাল হয়ে গেল কত লোক। তারা কেবল টাটকা করকরে নোট গুনছে। আসল উদ্বাস্তুগুনো ফুটপাতে হকারি করছে আজও।

    আদিত্যর এখনকার উপরি-দামি চাকরিটা মাঙনায় হয়নি। দেড় লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছিল। বাড়ি বয়ে একজন প্যাংলা ডাকমাস্টার জানিয়ে গিসলো কার সঙ্গে কখুন কোথায় দেখা করলে চাকরিটা হবে। ডাকমাস্টারহীন বাঙালিসমাজ ভাবা যায় না। এরা থানার জন্যে টাকা তোলার অঞ্চলভিত্তিক ঠিকেদারি নেয়। পুলিশে ঢোকার আগে জানতই না আদিত্য যে তথ্য আর সংস্কৃতির এরা বাঙালি জীবনের চাবিকাঠি।

    সাতচল্লিশ সালের পনেরই আগস্টের রাত্তির বারোটার পর থেকে খর্চাখরচ না করলে, এমন কী ক্ষমতাধারী স্বজনজ্ঞাতি থাকলেও, সরকারি চাকরি পাওয়া কঠিন। তারপর ফি-বছর বেড়েছে খর্চাখরচের হার। আর আদিত্য তো জন্মেছে তার পঁচিশ বছর পর, রজতজয়ন্তীর রাত্তিরে, বর্ধমান জেলার মামার বাড়িতে। কর্মসংস্হান কেন্দ্র থেকে নাম সুপারিশ করাতে লেগেছিল হাজার পাঁচেক, পার্টির তদবির সত্ত্বেও, নইলে বেশি লাগত আরও। ডেসপ্যাচের কেরানিকে কিছু না দিলে চিঠি ছাড়ে না, কিংবা পাঠিয়ে দেয় ভুল ঠিকানায়। কর্মসংস্হান কেন্দ্রের চিঠি দেখে পোস্ট অফিসে দেরি করে সরটিং করবে। আদিত্য প্রতিটি ধাপকে মসৃণ রেখেছিল, করকরে তাজা নতুন নোট দিয়ে, যার আভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে প্রাপকের মুখ। অপার বৈভব গড়ে তুলতে চায় ও, আদিত্য। নইলে ওর মতনই, ওর ছেলেপুলে নাতিদের, বনেদি ঘরের ছেলে বলে স্বীকৃতি দেবে না কেউ।

    আদিত্যর ঠাকুদ্দার জন্ম উনিশশো পাঁচ সালের ষোলুই অক্টোবর। সেদিন কিছু একটা হয়েছিল বলে পরিবারের স্মৃতিতে ঢুকে আছে তারিখটা। সবরমতী আশ্রমের দরোজা-জানলা বানাবার জন্যে ঠাকুদ্দা গিসলো নিজের বাবার সঙ্গে। অনেক যত্নে বানিয়েছিল দরোজাগুনো। গান্ধি মহারাজ নিজে বলে দিয়েছিলেন যে দরোজাগুনো এমন হবে যে কেউ খুললেই ক্যাঁচোওওওর আওয়াজ হবে, যাতে কেউ ঢুকলেই টের পাওয়া যায়। গল্পটা আদিত্যদের পারিবারিক সম্পত্তি। গান্ধি ইয়েরভাদা জেলে গেলে, নিজের গ্রাম ধর্মশিবপুরে ফিরে এসেছিল ঠাকুদ্দা। উনিশশো উনত্রিশের জানিয়ারিতে বাবার জন্ম।

    আওয়াজঅলা দরোজা বানাবার দরুন বাবু জগজীবন রাম ঠাকুদ্দার জন্যে স্বাধীনতা সংগ্রামীর মাসোহারার ব্যবস্হা করে দিয়েছিলেন। লবণ সত্যাগ্রহে যোগ দিয়েছিল, এরকমটাই লেখা ছিল প্রমাণপত্রে। আদিত্যরা তো ছুতোর, তত নিচু জাত তো আর নয়, তাই জগজীবন রামের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতে হয়েছিল। আজকাল অমন প্রণামে কোনও কাজ হয়না। প্রণামী চায় সবাই, আদিত্যও চায়।

    লেখাপড়া শেখেনি ঠাকুদ্দা। কংরেস সভাপতি ভূপেন বোস পাঠিয়েছিলেন সবরমতীতে ছুতোরের কাজে। ঠাকুদ্দা কিন্তু দূরদর্শী ছিল বলতে হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামীর মাসোহারার টাকায় নিজের আর একমাত্র নাতি আদিত্যর নামে যৌথ রেকারিং ডিপোজিট খুলেছিল। পুলিশে চাকরির শুভ কাজে লেগে গেল চক্রবৃদ্ধি। নয়তো অত থোক টাকা একলপ্তে কয়েক বিঘে জমি বেচলেও উঠত না। গান্ধির সঙ্গের লোকজনদের পায়ের কাছাকাছি থেকে, ঠাকুদ্দা বোধয় টের পেয়ে গিসলো অনেক আগেই, যে দেশটা ভাগ হবে, আর তার দরুন বাঙালিরা এক ধাঁচের বামপন্হী হবে। তাই জন্যেই হয়তো বাবাকে ইনডিয়ান প্রলেটারিয়ান রিভলিউশানারি পার্টির বিজয় মোদকের বাড়িতে ফাইফরমাস খাটার কাজে লাগিয়েছিল দশ বছর বয়সে। অত বড়ো-বড়ো মানুষের চোপরদিনের গুজগুজ-ফিসফিসের কাছাকাছি থাকার চাপে ওদের পরিবারটা ভদ্দরলোক হতে পেরেছে আর ছুতোর শ্রমিক বদনামটা ঘুচেছে।

    নোট গোনা আর কয়েন ওজন করার চাকরিতে, মনে হত আদিত্যর, রোজ কিছু-কিছু সরিয়ে গড়ে ফেলা যাক ধনী হবার তহবিল। কিন্তু ধরা পড়ার কেলেঙ্কারির গ্রাম্য ভয়ে, আর যারা অমন কাজ করে ধরা পড়েছে তাদের এনস্হা দেখে, বাতিল করেছে সে ভাবনা। তাছাড়া তাতে লেগে যেত অনেককাল। রোজ দুটো-চারটে একশো-পাঁচশো টাকার নোট সরালেও বহু বছর লেগে যেত ভৈভবশালী হতে। শুধু টাকা হলেই তো হয় না, সেটাকে খাটিয়ে-খাটিয়ে ফাঁপাতে হয়। এ এস আই এর চাকরিটা ধর্মঠাকুরের পাঠানো। টাকাও আপনা থেকে আসতে শুরু করেছে তাঁর কৃপায়। ধর্মরাজের কৃপায় একদিন-না একদিন রুণু গুহনিয়োগীর মতন প্রভাব-প্রতিপত্তি লোকবল ঐশ্বর্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর গণমাধ্যমের আদরযত্ন পাবে। বাসের সিটে বসে হাতজোড় করে আদিত্য। কপালে ঠেকায়।

    সত্যি, ইষ্টদেবতাকে স্মরণ ছাড়া আর গতি নেই, যেভাবে চালাচ্ছিল গাড়িটা, বলতে-বলতে বাস থেকে নাবলেন ফর্সা মোটা গলদঘর্ম গৃহবধু কেরানি। সওদাগরি অফিসে এত বেলায় হাজিরে দিলে চাকরি চলে যাবে। নির্ঘাৎ কোনও জনসেবা বিভাগের।


     

    দুই

    বি-বাদী বাগে বাস থেকে নেবে একটু এগোতে, এক হাড়-ডিগডিগে শতচ্ছিন্ন্ ভিকিরে বউ, কাঁখে পেটফোলা রুগ্ন শিশু, বোধয় ব্রিগেডের কোনো গ্রাম-ফোসলানো সমাবেশে এসে থেকে গেছে কলকাতায়, ওদের দিকে অনুকম্পা চাইবার হাত বাড়াতে, আদিটভ পাঁচশো টাকার একটা নতুন সবুজ নোট বুক পকেট থেকে বের করে ভিকিরি যুবতীর হাতের ওপর রাখলে, বউটি বলে ওঠে, পাকস্হলী থেকে নিজের দরদ টেনে বের করে আনা কন্ঠস্বরে, লটারির টিকিট লিয়ে কী করব বাবু ? কিছু পয়সা দাওনা ক্যানে, মেয়্যাটা মুড়ি খায়। আদিত্য বইটির হাত থেকে নোটতা তুলে নিয়ে ফুলপ্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একমুঠো খুচরো ভিকিরিটিকে দিলে, যুবতীর হনু-ঠেলা মুখমণ্ডল কৃতজ্ঞতায় উদ্ভাসিত হল।

    আদিত্যর অট্টহাস্য আর অরিন্দমকে শুনিয়ে স্বগতোক্তি, ওফ, এই নিয়ে বোধয় একশোবার হল।

    অরিন্দম স্তম্ভিত, হতবাক, থ।

    কী, খুব হাসি হচ্ছে দেখছি। ধর্ষণ-টরশন আজকাল কোটা অনুযাবী ভালোই চলছে তাহলে ! অফিসপাড়ার ভিড়ে, পরিচিত কন্ঠস্বরের মন্তব্যে, দুজনে একসঙ্গে সেদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, যিশু বিশ্বাস, শেষ যৌবনে খুদে চোখে মিটিমিটি, ফর্সা গোলগাল, চুল অত্যন্ত পরিপাটি, ভ্যান হিউসেন, অ্যালান সলি, লুই ফিলিপে, বেনেটন, অ্যাভাই, রেভলন, রে ব্যান জগতের অধিবাসী। খ্রিস্টান, কিন্তু টের পেতে দেয় না। ব্রাহ্মরা যেমন হিন্দুর ভিড়ে নিজেদের লুকিয়ে রেখেছে আজকাল, যিশুও তাই। মিশুকে। ব্রাহ্মরা নিজেরা একসঙ্গে জুটলে হিন্দুদের নিয়ে এখুনও রেনেসঁসি হাসাহাসি করে। যিশুর অমন জমায়েত নেই। পুলিশে চাকরি করে বলে আদিত্যকে ঠেস দিয়ে বলেছিল কথাগুনো। অরিন্দমের অফিসে বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিনিধি হিসেবে প্রকল্প বিশেষজ্ঞ ছিল। এখন পার্কস্ট্রিটে নিজের ফ্ল্যাটে কনফারেনসিং যন্ত্র বসিয়ে আন্তর্জাতিক কনসালটেনসি খুলেছে। আহমেদাবাদের এম বি এ। বিদেশে যায় প্রায়ই। অকৃতদার বলতে যে নৈর্ব্যক্তিক স্ফূর্তি আর আত্মমগ্ন অস্হিরতা। পাতলা ল্যাপটপ কমপিউটার আঁটে এমন ব্রিফকেস।

    বড্ডো খোঁচা দেন যিশুদা। আদিত্যর তরফদারি করে অরিন্দম।

    আর আপনার আলুর দোষ তো বিখ্যাত। যিশুর মন্তব্যের প্রতিদানে আদিত্য।

    যিশু বিশ্বাস অনভিপ্রেত যৌন টিটকিরিতে অভ্যস্ত। হাসল কাঁধ নাচিয়ে। বললে, ঠিক ধরেছিস। মেদনিপুর বাঁকড়ো বর্ধমান গিসলুম হিমঘরের স্টাডি করতে। এখুন বারাসাত থেকে ফিরছি। আলু সম্পর্কে আমার সত্যিই দুর্বলতা আছে। মাছ মাংস ডিমের চেয়ে আমার আলু খেতে ভাল্লাগে। কলেজে পড়তুম যখুন, প্রফুল্ল সেন আলুর বদলে কাঁচকলা খেতে বলেছিল। তোরা তো সেসব জানিস না, লিকুইড ছিলিস। পয়লা জুলাই বিধান রায় ট্রামের ভাড়া এক পয়সা বাড়িয়ে বিদেশে হাওয়া হয়ে গিসলো, আর প্রথম ট্র্যামটায় ভবেশকাকা আগুন ধরিয়ে দিলে।

    ভবেশ কাকা ? এই কাকার কথা বলেননি তো আগে ? সমস্বর প্রশ্ন।

    হ্যাঁ, ভাবতে পারিস ? স্বাধীনতার পর কলকাতার ট্র্যামের প্রথম মুখাগ্নি। আমরা তখুন নাকতলার কাছে থাকতুম। অ্যাতো গরিব রিফিউজিতে ভরে গিসলো ওদিকটা তখুন যে কলকাতার লোকে ভয়ে ও-মুখো হতো না। বাবাও ভয়ে বেচেবুচে এদিকে চলে এল। পুরোনো বাড়ির পাড়ায় ইউনাইটেড রিহ্যাবিলিটেশান কাইউনসিলের আগুন-খেকো নেতা ছিল ভবেশ মণ্ডল, ইয়া মাসকুলার বডি। পাকানো পেশি বলে একটা কথা আছে না ? ঠিক তাই। বাড়িতে না বলে কত্তো মিটিঙ-মিছিলে গেছি ওনার সঙ্গে। কিন্তু বুঝলি, ভবেশকাও একদিন ছোটো বোনকে নিয়ে কোথায় চলে গিয়েছিল।

    যিশু থামে। চুপচাপ। বাকিটা শোনার জন্যে অপেক্ষা করে দুজনে। এবার হুগলি জেলায় গিয়ে খুঁজে পেলুম ওদের, আশ্চর্য, তিরিশ বছর পর। কথাগুলোর ফাঁকে-ফাঁকে ম্লান উদাসীনতা ছেয়ে যায় যিশুর ফর্সা মুখমণ্ডলে।

    গল্পের আশানুরূপ সমাপ্তি না পেয়ে আশা পুরণের অন্য এক গল্পের দিকে যিশুকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে আদিত্য। বলে, রাইটার্স থেকে কেটলিসুদ্দু একজন কালো সুন্দরী চা-উলিকে নাকি ফুসলিয়ে নিয়ে গিসলেন ? তাও কিশোরী !

    তাতে কী ? আরে ! মেয়েমানুষ মানেই ওসব নাকি ? সস-শালাহ ! তোকে ওই ট্র্যাফিক সার্জেন্টটা বলেছে, না ? নির্মল বেরা না কি যেন নাম ? আচ্ছা চলি।

    হত্যা আর মৃত্যু থেকে যৌনতার এলাকায় খেলাচ্ছলে পৌঁছে উপশম হল অরিন্দমের। থেকে-থেকে হত্যার দু-দুটো দৃশ্য পুনরাভিনীত হচ্ছিল ওর মগজের মধ্যে। যা ভালো, তার চেয়ে যা খারাপ, তা বেশি করে মনে পড়ে। আধুনিকতা মানুষকে প্রকৃতি থেকে ছিঁড়ে আলাদা করে সংস্কৃতিবান বানিয়ে ফেলার পর তাকে নির্মমতার ওপারে অন্য কোনও মমতাহীনতায় পৌঁছে দিয়েছে। স্পষ্টই টের পাওয়া যাচ্ছে যে আদিত্যও পৌঁছে গেছে সে জায়গায়। কত সহজে খুনের আতঙ্ক থেকে নিজেকে যৌনতার আমোদে নিয়ে এলো।

    পাটনা থেকে কলকাতায় এসে নিজের গাড়ি নিয়ে সরকারি ঝুটঝামেলায় পড়ার পর আদিত্যর সঙ্গে অরিন্দমের পরিচয়। রাস্তার প্রায় মাঝকানে দাঁড়িয়ে খবরের কাগজ পড়ছিল এক ব্যাটা নিরক্ষর। যারা কলকাতার আদিনিবাসী নয় তারা এই শহরের ওপর তাদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে নানা ক্যারদানি অবলম্বন করে। বারদুয়েক হর্ন দেবার পর লোকটা সরে যাবে, ভেবেছিল অরিন্দম। সরেনি। ধাক্কাও লাগেনি লোকটার। রাস্তঅব পড়ে দুমড়ে-কুঁকড়ে আহত হবার অতিঅভিনয় করতে লাগল, হাতে খবরের কাগজ ধরা। নিখুঁত। আদিটভ পরে খোঁজ নিয়ে জানিয়েছিল যে লোকটা কোনো এক গ্রুপ থিয়েটারে কিশোর মালোর চরিত্রে অভিনয় করে, চাকরি নেই, দুই মেয়ে এক ছেলে আছে। আজকাল অমন পথনাটিকায় যাহোক রোজগারপাতি করে সংসার চালায়।

    লোকটা পথনাটিকা আরম্ভ করতেই গোটা আষ্টেক ষণ্ডা পৌঁছে গেল ওর সাহায্যের জন্যে। বাঙুর হাসপাতালে তো মেঝেতে শোবার ওব্দি জায়গা জোটে না রুগিদের ; দুর্ঘটনায় মাথা ফাটলে ব্রেন স্ক্যানিঙের তারিখ পাওয়া যায় সাত মাস পর। ও ব্যাটাকে অরিন্দমের গাড়িতে তুলে ষণ্ডাগুনো নিয়ে যেতেই বেড পেয়ে গেল। সঙ্গের স্যাঙাতদের কি খাতির। তারপর ওদের সঙ্গে থানায় যেতে গাড়ি বাজেয়াপ্ত করে নিলে ওসি। থানাতেও কি খাতির ওদের। পরের দিন থানার সামনে ফুটপাত ঘেঁষে নানা গাড়ির কঙ্কালের মাঝে রাখা গাড়িটা পরখ করতে গিয়ে দেখে ওয়াইপার, ব্যাটারি, এসি উধাও ; চারটে চাকাই পালটে টাকপড়া পুরোনো টায়ার লাগানো। আচমকা, ছাঁৎ করে, রক্তের চলকানির মাঝে মনৈ হয়েছিল অরিন্দমের, ওর পূর্বপুরুষদের এই পশ্চিমবঙ্গটা আর ওর নয়।

    অফিসে শলা-পরামর্শ-উপায় খুঁজতে গিয়ে, লালবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব ইন্সপেক্টর আদিত্য বারিকের হদিস পেয়ে, গাড়িটা ওই অবস্হায় ছাড়িয়ে এনেছিল রেকার দিয়ে টো করে। আর কদিন থাকলে মেশিনটাও পালটে যেত। কিশোর মালোর চরিত্রাভিনেতাকে আর থানায় খর্চাখরচ দিতে হয়েছিল মোটারকুম। আদিত্য বলেছিল, এসব মেনে নিতে, সব্বাই মানে, মেনে নিলে অসুবিধে হবে না। মেনে নিয়েছে অরিন্দম। মেনে নিয়েছে জনসেবার নতুন সংজ্ঞা। বহুকাল পাটনা শহরে থাকার ফলে অন্যায়, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, যথেচ্ছাচার, সন্ত্রাস মেনে নেওয়াটা রপ্ত করে ফেলেছে ও। কিন্তু পাটনায় সবই ছিল রাখঢাকহীন, খোলাখুলি। কলকাতায় সরকারি দফতরগুনোয় সবাই সততার মুখোশ পরে থাকে। মুখোশটার নাম হয়েছে সংস্কৃতি।

    আজকে আদিত্যকে নিয়ে ভোটবাগান গিসলো পাটনা থেকে ওর সঙ্গে আসা রসিক পাসওয়ান নামে পাটনা অফিসের এক চাপরাশির খোঁজে। গাড়িটা পাটনায় অসীম পোদ্দারের বাবার কাছ থেকে কিনেছিল অরিন্দম। চালিয়ে কলকাতায় এনেছিল ওরা দুজনে, ও আর রসিক পাসওয়ান। অরিন্দম এক রাত্তির কোন্নগরে বাপ-পিতেমোর ভিটেতে থেকে গিসলো আর রসিক চলে গেসলো হাওড়ায় ওর গ্রামতুতো জ্ঞাতির আস্তানায়। সে আজ দেড় বছরের বেশি হল। অরিন্দম তো এরই মধ্যে এক বছরের জন্যে ম্যানিলায় ট্রেনিঙে গিয়ে ফিরে এসেছে। অফিস পাঠিয়েছিল। এতদিন হয়ে গেল অথচ ফিরে গিয়ে অফিসে যোগ দেয়নি রসিকটা। আশ্চর্য। কদিন আগে পাটনা থেকে মোতিলাল কুশবাহা এসে একটা চিঠি দিয়ে গেছে, ভোটবাগান অঞ্চলে রসিকের খোঁজ করার জন্যে। হাতের লেখা দেখে মনে হয়েছিল অতনুচক্রবর্তীর। সম্বোধন করেছে কমরেড। কেউ কমরেড বলে ডাকলে যে মনে-মনে এরকুম অস্বস্তি হতে পারে, আগে ঠাহর করার সুযোগ হয়নি অরিন্দমের।

    সেই অতনু, সে মাওবাদি কমিউনিস্ট সেন্টার নাকি এম এল লিবারেশানের নেতা, আত্মগোপনের সমাজে থাকে এখুন। এককালে পাটনা অফিসে কয়েক-নোট এগজামিনার ছিল মুখচোরা অতনু। গাড়ি চালিয়ে আসার সময়ে নিয়ে গিসলো রসিক, হাজারিবাগের জঙ্গলে, নিখোরাকো খেতমজুরদের ছেলেমেয়েদের গণবিবাহে। মাও-এর লেখা রেডবুক থেকে পড়ে-পড়ে সে-কথাগুলোকেই মন্তর হিসেবে আওড়ে বিয়ে দিচ্ছিল। বেয়ের পরই ভিড়ের সুযোগে অন্ধকার জঙ্গলে উধাও। কথা হয়নি। এড়িয়ে গিয়েছিল অরিন্দমকে। বিহারি হতদরিদ্র অন্ত্যজদের বাঙালি ব্রাহ্মণ নেতার সঙ্গে মেলাতে বিভ্রান্ত বোধ করেছিল অরিন্দম।

    ভোটবাগান অঞ্চলটা সুবিধের নয় শুনে আদিত্যকে সঙ্গে নিয়ে গিসলো অরিন্দম। ওখানে এশিয়ার সবচে বড়ো লোহার ছাঁটের স্ক্র্যাপইয়ার্ড। সারসার খুপরি ঘর। অনুজ্বল শ্যামবর্ণ নর-মরদদের পাঁচমিশালি ভিড়। হলদে কমজোর টুনি। জেনারেটারের চাপাকান্না। অশীতিপর পাঁক। মাইকচোঙে পাঁচ-প্রহর লটারি। লোহার কালচে ছাঁট আর ভাঙা-ত্যাবড়ানো লোহার মরচে-পড়া ঠেক। এলাকাটা জুড়ে তেলকালির নড়বড়ে চোগা পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কারখানার সারিসারি ঢাঁচা। পুরো জায়গাটা মনে হয় নারী-বিবর্জিত। ছাঁট আর লোহাটুকরোর সাম্রাজ্যের দখল নিতে শেষ হয় না গান্ধী, গোলওয়লকর, মার্কসের কুলাঙ্গারদের কাজিয়া। ডোম বাগদি দুলে বর্ণাশ্রমের জেল ভেঙে স্বাধীন হবার পর, আধুনিকতার উন্নতি তত্ত্বের সাহায্যে বর্ণাশ্রম গড়ে ফেলেছে গামা রসগুল্লা মুন্না কওসর সীতারাম ড্যানি শেখ হিরার প্রজন্ম। ভেবে, রোঁয়ায় আতঙ্ক খেলে যায় অরিন্দমের। এ-ই তাহলে বঙ্গসংস্কৃতি।

    হাওড়া জেলার ভোটবাগানে যেমন লোহার ছাঁটের বাবরি, তেমনি নদীয়া জেলার কালীগঞ্জে কাঁসা-পেতলের ভাংরি। সুইস ডেভেলাপমেন্ট কোঅপারেশানের আর্থিক সাহায্যে কাঁসা-পেতল কারিগরদের স্টেনলেস স্টিলের শ্বদাঁত থেকে বাঁচানো যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখতে অরিন্দমকে পাঠিয়েছিল অফিস। যাদের পয়সাকড়ি আছে তারা আজকাল স্টেনলেস স্টিলে খায়। যাদের অঢেল পয়সা তারা খায় লা-ওপালা কাঁচে। গরিবরা এনামেল ছেড়ে ধরেছে অ্যালুমিনিয়াম। রুজি-রোজগার বন্ধ হবার পর কাঁসারিরা ভিটে ছেড়ে চলে গেছে, কাঁখে কোলে বাচ্চা-বোঁচকাসুদ্দু, কৃষ্ণনগর শান্তিপুর নকাশিপাড়া কালনা মেমারি পাণ্ডুয়া চুঁচড়ো। রাস্তার পাশে খুপরি-দোকানে, কোণে-কোণে দড়িবাঁধা প্লাসটিক চাদরের তলায় হাড়গিলে হাঁটুমুড়ে বসে থাকে তারা, উশকো-খুসকো উদাসীন ঘোলাটে চোখে, স্টোভ কুকার গ্যাসের উনুন সারাবার খদ্দেরের জন্যে। তার ওপর ফুটপাতে বসলেই পুলিশের ডাকবাবু আর পার্টির হাঁকবাবুকে ফি-হপ্তায় কিছু তো অন্তত দিতেই হবে।

    মাটিয়ারি গ্রামের সুভাষ খামরুই অরিন্দমকে শুনিয়েছিল সেনকিট হ্যাজাকের গল্প। ব্রিটিস আমলে কালীগঞ্জ থানার মাটিয়ারির হ্যাজাক কব্জা করে ফেলেছিল কলকাতা ঢাকা কটক লখনো চাটগাঁ। বরযাত্রীরা ফিরতে পারত না সেনকিট হ্যাজাকের জ্যোৎস্না ছাড়া। বিজলিবাতি এসে খেয়ে ফেলল হ্যাজাকসুদ্দু কাঁসারিদের খ মোরাদাবাদের কাঁসারিরা বাজার বুঝে মাল পালটে ফেলেছে। সেখানে তো কাঁসারি বাড়ির ছেলে ইন্দিরা গান্ধীর সুন্দরী নাতনিকে বিয়ে করেছে। এখানে দ্যাখেন খামরুইরা বাপ-পিতেমোর কাজ নুকোতে কোর্টে হলফনামা দিয়ে পদবি পালটে ফেলছে।

    মাটিয়ারি ধর্মদা মুড়াগাছা সাধনপাড়ার কারিগরদের আর বিদিশি ডলার যুগিয়েও বাঁচানো যাবে না। কাঁচামাল নেই, কাজের সময়ে বিজলি নেই, জেনারেটারের খরচ, রোলিং শিট মেশিনের এস এস আই রেজিস্টারি বন্ধ। ভাংরি দেখলেই উপরির খোঁজে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ বিয়েসেফ শুল্কবাবুরা। থানার ডাকমাস্টারের টোকেনে কারখানাগুলান লাটে। তার ওপর বিক্কিরির টেসকো। কেঁদে ফেলেছিল নরহরি বর্মন, ছাপ্পান্ন বছরের দশাসই। কান্না শোনার, চোখের জল মুছে দেবার, লোক নেই। কাঁসা ভাঙলেই, বললে নরহরি কাঁসারি, নুকোনো কান্না বেরোয় গো।

    পাটনা অফিসের সেই সুন্দরী দেখতে মানসী বর্মন, ফোলা-ফোলা আঙুলে টরটরিয়ে নোট গুনত ক্যাশ ডিপার্টমেন্টে, হঠাৎ চলে গিয়েছিল চাকরি ছেড়ে, অরিন্দমের কলকাতা বদলি হবার ঠিক আগে। ও কি কাঁসারি ছিল ? ওর তো প্লেস অব ডোমিসাইল নদীয়া জেলার কালীগঞ্জে। অমন নয়নাভিরাম আঙুল। মনে হত যেন জ্বরের রুগির কপালে রাখা ছাড়া আর কোনও কাজের জন্যে নয় হাত দুটো। নোট গুনে-গুনে কী ক্ষমাহীন অপচয়।

    কী অরিন্দমদা, আপনিও কি কেটলিউলির চিন্তায় মশগুল ?

    আদিত্যর কথা শুনে, অরিন্দম নিজেকে বলতে শুনল, পাটনা থেকে এক মুহূর্তে কলকাতায় পৌঁছে, হ্যাঁ, চেনো ? পরিচয় করিয়ে দাও না।

    আরে কী বলছেন কি আবোল-তাবোল। পুলিশের চাকরি করি। যিশুদার না হয় লোকলজ্জা নেই। আমার দ্বারা হবে না। যিশুদাকেই বলবেন। ভোটবাগানে ফের কবে যেতে চান একটা টেলিফোন করে জানিয়ে দেবেন।

    আর যাব না, বলল অরিন্দম। ভোটবাগানের হত্যার মাঝে দাঁড়িয়ে তখুনই মগজে তৈরি হয়ে গিয়েছিল উত্তরটা। তারপর আদিত্যর প্রত্যাখ্যানের জবাবে বলল, পুলিশ তো পশ্চিমবঙ্গে সত্যের মালিক।

    হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ।

    তিন

    মোকররি আর চাকরান মিলিয়ে বাহান্ন বিঘে জমি আর একলাখ কুইন্টাল ক্ষমতাসম্পন্ন মোমতাজ হিমঘরের অংশীদার, পঁয়ষট্টি বছরের গেরুয়া-পোশাক, বাঁ হাতের সরু-সরু তামাটে আঙুল দিয়ে আঁচড়াতে-থাকা সাদা ধবধবে দাড়ি, কালো-ফ্রেম গ্রাম্য বাইফোকাল, বাবরিচুল ভবেশ মণ্ডলকে হুগলি জেলার এই প্রত্যন্ত গ্রামে দেখে যতটা স্তম্ভিত হয়েছিল, তার চেয়েও অপ্রত্যাশিত ধাক্কায় নির্বাক আনন্দে ছারখার হয়েছিল যিশু, ভবেশকার বোন খুশিদিকে দেখে। খুশিরানি মণ্ডল।

    কাঁসার বগি থালায়, কম্বলের আসনে খেতে বসে, প্রথম গপঅস মুখে তুলে, তিতকুটে লাগায়, যিশু বলে ফেলেছিল, এ বড্ডো তেতো নিম-বেগুন, আপনাদের দেশে নিমপাতা একটু বেশি তেতো বউঠান। সরাসরি যিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে খুশিদি বলে উঠেছিল, নিমপাতা নয়, একে বলে বামমি শাগ, খেলে মাথা খোলে। আমি কি তোর বউঠান ?

    তিরিশ বছর পর শোনা পরিচিত কন্ঠস্বরে যিশু বিদ্যুৎস্পৃষ্ট। ওর সামনে, হাতে হাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে, ন্যাতানো আনারদানা জামদানিতে খুশিদি, ভবেশকার সৎ বোন। বিস্ময়ের নিষিদ্ধ স্বগতোক্তিতে বলে ফেলেছিল, আরে খুশি, খুশিদি, আর স্বাভাবিকভাবেই তাকিয়েছিল গম্ভীর ভবেশকার দিকে। মুখাবয়বে দ্রুত বদল ঘটতে দেখল চাষি মেয়ে আর গ্রামীণ ক্ষমতাকেন্দ্রের মালিক দাদার। ভবেশকার চাউনিতে বিদ্যুৎগতি তিরস্কার। বোধয় ওঁর ছোটো বোনকে চিনতে না পারায়। আজকাল গ্রামগুনোয় সত্যের স্বামীত্ব ভবেশকাদের হাতে।

    এই বয়েসেও খুশিদিকে দেখতে কত ভালো। অচেনা শব্দ খুশিদির কন্ঠে, না-বলা কথা গিলে ফেলার আওয়াজ, অনেকটা হেঁচকির মতন। কন্ঠ বেয়ে কান্নার ঘূর্ণি চলে এসেছে চোখের ডাগরে, মুখ না তুলেই টের পায় যিশু।

    সূর্যনগরে আমি একটা অশথগাছ পুতেছিলুম। সেই গাছটা আচে ? প্রসঙ্গ খোঁজে খুশিদি। তুই কেমন আচিস রে যিশকা ?

    হ্যাঁ, সেটা তো এখুন গাছতলা নামে বিখ্যাত। অনেক বাস ছাড়ে গাছতলা থেকে। তুমি দেখলে আর চিনতে পারবে না। গাছটা বিরাট হয়ে গেছে। উঁচু-উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি উঠে গেছে। আদিগঙ্গার ওপারেও গিজগিজ করছে বাড়ি। তুমি কি ভাবছ এখুনও ধানখেত আছে সেখানে ? যিশু কাঁধ নাচিয়ে নিজের স্বাভাবিক হাসি উপভোগ করে। যিশু আবার তাকায় খুশিদির মুখের দিকে, আর আমূল আক্রান্ত হয় ভারাক্রান্ত স্মৃতিতে। অশথ্থ গাছটার গোড়ায় একটা ঠাকুর আছে কী যেন।

    নমঃশুদ্রদের খুন ধর্ষণ বাড়িঘর জ্বালিয়ে যখুন তাড়ানো হয়েছিল খুলনার মাইড়া গ্রাম থেকে, পঞ্চাশ সালে, যুবক ভবেশকা রাতারাতি পালিয়ে এসেছিল কচি ফুটফুটে সৎ বোনকে কোলে নিয়ে। ভবেশকার ঠাকুমা দাদু বাবা মা দাদা বউদি কেউ বাঁচেনি। ভবেশকার সৎ মা নিশ্চই ফর্সা আর সুন্দরী ছিল। অনেক জমিজমা ছিল ওদের, নয়তো অমন ভালো দেখতে দ্বিতীয় পক্ষের বউ কী করেই বা পেয়েছিল ভবেশকার বাবা। উদবাস্তু কলোনির চূড়ান্ত দুর্দশার মধ্যেও অনেকের ঈর্ষা উদ্রেক করত খুশিদির চাঞ্চল্য। ডান চোখে তিল। কাঁদলে থুতনিতে টোল পড়ত। নিটোল টোল।

    তিরিশ বছর আগে আরামবাগি প্যাচে কংরেসি আলুর দাম হঠাৎ বাড়লে, খাদ্য আন্দোলনের দিনগুলোয়, তুলকালাম করেছিল ভবেশকা। তাঁবাটে পেশিতে দোহারা, ঝাঁকড়া অবিন্যস্ত, একদিনের খোঁচা-খোঁচা, নোংরা ধুতি-শার্ট, থমথমে চোখে-মুখে চেঁচাত, দেশভাগ আমরা চাইনি। হাতে পেলে জহোর্লাল জিনহাকে চিবিয়ে পোস্তবাটা করে। আর আজ হিমঘরের অংশীদার ভবেশকা, সংরক্ষণের ক্ষমতার দ্বিগুণ আলু হিমঘরে ঢুকিয়ে দুলাখ কুইন্টাল আলু পচিয়ে, সেই একই হুগলি জেলার চাষিদের ভয়ংকর বিপদে ফেলেও নির্বিকার। পচেছে আরও অনেক হিমঘরে। চাষির মুখের দিকে তাকালে সর্বস্বান্তের সংজ্ঞা টের পাওয়া যায়।

    পশ্চিমবঙ্গে টোটো ঘুরে, ব্রিফকেসে ফ্লপি আর ল্যাপটপ, তিন রকুমের হিমঘর দেখেছে যিশু : একলাখ কুইন্টালের বেশি, পঞ্চাশ হাজারের বেশি, পঞ্চাশ হাজারের কম। কৃষি বিপণনের বাবুদের তোয়াজে তেলিয়ে লাইসেন বের করতে হয়, হেঃ হেঃ, বলেছিল মোমতাজ হিমঘরের ক্যাশিয়ার শাসমল। তাও দাঁড়িয়ে যাবার পর তদারকিবাবু দেকে গেলে, মাত্তর দুবছের জন্যে, বোঝলেন, আবার দেবা-থোবার পালা, হেঃ হেঃ হেঃ। যে দেবে তাকে তো তুলতেও হবে, হেঃ হেঃ।

    ষাট হাজার কুইন্টালের হিমঘরে পাঁচতলা চেম্বারটা একশোদশ ফিট লম্বা, একশো আট ফিট চওড়া, ছাপ্পান্ন ফিট উঁচু। প্রত্যেক তলায় বারোটা করে তাক। মদ্যিখান দিয়ে যাতায়াতের জন্যে আড়াই ফিটের গলি। চ্যাঁচারির চালি দিয়ে আলাদা ভাগ-ভাগ করা থাকে তাকগুনো, যাতে তালাবন্ধ হাওয়া মনের আনন্দে খেলতে পারে চেম্বারের মধ্যে। সবচে ওপরে ছটা কনডেসেট কয়েল। তার ওপর ঘোরে ছাদপাখা। দেয়ালে চল্লিশ মিলিমিটার আর ছাদে আশি মিলিমিটার থার্মোকোলের পলেস্তারা।

    আরও, আরও টাকা করার পাঁয়তাড়ায় ভবেশকারা চলাফেরার আর হাওয়া খেলার জায়গাতেও ঠুসে দিয়েছিল বাড়তি বস্তা। তার ওপর বিজলির গোলমালে তাপের গুমোট বেড়ে গিসলো। শীতে জমে যাবার বদলে আলু ভেপসে গলদঘর্ম। কার জন্যে টাকাকড়ি জমিজমা চাই ভবেশকার !

    হিমঘরের আয়ু তো কুল্লে ষাট বছর। মেশিনঘরে থাকে সিনকো, কির্লোসকার, অশোক লেল্যাণ্ড, ক্রম্পটনের কমপ্রেশার, তেল-ইঞ্জিন, ইনডাকশান মোটর, ডিজেল জেনারেটার, অ্যামোনিয়া ট্যাঙ্ক, অয়েল সেপারেটার পাম্প, রেফ্রিজারেশান পাইপ। খড়গপুর আই-আই-টির মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার যিশুকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে-দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল জাবেদালি ঘরামি। শিক্ষানবিশের মতো মাথা নেড়েছে যিশু, ও, আচ্ছা, হ্যাঁ, তাই বুঝু, কেন, ঠিক, বুঝেছি।

    বৌজলেন বিশ্বেস মোসাই, ছাব্বিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হপ্তা রেকে দেয়া যায় আলু, পঁয়ত্রিশ থেকে আটতিরিশ ডিগ্রি ফারেনহাইটে, বললে ম্যানেজার, নাক সামান্য ফুলিয়ে। দাম বাড়লে অসময়ে বিক্কিরির ঘামের দাম পায় চাষি।

    কিন্তু পচ ধরে তো জলের দরে বিকোচ্ছে ?

    আসছে বছর দ্যাখবেন। আলুখোরদের বাঁশ দেবে চাষিরা।

    খাতাপত্তরে ফি-বছর লোকসান দেখান কেন ? মাল তো লোডিং হয় অনেক বেশি ? আপনার নাম তো কৃপাসিন্ধু, না ?

    ও আপনেরা কলকেতার লোক, বুজবেন না। গ্রামে তো আর খবরের কাগজের রাজনীতি হয় না।

    চাষবাসের ব্যাপার, সত্যিই, এভাবে জানা ছিল না যিশুর। কারখানার রাজনীতি, স্কুলের রাজনীতি, অফিসের রাজনীতি, চাষের রাজনীতি, সবই আলাদা। আলুর চাষ শুরু হয়েছিল নভেম্বরে, শুরু হয়েছে রাজনীতির হালখাতা। এক হেক্টরে দুশো থেকে আড়াইশো কুইন্টাল ফলন হয় আলুর। প্রথম ফসল জানুয়ারিতে। বাজারের জন্যে। নতুন ধবধবে তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ আলু, দামটা ভালো পাওয়া যায়, ফড়ে মেড়ো কাঁচা-বাজারের দালাল ওপরপড়া পার্টিদার সত্ত্বেও।

    আজ্ঞে মুসুলমান রাজার আমলে যেমন ছিল তালুকদার দফাদার পত্তনিদার তশিলদার মজুমদার হাওলাদার, এই আমলের কালে স্যার হয়েচে পার্টিদার, আজগালগার জমিদার। বলেছিল পুড়শুড়ার নিতাই মাইতি, ডাকবাংলোর কেয়ারটেকারের বড়ো ছেলে। যিশু কোনো চাকরি করে না, বুদ্ধি বিক্রি করে, শুনে ঠাহর করতে পারেনি চাকুরিপ্রার্থী ছোকরা।

    হিমঘরে রাখার আলু ওঠে ফেবরারির শেষাশেষি, বলেছিল জাঙ্গিপাড়ার নারায়ণ পোড়েল, ওখানকার হিমঘরের সুপারভাইজার, টাকমাথা, থলথলে, ময়লা। চাষিরা গোরুর বাড়ি আর মিনিট্রাকে চটের বস্তা ভরে আনে। হুগলি বর্ধমানে ষাট কেজিতে এক বস্তা। মেদিনীপুরে পঞ্চাশ কেজি। বস্তাকে বাংলায় বলে প্যাকেট। একখেও গোরুর গাড়ি মানে পাঁচ থেকে দশ কুইন্টাল, বলদ অনুযায়ী। আজ্ঞে বাঙালি বলদেরা তো আর হরিয়ানার বলদের মতন তাগড়া নয়। মিনিট্রাকে পঁচিশ থেকে চল্লিশ কুইন্টাল। তায় আবার ফি-বছর ডিজেলের দাম ডবল-ডবল বাড়ছে। হিমঘরে লোডিঙের সময় দেড়শো আর আনলোডিঙের সময় আশিটা কেঁদো মজুর আসে মুর্শিদাবাদ থেকে, সারা পশ্চিমবঙ্গে। নারায়ণ পোড়েল সিগারেটের টুসকি ঝাড়ে। মজুরগুনোকে আনে ওদের সরদার। বহরমপুরের কাসিমুদ্দি কাঠামি। সে দুদিকেরই ভাগা আর কমিশন খায়।

    আপনি তো হিমঘরে কাজ করে টেম্পো কিনে ফেলেছেন পোড়েলবাবু, মাইনেপত্তর ভালোই পান বলুন। ধনেখালি হরিপাল লাইনে চলে টেম্পোটা।

    না-না, কে বললে, এ আবার মাইনে নাকি। সরদারদের কাছ থেকে, মাটিঅলার কাছ থেকে, বাছনদারের কাছ থেকে, চাষির কাছ থেকে টাকা খাই। বস্তা পিছু ঘুষ নিই, ইচ অ্যাকর্ডিং টু হিজ এবিলিটি। আরে বিশ্বাসবাবু, এদিকের মাল ওদিকে না করলে কেউই সুস্হ জীবন কাটাতে পারে না। টাকা ছাড়া শান্তি কই। আমার ওসব ঢাক-ঢাক গুড়গুড় নেই। যিশুকে হতচকিত করেছিল নারায়ণ পোড়েল। সত্যবাদীরা আজও আছে পশ্চিমবঙ্গের বঙ্গসমাজে।

    ঠিকাছে, তারপর বলুন। ল্যালটপে টাইপ করতে থাকে যিশু, শুনে-শুনে। পেছন থেকে গ্রামীণ খোকাখুকুরা দেখতে থাকে পদিপিসির মার্কিন বাকসো।

    যে আলু রাখছে তাকে হিমঘর একটা রসিদ দ্যায়। তাতে তার নাম, সাকিন, আলুর হাল, ওজন, ভাড়া, বিমাখরচ দর্জ। এই রসিদটা বিক্কিরি করা যায়। কিনে কদজা নেয়া যায় আলুর। শ্যালদা বাজারের কাঁচা ফড়ে, বড়োবাজারের মেড়ো, হিমঘরের মালিক, পঞ্চায়েতের পাঁচুরা সময়মতন রসিদে কোপ মারে। সে এক জবর লড়াই। পার্টিবাবুরাও মারচে আজগাল।

    হ্যাঁ, বলে যান, বলে যান।

    প্যাকেটগুলো ঠিক জায়গায় রাখা, নম্বর লেখানো, মেলানো, এসব আমিই তদারকি করি। পনেরো দিন থেকে মাস খানেক লেগে যায় লোডিঙে। লোডিঙের দুদিন আগে থেকে মেশিন চলে। চেম্বারের তাপ দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে নাবিয়ে আনতা হয়। লোডিঙ যেমন-যেমন এগোয়, ভেতরের তাপ বেড়ে সাত ডিগ্রিতে ঠেকে। আলুর বুকের গরুমটা বুঝুন থালে। চা খাবেন নাকি ?

    না-না, আগে শেষ করুন।

    হ্যাঁ, কী বলছিলুম যেন ? ও, হ্যাঁ। তাপ বেড়ে গেলে তাকে নাবিয়ে আনতে হবে আবার দেড় ডিগ্রিতে, একটু-একটু করা, টানা একমাস। যদ্দিন আলু থাগবে, বজায় রাখতে হবে দেড় ডিগ্রি। আর্দ্রতা রাখতে হবে পঁচাত্তর শতাংশ। দুঘন্টা অন্তর কমপ্রেশার পাম্প, জেনারেটার চেম্বারের তাপ, বাইরের তাপ চেক করেন অপারেটারবাবু, সুকান্ত যুগি। ওই যিনি তখন মুটিয়াদের কাছ থেকে তামাকপাতা নিচ্ছিল, মোটামতন, জাতে তাঁতি, সিপিয়েম। আলুর দম খাবার সময়ে এই খাটনির হ্যাঙ্গাম কে-ই বা জানতে পারে। বুঝেছি। তারপর ?

    মে মাস থেকে আলুর বস্তা বের করা শুরু হয়। চলে সেই আপনার নভেম্বর ওব্দি। শুকোবার ছাউনিতে এনে রাখা থাকে। বীজ আলুকে কুন্তু শুকুলে চলবে না। শুকিয়ে ছোটো-বড়ো ছাঁটাই করে বাছনদাররা। আজগাল অবশ্যি সিঙুর থানার রতনপুরে বিরাট খোলাবাজারে কিংবা আপনার বদ্যিবাটি আর তারকেশ্বর রোডের আড়তে চাদ্দিক থেকে আনা মাল ফেলে বাছাই করাচ্ছে ব্যাপারি। সস্তা পড়ে। বাছনদারদের চাগরি নেই। বাছনদাররা তাই ইউনিয়ান করেচে। তাতে আর কার কী ! অমনেও মরবে এমনেও মরবে।

    জানি। বদ্যিবাটি তারকেশ্বরে গিসলুম। তা ফড়েরা চাষিদের রসিদ কিনে রাখে বলে নম্বর মিলিয়ে ওরা মুটিয়া দিয়ে নিজেরাই মাল বের করায়। চাষিরা মাল ছাড়াতে এলে ওৎ পেতে থাকে ব্যাপারির লোক। হিমঘরে মাল রাখা বাবদ তিন থেকে পাঁচ শতাংশ শুকোবার জন্যে বাদ যায়। ঔ তা নিয়েও নিত্যিদিন কিচাইন। নভেম্বরের পরেও হিমঘরে মাল পড়ে থাগলে বাড়তি ভাড়া দিতে হবে। ডিসেম্বরে মেরামত, চালিবদল, ওভারহলিং, কনডেনসার পাইপ পোস্কারের কাজ। নতুন রঙের পোঁচ পড়ে।

    কী, তুমি খাচ্ছ না ? ভবেশকার কথায় নিঃশব্দ গলাখাঁকারি ছিল। চেতনার ঝটকায় জাঙ্গিপাড়া থেকে সোজা শেষপুকুরে পৌঁছে যায় যিশু। সারাতির শেষপুকুর গ্রামে।

    হ্যাঁ, ন্যাকোরচোকর করচিস। বলল খুশিদি।

    কী বলবে ভাবতে কয়েক মুহূর্ত দেরি হল যিশুর। বলল, তোমরা না চাইলেও ঠিক খুঁজে বের করেছি তোমাদের। বের করতুমই একদিন।

    ময়ূরভঞ্জের রানির কুঠির কাছে ছিল না তোদের বাড়ি। এখুনও চোকে ভাসচে। মনে হচ্চে এই তো সেদিন। সবকিচু পালটে গেচে, না রে যিশকা ?

    রানির বাড়ি এখুন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ। আমাদের বাড়িটা একটা কারখানা কে বেচে দিয়ে আমরা তো বহুকাল পার্কস্ট্রিট চলে গেছি।

    তা ভালো করেছ। পার্কস্ট্রিট তো দামি জায়গা, সোনার খনি। ভবেশকার বৈষয়িক মন্তব্য।

    থালা থেকে মুখ না তুলে একের পর এক পদ গিলছিল যিশু। সারা বাড়ি চুপচাপ। ভবেশকার পুঁইডাঁটা চেবানো দাঁতহীন শব্দ। খেয়ে উঠে, কালো রঙের কাঠের চেয়ারের হাতলে তোয়ালে। যিশুর জন্যেই তোয়ালেটা বেরিয়ে এসেছে কাপড়ের গাদা থেকে। মুখ মুছতে গিয়ে আলতো ঘ্রাণ টানে যিশু। হ্যাঁ, জলজ্যান্ত খুশিদির অমোঘ সুগন্ধ রয়েছে এতে, সংস্কৃতির কৃত্রিমতামুক্ত প্রকৃতির গন্ধ।

    তুমি একটু শুয়ে জিরিয়ে নাও। আমি দেখিগে, জালি বণ্ডের খবর পেয়েচি। বলতে-বলতে বাড়ির বাইরে বেরোয় ভবেশকা, খালি পায়ে, গোড়ালি ওব্দি ঝুলে আছে টেরিকটের গেরুয়া আলখাল্লা। পঞ্চায়েতের মাদারির খেল খেলতে যাচ্ছে বোধয়।

    চার

    কোনও ডুবন্ত জোতদারের থেকে কেনা, সাবেকি মেহগনি পালঙ্কে শুয়ে, কলকাতা থেকে তিরিশ বছর আগে ভবেশকা আর খুশিদির আচমকা হারিয়ে-যাওয়া আর আজকে তেমনিই হঠাৎ খুঁজে পাওয়ায়, যিশুর ভাবনায় অনির্বাণ আহ্লাদ খেলছিল। ব্যাটমে তোলা নেটের মশারি। শিমুলের ধবধবে বালিশ। এমব্রয়ডারি নেই। ছোট্ট মোটা কোলবালিশ, পা রাখার জন্যে। বারান্দায় টালির চাল। শালি-শুনা জমি ইঁটভাটার জন্যে ব্যবহার বারণ বলে টালির খোলা তো উঠেই গেছে বলতে গেলে। দেয়ালে পুরোনো আমলের লম্বাটে আয়না। পেরেকে চাবির গোছা ঝোলানো। সঙ্গেকার তাকে কাঁকুই। দেয়ালে ঝাঁকড়া হাসছে সত্য সাঁইবাবা। ভবেশকা বোধয় এ-ঘরেই শোয়। খুলনার বাড়িতে হুবহু এরকুম ঘরই ছিল হয়তো। গ্রামে লোকেরাও আজকাল এভাবে থাকে না। শহর তার রঙিন উস্হিতি জানাবেই। শহর মানেই তো দাপটের কেন্দ্র। খুশিদির ঘরটা কেমন কে জানে। ঘর তো বেশ কয়েকখানা। দুজন মোটে লোক।

    দেয়ালে-বসানো আলকাৎরা রঙের লোহার সিন্দুক, দিশি। কিছুক্ষূণ দ্বিধাগ্রস্ত থাকার পর আলতো পায়ে বিছানা থেকে নেবে, চাবির গোছাটা নিয়ে বারকয়েক কৌতুহলী চেষ্টা করতে খুলে যায় সিন্দুক। আলুর বণ্ডের বই, পাকিস্তানের পুরোনো একশো টাকার নোটের একটা বাণ্ডিল, উনিশশো পঞ্চাশ সালের হলদে খড়খড়ে পাকিস্তান অবজার্ভার আর দৈনিক আজাদ, দুটো একই মাসের। একটা ছবিসুদ্দু বিঞ্জাপন লাল কালিতে ঘেরা। লাল শালুর পাক খুলে শতচ্ছিন্ন বইটা, গীতা নয়, লুপ্ত সোভিয়েত দেসে ছাপানো ‘দাস কভাপিটাল’, এত বছর পরও মোষের খুরের শিরীষ -আঠার ভকভকে স্তালিনি গন্ধ। সংগ্রাহকের জন্যে গর্বাচভের সৌজন্যে বইটার সোভিয়েত সংস্করণ এখন দুষ্প্রাপ্য। সিন্দুক বন্ধ করে পালঙ্কে ফেরে যিশু।

    পাড়সুতোর নকশিকাঁথা চাপা দিয়ে, ভাতঘুমের অলস তন্দ্রায়, অতীতে ভাসছিল ও, যিশু। ষোলো বছর বয়সে কুড়ি বছরের খুশিদিকে ছোঁয়া, বাহু ধরা, চুলে নারকোল তেলের গন্ধ। স্মৃতির আলতো জলপোকা।

    কোথাও দুপুর-কোকিলের চোরা-কুহু। পশ্চিমের জানলায় থোকা-থোকা ফিকে হলুদ নোড়ফল ঝোলানো গাছটার পেছনে মঞ্চস্হ হচ্ছিল সূর্যাস্তের দ্বিপ্রাহরিক মহড়া।

    কাজের সময় কোকিল ডাকে, ভাল্লাগে না বাপু। কপালে খুশিদির স্পর্শ আর কন্ঠস্বরে অস্বস্তিকর অস্হিরতা। যিশুর তন্দ্রায় ঝনৎকার ঘটে। যিশুর শিরা-উপশিরা যা টানটান বাঁধা, ছিঁড়ে গেল, আর শ্বাসনালিকায় মোচড় দিয়ে ওঠে অদম্য বিষাদ।

    তোমার বরের কী হল খুশিদি ?

    কেঁপে উঠেছে খুশিদির চোখের পাতা, মুখমণ্ডলে অবিশ্রান্ত ক্লান্তি, হৃৎপিণ্ডে অশ্রুপতনের টুপটাপ। বিয়ে আর হল কই ! চারটে মোটে শব্দ, অথচ, অথচ জ্যোৎস্নায় ডোবা ভুতুড়ে ঝিলের মতন নিষ্পন্দ। বর্ধমান জেলার ছুতোর গাঁ’র সহদেব মণ্ডলের বড়ো ছেলে এখানের উপসাসথো কেন্দ্রে কাজ করতো, আমাকে দেখতে পেয়ে বিয়ে করতে চেয়েছিল একাত্তর সালে। দশঘরার পোড়ামাটির পরি বলেছিল আমাকে দেখে। পালটি ঘর ছিল, কাসসপ গোত্তর। খুন হয়ে গেল। ধড় পাওয়া গেসলো, মাথা পাওয়া যায়নি। সবাই বললে, নকশাল ছিল, তা-ই। দাদাও সে কথাই বলেছিল। দাদা কী করে জানবে বল ? নকশাল তো ছিল ছোটো ভাইটা। নকশাল করলে বিয়ে করতে চাইবে কেন, বল ? গোপের হাটের আড়তদার রামরতন মণ্ডলও বিয়ে করতে চেয়েছিল। পনেরো বছর আগের কতা। দোকানে আগুন লেগে জ্যান্ত পুড়ে মারা গেল সে। আমি খুব অপয়া। খুশিদির চোখের নাব্যতা হয়ে ওঠে অতল। তুই কেমন আচিস যিশকা। কতো বড়ো হয়ে গেচিস, লোক অ্যাগবারে।

    দশঘরা অঞ্চলের টেরাকোটা, মাটির তলায় পুঁতে, তার ওপর মাস ছয়েক জলছড়া দিয়ে, কয়েকশো বছরের প্রাচীন আর দুর্মূল্য করে তোলার খবর জানে যিশু। দেখেছে। সন্তর্পণে ও বলল, অজানা ইনোসেন্ট নারীজীবনে প্রবেশ করে নিজেকে পুনরুদ্ধারের অভিপ্রায়ে, আমার সঙ্গে যাবে খুশিদি ? আমার কাছে ? পঞ্চাশ বছরের একজন বালিকাকে কাছে পাবার ক্ষমতাকে দুর্জয় করে তুলতে, উঠে বসেছিল যিশু। ওর কথার ঈষদুষ্ণ ভাপে, সালোকসংশ্লেষে অক্ষম স্বর্ণলতার মতন খুশিদি যখুন যিশুর কাঁধে মাথা রেখে, হ্যাঁ জানায়, রেশমগুটির মধ্যে তুঁতপোকার মতন ভাবাবেগের আরাধ্য পরিমণ্ডল গড়ে তুলেছে ও, যিশু।

    আমার শরীর কেমন-কেমন করচে। বুক ধড়ফড় করচে। কিছু আবার হবে না তো। বলেছিল সন্ত্রস্ত খুশিদি, আর যিশু উত্তর দিয়েছে, হোক, হওয়া দরকার, এরপর আর সময় নেই।

    হ্যাঁ, ঠিকই বলেচিস। ঠিক সময়ে পাকা ফসল তুলে না নিলে শুকনো সরষেও তো খেতে ঝরে যায়, বল ? তোর কিচু হবে না তো ? কাঁধ থেকে মাথা তুলে, চুলে নারকোল তেলের পরিচিত গন্ধ, যিশুর মুখের ওপর নিঃশ্বাস ফেলে জানতে চেয়েছে খুশিদি, আর তারপর বলেছে, আমার কাচে তুষলাব্রতর সরষে আর মুলোফুল আচে। তোর বাকসোয় রেকে নিস।

    তুমি ব্রত করো ? কী-কী ব্রত করো ? যিশু কাঁধ নাচিয়ে হেসেছিল, শব্দহীন, যাতে রাহু কেতু অশ্লেষা মঘা বসতে না পারে ওর গায়ে। ইউরোপ আমেরিকা এশিয়া আফরিকার বহু নারীর হার্দ্র সঙ্গ কাটিয়েছে ও, যিশু। কিন্তু এই প্রথম একজনকে মনে হল আধুনিকতার স্পর্শদোষ থেকে মুক্ত ; সমূল নিসর্গপ্রকৃতির অন্তর্গত।

    হাসচিস কি ! ব্রতর অনেক গুণ। এই তো শাবনমাসে মনসার ব্রত করেছিলুম। পান্তাভাত আর সজনে শাগের পেসাদ খেতে হয় তখুন। তারপর ভাদ্দরে চরাচরি ব্রত করি। চরাচরি পুজোয় সব রকুমের পিঠে ভাজা হয়। আশিন সংক্রান্তিতে পিঠে-পুলি খেয়ে খেতে নল দিতে হয়। ভাদ্দরে জল, আশিনে নল, ধান ফলে গলগল, শুনিসনি ? পোস মাসে পোসতলা ব্রত করি। শাঁক বাজিয়ে চাল দুধ ফল ফুল গোড়ায় দিয়ে পাঁচ গাচা ধান তুলতে হয় পোসতলায়। যখুন নতুন-নতুন এসছিলুম শেষপুকুরে, গাছতলায় বিলরান্না করতুম। আজগাল আর হয় না খ বডডো ঝগড়াঝাঁটি হয় গাঁয়ে। ঘেঁটুব্রতর গান জানতুম আগে। সবায়ের বে-থা ছেলেপুলে হয়ে গেল। কথা বলার সময়ে খুশিদির হাত নাড়া দেখে মনে হচ্ছিল বাতাসের তোশক সেলাই করছে।

    চাষবাস, গ্রামজীবন থেকে বঙ্গসংস্কৃতি এখুন গিয়ে পৌঁছেচে কলকাতা শহরের শেকড়হীন নাচাকোদা, বাজনা-থিয়েটারে। পশ্চিমবাংলার ভূজমিন থেকে আর সংস্কৃতির সত্য অঙ্কুরিত হয় না। তা নকল কায়দায় পয়দা হয় অকাদেমি, অ্যাকাডেমি, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, পার্টি অফিসে। খুশিদিই হয়তো শেষ বাঙালিনি।

    একবার ভবেশকার সঙ্গে মিছিলে হাঁটার সময়ে গলা ঢেলে গান গেয়েছিলুম তোমায় শুনিয়ে, মনে আছে ?

    মনে নেই আবার ? বাঙালদের মিছিলে গিসলি বলে পিটুনি খেয়েছিলি। খুশিদির চোখের কোলের অনিশ্চয়তার কালি কিছুটা কমে। চোখের কোলের কালির জন্যেও নারীকে ভালো দেখায়, আশ্চর্য। নৈকট্যার ঝাপটায় গড়ে ওঠে অজ্ঞাতসার। যিশু দুহাতে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরেছে শেষতম বাঙালিনিকে। অ্যাই, কী হচ্ছে কী, পাগল নাকি, ভালোবাসা এমনি করেই জানাতে হয় বুঝি ? ছাড়াবার চেষ্টা না করে, গলা নাবিয়ে বলল খুশিদি। প্রশ্রয়প্রাপ্ত যিশু গনগনে ঠোঁট বুলোয়, রুদ্ধশ্বাস, ত্রস্ত। সিনেমা দেখে, টিভি দেখে, উপন্যাস পড়ে, মানুষ-মানুষীর যৌনতার বোধ কলুষিত হয়ে গেছে, সর্বজনীন হয়ে গেছে। খুশিদির জৈব প্রতিদান, বোঝা যাচ্ছে, সেই অভিজ্ঞতায় নিষিক্ত নয়। থুতনির টোল কাঁপিয়ে, ফুঁপিয়ে ওঠে খুশিদি ; বলল, আয়, ভেতরের ঘরে চল যিশকা।

    যিশকা নামে ডাকার আর কেউ বেঁচে নেই। ডাক-নামের মৃত্যু মানুষের জীবনে জলবিভাজক। তার অস্তিত্বে যে যিশকা নামের কেউ একজন কখনও ছিল তা টের পেল যিশু, এতদিন পর। বহুকাল, বহুকাল, বহুকাল পর।

    খুশিদির কোমরলগ্ন যিশু, খুশিদির ঘরে, সেগুনকাঠের নিচু খাটের ওপর, খুশিদিকে আবরণমুক্তির সময়ে, খুশিদি বলল, পঞ্চাশ বছর বয়স হতে চলল, কেউ কখনও আদর করেনি আমায়, আদর করার মতন কিচু আচে কিনা তা-ও জানি না, কেউ ভালোবাসে না আমায়, কেএএএউ নয়। আমি খুবই অপয়া।

    উদোম স্বাস্হ্যবতী চাষি-প্রৌঢ়ার প্রগাঢ় চাউনির দিকে তাকিয়ে, ফুঁ দেবার মতন আলতো কন্ঠস্বরে যিশু বলেছে, ওসব বোলো না। জানি, পনেরই আগস্ট তোমার জন্মদিন করত ভবেশকা। তোমাদের কলোনিতে তা দেখে গালমন্দ করত অনেকে, আর ভবেশকা তাতে কান দিত না। এসো, আমি চোখ না বুজে তোমায় তিরিশ বছর পেরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। শরীর জুড়ে ঠোঁট বোলায় যিশু আর প্রতিবার বলে তুমি অনন্যা, তুমি অনন্যা, তুমি অনন্যা, তুমি অনন্যা, তুমি অনন্যা। যিশু অস্ফুট বলতে থাকে, তোমার মুখের ভেতর থেকে রক্তচন্দনের গন্ধ বেরোচ্ছে, তোমার ঠোঁটে মধুপর্কের স্বাদগন্ধ, আম্রপল্লবের গন্ধ তোমার চোখের পাতায়, কানের লতিতে রক্তপদ্মের পাপড়ি, তোমার চুলে দুর্বাঘাসের সুবাস, তোমার এই হাতে কাঁচা ধানের সুগন্ধ। বেলপাতার সবুজ গন্ধ তোমার পায়ে, তোমার বুক থেকে ডাবের জলের গন্ধ পাচ্ছি। আআআআআআআঃ। কী মাখো তুমি ? অ্যাঁ ? কী মাখো ? কী মাখো ? কী মাখো ? আলো ? জল ? বাতাস ? সময় ? কী মাখো ?

    চুপ করিসনি, তুই বলতে থাক রে, তুই বল। কিচ্ছু বুঝিনে তুই কী কইছিস, তবু তুই বল, বলতে থাক। আমু মুকখু। নাকতলায় তো তখুনই ইশকুল হয়। লেকাপড়া শেখায়নিকো। মুকখু, জানি আমি মুকখু। ঠোঁট দিয়ে খুশিদির চোখের কোল থেকে, অশ্রু পুঁছেছে যিশু। খুশিদির নাভি ঘিরে জেগে ওঠে নরম পরাগ-রোঁয়ার দল।

    বাইরের আমবাগানে চলচ্ছক্তি হারিয়ে ফেলেছে বাতাস। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে রোদ্দুরের। চাপা উত্তেজনায় জ্ঞান হারিয়ে টুপ শব্দে মাটিতে পড়ল একাকী শিমুল। মাঝবয়েসি রোদের শেষ ফালিটুকু এসে পড়ে আছে বিছানার একপাশে। জানলার জংধরা শিকের বাইরে, নারকোল গাছের পাতায় বয়োবৃদ্ধ চিলকে ঘিরে গুটিকয় যুবা পাতিকাকের হাওয়া-সাঁতার হুড়দং। দক্ষিণের জানলায় পুরুষালী চেহারার ঝাঁকড়ামাথা খেজুরগাছ। তারপর থেকে, খুশিদির কাঁধের ওপর দিয়ে যতটা দেখা যায়, আলু খেতের সবুজ, খুপরি হাতে ময়লাটে রঙিন শাড়িতে আবছা কামিনেরা। ফড়িঙের ইচ্ছানুকূল স্পন্দন ছেয়ে ফেলছে চরাচর।

    মুখচোরা স্পর্শের আতিশয্যে খুশিদি এখুন প্রাণবন্ত পাথরে রূপান্তরিত, অন্তঃপুর নির্বাক, চোখের জলে গড়া মানবী। যিশু ওর দাঁত ঠোঁট মুখ দিয়ে খুশিদির চরণবন্দনা করে, জানুবন্দনা করে, স্তনবন্দনা করে, বাহুমূলবন্দনা করে, চোখবন্দনা করে। খুশিদি ফিরে যেতে থাকে তিরিশ বছর অতীতে প্রতিবেশী তরুণের শ্রেণি-নিষিদ্ধ সম্পর্কে, অপ্রত্যাবর্তনীয় সময়ে। অস্তিত্বের শীতাতপ আনাচকানাচ ভেসে যায় অবিরাম স্নিগ্ধতায়। জানা ছিল না এতকাল যে ওর নিজের শরীর এরকুম, যাকে এখুন দেহের আর মুখের ভাষায় যিশু করে তুলেছে পূজনীয়, অর্চনীয়, বন্দনীয়, আরাধনীয়, সাধনীয়, অহর্নীয়, উপাসনীয়, টের পায় যিশু। নিজের অর্চক, উপাসক, যাজক, জাপক, পূজক, সেবাইত, সাধক, আরাধককে সারা জীবনে প্রথমবার, পঞ্চাশ বছরে এই প্রথম, সাহায্য করে খুশিদি নিজেকে অবাধ করে তুলতে। অস্ফূট উঃ, খুশিদির চোখবোজা, ক্রমাগত বলে চলেছে, কেউ ভালোবাসে না আমায়, কেউ চায় না আমায়, আমি মুকখু, আমি অপয়া। অবারিত যিশু, গড়ে তোলে স্বপ্নের দ্রুতশ্বাস সম্পখফ। তিরিশ বছর আগের না-মেটা আশ পুনরুজ্জীবিত হতে থাকে। সুখানুভূতির অঢেল বখরায় মরা গাঙ প্লাবিত হয়।

    বাঁশের বেড়া খোলার ক্যাঁচোর শুনে উৎকর্ণ শঙ্কিত খুশিদি উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত, পাক খেয়ে আনারদানা জামদানি জড়ায়, চোখের জল মোছে, হাত-খোঁপা বাঁধে, আর চাপা গলায়, দ্যাখ, দ্যাখ, দ্যাখ, দ্যাখ, বাইরে যা, বাইরে যা, এখুন তো দাদার আসার সময় হয়নি। ব্লাউজের হাতায় বাহু ঢোকায়। টেপা-বোতামের পট-পট শব্দ।

    ভীতির গভীরতায় অবাক যিশু বাইরে দাওয়ায় বেরিয়ে খুশিদি আর আগন্তুকের উদ্দেশে গলা চড়ায়, জাবেদালি এসেছে গো খুশিদি। বিশ্বাসবাবুর জন্যে খাসি কাটালে ভবঠাকুর, তাই পাটিয়ে দিয়েচে, আর এই হরিপালের দই, জানায় জাবেদালি ঘরামি, হিমঘরে নজরদার, থলথলে কালচে চাহারা, গোঁফ নেই, দাড়ি আছে, কুচকুচে। হিমঘরের নাটবল্টু পেরেক আলপিন ওর মুখস্হ। অনেক বন্ড কিনেছে নিজের নামে, নাবালক ছেলের নামে। পদবির বিশ্বাস শব্দটাকে কারা বিকৃত করবে তা মুখের দিকে তাকিয়ে টের পাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে যিশু।

    যিশকা এখেনে কদিন থেকে যাক না দাদা, কদ্দিন বাদে দেকা, ওর তো মা-বাপ কেউ নেই এসংসারে, আমরা ওকে পুষ্যি নিতে পারিনে ? ভবেশকা ফিরলে অবাস্তব প্রস্তাব করেছিল খুশিদি।

    কিইইইই যে আবোল-তাবোল বলিস ; বিলেত-ঘোরা লোক ও, আপিসের কাজে এয়েচে। তা থাকতে চায় থাকুক না কদিন, কিন্তু ব্যাবসা আর গাঁয়ের গপ্পো করিসনি ওর সঙ্গে।

    রাত্তিরে, মাংস খাওয়ার সময়ে, এই অভিজ্ঞতা অনেকবার হয়েছে যিশুর, আবার মনে হল, অন্ত্যজ বাঙালি পরিবার মোগলাই রান্না রাঁধতে পারে না, অথচ সবর্ণদের তুলনায় নবাব-সুলতানদের কত কাছে ছিল। যে হিন্দুর বাড়িতে এককালে ছাগলের মাংস আর মুরগি নিষিদ্ধ ছিল, তারা কিন্তু আজকাল নানা মোগলাই পদ দিব্বি রাঁধতে পারে। অরিন্দমের ছোটো ভাইয়ের বউ কত ভালো মাংস-পরোটা খাইয়েছিল অরিন্দমের জন্মদিনে। অরিন্দমের ছোটো ভাইটা তো সব রকমের মাংসই খায়।

    কে কোন তপশীলিকে সরকারি ব্রাহ্মণ বলেছিল বলে অরিন্দমের অফিসে ইউনিয়ান নেতাদের বিরুদ্ধে কত চেঁচামেচি করেছিল গৌরাঙ্গ নাগুরি, রমাপদ বাইন, জগৎ মান্না, সদানন্দ সাঁই, আর ঝাড়পিট ঘিরে নাট্যমোদীর কেরানিমঙ্গল। চাকরি-বাকরির চেয়ে নিজের বুদ্ধি বিক্রির ব্যবসা বরং ভালো, এর রাজনীতিতে তেমন হ্যাঙ্গাম নেই। খুশিদির সেগুনকাঠের পেল্লাই খাটে, রং-ওঠা নীল নেটের মশারির মধ্যে শুয়ে ভাবছিল যিশু।

    খুশিদির ঘরটা প্রায় ফাঁকা। একটা ড্রেসিং টেবিল অন্তত কিনে দিতে পারত ভবেশকা, একটা ট্রানজিস্টর বা টু ইন ওয়ান। নিদেনপক্ষে ছবি দেখার জন্যে সিনেমার ম্যাগাজিন। গ্রামপঞ্চায়ের এখানে কেবল টিভি নিষিদ্ধ করলেও, একটা টিভি তো রাখতে পারত সরকারি চ্যানেল দেখার জন্যে। খুশিদিকে ঠিক কোন শতকে আগলে রেখেছে ভবেশকা কে জানে। তালা-দেওয়া ঘরগুনোয় কী আছে জানতে অহেতুক আগ্রহ হয় ওর, যিশুর।

    ভেতরবাড়ির ভাঁড়ার ঘরে খাটে কটনের মশারি টাঙিয়ে খুশিদি বাতি নেভাবার পর, যিশু আলতো পায়ে ওর পাশে গিয়ে শুলে, কন্ঠস্বর উদারায় তুলে খুশিদি বলল, সকাল-সকাল ঘুমিয়ে পড়, কাল তো আবার আপিসের খাটনি আচে। আর গলা নাবিয়ে বলল, দুপুরে যা সব বলছিলি, সেগুনো আবার বল। পারবি ? ওমা তোর বুকে তো চুল নেই রে।

    যিশু প্রণয়ের প্রণয়ন করে।

    তোমাকে অনেক বলার আছে খুশিদি ; একই কথা বারবার কেন বলব ?

    না, না, দুপুরেরটাই বল, তখুন যেমন-যেমন করেছিলি। নিজের অস্তিত্বে উত্তেজনার ভণিতা চেয়েছে খুশিদি।

    তোমাদের খুলনার ভাষা তোমরা দুজনেই ভুলে গেছ ?

    তিরিশ বছরের ওপর রইচি এই গাঁয়ে। এই গাঁয়েরই হয়ে গেচি। আমি তো ছোটো ছিলুম, কিছুই মনে নেই। দাদা গপ্পো করে কখুনো-কখুনো।

    আমি তোমায় দেখে ভেবেছিলুম, বিধবা হয়ে ফিরে এসেছ। ভবেশকা যে কেন বিয়ে না দিয়ে আইবুড়ো করে রেখে দিয়েছে। অনেক ভালো পাত্র পেত তোমার জন্যে। নিজেও করেনি।

    দাদার তো চোপরদিন হিমঘর আর পারটি আর চাষবাস আর সভা। তুই করিসনি কেন ?

    আমি ? পড়াশোনো আর পড়াশুনো। তারপর রোজগার আর রোজগার। উন্নতি আর উন্নতি। ব্যাস, বিয়ের বাজার হাতছাড়া হয়ে গেল। আর তারপর বাবা-মা মারা গেল।

    তুই তো বেমমো, না রে ?

    যিশুর বেশ ভাল্লাগে খুশিদির অকৃত্রিম মর্মসত্তা। বলল, না, আমরা খ্রিস্টান, ফ্রানসিসকান খ্রিস্টান। আমাদের জাতের বাঙালি খ্রিস্টান কলকাতায় আর নেই। কলকাতায় জেসুইট,কারমেলাইট, ডোমিনিকান, অগাস্টানিয়ান জাতের বাঙালি খ্রিস্টানও আর নেই। কলকাতা এখুন নানা ধর্মের ট্যাঁসদের শহর, বুঝলে। হিন্দু ট্যাঁস, মুসুলমান ট্যাঁস, খ্রিস্টান ট্যাঁস। কিন্তু ছোটোবেলায় কতদিন বড়োদিনের কেক খাইয়েছিলুম, ভুলে গেলে ? অবশ্য তিরিশ বছর আগের মতন কেক আর হয় না। কেকের ময়দা তো এখুন দুপা দিয়ে মাড়িয়ে-মাড়িয়ে মাখে কলকাতায়।

    অতশত বুঝিনে, মোচরমান না হলেই হল। খিশিদির অজ্ঞানতার আহ্লাদ, আরো গভীরে, জানায়, তা বেমমোও যা খ্রিস্টানও তাই। আমিও তাই, বল ? কিন্তু দুপুরবেলা তুই আমার জন্যে হিন্দুর মন্তর পড়লি যে বড়ো। শুয়ে শুয়েই, যিশু কাঁধ নাচিয়ে আহ্লাদিত।

    জানলায় ফিকে শীতের শ্রবণসুভগ শুক্লপক্ষের স্তব্ধতা। ভুলো মনের বাতাসে আওয়াজ নেই। যিশু ফিসফিসিয়ে, তোমাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাব আমি। আমার কাছে ক্যামেরা আছে, কাল ফোটো তুলব তোমার।

    খুশিদির বিষণ্ণ উক্তি, আমার কোনো ছবি নেই, কেউ তোলেনি আজ ওব্দি। ভোটের ছবি তুলেচে যেন শাঁকচুন্নি। তারপর বহুক্ষুণ নিরুত্তর থেকে, কিন্তু কী করে যাব, দাদা এক পা-ও যেতে দেবে না। চাদ্দিকে দাদার পঞ্চায়েত, কিসক সভা, হ্যানোত্যানো কমিটি, হিমঘর, সমবায়ের লোকে গিজগিজ করচে। কী করে এড়াব ? সবাই চেনে আমাকে।

    বৈশাখী পূর্ণিমার মেলা আসছে তো। গাঁয়ের মুখে তো বিরাট মেলা বসে শুনেছি। সেদিন সন্ধ্যাবেলায় কেউ খেয়াল করবে না। আমি কলকাতা থেকে টানা গাড়ি আনব।

    শরীর কেঁপে ওঠে খুশিদির। যিশুর মাথাকে চেপে ধরে উন্মুক্ত বুকে। যা ভালো বুঝিস, কর। কিচ্ছু ভাল্লাগে না আর। রাত্তিরেও চুল আঁচড়ে শুস ? এক লহমায় যিশু ফিরে গেছে মায়ের কোলে। চাঁদের আলোর ক্ষীণ স্বাদ ওর জিভে। রোমকূপের গোড়ায়-গোড়ায় পড়ে গেছে সাজো-সাজো রব। একত্রে অনোন্যোপায় হয়ে ওঠে দুজনে, অভিভূত, দিশেহারা, বিভোর, আচ্ছন্ন। অন্ধকারে তিরতির করে কাঁপতে থাকে অন্ধকার। চোরাবালির কেন্দ্র থেকে প্রসারিত হাতের অনুনয়ের মতন খুশিদির নিঃশ্বাস। একে আরেকের ব্রাহ্মমুহূর্ত গড়ে তোলে আর প্রশমিত করে পারস্পরিক স্পন্দন।

    প্রাকভোরে, শুক্লপক্ষ তখুনও কৃষ্ণপক্ষে ঢলে পড়ার জন্যে তৈরি হয়নি, ঘুম ভেঙে গেলে খুশিদি যিশুকে ঝাঁকায়। এখুনো ঘুমোসনি, নিজের বিছানায় যা, বিপদ হবে শেষকালে। যিশু যখুন মশারি তুলে বেরোতে যাচ্ছে, ওর বাঁ হাত ধরে, না যাসনে, আমার কাছে থাক। যৌবন ফুরোতে থাকা নারী-পুরুষ চুপচাপ পাশাপাশি শুয়ে নৈশব্দ্যের খাঁই মেটায়। চরাচরের অপার্থিব উম কনশিকাঁথার রূপ নিয়ে ঢেকে রেখেছে ওদের দুজনকে। বহুদূরে, কোনো পথকুকুরের খেদোক্তি শোনা যায়। এই এভাবে পরস্পর, একেই বোধয় শুশ্রুষা বলে, প্রাণ জুড়োনো বলে, মনে হচ্ছিল যিশুর।

    অ্যাতো জমিজিরেত প্রতিপত্তি কী করে করলে গো তোমরা ?

    বিনময় করে। জানিস তো, বিনময় ? ওখেনে আমাদের খেতখামার ঘরদোরের বদলে এখেনে কে একজন ফরোজন্দো মোমেনিন ছিল, তার সঙ্গে অদল-বদল। তক্কে-তক্কে ছিল দাদা।

    ওঃ বিনিময় ! কখুনো তো টের পাইনি ?

    তুই আবার কী টের পাবি ? তখুন কতই বা বয়েস তোর।

    গায়ে কাঁথা চাপা দিয়ে পেছনের ওসারায় এসে দাঁড়ায় যিশু। সকাল হয়ে এল। স্পষ্টবাক বিবাহযোগ্য কোকিল ডাকছে। সঙ্গে ফস্টিনষ্টি আরম্ভ করেছে ফাল্গুনের প্রেমানুভূতিময় কচি-কচি বাতাস। বেশ ভালো বাগান করেছে ভবেশকা। ঘষাকাঁচ কুয়াশা দেখা যাচ্ছে দূরের ঠান্ডা দোচালাগুলোকে ঘিরে। সজনেফুল আঁকড়ে সদ্যোজাত লিকলিকে সজনে ডাঁটারা বেরিয়ে এসেছে রোদ্দুরের উড়ন্ত উনকির সঙ্গে খেলবে বলে। কাঁটাকাঁটা সবুজ ছুনিফলের মুকুটে তালঢ্যাঙা রেড়িগাছ। পুকুরের পাড়ে মুখ তুলে পাতাহীন গাছে আমড়ার ফিকে সবুজ বউল। ছোটো-ছোটো প্রায়ান্ধকারে দোফলা গাছে পুরুষ্টু সফেদা। পাকা আর ডাঁসা অজস্র টোপাকুল, আলতো নাড়ালেই ঝরে পড়বে গোঁসা করে। গা ভরতি নানা মাপের সবুজ আঁচিল নিয়ে কাঁঠাল গাছ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে মুখে পাউডার মেখে নার্সারি স্কুলের খোকাখুকুর মতন জামরুল ফুলের দলবদ্ধ কুঁড়ি। লালচে-সবুজ ছাই মেখে কচি খসখসে ফলসা পাতা। নরম তুলতুলে গুটিপোকাকে আলগোছে খেয়ে ফেলল ময়নাপাখি। কত রকুমের পাখির ডাক। বেলা হলে আর শোনা যায় না তো ! গলায় কোরালের মালা ঝুলিয়ে মোচা ফেলছে সুপুরিগাছের সারি। জীবনমুখী গায়কের দ্রুতলয় গিটারের মতন বাঁশের শুকনো ফ্যাকাশে গাঁটে কাঠঠোকরা।

    খালি গায়ে, বাগানের ঘাসপথ বেয়ে পুকুরপাড়ে গিয়ে দাঁড়ায় যিশু। আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে বাতাস। বাতাসে ডাঁটো স্ট্যাচু যেন। সব স্হির। দানদিকের বিশাল গাছে তেঁতুলপাতাও কাঁপছে না। বাঁধানো ঘাটে বয়ঃসন্ধির বালিকার মতন একধাপ ওপরে তো একধাপ নিচে খেলা করার পর ক্লান্ত হয়ে গেছে টলটলে পুকুর। আঁশটে গন্ধের ঐতিহ্যলালিত কুচোপোনার ঝাঁক ভেসে আছে আলতো রোদে ভেজা প্ল্যাঙ্কটন-পোকা খাবে বলে। ঘাটের জলে কাঁসার এঁটো বাসন। স্হানীয় চোরেরা ভবেশকাকে বেশ ভয় পায় বোধয়।

    কত জল পুকুরটায়। কত্তো। কলকাতায় হরদম ফেরুল নোংরা, জলের পাইপ পাম্প করার ঝঞ্ঝাট, স্টপকক চুরি, ফি-দিন মেরামত। জলের জন্যে টেনশানের চূড়ান্ত। অথচ এই অজ পাড়াগাঁয় অগুনতি পুকুর। ভবেশকার পুকুর তিনটের মধ্যে এটা সবচে ছোটো। পুকুরের উত্তরে গোয়ালঘর। সঙ্কর গাই রয়েছে দুটো, জার্সি।

    কত কি করে ফেলেছে ভবেশকা। দেশভাগের দরুন তাহলে জোতদার বিনিময়ও হয়েছিল। এগাঁয়ের লিগি মুসুলমান গিয়ে ইস্তাহারি রাজনীতিতে দড় হিন্দু জোতদার এল। মূল্যবোধ যে কে সেই। খুঁটিগুনোর তেমন তফাত হয়নি। তিরিশ বছর আগের ভবেশকার স্লোগান লাঙল যার জমি তার আজ ফলে গেছে। হালবলদ, জোয়াল-লাঙল ভবেশকার, জমিও ভবেশকার। সমন্বিত গ্রামীণ বিকাশ, প্রধানমন্ত্রীর প্রকল্প, ডোকরা, সাক্ষরতা অভিযান, রক্তদান শিবির, মৎস্য উন্নয়ন, পঞ্চায়েতের বরাত, তাঁতিদের সুতো, ত্রাণ প্রকল্প, তপশিলি কল্যাণ, হ্যান-ত্যান কমিটি, সমবায় তাপবিদ্যুৎ, স্বাস্হ্যকেন্দ্র, লোন-দাদন, আলুর বন্ড, ক্লাব, পুজো, নাটকদল, মেলা, বায়োগ্যাস, ধোঁয়াহীন চুলো, প্রশিক্ষণ, মডেল শৌচাগার, সব ভবেশকার, ভবেশকাদের, সব, সব, সঅঅঅঅব।

    পাঁচ

    পাতালের আলু, মর্ত্যের গতিপ্রকৃতি আর স্বর্গের খুশিদি, সমস্তকিছু ভবেশকার কবজায়। শাসনে এত আলু যদি সংরক্ষণ করা না-ই যাবে, পড়ে-পড়ে নষ্ট হবে, হিমঘরে গিয়ে পচবে, যাহোক-তাহোক দামে বেচে দিতে হবে চাষিকে, তাহলে বিঘের পর বিঘে পরিশ্রম, টাকা আর সময়ের অপচয় কেন ? ব্লকের আর জেলার আধিকারিকরা করছিলটা কী ? কী করছিল ? অ্যাঁ ?

    কোনো একটা অচেনা পাখির ডাকে চমকে উঠেছে যিশু। স্পষ্ট শুনেছিল পাখিটার গান। পরপর তিনবার পাখিটা বলল, ‘বাল ছিঁড়ছিল’।

    তিন সত্যিই করেছিল পাখিটা। পরের বছর নিশ্চয় প্রচণ্ড দাম বাড়বে। তখুনও কৃষি আধিকারিকরা একই কাজ করবে। ওঃ। চার বছর আগে আলু হয়েছিল একান্ন লক্ষ টন, যখুন কিনা সারা পশ্চিমবঙ্গের হিমঘরে রাখার জায়গা ছিল বাইশ লাখ টন। এবছর হয়েছে সত্তর লাখ টন। রাখার জায়গা আটাশ লাখ।

    যিশু ভেবেছিল বুঝি কাঁচা ফাল্গুনের ঘাসে শিশির মাখতে বেরিয়েছে একজোড়া বেঁজি, তার আওয়াজ। পেছন ফিরে দেখল ভবেশকা, নিমডাল পাড়ছে নাবালক গাছ থেকে। বলল, এ নাও যিশু, নিমের দাঁতন করো। খ্রিশ্চানরা কি দাঁতন করে ? টুথব্রাস বেরোবার আগে কী করত সিরিল র‌্যাডক্লিফ ? আর কঘর বাঙালি খ্রিশ্চান রইল হে এদেশে ? চার্চ-টার্চ যাও ? নাকি সেসবও বাইরের লোকেরা হাতিয়ে নিয়েছে ? নাকতলায় ডালগিশ সায়েবের বাড়িটা আছে ? ডালগিশ তো তোমাদের জ্ঞাতি, না ? তারপর ডালগিশের বাটলার, আরদালি, বাবুর্চি, খাদিম অনেকঘর খ্রিশ্চান তো ছিল নাকতলা-বাঁশদ্রোণিতে ?

    প্রশ্নাবলীর দাঁতন-বুলেটে যিশুর একাগ্রতা ছত্রভঙ্গ। অপ্রস্তুত, ও বলল, হ্যাঁ, ডালগিশ পরিবারে বাবার মাসির বিয়ে হয়েছিল। বাঙালি খ্রিস্টান বলতে গেলে আর নেই কলকাতায়। বাবা তো ওদিকের বাড়ি বেচে সেই আপনারা কলোনি ছাড়ার বছর দুয়েক পরেই পার্ক স্ট্রিটে ফ্ল্যাট কিনেছিল। সারা পশ্চিম বাংলায় আমিই শেষ বিশুদ্ধ বাঙালি খ্রিস্টান।

    হ্যাঁ, বলছিলে বটে। অত বড় বাগানবাড়ি ছেড়ে শেষে সেই ফ্ল্যাটে ! তা বেশ, বেশ। নাটকের চরিত্রের চিৎপুরি সংলাপের মহড়ার ঢঙে ভবেশকা। হিমঘরের লাইসেন্সটা আমরা শিগগিরই রিনিউ করিয়ে নেব। কোথায় আটকে আছে জানোই তো, অ্যাতো হিমঘর দেখেছো ঘুরে-ঘুরে। ড্রাই অ্যান্ড ওয়েট বাল্ব-থার্মোমিটারের অর্ডার দিয়ে রেখেছি ঠিকমতন তাপ মাপার জন্যে। পরিচালন সমিতির কার্যবিবরণীও এবার থেকে রেজিস্টারে লিখে রাখার ব্যবস্হা থাকবে, পরিচালকরা সই করবে তাতে। ডিফিউজানের বদলে বাঙ্কার পদ্ধতিতে পালটালে খর্চাখরচ কেমন পড়বে তার একটা তলবি-সভা হবে দিন-সাতেকের মধ্যে। বিজলির চেয়ে ডিজেলের খরচটা হয়তো কম, তাই আরকী। তারপর বিদ্যুৎ তো আজ আছে কাল নেই। দাঁতনের সঙ্গে চিবিয়ে-চিবিয়ে সেই প্রশ্নগুলোর একনাগাড় উত্তর দিয়ে গেল ভবেশকা যেগুলো মোমতাজ হিমঘরের কর্মীদের করেছিল যিশু, অথচ তারা সঠিক জবাব দিতে পারেনি বা চায়নি।

    ওহ-হো, ভবেশকা আমি এখানে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের হয়ে আসিনি, বলেছি তো তোমায়। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বা নাবার্ড কিংবা অমন কোনো ক্ষেত্রসমীক্ষক সংস্হার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। আমি নিজের কনসালটেনসি খুলেছি তো। একসঙ্গে অনেক কাজ নিয়ে ফেলি, কুলোতে পারি না একলা। এই কাজটা মিৎসুবিশির জন্যে করছি। ওরা আলুর নানারকুম ব্যবসায় ঢোকার আগে জেনে নিতে চায়। আমি তো চাষবাসের ব্যাপার বিশেষ জানি না। তাই বাড়তি কথা জিগেস করে ফেলি।

    হ্যাঁল য়যোতাজপুরের মামুদ মাফুজ বলছিল, তুমি নাকি ওর বাপের কাছে জানতে চেয়েছিলে মাদার সিডের ব্রডকাস্টিং কখুন হয়। আমরা বলি বীজ আলু পাতা। আরেকটা কথা। তোমার রিপোর্টে লিখো যে আমি এই ব্লকে কাভুর জাতের লাভজনক ওল চাষে সফলতা পেয়েছি। কাভুর ওলে মুখি বিশেষ হয় না, গলা কুটকুট করে না, ছোটো-ছোটো টুকরো কেটে আলুর মতন বসানো যায়। তোমায় খাওয়াবো অখন, তা হলে টের পাবে। আগে এখেনে সবাই সাঁতরাগাছি ওল চাষ করত। সিঙুর, বলরামবাটি, বাসুবাটি, মির্জাপুর, ঝাঁকিপুর, বারুইপানা সবখানে এখন কাভুর বসাচ্ছে চাষিরা। পা#চশো গ্রাম বীজে দশ কেজি মতন ওল পাচ্ছি, বুঝলে। অনেকে তো ওলের সঙ্গে বাড়তি ফসল হিসেবে লাল শাগ কি নটে বুনছে। বকবকম ফুরোলে, নিম দাঁতনের সঙ্গে ওলের জ্ঞান-চেবানো কথাবার্তা একদলা থুতুতে পালটে থুক করে রজনীগন্ধার ঝাড়ে ফেলল ভবেশকা। শিউরে উঠল ফুলগুলো।

    ধবধবে ফুলগুলো শিউরে উঠছে, স্পষ্ট দেখতে পায় যিশু। এই সাতসকালে ওলের জ্ঞানে বিব্রত লাগে ওর। কেনই বা প্রসঙ্গটা, আর কী-ই বা উদ্দেশ্য, ঠা্র করতে পারে না ও। চন্দ্রমুখী ধেকে ওকে কাভুরে নাবাচ্ছে ভবেশকা। পরের বছর আলুর দাম তিনচারগুণ বেড়ে গেলে শ্রমিক-মজুরদের খোরাকিটা ওল দিয়ে সামলাবার জন্যে সম্ভবত নিজেকে আগাম তৈরি করছে পশ্চিমবাংলার বঙ্গসমাজ।

    ভবেশকা নিমজ্ঞান চেবানো বজায় রাখে। চোত-বোশেখে ওল লাগালে ভাদ্দর-আশ্বিনে ফি-একরে পঞ্চাশ কুইন্টাল মতন পাচ্চি, বুঝলে। আলু যাদের মার খেলো, ক্ষতি নেই, পুষিয়ে নেবে। বোরো থেকে পোষাবার উপায়নেই। চাষের জল নেই। আরেক-দলা থুতুর ছিবড়ে পড়ে রজনীগন্ধার জামাকাপড়ে। আচমকা প্রসঙ্গ পালটে যেতে শোনে যিশু। আমাদের পঞ্চায়েত বিদ্যুতের বিল বাকি রাখে না কখুনো, বুঝলে, একটা রেকর্ড সারা পশ্চিমবঙ্গে। আরেকবার থুতুর পর বকনা বাছুরটাকে আঙোই পেড়ে ডাকে ভবেশকা।

    জল তাহলে এক ভয়ংকর সমস্যা। এই তো মনে হচ্ছিল গাঁয়ে কত জল। মাটির তলাকার জল যাতে রাজ্যসরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাই ব্লকগুনোকে কালো, ধূসর, সাদা, তিনরকুম ভাবে ভাগ করতে বলেছিল বিশ্বব্যাঙ্ক। কিন্তু কে কার কথা শোনে। চাষিকে বারণ করলেই অন্য পার্টিতে গিয়ে ঢুকবে। যার যেখানে ইচ্ছে শ্যালো বসাচ্ছে। সাদা ব্লক ধূসর হয়ে গেল। জল ফুরিয়ে ধূসর ব্লক হয়ে গেছে কালো। তারপর আর জল নেই। জল নেই তো জেলাশাসককে ঘিরে চেঁচাও। যেন কালেক্টর সায়েব মুতে-মুতে মাটির তলাটা আবার ভরিয়ে দেবে জলে। এরপর খাবার জলও জুটবে না। চাষের কীটনাশক চুয়ে-চুয়ে পাতালের জলও দূষিত হয়ে গেছে।

    কত নদীর বুকে, আজকাল, না, সাঁতার নয়, সাইকেল রেস হয়। নিজের চোখে দেখেছে যিশু। আর শুধু বোরো কেন ! ওই তো, বাঁকুড়ার মড়ার, বেলসুলিয়া, বাঁকদহতে রবি মরশুমে শ্যালো বসাতো না কেউ। উপচে পড়ত কংসাবতীর খালের জল। আচেরুদ্দি মল্লিক, আরেফ মণ্ডল জোড়া পাঞ্জাবি বলদ বিক্কিরি করে শ্যালো বসিয়েছিল খালের ধারেই। জল ওঠেনি। অক্টোবরে পাতা র‌্যাশন আলুর চারা বাঁচাতে গোরুর গাড়িতে ড্রামে করে ডিপ টিউকলের জল এনে ঢেলেছিল। বাঁচেনি। দিলশাদ বায়েন, আফিফ দালালদের চোপসানো চোখমুখ দেখে আগামী সংসারের দিনকাল আঁচ করেছিল যিশু।

    ওদিকে মেদিনীপুর, কাঁথি, এগরা, রামনগর, বাদলপুর, সাতমাইলের চাষিরা ভোগরাইতে গিয়ে উড়িষ্যা কোস্ট ক্যানালের লকগেট অপারেটারদের মোটা টাকা খাওয়ালে তবেই সেচের মিষ্টি জল জোটে। বাদলপুর পঞ্চায়েতের সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক দেবেন জানা নিজেই বলেছিল, নিজে। মাঝি-মালোরাও শংকরপুর মেছোঘাটায় ভুটভুটি নিয়ে যাবার জন্যে গাঁটের মালে হাসি ফোটায় অপারেটারবাবুদের মুখে। ফেরার পথে কিলো দশেক মাছ গচ্চা যায়। স্বাধীনতার আগে লোকে ওই খালে নৌকো বেয়ে কলকাতায় যেত, জানেন স্যার। বোরো তো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আমসি হয়ে গেল। এবারে আর ধর্ম নিয়ে দাঙ্গা হবে না, দেখে নেবেন, হবে জল নিয়ে।

    বহিরাগত, বহিরাগত, বহিরাগতর মতন এই হুগলি জেলার খানাকুল, মারোখানা, ডোঙ্গল, রামমোহন, চিংড়া, ধনেখালি, পাণ্ডুয়ায় দেখেছে যিশু, অশান্তির তোয়াক্কা করছে না চাষি। মুণ্ডেশ্বরী, শংকরী, দ্বারকেশ্বর নদী আছে। জল নেই। ডি ভি সি আছে। জল নেই। বড়োসায়েব জিপগাড়ি আছে। জল নেই। ভজহরি ভুঁইয়া সঙ্গে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছিল। ছোপছপে শংকরীর এখানে-সেখানে হাঁটু জলে বেআইনি বোরো বুনছে চাষি। মজা-যাওয়া কানা দামোদর আবার বর্ষায় হুড়মুড়িয়ে ঢুকে যায় হুগলি-হাওড়ায়। ত্রাণবাবুদের ঢল নাবে।

    গড়চুমুকে আটান্ন কপাটের স্লুইসগেট কোন কাজেই বা এলো, বলুন দিকি ? যিশুকে সরকারি আধিকারিক ঠাউরে অভিযোগ করেছিল ক্ষুদিরাম ঢাং। বছর কুড়ির আগের বাণে দ্বারকেশ্বর রাস্তা পালটে সেঁদিয়ে গিসলো গোয়ালসারা, খিলগাঁ, চোটডাঙল, শ্যামবল্লভপুর, কৃষ্ণবল্লভপুর, কলাগাছিয়ায়। নদী তো শুধরে ফিরে গেল আগের খাতে। চাষের জমিতে ফেলে গেল এক মানুষ গভীর ধু-ধু দিগন্তের বালি। হাজার তিনেক জাতচাষি এখুন দিনমজুর। দিনমজুর হলেই তো আর কাজ জোটে না !

    সেচ দপ্তর কী করে ? গ্রামোন্নয়ণ দপ্তর কী করে ?

    অচেনা পাখির ডাকে, পর পর তিনবার, সোচ্চার জবাবে চমকে ওঠে যিশু। ভাবনা গুলিয়ে যায়।

    শেষবার থুতু ফ্যালে ভবেশকা। কী, এখুনও ছোটোবেলার মতন চমকাও নাকি ? ন্যাচুরোপ্যাথি করো না কেন ? আমার তো আলসার সেরে গেছে।

    কটা দাঁত আর আছে ভবেশকার যে নিমের ডাঁটাটা সজনে খাড়ার মতন চিবিয়ে ফেলেছে ? নকল দাঁত হলে দাঁতন কেন ?

    নিমডালের কুচো-থুকথুক সেষে বলল, কালকে যখুন তোমার মা-বাবার দুর্ঘটনায় মারা যাবার খবরটা শুনলুম, মনটা বড্ডো খারাপ হয়ে গিসলো। ওঁয়ারা না থাকলে তো খুশিটা মানুষ হতো না। কত দুঃখের দিন গেছে। ঘাটে বসে পুকুর-কুলকুচো করে ভবেশকা।

    বাবা-মায়ের দুর্ঘটনার সূত্রেই আদিত্যর সঙ্গে যিশুর পরিচয়। বাগবাজারে গিসলো বাবা-মা, নয়ন সাহা লেনে ফাদার নরম্যানকে সেকেলে ধর্মান্তরিত বাঙালি খ্রিস্টান পরিবারের এখনকার হালহকিকতের তথ্য দিতে, অবহেলিত সাংস্কৃতিক ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। বিরল প্রজাতির এই ধর্মসম্প্রদায়ের নিশ্চিহ্ণ হবার কারণ গবেষণা করছেন ফোর্ড ফাউন্ডেশানের আওতায়। বাবা ছিলেন শেষ ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, কাঁধে চাদর, পায়ে পাম্পশু খ্রিস্টান। ক্রিসমাসের দিন মা পরতেন গরদের শাড়ি। খাঁটি বাঙালি খ্রিস্টান মেয়ের সন্ধান করতে-করতে যিশুর বিয়ে দেওয়া হল না।

    শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে, ল্যাজ-ওড়ানো ঘোড়ায় বসা নেতাজির মতন দেখতে ব্রোঞ্জের মনীষীর চোখের সামনে, হাত উঁচিয়ে ট্যাক্সি ধরতে গেলে, তিন নম্বর রুটের প্যাঙপেঙে জবেদকা বাসের ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে রক্তাক্ত, মায়ের ডান হাত তখুনও বাবার বাঁ হাতের মুঠোয়। রাস্তার লোকেরা প্রথমে বাসটাকে জ্বালিয়ে আর চালককে পিটিয়ে মেরে ফেলে, তারপর একটা পথচলতি প্রাইভেট গাড়িতে বাবা-মাকে চাপিয়ে নিয়ে গিসলো আর জি কর হাসপাতালে। পথেই মৃত্যু।

    মৃতদেহ অশনাক্ত অবস্হায় আর জি কর থেকে মাছি ভনভনে লাশগাড়িতে মেঝের ওপর দোল খেতে-খেতে চলে যায় নীলরতন সরকার হাসপাতালের মর্গে। সারারাত, পরের দিনও যিশু হন্যে হয়ে খুঁজেছে থানায়, চার্চগুলোয়, বাবার বন্ধু আর প্রাক্তন সহকর্মীদের বাসায়, হাসপাতালে। তৃতীয় দিন এন আর এস মর্গে পৌঁছে স্তম্ভিত। চাপা কান্না আর অসহায় ক্রোধে কন্ঠরুদ্ধ, ও আবিষ্কার করেছিল উদোম উলঙ্গ বাবা-মাকে। দুজনেরই বাঁ হাত আর কাঁধ থেঁতলে গেছে। ঘড়ি, চশমা, পার্স, আংটি, হার, চুড়ি তো নেই-ই, রক্তে ভেজা পোশাক আর অন্তর্বাস হাপিস। মা-বাবাই কেবল নয়। মর্গের টিমটিমে শীতের ইঁদুরমরা গন্ধে গাদাগাদি পড়ে আছে অনেক লাশ। উলঙ্গ। কাঠ। স্টার্ক নেকেড, ঠাণ্ডা শক্ত হয়ে পড়ে আছে প্রত্যেকে। উদ্ভিন্ন কিশোরী, পীনোন্নত গৃহবধু, ঢাউস প্রৌঢ়া, হাড়গিলে বৃদ্ধার হাঁ-মুখ-খোলা চেয়ে-ধাকা মৃতদেহও রেয়াত পায়নি।

    মৃতদেহ খালাস করতে গেলে, কালু ডোমের স্পর্ধিত হাসির খিক-খিক সিগারেট টুসকি ভোলা যাবে না। এসট্যাবলিশমেন্টের নির্মম হাসিখানি। মহানগর কলকাতা আজ এইসব কালুয়া মুদ্দোফরাসের বজ্র-আঁটন মুঠোয়। ধর্মমঙ্গলের কালু ডোম এখুন পশ্চিমবাংলার নিখিল মর্গের যক্ষ। থানায় অভিযোগ দায়ের করতে গেলে সেখানে মুদ্দোফরাসের খিকখিকের বদলে পেটমোটা সরকারি হাসির খাকিরঙা গিগগিগ। পশ্চিমবঙ্গে হাসির সরকারিকরণ হয়ে গেছে। সোশাল অ্যাকশান ফোরামের শিশির ভট্টাচার্য, মানবাধিকার কমিশনের চিত্তোষ মুখোপাধ্যায়ও প্রতিষ্ঠানের উত্তরঔপনিবেশিক ডোমদের কাছে অসহায়। শেষে, একেবারে শেষে, ভেঙে পড়েছে যখুন, যখুন ওপরতলায় ধরাধরি ব্যর্থ, অরিন্দমের মাধ্যমে আদিত্য বারিকের কাছে পৌঁছেছিল যিশু। আদিত্যর দৌড়ঝাঁপে রেস্ত রফার পর খালাস করতে পেরেছিল মৃতদেহ।

    আদিত্য কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, এগুলো একটু-আধটু মেনে নিতে হয় যিশুদা। মন খারাপ করে লাভ কী ? স্বাধীনতার পর কত লোকের স্বজন যে অজান্তে পচেছে, কানের লতি নাকের পাটা চোখের পাতা খেয়ে ফেলেছে ইঁদুরে, মনে হয়েছিল যিশুর, ওফ, বীভৎস, বীভৎস।

    কী হল, কাঁদছ নাকি যিশু ? ভবেশকা বাঁ হাত রাখে ওর, যিশুর, কাঁথাঢাকা কাঁধে। লাল সুতো দিয়ে নকশা-করা একজোড়া উড়ন্ত প্রজাপতির ওপর রেখেছিল হাতটা। যিশু জানায়, না, আজকাল ভোরবেলা আমার চোখ দিয়ে জল পড়ে। ডাক্তার বলেছে কান্নার থলিটা চোখের তলা থেকে কেটে বাদ দিতে হবে।

    যিশি কিন্তু জানাল না যে ক্যরটেজে কফিনদুটো নিয়ে গিয়ে সমাধিস্হ করার দিন বিকেলেই, ও যখুন কমপিউটার টেবিলের সামনে অনাহারে ক্লান্ত ধানশীষের মতন মাথা ঝুঁকিয়ে বসেছিল, দেয়ালে ভাসাই-এর সেকোয়েরার গড়া কাঠের বেদনাময় খ্রিস্ট, পার্ক স্ট্রিটের বাতিস্তম্ভে হ্যালোজেনের বিষাদে রবিবারের রাস্তা একদম একাকী, হৃদরোগের অতর্কিত আক্রমণে চেয়ার থেকে লুটিয়ে পড়েছিল সাদাকালো চৌখুপি মোজেকে। রক্তচাপ ছ্যাঁৎ করে পড়ে গিয়ে ওপরে সত্তর নিচে চল্লিশ, নাড়ি স্পন্দন কুড়ি। হুঁশাহুঁশহীন স্হানান্তরিত হয়েছিল, এত জায়গা থাকতে, কত জায়গায় খ্রিস্টানদের সুবিধে থাকতে, বাইপাসে একটা হাসপাতালে, যেখানে গেট থেকে ঢুকেই হিন্দু দেবতার মন্দির ডাক্তারদের দায়মুক্ত করার জন্য সদাজাগ্রত।

    যিশুর চব্বিশঘন্টা কাজের ছেলেটা, উত্তর দিনাজপুর ভাঙাপাড়া গ্রামে বাড়ি, পতিতপাবন কীর্টনীয়া, পুতু, যাকে কমপিউটার, ফ্যাক্স, ই-মেল, অডিও কনফারেনসিং, ইনটারনেট চালাতে শিখিয়ে দিয়েছে যিশু, সামনের ফ্ল্যাট থেকে অজয় ব্যানার্জিকে ডেকে আনতে, ওই অজয়ই ভরতি করিয়েছিল হাসপাতালটায়, চেনাজানা আছে বলে।

    নিজেই প্রচণ্ড টেনশনে ছিল অজয়, তবু অনেক করেছিল। ও তো নিজেও একলা থাকে। ওর দিদির হেনস্হার খবর সেদিনই বেরিয়েছিল খবরের কাগজে। যিশুকে ভরতি করে, পতিতপাবনকে ইনটেনসিভ কেয়ারের সামনে বারান্দায় বসিয়ে, বাগবাজারে নরম্যান সায়েবকে খবর দিয়ে, রাত্তিরের দূরপাল্লার ট্রেনে গিয়েছিল দিদির কাছে।

    কী হয়েছিল হে ? পুতু বলছিল নাকি অনেক নোংরামি ? বিছানায় শুয়ে, অজয় অসহায় ফিরে এলে, জানতে চেয়েছিল যিশু।

    কথা বলার আগেই ফুঁপিয়ে উঠেছিল অজয়। তারপর সরি বলে, ধাতস্হ হবার পর, যা বলল, তা শুনে, ওষুধগন্ধের পারদর্শী মশারির শীতাতপে শুয়ে, যিশুর মনে হয়েছিল, এসব স্বাধীনতা-উত্তর সমাজ আর দেশভাগোত্তর হিন্দুত্বের দোষ। খ্রিস্টান সমাজে এরকম ঘটনা অসম্ভব। কালু মুদ্দোফরাসের ইবলিস ঔরসে জন্মতে আরম্ভ করেছে বাঙালিরা।

    দিদি বেঙ্গলি কোলফিল্ড উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের হেডমিস্ট্রেস। শুক্কুরবার ইশকুল খোলার সময় গেটের মুখে নানা বয়সের ছাত্রী আর তাদের বাবা-মা চাকর-চাকরানির সামনে একদল লোক কান ধরে ওঠবোস করিয়েছে, শাড়ি-ব্লাউজ ছিঁড়ে দিয়েছে, তাদে মধ্যে মহিলাই ছিল বেশি। আসলে, একদল স্হানীয় নেতা ইশকুলের মধ্যেই জোর-জবরদস্তি দুটো ঘর জবরদখল করে আরেকটা ইশকুল চালাচ্ছিল বলে দিদি ওদের সেই কবে থেকে বলছিল সময়টা আরেকটু এগিয়ে নিতে, যাতে মাধ্যমিকের ক্লাস আরম্ভ হলে বাচ্চাদের চেঁচামেচি এড়ানো যায়। কথায় কান দেয়নি ওরা। দিদি তাই রেগে-মেগে জবরদখল করা দুটো ঘরে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। তাইতে এই অবস্হা। ভেবে দেখুন একবারটি।

    সে আবার কী রে বাবা ! ইশকুলের মধ্যেই জবরদখল ইশকুল ? শুনিনি তো আগে। বলেছিল হতবাক যিশু। একদল ছত্রাক-প্রতিম বাঙালির কাছে জবরদখল একটা ভালো আর বৈধ মূল্যবোধ হয়ে দাঁড়িয়েছে বটে। ঘরবাড়ি জমিজমার জবরদখল ছোটোবেলা থেকেই দেখেছে ও। ওদের নিজেদের ধানি জমি দখল হয়ে কলোনি হয়েছিল। তখনকার ওই অঞ্চলের মুসুলমান চাষিগুলোর জমি বসত দখল হয়ে পরের প্রজন্মে তো বলতে গেলে চাষবাস থেকে একেবারে উৎপাটিত। কিন্তু ইশকুল দখল করে ইশকুল ! নাঃ, ভাবা যায় না।

    হাসপাতালের সেবিকা মেনকা পাইক পাশে দাঁড়িয়ে গল্প গিলছিল। বলল, যাকগে, আর এসব শুনতে হবে না, মনিটর দেখুন হার্টবিট পঁচাশিতে চড়ে দপদপ করছে।

    হাসপাতালের কর্তারা এমন লোভী যে ভরতি হবার সঙ্গে-সঙ্গে ঢুকিয়ে দিসলো ইনটেনসিভ কেয়ারে। তারপর টানা পনেরো দিন রেখে দিলে আই সি সি ইউতে, যিশু একজন মালদার রুগি টের পেয়ে। দরকার ছিল না, তবু দুবেলা ইসিজি, ইকো, রক্তের নানা পরীক্ষা, সিটি স্ক্যান, অ্যানজিওগ্রাফি। তারপর বেলুন অ্যানজিওপ্লাসটি করে, কুঁচকির ওপর স্যান্ডব্যাগ চাপিয়ে, খাটের হাতলে পা বেঁধে রাখলে। মান্ধাতা আমলের সব চিকিৎসা পদ্ধতি। অনেক রুগি এদের খপ্পরে পড়েছে ঢাকা-চাটগাঁ থেকে এসে। যন্ত্রপাতি স্টেরিলাইজ করা ছিল না বলে যিশুর ডান দিকের উরু হাঁটু পর্যন্ত জোঁক লাগার মতন ছিট-ছিটে কালো ফোসকায় ভরে গিয়েছিল। ওফ, দুঃস্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন। সরে উঠে ফেরার পর পুতু পুজো দিয়ে এসেছিল নবদ্বীপের মায়াপুরে, হিন্দুদের চার্চে।

    ইনটেনসিভ কেয়ারটা ছিল বিশৃঙ্খলা, অযত্ন, দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা আর অকর্মণ্যতার স্বর্গরাজ্য। ছোকরা ডাক্তার-ডাক্তারনিগুনো শোবার পোশাক পরে রাত্তিরে ঘুমুতে চলে যায় রুগিদের প্রতি খেয়াল রাখার বদলে। সেবিকা, নার্স আর ঝি-চাকরগুনো ঢুলতো পালা করে, নাকও ডাকত। মাঝেমধ্যে বকরবকর ফস্টিনষ্টি। হাঁসফাস রুগির উদ্দেশে ইয়ার্কি থামিয়ে ডাক্তারকে ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে আনতে-আনতে, দেখেছিল যিশু, শরীরে বারতিনেক খিঁচ ধরে সে টেঁসে গেল। রুগির মরে যাবার পর, বাইরে রাত-জাগা অভূক্ত দিশেহারা স্বজনকে ডেকে এনে, মৃতের দেহে লাগানো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির চক্রাবক্রা সবুজ আলো দেখিয়ে, মুখে অভিনয়ের কাঁচু আর মাচু এনে বলেছে, পেশেন্টের অবস্হা খুব খারাপ, আমরা চেষ্টা করছি, ভগবানে ভরসা রাখুন। আত্মীয়রা বাইরে বেরিয়ে যেতেই ঊর্ধ্বতনরা অধস্তনদের নির্দেশ দিয়েছে, ডেডবডি এখন রিলিজ করিসনি, বিল সেকশান থেকে আগে পুরো পেমেন্টের কনফার্মেশান আসুক।

    শুনে-শুনে আর দেখে-দেখে, প্রতিদিন অন্তত একবার, মনে হয়েছিল যিশুর, ভগবান লোকটা হিন্দুদের অসাধারণ আবিষ্কার। তা না ঈশ্বর, না দেবতা।

    আত্মীয়স্বজনকে, মৃত অথচ জীবন্তের-অভিনয়রত রুগি দেখানো হয়ে যাবার পর, যন্ত্রপাতি অতিতৎপরতায় খুলে, খরচাপাতির কাগজ বানিয়ে, কমপিউটারে যোগফল মিলিয়ে, লাশকে সাদা চাদরে ঢেকে, স্ট্রেচারে চাপিয়ে, অপেক্ষারত ভগ্নহৃদয় আত্মীয়কে বলা হত, অনেক চেষ্টা করেছিলাম আমরা, বাঁচানো গেল না। হোটেলের মতন, হাসপাতালটায় লাশেরও চেকআউট টাইম আছে। লাশ তো আর বলবে না যে সে অনেক আগেই চেকআউট করেছে, বিলটায় একদিনের বাড়তি খরচ দেখানো হয়েছে।

    দেখা করতে এসে সদ্য-পরিচিত আদিত্য বারিক বলেছিল, এসব মেনে নিতে হয় স্যার, সমাজ ব্যাপারটা তো চিরকাল এরকুমই।

    একজন পয়সাঅলা মারোয়াড়ি বুড়িকে অপারেশানের পর মেডিকাল চেয়ারে বসিয়ে, মুখের ওপর ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে, যাতে না ঘুমিয়ে পড়ে, লেডি অর্থোপেডিক সার্জেন হাতমুখ ধুয়ে পোশাক পালটে এসে দেখে, ইনটেনসিভের ইনচার্জ ডাক্তারটা, বুড়িটা যন্ত্রনায় চিৎকার করে প্রলাপ বকছিল বলে, কড়া ডোজের ঘুমের ইনজেকশান দিয়ে অজ্ঞান করে নেতিয়ে রেখেছে। বুকের ওপর মাথা-ঝোলানো ধনী পরিবারের গৃহকর্ত্রীর সামনে, ইনটেনসিভের কাঁচঘরে আধমরা মানুষদের মাঝে দাঁড়িয়ে, দুই ডাক্তারের সে কী বাংলা-ইংরেজি খিস্তিখাস্তা। যিশুর মনে হচ্ছিল নিউইয়র্কের হার্লেমের ফুটপাতে শুয়ে গালাগাল শুনছে।

    কোনো রুগি প্রলাপ বকলে, ঝি-চাকরগুনো মাঝরাতেও তাকে নকল করে ভ্যাঙাত, যেন রাস্তার নির্মম চ্যাংড়ারা লেগেছে পাগলের পেছনে : মাঁ কোঁতায় গ্যাঁলে, জঁল খাঁবো জঁল খাঁবোঁ ডুঁডু খাঁবোঁ, ওঁরে আঁলোঁটা জ্বেঁলেদেঁ, যঁতীন কিঁ এঁলো, ওঁ মাঁ মঁরে গেঁলাঁম, ওঁহ আঁর কঁষ্ট সহ্য হঁয় নাঁ ঠাঁকুর, বাঁবাঁগোঁ আঁর পাঁরছি নাঁ, বাঁড়ি নিয়েঁ চঁল রেঁ, বাঁড়ি যাঁবোঁ, হেঃ হেঃ হেঃ, দাদু, সকালে পোঁদে ডুশ দেবো, আর চেঁচিও না। ভাষার নতুন কলোনাইজারদের বচননাট্য।

    শেষদিন তো কর্মীদের অতর্কিত স্ট্রাইকের ধাক্কায় বিজলিবাতিহীন ইনটেনসিভে একসঙ্গে তিনজন মরে গেল। আন্দোলনের কোল্যাটরাল ড্যামেজ।

    ভেলোর যাওয়া উচিত ছিল, বলেছিল ফাদার নরম্যান, বা কোনো খ্রিস্টান হাসপাতালে।

    হাসপাতালটায় কমবয়সী অগুন্তি নগণ্য মাস-মাইনের প্রশিক্ষার্থী নার্স। সবাই বলে সেবিকা। কলকাতায় শব্দের খেলায় বেশ্যারা যেমন যৌনকর্মী, মুটেরা যেমন শ্রমিক, ঝি-চাকররা যেমন কাজের লোক, তেমন ফালতু কাজের জন্য সেবিকা। শাসক তার শোষণপ্রক্রিয়াকে বৈধতা দেবার জন্য শব্দের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে রূপের প্রতিরূপ।

    শিশ্তথুতনি মেনকা পাইক মাছের কাঁটা বেছে, ভাত মেখে, যিশুর মুখে একগাল পুরে বলেছিল, কাকুদা, তোমায় তো শুয়ে-শুয়ে খেতে হবে এই কয়দিন। মুখের মধ্যে মেনকা পাইকের তর্জনী মধ্যমা অনামিকা যখন যিশুর অস্তিত্বকে স্পর্শ করেছে, মায়ের জন্যে অদম্য মন-কেমনের হাহাকারে আচমকা ফুঁপিয়ে উঠেছে ও, গোপনে। শোকের রক্তাভ শিহরণ কন্ঠকে রুদ্ধ করে ছড়িয়ে পড়েছিল ফুসফুসে।

    মেনকা নিজের নাম বলেছিল ম্যানকা। লেখা না বলে বলত ল্যাখা। জোড়াভুরু ছিপছিপে স্বাস্হ্যবতী, কালোর মধ্যে চটক, অতিসোনালি কানের দুল, প্যাতপেতে লালফুল ছাপাশাড়ি, মুখমণ্ডলে ঘামের ফসফরাস দ্যুতি, দুচোখে দুষ্টুবুদ্ধি বন্যের অদৃশ্য চোরাস্রোত, চকচকে কোঁকড়া চুল টানটান বাঁধা। আরেকজন, কিশোরী-থেকে-তরুণী মেবেকে সঙ্গে এনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল একদিন ভিজিটিং আওয়ারে, আমার বুইন কাকুদা, মহাকরণে কাইজ করে।

    কোন বিভাগে ?

    কুন ডিপাট রে তর ?

    তিন তলায়।

    কৃষি আধিকারিক ডক্টর ত্রিবেদীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে, মেয়েটিকে খুঁজে পেয়েছিল যিশু, বাঁ হাতের আঙুলে ঝোলানো অনেকগুলো কাপ, ডান হাতে চায়ের কেটলি।

    ইশ রে, কাকুদা ! কেমন আছে তোমার শরীর ? একেবারে সেরে গেছে তো ? সম্ভাষণের আহ্লাদ উপভোগ করেছিল যিশু। চালু-চায়ের অনুকাপে চুমুক দিয়ে, বি-বা-দী বাগের আকাশে দেখেছিল, ছাইমাখা মেঘেদের সফরসূচি চূড়ান্ত করতে বেরিয়ে পড়েছে কালবৈশাখী।

    চলি রে কেটলি, একদিন তোদের দুজকে তাজ বেঙ্গলে লাঞ্চ খাওয়াব, মেনকাকে কথা দেয়া আছে। বলে, নিচে নেবে বেরোবার মুখে, দ্রুতগামী ট্রেনের নিশুতি শব্দের মতন বৃষ্টি। ওফুটে কারপার্কের মাকাল গাছে, ঠোঁটে খ্যাংরা নিয়ে ভিজছে স্হপতি কাকপুরুষ। আকাশচুম্বী হাওয়ায় প্রতিভাদীপ্ত বিদ্যুতের স্নায়ুপ্রদাহে, কাতরে ককিয়ে ওঠে কয়েকটা অল্পবয়সী মেঘ।

    ছয়

    ওঃ, মরে গেলুম হুজুর, আহ, আরেব্বাপ, অঁক, ছেড়ে দিন স্যার, আমি কিচ্ছু জানি না স্যার, উঃ বাপরে, আঃ, বাবাগো, আআআআঃ।

    আদিত্যর জন্যে বহুক্ষুণ অপেক্ষারত অরিন্দম অসুস্হ বোধ করছিল ক্রমশ, লকাপ থেকে ছিটকে-আসা আর্তচিৎকারে। বমি-বমি আসছিল। অরিন্দমের কাহিল প্রতিক্রিয়া উপভোগ করছিল টেবিলের ওদিকে মিটিমিটি তাগড়া ভুঁড়িদাস পুলিশ অফিসারটা, বোধয় ইন্সপেক্টার। অনেকবার এসেছে বলে মুখ-চেনা, বলল, আপনি বরং নিচে গিয়ে গেটের কাচে টাটকা হাওয়া নিন। আসলেই পাঠিয়ে দোবো।

    অরিন্দম উঠে পড়ল ব্রিফকেস নিয়ে। দশ কুড়ি পঞ্চাশ একশো টাকার প্যাকেট এনে দিতে বলেছিল অরিন্দমকে ওর অফিস থেকে। আদিত্যর বোনের বিয়ের যৌতুক। থোক টাকা থাকলে উঁচু জাতের ভালো চাকরে পাত্র পাওয়া সহজ, পাত্রী যে জাতেরই হোক না কেন। এই একগাদা টাকা নিয়ে বাড়ি যেতে চায় না অরিন্দম। মা, ছোটো ভাই বা তার বউ জেনে ফেললে কেলেঙ্কারি। পাটনায় থাকতে হঠাৎই একবার ও মাসকতকের জন্যে পাগল হয়ে গিসলো বলে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব।

    গেটের কাছে দাঁড়িয়ে প্রায় ঘন্টাখানেক হয়ে গেল। পা ব্যথা করছিল। এই শহরের চতুর্দিকব্যাপী নিনাদে হারিয়ে যায় আর্তনাদ আর কাতরানির ছোট্টো-ছোট্টো শব্দকণা। আক্রমণ আর আত্মরক্ষার উপস্হিতি সারাটা শহরের চরাচর জুড়ে। পুরুষকর্মীদের চাউনি রুমার দিয়ে মুখের ওপর থেকে পুঁছতে-পুঁছতে বাড়ি ফিরছে আলগা চটকের গৃহবধু কেরানি। সঙ্গিনীর সাথে আলোচনার বিষয়বস্তু গণেশঠাকুরের শুঁড় ডানদিকে শুভ না বাঁদিকে। ক্ষীণস্বাস্হ্য সরকারি বাস চলে গেল, নাগরিক বোঝাই, ফোঁটার মতন মানুষ ফেলতে-ফেলতে, জিরোবে গিয়ে ঘণ্টাখানেকের জ্যামে। বাসে উঠলেই লোকে বসতে চায় এ শহরে, যুবকরাও, যাতে কাঁধে কাঁধ না মেলাতে হয়। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে অভ্যাসমতন পথচারিণীদের ওপর চোখ বোলাচ্ছিল অপ্রস্তুত অরিন্দম। খিনখিনে ট্যাক্সির কাতার। ডিজেলের নাকজ্বালানো ধোঁয়া। ধোঁয়া-ধুলোয় মুখ ভার করে আছে আকাশ।

    অফিসে আবার এলেন কেন অরিন্দমদা ? পেছন ফিরে আদিত্যর থমথমে চেহারা দেখতে পেল অরিন্দম। মানুষকে নিজে হাতে পেটানোর আহ্লাদ থেকে, মুখের আনন্দময় প্রতিভা থেকেই বেশ বোঝা যাচ্ছে, আর কোনও দিন মুক্তি পাবে না আদিত্য। প্রতিনিয়ত ওর দরকার পড়বে প্রহারযোগ্য দেহ, সারাজীবন। রিটায়ার করলে কী করবে ও ?

    তোমায় তো বাড়িতে পাওয়া যায় না।

    তা নয়। এসব টাকাফাকা অফিসে রাখতে চাই না। দেখলেই তো হিংসে।

    কোয়ার্টারে নিয়ে গিয়ে রেখে দাও। ছুটি তো ? এখুন ?

    কী যে বলেন না, এখুনও কবুলতি লেখানো হয়নি। চলুন ওফুটে চায়ের দোকানটায় একটা ছেলে আছে আমাদের গ্রামের। ওর হাতে পাঢিয়ে দেব। আদিত্য বিব্রত বোধ করে অরিন্দমের সারল্যে। নোটগুনো কোথা থেকে এলো, বড়ো মাপের নোট কেন, কিছুইকি সন্দেহ করে না অরিন্দমদা ? টিকে আছে কী ভাবে অমন অনর্থক বোকামি নিয়ে !

    বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট ব্লকের ধর্মশিবপুর গাঁয়ে, অজয় নদের তীরে, আদিত্য বারিকের বাস্তুভিটে। ঝিলুট থেকে কাঁচা রাস্তা আছে গ্রামে যাবার, তৃণমূল-কংরেস-সিপিয়েম মকদ্দমাবাজিতে আধখ্যাঁচড়া। সপ্তম পাঁচসালায় রাস্তাটা হবার আগে গাঁয়ে ফুলপ্যান্ট পরে ঢোকা যেত না বর্ষাকালে। কাঁধে বেলবটম, বাঁহাতে জুতোজোড়া, আন্ডারওয়্যার পরে ঢুকতো কলকাতা-বর্ধমানের কুটুমরা। ওদের গ্রামটা বাদে আশপাশের গ্রামগুনো মুসুলমান চাষিদের। জোতদার বর্গাদার কামলা সবাই মুসুলমান। ধর্মশিবপুরে আজ যাদের বাস, সেসব শীল, কাঁসারি, বারিক, কর্মকার, সাহা, শূর, পাল, কুণ্ডু, দাঁ, সাঁপুই, বায়েন, গায়েন, সরদার, পোড়েল পরিবার এসেছিল গঙ্গারাজা তৃতীয় অনঙ্গভীমের মন্ত্রী বিষ্ণু সিংহের রাঢ়দেশ অভিজানে সঙ্গী হয়ে। সেসব গৌড়ীয়দের প্লেস অব ডোমিসাইল এখন রাঢ়।

    র‌্যাদক্লিফ সায়েবের ভয়ে নেয়ামত মণ্ডল পালিয়েছিল পাকিস্তানে। পরে হাওয়া বুঝতে এলে নরহরি মণ্ডল নেয়ামতের একশো ছেচল্লিশ বিঘে জমি কিনে নিয়েছিল পচা আলুর দরে, মগফেজের দলিলে তারিখের গোলমাল করে। পাকা দলিল হয়নি, তাই রেজেস্ট্রি হয়নি। এর মধ্যে একশো বিঘে ছিল খোদখামার আর ওয়াকফ চিরাগি জমি, যা নরহরির ছেলে সত্যসাধনকে দিয়ে খাস লিখিয়েছিল ভূমিসংস্কার দপ্তর, আর যা রাঢ়ের লোক পায়নি। চাষবাস না করেও তার অনেকটা পেয়ে গেসলো সন্তোষ দাসের মামাতো ভাই। সন্তোষ দাস এ-তল্লাটে পার্টি করার জন্যে এসেছিল সত্তর সনে। বে-থা করে থেকে গেল। নিজেদের এখুন দাশ লেখে, বলে কায়েত।

    প্রথমে মুসুলমান গাঁয়ে-গাঁয়ে বকবক বকবক করে গান্ধির কোল থেকে মার্কসের কোলে চাষিগুনোকে তুলে নিয়ে গিসলো সন্তোষ জেঠু। মুসুলমানগুনো তো চালাক কম নয়, আগাম টের পায়। ওরা সদাসর্বদা শাসকের সঙ্গে আছে। কী লাটসায়েব, কী ফজলুল হক, কী নাজিমুদ্দিন, কী সুরাবর্দি, কী বিধান রায়, কী জ্যোতি বসু। হলে হবে কী ! কোথ্থেকে একদল কিশতিটুপি-পরা লিগি এসে ফিসফিস-গুজগুজ চালালে যে মুসুলমানগুনো আর সাউ সরদার নাইয়া ঘরামি পদবি রাখতে চায় না। মেটে মসজিদগুনোকে ওব্দি সবুজ তেলরঙে ছুপিয়ে ফেলেচে।

    প্রতিভা ছিল বটে সন্তোষ জেঠুর, বুঝলেন অরিন্দমদা, নইলে সহদেব মন্ডলের ছেলেটা নকশাল হয়ে ওর মুন্ডু কেটে লটকে দিত না, নিজের গ্রামর অরিন্দমকে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে বলেছিল আদিত্য। শৈশবে দেখা সেই দৃশ্য আজও, সময় বুঝে, আদিত্যকে কাবু করে। বুঝলেন অরিন্দমদা, আমার মামার বাড়ি ছুতোর-গাঁ গ্রামের পরামাণিক শ্মশানসাধুরা মানুষের মুণ্ডু ঝুলিয়ে চোত সংক্রান্তির ভোরে যে নাচ দেখাত, তার চে ভয়ের দৃশ্য ছিল বাঁশের খুঁটিতে টাঙানো সন্তোষ জেঠুর কাটামুণ্ডু। সারারাত শিশিরে-ভেজা জলজ্যান্ত মুণ্ডুটা চোখ রাঙাচ্ছিল, যে দেখতে গেছে তাকেই।

    সেই কবে, ছোটোবেলাকার কথা, পরের বছর শ্মশানসাধুদের হাতে ঝোলানো মুণ্ডুগুনোর মধ্যে দুটো ছিল সহদেব মণ্ডলের দুই ছেলের। ছোটোটা পূর্বস্হলী, ওই যে, গেছেন তো আপনি, ওখানে গুলি খেয়ে মরেছিল। বড়োটার ধড় পাওয়া গিসলো হুগলির শেষপুকুর গ্রামে। বুঝলেন অরিন্দমদা, সাধুরা অনেক দিন ধরে মাথাগুনো মাটিতে পুঁতে রেখেছিল তেল-সিঁদুর মাখিয়ে, গাজনাতলায় নাচবে বলে। এখুন তো কাটামুণ্ডু বেআইনি হয়ে গেছে বলে সাধুরা কুলি দিয়ে কাজ চালায়, দুধের বদলে ঘোল, আর কি। তার ওপর নাপতেরা আর কেউ সাধু হতে চায়না। তার চেয়ে গেরুয়া পরে হিন্দু পলিটিক্স করলে তবু কিছু পয়সাকড়ি হয়। চলুন না মামার বাড়ি, ব্রামভোন অতিথি পেয়ে মামামামিদের আনন্দই হবে।

    আমার তো গায়ে পৈতে-ফৈতে নেই।

    আরে ও তো পুরুতমশাইকে সকালে অর্ডার দিলে বিকেলে সাপ্লাই দিয়ে দেবে। পুরুতটা আবার বিজেপি, আগে সিপিয়েম করত। সিপিয়েমের পুরুত আসে কালনা থেকে। লোকটা স্টেট ব্যাংকে সিকিউরিটি গার্ড। চলুন না, জিপের ব্যবস্হা করি থালে।

    চলো যাওয়া যাক, ওয়েস্ট বেঙ্গলের অত ইনটিরিয়রে যাইনি কখুনও।

    খড়্গেশ্বরী নদীর ধারে ছুতোর-গাঁ গ্রামে আদিত্যর মামার বাড়ি। ঈশানেশ্বরের খেসসা গান, ফোকলা দাঁতে, আদিত্যর দিদিমার উদ্ভাসিত কন্ঠে, পুলকিত করেছিল অরিন্দমকে। দুই মামা মিলে বর্ধমানে ফার্নিচারের দোকান খুলে, বেতাহাশা কাঁচা পয়সা করেছে, জমিজিরেত, ট্রলিট্র্যাক্টর, চারাকাটার যন্তর, বিলিতি গাই, দুটো শ্যালো, আড়াই বিঘের পুকুর। আদিত্য যখুন বাবার কাঁধে চেপে মামার বাড়ি যেত, মামারা এত সচ্ছল ছিল না। কোচবিহার থেকে কাঠের টানামালের ব্যাবসা করে দিন ফিরিয়ে নিয়েছে। দহরম আর মহরম উঁচু মহলে। এফিডেভিট করে রায় পদবি নিয়েছে। মেয়েদের জন্যে ফরসা উদারচেতা বর পেয়েছে, মোটা টাকা যৌতুক দিয়ে।

    বুঝলেন অরিন্দমদা, ছোটোমামা দৌড়ঝাঁপ না করলে, এ এস আয়ের ইনটারভিউটা গুবলেট হয়ে যেত। দুরাত্তির ওর মামারবাড়িতে থেকে, অরিন্দমের মনে হয়েছিল, আদিত্যর মামারবাড়ির সবায়ের গা থেকে র‌্যাঁদামারা কাঁচা কাঠের গন্ধ বেরোয়। সত্যি। বড়োমামার শালকাঠ, বড়োমামির সেগুনকাঠ, ছোটোমামার নিমকাঠ, ছোটোমামির শিশুকাঠ। মাতুলালয় যেন ছালছাড়ানো গাছের জঙ্গল।

    কোচবিহারে তুফানগঞ্জে, মানসাই গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান তো মামাদের, মানে আমার মায়ের, মামাতো ভাই। একবারটি ওখানেও নিয়ে যাব আপনাকে। লুকিয়ে-লুকিয়ে আসাম থেকে কাঠ আসে। অবশ্য কাকেই বা লুকোনো। বনকর্মীরা ব্যবস্হা করে, মাস মাইনে পায়।

    তোমাদের শিডুল হপ্তা আর ওদের শিডুল মাস ?

    বিক্কিরি বাবদ তোলা দিতে হয় আলফা আর বোড়োদের, সোনার বাংলা থেকে চিনের আর পাকিস্তানের বোমাবন্দুক আনার জন্যে। একটু ইদিক-উদিক হলেই ডুয়ার্সে এলেমজি চলে। কুমারগ্রাম, বকশির হাটে ছানবিন হয়। হাঃ হাঃ, পুলিশকেও তো দিতে হবে। ছোটোমামা নিজেকে টিম্বার মাফিয়া হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসে, কিন্তু কাঠের ব্যাপারিরা সে স্বীকৃতি দিতেই চায় না।

    কলকাতায় না থাকলে কোনো কিছুতেই স্বীকৃতি মেলে না।

    ছুতোর-গাঁ’র মুসুলমানগুনো ধর্মশিবপুরের মুসুলমানগুনোর চে ফরসা। করিম মুনশি আর ফরিদ মোল্লার বাড়ির সবাই ফরসা আর ঢ্যাঙা। দাদু বলে ওরা সব খাঁটি আর আমাদের গাঁয়ের কেলটেগুনো পাতি। ফরসা না হলে আমেদ মামুদ করিম জালাল নামগুলো ঠিক মানায় না। বুঝলেন অরিন্দমদা, ছুতোর-গাঁ’র নাম পালটে রায়গ্রাম রাখার দৌড়ঝাঁপ চলছে। বড়োমামা বলছিল, ছুতোর-গাঁ’র কুসুমেটে তেঁতুলে, দুলে, বাগদি, হাড়িয়া সব এফিডেভিট করে রায় হয়ে গেছে। মামাদের চে উঁচু পরিবার বলতে উগ্রক্ষত্রিয় মন্ডলরা আর ব্রামভোনরা।

    জমিদাররা যখুন ছিল, তখুন স্হাপত্য বলে একটা ব্যাপার ঢুকেছিল গ্রামগুনিয়। এখুন তো গ্রামে-গ্রামে তোমার মাম,আদের মতন পয়সাওলা লোক কম নয়। অথচ কোনো নতুন স্হাপত্য দেখা দিল না উত্তরঔপনিবেশিক পশ্চিমবঙ্গের পল্লিসমাজে। গরিব সাজাটাই এখুন গ্রামবাংলার স্হাপত্য।

    ভাগ্যিস অর্ডার দেওয়া পৈতেটা পরেছিল অরিন্দম। আদিত্যর দিদিমা-মাইমা-ছোটো বউদির কাছে ওটার জন্যে অনাস্বাদিত খাতির চলছে। অরিন্দমের চেয়ে বয়সে ঢের বড়ো ওর দিদিমা আর মামিরা চান সেরে এসে হঠাৎ পায়ের কাছে মেঝেয় ঢিপ-ঢিপ। এই জন্যেই গ্রামে যেতে অস্বস্তি হয়। জাতিপ্রথা বেশ জেঁকে টিকে আছে ভেতরে-ভেতরে, নানা জাতের মানুষ এখুনও এক সারিতে খেতে বসতে চায় না, বামপন্হী রাজনীতির শেকড়ের ফ্যাঁকড়া ছড়ালেও । অবশ্য ছোটো ভায়ের বিয়ের সময়েও পরতে হয়েছিল রেডিমেড পৈতে।

    তোমার বড়ো মামার ছেলে-বউকে দেখলুম না ?

    বড়দা-বউদি ফিবছর পুজোয় চাইবাসায় শ্বশুরবাড়ি চলে যায়। ওখানে দশজন জামাই মিলে খুব হইহল্লা হয়। সত্যি, আরে স্ট্রাইক করেনি আগে। পনেরো বছর বিয়ে হয়েছে বড়দার, কিন্তু কোনও বার পুজোয় নিজের মা-বাপের কাছে থাকেনি।

    তুমি বিয়ে করে কী করো দেখা যাক।

    পুলিশে কাজ করে বিয়ে করার ঝামেলা আছে। আপনি করে ফেলুন না বিয়েটা। ব্রামভোন বাড়িতে কুচ্ছিত মেয়েরও রূপ থাকে। ছুতোর-গাঁয়ে ব্রামভোনরা সব ঈশানেশ্বরের পুজুরি, বুঝলেন তো। স্বাধীনতার পর সব মন্দিরের দখল নিয়ে নিয়েছে ব্রামভোনরা। দুলেদের ধর্মরাজের মন্দিরটা নিয়েছে। দেয়াসি তাঁতিরা বুড়ো-গাছতলায় কালাচাঁদ মন্দিরের সেবায়েত ছিল ; তাদের হটিয়ে সেটাও হাতিয়েছে। ব্রামভোনগুনোই দেশটাকে ডোবাল। জহোর্লাল তো ব্রামভোন ছিল, তাই না ?

    একটা মন্দিরের মধ্যেই অতগুলো পুতুল ডাঁই করে রাখা দেখলুম। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ চলছে নাকি ? শ্রীহীন দেবতাদে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার অবশিষ্টাংশ !

    আপনাদের আজগালকার ব্রামভোনদের ঠাকুর-দেবতা সম্পর্কে বড্ডো অচ্ছেদ্দা। ওগুনো ধর্মঠাকুরের মূর্তি। মামারবাড়ির এদিকটায় অনেক-অনেক মন্দির ছিল আগে। এখন আর কে দেখাশোনা করবে বলুন ? সেসব ঠাকুরের থান থেকে এনে রেখেছে ওই মন্দিরে। কত মূর্তি তো চুরি হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে গেল । অবশ্য বিদেশে গিয়ে যত্ন-আত্তি পায় মূর্তিগুনো, সেও তো একরকুম পুজোই, বলতে গেলে। সেবায়েতরা আজগাল দুর্গাপুর, আসানসোল, বর্ধমানে রিকশা চালায়, হকারি করে। বর্ধমানে দেখলেন তো, ঠেলায় চাউমেন বেচছে, আমায় যে দাকলে, ও ছেলেটা তাঁতি বাড়ির।

    আমাদের ধর্মশিবপুর গাঁয়ের অনেকে পাততাড়ি গুটিয়ে রানিগঞ্জ, আসানসোল, নিরসা, গোবিন্দপুর, ধানবাদ গিয়ে দুপুরুষ কয়লাখনিতে কুলিগিরি করছে। এমন সাতবাষ্টে হাড়গিলে চেহারা করে ফেলেছে, যে দেখলে টের পাবেন না বাঙালি না বিহারি, হিন্দু না মুসুলমান। আমরা তো ঠাকুদ্দার জন্যে পার পেয়ে গেলুম, নইলে কী দশা যে হতো। তল্লাটের মুসুলমানগুনো তো সোশালিস্ট ছেড়ে মুসলিম লিগে ঢুকে পড়েছিল, বুঝলেন, তার মধ্যেই ঠাকুদ্দার দৌলতে আমাদের ফ্যামিলির নামডাক ছড়িয়ে পড়েছিল সেই ভেদিয়া বেরাণ্ডা ছাড়িয়ে নিগন কৈচর উজানি কোগ্রাম ওব্দি। ঠাকুদ্দা তো বাবাকে ওয়ার্ধা আশ্রমে নিয়ে গিসলো। জহোর্লালের কোলে-বসা বাবার ফোটো আছে। তখনও টাক পড়েনি জহোর্লালের। সেসব এখন বাক্সবন্দি। আর বোধয় বেরুবে না।

    তোমার পুলিশে চাকরি এবার অন্যরকুম ইজ্জত এনে দিয়েছে, কী বলো ?

    ধুৎ, ইজ্জত-টিজ্জত নয়। ভয় পায় লোকে। বেশ ভাল্লাগে লোকেদের ভয় পাওয়াটা। শ্রদ্ধার ভালোলাগার থেকে ভয়ের ভালোলাগাটা সুপিরিয়র। হাঃ হাঃ।

    তুমি ছুতোর-গাঁ, ধর্মশিবপুর, মঙ্গলকোটের অ্যাতো গল্প জানলে কোথ্থেকে ? ঠাকুদ্দার কাছে ?

    না-না। ইশকুলে আসলাম স্যারের কাছে। ভুগোল পড়াতে-পড়াতে লোকাল ইতিহাস পড়িয়ে দিত। নিজেকে বলত রাঢ়ীশ্রেণি পাঠান। পূর্বপুরুষ কে একজন মোহম্মদ শামিম খান নাকি আলিবর্দি খাঁর সেনাদের সঙ্গে আরবি ঘোড়ায় চেপে বর্গিদের তাড়াতে-তাড়াতে এসে পৌঁছেছিল কাটোয়ায়। গঙ্গারাম নামে একজন কবি ছিল আগেকার কালে, তার লেখা মহারাষ্ট্রপুরাণে আছে নাকি গল্পটা। আসলাম স্যার তো কুচকুচে কালো। আর ঘোড়াটার টাট্টু বংশধররা এখন মন্তেশ্বর কিংবা দাঁইহাটে এক্কা টানে। হাঃ হাঃ, এক্কাও উঠে গিয়ে চাদ্দিকে ভ্যান রিকশা অটো ম্যাক্সি-ট্যাক্সি চলছে। আসলাম স্যার আজও ভূগোলের ক্লাসে ইতিহাস পড়ায়। ইতিহাস তো গপপো, বানিয়ে নিলেই হল। ভূগোল তো তা নয়।

    এখুনও পড়াচ্ছেন ? স্কুলমাস্টাররা তো শুনি রিটায়ার করে পাঁচসাত বছর ওব্দি পেনসন পাচ্ছে না।

    টাকের ওপর টুপি পরে আঙুল দিয়ে সাদা ধবধবে দাড়ি আঁচড়ায় আর দুপুরে ছেঁড়া আসন পেতে দেয়ালমুখো নামাজ পড়ে টিচার্স রুমে। এখুন তো টিচার্স রুম বলতে পশ্চিমের নোনা ইঁটের স্যাঁতসেঁতে ঘরটা, প্রায়ই ঠান্ডা খড়ামারা মেঝের ওপর দিয়ে গোখরো সাপ এদিক থেকে ওদিক নিশ্চিন্তি মনে চলে যায়। ছাত দিয়ে জল পড়ে। এখুন তো একটাও ক্লাসঘরে দরোজা-জানলার আড়কপাট নেই।

    আদিত্যর মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল অরিন্দম। নিজেকে ঘিরে গ্রেটনেসের বুদবুদ তৈরি করতে চাইছে ও, আদিত্য। সবাই, ওর চেয়ে ছোটো, দরিদ্র, নিকৃষ্ট, দুস্হ, শ্রীহীন, অবহেলিত। অনেক মানুষ প্রেমহীনতাকে ভালোবাসে। অরিন্দম বলল, তুমি তো নিজেই স্কুলে মাস্টারির চেষ্টা করেছিলে, বলেছিলে একবার।

    ওঃ, সে এক কেলো হয়েছিল বটে। মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়া হাইস্কুলে গিসলুম ইন্টারভিউ দিতে। এগারোজন প্রার্থী ছিল, বুঝলেন। চৈতন্য খামরুই বলে এক প্রার্থীর তো পাঞ্জাবির তলায় ছেঁড়া গেঞ্জি ওব্দি দেখা যাচ্ছিল। কুন্তু গুজগুজ ফিসফিস হাসাহাসি থেকে দশ মিনিটেই আমরা টের পেয়ে গিসলুম যে স্কুল কমিটি ওই পদের জন্যে আগে থাকতেই লোক ঠিক করে ফেলেছে। ইন্টারভিউটা লোকদেখানে।

    আমরা তো ইন্টারভিউ না দিয়ে বাস ধরার জন্যে ফিরে গিয়ে গ্যাঁজাচ্ছিলুম রাস্তার ধারে। হঠাৎ না, হইহই করতে-করতে তিরিশ চল্লিশজন লোক এসে ঘিরে ধরে কিল চড় লাথি থাপ্পড় কঞ্চিপেটা আরম্ভ করে দিলে। আমি ভাবলুম আমাদের ডাকাত ভেবে গণপ্রহার আরম্ভ হল বুঝি। আজগাল গ্রামে শত্রুপেটানোর এটা সবচে সহজ আর সস্তা কায়দা বেরিয়েছে। ভাবলুম আর বোধয় বাঁচার উপায় নেই। সব তো পাঁচ ফিটের গাঁইয়া বাঁটকুল। তিনটেকে দিলুম একটা করে পাঞ্চ, বুঝলেন। কেঁউয়ে কুকুর হয়ে কাৎ।

    তখুন ওদের নেতামতন লোকটা হুকুম ঝাড়লে যে ইন্টারভিউ না দিয়ে ফেরত যেতে পারবে না কেউ। ঘাড় ধরে হিড় হিড় করে, জামা খামচে, পেছন থেকে ঠেলে, স্কুল ওব্দি ধাক্কা দিয়ে-দিয়ে নিয়ে গিসলো আমাদের, পেছন-পেছন গ্রামের প্রায় একশো হাফল্যাংটো কচিকাঁচার দল, নেড়ি কুকুরের ঘেউ ঘেউ, একদল পাতি হাঁস গোঁতা খেয়ে নেবে গেল পুকুরে, তাইতে তিন-চারটে রুই-কাতলা লাফিয়ে উঠল, উড়িসশালা, সে অভিজ্ঞতা ভোলা যাবে না। কয়েকজন চাষি বউ মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসছিল। ইন্টারভিউ-ফিন্টারভিউ কিসসু নয়। হেডমাস্টারের ঘরে একটা রেজিস্টারে সবাইকে দিয়ে সই করিয়ে নিলে। ইন্টারভিউ না দিয়ে সবাই বাড়ি ফিরে গেলে তো শিক্ষক বাছাই বাতিল হয়ে যেত। তাই অমন হেনস্হা। কয়েকটা লোকের মুখ মনে রেখেছি। কখনও যদি পেয়ে যাই কলকাতায় কোথাও তো পোঁদের চামড়া তুলে নেব।

    এক্ষুনি লকাপে সেই কাজটা করছিলে বুঝি ? কী করে পারো ? আমার তো গলা শুকিয়ে বুক ধড়ফড় করতে লাগল বলে বেরিয়ে এলুম। তোমার সঙ্গে এবার বোধয় আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে। বলার পর, অরিন্দমের খেয়াল হল যে এই কমবয়সি আদিত্য ছাড়া ওর আর বন্ধু নেই কোনও ; এমন কেউ নেই যার কাছে গিয়ে বসর গল্প করা যায়। নানারকুমের গোলমালে আক্রান্ত হয়ে উঠেছে অপরিহার্য।

    আরে, এই ক্রিমিনালগুলোকে আপনি জানেন না। মহাফেজখানা থেকে কিছু গুণ্ডা ফাইল বের করিয়ে দেবো আপনাকে পড়তে, তাহলে টের পাবেন। আদিত্যর মুখময় ঘুরঘুর করছিল বিমূর্ত অভিভাবকত্বের গর্ব। তাস যেভাবে তার তুরুপ লুকিয়ে রাখে, সেভাবে হাসির মৃদুতা ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে রেখেছিল আদিত্য।

    অরিন্দম যেন হেমন্তের স্মৃতিভারাক্রান্ত কাঠফড়িং। বলল, জবাবদিহির সুরেই বলল, করেছে কী লোকটা ? শুনি।

    তিলজলার গোলাম জিলানি খান রোডের নাম শুনেছেন ? গেছেন ওদিকে কখনও ? র‌্যাফ নেবেছে। দুটি পাইপগান, রামদা, আর একগাদা বোমা পাওয়া গেছে। পুলিশের ওপর বোমা চালিয়েছে, অ্যাতো বুকের পাটা। কন্সটেবল গোপাল দাসকে তো চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে ভরতি করতে হয়েছে। শঙ্কর ঘোষ, কুমার দত্ত, এরশাদ খান, শঙ্করনারায়ণ পাণ্ডে, ওদেরও অল্পবিস্তর চোট লেগেছে। আসল দুটো খুনে হাওয়া হয়ে গেছে বোমার ধোঁয়ায়। চারটে হারামজাদাকে ধরেছি আমরা।

    তিলজলা ? অরিন্দমের মুখমণ্ডল উদ্ভাসিত।

    কেন ? তিলজলায় আবার কী আছে ?

    তিলজলায় একজন থাকে। আমি তাকে কখুনও দেখিনি। তার বিষয়ে জানিও না কিছু। এমনকী নামও জানি না। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। মনের ভেতর প্রেমের ফাঁকা জায়গাটায় বসিয়ে রেখেছি তাকে।

    আদিত্য স্তম্ভিত। রেশ কাটলে বলল, আপনাদের এইসব ন্যাকান্যাকা পারভারটেড কথাবাত্রা শুনলে আমার পিত্তি জ্বলে যায়।

    সাত

    নিঃস্ব, সন্ত্রস্ত, অভুক্ত ভবেশকাকা কাঁধে খুশিদিকে চাপিয়ে বর্ডার স্লপি হাতে বনগাঁ হয়ে শ্যালদা প্ল্যাটফর্মে উঠেছিল। জহোর্লাল ওদের মাটি থেকে ওদের উপড়ে ওদের দুরবস্হা দেখতে গিসলো নিজের চোখে। শ্যালদা থেকে চটকলের গুদামে। সেখান থেকে বালিগঞ্জের যশোদাভবন ক্যাম্প। তারপর কলকাতার দক্ষিণে ধানখেত আর জলাজমিতে যে যেমন ঠাঁই নিতে পারে। যিশুর দাদুর অনেক ধানিজমি ছিল ওদিকে। মুসুলমান ভাগচাষিদের বাস ছিল। এখুন তো সেসব জলাজমির নাম হয়েছে সূর্যনগর, আজাদগড়, নেতাজিনগর, শ্রীকলোনি, গান্ধি কলোনি, বাঁশদ্রোণি, বিজয়গড়, রামগড়, বাঘাযতীন, কত কী। যিশুর দাদুর ইংরেজ বন্ধুরা ডিঙি চেপে পাখি শিকারে যেত সেসব জলাজমিতে।

    আচমকা মানুষের ঢলে ভরে যেতে লাগল দিগন্ধ ওব্দি ধানখেত আর জলাজমি। ঠ্যাঙাড়েরা রাতবিরেতে তুলে দেবার চেষ্টা করত লোকগুনোকে। যিশুর দাদুও ভাড়াটে লেঠেল আর তাগড়া সব বৌবাজারি গুণ্ডা লাগিয়েছিল, গল্প করেছিল ভবেশকা। ভবেশকারা যে জায়গাটায় থাকত, লেঙেল-গুণ্ডাদের অনেকদিন ঠেকিয়ে জিতেছিল বলে জায়গাটার নাম দিয়েছিল বিজয়গড়। বারোভূতের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিল জিতে। নিজেরা ভারি-ভারি রোলার টটেনে রাস্তা বানিয়েছিল ভবেশকারা। রাত্তিরে পাহারা দিত দল বেঁধে। সেসব রাস্তায় সাইকেলে ঘুরেছে যিশু, দিনের বেলায়। বাঘাযতীন, বিদ্যাসাগর, শান্তিপল্লি, চিত্তরঞ্জন, রিজেন্টপল্লি, বিবেকনগর, দাশনগর, আদর্শপল্লি, রামকৃষ্ণ উপনিবেশ, বাপুজিনগর, বঙ্গশ্রী, নেলিনগর, শহিদনগর, মিত্রবাস, পোদ্দারনগর, মনেও নেই সব। এখুন গিজগিজ করছে মানুষ, উঁচুউঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি, ধনীদের আবাসন, চেনাই যায় না।

    ভবেশকা ছিল অসাধারণ নেতা। চলে আসার সময়ে রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজে ছিল ফার্স্ট ইয়ারে। পোড়-খাওয়া তাঁবাটে পেশি, ড্যাংডেঙে হাত-পা, চওড়া ছাতি, কোঁকড়াচুল ভবেশকা রোজই বেরিয়ে যেত আন্দোলন করতে। খুশিদিকে যিশুর মায়ের কাছে রেখে যেত। এরকুম নেতাকে হাতে রাখা ভালো, এই ভেবে বাবা বলেছিল, যিশুর সঙ্গে খুশিও যাক না স্কুলে, টিউটর রেখে নিচ্ছি না হয়। প্রস্তাবে ভবেশকার কীইই রাগ। বললে, তাহলে আর আপনাদের বাড়ি আসব না। মিতালিদের বাড়ি রেখে যাব।

    ট্র্র্যামের ভাড়া যখুন এক পয়সা বাড়ল, প্রথম ট্র্যামটায় ভবেশকাই আগুন ধরিয়েছিল, পুলিশ রেকর্ডে আছে। পাকিস্তানি ওপার বাংলা থেকে তখুন সত্তর হাজার লোক এসে কলকাতায় ফ্যা-ফ্যা করছে, অথচ রোজগারপাতির কাজ নেই। তখুনও কলোনিগুনো পশ্চিমবঙ্গে ছিল, কলকাতা হয়নি। নিত্যিদিন কলকাতায় গিয়ে পিকেটিঙ, ট্র্যাম জ্বালানো, বাস পোড়ানো, ব্যারিকেড, বোমা, অ্যাসিড বালব, মিছিল, র‌্যালি। বোমা বানাতে গিয়ে ভবেশকার কড়ে আঙুল উড়ে গিসলো। খুশিদির কান্নাই থামে না। কাঁদলেই টোল পড়ত থুতনিতে।

    তেসরা জুলাই জ্যোতি বসু, গণেশ ঘোষ, জ্যোতিষ জোয়ারদার, সুবোধ ব্যানার্জি গ্রেপ্তার হতে, কালিঘাট ট্র্যাম ডিপো, শোভাবাজার-চিৎপুর ক্রসিং, একডালিয়া বাজার, শ্যামবাজারে তুলকালাম হয়েছিল। রাত্তিরে বাড়ি ফেরেনি ভবেশকা। টিয়ারগ্যাসের শেল কুড়িয়ে এনে দিত ভবেশকা। খুশিদির মোটে ছাব্বিশটা জমেছিল। যিশুর আটচল্লিশটা। দুটো আজও আছে ডাইনিং টেবিলে নুন-গোলমরিচ রাখার কাজে। ভবেশকা ইউসিআরসি আর ট্র্যামভাড়া বৃদ্ধি কমিটি, দুটোতেই ছিল। অক্টারলোনি মনুমেন্টের গোড়ায় দাঁড়িয়ে রোজ বক্তৃতা দিতে যেত আর তারপর ভিড়ভাঙা মিছিলে শ্লোগান। বক্তৃতা দিতে-দিতে অল্প সময়েই কলকাতার কথা বলার টান রপ্ত করে ফেলেছিল।

    পনেরো জুলাই হয়েছিল সাধারণ ধর্মঘট। সেই প্রথম বাংলা বন্ধ। উৎসব। পশ্চিমবাংলার বাঙালির জীবনের মূল্যবোধ পালটে গেল। কর্মসংস্কৃতি পালটে গেল।

    একদিন বিকেলে বাবার হাত ধরে গড়ের মাঠের মিটিং দেখতে গিসলো যিশু। দ্রোহের জ্যোতিতে মথিত ভবেশকার মুখ মনে পড়ে। ষোলোই জুলাই কলকাতার রাস্তায় সেনা নেবে গেল। তখুনকার দিনে র‌্যাফ ছিল না। শোভাবাজারে ভিড়ের ওপর গুলি চলেছিল আঠেরো তারিখে। প্রফুল্ল সেন ভয়ে এমন কেলিয়ে গিসলো যে বিদেশে আরাম আদ্দেক বাকি রেখে তিরিশ জুলাই তড়িঘড়ি ফিরতে হয়েছিল বিধান রায়কে। জহোর্লালের তো তখুন কানে-তুলো চোখে-ঠুলির রোগ, ভবেশকা বলেছিল। আইন ভাঙা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু সবাই মিলোএ ভাঙা আইন আর জোড়া লাগে না। যত আইনই তৈরি হোক পশ্চিমবঙ্গে, সেই থেকে, ভেঙে-ভেঙে ঝনঝন করে পড়ে যায়। আদালতের জজকে চটি ছুঁড়ে মারে। টেলিফোনে হুমকি দেয়। উপায় নেই। উপায় যে ঠিক কী, কেউই জানে না। চায় না জানতে।

    চিনের সঙ্গে যুদ্ধের সময়, ভারতরক্ষা আইনের প্যাঁচে যখুন টালিগঞ্জ থানার সেপাইরা অশোকনগরে পঁয়তাল্লিশটা আস্তানা ভাঙতে এলো, তখুন ছুটি হয়ে গেসলো নাকতলা স্কুলে, যাতে ছাত্র আর টিচাররা প্রতিরোধে শামিল হয়। সন্তোষ দত্তর চেলা ছিল ভবেশকা। যুগান্তর বলতে যেটুকু টিকে ছিল, তা-ই করত দুজনে। পুনর্বাসন মন্ত্রী আভা মাইতিকে ওনার অফিসে গিয়ে ধমকে ছিল ভবেশকা। কী রোয়াব, ওহ, দ্যাখে কে !

    বিধান রায়ের আমলে যে খাদ্য রায়ট হয়েছিল, তা আবছা মনে আছে যিশুর। তখুন তো বর্গা আইনও হয়নি, পিএল চারশো আশির ল্যাং খেয়ে সবুজ বিপ্লবও হয়নি। ধানচালের কেনাবেচা সরকারি আওতায় নিয়ে গিয়ে গুবলেট করে ফেললে বিধান রায়। বাজার ধেকে উবে গেল চাল-গম। খাবার খুঁটতে কলকাতার ফুটপাথ ভরিয়ে ফেলেছিল গাঁয়ের লোকে, যে লোকগুনো কানিতে মাটির রং নিয়ে জন্মায়। ভবেশকা বিধান রায়কে মুখের ওপর বললে, সংগ্রহ বিতরণ তদারকির জন্যে গণসমিতি গড়া হোক পাড়ায়-পাড়ায়। বিধান রায় ভাবল, অ, বিরোধী দল পেছনের দরজা দিয়ে সেঁদোতে চাইছে। খাদ্যমন্ত্রী তখুন প্রফুল্ল সেন। তিরিশ হাজার পুলিশকে ধানচাল যোগাড়ের তদারকির কাজে লাগিয়ে দিলে। দাম বাঁধার হুকুম আর লেভি অর্ডার তুলে নেওয়া সত্ত্বেও, চাল গম ডাল তেল মশলার দাম বাড়তে লাগল। হু হু। হু হু। বিধান রায়ের বুকের ব্যারাম ধরিয়ে দিলে প্রফুল্ল সেন আর অতুল্য ঘোষ। খাদি-খদ্দর জামাকাপড় তো উঠেই গেল পশ্চিমবঙ্গে।

    গোলমাল আঁচ করে শুরু হল ভবেশকাদের ধরপাকড়। সেই নিয়ে তেইশবার জেল। গোলমাল কী আর সহজে থামে। ছাপোষার পেটে দানা নেই। আগস্টের শেষ দিনে, ডালহাউসি স্কোয়ারে, হাজার লোকের মিছিলের মাথায় ভবেশকা। ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট আর এসপ্লানেড ইস্ট ঘিরে রেখেছিল পুলিশ। একশো চুয়াল্লিশ চলছে। কী ভিড়, কী ভিড়। লাউডস্পিকারের দরকারই হতো না তখুনকার দিনে। মিছিল ভাড়াও করতে হতো না। রাস্তার ওপরেই বসে গিয়েছিল বউ-ঝি, পোলাপান, মরদরা। হাতাহাতি আর ঢিল ছোঁড়াছুড়ি ছড়িয়ে পড়ল ধর্মতলা, চৌরঙ্গি, সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ, কলেজ স্ট্রিট। ট্র্যামের লাইন নিজের হাতে উপড়ে ফেললে ভবেশকা। ড্রাইভারের ফেলে-পালানো বাসটায় আগুন ধরিয়ে দিলে। পুলিশের সোঁটা ভবেশ মন্ডল, অমর বসু, রাম চ্যাটার্জি, চিত্ত বসু, মাখন পাল, মোহিত মৈত্র কাউকে রেয়াত করলে না।

    পরের দিন ভোর পাঁচটায় খুশিদিকে মায়ের জিম্মায় দিয়ে বিধান রায়ের বাড়ির সামনে ছাত্রদের জড়ো করে ফেলেছিল ভবেশকা। মাথা-গরম টাটকা সভা-ভাঙা মিছিলটা যখুন এগুচ্ছে, প্রিন্সেপ স্ট্রিট থেকে রইরই করে এসে হামলে পড়েছে পুলিশ। খণ্ডযুদ্ধ। সুযোগ বুঝে গুণ্ডা-মস্তানরাও ফাঁকতালে নেবে পড়েছিল। তোড়ে বৃষ্টি এসে কিছুক্ষণের বিরতি দিলে কী হবে, ভবেশকা আশুতোষ বিল্ডিঙে ছাত্রদের জড়ো করে, ঠেলাগাড়ি আর বিদ্যুৎ বিভাগের মই এনে রাস্তা জ্যাম করে দিলে। পুলিশের হাত থেকে বেটন ছিনিয়ে নিয়েছিল ভবেশকা। সন্ধে নাবতে, রাস্তায়-রাস্তায় আলো ভেঙে ফেলার নেতৃত্ব দিলে। অন্ধকারে জ্বলেছে গাড়ির টায়ার, ট্র্যাম-বাস। ঠেলাগাড়ি দমকল অ্যামবুলেন্স। মরে ছাই হয়ে গেল সনাতন কলকাতিয়াদের তিলোত্তমা কলকাতা। গোবিন্দ বল্লভ পন্হের মাথা-কাঁপানো অনুমতি নিয়ে গুলি চালালে পুলিশ। ভবেশকার বাহুর মাংস খাবলে শিস দিয়ে চলে গিয়েছিল গনগনে বুলেট।

    ভবেশকা তোমার সেই গুলি লাগার দাগটা আছে ?

    না হে, অ্যাতো দিন থাকে নাকি ! কবেই মিলিয়ে গেছে। পুকুরের জলে মুখ ধুয়ে গোরুর গোয়ালের দিকে চলে গেল ভবেশকা। এই সাত সকালেই গেরুয়া আলখাল্লা পরে আছে। ওটা পরেই শোয় বোধয়।

    ভবেশকা বলত, কংরেসের জন্য, শিশুর জন্য, কাশ্মীরের জন্য, হিন্দির জন্য, এডউইনার জন্য, কৃষ্ণমেননের জন্য, আনন্দভবনের জন্য, জহোর্লালের প্রাণ কাঁদে। আমাদের দুর্গতির জন্য কাঁদে না। এখন ভবেশকাও জন্যকে বলে জন্যে।

    কিন্তু দোসরা সেপ্টেম্বর জহোর্লাল আর ওনার খাদ্যমন্ত্রী এস কে পাতিলের টনক পঙ পঙ করে নড়ে উঠতে, পশ্চিমবঙ্গে ট্রেন-ভরতি চাল-গম পাঠিয়েছিল কেন্দ্রিয় সরকার। তেসরা সেপ্টেম্বর সাধারণ ধর্মঘতের ডাক দিয়ে রেখেছিল মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি। ভবেশকা এই কমিটিতেও ছিল। হাওড়ার খুরুট থেকে বামনগাছি ওব্দি ধোঁয়াক্কার হয়ে গিসলো দড়িবোমায়। দাশনগরে চটকলের গুদোমে আর মজদুরদের ঝুপড়িতে আগুন ধরিয়ে দিল ভবেশকা। দাউ দাউ দাউ দাউ দাউ দাউ। জগাছা, বামনগাছি, মালিপাঁচঘরায় গিয়ে আম-জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে লাগল ভবেশকা। ধর্মঘটকে সফল করে তুলেছিল সুভাষ মুকুজ্জের পদ্য গেয়ে-গেয়ে। কমরেড তুমি নবযুগ আনবে নাআআআআআ ? খবরের কাগজের প্রথম পাতায় তখুন প্রায় রোজই নাক-ফোলানো ভবেশকা।

    সকাল হতে না হতে শোভাবাজার আর বিডন স্ট্রিটে শুরু হয়ে গেল হ্যাঙ্গাম। মায়ের কাছে খুশিদিকে সোপর্দ করে সেখানেও পৌঁছে গেছে চটি আর ধুতি-শার্ট পরা উশকোখুশকো ভবেশকা। রাত্তিরে মানিকতলা থানা আক্রান্ত। নেতৃত্বে ভবেশকা। ঢাকুরিয়ায় পুলিশ আউটপোস্টে বোমা। ভবেশকার কাঁধে বোমাভরা ব্যাগ। খিদিরপুর, টালিগঞ্জ, কালীঘাট, ভবানীপুর, বেলঘরিয়ায় ভবেশকার খ্যাপানো জনতার ওপর গুলি চালালে পুলিশ। বাহালার বাসের গুমটি আর ট্র্যাম ডিপোয় আগুন ধরিয়ে দিলে রাগি জনতা। নেতৃত্বে ভবেশকা। ভবেশকার মাথা থেকে প্রতিদিন নতুন-নতুন প্রতিবাদের শব্দ, শব্দবন্ধ, ভাষা বেরোচ্ছে। বনধ, হরতাল, অবরোধ, ঘেরাও, ধরনা, র‌্যালি, মিছিল, সমাবেশ, পথসভা, গেটসভা, পিকেটিং, মোড়মিটিং। ভুল বানানে ছেয়ে গেছে শহরের দেয়াল।

    চৌঠা সেপ্টেম্বর তো যারই মুখে রাগি-রাগি ভাব দেখেছে, তাকেই গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। কতজন যে মরেছিল কে জানে। মর্গে লাশ ল্যাংটো করার সেই শুরু। লাশ লোপাটের গণিতের ম্যাজিক তো আগেই শিখিয়ে গিয়েছিল ইংরেজরা। পুলিশকেও নিজের হাতে গড়ে-পিটে পুলিশ বানিয়েছিল ব্রিটিশরা। দুশো বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে।

    কলকাতা আর শহরতলির অবস্হা একটু-একটু করে থিতোল।

    সেবার তবু সামলেছিল। ষাটের মাঝামাঝি আর পারল না প্রফুল্ল সেন। একে বিধান রায় নেই, তার ওপর ভারতজোড়া ঘাটতি। আলু তো বাজার থেকে একদম লোপাট। প্রফুল্ল সেন বললে, তাতে কী, কাঁচকলা খাও, আপেল খাও। ধানের লেভি হুকুম জারি করলে সরকার। মানে, চালকলগুলোর পুরো মাল চলে গেল সরকারের একচেটিয়ায়। ভবেশকা বলেছিল, বুড়ার মাথা খারাপ হইয়া গিয়াসে।

    ব্যাবসাদাররা রেগে কাঁই। কলকাতার বড়োবাজারকে চটিয়ে দিলে কোনো সরকার টেকে না। তাদের বিকিকিনি তো লাটে। সরকারি দর আর বাজারদরের মধ্যেকার গভীর খাদে পড়ে গেল বেচারা কংরেস। থান পাকাত আগেই তুলে নিয়ে বিহার আসাম পাকিস্তানে চালান করে দিতে লাগল জোতদাররা। রেশনের দোকান ফাঁকা। মাছিরাও ডানা গুঁজড়ে গুমুচ্ছে। লোকে বলে সেটা ছিল তিতকুটে ফসলের শীত। খবরের কাগজের ক্রোড়পত্রে ভবেশকা।

    চাষিবাড়ির খেতমজুর-বউ ঝিরা চালপাচারের মজায় সেই যে ফেঁসে গেল, সংসার করার কায়দাই পালটে ফেললে। সংসারের ঝক্কি নেই, কাঁচা ট্যাকা, ট্রেনের গুলতানি, একদিনের টিকিটে প্রতিদিন যাতায়াত, রাত্তিরটা হাজতে কখনওবা, হোমগার্ড আর পুলিশের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি। মোড়লদের বানানো এতকালের বেড়াগুনো ছেদরে গেছে সেই থেকে।

    আগেরবার বিধান রায় তড়িঘড়ি দার্জিলিং থেকে ফিরে তুলে নিয়েছিল লেভি অর্ডার। এবার বুড়োহাবড়া কংরেসের তলানিরা টেরই পায়নি যে পথে-পথে নেবে পড়েছে কচি ছোকরার রাগি দল। ভবেশকা বললে, পচা গাছডারে শিকড়সুদ্ধ উপড়াইয়া ফেলার এই-ই সুযোগ। এবিটিয়ে, ওয়েবকুটা, বারো জুলাই, এসেফাই, পিয়েসিউ, এয়াইয়েসেফ, ডিয়েসো, সিটু, কোঅর্ডিনেশান, কিসান সভা, এসপ্লানেড ইস্টে মিলে-মিশে একাক্কার। ওপাড়ার সরকারি আর সওদাগরি অফিসের চাকরেরা আওয়াজে-এওয়াজে কালা হয়ে যেতে লাগলো বলে ওখানে লাউডস্পিকার বাজানো বন্ধ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। তা সত্ত্বেও চাষাভুষোরা মহাকরণে কাজে এলে কেরানিরা তাদের অনুরোধ-উপরোধ আর শুনতে পায় না। স্ফিকসের মতন বোসথাকে।

    তখুন ভবেশকার গড়নপেটনের আদলে দিকে-দিকে শ্রমিক-কৃষকের ছবি এঁকেছিল বড়ো দেবুদা। সেই থেকে লালশালু হলে দেয়াল-পেন্টাররা ওরকুমই শ্রমিক আঁকে। এমনিতেও, যদিও বাঙালি শ্রমিকগুনো প্যাংলা, বেঁটে আর রুগণ। আবার এরকুম ছবিও আঁকা হয়েছিল, মঞ্চে মাইকের ডান্ডা বাঁ হাতে আর আকাশের দিকে ডানহাত, বক্তৃতা দিচ্ছে ভবেশকা। অবস্হান, অনশন, ফেস্টুন, শ্লোগান, ওঃ, সরকারের ধনুষ্টঙ্কার হয়ে গেল।

    ভবেশকার গরিমা তখুন দ্যাখে কে। বসিরহাটে মহকুমায় হামলা। নেতৃত্বে ভবেশকা। কৃষ্ণনগরে স্টেশনে আগুন। নেতৃত্বে ভবেশকা। মদনপুর, পায়রাডাঙা, বিরাটির এলআইসি, স্কুল পর্ষদ, উদবাস্তু পুনর্বাসন দপ্তর তছনছ। নেতৃত্বে ভবেশকা। রামরাজাতলায় বম্বে মেল থামিয়ে আগুন। নেতৃত্বে ভবেশকা। কৃষ্ণনগরে পুলিশের গুলিতে মরা আনন্দ হাইতের শব মর্গ ভেঙে বের করে মিছিলের আগে-আগে ভবেশকা। ভবেশকার নির্দেশে, যে যেখানে মরেছিল, রাস্তায় গলিতে পার্কে মাঠে, লাল সিমেন্টের দেড় বাই আড়াই ফুটের শহিদ বেদি বানানো হচ্ছিল সেদিনকেই। অনেক জায়গায় শহিদ বেদির বদলে রাস্তায় হাম্প তৈরি হয়েছিল।

    তারপর ব্যাস, ছেষট্টির খাদ্য আন্দোলনের একদিন সকালে পাড়ার সবাই টের পেল, ভবেশকা রাত্তিরে ফেরেনি। কিন্তু খুশিদিও বাড়িতে নেই। আগের দিন সন্ধে থেকেই দেখা পাওয়া যায়নি ওদের। কলোনির লোকেরা কত জায়গায় খুঁজল ওদের। কোথাও ওদের লাশ পাওয়া গেল না ; হাসপাতালে, থানায়, মর্গে। কত জায়গায় সাইকেলে চেপে খোঁজ করেছিল যিশু, দিনের পর দিন। ভোরে তিলকনগর, সকালে পোদ্দারনগর, দুপুরে নেলিনগর, বিকেলে বাপুজিনগর। না, কেউ ওদের খবর জানে না। কেউ দেখেনি ওদের। অমন চটক আর গা-গতর, কেউ তুলে নিয়ে যায়নি তো খুশিদিকে, মা বলেছিল বাবাকে। খুঁজতে-খুঁজতে, নিজের প্রগাঢ় অনুভূতির ক্ষত আবিষ্কার করে কেঁদে ফেলেছিল যিশু, একা-একা দাশনগরের কাঁচা রাস্তায় দাঁড়িয়ে।

    আর ভবেশকা-খুশিদি কিনা এখানে, কলকাতার এত কাছে, মুণ্ডেশ্বরী নদীর ধারে এই শেষপুকুর গ্রামে, সেই থেকে। কলকাতা থেকে টানা গাড়িতে সারাতি, তারপর ভ্যান রিকশায় গোপের হাট। চাঁপাডাঙা ওব্দি ট্রেনে এসে ম্যাক্সিট্যাক্সিতে সারাতি আসা যায়। ভবেশকা কিনা এখানে। কলকাতায় যায় নিশ্চই। প্রথঞ পোড়ানো ট্র্যামের ছাই মেখে বাঙালির যে নতুন সৎসমাজ, ভবেশকা আজ তার অগুন্তি সন্তানদের একজন।

    কীইইইইরে, রোদ উঠে গেল, ক্যাঁদরা গায়ে দাঁড়িয়ে আছিস ঠায়, যা দাঁত মেজে নে।

    কন্ঠস্বরের জলতরঙ্গে ধ্বক করে উঠেছিল যিশুর হৃৎপিণ্ড। চ্যাটা খোঁপায় যিশুদি। হ্যাঁ, সকাল বেলাকার, রোদ্দুরে তার প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফেলেছে। পুকুরে ভাসছে মাদুরকাঠির মতন চিকচিকে রোদ। পাঠরত স্কুলবালকের মতন দোল খাচ্ছে সুপুরু গাছের ঝাঁকড়া মাথা। যিশু বলল, তোমার গলার আওয়াজ অবিকল সেরকুমই আছে খুশিদি ; তুমি একটুও বদলাওনি। চলো না, আজকেই চলে যাই।

    না না না না না না না না। খুশিদি স্পষ্টত আতঙ্কিত।

    অ্যাতো কীসের ভয় খুশিদি। এই বয়সেও ভয় পাও !

    ভয় তোর জন্যে। আমি বড্ডো অপয়া। তোর যদি বিপদ হয়। বৈশাখী পূর্ণিমার মেলার ভিড় যেদিন থাকবে, অনেক লোকের ভিড় হয়, তখুন যাওয়াই ভালো। টের পাবে না কেউ। কলকাতা থেকে টানা গাড়ি আনিস। ঘোমটা দিয়ে নেব।

    এখুন তোমার গা থেকে তোমার মতন গন্ধ বেরুচ্ছে না। ভয় পেয়েছ বলে।

    আমার মতন গন্ধ ? আছে বুঝি ? পঞ্চায়েত প্রধান আচে না ? অসীম তালোধি ওর মেয়ের ভুতের ব্যারাম আচে। দাদা ওষুদপথ্যি করে। রোগবালাই ঝাড়ার জন্যে রাসপা ত্রিফলা হিং রসুন শুঁঠ নিসিন্দে কুঁচিলা বেড়ালা হোত্তুকি চিতেমূল সব বাটছিলুম একসঙ্গে। বোধয় তারই গন্ধ পাচ্ছিলি। বাটতে-বাটতে কালকের মন্তরগুনো, যেগুনো আমার জন্যে বলছিলিস, মনে পড়ে গেল। তাই দেকতে এলুম অ্যাতোক্ষুণ ধরে ঘাটে কী কচ্চিস।

    ভবেশকা ঝাড়ফুঁক করে বুঝি ? অদ্ভুত। কোথায়, ভবেশকা ?

    দাদা তো বেরিয়েচে। কাজ ছিল কি ? দুপুরের আগে ফিরবে না।

    তাহলে এসো। খুশিদির হাত শক্ত করে ধরে যিশু। এসো আলুর গল্প করি। অভিভূত হাতের পর্যটনপ্রিয়তার কাছে সমর্পিত, স্পর্শে অবহিত হয়ে ওঠে দেহ। মুগ্ধ যিশু গলা নাবিয়ে বলল, যদি জানতুম তুমি এই গ্রামে আছ, তাহলে বাঁকুড়া বীরভূম বর্ধমান মেদিনীপুরে অযথা সময় নষ্ট করতুম না ; এসো।

    আট

    শেষপুকুরের হিমঘর কখনও মুসুলমান মালিকের ছিল। শাজাহানের তাজমহলের মতন হিমঘরটাকে দ্বিতীয় বেগমের স্মৃতিমন্দির করেছিল। হিমঘরের পেছনের মাঠে স্বামী-স্ত্রীর কবর, ইঁটের দাঁত-বেরোনো, ছাগলছানারা ওটায় চড়ে লাফ খেতে শেখে। লোকটার ছেলে দেশত্যাগের কাটাকাটির সময়ে গায়ে হাতে পায়ে ছোরাছুরির চোট নিয়ে পাকিস্তানে ভৈরব নদীর ধারে পালিয়েছিল। ভবেশকার সঙ্গে ওর যোগাযোগটা ভবেশকার নাছোড় অধ্যাবসায়ের ফসল।


     

    বর্ধমান থেকে আরামবাগ হয়ে সারাতি পৌঁছেছিল যিশু। আসার দিনই দেখেছিল, তারকেশ্বর-আরামবাগ রোডে চারটে করে আলুর বস্তা সাইকেলে চাপিয়ে সার বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে প্যাংলা গলদঘর্ম ছেঁড়ালুঙ্গি খালি-গা চাষিরা। চাষির কাছ থেকে ফ্যালনা দামেও আলু কেনার লোক নেই। চাষি ধারে বেচবে ছোটো আড়তদারকে, ছোটো আড়তদার বড়ো আড়তদারকে, বড়ো আড়তদার শ্যালদার কাঁচাবাজার কিংবা বড়োবাজারের পাকাবাজারকে। চাষিরা আর ছোটো আড়তদাররা কবে যে টাকা পাবে ঠিক নেই। আলুর চেয়ে খড়ের আশি আঁটির দাম বরং ভালো। আলু বিকোচ্ছে না। এদিকে খড়ের দাম চড়ছে। আলু বিকোয়নি বলে চাষিরা বীজ আলুর ঋণ শোধ করতে পারেনি। ছোটো আড়তদাররা বীজ আলুর টাকা আদায় করতে না পেয়ে অসহায়। ধরট নিতে চাইলেও এগিয়ে আসছে না কেউ।


     

    প্রশ্ন তুলে উত্তরটা লিখে নিতে দেখলে, কুন্ঠিত-সঙ্কুচিত হয় গাঁয়ের লোক। লেখালিখিকে সন্দেহ করে সবাই। বুকপকেটে একটা ছোটো টেপ রেখেছে যিশু যাতে কেউ টের না পায়। যারা অভিযোগ জানাতে চায়, তাদের জিগেস করতে হয়। কোন চাষির দুঃখের বোতাম কোথায়, আঁচ করে টিপলেই, গল-গল করে বেরোতে থাকে ক্রোধ কষ্ট দুর্দশা হতাশা গ্লানি অভিশাপ। চাষির অভিশাপ একদিন ফলবেই, চাষিরাই বলে সেকথা।


     

    বড়োতাজপুরের মামুদ মাফুজ। আগে তো লোডিঙের সময় থেকেই আলুর দর চড়ত। বণ্ডের ব্যামো ধরিয়ে দর কমিয়ে দিলে। আমরা কিচু বুঝিনে ? ঘোড়ার ঘাস খাই ? ওই তো, আলু চাষের জন্যে ঋণ নেয়নি শ্বেতলেশ্বর গাঁয়ের সমবায় সমিতি। তাদের সদস্যরা বণ্ড পেলে কী করে ? হাঃ। আমাদের কাচ থেকে সংরক্ষণ বাবদ বাড়তি ট্যাকা আদায় হচ্ছে। অথচ মহাজন আর ফড়িয়া দালালরা চাষি সেজে বণ্ড পেয়ে গেল। ভক্তিপদ কুণ্ডুর চার হাজার প্যাকেট ঢোকানো হয়েচে, ইদিকে এক ডেসিমাল জমিও নেই। হাতে-পায়ে কুঠ হয়ে মরবে যত বেজন্মার দল, এই আমি বলে রাকচি।


     

    খিলগাঁয়ের ক্ষুদিরাম ঢাং। এবছর শীত পড়েছিল টানা, না কী গো ? বিষ্টিবাদলা ঝড়ঝাপটা হয়নে। হাওয়াটাও শুগনো ছিল এবার। তা বোরো চাস তো হবে নে। আর গেল বছর আলুর দাম উটেছিল ভালো। ভেবেছিলুম, আলু তুলে সব ধার-দেনা মিটিয়ে দিতে পারব এবার, ওই যে দেকুন না, ওই চালটাও সারিয়ে নিতুম, মেজো মেয়্যাটার বিয়ের জন্যিও জমাতে পারব কিছু ট্যাকা। কিচ্ছু হল নে। আমাদের দেকার কেউ নেই। আমাদের কতা শোনার কেউ নেই। কীটনাশক খেয়ে মরতেও ভয় করে গো বাবু।


     

    বেলসলিয়ার আচেরুদ্দি মল্লিক। দেখেন না কেন, বাড়িতে সকাল থেগে উটে কাজ হয়েচে পচা আলু আর ভালো আলু আলাদা করার। নিত্যি দিন। আলুর তো পাহাড় জমে গেচে। পচা বাছতে বেলা হয়ে যায়, তাপপর দাগ ধরলিই কেটে-কেটে গরু-ছাগলকে খাওয়াচ্চি। গরুগুনোও আর আলু খেতে চায় না। আগে তো টানের সময়ে দাগি আলুও কাঁচাবাজারের মহাজন নিয়ে যেত। রাত্তিরে আলুর পাহারাও হয়েচে ঝকমারি। ছেলে দুটোর রাত জেগে-জেগে শরীর বরগতিক হয়ে গেল। ওর মায়ের হাত দুটো দেকুন। দেকাও হাত দুটো, দেকাও, দেকাও না, লজ্জাশরমের কী, উনি তো হালিম-কালিমের চেয়েও ছোটো। দেকুন, পচা বেছে-বেছে হাতময় দানা বেরিয়ে গেচে।


     

    হালিম মল্লিক। আমাদের গাঁয়ে পচা আলুর নাম হয়েচে কলিমালু, নেতার নামে। আলুর গোলমালের জন্যে মুখ্যমন্ত্রী ওনাকে ওননো বিভাগে পাটাচ্চেন শুনলুম।


     

    বাদলাপুরের দেবেন জানা। চল্লিশ বছর আগে দার্জিলিঙের বিজনবাড়িতে আলুর ধসা রোগ হয়েছিল, বুঝলেন বিশ্বাসদা। কেন্দ্র সরকার তখুন পশ্চিমবঙ্গ থেকে অন্য রাজ্যে আলু পাঠানো বন্ধ করে দেছলো। তা সে অর্ডার তোলবার কারুর খেয়াল হল না অ্যাদ্দিনেও। তেনারা পোঁদে তেল দে ঘুমুচ্চেন। ইদিকে অন্ধ্র উড়িষ্যা থেকে তো ফি বছর আলো এসছে এখানের বাজারে। এখান থেকে নুকিয়ে-নুকিয়ে গেছে সিকিম ভুটান আসাম। লাগ-লাগ টন আলু পচার পর এখুন অর্ডার তোলার কাগজ বেরুচ্চে বলে শুনিচি। কেন্দ্র সরকারে জহোর্লালের টাইম থেকে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের লোক নেই। জহোর্লাল দিনকতকের জন্যে চারু বিশ্বাসকে মন্ত্রী করেছিল, তাও ফ্যালনা। নেতাগুনোর বাপের দুটো করে বিয়ে। তাই বিমাতা-বিমাতা করে নাকে কাঁদে।


     

    খাগড়াপাড়ার সত্যনারায়ণ সামান্ত। আমি স্যার দিসি উপায় করিচি। এই বটগাছতলায়, ওই যে, ওখেনটায়, আড়াই ফুট গত্তো খুঁড়ে প্রথমে বালি, তার ওপর কীটনাশক ছড়িয়ে আট কুইন্টালটাক আলু রেকিচি। তার ওপর আড়াআড়ি-লম্বালম্বি খড় বিছিয়ে আবার ওষুদ ছড়িয়ে দিইচি। ওই ইঁটের পাঁজা চাপিয়ে ঢেকে দিইচি। তিনচার মাস তো অন্তত থাগবে। তারপর কপাল। ঠাকুরের যা ইচ্ছে তাই হবে। কত দৌড়োদৌড়ি কল্লুম। এক প্যাকেট মতনও জায়গা পেলুম না। পঞ্চায়েতের কোটাও পেলুম না, সরকারি কোটাও পেলুম না। আর কত দাম ধরে মালিকের কোটা নিতে গেলে আমাদের মতন চাষির পুষোবে না। জেলাসদরে বল্লে, মন্ত্রীর ঠেঙে চিটি আনো, থালে সরকারি কোটা পাবে। কাকে ধরি ? বলেন। তাই এই উপায় করিচি। ইদিকে সেলসিয়াস আবার চল্লিশে চড়তে চলেচে।


     

    গুপ্তিপুরের বুড়ি। আলু-পচা আন্ত্রিকে নাতি মারা গেচে। নিববংসো হবে, অ্যাই বলে রাগলুম। যমে নেবে, যমে নেবে।


     

    খড়ি নদীতে জোড়া-নৌকোর মাচানে দাঁড়িয়ে কুতিরডাঙার অক্ষয় ঘোষাল। আলু পুরটসুন্দরদ্যুতি কদম্ব সন্দীপিতঃ সদ্য পকেটকন্দরে স্ফূরতুবঃ হিমঘরনন্দনঃ।


     

    বড়োপলাশনের শ্যামদাস প্রামাণিক। দশ প্যাকেট আলুর জন্যে মাসে এক প্যাকেট সুদ। অতিষ্টো করে মাল্লে। পাপের ভোগান ভুগতিই হবে।


     

    ষাটপলনের কেষ্ট দেবনাথ। দাদা সিপিয়েম করে, আমি ফরোড ব্লক করি। আমি না পেলে দাদা। দাদা না পেলে আমি। কেউ তো বন্ড পাবো। তাছাড়া কৃষি বিপণন আর সমবায় তো আম,আদের দলের হাতে। আমাদের অসুবিধা তেমন হয় না।


     

    জমিরাগাছির অনন্ত কুণ্ডু। আপনি একবার ভেবে দেখুন স্যার। ধান আর গমের বেলায় সংগ্রহমূল্য বছর-বছর বাড়িয়ে দিলে বলোরাম জাখড়। আলু কি জাখড়ের অ্যাঁড়, অ্যাঁ ? তা কেন সংগ্রহ করবে না সরকার ? তার কেন সংগ্রহমূল্য হবে না ? বলুন আপনি। আলুও তো ক্যাশ ক্রপ। আসলে পঞ্জাব আর হরিয়ানার বেলায় দরোজা হাটকরে খোলা। আমাদের বেলায় পোঙায় লাতি।


     

    এর আগে অনেক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে যিশু। কত কারখানা আর ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দিতে সাহায্য করেছে মোদি গোয়েঙ্কা মল্ল ভারুচা খান্না খৈতান লালওয়ানি কেশওয়ানি মাহিন্দ্রা শিল্পপতিদের। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের। স্রেফ মগজ খাটিয়ে। এরকুম অভিজ্ঞতা হয়নি আগে। পেরু না বোলিভিয়া কোথ্থেকে এসে বাঙালি জীবনে ঢুকে পড়েছে নির্বিকল্প আলু।


     

    আলুহীন পৃথিবী ভাবাই যায় না। বেলে কিংবা পলি দোআঁশ অল্প-টোকো জমিতে মখমল মাটির লেপ চাপা দিয়ে কেমন ডিম্বাশয় গোলগাল, তিন থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে গভীর আয়ত চোখে ভূমিষ্ঠ হয় চন্দ্রমুখী আলু। ভূমিষ্ঠ হয় জ্যোতি অলঙ্কার কুন্দন সিঁদুরি নবীন সফেদ কুমার বংশের খোকাখুকু যুবকযুবতি। এদের অনেকে চন্দ্রমুখীর সদবংশের নামে পৌঁছোয় বাজারে। ভিজে হাওয়া আর কুয়াশা সহ্য হয় না ওদের। নাবি, ধসা, ভুষা, সাঙ্কোষপোরা রোগে ধরে। বড্ডো সুখী ওরা, তাই উই পোকা, পিঁপড়ে, কাটুই পোকা, লাল বিটল, জাব পোকা, থিপস, সাদা গ্রাব, সুতলি পোকার দলবল সুযোগ পেলেই ওদের শীতের রাত্তিরে জাপটে ধরে। ওদের আঃ উঃ লক্ষ্মীটি পায়ে পড়ি, প্রাণে মেরো না, বাঁচাও-বাঁচাও নিঃশব্দ চিৎকার মাঝরাতে মাটিতে কান পেতে শুনতে পায় আলমপুর গ্রামের কাশীনাথ মাইতি। টাকার মতন আলুও বহুবল্লভা।


     

    সে আলু, পচলে যে আটদশ কিলোমিটার পর্যন্ত বাতাসের দখল নিয়ে নেবে, নানা রকুমার মাছি আর উনকিকে দূরদূর দেশ থেকে ডেকে আনবে সোহাগ পেতে, সে অসহ্য দুর্গন্ধের সঙ্গে গতবছর বৈশাখে পরিচিত হল যিশু, পরপর কয়েকটা হিমঘরের তথ্য যোগাড় করতে গিয়ে। ওফ, নরক, নরক।


     

    শীতযন্ত্র বিকল হয়ে গিয়েছিল পোলবা দাদপুরের বালিকুখাড়ি সমবায় হিমঘরে। পচে জল হয়ে গেল আলু। পাঁচ হাজার চাষি পরিবার সর্বস্বান্ত, রিপিট, সর্বস্বান্ত, লিখে রেখেছে যিশু। চাষিরা হিমঘরের সামনে গিয়ে ধরনা দিচ্ছিল বলে একশো চুয়াল্লিশ জারি হল। একদিকে হিমঘরের লোকেরা আরেক দিকে চাষিরা। সে কী হাতাহাতি মারামারি লাথালাথি। চুঁচড়ো থেকে বিরাট পুলিশপার্টি গিয়ে লাঠিপেটা করে বাগে এনেছিল। দিনদুপুরে মশারির মধ্যে বসে ল্যাপটপ খুলেছিল, অ্যাতো মাছির ঝাঁক। না খেয়ে ছিল বারোঘন্টা, নিরম্বু। তারপর পালিয়েছে। কত জনের যে হাঁপানি ধরে গেল কে জানে। চারটে চাষির বাড়িতে সাতটা বাচ্চা মরেছিল আন্ত্রিকে। অনেকের গা-ময় দাগড়া দাগ বেরিয়েছে। দুর্গন্ধ সৃষ্টি করায় মানুষের জুড়ি নেই। যত উন্নতি, তত আবর্জনা, তত নোংরামি, তত দুর্গন্ধ।


     

    গোস্বামীমালপাড়ার হিমঘরে সাতষট্টি হাজার প্যাকেট নষ্ট হয়েছিল। গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য হালিম মাজেদ ছিল জেলাশাসকের আপিসে, কোনো কাজে। বললে, বিমার টাকা উশুল করেও হিমঘর সমিতি বিমা করায়নি। চোত মাসে বিমা কোম্পানির লোক এসেছিল, কিন্তু কম ভোল্টেজে যন্তর বিকল হয়ে আলু পচার ভয়ে বিমায় রাজি হয়নি। বেলমুড়ি থেকে বিজলি আসে টিমটিম করে। দুটো জেনারেটর, তা দুটোই পড়ে আচে ভেঙে। হিমঘরের সহসভাপতি মহম্মদ জাকারিয়া বলেছিল, কিচু আলু বাঁচানো যাবে। তা বাঁচানো যায়নে কিচুই। নির্বাচন এসে পড়েছিল বলে মজুর-কামলা-মুটিয়া পাওয়া যায়নে। এলেকশান এলে কিচু পয়সার মুখ দেখতে পায় ওরা।


     

    পচে হালুয়া হয়ে গিসলো আলু। অমন সুন্দরী চন্দ্রমুখী কন্দ নিজেরা পচেছে, থলেগুলোকেও পচিয়েছে। আলুর পাহাড় থেকে আগ্নেয়গিরির পচা লাভাস্রোত। আশপাশের ভাদিলপুর, দেপুর, কেয়োলপার গাঁয়ের লোকেদের পাতলা পায়খানা আর ভেদবমি থামতেই চায় না। প্রাণ একেবারে অস্হির, আইঢাই, কাহিল। সরকারি স্বাস্হ্যকেন্দ্র এই আলুপচা রোগ সারাতে বিফল। হিমঘরের বাইরে পচা আলুর কাই কেঁখে ব্লিচিং পাউডার ছড়ানো হয়েছিল। দুর্গন্ধ আর একরোখা মাছি যায়নি তবু। পচা আলুর গ্যাস বের করতে ছেঁদা করা হয়েছে দেয়াল। তবু হিমঘরে গুমরে মরছে পচা আলুর শবের বদগন্ধ। কলকাতায় তখুন বিদেশি সিনেমার উৎসব চলছে।


     

    আর যেটুক বেরোতে পেরেচে, বলেছিল বালিকুখাড়ির লুৎফর রহমান, এমনভাবে চাষিবাড়ির ছেল্যামেয়্যার পেচনে লেগেচে বাবু, যে ওঝা ডেকেও ছাড়চেনে। বিষ্টি পড়লে আর দেকতে হবেনে। আলুর গুয়ের বান ডাকবে। নিমাই ঢোলের মিষ্টির দোকান একমাস বনদো।


     

    কালনার বংশীধর হিমঘরে বীজ আলু পচে গেছে। হিমঘরের ভাড়া জমা দিয়ে গেটপাস পাবার পরও বীজ আলু দিলে না। অ্যাতোটা পথ এসে চোপোররাত হয়রানি। একদিন তো চারঘন্টা রাস্তা অবরোধ হল। হয় বীজ দাও নইলে দাম দাও। হিমঘরের চাকরে বাবুরা গণপিটুনির ভয়ে টেবিলে খোলা কলম ফেলে হাওয়া। শয়ে-শয়ে চাষি জড়ো হচ্ছে আর গলার শিরা ফোলাচ্চে। ভবভূতি কপালি জমি তৈরি করে, ছেলেকে বীজ আনতে পাঠিয়েছিল। শক্তি সরকার পাওয়ার টিলার ভাড়া নিয়ে, জমিকে দিন দশবারো পতিত রেখে, জল কমপোস্ট রেড়ির খোল নিমের খোল দিয়ে, জো বুঝে মাটি ভেঙে আলু বোনার নালা কেটে ফেলেছিল। অলদ্রিন আর ব্রাসিকল এনে রেখেছে। তারপরই বজ্রপাতের মতন সর্বনাশা খবর। আলুর মড়কে বীজ নষ্ট। দিন দশের মধ্যে না পাতলে ফলন হবে না।


     

    দুজনেরই করোনারি থ্রমবোসিস, আলুপচা রোগে, বললে সদর হাসপাতালের ডাক্তার।


     

    মুটিয়া মজুর সর্দারদের ভাগ্য আর কমিশন থেকে কাটমানির নিষ্পত্তি না হওয়ায় বীজের আলু বাইরেই পড়েছিল টানা পনেরো দিন। বীজ আলু হল চাঁপা ফুলের পাপড়ি। অযত্ন ওদের সহ্য হয় না। তিন নম্বর চেম্বারে তিরিশ হাজার প্যাকেট বীজ আলু নষ্ট হল। এক চাষির বীজ অন্যকে দিয়ে যদ্দিন চলে চালিয়েছে। দিতে-দিতে ফুরিয়ে গিসলো। আলুর অদেষ্ট, চাষির অদেষ্ট।


     

    কিন্তু আলুর গপ্পো নিয়ে তুই কী করবি রে ? বলল খুশিরানি মণ্ডল।


     

    ভবেশকা অ্যাতো সম্পত্তি আর টাকা নিয়ে কী করবে, বলো তুমি, অ্যাঁ ? সেই ভবেশকার এমন ভুঁড়িটুড়ি, ঠাকুরদেবতা, ঝাড়ফুঁক, দলাদলি, ওফ, আমি তো ভাবতেই পারি না। ট্র্যামের ভাড়া এক পয়সা বেড়েছিল বলে, আর আলু পাওয়া যাচ্ছিল না বলে, কী-ই না করেছিল ভবেশকা। ভবেশকাকে দেখছি আর মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। গেরুয়া, বাবরিচুল, সত্য সাঁইবাবা, মাদুলি, গোমেদের আঁটি। আধুনিক লোকটার তো দফারফা। কেন, অ্যাঁ, কেন ?


     

    যিশু জানে খুশিদি অবোধ, নিষ্পাপ, অজ্ঞান, তাই নির্বাক।


     

    তোমার জন্মের সুবর্ণ জয়ন্তীতে ভবেশকা তোমায় একটা ভারি কালো লোহার শেকলে আষ্টেপৃষ্টে আগলে রেখেছে, রুমালে চোখ বেঁধে। কত চাষির আলু নিশ্চিন্তে পচিয়ে ফেললে ভবেশকা। পঞ্চায়েতের যে পঁচাত্তর শতাংশ বন্ড তা-ও গোলমাল হয়েছে, কালোবাজার হয়েছে, আর মালিকদের কুড়ি শতাংশ তো সোজা বেচে দিয়েছে পাকাবাজারে। এমনকী চাষির বন্ডেও ভবেশকার সই না থাকলে হিমঘরে তোলা যাবে না। সেই ভবেশকা, ভাবতে পারো তুমি ! বুকের মধ্যে চব্বিশঘন্টা বারোভুতের মেলা চলছে ভবেশকার।


     

    জানি। খুশিদির চোখের পাতা কাঁপে।


     

    খুশিদি কেঁদে ফেলবে। যিশুর হৃৎপিণ্ডের কপাটক ফরফর শব্দ করে নিঃশব্দে। ভবেশকার প্রসঙ্গ পালটায়। বুঝলে, বীরভূমে ষাটপলসা হিমঘর চালানো নিয়ে সে কী খেওখেয়ি। হিমঘর সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান বিশ্বনাথ দাশ আর বাদবাকি সদস্য রেবতী ভট্টাচার্য, অম্বিকা দত্ত, জনার শেখ এরা হল ফরোয়ার্ড ব্লকের, কিন্তু আরেক সদস্য মিনতি ঘোষ, যিনি পঞ্চায়েত প্রধান, তিনি সিপিয়েমের। সমবায়ের পাঁচ লাখ টাকার হিসেব মিলছে না অভিযোগ তুলে বিশ্বনাথ দাশ বরখাস্ত করলে সহকারি ম্যানেজার শিশির ঘোষ আর ক্যাশিয়ার বৈদ্যনাথ মণ্ডলকে। ব্যাস, আর দ্যাখে কে ; বেঁধে গেল দু-দলের কাজিয়া। ময়ূরেশ্বরের সিপিয়েম সভাপতি ত্রিপুরেশ্বর মণ্ডল দখল নিলে চেয়ারম্যানের কুরসি। আদালতের হুকুমে বিশ্বনাথ দাশ ফিরে পেয়েছে চেয়ার। এই আলুমন্হনের বিষের ভাগটা চাষিদের।


     

    জানি, এখানেও সিপিয়েম, তৃণমূল, কংরেস আর বিজেপি হয়েচে। সবাই মিলে একটা নাম নিলেই তো হয়। চাপা কান্নায় খুশিদির অন্যমনস্ক কন্থস্বরে ভাঙন।


     

    গল্পের রেশ থামলে খুশিদির আপ্রাণ ধরে রাখা অশ্রুবিন্দু টপ করে ঝরে পড়বে আর যিশু চেতনায় ঘটে যাবে বিস্ফোরণ। কথা বলা বজায় রাখে ও, যিশু। পুরশুড়ার হরপার্বতী হিমঘরে কী হয়েছে জানো না ? দেড় কোটি টাকার আলু পচিয়ে, বিদ্যুৎ পর্ষদের কয়েক লক্ষ টাকার বিল না মিটিয়ে, পুরোনো মালিকরা নতুন এক ব্যাবসাদারকে চুপচাপ হিমঘর বেচে দিয়ে পালিয়েছে। চাষিদের ক্ষতিপূরণ যে কে দেবে বা আদৌ দেবে কিনা, কেউ জানে না। নতুন মালিক পচা আলু বাইরে বের করে পোড়াচ্ছিল। সেই তেল-চিটচিটে ধোঁয়ায় গোলাপজাম আর জামরুল ওব্দি পাকা জামের মতন কালো হয়ে গেছে। পুরশুড়া পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি পতিতপাবন জানা শেষে গিয়ে আলু পোড়ানো বন্ধ করলে।


     

    খুশিদির ম্লান মুখাবয়বে তবু পরিবর্তন নেই।


     

    যিশু বলল, এবছর মোহনবাটির হিমঘরে অ্যামোনিয়ার ট্যাঙ্ক ফুটো হয়ে সোমথ্থ পাটগাছগুলো অজ্ঞান হয়ে গিসলো। খুশিদির ভাব পাল্টাচ্ছে না দেখে যিশু দুবাহু ধরে চোখে চোখ মেলে জানায়, মিছেই এসব গল্প করছি। তুমি কি কিছু বলবে ? খুশিদি ? বলবে কিছু ?


     

    নয়

    সন্ধ্যা। চাঁপাডাঙা লোকাল থেকে হাওড়ায় নেবেই সুটকেস হাতে দৌড় লাগাতে চাইছিল যিশু। পারছিল না। রাস্তা আটকে ধিরে-ধিরে হাঁটছে ফণাতোলা সাপের মতন সতত উদ্যত নিতম্ব, একগাদা, নানা আদল আর আদরায়। সামান্য ফাঁক পেতেই পাশ কাটিয়ে আবার দৌড়োয়। একজন ষণ্ডা পুলিশ অফিসার আচমকা ওর বাহু আঁকড়ে থামাতে, রক্ত চলকে ওঠে হৃৎপিণ্ডে। পায়ের পাতা, আঙুলসুদ্দু, শিরশির করে ওঠে মোজার ভেতরে, ভয়ে, গলায় শ্লেশ্মা উথলোয় হঠাৎ। কোনো অপরাধ না করেও অপরাধের বোধ মগজে ঘুরঘুর করে ওর, মুহূর্তে মনে হল।


     

    সম্বিতস্হ হয়ে যিশু থ আর ক্রুদ্ধ। আদিত্য। সঙ্গে অরিন্দম, বিটকেল জুটি।


     

    আদিত্যর ভিড়-জমানো অট্টহাস্য, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ ওফ ভয় পান পুলিশকে ! কী কেলেঙ্কারি করে ফিরছেন দাদা ? অ্যাগবারে চোখকান বুজে দৌড়োচ্ছিলেন। তা কই, কোনো কেটলিবাই বা খুন্তিসুন্দরীকে তো দেখছি না। ওপাস ডিয়ে সটকিয়ে দিয়েছেন ?


     

    হাত ঝাঁকিয়ে ছাড়ায় যিশু। শ্যাঃ, এরকম ইয়ার্কি ভাল্লাগে না। অরিন্দম, তুমি আবার অপর্ণা সেনের মতন মার্কেটেবল হাসি দিচ্ছ কেন ?


     

    আদিত্য পাছায় দুহাত, পেছনে ঝুঁকে, জিভের ডগা মুড়ে কথা বলার কায়দা, পুলিশে চাকরি পেয়ে শিখেছে, বজায় রাখে। ওঃ হোঃ হোঃ হোঃ, নির্ঘাৎ কিছু গোলমাল করে ফিরছেন আটপুর জাঙিপাড়া থেকে, বলে দিন দাদা, বলে দিন, আমরাই বাঁচাব, আমরাই হলুম গে রোকখোক আর ভোকখোক।


     

    আরে ট্যাক্সি ধরতে ছুটছিলুম, কেঁচিয়ে দিলে। চলো, একটা ট্যাক্সি পাইয়ে দাও। সুটকেস প্ল্যাটফর্মে রেখে, সিগারেট বের করে ধরায় যিশু, তারপর খেয়াল হওয়ায়, এগিয়ে দ্যায় আদিত্যর দিকে।


     

    অ্যাতো টাকা রোজগার করেন, একটা গাড়ি কেনেন না কেন ?


     

    গাড়ি ? বাবা-মায়ের বিয়ের দিনেই গাড়ি কিনে দিয়েছিল দাদু, সেটা চুয়াল্লিশ সন। সে গাড়িতে চেপে শ্রীরঙ্গমে শম্ভু মিত্তির বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন দেখতে গিসলো দুজনে, প্রথম দিনের শো। পরে তো শ্রীরঙ্গমের নাম হয়েছিল বিশ্বরূপা, এখুন কাছাকাছি পার্ক করা যায় না। তা হল থেকে বেরিয়ে দেখলে গাড়ি হাপিস। আর পাওয়া যায়নি গাড়ি। বাবা আর গাড়ি ছোঁয়নি। আমিও বাবাকে ফলো করছি। গাড়ি রাখা আর চালানো কলকাতায় ঝকমারি, এমন তোদের গিরগিটি এসট্যাবলিশমেন্ট।


     

    মানে ? অন্য দিকে তাকিয়ে অন্য কিছু খোঁজায় মনস্ক, ধোঁয়ার টুসকি ঝেড়ে জানতে চায় আদিত্য।


     

    গিরগিটির মাথা কখুনও লাল, কখুনও সবুজ, কখুনও কমলা রঙের হলেও, গিরগিটিটা গিরগিটিই থাকে। তুই এসব বুঝবি না। অরিন্দম এখানে কেন ? কেউ আছে-টাসছে নাকি ?


     

    হ্যাঁ, অরিন্দমদা অফিস থেকে দুদিন ছুটি নিয়ে বিহার থেকে আসা সব গাড়ি অ্যাটেন্ড করছে। অরিন্দমদার এক পুরোনো বন্ধুর কলকাতায় আসার কথা আছে। লোকাল ট্রেনটা এখুনও বিয়োচ্ছে, তাই চেঁচিয়ে কথাগুলো বলে আদিত্য।


     

    অরিন্দমের বন্ধু তো তোর তাতে কি ?


     

    এককালে অরিন্দমদার সহকর্মী ছিল লোকটা। চাকরি ছেড়ে এখুন গয়া পালামউ জাহানাবাদ হাজারিবাগে খেতমজুর খেপিয়ে বিপ্লব করছে। সে ব্যাটা ব্রামভোন।


     

    তা করুক না ; তোর চাকরিতে তো বাধ সাধছে না।


     

    আরে কলকাতায় আসছে অ্যাসল্ট রাইফেল বোমাফোমা কিনতে। শালা আর জায়গা পেলে না। লোকালের টুপটাপ বিয়োনো শেষ। নিত্যযাত্রীদের পচা কর্মসংস্কৃতির ঘেমো গন্ধ। মমমম।


     

    ওওওও। তাই ফুল ড্রেসে চোর ধরতে বেরিয়েছিস আর অরিন্দ এসচে খোচরগিরি করতে। যিশু কাঁধ নাচিয়ে হাসে।


     

    আদিত্যর জিভের ডগা এখুনও মোড়া। আরে এই সাবভারসিভ এলিমেন্টগুলো দেশের কাঠামোটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দিচ্ছে না। আগে তবু রঞ্জিত গুপ্ত, দেবী রায়, রুণি গুহনিয়োগীর মতন দায়বদ্ধ অফিসাররা ছিল। সেরকম ডেডিকেটেড অফিসার আর আজগাল কোথায়।


     

    অরিন্দম গম্ভীর, নিরুত্তর। এরকুম অনেকবার হয়েছে ওর। ওর উপস্হিতিতে ওর উদ্দেশে করা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে আরেকজন। লোকালটা বিইয়ে শেডে ফেরার ভোঁ।


     

    বাড়ি ফেরার তাড়া, তার ওপর ক্লান্ত, দৌড়ে ট্যাক্সি ধরার ধান্দায় কুলি নেয়া হয়নি ; যিশু স্টেশানের ভিড়ে বিরক্ত। বলল, বেশি-বেশি পোঁদপাকামি করিসনি, বুঝলি। মরবি শেষকালে। ভদ্রেশ্বর থানার ওসি ভোলানাথ ভাদুড়ি, ডোমকলের কন্সটেবল তপন দাস, জয়নগরের এস আই অশোক ব্যানার্জি, ওদের মতন বেঘোরে মরবি। আর ডেডিকেশান সাবভারসান এসব কপচাসনি ফালতু। এই তো জুন মাসে, রায়গঞ্জ থেকে খড়-বিচুলি নিণে একটা ট্রাক শিলিগুড়ি যাচ্ছিল, তার ড্রাইভার অরুণ দাস তো ইসলামপুর থানার বেরাদরদের তোলা দিতে পারেনি বলে ওকে আর খালাসিটাকে আড়ংধোলাই দিয়ে ওদের রক্ত জবজবে মুখে মুতলেন তেনারা। ইটস আ ফ্যাক্ট, আই অ্যাম নট জোকিং। আমি তখুন ইসলামপুরে ছিলুম। অন্য লরি ড্রাইভাররা জানতে পেরে যখুন একত্রিশ নম্বর হাইওয়ে অবরোধ করল, তখুন কেস গুবলেট করার জন্যে তোর ব্রাদাররা খালাসিটাকে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিলে পাশের চোপড়া থানায়। আমার কাচে খাপ খুলিসনি, বুঝলি। দুশো পাতার প্রজেক্ট রিপোর্ট প্যারা বাই প্যারা মুখস্হ বলতে পারি। ভুলে যেও না ইন্দিরা গান্ধি যে অভিশাপ কোড়োল তাতে নিজে তো গেলই, ছেলে দুটোও অপঘাতে মারা গেল। আর তোদের তো হেমেন মণ্ডল, শ্রীধর দাস, রাম অবতার, জয়চাঁদ শৈঠিয়া, রশিদ খান, বালা ভাগানি, রমেশ সিংদের মতন দায়বদ্ধ ক্যারেক্টার না হলে চলে না। যিশু, সংলাপের অস্বাভাবিক দ্রুততায় হতবাক করে ওদের দুজকে।


     

    ওদের ঘিরে বেগতিক শুরু হওয়ায়, অপ্রস্তুত আদিত্য বলল, আপোষের স্তুতিময় কন্ঠে, আরে চটছেন কেন, চলুন-চলুন, ট্যাক্সি পাইয়ে দিচ্ছি। দেশভাগের পর আর ফলে, ভিড়ের ঠ্যাঙাড়ে, খামখেয়াল, প্রতিদ্বন্দ্বীর যে কোনও একটা পক্ষকে গণশত্রুর ছাপ দিয়ে দিতে চায়। কাউকে শত্রূ ঘোষণা করার মধ্যে ঘোষকের আত্মপ্রসাদের হহুকুমনামা থাকে। বাঙালিজীবনে এখুন শত্রু না থাকাটা অবক্ষয়। প্রেম, তার মানে, শুধু ঈশ্বরের জন্যে, প্রকৃতির জন্যে। অরিন্দম বিব্রত। গণশত্রু শব্দটা খাঁটি বাঙালির নয়।


     

    পাশাপাশি হাঁটতে-হাঁটতে আদিত্যর যিশুকে প্রস্তাব, অরিন্দমদা আপনার আবিষ্কার-করা কেটলিউলির সঙ্গে পরিচয় করতে চাইছিল।


     

    কেন ? ওর কি নিজের মুখ নেই কথাটা পাড়ার ? যিশুর পক্ষে রাগ করাটা ওর স্বাস্হ্যের পক্ষে জরুরি। কারুর দিকে না তাকিয়ে বলল, আগের নিজের বন্ধুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করুক, মুচলেকা দিক, ধরিয়ে দিক, ভারতরত্নটত্ন পাক।


     

    যিশুদা আপনি আমায় জানেন, তবু এমন কথা বলছেন কেন ? আসার আগে আদিত্য আমায় কিছুই বলেনি। অরিন্দম স্বার্থপর আম-জনতা আর ফিচেল হাবড়ুস নিত্যযাত্রীর ধাক্কা, এড়াবার চেষ্টা সত্ত্বেও, খেতে-খেতে, যিশুর সুটকেস আদিত্যর হাতে, ট্যাক্সিস্ট্যান্ড পর্যন্ত তিনজন চুপচাপ হাঁটে। আদিত্যকে দেখে একজন সাদাপোশাক ভিকির বেঁকানো শিরদাঁড়া সোজা করে সেলাম ঠুকল। পোশাকের রাষ্ট্র-ক্ষমতার দাপটে আদিত্যকে জায়গা ছেড়ে দেয় লোকে। হাঁটেও সেভাবে আদিত্য। উত্তরআদর্শবাদী নবযুগের কমিসার। কিউ-এর চ২ছামেচিকে দাবড়ে, আদিত্যর দরজা খুলে দেয়া প্রথম ট্যাক্সিটায় বসে, অরিন্দমের দিকে স্মিত তাকিয়ে, প্রশমিত যিশু জানায়, কেটলিউলি ঘৌড়দৌড় দেখতে চায় অরিন্দম, পরিচয় করিয়ে দেব, নিয়ে যাবেনখন রেসকোর্সে। নিজে গেছেন তো কখুনও ? না গিয়ে থাকলে রাসেল স্ট্রিটে খোঁজ নিয়ে শিখে নিন।


     

    যিশু হাত নেড়ে চলে গেলে, আদিত্য অসংকোচে বলল, আচ্ছা অরিন্দমদা, আপনি তো ক্যানসারে বুককাটা প্রেমিকাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, সে এপিসোড শেষ, নাকি ? না, মানে এমনিই জিগেস করছিলুম।


     

    অফিস এক বছরের জন্যে ম্যানিলায় আমাকে ট্রেনিঙে পাঠিয়েছিল, জানো তো ? এক বছরের ছাড়াছাড়িতে ব্যাপারটা কেমন যেন আপনা থেকেই চুকে-বুকে গেছে। আমি যখুন ছিলুম না তখুন অফিসে এ নিয়ে এমন ফিসফিস-গুজগুজ হয়েছিল যে ওর পক্ষে পিছোনো ছাড়া উপায় ছিল না। বেশিদিনবাঁচবে না, লিখেছিল আমাকে। সত্যিই বোধয় বাঁচবে না। রুগণ চেহারা হয়ে গেছে। আর তো কথাবাত্রাও হয় না। ও-ও এড়িয়ে যায়, আমিও এড়িয়ে যাই। একই অফিস বলে খুবই এমব্যারাসিং। ট্রান্সফার নিয়ে লখনো চলে যাব ভাবচি। এখানে একদম ভাল্লাগে না। অরিন্দমের কন্ঠে পরাজয়বোধ। অসহায়তার ঘূর্ণিপাকে বুঁদ হয়ে সদাসর্বদা প্রেমে পড়ে থাকতে চায় ও। একজন নারীকে ছেড়ে আরেকজন নারীর কাছে পৌঁছোনো ওব্দি ও ছটফট করে, আতঙ্কের ঘোরে থাকে। থিতু হতে পারে না কোনও নারীতে। বয়স বেড়ে যাচ্ছে। ছোটো ভাই বিয়ে করে নিয়েছে। মা চিন্তিত। ম্যানিলায় গিয়েও মালয়েশিয়ার যুবতী প্রশিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্কে পাতিয়ে ফেলেছিল।


     

    অরিন্দমের কথা শুনে আদিত্য বলে ওঠে, আরে না-না, এখুন যাবেন না। আগে লোকটাকে শনাক্ত করে দিন। কেরিয়ারের ব্যাপার। সিগারেটের বোঁটা মাটিতে ফেলে সরকারি জুতো দিয়ে মাড়ায় আদিত্য। ভিড়ে মধ্যে দিয়ে আবার প্ল্যাটফর্মে তাড়াতাড়ি ফিরতে অসুবিধা হচ্ছিল ওদের। পাজামা-পাঞ্জাবি-লুঙ্গিতে একদল ক্লান্ত পুরুষের জটলা লক্ষ করে আদিত্যর মন্তব্য, এই মালগুনিকে দেখচেন, সব বর্ডার পেরোনো ঢাকাইয়া পাতি-নেড়ে, রাতারাতি ঢুকে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের গাঁয়ে-গাঁয়ে, সবকটা লিগি, অ্যান্টি ইনডিয়ান এলিমেন্ট। ধমমো-শিবপুরেও জুটেচে। এগুনো আর ওই বাঙালগুনো, আমাদের পুরো পশ্চিমবঙ্গটাকে নষ্ট করে দিলে। আর ভারতবর্ষকে ডোবালো ব্রামভোনগুনো।


     

    আদিত্য যে কতরকুমের অ্যান্টিবডি খুঁজে বেড়াচ্ছে, কে জানে, মনে হল অরিন্দমের। মুসুলমানরাও নিজেদের মধ্যে আলোচনায় কেউ-কেউ এভাবে নিজের চরিত্রকে ব্যাখ্যা করে হয়তো। ও বলল, কিন্তু ওরা এখানে চিত্তরঞ্জন দাসে বেঙ্গল প্যাক্টও করতে আসেনি, আর তোমার কর্মসংস্হান কেন্দ্রে নাম নথি করে কাঁদতেও আসেনি। ওরা জানে পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ-লক্ষ লোকের কাজ ফাঁকা পড়ে আছে। সেই কাজগুনো করতেই আসচে ওরা। খাটবে-খাবেদাবে, বাচ্চা বিয়োবে, সাধ-আহ্লাদ করবে, মরে যাবে। কেন, বিহার-উড়িষ্যা থেকেও তো বছর-বছর লোক আসছে, কাজ পাচ্ছে, কাজ করছে, থেকে যাচ্ছে। শুধু এখানকার বাঙালিদেরই দেয়াল-জোড়া ন্যাকা-শ্লোগান প্যানপ্যানানি আর বুকনি।


     

    আদিত্যর পচন্দ নয় এরকুম যুক্তি। ঘরে-ঘরে কত বেকার ছেলেমেয়ে, দেশ রসাতলে যাচ্ছে, কেন্দ্র সরকার বঞ্চনা করছে, আইনশৃঙ্খলার সমস্যা, সমাজের অবক্ষয় নিয়ে বক্তব্যের রেকর্ড বাজায়। অরিন্দমকে বহুক্ষণ চুপচাপ থাকতে দেখে বলল, রসিক পাসওয়ান লোকটা বড়ো হলে কী হবে। সহজে মুখ খোলেনি বুঝলেন। চারদিন সময় নিয়েছে ভাঙতে। বাকিগুনোকেও আমরা ধরবই।


     

    অরিন্দম ভিন্ন খেয়ালে। ও যখুন পাটনা অফিসে এইচ আর ডিতে কাজ করত, অতনু চক্রবর্তী আর সুশান্ত ঘোষ দুই জিগরি বন্ধু ছিল ক্যাশ ডিপার্টমেন্টে। টাকাকড়ি পরীক্ষক, কয়েন-নোট এগজামিনার। চাকরি ফেলে রেখে, কাউকে কিছু না বলে, দুজনেই পর-পর দুম করে উধাও। বাড়ির আরাম আর স্বজনজ্ঞাতির সংস্রব ছেড়ে এভাবে কেন চলে যায় মানুষ ! তারা কি কারুর বা কোনও কিছুর সোহাগ-বঞ্চিত ? ওভাবে উধাও হবার সাহসকে আসলে ও ঈর্ষা করে। নয়তো আদিত্যর সঙ্গে কাল আর আজ দুটো ছুটি নষ্ট করছে কেন ! পচা টাকার উপত্যকায় দিনের পর দিন কাজে হাঁপিয়ে উঠেছিল বোধয় ওরা দুজনে। এখানে যেমন রোজকার দশ কিলো-কুড়ি কিলো কয়েন ওজন করার চাকরিতে বিরক্ত হয়ে পুলিশে আদ্দেক মাইনেতে ঢুকে গেছে আদিত্য।


     

    প্রথমে সুশান্তটা উধাও হয়ে গিসলো। দুশো একর জমি আর সাত একর ফলবাগান আর রোববারি হাট ছিল ওর দাদুর, মুঙ্গেরের পিপারিয়া গ্রামে। ফাঁসির হুকুমপ্রাপ্ত জোতদার ব্যাজনাথ সিংকে উচ্চ আদালতে বাঁচিয়ে দেবার পুরস্কার হিসেবে তোপেয়েছিল ওর উকিল-ঠাকুদ্দা। যতদিন যাদব ক্রিমিনালদের দৌরাত্ম্য ছিল পিপারিয়ায়, সুশান্তরা গোপ বলে, ফসলের বখরা আর হাটের খাজনা পেতে ওদের অসুবিধা হয়নি। বস্তা-বস্তা চাল ডাল গম সরষে রাখা থাকত পাটনায় ওদের গর্দানিবাগের বাড়িতে। কজ্জল ধানুকের দৌরাত্ম্যে সুশান্তর বাপ জ্যাঠা কাকা পরে আর পিপারিয়া-মুখো হতে পারেনি। ধানুক, বিন্দ, ভূমিহাররা তখন একদিকে আর যাদবরা আরেক দিকে। যাদবদের নিত্যিদিন খুন করত ধানুকরা।


     

    তারিণী মণ্ডল নামে আরেকজন নির্মম ক্রিমিনালের সাহায্যে, ওই সব জমিজমা আবার দখল করার উদ্দেশ্যে, কাউকে কিছু না বলে, কিছু টাকা জমিয়ে সুশান্ত গিসলো নওয়াগাছির কাজি-কোরাইয়ায়। ওই মণ্ডলরা এককালে হুগলি জেলার চাষি ছিল, থেকে গেছে দিয়ারায় গিয়ে। আরেকজন মানুষের যা কিছু ভালো, সে সদগুণ আমার নেই, সেই দুর্বলতার খাতিরে আমি, আমরা, তাকে আক্রমণ করি, ভাবছিল অরিন্দম। প্রথমে সুশান্তকে আটকে রেখে মণ্ডলরা ওর বাবা-জ্যাঠার কাছে দশ লাখ টাকা ফিরৌতি বা ক্ষতিপুরণ চেয়েছিল। অত টাকা কোথ্থেকেই বা দেবে। সুশান্তকে পছন্দ হওয়ায় তারিণী মন্ডল নিজের চোদ্দো বছরের মেয়ের সঙ্গে সুশান্তর বিয়ে দিয়ে দিলে। আর ফিরতে পারেনি সুশান্ত। অপরাধীদের সঙ্গে দিনভর আর তাদের মেয়ের সঙ্গে রাতভর কাটাতে-কাটাতে অপরাধকেও ভালোবাসতে অভ্যস্ত এখুন ও, সুশান্ত। বাপ জ্যাঠা কাকার বিশাল একান্নবর্তী ছিল সুশান্তদের। ওর জন্যে সব পাঁকমাটি।


     

    লালু যাদব মুখ্যমন্ত্রী হবার পর যাদব ক্রিমিনালরা তাদের হৃতরাজ্য ফিরে পেয়েছে, লড়ে দখল করে নিয়েছে। অপরাধের জাতীয়করণ হয়ছে অনেক গাঁয়ে-গঞ্জে, এমনকী শহরেও। জেলাশাসককেই পিটিয়ে মেরে ফেলেছে হাজিপুরে। পিপারিয়ার দুশো একর জমি আর সাত একর ফলবাগান ফিরে পেয়েছে সুশান্ত। পাটনায়ও গিয়েছিল তারপর, নিজের বাড়িতে, গর্দানিবাগে। অন্তরালকে ভাঙা, হয়ে গেছে অসম্ভব। বাংলা কথাবাত্রাও আর গড়গড় করে বলতে পারে না, গাঁইয়া হিন্দি মিশিয়ে বাংলা বলে। দূরত্ব বেড়ে গেছে সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টায়। ফিরে গেছে শ্বশুরের দেশে। দিয়ারা-দুপুরের উড়ন্ত রুপোলি বালিয়াড়িতে।


     

    সুশান্তর পর উধাও হয়ে গেল অতনু। একদম বেপাত্তা। কতরকুমের যে গুজব রটেছিল ওর নামে। একজন লোক যতদিন বাঁচে, তার নামে কতরকুমের গল্প হয়। মরে গেলে গল্পগুনোও মরে যায়। কেউ যে বেঁচে আছে তাকে নিয়ে রটনাগুনোই তার প্রমাণ। একা থাকত অতনু। নিজেদের বাড়ি। সব ছিল। স২সার পাতলেই মিটে যেত। সাজানো বাড়ি ছেড়ে আচমকা নিরুদ্দেশ। হাওয়া। পালঙ্ক, বিছানা, হাফ-তোলা মশারি, ডাইনিং টেবিলে চায়ের কাপ, মিউজিক সিসটেম, বিছানায় টেপে এনরিকো কারুসোর ক্যাসেট, টিভি, ডিম-মাখন, সবজি, কোল্ড ড্রিংকস ভরা থকথকে বরফ-ঝোলা ফ্রিজ, মিক্সার-গ্রাইণ্ডার, থালা-বাসন, জামাকাপড়, বাংলা-ইংরিজি হাজারখানেক বইপত্তর, পড়ে রইল যেমনকার তেমন, যেন ফিরবে এইমাত্তর, বাজারে গেছে। ওর প্রতিবেশি পদমদেও সিনহার বিধবা স্ত্রী দরোজায় তালা দিয়ে খবর দিসলো উদবিগ্ন বন্ধু-বান্ধদের।


     

    কতরকুম জনশ্রুতি পাক খেয়েছে অতনুকে নিয়ে। পাগল হয়ে গেছে। আত্মহত্যা করেছে। সাধু হয়ে চলে গেছে নেপালে। ড্রাগ অ্যাডিক্ট হয়ে বেঘোরে মরেছে। শেফালি বাউরি নামে এক হাফ-গেরস্তর সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে সংসার পেতেছে। শেষে কিনা, আশ্চর্য, অরিন্দম ওকে দেখতে পেল হাজারিবাগের ঘন জঙ্গলে। মাওবাদি কমিউনিস্ট সেন্টারের নিখোরাকি খেতমজুরের ছেলেমেয়েদের অনাড়ম্বর গণবিবাহে। রেড বুক থেকে ইংরিজিতে মন্তর পড়ে বিয়ে দিচ্ছিল। রেড বুককে বিয়ে দেবার বই করে ফেলেছে ! দেড়-দুশো হতদরিদ্র, ময়লা, স্নানহীন, হাফল্যাংটো গ্যাঞ্জামে বিয়ে শেষে অতনুর দিকে ভিড় ঠেলে এগোবার আগেই লোপাট হয়ে গিসলো। দেখতে কি আর পায়নি অরিন্দমকে ? এড়িয়ে গেল। স্রেফ উপেক্ষা করল। অদ্ভুত। অতনুর জীবনে অরিন্দমের জন্যে আর এক চিলতেও পরিসর নেই।


     

    পাটনা অফিসের চাপরাশি রসিক পাসওয়ানই নিয়ে গিসলো ওই জঙ্গলে। পাটনা থেকে অসীম পোদ্দারের ডিজেল অ্যামবাসাডর গাড়িটা কিনে কলকাতায় চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল অরিন্দম। অনেককে বলেছিল সঙ্গে যেতে। রসিক রাজি হল। দুজনে পালা করে চালিয়ে কোন্নোগর আসার পর রসিক পাসওয়ান বাসে করে চলে গেল হাওড়ায় ওর জেলার লোকের কাছে। আশ্চর্য, এই দেড় বছর চাকরি থেকে বেমালুমনিরুদ্দেশ ছিল রসিক। ভোটবাগানেই ধরেছে ওকে পুলিশ। ধরেছে গুণ্ডাদের দেওয়া তথ্যে। লোহার বাবরির সরকারি মান্যতাপ্রাপ্ত ক্রিমিনালদের সাহায্যে বন্দুক-টন্দুক জোগাড় করছিল। ও যে ভোটবাগানে লুকিয়ে রয়েছে, সেই চিঠিটা অরিন্দমকে আদপে সত্যিই কে যে লিখেছিল, সে সন্দেহ আরও গভীর হয়ে যাচ্ছে। আদিত্যর কি হাত আছে তাতে ?


     

    সমাজ কাউকে নিরুদ্দিষ্ট থাকতে দেবে না। খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে খুঁজে বের করবেই। এবার টেনে বের করতে চায় অতনুকে। লোকচক্ষু নামের একটামাত্র চোখের এই সমাজ। জিভ তার অনেক। আদিত্য সেদিন বলছিল, লেকচার ঝাড়ছিল, যে, সমাজ যাদের সহজে খুঁজে পায় না, তারাই যতরকুমের গোলমাল বাধায়। লুকোছাপা, গোপনীয়তা, প্রায়ভেসি দেখলেই তাকে উপড়ে ফেলতে হবে, হিঁচড়ে বের করতে হবে সবার সামনে। রঞ্জিত গুপ্ত, দেবী রায়, রুণু গুহনিয়োগীর দায়বদ্ধতার সেটাই ছিল চাবিকাঠি। আদিত্য সেই আদিম বুনো চাবিটা প্রায় করায়ত্ত করে ফেলেছে।


     

    অধ্যাপকের দামি উন্নাসিকতার আদলে বলেছিল আদিত্য, এই এখুন যদি রুণু স্যার গোয়েন্দা বিভাগে থাকত তাহলে অ্যাতো মার্ডার হত না। জানেন, গত বছর, এক হাজার আটশো আটত্রিশটা মার্ডার হয়েছিল, আর তার আগের বছর এক হাজার সাতশো পাঁচটা, যখুন কিনা মেয়েদের ওপর অত্যাচার গত বছর হয়েছিল সাত হাজার তিনশো উনআশি আর তার আগের বছর সাত হাজার তিনশো একাত্তরটা। ওই যে বললুম, ডেডিকেটেড অফিসার নেই। আগে ডিসি বিভূতি চক্রবর্তীর মতন লোক ছিল। অফিসারদের আর কত নাম করব ? রবীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি, রাজকুমার চ্যাটার্জি, নীহার চৌধুরী, রবি কর, উমাশংকর লাহিড়ি, অরুণ ব্যানার্জি, আদিত্য কর্মকার, দীপক কর, আশিস মুখার্জি, তারপর আপনার পাঁচুগোপাল মুখার্জি, বুঝলেন, এসব নাম বাঙালির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পিওর গোল্ডে। এরা না থাকলে নকশাল মিনেস ইর‌্যাডিকেট হত না পশ্চিমবঙ্গে।


     

    তা থাকবে। অন্যমনস্ক বলে, অরিন্দমের খেয়াল হল যে, সোনার বাংলা অক্ষর সত্যিই দ্যাখেনো ও আজ ওব্দি। এবারে ছোটোভাইয়ের বউয়ের জন্মদিনে একটা ভারি সোনার গিনি গড়িয়ে দেবে। বাংলা হরফ থাকবে তাতে, ‘সোনার বাংলা’। চাঁদ সদাগরের মুখ ? বল্লাল সেনের মুখ ? না, মুখ্যমন্ত্রীর মুখ। কিন্তু কোন মুখ্যমন্ত্রী ?


     

    আজগাল তো পদ্য লিকিয়েরাও পুলিশ কমিশনার হয়ে যাচ্চে। জিভের ডগা মুড়ে জানায় আদিত্য। রুণু স্যার ঠিকই বলেছিল, পদ্য লিকে-লিকে কলকাতা পুলিশের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল তুষার তালুকদারটা।


     

    তুমিও লেখো না। তুমি পারবে। ধর্ষণকে বলতে হবে নিগ্রহ বা নির্যাতন।


     

    অরিন্দমের খোঁচাটা সূক্ষ্ম হয়ে গেল বোধয়, মর্মার্থ বুঝতে পারল না আদিত্য। বলল, পাগল নাকি। পদ্য লেকে বলে দীপক রুদ্র আর পার্টসারথী চৌধুরী সুপারসিড হয়ে মুখ্য সচিব হতে পারল না, দেখচেন না। প্রত্যুষপ্রসূন ঘোষ তো পদ্য লেকে বলে প্রোমোটি আই এ এস হতে পারেনি। তারাপদ রায় অবশ্য হয়েছিল মজার-মজার পদ্য লিকতো বলে। চাকরিটা খাবেন দেকচি। পদ্য নাটক-ফাটক লিকে মন্ত্রী-টন্ত্রী হওয়া যায় বটে। কিন্তু সিরিয়াস সরকারি কাজে ওসব চলে না। আদিত্য নিজে নিজের জন্যে স্তোকবাক্যের বুজকুড়ি কেটে মাথামুণ্ডু বকে যায়।


     

    নিজের ভাবনায় মডগুল হবার দরুন, হাওড়া স্টেশানের অখিল ভারতীয় কচকচানি অরিন্দমের চারিপাশে শ্রুতির অবুঝ পার্টিশান তোলে। যিশুকে ওভাবে ধরে একটা ড্রাই রান দিলে আদিত্য। বর্ধমানের কোন-এক ধর্মশিবপুর গ্রামের, যেখানকার মানুষ এই একুশ শতকেও মাঠে হাগতে যায়, সেখানের এই স্বাস্হ্যবান যুবক একদিন মহিলাদের সামনে-পেছনে রুল ঢুকিয়ে রাষ্ট্রের আইন সামলাবে। যাকে ইচ্ছে ধরে তার পায়ের আর হাতের নখ উপড়ে নেবে, এক-এক করে। মারতেই থাকবে, মারতেই থাকবে, কিল চড় ঘুষি লাঠি লাথি, মারতেই থাকবে, মারতেই থাকবে, মারতেই থাকবে, মারতেই থাকবে, মারতেই থাকবে, যতক্ষণ না পেশি থেঁতলে লোকটা হেদিয়ে পড়ে। লোকটার ধড় সাপের লেজের মতন ছটফট না করা পর্যন্ত মুণ্ডু জবরদস্তি চুবিয়ে রাখবে জলে। ফেটে রক্তাক্ত অজ্ঞান না-হওয়া ওব্দি পায়ের পাতায় অবিরাম লাঠির বাড়ি মারবে ; কড়িকাঠ থেকে উল্টো ঝুলিয়ে। যতক্ষণ না শব্দ ওঠা বন্ধ হয়, হাতের গাঁটে পায়ের গাঁটে রুল পেটাবে। চুলের মুঠি ধরে, একবার এদেয়ালে একবার ওদেয়ালে মাথা ঠুকে দেবে। শিশ্নে মারতে থাকবে ফুটরুল দিয়ে। হাত-পা বেঁধে শুইয়ে বুটজুতো পায়ে উরু মাড়াবে। সিগারেটের টুকরোর ছ্যাঁকা দেবে, মেয়েদের নরম জায়গায়। ফাঁকে-ফাঁকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করবে মা-বাপ তুলে। পালাতে বলে, জলজ্যান্ত গুলি করবে পেছন থেকে ; মরে গেলে চ্যাংদোলা এক-দুই-তিন দুলিয়ে ফেলে দেবে হাসপাতালের আঁস্তাকুড়ে। এসবই ব্রিটিশের কাছ থেকে কংরেসিরা পেয়ে, দিয়ে গেছে বামপন্হীদের ; তারা আবার পরের কর্তাদের দিয়ে যাবে, অম্লানমগজে। সমাজ বোধয় কোনোকালেই বদলায় না। অধঃপতনের যাত্রাপথকেই বোধয় প্রগতি বলে। কিন্তু যতই যাই হোক, যিশু বিশ্বাসের কথাটাই ঠিক। ‘প্রান্তিক চিরকার ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংঘর্ষ চালিয়ে যায়।’


     

    অরিন্দম দেখল, জি আর পির চারজন কন্সটেবল তিনটে দেহাতিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আদিত্যকে সেলাম ঠুকলো কন্সটেবলগুনো। আদিতছ, কী রে জবাই করতে যাচ্ছিস, বলায়, একজন অম্লপিত্তকফে ভোগা কন্সটেবল চোখ টেপে, গাঁইয়াগুলা মহিলা কামরায় চাপতাসিলঅঅ।


     

    অরিন্দমের প্রশ্নবাচক ভুরুর উদ্দেশে আদিত্য রসিক হয়ে ওঠে। ওরা ওই দেহাতিগুনোকে জি আর পি থানায় ঢুকিয়ে একটাকে বলবে জামিনদার খুঁজে আনতে। এই বিদেশ-বিভূঁয়ে এসে টপ করে তো আর পাবে না জামিনদার। থানার দরোজার সামনে, দেখগে যাও, উবু হয়ে বসে আছে হুদো-হুদো হবু জামিনদার। ছাড়ান পাবার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠবে দেহাতিগুনো। কত রকুমার কেস যে সারাদিন ধরছে তার ইয়ত্তা নেই। জি আর পির সঙ্গে বেশ ভালো বোঝাপড়া আছে জামিনদারদের। রেস্ত খসালেই ছাড়া পেয়ে যাবে লোকগুনো। জামিন, জামিনদার, জামিনের কাগজ সব ভুয়ো। রেস্ত পাওয়া হয়ে গেলেই ছিঁড়ে ফেলে দেবে ওসব কাগুজে প্রমাণ-টমান। অনেক দেহাতি-পার্টি তো হাতে হেভি মালকড়ি নিয়ে কলকাতায় আসে। আমাদের ওদিকের কালনার শৈলেন ঘটক জামিনদারি করে এক বছরেই সাত বিঘে দোফসলা জমি কিনে ফেলেছে। অবশ্যি উবু হয়ে বসার ওই জায়গাটুকু অনেক দাম ধরে পেতে হয়েছিল শৈলেন ঘটককে।


     

    প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি-অভিমুখী যাত্রী-ঠাসা লোকাল ট্রেনের চকিত-করা ভোঁ বেজে ওঠে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ঘটকালি মন্দ নয়, বলল ও, অরিন্দম। ট্রেনটা ঘট করে শব্দ করে ছাড়তেই, আদিত্যকে ভ্যাবাচাকায় ফেলে, তাতে উঠে পড়ল অরিন্দ। টা-টা।


     

    দশ

    বাড়ি ফিরলেও অশান্তি। ছোটো ভাইটার বউ মধ্যশিক্ষা পর্ষদে কেরানি। অ্যামবাসাডরে পাশে বসিয়ে, সুপর্ণাকে ওর অফিসে নাবিয়ে, অরিন্দম চলে যায় বি-বা-দী বাগে নিজের দপ্তরে। তাড়াতাড়ি গাড়ি চালাতে ভয় করে। ভাইয়ের অনুযোগ যে, ইচ্ছে করে গাড়ি আস্তে চালায় অরিন্দম। জ্যামহীন হরিশ মুখার্জি দিয়ে যাবার বদলে সিগনালের অজস্র ব্যারিকেড-বাধা গাড়িকন্টকিত আশুতোষ-শ্যামাপ্রসাদ দিয়ে যায়। বাসে প্রায় ঘেঁষাঘেঁষি। চলন্ত গাড়িতে হাসাহাসি করে ভাসুর ভাদ্দরবউ। অনেকে নিজের চোখে দেখেছে। পাড়ার বেকার ফুটপাতবাজরা পর্যন্ত আকৃষ্ট হয়েছে ওদের হাসির আদান-প্রদানে, ছি ছি। পাড়া কমিটির উদবাস্তু নেত্রী অঞ্জনা হাজরার একমাত্র মেয়ে বলে খাপ খোলে না কেউ। কই, বাড়ি ফিরে তো হাসাহাসি হয় না।


     

    কী ঘোর বিপদ অরিন্দমের। হঠাৎ কী করেই বা বলবে, এই সুপর্ণা, কাল থেকে তুই বাসে যাস। ঘড়ির ব্যাপারে পাগলামি আছে সুপর্ণার। টেবিলে-টেবিলে, প্রতিটি ঘরের দেয়ালে-দেয়ালে, বিভিন্ন বাজনার গোল লম্বাটে চারকোণা ছকোণা ঘড়ি ঝুলিয়েছে। বৈঠকখানার দেয়ালে টাঙিয়েছে ্রিণ-শিং বিদেশি ঘড়ি, আধঘন্টা অন্তর পাখি বেরিয়ে ডাকে। একঘন্টা অন্তর সমস্ত ঘড়িগুনো বাজতে থাকলে নিভৃত আ্‌লাদ হয় অরিন্দমের। অবশ্য সব ঘযিগুলোই দিনের বেলায় বাজে ; অন্ধকার হলেই তারা বোবা। সাতদিনের জন্যে অরিন্দম ওকে সাতরঙা ঘড়ি কিনে দিয়েছে বলেও উষ্মা।


     

    ভাদ্রবধুর অফিসে প্রশ্নফাঁস, জাল মার্কশিট, ফেলকে পাশ করানো, নম্বর বাড়ানো কেলেংকারির দরুন সেদিন অরিন্দমের টেবিলের সামনে বসে হিঁয়াঃ হিঁয়াঃ হিঃ হিঃ হিঃ খিক খিক হিঁয়াঃ ইঁয়াঃ করে হাত-পা-মাথা নাড়িয়ে-নাচিয়ে হাসি উপহার দিয়ে গেল পাটনা অফিসের মহাত্যাঁদোড় নোটপরীক্ষক মোহন রাজবংশী, যেন ওসব নোংরামির জন্যে অরিন্দমই দায়ি। ব্যাটা তো কোনও কাজ করে না অফিসে। নোটের প্যাকেট গোনার বদলে বাঁ পাশ থেকে ডানপাশে নিয়ে সই মেরে দিত। তারপর সারাদিন কোনো অফিসারের চেলেমেয়েকে কোথায় ভরতি করাবে, ডোনেশানের দরদস্তুর, পরীক্ষায় ভালো নকল চেলেকে বসানো, ইনভিজিলেটারের সঙ্গে রফা, এইসব সমাজসেবা করে বেড়ায়, আর তার জন্যে কমিশন খায়। পাটনায় থাকতে একবার প্রচ্ছন্ন টিটকিরি মেরেছিল অরিন্দম। তার প্রতিশোধ নিয়ে গেল।


     

    অরিন্দম ভাবছিল যে ওর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সবায়ের সমস্যা। সেই ছাত্রজীবন থেকে একের-পর-এক প্রেমাস্পদার সঙ্গে ও সম্পর্ক গড়েছে আর তা ভেঙে গেছে। গড়া-ভাঙার মাঝখানটা ঘিরে একটা করে দূষিত গল্প ছড়ায়। বিশ্বাসযোগ্যতায় দূষণ ঘটে। শেষ গল্পটা তুলি জোয়ারদারকে নিয়ে। যারা কখুনও প্রেম করেনি, তারা মনে করে প্রেমের জন্যে বুঝি মেয়েমানুষটাই সবকিছু। তা তো নয়। নেসায় যেমন নেশাটাই মুখ্য, ড্রাগটা তো গৌণ। ম্যানিলায় একবছর ট্রেনিঙে ছিল বলে, নারীসঙ্গ বিষয়ে অনুমানভিত্তিক কথা ও কাহিনি ছড়িয়েছে অফিসে। ডলার বাঁচিয়ে হংকং আর ব্যাংককের লাল-আলো এলাকার সুমসৃণ মোঙ্গল-ত্বক আদর করার উত্তেজক জিভ-ভেজা গল্প। ছোটোভাইটাও অরিন্দমের নানা গল্পগাছায় ছোটোবেলা থেকে প্রতিপালিত। তার কাছে বিশ্বাস্য হয়ে ওঠা অসম্ভব।


     

    শ্যাওড়াফুলি লোকালে উদ্দেশ্যহীন উঠে পড়েছিল অরিন্দম। কোন্নোগরে নাবল না, ছোটোকাকার শ্রাদ্ধে যাওয়া হয়নি। হিন্দমোটরে নাবল না, অ্যাতো রাতে ব্যাতিব্যস্ত হয়ে পড়বে মেজোকাকা। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে এমন সমস্ত কেউটে গোখরো লাউডগা অজগর শঙ্খচূড় কিরাইত চিতি চন্দ্রবোড়া কানড় ময়াল বের করে-করে কামড় খেতে থাকবে যে রাতভর ঘুমুতে দেবে না। প্রতিটি কামড়ের আগে বলবে, গল্পটা হল এই ; অথচ তা গল্প নয়, তাঁর জীবনের দুঃখকষ্টের চিলতে।


     

    লাটের পর লাট ঘামে পচা নিত্যযাত্রী উঠছে-নাবছে, কোথাও না কোথাও যাবে। তীর্থযাত্রীর মতন একটা ইদ্দেশ্যময় নির্ধারিত গন্তব্য তো আছে। বাড়ি, পরিবার, দিনানুদিনের যৌনতা, রুটিনবদ্ধ কর্মসূচি। এটাই তো সুখপ্রদ আধুনিক জীবন।


     

    ট্রেনটার শেষ স্টেশান শ্যাওড়াফুলিতে, নেবে পড়ল অরিন্দম। মাকে টেলিফোন করে দিল, পিসিমার বাড়ি যাচ্ছে, পরশু অফিস হয়ে ফিরবে। অন্ধকারের অন্ধিসন্ধিতে পঁকপঁক তুলে এগোয় রিকশা। খোঁদল-কানা টিমটিমে রাস্তায় বৃষ্টির আবেগ-মাখা কাদা। দুপাশের হামলে-পড়া দোকানদারিতে নোনাডাঙা রোডটা অনোন্যপায়। বৃষস্কন্ধ ট্রাক চোখ বুজে র‌্যাশান পাচার করাচ্ছে। পাঁঠার শিড়িঙে মরদেহের অবশিষ্টাংশ ঝুলে আছে একাকী উদাসীন কসায়ের চ্যাঁচারি-চিলমনের আবডালে। শহুরে বর্ষার অকাল-ছপছপে গলিতে রিকশা থামল। ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে যতটা চোখ মেলা যায়, থিতু হয়ে জিরোচ্ছে কৃষ্ণপক্ষের সজল মেঘ।


     

    পিসিমা যে পাঁচ বছর আগে মারা গেছে তা পৌঁছে টের পেল অরিন্দম। পিসতুতো ছয় ভাই, ইঁটের অর্থেক তৈরি দাঁত-বেরোনো বাড়িতে ঢুকে দেখল ও, আলাদা-আলাদা মিনি সংসার বানিয়ে ফেলেছে যে-যার ছাদ-পেটানো নানান মাপের খুপরি-ঘর ফ্ল্যাটে। আজকে বড়ো বউদির জন্মের সুবর্ণজয়ন্তীতে, ওদের একত্রে মদ খেতে বসার দরুন, স্কচ হুইস্কির ভরাযৌবন বোতলদুটো পিসিমা-পিসেমশায়ের উপস্হিতির কাজ করল। নয়তো অরিন্দম ঠিক কোন ভায়ের অতিথি, সে সমসয়া এক অপ্রস্তুত ঝামেলায় ফেলে দিত এই বাদলা রাত্তিরে। দুই বোন আর তাদের স্বামীসন্ততিও হাজির। গ্রামীণ প্রকৃতি-পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন প্রতিটি পরিবার নিজের বাড়ির মধ্যেই মেলা বসাচ্ছে এ-যুগে। পাঁঠাবলির বিকল্প ব্রয়লার। নাগরদোলা আর ফকির-বাউলের বদলে ভিসিপি-ভিসিআর এনে বা কমপিউটারে হিন্দি সিনেমার জগঝম্প। একান্নবর্তী এ-যুগে একবোতলবর্তী।


     

    সত্যিকারের বাউল-ফকিররা বোথয় আর টিকবে না বেশিদিন। লালন থাকবে ইশকুল-কলেজের পুঁথিপত্তরে। টিভি আর নাটক-মাচানে থাকবে পূর্ণদাস বাউল। অফিসের কাজে একবার মুর্শিদাবাদ গিয়েছিল অরিন্দম। তাঁতিদের কীভাবে সাহায্য করা যায় যাতে মুর্শিদাবাদি সিল্কের শাড়ি কর্ণাটক আর তামিলনাডুর শাড়ির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিততে পারে তা খতিয়ে দেখতে ধরমপুর, কুমিরদহ, ছয়ঘড়ি, নতুন হাসানপুর, দুর্লভপুর, গুধিয়া, হাসানপুর, হরিহরপাড়া, বাগড়ি, আলিনগর অঞ্চলে ঘোরাঘুরির সময় ফকির-বাউলের হেনস্তার অভিযোগ পেয়েছিল অরিন্দম।


     

    বোঝলেন বাবু, আমরা নাকি কাফের, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদা করি না বলে আমরা নাকি আল্লার বান্দা নয়, আমাদের গানবাজনা নাকি হারাম, রোজা রাখি না বলে ইন্তেকালের পর জান্নাতে আমাদের জায়গা নেই। বলেছিল সিরাজ ফকির। আড়াই হাজার ট্যাকা দিতে হয়েচে গান করি বলে। কংরেস সিপিয়েম ফরোড ব্লক তৃণমূল কেউ বাঁচাতে আসলেনে।


     

    স্বাধীন বাংলাদেশ হলে কী হবে, পাকিসতানি জামাত আছে সেখানে লুক্যে। কুষ্টিয়া রাজশাহি পাবনা থিক্যা আসসা বুল্যে যায় ফকির যেন কাফেরের মতন দোল না খ্যাল্যে, যেন নুন না খায় কাফেরের ভোজে। পরামাণিক ঘরামি কলু মোহন্ত মাঝি পদবি বাদ না দিল্যা তার ঘর‌্যে সাদি-নিকা বন্ধ করা হব্যে। বিয়া আকিকা ইদ বকরিদে লালনের গান গাইবা না। কাজেম মোহন্তর মেয়্যের সোহরের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি আর তার আবার বিয়া কাফেরদের মতন দিল্যা, তাই লবণচল বন্ধ। রইসুদ্দি ফকির, একবাল হোসেন, কাজেমালি দোতারা নিয়্যা নেচেছিল। তেনাদের হুমকি দিয়্যা গেছে ওপারের তবলিগ। পাসপোট-ভিসা লাগ্যে নাই তবলিগঅলাদের। আমরা আল্লার বান্দা না পাকিস্তানের বান্দা বল্যেন আপনে। জানতে চেয়েছিল ফজলু ফকির।


     

    এমন অবস্হায় বালুচরি শাড়িকে ঢাকার বাজারে আর প্রবাসী ধনী বাংলাদেশিদের কাছে জনপ্রিয় করা শক্ত। বাঁকুড়া জেলায় বিষ্ণুপুর মহকুমার মাধবগঞ্জে মহাজন আর তাঁতিরা গোঁ ধরে আছে যে হিন্দু মোটিফ পালটাবে না। মুর্শিদাবাদি তাঁতিকে বালুচরি বোনা শিখতে হলে প্রথমে মাধবগঞ্জের মোটিফ শিখতে হবে। চাঁদ তারা উট তাঁবু খেজুরগাছ মিনার এসবের নকশা জ্যাকার্ডে তুলে যে সরকারি কম্পিউটারবিদ বিষ্ণুপুরে প্রচার করতে গিসলো তাকে তাঁতিরা আর মহাজনরা প্রচণ্ড মার দিয়েছিল। অরিন্দমের মনে হয়েছে এ তো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অতীত এক দুর্বোধ্য সমাজ, এর জট পাকাতে-পাকাতে দড়ির মুখ খোঁজাকে অপ্রয়োজনীয় করে ফেলেছে। অথচ মুর্শিদাবাদের বালুচর গ্রামেই জন্মেছিল বালুচরি।


     

    হতভম্ব অরিন্দম বলেছিল, কিন্তু জেলা সদরে যে শুনলুম বাউল ফকির সংঘের সভাপতি শক্তিনাথ ঝা, তারপর কলকাতার সব গণ্যমান্য লোকেরা, মহাশ্বেতা দেবী, আবুল বাশার, প্রকাশ কর্মকার, মনোজ মিত্র, আজিজুল হক, কবির সুমন, সুজাত ভদ্র, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ওনারা মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে দরবার করেছেন।


     

    সিরাজ ফকির : ওই কলকাতায় গান-গপপো-থেটার করেন, তেনারা ?


     

    অরিন্দম : হ্যাঁ হ্যাঁ।


     

    সিরাজ ফকির : তা তেনারা থাকে কলকাতায় আর নাসিরুদ্দি ছায়েব ভোটে জেতে হেথায়।


     

    অরিন্দম : ওহ।


     

    সিরাজ ফকির : খেতে জল দিচ্ছিল জব্বার ফকির। ওর পাম্প তুলে নে গিয়ে রেখে দিলে পঞ্চায়েতের ছইফুদ্দি সরকারের বাড়ি। যে-ই জব্বারের জন্যে তদবির করেছে সে-ই জরিমানা দিয়েছে। তুঁত খেত আর পলু চাষ লাটে উতেচে গো। আর আপনে এসেচে মুরসিদাবাদি সাড়ি বাঁচাতে।


     

    অরিন্দম দেখেছে, বাহকরাও বলেছে, মহাকরণে মন্ত্রী আর সচিবরাও জানে, চিন আর কোরিয়ার উন্নতমানের রেশমসোতো চোরাপথে আসচে মালদা মুর্শিদাবাদ নদিয়া বাঁকুড়ায়। আহা, করে খাচ্চে গরিব মুটেরা। বড্ডো দুঃখুগো কুষ্টিয়া কোটচাঁদপুর কুমিল্লায়। বিদেশি সাম্যবাদী দেশের সরকার তাই স্মাগলিঙে নিয়োজিত। বাঁকুড়ায় দেখেছিল অরিন্দম, তাঁতি আর মহাজনের আড়ংধোলাই-খাওয়া কম্পিউটারবিদ দেখিয়েছিল, বালুচরি শাড়ির মফসসলি দিকটা এদেশি রেশম, আর শাড়িটার সদর পিঠে কোরিয়ার সিল্ক।


     

    এখানের রেশমচাষিরা পড়ে-পড়ে মার খাচ্চে। দিনকতক পর দড়িদঙ্কা হয়ে মরবে। আমাদের কিছু করার নেই স্যার ল আমরা স্মঅঅঅঅল ফ্রাই। হ্যান্ডলুম অফিসার, নস্যি-নাকি হুতাশ জানিয়েছিল অনুকুলচন্দ্র বসাক। আর তুঁত-চাষি হাজি ইসরাইল বলেছিল, পাশের মালদা জেলায় অবস্হা আরও খারাপ। আমরা লাভজনক দাম পাই না। ভালো জাতের ডিমও পাই না আজ্ঞে। কাজের সময়ে বিদ্যুৎ থাকে না। সেচের জল বাড়ন্ত। সারের দাম বেড়েই চলেছে। আমাদের কতা কেউ ভাবে না। আমাদের দেখার কেউ নেই। এই আপনারা কলকাতা থেকে আসেন, লিখে নিয়ে চলে যান। বিহিত হয় না। এই অ্যাতোক্ষুণ আপনার সঙ্গে কতা বলে কত সময় নষ্ট করলুম। আজকে হাটবার ছিল। আগে আমরা বছরে চারবার পলুপোকা পুষতুম। এখুন একবার পোষা দায়।


     

    আছেরুদ্দি মহাজন, দাড়িপাকা, গোঁফকামানো, বললে, বাঁ পা চেয়ারের হাতলে তুলে পায়জামা নাবিয়ে হাঁটু চুলকোতে-চুলকোতে, সরকার তো পাওয়ারলুম বসাতে দিতে চায় না যাও বা রেশমসুতো হয়, তার বেশিটা নিয়ে চলে যাচ্ছে ভাগলপুর বেনারস মোবারকপুরের ফড়ে। অঙ্গুলিহেলন জানেন তো ? আপনাদের কলকাতার বড়োবাজার সুতোর দাম বেঁধে দিচ্ছে ষড় করে। অঙ্গুলিহেলন-কমরেডদের সঙ্গে ষড় করে। সঅঅঅঅব সমস্যা কলকাতার তৈরি। মুর্শিদাবাদি রেশমশাড়ির দিনকার ফুরুল।


     

    এগারো

    কী হল অরিন্দমদা, স্যাওড়াফুলি ইসটিশান থেকে হেঁটে এলে নাকি গো, অমন হাঁপ ছাড়চ ? জিভে জড়ানো উত্তর আগে জানিয়ে তার প্রশ্নটা পরে বলে সবচে ছোটো পিসতুতো ভাই পল্টু, থলথলে তাঁবাটে খালি গায়ে নেয়াপাতি ভুঁড়ির ওপর পৈতে, ডানবাহুতে রুপোর চেনে তাঁবার ডুগডুগি-মাদুলি, মুখের মধ্যে ভেটকি বৃদ্ধের লাশের ঝালঝাল টুকরো। সামনে কাঁচের গেলাসে মদের আদরে বিগলিত-চিত্ত বরফ-টুকরো। বলল, সময় লাগল বলতে, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ক্লাস টু ফাইভ এইট, ওঃ, কত যে ধকল গেল, নাঃ, বুঝবে না তুমি ; আগে বিয়ে করো, ছেলেপুলে হোক। মাদুলির চেন বাজিয়ে এক চুমুকে শেষ করে। দাঁতে বরফ ভাঙার কড়মড়।


     

    পল্টুর বউটাই কেবল হাঁটুমুড়ে টিভিতে নাক ঠেকিয়ে হিন্দি মারপিটে উৎকর্ণ। ছাপাশাড়ি, এলোখোঁপা, ছোট্ট কপালে মেরুন টিপ, পায়ের কাছে ফাঁকা গেলাস। বাদবাকি ননদ ভাজ ভাসুর ননদাই মদের পলু থেকে কথার মাকড়সার ঘরকুনো জাল বুনছে। গোল হয়ে সবাই। সামনে একাধিক কাঁসার থালায় আস্ত পারসে ভাজা, আরামবাগি মুরগি-ঠ্যাঙের সুস্বাদু পাহাড়, হলদিরাম ভুজিয়াওয়ালার ভুষিমাল, দুফাঁক ডিমসেদ্ধ, মাছের ডিমের বড়া, শশা পেয়াজ গাজর। ভাইরা, জামাইরা, সবাই খালিগা, কারুর চেহারাই ব্যায়াম করা পেশল নয়। পায়জামার ওপর একটা করে বিশার তাঁবাটে কুমড়ো। বউরা, বোনরা মোটার ধাতে এগুচ্ছে। বোধয় মাঝে-মাঝেই হুইস্কির ক্যালরিতে তনু ভেজে।


     

    শতরঞ্চিতে বসে মাছের ডিমের একটা বড়া মুখে পুরে অরিন্দম যখুন চিবিয়ে অবাক ওর মধ্যেকার কাজু কিসমিস রসুনকোয়া সাদা-তিলের উপস্হিতিতে, বড়ো বউদি, যার আজকে জন্মদিন, ছেঁচিয়ে হুকুম জারি করে, এই অরিকেও একটা গেলাস দাও, দাও,দাও,দাও, কতদিন পরে আমাদের বাড়ি এল, তাও আবার রাত্তিবেলা।


     

    অরিন্দম স্পষ্টত বিচলিত। বলল, আরে না-না, আমি এসব খাই না, ককখুনো খাইনি ; সিগারেট ওব্দি খাই না।


     

    স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা বড়ো বউদি, এমেবিয়েড, হাতে টলমলে গেলাস, ফরসা ভারিক্কি গতরকে একত্রিত করে পাছ-ঘেঁষটে উঠে বসে, আর বাঁহাতে অরিন্দমের গলা আঁকড়ে নিজের কানা-ভরা গেলাস দাঁতেদাঁত অরিন্দমের ঠোঁটের ওপর উল্টে দিলে। খাবিনে মানে ? তোর গুষ্টি খাবে, জানিস আজ আমার জন্মের সুবর্ণজয়ন্তী। বিশাল বুকের মাঝে অরিন্দমের মাথা ঠাসা।


     

    তোমার বুকে চেতল মাছের গন্ধ, বলতে, বড়ো বউদি চাপা গলায়, মাছটা কুরে রেখেছিলুম রে, হয়ে উঠল না। অরিন্দমের ফাঁস আলগা হয় না। জামা ভিজে গেছে। ফাঁসের দরুন কষ্ট হচ্ছে। আবার ভালোও লাগছে। নারীর বুকটুকুর এক পৃথক মাতৃত্ব আ্ছে মনে হয়।


     

    অ্যাই, দামি স্কচ বলে ভাবচ ওতে চান করলে নেশা হবে ? দুপাটি দাঁত ভিজছে গেলাসের হুইস্কিতে, ওয়ালরাসের হিলহিলে ঠোঁট নেড়ে বলল বড়ো জামাই। অরিন্দম, তার চে তুই বরং কিছু ভালগার জোক শোনা। গ্রামীণ বিকাশের অনুদান লোটা মাংসল জামাইয়ের কন্ঠস্বর।


     

    জাপটানো অবস্হাতেই বড়ো বউদির হুকুম, হ্যাঃ, তাই শোনাহ। বুজলি অরি, আমরা হলুমগে শান্ডিল্য গোত্রের মাতাল ; গোত্রের ভেতরেই শুঁড়িখানা। বিয়ের আগে তোর মতন ভারজিন কাশ্যপ গোত্র ছিলুম। নেশার কুয়াশায় ক্রমশ ঝিমোনো বউদির কন্ঠস্বর। জাপট আলগা হলেও অরিন্দম মাথা সরায় না। পাফ দিয়ে গুঁড়ো দুধ মাখানো বুক হলে ভালো হতো।


     

    আমি একটা বলছি। টিভি থেকে নিজেকে ছিঁড়ে আলাদা করেছে ছোটো বউ। স্বতঃপ্রণোদিত মাতাল। একবার না, অ্যাঁ, হি-হি, একজন না, অ্যাঁ, রাস্তার ধারে নর্দমায় হিসি করছিল, হি-হি। অশ্লীল নয়, অশ্লীল নয়, অ্যাঁ, নালির ধারে তোমরা যেমন করো। লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টের বোতাম লাগায়, অ্যাঁ, তখন জিপ ছিল না, বোতাম ছিল, বোতাম লাগিয়ে, অ্যাঁ, টের পেল ওর ঘাড় বেঁকে গেছে, হি-হি, একদম সোজা হচ্ছে না। ডাক্তারের কাছে গেলো, ওষুদ খেলো, মালিশ লাগাল, ইনজেকশান নিলে, অ্যাঁ, হি-হি, কিন্ত কিছুতেই কিছু হল না, ঘাড় সোজা হল না। মহাবিপদ। কী করে বেচারা। বেঁকা ঘাড় নিয়েই কাঁচুমাচু মুখে বাড়ি গেল, বউকে বলল। বউ বললে, তা এই কতা, দাঁড়াও এক সেকেণ্ডে ঘাড় সোজা করে দিচ্চি। বলে, হি-হি, প্যান্টের বোতাম খুলে দিতেই ঘাড় সোজা হয়ে গেল। উউউউফ। লোকটা কোটের বোতাম প্যান্টের বোতামঘরে লাগিয়ে নিয়েছিল।


     

    সবাই, মাতাল ভাজ ননদ ননদাই ভাসুর হাসবে বলে উদগ্রীব করে তুলেছিল নিজেদের, কিন্তু নিরুৎসাহিত হল। অরিন্দমের হাসি পেয়েছিল, ছোটোবউ তার স্বামীকে তির্যক আক্রমণটি করল অনুমান করে। কিন্তু হাসার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করতে গিয়ে টের পেল, বড়ো বউদি আবার জাপটকে আঁট করে ফেলেছে ; হয়তো নিজের চেয়ে বেশ ছোটো একজন যুবকের গ্রন্হিসুগন্ধের মাদকতা মদের সঙ্গে মিশে জরুরি আহ্লাদ এনে দিচ্ছে।


     

    নোংরা চুটকি না হলে কেউ হাসবে না রে, সেজো বউদির বিজ্ঞ মন্তব্য। নোংরা মানে সেক্স !


     

    ছোটো জামাই তলানিটা চুমুক মারে। আঁচ্ছা আমারটা শোনো। তেমন নোংরা নয় যদিও। ওই সেক্স-টেক্স নিয়ে নয়। আমাদের রাজনীতিকদের নিয়ে। সো-সো। একজন মাঝারি নেতা, ভাষণ শেষ করে যখুন চেঁচিয়ে স্লোগান দিচ্ছিল, ওনি কোঁৎ করে নকল দাঁতের পাটি গিলে ফেলেছে। এক্সরে হল, সোনোগ্রাফি হল, গু পরীক্ষা হল, নিউক্লিয়ার মেডিসিন টেস্ট হল, দাঁতের পাটি-জোড়ার কোনো হদিস পাওয়া গেল না। একদোম যেন উবে গেচে। কলকাতায় কিছু হল না বলে ভেলোর, অ্যাপোলো, রামমনোহর লোহিয়া, হিন্দুজা, যশলোক, এ আই এম এস কত জায়গায় দেখালে, ব্রেন স্ক্যান হল, রাজনীতিক তো, হয়তো ব্রেনে চলে গিয়ে থাকবে দাঁত-জোড়া, এই ভেবে। দাঁত পাওয়া গেল না। শেষে বিদেশে নেতাদের একটা দল যাচ্ছিল মৌমাছির চাষ কী ভাবে করে দেখার জন্যে, তা একে-তাকে, মন্ত্রী-রাষ্ট্রপতিকে ধরে প্রতিনিধি হয়ে ঢুকে গেল তাতে। উদ্দেশ্য হুসটনে গিয়ে রাষ্ট্রের খরচে ডাক্তার দেখাবে। দলটা আমেরিকায় পৌঁছোল। নানান পরীক্ষার পর যখুন ল্যাংটো উপুড় করে বডি চেক করছে, ডাক্তার অবাক। বললে, ইন্ডিয়ার রোপট্রিক শুনেছি বটে, কিন্তু এরকুম হাসিমুখ গুহ্যদ্বার এর আগে দেখিনি। ইন্ডিয়ার সব পলিটিশিয়ানদেরই কি এরকুম হাসি ? কয়েক মুহূর্ত ধেমে ছোটো জামাই বললে, হয়েছে কী, দুপাটি দাঁত ওইখানে গিয়ে আটকে গিয়েছিল।


     

    সমবেত হোঃ হোঃ হয় বটে তবে অভিপ্রেত অট্টহাস্য হয় না। অরিন্দম হাসতে পারে না। বড়ো বউদির ঢাউস বুকের মাঝে মাথা আটক। আসতে গেলে যদি আটক আলগা হয়ে যায়, তাই। সেজো বউদির মন্তব্য, নিজেকে ছাড়াচ্চিস না যে বড়ো ? অরিন্দম নিশ্চুপ, নিরাবেগ, নিরুত্তেজ।


     

    আঁচ্ছা, আমি একটা আসল অশ্লীল নোংরা অবসিন জোক বলছি। বড়ো জামায়ের প্রস্তাব সমর্থিত হবার মুহূর্তে অরিন্দম আঁৎকায়, জোকের জন্যে নয়, মহিলাদের সামনে অমন জোক শোনার অভিজ্ঞতা ওর নেই। না না না না, আমি তাহলে উঠে পড়ব, ধ্যাৎ।


     

    অরিন্দমের গলা আঁকড়ে রেখেই বড়ো বউদি, কেনওওওরে ? এখনও বে-থা করিসনি বলে ? কবে আর করবি ? আমার কাচে অনেক ছাত্রী-পাত্রী আচে। ফিগার-চটকে ভালো চাস ? না পড়াশুনোয় ? বলিস তো দেকি।


     

    মেজো বউদি : তোর সেই মাইকাটা শুদদুর প্রেমিকাটার কী হল রে ? আমাদের এদিকেও সব খবরাখবর আসে। খুব ঝুলোঝুলি করেছিলি নাকি বে করার জন্যে। তা কেঁচে গেল কেন ?


     

    বড়ো জামাই : অশ্লীল অঙ্গ দুটো নেই বলে।


     

    সমবেত মহিলা আর পুরুষের অট্টহাস্যের দমবন্ধ দমকা বোমাটা এবার ফাটে। হেসেই সামলে নেয় সবাই, ভাই বোন ভাজ ভাসুর ভাদ্দরবউ দেওর জামাই ননদ শালা ননদাই। চোখাচুখিতে ঝটিতি ইশারা বদল হয়। সবাই জানে, পাটনায় থাকতে অরিন্দম ওর চেয়ে বিশি বয়সের বিবাহিতা প্রতিবেশিনীর কিছুটা-খোলা হৃদয়ের গবাক্ষের নরম মাংসে করাঘাতের সাঁঝবিহান সম্পর্ক গড়ে তুলতে-তুলতে পাগল হয়ে চিকিৎসাধীন ছিল। পাড়াতুতো দিদিটার বর টাকা জমাবার ধান্দায় নিত্যিদিন ট্যুরে।


     

    কলকাতায় এসে ক্যানসারে এক-স্তন তুলি জোয়ারদারকে বিয়ে করার প্রস্তাবে, অরিন্দমের মায়ের, কিন্তু-কিন্তু বলতে যা বোঝায়, সে দুশ্চিন্তা ছিল। ছেলেটার আবার মাথা খারাপ হয়ে যেতে পারে আধখ্যাঁচড়া মেয়ের পাল্লায়। তবু, অন্য কাউকে না করলে ওকেই করুক, কাউকে করুক, স্হির হোক জীবন। তুলি এগিয়ে এসে পিছিয়ে গিয়েছে, কেননা মৃত্যুর আহ্বান বেশিদিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না, উচিত সময়ে লজ্জাবশত চিকিৎসা না করাবার দরুণ। ছোটো ছেলে বিয়ে করে নিয়েছে বলে বড়ো ভায়ের মা এখুন যাহোক একটা বউ চায়। এজাত বেজাত কালো ধলা কানা খোঁড়া মুখু বিধবা বর-পালানো বাচ্চাসুদ্দু যাকেই চাস আমি বাড়ির বউ করে আনব, গত দশ বছরে মা ওকে একা পেলেই বলেছে। কয়েকজন ঘটককেও বলে রেখেছে মা, যোটক-ফোটক কিচ্ছু চাই না, এককাপড়ে হলেও চলবে। ঘটকরা প্রতিদিন একজন-দুজন বিবাহযোগ্যাকে এনে ছুতোনাতায় বসিয়ে দিয়েছে ওর চেয়ারের সামনে, অফিসে এনে। ওফ, কী কেলেংকারি। চলকে ওঠার মতন নয়কো তারা কেউ। মেয়েগুলোরও অমন ডেসপারেট অবস্হা ? অপমান সহ্য করেও একজন স্বামী চাই। মেজোবউদি এক্ষুনি প্রতিশোধ নিল এগারো বছর আগে ওনার ছোটো বোনকে প্রশ্রয় দেয়নি বলে।


     

    আবার মেজবউদির খচানে উক্তি : মেয়েটা কিন জাতের রে ? কুলিকামিন ? নাকি ?


     

    বড়দা সর্বাধিক চুর। বুড়ো আঙুলে সুতো-ছেঁড়া পৈতে জড়িয়ে তরলীকরণের সরলীকরণ করে। এতঃ ন শুদ্রং ব্রাহ্মণাদি জাতি বিশেষং ভবতি সিদ্ধং, সর্বে লোকা একজাতি নিবদ্ধাশ্চ সহজ মেবিতি ভবঃ।


     

    মোনতোর-টোনতোর নিয়েচেন নাকি বড়দা ? আমাকে জানাতেন যদি তো আমিও নিতুম। বড্ডো অশান্ত থাকে মনটা। কার মোনতোর ? অনুকুল ঠাকুর না রামঠাকুর ? অ্যাঁ ? নাকি বাবা লোকনাথ ? বালক ব্রহ্মচারীর জপ শুনিচি বেশ কাজে দ্যায়। বড়ো জামায়ের কন্ঠে অকৃত্রিম আপশোশ।


     

    সেজো বউদি : আরে বামুনরা আবার মোনতোর নেয় নাকি ? ওসব কায়েত সুদদুরদের ব্যাপার। বামুনদের তো গায়িৎরি মনতোর আচেই। তাই-ই জপ করুন না দুবেলা মন দিয়ে।


     

    বড়ো জামাই : অঅঅঅঅ। অরিন্দম ভাবছিল, জোয়ারদার কোনো জাত হয় ? কেটলিউলি কোন জাত ? জাতিপ্রথার জন্মের সময়ে তো চা খাবার ব্যাপার ছিল না। দেখতে কেমন ? নাম কী ? কোথায় থাকে ? একদিন গেলে হয় মহাকরণে। কিন্তু সেখানে তো অনেক কেটলিউলি আছে। চিনতে পারবে নিশ্চই ও। চলকে ওঠা থেকে ঠিক টের পেয়ে যাবে।


     

    প্রধানশিক্ষিকা নিজের পুরো সুরাসক্ত ওজন ঢেলে রেখেছিল অরিন্দমের ওপর। বড়দি, তোমার ব্লাউজের বোতাম খুলে অরির ঘাড়টা এবার সোজা হতে দাও। মেজোবউদির কথায় অরিন্দম ছাড়া পায়।


     

    আগে লোকে সমাজের চাপে বাড়ির বাইরে মদ খেত। এখুন সমাজের ভয়ে বাড়ির মধ্যে বাড়িসুদ্দু সবাই খায়। তার কারণ আগে সমাজ বলতে যা বোঝাত তা আর নেই। সবাই সবাইকে ভয় পায় আজকাল। অন্যে কী করছে-করবে সবাই আঁচ করে টের পায়। কেউ বিশ্বাস করে না অথচ গালভরা কথা বলে। আমরা সবাই মিথ্যাগ্রস্ত মাতাল। বাঙালি মধ্যবিত্তের এ এক অদ্ভুত যাযাবর হামাগুড়ি। কোনো বিশেষ তীর্থ নেই। কত গোঁড়া ছিল এই বাড়িটা, পিসিমা-পিসেমশায় বেঁচে থাকতে। মুরগির মাংস তো নিষিদ্ধ ছিলই, মুরগির ডিমেরও বাড়িতে প্রবেশাধিকার ছিল না। খেতে বসে গণ্ডুষ না করা অপরাধ ছিল।


     

    পিসেমশায়ের বাস্তুভিটে ছিল হুগলি জেলার বলাগড় ব্লকের ফুলতলা গ্রামে। সেসব ছেড়েছুড়ে বেচেবুচে এখন শ্যাওড়াফুলিতে। এই বাড়িটায় অরিন্দম যখুন শেষ এসেছিল, টালির চালের দুটো মাত্র ঘর ছিল, সামনে-পেছনে ফুলের উচ্ছৃঙ্খল জঙ্গল। বলাগড়ের কাঁচাগোল্লা খেয়েছিল, মনে আছে। পিসেমশায় টাকমাথা, মোটা কাঁচের ভারিক্কি চশমা।


     

    ফুলতলার বসতবাড়ি, ভাগচাষ দেওয়া জমিজিরেত, সব ভেঙে-ভেঙে বিস্কুটের টুকরোর মতন তারিয়ে খেয়ে ফেলেছে গঙ্গা। কলকারখানার ফেনানো পাঁক আর পূণ্যার্থীর গু-মুত, গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে গিয়ে, বাঁকবদল ঘটেছিল নদীর। মাঝরাতে, চাঁদনি আলোর অগোচরে, কিংবা প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রামবাসীদের চোখের সামনে, ডাঙাজমিন, ভরাখেত, কুরেকুরে শেষ করেছে নদীটা। অরিন্দম গিয়েছিল স্কুলে পড়ার সময়। গঙ্গা বয়ে গেছে জিরাট, শ্রীপুর-বলাগড়, চরকৃষ্ণবাটি, গুপ্তিপাড়া, সোমড়া, খামারগাছি আর ডুমুরদহ-নিত্যানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ওপর দিয়ে।


     

    সুলতাপুর, গুপ্তিপাড়া, রিফিউজিবাজার, ভরপাড়া, বেনালি, চররামপুর, গোঁসাইডাঙা, রসুলপুর, সুন্দরপুর, চাঁদরা, ভবানীপুর, চরখয়রামারি, রুবেশপুর, রামনগর গ্রামগুলোর অনেক ঘরদালান, রাস্তাঘাট, দেউড়িদেউল, দোকানবাজার, ইশকুল, শিবের থান, মেটে মসজিদ, ফকিরের কবর, রঙেশ্বরীর একচুড়ো গর্ভগৃহ, তিনফসলি জমি, সব সঅঅঅঅব, গিলেছে গঙ্গা। ইঁট আর শালবল্লা পুঁতে থামানো যায়নি নদীটার বেয়াড়াপনা। সেসব ইঁট-কাঠ নিজেদের বসতকে অহেতুক ঠেকনো দিতে যে যার তুলে নিয়ে গেছে। কারুর চেষ্টাই টেকেনি বেশিদিন। বাঁধাগাছি আর পালপাড়ার বামুনরা শ্যাওড়াফুলিতে চলে যাচ্ছে খবর পেয়ে পিসেমশায়ও কিনেছিল চারকাঠা জমি। ছেলেরা নিজেদের অবস্হামতন খুপরি তুলেছে।


     

    এই ঘরটা সর্বজনীন।


     

    ফুলতলায় থাকতে আলতাপাতার ব্যবসা ছিল পিসেমশায়ের। ওনার বাবার আরম্ভ করা ব্যবসা। অনেক ঘর রংবেনে মণিবণিক ছিল তল্লাটে। লাক্ষা গালা আলতার কাজ করত। রাসায়নিক আলতা বেরোবার পর দুবেলা দুমুঠোর ওপর চোট সামলাতে রংবণিকরা স্যাকরার কাজ ধরে একে-একে চলে গেল সুরাট, মুম্বাই, বাঙ্গালোর, কিংবা ঘড়িকোম্পানির জহুরি হয়ে গেল। পিসেমশায় রংবেনেদের কুলদেবতা রঙেশ্বরীদেবীর পার্টটাইম সেবাইত হয়ে চালিয়েছিল কিছুদিন। আজকে দেয়ালের খুঁতখুঁতে টিউবলাইটের তলায় ফ্যাকাসে রঙেশ্বরীদেবীর উদাসীন দৃষ্টিবলয়ে বসে নোংরা-নোংরা মোদো চুটকি চলছে।


     

    তোমরা কেউ আলতা পরো না ? বলে ফেলেছিল অরিন্দম।


     

    অ্যাই ছুটকি, তোর কাছে আলতা আছে তো ? নিয়ায়। ফ্লোর লিডার মেজবউদির গম্ভীর অনুচ্চস্বর আদেশে দ্রুত উঠে দাঁড়ায় ছোটো বউ, এক রাশ চুল পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। অত চুল দেখে হঠাৎ ভয় করে ওঠে অরিন্দমের। অবাক হয় নিজেই। আজগে অরি আমাদের সবাইকে আলতা পরাবে। মেজবউদির দ্বিতীয় আদেশে ধাতস্হ হয়।


     

    ছুটকি দেয়াল, দরোজার কপাট, জানলার গ্রিল, বাকসোর থাক ধরে-ধরে নিজেকে সামলে ঘর থেকে বেরোয় আর ফিরে আসে বাঁ হাতে আলতার শিশি, তুলোকাঠি আর ছোট্ট কাঁসার বাটি নিয়ে। যেভাবে গিয়েছিল সেভাবেই মাতাল দেহবল্লরীকে সামাল দিয়ে। অরিন্দমের পাশে বসে। শাড়ি সামান্য তুলে পা বাড়িয়ে নিভৃত আবদার, আগে আমাকে পরাও। আলতাটা আমার বিয়ের ক’বছর যাবত পড়ে আছে। সময়ই হয় না। প্রফেসারির ঝকমারি, একটা তো মোটে রোব্বার, শাড়ি কেচে ইসতিরি করতেই সময় চলে যায়।


     

    ছুটকির বাঁ পা কোলের ওপর তুলে নিয়েছে অরিন্দম। প্রায় নিঃশব্দে বউটি বলে, তাড়াহুড়ো কোরো না, রয়ে-সয়ে সময় নিয়ে ভালো করে পরাও। অরিন্দম গলা নাবিয়ে বলল, তাহলে নেলকাটার আনো, নখ অনেক বেড়ে গেছে। নখ পালিশ লাগাও না বুঝি ? ছুটকি ঝটিতি উঠে দাঁড়াতে, মদ টলমল করে ওঠে ওর দেহ জুড়ে, বাতাসের ওপর দিয়ে হেঁটে নেলকাটার আর নখপালিশ আনে। কোলের ওপর পা তুলে নিয়ে অরিন্দম টের পায়, পা ধুয়ে মুছে এসেছে, আগের চে ঠাণ্ডা।


     

    মেয়েদের পা অপরিমেয় শ্রদ্ধার। তোমার পায়ে ছন্দ লেগে আছে। নখকাটার কুটকাট শব্দের চে আস্তে বলল অরিন্দম।


     

    ছন্দ ? কী ছন্দ ?


     

    অরিন্দম বিপাকে পড়ে। উচ্চমাধ্যমিকে বাংলা ভাষাটা মন দিয়ে পড়েনি। দ্রুত মনে করার চেষ্টা করে বলল, মুক্তক।


     

    যাঃ। ও তো বাংলা।


     

    হলেই বা। এই তো গোড়ালিতে তিল হয়ে লেগে রয়েছে অনুষ্টুপ।


     

    আবার সেই। না না। আমার পায়ে আছে আয়ামবাস, এই দ্যাখো, ট্রোকি।


     

    ওওওওও। ইংরেজি। ইংরেজি পড়াও।


     

    হ্যাঁ। ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলুম। ব্লেকের ম্যারেজ অব হেভেন অ্যান্ড হেল মুখস্ত। বুঝেছি। অমন বিয়েই করেছ। এখুন তো আর কিছু করার নেই।


     

    কে বললে ? সাহস থাকলে ভাসুরের কোলে পা তুলে সবায়ের সামনে বসা যায়। সাহস থাকলে, মরনিং আফটার ওষুধের জোরে, অনেক কিছু করা যায়। কটা বউ পারে ?


     

    এখন তুমি মাতাল। মাতাল গৃহবধু। কী বলছ, না বলছ, তার হুঁশ নেই।


     

    মাতাল ? ঠিকাছে, আমি না হয় মাতাল। তোমার তো হুঁশ আছে। মুক্তক আর অনুষ্টুপ ছন্দে ঠোঁট রাখতে পারো? ছন্দ তো শুধু চরণেই থাকে না। থাকে সবখানে। ভালো করে চোখ মেলে দ্যাখো।


     

    বড়োবউদি শয়ে পড়েছিল। ওদের দিকে পাশ ফিরে। তোদের গুজগুজ ফিসফিস সঅঅঅব শুনতে পাচ্ছি আমি। অরিকে চেনো না। চুপচাপ জাল বিছিয়ে দেবে, টেরটি পাবে না। ভয়ংকর চিজ। অ্যাগবারে কাপালিক। ছু-মন্তর এড়াতে পারবি না। মাতন লেগে যাবে।


     

    ছুটকি বড়োবউদিকে, তুমি তো ওর জালে ছিলে এতক্ষুণ। এবার আমি না হয় থাকি। কাল থেকে তো আবার জাঁতা পেষা। তারপর অরিন্দমকে, কই দেখালে না কী রকম তোমার হুঁশ। আমি একজন স্বঘোষিত আদেখলে।


     

    শব্দবধির হওয়া সত্ত্বেও, সাপ যেভাবে তার চোয়ালের মাধ্যমে জমির সূক্ষ্ম স্পন্দন অনুভব করতে পারে, অনুভব করে শিকারের উষ্ণতার সংবাদ পায়, সেই গোপন অনুভুতি নিয়ে, বেশ যত্নে, নখপালিশ লাগায় আর আলতা পরায় অরিন্দম। এত কাছ থেকে, এভাবে কোনো যুবতীর কেবল পাটুকু এর আগে খুঁটিয়ে দেখেনি অরিন্দম। মুখ নিচু, ঠোঁটে ধূর্ত হাসি, ছুটকির চোরাস্রোত-চাউনি অরিন্দমের উদ্দেশে। ফিসফিস কন্ঠে অরিন্দম বলল, বেশ কয়েক বছর মদ খাচ্ছ তাহলে, অধ্যাপিকা ? মাথা নাড়ে ছুটকি, হ্যাঁ, এট্টুখানি, নমাসে-ছমাসে, ভাললাগে, এটারচে কোকাকোলার সঙ্গে রাম ভাল্লাগে, কিন্তু বড়ো আর সেজোর যে শুগার। স্নায়ুসুখে আপ্যায়িত দেহকে পাশ ফিরিয়ে, বাঁ পা নাবিয়ে, ডান পা অরিন্দমের কোলে তুলে দিলে ছুটকি।


     

    তোমার জামায় মদ, প্যান্টে আলতা, বাড়ি যাবে কী করে ?


     

    এমনি করেই। আমার তো পায়ে কবকব নেই, ছন্দ নেই, লোকলজ্জার ভয় নেই।


     

    শুদুই বকবক। পথিক তুমি পথ হারাইতে ভুলিয়া গেছ। যাও, গিয়া দেয়ালে পোস্টার সাঁটো, ইনক্লাব-জিন্দাবাদ করো, কিন্তু প্রেমাপ্রেমি কোরো না।


     

    হুঁ।


     

    রেখেছ বাঙালি করে, পুরুষ করোনি।


     

    হুঁ।


     

    আচমকা ওপরতলা থেকে বিলিতি বাজনার তারস্বর আসে। ওপরেও ঘর আছে বুঝি ? জানতে চায় অরিন্দম, স্বাভাবিক কন্ঠস্বরে। আগেরবার যখুন এসেছিল তখুন ছিল না ওপরতলায় কোনো ঘর। ফাঁকা ছাদ ছিল। আলসেতে গোলাপফুলের টব।


     

    এইটে যেমন আমাদের কমনরুম, ওপরেরটা বাচ্চাদের। ছাতের ওপর ওই একটাই ঘর। একটু থেমে, ছুটকি বলে, অরিভাসুর, প্রেম না থাকলে প্রাণটা বড্ডো খাঁ-খাঁ করে, না গো ? তোমার প্রেমের গল্প অনেক শুনেছি। প্রেম ছাড়া তুমি অসুস্হ হয়ে পড়ো, শুনেছি। তোমাকে আমার হিংসে হয়। জানাই হল না প্রেমে পাগল হওয়া কাকে বলে।


     

    ছুটকির পর গরমমশলার গন্ধের মতন স্বাস্হ্যবতী, ভূমিসংস্কার দপ্তরের করণিক সেজো বউদি এগিয়ে আসে পাছা ঘষে। হাঁটুর ওপর ওব্দি সাড়ি উঠিয়ে মেদনরম পা জোড়া তুলে দিলে অরিন্দমের কোলে। নে, সেবাযত্ন কর। শাড়ির পাড়ে আঁকা ফুলের গোছা ধরে পা ওব্দি নাবিয়ে এনে অরিন্দম বলল, অমন কোরো না, এখুনও অটুট আছ তুমি ; উলটে মাঝখান থেকে আমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে। শুনে, আঁচলে মুখ চাপা দিয়ে কেঁপে-কেঁপে হাসে সেজো বউদি। বলল, আমার পায়ের ওপর রাজহাঁস এঁকে দে, ছোটোবেলায় ঠাকমা একবার এঁকে দিসলো, আমি তখুন পানিশ্যাওলার ইসকুলে পড়তুম। তারপর তো বাবা বদ্যিবাটিতে চলে এলো।


     

    প্রতিদিন সবাই মিলে কলকাতা ঠ্যাঙাও, ওদিকেই ফ্ল্যাট-ট্যাট কিনে নাও না কেন ?


     

    কীইইই যে বলিস। এখেনে একসঙ্গে আছি সবাই, বিপদে-আপদে দেখি। এরম তো বসা হবে না আজগের মতন। কলকাতায় সবাইকে আলাদা-আলাদা ফ্ল্যাটে থাকতে হবে, পুকুর-বাগান থাকবে না, দম বন্ধ হয়ে যাবে।


     

    অ্যাই, অরিকে আমাদের বাংড়ির জন্মদিনের ক্যালেন্ডারটা দিয়ে দিস। থালে ফি-মাসে আসতে পারবে। ছুটকির ঠেঙে নিয়ে নিস অরি। মনে পড়ে গেল, অরি, কালকে আমার আয়কর রিটার্নটা ভরে দিস। মদঘুমের জগতে প্রবেশ করার প্রাক্কালে বড়োবউদির আদেশ। শতরঞ্চিতে মেদবহুল গতর এলিয়ে কৃতবিদ্য প্রধানশিক্ষিকা। অজস্র ছাত্রীর প্রণাম সংগ্রহকারী পদযুগল। শোয়া অবস্হাতেই মাতাল চরণে আলতা পরায় অরিন্দম। গোড়ালি ফাটা। নখ বড়ো হয়ে গেছে। বাড়িটার জীবননাট্যে বোধয় পারস্পরিক যত্নের সময় নেই। সবাই মগ্ন জীবিকায়। আর ফাঁক পেলেই এক চিলতে যৌথ সীমালঙ্ঘনের মৌতাত।


     

    তর্জনীতে গণ্ডারের শিঙের আংটি, ছোটো জামাই বলল, যেন মদের বুদবুদ ফেটে স্মৃতি ফিরে পেয়েছে, বলল, সেনসেক্স চারশো পয়েন্ট উঠেছে, বড়দা, তেমন-তেমন স্ক্রিপস থাকলে এই বেলা ঝেড়ে দাও।


     

    একে-একে বউদের, তারপর দুই ধুমড়ি বোনের নখ কাটে অরিন্দম, নখপালিশ লাগায়, আর আলতা পরিয়ে দেয়। ওদের পরানো শেষ হতে বড়দা আচমকা এগিয়ে দিয়েছে নিত্যযাত্রীর ট্রেনে ওঠায় রপ্ত হাড়প্যাংলা ঠ্যাং, শিরাপাকানো, যেভাবে পুরোনো শ্যাওলাধরা মন্দিরকে দুমড়ে জড়িয়ে থাকে অশ্বথ্থ গাছের শেকড়। অরি, আমাকেও লাগিয়ে দে দিকিনি, ভাবিসনে যে মাতাল হয়ে গেচি, আপিসে তো বুট জুতো পরে যাই। অরিন্দম তাকায় বাদামি কুয়াশামোড়া নতোদর প্রৌঢ়ের মুখের পানে। পুরসভার স্বাধিকারপ্রমত্ত অ্যাসেসমেন্ট ইন্সপেক্টর। বাঙালির, পশ্চিমবাংলার বাঙালির, স্বাধীনতা-উত্তর খাঁটি প্রতিনিধি। ছেলে মণিপুরে মোইরাঙে পোস্টেড। মোটা টাকা দিয়ে মণিপুর রেভলিউশানারি পিপলস ফ্রন্টের কাছ থেকে ইমিগ্র্যান্ট পারমিট নিতে হয়েছিল থাকার জন্যে। কালকে বিপ্লবীরা ওকে বাহাত্তর ঘন্টা সময় দিয়েছে মোইরাঙ ছাড়ার জন্যে, উদ্বিগ্ন মুখে বললেন বড়দা। অ্যানথ্রোপলজিকাল সার্ভের ভালো সরকারি চাকরি ছেড়ে ফিরে চলে আসছে। শত্রুতা না বাড়ালে বিপ্লব সফল হয় না। বিপ্লব ছাড়া বিদেশি অস্ত্র কারখানা লাভে চলবে না।


     

    বড়দার একপায়ে কাস্তে-হাতুড়ি, আরেক পায়ে পদ্মফুল আঁকে অরিন্দম।


     

    ছাদের ঘর থেকে আরেকবার ষাঁড়াষাঁড়ি ডেসিবল আচমকা এঘরের মদ সিগারেট মাংস মাছ চানাচুর ডিমসেদ্ধর মাথাভার বাতাসে কুচি-কুচি আছড়ে পড়তে, ছাদে যাবার সিঁড়িতে ওঠে অরিন্দম। এঘরে আর কেউ কথা কইবার অবস্হায় নেই। প্রশস্ত ছাদ। টবের গাছে ছোটো-ছোটো ফুলকপি ক্যাপসিকাম লংকা। আকাশ ছেয়ে গেছে মেঘে। অরিন্দমের মনে হল, অজানা কোনও কিছুর জন্যে ওর মর্মমূল ধ্বনিত হচ্ছে। ছন্দের বোধয় নিজস্ব ধর্ম হয়। চৈতন্যের পায়ে ছিল একরকুম, রামকৃষ্ণের আরেকরকুম। বুদ্ধের ছিল। যিশুখ্রিস্টের ছিল। কেটলিউলির আছে কি ?


     

    বারো


     

    ছাদের ঘরের দিকে ছাইরঙের দরোজা ঠেলে অরিন্দম দেখল, কুচোকাঁচা থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাশেষ ছেলেমেয়ের দল, যে যার মতন নেচে যাচ্ছে, হাত তুলে কোমর বেঁকিয়ে। একজন ফ্রক উড়িয়ে শাস্ত্রীয় নাচের অঙ্গভঙ্গী করছে ইউরোপীয় বাজনার তালেতালে, বোধয় শাস্ত্রীয় ভারতীয় নাচ শেখে, কুচিপুড়ি ভারতনাট্যম কোনো-একটা হবে। ঘরে ঢুকতেই অরিন্দমকে ঘিরে ধরে সবাই। বড়দা-মেজদার মেয়ে দুটো অরিন্দমের হাত ধরে অরিকাকু অরিকাকু বলে হাঁক পাড়ে। এদের দুজনকে ছাড়া আর কাউকে চেনে না অরিন্দম। কেউ গিয়ে বাজনা বন্ধ করে। জামায় তীব্র হুইস্কির গন্ধ আর প্যান্টময় খাপচা লাল রং যে এরা কেউই অনুমোদন করছে না, ভুরু কোঁচকানো অনুসন্ধিৎসা দেখে আঁচ করে অরিন্দম। বলল, খাইনি আমি, বমি পায়, ওদের গেলাস থেকে চলকে পড়েছে। এই কচিকাঁচাদের কাছে নিজের দুর্বলতা মেলে ধরে কিছুটা ভারমুক্ত বোধ করল অরিন্দম। বয়সের সাহায্যে নিচের তলায় আর ওপর তলায় আনন্দের মুহূর্ত গড়ে নিয়েছে এই বাড়ির সদস্যেরা। ওই বা কেন যে বঞ্চিত হয় আনন্দের পরিসর থেকে ! কেন যে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনা !


     

    বালক-বালিকাদের মাঝে ভালো লাগে ওর, অরিন্দমের। আশ্বস্ত বোধ করে। পাটনায়, অফিসের লাঞ্চটাইমে পাশের নার্সারি স্কুলের ছুটি হত। ছোটো-ছোটো খোকা-খুকুর ছুটির হইচইয়ের মধ্যে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ত অরিন্দম, দাঁড়িয়ে থাকত বেশ কিছুক্ষণ। চারিদিকে অজস্র কচি ছেলেমেয়ের ছোটাছুটি আর কোলাহলের মাঝখানে চুলচাপ দাঁড়িয়ে থাকত ও। পুজো আর গ্রষ্মে যখুন ইশকুলটা বন্ধ থাকত তখুন মন খারাপ লাগত অরিন্দমের। এখানে, কলকাতায় বি-বা-দী বাগে ওর অফিসের কাছে ইশকুল নেই। এই অফিস পাড়াটায় বালক-বালিকাদের প্রবেশাধিকার নেই। আজ পর্যন্ত কোনও ইশকুলের ছাত্রছাত্রীদের এই এলাকায় দেখতে পায়নি ও, অরিন্দম।


     

    ওর সামনে হিচইরত ছেলেমেয়েদের মুখ দেখে বুঝতে পারছিল অরিন্দম, ওকে বিশ্বাস করছে না এরা। শিশু কিশোর তরুণদের চেখে এখুন আগের প্রজন্ম সন্দেহজনক। জনকেরা সন্দেহজনক। মেজদার বড়ো মেয়ে এই ফাঁকে বাবার জামা-প্যান্ট এনে দিয়েছে। যাও, নিচে বাথরুমে চান করে পাউডার মেখে পালটে এসো, গিজার আছে।


     

    চান করে, জামা-প্যান্ট পালটে এসে বসলে, কাছে এসে মুখ থেকে গন্ধ শুঁকে আশ্বস্ত করে নিজেদের, শাড়ি-পরা উচ্চ-মাধ্যমিক, চুড়িদার মাধ্যমিক। এদের মধ্যে সবচে ছোটোটা, তুলতুলে বছর তিনেকের, পায়ে রুপোর মল, বিস্ফারিত তাকায়। কোলে চাপতে চাইছে। তুলে নিলে, কাঁধে মাথা রাখে। ঘুমের গন্ধ আসছে শিশুটির মুখ থেকে। কত ভালো লাগে এই গন্ধ।


     

    তোদের খাওয়া হয়েছে তো ?


     

    সমস্বরে, হ্যা আ্য আ্য আ্য আ্য আ্য, সন্ধেতেই। আজ তো ভুরিভোজ ছিল।


     

    জানলা দিয়ে দেখা যায়, বাতিস্তম্ভের আলোয়, বাড়ির পেছনের থমথমে পানাপুকুর। একগাল হাসিমুখে ঠায় দাঁড়িয়ে ঝাঁকড়া স্হলপদ্ম। পুকুরের দক্ষিণে বৈদগ্ধ্যে ভারাক্রান্ত আমগাছ, স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে থাকবে, ফলহীন। পুকুরের এদিকে জানলার তলায়, গোলাপ ঝাড় দুহাত তুলে খরচ করছে মোলায়েম সুগন্ধ। গাছগুনোর পাতাকে ফুঁ দিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে অন্ধকার। লাস্যময়ী বাদলাপোকারা ঘরে ঢুকেই, ডানার ওড়না ফেলে দিচ্ছে পার্ক হোটেলের ক্যাটওয়াকে মডেলখুকিদের ঢঙে। অন্ধকারে তিরতির কাঁপা কৃষ্ণপক্ষের কনকনে আকাশে ভিজেভিজে বিদ্যুতের শব্দহীন আলো। কোনও প্রতিবেশির বাড়িতে উদাত্তকন্ঠ অ্যালসেশিয়ানের রোমশ ডাকের তরঙ্গ।


     

    পাঁচ-সাত বছরের গালে-টোল ফরসা দুঝুঁটি এগিয়ে আসে। তুমি কে গো ও ও ও ?


     

    আমি ? আমি হ্যামেলিনের কেটলিওলা। অরিন্দম কথাটা বলেই থ। এখনও তো কেটলিউলি অদেখা। তবে ?


     

    তুমি বাঁশি বাজাতে জানো ?


     

    বাঁশি ? উঁহু, জানি না।


     

    তবে কেটলড্রাম বাজাও ?


     

    না, তাও জানি না।


     

    লিটলুটা ঘুমিয়ে পড়েছে কেটলিকাকুর কোলে ; টুম্পা ওকে শুইয়ে দিয়ায়। আলো জ্বেলে মশারি টাঙিয়ে দিস। পিগটেল ফ্রকপরার হুকুম মান্য করে ববছাঁট ফ্রকপরা।


     

    কেটলিকাকু, তুমি গান জানো ? জানতে চায় ক্লস নাইনের পরীক্ষামুক্ত কিশোর।


     

    গান। মমমমমমম, ভেবে দেখি। গানের কিছুই জানে না অরিন্দম। কী করে লোকে যে রবীন্দ্রসঙ্গীত অতুলপ্রসাদ দ্বিজেন্দ্র নজরুলের গানের সুরের তফাত বোঝে, ঠাহর করতে পারে না ও, পারেনি। গানের আলোচনায় কুন্ঠিত বোধ করে। ওর সামনের ফ্ল্যাটে লরেটোতে পাঠরতা কিশোরী তিনচারটে গান কতকাল যাবৎ সেধে যাচ্ছে, সকালের আলো ফুটলেই, অবিরাম। শুনে-শুনে সুর আবছা মুখস্হ হয়ে গেছে অরিন্দমের। খোকাখুকু শ্রোতার মাঝে চেষ্টা করা যেতে পারে। শ্রোতাদের সামনে নিজেকে গান শোনানোর ভালই সুযোগ। শ্রোতারা যখুন অত্যুৎসাহী।


     

    কই গাও। গাইছি।


     

    মা রঙেশ্বরীকে হাত জোড় কল্লে না যে। ঠাকুর পাপ দেবে। গাইবার আগে, নাচবার আগে, পড়তে বসে, মা রঙেশ্বরীকে হাত জোড় কত্তে হয়। বিদেশী বাজনার তালে স্বদেশী নাচছিল যে কিশোরী, তার উপদেশ।


     

    অরিন্দম চোখ বুজে হাতজোড় করেছে। মগজের মধ্যে একাগ্র ভগবদভক্তি কী করে জোটায় কেউ-কেউ ? ব্যাপারটা ঠিক কী ? কোন উপায়ে অমন নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ঘটে ! আমি কেন ওই বোধ থেকে বঞ্চিত ?


     

    জীবনে প্রথমবার ও, অরিন্দম, সিরিয়াসলি গান ধরে :


     

    II { স..সপা…T পা…পধা…ধপহ্ম-T হ্ম…হ্মা…গসাঃ… I সগঃ…সপা…TI


     

    সাঁ….ঝে০….রপা….খি….রা০০…০…ফি…রি…ল০….০কু…লা০…য়


     

    I গহ্ম…ক্ষণা…নর্সা…ধনা…পাঃ I পহ্মগঃ…হ্মপা-T – T গমাগমা…গরসা }I


     

    তু০…মি০…ফি০…রি০…লে০…না ০০০ ঘরে ০ ০ ০০০০ ০০০


     

    I প…পনা—TI না….সর্ণা….র্সর্সনধা I ধনা…পধর্নারা…র্সনধা I ধনা…ধপা–TI


     

    আঁ….ধা০….র…ভ…ব০….০০০ন…জ্ব০…লে০০০…নি০০…প্র০…দী০…প


     

    I সা….রা….রা….I রা…গহ্মপধা….গহ্ম I – T হ্মপা- TI গমা…গগা…রসা I


     

    ম…ন…যে…কে…ম০০০…০ন….০করে…০….০০…০০…০০


     

    ভুল ভুল ভুল ভুল, জানোওওওওনা, হলোওওওনা। হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে শাড়িপরা উচ্চমাধ্যমিক।


     

    অরিন্দম স্তম্ভিত। ঠাহর করতে পারে না গানের হওয়া না হওয়া। অথচ গাইতে-গাইতে বিভোর আত্ম্রীতিতে আক্রান্ত হয়েছিল। কোকিল যেভাবে কাককে ফুসলিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়, ও-ও নিজেকে ফুসলিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছিল অচেনা আনন্দের পরিসরে।


     

    হ্যাঁ, তুই বড়ো কুমার শানুর মা এসচিস। মাধ্যমিক অরিন্দমের পক্ষে।


     

    তুমি তো মিশ্র ইমনে গাইছিলে। গানটা তো নজরুলের, মিশ্র মল্লারে হবে। তুই গেয়ে শোনা দেখি। মাধ্যমিক চ্যালেঞ্জ জানায়।


     

    উচ্চমাধ্যমিক বসে পড়ে মেঝেতে। চোখ বোজে। কোলে হাত। প্রথমে গুনগুন। তারপর গান ধরে।


     

    II { সা মরা মা I পা ধা ণা I ণা ধপা মপধাঃ I পঃ মজ্ঞা রসা I


     

    সাঁ ঝে০ রা পা খি রা ফি রি০ ল০০০ কু লা০ ০য়


     

    I স সরজ্ঞা রা I সা ণা ধ পা I পনা না সা I সা সা র্সা }


     

    তু মি০০ ফি রি লে না ঘ ০ ০ রে ০ ০


     

    I মা মরা মা I মপা পাধ মপাঃ I মঃ পা সর্ণা I ধা পা পা I


     

    আঁ ধা০ র ভ ব ন জ্ব লে নি প্র দী প


     

    I পধা পধা পমা I গা মগা রসাণ I না সা গা I রগা মা মা I


     

    মা০ ০ন যে কে ম০ ০ন ক রে০ ০০ ০ ০


     

    কেটলিকাকু, আমিও গান জানি। নাদুস কিশোরের প্রস্তাব।


     

    গাও তাহলে, শুনি।


     

    আমমি চিন্নিগো চিন্নি তোমাআআড়ে ওগ্গো বিদেশিন্নি, তুমি থাআআআকো শিনধু পাআআআড়ে….


     

    অরিন্দমের হাসি পেয়ে যেয়। দূরদর্শনের সংবাদপাঠিকাদের কী সর্বব্যাপী প্রভাব। অত্যন্ত জোরে হেসে ফ্যালে ও কিশোরটিকে জড়িয়ে ধরে। অট্টহাস্য। দিলখোলা হাসি। হাসতেই থাকে। এভাবে খোলামেলা হাসেনি বহুকাল। হাসতে-হাসতে ভালো লাগে ওর। ওর দেখাদেখি সবাই হাসতে থাকে। সব্বাই।


     

    অতর্কিতে, বাইরে থেকে, বাঁদিকের বন্ধ জানলার ফুলকারি ঘষাকাচের শার্শির ওপর ভারি একটা ঢিল পড়তে, থমকে থেমে যায় হাসি। সবায়ের মুখমণ্ডলে আতঙ্কিত অনুসন্ধিৎসা। শার্শির ঠিক মাঝখানে, যেখানে ইঁটটা পড়ল, সেখানে ঘাপটি-মারা ছোট্টো মাকড়সাটা সেই মুহূর্তে, তক্ষুনি, কাচের বুক জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে নিজের আলোকিত তন্তুজাল, শার্শির ফ্রেমের কোণে-কোণে।


     

    কেভ রে হারামজাদার বাচ্চা। গালাগালটা অরিন্দমের নিজেরই ভয় কাটাবার উপায় হিসাবে আরেকটু হলেই, এতগুলো কচিকাঁচা কিশোর-কিশোরীর সামনে বেরিয়ে যেত। ঠিক তখুনই, খোলা জানলাটা দিয়ে, ওরা দেখতে পেল, হ্যালোজেনের আলোয়, মাছরাঙার ঢঙে ছোঁ মেরে, ছোটো-ছোটো অগুনতি সাদা বরফের ছররা, ঝেঁপে নাবছে পানা-পুকুরের দাম সরিয়ে, মটকা-মেরে ঘুমোবার ভানরত কালবোস-কাতলার ওপর। জলতলের ওপরে লাফিয়ে উঠল কয়েকটা সোমথ্থ রুই।


     

    সাদা বরফ টুকরোর টিমটিমে প্রভায় উদ্ভাসিত হয় খোকাখুকুদের কচি-তুলতুলে মুখগুলো। পৃথিবীর মাটিতে নাবার আহ্লাদ-মাখানো শিলাবৃষ্টির খই খাবার নেমন্তন্নে, ছাদের দরোজা দিয়ে ঘরের মধ্যে আগত টুকরো মুখে পোরে মিনি টিঙ্কু টুম্পা তাতাই বুবুন খোকন বাবাই টুঙ্কা হাবলু গাবলু।


     

    অরিন্দম জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ফুঁ-এর মতন মুখময় বিচরণকারী আরামপ্রদ হাওয়ার আদর। গাছের পাতাদের গা শিরশির করছে ঠাণ্ডায়। বরফ-পাথরের টুকরো মেরে-মেরে ভ্যাপসা গরমকে তাড়িয়েছে বৃষ্টি। শিলাদের নাচের তাল ক্রমশ বিলম্বিত হয়ে থেমে যায়। বিদ্যুচ্চমকে, পুকুরের জলকে সর্পিল করল হেলে সাপ।


     

    দুকানে দুহাত চাপা দিয়ে তাতাই বলে ওঠে, যাআআআআআ।


     

    কেন ? কী হল ?


     

    এবার আর হিমসাগর খাওয়া হবে না। সঅঅঅঅঅব ঝরে গেল।


     

    তেরো

    পেঁকো জলজমা তপসিয়া সেকেন্ড লেন, নানান মাপের আধোডোবা ইঁটের ওপর দিয়ে যিশুর পেছন-পেছন বস্তির একটা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারল অপ্রস্তুত অরিন্দম, এ জায়গায় অন্য জুতো পরে আসা উচিত ছিল। ফুলপ্যান্টের গোড়া ভিজেছে নর্দমা-ওপচানো এঁদো গলির বিষাক্ত জলে। ম্যানহোলের ঢাকনা তুলে খালি-গা লেংটি-লুঙ্গি পরা কয়েকজন প্যাংলা মানুষ জমা জল খোঁচালেও, ঘূর্ণি খেয়ে নালির গু-গোলা জল উগরে উঠে গলির ভেতর সেঁদোচ্ছে।


     

    সামলে-সামলে যেতে হবে, গোলাম জিলানি রোডে মসজিদে জল ঢোকা নিয়ে হ্যাঙ্গাম হয়েছে। আসার সময়ে হুঁশিয়ার করেছিল যিশু। খেয়াল করেনি তখুন। হতদরিদ্র মুসুলমান পাড়া। গলির বেহালে, অপুষ্টিতে লালিত লোকগুনোকে, মহরমের পতাকা দেখে, ভয় করছিল অরিন্দমের। নাকে রুমাল চাপা দিলে হাসবে এরা। টিটকিরি মারবে। পেটের ভেতর ওব্দি ঢুকে পড়ছে দুর্গন্ধ। এমনকী রি-রি করছে, নোংরা জলের ওপর চলকে-পড়া রোদের গা। নর্দমাটা ডাকাবুকো।


     

    বাসার সামনে টাঙানো বাঁশে ছাপা-শাড়ি, কালো শায়া, লাল ব্লাউজ, হাতা অলা গেঞ্জি, সিড়িঙে ফুলপ্যান্ট শুকোচ্ছে। ডিজেল ড্রামের ঢাকনার ওপর রবারের পাকানো ক্লান্ত পাইপ। আলকাতরা-রাঙানো করুগেটেড টিনের দরোজার ফাঁক দিয়ে নজরে পড়ে ঝুলমাখা টিউবলাইট। শালের কালো খুঁটিতে পেরেকে ঝোলানো আংটায় গাঁথা কাগজপত্র ; শিকেতে চালকুমড়ো। দেয়াল দেখা যাচ্ছে যেটুকু, কালচে কাঠের তাকে শিশি-বোতল-কৌটো-ডিবে। মেঝের ওপর অ্যালুমিনিয়ামের বিশাল গামলা আর কয়েকটা তেল-চটচটে কালচে ট্রে।


     

    খাইয়াঁ-খাইয়াঁ পেট ভরাবার মতলব রহেছেঁ, আঁ। গলা জড়াই ধরি মুহে চুম খালেক। তাঁয় উড়াই ফেল্লেক তামাম। মজাদারি পাহিছেঁক। আঁচতা ধাকালি দিবঁ একটা। মেয়েলি কন্ঠে বকুনি ঘরের মধ্যে। সাদা কেঁদো বেড়াল বেরিয়ে, আধডোবা ইঁটের ওপর লাফিয়ে-লাফিয়ে ওদের পায়ের কাছ দিয়ে দৌড়োতে, অরিন্দমের ডান পা জলের মধ্যে পড়ে, নোংরা জল ঢুকে যায় জুতোয়।


     

    এই কেটলি। হাঁক পাড়ার পর, অরিন্দমের দিকে ফিরে যিশুর আবেগহীন কন্ঠ, গতবছর জলের মধ্যে খোলা ম্যানহোলে একটা আড়াই বছরের মেয়ে পড়ে গিসলো। দমকলের লোক এসে, শেষকালে হুক নাবিয়ে, বডি তুললে। ময়না তদন্ত হয়েছিল। তা এরা গরিব লোক, বুঝতেই পারছ, রিপোর্ট-ফিপোর্ট নিয়ে কীই বা করবে। হুক দিয়ে না তুলে কেউ নিচে নেবে চেষ্টা করলে বেঁচে যেত বোধয়। কিন্তু পৃথিবীর মাটিতে এতো বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে মানুষ যে সুযোগ পেলেই খপ করে ধরে নেবে পৃথিবী। অরিন্দম ভয় পাচ্ছে দেখে যিশু কথাগুলো বলে গেল চিউইংগাম খাবার ঢঙে। তারপর কাঁধ নাচিয়ে হাসে।


     

    আড়হল্যা লাগ্যে নেঁও ; জলটো অধন হল্যে মেরায়েঁ দে। কথ্যভাষার মধ্যেকার জলতরঙ্গে অরিন্দম মুগ্ধ। বাঙালির জিভ থেকে এই সমস্ত স্হানিক বুলি ক্রমশ মুছে যাবে। হারিয়ে যাবে বাংলার মাটি থেকে। শহর গিলে খেয়ে নেবে বাংলা বুলিগুলোকেও।


     

    আসছি কাকুদা, মোড়ে গিয়ে দাঁড়াও। খুকুস্বর তরুণী-কন্ঠের ভেতর থেকে আসা আশ্বাসে ভারমুক্ত হয়েছে অরিন্দম। কাকা আর দাদা মিলিয়ে নতুনতম এক সম্পর্ক পাতিয়েছে বটে মেয়েটা। কাকুদা ! বাশ লাগল শুনতে। কলকাতায় বেগুনউলিকে লোকে বলে মাসি, অথচ নিজের মাসিকে পাত্তা দেয় না। বাসযাত্রী বা পথচারীকে যুবকেরা বলে দাদু, কিন্তু নিজের দাদুকে দুমুঠো খেতে দেয় না। কলকাতায় শব্দের মধ্যে সম্পর্কগুলো আর নেই।


     

    অতর্কিতে এক ঝলক ভ্যানিলা গন্ধের ঝাপটা। এই নোংরা পেঁকো দুর্গন্ধের সমুদ্রে কোথ্থেকে এই সুগন্ধ ! যিশু বলল, কেটলির বাপ দিশি বিস্কুট আর কাপ-কেক বানায়, তারই গন্ধ। কেটলির পা-দুখানার দিকে তাকিয়ে দেখো তুমি, সদ্য ধানচারা রোয়া হাতের চেটোর মতন পরিষ্কার। ওই অ্যালুমিনিয়াম গামলাটা দেখলে তো ? ওর মধ্যে পা দিয়ে কেক-বিস্কুট বানাবার ময়দা-টয়দা মাখে। পুজো করার যুগ্যি। ভারজিন মেরির মতন। সত্যি, কলকাতার রাস্তায় হাঁটাচলার পরও যে অমন পা থাকতে পারে কারুর, ধারণা ছিল না আগে। রাইটার্সে ভালোই বিক্রি হয় ওর কেক-বিস্কুট।


     

    বাপরে ! কলকাতায় এরম গা-সওয়া জায়গা আছে জানতুম না। কী করে থাকে লোকে ? প্রশ্ন তোলে অরিন্দম, উত্তর নেই জেনেও। ফেরার পথে টের পায় জমা জল বাড়ছে। প্রায় পুরো ডুবে গেছে ইঁটগুলো। অন্য জুতোটাও চপচপে জলে ঢুকে মোজা ভেজাচ্ছে। গলি থেকে জলটা বেরোচ্ছে না-ই বা কেন ? আবার প্রশ্ন তোলে অরিন্দম।


     

    এখুন তো অবস্হা তবু ভালো। বর্ষাকালে এলে দেখবে যতরকুম প্রজাতি আর ভাষার মানুষ কলকাতায় আছে, এই গলিটা তাদের সব্বায়ের গুয়ের মিলনমেলা। এখানে আন্ত্রিকের টিশু কালচার হয়। কড়াইডাঙার চামড়া টাউনশিপের জন্যে এগারোশো একর নিচু জমি ভরাটের কাজ চলছে ডি ডাবলু খালের বুকে বাঁধ বেঁধে মাটি কাটার জন্যে। তুমি ওদিকটায় যাওনি বোধয়। এখুন বেশ কিছুদিন বেরোবার উপায় নেই। জল বেরুচ্ছে না বলে বানতলার ভেড়িগুনো চোতমাসের গরমে ভেপসে উঠে মাছ মরছে। ভেড়িগুনো এখানকার নোংরা জল খাল থেকে টানে। এখুন তো চারাপোনা ছাড়ার মরশুম।


     

    ওফ, যিশু বিশ্বাস তো মগজের মধ্যে খবরের ব্যাংক বানিয়ে ফেলেছে। এর জন্যেও কনসালটেনসি পাবার তালে আছেন নাকি ? প্রশংসা জানায় অরিন্দম।


     

    নিজের সংগৃহীত তথ্য ঝালাবার কাজ চালিয়ে যায় যিশু। বালিগঞ্জে, পামার বাজার, চৌবাগায় পাম্পং স্টেশানগুনো কলকাতার মাটির তলাকার নর্দমার জল ওই খালটায় পাঠায়। তিলজলার ট্যানারির চামড়াধোয়া জলও মেশে। অতএব বুঝতেই পাচ্ছ, এই গলির কলকাতা বহুকাল এই গলিতেই থাকবে। গুয়ের ভেনিস। সিগারেটের প্যাকেট সামান্য খুলে অরিন্দমের দিকে বাঁহাত বাড়িয়ে, ও তুমি তো খাও না।


     

    তোমরাদের বললুম না মোড়ে গিয়া দাঁড়াও। একটু আগেই শ্রুত কন্ঠস্বর শুনে পেছন ফেরে অরিন্দম। কালচে টেরাকোটা রঙের মেদুর-ত্বক স্বাস্হ্যবতী। কৈশোর আর যৌবনের সেই নিদারুণ সংযোগ-মুহূর্তে, যখন আজেবাজে চেহারাও হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। ভ্যানিলা-সুগন্ধের জেল্লা। নিজেকে হতবাক করার জন্য আরেকবার ফিরে চাইতে হয়। অরিন্দমের এভাবে তাকাবার বাধ্যবাধকতাকে উপভোগ করছিল যিশু। এখানে আসার আগেই সতর্ক করেছিল যিশু, এ তোমার বিশুদ্ধ বাঙালি পাড়ার কলকেতিয়া লাফড়াউলি নয় যে দশবছর বয়েসেই দুলুর-দুলুর বুক নাচিয়ে ঘুরবে।


     

    নর্দমার নোংরা জল-জমা গলিটার ঢোকার মুখেই, বিতৃষ্ণা, কুন্ঠা ও সার্বিক ভয় যখুন ওকে পেড়ে ফেলতে চাইছিল, মনে-মনে মনে হয়েছিল অরিন্দমের, এই পেঁকো ছমছমে ঘুঁজির বাসায় ভালো কি সত্যিই থাকা সম্ভব, সৎ থাকা ? অত্যন্ত ধনী আর ভীষণ গরিবের পক্ষে সৎ থাকা বেশ কঠিন। সেরকম সৎ-টাকাকড়ি রোজগার করে বাঁচা যায় কি এখানে, এই এঁদো এলাকায় ? পরিচ্ছন্ন কোনো পাড়ায় চলে গেলেই তো হয়। মহাকরণে চা আর সস্তা বাটি-কেক বেচে দু-তিনজন লোকের কুলিয়ে যায় হয়তো।


     

    এরকুম একটা পাড়ায় থেকেও কেটলিউলির স্বাস্হ্য নিখুঁত, সূর্যকরোজ্জ্বল। হাত দুটো শ্রম-সুডোল। চকচকে ত্বকের স্নেহপরবশ মসৃণতায় পিছলে যায় অরিন্দমের মুগ্ধ দৃষ্টি। দ্রুত বেঁধে ফেলেছে ঘনকালো কমনীয়-উজ্জ্বল কোঁকড়াচুল হাতখোঁপা। প্রিন্টেড শাড়িটাকে বেগনে-নীল-হলুদ কল্পরাজ্যের ফুলগুনো শাড়িটাকে সহজে নোংরা হতে দিতে চায় না বলে বেশ কিছুদিন সযত্নে না-কেচে চলে যায়। মেয়েটা লম্বায় কত ? পাঁচ ফিট ? তাই হবে। যিশুর চেয়ে কয়েক ইঞ্চি বেঁটে। প্লাসটিকের স্ট্র্যাপবাঁধা বর্ষাকালের কালো জুতো, নোংরা জলে উঠছে-নাবছে। জুতোর গোড়ালিটা নরম নিশ্চই, নইলে মহাকরণে হরেক প্রকার হাওয়ায় চেপে-থাকা রাজনীতিবিদ, আমলা, কেরানি, আর কৃপাপ্রার্থী নাগরিকদের সামনে দিয়ে কাঁচের গেলাস আর কেটলি হাতে গটগটিয়ে হাঁটলে তো বারান্দা থেকে ঠেলে বিনয়-বাদল-দীনেশের কাছে পাঠিয়ে দেবে আদিত্য বারিকের ভুঁড়ি-ভোম্বোল সহকর্মীরা, যারা বারান্দায় বসে সারাদিন হাই তোলে আর মুখের কাছে টুসকি বাজায়।


     

    পা দুখানা সত্যই প্রতিভাদীপ্ত। সকাল-দুপুর সংগৃহীত প্রতিদিনের সূক্ষ্ম নোংরা সন্ধ্যাকালে চালান হয়ে যায় কেকগুলোয়। অরিন্দমের মগজে নির্বাক হইচই। প্রাকগ্রীষ্মেও মেয়েটা ঠান্ডা হাওয়ায় মোড়া। মেদহীন নারীত্ব বোধয় হয় না। মোড়ে পোঁছে কলের মুখহীন সতত বহমান জলে, জুতোসুদ্দু পা এগিয়ে প্রথমে ডান তারপর বাঁ হাঁটু ওব্দি শাড়ি তুলে ধুয়ে নিল মেয়েটি নির্দ্বিধায়। বোঝা যায়, রোজকার, যেদিন মহাকরণ খোলা থাকে, অভ্যাস।


     

    যিশু চাপা গলঅব, কীইইইইরে, তোর এই একটাই শাড়ি, বলতে ততোধিক নাবানো গলায় মেয়েটি জানায়, অন্য দুটা কাচার সময় হয়নি, পরে কেচে নিবো। ওর গিঁটপড়া ভুরুর তলায় ঝলমলে চাউনিতে সন্দিগ্ধ প্রশ্ন ছিল, এই লোকটা আবার কে, কাকুদার সঙ্গে জুটেছে সাতসকালে।


     

    ওর নাম অরি, অরিন্দম মুখোপাধ্যায়। খুব ভালো লোক। তোকে রেস খেলা দেখতে নিয়ে যাবে। প্রস্তাব আর আদেশ একসঙ্গে মিশিয়ে, মাথা পেছনে হেলিয়ে, থুতনি দিয়ে অরিন্দমের দিকে নির্দেশ করে যিশু। কেটলিউলি ঝটিতি জরিপ করে ওকে, যেন এই কচি বয়সেও, মানুষের দিকে স্রেফ একটি বার তাকিয়ে, তার চরিত্রের ভালোমন্দ বুঝে ফেলবে।


     

    ভুরুর গিঁট বজায় থাকে। মাঝখান থেকে এই লোকটা আবার কেন ? কাকুদা তো নিজেই নিয়ে যাবে বলেছিল ঘুড়ার দৌড়ানো দেখতে। তা নয়, একজন অচেনা উটকো লোকের ঘাড়ে চাপাচ্ছে। এ কি ঘুড়ার পিঠে বসে ?


     

    যিশু নিজের সাফাইকে সাফসুতরো করে। আমি যেতুম, কিন্তু আমার দুদুটো রিপোর্ট ফাইনাল করা হয়নি এখুনো। একটা তো আজকে স্পাইরাল বাইন্ডিং করতে পাঠাব, যাতে রাত্তিরে কুরিয়ার করতে পারি। তার ওপর আবার কমপিউটারের প্রিন্টারটা আবার খারাপ হয়ে পড়ে আছে। ফ্লপিতে তুলে দেখতে হবে কাছেপিঠে কোথাও যদি প্রিন্টআউট নেয়া যায়। লাইটও থাকছে না সন্ধের দিকে। হাতের কাজ দু-এক দিনের মধ্যে শেষ করতেই হবে, নইলে কথার খেলাপ হয়ে যাবে। অরিন্দম অনেক ভালো লোক। বাড়িয়ে বলছি না। সত্যি। আলাপ করলেই টের পাবি। তোর অফিসের পাশেই ওর অফিস। ওই ডানদিকে যে তেরোতলা বাড়িটা। অফিসে এসকালেটার আছে, মেট্রোরেলের মতন। তোর অফিসে তো শ্রমিকদের সরকার তোকে চাপতেই দেয় না লিফ্টে, দিনে পঁচিশবার একতলা, তিনতলা করিস। ওর অফিসে ও অনেক বড়ো অফিসার। ওর গাড়িও আছে নিজের, তোকে চাপাবে। ওই তো, ওই যে, ওই ঘিয়ে রঙের গাড়িটা দেখতে পাচ্ছিস, ওইটে।


     

    কেটলিউলিকে কমপিউটারের বিশদ কেন ? ও কি কমপিউটার শিখছে ? কিন্তু অরিন্দম সম্পর্কে কথা বলার বদলে ওর অফিস, অফিসারি, তেরোতলা, এসকালেটর, গাড়ি এসমস্ত ওর সচ্চরিত্র হবার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে মেয়েটির এজলাসে পেশ হল। কেটলিউলির চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, যিশুর প্রয়াস দিব্বি সফল। মসৃণ তেলালো ত্বকে আভা দেখা যায়। ভুরুর গিঁট খোলে।


     

    তুইতোকারি করা বা তুমি বলা উচিত হবে কিনা নিশ্চিত হতে না পারায়, বিব্রত অরিন্দম বলল, আমাকে কাকুদা-অরিদা গোছের কিছু বলবেন না। স্রেফ অরি কিংবা অরিন্দম বলে ডাকবেন।


     

    যিশু কাঁধ নাচায়। ওহ হাসালে বটে। তুমিই বোথয় প্রথম আপনি-আজ্ঞে করছ ওর জীবনে। মহাকরণে সবাই তুইতোকারি করে। অত তোল্লাই না দিয়ে ওকে তুমি বলেই ডেকো। ঠিক, না রে কেটলি ?


     

    কেটলি বেশ বিখ্যাত পরিবারের মেয়ে, মাসখানেক আগে একবার বলে ফেলেছিল যিশু। ওর দাদু, মানে ওর মায়ের বাবা, নামকরা লোক ছিল, খাঁটি ডাকসাইটে। কুচকুচ করছে চুল। থমথম করছে মুখ। কুতকুত করছে চোখ। টনটন করছে জ্ঞান। খসখস করছে কন্ঠস্বর। তিরতির করছে চাউনি। গটগট করছে চলন। কনকন করছে আঙুল। দশাসই। পিস্তল রাখত। ভালো জামা-কাপড় পরার শখ ছিল। দু-দুটি বডিগার্ড থাকত সব সময়। স্বাধীনতার আগের বছর তো জান লড়িয়ে দিয়েছিল। আদিত্যকে জিগেস কোরো। যিশু আদিত্যর কথা পাড়ায় নিজের ক্ষুন্নতায় আশ্চর্য হয়েছিল অরিন্দম। আদিত্য তো বোধয় ওরচে অন্তত দশ বছরের ছোটো। যিশু আদিত্যর চেয়ে কুড়ি বছরের বড়ো।


     

    আদিত্যর দেওয়া তথ্যে বিস্মিত আর আকৃষ্ট হয়েছিল অরিনদম। সত্যি। অফিসের মহাফেজখানা থেকে ধুলোপড়া পুরোনো খড়খড়ে ফাইল এনে দিয়েছিল আদিত্য। ফাইল খুঁটিয়ে পড়ে, অবিচল অস্হিরতায় আক্রান্ত, ভেবেছিল অরিন্দম, বিকেলের বর্ষীয়ান আলোয় নিজের বিছানায় শুয়ে, টেবিলে রাখা চায়ে কখুন সর পড়ে গেছে খেয়াল নেই, ভেবেছিল ও, কলকাতার বিখ্যাত পরিবার বলতে ঠাকুর পরিবার মল্লিক পরিবারের মতন কয়েকটা উচ্চবিত্ত পরিবার বোঝায় কেন ! কত বাঙালি আছে, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ পঞ্চম ষষ্ঠ পুরুষ ওব্দি বংশলতিকা জানে বলে গৌরব বোধ করে। তারপর একদিন তারা মরে হাওয়া হয়ে যায়। সেই গৌরববোধটা কি তখুন হাওয়ায় ঈথারে ভেসে বেড়ায় ?


     

    আরও গোটাকতক ফাইল লুকিয়ে এনে দিয়েছিল আদিত্য। বর্ণময় সব চরিত্র।


     

    কেটলিউলির দাদুর নাম কেষ্টবাহাদুর জহোর্বাদি। দার্জিলিঙের বাঙালি। মা-বাপ অজানা। একজন চিনে মুটিয়া লালন-পালন করেছিল। তাকেই বাপ বলে জানত। দার্জিলিঙ থেকে কলকাতায় পৌঁছে, বছর ফুরোবার আগেই, পটল তুলল চিনে বাপ। কারা যে ওর মা-বাপ, চিনে বাপ সাঙ্গ হতে, জানা হল না আর। সব বাবারাই তখুন ওর চিনে বাপ। ফেকলু ছেলেটাকে শুয়োর মাংসের এক কসাই পুষ্যি নিলে। পযঅর বজ্জাতগুনোর সাকরেদিতে শিখে ফেলল চুরি-বাটপাড়ি, চাকুবাজি, হার ছিনতাই, ব্লেডমারা, পার্স তুলে চিতাবাঘ দৌড়। চোদ্দ বছর বয়সে রেফরমেটরি-জেলখানায়। কলকাতার আর আশেপাশের জেলখানায় যা হয়, গাঁজা চরস, হেরোইন, আফিম, কোকেন, সমকাম, ঝাড়পিট, অসুখ, অখাদ্য, অপুষ্টি। সেখান থেকে বেরিয়ে এলো পোড়-খাওয়া ঘ্যাঁচড়া। তারপর অবিরাম ভেতরে-বাইরে, ভেতরে-বাইরে, ভেতরে-বাইরে, ভেতরে-বাইরে…।


     

    ছেচল্লিশের প্রাকস্বাধীনতা আর মানুষ-জবাই উৎসবে, মুসুলমানদের পাড়া টেরিটিবাজার ছেড়ে পালাল মলঙ্গা লেন, আর সেখানে গিয়ে গোপাল মুকুজ্জের হিন্দু বাঁচাও দলের ঠ্যাঙাড়ে ও সদস্যে পদোন্নতি পাওয়া কেষ্টকে তখুন দ্যাখে কে ! যত খুন করে ততো প্রতিষ্ঠা বাড়ে। শার্টের কলার, গোপাল মুকুজ্জের দেওয়া হলেও, গাধার কানের মতন উঁচু। ও দার্জিলিঙের লোক ছিল বলে ওর অ্ত্রটার নাম সেই থেকে হয়ে গেছে ন্যাপলা। অন্তত শ’খানেক মুসুলমানকে নুলো খোঁড়া কানা করেছিল, পাঞ্জাবি পুলিশের নজর এড়িয়ে। কচুকাটা কন্দকাটা হেঁটেকাটাও করেছিল দাদু। ওই ফাঁকেই, দেশ স্বাধীন হব-হব, একজন তাগড়া হেলে কৈবর্তের মেয়ের সঙ্গে থাকতে লাগল। ফাইলের মার্জিনে লেখা বিয়ে হয়নি। বাচ্চা হতেই জিনহা আর জহোরলাল যে যার আঁতুড়ে যখুন স্বাধীনতার বিগুল বাজাচ্ছে, বউটা কাঁখে বাচ্চা নিয়ে এক গাঁট্টাগোঁট্টা তেঁতুলে বাগদির সঙ্গে পালাল পুরুলিয়ার আরসা ব্লকের হেঁসলা গ্রামে।


     

    দেশ স্বাধীন হতে, হাত-পা ছড়াবার অনেকটা জায়গা দিয়ে অনেক মুসুলমান তো ডানদিকের আর বাঁদিকের পাকিস্তানে পালাল। গোপাল মুকুজ্জেরা আর তাই কেষ্টটেষ্টদের পুষতে চাইল না। তখুন সংবিধান লেখালিখি হবে, দিশি বুড়ো-হাবড়ারা চেয়ার-কুর্সি পাইক-পেয়াদা পাবে, ফলে কেষ্ট গিয়ে সমাজের বাইরে মুখ থুবড়ে পড়ে চিৎপটা২। তারপর কখুনও পটুয়াটোলার সত্যেন বিশ্বাস, ভূবন সরকার লেনের ব্রজেন সরকারের কাজে, কিংবা ফ্রিল্যান্স ঠ্যাঙাড়ে। সাতচল্লিশে টালিগঞ্জ থানার বন্দুক-কার্তুজ লুট, আটচল্লিশের নভেম্বরে মহরমে মারপিট। পঞ্চাশের ফেবরারি-মার্চের দাঙ্গায় গোপালবাবু-সুধাংশুবাবুদের স্যাঙাত হয়ে আবার দেশপ্রেমিকে উন্নীত। কেষ্টোবাহাদুর জহোর্বাদি বাঙালি-সমাজের প্রথম মস্তান। তারপর থেকে মস্তান ছাড়া সরকারি দল অচল। পশ্চিমবাংলার রাজনীতি অচল।


     

    কেষ্ট তারপর আরম্ভ করে দিল ডাকাতি। খুল্লমখুল্লা ঘুরে বেড়াত স্টেনগান নিয়ে। গড়িয়াহাটের গিনি ম্যানসনের ডাকাতিটা ওই করেছিল। তখুনকার দিনে মুখোশ পরে মুখ লুকিয়ে ডাকাতির চল হয়নি। তবুও প্রমাণ করা যায়নি। কে আর সাক্ষী হয়। মানুষের ভয়ডরের শরীর। তার ওপর দেশ স্বাধীন হতেই পুলিশকেও একই রকুম ভয় পেতে আরম্ভ করেছে লোকে। ছাড়া পেয়ে কেষ্ট দিনকতকের জন্যে পালাল মুম্বাই। ফিরে আসতে, একদিন রাস্তায় হঠাৎ, ছেচল্লিশের প্রতিরোধ সমিতির পাণ্ডা শিবপ্রসাদ সাহার সঙ্গে কেষ্টবাহাদুরের দেখা। বউবাজারে সাহার চালডালের দোকান। চলছিল না। একদিন বউবাজারের বড়ো ব্যাপারি শ্যামলাল গুপ্তর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ব্যবসার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছিল শ্যামলাল। কেষ্ট তো ওকে গুলি মেরে খুন করে বোমার ধোঁয়া উড়িয়ে ব্যাগ হাতিয়ে পালাল। কিন্তু পাবলিকের তাড়া খেয়ে সেঁদিয়েছে গিয়ে রূপম সিনেমাহলে। ধরা পড়তে রাগি জনগণের হাতে দেম্মার, পেড়ে ফেলে আড়ং ধোলাই। স্বাধীনতার পর সেই প্রথম বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ আর রাজনীতি-নিরপেক্ষ গণপ্রহার, কেননা মাত্র ক’বছরেই পুলিশের ওপর থেকে ভরসা উবে গিয়েছে নাগরিকদের। বলেছিল যিশু।


     

    মাউনব্যাটোন যাবার সময়ে জহোরর্লালকে বলে গিসলো, এই স্বজন-ঠ্যাঙাড়েদের ভার তোমার হাতে সঁপে যাচ্ছি, এরা অনেক কাজে দেবে, তোমার মেয়ে যখুন বড়ো হবে তখুন, এমনকী তোমার নাতি আর তাদের ছেলেমেয়েদেরও কাজে দেবে। তুমি আবার বাহাদুরি মেরে মানবতাবাদ ফলাতে গিয়ে খোলনলচে পালটে ফেলো না যেন। জিনহাকেও একই কথা বলিচি। তা কথাটা অমান্য করেনি দুজনে। বলেছিল যিশু।


     

    অনেকদিন চলেছিল কেষ্টর মকদ্দমা। জেল হাজতে তো ওর দাড়ির চুল সাদা হয়ে গেল। স্বাধীনতার পর বছরের পর বছর মামলা ঝুলিয়ে রাখার সেই শুরু, ফউজদারি হোক বা দেওয়ানি। সাতান্ন সনের কলমের নিব ভেঙে ফাঁসির হুকুম হয়েছিল কেষ্টর। সে নিব পালটে নতুন নিব লাগালে, রাষ্ট্রপতির দয়ায় যাবজ্জীবনের পর কেষ্ট বেরিয়ে এল একেবারে লোলচাম বুডঢা, ভুরু আর কানের চুল পেকে দঙ্কাদড়ি। মেয়ের কাছে তপসিয়ায় বেঁচেছিল, অথর্ব। নাতনির টেরাকোটা হামাগুড়ি শেষ হবার আগেই, বাটিকেকের সদ্য নাবানো গরম ডালার মধ্যে পড়ে ঝলসে মরে গিয়েছিল। চিতায় ক্রিমিনালের লাশ থেকে ভ্যানিলার ভুরভুরে সুগন্ধ নিমতলার ঘাটকে শোকমুক্ত করে দিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্যে। বলেছিল যিশু।


     

    কেটলি ওর মায়ের কাছ থেকেই শিখেছে পা দিয়ে ময়দা চটকানো। ডালহাউসিতে ওর বাপ ফিরি করত সেসব কেক। উদবাস্তুরা তখুন সবে বড়োদিন, নিউ ইয়ার, হ্যাপি বার্থডে করতে শিখছে। নিয়মিত বিক্রিবাটা তো কেটলি মহাকরণে ঢোকার পর আরম্ভ হয়েছে। ঢোকার জন্যেও পুরুলিয়ায় গিয়ে ঝাড়খন্ড দলের বিরুদ্ধে বাড়ি-বাড়ি ঘুরতে হয়েছিল ওর বাপকে, নির্বাচনের সময়। বলেছিল যিশু।


     

    তাহলে মেনকা, আই মিন ম্যানকা পাইক, ওর বুইন নয় ? জিগেস করেছিল অরিন্দম।


     

    না-না। ও-ও তিলজলা বা বাইপাসের দিকে জবরদখল জমিতে থাকে কোথায় যেন। মস্তান ট্যাক্স আর পার্টি ট্যাক্স দিতে হয়।


     

    ওর নাম কী ? কেটলির ?


     

    নাম ? নাম দিয়ে কী করবে ?


     

    নিজের কাছে রাখব।


     

    ফাইলটার মার্জিনে একগাদা বানান ভুল সম্পর্কে মন্তব্য ছিল, পেনসিলে। মন্তব্যগুলোতেও বানান ভুল ছিল। উদবাস্তুরা এসে কমিউনিস্ট পার্টিটাকে দখল করে নিয়ে প্রাইমারি স্তরে ইংরিজি নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল, যাতে বাঙালিদের একঘরে করে রাখা যায়। ফল ভুগছে।


     

    মন্দ বলোনি।


     

    আরেকটা ফাইল থেকে তো জেরক্স তুলে নিয়েছে অরিন্দম, আদিত্যকে খ্যাপাবে বলে। খেপছেও আদিত্য। প্রসঙ্গ তুললেই, এমনকী ওর ভুঁড়িদাস খাকি সহবেতনভূকরাও। একজন কন্সটেবল, ব্যাটা কেবলমাত্র কন্সটেবল, মেদিনীপুরের পাণ্ডে, অ্যাঁ, সে তো রেগে কাঁই। আসলে, মেছুয়াপট্টির ফলবাজারে ব্যাটার একটা ম্যাটাডর ভ্যান খাটতো ; পুরসভা সেটা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। সতেরোটা হাতে-টানা রিকশা খাটে ওর। সবকটা রিকশা একটা লাইসেন্সেই চলে।


     

    কলকাতা থেকে হাতেটানা রিকশা কেন তুলে দেয়া হচ্ছে না জানো তো ? সব রিকশাই হয় পুলিশের নয়তো পলিটিকাল মাফিয়ার।


     

    ওই ফাইলটা, যেটার জেরক্স রেখেছে অরিন্দম, গৌরীবাড়ি লেনের হেমন্তকুমার মণ্ডল ওরফে হেমেন মণ্ডল ওরফে হেমা এজেন্টের। লুম্পেন কলকাতার জনকরাজা। ফাইলে, নামের আগায় ‘শ্রী’ জুড়ে দিয়েছিল কেউ সবুজ কালিতে। মহাশ্বেতা দেবীর লেখায় পড়েছিল অরিন্দম, মনে আছে, হেমেন মণ্ডলটা ছিল রুণু গুহনিয়োগীর স্যাঙাত ঠ্যাঙাড়ে। বোঝো তাহলে। শেষে এই রুণু কিনা আদিত্যর রোল মডেল !


     

    স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলে ক্লাস নাইন ওব্দি পড়েছিল হেমেন মণ্ডল। ক্লাস টেনে যাবার মুখে চলে গেল অন্যলোকের মালকড়ি-টানার ইশকুলে। গড়ে ফেলল হাড়-বজ্জাতদের হাড়হাভাতে হাড়গিলে দল। ভাড়াটে তুলতে হেমেন। চটকলে ভর্তি করাতে হেমেন। বানতলার ইঁট-বালি-লোহা কিনতে হেমেন। অবরোধকারীদের প্যাঁদাতে হেমেন। পুজোর চাঁদা তুলতে হেমেন। হেমেন রক্তদান ক্যাম্প করলে রোগাপটকা বুড়ো বাচ্চা সব্বাইকে দিতে হত ওর পাতা ফোলডিং খাটে কাঠ হয়ে শুয়ে। নইলে নয়ছয় লণ্ডভণ্ড খিস্তিখেউড় আড়ংধোলাই। লাশ লোপাট। নকশাল খুনের রেকর্ড করেছিল ও।


     

    রাষ্ট্র তখুন মহাকরণে কাগজ-কলম নিয়ে নাজেহাল। গৌরীবাড়িকে ভারতীয় সংবিধানের বাইরে নিয়ে যেতে সফল হয়েছিল হেমেন মণ্ডল। স্বাধীনতার পর পশ্চিমবাংলার প্রথম মুক্তাঞ্চল। পঞ্চান্ন হাজার লোকের ঘাড়ের ওপর সন্ত্রাসের ছত্রপতি হেমেনজি। ফি হপ্তায় কে কত তোলা দেবে তা বেঁধে দিয়েছিল হেমেন। খেরোর খাতায় হিসেব রাখত। চাইলেই গাড়ি টিভি ফ্রিজ চেয়ার টেবিল বাসন-কোসন বিছানা-মশারি তক্ষুনি দিয়ে দিতে হবে হেমেনজিকে। তক্ষুনি। বাড়ি বা ফ্ল্যাট চাইলে, তাও। তক্ষুনি।


     

    অনিতা দত্তর ভায়ের ফ্ল্যাট দখল করে থাকতে লাগল হেমেন আর ওর ল্যাংবোট সেনা। অনিতার কাজ ওদের জন্যে রান্না করা, বাসন মাজা, জলতোলা, কাপড় কাচা, ঘরমোছা, জামাপ্যান্ট ইস্তিরি। অন্ধকার ভাঁড়ার ঘরটা অনিতার ভায়ের জন্য বরাদ্দ। পাড়ার লোকেরা তো ভয়ে লেংটু গুটিয়ে কেঁচো। রাষ্ট্র তখুন মহাকরণে বৈপ্লবিক ফাইলবাজি শিখছে।


     

    হেমেন কি আর ধরা পড়ে না ? পড়ে বইকি। ধরে রাখা যেত না। উকিলরা ছাড়িয়ে এনে আবার ছেড়ে দিত সমাজে। হেমেন সমাজের ভেতর। পুলিশ সমাজের বাইরে হাই তুলছে। হেমেন যতবার ছাড়া পায় ততবার ওর ইজ্জত বাড়ে। এরম হতে-হতে আলটপকা একদিন খেলাচ্ছলে শ্যামপুকুর থানার পরশুরাম রায়কে খুন করে ফেলেছিল। যাবজ্জীবন হল। কিন্তু হেমেন মণ্ডল বলে কথা। দিব্বি ছাড়া পেয়ে গিসলো হাইকোর্টে। বুকের পাটা ফুলে হিমালয়। বড়োতলার গুণ্ডা হারু আদককে গিয়ে খুন করে দিলে, তারই পাড়ায়, হিন্দি সিনেমার সংলাপ বলতে-বলতে। ইন্দি ফিলমে তখুন সবে ক্রিমিনালরা নায়কের পিঁড়িতে বসছে। বাড়ির ছেলে-ছোকরা আর বউঝিরা বাংলা ফিল্ম ছেড়ে হিন্দির দিকে ভিড়ছে তখুন। পাড়ার কচি কিশোররা হিন্দি সিনেমার ঢঙে কথা বলে আহ্লাদে আটখানা হতে শিখছে।


     

    কংরেসের সিদ্ধার্থ রায় বিদেয় নিলে কী হবে, জনদরদী বামপন্হী সরকার সেশন আদালত থেকে হারু আদকের খুনের মামলা চুপিচুপি তুলে নিলে। এদিকে হেয়ার স্ট্রিটে, মানিকতলায়, উল্টোডাঙায়, শ্যামপুকুরে, পার্ক স্ট্রিট, বড়োতলা আর চব্বিশ পরগণার থানায়-থানায় হেমেনের নামে শ’খানেক কেস ঝোলানো। ঝোলানো মকদ্দমার দড়ি আপনা থেকেই পচে যায়। হেমেনের খাতিরে বিশেষ আদালত হল। হতেই, নাকচ করে দিলে হাইকোর্ট। জনদরদী সরকার জানতো যে হাইকোর্ট নাকচ করে দেবে। আইন বলে কথা। তা-ও আবার ইংরেজদের বানানো।


     

    শুধুমাত্র তিনটে কেসের তল্লাশিতেই হেমেনের বৈভবে পাওয়া গিসলো লাখের বেশি কাঁচা টাকা, বিলিতি মটোরগাড়ি, অনেকগুলো ব্যাংকের মোটা ফিক্স ডিপোজিত, লকার, গয়নাগাটি, ট্রাক, এমনকী ওর পাঁচ-পাঁচটা লাইফ ইন্সিয়োরেন্স। বিদেশি ইনসিয়োরেন্স কোম্পানিরা এসে যাতে না ব্যবসায় ভাগ বসায় তাই অনেক কাল আগে থাকতেই খুনি-ডাকাত-মস্তানদের জীবনবীমা আরম্ভ হয়ে গিসলো। পরে তো খুনি ধর্ষক আর ডাকাতরা বিধায়ক আর সাংসদ হয়ে যেতে লাগলো, খাদি-খদ্দরে ধবধবে।


     

    হেমেনকে শেষে শায়েস্তা করলে গৌরীবাড়ি পাড়ার মেয়েরা। পাড়ায় বিনে পয়সায় কোচিং চালাত লাবু স্যার, একটু খোঁড়া। সবাইকে নানা রকুমার কাজে সাহায্য করত লাবুবাবু। সবচে শ্রদ্ধেয় লোক ছিল পাড়ায়। লোকে লাবুকে এতো ভালোবাসছে শ্রদ্ধা করছে দেখে হেমেন আর ওর কেল্টে-খ্যাংরাটে সাঙ্গো-পাঙ্গোরা একদিন লাবুবাবুর ছেঁড়া কলার ধরে হুমকি দিলে, কোচিং-ফোচিং বন্দ করো, যথেষ্ট ল্যাখাপড়া শিখিয়েচো পাবলিককে। লাবুবাবু তাতে কান দিলে না। না শোনার ফলে একদিন ছাত্রছাত্রী আর অভিভাবকদের সামনেই ফাইট-মাস্টার হেমেন মণ্ডলের হাতে কোচিং ভাঙচুর আর লাবুস্যারকে লাথি গুষি চেন সোঁটা মেরে-মেরে বেধড়খ হল। থ্যাঁতা লাবুবাবুকে দেখতে গলায় স্টেথোঝোলানো ডাক্তার এলে তারও হল রামপ্যাঁদানি আড়ংধোলাই। শেষে থাকতে না পেরে একজন গেরস্ত বউ জোর করে ডেকে নিয়ে এল আরেক ডাক্তারকে। হেমেনরা আবার ট্যাঁ-ফোঁ করতেই পাড়ার সমস্ত বউ মেয়ে বুড়িরা হাতের কাছে যা পেল তাই নিয়ে গাছকোমরে নাবল রাস্তায়। জনদরদী সরকারের বরকন্দাজরা হেমেনকে বাঁচাতে গেলে তাদেরও জুটল চটিপেটা আর গুঁড়োলংকা। হেমেন-রাজ ফুরোলো।


     

    পশ্চিমবাংলার বাঙালিদের বোধ আর সংবেদনকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়ে গেছে রুণু গুহনিয়োগী-হেমেন মণ্ডলের দলবল। মর্গের আর ভাগাড়ের বেওয়ারিশ লাশের কংকাল বিদেশে চলে যাচ্ছে বিক্কিরির জন্যে। গঙ্গায় নৌকো ভাসিয়ে দিয়ারায় নিয়ে গেলেই হল। ওই তো, নিজের চোখেই দেখেছে অরিন্দম মুর্শিদাবাদের ট্যুরে গিয়ে। হরিহরপাড়ার স্বরূপপুরে জমির খেয়োখেয়ির ছোরাছুরিতে কাঙালি শেখের বারো বছরের ছেলে হাবল শেখের হাত কেটে দিলে কংরেসিরা। সেই কাটা হাতটা বাজারের থলেতে পুরে জেলা আর মহকুমা আধিকারিকদের দেখিয়ে বেড়াচ্ছিল এসিউসির ছেলেরা। ওই কাটা হাতটা দিয়েই একজন অনুসন্ধিৎসুর গালে চল কষিয়ে দিলে।


     

    চোদ্দো

    অভিনয়ের অ আ ক খ শিখছে এমন এক নিরক্ষর নোংরা আজীবন চান করেনি নাকে পোঁটা খয়েরি-চুল বালিকা ওদের দিকে নখপালিশ-ওঠা হাত বাড়িয়ে আনুনাসিক প্রার্থনা জানাতে আরম্ভ করলে, অরিন্দমের হুঁশ হয়, আবোল-তাবোল ভাবছিল ও, ছি-ছি !


     

    আমরা কি তাহলে মাঝপথে দাঁড়িয়ে বন্ধুত্ব পাতানোর অনুষ্ঠান করব ? যিশুর কথায় অরিন্দম বিব্রত। কেটলিউলি নিজের থুতনি একবার বাঁ-কাঁধে আরেকবার ডান-কাঁধে ঠেকায়।


     

    পাশ দিয়ে চটাং-চটাং কথা বলতে-বলতে একজোড়া হাওয়াই চপ্পল চলে যায়। সামনের দোকানটায় ন্যাতানো জিলিপির ওপর হাওয়ায় দোল খাচ্ছে ভিমরুল পরিবারের বালক-বালিকা। শালপাতার ওপর মাছি-সমাজের ভনভন গ্রাম পঞ্চায়েতের বখরা নিয়ে ঝগড়া। একটা সাদা-বাদামি কুকুর আস্তাকুঁড়ে চর্বিত চর্বনে একাগ্র। সাদা লংক্লথে জড়ানো শিশু আর গোটানো শীতলপাটিসহ গোটা তিরিশেক উদাসীন টুপি-লুঙ্গি দল ওদের দিকে এগিয়ে আসছে দেখে অরিন্দমের কোমরে ডান বেড় আর কেটলির হাত বাঁ-হাতে নিয়ে পার্ক-করা গাড়ির দিকে এগোয় যিশু।


     

    মুসুলমানদের নীরব শবযাত্রার শোক বড্ড ছোঁয়াচে। আর শবযাত্রায় নেতৃত্ব সব সময়ে এক মৃতদেহের। মৃত্যুর কি যাত্রা সম্ভব ? আমাদের এই কালখণ্ডটা শবযাত্রার। দাদু-ঠাকুমার কাল ছিল তীর্থযাত্রার। আমরা মডার্ন হবার যোগ্য নই। ওদের দুজনকে নিয়ে যেতে-যেতে ভাবছিল যিশু।


     

    ধুৎ, ভাললাগেনা। কেটলিউলির কথাগুলো কাঁপে থরথর। ঝটকায় হাত ছাড়ায়।


     

    পায়ের কাছ থেকে জিলিপি-ভেজা ঠোঙা তুলে নিয়ে যায় কাগজ-কুড়ানিয়া বাতাস। মেয়েটির উক্তিতে অরিন্দম একশা, হকচকায়। বাচনভঙ্গীর সঙ্গে মানানসই পুরু তাঁবাটে ঠোঁট। ওপরের ঠোঁটের ওপর, নাকের তলায়, কয়েক ফোঁটা ঘাম। হয়তো কেকের ময়দা ঠাসার পরিশ্রম।


     

    ভ্যানিলার ভারাতুর গন্ধের আদর কাটিয়ে, গাড়ির ডিকি তুলে জুতো-মোজা খুলে ঢোকায় অরিন্দম আর কোলহাপুরি বের করে পরে। রাস্তার কলে ও হাত-পা ধুতে গেলে, কেটলিকে যিশুর ফিসফিস। কী ভাবছে, বলতো, অরিন্দমটা। নির্ঘাত চটবে আমার ওপর। তোর কথা শুনেই এসেছে ও। বলছি তো, ওর মতন লোক আজকাল দেখা যায় না। তুই-ও অনেক লক্ষ্মী মেয়ে, বলেছি ওকে।


     

    ভালো লোক বললে চরিত্রের ওপর অসহ্য চাপ পড়া। অরিন্দম নীল বর্ডার দেয়া ধবধবে রুমালে হাত মুছতে-মুছতে এসে, ওদের কাছ-ঘেঁসে দাঁড়াতে, কেটলিউলি অরিন্দমের মুখে কনকনে চাউনি ফেলে জানতে চায়, কেনই বা যাব তোমার সঙ্গে ?


     

    কথাগুলো একযোগে অরিন্দমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিরে ফেলতে চায় ওর সযত্নলালিত সততাকে। দৃষ্টি স্হির রাখে অরিন্দম। সরাসরি তাকায়। একবারও পড়তে দেয় না চোখের পাতা। ওদের দুজনকে তো বটেই, নিজেকেও স্তম্ভিত করে ওর অনুচ্চস্বর ঘোষণা: তোমায় আমি বিয়ে করতে চাই।


     

    কেটলিউলি ভাবার সময় নেয় না। যেন প্রস্তাবের উত্তর আগে থাকতে নির্ণীত। কিংবা চিন্তার দ্বারা কলুষিত হবার আগেই প্রশ্ন তোলে। কুতো দিনের জন্য ?


     

    অরিন্দমের কানে কালো, মসৃণ-ডানা, ঝিঁঝির অদৃশ্য কলতান আটকে যায়। ওকে চাপা না দিয়ে একটা বেসরকারি বাস চলে গেল পাশ কাটিয়ে। টের পায় মগজের মঞ্চে অস্হিরতার ঝিঁকা নাচ। ফুসফুসের মধ্যে কোথাও নিজের ডাকের পুনরুক্তি দিয়ে আবহকে উত্তেজিত করছে কোকিল। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল ও, অরিন্দম, বাতাসের অদৃশ্য মৃগশিশুরা দুধ খেতে নাবছে কেটলিউলির সদ্যোদ্ভিন্ন হৃদ্যতায়। ওর মনে হল, কেটলিউলির মেরুতে বার্তা পৌঁছে দেবার ভাষা ওর আয়ত্বে নেই। হিন্দি আর বাংলা সিনেমা-ও কেটলিউলির কাছে প্রেম-ভালোবাসাকে হাস্যকর আর ফালতু করে দিয়ে থাকবে। প্রেমের সমস্ত অভিব্যক্তিকে ফোঁপরা করে দিয়ে গেছে আধুনিকতা।


     

    ওই অশথ্থ গাছটা যতদিন বাঁচবে, বলল ও, অরিন্দম, মেরুন-সবুজ স্বচ্ছ নৃত্যপটিয়সী অশথ্থপাতায় খেলতে-থাকা নিরুচ্চার রোদ্দুরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল ও, আমি আজকে, এক্ষুনি বিয়ে করতে চাই, বলল ও, বিয়ে করে বাড়ি নিয়ে যেতে চাই, বলল ও, আমি যে-কোনো প্রথায় বিয়ে করতে রাজি, বলল ও, আমি ঠান্ডা মাথায় ভেবে-চিন্তেই এসব কথা বলছি, বলল ও, আমি সব রকম ঝড়ঝাপটা পোয়াতে তৈরি, বলল ও, আমাদের বাড়িতে কেউই আপত্তি করবে না, বলল ও, মায়ের বরং আনন্দই হবে, বলল ও, তুমি তোমার মহাকরণের কাজ ইচ্ছে করলে বজায় রাখতে পারো, বলল অরিন্দম।


     

    যিশু থ, বোধয় মুগ্ধ। যৌন সম্পর্কের শ্রেণিবিভাজন কি সত্যিই মুছে ফেলা যায় ? আবেগকে এতকাল বারংবার অবজ্ঞা করার দরুন ওর নিজের গুরুত্বপূর্ণ নির্ণয়গুলো মুলতুবি থেকে গেছে, তামাদি হয়ে গেছে। অরিন্দমের এক্ষুনি বিয়ে করতে চাই আর কেটলিউলির কুতো দিনের জন্য, আত্মসমর্পনের এই আঘাত-প্রত্যাঘাত ওকে তীব্র চোট দিয়েছে। কপালে বরফের থান ইঁটের মতন। প্রতিভা তো সকলেরই থাকে, কিন্তু যে নির্বোধ অজানার আহ্লাদে টেনে নিয়ে গিয়ে মানুষের টুঁটি চেপে ধরতে চায় তার প্রতিভা, সেখানে একা ঢোকার সাহস, সবায়ের হয় না।


     

    গটগটিয়ে গাড়িতে বসতে গিয়ে দরোজা বন্ধ পায় কেটলিউলি। বিড়ম্বিত মুখশ্রী দেখে অরিন্দম দ্রুত তালা খুলে সামনের সিটে বসতে আ্‌বান জানায় দুজনকে। কেটলিউলি বসেছে চালক অরিন্দমের পাশে। যিশু বলল, আমি পেছনে বসছি। অরিন্দম গাড়ি ঘোরায়।


     

    বাবুরা দিনদুপুরে চললেন পিগনিগ কত্তে, শালা মটোরগাড়ির রোয়াব দেকাচ্চে। মন্তব্য ঝাড়ে রোগাটে কালচে ধুতি-পাঞ্জাবি, কটমট। যিশু বলল, ইনিও গরিব হওয়া ভালো, সর্বহারা হওয়া ভালো ইশকুলের সদস্য। অরিন্দম পালটা মন্তব্য করে কলকাতায় গাড়ি থাকাটা গণশত্রুতা।


     

    যিশু: আমরা কি তাহলে এখুন বিয়ে কত্তে যাবো ?


     

    কেটলি : হ্যাঁঅ্যাঅ্যঅ্যা। কুথায় যাবো ?


     

    যিশু : খ্রিস্টান হলে আমি আজই চার্চে ব্যবস্হা করে ফেলতুম। ব্যাপটাইজ করতেও সময় দরকার। রেজেস্ট্রি করতে চাইলেও তো নোটিশ দিতে হবে। যাবার পথে না হয় নোটিশটা দিয়ে যাওয়া যাক, কী বলো ? তোমার হিন্দু মতে তো পাঁজি-পুরুতের ঝক্কি। মহারাষ্ট্র মণ্ডল কিংবা তামিল সমাজমকে খর্চা-খরচ দিলে ওরা ইন্সট্যান্ট ব্যবস্হা করে শুনেছি। তোমার মুসুলমান বা বৌদ্ধ বন্ধুবান্ধবদের নক করে দেখা যেতে পারে। তার চেয়ে আমিই না হয় পুরুত হয়ে যাই, এক সঙ্গে বাঁচা নিয়ে তো কথা। ও, না, আজকে অনেক কাজ আছে আমার পরশু আমার কার্ডামম রিপোর্টের প্রেজেন্টেশান। গিয়ে ইকুইপমেন্টগুলো চেক করে রাখতে হবে।


     

    যিশুর ফ্ল্যাটে ছোটো ঘরটায় টেবিলে আর দেয়ালে বসানো আছে নানা যন্ত্রপাতি, দেখেছে অরিন্দম। বাঙালি কর্মীদের চেয়ে যন্ত্রপাতিকে বেশি বিশ্বাস করে ও। ঘরটায় একা বসে নিজের রিপোর্টের বিশ্লেষণ করে শোনায় জাপান বা আমেরিকার কোনো কোম্পানির বোর্ড সদস্যদের, যারা কাজটার ঠিকে দিয়েছে। তারা প্রশ্ন তোলে। যিশু উত্তর দেয়। প্রকল্প বা প্রস্তাব তক্ষুনি অনুমোদিত বা প্রত্যাখ্যাত হয়, কিংবা আবার বাড়তি তথ্য যোগাড়ে বেরোতে হয়, নতুনভাবে অনুমোদনের জন্যে। হলে ওর মোটা লাভ। না হলে মন খারাপ। প্রচণ্ড খাটে। নিয়ন্ত্রণ না করলে কাজ সবসময় দক্ষের দিকে, মানুষের দক্ষযজ্ঞের সক্ষমতার দিকে আকৃষ্ট হয়ে মানুষকে ঘিরে রাখে। যারা নিকৃষ্ট আর ফাঁকিবাজ তারা তাদের অক্ষমতার কর্মসংস্কৃতি গড়ে তোলে আর ক্রমশ রূপান্তরিত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠে।


     

    অ।। আমি তো ধর্মহীন আস্তিক।


     

    যি।। কেটলি তুই কী বলিস ?


     

    কে।। ঘুড়ার দৌড় দেখতে যাবো।


     

    যি।। তুই দৌড় দেখতে চাস, না রেস খেলতে চাস ? মাঠে না গিয়েই রেস খেলা যায় রাসেল স্ট্রিটে টার্ফ ক্লাবের কাউন্টারে।


     

    কে।। ঘুড়াও দেখে নিবো, রেসও খেলে নিবো।


     

    যি।। আমাকে তাহলে পার্কস্ট্রিটে নাবিয়ে দাও অরিন্দম। পার্ক সার্কাস বা ক্যামাক স্ট্রিট দিয়ে ঢোকার সময় আছে এখনও। টাইমে পৌঁছোতে পারলে কাজ হয়। নইলে সেই আবার ঘুরপথে চৌরঙ্গি দিয়ে ঢুকতে হবে।


     

    কে।। চলো না কাকুদা, আমরাদের সঙ্গে। খেলা জিতে নিবো আর চলে যাবো শশুরবাড়ি। হি-হি।


     

    যি।। আগে তো জিতগে যা। আজকে আমার সত্যই অনেক কাজ আছে। তার ওপর আমার ম্যান ফ্রাইডেটা বাড়ি যাচ্ছে। ওদের গ্রামে টেনশান শুরু হয়েছে আবার। বেচারা কীর্তনিয়া।


     

    অ।। সেই বাঙাল ছেলেটা ? কী হল ওর ? এইজন্যেই আপনার পুরোদস্তুর অফিস খোলা উচিত ছিল। ক্লার্ক, অ্যাকাউন্টেন্ট, ডাটা এনট্রি অপারেটর এসব রেখে। অঢেল টাকা তো রোজগার করেন।


     

    কিছুক্ষণ থম মেরে যায় যিশু। তারপর আরম্ভ করে পশ্চিমবঙ্গের স্বাধীনতাউত্তর পল্লিসমাজের অকথ্য রূপকথা। শোনার জন্যে গাড়ির গতি কমায় অরিন্দম।


     

    উত্তর দিনাজপুরের অন্ত্যজ উদবাস্তু গ্রাম ভাঙাপাড়ায় ওর বাড়ি। উত্তরবঙ্গের গ্রামগুনোর নামও স্ট্রেঞ্জ। ভাঙাপাড়া, মাথাভাঙা, ফাটাপুকুর, রাজাভাতখাওয়া। ওদের গ্রাম থেকে আমিই এনেছিলুম ছেলেটাকে। একদম রঅঅঅ। এখুন তো ও আর থাকতে পারে না গ্রামে গিয়ে। গ্রামটা একেবারে অজ পাড়াগাঁ, অলমোস্ট এইটিন্হ সেঞ্চুরিতে। পার্টির দলাদলি ছাড়া অন্য কোনও রকম আধুনিকতা নেই।


     

    গত বছর ওদের গ্রামের চালকলটায় আর সেখানকার শদেড়েক কুঁড়েঘরে আগুন ধরিয়ে আটজনকে পিটিয়ে গলাকেটে খুন করেছিল পাশের টুনিভিটা গ্রামের মাহাতোরা। পাঁচশো মাহাতো, হাতে মশাল নিয়ে দৌড়ে আসছে, কী ভয়াবহ। তোমাদের বিহারের খুনোখুনি তো এর কাছে নস্যি। পাঁআআআচ শোওওও লোক হাতে মশাল নিয়ে চ্যাঁচ্যাতে-চ্যাঁচাতে এগোচ্ছে একটা গ্রামের দিকে, ভাবতে পারো ? শরৎ চাটুজ্জে তো এই সিনারিও নিয়ে এপিক লিখে ফেলতেন, একশট আফিম মেরে। বিগ বাজেট হিন্দি ফিল্মও হতে পারে; পাঁচশো গব্বর সিং দাঁত বের করে ছুটে আসছে।


     

    বুঝলে ? একটা কোলের বাচ্চাকে কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল আগুনে। পড়পড় করে পুড়ে ঝামসে কালো হয়ে গেল জলজ্যান্ত তুলতুলে বাচ্চাটা। বুঝলে ? টুনিভিটার মহাজন সুরেন মাহাতোর লাশ আগের দিন পাওয়া গিসলো ভাঙাপাড়া গ্রামে। গ্রামে-গ্রামে ব্যাংক খুলে মহাজনদের খুব সুবিধে হয়েছে। কী বলছিলুম ? হ্যাঁ। অজিত বালা নামে একজন চালকল মালিকের কাছে মোটা টাকা পাওনা ছিল সুরেনের।


     

    আমার কাজের ছেলেটার বাবা-মা আর বোন এসে ছিল আমার ফ্ল্যাটে। বিহারের বলরামপুর থেকে লাঠিয়াল এনেছিল মাহাতোরা। তাদের হাতে লাঠি, বল্লম, সড়কি, টাঙি, বাঁশ, শাবল, জেরিক্যানে পেটরল। ওই সমস্ত অস্ত্র নিয়ে পাঁচশো লোক, ছুটে আসছে, হই-হই করতে-করতে, বুঝলে ? জাস্ট ভিজুয়ালাইজ। ভাঙাপাড়ার জোতদার বুধন মাহাতোর হাজার খানেক বিঘে জমির বেশিটাই খাস হয়ে গিসলো। ভাঙাপাড়ার রিফিউজিরা কেউ-কেউ পাট্টা পেয়েছিল। গোলমালের পাণ্ডা ওই বুধনটাই। ওর ছেলে ব্রহ্মদেবকে ধরেছিল পুলিশ। আরে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ তো সব আদিত্যর কার্বন কপি।


     

    ভাঙাপাড়ার পরিবারগুনো ধান থেকে চাল বানিয়ে বিক্কিরি করে। ধান কোটে বলে ওদের বলে কুটনি। মহাজনদের কাছ থেকে দাদন ছাড়া ওদের চলে না। কবে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, পঞ্চাশ বছর আগে। অনেক কুটনির অবস্হা সামান্য ফিরেছে। অনেকে আবার রয়ে গেছে উদবাস্তু, অলমোস্ট কাঙালি। এদিকে জমির দামও বেড়েছে তরতর করে। মাহাতোরা তো ব্রিটিশ আমলের জোতদার। ধার দিয়ে, লোভে ফেলে, ভয় দেখিয়ে, আবার হাতাবার তালে ছিল জমিজমা। মাহাতোদের দলে ভিড়েছিল পলিয়া জাতের লোকেরা, ওরাও ল্যান্ডেড ক্লাস। এরা ঝাড়খণ্ডিদের মতন উপজাতি নয়। ভাঙাপাড়ার উদবাস্তুদের চেয়ে উঁচু জাতের লোক এই চাষাগুনো।


     

    জমিদারি আমলের মতন ধার-দাদনের কাগজে টিপছাপ আজও চলছে। পঞ্চায়েতেও তো জোতদার, মহাজন, মাহাতোদের দখলে। খুনোখুনির পর ব্রহ্মদেবটা তো হাওয়া হয়ে গেসলো। আর ধরাটরা পড়েনি বোধয়। ওদিকে সমবায়-টমবায় বলে কিছু নেই। মেদিনীপুর, বর্ধমান, বাঁকুড়ার মতন সমবায় ব্যাপারটা মাটি পায়নি উত্তরবঙ্গে। এনজিও নেই বলেই মনে হয়, জেলা সদরে যা জেনেছি। এনজিও গঠন করতে গেলেই খুন হবে, আসামে মাজুলি দ্বীপে সঞ্জয় ঘোষের মতন। বাণিজ্যিক ব্যাংকের বাবুদের কথা তোমায় আর কী বলব। তোমরা তো ওদের মালিক। লাইসেন্স দাও, ইন্সপেক্ট করো।


     

    দেশভাগের পর বামুন, কায়েত, বদ্যি যারা এসছিল, কেউ আর পড়ে নেই। সব্বাই দিব্বি গুছিয়ে নিয়েছে। উদবাস্তুদের নেতা হয়েছে। রাজনীতিরও দখল নিয়েছে। কিন্তু মার খেয়ে গেল অন্ত্যজরা। উত্তরপ্রদেশের তরাই অঞ্চলে তো ওদের জমিজমা সব শিখ সরদাররা হাতিয়ে নিয়েছে ; আন্দামানে গিয়েও উপনিবেশ গড়তে দেয়া হয়নি।


     

    আচমকা ওদের সঙ্গিনী জিগ্যেস করে ফ্যালে, কুন দেশ গো ?


     

    এই নিষ্পাপ অজ্ঞানতা বজায় থাকুক। আধুনিকতার কলুষমুক্ত থাকুক, ভেবে, অরিন্দম বলল, কোন দেশ আবার, তোমার দেশ।


     

    না-না, আমরাদের দেশ নয়। আমরা ঝগড়া করি না। মেয়েটির দুচোখে ড্যাবড্যাবে গরিমা।


     

    তাই জন্যে তোর বিয়ে দিচ্ছি অরিন্দমের সঙ্গে, ও-ও মহাক্যাবলা, ঝগড়া-ফগড়া করতে পারে না, বলল যিশু, প্যাকেটে সিগারেট ঠুকতে-ঠুকতে।


     

    তুমি সিগ্রেট খাও না ? অরিন্দমের কাছে জানতে চায় বাগদত্তা।


     

    না, আমি পান সিগারেট মদ গাঁজা কিচ্ছু খাই না।


     

    ঠিক, তুমি বোকা। অরিন্দম সম্পর্কে বাগদত্তার মূল্যায়ন।


     

    যিশু ওর পল্লিকথার পরবর্তী পর্ব শুরু করে।


     

    গ্রামটায় থেকেছি আমি। প্রাইমারি ডাটাবেসের লোভ আমি সামলাতে পারি না, জানোই। কুটনিদের পুরো তথ্য আছে আমার কাছে। আনবিলিভেবলি গরিব এই লোকগুনো। একচালা, হোগলা, চ্যাঁচারি, ডিগডিগে, ক্যাঁতরা-কানি, লালচাল, জলেতে তেলের গন্ধ, পানাপুকুরে চন, নোংরা ছোটোছোটো মাছ আর শাকশেকড়। আমার তো পেট খারাপ হয়ে গিসলো। বুঝলে ! তাও আবার পায়খানা নেই। মাঠে হাগতে যাও।


     

    হি-হি।


     

    এই, হাসিসনি।


     

    লোকাল রাজনীতিকরা মাথা গলায়নি ? জানতে চেয়েছিল অরিন্দম।


     

    আরে তা আর বলতে। প্রান্তিকের সংঘর্ষ মানেই রাজনীতি, আই মিন পার্টি-পলিটিক্স। সিটুর কুটনি ইউনিয়ানের বিবেকানন্দ কীর্তনিয়া বলেছিল, গণহত্যার পুরো ছকটা সিপিয়েম নেতা হরেরাম মাহাতোর। সিপিয়ের সাংসদ সুব্রত মুখোপাধ্যায় বলেছিল, হরেরাম নির্দোষ, আসলে জোতদাররা জমি কাড়তে চাইছে। জেলা বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বীরেশ্বর লাহিড়ি বলেছিল, জোতদার-মহাজনদের কথায় ওঠবোস করি না আমরা। বিজেপির শ্রীধর মল্লিক বলেছিল, পেটরল এসেছে মাহাতোদের চালকল থেকে। কলকাতায় কংরেসের মানস ভুঁইয়া বলেছিল, যারা খুন হয়েছে তারা সবাই কংরেসের। আরেসপির জেলা সম্পাদক জ্যোতিষ সরকার বলেছিল, আরেসপির প্রভাবশালী নেতা ছিল টুনিভিটা গ্রামের সুরেন মাহাতো। কারামন্ত্রী বিশ্বনাথ চৌধুরি ভাঙাপাড়ায় গণশ্রাদ্ধের দিন বলেছিল, পুনর্বাসনের ব্যবস্হা করা হচ্ছে। ব্লক আধিকারিক অশোক সাহা বলেছিল, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুনোর জন্যে তেরপল আর কাপড় কেনা হচ্ছে। দিনাজপুর-মালদা রেঞ্জের ডি আই জি অশোক সেন বলেছিল, হত্যাকারীদের খোঁজ চলছে। জেলার পুলিশ সুপার দেবেন্দ্র সুকুল বলেছিল, অবস্হা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। জেলাশাসক পবন আগরওয়াল বলেছিল, গ্রামবাসীদের মাথাপিছু ষাট টাকা নগদ, শুকনো খাবার আর জামাকাপড় দেয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী শ্রীকুমার মুখোপাধ্যায় বলেছিল, শোকমিছিল বার করলে অশান্তি হবে। আরেসপির স্হানীয় নেতা রমণীচন্দ্র ঘোষ বলেছিল, বুধনের ছেলে ব্রহ্মদেব তো কংরেসের লোক….


     

    তুমি কী বলেছিলে ? সঙ্গিনীর রাগি প্রশ্নে দুজনেই স্তম্ভিত।


     

    যাক বাবা, আমার বাড়ি এসে গেল। জবাব এড়াবার সুযোগ পেয়ে সত্যিই প্রীত হয় যিশু। দোর খুলে, বাঁ পা বাড়িয়ে, চুলের টেরি বাঁচিয়ে নাবে। নেবে, সামনের জানালায় ঝুঁকে, মেয়েটি ওর কথাগুলো পুরোপুরি বুঝতে পারবে না জেনেও বলে, বুঝলি, আমরা সাধারণ লোকেরা মহলায় প্রক্সি দিই, কিন্তু আসল নাটকটা করে অন্য লোকেরা। আমাদের এই পাড়ায়, পার্ক স্ট্রিটে, বুঝলি, সক্কালবেলা একজন লোক কাক আর কুকুরদের আও আও আও আও, কানি আও, লেংড়ি আও, ডাক পেড়ে-পেড়ে রুটির গোছা খাওয়ায়।


     

    হি-হি।


     

    একদঙ্গল মেট্রোপলিটান কিশোরী রাস্তা দিয়ে ঢলঢলে বুক ফুলিয়ে যেতে-যেতে, হাই আংকল, চেঁচিয়ে হাত নাড়ায় যিশুকে। নজর ওদের কেটলিউলির দিকে।


     

    অরিন্দম : আমিও কাল থেকে আপনাকে কাকুদা বলে ডাকব।


     

    যিশু : কালকে কেন ? এখন থেকেই বলো।


     

    অরিন্দম : আগে বিয়েটা করি।


     

    যিশু : সত্যি ? না খাঁটি সত্যি ? কোনটা ? আচ্ছা চলি।


     

    গাড়ি থেকে নেবে, শনিবারে প্রাক-দুপুরে, সওদাগরি পাড়ায়, হঠাৎই দরাজ হয় যিশুর গলা। মোন মোর উড়াং বইরং করে রেএএএএ….। উত্তর দিনাজপুরে শোনা।


     

    ইশ রে, আবার গান !


     

     

    পনেরো

    তপসিয়া সাউথ রোড, বাইপাস, তিলজলা রোড, দিলখুশা স্ট্রিট, পার্কসার্কাসের মোড়ে পাক খেয়ে পার্ক স্ট্রিটে যিশুকে নাবাবার পর আউটরাম রোডে বাঁক নিয়ে ক্যাসুরিনা অ্যাভেনিউতে পড়ে গাড়ি। সদ্য-পরিচিতির আগল ভাঙার আগের নিশ্চুপ মুহূর্ত। কে কী কথা বলবে। আবার অভিব্যক্তির সমস্যা হয় অরিন্দমের।

    দু’পাশ জুড়ে পান্নাসবুজ। পিঠের ওপর থেকে রোদ্দুরকে ঘাসে ফেলে দিয়ে ছায়ায় দাঁড়ায় অরিন্দমের অ্যামবাসাডর গাড়ি। টুলবক্স খুলে একটা ছোট্ট হলুদ বই কেটলিউলির দিকে এগিয়ে দিয়ে আবার স্টার্ট দেয় গাড়িতে। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে গাড়ি বেগবান।

    পাতা উলটিয়ে ঘুড়ার ছবিগুনো দ্যাখে মেয়েটি। দেখে, রেসের বইটা রেখে দ্যায় টুলবক্সে। শরীর কাঁপিয়ে হাসতে থাকে নিঃশব্দে। উপভোগ করে নিজের হাসি।

    অরিন্দমের মনে হল, শরীর থিরকিয়ে এই যে হাসি, এভাবে দেহময় প্রতিভাদীপ্ত হয়ে ওঠা হাসি, দেহকে দেহাতীত করে দিচ্ছে, ভরসন্ধ্যার মতো আহামরি জোনাকিরা অন্ধকারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ঝরে-ঝরে পড়ছে। ও, অরিন্দম, বলল, কী হল ? ঘোড়া পছন্দ করো।

    পড়তে জানি না।

    কেন ? ইশকুলে ইংরেজি শেখায়নি ?

    বাংলাও পড়তে পারি না। কুনো ইশকুলে পড়ি নাই গো। আমি লিখাপড়া জানি না।

    অরিন্দম টের পায় ও সজোরে গাড়িতে ব্রেক মেরেছে। কিঁইইইচ। হসপিটাল রোডে ঘাসের কিনারে থামে গাড়ি। ভীত শঙ্কিত চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, অ আ হসসোই দিরঘোই কিচ্ছু জানো না ?

    মায়েটি আলতো মাথা নাড়ায়।

    দিকে-দিকে সাক্ষরতার এতো গল্প, গ্রাম-শহরের দেয়ালে-দেয়ালে সাক্ষরতা সফল হবার ছড়া, অথচ কলকাতা শহরে একজন তরতাজা তরুণীর সঙ্গে বাংলা অক্ষরের পরিচয় হয়নি। শিলেট-পেনসিল নিয়ে কেউ সঙ্গে বসেনি কোনওদিন। হাতেখড়ি হয়নি। হাজার -হাজার বাংলা শব্দের মানেই জানে না। অবিশ্বাস্য। টেরাকোটা রঙের ওই পুরু ঠোঁট উচ্চারণ করেনি আজ ওব্দি কোনো লিখিত অক্ষর। অবহেলা অনাদর অভাবে স্ফূরিত অজ্ঞান নিরক্ষর ঠোঁট।

    কী দেখছ গো ?

    তোমার কানের লতি পাটিসাপটার মতন তুলতুলে।

    লিখাপড়া শিখে নিবো।

    আমার মাও লেখাপড়া জানত না। পরে শিখেছে।

    আজকা একটা সিনেমা দেকবো, কেমন ? বালকুনিতে ?

    আমাদের বাড়িতে টিভি-ভিসিআর আছে। বাড়িতে বসে যত ইচ্ছে সিনেমা দেখতে পারবে।

    অরন্দম দেখল, ওর সামনের দুটো চোখের জলাশয়ের ওপর জোনাকি উড়ছে। গাড়ির কাচে সানফিল্ম লাগানো ; পিছনের দরোজাদুটোর কাচ তোলা ছিল। ড্রাইভারের দিকের কাচ দ্রুত তুলে দিয়ে অনুসন্ধিৎসু মেয়েটির দিকে নিষ্পলক তাকায় অরিন্দম। সামনের দিক থেকে যে গাড়িটা আসছে, সেটা এখুনও অনেক দূরে। ছোট্ট পুরু ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট একবার আলতো ছুঁইয়ে নিয়েছে অরিন্দম। কিন্তু মেয়েটি চোখ বুজে জড়িয়ে ধরেছে ওকে, আর বলে উঠেছে, আমার আচকা লজ্জা হয়।

    অরিন্দমের কনুই লেগে হর্ন বেজে ওঠে। বাতাসের পরতে লুকিয়ে-থাকা অদৃশ্য প্রতিধ্বনিরা হর্নের শব্দে কেঁপে ওঠে আচমকা। মেয়েটির হাঁ-মুখ থেকে বিকিরিত খুদের জাউয়ের পান্তার সোঁদা গন্ধে অরিন্দম মুগ্ধ, সন্মোহিত। শি্রণ চাউর হয় রোঁয়ায়-রোঁয়ায়।

    স্টার্ট দেয় গাড়ি। গাছের ফাঁকে-ফাঁকে দৃশ্যমান আকাশে সপারিষদ উড়ছে চিলপুরুষ।

    রেসকোর্সে পৌঁছে, গাড়ি থেকে নাবার আগে, রেসের গাইডবইটা আবার বের করে টুকিটাকি পরিচয় করায় অরিন্দম। ফিলি, জকি, ঘোড়ার মালিক, দূরত্ব, চাম্পয়ান কাপ, ট্রেবল, টানালা, জ্যাকপট, আউটার সাউন্ড। মাদি ঘোড়াগুনোকে ট্রেনিং দিয়েছে কারা। ঘোড়ার জাত। ঘোড়ার বংশতালিকা। কেটলিউলি হতবাক।

    দিল্লি আর ব্যাঙ্গালোরে বারোশো মিটার জিতেছে, এই ঘোড়াটার নাম জ্বলন্ত চুমু।

    হি-হি।

    এর নাম তোপের গোলা, ঘোড়সওয়ার রুবেন, ওজন ষাট কেজি, কলকাতায় চোদ্দোশো মিটার জিতেছে। সব নামই রেজিস্ট্রি-করা, অন্য কেউ দৌড়ের ঘোড়াকে এই নাম দিতে পারবে না। অনেক ঘোড়া আছে, নাম শোনো। ক্লাসিক অ্যাফেয়ার, অ্যাপোলোনিও, হার্ডিলা, ডানসিং কুইন, ইয়েনা, ফ্ল্যাশ গর্ডন, সান শ্যাক, অলস্টার, জেরিজ ফ্লেম, ওকহিল, সানফ্ল্যাগ, কিং র‌্যাট, টলারেন্স, কোপাকাবানা, কার্নিশ প্রিন্স। কোন ঘোড়াটার টিকিট কিনব ?

    আমি কী জানি ! বাংলা ঘুড়া নাই ?

    ওদের পাশে একটা ঠাসাঠাসি ট্যাক্সি এসে থামে। তর্করত পাঁচজন জুয়াড়ির কথা শোনা যায়। মফসসল থেকে বোধয়। শ্যালদায় নেবেই ট্যাক্সি ধরেছে। হয়তো ফিহপ্তা ট্রিপ মারে। মোটা লোকটার হাতে রেসের বই। রেসুড়েদের চেহারাটা তেলচোয়াড়ে হয় কেন কে জানে ! নিজেকে এদের সমগোত্রীয় ভেবে বিসদৃশ লাগল অরিন্দমের।

    প্রথম জুয়াড়ি: অ্যাপোলোনিয়ারের মা ব্রিটিশ। ডার্বি জিতেছিল, জানেন তো গোরাদা।

    দ্বিতীয় জুয়াড়ি: তোদের বাঞ্চোৎ মা-বাপের সদবংশে না হলে চলে না, না রে শশী ? জুয়া হল একটা জীবনদর্শন, বুজলি। জেতার ঘোড়ার শ্রেণিই আলাদা। এ তোর পার্টিবাজির শ্রেণি নয়, বুজলি। আমি শালা হেরো হতে চাই না। জিদবো, তবে ছাড়বো।

    তৃতীয় জুয়াড়ি : আসার সময়ে প্রতাপবাবু এই অ্যাপোলোনিয়ারের টিপস দিয়েছে সুখেনকে। গৌরাঙ্গ, অমরনাথ, কুমুদবাবু, বিরেন সিংহি সবাই একটা কতা বারবার করে বলে দিয়েচে। ঘোড়াটার আঁত্তা একেবারে ঝড় দিয়ে গড়া। সালা যেন জেলাধিপতি। মাথা বাঁয়ে কিন্তু দেকচে সামনেদিকে।

    চতুর্থ জুয়াড়ি : অমর প্রেম জকির সিক্স টু ওয়ান যাচ্চে, জানিস তো ব্রহ্মানন্দ।

    পঞ্চম জুয়াড়ি : সবাই আলাদা-আলাদা ঘোড়ায় লাগাই, সেইটেই ভালো, যারটা লাগে লাগবে। কে যে জিদবে বলা যায় না।

    লোকগুনো চলে গেলে, গাইডবই খুলে অরিন্দম বলল, হ্যাঁ, জকি অমর প্রেমের ঘোড়াটার নাম অ্যাপোলোনিয়ো। আরও সব জকি আছে। ব্রিজশা, কুমার, আলি, কামিল, প্রসাদ, রাবানি, যাদব, সুনীল সিং, খান, শ্রফ, প্যাটেল, রাজ্জাক, আলফ্রেড। তোমার কোন ঘোড়সওয়ার পছন্দ ?

    কে জেতে গো ? ঘুড়া, না ঘুড়ার পিঠে যে বসে ?

    জিতি আমরা, যারা খেলতে এসেছি।

    আমরাদের কুন ঘুড়া?

    তুমি তো বললে না। তুমি গাড়িতে বোসথাকো, আমি বুকির ঠেঙে টিকিট আনছি।

    না না না না। একলা-একলা থাকবো না।

    কাচ তুলে বাইরে থেকে বন্ধ করে দিচ্ছি, ভয়ের কী !

    রেসুড়েদের নমুনা দেখে কেটলিউলির এখানে আসা সম্পর্কে যে দ্বিধা জেগেছে তা উপভোগ করতে-করতে অরিন্দম প্রথম রেসের সবকটা ঘোড়ার টিকিট কাটে। ঘোড়েল বুকিক্লার্ক ওর দিকে অভিসন্ধির হাসি হাসে। প্রেমিকার সঙ্গে প্রথমবার ? নাকি হনিমুন লাক-ট্রাই ?

    ফিরে এসে, গাড়ি খুলে, বন্ধ করে, কেটলিউলির ঘর্মাক্ত হাত ধরে ও, অরিন্দম। বন্ধ গাড়িতে ঘেমেছে। দিনভর কেটলি বয়ে-বয়ে কড়া পড়ে গেছে হাতে। বলে, আমার হাত ছেড়ো না, ঠেলাঠেলিতে হারিয়ে যাবে। অরিন্দমের মনে হল, হাত ধরে না থাকলে কোনও মহাকরণবাসী বিরক্ত করতে পারে। ভাববে আস্পদ্দা তো কম নয়। স্রেফ হাত ধরে থেকেও তো শ্রেণিবদল ঘটানো যাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময়ে চাপা স্বরে বলল ও, অরিন্দম, আমিও খেলিনি কখুনো, আজ প্রথমবার, প্রথম জুয়ায় সবাই জেতে।

    জুয়া ?

    জুয়াই তো।

    ভিড়ের মধয়ে ওর অফিসের প্রোটোকল আধিকারিক রাঘব সান্যালকে দেখতে পেল অরিন্দম। শুনল, ওর বউ রমাকে বলছে, অরিটা ঝি-চাকরানিদেরও ছাড়চে না আজগাল, শালা বিয়ে কল্লে না কেন আজ ওব্দি কে জানে। রমার কষ্টার্জিত মুখাবয়বে প্রত্যুত্তর ফোটে না। পাটনায় থাকতে, রাঘব যখন অফিসে কেয়ারটেকার আর অরিন্দম মামুলি কেরানি, টেলিফোন অপারেটর রমার জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনেকটা এগিয়েছিল অভিসন্ধির অনুপযুক্ত অরিন্দম। জিতে-জিততে দান ছেড়ে দিয়েছিল, কেননা পাশের ফ্ল্যাটের অতসি বউঠানের মধ্যদুপুর বুকের সুরভিত স্নিগ্ধতা তখুন অফিস পালাতে উৎসাহিত করছে অনভিজ্ঞ অরিন্দমকে। সমাজের আজ্ঞায় অসফল প্রেমিকের গতিবিধি বেশ সন্দেহজনক।

    প্রথম খেলার ঘোষণা হয়। ভ্যানিলার গন্ধ হারিয়ে গেছে এখানকার নারীদের দামি আর বিদেশি সুগন্ধে। কেটলিউলি দৃশ্যত কুন্ঠিত। ঘোষিত হয় ঘোড়াগুনোর পরিচয়, জকিদের পরিচয়, ঘোড়া-মালিকের পরিচয়। জেতবার চাপা উত্তেজনা সবায়ের চোখে-মুখে।

    আমরাদের কুন ঘুড়া ?

    যে ঘোড়া ওড়ে কিন্তু ডানা নেই।

    পুলরুম থেকে এসে দাঁড়িয়েছে ঘোড়ারা। হালকানীল জিনস-পরা নাশপাতি-নিতম্ব একজন মহিলা ওদের সামনে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। কিলবিলে আনন্দে স্পন্দমান তার গেঞ্জিঢাকা বুক। পাকাচুল সঙ্গীর মুখে অনুমোদনের হাসি। রেসুড়ে ধনীদুহিতারা তাদের যৌবন ধরে রাখে বহুকাল। কেটলিউলির পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ভ্যানিলা। এতকালের সংস্পর্শে শরীরের গ্রন্হি থেকেই হয়তো নির্গত হয় ভ্যানিলা, ইচ্ছামতন।

    ভ্যানিলা কী করে হয় জানো। মাথা নাবিয়ে উড়ন্ত চূর্ণকুন্তলকে জিগেস করে অরিন্দম।

    কী করে ? অপলক জানতে চায় মেয়েটি।

    আলকাতরা থেকে।

    ইশ রে। তোমায় বলেছে।

    হ্যাঁ সত্যি। আলকাতরা থেকে পাওয়া যায় এথিল ভ্যানিলিন নামে একটা রস। স্টোক মেশিনে পরিষ্কার করে ভ্যানিলা হয়। সে ভ্যানিলা আমরা খাই।

    কেটলিউলির চোখে অবিশ্বাস আর শ্রদ্ধা।

    অরিন্দম শুনতে পায় চরাচর জুড়ে ধামসা, মাদল, ঝাঁঝ, শিঙা, চ্যাড়াপেটি, মদনভেরি, বাঁশি বাজছে। কলরোল তুলেছে হেঁতাল, গবান, গর্জন, গেঁওয়া, গোলপাতা, রাইন, পশুল, খলসি গাছের দল। ছাড়া পেয়েই ছুটতে আরম্ভ করেছে ঘোড়াগুনো, ছোটাচ্ছে ঘোড়সওয়ার, রঠিন টুপি, চকরা-বকরা পোশাক। দাঁড়িয়ে পড়েছে দর্শকরা, কয়েকজনের চোখে দূরবিন, নিজের ঘোড়াকে ইংরেজি ভাষায় উৎসাহিত করতে থাকে। বাতাসের ছোটো-ছোটো বাদামি টুকরোর ওপর লাগাম হাতে অর্ধেক উবু হয়ে বসে আছে ঘোড়সওয়ার। দর্শকরা নিজের গ্রীবাকে দীর্ঘ, দীর্ঘতর করছে, চ্যাঁচাচ্ছে। সবুজ ঘাসের ওপর ছুটছে ঘোড়াগুনো। হাওয়ার দুর্গপ্রাকার ডিঙোবে বলে ছুটছে। খুরের ডুগডুগি বাজিয়ে ছিৎরে দিচ্ছে আধভেজা ঘাস। ছুটছে গা ঘেঁষাঘেঁষি। রোদ্দুরের চিলতেকে এক মুহূর্তের জন্যেও বসতে দিচ্ছে না চামড়ায়। স্বমহিমায় উজ্জ্বল একের পর এক বাদামি ঢেউ উঠছে আর নাবছে। ঢেউগুনোর ওপর রঙিন পলকা ঘোড়সওয়ার। সাংগীতিক মূর্ছনায় খুরধ্বনির শব্দ দ্রুত থেকে দ্রুততর। ছুটছে ঘোড়াগুনো। ছুটছে ঘোড়াগুনো। ঝুরো ঝুরো হয়ে ভেঙে পড়ছে অদৃশ্য বাতাসের গমগমে প্রতিরোধ।

    ছুটছে ঘোড়াগুনো। অজস্র মানুষের দ্রুতশ্বাস চিৎকারের অনধিগম্য প্রতিধ্বনি চিরে কালোবরণ বিদ্যুৎ। পৃথিবীতে যেন অর্গল বলে কিছু নেই। ওরা ছুটছে। ভাসমান বেতারকণার সঙ্গে সংঘর্ষে দেদীপ্যমান সূর্যলোক চলকে পড়ছে ওদের ঝকমকে বেগবান পেশি থেকে। চারটে পায়ের কোনোটা মাটিতে পড়ার আগেই বাতাস ওদের টেনে নিচ্ছে সামনে। গ্রীবা প্রসারিত। ছুটছে রূপসীরা। রঙিন পালকে গড়া ওজনহীন ঘোড়সওয়ার, লাল-নীল, চৌখুপি জামা, হলুদ ডেনিম-টুপি, বাঁধভাঙা ঝরনার ধাক্কায় ছিটকে এগোচ্ছে, কালচে-বাদামি নদীতে রূপান্তরিত ঘোড়াগুনো বাঁক নিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে না ওদের দ্রুত ধাবমান পা। ছুটচে ঘোড়াগুনো। কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব কবকব……

    সবকটা ঘোড়া একাকার হয়ে বিশাল একটিমাত্র ঘোড়া হয়ে গেছে। উড়ে যেতে চাইছে আকাশে। বাদামি কুয়াশায় পালটে গেছে বিশাল ঘোড়াটার আদল। এদিকে আসার জন্য বাঁক নিচ্ছে উড়ন্ত নদীটা। স্পষ্ট কুচি-কুচি খুরধ্বনি। অমোঘ উদবেগের দিকে ধেয়ে আসছে। অজস্র পায়ের বিশাল ঘোড়াটা ছিঁড়ে-ছিঁড়ে অনেক ঘোড়া হয়ে যাচ্ছে। পারস্পরিক স্পর্শের পেশল বিদ্যুৎ বাঁচিয়ে ছিটকে চলে আসছে ঘোড়াগুনো। সামনে ঝুঁকে রয়েছে দোমড়ানো-পিঠ লাল নীল সবুজ ঘোড়সওয়ার। ঘোড়া আর ঘোড়সওয়ার একটিমাত্র ঝড়ের টুকরো। এগিয়ে আসছে। এগিয়ে আসছে।

    পুরুষ আর মহিলা জুয়াড়িদের উন্মত্ত বাহবায় দৌড়ে এগিয়ে আসছে একের পর আরেক ঘোড়া। যত জোরে চ্যাঁচাতে পারে উত্তেজিত অগুন্তি মানুষ-মানিষি, উৎসাহিত করছে বাজিধরা ঘোড়াকে। শেষতম ঘোড়া আর তার ঘোড়সওয়ারের নাম করেও লোকে চিৎকার করছে, বাকাপ, বাকাপ,বাকাআআআপ। অরবিটিনো, বাকাপ, শলিশ গোল্ড, বাকাপ, বাকাআআপ, লরেনজো, চাং ফা, অ্যাকোয়া মেরিন, কানসাই, স্যান্ড ডান্সার, বাকাপ, বাকাপ, মডেস্টি ব্লেজ, শিনজুকু, টিকোরিয়া, গোল্ড লাইট, বাকাপ, বাকাপ, বাকাপ, বাকাআআপ, অ্যাপোলোনিয়ো, জোরে, আরও জোরে, অ্যাপোলোনিও, অ্যাপোলোনিও…ও…ওওওও….

    চিৎকারের ঢেউ স্তিমিত হয়ে ফোঁপানি আর অট্টহাসিতে পালটে যেতে থাকে। হাততালি ক্ষীণবল। বিজয়ী ঘোড়ার নাম ঘোষিত হচ্ছে। অরিন্দম অ্যাপোলোনোয়োর টিকিটটা গোছা থেকে আলাদা করেছে। দ্বিতীয় সলিড গোল্ড। সেটাও আলাদা করে। জ্যাকপট ঘোষিত হয় আর প্রথমটিকিটটার নম্বর মিলিয়ে অরিন্দম স্তম্ভিত, তলপেট থেকে জলোচ্ছ্বাস উঠে কন্ঠরুদ্ধ করে।

    কুন ঘুড়া ? অরিন্দমের কবজি-খেমচানো তরুণী-আঙুল আলগা হয়।

    যেটা জিতল।

    সত্যি ?

    সত্যি।

    সত্যি বলছ ?

    সত্যি।

    বলো না, সত্যি কিনা। কেটলিউলির কন্ঠস্বরে কিশোরী।

    সত্যি। ড্যাবড্যাবে অবিশ্বাস আর উতলা বিশ্বাসে আক্রান্ত দ্বিধাগ্রস্ত মেয়েটির তাকলাগা ঘোরের দিকে তাকিয়ে অরিন্দমের আশ্বাস। কবজি ধরে থাকা আলগা আঙুলগুনো সজোড়ে আঁকড়ে ধরে আবার। মেয়েটির কোমরে হাতের বেড় দেবার আবেগ সামলাল অরিন্দম। এই মেয়েটা ওর থেকে বয়সে অনেক ছোটো। যত তাড়াতাড়ি হোক বিয়ে করে নিতে হবে। আজ হলে আজই। এর আগে অনেকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে অথচ ব্যাখ্যাহীন ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।

    ছোটোভাই আর ওর বউটা বিয়ের আমন্ত্রণপত্র ছাপিয়ে রেখেছে, কনে আর কনের বাবার নাম ফাঁকা রেখে। অরিন্দম জুয়াড়িদের ওই ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে মেয়েটির উদ্দেশে বলল, আজই আমরা বিয়ে করব।

    বাড়ি গিয়া বাবাকে খবর দিব আর জামাকাপড় গুছিয়ে নিবো।

    না-না। আর বাড়ি যাবার দরকার নেই। সোজা আমার বাড়ি যাব।

    সিনেমার মতন ?

    খুব সিনেমা দ্যাখো ? ম্যানকার সঙ্গে ?

    হ্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যা।

    চলো, টাকাটা নিয়ে নিই। ভিড় হবে কাউন্টারে।

    দামি বেদেশি সুগন্ধ একেবারে মিইয়ে গেছে উত্তেজিত সুন্দরীদের দেহগ্রন্হির বিলোড়িত গন্ধে। পার্স থেকে ছোটো স্প্রে বের করে সুগন্ধের নবীকরণ করে নিচ্ছে কেউ-কেউ পরবর্তী ঘোড়দৌড়ের আগে। কাউন্টার থেকে টাকাগুনো সংগ্রহে সময় লাগে। নতুন নোটের প্যাকেটগুনোর রোদে প্রতিফলিত আলোয় উদ্ভাসিত ওদের মুখমন্ডল। এটাই ব্যাধি, এটাই ওষুধ। বিব্রত হলে হাসে মানুষ। আগাম আশঙ্কায় হাসে।

    নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক রেসকর্মী বকশিশ প্রার্থনা করলে, কয়েকটা নোট দিয়ে দিলে অরিন্দম, নিজের উপশমের জন্যে। অ্যাতো টাকা দিয়ে দিলে ? কথা না বলে বলল মেয়েটি। ক্ষতের কষ্টের মতন গোপন আনন্দ পায় আরিন্দম।

    গাড়ি স্টার্ট করে অরিন্দম বলল, এবার জুতো খুলে পা তুলে বোসো। কেটলিউলি তা-ই করে। আয়নিত বিকিরণ-মাখানো পায়ের তলা থেকে আভাসিত হচ্ছে ধানচারা রোয়ার হিমেল গরিমা। নিঃশঙ্কচিত্ত তকতকে গোড়ালি। প্রতিদিন, কেকের ময়দামাখার সময়ে, ভ্যানিলা-সুগন্ধের অভিনন্দন পায় এই পা জোড়া। আমলা, কেরানি, পিয়োনরা, হয়তো মন্ত্রীও, সেই অভিনন্দনের স্বাদ পায়। দিনের বেলাতেও নৈশভোজের আলো লেগে আছে আঙুলগুলোয়। শাড়ির ফলের সেলাই খুলে গেছে। ধুলো-ময়লার কালচে কিনার শুকোয়নি এখুনও।

    ল্যাজধরা মরা ইঁদুরের মতন দু আঙুলে প্লাস্টিকের কালো জুতো জোড়া তুলে গাড়ির বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল অরিন্দম। ওই পায়ের জন্যে এই জুতো নয়, অন্য জুতো কিনব চৌরঙ্গি থেকে। তরুণী অবাক হয় না। অধিকারে শিকড় অস্তিত্বের অতল ওব্দি চারিয়ে দিচ্ছে অরিন্দম। শিরশির করে ওঠে আর্জি। মুখের ওপর এসে পড়েছে সোমথ্থ দুপুরের হিমসিম রোদ।

    অ।। কেটলি।

    কে।। অ্যাঁ।

    অ।। এই নামে সাড়া দিতে তোমার ভাল্লাগে, তাই না ?

    কে।। আমার কাজই তো তাই। এই দ্যাখো, কড়া পড়ে গেছে হাতে।

    অ।। জানি। এখন আমরা পিয়ারলেস ইন-এ যাব।

    কে।। তুমিও পিয়ারলেস করো ?

    অ।। না-না। ওটা একটা হোটেল। সেখানে গিয়ে আমরা আমাদের বিয়ের আইবুড়ো-ভাত খাব। কলাপাতায়।

    কে।। আইবুড়া কেমুন ভাত গো ? সিদ্ধ না আতপ ?

    অ।। আইবুড়ো চালের নাম নয়। বিয়ের আগে আমার আর তোমার নাম।

    কে।। হি-হি…আমি আই আর তুমি বুড়া।

    অ।। আমরা খাব আতপচালের ভাত, শুক্তো, পটলের ঝালসাজ, হিঞ্চেশাকের বড়া, ভাজামুগের ডাল, রুই মাছের কালিয়া, দইতে রাঁধা মুরগি, পাঁপড়া, শশা-আঙুরের চাটনি, মিষ্টি দই, ছানার পায়েস, কালাকাঁদ। হাতপাখার বাতাস। চাবিবাঁধা আঁচল কাঁধে ফেলে পানের খিলি এগিয়ে দেবে হোটেলের ওয়েটার বউদি। কেমন ?

    কে।। অত খাবার ? সব একই দিনে খেয়ে নিবো কেন ? আমরাদের জন্য রেখে দিবো। আজ ডাল খাবো, কাল শোক্তো খাবো, পরশু মাছ খাবো, তাপপরদিন মাংস খাবো। ছানার পায়েস কেমুন হয়গো ? বড়ো খিদা পেয়েছে আমার। নিমবেগুন হয় না ? নিমবেগুন খাওয়া ভালো। আমি সঅঅঅঅব শাগ ভাজতে জানি। কলমি, কুলাখাড়া, সেপুন্না, নিসিন্দা, পুঁই, নটে, কুমড়া, বাথুয়া, লাউ সব সব সব সব পারি।

    অ।। মাংস ?

    কে।। জানি। কলকাতায় পাখির মাংস নাই। ময়ূরের মাংস নাই। বয়লার আর বয়লার। তারচে বাবা ডালভাত ভালো।

    মেয়েটার শরীর জুড়ে প্রাচীন নিষাদকুলের নাচ লুকিয়ে আছে যেন, মনে হচ্ছিল অরিন্দমের। এর চাউনি রৌদ্রোজ্জ্বল। চিরপ্রদোষ-মাখা শ্যামলিনী। অত্যন্ত সাদামাঠা। কালো মেয়েদের সুশ্রী বলতে যা বোঝায়, এর তেমন কিছুই নেই। এর প্রাণশক্তির জোরের বখরাটুকু আজীবন চায়, আজীবন চায় অরিন্দম। হঠা্ৎ-ই, এই ভেবে যে মেয়েটা নাবালিকা নয়তো, ধ্বক করে ওঠে হৃৎপিন্ড। সব চুরমার হয়ে যেতে পারে তাহলে।

    তুমি এবার ভোট দিয়েছিলে ? কেটলিউলির অন্তস্হালের দখল নিতে জিগেস করে অরিন্দম।

    হ্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যা। এবার আবার একটা সাদা আর একটা গোলাপি দুটা-দুটা ভোট ছিল। ঞ্যানকা বলছিল লোকগুলার মাথা খারাপ। অন্যবার তো একটাই কাগজ হয়। আমি বলেছি, এবার আমি ভোট দিলুম কিনা, তাই আমার জন্য দুটা-দুটা। হি-হি।

    কেন্দ্র সরকারের নির্বাচন, রাজ্যসরকারের নির্বাচন, এসমস্ত আলোচনা অবান্তর। সাদা আর গোলাপি কাগজ থেকে পাওয়া রাজনীতিহীন আহ্লাদটুকুই যথেষ্ট। মেয়েটির দুচোখে ধানখেতের সবুজ অতিশয়োক্তি অরিন্দমকে আশ্বস্ত করে। হৃৎপিণ্ডে, বর্ষারাতের ঝিলমিলে মেরুণ অন্ধকার, কানে আসে আনন্দের অঙ্কুরোদ্গমের রিনরিন।

    আরেকটা জিনিস রাঁধতে জানি। বলব ? কাসুন্দির সুন্দি ছাড়া, পাঁঠার পা, লবঙ্গর বঙ্গ ছাড়া, কিনে আনগে তা। বলো তো কী ?

    মহোল্লাস ছেঁকে ধরে অরিন্দমকে কাঁটা দ্যায় গায়ে। বলবার ছিল কাঁঠাল, বলল এঁচোড়।

    হ্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যা। হ্যাঁ শব্দের রণন হতে থাকে অরিন্দমের মস্তিষ্কে। বলবার মতন ধাঁধা বা ছড়া মনে করার চেষ্টা করে। মাথায় আসে না। বোধহয় জানেই না আদপে কোনও।

    হসপিটাল রোড থেকে ক্যাসুরিনা অ্যাভেনিউতে গাড়ি বাঁক নিলে কেটলিউলি সজোরে বলে ওঠে, আবার ওই রাস্তায়, ইদিকে কাকুদা বলছিল তুমি ভালোলোক। আর মটোর থামাবে না কিন্তু। মেয়েটির মুখাবয়াবে শঙ্কা।

    পথের দুধারে গাচের ফাঁকে-ফাঁকে রোদ্দুরের সবুজ ঠাঠা। ব্রিটিশ আমল থেকে নিজের গায়ে রোদ বসতে দিচ্ছে না ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। কিন্তু স্বাধীনতারপর সরকারি বাসের ভেজাল-দেয়া পোড়া ডিজেলের ভাসমান গুঁড়োর দাঁত জোরজবরদস্তি বসে যাচ্ছে ওর মার্বেলে। কলকাতার এই ডিজেলগুঁড়োর আতঙ্ক ছাদে আলসেতে বারান্দায় বড়ি শুকোবার রেওয়াজ উঠে গেছে। তুলি জোয়ারদার শনিবার অফিস ছুটির মধ্যাহ্ণে অরিন্দমের সঙ্গে এখানে এসে এখানের ঘাসে বসে থাকতে ভালোবাসত। এই মেয়েটি,কেটলিউলি সম্পর্কে আরও জানতে ইচ্ছে করে অরিন্দমের।

    প্রশ্ন।। অত দূর থেকে রোজ কেমন করে যাও ?

    উত্তর।। কুথায় ? আমার আপিসে ?

    প্রশ্ন।। হ্যাঁ, কী ভাবে মহাকরণে পৌঁছোও ?

    উত্তর।। বাইপাস গিয়া এসপালানেড যাই। তাপপর ওইটুকু হাঁটা দেই। আর ডালাউসির বাস পেলে তাতে যাই। বড়ো আঁইশটানি গন্ধ ওই ঠিন, আমরাদের পাড়ায়।

    প্রশ্ন।। সারাদিন বড়ো বেশি কাজ, না ? দুতলা-তিনতলা ?

    উত্তর।। লোকগুলা বড়ো আগলটাপড়া।

    মেয়েটার কথাগুনো চিনচিন করে।

    অন্যান্য বছর চৈত্রাকাশে রাগ পুষে রাখে সূর্য। এবছর রোদ্দুরের হাবভাব নিরুত্তাপ। জহোর্লাল নেহেরু রোডে লাল রঙের শতছিন্ন বাস ধুঁকছে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে। হয়তো জহোর্লালের প্রথম কি দ্বিতীয় পাঁচসালা ফেবিয়ানি আমলে হাসিমুখে চশমা পরে কিনেছিলেন বিধান রায়। দুপুরের রাজপথে বাতাসের বুকে থেকে-থেকে হাঁপানির টান। ফুটপাতের কিনারে কয়েকটা দেশোয়ালি দাঁড়কাক, দেশোয়ালি পথ-হোটেলের ফেলে-দায়া হলদেটে ভাত খুটছে তিড়িক-তিড়িক। এ-অঞ্চলে, চৌরঙ্গিতে, জীবনের অবলম্বন বলতে বোঝায় জীবিকা। কেজো চোয়ালের হন্তদন্ত যুবকেরা বেতনভূক ভিড়ের স্বাধীনতা-উত্তর আলস্যকে বাঁ-হাতে একপাশে ঠেলে-ঠেলে এগোচ্ছে।

    পার্কিঙের জায়গা খুঁজছিল অরিন্দম। শাড়ি আর একজোড়া জুতো কিনতে হবে। বাটা, উডল্যান্ডস, মেসকো রয়েছে ওফুটে। দামি জুতো কেনা দরকার। জুতো দেখে লোকে চরিত্র নির্ণয় করে। গোড়তোলা ডার্কট্যান ব্যালেরিনা ? স্ট্র্যাপ-দেয়া গ্রিক স্যানডাল ? শাড়ি কোনটা ? তাঁতের। হালকা নীল বা ফিকে বেগুনি জমি। বেগমবাহার বা কটকি হলে কেমন মানাবে। সিল্ক বোধয় এই গরুমে অচল। নয়তো কাতান বা তাঞ্চোই। নাঃ, সুতির ফিকে সবুজ ভয়েল কেমন ? দোকানের কাউন্টারে যে মেয়েগুলো থাকে, তারাই বলতে পারবে, কেননা ম্যাচিং ব্লাউজ, শায়া চাই ; ওরাই সাহায্য করবে নিশ্চই।

    পাপহীনতার আঁচে-মোড়া মেয়েটির বাঁ পায়ের তলায় একটা তিল জনরে পড়ে। অরিন্দমের আছে ডানপায়ে। বার্ধক্যে বেড়াতে যাবে অনেক জায়গায়। চতুর্দিক জুড়ে নিঃশব্দ রাগসঙ্গীত লাউডগার সবুজ ঘুঙুরালি শুঁড়ের মতন গজিয়ে উঠতে থাকে অরিন্দমের চারিপাশে। সিন্ধু ভৈরবী, আহিরললিত, গান্ধারি-টোড়ি, শুক্লবিলাওল, মধুমাধবী সারং, বারোয়াঁ, পলাশকাফি, তিলকশ্যাম, পটকঞ্জরি, চাঁদনিকেদার, শিবরঞ্জনী, হংসকিংকিনি, জয়ন্তীমল্লার, দুর্গাবাহার, মধুমাধবী। ভালোলাগার এই মনস্হিতির বর্ণনা নেই।

    ওই দ্যাখো। তেলেঙ্গি, না ?

    মোটাসোটা বউ আর ব্লাউজ-শায়া পরা মেয়ের সঙ্গে, বোধয় কেরালার, সাদা লুঙ্গি শার্ট-পরা লোকটা হকারের সাথে দরদস্তুরে ব্যস্ত। তেলেগু নয়, বলল অরিন্দম। এখন তো অন্ধ্রের উগাদি উৎসব হয়। হতেও পারে। চৈত্রমাসেই তো হয় উগাদি। অন্ধ্রের একজন মুসুলমান অফিসার কাজ করত পাটনায় আমার সঙ্গে। ওর মা আর দিদি ঘাগরা আর ফতুয়া-ব্লাউজ পরত বলে, লজ্জা পেত ওর বাড়ি গেলে। সজনেপাতা দিয়ে মাংস রাঁধত।

    আমিও সজিনাপাতা রাঁধতে পারি। তোমার ডিপাটে তেলেঙ্গি আছে ? কুন আপিস ?

    ওই যে, তোমার অফিসের পাশে, এসকালেটার আছে।

    কাটা ট্যাকার ব্যবসা ?

    হ্যাঁ, নোটের আর পয়সার ব্যবসা আমাদের। নোট ছাপি, করকরে নোট বাজারে ছাড়ি, নোংরা পচা নোট গুঁড়ো করে কাগজ বানাই। পাঁচ কিলো দশ কিলো ওজন করে ব্যাগভর্তি পয়সা বেচি।

    ইশরে। অনেকঅনেক পাওনা পাও। আমার আপিসে লরির কাগজ বের করতে পাওনা লাগে, বাইরের লোকজন অগুন্তি আসে সারাদিন, কাগজ বের করার জন্য বোসথাকে, দাঁড়িয়ে থাকে একঠায়, গেলাস গেলাস চা খায়।

    জানে অরিন্দম। পায়ে-মাখা ময়দার কেক খায়। বহুদূর শহর-গঞ্জ থেকে এসে খেয়ে যায় চরণামৃত। কিছুদিন আগে বেশ হইচই হয়েছিল দশ কোটি টাকার ব্যাংক ড্রাফ্ট আর এক কোটি টাকার পোস্টাল অর্ডার ওই বিভাগের আলমারিতে গুঁজড়ে রাখা ছিল বলে। সরকারি তহবিলে জমা করার জন্যে পাঙানো হয়নি। বচরের পর বছর পড়ে-পড়ে খড়খড়ে, রং-ওঠা, দোমড়ানো, ওগুনোর কথা মনে ছিল না কারুর, আশ্চর্য। কাজই করতে চায় না কেউ। অলস শুক্রকীটের ফসল বলে কিছু হয় কি ? ওই নির্মম হৃদয়হীন পরিবেশে মেয়েটা কাপ আর কেটলি ঝুলিয়ে কতবার এঘর-ওঘর পাক খায় কে জানে !

    অরিন্দম দেখতে পেল, ওফুটের কিনারে, বাটার দোকানের সামনে কেরালার নাম্বারপ্লেট লাগানো হলুদ মারুতি জেন গাড়িকে টো করে থানায় নিয়ে যাবার জন্যে পুলিশের লালরঙা রেকারট্রাক থেকে কয়েকজন নাবল। গাড়িটার তলায় ঢুকল একজন। গিয়ারকে নিউট্রাল করে ক্রেনে ঝোলাবে।

    ওরেব্বাপ। এখানে পার্ক করলে ওই গাড়িটার দশা হবে। আগেই এই অভিজ্ঞতা হয়েছে অরিন্দমের। সেটুকুই যথেষ্ট। প্রথম পনেরো মিনিটে বভাটারি আর ওয়াইপার লোপাট। তারপর এক-এক করে স্টেপনি, কার্বুরেটার, রেডিয়েটার, ফিউজ বক্স, স্টিয়ারিং বক্স, প্রপেলার শ্যাফ্ট আর তার কদিন পরে তো মেশিনটাই হাপিস। ব্যাস। শ্যাশিটাকে ঠ্যালায় চাপিয়ে বাড়ি ফেরত নিয়ে যাও। আদিত্য তো বলেই দিয়েছে, এসব ব্যাপারে ও নাচার।

    রেকার-লরির পেছনে নিজের প্রিয় গাড়ির উর্ধ্বমুখী দুরবস্হা দেখে কেরালীয় লোকটা, ওর থপথপে বউ আর শায়া-ব্লাউজ পরা ঢ্যাঙা মেয়ে, তিনজনই দুহাত ওপরে তুলে চ্যাঁচাতে-চ্যাঁচাতে দৌড় লাগায় ধাবমান রেকারের দিকে।

    কেটলিউলির কি হাসি কি হাসি। মেয়েটির দিকে নয়, অরিন্দম তাকিয়ে থাকে ওর হাসির দিকে। অপার্থিব, অপার্থিব,অপার্থিব। দ্রুতগামী যানের মাঝে পড়ে রাস্তা পেরোতে পারছে না মালায়ালি পরিবারটা, আর তা দেখে হাসছে তো হাসছেই মেয়েটা। বিদ্যুৎবাহী হাসির অদৃশ্য প্রজাপতিরা উড়ছে গাড়ির মধ্যে। অরিন্দমের মাথা থেকে পায়ের আঙুল ওব্দি বইতে থাকে মহাজাগতিক রশ্মিতরঙ্গ।

    রাস্তা পেরোতে থাকা পরিবারটিকে বাঁচিয়ে, পাশ কাটিয়ে বেরোতে গিয়ে, দ্রুতবেগে ছুটে-আসা আলুর বস্তা বোঝাই হলদিরাম ভুজিয়াওয়ালার মিনি ট্রাক সজোরে ধাক্কা মারল অরিন্দমের গাড়ির পেছনে। প্রচণ্ড অট্টহাস্য করে ওঠে ধাতব সংঘর্ষ। আলুর চটের বস্তা ছিঁড়ে রাস্তাময় গড়ায় এলা-মাটি মাখা আলু। আরম্ভ হয় জনগণের আলু কুড়োবার উৎসব। হকার-ভিকিরি-কেরানি-দোকানি-গৃহবধু-দারোয়ান-পকেটমার-ট্যাক্সিচালক সবাই মেতে ওঠে আধ-পচা আলু সংগ্রহে।

    তীব্র ধাক্কা খেয়ে অরিন্দমের গাড়ি ওদের দুজনকে সুদ্দু কিছুটা ছুটে গিয়ে রাস্তায় পড়ে-থাকা পাথরে তুলে দিয়েছে বাঁ দিকের চাকা, আর তারপরেই কাৎ হয়ে উলটে গেল। আকাশের দিকে চারটে ঘুরন্ত চাকা। গুবরে পোকার মতন দুবার পাক খেয়ে আগুন ধরে গেল গাড়িটায়। সশব্দে বিদীর্ণ হয় ডিজেল ট্যাঙ্ক আর গাড়িটা আগাপাশতলা ঢাকা পড়ে যায় তরল দগদগে আগুনে। আগুনের টোপর পরে ওলটানো গাড়ির ওপর নাচতে থাকে শিখা।

    ষোলো

    ব্রিটিশ কাউনসিল থেকে হেঁটেই ফিরছিল যিশু। সেকসপিয়ার সরণি থেকে ক্যামাক স্ট্রিট ধরে মনে পড়ল তাকা তুলতে হবে। পরশু বৈশাখী পূর্ণিমা, জেনে রেখেছে। কাল সকালে বেরিয়ে পড়বে। ক্যাশ টাকা দরকার। পার্স খুলে ইন্দুসিন্ধ ব্যাক আর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এটিএম কার্ড দেখে আশ্বস্ত হল।

    ক্যামাক স্ট্রিট ভিড়াক্কার। রাস্তার দুপাশে পুলিশের জিপ। লরি, খাকি, লাঠি, রেব্যান, খইনি, এলাহি। আদিত্যকে দেখতে পেল। আদিত্য যিশুকে আসতে দেখে, যিশুর সেরকমই মনে হল, রে ব্যান চশমা পরে নিল। হাতে বেটন। বুকে নামের তকমা। গটগটীয়ে রোয়াব। প্রোমোশান পেয়ে গেল নাকি, ওপরঅলাদের মোটা টাকা খাইয়ে। ওঃ, তুই তো একদম উত্তমকুমারের পাইরেটেদ ভার্সান হয়ে গেলি রে।

    আদিত্যর মনে হল, আরেকটু হলেই ওর মুখাবয়াবে ধরা পড়ে যেত অরিন্দমদার বীভৎস মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর। সামলে নিয়েছে। যিশুদার কথা বলার ঢঙ থেকে পরিষ্কার যে অরিন্দমদার দুর্ঘটনার খবর জানে না। ভালোই। গাড়িতে সম্পূর্ণ দগ্ধ নারীর লাশ পাওয়া গেছে ল পোড়া নোটের তাড়া। অরিন্দমদার বাড়িতে কেউ বলতে পারেনি, কার লাশ, মেয়েটি কে ! শনাক্ত করা অসম্ভব, এমন পুড়েছে। কত লাশ যে এভাবে পুলিশের জিম্মায় এসে নামহীন পড়ে থাকে ; তারপর একদিন নামহীন ধোঁয়া হয়ে উবে যায়। যিসুদার কাছে চেপে যাওয়াই ভালো। নইলে কী মনে করবে অরিন্দমদা সম্পর্কে। কমবয়সী যুবতী, হয়তো, গুচ্ছের টাকা, গল্পের খেই আপাতত নেই। আর খেই না থাকলেই গল্প খুঁজতে থাকবে অন্ধকার চোরা রাস্তাগুলো। কত দেখলো তো পুলিশে ঢুকে। তুলি জোয়ারদার নয়, অন্য কেউ ছিল।

    যিশু বলল, কীরে, এখানেও তোলা তুলছিস ? এটা তো সম্ভ্রান্ত অফিসপাড়া। তোদের সত্যি, বলিহারি। তোদের সেই লিয়াকত আলি না কি নাম যেন, তিনটে গাড়ি খাটায় বেনামে, কর্ম বিনিয়োগ কেন্দ্রের কার্ড জাল করে হাওড়া আর ডায়মন্ড হারবারে চেলেছোকরাদের চাকরির লোভ দেখিয়ে লাখ-লাখ কামিয়েছিল, সে ধরা পড়েছে ? না কি লুকিয়ে রেখেছিস তোদের পুলিশ কলোনির কোয়ার্টারে ? সে তো আবার ওসি। তোর চে উঁচুতে।

    আদিত্য বলল, আঙুল করা স্বভাব আপনার গেল না।

    যিশু বলল, তা এখানে কী ?

    আদিত্য বলল, আর-রে আর বলবেন না। বাঙালিগুনো তলে-তলে কলকাতাকে দিয়ে দিচ্ছে। এক-একখানা ভাম বসে আছে অ্যাসেসমেন্ট বিভাগে।

    যিশু বলল, যা বলেছিস। ছাতুবাবু-লাটুবাবুদের ওপর পুরোবাবুদের খুব রাগ। ওরা কলকাতা ঐতিহ্যকে টিকতেই দেবে না। দেখছিস না, টাউনহলের বাগানে বেঢপ বাড়ি তুলেছে।

    আদিত্য বলল, এসব হল বাঙালদের কুকিত্তি।

    যিশু বলল, বাঙাল, মুসুলমান আর ব্রাহ্মণদের ওপর তোর দেখি যখন-তখন গোঁসা। তা পুরসভার বাবুরা ক্যামাক স্ট্রিটটাই বেচে দিয়েছে নাকি ? বলা যায় না ; ভাঙা টেবিল-চেয়ার জুড়ে যা সব মাল বসে আছে ওদের অফিসটায়। আদিত্য বলল, ওই মার্কেটটা সিল করে দেয়া হচ্ছে, ওই যে, ওইটা। বেআইনিভাবে একটা আংশ বাড়িয়েছিল, শালা ধসে পড়েছে। ভাগ্যি যে কেউ ট্যাঁসেনি। ভেতরে-ভেতরে একটা মেজানাইন ফ্লোর খাড়া করে ফেলেছিল, বুঝলেন। এ যেন পারমাণবিক অস্ত্র। কেউ টেরটি পায়নি। নকশা অনুমোদন হয়েছিল বসতবাড়ির, আর ওনাদের বিল্ডিং বিভাগের গ্যাঁড়াকলে রূপ পালটে হয়ে গেল মার্কেট। পার্কিঙের জায়গাতেও দোকানঘর। হ্যাহ হ্যাহ।

    যিশু বলল, একেবারে সুপার কেলো দেখছি। তা ওটা দেখছি ভাঙা হচ্ছে আলপিন দিয়ে, আর বাঙালি হকার তোলার বেলায় পেলোডার বুলডোজার। তা বেশ, তা বেশ।

    আদিত্য বলল, কেলো বলে কেলো ! আলিপুর রোডে একটা বহুতল বাড়ির একতলা দোতলা আর বেসমেন্ট নেই।

    যিশু বলল, বলিস কী রে। দাঁড়িয়ে আছে কী করে ? কেতাবি তত্ত্বের ওপর ?

    আদিত্য বলল, ম্যাজিক, ম্যাজিক, কমরেডদের ম্যাজিক। অ্যাসেসর কালেক্টর আর ইন্সপেক্টর ষড় করে নথি থেকে তিনটে ফ্লোর বেমালুম গায়েব করে দিয়েছে। পার্টির লোক, কারোর মুরোদ নেই মুখ খোলে। আপনি আর কী লুইফিলিপে আর পিয়ের কার্ডিন পরেন। অ্যাসেসমেন্ট ইন্সপেক্টারটাকে দেখলে ভিরমি খাবেন। সুট, সাফারি, সেলুলার, আই পড, বেনসন হেজেস। হিংসে হয়। রিঅ্যালি। কাসপারভের ডবল আই কিউ লোকটার। ভ্যালুয়েশানের আগেই মিউটেশান ফি জমা নিয়ে নিয়েছিল। ওফ শালা কী চিজ একখানা, যেন স্তালিনের বিচি থেকে একেবারে যুবক হয়ে বেরিয়েছে। ইন্সপেকশান বুক লেখা হবার আগেই হিয়ারিং নোটিসখানা পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেগুনো আর ফ্ল্যাট মালিকদের না পাঠিয়ে, পাঠিয়ে দিয়েছে বিল্ডারকে। বিল্ডিংটা দেখেছেন ? কী নেই ! পার্কিং লট, মার্কেট, এসকালেটর, হেল্থ ক্লাব, বিলিয়ার্ড রুম, রকেট লিফ্ট, পেল্লাই কম্যুনিটি হল, ছাতে খেলার মাঠ, আরেক ছাতে বাগান, কত কী ! সোনার লিকুইড দুইছে পার্টির পাকাচুল-দাদারা। ইন্সপেক্টরটা বদ্দি বামুন, বরিশালের ফেকলু, শালা তিলে খচ্চর। খাল কেটে মারোয়াড়ি কুমির ঢোকাচ্ছে। দেবে একদিন দাদাদের পোঁদে কামড়, তখন টেরটি পাবে মজা।

    যিশু বলল, আস্তে বল, আস্তে বল, শুনতে পেলে অবরোধ করিয়ে দেবে। তুই অবশ্য কম যাস না। লাইন তো ধরেই ফেলেছিস। শাসকবর্গের বশংবদ রোগপোকা।

    আদিত্য বলল, কীইইই যে বলেন।

    যিশু বলল, মেড়োগুনো এককাপড়ে এসে কোটিপতি হয়ে গেল। সেন্ট্রাল ক্যালকাটা, আলিপুর, সল্টলেক সব দখল করে নিয়েচে। আর শ্যালদায় একপাল লোক নাকে কাঁদচে, দেঁশ ভাঁগ চাঁইনি বলে। লাথি খেয়েও বাংলাদেশে ভিটে দেখতে যায়।

    আদিত্য বলল, ম্যানহোলের লোহার ঢাকনি চুরির ব্যাবসা করছে।

    যিশু বলল, তোরই তো মাসতুতো ভাই সব। দামি-দামি ট্যাংরা পারসে ইলিশ খাওয়া সর্বহারা।

    আদিত্য বলল, আমরা তো নস্যি। খুচরোর জন্যে পুলিশের লোকে প্যান্টের পকেটে চামড়ার লাইনিং লাগায়। সত্যি। জোক করছি না।

    যিশু বলল, যার যেমন মূল্যবোধ। কারুর খুচরো, কারুর করকরে। আমার ফ্ল্যাটটা মিউটেশানের সময়ে, এখুনও পরিষ্কার মনে আছে আমার, অ্যাসেসমেন্ট ইন্সপেক্টারটা বাবার কাছে অশৌচের শোকপোশাকে এসে হাজির। একটু আগেই বোধয় বাপকে পুড়িয়ে এসছে শ্মশানে। ভুঁসকো ভুঁড়িতে মোটা পৈতে ঝুলিয়ে, বুঝলি, পায়ে রবারের জুতো, হাতে ন্যাকড়াসন, এসেছে ঘুষ খেতে। আবার দাঁত বের করে হাসছিল, খ্যাক-খ্যাক খ্যাক-খ্যাক।

    আদিত্য বলল, আজগাল লোকে নিজের বাপকেও খুন করে দিচ্ছে বাপের চাগরিটা পাবার জন্যে, দেখছেন।

    যিশু বলল, সেটা বাঙালির চাকরি ওরিয়েন্টেশানের জন্যে। বাঙালির শালা জীবিকা মানেই চাকরি। কাজ দাও, মানেই চাকরি দাও। চাকরি ছাড়া আর ভাবতেই পারে না কিছু। বাপকে খুনের রিস্ক নেবে, কিন্তু নিজে কিছু করার রিস্ক নেবে না। বাঙালিরা এতো আড্ডা দ্যায় কেন বল তো ? আড্ডাটা হল মায়ের কোল। চাকরিটাও মায়ের কোল। মায়ের কোলের আরাম চাই বাঁধা টাকার মাই খেয়ে। অন্য সব কাজকম্ম তো চলে যাচ্ছে অবাঙালিদের কবজা্য়। ওই তো, দ্যাখ, ট্যাক্সি ড্রাইভারগুনো সবকতঅ বিহারি, নয় ইউ পি সাইডার। ট্যাক্সি আর বাসের মালিকগুনো পাঞ্জাবি। ধোপা, ছুতোর, নাপতে, মুচি, কামার, বাড়ি বানাবার মিসতিরি, পুরোসভার ডোম, বড়োবাজারের মুটে, তুই দেখগি যা, হয় বিহারি, নয় ইউ পি সাইডার। হাওড়া-শ্যালদা স্টেশানের, ব্যাংকশাল আর শ্যালদা কোর্টের, রোড ট্রান্সপোর্ট অফিসের, সব দালালগুনো, সবকটা ক্রিমিনাল, তুই তো ভালো জানবি, সব ওদিকের। কলের জলের কাজ করছে উড়েরা। বাঙালিদের ব্যাবসার কথা তো ছেড়েই দে। কেউ দাঁড়াতে চেষ্টা করলেই দাদারা লাল ডাণ্ডা ঢোকাবে। বড়োবাজার থেকে ডাণ্ডার ফাইনানসিং হয়।

    আদিত্য বলল, এতেও গবেষণা করছেন নাকি ? কিচ্ছু ছাড়বেন না দেখচি।

    যিশু বলল, আরও বলছি, শোন তাহলে। আমাদের বিলডিঙের লিফ্টটা রিনিউ হচ্ছে না দুবছর ধরে। ওদের অফিসে গিয়ে পাওয়াই যায় না কাউকে। একই বাড়ির জন্যে পুরসভাকে ট্যাক্স দাও, অট্টালিকা কর দাও, আবার বহুতল কর দাও। অথচ কোনও অফিসে পাবি না বাবুদের কাউকে। কোনও না কোনও রকম মায়ের কোলে ঢুকে বসে আছে। পঞ্চাশ বছরে স্বাধীনতা আমাদের খাঁটি জোচ্চোর করে দিয়েছে। পশ্চিমবাংলার বাঙালির বাকতালা আসলে মাইখাবার আরেকরকম ফর্ম।

    আদিত্য বলল, তা এখন কোথায় চললেন ? বাড়ি ?

    যিশু বলল, যাচ্ছি কাঁচা আম কিনতে। বিয়ারে দুচার টুকরো ফেলে খাবো। আমার অ্যাসিট্যান্টটা গ্রামে গেছে, এখনও ফেরেনি। চিন্তায় ফেললে। তুই জানিস তো ? ভাঙাপাড়া ?

    আদিত্য বলল, আপনি বিদেশে কোন একটা কাজে যাবেন বলছিলেন, তার কী হল ?

    যিশু বলল, হ্যাঁ, সিয়েরা লিয়োন। নিত্যিদিন শালা সরকার পালটায়। পয়সা-কড়ি পাওনা আছে অনেক।

    আদিত্য বলল, ওব-বাবা, আফরিকা ! আর জায়গা পেলেন না ? আফরিকায় যা কনডোমের সাইজ ! ইনডিয়ানরা গিয়ে পায়ে মোজা করে পরে শুনেছি। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ।

    যিশু বলল, তোর তো ওই একটাই চিন্তা। না, একটা বলি কী করে। দুটো, রূপ আর রুপিয়া।

    আদিত্য বলল, আরে আপনার তুলনায় আমি তো এখনও কচি। তা আপনি সেটল হচ্ছেন না কেন। ইন্সট্রুমেন্টটা লিগালাইজ করুন এবার।

    যিশু বলল, একবার কোনও রববার সেইন্ট পলস ক্যাথিড্রালে গেলে টের পাবি। যত দিন যাচ্ছে তত অবাঙালি আর কুচ্ছিত হয়ে যাচ্ছে বাঙালি খ্রিস্টানরা। কবর দেবার জায়গার অভাব তো মা-বাবার ফিউনারালের সময়ে দেখেছিলি। আমি হলুম গে বাঙালির রেনেসঁসের রেলিকস। বিশুদ্ধ বাঙালি খ্রিস্টান আর নেই। আমিই শেষ প্রতিভূ। মাইকেল মধুসূদনের নাতি-নাতনিরা শুনেছি অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। অন্তত কুচ্ছিত হওয়া থেকে তো বেঁচেছে।

    আদিত্য বলল, আপনার সেই কেটলিউলির কী হল ? তিলজলার কেটলি কুইন ? সে তো আছে।

    যিশু বলল, ধুৎ কীইইই যে বলিস বোকার মতন। অরিন্দমকে নিয়ে গিসলুম তো কেটলির বাসায়। গাড়িটারি নিয়ে অ্যাগবারে তৈরি হয়েই গিসলো ; মেয়েটাকে সেদিনকেই বিয়ে করবে বলে। প্রেম ছাড়া তো ও সাফোকেটেড ফিল করে। করে ফেলেছে বোধয়, বিয়ে, দেখগি যা।

    আদিত্য স্তম্ভিত। দ্রুত ছুটে গিয়ে মোটর সাইকেলে বসে। কিকস্টার্ট করে। নীলাভ ধোঁয়া তুলে মিডলটন স্ট্রিটে ঢুকে যায় মোটর সাইকেল।

    আদিত্যর ব্যাখ্যাহীন আচরণে যিশু অবাক। কাজ ফেলে ছুটল নাকি অরিন্দমের বউ দেখতে ! কিংবা কেটলির পরিবারের ফ্যাঁকড়া খুঁজতে পুলিশি ফলাতে ছুটল ?

    হাসপাতালে পরিচয়ের পর কেটলি আর ওর বন্ধু মেনকার বাড়ি তিলজলা-তপসিয়ায় বারকয়েক গেছে যিশু। প্রশংসনীয় ওদের স্বনির্ভর হবার উদ্যম। কেটলির সৎ ভাইটা মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টারে ঢুকেছিল। ওদিকে কোথায় বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার জঙ্গলে মরেছে পুলিশের গুলিতে। ওর বাপ বারকয়েক বিয়ে করেছে ছেড়েছে। গ্রাম ছেড়ে এসে ওরা সরকারি গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের রান্নাঘরে ঠিকেমজুর ছিল। তারপর ট্যাংরায় পাঁউরুটি কারখানায়। এখন দিনে একশোটা কেক বানাচ্ছে নিজেই। বিক্রিবাটাও মন্দ নয়।

    ছেলেটা মাওবাদী হবার আগেই, বহু আগে, কলকাতায় চলে এসেছিল। গত নির্বাচনে মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার কিছু এলাকায় ভোট বয়কটের ডাক দিয়েছিল। পাতলা গোবর দিয়ে সাঁটা, হাতে লেখা পোস্টার পড়েছিল গাছের গুঁড়িতে, চালাবাড়ির মেটে দেয়ালে, হোগলায়। আমলাশোল, শিয়াড়বিনধা, চাকাডোবা, বাঁশপাহাড়ি, কেঁউদিশোল গ্রামে হ্যান্ডবিল বিলি হয়েছিল। পুরুলিয়ার বান্দোয়ান ব্লকের ধাদকা আর কুমড়া পঞ্চায়েতে, বাঁকুড়া জেলার রাইপুর ব্লকের ছেঁদাপাথর এলাকায় ওদের প্রভাব যে সিপিয়েম আর ঝাড়খন্ডদলের তুলনায় যথেষ্ট তা যিশু টের পেয়েছিল খাদিবোর্ডের প্রকল্পের অ্যাসাইনমেন্টে। ঘনশ্যাম সিং সর্দার, যে পরে বন্দুক-কার্তুজসুদ্দু ধরা পড়েছিল, সেই মাওবাদী নেতার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল যিশুর।

    ওই এলাকার সংগঠক, মাওবাদীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ লোক, অতনু চক্রবর্তীর সঙ্গেও যিশুর আলাপ হয়েছিল গালুডিতে। তেড়ে সাঁওতালি, ভোজপুরি, হিন্দুস্হানি বলতে পারে। পাইকা-স্মল পাইকা গুলে খেয়েছে। চাকরি-বাকরি ছেড়ে-ছুড়ে ঢুকেছে এইসবে। সবাই আছে ওর খোঁজে ; বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ প্রশাসন, জোতদার, জঙ্গলের ইজারাদার, সবাই। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার গ্রামবাসীরা খবরাখবর দিয়ে যেমন ডাকাতদের বাঁচায়, ওইসব অঞ্চলের গ্রামবাসীরা বাঁচায় মাওবাদীদের। শত্রুপক্ষ-মিত্রপক্ষের তত্ত্বে ফারাক নেই। আছে কাজে।

    কুড়ি কিলোমিটার জুড়ে দুর্গম জংলি সবুজ। সাঁোতাল, মুন্ডা, ভুমিজ, খেড়ে, শবর, কৈবর্ত, তেঁতুলে বাগদির বাস। উঁচু জাতের বাঙালির ধাক্কায় শহরের প্রান্ত থেকে ঠেলে-ঠেলে পৌঁছে গেছে জঙ্গলে কিনারে, জঙ্গলে। এখন জঙ্গলের দেয়ালে পিঠ। কেন্দুপাতা, সাবাইঘাস, মহুয়াফুল, মহুয়াবীজ, শালবীজ, শালপাতা, কুসুম, নিম, বেল, কালমেঘ, কুড়চি, আমলকি, জ্বালানিকাঠ কুড়িয়ে আর বেচে যতটুকু চলে। ময়ূর মেরে টাউনে মাংস নিয়ে গেলে ভালো দাম পাওয়া যায়। যা কিছু দেখতে ভালো, মেয়েমানুষ হলে তো কথাই নেই, তাকেই সাবড়ে ভুষ্টিনাশ করতে চায় শহরের মানুষ। জিনিসটার বা প্রাণীটার নয়, মানুষ আহ্লাদিত হয় ভুষ্টিনাশের স্বাদে। প্রতিটি সৌন্দর্যবস্তুর চর্বণপদ্ধতি আলাদা। চেবাবার, খাবার, গেলার, চাটার আওয়াজ আলাদা-আলাদা।

    বাঁশপাহাড়ি এলাকার নিতাই মুড়া আর ভরত মুড়ার নামডাক আজ পঁচিশ বছর। বলছিল, তৃণমূল কংরেস বল্যেন, সিপিয়েম বল্যেন, ঝাড়খন্ড বল্যেন, সঅঅব গর্মাগরম বইকবকম। ওই খাদি বোর্ডের প্রকল্পের কাজের সময়ে তো ঝিলিমিলির কাছে বারোঘাটির জঙ্গলে বন্দুক-পিস্তল ভাঁজার শিবির দেখেছিল যিশু। বোড়ো, উলফা, আল উমমা, আনন্দমার্গীদের চিন নানা অস্ত্রশস্ত্র দিলেও, মাওবাদি কমিউনিস্ট সেন্টারকে দেয় না, ব্যাপারটা বুঝে ওঠা মুশকিল ! অবাক লেগেছিল যিশুর যে অল্প সময়ের মধ্যে ওরা ওর সম্পর্কে অনেক-কিছু জানে। কেন্দুপাতার ব্যাবসা বন্ধ করতে ওরা ট্রাক লুঠ করেছিল। প্রশাসন তো ব্যবসাদারদের। ওদের মালকড়ি ছাড়া ভোটাভুটি অচল।

    যাঃ, কী আবোল-তাবোল ভাবছিল হাঁটতে-হাঁটতে। ইন্দু সিন্ধ ব্যাংকটা পেরিয়ে, ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মোড় ছাড়িয়ে, রাসেল স্ট্রিটের কাছাকাছি এসে গিয়েছিল যিশু। ভাবল, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড থেকেই তুলে নেওয়া যাক টাকাটা।

    কাজের ছেলেটা ফ্ল্যাটে ফিরল কিনা জানার জন্যে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে বাড়ির নাম্বার প্রেস করে কানে ধরেছিল। ধুতি-পাঞ্জাবি চশমাচোখে হাফটেকো মধ্যবয়স্ক জিগ্যেস করল, দাদা, সোচিন কত করেচে ?

    সতেরো

    পুকুরের জলে টলটলে রোদের গুঁড়ো মাখতে-মাখতে জলের মধ্যে মাথা গুঁজে পাক খৈয়ে কুচোপোনা তুলে আনছে পানকৌড়ি। মাথা ডুবিয়ে পাক খায় আর রুপোলি মাছ তোলে। উড়ে গিয়ে ঘনসবুজ চিকচিকে নারকোল পাতার ওপর বসে সূর্যের দিকে পিঠ করে। স্নানশেষে যুবতীদের মাথা ঝাঁকিয়ে এলোচুল ঝাড়ার মতন গা কাঁপায়। কালো-কালো পালকের নিখুঁত ছুরি শুকোবার জন্যে জাপানি হাতপাখার মতন ডানা খোলে।

    পুকুরের এদিকটায় অপলক শালুকের আবরুর মধ্যে মাথা গুঁজে মিষ্টিমদ গিলছে তিরতিরে কাঠফড়িং। বাঁদিকের নারকোল গাছটার পাতার ওপর ভজনালয় খুলেছে দাঁড়কাকের দল। সমগ্র পুকুরটা উঠে এসেছে রাত্তিরের অবগাহন থেকে। তোলা উনুনের ধোঁয়াপাকানো তঞ্জেবকাশিদা মসলিনের মতন কুয়াশায় ঢাকা কলাগাছের ডানার পিছনে খোড়ো একচালা। গোলাপি পায়ে পুকুরের জলতলকে চিরে ধবধবে পাতিহাঁস কুলবধুরা গ্রীবা উঁচু করে বেরিয়েছে পাড়া বেড়াতে। ওই বড়ো গাছটায়, কী গাছ কে জানে, পনেরো-কুড়িটা ওড়নশেয়াল জাতের বাদুড় ঝুলছে।

    কলকাতা থেকে টানা ভাড়াগাড়িতে, চাঁপাডাঙা-বলরামপুর রোডে, মুণ্ডেশ্বরী নদীর পোলটার মুখে, রাস্তার ওপর পুকুরের ধারের ছাপ্পর-ছাওয়া ভেটেরাখানায় দাঁড়িয়ে ভাঁড়ে চা খাচ্ছিল যিশু আর ড্রাইভার। ট্র্যাভেল এজেন্সির শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি। পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গায় যিশু ঘুরেছে ওদের গাড়িতে। চেনা। শেষপুকুর যাবার জন্যে যেখান থেকে কাঁচা রাস্তায় বাঁক নিতে হয়, সেই গোপের হাট জায়গাটা দেখিয়ে দেবে ড্রাইভারকে। গাড়ি তো আর নজর বাঁচিয়ে দেড় দিন পার্ক করে রাখা যাবে না। অলসের অনুসন্ধিৎসা সর্বাধিক। কাল সন্ধ্যায় আবার আনবে গাড়িটা। মোচ্ছবতলা আর তালটিকুরির মদ্যিখান দিয়ে গ্রামে ঢোকার ঠিক মুখে বাবলাডাঙার ঢিপির গোড়ায় থাকবে গাড়িটা। আলের ওপর দিয়ে এলে তাড়াতাড়ি পৌঁছোনো যায় বাবলাডাঙায়। ওই গাড়িতেই ফিরবে যিশু। যিশু আর খুশিদি। বৈশাখী পূর্ণিমার মেলার জন্যে প্রচণ্ড ভিড় থাকবে সেদিন, চেঁচামেচি, নাগরদোলা, যাত্রাদল, হট্টগোল, চোঙার বাজনা, গুড়-বেসনের মেঠাই। হুকিং-করা জগমগে ঝিকিমিকি আলোর রোশনাই। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ছেলের মতন হারিয়ে যাবে দুজনে কোথাও। এত বিশাল পৃথিবী।

    ধুলোয় পড়া ভাঙা ভাঁড়ে সকালবেলাকার ভোমরালি মাছি। পচা আলুতে প্রতিপালিত স্বাস্হ্যবান মাছির রাজত্ব এই শুরু হল। বেলে মাছি, নীল মাছি, দিশি মাছি আর ডোরোসেফিলা মেলানোগ্যাসটার, যে মাছিগুনো আলুর পচাই খেয়ে মাতলামো করে।

    চায়ের দোকানের ওগলা-বেড়ার পিচনে তেতো-নাজনের পাতাহীন গাছে শুকিয়ে আমসি তিন-গতরি ডাঁটা। কয়েকটা নাজে-খাড়া তিনফলা নোঙরের মতন তিন পাশ ধেকে ওপরমুখো ঝুলছে। ধূসর ডালে তিড়িকনাচন খেলছে নালবুলবুলি আর ছাতারে পাখি। পিচপথ থেকে নেবে যাওয়া দুপাশের ঢালে কালবৈশাখীর বৃষ্টির প্রশ্রয়ে উৎফুল্ল মুজঘাস, চোরকাঁটকি, কাঁটাকারির হাঁটু-ঝোপ। তারপর কালচে-সবুজ হোগলাবন, একটা ঘোড়া নিমের গাছ। কোঁড়া-বেরোনো বাঁশঝাড়ের তলায় বাঁথা সৌম্যকান্তি রামছাগলটার বোটকা গন্ধ এতটা দূরে এসেও ভলক মারছে। তালকি তাড়ির হাঁড়ি আর মাটির ভাঁড় নিয়ে রাস্তার ধারে ধুলোয় উবু বসে খদ্দের সামলাচ্ছে, এই সক্কালবেলায়, শুঁড়িবাড়ির বুড়ি। আর কহপ্তা পরেই তো তালশাঁস। ঢাল থেকে নেবেই খেতের সবুজ প্রগলভতা। তিল, তিসি, পেঁয়াজ, রসুন। শ্যালো ঘিরে বোরো। ঠিকুলকাঠির টঙে চোখমুখ আঁকা রাজনীতিক-ঋঢ়িতুল্য কালো হাঁড়ি।

    টাট্টুটানা একটা ছক্করগাড়ি চলে গেল আলুর বস্তা নিয়ে। শিল পড়ে রয়ে-রয়ে মার খায়েচে গো, ইমঘরে জায়গা নেই, মহাজনও নেবেনে। যিশু জানতে না চাইলেও ওকে উদ্দেশ্য করে বলল বস্তার ওপর বসে-থাকা চাষি। তারপর লোকটার নিশপিশে স্বগতোক্তি, দেকি, চাঁপাডাঙায়, নইলে ফেলদোবো, উপায় নেই উপায় নেই, পচতে নেগেচে।

    শিলাবৃষ্টি ? আরে ! ছাঁৎ করে ওঠে। লক্ষ করেনি এতক্ষুণ। খেতের ফসল কি মাথা নত করে আছে ? তার মানে পেঁয়াজ আর রসুনের গোড়ায় তো জল জমে গেছে। কী ভয়াবহ। একে আলু পচছে, তার ওপর এই। বিঘে প্রতি দেড় কুইন্টাল সুস্বাদু সুখসাগর পেঁয়াজ হয় এই জেলায়। আগেরবারেই তো হামজানপুর, বড়াল, জ্যামোর, ব্যাপসাগড়, চণ্ডীগাছা, দুয়ারপাড়া মৌজায় গিয়েছিল যিশু। পেঁয়াজ সংরক্ষণের সরকারি চাড়ও তথৈবচ। সিজকামালপুরে পেঁয়াজ সংরক্ষণাগারে কথা চলছে তো আজ কয়েক বছর হয়ে গেল স্যার, পেঁয়াজের আড়তদার তীর্থ পৈতাণ্ডি বলেছিল।

    শিলাবৃষ্টি হয়েছে পর পর গত তিন দিন। তাইজন্যেই আসার সময়ে কাঁচা বাড়িগুনোর গোলটালির ছাউনি আর মেটেগরের দেয়াল অমন মনমরা লাগছিল। গোলপাতার আর শনের ঝুপড়ি ফর্দাফাঁই। সকালের নবোঢ়া বাতাসের শীতল আদরে খেয়াল করেনি কিছুই। ভালোলাগায় অতর্কিতে বিষণ্ণতার ছোঁয়াচ ধরে।

    শেষপুকুরেও চাষিরা অসহায় স্নায়ুচাপে আর দুঃখে আক্রান্ত হয়েছে নিশ্চই, ভবেশকার রাজনৈতিক ওল উৎপাদন সত্ত্বেও। দিন-খাওয়া চাষিবাড়ির ভেতরে পরিবেশটা কেমন ? আগের বছর হিমঘরের আলু পচেছিল সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে। চাষিরা ক্ষতিপূরণ পায়নি। পাবেও না। এবছর আলু রাখার জায়গা নেই হিমঘরে, গুদামে, আড়তে। বৈশাখী পূর্ণিমার মেলাও তাহলে হবে নির্জীব। চোদ্দ কাঠার বাশি খাস বিলি হয় না। বর্গাদার খাবে কী? কর্জ চোকাবে কোথ্থেকে ? আর গাঁয়ে গাঁয়ে তেভাগা ফসল হয়ে এখন ফসলের এক ভাগ জমির মালিকের, দ্বিতীয়ভাগ নথিকরা বর্গাদারের, তৃতীয়ভাগ যে কামলাটা আসলে চাষ করে, তার। পাঁচ সাক্ষ্যে মানুষ বর্গাদার হয়। কালীদাস গরাই বলেছিল, কেউ মরে বিল সেঁচে, কেউ খায় কই।

    পুকুর-পাড়ের কলাগাছের আড়াল থেকে একটা ভিকিরিকে আসতে দেখে গাড়িতে গিয়ে বসল যিশু। কাছে এলে সানফিল্ম লাগানো কাচ তুলে দেবে। নিশ্চিন্দি। ভিকিরিরা হাত বাড়ালে বেশ বিব্রত বোধ করে ও। পার্স খুলে হয়তো দেখবে খুচরো নেই। নোট দেওয়া যায়, কিন্তু অন্য লোকেদের তাতে গোঁসা হয়। অ, বড়োলোকমি। ড্রাইভারের দ্বিতীয় ভাঁড় শেষ হয়নি। নয়তো ভিকিরিটা এসে পৌঁছোবার আগেই কেটে পড়া যেত।

    লোকটা কাছে এলে, দেখল যিশু, বাউল আর ভিকিরি মেশানো এক তৃতীয় সম্প্রদায়। আধুনিকতা এদের এখুনও নামকরণ করেনি। শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা এদের চায় না। পৌষ মেলার জন্য পেডিগ্রি দরকার হয় কী ? কে জানে ! পশ্চিমবাংলায় এরা বোধয় উত্তরাধুনিক প্রাণী। গৃহবধু পকেটমারিনীদের মতন। বাউলের পদাবনতি হলে জাতভিকিরি হয়। ভিকিরিরা নিজের পদোন্নতি ঘটিয়ে নিজেদের আধা বাউল কিংবা নববাউল করে ফেলেছে। ক্লাবঘরের ফেকলুরা যেমন আঁতেল।

    কাছে এসে ঝুঁকে, জানালার কাচে মুণ্ডু এনে, না, ভিক্কে চায় না লোকটা, বলে, একটা চা খাওয়াও না কত্তা ; আর যিশুর দোনামনা শেষ হবার আগেই, দোকানদারকে বলে, নে রে মদনা, একটা চা আর লেড়ো দে দিকিনি, বড়ো সায়েব দিচ্চে, বড়ো সায়েবের সংসার ভরে উটুক নাতি-নাতজামায়ে।

    যিশু খুঁটিয়ে দেখছিল বছর পঁয়তাল্লিশের কালোবরণ দাড়িপাকানো গড়নের লোকটাকে। গায়ের খসখসে চামড়ায় ছিৎরে পড়েছে বয়েস। দুরঙের হাওয়াই চপ্পল দুপায়ে। সবুজটা শনের ধাগায় বাঁধা। তাঁবাটে পায়ের দরানি-পড়া গোছে লাউডগা-সাপ শিরা। কাছা মেরে পরা ধুলোট হাফলুঙ্গি। বোতামহীন কমবয়েসি বুশশার্টের ফাঁকে চ্যাটালো পেটের ওপর পাঁজর দেখা যাচ্ছে। নানা রঙের তাপ্পি-মারা তেলচিটে ঝোলা কাঁধে। ওষুধ বা মনিহারি জিনিসের টিনের একতারা। তাঁবার টান-টান ইলেকট্রিক তার। দাড়িতে বিশেষ চুল নেই লোকটার। কিন্তু মাথার কনকজটা নেবেছে কাঁধ পর্যন্ত। জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা-নেঙড়ানো একদা-আদল আন্দাজ করতে পারে যিশু।

    বড়ো সায়েবকে তোমার গান শোনাও না ক্যানে। ক্ষমা করে দেবার অপত্য কায়দায় হুকুম করে খালি-গা চা-দোকানি, ডেকচিতে চাপানো আলুর তরকারিতে খুন্তি নাড়তে-নাড়তে। তারপর মৃদু হেসে যিশুকে, ও অনেক গান জানে স্যার, হাফু গান। শুনেচেন নিকি, হাফু ? বাপ-চোদ্দোপুরুষের গান আমাদের এই হুগলি জেলার, তা হাফু তো উটেই গেল।

    হাফু ? শুনিনি তো !

    লোকে গাইতে-গাইতে হাঁপিয়ে যায় তো, তাই হাফু। এগবার ধল্লে আবনি না বললে আর থামবেনে। ওতোরপাড়ার মুকুজ্জে রাজারা ভালোবাসত।

    না, শুনিনি কখুনও।

    সোনেন্নিকো ? বাউল-ভিকিরির কন্ঠস্বরে ভর্ৎসনা। গলা কাঁপিয়ে, একতারায়, নাকি তোতারায়, ড়িং ড়াং বুগ বুগ। মাছ ভাজার তেল ছেটাবার শব্দ ওঠে গুপিযন্ত্রে। সোনেন কত্তা, মন দিয়া সোনেন,

    ওগো কলিমালুর জোড়া

    তোমার পচা বেগুনপোড়া

    ল্যাং খেয়ে তোর চাগরি গেল

    বুজলিরে মুকপোড়া…

    ড্রাইভারটা সশব্দে হেসে ওঠে আচমকা। ভাঁড়ের চা ফুলপ্যান্টে পড়লে হাসি চুপসে যায়।

    কিন্তু সে লোক তো কবেই পালটে গেছে। এখুন তো ওন্নোলোক। তোমার হাফু পালটায়নি কেন ? ঠোঁটে মুচকি এনে যিশির প্রশ্রয়। গায়কের হাঁপানি রোগে ওর কন্ঠে সব গানই হাফু।

    পরবর্তী ড়িং ড়াং বুগ বুগ ধরে লোকটা,

    সুবাস বোসের নাম ডুবোলি অণ্ডকোষের জামাই

    ঠেককেদারি তুরাই পেলি লেইকো চুরির কামাই

    তুদের সমাজবদল হ্যাঁ লা, ন্যাড় জোলাবার খ্যালা

    থালে কেনরে এতো জুলুস-মিছিল

    কেনরে ধানাই পানাই

    হায় রে তুদের গোডিম ভাঙে নাই,

    তুদের গোডিম ভাঙে নাই…

    গান বোধয় শেষ হয়নি, হাফু গান যখন। বাউল-ভিকিরি থেমে গেল চা-দোকানির কথায়। আগে ও পার্টি করত স্যার। মাধ্যমিক ওব্দি পড়েছেল। সোনাওনে সেই গানটে, সেই যে…

    বাউল ভিকিরির সুরহীন ড়িং ড়াং আরম্ভ হয় আবার। বলল, ম্যাট্রিক আর দেয়া হল কই। আলুর আর চালের আকাল করে দিলে পোফুল্লবাবু ; চলে গেলুম চাঁপাডাঙা ইসটিশান পোড়াতে। সে আগুন আর নিববেনে কত্তা। রাবণের মুকে আগুন বলে কতা।

    গোটা পনেরো দশ-বারো বছরের খালি-গা বালক জড়ি হয়ে গেছে এরই মধ্যে। সারা পশ্চিমবঙ্গ ভরে গেছে এরকম লৈকাপড়াহীন-কাজহীন কিশোর-কিসোরীতে। মাঠ আর পথ বেয়ে অমন আরও বালক-বালিকা আসছে। গ্রামে কিছু একটা হলেই এরা জড়ো হয়ে যায়।

    সেই ইংরিজি গানটে সোনাও না বড়ো সায়েবকে।

    ইংরিজি গান ? তুমি বেঁধেছ ? শোনাও দেখি।

    সোনেন সোনেন:

    দিনে মিটিং রাতে মেটিং

    এই তো হোলো বাংলাদেস

    আসে যায় মাইনে পায়

    রাঁড়ের পো-রা রয়েচে বেস

    কলঙ্কে গড়া রাজনীতিকদের গল্প আরও অশ্লীল হয়ে উঠতে পারে আঁচ করে, গাড়ি থেকে নেবে দোকানির পাওনা তাড়াতাড়ি মিটিয়ে বাউল-ভিকিরিটাকে দুটো পঞ্চাশ টাকার নোট দিলে, লোকটা এক পায়ে দাঁড়িয়ে ড়িং ড়াং পাক খায়। বলে, শেষপুকুরের মেলায় যাবার ভাড়াটা দেলেন বড়ো সায়েব, তেনার নাতিপুতিরা সুখে থাকুক। তারপর গেয়ে ওঠে প্রকৃত হাফু গান,

    মাছ ধরা হল না গো সই

    দোটো পায়লা লেগেছে জালে

    সই যে পাতালে

    সব দেখে যা লে…

    কী সবটা লে

    যম না চিতিলে

    যাকে খেলে লে…

    ময়না ধানের খয় না

    ছেলে কেন আমার হয় না

    মক্কাশ্বর যাবি

    তবে খোকা পাবি

    তেঁতুল খেলে গা জ্বলে

    আমড়া কেলে ব্যাং হলে

    মাছ ধরা হল না গো সই…..

    গানের মাঝেই ছেড়ে দিল গাড়ি। গাড়িতে জুত করে বসে, ঘন্টায় আশি কিলোমিটার বেগের আরামে, দুটো কাঠি নষ্ট করার পর, তৃতীয়টায় ধরাতে সফল হয় যিশু। হাফু গানের দুর্গতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওর মনে হচ্ছিল, কাউকে অপমান করলে, এমনকী গানের মাধ্যমেও, তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা বোধয় দুটো ভালো-কথা বলা সম্পর্কের চেয়ে গাঢ়। গাঁয়ে-গাঁয়ে, পাড়ায়-পাড়ায়, এত যে আড়াআড়ি আর খাড়াখাড়ি বিভাজনের খেয়োখেয়ি আর দলাদলি, যার কোনো মাথা নেই মুন্ডু নেই, হয়তো সেকারণে।

    গা-ছাড়া রাস্তার দুধারে, শনাক্তকরণ প্যারেডের মতন ভাটাম, চটকা, ইউক্যালিপটাস, বাবলা, শিরিষ। সবুজের ফাঁকে-ফাঁকে সকালের বলদর্পী আলোর ব্যাটন। উবড়ো-খাবড়া পথ, গতিকে গোরুর গাড়ির বেগে এনে ফেলেছে। পথের হাল স্হানীয় বিধায়কের ক্ষমতা বা জোচ্চুরি ফাঁস করে।

    বেশ ভোর রাত্তিরে উঠতে হয়েছিল বলে তন্দ্রার আমেজ কাটাতে পারছিল না যিশু। চা-সিগারেট-হাফুর পরও। ওর খেয়াল হল গাড়ি থেমে রয়েছে আর চিৎকার চেঁচামেচির রেশ আসছে। কী ব্যাপার ? ড্রাইভারকে জিগ্যেস করল ও।

    অবরোধ করতাসে পাবলিক !

    অবরোধ ? সে কী ? আচমকা উদ্বেগের রক্ত ছড়িয়ে পড়ল যিশুর মুখমণ্ডলে। হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়। পৌঁছোতে আমাকে হবেই। তুমি হর্ন না বাজিয়ে আস্তে আস্তে গাড়ি চালাও।

    গাইড়িরে ড্যামেজ কইরা দিবে স্যার !

    না-না, তা করবার হলে লোকগুনো ছুটে আসত এতক্ষুণে। ওদের তো আমাদের সম্পর্কে আগ্রহ দেখচি না। ওই তো, ওদিক থেকে গাড়ি আর বাস আসছে তো ভিড় কাটিয়ে।

    জমায়েতের কাছাকাছি পৌঁছে যিশু দেখল রাস্তার পাশে রাখা কাঁচাবাঁশের মাচানবাঁধা দুটো মধ্যবয়স মৃতদেহ। পুরুষ আর চাষি বউয়ের। তুমুল চিৎকার করে কাঁদছে, বুক চাপড়াচ্ছে কয়েকজন। এভাবে শোকপ্রকাশ কলকাতায় আর দেখা যায় না। ওফ, দ্যাখা যায় না এসব দৃশ্য। গলার কাছে শ্লেষ্মা এসে গেছে। একসঙ্গে দুজনের মৃত্যু। গ্রামবাসীদের মধ্যে মৃত্যুজনিত প্রাণচাঞ্চল্য। সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে ও, যিশু। অচলাবস্হা গড়ে উঠতে পারে এদের আবেগের চাপে। তার আগেই দ্রুত বেরিয়ে যাওয়া দরকার। কী হয়েছে গো ? একজনকে জিগ্যেস করল যিশু।

    মাল তুলেছে আজ দুবচ্ছর অথচ তাঁতি সমবায়ের ট্যাকা দ্যায়নে পান্না মাঝি। তাঁতিরা তাই চাষের ওষুদ খেয়ে মরচে। মহাজন দিয়েছেল সুতো। তা কী আর করবে। আগে পেটটা ভরাতে হবে তো। সুতো বেচে খেয়ে ফেলেচে।

    ওওওও। এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারল যিশু। ড্রাইভারকে বলল, চলো চলো। উদ্বেগে রক্তচাপ বেড়েছে নির্ঘাত। তন্তুজ আর কী করবে ! তাঁতিদের শীর্ষ সংস্হা। নিজেই তো এর কাছে ধার করে ওকে শোধ দ্যায়। তাঁত সমবায়ের পাওনা মেটাবে কোথ্থেকে। টঙে-টঙে পার্টির লোক। দুবছর কেন, অনেক তাঁত সমবায়ের পাঁচ বছরের পাওনা মেটাতে পারেনি। যেখানেই বাঙালি আমলা সেখানেই রক্তচোষার দিগ্বিজয়। পার্টির প্রতি প্রভূভক্ত আমলা। মুসুলমান তাঁতি বউরা আজকাল বিড়ি বাঁধছে। মরদরা যাচ্ছে মাছ ধরতে। হিন্দু পরিবারের সদস্যরা হেস্তনেস্ত করে উঠতে পারছে না এখুনও। শীর্ষ সমবায় যেসব গামছা লুঙ্গি ধুতি শাড়ি তুলেছে, তাঁত সমবায়গুনোর কাছ থেকে সেগুনো আদপে বিক্কিরি হবে কি না ঠিক নেই। ওদের দোকানগুলো সময়মতন খোলে না, আর বন্ধ হয়ে যায় সন্ধের আগেই। সরকারি কর্মী ওরা; ওদের দোষ দেয়া যায় না, দশটা-পাঁচটার চাকরি। তাঁতজিনিসটাই বোধয় দশ বছরে নিপাত্তা হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গে।

    দু-দুজন আত্মহতভঅ করেছে। পুলিশ পৌঁছোবে সৎকারের পর। সবাই তো আদিত্যর জাতভাই। কাঁচ তুলে এসি চালিয়ে দিতে বলল যিশু। ঘুম পাচ্ছে।

    আঠারো

    বাবলাডাঙায় বাবলাগাছ আর নেই। রয়েছে অর্জুনগাছ, বয়োবৃদ্ধ। মোচ্ছবতলায় আর কোনও মহোৎসব হয় না। গোপের হাটে হাট আর বসে না, গোপরাও থাকে না। তালটিকুরিতে তালগাছ আর নেই। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর, নামের মধ্যে জিনিসটা বা ব্যাপারটা আর থাকে না, নেই। মানে একেবারে নিশ্চিহ্ণ। যেমন স্বাধীনতা, যেমন গণতন্ত্র, যেমন নাগরিকতা, যেমন ন্যায়, যেমন দায়দায়িত্ব, যেমন সত্য, যেমন কর্তব্য। ভাবছিল যিশু। বাবলাডাঙায় গাড়ি থেকে নেবে ড্রাইভারকে অর্জুনগাছটা দেখিয়ে দিল যিশু, যার তলায় কাল, বৈশাখী পূর্ণিমার সন্ধ্যায়, চাঁদের আলো মেখে অপেক্ষা করবে এই গাড়িটা বা ট্র্যাভেল এজেন্সির নাম আঁকা অন্য যে-কোনও গাড়ি।

    পাঁচটা নাগাদ পোঁছে যেও কিন্তু।

    হঅঅঅ। আমাদের দ্যাখসেন নাকি ডিউটি ফেল করসি ?

    মোচ্ছবতলায় কদমগাছের নিচে দাঁত বেরোনো ইঁটের চবুতরার ওপরে বসে গ্যাঁজাচ্ছে হাফবুড়োরা। কয়েকজনকে চিনতে পারল ও, যিশু। হিরু পাকড়ে। মন্দিরে ওকে রামচাকি বাজাতে দেখেছে। সুনীল মালিক, বাদল কোঁড়া, মানিক সাঁতরা, বদরুদ্দি খোনকার, সবাই বর্গাদার ; গত বছর এদের সমস্ত আলু পচেছিল হিমঘরে। আর ওই লোকটা তো জগৎ বাইন। আলুতে সারের ব্যবহার সম্পর্কে জিগ্যেস করতে গেয়ে উঠেছিল, বেনফেডের সার দিলি কনফেডের জামা, ধুতির নামে গামছা দিলি, ত্রাণের নামে মামা। রসিক লোকেরা, সত্যি, অদম্য ; নিজের দুঃখকষ্টকেও অলঙ্কারে মুড়ে তোলে।

    ওর, যিশুর, পদবি, বিশ্বাস, সেটাও কেউ ঠিকমতন উচ্চারণ করতে চায় না। কেউ বলে, বিসসেস, কেউ বিসাস, কেউ বিহহাহ, কেউ বিষশ্বাস ; যার যা ইচ্ছে। চব্বিশ পরগণার বিরাট ঝিয়ের দল প্রতিদিন কলকাতায় কাজ করতে আসে। সবাই মুসুলমান। অনেকে বাংলাদেশি। আসল নামে কাজ পাওয়া অনেক সময়ে মুশকিল বলে বউগুনো সরস্বতী, আরতি, সন্ধ্যা, কামিনী, অর্চনা নাম দিয়ে রাখে। যারা কাজ দেয় তারাও জানে। ইন্দু হলে নাম হতো খেন্তি, পেঁচি, পুঁটি ধরণের। আত্মপরিচয় ব্যাপারটা বায়বীয় বোধয়। বাবলাডাঙায় বাবলাগাছ আর নেই। বাবলাগাছেদের নামও আর নেই। বনবিভাগ গাছে-গাছে সংখ্যাচিহ্ণ এঁকে রাখে। যিশু অন্য দিকে তাকাল।

    বারবার ব্যাখ্যা করা সত্ত্বেও ওকে এই লোকগুনো সরকারি প্রতিনিধি মনে করে। অভোযোগের কান্না আরম্ভ করবে এক্ষুনি। যিশু বলে, আরে বাবা, আমি সে-লোক নই ; ওরা ভুরু কোঁচকাবে, থালে থাতবাকসো কেন, লাল কালি সবুজ কালির কলম কেন, ফাইল-কাগজ কেন, ইংরিজি লেকালিকি কেন !

    মোচ্ছবতলার এই চবুতরায় কখুনো নাকি শ্যামানন্দ শ্রীজীব গোস্বামী বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের জন্যে এসে বসেছিলেন। পাশবালিশের মতন গোল ভগ্নাবশেষটা হয়তো চাঁদনির ইমারতি থাম। অথচ কোনও বৈষ্ণবের দেখা পায়নি যিশু এ-তল্লাটে। অষ্টসাত্ত্বিকভাব বলতে নতুন চন্দ্রমুখী আলুর রাঙাপানা ত্বক।

    তালটিকুরি আর মেলাতলা পেরোয় যিশু। দরমা, হোগলা, চ্যাঁচারি, চট, তেরপলের দোকানপাট। নাগরদোলা, ম্যাজিক, যাত্রা-অভিনয়ের মঞ্চ, সব জোগাড়যন্তর পুরো। হুকিংও। হুকিং করে বিদ্যুৎ না নিলে আর মেলা জমে না। রোশনাই-এর খরচ তো আর মেলা-দর্শকরা জোগাবে না। শনি, শেতলা, মনসা, শিব, ধর্মঠাকুর, সমস্ত মন্দিরের অধিষ্ঠাতারা হুকিং করে নিজেদের আলোকিত করে রাখে পশ্চিমবঙ্গে। ইষ্টদেবতা বলে কিছু আর নেই। সব সার্বজনীন।

    মন্দিরে লোকজন নেই। যিশু দেখেছিল ঢুকে আগেরবার এসে। কে আর টের পাচ্ছে যে ও খ্রিস্টান। কলকাতার কালীঘাটেও ঢুকেছে। পাকা তাল আর জবাফুল হাতে শাঁখারুলি বধুদের প্যাচপেচে কিউ। ঢুকেছে দক্ষিণেশ্বরেও। মুলো হাতে দর্শনার্থীদের ময়ালসাপ লাইন। বিহারের লোকেরা কবজা করে ফেলেছে মন্দিরগুনো। ইশকুলে পড়ার সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঢুঁ মেরেছিল। তাল আর মুলোর চল তখন ছিল না। এরকুম সাংস্কৃতিক রদবদল বোধয় দেশভাগের দরুন। চার্চগুনোও তো কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়কার প্রতিভা হারিয়ে ফেলেছে।

    মন্দিরের দক্ষিণে বিশাল বটগাছটা। বটগাছে যে এরকুম গাদা-গাদা বুনো মৌমাছির চাক ঝুলে থাকে, শেষপুকুরে আসার আগে দেখেনি যিশু। কিসের মধু এরা জোগাড় করে কে জানে। আলুফুলের মধু হয় ? মন্দিরের পেছনে তো বিরাট দামপুকুর, যার নামে এই গ্রাম। পুকুর খোঁড়ার সময়ে সেষনাগের প্রতিমা পেয়েছিল গোপেরা। বটতলার অজস্র ঝুরির সোঁদা অন্ধকারে আধা-অবহেলিত সেই পাথরটার নাম আজ বুড়ো শিব। পূঞ্জীভূত সময়ের বিরামহীনতাকে ধরে রেখেছে দিনেমারের সময়কার এই বট গাছটার সুকোমল অন্ধকার। মৌমাছিদের ডানাগুঞ্জনের ঝিরিঝিরি সুগন্ধ।

    ভবেশকার বাড়ি যাবার কোনও নির্দিষ্ট পথ নেই। রাজনৈতিক দলাদলির মামলা আর পালটা মামলায় কাঁচা রাস্তাটা বছর দশেক থেকে আধখ্যাঁচড়া। আদালতের স্হগিতাদেশ উঠতে-উঠতে কোনোদিন এটুকুও ভেসে যাবে ঠিকেদারদের প্রার্থনায় প্রীত মুন্ডেশ্বরীর বদরাগি জলে। বাঁশঝাড়ের অধোবদন সবুজ বাতাসে জিরোবার জন্যে ঝরাপাতার ওপর ব্রিফকেস রেখে সিগারেট ধরাল যিশু। চারিদিকে নিস্পন্দ আলোড়নের ছায়াছন্ন তরিবাতময়তা।

    এখুন আগে বরং হিমঘরে গিয়ে এখানে আসার ন্যায্যতা প্রমাণ করা যাক, ভাবল ও, যিশু। হিমঘর আর বিদ্যুৎ সাবস্টেশানটা তো দেখাই যাচ্ছে। বিদ্যুতের হুকিঙের লোড হিমঘরটা নিতে পারবে কিনা আঁচ করা কঠিন। আলুগুনো আবার হয়তো দমবন্ধ হয়ে মরবে। আলের ওপর দিয়ে হেঁটে, পরিত্যক্ত উপস্বাস্হ্যকেন্দ্রের পেছনের আমবাগানের পাশ দিয়ে, পিচ রাস্তার ওপর পোঁছল যিশু। এই উপস্বাস্হ্যকেন্দ্রটা যখুন স্বাস্হ্যবান ছিল, তখুন এখানে কাজ করত খুশিদির যুবক পাণিপ্রার্থী। দরোজা, জানলা, মায় ইঁটও উপড়ে নিয়ে গেছে স্বাবলম্বী মানুষ।

    ইমঘরের ক্যাশিয়ার জয়দেব শাসমল আসছিল ক্যাঁচোর-ক্যাঁচোর সাইকেলে। যিশুকে দেখে নেবে পড়ে। কেঁদো থপথপে হাঁটুনি। এগিয়ে আসে মুচকি মুখে। প্রথমদিন এই লোকটা ভেবেছিল যিশু বুঝি সরকারি আধিকারিক, চুরিচামারি ধরতে এয়েচে। তাই সুনিয়ে-সুনিয়ে জিভ-গোটানো মন্তব্য করেছিল, লিকতে দে, লিকতে দে, বাবারও বাবা আচে। গ্রামে গেলে, লোকে নিজের ভয় অনুযায়ী যিশুকে কিছু-একটা ভেবে নেয়। বিদ্যুৎ পষহদের লোক, হুকিং ধরবে। ব্যাঙ্কের লোক, ঋণখেলাপি উশুল করতে এয়েচে, পালাও। স্বাস্হ্য দপতরের লোক, টিকে দিতে, ওষুদ গেলাতে, এয়েচে। গ্রামীণ বিকাশের, মেলা বক্তিমে ঝাড়বে।

    দেকেচেন নাকি ? কাগোচে ? ধুতির খুঁট পকেট থেকে টেনে মুখ পুঁছে জানতে চায় শাসমল। নিজেই খোলসা করে। বারাসাত হিমঘরের ইউনিট ম্যানেজার শান্তি চাটুজ্যে নাকি গা ঢাকা দিয়েচে, হেঁ হেঁ, বন্ডের বই ভুলে গিয়ে বাড়ি নে গেসলো। বলেচে জেলাশাসকের নির্দেশ মানিনে, হেঁ হেঁ।

    ক্লান্ত যিশু চাইছিল কোথাও গিয়ে একটু বসে, এক গ্লাস জল খায়। আপাতত শাসমলের কথায় দেখনসই সায় দেয়া প্রয়োজন মনে করে হাঁসল কাঁধ নাচিয়ে। শাসমল প্রশ্রয় পায়, আরেকবার মুখ পোঁছে চল্লিশোর্ধ ভুঁড়িদাস। বলে, আমডাঙা, বারাসাত, দেগঙ্গা ব্লকের চাষিদের আলু তো এই বোসেখ মাসেও হিমঘরের মাটে পড়ে আচে, হেঁ হেঁ।

    মানুষ অন্যের অবমাননায় বা তাকে হেয় করার জন্যে যখুন হাসে, মনে হল যিশুর, তখুন হাসিতে ক্যারদানি ফলায়। এক-একজন এক-একরকুম। ঠিঁউউউ। হ্যাঁহ হ্যাঁহ হ্যাঁহ। হা হা হা হা। ফিঃ ফিঃ ফিঃ ফিঃ। ইয়াহ ইয়াহ ইয়াহ। খ্যাক খ্যাক খ্যাক খ্যাক। খিক খিক খিক। হুমফ হুমফ হুমফ। ওঃ হোঃ হোঃ।

    শাসমলের কাঁধে হাত রেখে আরেকটু প্রশ্রয় দিলে যিশু। এই লোকটা বুঝতে পারে না কনসালট্যান্ট কাকে বলে। ভাবে উপদেষ্টার আবার কী দরকার। উপদেষ্টার উপদেশের দরদাম শুনলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে এর। আলু, ক্যাশিয়ারকে জমিদারি দিয়েছে, নায়েবি ফলাবার জন্যে। চলুন না, আপনার হিমঘরেই যাই, একটু বসা যাক, আরও একাধটা ব্যাপার জানবার ছিল, আপনার মতো অভিজ্ঞ লোক তো বড়ো একটা দেখলুম না এলাইনে, বলল যিশু। তারপর শাসমলের ইতস্তত দেখে স্তো দেয়, আমি তো সরকারি লোক নই, জানেনই তো আপনি, জাপানি কোম্পানিতে কাজ করি, জাপানি মেশিন কত ভালো হয়, জানেন তো।

    বারাসাতের আলু ঘোটালার কথা ভালোই জানে যিশু। এ আর নতুন কী। প্রথম ট্রাম-পোড়া ছাইমাখা সাধুসন্ত আজ সর্বত্র। সত্তর হাজার বস্তা রাখার জায়গায় রাখা হয়েছিল এক লাখ কুড়ি হাজার। প#ত্রিশ হাজার বস্তার তবু জায়গা হয়নি, বাইরে পড়ে-পড়ে নষ্ট হয়েছিল। সিলাবৃষ্টির মার খেয়ে এলিয়ে পড়েছিল বস্তাগুলো। কালোবাজারে পাঁচগুণ দামে বন্ড কেটেছে ইউনিট ম্যানেজারের চোখের সামনে। পিয়োনটা গ্রুপ থিয়েটার করে। ওদের দলটার নাম প্রতিবাদী সভা। আকাদেমিতে নীলদর্পণ-এ ভালো অভিনয় করেছিল, ক্লাস।

    ওই অঞ্চলে, বারাসাতের ওদিকটায়, হিমঘরের ভরসাতেই অত আলু চাষ হয়েছিল, অথচ ঠাঁই পেল মহাজনের আলু। সব বামপন্হী আর রামপন্হী দলে চেয়ার আছে মহাজনদের। তারা তো আর আজকের লোক নয়। মেহনতি চাষি যে সত্যি-সত্যি এমনতর মেহনত করে ফেলতে পারে, মাটির উমে ঘাপটি মেরে আলুগুনো নিজেরাই টের পায়নি, আমলা-গামলা তো কোন ছার। বর্গা আইন পাস করলেই যেন সব হয়ে গেল, ব্যাস, ভূমিসংস্কার শেষ ! খেতে-মাঠে যা ফলছে তার কী হবে ? তার তো হিল্লে করতে হবে। মেয়ের বিয়ে দিতে তো ট্যাকা চাই। চাষির বুক চাপড়াবার শব্দ পৌঁছোয়নি কোথাও।

    মন্ত্রীর কাছে ডেপুটেশান দিয়েছিল চাষিরা। ম্যানেজিং ডিরেক্টার বেংকটরমণ এক-খেপ পরিদর্শন করেছিল। জেলাশাসক অরুণ মিশ্র বিভাগীয় ব্যবস্হা নেবার জন্যে প্রতিবেদন দিয়েছিল সরকারকে। পঞ্চায়েত সমিতির পৃথ্বীশ দে আর ব্লক আধিকারিক অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় যথেষ্ট দৌড়ঝাঁপ করেছিল। অচলায়তন ভেঙে মুক্তধারা বেরোয়নি। জমিদারি উঠে গেছে, জমিদার ওঠেনি। হয়ত কোনও দিন উঠবে না।

    বুজলেন বিসসেসবাবু, হিমঘরের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে বলল শাসমল, আমাদের এখেনে ট্রান্সফরমারের পোরসিলিন চুরি হয়ে দুদিন লাইট আসেনে, হেঁ হেঁ।

    রাজনৈতিক ঋণমেলার ঠেলায় গ্রামীণ ঋণ বন্ধ করে দিয়েছিল বিশ্বব্যাঙ্ক। মেলার মজা লুটল পাঞ্জাব, হরিয়ানা, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র। নয়তো ঠিক সময়ে আরও কটা হিমঘর দাঁড়িয়ে যেত পশ্চিমবঙ্গে। এখটা হিমঘর বসাতে তিন কোটির মতন টাকা দরকার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে।

    হিমঘরে পৌঁছে যিশু দেখল, শেডে এখনও শ’দেড়েক বস্তা পড়ে আছে। গোটা দশেক হাফল্যাংটো মুটিয়া ঘুমোচ্ছে। ওদের ঠোঁট থেকে শেষ তাড়িটুকু শুষে নিচ্ছে বেলে মাছির দঙ্গল। এলা মাটির ডাঁই। বাতিল আলু ছড়ানো-ছিটোনো চাদ্দিকময়। তার ওপর দিয়েই হেঁটে অফিসঘরে যেতে হল যিশুকে। একটা থনঝোলা সাদাকালো ছাগল শুকে বেড়াচ্ছে বাতিল আলু, খাচ্ছে না।

    লোক লাগিয়ে নিজেরাই হয়ত ট্রান্সফরমার খারাপ করিয়ে রাখে। আলু পচলে বিদ্যুৎ পর্ষদের ঘাড়ে দোষ চাপাবার সুযোগ থাকবে। একশো বত্রিশের তেত্রিশ কেভির ক্ষমতাসম্পন্ন। সোজা কথা নয়।

    আপনাদের তো জেনারেটর আছে ? অনেক হিমঘরে দেখেচি বিদ্যুতের চে ডিজেল সস্তা বলে অষ্টপ্রহর জেনারেটর চলছে, বলল যিশু।

    স্টোরকিপার কৃপাসিন্ধু আশ এসে দাঁড়িয়েছিল। বলল, আঁগগে ডিজেল ছেল না। রসুলপুর থেকে নিয়েলুম। আআআর বলেন কেন। তা ওইটুকুন শীত ইমঘরে ধরা থাকে। খেতি হয় না।

    শাসমল পৈতেতে বাঁধা চাবি দিয়ে ক্যাশিয়ারের ঘরের তালা খোলে। শাসমলরা কি বামুন যে পৈতে পরে আছে ? কে জানে, হবেও-বা। আদিত্য ভালো বলতে পারত। পলিশহীন আমকাঠের চেয়ার-টেবিল এলা মাটির ধুলোয় গেরুয়া। দেয়ালে সত্য সাইবাবার হাসিমুখ ঝাঁকড়াচুল ছবি। কোণে, মেঝেতে, স্টোভ। চা ফোটানোর অ্যালুমিনিয়াম ডেকচি। তলানিপড়া তিনটে খুদে মাপের কাচের গেলাস। মাছি অধ্যুষিত। প্লাসটিক বয়ামে চিনি, চা, গুঁড়ো দুধ।

    চা খাবেন নাকি ?

    নাঃ। মুন্ডেশ্বরী পোলের আগে খেয়েছিলুম আসার সময়ে। এখুন বরং এক গেলাস জল খাওয়ান।

    কুঁজোর ওপর ঢাকা দেওয়া স্টিলের গেলাসে জল গড়িয়ে শাসমল বলল, অঅঅঅঅ। হরেন পাইকের ছেলের দোকানে। ভালো চা করে। ময়দার পরোটা আর আলুর দমটাও ভালো করে। হরেন পাইকের হাফু গান শুনলেন নাকি ? হেঁ হেঁ।

    যিশু স্তম্ভিত। হরেন পাইক ? বাউল ভিকিরিটা চা-দোকানির বাবা। বাবা-ছেলের সম্পর্ক এমন স্তরেও পৌঁছোয়। মাই গড। বলল, হ্যাঁ, হাফু কিনা জানি না, নিজেই গান বেঁধেছে মনে হয়। একতারাটাও হাফুছাপ।

    ওওওই যখন যা খবর হয় আর কী। শেষপুকুরে মেলা বসলেই আসে ফিবছর। থাকচেন তো, কাল, মেলায় ? মেলাটা এবার জমবে না বোধয়।

    কেন ?

    মহাজনের সঙ্গে দেকাদেকির ভয়ে চাষিরা আবার আসে কিনা দেকুন। ব্যাঙ্কের বাবুরাও তো একটা ঘর নিয়েচে।

    শেষপুকুরে আসবার ন্যায্যতা প্রমাণের জন্যে, শাসমলের আর কৃপাসিন্ধুর কাছে যিশু যখুন আবোল-তাবোল আগডুম-বাগডুম ফাঁদছে,পিয়োন মুরার প্রামাণিক, শালপ্রাংশু ষাঁড়ের মতন নজরকাড়া ছাতি, বলল, আবনার সেই আলোজ্বলা ল্যাপটু টাইপযন্তরটা আনেননি এবার ?

    ল্যাপটপ ? ওটা তো কমপিউটার। না, আনিনি। বলল যিশু। ল্যাপটপে খুশিদির ফোটো লোড করেছে ; এদের সামনে খোলা যাবে না আপাতত।

    লেকালিকি সব হয়ে গেচে ? বই হয়ে বেরোবে তো, না ?

    এই সামান্য কিছু বাকি। তাই তো এলুম আপনাদের কাছে। তারপর প্রশ্নমালার লাটাই থেকে সুতো ঢিলে করতে থাকে যিশু। উত্তরদাতাদের ঋতুবন্ধ খুলে যাবার আহ্লাদ।

    এবার সবাই রাধাপদ্ম চাষের কথা ভাবচে।

    রাধাপদ্ম ? জানা নেই বলে ক্ষুণ্ণ হয় যিশু।

    ও ওই সুযযোমুখি ফুল, বলল কৃপাসিন্ধু। তারপর দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে প্রায় স্বগতোক্তি, আলুর বুক এমন টাটিয়ে উডলো গেলোবছর। আবনি হলেন গে রায়রাঁয়া লোক, দেকুন যদি চাষিদের কিচু উবগার হয়। কৃপাসিন্ধুর মুখে গরম বালিতে চাল ভাজার গন্ধ। শাসমল পান্তা ব্রেকফাস্টের হাঁইইইই হাঁইইইই হাঁ-মুখ খুলে সুরেলা হাই তুলে যাচ্ছে কিছুক্ষুন অন্তর। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা আলুর মধ্যে মুটিয়াগুনো সম্পর্কে উদাসীন একটা ডেঁপো ইঁদুর চষে বেড়াচ্ছে। আমোদে উ৮ড়ছে দুচারটে শুকনো আমপাতা।

    গোগ্রাসে ছুটন্ত একটা রাতকানা ট্রাক চলে গেল। হাম্প ডিঙিয়ে, ডিগুম ডিগুম তুলে।

    সবশেষে, আদপে যেটা জানতে চায় যিশু, সেই প্রশ্ন করে। আচ্ছা ভবেশকা কি বাড়িতে আছেন ?

    অ্যাই দ্যাকো অ্যাগবারটি। আগে বাড়ি যাননি ? ভবঠাকুর তো আরামবাগ গ্যাচে খড়ের ছাতু কিনতে। ওই যে মাশরুম চাষের বীজ, তাই আনতে। তারোপোর পার্টির কাজ তো আচেই। ফিরতে সেই সোনধে। মুরারি প্রামাণিকের মিছিল-চনমনে উত্তর।

    জবাবের আঘাতে টলে যায় যিশু। ওফ। গাড়িটা না ছাড়লেই হত। আজই ফিরে যেতে পারত। অনুশোচনার সর্পাঘাতে আক্ষেপের বিষ ছড়িয়ে পড়ে অস্তিত্বে। হিমঘর অফিসের দোরগোড়ায় কূট প্রশ্নের মতন শেয়ালকাঁটা। গেটের বাইরে রাস্তার ওপারে দুলছে অর্কমন্দারের জংলি ডালপালা। বকুলপাখিদের উচ্চবাচ্যে মুখরিত।

    এরকম একটা জায়গায় রাস্তার ওপর স্পিডব্রেকারের হাম্প ! না আছে কাছে ইশকুল, না আছে জনবসতি। তোলা আদায়ের নতুন ধাঁচের জমিদারি খাজনা আদায়। হয়তো ভবেশকাই প্রথম তোলা আবিষ্কার করেছিল। তোলা আদায়ের খরচ মেটাতে পরিবার পিছু এক পয়সা। তাঁবার পয়সা চালু ছিল তখন। আর এখুন গতিকে স্তিমিত করা আর রুদ্ধ করার নাম প্রগতি।

    আত্মপ্রসাদে ভেজা কন্ঠস্বরে শাসমল বলল, চলুন না পৌঁছে দিই ; সাইকেলের পেচনের সিটে বসতে পারেন তো ? বাকসোটাকে কোলে ধরে নেবেন, যা অগনিশর্মা চড়চড়ে রোদ।

    সন্ধিক্ষণ। এ-ই তো সন্ধিক্ষণ। ভবেশকা নেই। সময়ের সম্রাজ্ঞী এখন খুশিদি। ওর পক্ষে অত্যন্ত হাস্যকর, সিটে বসে যেতে তক্ষুনি রাজি হয়ে যায় যিশু। কন্ঠের গোড়ায় লুকিয়ে থাকা আওয়াজহীন ঢক্কানিনাদ ঢিপ-ঢিপ করে ধাপে-ধাপে নেবে যাচ্ছে বুকের মধ্যে। জ্ঞান তো ক্ষমতার বনেদ। যে আবাদ করবে, সে-ই জানবে কেবল।

    প্রকাস করা যায় না এমন ত্রব্র আবেগের ধাক্কায় সারাটা পথ প্যাঙপেঙে সাইকেলের পিছনের সিটে চুপচাপ বসে থাকে ও, যিশু। আগে এরকুম কখুনও হয়নি। যৌনতা নয়। যৌনতা তো তৃপ্তির বাজারে অঢেল। ওর মাথার কাছে সঙ্গী এক হলুদ বোলতার বুঁবুঁবুঁ বুঁবুঁবুঁ সত্ত্বেও বসে থাকে কথাহীন উদ্বেগে। বুজলেন যিশুবাবু, আমার মতন টাকমাতা লোকের আপনার অমন একরাশ চুল দেকে হিংসে হচ্ছিল, সেইটেই জানান দিচ্চে বোলতাটা। যিশু বলল, বোলতাটা চুলের গোপন তথ্য জানতে পেরেছে বোধয় !

    দুপুরের রোদ এপাশ-ওপাশ আরম্ভ করেছে। হাসাহাসি করতে-করতে ইশকুল যাচ্ছে একদল ছেলেমেয়ে, খাতাপত্তর হাতে, ইশকুলই হবে, প্রাইমারি। জলতেষ্টায় দীর্ঘশ্বাস গেলে যিশু।

    পাতাঅলা ফণীমনসার ঝাড়ের কাছে, মাটিতে বাঁ আর প্যাডেলে ডান পা, রোদের উষ্মা বাঁচাতে মাথায় ধুতির খুঁট, শাসমল বলল, ওই কলাবাগানে, ওই যে, গোলাপি-গোলাপি করমচা হয়ে রয়েচে, ওর পাশ দিয়ে মিনিট দশেক হাঁটলেই ভবঠাকুরের নাচদুয়োর।

    পথার ধারে কচুরিপানা গিজগিজে জলায়, সংসার চিন্তায় এক পায়ে ঠায়মগ্ন মেচোবক। গঙ্গাফড়িঙের ঝিমুনির খাতিরে হাতের পাতা মেলে আছে জলকলমি।

    ঠিকাছে, কাল সকালে একবার আসব। ভুরুর ওপর বাঁহাতের ছায়া ফেলে,ক্যাসিয়ারের কাছ থেকে মুক্ত হল যিশু। শর্টকাটের বদলে ঘুরপথের মুখে ছেড়ে দিয়ে গেল লোকটা। এর চে তো একা গেলে তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেত আলের ওপর দিয়ে।

    হাঁটছিল যিশু। কলাবাগান। রকমারি কলা। তেউড়ের ব্যবসা নিশ্চই। বেহুলা, মন্দিরা, বাতিসা, জাঁতিকোল, মালভোগ, কানাইবাঁশি, চিনিচাঁপা, জাহাজি, মনুয়া, ডয়বাকলা। একজন আইধোইরা তেউড় চাপাচ্ছিল ভ্যান রিকশায়, জানতে চাইল, কটা বেজেছে এখুন। যিশু বাঁহাত নাড়িয়ে দেখায় ঘড়ি নেই। কাজ আরম্ভ করার মুহূর্ত থেকেই অনেকে চায় তা তক্ষুনি শেষ হোক। করমচা গাছের পর বড়ো-বড়ো পাটিগাছ। কুচবিহারের মাথাভাঙায় এর শেতলপাটি হয়।

    পাটিগাছের লাগোয়া দরমার বেড়ার ওপর সার বেঁধে ছড়ানিটিকার সংলাপ বলছিল ফালতা পায়রাদের ভ্রাম্যমাণ দল। ফটফটিয়ে উড়াল দিলে অচেনা লোক যিশুকে দেখে। দরমার বেড়ার ভয়াবহ স্মৃতি থেকে মুক্ত হতে পারেননি ভবেশকা। কী ভয়ংকর এলাকা ছিল দরমার অভিশপ্ত কলোনিগুলো। খাস কলকাতার লোকে যেতে চাইত না ভয়ে। সন্ধে হলেই ময়ূরভঞ্জের রানির বাড়ি থেকে গোড়ে ওব্দি ওৎপাতা আতঙ্ক। মুসুলমান ফুলচাষিগুনো গোড়ে গ্রাম থেকে পালাবার সময়ে গ্রামের নামটা নিয়ে পালিয়েছিল, গোড়ের মালার সঙ্গে-সঙ্গে। সেই গোড়ে এখন নোংরা ঘিঞ্জি গড়িয়া। ভাবা যায় না।

    পরপর তিনটে ধানের মরাই পেরোয় যিশু। অব্যবহৃত পোর্টেবল শৌচাগার। ছায়ায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মাটির খয়াটে প্রতিমার ভিড়, কয়েক বছরের খড় বেরোনো, আঁচ করে যিশু, বোধয় শনি, শেতলা, বিশ্বকর্মার, রক্তাল্পতায় জ্ঞান হারিয়ে নিমতলায় অপেক্ষা করছে প্রকৃতির দাপটের জন্য। তাদের ঘিরে কংরেস ঘাস। বকফুলের গাছ। কত্তো ফিকে সবুজ বকফুল। আশশ্যাওড়া, হিমচাঁপা, কোকিলাক্ষ করবী, বেগনে রঙের কলকে। পায়ের কাছে ফুরফুরে সুসনি। পুকুরে চান করতে নেবেছে খুশিরানি মন্ডল।

    উনিশ

    কে রে ওদিকে ? তিরস্কার-মাখানো কন্ঠস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে অপ্রস্তুত খুশিদি। তাড়াতাড়ি জলে নেবে কেবল মাথাটুকু জলের ওপর। চুল ভাসছে।

    আমি যিশু। যিশকা।

    যিশু ! তবে ? কালকেই তো বৈশাখী পূর্ণিমা। আমি ভাবলুম….

    কী করে ভাবতে পারলে খুশিদি ?

    আমি ভাবলুম আমার বয়েস ফুরিয়ে গেছে বলে..। খুশিদির মুখমন্ডলে ফোঁপানির পূর্বাভাস। প্রতিবিম্ব দোল খায়।

    তা ভুল। অমন ভেবো না। তুমি অপূর্বময়ী।

    তুই ঘরে গিয়ে জিরো। আমি একটা ডুব দিয়েই আসচি।

    না, তুমি চান করো। আমি দেখব। ঘাটের সিঁড়িতে ব্রিফকেস রেখে বসে যিশু। জুতো-মোজা খোলে। পায়ের পাতা জলে ডুবিয়ে বসেছে।

    অনেক অনেক অনেক অনেক বছর পর সাঁতার কাটছে খুশিদি।

    বুকের গামছা ভাসিয়ে দিয়েছে খুশিদি। শায়াও নাবিয়ে দিয়েছে ফাঁস খুলে। জলের চাদর গায়ে জড়িয়ে জলেতে খেলতে থাকে ছিপছিপে ঢ্যাঙা পেশল-গড়ন, এর একরাশ চুল। অনির্বচনীয় স্পন্দন ওঠে জলতলে। পুকুরটাকে জুড়ে সমগ্র ভূমণ্ডল চাষি-মেয়ের আনন্দিত নিরাভরণে অভিভূত। নারীর তরল রূপ পায় জলখন্ডের অমেয় কায়াকান্তি। আসক্ত করে তোলে দশাসই চিতল আর কাতলদের। মৎস্যকুমারী খুশিদি একজায়গায় কিছুক্ষণ তলিয়ে গিয়ে দেদীপ্যমান করে তুলছে আরেক দিকের জল। তলিয়ে ভেসে না-ওঠা ওব্দি যিশু রুদ্ধশ্বাস।

    হিরের টুকরোয় রুপান্তরিত জলের প্রাঞজল ফোঁটারা লাফিয়ে উঠছে বিশাল প্রজাপতির দানার ঝাপটায়, তারপর ছত্রখান হয়ে যাচ্ছে জলের ওপর পড়ে। বাতাস আচমকা নিরুচ্চার। রোমহর্ষে আক্রান্ত হয়েছে ঘাটের পাশে আমলকি পাতারা, নিঃশব্দ জলতরঙ্গের রিনরিন পাতায় পাতায়। এপার থেকে ওপারে, ওপার থেকে এপারে, ওইদিকে, এইদিকে, চারিদিকে, যিশু যেদিকে তাকায়, পুকুরের জলকে উদ্ভাসিত করে তুলছে ত্বকের আলো। রোখ চেপে গেছে প্রথম আনর্গল উৎসর্জনের, নিজেকে উজাড় করার কমনীয়তা। নমনীয়তায় ভর করেছে আজীবন জমানো ব্যথা বেদনা পুলক অভিমানের ভাঁড়ার।

    স্বতঃপ্রবৃত্ত পুকুর সাঁতরাচ্ছে খুশিদিকে ঘিরে, সারা গায়ে মাখিয়ে দিচ্ছে আপ্যায়ন। নারীর জ্যোতির্ময়ি আদলে রূপান্তরিত হয়েছে জলে আটক তরল দুপুর। আর জলেতে ছড়িয়ে দিচ্ছে গাছের ফাঁকে-ফাঁকে এসে-পড়া সূযফরশ্মির গুঁড়ো। মুক্তি পেয়ে গেছে শাড়ি শায়া ব্লাউজ ভিতরের জামায় এতকাল অন্তরীণ দেহলাবণ্য। মুক্তি পাচ্ছে খুশিদের মাথার মধ্যে জমা উদ্দেশ্যহীণতা, অবসাদ, দিনানুদৈনিক।

    দুই হাঁটুর ওপর দু’কনুই রেখে, দু’হাতের পাতায় দুই গালের ভার ছেড়ে দিয়ে, পায়ের পাতা জলেতে, ট্রাউজারের কানাত ভিজছে, যিশু সুনতে পায় নিজের হৃৎপিণ্ডের ক্বণ, নিক্বন, শিঞ্জন, শিঞ্জিনী। মসিদখানি, রেজাখানি শুনতে পায়। ঝাঁজ, ঝাঁজর, দগড়, চিকারি, খমক শুনতে পায়। দেখতে থাকে খুশিদির বিভোর ভাসমান বুক, জানু, মুখশ্রী, এলোচুল, অনাবিল ব্যাকস্ট্রোক, প্লবমান চিৎসাঁতার, উড্ডীন বাটারফ্লাই, অনুসন্ধানী ডুবসাঁতার। এক ঘন্টা, হয়তো দু’ঘণ্টা হয়ে গেল, হুঁশ নেই। জলের সঙ্গে খেলছে চাষিমেয়ে। বাড়িয়ে তুলছে জলের তাপমাত্রা।

    যিশু আমূল সন্মোহিত। পৃথিবীতে ভ্রুক্ষেপ বলে কিছু নেই। লবনাম্বু উদ্ভিদের জরায়ুজ অঙ্কুরোদ্গমের মতন ও, যিশু, টের পায়, অনুরণনের দপদপে লয়ে নিজের উদগ্রীব, থমথমে, উপদ্রুত আহ্বান। খুশিদির বয়েস একটা স্হিতিতে স্হির হয়ে আছে। তারপর আর বাড়েনি। খুশিদির চেয়ে ইতিমধ্যে বয়েস বেড়ে গেছে যিশুর।

    শুশুকের মতন জলের পোশাকসুদ্দু আচমকা উঠে, বাঁহাতে গামছা আর শায়া, জলের তৈরি সলমা-সিতারায় ঠিকরোচ্ছে রোদ্দুর, জলের তৈরি স্বচ্ছ পুঁতি বেজে উঠছে প্রতিটি চুলের প্রান্তে, যিশুর কাঁধে ডান হাতের ভর দিয়ে, খুশিদি একছুটে গিয়ে দাঁড়াল ভাঁড়ারঘরের ছেঁচতলায়। ডাকে হাতছানি দিয়ে। দরোজার আগড় ঠেলে চলে যায় ভিতরে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে স্পর্শ করলে গড়ে ওঠে এক ব্যাখ্যাহীন দায়দায়িত্ব।

    এক হাতে জুতো জোড়া, আরেক হাতে ব্রিফকেস নিয়ে ঘরে ঢুকে যিশু দেখল উদোম খুশিদি চুল ঝাপটাবার আগে গামছা নেঙড়াচ্ছে। ভিজে চুলের প্রান্ত থেকে শানের ওপর টুং টাং টিং টুং ঝরে পোড়ে মিহিন বাজনা-তরঙ্গ তুলছে পোখরাজের খুদে-খুদে পুঁতি। প্রতিটি জলফোঁটার পতনে, আশ্চর্য হয় যিশু, বালক-বয়সে শোনা মায়ের কন্ঠ আবছা ভেসে আসছে :

    টুং : যিশকা, দুপুর রোদে টো-টো করতে বেরিয়ো না, জ্বর হবে।

    টাং : ওদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা কোরো না যিশকা, ওরা হিদেন।

    টিং : আজকাল যিশকা তোমার কথাবাত্রায় রিফিউজিদের মতন টান এসে যাচ্ছে।

    টাং : তুমি নাকি দক্ষিণেশ্বরে হিন্দু টেম্পলে গিসলে যিশকা।

    টুং : খুশির সঙ্গে অমন হাসাহাসি কোরো না যিশকা। ওরা ইল ম্যানার্ড, চাষাভুষো।

    টিং : চাদর নোংরা হলে কাচতে বের করে দাও না কেন যিশকা।

    টিং : যিশকা, অত বাংলা স্টোরি বুকস পড়ে সময় নষ্ট কোরো না।

    টাং : তোমার চুল সবসময়ে অত আনটাইডি থাকে কেন যিশকা।

    টুং : অত-অত ভাত ছোটোলোকরা খায়।

    টিং : স্কুলের খাতায় ওসব হিজিবিজি লিখেছ কেন।

    খুসিদিএ স্মিতস্নিগ্ধ আভায় ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে টলটলে শীতলতা। ঝিকমিক করছে কেশকূপ। অবিনশ্বরতার সমারোহ মনে হয়। চোখের তারায় আত্মগোপনরত রূপাতীত বিষাদের শিশিরবিন্দু ঝরে পড়ছে মেঝেয়। চোখ দুটো আরোগ্যকামনার মতন আয়ত। জুতো আর বাকসো মাটিতে রেখে লুই ফিলিপে আর পিয়ের কার্ডিন থেকে দ্রুত মুক্ত হয় যিশু। দু’বাহুতে নিয়েই, আঃ, কী শীতল। একেই হয়তো প্রাণ জুড়িয়ে-যাওয়া বলে। সামুকের মাংসের মতন ঠাণ্ডা কোমলস্বভাব বুক। অস্ফুটস্বরে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। নিশি-পাওয়া প্রাণীর মতন স্পর্শেন্দ্রিয়। হৃৎস্পন্দনে থিরথির কাঁপছে ত্বক, চ্যাটালো নিম্ননাভি।

    প্রায়ান্ধকার বিশাল ঘরটা, এ বাড়ির সবচেয়ে বড়ো ঘর, যেন নিঃসঙ্গ শোকসন্তপ্ত অচলায়তন। খেতমজুরের, চাষির আর শ্রমিকের হাতিয়ার আর যন্ত্রপাতি আর কাজের জিনিসে ঠাসা ঘরখানা।

    আষ্ঠেপৃষ্ঠে, চাউনির ওপর চাউনি মেলে, শুকনো স্পর্শের ওপর ভিজে স্পর্শ সামান্য তুলে খুশিদি বলল, হ্যারে যিশকা, সকাল থেকে কিচু খাসনি বুজি ? মুখ থেকে খিদের গন্ধ বেরুচ্চে ? সিগ্রেটের গন্ধও বেরুচ্চে। তোর গা কী গরুম !

    হ্যাঅ্যা গো, খাইনি কিছু। সত্যি, তুমি আমার মা আমার দিদি আমার বউ আমার বন্ধু আমার গডেস, সবকিছু। ডেঁড়েমুশে আদর করছিল যিশু। গতরের মোহময় নিভৃতি জুড়ে চারিয়ে দিচ্ছিল এক্তিয়ার, যথেচ্ছ প্রবণতা। দু’গাল ভাত বসিয়ে দিই। আরেকবার নেয়েনে।

    সৌজন্য জানাবার ভঙ্গীতে, ঘরের মেঝেতে ডাঁই-করা মাছ ধরবার জালের ওপর এলিয়ে পড়ে খুশিদি। দেয়ালে খুঁটিতে, কোণে, মেঝের ওপর, বেড়াজাল, বিনজাল, পাঁতিজাল, খেপলা জাল, কুঁড়ো জাল, ভাসা জাল, চুনো জাল, টানা জাল, শ্যাংলা জাল, উঁখা জাল, ধর্ম জাল, খেটে জাল, বেঁওতি জাল, ঘুরণ জাল, ওঃ, কতরকুমের আঁশটে গন্ধের জাল !

    অ্যাতো জাল কী হয় গো ?

    ভাড়া খাটে।

    ভাড়া ?

    হ্যাঁ, মাঝি জেলে মালোরা নিয়ে গিয়ে মাছ ধরে। খালে বিলে পুকুরে দামোদরে যায় গঙ্গায় যায় সমুদ্দুরে যায়।

    যিশু চুপসে যায়। সেই ভবেশকা। শ্রমিকদের আর শিষিতের নেতা ভবেশকা। আজকে তাদের হাতিয়ারকে ভাড়া খাটাচ্ছে। এই ঘরের সবই ভাড়ার, অবিশ্বাস্য। লাঙল, জোয়াল, ডিজেল-পাম্পসেট সব, সব, সব ভাড়া দেবার জন্যে।

    ওই পেতলের ঘড়াগুনো ? ওগুনোও ভাড়া দেবার ?

    না, ওগুনো বন্দকিন। চাষি বউরা, মুনিশ বউরা বন্দক রেকেচে।

    বন্ধক ?

    বন্দক জানিস না ? বনদোওওওক বনদোওক। ঘড়া-বাসন বাঁধা দিয়ে ট্যাকা ধার নিয়েচে।

    সুদে টাকা নেবার জন্যে ?

    হ্যাঁরে। একশো ট্যাকায় মাসে দশ ট্যাকা।

    মাসে ?

    হ্যাঁ, মাসেই তো। কেন ?

    ঘড়াগুনোর ওপর, যেগুনো খুশিদির মাথার কাছে রাখা, দেখতে পাচ্ছিল যিশু, তাতে ছোটো-ছোটো কাগজ সাঁটা। কাগজের ওপর নাম আর তারিখ দেওয়া। লক্ষ্মী লোহার। পদ্ম মান্না। বিবিজান। রাধা পোড়েল। চম্পা সাঁপুই। কনকবালা দাস। আশা ঘরামি। আরও অনেক অনেক অনেক অনেক। পিতলের বাসন চিরকাল থেকে যাবে। মন খারাপ হয়ে যায় যিশুর।

    তোমার পিঠে ফুটছে না তো ? উষালগ্নের মতন বাহুমূলে ছুঁয়া বুলিয়ে জানতে চায় যিশু। দৃশ্যমান জগৎ থেকে এই ঘরের বস্তুপৃথিবীকে অস্বীকার করার জন্য ও চোখ বোজে।

    খুশিদির চাউনি হিমায়িত, শ্বাস গনগনে, খিদের গন্ধের খোঁজে পুরুষের হাঁ-মুখে নারীর অনাস্বাদিতপূর্ব জিভ। গলা-কাটা মোরগের মতন কেঁপে ওঠে শরীর। সাপ যেভাবে জিভ দিয়ে গন্ধবস্তুর কণা বাতাস থেকে তুলে নিয়ে নিজের ঘ্রাণিকা ইন্দ্রিয়ের গ্রন্হিতে মাখিয়ে নেয়, ওরা দুজনে একে আরেকের ভারাতুর অনুভূতি মেখে নিচ্ছিল অসংলগ্ন কথাবার্তা দিয়ে। প্রমোদ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে ওদের হাত, ভক্তিনম্র স্পর্শ।

    কাল, বৈশাখী পূর্ণিমার সন্ধ্যায়, শেষপুকুর ছেড়ে যাবার বিস্তারিত পরিকল্পনা শুনে খুশিদি বলল, আমার তো কেমন যেন ভয় করচে, আজগে এক্ষুনি চলে গেলে ভালো হতো। শুনে আবার অনুশোচনা হল যিশুর। গাড়িটা রেখে দিলেই হতো বরং। খুশিদির ভয়ের যে কী আছে এই বয়েসে।

    তোমাকে তো জোর করেই নিয়ে যেতে পারি।

    না না না না না না।

    অদ্ভুত, সত্যি। ভাবল যিশু। পশ্চিমবাংলার গ্রাম মানেই ভয়ের চক্রব্যূহ।

    এ-ঘরেই শুস তুই যিশকা। থালে দাদার সন্দেহ হবে না। মশারি টাঙিয়ে দেবোখন রাত্তিরে। তুই যদি পালটি ঘর হতিস কত ভালো হতো থালে।

    পালটি তো। তুমি মেয়ে, আমি ছেলে।

    খুশিদি ওঠে ওভাবেই, নিরাবরণ, খাটের ওপর রাখা জালগুলো নাবায়। খাটের তলায় রাখা মরচে-পড়া হাতুড়ি দুরমুশ কাস্তে করাত কাটারি উকো নিড়ুনি হেঁসো টাঙি বল্লম খন্তা গাঁইতি দাউলি কোদাল ঠিক করে সাজায়। ঘরের মাঝে রাখা ডালা কুলো ডাবড়ি চারি সিউনি তসলা ধামি এক-এক করে এক পাশে সরিয়ে গুছিয়ে রাখে। কাজের দ্রুততায় যিশু অবাক, মুগ্ধ। গেমে গেছে। ছাদ-পাখার সুইচ টিপে বলল, ঠিকাছে, চলছে, রোজই তো অ্যাগবার দুবার ঢোকে দাদা।

    জিরিয়ে নাও একটু, ক্লান্ত হয়ে গেছো।

    যাঃ দাঁড়া, চাদর তোশক বালিশ আনছি। তুই ততোক্ষুণে পুকুরে একডুব দিয়ায়।

    চান তো করেই বেরিয়েছি সকালে। আরেকবার তোমাতে ডুব দিই। দখলের অপ্রতিরোধ্য চাহিদায় যিশু বাহুবদ্ধ করে খুশিদিকে। বিচ্ছুরিত ঘামসুগন্ধের আ-আলজিভ ঘ্রাণ নিলে। ওর হাতের ঔৎসুক্য ফুরোয় না।

    যাঃ, শরীর খারাপ হবে। খালি পেটে রইচিস না।

    হলেই বা। নিষেধ থাকলেই ভাঙতে হয়।

    আচ্ছা, সেবার যেসব মন্তর আমার জন্যে পড়েছিলি, সেগুনো আরেকবার বলবি ? যিশকা ?

    যিশু কাঁধ কাঁপিয়ে হাসে। নতজানু, জড়িয়ে ধরে উতলা আগ্রহে। বলে, তুমি শান্ত, তুমি দাস্য, তুমি সখ্য, তুমি বাৎসল্য, তুমি মধুর। যিশু উঠে দাঁড়ায়।

    দেহের হালকানো ভার যিশুর ওপর ছেড়ে দিয়েছে খুশিদি। আর খুশিদি, নিঃশব্দ কান্নায় কেঁপে-কেঁপে আপ্লুত করছে ওকে। খুশিদির চোখের জল নিজের গালে অনুভব করে যিশু। জিভ দিয়ে কান্নায় নুনের স্বাদ পায়। খুশিদির থুতনিতে টোল। কাঁপছে।

    চুপ করলি কেন ? আরও বল, যিশকা।

    তুমি অনিমা, তুমি লঘিমা, তুমি গরিমা, তুমি প্রাপ্তি, তুমি প্রকাম্য, তুমি ঈশিত্ব, তুমি ঈশিত্ব। এসব মন্তর যিশুখ্রিস্টের মায়ের জন্যে।

    সে কে ?

    আমার মা-বাবার ভগবান। যিশু কৈশোরের স্মৃতিতে যেতে চেষ্টা করে।

    চুপ করে গেলি কেন ? চুপ করিসনি। বল। বলতে থাক। যিশকা।

    তোমার ডান কাঁধে পোকা কামড়াল বোধয়। লাল হয়ে গেছে।

    ওটা জড়ুল। জন্মে ওব্দি আচে। তুই থামলি কেন ? খুশিদির কন্ঠস্বরে ভাঙন।

    তুমি মঙ্গলা, তুমি বিজয়া, তুমি ভদ্রা, তুমি জয়ন্তী, তুমি নন্দিনী, তুমি নারসিংহী, তুমি কৌমারী। কিছুক্ষণ চুপচাপ, তারপর শেষতম নিদানের মতন যিশুর ফিসফিস, আর কত কষ্ট পেতে চাও খুশিদি ? কেনই বা চাও ?

    খুশিদি সটান দাঁড়িয়ে আছে চোখ বুজে, ওপর দিকে মুখ, চাষি-মেয়ের শ্রমসোহাগী পেশল বাহু ঝুলে আছে দু’পাশে, কাঁধে এলিয়ে নাবা ভিজেচুলে বুক ঢাকা, নাভির ঘাম শুকোয়নি এখুনও, পায়ের গোছ আর পাতা জুড়ে অনুপম কৌলিন্য।

    মুগ্ধতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে যে সত্তা, তার দুর্নিবার ঔজ্জ্বল্যের সঙ্গে পরিচিত হয় যিশু।

    কুড়ি

    বুকড়ি চালের ভাত আর আগাছা ট্যাংরার ঝোল খেয়ে, অবেলা ওব্দি ক্লানত গুম ধেকে উঠে, দাওয়ায় বেরিয়ে যিশু দেখল, হাতল-আলা চেয়ারের পিছনের দু-পায়ায় ভর দিয়ে দোল খাচ্ছে ভবেশকা। কালো ভারিক্কি চশমা। বাঁ পায়ে ভয়ানক ঢেউ-খেলানো গোদ।

    ভবেশকার পায়ে গোদ ! ভাবা যায় ? লাফিয়ে উঠে যেত পুলিশের ভ্যানে। মিছিলের নেতৃত্বে হেঁটে চলে যেত এসপ্ল্যানেড ইস্ট পর্যন্ত। একবার তো কলেজ স্ট্রিটে বাসের ছাদ থেকে রাস্তায় নেবেছিল লাফিয়ে, প্রেসিডেন্সি কলেজের ছেলেরা দেখেছিল, অ্যালবার্ট হল কফিহাউসে বসে গল্প করেছিল বহুকাল ওব্দি। গোদের জন্যই বোধয় গেরুয়া আলখাল্লা। আলখাল্লার জন্যে সত্য সাইবাবা।

    জলেতে ভুরু ভাসিয়ে-রাখা কুমিরের মতন চশমার ফ্রেমের ওপর দিয়ে চোখ তুলে নাকচ-করা দৃষ্টি মেলে, সর্দিগর্মিতে নাকবন্ধ গলায় ভবেশকা বলল, কী এখুনো আলুর রিপোর্ট ফাইনাল কত্তে পাল্লে না ? কী-ই বা আচে এতে ? আমি তো অ্যাক দিনে লিকে দিতে পাত্তুম।

    এরম অনেক মানুষ আছে। জানতে না চাইলেও নিজের বিষয়ে বলবে। গতবার তারকেশ্বর লোকালে, ঠাসাঠাসি-গাদাগাদি ভিড়ে ওর, যিশুর, গায়ের ওপর দাঁড়িয়ে এনতার কথা বকছিল দুজন বউড়ি যুবতী। ছোট্টখাট্ট গোলগাল, অত্যধিক সিঁদুর। যিশু বসেছিল, আর ওর দিকে মুখ করে ওরা দুজন দাঁড়িয়ে, ওর কাঁধের ওপর দিয়ে জাল আঁকড়ে। ওদের নির্ভেজাল অতিমাংসল বুকে যিশুর নিশ্বাস পড়ছিল নিশ্চয়ই। চানাচুর চিবোবার শব্দের মতন ওদের একজন বলে উঠেছিল, আমো তো অ্যাকদোম সেন্টটেন্ট মাকি না। যিশুর বিদেশি পারফিউমের প্রতি কটাক্ষ। দার্শনিক গাম্ভীর্যের আড়ালে যিশু বুঝতে পারছিল, এদের মাংসের ঘর্মাক্ত অকৃত্রিম গন্ধ যদিও ওর খারাপ লাগছে, তবু তা এক ঝটকায় বিপথগামী করে দিতে পারে। ওদের লাল ব্লাউজের আহ্বায়ক বাহুমূলের টানটান সাদা সুতোর সেলাই, যিশুকে চোখ বুজতে বাধ্য করেছিল।

    বউ দুটির তক্কাতক্কি, কার জামাইবাবু শালির পেটে বাচ্চা এনে ফেলেছিল, দোষ তিনজনের মধ্যে কার, এখুন কী করণীয়, তাই নিয়ে। কইকালার ঘরজামাই নিতাই সাহা। শালি, একমাত্র, কণা। বউটার নাম আলোচনায় আসেনি। ওদের গল্পের থুতুর ছিটে লাগছিল নিরুপায় যিশুর মুখে-হাতে-গলায়। হাওড়ায় নাবার সময়েও নিষ্পত্তি হয়নি কার আত্মহত্যা করা উচিত, তিন জনের মধ্যে কার। প্ল্যাটফর্মে পা দিয়ে, ওদের পাশ দিয়ে যেতে-যেতে যিশু আলতো শুধিয়েছিল, দুজনকে দুপাশে নিয়ে শুক না নিতাই, ঘটেই যখন গেছে ব্যাপারটা।

    এখন, এই মুহূর্তে, ভবেশকার কথার কী উত্তর দেবে ? ভবেশকা বোধয় দুর্ব্যাবহারের সম্ভাবনা গড়া তোলার লোভে পড়েছে। কারণ, মনে হয়, আলু। একদা হুগলি জেলার কংরেসিরা বাজার থেকে আলু লোপাট করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে আস্তিন গুটিয়ে বাসে-ট্রামে আগুন ধরিয়ে গুলিতে মরার জন্য রাজপথে নেবেছিল পরোয়াহীন যুবক ভবেশকা। আজ পায়ে গোদ, গেরুয়া, বাবরি চুল, আলখাল্লা, বুড়ো, মহাজন, ভূস্বামী, আঙুলে গ্রহরত্নের রুপোর আংটি, ধর্মগুরু, দলাদলি, ভবেশকার কিচ্ছু যায়-আসে না। হাজার-হাজার কুইন্টাল আলু পচলে, আলু-চাষি সর্বস্বান্ত হলে, আলুর দাম পাকা বাজারি-কাঁচাবাজারি দাঁওপ্যাঁচে নিম্নবিত্তের পক্ষে অসহনীয় হয়ে গেলেও কিচ্ছু যায়-আসে না। পচা আলু আসা আরম্ভ হয়ে গেছে শহরগঞ্জের বাজারে। চাষিরা গোর দিচ্ছে।

    নির্লিপ্ত নির্বিকার নৈর্ব্যক্তিক মহারাজ ভবেশকা বসে আছে প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবকত্বের জাদু-সিংহাসনে, নাক ফুলিয়ে, হাসি নেই। জিভের ভাষায় আড় পর্যন্ত পালটে, করে ফেলেছে স্হানীয়। পায়ের গোদে হাত দিয়ে হিন্দুয়ানি প্রণাম করে যিশু বলল, প্রান্তিক চাষিদের সার আর সেচের চাহিদা-জোগানের ব্যাপারটা দেখিনি তখুন, আজকে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে নেব। তুমি ভালো আছ তো ? কথাগুলো বলতে-বলতে যিশু দেখল বারান্দায় ঘটি আর জলভরা বালতি রাখা রয়েছে। গোদ-ছোঁয়া হাতটা ধুয়ে নিতে হবে।

    আমি ? হঁ। আরে আমরাও তো সব কল্লুম, নইলে কোতায় থাগতে তোমরা আজগে ? তা ভেবে দেকেচো ? এই যে ধরনা, ঘেরাও, বয়কট, অবরোধ, ধীরে চলো, কর্মবিরতি, র‌্যালি, সমাবেশ, হরতাল, পথসভা, গেটসভা, এইসব ? এই সব গণতান্ত্রিক হাতিয়ার। এসব চাড্ডিখানি কতা নয় হে। নদী যেভাবে নিজের ঘোলাস্রোতে গা এলিয়ে দেয় বর্ষার বাজে কথায়, ভবেশকা, দরবেশ-পোশাক ভবেশকা, বলে যায় নিজের অভ্যস্ত গল্প। নিমের দাঁতনের মতন আতীতকে চিবিয়ে-চিবিয়ে ছিবড়ে বার করে ভবেশকা। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে, থামে হেলান দিয়ে শুনতে-শুনতে, খেই হারিয়ে ফেলে যিশু। ওর চারপাশে ওড়ে খোশমেজাজ বুদবুদ।

    আচমকা একটা কোকিল ডাকতে আরম্ভ করে। উত্তেজনার পর্যায়ে উঠে যায় পাখিটার ডাক। ভবেশকাকে বাধ্য করে রোমন্হন পালটাতে। তোমার জন্যে কামারপুকুরের বোঁদে আর সিঙুরের দই আনিয়ে দিয়েচে কৃপাসিন্ধু, জলখাবারে খেয়ে দেকো। আর খানাকুল থেকে কালাকাঁদ আনতে বলেচি বিষ্ণু সাঁবুইকে।

    যিশু ফিরে আসে সম্বিতে। মিষ্টিগুনোর নামের মধ্যে মিষ্টিগুনো আর নেই। শব্দের মানে ব্যাপারটা পশ্চিমবঙ্গে আজ মৃত্যুশয্যায়। ও, যিশু, দেখল, আর্কাজাতের করলার জন্যে টাঙানো তারের মাচার তলায় ঢুকে, বেলে-দোআঁশ মাটিতে বসানো হলুদ চারার কেয়ারি বাঁচিয়ে করলা লতার শুকনো পাতা ছাঁটাই করছে খুশিদি, কুঁজো বুড়িদের মতন ঝুঁকে। খুশিরানি মন্ডল। পনেরো থেকে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে বয়সের স্হিতিস্হাপকতাকে ইচ্ছেমতন নিয়ন্ত্রণ করে খুশিদি। বিশুদ্ধ আকর্ষণ ছাড়া বিশুদ্ধ যৌনতা হয় না। কীভাবে, কোথায়, মুলতুবি ছিল এই আকর্ষণ ? মস্তিষ্কে ? হবেওবা।

    আচ্ছা ভবেশকা, তুমি নিজেও বিয়ে করলে না, খুশিদিকেও আগলে-আগলে রাখলে, বিয়ে দিলে না। কেন বলো তো ? যিশুর অযাচিত প্রশ্নে আপ্রস্তুত ভবেশকার ্তচকিত চমক। যেন এই প্রশ্নের উত্তর আজীবন লুকোতে-লুকোতে নেশা ধরে গেছে কোনও গোলকধাঁধার আমোদে। হরিণের উৎকর্ণ মাথা নাড়িয়ে খুশিদি রান্নাবাড়ির দিকে চলে যায়।

    ভবেশকা দু-হাত সামান্য তুলে ঘোরায়। বলল, লোকে করলা, লাউ, কুমড়ো, চিচিঙে, ঝিঙে গাছে আজগাল ডিডিটি আর বিএচসি দিচ্চে, ভাবদে পারিস, অ্যাঁ ? দেকগিজা, দেকগিজা, আমার মাটিতে লেদা, চুঙি, পাতামোড়া, কুরনি, গণ্ডারে, কাঁটুই কোনও পোকা পাবি না তুই। হাতের তালুতে আগুনে-বাত হয়ে চামড়া উঠছে ভবেশকার, বলল, পানের চাষও করেছিলুম, বুজলি, আংরা দাগ ধরে বড্ডো, নইলে…

    জবাজবদিহি চেপে রাখত চাইল না যিশু। আত্মতৃপ্ত প্রশান্তি থেকে নাড়া দিয়ে ভবেশকাকে টেনে বের করার চেষ্টায় নাছোড়, অস্বাভাবিক প্রত্যয়ের সঙ্গে জানতে চায়, কই বললে না তো, সংসার পাতলে না কেন ? সামান্য থেকে, সতর্কতা মিশিয়ে সন্তর্পণে যিশু বলল, খুশিদিরও বিয়ে দিলে না কেন ?

    যিশুর দিকে না তাকিয়েই হাসল ভবেশ মণ্ডল। পরস্পরকে বিব্রত করার মতন কিছুক্ষণের স্তব্ধতা। থামে হেলান দিয়ে উত্তরের অপেক্ষায় যিশু। হাসনিহানার নিরিবিলি গন্ধের বিচ্ছুরণে দুজনেই টের পায়, সন্ধে নেবেছে বহুক্ষুণ। জুনিপোকার উড়ন্ত আলোয় ধুকপুক করছে অন্ধকার। নিষেকের পর করলা-ফুলের ডিম্বাশয় চুপচাপ রূপান্তরিত হচ্ছে ফলে।

    চেয়ার থেকে তার ক্যাঁঅ্যঅ্যঅ্যচ শব্দটা নিজের পাছার সঙ্গে তুলে নিয়ে ভবেশকা বলল, ভবিতব্য হে ভবিতব্য। যেন ভবি আর তব্য আলাদা-আলাদা।

    মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যিশু দেখতে পায় মশারির বাইরে খুশিদি। উঠে এসেছে নিজের ঘর থেকে। অনুচ্চস্বরে বলল, যিশকা, সরে শো, একটু জায়গা দে।

    এত অস্ত্রশস্ত্রের ঘরে কেন শুতে দিলে খুশিদি ? জিগ্যেস করেছিল যিশু, যখন যিশুকে করলা-ফুলের পরাগ মাখিয়ে আর নিজে কাকভোরের বাতাস মেখে চলে যাচ্ছে খুশিদি। আর খুশিদি বলেছিল, শিয়োরে লোহা নিয়ে শুলে ভুতপেত দূরে থাকে। তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল যিশু। ঘুম ভাঙলে শেনতে পায় খুশিদির একটানা কন্ঠস্বর:-

    কোতায় আচো গো মাতা লক্ষ্মী দয়াবতী

    কাতরে তোমার পায়ে করিগো মিনতি অ্যাকেতো অবলা মোরা তাতে ভক্তিহীন বিদ্যেবুদ্ধি শক্তিহীন সদা অতি দীন

    না জানি করিতেস তুতি না জানি পুজোন কেমনে তোমারে মোরা করি আবাহন কেবলি ভরোসা মনে ইহা শূন্য আচে যে তোমাকে ডাকে তুমি যাও তার কাচে নিজ গুণে কিপা করি বসিয়ে আসনে কিপা দিষ্টি করো মাগো যতো ব্রতীজনে এই মাত্র বর তুমি দেও গো সবায় সতত ভকোতি যেন থাকে তব পায়

    লক্ষ্মীর রেফারেন্স রয়েছে যখন, তার মানে এটা বোধয় পাঁচালি, শুনে-শুনে মুখস্হ করে ফেলে থাকবে খুশিদি। এভাবে দিনের পর দিন মুখস্হ বলার কথাগুলোর কোনও মানে কি আর আছে খুশিদির কাছে ? যিশুর মনে হল এ যেন খুশিদিরই বন্দনা। আজানা কোনও কিছুর প্রতি খুশিদির এই প্রগাঢ় আত্মসমর্পণ আর বিশ্বাসের ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তার জন্যে হিংসে হয় যিশুর। কত লোক, হাজার-হাজার লোক, ইদের দিন নামাজ পড়ে। রবিবারের দিন চার্চে হাঁটু গেড়ে হাতজোড় করে বহুক্ষুণ নিঃশব্দ প্রার্থনা জানায়। মন্দিরের সিঁড়িতে বহুক্ষুণ যাবত মাথা ঠেকিয়ে থাকে। বিভোর হবার মতন ওই বীজ, খুসিদির সংস্পর্শে এসে, খুশিদির জন্যে, নিজের সত্তায় আবিষ্কার করে, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল যিশুর।

    বিছানা ছেড়ে জামাকাপড় পরে যিশু বেরিয়ে পড়ে গাঁয়ের আঁদুল-কাঁদুল ঘুরতে। ফেলে-ছড়িয়ে রোদ উঠেছে। রোদ্দুরের ভয়ে বটগাছটার ছায়াসঙ্গিনী তখুনও ওর তলা থেকে বেরোয়নি। বুড়ো শিব ঢাকা পড়ে আছে শুকনো বটপাতায়। কিংবা এখুন পার্বনহীন অনাদরে শেষনাগ হয়ে আছে। পাতাগুনো ওপর থেকে কয়েকটা সরিয়ে দিল যিশু। পিঁপড়ের কাতার। সাতসকালে কেউ এসে চিনিগোলা দুধ ঢেলে থাকবে। গাছটার ডালে ডালে বুনো মউমাছির চাকগুনো থেকে একাধ কুইন্টাল মোম বেরোয়। কত লিটার মধু আছে কে জানে। বটগাছটা মধু চায় না।

    মন্দিরে পুজুরিটা একা। দেবতার সাজগোজ চলছে। মেলার দোকানপাট অগাধ ঘুমে। তালটিকুরির দিকটায় দার্শনিক উদাসীনতায় হাগতে বসেছে বুড়ো আর জোয়ান। যাত্রাদল আসছে মেলায়। মুনমুন সেন আর তাপস পালের গালফোলা পোস্টার। যাক, ভালোই, বিকেল থাকতেই পুরো তল্লাট ছেয়ে যাবে অচেনা গাদাগাদি ভিড়ে। লাঙল আর জোয়ালের কাঠ কিনতে আসে মেলাটায় দূরদূর থেকে চাষিরা। বেগমপুর আর গুপ্তিপাড়া থেকে সং আসে। ঘন্টাকয়েক পর থেকেই লোকজনের যাতায়াত শুরু হয়ে যাবে মেলায়।

    ভোরের আলোর কুচিকুচি ঢেউ যিশুর চোখেমুখে ঠাণ্ডা হাওয়া মাখাচ্ছিল।

    চারিদিকে মূষিক প্রসবকারী গর্ত। সারোতা, গোপের হাট, খেমাপাড়া, তেঘাট যাবার ছক্করগাড়ি আর ভ্যান-রিকশা এই ভোর থেকেই। রাস্তা পার হচ্ছিল একজন বুড়ো চাষি। হাতে ধরা দড়িতে রোগাটে দিশি গাই, পেট ঢোকা, পাঁজর জিরজিরে। যিশুর দিকে তাকিয়ে বলল, গোরুটার আওয়া হয়েচে, গুয়াবুড়ি শাগ খাওয়াতে নে যাচ্চি। রোগ আর তার ওষুধ, দুটোর কিছুই জানে না যিশু। কী বলবে ? রাস্তার পাশে হিলুয়ার ভূঁয়ে নেবে-পড়ে ফিতে-কিরমিতে ভোগা গতরের বৃদ্ধ আর তার গাই।

    রাস্তার দু’ধারে আলুর বস্তা, একের ওপর আরেক, গোটা বিশেক করে, পড়ে আছে হিল্লে হবার অপেক্ষায়। কবে কে জানে। পাহারা নেই। রাস্তার কিনার-বরাবর একের পিছনে আরেক চাষি বা খেতমজুর, লুঙ্গি-গেঞ্জিতে, সাইকেলে তিনটে বস্তা চাপিয়ে ঠেলতে-ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে, ভারসাম্য বজায় রেখে। কে জানে কোথায় যাচ্ছে। মুখ খুলে কথা বললেই কাহিল হয়ে পড়বে লোকগুনো।

    মোড়ের ঝুপড়িতে বসে চা আর ভাণ্ডারহাটির রসগোল্লা খায় যিশু। মহানাদের খাজাও ছিল। তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে চমচম খেতে ভালোবাসত খুশিদি। ছবি বিশ্বাসের বাড়ির পাশেই ছিল ময়রার দোকানটা। খ্রিস্টান চরিত্রে অভিনয়ের খুঁটিনাটি জানার জন্যে বাবার কাছে এসেছিল কয়েকবার। এখানে ভবেশকার বাড়িতে চায়ের ব্যবস্হা নেই। এককালে চায়ের পর চা না হলে ভবেশকার গলায় বক্তৃতা আটকে যেত। ভবেশকাদের যুগের আগে এমন ছিল যে ফরসারা কালোদের, ঢ্যাঙারা বেঁটেদের, শহুরেরা গেঁয়োদের, সবর্ণরা অন্ত্যজদের, পয়সাঅলারা গরিবদের, ধোপদুরস্তরা নোংরাদের, টেরিকাটারা উস্কোখুস্কোদের, রাজনৈতিক বক্তৃতা দিত। এখনও আছে অনেকটা। অ্যাবং, অ্যাবং, অ্যাবঙের শিকলি জুড়ে-জুড়ে কজনই বা অবিরাম বকে যেতে পারে। বাংলাভাষাটা তো আর সব বাঙালির নয়। বেশিরভাগ লোক তো স্যাঙাত হয়ে ল্যাঙাত খায়।

    চা খেয়ে, গোপের হাটের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে, একটা পেঁপে বাগান দেখতে পেয়ে, গাছে-গাছে কুর্গ-হানিডিউ জাতের সোমথ্থ পেঁপে, কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে যখুন মনে-মনে প্রশংসা করছিল যিশু, বাগানের ভেতর থেকে দোহারা যুবক, জিনস প্যান্টে গোঁজা হাতকাটা গেঞ্জি, শহুরে স্মার্ট চেহারা, ডাকে ওকে, আপনি তো স্যার ভবঠাকুরের আত্মীয়, শুনেছি, হিমঘর নিয়ে গবেষণা করছেন।

    যিশুর মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে ভয়। মাত্র ক’দিনে লোকে ওর গতিবিধির সঙ্গে পরিচিত। ভাগ্যিস মেলা আর যাত্রার ভিড় থাকবে, নইলে বিপদ অনিবার্য। গ্রামে আর ঘোরাঘুরি চলবে না। বহিরাগত সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা আর ঔৎসুক্য থাকবেই। যিশু বলল, দু-আড়াই কেজির ফল হয়, না ?

    যুবক তার গাছের অস্মিতা ধার করে। আজ্ঞে স্যার তিন কেজি ওব্দি হয়। যিশু এর পর মাটি আংলানো, বীজে সেরেসার ড্রাই মাখানো, মাটি চৌরস, নুভাক্রন স্প্রে, হাওয়া-পরাগি ফুল, কত মাদিগাছের জন্যে কটা নরগাছ, তরুক্ষীরের পেপেন, লালমাকড়, কুটে রোগ ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্নের সিরিজ সহযোগে যুবকের মনে শ্রদ্ধা তৈরি করলে, যুবক ওকে তাদের বাড়ি যেতে বলে। ওই তো, দেখা যাচ্ছে, স্যার আসুন না।

    আরেকদিন কখুনো, জানিয়ে, ফেরার রাস্তা ধরে যিশু। জানা রইল বাড়িটা, দরকারে কাজে লাগবে। কিন্তু ও খ্রিস্টান জানলে পুরোটা শ্রদ্ধা কি বজায় থাকত ? ভবেশকাই হয়তো সিংহাসনচ্যুত হয়ে যাবে, জানাজানি হলে। ভবেশকাও বলবে না কাউকে।

    ফিরে, যিশু দেখল, জাবেদালি এঁড়ে বাছুরটার লাফঝাঁপ সামলে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। ভাগচাষিদের গ্রামীণ রাজনীতির বখরা দিয়ে বর্গা এড়াবার কায়দা করে ফেলেছে লোকে। ভবেশকার পরিবার বলতে কেবল ভাই-বোন। জাবেদালি ক্ষমতার বখরাটুকুতেই তৃপ্ত। অনেক জায়গায় তো ভাগচাষ এড়াতে লোকে এড়িয়ে যাচ্ছে চাষবাস, ইউকালিপটাস পুঁতে ফেলছে অথচ এখানেই পোলবা থানার হালসুই গ্রামে প্রথম বর্গা ক্যাম্প বসেছিল। হিমঘরের আলু পচিয়ে সেই পোলবা আজ জগদবিখ্যাত, সত্যিই জগদবিখ্যাত। পচা আলু থেকে চামড়ায় রোগ ধরেছে চাষিবউদের ; সারছে না।

    জাবেদালি জানালে, ভবঠাকুর হিমঘরে গেছে, যিশধ যেতে পারে যাবার থাগলে। হৃৎপিণ্ডে সমুদ্র চলকে ওঠে, শব্দ শোনা যায়। দাওয়ায় উঠে জুতো খুলে রেখে, তার পর নেবে হেঁসেলে ঢুকে যিশু দেখল, চাকা-চাকা আলু কাটছে খুশিদি। অত্যধিক ধেনো-টানা পথে পড়ে-থাকা মাতালের মতন একটা শোলমাছ বিলকিয়ে উঠছে থেকে-থেকে ঘরের কোণে। ধোঁয়াহীন চুলাটায় বোধয় প্রথম দিনের পর আর রান্না হয়নি। বাসনকোসন সবই কাঁসা আর পিতলের। এ-গ্রামে এখুনও স্টেনলেস স্টিল ঢোকেনি বোধয়। চালায়-ছাদে বুস্টার লাগানো অ্যান্টেনা দুতিনটে নেতাবাড়িতে নজরে পড়েছে গ্রামে। ভবেশকার নেই। কেবল-ও, পার্টির অনুমতি আর ট্যাক্স ছাড়া টানা যায় না।

    মেঝেয় বসে যিশু বলল, আমি তো বেজাত, মদ মাংস গোরু শুয়োর সব খাই।

    জানি তুই মেলেচ্ছো, ওই পিঁড়েটা নিয়ে বোস।

    তোমাকেও ম্লেচ্ছ করে তুলব।

    আমার কিন্তু বড্ডো ভয় করচে। আমি এমন অপয়া। অশথ্থগাছ তুলে পুঁতেছিলুম, তাই। অশথ্থগাছ ওপড়াতে নেই। নম্রতায় ঢাকা খুশিদির সত্যিকার আশঙ্কা।

    কুটনো কোটা হয়ে গেলে, তোলা উনুনের পাশে যখুন বঁটিটা মুড়ে রাখছে খুশিদি, যিশু বলল, ভবেশকাকে যদি বলি, আমি তোমায় নিয়ে যাচ্ছি, বিয়ে করতে চাই, তাহলেও রাজি হবে না ভবেশকা ; কেন, আমি জানি।

    না না না না না না। প্রায় আঁৎকে ওঠে খুশিদি। অ্যাকদোম পাড়িসনি ওসব কতা। খুশিদির আতঙ্কিত মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে কয়েক দশক যাবৎ জমানো অন্তরঙ্গ উচ্ছ্বাসের রক্তিমাভ আকুতি। পারবি তো ? যিশকা ?

    তোমাকে এভাবেই আগলে রেখে দেবে ওনার হিমসংসারে। কেন, আমি জানি। তার পর পচা আলুর মতন……

    তুই আজ বাইরে-বাইরেই থাক। আকাশের মুকও আজ যা দেকচি, বিকেলে হয়তো কালবোশেখি আসবে, ভালোই হবে একদিক থেকে। ভাঙা গলায় বলল খুশিদি। যেন নিজেই নিজেকে পাহারা দিচ্ছে। পোড়াবাড়ির ডাকবাক্সে বহুদিন পড়ে-থাকা চিঠির মতন কেমন এক প্রাপকহীনতা ভর করে আছে। উঠে পড়ে যিশু। হিমঘর রওনা হয় মোজা-জুতো পরে।

    সকালের উদার শীতবাতাসকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে অন্তরীক্ষ। রোদের কণায় ঘষটানি খেয়ে দিনের আলো ক্রমশ ্য়ে উঠছে অনচ্ছ। অশোভন বৈশাখী গরম। কর্মযজ্ঞে প্রবেশ করার আগে পাতাহীন মগডালে বসে আছে তরুণ শকুনেরা। নিজেরই অনন্যোপায়, আকাঙ্খার আক্ষেপ, খুশিদির জন্যে পুনর্জীবিত বয়ঃসন্ধি, হিমঘরের দিকে যেতে-যেতে, নিজেকে বোঝার চেষ্টা করছিল যিশু। আর কখুনও তো এরম হয়নি, কারুর জন্যে। লাফিয়ে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে নিজের ভেতর থেকে। ঢোলবাদকদের বাহুর দুপাশে বাঙ্ময় ডানা মেলে ছুটতে ইচ্ছে করছে আলের ওপর দিয়ে।

    হিমঘরে ভবেশকার দরবার বসেছে। চিন্তান্বিত ভবেশকা প্রৌঢ় আই-এ-এস আমলার ঢঙে কালো ফ্রেমের চশমা খুলতে গিয়ে হাত নেড়ে বলতে চাইছিল কিছু। চা ভরতি গেলাস টেবিলের ওপর থেকে পড়ে চুরমার। অস্বাচ্ছন্দ্যের তাৎক্ষণিক ঘোর থেকে চকিতে নির্মিত প্রসন্নতায় যেতে দেরি হয় না। এসো, এসো, পুলিন তুই টুলটায় বোস, যিশুকে বসতে দে।

    এক ডজন লোক হবে এখানে। একজন বিশাল-পাছা মহিলা, পঞ্চায়েত কি পার্টির উঠতি-নাবতি কেউ। যিশু কেবল কৃপাসিন্ধু আর শাসমলকে চেনে। পুরুষগুনোকে দেখে মনে ্চ্ছে এরা কেউ চান করে না, চুল আ#চড়ায় না, নিয়মিত দাড়ি কামায় না। একত্রত হলে গুজগুজ-ফিসফিস করে। বাঙালির রেনেসঁসের উত্তেজনায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণকারী পূর্বপুরুষদের মাত্র চতুর্থ উত্তরপুরুষ ওব্দি পৌঁছে বাঙালি গ্রামসমাজে যিশু নিজেকে বেমানান পেল। এদের দেখে কথাটা স্পষ্ট যে ধুতি পরার রেওয়াজ গ্রামেও শেষ হয়ে এল।

    শাসমল ঘড়াঞ্চি সিঁড়িতে বসে। কিছু বলার জন্যে হাঁ করেছিল। মুখ বন্ধ করে অক্ষরগুনোকে ফুসফুসে ফেরত পাঠিয়ে দিলে। ওর পাশে হাতলভাঙা চেয়ারে ময়লামতন বেঁটে, গালে দুদিনের নুন-গোলমরিচ দাড়ি, গেরুয়া পাঞ্জাবি, অভিব্যক্তিহীন অলস চাউনি মেলে বলল, সকালে পেঁপে দেখতে যেওয়া হয়েছিল ? লোক ভালো নয় স্বপন সামন্ত। জেলাসদরে মিধ্যে চিটি লিকেচে আমাদের হিমঘর নিয়ে। যেন আমরা সবাই চোর আর উনি হরিসচন্দোর। ওর বাপটা তো অতুল্লো ঘোসের চাকর ছিল। ল্যাঙোট কাচত। আর গেঁটে বজ্জাত দাদুটা পোফুল্ল সেনের দয়ায় আলুর ট্যাকায় জমিজমা করে নিলে।

    টেবিলের ওপর তবলাবাদকের আঙুল নকল করে একজন বৃহদায়তন নিতম্ব বলল, জহোর্লালের দ্যাকাদেকি যখুন সুবাস বোসকে হেয় করছিল ওই পোফুল্ল ঘোস, কিরনসংকর রায়, নলিন সর্কার, নিমল চন্দর, তখুন ওদের ল্যাংবোট ছিল ওর দাদু।

    লোকটাকে দেখতে-দেখতে যিশুর মনে পড়ে গেল সেই অডিটারদের চেহারা, যাদের কিছুদিন আগে পুরুলিয়া জেলা সমবায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একটা ঘরে তালাবন্ধ করে রেখেছিল। এই লোকগুনো বোধয় অন্যের জীবনকাহিনীতে তালাবন্ধ। বিপুলবপু লোকটা গ্রামের কিংবা ব্লকের কিংবা আরও বড়ো ভূখন্ডের সমসাময়িক রাজনীতিতে ভবেশকার চে উঁচুতে। চিৎকার করে মুণ্ডেশ্বরী নদীতে ঢেউ তোলে। নিজের কথাবার্তাকে বাকচাতুরীর আড়ালে কী উদ্দেশ্য দিতে চাইছে আঁচ করতে না পেরে, যিশির মনে হল, এরা সবাই পার্টিমণ্ডুক, ছদ্মবেশী বেকার, আর ও এদের একটা ওয়াক-ইন ইনটারভিউ দিচ্ছে।

    ও, যিশু বিবৃতির ঢঙে বলল, পেঁপেগুনো কিন্তু বিরাট-বিরাট।

    তা হবে না কেন ? ব্যাংকের লোন নিয়ে মহাজনি করা হয়। মহিলার মন্তব্য।

    তাই বুঝি ? যিশুর মনে হল, জগৎটা মিটমাটপন্হীদের। প্রত্যয়ও চাই আবার মিটমাটও চাই।

    আমাদের চাসিদের আতান্তরে ফ্যালেনি ? এই এনাদের জিগ্যেস করে দেকুন। রোগা, কালো, ময়লা-জামাকাপড় বৃদ্ধের উক্তি।

    আলু রপ্তানির নিষেদনামা তো উটে গ্যাচে। আফরিকায় দেসে-দেসে লোকে আলু খায় ভাতরুটির বদলে।

    টুলে-বসা পুলিন জ্ঞান দিলে ভবেশকা অবস্হা সামাল দ্যায়, আরে ওকে কী বোঝাচ্ছিস, ও নানা দেশ ঘুরেচে।

    এবার আমরা ওননো রাজ্যেও পাটাতে পারবো, বলল পাশের লোকটা, যার গা থেকে তিতকুটে গন্ধ বেরুচ্ছিল।

    পশ্চিমবঙ্গে শিষ্টভাষার নামে কলকাতায় যা আজ বাজারচালু, সেই লোকগুনোর কথা শুনে যিশুর মনে হচ্ছিল, দেশভাগ না হলে তা এক্কেবারে আলাদা হতো।

    আমাদের দোসে আলু পচেনি, আর বাড়তি আলু রাকিও না আমরা। গেরুয়া পাঞ্জাবি বক্তব্য পেশ করে। স্বপন সামন্ত যেসব চুগলি করেচে, সব মিথ্যে।

    ওফ, এরা এখুনও ভাবচে ও একজন আলুগোয়েন্দা। কেলেংকারি জড়ো করে-করে প্রতিবেদন লিখে কোনও অজানা ওপরঅলাকে পাঠিয়ে এদের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, শান্তি, সমৃদ্ধি, ক্ষমতা সব নষ্ট করে দেবে। পশ্চিমবঙ্গে কেউ কি কোথাও সত্যিই আছে, যাকে ধরলে দুর্ভোগের প্রতিকার হয় ? কাঙধ কাঙপিয়ে স্বাভাবিক হাসি হেসে ফ্যালে যিশু। বাইরে মুটিয়াগুনো এখনও পড়ে-পড়ে ঘুমোচ্ছে, আর শেডের তলায় রাখা আলুর বস্তার সংখ্যা যথেষ্ট বেড়েছে। যিশু বেফাঁস বলে ফেলল, ওগুনো কী হবে ?

    ওসব আড়তদার, ফড়ে, মহাজনদের মাল, নিয়ে যাবে। ভবেশকার খোলসা।

    স্বপন সামন্তের অভিযোগের কপি দেয়া হয়েচে নাকি আবনাকে ?

    দেয়া হয়েচে, করা হয়েচে, শুনে আদিত্যর কথা মনে পড়ে গেল যিশুর। ওর জেরা করার কায়দা। ইংরেজ পুলিশ অফিসারদের কাছ থেকে অনুবাদ করে পেয়েছিল বাঙালি ঊর্ধ্বতনরা। দিয়ে গেছে অধস্তনদের, আদিত্যকে। সেদিন মোটরবাইকে উধাও হয়ে গেল আচমকা, অদ্ভুত। উপস্হিত লোকগুনোর মুখের ওপর চাউনি ঘোরাল যিশু, আর দেখতে-দেখতে মনে হল, মানহানি ব্যাপারটা সম্ভবত আর্থিক। আত্মিক নয়।

    না, তা ইমঘর নিয়ে ওনার সঙ্গে কোনও কথা হয়নি আমার। উনি যে চিঠি-ফিটি লিখে কমপ্লেন করেছেন, তা-ই জানতুম না। কপিটা পেলে মন্দ হতো না। অবশ্য ওসব কমপ্লেন-ফমপ্লেনে কারুর কিছু হয় না আজকাল। গাজোয়ারি ছাড়া কিচ্ছু আর কাজে দ্যায় না।

    হুঁ।

    সকালে বেড়াতে-বেড়াতে দেখলুম অত বড়ো-বড়ো পেঁপে, তাই দাঁড়িয়ে পড়েছিলুম। মুখগুনোর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিল হতভম্ব যিশু, কেউ বিশ্বাস করছে না ওকে। কী বিপজ্জনক। বাড়িতে থাকলে সন্দেহ হতে পারে, আবার গ্রামে বেড়ানোটাও উদ্রেক করছে সন্দেহ। গত দশ-বিশ বছরে গ্রামে-গ্রামে, এমনকী কলকাতার সনাতন পাড়ায়-পাড়ায়, নতুন এক সন্দেহভিত্তিক বর্ণাশ্রম উদ্ভব হয়ে্ছে। নতুন তত্ত্বটার নাম শত্রুশিবির। তা থেকেই নতুন বর্ণ-বিভাজন। বাইরের লোক আর কোনও গ্রামে গিয়ে জমিজমা কিনে টিকতে পারবে না।

    চৌকাঠের কোণের গর্ত থেকে একটা গোবরিয়া বিছে বেরিয়ে বিবাদী বাগের রাস্তা পেরোবার মতন শুঁড় দিয়ে এদিক-ওদিক দেখে ঢুকে গেল বাইরে ছড়ানো-ছেটানো বাতিল আলুর ভেতর। রাস্তার ওপারে, আকন্দ গাছটার কাছে, খুলে কথা বলঅব মগ্ন শালিকদল। পশু-পাখি ছাড়া আর কেউ খুলে কথা বলে না পশ্চিমবাংলায়। পুঁটলি থেকে রামরোট রুটি, কাঁচা পেঁয়াজ, আলুমশলা নিয়ে, গামছা পেতে বসেছে চারজন মুটিয়া। বোধয় ব্রেকফাস্ট।

    টেবিলের ওদিকে কন্দর্প-ক্যাবলা ফরসা একজন কাগজ পড়ছিল, কালকের, হাঁইইইইহ আওয়াজ সহযোগে হাই তুলল। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে পূর্বতন মালিকের ইঁটজিরজিরে নোনা কবরের ওপর কাকেদের ভরা সংসার। গোড়ায় আপনা থেকে গজিয়েছে বুনো কনকনটে। কন্দর্প-ক্যাবলা জানায়, ডাবল সার্কিট লাইনের তার চুরি হয়ে কোলাঘাটের একটা ইউনিট বন্ধ, পুলিনদা।

    অ।

    সবাই চুপচাপ। ইন্টারভিউ নেবার প্রশ্ন বোধয় ফুরিয়ে গেছে।

    হঠাৎ জাবেদালি অফিসঘরে প্রবেশ করে। লুঙ্গি আর খালি গায়ে। ঘর্মাক্ত। দৌড়ে এসেছে। চোখমুখ থমথমে। হাঁপাচ্ছিল। উদবিগ্ন ঘোষণা করে, হালিক ধাড়া গলায় দড়ি দিয়েচে, পুলিশ এয়েচে লাশ নাবাতে।

    অন্ধকারের বিস্ফোরণ হয়, আর গুঁড়ো-গুঁড়ো কালো অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে দরবারিদের চেহারায়। সবাই এমন কনকনে তাকায় যেন যিশুই খুনি। ওকে একা ফেলে রেখে সবাই ছিটকে বেরোয় অফিসঘর থেকে, আর মাঠ ভেঙে গ্রামের দিকে দৌড়োয় । মহিলা সবার শেষে, পাছায় চেয়ারের হাতল আটকে গিয়েছিল বলে।

    তালা দিয়ে দি থালে। জাবেদালির ইশারায় উঠে পড়ে যিশু। ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন তোলে।

    ধারদেনা করে সাড়ে তিন বিঘে বুনেছিল। অবোসথা তো নিজের চোকেই দেকেচেন। বোরা বোনা আবার বারণ।

    পশ্চিমবঙ্গের বাইরে রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়া সত্ত্বেও, পঞ্চাশ লক্ষ টন আলুর হিল্লে হবে না। হিমঘরেও জায়গা নেই। বিহার, উত্তরপ্রদেশে, অন্ধ্র, উড়িষ্যায় অনেক আলু হয়েছে। লুকিয়ে পাচার হবে নেপাল বাংলাদেশ বর্মায়। তার কিছু টাকা যাবে সুইস ব্যাংকে। গুজরাতের জমিতে তো জো নেই, তবু হয়েছে আলু। দুধ সমবায়ের জোরে সেখানে গোরু-মোষকে আলু খাওয়ানো যায়। যিশু জিগ্যেস করল, হালিক ধাড়া বন্ড পায়নি ?

    জাবেদালি উত্তর না দিয়ে বলল, আপনি এগোন।

    যিশু একটা সিগারেট ধরায়।

    জনশ্রুতির মতন বাতাস বইছে। মন্দিরের পাঁচিলের ওপর কয়েকটা চটুল কাক। মসজিদ বলতে এ-গ্রামে সবুজ-সবুজ চুড়ো-দেয়া মাঠের মাঝে একটা দেয়াল, ধবধবে সাদা। সুলতানি চারচালা বাঙালি মসজিদ আর হবে না। আরবদেশের মসজিদের নকল হবে কেবল। মন্দিরের বাইরে পুজোর উপাচার বিক্রির খাট পাতা। আকন্দফুলের মালা ঝোলানো খদ্দেরহীন দোকানটায় বুড়িটা ঢুলছে। একটা আলাপি কুকুর ল্যাজ নাড়ে। মদগর্বিত ষাঁড়। মদিরেক্ষণা মৌমাছি। ভিজে চিলের মতন ডানা ঝুলিয়ে রয়েছে ঝিম্ত কলাগাছগুনোর ছেঁড়া পাতা। কঞ্জুস হাওয়ার তাপে বাবলাগাছগুনোর গায়ে কাঁটা দিয়েছে। পথিপার্শ্বে উইপোকাদের বিজয়স্তম্ভ। মার্জিত চেহারার খেজুরগাছ, গলায় খেজুরছড়ার মালা।

    দুপুর টাটিয়ে উঠেছে ক্রমশ, অথচ মেঘেদের ধূসর আনাগোনাও চলছে। বৃষ্টির ওপর আধিপত্য, দুঋতু আগে খর্ব হবার ফলে, নেতিয়ে পড়েছে ভেষজ সবুজ। মোরামপথ ধুলোয় জেরবার। প্রমেথিউসের নাট্যাভিনয়ে গুবরেপোকা। সকৌতুকে ফুটে আছে শেয়ালকাঁটার নরম ফুরফুরে হলুদ। কাঁঠালগাছে অজস্র এঁচোড়ের সঙ্গে ঝুলে আছে সুরাসক্ত মৌমাছিদের মোমভিত্তিক ক্ষুদ্রশিল্প। নীরবতা পালন করছে শোকমগ্ন শ্মশান। মেলার তোড়জোড় জানান দিচ্ছে বাচাল-প্রকৃতির লাউডস্পিকার। গাছের ছায়া থেকে কিশোর হিমসাগর বেরিয়ে লাফ দিয়েছে আলোয়।

    সারাটা দুপুর ফ্যা-ফ্যা কাটিয়ে, চুল না-ভিজিয়ে পুকুরে ক্লান্ত চান সেরে ঘুমিয়ে পড়েছিল যিশু। ঘুম ভাঙে ভবেশকার চ্যাঁচামেচিতে। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল, খুশিদিকে বকছে। এই বয়সেও বকুনি ! কাছে গিয়ে ভবেশকাকে, কী হয়েছে গো, জিগ্যেস করায়, উলটে বকুনি খায় যিশু, তুমি মাঝখানে কতা বলতে এসো না।

    ক্ষুব্ধ যিশু বলল, আরে, এই বয়সে এমন বকা-ঝকা করছ কেন ? শুধু নিজের স্বার্থটাই দেখবে ? বিষয়ী হওয়ার এতই দরকার নাকি তোমার ? আমি…। কথা সম্পূর্ণ করা উচিত হবে না মনে করে যিশু চুপ করে যায়।

    ভবেশকা বাঁপাশে হেলে, থপথপিয়ে দাওয়া থেকে নেবে বেড়ার আগল খুলে ক্রুদ্ধ বেরিয়ে গেলে খুশিদি স্কুলবালিকার মতন চোখ মুছে বলল, তুই খেয়ে নে। বাকসো গুচিয়ে রেকেচিস তো ? আমি এককাপড়ে চলে যাব। একদোম ভাল্লাগে না আর।

    হ্যাঁ। সন্ধে হলেই তুমি চলে যেও। মেলার ভিড় তো থাকবেই। কদম গাছতলায় অপেক্ষা কোরো, নইলে সোজা বাবলাডাঙায় গাড়িটার কাছে চলে যেও। ড্রাইভারটাকে বলা আছে। ভবেশকা একেবারে আউটডোর জীব হয়ে গেছে। কী হয়েছিল কী ? যে এত বকছিল তোমায় ?

    মোদকের বউকে জলপড়া দেবে। জলপড়ার কাঁসার জামবাটিটা পাওয়া যাচ্চে না। বাবা তারকেশ্বরের ছোঁয়ানো বাটি। কোতায় রেকেচে নিজেই। গুষ্টির তো জিনিস। ভাল্লাগে না।

    জলপড়া ? ভবেশকা জলপড়া দেবে ? যিশুর মাথার ভেতরে শম্ভূ মিত্রের কন্ঠস্বরের অনুকরণে ডলবি ডিজিটাল বজ্রপাত হয়। জলপড়া !

    হ্যাঁ। সেরে যায় তো। কানচোন মোদকের বউ বাচ্চা বিয়োবার আনজা রাকতে পারচে না।

    ভবেশকা সেই যে রেগেমেগে বেরিয়েছে, ফেরেনি। সন্ধে হয়ে গেল। লাইট চলে গেছে, সম্ভবত মেলার হুকিঙের অকথ্য শোষণে। যাত্রাদলের জেনারেটারের ক্ষীণ নিরবয়ব একটানা শব্দ। শুরু হয়ে গেছে ঝিঁঝিদের দেয়ালা-পারঙ্গম কানাঘুষা। কাতর আবেদনের মতন অন্ধকার। মাঝে-মাঝে স্পন্দিত হয়ে উঠছে শব্দহীন বিদ্যুচ্চমকের উদ্বেগ।

    আমি থালে এগুচ্চি, অন্ধকারে অনুচ্চ গলায় বলল খুশিদি, চাপা উত্তেজনায় কন্ঠস্বর রুদ্ধ। মুখে-মাখা স্নোক্রমের গ্রামীণ সুগন্ধকে ছাপিয়ে যাচ্ছে হাঁ-মুখের শঙ্কিত উৎকন্ঠার ভাপের গন্ধ। একপলক বিদ্যুচ্চমকে দেখা গেল থুতনির নিটোল টোল। পাটভাঙা, কাসুন্দি রঙের, ফুলফুল শাড়ি। হাত কাঁপছে। হাঁটার ধরনে স্পষ্ট যে ভয় আর উৎকন্ঠা নিয়ন্ত্রণ করছে খুশিদির শরীরকে, খনিগর্ভে আটকে-পড়া শ্রমিকের মতন।

    অ্যাতো ভয় কিসের খুশিদি। বুকে জড়িয়ে ধরে ভয় স্তিমিত করার চেষ্টা করে যিশু।

    জানি না কেন জিশকা, আমার খুব ভয় করচে। দাওয়া থেকে নেবে দ্রুত অন্ধকার বাগান পেরিয়ে চলে গেল খুশিদি।

    পেনটর্চ জ্বেলে যিশু নিজের বাকসো আরেকবার দেখে নিলে। খুশিদিকে ভরসা দিচ্ছিল অথচ ছোঁয়াচে উদ্বেগে চাবি লাগাতে ভুলে যায় ব্রিফকেসে। নৈঃশব্দে বসে থাকে কিছুক্ষণ। পা টিপে বেরোয়। আলতো খোলে বাঁশের বেড়া। চাঁদ ঢাকা পড়ে গেছে কালবৈশাখীর ছেতরানো মেঘে, কিন্তু পূর্ণিমার আগাম আভায় নির্জন বধির অন্ধকারকে মনে হচ্ছে হাস্যোজ্জ্বল। নেশাগ্রস্তের মতন মাথা ঝুঁকিয়ে আছে গাছগুনো। বুনো সুগন্ধ ছড়াচ্ছে সিসলকাঁটার গুঁড়িসুড়ি ঝোপ।

    ভবেশকার বাড়িটা যেন গাছে-ঘেরা দুর্গ। এখান থেকে মোচ্ছবতলার কদমগাছ অনেকটা পথ। ট্রান্সফরমার লোড নিতে পারেনি হয়তো, কখুন আলো আসবে অনিশ্চিত। এই ভেষজ অন্ধকারে সেঁদোতে আলোরও গা ছমছম করবে। বুড়ো শিবতলার বয়োবৃদ্ধ বটগাছটার একগাদা স্তম্ভমূল ঝুরিতে অন্ধকারকে এখানে ছোঁয়া যায়। টর্চটা ব্যবহার করা উচিত হবে না। সাপ বা শেয়াল একটা গেল বোধয়। যিশু দ্রুত হাঁটে শুকনো পাতার ওপর। শ্মশানের বিয়োগান্ত গন্ধ আসছে ওদিক থেকে। হালিক ধাড়ার নশ্বরতার প্রতি শেষ সম্ভাষণ হয়তো। মেঘ না থাকলে সন্ধ্যাতারার ঘনবসতিপূর্ণ আকাশভূমি দেখা যেত। আলো ফোটাতে তলবিসভা ডাকছে ঝিঁঝিপোকারা। শুকনো পাতার ওপর বোধয় সাপ বা তক্ষকের বুকে হাঁটার আওয়াজ।

    উদ্বেগ কাটাতে সিগারেট ধরাবার জন্যে দাঁড়িয়ে পড়েছিল যিশু। হঠাৎ শুনতে পায় অনেকগুনো লোকের কন্ঠে ডাকাত ডাকাত ডাকাত চিৎকার। পেছন দিক থেকেই তো ছুটে আসছে। এরা ডাকাত ? টাকাকড়ি তো বিশেষ নেই ওর কাছে। কাদের বাড়ি ডাকাতি করেই বা পালাচ্ছে ? ছোটাছুটির পদধ্বনি কাছাকাছি কোথাও। গাছের ডাল থেকে লাফাবার ধুপধাপ। ওর দিকেই আসছে মনে হয় ডাকাতের দলটা। যিশু দৌড়োয়।

    যিশুর মাথার ওপরে সজোরে বাড়ি পড়তে, হাতছাড়া ব্রিফকেস ছিটকে গিয়ে লাগে বটগাছের ঝুরিস্তম্ভে আর ডালা খুলে শুকনো পাতার ওপর ছড়িয়ে পড়ে শার্ট-প্যান্ট, কাগজপত্তর, টর্চ, টাকাকড়ি, ডটপেন, ক্যালকুলেটর, মোবাইল ফোন, ক্রেডিট কার্ড, চেকবই, পাসপোর্ট, টাই, ঘড়ি, ডাকটিকিট, তুষলাব্রতর সরষে আর শুকনো মুলোফুল। টাল সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করলে, পিঠের ওপর লাঠির শব্দ ওঠে। তারপর পায়ে আর কাঁধে। তবু দাঁড়াবার চেষ্টা করে যিশু। মাথার ওপর আবার আঘাত। যিশুর পরিপাটি আঁচড়ানো দামি পরচুলা মাথা ধেকে খুলে বেরিয়ে গেলে, আবার আঘাত। সেই মুহূর্তে, যিশু দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে তখুনও, অন্তরীক্ষ থেকে পতনরত চকচকে রুপোলি কিলবিলে সাপটার ল্যাজ ধরে হ্যাঁচকা টান দ্যায় বুড়োশিব। প্রচণ্ড আওয়াজ তুলে কাছেই বজ্রপাত হল কোথাও। বজ্রপাতের কাঁপুনিতে, মৌমাছির চাক থেকে কয়েক ফোঁটা মধু ঝরে পড়ে যিশুর রক্তাক্ত মাথায়।

    শ্বাস দ্রুত আর হৃৎস্পন্দন খাপছাড়া হয়ে যাচ্ছে যিশুর। ফুসফুসে ভাসমান রক্তের হেমোগ্লোবিনে অক্সিজেনের স্হান সংকুলানে ব্যাঘাত ঘটছে বলে মস্তিষ্কে পৌঁছোতে অসুবিধা হচ্ছে। কপালে, হাতের চেটোয়, ঘাম জমছে আর জুতোর মধ্যে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে আঙুলগুনো। আলজিভের চারিপাশ শুকিয়ে যাচ্ছে। ক্রমক্ষীয়মান অশরীরী হলুদ ও বেগুনি অন্ধকার-কণার অজস্র খুদে-খুদে ফুল ভাসছে অস্পষ্ট চরাচর জুড়ে।

    ব্রিফকেস থেকে পড়ে বহুকালের পোরোনো হলদে খড়খড়ে কাগজের পাতা উড়তে থাকে ইতিউতি। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের খবরের কাগজ। প্রথম পৃষ্ঠায় তলার দিকে ডানকোণে ফুটফুটে আড়াই বছরের নাতনির ফোটোর তলায় তার হারিয়ে যাবার বিজ্ঞাপন দিয়েছে দাদু মিনহাজুদ্দিন খান। মেয়েটির ডান কাঁধে জড়ুল। ডান চোখে তিল আছে। কাঁদলে থুতনিতে টোল পড়ে। মেয়েটির নাম খুশবু। ডাক নাম খুশি।

    -------------------------------------------------------------------------------------------------------


  • মলয় রায়চৌধুরী | ০১ আগস্ট ২০২১ ১২:৩৫734812
  • মলয় রায়চৌধুরীর গল্প : ভোররাতে শেক্সপিয়ার


     

    ‘পাড়া’ বলতে ঠিক কী বোঝায়? মহানগরগুলোয় ‘পাড়া’ জিনিশটা ক্রমশ লোপাট হয়ে চলেছে। বা, বলা যায়, মহানগরের অনুন্নত এলাকাগুলোয় টিকে থাকছে আধখ্যাঁচড়া ‘পাড়া’। কলকাতার কেন্দ্র থেকে পাড়া চলে গেছে শহরের পরিধিতে; কসমোপলিসের পরিধি মানেই তো প্রান্তিক। ভুল বললুম, কলকাতায় দলতন্ত্রের দাপটে, তা সে যে দলই রাজত্ব করুক, ‘পাড়া’র অস্তিত্ব অবলুপ্ত। আগের দল পাড়ার নতুন নামকরণ করেছিল মহল্ল¬া’, কেন তা জানি না। কিন্তু সেই মহল্ল¬ায় অংশভাগ ছিলেন কেবল দলের হবুগবুরা। শহরতলি বা গ্রামেও, পশ্চিমবঙ্গে ‘পাড়া’ সমাজতাত্ত্বিকদের গবেষণার আওতায় চলে গেছে। হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় বসতবাড়িতে যখন থাকতুম, ছোটোবেলায়, পাড়া ছিল জীবন্ত জীবনপ্রক্রিয়া। তারপর তো নাকতলায় যে রাস্তায় থাকতুম তার নাম ‘লেটারবক্সপাড়া’ হলেও, দুই দলের জগঝ¤পতে অঞ্চলটি থেকে পাড়া উবে গিয়ে যে সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল তাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। কিংবা, হয়তো, পর¯পরের পরিচিত কয়েকজন মানুষ-মানুষী মহানগরের এক জায়গায় উদ্দেশ্যহীন জড়ো হলে একটা তাৎক্ষণিক পাড়া গড়ে ওঠে।


     

    আমি এখন মুম্বাইয়ের শহরতলিতে থাকি। এই অঞ্চলে যাঁরা থাকেন তাঁদের পর¯পরের সঙ্গে পরিচয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ। যখন পাটনার ইমলিতলা পাড়ায় থাকতুম তখন ওই পাড়ার সবাই সবাইকে চিনতুম; আমরা ছোটোবেলায় চোর-পুলিশ খেলার সময়ে যে কোনো বাড়ির যে কোনো ঘরে গিয়ে লুকিয়ে পড়তে পারতুম। এমনকি পাড়ার শিয়া মসজিদে গিয়ে লুকোলেও, নামাজের সময় ছাড়া, নিষেধ করতেন না ইমামসাহেব। মসজিদের সামনে নাজিম-কুলসুম আপাদের বাড়িতেও যে কোনো ঘরে লুকোনো যেত। ইমলিতলা থেকে ‘পাড়া’ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল ধর্মীয় ভেদাভেদ আর জাতিপ্রথার রাজনীতিকরণের কারণে। ‘পাড়া’ উবে যাবার সঙ্গে ছোটোদের বহু খেলাও, মহানগরে, লোপাট হয়ে গেছে। চোর-পুলিশ, গুলি, লাট্টু ইত্যাদি আর বোধহয় খেলা হয় না। ‘পাড়া’ জিনিশটার আরেকটা অবদান ছিলÑ গোপন প্রেম। কসমোপলিসগুলোয়, কিশোর-কিশোরী আর তরুণ-তরুণীদের, প্রৌঢ়রাও বাদ যান না, কাজ-কারবার দেখে আঁচ করতে পারি যে প্রেমও তার সংজ্ঞা পরিবর্তন করে ফেলেছে।


     

    আমাদের বিল্ডিঙের তিনদিকে রাস্তা, যার একটি ওয়েস্টার্ন এক্সপ্রেস হাইওয়ে, একটি সার্ভিস রোড আর অপরটি খ্যাত সাঁই-টেমপল স্ট্রিট। হাইওয়ে কখনও ঘুমোয় না; রাতে বরং আওয়াজের রকমফের পায়ে হাইওয়ে উড়তে থাকে নানা বেগবতী আলোগুলোকে ধাওয়া করে। মন্দিরের রাস্তাটা ঘুমোতে বাধ্য হয় কেন-না গাড়ি পার্ক করে চারিদিকের আবাসিকরা চলাচলের অযোগ্য করে দেন মাঝরাতের পর। সার্ভিস রোডটা, যার দুধারে দোকানপাট, আধা-মল, স্কুল, পলিটেকনিক-কলেজ, ফুটপাথ জুড়ে ফল, সবজি আর নানা টুকিটাকি, রাত্রিবালা ঘুমোয় না, ঝিমোয়— যেকোনো সময়ে অটো বা ট্যাক্সি পাওয়া যায়, রাতদুপুরেও, কেননা এই রাস্তাটা সকাল থেকে তার রূপ বদলাতে থাকে। বহু আকাশমুখো আবাসন এই সার্ভিস রোডে আর তার ফ্যাঁকড়াগুলোয়। বেশ কয়েকটা নার্সিংহোম থাকায় রাতের দিকে অ্যামবুলেন্সের হুটার ঘুমন্ত বুড়োদের হুশিয়ারি দিতে দিতে চলে যায়। ভোরের দিকে বিটকেল নামের চকচকে মোটরগাড়িতে চেপে শুটিং সেরে ফেরেন টিভি-সুন্দরীরা, যাঁরা না ঘুমিয়েও কি করে যে রূপ ধরে রাখেন জানতে ইচ্ছা করে।


     

    সার্ভিস রোডের দুধারে, অন্ধকার থাকতে, ভোরবেলা থেকে, কোচিংক্লাসের জন্য কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীরা জড়ো হতে থাকে, বিভিন্ন বিল্ডিঙের ওপরতলার কোচিং ইনস্টিটিউটে ঢোকার আগে, ছোটো ছোটো পাড়া গড়ে ওঠে। এই সমস্ত কোচিং ক্লাসেও সহজে স্থান পাওয়া যায় না, তার ওপর কোচিং ক্লাসের প্রতিটি বিষয়ের জন্য ফিজ প্রতিমাসে আমার পেনশনের কয়েকগুণ। বেশ কয়েকটির বিষয়-অনুযায়ী বাৎসরিক চার্জ; একলক্ষ টাকার কাছাকাছি বা বেশি। সকলেরই ৯৫% এর চেয়ে বেশি মার্কস চাই। আগের বছর যারা মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকে বিভিন্ন বিষয়ে ৯৯% মার্কস পেয়েছিল বা যারা ক্যাট আইআইটি জেইইতে সফল হয়েছে তাদের মুখের ছবি দিয়ে বিরাট-বিরাট ব্যানার টাঙিয়েছে বিভিন্ন কোচিং ক্লাস, সেসব ব্যানারের মাপ এলাকার খুচরো রাজনৈতিক নেতাদের মুখের ব্যানারের চেয়ে বড়।

    এই প্রায়ান্ধকার ভোরেও কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের কাউকে দেখি না যে সে ঘুম থেকে উঠেই চলে এসেছে, পিঠে বইখাতার রাকস্যাক ঝুলিয়ে। সকলেই হাল আমলের রঙচঙে পোশাকে। যারা ৯৯% পেতে চায় বা নিজের পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে চায়, তারা কেউই যে আনস্মার্ট নয় তাও হয়তো কোচিংক্লাসেই শিখিয়ে দেয়া হচ্ছে, জীবনযুদ্ধে লড়াইটা যে অবস্থায় পৌঁছেছে, পার্সোনালিটি তৈরি করার কাজও চলছে পাশাপাশি। পাশ দিয়ে যাবার সময়ে ভেসে আসে পারফিউম। মানুষ যত ধনী হয় ততই তার দেহের গন্ধ নকল হতে থাকে। অবশ্য এক-আধজন যুবতীর হরমোন এতই কড়া যে বৈভবশালী পরিবারের হওয়া সত্ত্বেও পারফিউম দিয়ে তা চাপা পড়ে না। এই সময়ের, ভোররাতের, বাসট্রেনেও যথেষ্ট ভিড় হয়, সেই গাদাগাদি সামলে ফুরফুরে চেহারায় সুগন্ধ বয়ে নিজেদের হাজির করা সহজ নয় নিশ্চয়ই। আমি তো আর বাসট্রেনে চাপতে পারিনা, তা সারাদিনে যে সময়েই হোক। মোটরসাইকেলেও আসতে দেখেছি ছাত্রদের, পেছনে গার্লফ্রেন্ডকে বসিয়ে, যদিও যারা কিশোর চেহারার তাদের তা চালাবার লাইসেন্স আছে কিনা সন্দেহ। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল পাখা মেলে দেয় হাইওয়ের ওপর।


     

    অন্য শহরের কথা জানি না। নতুন এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের এত কাছ থেকে অবজার্ভ করার সুযোগ অন্য শহরগুলোয় ছিল না। আমার স্কুলে পড়ার শেষপর্বে, কোএডুকেশান থাকলেও, সহপাঠিনীদের সঙ্গে তেমন হৃদ্যতা সম্ভব ছিল না; তারা সবাই আমার চেয়ে বয়সে বড় ছিল; বয়স্ক সহপাঠীদের দিকেই ছিল তাদের টান। মুম্বাইতে অধিকাংশ স্কুলে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছোলে গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড জুটি তৈরি হতে থাকে। সবচেয়ে সুন্দরীরা সৌম্যকান্তি ছেলেদের বয়ফ্রেন্ড হয়ে ওঠে। যে মেয়েটির চটক নেই তার ভাগ্যে বয়ফ্রেন্ডটিও তেমন জোটে। কোচিং ক্লাস শুরু হবার আগে মোটরসাইকেলের সিটে বা দোকানের বন্ধ শোকেসের সামনের চাতালে জুটিতে বসে গ্যাঁজায় যারা তাদের দেখে এরকম আন্দাজ করে নিয়েছি। পড়াশোনায় সকলেই নিশ্চয়ই ভালো নয়তো কোচিং ক্লাসেও সিট পাওয়া কঠিন। ভোরবেলা থেকেই জেরক্সের দোকানে ছাত্রছাত্রীদের জমায়েত দেখে ধারণাটা আরও দৃঢ় হয়।


     

    ইংরেজি পড়ার, শেখার ও বলার ক্লাসের পর্ব ফুরোলে অন্যান্য বিষয় ও ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদের কোচিং ক্লাস শুরু হয়। কোচিং ক্লাস শেষ হবার পর দলে-দলে শিশুদের দেখা মেলে স্কুলের পথে। মায়েরা টানতে-টানতে বা অটো বা গাড়িতে করে নিয়ে চলেছেন। তারই ফাঁকে কাঁধে নানা আকারের ব্যাগ ঝুলিয়ে অফিসযাত্রী আর যাত্রিণী। তারপর বেরোন বিভিন্ন বয়সের মহিলা ও পুরুষ, বাজারে কেনাকাটা করার জন্য। এই মহানগরে লোকে সব সময়ই কিছু না কিছু কিনছে! কোনো দোকান দুপুরে বন্ধ হয় না। রাত এগারোটা পর্যন্ত খোলা থাকে। দোকানপাট বন্ধ হবার পর সার্ভিস রোডের ওপর এলাকার বিয়ার বার জ্বলে ওঠে রঙিন আলোয়, জড়ো হতে থাকে কত রকমের গাড়ি, রাস্তার দুই ধারে। রাত তিনটে পর্যন্ত ওই ঝিলমিলে আলোগুলো দেখতে পাই আমার ছয় তলার জানলা দিয়ে। মৌমাছির চোখের মতন হয়তো হয়ে ওঠে গাড়ির দিকে এগোতে থাকা মাতালদের চোখ, কারোর কারোর কাঁধে সঙ্গিনীর মাথা। জানলা দিয়ে দেখেছি বিভিন্ন বিল্ডিঙে রাত তিনটের সময়েও লোকে টিভিতে দেখছেন কোনো প্রোগ্রাম বা হয়তো ব্লু ফিল্ম। মদ খাবার জন্য, তা সে বাড়িতে বসে হোক বা বারে, আবগারি দপতরের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয় মুম্বাইতে। মদের দোকানে কিনতে গেলে বা বারে মদ খেতে গেলে যথাযথ চার্জ নিয়ে তারা নিজেরাই দিয়ে দেয় প্রমানপত্রখানা। মাঝে শখের কেক প্রস্তুতকারিণী এক মহিলা বাড়িতে বেশ কয়েকটা বোতল রেখেছিলেন বলে পুলিশের খপ্পরে পড়েন! আমি কেবল সিঙ্গল মল্ট খাই যা ছেলে বা মেয়ে এনে দেয় বিদেশ থেকে— প্রমাণপত্র ছাড়াই খাই। প্রতিদিন মদ খাবার প্রমাণপত্র নিতে হলে ডাক্তারের লেখা চিঠি চাই।


     

    সার্ভিস রোডের ধারে বৃদ্ধদের জন্য ঝকঝকে-তকতকে একটা আড্ডা মারার ঘর তৈরি করে দিয়েছে মুম্বাই মিউনিসিপাল কর্পোরেশন— ভোরবেলায় হাঁটতে বেরিয়ে যাঁরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন তাঁরা এখানে বসে জিরিয়ে নেন, স্ত্রী বা ছেলের বউয়ের বারণ-করা সিগারেটটি ফুঁকে নেন। অবশ্য এই ঘরে বসে কোচিং ক্লাসের কচি খুকিদের দেখার আর তাদের কথাবার্তা শোনার আনন্দটাও পেয়ে যান সেই ফাঁকে। নতুন প্রজন্মের খোকা-খুকুদের কথাবার্তা শোনেন মুচকি মুখে। গ্যাপ যে কতগুলো জেনারেশানের তা কপালের ভাঁজের সংখ্যা দিয়ে টের পাওয়া যায়। এলাকাটা গুজরাতিতে ওপচানো; ফলে বুড়োরা, ভেতরে ভেতরে যাই হোন, মুখে সংরক্ষণশীল। অধিকাংশ গুজরাতিরা ব্যবসাদারি করেন, আর সে কারণে ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকা পড়েন, যে পত্রিকাটিতে গত বছর আমার সম্পর্কে বড়সড় ফোটো দিয়ে একটা সাক্ষাৎকার-নির্ভর প্রবন্ধ লিখেছিলেন নয়নিমা বসু। সেই থেকে কয়েকজন জানেন যে আমি কবিতা লিখি।


     

    আমার সকালের হাঁটাহাঁট শেষে, দুধের প্যাকেট আনতে গিয়ে যেদিন দেখি বুথটা তখনও খোলে নি, আমিও অবসর সময়টা খুকিদর্শন আর ছেলেমেয়েদের কথাবার্তা শোনায় খরচ করি। অত্যন্ত বোল্ড প্রজন্ম, সন্দেহ নেই। নিজেদের মধ্যে এরা প্রায় সবাই ইংরেজিতে বা মুম্বাইয়া হিন্দিতে কথা বলে। অধিকাংশ সময় ইংরেজিতেই, যেহেতু শিট, ফাক, কান্ট, আসহোল, সাকার, হুকার, ফাক ইউ ইত্যাদি শব্দ মাতৃভাষায় বললে যেমন কাঁচা শোনায়, ইংরেজিতে বললে নোংরা শোনায় না। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় চেতলা বাজারের ওপর ওনার ফ্ল্যাট থেকে প্রতিদিন সকালে নেমে আসতেন বাজার থেকে চরিত্র আর চরিত্রানুযায়ী সংলাপ সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে, কেননা বার্ধক্যে পৌঁছে কম বয়সের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ ক্রমশ ফরম্যাল হয়ে ওঠে।


     

    ইংরেজি ক্লাসের একটি সৌম্যদর্শন তরুণ, যাকে দেখে অনুমান হয় যে সে বোধহয় কোনো তরুণীকে গার্লফ্রেন্ড করতে চায়নি বা সে এতই সোফিসটিকেটেড যে কোনো তরুণী তার বন্ধুনী হবার সাহস যোগাড় করতে পারে নি, প্রায়ই ইংরেজি সংলাপ আওড়ায়। তরুণ-তরুণীরা তার সংলাপ বলার ধরনে আকৃষ্ট হয়ে তাকে ঘিরে থাকে। হয়তো মুম্বাইয়ের কোনো নাটকদলে অভিনয় করে— বহু নাটকদল আছে সোবোতে বা সাউথ বম্বেতে যারা নিয়মিত ইংরেজি নাটক করে। একদিন যখন তরুণটি একটা দীর্ঘ সংলাপ শোনাচ্ছিল সমবেত তরুণ-তরুণীদের, পাশের বিল্ডিঙের দোতলার কোচিং ক্লাসের ইংরেজির অধ্যাপক আমার পাশে এসে বসলেন। ইনিও পারফিউম মেখে বেশ সেজেগুজে আসেন, প্রতিদিন প্রেস-করা ফুলশার্ট আর ট্রাউজারে, নিজে স্কোডা অকটাভিও ড্রাইভ করে। ফিসফিস করে বললেন, শুনুন শুনুন, ছেলেটি যে কবিতাটা আবৃত্তি করছে, সেটা ভালো করে শুনুন। শোনবার চেষ্টা করলুম কিন্তু স্পষ্ট শুনতে পেলুম না।

    অধ্যাপক মশায় ডাকলেন তরুণটিকে। জানতে পারলুম ছেলেটির নাম মন্দার। মন্দারের সঙ্গে তার বন্ধুবান্ধবরাও এলো পেছন-পেছন। অধ্যাপক মন্দারকে আমার পরিচয় দিয়ে বললেন যে ইনিও কবিতা লেখেন। তুমি যে কবিতাটা সবাইকে এতক্ষণ শোনাচ্ছিলে সেটি ইনিও শুনতে চাইছেন। ছেলেটি কুণ্ঠিত। আমি বললুম, লজ্জার কী আছে, শোনাও না, তোমার সহপাঠীদের তো শোনাচ্ছিলে, বেশ মনোমুগ্ধকর তোমার কন্ঠস্বর। মন্দার নাটুকে আবৃত্তি আরম্ভ করল, অনেকটা উৎপল দত্তের স্টাইলে। শুনলুম। সমবেত গুজরাতিরা হাততালি দিলেন। তরুণটি ও তার সহপাঠীরা চলে গেলে অধ্যাপক বললেন, ফিসফিস করেই বললেন, জানেন কি যে এটি শেকসপিয়ারের একটি বিখ্যাত সনেট।


     

    নিজেকে নিজে চুপচাপ শোনালুম বিখ্যাত? শেকসপিয়ারের ১৫৪টি সনেটই তো বিখ্যাত। ১ থেকে ১২৬ পর্যন্ত সনেটগুলো একজন পুরুষকে উদ্দেশ্য করে রচিত, যার সঙ্গে কবির অন্তরঙ্গ রোমান্টিক স¤পর্ক। তাঁর সনেটগুলো শেকসপিয়ার উৎসর্গ করেছিলেন ডাবল্যু এইচ নামে রহস্যে মোড়া কোনো একজনকে, যিনি, সমালোচকদের মতে, পেমব্রোকের আর্ল উইলিয়াম হারবার্ট। অবশিষ্ট ১২৭ থেকে ১৫৪ পর্যন্ত সনেটগুলো একজন কৃষ্ণাঙ্গী নারী, যিনি ‘ডার্ক লেডি’ নামে খ্যাত, এবং যিনি নাকি ব্যভিচারিণী ও কুচুটে, তাঁকে নিয়ে লেখা। শেকসপিয়ারের সনেট শক্তি চট্টোপাধ্যায় বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন, ওনার নিজস্ব ডিকশানে। ইনটারমিডিয়েটে, অর্থাৎ এখনকার যা উচ্চমাধ্যমিক, কোর্সে শেকসপিয়ারের ১৮ নম্বর সনেটটি পাঠ্য ছিল। আমাদের ইংরেজির অধ্যাপক ড. দাশগুপ্ত, যিনি আমার হাতে বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকা দেখে আমায় ওনার প্রিয় ছাত্রের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলেন, ১৮ নম্বর সনেটটি পড়াবার সময় বলেছিলেন, ‘শেকসপিয়ারের সনেট আগুপিছু ক্রিটিকাল অ্যাসেসমেন্ট করতে হয়’। ওই আগু-পিছু ইশারাখানা উনি নিজেই পরে খোলোসা করেছিলেন।


     

    মন্দারের অধ্যাপক মশায়কে আমি বললুম, মনে হচ্ছে সনেটটা আপনার বেশ প্রিয়, শোনান না, শুনি, একটু রয়েসয়ে শোনান যাতে বুঝতে পারি। উনি শোনালেন,


     

    A woman’s face with Nature’s own hand painted

    Hast thou, the master-mistress of my passion;

    A woman’s gentle heart, but not acquainted

    With shifting change, as is false women’s fashion;

    An eye more bright than theirs, less false in rolling,

    Gliding the object whereupon it gazeth;

    A man in hue, all ‘hues’ in his controlling,

    Much steals men’s eyes and women’s souls amazeth.

    And for a woman wert thou first created.

    Till Nature, as she wrought thee defeated

    By adding one thing to my purpose nothing.

    But since she pricked thee out for women’s pleasure,

    Mine by thy love and thy love’s use their treasure.


     

    ১৯৫৬ এর পর শেকসপিয়ারের সনেট শুনলুম পর-পর দুজনের কণ্ঠে। ১৯৫৬ সালের পরেও শুনেছি, কাঠমান্ডুতে, ১৯৬৬ সালে, চরসের নেশায় চুর ট্রেশাম গ্রেগ নামে এক হিপির কণ্ঠে। মন্দার শোনালো ভোরের আলো ফোটার সময়। গ্রেগ শুনিয়েছিল মাঝরাতে, খড়ের ওপর পাতা চাদরের বিছানায় শুয়ে— রিচার্ড বার্টনের ঢঙে।


     

    অধ্যাপক মশায়, ওনার ফিসফিসে কণ্ঠস্বরে ফেরত এলেন, বললেন, এটা শেকসপিয়ারের কুড়ি নম্বর সনেট; ‘মাস্টার-মিস্ট্রেস’ শব্দটা শুনলেন তো? মাস্টার-মিস্ট্রেস মানে পুরুষ রক্ষিতা। এই কবিতাটি শেকশপিয়ার কোনো নারীকে নিয়ে লেখেননি, লিখেছেন পুরুষ প্রেমিকের উদ্দেশে। শেকসপিয়ার বলছেন, তোমার হৃদয় একজন নারীর মতো কোমল, অথচ তুমি নারীদের মতো আনচান করো না; তাদের চেয়েও তোমার চোখদুটি অত্যুজ্জ্বল ও সৎ, যে বস্তুর দিকে তাকাও তাকেও তুমি তোমার দৃষ্টি দিয়ে আলোকময় করে তোলো।


     

    কিছুক্ষণ থেমে, বোধহয় ভাবলেন আমি ওনার কথাটা ঠিকমতো নিতে পারব কিনা, বললেন, জানেন তো, শেকসপিয়ার উভকামী ছিলেন আর এই কবিতাটিসহ অনেকগুলো সনেট তার প্রমাণ। আমি ওনার মুখের দিকে খুঁটিয়ে তাকালুম, তারপর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সৌম্যকান্তি মন্দারের দিকে তাকিয়ে দেখলুম। ওহ, মন্দারের চোখের আলোয় উনি আলোকিত; কামানো দাড়িতে দামি লোশন মেখে আরও বেশি আলোকিত দেখাচ্ছিল ওনাকে।


     

    উভকামীরা, বিশেষ করে যারা কচি তরুণদের প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ বোধ করে, মনে হয় সত্তর বছর পেরিয়েও সক্রিয় যৌনতা দিব্বি বজায় রাখতে পারে।

    ——————————————————–

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০১ আগস্ট ২০২১ ১২:৩৬734813
  • মেয়েদের দিকে কেন তাকাই

    মলয় রায়চৌধুরী

    আমরা অনেক জিনিস কেবল দেখি, তাকিয়ে থাকি সেদিকে কিছুক্ষণ, তাকিয়ে থাকার জন্যে তাকাই, হয়তো একটি মুহূর্তের জন্যে। কোনও মেয়ে দেখলে তার দিকে তাকাই। ম্যাজিক হলে সেদিকে তাকাই, সার্কাসের দিকে তাকাই; তাকাবার জন্যে উঠতি সূর্যের খোঁজে যাই কাঞ্চনজঙ্ঘা বা পড়ন্ত সূর্যের খোঁজে যাই কন্যাকুমারীল পুরীর সমুদ্রের ঢেউ বা হরিদ্বারের জলস্রোতের দিকে তাকাই। তারাপীঠের কালীর মুখের দিকে তাকাই বা ছুটে বারান্দায় গিয়ে বরযাত্রীর দিকে তাকাই, বা পুকুর পাড়ে মাছের দিকে তাকাই।

    কেন তাকাই?

    সে-সব তাকানোর সঙ্গে গভীর চিন্তার সংস্রব থাকে না। তাকাবার পর কোনও কিংবা বিশেষ দার্শনিক প্রতিক্রিয়া ঘটে না মননে। দেখলুম, ব্যাস, কাজ শেষ। কিন্তু কেন দেখি?

    আগেকার কালে এরকম ধারণা ছিল যে যা সুনদর তা আমাদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু সুন্দর হোক বা কুৎসিত, এই বাইনারি বৈপরীত্যের অস্তিত্ব তর্কের খাতিরে স্বীকার করে নিলেও আমরা কিন্তু সুন্দর-কুৎসিতের ভেদাভেদ দেখার আগে ওব্দি, এবং পরেও করি না। পথে চলতে-চলতে একজন পটচাঋঈ মহিলার দিকে যখন তাকাই তখন কী চাই? আমি আমার কাছ থেকে কী চাই? সুন্দরী না হলেও তাকাই। পথদুর্ঘটনা হলে তাকাই। ঝগড়াঝাঁটি হলে তাকাই। তাকিয়ে দেখবো বলে ছবি আঁকিয়ের প্রদর্শনীতে যাই।

    যাকে বা যে-ব্যাপার দেখি, আমরা কিন্তু তার জন্যে দেখি না। আমরা নিজের জন্যে দেখি। আমার দেখায় তার কি এলো-গেল তা নিয়ে ভাবি না। আমি আমার কাছ থেকে কিছু-একটা চাই বলেই দেখি। কিন্তু প্রত্যেকবার তাকালেই যে তা হবে তার স্হিরতা নেই। আমরা সবসময়েই যৌনতার জন্যে কোনও নারীর দিকে তাকাই যে তা নয়। মা কালীর মুখ মোক্ষ-প্রাপ্তির জন্যে দেখি না। তুরীয় আনন্দের জন্যে যে পাঁঠা বলি দেখি, তা নয়। আনন্দ পাবো বলে সূর্যোদয় বা শূর্যাস্ত দেখি না। এমন নয় যে যা দেখি তা ভাললাগে; কিন্তু তবু দেখি।

    দেখলে, সঙ্গে-সঙ্গে কেমন একটা অনুরণনের মুহূর্ত তৈরি হয়। চিন্তার গভীরতায় নয়, কেননা দেখা হয়ে গেলে সে-সব নিয়ে আর ভাবি না। আমি একে নাড়া খাওয়া বলতে চাই না। হয়তো একে চমৎকৃত হওয়া বলা যায়। কিন্তু দেখার আগে চমৎকৃত হবো কিনা জানি না। কিংবা যেমন তাজমহলের ক্ষেত্রে, চমৎকৃত হবো ভেবে দেখতে গিয়ে হই না। অথচ কালবৈশাখীর দাপটে নারকেল গাছের পাতাদের একপাশে হেলে গিয়ে দুলছে দেখে চমৎকৃত হই। যদিও মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তা দেখতে থাকলে ভয়ের উদ্রেক হবার সম্ভাবনাকে বাদ দেওয়া যায় না।

    অনুরণন কেন ঘটে?

    যে-প্রাণী, ঘটনা বা জিনিসের দিকে তাকাই, তার ক্ষমতা নিজের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর জায়গায় পৌঁছোয়। যে দেখছে তার মধ্যে তৎক্ষণাৎ একটি জটিল ও জীবন্ত সাংস্কৃতিক সাড়া জাগিয়ে তোলে, তা অজানা বা অচেনা হতে পারে। যে দেখছে, তাকে মুহূর্তের জন্যে থামিয়ে দ্যায়। যে দেখছে সে নিজের দেখবার প্রক্রিয়ার মধ্যেই গ্রেপ্তার হয়ে যায়।

    দেখি বলে, দৃষ্টি আকর্ষণের তোড়জোড় হয়। নারী সাজগোজ করতে পারেন। অট্টালিকার স্হাপত্য অন্যরকম হতে পারে। সত্যসাইবাবা ম্যাজিক দেখাতে পারেন। পত্রিকার প্রচ্ছদ রংবেরং হতে পারে। একে অনেকে বলেন চিত্তাকর্ষক। এখানে চিত্তের কিছু করার নেই। মনের ভাবার সময় নেই। মুহূর্তের মধ্যে প্রভাবিত হবার প্রশ্ন ওঠে না। কেননা দেখি আর ভুলে যাই। মেয়েদের দিকে চোখ বুলোই আর এগোই, হয়তো তখন মনে-মনে অন্য কোনও চিন্তা চলছে, এমনও হতে পারে।

    যে প্রাণী, ঘটনা বা জিনিসকে মুহূর্তের জন্যে, vulnerable লাগে, দেখার মাধ্যমে, সেদিকেই বোধহয় তাকাই আমরা। অনেকে মিউজিয়ামের এঘর-সেঘর ঘুরে কোনও একটি দর্শনীয়ের সামনে দাঁড়িয়ে চমৎকৃত হন। মিউজিয়ামে ভাঙাচোরা মূর্তি দেখবো বলে প্রস্তুত হয়ে যাই। তার মানে চমৎকৃত হবো বলে প্রস্তুতি নিই। অথচ পরে স্মৃতিতে ধরে রাখি না অনেক কিছুই।

    যা দেখি তা ছোঁয়া যাবে না, তার স্বত্বাধিকারী হওয়া যাবে না, ভোগদখল করা যাবে না। আর দেখার সময় আমার সেসব চিন্তাও করি না। কোনও আধ্যাত্মিকতা নেই, শিল্পবোধ নেই, শিক্ষিতকরণ নেই, আধুনিকতার ব্যাপার নেই, ক্ষণমুহূর্তের দেখাটির মধ্যে। আগেকার দিনে রাজারাজড়াদের দেখাবার জন্যে, ‘খুশি’ করার জন্যে, প্রজারা, ব্যাপারিরা, নানা বিদঘুটে জিনিস উপহার দিতেন বা ক্যারদানি প্রস্তুত করতেন। স্রেফ তাকা বার জন্যে। মনোযোগ দিয়ে, সতর্কভাবে দেখার জন্যে নয়। উদ্দেশ্য থাকে না অমন চাউনিতে। অনুরণনের ক্ষমতা, সেই ক্ষণটুকুর জন্যে, যে দেখছে তার খাতিরে, ওই বস্তুটির বা ঘটনার বা প্রাণীটির মধ্যে জাগ্রত হয়। অনুরণনটি প্রেম নয়। অভিজ্ঞতা শুরু হবার আগেই আমাদের দেখার পর্বটি শেষ হয়ে যায়। অনন্ত পৃথিবীতে একটি জটিলতম সংকেত এক পলকের জন্যে তৈরি হয়।

    দেখার মুহূর্তটিই তো কবিতা। নয় কি?

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০১ আগস্ট ২০২১ ১২:৩৮734814
  • হৃৎপিণ্ডের সমুদ্রযাত্রা : রবীন্দ্রনাথের দাদুর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্রনাথের সমালোচনা

    মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস

    হৃৎপিণ্ড : আর কতো দূর হুলি ?

    আমি : আরও চার মাস, রাজকুমার।

    ##

    আমি, হুলি গন্ধবণিক, রাজকুমারের ভৃত্য, আমার সমস্যা হলো যে, মাথায় চুলের জঙ্গলে ভাববার কুয়াশা গড়ার দরকার হয় না, মুখ খুললেই নর্দমার পাঁকের তোড়ের মতন কথা ওগরাতে থাকি, গাঁয়ের নর্দমা নয়, সুতানুটি-গোবিন্দপুরের বর্ষাকালের আধকাঁচা নর্দমা, যে নর্দমায় জোব চার্নক দাঁড়িয়ে হিসি করে গেছেন, লর্ড হবার আগে পোঁদপোঁছা টয়লেট-কাগজ ফেলে গেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাহি লুটেরা রবার্ট ক্লাইভ, চার্লস স্টুয়ার্ট যাকে আমরা বলতুম হিন্দু স্টুয়ার্ট যিনি প্রতিদিন গঙ্গাস্নান করতেন আর নিজের হিন্দু বউকে পাল্কিতে বসিয়ে নিজের সঙ্গে স্নান করাতে নিয়ে যেতেন, ব্রিটিশ আমল থেকে জেরা করার মতন করে বকবক, বর্ষা ফুরোলেই কথা বন্ধ, পচা গন্ধের সঙ্গে আমোদে ফুলতে থাকে, এখন, কয়েকশো বছর পরে, বাতিল প্লাসটিকের থলে, নেতাদের হাসিমুখের পোস্টার আর কন্ডোমে জ্যাম।

    আমার কথা বলতে হলে বলতে হয় যে, গ্রামসমাজ, ধর্ম আর গোষ্ঠীজীবন কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ লোক, যাঁদের মতামত আদ্যিকালে সমাজের সব স্তরে প্রভাবী ছিল, সেই লোকগুলোর পরের প্রজন্মকে দেয়া একপ্রস্হ আচার আচরণকে ঐতিহ্য আর পরম্পরা বলে মেনে নিতে খটকা লাগে ; সেসব আজ উপড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে, আর তার জায়গায় এসেছে কারখানার পাতিমার্কা জীবন, সেই সঙ্গে জটিল আমলাবাজির বাড়বাড়ন্ত, নিয়মকানুন, হ্যান কোরো না, ত্যান কোরো না, ওখানে ঢুকতে পারবে না, সেখানে অনুমতি নিয়ে যেতে হবে। তাহলেই বুঝুন।

    আইডেনটিটি কার্ড হাতে, দরোজার বাইরে দাঁড়িয়ে বিচি চুলকোন।

    যাকগে যাক, এখন রাজকুমারের ব্যাপারটাই বলি ; পরে অন্য।

    আমি একজন রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড, ক্লিপার জাহাজে করে সুতানুটি-গোবিন্দপুরে, রাজকুমারের নিজের বাড়িতে ফিরছি, তাঁর ছেলেদের জিম্মায় হৃৎপিণ্ড বা হৃৎখণ্ডখানা হিল্লে করে আমার ছাড়ান, ওনাদের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তি, এর আগে আফ্রিকার পোঁদের তলা দিয়ে ফিরতে হতো, সেই যে-জলরাস্তায় ভাস্কো ডাগামা এসেছিল, আর তার পেছু-পেছু পর্তুগিজ জলদস্যুর দলবল, ওরা অবশ্য আলু, বাঁধাকপি, ফুলকপি, টোমাটো এনেছিল, তার আগে আমরা সেসব খেতুম না, রাজকুমারের বাড়ির লোকজনও খেতো না, জাত যাবার আঁৎকানির দরুন, রাজকুমার নিজে কিচ্ছু মানতেন না, বলতেন ওরা সময়-অন্ধ, নিজের সময়কে চিনতে পারছে না, বাইরের জগতের বদলে নিজেদের মাথার পাঁকে সাঁতরায়।

    রাজকুমার ছিলেন আত্মগর্বী, বেপরোয়া, রুচিবাগীশ, কড়া-মেজাজের, বেয়াদপি করলে চাবকাতে কুন্ঠিত হতেন না, আয়েশি, ধবধবে ফর্সা, আদেশ না শুনলে বরখাস্ত করতেন, টাকা রোজগারের আর খরচ করার ঘাঁতঘোঁত খুঁজতেন, অন্নসত্র খুলে কাঙালিভোজন করাতেন, যোয়ান বয়সে খড়াদার গোঁসাইয়ের শিষ্য ছিলেন, পেঁয়াজও ছুঁতেন না, কিন্তু ‘চৈতন্য মঙ্গল’ পড়া সুতানুটি-গোবিন্দপুরের বামুনরা ওনাকে ঠ্যাটা করার পর উনি বললেন, আচ্ছা দাঁড়া তোদের দেখাচ্ছি, আমি তোদের চেয়ে কতো বড়ো হই, কতো উঁচু হই, সেই যে উনি পালটে গেলেন, তারপর ওনার উন্নতি শুধু মরণই থামাতে পেরেছে । রাজকুমারের ভেতরে যে একজন সম্রাট রাজত্ব করছে, তা উনি বামুনদের খেলো-করা কথা শোনার পরই টের পেলেন।

    ওনার বংশে কেউই ওনার মতন শ্বেতাম্বর টাইকুন হতে পারেননি, দিগম্বর হয়ে গেছেন।

    রাজকুমার বলতেন, বাঙালিরা এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে, যেকোনো নতুন ধারণাকেই মনে করে বিপজ্জনক, যেকোনো নতুন আবিষ্কার দেখলেই ভাবে আবার সেই খেটে মরতে হবে, সমাজে এগিয়ে যাবার নতুন পদক্ষেপকে মনে করে বুঝি বিদ্রোহ করে ফেলছে, তাই যখানে বসে আছে সেখাইনেই পাথরের মতন বসে থাকতে চায়।

    রাজকুমারের বড়ো ছেলে ঠাকুর-দেবতা দেখতে পান না, ওনার ঠাকুর-দেবতা নাকি নিরাকার, যেমন মোচরমানদের হয়, বলেছিলেন আমায় রাজকুমার।

    এই সমুদ্রযাত্রা আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের, শান্তি আর অশান্তির জগাখিচুড়িতে ডুবে অদ্ভুত আনন্দ গড়ে ফেলতে পেরেছি, রাজকুমারের জন্য, চোখ বুজলেই আকাশে প্রায় কুড়িটা পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে পাই।

    আমার প্রতিটি জন্মে থেকে গেছে এই নাতিশীতোষ্ণ বোধ, থেকে গেছে সমুদ্রে দেখা উড়ন্ত মাছেদের নোনা হাওয়া, ঢেউদের ওপরে ফেনার গান।

    সেইন্ট মার্টিন দ্বীপের একজন হাবশিকে, সে বলতে গেলে বাঙ্গাল হয়ে গেছে, পর্তুগিজরা আফ্রিকার সিমলোপা প্রদেশ থেকে আরও অনেক ছেলে-ছোকরার সঙ্গে ওকে জাল ফেলে চুরি করে এনেছিল, যাতে যুদ্ধে কাজে লাগাতে পারে, তা সে যাদের সঙ্গেই যুদ্ধ হোক না কেন, রণে বনে জঙ্গলে, রাজকুমার পর্তুগিজদের মোটা টাকা দিয়ে হাবশিটাকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন, এখন ব্যাটা নিজের দেশে ফিরতে চায় না, গিয়ে করবেটাই বা কী, নিজের ভাষাও তো ভুলে গেছে। সমুদ্রপথে আঁকশি দিয়ে, ও দুটো উড়ুক্কু মাছ ধরে লোহার চৌবাচ্চায় ঢাকা দিয়ে রেখেছে, এই জাহাজে, মাংসের টুকরো খেতে দেয়, শুকনো মাংস, উটের, ভেড়ার, হলুদ আর লঙ্কাগুড়ো মাখানো, যাতে পচে না যায়, জাহাজের খালাসি ক্যাপ্টেন সকলেই ওই মাংস খায়।

    হাবশিটা আমার দেখাশোনা করে, আমি তো চাকর, ও হলো চাকরের ভৃত্য। সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ এখন বাংলাদেশে। রাজকুমারের সময়ে বাংলাদেশ ছিল না, অখণ্ড বঙ্গদেশ ছিল, সেখানে ওনার জমিদারি ছিল, সে অনেক জমিজমা ছিল, মোচোরমানরা ভেন্ন হয়ে যেতে চাইলো, তাই আলাদা হয়ে গেছে, তারপর নিজেদের মধ্যে কচুকাটা খুনোখুনি করে আলাদারও আলাদা হয়ে গেছে, এখন সেই আলাদার আলাদার মধ্যেও আলাদা হবার মারিকাটারি চলছে, আদালত চত্বর থেকে গ্রিক দেবীর মূর্তি হাপিশ করে দিয়েছে, নেড়ে সালাফিস্টদের যা তে মন ভরে।

    সুতানুটি-গোবিন্দপুরের এখনকার লোকেরা বলে যে ওরা আলাদা হয়ে ভালোই করেছে, নয়তো ছেচল্লিশের খুনোখুনি বজায় থাকতো, এখন নিজেরা লড়ে মরছে, সে-ই ভালো ।

    রাজকুমার চোগা-চাপকান পরতে ভালোবাসতেন, কাঁধে কাশ্মিরি কাজ করা শাল, নাগরা জুতোয় মুক্ত বসানো, সবই বিলেতে ছেড়ে আসতে হয়েছে, ওনার সুইটহার্টরা কেউ-না-কেউ হাতিয়ে নিয়ে থাকবেন। এখন যাকে অ্যাটিচিউড বলে, ওনার চাল-চলন থেকে তা গর্বের গুঁড়ো হয়ে ঝরে-ঝরে পড়তো, হাওয়ায় উড়তো ওনার জ্যোতি।

    ক্লিপার জাহাজ মানে তিন মাস্তুলের জাহাজ, সবকটা মাস্তুলে চারচৌকো নস্যি রঙের ছোটো-ছোটো পাল, সবচেয়ে উঁচু মাস্তুল মায়িস, দ্বিতীয়টা ফোরমাস্ট, তৃতীয় মেজ্জিন ; দুবার বিলেত যাওয়া আর দুবার আসায় ক্লিপার জাহাজের অনেক ব্যাপার জেনে ফেলেছি।

    আমি পেয়েছি চারচৌকো কেবিন, কাঠের মেঝেয় নীল রঙের কার্পেট, বার্নিশ-করা সেগুনকাঠের দেয়াল, ল্যামিনেশানে চকচকে, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড নিয়ে যাচ্ছি বলে আমার দেখাশোনার জন্যে হাবশিটা রয়েছে, সে আফ্রিকার মোচোরমান ছোঁড়া, কিন্তু বাঙ্গাল হয়ে গেছে, না ও আমার ঘটি ভাষা বোঝে আর না আমি ওর বাঙ্গাল ভাষা বুঝি। সঙ্গে ঢিলা কুলুপ আনেনি, সমুদ্রের নোনতা জল ব্যবহার করে-করে নুনুতে নুনের পলি জমে হেজে যেতে বসেছে, নোনতা জল মানে যে জলে উড়ুক্কু মাছ দুটো পুষেছে, ফিদিন বদলাতে হয়, ক্যাপ্টেন বলেছে খাবার জল ব্যবহার করতে পারবে না। সুতানুটি-গোবিন্দপুর না পৌঁছানো অব্দি বেচারার অঙ্গখানা আস্ত থাকলে হয় ; নুনুর খোসা ছাড়ানোয় যেমন সুবিধে আছে, তেমন অসুবিধেও আছে।

    রাজকুমারের এক মেয়ে আর পাঁচ ছেলে, ওনাদের পরিবারে বছর বছর বিয়োবার রীতি, তা সত্বেও উনি বেশি ছেলেমেয়ে পয়দা করতে পারেননি কেননা ওনার বউ, ব্রাহ্মণ পুরুতদের পরামর্শে, ওনাকে ছুঁলে সাতবার পাল্কিসুদ্দু গঙ্গায় চান করতেন, তখন অবশ্য গঙ্গা এরকম গুয়ে গোবরে পাঁকে নর্দমার-কারখানার জলে দুর্গাকালীর মূর্তি-ভাসানো খড়ে কালোকেলটে হয়ে যায়নি, মাদি ইলিশরা দুরছাই করে বর্মায় বিয়োতে পালায় নি, শুশুকরা এই নদীতে যাতে না সেঁদোতে হয় তার প্রতিজ্ঞা করেনি, দলদাসদের খুন করা মুন্ডুহীন ধড় ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় গাইতে-গাইতে ভাসতো না।

    ওনার বউ ছিলেন গোঁড়াবামুন- বাড়ির মেয়ে, বরের দেহের চেয়ে বেশি গঙ্গার জলকে পবিত্র মনে করতেন।

    রাজকুমার বলতেন, যারা গোঁড়া তারা অজানার চেয়ে পরিচিতকে পছন্দ করে, যা পরখ করা নয় তার চেয়ে বেশি পছন্দ করে যা আগে থাকতে পরখ করা, রহস্যের চেয়ে ঘটনাকে পছন্দ করে, সম্ভাব্যের চেয়ে যথাযথকে পছন্দ করে, অসীমের চেয়ে সীমিতকে পছন্দ করে, দূরের চেয়ে কাছেরকে পছন্দ করে, প্রাচুর্যের তুলনায় যা যথেষ্ট তাকে পছন্দ করে, নিখুঁতের হবার চেষ্টার চেয়ে যা সুবিধাজনক তাকে পেতে চায়।

    একটা উড়ুক্কুমাছ লাফিয়ে উঠে বললে, গুড স্পিচ।

    রাজকুমারকে বিদেশিনী বন্ধুনিরা এতো চাইতো যে বউয়ের দরকার পড়তো না, নিজের চোক্ষে দেখা, কানে শোনা। আমার মাঝে-মাঝে সন্দেহ হয় যে কোনো বিদেশিনী বন্ধুনি ওনার টাকাকড়ি মণিমুক্তো চুরি করে ওনাকে মেরে ফেলার তাল করেছিল, তাই অতো কম বয়সে হঠাৎ মারা গিয়েছিলেন। তখনও ওনার কতো কাজ বাকি।

    চাকর তো, তাই হলফ করতে পারি না, নইলে তাও করতুম আপনাদের খাতিরে।

    যতোদূর মনে পড়ে, আমি আমার গত চার জন্মের কথা পুরোটা মনে রাখতে পেরেছি, গ্রীষ্মের কী-গরম কী-গরম ঘামে গলগল খরার গাঁয়ের ছমছমে রাত ( অক্ষাংশ ২২.৩৪ উত্তর, দ্রাঘিমাংশ ৮৮.২৪ পূর্ব )।

    হেমন্তের ফুরফুরে হাওয়ার সোনালি বিকেল ( অক্ষাংশ ২৫.৬ উত্তর, দ্রাঘিমাংশ ৮৫.৭ পূর্ব )।

    শীতের হিহি ঠাণ্ডা লালশালুর দুপুর ( অক্ষাংশ ২৫.৩৬ উত্তর, দ্রাঘিমাংশ ৮৩.১৩ পূর্ব )।

    বর্ষার ঝমাজঝম বরফের সুপুরি বৃষ্টির সকাল ( অক্ষাংশ ১৯.০১ উত্তর, দ্রাঘিমাংশ ৭৩.০১ পূর্ব )। বিশ্বাস না হলে লাহোরে আকবরের ফারসিতে খাকের কলমকারি নথি, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা রানি ভিক্টোরোয়ার গেজেট আর দুই বাংলার ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান, দুইরকম বাংলায় ছাপানো খবরের কাগজ দেখতে পারেন ; প্রতিবারই আমার নাম হুলি রেখেছেন আমার নিজের বাবা-মা বা অন্যের বাবা-মা, আমার চোখ কটা বলে তিনবার আর একবার আকাশ কালো করে নিম্নচাপের হুলোরাঙা মেঘ জমেছিল, তাই।

    তার আগের জন্মগুলোর ঘটনা একটু-আধটু কখনও সখনও মনে পড়ে বটে, তবে গোলমাল হয়ে যায় যে তা ছয় বারের জন্মে ঘটেছিল নাকি দশ বারের, নাকি অন্য কোনো, তবে হুলি নামটা পালটায়নি, বড়ো জাতে জন্মালে পদবি পালটেছে, ছোটো জাতে জন্মালে পদবির দরকার হয়নি।

    রাজকুমার, মানে ছয় ফুটের গৌররাঙা যে মানুষটার কথা থেকে-থেকে মনে পড়ছে, যিনি মেমদের কোমরে হাত রেখে সুইটহার্ট বলতেন, যদিও সুইটহার্ট বলতে যে ঠিক কী বোঝায় তা আজও জানি না, মিষ্টি হৃদয় মানেই কি মিষ্টি মেয়ে, ভেতরে নোনতা বাইরে মিষ্টি কিংবা ভেতরে নোনতা বাইরে নোনতা হলেও তো তাকে চাওয়া যায়, নয় কি ?

    সেই রাজকুমারের, যাঁর গোলাপি প্রজাপতির ডানার মতন কাঁপতে-থাকা হৃৎপিণ্ডও বিশ্বাস করতে চাইছেন না যে, ওনার সঙ্গে কথাবাত্রার আগেও আমি জন্মেছিলুম, উনি যে ভাবছেন হুলি নামটা ওনার দেয়া, তাও ভুল।

    রাজকুমার ঠাকুর ঘরে গরদের ধুতি কাঁধে সিল্কের চাদর দিয়ে দেবী-দেবতার এতো পুজোআচ্চা করতেন, অথচ বিশ্বাস করতে পারলেন না যে আমি এর আগেও জন্মেছি, হিন্দু যখন, তখন বার বার জন্মাবার সুযোগটা নেবো না কেন ! অ্যাঁ ? শীতেও খালি গায়ে পুজো করতেন উনি।

    এই জন্মটা না হয় শুদ্দুর হয়ে জন্মেছি, আগের জন্মে তো ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য হয়ে জন্মেছিলুম। মনুস্মৃতির প্রোটোকলটা যে কোন খাতে বয়, তা ঠাহর করতে মাথা ডগমগ করে, বামুনের মধ্যেও এতো রকমের বামুন কেন, উনি রাঢ়ীশ্রেণির বামুন, অন্য বামুনগুলো বোধহয় আড়িশ্রেণি, ঘড়িশ্রেণি, বড়িশ্রেণি, নুড়িশ্রেণি, চুড়িশ্রেণি। নাহ, সংসারত্যাগী বামুন, দীক্ষা বিলোবার বামুন, গেরস্ত বামুন, জজমানি বামুন, মন্দিরের পুজুরি বামুন, ছেরাদ্দের বামুন, ব্রাত্য বামুন যারা পৈতে ফেলে দিয়েছে, বর্ণহীন বামুন যে জাতিপ্রথা মানে না। তাহলে বামুনদের মধ্যেও উঁচু জাত-নীচু জাত আছে, অ্যাঁ।

    বাঙালিদের মধ্যে ক্ষত্রিয় আর বৈশ্য নেই কেন, যার জন্যে আমাকে দুবার অবাঙালি হয়ে জন্মাতে হয়েছিল, শুদ্দুরদের মধ্যেও এতো ভাগাভাগি কেন, ওফ কতো রকমের শুদ্দুর যে হয় তা শুদ্দুররাই বলতে পারে না, কামার কুমোর ছুতার স্যাকরা লোহার মালি মালো তাঁতি তেলি জেলে চাষি, তারা তো কৌরব পক্ষে ছিল, তবে ক্ষত্রিয় নয় কেন !

    পাটনার আফিমকুঠীর এক আফিমচাষীর বিধবাকে বিয়ে করেছিল জোব চার্ণক, চাষীরা তো তখন শুদ্দুর ছিল না !

    পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়, উগ্রক্ষত্রিয় বাঙালিরা সব গেলো কোথায় ? তারা তো ক্ষত্রিয় ছিল !

    নেপালের লুম্বিনীর গৌতমও রাজকুমার ছিলেন, তিনিই যখন এই প্রোটোকল নষ্ট করতে পারলেন না, গাছের তলায় বসে বুদ্ধ হয়ে গেলেন, তখন যে-রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড আমি ফরম্যালিনের শরবতে চুবিয়ে সুতানুটি-গোবিন্দপুর ফিরছি, তিনি কীই বা করতে পারতেন।

    কলকাতায় লুম্বিনী পার্ক নামে একটা পাগলামি সারাবার হাসপাতাল আছে যেখানে ঋত্বিক ঘটক, বিনয় মজুমদার, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর আমি ছিলুম দিনকতকের জন্যে, বিজলির ছোবল মেরে-মেরেও কোনো সুরাহা হয়নি।

    পুরুষের পাগলামি সারে না, সে যদি রাজকুমার হয়ে জন্মায়, তাহলেও।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না টু-পিস সাঁতারের পোশাকে বিদেশিনীদের।

    তুই ভাবছিস দেখিনি, আমি চিরটকাল ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছি।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগীতায় জিতে ফেরা ভারতীয় নিকোল ফারিয়া, দিয়া মির্জা, সুস্মিতা সেন, ঐশ্বর্য রায়, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, লারা দত্ত, যুক্তা মুখি, ডায়না হেডেনকে।

    তুই ভাবছিস জানতে পারিনি, আমি সবই আগাম জানতে পারি রে।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না সুচিত্রা সেনকে ; সুচিত্রা সেনও দেখে যেতে পারলেন না রাজকুমারকে।

    আমরা দুজনে দুজনকে দেখেছি, তুই জানিস না।

    রাজকুমারের হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে আমার কথাবাত্রা হয়েছিল ১৮৪৬ সালে, যখন কিনা আজ এটা ২০১৭ সাল, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সেই সময় থেকে বয়সের হিসাব ধরলে এখন আমার বয়স ১৭১ বছর, দাড়ি-চুল-গোঁফে চিরুনি পড়েনি বহুকাল, যশোর থেকে পালিয়ে আসার সময়ে আনা হয়নি, মেহেদি লাগিয়ে বাদামি জটাজুট হই, আর ভালো না লাগলে ন্যাড়া হয়ে যাই।

    জাহাজের কেবিনে বসে কথা বলার সময়ে টের পাচ্ছিলুম যে দুঃখে-দুঃখে আমার গলার ভেতরে চার-পাঁচটা কাক ঢুকে বসে আছে।

    এই ১৭১ বছরেও, চাকরদের হেড হরিখুড়ো যে গাঁয়ে থাকে, সেখানে এই ব্যাপারগুলো এখনও পালটায়নি : ১) শ্রাদ্ধ আর বিয়ের ভোজে বামুনদের আগে খাওয়ানো হয়, সব শেষে শুদ্দুরদের ; ২) নিচুজাতের মানুষকে খেতে দেবার জন্যে উঁচু জাতের বাড়িতে কাপ-গেলাস এমন অচ্ছুত করে রাখা থাকে যেন সেগুলো হাতবোমা ; ৩) গাজন বা শিবের অন্য পুজো্য নিচুজাতের কাউকে সন্ন্যাসী সাজতে দেয়া হয় না ; ৪) উঁচুজাতের বউ-মেয়েরা নিচুজাতের বউমেয়েদের ছুঁতে চায় না, এড়িয়ে যায় ; ৫) একজন পৈতেধারী বামুনের বারো বছরের ছেলেকে নিচুজাতের সত্তর বছরের বুড়ো পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ চায় ; ৬ ) অনেক গ্রামে জাত অনুযায়ী পাড়া ভাগ করা আছে ; ৭ ) গরিব পুজারী আর পিণ্ডদানকারী বামুনকে অন্য বামুনরা নিচু নজরে দ্যাখে ; ৮) উঁচুজাতের রান্নাঘর, শোবারঘর আর ঠাকুরঘরে নিচুজাতের লোকেদের ঢুকতে দেয়া হয় না ; ৯ ) নীচুজাতের মানুষকে যে থালায় খেতে দেয়া হয় তা উঁচুজাতের বাড়ির বউরা ধুতে চায় না, কাজের লোককে দিয়ে ধোয়ায় আর যদি কাজের লোক না থাকে তাহলে বাড়ির পুরুষরা ধুয়ে দ্যায় ; ১০ ) মোচোরমানদের জন্যে বাসন-কোসন আলাদা।

    হরিখুড়োর গাঁয়ে মোচরমানদের মধ্যেও উঁচু জাত নীচু জাত আছে, তাদের মধ্যে বিয়ে হয় না। সুন্নি মুসলমান আর শিয়া মুসলমান আছে, তাদের মধ্যে বিয়ে হয় না।

    আমি বিয়েথা করিনি, রাজকুমারের দেখাশুনা কে করবে আমি যদি সংসারি হয়ে যাই !

    ১৭৫৬ সালে সিরাজ উদ দৌলা যখন কলকাতা আক্রমণ করেছিলেন, তখন আমি দু’পক্ষের লড়াইয়ের মাঝে পড়ে খুন হয়ে গিসলুম, তারপর গোবিন্দপুরের জঙ্গলে এক গর্ভবতী বাঘিনী আমাকে খেয়ে ফেলেছিল, যখন ওর বাচ্চা হলো, সেই সঙ্গে আমিও সুন্দরবনে জন্মেছিলুম, বাঘ হয়ে নয়, মানুষ হয়েই, বাঘিনী আমাকে অন্য রকমের দেখতে বলে খুবই আদর করতো, আমার সারা শরীর চাটতো আর আমার কাতুকুতু লাগতো। বাঘিনীর পেটের ভেতরে আরও বেশ কয়েকজন মানুষ ছিল, তারা বললে, না, না, পেছন দিক দিয়ে জন্মাতে পারব না, বাঘিনী হজম করে আমাদের বদবুদার ন্যাড়ে প্রসব করে দিক সেও-ভি-আচ্ছা, আমাদের দাবি মানতেই হবে, আমরা সামনে দিক থেকে জন্মাতে চাই, ফলে সেই মানুষগুলো আর জন্মাতে পারলো না, সুন্দরীগাছের গোড়ায় বাঘিনীর গু হয়ে অমর হয়ে গেল।

    ভাটার সময়ে সুন্দরীগাছের আকাশমুখো শেকড়ের মাঝে ন্যাড় হয়ে যাওয়া মানুষরা দেখা দিতো যখন, তারা চেঁচাতো সর্বহারা হওয়া ভালো, গরিব হওয়া ভালো, উদ্বাস্তু হওয়া ভালো, জবরদখল করা ভালো, ইংরেজি না শেখা ভালো ; এই সমস্ত কথা আউড়ে তারা অমর হতে চাইলে।

    যে লোকটা এইসব স্লোগানের নেতা ছিল, সে নিজের মরিচঝাঁপি নামে উদ্বাস্তুদের দ্বীপকে চারিদিক থেকে ঘিরে গুলি চালিয়ে বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে লাশগুলোকে সমুদ্রে ফেলার হুকুম দিয়ে বিলেতে গরমকাল কাটাতে হার সিঙ্গল মল্ট খেতে চলে গিয়েছিল।

    মানুষ যতোদিন বেঁচে থাকে, অমর হতে চায়, তা সে গু হয়েই হোক, কিংবা নিরাকার গোল্লা হয়েই হোক।

    বাঘিনীর কাছ থেকেই আমি কাঁচা মাংস খেতে শিখেছিলুম, জন্তু আর মানুষ মেরে খেয়ে ফেলতুম, পরে শুনেছি যে বাঘিনীর ছেলেপুলেরা এইশাল ওইশাল হ্যানশাল ত্যানশাল নাম নিয়ে মানুষ মারতো আর খেয়ে ফেলতো, লুকিয়ে ঘুরে বেড়াতো আর যাদের জমিজমা আছে তাদের জবাই করতো, ওদের দেখাদেখি সেপাই সান্ত্রিরাও ঝাঁটছাল বালছাল আঁড়ছাল গাঁড়ছাল সেজে মানুষ খাওয়া আরম্ভ করেছিল, কিন্তু সেসময়ে আমি আরেকবার জন্মাইনি, দুই জন্মের মাঝে আরাম করছিলুম। ওদের কারোর গায়েই আমার মতন বাঘের চামড়ার ডোরা দাগ ছিল না, যে কজনের গায়ে চিতাবাঘের ফুটকি ছিল তারা শীতকালেও পুকুরে কুয়োয় কলতলায় নদীতে চান করে ধুয়ে ধুয়ে ফুটকির দাগ চামড়া থেকে মুছে ফেলতে পেরেছিল, মুছে ফেলে বলেছিল এইশাল ওইশাল হ্যানশাল ত্যানশাল চিতাবাঘদের দাগগুলো ছিল পদ্ধতিগত ভুল, এগুলোকে বাঘের ডোরার মান্যতা দেয়া যায় না।

    ওরা কিন্তু অমর হতে পারেনি, ওদের নাম-সাকিনও কেউ মনে রাখেনি ; যে গেছে সে গেছে ; যা গেছে তা গেছে। ওদের যারা হালুমখোর বানালে, আর যারা হাপিশতোড় শেখালে, সেই, চারু এম, জ্যোতি বি, সিদ্ধার্থ আর, আজ অমর, হাসি মুখ, ছবি হয়ে, ভক্তদের চুনওঠা দেয়ালে, দরমার বেড়ায়, চ্যাঁচারির কুঁড়েঘরে এই যে হেথায় কুঞ্জছায়ায় স্বপ্নমধুর গাইছেন।

    আমি তো যতোদূর জানি ভুল মানে ভুল, তা সে পদ্ধতিগত হোক বা দিবঙ্গতবা সদগতিগত হোক।

    বাঘিনীর পেছন দিক দিয়ে জন্মেছিলুম বলেই তো আমি এককালে ঠগীদলের সর্দার হতে পেরেছিলুম ; কমিউনিস্ট দলের সর্দার হবো তাও ভেবেছিলুম, কিন্তু বার বার জন্মাবার ফলে এমন ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলুম যে আর আগ্রহ হয়নি। ততোদিনে কমিউনিজমও ক্লান্ত, ভোদকা টেনে ইয়েল্তসিন নামে এক মাতাল কামান দেগে উড়িয়ে দিলে হাজার হাজার লোকের জোর করে দেখানো স্বপ্ন।

    আসলে কমিউনিজম হোক বা অন্য কোনো ইজম, সব ইজমই একসময়ে ক্লান্ত হয়ে যায়, তত্বতে গাঁটে-গাঁটে আরথ্রাইটিস হয়ে যায়। পুঁজির হলকা ভেতরে ভেতরে ফোঁপরা করে ফ্যালে সবকটা ইজমকে।

    চীন দেশে কমিউনিজম ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিল, তাই ওরা নতুন উপায় বার করলে, বললে সর্বহারা হওয়া ভালো নয়, গরিব হওয়া ভালো নয়, উদ্বাস্তু হওয়া ভালো নয়, ন্যাড়ের জীবন ভালো নয়, যে করেই হোক ইংরেজি শিখতেই হবে, ব্যাস, ওরা এখন সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাধর দেশ, ওদের চেপ্টা নাক প্রতি বছর একটু-একটু করে উঁচু হয়ে চলেছে। ওরা সব রকমের মাংস খায়, যেকোনো প্রাণী হলেই হলো, ঘাস থেকে ফড়িং তুলে খেতে ভালোবাসে, তেঁতুলে বিছের বড়া খেতে ভালোবাসে, রাস্তার ধারে কাঠিতে গিঁথে সাপের ফুলুরি বিক্রি করে। যখন মনোজ বসুর সঙ্গে চীনে গিয়েছিলুম, তখন খেয়েছি।

    যারা চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান হাঁকতো, তারা বাঙালির গাঁ-গেরাম-গঞ্জ-শহর থেকে উধাও। চীনও সেই চেয়ারম্যানকে উধাও করে দিয়েছে।

    এই যে গোরু-মোষের মাংস খাই, তার কোনো শাস্ত্রগত ভুল নেই, কিন্তু হিন্দিওয়ালারা, যারা শাকাহারি, মানে শাক দিয়ে ঢেকে টাকা খায়, টাক পড়ে গেছে বলে টিকি ঝরে গেছে, টিনের ত্রিশূলকে মনে করে সমাজ পালটানোর তত্ব, ভাবে, তাদের যা শেখানো হয়েছে তা-ই তো তারা ভাববে, মনে করে, গোরু-মোষ খেলে নরকে যাবে।

    কী বোকামি বলুন ! আরে আমি তো হিন্দু, বার বার জন্মাই, জন্মাবো, জন্মেছি, সেখানে নরকে যাওয়া স্বর্গে যাওয়ার গোলমাল আসছে কোথ্থেকে শুনি, অ্যাঁ !

    মহাভারত বইয়ের, মহাভারত তো আমাদের ইতিহাস, কী না, অ্যাঁ, ব্যাসদেবজীর লেখা, তা ওই ইতিহাসের অনুশাসন পর্বে পাণ্ডবদের ক্যাবলা বড়ো ভাই যুধিষ্ঠিরকে ভীষ্ম বলেছিলেন শ্রাদ্ধে যাদের নেমন্তন্‌ করা হয়েছে তাদের যেন গোরুর মাংস ভালো করে রেঁধে খাওয়ানো হয়, তাহলে পূর্বপুরুষরা স্বর্গসুখ পাবেন।

    বিরাট রাজা তো পুরো একটা খাটাল খুলেছিলেন টেস্টি-টেস্টি গোরু পোষার জন্য, এখনকার দিন হলে অবশ্য সেগুলো পাচার হয়ে যেতো আর গৌরাক্ষসরা পাচারকারীদের আড়ং ধোলাই দিয়ে তক্তা করে মাটিতে মিশিয়ে দিতো।

    আরেকটা ইতিহাস, যেটা বাল্মীকিজি লিখেছিলেন, তাতে আছে যে বনবাসের পথে রাম-সীতা-লক্ষ্মণ যখন ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে পৌঁছেছিলেন, তখন ভরদ্বাজ সন্ন্যাসি ওনাদের মধুপর্ক, বৃষমাংস আর ফলমূল দিয়ে লাঞ্চ করিয়েছিলেন। বাল্মীকিজি শুদ্দুর ছিলেন শুনেছি, নারদের আশীর্বাদে ব্রাহ্মণ হয়ে গিসলেন।

    চাণক্যর কথা তো জানেন, যাঁর সমান আই কিউ সেই সময়ে কোনো পণ্ডিতের ছিল না, উনি অর্থশাস্ত্র বইতে লিখে রেখে গেছেন যে রাখালরা মাংসের জন্য ছাপ দেয়া গোরুর মাংস কাঁচা কিংবা শুকিয়ে বিক্রি করতে পারে। ছাপ দেয়া মানে এখন যাকে বলে আধারকার্ড।

    তারপর চরক, ওই যিনি ডাক্তার ছিলেন, উনি ওনার সংহিতায় লিখে গেছেন যে গোরুর মাংস খেলে বাত, নাক-ফোলা, জ্বর, শুকনোকাশি, রোগা হয়ে যাওয়া, পেট গরম সারে। চরক কিন্তু সত্যিকারের ডাক্তার, দেড়-দুকোটি টাকা দিয়ে এমবিবিএস আর এমডি হতে হয়নি।

    ব্যাপারটা আমি জানি, তার কারণ বাবর আর ইব্রাহিম লোদি দুটো পার্টিকেই পানিপতের যুদ্ধের সময়ে আমি মাংস নুন তেল কাঠকয়লা সাপলাই দিতুম। সেই জন্মে আমার নামছিল হুলিকাঞ্চন গুপ্তা, বেনের বাড়ি জন্মেছিলুম, বাপ-ঠাকুর্দা আগে থাকতেই ব্যবসার ঘাঁতঘোঁত জানতো, সিংহাসনে যে পার্টিই বসুক না কেন, মাল তাকে তো বেচবেই, তার শত্তুরকেও বেচবে। শত্তুরকে একটু বেশি দামে খারাপ মাল বেচবে, যাতে যে সিংহাসনে বসে আছে, সে চটে না যায়। বেনে বলে আমরা ছিলুম শাকাহারি, দইয়ের রায়তা দিয়ে পুদিনার পরোটা খেতুম, কিন্তু ব্যবসা তো যেকোনো জিনিস নিয়ে করা যায়, কেনবার পার্টি হলেই হলো ; এই যে আজকাল বুদ্ধি ছড়ানোর এতো বই বিক্রি হচ্ছে, তাও তো ব্যবসা, মুকখুরা তো কিনছে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

    বাবর এসেছিল বাইরে থেকে, নাক চেপটা, দাড়িতে চারটে চুল, গোঁফে দুটো করে, সেই চেঙ্গিজ খানের বংশধর, যার তত্ব ছিল ধরো আর মারো, মেয়েদের লোটো আর তুলে নিয়ে যাও, বাড়িঘর পুড়িয়ে পাবলিকদের ভাগাও। সেই টেকনিক রপ্ত করে তিনি আজ অমর, ওনার স্টেনলেস স্টিলের বিরাট মূর্তি বসেছে মোঙ্গোলিয়ার ফাঁকা মরুভূমিতে, সেই চেঙ্গিজ খান, তার কোনো এক প্রজন্ম ছিল বাবর, চেঙ্গিজ খানের একশো আটাত্তরটা বউ ছিল, বাবর নিশ্চয়ই কোনো তাগড়া বউয়ের নসল থেকে জন্মেছিল।

    আসবার আগে বাবর এদেশের কিছুই জানতো না, শুধু তরমুজ খাওয়া জানতো। তবে বাবর লোকটা দিন নেই দুপুর নেই রাত নেই সন্ধে নেই লড়ে লড়ে যুদ্ধু বিশেষজ্ঞ হয়ে গিয়েছিল, সেই তখনকার দিনে, মানে ১৫২৬ সালে, মোটে পনেরো হাজার সেনা নিয়ে সুলতান ইব্রাহিম লোদির চল্লিশ হাজার সেনাকে গুহারান হারিয়ে দিলে, তার কারণ বাবরের ছিল কামান বন্দুক আর ঘোড়সওয়ার, যখন কিনা ইব্রাহিম লোদির এক হাজার হাতি বাবরের কামানের গোলায় ক্ষেপে গিয়ে নিজের সেনাদেরই পায়ে পিষে মেরে ফেললে, তাছাড়া সুলতানের সেনায় অনেক হিঁদু ছিল যারা মাংস খেতে চাইলে না, তাদের জন্যে ফলমূল চালডাল সাপলাই দিতে হয়েছিল, তারা বোধহয় ভেবেছিল নেড়ের সঙ্গে নেড়ে লড়ে মরুক, আমাদের তাতে কি, এক নেড়ে গিয়ে আরেক নেড়ে আসবে, অবস্হা যে কে সেই।

    বাবরের পার্টি অনেক দূর দেশ থেকে এসেছিল বলে ওদের শুকনো মাংস খাইয়ে চালিয়ে দিয়েছিলুম, শুকনো মাংসই ওরা পছন্দ করতো, সঙ্গে কাঁচা মাংস নিয়ে তো আর যুদ্ধুর মাঠে যাওয়া যায় না। সেনারা তো সবাই নেড়ে, মাংস পেয়ে বাবর কতো যে সোনাদানা দিয়েছিল, বাড়িতে মাটির তলায় পুঁতে রাখতে হয়েছিল। এই যে শেষ পর্যন্ত বাবর জিতে গেল, তা তো আমাদের সাপলাই দেয়া শুকনো মাংসের জোরে, নয়তো ভারতে মোগল সাম্রাজ্য হতেই পারতো না। সিংহাসনে হাঁটু মুড়ে বসেও বাবর শুকনো মাংসের দোপেয়াজা রিজালা খেতে চাইতো, এক পিস তরুমুজ খেয়ে এক কামড় রিজালা, তখন জোরে ঢেঁকুর তোলা আর পাদায় ছিল সম্রাটদের একচ্ছত্র অধিকার।

    একটা উড়ুক্কুমাছ লাফিয়ে উঠে বলল, গুড স্পিচ।

    বাবরের ছেলেও রাজকুমার, বড্ডো রোগে ভুগতো, সাত মাসের মাথায় পয়দা হয়েছিল, হুমায়ুন, সেও বেশি দিন সিংহাসনে টিকলো না, আটচল্লিশ বছর বয়সে ওই যাকে বলে ইন্তেকাল, তাই করলো, যখন কিনা বাবর পশ্চিম দিকে মুখ করে নিজের জীবনের বদলে ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখতে বলেছিল। পরে একজন কাব্যলিখিয়ের সুবিধে হল বাবরের পশ্চিমমুখো দোয়া চাইবার ব্যাপারটা নিয়ে ; না, বাবরের ভাষায় নয়, সুতানুটি-গোবিন্দপুরের ভাষায়।

    হুমায়ুন বড্ডো আফিম খেতো, নেশার ঘোরে সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে ইন্তেকাল করেছিল, তার দোষ আমার বাপ-ঠাকুর্দার ওপর এসে পড়েছিল, ভালো জাতের আফিম সাপলাই করার জন্য, আমরা তো ওনার দরবারের সকলকেই, যারা আফিম ভালোবাসতো, তাদের বিশুদ্ধ আফিম সাপলাই দিতুম। তারপর থেকে বিশুদ্ধ জিনিস বিক্রি বন্ধ করে সবেতেই ভেজাল মেশাতে হয়।

    হুমায়ুনের পরে যে সিংহাসনে বসল, সে সত্যিই কচি খোকা রাজকুমার, আকবর। উনিও যুদ্ধু করতে ভালোবাসতেন, আমারাও শুকনো মাংস সাপলাই করতে ভালোবাসতুম।

    আমি যে রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড নিয়ে সুতানুটি-গোবিন্দপুরে ফিরছি, সেই রাজকুমারের বাপ-ঠাকুর্দা চালাক-চতুর লোক ছিলেন, সিরাজের দলকে সমর্থন করেননি ; বিলেতের সায়েবদের পক্ষে ছিলেন, যেমন ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র, যাকে সায়েবরা রাজা করে দিলে, রাজা নয় মহারাজা, আলিবর্দি খাঁ তাকে জেলে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, খাজনা দিতে পারেননি বলে, কিন্তু লোকটা ঘোড়েল, যেদিকে হাওয়া বয় সেই দিকে মুখের তত্বে বিশ্বাস করতেন।

    অন্য দেশে জামশেদজি টাটা, ঘনশ্যামদাস বিড়লা, ধিরুভাই আমবানি, আজিম প্রেমজি, নারায়ণ কৃষ্ণমূর্তি, রাহুল বাজাজ, ওয়ালচাঁদ হীরাচাঁদ, পালোনজি মিস্ত্রি, ইন্দু জৈন, কস্তুরভাই লালভাই, জামশেতজি জিজিভয়, টি ভি সুন্দরম আইয়ার, নবীন জিন্দল, অজিত গুলাবচাঁদ, আনন্দ মহেন্দ্র, অজয় পিরামল, আরদেশির গোদরেজ, বি এল মুঞ্জল, জি আর গোপীনাথ, কিরণ মজুমদার শা, এল আর কিরলোসকর, শিব নাদার, ভেনুগোপাল ধুতদের মতন ধনী পাঁয়তাড়া-বিশেষজ্ঞ জন্মেছেন, অথচ রাজকুমারের পর, আমার এই-ওই জন্মে আমাদের দেশে কেউই অমন হতে পারল না।

    রাজকুমার বিশ্বাস করতেন ইউরোপীয় বৌদ্ধিক প্রগতিতে, সময়ের সামাজিক প্রগতিতে, যুক্তিবাদী বিচার বিবেচনা আর বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাহায্যে পাওয়া মুক্তিতে, ইতিহাসের এমন এক গতিতে যার গড়াগ্গড় রাস্তা হলো মানব কল্যাণমুখী। গোঁড়া হিন্দু বাঙালির মামদোবাজি থেকে সমাজকে ছাড়িয়ে এনে আরও তাড়াতাড়ি বাঙালির জীবনে যুক্তি আর বিচারবুদ্ধির ভূমিকাকে গূরুত্ব দিতে চেয়েছিলেন উনি, কিন্তু সেই জন্যে সকলেই ওনাকে ইউরোপের নকলনবীশ বলে দুষতে লাগলো। বিলেতে গিয়ে ইউরোপীয়দের এমন তারিফ করলেন যে সে খবর পেয়ে সুতানুটি-গোবিন্দপুরের হিন্দু নেতারা খাপ্পা।

    রাজকুমার কি কখনও বিষাদে ভুগেছেন ? নাহ, কক্ষোনো নয়।

    হ্যাম, টেণ্ডারলয়েন, ফিলেটো, কোপা, বোস্টন বাট, হকস, চপস, রিবটিপ, জোল, বেকন, স্পাটা, টেস্টা কিংবা সালামির সঙ্গে দুপেগ সিঙ্গল মল্টে বিষাদ ছাক্কাস।

    হায়, কম বয়সেই মারা গেলেন রাজকুমার।

    রাজকুমার পড়ে যেতে পারলেন না ওনার জগৎবিখ্যাত নাতির এই লেখা, ‘সুবিচারের অধিকার’ শিরোনামে নাতি লিখেছিলেন, “মুসলমান ভ্রাতাদের প্রতি ইংরেজের স্তনে যদি ক্ষীরসঞ্চার হইয়া থাকে তবে তাহা আনন্দের বিষয়, কিন্তু ‘আমাদের’ প্রতি যদি কেবলই পিত্তসঞ্চার হইতে থাকে তাবে সে আনন্দ অকপটভাবে রক্ষা করা কঠিন হইয়া উঠে।”

    রাজকুমার পড়ে যেতে পারলেন না ওনার জগৎবিখ্যাত নাতির এই লেখা, ‘স্বামী শ্রদ্ধানন্দ’ শিরোনামে নাতি লিখেছিলেন, “অতএব যদি মুসলমান মারে আর ‘আমরা’ পড়ে পড়ে মার খাই -- তবে জানব, এ সম্ভব করেছে শুধু ‘আমাদের’ দুর্বলতা। আপনার জন্যেও, প্রতিবেশীর জন্যেও, ‘আমাদের’ নিজেদের দুর্বলতা দূর করতে হবে। ‘আমরা’ প্রতিবেশীদের কাছে আপিল করতে পারি, ‘তোমরা’ ক্রুর হোয়ো না, ‘তোমরা’ ভালো হও, নরহত্যার উপরে কোনো ধর্মের ভিত্তি হতে পারে না -- কিন্তু সে আপিল যে দুর্বলের কান্না।”

    হায়, রাজকুমার পড়ে যেতে পারলেন না, সতেরো বছর বয়সে লেখা ‘দেবদাস’ উপন্যাসের লেখকের জ্ঞানবাক্যি, যা নিয়ে কতোবার যে সিনেমা হয়েছে কতো ভারতীয় ভাষায়, দেবদাস সেজেছে ফণী শর্মা, প্রমথেশ বড়ুয়া, কে এল সায়গল, নাগেশ্বরা রাও, দিলিপ কুমার, হাবিব তালাশ, ঘাট্টামামেবি কৃষ্ণ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বুলবুল আহমেদ, ভেনু নাগাভাল্লি, প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি, শাহরুখ খান, অভয় দেওল, নাদিম শাহ, শাকিব খান, রাহুল ভাট, সেই লেখকের ‘বর্তমান হিন্দু-মুসলমান সমস্যা’ শিরোনামে এই মতামত, “হিন্দুস্তান হিন্দুর দেশ। সুতরাং এ-দেশকে অধীনতার শৃঙ্খল হইতে মুক্ত করিবার দায়িত্ব একা হিন্দুরই। মুসলমান মুখ ফিরাইয়া আছে তুরস্ক ও আরবের দিকে, -- এ দেশে তাহার চিত্ত নাই। যাহা নাই তাহার জন্য আক্ষেপ করিয়াই বা লাভ কি, এবং তাহাদের বিমুখ কর্ণের পিছু পিছু ভারতের জলবায়ু ও খানিকটা মাটির দোহাই পাড়িয়াই বা কি হইবে। আজ এই কথাটাই বুঝিবার প্রয়োজন হইয়াছে যে এ কাজ শুধু হিন্দুর, --- আর কাহারও নয়। ”

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না তাঁর প্রপৌত্রের আঁকা ভারতমাতা।

    তুই কী করে জানলি দেখিনি ? আমি তো আগাম দাঙ্গাও দেখে ফেলেছি।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না তাঁর ছেলের অতিবামুন কাল্টের নিরাকার পরমব্রহ্ম কেমন করে ছবি আঁকার পৌত্তলিকতায় পৌঁছে গিয়েছিল।

    তুই জানিস না, আমি তখনই জানতুম, কোথাকার ঠাকুর-দেবতা কোথায় পৌঁছোবে।


     

    হৃৎপিণ্ড : আর কতো দূর হুলি ?

    আমি : আরও তিন মাস, রাজকুমার।


     

    রাজকুমার আমায় বলেছিলেন যে, আমবাগানে পড়াশুনা শেখাবার বদলে, দোলখেলার নাচানাচির বদলে, বাউলদের ছিলিমটানা হইচইয়ের বদলে, একটা ইন্সটিউট অফ টেকনোলজি খোলার ইচ্ছে ছিল তাঁর, উনি বেঁচে থাকলে তা-ই করতেন, ওনার অতিবামুন কাল্টগুরু হবার আদেখলাপনা ছিল না ; জমিদারি আর ব্যবসা অবহেলা করে ওনার ছেলে অতিবামুন কাল্টগুরু হয়ে গিয়েছিল বলে রাজকুমার মারা যাবার আগের বছর, ১৯৪৫ সালের মে মাসে কড়া চিঠি লিখেছিলেন তাকে, মনে আছে আমার :

    “আই হ্যাভ দিস মোমেন্ট রিসিভড ইয়োর লেটার অফ ৮থ এপ্রিল অ্যাণ্ড কোয়াইট ভেক্সড উইথ দি নেগলিজেন্স শোন বোথ অন দি পার্ট অফ রাজা বরদাকান্ত অ্যাণ্ড ইয়োর ওন মোক্তারস অ্যাবাউট দি সেল অফ শাহুশ তালুক। অ্যাজ ফর দি ফরমার, হি ডাজ নট কেয়ার এ পাইস অ্যাবাউট হিজ ওন অ্যাফেয়ার্স --- বাট হাউ ইয়োর সারভেন্টস ক্যান শেমফুলি নেগলেক্ট টু রিপোর্ট দিজ ম্যাটার্স ইজ সারপ্রাইজিং টু মি। অল দ্যাট আই হ্যাভ হিদারটু হার্ড ফ্রম আদার কোয়ার্টার্স, অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ হোয়াট মিস্টার গর্ডন হ্যাজ রিটন টু মি অ্যাবাউট ইয়োর আমলাজ নাউ কনভিনসেস মি অফ দি ট্রুথ অফ দেয়ার রিপোর্টস। ইট ইজ ওনলি এ সোর্স অফ ওয়ানডার দ্যাট অল মাই এসটেটস আর নট রুইনড। ইয়োর টাইম, আই অ্যাম শিওর, বিইং মোর টেকন আপ ইন রাইটিং ফর নিউজপেপার্স অ্যাণ্ড ইন ফাইটিং উইথ দি মিশনারিজ দ্যান ইন ওয়াচিং ওভার অ্যাণ্ড প্রোটেক্টিং দি ইমপরট্যান্ট ম্যাটার্স হুইচ ইউ লিভ ইন দি হ্যাণ্ডস অফ ইয়োর ফেভারিট আমলাজ -- ইনস্টেড অফ অ্যাটেণ্ডিং দেম ইয়োরসেল্ফ ভিজিল্যান্টলি। ”

    হাবশিকে বলছিলুম, ও বুঝুক বা না বুঝুক, জানিস, রাজকুমার বলেছিলেন, বুঝলি হুলি, ধনী হবার চেষ্টা করবি, পয়সাঅলা হবার চেষ্টা করবি, বৈভবশালী হবার চেষ্টা করবি, ব্যবসাদার হবার চেষ্টা করবি, কারখানা খোলার চেষ্টা করবি। অতিবামুন হবার চেষ্টা করিসনি, জাতধর্ম যাক চুলোয়। ধর্ম নিয়ে এতো ঢাকঢোল পেটাবারই বা কী দরকার।

    উড়ুক্কু মাছ দুটো লাফিয়ে উঠে বললে, গুড ফিলোজফি, বাট বেঙ্গলিজ লাভ হোয়াইট কলার জবস।

    রাজকুমারকে যদি সুতানুটি-গোবিন্দপুরের ইংরেজরা, যারা নেটিভদের ভালো চোখে দেখতো না, আর বাড়ির লোকেরা, জলচল বন্ধ করে একঘরে না করতো, তাহলে উনিও ধিরুভাই আম্বানি হতে পারতেন, এমনকি ওদের থেকে অনেক এগিয়ে থাকতে পারতেন, ধিরুভাই আম্বানিও তো আরবদেশে ভুঁড়িকাঁপানো মেয়েদের নাচ দেখতো। তবে রাজকুমারের দোষ ছিল যে উনি কারখানা বসাবার চেয়ে সবকিছু কেনা আর বেচায় এতো জড়িয়ে পড়েছিলেন যে পরে গিঁট খুলে বেরোতে পারেননি, নয়তো রানিগঞ্জ থেকে কলকাতা, বর্ধমান থেকে হাওড়া পর্যন্ত রেল লাইন উনিই বসিয়ে দিতেন।

    ধিরুভাইয়ের বিরাট কারখানা কেমন খেপে-খেপে বিদেশ থেকে লুকিয়ে আনা হয়েছিল তা কি আর আমি জানি না, সকলেই জানে, ওনার মা, ছেলেরা, গাঁয়ের লোকেরা, দিল্লির নেতারা, কিন্তু কই ওনার কাগজপত্র তো ওনার নাতিরা পুড়িয়ে দেয়নি, উল্টে ওনার বড়ো ছেলে বড়োলোকদের মধ্যে সবচেয়ে বড়োলোক হয়ে গেল। সেই কারখানা বসানোর তিকড়মবাজি নিয়ে সিনেমাও হলো, ওনাদের কিন্তু কেউ কমপ্রাডর বলে টিটকিরি মারে না, তার কারণ যারা টিটকিরি মারতো তারা আজ ভিখিরি। এক নৌকরি দে দে ও বাবু, ভগবান তেরা ভলা করেগা, ভিক্ষে করে মরে।

    বড়োলোক হতে হলে যা দরকার রাজকুমারের চরিত্রে কাজকম্মে সবই ছিল, বাধ সাধলো ওনার আশেপাশের বাঙালিরা আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হিংসুটে সায়েবরা ।

    বাংলার ইতিহাসে রাজকুমার ছিলেন প্রথম প্রেমিকবয়।

    উনি যে মারা গেলেন সে খবর অব্দি কলকাতায়, পৌঁছোয়নি, তখন তো আর পাবলিকের জন্যে টেলিগ্রাফ ছিল না, ফোনও ছিল না, চিঠি পৌঁছোতেই তিন মাস লাগতো, বিলেতে কোথায় কবর দেয়া হয়েছিল, তা খুঁজে বের করতেই কতোকাল লেগে গিয়েছিল। কেমন বংশ রে বাবা।

    ওনার বাড়ির লোকে গঙ্গার ঘাটে কুশপুতুল জ্বালিয়ে অন্ত্যেষ্টি করলে, এখন ওনার হৃৎপিণ্ড নিয়ে যাচ্ছি আসল শ্রাদ্ধের জন্যে, জানি না কী করবে বাড়ির লোকে, হয়তো লুকিয়ে ফেলবে। অতিবামুন কাল্টের তো নতুন হুজুগ জেগেছে, সব ঠাকুরদেবতাকে এক জায়গায় জড়ো করে তাদের হাপিশ করে ফেলে সেই ফাঁকা জায়গাটাকে পুজো করা, নিরাকার গোল্লাছুট যাকে বলে।

    নেইকে পুজো করা আর নেইকে পুজো না করার মধ্যে তফাত আছে কোনো ? বলুন দিকি।

    রাজকুমার যখন সুতানুটি-গোবিন্দপুরের বাড়িতে থাকতেন তখন রোজ বাড়ির ঠাকুদেবতার ঘরে বসে কতোক্ষণ পুজো করতেন, তখন তাঁকে কেউ ডাকতে পারতো না, লোকে দেখা করতে এলেও দু’ঘণ্টা বসে থাকতে হতো। যারা নেইকে পুজো করতে লাগলো তারা ওনাকে কতো যে হ্যাটা করেছে তা ইয়ত্তা নেই।

    হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি, ঠগীর একটা দল বাঘিনীর বাচ্চাদের সঙ্গে আমাকে জন্মাতে দেখে নিজেদের দলে নেবার জন্যে তক্কে তক্কে ছিল, তার কারণ আমার মাথার চুলের রঙ ছিল আগুনের মতন, বাঘিনী মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। একদিন ওদের দলটা আমাকে কম্বল চাপা দিয়ে ধরে নিজেদের আস্তানায় নিয়ে গিয়ে জেরা করে জানতে চেয়েছিল যে ওরা সবাই তো ওদের মায়ের সামনে দিক থেকে জন্মেছে, তাহলে আমি কোন যাদুবলে বাঘিনীর পেছন দিক থেকে জন্মালুম।

    ঠগীর দল আরও অবাক হলো যখন দেখলো যে প্রতি বছর আমার বয়স চার বছর বেড়ে যায়, যার দরুণ আমি পাঁচ বছর বয়সে কুড়ি বছরের হয়ে গিসলুম। আঠেরো বছর বয়সে আমাকে শেখানো হলো কেমন করে সিল্কের হলদে রুমালে দুটো রুপোর সিক্কা বেঁধে পেছন দিক থেকে মানুষ খুন করতে হবে, একজন পা চেপে ধরবে, একজন মাথা মাটিতে চেপে ধরবে আর একজন গলায় ফাঁস দেবে।

    ঠগীজন্মের রুপোর টাকাগুলো যদি লুকিয়ে রাখতুম, তাহলে এই জন্মে বিলেত আমেরিকার নিলামঅলাদের দিয়ে অনেক টাকা রোজগার করতে পারতুম।

    আমাদের ঠগী সর্দারের মোহোল্লা আর লোকাল কমিটির ক্যাডাররা আশেপাশের গাঁয়েগঞ্জে লোক পাঠিয়ে খবর যোগাড় করতো, কোন পথ দিয়ে বানিয়ারা তীর্থযাত্রীরা যাবে, কখন যাবে, আর সেই খবর অনুযায়ী আমরা রাস্তার ধারে লুকিয়ে ওৎ পেতে থাকতুম, এখন যেমন মাওবাদীরা পুলিশ মারার জন্যে রাইফেল হাতে লুকিয়ে থাকে আর দনাদ্দন গুলি ছোঁড়ে। পাশের রাষ্ট্রের ছোঁড়ারা যেমন এদেশে কয়েকজনের ঘুমন্ত গোষ্ঠী তৈরি করে বোমা মারার জন্য প্যাঁচ কষে, তেমনি আমরা তিনজন ঠগীর ক্যাডার তৈরি করে তক্কে তক্কে থাকতুম।

    আমাদের ঠগী দলটা এক রাতে স্লিম্যান নামে একজন সাহেবের পাতা ফাঁদে ধরা পড়ে গেলুম। সকলের সঙ্গে আমারও ফাঁসি হয়েছিল, কিন্তু আমি যখন বললুম যে আমাকে কোনো বাঘের খাঁচায় হাতপা বেঁধে ফেলে দেয়া হোক তখন সাহেবরা তাই করেছিল। দুটো বাঘ আমাকে কেমন করে খাচ্ছে দেখার জন্য সাহেব মেমরা ঝিলমিলে চকরাবকরা পোশাক, পালকদেয়া রঙিন টুপি পরে সকাল থেকে জড়ো হয়েছিল। তাদের অমন জড়ো হতে দেখে পরে গোবিন্দপুরের বাইরে একটা চিড়িয়াখানা খোলা হয়েছিল, যেখানে শাদা চামড়ার সাহেব-মেমরা যেতো, পরে বাদামি চামড়ার সাহেব-মেমরা, আরও পরে ধুতি-শাড়ি শার্ট-প্যান্ট পরা দেশি পাবলিকরা, এতো পাবলিক হতে লাগলো যে তাদের তিতকুটে ঘামের গন্ধে চিড়িয়াখানার মাটি থেকে সব ঘাস লোপাট হয়ে গেল।

    ঠগীর দলে প্রথম দিন ছিল আমার খুনোখুনি-লুটপাটের শিক্ষানবিশির, তাই রাস্তার ধারে জঙ্গলের আড়ালে ওৎ পেতে তীর্থযাত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমি খুন করিনি। যারা খুন করলো তারা তীর্থযাত্রীদের টাকাকড়ি সোনাদানা কেড়ে নিয়ে মরা লোকগুলোর পেছন দিক দিয়ে আর মরা মেয়েমানুষদের সামনে দিক দিয়ে ঝর্ণাপতন খেলা খেললো, তারপর তাদের হাড়গোড় ভেঙে আগে থাকতে খুঁড়ে রাখা গর্তে কবর দিয়ে দিলে, তার ওপর এক বস্তা পাথুরে নুন।

    আমরা ঠগীরা পয়দা হয়েছিলুম মা-ভবানী, মানে মা কালীর ঘাম থেকে। দেবীমূর্তিই তিরিশ ইঞ্চির সিল্কের রুমালে বাঁধা সিক্কা দিয়েছিলেন।

    শিখে যাবার পর আমি শুধু মেয়েমানুষদের খুন করতুম, সে তার বয়স যতোই হোক, ওই পেছন দিক দিয়ে আমি কিছু করতে পারতুম না, কেননা আমি বাঘিনী মায়ের পেছন দিক দিয়ে জন্মেছিলুম, দলের ঠগী ক্যাডাররা বলতো যে মেয়েমানুষদের ছেড়ে দেয়া উচিত, খুন করা তো এক্কেবারে অনুচিত, আর খুনের পরে সামনে দিয়ে ঝর্ণাপতন খেলা নোংরামির চূড়ান্ত। আমি বলতুম যে ঠগী কভাডারই যখন হয়েছি, তখন আবার নোংরামি নিয়ে ভাববো কেন, যতো রকমের নোংরামি হয় চালিয়ে যাবো।

    এখনকার দিনের ঠগীরা এই ধরনের খেলা ট্যাক্সিতে, বাসে, আড়ালে করে বেড়ায়, লুকিয়ে নয়, খোলাখুলি, বুক ফুলিয়ে। যে যতো নোংরামি করতে পারে, তার ততো বেশি ফোটো কাগজে ছাপা হয়, টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো হয়, টেলিভিশনে দেখানো আর কাগজে ছাপা হবে জেনে তারা ছ্যাদলাপড়া দাঁত বের করে হাসে।

    এই যে লুট শব্দটা ইংরেজিতেও তিনশো বছর যাবত চালু, শব্দটা তো আমরা, ঠগী ক্যাডাররাই, ইংরেজদের দিয়েছিলুম। ওরা কোনো শব্দ চুরি করতে কুন্ঠিত হয় না, যেমন কুন্ঠিত হয় না অন্য দেশের মালপত্তর হাতাতে। একে ওরা বলে ইউরোপিয় মূল্যবোধ।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না, গরিবের টাকা লোটার লুচ্চাদের।

    তুই জানিস না, আমি আগাম দেখে যেতে পেরেছি, আর এরাই কিনা আমায় বদনাম করে দিয়েছিল।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না, বাড়ির চালে আগুন লাগিয়ে সর্বস্ব লোটার লাফাঙ্গাদের।

    তুই জানিস না, চোখ বুজে আমি জ্বলন্ত খেত-খামার আর চালাবাড়ি দেখেছি।

    এক বছরে চার বছর করে বাড়তে থাকার দরুন ষোলো বছর বয়সে আমার চৌষট্টি বছর বয়স হয়ে গেলে আমাকে সবাই মিলে ঠগীদলের হাইকমাণ্ড-পলিট ব্যুরোর নেতা করে দিলে, লুটপাটের সোনাদানা টাকাকড়ি আমিই ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দিতুম। হুলিঠগী নামে আমি বিখ্যাত হয়ে উঠলুম, গাঁয়ে-গাঁয়ে আমার নাম নৈরাজ্যের নাট্যকার হিসাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমার ভয়ে রাতের দিকে মানুষ দলবেঁধেও বেরোতো না।

    হুলিঠগীর মা-ভবানী নামে যে কালীবাড়িতে বউরা পাকা তাল আর মুলো নিয়ে আজকাল পুজো দিতে যায়, সেই মন্দির আমিই প্রতিষ্ঠা করেছিলুম, লুটের টাকায়। লুটের টাকা না হলে মানুষ কিছুই প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। প্রতিষ্ঠান মানেই লোটালুটির কারবার।

    এখন বুদ্ধিমান পাঁয়তাড়াবাজরা পনজি-স্কিম নামে লুটের টাকা যোগাড়ের খেলা আরম্ভ করেছে, অনেকে সেই খেলা খেলতে গিয়ে ল্যাংটো পোঁদে বাড়ি ফিরেছে, অনেকে আত্মহত্যা করে নিয়েছে, কিন্তু লুটের টাকা সেই যে একবার ওরা হাতিয়ে নিলে, তারপর সেসব টাকাকড়ি যে কোথায় ডানা মেলে উড়ুক্কু মাছ হয়ে গেল কেউই জানতে পারলে না। মূর্খগুলো ভাবলোই বা কী করে যে টাকা খাটিয়ে হুশহুশিয়ে ডবল করা যায় ! টাকার কি মানুষের মতন ফিবছর বাচ্চা হয় !

    রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড বললে, বাঙালি আর বাঙালি নেই, মহামূর্খের কৌম হয়ে গেছে।

    আমার নাম হুলি, এখন আমি জাতে শুদ্দুর, না চণ্ডাল-শুদ্দুর নয়, গন্ধবেনে, আড়কাঠির লোকেরা মা-বাপকে পালতোলা জাহাজে চাপিয়ে কালাপানি পেরিয়ে আখকাটার জন্যে ভিনদেশে নিয়ে চলে গিয়েছিল, আমি তখন ঝুপড়িতে ছিলুম না, খোসা ছাড়িয়ে বস্তায় পোস্ত ভরছিলুম, আফিম চাষ না হলে বাঙালি কি আর পোস্ত খেতে শিখতো, অ্যাঁ ?

    বাঙালিরা পোস্ত খেতে ভালোবাসে, আলুপোস্ত, পেঁয়াজ পোস্ত, ধুঁধুল পোস্ত, কাঁচা পোস্তবাটা সর্ষের তেল মেখে, পোস্তর বড়া, সেই থেকে আমি রাজকুমারের বাড়ির চাকর, আসলে রাজকুমারের খাস-চাকর, ওনার আফিম কারখানায় কাজ করতো বাবা আর মা, কারখানা মানে অনেক উঁচু ছাদের ঘরে আফিমের বস্তা সাজিয়ে রাখা, আমিও খাটতুম, কিন্তু বেগার, আমার চোখ কটা বলে ছোটোবেলা থেকে আমার নাম হুলি।

    কোম্পানি পাঁচ হাজার চাষিকে দিয়ে আফিম চাষ করাতো, আফিমের হিসেব রাখা, রপ্তানি করা, রপ্তানির খরচ-খতিয়ান লেখা, এই সবের জন্যে কোম্পানি অঢেল কেরানি, হিসেবের খাতা লেখার লোক আর ছড়িদারদের চাকরি দিয়েছিল। দিকে দিকে গজিয়ে উঠল বাঙালি কেরানির দল, বাবুর দল, তারা ভদ্দরলোক হবার চেষ্টা করে করে হেদিয়ে কাঁকুড় হয়ে গেল, কিন্তু বাংলাদেশে কেরানির পাল পয়দা করে গেল, সরকারি চাকরির জাঁতিকল পেতে যেতে পারলো।

    রাজকুমারের সঙ্গে আমিও কালাপানি পেরিয়ে পালতোলা ক্লিপার জাহাজে চেপে বিলেতে গেছি, পরপর দু’বার, আমি শুদ্দুর বলে কালাপানি পেরিয়ে জাত যায়নি, কিন্তু রাজকুমারের জাত চলে গিয়েছিল, যখন প্রথমবার গেলেন, ফেরার পর গঙ্গাজলে চান করিয়ে কুলীন পুরুত ডাকিয়ে নিজের জাতে ফিরেছিলেন, তা সত্ত্বেও ওনার ভারিভরকম বউ আলাদা ঘরে থাকতেন-শুতেন, ফলে রাজকুমার বিলেতে গিয়ে আশ মেটাতেন। জ্ঞানীগুণিরা রাজকুমারকে গ্রিস দেশের রাজা ক্রিসাসের সঙ্গে তুলনা করতেন, যিনি গ্রিসদেশের মানুষকে অনেক কালের জন্যে বড়োলোক করে তুলেছিলেন।

    রাজকুমারের কাজকারবারের দরুনই তো সুতানুটি-গোবিন্দপুর আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠল, দেখা দিলো অন্য রকমের মানসিক জীবন। শহুরে জটিলতার হ্যাঙ্গামের সঙ্গে নিয়মানুবর্তীতা, হিসাবনিকাশ, নিখুঁত হবার চেষ্টাচরিত্তির। বাঙালির, যে বাঙালি তখন বাঙালি হিসেবে গড়ে উঠছিল, তার গঠন-বিগঠনের গলনপাত্র হয়ে উঠল সুতানুটি-গোবিন্দপুর। গাঁগেরাম থেকে জনে জনে মানুষ এসে জড়ো হতে লাগলো, যারা একে আরেকজনকে চেনে না, বোকা-হাবার মতন তারা দিন আনি দিন খাইতে চরকিনাচন দিতে লাগলো।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না তাঁরই অবদান হিসাবে সুতানুটি-গোবিন্দপুরে তাৎপর্য পেয়েছে জেলখানার গিজগিজে ডিগডিগে বিচারাধীন কয়েদি, থানার পেটমোটা ওসি যেন সাত মাসের অন্তঃসত্বা, চিনের রঙিন আলোয় ঝলমলে বেশ্যালয়, ভাটিখানার ঠেলাঠেলি, মল, মালটিপ্লেক্স, ডিসকো, নাইট ক্লাব, পাগলা গারদ, দেওয়ানি আর ফৌজদারি আদালতের চাকুরে বিচারক, মোক্তার, অপরাধী, পাগল, দ্রোহী, বিরোধী।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না শহর এখন সংঘাতক্ষেত্র।

    তুই কেমন করে জানলি, ক্লাইভের পোষা গুণ্ডারা তো দেখিয়েছিল, সেটাই রিপিট হতে থাকে, শুনিসনি নাকি, হিস্ট্রি রপিটস ইটসেল্ফ ?

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না লাঠিবাজ ক্যাডারের দল, কে কাকে কেন পেটায় কেউই জানতে পারে না।

    তুই জানিস না, আমি যেসব লাঠিবাজ পুষতাম, এরা তাদেরই বংশধর, তারা ধুতি পরতো বা লুঙ্গি, এরা প্যাণ্টালুন পরে, এই যা তফাত।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না গাঁয়ে গঞ্জে শহরে বেকার ছেলেদের ক্লাব নামের অলস আড্ডাখানা, যেখানে তারা দিনভর ক্যারাম আর তাস খেলে।

    আমি জানি হুলি, দিনভর লোকে চণ্ডীমণ্ডপে বসে গ্যাঁজাতো, দাবা খেলতো, এরা তাদেরই চেলাচামুণ্ডা।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না অকর্মণ্য বুকনিবাজ দলনেতা, দলদাস, মন্ত্রী, আমলা, ট্রেড ইউনিয়ান, কেরানি ইউনিয়ান নেতাদের।

    দেখেছি, দেখেছি, হিন্দুদের নেতারা আমার বিরুদ্ধে কতো বদনাম দিয়ে বেড়াতো, সেই তাদেরই তো রক্ত বইছে এখনকার বুকনিবাজদের শিরায়, আর তুই বলছিস আমি দেখে যেতে পারলুম না। আমার শবের বদলে কুশপুতুল পুড়িয়ে শ্রাদ্ধের সময়ে হিন্দুদের চাঁইরা কতো হ্যাঙ্গাম করেছিল ; ওদের কথা মানা হয়নি বলে ওরা একঘরে করে দিলে, আমার ছেলেরাও চটে-মটে হিন্দুদের থেকে আলাদা হয়ে গেল, আর আমার ব্যবসাও লাটে উঠে গেলো।

    চিনে আফিম চালানের জন্যে রাজকুমারের দুটো ক্লিপার জাহাজ ছিল, একটার নাম এরিয়েল, সেই যে সিলভিয়া প্লাথ এরিয়েল নামে কবিতার বই ছাপিয়ে ছিলেন, তা তো রাজকুমারের কাছ থেকেই পাওয়া। সিলভিয়া প্লাথের সঙ্গে রাজকুমারের দেখা হয়নি, রাজকুমার অনেক আগেই জন্মেছিলেন তো। সিলভিয়া প্লাথের যেমন অকাল মৃত্যু হয়েছিল, তেমনই এরিয়েল জাহাজেরও অকাল মৃত্যু হয়েছিল, কেননা জাহাজটাকে চীন বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছিল, বিলেতি কোম্পানির ওসকানিতে, যারা রাজকুমারকে এক্কেবারে পছন্দ করতো না, এদিকে বাইরে-বাইরে দেখাতো কতোই না রাজকুমারকে ভালোবাসে।

    রাজকুমারের দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কীই বা বলি, অন্য জাহাজটা, যার নাম ছিল ম্যাভিস, তার ওপর সমুদ্রে বাজ পড়ল একদিন, জাহাজ পুড়ে ছাই, বিলেতি কোম্পানিরা সে খবর পেয়ে মাগি-মরদের মদ গেলার আর আস্ত পোড়ানো শুয়োর খাবার আর নাচানাচির পার্টি দিয়েছিল। ওয়ান টু থ্রি ফোর, হোয়্যার ইজ দি পার্টি টুডে ? অন দিস ডান্স ফ্লোর, ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং।

    রাজকুমারের বাড়িতে কেউই ওনাকে পছন্দ করতো না, অথচ ওনার টাকাতেই সবাই ফুটানি মারতো। এই যে রাজকুমারের এক ছেলের বারোটা বাচ্চা হলো, সাত ছেলে আর পাঁচ মেয়ে, তার খরচ যোগানো কি সোজা কথা, সেসব খরচের টাকা তো রাজকুমারের কাজকম্মো থেকেই আসতো, এখন খরচের মজাও নেবে আবার রোজগারের উপায়কে খারাপ ভাববে, এ কেমন ধারা কথা বাপু, অ্যাঁ। বারোটা বাচ্চা বিয়োতে বউটার যে কষ্ট হয়েছিল, তা কি রাজকুমারের বড়ো ছেলে অনুভব করতে পেরেছিল ? রাতে বিছানায় গেলেন, মশারি টাঙালেন আর ব্যাস, অ্যাঁ, কী মানুষ রে বাবা, ধন্যি মহাপুরুষ। দিনের বেলা সকাল থেকে নেই-ঠাকুরের পুজো।

    রাজকুমারের টাকাতেই তো একটা বাঙালি রাজবংশ গজিয়ে উঠলো ; রাজকুমারের দেখাদেখি নিজেদের নামে নাথ জুড়তে হলো।

    বাঙালি পাবলিক অবশ্য মনে করে যে ওনার এক ডজন বাচ্চাকাচ্চা জরুরি ছিল, নয়তো বাঙালিরা নোবেল প্রাইজ পাবার গর্ব করতে পারতো না, নোবেলের মেডেল চুরি যাবার গর্ব করতে পারতো না, এই পার ওই পারের জাতীয় সঙ্গীতের গর্ব করতে পারতো না, যদিও ওই পারের দাড়িয়াল টুপিয়াল লোকেরা চোপোর দিন চেল্লাতে থাকে যে ওনার লেখা জিম্মি মালাউন জাতীয় সঙ্গীত চলবে না, কোনো পাকিস্তানিকে দিয়ে জাতীয় সঙ্গীত লেখাও। পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের শিরোনাম দিয়ে হুমায়ুন আজাদ নামে এক জ্ঞানীগুণী মানুষ একটা বই লিখেছিলেন, তার জন্যে তাঁকে রামদা-কাটারি মেরে-মেরে কোতল করলে সউদি আরবের বাঙালি চুটকিদাড়ি ট্যাংরাটুপি খিদমতগাররা।

    রাজকুমারের বড়ো ছেলে নিজের অতিবামুন কাল্টের জন্যে লিটল ম্যাগাজিন বের করা আরম্ভ করলে, বন্ধুবান্ধবদের জড়ো করে কফিহীন কফিহাউস তৈরি করলে, সবই তো রাজকুমারের টাকায়। সেই টাকাকে তোমরা ঘেন্না করোনি, অথচ রোজগারের উপায়কে ঘেন্না করলে। কী আর বলি, বড়োলোকদের ব্যাপার-স্যাপারই ভিতরঘুন্না। তবে তারপর থেকে লিটল ম্যাগাজিন বের করার আর অতিবামুনগোষ্ঠী হবার চল আরম্ভ হতে পেরেছিল। সবচেয়ে পেল্লাই যে অতিবামুনগোষ্ঠী গড়ে উঠল তা বিগ ম্যাগাজিন, দুর্গন্ধবনিকের দরিয়া।

    রাজকুমারের পরিবারও বামুন, তবে উঁচু বামুন নয়, কায়েত আর বামুনের মাঝ-মদ্যিখানে, তবে বদ্যি নয়। ঋগ্বেদের পুরুষ সুক্তয় বলেছে যে পুরুষের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য আর পা থেকে শুদ্র লোকেরা জন্মেছিল। যদি তাই হয় তাহলে পুরুষের মুখ থেকে বেরিয়ে কোথায় আটকে গিয়েছিলেন রাজকুমারের পরিবার যে খাঁটি বামুনের ছাতার তলা থেকে সরে গেলেন।

    রাজকুমারের এতো টাকাকড়ি থাকা সত্বেও বাড়ির ছেলে আর মেয়েকে খাঁটিমার্কা বামুনরা বিয়ে করতে চায়নি, রুপোর সিক্কার পুঁটলি দিতে চাইলেও তারা রাজি হয়নি, কনে সুন্দুরী হলেও চায় নি, তাই ওনার ছেলেপুলেরা বামুন থেকে অতিবামুন কাল্ট হয়ে গিয়েছিল।

    আসলে ওনাদের বাপঠাকুদ্দার কেউ একজন মোচোরমানের বাড়ির রান্নাঘরের মম গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে গিয়েছিলেন, তারা বোধহয় গোরুর শিককাবাব কিংবা দোপেয়াজা রাঁধছিল, রেগেমেগে রাজকুমার এখন বিদেশে গেলে অন্য মাংসও খান।

    আমিও খেয়েছি, খুবই ভালো খেতে, আহা বিলেতের গোলাপি শুয়োরের তো তুলনাই হয় না, জড়িয়ে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে, মাদি শুয়োরের গোলাপি থনে চুকুস-চুকুস করতে মন চায়। গোরুর মাংসের চেয়ে হাজার গুন সুস্বাদু, মোচোরমানরা তো শুয়োরের মাংস খায় না, হালাল করা যায় না বলে, কিন্তু হিন্দুর ঝটকাতেও শুয়োর মরে না, বিলেতে শুয়োরের মাংস পাঁঠার মাংসের চেয়েও মোলায়েম, মুখে দিলেই গলে যায়, কিন্তু গোরুর মাংস তো ছিবড়ে, অ্যাহ, বিটকেল, ভাবা যায় না।

    রাজকুমার গোরুর মাংস খান না, রুচিতে বাধে।

    আমি তো শুদ্দুর হুলি, আমাদের কোনো রুচি রয়েছে দেখলে বামুনরা চটে যায়, বামুন মানে জাতবামুন নয়, টাকাবামুন।

    ঢাকনা দেয়া ভেনিশিয়ান কাঁচের জারে ফরম্যালিনে চোবানো রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড নিয়ে আমি লণ্ডন থেকে পালতোলা জাহাজে চেপে সুতানুটি-গোবিন্দপুরে ফিরছি। ফরম্যালিন মানে একরকমের শরবত, তাতে মরা মানুষের হৃৎপিণ্ড বেঁচে ওঠে, শরবত খায় আর অনেককাল তাতে আয়েশ করে শুয়ে থাকে, সেই হৃৎপিণ্ড ইচ্ছে হলে কথা বলতে পারে, হাসতে পারে, গাইতে পারে, কাঁদতে পারে।

    ওই শরবতে মরা মানুষের যে-কোনো অঙ্গ চুবিয়ে রাখা যায়। এই জন্মে যদি বিয়ে করে সংসার পাতি, আমি মরে গেলে আমার ছেলেপুলেদের বলে যাবো যেন ওরা আমার দুই অণ্ডকোষ আর লিঙ্গখানা শরবতে চুবিয়ে রাখে, পছন্দ হলে পরের জন্মে এসে ওটাই ফিট করে নেবো, যদি আগামি জন্মেরটা মনের মতন না হয়।

    প্রথমবার গিসলুম ‘দি ইন্ডিয়া’ নামের ক্লিপার জাহাজে, তিনটে মাস্তুল। অনেক ঘুরে যেতে হয়েছিল, আফ্রিকার পোঁদের তলা দিয়ে কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে, আমার বেশ ভালোই লেগেছিল, তিন মাস জাহাজে কাটিয়েছিলুম, কতো দেশ দেখতে দেখতে গিয়েছিলুম, কালো হাবশি, শাদা চামড়ার লোক, নানা রঙের শাদা চামড়ার মেম। দেখলেই লোভ হতো। হাবশি মেয়েদের দেখেও আমার খুব লোভ হতো, ওদের পাছা আর বুক বেশ উঁচু-উঁচু, টাটকা, বুক খুলেই ঘুরে বেড়ায়, সুতানুটি-গোবিন্দপুরের শুদ্দুর বউদের মতন ঢিলেঢালা নয়, বউবাজারের সন্ধ্যাবাজারে যদি অমন হাবশি মেয়েদের আনতে পারতো, আহা, জীবন সার্থক হয়ে যেত গো।

    দ্বিতীয়বার রাজকুমারের সঙ্গে ‘বেন্টিঙ্ক’ নামের জাহাজে করে সুয়েজখাল পেরিয়ে বিলেতে গিসলুম, জাহাজখানা বিরাট, তাতে আশিজন যাত্রী ছিল আর রাজকুমারের ছোটো ছেলে, ভাগ্নে, ইংরেজ সচিব আর আমরা তিনজন চাকর, অন্য দুজন আমার চেয়ে বয়সে বড়ো।। সুয়েজ খাল তৈরি হবার দরুন যাওয়া-আসার সময় অনেক কমে গিসলো।

    মিশরে ইব্রাহিম পাশার অতিথি ছিলেন রাজকুমার, আমি তো ওনার খাস চাকর, ওনার আদর-যত্নের ভাগ আমিও পেইচি। পাশা ওনাকে লাল মখমলের পোশাক আর নিজের খচ্চরঘোড়া দিয়েছিলেন ঘুরেফিরে শহর-বাজার দেখার জন্য। পাশা ওনাকে শাহজাদা অফ বেঙ্গল বলে ডাকতেন।

    মিশর দেশটা যে এতো পুরোনো তা জানতুম না, মরুভূমির মাঝখানে কী বিরাট বিরাট তিনকোনা বাড়ি, যাকে ওরা বলছে পিরামিড, ওর ভেতরে নাকি আগেকার রাজা রাজড়াদের অনেক গল্প আছে, তাদের মলম মাখানো সোনায় মোড়া বাক্সবন্দী লাশ আছে, কতো যে গয়নাগাটি আছে তার ঠিকঠিকানা নেই, সেকালের মানুষদের শক্ত শক্ত ভাষায় গল্প লেখা আছে দেয়ালে-দেয়ালে। মরুভূমির মাঝখানে কেন যে এমন তিনকোনা বাড়ি বানিয়েছিল সেকালের রাজারা তার খোঁজ-খবর নিচ্ছে সায়েবের দলবল।

    মিশরের লোকেরা তাদের মন্দিরকে বলে মসজিদ, তার ভেতরে ঠাকুর-দেবতা নেই, রাজকুমারের ছেলে যেমনধারা পুজো করে এরাও তেমনি ধারা পুজো করে, কিন্তু হাঁটু মুড়ে নানা রকম অঙ্গভঙ্গী করে সবাই মিলে কাতারে বসে পুজো করে, কোনো শুদ্দুর বামুন তফাত নেই। এখানে মরে গেলে কাউকেই পোড়ায় না, আমাদের দেশে নেড়েদের যেমন গোর দেয়া হয় এখানেও তাই। মেয়েদের দেখতে খুবই সুন্দর, জড়িয়ে চুমু খেতে ইচ্ছে করছিল, একজন স্বামী চারজন বউ রাখতে পারে, শুনে বড়ো ভালো লাগলো, চারজন বউই স্বামীর সঙ্গে থাকে, স্বামী মরলে বউদের কবরে পোঁতা হয় না। যারা অনেক বড়ো লোক, যেমন পাশা, বউ ছাড়া বাঁদিও রাখে, তাকে বলে হারেম, আমাদের দেশে সায়েবরা আসবার আগে নেড়ে সুলতানদের যেমন ছিল।

    মিশর থেকে আমরা গেলুম মাল্টা নামে একটা দ্বীপে, দিনকতক সেখানে থাকতে হল, আমাদের কারো ছোঁয়াচে রোগ আছে কিনা যাচাই করার জন্যে। দ্বীপটায় বিলেতের রাণী ভিক্টোরিয়ার রাজত্ব, মন্দিরকে বলে চার্চ, ওদের ঠাকুর-দেবতাকেও দেখা যায় না, তবে ওরা মনে করে কুরুশকাঠে পেরেক-বেঁধা পোশাক-খোলা লোকটাই ভগবানের ছেলে। সেই দিক থেকে রক্ষে। ঠাকুর-দেবতাকে দেখতে না পেলে সে আবার কেমনতর পুজো ! যা নেই তাকে পুজো করার বদলে এখানকার সায়েবরা চার্চে একজনকে আছে নাম দিয়ে পুজো করে, তা সে পোশাক পরে না থাকলেই বা।

    মাল্টা দ্বীপ থেকে রাজকুমারের পুরো দল গেলুম ফরাসিদেশের বোর্দো নামে একটা জায়গায়, মদের উৎসব আরম্ভ হয়েছিল, এখানকার মদকে বলে ওয়াইন, রাজকুমার মদ খেতে ভালোবাসতেন, আর ওনার যে কোম্পানি ছিল, সেই সিটি কোম্পানি তো সুতানুটি-গোবিন্দপুরে, মায় তার বাইরেও, যেখানে-যেখানে সাহেব-মেমরা বাসা বেঁধেছিল, সেখানেও মদ বিক্রি করতো। মদ খেয়ে মেমরা এতো হাসতো যে তাদের ঠোঁটের হাসি খাবার ইচ্ছে হতো আমার, মনের ভেতরেই চেপে রাখতুম, যদ্দিন না রানি ভিক্টোরিয়ার মুনশির সঙ্গে আলাপ হলো।

    বোর্দো থেকে আমরা রাজকুমারের সঙ্গে গেলুম প্যারিস নামে একটা শহরে, দশদিন ছিলুম, সেখানের লোকগুলো কী বোকা, প্যারিসকে বলে পেয়ারি। মেমদের দেখতে কী সুন্দর কি বলব, তাই বোধহয় প্যারিসকে পেয়ারি বলে, কচি মেমগুলো যেন নরম তুলতুলে পুতুলের মতন, দেখলেই চটকাতে ইচ্ছে করে। যে কচি মেমরা রাজকুমারকে পছন্দ করতো, তারা রাত্তিরে ওনার হোটেলের ঘরে এসে ফুর্তি করতো, বিলিতি বাজনার তালে তালে ফরাসি নাচ নাচতো, কুঁচির থাক দেয়া ঘাগরা পরে। আমারও ইচ্ছে করত ফরসা মেমদের সঙ্গে ফুর্তি করার, রাজকুমারের দেয়া হাতখরচের টাকায় এখানকার বউবাজারে গিয়ে করতে পারতুম, কিন্তু আমি ওনার খাস চাকর বলে সাহসে কুলোয়নি, আর ভাষাও তো জানিনে, দরদস্তুর করতুম কেমন করে।

    অন্য দুজন চাকরের মধ্যে যাকে আমরা হরিখুড়ো বলতুম, ঘুরে এসেছিল পিগালে নামের পাড়ায়, ওই ঘোরার জন্যেই দেশে ফিরে নুনুর রোগ দেখা দিয়েছিল, সেই রোগের যন্তন্না থেকে ছাড়ান পেতে দলা-দলা আফিম খেতো, এসব কথা আমি হরিপদ খুড়োর খুড়িকে বলিনি কখনও, খুড়ি টের পেয়ে গিয়েছিল নিশ্চই, খুড়িকেও তো ওই রোগে ধরল, খুড়ো-খুড়ি দুজনে আফিমের দলা খে্যে ভোম মেরে পড়ে থাকতো।

    মানুষের আনন্দের পথে কেন যে রোগের লাইন টেনে দেয় ভগমান তা বুঝতে পারি না। ভগমানই আনন্দ তৈরি করেছে, আবার ভগমানই আনন্দের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, এ কেমন বিচার, অ্যাঁ !

    রাজকুমারের সঙ্গে আমরা সবাই ১৮৪৬ সালের ১৮ই মার্চ লণ্ডনে পৌঁছেছিলুম। ওনার ছোটো ছেলের লণ্ডন আর সেখানকার আদবকায়দা একেবারেই পছন্দ হলো না। রাজকুমার আমায় বলেছিলেন, বেশ দুঃখ করে বলেছিলেন, পলকাটা মদের গেলাসে সোনালি রঙের মদে চুমুক দিতে দিতে, এরা বঙ্গদেশকে ডুবিয়ে দেবে, কিছুই শিখতে চায় না, বিলেতের লোকেরা কেমন দিকে দিকে কল-কারখানা বসিয়ে দেশটাকে সারা পৃথিবীর মালিক করে তুলছে, আর আমার নিজের রক্তই আমাকে বুঝতে পারলে না। ওরা আমিন, বানিয়ান, সেরেস্তাদার, বানিয়া, মুৎসুদ্দি কথাগুলোকে খারাপ মনে করে, ঘরের খেয়ে মিছিল দিয়ে রাস্তা জ্যাম করবে, আর নিজেদের ভদ্রলোক ছাপ্পা মেরে বারফট্টাই দেখাবে, দেখে নিস তুই, একদিন ভদ্দরলোক নামের প্লেগ ছড়িয়ে পড়বে দেশময়, কেরানি হবার জন্যে মানুষ হত্যে দিয়ে কালীঘাটের কালীর দোরে পড়ে থাকবে।

    লণ্ডনে রাজকুমার রোজই খানাপিনার ব্যবস্হা করতেন, কিংবা অন্য বড়োলোক সাহেবরা ওনার জন্যে খানাপিনার ব্যবস্হা করতো। রাজকুমার যে কেন মদ খেতে এতো ভালোবাসতেন কে জানে, বরং আমাদের মতন আফিম আর তাড়ি খেলে ওনার স্বাস্হ্য ভালো থাকতো। শুধু তো মদ খাওয়া নয়, কচি সুইটহার্ট মেমদের নিয়ে আমোদ করতেন, সারারাত মেতে থাকতেন আমোদে, মেমগুলোরও লজ্জা শরম ছিল না, এমন পোশাক পরতো যে অনেক কিছুই দেখা যেতো, আমার মতন হেলাফেলার চাকরেরও পুঁইমেটুলি দেখে শরীর চিনচিন চিনচিন করতো, চাকরদের চানের ঘরে গিয়ে চিনচিন কমাতে হতো।

    ৩০ জুন ডাচেস অফ ইনভেরনেসের প্রাসাদে রাতের খাবারের নেমন্তন্নয় খাবার টেবিলে বসে হঠাৎই রাজকুমারের তেড়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলো। ওই অসুখেই উনি পয়লা আগস্ট মারা গেলেন, মাত্র একান্ন বছর বয়সে। আমার আর হরি খুড়োর কাঁদতে কাঁদতে গলা বুজে গিয়েছিল।

    কলকাতায় লোক মুখে খবর পাঠানো হয়েছিল, সে খবর পৌঁছোলো আড়াই মাস পরে। ইতিমধ্যে ওনার অন্ত্যেষ্টিতে কী করা হবে কেউ ঠিক করতে পারল না বলে কবর দেয়া হলো ; একজন হিন্দুকে গোর দিয়ে দেয়া হলো, এতো বড়ো একজন মানুষ, লাখ লাখ টাকার মালিক, তাকে মুখে আগুন দেবার লোক পাওয়া গেল না। হাসপাতালের বিছানায় উনি যদি একবার বলতেন, হুলি, তুইই আমার মুখে আগুন দিবি, কেউ দিক বা না দিক, তাহলে আমিই দিতুম, হলেই বা শুদ্দুর।

    নিজের মা-বাপের মুখে আগুন তো দিতে পারিনি, কে তাদের মুখে আগুন দিয়েছিল তাও জানি না, গুজব আসতো যে যারা আড়কাঠির ফোসলানোয় বিদেশে আখখাটার মজুর হয়ে গেছে, তাদের সবাইকে ধরে-ধরে কেরেস্তান করে দিয়েছে সেখানকার পাদ্রিরা, মুখে আগুনের আর দরকার নেই, মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিলেই কাজ শেষ, মাটিতে মিশে ভালো সার হয়ে যাবে, আখকে আরও মিষ্টি করে তুলবে, সায়েবরা সেই মিষ্টি আখ থেকে চিনি তৈরি করে চায়ের কাপে চামচের টুঙটুঙি বাজাবে, জন্মদিনের কেকে চিনির আরক দিয়ে লিখবে,, হ্যাপি বার্থডে টু ড্যাডি রামু গাণ্ডুবনিক, হ্যাপি বার্থডে টু মাম্মি হরিমতি গাণ্ডুবনিক ।

    রাজকুমারের গোর যেমন অনেককাল রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে অচেনা পড়েছিল, তেমন ছিল ক্লাইভ নামে সাহেবটার, কেউ জানতোই না কোথায় তেনাকে গোর দেয়া হয়েছিল।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না সুতানুটি-গোবিন্দপুরের ভিড়, জঞ্জাল, জ্যাম, মারামারি, মিছিল, বিশৃঙ্খলা, হুমকি।

    তুই কেমন করে জানলি যে আমি জানি না, আমি সবই আগাম দেখতে পাই।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না মোটর সাইকেলে চেপে মাঝরাতে কোটিপতি-বাড়ির যুবকদের হার ছিনতাই দল।

    জানি হুলি জানি, তোকে আর আপশোষ করতে হবে না।

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না ট্যাক্সিতে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ।

    জানি হুলি জানি, ওরা তো আমার পোষা লাঠিয়ালদেরই ছেলেপুলে।

    এখন রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড যত্নকরে সামলে দেশে নিয়ে যাবার দায়িত্ব আমাকেই দেয়া হয়েছে, ওনার তিনজন চাকরের মধ্যে আমাকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন উনি। আমি সব সময় নজর রাখছি যাতে সমুদ্রের ঢেউয়ে ফরম্যালিন শরবত চলকে না ওঠে, যাতে গোলাপি প্রজাপতির মতন হৃৎপিণ্ডের কষ্ট না হয়।

    জাহাজে একদিন রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড আমাকে ডেকে বললেন যে একা-একা ভাল্লাগছে না, তাই একটু গল্প করতে চান। আমি তো থ। কোথায় আমার মালিক একজন রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড, আর কোথায় আমি গৃহস্বামীর পরিবারের থাকা-খাওয়ার ছোকরা চাকর যাকে ওনারা বলেন ভৃত্য, কীই বা গল্প করব রাজকুমারের হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে, রাজকুমার সামনে থাকলে না হয় তাঁর পায়ের কাছে বসে ওনার নানা দেশ ঘোরার গল্প শুনতুম, মোজরি জুতো খুলে পা টিপে দিতুম, সব দেশে তো আমি সঙ্গে যাইনি।

    রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড বললেন, জানি তুই আমাকে মনে-মনে হৃৎপিণ্ড বলছিস, কিন্তু হুলি, তুই তো আমার খাস-চাকর, বিশ্বাস কর, এটা আমার হৃদয়, হৃৎপিণ্ড আর হৃদয়ের তফাত জানিস তো।

    আমি গলার ভেতরে জমে থাকা কুয়াশা সরিয়ে বললুম, মাফ করবেন হুজুর, আপনি তো আপনার মাথার জন্য বিখ্যাত ছিলেন, তবে হৃদয় কেটে নিয়ে যাচ্ছি কেন আমরা ?

    রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড বললেন, দ্যাখ, লোকে সামনাসামনি আমাকে যাই বলুক না কেন, তুই তো জানিস আড়ালে ওরা আমাকে বানিয়ান, মুৎসুদ্দি, মহাজনি সুদখোর, আবগারি ঘুষখোর, বউবাজারের বাড়িগুলোর মালিক, আফিমচাষি, কোম্পানির দালাল এইসব কথা বলে বেড়ায়।

    আমি ভেবে পেলুম না কী বলি, আমরা চাকররা তো এসব কথা আলোচনা করি না, করার সময় পাই না, তবু বললুম, ওরা বলুকগে, ওদের সংসারে যারা জন্মাবে তারা এইসব কাজ একেবারে ভুলে গিয়ে দেশটাকে ডোবাবে, বিলেতের লোকেদের তো দেখলুম, সকলেই বানিয়াগিরি করে কিংবা করতে চায়।

    রাজকুমারের হৃদয় বললে, তুই তো জানিস, হরিমোহনের ছেলে উমানন্দ, ওই যার আরেকটা নাম নন্দলাল, বলে বেড়িয়েছিল যে যৌবনের গরমে, টাকাকড়ি, ক্ষমতা-প্রতিপত্তির জোরে, আমি নাকি কুসঙ্গে পড়ে ধর্ম আর জনমতকে ভয় পাই না, টিকি কেটে ফেলে দিয়েছি, পৈতে ফেলে দিয়েছি, মদ খাই আর মুসলমান মেয়েদের সঙ্গে শুই, মুসলমানের হাতের রান্না খাই।

    আমি বললুম, হুজুর, আপনি যে মদ ইচ্ছে খাবেন, যার সঙ্গে ইচ্ছে শোবেন, তাতে অন্যলোকের মাথাব্যথা কেন হয় ? আপনার মুসলমান বাবুর্চি এতোভালো রাঁধে, যা বেঁচেখুচে থাকে, তা খেয়ে দেখেছি, আহা, মন ভরে যায়। আর কুসঙ্গ মানে তো চোগা-চাপকান পরা আপনার জমিদার বন্ধুরা।

    জাহাজের ক্যাপ্টেনের দেয়া মদ খেয়ে আমার গলায় লাল রঙের মেঘ জমে আছে, ঘড়ঘড়ানির দরুন টের পেলুম। আর সবাই যাবার সময়ে আর আসার সময়েও ঢেউ সামলাতে না পেরে বমি করেছিল, আমি করিনি, বরং নীল সমুদ্র আমার খুবই পছন্দ হচ্ছিল, দূর-দূর পর্যন্ত কিচ্ছু দেখা যায় না, দেখা পাওয়া যায় না বলেই আরও ভালো লেগেছিল।

    সমুদ্রে মাঝে মাঝে উড়ুক্কু মাছের ঝাঁক, তিমি মাছেদের ঘাই দেখতে দেখতে যেতুম।

    রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড বললে, উনি বন্ধু নয় রে, ওই চোগা-চাপকান পরা জমিদার আমার পথদেখানোর লোক ছিলেন ; তবে ওনার দেখানো পথে চলতে গিয়ে আমার বড়ো ছেলেটা রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে।

    পরের জন্মে তো দেখেছি রাজকুমারের নিজের একজন নাতি বানিয়াগিরি-জমিদারি ভুলে গিয়ে পদ্য লিখে আর গান গেয়ে বাঙালি জাতটাকে ক্যাবলা করে দিলে, কতো লোকে চট দিয়ে ওনার নকল দাড়ি তৈরি করে বাড়িতে ঝুলিয়ে রাখে, যাতে ছেলেপুলেরা ক্যাবলা-টাইপ হয়। হয়তো সেই কারণেই চটকলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেল, সায়েবদের থেকে কিনে নিয়ে মেড়োপার্টিরা চটের ফাটকা খেলে ডুবিয়ে দিলে।

    এখন সকলেই পদ্য লিখতে চায় আর গান গাইতে চায়। ছেলে-ছোকরারা যখন বিপ্লব আরম্ভ করলে তখনও পদ্য লেখা আর গান গাওয়া শুরু করলে, সেই সঙ্গে খুনোখুনি। ব্যাস দেশের দফারফা। সেসব নিয়ে সিনেমাও হয়েছে। যাক, বিপ্লব ফেল মারলেই বা, পদ্য আর সিনেমা তো পাওয়া গেছে।

    রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড আমার মালিকের, যিনি পয়লা আগস্ট ১৮৪৬ লণ্ডনের সেইন্ট জর্জ হোটেলে একান্ন বছর বয়সে মারা গেলেন, আর ৫ আগস্ট তারিখে কেনসাল গ্রিন গোরস্তানে তাঁকে এলেবেলে সমাধি দেয়া হলো ; হিন্দু, খ্রিস্টান ব্রাহ্ম কোনো রীতিই মানা হয়নি।

    ওনার শব তো কলকাতায় পায়নি পরিবারের লোকেরা, তাই গঙ্গার ধারে একটা কুশপুতুল তৈরি করে ওনার নামে শ্রাদ্ধশ্রান্তি করেছে। তাও আবার হিন্দু বামুন আর অতিবামুন কাল্ট মিলে ঝগড়া বাধিয়ে ফেলেছিল, কোন মন্তর পড়া হবে, পিণ্ডদান করা হবে কি না, বড়ো ছেলে ন্যাড়া হবে কিনা। ছেলেরা তো বাপকে কেয়ারই করেনি কখনও, ওনাদের কথা না বলাই ভালো।

    সমাধি দেবার দু’মাস পরে কবর থেকে তুলে ওনার বুক থেকে হৃৎপিণ্ডখানা কেটে বের করে নিজের দেশে নিয়ে গিয়ে অন্ত্যেষ্টি করতে চাইলেন আত্মীয়স্বজন ছেলেপুলেরা, তাই নিয়ে যাচ্ছি সুতানুটি-গোবিন্দপুরে।

    প্রথমবার আসার সময়ে রাজকুমার নিজের সঙ্গে ইংরেজ ডাক্তার, ভাগনে, বাঙালি সহকারী, আমাকে নিয়ে তিনজন চাকর আর মুসলমান বাবুর্চি আসলাম মিয়াঁকে এনেছিলেন।

    ডাক্তার বলেছিল যে রাজকুমারের স্বাস্হ্য ভালোই আছে, চিন্তার কারণ নেই। সেবারও রাজকুমার রোজই নানা হোটেলে খানাপিনার আয়োজন করতেন, কতো কতো বিলিতি সাহেব-মেমরা আসতো, রাজকুমার অনেকের হাতে মুঠো-মুঠো হীরে-মুক্ত গুঁজে দিতেন।

    মেমদের দেখেছি, হাঘরে, আদেখলাপনার শেষ নেই, তারা ওনাকে দেখনদারি দিয়ে ভালোবাসতো, ঢলাঢলি করতো, জড়িয়ে ধরে, হাত ধরে হোটেলের ঘরে টেনে নিয়ে যেতো। একজন মেম তো রোজই আসতো রাজকুমারের কাছে, পরের দিন সকালে বাড়ি ফিরতো। নিশ্চই কোনো ইংরেজ খোচর এই খবরগুলো সুতানুটি-গোবিন্দপুরে পৌঁছে দিয়েছে। বাঙালিরা তো কালাপানিতে জাত যাবার ভয়ে যায়না।

    যাক, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি থেকে খোচর হবার শিল্পখানা বাঙালিরা শিগগিরই আয়ত্ত করে ফেললে।

    রাজকুমার যেদিন মারা গেলেন, সেদিন এমন ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল যা আমি বিলেতে কেন, সুতানুটি-গোবিন্দপুরেও আগে কখনও দেখিনি ; আবদুল করিম, রানি ভিক্টোরিয়ার মুনশি, উনিও বলছিলেন যে ব্রিটেনে এসে পর্যন্ত এমন ঝড়বৃষ্টি দেখেননি।

    মুনশি আবদুল করিমের সঙ্গে আমার ভালো আলাপ-পরিচয় হয়ে গিয়েছিল, মুনশিজি যেচে আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, সেই যেদিন রাজকুমারকে রাতের ভোজে ডেকেছিলেন রানি, তারিখটা মনে আছে, আট জুলাই, সে রাতেও প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছিল, রানির মতন করে রাজকুমারও কাঁটা-চামচ-ছুরি দিয়ে মাংস কেটে-কেটে খেয়েছিলেন, ছাগলের মাংস নয়, অন্য কিছুর, বেশ ভালো গন্ধ বেরিয়েছিল। তার আগে রানির সঙ্গে একদিন রাজকুমার বিলেতের রাজা-রানিদের সেনাবাহিনীর সেলাম নিয়েছিলেন, ওদের পোশাক কেমন যেন বিটকেল, চোখ পর্যন্ত গোল টুপিতে ঢাকা, দেখতে পায় কেমন করে ভাবছিলুম।

    রানির পছন্দ হয়েছিল রাজকুমারকে, নিজের ডায়রিতে লিখে রেখেছিলেন, ‘ব্রাহ্মণ ভদ্রলোকটি বেশ ভালো ইংরেজি বলেন এবং তিনি একজন বুদ্ধিমান ও চমৎকার মানুষ।’

    রানির মুনশিও বিশ্বাস করতে চায়নি যে আমি এর আগেও জন্মেছি, বলতো কাফেররা এরকম বিশ্বাস করে, তোরা মুরতাদ, তোরা মালাউন, তোরা জিম্মি, কাফেরদের তো জন্নতে যাবার নেই, আর কেয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করারও বালাই নেই। রানি ভিক্টোরিয়ার জন্যে দুজন চাকর এদেশ থেকে গিয়েছিল, অন্যজনের নাম মোহম্মদ বক্স, তার সঙ্গে তেমন আলাপ হয়নি, রানির খাস-আর্দালি বলে তার পোঁদে খুব তেল ছিল। আবদুল করিমের তো কোমরে তরোয়াল ঝুলতো, বুকে রানির দেয়া মেডেল ঝুলতো, মোহম্মদ বক্স অমন তোল্লাই পায়নি, তাই হয়তো খিটখিটে মেজাজের হয়ে গিয়েছিল।

    আবদুল করিম একটা গোপন খবর দিয়েছিল। রানি আর রাজবাড়ির সবাই নাকি জল দিয়ে ছোঁচায় না, পাতলা কাগজে পুঁছে নেয়। আবদুল করিম তাই রানির কাজ সেরে নিজের ঘরের চান করার ঘরে গরম জলে চান করে শুদ্ধ হয়ে নিতো, নইলে নামাজ পড়বে কেমন করে। শুদ্ধ হবার জন্যে পাশপকেটে ঢিলা কুলুপ রাখতো।

    চাকরদের মুখ উঁচু করে তোলা অনুচিত, সব সময়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, তবুও আমি রানিকে দেখেছিলুম, দেখতে ভালো নয়, বড্ডো মোটা, জানি না মুনশির কেন পছন্দ হয়েছিল, হয়তো রানি বলে, হয়তো শাদা চামড়া বলে, সোনাদানা পেতো বলে।

    যদিও রানির পরিবারের সবাই বলাবলি করতো যে মুনশির সঙ্গে ৬৮ বছরের রাণির একটা গোলমেলে সম্পর্ক নিশ্চয়ই আছে, নয়তো একজন আরেকজনকে অতো চিঠি লেখালিখি করবেই বা কেন, বালটিমোর, বাকিংহাম, বালমোরাল প্রাসাদের সোনালি গলিঘুঁজিতে রানির সাতহাতি ঘাঘরার কাপড় ধরে পেছন পেছন হাঁটবে কেন, মাঝরাত পর্যন্ত রানির ঘরে থাকবে কেন !

    মুনশি আমায় বলেছিল যে রানিকে উর্দু হিন্দি আর ফারসিতে সড়গড় করে তোলার জন্যেই ও চিঠি লিখতো আর রানিও ওকে চিঠি লিখতেন। সেসব চিঠিপত্তর অবশ্য রানি মারা যেতেই রানির পরিবারের লোকেরা হাপিশ করে দিয়েছে। রানিকে পাঠানো একটা চিঠিতে মুনশি করিম যে দু লাইন কবিতা লিখেছিল, তা আমার এই জন্মেও মনে আছে, ও পড়ে শুনিয়েছিল আমায়,


     

    মোহব্বত মেঁ নহিঁ হ্যায় ফর্ক জিনে অওর মরনে কা

    উসি কো দেখ কর জিতে হ্যাঁয় জিস কাফির পে দম নিকলে


     

    তবে মুনশি আবদুল করিমের যে কেন গনোরিয়া হয়েছিল তা আমি জানি, রানির নিজের ডাক্তারই করিমের রোগ ধরে ফেলেছিল। রানি কেন জানতে চেয়েছিলেন করিমের যৌনরোগ আছে কিনা ! আসলে রাজারাজড়াদের ব্যাপারস্যাপারই আলাদা। রানির তো আর গনোরিয়া হতে পারে না, হলে পুরো বিলেতি সাম্রাজ্যে ঢি-ঢি পড়ে যেতো।

    বেচারা আবদুল করিম চব্বিশ বছর বয়সে ব্রিটেনে এসেছিল, ওর কি সাধ-আহ্লাদ হয়নি লণ্ডনের মেমদের সঙ্গে শোবার, দেশে ফিরে গেলে সেই তো বাদামি চামড়ার বউ বা আগ্রার কালো-বাদামি চামড়াউলিদের কোঠা। আবদুল করিমের সঙ্গে আমি লিডসের হলবেক শহরতলিতে গিয়েছি, ওটাই তখন মেমদের রমরমে বউবাজার ছিল, পরে তো সোহো হয়ে উঠল বউবাজার, বউবাজার মানে বউদের বাজার নয়, মেমদের বাজার, যাকে এক রাতের জন্যে কিংবা কিছুক্ষণের জন্যে বউ করে নিয়ে ভালোবাসাবাসি করা যায়, আমাদের সুতানুটি-গোবিন্দপুরেও আছে, আমার এতোগুলো জন্মের আগে-পরেও আছে।

    রানির সঙ্গে ইউরোপের অন্য দেশগুলোয় যখন আবদুল করিম যেতো তখন এক ফাঁকে শহর দেখার নাম করে সেখানের মেমদের বউবাজারেও ঢুঁ মারতো, আমার সঙ্গে সেসব গল্প করতো, আমি ছাড়া তো দেশের আর কোনো মানুষ ছিল না যার সঙ্গে নিজের লুকোনো ব্যাপারগুলো ভাগ করে নেয়া যায়।

    দশ বছর বিলেতে ছিল আবদুল করিম, নিজের লুকোনো জীবনের ঘটনাগুলো একটা ডায়রিতে লিখে রাখতো। আবদুল যখন দেশে ফেরার জন্য তৈরি তখন ওর বাক্স-প্যাঁটরা ঘাঁটাঘাঁটি করেছিল রানির পরিবারের লোকেরা, ডায়রিটা পাবার জন্যে, কিন্তু আবদুল করিম তো মহা চালাক, আগেই ডায়রিখানা এক আত্মীয়ের হাতে আগ্রায় পাচার করে দিয়েছিল।

    যখন পাকিস্তান হলো তখন ওর ভাইপোরা সেই ডায়রিখানাকে বাঁচাবার জন্য লুকিয়ে পাকিস্তানে চলে গিসলো কেননা ভাইপোদের সন্দেহ ছিল যে জওহারলাল নেহেরু মাউন্টব্যাটেনের বউয়ের চাপে পড়ে ডায়রিখানা খুঁজে বের করবে আর নষ্ট করে ফেলবে, হয়তো জেলেই পুরে দেবে আবদুল করিমের আত্মীয়দের ; ওই ডায়রি বাঁচাবার জন্যেই ওদের পাকিস্তানে যেতে হয়েছিল নয়তো যেতো না, সেখানে গিয়ে ওরা মোহাজির নামে অনেককাল বদনাম ছিল, সে তো দাউদ ইব্রাহিম নামে এক মোহাজির পাকিস্তানে যাবার পর ওরা করাচিতে এখন শান্তিতে আছে।

    দেখি পরের জন্মে যদি মোহাজির হয়ে পাকিস্তানে জন্মাতে পারি, ওদের বউগুলো অপরূপ সুন্দরী হয় আর উপরি পাওনা হলো যে চারটে করে অমন কচি সুন্দরীকে বিয়ে করা যায়।

    বলেছি তো, আবদুল করিম বিশ্বাস করতো না যে আমি এর আগেও জন্মেছি। ওদের ধর্মে নাকি বার বার জন্মানো বারণ। যাক আমার তো অমন ধর্মের বালাই নেই, তাই জন্মাতে পেরেছি, মনেও রাখতে পেরেছি আগের জন্মের কথা। রাজকুমারও বিশ্বাস করতেন না যে আমি এর আগেও জন্মেছি, আর আগের জন্মের বেশ কিছু ঘটনা আমার মনে আছে। এই যেমন জব চার্নকের হিন্দু বউয়ের কবরের ওপর যে মুর্গিটাকে বলি দেয়া হয়েছিল, সেটা তো আমিই গাঁ থেকে এনে দিয়েছিলুম। সিরাউদ্দৌলা যখন কলকাতা আক্রমণ করেছিল, তখন দুদলের সেনারাই ভাবলে আমি অন্য দলের, বর্শায় গিঁথে মেরে ফেললে, বর্শার ডগায় আমার মুণ্ডুটা রাস্তায় পোঁতা ছিল, সুন্দরবন থেকে একটা বাঘ এসে ধড় আর মুণ্ডু দুটোই চিবিয়ে-চিবিয়ে আয়েস করে খেয়ে নিলে, চিবোবার আওয়াজ এখনও আমার কানের খোলে রয়ে গেছে।

    বাঘের পেটে দু’রাত এক দিন আমার মুণ্ডুটা ভালোই ছিল, তবে বাঘের পেটের ভেতরটা বড্ডো গরম।


     

    হৃৎপিণ্ড : আর কতো দূর হুলি ?

    আমি : আরও দুই মাস, রাজকুমার।


     

    আমি এপর্যন্ত চারবার জন্মেছি, যা আমার মনে আছে, বাকিগুলো তেমন মনে রাখতে পারিনি, অ্যালঝিমারের রোগের দরুণ, আর চারবারই আমি পাঁচের নামতায় মারা গেছি, পঁচিশ থেকে পঁচাত্তরের মধ্যে, মানুষ হয়ে জন্মাবার কথা বলছি, হয়তো তার আগে কীট পতঙ্গ জন্তু জানোয়ার হয়ে জন্মে থাকবো, সেসব স্মৃতি ধরে রাখতে পারিনি, কেননা কীট পতঙ্গ জন্তু জানোয়ারের পূর্বজন্মের স্মৃতি হয় কি না জানি না, আগের জন্মে কালেজে পড়ার সময়ে ডারউইন সাহেবের বই পড়ে দেখেছি তাতে উনিও কিছু লিখে যাননি।

    আমার এখনকার জন্ম দিয়েই শুরু করি। আমি ছিলুম রাজকুমারের খাস-চাকর। উনি আমাকে হুকুম দিয়েছিলেন যেন আমি ওনাকে অন্য লোকের সামনে হুজুর বলে সম্বোধন করি। উনি যেখানে যেতেন আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন, আমি না হলে ওনার গোপন ফাই-ফরমাস খাটার লোক ছিল না, সকলকে বিশ্বাস করতেন না, বলতেন ওরা সব হাফলিটারেট ইডিঅট।

    রাজকুমারের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমি ইংরেজি শিখে নিয়েছিলুম। উনি ফারসি আর ইংরেজিতে বেশ তুখোড় ছিলেন, সুতানুটি গোবিন্দপুরের বিলেতি সাহেব-মেমরাও ওনার ইংরেজি শুনে মাথা দোলাতো, নিজের চক্ষে দেখা। আফিম, চিনি, নুন, নীল, রেশম, কয়লার ব্যবসায় ওনাকে টক্কর দেবার মতন কোনো বাঙালি মাই-কা লাল ছিল না।

    একটা মজার কথা তোকে বলি, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড বললেন, বাবর ওনার বাবরনামায় কতোকিছু লিখে গেছেন হিন্দুস্তান সম্পর্কে, উনি জানতেন না যে এদেশে কয়লা নামে এক রকমের পাথর মাটির তলায় পাওয়া যায় ; ওনারা কাঠকয়লার কথা জানতেন, গাছ পুড়িয়ে রান্নার জন্যে কাঠকয়লা তৈরি করতেন। আমিই তো ইরেজদের কয়লার কথা বললাম, এই বাংলার মাটির তলায় অঢেল কয়লা পাওয়া যায়, বিশ্বাসই করতে চায়নি ব্যাটারা।

    বললুম, হুজুর, আমি এর আগে একটা জন্মে হুলিকাঞ্চন গুপ্তা হয়ে বেনের বাড়িতে জন্মেছিলুম, তখন আমরাই বাবর আর ইব্রাহিম লোদিকে মাল সাপলাই করতুম। নেড়েরা কয়লার কথা জানতো না, যুদ্ধু করতে গিয়ে ওদের কাঠ কয়লার দরকার পড়তো, সেগুলো আমরাই সাপলাই দিতুম, শুকনো আর কাঁচা মাংস, সেনাদের জন্যে মদ, আফিম সাপলাই দিতুম। শ্মশান থেকে অঢেল কাঠ কয়লা পাওয়া যেতো, শ্মশানের পাশেই আমাদের কাঠ কয়লার গুদোম খুলতে হয়েছিল।

    হৃৎপিণ্ড কিম্বদন্তি হতে চাননি।

    রাজকুমার ইতিহাস হতে চাননি।

    ওনার পা ব্যথা করলে আমি অনেকক্ষণ পা-টিপে ঘুম পাড়াতুম।

    পুরুতের পরিবার কেন ব্যবসাদার হয়ে গেল, সবাই জানতে চায়।

    পুরুত না হয়ে কেন আমিন, মুৎসুদ্দি, সেরেস্তাদার, বানিয়ান, মহাজন, কোম্পানির দালাল, কমিশনখোর, গোমস্তা, আমলা, জাহাজের কারবারি হয়ে গেল, জানতে চায়।

    কেন আবার ! সমাজের দেয়া চোট-জখম থেকে উচ্চাকাঙ্খার বোধ, সমাজ একঘরে করে দেয়ায় গভীর চোট-জখম, পরিবারের সদস্যদের দেয়া আঘাত, স্বদেশবাসীর রক্ষণশীলতা। সুতানুটি-গোবিন্দপুরের কোনো বামুন রাজকুমারের বাড়ি গেলে, তার জরিমানা ধার্য ছিল, সেই বামুন পুরুতদের পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে নিজের ব্রাহ্মণ পিঁড়িতে ফিরতো, বিগট, বিগট, বিগট, বিগট ! কে এক পুরুষোত্তম পীর আলি খানের রান্নাঘর থেকে বিরিয়ানি রাঁধার খাইখাই গন্ধ পেয়েছিল, ব্যাস, কিম্বদন্তি চালু।

    সুতানুটি-গোবিন্দপুরকে মেট্রপলিস কে বানালো ?

    মফসসলগুলোয় গথিক স্হাপত্যের জমিদারবাড়িগুলো, যা ভেঙে-ভেঙে চুনবালিসুরকির চুরো হয়ে গেছে, কার বাড়ির নকল ?

    দলপতির বিরুদ্ধতা কে করল ? রেনিগেড, রেনিগেড, রেনিগেড। দলপতির বাড়ি থেকে নিজের বাড়ির দূরত্ব এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ করতে করতে একশো কোশ সরে গেলো।

    মেট্রপলিসের প্রথম প্রেমিকবয়।

    হৃৎপিণ্ড : প্রেমিকবয় হওয়া ভালো, নাকি গুচ্ছের অ্যাণ্ডাবাচ্চা পয়দা করে দেশের জনসংখ্যা বাড়ানো ভালো, বল তুই ?

    আর কেউ রাজকুমারের পরিবারের পেডিগ্রির সমকক্ষ করে তুলতে পারেনি নিজের পরিবারকে।

    রাজকুমার ব্যবসার কাজে বাইরে গিয়েছিলেন, সেই সুযোগে ওনার মাকে, যিনি রাজকুমারকে ছোটোবেলা থেকে নিজের ছেলের মতন মানুষ করেছিলেন, তাঁকে যখন গঙ্গার ধারে অন্তর্জলী যাত্রায় নিয়ে গিয়ে রাখা হল, বলেছিলেন, রাজকুমার বাড়িতে থাকলে তাঁকে এই জ্বালাযন্ত্রণা পোয়াতে হতো না, বাড়িতে নিজের ঘরেই মারা যেতাম।

    হৃৎপিণ্ড বলল, আমার সম্পর্কে তুই যেসব গুজব শুনিস, সবই সত্যি হুলি, তুই তো আমার খাস চাকর, সবই দেখিস। হ্যাঁ, নুনের মোলুঙ্গিদের আমি চাপ দিয়ে টাকা আদায় করতুম। নিলামে পড়ন্ত জমিদারদের জমিদারি কিনে নিতুম, কড়া জমিদার ছিলুম, গরিব হলেও নীলচাষিদের রেয়াত করতুম না, কিন্তু আমার আইনি পরামর্শতেই তো যশোরের রাজা বরোদাকান্ত রায়, বাগবাজারের দুর্গাচরণ মুখার্জি, কাসিমবাজারের হরিনাথ রায়, পাইকপাড়া রাজ পরিবারের রানি কাত্যায়নি নিজেদের জমিদারির নিলাম হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিল। আমাকে কোম্পানির কমপ্রাডর বললে আপত্তি করব না।

    রাজকুমার চুপ করে গেলেন বেশ কিছুক্ষণের জন্যে ; সেই সুযোগে আমি ওনাকে আমার আগামি জন্মে ঘটে যাওয়া দেশভাগ, বাংলাদেশে বাঙলা ভাষার জন্যে লড়াই, মুক্তিযুদ্ধ, লক্ষ-লক্ষ উদ্বাস্তুর যশোর রোডে চ্যাঁচারির চালায় ঠাঁই, সেই যশোর রোডের ছায়াকে কেটে ফেলার ঠিকেদারি, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্যে ভারতীয় সেনার আক্রমণ, পাকিস্তানিদের নব্বুই হাজারের বেশি সেনা ভারতের হাতে বন্দী, বাংলাদেশের গদ্দার বাহিনী রাজাকর, আল বদর, তাদের ফাঁসি আর পাকিস্তানের বিফল হয়ে যাওয়া রাষ্ট, সব গল্প শোনালুম। এখনকার বাংলাদেশে হিন্দুদের দেবী-দেবতার মন্দির ভেঙে ফেলার, বাঙালি মুসলমানদের গোঁপ কামিয়ে দাড়ি রাখার, হিন্দুদের তাড়িয়ে-তাড়িয়ে পুরোদেশটাকে নেড়েভূমি করার ঘটনা বললুম।

    হৃৎপিণ্ড বলল, জানিস, কখনও ভাবিনি যে বাঙালিদের দেশটা পাকিস্তানের মতন একটা ফেলমারা এলাকা হয়ে যাবে, ইউরোপিয়রা যাকে বলে ফেইলড স্টেট।

    আমি তো পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে কতো কমপ্রাডরকে দেখেছি, চীনের ঘুষ খেয়ে দালালি করতো, রাশিয়ার ঘুষ খেয়ে দালালি করতো, তারাও তো বেনিয়ান, রেনিগেড, ভিনদেশের দালাল, সব ভোঁভাঁ, হামবড়াই ফুসকি, দেয়ালে লেখালিখি ফুসকি, দলপতি ফুসকি, দল ফুসকি।

    আমিও যে একটা জন্মে প্রেমিকবয় ছিলুম, তা আর রাজকুমারকে বললুম না, মনে হবে ওনার সমকক্ষ হবার চেষ্টা করছি, প্রেমিকবয় মানে সেকেলে লোকেরা যাকে বলে দুশ্চরিত্র হওয়া, এই যেমন যারা চিরকুমার আর শাকাহারি তারা নিজেদের মনে করে সাত্বিক, তারা যদি কাউকে মদমাংস খেতে দেখে, বউ ভাড়ার কোঠায় যেতে দেখে, রেসের মাঠে যেতে, জুয়ার আড্ডায় যেতে, নাইট ক্লাবে গিয়ে নাচতে, কিংবা বছরে বছরে প্রেমিকা বদলাতে দেখে, তাদের মনে করে তামসিক, সোজা বাংলায় চরিত্রহীন, আমি তা-ই ছিলুম। দুর্গাপুরের বড়ো রাস্তায় মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরগাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলুম, সেই যে জায়গাটা দুর্ঘটনার জন্যে তৈরি হয়েছে, ফি বছর দু’চারটে গাড়িতে মানুষ থেঁতো হয়।

    দুশ্চরিত্র জীবনে, আমার নাম হুলিই ছিল, পদবি ছিল শিট, পদবিটা আমার পছন্দ ছিল না, শিট মানে তো গু, তাই আমি সবাইকে নিজের পরিচয় দিতুম হোলি শেঠ নামে ; বাবা হুমকিপতি দলদাস ছিলেন, প্রচুর টাকাকড়ি গ্যাঁড়াতে পেরেছিলেন, তোলাবাজি কমিশন ঠিকেদারি দালালি ঘুষ সিণ্ডিকেট থেকে, বাড়ির ওয়াশিং রুমের দেয়ালে যে আলমারি ছিল তা বাইরে থেকে দেখে টের পাওয়া যেতো না, রিমোট দিয়ে খুলতে হতো, সোনার বিস্কুটও সেখানেই রাখা থাকতো। আমি তখন বাঙালি গেস্টাপো গুণ্ডা-ক্যাডারদের পুষতুম।

    আমার সম্পর্কে এক মহিলা, যার সঙ্গে কিছু দিনের প্রেমিকবয় সম্পর্ক পাতিয়েছিলুম, কমপ্লিকেটেড, সে আমার সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখে রেখে প্রচুর কোকেন নিয়ে বাথটবে চান করার সময়ে ডুবে মারা গিয়েছিল :

    “হে ভগবান, কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই। ”

    “হে ভগবান, হীরের আঙটি পরিয়ে আটকে রেখেছে। ”

    “হে ভগবান, কিনারায় নিয়ে গিয়ে রেখে দিয়েছে। ”

    “হে ভগবান, আমিই একমাত্র নই। ”

    “হে ভগবান, ছেড়ে চলে যাওয়া যে সম্ভব হচ্ছে না। ”

    “হে ভগবান, এ যে এক নম্বরের ফ্লার্ট। ”

    “হে ভগবান, কাজকর্ম ব্যবসা দেখার এর আগ্রহ নেই। ”

    “হে ভগবান এর যে কী কাজ আর কী ব্যবসা তাও জানতে পারলাম না এতো দিনে। ”

    “হে ভগবান, সম্পর্কের বনেদ কেবল যৌনতা। ”

    “হে ভগবান, এ যে ঢ্যাঙা ফর্সা রূপবান জলের মতন টাকা খরচ করে। ”

    “হে ভগবান, এর কাজের সঙ্গে কথার মিল নেই। ”

    “হে ভগবান, এ মূল প্রশ্নের উত্তর দেয় না, এড়িয়ে যায়। ”

    “হে ভগবান, এর বাড়ির চাকরানি এতো সুন্দরী যে চাকরানি বলে মনে হয় না। ”

    “হে ভগবান, এ যে সব সময়েই নিখুঁত। ”

    “হে ভগবান, এর সব সময়েই এতো তাড়া কেন যে। ”

    “হে ভগবান, এ রোজই একটা ফুলের তোড়া পাঠায়, সঙ্গে হাল আমলের গানের ক্যাসেট। ”

    “হে ভগবান, এ প্রতিদিন নতুন পোশাক পরে থাকে, নতুন পারফিউম লাগায়। ”

    এই সব ভাবতে ভাবতে রাজকুমারের বন্ধুনি কবি ক্যারোলিন নরটনের কথা মনে পড়ছিল আমার, অপরূপ সুন্দরী, রাজকুমারকে ভালোবাসতেন। বজরায় ওয়াল্টজ, কোয়াড্রিলো, গ্যালপ নাচতেন দুজনে। ক্যারোলিনের বরের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল, তালাক নয়, এমনিই ছাড়াছাড়ি, ক্যারলিন লর্ড মেলবোর্নের সঙ্গে ইশক ওয়ালা মোহব্বত করতো, তা ধরে ফেলেছিল ওর বর, ফলে ছাড়াছাড়ি, ছাড়াছাড়ির দরুন ক্যারোলিনের টাকাকড়ির এমন খাঁকতি পড়েছিল যে রাজকুমার মণিমুক্তো বিলিয়ে দেন শুনে আঁকড়ে ধরেছিল, রাজকুমারকে ফুসলিয়ে অনেক সোনাদানা আদায় করতে পেরেছিল।

    রাজকুমার মারা যেতে মনের দুঃখে ক্যারোলিন একখানা কবিতা লিখেছিল, ‘আমার হৃদয় এক শুকনো বাদাম’ শিরোনামে, তার গদ্য করলে এরকম দাঁড়ায় :


     

    আমার জীবন এক শুকনো বাদামের মতো

    ফাঁকা খোলের ভেতরে ঝুমঝুমির মতো বাজে

    তুমি আমার বুকের ভাঁজ খুলে তার ভেতরে রাখতে পারবে না

    তাজা কোনো জিনিস যা সেখানে বাসা বাঁধতে পারে

    আশা আর স্বপ্নে ভরা ছিল এক সময় যখন

    জীবনের বসন্তগৌরব আমার দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে

    বিদায় নিয়েছে আজ সেখানে আনন্দ নেই দুঃখ নেই

    আর শুকনো হৃদয় কখনও উদ্বেলিত হবে না


     

    আমার জীবন এক শুকনো বাদামের মতো

    এক সময়ে প্রতিটি স্পর্শে জেগে উঠতো

    কিন্তু এখন তা কঠিন ও বন্ধ হয়ে গেছে

    আমি তার হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করতে পারবো না

    প্রতিটি কন্ঠস্বরের আলো আমার ভ্রুপল্লবকে কাঁপাতে পারতো

    প্রতিটি মৃদু বাতাসে দুলে উঠতো গাছের ডাল

    যে ডালে রোদের আলোয় দোল খেতো বাদামফল

    এখন তা শীতে আক্রান্ত, আমার মতো কঠিন আর দুঃখী


     

    আমার হৃদয় এক শুকনো বাদামের মতো

    যে দেখতো সে-ই আকর্ষিত হতো এক সময়

    কিন্তু যবে থেকে দুর্ভাগ্য আমাকে ভেঙেচুরে দিয়েছে

    তেতো হয়ে গেছে মুখের স্বাদ গন্ধ

    তার চঞ্চল যৌবনের নতুন পরাগ

    শেষ হয়ে গেছে আর ফিরবে না কোনোদিন

    আর আমি অনুভব করি আমার দুঃখী হৃদয়ের সত্য

    রোদ নেই, হাসি নেই, যা আমাকে ঔজ্বল্য দেবে।


     

    চাকরদের মুখ তুলে অতিথিদের দিকে তাকানো অনুচিত, তবু আমি ক্যারোলিন নর্টন এলেই ওনার দিকে তাকিয়ে দেখতুম, কী ফর্সা গোলাপি চেহারা, এখানের মেমরা কেউই ওনার মতন বুকের খাঁজ দেখানো পোশাক পরে না, আমি আড়চোখে খাঁজের দিকে তাকাতুম, বুকের পুঁইমেটুলি দেখতুম।

    চাকরের দুর্বলতা শোভা পায় না, আমি বেশ দুর্বল বোধ করতুম, ওনাকে চোখ বুজে কল্পনা করতুম চান করার সময়ে। জমিদার আর কোম্পানি বাহাদুর ছাড়া মেমদের ছোঁয়াও অপরাধ, তবু আমি ছলছুতোয় ছুঁতুম ওনাকে, ফুলের তোড়া দেবার সময়ে, মদের গ্লাস এগিয়ে দেবার সময়ে।

    বিদেশিনীরা রাজকুমারকে ভালোবাসতেন বলে, বিদেশে গিয়ে নানা রকমের মাংস খেতেন বলে, সুতানুটি-গোবিন্দপুরে ওনাকে বামুনরা সমাজের বাইরে একঘরে করে দেবার তাল করেছিল, ওনার বাড়ির মেয়ে-বউরা যদি ওনাকে ছুঁয়ে ফেলতো, তাহলে তারা গঙ্গাজলে চান করে পবিত্রতা ফিরে পেতো, রাজকুমার পবিত্রতার কেয়ার করেননি, বাড়িতে বৈঠকখানাঘর তৈরি করে সেখানেই থাকতেন, বন্ধুবান্ধবরা আর ব্যবসার লোকরা, দেশি হোক বা বিদেশি, সেই ঘরেই দেখা করতো, আরাম কেদারায় বসে হুঁকো টানতো।

    রাজকুমার মারা যাবার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই প্রতিদিন ক্লিভল্যাণ্ডের ডাচেস এসে ওনার সঙ্গে সময় কাটাতেন।

    হৃৎপিণ্ড বহুক্ষণ চুপ করে ছিলেন, হয়তো সমুদ্রের ঢেউয়ের দোল খেতে খেতে শৈশবের কথা ভাবছিলেন, সৎমায়ের আদর-যত্নের কথা ভাবছিলেন, হঠাৎ বলে উঠলেন, বুঝলি হুলি, তুই যেমন ম্যাজিকে বিশ্বাস করিস, আমার বড়োছেলেও তেমন ম্যাজিকে বিশ্বাস করে, মঙ্গলকাব্যের কবিরা যেমন স্বপ্নাদেশ পেয়ে কবিতা লিখতেন, আমার বড়োছেলেও তেমন স্বপ্নাদেশ পায়, কোথা থেকে জ্ঞানের কাগজ ওর হাতে উড়ে এসে পড়ে, আর ও নিরাকার ব্রহ্মের খোঁজে লীন হয়ে যায়, তখনই ব্রহ্ম ব্রহ্ম ব্রহ্ম জপতে থাকে, ব্যবসা লাটে উঠিয়ে দিলে।

    রাজকুমার রোমে গিয়ে পোপের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, প্যারিসে গিয়ে রাজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, লণ্ডনে থ্যাকারে আর চার্লস ডিকেন্সের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, প্যারিসে ম্যাক্সমুলারের সঙ্গে সংস্কৃত ভাষা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন । এই দেখা করার কায়দা ওনার কাছ থেকেই তো শিখেছিলেন ওনার ছোটো নাতি।

    আমি বললুম, হ্যাঁ, রাজকুমার, জানি, ব্রহ্ম ব্রহ্ম জপে জপে আলাদা স্বর্গে গেলেন । বিষয়সম্পত্তিকে উনি মনে করতেন বিষ, মন বিষিয়ে দেয়, অনেক লোককে জড়ো করেছেন ওনার অতিবামুন কাল্টে। ওনার সময় থেকেই দিকে দিকে ভদ্রলোক বিয়োবার যুগ আরম্ভ হলো। বাঙালি আর ব্যবসাবাণিজ্য করবে না, কারখানা খুলবে না, শুধু ভদ্রলোক হয়ে কেরানিগিরি করবে। আপনার সময়ে উনিশ শতকের আশির দশক আর নয়ের দশকটুকুই বাঙালির এগিয়ে যাবার সময় ছিল, কেরানি হবার আর সরকারি চাকুরে হবার দৌড়ঝাঁপ ছিল না, শুধু আপনার ছোটোছেলে ওই লাইনে চলে গিয়েছিলেন।

    হৃৎপিণ্ড বললেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলে, হ্যাঁ, আধ্যাত্মিকতাই এখন বাঙালির ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    আমি বললুম, এই আধ্যাত্মিকতা আপনার সময়ের আধ্যাত্মিকতা নয়। এই আধ্যাত্মিকতার কোনো দার্শনিক বনেদ নেই। দিকে-দিকে আকাট গুরুদেবের ছড়াছড়ি, গেরুয়া পোশাক পরে মাফিয়ারা বোকাদের ঠকিয়ে বিরাট বিরাট দল তৈরি করে সরকারি জমিজমা দখল করছে, আর সেখানে মন্দির গড়ে মেয়েদের ফুসলিয়ে ধর্ষণ করছে। প্রতিদিন তার বিজ্ঞাপনও বেরোচ্ছে কাগজে, বাড়ি-বাড়ি হ্যাণ্ডবিল বিলি করছে তারা। এমন বাঙালি আর দেখতে পাবেন না যার হাতের আঙুলগুলোয় গ্রহরত্নের গোটা পাঁচেক আঙটি নেই, গলায় কিংবা বাহুতে মাদুলি নেই ।

    হৃৎপিণ্ড বললেন, আমি সারাজীবন এই গুরু ব্যাপারটার বিরোধী ছিলাম, আমার কোনো গুরুর দরকার হয়নি, নিজে ঠেকে শিখেছি, নিজে নিজের রাস্তা গড়ে তুলেছি।

    আমি জিগ্যেস করলুম, রাজকুমার আপনি শনিদেবতার নাম শুনেছেন ?

    হৃৎপিণ্ড বললেন, শুনেছি, কখনও শনিদেবতার পুজো হতে দেখিনি বা শুনিনি, আমার জমিদারিতে কতো চাষি থাকতো, বিপদে পড়তো, আমি তাদের চাপ দিয়ে পাওনা আদায় করতাম, তবুও তো তারা শনি নামে কোনো দেবতার আশ্রয়প্রার্থী হয়নি।

    বললুম, আপনি জানেন না, মোড়ে-মোড়ে রিকশা স্ট্যাণ্ডে এখন শনি মন্দির, নাস্তিক মার্কসবাদীরা বসিয়ে দিয়ে চলে গেছে, এখন গান্ধিবাদীরা তাদের কাছ থেকে ফি-হপ্তায় চাঁদা তোলে। রিকশাস্ট্যাণ্ডগুলোয় আর মোড়ে মোড়ে আরেকটা পুজো হয়, বিশ্বকর্মা পুজো, আপনি জাহাজের মালিক হয়ে যে পুজো করেননি, এখন কেউ রিকশা টানলে বা কোনো সাঁড়াশি নিয়ে কাজ করলেও লাউডস্পিকার বাজিয়ে পুজো করে, ইয়ে দুনিয়া পিত্তল দি, হো বেবি ডল ম্যায় সোনে দি, হো মেরে হুস্ন দে কোনে কোনে দি, বেবি ডল ম্যায় সোনে দি, জয় বাবা বড়োঠাকুর, তুমি ঠাকুরদের মধ্যে সবচে বড়ো, পেন্নাম হই ।

    হৃৎপিণ্ড জানতে চাইলেন, শরবতের বয়ামের দেয়ালে এসে, হ্যাঁরে, লাউডস্পিকার কি জিনিস, স্টিম ইঞ্জিনে চলে ?

    বললুম, না রাজকুমার, বিজলিতে চলে, তার ভেতরে একহাজারটা ষাঁড়ের গলার আওয়াজ লুকোনো থাকে, কেউ কোনো কথা বাজালে কিংবা গান করলে, সেই ষাঁড়েরা মানুষের মাথার ওপরে চেঁচাতে চেঁচাতে উড়তে থাকে। যে গান গায় বা বক্তৃতা দেয় তাকে তখন পাগলা ষাঁড় বলে মনে হয়।

    হুলি, তুই কি বলতে চাইছিস, ওগুলো আমার বড়ো ছেলের প্রভাবের কুফল ? জিগ্যেস করলেন হৃৎপিণ্ড।

    বললুম, একবার আধ্যাত্মিকতার গাড়ি চালিয়ে দিলে স্পেনের ধর্মধ্বজাধারীরা যে পথে সমাজকে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পথেই সমাজটা দৌড়োতে থাকে, গড়াতে থাকে, জানেন তো। স্পেন ওই ধ্বজাগুলো লাতিন আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে পুঁতেছে আর সেখানকার মানুষদের হতভাগ্য করে দিয়েছে, দক্ষিন আমেরিকা হয়ে গেছে উত্তর আমেরিকার চেয়ে গরিব ; এখন উত্তর আমেরিকা ভাবছে দক্ষিণ আমেরিকার লোকদের আসা বন্ধ করতে দেয়াল তুলবে।

    হৃৎপিণ্ড দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ফরম্যালিনের শরবত দুলে উঠল, বললেন, আমেরিকায় যাবো ভেবেছিলুম, কিন্তু তার আগেই মারা গেলুম রে।

    আমি আমার বাকি কথাগুলো বললুম, আপনি বলুন না, এসব এলো কোথা থেকে, এই যে শীতলা পুজো, মনসা পুজো, কার্তিক পুজো, আরও কতো অজানা অচেনা দেবীদেবতার পুজো ? মাঝ রাস্তার ওপরে, লোকের বাড়িতে ঢোকার দরোজা বন্ধ করে, নর্দমার ওপরে পাটাতন পেতে, খেলার মাঠে খুঁটি পুঁতে ? বাজারগুলোয় লাটে-লাটে মূর্তি বিক্রি হয়, দরাদরি হয়।

    কিন্তু আমার বড়োছেলের প্রভাব তো কবেই মুছে গেছে, টিকে আছে শুধু আমার নাতির গান, বললেন হৃৎপিণ্ড, আর সবায়ের নামে লেজুড় হিসাবে নাথ আর ইন্দ্র জুড়ে দেবার রেওয়াজ।

    ঘণ্টাখানেক পরে রাজকুমার বললেন, কার্ল মার্কস লিখে গেছেন যে চিরস্হায়ী বন্দোবস্তের কারণে বাঙালিদের পুঁজি ব্যবসাবাণিজ্য আর শিল্পোদ্যোগ থেকে জমিজমায় নিবেশের দিকে চলে গিয়েছিল ; আমি তা নিজের জীবন দিয়ে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছি। আমি যেমন বেশ কয়েকটা জমিদারির মালিক ছিলাম, তেমনি ব্যবসাবাণিজ্যও করেছি, ব্যাঙ্ক খুলেছি, জাহাজ চলাচল শুরু করেছি, খবরের কাগজ শুরু করতে সাহায্য করেছি, মেডিকাল কলেজ শুরু করার চেষ্টা করেছি, বিলেতে যাতে ভারতীয়রাও পার্লামেন্টে সিট পায় তার চেষ্টা করেছি, আরও কিছুকাল বেঁচে থাকলে দেখতিস গঙ্গায় স্টিম ইঞ্জিনের স্টিমার চলতো, বর্ধমান থেকে কলকাতা রেলগাড়ি চলতো, কলকাতায় জাহাজ তৈরির কারখানা বসাতাম, স্টিম ইঞ্জিন দিয়ে যে-যে কারখানা বসানো যায় তার চেষ্টা করতাম।

    আমি বললুম, হুজুর, কার্ল মার্কস তো আর জানতো না যে বাঙালিবাবু আর বাঙালি ভদ্রলোক নামে একরকমের জীব জন্মাবে যারা আস্তিক হয়েও দুর্গাপুজো-কালীপুজোয় পুরুতকে নাচতে বলবে, নিজেরা ধুনুচি নাচ নাচবে, মিষ্টি দই খেয়ে ডায়াবেটিসে ভুগবে, আর বলবে যে এটা ধর্মবিশ্বাস নয়, এটা হলো গণতন্ত্রে মানুষের কৌম আনন্দ।

    রাজকুমার বললেন, আমিই তো আমার পরিবারের পুরুতের বাংলা পদবিকে ইউরোপীয় করে তুলেছিলাম ; সেই পদবি নিজেদের নামে লেজুড় হিসেবে সেঁটে পরের প্রজন্মে সবায়ের কতো গর্ব দেখেছিস তো ? উপযোগীতাবাদ, খোলা বাণিজ্য, প্রবুদ্ধ করে তোলার উদ্যোগ, স্বাধীনতাবোধ, একেশ্বরবাদে বিশ্বাস, এসব আমিই তো এনেছিলাম।

    আমি শুনছিলুম রাজকুমারের কথা, তার দুশো পঁচিশ বছর পরে দুনিয়ায় যা ঘটছে তা জানিয়ে ওনাকে ওয়াকিবহাল করতে চাইলুম, বললুম, যে পথে আপনার জাহাজ গিয়েছিল, সেপথে এখন জোর যুদ্ধু চলছে, মোচরমানরা দলাদলি করে কার ব্যাখ্যা কার চেয়ে বড়ো প্রমাণ করার জন্যে নিজেদের মধ্যে লড়ে মরছে, মিশর আর পাশাদের দেশ নয়, মিলিটারির দেশ, সেখানে খ্রিস্টানদের গির্জায়, খ্রিস্টান ছাত্রছাত্রীদের বাসে বোমা মারছে মোচোরমান ধর্মের মানুষ, যতো বেশি পারে খুনোখুনির রেশারেশি চলছে।

    আমার মনে পড়ল যে ‘অপর’ বলতে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় যে অর্থগুলো পুরোনো বাংলা কাব্য থেকে যোগাড় করেছেন, তার মানে অন্য, ভিন্ন পৃথক, ইতর, অর্বাচীন, নিকৃষ্ট, অশ্রেষ্ঠ, বিজাতীয়, অন্যজাতীয়, প্রতিকূল, বিরোধী, শত্রু ইত্যাদি। অথচ উনি লিখেছেন যে অপর বলতে আত্মীয় স্বজন মিত্রও বোঝাতো।

    শত্রুও আবার মিত্র।

    একই শব্দের যে এরকম উলটো মানে হতে পারে তা ইংরেজি-শেখা বাঙালিরা ভুলে গেছে। ইংরেজি শেখা বাঙালিরা নিজেদেরই ভুলে গেছে। মার্কস এঙ্গেলস লেনিন মাও তারা ইংরেজিতেই পড়েছে, বাংলায় অনুবাদ করে চল্লিশ বছর আগে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে বিক্রি হতো সেসব বই। যারা বিক্রি করতো তারা সকলেই পেল্লাই বাড়ি তুলে ফেলেছে, গাড়ি হাঁকাচ্ছে, আর বই বিক্রির স্টল খোলে না, অপমান বোধ করে।

    একটা জন্মে যখন আমি সংস্কৃতের শিক্ষক ছিলুম তখন জেনেছিলুম, ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে অপর ভাবনার কিছু মিল আছে। উপনিষদ বলছে, ব্যক্তির নিজস্ব বা অহংবোধ বহু কিছুকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠে। আত্মন বলতে যদিও নিজেকেই বোঝায়, কিন্তু শুধু এইটুকু বললে তার যথার্থ সংজ্ঞা নির্দেশিত হয় না। আত্মন এমন এক অস্তিত্ব যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র পরিব্যপ্ত। এই জায়গা থেকে উপনিষদ চলে গেছে অদ্বৈত দর্শনের দিকে।

    আশ্চর্য যে মানুষ নিজেকে মাপে বড়ো করে আর অপরকে মাপে ছোটো করে। এক পক্ষের অপর তৈরি হয় অপর পক্ষের অপরকে বাদ দিয়ে। অপরীকরণে তারাই সক্রিয় পক্ষ যাদের হাতে নির্ণায়ক ক্ষমতা থাকে। অপরীকরণে এক পক্ষ নিজ, আরেক পক্ষ অপর। এই নিজ যতোই ব্যক্তির সত্বা হোক, তার মূলে আছে সমাজ। মানুষ নিজের সমাজ, ও সম্প্রদায়ের সংস্কার, বিদ্বেষ, ভীতি, পছন্দ-অপছন্দ, ক্ষোভ, আশা-নিরাশা, ধর্মচেতনা, ন্যায়-অন্যায়বোধ, ঘৃণা-লালসা, পুরোনো ইতিহাস, বন্ধুতা-শত্রুতা, রাজনীতি দ্বারা সব সময়েই প্রভাবিত হয়। সমাজ মানুষকে যে-ছাঁচে গড়ে তোলে, সে তারই আকার নেয়। পরিবার, পরিবেশ, নানা রকমের মিডিয়া, সভা-সমিতি, সরকার, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় সঙ্গঠন, শিক্ষাব্যবস্হা, রাজনৈতিক আর সামাজিক মতবাদ, হুজুগ, ধর্মীয় উন্মাদনা, এ-সবেরই কিছু-না-কিছু ছাপ পড়ে তার ওপর -- চেতনা-অবচেতনার নানা স্তরে তা ছড়িয়ে পড়ে।

    আমি তো শুদ্দুর, তাই বাদ দেয়া অপর।


     

    হৃৎপিণ্ড : আর কতো দূর হুলি ?

    আমি : আর এক মাস, রাজকুমার।

    ## Space

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না বিয়ের আগেও ছেলে-মেয়েরা ট্যাবলেট খেয়ে যতোবার যতোজনের সঙ্গে ইচ্ছে সেক্স করতে পারে। ইচ্ছে মেয়েদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে।

    তুই অতো ভাবছিস কেনো, দেখে যেতে পারিনি বটে, মেয়েদের স্বাধীনতা তো আমার জন্যেই সম্ভব হয়েছে, আমি যদি না অঢেল টাকা রোজগার করতাম, আমাদের বাড়ির মেয়ে-বউরা কি নারী স্বাধীনতা আনতে পারতো?

    হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না কানির বদলে মেয়েরা স্যানিটারি ন্যাপকিন বাঁধে।

    তুই ভুল ভাবছিস, হুলি।

    হায়, রাজকুমার এতো সাহসী ছিলেন হয়তো নিজেই স্যানিটারি ন্যাপকিনের কারখানা বসাতেন।

    হ্যাঁ, আমিই কারখানা বসাতুম, ওতে বিশেষ লগ্নির দরকার হয় না।

    আমার মনে পড়ল যে বিশ শতকের সাতের দশক আমি একটা কলেজে সমাজবিজ্ঞান পড়াতুম, আমার নাম ছিল হুলিচরণ ভট্টাচার্য, স্নাতকোত্তর সিলেবাসে ‘ভুতবিদ্যা কামাখ্যাতন্ত্র’ নামে একটা বই ছিল, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড নিয়ে পৌঁছোতে মোটে এক সপ্তাহ বাকি, আশঙ্কায়, কী করবে ঘাটে নেমে ঠিক করে উঠতে পারছিলুম না, কেননা রাজকুমারে এতো শত্তুর ছিল, তারা নিশ্চই জেটিতে এসে ব্যাগড়া দেয়া আরম্ভ করবে।

    চোখ বুজে আঁচ করতে পারলুম, জেটির খালি-গা হেটো ধুতি বামুনগুলো আর অতিবামুন কাল্টের কোরাধুতি কাঁধে চাদর লোকেদের নির্ঘাত ভুতে পেয়েছে, জানি আমি, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ডের দিকে এক ঠায় তাকিয়ে এক্কেবারে নিশ্চিত হলুম।

    ‘ভুতবিদ্যা কামাখ্যাতন্ত্র’ বইয়ের মন্তর মনে পড়ে গেল যা স্নাতোকোত্তরে ছাত্র-ছাত্রীদের মুখস্হ করাতুম যাতে ওরা জীবনে বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে কেউকেটা হয়ে উঠতে পারে, আইআইটি আইআইম-এ ভর্তি হতে পারে, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশুনা করে সেদেশের মেম বিয়ে করে এদেশে মাবাপকে ভুলে যেতে পারে। জাহাজের জেটিতে পৌঁছে, যাদের ভুতে পেয়েছে, আর তাদের মগজে ঢুকে নানা উৎপাত করছে, তাদের কাছে গিয়ে চুপিচুপি এই মন্তরটা তিনবার পড়তে হবে আর ওদের শরীরে তিনটে ফুঁ দিতে হবে।

    জেটিতে নামার পরে তো কাছ-ঘেঁষতে দেবে না ওরা, আমি যে শুদ্দুর, তাই জাহাজের কেবিনে বসেই এই মন্তরটা তিনবার পড়লুম :

    ভুত কে ? আমি কে ? কে বলতে পারে ?

    ভুতের সন্ধান করি বেড়াই ঘুরে ঘুরে।

    ভুতের দেখা পেলাম হেথা।

    ভুতের সঙ্গে কই কথা।

    শুনাই কানে হরেকৃষ্ণ হরেরাম।

    সজীব ছিল নির্জীব হলো শুনে রামনাম।

    ভুতের রাজা মহাদেব রাম নামেতে খেপা।

    ভুতকে ডেকে নিলেন কাছে বুকে পেয়ে ব্যথা।

    দোহাই শিবের, দোহাই রামনামের।

    জেটিতে যারা দাঁড়িয়ে থাকবে তাদের ঘাড় থেকে শিগগির যা।

    জয় ভুতনাথ জয় জয় শিবশঙ্কর।

    মনে মনে মন্তরটা তিনবার আওড়ালুম।

    রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড শুনতে পেলে চটে যাবেন, বলবেন তোদের এইসব ভুতপ্রেতে বিশ্বাস গেলো না, বিলেত ঘুরিয়ে নিয়ে এলাম, তবুও গেঁয়ো মুর্খ থেকে গেলি, সভ্য মানুষ হতে পারলি না।

    না, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড সেসব কিছুই বললেন না। বয়ামে ফরম্যালিনের শরবতে হয়তো উনি এখন ঘুমোচ্ছেন, সমুদ্রের এমন ঢেউ, এমনিতেই ঘুম পায়, মনে হয় মায়ের কোলে দোল খাচ্ছি। আর ওনার তো নিজের মা ছিলেন না, যদিও সৎমা ওনাকে খুবই ভালোবাসতেন।

    ভুত যার কিংবা যাদের ঘাড়ে ভর করে সহজে তাদের ছেড়ে যায় না। আমার মনে হতে লাগলো জেটিতে যারা হৃৎপিণ্ডের জন্য অপেক্ষা করছে, তাদের ঘাড়ের ভুতগুলো হয়তো তাদের ঘাড় থেকে নেমে তাদের ছেলেপুলের ঘাড়ে চাপবে, ছেলেপুলের ঘাড় থেকে নেমে তাদের ছেলেপুলের ঘাড়ে চাপবে, হয়তো কেন, নিশ্চই ঘাড়ের পর ঘাড়ে চেপে সব বাঙালির ঘাড়ে ভুতেরা ভর করেছে, তাদের আর যাবার নাম নেই, রাজকুমারকে হিংসে করার লোক কি কম আছে আজকের দিনে ? একজন আরেকজনকে হিংসে না করলে শ্বাস নিতে পারে না।

    রাজকুমারের মতন রাজসিক আর জাঁকজমকঠাশা জীবন দেখলেই লোকেদের ভুতে পায়, ঈর্ষায় জ্বলে খাক হয়, কাউকে মুকেশ আমবানি হতে দেখলেই গালমন্দ করে, তার কারণ নিজেরা তো কুটোটি নাড়তে পারলেন না, যারা রাজকুমারের দেখানো পথে এগিয়ে গেল, যেমন গৌতম আদানি, তাদের হিংসে করে, তাদের প্যাঁচ-পয়জার তিকড়মবাজি শিখতে না পেরে ভুতের জিম্মায় নিজেদের ছেড়ে দেয়, যাতে ভুতেরা এক বছরেই টাকা ডবল করে দিতে পারে, যেন ভুতেরা দাউদ ইব্রাহিমের বংশধর, দাউদের বোন হাসিনার ছেলেপুলে।

    রাজকুমার জন্মেছিলেন ১৭৯৪ সালে আর আজ ২০১৭ সাল, কতো বছর হলো ? দুশো তেইশ বছর ! এরই মধ্যে বাঙালিরা ভুতের আক্রমণে আধপাগল হয়ে গেছে, কাজের বদলে বইতে লেখা বাক্যিকে মনে করে এগিয়ে যাবার রাস্তা। নিজেরা একা এগোতে চায়না, সঙ্গে সাঙ্গোপাঙ্গো চাই, মিছিল চাই, ধুলোট চাই, জুলুস চাই, যেন তাতেই রাজকুমারের স্বপ্নের বাঙালিরা পয়দা হবে।

    হায়, রাজকুমার, কিছুই হয়নি, প্রতিটি বাঙালির ঘাড়ে চেপে বসেছে বুকনির ভুত, বাগাড়ম্বরের ভুত, লেকচারবাজির ভুত, দলবাজির ভুত, দলদাসের ভুত।

    ঘাড় থেকে ভুত না নামলে কী করতে হবে তা স্নাতকোত্তরের সমাজবিজ্ঞানের সিলেবাসে ‘ভুতবিদ্যা কামাখ্যাতন্ত্র’ বইতে আছে, তখন অগ্নিবাণ উচ্চারণ করতে হবে, যাকে বা যাদের ভুতে পেয়েছে, তাকে বা তাদের ভুতছাড়া করার জন্যে খড়ের মশাল তৈরি করে এই মন্তর আউড়িয়ে আগুনে জোরে ফুঁ দিতে হয় যাতে মশালের ধোঁয়া ভুতে পাওয়া মানুষদের গায়ে লাগে, লাগলে ভুত তাদের ছেড়ে যেতে বাধ্য। আমি তাই চুপি চুপি এই মন্তর আওড়ালুম যাতে রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড শুনতে না পান, মশাল তো নেই, এমনিই ফুঁ দিলুম।


     

    অষ্টবজ্র করলুম এক অষ্ট্ দেবতার বরে

    অষ্টবজ্রের তেজ নিলুম শক্তির শক্তি ধরে

    অগ্নিবাণ সৃষ্টি হলো ব্রহ্মার দোহায়ে

    হান হান শব্দে বাণ চল্লো আকাশ ছেয়ে

    ওঁ হরি নারায়ণ বাণের মুখে জ্বলে

    নাগ-মানব দেব-মানব কাঁপলো ব্যাকুল হয়ে

    স্বর্গ কাঁপে, মর্ত্য কাঁপে, পাতাল কাঁপে ভয়ে

    যা চলে বাণ গঙ্গাতীরের জেটির মানুষদের দিকে

    যে দেহ আশ্রয় করে পুড়িয়ে ফ্যাল, কটি অঙ্গ তার

    তেত্রিশ কোটি দেবতার হুকুম

    লাগ লাগ শিগগির লাগ..

    ##Space

    রাজকুমার : আর কতো দূর হুলি ?

    আমি : আমাদের জাহাজ পৌঁছে গেছে রাজকুমার। ঘাটে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।

    জাহাজ গঙ্গায় ঢোকার আগেই আমার হাবশি সহচর উড়ুক্কু মাছ দুটো নিয়ে সমুদ্রে নেমে গিয়েছিল, সাঁতরে মার্টিন দ্বীপে চলে যাবে ; উড়ুক্কু মাছ দুটো ওকে সমুদ্রের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে ।

    আমি শরবতের বয়ামে রাজকুমারের হৃদয় হাতে নিয়ে জেটির ঘাটে নামলুম। অপেক্ষা করলুম সন্ধ্যা পর্যন্ত, কাউকে আসতে না দেখে কুমোরটুলির দিকে রওনা দিলুম।

    [ রচনাকাল : মার্চ - মে ২০১৭ ]


     

     

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০১ আগস্ট ২০২১ ১২:৫৯734815
  • বিনয় মজুমদার : কবিতার বোধিবৃক্ষ — মলয় রায়চৌধুরী

    জাগতিক সফলতা নয়, শয়নভঙ্গির মতো

    অনাড়ষ্ট সহজবিকাশ সকল মানুষ চায়’

    আমার মনে হয়েছে, গাণিতিক সৌন্দর্য তত্বের ওপর বিনয় মজুমদার গড়ে তুলেছেন তাঁর চারটি সাব-জনার ( sub-genre )-এর কবিতার বনেদ, ‘ফিরে এসো, চাকা’, ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’, ‘বাল্মীকির কবিতা’ এবং হাসপাতালে ও শিমুলপুরে দিনযাপনের খতিয়ান ‘শিমুলপুরে লেখা কবিতা’, ‘কবিতা বুঝিনি আমি’, ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’, ‘ছোটো ছোটো গদ্য ও পদ্য’ আর ‘পৃথিবীর মানচিত্র’। ‘ফিরে এসো, চাকা’ ছিল বাংলা সাহিত্যে ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণের সঙ্গে তুলনীয়, এবং পরবর্তী সাব-জনারগুলো প্রতিবার নতুন স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে।

    যিনি গণিতের সৌন্দর্যে সমর্পিত তিনি নান্দনিক তৃপ্তি পান, গণিতের নির্দিষ্ট রূপকে সুন্দর মনে করে আনন্দ উপভোগ করেন, দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণার মাঝেও তিনি হর্ষের মনন-জগতে বসবাস করেন। যাঁরা বিনয় মজুমদারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাঁরা জানেন যে উত্তর দেবার সময়ে তিনি হঠাৎই রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে উঠতেন, এবং শিমুলপুরে থাকাকালীন কয়েকটি গানও রচনা করেছিলেন।

    ওমর খৈয়াম ও এমিলি ডিকিনসনও গণিতের সৌন্দর্যের বনেদে গড়ে তুলেছিলেন তাঁদের কাব্য। গণিতের সাথে কবিতা ও সঙ্গীতের, এমনকি পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের আরাধ্য পুস্তকগুলোর গাণিতিক লেখনবিন্যাসে ( যেমন বাইবেল, কোরান, জেন্দাভেস্তা, গীতা, ত্রপিটক, গুরুগ্রন্হ, তোরা, তালমুদ, কিতাব-ই-আকদাস, অগমসমূহ, কোইজিকি ইত্যাদি ) পার্থক্য খুঁজে পান না গণিত ও কবিতার বিস্ময়ে আক্রান্ত বেশ কয়েকজন গণিতবিদ। কবিতা ও সঙ্গীতের মতো তাঁদের মননে গণিত অনির্বচনীয়, তা ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি ক্রিয়ায় বিদ্যমান। গাণিতিক সৌন্দর্যের বিখ্যাত উদাহরণটি হল পিথাগোরাসের উপপাদ্যটি। বিনয় মজুমদারের সঙ্গে জীবনানন্দের প্রধান তফাত এখানেই। বিনয় দারিদ্র্য, দুঃখ, কষ্ট, অবহেলা, অসুস্হতা, নিঃসঙ্গতা সত্বেও থাকতেন আনন্দের প্রভায় জ্যোতির্ময়।

    কবিতাকে জীবনের সঙ্গে একাত্ম করেছেন বিনয় মজুমদার। তাঁর কাছে অনেকেই জানতে চাইতেন ‘কবিতা কী?’ বিনয় ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে বলেছেন, “কবিতা কী তা বলা অসম্ভব। কেন ? বলুন তো আপনি কী ? আপনি কি একশো কোটি বছর আগে থেকে পৃথিবীতে আছেন ? আপনি মরলে কি যে-কোনো অবস্হায় হোক প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন ? আপনি যখন আলুডাল খান, এই আলুডাল পাকস্হলীতে গিয়ে হজম হয়ে শেষে প্রাণবন্ত মাংস হয়। তা হলে দেখা যাচ্ছে পাকস্হলীতে জড়বস্তু আলুডাল প্রাণবন্ত হচ্ছে অর্থাৎ পাকস্হলীতে প্রাণ সৃষ্টি হচ্ছে এই তত্বে কি আপনি বিশ্বাস করতে পারেন ? যদি না পারেন তবে আপনার প্রাণ কী ? এইভাবে দেখা যাবে যে আপনি নিজের সম্বন্ধে কিছু কথা জানেন না। নিজেকেই পুরোপুরি জানেন না আপনি। তা হলে কবিতা কী তাও আপনার জানা অসম্ভব। ”

    ২০০০ সালে প্রকাশিত ডেভলিন কিথ তাঁর ‘ডু ম্যাথেমেটিশিয়ানস হ্যাভ ডিফারেন্ট ব্রেইনস’ গ্রন্হে হাঙ্গরিয় গণিতবিদ পল এরডস -এর এই উদ্ধৃতির মাধ্যমে গণিতের সঙ্গে সঙ্গীতের সম্পর্ক স্পষ্ট করেছেন : Why are numbers beautiful ? It is like asking why is Beethoven’s Ninth Symphony beautiful. If you do not see why, someone can not tell you. If they are not beautiful, nothing is.

    ১৯১৯ সালে বারট্রাণ্ড রাসেল তাঁর ‘দি স্টাডি অফ ম্যাথেম্যাটিক্স’ গ্রন্হে লিখেছিলেন : Mathematics, rightly viewed, possesses not only truth, but supreme beauty — a beauty cold and austere, like that of sculpture ; without appeal to any part of our weaker nature, without the gorgeous trappings of painting or music, yet sublimely pure, and capable of a stern perfection such as only the greatest art can show. The true spirit of delight, the exaltation, the sense of being more than Man, which is the touchstone of the highest excellence, is to be found in mathematics as surely as poetry.

    আইনস্টাইন বলেছিলেন, Pure mathematics is, in its way, the poetry of logical ideas.

    গণিত ও কবিতা উভয়েরই যে ব্যাপারে মিল আছে তা হলো ভাষার মাধ্যমে পরিমাপ ও আঙ্গিকের প্রতি তাদের নিখুঁত হবার প্রচেষ্টা ; মাত্রা বা সংখ্যানিরূপণ ; সমানতা ; ছন্দ ; প্রণালী ; পুনরাবৃত্তি ; অনুক্রম এবং পরিণতি ; পৃষ্ঠার ওপরে আঙ্গিক ও লেআউট, এবং প্রকাশের সংক্ষেপণ, ঘণীভূত করার ইন্দ্রজাল। স্বকীয় মর্মার্থ থেকে পৃথক করার জন্য শব্দ ( সংখ্যা ) ও প্রতীকের একাত্মতাকে একটি স্তরে মান্যতা দিয়ে সংখ্যাবিন্যাস অথবা বাকবিন্যাসের নিরীক্ষা করে গণিত ও কবিতা উভয়ই। জ্ঞান ও বোধ-অভিজ্ঞতার একটি আদর্শ অথচ বিমূর্ত এলাকা গড়ে তোলে উভয়ই, যেখানে সত্য ও মর্মার্থের প্রকৃতি, এবং কেমন করে তাদের সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করা যায়, বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্কায়িত করা যেতে পারে, তার অন্বেষন করে। উভয়ই কল্পনা ও আবিষ্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শৈশবে অক্ষর এবং সংখ্যা শেখার উপায় হলো ছন্দের মাধ্যমে মুখস্হ করা। সেই বয়স থেকেই অক্ষর ও নামতা মনে রাখার চেষ্টা করানো হয় একই ভাবে ; তাদের জন্য রচিত কবিতাগুলো গণিত মেনে লেখা হয় যাতে তাদের মনে থাকে। চন্দন ভট্টাচার্যকে বিনয় মজুমদার বলেছিলেন, “ছন্দে ও অন্তমিলে লিখলে সে-কবিতা পাঠকের মনে থেকে যায়। কাজেই পাঠকের স্মৃতিতে কবিতা সুমুদ্রিত করার এটাই সেরা পদ্ধতি।”

    বেদের শ্লোকগুলো, যা ছন্দে রচিত, তাতে গণিতের সংযোজন করেছিলেন অপস্তম্ব, বৌধায়ন, মানব, কাত্যায়ন, বরাহ, হিরণ্যকেশিন — ধর্মাচরণের বিষয়গুলো জ্যামিতিক ছক দিয়ে এবং সেগুলো ছন্দের মাধ্যমে উপস্হাপন করেছিলেনঅশ্বমেধ-হোম-যজ্ঞ ইত্যাদির সময়ে সেই জ্যামিতিক ছকগুলো আঁকা হতো। এখনও পুরোহিতরা অনেকে পুজো, অন্নপ্রাশন, বিয়ে, শ্রাদ্ধ ইত্যাদির সময়ে মাটিতে নকশা আঁকেন, জল দিয়ে, কুশকাঠি দিয়ে, বালির ওপর আঙুল দিয়ে, সিঁদুর দিয়ে। বর্তমান কালখণ্ডে পৌঁছে আমরা শূন্য ও এক-এর বাইনারি কবিতায় পৌঁছেছি। গণিতের ক্ষমতার অংশিদার হলো কবিতা, এই তর্কে যে ভাবকল্প যতো ব্যাপকই হোক না কেন, গণিত ও কবিতা তাকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংখ্যাপ্রণালী অথবা বাকপ্রণালীতে আঁটিয়ে দিতে পারে — এমনকি বিশাল ব্রহ্মাণ্ডকে্ অত্যন্ত ছোট ফর্মে ভরে ফেলতে পারে।

    কিংবদন্তি অনুযায়ী ঋষি বৃহস্পতির সাতটি মুখগহ্বর থেকে সাত রকমের ছন্দ নিঃসৃত হয়েছিল, এবং প্রতিটির গণিত-কাঠামো সুস্পষ্ট। সংস্কৃত কাব্যরচনার জন্য গণিত নির্দেশিত ছিল। ছন্দের গণিত বর্ণিত আছে বেদাঙ্গতে, যথা গায়ত্রীঃছন্দ ( ৬ x ৪ ), উশ্নীঃছন্দ ( ৭ x ৪ ), অনুষ্টুভছন্দ ( ৮x ৪ ), বৃহতীঃছন্দ ( ৯x ৪ ), ত্রিষ্টুভছন্দ ( ১১x ৪ ) ইত্যাদি। পিঙ্গলের ‘ছন্দসূত্র’ গ্রন্হে গণিতের সঙ্গে মাত্রা ও শব্দের সম্পর্কনিয়ম আলোচনা করা হয়েছে। ‘নাট্যশাস্ত্র’তে বলা হয়েছে মাত্রার গণিতবর্জিত শব্দ হয় না ; শব্দের গণিতহীন মাত্রা হয় না। ছান্দস বিষয়ে গাণিতিক নিয়মগুলি আলোচিত হয়েছে অগ্নিপূরাণ, নাট্যশাস্ত্র, বৃহৎসংহিতা ও মানসোল্লাস-এ। ‘মহাভারত’-এর ছন্দের গণিত মূলত অনুষ্টুভ ও ত্রিষ্টুভ।

    ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়ে বিনয় মজুমদার বটানিকাল গার্ডেনে প্রায়ই যেতেন ; গঙ্গার ধারের দৃশ্যাবলী দেখতেন । পরে যখন শিমুলপুর গ্রামে বসবাস করতে গেলেন তখন আরও কাছ থেকে প্রতিদিন পুকুরের মাছ গাছপালা ফুলফলের জন্ম ও বিকাশ দেখার অফুরন্ত সময় পেতেন। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হে তিনি গণিতের ফিবোনাচ্চি রাশিমালার বিস্ময়কে বকুলফুল এবং বিভিন্ন গাছের শাখা-প্রশাখার প্রসারণের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এই রাশিমালা আবিষ্কার করেছিলেন ত্রয়োদশ শতকের গণিতবিদ ফিবোনাচ্চি, যিনি বলেছিলেন, ‘প্রকৃতির মূল রহস্য তাঁর বর্ণিত রাশিমালা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এই রাশিমালা শুরু হয় শূন্যতে এবং সিরিজের পরবর্তী সংখ্যাগুলো প্রতিটি তার পূর্ববর্তী দুটি সংখ্যার যোগফল। সূর্যমুখী ফুলের পাপড়িবিন্যাস, শামুকের খোলের ওপরকার ডোরা, ফুলকপির ছড়িয়ে পড়ার বিন্যাস, মৌমাছির পরিবারতন্ত্র, বিভিন্ন গাছের শাখাবিন্যাস, আনারসের বাইরের বিন্যাস ইত্যাদিতে পাওয়া যাবে প্রকৃতির এই নান্দনিক-গাণিতিক খেলা।

    গণিতে ‘ফিবোনাচ্চি সিরিজ’ নিয়ে বিনয় এই কবিতাটি লিখেছিলেন :-

    অনেক কিছুই তবু বিশুদ্ধ গণিতশাস্ত্র নয়

    লিখিত বিশ্লিষ্টরূপ গণিতের অআকখময়

    হয় না, সে-সব ক্ষেত্রে উপযুক্ত গণিতশাস্ত্রের

    নির্যাস দর্শনটুকু প্রয়োগ করেই বিশ্লেষণ

    করা একমাত্র পথ, গণিতশাস্ত্রীয় দর্শনের

    বহির্ভূত অতিরিক্ত দর্শন সম্ভবপর নয়।

    সেহেতু ঈশ্বরী দ্যাখো গণিতের ইউনিট

    পাউণ্ড সেকেণ্ড ফুট থেমে থাকে চুপে

    এদের নিয়মাবদ্ধ সততা ও অসততা মনতস্ত্বে বর্তমান ইউনিটরূপে

    আলোকিত করে রাখে বিশ্বের ঘটনাবলী চিন্ত্যনীয় বিষয়গুলিকে

    আগামীর দিকে।

    পোল্যাণ্ডের কবি উইসলাভা সিমবোরস্কা, যিনি ১৯৬৬ সালে কবিতায় গণিত ও জৈবজীবনের রহস্যকে একীভূত করার জন্য নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন, তাঁর ‘পাই’ শিরোনামের বিখ্যাত কবিতাটি পড়লে বোঝা যাবে, যে-কবিরা গণিতকে ভালোবাসেন তাঁদের কবিতা কীভাবে রূপায়িত হয়েছে। আমি ইংরেজি অনুবাদটিই এখানে তুলে দিচ্ছি :-

    The admirable number pi

    three point one four one.

    All the following digits are also initial,

    five nine two because it never ends.

    It can not be comprehended six five three five at a glance,

    eight nine by calculation,

    seven nine or imagination,

    not even three two three eight by wit, that is, by comparison,

    four six to anything else

    two six four three in the world.

    The longest snake on earth calls it quits at about forty feet.

    Likewise, snakes of myth and legend, though they may hold

    out a bit longer.

    The pageant of digits comprising the number pi

    does not stop at the page’s edge.

    It goes on across the table, through the air,

    over a wall, a leaf, a bird’s nest, clouds, straight into the sky,

    through all the bottomless, bloated heavens.

    Oh how brief — a mouse tail, a pigtail — is the tail of the comet !

    How feeble the star’s ray, bent by bumping up against space !

    While here we have two three fifteen three hundred nineteen

    my phone number your shirt size the year

    nineteen hundred and seventy-three the sixth floor

    the number of inhabitants the sixty five cents

    hip measurement two fingers a charade, a code,

    in which we find hail to thee blithe spirit, bird thou never

    were

    alongside ladies and gentlemen, no cause for alarm,

    as well as heaven and earth shall pass away,

    but not the number pi, oh no, nothing doing,

    it keeps right on with its rather remarkable five,

    in uncommonly five eight,

    its far from final seven,

    nudging, always nudging a sluggish eternity

    to continue.

    গণিতের সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা ইউরোপ আমেরিকায় বহুকাল যাবত লেখা হচ্ছে। যেমন মারিয়ান মুর-এর ‘দি আইকোস্যাসফিয়ার’, কার্ল স্যাণ্ডবার্গের ‘অ্যারিথম্যাটিক’, ওয়ালেস স্টিভেন্সের ‘ল্যাণ্ডস্কেপ ফাইভ’, ভ্যাচেল লিন্ডসের ‘ইউক্লিড’ ইত্যাদি।

    আল মাহমুদ যথার্থই বলেছিলেন, “বিনয় অগোছালো একজন কবি আর আমি খুব গোছানো কবি”, তিনি আশ্রয় নিয়েছেন ধর্মে, যখন কিনা বিনয় মজুমদার ধর্মকে ছোঁয়াচে-রোগের মতো পরিহার করে গণিতের আশ্রয় নিয়েছেন, এবং গণিত যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের মতন বিনয় মজুমদার একজন বেপরোয়া কবি। বিনয়ের এই গাণিতিক কবিতার মতো আল মাহমুদ কোনোদিন রহস্যময় কবিতা লেখেননি, লেখা সম্ভব ছিল না তাঁর শেষ পর্যায়ের মৌলবাদী জীবন পরিসরে । বিনয় মজুমদার লিখিত একটি গণিতাশ্রিত গান :-

    একটি গান

    X = 0

    এবং Y = 0

    বা X = 0 = Y

    বা X = Y

    শূন্য 0 থেকে প্রাণী X ও Y সৃষ্টি হলো

    এভাবে বিশ্ব সৃষ্টি শুরু হয়েছিল।

    এবং একটি গাণিতিক কবিতা :-

    X, Y ও Z

    দুটো ভ্যারিয়েবল X ও Y

    X ও Y থেকে তৃতীয় একটি ভ্যারিয়েবল বানাতে চাই

    আমরা। তৃতীয় ভ্যারিয়েবল ‘Z’ সহজেই বানানো যায়

    ক্যালকুলাসের দ্বারা।

    একমাত্র ঐ ক্যালকুলাসের জন্যই ময়ূরীর সন্তান আরেকটি

    ময়ূরীই হয় — ডিম থেকে ময়ূর হয়, তারপরে

    ‘Z’ হয়। Y আর X

    Y ইজ আ ফাংশন অফ X

    ঠিক ডিমটাও হয় সেইরকম। ডিমের ভিতরে

    ‘Y’- ও আছে ‘X’ -ও আছে। সুতরাং ‘Z’ সহজেই

    হয় Y নতুবা X -এর মতন হয়ে। ময়ূরীর ডিম

    তার ভিতরে ময়ূরীও আছে ময়ূরও আছে।

    সুতরাং ডেরিভেটিভ হয় ময়ূর হবে নয়তো ময়ূরী হবে।

    বিনয় লিখেছেন, এবং এখানে সত্য কথাটার ওপর আমি জোর দিতে চাই :-

    ক্যালকুলাসের এক সত্য আমি লিপিবদ্ধ করি।

    যে-কোনো ফাংকশানের এনেথ ডেরিভেটিভে এন

    সমান বিয়োগ এক বসিয়ে দিলেই

    সেই ফাংকশানটির ফার্স্ট ইন্টিগ্রেশনের ফল পাওয়া যায়।

    বিনয় মজুমদারের চিন্তার গাণিতিক ব্যাপ্তি, ১৪১৩ সালে ‘অউম’ পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকার যা বলেছিলেন, তা থেকে স্পষ্ট হবে, “তোমরা মহাগ্রন্হ শুনেছ কি ? পড়েছ কি ? জানো কি ? পৃথিবীর যত বই আছে, সব বই মিলে আসলে একখানি বই। তারই নাম মহাগ্রন্হ। এই মহাগ্রন্হ নিজের প্রয়োজনে বাড়ে। ঠিক আমগাছের মতো বাড়ে মহাগ্রন্হের শাখা-প্রশাখা। মহাগ্রন্হ এখনই বেড়ে যাচ্ছে, এই কলমের মুখ দিয়ে এই মুহূর্তে মহাগ্রন্হ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান পাঠক যা পড়তে পড়তে টের পাবেন। এবং এই যে পৃথিবীর যেখানে যত লোকই, এখন যারা লিখছে — সবার হাত দিয়েই মহাগ্রন্হ বেড়ে চলেছে। রসায়নশাস্ত্র, উড়োজাহাজ বানাবার বিদ্যা, লোকেদের লেখা চিঠি, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা — এইরূপ অসংখ্য বিষয়ে বর্তমান মুহূর্তে লেখা হচ্ছে, এ সবগুলিই একখানি মহাগ্রন্হের বৃদ্ধিমাত্র। যেমন আমগাছের ডাল একসঙ্গে অনেক গজায় এবং বাড়ে, তেমনি মহাগ্রন্হ একসঙ্গে অনেক গজায় এবং বাড়ে।

    ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কবিতায় বিনয় এই একই গাণিতিক ব্যাপ্তি লক্ষ্য করেছেন দর্শনে। তিনি বলেছেন :-

    দর্শনের জগতেও নানা পরিবার আছে, অগণন পরিবার আছে

    সে-সকল পরিবারে — আলাদা যে কোনো পরিবারে সবার চেহারা

    চরিত্র ইত্যাদি প্রায় একরকমের হয়, তাই এত পরিবার হয়

    এমন পরিবারের কারো সাথে কথা বলে নিতে গিয়ে যদি তাকে

    পাওয়া নাই যায় তবে সেই পরিবারভূক্ত — একই পরিবারভূক্ত কারো

    অন্য কারো কাছে সেই কথা বলে আসা যায় একই আলোচনা করা যায়;

    তাতে খুব অসুবিধা হয় না, হয়তো বেশি সুবিধাও হয়ে যেতে পারে।

    ‘লোক’ পত্রিকার জন্য ২০০১ সালে শামীমুল হক শামীম বিনয় মজুমদারের যে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, তাতে ছন্দ সম্পর্কে এরকম প্রশ্নোত্তর হয়েছিল :

    প্রশ্ন : আপনি তো পয়ারেই কবিতা লিখলেন সারা জীবন। পয়ারেই কি আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

    বিনয় : এখন আর পয়ারে লিখি না তো। হ্যাঁ, অধিকাংশই, সেই ১৯৬০ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯৫ পর্যন্ত পয়ারেই লিখে গেছি। একটানা। তবে আমার পয়ারে তফাত আছে, অন্য পয়ারের মতো না। তফাতটা আমি বলছি ; শোনো, এটা হচ্ছে সংস্কৃত পয়ার, ছন্দিত সংস্কৃত ছন্দ আসলে। আর পয়ার ছন্দ বললাম দুটো। কিন্তু কর্কশ ছন্দ ছিল। সেটা মন্দাক্রান্তা ছন্দ। ওই মন্দাক্রান্তা ছন্দটা হচ্ছে মেঘদূতের ছন্দ। ছন্দটাকে ভেঙে আমি এমন বানালাম যে, পয়ার ছন্দটা খুব মিষ্ট হয়ে গেল। পয়ার ছন্দটাকে আমি মিষ্ট বানালাম নানান কাণ্ড করে। ‘আমার ছন্দ’ বলে একটি প্রবন্ধ লিখেছি আমি। সম্পাদক রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় তার পত্রিকায় ছাপিয়েছে।

    প্রশ্ন : পরে সেটা বই হয়ে বেরিয়েছে।

    বিনয় : কোন বইতে যেন ?

    প্রশ্ন : ‘ঈশ্বরীর স্বরচিত নিবন্ধ ও অন্যান্য’ বইতে।

    বিনয় : হ্যাঁ, প্রতিভাস থেকে বেরিয়েছে। সেই বইতে ‘আমার ছন্দ’ প্রবন্ধটি আছে। ‘আমার ছন্দ’ প্রবন্ধে পয়ার ছন্দে কীভাবে লিখেছি, পয়ার ছন্দটাকে আমি কীভাবে নিজস্ব পদ্ধতিতে নিয়ে এসেছি সেটা বিশদভাবে লিখেছি, খুবই বিশদভাবে লিখেছি। গাণিতিক ছবি-টবি দিয়ে খুবই সুন্দরভাবে লিখেছি। তারপরে পয়ারটা খুব মিষ্ট ছন্দ হয়ে গেল। এ জন্য পয়ারেই, যেহেতু আমি পয়ারেই ওইরকমের মিষ্ট পয়ার লেখা আবিষ্কার করলাম ; সেই হেতু ঠিক করলাম যে আমি এর পরে শুধু পয়ারেই লিখব, আর কোনও ছন্দে নয়।

    ‘ঈশ্বরীর স্বরচিত নিবন্ধ’ বইটিতে বিনয় মজুমদার লিখেছেন, “রূপ থেকে অরূপে আসা, আবার অরূপ থেকে রূপে ফিরে যাওয়া, রূপের সহিত অরূপের পারস্পরিক সম্পর্কে — এ সকল বিষয় অত্যন্ত মূল্যবান। গণিতশাস্ত্রেও ঠিক এই। একই ব্যাপার ঘটে। কোনো রূপের নির্যাসরূপে থিওরেম বা ফর্মুলা তৈরি করা হয়। অতঃপর সেই থিওরেম বা ফর্মুলা থেকে যত খুশি রূপ ফিরে পাওয়া যায়, যত খুশি রূপের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়। এই অর্থে –’এই করেছ ভালো,নিঠুর, এই করেছ ভালো…’ কবিতাটি একটি ফর্মুলা — জীবন ফর্মুলা। ”

    বিনয় মজুমদার রবীন্দ্রনাথের এই গানটিকে ফর্মুলা বলায়, অনুমান করা যায়, হয়তো, তিনি নিজের জীবনের ক্ষেত্রেই এই ফর্মুলাটিকে রূপায়িত হতে দেখলেন, যেমনটা রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ নিজেদের জীবনের ক্ষেত্রে দেখেছিলেন।

    দুই

    উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ব্রিটিশ সরকার, নিজেদের নিয়ন্ত্রণ তদানীন্তন বর্মায়, বর্তমানে মিয়ানমারে, প্রসারণ ঘটালে, নিজেদের সঙ্গে বহু বঙ্গভাষীকে টেনে নিয়ে যায়, প্রধানত সরকারি চাকরিতে ইংরেজির ব্যবহারে দক্ষ ঔপনিবেশিক শিক্ষায় সড়গড় কেরানি এবং জঙ্গলগুলো থেকে সেগুন ও অন্যান্য কাঠ কেটে সেগুলো রপ্তানির কাজে লাগাবার জন্য, স্বাস্হ্যবান চাষিদের তুলে নিয়ে যায়, যারা কালক্রমে বন্দরশহর রেঙ্গুন বা য়াঙ্গন,এবং প্রাকৃতিক জঙ্গলে ঘেরা মান্দালয়ে বসতি স্হাপন করে। সেসময়ে নিন্মবর্ণের চাষিদের নমঃশুদ্র বলা হতো না, বলা হতো চণ্ডাল, উচ্চবর্ণের বাঙালিরা যাদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতো, তাঁরা ছিলেন চতুর্বর্ণের বাইরে একটি অস্পৃশ্য বর্ণ। তখনকার পূর্ববঙ্গে চণ্ডাল বিদ্রোহের চাপে ১৯০১ এর আদমশুমারিতে ব্রিটিশ সরকার চণ্ডাল বর্গের পরিবারদের নমঃশুদ্র হিসাবে চিহ্ণিত করার হুকুম জারি করেছিল। বিনয় মজুমদারের বাবা ব্রিটিশ ভারতের পি ডাবলিউ ডিতে চাকরি করতেন এবং সেই সূত্রে মিয়ানমারে পোস্টেড ছিলেন। বিনয় মজুমদারের বয়স যখন সাড়ে সাত বছর তখন তাঁরা মিয়ানমার ত্যাগ করে স্বদেশে ফিরতে বাধ্য হন।

    পাঠক নিশ্চয়ই ভাবছেন যে বিনয় মজুমদারের জীবন ও সাহিত্যে অবদান আলোচনা করতে বসে চণ্ডাল ও নমঃশুদ্রের প্রসঙ্গ কেন তুলছি। তার কারণ দুটি। প্রথম হলো এই যে ইরেজরা মিয়ানমারের জঙ্গলের গাছকাটার জন্য এবং ধান চাষের জন্য প্রধানত বাঙালি নমঃশুদ্রদের ও অবাঙালি অন্ত্যজদের তুলে নিয়ে গিয়েছিল, ঠিক যেভাবে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ফিজি, মরিশাস ও লাতিন আমেরিকায় ভারতীয়দের জোর করে বা ফুসলিয়ে কায়িক শ্রমের জন্য তুলে নিয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় কারণ হলো বিনয় মজুমদারের কবিতায় তাঁর চণ্ডাল বা নমঃশুদ্র হবার কথা বেশ কয়েকবার এসেছে। সম্ভবত তিনি আঁচ করেছিলেন, যে তাঁর চেয়ে কম প্রতিভাবান উচ্চবর্ণের কবিদের ওপর প্রতিষ্ঠান আলো ফেললেও তাঁকে রেখে দিয়েছে অন্ধকারে। তাঁর অসুস্হতার সংবাদ প্রচারের পরও তাঁর কবিতায় এই প্রসঙ্গটি এনেছেন তিনি, এবং রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি সম্পর্কে দুর্বলতার উৎসও হয়তো তাঁর জন্মসূত্রের এই বোধ, আমার মনে হয়, কেননা সাধনা করার পর নারদ বাল্মীকিকে ঋষি ও ব্রাহ্মণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন, যদিও বিনয় বলেছেন যে ‘বাল্মীকি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলে তাঁর একটি বিতর্কিত বইয়ের নাম ‘বাল্মীকির কবিতা’।

    সেই সময়ের মিয়ানমারে নিম্নবর্গের ভারতীয়দের বলা হতো ‘কা-লা’ অথবা ‘কা-লার’, তাদের ত্বক কৃষ্ণবর্ণের বলে। নিজের দেহত্বক সম্পর্কে সেনসিটিভ ছিলেন বিনয়, তিনি লিখেছেন, “সত্যব্রতর বাবাকে আমি দেখেছি/সত্যব্রতর বাবা-ই তখন রাজা/রাজা বলে যে দুধের মতন সাদা গায়ের রঙ তা নয়/প্রায় আমার মতনই গায়ের রঙ।” উল্লেখ্য যে বিনয় মজুমদার সম্পর্কে পশ্চিমবাংলায় যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই নিম্নবর্গের।

    বাংলাদেশের একটি পত্রিকার জন্য শামীমুল হক শামীম, অমলেন্দু বিশ্বাস, মানসী কীর্তনীয়া এবং মানসী সরকারকে ২০০১ সালে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে এই ধরণের প্রশ্নোত্তর হয়েছিল:-

    প্রশ্ন : আপনার পাণ্ডুলিপিখানা এখানে ছাপানোর ব্যবস্হা না করে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের মিউজিয়ামে পাঠানোর উদ্দেশ্য কী ? এখানে কি কোনও রহস্য আছে ? কোনও গোপন ব্যাপার না থাকলে খুলে বলুন।

    বিনয় : মূল উদ্দেশ্য — নমঃশূদ্র। আসল কথা হচ্ছে এটা। নমঃশূদ্র সমাজে তখন কবি বলে কেউ ছিল না। আমি প্রথম

    বিনয় : কবিদের কাছ থেকে, খবরের কাগজের কাছ থেকে, পত্রিকার কাছ থেকে, প্রকাশকের কাছ থেকে, অনুবাদকের কাছ থেকে, সমস্ত। দেখলাম ভেবে ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’টাকে বাঁচাতে হয়। আমার নিজের টাকায় তো ছাপা সম্ভব না। এত বড় বই, টাকা পাব কোথায় ? আমার চাকরি তো নেই। সুতরাং পাঠিয়ে দিলাম ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। থাকুক ওদের কাছে। ওদের কাছে থাকলে তবু একটা সান্ত্বনা থাকবে যে — আছে।

    বিনয় মজুমদারের দুটি রচনা আমার চোখে পড়েছে, হয়তো আরও কয়েক জায়গায় লিখে থাকবেন মনের কথা, অভিমানের কথা, প্রথম কবিতাটিতে উচ্চবর্ণের কবিরা, যাঁরা তাঁকে সাংস্কৃতিক রাজনীতির মাধ্যমে কোনঠাশা করে নমঃশূদ্র কবি। আমার কবিতা লিখতে বহু কষ্ট করতে হয়েছে। বহু অবহেলা সইতে হয়েছে। আমার বই কেউ ছাপতো না। প্রথম ছাপল মীনাক্ষী দত্ত, তার মানে জ্যোতির্ময় দত্তর বউ অর্থাৎ বুদ্ধদেব বসুর মেয়ে — ১৯৬৮ সালে। টাকা দিয়েছে মীনাক্ষী দত্ত নিজে। অথচ ‘ফিরে এসো, চাকা’ প্রথম ছাপা হয় ১৯৬২ সালে। তারপর, সেই নমঃশূদ্র বলে তো এখনও অবহেলা সইতে হচ্ছে।

    প্রশ্ন : সেটা কি কবি-সাহিত্যিকদের কাছ থেকেও ?দিয়েছিল, তাঁদের তিনি বলছেন নাপিত, যে কবিরা শরীরের চুল কামিয়ে দ্যায় এবং চুগলি করে বেড়ায়। দ্বিতীয় কবিতাটি লেখার সময়ে তাঁর মনে যে মাইকেলের উক্তি বিঁধেছিল, তা প্রকাশ হয়ে পড়ে, নয়তো সাধারণ পাঠকরা মধুসূদনের লাইন তিনটি মনে রাখবেন না ।

    নাপিত বনাম নমঃশুদ্র

    নাপিত উপরে নাকি নমঃশুদ্র সম্প্রদায় উপরে — এ কথা

    যখন আলোচ্য হল তখন কেবলমাত্র এই বললাম

    সাহিত্য দিয়েও নয়, গোপাল ভাঁড়ের গল্প দিয়ে

    নয়, রাজনীতি দিয়ে ভাবো। কতজন মন্ত্রী হয়েছে এ

    নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ে — তাই দিয়ে ভাবো।

    নাপিতদের কেউ মন্ত্রী হতে পারেনি তো আর

    বহু নমঃশুদ্র মন্ত্রী হয়েছে তো এ যাবৎ গুনে গুনে দ্যাখো।

    এই রাজনীতি দিয়ে বোঝা যায় নমঃশুদ্র সম্প্রদায় নাপিতের উপরেই ঠিক।

    ( ছোটো ছোটো গদ্য ও পদ্য [ ২০০৭ ] বই থেকে )

    সত্যব্রত ও আমি

    কবি মধুসূদন দত্তের কবিতা :

    ‘চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে।

    কিন্তু নহি গঞ্জি তেমা, গুরুজন তুমি

    পিতৃতুল্য, ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে…’

    মধুসূদন দত্ত এই কবিতা লেখার শ-খানেক বছর পরে

    মৈমনসিংহের রাজা সত্যব্রত চৌধুরী এবং চণ্ডাল আমি

    এক ঘরের ভিতরে দুই বছর ছিলাম — ইডেন হিন্দু হোস্টেলে।

    এইসব আমি ভাবি এবং অবাক হয়ে যাই।

    সত্যব্রত ব্রেকফাস্ট খায় FIRPO হোটেলে।

    এবং বর্তমানে ৭২ বছর বয়সে চা খাই তা সিনেমায়

    তুলে নিয়ে গেছে ঢাকার মুসলমানরা। আমি

    FIRPO রেস্তোঁরায় একবারই ব্রেকফাস্ট খেয়েছিলাম

    সত্যব্রতর সঙ্গে।

    ( ছোটো ছোটো গদ্য ও পদ্য [২০০৭ ] বই থেকে )

    বিনয় যখন প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তেন তখন সত্যব্রত চৌধুরী নামে তাঁর এক সহপাঠী ছিল। সত্যব্রতর বাবা ছিলেম ময়মনসিংহের জমিদার। সত্যব্রতর দাদা শ্রীপতি চৌধুরী ছিলেন সিনেমার হিরো। কবি বিমল চন্দ্র ঘোষ তখন সিনেমার গান লিখতেন। সত্যব্রত চৌধুরী বিনয়কে বিমলচন্দ্র ঘোষের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দ্যান। বিমলচন্দ্র ঘোষ, বিনয় জানিয়েছেন, থাকতেন যদু ভট্টাচার্য লেনে এবং শীত গ্রীষ্ম যাই হোক, লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকতেন। পাশে একটা বিরাট আকারের অ্যাশট্রে। তাতে অজস্র ক্যাপস্ট্যান সিগারেটের টুকরো। উনি বিনয়কে বলেছিলেন, তোমার কবিতা আমাকে দেখাবে তো। তখন প্রত্যেক রবিবার বিনয় যেতেন বিমলচন্দ্র ঘোষের বাড়ি। বিমলচন্দ্র ঘোষ কয়েকটা কবিতা প্রকাশ করেছিলেন ‘বারোমাস’ পত্রিকায়। বিমলচন্দ্র ঘোষের আগে রমাপদ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন বিনয়। কবিতার খাতা দিয়ে এসেছিলেন। রমাপদ চৌধুরী তখন ‘ইদানিং’ নামে একটা পত্রিকা বার করতেন। রমাপদ চৌধুরী কয়েকদিন খাতাটা রেখে বিনয়কে ফেরত দিয়ে বলেছিলেন, তুমি লিখে যাও, লিখে যাও।

    বন্ধু মনোজ বিশ্বাসকে বিনয় মজুমদার একবার বলেছিলেন, “জানিস, মজুমদার পদবিটা নবাব-বাদশার কাছ থেকে পাওয়া যেতো। আমার মনে হয় ওরা যদি বুদ্ধি করে মজুমদার না দিয়ে, মজুতদার দিতো, তাহলে খুব মানানসই হতো — বিনয় মজুতদার। কি রে, মজুতদার দিলে ভালো হতো না ? দেখ না, কতো যন্ত্রণা, কষ্ট, নিঃসঙ্গতা, ব্যথা সব একটা খাঁচার মধ্যে মজুত করে বসে আছি !”

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপানিরা মিয়ানমার আক্রমণ করলে আরও বহু বাঙালি পরিবারের সঙ্গে বিনয় মজুমদারের বাবা বিপিনবিহারি মজুমদার ( বিনয়ের মায়ের নাম বিনোদিনী, ঠাকুরনগরের শিমুলপুর গ্রামে তাঁদের বাড়িটির নাম ‘বিনোদিনী কুঠি’ ) ছয় ছেলে-মেয়ে নিয়ে ফিরে এসে বর্তমান বাংলাদেশে ঢাকা ডিভিশনের গোপালগঞ্জ উপজেলার ( সে সময়ের ফরিদপুর জেলা ) বৌলতলিতে তাঁদের আদি নিবাসে বসবাস আরম্ভ করেন। বিনয়ের ঠাকুর্দার নাম নিমচাঁদ। বিনয়ের বাবা মারা গেছেন ৯৩ বছর বয়সে, ১৯৮৪ সালের ৪ঠা জুলাই। তাঁর ছয় মাস আগে মা মারা যান।

    বেশির ভাগ বাঙালি যুদ্ধের সময়ে মিয়ানমার থেকে পায়ে হেঁটে বর্তমান বাংলাদেশে ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে পৌঁছে ছিলেন। বিপিনবিহারি মজুমদারও ছেলে-মেয়েদের নিয়ে পায়ে হেঁটে নিজেদের গ্রামে পৌঁছেছিলেন। বাংলাদেশের উপরোক্ত পত্রিকায় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের বিনয় বলেছিলেন যে, “পাহাড় দিয়ে আমি হেঁটেছি যুদ্ধের সময়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে আমি নাগা খাসিয়া পাহাড়ের ওপর দিয়ে হেঁটে চলে ফিরেছি।” অতো দীর্ঘ পথ সাড়ে সাত বছরের বালকের পক্ষে পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা সম্ভব ছিল না। একজন নাগা শ্রমিকের পিঠের ঝুড়িতে বসে বিনয়কে অনেকটা পথ পেরোতে হয়েছিল। তার স্মৃতিতে তিনি এই কবিতাটি লিখেছিলেন :-

    একটি নাগার কথা

    একটি নাগার কথা মনে এল কেন যে হঠাৎ।

    চা বাগানে মহিলারা যেমন ঝুড়িটি পরে, ফিতে

    কপালে ঝুলিয়ে নিয়ে, তেমনি একটি ঝুড়ি পরে

    সেই ঝুড়িটির ‘পরে আমাকে বসিয়ে সেই নাগা

    হেঁটে হেঁটে আসছিল উনিশ’শ বিয়াল্লিশ সালে।

    তার মানে নাগাটির পিঠে ঝুড়ি, ঝুড়ির উপরে আমি বসা,

    ঝুড়িটি তো ঝুলছিল নাগার

    কপাল থেকে ফিতের সাহায্যে তাই মনে পড়ে গেল।

    এভাবে আমাকে বয়ে আনছিল উনিশ’শ বিয়াল্লিশ সালে।

    ( শিমুলপুরে লেখা কবিতা – ২০০৫ )

    বিনয়ের ভাই-বোনদের সম্পর্কে বিশদ তথ্য সংগ্রহ করতে পারিনি, তাঁর এক প্রয়াত অগ্রজ অনিল মজুমদার-এর তথ্য ছাড়া, যিনি মধ্যমগ্রামের হৃদয়পুরে বসবাস করতেন, এবং সম্ভবত মধ্যবয়সে অপ্রকৃতিস্হতায়, অর্থাৎ স্কিৎসোফ্রেনিয়ায়, আক্রান্ত হন। মেজো ভাই সুনীল কোথায় থাকতেন জানি না। দূর সম্পর্কের অথবা পরিচিত এক দিদি হাবড়ায় থাকতেন, এবং বিনয় মজুমদারের মৃত্যুর পর দিদির ছেলে উত্তম বিশ্বাস বিনয় মজুমদারের রচনাগুলো প্রকাশের দিকে খেয়াল রেখেছেন। পারিবারিক তথ্য প্রয়োজন এই জন্য যে মধ্যবয়সে তাঁদের পরিবারে অন্যান্য সদস্য ও আগের প্রজন্মের সদস্যরা অপ্রকৃতিস্হতা্য ভুগেছিলেন কিনা, কেননা আমার এক কাকা এবং মেজ জ্যাঠা মধ্যবয়সে অপ্রকৃতিস্হতায় আক্রান্ত হন, আমার ঠাকুর্দার ছোটো ভাইও মধ্যবয়সে অপ্রকৃতিস্হতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।

    অপ্রকৃতিস্হ বলতে আমি পাগল বলছি না, অসংলগ্ন কথাবার্তা বা আচরণের কথা বলছি, স্কিৎসোফ্রেনিয়ার কথা বলছি। মস্তিষ্কের রোগ আর জিনগত রোগের মধ্যে পার্থক্য আছে। জিনগত রোগ সারাবার জন্য জিন এডিটিং অথবা জিন থেরাপি করতে হয়, যা আমাদের দেশে এখনও এসে পৌঁছোয়নি। তা সম্ভব না হলে পরিবারের সদস্যদের মাঝে বসবাস থেরাপির কাজ করে। স্কিৎসোফ্রেনিয়া মূলত একটি জিনগত রোগ, এই জিনগত রোগ হোমো স্যাপিয়েনদের দেহে প্রবেশ করেছিল বহুকাল আগে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে,, যখন তাদের সঙ্গে নেয়ানডারথালদের সম্পর্ক ঘটে। বাংলাভাষায়, আমাদের দুর্ভাগ্য যে অস্বাভাবিক আচরণ দেখলেই তাকে পাগল বা ক্ষ্যাপা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। ‘পাগল’ ছাড়া আর কোনো শব্দই নেই।

    স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত বিদেশি কবি ও শিল্পীদের কথা আমরা জানি, যেমন আঁতোয়াঁ আর্তো, কনস্ট্যানটিন বাতিয়ুশনভ, রিচার্ড ব্রটিগান, ভিক্টর হিউগোর মেয়ে আদেলে হিউগো, ফিনল্যাণ্ডের কবি ইউনো কাইলাস, রাশিয়ার ব্যালে নর্তক ভাসলাভ নিজিন্সকি, লর্ড বায়রন, ডিলান টমাস, পাবলো পিকাসো, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত গণিতজ্ঞ জন ন্যাশ যাঁর জীবনকাহিনি নিয়ে ‘এ বিউটিফুল মাইন্ড’ নামের একটি ফিল্ম হয়েছিল। আর বলা বাহুল্য ভ্যান গগ। মধ্যবয়স থেকে এই বিকলনের কারণে পিকাসো অতিযৌনতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।

    পশ্চিমবাংলায় ঋত্বিক ঘটক, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, রামকিঙ্কর বেইজ মানসিক বিকলনে আক্রান্ত হয়েছিলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও চিকিৎসা করিয়েছেন লুম্বিনি পার্ক মানসিক চিকিৎসালয়ে। তাঁরা স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন না। তারাপীঠের বামাক্ষ্যাপার আচরণকে আমরা মনে করি সাধকের স্বাভাবিক দিনানুদৈনিক ব্যাপার, দাহরত শবের মাংসভক্ষণকে কেউই মস্তিষ্কবিকৃতি বলে মনে করেননি। রামপ্রসাদ সেন গঙ্গায় গলা পর্যন্ত জলে দাঁড়িয়ে শ্যামাসঙ্গীত গাইতেন, হিসেবের খাতায় শ্যামাসঙ্গীত লিখতেন, আমরা কখনও ভাবিনি যে তাঁকে ইলেকট্রিক শক দিতে হবে। তার কারণ প্রাগাধুনিক কালখণ্ডে সাধকদের সেই কাজগুলোকে আমরা স্বাভাবিক মনে করতুম। অঘোরী এবং তান্ত্রিকদেরও বঙ্গসমাজে পাগল বলা হতো না। বিনয় মজুমদারকে বার বার পাগল বলা হয়েছে বলে তিনি অপমানিত, আহত ও বিরক্ত বোধ করতেন।

    বিনয় মজুমদারদের পারিবারিক পদবি ছিল মৃধা, এবং বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় তাঁদের গ্রামের বাড়িকে গ্রামবাসীরা মৃধাবাড়ি নামে চিনতো। ব্রিটিশ পি ডাবলিউ ডিতে চাকরি পাবার সময়ে বিনয়ের বাবা মৃধা পদবি ত্যাগ করে নবাবি আমলে পাওয়া মজুমদার পদবি নিয়েছিলেন। অবিভক্ত বাংলায় ফিরে ১৯৪২ সালে বিনয় মজুমদার গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলতলির তারাইল পাঠশালায় ভর্তি হন। ১৯৪৪ সালে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম হবার পর তাঁকে ভর্তি করা হয় ফরিদপুর হাই ইংলিশ স্কুলে। তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল স্কুলের ম্যাগাজিনে। কিন্তু বৌলতলিতে বেশিদিন বসবাস করা সম্ভব হয়নি। সুরাবর্দির ডায়রেক্ট অ্যাকশান ডের আহ্বানে হিন্দু ও মুসমান সম্প্রদায়ের মাঝে বহুকালের যে সম্পর্ক ছিল তা ভেঙে পড়া আরম্ভ হয়, ক্রমশ বৌলতলিতেও হিন্দুদের ওপর অত্যাচার আরম্ভ হলে অন্যান্য গ্রামবাসীদের সঙ্গে ১৯৪৮ সালে বিপিনবিহারী মজুমদারও ছেলে-মেয়েদের নিয়ে হিন্দু উদ্বাস্তুদের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন, কলকাতার উপকন্ঠে ঠাকুরনগরের শিমুলতলা গ্রামে চাষের জমিজমা কিনে বসবাস আরম্ভ করেন।

    ভারতে চলে এসে বিপিনবিহারী মজুমদার বুদ্ধিমানের কাজ করেছিলেন। গত বছরে, মানে ২০১৬ সালে, আমরা দেখেছি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের পরিবারদের ওপর আক্রমণ হয়েছিল, আর দুর্গাপুজো-কালীপুজোর সময়ে তাঁদের উৎসব ভণ্ডুল করে দিয়ে মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও সেখানকার নামকরা কবি-লেখকরা সরকারি খুদকুঁড়ো পাবার আশায় মুখ খোলেননি। দেশভাগের আগে পূর্ববঙ্গের উচ্চবর্গের হিন্দু কমিউনিস্ট নেতারা দেশভাগ সমর্থন করেছিলেন। দেশভাগ হতেই সবচেয়ে আগে পালিয়ে আসেন তাঁরা, সেখানকার নিম্নবর্ণ হিন্দুদের দিশেহারা করে দিয়ে, আর পশ্চিমবঙ্গে এসে সাম্যবাদের নামে গদি দখল করে বসেন। নমঃশুদ্র জনগণকে পূর্ব পাকিস্তানে ধরে রাখার জন্য জিন্নাহ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে মন্ত্রীত্ব দিয়েছিলেন। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের আশ্বাসে বেশির ভাগ নিম্নবর্ণের পরিবার থেকে গিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, যিনি নিজেও নমঃশুদ্র ছিলেন, ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত করাচিতে বসবাস করে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের ঘটনা সহ্য করতে না পেরে ভারতে পালিয়ে আসেন, এবং লিয়াকত আলি খানকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।

    বিনয় মজুমদার জন্মেছিলেন মিয়ানমারের মেকটিলা অঞ্চলের তেডো শহরে ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪, অর্থাৎ, দেশভাগজনিত সাম্প্রদায়িক বিভাজনে বৌলতলীর দাঙ্গায় ভিটা ছাড়ার সময়ে তাঁর বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। মিয়ানমার ছাড়ার সময়ে তাঁর বয়স ছিল সাড়ে সাত বছর। যুদ্ধ ও দাঙ্গায় আক্রান্ত বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে দেশ থেকে দেশান্তর ও স্হান থেকে স্হানান্তর, এই বিপর্যস্ত জীবন কাটানোর দুঃসহ ঘটনাবলী বিনয় মজুমদারের শৈশব-কৈশোরের চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলে থাকবে। স্কিৎসোফ্রেনিয়ার দুটি উৎসের কথা বলেছেন মনোবিদরা, পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলীর প্রভাবে স্কিৎসিফ্রেনিয়া জিনের প্রাণবন্ত হয়ে ওঠা, এবং বংশপরম্পরায় পাওয়া জিন যা যৌবনে দেখা দেয়। মিয়ানমার থেকে পলায়ন, দেশভাগজনিত দাঙ্গার প্রভাব কিশোর বিনয়ের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেছিল নিঃসন্দেহে, এবং আমার মনে হয়, বংশের জিনগত প্রভাবও ছিল, কেননা বিনয়ের মৃত্যুর আগের দিন তাঁর মধ্যমগ্রাম নিবাসী দাদা অনিলবরণ মজুমদারকে ‘কবিতীর্থ’ সম্পাদক উৎপল ভট্টাচার্য ফোনে মৃত্যুশয্যায় বিনয়ের শারীরিক অবস্হা জানানো সত্বেও তিনি কোনো আগ্রহ দেখাননি ; বরং বিরক্ত বোধ করেন তাঁকে জানাবার জন্য।

    তিন

    ১৯৮২ সালে সমর তালুকদারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় জানিয়েছেন যে, “আমার বাবা ১৯৪৮ সালে এখানে ( শিমুলপুর ) এসে প্রায় এগারো বিঘার মতন জমি কিনে এই ছোট্ট বাড়িটা তেরি করেন। তখন এক বিঘা জমির দাম ছিল পঞ্চাশ টাকা। এখানে ঠাকুরনগর স্টেশানটি হয়েছে প্রাক্তন এম. পি. ঠাকুরবাবুর প্রচেষ্টায়। লোকও বেড়েছে অনেক। স্টেশনের কল্যাণে এখন জমির দাম কুড়ি হাজার টাকা বিঘা। এই তো, সেদিন বাবা দু’বিঘা জমি বিক্রি করে দিলেন। ”

    ১৯৪৯ সালে তাঁকে, বিনয় মজুমদারকে, কলকাতার মেট্রোপলিটান ইন্সটিটিউটের বউবাজার শাখায় ক্লাস নাইনে ভর্তি করা হয়েছিল। ১৯৫১ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে আই এস সি তে ভর্তি হন। সেই ব্যাচের ছাত্রদের মধ্যে গণিতে সর্বোচ্চ নম্বর পান। এর পর বিনয় মজুমদার শিবপুরের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ১৯৫৭ সালে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিঙে স্নাতক হন, প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ইঞ্জিনিয়ার হবার পর কিছুকাল চাকরি করেন ইনডিয়ান ইন্সটিউট অফ পাবলিক হেল্হ দপতরে, ইনডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইন্সটিউটে, অধ্যাপনা করেন ত্রিপুরা গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে, এবং ইঞ্জিয়ারের চাকরি করেন দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টে।

    কলকাতার সাহিত্যিকদের সঙ্গে যোগাযোগের অভাবের কারণে এবং কবিতা রচনায় একাগ্র হতে চাইছিলেন বলে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কলকাতা ফিরে আসেন। অবশ্য চাকুরিস্হলে তাঁর সহকর্মীরা তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন না, সেটাও একটা কারণ। মারুফ হোসেনকে ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন, “১৯৫৭ সালে আমি ছাত্রাবস্হায় কিছু যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছিলাম। সে সময়ে আমার সহপাঠী ও শিক্ষকেরা যে ব্যবহার করলেন আমার সঙ্গে তা ভোলবার নয়। তারপর চাকরি করলাম সেখানেও সহকর্মীরা আমার সঙ্গে যা ব্যবহার করলেন চাকরি ছেড়ে দিলাম। তখন মনে হল জীবনে একবার মাছের মতো শ্বাস নিতে জলের ওপরে উঠেছিলাম ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে। ইঞ্জিনিয়ারিঙে রেকর্ডস মার্কস পেয়ে। ”

    তারপর থেকে তিনি নিজের জীবনকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালিত করেছেন, তাঁর কবিতার স্পেকট্রাম বিশাল হয়ে ওঠে, গণিতবিদ রামানুজম এবং সুফি সন্তের চরিত্রের মিশেলে যে ধরণের প্রতিস্ব গড়ে উঠতে পারে, বিনয় পেয়েছিলেন সেরকমই প্রতিস্ব। এই বিশাল পরিধিতে ধরে রাখা জ্ঞান ও কবিত্বের সময়ানুগ বাঁকবদলগুলো তাঁকে বাংলা কবিতার বোধিবৃক্ষ করে তুলেছে। বলা যায় যে জীবনানন্দের পর তিনি বাংলা কবিতার প্রধান বাঁকবদলকারী কবি। বিনয় জীবনানন্দের মতন কবিতার একটি জনারেই আটক থাকেননি। চারটি বিভিন্ন সাব-জনারে ( sub-genre ) কাজ করেছেন, এবং তৃতীয়টি দুঃসাহসিক কাজ, বলা যায় মধ্যবিত্ত ডিসকোর্সকে ফাটিয়ে চৌচির করে দিয়েছেন ‘বাল্মীকির কবিতা’ নামের কাব্যগ্রন্হের সাব-জনারে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ কাব্যগ্রন্হের জনার থেকে বেরিয়ে যেতে চাননি, সারা জীবন তাতেই নিজেকে আটক রেখেছিলেন।

    বিনয় মজুমদার প্রায় প্রতিটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে তিনি চাকরি ছেড়ে কবিতা লেখা আরম্ভ করেন বন্ধুদের কথায় — শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, জ্যোতির্ময় দত্ত, দীপক মজুমদার, শরৎ মুখোপাধ্যায়, শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখের কথায়। অথচ বিনয় যখন ঠাকুরনগরে নিষ্কপর্দক অবস্হায় জীবন কাটাচ্ছেন তখন তাঁর বন্ধুরা প্রতিষ্ঠিত, এবং ইচ্ছা করলেই বিনয়কে দিয়ে কোথাও অর্থকরী লেখালিখির ব্যবস্হা করে দিতে পারতেন। ২০০১ সালে শামীমুল হক শামীমকে বিনয় বলেছিলেন, “চাকরি না করে আমি ছিলামও বটে। ওরা চাঁদা তোলা শুরু করল বটে এবং দিয়েও ছিল বছরখানেক, বছর দেড়েক। তারপরে কিন্তু চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দিল। আমি অত্যন্ত, অতিশয় কষ্টে, দিন কাটিয়েছি তারপর। ১৯৬৪ সালের পরে ১৯৭০ সালে আমি আমার বাবার কাছে এখানে চলে আসি। ছয় বছর আমি অত্যন্ত টাকার অভাবে ভুগেছি। টাকার অভাব দেখে বাবা আমাকে ১০০ টাকা করে দিত। আমি প্রতি মাসে পয়লা তারিখে শিমুলপুর এসে টাকা নিয়ে চলে যেতাম কলকাতায়। কলকাতায় ঘর ভাড়া করে ছিলাম।”

    বিনয় মজুমদার সম্পর্কে তাঁর সমসাময়িক কবিদের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গী ‘কবিতীর্থ’ পত্রিকায় প্রকাশিত সমর তালুকদারের ১৯৮২ সালের এই কটি কথা থেকে টের পাওয়া যায়, যা সমরবাবু বিনয়ের সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে লিখেছেন : “কফিহাউসের টেবিলে এক সন্ধ্যায় হঠাৎ হাঁপাতে-হাঁপাতে এসে বসলেন শ্রীঅমিতাভ দাশগুপ্ত, বসেই চিৎকার করে হাসতে শুরু করে দিলেন, সে হাসি থামতেই চায় না — আমরা যারা টেবিলে ছিলাম ভেবে নিলাম বোধহয় ক্লাবে ( খালাসিটোলায় ) প্রচুর হয়েছে। হাসি থামতে বললেন, ‘তোমরা শালারা একেবারেই অপদার্থ। কলকাতায় কী ঘটছে কিছুরই খবর রাখো না। ’ সত্তরের দশক — বড়-বড় চোখ করে ওঁর দিকে চেয়ে থাকলুম দুরুদুরু বুকে — এবার কে গেল ? কোন শ্রেণিশত্রু ! অমিতাভ বললেন, ‘বিনয়দা এ-যাত্রা বেঁচে গেলেন — গোবরা মানসিক হাসপাতালে আছেন — স্নানটা অন্তত করছেন নিয়মিত — খাওয়া দাওয়াও মন্দ করছেন না। বেশিরভাগ একা-একাই থাকেন, আর কী সব নাকি বিড়বিড় করে বলেই চলেন অনবরত। শুনেছি পাশের ঘরে এসে জুটেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। বাংলা মদের সাপলাইয়ের কোনও অভাব ছিল না। এ যেন একটা এক্সকারশান। ওখানেই ঋত্বিক শেষ করেছেন তাঁর ‘জ্বালা’ নাটক, অভিনয়ও হয়ে গেছে ওই গোবরাতেই — প্রধান ভূমিকায় বিনয় মজুমদার। ”

    পরে ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন, “আমি সাম্প্রতিক কালের এক কবির সম্পর্কে আস্হা রাখি, যিনি কবিতার জন্য যথার্থ জন্মেছেন। আমার মনে হয় এ-কালে বাংলাদেশে এতোবড় শুভবুদ্ধি সম্পন্ন কবি আর জন্মাননি। তিনি হলেন বিনয় মজুমদার।” প্রৌঢ় বয়সে বিনয়ের স্মৃতি থেকে ঋত্বিক ঘটক মুছে গিয়েছিলেন ; বিনয় বলেছিলেন, ঋত্বিকের সম্পর্কে তাঁর কিছুই মনে নেই।

    আমরা যারা সেই সময়ের অমিতাভ দাশগুপ্তকে খালাসিটোলায় মাতাল অবস্হায় উল্টোপাল্টা আচরণ করতে দেখেছি, বলতুম যে উনি হলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিলিপি। সেই সময়ে কলকাতায় মধ্যবিত্ত কমিউনিস্টদের বাংলা মদ অর্থাৎ শ্রমজীবিদের পানীয় খেয়ে বিশেষ বুদ্ধিজীবি প্রমাণ করার চল ছিল। তাছাড়া বুদ্ধদেব বসু বাঙালি লেখকদের বদলেয়ার, হেনরি মিলার, অ্যালেন গিন্সবার্গ প্রমুখের জীবন ও কাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার পর অনেকেই এই বিদেশি কবি-লেখকদের জীবনকে আত্মস্হ করার প্রয়াস করেছিলেন সেসময়ে, মদের জমঘট এবং যৌনপল্লীতে সমবেত হইচইয়ের মাধ্যমে।

    বস্তুত বিনয় মজুমদারের ‘ফিরে এসো,চাকা’ ছিল বাংলা কবিতার জগতে, আগেই বলিছি, ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণ; ওই কাব্যগ্রন্হের কবিতাগুলোর পাশে পঞ্চাশ দশকের কবিদের কাজগুলো জোলো হয়ে যাচ্ছিল, একমাত্র শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ ছাড়া। শক্তির ছন্দময় অথচ দুর্বোধ্য কবিতার তুলনায় বিনয়ের কবিতা তরুণ কবিদের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল, তার কারণ তাঁর কবিতার ক্ল্যারিটি এবং অসাধারণ রূপকল্প। ফলে বিনয়ের বিরোধিদের সংখ্যা এবং ক্ষতিকারক লবি বেড়ে উঠতে সময় লাগেনি। বিনয়ের কবিতার উচ্ছ্বসিত বিশ্লেষণ করে জ্যোতির্ময় দত্ত ‘দি স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লেখার পর বিরোধিরা আরও বেশি বিনয়-নিন্দা আরম্ভ করে দিয়েছিল। ‘দি স্টেটসম্যান’ সংবাদপত্র সেসময়ে বর্তমানকালের আনন্দবাজারের চেয়ে বেশি নজরকাড়া প্ল্যাটফর্ম ছিল। সমসাময়িকদের কার্যকলাপে বিনয়ের ক্রুদ্ধ ও অপমানিত হওয়া স্বাভাবিক ছিল, বিভিন্ন টেবিলে গিয়ে তিনি গালমন্দ করতেন। একদিন তিনি কফিহাউসের এক বেয়ারার মাথায় লাঠি মারার দরুন বেয়ারাদের অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হন আর কুড়ি দিনের জেল-হাজতবাস করতে হয়। সেসময়ে গুজব ছিল যে তাঁর সমসাময়িক কয়েকজন কবি তাঁকে উসকেছিলেন।

    কলকাতার বিরক্তিকর পরিবেশ থেকে মুক্তি পাবার জন্য বিনয় মজুমদার ১৯৬৬ সালে পায়ে হেঁটে বনগাঁ সীমান্ত পেরিয়ে চলে গেলেন পূর্ব পাকিস্তান, ফরিদপুরের নিজেদের গ্রাম তারাইলে, তখন তাঁর বত্রিশ বছর বয়স। গ্রামে গিয়ে আত্মীয় আর পরিচিত লোকজন পেয়ে গেলেন। সেখানকার যুবকেরা দিব্বি তাঁর আদর আপ্যায়ন করল। ভোরবেলা একজনকে ইংরেজি পড়াতেন, দুপুরবেলায় শেখাতেন অঙ্ক। আর রাত্রিবেলা চার-পাঁচজনকে পড়াতেন — ক খ গ ঘ থেকে শুরু করে ক্লাস নাইনের পড়া পর্যন্ত। বাকি সময়টা আড্ডা মেরে বেড়াতেন। থাকা খাওয়া আর সিগারেটের বিনিময়ে। কলকাতা ছেড়ে সেখানে বেশিদিন থাকতে ভালো লাগলো না। একদিন স্হানীয় থানায় গিয়ে জানালেন যে তিনি অনধিকার প্রবেশকারী ভারতীয় নাগরিক, বিনা পাসপোর্ট-ভিসায় পাকিস্তানে প্রবেশ করেছেন, তাঁকে যেন ভারতে ফিরে যেতে বলা না হয়, যদি দরকার হয়, তিনি মুসলমান হয়ে যেতে রাজি, তিনি মুসলমান হয়েই তাঁর গ্রামে থাকবেন যেখানে তাঁর বাবা-মা জন্মেছিলেন, তাঁকে যেন ভারতে পাঠানো না হয়।

    বিনয় জানিয়েছেন, “ঢাকা থেকে গোয়েন্দা এলো। আমাকে বলল, কবিতা লেখেন নাকি ? কাগজ দিচ্ছি, লিখুন দেখি কী কবিতা লেখেন। ফোটো তুললো আমার। সামনে, দুই পাশে, চুল দাড়িসহ, চুলদাড়ি কামিয়ে ইত্যাদি নানাভাবে ফোটোতোলা হল।” বিচারাধীন আসামি হিসাবে ছ’মাস জুডিশিয়াল কাস্টডিতে থাকার পর তাঁকে বেকসুর মুক্তি দেয়া হয়। সেই অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে বিনয় বলেছেন, “আমাদের হাজতের চেয়ে ওদের হাজত অনেক ভালো। লোকগুলো ভদ্র, খাওয়াদাওয়া ভালো। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হলো কী জানো, যত্ন করে বেশ কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে দিলে, সঙ্গে দু’পাশে দু’জন এসকর্ট, যারা আমাকে সীমান্ত অব্দি পৌঁছে দিয়েছিল। ”

    শামীমুল হক শামীম বিনয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, “হঠাৎ মুসলমান হবার আকাঙ্খা জাগল কেন ?” উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, “তখন এত কষ্টের ভিতরে চলছিল অবস্হা হিন্দুদের নির্যাতনে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যাওয়ার যোগাড়। তখন আমি পালিয়ে চলে গেলাম ফরিদপুর। বাল্যকালের বন্ধবান্ধবদের সঙ্গে দেখা। আমি বললাম মুসলমান হব। আমাকে তোমরা তোমাদের ধর্মে নিয়ে নাও। তারপর তারা বহু ভেবে বলল — তোমাকে আমরা মুসলমান করব না, তুমি হিন্দুই থাক। তোমাকে আমরা মুসলমান করতে রাজি নই। ”

    পরে, ১৯৯৮ সালে ধর্ম নিয়ে বিনয় মজুমদার এই কবিতাটি লেখেন ( ‘কবিতা বুঝিনি আমি’ কাব্যগ্রন্হের অন্তর্ভূক্ত।

    এই এক

    এই এক গুপ্ত রোগ পৃথিবীর সবার হয়েছে।

    যদিও গোপন খুব, তবুও সংবাদপত্রে মাঝে-মাঝে ছাপে —

    এসব রোগের কথা নিক্তি অনুসারে

    ছাপা হয়ে যায় দেখি। আড়াই হাজার বছর

    আগের ডাক্তার বুদ্ধ কিছু কিছু ওষুধ বলেছে–

    সে-সব ওষুধে কিন্তু মায়ামৃত সুফল ফলেনি।

    আরেক ডাক্তার ছিল হজরত মোহম্মদ, তার

    কথামতো ওঠে বসে রোগীগণ, তবু

    রোগ তো সারে না, আরো বেড়ে যায়, দেখি

    সীমান্তেও গুলিগোলা অল্প স্বল্প বিনিময় হয়।

    বিনয় মজুমদারের নিজের কলমেই পড়া যাক কবিতার বিশ্বে তাঁর প্রবেশের কথা : “কৈশোর থেকেই আমি কবিতা লিখতে শুরু করি। প্রথম কবিতা যখন লিখি তখন আমার বয়স তেরো বছর। নানা কারণে সেই ঘটনাটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। কবিতাটির বিষয়বস্তু ছিল এই : এক পালোয়ান বাজি ধরে একটি চলন্ত মোটরগাড়িকে টেনে পেছিয়ে নিয়ে এলো। এর পরেও আমি মাঝে-মাঝে কবিতা লিখতাম। কিন্তু ষোলো-সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত কী লিখেছিলাম, কবিতাগুলির দশা কী হয়েছিল কিছুই এখন আর মনে নেই। তখন কলকাতার স্কুলে পড়ি। মাস্টারমশাইরা ঘোষণা করলেন যে স্কুলের একটা ম্যাগাজিন বেরোবে। ছাত্রদের কাছে লেখা চাইলেন। আমি একটা কবিতা লিখে ফেললাম ; তার একটা পংক্তি এখনও মনে আছে — ‘ভিজে ভারি হলো বেপথু যুথীর পুষ্পসার’। মাস্টারমশাইয়ের হাতে নিয়ে দিলাম। তিনি পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। কিন্তু কী জানি কেন, শেষ পর্যন্ত সে ম্যাগাজিন আর বেরোলো না। এর পরবর্তী সময়কার কবিতা লেখার ব্যাপার একটু বিশদ ভাবেই আমার মনে আছে। স্কুল ছেড়ে কলেজে এসে ভর্তি হলাম এবং আমার কবিতা লেখার পরিমাণও কিছু বাড়লো। আমার একটি খাতা ছিল। ডবল ক্রাউন সাইজের চামড়ায় বাঁধানো, কাগজের রঙ ইঁটের রঙের মতো। খাতাটি খুব মোটা। আমার সব লেখাই এই খাতায় লিখতাম। স্কুলে কবিতা লিখতাম কচিৎ-কদাচিৎ। কিন্তু কলেজে উঠে নিয়মিত লিখতে শুরু করি। লিখতাম বেশ গোপনে-গোপনে, যাতে কেউ টের না পায়। কারণ আমি কবিতা লিখি — একথা কেউ বললে খুব লজ্জা হতো আমার। কলেজের হোস্টেলে থাকতাম। ফলে অন্যান্য আবাসিকরা শীঘ্রই জেনে ফেললো যে আমি কবিতা লিখি। আমার ঘরে দুটি সিট ছিল। আমার রুমমেটই বোধহয় ফাঁস করে দিয়েছিল খবরটা। আমাদের রান্নাঘরের দেওয়ালে একটা নোটিসবোর্ড টাঙানো ছিল। হোস্টেল কর্তৃপক্ষের নোটিসগুলি ঐ বোর্ডে আঠা দিয়ে সেঁটে লাগানো হতো। কিছু দিনের ভেতরেই ঐ নোটিশবোর্ডে আমার লেখা কবিতাও সেঁটে দিতে লাগলাম — সবগুলিরই বিষয়বস্তু হোস্টলের খাবার দাবার সম্বন্ধে ছাত্রদের অভিযোগ। সবই হোস্টেলের সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট সম্পর্কে লেখা ব্যঙ্গ কবিতা। পড়ে ছাত্ররা কিংবা সুপারিনটেনডেন্ট যে প্রশংসা করতো তা নয়। ডালে কেন ডাল প্রায় থাকেই না, কেবল জল, মাংস কেন ঘন ঘন খেতে দেওয়া হয় না — এই সবই ছিল নোটিশবোর্ডে সাঁটা কবিতার বিষয়বস্তু। কলেজে একটা দেওয়াল পত্রিকাও ছিল। খুব সুন্দর হাতের লেখায় শোভিত হয়ে পত্রিকাটি নিয়মিত বেরোতো। আমার লেখা কবিতা কিন্তু কখনও এ-দেওয়াল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। সেই সময় আমার সব কবিতায় মিল থাকতো। মিলগুলি অনায়াসে মন থেকে বেরিয়ে আসতো। তার জন্য একটুও ভাবতে হতো না। কবিতা যখন লিখতাম তখন মনে হতো আগে থাকতে মুখস্হ করা কবিতা লিখে যাচ্ছি, এতো দ্রুত গতিতে লিখতে পারতাম। এক পয়ার ভিন্ন অন্য সব ছন্দেই লিখতাম। কবিতাগুলোর বিষয়বস্তু ছিল বিচিত্র, প্রায় সবই কাল্পনিক। দু’একটা বিষয়বস্তু অবশ্য আমার এখনও মনে আছে — চিল্কা হ্রদের ধারে এক সঙ্গিনীসহ বসে বসে চারিপাশে নিসর্গকে দেখছি বা এক সঙ্গিনীসহ মোটরগাড়িতে করে খুব দ্রুত বেগে চলেছি, মনে হচ্ছে গাড়িটা পৃথিবীর এক উপগ্রহ বিশেষ বা ট্রেনে করে দৈনিক লক্ষ লক্ষ কেরানি কী ভাবে চাকুরি করতে কলকাতায় আসে ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সময়ে লেখা কবিতাগুলো খুব দীর্ঘ হতো। ছোটো কবিতা আমি প্রায় লিখতে পারতাম না। এবার একটু আগের কথা লিখে নিই। আমি যখন দশম শ্রেণিতে পড়ি, মনে হচ্ছে, তখনই সিগনেট বুক শপ নামক দোকানটি সবে খুললো। তখন দোকানের মালিক দিলীপবাবু নিজেই দোকানে বসে বই বিক্রি করতেন। কী করে যে তাঁর সঙ্গে আলাপ হলো ঠিক মনে নেই। আমি তখন দৈনিকই ঐ দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতাম। বোধ হয় বই কিনতে গিয়েই আলাপটা হয়ে থাকবে। আমি প্রায় দৈনিক একখানা করে কবিতার বই তাঁর কাছ থেকে কিনতাম। রবীন্দ্রোত্তর যুগের বাছা বাছা কবিদের বই অনেক কিনে ফেললাম, পড়েও ফেললাম সব। অথচ কোনো কারণে সেই বইগুলি মনে বিশেষ সাড়া জাগাতো না। বয়স কম বলেই হয়তো অমন হতো। যাই হোক, ইংরেজি ক্লাসিকাল কবিদের বই আমি প্রায়শই লাইব্রেরি থেকে এনে পড়তাম। সেই বয়সে তাদের কবিতা আমার ততো ভালো লাগতো না। আবার মনে হচ্ছে বয়স কম বলে অমন হতো — একথা বোধহয় ঠিক লিখিনি। কারন তখন রবীন্দ্রনাথের কাব্যগুলির মধ্যে আমার ভালো লেগেছিল ‘প্রান্তিক’ নামক ছোটো বইখানি। এখনও আমার ঐ বইখানি সবচেয়ে ভালো লাগে। বয়স বাড়ার ফলে আমার সে অল্প বয়সের ভালো লাগা পাল্টায়নি। যা হোক আমি নিজে কী লিখতাম সেইটেই এ প্রবন্ধের বিষয়বস্তু। বিষয়বস্তু লিখেই মনে পড়লো কবিতা লেখার অন্যতম প্রধান ব্যাপার হচ্ছে একটি ভালো বিষয়বস্তু মনে আসা। তখনকার বিষয়বস্তু ছিল অধিকাংশ কাল্পনিক একথা আগেই লিখেছি। শহরের দৃশ্যাবলী — পথ ঘাট মাঠ বাড়ি — এসকল আমার কবিতার বিষয়বস্তুতে আসতো না। মাঝে-মাঝে গ্রামে আসতাম। গ্রামের দৃশ্যাবলীও আমার বিষয়বস্তু হতো না। অর্থাৎ কেবল বর্ণনামূলক কবিতা আমি সেই বয়সেই লিখতে পারতাম না। এতোদিন পরে এখন কিছু কিছু লিখতে পারি। এ প্রসঙ্গে পরে আবার আসবো। ইতিমধ্যে কলেজ পালটে অন্য এক কলেজে চলে যেতে হলো। সেখানে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশুনা করতে হতো। সেখানে কলেজের পড়াশুনায় এতো বেশি সময় দিতে হতো যে অন্য কোনো বিষয়ে মনোনিবেশ করার সময় পাওয়া যেতো না। ফলে বছর দুয়েক আমার কবিতা লেখা বন্ধ থাকলো। গঙ্গার ধারে কলেজ, পাশেই বোটানিক গার্ডেন। নদীর পাড়ে বিরাট কাঠগোলা। আন্দামান থেকে জলপথে নিয়ে আসা বিশাল বিশাল সব কাঠের গুঁড়িতে নদীর পাড় ঢাকা। সেখান থেকে গঙ্গার দৃশ্য অপূর্ব। কেবল বর্ণনামূলক কবিতা আমি তখনও লিখতে শিখিনি। ফলে সেই কলেজে থাকাটা আমার কাব্যচর্চার ভিতরে বিশেষ স্হান পায়নি। সেই কলেজে ছিলাম চার বছর ছাত্রাবাসে। তার প্রথম দু’বছর কবিতা লেখার সময়ই পাইনি। শেষ দু’বছর কিছু কিছু সময় পেতাম এবং মাঝে মাঝে লিখতাম। কাপড়ে বাঁধানো রয়াল সাইজের একটা প্রকাণ্ড ডায়েরি আমি যোগাড় করেছিলাম। মিল দিতে বিশেষ বেগ পেতে হতো না। মিল যেন আপনিই এসে যেতো। এই কলেজে আসার পর আমি পয়ারে লেখার চেষ্টা করতাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় নির্ভুল পয়ার আমি একবারও লিখতে পারতাম না। কোথায় ভুল হচ্ছে সেটি স্পষ্ট টের পেতাম। কিন্তু সে ভুল শোধরাবার উপায় খুঁজে পেতাম না। তখন থেকে শুরু করে চার বছর লেগেছিল আমার পয়ার লেখা শিখতে। এবং ১৯৬০ সালের শুরুতে আমি পয়ার লেখার নিখুঁত পদ্ধতি আবিষ্কার করি। তারপর পয়ার ভিন্ন অন্য কোনো ছন্দে লিখিইনি। এখন পয়ারই আমার প্রিয়তম ছন্দ। শুধু পয়ারেই লিখি। নানা কারণে এখন আমার মনে হয় কেউ নিখুঁত পয়ার লিখতে পারলেই তাকে কবি বলে স্বীকার করা যায়, স্বীকার করা উচিত। যাই হোক, সেই বয়সের কথায় ফিরে যাই। আমাদের কলেজ থেকে ছাত্রদের সম্পাদনায় একটা বার্ষিক সাহিত্য সংকলন বেরোতো। তাতে আমার লেখা কবিতা চেয়ে নিতো। গোটা কয়েক কবিতা ছেপেছিল। এই কলেজে পাঠকালে লেখা কবিতায় কাটাকুটি আবির্ভূত হয়। আগে কাটাকুটি করার বিশেষ দরকার হতো না। এবার দরকার হতে লাগলো। কবিতায় অলঙ্কার বলতে আগে দিতাম শুধু উপমা। এবার কবিতায় উপমার সঙ্গে সঙ্গে প্রতীকও ব্যবহার করতে লাগলাম। সে সময়কার কবিতার খাতাগুলি আমি সব হারিয়ে ফেলেছি। আমার যতোদূর মনে পড়ে ঐ কলেজে চার বছরব্যাপী পড়ার সময়ে আমি গোটা পঞ্চাশ কবিতা লিখেছিলাম। শুধু যে সময়াভাব এর জন্য দায়ী তা নয়। কাব্যিক বিষয়বস্তুর অভাবও এর জন্য দায়ী। অনেক পরে আমি যে কোনো বিষয়বস্তু নিয়ে কবিতা লেখার পদ্ধতি আবিষ্কার করি। অনেক পরে শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমার বইয়ের এক সমালোচনায় লিখেছিলো, আমি যে কোনো বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতে পারি, এমনকি ‘গু-গোবর’ নিয়েও আমি সার্থক কবিতা লিখতে পারি। কিন্তু তখনও অবস্হা অমন হয়নি। সেই কলেজে পাঠকালে ভাবলাম কিছু বিষয়বস্তু কাব্যিক, আর কিছু বিষয়বস্তু কাব্যিক নয়। এখন আমার মনে হয়, ব্যাপারটা তেমন নয়। সব বিষয়বস্তুই কাব্যিক এবং যার দৃষ্টিতে এই কাব্যিকতা ধরা পড়ে, তিনিই কবি। এমনকি চিন্তা করার নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে, যে পদ্ধতিতে ভাবলে কাব্যিকতা বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়। বিষয়বস্তুর মধ্যে কাব্যিকতা লুকিয়ে থাকে, তাকে বের করার জন্য চিন্তার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। এসব কথা আমি টের পাই, বুঝতে পারি, ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের গোড়া থেকে। তার আগে জানতাম না। যাই হোক, ১৯৫৭-ও শেষ হলো, আমার কলেজে পড়াও শেষ হলো। পঠদ্দশা শেষ হয়ে গেল। কলেজের ছাত্রাবাস ত্যাগ করে আমি শেষ অবধি কলকাতায় চলে এলাম। এই সময় কুশল মিত্র নামে এক কবির সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তার কবিতার বই তখন সবে বেরিয়েছে। যেদিন বেরোলো সেদিন তিনি বললেন, চলুন মিষ্টির দোকানে, আপনাকে মিষ্টি খাওয়াই। এই বইয়ের প্রকাশক দেবকুমার বসুর সঙ্গে আমাকে আলাপ করিয়ে দিলেন। অধুনালুপ্ত ‘গ্রন্হজগৎ’ দোকানটি ছিল দেবকুমার বসুর। আমি মাঝে মাঝে দেবকুমার বসুর দোকানে গিয়ে বসে থাকতাম। আমি স্হির করলাম আমারও একখানি বই প্রকাশ করা দরকার। কলকাতায় তখন নিজেকে একেবারে নবাগতর মতন মনে হতে লাগলো। কফির আসরে, আড্ডাখানাগুলিতে, আমি যেতাম আমার অফিস ছুটি হলে পর। দেখতাম আলোচনার বিষয় সর্বত্রই সাহিত্য এবং রাজনীতি। অথচ বাংলা সাহিত্যের খবর আমি তখন রাখতাম না। রাখার সুযোগই হয়নি ইতিপূর্বে। ফলে আলোচনায় যোগদান করা আমার হতো না। চুপচাপ বসে শুনতাম কে কী বলে। তারপর ভাবলাম আর কিছু না হোক লোকজনের সঙ্গে মেশার জন্যই তখনকার কাব্যসাহিত্য কিছু পড়া ভালো। ফলে কিছু পড়াশুনা শুরু করলাম। এই সময় ‘দিগদর্শন’ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে আমার জানাশোনা হয়। তিনি আমার কাছ থেকে কিছু অনুবাদ চেয়ে নিয়ে তাঁর পত্রিকায় প্রকাশ করলেন। আনুবাদগুলি কবিতার নয়, গদ্যের। এই সময়ে মোহিত চট্টোপাধ্যায় ও অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। ওঁরা তখন কবিরূপে অল্পপরিচিত। মোহিতবাবু তখন এম. এ. পড়তেন। আমি তখন সাহিত্য বিষয়ে আলোচনায় মোটামুটি যোগদান করতে শিখছি। আমার কোনো কবিতা আমি কোনো পত্রিকায় পাঠাতাম না। আপন মনে লিখে খাতাতেই রেখে দিতাম। দেবকুমার বসু আমার কবিতার বই প্রকাশ করতে রাজি হলেন। আমি তখন আমার পুরোনো কবিতার খাতা ফের পড়তে লাগলাম। পড়ে মনে হলো, গোটা পঞ্চাশ কবিতার মধ্যে কবিতাপদবাচ্য বলা যায় গোটা পাঁচেককে। মনটা খুব দমে গেলো। তখন নতুন কিছু কবিতা লিখতে গেলাম। সব পয়ারে। বাছাই ইত্যাদি করে অতো ছোটো একখানি পুস্তিকা প্রকাশ করা যায় বলে দেখা গেল। দেবকুমারবাবু অতি সজ্জন। তিনি বললেন, চলুন দেবুদার কাছে, মলাট আঁকিয়ে নিয়ে আসি। চললাম তাঁর সাথে দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে, বেলেঘাটায়। কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মুড়ি খেতে খেতে তিনি একটা ছবি এঁকে দিলেন। অতি সুন্দর হলো দেখতে। বই ছাপা হয়ে বেরোলো। মোট ষাট পাউন্ড অ্যান্টিক কাগজে ছাপা। জানাশোনা লোকেদের কয়েকজনকে দিলাম পড়তে। কিন্তু কেউ আমার কবিতা সম্বন্ধে উচ্চবাচ্য শুরু করলো না, প্রশংসাও করলো না। দেবকুমারবাবু নিশ্চয়ই সাময়িক পত্রিকায় দিয়েছিলেন। কেউ ভালো করে রিভিউ করলো না। সব চুপচাপ, যেন আমার বই প্রকাশিত হয়নি। এ-বইয়ের নাম ‘নক্ষত্রের আলোয়’। দেবকুমার বাবুর মাধ্যমে আমার বহু তরুণ কবির সঙ্গে আলাপ হয়। তাঁরাও আমার বই সম্পর্কে কোনো আলোচনা করতেন না। তবে এটা ঠিক যে লক্ষ্য করে পড়ে দেখতাম অন্যান্য তরুণ কবির লেখা থেকে আমার কবিতা ভিন্ন প্রকারের, একই রকম নয়। আমার কবিতা বেশ পুরোনো ধাঁচের, সেগুলিকে ঠিক আধুনিক কবিতা বলা চলে না। এই সময় কবি বিষ্ণু দের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। কী করে হয়েছিল এখন আর তা মনে নেই। মোট কথা মাঝে মাঝে সন্ধ্যার সময়ে তাঁর বাড়িতে যেতাম। কোনো কোনো দিন কবিতার খাতা নিয়ে যেতাম। তিনি খাতা পড়ার জন্য রেখে দিতেন। তৎকালে ‘সাহিত্যপত্র’ নামে একটি পত্রিকা বেরোতো বিষ্ণুবাবুর তত্বাবধানে। ঐ ‘সাহিত্যপত্রে’ আমার একটি কি দুটি কবিতা তিনি ছেপে দিয়েছিলেন। ‘নক্ষত্রের আলোয়’ বইখানা পাঠক-সমালোচক মহলে সমাদৃত না হওয়ায় আমি খুব ভাবিত হয়ে পড়লাম। অন্যান্য তরুণ কবির ঢঙে লেখা তো আর চাইলেই হয়ে ওঠে না। ফলে এরূপ চিন্তা আমি করতাম না। কলকাতার কোনো লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যোগাযোগ তো দূরের কথা, জানাশোনাই ছিল না। আমার বয়স তখন তেইশ-চব্বিশ। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ। এসময়ে লেখা আমার কবিতা বর্জন করে মন খুব বিষময়। এই ভেবে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ চলে গেলো। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দটি চাকুরি না করে শুয়ে শুয়েই কাটিয়ে দিলাম। এই সময় প্রচুর বিদেশি সাহিত্য পাঠ করি। ধীরে ধীরে আমার মনে কবিতা রচনার একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি আবির্ভূত হয়। এই ১৯৫৯ সালে আমায় বেশ কিছু অনুবাদ করতে হয়। পাইকপাড়া থেকে ‘বক্তব্য’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হতো। সম্পাদক ছিলেন বিমান সিংহ। আমি থাকতাম গ্রামে ; আমার গ্রামের ঠিকানায় তিনি প্রায়ই চিঠি দিতেন অনুবাদ কবিতা প্রার্থনা করে। আমি অনুবাদ করে পাঠাতাম এটা ঠিক। কিন্তু তিনি আমার নিজের লেখা কবিতা কেন চান না — এ ক্ষোভ আমার মনে মনে থাকতো। কিছু বিরক্তও বোধ করতাম। আমি যে কবিতা লিখি সে কথা সম্পাদক জানতেন, ‘নক্ষত্রের আলোয়’ তিনি পড়েছিলেন। তবু কখনো আমার নিজের লেখা কবিতা চাইতেন না। এরপর ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের একেবারে গোড়ার দিকে আমি স্হির করলাম সর্বান্তঃকরণে কবিতাই লিখি। চাকুরি আপাতত থাক। গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় চলে এলাম। সকালে জাগরণ থেকে শয়ন পর্যন্ত সারাক্ষণ কবিতাই ভাবতাম। আশেপাশে শহরের যে দৃশ্যাবলী দেখতাম তার কোনো কিছু কাব্যিক মনে হলে তখনি নোটবুকে টুকে রাখতাম। ছোটো আকারের কবিতার নোটবই সর্বদাই প্যাণ্টের পকেটে রাখতাম। সৃষ্টির মূল যে সূত্রগুলি তা জড়ের মধ্যে প্রকাশিত, উদ্ভিদের মধ্যে প্রকাশিত, মানুষের মধ্যেও প্রকাশিত। এদের ভেতরে সূত্রগুলি পৃথক নয়, একই সূত্র তিনের ভেতর বিদ্যমান। এই সার সত্য সম্বল করে ভেবে দেখলাম জড়ের জীবনে যা সত্য, মানুষের জীবনেও তা-ই সত্য, উদ্ভিদের জীবনে যা সত্য মানুষের জীবনেও তা-ই সত্য। অতএব জড় ও উদ্ভিদের জীবন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করতে লাগলাম আমি। এবং তাদের জীবনের ঘটনাকে মানুষের জীবনের ঘটনা বলেই চালাতে লাগলাম। এইভাবে শুরু হলো কবিতার জগতে আমার পথযাত্রা, আমার নিজস্বতা। এইভাবে সৃষ্টি হলো ‘গায়ত্রীকে’, ‘ফিরে এসো, চাকা’। ”

    ঠিক কী যে বিনয়কে উদ্বেলিত করেছিল, ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে অসাধারণ প্রেমের কবিতাগুলো লিখতে, তা রহস্যই থেকে গেছে। শিবপুরের ছাত্রজীবন থেকে কলকাতায় ফিরে, কফিহাউসে যাতায়াত করে, প্রেসিডেন্সির করিডরগুলোয় ঘুরে, গায়ত্রী চক্রবর্তী নামের সেই কিশোরীটির স্মৃতিই কী ? স্মৃতির গোপন ঘায়ের রক্ত আবার যদি না বেরোতো তাহলে এই তিন বছরের কবিতাগুলো লেখা সম্ভব হতো না বলেই মনে হয়। এমনও হয়েছে যে একই দিনে তিনি দু’তিনটি কবিতা লিখেছেন ; রাতে তাঁর ঘুম হয় না, যৌবনের স্বাভাবিক কুসুম-কুসুম জ্বরে তপ্ত হয়ে ওঠেন, যার দরুন রস এসে চাপ দিতে থাকে, ছন্দিত ঘর্ষণে উত্তেজনা চরমে ওঠে, তারপর রসপাত হলে শান্তি হয়। বিনয়ের সঙ্গে জীবনানন্দের এখানে পার্থক্য এই যে, জীবনানন্দ ‘যোনি’ শব্দটি বহুবার প্রয়োগ করলেও, ব্রাহ্মধর্মের বেড়াজাল তাঁকে যুবকের যৌন উত্তেজনার যন্ত্রণা সম্পর্কে এরকম খোলাখুলি লিখতে দিতো না।

    ২২ জুন ১৯৬২ তারিখে বিনয় মজুমদার এই কবিতাটি লিখেছিলেন :-

    যাক তবে জ্বলে যাক, জলস্তম্ভ, ছেঁড়া ঘা হৃদয়।

    সব শান্তি দূরে থাক, সব তৃপ্তি, সব ভুলে যাই।

    শুধু তার যন্ত্রণায় ডুবে থাক হৃদয় শরীর।

    তার তরণির মতো দীর্ঘচোখে ছিল সাগরের

    গভীর আহ্বান, ছায়া, মেঘ, ঝঞ্ঝা, আকাশ বাতাস।

    কাঁটার আঘাতদায়ী কুসুমের স্মৃতির মতন

    দীর্ঘস্হায়ী তার চিন্তা — প্রথম মিলনকালে ছেঁড়া

    ত্বকের জ্বালার মতো গোপন, মধুর এ-বেদনা।

    যাক সব জ্বলে যাক, জলস্তম্ভ, ছেঁড়া ঘা হৃদয়।

    ২৯ জুন ১৯৬২ তারিখে লিখেছিলেন এই কবিতাটি

    তুমি যেন ফিরে এসে পুনরায় কুন্ঠিত শিশুকে

    করাঘাত করে-করে ঘুম পাড়াবার সাধ করে

    আড়ালে যেও না ; আমি এতদিনে চিনেছি কেবল

    অপার ক্ষমতাময়ী হাত দুটি ; ক্ষিপ্র হাত দুটি…

    ক্ষণিক নিস্তারলাভে একা-একা ব্যর্থ বারিপাত।

    কবিতা সমাপ্ত হতে দেবে না কি ? সার্থক চক্রের

    আশায় শেষের পংক্তি ভেবে-ভেবে নিদ্রা চলে গেছে।

    কেবল কবোষ্ণ চিন্তা, রস এসে চাপ দিতে থাকে।

    তারা যেন কুসুমের অভ্যন্তরে মধুর ঈর্ষিত

    স্হান চায়, মালিকায় গাঁথা হয়ে ঘ্রাণ দিতে চায়।

    কবিতা সমাপ্ত হতে দাও নারী, ক্রমে…ক্রমাগত

    ছন্দিত ঘর্ষণে, দ্যাখ, উত্তেজনা শীর্ষ লাভ করে

    আমাদের চিন্তাপাত, রসপাত ঘটে, শান্তি নামে।

    আড়ালে যেও না যেন, ঘুম পাড়াবার সাধ করে।

    চার

    বিনয় মজুমদার স্বীকার করেছেন যে তিনি কাল্পনিক বিষয় নিয়ে লেখেন না, তাঁর বিষয়বস্তু বাস্তবজগত থেকে সংগ্রহ করা। সুতরাং অনুমান করা যেতেই পারে যে ‘গায়ত্রী’ বাস্তব জগতেরই কেউ একজন ; বনলতা সেন, নীরা বা সুপর্ণার মতো কাল্পনিক নন। এখানে উল্লেখ্য যে জীবনানন্দ দাশ এবং ভাস্কর চক্রবর্তী স্ত্রীর সঙ্গে স্বাভাবিক মধ্যবিত্তের মতন দাম্পত্য সম্পর্কে গড়ে তুলতে পারেননি, যেকারণে তাঁরা কাল্পনিক প্রেমিকা তৈরি করে নিয়েছিলেন। ‘গায়ত্রীকে, বা ‘ফিরে এসো, চাকার’ পরে বিনয় মজুমদারের বড়ো কাজ ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’। এই বইটি সম্পর্কেও তাঁর কলমেই পড়ি তিনি কী বলছেন:

    “এ পর্যন্ত আমি কোনোদিন নিসর্গমূলক কবিতা লিখিনি। অধিকাংশই ঘটনার বিবৃতি লিখেছি। অতঃপর আমায় কলকাতার শহরতলিতে থাকতে হয়, যাকে প্রায় গ্রাম বলা যায়। চারিদিকে নানা গাছপালা লতাপাতা ছিলো, ছোট বড়ো পুকুর ছিল। ভাবলাম প্রকৃতির বর্ণনা লেখা যাক। এক মাসের ভেতর খুব দীর্ঘ ছয়টি কবিতা লিখলাম। হিসাব করে দেখলাম, বই আকারে ছাপলে এই ছয়টি কবিতা ৪৮ পৃষ্ঠার বেশি জায়গা নেবে। ফলে আর বেশি লিখলাম না। বইয়ের নাম দিলাম ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ এবং কবিতাগুলির কোনো নাম না দিয়ে সংখ্যাচিহ্ণ দিয়ে চিহ্ণিত করলাম — ১, ২, ৩, ৪, ৫ এবং ৬। একবার ভাবলাম কায়দা করে ছ’টি কবিতাকে জোড়া লাগিয়ে একটা কবিতা করি, ৪৮ পৃষ্ঠার লম্বা একটা কবিতা। কিন্তু এতো দীর্ঘ কবিতা পত্রিকায় ছাপা অসম্ভব হবে ভেবে শেষ পর্যন্ত আলাদা আলাদা ছ’টি কবিতাই রাখলাম। এর প্রথম কবিতাটি ছাপতে নিলেন ‘অনুভব’ পত্রিকার সম্পাদক গৌরাঙ্গ ভৌমিক, দ্বিতীয় কবিতাটি নিলেন ‘এক্ষণ’ পত্রিকার সম্পাদক নির্মাল্য আচার্য, তৃতীয় কবিতাটির কী হয়েছিল তা গোপন রাখতে চাই, চতুর্থ ও পঞ্চম কবিতা দুটি ছাপতে নিলেন ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার সম্পাদক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং ষষ্ঠ কবিতাটি ছাপতে নিলেন ‘দৈনিক কবিতা’ পত্রিকার সম্পাদক বিমল রায়চৌধুরী। সকলেই যথা সময়ে ছেপে বার করলেন। পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ বইখানা আমি ছেপে বের করব, কবিতার সঙ্গে ইলাসট্রেশন দেবো। অমিতাভ দাশগুপ্ত বললো, তোর ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’র সমালোচনা লিখব, বই হয়ে বেরোবার আগেই। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেলো তাদের কথা প্রশংসাবাক্য মাত্র। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’র তৃতীয় কবিতাটি ছাপা হয়েছে জ্যোতির্ময় দত্ত সম্পাদিত ‘কলকাতা’ পত্রিকায় — ১৯৭০ সালে। এই একই প্রকার কবিতা আমি আরো লিখে যেতে পারতাম। কিন্তু পড়তে একঘেয়ে হয়ে যাবে ভেবে লিখিনি। এর পরে আমার কবিতা লেখার গতি খুব মন্দ হয়ে আসে। ”

    একজন কবি যদি আখের গোছাবার ধান্দায় থাকতেন তাহলে তিনি পরের পর ‘ফিরে এসো, চাকা’র মতোই কবিতা লিখে যেতেন, যা বিনয়ের পক্ষে সেই সময়ে সহজও ছিল, কেননা তিনি অমন কবিতা লেখার পদ্ধতি ও ছন্দ রপ্ত করে ফেলেছিলেন। কিন্তু সেই পথ ছেড়ে বিনয় লিখলেন আদিরসাত্মক কবিতা। র‌্যাবেলের ‘গার্গাঁতুয়া পাঁতাগ্রুয়েল’ আলোচনাকালে বাখতিন বলেছেন, লেখক যদি বেপরোয়া না হন তাহলে তাঁর পক্ষে কার্নিভালেস্ক রচনা সম্ভব নয়। বিনয় প্রচলিত গণ্ডি কেটে বেরিয়ে গেলেন এবং লিখলেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’, তারপর ‘বাল্মীকির কবিতায়’ ভুট্টা সিরিজ ও ডালাসারির কবিতাগুচ্ছ, এবং হাসপাতাল ও গ্রামজীবনের দিনপঞ্জিমূলক কবিতা, অর্থাৎ বিদ্যায়তনিক সাহিত্যের ক্যাননের তিনি ধার ধারলেন না, বলা যায় সপাটে চড় কষালেন সাহিত্যিক মূল্যবোধের মালিকদের গালে। গণ্ডিকেটে বেরোনোর সঙ্গে বিনয়ের স্কিৎসোফ্রেনিয়ার সম্পর্ক খোঁজা ভুল হবে কেননা র‌্যাবেল-এর এবং ডন কিয়োটের লেখক সেরভানথেসের স্কিৎসোফ্রেনিয়া ছিল না।

    নিজের জীবনকে কবিতার জগতে এমনভাবে নিয়ে গেলেন বিনয় যে আর সবাইকে শুনিয়ে বলার দরকার হলো না যে শুধু কবিতার জন্য তিনি অমরত্বের তোয়াক্কা করেননি, এবং সত্যই তাই, তিনি কারোর তোয়াক্কা করেননি, আর এই ধরণের কবিতাও তাঁকে লিখে যেতে হয়নি যা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘শুধু কবিতার জন্য’ রচনায় লিখলেন :-

    শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম শুধু কবিতার

    জন্য কিছে খেলা, শুধু কবিতার জন্য একা হিম সন্ধ্যাবেলা

    ভূবন পেরিয়ে আসা, শুধু কবিতার জন্য

    অপলক মুখশ্রীর শান্তি এক ঝলক ;

    শুধু কবিতার জন্য নারী, শুধু

    কবিতার জন্য এত রক্তপাত মেঘে গাঙ্গেয় প্রপাত

    শুধু কবিতার জন্য, আজো দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকতে লোভ হয়।

    মানুষের মতো ক্ষোভময়, শুধু কবিতার

    জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি।

    বিনয় মজুমদার যখন ২০০৩ সালে বাঙ্গুর সাইকিয়াট্রি ইন্সটিউটে চিকিৎসাধীন তখন তাঁর প্রয়াত মা ও বাবার সম্পর্কে মনকেমনকে কেন্দ্র করে দুটি কবিতা লিখেছিলেন, পড়লে টের পাওয়া যাবে তাঁর চিন্তাধারা কোন পথে চালিত হচ্ছিল সেসময়ে :

    মায়ের

    মায়ের ইনসোফেগাস ক্যানসার হয়েছিল

    কোনো কিছু গিলে খেতে পারত না, জল

    খেতে পারত না।

    পীযুষ ডাক্তার

    গ্লুকোজ ইনজেকশান দিত দুই হাতে।

    তাতে আর কী বা হয়, না খেয়ে পনেরোদিন থেকে

    মা-ও মারা গেল।

    মরবার আগে একবার

    আমার বাবাকে মা তো কুকুর বলেছে।

    মরবার আগে মা আমার

    বাড়ির চাকরটির পা-ও ধরেছিল।

    এর নাম মৃত্যু মহাশয়।

    নিজের মাকে নিয়ে এই ধরণের কবিতা বিনয়ের আগে আমরা আর কোনো কবিকে লিখতে দেখিনি। সকলেই মাকে নিয়ে যেসব কবিতা এযাবৎ লিখেছেন সেগুলো নাটুকে ও কৃত্রিম বলে মনে হয়। এবার পড়া যাক বাবাকে নিয়ে লেখা কবিতা :

    যখন আমার বাবা

    যখন আমার বাবা খুব বুড়ো হয়েছিল

    বয়স তিরানব্বই বৎসর হয়েছিল তখন তো বাবা

    বিছানায় বসতেই পারত না, শুয়েই থাকত।

    বুড়ো হলে এই হয়, আমারো তো হবে।

    বড় ভগ্নীপতি এসে হাবড়ায় নিয়ে

    বাবার পেটটি কেটে এনেছিল, পরে

    একটানা এগারোটি দিনব্যাপী রক্ত পড়েছিল

    কাটা পেট থেকে।

    তারপরে বাবা মারা গেল।

    বাবার তো আত্মা নেই পূনর্জন্ম নেই।

    বাবাকে পোড়ালে পরে বাবার ছাই তো আছে, এই

    ছাই ভাবে পৃথিবীর মাটির সহিত।

    বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বের জন্য বিনয় মজুমদার জার্মানিতে গণিত অধ্যাপকের চাকরি পেয়েও জাননি। ১৯৯৮ সালে ‘অধরা মাধুরী’ পত্রিকার জন্য বোধিসত্ব রায়কে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় জানিয়েছিলেন, “ বার্লিনে নেমন্তন্ন করেছিল আলেকজান্ডার ডি ভার্স্ট বলে একজন ভদ্রলোক। তিনি ছিলেন গণিতের অধ্যাপক। আমি তাঁকে দরখাস্ত দিই, আমি চাকরি করতে চাই জার্মানিতে। আমি তাঁকে আমার গণিতের গোটা কয়েক খাতা পাঠিয়েছিলাম। সেইগুলি পড়ে উনি আমাকে নিমন্ত্রণ করলেন। বললেন, তুমি এসো, আমাদের বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্ক কষাবে। তোমাকে মাইনে দেয়া হবে ইউ. এস. এ.’র স্কেলে। তখন আমি বাবাকে বললাম, আমাকে দেখছি জার্মানিতে ডেকেছে ! অঙ্ক কষাতে হবে এম. এস. সি ক্লাসে, জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাবা বললেন, দ্যাখ, আমরা বুড়ো হয়ে গেছি। আমার বয়স আশি-পঁচাশি বছর। তোর মায়ের বয়সও ওইরকম। আমাদের বাড়িতে দেখাশুনা করার মতো কেউ নেই। তুই-ও একা আছিস। তুই আর যাসনে কোথাও। আমাদের দেখাশোনা কর। সুতরাং আমি আর জার্মানিতে যেতে পারিনি।”

    দার্শনিক-তাত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, যাঁকে নিয়ে’ গায়ত্রীকে’ ( পরিবর্তিত নাম’ ‘ঈশ্বরীকে’ এবং আরেকবার পরিবর্তিত নাম ‘ফিরে এসো, চাকা ) বইয়ের কবিতাগুলো বিনয় মজুমদার লিখেছেন, এবং বিনয় নিজেও তা প্রথম দিকে স্বীকার করেছিলেন, এবং জীবনের মধ্যভাগে তা স্বীকার-অস্বীকারের দোনামনায় ভোগা আরম্ভ করেন, তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক হন ১৯৫৯ সালে।

    গায়ত্রী চক্রবর্তীর বাবার বাড়িতে বিনয় গিয়েছেন কয়েকবার তা তিনি ২০০১ সালে ‘লোক’ পত্রিকার সম্পাদক শামীমুল হক শামীম-এর কাছে স্বীকার করেছেন, এবং কিশোরী গায়ত্রীর প্রতি তিনি টান অনুভব করতে থাকেন, সেই টান তিনি আজীবন বয়েছেন, একতরফা প্রেমের টান, নিজের মনের কথা উচ্চবর্ণের ধনী পরিবারের স্মার্ট কনভেন্টে-পড়া ইংরেজি-বলিয়ে কিশোরীটিকে বলে উঠতে পারেননি। তাঁর অবস্হান থেকে তা বলা বিপজ্জনক ছিল।

    শামীমুল হক শামীম প্রশ্ন করেছিলেন, “ফিরে এসো, চাকা’ যাঁকে উৎসর্গ করেছেন সেই গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক সম্পর্কে কিছু বলবেন কি ?”

    বিনয় মজুমদার উত্তরে বলেছিলেন, আমি যখন ইডেন হিন্দু হোস্টেলে ছিলাম তখন গায়ত্রীর বাবা ছিলেন সুপারিনটেনডেন্ট, জনার্দন চক্রবর্তী, দাদার নাম প্রসূন চক্রবর্তী। তখন ওর বয়স বারো। তখন থেকে দেখেছি। পুরোহিতের মেয়ে তো। বেশি কথাবার্তা হয়নি। আলাপ-আলোচনা হতো — কবিতা নিয়ে। ‘কবিতা লিখেছি কবে, দুজনে চকিত চেতনায়’ — এবার বুঝলে তো ! তারপর ভালো ছাত্রী হওয়ার ফলে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে ২৩ বছর বয়সে আমেরিকায় চলে গেল। আমি তিনটি বই তাকে উৎসর্গ করেছি।”

    গায়ত্রী স্মার্ট তন্বী ছিলেন, আকর্ষনীয়া, প্রতিভাময়ী, কিন্তু সুন্দরী বলতে যা বোঝায়, তাঁর যৌবনের ছবি দেখে তা মনে হয় না। মিষ্টি মেয়ে বলতে যা বোঝায়, তাই ছিলেন তিনি। কিন্তু তরুণ বিনয়ের অস্তিত্বে তিনি প্রগাঢ় ছাপ ফেলতে পেরেছিলেন, “কী উৎফুল্ল আশা নিয়ে” কবিতাটি পড়লে তার আঁচ পাওয়া যায় :

    কী উৎফুল্ল আশা নিয়ে সকালে জেগেছি সবিনয়ে।

    কৌটার মাংসের মতো সুরক্ষিত তোমার প্রতিভা

    উদ্ভাসিত করেছিল ভবিষ্যৎ দিকচক্রবাল।

    সময়ে ভেবেছিলাম সন্মিলিত চায়ের ভাবনা,

    বায়ুসেবনের কথা, চিরন্তন শিখরের বায়ু।

    দৃষ্টিবিভ্রমের মতো কাল্পনিক বলে মনে হয়,

    তোমাকে অস্তিত্বহীনা, অথবা হয়তো লুপ্ত, মৃত।

    অথবা করেছ ত্যাগ, অবৈধ পুত্রের মতো, পথে।

    জীবনের কথা ভাবি, ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে

    পুনরায় কেশোদ্গম হবে না ; বিমর্ষ ভাবনায়

    রাত্রির মাছির মতো শান্ত হয়ে রয়েছে বেদনা–

    হাসপাতালের থেকে ফেরার সময়কার মনে।

    মাঝে মাঝে অগোচরে বালকের ঘুমের ভিতরে

    প্রস্রাব করার মতো অস্হানে বেদনা ঝরে যাবে।

    পাঁচ

    অরুণেশ ঘোষ ‘গায়ত্রীকে’ বা ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্হে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের প্রতি বিনয়ের আকর্ষণ স্বীকার করেননি। অরুণেশ লিখেছিলেন, “এমন একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বিনয় পাগল হয়ে গেছে আর সেই উন্মত্ত অবস্হার মধ্যে লেখা হয়েছে ‘ফিরে এসো, চাকা’র কবিতাগুচ্ছ। আরও গুজব ছিল, এমন একটি অভিজাত, উঁচু বংশীয় আর সুন্দরী মেয়েকে সে দূর থেকে ভালবাসত — সে ঘূনাক্ষরেও নাকি ধারণা করতে পারেনি, কোনো উন্মাদপ্রায় কবি তাকে ভালবেসে লিখে ফেলেছে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবিতাবলি। এই গুজবের রেশ এখনও রয়ে গেছে।”

    আসলে গায়ত্রী সম্পর্কে ক্রাশ এবং স্কিৎসোফ্রেনিয়া যে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার তা ধরতে পারেননি অরুণেশ। বোধিবৃক্ষের তলায় গৌতমবুদ্ধ উলঙ্গ হয়ে বসেছিলেন আমৃত্যু, কিন্তু তার জন্য তাঁকে তাঁর শিষ্যরা পাগল তকমা দেননি। একজন ভিখারিনিকে নিজের কাপড় খুলে দিয়ে উলঙ্গ হেঁটেছিলেন শিষ্যদের সঙ্গে, তার জন্য তাঁকে পাগল বলা হয়নি। সম্প্রতি হরিয়ানা বিধানসভায় জনৈক উলঙ্গ দিগম্বর জৈন সন্ন্যাসী বক্তৃতা দিয়েছিলেন ; তাঁকে কেউ পাগল বলেননি। মহাবীরও উলঙ্গ বসে সাধনা করেছিলেন, শিষ্যদের বাণী শুনিয়েছেন, তার জন্য কেউ তাঁকে সমাজবহির্ভূত উন্মাদ মনে করেনি। কবিদের বোধিপ্রাপ্তির পথে যাত্রাকে তাহলে কেন পাগলামি ইত্যাদি বলা হবে ! এই বিপর্যয় এনেছে আধুনিকতাবাদী শিক্ষা, ইউরোপের সংস্কৃতি। ব্রিটিশরা আসার আগে ভারতবর্ষে পাগলাগারদ বলে কিছু ছিল না।

    গণিতের অধ্যাপক নারায়ণচন্দ্র ঘোষও মনে করেন যে গায়ত্রী চক্রবর্তীকে নিয়ে অহেতুক মিথ সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়েছে। ‘গায়ত্রীকে’ নামকরণ তিনি সম্পৃক্ত করেছেন হিন্দু ধর্মের গায়ত্রীমন্ত্রের সঙ্গে, যে মন্ত্রটি দ্বারা উপনয়নের সময়ে সদ্যব্রাহ্মণকে দীক্ষিত করা হয়। তিনি ‘সৃষ্টিসন্ধান’ ওয়েব-পত্রিকায় লিখেছেন যে, “বিনয় মজুমদারের ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্হটি বিভিন্ন নামে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৬১ সালে চোদ্দটি কবিতা নিয়ে বিনয়ের ‘গায়ত্রীকে’ নামের কবিতার বই প্রকাশিত হয়। চোদ্দর সঙ্গে আরও তেষট্টিটি কবিতা যোগ করে ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় ‘ফিরে এসো.চাকা’ কাব্যগ্রন্হ। ‘ফিরে এসো, চাকা’ নাম পালটিয়ে একই কবিতাগুচ্ছ নিয়ে ১৯৬৪ সালে নতুন নামে প্রকাশিত হয় ‘আমার ঈশ্বরীকে’। নামকরণের কারণেই গায়ত্রী চক্রবর্তী-চাকা-ঈশ্বরী সম্পৃক্ত হয়ে এক মিথের জন্ম দিয়েছিল এবং গাণিতিক চেতনার কবির বিশ্লেষণাত্মক ছন্দময় কাব্যপ্রবাহকে ‘হতাশাজনিত মস্তিষ্কবিকৃতি’, ‘ব্যর্থ প্রেমিকের পাগলের প্রলাপ’ প্রভৃতি উক্তি দ্বারা অভিহিত করে কবি বিনয় মজুমদারের কাব্যভাবনার মূলকে সৃষ্টির আড়ালে রাখার সচেতন বা হেঁয়ালি প্রয়াস দেখা যায়। অনেক সময়ে মিথ যেন সত্য মনে হয়:

    ‘কী রহস্য যেন সর্বদা আমাকে ঘিরে রাখে’

    ‘রহস্য’ কবিতার এই পংক্তিটি যেন কবি বিনয় মজুমদারের নিজের জীবনযাপন, কাব্যকৃতি, প্রেম-বাসনা, বিষাদ-আনন্দের অনুরণন। তাঁর কবিতায় জননপ্রক্রিয়া, পদার্থবিদ্যা, বীজগণিত, কফিহাউস, পড়শি রঞ্জিত, পীযুষ ডাক্তার, কৃত্তিবাস, হাংরি আন্দোলন, বাবলা গাছ, লাঙল, হারাধন, বুচি, জীবনানন্দ, বাবা, মা, মানসিক হাসপাতাল, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, মঘা তারা, রেবতী, কৃত্তিকা, ছন্দভাবনা, সমাজভাবনা, সরস্বতীপুজো, সব একাকার হয়ে গেছে। সেখানে কোনো কাব্যের নামকরণ বা কাব্যভাবনাকে বিশেষ কৌণিক বিন্দু থেকে মূল্যায়ন করলে মিথ আরও মিথের জন্ম দেবে। বিনয় রহস্য উন্মোচনে তাই বড়ো বেশি সাবধানী হওয়া বোধহয় শ্রেয় :

    ‘তাকাই সামনে সোজাসুজি

    ব্যাকুল আশায় তাকে খুঁজি’

    যিনি ব্যাকুল আশায় তাঁকে খোঁজার প্রয়াস চালিয়েছেন সম্ভবত সেই বিনয় মজুমদারকে খুঁজতে দুচোখ ধারালো করা প্রয়োজন এবং এ-কাজে কোনো মিথর শিকার না হয়ে মনে রাখা দরকার : সংযম কবিদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, এক দুরূহ তপস্যার মতো। কেননা বিনয় মজুমদারের কথায় :

    ‘নিষ্পেষণে ক্রমে-ক্রমে অঙ্গারের মতন সংযমে

    হীরকের জন্ম হয়, দ্যুতিময়, আত্মসমাহিত’

    এ তো বিনয়ই শিখিয়েছেন। তাই মিথ নয়, যুক্তসমীকরণে বিনয়-প্রতিভার সন্ধান চালানো ভালো :

    যে কোনো গণিতসূত্র নিয়ে তার পরবর্তীদের

    বাঁপাশে আনার পরে সে সমীকরণে

    সমান চিহ্ণের পরে — ডানপাশে শূন্য হয়ে যায়।

    এইভাবে কতিপয় যত খুশি সূত্র নিয়ে এগুলির বামপার্শ্বগুলি

    গুণ করে শুধুমাত্র একটি সমীকরণ সহজেই পাই

    এবং ডানপার্শ্বে শূন্য শূন্যের সমান

    সদ্য উল্লিখিত এই একটি সমীকরণ জ্যামিতিতে রূপায়িত হলে

    অনেক পৃথকরূপ পৃথক পৃথক চিত্র পাওয়া যায় সর্বদাই পাই।

    মূল সমীকরণের — আলাদা আলাদা সব সমীকরণের

    আলাদা সকল চিত্র একীভূত সমীকরণের

    জ্যামিতিক রূপায়ণে তার মানে পাওয়া যায় অনেক সূত্রকে

    একীভূত করা যায় কেবল একটিমাত্র করে ফেলা যায়।

    তাতে আমাদের কিছু লাভ হয় এখানে আমার বৌ রাধা

    এই লিখে রাখা ভালো সবার অবগতির জন্যই নিশ্চয়।

    নারায়ণচন্দ্র ঘোষ আরও বলেছেন যে, “প্রকল্পিত সমীকরণের পদ্ধতি অজানা থাকলে রাধার একীভূত সত্তার প্রসঙ্গ সহজবোধ্য হয় না। অজানা থেকে যায় রূপময়তার পরিসরে আলাদা হয়ে যাওয়া, আলাদা থাকা, বহুময়তা আর সমন্বয়, সমাবিষ্ট, একীভূত হওয়ার সম্ভাবনাসূত্র — ভেদ ও অভেদের গমনপথ, পারস্পারিকতার রহস্য। বিনয়কে বুঝতে হলে, বিনয়ী হয়ে বলা ভালো, গাণিতিক চেতনায় সমৃদ্ধ হওয়া জরুরি ; অন্যথায় মিথ মিথের জন্ম দেবে ; বিনয় কেবলমাত্র অবিনশ্বর প্রেম কাহিনীর প্রতীক হয়ে থাকবেন। মিথপ্রেমীদের পথ তখন মহাশূন্যের কোটরে দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হবে। গণিতবিদ নারায়ণবাবু তাই পৌরাণিক মিথে টেনে নিয়ে গেছেন বিনয়ের ‘চাকা’কে। তিনি বলেছেন সুদর্শন চক্রের আবহমণ্ডলে ভারতবাসী তথা বাঙালির অবস্হান। কত না মিথ সুদর্শনচক্রকে উপলক্ষ্য করে। অশোকচক্র, সেও কি কম কথা। উপনিষদে বর্ণিত সত্যচক্র হলো একটি ত্রিমুখী সিংহের পায়ের নিচে একটি ছোটো চক্র আর মাথার উপরে আরেকটি বড়ো চক্র। এর অর্থ হলো পশু শক্তি সত্যকে দমন করতে চাইলে সত্য আরও বড়ো আকার নিয়ে পশু শক্তির উর্ধ্বে নিজের স্হান করে নেয়। ”

    বলা বাহুল্য, নারায়ণবাবুর এই যুক্তি আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। বিনয়ের কবিতায় পুরোহিততন্ত্র ও ব্রা্‌হ্মণ্যবাদের প্রতি খোঁচা বেশ কয়েকটি কবিতায় ও সাক্ষাৎকারে পাওয়া যায়।

    কবি জুবিন ঘোষ ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকার ২০১৬ সালের একুশে জানুয়ারি সংখ্যায় বিনয় মজুমদারের ‘ফিরে এসো চাকা’ কাব্যগ্রন্হটি সম্পর্কে আলোচনাকালে নারায়ণ ঘোষের বক্তব্যকে আরও প্রসারিত করেছেন গায়ত্রীমন্ত্র ও ষটচক্রের প্রেক্ষিতে। তিনি বলেছেন যে, গায়ত্রী শুধুমাত্র একটা মন্ত্র নয়, এটা হিন্দুদের একটা পরম সাধিত স্তব। যার সুর অমর। ‘শান্তিনিকেতন’ গ্রন্হে ‘ভক্ত’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ থাকুর লিখেছেন, “একদিকে ভূলোক, অন্তরীক্ষ, জ্যোতিষ্কলোক, আর একদিকে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি, আমাদের চেতনা — এই দুইকেই যদি এক শক্তি বিকীর্ণ করছে, তার এই শক্তি বিশ্বের মধ্যে এবং আপনার বুদ্ধির মধ্যে ধ্যান করে উপলব্ধি করবার মন্ত্র হচ্ছে গায়ত্রী। ” বিনয় ‘আমার আশ্চর্য ফুল’ কবিতার শেষ কয়েক পংক্তির মধ্যে বলেছেন, “আমরা বিশুদ্ধ দেশে গান হবো, প্রেম হবো, অবয়বহীন/সুর হয়ে লিপ্ত হবো পৃথিবীর সকল আকাশে।” সেখানে এক অমরতার চিহ্ণ পাই সকল আকাশে বিচরণ করার শক্তির মধ্যেই। গায়ত্রী স্তবের সুর যা ‘জয় হয়ে, চিরন্তন কাব্য হয়ে’ আসে হিন্দুদের কাছে। এই অমরতা যা মন্ত্রের সুরেই সম্ভব। স্বর না থাকলেও সুর থেকে যায় অনাদিকাল, পুনরাবিষ্কার হয় তার। সেই গায়ত্রী শব্দোচ্চারণের সুরেই বিনয় বলেছেন, “লিপ্ত হবো পৃথিবীর সকল আকাশে।” এখন বেদ মন্ত্রের আলোকে দেখা যাক ‘ধী’ কী ! সূর্যের কল্যাণতম তাপ মানবের ব্যক্তিচৈতন্যের উপরে বেগ সৃষ্টি করে জ্ঞান, আত্মা বা ‘ধী’ এর পরিস্ফূটন ঘটায়। এই ‘ধী’, যা মানুষের আত্মশক্তিকে তেজপূর্ণ করে, সূর্যের অমৃতজ্যোতির সঙ্গে সাযুজ্যতা দিয়ে থাকে। ‘ধী’ প্রসঙ্গে ঋগ্বেদের ২/৪০/৬ ঋক বলছে, ‘ধিয় পূষা জিম্বতু বিশ্বামিত্রো রয়ি সোমা রয়িপতির্দাধতু।’ মানে হলো, সব জীবনের ধ্যানে, মননে, চিন্তনে রয়েছেন পূষা, তিনিই ‘ধী’ যা সবার ধ্যানচৈতন্যের স্ফূরণ করে, সোমলতাকে ‘ধী’ রসবন্ত করে। গায়ত্রী স্তবেও বলছে ‘ধিযো নঃ প্রচোদয়াৎ’। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, এই ধ্যানকে উপলব্ধি করতে হয়, আবিষ্কার করতে হয়, তাই তো ‘আমার আশ্চর্য ফুল’ কবিতায় বিনয় লেখেন, ‘দীর্ঘ তৃষ্ণা ভুলে থাকি আবিষ্কারে, প্রেমে।’ গায়ত্রীমন্ত্র একবার মনস্হ করে হয় না, তাকে ধীরে ধীরে ১০ থেকে ১০৮ বার করতে হয়। বিনয় ‘আমার আশ্চর্য ফুল’ কবিতায় লেখেন, ‘নিমেষেই/গলধঃকরণ তাকে না করে ক্রমশ রস নিয়ে/তৃপ্ত হই’ — এই ধীর স্বাদ গ্রহণের চমৎকার অবস্হায় প্রকৃত সাধক বিনয় মজুমদার ‘পরাবর ব্রহ্ম’ দর্শন করেন। দর্শনের শেষে যা আসে তা দেব দর্শনের মতো মিলিয়ে যায়, শরীর সাকার হয় না, চিত্ররূপ থেকে যায় মনে, ‘প্রাচীন চিত্রের মতো চিরস্হায়ী হাসি নিয়ে তুমি/চলে যাবে ; ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণায় স্তব্ধ হব আমি’ ( ভালোবাসা দিতে পারি — ১৮.৫.৬২ )। এই ভাবে স্তব বা বেদমন্ত্রে গায়ত্রী জীবন্ত মানুষী হয়ে ওঠেন। ঠিক যেমন গায়ত্রীমন্ত্রের মধ্যে অন্তর্নিহিত আছে এক অপূর্ব আলোর পরিস্ফূরণ, স্রোতের তরঙ্গশীর্ষে রয়েছে উত্তরণের সাংকেতিক লিপি। লক্ষ-কোটি মুহূর্তের প্রবাহে যিনি নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে এই শক্তিকে আত্মস্হ করেন, তিনিই যোগী। ‘ধী’ অর্থাৎ বোধ আমাদের রক্ষা করছে। বোধের পূজারী হলেন বিনয় মজুমদার। তিনি বারবার গায়ত্রীর মূল রসকে সেই স্তরের ব্যাখ্যায় অন্তস্হিত মর্মে পদার্পণ করেছেন। ‘ধী’ ও গায়ত্রীকে মিশিয়ে দিয়েছেন কাব্যের আধ্যাত্মিকতায়।

    জুবিন ঘোষ আরও বলেছেন, এবং যা বলেছেন, খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে বিনয়ের ‘বাল্মীকির কবিতার’ ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য, যদিও জুবিন ঘোষ ‘বাল্মীকির কবিতা’র পপসঙ্গ তোলেননি এখানে। জুবিন বলেছেন, “ফিরে এসো, চাকা’ তো সভ্যতার প্রধান চক্র, যার মাধ্যমে মানবসভ্যতা গড়িয়ে এগিয়েছে, আর চক্র মানেই ‘ষটচক্র’। সেখানে দেখব রয়েছে : ১) মূলাধারচক্র; ২) সাধিষ্ঠচক্র ; ৩) মণিপুরচক্র ; ৪) অনাহতচক্র ; ৫) বিশুদ্ধিচক্র ও ৬) আজ্ঞাচক্র। এই চক্রের পুনঃসাধনার কথাই বলেছেন কবি বিনয় মজুমদার। এতো সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক গভীরতার দিকে এগিয়েছে বিনয়ের ‘ফিরে এসো, চাকা’, যাকে বলতে পারি ফিরে এসো চক্র — সভ্যতার সাবলীল গতিসমূহ মানবদেহের সাবলীল সাধনাসমূহ। মূলাধারচক্র সাধনায় মানুষের বাসনা সিদ্ধ হয় — সে মুক্তি লাভ করে। বিনয় ‘আমার আশ্চর্য ফুল’-এ বলছেন, ‘কাকে বলে নির্বিকার পাখি/অথবা ফড়িং তার স্বচ্ছ ডানা মেলে উড়ে যায়/উড়ে যায় শ্বাস ফেলে যুবকের প্রাণের উপরে/…/আমি মুগ্ধ ; উড়ে গেছ ; ফিরে এসো চাকা। এই মুগ্ধ উড়ে যাবার মধ্যে মুক্তির স্বাদ। মুগ্ধতার অর্থ বাসনা পরিতৃপ্তির ফল। এই মুগ্ধ উড়াল আমরা বার বার পাই ‘ফিরে এসো, চাকা’র প্রথম কবিতাতেই, ‘একটি উজ্বল মাছ, যা ১৯৬০ সালের ৮ই মার্চ লেখায় আশ্রিত — ‘একটি উজ্বল মাছ একবার উঠে/দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে পুনরায় ডুবে গেল/ এই স্মিত দৃশ্য দেখে বেদনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম হল ফল/…/বিপন্ন মরাল ওড়ে অবিরাম পলায়ন করে। ’ আবার ‘কাগজ কলম নিয়ে’ ( ১৪/১০/১৯৬০) বিনয় লিখছেন, ‘তবু কী আশ্চর্য দ্যাখো, উপবিষ্ট মশা উড়ে গেলে/তার সেই উড়ে যাওয়া ঈষৎ সঙ্গীতময় হয়।’ এই ওড়াটাই হলো মুক্তির আর্কিটাইপ, উড়ে যেতে চাইছে সব ছিন্ন করে, মুক্তি পেতে চাইছে বাসনা তৃপ্ত করে, যা মূলাধারচক্র সাধনার মূল রস, যা আবার ফিরে এসেছে ‘মুকুরে প্রতিফলিত’ ( ২৬/৮/১৯৬০) কবিতায়, ‘মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়।’ এভাবেই ঈচ্ছিক মুক্তির পথে বার বার তাঁর কলম লিখে চলেছে মূলাধারচক্রের সার কথা। মণিপুরচক্র বলছে যে, এই সাধনার ফলে সাধক অন্যের শরীরেও প্রবেশ করতে পারেন, যেভাবে ‘আমার আশ্চর্য ফুল যেন চকোলেট এক বস্তুস্হিত অবস্হান থেকে অন্য বস্তুস্হিত অবস্হানে চলে যাচ্ছেন কবি। স্বচ্ছ জলে মিশে যাওয়াটাই মণিপুরচক্র। প্রায় প্রত্যেক কবিতায় এই বৌদ্ধিক সাধকের মিশে যাওয়াটাই অনুভব করতে হয়। একটা চিত্র বার বার অন্য চিত্রের সঙ্গে, অন্য আর্কিটাইপের সঙ্গেমিশে যাচ্ছে। বিশুদ্ধিচক্রে পরমযোগী হবার সাধনা বার বার তাঁর কাব্যে এসেছে, যেমন ‘কী উৎফুল্ল আশা নিয়ে সকালে জেগেছি সবিনয়ে’। এমন তো একজন প্রকৃত ঋষিই পারেন, পরম সাধকেই তো তিনি উত্তীর্ণ। ”

    জুবিন ঘোষ বাসনা পরিতৃপ্তির যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা আমরা বিনয়ের ভুট্টা সিরিজ কবিতাতেও পাই। সেই কবিতাগুলোয় একটি আশ্চর্য ফুল রূপান্তরিত হয়েছেন একজন রক্তমাংসের ফুলে। হিন্দু তন্ত্রসাধকদের মতো বিনয়ও আশ্রয় নিয়েছেন রক্তমাংসের অভিজ্ঞতায়। বিনয় তাঁর জাগতিক অভিজ্ঞতাকে অসম্পূর্ণ রাখতে চাননি, যা তিরিশের মধ্যবিত্ত কবি-লেখকদের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল। ভুট্টা সিরিজের কবিকে আমরা হিন্দু তন্ত্রসাধকদের অন্বেষণের সঙ্গে তুলনা করতে পারি, যাঁরা তনুমনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করতেন। দেবীর আধারে নির্বাচিত সঙ্গিনীর সঙ্গে যৌন একাত্মের মাধ্যমে জরা, ব্যাধি, বার্ধক্য, মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণ করতেন ; মৃত্যুঞ্জয়ী ও ভয়জয়ী হয়ে অমরত্ব লাভ করতেন। হিন্দু ও বৌদ্ধিক তান্ত্রিকদের যৌন একাত্মতা ছিল দেহ ও মনের পরস্পরের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বুনন, পুরুষের সঙ্গে নারীর, মানবের সঙ্গে দৈবের। বিনয় মজুমদার রক্তমাংসের ঈশ্বরীকে খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর রাধায়। সর্বোচ্চ প্রাপ্তির জন্য বিনয় মজুমদার স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চেয়েছেন, বোধিপ্রাপ্ত, এবং চেয়েছেন শেষতম শান্তি, যাতে মন থেকে যাবতীয় নোংরা বিদায় নিয়ে তাঁকে বামাক্ষ্যাপার স্তরের বোধিতে উন্নীত করতে পারে।

    অরুণেশ ঘোষ, জুবিন ঘোষ ও নারায়ণচন্দ্র ঘোষ, এবং তাঁদের মতো আরও অনেকে বিনয়ের কবিতায় গায়ত্রী চক্রবর্তীর অস্তিত্ব নস্যাৎ করতে চাইলেন কেন বোঝা কঠিন। বিনয়ের ইনটারমিডিয়েট পড়ার সময়ে আরও ছাত্রী ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। গায়ত্রীর নামটিই কেন তাঁর কাব্যগ্রন্হের নামকরণে এলো ? পুরাণের নানা রকমের চক্র বিনয়কে ‘ফিরে এসো, চাকা, অথবা ‘গায়ত্রীকে’ অথবা ‘আমার ঈশ্বরীকে’ নামকরণে উদ্বুদ্ধ করেছিল, এরকম ভাবতে খটকা লাগে। বিনয় যদি ব্রাহ্মণ পরিবারের বা উচ্চবর্ণের সন্তান হতেন তাহলে না হয় কিছু যুক্তি দেয়া যেতে পারত।

    তরুণ বয়সে কোনো কিশোরীর প্রতি ক্রাশ যদি হয়েই থাকে এবং তা যদি মনের গভীরে বাসা বেঁধে তরুণটিকে সেই কিশোরীকে নিজের কবিতায় তুলে আনতে প্ররোচিত করে থাকে, সেটাই তো বরং স্বাভাবিক মনে হয়। তবে বিনয় নিজেই বলে গেছেন যে লিখিত কবিতার ভেতরে যা লুকিয়ে থাকে এবং পরবর্তীকালে তাকে পাঠ করলে যদি নতুন কিছু পাওয়া যায় তাহলে তা কবিতাটির অন্তর্গত ‘অতিচেতনা’ ; এই অতিচেতনা এবং অতিসত্য গণিতে থাকে, যে কারণে একই গণিততন্ত্র পরবর্তীকালে আরেকজন গণিতবিদের জন্য অন্য পথের দিশারী হয়ে ওঠে। তাই নারায়ণবাবু ও জুবিনবাবুর যুক্তিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা উচিত হবে না, তাঁরা বিনয়-কথিত ‘অতিচেতনা’ আবিষ্কার করেছেন তাঁর কবিতায়।

    ১৯৮২ সালে ‘কোনো গোপনতা নেই’ শীর্ষক সাক্ষাৎকারে “বাস্তব কবিতা বলে কিছু হয়কি?” প্রশ্নের উত্তরে বিনয় মজুমদার বলেছিলেন, “পুরোটাই — কবিতার প্রত্যেক শব্দ, প্রত্যেক বাক্য, বাস্তব জগত, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া।” ১৯৬৬ সালে ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হে তিনি লিখেছেন যে একেবারে কাল্পনিক ভাবনা হলো চিন্তাশূন্য শূন্যস্হান, তার মানে মৃত :-

    সব মিলে একটিই বিশাল জীবন তবে ভূবক্ষে রয়েছে

    আপাত দৃষ্টিতে দেখা যে-কোনো তথাকথিত একটি ব্যক্তিকে

    বিশাল সমগ্র থেকে আলাদা করে নিলে হঠাৎ —

    যদি কোনোদিন নিতে কোনোভাবে পারা যায় তবেই হঠাৎ

    দেখা যাবে ব্যক্তিটির চিন্তা বলে কিছু নেই, মন তার শুধু

    চিন্তাশূন্য শূন্যস্হান — একেবারে কাল্পনিক, তার মানে মৃত

    অর্থাৎ পুরাণের কোনো মিথ থেকে তিনি চাকা ও গায়ত্রীকে এনেছেন বলে বিশ্বাস করা কঠিন। সুমন গুণও বলেছেন, “বিনয়ের ভাষ্য আক্ষরিক অর্থেই ব্যক্তিগত; নিজেকে কেন্দ্র করেই তাঁর বিস্তার।

    ওই সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন, “আচ্ছা, কবিতা কি এমন হতে পারে না — ধরো, খাতা কলম নিয়ে রেল লাইনের ধারে গিয়ে বসলাম, যা দেখি ঠিক তাই লিখি — না দেখা একটা শব্দও যেন না থাকে — যেমন ধরো —

    সামনেই ধানক্ষেত দীর্ঘায়িত হয়ে পড়ে আছে

    ধানক্ষেতটির ওই পাশ দিয়ে রাস্তা চলে গেছে

    উত্তরের দিক থেকে ঠিক দক্ষিণের দিকে — তাই দেখি…।

    ‘গায়ত্রীকে’, ‘ফিরে এসো, চাকা, ‘ঈশ্বরীকে’ কাব্যগ্রন্হটির অসাধারণ প্রেমের কবিতাগুলোও বাস্তবজগতের, এবং এখানেই জীবনানন্দ দাশ-এর কবিতার সঙ্গে বিনয় মজুমদারের পার্থক্য। ১৯৮২ সালের উপরোক্ত সাক্ষাৎকারটিতে বিনয় মজুমদারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “গায়ত্রীকে কি তুমি ভালোবাসতে ?” উত্তরে বিনয় মজুমদার, একজন প্রেমিক যেভাবে নিজের গোপন প্রেমের কথা বলে, বলেছিলেন, “আরে ধ্যুৎ, আমার সঙ্গে তিনচার দিনের আলাপ — প্রেসিডেন্সি কলেজের নামকরা সুন্দরী ছাত্রী ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের, তারপরে কোথায় চলে গেলেন, আমেরিকা না কোথায়, ঠিক জানি না।”

    পরে অজয় নাগ জিগ্যেস করেছিলেন, “বিনয়দা, চক্র মানে কী ?” উত্তরে বিনয় মজুমদার বলেছিলেন, “চাকা, যা গড়িয়ে গিয়ে চলে আসে, যেখান থেকে শুরু করেছিল ; যে চাকা চালায় সে চক্রবর্তী, আমি সেই চক্রবর্তীকে ফিরে আসতে বলেছি, গায়ত্রী চক্রবর্তীকেই একটা আস্ত চাকা বানিয়ে দিয়েছি। ” ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে মারুফ হোসেন জিগ্যেস করেছিলেন, “গায়ত্রী চক্রবর্তী সম্পর্কে কিছু শুনতে চাই। ” উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, “যিনি আমার গুরুদেব ছিলেন, বাংলা ভাষা পড়াতেন আমাকে প্রেসিডেন্সি কলেজে, সেই জনার্দন চক্রবর্তীর মেয়ে হলো গায়ত্রী চক্রবর্তী। ইডেন হিন্দু হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্টও ছিলেন। আমি ওই হোস্টেলে থেকেছি দুই বছর। গায়ত্রীর বয়স তখন কত হবে ? ১০-১১-১২ বছর। আমার তখন হবে ধরো ১৬-১৭-১৮ বছর। তখন আমি ওকে দেখেছি। ”

    ‘একটি উজ্বল মাছ’ কবিতাটি সম্পর্কে মাসুদুল হক বিনয় মজুমদারের মনোভঙ্গ বিশ্লেষণ করে বলেছেন যে, “ব্যাপারটি এভাবে উপলব্ধি করা যায়। পুকুরের তলদেশে একটি নারীমৎস্য দুঃখ নিয়ে সাঁতরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ একটি পুরুষ মৎস্য কোনো এক আনন্দের স্পর্শ দিল। সে-সুখে নারীমৎস্যটি জলমাধ্যম থেকে বায়ুমাধ্যমে উড়াল দেয়। কিন্তু সে আনন্দের উড়াল ক্ষণিকের, কেননা সে অনিবার্যভাবেই আবারও দুঃখের স্রোতে মিশে যাবে। কিন্তু মাঝখানে প্রকৃতির ঐক্যের কারণে, আপেক্ষিত তত্বের পরিপ্রেক্ষিতে, এই উড়াল দৃশ্য একটি ফল দেখে নিয়ে দার্শনিক বেদনাতে আপক্ক রক্তিম হয়ে ওঠে। নিউটনের সেই আপেলের ভূপৃষ্ঠে পতিত হবার যে ঘটনা তা দুঃখবাদের কেন্দ্রগামী বিন্দু। যাকে তিনি অভিকর্ষীয় ত্বরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন এই বস্তুবিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে দুঃখবাদের এক অনন্ত সমীকরণ। সেই সমীকরণই ঘটান বিনয় মজুমদার, তাঁর ‘একটি উজ্বল মাছ’ কবিতায় গণিতের সমীকরণ দিয়ে। বিনয় তো নিজের সম্পর্কে বলেছেন, মূলত আমি গণিতবিদ, আমার অধিকাংশ সময় কাটে গণিত চিন্তায় ; আর কবিতা, মানুষ যেরকম কাজের অবসরে সুন্দর সুন্দর ফুলের বাগান তৈরি করে, তেমনি। ”

    মাসুদুল হক কিন্তু বিনয় মজুমদারের দুঃখের উৎসসূত্রটি জানাননি।

    বিনয়ের চোখে গায়ত্রী নামের যুবতীটি সুন্দরী, তিনি একজন গর্বোদ্ধত স্মার্ট ইংরেজিতে-কথা-বলিয়ে কনভেন্টে-পড়া যুবতী সন্দেহ নেই, তবে ফিল্মস্টার বা মডেলদের মুখশ্রীর সৌন্দর্যের দাবিদার তাঁকে বলা যায় না। তাঁর সৌন্দর্য সবাইকে ছাপিয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হবার, এবং পরবর্তীকালে দেরিদার অনুবাদকের ও সাবঅলটার্ন দর্শনের মুখপাত্রীর। গায়ত্রীর চলে যাওয়াটাও ফিরে এলো ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্হে, এবং যে ছবিগুলো কবিতায় বিনয় মজুমদার নিয়ে এলেন, তা বাস্তব জগতের, চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা নয়, অবলোকিত বাস্তব :

    বেশ কিছু কাল হল চলে গেছ, প্লাবনের মতো

    একবার এসো ফের ; চতুর্দিকে সরস পাতার

    মাঝে থাকা শিরীষের বিশুদ্ধ ফলের মতো আমি

    জীবন যাপন করি ; কদাচিৎ কখনো পুরোনো

    দেওয়ালে তাকালে বহু বিশৃঙ্খল রেখা থেকে কোনো

    মানুষীর আকৃতির মতো তুমি দেখা দিয়েছিলে।

    পালিত পায়রাদের হাঁটা, ওড়া, কুজনের মতো

    তোমাকে বেসেছি ভালো ; তুমি পুনরায় চলে গেছ।

    বিনয় মজুমদারের কাব্যসমগ্রের সম্পাদক তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় কাব্যসমগ্রের প্রথম খণ্ডে উল্লেখ করেছেন, ‘গায়ত্রীকে’ কবিতাপুস্তিকাটির নামকরণ প্রসঙ্গে বিনয় মজুমদার তাঁকে লিখেছিলেন, গায়ত্রী চক্রবর্তী প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তো এবং ১৯৬০ কি ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে বি.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে পাশ করেছিল। সে-ই আমার কবিতা বুঝতে পারবে ভেবে তাকেই উদ্দেশ্য করে ‘গায়ত্রীকে’ বইখানি লেখা। সেই হেতু বইয়ের নাম ‘গায়ত্রীকে’ রেখেছিলাম।

    ছয়

    জীবনানন্দের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতা ‘বনলতা সেন’-এর যদি উল্লেখ করি তবে দেখা যাবে যে তা সম্পূর্ণ কবিকল্পিত, তা অবলোকিত বাস্তব নয়, যা আমরা বিনয় মজুমদারে পাই। তাছাড়া জীবনানন্দ বলছেন ‘থাকে শুধু অন্ধকার’ যা সারাজীবন দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করার পরও বিনয় মজুমদারকে বলতে শোনা যায় না। ‘পুনর্বসু’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে ( ১৯৮৭ ) বিনয় মজুমদারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “আপনি এরকম থাকেন কী করে ? রহস্যটা কী ? সর্বদাই এমন আনন্দে ?” জবাবে বিনয় বলেছিলেন, “আমি সারাক্ষণ আনন্দে থাকি এটা সত্য কথা। তার জন্য আগে থাকতে ব্যবস্হা করে রাখতে হয়। ” পক্ষান্তরে জীবনানন্দ লিখেছিলেন :-

    হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে

    সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে

    অনেক ঘুরেছি আমি ; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে

    সেখানে ছিলাম আমি ; আরো দূর অন্ধকার বিদর্ভ নগরে

    আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

    আমারে দু’দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন

    চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা

    মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ; অতিদূর সমুদ্রের পর

    হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা

    সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর

    তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে ; বলেছে সে ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’

    পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

    সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন

    সন্ধ্যা আসে ; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল ;

    পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

    তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল ;

    সব পাখি ঘরে আসে — সব নদী — ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন ;

    থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

    পাশাপাশি পড়ে দেখা যাক বিনয় মজুমদারের অবলোকিত বাস্তবের কবিতা, বিশেষ করে যেগুলো জনপ্রিয়। বিনয় প্রয়োগ করছেন যা বিজ্ঞানের দ্বারা প্রমাণিত, যা যুক্তিপূর্ণ, এমন ছবি :

    একটি উজ্জ্বল মাছ

    একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে

    দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে

    পুনরায় ডুবে গেলো — এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে

    বেদনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম হলো ফল।

    বিপন্ন মরাল ওড়ে, অবিরাম পলায়ন করে,

    যেহেতু সকলে জানে তার শাদা পালকের নিচে

    রয়েছে উদগ্র উষ্ণ মাংস আর মেদ ;

    স্বল্পায়ু বিশ্রাম নেয় পরিশ্রান্ত পাহাড়ে পাহাড়ে ;

    সমস্ত জলীয় গান বাষ্পীভূত হয়ে যায় তবু

    এমন সময়ে তুমি হে সমুদ্রমৎস্য, তুমি… তুমি…

    কিংবা দ্যাখো, ইতস্তত অসুস্হ বৃক্ষেরা

    পৃথিবীর পল্লবিত ব্যপ্ত বনস্হলী

    দীর্ঘ দীর্ঘ ক্লান্ত শ্বাসে আলোড়িত করে

    তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে যার ভূমিতে দূরে দূরে

    চিরকাল থেকে ভাবে মিলনের শ্বাসরোধী কথা।

    আর যদি নাই আসো

    আর যদি নাই আসো, ফুটন্ত জলের নভোচরী

    বাষ্পের সহিত যদি বাতাসের মতো নাই মেশো,

    সেও এক অভিজ্ঞতা ; অগণন কুসুমের দেশে

    নীল বা নীলাভবর্ণ গোলাপের অভাবের মতো

    তোমার অভাব বুঝি, কে জানে হয়তো অবশেষে

    বিগলিত হতে পারো ; আশ্চর্য দর্শন বহু আছে

    নিজের চুলের মুগ্ধ ঘ্রাণের মতন তোমাকেও

    হয়তো পাইনি আমি, পূর্ণিমার তিথিতেও দেখি

    অস্ফূট লজ্জায় ম্লান ক্ষীণ চন্দ্রকলা উঠে থাকে,

    গ্রহণ হবার ফলে, এরূপ দর্শন বহু আছে

    জীবনানন্দ দাশ-এর ‘রাত্রি’ ( সাতটি তারার তিমির ) কবিতাটি এবার পড়ে দেখি। দেখবো যে জীবনানন্দ কলকাতা শহরকে পর্যবেক্ষণ করে কবিতাটি লিখেছেন ; বিনয় মজুমদারের অবলোকন পদ্ধতির ( act of observing, viewing, noticing from personal experience ) সঙ্গে জীবনানন্দের পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির ( act of seeing or looking at and act of ruminating historical events ) পার্থক্য আছে। বিনয় নিজের কবিতার খাতায় মার্জিনে যে নোটগুলো নিতেন, ‘ফিরে এসো, চাকা’ লেখার সময়ে, সেগুলো প্রধানত ছিল তাঁর ব্যক্তিজীবনে পাওয়া অভিজ্ঞতাগুলো, যখন কিনা জীবনানন্দ অন্য খাতায় নোট নিয়ে রাখতেন বাক্যের, শব্দবন্ধের, চিত্রকল্পের, যেগুলোর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিজীবনের তুলনায় বাইরের জগতের বিষয়বস্তু বা ঘটনা এবং পৃথিবীর লুপ্ত সভ্যতাগুলোর স্মৃতিচারণ বেশি। জীবনানন্দের ‘পর্যবেক্ষণ’ আর বিনয়ের ‘অবলোকন’ এর সূক্ষ্ম তফাত। ‘রাত্রি’ কবিতাটি :

    হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল ;

    অথবা সে হাইড্র্যাণ্ট হয়তো বা গিয়েছিল ফেঁসে।

    এখন দুপুর রাত নগরীতে দল বেঁধে নামে ;

    একটি মোটরকার গাড়লের মতো গেল কেশে

    অস্হির পেট্রল ঝেড়ে — সতত সতর্ক থেকে তবু

    কেউ যেন ভয়াবহভাবে প’ড়ে গেছে জলে।

    তিনটি রিকশ ছুটে মিশে গেল শেষ গ্যাস ল্যাম্পে

    মায়াবীর মতো জাদুবলে।

    আমিও ফিয়ার লেন ছেড়ে দিয়ে — হঠকারিতায়

    মাইল মাইল পথ থেঁটে — দেয়ালের পাশে

    দাঁড়ালাম বেণ্টিঙ্ক স্ট্রিটে গিয়ে — টেরিটিবাজারে ;

    চীনেবাদামের মতো বিশুষ্ক বাতাসে।

    মদির আলোর তাপ চুমো খায় গালে।

    কেরোসিন কাঠ, গালা, গুনচট, চামড়ার ঘ্রাণ

    ডাইনামোর গুঞ্জনের সঙ্গে মিশে গিয়ে

    ধনুকের ছিলা রাখে টান।

    টান রাখে মৃত ও জাগ্রত পৃথিবীকে।

    টান রাখে জীবনের ধনুকের ছিলা।

    শ্লোক আওড়ায়ে গেছে মৈত্রেয়ী কবে।

    রাজ্য জয় করে গেছে অমর আত্তিলা।

    নিতান্ত নিজের সুরে তবুও তো উপরের জানালার থেকে

    গান গায় আধো জেগে ইহুদী রমণী ;

    পিতৃলোক হেসে ভাবে, কাকে বলে গান —

    আর কাকে সোনা, তেল, কাগজের খনি।

    ফিরিঙ্গি যুবক কটি চলে যায় ছিমছাম।

    থামে ঠেস দিয়ে এক লোল নিগ্রো হাসে ;

    হাতের ব্রায়ার পাইপ পরিষ্কার করে

    বুড়ো এক গরিলার মতন বিশ্বাসে।

    নগরীর মহৎ রাত্রিকে তার মনে হয়

    লিবিয়ার জঙ্গলের মতো।

    তবুও জন্তুগুলো আনুপূর্ব — অতিবৈতনিক

    বস্তুত কাপড় পরে লজ্জাবশত।

    শার্ল বদল্যারের মতন জীবনানন্দও একজন পথচর ছিলেন, নিশাচরও, এবং তাঁর ‘পথ হাঁটা’ কবিতাটি পড়লে তা স্পষ্ট হবে :

    কী এক ইশারা যেন মনে রেখে একা-একা শহরের পথ থেকে পথে

    অনেক হেঁটেছি আমি, অনেক দেখেছি আমি ট্রাম বাস সব ঠিক চলে

    তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হয়ে চলে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে

    সারারাত গ্যাসলাইট আপনার কাজ বুঝে ভালো করে জ্বলে।

    কেউ ভুল করেনাকো — ইঁট বাড়ি সাইনবোর্ড জানালা কপাট ছাদ সব

    চুপ হয়ে ঘুমাবার প্রয়োজন বোধ করে আকাশের তলে।

    একা একা পথ হেঁটে এদের গভীর শান্তি হৃদয়ে করেছি অনুভব ;

    তখন অনেক রাত — তখন অনেক তারা মনুমেন্ট মিনারের মাথা

    নির্জনে ঘিরেছে এসে ; মনে হয় কোনোদিন এর চেয়ে সহজ সম্ভব

    আর দেখেছি কি ? এক রাশ তারা আর মনুমেন্ট ভরা কলকাতা ?

    চোখ নিচে নেমে যায় — চুরুট নীরবে জ্বলে — বাতাসে অনেক ধুলো খড় ;

    চোখ বুজে একপাশে সরে যাই — গাছ থেকে অনেক বাদামি জীর্ণ পাতা

    উড়ে গেছে ; বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতরে

    কেন যেন ; আজো আমি জানিনাকো হাজার হাজার ব্যস্ত বছরের পর।

    বিনয় মজুমদার পথচর ছিলেন না, নিশাচর তো নয়ই। মাঝবয়সে আসঙ্গ-উন্মুখ বিনয় যৌনপল্লীতে ( যাকে তিনি বলেছেন তাঁর ‘বৃন্দাবন’ ) হয়তো রাধার কাছেও, তিনি যেতেন ‘বিশাল দুপুরবেলায়’, ‘প্রকাশ্য দিনের বেলা’। ‘বাল্মীকির কবিতা’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৬ সালে, তার মানে তখন তাঁর বয়স ৪২। তার আগে ১৯৬৬ সালে তিনি লিখেছেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ নামে আদিরসাত্মক কবিতাটি, তখন তাঁর বয়স ৩২, যে বয়সে পঞ্চাশ দশকের কয়েকজন কবি সোনাগাছি যাওয়া আরম্ভ করেন। আমি তাঁদের সেই পাড়ায় দেখেছি বলে জানি। আমার হাংরি মামলার উকিলের বাড়ি ছিল ঠিক অবিনাশ কবিরাজ লেনের উল্টোদিকে, এবং উকিলের জানালা দিয়ে সবই দেখা যেতো।

    কল্পনা নয়, বাস্তব জীবন থেকেই বিনয় তুলে এনেছেন তাঁর কবিতা ও গল্পের রসদ। ঠাকুরনগরের শিমুলপুরের গ্রামে চায়ের ঠেকে আড্ডা দিতে দিতে যা চোখে পড়ত, সেগুলোই উঠে আসত বিনয় মজুমদারের কবিতায় এবং গদ্যকাহিনিতে। এই পর্বে বিনয় তাঁর দিনপঞ্জীর কাব্যায়ন করতেন : “দিনপঞ্জী লিখে লিখে এতোটা বয়স হলো/দিনপঞ্জী মানুষের নিকটতম লেখা।” যৌনপল্লীতে রাধার কাছে দিনের বেলায় যাবার স্বীকৃতি রয়েছে তাঁর ‘চাঁদের গুহার দিকে’ কবিতায়:-

    চাঁদের গুহার দিকে নির্নিমেষে চেয়ে থাকি, মেঝের উপরে

    দাঁড়িয়ে রয়েছে চাঁদ, প্রকাশ্য দিনের বেলা, স্পষ্ট দেখা যায়

    চাঁদের গুহার দিকে নির্নিমেষে চেয়ে থাকি, ঘাসগুলো ছোটো করে ছাঁটা।

    ঘাসের ভিতর দিয়ে দেখা যায় গুহার উপরকার ভাঁজ।

    গুহার লুকোনো মুখ থেকে শুরু হয়ে সেই ভাঁজটি এসেছে

    বাহিরে পেটের দিকে। চাঁদ হেঁটে এসে যেই বিছানার উপরে দাঁড়াল

    অমনি চাঁদকে বলি, ‘তেল লাগাবে না আজ’, শুনে চাঁদ বলে

    ‘মাখব নিশ্চয়, তবে একটু অপেক্ষা কর’ বলে সে অয়েলক্লথ নিয়ে

    পেতে দিল বিছানায়, বালিশের কিছু নিচে, তারপর হেঁটে এসে চলে গেল

    নিকটে তাকের দিকে, একটি বোতল থেকে বাম হাতে তেল নিয়ে এল

    এসে তেল মাখা হাতে ভুট্টাটি চেপে ধরে।

    যখন ধরল তার আগেই ভুট্টাটি খাড়া হয়ে গিয়েছিল।

    চাঁদ আমি দুজনেই মেঝেতে দাঁড়ানো মুখোমুখি

    এক হাতে ঘসে ঘসে ভুট্টার উপরে চাঁদ তেল মেখে দিল।

    বিনয়ের দৃষ্টিপথে ব্যবিলন, বিম্বিসার, অশোক, মালয় সাগর, আত্তিলা, বিদিশা, শ্রাবস্তী, দারুচিনি দ্বীপ, লিবিয়ার জঙ্গল ইত্যাদি পড়ে না। বিনয়ের কাছে গ্রামের তুচ্ছ জিনিস আর সামান্য চাষি বা দোকানিও গুরুত্বপূর্ণ, তিনি সকলের নাম জানেন, চেনেন। বিনয় লিখেছেন : “সকলকিছুর মানে আছে, মানে থাকে, মানে নেই এরকম কিছু/স্বাভাবিক প্রকৃতিতে কখনো সম্ভব নয়, সৃষ্টি হলে মানে হয়ে যায়।” ‘বিনয় মজুমদারের ছোটগল্প’ বইটিতে তাঁর গ্রামের মানুষজনদের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সূত্র পাই। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় চম্পাহাটি গ্রামে জমিজমা কিনে বেশ কয়েক বছর ছিলেন, অথচ তাঁর গল্পগুলোয় সেই আন্তরিকতা পাওয়া যায় না যা বিনয়ের ছোটগল্পের চরিত্রদের সঙ্গে বিনয়ের কথাবার্তায় পাওয়া যায়। শ্যামল একটি সাহিত্যিক দূরত্ব গড়ে চরিত্রগুলোকে উপস্হাপন করেছেন।

    জীবনানন্দ সম্পর্কে বিনয় মজুমদারের শ্রদ্ধা ১৯৯৯ সালে মারুফ হোসেনের সঙ্গে এই প্রশ্নোত্তরে ফুটে ওঠে :

    প্রশ্ন : আপনার মতে বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ কবিতা কোনটি ?

    বিনয় : জীবনানন্দের ‘সমারূঢ়’ অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা। ( বিনয় আবৃত্তি করেন )

    বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটি কবিতা

    বলিলাম ম্লান হেসে ; ছায়াপিণ্ড দিল না উত্তর ;

    বুঝিলাম সে তো কবি নয় — সে যে আরূঢ় ভণিতা;

    পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের ‘পর

    বসে আছে সিংহাসনে — কবি নয় — অজর, অক্ষর

    অধ্যাপক ; দাঁত নেই — চোখে তার অক্ষম পিচুটি ;

    বেতন হাজার টাকা মাসে — আর হাজার দেড়েক

    পাওয়া যায় মৃত সব কবিদের মাংস কৃমি খুঁটি ;

    যদিও সে-সব কবি ক্ষুধা প্রেম আগুনের সেঁক

    চেয়েছিল — হাঙরের ঢউয়ে খেয়েছিল লুটোপুটি।

    প্রশ্ন : হাঙর মানে ?

    বিনয় : হাঙর মানে মনস্তত্ববিদগণ, হাঙর মানে ডাক্তারগণ, হাঙর মানে পুলিশগণ, হাঙর মানে মন্ত্রীগণ, হাঙর মানে পুরোহিতগণ। এই হাঙরদের পাল্লায় পড়ে প্রাণ বেরিয়ে যাবার যোগাড়। বহু কবি মারা গিয়েছেন এদের দুর্ব্যবহারের জন্য। ভেবে দ্যাখো আমরা পাঁচ দশকে যারা কবিতা লিখতাম তাদের মধ্যে বর্তমানে কজন টিকে আছে ? জনা দশেক। তাও নয়। হাঙরেরা দিয়েছে বাকিগুলোকে শেষ করে। ফলে ভয়ে ভয়ে লেখা বন্ধ করে দিয়েছি। এখন একটু জ্বলাতন কম আছে। তবে মরে গেলেই মুক্তি পাব। আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে/আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ভাসে ভাসে।

    এখানে মনে করিয়ে দিই যে বিনয় যাদের দ্বারা সীমাবদ্ধ হয়েছেন, বা যারা তাঁকে অসীমের দিকে যাত্রায় বাধা দিয়েছেন, তাদের বলছেন হাঙর, মনস্তত্ববিদরা, ডাক্তাররা, পুলিশরা, এমনকি গায়ত্রীর পরিবার যে পুরোহিতের পরিবার ছিল, সেই পরিবারকেও। সময় ও বয়সের সঙ্গে কিশোরী গায়ত্রী ক্রমশ আবছা হয়ে বিনয়ের কাছে হয়ে উঠেছেন বিমূর্ত ঈশ্বরী।

    ২০০৩ সালে প্রৌঢ়া গায়ত্রী চক্রবর্তীকে নিয়ে এই কবিতাটি লিখেছিলেন বিনয় মজুমদার, কবিতাটি থেকে অনুমান হয় যে সেই কিশোরী গায়ত্রী যে তাঁকে আকর্ষণ করেছিল, সে তার স্মৃতিতে আর নেই, চাকা আর ফেরেনি :

    আমরা দুজনে মিলে

    আমরা দুজনে মিলে জিতে গেছি বহুদিন হলো।

    তোমার গায়ের রঙ এখনও আগের মতো, তবে

    তুমি আর হিন্দু নেই, খৃষ্টান হয়েছ।

    তুমি আর আমি কিন্তু দুজনেই বুড়ো হয়ে গেছি।

    আমার মাথার চুল যেরকম ছোটো করে ছেটেছি এখন

    তোমার মাথার চুলও সেইরূপ ছোট করা ছাটা,

    ছবিতে দেখেছি আমি, দৈনিক পত্রিকাতেই ; যখন দুজনে

    যুবতী ও যুবক ছিলাম

    তখন কী জানতাম বুড়ো হয়ে যাব ?

    আশা করি বর্তমানে তোমার সন্তান নাতি ইত্যাদি হয়েছে।

    আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে,

    তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে,

    চিঠি লিখব না।

    আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায়।

    ( হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ )

    ২০১৩ সালে কলকাতায় যে লিটেরারি ফেস্টিভাল হয়েছিল, সেখানে বাংলা কবিতা আলোচনাকালে বিনয়ের কবিতাকে গায়ত্রী চিহ্ণিত করেছিলেন ‘জ্ঞানতত্ত্বের মহাকাব্য’ এবং ‘এপিসটেমলোজিকাল এপিক’ হিসাবে। গায়ত্রী পরবর্তীকালে লিখেছিলেন ‘ক্যান দি সাবলটার্ন স্পিক’ ; আমি বলব এর উত্তর তো বিনয় মজুমদার, যিনি সাবলটার্ন বর্ণের বলে কবিতা রচনা সত্ত্বেও জীবদ্দশায় সেরকম গুরুত্ব পাননি, যেমন পেয়েছেন তাঁর সমসাময়িক উচ্চবর্ণের কবিরা।

    বিনয় যে বহুবার মানসিক চিকিৎসালয়ে ছিলেন এবং তাঁকে অনেকে পাগল মনে করে, তা তাঁর চেতনায় ক্ষতের মতন থেকে গিয়েছিল। অন্যের অস্বাভাবিক আচরণকে কেন পাগলামি বলে হবে না তা তিনি লক্ষ্য করেছেন এবং লিখেছেন। ‘কয়েকটি কবিতা’র পাঁচ সংখ্যক কবিতায় কলকাতা কফি হাউসে দুটি যুবতীর অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ে এই রচনাটি লিখেছিলেন বিনয় :

    আমাদের কফি হাউসে

    অন্তত দেড়শো জন লোকের সামনে বসে

    একজন যুবতী একজন যুবকের হাতে হাত বোলায়

    আর রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনায় — ‘তুমি কেমন করে

    গান করো হে গুণী…’

    যুবতীটি সবার সামনেই যুবকটির হাতে বহুক্ষণ যাবৎ

    হাত বোলায় আর বোলায় আর বলে —’আপনি আমার

    দাদার মতো।’

    এবং যুবতীর বোন আরেক যুবতী কফি হাউসের

    টেবিলের নীচে যুবকটির পা দুই পা দিয়ে

    জড়িয়ে ধরে সবার সামনেই, কফি

    হাউস ভর্তি লোকের সামনেই। এ করে প্রত্যহ।

    অর্থাৎ পাঠকগণ আমার মতে সব মেয়েই একটি

    ‘মানসিক হাসপাতাল’

    ( ছোটো ছোটো গদ্য ও পদ্য, জানুয়ারি ২০০৭ )

    সাত

    ‘ফিরে এসো, চাকা, বইটির অসাধারণ কবিতাগুলো সত্বেও বিনয় মজুমদারকে সেই ধরণের গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিল না, যেমন শক্তি-সুনীল শক্তি-সুনীল ধুয়ো তুলে একটা প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মে তাঁদের দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছিল। স্বাভাবিক যে নিজের মধ্যে পুষে রাখা অপরত্ববোধ বা আদারনেস বিনয় মজুমদারের মানসিকতায় প্রগাঢ় প্রভাব ফেলে থাকবে। আশ্চর্য যে ওই সময়ের কবিদের তরুণ বয়সের অজস্র ফোটো পাওয়া যায় অথচ বিনয়ের তরুণ বয়সের ফোটো দুষ্প্রাপ্য। বিনয় মজুমদারের প্রায় সমস্ত ফোটোই এমন যে যাঁরা ফোটোগুলো তুলেছেন তাঁরাও প্রমাণ করতে চাইছেন যে বিনয় একজন “অপর’’– উস্কোখুস্কো চুলের বিনয়, লন্ঠন হাতে চলেছেন বিনয়, মাথায় মাফলার জড়িয়ে বিনয়, হাতে বালতি ঝোলানো বিনয়, খালি গায়ে বেঞ্চে বসে বিনয়, ইত্যাদি। আর্যনীল মুখোপাধ্যায় এমনকি লিখেছেন যে বিনয় ছিলেন ‘একসেনট্রিক’ ; আমি বলব বিনয় ছিলেন ‘একলেকটিক’। বিনয় তো সাহিত্য সভায় কবিতা পাঠও করতেন অথচ সেই সময়ের বিনয়ের ফোটো পাওয়া যায় না কেন ? শক্তি-সুনীল-শরৎ এমনকি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ফোটোও পাওয়া যায়, কিন্তু গায়ত্রীর প্রেমিক যুবক বিনয়ের ফোটো বিরল। অপর করে দেয়া বা ‘আদারিং’ শব্দটি গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের সৃষ্ট।

    সবচেয়ে বিস্ময়কর, বিনয় মজুমদারের সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা নিয়ে কোনো লোভ ছিল না, যেমনটা ছিল তাঁর দশকের অধিকাংশ কবি-লেখকের, এবং পরের প্রতিটি দশকের কবি-লেখকদের মধ্যে। পুরস্কার, সম্বর্ধনা, রেডিও-টেভিতে রঙিন জামা পরে হাত-পা নাড়াতে দেখা যায়নি তাঁকে। আনন্দবাজার আর দেশ পত্রিকার করিডরে কোনোকালেই ঘুরঘুর করতে যাননি। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন যে তাঁকে কোনঠাশা করে দেবার প্রয়াস চলছে। তিনি অনুমান করেছিলেন যে তাঁর পাণ্ডুলিপি সেইভাবে সংরক্ষিত হবে না যেভাবে খ্যাতনামা কবিদের পাণ্ডলিপি সংরক্ষণ করা হয়। “অঘ্রাণের অনুভূতিমালা” কাব্যগ্রন্হের পাণ্ডুলিপি যাতে সংরক্ষণ করা হয় তাই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও ওয়েস্ট বেঙ্গল আর্কাইভকে অনুরোধ করেছিলেন। তারা প্রত্যাখ্যান করলে পাঠিয়ে দেন ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে। পঁচিশ বছর পর একটা চিঠি লিখে বিনয় মজুমদার জানতে পারেন যে পাণ্ডুলিপিটি সেখানে সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

    গণিত নিয়ে তাঁর গবেষণা সম্পর্কে ১৯৭২ সালে দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে দেয়া সাক্ষাৎকালে বিনয় মজুমদার জানিয়েছিলেন, “১৯৬৩ সালের কিছু চিন্তাকে আমি ভাবলাম মৌলিক আবিষ্কার এবং সেগুলোকে আমি লিখে ফেললাম। লিখে ফেলে প্রথমে আমি ম্যাকমিলান কোম্পানিকে দিয়ে বললাম যে, ভাই দ্যাখ তো তোমরা ছেপে দিতে পারো কিনা পুস্তকাকারে। তবে শেষ পর্যন্ত ছাপা হয়নি, তার কারণ আমি যা শুনেছিলাম, তা হল যে ওদের অধিকাংশই পাঠ্যপুস্তক ছাপার দিকে নজর। একদম একেবারে যা কিনা মৌলিক আবিষ্কার, যা কোথাও পাঠ্য নেই, সেটা ছাপতে ওদের অসুবিধা হয়, বিক্রির ব্যাপার রয়েছে, বিক্রি হয় না। যাই হোক পরে সেই ম্যানাসক্রিপ্ট, ১৯৬৩ সালের ব্যাপার বলছি, ১৯৬৪ সালের শেষ দিকে ব্রিটিশ মিউজিয়াম আমার কাছ থেকে অ্যাকসেপ্ট করল। আমি পাঠিয়েছিলাম, ওরা বলল, হ্যাঁ, আমরা আপনার পাণ্ডুলিপিখানাকে যত্নের সঙ্গে প্রিজার্ভ করছি, আমাদের মিউজিয়ামে রেখে দিচ্ছি। আমি নিশ্চিন্ত হলাম। সেই পাণ্ডুলিপিখানাকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রিজার্ভ করে রেখেছে। এর মাস কয়েক পর আমি লিখলাম যে

    আমার কাছে তো কোনও কপি নেই ভাই, আমার একটা কপি দরকার। ওরা তখন পুরো ম্যানাসক্রিপ্টকে, ধরো একশো পৃষ্ঠা হবে, সেটাকে ওরা পুরো ফোটোকপি করে, ওই একশো পৃষ্ঠা আমাকে পাঠিয়ে দিলো। আমি সেই ফোটোকপিগুলোকে ভালো করে ভাঁজ করে বাঁধালাম, সুন্দর চামড়া দিয়ে বাঁধিয়ে আমাদের ন্যাশানাল লাইব্রেরি, ভারত সরকারের লাইব্রেরি, ওখানে জমা দিয়ে দিলাম। সে হচ্ছে তোমার ধরো ১৯৬৫ সালের গোড়ার দিকের কথা। আমার পাণ্ডুলিপি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে যে কপি রয়েছে, সেই কপির ভেতরে বারংবার ব্রিটিশ মিউজিয়ামের স্ট্যাম্প মারা রয়েছে। ওই স্ট্যাম্প দেখে ন্যাশানাল লাইব্রেরি ওটা অ্যাকসেপ্ট করল। আমার তারণা ওই পাণ্ডুলিপিখানা এক মৌলিক আবিষ্কার, গণিতের মৌলিক আবিষ্কার। Interpolation Series and Geometrical Analysis and United Analysis Roots of Calculus.” তবে ? যিনি এইভাবে নিজের রচনাবলী নিয়ে চিন্তা করতে পারেন তাঁকে কলকাতার সাহিত্যিকরা ‘পাগল’ হিসেবে দেগে দিল কেন ?

    ১৯৭২ সালে ‘গল্পকবিতা’ পত্রিকায় গণিত ও কবিতা নিয়ে দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেয়া বিনয়ের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। বিনয় তখন কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন, এবং তার কারণ তিনি জানিয়েছিলেন যে গণিত তাঁর মস্তিষ্ক দখল করে আছে। প্রশ্নোত্তরের প্রাসঙ্গিক অংশটুকু পড়লে বিনয়ের সেই সময়কার ভাবনাচিন্তা কোন পথে প্রবাহিত হচ্ছিল তা স্পষ্ট হবে।

    প্রশ্ন : কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে যে জীবিত খুব কম জনই আপনার মতো কবিতার এতো ভেতরে যেতে পেরেছেন। আপনি খুব সার্থক এবং সাবলীলভাবে, বলা যেতে পারে, কবিতার অতো ভিতরে গিয়েও কেন কবিতা ছেড়ে দিলেন এটা হচ্ছে প্রশ্ন। আর কবিতা লেখা ছেড়ে দেওয়ার আগে পর্যন্ত আপনি নিশ্চয়ই ভেবেছেন যে এই এই কারণে, এই এই অসুবিধে হচ্ছে আমার কবিতা লেখার জন্য — যার ফলে আমি কবিতা লেখা ছেড়ে দেব। আমরা সেই ভেতরের কারণটা জানতে চাইছি।

    বিনয় : ভেতরের ?

    প্রশ্ন : ভেতরের কারণ বলতে আপনার মনের ভেতরে যে কারণটা ছিল, যেটা আপনাকে কবিতা লেখা ছেড়ে দিতে প্রণোদিত করেছে। এই আর কি !

    বিনয় : কিছুদিন আগে তুমি আমাকে লিখেছিলে যে ‘আমার ঈশ্বরীকে’ বইয়ের পিছনে গণিত গ্রন্হের বিজ্ঞাপন দেখেছ তুমি। শুধু ‘আমার ঈশ্বরীকে’ কেন, অনেকগুলো বইয়ের ভিতরে বিজ্ঞাপন আছে। ‘আমার ঈশ্বরী’ বইয়ের বিজ্ঞাপনও আছে। ‘ঈশ্বরীর’ বলে আমার একটা বই আছে, তার ভিতরেও বিজ্ঞাপন আছে। ‘ঈশ্বরীর কবিতাবলী’ বলে আরেকখানা বই আছে, তার ভিতরেও গণিতগ্রন্হের বিজ্ঞাপন রয়েছে। এমনকি এক ফর্মার একটি ছোটো পুস্তিকা বেরিয়েছিল ‘অধিকন্তু’, সেই ‘অধিকন্তু’র ভিতরেও আমার লেখা গণিত গ্রন্হের বিজ্ঞাপন রয়েছে। এই গণিতের জন্য আমি কবিতা লেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম।

    প্রশ্ন : কিন্তু গণিত এবং কবিতা কি পাশাপাশি চালানো যেত না ? আপনি চেষ্টা করলে পারতেন। সকলের পক্ষে সম্ভব না হলেও। এবং গণিত ও কবিতার মধ্যে কোথাও মিলও তো আছে। হায়ার ম্যাথমেটিকসের কথা আমি বলছি, আমি যতদূর শুনেছি অবশ্য।

    বিনয় : কথাটা অবশ্য সত্য। গণিত জিনিসটা ইচ্ছা করলে আত্মস্হ করা যায় না, আবার ইচ্ছা করলে এড়ানোও যায় না। মাথার ভিতরে যখন চিন্তা আসে, গণিত বিষয়ক চিন্তা, তখন তাকে ফেলবার উপায় থাকে না। চিন্তাগুলো বার বার আসতে থাকে। গণিতের নানা সূত্র, গণিতের নানা দর্শন, গণিতের নানা প্রকৃতি মাথার ভিতরে আসতে থাকে, সেটাকে ইচ্ছা করলে বন্ধ করা যায় না। কত সময় মাসের পর মাস মাঝে-মাঝে মাঝে-মাঝেই আসতে থাকে। এইভাবে গণিত একজনের চিন্তাকে, এবং আমার চিন্তাকে আত্মসাৎ করে নিয়ে বসে আছে। আমি এই যে বাড়িতে বসে থাকি, কখনও ঘুরে বেড়াই, যখনই একটু-একটু একা থাকি, অন্য মনে, তখনই দেখা যায় মাথায় গণিতের বিষয়ে চিন্তা আসছে। এই ভাবে আসা শুরু করেছে এমন নয়, বহু-বহু অনেক বছর আগে থেকেই, ১৯৫৬-৫৭ সাল থেকেই বলা যেতে পারে। তারপর প্রায়ই আসে মাঝে-মাঝে, আর আসতে-আসতে যখন কোনও চিন্তাকে মনে হয়, গণিত বিষয়ক চিন্তাকে মনে হয়, যে এটা লিখে রাখা উচিত, কাজে লাগতে পারে, আমার কিংবা অপরের যদি কাজে লাগে, তখন তাকে লিখেও রাখতে হয়। এইভাবে গণিতের চিন্তা আমার সমস্ত চিন্তার ভিতরে একটা প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে আছে দীর্ঘকাল থেকে।

    প্রশ্ন : গণিতের বিষয় নিয়ে নতুন করে আপনি ভাবতে শুরু করেছেন আবার তাহলে !

    বিনয় : না, কবিতা আমি লিখতাম, এটা ঠিক, কিন্তু সেটা আমার গণিত চিন্তার ফাঁকে-ফাঁকে, এবং তুমি আমার কবিতাগুলো পড়লে দেখতে পাবে যে অধিকাংশই গাণিতিক কবিতা।

    প্রশ্ন : হ্যাঁ, সেটা আমি লক্ষ্য করেছি।

    বিনয় : এটা তুমি লক্ষ্য করেছ, ভালো করেছ। বইগুলি এখনও সব পাণ্ডুলিপি আকারে পড়ে আছে। গণিতের কোনও গ্রন্হ আমার ছাপা হয়নি, সমস্ত গ্রন্হই পাণ্ডুলিপি আকারে পড়ে আছে। এখন এই বর্তমানে আমায় তো সারাক্ষণ গণিত ভেবেই কাটাতে হয়। না ভেবে উপায় থাকে না, মাথায় এসে উদিত হয়, যাকে বলে আবির্ভূত হয়। সারাক্ষণ। অন্য কোনও চিন্তা করতেই পারি না। এই চিন্তার উপরে, এই চিন্তার আসা যাওয়ার উপরে, আমার নিজের কোনও হাত নেই। নিজের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। মাথায় আসতে থাকে সারাবেলা, ফলে কবিতা লেখার কথা ভাবতেই পারি না, কবিতা আর মাথায় এখন আসেই না। তুমি নিজে কবি, কবিতার আবির্ভাব কী করে হয় নিজের মনে বুঝতেই পারো। নিশ্চয়ই টের পাও কবিতা কী করে আবির্ভূত হয়। সে ইচ্ছে করলে যে কবিতা আবির্ভূত হল সেরকমও নয়, আবার ইচ্ছে করে কবিতা এড়িয়ে গেলে সেরকমও নয়। কবিতার যখন আসার সময় তখন এসে যায়। গণিতও সেরকম, যখন আসার সময় তখন এসে যায়। আমার মাথায় এখন শুধু গণিতই আসছে, অন্য কিছু চিন্তা করার অবকাশ থাকছে না। ”

    ‘গ্রন্হি’ পত্রিকার জন্য ১৪১২ বঙ্গাব্দের সাক্ষাৎকারে চন্দন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিনয় মজুমদারের বিজ্ঞানভাবনা নিয়ে যে কথাবার্তা হয়েছিল, তা পড়লে বিনয়ের একটি সামগ্রিক ছবি তৈরি হয় :-

    প্রশ্ন : একজন কবিতা পাঠক হিসেবে যখন কবি বিনয় মজুমদারের মহত্ব বা uniqueness-এর কারণ খুঁজতে বসি, তখন মনে হয় বৈজ্ঞানিক মনন, বৈজ্ঞানিক যুক্তিপদ্ধতি আর বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে কাব্যরসে আগাগোড়া ডুবিয়ে হাজির করার অভূতপূর্ব গুণটিই আপনার কাব্য-সার্থকতার জন্য এক নম্বর কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। ‘ফিরে এসো, চাকা’র খুব জনপ্রিয় কয়েকটি লাইন তুলে নিচ্ছি উদাহরণ হিসেবে। ‘মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়’– এই লাইনের শিরদাঁড়া একটি বৈজ্ঞানিক সাধারণ জ্ঞান বা যুক্তিসিদ্ধ পর্যবেক্ষণ ছাড়া আর কিছু তো নয়। অথচ লাইনটি একটি শ্রেষ্ঠ পংক্তি হয়ে উঠল কীভাবে ? ‘প্রকৃত’ শব্দের প্রয়োগের জন্য। ‘প্রকৃত’ শব্দটি কাব্যগুণের দ্যোতক হিসেবে কাজ করছে এখানে। একই ভাবে, ‘একটি উজ্বল মাছ…পুনরায় ডুবে গেল’, এই দীর্ঘ বিখ্যাত কবিতার লাইন মূলত বিধৃত করেছে ক্লাস নাইনের ফিজিক্স জ্ঞানকে, একটি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিশিয়ে। আমরা সবাই পড়েছি জলের রঙ নেই। গভীর জলের মধ্যে যখন আলোকরশ্মি প্রবেশ করে, তখন রশ্মিগুচ্ছ বর্ণালীতে বিশ্লিষ্ট হয়। বর্ণালির সাতটি রঙের সাতটি বিভিন্ন চ্যুতিকোণ আছে। জলের গভীরতার ওপর নির্ভর করে কোনও নির্দিষ্ট রঙের চ্যুতি আমাদের চোখের অবস্হানের সঙ্গে মিলে-মিশে যায়। ফলে জলকে আমরা সেই রঙেই রঙিন দেখি। আপনি দৃশ্যত সুনীল না লিখে দৃশ্যত সবুজ বা দৃশ্যত তমস — যেখানে সব রঙ শোষিত — লিখতে পারতেন। কিন্তু লাইনটায় কবিতা সৃষ্টি হল ‘প্রকৃত প্রস্তাবে’ শব্দবন্ধের আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে। বিজ্ঞানভাবনার হাড়কাঠামোর ওপর সৌন্দর্যের মাংসত্বক বসিয়ে দিলো সে। এইরকম নানা উদাহরণ আছে। যেমন মশা উড়ে গেলে তার এই উড়ে যাওয়া ‘ঈষৎ সঙ্গীতময় হয়ে থাকে’ সেই বিষয়টা। এখন কথা হচ্ছে বৈজ্ঞানিক মননকে এভাবে বাংলা কবিতায় তো কেউ আনেননি ?

    বিনয় : তোমাদের এই কথাটা ভুল। প্রাচীনকালেও কবিরা বিজ্ঞানভাবনা থেকে কাব্যের আঙ্গিক সৃষ্টি করে নিয়েছেন। আমি যে খুব নতুন কিছু করছি তা নয়। যেমন ধরো কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব কাব্য’। একটি দৃশ্যে যখন হরপার্বতীর বিয়ে হচ্ছে, সেখানে কালিদাস লিখলেন, পৃথিবীর চারদিকে যেমন আলো আর অন্ধকার ক্রমাগত ফিরে-ফিরে আসে, তেমনি শিব আর উমা আগুনের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছেন। এটা তো বিজ্ঞানই। অথবা, এই সংস্কৃত শ্লোকটি লক্ষ্য করো — ‘হংসের্যথা ক্ষীরম অম্বু মধ্যাত’। মানে হল, হাঁস যেমন অম্বু অর্থাৎ জলের ভেতর থেকে ক্ষীর বেছে নেয়। তো, এটাও তো সেই তোমার ভাষায় যুক্তিসিদ্ধ বা বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে কাব্যে প্রকাশ করা। তাই নয় কি ? আমিও লিখেছি ‘ব্রোঞ্জের জাহাজ আছে যেগুলি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয় না। এরূপ জাহাজে বৈজ্ঞানিক সামুদ্রিক গবেষণা করে।’ এই কবিতাটি ‘গায়ত্রী’ কাব্যগ্রন্হে আছে। ‘ফিরে এসো, চাকা’তে নেওয়া হয়নি।

    প্রশ্ন : বেশ। কিন্তু পরের দিকের কাব্যগ্রন্হে আর একটা জিনিস লক্ষ্য করা গেল। বিজ্ঞান বা অঙ্কের কোনো কনসেপ্টকে আপনি মানবজীবনের কোনও ঘটনার মতো উল্লেখ করেছেন কবিতায়। বা বহু জায়গায় অঙ্কের সূত্র দিয়ে মানুষের জীবনকে ব্যাখ্যা করতে চাইছেন। বিজ্ঞান ও অঙ্কের সূত্রেরা এভাবে রক্তমাংসে জীবিত হয়ে উঠছে।

    বিনয় : মনুষ্যীকরণ। মনুষ্যীকরণ। আর কিছুই না। সেই সময়ে বিজ্ঞানের বেশ কিছু বই অনুবাদ করতে হয়েছিল আমাকে। বইগুলো মন দিয়ে পড়ে দেখলাম, বৈজ্ঞানিক সত্যদের মানুষের জীবনের সঙ্গে মেলানো যায়। এবং এটা কবিতা লেখার এক নতুন পদ্ধতি হতে পারে।

    প্রশ্ন : সীমা, অসীম, কল্পনা, ব্যোম, রেখা ইত্যাদি জ্যামিতিক ধারণাগুলিকে আপনি মানব বা মানবীচরিত্র দিতে লাগলেন কবিতায়। জ্যামিতির ওপরও আপনার অসম্ভব টান লক্ষ্য করি।

    বিনয় : ঠিক তাই। আচ্ছা আমি হচ্ছি ইঞ্জিনিয়ারিঙের ছাত্র। একটা কথা আছে, ড্রইং ইজ দি ল্যাঙ্গুয়েজ অফ ইঞ্জিনিয়ার্স। আমি যদি একটি ড্রইং এঁকে পাঠিয়ে দিই তবে পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তেই একজন ইঞ্জিনিয়ার সেটি দেখে বুঝতে পারবে আমি কী বলতে চেয়েছি। নানা রকম ভাবনা মনে আসে। ধরো ম্যাক্সিমা-মিনিমা বিষয়টা। একটা কার্ভড লাইনের পয়েন্ট অফ ইনফ্লেকশান-এ কার্ভটাকে ডিফারেনশিয়েট করলে পাচ্ছ একটা পজিটিভ ম্যাক্সিমা, তাকে আবার ডিফারেনশিয়েট করলে আসবে নেগেটিভ স্ট্রেট লাইন, তাকে ফের ডিফারেনশিয়েশানের ফল হলো নেগেটিভ মিনিমা বা ইনফিনিটি…অর্থাৎ অসীম। সুতরাং কার্ভটির পয়েন্ট অফ ইনফ্লেকশান-এ কী ঘটছে, তার একটা ডায়াগ্রাম এঁকে আমি একখানা জেরক্স করে রেখেছি।

    প্রশ্ন : আপনার আরেকটি চূড়ান্ত রহস্যময় কবিতা হলো ‘সমান সমগ্র সীমাহীন’-এর ছয় নম্বর লেখাটি: ‘একটি বিড়ি ধরিয়ে সেই পোড়া দেশলাই/কাঠি দিয়ে আমি/টেবিলে লিখেছিলাম অসীম এক নং যোগ অসীম দুই নং যোগ অসীম তিন নং যোগ ফোঁটা ফোঁটা ফোঁটা…’ এবং তারপর লেখা যখন সমাপ্তিকে ছুঁতে চাইছে সেই সময়ে ‘পেলাম অসীম সিংহ/পেলাম অসীম বালা, অসীম মজুমদার/পেলাম অসীম রায় ভাইরে/অসীম’। আমরা জানি ইনফিনিটি অবিভাজ্য। তো এই অসীমকে ভাগ করা বা বিভিন্ন অসীমের ধারণা করা কীভাবে সম্ভব ?

    বিনয় : কতকগুলো চিন্তা আমার মাথায় অনেকদিন ধরেই ঘুরপাক খায়, এটি তার অন্যতম। ধরা যাক, আমাদের এই ঠাকুরনগরে এক বিঘে বর্গ ক্ষেত্রাকার জমি আছে, অর্থাৎ দৈর্ঘ্যে এক বিঘে, প্রস্হেও এক বিঘে। এবার যদি মাটির ওপর ওই জমির অংশটুকু কল্পনা করি, তবে তা আকাশ ছাড়িয়ে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যাবে। একইভাবে জমিটির মাটির নীচেও নেমে যেতে অসীম পর্যন্ত ছড়িয়েছে। কাজেই এক বিঘে বর্গক্ষেত্রের এক টুকরো অসীম পাওয়া গেল।

    প্রশ্ন : কিন্তু বর্গক্ষেত্র তো দৈর্ঘ্য আর প্রস্হের গুণফল। তার অস্তিত্বের ধারণা শুধুমাত্র টু-ডাইমেনশানাল। সেটি আকাশে বা পাতালে প্রসারিত হওয়ার উপায় কোথায় ?

    বিনয় : বেশ, তাতে না হয় আমি আরেকটি মাত্রা জুড়ে দিলাম। সুতরাং তাকে ত্রিমাত্রিক কল্পনা করতে আর অসুবিধা নেই। এইভাবে, ধরো, ওই এক বিঘে বর্গক্ষেত্রের পাশে আর এক টুকরো এক বিঘের বর্গক্ষেত্র, তার পাশে আরও একটা, এইভাবে টুকরো টুকরো অসীমকে পেয়ে যাচ্ছি। এই অংশগুলির কোনওটির নাম দেয়া যায় অসীম বালা, কেউ অসীম রায়, কেউ অসীম মজুমদার ইত্যাদি। আবার এই সব আলাদা অসীমের যোগফল এক পূর্ণ অসীমও কিন্তু রয়েছে। সে যেন এক ঈশ্বর, এই ব্রহ্মাণ্ডের রাজা। সম্পূর্ণ অসীম যেন এই ছোট-ছোট অসীমের সাহায্যে আমাদের বিশ্বকে শাসন করে চলেছে।

    ২০০০ সালে ভালোবাসা নিয়ে রোমন্হন করেছিলেন বিনয় মজুমদার, এবং আরেকবার ভেবেছিলেন মানসিক শান্তির কথা এই কবিতাটিতে :-

    একমাত্র ভালোবাসা

    ভালোবাসা একমাত্র ভালোবাসা ভরে দিতে পারে মনে

    শান্তি এনে দিতে

    কেবল নারীর প্রতি পুরুষের কিংবা কোনো পুরুষের প্রতি

    কোনো নারীর প্রণয় ভালোবাসা।

    — এ তো আছে থাকবেই, তদুপরি প্রতিটি বিশেষ্য পদকেই

    ভালোবাসা হল সেই ভালোবাসা যাতে মনে

    শান্তি এনে দেয়

    আর এই শান্তি কী বা আমাদের প্রয়োজন ?

    মনে যদি শান্তি থাকে তবে আর কোনো কিছু

    চাওয়ার থাকে না।

    যদি বা চাওয়ার থাকে তা এরূপ যাতে মনে

    শান্তি ঠিক আগের মতন থেকে যায়

    আমাদের চাওয়া আর পাওয়ার তালিকাগুলি এইভাবে

    আমরাই তৈরি করে থাকি।

    ( কবিতা বুঝিনি আমি — জানুয়ারি ২০০১ )

    আট

    যে লোকটির নিজের সম্পর্কে এই ইতিহাসবোধ আছে তাঁকে কেমন করে ‘পাগল’ বলা হয় ? এ যেন উস্কো-খুস্কো চুলের জন্য আইনস্টাইনকে পাগল বলার মতন। বস্তুত বিনয় মজুমদারের মানসিক চিকিৎসালয়ের প্রেসক্রিপশানগুলো কোনো গ্রন্হের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।

    বিনয় মজুমদারের রাজনৈতিক মতামত নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে, বিশেষ করে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত “আমি এক কমিউনিস্ট এই কথা উচ্চারিত হোক/দিকে-দিকে পৃথিবীতে’, কবিতাটি লেখার পর। ‘কবিতা বুঝিনি আমি’ কাব্যগ্রন্হে তাঁর এই কবিতাটিও বিতর্ককে উসকে দিয়েছে :-

    দেশে সাম্যবাদ এলে

    দেশে সাম্যবাদ এলে সকল মন্দির

    ডিনামাইটের দ্বারা ভেঙে ফেলা হবে

    আর যদি কেউ তার বিবাহের কালে

    পুরোহিত ডেকে আনে মন্ত্র পড়াবার

    নিমিত্ত তাহলে তাকে যাবৎ জীবন

    কারাদণ্ড দেওয়া হবে যথা ভগবান

    নামক ব্যক্তিকে দাহ করা দরকার

    হয়ে পড়ে একদিন অথবা যেমতি

    অন্ধকারে বজ্রপাত প্রয়োজন হয়।

    মাঝে-মাঝে মন ক্রমে মহীর মানুষ

    অসভ্য অসভ্যতর হয়েই চলেছে

    এইভাবে মুহূর্তেই ভাবি মানুষের

    গড় আয়ু বেড়ে যাচ্ছে — এ চিন্তা আমার

    সান্ত্বনা আনত না মনে, আমি তো ভ্রান্ত না।

    কিন্তু ১৯৮২ সালে ‘কবিতীর্থ’ পত্রিকার দেয়া সাক্ষাৎকারে সমর তালুকদার যখন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, “শুনেছি সেই সময়ে ( ১৯৫১-১৯৫২ ) তুমি মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচিতই হওনি শুধু — ‘ডাস ক্যাপিটাল’-টাও নাকি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ে ফেলেছিলে ?” জবাবে বিনয় বলেন, “সে সময়টা বড়ো অদ্ভুত সময় ছিল। মার্কসবাদ সম্পর্কে লেখাপড়া, মার্কসবাদ নিয়ে আলোচনা একটা ফ্যাশানের মতোই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল — বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে। Serious commitment of sincere conviction কতটা ছিল তা বুঝতেই পারি আজ ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের চেহারা দেখেই। চীনের পার্টি আর আমাদের পার্টির জন্ম প্রায় একই সময়ে — ওরা কোথায় আর আমরা কোথায় ! কী করেই বা হবে ? — ভাবা যায় কমিউনিস্ট পার্টির ( ভারতের ) ইতিহাস লেখা হচ্ছে বুর্জোয়া সরকারের জেলে বসে — ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস ! একে এক ধরণের অর্ডারি লেখা বলা যায় নাকি ? আমি নিজে ন্যাশানাল বুক এজেন্সিতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রুফ দেখে দিয়েছি।”

    সমর তালুকদার বিনয়কে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে তো কমিউনিস্টরা শাসন চালাচ্ছেন এখন ?” উত্তর বিনয় বলেন, “ধ্যূৎ, এরা আবার কমিউনিস্ট নাকি !” লক্ষ্যনীয় যে বিনয় মজুমদার কথাটা বলছেন ১৯৮২ সালে, এবং তখনই তিনি আঁচ করে ফেলেছিলেন নেতাদের অধঃপতন, অথচ বহু কবি-লেখক সেসময়ে আর তারপরও বহুকাল বামপন্হীদের লোভী লেজুড় আর স্যাঙাত হয়ে সেঁটে ছিলেন। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে তো মৃত্যুর কয়েক বছর আগেও দেখা গেছে বইমেলায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পেছন-পেছন ঘুরছেন। স্বাভাবিক যে বিনয়ের মতন এই ধরণের খোলাখুলি কথাবার্তা বললে কার্ড হোল্ডারদেরও পার্টিতে পাত্তা দেয়া হতো না।

    ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য মারুফ হোসেনের সঙ্গে বিনয়ে যে প্রশ্নোত্তর হয়েছিল তা থেকে তাঁর সামাজিক অবস্হানের আঁচ পাওয়া যায়।

    প্রশ্ন : ষাট-সত্তরের উত্তাল সময়। খাদ্য আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সময়কে নিয়ে কবিতা লিখে চলেছেন একের পর এক, সহযাত্রী মণিভূষণ ভট্টাচার্য, সমীর রায় প্রমুখ। আর আপনি ১৯৬৬ সালে লিখলেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’। প্রকাশ হল ১৯৭৪-এ। এটা কি সময় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয় ?

    বিনয় : আমি লিখেছি আমাকে নিয়ে, অন্য কাউকে নিয়ে কবিতা লিখিনি। সবই আমার দিনপঞ্জি। দিনপঞ্জি লিখে লিখে এতটা বয়স হলো/দিনপঞ্জি মানুষের নিকটতম লেখা। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ হল আমার একাকীত্ব নিয়ে।

    প্রশ্ন : ওই সময় আপনার জীবনে কোনও প্রভাব ফেলেনি ?

    বিনয় : না, একদম না। আমি তখন থাকতাম কলকাতা -২৮, মানে দমদম ক্যাণ্টনমেন্টে দিদির বাড়ি। আসলে পঞ্চাশের কবিরা প্রায় সবাই আত্মজীবনীমূলক কবিতা লিখেছে। শুধুমাত্র নিজেদের নিয়ে লেখা। এটা একটা ট্রেণ্ড বলা যেতে পারে। কেননা এর আগে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বিষয়ে কবিতা লিখেছেন। জীবনানন্দ লিখেছেন, নজরুল লিখেছেন। পঞ্চাশের পরেও বিভিন্ন কবিরা লিখেছেন। কিন্তু পঞ্চাশের প্রায় সবাই নিজেদের নিয়ে লিখেছে।

    প্রশ্ন : এর কারণ কী বলে মনে করেন আপনি ?

    বিনয় : তার আবার কারণ কী ! তখন দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত কবি বলে আমাদের কবিতায় আনন্দের কথা ছিল। স্ফূর্তিও ছিল প্রচুর।

    ২০০১ সালে ‘লোক’ পত্রিকার জন্য শামীমুল হক শামীম-এর সঙ্গে প্রায় একই বিষয়ে বিনয়ের সঙ্গে এই কথাবার্তা হয়েছিল :-

    প্রশ্ন : আপনি যখন লেখালিখি শুরু করেন তখনকার কলকাতার আর্থ-সামাজিক অবস্হা সম্পর্কে জানতে চাই।

    বিনয় : আর্থ-সামাজিক অবস্হা কী হবে ? সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে। প্রচুর উদ্বাস্তু এসে হাজির হয়েছে। কলকাতায় তাদের থাকতে দেওয়ার জায়গা হচ্ছে না। বাড়িঘর নেই, বেকার, চাকরি নেই, কী চাকরি দেবে ? চাল-ডালের অভাব। এখন একেক বিঘে জমিতে ধান হয় ২৫ মন, তখন হতো ৮ মন। খাবার নেই। পুরো বীভৎস অবস্হা তখন। ১৯৫৩ সালে অনেক হাতে-পায়ে ধরে নেহরু আমেরিকা থেকে গম আনায়। দেশ ভাগ হয়েছে ১৯৪৭-এ। সারা বছর না খেয়ে, শুটকি মেরে, চাকরি নেই, বাকরি নেই, থাকার জায়গা নেই — এ অবস্হায় থেকে ৬ বছর পর আমেরিকা দয়া করে গম পাঠাল। সেই গম খেয়ে-খেয়ে মানুষের দিন চলে। কিন্তু দেশ তো স্বাধীন। ৫০-এর কবিরা সেই স্বাধীনতা পাওয়ার ঠিক পরবর্তী সময়কার কবিরা, স্বাধীন যে বছর হল সেই বছর বেশ কিছু কবিতা লিখেছি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও তাই। কবিতাগুলো খুব আনন্দদায়ক হয়েছিল কিংবা আনন্দ-স্ফূর্তির কবিতা হয়েছিল।

    প্রশ্ন : তার মানে কম বয়সে লেখার ফলে আনন্দদায়ক হয়েছিল ?

    বিনয় : না, স্বাধীনতা পাওয়ার ফলে।

    ‘ পুনর্বসু’ পত্রিকার জন্য দেয়া ১৯৮৭ এর সাক্ষাৎকারে, রণজিৎ দাশ জানতে চেয়েছিলেন, “শেষ লেখাটায় আপনি বলেছেন, যে আমি এক কমিউনিস্ট, এই কথা উচ্চারিত হোক ?” জবাবে বিনয় বলেন, “হ্যাঁ, যখন আমি লিখেছিলাম, তখন আমার মনে হল যে এইটা হওয়াই ভালো বুঝলে, ‘পরিচয়’ পত্রিকা… ’পরিচয়’ পত্রিকা, আমার কাছে একটা কবিতা চাইল। কমিউনিস্টদের কাগজ, বুঝেছ ? তখন ভেবে চিন্তে দেখলাম, লিখে দেব। কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য আমি ছয়মাস ছিলাম। এত খাটতে হয়, এত দৌড়োদৌড়ি ছুটোছুটি, যে আর আমার দ্বারা হল না, ছেড়ে দিলাম। হ্যাঁ, রাত্তির সেই এগারোটা পর্যন্ত বক্তৃতা, বুঝতে পারছ ?”

    এখানে পরিষ্কার যে বিনয় মজুমদার সেই সময়ের চালু ধুয়ো “গরিব হওয়া ভালো, উদ্বাস্তু হওয়া ভালো, সর্বহারা হওয়া ভালো, ইংরেজি না শেখা ভালো, কমপিউটার না শেখা ভালো, অবরোধ করা ভালো, কারখানা লাটে উঠিয়ে দেয়া ভালো” ইত্যাদি ভাঁওতার খপ্পরে পড়েননি।

    কেবল বামপন্হীদের সমালোচনায় নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি বিনয় মজুমদার। অগ্রজ আর সমসময়ের কবিদের সম্পর্কেও নিজের মনের কথা বলেছেন, রাখঢাক করেননি। ১৯৯৮ সালে ‘অধরা মাধুরী’ পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকারে বোধিসত্ব রায় বিনয়ের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলেন, “বাংলা আধুনিক কবিতা কি পাশ্চাত্যের অনুসারী ?” উত্তরে বিনয় বলেন, “না তো ! ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট আমলে যত বাঙালি কবি ছিল সবাই ইংরেজির অধ্যাপক। ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট এদের ছাড়া কাউকে কবি হতে দেয়নি। জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণুদে, সমর সেন, অমিয় চক্রবর্তী এঁরা ইংরেজির অধ্যাপক। ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের ইচ্ছানুসারে এই সব কবির কাজই ছিল ইউরোপিয়ান কবিতা নকল করা।”

    ২০০১ সালে ‘লোক’ পত্রিকার জন্য শামীমুল হক শামীমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেন, “শক্তি খুব ভালো কবিতা লিখত কিন্তু শেষ বয়সে মাথাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সুনীল যে কী লেখে তা আমি জানি না। মন্তব্য না করাই ভালো। ” ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য মারুফ হোসেনের প্রশ্ন, “আপনার সমসাময়িক কবিদের কবিতা আপনার কেমন লাগে?” এর উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, “এদের কবিতা আমার খুব বেশি ভালো লাগে বলি না। উৎপলকুমার বসুর কবিতা ভালো লাগত। ‘গোলাপ তোমাকে আমি ঈর্ষা করি/কত না সহজে তুমি তার মত্ত কেশে ঢুকে যাও। ” উৎপল বসুর এটুকু কবিতাই মনে আছে। অমিতাভ দাশগুপ্তর কবিতা একখানাও মনে নেই। ”

    ১৯৮২ সালে ‘কবিতীর্থ’ পত্রিকার জন্য নেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন, “সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর সে ধরনের কবিতা লিখছেন কোথায় — ওনাকে এখন বরঞ্চ ঔপন্যাসিক বলাই ভালো। নীরেন চক্রবর্তীর অনেক আগের লেখা মন্দ নয় — এখন উনি লেখা বন্ধ করে দিলেই ঠিক কাজ হবে বলে মনে হয়। শঙ্খ ঘোষ মাঝে মাঝে ভালো লেখেন। ” প্রতিষ্ঠানে যাঁরা ছড়ি ঘোরান তাঁদের সম্পর্কে এই ধরণের সাক্ষাৎকার দেবার পর যে সাহিত্যের জন্য পুরস্কার পাওয়া এবং বহুল প্রচারিত পত্রিকার পাতায় ঠাঁই পাওয়া কঠিন তা আমরা বহুকাল হলো জেনে গেছি।

    জীবনের শেষ দিকে বিভিন্ন পুরস্কার পাবার আগে বিনয় মজুমদারকে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার দেয়া হয়েছিল, দশ হাজার টাকা, প্রধানত তাঁর আর্থিক অবস্হার কারণে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পুরস্কারের টাকা নিয়ে গিয়েছিলেন এবং বিনয়কে পুরস্কারটি দেবার জন্য একটি মঞ্চ তৈরি করে অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। বিনয় মজুমদার বসে ছিলেন একটি চেয়ারে। একের পর এক বক্তা সাম্প্রতিক কবিতা নিয়ে, বিনয় মজুমদারের কবিতা নিয়ে বক্তৃতা দিতে থাকেন। ঘণ্টাখানেক পর বিরক্ত হয়ে বিনয় মঞ্চ থেকে নেমে নিজের ঘরে ফিরে যান। কিন্তু তারপরও বক্তৃতা থামেনি। কলকাতা থেকে যাঁরা বক্তৃতা দেবার জন্য গ্রামে পৌঁছেছিলেন, সবায়ের কোটা শেষ হবার পর অনুষ্ঠান ফুরোয়। চা-সিঙাড়া-সিগারেট পর্ব শেষে তাঁরা বিনয়ের ঘরে গিয়ে দেখেন যে তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন।

    মৃত্যুর এক বছর আগে তাঁকে অকাদেমি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল, রবীন্দ্র পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ওই বছরেই, তাও সেই পুরস্কারটি তাঁকে ভাগাভাগি করে নিতে হয়েছিল জীবনানন্দ গবেষক ভূমেন্দ্র গুহর সঙ্গে ! রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়ে বিনয় বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার একজন ডাক্তার আর একজন ইঞ্জিনিয়ারকে সাহিত্যের স্বীকৃতি দিলো। রবীন্দ্র পুরস্কার তাঁর আগে দেয়া হয়েছিল অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, অমিতাভ দাশগুপ্ত এবং সমরেন্দ্র সেনগুপ্তকে। আনন্দ পুরস্কার তাঁকে দেয়া হয়নি, যে পুরস্কার পেলে তাঁর দৈনন্দিন খরচের সুরাহা হতো, অথচ ওই পুরস্কার দুবার করে দেয়া হয়েছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তসলিমা নাসরিন ও জয় গোস্বামীকে। অকাদেমি পুরস্কার নিতে তিনি যাননি, তাঁর ঠাকুরনগরের বাড়িতে এসে দিয়ে যান দিব্যেন্দু পালিত, উপস্হিত ছিলেন অমিয় দেব।

    বিনয় মজুমদার কয়েকবার আত্মহত্যার প্রয়াস করেছিলেন বলে শোনা যায়। ঠিক কোন কারণে তিনি নিজের জীবনকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন, সে-বিষয়ে কোনো সাক্ষাৎকার অথবা নিকটজনের বিবৃতি পড়িনি। পুলিশও হস্তক্ষেপ করেছিল কিনা জানি না। তবে স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় জিন জাগ্রত হয়ে উঠলে সেই সময়টায় আত্মহত্যা করার রোখ মাথায় চেপে বসে।

    জয় গোস্বামী, যিনি বিনয়ের কবিতার পাণ্ডুলিপি দেখেছেন, এবং টেলিফিল্মে বিনয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তিনি ‘আকস্মিকের খেলা’ ( ২০০২) গ্রন্হে বলেছেন যে বিনয়ের ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্হের পাণ্ডুলিপি যেন কাফকার ডায়েরি। পাণ্ডুলিপির মার্জিনে আছে স্বপ্নের অনুবর্তীতা, দ্রুত-নেয়া নোট, সংক্ষিপ্ত লিখন — তাঁর মনে হয়েছে তিনি যেন কবির পাশেই রয়েছেন, যেমন যেমন কবি তাঁর লাইনগুলোকে আদল-আদরা দিচ্ছেন।

    জয় গোস্বামী এই সূত্রে উল্লেখ করেছেন বার্গম্যানের ‘থ্রু এ গ্লাস ডার্কলি’ ফিল্মটির, যা মোটামুটি ‘ফিরে এসো, চাকা’ রচনার সমসাময়িক। ফিল্মটিতে একজন নারী দেয়ালের ফাটলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন, যা নারীটিকে এক ঐন্দ্রজালিক জগতে নিয়ে যায়, যেখানে সবাই আলোচনা করছে এবং অপেক্ষা করছে, লোকগুলোর মুখশ্রী উজ্বল, যে কোনো মুহূর্তে ঈশ্বরের দেখা পাবার জন্য। একজন কবি যদি ভিন্নভাবে আসপাশের বস্তু ও ঘটনাবলীর দিকে তাকান, এবং সাধারণ মানুষ যেটুকু সচরাচর দেখতে পায়, তার চেয়েও বেশি কিছু দেখতে পান কবি, তাহলে তাকে মানসিক রোগগ্রস্ত তকমা দিয়ে দেয়া হয়, ‘থ্রু এ গ্লাস ডার্কলি’ ফিল্মের নারীটির মতো।

    গ্রামের পথে বাজারে বিনয় মজুমদার স্হানীয় একটি দোকানের দিকে তাকিয়ে যখন অবলোকন করেন, তা শার্ল বদল্যারের ফ্ল্যনেয়ার থেকে ভিন্ন। তিনি দোকানটি, দোকানে রাখা জিনিসপত্র, দোকানের বিক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং সম্পর্কটির বিস্তার ঘটিয়ে বিশাল সৃষ্টিজগতের সঙ্গে সম্বন্ধস্হাপন করেন। সাধারণ গ্রামীণ দোকানটির সম্পর্ক রয়েছে স্হানীয় খেতের চাষিটির সঙ্গে, পৃথিবীর অভিকর্ষের সঙ্গে, অক্লান্ত সূর্যের সঙ্গে, দেবী সরস্বতীর সঙ্গে। ‘বিনয় মজুমদারের ছোটগল্প’ ( ১৯৯৮ ) গ্রন্হে শিমুলপুরে তাঁর দিনযাপনের চিন্তাকর্ষক খতিয়ান মেলে।

    নয়

    একজন কবির সঙ্গে জনসাধারণ কেমনতর আচরণ করেন তা আমরা কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে দেখেছি ; তাঁর জন্মদিন এলে তাঁকে বিয়ের বরের মতন কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করা হতো। অথচ কবি কিছুই বুঝতে পারছেন না। ভ্রাতৃতুল্য ব্যক্তির প্রতি নিষ্ঠুরতা হলো সম্পর্কের একটি প্রাগৈতিহাসিক আচারানুষ্ঠান। কবিরা এই সামাজিক শোষণপদ্ধতি থেকে পরিত্রাণ পান না, বিশেষ করে তাঁকে যদি মনে করা হয় মস্তিষ্কবিকৃত একজন প্রতিভাধর ব্যক্তি। জন্মদিন পালন এই আচারানুষ্ঠানে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুরতা ও অবমাননার উৎসব, যাতে অংশগ্রহণ করে লোকটিকে হেনস্হা করা হয়, এবং প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে মানুষটিকে সমভোগতান্ত্রিক বারোয়ারি পীঠস্হানে বসিয়ে হাস্যকর করে তোলা হয়। প্রতিভাবান মানুষকে নিষ্ঠুরতার অস্ত্র প্রয়োগ করে রোমান্টিসাইজ করার এটি একটি ভয়ঙ্কর খেলা। বিনয় এটি বুঝতে পেরেছিলেন, আর সে কথা তাঁর ‘কয়েকটি কবিতা’র ছয় সংখ্যক কবিতায় লিখেছেন :

    আমার জন্মদিন পালন করত আগে

    কয়েক বছর আগে।

    আহ্বায়ক ছিল অমলেন্দু বিশ্বাস নৌকা পত্রিকার সম্পাদক।

    দৈনিক ‘আজকাল’ পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হতো–

    ‘১৭ই সেপ্টেম্বর কবি বিনয় মজুমদারের

    জন্মদিন পালন করা হবে, আপনারা দল বেঁধে আসুন

    শিমুলপুরের কবির বাড়িতে। ’

    অনেকেই আসত। এসে কবিতাপাঠ গানবাজনা

    ইত্যাদি করত। এই অনুষ্ঠানে খাওয়া দাওয়াও হতো।

    কয়েক অতিথি আমার প্রতি সদয় ছিল না–

    আমাকে কতবার মানসিক হাসপাতালে

    নেওয়া হয়েছিল সেই কথা আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে

    আলোচনা করত। তাতে আমি মনে খুব ব্যথা পেতাম।

    ফলে আমি আমার জন্মদিন আর পালন করতে দিই না।

    আমার জন্মদিন পালন বন্ধ হয়ে গেছে।

    কবিতাটি থেকে স্পষ্ট যে, আয়োজকগণ এবং যাঁরা কলকাতা থেকে গিয়ে শিমুলপুরে জড়ো হতেন, তাঁরা গোপনে একজন প্রতিভাবান স্কিৎসোফ্রেনিয়া রোগির রোগটিকেই উৎসবে বদলে দিয়ে নিজেরা আনন্দ করতে চাইতেন। কবিকে মনে করিয়ে দিতেন যে তিনি কতোবার মানসিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ছিলেন, যেন মানসিক চিকিৎসালয়ে থাকা একজন দ্রষ্টা কবির বৈশিষ্ট্য। তাঁকে মনে করিয়ে দেয়া হতো যে তাঁর অসুস্হ জীবনের আরেকটি বছর হাতছাড়া হয়ে গেল। নিজের জন্মদিনে জড়ো হওয়া লোকগুলো সম্পর্কে যিনি এরকম কবিতা লিখতে পারেন, তাঁকে কি মানসিক অসুস্হ বলা যায় !

    ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’ ( ২০০৩ ) কাব্যগ্রন্হের ভূমিকায় বিনয় মজুমদার লিখেছেন, “কবিতীর্থ প্রকাশিত ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’ গ্রন্হের প্রায় সব কবিতাই হাসপাতালে থাকাকালে লিখেছি। একটা কথা আমি দিনে তিনচার বার বলি — সবই সৃষ্টিকর্তার লীলাখেলা। এবারেও তাই লিখি। আমাকে হাসপাতালে পুরে সৃষ্টিকর্তা কী পরীক্ষা করলেন কে জানে ! কী দুরূহ পরীক্ষা দিতে হয়েছে আমাকে সৃষ্টিকর্তার কাছে এবং পাঠকপাঠিকাগণের কাছে। পরীক্ষায় পাশ করেছি বোঝা যায়। ”

    “কবিতা লেখা আমি মাঝে-মাঝে ছেড়ে দিই। তখন এমন-এমন কাণ্ড ঘটে যাতে ফের লিখতে বাধ্য হই। এই বইখানাও তেমনি জোর করে লেখানো। কবিতা না লিখে বছর চারেক ছিলাম। তারপর আমাকে হাসপাতালে পুরে কাগজ এবং কলম দিয়ে আমাকে বলা হল — ‘কবিতা লিখলে ছাড়া হবে নচেৎ নয়।’ তার ফলে আমি লিখেছি ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’ বইখানা। ”

    স্কিৎসোফ্রেনিয়ার নিরাময় হিসাবে হয়তো মানসিক চিকিৎসকরা তাঁকে কবিতা লিখতে বলতেন।

    রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাঙালির নিষ্ঠুরতা বিষয়ে বিনয় একটি কবিতা লিখেছেন, শিরোনাম ‘কিছু কিছু কবির’। এই কবিতাটিতে বিনয় মজুমদার দেখিয়েছেন যে মৃত্যুপথযাত্রী রবীন্দ্রনাথের প্রতি নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে যতো বেশি পারা যায় কবির প্রত্যাদেশ ছেঁকে বের করে আনার চেষ্টা করেছিল সমবেত জনগণ। রবীন্দ্রনাথের সেই মুহূর্তের কাঁপা কাঁপা কন্ঠের কবিতাকে দ্রষ্টার দিব্যদৃষ্টি করে তোলার চেষ্টা হয়েছিল, যাকে বলা যায় রবীন্দ্রনাথের ‘বাণী’। একজন কবি, যিনি মানবজীবনের অস্হিরতা সম্পর্কে চিরকাল চিন্তা করে গিয়েছেন, তাঁকে মৃত্যুশয্যায় একটি স্বয়ংক্রিয় দিব্যদৃষ্টির যন্ত্রে পালটে ফেলার চেষ্টা হলো। এখনকার দিন হলে মোবাইল ফোনে রেকর্ড করা হতো, টিভি সাংবাদিকরা ক্যামেরা মাইক নিয়ে পৌঁছে যেতো আর জানতে চাইতো তিনি কেমন ফিল করছেন !। বিনয়ের ক্ষেত্রেও, “মানসিক হাসপাতাল থেকে ফেরা” কিংবা “মানসিক হাসপাতালে প্রতিভাবান কবি বিনয়” নাম দিয়ে মোবাইলে তোলা হয়ে থাকবে হয়তো।

    কিছু কিছু কবির সঙ্গে বাঙালিগণ

    খুব নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছেন ; এবং মনে হয়

    ভবিষ্যতেও করবেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ যখন মৃত্যুশয্যায়

    হাত নাড়তে পারছিলেন না

    তখনো বাঙালিগণ দাবি করলেন যে

    রবীন্দ্রনাথ মুখে মুখে একটি কবিতা বলুন

    সেই কবিতা কাগজে লিখে নেবেন অন্য একজন।

    অগত্যা রবীন্দ্রনাথ কবিতা বললেন এবং

    তা লিখে নিলেন একজন শ্রোতা।

    এই হলো রবীন্দ্রনাথের শেষ কবিতা।

    দাদা সমীর রায়চৌধুরী ‘অপর’ তত্ত্বটি বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে পুরাণ থেকে ‘সংজ্ঞা’ নিরুপণ আলোচনা করেছিলেন। উনি বলেছিলেন, মার্কণ্ডেয় পুরাণে সংজ্ঞা বিশ্বকর্মার মেয়ে আর সূর্যের স্ত্রী। সংজ্ঞাকে নিয়ে যে আখ্যান তা থেকে জানা যায় কখন তিনি চোখ বোজেন, আর কখনই বা চপলভাবে দৃষ্টিপাত করেন, আবার কখনও চোখ মেলে পরম মিলনে প্রস্ফূট হয়ে ওঠেন। এই অবলোকন বদলের ওপর নির্ভর করে কখন তিনি সংযমনকারী যমকে প্রসব করবেন, আর কখনই বা প্রসব করবেন চঞ্চলাস্বভাবা নদী যমুনাকে, আবার কখন জন্ম দেবেন যুগলদেবতা অশ্বিনীকুমারদের। অশ্বিনীকুমার যম নন, তবে যমজ, সৌন্দর্যের অধিকারী আর নিরাময়ে পারদর্শী — স্বর্গবৈদ্য ; বিশ্বচরাচরের মহাপারিবারিক আসঙ্গযুক্ত দ্বিপাক্ষিক শঙ্খিলতার মহাপরিপূরকতা বজায় রাখা যাঁর ধর্ম। চোখ মেলে সংজ্ঞা আরও প্রসব করেন রেবন্ত, যিনি সর্বদা সংঘর্ষে, প্রতিবাদে উদ্যত। যিনি পূর্বের ক্লেদ অপসারণ করে নবীনতাকে প্রশ্রয় দেন। এই আখ্যান বিনয় মজুমদারকে সংজ্ঞায়িত করে, অবলোকন ক্ষমতার মাধ্যমে তিনি জগতসংসারের বিশাল স্পেকট্রামকে পাঠকের সামনে মেলে ধরেন।

    ‘আজকের পত্রিকা’র ১১ই ডিসেম্বর ২০১৫ সংখ্যায় বীরেন মুখার্জি লিখেছেন যে বিনয় মজুমদার একজন ইনট্রোভার্ট বা আত্মমুখিনতার রূপদক্ষ শিল্পী — অপ্রাপ্তির বিভিন্ন অনুষঙ্গ, স্বগতোক্তি কিংবা আত্মকথন যা শান্তরস-সিক্ত তা রয়েছে তাঁর ‘ফিরে এসো, চাকা’ পর্যায়ের কবিতায় — তীব্র ব্যঞ্জনাধর্মী ও গভীর অর্থবোধক, তাঁর কবিতার সুর তন্ময় ব্যক্তিগত কিংবা মন্ময় বস্তুগত ; তাঁর কাব্যবোধ তাঁর প্রেমিক সত্তাকে প্রজ্ঞাবান করার পাশাপাশি জ্ঞানের গভীরতায় জারিত। তবে বীরেন মুখার্জি মনে করেন যে বিনয় মজুমদারের ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ ও ‘বাল্মীকির কবিতা’ পাঠে তাঁকে ‘কামোন্মাদ’ বলে মনে হয়। তিনি বলেছেন, জৈবিক মিথুন-সত্তায় আক্রান্ত বিনয় না পাওয়ার তীব্রতর বেদনা শব্দমাধুর্যে উপস্হাপন করলেও, তা অত্যন্ত নিচুস্বরে, যেমন :-

    কবিতা সমাপ্ত হতে দাও, নারী, ক্রমে, ক্রমাগত

    ছন্দিত, ঘর্ষণে, দ্যাখো, উত্তেজনা শীর্ষলাভ করে,

    আমাদের চিন্তাপাত, রসপাত ঘটে, শান্তি নামে।

    আড়ালে যেও না যেন ঘুম পাড়াবার সাধ করে।

    বিনয় মজুমদারকে নানা ধরণের উন্মাদের তকমা দেয়া হয়েছে দেখে বীরেন মুখার্জি সম্ভবত ‘কামোন্মাদ’ তকমাটি ধরিয়ে দিলেন। ‘কামোন্মাদ’ ! এরকম ভয়ঙ্কর আরোপ আর হয় না, যেন বিনয় একজন গ্রিক দেবতা স্যাটারিয়াসিস। বিনয় নিজেই বলেছেন যে তিনি ‘ইরোটিক’ কবিতা লিখতে চান, কেননা ইরোটিক কবিতা লেখার যে চল ইংরেজরা আসার আগে ছিল তা শেষ হয়ে গেছে। কথাটা সত্যি। শ্রীরামপুরের পাদরি আর ম্যকলে সাহেবের ভিকটোরিয় শিক্ষাপদ্ধতির দরুণ প্রাগাধুনিক বাংলার ধারা থেকে নিজেদের মুক্ত করে নেওয়াকে মধ্যবিত্ত বাঙালি গৌরবের ব্যাপার মনে করেছে বহুকাল, তার ওপর ব্রাহ্মধর্মের হাস্যকর রক্ষণশীলতা মিশে সেই ধারাকে সম্পূর্ণ তামাদি করে দিয়েছে।

    ইংরেজি ভাষার কবি নন বলে ওভিদ, কাতুল্লুস, সেক্সটাস প্রোপার্টিয়াস, পেত্রার্ক, পিয়ের লোয়ুস, গ্রেগোরিও দে মাত্তোস, হিল্ডা হিলর্স্ট, গ্লাউকো মাটোসো, ভিনি করেয়া, ম্যানুয়েল মারিয়া প্রমুখ বাদ গেছেন আমাদের বিদ্যায়তনিক জগত থেকে। ইংরেজিতেও কবিরা লিখেছেন, যেমন চার্লস সুইনবার্ন ( লাভ অ্যাণ্ড স্লিপ ), রবার্ট হেরিক ( আপঅন জুলিয়াজ ক্লোদস ), ই ই কামিংস ( মে আই ফিল সেড হি ), ডাবলিউ এইচ অডেন ( দি প্ল্যাটনিক ব্লো ), জন ডান ( টু হিজ মিসট্রেস গোইং টু বেড ), এমিলি ডিকিনসন ( কাম স্লোলি ইডেন ), ওয়াল্ট হুইটম্যান ( আই সিং দি বডি ইলেকট্রিক ), হার্ট ক্রেন ( ভয়েজেস ) ইত্যাদি। ইংরেজরা সবচেয়ে বড়ো যে ক্ষতি করে গেছে, তা হলো আমাদের সনাতন রসশাস্ত্রকে লোপাট করে দিয়ে নিজেদের ভাষার অলঙ্কার বাংলা ভাষায় চাপিয়ে দেয়া।

    বাংলা সাহিত্যে ইরটিক কবিতা লেখার ঐতিহ্য ছিল। জেমস লঙ-এর কুযুক্তির দরুন বটতলা সাহিত্য বিলুপ্ত হতে সময় লাগেনি। চর্যাপদ, কালিদাসের মেঘদূত, বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যান, দৌলত কাজীর সতীময়না লোরচন্দ্রানী, সপ্তদশ শতকের শুকুর মামুদের গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস ইত্যাদি। বহু আলোচক বিনয়ের ‘ফিরে এসো, চাকা’র পর আর তাঁর কাব্য বিশ্লেষণে এগোন না, তাঁদের মধ্যমেধা-মধ্যবিত্ত মননে চোট লাগে। নৈসর্গিক বর্ণনার মাধ্যমে ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হে যে যৌনতা আছে তা হয়তো বহু পাঠক ধরতে পারেন না, কিন্তু ‘বাল্মীকির কবিতা’ কাব্যগ্রন্হের ভুট্টা সিরিজে ও ডালাসারির কবিতায় গিয়ে তাঁদের মধ্যবিত্ত চেতনা আক্রান্ত হয়। ‘বাল্মীকির কবিতা’ কাব্যগ্রন্হের পরেও বিনয়ের কবিতার বই বেরিয়েছে, ছোটো গল্পের বই বেরিয়েছে, সেগুলো নিয়ে আগ্রহ দেখা যায় না তাঁদের !

    কবিতা লিখে আনন্দের কথা বলেছেন বিনয়, তা যেমন কবিতাই হোক, তাঁর ‘কবিতালেখা’ নিবন্ধে, “তুমি কষ্ট পাচ্ছো সেই কষ্টের কথা লিখে তুমি আনন্দ পেতে পারো। সৃষ্টির ব্যাপারে এই আনন্দটা তিন স্তরে বিভক্ত। লেখার আগে একটা জিনিস ভাবতে হচ্ছে, তখনকার আনন্দ একরকম ; যখন লিখছি তখন আরেকরকম, আর লেখার শেষে আরেকরকমের আনন্দ। আনন্দ না থাকলে শিল্পসৃষ্টি হয় না। ” তারপর যোগ করেছেন, “ময়ূর পেখম তুলে নাচে — আমরা দেবতারা মন খুলে কবিতা লিখি। ময়ূরের নাচের মতনই কবিতা লেখা ব্যাপারটা। ”

    দশ

    বিনয়ের ঈশ্বরীতে ফিরি। উচ্চাকাঙ্খী গায়ত্রী আমেরিকায় গিয়ে ১৯৬০ সালে ট্যালবট স্পিভাককে বিয়ে করেন, এবং কিছুকাল পরেই তাঁদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আমার মনে হয় আমেরিকায় পাকাপাকি বসবাসের জন্য ট্যালবট স্পিভাককে বিয়ে করেছিলেন গায়ত্রী, আর ছাড়াছাড়ির পরেও তিনি নিজের নাম থেকে স্পিভাক পদবি বাদ দেননি। আমেরিকায় গিয়ে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর এবং তুলনামূলক সাহিত্যে পিএইচ ডি করেন। স্নাতক স্তরে ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। বিনয় মজুমদার গায়ত্রীর প্রতিভায় আকৃষ্ট হয়ে থাকবেন, কেননা হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্টের বাড়িতে আত্মগর্বী গায়ত্রীকে তিনি দেখে থাকবেন কয়েক ঝলক মাত্র। পরবর্তীকালে গায়ত্রীর বিশ্বব্যাপী খ্যাতি তাঁকে বিনয়ের কবিতার কেন্দ্রে এনে থাকবে। ‘ফিরে এসো, চাকা’ বইটির খ্যাতির পরেও গায়ত্রী বহুকাল জানতেন না যে বিনয় মজুমদার নামে প্রতিভাবান অথচ উচ্চাকাঙ্খাহীন, প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া এক ইঞ্জিনিয়ার যুবক তাঁকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখেছেন। গায়ত্রী কেবল কলকাতার খ্যাতনামা উচ্চ পরিবারের মেয়ে নন, তাঁর দাদুর বাবা ছিলেন রামকৃষ্ণদেবের চিকিৎসক, গায়ত্রীর বাবা সারদা দেবীর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন — কলকাতার বুর্জোয়া পরিবার বলতে যা বোঝায়। বিনয় তাই এঁদের বলেছেন পুরোহিত পরিবার।

    ষাটের দশকে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে যখন আমার পরিচয় হয় তখন আমিও জানতুম না যে ‘ফিরে এসো, চাকা’ বইয়ের চাকা হলো গায়ত্রী চক্রবর্তী নামের একজন বিদুষী। বিনয় মজুমদার দুই বছরের জন্য হাংরি আন্দোলনে ছিলেন। সেই সময়ে তিনি একটার পর একটা চারমিনার সিগারেট খেয়ে তর্জনীকে নিকোটিনের রঙে মুড়ে ফেলে ছিলেন। উনি আমায় বলেছিলেন, “তুমি শক্তিকে নেতা করেছো আর শক্তি আমাকে নেতা করেছে।”

    ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকায় মারুফ হোসেনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছেন, মলয় “হাংরি সাক্ষাৎকারমালা” নামে একটা বই প্রকাশ করেছে। ওতে আমাকে বা শক্তিকে প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়নি।” এই বক্তব্য থেকে মনে হয় যে হাংরি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতার স্বীকৃতি বিনয় চেয়েছিলেন, এবং তাঁকে প্রতিষ্ঠাতার আসনে বসাইনি বলে আহত বোধ করেছিলেন। উনি স্পষ্ট বললে, ওনাকে প্রতিষ্ঠাতার স্বীকৃতি দিলে, বরং পরবর্তীকালে হাংরি আন্দোলন নিয়ে সুনীল-শক্তি-সন্দীপন যে সাংস্কৃতিক রাজনীতি আরম্ভ করেছিলেন তা ঘটত না।

    সেই সময়ে কলকাতায় হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছিল, তাতে বিনয় মজুমদারও প্রভাবিত হয়ে থাকবেন। ২২ জুন ১৯৬৪ তারিখে দেবী রায় আমাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন, তাতে এই কথাগুলো ছিল, “তুমি-আমি নাকি কলকাতায় অ্যারেস্ট হয়ে গেছি, চতুর্দিকে গুজব। কয়েকজন চেনা হেফচেনার সঙ্গে দেখা হলে অবাক চোখে তাকাচ্ছে। ভাবখানা এই : কবে ছাড়া পেলে ? আমার তো এখন একতারা নিয়ে বাউল হয়ে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে কলকাতায়। সবাই তালে আছে ‘বাঘে ছুঁইয়ে দেওয়ার’, পর্নোগ্রাফি প্রমাণ করে। সুবিমলকে মেসে কে একজন বলেছে, ‘দেখব কী করে হাংরি বুলেটিন বের হয়। ” সেপ্টেম্বর ১৯৬৪-এ আমরা সত্যিই গ্রেপ্তার হই আর আমার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা আরম্ভ হয়।

    সেই সময়ের এলিট বঙ্গসমাজ যে কতোটা চটেছিলেন, হাংরি আন্দোলনের ওপর, তা অ্যালেন গিন্সবার্গকে লেখা আবু সয়ীদ আইয়ুব-এর ৩১ অক্টোবর ১৯৬৪-এর এই চিঠি থেকে অনুমান করা যায়:-

    Dear Mr. Ginsberg,

    I am amazed to get your pointlessly discourteous letter of 13th. That you agree with the Communist characterization of the Congress for Cultural Freedom as a fraud and a bullshit intellectual liberal anti-communist syndicate did not, however, surprise me ; for I never thought the Congress for Cultural Freedom had any charge of escaping your contempt for everything ‘bourgeois’ or ‘respectable’.

    If any known Indian writer or intellectual come under police repression for their literary and intellectual work, I am sure the Indian Committee for Cultural Freedom would move in the matter without any ungraceful promptings from you. I am glad to tell you that no repressions of that kind has taken place here currently. Malay Roychoudhury and his young friends of the Hungry Generation have not produced any worthwhile to my knowledge, though they have produced and distributed a lot of self-advertising leaflets and printed letters abusing distinguished persons in filthy and obscene language ( I hope you agree that the word ‘fuck’ is obscene and ‘bastard’ filthy, at least in the sentence ‘Fuck the bastards of the Gangshalik School of Poetry’; they have used worse language in regard to poets whom they have not hesitated to refer to by name ). Recently they hired a woman to exhibit her bosom in public and invited a lot of people including myself to witness this wonderful avantgarde exhibition ! You may think it your duty to promote in the name of cultural freedom such adolescent pranks in Calcutta from halfway round the world. You would permit me to differ from you in regard to what is my duty.

    It was of course foolish of the Police to play into the hands of these young men and hold a few of them in custody for a few days ( they have all been released now ) thus giving the publicity and some public sympathy — publicity is precisely what they want to gain through their pranks.

    I do not agree with you that it is the prime task of the Indian Committee for Cultural Freedom to take up the cause of these immature imitators of of American Beatnik poetry. I respect your knowledge of European literature but can not permit myself to be guided by your estimation of writers in my language — a language of which you to choose to remain totally ignorant.

    With all good wishes in spite of your grave disagreements and in admiration of some of your wonderful poems.

    Yours Sincerely

    Abu Sayeed Ayyub

    অ্যালেন গিন্সবার্গকে এই চিঠিটা লেখার সময়েও আবু সয়ীদ আইয়ুব আমাদের গ্রেপ্তার হওয়া ও মকদ্দমা সম্পর্কে কোনো খবর রাখেননি। আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কোমরে দড়ি বেঁধে আর হাতে হাতকড়া পরিয়ে, তা উনি জানতেন না। উনি যখন চিঠিটা লিখছেন তখন কেউই মকদ্দমা থেকে ছাড়া পায়নি ; তারা ছাড়া পেয়েছিল ১৯৬৫ সালের মে মাসে। আইয়ুব সাহেব জানতেন না যে আমার বিরুদ্ধে মামলা আরম্ভ হয়েছে য পঁয়ত্রিশ মাস চলেছিল। শঙ্খ ঘোষ যখন ১৯৭১ সালে ‘শব্দ আর সত্য’ প্রবন্ধটি লেখেন, তখন তিনিও খবর রাখেননি যে ইতিমধ্যে নিম্ন আদালতে আমার জেল-জরিমানার দণ্ডাদেশ হয়ে গেছে, বা হয়তো জেনেও চেপে গিয়েছিলেন, আর প্রবন্ধতে কেবল লিখে দিয়েছেন ‘কয়েকজন যুবককে একদিন হাজতবাস করতে হয়েছিল’। শঙ্খ ঘোষের এই বইটি বিভিন্ন কলেজে বাংলা ভাষার সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত, এবং ছাত্রদের কাছে ভুল বার্তা চল্লিশ বছর যাবত চলেই চলেছে; নতুন সংস্করণেও তিনি সঠিক তথ্য দেবার প্রয়োজন মনে করেননি।

    যাই হোক, পরে হাংরি বুলেটিন থেকে নেতা ব্যাপারটা আমি বাদ দিয়ে দিই। বিনয়ের কবিতা কয়েকটা বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছিল। সেসময়ে বিনয় মজুমদারের কথাবার্তায় অসংলগ্নতা লক্ষ্য করিনি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক রাজনীতিতে বিরক্ত হয়ে বিনয় মজুমদার আন্দোলন ত্যাগ করেন, কিন্তু আন্দোলন ছাড়ার সময়ে শক্তি আর সন্দীপনকে গালমন্দ করে একটা বুলেটিন নিজেই ছাপিয়েছিলেন, বিলি করতে দিয়েছিলেন আমাদের। বিনয়ের কবিতার নতুনত্বের কারণে ওনার খ্যাতি তরুণ মহলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, যা সহ্য করতে পারছিলেন না পঞ্চাশ দশকের কবি আর লেখকরা। আমি গ্রেপ্তার হয়েছিলুম বলে হয়তো বিনয়ের কিছু ভীতিও জন্মেছিল হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে।

    শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নির্মল মৈত্র এবং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে উল্লেখ করে তাঁর লেখা বুলেটিনটি তুলে দিচ্ছি এখানে। স্বাভাবিক যে এই বুলেটিনটির পর তাঁর সময়ের কবি-সাহিত্যিকরা, যাঁরা তাঁকে আর্থিক সাহায্য করার কথা বলেছিলেন, সেই সাহায্য বন্ধ করার জন্যে তদবির আরম্ভ করেন আর শেষাবধি বন্ধও করে দেন।

    ১) শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অনিপুণ নপুংসকরূপ আশা করি এযাবৎ পাঠকপাঠিকা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পাননি ; সরকার পৃষ্ঠপোষকতা করে অবস্হাকে বেশ মজাদার করেছেন ; পদলেহী কুকুরের নিয়োগকারিণী চালচুলোহীন এক নারীর আত্মার নির্দেশনা অনুসারে উক্ত কবি নিজেকে মহিলা মনে করে কবিতা লেখেন ; আর কথপোকথনকালে দেখি মহিলার অভিনয় করায় শ্রীমানটির কোনো ভাবলেশ উপস্হিত হয় না ; অথচ ক্রমে-ক্রমে আমার দাসীত্ব দিয়ে সেই বেয়াদপ আত্মাটিকে শায়েস্তা করেছি আর অঙ্কশাস্ত্রে শ্রীমতি এখন মতামত জ্ঞাপনের মতন স্হূলতা দেখাবার বিপদের ঝুঁকি নিতে সক্ষম হবে কি ? কবিটির জন্ম কি কুকুর আর গাধার সঙ্গমজাত ফল।

    ২) স্হাপত্যবিদ্যায় ফেল মেরে-মেরে এক ছাগছানা বীর্যজাত নির্মল মৈত্রেয় জীবিকায় হাস্যকর ভিক্ষাবৃত্তি ঝুলে আছে। তবে ভয় নেই, যতক্ষাণ তার কচি পায়ু আছে, দালালী রয়েছে।

    ৩) সন্দীপন, হে শ্রীমান, দাস-অনুদাস শব্দটি শুনেছিলাম কবে যে ঠিক মনে নেই। তবে এটা নিশ্চিতই কবুল করতে হবে — দাসী-অনুদাস বলে কোনো শব্দ এ যাবৎ আমি তো শুনিনি। ফলে যথাযথরূপে তোমার অবস্হা প্রকাশের স্বচ্ছতা, বৎস, ভবিষ্যতে ভেবে দেখা যাবে।

    ৪) দল পাকাবার আগে, পরেও তাদের, রেকটাম বীট করে দিয়েছি বলেই, এইসব কেঁচোবৃন্দ বীটনিক নাম নিয়েছিল।

    ১০.৬.১৯৬৪

    রচয়িতা ও প্রকাশক

    বিনয় মজুমদার

    ৬৯, মীর্জাপুর স্ট্রিট, কলকাতা – ৯

    কফিহাউসে বেয়ারার মাথায় লাঠি মারার দরুন পুলিশ হাজতে থাকার সময়ে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে পুলিশ দুর্ব্যবহার করে থাকবে, হয়তো থানার লকআপে তাঁর আচরণেও স্কিৎসোফ্রেনিয়া রোগির ব্যাখ্যাহীন আস্ফালন নিচু স্তরের পুলিশকর্মীদের বিরক্ত ও ভীত করে থাকবে। আর হাংরি আন্দোলনে আমাদের গ্রেপ্তারি-মামলা ইত্যাদি নিয়ে কলকাতার সাহিত্যজগত তখন বেশ উত্তপ্ত। বিনয়ের ওপর হাজতে পুলিশ সত্যই খারাপ ব্যবহার করে থাকবে, যে কারণে বিনয়ের বাঁ কান আর বাঁ চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সঞ্জয় চক্রবর্তীকে দেয়া ১৯৯৩ সালে ‘যোগসূত্র’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছেন যে, বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার সময়ে তাঁর চোখ কান সবই ভালো ছিল। কিন্তু কলকাতাতেই পরে লোকে ধরে বাঁ-চোখ আর বাঁ-কান নষ্ট করে দিয়েছিল। সম্ভবত বারবার ইলেকট্রিক শক দেবার ফলে অবস্হা আরও খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সঞ্জয় চক্রবর্তীকে বিনয় বলেছিলেন যে উনি চারবার জেল খেটেছেন। দ্বিতীয়বার জেলে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে গিয়ে। অন্য দুইবারের তথ্য আমি যোগাড় করতে পারিনি। ১৯৭২ সাল থেকে যে সাক্ষাৎকারগুলো বিনয় মজুমদার দিয়েছেন, তাঁর উত্তরগুলো থেকে মনে হয় যে তিনি ঠিকমতন শুনতে পারছেন না, এবং মাঝে-মাঝে তাঁর উত্তর অস্ফূট হয়ে যাচ্ছে। পরে তাঁর ডান কানের ব্যথা বেড়ে গিয়ে শ্রবণশক্তি কমে যায়, যা উনি এই কবিতাটিতে লিখেছেন :-

    চোদ্দই অগাস্ট আজ

    চোদ্দই অগাস্ট আজ দু-হাজার দুই সাল। কানে

    তীব্র ব্যথা, ফলে

    সব কাজ বন্ধ আছে, অতি কষ্টে কবিতাটি লিখছি এখন।

    ডান কানে তীব্র ব্যথা, এবং ডাক্তার

    ওষুধ দিয়েছে কিন্তু ব্যথা তো সারেনি।

    কানের শ্রবণশক্তি কিছুটা কমেছে।

    যদি কেউ কথা বলে তাকে বলি ‘চিৎকার করো’।

    যদি চিৎকার করে তাহলে শুনতে পাই, না হলে শুনি না।

    ( হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ – ২০০৩ )

    ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকারে মারুফ হোসেন বিনয় মজুমদারকে প্রশ্ন করেছিলেন, “হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে কিছু শুনতে চাই”। জবাবে বিনয় মজুমদার বলেছিলেন, “শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘ফিরে এসো, চাকা’ সমালোচনা করতে গিয়ে সম্প্রতি পত্রিকায় প্রথম লিখল ‘খুতকাতর সম্প্রদায়’। বলল আমি নাকি হাংরি জেনারেশনের প্রতিষ্ঠাতা। এরপর হাংরি জেনারেশন পত্রিকা বেরোলো ‘ক্ষুধার্ত’। হাংরি জেনারেশনের বুলেটিন। সেই পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রথম কবিতাটিই ছিল আমার। ‘খেতে দেবে অন্ধকারে সকলের এই অভিলাষ’। আমার পরে শক্তির কবিতা। তারপরে মলয় রায়চৌধুরী প্রমুখের কবিতা। এরপর আমি শক্তিকে লিখলাম, না আমি প্রতিষ্ঠাতা নই। হাংরি জেনারেশন যখন শুরু হয়, যখন পত্রিকা বেরোয় তখন আমি দুর্গাপুরে চাকরি করি। ফলে আমার পক্ষে কোনো আন্দোলন শুরু করা সম্ভব নয়। সুতরাং আমি নই, শক্তি চট্টোপাধ্যায় হল হাংরি জেনারেশনের প্রতিষ্ঠাতা। পরে শক্তি হাংরি থেকে বিচ্যুত হল, আমিও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। ফলে মলয় রায়চৌধুরী হাংরি প্রতিষ্ঠা করেছে বলে দাবি করে। কথাটা মোটামুটি সত্য কথাই। শেষ পর্যন্ত ও-ই যখন হাংরি জেনারেশন চালাচ্ছে তখন ওকেই প্রতিষ্ঠাতা বলা কর্তব্য বলে আমার মনে হয়। এটা উচিত। ”

    প্রথম সংখ্যায় নয়। বিনয়ের কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল দশ নম্বর বুলেটিন থেকে। তার আগের বুলেটিনগুলো আমি পাটনা থেকে ইংরেজিতে ছাপাতুম। দেবী রায় কলকাতায় ছাপানো আরম্ভ করলে বাংলায় নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। আর “ক্ষুধার্ত” হলো সুভাষ ঘোষ-শৈলেশ্বর ঘোষ-বাসুদেব দাশগুপ্তদের সত্তর দশকের পত্রিকা, হাংরি বুলেটিন নয়। মামলায় রাজসাক্ষী হবার দরুন ওরা হাংরি শব্দটা তখন ব্যবহার করতে ভয় পেতো, তাই “ক্ষুধার্ত” বের করতো। আমি “হাংরি কিংবদন্তি” বইটা লেখার পরে ওদের টনক নড়ে। শঙ্খ ঘোষের বদান্যতায় হাংরি আন্দোলনের বিকৃত ইতিহাস ও আমাকে গালাগালসহ দে’জ থেকে “ক্ষুধার্ত” সংকলনগুলো হাংরি জেনারেশনের নামে প্রকাশিত হয়েছে। বলা বাহুল্য যে তাতে বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, দেবী রায়, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, অনিল করঞ্জাই, আলো মিত্র এবং আমার কোনো রচনা নেই। অর্থাৎ যাঁরা আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন তাঁদের লেখাই নেই।

    শক্তি আর সন্দীপনও একই সময়ে হাংরি আন্দোলন ছাড়েন, প্রধানত আমেরিকা থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ওসকানিতে; সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মনে করেছিলেন যে তাঁর ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠী ভেঙে দেবার ষড়যন্ত্র হিসাবে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করা হয়েছে, আর সেকথা তিনি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন। বস্তুত সেসময়ে তিনি এতোই হিংসুটে মনোভাবের হয়ে গিয়েছিলেন যে তারপর আমার কাছ থেকে কখনও কবিতা চাননি, দাদাকে চিঠিতে লিখেছিলেন যে মলয় কবিতা লিখতে জানে না, যদিও তার আগেই উনি ‘কৃত্তিবাস প্রকাশনী’ থেকে আমার ‘শয়তানের মুখ’ কাব্যগ্রণ্হ প্রকাশ করেছিলেন, ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় আমার যে কবিতা প্রকাশ করেছিলেন সেগুলো ‘কৃত্তিবাস সংকলন’ গ্রন্হে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ও আমাকে ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় কবিতা লিখতে বলেছিলেন। আমি ‘নীরার জন্য প্রেমের কবিতা’ লিখেছিলুম যা প্রকাশ করতে চাননি তাঁর সহসম্পাদকরা। এই কবিতাটা আমার ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো’ কাব্যগ্রন্হে আছে।

    সেই সময়ে কফি হাউসের বেয়ারার মাথায় লাঠি মারার দরুন বিনয় মজুমদারকে পুলিস আটক করেছিল, কুড়ি দিন জেল-হাজতে কাটাতে হয়েছিল। আরেকটা মারামারির দরুণ মাতালদের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বেশ আহত হয়েছিলেন, তাঁর চোখ-মুখে রক্তের কালশিটে পড়ে গিয়েছিল। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় দাদাকে লেখা একটা চিঠিতে এই ব্যাপারগুলো বেশ রসিয়ে লিখেছিলেন। মারামারির একটা পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন ; সুবিমল বসাককে কফিহাউসের সামনে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর অনুজ কবিরা ঘিরে ধরেছিলেন মারার জন্য কিন্তু সুবিমলের হিন্দি গালাগালের হুঙ্কারে সবাই পালিয়েছিল।

    এগারো

    স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হবার বয়স হল ষোলো থেকে তিরিশ বছরের মধ্যে। তা মূলত জিনগত রোগ হলেও, জন্মের আগে গর্ভে ভ্রুণের দুর্বলতার জন্য, সামাজিক চাপে মস্তিষ্কে ডোপামাইন ও গ্লুটামেটের রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য, ভাইরাসের আক্রমণে জিনে প্রভাবের জন্যে ঘটতে পারে। চিকিৎসা হয় প্রধানত অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধের দ্বারা, বন্ধুবৎসল পরিবেশের দ্বারা, পরিবারে আদরযত্নের দ্বারা।

    ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্হের কবিতাগুলো লেখা হয়ে যাবার পর বিনয় মজুমদার প্রথমবার স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে অনুমান করা যায়। প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় তিনি স্বাভাবিক ছিলেন এবং ইডেন হোস্টেলের মাঠে ফুটবল খেলতেন ; ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ছাত্র ইউনিয়ানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। সুতরাং ছাত্রাবস্হায় তিনি স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হননি। তাহলে কি গায়ত্রীকে নিয়ে কবিতা রচনার প্রচণ্ড চাপ গড়ে উঠেছিল বিনয়ের ওপর ? সমর তালুকদার ১৯৮২ সালে কবিতীর্থ পত্রিকায় লিখেছিলেন, তিনি ষাটের দশকের মাঝামাঝি যখন বিনয় মজুমদারকে দেখেছিলেন তখন “বিনয়ের মাথায় ঝাঁকড়া অগোছালো চুল, মুখভর্তি দাড়ি, জামাকাপড়ে মালিন্যের করুণতম ছাপ, গায়ে দুর্গন্ধ, আঙুলে বড় বড় নখভর্তি ময়লা। আর ছিল সমস্ত শরীর, স্নায়ু-গ্ল্যাণ্ডভর্তি রাগ। সবাইকে ভেংচাচ্ছেন — কাউকে খামচে দিচ্ছেন নিজের খেয়ালখুশিমতো। অশ্লীল ভাষায় থুতু ছিটিয়ে চলেছেন টেবিলে টেবিলে।”

    আমি কিন্তু হাংরি আন্দোলনের শুরুতে বিনয়ের ওই রূপ দেখিনি। কোন ঘটনার চাপ তাঁর ভারসাম্যকে দুলিয়ে দিয়েছিল তা জানি না, কবিতা লেখার চাপ ছাড়া। হিন্দি লেখক ও ‘জ্ঞানোদয়’ পত্রিকার সম্পাদক শরদ দেওড়া এই সময়ের বিনয় মজুমদারকে নিয়ে “কলেজ স্ট্রিট কা নয়া মসিহা” নামে একটা বই লিখেছিলেন। অন্যান্য সমসাময়িক কবিদের তুলনায় বিনয় যে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন তা অবাঙালি লেখক শরদ দেওড়ার সাহিত্যিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন থেকে স্পষ্ট হয়।

    স্কিৎসোফ্রেনিয়ার জন্য একজন লোক কবি বা আঁকিয়ে হন, নাকি তিনি কবি বা আঁকিয়ে বলে স্কিৎসোফ্রেনিয়ার জিন জাগ্রত হয়ে ওঠে, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর মনোবিদরা খুঁজে পাননি আজও। কোনো কোনো পুরাতাত্বিক মনে করেন যে গুহার দেয়ালে হোমো এরেকটারদের আঁকা যে ছবিগুলো দেখা যায় তা হয়তো স্কিৎসোফ্রেনিয়ার জিন দেহে ছিল এমন মানুষদের আঁকা। অধিকাংশ বিখ্যাত লেখক-কবি-আঁকিয়ের চরিত্রে সমাজের বাইরে বসবাস করার এবং সীমালঙ্ঘনের আগ্রহ দেখা গেছে। কবিতার ও ছবিআঁকার শৈলী সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে আর পরিবর্তনের সেই উথ্থান-পতনের সঙ্গে নিজের কাজকে সামাল দেবার প্রয়াস করতে হয়, এই ব্যাপার যেমন দেখি পাবলো পিকাসো এবং পল গঁগার ক্ষেত্রে, তেমনই দেখা গেছে বিনয় মজুমদারের ক্ষেত্রে। এর দরুণ আলোচকদের প্রশংসা অথবা কটূ সমালোচনা জোটে কবি-লেখক-আঁকিয়ের। তাঁদের ভাবতে বাধ্য করে যে সাহিত্য বা ছবি আঁকা তাঁদের সারা জীবন হয়তো চাকুরিহীন থাকতে বাধ্য করবে, এই ভাবনা বিনয় মজুমদারে পাই আমরা। এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিগ্যেস করা হয়েছিল, তিনি বিয়ে করেননি কেন ? উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, তাঁর কোনো চাকরি নেই, বাঁধা আয় নেই, তাই।

    স্কিৎসোফ্রেনিয়া রোগের উপসর্গ হল অজীর্ণ, যা লোকটিকে সারা জীবন বইতে হয়, অনেক সময়ে পেট খারাপের দরুন যেখানে-সেখানে মলত্যাগ হয়ে যায় ; তারপর অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধের ক্রিয়ায় অজীর্ণ স্হায়ী হয়ে যায় ; ফলে ফ্যানাভাত খেতে হয় বা আলুসিদ্ধ খেতে হয়। বিনয় মজুমদার শেষ বয়সে তাঁর অজীর্ণ নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন, তাতে “মুগ্ধ মলত্যাগ” অভিব্যক্তিটি অসাধারণ :-

    আর গাইব না

    অজীর্ণ, তোমাকে নিয়ে আর গান গাই না তো।

    যেখানে সেখানে মুগ্ধ মলত্যাগ শেষ হয়ে গেছে।

    বর্তমানে বসে আছি আমার চৌকির উপরে।

    পরনে একটি লুঙ্গি, গায়ে এক গেঞ্জি আছে।

    ঢেকুর বেরোচ্ছে বটে, তবে এ ঢেকুর ধোঁয়া ঢেকুর নয়।

    কোনো গন্ধ নেই এ ঢেকুরে ; আমি একা একা আছি ঘরের ভিতরে।

    আমার বাড়ির সব আলো জ্বালা আছে।

    তদুপরি হারিকেন লন্ঠনটি জ্বালা আছে টেবিলের উপরে।

    অজীর্ণ, তোমাকে নিয়ে আর গান গাই না তো, আর গাইব না।

    আধুনিকতাবাদের সবচেয়ে গোলমেলে ব্যাপার হলো যে বৃহত্তর সমাজ তাঁদের সম্পর্কে একটি নেগেটিভ ধারণা গড়ে তোলে, যেন নিউরোটিক এবং মনস্তাত্বিক বিপর্যয় কবিতা রচনা বা ছবি আঁকার জরুরি উপাদান। বঙ্গসমাজে আমরা দেখেছি যে প্রাগাধুনিক কালে এই ধরণের মানুষ সমাজের বাইরে বেরিয়ে অঘোরী-তান্ত্রিক-সন্ন্যাসী-সুফি-দরবেশ-ফকির-আউল-বাউলের জীবন বেছে নিতেন। সুফি সন্তরা যেভাবে নৃত্য করেন তাকে সালাফিস্টরা বলেন পাগলামি, তার কারণ সবাইকে সালাফিস্ট ভাবধারায় পিটিয়ে সমরূপী করার তত্ত্বকে অস্বীকার করেন সুফিরা ; এ এক ধরণের সাম্রাজ্যবাদি প্রয়াস, তত্বের উপনিবেশের জেলখানায় ঢুকিয়ে বন্দি করে রাখার চেষ্টা। পাকিস্তানে সুফি সন্তদের সমাধিগুলোকে সালাফিস্টরা বোমা মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে, তার দরুণ সমবেত তীর্থযাত্রীরাও মারা যাচ্ছেন। বুল্লে শাহের মতন সন্তের গান নিষিদ্ধ করে দিয়েছে সালাফিস্টরা। বিনয় মজুমদারের ক্ষেত্রেও, বহু আলোচক তাঁকে ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্হের সাব-জনারেই আটক রাখতে ভালোবাসেন, অথচ তিনি আরও তিনটি সাব-জনারের কবিতা লিখে গেছেন।

    আজকাল দেখি অনেকেই, এমনকি দরবারি তাঁবেদাররাও, উপদেশ দেন যে হাংরি হলে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয় ! আমি পড়াশুনায় ভালো ছিলুম বলে গ্রামীণ উন্নয়নের কাজে উঁচু পদে চাকরি করেছি বলে আমাকে আক্রমণ করা হয়, যেন গরিব সেজে ঘুরে বেড়ানো উচিত ছিল। হাংরি আন্দোলনের সময়ে বিনয় মজুমদার যদি ভুট্টা সিরিজের কবিতা লিখতেন তাহলে সরকার সংবাদপত্র বিদ্যায়তনিক প্রতিনিধিরা তাঁর কি গতি করতেন তা সহজেই অনুমেয়। গোর্কি সদনের অনুষ্ঠান থেকে ‘বাল্মীকির কবিতা’র কবিতা পাঠ করার জন্য বিনয় মজুমদারকে অশ্লীল কবি ছাপ্পা দিয়ে বিতাড়ন করা হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে প্রকাশক ‘বিশ্ববাণী’র কাছে লালবাজার থেকে নির্দেশ গিয়েছিল যাতে বইটি বিক্রি করা না হয়। পুলিশকর্তারা তো নিজে থেকেই নির্ণয় নেন না ; কোনো সাহিত্যিক খোচর তাঁদের কাছে বইটির কথা রসিয়ে-রসিয়ে বলে থাকবে, একটি কপি প্রেস সেকশানে জমা দিয়ে, একথা আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, হাংরি মামলায় ‘উপদ্রুত’ নামের পত্রিকার সম্পাদক পবিত্র বল্লভ পুলিশের খোচরের কাজ করতেন, এবং আমাদের যাবতীয় প্রকাশনা নিয়মিত পৌঁছে দিতেন লাল বাজারের প্রেস সেকশানে, তার বিভাগীয় প্রধান ডেপুটি কমিশনার ছিলেন আবার কবি তারাপদ রায়ের মেসোমশায়। এই খোচরটিকেই সৃজিত মুখার্জি তাঁর ‘বাইশে শ্রাবণ’ ফিল্মে তুলে ধরেছিলেন।

    আধুনিকতাবাদের ফলে কবি বা ছবি আঁকিয়ের আর্থিক অবস্হা খারাপ হয়ে উঠলে সাধারণ সমাজ এবং রাজনীতিকরা কবি বা ছবি আঁকিয়ের চরিত্রের নেগেটিভ দিকগুলোকে গুরুত্ব দেন। বিনয় মজুমদারকে আর্থিক সাহায্যের সময়ে এই তর্ক তুলেছিলেন অনেকে। ইউরোপে নেগেটিভ ছাঁচে ফেলে মার্কা-মারা করে দেবার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। আধুনিতাবাদের প্রভাবে আমরাও সেই ছাঁচটা নেগেটিভ বলে চিহ্ণিত করতে শিখেছি। এই ইউরোপীয় মানদণ্ডের ফলে সাহিত্য এবং ছবি আঁকার যে সৃজনশীল প্রক্রিয়া তার অর্থপূর্ণ বিশ্লেষণ হয় না। সৃজনশীল সাহিত্যিক ও ছবি আঁকিয়ে বা নৃত্যশিল্পীর ওপর ব্যাপারটা ভয়ংকর চাপের কাজ করে। এই প্রসঙ্গে আমরা আধুনিকতার বাইরে বসবাসকারী রামকিঙ্কর বেইজের প্রসঙ্গ তুলতে পারি। সামাজিক মানদণ্ডের বাইরে বসবাসকারি লালন সাঁই, তুকারাম, কবীর, রবিদাস-এর প্রসঙ্গ তুলতে পারি, যাঁদের এখন বলা হয় সন্ত।

    কবি, লেখক, ছবি আঁকিয়ে যা করেন তার প্ররোচনার উৎস কোথায় ? যাঁরা টাকা রোজগারের জন্য করেন তাঁদের কথা আমি বলছি না। এই প্রশ্নটা আলোচকদের, দার্শনিকদের, মনোবিদদের, চিকিৎসকদের বহুকাল ধরে ভাবাচ্ছে। নতুন প্রজন্মে নতুনতর তত্ত্ব উপস্হাপন করা হয়েছে। সৃজনশীল প্রক্রিয়ার যুক্তিহীনতাকে নিদারুণ অবজ্ঞা করে প্ল্যাটো বলেছিলেন যে “কবিরা সঠিক চেতনার মানুষ নন, তাঁরা সৃজনদেবীর নিশিডাকে যুক্তির জগত থেকে বিচ্ছিন্ন। ”

    ১৪১৩ বঙ্গাব্দে ‘অউম’ পত্রিকার জন্য জয় মুখোপাধ্যায় ও সন্মোহন চট্টোপাধ্যায়ের নেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে এরকম প্রশ্নোত্তর হয়েছিল :-

    প্রশ্ন : ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’য় আক্রান্ত হয়ে স্বদেশ নির্বাচনের দায়িত্ব একদিন যে সাম্রাজ্যবাদ আপনাকে দিয়েছিল, আজ এই অন্ধকার ও প্রায় অজ্ঞাত পৃথিবীর মধ্যে বাঁচতে বাঁচতে আপনার কি মনে হয় না যে বস্তুত সেই সাম্রাজ্যবাদই আসলে কোনও দিন ছিল আপনার বাস্তুচেতনা ?

    বিনয় : কবি ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছিলেন — “তুমি মা কল্পতরু/আমরা সব পোষা গোরু।” বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন, তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তখন লোকে বলেছিল, ‘একটি এঁড়ে বাছুর জন্মেছে।’ প্লেটো বলেছিলেন — তাঁর রিপাবলিকে কোনো কবি রাখা হবে না। এই মত এখনও এই পশ্চিমবঙ্গে ছাপা হয় ( ব্যঞ্জনবর্ণ পত্রিকা )। আর কবিরা নিজেদের ঢাক নিজেরাই শুধু পেটায়। তবে ওই প্লেটোই যখন জন্মেছিল, তখন মন্ত্র পড়া হয়েছিল কবিতায়, ওই প্লেটোর অন্নপ্রাশনের সময় যে মন্ত্র পড়া হয়েছিল. সেই মন্ত্র কবিতা, ওই প্লেটোর বিয়ের সময় যে মন্ত্র পড়া হয়েছিল, সেই মন্ত্র কবিতা, ওই প্লেটোর শ্রাদ্ধের সময় যে মন্ত্র পড়া হয়েছিল, তা-ও কবিতা, এমনকি জীবিত অবস্হায় প্রত্যেক রবিবারে ওই প্লেটো গির্জায় যে প্রার্থনা করত, তাও কবিতা — এর পরে আর কী বলা যায়। ’

    বিনয় মজুমদার প্ল্যাটোকে একজন খ্রিস্টধর্মী অনুমান করে কথাগুলো বললেও, জয় মুখোপাধ্যায় ও সন্মোহন চট্টোপাধ্যায়ের তথাকথিত জোলো বামপন্হী ভাবধারাকে যুৎসইভাবে উপড়ে দিতে পেরেছিলেন। বিনয় মজুমদার ধর্মে আস্হা রাখেননি কিন্তু ‘সৃষ্টিকর্তা’ নামের কোনো ক্ষমতাকে বিশ্বাস করেছেন, যা তাঁর এই কবিতায় পাই আমরা :-

    ২০ আগস্ট ১৯৯৮

    তিন চোখ, চার হাত — এইসব দেবদেবীদের

    মূর্তি দেখে যেতে হবে চিরকাল ? কী করে টের

    পেয়েছিল হিন্দুগণ — এরা সব আছে ?

    ধীরে ধীরে যেতে হয় হিন্দুদের পঞ্জিকার কাছে।

    পঞ্জিকায় ছবি ছাপা — দশভূজা, আরো কতোজন।

    এদের এড়িয়ে দেখি বেঁচে থাকে খ্রিস্টানের মন।

    এই বিশ্বে দীর্ঘকাল টিকে থাকে যা যা

    তা তা সত্য ; তাহলে দেবতাদের রাজা

    ইন্দ্র আর সরস্বতী, লক্ষ্মী এরা আছে

    তবুও আমার মনে সন্দেহ থেকেই যায়, বলি কার কাছে

    সেহেতু কখনো কারো পুজাই করিনি।

    তবু সৃষ্টিকর্তা আছে যার কাছে আমি আজো ঋণী।

    আমার বাঁহাত আছে এটা যত সত্য বলে মানি

    সৃষ্টিকর্তা আছে এটা তত সত্য বলে আমি জানি।

    ( শিমুলপুরে লেখা কবিতা — ২০০৫ )

    বিনয় মজুমদারের সমসাময়িক কবিরা, এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের কবিরাও, এই ফান্ডামেন্টাল প্রশ্নগুলো নিয়ে নিজেদের ভাবনাচিন্তা উপস্হাপন করেননি। তাঁরা কেবল আঙ্গিক আর বিষয়বস্তুর ভেতরে নিজেদের চিন্তাকে সীমিত রেখেছেন।

    ফ্রেডরিক নিৎশে বলেছিলেন যে “মানসিক অসুস্হ না হলে কবি বা শিল্পী হওয়া যায় না ; অস্বাভাবিকতা থেকে সৃজনশীলতার সৃষ্টি হয়। ” আবার ফ্রেডরিক নিৎশেই বলেছেন যে খ্রিস্টধর্মের প্রসার ঘটেছে মানুষের চরিত্রে সৃজনশীলতার অস্বাভাবিকতা থেকে। খ্রিস্টধর্মের প্রসার সম্পর্কে একই কথা বলেছিলেন টমাস অ্যাকুইনা। গভীরভাবে ভেবে দেখলে ধর্ম ব্যাপারটাই অস্বাভাবিক ; সেকারণেই ধর্মের মতন অব্যাখ্যেয় চিন্তার দরুণ মানুষ পরস্পরের সঙ্গে লড়ে মরে। ২০০১ সালে বাংলাদেশের ‘লোক’ পত্রিকার জন্য শামীমুল হক শামীমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন, “ধর্ম জিনিসটা বড় গোলমেলে। আমি ওই সাতে পাঁচে নেই। ধর্মীয় কারণে জীবনানন্দের চেয়ে নজরুল এদেশে উপেক্ষিত হচ্ছে এবং ঠিক একই কারণে নজরুলকে তোমরা জাতীয় কবি করেছ।” ওই সাক্ষাৎকারে বিনয় আরও বলেছেন, “গান্ধী বলেছেন ‘ঈশ্বর আল্লাহ তেরো নাম সব কো সন্মতি দে ভগবান’। এই কথা বলাতে গান্ধীকে গুলি করে মেরে ফেলল। ধর্মভিত্তিক একটা বিভাজন হয়ে গেছে। ধর্মের চেয়ে বরং মৃত্যু নিয়ে লেখা সাহিত্যিকদের স্মরণীয় করে রাখে। জীবনানন্দের ‘অদ্ভুত আঁধার’, ‘আট বছর আগে একদিন’ কী অদ্ভুত কবিতা !”

    সবাই কবিতা লেখেন না, ছবি আঁকেন না, কৈশোরে আর তরুণ বয়সে আরম্ভ করে ছেড়ে দেন, কিন্তু অনেকে ছাড়তে পারেন না, খ্যাতি বা টাকাকড়ির জন্য নয়, তাঁরা ছাড়তে পারেন না কেননা, তাঁরা আটক পড়েন কোনও এক অস্বাভাবিক মননঘুর্ণিতে, তাঁরা তাড়িত হন সাইকোপ্যাথিক সাহসের কোনো এক মানসিক চাঞ্চল্যের নিশ্চয়তায়, যা কিনা সৃজনশীল ব্যক্তিমানুষের চরিত্রের সৎ উপাদান, এবং সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ক্রিয়াবৈগুণ্যে সম্পর্কিত। ‘ট্রেণ্ডস ইন কগনিটিভ সায়েন্সেস’ পত্রিকার জুলাই ২০১৫ সংখ্যায় ‘থিংকিং টু মাচ : সেল্ফ জেনারেটেড থট অ্যাজ দি ইনজিন অফ নিউরটিসিজম’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে যে স্বতঃচিন্তা সৃজনশীল কাজে সাহায্য করে বটে কিন্তু তা ব্যক্তিবিশেষের দুঃখেরও কারণ হয়ে ওঠে। বিনয় মজুমদার একটি লেখায় বলেছেন যে দুঃখের কবিতা লিখে কবি আনন্দ পান। ‘নেচার নিউরোসায়েন্স’ পত্রিকার জুন ২০১৫ সংখ্যায় বলা হয়েছে যে, স্কিৎসোফ্রেনিয়া এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডার ব্যক্তিএককের ভেতরে ঘুমিয়ে-থাকা বংশগত জিনটি সহজাত সৃজনীপ্রতিভাকে জাগিয়ে তোলে, এবং এই জিনগুলো সাধারণ মানুষের থেকে ভিন্ন।

    কে জেমিসন তাঁর ‘টাচড উইথ ফায়ার : ম্যানিক ডিপ্রেসিভ ইলনেস অ্যাণ্ড দি আর্টিস্টিক টেমপেরামেন্ট’ ( ১৯৯৬ ) বইতে বলেছেন যে কবি ও ছবি আঁকিয়েদের সৃজনশীলতার সঙ্গে তাঁদের মুডের বিশৃঙ্খলা এবং শৈল্পিক বাতিকজনিত মনোভঙ্গের সরাসরি যোগাযোগ আছে। তাঁদের শৈল্পিক ক্ষমতা যতো হ্রাস পেতে থাকে তাঁদের অবদমিত বিষণ্ণতাবোধ ও যৌনতায় বিফলতা ততো বেশি তাঁদের মেজাজকে বিধ্বস্ত করতে থাকে। স্টিফেন ডায়ামণ্ডস ‘অ্যাঙ্গার ম্যাডনেস অ্যাণ্ড দি ডায়ামনিক : দি সাইকোলজিকাল জেনেসিস অফ ভায়োলেন্স, ইভিল অ্যান্ড ক্রিয়েটিভিটি’ ( ১৯৯৯ ) গ্রন্হে বলেছেন যে, সৃজনশীলতার সঙ্গে ক্রোধ, ক্ষিপ্তাবস্হা, আকস্মিক উদ্দীপনা, উগ্রতা, মন্দচিন্তা, অশ্লীল ভাবনা ও অসংলগ্ন আচরণের সম্পর্ক আছে, এবং তা কবিতায়-ছবি আঁকায় বা আচরণে ফুটে ওঠে ; বহুক্ষেত্রে শিল্পী তাঁর পুরোনো গড়ে তোলা ইমেজের বাইরে বেরিয়ে যাবার প্রয়াস করেন।

    বিনয় মজুমদারের কবিতাগুলো সম্পর্কে কেউ-কেউ সেরকম কথাই বলে থাকেন। অথচ বিনয় মজুমদার ইনসেন বা ম্যাড ছিলেন না, তিনি স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় ভুগতেন। স্কিৎসোফ্রেনিয়া যদি জিনগত রোগ হয়, তাহলে কেন তাঁকে ‘পাগল’ তকমা দিয়ে ইলেকট্রিক শক দেয়া হতো ? প্রায় তিরিশ বার তাঁকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়েছে ; আটবার ভর্তি করা হয়েছে মানসিক চিকিৎসালয়ে, যেখানে স্কিৎসোফ্রেনিয়ার চিকিৎসার কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছিলেন না। যাঁরা চিকিৎসা করতেন তাঁরা হয় এম.বি.বি.এস অথবা মনোবিদ।

    সুমন গুণ, ছন্দবিদ অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়ের একটি উক্তি উদ্ধৃত করে বলেছেন, বাঙালির সহজাত আলস্যপ্রবণতার একটি জনপ্রিয় প্রকাশ হলো জীবনানন্দের কবিতায় ছড়ানো অক্ষরবৃত্ত ছন্দ। এই ছন্দই বিনয় মজুমদারেরও পছন্দ। তাঁর প্রতিটি কবিতা পয়ারে লেখা। সুমন গুণ বলেছেন, এই প্রাকরণিক সখ্য তাঁদের সংঘবদ্ধ করেছে। এই দুজন কবির ঘরানার মধ্যে একটি বৈষয়িক সম্বন্ধও আছে। তাঁরা দুজনেই কবিতায় এক স্মিত দার্শনিকতার প্রশ্রয় দিয়েছেন। জীবনানন্দের দর্শন ভেতরে জড়িয়ে রাখে সময়ের ইতিহাসের ঘোর। আর বিনয়ের কবিতা ঘটনার, বিজ্ঞানের, গণিতশাস্ত্রের উদাহরণ পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের পরে সময় ও সমাচার নিয়ে এমন অক্ষুন্ন মনস্কতা অন্য কোনো কবির লেখায় বিশেষ পাওয়া যায় না। জীবনানন্দ ও বিনয় কোনও ঘটনার বিবরণ দিয়ে থেমে যান না, সেই ঘটনা বা প্রসঙ্গের একটি সাধারণ নির্ণয়ও রচনা করেন। সুমন গুণও ‘ফিরে এসো,চাকা’ কাব্যগ্রণ্হের পর সম্ভবত আর এগোননি।

    বিনয় মজুমদার তাঁর ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে বলেছেন, “গোবরডাঙায় সন্দীপ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার একবার আলোচনা হয়েছিল। সন্দীপ এবং আমি একমত হলাম যে গত আড়াই হাজার বছরে যত বই লিখেছে ভারতীয়গণ, তার একটা মোটামুটি হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে দুইজন অমর কবি আছেন। এক শতাব্দীতে সারা ভারতে মাত্র দু’জন। এই হিসেবটাই সত্য। সুতরাং হে বাঙালিগণ, কবি জীবনানন্দের কী দশা হবে আগামী ২০০০ বছর পরে কে বলতে পারে ? কিন্তু জীবনানন্দ খুব খারাপ কবিতা লেখেননি। জীবন যোগ আনন্দ — একসঙ্গে মিলে জীবনানন্দ। তা সত্বেও জীবনানন্দ একটিও আনন্দের কথা লিখতে পারেননি। সব বেদনার কবিতা লিখেছেন। ”

    ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে বিনয় আরও লিখেছেন, “আমি কৈশোরে দাড়ি গোঁফ গজাবার আগে, প্রায় প্রত্যহ দিলীপ গুপ্ত মশাইয়ের সিগনেট বুকশপে যেতাম। দিলীপবাবু আমাকে একটানা আবৃত্তি করে শোনাতেন, তৎকালীন তরুণ কবিদের কবিতা — জীবনানন্দ, সমর সেন, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে প্রমুখ আরো নানাজনের কবিতার বাছা-বাছা অংশগুলি। আমি হাঁ করে শুনতাম। ফলে সপ্তাহে অন্তত একখানা এদের রচিত বই খানিকটা প্রেমে পড়েই কিনে ফেলতাম। জীবনের আনন্দের, মানে জীবনানন্দের কোনো কবিতার বই তখন কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ায় কেনার জন্য পাওয়া যেতো না। সুতরাং দিলীপ গুপ্ত মশাই জীবনানন্দের বাড়িতে গিয়ে একখানি ‘ধূসর পাণ্দুলিপি’ এনে আমাকে দিয়েছিলেন। যতখানি ব্যথাভারাতুর মন হলে জীবনানন্দের ব্যথাভারাতুর কবিতাগুলি ভালো লাগে, ততদূর ব্যথাভারাতুর মন আমার তখনো হয়নি। তবুও আমার কবিতাগুলির প্রতি কেমন যেন মায়া জন্মেছিল। ধূসর শালপাতায় জড়িয়ে যেমন মাংস বিক্রি করে, তেমনি দু-খানি ধূসর মলাটের মধ্যে কবির হৃৎপিণ্ড জড়িয়ে আমার হাতে দেওয়া হয়েছিল। ”

    মামুদ সীমান্ত, যিনি ভারতে এসে শিমুলপুর গ্রামে গিয়ে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, জোগিরার ১৮ অক্টোবর ২০১২ সংখ্যায় লিখেছেন, “যে দৃষ্টি দিয়ে বিনয়কে মানসিক অসুস্হ বিবেচনা করে থাকি, মূলত সেটাই বিনয়ের কাব্যভাষা। লক্ষ্য করার বিষয়, বিনয়কে আমাদের এই অপ্রকৃতিস্হ বোধ-বিবেচনার ফলে বিনয়ের কোনো কবিতায় ব্যঙ্গ-রসাত্মক উপমাটি আমাদের কাছে অন্য মানে তৈরি করে। জৈবনিক দীক্ষায় তিনি কি অন্যমনে শেষমেষ কবিতাকেই ধিকৃত করেছিলেন সমর্পণের দায়ে ? বিনয়ের এইরূপ ভাষা-প্রক্রিয়ায় খেলা করার বিষয়টি বাংলা কবিতার সমঝদার পাঠকশ্রেণিকে নিশ্চয়ই আন্দোলিত করে। বিষয়-বৈচিত্র্যে বিনয়ের কাব্যভাষায় যথেচ্ছ চমক আছে। বিনয় সেই অবতারপ্রাপ্ত হয়েই জন্মেছেন। কিন্তু সমকালের বিকৃত বিবেচনাই তাঁর সে অবস্হানকে ক্ষুন্ন করেছে। বৈচিত্র্যের বদলে হয়ে উঠেছেন মরুবৃক্ষের ন্যায় বিপন্ন, বৈভবহীন, ছিন্ন-মণিষা। ভুল আলোচনার শিকার হয়ে পীড়িত হয়েছেন তিনি। তাঁর কাব্যভাষা মহাকালের খণ্ডিত কম্পনরূপে সাক্ষরিত হয়ে থাকলো আমাদের কাছে। ”

    মামুদ সীমান্ত আরও লিখেছেন, “বিনয় তাঁর কাব্যে অবস্হান করেন উত্তমপুরুষে। এই উত্তমপুরুষটি এককেন্দ্রিক, অন্য অর্থে বহুধাবিভক্তও বটে। কবিতার অন্তর্গত সেই উত্তমপ্রকৃতিটিরই প্রকাশনা ঘটিয়েছেন নির্দ্বিধ, কোথাও ফাঁকি দেননি। এটি তাঁর একটি সেনশেশানাল ফেজ। অথচ তাতে বিনয়ের কোনো খেদ নেই। কেননা বিনয় সেদিকে ফিরেও তাকান না বা তাকানোর প্রয়োজন বোধ করেন না। তাঁর ‘বাল্মীকির কবিতা’, যাকে বলা হচ্ছে যৌনতার ভাষনির্মাণ, সেই কবিতাগুলোকেই আমার বহুল অর্থে লিখিত বলে মনে হয়। প্রশ্ন উদ্রেক হয় যে কবিতাগুলো পাঠের শুরুতেই পাঠক যৌনতা বিষয়ক আচ্ছন্নতায় মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে যৌনতার সূত্র ধরে বাংলা কবিতায় উপমা ও বিবৃতির গাণিতিক ব্যাখ্যাটিকেই তিনি পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন। . কবিতাগুলোর মূল্যায়ন বিষয়ে অধিকাংশ পাঠকের নিম্নরুচির উপমাবিচার বাদ দিলে, কবিতাগুলো সর্বাধিক কাব্যশৃঙ্গারে উন্নীত। ভারতীয় উপমহাদেশে কামশৃঙ্গারের বিশ্লেষিত উপস্হাপনায় যেরূপ চিত্র সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত, বিনয়ের কবিতা মোটেও তা থেকে পিছিয়ে থাকে না। ‘আমার ভুট্টায় তেল’ জাতীয় কবিতায় রূপকার্থে ব্যবহৃত এমন সব শব্দ পাওয়া যায় যাকে বহু পাঠক, প্রাবন্ধিক, আলোচক এ যাবত কবিতাগুলিকে যৌনতার অপব্যাখ্যা দিয়ে কবিতার মূল টার্ম ভেঙে বিনয়কে কাণ্ডজ্ঞানহীন দোষী সাব্যস্ত করেছেন, যা একজন উচ্চমার্গীয় কবি-লেখকের ক্ষেত্রে কোনো কালেই প্রাপ্য ছিল না। কবিতাগুলি পাঠশেষে, সর্বাগ্রে আমি এটাই মনে করি, বিনয় মজুমদার এই কাব্যগুলোতেই ভাষার গূঢ়তাত্বিক কারিগরি করেছেন।”

    তিনটি কবিতা পাঠ করে দেখা যাক :-

    বসার পরে

    বসা শেষ হয়ে গেলে দেখা যায় ভুট্টা অতি সামান্যই নরম হয়েছে।

    নদী সোজা উঠে পড়ে, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি গ্লাসের বাহিরে

    রস লেগে আছে কিনা, নদী তার হাত দিয়ে আমার ভুট্টাটা

    তখন — বসার শেষে কখনো ধরে না, ভুট্টা রসে ভেজা থাকে।

    আমি কিন্তু হাত দিই, ঘাসের উপরে হাত বোলাতেই থাকি,

    ঘাস টেনে টেনে দেখি, ঘাসের উপরে হাত বোলাতেই থাকি,

    ঘাস টেনে টেনে দেখি, অনেক অশ্লীল কথা অনায়াসে বলি।

    নদীর গ্লাসের দৃশ্য — গ্লাসের বাহিরটিকে প্রাণভরে দেখি

    ( গ্লাসের ভিতরে দেখি বসার সময়ে শুধু ) বসা শেষ হলে

    গ্লাস খুলে দেখতে সে এখনো দেয়নি, আমি বহির্ভাগ দেখি।

    হঠাৎ বেলের দিকে চোখ পড়ে মুগ্ধ হয়ে যাই।

    বেল দুটি এ বয়সে অল্প পরিমাণ ঝুলে পড়েছে, সে দুটি

    মনোমুগ্ধকর তবু চোখ ফের নেমে যায় নিচের গ্লাসের দিকে, সেই

    গ্লাসের উপরিভাগ বসার সময়ে যতো চওড়া দেখেছি

    এখন ততটা নয়, সরু হয়ে পড়েছে তা ঘাসগুলি ঘন হয়ে পড়েছে এখন।

    যৌবন কাহিনী

    এখন ফুলকে খাই প্রায়শই কলকাতা গিয়ে।

    কয়েক বছর ধরে খাওয়া হলো, ছেলেও হয়েছে।

    আরো ছেলে মেয়ে চাই — এই কথা ফুলকে বলেছি,

    খাওয়ার সময়ে আমি ধাক্কা দিতে দিতে এই কথাই বলেছি।

    ফুল তাতে রাজি আছে, এই ভাবে দুজনের জীবন চলেছে।

    ফুলের ঘরের পাশে আরো বহু ঘর আছে, প্রতিটি ঘরেই

    নদী আছে, তারা সব আমার খাওয়ায় খুব সহযোগীতাই

    করে থাকে সর্বদাই, ফুল যেই বলে ‘আজ একবার বসি’

    অমনি সে নদীদের একজন জল এনে দেয়।

    আমরা খাওয়ার পরে সেই জলে কলা গুহা ধুই।

    আমি গেলে মাঝে মাঝে তাদের ভিতরে কেউ জিজ্ঞাসাও করে

    ‘আজ তুমি বসবে কি’ এইসব পরস্পর খাওয়ার সহযোগীতা করে

    সেখানে — আমার ফুল যেখানে রয়েছে সেই বাড়িটিতে

    নদী আছে, প্রতিবার খাওয়ার পরেই ভাবি তারা সব দেবী।

    তিন ঘণ্টা পরে

    একবার বসা হলে কমপক্ষে সারাদিন তার

    আমেজ শরীরে থাকে, ভুট্টা থাকে কাৎ হয়ে পড়ে

    সহজে দাঁড়ায় না সে ; মাঝে মাঝে ভুট্টাকে ফুটিয়ে

    ময়লা ও লেগে থাকা রস তুলে আনি

    হাতের আঙুল দিয়ে এবং সে ময়লা ও রসের সুঘ্রাণ

    নাক দিয়ে শুঁকি খুব ভালো লাগে ; প্রথম প্রথম

    বসার পরেই আমি ভুট্টা ধুয়ে ফেলতাম — চাঁদ জল দিয়ে

    গুহা ধুয়ে ফেলবার পরেই আমার ভুট্টা ধুয়ে দিতো জল ঢেলে ঢেলে।

    অবশ্য কয়েকবার নিজেও ধুয়েছি আমি নিজে জল ঢেলে।

    তারপর ভাবলাম ভুট্টাতে গুহার রস লেগে থাকা ভালো।

    তাতে বেশি সুখ পাবো, রস শুঁকে আনন্দও পাবো।

    সেহেতু এখন আর ধুই না এবং আমি মাঝে মাঝে ভুট্টাকে ফুটিয়ে

    ময়লা ও লেগে থাকা রস তুলে এনে তাই শুঁকি।

    ভালো লাগে, তার হেতু এই রস চাঁদের গুহার।

    সমর তালুকদার বিনয় মজুমদারকে প্রশ্ন করেছিলেন, “নারী সংসর্গের অভাব বোধ কর না ?” উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, “এটা ব্যক্তিগত — এ ব্যাপারে তোমার সঙ্গে কোনো আলোচনা করব না।”

    বারো

    ‘শব্দের শিশির’ গ্রন্হপ্রণেতা কবি ও প্রাবন্ধিক জয়িতা চক্রবর্তী বলেছেন যে, “প্রত্যেক সৃষ্টিশীল কাজেই প্রাথমিক উথ্থান কবিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয় ; তাঁর সেরা সৃষ্টিগুলি একে-একে শেষ হতে থাকে। অধোগতি হয়েছে একথা শুনতে হয় তাঁকে। ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ, যাঁর সেরা সৃষ্টিগুলি পরিণত ও শেষ পর্বে পাওয়া যায়। শিল্পী কখনও নিঃশেষিত হন না। পঞ্চাশের দশকের কবি বিনয় মজুমদার যতো জনপ্রিয় ততোটাই নিন্দিত। আমি মনে করি ‘ভালো কবিতা’ বা ‘মন্দ কবিতা’ বলে কিছু হয় না। বিনয় মজুমদারের প্রথম পর্বের কবিতাগুলিতে রোমান্টিসিজম ছিল, যা বাঙালি পাঠকের চির পছন্দের। শেষ পর্বের লেখাগুলো সময়ের চেয়ে এগিয়ে। কবিতা যেখানে জীবনের অপ্রিয় সত্য, জৈব সত্য ও জীবনের বাহ্যিক অর্থহীনতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে। অনেক কবির মতে বিনয় মজুমদারের সেসব কবিতা অপাঠ্য, বিকৃতরুচির পরিচায়ক। আমি জোর দিয়ে বলছি, তারা বদ্ধ জলাশয়। এমনকি ভুট্টা সিরিজের কবিতার বই পুলিশ অব্দি গড়ায়। স্টল থেকে তুলে নেওয়া হয় তাঁর বই। বাঙালির যৌনতা সম্পর্কে ছুঁৎমার্গ কাটবে না ; তাঁরা ঘোমটার আড়ালে খেমটা নাচ পছন্দ করেন। বিনয় মজুমদারের কবিতায় আছে কাব্যগুণ, আছে জীবনবোধ। তাই শেষজীবনে অসুস্হ শরীরে লেখা কবিতাগুলি অত্যন্ত উপভোগ্য ও উত্তরআধুনিক কবিতাধারায় সৃষ্ট ; একজন সাহসী লেখকের মননশীলতার পরিচয়।”

    এই প্রসঙ্গে পুনরাধুনিক কবিতার প্রবক্তা ও কবি অনুপম মুখোপাধ্যায় বলেছেন, “এই ভুট্টাপর্বের কবিতাগুলোর জন্য তাঁকে কম গালমন্দ খেতে হয়নি। অনেকেই তাঁকে সিরিয়াসলি নিতে চাইলেন না আর এই কবিতাগুলো লেখার পরে। কিন্তু বিনয় ভুট্টা পর্বের কবিতাগুলোয় সম্ভবত সেটাই করলেন, যেটা পিকাসো তাঁর অন্তিমপর্বের এচিংগুলোয় করেছিলেন। নিজের জৈবিক এবং প্রায় হাস্যকর ও অসহায় কামপ্রবৃত্তিকে তুলে আনলেন চোখের সামনে। তিনি ‘লিঙ্গ’ লিখলেন না, এমনকি তার দেশজ প্রতিশব্দটিও লিখলেন না, তিনি লিখছেন ভুট্টা। এটা শব্দের প্রতিস্হাপন। এই খেলাই আমি আজকাল নিজের কবিতায় খেলি। আমি তাঁর স্হানে থাকলে ‘লিঙ্গ’ কেটে ‘ভুট্টা’ লিখতাম, কিন্তু কাটা শব্দটিও পাশে রেখে দিতাম। বিনয় ‘রমণী’ লিখলেন না, তার বদলে ‘চাঁদ’ লিখলেন। ‘যোনি’ লিখলেন না, তার বদলে ‘গুহা’ লিখলেন। ‘সঙ্গম’ লিখলেন না, তার বদলে ‘নাচ’ লিখলেন। বললেন, মেয়েদের নিয়মিত নাচা উচিত। বেশ্যাগৃহে গিয়ে সঙ্গমকে ‘বসা’ লিখলেন। কোনো মেয়ের নাম দিলেন ‘ঔদার্য’, এবং মনে মনে তার সঙ্গে রমণ করে কবিতা লিখলেন। যোনিপ্রদেশকে বললেন মায়াসভ্যতা। বীর্যের ফোঁটাকে বললেন চন্দন। কিন্তু যখন তাঁর কবিতার নাম হলো ‘আমার ভুট্টায় তেল’, স্পষ্টই বোঝা গেল তিনি কী লিখছেন — একজন দেহপসারিণী নিজের যোনিতে নেওয়ার আগে একজন পুরুষের লিঙ্গে তেল মাখাচ্ছেন। যেমন গাছের তলায় রাখা লম্বাটে পাথর দেখলে মানুষ প্রণাম করে, কারণ তার মাধায় শিবলিঙ্গ উদ্ভাসিত হয়, যেমন আলুর শুঁড় দেখেই তাকে বস্তা থেকে সরিয়ে কুলুঙ্গিতে রাখা হয়, গণেশ হিসাবে। কিন্তু একজন প্রতিষ্ঠিত কবি এভাবে সরাসরি কামবিষয়ক কবিতা লিখবেন এটা অনেকেই মানতে পারেননি, আজও পারেন না। তাঁরা আজও ‘ফিরে এসো, চাকা’, অথবা খুব বেশি হলে ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’কেই বিনয় মজুমদার মনে করেন এবং স্বস্তিতে থাকেন, মধ্য ও শেষ পর্বের বিনয়কে উন্মাদ আখ্যা দিয়ে।” ( ২০১৬ )

    অনুপম মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য লক্ষনীয়। অনুপম বলছেন না যে বিনয় তাঁর এই কবিতাগুলোয় ‘উপমা’ প্রয়োগ করেছেন। বিনয় মজুমদার শব্দের ‘প্রতিস্হাপন’ ঘটালেন। এখানেই জীবনানন্দের সঙ্গে বিনয়ের পার্থক্য। জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় ‘মতো’ ‘যেন’ ইত্যাদি প্রয়োগ করে গেছেন, যা বিনয় ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ থেকে তাঁর পরের কবিতায় আর করেননি, ‘বাল্মীকির কবিতা’য় তো করেনইনি। উপমা বাদ দেবার দরুণ বিনয় প্রকৃতির সঙ্গে পরমাপ্রকৃতির অভেদকে সনাক্ত করছেন। কিন্তু জীবনানন্দ যে ক্রমে উপমা থেকে সরে গিয়ে প্রতীকে এবং প্রতীক থেকে বস্তু-সম্পর্কে চলে যেতে লাগলেন, তা বিনয় ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন তাঁর ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে। বিনয়ের এই পর্বের কবিতায় শব্দের প্রতিস্হাপনের কথা অর্ঘ্য দত্ত বকসীও বলেছেন তাঁর “প্ল্যানচেটে যৌনসমীক্ষায় বিনয় মজুমদার” আলোচনা পুস্তিকায়, তিনি এদের বলেছেন প্রতীক : চাঁদ, নদী, ফুল, গুহা,হ্রদ ( যোনি ), ঘাস ( যোনিরোম ), লেবু, বেল ( স্তন ), ভুট্টা, কলা, চন্দনকাঠ ( লিঙ্গ )।

    এই প্রতিস্হাপন বাংলা কবিতায় নতুন নয়। চণ্ডিদাস-এর ৮৭৯ পদ পাঠ করা যাক :

    সহজ সহজ সবাই কহয়ে

    সহজে জানিবে কে।

    তিমির অন্ধকার যে হইয়াছে পার

    সহজে জেনেছে সে। ।

    চান্দের কাছে অবলা আছে

    সেই সে পিরীতি সার।

    বিষে অমৃততে মিলন একত্রে

    কে বুঝিবে মরম তার

    বাহিরে তাহার একটি দুয়ার

    ভিতরে তিনটি আছে।

    চতুর হইয়া দুইকে ছাড়িয়া

    থাকিব একের কাছে। ।

    যেন আম্রফল অতি সে রসাল

    বাহিরে কুশী ছাল কষা।

    ইহার আস্বাদন বুঝে যেই জন

    করহ তাহার আশা। ।

    নিজের কবিতার কৃৎকৌশলের সঙ্গে বিনয় মজুমদার প্রথম থেকে শেষ পর্ব পর্যন্ত সচেতন ছিলেন ; কবিতার সৃজন এবং বর্জনীয় উপাদান সম্পর্কে অতিসতর্ক থাকতেন। সেকারণে দেখা যায় যে আলোচনাকালে তিনি আধুনিক পেইনটিঙ থেকে ব্রাশ স্ট্রোকের বিলয় এবং মেটাফর থেকে কবিতার মুক্তির কথা বলেছেন, যাতে জীবনের রহস্যময়তাকে সম্পূর্ণ উদ্ঘাটন করা না হয়, এবং সেই সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার ও পারলৌকিকতার ফাঁদে না পড়তে হয়।

    প্রণব সরকার বলেছেন, “বিনয় একালের কামসূত্র বা ভুট্টা সিরিজের কবিতা বা ‘বাল্মীকির কবিতা’র ভিতরে রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার করেছেন দক্ষতার সঙ্গে, যা আমাদের কাছে সরাসরি অশ্লীল কোনো ভাব প্রকাশ করে না। বরঞ্চ প্রাপ্তবয়স্কদের মনস্ক করে। ”

    উপরোক্ত বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে প্রবীর ভৌমিক বলেছেন, “যে সৌন্দর্যময় নারীচেতনার তান্ত্রিক পূজারী বিনয়, তিনিও অপরিচ্ছন্ন, বিকৃত, বমন উদ্রেককারী এই লাইনগুলো লেখেন, ‘গুহায় বোজানো মুখ চেপে ধরে ঠেলা দিই/সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি/ভুট্টাটি সহজভাবে ঢুকে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা শুরু করি। ’ এ বিনয়কে মানায় না। বিনয়ের এই কবিতাগুলোকে মহিমান্বিত করে ছোট করবার একটা অপচেষ্টা চলছে। আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত।”

    রনজিৎ দাশ একটি যুক্তি দেবার প্রয়াস করেছেন। তিনি বলেছেন, “আর দশজন আধুনিকের মতো বিনয়ও হেঁটেছেন বদল্যার নির্দেশিত এই স্বপ্নসম্ভব পথেই, কিন্তু পৌঁছেছেন এক ভিন্ন গন্তব্যে।”

    প্রশ্ন হলো, ‘ফিরে এসো, চাকা’ লিখে বিনয় তো বাংলা কবিতার ইতিহাসে জীবনানন্দের পর নিজস্ব স্হান করেই নিয়েছিলেন। তাহলে তিনি ‘অঘ্রাণের অনূভূতিমালা’ আর ‘বাল্মীকির কবিতা’ এবং তার পরবর্তী সাব-জনারের কবিতাগুলো লেখার উদ্যোগ নিলেন কেন ! এগুলো লেখার জন্য তো তিনি টাকা পাননি, বরং পুরস্কারের লক্ষ্যবস্তু থেকে দূরে ছিটকে গিয়েছিলেন। বদল্যারের জীবনকাহিনির প্রভাবে পঞ্চাশের কবিরা কলকাতার যৌনপল্লি যাওয়া আরম্ভ করেন ঠিকই, বিনয়ও, আমার অনুমান, তাঁদের কিছু পর থেকে তাঁর নারীহীন যৌনজীবনের প্রয়োজন মেটাতে যাওয়া আরম্ভ করেছিলেন বটে, কিন্তু কবিতা লিখে তার প্রমাণ দিতে যাবেন কেন ?

    আমার মনে হয় যে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে-তুলে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীরা এবং তাঁর গুণমুগ্ধরা, একই খোঁচা বার বার দিয়ে তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছিলেন। তা থেকে মুক্তি পাওয়া জরুরি হয়ে উঠেছিল, এবং তার প্রথম ধাপ হিসাবে তিনি লিখলেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’. যেটিকে তিনি বললেন “নারীভূমিকা বর্জিত আদিরসাত্মক কবিতা”– ঈশ্বরী অথবা গায়ত্রীর ভূমিকা আড়াল করার এটি প্রথম পদক্ষেপ। বিনয় লিখলেন :-

    এইখানে পাহাড়ের ভাঁজ বলা যেতে পারে, বাঁক বলা যেতে পারে, অথবা

    দু-দুটি পাহাড় এসে মিলে গেছে যদি বলা হয় তবে একেবারে

    হুবহু বর্ণনা হয় ; …মিশেছে প্রায় সরলকোণের খুব কাছাকাছি এক স্হুলকোণে

    ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ থেকে প্রাসঙ্গিক লাইন তুলে তুলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন অর্ঘ্য দত্ত বকসী তাঁর ‘বিনয় মজুমদার ও অঘ্রাণের অনুভূতি– বিশাল দুপুরবেলার যৌনসমীক্ষা’ বিশ্লেষণে ( ২০১৪ )। অর্ঘ্য বলেছেন, “অনেকটা উল্টোনো বিস্ময়বোধক চিহ্ণের মতো লাগে এই যোনি। বিস্ময়বোধক, তাই হয়তো উল্টোনো, ডিসপ্লেসড। দেহের সর্বাপেক্ষা গোপন স্হানে যোনির অবস্হান। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তি গোপনতায়। চাঁদের গুহার দিকে অনিমেষ চেয়ে থাকেন কবি। কবি বলছেন, প্রাণলোকে ( অনুভূতিমণ্ডলে ) প্রবেশাধিকার দিয়ে তৎলোকে বিক্ষোভ সৃষ্টি করে তৃপ্তিদান করানোর বাসনা এবং গোপনতার অনুভূতির সঙ্গে যোনির সরাসরি সম্পর্ক। যোনি varies directly as প্রাণলোকে প্রবেশাধিকার দেওয়ার বাসনা — গোপনতা। তাই পাহাড়ের জীবনেও গোপনভাবে প্রবেশ করে কবি বর্ণনা করেছেন এই জোড় ও মধ্যবর্তী গোপন গোপন ক্রীড়ার স্হান — বানিয়েছেন প্রাকৃতিক যোনি — প্রকৃত কবিতার মতো ! প্রকৃত সারসের মতো !”

    এক কোণে, পাহাড়ের কোণের ফাঁকেই হল আমার বাড়িটি, ঠিক কোণে

    পাহাড়ের ঢালু গায়ে চুড়ার কিছুটা নীচে ঢালু কোণে বাড়িটি ঢোকানো

    লম্বালম্বিভাবে পাহাড়ের ভিতরে অনেক দূর খুব বেশি সুন্দর উপায়ে

    অর্ঘ্য বলেছেন, “স্তন বা চূড়ার নীচে যৌনস্হান যা ঢালু অংশে স্হাপিত সেখানে যোনিমুখ থেকে ভিতরে ‘ঢোকানো’ দীর্ঘ যোনিগহ্বর ও তাতে নিত্য অবস্হানরত অনুপ্রবেশিত শিবলিঙ্গ, সদারমণরত নিত্য পূজা।”

    বারান্দাটি শুধু এই পাহাড়ের পাথরের গা থেকে বেরিয়ে ঝুলে আছে

    সামান্যই বেরিয়েছে, পাতলা লতার গাছে বারান্দাটি চারপাশে ঘেরা

    অর্ঘ্য মনে করেন, “বাড়ি যদি লিঙ্গ হয়, বারান্দা তবে স্বভাবতই বাইরে ‘ঝুলে’ থাকা চারপাশের যৌনরোমসহ অন্ডকোষ। বিনয় অন্যত্র ঘাসের কথা বলেছেন যা প্রকৃতপক্ষে যোনিরোম।”

    দ্বিতীয় পদক্ষেপ হল ‘বাল্মিকীর কবিতা’ — যা তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ও গুণমুগ্ধ স্তাবকদের থেকে গায়ত্রীকে সম্পূর্ণ আড়াল করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

    ‘বাল্মীকির কবিতা’ নিয়ে বিনয়ের মনে দোনামনা ছিল বলে মনে হয়। ‘গ্রন্হি’ পত্রিকার জন্য নেয়া সাক্ষাৎকারে ১৪১২ বৈশাখে চন্দন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিনয়ের এরকম কথাবার্তা হয়েছিল :-

    প্রশ্ন : এখনকার বাংলা কবিতায় মেয়েরা যৌন আকাঙ্খামূলক লেখাগুলো বেশ খোলামেলা ভাবেই লিখছেন। প্রতিষ্ঠিত কবিরা স্বাগতও জানাচ্ছেন এই পরিবর্তন কে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গ্রন্হির বর্তমান সংখ্যাতেই তসলিমা লিখেছেন একটি গদ্য, নাম ‘নারী শরীর’। আপনিও যৌন অভিজ্ঞতার কথা সরাসরি দু’একটি প্রতীকের আড়ালে লিখেছিলেন ভুট্টা সিরিজের কবিতায়। একটা ছোট কবিতার বইও সম্ভবত হয়েছে কবিতাগুলি জড়ো করে। পরে আপনি তাদের disown করেন। আজ এই মুহূর্তে কি পাল্টাবেন মতামত ? এই ধরণের কবিতার স্হায়ীমূল্য কি আছে ?

    বিনয় : ( মৃদুস্বরে বলে যান ) না, কোনও বই নেই তো। আমার জানা নেই এমন কোনও বইয়ের কথা। এগুলো উল্লেখযোগ্য লেখা নয় ( অস্বীকারের ভঙ্গীতে হাত নাড়েন )। তবে মহিলা কবিরাই চিরকাল ভালো কবিতা লিখে এসেছেন। যেমন, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে। ’ কিংবা ওই লেখাটা, ‘ফুটফুটে জ্যোৎস্নায়…।’ আর স্হায়ী মূল্যের কথা বলছ ? দ্যাখো, প্রথমে যখন লিখতে শুরু করি তখন লক্ষ্য ছিল পাঠককে জ্ঞান দান, তার বুদ্ধি বাড়ানো, কবিতাগুলিকে তার মনে রাখানোর চেষ্টা, তার সঙ্গে যেন আমার কথাও মনে পড়ে, সেদিকে নজর রাখা ইত্যাদি। কবিতা কীভাবে হয়, কীভাবে সার্থক, আমিও জানি না। হয়ে যায়, এই পর্যন্ত।’

    ‘কবিতীর্থ’ পত্রিকায় ১৯৮২ সালে প্রকাশিত সমর তালুকদারের ঠাকুরনগর স্টেশানে ট্রেনের জন্য অপেক্ষার সময়ে কথাবার্তার মাঝে বিনয় মজুমদার সমরবাবুকে জিগ্যেস করেছিলেন, “১৯৭৭ সালে বিশ্ববাণী থেকে প্রকাশিত ‘বাল্মীকির কবিতা’ বইটি তিনি পড়েছেন কিনা।” ১৯৯৩ সালে কথাপ্রসঙ্গে ‘যোগসূত্র’ পত্রিকার জন্য নেয়া সাক্ষাৎকারে অজয় নাগকে বিনয় বলেছিলেন, “আদিরসাত্মক কবিতাগুলি নিয়ে একটা বই বেরোয় তার নাম দিই ‘বাল্মীকির কবিতা’ ; কেন যে লিখেছিলাম মনে নেই এখন। ”

    বিনয়ের কবিতাকে প্রতি-রোমান্টিসিজমের প্রসারণ থেকে, যা কিনা পুনরুদ্ধারের অতীত এক নিগূঢ় পন্হা, এবং যা কিনা অবিরাম রোমান্টিক-নিউরোটিককে, আর আমাদের জীবনযাপনের আধুনিকতাবাদী ব্যাজস্তুতিকে, পর্যদুস্ত করে, তা থেকে বের করে আনা দরকার। বিনয়ের কবিতা আক্রান্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে, বাঙালি ভদ্রলোকের সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে, যার পাল্লায় এক সময়ে জীবনানন্দকে পড়তে হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথকেও পড়তে হয়েছিল। এখানে বিনয়ের এই কবিতাটি প্রাসঙ্গিক :

    হাসপাতালে

    এজরা হাসপাতালে যখন ছিলাম

    তখন পাগল বলে ডাকত আমাকে

    রাত্রিবেলা অন্ধকারে দেখতাম আমাকে খাওয়ার

    নিমিত্ত রামদা হাতে আসত পরমেশ ও

    উমা দাশগুপ্ত, দেখে আমি

    বলতাম দরজায় লেখা আছে আমি আছি পাগলা গারদে

    আমি তো পাগল আর পাগলের মাংস খেলে

    তোরাও পাগল হয়ে যাবি

    প্রতিদিন রাত্রিবেলা এ কাণ্ড ঘটতো।

    তখন আমাকে আর কেটে কেটে খেতে আসত না।

    প্রত্যেকেই অস্তিত্বের পাগলাগারদে জীবন কাটান। সেটা হলো অক্ষমতার অস্তিত্ব। তা এই জন্য নয় যে আমরা মানসিকভাবে যুক্তিহীন প্রাণী, বরং মানুষকে মেরে ফেলে তার মাংস খাওয়াকে অসম্ভব মনে করা যায় না। আমরা সবাই কিনারায় দাঁড়িয়ে কাঁপছি। মানুষ মেরে তার মাংস খাবার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা যাবে না। সেই দিন আগত। প্রতিটি বাঁকে আমরা আমাদের সহযাত্রীদের প্রতি নিষ্ঠুর, এবং তা মেরে ফেলে মাংস খাওয়ার চেয়ে কম কিছু নয়। পাগলাগারদের পাহারাদার অভিভাবকদের ভূমিকা সেটাই। সুযোগ পেলেই মানুষ তার সহযাত্রীদের প্রতি নিষ্ঠুর হবার যারপরনাই প্রয়াস করে। পাগলাগারদের বিশেষ অভিভাবক হবার সংজ্ঞা সেইটাই। আমরা নিজেদের কেটে টুকরো করছি, আমাদের অস্হিরতা আমাদের তা করতে প্ররোচিত করছে, যাতে আমরা সমাজে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে পারি।

    কলকাতা শহরের হাসপাতালগুলোয় রোগীদের ক্রুদ্ধ আত্মীয়দের আক্রমণাত্মক আচরণ দেখলেই তা টের পাওয়া যাবে। স্কিৎসোফ্রেনিয়ার চিকিৎসক আমাদের দেশে বিরল ; যে চিকিৎসকরা আছেন তাঁরা ম্যাডনেস ও ইনস্যানিটির ডাক্তার, যে কারণে সোভিয়েত দেশ ভেঙে পড়লে নিমু ভৌমিক তা সহ্য করতে না পেরে স্বদেশে ফিরে আসেন এবং উন্মাদ হয়ে যান, তাঁকে বাঁচানো যায়নি, তিনি জার্মান কবি ফ্রেডরিক হ্বেল্ডারলিনের মতন ‘হাইপোকনডিয়াইসিস’ মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সোভিয়েত দেশে নিমু ভৌমিক সারা জীবন সুস্হ ছিলেন। বাংলা ভাষায় ‘হাইপোকনডিয়াইসিস’-এর বাংলাও পাগল হয়ে যাওয়া, কেননা হাইপোকনডিয়াইসিসের বাংলা প্রতিশব্দ নেই।

    মালটিপল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, প্যারানয়া, সাইকোসিস, ডিপ্রেশনজনিত অসংলগ্নতা, উদ্বেগের অসংলগ্নতা, ট্রমাজনিত আচরণ, ফোবিয়া, হ্যালুসিনেশনবোধ, ডেলিউজান, অ্যানেরোক্সিয়া নার্ভোসা, বুলিমিয়া নার্ভোসা সোমাটোফর্ম, স্মৃতিবিলোপ, সবই বঙ্গসমাজে পাগলামির নাম দিয়ে চালানো হয়। স্কিৎসোফ্রেনয়াও তিন রকমের হয় : অ্যাক্টিভ, ক্যাটাটনিক এবং ডিসঅর্গানিজড — শরীরে রাসায়নিক ও হরমোনের ভারসাম্যের তারতম্য দিয়ে নির্ধারিত হয়। সবগুলোকেই বলা হয় মস্তিষ্কবিকৃতি বা পাগল হয়ে যাওয়া ! লুম্বিনী পার্কের চিকিৎসকরাও শব্দগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ তৈরি করেননি।

    বাংলা ভাষায় শব্দসংখ্যা এতোই কম যে এই বিষয়ে ১৪১৩ বঙ্গাব্দে ‘অউম’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে বিনয় মজুমদার জয় মুখোপাধ্যায় ও সন্মোহন চট্টোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, “ শিবরাম চক্রবর্তী বলেছিলেন যে, একটি কবিতায় একস্হানে একটিমাত্র শব্দ বসার কথা। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানে ১,২০,০০০ শব্দ আছে। সেই শব্দের ভিতর থেকে একটিমাত্র শব্দ এনে বসাতে হবে। এই খুঁজে বের করা কবির বিষয়। এটা শিবরামের হলেও সমান চিন্ত্যনীয়। কারণ আগেই বলেছি যে ধেনুর সঙ্গে বেণু, গেনু, পেনু এইসব শব্দ অভিধান থেকে বেছে বের করার সময় সৃষ্টিকর্তার মাতব্বরির খপ্পরে পড়তে হয়। ” বস্তুত সৃষ্টিকর্তার মাতব্বরির খপ্পর থেকে বেরোবার জন্যই কবিরা একটি শব্দের জায়গায় আরেকটি শব্দ প্রতিস্হাপন করেন, যা বিনয় মজুমদার করলেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ ও ‘বাল্মীকির কবিতা’ কাব্যগ্রন্হে। উল্লেখ্য যে হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি শব্দের ডিজিটাইজেশনের পর জানিয়েছে যে তাতে শব্দসংখ্যা ১০,২২,০০০ ; অর্থাৎ আমাদের ভাষার দশগুণ। ইংরেজির চেয়ে তুর্কি ও জার্মান ভাষায় শব্দের সংখ্যা বেশি। শেক্সপিয়ার বহু শব্দ তৈরি করে দিয়ে গেছেন। জীবনানন্দের মতন বিনয় মজুমদারও বেশ কয়েকটি শব্দ তৈরি করেছেন। আটের দশক থেকে কবিরা শব্দ তৈরি করছেন, কলকাতার সাধারণ মানুষও সমবেত শব্দ তৈরি করেন। কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য অক্সফোর্ড ডিকশনারি কমিটি না থাকায় শব্দ সংগ্রহ করে অভিধানে ঢোকানো হয় না।

    বিনয় মজুমদারের কোন ধরণের স্কিৎসোফ্রেনিয়া হয়েছিল তা তাঁর হাসপাতালের কাগজ দেখে গবেষকরা বের করবেন কখনও, আশা করি। তাঁর অসংলগ্নতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে অসফল আশপাশের মানুষেরা তাঁকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিতেন মানসিক চিকিৎসালয়ে। এই প্রসঙ্গে বিনয় মজুমদার লিখেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গের পাগলাগারদ সমূহের পরিদর্শক আমি। আমার সরকারি চাকরিই তাই। যা বেতন পাই তাতে মোটামুটি সংসার চলে যায় — একার সংসার।” ১৯৯৩ সালে সঞ্জয় চক্রবর্তীকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন, সীমান্ত অতিক্রম করে পূর্ব পাকিস্তানে যখন ছিলেন, “তখন কেউই বড়ি-ফড়ি কিছু খাওয়াতেও এলো না। ইনজেকশানও দিতে এলো না। তোফা ছিলাম। আর ভারতবর্ষে আমাকে সাতবার পাগলাগারদে পোরা হয়েছে। অনেকেই তো পাগলাগারদে ছিলেন। তাঁদের জীবনীতে তা লেখা হয় না। আর আমার জীবনী লিখতে গেলে প্রথম বাক্যই লেখে — গোবরা মানসিক হাসপাতালে ছিলেন। পাগলাগারদে আর কে কে ছিলেন শুনবে ? লুম্বিনী পার্কে ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, ঋত্বিক ঘটক। এঁদের জীবনী যখন লেখে তখন তো একথা এভাবে লেখে না যে এঁরা পাগলা গারদে ছিলেন। অথচ আমার ক্ষেত্রে প্রথমেই ওই কথা — মানসিক হাসপাতালে ছিলেন। ”

    আমাদের মানসিক অবস্হা দিয়ে আমাদের প্রকৃতিস্হতা সংজ্ঞায়িত হয় না। হয় আমাদের বেঁচে থাকার উপরিতল দিয়ে – বিনয়ের উপরোক্ত কবিতার ক্ষেত্রে ‘মাংসভক্ষণ’ নিষ্ঠুরতাকে গোপন করে রেখেছে, মানুষের নিষ্ঠুরতা, প্রতিপদে সামনের শত্রুকে খেয়ে ফেলার ষড়যন্ত্র। এই নিষ্ঠুরতা যেন সহ্য হয়ে-যাওয়া নৈতিকতা। প্রতি রাতেই যে তা ঘটে তা বিনয়’ বাল্মীকির কবিতা’য় আমাদের দেখিয়েছেন। মানুষের মাংসভক্ষণ হয়ে ওঠে মানুষের অন্তরাত্মার ভক্ষণ। এই কবিতাটি পড়ে দেখা যাক :

    মাংস খাওয়া

    আমি যদি মুরগির মাংস খাই

    তাতে মুরগির উপকার হয়।

    জীবিত অবস্হায় ছিল তুচ্ছ মুরগি

    তার মাংসে খুব উন্নত স্তরের কিছু ছিল।

    প্রবাদ বাক্য হচ্ছে মাংসে মাংস বৃদ্ধি।

    তার মানে যখন মুরগির মাংস খেলাম

    তখন সে মুরগির মাংস আমার শরীরের

    মাংস হয়ে গেল।

    তার মানে সবই বুঝতে পারি

    আমার শরীরের মাংস মুরগির

    মাংসের চেয়ে উন্নত স্তরের কিছু।

    এতে দেখা যাচ্ছে মুরগির উপকার হয়ে গেল।

    তেরো

    বিনয় মজুমদারের অসুস্হতাকে তরুণ কবি-লেখকরা অনেকেই রোমান্টিসাইজ করার প্রয়াস করেছেন — তা একজন মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে ছেলেখেলা। কলকাতায় বসবাস করে দূরত্ব বজায় রেখে বিনয়ের অসুস্হতার নান্দনিকতা গড়ে তুলতে চেয়েছেন তাঁরা, যেন তাঁরা বিনয়ের কবিতার উদ্ধারকারী। কবি কিন্তু তাঁর পারক্যবোধকে সযত্নে আগলে রাখতেন, এবং অতিথি গুণমুগ্ধদের ভাবপ্রবণ আচরণকে প্রকৃতি-পৃথিবীর অত্যন্ত জটিল ব্যাখ্যার মাধ্যমে সীমায়িত করে দিতেন। বিনয়ের চরিত্রে ছিল অদম্য বলিষ্ঠতা। তাই তিনি নিজে যে ধরণের কবিতা ও গদ্য লিখবেন বলে মনস্হ করতেন, তাই লিখতেন। তাঁর ‘ধূসর জীবনানন্দ’ পড়লে বোঝা যায় তিনি ভাবনাকে কোন পথে পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন। কবিতায় দিনপঞ্জির অনুপ্রবেশ ঘটনোর মাধ্যমে তিনি নিজের জীবনচর্যা রেকর্ড করেছেন এবং এগিয়ে গেছেন, যেমনটা দিনপঞ্জি লেখকেরা করে থাকেন, আগের দিনের ঘটনাকে পেছনে ফেলে আসেন। কবিতা লেখা হয় ভাষার মাধ্যমে, এবং ভাষা চিরকাল সময়বন্দী, পরবর্তীকালে গিয়ে তা আটকে যায়, যেমন চর্যপদের ক্ষেত্রে ঘটেছে, সময়ের দ্বারা তা সীমায়িত। প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন কাল্ট ফিগার, আর নিজের দুরাবস্হাকে উপস্হাপন করে সেই প্রতিষ্ঠানকে হাস্যকর ও অপ্রয়োজনীয় প্রতিপন্ন করে দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত ব্যথা তিনি তাঁর কবিতাকেই অবিরাম জানিয়ে গেছেন, ‘ফিরে এসো, চাকা’ বইয়ের কবিতাগুলোর সময় থেকে। তাঁর একটি কবিতার শিরোনাম ‘আমরা সর্বাঙ্গ দিয়ে ভাবি’ — তাঁকে যারা পাগল তকমা দিয়েছিল তাদের এটা সরাসরি আক্রমণ, কেননা তিনি কেবল মস্তিষ্ক দিয়ে ভাবছেন না, সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে ভাবছেন।

    আমরা সর্বাঙ্গ দিয়ে ভাবি

    আই গ্রাফটিং করা হয়

    তার মানে একজনের চোখ

    কেটে তুলে নিয়ে অন্য একজনের

    চোখের জায়গায় জোড়া লাগিয়ে

    দেওয়া হয়।

    প্রথম ব্যক্তির চোখ উপড়ে

    নেওয়া হল। জোড়া লাগিয়ে

    দ্বিতীয় ব্যক্তির শরীরে।

    এই উপড়ে নেওয়া এবং জোড়া

    লাগানো, এই করতে সময় লাগল

    ধরা যাক পাঁচ মিনিট। এই পাঁচ মিনিট যাবৎ

    চোখ জীবিত ছিল।

    একজনের শরীরের রক্ত বার করে নিয়ে

    বোতলে পুরে রাখা হয় এবং কয়েক

    দিন পরে এই বোতলের থেকে অন্য

    একজনের শরীরে ঢুকিয়ে

    দেওয়া হয় এর থেকে বোঝা যায়

    বোতলে পোরা অবস্হায় রক্ত জীবিত

    ছিল, রক্তের প্রাণ ছিল, রক্ত ভাবছিল।

    কারণ দ্বিতীয় ব্যক্তির শরীরে ঢুকে

    রক্ত স্বাভাবিক হয়ে গেল।

    ‘খ’-এ যা লিখেছি ( বোতলে যখন রক্ত ছিল তখন রক্তের প্রাণ

    ছিল ) তাহলে মুরগি যখন কাটা অবস্হায় পড়েছিল ( ‘ক’ দেখো )

    তখন মুরগির মাংসের প্রাণ ছিল, ভাবছিল সুতরাং একজন মানুষ

    মুরগির মাংস খেলে পাকস্হলির ভিতরের মুরগির মাংস জীবিত,

    ভাবছিল পরে এই মুরগির মাংস মানুষের শরীরে মাংস হয়ে

    গেল। এই নতুন দ্বিতীয় অবস্হায় মুরগির উপকার হল।

    অদ্রীশ বিশ্বাস তাঁর স্মৃতিচরণে লিখেছেন, “আমি যখন প্রেসিডেন্সির ছাত্র, তখন বিনয় মজুমদারকে ঠাকুরনগর থেকে মেডিকাল কলেজে এজরা ওয়ার্ডে ভর্তি করে নিয়মিত কলেজ থেকে এসে দেখাশোনা আর গল্প করার ভার দেন তৎকালীন দুই উচ্চপদস্হ আমলা তারাপদ রায় ও কালিকৃষ্ণ গুহ। সেই সময় থেকে বিনয় মজুমদার ওনার বিখ্যাত খবরের কাগজের সংবাদই কবিতায় ঢোকান। আর ছিল ডায়েরি বা দৈনন্দিনকে কবিতায় ঢোকানোর পর্ব। এই পদ্ধতির ব্যবহার নিজের চোখে দেখা। অনেক কবিতা আজও সংগ্রহে আছে। কিন্তু বিনয় মজুমদার যে মহাপয়ারের জন্য বিখ্যাত, সেই কবিতাগুলো, ‘ফিরে এসো, চাকা’ নিয়ে শৈবাল মিত্র একটা চমৎকার টেলিফিল্ম বানান যা অনালোচিত থেকে গেছে বাঙালি জীবনে। এই সেই একমাত্র টেলিফিল্ম যেখানে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাককে সেরিব্রাল ডিরেক্টারের মতো করে তুলে এনেছেন। কিন্তু বিনয় মজুমদারের সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতে আমি ওঁর লেখা দুষ্প্রাপ্য কাব্যগ্রন্হ ‘বাল্মীকির কবিতা’ বিষয়ে আলোচনা তুলি। দেখি, উনি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, এড়িয়ে যাচ্ছেন। বললেন, কোথায় শুনলাম এই নাম। আসলে ‘বাল্মিকীর কবিতা’র কথা বলেন সন্দীপ দত্ত। তখন আমি কপি সংগ্রহ করি বইটার প্রকাশকের ঘর থেকে। কিন্তু দেখি সন্দীপ দত্ত কথিত সেটা একটা খণ্ডিত সংস্করণ ; মানে, সব কবিতা নেই। ব্রজগোপাল মণ্ডল ছিলেন প্রকাশক। তারপর বিনয় মজুমদার বলেন ‘এটা হলো বিনয় মজুমদারের একমাত্র ইরোটিক কবিতার বই বা বাংলা ভাষায় একমাত্র ইরোটিক কবিতা। ভারতীয় কামসূত্র বা দেশীয় আকাঙ্খাকে তত্ত্ব হিসাবে ব্যবহার করা ও ব্যক্তিজীবনকে মিশিয়ে কবিতার ইরোটিকা তৈরি করা। ’ কেউ জানতো না। প্রকাশক ছাপতে রাজি হয়নি। খণ্ড ছেপেছে। আমি সন্দীপ দত্তের কাছে কিছু পূর্ণসংস্করণের খোঁজ পাই। কপি মেলে না। তখন বিনয় মজুমদার ঠাকুরনগর থেকে কপি এনে দেন। পড়ে আমি অবাক হই যে কেন এমন একটা কবিতার ইরোটিকা বাঙালি পড়তে পারবে না। এটা নিয়ে লিখি ও পুনর্মুদ্রণের দাবি করি। এই দাবি বিনয় মজুমদার সমর্থন করে ইনটারভিউ দেন সুবীর ঘোষকে। তারপর দেজ থেকে ‘বাল্মীকির কবিতা’র পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ বের হয়। ওই ‘বাল্মিকীর কবিতা’র সূত্রেই আমি ওঁর বউ ও ছেলের খোঁজ পাই। তাদের নাম রাধা ও কেলো। একদিন সোনাগাছিতে গিয়ে তাদের আবিষ্কার করি আর সেলুলয়েডে ইনটারভিউ তুলে আনি।”

    অদ্রীশ বিশ্বাস যদি সংবাদপত্র থেকে গড়া বিনয়ের কবিতাগুলো প্রকাশ করেন তাহলে আমরা বিনয়-চরিত্রের আরেকটা ডাইমেনশনের সঙ্গে পরিচিত হবো, বিনয়ের কবিতার আরেকটি সাব-জনারের কথা জানতে পারবো।

    এই সূত্রে সন্দীপ দত্ত জানিয়েছেন যে, “১৯৭৫ সালে এক সাহিত্য সন্মেলনে বিনয় মজুমদার ‘বাল্মীকির কবিতা’ বই থেকে কবিতা পড়া শুরু করা মাত্র ভদ্রলোকদের উঠে যেতে দেখেছিলাম।”

    পরে বিনয় মজুমদারকে নিয়ে একটি টেলিফিল্ম হয়ছিল যাতে বিনয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জয় গোস্বামী। বিনয় ফিল্মটা প্রতিবেশীর টিভিতে দেখেছিলেন। এই বিষয়ে চন্দন ভট্টাচার্য তাঁকে প্রশ্ন করলে প্রথমে তিনি নিরুত্তর থাকেন, পরে বলেন, “এক-দু ঘণ্টার সিনেমায় কি গোটা জীবন ধরা যায়!”

    বিনয় মজুমদারের বউ রাধা আর ছেলে কেলোকে নিয়ে লেখা কবিতাটি একটি গাণিতিক প্রতর্কে মোড়া :

    ভারতীয় গণিত

    ক্যালকুলাসের এক সত্য আমি লিপিবদ্ধ করি।

    যে কোনো ফাংকশানের এনেথ ডেরিভেটিভে এন

    সমান বিয়োগ এক বসিয়ে দিলেই

    সেই ফাংকশানটির ফার্স্ট ইন্টিগ্রেশনের ফল পাওয়া যায়–

    এনেথ ডেরিভেটিভে এন

    সমান বিয়োগ দুই বসিয়ে দিলেই

    সেই ফাংকশানটির থার্ড ইন্টিগ্রেশনের ফল পাওয়া যায়–

    এই ভাবে সহজেই যে কোনো অর্থাৎ

    দশম বা শততম অথবা সহস্রতম ইন্টিগ্রেশনের

    ফল অতি সহজেই পাই।

    এই কবিতায় লেখা পদ্ধতির আবিষ্কর্তা আমি

    বিনয় মজুমদার। আমার পত্নীর নাম রাধা

    আর

    আমার পুত্রের নাম কেলো।

    বিনয়েরর স্মৃতিশক্তি বার্ধক্যেও প্রখর ছিল, সাক্ষাৎকারগুলোয় তিনি অনায়াসে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে উঠতেন। ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হের প্রকাশক উৎপল ভট্টাচার্য জানিয়েছেন যে এই গ্রন্হের জীবনানন্দ বিষয়ক নিবন্ধগুলো জীবনানন্দের বই ছাড়াই, কেবল স্মৃতি থেকে লিখেছিলেন বিনয় মজুমদার। বইটিতে ‘ধূসর জীবনানন্দ’ শিরোনামে তাঁর এই কবিতাটি আছে :-

    ধূসর জীবনানন্দ, তোমার প্রথম বিস্ফোরণে

    কতিপয় ছিল শুধু বলেছিল, ‘এই জন্মদিন’।

    এবং গণনাতীত পারাবত মেঘের স্বরূপ

    দর্শনে বিফল ব’লে, ভেবেছিলো, অক্ষমের গান।

    সংশয়ে সন্দেহে দুলে একই রূপ বিভিন্ন আলোকে

    দেখে-দেখে জিজ্ঞাসায় জীর্ণ হয়ে তুমি অবশেষে

    একদিন সচেতন হরীতকী ফলের মতন

    ঝরে গেলে অকস্মাৎ, রক্তাপ্লুত ট্রাম থেমে গেলো।

    এখন সকলে বোঝে, মেঘমালা ভিতরে জটিল

    পূঞ্জীভূত বাষ্পময়, তবুও দৃশ্যত শান্ত, শ্বেত ;

    বৃষ্টির নিমিত্ত ছিলো, এখনো রয়েছে, চিরকাল

    রয়ে যাবে ; সঙ্গোপন লিপ্সাময়ী, কল্পিত প্রেমিকা–

    তোমার কবিতা, কাব্য, সংশয়ে-সন্দেহে দুলে-দুলে

    তুমি নিজে ঝরে গেছো, হরীতকী ফলের মতোন।

    নিজেকে বিনয় মজুমদার কখনও কবিতার শহিদ বলে মনে করেননি, কেননা সাহিত্যকে জীবিকা বা ধনোপার্জনের সঙ্গে একাসনে বসাননি তিনি, তাঁর সমসাময়িক কবিদের মতন। ‘কবিতার শহিদ’ তকমাটা শক্তি চট্টোপাধ্যায় চাপিয়েছিলেন বিনয়ের ওপর। প্রাপ্তির জন্য লালসা ছিল না তাঁর, কিংবা জাগতিক ধনদৌলতের জন্য দুঃখ। অনুষ্টুপ পত্রিকায় ২০১৩ সালে সুমন গুণ ঠিকই লিখেছিলেন যে “জীবনানন্দের সময় থেকে এখনও পর্যন্ত এই রকম সয়ম্ভর কবি আর কেউ নেই।” এক সময়ে বিনয় ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিলেন লণ্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে। সেই বিনয়ই শিমুলপুরে বসবাসের সময় থেকে পাণ্ডুলিপি এবং লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত কবিতা সংরক্ষণ করা আর জরুরি মনে করতেন না।

    বিনয় এক স্বতন্ত্র সত্বার কবি, তাঁর সময়ের সবচেয়ে বৈচিত্রময় কবি তিনি, বিচিত্রপথগামী তাঁর ভাবনা। আঙ্গিকগত বিন্যাস, শব্দ, ছন্দ, চিত্রকল্পের মিশ্রণে তাঁর কাব্যচেতনা অভিনব। ‘আধুনিক কবিতার হালচাল’ প্রবন্ধে বিনয় বলেছেন, “কালোত্তীর্ণ নয়, কালোপযোগী লেখাই অমর।” সহিদুল হক ২০১৭-এর বাংলা কবিতা পোর্টালে লিখেছেন, “বিনয় মজুমদার তাঁর বহু কবিতায় তথাকথিত অশ্লীলতাকে এক আশ্চর্য সুন্দর শৈল্পিকরূপ দান করেছেন। ” বিনয় মজুমদার অত্যন্ত সচেতন মানুষ ছিলেন, নয়তো তাঁর কথা শোনার জন্য তাঁর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তরুণ কবিরা জড়ো হতেন না, এবং তা প্রায় প্রতিদিন। , কেবল তাঁর লেখার ব্যাপারেই নয়, তাঁর পার্সোনা নিয়ে সাহিত্যিকরা যে ছবি গড়ে তুলতে চাইছেন তা সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন তিনি তা এই কবিতাটি থেকে পরিষ্কার হবে, তাঁর জীবনের শেষ পর্বে লেখা :-

    মনস্তত্ত্ববিদদের কীর্তি

    ভাস্কর চক্রবর্তী পাগলা গারদে ছিল

    কিন্তু পাগলা গারদ বলে না, বলে এটা মানসিক হাসপাতাল।

    ভাস্কর চক্রবর্তীর বাবাকে মনস্তত্ত্ববিদগণ বলেছে আপনার

    ছেলে আপনার চাইতে বেশি খ্যাতিমান

    এই কথা বলাবলি করছে অন্যান্য কবি ও কবিবন্ধুগণ

    ভাস্কর চক্রবর্তী নিজেও একথা বলেছে।

    এটা ভাস্কর চক্রবর্তীর মনোরোগ

    এই মনোরোগ আমরা সারিয়ে দিতে পারি

    কিভাবে সারাতে পারি ?

    ভাস্কর চক্রবর্তী নিজেই লিখবে যে আমার বাবা

    আমার চাইতে বেশী বিখ্যাত লোক

    আমাকে পশ্চিমবঙ্গে কেউ চিনল না বাবাকে চেনে

    এই কথা ভাস্কর চক্রবর্তী নিজেই লিখবে

    এই রকম মনোরোগীর চিকিৎসা আমরা বহু

    করেছি। সঞ্জয় ভট্টাচার্য, ঋত্বিক ঘটক এদের

    আমরা চিকিৎসা করেছি।

    হে জনসাধারণ এই যে ভাস্কর চক্রবর্তী

    ভাবে যে ভাস্কর চক্রবর্তী জনসাধারণের চাইতে

    উঁচু দরের বাঙালি একজন।

    আমরা এই ভাস্কর চক্রবর্তীর মনোরোগ চিকিৎসা

    করতে পারি। চিকিৎসা করতে পারলে ভাস্কর চক্রবর্তী নিজেই

    বলবে যে আমি জনসাধারণের সমান মানে

    কেরানির সমান, স্কুল মাস্টারের সমান। চাষার

    সমান।

    তোমরা শুধু অনুমতি দাও ভাস্কর চক্রবর্তীর

    চিকিৎসার জন্য তাহলে আমরা ভাস্কর চক্রবর্তীকে

    তোমাদের সমান অর্থাৎ কেরানি, চাষী, স্কুল মাস্টার

    রিকশাওয়ালার সমান। একথা ভাস্কর চক্রবর্তী

    নিজেই বলবে আমাদের এখানে চিকিৎসা করার

    পর।

    বাঃ ভাস্কর চক্রবর্তীর বাবা অনুমতি দিয়েছেন

    জনসাধারণ অনুমতি দিয়েছেন। এইবার তাহলে

    হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করি।

    এই রকমের পাগলাগারদে ডাক্তাররাও আছে

    যেমন রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস এম. বি. বি. এস. পাশ

    করা ডাক্তার সে আছে মেডিকাল কলেজের পাগলা

    গারদে। এইরকম ভাবে পুলিশও আছে পাগলা গারদে।

    ( তার মানে মানসিক হাসপাতালে )।

    মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করা হচ্ছে

    পুলিশ অনন্ত দেবরায়কে অর্থাৎ এরা হচ্ছে বিশেষ

    বিশেষ উদাহরণ।

    পুলিশ, এম.বি.বি.এস. পাশ করা ডাক্তার রবীন্দ্রনাথ

    বিশ্বাস। এর পরে কবি বাদ দিলাম। অন্যান্য

    যারা পাগলা গারদে ছিল এবং আছে ডাক্তার রবীন্দ্র

    নাথ বিশ্বাস, পুলিশ অনন্ত দেবরায়

    কিন্তু এই রকমের দু’একজন ডাক্তার পুলিশ

    এদের সঙ্গে পাগলা গারদে আছে শত শত জনসাধারণ

    হাজার হাজার জনসাধারণ এবং

    ডাক্তার রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস নিজেই বলল যে

    তার নিজের হয়েছে ক্রনিক শিজোফ্রেনিয়া

    এই অসুখের কোনো চিকিৎসা নেই রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস

    কে সারাজীবন ঔষধ খেতে হবে এবং আনুসঙ্গিক

    চিকিৎসা করাতে হবে।

    এ তো হল একজন ডাক্তার, একজন কবি, একজন পুলিশ

    এদের ভাগ্য আর অন্যান্য যাদের এই ভাগ্য হয়েছে

    তারা হলেন হাজার হাজার জনসাধারণ।

    ডি. জ্যাবলো হার্শম্যান এবং জুলিয়েন লিয়েব ( ১৯৯৮ ) তাঁদের ‘ম্যানিক ডিপ্রেশান অ্যাণ্ড ক্রিয়েটিভিটি’ গবেষণাপত্রে বলেছেন যে সৃজনশীল শিল্পীরা ম্যানিক ডিপ্রেশানকে নিজের জীবনে ও কাজে সদর্থক উদ্দেশে ব্যবহার করতে পারেন। পল গঁগা যখন দেখলেন তিনি ফ্রান্সে বসে আঁকতে পারছেন না তখন ইউরোপের সমাজকে পরিত্যাগ করার জন্য তাহিতি দ্বীপে বসবাস করতে চলে গিয়েছিলেন। ম্যানিক ডিপ্রেশানে আক্রান্ত হয়েছিলেন নিউটন, বিটোফেন এবং চার্লস ডিকেন্সও। মনোভঙ্গের বাঁধন কেটে বেরোবার জন্য ডিকেন্স লিখেছিলেন ‘ক্রিসমাস ক্যারল’।

    লুডউইগ এম অ্যারনল্ড ‘দি প্রাইস অফ গ্রেটনেস : রিজলভিং দি ক্রিয়েটিভিটি অ্যাণ্ড ম্যাডনেস কনট্রোভার্সি’ ( ১৯৯৫ ) গ্রন্হটি ১০০০ বিখ্যাত মানুষের জীবনকাহিনি বিশ্লেষণ করে লিখেছেন। তিনি তর্ক দিয়েছেন যে যাঁদের চেতনার স্তর সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা, স্কিৎসিফ্রেনিয়া, হিস্টিরিয়া, সংবেদনের অতিরেক, যৌন অক্ষমতা, যাঁরা নিঃসঙ্গতা পছন্দ করেন, তাঁদের মুক্তির পথ হলো সৃজনশীল শিল্প, তাঁদের ক্ষেত্রে তা নিরাময়ের কাজ করে। বিনয় মজুমদারকে কেউ কেউ বলেছেন পাগল ; কিন্তু তাই যদি হবে তাহলে তিনি রুশভাষা শিখে ছয়টি বই অনুবাদ করলেন, একুশটি কাব্যগ্রন্হ লিখলেন, ছয়টি গদ্যের বই, গণিতের বই লিখলেন কেমন করে ? এখনও তাঁর বহু রচনা অগ্রন্হিত রয়েছে।

    দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রশান্ত চক্রবর্তী, সম্প্রতি বিজেপির ছাত্র সঙ্গঠন যাঁকে আক্রমণ করে পাঁজরের হাড় ভেঙে দিয়েছে, তাঁর ‘দি অপুলেন্স অফ এক্সিসটেন্স : এসেজ অন ইসথেটিক্স অ্যাণ্ড পলিটিক্স’ ( জানুয়ারি ২০১৭ ) বক্তৃতামালায় বিনয় মজুমদার সম্পর্কে এই কথাই বলেছেন যে, “বিনয়ের কবিতা আলোচনাকালে চিরকাল তাঁর একাকীত্বপ্রিয়তা এবং নিউরটিক প্রলক্ষণকে তাঁর কবিতার মূল্যায়নের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে ; এর চেয়ে বেশি নাটুকে ও বিরক্তিকর ভাবপ্রবণতা আর হতে পারে না। বিনয়ের কবিতার বিশুদ্ধ প্রাণচাঞ্চল্য মূল্যায়নের পথে এটি পরিত্যাজ্য বাধা। বিনয় ছিলেন পরমোৎকর্ষ-সন্ধানী এবং সতর্ক কবিতাশিল্পী। ”

    প্রশান্ত চক্রবর্তী আরও বলেছেন, এবং এই প্রসঙ্গে ওপরে আলোচিত সংজ্ঞার অবলোকনের প্রসঙ্গ এসে পড়ে, কবিজীবনের শেষ পর্বে বিনয় মজুমদার কবিতাকে জার্নাল লেখার মতো করে তোলেন। তিনি নিজের চারিপাশের বস্তুগুলো এবং ঘটনাগুলোর দিকে গভীর ভাবে তাকাতেন এবং সেগুলি রেকর্ড করতেন। তার ফলে একদিকে আমরা যেমন একজন ঘটনাপঞ্জীর দ্রষ্টাকে পাই, তেমনিই আরেকদিকে পাই কলকাতার বাইরে চলতে থাকা সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো। পংক্তিগুলো জার্নাল রচনার অসাধারণ অভিব্যক্তি, তাতে কোনোরকম কৃত্রিম কবিত্ব করা হয়নি, তার চেয়েও বেশি কিছু উপস্হাপন করা হয়েছে যা বুনিয়াদি : স্রেফ বেঁচে থাকা। রেকর্ড করার অর্থ হল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বস্তুদের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসন্ধান।

    বিনয়ের লেখার প্রথম কালখণ্ড ছিল মূলত ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৬। এই সময়টাতেই পঞ্চাশের কবিদের অনেকে সোনাগাছি-হাড়কাটা-খিদিরপুর যাওয়া আরম্ভ করেন, প্রধানত বুদ্ধদেব বসুর বদল্যার সম্পর্কিত বইটি প্রকাশিত হবার পর। বিনয় মজুমদার একা সোনাগাছি এলাকায় যেতেন বলে অনুমান করি, তাঁর ‘বাল্মীকির কবিতা’ থেকে সেরকমই মনে হয় ; যৌনকর্মীর ঘরের যে বর্ণনা তাঁর কবিতায় পাই তা কেউ যৌনকর্মীর ঘরে না গেলে বলতে পারবেন না। অদ্রীশ বিশ্বাসের স্মৃতিচারণা থেকেও তেমনটাই আঁচ করা যায়। নিয়মিত গ্রাহক সোনাগাছিতে ‘বাবু’ অভিধা পান ; বিনয় হয়তো কিছুকালের জন্য রাধার ‘বাবু’ প্রেমিক ছিলেন। রাধা নামে এক যৌনকর্মী আর তার ছেলের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা বলে গেছেন বিনয়। অদ্রীশ বিশ্বাস জানিয়েছেন যে তিনি যৌনপল্লীতে গিয়ে রাধা আর কেলোর ফিল্ম তুলে এনেছিলেন। সেগুলো প্রকাশিত হলে পাঠকের অনুসন্ধিৎসা মেটে। ভুট্টা সিরিজের কবিতাগুলো পড়লে বিশ্বাস করা যায় যে তিনি নিয়মিত নারীসঙ্গ করতেন কোনো এক সময়ে। হয়তো লেখালিখি তাঁকে এই সময়টায় ছেড়ে গিয়েছিল বলে তিনি রাধায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। হাংরি আন্দোলনের গল্পলেখক বাসুদেব দাশগুপ্ত যখন আর লিখতে পারছিলেন না তখন তিনি ‘বেবি’ নামে এক যৌনকর্মীর ‘বাবু’ হয়ে ওঠেন। হাংরি আন্দোলনের কবি প্রদীপ চৌধুরী জানিয়েছেন যে বাসুদেব দাশগুপ্ত সে-সময়ে ভায়াগ্রার সন্ধান করতেন।

    “অঘ্রাণের অনুভূতিমালা” কাব্যগ্রন্হে ‘বিশাল দুপুরবেলা’ শিরোনামে একটি কবিতা আছে। যাঁরা দুপুরবেলায় সোনাগাছি নিয়মিত যান তাঁরা জানেন যে এই সময়টাতেই অনেকক্ষণের জন্য নিজের কাছে পাওয়া যায় প্রেমিকা-যৌনকর্মীকে। সময়টা বিশাল, দুজনে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করে সন্ধ্যার খদ্দের না আসা পর্যন্ত অঢেল সময়। যিনি ‘বাবু’ তিনিও নিজের জীবনের দুপুরবেলাতেই আগ্রহী হয়ে ওঠেন, অমন সম্পর্কে, বাসুদেব দাশগুপ্তের মতন। বাসুদেব দাশগুপ্ত অমন দুপুরবেলা কাটিয়ে সন্ধ্যার সময়ে আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীর বাড়িতে এসে চিৎপটাঙ হয়ে শুয়ে পড়তেন, নেশা কেটে গেলে অশোকনগরে বাড়ি ফিরতেন।

    আশি ও নব্বুই দশকে বিনয় মজুমদার অসুস্হ হয়ে পড়েন এবং তাঁকে দেখাশোনা করতো কলকাতা শহরতলীর ঠাকুরনগরের শিমুলপুরের একটি পরিবার। অনেকে এই আশ্রয়কে তুলনা করেছেন মানসিক রোগাক্রান্ত পরিবার-পরিত্যক্ত কবি ফ্রেডরিক হ্বেলডার্লিনের সঙ্গে, যাঁকে অমনই একটি গরিব মুচি পরিবার আশ্রয় দিয়েছিল। কেমন ছিল বিনয় মজুমদারের সে সময়ের জীবন ? এই কয়েকটা লাইন পড়লে কিছুটা আঁচ পাওয়া যাবে, কেবল কার্বোহাইড্রেট খেয়ে দিনের পর দিন চালিয়েছেন বিনয় মজুমদার, জীবনানন্দের পর শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি। সে সময় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ম্যাণ্ডেভিলা গার্ডেন্সে বসে খাচ্ছেন মুর্গির ললিপপ দিয়ে স্কচ এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় খাচ্ছেন স্ত্রীর রান্না করা উপাদেয় স্বাস্হকর খাদ্য। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ বক্তৃতা দেবার জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিজের ক্যাম্পাসে আহ্বান করে নিয়ে গিয়েছিলেন, প্রধানত শক্তি-সুনীল ব্র্যাণ্ডটাকে ব্যবহার করার জন্য, বিনয়কে নিমন্ত্রণ জানাতে তাঁরা হয়তো ভয় পেয়েছিলেন। শিমুলপুরে পাকাপাকি থাকতে গিয়ে বিনয়ের দৈনিক জীবন কেমন কাটছিল তা উনি বিয়াল্লিশ মাত্রার মহাপয়ারে লিখে রেখে গেছেন :

    এইমাত্র পান্তাভাত

    এইমাত্র পান্তাভাত খেলাম অর্থাৎ আমি হাত ধুতে গেছলাম

    অবশ্য খাবার পরে এঁটোথালা ধুই আমি নিজে

    ভোরে ধুই দুপুরেও ধুই শুধু রাত্রিবেলা ধুই সে এঁটো থালা

    ভোরবেলা রাত্তিরের এঁটোথালা হাতে নিয়ে যাই

    বুচির বাড়ির কাছে, এঁটো থালা দিয়ে আসি তার হাতে, বুচি নিজে

    ধুয়ে দেয় রাত্তিরের এঁটো থালাখানি।

    সেই ধোয়া থালাটিতে বুচি নিজে খাদ্য দেয় আমার ভোরের খাদ্য

    গতকাল দিয়েছিল বেগুনসিদ্ধ ও ভাত আর

    আজ দিল তো পান্তাভাত ; ভোরে বেশিদিন দ্যায় আলুসিদ্ধ আর ভাত

    মনে হয় আগামীকাল দেবে আলুসিদ্ধ ভাত।

    আজ আমি এঁটো থালা কলঘরে ধুয়ে এনে রেখেছি তো টেবিলের

    উপরেই, এই ধোয়া থালাটিতে ভাত দেবে বুচি।

    ( ‘পৃথিবীর মানচিত্র’ কাব্যগ্রন্হ — ২০০৬ )

    অসুস্হতার পরে তাঁর কবিতা রচনার আরেকটি পর্ব শুরু হয়, প্রধানত লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের চাহিদা মেটাতে, যে কবিতাগুলিতে বিনয় তাঁর সামনেকার বস্তুজগতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং বস্তুগুলোর পারস্পারিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে চলেছেন।

    ‘মনে থাকা’ শিরোনামে একটি কবিতায় বিনয় জানিয়েছেন যে, যে-কবিতার মানে বোঝা যায় না তাও ওনার মনে থাকে। তাঁর স্মৃতিশক্তি শেষ বয়সেও ছিল প্রখর। বিনয়ের মনে থাকলেও দুর্বোধ্য কবিতা আমার মনে থাকে না। বিনয় তিনটি উদ্ধৃতি দিয়েছেন :

    অমিয় চক্রবর্তী :

    “খড়মাঠ কথা কয়, অজানা খোটানি

    ঘনমেঘ চলে ছায়াটানি

    নয় নীল শূন্য ত্রিশূল

    টুকরো পাহাড়”

    বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় :

    “সাদা বা কালো ক্ষণপাথর

    এ কোন আলো হৃদয়ে বা

    অথবা নীচে নীল সাগর

    পাহাড়ে নাচে হৃদয়ে বা

    বুড়োর এ মন কবরে যায়

    যখের ধন গভীরে চায়

    হৃদয়ে তবু প্রেম নাচায়

    পাহাড়ে বা হৃদয়ে”

    মৃদুল দাশগুপ্ত

    “কয়েক মুহূর্তকাল থামো —

    আমি তাকে বলি

    থেমে অশ্ম মন্ত্র ও মেশিন”

    চোদ্দ

    ‘গ্রন্হি’ পত্রিকার জন্য চন্দন ভট্টাচার্যকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ( মে, ২০০৫ ) বিনয় মজুমদার কবিতা-বিশেষের মনে রাখা নিয়ে ছন্দ ও অন্ত্যমিলকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন :

    চন্দন : আপনি কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, ছন্দ ও অন্ত্যমিলে লিখলে সে কবিতা পাঠকের মনে থেকে যায়। কাজেই পাঠকের স্মৃতিতে কবিতাকে সুমুদ্রিত করার এটাই সেরা পদ্ধতি। এখনও কি তাই মনে করেন কবি ? তবে কি গদ্যে লেখা কবিতাগুলি মানুষ বিস্মৃত হবে কালে কালে ?

    বিনয় : আজও তাই মনে হয়।

    চন্দন : কিন্তু ধরুন, লাতিন আমেরিকার বা ইউরোপেও তো শুধু গদ্য কবিতার ছড়াছড়ি। মিটার নামক শব্দটা ওরা হয়তো ভুলেই গেছে। শুধু কিছু গানের কথা ছাড়া —

    বিনয় : গানও আজ কবিতা হয়ে গেছে। আমিও তো গদ্য কবিতা লিখেছি, প্রথম কবিতাটির নাম ছিল “আমার প্রথম গদ্যকবিতা”, বেরিয়েছিল ‘রোপণ’ পত্রিকায়। আমার ধারণা লোকে গদ্য কবিতা পংক্তির পর পংক্তি এভাবে মনে রাখে না। মনে রাখে শুধু কবিতাটির বিষয়বস্তুকে।

    চন্দন ভট্টাচার্য প্রশ্ন করতে পারতেন যে তাঁর ভুট্টা সিরিজের কবিতাগুলো কি তাহলে বিষয়বস্তুকে মনে রাখার জন্য।

    বিনয় মজুমদারের কিন্তু প্রতিটি কবিতাই বোঝা যায়। ‘ফিরে এসো, চাকা’ এবং ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ বইয়ের কবিতাগুলো তো বটেই, স্কিৎসোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা করে ফিরে এসে লেখা যে কবিতাগুলোর জন্য তিনি অনেকের দ্বারা আজকাল নিন্দিত হন, সেই কবিতাগুলোও। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ বইতে ছয়টি দীর্ঘ কবিতা আছে। বিনয় মজুমদার বলেছেন যে কবিতাগুলি যদিও নারীভূমিকাবর্জিত, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যাকে লেখা চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন কবিতাগুলো আদিরসাত্মক। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হে বিনয় মজুমদার ‘অতিচেতনা’ ও ‘অতিসত্য’. নামে দুটি ভাবকল্পের সূত্রপাত ঘটালেন।

    ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হে বিনয় লিখেছিলেন

    আমার সচেতনতা যেন অতিচেতনার সমপরিমাণ হয়ে যায়

    উভয় চেতনা যেন সমান কুশলী হয় সমান সক্ষম হয়ে যায়

    দুই চেতনার মাঝে যোগাযোগ ব্যবস্হাটি যেন খুব স্বচ্ছলতা পায়

    বিনয় সচেতনতা ও অতিচেতনায় পার্থক্য করেছেন। সচেতনা কবির প্রতিস্বের, যিনি কবিতাটি অথবা গল্প-উপন্যাস লিখছেন, তাঁর। কিন্তু অতিচেতনা ও অতিসত্য পাঠবস্তুতে লুকিয়ে থাকে। কিছুকাল পরে পড়লে কবি অথবা পাঠক টের পান যে তাঁর সচেতনতায় ছিল না এমন জিনিসও রয়েছে পাঠবস্তুতে ; আবার বহুকাল পরে পড়লে আরও নতুন উদ্ভাস পাবেন তিনি, যা প্রথমবার বা দ্বিতীয়বার পড়ে পাননি। অর্থাৎ পাঠবস্তুটি নিজের উপরিতলের নীচে অতিচেতনার ও অতিসত্যের বহুবিধ স্তর সঙ্গোপনে রেখে দেয়। বিনয়ের অতিচেতনা ও অতিসত্য তাঁর ব্যক্তিপ্রতিস্বের নয়, তা পাঠবস্তুটির।

    ১৯৮৭ সালে ‘পুনর্বসু’ পত্রিকার জন্য রণজিৎ দাশের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বিনয়ের অতিচেতনা ও অতিসত্য বিষয়ে এরকম প্রশ্নোত্তর হয়েছিল :

    প্রশ্ন : কথা হচ্ছে যে, আমি একটা কথা মনে করি, সেটা হচ্ছে যে আমি মনে করি, আমার সঙ্গে তখন একমত হয়েছিলেন আপনি — যে কোনও অভিজ্ঞতাই একজন কবির লেখার বিষয় নয় ! মানে যে কোনও অভিজ্ঞতা, হঠাৎ একটা অভিজ্ঞতা হল, এটাই আমার লেখার বিষয় হয়ে উঠতে পারে না। মানে যতক্ষণ না সেই অভিজ্ঞতাটা আমার মধ্যে জারিত হচ্ছে। জারিত হতে হতে এমন একটা পয়েন্টে এসে পৌঁছোল, যখন সেটা, শুধুমাত্র অভিজ্ঞতা বা একটা সাধারণ উপলব্ধির স্তরে থাকে না — মানে সেটা একটা, কী বলব, অভিজ্ঞা বা আদ্যাজ্ঞানের অবস্হায় চলে যায়। তখনই একটা, সেই অবস্হা থেকে যখন একটি লোক লেখে, তখন সেটাই চূড়ান্ত কবিতা হয়ে উঠতে পারে, সম্ভাবনা থাকে। তো আপনি কি এটা মনে করেন ? কেননা আপনার কবিতা পড়ে তো — তাই মনে হয়েছে, কেননা চার বছর অতিক্রম করবার পরে–

    বিনয় : কবিতায় অবচেতন মন বলে একটা জিনিস আছে, শুনেছ ? সেটা কিছু-কিছু লোকের কবিতায় খুব থাকে। তুমি নিজের কবিতা রেখে দাও, ছাপা কবিতা…চার…পাঁচ, আস্তে আস্তে তোমার নিজের কবিতার মানেই তোমার কাছে কিন্তু ধীরে-ধীরে উন্মোচিত হতে থাকবে, মনে হবে যেন, এই মানেটাও, রয়ে গেছে কবিতার মধ্যে, খেয়াল, খেয়াল না করে লিখে ফেলেছ, বুঝতে পারলে, এই যে জিনিসটা এটাকে তোমার অবচেতনাই বল, অতিচেতনা, আমি ‘অতিচেতনা’ বলে একটা শব্দ সৃষ্টি করেছি, আলট্রা ভায়োলেট রে।

    প্রশ্ন : এটা অনেক ভালো শব্দ, অনেক ভালো শব্দ।

    বিনয় : অতিচেতনা।

    প্রশ্ন : খুব ভালো, কাজে লাগবে।

    বিনয় : আমি প্রথম ব্যবহার করেছি, ‘অতিচেতনা’ শব্দটা আগে ছিল না।

    প্রশ্ন : আপনি তো ‘অতিসত্য’ বলেও একটা সাংঘাতিক শব্দ ব্যবহার করেছেন, এক জায়গায় আছে —অতিসত্য।

    বিনয় : আচ্ছা, কনসাস মাইণ্ড, অ্যাঁ ?

    প্রশ্ন : অতিসত্য। অতিসত্য, আপনার লেখায় এক জায়গায় আছে। –’শুধু সত্য আমি’, ‘বাকিসব অতিসত্য, শুধু সত্য আমি’।

    বিনয় : অতিসত্যটা তখন….

    প্রশ্ন : আপনি ‘অতিসত্য’ ব্যবহার করেছেন। মানে, সমাসবদ্ধভাবে। তাহলে ‘আমার’ সঙ্গে চারিদিকের তফাত একটা আছে ?

    বিনয় : অ্যাঁ ?

    প্রশ্ন : আমার সঙ্গে।

    বিনয় : তুমি যা লিখে রেখেছ, রেখে দাও, ছাপা হোক, বই হোক, দশ, পনেরো, কুড়ি বছর পরে নিজেই টের পাবে ভিতরে-ভিতরে একটা গভীরতম অনুভূতিও রয়ে গেছে, নিজেও ভালো করে লক্ষ্য করতে পারোনি লেখার সময় ! বুঝতে পারছ ! লেখার সময়ে তুমি নিজেও ভালো করে লক্ষ্য করনি, তোমার অজ্ঞাত, তোমার নিজেরই অজ্ঞাতসারে এমন কিছু হয়ে গেছে। তাকে আমি নাম দিলুম অতিসত্য, সেটা একদম অতিচেতন মন। সাবকনসাস, কনসাস, এদুটো ছিল, আলট্রাকনসাস বলে, আলট্রা কনসাস, আলট্রাকনসাস, নাম দিলুম ‘অতিচেতনা’।

    প্রশ্ন : আচ্ছা এটা কি সব লেখা সম্পর্কেই মনে হয়, না কিছু-কিছু লেখা সম্পর্কে মনে হয় ?

    বিনয় : তুমি নিজে মনে-মনে ভাব।

    বিনয় মজুমদারের দেয়া সাক্ষাৎকারগুলো অন্যান্য কবিদের সাক্ষাৎকারের থেকে একেবারে আলাদা। বিনয় সাক্ষাৎকারের মাঝেই নিজের কবিতা, জীবনানন্দের কবিতা, রবীন্দ্রনাথের কবিতা আচমকা আবৃত্তি করে সাক্ষাৎকার যাঁরা নিচ্ছেন আর নিজের মাঝে একটি অভিকরসম্পর্ক গড়ে তোলেন, দূরত্বকে মুছে ফেলেন। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তাঁর নিজের দেয়া সাক্ষাৎকার সম্পর্কে একবার বলেছিলেন যে তা হল Gesture towards a history of vanishing present এবং the interview is an enabling violation that allows the interviwee subject to produce a narrative of the self through a responsive encounter with the OTHER, as well as produce an ethics of accountable transformation. The interviewee not only articulates strategic essentialism but performs it. এই বক্তব্য বিনয় মজুমদারের দেয়া সাক্ষাৎকারগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোয্য। অন্যান্য লোকেদের যদি জিগ্যেস করা হয়, কেমন আছেন, তাঁরা উত্তর দ্যান ‘চলছে’। বিনয় কিন্তু জানান যে তিনি আনন্দে আছেন।

    সত্তর দশকের কবি বারীন ঘোষাল ‘অতিচেতনা’ নামে একটি কাব্যিক ভাবকল্পের কথা বলেছেন যা বিনয় মজুমদারের চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বারীন ঘোষাল ব্যক্তিএককটির প্রতিস্বের অতিচেতনার কথা বলেছেন, সে কারণে বারীনবাবুর ‘অতিচেতনা’ কবিতার ভাবকল্পে সমর্পিত কবিদের আঙ্গিকে প্রতিফলিত হয়, এমনটাই তাঁরা মনে করেন, এবং সেই আঙ্গিকের প্রতি নজর দিলে স্তেফান মালার্মের বিখ্যাত কবিতা “এ রোল অফ দি ডাইস উইল নেভার অ্যাবলিশ চান্স’-এর প্রভাব সহজেই চোখে পড়ে। মালার্মে বলেছিলেন বস্তুজগতের সত্য স্বপ্রকাশিত হয় কবির অতিচেতনার ( সুপারকনসাশনেস ) দ্বারা। দি নিউ ইয়র্কার পত্রিকা এপ্রিল ২০১৬ সংখ্যায় বলেছে যে স্তেফান মালার্মে হলেন ‘প্রফেট অফ মডার্নিজম’ । বিট ঔপন্যাসিক উইলিয়াম বারোজ কিন্তু বলেছেন যে অতিচেতনা ( সুপার-কনসাশনেস ) সম্ভব হয় মাদক সেবনের মাধ্যমে এবং সেই অবস্হায় সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়। বলা বাহুল্য যে বিনয় মজুমদারের অতিচেতনা থেকে এনাদের অতিচেতনা সম্পর্ণ আলাদা।

    ‘নিশিকড়’ প্রবন্ধে বারীন ঘোষাল লিখেছেন, “চেতনা শব্দটা একটু গোলমেলে। অনেকে একে বিবেক, চৈতন্য ইত্যাদির সাথে গুলিয়ে ফেলেন। মানুষের মনে যখন একটা বদ্ধমূল ধারণা হয় যা অন্ধ সেটাকেই তার চেতনা মনে করে। একই বিষয়ে অনেক চেতনা, আবার অনেকানেক বিষয়ে বহুবিধ চেতনা তার হতে পারে। অনেক সময়েই চেতনাগুলোর মধ্যে সংঘাত হয় তাদের আপাতবিশৃঙ্খলার জন্য, কার্য ও কারণের মধ্যে সম্পর্কহীনতার জন্য, মিথ্যা বিশ্বাসের জন্য, এবং ভাষা ও শব্দের প্রতীকভাষ্যের জন্য। চেতনাগুলির মধ্যে যদি শৃঙ্খলা সম্ভব হয় তবে তার মানসিকতাও সমৃদ্ধ হয়। আবার দেখুন, মানুষের শরীরে বস্তুগত শূন্যতা ৭০%, যা তার প্রতিটি পরমাণুর কোয়ার্কের সমষ্টিগত অন্ধকার। এই অন্ধকারও সচল, তার ডাইমেনশান আছে, আলোয় আসতে চায়। এটা তার প্রগতির লক্ষণ, প্রকৃতির শিক্ষা। চেতনাদলের অপার বিশৃঙ্খলার মধ্যে মানুষের পরিবেশ-সঞ্জাত যে সর্বশ্রেষ্ঠ প্যাটার্নটি সম্ভাবিত হয় তা-ই তার অতিচেতনা। ” প্রশ্ন হলো বারীনবাবুর ‘নতুন কবিতা’ আন্দোলনের সকলেরই ব্যক্তি-প্রতিস্বে যা ঘটে তা কি অন্য মানুষদের থেকে আলাদা ?

    অতিচেতনা সম্পর্কে ‘অষ্টাবক্র গীতা’য় বলা হয়েছে যে, “তুমি তখন পৃথিবী নও, জল নও, আগুন নও, বায়ু নও, আকাশ নও তখন স্বাধীনতাবোধের জন্য নিজের আত্মনকে অতিচেতন বলে মনে করো এবং ওই স্হিতিতে সাক্ষী থাকো পঞ্চভুতের। ”

    একটি থেকে আরেকটি সাব-জনারে বিনয় স্বচ্ছন্দে চলে গেছেন। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হের কবিতাগুলো এবং তার পরে লেখা কবিতাগুলো আঙ্গিক ছন্দ ও ভৌতজগতের নৈসর্গিক বিস্তার ‘ফিরে এসো, চাকা’ থেকে সম্পূর্ণ সরে গেল। প্রশ্ন ওঠে, তা কি এইজন্য যে আলোচকরা তাঁর কবিতাকে বার বার জীবনানন্দের সঙ্গে তুলনা করছিলেন। বিনয় বলেছেন জীবনানন্দের কবিতা অত্যন্ত জটিল, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপলকুমার বসু চেষ্টা করেছিলেন জীবনানন্দের ঢঙে লিখতে। কিন্তু তিনি নিজে যে প্রভাবিত নন, এবং মৌলিকতা যাতে কবিতা রচনা করার সময়ে আসে শেষ পর্বের এই কবিতাটিতে বয়ান করে গেছেন :

    কলমটি পড়ে আছে টেবিলের কোণে

    হাত দিয়ে কলমটি ধরি…

    এইভাবে আমি কবিতা রচনা করি

    যাতে মৌলিকতা কবিতায় আসে

    কারো কাব্য অনুসরণের চেষ্টা তো করিনি আমি

    যা-যা ঘটে যা-যা করি তাই লিখি মাঝে -মাঝে।

    পনেরো

    মাদুলি পত্রিকার বিনয় মজুমদার সংখ্যায় ( ২০১০ ) শিমুল সালাহউদ্দিন “‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ আবিষ্কার” প্রসঙ্গে লিখেছেন যে ঢাকার এক সাহিত্য আসরে একজন আবৃত্তিকার এই কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন, এবং খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন কবির নাম বিনয় মজুমদার :-

    বিড়িতো ফুরালো প্রায়। দুটি বিড়ি আছে

    শালপাতা দিয়ে এই বিড়ি বানায়। এপর্যন্ত লিখে

    মনে এলো রেললাইনের পাশে লম্বা এক শালবন

    বানিয়েছে। শালপাতাগুলির সেই শাদা শাদা ফুল।

    গন্ধ আছে নাকি এই শালফুলে, ঘ্রাণ যদি না থাকে

    এই শালফুলে তবে শালফুল অঘ্রাণ

    এবং এই শালফুলের মানে শালফুলের মনের অনুভূতি

    ধরা আছে আমাদের পৃথিবীর ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালায়”

    শিমুল সালাহউদ্দিন লিখেছেন, “পড়িতে বসিলাম ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’। জীবন্ত সব ডালপালা সমেত যেন অন্ধকারে একটি মৃত গাছ আমার জানালায় নড়িয়া উঠিল। মৃত গাছ তথাপি প্রসারণশিল তার ডালপালা। জীবন্ত। নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে কথা কই্ছে যেন। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’র সেই ঘোর বাধ্য করিল বিনয়ে আসক্ত হইতে, বিনয়কে ভয় পাইতে, বিনয় নিয়া পড়াশুনা চিন্তা করিতে। দেখিলাম বিনয় পণ্ডিতরা বিবৃতি করেছেন বিনয় মানসিক অসুস্হতার কারণে কলকাতা মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রহিয়াছিলেন। দীর্ঘ সময়। কিন্তু সেই সময়ে লিখিত এক পংক্তির দুইশত একটি কবিতার ভিতর দিয়া খেয়া-নাও পাড়ি দিতে দিতে এ অধমের কখনও মনে হয় নাই সেই মেদুর কবিতাপংক্তিসমূহের কোনো একটাও পাগলপ্রলাপ। বিনয়ের এ কবিতাগুলো যেন ভিন্নতর দর্শনের আয়না, জন্মশেকড় হইয়া দেখা দিলো আমার কাছে। কল্পনা, তাঁহার পরিচিত দৃশ্যকল্প জগতে কল্পনার স্হান বিনয়ের এ কবিতাগুলোতে নাই। যেন বা জীবনের প্রতি অনাসক্ত এক দ্রষ্টা বিপরীত আয়নায় দেখিতেছেন জগতকে। কবিতার সবকটি লাইন জুড়িয়াই রহিয়াছে অনন্য সব বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং অনুধাবন। কেবল কবিতা কেন, বিনয় গদ্য সাহিত্যও সাজান পরতে-পরতে, তাকে তাকে, থাকে থাকে, গণিত প্রভাবিত দার্শনিকতায়। প্রতিভা ও মেধার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা জানি না আমি। কোনো লেখক বা কবিকে আমাদিগের জগতে চরিয়া খাওয়া তথাকথিত অ্যাকাডেমিশিয়ানরা যে সকল অভিধায় ভূষিত করিয়া থাকেন, তা-ও করা যায় কিনা এ-লইয়া রহিয়াছে পক্ষে-বিপক্ষে প্রভূত বিতর্ক। তবে বিনয়ের কবিতা, তামাকে ডুবিয়া গিয়া যেমন, তেমনি বিনয়ের শত্রু ধরিয়া নিয়াও নিঃসন্দেহে বলা যায়, কোনো গণিতে, কোনো ভূগোলেই কোনো কবি-লেখক-সৃষ্টিশীল সত্ত্বাকে আটক করিয়া রাখা যায় না। দৃশ্যত এমনই এক অতিবাস্তব-অধিবাস্তব অনুধাবনের মাঝখানে নির্লিপ্ত দাঁড়াইয়া সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন একের পর এক। হইয়া উঠিয়াছেন রাজা। ঘোর আর প্রবণতার। আর শব্দ, ব্যঞ্জনা, উপমায় উপমিত করিয়াছেন কবিতার ঘরগেরস্হালি, শিথান-পৈঠা-উঠান। নিজস্ব ডায়েরির মতো সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র আঙ্গিকের কাব্যে হইয়া উঠিয়াছেন দৃশ্য আর বলিবার মতোন নিরাসক্ত, নির্মেদ, সাবলীল, বহমান, অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ষোলোঘুটির ঘরের প্রবাদপুরুষ।”

    ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কবিতাটির তৃতীয় পর্ব কিছুটা পড়ে দেখা যাক, যে পর্বটি এক সম্পাদক ছাপবেন বলে নিয়ে অশ্লীলতার ভয়ে ছাপতে চাননি, কেননা তখনও হাংরি মামলা হাইকোর্টে চলছে আর বিনয় মজুমদার বছর দুয়েকের জন্য হাংরি আন্দোলনে ছিলেন। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ রচনার পরে ‘বাল্মীকির কবিতা’কে স্বাভাবিক ও অনায়াস অগ্রগতি বলে চিহ্ণিত করা যায়, যে পথে হাঁটার সাহস আর কোনো কবি এতাবৎ দেখাতে পারেননি।

    বহু পরে, জ্যোতির্ময় দত্ত ওনার ‘কলকাতা’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন তৃতীয় পর্বটি :-

    সকল বকুল ফুল শীতকালে ফোটে, ফোটে শীতাতুর রাতে

    যদিও বছর ভর, আষাঢ়ে-আশ্বিনে, চৈত্রে বকুলের নাম শোনা যায়,

    শুনি বকুলের খ্যাতি, বকুলের প্রিয়তার সকল কাহিনী

    তবু খুব অন্তরঙ্গ মহলেই শুধুমাত্র আলোচিত হয়

    তার ঢাকাঢাকি করে এ-সব নরম আর গোপন বিষয় ;

    অচেনা মহলে প্রায় কখনোই বকুলের নাম বা কাহিনী

    তোলে না, শরমবোধে চেপে যায় যেন কেউ বকুল দ্যাখেনি ;

    তবে — তবু আমি জানি সকলেই এ-সকল মনে মনে ভাবে

    বড়ো বেশি করে মনে মনে ভেবে থাকে সারাটা জীবন

    ভেবে বেশ ভালো লাগে বকুল ফুলের রূপ এবং সুরভি।

    আমাদের সব চিন্তা অদৃশ্য বাস্তব হয়ে পাশে চারিধারে

    রূপায়িত হতে থাকে, হয়ে যায়, অবয়বসহ হয়ে যায়,

    চলচ্চিত্রাকারে হয়, চিন্তাগুলি অবিকল এমন বাস্তব

    বলেই হয়তো এতো ভালো লাগে বকুলের বিষয়ে ভাবনা।

    বকুলের আকারের বিষয়ে ভাবনা তবু বেশি ভালো লাগে

    ঘ্রাণ ও রঙের চেয়ে অন্যান্য গুণের চেয়ে ফুলের আকার

    চিরকাল সকলেরই অনেক অনেক বেশি ভালো লেগে থাকে–

    মাঝখানে বড়ো এক ছিদ্রপথ, ছিদ্রপথ ঘিরে

    অনেক পাপড়ি আছে, এলোমেলো সরু সরু পাপড়ি ছড়ানো ;

    এই চেহারাটি আমি স্বভাবত সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি

    এ-সকল পাপড়িকে অতিশয় সাবধানে নাড়াচাড়া করি,

    এখন এই তো এই বকুলবাগানে একা অঘ্রাণের রাতে

    নাড়াচাড়া করে দেখি, অতি সাবধানে টানি, ধীরে-ধীরে টানি

    যাতে এ-সকল দল ছিঁড়ে বা উঠে না যায় ; কী রকম লাগে,

    মনে হয়, মনে পড়ে এতো বড়ো বাগানের শরীরের থেকে

    শুধুমাত্র ভালো-ভালো, মূল্যবান জিনিসকে বেছে-বেছে নিয়ে

    যে-রকম চর্চা হয়, সৌন্দর্যচর্চার রীতি চিরকাল আছে

    তার বিপরীতভাবে গদ্যময়তার থেকে বাদ দিয়ে দিয়ে

    সারহীন অঙ্গগুলি সরিয়ে-সরিয়ে রেখে ডালপালা পাতা

    একে-একে বাদ দিতে-দিতে শেষে যখন এমন

    আর বাদ দিতে গেলে মূল কথা বাদ যায় যার তখন থেকেই

    দেখা যায় জোছনায় ফুল ফুটে আছে, এই বকুল ফুটেছে,

    দেখা যায় একা-একা অঘ্রাণের জোছনায় আমি ও বকুল,

    বকুলের ফাঁকটির চারধারে সরু-সরু পাপড়ি ছড়ানো

    অতি সোজা সাদা কথা যেন অবশিষ্টরূপে পড়ে আছে তবু–

    তবু এ তো ডাল নয়, তবু এ তো পাতা নয়, এ হলো বকুল।

    ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’র ছয়টি কবিতাই বেশ দীর্ঘ, এবং একই কথা শুনতে শুনতে পাঠক আগ্রহ যাতে হারিয়ে না ফেলেন, এবং পাঠকের মনে প্রশ্নের উদয় হয়, তাই বিনয় মজুমদার ‘এলিমিনেশান পদ্ধতি’ প্রয়োগ করে মাঝে-মাঝে কবিতার মাঝখানে বাঁকবদল ঘটিয়ে দিয়েছেন। এই এলিমিনেশন পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর একটি প্রবন্ধ আছে যা আমরা পরে আলোচনা করব। যেমন ওপরের ওই লাইনটির পরে একটি ভাঙন তৈরি করে তিনি আরম্ভ করছেন এইভাবে :

    শতকরা একেবারে একশতভাগ খাঁটি দর্শনের নাম

    সংজ্ঞা অনুসারে ধর্ম, মনে হয় চারপাশে মহাকাশময়

    অনাদি সময় থেকে, গণিতেরই মতো বহু কবিতা রয়েছে

    চুপচাপ পড়ে আছে কোনোদিন একে-একে আবিষ্কৃত হয়

    কোনো অঘ্রাণের রাতে বকুলবাগানে খুব মৃদু জোছনায়

    সুডৌল পাতার ফাঁকে গহ্বরের মতো কিংবা ছিদ্রের মতোন।

    এর পরে বাঁকবদল করে কবিতাটিকে অন্যদিকে চালিত করলেন বিনয়, বা বলা যায়, যারা এতক্ষণ আঁচ করতে পাচ্ছিলেন না বকুলফুল প্রকৃতপক্ষে ঠিক কোন জিনিশ, তাঁদের নিয়ে গেলেন পথ দেখিয়ে :

    ছবি আঁকবার কালে কোনো যুবতীর ছবি আঁকার সময়ে

    তার সব প্রত্যঙ্গকে হাজির রাখাই হলো বেশি দরকারি–

    সবচেয়ে দরকারি, কোনো অঙ্গ কোনোক্রমে বাদ চলে গেলে

    অন্যান্য অঙ্গগুলি যতো ভালো আঁকিই না কেন এই ছবি দেখে

    ভয় করে, সকলেরই অতিশয় ভয়াবহ বলে মনে হয়।

    তাই সব প্রত্যঙ্গকে হাজির রাখাই হলো বেশি দরকারি–

    দরকারি বকুলের কুঁড়িগুলি শাদা-শাদা গোল-গোল কুঁড়ি–

    এই কথা বকুলের কাছে আমি চোখ বুজে বলে ফেললাম,

    বলি, ও বকুল, তুমি বোঝো না কি কুঁড়িগুলি খুব বেশি ছোট,

    আরো ঢের বড়ো-বড়ো নরম-নরম হবার কথা না ?

    এ-সকল কুঁড়ি নেড়ে টিপে-টিপে সুখ পেয়ে — পাবার পরে না ?

    শুনে ফুল হেসে ফ্যালে, মৃদু-মৃদু হেসে ফ্যালে, কথা সে বলে না।

    হেসে ফেললেই এই ঠোঁট দুটি এতো বেশি ফাঁক হয়ে যায়

    গোলটুকু এতো বেশি ফাঁক হয়ে যায় কেন বকুল-বকুল,

    হাসিকান্না যাই হোক গোল ঠিক এক মাপে থাকার কথা না —

    এই কথা আমি বলি, একটু বিস্মিত হয়ে বলে ফেলি আমি।

    এলিমিনেশান পদ্ধতি প্রয়োগ সম্পর্কে বিনয় মজুমদার আলোচনা করেছেন তাঁর ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে। তিনি লিখেছেন, “যে-কোনো রচনা সম্পূর্ণ বিবরণ-সংবলিত হওয়ার কথা। কিন্তু তা থেকে কোনো অংশ ( স্তবক ইত্যাদি ) কিংবা বাক্য সুপরিকল্পিতভাবে বাদ দিলে, এই বাদ দেওয়ার ব্যাপারটিকে বলি ‘এলিমিনেশান’, যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘পুজারিনি’ কবিতাটির শেষ স্তবক এবং ঠিক তার আগের স্তবক — এই দুইয়ের মাঝখানে ঘটনার বিবরণ মহাকবি স্বেচ্ছায় সুপরিকল্পিত ভাবে বাদ দিয়েছেন :-

    এমন সময়ে হেরিলা চমকি প্রাসাদে প্রহরী যত

    রাজার বিজন কানন-মাঝারে

    স্তূপপদমূলে গহন আঁধারে

    জ্বলিতেছে কেন যেন সারে সারে প্রদীপমালার মতো।

    মুক্তকৃপাণে পুররক্ষক তখনি ছুটিয়া আসি

    শুধালো, “কে তুই ওরে দুর্মতি,

    মরিবার তরে করিস আরতি।”

    মধুর কন্ঠে শুনিল, শ্রীমতী, আমি বুদ্ধের দাসী”

    সেদিন শুভ্র পাষাণফলকে পড়িল রক্তলিখা।

    সেদিন শারদ স্বচ্ছ নিশীথে

    প্রাসাদকাননে নীরবে নিভৃতে

    স্তূপপদমূলে নিভিল চকিতে শেষ আরতির শিখা। ।’

    শেষ স্তবকের ঠিক আগের স্তবকে কবি লিখেছেন যে প্রাসাদের প্রহরীরা দেখতে পেলো রাজার বিজন কাননে স্তূপপদমূলে প্রদীপমালা জ্বলছে। তার পরেই শেষ স্তবক — শেষ স্তবকে শুধু লিখেছেন যে সেদিন শুভ্র পাষাণফলক রক্তচিহ্ণিত হল এবং শেষ আরতির শিখা চকিতে নিভে গেল। এতে রচনা অধিকতর হৃদয়গ্রাহী হয়েছে, বেশি সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়েছে। অনুরূপভাবে কোনো রচনার কোনো বাক্য বা বাক্যাংশ বাদ দেওয়ার উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করছি বর্তমান প্রবন্ধের রচয়িওতারই একটি কবিতা। ‘আমার ঈশ্বরীকে’ গ্রন্হের তৃতীয় সংস্করণে ছিল, ‘যে গেছে সে চলে গেছে, দেশলাইয়ের বিস্ফোরণ হয়ে/বারুদ ফুরায় যেন, অবশেষে কাঠটুকু জ্বলে/আপন অন্তরলোকে’, ইত্যাদি। পরে ‘ঈশ্বরীর কবিতাবলী’র সংস্করণে পরিমার্জনার পর লিখি : ‘যে গেছে সে চলে গেছে, অবশেষে কাঠটুকু জ্বলে/আপন অন্তরলোকে’ ইত্যাদি। এতে কবিতাটি অধিকতর হৃদয়গ্রাহী হয়েছে বলে আমার ধারণা। চিত্রশিল্পীদেরও এই ধরণের এলিমিনেশান ব্যবহার করা ভিন্ন গত্যন্তর নেই। পিকাসোর চিত্রে ( একটি উদাহরণ ‘মা ও ছেলে’ ), মাতিসের চিত্রে ( একটি উদাহরণ সেই দীর্ঘ গ্রীবা বিশিষ্ট তরুণী মহিলা ), দেখা যায় বিশদরূপে আঁকতে গেলে যত রেখা ব্যবহার করতে হয়, তত রেখা তাঁরা ব্যবহার করেননি, বহু রেখাই বাদ দিয়ে দিয়েছেন। দিয়েছেন সংক্ষেপে কাজ সারার জন্য, শ্রীমণ্ডিত করার জন্য। এলিমিনেশানের ফল রহস্যময়তা ও দুর্বোধ্যতা। জীবনানন্দের নিজেরই রচনায় এলিমিনেশানের একটি সুন্দর উদাহরণ মনে পড়ল : ‘বিবর্ণ প্রাসাদ তার ছায়া ফেলে জলে।/ও প্রাসাদে কারা থাকে ? কেউ নেই — সোনালি আগুন চুপে জলের শরীরে/নড়িতেছে-জ্বলিতেছে -মায়াবীর মতো যাদুবলে’ ইত্যাদি। এখানে এই আগুন কি কোনো আলেয়ার, নাকি ওই প্রাসাদ থেকে আসা আলোর প্রতিফলন, না কি অন্য কোনো স্হান থেকে আসা আলোর প্রতিফলনও হতে পারে। কবি সে কথাটি বাদ দিয়ে দিয়েছেন, যেন বিষয়টি অত্যন্ত গোপন কথা। ফলে কবিতাটির এস্হানটি রহস্যময় হয়ে উঠেছে, পাঠক উপরিউক্ত সম্ভাবনাগুলির কোনটি হতে পারে ভাবতে শুরু করেন ; পথ চলতে-চলতে রহস্যের ঘ্রাণ পেয়ে থেমে পড়ার মতো, থেমে পড়ে চতুস্পার্শ্ব একটু খতিয়ে দেখার মতো। এর ফলে সেই খতিয়ে দেখা স্হানটি পথিকের মনে গেঁথে যায়, গেঁথে যায় অনুরূপভাবে কবিতাটির পংক্তিগুলিও। ফলে দেখা যাচ্ছে এলিমিনেশান কবিদের মস্ত সহায়, প্রায়শই ভরসা। এলিমিনেশানের ফলে রহস্যময়তা বাড়ে, দুর্বোধ্যতা বাড়ে– মাঝে-মাঝে কবিতার অর্থ ‘কোনোদিন বোঝা যাবে না’ অবস্হায়ও এসে দাঁড়ায়। কিন্তু কবির চরম উদ্দেশ্য পাঠককে ভালো লাগানো, বোঝানো নয়।”

    বিনয় মজুমদার ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে লিখেছেন যে জীবনানন্দের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতায় সৌন্দর্যতত্বের কয়েকটি ব্যাপার অনুপস্হিত ; প্রবন্ধটি ১৯৬৬ সালে লেখা।

    অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ

    যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা ;

    যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই — প্রীতি নেই —

    করুণার আলোড়ন নেই

    পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়।

    যাদের গভীর আস্হা আছে আজো মানুষের প্রতি

    এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়

    মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা

    শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।

    “এতে ‘এলিমিনেশান নেই। আলোকচিত্রধর্মিতা থেকে চ্যুতি নেই”। বিনয় বলেছেন, “অঙ্কিত চিত্র যেমন আলোকচিত্র নয়, কবিতাও তেমনি সাংবাদিকতাময় মাধ্যম নয়। অর্থাৎ চিত্রশিল্পীকে ভেবে-চিন্তে সুপরিকল্পিত ভাবে আলোকচিত্র হতে চ্যুত হতে হয় — তার উদ্দেশ্য দর্শককে অধিক পরিমাণে ভালো লাগানো। তেমনি কবিকেও ভেবেচিন্তে সুপরিকল্পিতভাবে সংবাদসুলভ রচনা থেকে চ্যুত হতে হয়। ফলে জন্ম হয়েছে ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রের, অ্যবসট্র্যাক্ট চিত্রের। ফলে জন্ম হয়েছে অ্যাবসট্র্যাক্ট চিত্রের সমধর্মী আধুনিক কবিতার। আলোকচিত্রধর্মিতা থেকে চ্যুতির একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত জীবনানন্দে — ‘ঘাসের উপর দিয়ে বয়ে যায় সবুজ বাতাস/অথবা সবুজ বুঝি ঘাস ? /অথবা নদীর নাম মনে করে নিতে গেলে চারিদিকে প্রতিভাত হয়ে ওঠে নদী’, ইত্যাদি। এখানে কবি স্বেচ্ছায় আলোকচিত্রধর্মিতা থেকে অত্যন্ত বেশি সরিয়ে নিয়ে এসেছেন রচনাকে এবং রচনাও আশ্চর্য হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছে। ”

    কবিতাটির বিশ্লেষণে বিনয় মজুমদার বলেছেন, “মূল বিষয়বস্তু যা কবিকে ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতায় উক্ত বা ব্যক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য করেছিল, সেই মূল বিষয়বস্তুটি নেই। অর্থাৎ সাক্ষপ্রমাণহীন অবস্হায় রয়েছে কবিতাটির বক্তব্যবিষয়। এগুলো কবিতাটির এডিটিং-এর অঙ্গ। কিন্তু এই কবিতাটিতে আছে: ১) আবিষ্কার। যে-কোনো নতুন আবিষ্কার চমকপ্রদ এবং মনকে সেহেতু নিজের দিকে আকৃষ্ট করে। ২) উপমার বদলে সাবস্টিটিউশান আছে। প্রকৃতপক্ষে মূলে সাংবাদিকসূলভ কতকগুলি বাক্য কবির লেখার ছিল ; সেই বাক্যগুলির সাবস্টিটিউটরূপে কতকগুলি বাক্য কবি লিখেছেন, মূল বাক্যগুলি একদম না লিখে। মূল বিষয়বাহী বাক্যের সাবস্টিটিউটরূপে কবি অ্যানালজাস বিষয়বাহী বাক্য লিখলেন, এবং তা করতে উপমা, উপমার থেকে প্রতীক তাঁকে সাহায্য করল। ৩) বারংবার পঠনেচ্ছা-উদ্রেকের ব্যবস্হা আছে। অন্যতম প্রকৃত চিন্তনীয় বিষয় এই যে কবিতার অদ্ভূত সংসৃজন, এতে বিবৃত দার্শনিক আবিষ্কার, এর অন্তর্নিহিত এবং অনুল্লেখিত বেদনা, কবিতায় সৃষ্ট বিষণ্ণ পরিবেশ, মন্হর গতি ইত্যাদি সব মিলিয়ে পাঠককে কবি দ্বিতীয়বার পাঠে বাধ্য করতে সমর্থ হয়েছেন। এবং প্রথমে, দ্বিতীয়বার পাঠের পরে তৃতীয়বার পাঠের আগ্রহ আরো বাড়তে থাকে — কারণ পাঠক নিজে তখন পাঠক থেকে কবি হতে থাকেন, চিন্তায় পড়ে, বাধ্য হয়ে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঠ করতে করতে পাঠক নিজেকে অত্যন্ত তুচ্ছ ( রবীন্দ্রনাথের তুলনায় ) মনে করতে বাধ্য, আর জীবনানন্দের কবিতা পাঠ করতে করতে পাঠক নিজেকে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করতে বাধ্য, যার ফলে পাঠকের পঠনেচ্ছা বাড়তেই থাকে। ৪) সহজে মুখস্হ করে রাখার ব্যবস্হা আছে। বারংবার পড়তে পড়তে যাতে কবিতাটি স্মৃতিস্হ হয়ে যায় সেদিকে কবি দৃষ্টি রেখেছেন। ৫) গভীরতা আছে। অর্থাৎ পাঠকের চিন্তার খোরাক প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। ৬) সংযম আছে। সংযম কবিদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, এক দুরূহ তপস্যার মতো। যে-সব ব্যাপার লক্ষ্য করে কবি এই ‘সিদ্ধান্ততে’ পৌঁছেছেন, সেসব ব্যাপার অনুল্লেখিত, অলিখিত। ‘সিদ্ধান্তটিই’ কবিতা। ৭ ) বহুমাত্রিক চরিত্র আছে। বহুমাত্রিক শব্দটি আমি মাল্টিডাইমেনশানাল অর্থে ব্যবহার করছি। মাত্রা বা ডাইমেনশন মানে স্বয়ংসম্পূর্ণ কিন্তু একটিমাত্র বিষয় ধরছি — যেমন প্রেম, জীবনদর্শন, সমাজনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান ইত্যাদি। ”

    ১৯৬৬ সালে লেখা উপরোক্ত বিশ্লেষণের মূল বিন্দুগুলো এই জন্যই উপস্হাপন করলুম যে বিনয় সেই সময়েই লিখছিলেন ছয় পর্বে দীর্ঘ তাঁর ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’। ১৯৯৯ সালে মারুফ হোসেনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা; কবিতাটি তিনি লিখেছেন তাঁর একাকীত্ব নিয়ে। আশা করি আলোচকরা বিনয়ের এই কবিতাটি এবং পরবর্তীকালে রচিত ‘বাল্মীকির কবিতা’ পড়ার সময়ে খেয়াল রাখবেন যে বিনয় তাঁর কবিতার ক্রাফটে কেমন ধরণের বৈশিষ্ট্য বুনে দ্যান। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’র বকুল ফুল তার ছিদ্রপথ এবং ফাঁক আর পাপড়িদের নিয়ে আরো সুস্পষ্টভাবে ফিরে এসেছে ‘বাল্মীকির কবিতা’য়। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যটিকে বিনয় মজুমদার বলেছেন সেটি হলো ‘ধর্মগ্রন্হ’ ; এই ধর্ম তাঁর ব্যক্তিগত ধর্ম, কেননা একটা আগেই পড়েছি যে ধর্ম থেকে বিনয় সাত হাত দূরে। অর্ঘ দত্ত বকসী তাঁর ‘বিনয় মজুমদার ও অঘ্রাণের অনুভূতি — বিশাল দুপুরবেলার যৌনসমীক্ষা’ নিবন্ধে বলেছেন যে “জীবন থেকে, গণিত থেকে, আত্মসমীক্ষা থেকে পাওয়া যাবতীয় দর্শনের মহাবিস্ফোরণ আছে এই কবিতাগ্রন্হে”।

    বিনয় মজুমদার যখন সীমান্ত পেরিয়ে পুর্ব পাকিস্তানে নিজের গ্রামে গিয়ে কিছুকাল ছিলেন, তখন তাঁর আচরণে গ্রামবাসীরা কোনো অস্বাভাবিকতা পাননি। বিনয় যখন শিমুলপুর গ্রামে পাকাপাকি বসবাস আরম্ভ করলেন তখনও তাঁর আচরণ থেকে অস্বাভাবিকতা বিদায় নিয়েছিল। তার কারণ পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামে এবং শিমুলপুরে তিনি ফিরে পেয়েছিলেন তাঁর কৌম-প্রতিস্ব, হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃতির সবুজ ভূখণ্ডের অঙ্গাঙ্গী। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ বিনয়ের সেই কৌম-প্রতিস্বকে উন্মুক্ত করেছে, কোনো রাখঢাককে তোয়াক্কা করেনি।

    ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বেরিয়ে কলকাতা মহানগরের জটিল ও সর্পিল পথসমষ্টির বিভ্রান্তিকর রাস্তা, পথ, গলির এবং সেখানকার মানুষদের ভুলভুলাইয়ায় তাঁর কৌম-প্রতিস্ব আবছা হয়ে উঠছিল ক্রমশ। তা থেকে মুক্তি পাবার জন্যই হয়তো তিনি পূর্ব পাকিস্তানে নিজেদের ছেড়ে আসা গ্রামে চলে গিয়েছিলেন। কলকাতা মহানগরে তিনি আক্রান্ত হচ্ছিলেন পারস্পরিক দূরত্বের অসম্বদ্ধতায়, অপসৃতির বোধে। শিমুলপুরে পৌঁছে তিনি স্রষ্টাকে খুঁজে পেলেন, যা একযোগে তাঁর ভেতরে এবং বাইরে বিদ্যমান। ‘অউম’ পত্রিকার জন্য দেয়া সাক্ষাৎকারে ১৪১৩ বঙ্গাব্দে তিনি বললেন, “শরীরই অন্তর আর অন্তরই শরীর — এই অনাদি একের থেকে সৃষ্টি হয়েছিল এ বিশ্বের সবকিছু। অত্রি তারা আমাকে বলেছিল, শরীরই অন্তর আর অন্তরই শরীর। আমারও তাই মত। বেঁচে থাকতে হলে এই একটি বাক্যাংশই মনে রাখতে হবে। আর কোনও মন্ত্র নেই। ” ‘ফিরে এসো, চাকা, ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’, ‘বাল্মীকির কবিতা’ ও পরের দিনপঞ্জিমূলক সাব-জনারের কাব্যগ্রন্হগুলোতে আমরা বিনয়ের এই বার্তাটিকেই প্রতিটি পংক্তিতে প্রবহমান দেখি।

    ষোলো

    বিনয় মজুমদার কয়টি নাটক লিখেছিলেন জানি না। ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে একটি নাটক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, ১৯৯৫ সালে লেখা। নাটকটির নাম ‘আপনারা হাসুন’। বইটি ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল, যে বছর উনি মারা যান। তার মানে আর কোনো নাটক সম্ভবত উনি লেখেননি।

    রচনাটিকে আমি নাটক বলছি কেননা বিনয় মজুমদার একটি মঞ্চ কল্পনা করেছেন। আসল যে ব্যাপারটি তিনি ঘটিয়েছেন তা হল মঞ্চের মাঝখানে নাটকের প্রমটারকে একটি চেয়ারে বসিয়ে রেখেছেন, যার হাতে একটি গ্রন্হ, যখন কিনা প্রমটার উইংসের আড়ালে থাকেন এবং অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যাতে সংলাপ ভুলে না যান তাই আড়াল থেকে সংলাপ প্রমট করেন, দর্শকরা তাঁকে কখনও দেখতে পান না। ওই চেয়ারটি ছাড়া মঞ্চে আর কোনো আসবাব নেই। শাড়ি-ব্লাউজ পরা নামহীন তিনজন সুন্দরী নারী আছেন মঞ্চে যাদের কোনো সংলাপ নেই। বিনয় হয়তো বলতে চেয়েছেন, নারীদের প্রমট করার প্রয়োজন হয় না এবং তাঁরা অযথা সংলাপ খরচ না করে ঘটনাবলীর প্রতি নজর রাখেন। প্রমটারও নামহীন।

    তিনজন পুরুষ আছেন মঞ্চে, এবং তারা প্রমটার যে সংলাপ বলে তার পুনরুক্তি করে। প্রমটার মাঝে-মাঝে সেই চরিত্রগুলোর নাম নিয়ে আদেশ করে, অমুক এবার তুমি বলো, অথবা তমুক এবার তুমি বলো, ইত্যাদি। পুরুষ চরিত্রগুলোর নাম হলো :

    ১ ) পিঙ্গুহুয়া : পাজামা পরা অভিনেতার বাংলা নাম কাহালি।

    ২ ) টিরিনচাগা : প্যান্ট পরা অভিনেতার বাংলা নাম বুদ্ধ।

    ৩ ) গেঞ্জি পরা অভিনেতার বাংলা নাম দীপক।

    চরিত্রগুলোর নামকরণে গণিতের খেলা আছে কিনা তা ডিকোড করা দুরূহ। বিনয় মজুমদার মূলত একজন কবি ও গণিতজ্ঞ, তাই নাটকটির বাস্তবতাকে পাশে সরিয়ে তাকে মেটাফর হিসাবে ব্যাখ্যা করার প্রলোভন হয়। সংলাপগুলোতেও রহস্য বুনেছেন বিনয় কিন্তু তার মাধ্যমে চরিত্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। ফলে মঞ্চটাকে মনে হয় সমাজের একটি সামগ্রিক মানসিক স্হিতি। চরিত্রগুলো মঞ্চের কারাগারে আটক, তারা প্রমটারের সংলাপ আউড়িয়ে জীবনযাপন করতে বাধ্য। তারা নিজের মনের কথা বলার স্বাধীনতা পায়নি। অতএব মঞ্চটি অথবা এই জগতসংসারটিকে একটি আবদ্ধ জায়গায় আটক থাকার গারদ বলে অনুমান করা যায়। কিন্তু প্রমটার লোকটি তার কাজের মাধ্যমে চরিত্রগুলোকে নিয়ে একটি ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে অসমর্থ।

    নাটকটির সংলাপের পুনরুক্তির পর পুনরক্তি থেকে আঁচ করা যায় যে, বিনয় মজুমদার একটি বাধ্যবাধকতার ও সীমাবদ্ধতার দমবন্ধকর পরিসরকে আগাম অনুমান করতে পেরেছিলেন, যাকে নিয়ন্ত্রণ করছে অন্ধকার ও ক্ষতিকর ক্ষমতাগুলো। সেই নিমিত্তবাদকে গড়ে তুলেছে একটি নিষ্ঠুরতা যার মুখোমুখি হতে মানবসমাজ বাধ্য। এখানে উল্লেখ্য যে বিনয় মজুমদার যখন এই নাটকটি লেখেন তখন বামপন্হী ভাবধারায় প্রভাবিত গ্রুপ থিয়েটারগুলোর রমরমা চলছে। তাছাড়া বিনয়ের নিবন্ধগুলোয় ‘নবান্ন’, ‘ছেঁড়া তার’, ‘উলুখাগড়া’ ইত্যাদি নাটকের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। সাক্ষাৎকার গ্রহনকারীরাও তাঁকে নাটক বা গ্রুপ থিয়েটার সম্পর্কে প্রশ্ন করেননি। হয়তো তাঁরা জানতেন না যে বিনয় ১৯৯৫ সালে একটি নাটকও লিখেছেন।

    বিনয় তাঁর নাটকটির মাধ্যমে সে-সময়ের নাটক-সংস্কৃতিকে তুলোধনা করেছেন। গ্রুপ থেয়েটার তখন ক্রমশ জীবাশ্ম হয়ে উঠছিল, জীবনের বুনিয়াদি প্রশ্নাবলী থেকে সরে গিয়ে র‌্যালি ও র‌্যালায় মজে যাচ্ছিল, দারিদ্র্যকে গৌরবান্বিত করা আরম্ভ করেছিল, যাকে বলা যায় এক ধরণের বামপন্হী এলিটিজম, নানা জারগণের ধুমধাড়াক্কা। থিয়েটার ক্রমশ হয়ে পড়ছিল লিখিত নাটকের চাকর। বিনয় তাই প্রমটারটিকে নিয়ে এলেন চাকরের ভূমিকায় যে আবার একই সঙ্গে প্রভূত্ব করে। প্রমটার খোলাখুলি দেখিয়ে দিচ্ছে যে যেগুলোকে নাটকের মাস্টারপিস মনে করা হয়, গ্রুপ থিয়েটারের সেই সব ভাষাপ্রবৃত্তির কোনো স্হান আর বাঙালিসমাজে নেই। তারা বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অক্ষম। তারা কেবল ব্যক্তি-বিশেষেরর মামুলি সমস্যাকে মানসিক সমস্যা বলে উপস্হাপন করতে চেয়েছে।

    মানসিক সমস্যা বলতে যে ঠিক কী বোঝায় তা বিনয় মজুমদারের চেয়ে ভালো আর কেউ জানতেন না বাংলা সাহিত্যের জগতে।

    ১৯৯৮ সালে বিনয় মজুমদারের চল্লিশটি ন্যারেটিভ’ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বিনয় মজুমদারের ছোটগল্প’। ছোটগল্পের সংজ্ঞা অনুযায়ী এগুলো ছোটোগল্প নয়, কোনো গদ্যেই সেই হুইপক্র্যাক এনডিং এবং ব্যক্তি-এককের সমস্যা নেই। ন্যারেটিভগুলো শিমুলপুরে বিভিন্ন গ্রামবাসীর সঙ্গে বিনয়ের কথোপকথন, বিনয়ের দিনপঞ্জিমূলক কবিতাগুলো গদ্যে রূপান্তরিত। এগুলোকে বলা যায় ‘গল্পহীন গল্প’। বাংলা ভাষায় গল্পহীন গল্প বিনয়ই সম্ভবত প্রথম লিখেছেন।

    বড়ো ও ছোটো আইডিয়াগুলোকে বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে উপস্হাপন করেছেন বিনয় ; ঠাকুরনগরের মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন সেই আইডিয়াগুলোকে। চল্লিশটি গদ্যকে যদি ঘটনা অনুযায়ী জুড়ে একটি দীর্ঘ গদ্য তৈরি করা হয়, তাহলে বিনয়ের সেই সময়ের জীবনযাপন ও গ্রামবাসীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে একটি ন্যারেটিভ গড়ে উঠবে ; সেগুলোকে বলা যায় গল্প সম্পর্কে গল্প। গদ্যগুলো দিয়ে ন্যারেটিভের নদী তৈরি করেছেন বিনয়, প্রতিটি গদ্য পৃথকভাবে তার শাখানদী। আর প্রতিটি শাখানদী তার সংলাপপ্রবাহে লুকিয়ে রেখেছে একটি বার্তা। গদ্যগুলো জুড়ে একটা দীর্ঘ পাঠবস্তু তৈরি করলেও তা মেটাফিকশান হবে না।

    গদ্যগুলো গতানুগতিক গল্পের মতন ফরমুলাচালিত নয়। ফরমুলানির্ভর গল্প ক্রমশ একটি সমস্যা উপস্হাপন করে এবং শেষে গিয়ে তার সমাধান ঘটে। বিনয়, যিনি একজন গণিতবিদ, তিনি প্রতিটি গদ্যে ওই ফরমুলাতেই অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে দিলেন। ফরমুলা-নির্ভর গল্প রচিত হয় বাজারের কথা ভেবে এবং সেটি একটি মার্কেটেবল প্রডাক্ট — বাস্তব হোক বা কাল্পনিক। চিরাচরিত কাহিনি-প্রণালীকে চ্যালেঞ্জ করলেন প্রণালীহিনতার দ্বারা।

    প্রথানুগত গল্পের মতন কোনো বাঁধাধরা আরম্ভ ঘটান না, সংলাপ দিয়ে আরম্ভ করেন, এবং পাঠককে তিনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা পাঠক সেই সংলাপগুলোকে অনুসরন করার পর টের পায় ; বহুক্ষেত্রে তিনি পাঠককে কোথাও নিয়ে গিয়ে মাঝপথে ছেড়ে দেন, যাতে বাকি পথটা পাঠক নিজেই নির্ণয় নিয়ে এগোতে পারে। তাতে কিন্তু ফরমুলা গল্পের নাটক জোড়েন না বিনয়। সংলাপের আঙ্গিকটি অনেক সময়ে এমনভাবে উপস্হাপিত হয় যে বোঝা যায় বিনয় নিজেই বিরুদ্ধ-যুক্তি-প্রদর্শক কিংবা মূল প্রতর্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন, যাতে যাঁর সঙ্গে বিনয় কথা বলছেন তাঁকে ছোটো করা না হয়। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় যাকে বলতেন ‘না-গল্প’, বিনয়ের ন্যারেটিভগুলো তা নয়, অর্ক দত্ত বকসী যাকে বলছেন ‘প্রগল্প’, তাও নয়, এবং অর্ক চট্টোপাধ্যায় যাকে বলেছেন ‘গল্পনা’ তাও নয়। বিনয়ের গল্পগুলোর উপসংহার এবং ক্যাথারসিস ঘটে কাহিনিটি ফুরিয়ে যাবার পর অন্য কোথাও।

    ঠাকুরনগরের একজন বা কয়েকজনের সঙ্গে কোনো একটি বিষয়ে আলোচনা আরম্ভ করেন বিনয়, এবং তা বিনয় নামেই করেন। সেই আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে যুক্তি, শ্লেষ, বিদ্রূপ, ব্যাজস্তুতি, হাস্যরস, বৈজ্ঞানিক-তর্ক, সরল গণিত, ব্যঙ্গ, আমোদ, ঠাট্টা, কৌতুক, গভীর জ্ঞান, প্ররোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে শ্রোতার মনে শেষ পর্যন্ত প্রত্যয় উৎপাদন করেন তিনি। কিছু-কিছু ক্ষেত্রে সমাজের বিরুদ্ধে আক্রমণ আছে, এবং সেগুলো এমনভাবে উপস্হাপন করেছেন তিনি যেন ব্যাপারগুলো স্বাভাবিক। কোনো-কোনো প্রতর্ক তাঁর কবিতাতেও আছে। প্রায় প্রতিদিন সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিতর্কিত বিষয়ের আলোচনা করে বিনয় মজুমদার, যাঁকে গ্রামের মানুষ জানে একজন বিখ্যাত কবি হিসাবে, পারস্পরিক হায়ারারকি ভেঙে ফেলেছেন।

    ‘মনা আজ এসেছিল আমার কাছে…’ গল্পটিতে তিনি মনে নামের ছেলেটিকে বলছেন, “দ্যাখো, আমিই চাঁদ নিয়ে কবিতা লিখেছি, ‘চাঁদের গুহার দিকে নির্নিমেষ চেয়ে থাকি…’, যা তাঁর ‘বাল্মীকির কবিতা”র লাইন, এবং কথা প্রসঙ্গে পাঠককে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে তাঁর কাছে বইটির গুরুত্ব আছে। গল্পটিতে তিনি গণিতবিদ ও ইঞ্জিয়ার লেওনার্দো দা ভিঞ্চির সঙ্গে নিজের তুলনা করেছেন, লেওনার্দোর মতন তাঁরও অবিবাহিত থাকার প্রসঙ্গে এনেছেন, ‘মোনালিসা’ আঁকার কথা তুলেছেন, বলেছেন যে লেওনার্দোর মতন তিনিও ছবি এঁকেছেন সাহিত্যচর্চা করেছেন, কিন্তু একবারও গায়ত্রী প্রসঙ্গ আসেনি।

    ‘পরোপকারী’ গল্পে বিনয় হোটেল মালিক মিত্র মশায়কে বোঝাচ্ছেন যে তিনি মুর্গির মাংস, পাঁঠার মাংস খাওয়াচ্ছেন খদ্দেরদের। মানুষেরা পাঁঠা পোষে, খাইয়ে দাইয়ে মোটা করে, তারপর তাকে কেটে খায়। কারণ মানুষ পাঁঠার চেয়ে অনেক উঁচুস্তরের জীব। তিনি প্রস্তাব দেন যে মিত্র মশায় সেই তর্কে যদি মানুষের মাংস কেটে খদ্দেরদের খাওয়ান তাহলে একজন মানুষের মাংস খেয়ে আরেকজন মানুষ দেবতার পর্যায়ে উন্নীত হবে। মিত্র মশায় বলেন বুঝেছি। বিনয় জানান যে কলকাতায় তিনি নিজের চোখে দেখেছেন যে মানুষের মাংস খাচ্ছে মানুষ, একবার নয়, অনেকবার।

    ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ নামের পাঠবস্তুটিতে খাদ্যবস্তু থেকে মানুষের দেহে মাংস তৈরি হবার কথা আরেকবার এসেছে। মিষ্টি বিক্রেতা মুকুন্দ বণিকের সঙ্গে বিনয়ের কথাবার্তা হয়। মুকুন্দ বণিক প্রতিদিন মানুষকে মিষ্টি বিক্রি করে তাদের দেহে মাংস তৈরি করে দিচ্ছেন। তেমনই চাষিরাও মানুষের দেহে মাংস তৈরি করে। বিনয়ও বছরে আড়াই হাজার ডাব বেচে অন্তত আড়াইটে ডাবের সমান রক্ত তৈরি করে দেন মানুষের শরীরে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কিছুই করেন না, কেবল মুখে-মুখে গল্প মেরে বেড়ান। মুকুন্দ বণিককে বিনয় জানান যে সেই জন্যই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ে অনেক উপরে। মুকুন্দ বণিক তর্কে বিশ্বাস করেন এবং বলেন যে যত মন্ত্রী আছে, বিধানসভায় সদস্য আছে, রাজ্যপাল তাঁরা মুকুন্দ বণিকের নীচেই। এই একই বিষয় ফিরে এসেছে ‘আমার চাষিভাইরা’ গদ্যে, যখন বিনয় দ্যাখেন যে রেলস্টেশনে মাইক বসিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে স্হানীয় নেতা গোবিন্দ দেব। বিনয় মজুমদার সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন দেখে তাঁকেও বক্তৃতা দিতে বলা হয়, চাষিদের ধানের দাম, পাটের দাম বাড়ানোর জন্য। বিনয় একটি দীর্ঘ বক্তৃতা দেন এবং জানান যে চাষিদের ফসল খেয়েই মানুষের দেহে বছর-বছর রক্তমাংস হয়, চাষিরা ভালো-লোক খারাপ-লোকের পার্থক্য করেন না, তাঁদের ফসল সকলেই খায়, সেকারণে ধানের আর পাটের দাম বাড়ানো জরুরি।

    শেষ গদ্যটিতে যুগপৎ অনেককে ঠোনা মরেছেন বিনয় মজুমদার। গদ্যটির শিরোনাম ‘সম্রাট ষষ্ঠ জর্জ’। গদ্যটিতে বিনয় একজন সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর নির্দেশেই নানা ঘটনা ঘটে। ভারতের লোকে স্বাধীনতা চাইছে এবং ষষ্ঠ জর্জ পরামর্শ চাইছেন মেরির কাছে। উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মতিলাল নেহরু, করমচন্দ গান্ধিকে এক এক করে পেশ করা হলো সম্রাটের সামনে। তাঁরা তিনজনেই জানালেন এ হলো বিনয়দার লীলাখেলা, স্বাধীনতা দিতে হবেই। মনস্ত্বত্ববিদরা সম্রাটকে জানালো যে এই ভারতীয়দের পরীক্ষা করে জানা গেছে যে তারা মনোরোগী। সম্রাটের অমাত্য নিলসন জানতে চাইল, এদের চিকিৎসা কোথায় করা হবে, লণ্ডনে না অন্যত্র ? সম্রাট আদেশ দিলেন, এই তিন যুবকের মনোরোগের চিকিৎসা করা হোক ভারতে — কলকাতায় মেডিকাল কলেজের এজরা ওয়ার্ডে।

    বিনয় মজুমদারের ‘ছোটোগল্প’ নামের এই পাঠবস্তুগুলোকে বিদ্যায়তনিক ডিসকোর্সের বাইরে ঠেলে দেয়া হয়েছে অথচ মর্মার্থ ও সংলাপের এরকম বুননশৈলী আর কারো গদ্যে দেখা যায় না। সাধারণ মানুষ ও তাদের সংলাপ ব্যবহার করে বিনয় নির্মাণ করেছেন একটি দার্শনিক ভঙ্গী অথবা অভিগমন। গ্রামে জীবনযাপনের দরুন তিনি জানেন যে মানুষের জীবনে ভাষা একটি প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, তা একজনের সঙ্গে আরেকজনের সহজ যোগাযোগের মাধ্যম, তা বাস্তবতাকে পালটে দিতে পারে, অভিজ্ঞতাকে আদল দিতে পারে। সংলাপ তখনই নিজস্ব হয়ে ওঠে যখন বক্তার মস্তিষ্কে সেই সংলাপের উদ্দেশ্য গাঁধা হয়ে যায়। সাধারণ মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলার সময়ে বিনয় খেয়াল রেখেছেন যে গাম্ভীর্যের ভেতরে লুকোনো হাসাহাসি বুদ্ধির খেলাকে পরস্পরের মধ্যে জীবন্ত করে তোলে।

    [ রচনাকাল জানুয়ারি – মার্চ ২০১৭ ]


     

     

     

     


     

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৪ আগস্ট ২০২১ ১৮:২৩734823
  • শার্ল বোদলেয়ার : নকল স্বর্গ - হ্যাশিসের কবিতা


     

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    প্রথম অধ্যায়

    অমেয়তার সাধ

    নিজেদের কেমন করে নিরীক্ষা করতে হয় তা যাঁরা জানেন, এবং যাঁরা তাঁদের প্রতীতির স্মৃতিকে সংরক্ষণ করেন, যাঁরা, হফম্যানের মতন, আধ্যাত্মিক পরিমাপযন্ত্রকে তৈরি করতে জানেন, অনেক সময়ে মনের রসায়ানাগারে লক্ষ্য করে থাকবেন বিভিন্ন ঋতু, আনন্দের দিন, মনোরম মুহূর্তদের। এমন দিনও হয় যখন একজন লোক অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে যৌবনে জেগে ওঠে। যদিও তার চোখের পাতা তন্দ্রার আচ্ছন্নতা থেকে তখনও মুক্তি দেয়নি তাকে, বাইরের জগত তার কাছে প্রতিভাত হয় এক শক্তিময় উপশম হিসাবে, বহিরায়বের এক স্বচ্ছতা নিয়ে, আর রঙের এমনই এক বৈভব সৃষ্ট করে যা তারিফযোগ্য। নৈতিক জগত মেলে ধরে তার বিশাল পরিপপ্রেক্ষণ, নতুন নির্মলতায় পরিপূর্ণ।


     

    একজন লোক, এই আনন্দে লব্ধকাম, দুর্ভাগ্যবশত বিরল আর সাময়িক, নিজেকে তখনই একজন বড়ো শিল্পী আর বড়ো মানুষ হিসাবে অনুভব করতে থাকে ; যদি এই সবকিছু একটি অভিব্যক্তি প্রয়োগ করে বলতে হয়, তাহলে তখন সে একজন মহৎ সত্তা। কিন্তু আত্মা ও ইন্দ্রিয়ের এই ব্যতিক্রমী অবস্হার একমাত্র ব্যাপার হল -- আমি বাড়িয়ে না বলেও তাকে বলব স্বর্গীয়, যদি তাকে আমি প্রতিদিনের ফালতু যাপনের ভারি ছায়ার সঙ্গে তুলনা করি-- তাহলে বলব যে তা কোনো দৃশ্যমান ও সহজে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে এমন কোনো সৃষ্টি নয়। তাহলে তা কি সুস্বাস্হ্য এবং বিবেচক জীবনযাত্রার ফলাফল ? প্রথম ব্যাখ্যায় সেরকমটাই মনে হবে ; কিন্তু আমরা মেনে নিতে বাধ্য যে প্রায়ই এই অলৌকিক বিস্ময় ও নিরাময়কারী দানব, সহজ কথায়, নিজেকে এমনভাবে প্রক্রিয়াকরণ করে যেন তা এক উচ্চতর এবং অদৃশ্য ক্ষমতা, যে ক্ষমতা মানুষের বাইরের, তার দৈহিক ক্রিয়াকর্মকে বেশ কিছুকাল যাবত অপব্যবহারের পর ঘটে। আমরা কি বলব যে এটা একনিষ্ঠ প্রার্থনা এবং আধ্যাত্মিক আকুলতার পুরস্কার ? এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আকাঙ্খার অবিরাম অধিরোহ, স্বর্গাভিমুখী আধ্যাত্মিক পরাক্রমের বিততি, নৈতিক স্বাস্হ্য গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে সঠিক বিধিনিয়ম, যা অতীব উজ্বল এবং অতীব মহিমান্বিত। কিন্তু কোনো এক কিম্ভুত বিধান একে প্রতিভাত করার কারণ হয়ে ওঠে ( যেমন অনেকসময়ে করে ) কল্পনার লজ্জাকর বেলেল্লাপনার পর ; যুক্তিবোধের কুতর্কমূলক অপব্যবহারের পর, যা কিনা, তার সরাসরি ও বিচক্ষণ প্রয়োগে, অনেকটা তুলনীয় বুদ্ধিমান জিমনাস্টিকসের সঙ্গে রাস্তার দড়াবাজিকরদের স্বশিক্ষিত বোকা-বানানো অঙ্গ-ভাঙনের মতন ? এই কারণে আত্মার এরকম অস্বাভাবিক অবস্হাকে আমি সত্যকার মাধুর্য বলে মনে করব ; একটি ম্যাজিক আয়না যাতে মানুষকে আহ্বান করা হয় নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর দেখার জন্য ; অর্থাৎ, যা তার দেখা দরকার, আর যা প্রকৃতপক্ষে হয়তো সে-ই ; এক ধরণের দেবদূতীয় উত্তেজনা ; সবচেয়ে চাটুকার ধরণের একরকম পুনর্বাসন। একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক গোষ্ঠী, যাদের প্রতিনিধিরা ইংল্যাণ্ড ও আমেরিকায় থাকেন, তাঁরা মনে করেন অতিপ্রাকৃত ঘটনা, যেমন ধরা যাক অশরীরীদের প্রেত, ভুত ইত্যাদি হলো ঐশ্বরিক ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ, সদাসর্বদা মানুষের আত্মায় প্রচ্ছন্ন সত্যের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলার উদ্বেগ।


     

    এই একক ও চমৎকার স্হিতিতে যাবতীয় ওজস্বীতা ভারসাম্য বজায় রাখে ; যেখানে কল্পনা, যদিও অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন, নৈতিক বোধকে বিপজ্জনক ঝুঁকিতে টেনে নিয়ে যায় না ; যখন সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতার ওপরে অসুস্হ স্নায়ুরা, যেগুলো সাধারণ অপরাধকে কিংবা বিষাদকে উসকে দ্যায়, তাকে অত্যাচার করে না ; এই অবিশ্বাস্য স্হিতি, আমি বলব, এর কোনো উন্নত লক্ষণ নেই। তা প্রেতের মতনই ধারণাতীত। বদ্ধসংস্কারের কোনো একটা প্রজাতি, তবে বিক্ষিপ্ত বদ্ধসংস্কারের; তা থেকে আমরা এই নির্ণয়ে পৌঁছোতে পারি যে আমরা সঠিক ছিলুম, অভিজাত অস্তিত্বের নিশ্চয়তা, আর আমাদের প্রতিদিনকার ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে তাকে অধিগত করার আশা আমাদের আছে। চিন্তার এই প্রখরতা, ইন্দ্রিয় এবং আত্মার এই উৎসাহ, প্রতিটি যুগে মানুষের কাছে সর্বোচ্চ আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়ে থাকবে ; আর এই কারণে, অন্য কোনো কিছু না ভেবে, যে তাৎক্ষণিক আনন্দ সে পাচ্ছে, নিজের সংবিধানের আইনকে অমান্য করার উদ্বেগে না ভুগে, সে যাচ্ঞা করেছে, ভৌতিক বিজ্ঞানে, ঔষধি-বিজ্ঞানে, সস্তা পানীয়তে, সূক্ষ্ম সুগন্ধে, প্রতিটি আবহাওয়া ও প্রতিটি কালখণ্ডে, পালিয়ে বাঁচার মাধ্যম, তা কয়েক ঘণ্টার হলেও, তার পাঁকের স্বদেশে, এবং, সমালোচক লাজারে যেমন বলেছেন, “প্রথম আক্রমণেই স্বর্গোদ্যান দখল করা” তা করার উদ্দেশ্যে। হায় ! মানুষের অসৎ চরিত্র, আতঙ্কে ঠাশা এবং তাকেই মান্যতা দিতে হয়, তার প্রমাণ আছে, এমনকি তা তাদের অসীম প্রসারণ হলেও, তার শাশ্বতের জন্য ক্ষুধা ; কেবল, এ এমনই এক স্বাদ যা পথ হারিয়ে ফ্যালে।


     

    সেই বহুল প্রচারিত রূপকের উল্লেখ করা যেতে পারে, “সব রাস্তাই রোম-এ যায়,” আর তাকে নৈতিক জগতে প্রয়োগ করা যায় : সব রাস্তাই পুরস্কার কিংবা শাস্তি-তে পৌঁছোয় ; শাশ্বতের দুটি বিন্যাস। মানুষের মন প্যাশনে কানায় কানায় ভরা : তার আছে, আমি যদি আরেকটা পরিচিত বাক্য ব্যবহার করি, জ্বলতে থাকার প্যাশন। কিন্তু এই অসুখি আত্মা, যার স্বাভাবিক দুরাচার তার আকস্মিক প্রবণতার সমান, যথেষ্ট আপাতবিরোধী, পরার্থবাদীতা এবং কঠোর গুণাবলীর জন্য, আপাতবিরোধিতায় ঠাশা, যা তার উপচে-পড়া অতিমাত্রিক প্যাশনকে অন্য উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে তাকাবার সুযোগ দ্যায়। সে কখনও আঁচ করতে পারে না যে সে নিজেকে পুরোপুরি বিক্রি করে দিচ্ছে : সে ভুলে যায়, তার প্রমত্ততায়, যে তার চেয়েও ধূর্ত এবং তার চেয়ে শক্তিশালী খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হয়েছে সে ; আর পাপের আত্মাকে এক চুল জায়গা ছাড়লে পুরো মাথাটা তুলে নিয়ে যেতে মোটেই বিলম্ব করবে না। এই দৃশ্যমান মালিকের দৃশ্যমান প্রকৃতি -- আমি মানুষের কথা বলছি -- তাহলে, রসায়নের মাধ্যমে স্বর্গোদ্যান গড়তে চেয়েছে, গ্যাঁজানো পানীয়ের মাধ্যমে ; সেই ক্ষিপ্ত লোকটার মতন যে নিরেট আসবাব আর আসল বাগানকে ফ্রেমে বাঁধানো ক্যানভাসের ওপর আঁকা পেইনটিঙ দিয়ে প্রতিস্হাপন করতে চায়। শাশ্বত সম্পর্কিত সংবেদনের এই অধঃপতনে আছে, আমার মতে, কলুষিত মাত্রাধিক্যের কারণ ; সাহিত্যিকের নিঃসঙ্গ এবং নিবিষ্ট মাতলামি থেকে, যে শারীরিক যন্ত্রণার উপশমের জন্য আফিমে বেদনানাশকের সন্ধান করে, আর এই ভাবে অস্বাস্হ্যকর আহ্লাদের কুয়ো আবিষ্কার করে, একটু একটু করে তাকে বানিয়ে ফ্যালে তার একমাত্র আহার, আর তা হয়ে ওঠে তার আত্মিক জীবনের সমষ্টি ; শহরতলির সবচেয়ে ন্যক্কারজনক নেশাখোরের পর্যায়ে নেমে, তার মস্তিষ্ক অর্চি এবং গরিমায় প্রদীপ্ত, রাস্তার পাঁকে হাস্যকর গড়াগড়ি খায়।


     

    আমি যাকে বলি নকল আদর্শ, তা গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে ফলপ্রদ মাদক হলো, পানীয়গুলোর কথা বাদ দিচ্ছি, যা দ্রুত স্হূল উত্তেজনাকে তাতিয়ে তোলে আর যাবতীয় আত্মিক শৌর্যকে, সুগন্ধকে, চাপা দিয়ে দ্যায়, যার অত্যধিক সেবন, সবচেয়ে নিগূঢ় মানুষের কল্পনাকে প্রতিদান দিলেও, তার দৈহিক ক্ষমতাকে ক্রমশ ক্ষইয়ে দ্যায় ; দুটি প্রবলভাবে সক্রিয় মাদক, সবচেয়ে সুবিধাজনক আর সবচেয়ে কুশলী, হলো চরস আর আফিম। এই মাদকগুলো যে রহস্যময় প্রতিক্রিয়া এবং অস্বাস্হ্যকর আনন্দ সৃষ্টি করে, বহুকাল যাবত তার সেবনের ফলাফল থেকে যে অবশ্যম্ভাবী শাস্তি হয়, আর সর্বোপরি এই নকল আদর্শকে পাওয়ার সন্ধানে যে অমরত্বের জরুরি ব্যবহার হয়, সেই বিষয়ে অধ্যয়ন করাই এই রচনার উদ্দেশ্য।


     

    আফিমের বিষয়ে আগেই আলোচনা করা হয়েছে, আর তা একই সঙ্গে এমন চমকপ্রদ, বৈজ্ঞানিক আর কাব্যিকভাবে যে, আমি নতুন করে আর কিছু যোগ করতে চাই না। আমি অতএব আরেকটি বিষয়ে অধ্যয়ন করে নিজেকে সন্তুষ্ট করতে পারব, সেই সঙ্গে অতুলনীয় এই বইটির বিশ্লেষণ করব যা পুরোপুরি ফরাসি ভাষায় অনুদিত হয়নি। তার লেখক, একজন সুপ্রসিদ্ধ মানুষ, যাঁর কল্পনার ক্ষমতা অসাধারণ এবং সূক্ষ্ম, বর্তমানে অবসর নিয়েছেন এবং মৌন অবলম্বন করেছেন, বিয়োগান্তক অমায়িকতার সাহসে একদা আফিমে তিনি যে আহ্লাদ ও পীড়ন সহ্য করেছেন তা লিখে গেছেন, আর তাঁর বইয়ের সবচেয়ে নাটকীয় অংশ হলো যেখানে তিনি ইচ্ছাশক্তির অতিমানবিক প্রয়াসের কথা বলছেন, যা তাঁর মনে হয়েছিল জরুরি, যাতে তিনি অবিচক্ষণতায় করে ফেলা অধঃপতনের পথ থেকে নিস্তার পান।


     

    আজকে আমি কেবল চরসের কথা বলব, আর আমি সেকথা বলব একাধিক অনুসন্ধান আর পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যাদির পর ; বুদ্ধিমান মানুষদের টীকা কিংবা গুপ্তকথা থেকে পাওয়া সারাংশ থেকে, যাঁরা বহুকাল এই মাদকে নেশা করতেন ; আমি কেবল এই সমস্ত বিভিন্ন তথ্যাদি একত্রিত করব এক ধরনের প্রকরণে, একটি বিশেষ আত্মাকে বেছে নিয়ে, আর যাঁকে ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞায়িত করা সহজ, এই প্রকৃতির অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার পক্ষে যিনি উপযুক্ত।

    দ্বিতীয় অধ্যায়

    চরস কাকে বলে ?

    মার্কো পোলোর গল্পগুলো, যা নিয়ে অবিবেচকের মতন হাসাহাসি হয়েছে, যেমনটা হয়েছে অন্যান্য পর্যটকদের ক্ষেত্রে, সেগুলো বৈজ্ঞানিকরা যাচাই করেছেন, আমাদের বিশ্বাস দাবি করে। আমি ওনার গল্পগুলো এখানে আরেকবার বলছি না যে কেমন করে, হ্যাশিসে নেশাগ্রস্ত হয়ে ( যা থেকে “অ্যাসাসিন” শব্দের উৎপত্তি ), পর্বতনিবাসী একজন বৃদ্ধ তাঁর আমোদ-প্রমোদে উচ্ছসিত বাগানে কয়েদ করে রাখতেন যুবক শিষ্যদের, যাদের তিনি নিষ্ক্রিয় ও চিন্তাহীন আনুগত্যের পুরস্কার হিসাবে স্বর্গোদ্যানের ধারণা দিতে চাইতেন। পাঠক ভন হ্যামার-পার্গস্টলের লেখা ‘দি সিকরেট সোসায়টি অফ হ্যাশিসিনস’ বইটি এবং ‘মেমরিজ দ্য লাকাদেমি দেস ইনসক্রিপশানস এত বেলে-লরত্রস” বইটির ষোড়শ খণ্ডে মসিয়ঁ সিলভেসত্রে দ্য সাসির টীকা পড়ে দেখতে পারেন ; আর “অ্যাসাসিন” শব্দের ব্যুৎপত্তিরl বাষ্প ওড়ে তা তাদের মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে তুলতো। যারা ফসল কাটে তাদের মাথা ঘুর্ণিতে ভরে ওঠে, অনেক সময়ে তারা ভাবাবেশে আচ্ছন্ন হয় ; কখনও বা তাদের অঙ্গ সাময়িক দুর্বল হয়ে পড়ে আর কাজ করতে চায় না।

    আমরা রুশদেশের চাষিদের মধ্যে প্রায়শই স্বপ্নচারিতার সঙ্কটের কথা শুনেছি, যার কারণ, ওদের মতে, খাবার রান্নায় গাঁজাবীজের তেলের ব্যবহার। কেই বা মুর্গিদের অস্বাভাবিক আচরণের কথা জানে না যে মুর্গিগুলো গাঁজাবীজ খেয়েছে, আর সেইসব ঘোড়াদের বুনো উৎসাহের কথা, যেগুলোকে চাষিরা, বিয়ে উপলক্ষে আর পৃষ্ঠপোষক সন্তদের ভুরিভোজের উৎসবে, খানাখন্দে-ভরা মাঠে ঘোড়দৌড়ের জন্য যৎসামান্য গাঁজাবীজ খাওয়ায় না, অনেকসময়ে মদের সঙ্গে মিশিয়ে ? যাই হোক, ফরাসি গাঁজা চরস তৈরির জন্য উপযুক্ত নয়, অন্তত, বারংবার নিরীক্ষার পর দেখা গেছে, সেই মাদকের ক্ষমতা চরসের সমান নয়। চরস, বা ভারতীয় গাঁজা ( ক্যানাবিস ইনডিকা ), উরটিকেশিয়া পরিবারের গাছ, দেখতে হুবহু আমাদের অক্ষাংশে যেমন গজায় তেমনই, ব্যতিক্রম হল যে ততো উঁচু হয় না। তাতে নেশা ধরার অসাধারণ উপাদান আছে, যার দরুণ ফরাসিদেশের আর পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের আকর্ষণ করতে পেরেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে তা কম-বেশি উঁচুদরের বলেই গণ্য করা হয় : আসলে ইউরোপীয়দের কাছে বঙ্গদেশের গাঁজা সবচেয়ে দামি ; যদিও, মিশরের, কন্সটান্টিনোপলের, পারস্যের এবং আলজিরিয়ার গাঁজার উপাদানও এক, তবে এগুলো নিকৃষ্ট স্তরের।


     

    হ্যাশিস বা চরস ( কিংবা পাতাঘাস ; অর্থাৎ, সর্বোচ্চ স্তরের পাতাঘাস, যেন আরব দেশের লোকেরা একটি মাত্র শব্দ দিয়ে একে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছে, পাতাঘাস হলো পার্থিব আনন্দের উৎস ) বিভিন্ন নামে চেনা যায়, যে সমস্ত দেশে তার ফসল সংগ্রহ করা হয়, তার মিশ্রণের উপাদান আর তৈরির কায়দা অনুযায়ী : ভারতে ‘ভাঙ’ ; আফ্রিকায় ‘তেরিয়াকি’ ; আলজেরিয়া এবং আরাবিয়া ফেলিক্সে ‘মাদজৌন্দ’, ইত্যাদি। বছরের কোন ঋতুতে তা সংগ্রহ করা হচ্ছে তা অনেকটা পার্থক্য ঘটায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা থাকে যখন তা ফুলের অবস্হায়। বিভিন্ন প্রস্তুতি-মিশ্রণে ফুলটা কেমন করে প্রয়োগ করা হচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ, আর সে-বিষয়েই আমরা আলোচনা করব। চরসের পাতার নিষ্কাশন, যেভাবে আরবরা তৈরি করে, তা হলো তাজা গাছের চুড়োকে মাখনে ফোটানো, সামান্য জল মিশিয়ে। বাষ্পীকরণের ফলে শুকিয়ে এলে, তাকে ছেঁকে নেয়া হয়, যে অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায় তাকে দেখতে পমেটমের মতন, সবুজ-হলুদ রঙের, আর যাতে পাওয়া যাবে চরস আর বিস্বাদ মাখনের অনুপভোগ্য গন্ধ। এ থেকে তৈরি করা হয় দুই থেকে চার গ্রাম ওজনের ছোটো-ছোটো গুলি, কিন্তু বিটকেল গন্ধের দরুণ, যা সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে, আরবরা এক একটা গুলি এক একটা মিষ্টান্নর ভেতরে পুরে রাখে। সচরাচর যে মিষ্টান্নে পোরা হয় তার নাম ‘দাওয়ামেস্ক’, তা হলো চরস, চিনি, আর বিভিন্ন সুগ্ধের মিশ্রণ, যেমন ভ্যানিলা, দালচিনি, পেস্তাবাদাম, কাগজিবাদাম, কস্তুরী। অনেক সময়ে একটু ক্যানথারাইড মেশানো হয়, যার সঙ্গে সাধারণ চরসের প্রতিক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এই নতুন চেহারায় চরসের আর কোনো বদগন্ধ থাকে না, আর পনেরো, কুড়ি, তিরিশ গ্রাম ওজনের মাদক সেবন করা যায়, পানপাতায় মুড়ে কিংবা কফিতে গুলে।


     

    স্মিথ, গ্যাস্টিনেল এবং দেকুরতিভের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চরসের সক্রিয় উপাদান আবিষ্কারে নিয়োজিত ছিল। তাদের প্রয়াস সত্বেও, চরসের রাসায়নিক মিশ্রণের উপাদান বিশেষ জানা যায়নি, কিন্তু সাধারণত মনে করা হয় যে এর মধ্যে রজন জাতীয় গঁদের উপস্হিতি হলো প্রধান উপাদান যে কেবল দশ শতাংশ থাকে। এই রজন পাবার জন্য শুকনো গাছটাকে পাউডার করে ফেলা হয়, যা বেশ কয়েকবার অ্যালকোহলে ধুয়ে নেয়া হয় ; সামান্য চোলাই আর বাষ্পীয়করণের পর দেখা হয় অবশিষ্টাংশে ঘনত্ব একইরকম কিনা ; এই অবশিষ্টাংশকে জলে ধোয়া হয়, যার ফলে চটচটে জিনিসটা বেরিয়ে যায়, আর বেঁচে থাকে কেবল বিশুদ্ধ রজন।


     

    উৎপাদিত জিনিসটা নরম, ঘন সবুজ রঙের, আর তাতে অনেকাংশে পাওয়া যায় চরসের বিশিষ্ট গন্ধ। পাঁচ, দশ, পনেরো সেন্টিগ্রাম বিস্ময়কর ফলাফল দেবার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু হ্যাশচিশাইন, যা চকোলেটের বরফির মতো কিংবা বড়ির আকারে আদার সঙ্গে মেশানো, তা ‘দাওয়ামেস্ক’ আর ‘পাতাঘাস’-এর মতন কম-বেশি কার্যকর, আর তা সম্পূর্ণ আলাদা প্রকৃতির, যে চরস নিচ্ছে তার ব্যক্তিগত পছন্দ আর স্নায়বিক গ্রাহীক্ষমতার ওপর নির্ভর করে; আর, তার থেকেও বেশি, একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ফলাফল হতে পারে। কখনও বা সে অপ্রতিরোধ্য এবং সীমাতিরিক্ত উল্লাসের অভিজ্ঞতা পাবে আবার কখনও স্বপ্নালু তন্দ্রায় আচ্ছন্ন বোধ করবে। এমনকিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা প্রায়ই ঘটে থাকে ; সর্বোপরি, সাধারণ মানসিক ধাত আর শিক্ষিত মানুষের ক্ষেত্রে। বৈভিন্নের ক্ষেত্রে এক ধরণের ঐক্য থাকে যা আমায় চরস-মাতলামির মোনোগ্রাফ সম্পাদনা করার সুযোগ দিচ্ছে, যে ব্যাপারে আমি একটু আগেই বলেছি।


     

    কন্সটানটিনোপলে, আলজেরিয়ায়, এমনকি ফরাসিদেশেও, কিছু লোক তামাকের সঙ্গে চরস মিশিয়ে ধোঁয়া ফোঁকেন, কিন্তু প্রাসঙ্গিক ব্যাপারটা ঘটে মাত্রা বজায় রেখে, আর, সেহেতু, আলস্যে। আমি সম্প্রতি একজনকে বলতে শুনেছি, চোলাই করার মাধ্যমে, চরস থেকে একটা প্রয়োজনীয় তেল বের করা হয়, যার ক্ষমতা এতাবৎ শোনা মিশ্রণগুলোর থেকে অনেক বেশি সক্রিয়, কিন্তু এই বিষয়ে আমি তেমন গভীর অধ্যয়ন করিনি বলে ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত বলতে পারছি না। একথা বলা কি বাহুল্য নয় যে চা, কফি, নানারকম মদ বেশ শক্তিশালী সহায়ক যেগুলো রহস্যময় নেশার সঙ্ঘটনকে কম বা বেশি দ্রুততর করে ?


     

    তৃতীয় অধ্যায়

    আলোকময় দেবদূতের খেলার বাগান

    কেমন হয় একজন লোকের অভিজ্ঞতা ? সে কী দেখতে পায় ? অবিশ্বাস্য জিনিসপত্র, নয় কি? বিস্ময়কর দৃশ্যাবলী ? তা কি খুবই সুন্দর ? আর অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ? আর অত্যন্ত বিপজ্জনক? চরস সম্পর্কে অনবগত লোকেরা চরসসেবিদের কৌতূহলমিশ্রিত ভয়ে এই ধরণের প্রশ্ন করেন। ব্যাপারটা, বস্তুত, জানবার শিশুসুলভ ব্যগ্রতা থেকে করা হয়, সেই সব লোকেদের মতন যারা তাদের আগুন পোয়াবার জায়গা থেকে কখনও নড়েনি তারা বহুদূরের অজানা দেশ থেকে আসা কোনো মানুষের মুখোমুখি হয়। তারা মনে করে তাদের কাছে চরসের নেশা এক অস্বাভাবিক বিস্ময়কর দেশ, হাতসাফাই ম্যাজিকের আর ভেলকি দেখাবার বিশাল নাটমঞ্চ যেখানে সবকিছুই অলৌকিক, সবকিছুই অপ্রত্যাশিত। -- তা হলো পূর্বধারণা, সম্পূর্ণ ভ্রান্তিকর। আর যেহেতু সাধারণ পাঠক এবং প্রশ্নকারীর কাছে “চরস” বা হ্যাশিস গড়ে তোলে অদ্ভুত আর ওলোট-পালোট জগতের ধারণা, আশ্চর্যময় স্বপ্নের প্রত্যাশা ( হ্যালুশিনেশান বা অমূলপ্রত্যক্ষ বললে ভালো হবে, যা ব্যাপারটা, লোকে যা ভাবে তেমন পৌনঃপুনিক নয় ), আমি এখনই দুটোর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট করে দিতে চাই, যে চরসের প্রভাব স্বপ্ন থেকে একেবারে আলাদা। স্বপ্নে আমরা যে অ্যাডভেঞ্চার যাত্রায় প্রতি রাতে যাই, তাতে রয়েছে কিছু ইতিবাচক বিস্ময়। এই অলৌকিক ব্যাপারটা নিয়মিত ঘটার দরুণ এর রহস্য ভোঁতা হয়ে গেছে। মানুষের স্বপ্ন দুই ধরণের হয়। কিছু স্বপ্ন তার প্রতিদিনের ঘটনা, তার কাজকারবার, তার ইচ্ছা, তার দোষ, সব মিলেমিশে গিয়ে মোটামুটি স্মৃতির বিশাল ক্যানভাসে দেখা দেয়। এটা স্বাভাবিক স্বপ্ন ; এক্ষেত্রে লোকটা নিজেই তাতে থাকে। কিন্তু অন্য ধরণের স্বপ্নে, যে স্বপ্ন অদ্ভুত আর অপ্রত্যাশিত, স্বপ্নদ্রষ্টার চরিত্র, জীবন, আবেগের সঙ্গে সম্পর্কহীন আর ব্যাখ্যাহীন : এই স্বপ্ন, যাকে আমি বলব এয়ারোগ্লিফিক, প্রত্যক্ষরূপে জীবনের অতিপ্রাকৃত দিকটির প্রতিনিধিত্ব করে, এবং তা উদ্ভট বলেই প্রাচীন যুগের মানুষেরা একে দৈবী বলে বিশ্বাস করতো। স্বাভাবিক কার্যকারণে ব্যাখ্যাহীন বলে, তাঁরা মনে করতেন ব্যাপারটা একজন মানুষের বাইরে থেকে ঘটে, এবং এমনকি আজকের দিনেও, দার্শনিকদের রোমান্টিক ও মূর্খ গোষ্ঠীকে বাদ দিলেও, তাঁরা এই ধরণের স্বপ্নের মধ্যে অনেক সময়ে আবিষ্কার করেন ভর্ৎসনা, অনেক সময়ে হুঁশিয়ারি ; সংক্ষেপে, এক প্রতীকি এবং নৈতিক ছবি যা ঘুমন্ত লোকটার আত্মায় বাসা বেঁধেছে। এটা এক অভিধান যার অধ্যয়ন প্রয়োজন ; এমনই এক ভাষা যার চাবিকাঠি সন্তরা যোগাড় করতে পারেন।


     

    চরসের নেশায় এরকম কিছুই নেই। আমরা সাধারণ স্বপ্নের বাইরে যাবো না। নেসাটা, যতোক্ষণ থাকে, একথা সত্য, অপরিমেয় স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়, তার জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য এই নেশার রঙবাহুল্যের আতিশয্য আর এর নিষেকের দ্রুতি। কিন্তু তা সব সময়ে ব্যক্তিটির মেজাজের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে। মানুষটা স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিল ; স্বপ্নটা লোকটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু এই সপ্ন হবে সত্যকার বাপের সন্তান। অলস লোকটা নিজের উদ্ভাবন কুশলতাকে চাপ দিয়েছে তার জীবনে আর তার চিন্তাধারায় নকল অতিপ্রাকৃতকে প্রবর্তন করার জন্য ; কিন্তু, তার অভিজ্ঞতার আকস্মিক সক্রিয়তার প্রাবল্য সত্তেও, সে সেই একই মানুষ যে এখন অতিরঞ্জিত, সেই একই সংখ্যা যাকে অত্যন্ত বেশি তেজপূঞ্জে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাকে আনা হয়েছে অধীনতায়, কিন্তু, তার পক্ষে দুঃখের ব্যাপার, সে তা নিজে আনেনি ; অর্থাৎ, তার সেই অংশের দ্বারা যা আগে থেকেই প্রভাবশালী। “সে হতে পারতো দেবদূত ; অথচ সে হয়ে গেলো পশু।” সাময়িকভাবে অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন বলা যেতো, যদি নিয়ন্ত্রণহীন ও সহনীয় সংবেদনের বাড়বাড়ন্তকে ক্ষমতার নাম দেয়া হয়।


     

    তাহলে ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝে নিক, মামুলি আর অজ্ঞ লোকেরা, যারা অসাধারণ আনন্দের সঙ্গে পরিচয়ের জন্য কৌতূহলী, যে তারা হ্যাশিস বা চরসে কোনোরকম অলৌকিক ব্যাপার পাবে না, কেবল প্রকৃতিকে তার মাত্রাধিক্য ছাড়া কিচ্ছু পাবে না। মস্তিষ্ক এবং যে জৈবদেহে চরস কাজ করে তা কেবল সাধারণ আর ব্যক্তিগত ইন্দ্রিয়-পরিমণ্ডলকে বিবর্ধিত করে তুলবে, একথা সত্যি, পরিমাণ ও গুণমান উভয় ক্ষেত্রে, কিন্তু সদাসর্বদা তাদের উৎসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে। মানুষ তার নৈতিক ও শারীরিক মেজাজের সর্বনাশ থেকে পালাতে পারে না। চরস হবে, বস্তুত, মানুষের পরিচিত ভাবনাচিন্তা ও প্রতীতির আয়না, যে আয়না বাড়িয়ে প্রতিফলন ঘটায়, অথচ আয়না ছাড়া আর কিছুই নয়।


     

    মনে করুন আপনার চোখের সামনে মাদকটা রয়েছে : একটা সবুজ রঙের মিষ্টি, প্রায় বাদামের সমান মাপের, তাতে এক অদ্ভুত গন্ধ ; এমনই অদ্ভুত যে মনোভাব বা রুচিকে বিকর্ষিত করে, বমিও পেতে পারে -- যেমন, ধরুন, কোনো সূক্ষ্ম এবং অমায়িক সুরভির ক্ষেত্রে, তাকে যদি তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং ঘনত্বে উন্নত করা হয়, তা যা ঘটাবে, তেমনই।

    প্রসঙ্গক্রমে বলার অনুমতি দিন যে প্রস্তাবটা বিপরীতও হতে পারে, এবং সবচেয়ে বিতৃষ্ণাজনক ও বিকর্ষক সুরভিও শুঁকে অপার আনন্দ পাওয়া যাবে যদি তার পরিমাণ ও ঘনত্ব কমিয়ে আনা হয়।


     

    সে-ই ! তাতে রয়েছে আনন্দ ; একটা চামচে স্বর্গ ; যাবতীয় নেশাসহ আনন্দ, তার দোষ, তার বালখিল্য। তুমি বিনা ভয়ে এটা গিলে ফেলতে পারো ; এটা মেরে ফেলবে না ; তোমার দেহের অঙ্গকে জখম করবে না। হয়তো ( পরে ) মায়াবিদ্যার ঘনঘন প্রয়োগ তোমার ইচ্ছাশক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে ; হয়তো মানুষ হিসাবে আজকে তুমি যে লোকটি তার থেকে কম-মানুষ হয়ে যাবে ; কিন্তু প্রতিশোধ তো বহু দূরের ব্যাপার, আর পরিণামস্বরূপ বিপর্যয়কে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন ! তুমি কিসের ঝুঁকি নিচ্ছ ? আগামীকাল যৎসামান্য ক্লান্তি -- তার বেশি কিছু নয়। তুমি কি প্রতিদিন কম পুরস্কারের বিনিময়ে এর চেয়ে বড়ো শাস্তির ঝুঁকি নাও না ? তাহলে খুবই ভালো ; তুমি যদি চাও যে এটা দ্রুত আর প্রগাঢ় প্রভাব ফেলুক, তাহলে এক কাপ কালো কফিতে তোমার চরসের খোরাক গুলে নাও। তুমি আগে থেকে তোমার পেট খালি রাখার সাবধানতা নিয়েছো, রাতের খাবার নয়টা বা দশটা পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছ, যাতে বিষটা সক্রিয় হবার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পায়। বড়ো জোর ঘণ্টাখানেক পরে একটু সুপ খেতে পারো। একটা অদ্ভুত দীর্ঘ যাত্রায় বেরোবার জন্য তুমি যথেষ্ট ব্যবস্হা করে রেখেছ ; স্টিমার ভোঁ বাজিয়ে দিয়েছে, পাল তুলে দেয়া হয়েছে ; আর সাধারণ যাত্রীদের চেয়ে তোমার সুবিধা এই যে তুমি জানো না কোথায় চলেছ। তুমি তোমার যাত্রাপথ বেছে নিয়েছ ; ভাগ্য প্রসন্ন হোক !


     

    আমি আশা করি তুমি সতর্ক হয়ে অ্যাডভেঞ্চারে বেরোবার সময়টা সাবধানে বেছে নিয়েছ, কেননা সর্বগুণান্বিত লম্পটের জন্য প্রয়োজন পূর্ণ অবসর। তাছাড়া তুমি জানো, চরস অতিরঞ্জিত করে, কেবল লোকটির অনুভূতি ও সংবেদন নয়, কিন্তু তার পরিবেশ এবং পরিস্হিতিও। তোমার এমন কোনো কর্তব্য নেই যে সমায়ানুবর্তীতা কিংবা তৎপরতা দরকার ; কোনো গার্হস্হ দুশ্চিন্তা নেই ; প্রেমিকের দুঃখ নেই। এসব ব্যাপারে সাবধান হতে হবে। অমন কোনো নিরাশা, কোনো উদ্বেগ, ভেতরে-ভেতরে চিন্তা যা তোমার ইচ্ছা ও আগ্রহ দাবি করে, কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে, শোকের ঘণ্টার মতন তোমার নেশা জুড়ে বাজতে থাকবে আর আনন্দকে বিষাক্ত করে দেবে। উদ্বেগ হয়ে উঠবে যন্ত্রণা, আর নিরাশা হয়ে উঠবে অত্যাচার। কিন্তু, যদি এই সমস্ত প্রাথমিক অবস্হা পরখ করার পর, আবহাওয়া যদি ভালো থাকে, তুমি যদি মনের মতন পরিবেশে থাকো, যেমন ধরো ছবির মতো ভূদৃশ্যে কোথাও কিংবা সুন্দরভাবে সাজানো একটা ঘরে, আর বিশেষ করে তোমার আয়ত্তে যদি সঙ্গীতের আবহ থাকে, তাহলে তার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না।


     

    মোটামুটি, চরসের নেশার তিনটি স্তর আছে, যাদের পার্থক্য করা সহজ, আর যারা শুরু করছে তাদের পক্ষে বেমানান নয় যে প্রথম স্তরে তারা কেবল প্রাথমিক লক্ষণগুলোর সন্মুখীন হবে। তুমি শুনে থাকবে চরসের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে লোকেদের ফালতু কথাবার্তা ; তোমার কল্পনাতে বিশেষ কোনো ধারণে এই ব্যাপারে ঘর করে থাকবে, এক আদর্শ নেশার ধারণা। তুমি আশা করো যে বাস্তব সত্যিই তোমার আকাঙ্খার স্তরে পৌঁছোবে ; সেটাই একা শুরুতেই তোমাকে উদ্বেগের স্হিতিতে পৌঁছে দেবে, যা বিষটার ঘিরে ধরার চারিত্র্য আর বিজয় করে ফেলার জন্য যথেষ্ট অনুকূল। বেশির ভাগ আনাড়িরা, তাদের প্রথম দীক্ষায়, প্রভাবের মন্হরতার অভিযোগ করে : তারা বালসুলভ অধীরতায় অপেক্ষা করে, আর তাদের পছন্দমতন মাদকের দ্রুত প্রভাব না ঘটলে, তারা অবিশ্বাসের অনর্থক বুকনি হাঁকে, যা অভিজ্ঞদের কাছে, যারা চরসের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপার ভালো করে জানে, বেশ মজার। প্রথম ঝাপটা, বহুক্ষণ আটক ঝড়ের মতন যার লক্ষণ, দেখা দেয়া আরম্ভ করে আর ওই অবিশ্বাসীর বুকে জমে-জমে প্রাচুর্যে ঘনিয়ে ওঠে। তখন তা এক ধরণের আহ্লাদের, অপপতিরোধ্য অসম্ভাব্যতার, যা তোমাকে কব্জা করে ফ্যালে। উল্লাসের এই উপলব্ধিগুলো, কোনো কারণ ছাড়াই, যা নিয়ে তুমি লজ্জাবোধ করতে পারো, পর্যায়ক্রমে ঘটতে থাকে আর তন্দ্রায় মাঝে-মাঝে বিরাম ঘটাতে থাকে, যে সময়টায় তুমি নিজেকে সামলে নিতে চাও। সহজ কথায়, একেবারে মামুলি ধারণাগুলো, নতুন আর অদ্ভুত বাহ্যিক গঠন পায়। যখন এগুলো ঘটতে থাকে তুমি নিজের সম্পর্কে অবাক হও যে ব্যাপারটা আসলে কতো সহজ। বেখাপ্পা প্রতিচ্ছায়া আর সঙ্গতিসমূহ, আগে থাকতে আঁচ করা অসম্ভব, অন্তহীন শ্লেষ, কৌতূকপ্রদ নকশা, তোমার মস্তিষ্ক থেকে অবিরাম ঝর্ণার মতন বেরোতে থাকে। দানবটা তোমাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে রেখেছে ; আহ্লাদের খোঁচা, যা কাতুকুতুর মতন, তার বিরুদ্ধতা করা তখন বোকামি ! মাঝে-মাঝে তুমি নিজেই তোমার বোকামি আর তোমার পাগলামি নিয়ে হাসতে থাকো, আর তোমার বন্ধুবান্ধব, যদি তুমি আরও অনেকের সঙ্গে থাকো, তারাও হাসে, তোমার আর তাদের নিজেদের অবস্হা নিয়ে তোমরা হাসাহাসি করো ; কিন্তু তারা যেমন কোনো অসূয়া ছাড়াই হাসে, তুমিও তাদের প্রতি বিরক্ত না হয়েই হাসো।


     

    এই আহ্লাদ, একবার আলস্যে আর একবার তীব্রতায়, খোশমেজাজের এই অস্বস্তি, অসুরক্ষার বোধ, এই নির্ণয়হীনতা, শেষ পর্যন্ত, নিয়মমতো, বেশ কম সময়ের জন্য ঘটে। তোমার ধারণাগুলোর মর্মার্থ তাড়াতাড়ি অস্পষ্ট হয়ে যায়, যে আবহের সুতো দিয়ে তোমার ধৃতি একসঙ্গে বাঁধা তা এমন ভঙ্গুর হয়ে যায় যে তোমার দুষ্কর্মের সহযোগীরা কেউ তোমাকে বুঝতে পারবে না। আর তাছাড়া, এই বিষয়ে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে, তাকে যাচাই করার কোনো উপায় নেই ! হয়তো তারা ভাবে যে তারা তোমাকে বুঝতে পারছে, আর ভ্রমটা পারস্পরিক। এই চাপল্য, হাসিতে ফেটে পড়া, বিস্ফোরণের মতন, যে লোকেরা তোমার স্হিতিতে নেই তাদের মনে হবে যেন এক সত্যকার খেদোন্মত্ততা, কিংবা অন্তত একজন ক্ষিপ্ত মানুষের বিভ্রম ঘটছে। আরও একটা ব্যাপার, যে লোকটা দেখছে অথচ সতর্কতা অবলম্বন করে নেশা করেনি, তার বিচক্ষণতা এবং সুবুদ্ধির দরুণ, তোমাকে আনন্দ দেয় আর তোমাকে নিয়ে মজা করে যেন তুমি স্মৃতিভ্রংশে ভুগছ। ভূমিকা পালটে যায় ; তার আত্মস্হতা তোমাকে বিদ্রূপের শেষ সীমা পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যায়। কতোটা রাক্ষুসে মজার এই অবস্হাটা, এমন একজন লোকের ক্ষেত্রে যে আহ্লাদ উপভোগ করছে আর অন্য লোকটা যে সেই অবস্হায় নেই সে মজা করছে ! পাগলেরা সন্তদের কৃপা করে, আর তখন থেকেই নিজেকে উন্নত মনে করার ধারণা পাগলের মগজে বাসা বাঁধে। দ্রুত তা বিরাট হয়ে উঠবে আর উল্কার মতন ফেটে ঝরে পড়বে।


     

    আমি একবার এই রকম এক দৃশ্যের সাক্ষী ছিলুম আর যা অনেকক্ষণ যাবত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আর যার সৃষ্টিছাড়া চাপ কেবল তারাই টের পাচ্ছিল যারা পরিচিত ছিল, অন্তত অন্য লোকেদের দেখে, মাদকের প্রতিক্রিয়া আর পূর্ণ-স্বরগ্রামের ওপর প্রভাব কতো বিশাল পার্থক্য ঘটায় দুই বুদ্ধমত্তার মাঝে যারা আপাতদৃষ্টিতে সমান। একজন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ, যিনি চরসের প্রভাব সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন, যিনি সম্ভবত বিষয়টা সম্পর্কে শোনেননি কখনও, নিজেকে কয়েকজনের মধ্যে বেমানান মনে করেন, যখন দ্যাখেন আশেপাশে সবাই মাদকটা নিয়েছে। তারা ওনাকে মাদকটার চমৎকার প্রভাবের কথা বোঝাবার চেষ্টা করে ; এই সমস্ত গালগল্প শুনে তিনি সৌজন্যবশত চওড়া একখানা হাসি হাসেন, একজন মানুষের কিছুক্ষণের জন্য বোকার ভান করার শিষ্টতা। এই আত্মাগুলো তাঁর অবজ্ঞায় দ্রুত উত্তেজিত হয়ে ওঠে, ধারালো বিষের দরুণ, আর এদের হাসাহাসি তাঁকে আহত করে ; আহ্লাদের এই সমস্ত বিস্ফোরণ, শব্দ নিয়ে খেলাখেলি, বদলে যাওয়া মুখভঙ্গী -- এই ক্ষতিকর আবহ তাঁকে বিরক্ত করে, আর তাঁকে ঘোষণা করতে বাধ্য করে, হয়তো, যে তাঁর মতে এই আচরণ অত্যন্ত ক্ষুদ্রের, আর যারা এই মাদক নিয়েছে তাদের পক্ষে নিশ্চয়ই ক্লান্তিকর। তাঁর মন্তব্যের মিলনানন্তকতা সকলকে এক ঝটকায় হালকা করে দিলো ; তারা তখন আহ্লাদে টইটুম্বুর। “এই ভূমিকা তোমাদের পক্ষে ভালো হতে পারে.” উনি বললেন, “কিন্তু আমার জন্যে, নয়।” অন্যেরা অহংকারে চেঁচিয়ে বলল, “আমাদের জন্য এটা ভালো ; আর আমরা কেবল তাইই পরোয়া করি।” প্রকৃত পাগলদের মাঝে রয়েছেন নাকি পাগলের ভান করছে এমন লোকজনেরা তাঁকে ঘিরে রয়েছে তা বুঝতে না পেরে উনি নির্ণয় নিলেন যে সেখান থেকে চলে যাওয়াই ভালো ; কিন্তু কেউ একজন দরোজা বন্ধ করে চাবিটা লুকিয়ে রাখে। আরেকজন, তাঁর সামনে হাঁটুগেড়ে বসে, ক্ষমা চায়, সহযোগী হবার দরুণ, আর অহংকার মিশিয়ে বলে, চোখে জল নিয়ে, যে সে মানসিকভাবে নিকৃষ্ট হলেও, যা বলার ফলে কিছুটা সমবেদনা জাগায় ওনার মনে, আর উপস্হিত সবায়ের ওনার সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। উনি সেখানে থেকে যাওয়া মনস্হ করেন, এমনকি ধরাধরি করার কারণে, প্রসন্ন হয়ে বাজনা বাজাতে রাজি হন।


     

    কিন্তু বেহালার আওয়াজ, নতুন রোগের মতন সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে, ছুরি মারে -- শব্দটা বড়ো বেশি কঠিন নয় -- প্রথমে একজন মাতালকে, পরে আরেকজনকে। আরম্ভ হয়ে যায় একটানা ফ্যাসফেসে দীর্ঘশ্বাস, আচমকা ফোঁপানি, নিঃশব্দ কান্নার অশ্রূজল। ভয়ে সঙ্গীতকার বেহালা বাজানো বন্ধ করেন, এবং, যার আহ্লাদ সবচেয়ে বেশি হইচই-মাখানো ছিল তার কাছে গিয়ে জিগ্যেস করেন যে অতোই যদি কষ্ট হচ্ছে, তাকে যন্ত্রণামুক্ত করতে হলে কী করতে হবে ? উপস্হিত একজন, সাধারণ জ্ঞান আছে এমন একজন, পরামর্শ দ্যায় লেমোনেড আর টক খাওয়াবার ; কিন্তু “অসুস্হ লোকটা”, তার চোখ আহ্লাদে তখন ঝলমল কর‌্ছে, তাদের দুজনের দিকেই ভাষাতীত অবমাননার দৃষ্টিতে তাকায়। একজন “অসুস্হ” মানুষকে তার জীবনপ্রাচুর্যের জন্য সারিয়ে তোলার প্রয়াস, আনন্দধারায় যে “অসুস্হ” !


     

    এই অনুকাহিনি থেকে বোঝা যাচ্ছে, চরসের নেশায় উত্তেজিত লোকেদের অনুভূতিতে মানুষের মঙ্গলকামনার একটা বড়ো জায়গা থাকে। একটা কোমল, অলস, মুক হিতৈষিতা যা জেগে ওঠে স্নায়ুগুলোর শিথিলকরণ থেকে। এই মতামতের সমর্ধনে একজন আমাকে একটা অ্যাডভেঞ্চারের কথা বলেছিল, যা তার ঘটেছিল যখন সে চরসের নেশায় চুর, আর নিজের অনুভূতির হুবহু স্মৃতি ধরে রেখেছিল বলে আমি ভালো করে বুঝতে পেরেছিলুম যে তাকে কেমন বিদকুটে আর নাছোড় বিব্রত অবস্হায় পড়তে হয়েছিল,সমবেদনার পাল্লায় পড়ে। আমার মনে নেই প্রাসঙ্গিক লোকটির নেশা প্রথমবার নাকি দ্বিতীয়বারের নিরীক্ষা ছিল; লোকটা যদি আরেকটু কড়া মাত্রায় নিতো, কিংবা চরসটা যদি প্রতিক্রিয়া করে থাকে, কোনো কারণ ছাড়াই, সাধারণের চেয়েও যার প্রভাব অনেক বেশি-- তাহলে তা কি বিরল ঘটনা নয়?


     

    লোকটা আমাকে বলেছিল যে তার আহ্লাদের পুরো সময়টা জুড়ে, নিজেকে প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ অনুভব করা আর নিজেকে প্রতিভাসম্পন্ন বিশ্বাস করার পরম আনন্দময়তায়, হঠাৎ কামড় বসিয়েছিল প্রচণ্ড ভীতির আতঙ্ক। প্রথমে নিজের সংবেদনের সৌন্দর্যে ঔজ্বল্যে ভেসে, ওর আচমকা ভীতির গহ্বরে পড়ে গিয়েছিল। লোকটা নিজেকে প্রশ্ন করেছিল : “এই স্হিতিতে আমার বুদ্ধিমত্তা আর দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কেমন দশা হবে” ( যে স্হিতিকে ও মনে করেছিল অতিপ্রাকৃত )” যদি এই স্হতি চলতেই থাকে আর অসুস্হ অবস্হায় আত্মার চোখ উন্মোচিত হয়, এই ভয় এমনই যে তার যন্ত্রণা কথা বলে বোঝানো যাবে না। “আমি যেন এক পলাতক ঘোড়া হয়ে উঠেছিলুম”, বলল লোকটা, “টগবগিয়ে রসাতলের দিকে ছুটছি, থামতে চাইছি কিন্তু পারছি না। সত্যিই আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা, আর আমার ভাবনাচিন্তা, ঘটনাক্রমের, দুর্ঘটনার, প্রতিবেশের গোলাম, আর এই সবকিছুই একটা কথায় বলা যায়, তা হলো ঝুঁকি, যা বিশুদ্ধ, পরম গীতোচ্ছাসের আদল নিয়েছিল। আমি কাতর হয়ে নিজেকে বারবার বলতে থাকলুম, ‘অনেক দেরি হয়ে গেছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে !’ যখন এই মেজাজ, যা আমার মনে হচ্ছিল অনন্তকালীন, আর আমি সাহস করে বলছি যে তা কেবল কয়েক মিনিটের ছিল, পালটে গেলো, যখন আমি ভাবলুম যে প্রাচ্যের মানুষদের প্রিয় আনন্দের সাগরে আমি ডুব দিতে পারি, যা এই ভয়ঙ্কর অবস্হায় সফল হয়, নতুন একটা দুর্ভাগ্য আমাকে জড়িয়ে ধরল; এক নতুন উদ্বেগ, যদিও মামুলি, আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার হঠাৎ মনে পড়ল রাতে আমাকে একটা ভোজে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে, অভিজাত লোকেদের সান্ধ্য জমায়েতে। আমি আগাম দেখতে পেলুম যে আমি ভদ্র সুশীল সম্ভ্রান্ত লোকেদের মধ্যে রয়েছি, যেখানে প্রত্যেকে নিজের প্রতিভূ, যেখানে আমার মনের অবস্হা ঝলমলে আলোর মাঝে সাবধানে গোপন করতে হবে। আমি নিশ্চিত ছিলুম যে সফল হবো, কিন্তু ইচ্চাশক্তির প্রয়াসের কথা মনে আনতেই আমার হৃদয় প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে, কারণ ঠিক মনে নেই, গসপেলের উপদেশ, “যে দুর্ভোগে ভোগে তার কাছে অপরাধ আসে!” আমার স্মৃতিতে লাফিয়ে এলো, আর তা ভুলে যাবার চেষ্টায়, তাকে ভুলে যাবার জন্য চিন্তাকে কেন্দ্রিত করতে গিয়ে, আমি কথাটা বারবার নিজেকে শোনাতে লাগলুম। আমার বিপর্যয়, ব্যাপারটা সত্যিই বিপর্যয় ছিল, বিশাল আকার নিয়ে ফেললো : আমার দুর্বলতা সত্তেও, আমি সক্রিয় হবার নির্ণয় নিলুম, আর একজন ডাক্তারের পরামর্শের জন্য গেলুম, আমি প্রতিষেধক ওষুধগুলো জানতুম না, আর বেপরোয়া স্বাধীন মেজাজে জমায়েতে পৌঁছোতে চাইছিলুম, যেখানে আমাকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে ; কিন্তু দোকানটার চৌকাঠে অকস্মাৎ একটা চিন্তা আমাকে কাবু করে ফেললো, ভুতে পাওয়ার মতন, ভেবে দেখতে বাধ্য করলো। আর যেতে-যেতে একটা দোকানের জানলায় নিজেকে দেখতে পেয়েছিলুম, আর আমার মুখটা আমাকে চমকে দিলো। ফ্যাকাশেপনা, চাপা দুটো ঠোঁট, এই ফ্যালফেলে চোখ ! -- আমি সজ্জন লোকটাকে ভয় পাইয়ে দেবো, নিজেকে বললুম, আর সামান্য হেলাফেলার খাতিরে ! আর তার সঙ্গো যোগ করো তামাশা যা আমি এড়াতে চাইছিলুম, ওষুধের দোকানে লোকজন থাকারও আশঙ্কা ছিল। কিন্তু অচেনা ডাক্তারটার প্রতি আমার আচমকা সমবেদনা আমার অন্য অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে নিলো। আমি কল্পনা করলুম যে এই লোকটা আমার এই মারাত্মক মুহূর্তে আমার মতনই সংবেদনশীল, আর যেমন-যেমন কল্পনা করলুম, এও ভাবলুম যে লোকটার কান আর আত্মা, আমার মতনই, সামান্য আওয়াজে কেঁপে ওঠে, আমি পা টিপে টিপে এগোবার কথা ভাবলুম।

    ‘ব্যাপারটা অসম্ভব’, নিজেকে বললুম, ‘আমি যে লোকটার সহানুভূতিতে গলা ঢোকাতে যাচ্ছি, তার সঙ্গে আচরণে বড়ো বেশি সতর্কতা নিয়ে ফেলবো।’ তারপর নির্ণয় নিলুম যে নিজের কন্ঠস্বরকে একেবারে স্তব্ধ করে ফেলবো, আমার পায়ের আওয়াজের মতন। তুমি তো জানোই, চরস-নেয়া গলার আওয়াজ : গম্ভীর, ঘড়ঘড়ে, রাশভারি ; আফিমখোর নেশাড়ুদের মতন নয়। যা চেয়েছিলুম ফলাফল হলো তার একেবারে উল্টো ; ডাক্তারকে বিশ্বাস করাবার প্রয়াসে, আমি তাঁকে ভড়কে দিলুম। উনি এই অসুস্হতার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না ; এমনকি এই অসুখের কথা শোনেনওনি কখনও ; তবু উনি আমার দিকে তাকিয়ে দেখলেন কৌতূহল আর অবিশ্বাস মিশ্রিত চাউনি মেলে। উনি কি আমাকে পাগল, অপরাধী বা ভিখারি বলে মনে করলেন ? নিঃসন্দেহে, কোনোটাই নয়, কিন্তু এইসমস্ত বিদঘুটে চিন্তা আমার মগজে লাঙল চালাচ্ছিল। আমি ওনাকে বিস্তারিতভাবে খোলোশা করতে বাধ্য ছিলুম ( কী ক্লান্তিকর ! ) চরসের মেঠাই ঠিক কী বস্তু আর কি জন্য নেয়া হয়, বারবার বোঝাচ্ছিলুম যে তাতে কোনো বিপদ হয় না, আর যাঁহাতক ওনার ব্যাপার, আঁৎকে ওঠার প্রয়োজন নেই, আর আমি যা চাইছিলুম তা স্রেফ প্রভাবটাকে কমাবার বা প্রতিরোধ করার উপায়, মাঝে মাঝে যোগ করছিলুম যে ওনাকে বিরক্ত করার জন্য আমি আন্তরিক দুঃখিত। আমার বলা শেষ হয়ে গেলে ( এই কথাগুলোয় নিজেকে কতোটা ছোটো করলুম সেদিকে খেয়াল দিতে বলব তোমাকে ) উনি বেমালুম চলে যেতে বললেন। আমার ভাবনাচিন্তাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্হাপনের আর শুভচিন্তার এই ছিল পুরস্কার। আমি সন্ধ্যার নিমন্ত্রণে গেলুম ; আমি কাউকেই অপদস্হ করলুম না। কেউই আঁচ করতে পারলো না অন্য লোকেদের মতন হবার জন্য আমাকে কতো কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে ; কিন্তু আমি কখনও ভুলবো না অতিকাব্যিক নেশার অত্যাচার যা শালীনতা দিয়ে সীমাবদ্ধ আর কর্তব্যের চিন্তায় স্বভাববহির্ভূত। ” যদিও কল্পনাপ্রসূত প্রতিটি যন্ত্রণার প্রতি আমি সমবেদনা জানিয়ে ফেলি, এই ঘটনা শুনে আমি নিজের হাসি থামাতে পারিনি। যে লোকটা আমাকে গল্পটা বলেছিল সে সেরে ওঠেনি। লোকটা অভিশপ্ত মেঠাইতে উত্তেজনা পাবার ঝোঁক বজায় রেখেছিল যা কিনা সে জ্ঞান থেকেই পেতে পারতো ; কিন্তু যেহেতু লোকটা বিচক্ষণ আর সংসারি, পার্থিব মানুষ, ও মাত্রা কমিয়ে এনেছে, যার দরুণ বেড়ে গেছে পুনরাবৃত্তি। লোকটা পরে টের পাবে “বিচক্ষণতার” পচা ফলের স্বাদ কেমন হয় !


     

    এবার ফিরে যাই নেশার স্বাভাবিক অগ্রগতির বিষয়ে। প্রথম পর্বের বালকসূলভ আহ্লাদের পরে, বস্তুত, সাময়িক শিথিলতা আসে ; কিন্তু নতুন ঘটনাবলী এসে হাজির হয় সংবেদনের অতিমাত্রিক শীতলতায় -- যা এমনকি হয়ে উঠতে পারে, কোনো কোনো লোকের ক্ষেত্রে, তিক্ত-শীতল -- আর অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে প্রচণ্ড দুর্বলতা। তখন তোমার হবে “মাখনের আঙুল”; আর তোমার মগজে, তোমার সমগ্র অস্তিত্বে, তুমি বোধ করবে এক হতবুদ্ধিকর তন্দ্রা আর স্তম্ভন। তোমার মাথা থেকে এগোতে থাকে তোমার চোখ ; যেন সেগুলোকে প্রতিটি দিকে টান মারছে অনবদ্য পরিতোষ। তোমার মুখাবয়ব ঢেকে যাবে ফ্যাকাশেপনায় ; ঠোঁট ঢুকে যাবে ভেতরে, শ্বাসহীনতার টানে, সেই ধরণের উচ্চাকাঙ্খী মানুষদের মতন যারা নিজেদের বড়ো-বড়ো প্রকল্পনার শিকার হয়, পেল্লাই ভাবনাচিন্তার পাহাড়ের তলায় চাপা, কিংবা দীর্ঘ শ্বাস নেয় যেন ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে। বলা যায়, গলা বন্ধ হয়ে আসে ; তৃষ্ণায় টাকরা শুকিয়ে যায়, যাকে তৃপ্ত করা হয়ে উঠবে অত্যন্ত মিষ্টি, যদি তখনও আলস্যের আনন্দ মজাদার বলে মনে না হয়, আর দেহে কোনোরকম তোলপাড় না ঘটায়। গভীর অথচ কর্কশ দীর্ঘশ্বাস বেরোয় তোমার বুক থেকে, যেন পুরোনো বোতলের মতন তোমার দেহ, নতুন মদের, তোমার আত্মার, সক্রিয় আবেগ সইতে পারছে না। সময়ে-সময়ে অঙ্গবিক্ষেপ তোমাকে অসাড় করে তোলে আর শিহরণ ঘটায়, অনেকটা প্রচণ্ড দৈহিক খাটুনির পর দিনের শেষে মাংসপেশিতে যেমন খিঁচুনি হয় কিংবা রাতের বেলায় ঝড়ের আগে নিশ্চিন্ত তন্দ্রায় যেমন হয়।


     

    আরও এগোবার আগে আমি ওপরে যে শীতলতার সংবেদনের কথা বলেছি, সেই প্রসঙ্গে আরেকটা কাহিনি বলব, যা পরিষ্কার করে দেবে যে ঠিক কতোখানি প্রভাবগুলো, এমনকি নিছক দৈহিক প্রভাব, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে বদলাতে পারে। এবারে যিনি কথা বলছেন তিনি একজন সাহিত্যিক, আর তাঁর গল্পের কোনো কোনো অংশে যে কেউ ( আমি মনে করি ) সাহিত্যিক মেজাজের ইঙ্গিত পাবেন। “আমি নিয়েছিলুম”, উনি আমাকে বলেছিলেন, “যৎসামান্য পাতাঘাসের মাত্রা, আর সব কিছুই ভালোভাবে চলছিল। আহ্লাদের সঙ্কট বেশিক্ষণ স্হায়ী হয়নি, আর আমি নিজেকে পেলুম অবসন্নতা আর বিস্ময়ের স্হিতিতে যা প্রায় ছিল মহানন্দের। আমি আশা করছিলুম এক শান্তিময় আর উদ্বেগহীন সন্ধ্যা : দুর্ভাগ্যবশত, সুযোগ আমাকে উৎসাহিত করলো এক বন্ধুর সঙ্গে নাটক দেখতে যাবার। আমি নায়কোচিত পথ বেছে নিলুম, আমার অপার আলস্য আর চুপচাপ বসে থাকার স্হিতিকে কাটিয়ে উঠতে চাইলুম। আমাদের পাড়ার প্রতিটি ঘোড়ার গাড়ি লোকে ভাড়া করে নিয়েছিল ; আমি রাস্তার ভিড়ের কর্কশ আওয়াজ, বোকা পথচারীদের মূর্খ কথাবার্তা, একটা পুরো সাগর ফালতু লোকে ঠাশা, তার ভেতর দিয়ে অনেকটা হাঁটতে বাধ্য হলুম। আমার আঙুলের ডগাগুলো আগে থাকতেই একটু ঠাণ্ডা ছিল, যেন আমি দুটো হাত বরফের জলে চুবিয়েছি। কিন্তু একে যন্ত্রণাবোধ বলব না ; ধারালো ছুঁচ ফোটানোর মতন অনুভূতি বরং আমাকে আনন্দ দিচ্ছিল। তবু যতো হাঁটতে লাগলুম ততো এই শীতলতা আমার ওপর ছেয়ে যেতে লাগলো। যাঁর সঙ্গে আমি ছিলুম তাঁকে কয়েকবার জিগ্যেস করলুম যে সত্যিই কি খুব ঠাণ্ডা লাগছে। উনি উত্তরে বললেন যে, বরং উলটো, অন্য দিনের তুলনায় তাপ বেশ উষ্ণ। শেষ পর্যন্ত নাটকে পৌঁছে, যে বক্স আমার জন্য নির্ধারিত ছিল সেখানে বসে, তিন-চার ঘণ্টা বিশ্রাম নেয়া যাবে আঁচ করে মনে হলো বাইবেল বর্ণিত ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’তে পৌঁছে গেছি। আসার সময়ে যে অনুভূতিগুলো আমি যৎসামান্য কর্মশক্তি দিয়ে মাড়িয়ে এসেছিলুম তা এবার ফেটে পড়ল, আর আমি নিজেকে ছেড়ে দিলুম আমার নিঃশব্দ প্রমত্ততায়। শীতলতা বাড়ছিল, অথচ দেখলুম লোকেরা হালকা পোশাকে এসেছে, এমনকি ঘেমে গিয়ে ক্লান্তি কাতাবার জন্য কপাল পুঁচছে। এই মজাদার ধারণাটা আমাকে পেয়ে বসল, যে আমি একজন বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ, যাকে নাটকের হলঘরে গ্রীষ্মকালে শীত উপভোগ করার অধিকার দেয়া হয়েছে। ভীতিকর মনে না হওয়া পর্যন্ত শীতলতা বাড়তেই থাকলো ; কিন্তু কতো বেশি শীতলতায় আচ্ছন্ন হতে পারি সেই কৌতূহল আমাকে কাবু করে ফেলেছিল। শেষ পর্যন্ত এমন একটা সময় এলো যখন তা অনেক বেশি হয়ে পড়লো, সার্বত্রিক, যে আমার ধারণাগুলো জমে বরফ হয়ে যেতে লাগলো ; আমি হয়ে গিয়েছিলুম চিন্তান্বিত একতা বরফের চাঙড়। আমি কল্পনা করছিলুম যে বরফ কেটে আমার মূর্তি গড়া হয়েছে, আর এই উন্মাদ বিভ্রম আমাকে এতো গর্বান্বিত করলো, নিজের মধ্যে এক নৈতিক শুভত্বের বোধ জাগিয়ে তুললো, যে তোমাকে তা বর্ণনা করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। আমার জঘন্য আহ্লাদকে যা উঁচুতে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল তা হল নিশ্চয়তার এই বোধ যে বাদবাকি উপস্হিত লোকজন আমার অবস্হা আর তাদের তুলনায় আমার নায়কত্ব তারা অজ্ঞতার কারণে টের পাচ্ছে না, আর এই আনন্দে বিহ্বল হয়ে যে আমার সঙ্গী এক মুহূর্তের জন্যেই সন্দেহ করতে পারেনি যে কেমন অদ্ভুত অনুভূতিতে আমি টইটুম্বুর। আমি

    আমার কৈতবের পুরস্কার চুপচাপ গ্রহণ করলুম, আর আমার অসাধারণ আনন্দ হয়ে রইলো যথার্থ গোপনতা।


     

    “তাছাড়া, আমি সবে বক্সে ঢুকেইছিলুম আর আর আমার চোখ অন্ধকারের প্রকোপে ছেয়ে গেলো যার সঙ্গে, আমার মনে হলো, আমার শীত করার ধারণার সম্পর্ক আছে ; হতে পারে যে এই দুটো ধারণা একে অপরকে শক্তি যুগিয়েছিল। তুমি তো জানো হ্যাশিস সদাসর্বদা আলোর চমৎকারিত্বের উদ্রেক করে, রঙের বাহার, তরল সোনার গড়িয়ে পড়া ; সমস্ত ধরণের আলোই এর প্রতি সমবেদী, যা আলো চাদরের মতন ভাসতে থাকে আর যে আলো আঁটা থেকে আবছা ঝুলে থাকে, উভয় ক্ষেত্রেই ; সামাজিক মহিলাদের আয়োজিত সালোঁর ঝাড়বাতিদান, মোমবাতি যা লোকেরা মে মাসে জ্বলায়, সূর্যাস্তের গোলাপি সম্প্রপাত। মনে হয় যে বেচারা ঝাড়বাতি এতো আলো ছড়ায় যে ঔজ্বল্যের তৃপ্তিহীন তৃষ্ণা মেটাতে অকিঞ্চিৎকর হয়ে পড়ে। আমি ভাবলুম, তোমাকে যেমন বলেছি, আমি ছায়ার জগতে প্রবেশ করছিলুম, যা, উপরন্তু, ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছিল, আর আমি স্বপ্ন দেখতে লাগলুম মেরুঅঞ্চলের আলো আর অনন্তকালীন শীতের। আর মঞ্চের কথা বলতে গেলে, নাটকটা ছিল মজার দেবীকে নিয়ে ; তা নিজেই ছিল আলোকময় ; প্রথম দিকে ছোটো এবং অনেকটা দূরে, যেন টেলিসকোপের উলটো দিক দিয়ে কোনো ভূদৃশ্য দেখছি। আমি তোমাকে বলব না যে আমি অভিনেতাদের সংলাপ শুনছিলুম ; তুমি জানো যা তা অসম্ভব। থেকে থেকে আমার চিন্তা কোনো সংলাপের টুকরো খুবলে আনছিলো, আর চতুর নাচিয়ে মেয়ের মতন তাকে বহুদূরের হর্ষোল্লাসে লাফিয়ে পৌঁছোবার পাটাতন হিসেবে ব্যবহার করছিল। তুমি হয়তো ভাববে যে এইভাবে একটা নাটক শোনা যুক্তিহীন আর সঙ্গতিহীন। নিজের ভ্রান্তি দূর করো! আমি আবিষ্কার করলুম যে আমার চিত্তবিক্ষেপ নাটকটা আমার সূক্ষ্ম অনুভূতিকে ছাপিয়ে গেছে। কিছুই আমাকে বিক্ষুব্ধ করলো না, আর আমি যেন হয়ে উঠলুম সেই ক্ষুদে কবির মতন, যে প্রথমবার ‘এসথার’ নাটক দেখে, ভেবেছিল যে রানিকে ভালোবাসার ঘোষণা হামান-এর পক্ষে স্বাভাবিক ছিল। ব্যাপারটা ছিল, যেমন তুমি আঁচ করেছ, সেই দৃশ্যের যেখানে ও এসথারের পায়ে পড়ে নিজের অপরাধের ক্ষমা চাইছিল। যদি এই প্রণালীতে সব নাটক শোনা হয় তাহলে ওরা সবাই, এমনকি রাসিনের নাটকেরও, প্রচুর লাভ হবে। আমার মনে হচ্ছিল যে অভিনেতাগুলো খুবই ছোট্টো, সুস্পষ্ট এবং রেখাঙ্ক দিয়ে বাঁধা, অনেকটা মেইসনিয়ারের ছবির আকৃতিগুলোর মতন। আমি একেবারে পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছিলুম ওদের পোশাক, তাদের নকশা, সেলাই, বোতাম, ইত্যাদি, কিন্তু তাদের নকল কপাল আর আসল কপালের তফাতও চোখে পড়ছিল ; শাদা, নীল আর লাল, আর মুখ সাজাবার কায়দা; আর এই লিলিপুটগুলোর পোশাক ছিল শীতল ও ঐন্দ্রজালিকভাবে সুস্পষ্ট, যেমনটা কোনো তৈলচিত্রের ওপরে কাচ থাকলে হয়। শেষ পর্যন্ত যখন আমি এই ঠাণ্ডায় জমাট ছায়াদের গুহা থেকে বেরোলুম, তখন, অন্তরজগতের অলীক ছায়ামূর্তিদের ধারাবাহিক প্রবাহ উবে গেল, আমি নিজেকে ফিরে পেলুম, আমি বড়ো বেশি ক্লান্তি অনুভব করলুম যা তার আগে দীর্ঘক্ষণ যাবত করা কঠিন কাজকর্ম করেও আমার হয়নি।”


     

    সত্যি বলতে কি, নেশার এই পর্বে এক নতুন মাধুর্য দেখা দ্যায়, প্রতিটি ইন্দ্রিয়তে এক উচ্চতর প্রখরতা : গন্ধ, দেখা, শোনা, স্পর্শ এগিয়ে চলায় সমানভাবে যোগ দ্যায় ; চোখ দেখতে পায় অসীমকে ; প্রচণ্ড আওয়াজের মধ্যেও কান শুনতে পায় সূক্ষ্ম শব্দগুলো। এই সময়েই আরম্ভ হয় হ্যালুশিনেশানের কুহক ; বহির্জগতের বস্তুরা একের পর এক অদ্ভুত আকার নিতে থাকে ; তারা বিকৃত হয় আবার নিজের আকারে ফিরে আসে। তারপর -- ধারণাদের অস্পষ্টতা, ভুলবোঝা, আর পক্ষান্তরণ ! শব্দেরা নিজেদের রঙে মুড়ে ফ্যালে ; রঙেরা কুসুমিত হয় সঙ্গীতে। যা তুমি বলবে, স্বাভাবিকতা ছাড়া কিছুই নয়। প্রতিটি কাব্যিক মস্তিষ্ক তার সুস্হ, স্বাভাবিক অবস্হায়, এই আনুরূপ্যগুলো সহজেই কল্পনা করতে পারে। কিন্তু আমি পাঠকদের আগেই সতর্ক করেছি যে চরস সেবন করায় কোনোরকম ইতিবাচক অতিপ্রাকৃত ব্যাপার নেই; আনুরূপ্যগুলোতে আছে অপরিচিত প্রাণবন্ততা ; তারা প্রবেশ করে আর তারা বিকশিত হয় ; তারা তাদের দক্ষতা দিয়ে মনকে অভিভূত করে। সঙ্গীতের স্বরলিপি হয়ে যায় সংখ্যা ; আর যদি তোমার মগজ গাণিতিক প্রবণতায় দক্ষ, যে ঐকতান তুমি শোনো, তার সংবেদনাময় ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ চরিত্র বজায় রেখে, নিজেকে বিশাল ছন্দময় ক্রিয়াকলাপে বদলে ফ্যালে, যেখানে সংখ্যা থেকে সংখ্যার জন্ম হয়, আর যার স্তরগুলো এবং উৎস এক অনির্বচনীয় স্বাচ্ছন্দ্য ও তৎপরতাকে অনুসরণ করে, যা সঙ্গীতকারের সমান হয়ে ওঠে।


     

    অনেক সময়ে এমনও হব যে লোকটার ব্যক্তিত্বের বোধ লোপাট হয়ে যায়, আর যে বস্তুনিষ্ঠতা সর্বেশ্বরবাদী কবিদের জন্মগত অধিকার তা তোমার মধ্যে এমন অস্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয় যে বহির্জগতের বস্তুদের সম্পর্কে তোমার চিন্তা তোমাকে নিজের অস্তিত্বের কথা ভুলিয়ে দ্যায় আর তোমাকে তাদের সঙ্গে হতবুদ্ধি করে। তোমার দৃষ্টি একটা গাছে নিবদ্ধ, বাতাস তাকে সুসঙ্গতভাবে বেঁকিয়ে দিয়েছে ; কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে একজন কবির মস্তিষ্কে যা কেবল স্বাভাবিক উপমা তোমার কাছে বাস্তব হয়ে দেখা দ্যায়। প্রথমে তুমি গাছটাকে তোমার আবেগ, তোমার আকাঙ্খা, তোমার বিষাদ দান করো ; তার কড়কড় শব্দ আর দোল খাওয়া তোমার হয়ে ওঠে, আর শীঘ্রই তুমি নিজেই গাছ হয়ে যাও। ঠিক যেভাবে পাখিরা নীলিমার বিস্তারে ঘুরে বেড়ায় : প্রতীকিস্তরে তা মানুষের যাবতীয় ব্যাপারের ওপর তোমার অমরত্বের ক্ষুধাকে প্রতিনিধিত্ব করে ; কিন্তু শীঘ্রই তুমি পাখি হয়ে যাও। তারপর, মনে করো, তুমি বসে-বসে ফুঁকছো ; তোমার দৃষ্টি বেশ কিছুক্ষণের জন্য নীল মেঘের প্রতি আকৃষ্ট হবে, যা তোমার পাইপ থেকে শ্বাস হয়ে উঠেছিল ; মন্হর, অবিরাম, অনন্তকালীন বাষ্পীভবনের ধারণা দখল করে নেবে তোমার আত্মা, আর এই ধারণা তুমি তোমার ভাবনাচিন্তায়, তোমার চিন্তাধারার নিজস্ব উপকরণে প্রয়োগ করা আরম্ভ করবে। অনন্যসাধারণ অস্পষ্টতার মাধ্যমে, বুদ্ধিমত্তার পরিবহন প্রজাতির অদলবদলের দ্বরা, তুমি নিজের বাষ্পীভবন অনুভব করবে, আর তুমি তোমার পাইপকে দেবে, যাতে তুমি তামাকের মতন কুঁজো আর দাবিয়ে ঠাশা অনুভব করছি, তোমাকে ধোঁয়ায় পরিবর্তনের অদ্ভুত কর্মক্ষমতা !


     

    সৌভাগ্যবশত, এই অন্তহীন কল্পনা শুধু এক মিনিটের জন্য স্হায়ী ছিল। একটা সূক্ষ্ম বিরতির জন্য, অনেক চেষ্টা করে অভিগ্রস্ত, তোমাকে ঘড়ির দিকে তাকাতে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু চিন্তাধারার আরেকটি স্রোত তোমাকে বহন করে নিয়ে যায় ; তা তোমাকে আরও এক মিনিট তার ঘুর্ণিতে তোমাকে গড়িয়ে নিয়ে যাবে, আর এই অতিরিক্ত মিনিট হবে অনন্তকালীন। কেননা তোমার অনুভূতি আর ধারণা সময়ের বিপুল অংশের দ্বারা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল। কেউ হয়তো বলতে পারে যে একটিমাত্র ঘণ্টার পরিসরে একজন লোক বহুবার বাঁচতে পারে। তাহলে তুমি কি, অসাধারণ উপন্যাসের মতন, লিখিত হবার বদলে জীবন্ত ? দেহিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর আনন্দ উপভোগের মধ্যে আর কোনও সমীকরণ নেই ; আর সর্বোপরি, এর ফলে যে দোষারোপ উৎপন্ন হয় তাকে ব্যক্তি-স্বাধীনতার বিপজ্জনক প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।


     

    যখন আমি হ্যালুশিনেশানের কথা বলি তখন শব্দটা তার যথাযথ বোধে গ্রহণ করতে হবে। বিশুদ্ধ হ্যালুশিনেশানের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব, যে বিষয়ে ডাক্তাররা অধ্যয়ন করে থাকেন, তার সঙ্গে হ্যালুশিনেশনের, বা ইন্দ্রিয়দের ভুল ব্যাখ্যা, ঘটে চরসের দরুন উৎপন্ন মানসিক স্হিতির। প্রথমটির ক্ষেত্রে হ্যালুশিনেশন হয় আচমকা, সম্পূর্ণ, এবং মারাত্মক ; তাছাড়া, তার কোনো পৃষ্ঠভূমি বা ওজর বাইরের জগতে খুঁজে পাওয়া যায় না। অসুস্হ মানুষ দেখতে পায় ছায়া-আকার কিংবা শুনতে পায় এমন সমস্ত আওয়াজ যা আদপে ঘটেনি। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, যেখানে হ্যালুশিনেশান ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তা প্রায় ইচ্ছাকৃত, আর তা নিখুঁত হয় না, তা কল্পনার আশ্রয়ে পরিপুষ্ট হয়। শেষে, এর একটা অজুহাত আছে। আওয়াজ কথা বলবে, সম্পূর্ণ আলাদা উচ্চারণে ; কিন্তু আওয়াজ যে ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। চরস নেশাখোরের উৎসাহী দৃষ্টি অদ্ভুত আকারদের দেখতে পায়, কিন্তু অদ্ভুত আর রাক্ষুসে হবার আগে আকারগুলো সরল আর স্বাভাবিক ছিল। তেজোময়তা, হ্যালুশিনেশনের জীবন্ত সংলাপ এই নেশায় কোনোক্রমেই এই মৌলিক পার্থক্যকে বাতিল করে না : একটির শিকড় রয়েছে অবস্হায়, এবং বর্তমান সময়ে, অন্যটার নেই। তপ্ত ফুটন্ত এই কল্পনাকে বরং ব্যাখ্যা করা যাক, স্বপ্নের এই পরিপক্বতা, আর এই কাব্যিক বালখিল্য যে কারণে চরসের নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক নিন্দিত হয়, আমি তোমাকে আরেকটা গল্প শোনাবো। এবার কোনো অলস লোক নয় যে কথা বলছে। ইনি একজন মহিলা ; মহিলাটি আর তাঁর প্রথম যৌবনে নেই ; কৌতূহলী, উত্তেজিত হতে চান এমন মনের, এবং যিনি, বিষটির সঙ্গে পরিচিত হবার আগ্রহে আত্মসমর্পণ করেছেন, এইভাবে আরেকজন মহিলার গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলো বর্ণনা করেছেন। আমি হুবহু তুলে দিচ্ছি।


     

    বারো ঘণ্টার উন্মাদনা থেকে আমার পাওয়া অনুভূতিগুলো যতোই অদ্ভুত হোক বা নতুন-- বারো ঘণ্টার ছিল নাকি কুড়ি ? সত্যি বলতে, আমি সঠিক বলতে পারব না -- আমি আর কখনও সেই স্হিতিতে ফিরে যেতে চাই না। আত্মিক উত্তেজনা ছিল প্রাণবন্ত, তা থেকে পাওয়া ক্লান্তি বড্ডো বেশি ; আর, এক কথায় বলতে হলে, শৈশবে এইভাবে ফিরে যাওয়া আমার মনে হয়েছে অপরাধ। শেষ পর্যন্ত ( বহুবার ইতস্তত করার পর ) কৌতূহলে আত্মসমর্পণ করলুম, যেহেতু সেটা বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া বোকামি ছিল, আমার মনে হয়েছিল যৎসামান্য সন্মান নষ্ট হলে খুব বেশি ক্ষতি হবে না। কিন্তু প্রথমেই তোমাকে বলে রাখি অভিশপ্ত এই হ্যাশিস জিনিসটা বড়ো ভয়ঙ্কর বিশ্বাসঘাতক মাদক। অনেক সময়ে লোকে মনে করে যে সে নেশা থেকে মুক্ত হয়ে গেছে ; কিন্তু তা নিছক শান্তির প্রতারণা। বিশ্রামের মুহূর্ত থাকে বটে, আর তারপর পুনঃপ্রকোপ। সন্ধ্যায় দশটার আগে আমি নিজেকে এই রকম এক সাময়িক স্হিতিতে পেলুম ; আমি ভাবলুম জীবনের এই প্রাণপ্রাচুর্য থেকে পালিয়ে আসাটা, যা আমাকে এতো আনন্দ দিয়েছে, ব্যাপারটা সত্যি, কিন্তু তা উদ্বেগহীন আর ভয়হীন ছিল না। রাতের খাবারের জন্য মহানন্দে বসলুম, সেই ধরণের মানুষের মতন যে দীর্ঘ যাত্রার পর বিরক্তিকর পরিশ্রান্তে ক্লান্ত ; কেননা তার আগে পর্যন্ত, সাবধান হয়ে, আমি খাওয়া থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলুম ;কিন্তু আমি টেবিল থেকে ওঠার আগেই বিভ্রম আমাকে আবার আঁকড়ে ধরেছিল, যেমন কোনো বিড়াল ইঁদুরকে ধরে, আর বিষটা আমার বেচারি মগজে নতুন করে খেলা আরম্ভ করল। যদিও আমার বাড়ি বন্ধুদের বাড়ির কাছেই, আর আমার জন্য ঘোড়ার গাড়িও ছিল, আমি স্বপ্ন দেখার জন্য, আর নিজেকে অপ্রতিরোধ্য উন্মাদনার হাতে ছেড়ে দেবার জন্য একেবারে আবিষ্ট অনুভব করলুম, যে সকাল পর্যন্ত থেকে যাবার তাদের প্রস্তাবে আনন্দে রাজি হয়ে গেলুম। তুমি তো দুর্গের কথা জানো ; তুমি জানো যে ওরা যে অংশে সাধারণত থাকে সেখানে আয়োজন করেছে, সাজিয়েছে, আর আধুনিক কায়দায় সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্হা করেছে, কিন্তু যে অংশটা সাধারণত যেমনটা আগে ছিল তেমনই খালি পড়ে থাকে, সেই পুরোনো শৈলী আর পুরোনো নকশাগুলো বজায় রেখেছে। বন্ধুরা এই অংশে আমার জন্য একটা শোবার ঘরের ব্যবস্হা করল, আর এই জন্য তারা সবচেয়ে ছোটো ঘরটা বেছে নিলো, এক ধরণের খাসকামরা, যেটা, কিছুটা ফ্যাকাশে আর পলেস্তারা-খসা হলেও মনোমুগ্ধকারী। যতোটা পারি তোমার জন্য বর্ণনা করব, যাতে তুমি টের পাও যা কেমনতর অদ্ভুত দর্শনশক্তিতে আপ্লুত হয়েছিলুম, যে দর্শনশক্তি আমার সারাটা রাতে ছেয়ে গিয়েছিল, সময়ে চলে যাওয়া সম্পর্কে জানার বিশ্রামটুকুও দেয়নি।


     

    “খাসকামরাটা খুবই ছোটো, বেশ অপ্রশস্ত। ঝালরের উচ্চতা থেকে ছাদের খিলান নেমেছে গম্বুজের মতন ; দেয়ালগুলো সঙ্কীর্ণ, লম্বা আয়নায় ঢাকা, প্যানেল দিয়ে আলাদা-করা, যার ওপর ভূচিত্র, সাজাবার মতন সহজ শৈলীতে, আঁকা। চার দেয়ালের ছাদের কারুকার্যে নানা রকমের রূপকধর্মী মূর্তি আঁকা, কয়েকজন বিশ্রামরত, অন্যেরা দৌড়োচ্ছে বা উড়ছে ; তাদের ওপরে চমৎকার সব ফুল আর পাখি। মূর্তিগুলোর পেছনে জাফরি, চোখকে ফাঁকি দেবার মতন করে আঁকা, আর স্বাভাবিকভাবে ছাদের বাঁককে অনুসরণ করেছে ; ছাদটা সোনালী।

    কাঠের কারুকাজ আর জাফরি আর মূর্তিদের মাঝেকার ফাঁকগুলো সোনায় মোড়া, আর একেবারে মধ্যখানে সোনাকে নকল জাফরির জ্যামিতিক নকশায় বিভক্ত করা ; তুমি দেখলে মনে করবে সেটা অনেকটা খানদানি খাঁচার মতন, বেশ বড়ো একটা পাখির জন্যে একটা সুন্দর খাঁচা। আমি একানে যোগ করতে চাইব যে রাতটা ছিল বেশ সুন্দর, বেশ পরিষ্কার, আর চাঁদ ঝলমল করছিল আলোয় ; এমনই যে আমি মোমবাতি নেভাবার পরও সাজানো নকশাগুলো দেখা যাচ্ছিল, আমার মনের চোখ দিয়ে যে আলোকিত তা নয়, তুমি হয়তো তাইই ভাববে, বরং এই সুন্দর রাত দিয়ে, যার আলো সোনার সমস্ত নকশা, আয়না, আর রঙের বাহারকে আঁকড়ে ছিল।


     

    “আমি প্রথমে খুবই অবাক হয়েছিলুম যে আমার সামনে বিশাল ফাঁকা জায়গা ছড়িয়ে রয়েছে, আমার আসেপাশে, আমার চারিদিকে। রয়েছে অনাবিল নদী, আর সবুজ চারণভূমি যারা নিজেদের সৌন্দর্যকে শান্ত জলে মুগ্ধভাবে প্রশংসা করছে : আয়নায় পপতিফলিত প্যানেলগুলোর প্রভাব তুমি নিশ্চয়ই আঁচ করতে পারছ। চোখ তুলে আমি দেখতে পেলুম সূর্য আস্ত যাচ্ছে, যেন শীতল হয়ে-আসা গলিত ধাতু। তা আসলে ছিল ছাদের সোনা। কিন্তু জাফরিগুলো দেখে আমার মনে হলো আমি এক ধরণের খাঁচায় রয়েছি, কিংবা শূন্যে ঝোলানো একটা বাড়িতে যার সব দিক খোলা, আর এই বিস্ময়গুলো থেকে আমাকে আলাদা করে রেখেছে আমার কয়েদখানার শিকগুলো। যে বিভ্রম আমাকে পাকড়াও করেছিল তাতে প্রথমত তো আমি একচোট হাসলুম ; কিন্তু যতোই দেখতে থাকলুম ততোই তার ম্যাজিক বাড়তে লাগলো, চতুর বাস্তবতায় জীবন্ত ও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগলো। যে মুহূর্ত থেকে আমার মাথায় বন্দি থাকার ধারণা চেপে বসল, আমি মানতে বাধ্য, যে নানারকম আহ্লাদ আমি চারিদিক এবং ওপর থেকে পাচ্ছিলুম তাতে আর গুরুতরভাবে বাধা দিলো না। আমি নিজের সম্পর্কে ভাবতে লাগলুম যে আমি দীর্ঘকাল যাবত কারারুদ্ধ, হয়তো হাজার বছরের জন্য, এই মহার্ঘ খাঁচায়, পরীদের এই চারণভূমিতে, মনোমুগ্ধকর দিগন্তের মাঝে। আমি কল্পনা করলুম আমি ‘ঘুমন্ত সুন্দরী’ হয়ে গেছি ; স্বপ্ন দেখলুম প্রায়শ্চিত্তের যা আমাকে ভোগ করতে হবে, আগামী উত্তরণের জন্য। আমার মাথার ওপর ডানা ঝাপটাচ্ছিল গ্রীষ্মমণ্ডলের চমৎকার পাখির দল, আর আমার কান যখন শুনতে পেলো প্রধান রাস্তায় বহুদূর হেঁটে যাওয়া ঘোড়ারদের গলার ছোটো ঘণ্টার শব্দ, দুটি ইন্দ্রিয় একত্রিত হয়ে একটি মাত্র ধারণায় তাদের প্রতীতিকে মিশিয়ে ফেললো, আমার মনে হল রহস্যময় বেহায়া মন্ত্রোচ্চারণ করছে পাখির দল ; আমি কল্পনা করলুম যে পাখিগুলো ধাতব কন্ঠে গান গাইছে। প্রত্যক্ষরূপে তারা আমার সঙ্গে কথা বলছিল, আর আমার বন্দিদশা নিয়ে স্তবগান করছিল। তিড়িং-নাচিয়ে বাঁদরেরা, ভাড়ের মতন দেখতে বনদেবতারা এই বন্দির দশা দেখে, যে নড়াচড়া করতে অপারগ, নিজেদের মধ্যে হইহুল্লোড় করছিল ; তবু পুরাণের সব কয়টি দেবী-দেবতারা আমার দিকে মনোরম হাসিমুখে তাকাচ্ছিল, যেন আমাকে ধৈর্য ধরে উৎসাহিত করছিল যাতে এই ডাকিনি-প্রকোপ সহ্য করতে পারি, আর ওনাদের চোখগুলো চোখের পাতার কোনায় আটকে ছিল যাতে আমাকে কোনঠাশা করা যায়। আমি এই নির্ণয়ে পৌঁছোলুম যে যদি আগেকার কালের কোনো দোষ, যা আমিও জানি না, এই সাময়িক শাস্তিকে জরুরি করে তুলেছিল, আমি তবুও এক উপচে-পড়া শুভত্বে বিশ্বাস করতে পারছিলুম, যা কিনা, আমাকে বুদ্ধিমান কার্যধারায় নিপাতিত করলেও, আমাদের যৌবনের লঘুমস্তিষ্ক আনন্দের চেয়ে আমাকে সত্যকার আনন্দ দেবে। দেখছেন তো যে আমার স্বপ্নে নৈতিক বিবেচনা অনুপস্হিত ছিল না ; কিন্তু স্বীকার করছি যে এই সমস্ত চমৎকার আদল-আদরা আর রঙবাহার পর্যবেক্ষণ করার আনন্দ এবং নিজেকে এক অদ্ভুত নাটকের কেন্দ্র মনে করার ভাবনা আমার অন্যান্য চিন্তাকে অহরহ নিবিষ্ট করে ফেলছিল। এটা দীর্ঘক্ষণ স্হায়ী ছিল, অনেক ক্ষণ। সকাল পর্যন্ত ছিল কি ? আমি ঠিক জানি না। হঠাৎই আমি দেখলুম সকাল বেলাকার সূর্য আমার ঘরে স্নান করছে। আমার এক প্রাণবন্ত বিস্ময়বিমূঢ়তার অভিজ্ঞতা হলো, আর আমি যেটুকু গড়ে ফেলতে পেরেছি, স্মৃতির যাবতীয় প্রয়াস সত্তেও, আমি কখনও নিজেকে নিশ্চিন্ত করতে পারিনি যে আমি ঘুমিয়েছিলুম নাকি ধৈর্যসহকারে এক সুস্বাদু অনিদ্রায় ভুগেছিলুম। এক মুহূর্ত আগে, রাত ; এখন, দিন। আর তবু আমি বহুক্ষণ সময় কাটিয়েছিলুম ; ওহ, অনেকক্ষণ ! সময়ের প্রতীতি, কিংবা বলা যায় নিয়মানুগ সময়, বাতিল করে দেবার কারণে, সমস্ত রাত আমার চিন্তার অজস্রতা দিয়ে কেবল পরিমাপযোগ্য ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমার মনে হয়েছিল এতো দীর্ঘকালীন ক্ষণ, এও মনে হয়েছিল যে তা কেবল কয়েক সেকেণ্ড বজায় ছিল ; এমনকি হয়তো তা আদপে অনন্তকালে ঘটেইনি।


     

    “আমি আপনাকে আমার ক্লান্তির বিষয়ে কিছু বলিনি ; তা ছিল অপরিমেয়। আমি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলুম, লোকে বলে যে কবিদের আর সৃজনশীল শিল্পীদের উৎসাহের সঙ্গে তার মিল আছে, যদিও আমি চিরকাল বিশ্বাস করেছি যে যাঁদের ওপর আমাদের আলোড়িত করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, নিশ্চয়ই তাঁরা শান্ত ধাতের মানুষ হবেন। কিন্তু কবিদের সৃজনশীল-উন্মাদনা যদি আমার জন্য যোগাড় করা এক চামচ হ্যাশিস মেঠাইয়ের সমান হয়, আমি ভাবতে বাধ্য হচ্ছি যে কবিরা জনগণের খরচে যে আনন্দ বহন করেন, আর তা এক ধরণের ভালো-থাকার বাইরের ব্যাপার নয়, তাহলে আমি অন্তত নিজেকে নিজের আশ্রয়ে রয়েছি বলেই মনে করব, মানে আমার বৌদ্ধিক আশ্রয়ে ; অর্থাৎ, বাস্তব জীবনে।”


     

    মহিলাটির বক্তব্য, স্পষ্টত যুক্তিসঙ্গত ; কিন্তু ওনার গল্প থেকে আমরা কয়েকটা জরুরি তথ্য নেবো, যা হ্যাশিসের উদ্রেক করা প্রধান অনুভূতিগুলোর কথা পুরো করবে।


     

    উনি বলছেন রাতের ভোজের সঙ্গে সঠিক সময়ে আনন্দের আগমনের কথা ; এক মুহূর্তে যখন সাময়িক উপশম, চূড়ান্ততার ভানের জন্য সাময়িক, তাঁকে বাস্তব জগতে ফিরে যাবার অনুমতি দিলো। সত্যিই, যেমন আমি বলেছি, সাময়িক বিরতি এবং প্রতারণাময় শান্তি ঘটে, আর হ্যাশিসের নেশা সঙ্গে আনে উদারসর্বস্ব ক্ষুধা, এবং প্রায় সব সময়ের প্রচণ্ড তৃষ্ণা। কেবল সন্ধ্যার খাওয়া বা রাতের ভোজ, স্হায়ী আরাম আনার বদলে, শুরু করে নতুন অভিগ্রহ, যে ঘুর্নিময় সঙ্কটের অভিযোগ মহিলা করছেন, এবং যার পরে ঘটতে থেকেছে একের পর এক জাদুপূর্ণ অল্প আতঙ্ক মেশানো দৃষ্টিপ্রতিভা, যাতে উনি আত্মসমর্পণ করলেন, জগতের সেরা অনুগ্রহের কোলে নিজেকে সোপর্দ করে। আমরা যে স্বৈরাচারী ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা বলি তা প্রচুর সমস্যা ছাড়া নিরীক্ষা করা যায় না। কেননা লোকটা নিজেই নিজেকে এমন বস্তুজগতের ঊর্ধে মনে করে যে, কিংবা বলা যায় লোকটা নেশাব এতো আচ্ছন্ন হয়ে যায়, যে একটা বোতল বা কাঁটাচামচ তুলতেও তার সাহসের দীর্ঘ সময় লাগবে। খাবার হজম করার সঙ্কটও বেশ উদ্দাম ; তার বিরুদ্ধে লড়া অসম্ভব। এবং এই স্হিতি যদি দীর্ঘক্ষণ চলে তাহলে তাকে সমর্থন করা যায় না, আর যদি তার জায়গায় নেশার আরেকটা দমক তাড়াতাড়ি দেখা না দ্যায়, যা উপরোক্ত ক্ষেত্রে অসাধারণ ভিশান, মনোরমভাবে আতঙ্কিত স্হিতির মাধ্যমে বর্ণিত, তা একই সঙ্গে সান্তনায় পরিপূর্ণ। এই নতুন স্হিতিকে প্রাচ্যের লোকেরা বলে ‘কায়েফ’। স্হিতিটা আর ঝড়ের ঘুর্ণি নয় ; তা সমাহিত পরম সুখের প্রশান্তি, এক মহিমান্বিত সমর্পণের। বহুক্ষণ যাবত তুমি তোমার নিজের মালিক ছিলে না ; কিন্তু তা নিয়ে তুমি নিজেকে ব্যতিব্যস্ত করো না। ব্যথা, এবং সময়ের বোধ, লোপাট হয়ে গেছে ; কিংবা যদি তারা উঁকি মারার সাহস দেখায়, তা কেবল প্রধান অনুভূতি দিয়ে পালটানো, আর তারা তখন, তাদের সাধারণ প্রকোপের তুলনায়, কাব্যিক বিষাদ। গদ্যের ক্ষোভ নয়।


     

    কিন্তু সর্বোপরি বলা যাক যে এই মহিলার বর্ণনায় ( এবং সেকারণেই আমি ওনার বক্তব্যের মাধ্যমে উপস্হাপন করেছি ) হ্যালুসিনেশানটা জারজ, আর তার প্রকাশ ঘটছে বহির্জগতের বস্তুদের উপস্হিতির দরুন। আত্মা তো কেবল আয়না যাতে পরিবেশ প্রতিফলিত হচ্ছে, অদ্ভুতভাবে পরিবর্তিত। তারপর, আবার, আমরা দেখছি ঢুকে পড়ছে একটা ব্যাপার যাকে আমি বলব নৈতিক হ্যালুশিনেশান ; রুগি মনে করছেন যে তিনি কিঞ্চিদধিক প্রায়শ্চিত্তে নিপাতিত ; কিন্তু নারীর মেজাজ, যার বিশ্লেষণ করা মনানসই হবে না, হ্যালুশিনেশানের অদ্ভুত ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যকে নজর দিতে পারল না। অলিমপাসের দেবতাদের দয়াময় মুখাবয়বকে কাব্যিক করে তোলা হয় হ্যাশিসের পালিশের দ্বারা। আমি বলব না যে এই মহিলা অনুশোচনার আঁচল ছুঁতে পেরেছেন, কিন্তু ওনার ভাবনাচিন্তা, মুহূর্তের জন্য বিষাদের দিকে মোড় নিয়েছিল এবং গতানুশোচনা বেশ তাড়াতাড়ি আশার রঙে রাঙিয়ে উঠেছিল। এই পর্যবেক্ষণ আমরা আবার বিবেচনা করার সুযোগ পাবো।


     

    উনি সকালবেলাকার ক্লান্তির কথা বলছেন ল সত্যি বলতে কি, এটা বিরাট ব্যাপার। কিন্তু তা তক্ষুনি দেখা দেয়নি, আর যখন তুমি তার অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছ তুমি তা অবাক না হয়ে দিচ্ছ না : কেননা প্রথমে তুমি সত্যিই নিশ্চিন্ত হয়েছ যে তোমার জীবনের দিগন্তে এক নতুন দিন দেখা দিয়েছে, তুমি শুভত্বের অসাধারণ অনুভূতির অভিজ্ঞতা পাচ্ছ ; মনে হচ্ছে তুমি আত্মার চমৎকার ভারহীনতা উপভোগ করছ। কিন্তু তুমি উঠে নিজের পায়ে দাঁড়াবার আগেই নেশার একটা ভুলে যাওয়া টুকরো তোমাকে অনুসরণ করে পেছনে টেনে নিচ্ছে ; এটা তোমার সাম্প্রতিক ক্রীতদাসত্বের নিশানচিহ্ণ। তোমার দুর্বল পা তোমাকে সাবধান করে দেবে, আর তুমি প্রতিমুহুর্তে ভেঙে টুকরো হবার ভয়ে আতঙ্কিত হবে, যেন তুমি পোর্সিলিন দিয়ে গড়া। এক বিস্ময়কর অবসাদের স্নিগ্ধতা -- এমন অনেকে আছেন যাঁরা ভান করেন যে এতে চারুতার অভাব নেই -- তোমার আত্মাকে দখল করে, আর ছড়িয়ে পড়ে তোমার কর্মক্ষমতা জুড়ে, যেমনভাবে কুয়াশা ছড়িয়ে পড়ে কোনও তৃণভূমিতে। তাহলে, তুমি মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য, সেখানে আটক, কাজ করতে অক্ষম, ক্রিয়াহীন আর তেজোময়তা-বর্জিত। এটা অপবিত্র অপব্যয়িতার শাস্তি ; তুমি তোমার স্নায়বিক তেজ খুইয়েছো। তুমি তোমার ব্যক্তিত্বকে স্বর্গের চারটি বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছো -- আর এখন, কীই বা হবে আবার কষ্ট করে তাতে নিবিষ্ট হয়ে !


     

    চতুর্থ অধ্যায়

    মানবেশ্বর

    বালকসুলম মাথার ধোঁয়া থেকে জন্মানো এই সমস্ত ভোজবাজি, বড়ো-বড়ো পুতুলনাচ এখন একপাশে সরিয়ে রাখার সময় এসেছে। আমাদের কি আরও গুরুতর ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে হবে না -- লোকজনের মতামতের পরিবর্তন, এবং, এক কথায়, হ্যাশিসের নিয়মনিষ্ঠা সম্পর্কে?


     

    এখন পর্যন্ত আমি নেশা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন দিয়েছি ; আমি সীমাবদ্ধ থেকেছি নেশার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর লক্ষণ নিয়ে। কিন্তু যা গুরুত্বপূর্ণ, আমার মনে হয়, আধ্যাত্মিক মানসিকতার মানুষের জন্য, মানুষের যে অংশটা আধ্যাত্মিক তার ওপর এই বিষের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে পরিচয় ; অর্থাৎ, তার অভ্যাসগত ভাবপ্রবণতা এবং তার নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর বৃদ্ধি, বিকৃতি ও অতিরঞ্জন, যা তাদের উপস্হাপন করে, বিরল আবহে, তাদের একটি সত্যকার প্রতিসরণ।


     

    যে লোকটা দীর্ঘকালের জন্য নিজেকে আফিম বা হ্যাশিসের নেশায় ছেড়ে দেবার পর, হয়ে উঠেছে, অভ্যাসের দাসত্বের দরুণ দুর্বল, তাকে পেতে হবে বাঁধন কেটে বেরোনোর কর্মশক্তি, তাকে আমার মনে হয় ফেরারি কয়েদির মতন। লোকটা আমাকে তার প্রতি অনুরক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে, বিশেষ করে সেই সাবধানী লোকগুলোর তুলনায় যারা কখনও অধঃপতিত হয়নি, সব সময় প্রলোভন এড়াতে যত্নশীল থেকেছে। ইংরেজরা, আফিমখোরদের বিষয়ে আলোচনার সময়ে, প্রায়ই এমন সমস্ত শব্দ ব্যবহার করে যেগুলো অত্যন্ত কঠোর মনে হবে সেই সমস্ত নিরীহ লোকেদের কাছে যারা অধঃপতনের আতঙ্ক সম্পর্কে কিছুই জানে না -- ‘শৃঙ্খলিত’,

    ‘পায়ে বেড়ি পরানো’, ‘ক্রীতদাসত্ব’ ইত্যাদি। শৃঙ্খল, সত্যি বলতে, এর সঙ্গে যদি তুলনা করতে হয়, কর্তব্যের শৃঙ্খলতা, বেপরোয়া প্রেমের শৃঙ্খল -- মাকড়সার লুতাতন্তু কিংবা পাতলা কাপড়ের বুনানি ছাড়া আর কিছুই নয়।


     

    মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের অপপ্রীতিকর বিয়ে ! “আফিমের খাঁচায় আমি কয়েদি ক্রীতদাস হয়ে গিয়েছিলুম, আর আমার শ্রম ও আমার ব্যবস্হা স্বপ্নের রঙে রাঙিয়ে উঠেছিল”, লিজিয়ার স্বামী বলেছিল। কিন্তু কতোগুলো বিস্ময়কর অনুচ্ছেদে এডগার পো, এই অতুলনীয় কবি, এই দার্শনিক যাঁর বিরোধিতা করা হয়নি, যাঁর উদ্ধৃতি, যখনই আত্মার রহস্যময় গোলমালের প্রসঙ্গ উঠবে, দেয়া জরুরি, আফিমের অন্ধকার আর আঁকড়ে-ধরা উজ্বল দীপ্তির কথা বর্ণনা করে গেছেন ! আলোকময়ী বেরেনিসের প্রেমিক ইগোয়াস, অধিবিদ্যায় পণ্ডিত মানুষ, নিজের মৌলিক মানসিক শক্তির পরিবর্তনের কথা বলেন, যা তাঁকে মামুলি ঘটনারও অস্বাভাবিক ও দানবিক মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে।


     

    “দীর্ঘ ক্লান্তিহীন সময় গভীর চিন্তায় মগ্ন থেকে, কোনো বইয়ের মার্জিন অথবা হরফের অপ্রয়োজনীয় নকশায় আমার আগ্রহ কেন্দ্রিত ; গ্রীষ্ম-দিনের বেশিক্ষণ সময়, মেঝের ওপরে কিংবা দেয়াল-ঢাকা পর্দায় মিহি বেঁকে-থাকা ছায়ায় ডুবে থাকা ; সারা রাতের জন্য আমার নিজেকে হারিয়ে ফেলা, বাতির শিখার কিংবা আগুনের স্ফূলিঙ্গের দিকে একঠায় তাকিয়ে থাকা ; সারাদিন ফুলের সুগন্ধে স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকা ; কোনো প্রচলিত শব্দকে একঘেয়ে বারবার বলে, যতক্ষণ না শব্দ, প্রতিবার বলার কারণে, মনের ভেতরের কোনো ধারণাকে অর্থহীন করে দিচ্ছে ততোক্ষন ; গতিবিধির সমস্ত ধারণা কিংবা দৈহিক অস্তিত্বের সংবেদন হারিয়ে ফেলা, শরীরের চরম নিশ্চলতায় দীর্ঘক্ষণ ও একগুঁয়েভাবে যত্নশীল হওয়া : এগুলোই ছিল কয়েকটা সাধারণ আর ন্যূনতম ক্ষতিকারক অস্পষ্টতা, যা মানসিক ক্ষমতার এক বিশেষ অবস্হার ফলে প্রণোদিত, যদিও একেবারে নিরুপম নয়, কিন্তু তা নিঃসন্দেহে বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা করার চেষ্টার প্রতি দৃঢ় অবজ্ঞা। ”


     

    এবং স্নায়ুচাপে পীড়িত অগাস্টাস বেদলো, যিনি প্রতিদিন সকালে হাঁটতে যাবার আগে নিজের আফিমের খোরাক খেয়ে বেরোন, বলেছেন যে এই দৈনিক বিষপান থেকে তিনি যে অন্যতম পুরস্কার পেয়েছেন তা হল মহাআগ্রহে সমস্তকিছুকে নিজের অন্তরে নিয়ে নেওয়া, এমনকি অত্যন্ত মামুলি ব্যাপারও।


     

    “ইতিমধ্যে মরফিন তার পরিচিত প্রভাব আরম্ভ করে দিয়েছিল -- তা হল বহির্জগতকে তীব্র আগ্রহে আত্মস্হ করা। কোনো পাতার কাঁপুনি -- ঘাসের শিসের রঙে -- ছাতিম পাতার আকারে -- একটা মৌমাছির গুঞ্জনে -- এক ফোঁটা শিশিরের আলোকণায় -- বাতাসের শ্বাসে -- বনানী থেকে আসা মৃদু গন্ধগুলোতে -- নিয়ে এলো সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের ইশারা -- উচ্ছসিত এবং শৃঙ্খলাহীন চিন্তার এক আনন্দময় ও চিত্রবিচিত্র সারি। ”


     

    এই ভাবেই নিজেকে ব্যক্ত করেছেন, কাঠপুতুলদের মুখ দিয়ে, ভয়ঙ্করতার গুরু, রহস্যের রাজকুমার। আফিমের এই দুটি বৈশিষ্ট্য হ্যাশিসের ক্ষেত্রে হুবহু প্রযোজ্য। একটির ক্ষেত্রে, যেমন অপরটির ক্ষেত্রে, বুদ্ধিমত্তা, যা আগে স্বাধীন ছিল, ক্রীতদাস হয়ে যায় ; কিন্তু ‘মহাকাব্যিক’ শব্দটি, যা বাইরের জগতের প্ররোচিত ও নির্দেশিত চিন্তার ধারাপ্রবাহ ও পরিবেশের দুর্ঘটনা দ্বারা সুন্দরভাবে সংজ্ঞায়িত, বলতে গেলে সত্য এবং হ্যাশিসের নেশার ক্ষেত্রে আরও বেশি করাল। এক্ষেত্রে যুক্তিবোধের ক্ষমতা কেবল ঢেউয়ের মতন, প্রবাহের দয়ার ওপর নির্ভরশীল এবং চিন্তার শৃঙ্খলা অনেক গতিবেগসম্পন্ন ও বেশি ‘মহাকাব্যিক’; অর্থাৎ, স্পষ্ট করে আমি বলতে চাই যে হ্যাশিস, তার তাৎক্ষণিক ক্রিয়ায়, আফিমের থেকে অনেক বেশি অনুভূতি উৎপন্নকারী, রোজকার জীবনযাপনে বড়োই প্রতিকূল ; এক কথায়, বিপর্যস্তকারী। আমি জানি না টানা দশ বছর হ্যাশিসের নেশা টানা দশ বছর আফিমের নেশার সমান অসুখগুলো সঙ্গে আনবে কিনা ; আমি বলতে চাইছি, খানিক সময়ের জন্য, সেবনের পরের দিনের জন্য, হ্যাশিসের ফলাফল মারাত্মক হয়। একটা হলো মিঠে কথার মায়াবিনী ; অন্যটা তেড়ে আসা রাক্ষস।


     

    এই শেষ পর্বে আমি সংজ্ঞায়িত ও বিশ্লেষণ করতে চাই এই বিপজ্জনক এবং সুস্বাদু অভ্যাসের কারণে যে নৈতিক সর্বনাশ ঘটে সেই সব কথা ; এই সর্বনাশ এতো ব্যাপক, এক বিপদ যা প্রগাঢ়, যে যারা এর সঙ্গে লড়ে ফিরেছে কিন্তু যৎসামান্য আহত, তাদের দেখে আমার মনে হয় সেই নায়কেরা যারা প্রোটিয়াসের বহুরুপী গুহা থেকে পালাতে পেরেছে, কিংবা অরফিয়াসের মতন, নরকের বিজেতা। তুমি চাইলে, মনে করতে পারো, এই ধরণের ভাষা বাড়িয়ে বলা রূপক, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আমি জোর দিয়ে বলব যে এই উত্তেজক বিষগুলোকে আমার মনে হয় কেবল এক রকমের ভয়ঙ্কর এবং নিশ্চিত উপায় নয় যা অন্ধকারের মায়াপুরুষ বরবাদ মানবদের বন্দি করার জন্য প্রয়োগ করে, বরং তার নিখুঁত অবতারদের অন্যতম।


     

    এবার, আমার কাজ কমিয়ে এনে বিশ্লেষণকে স্পষ্ট করার খাতিরে, ছড়ানো-ছেটানো গল্প সংগ্রহ করার পরিবর্তে, আমি পর্যবেক্ষণের প্রাচুর্যের মাঝে একটিমাত্র পুতুলকে পোশাক পরাবো। সেক্ষেত্রে আমাকে আবিষ্কার করতে হবে একটি আত্মা যা আমার উদ্দেশ্যের সঙ্গে খাপ খাবে। তাঁর ‘স্বীকৃতি’ বইতে ডি কুইনসি সঠিক বলেছিলেন যে আফিম, মানুষকে ঘুম পাড়াবার বদলে, তাকে উত্তেজিত করে ; কিন্তু তাকে তার স্বাভাবিক পথে উত্তেজিত করে, তাই আফিমের বিস্ময়গুলোকে বিচার করার জন্য কোনো বলদ বিক্রেতার ওপরে তা চেষ্টা করা বাতুলতা হবে, কেননা সেরকম এক স্বপ্ন হবে গবাদি পশুর আর ঘাসের। আমি একজন হ্যাশিসের নেশাগ্রস্ত গরুমোষ প্রজননকারীর জগদ্দল কল্পনা বর্ণনা করতে যাচ্ছি না। কেই বা তা আনন্দে পড়বে, কিংবা পড়বার অনুমতি দেবে ? আমার বিষয়কে আদর্শ হিসাবে উপস্হাপনের জন্য আমাকে যাবতীয় রশ্মিকে একটিমাত্র বৃত্তে কেন্দ্রিত করে সমবর্তিত করতে হবে ; আর যে বিয়োগান্তক বৃত্তে আমি তাদের জড়ো করব তা হলো, যেমন আগেই বলেছি, আমার নিজের পছন্দের একজন মানুষ ; অনেকটা আঠারো শতকে যাকে বলা হতো ‘সংবেদনশীল মানুষ’ ( homme sensible ), যাকে রোমান্টিক গোষ্ঠি নাম দিয়েছিল ‘ভুল বোঝা মানুষ’ ( homme incompris ), আর গৃহস্হ ও বুর্জোয়ারা সাধারণত বলত “মৌলিক।” এই ধরণের নেশায় মাতাল হবার জন্য অনুকূল হলো অর্ধেক স্নায়ুচাপে পীড়িত, অর্ধেক খিটখিটে মনগঠন। এর সঙ্গে যোগ করা যাক এক শিক্ষিত মন, আদরা আর রঙের সাথে পরিচিত, একটি কোমল হৃদয়, দুর্ভাগ্যের দরুন বিষাদগ্রস্ত, কিন্তু তবু আবার যুবক করে তোলা যেতে পারে তাকে ; তোমরা অনুমতি দিলে, আমরা বিগতকালের ভুলগুলো স্বীকার করে নেবো, এবং, এর দরুন সহজে উত্তেজিত হয় এমন, ইতিবাচক পশ্চাত্তাপ যদি নাও হয়, অন্তত বাজেভাবে খরচ করে ফেলা ও সীমালঙ্ঘিত সময়ের কারণে অনুতাপ করবে।

    অধিবিদ্যায় আগ্রহ, মানব নিয়তি সম্পর্কিত দর্শনের বিভিন্ন ধরনের অনুমানের সঙ্গে পরিচয়, নিঃসন্দেহে অপ্রয়োজনীয় শর্ত হবে না ; এবং, তাছাড়া, সততাকে গ্রহণ করা, বিমূর্ত সততাকে, সামাজিক হোক বা নিগূঢ়, যা তাবৎ বইতে রচিত যার ওপর নির্ভর করে আধুনিক বালখিল্য, যার যাকে মনে করা হয় লক্ষে পৌঁছোবার জন্য আত্মার সর্বোচ্চ শিখর। এই সমস্তের সঙ্গে যদি যোগ করা হয় ইন্দ্রিয়ের পরিশোধন -- আর আমি যদি এটা উল্লেখ করতে ভুলে গিয়ে থাকি তাহলে বুঝতে হবে আমি একে মনে করেছিলুম বাহুল্যপূর্ণ -- আমি মনে করি যে আমি সাধারণ উপাদান সংগ্রহ করতে পেরেছি যা ‘সংবেদনশীল মানুষদের’ মধ্যে আখছার পাওয়া যায় এবং যাকে বলা যেতে পারে মৌলিকতার সর্বনিম্ন পরিমাপ। এবার দেখা যাক এই ব্যক্তিতার কী ঘটবে যদি তাকে হ্যাশিসের চূড়ান্ত নেশায় ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মানুষের কল্পনার শেষ এবং অতীব চমৎকার পান্হশালা পর্যন্ত এর ক্রমবৃদ্ধি অনুসরণ করা যাক ; ব্যক্তিটির নিজের দিব্যতায় বিশ্বাসের সীমা পর্যন্ত যাওয়া যাক।


     

    যদি তুমি এইরকম এক আত্মা হও আদরা এবং রঙ সম্পর্কে তোমার স্বভাবগত ভালোবাসা শুরু থেকেই তোমার প্রাথমিক স্তরের নেশায় পাবে বিশাল এক ভোজসভা। রঙগুলো অপরিচিত তেজোময়তায় আক্রান্ত হবে আর তোমার মস্তিষ্কের ভেতরে বিজয়ের কেতন উড়িয়ে পরস্পরকে আচ্ছন্ন করবে। তারা সূক্ষ্ম, মামুলি, কিংবা খারাপ হলেও, ছাদে আঁকা ছবিগুলো প্রাণশক্তির পোশাক পরে অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠবে। পান্হশালার দেয়ালগুলোয় যে খসখসে কাগজ সাঁটা তা অসাধারণ পরিদৃশ্যের মতন নিজেদের মেলে ধরবে। ঝিকমিকে মাংসল পরিরা আকাশ ও সাগরের চেয়ে গভীর ও অনাবিল আয়ত চোখে তোমার দিকে তাকাবে। বহু-প্রাচীন চরিত্রেরা, যাজক কিংবা সেনার পোশাকে, একটিমাত্র চাউনি মেলে, তোমার সঙ্গে গোপন কথাবার্তা আদান-প্রদান করবে। সর্পিল রেখেগুলো নিঃসন্দেহে বোধগম্য একটি ভাষা যেখানে তুমি পড়তে পারবে তাদের আত্মার দুঃখ ও আবেগ। তা সত্তেও, এক রহস্যময় অথচ সাময়িক মানসিক স্হিতি আপনা থেকে গড়ে উঠবে ; জীবনের নিগূঢ়তা, বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত, দৃষ্টির সামনে সুস্পষ্ট উদয় হবে, তা যতোই স্বাভাবিক ও মামুলি হোক না কেন, চোখের সামনেই রয়ে যাবে ; যে বস্তুগুলো প্রথমে দেখা দেবে সেগুলো বার্তাবহ প্রতীক। ফুরিয়ার এবং সোয়েডেনবোর্গ, প্রথমজন তাঁর উপমান দিয়ে, এবং দ্বিতীয়জন সংগতি দিয়ে, তোমার চোখের সামনে যাকিছু ভেষজ ও জান্তব দেখা যায়, তাতে নিজেদের মূর্ত করেছেন, এবং কন্ঠস্বরের দ্বারা স্পর্শের পরিবর্তে তাঁরা তোমাকে আঙ্গিক ও রঙে উদ্বুদ্ধ করেন। এই রূপকের বোধ তোমার অন্তরে যে অনুপাত সৃষ্টি করে তা তুমি নিজেই জানো না। প্রসঙ্গক্রমে আমরা বলব যে রূপক, শিল্পের এতো আধ্যাত্মিক অংশ, চিত্রকরদের আনাড়িপনার ফলে যাকে আমরা হেয় জ্ঞান করতে অভ্যস্ত, অথচ যা সত্যিই কবিতার সবচেয়ে স্বাভাবিক ও আদিম আঙ্গিক, তার দৈব অধিকার ফিরে পায় নেশার দ্বারা আলোকিত বুদ্ধিমত্তায়। তখন হ্যাশিস ছড়িয়ে জীবনের সর্বত্র ; বলা যায়, ম্যাজিক পালিশের মতন। তার অসামান্যতা আলোকিত হয় রঙের সুশীল আবছায়ায় ; অসমতল উপত্যকা, ধাবমান দিগন্ত, শহরগুলোর পরিপ্রেক্ষণ যা শাদা হয়ে উঠেছে ঝড়ের শবানুগ বিবর্ণতায় কিংবা সূর্যাস্তের কেন্দ্রিত ব্যকুলতায় উজ্বল ; শূন্য-পরিসরের রসাতল, সময়ের অতলের রূপক ; নৃত্য, অভিনেতাদের অঙ্গভঙ্গী অথবা সংলাপ, যদি তোমি নাট্যালয়ে থাকো ; তোমার চোখ যদি কোনো বইতে পড়ে তাহলে প্রথম প্রবাদ ; এক কথায়, সমস্তকিছু ; অস্তিত্বের বিশ্বজনীনতা নতুন গৌরব নিয়ে তোমার সামনে এসে দাঁড়ায় যা ততোক্ষণ পর্যন্ত ছিল অজানিত। ব্যাকরণ, শুকনো ব্যাকরণ নিজেই, হয়ে দাঁড়ায় “আহ্বানের অশুদ্ধ নাম”-এর বই। শব্দেরা আবার উঠে দাঁড়ায়, মাংস ও হাড়ের পোশাকে ; বিশেষ্য, তার অটল মহিমায় ; রঙ আর ঝিলমিলে জালে মোড়া বিশেষণদের স্বচ্ছ আলখাল্লা ; এবং ক্রিয়াপদ, গতির প্রধান দেবদূত যা বাক্যটিকে দোল খাওয়ানো আরম্ভ করে।

    সঙ্গীত, অলসদের কিংবা জ্ঞানী আত্মাদের প্রিয় ভাষা, যারা তাদের কাজ-কারবারকে বদলে-বদলে জিরিয়ে নিতে চায়, তোমাকে তোমার কথাই বলে, তোমার জীবনের কবিতা আবৃত্তি করে শোনায় ; তা তোমার অন্তরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে, এবং তুমি তাতে মুর্ছিত হয়ে পড়ো। এ তোমার কামনার কথা বলে, কেবল অস্পষ্ট, অসংজ্ঞায়িত উপায়ে নয়, যেমনটা অপেরায় তোমার অমনযোগী সন্ধ্যায় করে, কিন্তু বেশ সারগর্ভ ও ইতিবাচকভাবে, প্রতিটি ঝঙ্কার একটি চলনকে চিহ্ণিত করে যাকে তোমার আত্মা চেনে, স্বরলিপির প্রতিটি স্বর পরিবর্তিত হয়ে যায় শব্দে, এবং সম্পূর্ণ কবিতাটি তোমার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে যেন একটা প্রাণপ্রাপ্ত অভিধান।


     

    এটা অনুমান করা উচিত হবে না যে এই ব্যাপারগুলো একে অপরের ওপরে উদ্দীপনায় তড়িঘড়ি পড়ে যায়, বাস্তবতার কলরবপূর্ণ স্বরাঘাত ও বহির্জীবনের বিশৃঙ্খলাসহ ; অন্তরজগতের চোখ সমস্তকিছুকে পরিবর্তিত করে, এবং সবাইকে সৌন্দর্যের অভিনন্দন জানায় যা এর নিজের নেই, যাতে সত্যকার আনন্দের যোগ্যতাসম্পন্ন হয়। এই জরুরি ইন্দ্রিয়জ ও সংবেদনের পর্বের সঙ্গে তুলনীয় অনাবিল জলের প্রেম, স্হির বা স্রোতোময়, যা আশ্চর্যজনকভাবে কোনো কোনো শিল্পীর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের নেশায় অভিব্যক্ত হয়। আয়না হয়ে উঠেছে এই স্বপ্নবিহ্বলতার অজুহাত, যা অনেকটা গলায় শুকিয়ে যাওয়া আত্মার তৃষ্ণা ও দেহের তৃষ্ণার মিশেল, এবং যে বিষয়ে আমি আগেই বলেছি। বইতে থাকা জল, খেলতে থাকা জল; সঙ্গীতময় ঝর্ণা ; সমুদ্রের অপার নীল ; সবই বর্ণনার অতীত গড়িয়ে যায়, গান গায়, লাফায়। মোহিনীর মতন দুই বাহু এগিয়ে দ্যায় জল ; এবং যদিও আমি হ্যাশিস-সৃষ্ট উন্মাদ হইচইতে বিশ্বাস করি না, আমি জোর দিয়ে বলতে চাই না যে শূন্য-পরিসর ও স্ফটিকে আকর্যিত মানুষের পক্ষে কিঞ্চিদধিক অনাবিল আবর্তের অনুশীলন একেবারেই বিপজ্জনক হবে না, আর উনদাইন জলপরীর গল্পটা যে উৎসাহীদের জীবনে বিয়োগান্তক হবে না তাও নিশ্চয় করে বলতে পারি না।


     

    আমার মনে হয় শূন্য-পরিসর এবং সময়ের বিশাল বৃদ্ধি সম্পর্কে আমি যথেষ্ট বলেছি ; দুটি ধারণা সবসময় মিশ খেয়েছে, সবসময় একে আরেকের সঙ্গে বোনা, কিন্তু সেই সময়ে আত্মা বিষাদ ও ভয়ের মুখোমুখি হয় না। তা বিশেষ বিষণ্ণ আহ্লাদ নিয়ে বহু বছরের ওপারে তাকিয়ে থাকে, এবং অত্যন্ত সাহসিকতায় অনন্তকালীন পরিপ্রেক্ষণে ডুব দ্যায়। তুমি নিশ্চয়ই ভালো করে বুঝতে পেরেছো, আশা করি, যে এই বিকৃত ও স্বৈরাচারী বাড়বাড়ন্ত যাবতীয় সংবেদন এবং ধারণার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমি মনে করি, আমি তুলে ধরতে পেরেছি হিতৈষিতার যথেষ্ট ন্যায্য উদাহরণ। ভালোবাসার ব্যাপারেও এটা সত্য। আমি যেরকম আত্মিক মেজাজের উদ্ভাবন ঘটিয়েছি, সৌন্দর্যের ধারণা স্বাভাবিকভাবেই তাতে বিশাল একটা পরিসরের দখল নিয়ে নেবে। ঐকতান, পংক্তির ভারসাম্য, গতির সূক্ষ্ম সুরপ্রবাহ, যে স্বপ্ন দেখছে তার কাছে দেখা দ্যায় প্রয়োজনীয় হিসাবে, কর্তব্য হিসাবে, কেবল সৃষ্টির তাবৎ অস্তিত্বের জন্য নয়, কিন্তু তার নিজের জন্যও, যে স্বপ্ন দেখছে, যে এই সঙ্কটের সময়ে নিজের মধ্যে আবিষ্কার করে অমর এবং সর্বজনীন ছন্দের এক চমৎকার প্রবণতা। এবং যদি আমাদের গোঁড়া লোকটির ব্যক্তিগত সৌন্দর্যের অভাব থাকে, তাহলে সে মনে করবে যে সে দীর্ঘ সময় যাবত যে দোষ করেছে তা স্বীকার করতে অপারগ, কিংবা নিজেকে মনে করবে যে তার কল্পনায় গড়া জগতের ঐকতানে ও সৌন্দর্যে সে একটি বেসুরো কন্ঠস্বর। চরস সম্পর্কিত কুতর্ক অসংখ্য ও প্রশংসনীয়, প্রথাগতভাবে ইতিবাচকতার দিকে তার ঝোঁক, এবং প্রধান ও প্রভাবশালী ব্যাপার হলো যে তা ইচ্ছাকে উপলব্ধিতে পালটে দিতে পারে। ব্যাপারটা একই, নিঃসন্দেহে, সাধারণ জীবনের বহু ক্ষেত্রে ; কিন্তু এখানে আরও কতো আকুলতা ও তনিমার প্রয়োজন হচ্ছে ! নয়তো, কেমন করেই বা একজন মানুষ যে ঐকতান হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম, যেন সে সৌন্দর্যের যাজক, কেমন করেই বা সে তার নিজেরই তত্বের কলঙ্ক হতে পারে, ব্যতিক্রম হতে পারে ? নৈতিক সৌন্দর্য ও তার ক্ষমতা, গরিমা ও ফুসলিয়ে নেবার গুণ, বাগ্মীতা এবং তার কৃতিত্ব, এই সবকয়টি ধারণা শীঘ্রই নিজেদের উপস্হিত করে যাতে চিন্তাহীন কদর্যতাকে শুধরে নেয়া যায় ; তারপর তারা উদয় হয় সান্ত্বনাদানকারী হিসাবে, এবং সব শেষে এক কাল্পনিক দরবারের যুৎসই সভাসদ, মোসাহেব হিসাবে।


     

    ভালোবাসার বিষয়ে, আমি অনেকের কাছে স্কুল-বালকসুলভ কৌতূহলের কথা শুনেছি, যারা হ্যাশিসের প্রয়োগের সঙ্গে পরিচিত তাদের কাছ থেকে তথ্য যোগাড় করছে, যা কিনা ভালোবাসার নেশা নয়, নিজের স্বাভাবিক স্হিতিতে এতো ক্ষমতাসম্পন্ন, যখন তা অপর নেশাটিতে আবদ্ধ ; সূর্যের ভেতরে এক সূর্য। আমি যাদের বলি বৌদ্ধিক হাঁ-করা, সেই শ্রেনির লোকের মনে এরকম প্রশ্ন জাগে। যে প্রশ্নের লজ্জাজনক অর্ধেক-অর্থের উত্তর খোলাখুলি আলোচনা করা যায় না, আমি পাঠককে বলব প্লিনি পড়তে, যিনি কোথাও গাঁজাপাতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এমনভাবে বলেছেন যে যাতে বিষয়টা নিয়ে বিভ্রমের ঘোর কেটে যায়। তাছাড়া লোকে জানে, যে সমস্ত মাদক তাদের উত্তেজিত করে তা সেবন করলে কন্ঠস্বরের ক্ষয় হলো নেশার সবচেয়ে সাধারণ প্রতিফল যা মানুষ তাদের স্নায়ুর ক্ষেত্রে ঘটায়। এখন, যখন আমরা প্রভাবশীল গুণের বিষয়ে আলোচনা করছি, গতি আর গ্রাহীক্ষমতা, আমি পাঠককে শুধুমাত্র ভেবে দেখতে বলব যে হ্যাশিসের নেশাগ্রস্ত একজন সংবেদনশীল মানুষের কল্পনাকে

    চূড়ান্ত স্তরে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে টের পাওয়া তেমনই সহজ যেমন ঝড়েতে বাতাসের গতির তীব্রতা, আর তার ইন্দ্রিয়গুলো এমনই এক বিন্দুতে নিগূঢ়, যাকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। অতএব এটা বিশ্বাস করা যুক্তিযুক্ত যে আলতো আদর, যতোটা নিষ্পাপ হতে পারে, হ্যাণ্ডশেক, উদাহরণস্বরূপ, আত্মার ও সৌন্দর্যের প্রকৃত স্হিতিকে একশোগুণ ধরে রাখতে পারে, আর হয়তো তাদের পরিচালিত করতে পারে, এবং তাও বেশ দ্রুত, সেই সাময়িক সংজ্ঞাহীনতা পর্যন্ত যাকে আনাড়ি নশ্বররা মনে করে আনন্দের সমাপ্তি ( summum );কিন্তু এটা সংশয়াতীত যে হ্যাশিস জেগে ওঠে এমনই এক কল্পনায় যা নিজেকে কোমল স্মৃতিতে পরিব্যপ্ত করতে অভ্যস্ত, যে অবস্হায় ব্যথা ও আনন্দহীনতা নতুন জেল্লা পায়। মনের এই ধরনের মন্হনক্রিয়ায় এটা কম নিশ্চিত নয় যে তাতে রয়েছে কামনার তীব্র উপাদান ; এবং তাছাড়া, এখানে মন্তব্য করা জরুরি -- আর হ্যাশিসের অনৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই তর্ক যথেষ্ট বলে মনে হয় -- ইশমায়েলাইটদের ( ইশমায়েলাইটদের থেকেই অ্যাসাসিন বা গুপ্তঘাতকদের উৎপত্তি ) একটা একটা উপদল হ্যাশিসের অভিবন্দনা এমন স্তরে নিয়ে গিয়েছিল যে তারা লিঙ্গ-যোনি থেকে বহুদূরে চলে গিয়েছিল ; অর্থাৎ, লিঙ্গের চরম অর্চনায়, নারীপ্রতীকের অর্ধাংশকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে। কিছুই অস্বাভাবিক নয়, প্রতিটি মানুষ যেহেতু ইতিহাসের প্রতীকি প্রতিনিধি, কোনো অশ্লীল বৈধর্ম্য দেখতে পেয়ে, এক দানবিক ধর্ম, মনের মধ্যে জাগ্রত হয় যা ভীরুতার সঙ্গে নারকীয় এক মাদকের দয়ায় আত্মসমপহণ করেছে এবং যা নিজের মৌলিক মানসিক শক্তির অবক্ষয় নিয়ে হাসাহাসি করে।


     

    যেহেতু হ্যাশিসের নেশায় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি মানুষের প্রতি অদ্ভুত সদিচ্ছা, এমনকি অচেনা লোকের প্রতিও, লোকহিতৈষণার একটি প্রজাতি যা ভালোবাসার বদলে পরদুঃখকাতরতায় গড়া ( আর এখানেই শয়তানি আত্মার প্রথম বীজ যা পরবর্তীকালে অসাধারণভাবে বিকশিত হবে তা দেখা দেয় ), কিন্তু যা অন্য কাউকে যন্ত্রণা দেবার ভীতি পর্যন্ত এগোয়, যে কেউ অনুমান করতে পারে যে যা ভালোবাসার পাত্রের ক্ষেত্রে স্হানিক ভাবপ্রবণতা হয়ে দেখা দ্যায়, কিংবা দিয়েছে, হইচইকারীর নৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূজা, অর্চনা, প্রার্থনা, আনন্দের স্বপ্ন, ছিটকে বেরোয় এবং অস্পষ্ট তেজোময়তায় ও অত্যুৎসারিতায় রকেটের মতন উৎসারিত হয়। আতশবাজির মশলা আর রঙবস্তুর মতন, তারা ঝিকমিক করে অন্ধকারে বিলীন হয়ে যায়। এমন কোনোরকম সংবেদনশীল সমন্বয় নেই যাতে হ্যাশিস-গোলামের সূক্ষ্ম ভালোবাসা নিজেকে উপুড় করে দেবে না। রক্ষা করার ইচ্ছা, পিতৃত্বের আকুল ও একনিষ্ঠ অনুভূতি মিশে যেতে পারে অপরাধমূলক কামনার সঙ্গে যা হ্যাশিস সদাসর্বদা জানবে কেমন করে মাফ করে দিতে হয় এবং পাপমুক্ত করতে হয়। ব্যাপারটা আরও প্রসারিত হয়। আমার মনে হয়, অতীতের ভুলগুলো আত্মায় তিক্ত পথচিহ্ণ রেখে যায়, একজন স্বামী অথবা একজন প্রেমিকা স্বাভাবিক পরিস্হিতিতে বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে তার ঝঞ্ঝাময় অতীতের মেঘে ছায়া দিনগুলোর কথা ভাববে ; এই তিক্ত ফলগুলো, হ্যাশিসের নেশাগ্রস্ত থাকার সময়ে, মিষ্টি ফল হয়ে উঠতে পারে। ক্ষমা করে দেবার প্রয়োজন কল্পনাকে আরও চতুর ও আরও মিনতিপূর্ণ করে তোলে, এবং অনুশোচনা স্বয়ং, এই শয়তানি নাটকে, যা নিজেকে দীর্ঘ স্বগতসংলাপে প্রকাশ করে, হৃদয়ের উৎসাহকে প্রাচুর্যে ভরিয়ে প্ররোচিত করতে পারে। হ্যাঁ, অনুশোচনা। সত্যকার দার্শনিক মনে হ্যাশিস নিখুঁত শয়তানি যন্ত্রের মতো মনে হয়, এই কথাটা আমি কি ভুল বলেছিলুম ? অনুশোচনা, আহ্লাদের একমাত্র উপাদান, দ্রুত চাপা পড়ে যায় অনুশোচনার সুস্বাদু প্রত্যাশায় ; এক ধরণের ইন্দ্রিয়পরায়ণ বিশ্লেষণে ; এবং এই বিশ্লেষণ এতো তাৎক্ষনিক যে মানুষ, এই প্রাকৃতিক শয়তান, সোয়েডেনবোর্গের অনুসরণকারীরা যেমন বলেন, বুঝতে পারে না এটা কতো অনৈচ্ছিক, আর কেমন করে, মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে, সে শয়তানের পরিপূর্ণতা লাভ করে। সে তার অনুশোচনাকে প্রশংসা করে, আর নিজেকে করে গৌরবান্বিত, এমনকি যখন সে তার স্বাধীনতা খোয়াতে চলেছে।


     

    তাহলে, আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমার কাল্পনিক মানুষটাকে, যে মন আমি বেছে নিয়েছি, আহ্লাদ এবং প্রশান্তির সেই স্তরে পৌঁছেচে যেখানে সে নিজেকে প্রশংসা করতে বাধ্য। প্রতিটি পরস্পরবিরোধিতা নিজেদের মুছে ফ্যালে ; যাবতীয় দার্শনিক সমস্যা স্পষ্ট হয়ে যায়, অন্তত সেটাই মনে হয় ; আনন্দের জন্য সমস্তকিছুই বস্তুগত ; জীবনের যে প্রাচুর্য সে উপভোগ করে তাকে গর্বান্বিত বোধ করতে উৎসাহ যোগায় ; একটা কন্ঠস্বর তার সঙ্গে কথা বলে ( হায়, তার নিজেরই কন্ঠস্বর ! ) যা তাকে বলে : “এখন তোমার অধিকার জন্মেছে নিজেকে সমস্ত মানুষের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করার। কেউ তোমাকে চেনে না, তুমি যা চিন্তা করো ও যা অনুভব করো তা কেউ বুঝতে পারবে না ; তারা, নিঃসন্দেহে, তোমার অন্তরে জাগরিত কামনাসিক্ত ভালোবাসাকে সমাদর করতে পারবে না। পথচারীর কাছে তুমি অপরিচিত মহারাজা ; যে মহারাজা জীবিত, কিন্তু কেউই টের পায় না সে নিজেই নিজের মহারাজা। কিন্তু তোমার তাতে কীই বা আসে-যায় ? তোমার কি সার্বভৌম অবমাননা নেই, যা আত্মাকে দয়ালু করে তোলে ?”


     

    তুমি হয়তো ভাববে, যে এক সময় থেকে আরেক সময়ে কোনো তোমাকে স্মৃতি কামড়ে ধরবে আর আনন্দকে মাটি করে দেবে। বহির্জগতের কোনো অপছন্দের প্রসঙ্গ অতীতকে জাগিয়ে তোমার মেজাজ খারাপ করে দেবে। অতীতে কতোই বা বোকা আর ইতর কাজকর্ম রয়েছে ! --- চিন্তার মহারাজার পক্ষে যা সত্যিই বেমানান, আর কার বর্মকে তারা নোংরা করে ? বিশ্বাস করো, হ্যাশিস-নেয়া লোকটি এই সমস্ত মানহানিকর ভুতপ্রেতকে সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করবে, এমনকি এই সমস্ত বিরক্তিকর স্মৃতি থেকে সে জানতে পারবে আনন্দ আর গর্বের নতুন উপাদান পাওয়া যায়।


     

    তার যুক্তিতর্কের উদ্ভব এই ভাবেই ঘটবে। ব্যথার প্রাথমিক সংবেদন ফুরিয়ে যাবার পর, সে কৌতূহলী হয়ে যাচাই করে দেখবে তার বর্তমান গৌরবকে কোন কোন স্মৃতি কষ্ট দিয়েছে ; কোন মানসিকতা অমন করে কাজ করতে প্ররোচিত করেছিল ; কোন পরিস্হিতি তাকে তখন ঘিরে রেখেছিল ; এবং সে যদি ঘটনাগুলোয় যথেষ্ট কারণ খুঁজে না পায়, দোষক্ষালনের জন্য না হলেও, অন্তত তার অপরাধবোধকে প্রশমিত করার খাতিরে, এটা মোটেই মনে করা উচিত নয় যে সে পরাজয় স্বীকার করেছে। আমি তার যুক্তিতর্কে উপস্হিত রয়েছি, যেমন করে স্বচ্ছ কাচের তলায় কোনো যন্ত্রের খেলা দেখা যায়। “এই হাস্যকর, ভীতু, কিংবা ইতর কাজ, যার স্মৃতি আমাকে এক মুহূর্তের জন্য বিপর্যস্ত করেছিল, তা আমার সত্যকার ও বাস্তব প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত, এবং যে তেজোময়তায় আমি তাকে ভর্ৎসনা করছি, যে বিচার-বিবেচনার সাহায্যে আমি তাকে বিশ্লেষণ আর জেরা করছি, প্রমাণ করে সততার জন্য আমার উত্তুঙ্গ ও দৈব আগ্রহ। মানবজগতে কতোজন বুদ্ধিমান মানুষই বা পারে নিজেদের বিচার করতে ; নিজেদের ভর্ৎসনা করার মতো যথেষ্ঠ কঠোর ?” এবং সে কেবল নিজেকে ভর্ৎসনাই করছে না, বরং নিজেকে গৌরবান্বিতও করছে ; ভয়ঙ্কর স্মৃতি আদর্শ সততার অভিপ্রায়ে, আদর্শ পরার্থিতা, আদর্শ প্রতিভায় অভিনিবিষ্ট হবার পর, সে নিজেকে ছেযে দ্যায় বিজয়ী আত্মিক স্ফূর্তিতে। আমরা তা লক্ষ করেছি, কলুষিতকারীদের ধর্মসংস্কারের নকল তপস্যা, একই সঙ্গে কলুষিত করছে আর স্বীকৃতি দিচ্ছে, সে নিজেকে এক সহজ পাপমোচনে সোপর্দ করেছে ; কিংবা, আরও খারাপ, নিজের গর্ববোধের খোরাকের জন্য সে তার অভিপ্রায়ের আশ্রয় নিয়েছে। এখন, তার স্বপ্নের অন্তর্গত অভিপ্রায় এবং তার সততার পরিলেখ থেকে সে শেয পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারে যে সততার ব্যবহারিক দক্ষতা তার আছে ; যে প্রণয়োদ্দীপক তেজোময়তা দিয়ে সে এই সততার প্রেতকে প্রভাবিত করে তা থেকে তার মনে হয় তার কাছে যথেষ্ট ও সুনিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে যে নিজের উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য তার আছে পুরুষোচিত বীর্যশক্তি। সে স্বপ্নকে কাজ দিয়ে পুরোপুরি বানচাল করে দ্যায়, আর তার কল্পনা, তার নিজের মোহিনী প্রদর্শনীর সামনে উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে তার প্রকৃতিকে শুধরে দ্যায় আর আদর্শায়িত করে, নিজের কল্পনার প্রতিচ্ছবির জায়গায় স্হাপন করে তার সত্যকার ব্যক্তিত্ব, যা ইচ্ছাশক্তিতে দুর্বল, অহমিকায় ধনী, সে তার মহিমান্বয়নকে এই সুস্পষ্ট ও সরল ঘোষণা দিয়ে শেষ করে, যাতে রয়েছে তার জন্য ন্যক্কারজনক আহ্লাদের সমগ্র জগতসংসার :”আমি সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র।” এ-কথা কি তোমায় মনে করায় না ছোট্ট জাঁ-জাক-এর ব্যাপার, যে, সেও ব্রহ্মাণ্ডের কাছে স্বীকার করেছিল, আনন্দহীন নয়, সাহস দেখিয়েছিল বিজয়ের একই কান্নায় ( কিংবা তফাতটা যৎসামান্য ) একই আন্তরিকতা এবং একই প্রত্যয় নিয়ে ? যে উৎসাহ নিয়ে সে সততার প্রশংসা করেছিল, ভালো কাজ কিংবা ভালো কাজের চিন্তা, যা সে নিজে অর্জন করতে চেয়েছিল, যার দরুন স্নায়বিক আবেগে তার চোখ জলে ভরে উঠেছিল, তার যথেষ্ট ছিল নিজের নৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে বাড়িয়ে-চাড়িয়ে ধারণা গড়ার জন্য। হ্যাশিস ছাড়াই জাঁ-জাক নিজেকে নেশাগ্রস্ত করে ফেলেছিল।


     

    আমি কি এই বিজয়ী বাতিকের আরেকটু বিশ্লেষণ করব ? আমি কি ব্যাখ্যা করব কেমন করে, বিষটার প্রভাবে, আমার আলোচ্য লোকটা নিজেকে ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র করে ফেলেছে ? কেমন করে সে জীবন্ত আর উড়নচণ্ডী উদাহরণ হয়ে উঠেছে সেই প্রবাদের যা বলে যে কামনা চিরকাল সমস্তকিছু নিজের প্রসঙ্গে উল্লেখ করে ? সে নিজের সততা আর নিজের প্রতিভায় বিশ্বাস করে ; তুমি কি শেষটা আঁচ করতে পারছ না ? তাকে ঘিরে থাকা চারিপাশের বস্তুগুলো এতো বেশি পরামর্শমূলক যে সেগুলো তার অন্তরের চিন্তার জগতে আলোড়ন তোলে, আরও বেশি রঙ নিয়ে, বেশি জিবন্ত, আগের থেকে সূক্ষ্ম, ম্যাজিকের ঠাটঠমকে মোড়া। “এই বিশাল শহরগুলো”, সে নিজেকে বলে, “যেখনে অনন্য অট্টলিকাগুলো একটার ওপরে আরেকটা উঠে গেছে ; স্বদেশে ফেরার জন্য কাতর আলস্যে এই সুন্দর জাহাজগুলো পথের ধারের জলরাশিতে ভারসাম্য নিয়ে ভাসছে, আমাদের চিন্তাকে এইভাবে অনুবাদ করে, ‘কখন আমরা আনন্দের পাল তুলে ভাবো ? ; এই জাদুঘরগুলো সুন্দর প্রতিমা আর মোহক রঙে নেশা ধরায়; এই গ্রন্হাগারগুলো যেখানে রয়েছে বিজ্ঞানের বই আর কবিতার স্বপ্নের সংগ্রহ ; যন্ত্রপাতির এই সমাবেশ যাদের একটিই সঙ্গীত ; এই মোহিনী নারীরা, যাদের আরও সুন্দরী করে তুলেছে সাজসজ্জার বিজ্ঞান ও ভালোবাসার ভান : এই সমস্তকিছুই আমার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, আমার জন্য, আমার জন্য ! আমার জন্য মানব সম্প্রদায় খেটেছে ; শহিদ হয়েছে, ক্রুশকাঠে চেপেছে, চারণভূমিতে কাজ করেছে, আমার অপ্রশম্য আবেগ, জ্ঞান ও সৌন্দর্যের ক্ষুধা মেটাবার জন্য খেটেছে।” গল্প ছোটো করার খাতিরে আমি উপসংহারে লাফ দিই। কেউই আশ্চর্য হবে না স্বপ্ন দেখিয়ের মগজ থেকে এক শেষ ও মহান চিন্তার ঝর্ণা বেরোয় : “আমি ঈশ্বর হয়ে গেছি।”


     

    কিন্তু তার বুক থেকে একটা বুনো আর জ্বলন্ত কান্না এমন জোরে, উৎসারের এমন ক্ষমতায় বেরিয়ে আসে যে, কোনো নেশাগ্রস্ত মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাস যদি প্রভাবশীল ক্ষমতা রাখতো তাহলে এই কান্না স্বর্গের আশ্রয়ে দেবদূতরা ছত্রখান হয়ে ছড়িয়ে পড়ত : আমি একজন দেবতা।”


     

    কিন্তু বেশ তাড়াতাড়ি গর্বের এই ঝঞ্ঝা শান্ত, নিঃশব্দ, বিশ্রামরত স্বর্গসুখের আবহাওয়ায় পরিবর্তিত হয়, আর অস্তিত্বের সার্বজনীনতা নিজেকে উপস্হিত করে রঙিন আর উজ্বল প্রতিভাময়ী ভোরবেলায়। যদি কোনোক্রমে এই শোচনীয় তিনবার-সুখি আত্মায় এক অস্পষ্ট স্মৃতি ঢুকে পড়ে --- “তাহলে কি আরেক ঈশ্বর হবেন না ?” --- বিশ্বাস করো, সে ঈশ্বরের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবে ; সে ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরোধিতা করবে, এবং বিনা ভয়ে ঈশ্বরের মোকাবিলা করবে।


     

    কে সেই ফরাসি দার্শনিক যিনি আধুনিক জার্মান তত্বকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন : আমি কি দেবতা যে রাতের ভোজে অখাদ্য খেয়েছে ?” হ্যাশিসের দ্বারা উন্নীত আত্মায় এই বিদ্রূপ কামড় বসাবে না ; সে ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দেবে : “হয়তো আমি রাতের ভোজে অখাদ্য খেয়েছি ; কিন্তু আমি একজন দেবতা।”

    পঞ্চম অধ্যায়

    নৈতিক শিক্ষা

    কিন্তু আগামীকাল ; ভয়ানক আগামীকাল ! সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিরুদ্বেগ, ক্লান্ত ; স্নায়ুরা অপ্রসারিত, অশ্রুজলের উত্যক্ত করার প্রবণতা, নিয়মিত কাজে নিজেকে নিয়োগ করার অসম্ভাব্যতা, নিষ্ঠুরভাবে তোমাকে শেখায় যে তুমি একটি নিষিদ্ধ খেলা খেলছিলে। ঘৃণ্য প্রকৃতি, আগের সন্ধ্যার ঔজ্বল্য থেকে বের করে আনা, কোনো উৎসবের মনমরা অবশেষের মতন দেখায়। ইচ্ছাশক্তি, কার্যক্ষমতায় যেটি সবচেয়ে মহার্ঘ, সবার আগে আক্রান্ত হয়। লোকে বলে, এবং সেকথা সত্যি, যে এই মাদক কোনো শারীরিক অসুখ ঘটায় না ; কিংবা অন্তত ভয়ানক কোনো অসুখ ; কিন্তু কেউ কি জোর দিয়ে বলতে পারে যে একজন লোক যে কোনো কাজ করতে অক্ষম এবং কেবল স্বপ্ন দেখার জন্য কর্মক্ষম, সত্যিই সুস্বাস্হ্যে রয়েছে, এমনকি দেহের প্রতিটি অঙ্গ ঠিকঠাক কাজ করলেও ? এখন আমরা মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে ভালো করে জানি যে একজন লোক যে এক চামচ মেঠাই খেয়ে নিজের জন্য স্বর্গের ও জগতের তাবৎ ঐশ্বর্য সংগ্রহ করতে পারে সে কখনও তার হাজার ভাগের এক ভাগও তা পাবার জন্য কাজ করেও পাবে না। তুমি কি এমন এক রাষ্ট্রের কল্পনা করতে পারো যার প্রতিটি নাগরিক চরসখোর ? কেমনতর নাগরিক ! কেমনতর যোদ্ধা ! এমনকি প্রাচ্যদেশেও, যেখানে এর ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানকার সরকাররা একে নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবেছে। মানুষের ব্যবহারের জন্য নিষিদ্ধ, বৌদ্ধিক ক্ষয় ও মৃত্যুর শাস্তির আশঙ্কায়, যা মানুষের অস্তিত্বের প্রাথমিক অবস্হাকে বিপর্যস্ত করে, আর যে পরিবেশে সে ঘুরে বেড়ায় এগুলো তার গুণের ভারসাম্যকে নষ্ট করে ফ্যালে ; এক কথায়, নিজের নিয়তিকে ছাপিয়ে যাবার জন্য, নতুন ধরনের এক সর্বনাশকে তার জায়গায় আনার জন্য। মনে করো মেলমথের কথা, ( আরও দেড়শো বছর বাঁচার জন্য মেলমথ নিজের আত্মা শয়তানকে বিক্রি করে দিয়েছিল ) সেই অসাধরণ কাহিনি। তার অতিশয় বেদনাদায়ক যন্ত্রণার কারণ ছিল তার অসাধারণ দক্ষতা, যা সে শয়তানের সঙ্গে আড়ম্বরহীন চুক্তি করে পেয়েছিল এবং তার পরিবেশের ভিন্নতায়, ঈশ্বরসৃষ্ট প্রাণী হিসাবে, বেঁচে থাকতে বাধ্য থাকার চুক্তির ফলে অভিশপ্ত। এবং যাকেই সে অনুরোধ করতো তার কাছ থেকেশয়তানের চুক্তি কিনে নেবার জন্য, সেই একই ভয়ঙ্কর শর্তে, তারা কেউই রাজি হতো না। প্রসঙ্গত, প্রতিটি মানুষ, যে জীবনের অবস্হাকে স্বীকৃতি দিতে চায় না সে নিজের আত্মাকে বিক্রি করে। রূপকটা বুঝতে পারা যায় কবিদের শয়তানি সৃষ্টি এবং সেই মাদকের কাছে আত্মসমর্পিত জীবন্ত প্রাণীগুলোর উদ্দীপনার পার্থক্যে। মানুষ ঈশ্বর হতে চেয়েছে, এবং তা দ্রুত ? -- তবে সে এইখানে, এক অমোঘ নৈতিক আইনের দ্বারা, তার স্বাভাবিক অবস্হার তলায় অধঃপতিত ! সে এমনই এক আত্মা যে নিজেকে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করে।


     

    বালজাক নিঃসন্দেহে ভেবেছিলেন যে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে পরিত্যাগ করার চেয়ে মানুষের আর কোনো বড়ো লজ্জার ব্যাপার হতে পারে না, কোনো বড়ো যন্ত্রণা হতে পারে না। আমি ওনাকে একবার এক বৈঠকখানায় দেখেছিলুম, যেখানে অনেকে হ্যাশিসের বিস্ময়কর প্রভাবের কথা আলোচনা করছিল। উনি শুনছিলেন এবং মজাদার আগ্রহে ও উৎফুল্ল হয়ে প্রশ্ন করছিলেন। যারা ওনাকে জানতো হয়তো অনুমান করে থাকবে যে বিষয়টা সম্পর্কে উনি আগ্রহী, কিন্তু ‘নিজের উপস্হিতিতেও নিজেকে নিয়ে চিন্তা করার ধারণা’ ওনাকে ভীষণ বিপর্যস্ত করেছিল। কেউ ওনাকে ‘দাওয়ামেস্ক’ সেবন করার জনভ দিয়েছিল। উনি তা নিরীক্ষণ করলেন, শুঁকলেন, এবং বিনা ছুঁয়ে ফেরত দিলেন। ওনার প্রায় শিশুসুলভ কৌতূহল এবং ওনার নিজেকে আত্মসমর্পণ করার ঘেন্না চোখেমুখে অদ্ভুতভাবে ফুটে উঠেছিল। আত্মসন্মানের পপতি তাঁর ভালোবাসা দিনটাকে উৎরে দিয়েছিল। এ ব্যাপারটা কল্পনা করা কঠিন যে যিনি ইচ্ছাশক্তির তত্ব তৈরি করেছিলেন, লুই ল্যামবার্টের পারমার্থিক যমজ, এই দামি মাদকের একটা কণা দিতে রাজি হলেন। মানুষের সেবায় ইথার এবং ক্লোরোফর্ম প্রশংসনীয় কাজ করে থাকলেও, আদর্শবাদী দর্শনের দিক থেকে আমার মনে হয়, সেই একই নৈতিক বদনাম দেয়া হয় প্রতিটি আধুনিক আবিষ্কারকে, যেগুলো মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে ও দেহের যন্ত্রণাকে কম করে। আমি একবার বিশেষ আগ্রহে একজন অফিসারের কাছে ফরাসি সেনাধ্যক্ষ এল-আঘুতের শল্য চিকিৎসায় কূটাভাসের কধা শুনেছিলুম, যে তাঁকে ক্লোরোফর্ম দেয়া সত্বেও তিনি মারা গেলেন। এই সেনাধ্যক্ষ ছিলেন অত্যন্ত সাহসী মানুষ, এমনকি তার থেকেও বেশি: সেই রকম এক আত্মা যাঁর ক্ষেত্রে লোকে স্বাভাবিকভাবে ‘বিক্রমশালী’ শব্দটা ব্যবহার করে। অফিসার আমাকে বলেছিলেন যে, ওনার ক্লোরোফর্মের প্রয়োজন ছিল না, প্রয়োজন ছিল সমগ্র সেনাবাহিনীর দৃষ্টি এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গীত। তা হয়তো তাঁকে বাঁচাতে পারতো। অফিসারের সঙ্গে শল্যচিকিৎসক একমত হননি, কিন্তু সেনাবাহিনীর যাজক এই ধরণের অনুভূতিতে নিঃসন্দেহে আপ্লুত হতেন।


     

    ব্যাপারটা নিশ্চয়ই অনাবশ্যক, এই সমস্ত বিবেচনার পর, হ্যাশিসের নৈতিক বৈশিষ্ট্যের ওপর জোর দেয়া জরুরি। তুলনা করা যাক আত্মহত্যার সঙ্গে, মন্হর আত্মহত্যা আর সদাসর্বদা রক্ত বইয়ে দেওয়া কোনো অস্ত্রের সঙ্গে, সবসময়ে ধারালো, এবং কোনো যুক্তিপূর্ণ মানুষ তাতে আপত্তি করবে না। এবার একে তুলনা করা যাক ডাকিনিবিদ্যা কিংবা ম্যাজিকের সঙ্গে, যা বস্তুর ওপরে গোপন রহস্যের মাধ্যমে সক্রিয় ( যা অসাধুতার চেয়ে নিশ্চিত ফলদানের ক্ষমতাকে হেয় করে না ) এবং এক প্রভূত্বকে জয় করতে চায় যা মানুষের কাছে নিষিদ্ধ অথবা কেবল সেই লোকগুলোকে অনুমতি দেয়া যায় যারা এর যোগ্য, আর কোনো দার্শনিক মন এই তুলনাকে দোষ দেবে না। গির্জা যদি ম্যাজিক আর ডাকিনিবিদ্যাকে নিন্দা করে তা এই জন্য যে এরা ঈশ্বরের অভিলাষে বাগড়া দ্যায় ; এরা সময় বাঁচায় এবং নৈতিকতাকে অনাবশ্যক প্রতিপন্ন করে, এবং গির্জা একনিষ্ঠৈ শুভচিন্তার মাধ্যমে পাওয়া ঐশ্বর্যকে কেবল বৈধ ও সত্য বলে মনে করে। যে জুয়াড়ি জেতার উপায় খুঁজে পেয়েছে তাকে আমরা ঠকাই ; আমরা কেমন করে সেই লোকটার বর্ণনা করব যে মাত্র কিছু পয়সা নিয়ে আনন্দ ও প্রতিভা কিনতে চায় ? উপায়ের আপ্ততা নিজেই অনৈতিকতা সৃষ্টি করে ; ম্যাজিকের অনুমিত আপ্ততা তাকে শয়তানির কালিমালিপ্ত করে ; আমি কি যোগ করব যে হ্যাশিস, একক আনন্দগুলোর মতন, ব্যক্তিকে তার সহযোগিদের কাছে এবং সমাজের কাছে ফালতু করে তোলে, তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় অবিরাম আত্ম-প্রশংসায়, এবং দিনের পর দিন তাকে টেনে নিয়ে যায় এক আলোকময় রসাতলে যেখানে সে নিজের নার্সিসাস মুখাবয়ব দেখে আহ্লাদিত হয় ? কিন্তু তবু তার সন্মান, তার সৎপ্রবৃত্তি, আর তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির দামের বিনিময়ে মানুষ কি হ্যাশিস থেকে পেয়েছে আত্মিক কল্যাণ ; হতে পেরেছে একধরণের চিন্তাযন্ত্র, এক উর্বর সাধিত্র ? এই প্রশ্ন আমি অনেককে করতে শুনেছি, আর আমি উত্তর দিয়েছি : প্রথমত, যেমন বিস্তারিত আলোচনা করেছি, হ্যাশিস মানুষের কাছে তাকে ছাড়া আর কিছুই মেলে ধরে না। একথা সত্যি যে এই ব্যক্তি ঘণাঙ্কিত হয়, আর যদি তার সীমা পর্যন্ত তাকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হয়, এবং এও সমানভাবে নিশ্চিত যে হইহুল্লোড় সত্তেও স্মৃতিতে ঘটনাগুলো থেকে যায়, এই উপযোগবাদীদের আশায় প্রথম দৃষ্টিতে যা দেখা মেলে তা একেবারে অযৌক্তিক নয়। কিন্তু আমি তাদের লক্ষ করতে অনুরোধ করব যে, যে ভাবনাচিন্তা থেকে তারা দারুন সুফল চাইছে তা তেমন সুন্দর নয় যেমনটা তারা ম্যাজিকের রাংতায় মোড়া সাময়িক রূপান্তরণে দেখতে পাচ্ছে। তা স্বর্গের নয়, পৃথিবীর ব্যাপার, আর স্নায়ুর উত্তেজনা থেকে আহরণ করছে সৌন্দর্য। ফলত এই আশা একটি দুষ্টচক্র। কিছু সময়ের জন্য না-হয় মেনে নেওয়া যাক যে হ্যাশিস সৃষ্টি করে, অন্তত বাড়িয়ে দ্যায় প্রতিভাশক্তি ; তারা ভুলে যায় যে হ্যাশিসের বৈশিষ্ট্যেই রয়েছে ইচ্ছাশক্তিকে হ্রাস করার ক্ষমতা, অর্থাৎ তা এক হাতে দ্যায় এবং আরেক হাতে নেয় ; একথা বলার মানে হলো, কল্পনা গড়ে ওঠে অথচ তা থেকে লাভ করার মতো কর্মশক্তি থাকে না। সব শেষে, মনে রাখা দরকার, একজন লোক হয়তো এই উভয়সঙ্কট এড়াবার মতো যথেষ্ট ধুরন্ধর ও তেজস্বী, কিন্তু আরেকটা বিপদ আছে, মারাত্মক এবং ভয়ঙ্কর, যা প্রতিটি অভ্যাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বেশ তাড়াতাড়ি এগুলো অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। চিন্তা করার জন্য যে লোকটাকে বিষের আশ্রয় নিতে হয় সে দ্রুত বিষ ছাড়া আর চিন্তা করতে পারবে না। সেই ভীতকর লোকটার কথা ভেবে দ্যাখো যার পক্ষাঘাতগ্রস্ত কল্পনা হ্যাশিস কিংবা আফিম ছাড়া আর কাজ করবে না ! দার্শনিক স্হিতিতে মানুষের মন, নক্ষত্রদের যাত্রাপথকে নকল করার জন্য, একটি অর্ধবৃত্তকে অনুসরণ করতে বাধ্য যা বেঁকে ফিরে আসে তার প্রস্হানবিন্দুতে, যখন বৃত্তটি সম্পূর্ণ হবে। শুরুতে আমি এই চমৎকার স্হিতির কথা বলেছি যার মধ্যে মানুষের আত্মা অনেক সময়ে তাকে ছুঁড়ে-ফেলা অবস্হায় আবিষ্কার করে, যেন তা বিশেষ অনুগ্রহ। আমি বলেছি যে অবিরাম নিজের আকাঙ্খাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াসে এবং নিজেকে অনন্তের দিকে তুলে নিয়ে যাবার চেষ্টায়, সে দেখায় ( প্রতিটি দেশে এবং প্রতিটি সময়ে ) সব রকমের মাদক সম্পর্কে প্রমত্ত ক্ষুধা, এমনকি যেগুলো বিপজ্জনক সেগুলোও, যা তার ব্যক্তিত্বকে উন্নীত করে, মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের সামনে বিনিময়ের স্বর্গোদ্যান নিয়ে আসে, তার যাবতীয় আকাঙ্খার উদ্দেশ্য ; এবং সব শেষে তার বেপরোয়া আত্মা, না জেনেই রথ চালিয়ে নিয়ে যায় নরকের দরোজা দিয়ে, এই তথ্যই সাক্ষী হয়ে থাকে তার প্রাথমিক গরিমার। কিন্তু মানুষ তো তেমন ঈশ্বর-ত্যাজ্য নয়, সরাসরি স্বর্গে পৌঁছোবার উপায় থেকে প্রতিভাশূন্য, যে তাকে ম্যাজিক আর ডাকিনিবিদ্যার আশ্রয় নিতে হবে। হুর আলাইনের ( আরব স্বর্গের হুরিপরি) বন্ধুত্ব এবং নেশার আদর কেনার জন্য নিজের আত্মা বিক্রি করার প্রয়োজন তার নেই। শাশ্বত উত্তরণের জন্য দাম দিয়ে যে স্বর্গোদ্যান পাওয়া যাবে সেটা কী? আমি একজন মানুষের কল্পনা করি ( আমি কি বলব সে একজন ব্রাহ্মণ, একজন কবি, কিংবা একজন খ্রিস্টধর্মী দার্শনিক ?) আধ্যাত্মিকতার অলিমপাসের চূড়ায় বসে আছেন; তাঁর চারিপাশে রাফায়েল কিংবা মাতেঙ্গার মিউজদেবীরা, তার দীর্ঘকালের উপবাস এবং আন্তরিক প্রার্থনার দরুণ সান্ত্বনা দিতে, অভিজাত নৃত্য রচনা করতে, কোমল চাউনি মেলে ও ঝিকমিকে হাসিতে তাকে দেখতে ; দৈবিক অ্যাপোলো, যাবতীয় জ্ঞানের শিক্ষক ( ফ্রাঙ্কাভিলা, আলবের্ত দুয়েরার, গোল্তজিয়াস, কিংবা অন্য কারোর -- তাতে কিই বা আসে-যায় ? প্রতিটি মানুষের জন্য কি একজন অ্যাপোলো নেই, যে মানুষ তার যোগ্য ?), সবচেয়ে সুবেদী তারগুলোকে আদর করছেন তাঁর ধনুক দিয়ে ; তাঁর নীচে, পাহাড়ের পাদদেশে, কাদায় আর কাঁটাঝোপে, মানুষের কলরোল ; হেলট গোষ্ঠী উপভোগের মুখবিকৃতি নকল করে আর চিৎকার করে যার হুল তার বুক থেকে বিষ টেনে বের করে ; এবং কবি, দুঃখে কাতর, নিজেকে বলেন : “এই অভাগা লোকগুলো, যারা উপোস করেনি আর প্রার্থনাও করেনি, যারা খাটুনির মাধ্যমে উত্তরণ প্রত্যাখ্যান করেছে, ডাকিনিবিদ্যার আশ্রয় নিয়ে এক ধাক্কায় উঠে যেতে চেয়েছে তুরীয় জীবনে। তাদের ম্যাজিক তাদের ঠকায়, তাদের মধ্যে জাগায় নকল আনন্দ, নকল আলো ; যখন কিনা আমাদের কবিদের ও দার্শনিকদের ক্ষেত্রে, আমরা আমাদের আত্মাকে অবিরাম খাটাখাটুনি করে এবং মনোনিবেশের মাধ্যমে আবার জন্ম দিয়েছি; ইচ্ছাশক্তির অক্লান্ত প্রয়োগে এবং আকাঙ্খার দ্বিধাহিন গরিমায় আমরা আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছি সত্যের বাগান, যা সৌন্দর্য ; সৌন্দর্য যা সত্য। বিশ্বাস পাহাড় সরাতে পারে এই বাক্যে আত্মবিশ্বাসী, আমরা কেবল সেই অলৌকিকতা অর্জন করেছি যা প্রতিপাদন করার জন্য ঈশ্বর আমাদের অনুজ্ঞাপত্র দিয়েছেন। ”

  • মলয় রায়চৌধুরী | ০৪ আগস্ট ২০২১ ১৮:২৬734824
  • মহানগরে পথচর বোদলেয়ার

    মলয় রায়চৌধুরী

    কী এক ইশারা যেন মনে রেখে একা-একা শহরের পথ থেকে পথে

    অনেক হেঁটেছি আমি ; অনেক দেখেছি আমি ট্রাম বাস সব ঠিক চলে

    তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হয়ে চলে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে


     

    সারারাত গ্যাসলাইট আপনার কাজ বুঝে ভালো করে জ্বলে।

    কেউ ভুল করেনাকো --- ইঁট বাড়ি সাইনবোর্ড জানালা কপাট ছাদ সব

    চুপ হয়ে ঘুমাবার প্রয়োজন বোধ করে আকাশের তলে।


     

    একা একা পথ হেঁটে এদের গভীর শান্তি হৃদয়ে করেছি অনুভব ;

    তখন অনেক রাত --- তখন অনেক তারা মনুমেন্ট মিনারের মাথা

    নির্জনে ঘিরেছে এসে ; মনে হয় কোনোদিন এর চেয়ে সহজ সম্ভব


     

    আর দেখেছি কি : একরাশ তারা আর মনুমেন্ট ভরা কলকাতা ?

    চোখ নিচে নেমে যায় --- চুরুট নীরবে জ্বলে --- বাতাসে অনেক ধুলো খড় ;

    চোখ বুজে একপাশে সরে যাই --- গাছ থেকে অনেক বাদামি জীর্ণ পাতা


     

    উড়ে গেছে ; বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর

    কেন যেন ; আজো আমি জানিনাকো হাজার হাজার ব্যস্ত বছরের পর।

    ( “পথ হাঁটা”--- জীবনানন্দ দাশ )


     

    আমি একজন রেকলুজ, একা থাকতে ভালোবাসি, একা-একা শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসি। ভারতের এবং পৃথিবীর অন্যান্য যে শহরেই কিছুকাল থেকেছি, কুড়ি বছর হোক বা কুড়ি দিন, রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছি, একা-একা টহল দিয়ে চারিদিকে চোখ বোলাতে-বোলাতে, কান পেতে, গন্ধ নিতে-নিতে, হেঁটেছি, স্রেফ হেঁটেছি, কোথাও বা ফাঁকা ফুটপাত বেয়ে শোকেস দেখতে-দেখতে আর কোথাও বা ভিড়ে গাদাগাদি মানুষ-মানুষীর মাংসময়তার ভেতরে-ভেতরে। শহরবাসীর ভাষায় দখল থাকলে যে অভিজ্ঞতা হয়, তার থেকে ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে অজানা ভাষাভাষিদের চলমান জমায়েতে। অফিসের কাজে পশ্চিমবাংলার গ্রামাঞ্চলে সমীক্ষা করতে গিয়ে টের পেতুম যে রাজনৈতিক ভয়ে অনেকে সঠিক উত্তর দিচ্ছেন না ; তখন আমার হিন্দি-উর্দু প্রয়োগ করে, যেহেতু দাড়ি-গোঁফ ছিল, আর সহকারীরা আমার পরিচয় এম আর চৌধরী বলে দিত, অবাঙালি রূপে ভেতরের কথা টেনে বের করা সহজ হয়ে যেত। আমার ‘অপ্রকাশিত ছোটগল্প’ বইতে ব্যাপারটা নিয়ে ‘মিহিকার জন্মদিন’ শিরোনামে একটা গল্প লিখেছিলুম। ইনকগনিটো থাকার অভিজ্ঞতা। যেমন অভিজ্ঞতাই হোক না কেন, তা বেশ আহ্লাদময়।

    উনিশ শতকের প্যারিস মহানগরের পথে-পথে টহলক্রিয়াকে চিহ্ণিত করে শার্ল বদল্যার একটি ভাবকল্প তৈরি করে দিয়ে গেছেন। ক্রিয়াটিকে তিনি বলেছেন ‘ফ্ল্যানেরি’ এবং ওই পথচর দর্শককে বলেছেন ‘ফ্লনিয়র’।

    উনিশ শতকের ইউরোপে শহরগুলো দ্রুত অভূতপূর্ব বিশাল আকারে এমন ভাবে বেড়ে উঠছিল যে শহরবাসীর অভিজ্ঞতায় সুদূরপ্রসারী প্রভাবের নকশা গড়ে দিচ্ছিল তারা। বদল্যারের ফ্লনিয়র জন্মেছিল এই নকশাটি থেকে, আধুনিকতাবাদের প্রথম চারিত্র্যবৈশিষ্ট্যের অন্যতম। গ্রামাঞ্চল থেকে এসে বিশাল মহানগরের ভুলভুলাইয়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল ব্যক্তিমানুষ। গ্রামাঞ্চলে সে ছিল কৌমের অংশ, সবুজ ভূখণ্ডের অংশ। মহানগরের জটিল ও সর্পিল পথসমষ্টির বিভ্রান্তিকর রাস্তা, পথ, গলি, তস্যগলির ভুলভুলাইয়ায় তার কৌমপ্রতিস্ব ক্রমশ আবছা হয়ে জন্মাচ্ছিল ব্যক্তিএককের আধুনিক প্রতিস্ব । ভুলভুলাইয়াগুলোতে গড়ে উঠছিল গোপন ও নিষিদ্ধ পরিসর, যা একযোগে ভয়ের এবং আনন্দলাভের এলাকা ; সেই পরিসরে বক্তিমানুষ, অবশ্যই পুরুষ-ব্যক্তি, এলাকাটির অংশ হয়েও আক্রান্ত হচ্ছিল পারস্পরিক দূরত্বে, অসম্বদ্ধতায়, অপসৃতির বোধে। আধুনিকতা দেশে-দেশে গড়ে তুলছিল মহানগর, এবং সেই মহানগরগুলোয়, আধুনিকতার অবদানরূপে দেখা দিচ্ছিল আলোকময়তার পরিসর ও অন্ধকারাচ্ছন্নতার পরিসর ; বৈভবশালীর এলাকা ও ভিখারি জুয়াড়ি নেশাখোর যৌনকর্মী অপরাধী ও শ্রমিকদের এলাকা। যুগ্মবৈপরীত্যের বিভাজন।

    গ্রিক পুরাণে আছে যে ক্রিট দ্বীপে ছিল এক সর্পিল জটিল বিভ্রান্তিকর ভুলভুলাইয়া, আর সেই ভুলভুলাইয়ায় থাকত মাইন্যটর নামের বৃষাসুর, যার দেহ মানুষের মতন কিন্তু মাথাটা ষাঁড়ের। জার্মান ভাবুক ওয়াল্টার বেনিয়ামিন ভুলভুলাইয়ার এই গ্রিক রূপকটির তুলনা করেছেন নতুন গড়ে ওঠা উনিশ শতকের ইউরোপীয় মহানগরের সঙ্গে। পথ, গলি, তস্যগলি, ইত্যাদির গোলকধাঁধায় তৈরি ভয়ের ও আনন্দের চিত্তাকর্ষক পরিসরকে তুলনা করেছেন মাইন্যটর দানবটির সঙ্গে। মহানগরের ভেতরে একটি এলাকা মানব দেহের আরেকটি ষাঁড়ের মাথার। বেনিয়ামিন ও বদল্যারসহ ইউরোপীয় ইমপ্রেশানিস্ট চিত্রকরদের অনেকেই ভয়ের ও বাসনার যে মনোহর মেট্রপলিটান এলাকাটিতে আকর্ষিত হতেন তা যৌনকর্মী, লুম্পেন, ভবঘুরে, ছন্নছাড়া, মাতাল, নেশাড়ু, জুয়াড়ি, অপরাধী অধ্যুষিত।

    ১৮৬৩ সালে, যে-সময়ে প্যারিস শহরকে পুঁজিবাদের চিত্তাকর্ষক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলছেন তৃতীয় নেপোলিয়ান ও ব্যারন হাউসমান, সে-সময়ে, চারিদিকের ঝিকমিকে ঝিলমিলে দোকান-পশার ও তা উপভোগের জন্য উপচে-পড়া জনসমুদায়কে বিশ্লেষণ করে, নিজেকেও সেই আয়নায় প্রতিফলিত দেখে, ‘লে ফিগারো’ পত্রিকায় শার্ল বদল্যার একটি প্রবন্ধ লেখেন, যার শিরোনাম ছিল ‘আধুনিক জীবনের চিত্রকর’। রচনাটিতে তিনি ‘ফ্লনিয়র’ (Flaneur ) শব্দটি প্রয়োগ করেন। বদল্যারের আলোচকরা বলেছেন ফ্লনিয়র শব্দটির প্রতিশব্দ অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় নেই। অনেকে অবশ্য ইংরেজি Stroller ও Saunterer শব্দগুলো ব্যবহার করেছন। যে লোকটি পথে-পথে গন্তব্যহীন অলস পায়ে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে বেড়িয়ে বেড়ায়, তাকে তিনি বলেছেন ফ্লনিয়র। লোকটাকে ভবঘুরে (Vagabond, Badaud, Gawker ) বলা যাবে না। সে কোনো-কিছুর ক্রেতা নয়, কেননা সে শপিং করতে বেরোয়নি। বদল্যার নিজেই রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন, একা-একা, অনেক সময়ে ভোর

    রাত পর্যন্ত, অপাড়া-বেপাড়া সর্বত্র। পৃথিবীর সব ভাষাতেই শব্দটি যেভাবে ব্যবহৃত ও উচ্চারিত হচ্ছে, আমি সেভাবেই তাকে বাংলায় ব্যবহার করছি। আরও অনেকে, যেমন জীবনানন্দ দাশ, ফালগুনী রায়, অসকার ওয়াইল্ড, জ্যাক কেরুয়াক পথে-পথে হেঁটে বেড়াতেন। তবে, নিষিদ্ধ পরিসরগুলো জীবনানন্দের ক্ষেত্রে কিয়দংশে নিষিদ্ধ ছিল বলেই অনুমান করি।

    ফ্ল্যানেরি, তাকিয়ে-তাকিয়ে বেড়িয়ে বেড়াবার ক্রিয়াটি, মডার্নিটির আলোচনায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফ্লনিয়র লোকটি একা ঘুরে বেড়ায় ; বন্ধুবান্ধদের সঙ্গে পথচারণা করে না, নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে গুলতানি করে না, বন্ধু বা বন্ধুনির পাশাপাশি হাঁটছেনা, কাউকে দেখে মন্তব্য করে না। বস্তুত ফ্লনিয়র লোকটি নিজে একজন অজ্ঞাত সত্তা। আধুনিকতাবাদের গর্ভ থেকে পয়দা হওয়া পুরুষালি প্যাশনের মহানাগরিক নমুনা। নগ্নিকার ছবি আঁকেন চিত্রকর, কিন্তু নগ্নিকার দিকে তাকিয়ে-থাকা একজন সাধারণ পুরুষ যে আ্হ্লাদ লাভ করে তা স্কোপোফিলিয়া নামের চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য। আমি আমার ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ উপন্যাসে এই বৈশিষ্ট্যযুক্ত একটি চরিত্রকে উপস্হাপন করেছি, তার পুরুষালি চাউনির মাধ্যমে দখল করে নেবার প্রক্রিয়াটি কী ভাবে কাজ করে তা বিশ্লেষণের জন্যে। ফ্ল্যানেরি ও স্কোপোফিলিয়া দুটি ভিন্ন প্যাশন। স্কোপোফিলিয়া নারীর ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে বটে, ( তরুনীরা যেমন নগ্ন উর্ধ্বাঙ্গের হৃতিক রোশন বা সালমান খান দেখতে ভালোবাসেন ) তবে নারীর পক্ষে ফ্লনিয়র হওয়া কঠিন বলে স্বীকার করে নেয়া যায়। মহানগরের গোপন পরিসরগুলো নারীর কাছে প্রায় অগম্য। ভিড়ের গাদাগাদির ভেতরে সেঁদিয়ে মাংসের মহাসমুদ্রের অংশ হয়ে হাঁটা সম্ভব নয় নারীর পক্ষে। উনিশ শতকের লেখিকাদের কেউ-কেউ অবশ্য তাঁদের পাঠবস্তুতে ফ্লনিয়র-নারী চরিত্র উপস্হাপন করে গেছেন, যেমন চার্লট ব্রন্টে, ক্যাথারিন ম্যান্সফিল্ড, জিন রাইস, ভার্জিনিয়া উলফ প্রমুখ। বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশ ও সেই পরিসরের জীবনযাত্রার দিকে তাকিয়ে গড়ে ওঠে তাঁদের উপস্হাপিত নারী-চরিত্রগুলো। নিজেদের ও শহরের মাঝের দূরত্বকে তারা কল্পনা প্রয়োগ করে মিটিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়।

    আধুনিক কবি ও চিত্রকরকে চিহ্ণিত করার জন্য বদল্যারের তৈরি ফ্লনিয়র ভাবকল্পটি, এখন ব্যবহার করা হচ্ছে ‘পোস্টমডার্ন গেজ’ বা উত্তরাধুনিক চাউনি বিনির্মাণ করার কাজে। পুরুষের চাউনির চাপে সংস্কৃতিতে পরিবর্তন ঘটতে থাকে ; বহু মহিলা নিজেদের ওই চাউনির উপযুক্ত করে তোলার জন্য আকর্ষক পোশাক পরেন, সাজগোজ করেন। পুরুষের চাউনির কথা মাথায় রেখে পণ্যবস্তু বিজ্ঞাপিত হয়, এবং সেখানেও নারীকে উপস্হাপন করা হয় টোপ হিসেবে। মিশেল ফুকো বলেছেন যে এমন নয় যে চাউনি ব্যাপারটা কারোর থাকে বা সে প্রয়োগ করে ; এটি একটি সম্পর্কক্ষেত্র যেখানে কেউ প্রবেশ করে। দর্শক যখন কোনো বস্তুর দিকে তাকায় তখন সে ওই বস্তুটিই কেবল দেখছে না। দর্শক আসলে দেখছে সেই বস্তুটি ও নিজের সম্পর্কের দিকে। কোনো-কোনো বস্তু কেবল তাকাবার খাতিরেই তৈরি হয়, যেমন চিত্রকরদের পেইনটিঙ। এখন সাইবার জগতে একা-একা বা কয়েকজন মিলে ভারচুয়াল জগতের দিকে তাকিয়ে কোনো বস্তু বা জীবের সঙ্গে পোস্টমডার্ন সম্পর্ক গড়ে তোলে। ইনটারনেট পরনোগ্রাফিক চলচ্চিত্র বা নগ্ন নারী-পুরুষ দেখে যে দর্শক সে একজন স্কোপোফিলিক চরিত্রবৈশিষ্ট্য মানুষ। সে ফ্লনিয়র নয়।

    ফ্লনিয়রকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বদল্যার বলেছিলেন, ভিড় হল এই মানুষটির অপরিহার্য অংশ বা নিদান, পাখির যেমন আকাশ এবং মাছের যেমন জল। তার প্যাশান ও তার বৃত্তি হল জনসমুদায় নামক বিশাল মাংসল সমুদ্রের মাংসাংশ হয়ে ওঠা। একজন নিখুঁত ফ্লনিয়রের, একজন আবেগোচ্ছাসিত দর্শকের, মহানন্দ ঘটে জনসমুদায়ের হৃদয়ে নিবাসস্হান গড়ে নেবার দরুন, জনস্রোতের ঢেউগুলোর গতির ওঠা-নামার লয়ের সাথে-সাথে মিশ খাবার কারণে। সে ওই অনন্তময় ও আশ্রয়প্রার্থী গায়ে-গা ভিড়ের ভেতরে নিজের জন্য এমনই এক বোধে আহ্লাদিত হয় যেন সে বাড়ি থেকে বহুদূরে চলে গেছে অথচ চারিদিকেই তার বাড়ি, সমাজ-সংসার থেকে লুকিয়ে পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করছে, ওই পৃথিবীটিরই অংশ হিসেবে। ওই দর্শক-কবি হল রূপকথার সেই রাজপুত্র যে সাধারণ মানুষের পোশাকে নিজেকে লুকিয়ে জনগণের কাজ-কারবার দেখার আনন্দে মজে আছে। সে হল জীবনের এমনই এক প্রেমিক যে সমগ্র জগত-সংসারকে নিজের পরিবারের অন্তর্ভূক্ত করে নিয়েছে ; কিংবা সুন্দরীদের প্রতি আকর্ষিত সেই যুবকের মতো যে ওই না-পাওয়া সুন্দরীদের নিয়ে নিজের পরিবার গড়ে তুলেছে ; কিংবা পেইনটিঙের সেই আঁকিয়ের মতন, যার নিবাস স্বপ্ন দিয়ে বোনা এক ম্যাজিক নগরীতে, যা সে ক্যানভাসে মেলে ধরে। অর্থাৎ সার্বজনীন জীবনের প্রেমিক মানুষটি ভিড়ের ভেতরে এমনভাবে সেঁদিয়ে যায় যেন তা বৈদ্যুতিক তেজোময়তার অপরিমেয় আধার। অথবা আমরা তাকে জনসমুদায়ের মাপের সমান একটা আয়নার সঙ্গে তুলনা করতে পারি, কিংবা তুলনা করতে পারি এমনই এক ক্যালাইডোস্কোপের সঙ্গে যা নিজের চেতনার সাহায্যে প্রতিটি বিচলনে সাড়া দেয়, আর জীবনের বহুত্বময়তাকে তার উপাদানগুলোর ঝিলমিলে মাধুর্যসহ পুনরুৎপাদন করে চলে।

    তাঁর ‘প্যারিস সপ্লিন’ গ্রন্হে ফ্ল্যানেরি ক্রিয়াটিকে বদল্যার গ্রহণ করেছেন পাঠবস্তু গঠনের কৌশল রূপে, বিশেষ করে ‘ভিড়’ শিরোনামের গদ্যকবিতায়। একজন ফ্লনিয়র ঠিক কী-কী করে,তাকে উপলব্ধি করার বনেদ হয়ে উঠেছে পাঠবস্তুটি। ফ্লনিয়র চরিত্র-বিশিষ্ট কবির ব্যক্তিসত্তাটি একজন পুরুষের, যে কিনা চেয়ে-দেখা প্রাণী বা বস্তুটির দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে তাতে নান্দনিক মর্মার্থ সঞ্চার করে দিতে পারে, এবং নিজেকে ঘিরে গড়ে ফেলতে পারে, ভিড়ের সাহায্যে, আস্তিত্বিক নিরাপত্তার বলয়। তাঁর ফ্লনিয়র একজন পুরুষ কবি, যে তার ব্যক্তিগত একাকীত্ব থেকে আত্মবিতাড়িত অবস্হায় নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে চলেছে, জনসমুদায়ের সমুদ্রে, পণ্যবাজারের মনোহারি শোভায়, নিষিদ্ধ পরিসরের গোপন খাঁজখোদরে। তার দিনের বেলাকার মেট্রপলিটান পরিবেশ হল ভিড় এবং দোকানপাট। সে ভিড়ের মানুষ ; ভিড়ের মধ্যেকার একজন মানুষ নয়। জনসমুদায়ের সাহায্যে যে শৃঙ্খলা সে নির্মাণ করছে, সে অবিস্হিত তার কেন্দ্রস্হলে, যদিও ভিড়ের অন্যান্য মানুষের কাছে সে, অর্থাৎ ফ্লনিয়র-কবি, মেট্রপলিসের নিরন্তর প্রবহমান জনসমুদায়েরই অংশ। তার আস্তিতিক বোধ তাকে ফ্লনিয়র করে তুলছে, পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে অন্যান্যদের থেকে।

    ‘ভিড়’ গদ্যকবিতায় বদল্যার বলেছেন, জনতার ভেতরে নিজেকে চুবিয়ে জনতা দিয়ে স্নান করার ক্ষমতা সকলের থাকে না ; জনতা ও একাকীত্ব, এ-দুটি হল অভিন্নরূপ যমজ অভিধা। তাদের পরস্পরকে পালটাপালটি করার ক্ষমতা রাখে ফ্লনিয়র কবি। যে মানুষ তার একাকীত্বকে জনতাপূর্ণ করতে অক্ষম, সে গাদাগাদি ভিড়েও একা থাকতে অক্ষম। আসলে ফ্লনিয়র তো সেই রাজপুত্র যে পোশাক পালটে প্রজাদের কেন্দ্রস্হলে গোপনে প্রবেশ করেছে ; এই রাজসিক নামহীনতা, বদল্যারের মতে, ফ্লনিয়র-কবির কাছে স্পষ্ট করে মেলে ধরছে মহানাগরিক পরিসরের মর্মার্থ। সতত অপসৃয়মান ওই প্রবাহের অন্তস্হলে যে অনন্তকাল তাকে টের পান কেবল একজন ফ্লনিয়র-কবি।

    জীবদ্দশায় বদল্যার স্বীকৃতি পাননি, তাঁর কবিতা প্রকাশ করার আগ্রহ দেখাতেন না পত্রিকা-সম্পাদকরা, তাঁর বন্ধুবান্ধব বিশেষ ছিল না, বন্ধুনিরা তাঁকে এড়িয়ে যেতেন, চাকরি-বাকরি ছিল না, অন্যের দানের ওপর নির্ভর করতে হত তাঁকে, উদ্যমের পরিবর্তে যন্ত্রণা ভুগতে ছিলেন আগ্রহী, সংসার বলতে যা বোঝায় তা তাঁর ছিল না, থাকতেন একটি ভাড়ার বাসায়, ছিলেন মহানগরের পথচর, তাঁর কবিতায় চলে আসে জঞ্জালকুড়ুনিয়া আর ভিখারি। একাকীত্বের সেই জীবনযাত্রায় বদল্যার একা-একা পথে-পথে হাঁটতেন,নিরাময়ের উপায় হিসেবে। প্রায় মিলে যায় জীবনানন্দ দাশ ও ফালগুনী রায়ের জীবনের সঙ্গে। জীবনানন্দের থেকে পার্থক্য এই যে বদল্যার ও ফালগুনী রায় দুজনেই ছিলেন হ্যাশিশের ভক্ত।

    ওয়াল্টার বেনিয়ামিন সর্বপ্রথম বদল্যারের ফ্লনিয়র ভাবকল্পটি পুঁজিবাদের উন্মেষের প্রেক্ষিতে একটি সর্বৈব ‘মহানাগরিক অভিজ্ঞতা’ হিসেবে বিশ্লেষণ করার পুর্বে আরও অনেকে চর্চা করেছিলেন বিষয়টি। স্যঁৎ ব্যোভ বলেছিলেন যে ভাবকল্পটিকে ‘কোনও কিছু না করার’ সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ভুল হবে। বালজাক বলেছিলেন, ফ্লনিয়র লোকটির কাজ হল ‘চোখের মাধ্যমে ভুরিভোজ’। অ্যানাইস বাজিন বলেছিলেন যে ‘প্যারিসের সার্বভৌম কর্তা হল ফ্লনিয়র’। ভিকটর ফুরনেল বলেছিলেন, ‘ফ্লনিয়র লোকটির কাজের সঙ্গে আলস্যের কোনো সম্পর্ক নেই ; তার কাজটি হল বিশেষ এক ধরনের আর্ট বা শিল্প কেননা সে মহানগরের ঐশ্বর্যময় ভূদৃশ্যের বৈভিন্ন্যেকে বোঝার ক্ষমতা রাখে।’ যাঁরা তাঁদের জীবন মহানগরের বাইরে গ্রামঞ্চলে বা উপনগরে কাটিয়েছেন, তাঁদের পক্ষে ভিড়ে গাদাগাদি রাজপথে হাঁটার এই মেট্রপলিটান অভিজ্ঞতার বিষয়টি ঠাহর করতে অসুবিধা হবে।

    ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের বদল্যার বিশ্লেষণ বদল্যারকে উপস্হাপন করেছে আধুনিকতা ও আধুনিকতাবাদ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান ও উপলব্ধির সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিপ্রেক্ষিতে। বেনিয়ামিন মানতে চাননি যে বদল্যার ছিলেন রোমান্টিক স্বপ্নময় জগতের লিরিক কবি। তিনি বলেছেন যে বদল্যার এমনই একজন আধুনিক কবি যিনি ১৮৫০ এর দশকের পর উদ্ভূত মহানাগরিক পণ্য পুঁজিবাদের হাঙরদাঁতের মাঝে ফেঁসে গিয়ে জীবন-মৃত্যুর লড়াই লড়ছেন ; তাঁর কবিতা ও গদ্য থেকে যে বদল্যার আমাদের সামনে আসেন তিনি একজন ফ্লনিয়র, যিনি বাণিজ্যে ভাসমান প্যারিস মহানগরের রাস্তায়-রাস্তায় পদচারণা করতে-করতে তুলে নিচ্ছেন একের পর এক চলমান ছবি; তিনি পুঁজিবাদী ব্যবস্হার জঞ্জাল-কুড়ুনিয়া, যিনি কবিতায় পালটে ফেলার জন্য জড়ো করে চলেছেন শহুরে সংঘর্ষে উৎপন্ন সামাজিক জঞ্জালের নুড়িপাথর ; বদল্যার একজন আধুনিক নায়ক যিনি আধুনিক মহানাগরিক জীবনের পরস্পরবিরোধিতা ও অসম্ভাব্যতার জাঁতাকলে আত্মসমর্পণ করে সেই দুর্ভোগকে দিয়েছেন কাব্যিক অনুভববেদ্যতা। তিনিই প্রথম আধুনিক কবি-শিল্পী যিনি নিজের সৃজনকর্মকে একটি ব্র্যাণ্ড দিতে চেয়েছেন যাতে তা সাহিত্যিক পণ্যতোরণ শোভিত পথের দুধারের রঙিন শোকেসের উপযুক্ত হয়ে ওঠে।

    বদল্যার বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন যে মহানাগরিক আধুনিকতার মসনদে তাঁর সাহিত্যকর্মকে কী ভাবে অধিষ্ঠিত করলে তা কালক্রমে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। একজন ফ্লনিয়র হিসাবে তিনি বাজারে ঘুরলেন, বাজারে যে মালগুলো নামছে সেগুলো দেখলেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি অপেক্ষা করলেন সেই ক্রেতাদের জন্যে যারা আধুনিকতার হাতে মার খেয়ে তাঁর কবিতা ও গদ্য তুলে নিতে আসবে। সে-অর্থে বদল্যার ছিলেন একজন সামাজিক কবি, বলেছেন বেনিয়ামিন।

    ১৮৫০ এবং ১৮৬০-র দশকে লেখা তাঁর কবিতা ও গদ্যে বদল্যার বর্ণনা করেছেন মহানগরের পথে-পথে হেঁটে বেড়ানোর উত্তেজক অ্যাডভেঞ্চারগুলো, যা যে-কোনও নাটকের চেয়ে বেশি নাটুকে, যে-কোনও গ্রন্হে আলোচিত আইডিয়ার চেয়ে গভীর ও চিন্তা-উদ্রেককারী। ফ্লনিয়রের সঙ্গে অন্যান্য পথচারীর পার্থক্য হল যে অন্যেরা, তারা অলস পায়ে হাঁটলেও, কোনো একটা কাজে বেরিয়েছে, তাদের হাঁটার উদ্দেশ্য আছে, তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্য আছে, যে পথে তারা হাঁটবে তা পূর্ব-নির্ধারিত, যে পথে ফিরবে হয়তো তাও পূর্ব-নির্ধারিত। ফ্লনিয়র কোথাও যাবার জন্য হাঁটছে না, তার কোনো গন্তব্য নেই, উদ্দেশ্য নেই, কেনাকাটা করার নেই। পুঁজিবাদী সমাজের দুটি প্রধান অনুজ্ঞাকে সে অবহেলা ও অস্বীকার করছে : প্রথমত তার তাড়া নেই, এবং দ্বিতীয়ত তার কিছু কেনার নেই, এমনকী সে দরদস্তুরেরও প্রয়োজন বোধ করে না। বদল্যারের ফ্লনিয়র ভাবকল্পটিকে আদর্শে রুপান্তরিত করে কোনো-কোনো অনুজ কবি কাছিমের গলায় বাহারি ফিতে বেঁধে প্যারিসের বাজারে হাঁটতে বেরোতেন, যখন কিনা ব্যস্ত লোকেরা কুকুরের বেল্ট ধরে কুকুরের পেছন-পেছন দৌড়োতেন।

    ভিড়ের দরুন ফ্লনিয়র বিরক্ত হয় না ; জনসমুদায়কে চলার পথে বাধা মনে করে না সে। জনসমুদায়ের মাঝে সে নিজেকে চুপচাপ খুলে ধরতে পারে যাতে সে আশপাশের সবকিছু সেই খোলা হাঁ-মুখে ফেলে-ফেলে কবিতার জন্য সঞ্চয় করতে পারে। ছবি আঁকার জন্য সঞ্চয় করতে পারে । জনসমুদায়ই তার ন্যারেটিভের উৎস। বদল্যারের সমসাময়িক সাহিত্যিকরা আগ্রহান্বিত ছিলেন ধ্রুপদি শিল্পবস্তুর সৌন্দর্যে। বদল্যার আগ্রহান্বিত হলেন পথে-পথে পাওয়া জীবনযাত্রার আধুনিকতায়। মহানগর যেমন নিজের প্রতি আকর্ষন করে অজস্র মানুষকে, কিন্তু এমনই তার আত্মবিরোধিতা যে একজন ব্যক্তিএককের সঙ্গে আরেকজনের অমিল ঘটাতে ওস্তাদ। ‘অমিল’ হল আধুনিকতাবাদের মহানাগরিক বীজ। অসম্ভব হলেও ফ্লনিয়র ফিরে পেতে চায় মিলগুলোকে, ফিরে পেতে চায় গোষ্ঠীসমাজের সংবেদনকে, যাকে বদল্যার

    বলেছিলেন, “বাড়ির বাইরে গিয়েও নিজের চারিধারে বাড়ি গড়ে নেওয়া”। স্বাধীন ও নামহীন ফ্লনিয়র, এর দরুন, ঘটনার সঙ্গে আত্মতা গড়ে নিয়ে আহত, বিষণ্ণ, দুঃখিত, ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে পড়তে পারে, এমনকী দর্শকরূপে একতরফা প্রেমেও পড়তে পারে। যে বস্তু বা যাদের বদল্যার দেখছেন-শুনছেন তা তাঁর কাছে টেক্সটরূপে দেখা দিচ্ছে। নিজের চতুর্দিক থেকে সূক্ষ্ম অনুসন্ধান-সূত্র এবং ইশারা সংগ্রহ করেছেন বদল্যার, যা সাধারণ পথচারীদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। ভিড়ের অংশ হয়ে, যে ভিড় ছেয়ে ফেলেছে রাস্তার দুধার, ফ্লনিয়র তার টেক্সটে দৈহিকভাবে উপস্হিত। শীতল ও কৌতুহলী চাউনি মেলে, ক্ষণকালীন ও একান্ত দূরত্ব বজায় রেখে, পরিবর্তনরত প্রদর্শনীর মিছিলকে অবিরাম অধ্যয়ন করতে থাকে ফ্লনিয়র। তার অস্তিত্বে রয়েছে সক্রিয় বুদ্ধিপ্রক্রিয়া। এই নবতর সাহিত্যিক পরিকল্পনার জনক হিসাবে, সে, চাউনি ফেলে ফেলে নির্মিত সংস্কৃতির সন্দর্ভ-নির্মাতা ; ফলে সে একযোগে হয়ে ওঠে প্রট্যাগনিস্ট ও দর্শক। ভিড়ের কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক নেই, অথচ যা বা যাকে সে দেখছে তার সঙ্গে সে গড়ে তোলে,সাময়িক হলেও, তার সত্তায় লীন হবার মতন গভীর ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক।

    ওয়াল্টার বেনিয়ামিন বলেছেন, ফ্লনিয়র নিজেকে খেলানোর জন্যে ছেড়ে দেয়, অন্যের সত্তায় লীন হবার মাদক প্রক্রিয়ায়। সে একযোগে উপভোগ করে স্বকীয় আত্মতা এবং ‘আরেকজন’ হয়ে ওঠার মজা, যেন সে দেহের খোঁজে চরে বেড়ানো একটি আত্মা। সে যথেচ্ছ অন্যের দেহে প্রবেশ করে যায়। তার বুদ্ধিবৃত্তির খাবারের খোঁজে সে যেন ভিড়ের দেহে একটি পরভুক প্রাণী। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সে নিজেরই তৈরি করা আশ্চর্যনগরীতে, কখনও এই বিপণি-জানালায়, কখনও সেই বিজ্ঞাপনের দিকে, কখনও ওই ভবঘুরের দিকে, কখনও সেই নারীটির দিকে, তাকিয়ে-তাকিয়ে, তাদের শরীরে পরজীবি হয়ে জীবনরস সংগ্রহের আনন্দ উপভোগ করে। সে নিজেই নিজের চিন্তার আদল নিয়ে চারিদিকের বস্তুজগতে চষে বেড়ায়, হাঁটতে থাকে সাধনা-তাড়িতের একাগ্রতায়, পর্যবেক্ষণের সতর্কতায়। প্রকৃতপক্ষে তার রয়েছে পর্যবেক্ষণের বৌদ্ধিক কর্মতাড়না। অথচ তার আছে সত্তাস্বাতন্ত্র্য। ফ্লনিয়র নিজেই নিজের চেতনাশক্তি। বদল্যার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন মহানগরের আধুনিক দর্শকের, মহানগরগুলোয় সে অপরিহার্য চরিত্র, একজন অ্যামেচার ডিটেকটিভ বা শহরের তদন্তকারী।

    বদল্যারের ফ্ল্যানেরি ক্রিয়া ও ফ্লনিয়র কবিসত্তা ভাবকল্পটির বিশ্লেষণ, তাঁর আলোচকদের মতে, অসম্পূর্ণ থেকে যায় তাঁর ‘ক্লেদজ কুসুম’ গ্রন্হের ‘ট্যাবলো প্যারিসিয়েন’ এর অন্তর্গত ‘পাশ দিয়ে যাওয়া পথচারিণী’ কবিতাটির উল্লেখ ব্যতিরেকে ( A une passante )। ফ্লনিয়রের প্যাশনকে উপস্হাপনের একটি নিখুঁত দৃষ্টান্ত এই কবিতাটি। ফ্লনিয়রের ভূমিকায় অবতীর্ণ বদল্যার যাঁকে উদ্দেশ করে কবিতাটি লিখছেন, তাঁর পোশাক দেখে তিনি অনুমান করছেন যে যুবতীটি বিধবা ; যুবতীটি এক মুহূর্তের জন্য তাঁর চোখের সামনে আসেন আর অপসৃয়মান ভিড়ে মিশে যান। ওই মুহূর্তটি গড়ে তোলে অনন্তকাল। প্যারিসের মতন বিশাল শহরে একজনকে দেখার সুযোগ বারবার ঘটার সম্ভাবনা কম। যুবতীটির চকিত চাউনির সঙ্গে কবির চাউনির আদানপ্রদানে লুকিয়ে থাকে ক্ষণস্হায়ীত্বের অনন্তকালীন উপাদান। সেই উপাদান দর্শককে মৃত্যুর হুঁশিয়ারি দেয় এবং জীবন সম্পর্কে মুগ্ধতার ইশারাও দিয়ে যায়। যুবতীটিকে দেখে কবির অস্তিত্বে প্রেমের আভাস সৃষ্টি হয়, সে প্রেম ‘প্রথম দর্শনে প্রেম’ নয়, সে প্রেম ‘শেষ দর্শনে প্রেম’।

    কবিতাটিতে ওই বিধবা যুবতীটি পথচারী ব্যক্তি-এককদের দ্বারা নির্মিত জনসমুদায়ের কথা ঝলকের জন্য কবিকে জানিয়ে উধাও হয়ে যায়। যুবতীটি পূর্বাভাসদায়ক সম্ভাবনা ও কার্যকরিতার প্রতিমূর্তি হয়ে দেখা দেয় কবির জীবনে --- আশ্চর্য নয় যে সেগুলো ভবিষ্যমুখী বৈশিষ্ট্য ; অর্থাৎ কবির জন্যে ওই অচেনা মহিলা তাঁর সৃজনকর্মের সাধিত্র। অন্য যে কোনও প্রেরণাসুত্রের প্রতি তাঁর যে আকর্ষণ সেই একই প্রেরণাসূত্র কবি পেয়ে যান যুবতীটির ক্ষণিক ঝলকে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই সনেটটি ফ্লনিয়রের বহুবিধ বিচার্য বিষয়কে মেলে ধরছে। প্রথমত, শহরের পশ্চাতপটে কান ঝালাপালা-করা আওয়াজ, যা ভিড়ের ভেতরে অকস্মাত চয়নিত বিষয়বস্তুর সঙ্গে কবির সম্পর্ককে ক্ষণিক ও আচমকা করেই শেষ হয় না ; দ্বিতীয়ত, ফ্লনিয়রের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া যুবতীটির সঙ্গে প্রা্য় ভ্যামপায়ারের আদলে জীবনরস ছেঁচে তোলার সম্পর্ক গড়ে ফেলেন কবি ; যুবতীটির চোখ তাঁর কাছে পানপাত্র। ফ্লনিয়র উন্মাদের মতন কাঁপে, রোমাঞ্চিত হয়। তৃতীয়ত, তাঁদের দুজনের সম্পর্ক, যা হয়তো গড়ে উঠতে পারতো, সেই সম্ভাবনা যাচাই করার সুযোগ ঘটে না। পারস্পরিক চাউনি-বদল দুজন মানুষের অস্তিত্বে নৈকট্যের অনুভূমিক মুহূর্ত তৈরি করে দেয় ; চাউনি হয়ে ওঠে, ফ্লনিয়রের কাছে, এমনই এক কাল্পনিক সাধিত্র, যার সাহায্যে কবি ওই মেয়েটির শোক দুঃখ কষ্ট ও অন্যান্য ঝড়ঝাপটের অভিজ্ঞতা নিজে অনুভব করতে পারেন, একদা বাংলায় যাকে বলা হতো “হৃদয় দিয়ে হৃদয় অনুভব” করার শক্তি। চতুর্থত, সতত অপসৃয়মান নৈর্বক্তিক রাস্তা ফ্লনিয়রকে দিচ্ছে ব্যক্তিক হাল-হকিকত অনুমানের দক্ষতা। কবিতাটি অনেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। আমি এখানে ১৯৫২ সালে রয় ক্যাম্পবেল কৃত অনুবাদটি তুলে দিচ্ছি :


     

    The deafening street roared on. Full, slim, and grand

    In mourning and majestic grief, passed down

    A woman, lifting with a stately hand

    And swaying the black borders of her gown ;


     

    Noble and swift, her leg with statue’s matching,

    I drank, convulsed, out of her pensive eye

    A livid sky where hurricanes were hatching,

    Sweetness that charms, and joy that makes one die.


     

    A lightning flash --- then darkness ! Fleeting chance

    Whose look was my rebirth --- a single glance !

    Through endless time shall I not meet with you ?


     

    Far off ! too late ! or never ! --- I not knowing

    Who you may be, nor you where I am going ---

    You, whom I might have loved, who know it too.

    ( রচনাকাল: ফেব্রুয়ারি-মার্চ, ২০১৩ )


     

     

     

  • ইকরা খিলজি | ২১ আগস্ট ২০২১ ১৭:৩৪734889
  • ভারতীয় উর্দু কবি ইকরা খিলজি’র কবিতা
    খবিশ KHABISH خبيث “Impure; base; wicked.”
    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী
    আমি অশুদ্ধ, আমি নোংরা
    আমি ভবঘুরেপনার প্রচারক
    স্বর্গের বিশুদ্ধ পরিদের গানের
    সৌন্দর্যের প্রতিমা আমি নই
    আমি আমার কামনার দাসী
    আমি লালসার বুদবুদ
    আমি জীবন্ত, আমি ভঙ্গুর
    তবু আমি অহঙ্কারের মিনার
    আমি মাত্রাধিক অহমিকার মানুষী
    তোমরা আমাকে কখনও ছুঁতে পারবে না
    তোমাদের মনে হতে পারে আমি খড়ের বা লাঠির শব
    কেনই বা আমি ভুয়ো আকাঙ্খায় গড়ব নিজেকে ?
    তোমরা যতোটা স্বার্থপর, আমিও ততোই
    কেনই বা আমি পরার্থতার প্রতিমা হবো ?
    তোমাদের মতনই মিষ্ট আমার কথাবার্তা
    আমি কেন মিছরির তৈরি সৎচরিত্রের দেবী হবো ?
    আমি অতিসাধারণ
    তোমাদের খাতিরে ভালো হবার ভার আমি কেন বইব ?
    তোমাদের রয়েছে উন্নত হবার গর্ববোধ
    কিন্তু খ্যাতি আমার কাছে সহজেই আসে
    তোমাদের যদি প্রাণহীন হাসিমুখ ভালো লাগে
    তাহলে শ্বেতপাথরের মূর্তি যোগাড় করে নাও
    তোমাদের আনন্দের খাতিরে আমার কপালের বলিরেখা উবে যাবে না
    আমার মুখমণ্ডলের ভাবভঙ্গী তোমাদের আদেশ পালন করে না
    এমনকী তা তোমাদের খাতিরে নয়
    আমি সৌন্দর্যের জিনিস নই
    আমি বিনয়ের আজ্ঞাবহ নই
    আমি লাবণ্যের কথা জানি না
    আমি পুজো করা মানি না
    তোমাদের স্নেহ বা মনোযোগ চাই না
    মনে করার কারণ নেই যে তোমাদের ছাড়া আমি দুর্দশাগ্রস্ত
    তোমাদের রাজত্বের প্রজা আমি আর নই
    বাধিত নই তোমাদের কৃতজ্ঞতায়
    মনে কোরো না তোমাদের প্রাসাদের আমি পাপোশ
    এবার বলো, তোমাদের বিশ্বস্ততার প্রতিশ্রুতি কেমন ছিল
    যখন আমি ছলনাময় তাবিজ হয়ে উঠি
    যে তোমাদের জাহাঙ্গীর করে তুলেছিল
    আমি আর তীরবঞ্চিত ঢেউ নই
    স্বর্গের কৌতূহলে চেপে আমি উড্ডীন
    ইতিহাসের পাতা আমাকে মুছে ফেললেও
    বিশ্বাসীরা আমাকে আশীর্বাদ করবে
    আমার দেহ আর আমার মনকে বহুকাল বোরখায় ঢেকে রাখা হয়েছে
    কিন্তু এই অন্ধকার সময়ে আমার অস্তিত্ব দীপ্তিময়ী
    আকাশে এমনই কানাকানি চলছে
    শেকলে বেঁধে কতোকাল আমাকে পেছনে ফেলে রাখবে
    আমার ক্ষমতা বহুকাল প্রদর্শিত হয়েছে
    আর কতোদিন মাদ্রাসাগুলো আমাকে অপমান করবে
    বহুকাল আমি পদাতিকের যুদ্ধ লড়ে চলেছি
    আমার বিদ্রোহ এই পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে
    আর আমার ষড়যন্ত্র দুর্বলও নয় মূর্খেরও নয়
    যে ক্ষমতাপ্রাসাদ থেকে তোমরা আমাকে দাবিয়ে রাখো তাতে আমি ঢুকে পড়েছি
    আমি তোমাদের জগতকে অলঙ্কৃত করার জন্যে যে সৃষ্ট নই তা তোমাদের জানার সময় এসে গেছে
  • মলয় রায়চৌধুরী | ২৪ আগস্ট ২০২১ ১৯:৩৬734904
  • রূপকথার একশো বছর

    মলয় রায়চৌধুরী

    কেউ কি ভেবেছিল কখনও ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে বাংলাভাষী একজন

    নেমে আসবে রূপকথা থেকে ? অখ্যাত কবির রোমকূপে হর্ষের ঝড় তুলে

    আত্মাভিমানকে তার অনন্তকালের আলো দেবে ! হ্যাঁ, মুজিব বঙ্গবন্ধু

    অখ্যাত বাংলাভাষী আমি ও আমার পিতা, আমার বংশধরেরা, চিরকাল

    বেঁচে থাকবে আপনার ধ্বনি-দেয়া মর্ত্যলোকের অভূতপূর্ব বিস্ময়ে।

    কেবল আমার বাংশধরেরা নয়, আমার মতন আরো কোটি-কোটি

    ভাষাসন্তানেরা বেঁচে থাকবে আপনার অমরত্বে, পৃথিবীর যেখানে থাকুক

    তারা, তাদের প্রতিটি উচ্চারণে আপনার নায়কোচিত আত্মবলিদান

    সেইসব যুবকের হাতে যারা নিজেরই মায়ের ভাষা বর্জনীয় ভেবে

    রূপকথা-বর্ণিত রাক্ষসপুত্রের ভূমিকায় দানবের দেয়া স্বর্ণের বিনিময়ে

    ভাবলো আপনাকে ও আপনার বাড়ির লোকেদের গুলিবিদ্ধ করলেই

    মৌন হয়ে যাবে জয়ধ্বনি। হয়নি যে তা তো তারা এবং তাদের

    দোসরেরা জীবৎকালেই জেনে গেছে। বাংলাভাষা তো ঘাসের মতন

    কখনও শুকায় না ; জঙ্গলে আগুন লেগে অলিভ-পোশাক-পরা গাছ

    ছাই হয়, কিন্তু সে-আগুন নিভে গেলে ঘাসেরা আবার আসে ফিরে--

    যেমনই সে ঘাসেরা হোক, ছোটো-বড়ো-গরিব-বৈভবশালী, দ্রুত

    ছোটে তারা জয়ধ্বনি দিতে-দিতে পৃথিবীর ভিজে বা শুকনো মাটিতে--

    জানে ওই সবুজ ঘাসেরা আপনার পায়ের ধূলিকণা তাদের অমরত্ব

    দিয়ে গেছে। যতোদিন পৃথিবীতে রয়েছে বাংলাভাষী আপনি আছেন

    রক্তে সেই সব মানুষের পূর্বপুরুষ হয়ে, আদিবন্ধু বঙ্গভাষী হয়ে



     
  • শ্রীমন্তী সেনগুপ্ত | ২৪ আগস্ট ২০২১ ১৯:৩৮734905
  • শ্রীমন্তী সেনগুপ্ত : হাংরি আন্দোলনের কবি মলয় রায়চৌধুরী

    এই রচনাটি আমার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এটা এক ধরণের ফিরে আসা -- আমি শব্দহীনতার মানসিক অবসাদে দীর্ঘকাল ভুগছিলাম, যখন আমার মনে হলো যে এর থেকে নিষ্ক্রমণের সহজ উপায় হবে কমপিউটারের কিবোর্ডে আঙুল রেখে টকাটক টাইপ করে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, এই রচনাটি উৎসর্গ করেছি একজন ডিস্টার্বিং কবির প্রতি, এমন একজন যাঁর গভীরতায় প্রবেশ করার সাহস নেই আমার। এখানে আমি যা কিছু লিখব তা মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে আমার বোধবুদ্ধির অতীত, যিনি বাংলা ভাষার কবি, স্কলার, ষাট দশকের হাংরি আন্দোলনের জনক। তিনি তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে ষাটের দশকের পশ্চিমবঙ্গে সক্রোধে আবির্ভুত হলেন, বাঙালির পচনরত সমাজকে পরিবর্তনের উদ্দেশ্য নিয়ে।

     

    আমি ইংরেজি উইকিপেডিয়া থেকে অনুবাদ করে একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি :-

     

    “হাংরি জেনারেশন সাহিত্য আন্দোলন মলয় রায়চৌধুরী, সমীর রায়চৌধুরী (মলয়ের বড় ভাই), শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং হারধন ধাড়া (ওরফে দেবী রায়) আরম্ভ করেছিলেন। পরে ত্রিশের বেশি কবি এবং শিল্পীরা তে তাঁদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য বিনয় মজুমদার, উৎপলকুমার বসু, ফাল্গুনী রায়, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, রবীন্দ্র গুহ এবং অনিল করঞ্জাই।

     

    “হারি আন্দোলনে মলয় রায়চৌধুরীর ভূমিকা তুলনীয় স্টিফেন মালর্মের সিমবলিজম, এজরা পাউণ্ডের ইমজিজম, আঁদ্রে ব্রেতঁর পরাবাস্তববাদ, এবং অ্যালেন গিন্সবার্গের বিট আন্দোলনের সঙ্গে। হাংরি আন্দোলন এখন ইংরাজিতে Hungryalism বা "ক্ষুধার্ত প্রজন্ম" নামে পরিচিত। হাংরি শব্দটি জিওফ্রে চসারের "ইন দ্য সাওয়ার হাংরি টাইম" থেকে নেয়া হয়েছে; দর্শনটি ওসওয়াল্ড স্পেঙ্গলারের “দ্য ডিক্লাইন অব দ্য ওয়েস্ট"-এর ওপর ভিত্তি করে। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে আন্দোলনের প্রথম বুলেটিন ইংরেজিতে মলয় রায়চৌধুরী কর্তৃক প্রকাশিত হয়। তবে আন্দোলনটি ১৯৬৫ সালে ফুরিয়ে যায়। এরপর মলয় রায়চৌধুরী কবিতা ছাড়াও উপন্যাস, নাটক, এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তু নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন, যে ব্যাপারগুলো বাঙালি সমাজকে ভোগান্তির শেষ প্রান্তে এনেছে। ”

     

    “ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন ইংরেজী শিক্ষক হাওয়ার্ড ম্যাককোর্ড এবং পরে বাওলিং গ্রিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক, যিনি কলকাতা সফরের সময় মলয় রায়চৌধুরীর সাথে সাক্ষাত করেছিলেন, তিনি ফেরলিংঘেটি-সম্পাদিত ‘সিটি লাইাইটস জার্নাল’ ৩-এ এই বিষয়ে লিখেছিলেন : "ষাটের দশকের শুরুতে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে হাংরি জেনারেশনের সাংস্কৃতিক সংগঠনের আক্রমণের একটি কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হলেম মলয় রায়চৌধুরী"। মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা, "এসিড, ধ্বংসাত্মক, ক্ষতিকারক, নির্বিচার, অসম্মানজনক, ক্ষুব্ধ, আক্রমণাত্মক, হতাশাব্যঞ্জক, - এই ভয়ঙ্কর এবং বিশুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গিকে চিত্রিত করে"।


    এ থেকে আপনি তাঁর জীবন ও সময় সম্পর্কে ধারণা করতে পারবেন, অন্তত আমি যা বলতে পারব তার তুলনায় স্পষ্ট, কেননা প্রথমত, আমি অনুভবের তাৎক্ষণিকতায় বিশ্বাস করি যাতে পাঠকের সংবেদনকে আক্রমণ করতে পারি, এবং দ্বিতীয়ত, তাঁর সঙ্গে সাইবার জগতে আমার যোগাযোগকে আমি এই রচনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

     

    আমার অশেষ ভাগ্য যে মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে, যাঁকে আমি মলয়দা বলে ডাকতে ভালোবাসি, তাঁর সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল। এই ঘটনাটি ‘সোশাল নেটওয়র্কিঙের’ প্রতি আমার উদাসীন অবস্হানকে কিছুটা নমনীয় করেছে। মলয়দার রচনাবলীর সঙ্গে আমার প্রথম যোগাযোগ ঘটে একজন বুদ্ধিজীবীর মাধ্যমে, দুই বছর পুর্বে, যে ব্যাপারটিকে আমি মনে করি এ-পর্যন্ত আমার জীবনে একটি বাঁকবদলের ঘটনা। যা আমাকে যৌক্তিকতার পাহাড়চূড়া থেকে মোহাচ্ছন্ন জ্ঞানের অতলে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল, এবং আমি ভয়ংকর পতন থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্য একটা লতাকে আঁকড়ে ধরেছিলাম। তাঁর প্রথম যে রচনাটির সঙ্গে আমি পরিচিত হলাম তা ইনটারনেটে পাওয়া ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতাটি। আমি কবিতাটির কয়েকটি লাইন তুলে দিচ্ছি, যা পড়ার পর আমি ব্লাশ করতে বাধ্য হয়েছিলাম এবং চোখ বুজে অনুভব করতে পারছিলাম যে এক গরম হল্কা আমার মাথার চুলের গোড়া থেকে বইতে আরম্ভ করেছে :-

     

    তোমার তীব্র রূপালি য়ূটেরাসে ঘুমোতে দাও কিছুকাল শুভা

    শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও

    তোমার ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে দাও আমার পাপতাড়িত কঙ্কাল

    আমাকে তোমার গর্ভে আমারই শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও

    আমার বাবা-মা আন্য হলেও কি আমি এরকম হতুম ?

    সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শুক্র থেকে মলয় ওর্ফে আমি হতে পার্তুম ?

    আমার বাবার অন্য নারীর গর্ভে ঢুকেও কি মলয় হতুম ?

    শুভা না থাকলে আমিও কি পেশাদার ভদ্রলোক হতুম মৃত ভায়ের মতন ?

    ওঃ বলুক কেউ এসবের জবাবদিহি করুক

    শুভা, ওঃ শুভা

    তোমার সেলোফেন সতীচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও আমায়

    পুনরায় সবুজ তোশকের ওপর চলে এসো শুভা

    যেমন ক্যাথোড রশ্মিকে তীক্ষ্ণধী চুম্বকের আঁচ মেরে তুলতে হয়

    ১৯৫৬ সালের সেই হেস্তনেস্তকারী চিঠি মনে পড়ছে

    তখন ভাল্লুকের ছাল দিয়ে সাজানো হচ্ছিল তোমার ক্লিটোরিসের আশপাশ

    পাঁজর নিকুচি করা ঝুরি তখন তোমার স্তনে নামছে

    হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা

    পায়জামায় শুকিয়ে-যাওয়া বীর্য থেকে ডানা মেলছে

    ৩০০০০০ শিশু উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে

    ঝাঁকে-ঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়

    এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে

    হিপ্নোটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপর্চুলায়

    ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখি আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি

     

    এর আগে আমি এরকম কবিতা কখনও পড়িনি। আমি সবচেয়ে প্রথমে আসেপাশে তাকিয়ে দেখে নিলাম যে বাড়ির গুরুজনরা কেউ আমার কমপিউটার স্ক্রিনে উঁকি মারছেন না তো ! আমার চোখ কুঁচকে উঠল আর মণি দুটো ঘন হয়ে এলো, যেমন-যেমন আমি কবিতার ছবিগুলো মস্তিষ্কে স্পষ্ট করে তুলতে লাগলাম, তেমন তেমন ঘটতে লাগলো এগুলো।

     

    “এই লোকটা কী লিখছে রে বাবা ! লোকটা তো উন্মাদ আস্ফালন করছে !” আর তারপর বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে আমি আমার স্হিতির সঙ্গে আপোষ করে বুঝতে পারলাম যে কবিতাটা আমাকে মর্মপীড়ায় অভিভূত করেছে, কয়েকটা লাইন আমাকে ধর্ষণ করেছে। আমি একা ছিলাম না। অশ্লীল রচনার দায়ে মলয়দাকে আদালতে মামলার দুর্ভোগ পোয়াতে হয়েছিল, আর সেই মামলায় বাংলা কবিতার কয়েকজন নামিদামি মানুষ তাঁর বিরুদ্ধ সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

     

    প্রায় এক সপ্তাহের ঘুমহীন দাহময় দুপুরের পর, আমি কবিতাটায় ফিরে-ফিরে যেতে লাগলাম, বয়ঃসন্ধির সেই বালিকার মতন যে সদ্য নিজের দেহের রহস্যগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। বিপরীত সেক্সের মানুষকে ছোঁবার জান্তব প্রবৃত্তি, দেহকে লুটেনেবার আগ্রহ, আরন্যক আকাঙ্খায় পাগল হয়ে ওঠার উপক্রম হলো। মলয়দার ভাষার ক্ষমতা আমাকে চিরকালের জন্য যেন অসাড় করে দিয়েছিল। আর তারপর হঠাৎই ফেসবুকে তাঁর সঙ্গে দেখা, আর আমাকে ঘিরে ধরল এক অদ্ভুত ভয়। স্পষ্ট কথায়, আমি এই ধরণের মানুষদের সম্পর্কে ভীষণ আতঙ্কিত। একদল শিল্পী আছেন যাঁরা তাঁদের শিল্পকর্মের প্রতি অত্যন্ত সমর্পিত। এই এলাকায় যাঁদের পাওয়া যাবে তাঁরা হলেন অ্যালেন গিন্সবার্গ, অ্যামি ওয়াইনহাউজ, কুর্ট কোবেইন এবং আরও অনেক চরমপন্হী-শিল্পী ; তাঁদের জন্য শব্দবন্ধটা আমিই তৈরি করেছি। তাঁরা বিপরীত সেক্সের মানুষদের দুর্নিবার আকর্ষণ করেন, তাঁরা নিজেদের সময় ও শিল্পের সঙ্গে চূড়ান্ত ও বিপজ্জনকভাবে জড়িয়ে পড়েন। পাবলো পিকাসোকে অনেক সময়ে গ্রিক পুরাণের অর্ধেক-মানব ও অর্ধেক দানব মিনোটরের সঙ্গে তুলনা করা হয়। মিনোটরের মতো তিনি চাইতেন যে নারীদের তাঁর সামনে বলি দেয়া হোক, তাঁর ব্যক্তিজীবনের ঘটনাবলী থেকে যা প্রমাণিত, যেসব ঘটনা পিছনে ফেলে গেছে ধারাবাহিকভাবে যন্ত্রণাগ্রস্ত স্ত্রীদের, রক্ষিতাদের ও সন্তানদের।

     

    মলয়দা আমাকে একবার বলেছিলেন যে তাঁর চেয়ে বয়সে কুড়ি বছর ছোটো একজন তরুণী তাঁকে থ্রেটেন করেছিলেন যে যদি মলয়দা তাঁকে বিয়ে না করেন তাহলে আত্মহত্যা করবেন। তরুণীটি নিজের কথা রেখেছিলেন। টয়লেটের অ্যাসিড খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন।

     

    আমি লুকিয়ে মলয়দার সাইবার জগতে প্রবেশ করেছিলাম, অত্যন্ত সাবধানে, ছায়ার মতো সশ্রদ্ধ প্রশংসকরূপে, যাতে আমি নিজে না উন্মাদনার বিপদে আক্রান্ত হই, কিন্তু আমি তাতে সফল হইনি। শেষ পর্যন্ত একদিন আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ তোমার কবিতায় যৌনতার এরকম খোলাখুলি প্রয়োগের ভূমিকা কি ?”

     

    মলয়দার অবাক-করা উত্তরে ছিল সাহসিক প্রশান্তি : “ভাষার লোভনীয় শরীরের সঙ্গে সঙ্গম করলে কবিতার জন্ম হয়। ”

     

    শুনে, আবার আমি শব্দহীনতায় থতমত খেলাম। আমি ইনটারনেটে মলয়দার লেখাগুলোতে ঢুঁ মারতে লাগলাম ( সবই ‘ব্লগস উইথ জবস’ ট্যাগ করা ), পাঠকের মন্তব্য থেকে বোঝা যায় তারা কবিতাগুলোকে অশ্লীল তকমা দিয়েছে। মলয়দা তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “অশ্লীলতা বলতে ঠিক কী বোঝায়? শুনতে ভালো লাগে এরকম শব্দে সাজানো রোমান্টিক ছবিকেই কি কবিতা বলা হবে ? তোমরা বরং পড়া অভ্যাস করো, তাহলে ঠাহর করতে পারবে। ”

    মলয়দার বিষয়ে ভাবলে আমার মনে পড়ে কমলা দাস-এর কথা, আরেকজন একমাত্র কবি যার প্রভাব আমার ওপরে একই রকম হয়েছিল। তিনিও, পাঠকের গ্রহণ করার শেকল ভেঙে নিজের কন্ঠস্বরকে কবিতায় জায়গা দিয়েছেন। এই ধরণের মানুষের কাছে কবিতা হলো তাঁদের অস্তিত্বের প্রসারণ। ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক, আমি অন্তত তাই মনে করি, যেমন বন্ধুদের সম্পর্কে কুৎসা করা, অফিসের বসের সম্পর্কে গজগজ করা, দাঁত মাজা, কিংবা পেচ্ছাপ করার মতন।

     

    এই ধরণের মানুষরা অন্যের খারাপ লাগতে পারে ভেবে নিজের কাজকে কার্পেটের তলায় লুকিয়ে ফেলতে পারেন না, এই ভেবে যে তা করলে জনপ্রিয় হওয়া যাবে। তাঁরা বেশ বিপজ্জনক, অরুন্ধতী রায়ের ‘গড অফ স্মল থিংস’-এর আম্মুর মতন, তাঁদের থাকে চূড়ান্ত উন্মাদনা, দায়িত্বহীন এনার্জি, যেমন ভাই আর বোনের প্রেম, প্রেমের সীমারেখা লঙ্ঘন করে তারা।

     

    আমি এখন মলয়দার ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’ পড়ছি। তাঁর কটু শৈশবের উষ্ণ স্মৃতিচারণা, মতামতে সমঝোতাহীন, অবাক-করা সততা এবং তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গে ও বক্রোক্তিতে পরিপূর্ণ। মলয়দার শৈশব কেটেছিল প্রাক-স্বাধীন ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনা শহরের এক এঁদো পাড়ায়। বালক মলয়ের চোখ দিয়ে দেখা জগতকে তিনি তুলে ধরেছেন, এবং অনেক সময়ে বর্তমানের জ্ঞানী, চোটখাওয়া লেখকের দয়াহীন সততায় গড়ে তুলেছেন ন্যারেটিভ। তাঁদের পরিবার, সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বংশ, মিথ্যা কুসংস্কার ও অতীত গৌরবে আক্রান্ত, অসহ্য দারিদ্রের মাঝে মাথা চাড়া দিয়েছিল। মলয় দারিদ্রের কথা বলেন, প্রথম দেখা এক উলঙ্গ বিধবার কথা, দুইজন বোবা দর্জি যারা তাঁদের বাড়ির সকলের পোশাক সেলাই করত, পায়খানা থেকে বেরিয়ে অদ্ভুত নিয়মপালন, পাটনা মিউজিয়ামের কিপার অব পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার তাঁর বড়োজেঠার সঙ্গে সেখানে গিয়ে দর্শনার্থীরা কেমন গ্রিক মূর্তির লিঙ্গে হাত দিচ্ছে তা এক বালকের বিস্ময়ে যে ঢেউ তোলে তার বর্ণনা।

     

    বইটা থেকে পাঠক পাবেন অনেককিছু, যা চাই তাই, সবকিছু, যখন কিনা প্রথম দৃশ্য থেকে শুরু হয় মলয়দার পনেরো বছরের জাঠতুতো ভাই বাড়িতে একজন বেশ্যাকে এনে বিদায় দেবার সময়ে মাঝরাতে ধরা পড়ার ঘটনা। কম বললেও একথা বলতে হয় যে মলয় রায়চৌধুরী একজন ডিস্টার্বিং লেখক। অনেক সময়ে আমি ওনার গড়ে তোলা দৃশ্যাবলী ও ঘটনায় প্রতিহত হই, এমনকি বিবমিষায় আক্রান্ত হই। কখনও বা মনে হয় তাঁর কবিতা যেন ফাঁদ পেতে রাখে, মর্মার্থহীন গোঁসায় ঠাশা, নঙর্থক এবং উত্তেজনাপূর্ণ। তারপর আমি ফিরে আসি সন্ধ্যার প্রশান্তিতে এবং সবকিছু আবার নিজের জায়গায় স্হান করে নেয় -- সময়, ক্রোধ, মানুষের অবস্হার প্রতি অবিশ্বাস।

     

    সত্তর বছর বয়সের এই মানুষটার সঙ্গে কথা বলার সময়ে আমি ক্রুদ্ধ এবং নিজেকে ব্যর্থ অনুভব করি, যে লোকটা অবসর নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে মুম্বাইতে থাকে। লোকটার এতো বুকের পাটা হলো কেমন করে যে বিস্ময়করভাবে নিজের সততা প্রকাশ করে ? কোন সে স্পর্ধার অনুমতি লোকটা পেয়েছে যে এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে স্বাধীন। এই প্রশ্নগুলো মলয়দাকে করলে আমি ওনার দেয়া উত্তরে নিঃশব্দ হাসি শুনতে পাই:-

     

    “তুই কি কখনও ভেবে দেখেছিস তোর জীবনে কে এমন হতে পারে যাকে তুই একই সঙ্গে ভালোবাসিস আর ঘৃণা করিস ? আমি সেই ধরণের ক্ষতিকর জীব যে আক্রান্ত হওয়াকে উপভোগ করে ! তুই কি লক্ষ্য করেছিস যে আলফা পুরুষ জানোয়ার তার বিপক্ষকে হারাবার জন্য মাথাকে ব্যবহার করে ? বাইসন, জিরাফ, সিংহ, হাতি, গণ্ডার, কুমির, যেকোনো ক্ষমতাবান জানোয়ার। আমি সেই ধরণের জানোয়ারদের মতন অস্তিত্ব বজায় রাখি, যারা একটা দলের নেতৃত্ব দেয়। যেমন সিংহ। সিংহের মতন আমি একাকীত্ব পছন্দ করি। লেখার জন্য আমি আমার মস্তিষ্ক ব্যবহার করি। পাঠক তো অপ্রাসঙ্গিক। ভাষাই হলো প্রেমিকা, যাকে আমি ভালোবাসি।”

     

    আর ব্যাস, মলয়দা নির্ণয় নিলেন যে সাম্প্রতিক কবিতাগুলোকে ‘আলফা মেল পোয়েট্রি’ নাম দেবেন। লোকটা এই রকমই, বিরক্তিকরভাবে সরল। ওনার হৃদয় আর হাতের মাঝে কোনো জেসটেশান পিরিয়ড নেই। ওনার অনুভূতি ও যন্ত্রণার মাঝে কেউ একজন কয়েক আলোকবর্ষের দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছে। আমরা যারা ভেবেচিন্তে পা ফেলি তারা এই ধরণের ঔদ্ধত্য কেবল হাঁ করে দেখি। আমরা একে বলতে পারি ক্ষিপ্ত তারস্বর ; আমরা উত্যক্ত হয়ে পাতার পর পাতা বিতর্ক করতে পারি, ওনাকে ঘরে তালা বন্ধ করে রাখতে পারি, কিন্তু ওনাদের কলম কেড়ে নেবার ক্ষমতা, কষ্টযন্ত্রণা লাঘব করার ক্ষমতা, আমাদের নেই।

     

    একবার আমি ওনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘তুমি কি সাধারণ সংসারি মানুষের মতন আচরণ করো ? বাজারে যাও, চায়ে দুধ ঢেলে চুমুক দাও ? ইত্যাদি। ”

     

    উনি কোনো গুরুত্ব না দিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন যে ওনার স্ত্রী বাজার ইত্যাদি করার দায়িত্ব নিয়েছেন, এবং উনি লিকার চা খান। আর খাদের কিনারায় বসবাসের চেয়ে সংসারি মানুষ হওয়া ঢের ভালো। আমার গভীর উদ্বেগকে এভাবে এড়িয়ে যাবার জন্য আমি ওনাকে ক্ষমা করতে পারিনি। লোকটা কি সত্যিই বাস্তব ?

     

    উনি একবার বলেছিলেন, “পিকাসো সম্পর্কে তোর লেখাটা পড়লুম। দারুণ। আমার সম্পর্কে এক পাতা লিখলেই তো পারিস, কেননা এখন আমার বইগুলো পড়ে ফেলেছিল। যা ইচ্ছে লিখবি ; আমার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে চিন্তা করার দরকার নেই। আমি গণ্ডারের-চামড়া লেখক। তোর নিজের চিন্তাধারার ওপর ভালো দখল আছে। অতএব শুরু করে দে। আমাকে তুই যাকে বলে ‘পিস অব ইয়োর মাইন্ড’, তাই দিস। ”

     

    এই ছোটো লেখাটা মলয় রায়চৌধুরীকে উৎসর্গ করলাম। অশ্লীলতার জয় হোক।



     
  • মলয় রায়চৌধুরী | ২৪ আগস্ট ২০২১ ১৯:৪০734906
  • জাঁ জেনের কবিতা : মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত কয়েদি

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    জাঁ জেনে (১৯শে ডিসেম্বর, ১৯১০ – ১৫ই এপ্রিল, ১৯৮৬) ছিলেন এক বিশিষ্ট ফরাসি ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক অধিকার আন্দোলন কর্মী। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন এক যাযাবর ও ছিঁচকে অপরাধী। পরবর্তী জীবনে তিনি লেখালেখি শুরু করেন। তার প্রসিদ্ধ রচনাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস কুইরিল অফ ব্রেস্ট, দ্য থিফস জার্নালআওয়ার লেডি অফ দ্য ফ্লাওয়ার্স; নাটক দ্য ব্যালকনি, দ্য ব্ল্যাকস, দ্য মেইডস, ও দ্য স্ক্রিনস । জাঁ জেনে সমকামী ছিলেন।

     

    কবিতাটি সম্পর্কে জাঁ জেনের বক্তব্য : “আমি এই কবিতাটি আমার বন্ধু মরিস পিলোর্গেকে উৎসর্গ করেছি, যার উজ্বল মুখ আর দেহ আমার ঘুমহীন রাতগুলোয় ঘাপটি মেরে ঢোকে। আত্মার আত্মীয় হিসাবে তার জীবনের শেষ চল্লিশ দিন তার সঙ্গেই আমি বেঁচেছি। সে ছিল পায়ে চেন বাঁধা অবস্হায় এবং অনেকসময়ে দুই হাতেও, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অন্ধকার কুঠুরিতে, সাঁ-ব্রিয়েক কারাগারে। সংবাদপত্রগুলো আসল ব্যাপারটাই ধরতে পারেনি। তারা নির্বোধ প্রবন্ধগুলোর সঙ্গে সায় দিয়েছে যেগুলো পিলোর্গের মৃত্যু নিয়ে আহ্লাদ করেছিল। ইউভ্রে সংবাদপত্র লিখেছিল, ‘এই বালক ছিল আরেক নিয়তির উপযুক্ত’। সংক্ষেপে, তারা পিলোর্গেকে হেয় করেছিল। আমি তাকে চিনতুম, সে ছিল দেহ ও আত্মায় সৌম্যদর্শন ও মহৎ। প্রতিদিন সকালে যখন আমি আমার কুঠুরি থেকে তার কুঠুরিতে যেতুম, ওর জন্য কয়েকটা সিগারেট নিয়ে -- জেলার সাহেবকে ধন্যবাদ, কেননা তিনি পিলোর্গের সৌন্দর্য, যৌবন ও অ্যাপোলোর মতন মাধুর্যে বিমোহিত ছিলেন -- পিলোর্গে গুনগুন করে গান গাইতো আর হেসে আমাকে বলতো, সেলাম সকালবেলার জনি। পিলোর্গের বাড়ি ছিল পুই দ্য দোমে, সেখানকার টান ছিল ওর কথাবার্তায়। পিলোর্গের ঐশ্বর্ষময় করুণার সৌষ্ঠবে ঈর্ষান্বিত জুরিরা, অদৃষ্টের ভূমিকা নিয়ে, ওকে কুড়ি বছরের জন্যে সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল, কেননা ও সমুদ্রের ধারে কয়েকটা বাড়িতে ডাকাতি করেছিল আর পরের দিন নিজের প্রেমিক এসকুদেরোকে খুন করেছিল ; এসকুদেরো পিলোর্গের এক হাজার ফ্রাঁ চুরি করে নিয়েছিল। এই একই আদালত পরে আদেশ দিয়েছিল যে পিলোর্গের মাথা গিলোটিনে রেখে ধড় থেকে আলাদা করে দেয়া হোক। ১৭ মার্চ ১৯৩৯ সালে পিলোর্গেকে রাষ্ট্র ওইভাবে হত্যা করে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে মারা যায় মরিস পিলোর্গে। ”

    এই কবিতাটিতে কয়েদি ও সমকামীদের জগতে প্রচলিত বহু ইশারা প্রয়োগ করেছেন জাঁ জেনে। জেনে তাঁর কবিতায় পাঠকদের নৈতিক ও ঐতিহ্যগত মূল্যবোধে অন্তর্ঘাত ঘটাবার কাজ করেছেন। তিনি পাপ, পতন, ক্লেদ ইত্যাদিতে পেয়েছেন সৌন্দর্য এবং তার গুণকীর্তন করেছেন, গুরুত্ব আরোপ করেছেন নিজের অসাধারণত্বে, নিষ্ঠুর ও বেপরোয়া অপরাধীদের করে তুলেছেন নিরুপম আইকন, সমকামের বিশেষ আচার-আচরণ ও শব্দভাঁড়ারকে নির্দিধায় ব্যবহার করেছেন এবং হিংস্রতা ও বিশ্বাসঘাতকতার বর্ণনাকে উপভোগ করেছেন।

    -----------------------------------------------------------------------------------------------------------------

    জেলের উঠোনে বাতাস একটি হৃদয়কে গড়িয়ে নিয়ে চলেছে

    গাছ থেকে ঝুলছে ফোঁপাতে থাকা এক দেবদূত

    শ্বেতপাথরকে পাকিয়ে নভোনীল থাম

    গড়ে তুলছে জরুরি দরোজা

    তা আমার রাতের জন্য খোলা।

    এক বেচারা পতনরত পাখি আর ছাইয়ের স্বাদ

    দেয়ালে ঘুমন্ত চোখের স্মৃতি

    আর এই দুঃখে ঠাশা মুঠো যা নভোনীলকে হুমকি দিয়ে

    তোমার মুখ নামিয়ে আনে

    আমার হাতের

    গহ্বরে।

     

    এই কঠিন মুখ, মুখোশের চেয়েও হালকা

    দামি মণিরত্নের চেয়েও আমার হাতে ভারি ঠেকছে

    প্রতিরোধের আঙুলে ; ভিজে গেছে কান্নায়

    অন্ধকারাচ্ছন্ন ও ভয়ঙ্কর

    এক সবুজ চাদর তাকে

    ঢেকে রেখেছে।

    তোমার মুখ কঠোর। একজন গ্রিক মেষপালকের মতন

    আমার বন্ধ দুই হাতের মধ্যে কাঁপছে

    তোমার মুখ এক মৃত নারীর মতন

    তোমার চোখ দুটো গোলাপ

    আর তোমার নাক হতে পারে

    এক শ্রেষ্ঠ দেবদূতের ঠোঁট।

    যদি তোমার মুখ গান গায়, তাহলে কোন নারকীয় পাপ

    তোমার দূষিত বিনয়ের ঝিলমিলে তুষারকে গলিয়ে দিয়েছে

    ইস্পাতের উজ্বল নক্ষত্র দিয়ে তোমার চুলের ধুলো ঝেড়েছে

    আর কাঁটার মুকুট পরিয়েছে তোমার মাথায় ?

    আমাকে বলো কোন উন্মাদ দুর্ভাগ্য আচমকা তোমার চোখকে মেলে ধরে

    এক বিষাদ যা এতো তীব্র যে বুনো দুঃখ

    তোমার শীতল চোখের জল সত্বেও

    তোমার গোল মুখকে আদর করতে আতঙ্কিত হয়

    শোকের মিষ্টি হাসি হেসে ?

    আজ রাতে, সোনালী বালক, “চাঁদের ফেনা” গানটা গেও না

    তার বদলে মিনারবাসিনী এক রাজকন্যা হও যে স্বপ্ন দেখছে

    আমাদের দুর্ভাগা প্রেমের -- কিংবা ফরসা কেবিন বালক

    যে উঁচু মাস্তুল থেকে নজর রাখছে।

    আর সন্ধ্যায় জাহাজ-পাটাতনে গান গাইবার জন্যে নেমে আসবে

    নাবিকদের মাঝে গইবে ‘সমুদ্রের নক্ষত্রদের জয়’

    ন্যাড়ামাথা আর হাঁটুগেড়ে, ধরে রেখেছে

    তাদের বজ্জাত হাতে

    লাফখোর লিঙ্গকে।

    তোমাকে ধর্ষণ করার জন্য, সুন্দর হঠকারী কেবিন বালক

    পালোয়ান নাবিকরা এতোক্ষণে তাদের ট্রাউজারের মধ্যে টনটন করে উঠছে

    আমার প্রেম, আমার প্রেম, তুমি কি আমার চাবি চুরি করবে

    আমার জন্য মেলে ধরবে

    শিহরিত মাস্তুলের আকাশ ?

    যেখানে তুমি রাজকীয় কায়দায় পোঁতো শাদা পাগলকরা তুষার

    আমার পৃষ্ঠতলে, আমার নিঃশব্দ কারাগারে :

    আতঙ্কিত, মৃতের মাঝে ফুটে ওঠা ল্যাভেণ্ডার

    মৃত্যু তার গৃহিণীদের নিয়ে আসবে

    আর আনবে মায়াপুরুষ প্রেমিকদের…

    নিজের মখমল পদক্ষেপে, একজন শিকারি পাহারাদার পাশ কাটায়

    আমার চোখের খোদলে তোমার স্মৃতি রয়ে গেছে

    আমরা ছাদের ওপর চড়ে হয়তো পালিয়ে যেতে পারি

    ওরা বলে গিয়ানা

    ভীষণ গরম জায়গা।

    ওহ দ্বীপান্তরের কলোনির মিষ্টতা

    অসম্ভব আর বহুদূর

    ওহ পালাবার আকাশ, সমুদ্র আর নারিকেলসারি

    স্বচ্ছ ভোরবেলা, মোহময় সন্ধ্যা

    শান্ত রাত, কামানো মাথা

    আর চিকনত্বক গাণ্ডু !

    ওহ প্রেম, চলো দুজনে মিলে এক বলিষ্ঠ প্রেমিকের স্বপ্ন দেখি

    ব্র্‌হ্মাণ্ডের মতন বিশাল

    যদিও তার দেহ ছায়ার ময়লামাখা

    সে আমাদের এই স্বর্গীয় কারা-আশ্রয়ে ল্যাংটো করে শেকলে বাঁধবে

    ওর সোনার দুই উরুর মাঝে

    ওর পেটের ওপরে

    সিগারেট ফুঁকতে-ফুঁকতে

    দেবদূতের দেহ থেকে কেটে গড়ে নেয়া এক ঝলমলে কোটনা

    ফুলের তোড়ার ওপরে শক্ত হয়ে ওঠে

    কারনেশন আর জুঁইফুলের তোড়া

    যেগুলো তোমার উজ্বল হাত কাঁপতে কাঁপতে নিয়ে যাবে

    ওর অভিজাত মর্যাদায়, বিকৃতমস্তিষ্ক

    তোমার চুমুর ছোঁয়ায়।

    আমার মুখগহ্বরে দুঃখ ! উথলে উঠছে তিক্ততা

    আমার অসুখি হৃদয়কে ফুলিয়ে তুলছে ! আমার সুগন্ধী ভালোবাসাগুলো

    দ্রুতই বিদায় নেবে, বিদায় ! বিদায়

    প্রিয়তম অণ্ডকোষ ! আমার অবরুদ্ধ কন্ঠস্বরকে

    থামিয়ে, বিদায়

    হে বেহায়া লিঙ্গ !

    গান গেও না, তুমি ফন্দিবাজ, বর্বরতা দেখাও !

    পবিত্র উজ্বল গলার কচি মেয়ে হয়ে ওঠো

    আর যদি তুমি ভয় না পাও, সঙ্গীতময় বালিকা

    আমার অন্তরজগতে বহুকাল আগে মৃত

    কুঠার দিয়ে কেটে বিচ্ছিন্ন

    আমার মাথা।

    আদরের বালক, কতো সুন্দর, লিলাকফুলের মুকুট তোমার মাথায় !

    আমার বিছানায় নত হও, আমার জাগ্রত লিঙ্গকে

    তোমার সোনালি গালের পরশ নিতে দাও। শোনো

    সেই খুনি, যে তোমার প্রেমিক

    হাজার স্ফূলিঙ্গ জরিয়ে

    নিজের গল্প শোনায়।

    ও গান গেয়ে বলে যে তোমার দেহকে পেয়েছিল, তোমার মুখ

    আর তোমার হৃদয় -- যা এক দ্রুতগতি

    শক্তিশালী অশ্বারোহীও

    কখনও ফাঁক করতে পারবে না। ওহ বালক

    তোমার গোলাকার হাঁটু পাবার জন্য

    তোমার শীতল গলা, নরম হাত

    তোমার বয়সী হতে হবে !

    উড়তে হলে, তোমার রক্তাক্ত আকাশে উড়তে হলে

    আর মৃতদের নিয়ে অনন্যসাধারণ মূর্তি গড়তে হলে,

    এখানে আর সেখানে জড়ো করা, চারণভূমিতে, ঝোপে,

    ওর মৃত্যুর জন্যে তৈরি করা ঔজ্বল্যে

    আছে ওর বয়ঃসন্ধির আকাশ…।

    বিষণ্ণ সকালগুলো, মদ, সিগারেট…

    তামাকের ছায়া, নাবিকদের কলোনি

    আমার জেলকুঠুরিতে খুনির প্রেত আসে

    এক বিশাল লিঙ্গ দিয়ে আমাকে ঠেলে দ্যায়

    আমাকে আঁকড়ে ধরে।

    «

    এক কালো জগতকে যে গান অতিক্রম করে যায়

    তা হলো এক কোটনার কান্না যে তোমার সঙ্গীতে আনমনা

    তা ফাঁসিতে লটকানো একজন মানুষের

    যে কাঠের মতন শক্ত

    তা এক কামার্ত চোরের

    মায়াময় আহ্বান।

    ষোলো বছরের এক কয়েদি সাহায্য চায়

    কোনো নাবিক ওই আতঙ্কিত কয়েদিকে সাহায্য করতে এগোয় না

    আরেকজন কয়েদির পা মুচড়ে

    শেকলে বাঁধা।

    আমি নীল চোখের জন্য খুন করেছি

    এক উদাসীন সৌন্দর্যকে

    ও আমার শ্বাসরুদ্ধ ভালোবাসা কখনও বোঝেনি

    তার কালো শকটে, এক অচেনা প্রেমিক

    আমাকে পুজো করে মৃত

    জাহাজের মতন সুন্দর।

    যখন তুমি অপরাধ করার জন্য তৈরি

    নির্দয়তার মুখোশ পরে, সোনালি চুলে ঢাকা

    বেহালার মিহি পাগলকরা সুরে

    তোমার কেলেঙ্কারির সমর্থনে

    কচুকাটা করো এক মহিলাকে।

    এরকম সময় সত্বেও, লোহাব গড়া এক রাজকুমার

    হৃদয়হীন আর নিষ্ঠুর, পৃথিবীতে দেখা দেবে

    যেন কোনো বুড়ি কাঁদছে।

    সর্বিপরি, ভয় পেও না

    চোখ ধাঁধানো ঔজ্বল্যের সামনে।

    এই প্রেত ভিতু আকাশ থেকে নেমে আসে

    অপরাধের কামোন্মাদনায়। এক বিস্ময়কর বালক

    অনন্যসাধারণ সৌন্দর্য নিয়ে ওর দেহ থেকে জন্মাবে

    ওর বিস্ময়কর লিঙ্গের

    সুগন্ধিত ধাতুরস থেকে।

    পশমের জাজিমের ওপরে কালো গ্র্যানিট পাথর

    এক হাত পাছায়, শোনো ও কেমন করে কথা বলে

    সূর্যের দিকে ওর পাপহীন শরীর

    আর ফোয়ারার কিনার পর্যন্ত

    শান্তিময়তায় প্রসারিত।

    রক্তের প্রতিটি উৎসব এক টগবগে ছোকরাকে উৎসর্গ করে

    যাতে প্রথম পরীক্ষায় বালকটি সমর্থন যোগাড় করতে পারে

    তোমার মানসিক যন্ত্রণা আর ভয়কে তুষ্ট করো

    ওর শক্ত প্রত্যঙ্গকে শোষণ করো

    কাঠিবরফের মতন।

    তোমার গালে স্পন্দিত হতে-থাকা লিঙ্গকে আলতো চিবোও

    তার ফোলা মুখকে চুমু খাও, ঝাঁপ নিতে দাও

    আমার প্রত্যঙ্গকে

    তোমার গলার ভেতরে, এক শোষণেই গিলে নাও

    ভালোবাসার রুদ্ধকন্ঠ, ফেলে দাও থুতুর সঙ্গে

    মুখ খুলে !

    হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করো টোটেম-গাছের মতন

    আমার উল্কিদাগা ধড়, কান্না না পাওয়া পর্যন্ত তাকে পুজো করো

    আমার যৌনতা তোমাকে চুরমার করে দেবে

    প্রহার করবে অস্ত্রের চেয়ে বেশি

    যা তোমার ভেতরে প্রবেশ করবে।

    জিনিসটা তোমার চোখের সামনে লাফিয়ে ওঠে

    সামান্য মাথা নামিয়ে দ্যাখো কেমন লাফিয়ে ওঠে

    এতো সুন্দর দেখতে যে চুমু খেতে ইচ্ছে করে

    তুমি ঝুঁকে ফিসফিস করে তাকে বলো :

    “মাদাম” !

    মাদাম, আমার কথা শোনো ! মাদাম, আমরা এখানে মারা যাবো।

    খামারবাড়িটা ভুতুড়ে ! জেলখানা ভয়ে কাঁপছে !

    সাহায্য করো, আমরা যাচ্ছি ! আমাদের তুলে নিয়ে চলো

    আকাশে তোমার ঘরে

    হে দয়ার ম্যাডোনা !

    সূর্যকে হাঁক পেড়ে ডাকো যাতে সে এখানে এসে আমাকে সান্ত্বনা দেয়

    গলাটিপে মারে এই গেরস্ত মোরগগুলোকে !

    জল্লাদকে ঘুম পাড়াও !

    আমার জানালায় নষ্টামির হাসি হাসে দিন

    জেলখানা হলো মারা যাবার বিস্বাদ পাঠশালা।

    «

    তোমার হাসিমাখা নেকড়েদাঁতকে আমার ঘাড়ে বিশ্রাম নিতে দাও

    আমার ঘাড়ে আস্তরণ নেই আর ঘৃণাহীন

    বিধবার হাতের চেয়েও হালকা আর ঐকান্তিক আমার হাত

    আমার কলারের ভেতরে হাত বুলোও

    এমনকি তা তোমার হৃদয়কে স্পন্দিতও করে না

    ওহ এসো আমার সুন্দর সূর্য

    ওহ এসো আমার স্পেনের রাত

    আমার দৃষ্টির সামনে এসো যা কাল মারা যাবে

    আমাকে এখান থেকে অনেক দূরে নিয়ে চলো

    যাতে বিকারের উন্মত্ততায় ঘুরে বেড়াতে পারি।

    আকাশ জেগে উঠতে পারে, নক্ষত্রেরা ঝংকার তুলতে পারে

    ফুলেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে পারে, আর চারণভূমিগুলোতে

    কালো ঘাসগুলো আহ্বান করতে পারে শিশিরকে

    যেখানে সকাল তৃষ্ণা মেটাতে আসে

    হয়তো ঘণ্টাধ্বনি হবে : আমি একা

    মারা যাবো।

    ওহ এসো গো আমার গোলাপি আকাশ, ওহ এসো আমার সোনালি ঝুড়ি !

    রাতে শাস্তিপ্রাপ্ত তোমার জেলবন্দীকে দেখে যাও

    মাংস খুবলে নাও, মেরে ফ্যালো, ওপরে ওঠো, কামড়াও

    কিন্তু এসো। তোমার গাল রাখো

    আমার গোল মাথার ওপরে।

    আমরা এখনও ভালোবাসার কথা বলা শেষ করিনি

    আমরা এখনও শেষ করিনি আমাদের চুরুট ফোঁকা

    আমরা অবাক হই কেন আদালত দণ্ড দ্যায়

    একজন সৌম্যদর্শন খুনিকে

    যার তুলনায় দিনকেও ফ্যাকাশে মনে হয়।

    হে প্রেম, আমার মুখগহ্বরে এসো। হে প্রেম, দরোজা খুলে দাও !

    নেমে পড়ো, আলতো হাঁটো, দালানগুলো পেরিয়ে যাও

    মেষপালকের চেয়েও আলতো পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে উড়ে যাও

    মৃত পাতাদের ঝটিতি চলে যাবার বদলে

    বাতাস তুলে নিয়ে যাবে।

    ওহ দেয়ালের ভেতর দিয়ে যাও, আর যদি চলে যেতে হয়

    আলসের ওপর হাঁটো -- ছাদের ওপরে, সাগরের ওপরে

    আলোয় ঢেকে নাও নিজেকে, হুমকি প্রয়োগ করো, প্রার্থনা ব্যবহার করো

    কিন্তু এসো, আমার কুক্কুরি

    আমার মৃত্যুর এক ঘণ্টা আগে এসো।

    «

    আমার দোলখাবার কুঠুরিতে, ঝাউগাছের গানের সামনে উন্মুক্ত

    ( নাবিকদের গিঁটপাকানো দড়িতে ঝুলছে

    যাদের সকালের স্বচ্ছতা সোনালী করে তোলে ) দেয়ালের ওপরের খুনিরা

    নিজেদের ভোরবেলা দিয়ে মুড়ে রাখে।

    কে পলেস্তারার ওপরে বাতসের গোলাপ খোদাই করেছে ?

    কে আমার বাড়ির স্বপ্ন দ্যাখে

    হাঙ্গেরির তলদেশ থেকে ?

    কোন বালক আমার পচা খড়ের ওপরে শুয়েছে

    ঘুমভাঙার মুহূর্তে

    বন্ধুদের কথা মনে করে ?

    আমার উন্মাদনাকে অস্হিরতা দাও, জন্ম দাও আমার আনন্দ থেকে

    সৌম্যকান্তি সেনায় ঠাশা এক সান্তনাদায়ক নরক

    কোমর পর্যন্ত নগ্ন -- আর স্বকামী পুরুষের ট্রাউজার থেকে

    টেনে নামাও গন্ধের অদ্ভুত ফুল

    যা আমাকে বিদ্যুতের মতন আঘাত করবে।

    কে জানে কোথা থেকে উপড়ে তোলো উন্মাদ অঙ্গভঙ্গীগুলো--

    বালকদের পোশাক খোলো, অত্যাচার আবিষ্কার করো,

    তাদের মুখের সৌন্দর্যকে বিকৃত করো

    আর গিয়ানার জেলখানা দিয়ে দাও বালকদের

    যাতে তারা দেখাসাক্ষাৎ করতে পারে।

    হে আমার বুড়ি মারোনি নদী, হে মিষ্টি কেয়েনের জল !

    পনেরো থেকে কুড়িজন কয়েদির

    আমি অবনত দেহগুলো দেখতে পাই

    ফরসা বালকটিকে ঘিরে ধরেছে

    পাহারাদারদের ফেলে-দেয়া সিগারেট ফুঁকছে

    ফুলের মাঝে আর শ্যাওলায়।

    একটা ভিজে আধা-সিগারেট সবাইকে দুঃখিত করার জন্য যথেষ্ট

    ঋজু, একা, শক্ত ফার্নের ওপরে

    তাছাড়া মার্জিত এবং খাঁটি একটি ভ্রাম্যমান কামড়।

    সবচেয়ে যে কমবয়সী সে স্হির হয়ে বসে

    নিজের সুন্দর পোঁদ রেখে

    অপেক্ষা করে

    গৃহিনী হবার জন্য।

    আর পুরোনো খুনিরা রাতের বেলায় উবু হয়ে

    আচার অনুষ্ঠানের জন্য জড়ো হয়

    একটা শুকনো কাঠি থেকে টেনে বের করবে

    কোনো চটপটে কয়েদি

    চুরি করা এক টুকরো আগুন

    উথ্থিত লিঙ্গের চেয়েও যা

    পবিত্র ও মার্জিত।

    চকচকে পেশির পালোয়ান ডাকাতও

    এই কচি তরুণের সামনে নত হয়ে শ্রদ্ধা জানায়

    চাঁদকে তুলে নিয়ে যায় আকাশে

    হাতাহাতি প্রশমিত হয়

    যখন কালো পতাকার

    রহস্যময় ভাঁজগুলো

    ঢেউ খেলতে থাকে।

    তোমার অঙ্গভঙ্গী তোমাকে কতো ভালো করে মুড়ে নেয় !

    রক্তিম হাতের তালুতে রাখা একদিকের কাঁধ

    তুমি সিগারেট ফোঁকো। আর গলায় ধোঁয়া নেমে যায়

    তখন কয়েদিরা গম্ভীরমুখে নাচতে থাকে

    গুরুত্ব দিয়ে, নিঃশব্দে, পারাপারি করে

    তোমার মুখ থেকে ওরা এক সুগন্ধী ফোঁটা নেবে

    দুটো নয়, গোল হয়ে বেরিয়ে আসা ধোঁয়ার

    তোমার জিভ থেকে ওদের জিভে

    হে বিজয়ী ভাই।

    ভয়ানক দিব্যতা, অদৃশ্য আর বজ্জাত

    তুমি তখন ঝকঝকে ধাতুতে গড়া উদাসীন ও তীক্ষ্ণ

    একা নিজের কথা ভাবছ, মারাত্মক ব্যবসাদার

    তোমার হ্যামক থেকে দড়ি খুলে

    গান গায়।

    তোমার অপলকা আত্মা পর্বতমালার ওপরে ভেসে যায়

    সঙ্গে আবার যায় জাদুমথিত উড়াল

    জেলকলোনি থেকে পলাতক এমন কেউ

    উপত্যকার প্রান্তসীমায় মারা গেছে

    ফুসফুসে গুলি খেয়ে

    এমনকি তোমার কথা

    না ভেবেই।

    হে বালক, চাঁদের বাতাসে জেগে ওঠো

    আমার মুখের ভেতরে ঝরাও কয়েকফোটা ধাতুরস

    তোমার গলা থেকে তোমার দাঁত পর্যন্ত গড়িয়ে-আসা, হে প্রেম

    গর্ভবান করার জন্য, শেষ পর্যন্ত

    আমাদের মহাসমাদরে বিয়ে হচ্ছে।

    তোমার পরমানন্দিত দেহকে আমার দেহের সঙ্গে জুড়ে দাও

    তা জঘন্যতার কারণে মারা যাচ্ছে

    হে তুলতুলে মিষ্টি ইতর

    তোমার গোল সোনালী অণ্ডকোষদের বিস্ময়ে

    আমার কালো শ্বেতপাথরের লিঙ্গ

    তোমার হৃদয়কে বিদ্ধ করবে।

    ওর যে সূর্যাস্ত পুড়ছে তাতে নিশানা করো

    যেটা আমাকে খেতে চাইছে !

    আমার শিকারের আত্মারা, আমার হাতে বেশি সময় নেই

    এসো, সাহস থাকলে, তোমাদের পুকুর

    তোমাদের জলাজঙ্গল, কাদা ছেড়ে যাও

    যেখানে তুমি বুদবুদ ওড়াও ! আমাকে খুন করো ! পোড়াও !

    একজন ফুরিয়ে-যাওয়া মিকেলাঞ্জেলো, আমি জীবন থেকে গড়েছি

    কিন্তু প্রভু, আমি চিরকাল সৌন্দর্যের সেবা করেছি :

    আমার তলপেট, আমার হাঁটু, আমার রক্তিম হাত

    সবই বিপদাশঙ্কার।

    মুর্গিখামারের মোরগেরা, ফরাসিদেশের ক্রীড়াকৌতূক

    দুধঅলার বালতি, বাতাসে একটা ঘণ্টা

    পাথরকুচিতে এক পদক্ষেপ

    আমার শার্শি শাদা আর স্বচ্ছ

    এক আনন্দময় ঔ্রজ্বল্য আছে

    লিখনস্লেটের কারাগারে।

    মহাশয়গণ, আমি ভীত নই !

    যদি আমার মাথা গিলোটিনের চুবড়িতে গড়িয়ে পড়ে

    তোমার ফ্যাকাশে মাথা নিয়ে, আমার ভাগ্যের কারণে

    তোমার কৃশতনু পাছায়।

    কিংবা আরো ভালোভাবে বলতে হলে :

    তোমার গলার ওপরে

    হে প্রিয়...।

    চেয়ে দ্যাখো ! অর্ধেক খোলা মুখের বিয়োগান্তক রাজা

    তোমার উষর বাড়িয়াড়ির বাগানে আমার ঢোকার অধিকার আছে

    যেখানে তুমি শক্ত হও, ঋজু, একা

    দুই আঙুল তুলে

    নীল কাপড়ের পর্দা

    তোমার মাথা ঢেকে রেখেছে।

    আমার তন্দ্রার ভেতর দিয়ে আমি তোমার পবিত্র সদৃশকে দেখি !

    ভালোবাসা ! গান ! আমার রানি !

    তোমার ফ্যাকাশে চোখের মণিতে কি পুরুষের এক প্রেত

    খেলার সময়ে

    আমাকে যাচাই করছিল

    দেয়ালের পলেস্তরার ওপরে ?

    গোঁ ধরে থেকো না, প্রভাতসঙ্গীত গাইতে দাও

    তোমার ভবঘুরে হৃদয় থেকে, আমাকে একা একটা চুমু দাও...।

    হা ঈশ্বর, আমার গলা চিরে যাবে

    যদি আমি তোমাকে চটকিয়ে হৃদয়ে পুরতে না পাই

    আর ধর্ষণ করতে পারি !

    «

    ক্ষমা করুন ঈশ্বর কেননা আমি পাপ করেছি !

    আমার কন্ঠস্বরের অশ্রু, আমার জ্বর, আমার দুঃখদুর্দশা

    ফ্রান্সের মতন সুন্দর দেশকে ছেড়ে পালিয়ে যাবার পাপ

    তা কি যথেষ্ট নয়, প্রভু, আমার বিছানায় গিয়ে

    আশায় উপুড় হয়ে পড়ার ?

    আপনার সুগন্ধী বাহুতে, আপনার তুষারের দুর্গে !

    অন্ধকার জগতের প্রভু, আমি এখনও জানি কেমন করে প্রার্থনা করতে হয়

    হে পিতা, এটা আমিই, যে এক সময়ে কেঁদে বলেছিল :

    “সর্বোচ্চ স্বর্গের জয়,

    চৌর্য ও ব্যবসায়ের পৌরাণিক

    আলতো পায়ের গ্রিক দেবতা হারমেসের জয়

    যিনি আমাকে রক্ষা করেন !”

    মৃত্যু থেকে আমি শান্তি আর দীর্ঘ ঘুম চাইছি

    ঈশ্বরের সিংহাসন রক্ষদের গান

    তাদের সুগন্ধ, তাদের গলার মালা

    বড়ো তপ্ত পোশাকে ক্ষুদে দেবদূতদের লোমাবরণ

    আমি চাই চাঁদহীন সূর্যহীন রাত

    বিস্তীর্ণ প্রান্তরের আকাশে।

    আমার মাথা গিলোটিনে কাটার সময় এটা নয়

    আমি আরামে ঘুমোতে পারি।

    ওপরের ছাদে, আমার অলস প্রেম

    আমার সোনালি বালক, আমার মুক্তা জেগে উঠবে

    ভারি জুতো দিয়ে পিষে ফেলার জন্য

    ন্যাড়া করোটির ওপর।

    «

    যেন পাশের বাড়িতে কোনো মৃগিরোগি বাস করে

    জেলখানাটা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ঘুমোয়

    একজন মৃত মানুষের গানের অন্ধকারে।

    জলে ভাসমান নাবিকরা যদি বন্দর দেখতে পায়

    তাহলে আমার লোকলস্কর উড়াল নেবে

    আরেক

    আমেরিকার দিকে।



     
  • মলয় রায়চৌধুরী | ২৪ আগস্ট ২০২১ ১৯:৪২734907
  • জঁ আর্তুর রেঁবো : নরকে এক ঋতু

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

     

    আগে কোনো এক সময়ে, যদি ঠিকমতম মনে থাকে, আমার জীবন ছিল ভুরিভোজের উৎসব যেখানে প্রতিটি হৃদয় নিজেকে মেলে ধরত, সেখানে অবাধে বয়ে যেতো সব ধরণের মদ।

     

    একদিন সন্ধ্যায় আমি সৌন্দর্য্যকে জড়িয়ে ধরলুম -- আর তাকে আমার তিতকুটে মনে হলো -- আর আমি ওকে অপমান করলুম।

     

    বিচারের বিরুদ্ধে নিজেকে করে তুললুম ইস্পাতকঠিন।

     

    আমি পালালুম। ওহ ডাইনিরা, ওহ দুর্দশা, ওহ ঘৃণা, আমার ঐশ্বর্য্য ছিল তোমাদের হেফাজতে।

     

    যাবতীয় মানবিক আশা আমি নিজের মধ্যে নষ্ট করে ফেলেছি। বিরূপ জানোয়ারের নিঃশব্দ লাফ নিয়ে আমি গলা টিপে মেরে ফেলে দিয়েছি প্রতিটি আনন্দ।

     

    আমি জল্লাদদের আসতে বলেছি ; আমি তাদের বন্দুকের নল চিবিয়ে নষ্ট হয়ে যেতে চাই। আমি বালি আর রক্তে রুদ্ধশ্বাস হবার জন্য নিম্নত্রণ করেছি মহামারী রোগদের। দুর্ভাগ্য ছিল আমার ঈশ্বর। আমাকে পাঁকে শুইয়ে দেয়া হয়েছে, আর নিজেকে শুকিয়ে নিয়েছি অপরাধাত্মক হাওয়ায়। আমি উন্মাদনার সীমায় নিজেকে নিয়ে গিয়ে মূর্খের খেলা খেলেছি।

     

    আর বসন্তঋতুর দিনগুলো আমাকে এনে দিয়েছে বোকার আতঙ্কিত হাসি।

     

    এখন কিছুদিন হলো, যখন আমি নিজেকে ভবিষ্যত অমঙ্গলের বার্তাবাহক হিসাবে আবিষ্কার করলুম, আমি ভাবতে লাগলুম পুরোনো দিনকালের ভোজনোৎসবের উৎসসূত্রের কথা, যেখানে আমি খুঁজে পাবো আবার নিজের বাসনার আকাঙ্খা।

     

    সেই উৎসসূত্র হলো সর্বজনে প্রীতি -- এই ধারণা প্রমাণ করে যে আমি স্বপ্ন দেখছিলুম !

     

    যে দানব একসময়ে আমাকে অমন সুন্দর আফিমফুলের মুকুট পরিয়েছিল, চিৎকার করে বলে ওঠে: “তুমি হায়েনা ইত্যাদি জানোয়ার হয়েই বেঁচে থাকবে”...। “মৃত্যুকে খুঁজবে তোমার আকাঙ্খাপুর্তির মাধ্যমে, আর যাবতীয় স্বার্থপরতা দিয়ে, আর সাতটি মারাত্মক পাপ দিয়ে।”

     

    আহ ! আমি সেসব অনেক সহ্য করেছি : তবু, হে প্রিয় শয়তান, অমন বিরক্তমুখে তাকিও না, আমি তোমার কাছে আবেদন করছি ! আর যতোক্ষণ অপেক্ষা করছি কয়েকটা পুরোনো কাপুরুষতার খাতিরে, কেননা তুমি একজন কবির মধ্যে সমস্ত রকমের চিত্রানুগ কিংবা নীতিমূলক স্বাভাবিকতার অভাবকে গুরুত্ব দাও, আমি তোমাকে এক অভিশপ্ত আত্মার রোজনামচা থেকে এই কয়েকটা অপবিত্র পৃষ্ঠা পাঠিয়ে দিচ্ছি।

     

    বদ রক্ত

     

    ফরাসি দেশের প্রাচীন অধিবাসী গলদের থেকে আমি পেয়েছি আমার ফিকে নীল চোখ, একখানা ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক, আর প্রতিযোগীতায় আনাড়িপনা। আমার মনে হয় আমার জামাকাপড় তাদের মতনই অমার্জিত।

     

    কিন্তু আমি চুলে তেল লাগাই না।

     

    সেই প্রাচীন অধিবাসী গলরা ছিল তাদের সময়ের অত্যন্ত মূর্খ চামার আর খড় পোড়ানোর দল। তাদের কাছ থেকে আমি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি : প্রতিমা-উপাসনা, আর যা-কিছু পবিত্র তাকে নোংরা করে দেবার প্রতি টান ; ওহ ! যতোরকমের কদভ্যাস হতে পারে, ক্রোধ, লাম্পট্য, -- ভয়ানক ব্যাপার, এই লাম্পট্য ; -- তাছাড়া মিথ্যে কথা বলা, আর সবার ওপরে আলস্য।

     

    যাবতীয় ব্যবসাপাতি আর কাজকারবার সম্পর্কে আমি বেশ আত্ঙ্কে ভুগি। কর্তাব্যক্তিদের আর খেটে-খাওয়া লোকেদের সম্পর্কে, ওরা সব্বাই চাষাড়ে আর মামুলি। যে হাত কলম ধরে থাকে তা লাঙল ধরে থাকা হাতের মতনই শুভ। -- হাতের ব্যাপারে একটা শতাব্দী বলা যায় ! -- আমি কোনোদিনও আমার হাত ব্যবহার করতে শিখবো না। আর হ্যাঁ, পারিবারিক ঝুঠঝামেলা তো আরও এক কাঠি বাড়া। ভিক্ষা চাওয়ার মালিকানা আমাকে লজ্জা দেয়। অপরাধীরা অণ্ডকোষহীন পুরুষদের মতোই নিদারুণ বিরক্তিকর : আমি আছি বহাল তবিয়তে, আর আমি কাউকে পরোয়া করি না।

     

    কিন্তু ! কে আমার জিভকে এতো বেশি মিথ্যা-সুদর্শনে ভরে তুলেছে, যা কিনা আমাকে এতোদিন পর্যন্ত পরামর্শ দিয়েছে আর অলস করে রেখেছে ? আমি তো আমার জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে শরীরকেও ব্যবহার করিনি। ঘুমন্ত কোলাব্যাঙের আলস্যকে ছাপিয়ে, আমি সব রকমের জায়গায় বসবাস করেছি। ইউরোপে এমন কোনো পরিবার নেই যাদের আমি চিনি না। -- পরিবার বলতে, আমি বোঝাতে চাইছি, যেমন আমার, যারা মানুষের অধিকারের ফতোয়ার জোরে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। -- আমি প্রতিটি পরিবারের সবচেয়ে বড়ো ছেলেকে চিনি!

     

    -------------------------------

     

    যদি ফ্রান্সের ইতিহাসের কোনো একটা সময়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক থাকতো !

     

    কিন্তু তার বদলে, কিছুই নেই।

     

    আমি ভালো করেই জানি যে আমি চিরটাকাল এক নিকৃষ্টতর জাতির মানুষ। আমি দ্রোহ ব্যাপারটা বুঝতে পারি না। নেকড়ের পালের মতন কোনো জানোয়ারকে ছিঁড়ে খাবার জন্য, যা তারা নিজেরা মারেনি, আর লুঠপাচার বাদ দিলে, আমার জাতি কখনও উঠে দাঁড়ায়নি।

    খ্রিস্টধর্মের বাড়ির বড়ো মেয়ে ফ্রান্সের ইতিহাস আমার মনে আছে। পবিত্র ভূমির জন্যে ক্রুসেডে লড়তে, আমিও চলে যেতে পারতুম, একজন গ্রাম্য চাকর হিসাবে ; আমার মগজের ভেতরে ব্যাভেরিয়ার বনানীর ভেতর দিয়ে অজস্র পথ রয়েছে, বসফরাসের বাইজেনটিয়াম সাম্রাজ্যের ছবি, জেরুজালেমের কেল্লা ; মেরির পুজোপদ্ধতি, ক্রুশকাঠে ঝোলানো যিশুর সম্পর্কে দুঃখদায়ক চিন্তা, আমার মগজের ভেতরে হাজার অবজ্ঞায় পুলকিত হতে থাকে। -- রোদ্দুরের কামড়ে ধ্বসে পড়া দেয়ালের কিনারায়, ভাঙাচোরা মাটির বাসনকোসন আর বিছুটিবনের মাঝে আমি একজন কুষ্ঠরোগির মতন বসে থাকি। --- আর তাছাড়া, আমি একজন উদ্দেশ্যহীন ভবঘুরে ভাড়াটে সৈনিক, জার্মান রাত্রির আকাশের তলায় সময় কাটাতুম।

     

    আহ ! আরেকটা ব্যাপার : বুড়ি আর বাচ্চাদের দলের সঙ্গে অত্যুজ্জ্বল লালচে ফাঁকা মাঠে আমি স্যাবাথছুটির নাচ নেচে চলেছি।

     

    আমি এই দেশ আর খ্রিস্টধর্মের বিষয়ে বিশেষ কিছুই মনে রাখতে পারিনি। আমি নিজেকে চিরটাকাল অতীতে দেখতে পাবো। কিন্তু সবসময়ে একা ; পরিবারহীন ; প্রকৃতপক্ষে, কোন সেই ভাষা, যাতে আমি কথা বলতুম ? আমি কখনও নিজেকে যিশুখ্রিস্টের পারিষদবর্গের সদস্য হিসেবে দেখি না ; সন্তদের সভাতেও নয়, -- যারা যিশুখ্রিস্টের প্রতিনিধি।

     

    এক শতক আগে আমি ঠিক কী ছিলুম : আজকে আমি কেবল নিজেকে খুঁজে পাই। টো-টো করে ঘুরে বেড়ানো সেইসব লোকগুলো, ধূসর যুদ্ধগুলো উধাও হয়ে গেছে। নিকৃষ্ট জাতি চেপে বসেছে সবার ওপরে -- যাকে লোকে বলে জনসাধারণ, যুক্তিপূর্ণতা ; রাষ্ট্র এবং বিজ্ঞান।

     

    আহ ! বিজ্ঞান ! সমস্তকিছু অতীত থেকে নিয়ে আসা হয়। শরীর আর আত্মার জন্যে, -- শেষ আধ্যাত্মিক সংস্কার, -- আমাদের রয়েছে ওষুধ আর দর্শনতত্ব, বাড়িতে সারিয়ে তোলার টোটকা আর নতুনভাবে বাঁধা লোকগান। এবং রাজকীয় আমোদপ্রমোদ, আর যে সমস্ত খেলাধুলা রাজারা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে ! ভূগোল, আকাশবিদ্যা, যন্ত্রবিদ্যা, রসায়ন !...

     

    বিজ্ঞান, নবতর আভিজাত্য ! প্রগতি। জগতসংসার এগিয়ে চলেছে !.... আর কেনই বা তা করবে না ?

    আমাদের রয়েছে গণিতের দৃষ্টিপ্রতিভা। আমরা এগিয়ে চলেছি প্রাণচাঞ্চল্যের দিকে। আমি যা বলছি তা অমোঘ রহস্যপূর্ণ এবং ধ্রুবসত্য। আমি বুঝতে পারি, আর যেহেতু আমি পৌত্তলিকতার নিকৃষ্ট শব্দাবলী ছাড়া নিজেকে প্রকাশ করতে পারি না, আমি বরং চুপ করে থাকবো।

     

    পৌত্তলিকতার নিকৃষ্ট রক্ত ফিরে বইতে থাকে শরীরে ! প্রাণচাঞ্চল্য এখন আয়ত্বে, যিশু কেন আমাকে সাহায্য করেন না, কেন আমার আত্মাকে আভিজাত্য আর স্বাধীনতা দেন না। আহ ! কিন্তু যিশুর উপদেশাবলী তো অতীতের ব্যাপার ! খ্রিস্টের উপদেশাবলী ! খ্রিস্টের উপদাশাবলী !

     

    আমি হাঘরের মতন ঈশ্বরের জন্যে অপেক্ষা করি। আমি চিরকালের জন্যে, চিরকালের জন্যে, এক নিকৃষ্ট জাতের মানুষ।

     

    আর এখন আমি উত্তরপশ্চিম ফ্রান্সের ব্রিট্যানির সমুদ্রতীরে। শহরগুলো সন্ধ্যায় তাদের আলোকমালা জ্বালিয়ে দিক। আমার দিনকাল ফুরিয়ে গেছে ; আমি ইউরোপ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। সমুদ্রের হাওয়া আমার ফুসফুসকে গরম করে তুলবে ; হারিয়ে-যাওয়া আবহাওয়া আমার ত্বককে পালটে ফেলবে চামড়ায়। সাঁতার কাটার জন্যে, ঘাসভূমি মাড়িয়ে চলার জন্যে, শিকার করার জন্যে, সবচেয়ে প্রিয় ধোঁয়াফোঁকার জন্যে ; কড়া মদ খাবার জন্যে, সে মদ গলিয়ে ফেলা লোহার মতন কড়া, -- আগুনের চারপাশে আমার প্রণম্য পূর্বপুরুষরা যেমন ভাবে বসে থাকতেন।

     

    আমি লোহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে ফিরে আসবো, কালো ত্বক, আর রাগি দুটো চোখ : এই মুখোশে, ওরা সবাই মনে করবে আমি উৎকৃষ্ট জাতির মানুষ। আমার কাছে থাকবে স্বর্ণভাঁড়ার : আমি হয়ে উঠবো নৃশংস আর শ্রমবিমুখ। যে দুর্ধষ্য পঙ্গুরা গ্রীষ্মমণ্ডলের দেশ থেকে ফিরে আসে, তরুণীরা তাদের সেবা করে। আমি রাষ্ট্রনীতিতে জড়িয়ে পড়বো। বেঁচে যাবো।

     

    এখন আমি অভিশপ্ত, আমি আমার নিজের দেশকে অপছন্দ করি। সবচেয়ে ভালো হলো মাতাল অবস্হায় ঘুমোনো, চিলতেখানেক কোনো সমুদ্রতীরে হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়া।

     

    --------------------------

     

    কিন্তু কেউই ছেড়ে চলে যায় না। --- আরেকবার বেরিয়ে পড়া যাক আমাদের এলাকার পথে-পথে, আমার অধার্মিকতার ভার সঙ্গে নিয়ে, সেই অধার্মিকতা যা যুক্তিপূর্ণতার যুগ থেকে আমার অস্তিত্বে দুঃখকষ্টের শিকড় পুঁতে দিয়েছে -- স্বর্গ পর্যন্ত উঠে যাওয়া, আমাকে বিদ্ধস্ত করে, ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দ্যায়, আমাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যায়।

     

    চরম পাপহীনতা, শেষ মায়া। সবকিছু বলা হয়ে গেছে। পৃথিবীতে আমার জঘন্যতা ও বিশ্বাসঘাতকতা আর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবার নয়।

     

    চলে এসো ! কুচকাওয়াজ করে, ভার কাঁধে তুলে, মরুভূমি, একঘেয়েমির বিরক্তি এবং ক্রোধ নিয়ে।

     

    কার কাছে গিয়ে ভাড়া করা মজুর হবো ? কোন সে জানোয়ারদের আদর করি ? কোন পবিত্র মূর্তিগুলোকে ধ্বংস করি ? কেমনতর হৃদয়কে ভাঙি ? কোন মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিই ? -- কোন সে রক্তের নদী হেঁটে পার হই ? বরং বিচার থেকে দূরত্ব রাখা ভালো। -- এক কঠিন জীবন, সুস্পষ্ট বিস্ময়, -- কফিনের ঢাকা তোলার জন্যে একটা শুকনো মুঠো, শুয়ে থাকো, আর দম বন্ধ হয়ে যাক। এইভাবে বার্ধক্যে পৌঁছোবার কথা নয়, কোনো বিপদ নেই : সন্ত্রাস ব্যাপারটা অ-ফরাসী।

     

    --আহ ! আমি এমন পরিত্যক্ত যে নিজেকে কোনও না কোনও স্মৃতিমন্দিরে গিয়ে নিখুঁত হবার আবেগ উৎসর্গ করব।

     

    ওহ আমার আত্ম-অস্বীকৃতি, আমার মনোমুগ্ধকর বিশ্বপ্রেম ! আমার নিঃস্বার্থপর ভালোবাসা ! অথচ তবু আমি এই তলানিতে !

     

    গভীর অতল থেকে কেঁদে উঠি, আমি আসলে একটা গাধা !

     

    ----------------------------------

     

    যখন আমি এক ছোট্ট শিশু ছিলুম, আমি সেই দণ্ডিত অপরাধীকে শ্রদ্ধা করতুম যার মুখের ওপর কারাগারের দরোজা সদাসর্বদা বন্ধ থাকবে ; আমি সেই সমস্ত মদের আসর আর ভাড়াদেয়া ঘরগুলোয় যেতুম যেগুলোকে তার উপস্হিতি পবিত্রতায় উন্নীত করেছে ; আমি তার চোখ দিয়ে নীলাকাশ আর ফুলে ছাওয়া মাঠের কর্মোন্মাদনা দেখতুম ; শহরের রাস্তায় আমি তার সর্বনাশা সুগন্ধকে অনুসরণ করেছি। তার ছিল সন্তদের চেয়েও বেশি ক্ষমতা, যেকোনো অনুসন্ধানকারীর চেয়েও বেশি বোধশক্তি -- আর সে, কেবল সে-ই ! নিজের মহিমা এবং নিজের ন্যায়পরায়ণতার সাক্ষী ছিল।

     

    শীতের রাতের ফাঁকা রাস্তা-বরাবর, ঘরছাড়া, ঠাণ্ডায় কাতর, আর ক্ষুধার্ত, একটা কন্ঠস্বর আমার হিমায়িত হৃদয়কে আঁকড়ে ধরল : “দুর্বলতা হোক বা শক্তিমত্তা : তুমি টিকে আছো, তাইই হলো শক্তিমত্তা। তুমি জানো না তুমি কোথায় চলেছো কিংবা কেন তুমি কোথাও যাচ্ছো, যেদিকে চাও যাও, সবাইকে জবাব দাও। কেউই তোমাকে মেরে ফেলবে না, তুমি শবদেহ হলে যেরকম করতো তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। ” সকালবেলায় আমার চোখদুটো এতো বেশি ফ্যালফ্যালে হয়ে উঠেছিল আর মুখ শবের মতন ফ্যাকাশে, যে যাদের সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছিল তারা যেন আমায় দেখতে পাচ্ছিল না।

     

    শহরগুলোয়, কাদার রঙ আচমকা বদলে গিয়ে লাল আর কালো হয়ে উঠল, পাশের ঘরে আলোর শিখা কাঁপলে আয়নায় যেমন হয়, জঙ্গলে গুপ্তধনের মতন ! আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, গুড লাক, আর আমি দেখতে পেলুম আগুনশিখার সমুদ্র আর ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে স্বর্গের দিকে ; এবং বাঁদিকে আর ডানদিকে, কোটি-কোটি বজ্রবিদ্যুতের মতন সমস্ত ঐশ্বর্য্য বিস্ফোরণে ফেটে পড়ছিল।

     

    কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল পানোমত্ততা এবং নারীসঙ্গ ছিল আমার পক্ষে অসম্ভব। এমনকি কোনো বন্ধুসঙ্গও নয়। আমি দেখলুম আমি একদল রাগি মানুষদের সামনে পড়ে গেছি, ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি, তারা যে দুঃখে কাঁদছিল তা তারা নিজেরাই বুঝে উঠতে পারছিল না, আর ক্ষমা করে দিচ্ছিল ! ঠিক যেন জোয়ান অব আর্ক ! -- “যাজকরা, অধ্যাপকরা আর ডাক্তাররা, আপনারা আমাকে আইনের হাতে তুলে দিয়ে ভুল করছেন। আমি কখনও আপনাদের একজন ছিলুম না; আমি কখনও খ্রিস্টধর্মী ছিলুম না ; আমি সেই জাতির মানুষ যারা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গায়; আমি তোমাদের আইনকানুন বুঝি না ; আমার নৈতিক জ্ঞানগম্যি আছে ; আমি ভালোমন্দজ্ঞানশূন্য ; তোমরা একটা বড়ো ভুল করে ফেলছো…”

     

    হ্যাঁ, তোমাদের ঝলমলে আলোয় আমার চোখ বন্ধ। আমি একটি পশু, একজন কৃষ্ণাঙ্গ। কিন্তু আমার পরিত্রাণ সম্ভব। তোমরা সব নকল কৃষ্ণাঙ্গ ; বাতিকগ্রস্ত, বুনো, কৃপণ, তোমরা সবাই। ব্যবসাদার, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; জজসাহেব, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; সেনাপতি, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; সম্রাট, বুড়ো চুলকানো-মাথা, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; তুমি শয়তানের হেফাজত থেকে যে মদ খেয়েছো তাতে কেউ কর বসায় না। -- এই দেশকে উৎসাহিত করে জ্বরের তাপ আর কর্কটরোগ। পঙ্গু আর বুড়ো মানুষেরা এতো বেশি শ্রদ্ধার পাত্র যে তারা চায় তাদের উষ্ণতাপে সেদ্ধ করা হোক। -- সবচেয়ে ভালো হবে এই মহাদেশ ছেড়ে বিদায় নেয়া, যেখানে এই হতভাগাগুলোকে প্রতিভূ সরবরাহ করার জন্যে পাগলামি জিনিশটা ঘুরঘুর করে বেড়ায়। আমি প্রবেশ করবো ক্যাম্বোডিয়ার সত্যকার চাম রাজার সন্তানদের দেশে।

     

    আমি কি প্রকৃতিকে বুঝতে পারি ? আমি কি নিজেকে বুঝতে পারি ? কোনও বাক্য আর আয়ত্বে নেই। আমি মৃত মানুষদের নিজের পাকস্হলিতে পুরে রাখি...হইহট্টোগোল, ঢোলঢোলোক, নাচো, নাচো, নাচো ! আমি সেই মুহূর্তের কথা চিন্তাও করতে পারি না যখন শ্বেতাঙ্গ মানুষরা পোঁছেচে, আর আমি শুন্যতায় তলিয়ে যাবো।

    পিপাসা আর ক্ষুধা, হইহট্টোগোল, নাচো, নাচো নাচো !

     

    -----------------------------

     

    শ্বেতাঙ্গরা তীরে নামছে। কামানের গোলার আওয়াজ ! এখন আমাদের নির্ঘাত খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হবে, পোশাক পরে তৈরি হও, আর কাজে বেরোও।

     

    আমার হৃৎপিণ্ডকে ঈশ্বরিক করুণায় বিদ্ধ করা হয়েছে। আহ ! আমি কখনও ভাবিনি যে আমার জীবনে এই ঘটনা ঘটবে !

     

    কিন্তু আমি কোনও অন্যায় তো করিনি। আমার দিনগুলো হয়ে উঠবে স্বস্তিময়, এবং পশ্চাত্তাপ থেকে আমাকে মুক্তি দেয়া হবে। যেখানে আনাড়ম্বর আলোকমালা শোকসভার মোমবাতির মতন আরেকবার জ্বলে ওঠে, আমাকে আধমরা আত্মার শুভত্বে পীড়ন করা হবে না। প্রথম সন্তানের অদৃষ্ট, সময়ের আগেই জন্মানো কফিন যা ঝিলমিলে কান্নাফোঁটায় ঢাকা। কোনও সন্দেহ নেই, ন্যায়ভ্রষ্টতা হলো বোকামি, কদভ্যাস হলো বোকামি ; পচনবিকারকে সদাসর্বদা দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু দেয়ালঘড়িকেও শিখতে হবে বিশুদ্ধ যন্ত্রণার সময়নির্দেশের চেয়ে বেশিবার কাঁসরঘণ্টা কেমন করে বাজাতে হয় ! এই সমস্ত দুঃখকষ্ট ভুলিয়ে, আমাকে কি শিশুর মতন তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে স্বর্গোদ্যানে গিয়ে খেলা করতে পারি ! তাড়াতাড়ি করো ! সেখানে কি অন্যান্য জীবনও আছে ? -- বৈভবশালীদের পক্ষে শান্তিতে ঘুমোনো অসম্ভব। ঈশ্বর্য্য চিরকাল সবায়ের সামনে খোলামেলা থাকে। কেবল জ্ঞানের চাবিকাঠি দিতে পারে দেবোপম প্রেম। আমি তো দেখতে পাচ্ছি প্রকৃতি একধরণের দয়ামায়ার প্রদর্শনী। বিদায় বিশপের আঙরাখায় ঢাকা আগুনের নিঃশ্বাস-ওড়ানো দানব, আদর্শবোধ আর ভুলভ্রান্তি।

     

    উদ্ধারকারী জাহাজ থেকে ভেসে আসছে দেবদূতদের উদ্দেশ্যময় গান : এ হলো দেবোপম ভালোবাসা। -- দুটি ভালোবাসা ! আমি জাগতিক প্রেমে মরে যেতে পারি, আনুগত্যের কারণে মরে যেতে পারি। আমি পেছনে ফেলে যাচ্ছি সেই সমস্ত প্রাণীদের, আমি চলে যাবার পর যাদের যাতনা ক্রমশ বাড়তে থাকবে ! বাতিলদের মধ্যে থেকে তুমি আমাকে বেছে নিয়েছো, যারা রয়ে গেলো তারা কি আমার বন্ধু নয় ?

     

    তাদের অমঙ্গল থেকে বাঁচাও !

     

    আমি নিমিত্তসিদ্ধির খাতিরে দ্বিতীয়বার জন্মেছি। জগৎসংসার বেশ শুভময়। আমি জীবনকে আশীর্বাদ করবো। আমি আমার ভাইবেরাদরদের ভালোবাসবো। বাল্যকালীন প্রতিজ্ঞার ব্যাপার আর নেই। বার্ধক্য আর মৃত্যুকে এড়িয়ে যাবার আশা নেই। ঈশ্বর আমার শক্তি, এবং আমি ঈশ্বরের বন্দনা করি।

     

    ----------------------------

    একঘেয়েমি-জনিত বিরক্তিকে আমি আর পছন্দ করি না। দুর্বার-ক্রোধ, বিকৃতকাম, উন্মাদনা, যাদের সব কয়টি স্পন্দনাঘাত আর দুর্বিপাকের সঙ্গে আমি পরিচিত, -- আমার সম্পূর্ণ ভার লাঘব হয়েছে। এবার আমার অপরাধশূন্যতার সীমাকে ঠাণ্ডা মাথায় মূল্যায়ন করা যাক।

     

    প্রহারের সন্তুষ্টি চাইবার মতন অবস্হায় আমি আর নেই। আমি কল্পনা করি না যে আমার শ্বশুর যিশুখ্রিস্টের সঙ্গে আমি মধুচন্দ্রিমায় বেরিয়েছি।

     

    আমি আমার নিজের যুক্তিজালে আটক জেলবন্দি নই। আমি তো বলেছি। হে ঈশ্বর। আমি উত্তরণের মাধ্যমে স্বাধীনতা চাই : আমি কেমন করে সেই দিকে যাবো ? ছেলেমানুষির সেই স্বাদ আর নেই। আর দরকার নেই দেবোপম ভালোবাসার কিংবা কর্তব্যের প্রতি উৎসর্জন। আমি ছেলেবেলার আবেগ ও অনুভবের ত্রুটিকে দোষ বলে মনে করিনা। যে যার নিজের যুক্তিপূর্ণতায়, অবজ্ঞায়, সর্বজনপ্রীতিতে রয়েছে : শুভবুদ্ধির দেবদূতোপম সিঁড়ির সবচেয়ে ওপরের ধাপে নিজেকে রেখেছি আমি।

     

    আর যদি সুস্হিত আনন্দের কথা বলতে হয়, গার্হস্হ হোক বা না হোক...। না, আমি পারবো না। আমি বড়ো বেশি তুচ্ছ, অত্যন্ত দুর্বল। কর্মকাণ্ড জীবনকে কুসুমিত করে তোলে, ওটা পুরোনো ধ্যানধারণা, আমার নয় ; আমার জীবন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়, তা কর্মকাণ্ডের থেকে দূরে লক্ষ্যহীন ভেসে চলে যায়, পৃথিবীর সেই তৃতীয় মেরুঅঞ্চলে।

     

    বুড়ি চাকরানি হয়ে যাচ্ছি আমি, মৃত্যকে ভালোবাসার সাহস হারিয়ে ফেলেছি !

     

    ঈশ্বর যদি আমাকে সেই দিব্যশান্তি দিতেন, নির্মল প্রশান্তি, এবং প্রার্থনা, -- প্রাচীনকালের সন্তদের মতন -- সেই সন্তরা ! তাঁরা ছিলেন শক্তিমন্ত ! নোঙোর, এমনই এক ধরণের শিল্পী যাঁদের প্রয়োজন আর আমাদের নেই !

    এই প্রহসনের কি এবার শেষ হওয়া প্রয়োজন ? আমাকে কাঁদাবার জন্যে আমার শুদ্ধতা যথেষ্ট। জীবন নামের প্রহসনে সবাইকে খেলতে হবে।

     

    --------------------------

     

    এবার থামাও ! এটা তোমার শাস্তি। -- কুচকাওয়াজ করে এগিয়ে যাও !

     

    আহ ! আমার ফুসফুস জ্বলছে, কপাল দপদপ করছে ! রাত্রি ঘনিয়ে আসছে আমার চোখে, এই সূর্যের তলায় ! আমার হৃদয়….আমার দুই হাত আর পাদুটো….

     

    আমরা কোথায় চলেছি ? যুদ্ধ করতে ? আমি বেশ দুর্বল ! অন্যেরা এগিয়ে চলেছে। যন্ত্রপাতি, অস্ত্রশস্ত্র...আমাকে সময় দাও !

     

    গুলি চালাও ! আমাকে তাক করে গুলি চালাও ! নয়তো আমি তোমাদের হাতে ছেড়ে দেবো নিজেকে। -- ভিতুর দল ! -- আমি নিজেকে খুন করবো ! আমি নিজেকে ঘোড়ার খুরের তলায় নিক্ষেপ করবো !

     

    আহ !

     

    --আমি এ-সবে অভ্যস্ত হয়ে যাবো।

     

    সেটাই হবে ফরাসি উপায়, শৌর্যের পথ।

     

    নরকে এক রাত

    আমি এক্ষুনি মুখভরা ভয়ানক বিষ গিলে ফেলেছি। -- আমাকে যে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল তাতে আমি মহিমান্বিত, মহিমান্বিত, মহিমান্বিত ! -- আমার নাড়িভূঁড়িতে আগুন ধরে গেছে। বিষের ক্রিয়াক্ষমতায় আমার দুই হাত আর পাদুটো মুচড়ে উঠছে, পঙ্গু করে দিচ্ছে, মাটিতে থুবড়ে ফেলে দিয়েছে। তৃষ্ণায় মরে যাচ্ছি, শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে, আমি কাঁদতে পারছি না। এ হলো নরক, অনাদি-অনন্ত যন্ত্রণাভোগ ! দ্যাখো আগুনের শিখা কেমনভাবে ওপরে উঠে যাচ্ছে ! আমার যাওয়া উচিত, আমি জ্বলেপুড়ে মরছি। চালিয়ে যাও, হে শয়তান !

     

    আমি একবার শুভের সঙ্গে আর প্রকাশসৌষ্ঠভের সঙ্গে কথা কইবার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলুম, পাপের শাস্তি হিসাবে নরকভোগ থেকে মুক্ত। কেমন করেই বা আমি নিজের দৃষ্টিপ্রতিভা বর্ণনা করবো, নরকের বাতাস বন্দনাগান গাইবার পক্ষে বড্ডো গাঢ় ! সুসংবদ্ধ আত্মিক ঐকতান, বলিষ্ঠতা এবং শান্তি, অভিজাত উচ্চাশা, তাছাড়া জানি না আরও কি ছিল সেখানকার লক্ষ-লক্ষ পরমানন্দিত প্রাণীদের ?

     

    পরমানন্দের উচ্চাশা !

     

    কিন্তু তবু আমি বেঁচে আছি ! -- মনে করো নরকযন্ত্রণা হলো শাশ্বত ! একজন মানুষ যে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করতে চাইছে সে নিশ্চয়ই অভিশপ্ত, নয়কি ? আমার বিশ্বাস আমি নরকে রয়েছি, তার মানে আমি বেঁচে আছি। এই প্রশ্নোত্তরপর্বই কাজ করে চলেছে। আমি আমার খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত কেনা-গোলাম। তোমরা, আমার বাপ-মা, আমার জীবন নষ্ট করে দিয়েছো, আর নিজেদের জীবনও। বেচারা খোকা ! -- পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে নরক ক্ষমতাহীন। -- আমি তবু বেঁচে আছি! পরে, নরকযন্ত্রণার মহানন্দ হয়ে উঠবে আরও নিগূঢ়। একটা অপরাধ, দ্রুত, আর মানুষের আইনে দণ্ডাদেশ পাওয়া আমাকে শূন্যতায় তলিয়ে যেতে দাও।

     

    চুপ করো, তুমি কি চুপ করবে !...এখানে সবকিছুই লজ্জাকর আর কলঙ্কিত ; শয়তান বলছে যে আগুনটার কোনও মানে হয় না, বলছে যে আমার ক্রোধ হলো হাস্যকর এবং নির্বোধ। -- আহ, থামো দিকিনি !...কেউ ফিসফিস করে ওই ভুলগুলোর কথা বলেছে, ইন্দ্রজালের সন্মোহন, বোকা-বানানো গন্ধ, শিশুতোষ সঙ্গীত। -- আর এই কথা ভাবা যে আমিই সত্যের অধিকারী, যে আমার আয়ত্বে চলে আসতে পারে বিচারের দৃষ্টিপ্রতিভা : আমার নির্ণয় বিচক্ষণ আর দৃঢ়, নিখুঁত হয়ে ওঠার জন্যে আমি শ্রেষ্ঠগুণসম্পন্ন… গর্ববোধ। -- আমার করোটি চেপে বসছে। দয়া করো ! হে নাথ, আমি সন্ত্রস্ত ! জল দাও, আমার তেষ্টা পাচ্ছে, আমার তেষ্টা পাচ্ছে ! আহ, শৈশব, ঘাসভূমি আর বৃষ্টি, পথের পাথরে জমা জল, যখন রাত বারোটা বাজে তখনকার চাঁদের আলো….শয়তান দাঁড়িয়ে রয়েছে ঘড়িমিনারের ছাদে, ঠিক এখনই ! মেরি। পবিত্র অক্ষতযোনি !...ভয়ংকর মূর্খতা।

     

    ওই দিকে তাকাও, ওরা কি মাননীয় মানুষ নয়, যারা আমার ভালো চেয়েছে ?...এসো...মুখের ওপরে বালিশ, ওরা আমাকে শুনতে পাবে না, ওরা তো কেবল প্রেত।

     

    যাই হোক, কেউ আর অন্য কারোর কথা ভাবে না। ওদের কাছে আসতে দিও না। আমার গা থেকে নিশ্চয়ই পোড়া মাংসের গন্ধ বেরোচ্ছে।

     

    আমার অলীকদৃশ্যগুলো অসংখ্য। এগুলোই আমাকে সব সময় সহ্য করতে হয়েছে : ইতিহাস সম্পর্কে আমার বিশ্বাসহীনতা, আদর্শগুলোকে উপেক্ষা। আমি এই বিষয়ে আর কোনও কথা বলব না : কবিরা এবং দ্রষ্টারা ঈর্ষা করবে। আমি সকলের চেয়ে ধনী, কয়েক হাজার গুণ, আর আমি তা সমুদ্রের মতন আগলে রাখবো।

    হে ঈশ্বর -- এক মুহূর্ত আগে জীবনের ঘড়ি থেমে গেছে। আমি আর পৃথিবীর অন্তর্গত নই। -- ব্রহ্মবিদ্যা সঠিক ; নরক নিশ্চয়ই নিচের দিকে -- এবং স্বর্গ ওপরদিকে। -- ভাবাবেশ, দুঃস্বপ্ন, ঘুম, আগুনের নীড়ের ভেতরে।

    দেশের মধ্যে কেমন করে অলস ঘুরে বেড়ায় মন...শয়তান, ফার্দিনান্দ, বুনো বীজের সঙ্গে উড়ে যায়...যিশুখ্রিস্ট ময়ূরপঙ্খী রঙের কাঁটার ওপর দিয়ে হেঁটে যান কিন্তু তাদের নত করেন না...যিশু হেঁটে যেতেন চঞ্চল সমুদ্রের ওপর দিয়ে। লন্ঠনের আলোয় আমরা ওনাকে সেখানে দেখেছি, শ্বেতবসনে, দীর্ঘ বাদামি চুল, পান্নারঙা এক ঢেউয়ের ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন।

     

    যাবতীয় রহস্যের চাদর আমি ছিঁড়ে ফেলবো : ধর্মের রহস্য হোক কিংবা প্রকৃতি, মৃত্যু, জন্ম, ভবিষ্যৎ, অতীত, সৃষ্টির উৎপত্তিতত্ব, এবং শূন্যতার রহস্য। আমি হলুম মোহাবিষ্ট চোখে-দেখা অলীক ছায়ামূর্তিদের মালিক।

    শোনো !...

     

    প্রতিটি কর্মদক্ষতাই আমার ! -- এখানে কেউ নেই, ওখানে কেউ রয়েছে : আমি আমার ঐশ্বর্য নষ্ট করতে চাইবো না। -- আমি কি তোমাকে আফরিকার বাঁশি শোনাবো, তলপেট-নাচিয়েদের ? আমি কি উধাও হয়ে যাবো, আমি কি চেষ্টা করবো গসপেল-কথিত আঙটি খুঁজে আনার। যাবো? আমি তৈরি করব সোনা আর ওষুধ।

    তাহলে, আমাকে বিশ্বাস করো। বিশ্বাস আরাম দ্যায়, তা পথনির্দেশ করে এবং সারিয়ে তোলে। তোমরা সবাই আমার কাছে এসো, -- ছোটো বাচ্চারাও -- এসো তোমাদের সান্তনা দিই, তোমাদের সামনে আমার হৃদয়ের কথা মেলে ধরি -- আমার অলৌকিক হৃদয় ! -- হে দরিদ্রগণ, হে দরিদ্র শ্রমিকবৃন্দ ! আমি বন্দনাগান চাইছি না : তোমরা কেবল আমাকে বিশ্বাস করো, আর তাহলেই আমি আনন্দিত হবো।

     

    -- এবার, আমার কথা ভাবো। এই সবকিছু পৃথিবীকে হারানোর ব্যাপারে আমাকে তাড়িত করে না। আমি ভাগ্যবান যে আমাকে আর যন্ত্রণা পেতে হবে না। আমার জীবন, দুর্ভাগ্যবশত, মিষ্টি বোকামি ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

     

    বাহ ! যতো রকমের কুৎসিত মুখভঙ্গী হতে পারে আমি তা করবো।

     

    আমরা জগৎসংসারের বাইরে, নিঃসন্দেহে। কোনও শব্দ নেই। স্পর্শের বোধশক্তি আমার চলে গেছে। আহ, আমার দুর্গভবন, আমার স্যাক্সনি, আমার উইলোবনানী ! সন্ধ্যা ও সকাল, রাত আর দিন...আমি কতো ক্লান্ত !

    আমার ক্রোধের জন্যে একটা বিশেষ নরক থাকা উচিত ছিল, একটা নরক গর্ববোধের জন্যে, -- এবং একটা নরক যৌনতার জন্যে ; নরকের এক পরিপূর্ণ ঐকতান-সঙ্গীত !

     

    আমি পরিশ্রান্ত, আমি মরে যাচ্ছি। এটাই কবর আর আমি কীটে পরিণত হয়ে চলেছি, আতঙ্ক ছাপিয়ে গেছে আতঙ্ককে ! শয়তান, ভাঁড় কোথাকার, তুই নিজের চমৎকারিত্ব দিয়ে আমাকে গলিয়ে ফেলতে চাইছিস। ঠিক আছে, আমি তাইই চাই। আমি তাই চাই। কোদালকাঁটা দিয়ে আমাকে গিঁথে ফ্যালো, আমার ওপরে আগুনের ফোঁটা ঝরাও।

     

    আহ ! জীবনে ফিরে যাওয়া ! আমাদের বিকলাঙ্গতার দিকে তাকিয়ে দ্যাখা। আর এই বিষ, এই শাশ্বত অভিশপ্ত আলিঙ্গন ! আমার দুর্বলতা, এবং জগতসংসারের নির্দয়তা ! হে ঈশ্বর, দয়া করো, আমাকে লুকিয়ে ফ্যালো, আমি নিজেকে একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না -- আমি আড়ালে রয়েছি, আর আমি নেইও।

     

    আর যেমন-যেমন অভিশপ্ত আত্মা জেগে উঠতে থাকে, ঠিক তেমনই আগুনও।


    প্রথম ডিলিরিয়াম : সেই বোকা অক্ষতযোনি মেয়ে

    নরকবাসী একজন পুরোনো বন্ধুর আত্মস্বীকৃতি শোনা যাক, “হে প্রভু, হে দিব্য বিবাহের বর, তোমার সবচেয়ে সমব্যথী পরিচারিকাদের আত্মস্বীকৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি। আমি মাতাল। আমি অশুদ্ধ।

     

    এই কি জীবন !

     

    “ক্ষমা করো, স্বর্গের নিবাসী হে প্রভু, ক্ষমা করে দাও ! আহ ! ক্ষমা করো। এই কান্নার জল। এবং আরও যে অশ্রু পরে ঝরতে থাকবে, অনুমান করি !

     

    “পরে, আমি দিব্য বিবাহের বরের সঙ্গে দেখা করবো ! আমি তো জন্মেছিলুম তাঁর কেনা-গোলাম হবার জন্যে। -- ওরা এবার আমাকে পিটুনি দিতে পারে !

     

    “ঠিক এখনই, জগতসংসারের শেষ ! ওহ, মেয়েরা...আমার বন্ধুনিরা !...না, আমার বন্ধুনিরা নয়...আমি কখনও এমনতর অবস্হা সহ্য করিনি, ডিলিরিয়াম, পীড়নসমূহ, সমস্তকিছু...এটা এমন অর্থহীন।

     

    “ওহ ! আমি কাঁদছি, আমি কষ্ট পাচ্ছি। আমি সত্যিই যন্ত্রণাভোগ করছি। তবু আমার যা ইচ্ছা করার অধিকার রয়েছে, যখন কিনা আমাকে ঘিরে ফেলা হয়েছে সবচেয়ে অবজ্ঞেয় হৃদয়গুলোর অবজ্ঞা দিয়ে।

     

    “ঠিক আছে, আমাকে আত্মস্বীকৃতি করতে দেয়া তো হোক, যদিও আমাকে হয়তো তা কুড়িবার নতুন করে আওড়াতে হবে, -- এমনই নীরস, এবং এমনই গুরুত্বহীন !

     

    “আমি নারকীয় বিয়ের বরের একজন কেনা-গোলাম, সেই লোকটা যে বোকা অক্ষতযোনি মেয়েদের ফুসলিয়ে সতীত্বহানি করেছিল। ও একেবারে সেই রকমেরই শয়তান। ও মোটেই মায়াপুরুষ নয়, ও প্রেতও নয়। কিন্তু আমি, যে কিনা নিজের কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি, জগতসংসারের কাছে অভিশপ্ত আর মৃত, -- কেউই আমাকে খুন করতে পারবে না ! কেমন করে তোমার কাছে তার বর্ণনা করি ! এমনকি আমি কথাও বলতে পারছি না। আমি পরে আছি শোকের পোশাক, আমি কাঁদছি, আমি বেশ ভয়ার্ত। দয়া করো, হে প্রভু, একটু টাটকা বাতাস, যদি তোমার খারাপ না লাগে, দয়া করো !

     

    “আমি এক বিধবা…-- আমি এক সময় বিধবা ছিলুম…--ওহ, হ্যাঁ, তখনকার সময়ে আমি ভীষণ গম্ভীর থাকতুম, আমি কংকাল হয়ে ওঠার জন্য জন্মাইনি !...ও ছিল কচিখোকা কিংবা বলা যায় প্রায়...ওর কোমল, রহস্যময় চালচলন আমাকে পুলকিত করেছিল। ওকে অনুসরণ করতে গিয়ে আমি আমার সব কর্তব্য ভুলে গেলুম। কি যে এক জীবন আমরা কাটাই ! সত্যকার জীবনের অভাব রয়েছে। আমরা এই জগতসংসার থেকে নির্বাসিত, সত্যি -- ও যেদিকে যায় আমিও সেই দিকে যাই, আমাকে যেতেই হয়। আর বেশির ভাগ সময়ে ও আমার ওপর ক্ষেপে যায়, আমার প্রতি, বেচারা পাপিষ্ঠ। সেই শয়তানটা ! ও সত্যিই একটা শয়তান, তুমি জানো, এবং মোটেই মানুষ নয়।

     

    “ও বলে : “আমি মেয়েদের ভালোবাসি না। ভালোবাসাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে, আমরা তা জানি। মেয়েরা যা শেষপর্যন্ত চায় তা হল সুরক্ষা। একবার ওরা তা পেয়ে গেলে, প্রেম, সৌন্দর্য্য, সবই জানালার বাইরে কেটে পড়ে : যা তাদের কাছে রয়ে যায় তা হলো তাচ্ছল্য, আজকাল বিবাহ তার ওপরই টিকে থাকে। অনেক সময়ে আমি এমন তরুণীদেরও দেখেছি যাদের খুশি থাকার কথা, যাদের সাথে আমি সঙ্গলাভ করতে পারতুম, কিন্তু তাদের তো আগে থেকেই মাস্তানরা এমন গিলে খেয়েছে যেন কাঠের গুঁড়ি ছাড়া তারা আর কিছুই নয়…”

     

    “আমি ওকে শুনি, বদনামকে শৌর্যে পালটে ফেলছে, নিষ্ঠুরতাকে মায়ায়। “আমি প্রাচীন এক জাতির সদস্য : আমার পুর্বপুরুষরা ছিল ভাইকিং যোদ্ধা : তারা নিজেদের দেহ ফালাফালা করে ফেলতো, নিজেদের রক্ত পান করতো। ---আমি আমার সমস্ত শরীর ফালাফালা করে ফেলবো, উল্কি দেগে দেবো সারা শরীরে, আমি মোঙ্গোলদের মতন কুৎসিত হয়ে উঠতে চাই : তুমি দেখো, রাস্তায় দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ আর্তনাদ করতে চাই। আমি সত্যিই রাগে ফুঁসিয়ে উঠতে চাই। আমাকে হীরে-জওহরত দেখিও না ; আমি চার হাতেপায়ে জাজিমের ওপরে হামাগুড়ি দিয়ে দুমড়ে উঠবো। আমি চাই আমার ধনসম্পত্তি রক্তে জবজবে হয়ে উঠুক। আমি কখনও কোনো কাজ করবো না… “বহুবার, রাতের বেলায়, ওর দানব আমাকে কাবু করেছে, আর আমরা কুস্তির দাঁওপ্যাঁচে গড়াগড়ি খেয়েছি ! -- অনেক সময়ে রাতের বেলায় যখন ও মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যায় তখন ও রাস্তার আনাচে-কানাচে কিংবা দরোজার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়, যাতে আমাকে ভয়ে আধমরা করে দিতে পারে। -- আমি নির্ঘাৎ আমার গলা কেটে ফেলবো ; তা কি বিরক্তিকর হবে।” আর, ওহ ! সেই দিনগুলো যখন ও খুনি হবার ভান করে !

     

    “অনেক সময়ে ও ওর দেশোয়ালি বুলিতে কথা বলে, তা একেবারে আবেগে ঠাশা, মৃত্যু সম্পর্কে, আর তা কেমন করে আমাদের অনুতপ্ত করে, এবং জগতসংসারে নিশ্চয়ই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ আছে, শ্রমে পরিশ্রান্ত, আর বিদায় জানাবার প্রসঙ্গ তোলে এবং তা কেমন করে তোমার হৃদয়কে বিদীর্ণ করে ফ্যালে। যে নোংরা পানশালাগুলোতে ও মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যেতো, তখন আমাদের চারিপাশের লোকজনদের দেখে কাঁদতো -- যেন বস্তি-অঞ্চলের গোরুমোষ। অন্ধকার রাস্তায় মাতালদের তুলে নিতো। ছোট্ট খোকাদের জন্য নির্দয় মায়ের দয়ামায়া ছিল ওর। রবিবারের স্কুলের পথে এক ছোট্ট খুকির মতন মধুরস্বভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। ও ভান করতো যেন সবকিছুই জানে, ব্যবসাপাতি, শিল্প, ওষুধ। -- আর আমি সবসময় ওর সমর্থন করতুম, আমাকে করতে হতো !

     

    “ও নিজের কল্পনাজগতে যেসব ঝালর ঝুলিয়ে রাখতো তা আমি সুস্পষ্ট দেখতে পেতুম ; পোশাক-পরিচ্ছদ, কারিগরি, আসবাবপত্র….আমিই ওকে অস্ত্র ধার দিয়েছিলুম, আর মুখভঙ্গীতে রদবদল। ওকে যাকিছু প্রভাবিত করতো তা আমি টের পেতুম, ঠিক যেমনভাবে ও নিজেকে কল্পনা করে নিতো। যখনই ওকে মনে হয়েছে হতোদ্যম, আমি ওকে অদ্ভুত দুর্বোধ্য অভিযানে অনুসরণ করতুম, চলেছি তো চলেইছি, শুভ হোক বা অশুভ : কিন্তু আমি সবসময়ে জানতুম যে আমি ওর জগতের অংশীদার হতে পারবো না। ওর প্রিয় দেহের পাশে, শুয়ে থাকার সময়ে, জেগে থাকতুম ঘণ্টার পর ঘণ্টা, রাতের পর রাত, ভাবতে চেষ্টা করতুম যে কেন ও বাস্তব থেকে পালিয়ে যেতে চায়। এর আগে আর কোনো লোকের এই রকম ইচ্ছে হয়নি। আমি বুঝতে পেরেছিলুম, ওর সম্পর্কে বিনা ভয়ে -- যে, সমাজের পক্ষে ও ভয়ানক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ওর কি, হয়তো, এমন কিছু গোপন ব্যাপার ছিল যা ওর জীবনের নবীকরন ঘটাবে ? না, আমি নিজেকে বলেছি, ও কেবল সেগুলোকে অনুসন্ধান করছিল। কিন্তু তবু, ওর বদান্যতা এক সন্মোহনে আবৃত, এবং আমি তাতে বন্দী। আর কারোর অমন শক্তিক্ষমতা থাকতে পারে না -- হতাশার শক্তিক্ষমতা --- তা সহ্য করবার, ওর ভালোবাসা আর শুশ্রুষা সহ্য করার ক্ষমতা। তাছাড়া, অন্য কারো সাথে আমি ওকে কল্পনাও করতে পারি না : আমাদের সকলের রয়েছে নিজস্ব কালো-দেবদূতের চোখ, অন্য লোকেদের দেবদূতদের নয়, --- অন্তত আমি তাইই মনে করি। আমি ওর আত্মার ভেতরে বাসা বেঁধেছিলুম, যেন তা ছিল এক ফাঁকা প্রাসাদ যাতে সবচেয়ে অযোগ্য লোক হিসাবে তুমিই তাতে থাকো : ব্যাস এইটুকুই। আহ! সত্যি বলতে কি আমি ওর ওপর শোচনীয়ভাবে নির্ভর করতুম। কিন্তু আমার নিষ্প্রভ, আমার ভিতু অস্তিত্ব থেকে ও কিই বা চাইতো ? ও তো আমার উৎকর্ষসাধন করতে পারতো না, যদিও ও কখনও আমাকে মেরে ফেলার ব্যবস্হা করতে পারেনি ! আমি এমন ভেঙে পড়ি আর হতাশ হই : অনেকসময়ে আমি ওকে বলি: “আমি তোমাকে বুঝতে পারি।” ও তাতে কেবল কাঁধ নাচায়।

     

    “আর তাই আমার হৃদয়ের বেদনা বাড়তেই থাকলো, আর আমি দেখলুম যে বেশি করে ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছি -- আর সবাই তা হয়তো দেখতে পেয়েছে, নিশ্চয়ই, আমি যদি এতোটা অবজ্ঞেয় না হতুম তাহলে কেউই আর আমার দিকে তাকিয়ে দেখতো না ! আর তবু আমি ওর অনুরাগের জন্যে আকুল কামনা করেছি...ওর চুমুগুলো আর ওর বন্ধুত্বের আলিঙ্গন ছিল স্বর্গীয়-- অন্ধকার স্বর্গ, যার মধ্যে আমি প্রবেশ করতে পারতুম, আর যেখানে আমি চাইতুম আমাকে রেখে দেয়া হোক -- গরিব, বধির, বোবা, এবং অন্ধ। আমি ইতিমধ্যে ওর ওপর নির্ভর করা আরম্ভ করেছিলুম। এবং আমি কল্পনা করতুম যে আমরা দুজন সুখী বালক দুঃখের স্বর্গোদ্যানে স্বাধীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমাদের মধ্যে ছিল চরম সামঞ্জস্য। গভীর সমবেদনায়, আমরা পাশাপাশি খেটেছি। কিন্তু তারপর, এক ছিঁড়েফেলা আলিঙ্গনের শেষে, ও বলে উঠবে : “কতো মজার মনে হবে এই সমস্ত কাণ্ড, যা তুমি সহ্য করেছো, যখন আমি আর এখানে থাকবো না। যখন তুমি তোমার কাঁধ ঘিরে আমার বাহু অনুভব করবে না, তোমার তলায় আমার হৃদয়কেও পাবে না, তোমার চোখের ওপর আমার এই মুখ। কেননা একদিন আমাকে চলে যেতে হবে, অনেক দূরে। তাছাড়া, অন্যদেরও তো আমার সহচর্যের প্রয়োজন : সেই জন্যেই আমি এখানে রয়েছি, যদিও আমি সত্যিই তা চাই না...প্রিয় হৃদয়…”আর সেই মুহূর্তে আমি নিজেকে অনুভব করতে পারি, ও চলে যাবার পর, ভয়ে বিহ্বল, ভয়ঙ্কর কালোগহ্বরে তলিয়ে যাওয়া : মৃত্যুর দিকে। আমি ওকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করালুম যে ও আমাকে কখনও ছেড়ে চলে যাবে না। এবং ও প্রতিজ্ঞা করলো, কুড়িবার ; প্রেমিকের মতন প্রতিজ্ঞা করলো। ব্যাপারটা যেন ওকে বলা আমার এই কথার মতন অর্থহীন “আমি তোমায় বুঝতে পারছি”।

     

    “ওহ, আমি কখনও ওর সম্পর্কে ঈর্ষান্বিত হইনি। ও আমাকে কখনও ছেড়ে চলে যাবে না, আমি সে বিষয়ে নিশ্চিত। কিই বা ও করবে ? কোনো লোককেই ও চেনে না ; ও কোনও কাজও করতে পারবে না। ও ঘুমে-হাঁটা মানুষের মতন বাঁচতে চায়। ওর দয়া আর বদান্যতা কি বাস্তব জগতে ওকে ঠাঁই দেবে ? এমন মুহূর্তও আসে যখন আমি ভুলে যাই যে কোনও জঘন্য নোংরামিতে আমি জড়িয়ে পড়েছি : ও আমাকে শক্তি যোগাবে, আমরা দেশান্তরে যাবো, মরুভূমিতে শিকার করতে যাবো, অচেনা শহরের পথের ধারে ঘুমোবো, পিছুটানহীন আর মজায়। কিংবা হয়তো কোনোদিন জেগে উঠলুম আর -- ওর ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা যাবতীয় আইনকানুন ও নীতি-নৈতিকতায় বদল ঘটিয়ে ফেলেছে, -- কিন্তু জগতসংসার ঠিক আগেকার মতনই রয়ে যাবে আর আমাকে রেখে যাবে আমার আকাঙ্খা আর আমার আনন্দ আর আমার উদ্বেগহীনতায়।

     

    ওহ! অভিযানের সেই বিস্ময়কর জগৎ যা আমরা বাচ্চাদের বইতে পেতুম -- তুমি কি সেই জগৎ আমাকে দেবে না ? আমি অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছি, আমি একখানা পুরস্কারের যোগ্যতা রাখি। ওর তা নেই। আমি সত্যিই জানি না ও ঠিক কী চায়। ও বলে যে ওর রয়েছে নানাবিধ আশা এবং পশ্চাত্তাপ : কিন্তু সেসব ব্যাপার নিয়ে আমার কিছুই করার নেই। ও কি ঈশ্বরের সঙ্গে কথা কয় ? আমারও উচিত ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলা। আমি অতলের তলানিতে, আর আমি ভুলে গেছি কেমন করে প্রার্থনা করতে হয়।

     

    “মনে করো ও আমাকে নিজের দঃখকষ্ট ব্যাখ্যা করলো, আমি কি তা ওর ঠাট্টা-ইয়ার্কি এবং অপমানের চেয়ে ভালো করে বুঝতে পারবো ? ও আমাকে আক্রমণ করে, ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে লজ্জায় ফেলার জন্য সেইসব ব্যাপার যা আমার কাছে কখনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা নিয়ে বকে যায়, আর তারপর আমি যখন কাঁদি তখন ক্ষেপে যায়।

     

    “-- তুমি কি ওই সৌম্যকাক্তি যুবকটিকে দেখতে পাচ্ছো সুন্দর, শান্তিপূর্ণ বাড়িটায় ঢুকছে? ওর নাম দুভাল, দুফো, আরমান্দ, মরিস, যা তুমি মনে করো। ওখানে এক মহিলা আছেন যিনি ওই অশুভ প্রাণীটাকে ভালোবেসে সারাজীবন কাটিয়েছেন : উনি মারা গেলেন। আমি নিশ্চিত উনি এখন স্বর্গবাসী একজন সন্ত। তুমি আমাকে সেইভাবেই খুন করবে যেভাবে ও ওই মহিলাকে খুন করেছে। যাদের রয়েছে পরার্থবাদী হৃদয় তাদের এটাই ভবিতব্য…”। হে প্রিয় ! এমনও দিনকাল ছিল যখন ওর মনে হতো উদ্যমী মানুষেরা ওর গ্রটেস্ক উন্মাদনার খেলনা : ও তারপর ভয়ানকভাবে হাসতেই থাকবে, হাসতেই থাকবে। ---তারপর ও কমবয়সী মায়ের মতন বা বয়স্কা বোনের মতন অভিনয় করায় ফিরে যাবে। ও যদি অমন বুনো জিনিস না হতো, তাহলে আমরা বেঁচে যেতুম। কিন্তু ওর মধুরস্বভাবও সাঙ্ঘাতিক। আমি একজন কেনা-গোলাম। -- ওহ, আমি আমার চিন্তাক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি !

     

    “কোনও দিন হয়তো ও অলৌকিকভাবে লোপাট হয়ে যাবে, কিন্তু আমাকে তা নিশ্চিত করে বলে যাওয়া দরকার, মানে আমি বলতে চাইছি ও যদি স্বর্গে বা অন্য কোথাও ফিরে যেতে চায়, যাতে আমি গিয়ে এক মুহূর্তের জন্যে দেখতে পারি অক্ষতযোনি মেরির ঢঙে আমার সোহাগের খোকাটার স্বর্গারোহন।

     

    একটা নারকীয় গৃহস্হালী বটে !


    দ্বিতীয় ডিলিরিয়াম : শব্দের অপরসায়ন

    এবার আমার পালা। আমার উন্মাদনাগুলোর এক কাহিনি।

     

    অনেককাল যাবত আমি এই ভেবে দম্ভোক্তি করতুম যে সমস্ত সম্ভাব্য ভূদৃশ্যের আমি গুরু এবং আমি মনে করতুম যে আধুনিক তৈলচিত্র আর কবিতার মহান ব্যক্তিদের কাজগুলো হাস্যকর।

     

    যা আমি পছন্দ করতুম তা হলো : কিম্ভুতকিমাকার তৈলচিত্র, চৌকাঠের মাথার ওপরের ছবি, মঞ্চের সজ্জা, কার্নিভালের পশ্চাতপট, সাইনবোর্ড, রঙচঙে ছাপা ; পুরোনোদিনের সাহিত্য, গির্জার লাতিন, ভুল বানানে ভরা যৌনপুস্তক, যে ধরণের উপন্যাস আমাদের ঠাকুমা-দিদিমারা পড়েন, পরিদের গল্প, বাচ্চাদের বই, পুরোনো অপেরা, ফালতু পুরোনো গান, দেশোয়ালি গানের ঠুনকো তাল।

     

    আমি ক্রুসেডের স্বপ্ন দেখতুম, এমন আবিষ্কারযাত্রায় বেরিয়েছি যা কেউ কখনও শোনেনি, ইতিহাসহীন গণরাজ্য, মুছে-ফেলা ধর্মযুদ্ধ, নৈতিকতায় বিপ্লব, মহাদেশ ও জনজাতির প্রসারণ : আমি সমস্ত রকমের ইন্দ্রজালে বিশ্বাস করতুম।

     

    আমি প্রতিটি স্বরবর্ণের রঙ আবিষ্কার করেছি ! --A কালো, E শাদা, I লাল,O নীল, U সবুজ।

     

    ---আমি আঙ্গিকের নিয়ম তেরি করেছি এবং প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের বিচলন, এবং আমি নিজের অন্তরজগত থেকে ছন্দ আবিষ্কারের দম্ভোক্তি করতুম, এমনই এক ধরণের কবিতা যাকে প্রতিটি ইন্দ্রিয়, এখন হোক বা পরে, স্বীকৃতি দেবে। এবং কেবল আমিই হবো তার অনুবাদক।

     

    এটা আমি অনুসন্ধান হিসাবে আরম্ভ করেছিলুম। আমি নৈঃশব্দ আর রাতকে শব্দে পরিবর্তিত করে দিয়েছিলুম। যা উচ্চারণ করা যায় না, আমি তা লিখে ফেলতুম। আমি ঘুরন্ত পৃথিবীকে এক জায়গায় স্হির করে দিয়েছিলুম।

     

    ----------------

     

    ঝাঁকের থেকে দূরে, পাখিদের আর গ্রামের খুকিদের,

    ওই পাতা-সবুজের ভেতরে আমি কী পান করেছিলুম

    কচি বাদামগাছে ঘেরা

    দুপুরের উষ্ণসবুজ কুয়াশায় ?

    এই নতুন ওয়াজ নদী থেকে আমি কী পান করতে পারি

    --জিভহীন গাছেরা, ফুলহীন ঘাসভূমি, অন্ধকার আকাশ !--

    এই হলুদ কুমড়োখোসা থেকে পান করব, সেই কুটির থেকে দূরে

    যা আমি ভালোবাসতুম ? একটু সোনালি চুমুক যার দরুন আমি ঘামছি।

    আমাকে দেখে কোনো সরাইখানার সন্দিগ্ধ প্রতিনিধি মনে হতে পারতো।

    -- পরে, সন্ধ্যার দিকে, আকাশ মেঘেয় ভরা…

    বনের ভেতর থেকে জলধারা ছুটে চলেছে বিশুদ্ধ বালিয়াড়িতে,

    আর পুকুরের ওপরে স্বর্গীয় বাতাসে বরফের পুরু সর ;

    তারপর আমি দেখতে পেলুম স্বর্ণ, আর ফোঁপালুম, কিন্তু পান করা হলো না।

     

    গ্রীষ্মকালে, সকাল চারটের সময়ে

    ভালোবাসার খোঁয়ারি তখনও থেকে গেছে…

    ঝোপঝাড় ছড়িয়ে দিচ্ছে সুগন্ধ

    রাতের পানভোজনোৎসবের

    উজ্জ্বল নদীকন্যাদের ওইদিকে

    সূর্যের পশ্চিমা কারখানার মধ্যে,

    ছুতোরেরা তাড়াহুড়ো করছে -- শার্টের হাত গুটিয়ে --

    এবার কাজ আরম্ভ হবে।

    কাজ শুরু হয়ে গেছে।

    আর ফাঁকা, শেওলা-ওপচানো পাথুরে জমিতে

    তারা তাদের দামি জিনকাপড় মেলে ধরছে

    যেখানে শহর

    এঁকে দেবে এক ফোঁপরা আকাশ

    ছবি আঁকা নিয়ে সেইসব মনোরম শখের চর্চাকারীদের জন্যে

    যারা ব্যাবিলনের কোনো রাজার জন্যে পরিশ্রম করছে,

    ভিনাস ! একটু সময়ের জন্য ছেড়ে চলে যাও

    প্রেম-করিয়েদের উজ্বল হৃদয়।

    হে মেষপালকদের রানি !

    শ্রমিকরা যেখানে জিরোচ্ছে

    আর দুপুরের সমুদ্রে স্নান করছে

    সেখানে নিয়ে যাও ফলের বিশুদ্ধতম মদ।

     

    --------------------------

     

    আমার শব্দের অপরসায়নে পুরোনো দিনের কবিতার ক্ষয়ে-যাওয়া ধারণাগুলো গূরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

    আমি প্রাথমিক সন্মোহনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলুম : কারখানা দেখার বদলে আমি সুস্পষ্ট দেখতে পেতুম মসজিদ, দেবদূতদের ড্রামবাদকদল, আকাশের রাজপথে ঘোড়ার গাড়ি, ঝিলের জলের তলায় বৈঠকখানা ; দানবদের, আর রহস্যগুলো ; এক প্রমোদানুষ্ঠানের নামপত্র আমাকে শ্রদ্ধায় ভীত করেছিল।

     

    আর তাই আমি শব্দগুলোকে দৃষ্টিপ্রতিভায় বদলে দিয়ে আমার ঐন্দ্রজালিক কুতর্কগুলোকে ব্যাখ্যা করলুম !

    শেষ পর্যন্ত আমার মগজের বিশৃঙ্খলাকে আমি পবিত্র বলে মনে করতে লাগলুম। গা এলিয়ে শুয়ে থাকতুম, জ্বরে গিলে খেয়ে ফেলছে শরীর : আমি জানোয়ারদের শান্তিময়তাকে হিংসে করতে লাগলুম -- গুটিপোকা, যারা দ্বিতীয় শৈশবের পাপহীনতাকে সুস্পষ্ট করে তোলে, গন্ধমুষিক, অক্ষতযোনি মেয়েদের তন্দ্রাভাব !

     

    আমার মন বিষিয়ে উঠলো। আমি জগতসংসারকে গাথাসঙ্গীতের মতন কবিতায় বিদায় জানালুম :

     

    সবচেয়ে উঁচু মিনার থেকে গাওয়া একটি গান

    তাকে আসতে দাও, তাকে আসতে দাও,

    যে ঋতুকে আমরা ভালোবাসতে পারি

    আমি বহুকাল অপেক্ষা করেছি

    যা আমি ভুলে যেতে পারি ;

    আর স্বর্গে রেখে দিতে পারি

    আমার ভয় ও পশ্চাত্তাপ।

    এক অসুস্হ তৃষ্ণা

    আমার শিরাগুলোকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তোলে।

    তাকে আসতে দাও, তাকে আসতে দাও,

    যে ঋতুকে আমরা ভালোবাসতে পারি

    তাই সবুজ মাঠ,

    অনেক ছড়িয়ে পড়েছে, ফুলে ছেয়ে গেছে,

    সুগন্ধ আর বুনোঝোপে

    আর নোংরা পোকাদের

    নিষ্ঠুর আওয়াজে।

    তাকে আসতে দাও, তাকে আসতে দাও,

    যে ঋতুকে আমরা ভালোবাসতে পারি

     

    আমি মরুভূমিকে ভালোবাসতুম, পোড়া ফলবাগানকে, ক্লান্ত পুরোনো দোকান, গরম পানীয়। আমি নিজেকে দুর্গন্ধ গলির ভেতর দিয়ে টেনে নিয়ে গেলুম, আর দুই চোখ বন্ধ করে আমি সূর্যের কাছে, যিনি আগুনের দেবতা, নিজেকে উৎসর্গ করলুম।

     

    “সেনাধিপতি, যদি তোমার বিদ্ধস্ত পাটাতনের ওপরে একটা কামানও টিকে থাকে, আমাদের ওপরে শুকনো মাটি দিয়ে গড়া গোলা চালাও। দামি দোকানগুলোর আয়নাগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দাও ! এবং বৈঠকঘরগুলো ! শহরের মুখে তারই ধ্বংসধুলো ঢুকিয়ে দাও। মরচে পড়ে যেতে দাও ছাদের সিংহমুখো নালিগোলোয়। পদ্মরাগমণির আগুনগুঁড়ো দিয়ে বন্ধ করে দাও মহিলাদের গোঁসাঘরগুলো….”

     

    ওহ ! গ্রামের সরাইখানার পেচ্ছাপঘরের ছোট্ট মাছিটা, পচা আগাছার প্রেমে মশগুল, আলোর একটা রশ্মিতে ঝিমিয়ে পড়ে !

     

    ক্ষুধা

     

    আমি আমার হাড়ের ভেতরে কেবল খুঁজে পাই

    পৃথিবীর মাটি আর পাথর খাবার স্বাদ।

    যখন আমি খাই, আমি বাতাস খেয়ে টিকে থাকি,

    নুড়ি আর কয়লা আর আকরিক লোহা।

    পরিবর্তে, আমার ক্ষুধা। ক্ষুধা, খাওয়াও

    খেতভরা ভূষি।

    যতো পারো যোগাড় করো সেই উজ্বল

    বিষের আগাছা।

    একজন ভিখারির হাত দিয়ে ভাঙা পাথর খাও,

    পুরোনো গির্জার দেয়ালের পাথর ;

    নুড়িশিলা, বানভাসির শিশুরা,

    কাদায় পড়ে থাকা রুটি।

     

    ----------------------------------

     

    ঝোপের পেছনে ডেকে উঠবে এক নেকড়ে

    মোরগের মাংসখাবার উৎসবে

    ঝলমলে পালকগুলো ছিঁড়ে :

    ওরই মতন, আমি নিজেকে গিলে ফেলি।

    জড়ো করার জন্যে অপেক্ষা করে

    ফল আর ঘাস তাদের সময় কাটায় ;

    বেড়ায় যে মাকড়সা জাল বোনে

    শুধু ফুল খায়।

    আমাকে ঘুমোতে দাও ! আমাকে সেদ্ধ হতে দাও

    সলোমনের পূজাবেদির ওপরে ;

    আমাকে শুষে নিতে দাও ছাতাপড়া মাটি,

    আর বয়ে যেতে দাও কেন্দ্রনে।

     

    সব শেষে, হে যৌক্তিকতা, হে মহানন্দ, আমি আকাশ থেকে তার নীল সরিয়ে ফেলেছি যা আসলে অন্ধকার, আর আলোর প্রকৃতির সোনালি স্ফূলিঙ্গে বসবাস করেছি। আমার আনন্দের আতিশয্যে, আমি আমার মুখকে যতোটা পারি মজাদার আর আদিম করে তুলতে চেয়েছি:

     

    ওটা খুঁজে পাওয়া গেছে।

    কী ? -- অনন্তকাল।

    ঘুরন্ত আলোয়

    সমুদ্রের সূর্যে।

    হে আমার চিরকালীন আত্মা,

    আকাঙ্খা আঁকড়ে ধরে থাকো

    রাত হওয়া সত্ত্বেও

    এবং আগুনের দিন।

    তোমাকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে

    মানবের কঠোর সংগ্রাম থেকে

    আর জগতসংসারের সকলরব প্রশংসা থেকে

    তোমাকে উড়ে যেতে হবে যতোটা তুমি পারো….

    --চিরকালের আশা নেই

    নেই উথ্থানের অবকাশ।

    বিজ্ঞান আর ধৈর্য,

    যাতনা অবশ্যম্ভাবী।

    তোমার অন্তরের আগুন,

    মোলায়েম রেশম-অঙ্গার,

    আমাদের সমস্ত কর্তব্য

    কিন্তু কেউই তা মনে রাখে না।

    তা খুঁজে পাওয়া গেছে।

    কী ? অনন্তকাল।

    ঘুরন্ত আলোয়

    সমুদ্রের সূর্যে।

     

    -------------------

     

    আমি হয়ে উঠলুম নীতিকাহিনির অপেরা : আমি দেখলুম জগতসংসারে সকলেই আনন্দে দণ্ডপ্রাপ্ত। কর্মশক্তি প্রয়োগই জীবন নয় : তা কেবল ক্ষমতাকে বরবাদ করার একটা উপায়, স্নায়ুকে ধ্বংস করার নিমিত্তমাত্র। নৈতিকতা হলো মস্তিষ্কে ভরা জল।

     

    আমার মনে হয়েছে যে প্রত্যেকেরই আরও বেশ কয়েকটা জীবন থাকা উচিত ছিল। ওই লোকটা জানে না ও কি করছে : ও একজন দেবদূত। ওই পরিবারটা কুকুর-বাচ্চাদের গাদাঘর। কয়েকজনের ক্ষেত্রে, আমি অনেকসময়ে তাদের কোনো এক অপরজীবন থেকে চেঁচিয়ে কথা বলেছি। -- ওই সূত্রেই আমি একটা শুয়োরকে পছন্দ করেছিলুম।

     

    উন্মাদনার একটিও মেধাবী যুক্তিতর্ক নয়, -- যে উন্মাদনাকে তালাচাবি দিয়ে আটক করা হয়, -- আমি কি ভুলে গেছি : আমি আবার তার কোটর দিয়ে যেতে পারি, পুরো প্রণালীটা আমার হৃদয়ে খোদাই করা আছে।

    তা আমার স্বাস্হ্যে প্রভাব ফেলেছিল। সামনেই যেন সন্ত্রাস। আমি বারবার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তুম, যা এক লপ্তে অনেকদিন স্হায়ী হতো, আর যখন আমি জেগে উঠতুম, আমার দুঃখি স্বপ্নগুলো বজায় থাকতো। মারাত্মক ফসল তোলার জন্যে আমি ছিলুম তৈরি, আর আমার দুর্বলতা আমাকে জগতসংসারের বিপজ্জনক রাস্তার কিনার পর্যন্ত নিয়ে যেতো, সিমেরিয়ার সমুদ্রতীর পর্যন্ত, ঘুর্নিঝড় আর অন্ধকারের স্বর্গে।

     

    আমাকে ভ্রমণ করতে হতো, যাতে মগজে জড়ো হওয়া জাদুগুলো উবে যেতে পারে। সমুদ্রের ওপরে, যা আমি এমন ভালোবাসতুম যে তা যেন আমার অশুদ্ধতা ধুয়ে দেবে, আমি দেখলুম দয়াময় ক্রুশকাঠ ওপরে উঠে এলো। আমি ছিলুম রামধনু দ্বারা শাপিত। প্রকাশসৌষ্ঠব ছিল আমার শাস্তি, আমার কুরে-খাওয়া মনস্তাপ, আমার কীট : তারপর আমার জীবন শক্তিমত্তা এবং সৌন্দর্যের তুলনায় অনেকটাই বড়ো হয়ে উঠবে।

     

    আনন্দধারা ! তার মারাত্মক মিষ্টতার হুল আমাকে কাকডাকা ভোরে জাগিয়ে তুলবে, --রাত বারোটায়, যিশুর পুনরুথ্থানের মুহূর্তে, -- বিষণ্ণতম শহরে :

     

    হে ঋতুসকল, হে পল্লীদুর্গেরা !

    কোথায় আছে সেই নিখুঁত আত্মা ?

    আমি শিখলুম ইন্দ্রজাল

    আনন্দধারা, আমাদের সবাইকে সন্মোহিত করে।

    আনন্দধারা তোমাকে, জীবনের জয়গান করো

    যখনই ফরাসিদেশের কাক ডেকে উঠবে।

    এখন সমস্ত আকাঙ্খা বিদায় নিয়েছে :

    আমার জীবনকে তা নিজের করে নিয়েছে।

    সেই সন্মোহন প্রভাবিত করেছে আমার হৃদয় ও আত্মা

    আর প্রতিটি যোগ্যতাবিচারকে লণ্ডভণ্ড করেছে।

    হে ঋতুসকল, হে পল্লীদুর্গেরা !

    আর, ওহ ! যেদিন তা মিলিয়ে যাবে

    সেইদিনই হবে আমার মৃত্যুর দিন।

    হে ঋতুসকল, হে পল্লীদুর্গেরা !

     

    ----------------------

     

    তা সবই শেষ হয়ে গেছে। আজকে, আমি জানি সৌন্দর্যকে কেমন করে উদযাপন করতে হয়।

     

    সেই অসাধ্যসাধন

     

    আহ ! বালক হিসাবে আমার জীবন, প্রতিটি আবহাওয়ায় খোলা রাস্তার মতন ; আমি ছিলুম অস্বাভাবিকভাবে মিতাচারী, সবচেয়ে ভালো ভিখারির চেয়েও উদাসীন, কোনো দেশ না থাকার চেতনায় গর্বিত, বন্ধুহীন, তা যে কি বোকামি ছিল। -- আর আমি এখন তা উপলব্ধি করছি!

     

    -- বুড়ো লোকগুলো যারা আদর করার সুযোগ ছাড়ে না তাদের অবিশ্বাস করার ব্যাপারে আমি সঠিক ছিলুম, আমাদের নারীদের স্বাস্হের গায়ে আর নির্মলতায় পরগাছা, যখন কিনা আজকে নারীরা আমাদের থেকে আলাদা এক জাতি।

     

    যা কিছু আমি অবিশ্বাস করতুম সে ব্যাপারে আমি সঠিক ছিলুম : কেননা আমি পালিয়ে যাচ্ছি!

     

    আমি পালিয়ে যাচ্ছি !

     

    বলছি বিশদে।

     

    এমনকি কালকেও, আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছি : “ঈশ্বর ! এখানে এই তলানিতে আমাদের মতন প্রচুর অভিশপ্ত রয়েছে ! তাদের সারিতে আমি ইতিমধ্যে যথেষ্ট দুর্দশায় ভুগেছি ! আমি ওদের সবাইকে চিনি। আমরা পরস্পরকে চিনতে পারি ; আমরা পরস্পরকে বিরক্ত করি। আমাদের কেউই পরার্থবাদীতার কথা শোনেনি। তবুও, আমরা মার্জিত ; জগতসংসারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বেশ নিয়মানুগ। ” তা কি অপ্রত্যাশিত ? এই জগতসংসার ! ব্যবসাদারের দল, আর মূর্খেরা ! -- এখানে থাকায় কোনো অসন্মান নেই। -- কিন্তু নির্বাচিত লোকজন, তারা আমাদের কীভাবে আপ্যায়ন করবে ? কেননা তেমন লোকজনও তো আছে, খুশমেজাজ লোকজন, নকলভাবে নির্বাচিত, কেননা তাদের সান্নিধ্যে যাবার জন্যে আমাদের সাহসী ও বিনয়ী হতে হবে। ওরাই প্রকৃত নির্বাচিত। মোটেই কপটাচারী সন্ত নয়, ওরা !

     

    যেহেতু দুই পয়সা দামের যুক্তিপূর্ণতা ফিরে পেয়েছি -- কেমন তাড়াতাড়ি তা চলে যায়! -- আমি দেখতে পাই যে আমার ঝঞ্ঝাটের উৎস হলো আগেই টের না পাওয়া যে এটা পাশ্চাত্য জগৎ। এগুলো পাশ্চাত্য জলাভূমি ! এমন নয় যে আলো ফিকে হয়ে গেছে, আঙ্গিক ক্ষয়াটে, কিংবা অগ্রগমন বিপথে চালিত...। ঠিক আছে ! প্রাচ্যের পতনের পর থেকে আমার মনের মধ্যে যে রদবদল ঘটেছে আমার মন এখন নিশ্চিতভাবে সেই সব নিষ্ঠুর ঘটনার মোকাবিলা করতে চায়...। আমার মনের সেটাই চাহিদা !

     

    ...আর সেখানেই আমার দুই পয়সা দামের যুক্তিবোধের সমাপ্তি ! নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মন, তা দাবি করছে যে আমি পাশ্চাত্যজগতেই থাকি। যেমনটা আমি চিরকাল চেয়েছি, আমি যদি এটা শেষ করে ফেলতে চাই তাহলে একে চুপ করিয়ে দিতে হবে।

     

    আমি আগে বলতুম, চুলোয় যাক শহিদদের করতল, শিল্পের যাবতীয় আলোকসঙ্কেত, আবিষ্কারকের গর্ববোধ, লুন্ঠনকারীর উত্তেজনা ; প্রাচ্যদেশে এবং মৌলিক, শাশ্বত জ্ঞানে আমার ফিরে যাবার কথা। কিন্তু এসবই নিঃসন্দেহে কলুষিত আলস্যের স্বপ্ন !

     

    আর তবুও আধুনিক যন্ত্রণাবোধ থেকে পালাবার ইচ্ছে আমার ছিল না। কোরানের মিশ্রিত পাণ্ডিত্য সম্পর্কে আমার গভীর কৌতূহল নেই। -- কিন্তু এই জ্ঞানে কি প্রকৃত পীড়ন নেই যে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রদোষ থেকে, খ্রিস্টধর্ম, মানুষ নিজেকে মূর্খ প্রতিপন্ন করে চলেছে, যা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান তাকে প্রমাণ করতে চাইছে, বারবার প্রমাণ দেখিয়ে গর্বে বুক ফোলাচ্ছে, আর কেবল তা নিয়েই বেঁচে আছে ! এটা একরকমের সূক্ষ্ম, বোকা পীড়ন ; আর এটাই আমার আত্মিক অসংলগ্নতার উৎস। প্রকৃতি হয়তো এই সমস্ত ব্যাপার নিয়ে বিরক্ত ! যিশুর সঙ্গেই জন্মেছিলেন প্রুধোম।

     

    তা কি এই জন্যে নয় যে আমরা কুহেলিকার চর্চা করি ! জোলো শাকসবজির সঙ্গে জ্বরকে গিলে ফেলি। এবং মাতলামি ! আর তামাক। আর অজ্ঞানতা ! আর অন্ধ ধর্মবিশ্বাস ! -- এই সমস্তকিছুই কি প্রাচ্যের জ্ঞান, আমাদের আসল পিতৃভূমি, তার দর্শন থেকে দূরে নয় ? আধুনিক জগতসংসার নিয়ে কিই বা করার আছে, যদি অমন বিষ আবিষ্কার হয় !

     

    যাজকরা আর ধর্মোপদেশকরা বলবেন : নিশ্চয়ই। কিন্তু তুমি তো আদম আর ইভের নন্দনকাননের প্রসঙ্গ তুলছো। প্রাচ্য জাতিদের অতীত ইতিহাসে তোমার জন্য কিচ্ছু নেই...। সে কথা সত্যি। আমি নন্দনকাননের কথাই বলতে চাইছি ! প্রাচীন জাতিদের বিশুদ্ধতা কেমন করেই বা আমার স্বপ্নকে প্রভাবিত করবে ?

     

    দার্শনিকরা বলবেন : জগতসংসারের কোনো বয়স নেই। মানবতা স্হান থেকে স্হানান্তরে যায়, ব্যাস। তুমি একজন পাশ্চাত্য মানুষ, কিন্তু তুমি তোমার নিজস্ব প্রাচ্যে বসবাসের জন্য স্বাধীন, যতো পুরোনো তুমি চাও ততোই, -- আর সেখানে তুমি যেমন ইচ্ছে থাকতে চাও। হেরো হয়ে যেও না। দার্শনিকগণ, আপনারা পাশ্চাত্য জগতের পাকাপাকি অংশ !

     

    মন, সাবধান হও। উত্তরণের পেছনে পাগলের মতন ছুটো না। নিজেকে শিক্ষিত করো! --আহ!

     

    বিজ্ঞান আমাদের থেকে কখনও এগিয়ে থাকে না !

     

    --কিন্তু আমি দেখি আমার মন ঘুমিয়ে পড়েছে।

     

    এই মুহূর্ত থেকে যদি তা পূর্ণসতর্ক থাকে, আমরা দ্রুত সত্যকে পাবো, যা হয়তো এখনই ফোঁপাতে থাকা দেবদূতদের দিয়ে আমাদের ঘিরে রেখেছে !....-- যদি তা এই মুহূর্ত পর্যন্ত পূর্ণসতর্ক ছিল, তাহলে, অনেককাল আগেই, আমি তা নীচ প্রবৃত্তির কাছে সোপর্দ করতুম না !...--যদি তা চিরটাকাল পূর্ণসতর্ক থাকতো, আমি প্রজ্ঞায় ভাসতুম!...

     

    হে বিশুদ্ধতা ! বিশুদ্ধতা !

     

    এই জাগরণের মুহুর্তে, আমার ঘটে গেল বিশুদ্ধতার দৃষ্টিপ্রতিভা ! মনের মাধ্যমে আমরা ঈশ্বরের কাছে পৌঁছোই !

     

    কী যে এক ঠুঁটো দুর্ভাগ্য !

     

    সৌদামিনী

    ----------------

     

    মানুষের শ্রম ! সেই বিস্ফোরণ আমার অতলকে সময়ে-সময়ে আলোকিত করে।

     

    “জ্ঞান আহরনের পথে : কোনো ব্যাপারই আত্মশ্লাঘা নয়!” চেঁচিয়ে বলে ওঠেন আধুনিক ধর্মপ্রচারকদল, যার অর্থ সব্বাই। আর তবুও বজ্জাত ও অলসদের চাপ গিয়ে পড়ে বাদবাকিদের হৃদয়ের ওপরে….। আহ ! তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি ওইখানে চলুন ; রাতের ওই পারে...ভবিষ্যতের সেই পুরস্কার, সেই শাশ্বত পুরস্কার...আমরা কি তা থেকে নিষ্কৃতি পাবো?

     

    ---এর থেকে বেশি আমি কিই বা করতে পারি ? শ্রমের কথা জানি ; এবং বিজ্ঞান বড়োই মন্হর। প্রার্থনা দ্রুতগামী আর আলোকমালার গর্জন...আমি তা ভালো করে জানি। ব্যাপারটা খুবই সহজ, আর আবহাওয়া বেশ তপ্ত ; আমাকে ছাড়াই তোমাদের চলে যাবে। আমার রয়েছে কর্তব্য ; একে একপাশে সরিয়ে রাখতে, আমি গর্ববোধ করবো. যেমন অন্যেরা করেছে।

     

    আমার জীবন নিঃশেষিত । ঠিকই, চলো ভান করা যাক, আমরা কোনো কাজই করবো না ! ওহ ! দুঃখদায়ক ! আর আমরা বেঁচে থাকবো, আর নিজেদের মনোরঞ্জন করবো, দানবিক প্রেম আর খেয়ালি জগতের স্বপ্ন দেখবো, পৃথিবীর আদল-আদরা নিয়ে অভিযোগ আর ঝগড়া করবো, দড়াবাজিকর, ভিখারি, শিল্পী, ডাকাত, -- যাজক ! আমার হাসপাতালের বিছানায়, ধুপকাঠির সুগন্ধ তীব্রভাবে আমার কাছে ফিরে এলো ; পবিত্র সৌরভের অভিভাবক, আত্মস্বীকৃতিকারী, শহিদ...।

     

    শৈশবের মলিন শিক্ষা সেখানে আমি চিনতে পারি। তারপর কী !...কুড়ি বছর বয়সে পৌঁছোও: আমি কুড়িবছর পালন করবো, অন্য সকলে যদি তা করে...।

     

    না ! না ! এখন আমি মৃত্যুর বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াচ্ছি ! আমার গর্ববোধের তুলনায় শ্রমকে মামুলি মনে হয় : জগতসংসারের কাছে আমাকে ফাঁসিয়ে দেয়াটা আমার শাস্তির পক্ষে যৎসামান্য হবে। শেষ মুহূর্তে আমি আক্রমণ করব, একবার ডানদিকে, আরেকবার বাঁদিকে....।

     

    ---ওহ ! -- বেচারা প্রিয় আত্মা, তাহলে অমরত্ব হয়তো হাতছাড়া হবে না !

     

    সকাল

     

    আমার কি একসময় তেমন যৌবন ছিল না যা মনোরম, বীরোচিত, কিংবদন্তিপ্রতিম, যা সোনার কাগজে লিখে ফেলা যায় ? -- আমি ছিলুম খুবই ভাগ্যবান ! কোন সে অপরাধ, কোন ভুলের কারণে আমার ওপর বর্তেছে বর্তমান দুর্বলতা ? তোমরা যারা মনে করো যে জানোয়াররাও দুঃখে ফোঁপায়, অসুস্হরা বিষাদগ্রস্ত হয়, মৃতেরা খারাপ স্বপ্ন দ্যাখে, এবার আমার পতনের সঙ্গে আমার ঘুমের সম্পর্ক খোঁজো। যে ভিখারিটা পাখির মতন এবং প্রভুর বন্দনাগান গায়, আমি নিজেকে তার চেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি না। কীভাবে কথা কইতে হয় তা আমি আর জানি না !

     

    অথচ তবু, আজকে, আমার মনে হয় এই নরকের হিসাব আমি শেষ করে ফেলেছি। আর তা নরকই ছিল : সেই পুরোনোটা, যার সিংহদরোজা খুলে দিয়েছিল মানবপুত্র।

     

    সেই একই মরুভূমি থেকে, সেই একই আকাশপানে, আমার ক্লান্ত চোখ রূপালি নক্ষত্রের দিকে সবসময় চেয়ে থাকে, সব সময়ের জন্যে ; কিন্তু সেই তিন জ্ঞানী মানুষ একেবারও নিজেদের জায়গা থেকে নড়াচড়া করেন না, জীবনের মহারাজারা, হৃদয়, আত্মা, মন। আমরা যখন যাবো, পাহাড়ের ওপর আর সমুদ্রের তীরে, নতুন শ্রমের, নতুন জ্ঞানের জন্মের গুণগান করার জন্যে, অত্যাচারী এবং দানবরা পালাবে, কুসংস্কারের সমাপ্তি ঘটবে, -- আমরাই হবো প্রথম ভক্ত ! -- পৃথিবীর মাটিতে খ্রিস্টের জন্মোৎসব !

     

    স্বর্গসমূহের গান, রাষ্ট্রদের অগ্রগমন ! আমরা কেনা-গোলাম, জীবনকে অভিশাপ দেয়া আমাদের উচিত নয় !


    বিদায়

     

    হেমন্ত এসে গেছে ! -- আমরা যদি দৈব উজ্বলতা অনুসন্ধানের জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাহলে চিরকালীন সূর্যের জন্যে কেনই বা দুঃখপ্রকাশ করা, -- ঋতুবদলের সঙ্গে যাদের মৃত্যু হয় তাদের থেকে বহু দূরে।

     

    হেমন্ত। আমাদের নৌকা, ঝুলন্ত কুয়াশা থেকে উঠে এসেছে, বাঁক নেয় দারিদ্রের বন্দরের দিকে, দানবিক শহর, তার আকাশ আগুন আর কাদায় নোংরা। আহ ! সেইসব কটুগন্ধ কাঁথা, বৃষ্টিতে ভেজা রুটি, মাতলামি, আর হাজার প্রেম যা আমাকে ক্রুশকাঠে বিঁধেছে ! লক্ষকোটি মৃত আত্মা আর দেহের পিশাচিনী রানির দিন কি কখনও ফুরোবে না, আর কবেই বা তাদের সবায়ের বিচার হবে ! আমি নিজেকে আবার দেখতে পাই, নোংরায় আর রোগে আমার গায়ের চামড়া ক্ষয়ে গিয়েছে, মাথার চুলে আর বগলে পোকারা কিলবিল করছে, আর তাদের চেয়েও বড়ো-বড়ো পোকা চরে বেড়াচ্ছে আমার হৃদয়ে, আয়ূহীন, হৃদয়হীন, অচেনা আকারে ছেয়ে ফেলেছে...। আমি সেখানে অনায়াসে মরে যেতে পারতুম...। কি ভয়ানক স্মৃতি ! দারিদ্র্যকে আমি খুবই ঘেন্না করি।

     

    আর শীতকালকে আমি ভীষণ ভয় পাই কেননা তা বড়োই আরামদায়ক !

     

    ---অনেকসময়ে আমি আকাশে দেখতে পাই বালিছড়ানো সীমাহীন তীর শাদা উদ্দীপনাময় রাষ্ট্রে ছেয়ে গেছে। একটা সোনালি জাহাজ, আমার ওপরদিকে, সকালের হাওয়ায় নানা রঙের নিশান ওড়াচ্ছে। প্রতিটি ভোজনোৎসব, প্রতিটি বিজয়, প্রতিটি দৃশ্যকাব্যের আমি ছিলুম স্রষ্টা। নতুন ফুল, নতুন গাছপালা, নতুন মাংস, নতুন ভাষা আবিষ্কারের চেষ্টা করেছিলুম আমি। আমি ভেবেছিলুম আমি অর্জন করেছি অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা।

     

    হাঃ ! আমাকে আমার কল্পনা আর আমার স্মৃতিকে গোর দিতে হবে ! শিল্পী আর গল্পকার হিসাবে জমকালো কর্মজীবনের কেমনতর সমাপ্তি!

     

    আমি ! নিজেকে ম্যাজিশিয়ান, দেবদূত, নৈতিকতার বাঁধন থেকে মুক্ত বলে মনে করেছিলুম।

     

    আমাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে যাতে চাষের জমির প্রতি কৃতজ্ঞতা শোধ করতে পারি, বাহুতে মুড়ে নিতে পারি গ্রন্হিল বাস্তবতা ! একজন চাষি !

     

    আমি কি প্রতারিত ? পরার্থবাদিতা কি হয়ে উঠবে মৃত্যুর বোন, আমার জন্যে ?

     

    ঠিক আছে, মিথ্যা আশ্রয় করে বেঁচে থাকার জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নেবো। আর তাইই শেষ।

     

    কিন্তু বন্ধুত্বের একটাও হাত নেই ! আর কোথায়ই বা আমি সাহায্য খুঁজবো ?

     

    ¯¯¯¯¯¯¯¯

    সত্যি, নতুন যুগ রূঢ় ছাড়া আর কিছুই নয়।

     

    কেননা আমি বলতে পারি যে আমি একটা বিজয় পেয়েছি ; দাঁতের ওপর দাঁত চেপে, নরকের আগুনের ফোঁসফোঁসানি, দুর্গন্ধিত দীর্ঘশ্বাস ফুরিয়ে এসেছে। আমার রাক্ষুসে স্মৃতি মিলিয়ে যাচ্ছে।

    বিদায় নিচ্ছে আমার শেষ আকাঙ্খাগুলো, -- ভিখারিদের, ডাকাতদের, মৃত্যুর বন্ধুদের, যে জগত পাশ দিয়ে চলে গেছে, তার সম্পর্কে ঈর্ষা। --- অভিশপ্ত আত্মারা, যদি আমি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে পারতুম !

     

    চরম আধুনিক হওয়া দরকার।

     

    ধন্যবাদোৎসবের স্তবগানকে গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন নেই : একবার যে ধাপে পা রেখেছো তা ধরে রাখো। এক দুঃসহ রাত ! আমার মুখের ওপরে শুকনো রক্তের ধোঁয়া, আর আমার পেছনদিকে ওই ছোট্ট বীভৎস গাছ ছাড়া আর কিছু নেই !...মানুষের সংগ্রামের মতনই আত্মার জন্য সংগ্রামও পাশবিক ; কিন্তু বিচারের আনন্দদর্শন কেবল ঈশ্বরের একার।

     

    তবু এটাই রাত্রিকালের জাগ্রদবস্হা। চলো আমরা নতুন শক্তিক্ষমতাকে, আর প্রকৃত প্রেমপরায়ণতাকে মেনে নিই। এবং সকালে, দীপ্তমান ধৈর্যকে বর্ম করে, আমরা মহিমান্বয়ের শহরগুলোয় প্রবেশ করবো।

     

    আমি কেন বন্ধুত্বের হাতের কথা বলেছিলুম ! আমার সবচেয়ে বড়ো সুবিধা হলো যে মিথ্যায় ভরা পুরোনো ভালোবাসা আমি হেসে উড়িয়ে দিতে পারি, আর অমন প্রতারণাভরা যুগলকে কলঙ্কে দেগে দিতে পারি, -- সেখানে আমি নারীদের নরকের অভিজ্ঞতাও পেয়েছি ; -- আর এবার আমি একই দেহ ও একই আত্মায় সত্যকে ধারণ করতে সক্ষম হবো।

     

    [ রচনাকাল : এপ্রিল-আগস্ট, ১৮৭৩ ]

    [ অনুবাদ : ২০১৯ ]


  • মলয় রায়চৌধুরী | ২৪ আগস্ট ২০২১ ১৯:৪৫734908
  • জাঁ আর্তুর র‌্যাঁবো-র কুড়িটি কবিতা

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    জাঁ নিকোলা আর্তুর র‍্যাঁবো (২০ অক্টোবর ১৮৫৪- ১০ নভেম্বর ১৮৯১) একজন ফরাসি কবি। ১৮৫৪ সালে ২০ অক্টোবর তিনি ফ্রান্সের শার্লভিল-মেজিয়ের শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার অধিকাংশ কবিতাই লিখেছিলেন কিশোর বয়সে।

    র‍্যাঁবোর পরিবারটি ছিল মধ্যবিত্ত। বাবা সৈন্য, মা গৃহিনী। ইজাবেল নামে এক বোন ছিল র‌্যাঁবোর। বড় এক ভাইও ছিল। র‌্যাঁবোর বয়স তখন দু’বছর - তখনই তার মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে। বাবা নয়, র‌্যাঁবোর ছেলেবেলা জুড়ে ছিল মায়ের কঠোর শাসন। মায়ের শাস্তিও ছিল অদ্ভুত রকমের, পড়া না পারলেই ১০০ লাইন লাতিন কবিতা মুখস্থ করতে হত। এরপরও আবৃত্তি ভুল হলে খাবার জুটত না। ৯ বছর বয়েসেই তাই নাকি ৭০০ লাইন লাতিন কবিতা ঠোটস্থ হয়ে গেছিল তার। তাদের বাড়ির নিচেই ছিল বিরাট এক লাইব্রেরি। খুব অল্প বয়সেই সেখানে বসে তিনি ফেনিমোর কুপার, গুস্তাভ আইমোর, জুল ভের্ন থেকে শুরু করে হেগেল ও সোয়েডনবর্গের দর্শন, প্রুদম, ফ্রান্সের লোককাহিনী এবং ইতিহাস ও সাহিত্য, এমনকী প্রাচ্য তথা ভারতীয় ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ, দর্শন, ধর্ম প্রচারক এবং দেব-দেবী ও দেবালয় সম্বন্ধেও পড়াশুনো করেন।] মাত্র সতেরো বছর বয়সেই অত্যন্ত আলোড়ণ উদ্রেককারী কবিতার মাধ্যমে তিনি প্যারিসের কবিসমাজকে উদ্বেলিত করে তুলেছিলেন। তার মাতাল তরণী কবিতাটি পড়ে সেযুগের ফ্রান্সের অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় প্রতীকবাদী কবি পল ভর্লেন তার প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়েও উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মাত্র ২০ বছর বয়সেই তিনি সব ধরনের সৃষ্টিশীল লেখালেখি ছেড়ে দেন। এরপর তিনি আরব এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে ভ্রমণ করেন। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৮৯১ সালের ১০ নভেম্বর তার মৃত্যু হয়। তার বিখ্যাত লেখনির মধ্যে নরকে এক ঋতু (উন সেজোঁ অন অঁফের), মাতাল তরণী (ল্য বাতো ইভ্র্‌) এবং গদ্য কবিতা ইলুমিনাসিওঁ অন্যতম।

    র‍্যাঁবোর কাব্যদর্শনের মূল কথাই ছিল স্বেচ্ছাধীন স্বতঃস্ফূর্ততার মাধ্যমে অসীম, অনন্ত ও অচেনা এক জগতের সন্ধান। এ' জগতের সন্ধান শুধুমাত্র পঞ্চেন্দ্রিয়য় আবদ্ধ অনুভূতির দ্বারা পাওয়া সম্ভব নয়। এই কারণেই বোধহয় তিনি কাব্যে আরও আরও প্রতীকের ব্যবহারের দিকে ঝোঁকেন। বিশ শতকে এসে পাবলো পিকাসো এবং জিম মরিসনের মত অনেকেরই তিনি গুরুতে পরিনত হন। এই প্রতিভাবান লেখকের হুট করে আবির্ভাব এবং আকস্মিক চলে যাওয়া এখনও অনেকের কাছে বিষ্ময়ের ব্যাপার।


    প্রথম সন্ধ্যা

    মেয়েটি যদিও সাদামাটা পোশাকে ছিল,

    আর বিশাল অসাবধান গাছেরা

    তাদের পাতা দিয়ে ছুঁয়েছিল কাচ,

    আড়ি পেতে, কাছ থেকে, বেশ কাছ থেকে।

    আমার আরাম-চেয়ারে বসে,

    অর্ধেকনগ্ন, দুই হাতজোড় করে,

    মাটিতে, ছোট্ট পা, কতো সুন্দর,

    কতো সুন্দর, আনন্দে হচ্ছিল শিহরিত।

    আমি দেখছিলুম, মৌমাছিমোম রঙ

    সূর্যালোকের এক ভবঘুরে রশ্মি

    ওর হাসিতে নাড়াচ্ছিল পাখা, আর ওর

    বুকের ওপরে -- গোলাপের ওপরে এক মাছি।

    আমি চুমু খেলুম ওর কৃশতনু কনুইতে।

    মেয়েটি হঠাৎই খিলখিলে মিষ্টি হাসি দিলো

    একই সুরে স্বরভঙ্গী স্পষ্ট কাঁপিয়ে,

    স্ফটিকের এক চমৎকার হাসি।

    ওর পালাবার ছোট্ট পাদুটি

    চলে গেলো দ্রুত : ‘তুমি থামবে !’

    প্রথম সাহসী কাজের অনুমতি দিয়ে,

    শাস্তি দেবার ভান করছিল ওর হাসি !

    -- আমার দুই ঠোঁটের মাঝে শিহরিত,

    বেচারি, আমি আলতো চুমু খেলুম চোখের পাতায়।

    -- ও নিজের নিস্তেজ মাথা পেছনে করে নিলো।

    ‘ওহ ! ওটা আরও খারাপ, বলতে হয় !’

    ‘স্যার, আপনাকে আমার দুটো কথা বলার আছে…’

    -- আমি বাকিটুকু ওর বুকে চেপে ধরলুম

    একটা চুমুতে যা ওকে হাসাতে লাগলো

    রাজি হবার এক হাসি…

    -- মেয়েটি যদিও সাদামাটা পোশাকে ছিল,

    আর বিশাল অসাবধান গাছেরা

    তাদের পাতা দিয়ে ছুয়েছিল কাচ

    আড়ি পেতে, কাছ থেকে, বেশ কাছ থেকে।

    ১৮৭০


    সংবেদন

    গ্রীষ্মের নীল দিনগুলোয়, আমি ঘুরে বেড়াবো চারিদিকে,

    ভুট্টার খোসা দিয়ে খোঁচা খাবো, মাড়াবো শিশির :

    এক স্বপ্নদর্শী, তাকিয়ে থাকবো, পায়ের তলায় খেলা করবে হিম।

    সন্ধ্যার বাতাসকে অনুমতি দেবো আমার মাথার নবায়ন করতে।

    আমি বলবো -- কোনো কথা নয় : আমি ভাববো -- কিচ্ছুটি নয় :

    কিন্তু এক অনন্ত ভালোবাসা পূর্ণ হবে আমার আত্মায়,

    আর আমি চলে যাবো বহুদূর, এক ঘরছাড়া লোক,

    প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে -- তেমন আনন্দে, যেন আমি এক প্রেমিকা পেয়েছি।

    মার্চ, ১৮৭০



    রোমান্স

    .

    তুমি ঐকান্তিক ছিলে না, যখন তোমার বয়স ছিল সতেরো।

    -- এক সুন্দর সন্ধ্যায়, বিয়ার আর লেমোনেডে ক্লান্ত,

    ঝকঝকে আভা নিয়ে হট্টোগোলেভরা রেস্তঁরাগুলো !

    -- প্রশস্ত রাস্তায় লেবুগাছের সবুজের ভেতর দিয়ে তুমি হেঁটে যাও।

    সুন্দর জুনের সন্ধ্যায় লেবুগাছের সুন্দর সুগন্ধ !

    বাতাস এতো মিষ্টি তুমি কখনওবা দুচোখ বন্ধ করে নাও :

    হাওয়া শব্দে ভরপুর -- কাছেই শহর --

    বিয়ারের গন্ধ ভেসে আসে, আর আঙুরলতার সুবাস...

    -- তারপর তুমি একটা ছোটো টুকরো তৈরি করে নাও

    রাতের এক শাখা দিয়ে গড়া বিষণ্ণ নীলিমার,

    এক সর্বনাশা নক্ষত্র দিয়ে ভেদ করা, তা গলে যায়, তারপর

    নরম স্পন্দন, ক্ষুদে আর নিখুঁত ধবধবে…

    জুন মাসের রাত ! আর সতেরো বছর! -- তুমি তখন প্রায়-মাতাল।

    উদ্ভিদরসের শ্যামপেন আর চেহারাগুলোকে অস্পষ্ট করে দ্যায়…

    তুমি ঘুরে বেড়াও : তুমি ঠোঁটে এক চুমু অনুভব করো

    তা সেখানেই কাঁপতে থাকে, কোনো ক্ষুদে কীটের মতন…

     

    তোমার উন্মাদ হৃদয় ক্রুসোর মতন রোমান্স করতে যায়,

    -- যেখানে কুপির ফিকে আলোয় তোমার দৃষ্টি অনুসরণ করে

    মিষ্টি চাউনি বিলিয়ে মিষ্টি এক তরুণী চলে যাচ্ছে পাশ দিয়ে

    তার মাড়দেয়া শার্ট পরা বাবার অন্ধকারের মোড়কে…

    আর মেয়েটি তোমাকে হাবাগবা মনে করছে বলে

    যেতে যেতে, হাঁটু-অব্দি জুতো পায়ে, ও হোঁচোট খায়

    কাঁধ নাচিয়ে মেয়েটি সতর্কভাবে চলে যায়…

    আর তোমার ঠোঁটে মারা যায় দ্রুতলয় গান…

    তুমি প্রেমে পড়েছো। আগস্ট মাস পর্যন্ত চালিয়েছো।

    তুমি প্রেমে পড়েছো। -- তোমার সনেটগুলো মেয়েটির মুখে হাসি ফোটায়।

    আর তোমার বন্ধুরা চলে গেছে : তোমার মনে অবস্হা ভালো নয়।

    -- তারপর আদরিণী, এক সন্ধ্যায়, প্রসন্ন হয়ে লেখে !

    সেই সন্ধ্যায়...তুমি রেস্তরাঁর ঔজ্বল্যে ফিরে যাও,

    তুমি বিয়ার কিংবা লেমোনেডের অর্ডার দাও…

    তুমি হৈকান্তিক ছিলে না, যখন তোমার বয়স ছিল সতেরো

    আর প্রশস্ত পথে লেবুর গাছগুলো সবুজ।

    ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৮৭০

     

    ১৮৭০

    ‘৭০-এর ফরাসিরা, বোনাপার্টিস্টরা, রিপাবলিকানরা,

    ‘৯২-র তোমাদের পূর্বপুরুষদের মনে করো…

    পল দ্য কাসানে ( লে পায় )

    তোমরা বিরানব্বুই আর তিরানব্বুইয়ের মৃতরা,

    যারা, মুক্তির মআন চুমুতে ফ্যাকাশে হয়ে যাও,

    পিষ্ট, শান্ত, তোমাদের কাঠের জুতোর তলায়

    মানুষের ভ্রূযুগল আর আত্মায় যে জোয়াল ভারিভাবে চেপে বসে :

    পুরুষেরা উল্লসিত, যন্ত্রণায় মহিয়ান,

    তোমরা যাদের হৃদয় ভালোবাসায় উত্তাল, দুঃখদুর্দশায়,

    হে সৈন্যদল যাদের জন্য মৃত্যু, উদাত্ত প্রেমিক, বীজ পুঁতেছে

    সমস্ত পুরোনো হলরেখায়, যাতে তারা পুনর্জন্ম লাভ করে :

    তোমরা যাদের রক্ত ধুয়ে দিয়েছে প্রতিটি কলুষিত জাঁকজমক,

    ভামিতে মৃত, ফ্লিউর্সে মৃত, ইতালিতে মৃত,

    হে লক্ষলক্ষ অমায়িক ও নিরানন্দ চোখের যিশুখ্রিস্ট :

    আমরা তোমাদের রিপাবলিকের সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়তে দিয়েছি,

    আমরা, রাজার শাসনে ভয়ে জড়োসড়ো যেন পিটুনি খাচ্ছি।

    -- ওরা তোমাদের গল্প বলছে যাতে আমরা তোমাদের মনে রাখি !

    দোনে আত মাজাস, ৩ সেপ্টেম্বর, ১৮৭০

     

    সিজারদের ক্ষিপ্ততা

    ( নেপোলিয়ান-৩, সেদানের পর )

    ফ্যাকাশে লোকটা ফুলের দৃশ্যের ভেতর দিয়ে হেঁটে যায়,

    কালো পোশাকে, দাঁতের মাঝে চুরুট :

    ফ্যাকাশে লোকটা তুইলেরিজের ফুলের কথা ভাবে

    আর অনেকসময়ে ওর মাছের মতন চোখ হয়ে ওঠে প্রখর..

    চব্বিশ বছরের ব্যভিচারে সম্রাট মদে চুর !

    উনি নিজেকে বললেন : “আমি মুক্তিচেতনাকে মিটিয়ে দেবো

    যেন তা এক মোমবাতি, আর বেশ সূক্ষ্মভাবে !”

    মুক্তিচেতনা জেগে ওঠে ! উনি নিজেকে অবসন্ন মনে করেন !

    উনি কারাগারে। -- ওহ ! কোন সে নাম যা কাঁপতে থাকে

    ওনার মৌন ঠোঁটে ? কোন অবিরাম অনুতাপ উনি অনুভব করেন ?

    কেউ কখনও জানতে পারবে না। সম্রাটের চোখে অন্ধকার।

    উনি ‘সহচরকে’ ডেকে পাঠান, হয়তো, চশমা পরে…

    দেখতে পান সরু ধোঁয়ার রেখা উঠে যাচ্ছে,

    যেমন সেই সন্ত-মেঘ সন্ধ্যায়, চুরুট থেকে।

     

    সারব্রুকেনের বিখ্যাত বিজয়

    মাঝখানে, সম্রাট, নীল-হলুদ, সমারোহাঙ্কে,

    টগবগিয়ে ঘোড়া ছোটান, বন্দুকছড়ের মতন সোজা, তাঁর ফিকে হেইহোসহ,

    খুবই আনন্দে -- কেননা সবকিছুই তাঁর মনে হয় আশাব্যঞ্জক,

    গ্রিক দেবতা জিউসের মতন হিংস্র, আর একজন পিতার মতন ভদ্র :

    সাহসিক পদাতিক সৈন্যরা ঘুমিয়ে নিচ্ছে, বৃথাই

    সোনালি ড্রাম আর রক্তবর্ণ তোপের তলায়,

    সবিনয়ে উঠে দাঁড়ায়। একজন পরে নেয় তার উর্দি,

    আর, সেনাধ্যক্ষের দিকে তাকায়, বিশাল নামের দরুন হতবাক !

    ডানদিকে, আরেকজন, রাইফেলের কুঁদোয় হেলান দিয়ে,

    অনুভব করে তার ঘাড়ের পেছনে চুল ওপরে উঠছে,

    চেঁচিয়ে ওঠে : ‘সম্রাট দীর্ঘজীবি হোন !!’-- তার পাশের জনের মুখ বন্ধ…

    একটা শিরস্ত্রাণ উঠে দাঁড়ায়, কালো সূর্যের মতন…-- তার মাঝে

    শেষজন, লাল আর নীল পোশাকে এক হাবাগবা, উপুড় হয়ে শুয়ে

    উঠে পড়ো, আর, -- নিজের পোঁদ দেখিয়ে -- জিগ্যেস করে : “কিসের ওপরে?”



    শীতের এক স্বপ্ন

    মেয়েটিকে

    শীতের সময়ে আমরা ছোটো এক গোলাপী ঘোড়ার গাড়িতে বেড়াতে বেরোবো

    তার গদি হবে নীল রঙের

    বেশ ভালো থাকবো আমরা। পাগল চুমুর নীড় অপেক্ষায় আছে

    প্রতিটি কোনায়।

    তুমি তোমার চোখ বন্ধ করে নেদে, যাতে দেখতে না হয়, কাচের মধ্যে দিয়ে,

    সন্ধ্যার বিকৃতমুখ ছায়া,

    ওই সমস্ত খেঁকি দানবেরা, পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে একদল

    কালো নেকড়ে আর কালো দানবেরা।

    তখন তুমি অনুভব করবে তোমার গালে বেজায় সুড়সুড়ি…

    একটা ছোট্ট চুমু, কোনো পাগল মাকড়সার মতন,

    তোমার ঘাড়ে চলছে…

    আর মাথা নিচু করে তুমি বলবে : “ধরো ওটাকে !”

    --- আর প্রাণীটাকে খোঁজার জন্য আমরা নিজেদের সময় নেবো

    --- যে অনেকদূর চলে যায়

    রেলের কামরায় বসে লেখা, ৭ অক্টোবর, ১৮৭০


    পাপ

    যখন কামান-গোলার রক্তবর্ণ লালা

    অসীম নীলাকাশে সারা দিন শিস বাজায় :

    যখন সেনাবাহিনী, লাল কিংবা সবুজ, ঝাঁপায়,

    রাজার ওপরে যে টিটকিরি মারে, দলবেঁধে, পাত্রের ভেতরে :

    যতক্ষণ ভয়ানক মূর্খতা গিঁথে আর পিষে মারে,

    আর হাজার মানুষের ধোঁয়াধার স্তুপ তৈরি করে :

    -- বেচারা মৃতেরা ! গ্রীষ্মে, ছত্রভঙ্গের মাঝে,

    তোমার আনন্দে, পবিত্র প্রকৃতি, যে ওদের সৃষ্টি করেছে !...

    -- একজন ঈশ্বর আছেন, যিনি বেদির ঢাকা দেখে হাসেন

    নকশাকাটা, ধুপধুনো, আর সোনার সুন্দর পানপাত্র :

    যিনি ঘুমপাড়ানি গানের আশায় প্রার্থনা শুনে ঝিমোন,

    আর জাগেন যখন মায়েরা, দুঃখদুর্দশায় জড়ো হয়ে,

    তাদের পুরোনো কালো কাপড়ে মাথা ঢাকা দিয়ে ফোঁপান, দীর্ঘশ্বাস ফ্যালেন

    আর রুমালে বাঁধা পয়সা তাঁর উদ্দেশ্যে মিটিয়ে দ্যান।


    আমার বোহেমিয়া : একটি কল্পনা

    আমি পালিয়ে গিয়েছিলুম, শতচ্ছিন্ন পকেটে দুই মুঠো রেখে :

    এমনকি আমার ঝোলাকোটও হয়ে উঠেছিল আদর্শ :

    কবিতার দেবী, আমি আকাশের তলায় ! আমি তোমার :

    ওহ ! কতো অলৌকিক প্রেমের স্বপ্ন আমি দেখেছিলুম !

    আমার একটাই প্যান্ট আর তাতে বড়ো এক ছ্যাঁদা।

    -- স্বপ্নদর্শী টম থামব, সেখানের পথে বীজ পুঁতছিল

    ছন্দের। আমার সরাইখানা পেল্লাই ভাল্লুকের স্মারক।

    -- আকাশে আমার নক্ষত্রেরা দোল খাচ্ছিল এদিক-ওদিক।

    আমি ওদের শুনতে পাচ্ছিলুম, পথ জবরদখল করে বসেছিল,

    সেপ্টেম্বরের গোধূলীবেলায়, সেখানে আমি শিশিরের ছোঁয়া পেলুম

    আমার কপালে ফোঁটা পড়ল, কড়া কাঁচা মদের মতন।

    সেখানে, অদ্ভুত অন্ধকারে ছন্দ তৈরি করে,

    আমি অবচিত হলুম, সুরবাহারের তারের মতন, আমার ছেঁড়া জুতোর

    স্হিতিস্হাপক ফিতে, একটা পা হৃদয়ে বসানো।

     

    সবুজ সরাইখানায়

    আটদিন যাবত, আমি জুতো ছিঁড়ে ফেললুম

    রাস্তার পাথরগুলোয়। পৌঁছোলুম শার্লেরয় শহরে।

    -- সবুজ সরাইখানায় : রুটির অর্ডার দিলুম

    মাখনমাখা, কিছু-ঠাণ্ডা শুয়োর মাংসের সঙ্গে।

    খুসিতে, টেবিলের তলায় ছড়িয়ে দিলুম পা দুটো,

    সবুজ মেয়েটা : মুছে যাওয়া প্রিন্ট দেখে মনে হলো

    দেয়ালে। -- আর বেশ মনোরম,

    যখন বড়ো-বড়ো মাই আর জীবন্ত চোখের মেয়েটা,

    -- ওই যে, একটা চুমুতে ও ভয় পাবে না !--

    হাসিমুখে, আমাকে এনে দিলো রুটির স্লাইস আর মাখন,

    রঙিন থালায় কিছু-ঠাণ্ডা শুয়োরের মাংস নিয়ে,

    শুয়োরের মাংস, শাদা আর গোলাপী, রসুনকোয়ার সুগন্ধ মাখা,

    আর আমি বড়ো একটা বিয়ার-জাগ কানায় কানায় ভরলুম, তার ফেনা

    বিকেলের রোদের আলোয় সোনা হয়ে উঠলো।


    সেয়ানা মেয়েটি

    বাদামি খাবার ঘরে, বাতাসে সুগন্ধ

    মোম আর ফলের সুবাসে ভরপুর, আরামে

    আমি একটা থালা নিয়ে কে জানে কোন বেলজিয়

    খাবার, আর আমার বিশাল চেয়ারে বিস্ময়ে বসলুম।

    খেতে খেতে ঘড়ির আওয়াজ শুনতে লাগলুম -- নিস্তব্ধ, আনন্দিত।

    এক ঝাপটায় খুলে গেলো রান্নাঘরের দরোজা,

    -- আর সেবিকা মেয়েটি এলো, কে জানে কেন,

    শালে অর্ধেক ঢাকা, চুল চাতুরিতে বাঁধা।

    আর নিজের কড়ে আঙুল কাঁপিয়ে ঠেকালো

    নিজের গালে, গোলাপি আর শাদা মখমলে পিচফল,

    আর খুকির মতন ঠোঁট আলতো ফাঁক করে,

    আমাকে স্বাচ্ছন্দ্য দেবার উদ্দেশে থালাগুলো সাজালো :

    -- তারপর, এমনিই -- একটা চুমু পাবার জন্য, আমি নিশ্চিত --

    ফিসফিস করে বলল : ‘ছুঁয়ে দ্যাখো : ঠাণ্ডা লেগে গেছে, আমার গালে…’

    শার্লেরয়, অক্টোবর, ১৮৭০

    ----------------------------------------------------------------------------------------------------

    উপত্যকায় ঘুমন্ত

    সবুজ এক গহ্বরে যেখানে নদী গান গায়

    পাগলের মতো ধরছে ঘাসে ফেলা শাদা টুকরো-টাকরা।

    যেখানে গর্বিত পাহাড়ে সূর্যের আলো চক্র তৈরি করে :

    এটা একটা ছোটো উপত্যকা, কাচের গেলাসে আলোর মতো ফেনায়।

    একজন রংরুট, মুখ-খোলা, মাথায় কিছু পরে নেই

    আর উন্মুক্ত ঘাড় স্নান করছে শীতল নীল আলোয়,

    ঘুমোচ্ছে : হাত-পা ছড়িয়ে, আকাশের তলায়, ঘাসের ওপরে,

    ঝিরঝিরে বৃষ্টি ওর সবুজ বিছানাকে ফ্যাকাশে করে তুলেছে।

    হলুদ পতাকায় ওর পা, ও ঘুমোচ্ছে। হাসছে

    যেমনভাবে কোনো অসুস্হ শিশু হাসে, ঝিমোচ্ছে।

    প্রকৃতি, ওকে উষ্ণতা দিয়ে নাড়াও : ও শীতল হয়ে আছে।

    সুগন্ধ ওর নাককে আর কাঁপিয়ে তুলছে না :

    ও ঘুমোচ্ছে রোদে, বুকে এক হাত রেখে,

    নিথর। ওর দেহের ডান দিকে রয়েছে দুটো রক্তাক্ত ফোটো।

     

    সাত বছরের কবি

    আর মা, কাজের বই বন্ধ করে

    চলে গেলেন, গর্বিত, তৃপ্ত, চেয়ে দেখলেন না,

    নীল চোখে, ঘন ভ্রুর তলায়,

    তাঁর ছেলের আত্মা আক্রান্ত হয়েছে বিতৃষ্ণায়।

    সারা দিন ছেলেটা আনুগত্যের ঘাম ঝরিয়েছে : খুবই

    বুদ্ধিমান : কিন্তু বদভ্যাস, বিশেষ কিছু প্রলক্ষণ

    মনে হয় তিক্ত খলতা কাজ করে চলেছে !

    স্যাঁতসেতে কাগজ লাগানো দালানের ছায়ায়,

    যেতে যেতে ছেলেটা জিভ বের করলো, দুই মুঠো

    কুঁচকিতে, বোজা চোখের পাতার তলায় দেখার চশমা।

    দরোজা সন্ধ্যার দিকে মুখ করে খোলা : আলোয়

    তুমি ওকে দেখতে পাবে, ওপর দিকে, আলসেতে গোঙাচ্ছে

    আলোর শূন্যতায় ছাদ থেকে ঝুলে। গ্রীষ্মকালে,

    বিশেষকরে, পরাজিত, হতজ্ঞান, একগুঁয়ে,

    ছেলেটা নিজেকে পায়খানার শীতলতায় বন্ধ করে নেয় :

    সেখানে ও শান্তিতে চিন্তা করতে পারে, নাকের ফুটোকে বলি দিয়ে।

    যখন ছোট্টো বাগান থেকে দিনের গন্ধ বেরিয়ে যায়

    আলোয় ভরা, বাড়ির পেছনে, শীতকালে,

    পাঁচিলের তলার দিকে পড়ে, মাটি চাপা

    নিজের অবাক চোখ দুটো কচলে, দৃষ্টিপ্রতিভার জন্য,

    ছেলেটা শোনে ছড়িয়ে-পড়া লতাগাছের হিল্লোল।

    হায় ! ওর সঙ্গী বলতে বাচ্চার দল যাদের

    মাথায় ঢাকা নেই আর বেঁটে, চোখ দুটো ভেতরে ঢুকে গেছে,

    কাদায় হলুদ আর কালো হয়ে যাওয়া রোগাটে আঙুল লুকোয়

    গু-পেচ্ছাপ মাখা পুরোনো তেলচিটে কাপড়ের তলায়,

    যারা সরল মনের মিষ্টতা নিয়ে কথা বলে !

    আর ছেলেটির মা যদি আতঙ্কিত হন, ছেলেকে অবাক করে

    তার জঘন্য সমবেদনায় : ছেলেটির গভীর

    কোমলতা তাঁর বিস্ময়বিমূঢ়তাকে পরাস্ত করে।

    সবই ঠিক আছে। মা নীল দৃষ্টিতে তাকাবেন, -- অসত্য !

    সাত বছর বয়সে ছেলেটি জীবনের উপন্যাস তৈরি করছিল

    বিশাল মরুভূমিতে, যেখানে ধর্ষিত স্বাধীনতা উদ্ভাসিত হয়,

    অরণ্যানী, প্রচুর সূর্যালোক, নদীদের তীর, নিষ্পাদপ প্রান্তর ! -- ছেলেটি

    সাপ্তাহিক পত্রিকা উলটাতো যার পাতায় দেখতো, লজ্জানত,

    ইতালীয় তরুণীদের হাসিমুখ, আর স্পেনের নারীদের।

    যখন পাশের বাড়ির কর্মীর মেয়েটা এলো,

    আট বছর বয়সের -- ভারতীয় নকশার পোশাক, বাদামি-চোখ,

    এক ক্ষুদে মূর্খ, আর পেছন থেকে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল,

    বিনুনি নাচিয়ে মেয়েটি, এক কোনে,

    আর ও মেয়েটির নিচে, ও মেয়েটির পাছা কামড়ে দিলো,

    যেহেতু মেয়েটা কখনও জাঙিয়া পরতো না :

    -- আর, মেয়েটির ঘুষি আর লাথি খেয়ে থেঁতো,

    নিজের ঘরে নিয়ে গেলো মেয়েটির পোঁদের স্বাদ।

    ডিসেম্বরের বিবর্ণ রবিবারগুলোকে ও ভয় পেতো,

    যখন, চুল পেছন দিকে আঁচড়ানো, মেহগনি টেবিলে,

    ছেলেটি বাঁধাকপি-সবুজ মার্জিনের বাইবেল পড়তো :

    রাতের বেলায় একান্ত জায়গায় স্বপ্নেরা ওকে নির্যাতন করতো।

    ছেলেটি ঈশ্বরকে ভালোবাসতো না : বরং সেই সমস্ত লোক যারা সন্ধ্যায়,

    ফিরতো, কালো, আলখাল্লায়, বাইরের শহরতলিতে

    যেখানে নগরঘোষক, তিনবার ঢোল বাজিয়ে,

    ফরমান শোনাতো আর ভিড়ের লোকেরা হাসাতো আর গুজগুজ করতো।

    -- ও স্বপ্ন দেখতো বৃক্ষহীন কামার্ত তৃণভূমির, যেখানে

    স্ফীত ভাস্বরতা, বিশুদ্ধ সুগন্ধ, সোনালি যৌবনারম্ভ

    শান্ত বাতাবরণকে স্পন্দিত করতো, আর তারপর উড়ে যেতো !

    আর সবার ওপরে ছেলেটি নিরানন্দ ব্যাপারের স্বাদ নিতে কেমন ভালোবাসতো,

    যখন, ওর ফাঁকা ঘরে ছিটকিনি বন্ধ করে,

    উঁচুতে, আর নীল, আর স্যাঁতসেতে ঝাঁঝের মোড়কে,

    ও ওর উপন্যাস পড়তো, যতো পারে সময় নষ্ট করতো,

    জলে ডোবা জঙ্গলে ভরা, আকাশ গৈরিকরঙে ভারি,

    নক্ষত্রে ভরা বনানীতে মেলে উঠছে মাংসের ফুল,

    মাথাঘোরা, মৃগিরোগ, পরাজয়, মমত্ববোধ !

    -- যখন রাস্তার আওয়াজ তলায় হইচই করছে

    মামুলি চাদরের টুকরোর ওপরে একলা শুয়ে,

    উদ্দাম পূর্বাভাসে ভাসিয়ে দিতো জাহাজের পাল !


    উকুনের অন্বেষকরা

    যখন বালকের ভ্রু, লাল রঙে নির্যাতিত,

    অর্ধেক-দেখা স্বপ্নের শাদা ভিড়কে মিনতি করে,

    দুটি চমৎকার বোন ওর বিছানার কাছে আসে

    সরু-আঙুল, নখগুলো বোধহয় রুপোর।

    বালকটিকে ওরা জানালার সামনে বসায়,

    একেবারে খোলা যেখানে নীল বাতাস জড়ানো ফুলদের স্নান করায়,

    আর শিশিরে ভেজা বালকটির চুলে,

    আঙুল দিয়ে বিলি কাটে, ভয়ার্ত, ইন্দ্রজালিক।

    বালকটি শুনতে পায় তাদের সাবধানে দম নেবার দীর্ঘশ্বাস

    যা বইতে থাকে গোলাপি উদ্ভিদের মধু,

    আর মাঝে মাঝে স্হগিত এক ফিসফিসানিতে,

    ঠোঁটে চলে আসা লালা কিংবা চুমুর আকাঙ্খায়।

    ও শুনতে পায় তাদের কালো চোখের পাতা সুগন্ধে স্পন্দিত

    নৈঃশব্দে। আর ওদের আঙুলগুলো, বৈদ্যুতিক আর মিষ্টি

    বালকটির ধূসর আলস্যে, ছোট্ট উকুনদের মৃত্যু

    ওদের রাজকীয় সেবার দরুণ পটপট করে।

    এখন জাড্যের মদ বালকটিতে জেগে ওঠে, দীর্ঘশ্বাস

    একজন বালকের বাদ্যযন্ত্র যা বিভ্রম এনে দিতে পারে :

    ধীর আদরে প্রোৎসাহিত, বালকটি তখন অনুভব করে

    কাঁদবার এক অবিরাম উথাল আর শেষতম অভিলাষ।

     

    স্বরবর্ণ

    A কালো, E শাদা, I লাল, U সবুজ, O নীল : স্বরবর্ণ

    কোনো দিন আমি তোমার জন্মাবার কান্না নিয়ে কথা বলবো,

    A, মাছিদের উজ্বল কালো মখমল জ্যাকেট

    যারা নিষ্ঠুর দুর্গন্ধের চারিধারে ভন ভন করে,

    ছায়ার গভীর খাত : E, কুয়াশার, তাঁবুগুলোর অকপটতা,

    গর্বিত হিমবাহের, শ্বেত রাজাদের বর্শা, সুগন্ধলতার শিহরণ :

    I, ময়ূরপঙ্খীবর্ণ, রক্তাক্ত লালা, নিঃসঙ্গের হাসি

    যার ঠোঁটে ক্রোধ কিংবা অনুশোচনায় মাতাল :

    U, তরঙ্গ, ভাইরিডিয়ান সমুদ্রের দিব্য কম্পন,

    চারণভূমির শান্তি, গবাদিপশুতে ভরা, হলরেখার শান্তি

    কিমিতির চওড়া পড়ুয়া ভ্রুজোড়া দিয়ে বিরচিত :

    O, চরম তূর্যনিনাদ, অদ্ভুত কর্কশ আওয়াজে ভরপুর,

    জগত আর দেবদূতে রেখিত নৈঃশব্দ :

    O, সমাপ্তি, মেয়েটির চোখের বেগুনি রশ্মি !


    দাঁড়কাক

    প্রভু, ক্ষেতগুলো যখন শীতল,

    যখন, শোচনীয় চালাঘরগুলোতে,

    অবতারের দীর্ঘ ভক্তিগীতি থেমে গেছে…

    পকৃতিতে, নিপাতিত, বুড়ো,

    খোলা আকাশ থেকে পড়ে

    সুন্দর দাঁড়কাকগুলোকে উড়ে যেতে দাও।

    তোমার কঠোর ডাকে অদ্ভুত সেনানি,

    শীতল বাতাস তোমার বাসাকে আক্রমণ করে !

    তুমি, হলদেটে নদীকিনারা ধরে,

    পুরোনো ক্রুসকাঠেভরা রাস্তার ওপর দিয়ে, নামো,

    পথের ধারের আর গলিগুলোর খানাখন্দে,

    নিজেদের ছত্রভঙ্গ করো, তারপর এক সঙ্গে জড়ো হও !

    হাজারে হাজারে, ফ্রান্সের মাঠগুলোর ওপরে,

    যেখানে গতবছরের মৃতেরা ঘুমোয়,

    পাক খায়, তারপর, হিমেল বাতাসে,

    প্রতিটি পর্যটক, এক নজরে

    মনে রাখে ! কর্তব্যের ডাকে সাড়া দাও,

    হে আমাদের কালো শোকাতুর সৌন্দর্য !

    কিন্তু, স্বর্গের সন্তরা, ওক গাছের মগডালে,

    ফিকে হয়ে আসা চমৎকার দিনের হারানো মাস্তুল,

    মে মাসের ক্ষুদে গায়কপাখিদের ছেড়ে যায়

    যারা শবদেহে বন্দি তাদের জন্য,

    যার গভীরতা থেকে কেউ পালাতে পারে না,

    যারা হারিয়ে দেয়, ভবিষ্যৎহীন, দেখে নাও।

     

    স্মৃতি

    স্বচ্ছ জল : শিশুর নোনা অশ্রুর মতন মর্মপীড়ক,

    নারীদেহের শ্বেতরঙ আক্রমণ করছে সূর্যকে :

    রেশম, দলবেঁধে আর পবিত্র নলিন, ফরাসি নিশান

    দেয়ালের পেছনে একটি তরুণী ভয়হীন আত্মরক্ষা করলো :

    দেবদূতদের নাচ : -- না..সোনার স্রোত মসৃণ এগিয়ে দিলো

    তার অন্ধকার বাহু, ক্লান্ত, সবার ওপরে ঠাণ্ডা, আর সবুজ।

    মেয়েটি, বিষণ্ণ, স্বর্গীয় নীল তার চাঁদোয়া,

    তলব করলো, পরদার মতন, গম্বুজ আর পাহাযের ছায়াকে।

    আহ ভিজে মাটি কেমন ধরে রাখে অনাবিদ বুদবুদগুলো !

    সাজানো বিছানায় ছেয়ে থাকে ফিকে গভীর সোনার জল :

    ছোট্টো খুকিদের সবুজ আর ম্লান পোশাকগুলো

    আসলে উইলো-গাছ যেখান থেকে উঠে গেল নিয়ন্ত্রণহীন পাখিরা।

    সোনার চেয়ে বিশুদ্ধ, এক হলুদ চোখের পাতা আর উষ্ণ,

    জলাজঙ্গলের গাঁদাফুল -- তোমার বিবাহিত বিশ্বাস, হে নববধূ ! --

    কাঁটায় কাঁটায় দুপুরে, তার নিষ্প্রভ আয়না থেকে, ঈর্ষান্বিত

    প্রিয় গোলাপরঙা গগনমণ্ডল : আকাশে ধূসর তাপ।

    কাছের মাঠে ঋজু দাঁড়িয়ে আছেন শ্রীমতি,

    যেখানে শ্রমের সূত্রে তুহিনপাত হয়েছে : ওনার হাতে

    ছোটো ছাতা : গবাদির জন্য চারা কাটছেন : বেশ গর্বিত :

    ফুলেল সবুজে বসে বাচ্চারা বই পড়ছে :

    একটা মোটা মরোক্কো বই ! হায়, সেই পুরুষ, সে, হাজার

    শ্বেত দেবদূতের মতন বিদায় নিচ্ছে রাস্তায়,

    পাহাড়ের পেছনে অদৃশ্য হয়ে যায় ! শ্রিমতি, বেশ শীতল,

    আর কালো, দৌড়োয় ! পুরুষটার উধাও অনুসরণ করে !

    বিশুদ্ধ ঘাসের তরুণ বাহুর আলিঙ্গনের জন্য মন খারাপ !

    এপ্রিল চাঁদনির সোনা পবিত্র বিছানার হৃদয়ে !

    নদীতীরের নৌকো-চত্বরের আনন্দ, ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেয়া,

    আগস্ট মাসের সন্ধ্যায় যা পচনকে অঙ্কুরিত করছে !

    মেয়েটি এখন কেমন করে ফোঁপাচ্ছে পাঁচিলের পেছনে !

    পপলারগাছের নিঃশ্বাস ওপরের একমাত্র হাওয়া।

    তারপর অপ্রতিবিম্বিত পৃষ্ঠতল, উৎসহীন, ধূসর :

    একজন বুড়ো, মাল তুলছে, পরিশ্রম করছে তার স্হির যাত্রিবাহী নৌকোয়।

    বিষাদ-জলের চোখ এই খেলনা, আমি পৌঁছোতে পারি না,

    হে স্হির নৌকো ! হে বাহু অনেক ছোটো ! একটি নয়

    কিংবা অন্য ফুলটি : হলুদরঙা নয় যেটা আমায় অনুরোধ করছে :

    নীলও নয়, জের মধ্যে যে বন্ধু, সে ছাইরঙা।

    আহ ! ডানার উইলো পরাগ বিরক্ত করছে !

    ঘাটের গোলাপগুলো কবেই খেয়ে ফেলা হয়েছে !

    আমার নৌকো, শক্ত করে বাঁধা। আর তার গভীর নোঙোর পোঁতা আছে

    জলের এই সীমাহীন চোখে -- কোন কাদায় ?


    অশ্রুজল

    গ্রামের মেয়েদের, গরুমোষের, পাখিদের থেকে অনেক দূরে

    আমি মদ খেলুম, কাশফুলের কাছে হাঁটু গেড়ে

    কচি হ্যাজেল-বাদামের গাছে ঘেরা,

    দুপুরের সবুজ উষ্ণ কুহেলিকায়।

    কী পান করতে পারতুম আমি তরুণ ওয়াজ নদী থেকে,

    কন্ঠস্বরহীন এলম-গাছ, ফুলহীন তৃণভূমি,

    বন্ধ আকাশ থেকে ? কিংবা আঙুরলতার বাগানে লাউয়ের খোলে চুমুক দিতুম ?

    সোনার কিছু মদ পান করলে অল্প ঘাম দেখা দেয়।

    তেমন করে আমি গরিব সরাইখানা আঁকতে পারতুম।

    তারপর সন্ধ্যা পর্যন্ত আকাশকে বদলে দিলো ঝড়।

    অন্ধকার ভূদৃশ্য, খুঁটি, হৃদ, গাছের সারি

    রাতের নীলাভের তলায়, রেলস্টেশনগুলো।

    বনানীর জল হারিয়ে গিয়েছিল কুমারী বালিতে।

    বাতাস, স্বর্গ থেকে নেমে, পুকুরগুলোতে তুষার জমিয়ে দিয়েছিল…

    কিন্তু, সোনা বা ঝিনুকের ধীবরদের মতন, এ-কথা ভাবা যে

    আমি পান করার জন্য কোনো কষ্টস্বীকার করিনি !

    ১৮৭২-এর শেষ দিকের কবিতা


    সর্বোচ্চ মিনারের গান

    অলস যৌবন

    সমস্তকিছু দিয়ে দাবিয়ে রাখা

    সুবেদিতাকে কাজে লাগিয়ে

    আমি আমার সময় নষ্ট করেছি।

    আহ ! সেই মুহূর্তকে আসতে দাও

    যখন হৃদয়েরা মিশে গিয়ে ভালোবাসে।

    আমি নিজেকে বলেলুম : অপেক্ষা করো

    আর কেউ যেন দেখতে না পায় :

    আসল আহ্লাদের

    প্রতিশ্রুতি ছাড়াই।

    এই লুকোনোকে

    বিলম্বিত কোরো না।

    এতোকাল আমি সহিষ্ণু ছিলুম

    আমি এমনকি ভুলে গেছি

    আতঙ্ক আর দুঃখদুর্দশা

    আবার এক অসুস্হ তৃষ্ণা

    স্বর্গের দিকে উঠে গেছে

    কালো করে তিলেছে আমার শিরাগুলো।

    তাই চারণভূমি

    অবহেলার ফলে স্বাধীন,

    ভরে উঠেছে ফুলে, ঝোপঝাড় আর সুগন্ধে

    বাড়বাড়ন্ত

    শ’খানেক নোংরা মাছির

    কাছাকাছি গুঞ্জনে।

    আহ ! হাজার বৈধব্য

    এক দরিদ্র আত্মার

    তা কেবল বয়ে নিয়ে যায়

    আমাদের সামনে দিয়ে মা মেরিকে !

    তাহলে কি কেউ প্রার্থনা করবে

    কুমারী মেরিকে আজকের দিনে ?

    অলস যৌবন

    সবকিছু দিয়ে দাবিয়ে রাখা

    সুবেদিতাকে কাজে লাগিয়ে

    আমি আমার সময় নষ্ট করেছি।

    আহ ! সেই মুহূর্তকে আসতে দাও

    যখন হৃদয়েরা মিশে গিয়ে ভালোবাসে।

    ‘ধৈর্য উৎসব’ থেকে

     

    অনন্তকাল

    দেখতে পাচ্ছি খুঁজে পাওয়া গেছে।

    কী ? -- অনন্তকাল।

    তা হলো সূর্ষ, স্বাধীন

    সমুদ্রের সঙ্গে বয়ে যাবার জন্য।

    আত্মার প্রতি নজর রাখা হয়েছে

    ফিসফিসানিদের আত্মস্বীকার করতে দাও

    ফাঁকা রাতের

    দিনের বাড়াবাড়ির।

    নশ্বর স্বস্তি থেকে

    সাধারণ তাগিদ থেকে

    এখানে তুমি বিপথগামী হও

    যেমন চাও তামনভাবে ওড়ার জন্য।

    যেহেতু শুধু তোমার কাছ থেকেই

    মলমলের স্ফূলিঙ্গ

    নিঃশ্বাস ফ্যালে

    কখনও ‘সমাপ্তি’ ঘোষণা হয় না।

    আশা করার কিছুই নেই,

    এখানে সানুনয় প্রার্থনা নেই।

    বিজ্ঞান আর ধৈর্য্য

    অত্যাচার অত্যন্ত বাস্তব।

    দেখতে পাচ্ছি খুঁজে পাওয়া গেছে।

    কী ? -- অনন্তকাল।

    তা হলো সূর্য, স্বাধীন

    সমুদ্রের সঙ্গে বয়ে যাবার জন্য।

    ‘ধৈর্য উৎসব’ থেকে


    হে ঋতুসকল, হে দুর্গ

    হে ঋতুসকল, হে দুর্গ,

    কোথায় আছে খুঁতহীন আত্মা ?

    হে ঋতুসকল, হে দুর্গ,

    আমি যে ইন্দ্রজালের পেছনে ছুটেছি,

    আনন্দের, যাকে কেউ এড়াতে পারে না।

    ও তা বেঁচে থাকুক, প্রতিবার

    ফরাসি মোরগ ছন্দ বাঁধে।

    আমি আর কিছু চাই না,

    ব্যাপারটা আমার পুরো জীবনকে কাবু করেছে।

    সেই চমৎকারিত্ব ! নিয়ে নিয়েছে হৃদয় আর আত্মাকে

    ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে আমার প্রয়াস।

    আমি যা বলি তাতে অর্থ কোথায় ?

    ফলে পুরো ব্যাপারটা লোপাট হয়ে যায় !

    হে ঋতসকল, হে দুর্গ !

    আহ ! আমি আর কিছু চাই না,

    ব্যাপারটা আমার পুরো জীবনকে কাবু করেছে।

    সেই চমৎকারিত্ব নিয়ে নিয়েছে হৃদয় আর আত্মাকে

    ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে আমার প্রয়াস।

    হে ঋতুসকল, হে দুর্গ !

    তার উড়ালের সময়, হায় !

    তা হবে আমার যাবার সময়।

    হে ঋতুসকল, হে দুর্গ !

    ‘ধৈর্য উৎসব’ থেকে


  • অজিত রায় | ২৭ আগস্ট ২০২১ ১১:০৯734909
  •  

    “নামগন্ধ” উপন্যাস বিশ্লেষণ করেছেন অজিত রায়
    মলয় রায়চোধুরীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় পঁয়ত্রিশ বছর আগে। সামান্য অভূয়িষ্ট পড়াশোনা থেকে ক্ষুধিত প্রজন্মের কবি ও কবিতা নিয়ে একটা আচাভূয়া লেখা লিখেছিলাম ১৯৮২ সনে, এক মফস্বলী কাগজে, সেই তখন। এবং, সেই শুরু। সেদিনের সেই সব্রীড় আত্মপ্রতর্ক থেকে প্ররোচিত হই মলয়-সিসৃক্ষার কলিন অধ্যয়নে। ততদিনে, তার বিশ বছর আগেই হাংরি আন্দোলনের অন্যতম এই স্রষ্টার নখদন্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের শরীরে কিছু পিরেনিয়্যাল আঁচড় কেটে ধাবাড় মেরে গেছিল। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫-কেই বলা যায় হাংরি আন্দোলনের সবচেয়ে উত্তেজনাকর আর ঘনাবহুল অস্তিত্বকাল। যদিও জেব্রা উপদ্রুত ক্ষুধার্থ ফুঃ প্রতিদ্বন্দ্বী স্বকাল চিহ্ন উম্মার্গ ব্লুজ প্রভৃতি কাগজকে ঘিরে পাশাপাশি দেবী রায়, ফালগুনী রায়, প্রদীপ চৌধুরী, বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবিমল বসাক, সুভাষ ঘোষ, শম্ভু রক্ষিত, সুবো আচার্য, ত্রিদিব মিত্র প্রমুখেরা গড়ে তুলেছিলেন হাংরি সিসৃক্ষার আরেকটি চক্র। এবং আন্দোলনের উত্তেজনা থম মেরে গেলেও, তারপরেও সেই সব সেরকশ আর গেঁতো মৌমাছি, প্রাগুক্ত পত্রিকাগুলিকে আঁকড়ে ধরে কিছু কাল শর্করীবাজি চালিয়ে গেছেন বটে, কিন্তু আসর আর জমেনি।
    এহেন বিশাল ব্যবধানে, এই প্রেক্ষিতে কুড়ি-বাইশ বছর আগে বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত সংস্কারের বিরুদ্ধে, তার পচা ভিত্তিকে উৎখাত করার একান্ত অভীপ্সায় দুর্বিনীত আসব যিনি করেছিলেন, সেই মলয় রায়চোধুরী বিশ বছর বাদে লেখালেখির জগতে প্রত্যাবর্তন করতে চাইলে তাঁর কাছে প্রধান সমস্যাটা কী হতে পারে? এমনিতে পঞ্চাশের কবিরা যাঁরা হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন, আন্দোলন ফুরিয়ে যাবার পর নিজেদের চরিত্র মোতাবিক লিখে আসছিলেন। শক্তির এতোলবেতোল জীবন শুরু হয়ে যায় আর তিনি রূপচাঁদ পক্ষী হয়ে যান, সন্দীপন একটা নির্দিষ্ট গদ্যে রেওয়াজ করতে করতে নিজস্ব শৈলীতে থিতু হন। বিদেশ থেকে ফিরে উৎপল বসুও কাব্যচর্চার নবাঞ্চল অব্যাহত রাখেন। ষাটের কবি হিশেবে অশোক চট্টোপাধ্যায়, দেবী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, অরনি বসু, শম্ভু রক্ষিত, প্রদীপ চোধুরী প্রমুখের লেখালেখি থেমে থাকেনি এবং দেখা গেছে বয়স, অভিজ্ঞতা ও সিরিয়াসনেসের দরুন এঁদের কেউ কেউ খুঁজে পেয়েছেন নিজস্ব ফর্ম, চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে একজন আলাদা হয়ে উঠেছেন অন্যজনের থেকে।
    মলয়ের কেসটা এঁদের চেয়ে আলাদা। এবং আপাত জটিল। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান হিশেবে বিজ্ঞাপিত কলকাতার ধুলো মলয়ের পায়ের চেটোয় সেভাবে লাগেনি। কলকাতার একটা পুশিদা ক্লোমযন্ত্র আছে যা বামুন আর চাঁড়ালকে শুঁকে চিনতে পারে। কলকাতা মলয়কে নিজের দাঁত দেখিয়ে দিয়েছিল। কলকাতা তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, তুমি আমাদের কেউ নও। তুমি একটা কৃষ্টিদোগলা। তোমার কলমে নিম্নবিত্ত রক্ত। তোমার টেক্সট আলাদা। আলাদা থিসরাস। তফাৎ হটো তুমি। এবং, কলকাতা মলয়ের সঙ্গে সমস্ত শরোকার ছিন্ন করে। কোনও সম্পাদক তাঁর কাছে আর লেখা চান না, বন্ধুবান্ধবদের চিঠি আসা বন্ধ হয়ে যায় এবং ক্রমশ সবাই স্লিক করে যায়। লেখা ছাপানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই বীভৎস যন্ত্রণা, অপমান আর তিরস্কার একমাত্র কলকাতাই দিতে পারে। এই যন্ত্রণা, এই অপমানই লেখালেখি থেকে নির্বাসন ভোগের আরেক অব্যক্ত যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দিয়েছিল মলয়কে। ২৭ জুলাই ১৯৬৭, মানে, হাইকোর্টের রায়ে বেকসুর খালাস পাওয়ার পরদিন থেকে মলয় কবিতা লেখা ছেড়ে দেন। সবায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়, আর ক্রমশ নিজেকে অসীম একাকীত্বে ঘিরে ফেলেন। প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের দুর্গদ্বার থেকে অপরিগৃহীত হয়ে লেখার জগৎ থেকে একান্তে অপসৃত হয়ে স্বরচিত নির্জনতার এক সুচারু এরিনায় নিজেকে বন্দী রেখে, রাইটার্স ব্লকের অখল জ্বালা ভোগ করা ---- হাংরিদের মধ্যে এটা একমাত্র মলয়ের ক্ষেত্রেই ঘটেছে।
    আত্মবিবাসনের সেই বিবিক্ত দিনে, ১৯৬৮-র ডিসেম্বরে শলিলা মুখার্জির সঙ্গে উদ্বাহ সাময়িক স্বস্তি ফিরিয়ে আনে তাঁর জীবনে। জীবন নামক ভেলকিবাজ বারে-বারে মানুষকে ষাঁড়ের গোবর করে। চটকায়। ঘুঁটে বানিয়ে শুকোতে দেয়। আবার, পেড়েও আনে। জীবন লিখেওছে এমন এক ফিচেল কেলিকিন, যে কবিতা বোঝে না। মন বোঝে না। আদর্শ বোঝে না। আলোপিছল প্রতিষ্ঠানের মসৃণ করিডর দিয়ে হাঁটিয়ে সটান তুলে দেয় আরাম, স্বাচ্ছন্দ্য আর কর্তৃত্বের সুনিপুণ এলিভেটারে। অর্থাৎ 'একদা আপোষহীন' পরে 'অংশভাক' এই ঐতিহাসিক গল্পের পুনরাবৃত্তি মলয়ের জীবনে ঘটাল সেই নর্মদ। এই ট্রাজেডির জন্যে আমরা ইতিহাস আর সময়কে বাদ দিয়ে বরাবর ব্যক্তিকে দায়ী করি, তাকে ব্যক্তির ট্রাজেডি হিশেবে চিহ্নিত করে সৌমনস্য উপভোগ করি, সে আমাদের প্রবলেম।
    কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এক অনৈতিহাসিক তত্ত্ব। এ-খবর সত্যি যে বিবাহোত্তর প্রবাসে কিছুদিনের জন্যে এলিট সংসারী হয়ে উঠেছিলেন মলয়। সৃজন, সাহিত্য, বইপড়া, বাংলা ভাষা ইত্যাদি থেকে আরও দূরে সরে

    থাকবার মতো সরঞ্জাম তখন মজুত। মৎসরী বন্ধুরা হয়তো এই জেনে

    কিঞ্চিৎ আরামও উপভোগ করেছিলেন যে গার্হস্থ্য দায়িত্ব নির্বাহ করা ছাড়া মলয় 'আর কিছুই করছেন না'। ..... কিন্তু তাঁদের গুড়ে বালি নিক্ষেপ করে আশির দশকের গোড়ার দিকে বারদিগর লেখালেখির জগতে তুমুল বেগে ফিরে এলেন মলয় রায়চোধুরী।
    প্রত্যাবর্তিত মলয়ের মধ্যে অনেক মাল, অনেক ময়ুজ। মানে, দারুণ-একটা রায়বেঁশে, হৈ হল্লা, তারপর নর্তকের আর কোমর-তোমার রইল না, মলয়ের কেসটা সের'ম নয়। তিনি যে হাত-পা ছুঁড়েছিলেন, বেশ-কিছু জ্যামিতিক পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন ----- বিশ বছর বাদেও দেখছি, সেই কোরিওগ্রাফিটা থেকে গেছে। দেখেশুনে তো মনেই হচ্ছিল গুঁতো দেবার তালেই ছিলেন যেন। আর, গুঁতোবার আগে যেমন মাথা নিচু করে কয়েক পা পিছিয়ে যায় অগ্নিবাহন, তেমনি করে হয়তো-বা আবার করে অঙ্গহার দেখাবেন বলে খানিক জিরিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি। কিম্বা, লেখা ছাপানো বন্ধ রেখে পরখ করে নিচ্ছিলেন তিনি টিঁকে আছেন, না উবে গেছেন।
    ১৯৮০-৮২ নাগাদ, বিশ বছর বাদে ফিরে-আসা সেই হৈচৈ-হীন নিরুত্তেজ উদ্দান্ত-যমিত শান্ত অব্যস্ত নিরুদ্বেগ ঠাণ্ডামাথা মলয় রায়চোধুরীর মধ্যে সে দিনের সেই উত্তপ্ত অস্থির আন্দোলিত প্রবহস্রোতের মাঝে অবগাহনরত মলয় রায়চোধুরীকে খুঁজতে যাওয়া গোঁয়ার্তুমি মাত্র। তবে, বুকের মধ্যে ঢেউয়ের সেই দাপানিটা আর নেই বটে, কিন্তু পানখ সাপের ফণাটা এখনও উদ্যত। সেই কর্কশ আর গতলজ্জ ভাষা, নিলাজ শব্দানুক্ৰমণের ফলাটা এখনো তেমনি পিশুন। আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন করে বেড়ে-ওঠা অদম্য উৎসাহ, জেদ আর সামর্থ্য। যেন পুরনো দখলতি হাসিল করতেই তাঁর ফিরে আসা।
    মলয়ের প্রাইম কনসার্ন হলো কবিতা। কবিতার মধ্যেই যা-কিছু দেখা ও দেখানো। ছয়ের দশকের মলয়ের চেয়ে অনেক বেশি লিখেছেন আটের দশকের প্রত্যাবর্তিত মলয়। পূর্বাপরের সঙ্গে স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় একটা সীমারেখা তিনি গড়ে ফেলেছেন অনেক দিন আগেই। কী কবিতায় কী গদ্যে পুনরুত্থিত মলয় খুব সচেতনভাবে নিজের একটা জায়গা বানিয়ে নিয়েছেন, এটা অবম বা ঊন কথা নয়। বাংলা সাহিত্যে প্রথা ভেঙে যেখানে কিছুই হয় না, মলয় রায়চোধুরী সেখানে একটা তাক-লাগানো মিশাল। পুনরুত্থিত মলয় গদ্যকার হিশেবেও অভিনিবেশযোগ্য। একটা খুবই সাদামাটা, ঝরঝরে, গতিশীল আর মেদবর্জিত গদ্যের কারিগর তিনি। আন্দোলনের সময়ে লেখা বিভিন্ন ইস্তেহার, প্রবন্ধ, পরবর্তী বা আটের দশক থেকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার জন্য লেখা হাংরি বিষয়ক আলোচনা, স্মৃতিচারনা, সাহিত্য বিষয়ক নিবন্ধ, তাঁর 'হাংরি কিংবদন্তী' (১৯৯৪) এবং হওয়া ৪৯ প্রকাশনীর 'পোস্টমর্ডানিজম' (১৯৯৫) গ্রন্থদ্বয়ে বাহন হয়েছে এই আকর্ষণীয় ও মূল্যবান গদ্য। অন্যদিকে আর একটি গদ্য আছে তাঁর, যা এখনো নিরীক্ষার পর্যায়ে, যাতে অনিবার নতুন আর আপাত-জটিল শব্দের তোড়, তাকে আশ্রয় করে মলয় তাঁর এখনকার মৌলিক গল্প-উপন্যাসগুলি লিখছেন। দারুন মডার্ন প্রোজ। দারুণ-দারুণ সব কৌণিময়তা, যে-মুহূর্তে ক্লিক করেন, মলয় আমাদের কাছে এ-সময়ের একজন মেজর গদ্যকার হিশেবে ফুটে ওঠেন। কিন্তু, এখানে তিনি শর্ট ডিস্টান্স রানার। বেশিক্ষণ নাগাড়ে ছুটতে পারেন না। এক-একটা প্যারাগ্রাফের দারুণ স্পিড, কিন্তু প্যারা ফুরোতেই যে দমও ফুরিয়ে আসে। মলয়ের বেশির ভাগ গল্প-উপন্যাস এই শ্রেণীর গদ্যে লেখা। যে, কারণে, শুধুমাত্র গদ্যের এই রেসের কারণেই তাঁর 'নামগন্ধ' বাদে অন্য কোনো উপন্যাস আমায় টানেনি। এটা আমার ব্যক্তিগত গদ্যকার হবার কুফলের দরুনও হতে পারে।
    কবিতার মতো গদ্যেও মলয় খুব শব্দ-সচেতন। কোনো কোনো কখনওএতে যেন অতিরিক্ত সচেতন। প্রায় প্রত্যেকটা শব্দেই অনেক বেশি করে কলেজা-রক্ত, কিন্তু নুনের পরিমাণ একটু বেশি। শব্দ-ব্যাপারে মলয়ের ঢালাইঘরে অনবরত হিট ট্রিটমেন্ট। দারুণ মেদবিহীন গতিশীল গদ্যের তিনি প্রাকৃত-ভাণ্ডার। কিন্তু যেইমাত্র সচেতন হয়ে ওঠেন যে তিনি গল্প বা উপন্যাস লিখছেন, সেইমাত্র একরাশ আগুন-হলকা তাঁর হাত দিয়ে চাঁদির চন্দোত্তরি করে ফেলেন। ফলত স্ক্র্যাপ আয়রন আর স্টেইনলেস হয় না। ক্র্যাক হয়ে যায়। তিনি ভালোভাবেই জানেন, ধরো তক্তা মারো পেরেক গোছের লেখক তিনি নন। তবু মারা তিনি থামাতে পারেন না। যার ফলে পেরেকের পর পেরেক ভোঁতা হয়ে-হয়ে বেঁকে বেঁকে যায়। এর ফলে।কী হয়, কোনও কোনও অনুচ্ছেদ খুব দারুণ লাগলেও খুব কনট্রাইভড, গদ্য বানাবার দাগগুলো চোখে পড়ে যায়। এটাকে মলয়-গদ্যের দুর্বলতা বলুন, বা বৈশিষ্ট্য।
    এই অবক্ষ্যমান গদ্যেই আমি মলয়ের 'দাফন শিল্প' পড়ি ১৯৮৪সালে, 'এবং' পত্রিকায়, যা পরে তাঁর প্রথম গল্পসংগ্ৰহ 'ভেন্নগল্প'-র অন্যতম ভূমিকা হিশেবে পুনর্মুদ্রিত। আবার সেই একই গদ্যে, সামান্য আলগা-ভাবে লেখা তাঁর প্রথম নভেলা 'ঘোঘ' পড়ি ১৯৯২ সনে এবং সেই গদ্যের উত্তরণ দেখি তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস 'ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাসে' (১৯৯১-৯৩ সালে লেখা, এবং ১৯৯৪-এ প্রকাশিত)। তাঁর পরবর্তী উপন্যাস 'জলাঞ্জলি'ও এই গদ্যে লেখা। এমনকি আমার-পড়া তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস 'নামগন্ধ'ও সেই একই গদ্যে লেখা। ভেন্নগল্পের এক ডজন ছোটগল্প আর এই তিনটি উপন্যাস পড়ে বুঝেছি, তাত্ত্বিক মলয় আর লেখক মলয়ের মধ্যে একটা দারুণ প্রত্যাসত্তি রয়েছে। কিছু সর্ব-অস্তিত্বময় বর্তিষ্ণু চরিত্রকে ঘিরে লেখকের নিজস্ব চাকরিজীবন থেকে হাসিল অভিজ্ঞতা, নানা অন্তর্দেশীয় চেতনা আর আচার-আচরণের সঙ্গে সমকালীন রাজনীতির জটিল প্রভাব, তত্ত্ব ও তথ্যের প্রাচুর্যের সঙ্গে বোধ ও বুদ্ধির বিচিত্র জটিলতার এক-একটি ছবি ফুটে উঠেছে এইসব গল্প-উপন্যাসে। কলকাতার পাতি কাগজগুলোতে বিশেষত 'ডুবজলে'র উচ্চকিত প্রশংসা পড়ে এটা ভাবা ঠিক হবে না যে বাঙালি পাঠকরা তাঁদের প্রোডরম্যান ফেজ কাটিয়ে উঠেছেন। আসলে আলোচক-পাঠকদের একটা গ্রূপ যে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তার মূলে বাংলা সাহিত্যের অনেক অচ্ছুৎ-অব্যবহৃত শব্দ আর ছবি একটা বিল্টি কেটে পাঠানো হয় সেই প্রথম। সতীনাথ ভাদুড়ী, প্রফুল্ল রায়, সুবিমল বসাককে মনে রেখেও বলা যায়, আবহমান বাংলা আখ্যান-সাহিত্যের ট্রাডিশনে যা আগে কখনো এভাবে খাপ খায়নি। মোটামুটি সবই এসেছে হিন্দি বলয় থেকে। খাস করে বিহারের দেশয়ালি আর সড়কছাপ জং-মরচে লাগা শব্দগুলোকে সামান্য ঝেড়েঝুড়ে তোলা হয়েছে এই ফিকশানে। ঐ ষাট-সত্তর দশক থেকেই বিহারি-ঝাড়খন্ডি বঙ্গকৃষ্টি দারুণ-দারুণ ঝাপটা মেরে বাংলা সাহিত্যের ঘাটে এসে লাগতে শুরু করেছিল। একটা সফল ঝাপটা ছিল ন'য়ের দশকের 'ডুবজলে'। বিহারের আর্থ-সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির এমন ভিতর-বার গুলিয়ে ফেলা ফিকশান আর কোথাওটি পাননি কলকাতার কূপব্যাঙ আলোচক-পাঠকরা। আর তাতেই তাঁরা দারুণ অমায়িক হোস্টেস হয়ে পড়েছিলেন 'ডুবজলে'র। কিন্তু, এটা, মলয়ও জানতেন, রানওয়ে মাত্র--- তিনি উড়ান দেখাবেন পরবর্তীতে। সেই উড়ান-ই হলো মলয়-ট্রিলজির শেষ পর্দাফাঁস উপন্যাস 'নামগন্ধ'।
    মলয় জনান্তিকে বলেছেন, এ-উপন্যাস পশ্চিমবঙ্গের কোনো সম্পাদক ছাপতে সাহস পাননি, যে কারণে ঢাকার লালমাটিয়া থেকে বেরিয়েছিল আগে, পরে হওয়া ৪৯ থেকে বেরোয়। গোড়াতেই ফাঁস হয়ে গেল নামগন্ধে কী মাল তিনি দিয়েছেন এবং যা অবধার্য হয়ে উঠেছে এসময়ে, মলয়ের পাঠকৃতি সেই আধুনিক ঝোঁকে স্বতঃউৎসারিত। স্বীয় আয় করা দৃঠি ও অভিজ্ঞতাকে ছিঁড়ে পাঠবস্তুর টুকরো পাত্রে স্বত্বহীনভাবে বিলিয়ে দিচ্ছেন বহুরৈখিক আয়ামে। তাঁর অন্যান্য রচনার মতো এ উপন্যাসও দামাল ঝাপটা মারে ঝাদানভ-প্লেখানভদের বাঙালি ভাবশিষ্যদের এতদিনকার নির্বিঘ্নে মেলে রাখা অরজ্ঞানডির ভুলভুলইয়াপনায়। নামগন্ধেও কাহিনী পরিণাহটি ন্যূন, বক্তব্যেই মূলত মাটাম ধার্য করেছেন মলয়। তিনি সঠিক কষে ফেলেছেন যে বর্তমান কালখণ্ডে ভারতবর্ষীয় হিন্দু-বাঙালির তথাকথিত সংস্কৃতি মূলত ক্ষমতাকেন্দ্রের ও তার চারপাশের সংস্কৃতি। মানে, ঐ কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী হাওড়া-হুগলি-চব্বিশ পরগণার সংস্কৃতি। সুতরাং গুনসুঁচ নিয়ে ধেয়েছেন ওই ক্ষমতাকেন্দ্রটিকে বেঁধবার জন্য।

    একদিন মলয়দা, জায়মান কিংবদন্তী মলয় রায়চৌধুরী বেমক্কা একটা প্রশ্ন হেনে বসলেন ---- "অজিত, একটা কথা জানবার ছিল। নারীর যৌনতা নিয়ে লেখার সময়ে তুমি কি তার প্রেমে পড়ো ? এমন হয়েছে কি, যে লিঙ্গ দাঁড়িয়ে গেছে?"
    প্রশ্নটা আমার কাছে মোটেই অস্বস্তিকর ছিল না। জবাবে লিখেছিলাম, মলয়দা, তুমি ভদ্দরলোকদের মতো 'লিঙ্গ' লিখেছো কেন? 'বাণ্ড' বললে কিচাইন হবার চান্স বলে আমি সরাসরি নিজের ভাষায় নামি। 'বাঁড়া' সহজবোধ্য, স্বয়ংসিদ্ধ ও সর্বত্রগামী শব্দ। আধুনিক বিশ্বকোষ প্রণেতা বাঁড়ার নামকরণ করেছেন 'আনন্দদণ্ড'। নামটা খাসা। তবে, অনেকে বলবেন 'মদনদণ্ড'। 'সাধনদণ্ড' বলেও সুখ। কিংবা 'কানাই বাঁশি'। কলকাতার রকফেলার আর হাফ-লিটারেট গবেষকরাও এই যন্তরটিকে নিয়ে কম মেহনত করেননি। 'কলা' 'ডাণ্ডা' 'রড' 'কেউটে' 'ঢোঁড়সাপ' 'পিস্তল' 'যন্তর' 'ল্যাওড়া' 'ল্যাও' 'লাঁড়' 'লন্ড' 'মেশিন গান' 'মটনরোল' 'ঘন্টা' 'ঢেন্ঢেন্পাদ' 'খোকা' 'খোকার বাপ' 'ধন' ' নঙ্কু' 'পাইপ' 'তবিল' 'পেনসিল' 'ফাউন্টেন পেন' 'মেন পয়েন্ট' ---- আরও কী কী সব নাম দিয়েছেন ওই প্রতাপী মহাপ্রাণীকে সদা উজ্জীবিত রাখতে! বিহার-ঝাড়খণ্ড-ইউপিতে 'ল্ওড়া' আর 'লন্ড' সুপার কোয়ালিটির স্ল্যাং, যা পূর্ব ভারতের সর্বত্র একই কিংবা খানিক বিকৃত উচ্চারণে ব্যবহার হয়ে থাকে। বাঙালি জবানে সেটা হয়েছে মিনমিনে 'ল্যাওড়া' 'ল্যাউড়া' 'ল্যাও' আর 'লাঁড়'। কিন্তু বাংলার নিখাদ 'বাঁড়া' বিহারে বোঝে না, পাত্তাও পায় না। ওপার বাঙলায়ও সর্বত্র বোঝে কি? ডাউট আছে। খোদ বর্ধমান আর বীরভূমেই বাঁড়াকে বলে 'বানা'। কুমিল্লায় ধনকে বলে 'দন'। কুমিল্লা, ঢাকা আর খুলনায় 'চ্যাট' শব্দটাও চলে। ময়মনসিংহে যেটা হয়েছে 'চ্যাম'। সিলেটেও 'চ্যাম'। সিলেটে আবার 'বটই'ও বলে। বাকরগঞ্জে 'চ্যাড' 'ভোচা'। বাকরগঞ্জের মোক্ষম স্ল্যাং হলো 'মদন কল'। 'ভোঁচান' আর 'ভুন' বলে রাজশাহীতে। এছাড়া রয়েছে 'ভুন্দু' 'ভুচা'। 'বিচা' বলে ঢাকা, কুমিল্লায়। কুমিল্লায় ফের 'শোল'ও বলে। বলে, 'নসকা'। 'সাঁও' বলে ফরিদপুরে, ময়মনসিংহে। 'প্যাল' আর 'বগা' চলে ময়মনসিংহ, রাজশাহী আর সিলেটে। চাঁটগেঁয়েরা বলে 'ফোডা'। যশোরের 'পাউন্ড' এসেছে খুবসম্ভব 'পিণ্ড' থেকে। 'বাচ্চা' বলে পাবনায়। 'পক্কি' চলে খুলনা, ফরিদপুর আর ময়মনসিংহে। 'পক্কু' শিশুদের শিশ্ন, এ-বঙ্গে যেটা 'নোঙ্কু' ব 'চেনকু' কিংবা ঝুটমুট 'পক'। ময়মনসিংহে বাঁড়ার অপর নাম 'থুরি'। আরেকটা প্রতিশব্দ 'শুনা' কুমিল্লায় চল আছে। চট্টগ্রাম আর নোয়াখালিতে বলে 'সনা'। আসলে, 'সোনা'। কেউ কেউ বলে সোনা, সোনামণি। মদনার বউটা ভোরবেলা আদর করে টুলস দিত, --- ও জামাই, ওঠো, জাগো। শ্বশুরবাড়ি যাবা না? শ্বশুরবাড়ি ছিল ওর ওইটে, আর জামাই ছিল মদনের এইটে। শ্বশুরবাড়ি ভোগে গ্যাচে, ফলে এ ব্যাটা হামানচোদা জামাই এখন ঢোঁড়সাপ হয়ে স্রেফ জাবর কেটেই খালাস। 'জাবর কাটা' বোজো তো? একষট্টি-বাষট্টি। মানে, খুচরো গোনা।। মানে, হাতলেত্তি। মানে হ্যান্ডেল করা। সকলেই নাকি করে। মদনাই বলছিল, 'মেয়েরা আঙুল করে, শুনিচি বেগুনও করে।' সত্তিমিত্তে জানিনে বাপু।
    ভালো কথা। আরও একটা শব্দ যোগ করি। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা মলয়দার এই 'লিঙ্গ'কে বলে 'লিকাম'।
    তো খালিপিলি এই লিকাম লইয়া পুরুষ কী করিবে? লিখিবেই বা কেন, আঁকিবেই বা কোন আহ্লাদে! ব্যাংক তাহার অচল যদি তার বাঁড়ার উপযুক্ত একটি পার্স না থাকে। বলছি, যেহেতু, বলছি আমাদের চালুচরকি সমাজের দিকে একপাক ঘুরে তাকাও, হালিতেই চোখে পড়বে যৌনতা। এ সমাজে যৌনতা মানে কিন্তু নারীক্ষেত্র। পুরুষ গৌণ। বেচছে ছাতু, দেখাচ্ছে নারীর বক্ষপট। পটকা, টিভি, মোবাইল, ভটভটির কথা না-হয় ছেড়েই দাও, ----- অপথ্যপথটি বাদে সেখানে নারীদেহের সব পার্টসই হাজির। বলে রাখি তোমায়, তুমি জানো, আমার সমস্ত উপন্যাসেই 'নারী' পুরুষের ইন্টেলেক্ট থেকে আঁকা। কিন্তু একজন বখাটে খানাখারাব হলে কি নারীদেহের মহার্ঘ পার্টসগুলোকে আমি অন্য চোখে দেখতাম? হয়ত, একদমই না। এ ব্যাপারে ভদ্দরলোক বলো, ছোটলোকই বলো, সব মিনসের এক রা। মাথার শিরোজ থেকে গোড়ের পদরজ, একটা হোলদামড়ি নারীর কী-ই না ভাল্লাগতো কালিদাসের! তবে আমার-মতো উনি কতখানি সাধুলোক ছিলেন, খটকা আছে। সাধুমণ্ডলে নারীর অষ্টোত্তর শতনাম। শঙ্খিনী, পদ্মিনী, চিত্রিণী, হস্তিনী ----- এসব তো মানুষের নিজস্ব এলেমে হয়নি, খোদ বিশ্বকর্তা নিজের হাতে গড়ে দিয়েছেন। ফের এদের মধ্যে শঙ্খিনী আর পদ্মিনী হলো 'আইটেম' বিশেষ। তেনার 'অন্তিমের মার'ও বলতে পারো। একা তুমি কেন, বাইবেলেও বলেছে, নারীই বিধাতার শেষ সৃষ্টি। 'হে শুভদর্শনা', অশোক ফরেস্টে সীতাকে দেখে রাবণ কেলিয়ে গিয়ে বলছেন, 'আমার মনে হয় রূপকর্তা বিশ্বনির্মাতা তোমায় রচনা করেই নিবৃত্ত হয়েছেন, তাই তোমার রূপের আর উপমা নেই।' অথবা, ঈভার প্রতি মিল্টন : 'ও ফেয়ারেস্ট অফ ক্রিয়েশন, লাস্ট অ্যান্ড বেস্ট / অফ অল গড'স ওয়র্কস'।
    বাংলা সাহিত্যেও নারীর উপমা যে একেবারেই নেই, সেটা বললে বাওয়াল হবে। তবে আমি আমার কথাই বলব। 'যোজন ভাইরাসে' কমল রানীর বুকে কান পেতে শুনেছে সমুদ্রের কলকল। নারী সমুদ্র ছাড়া আর কী, বলো! হোক নোনা। কিন্তু নোনা থেকেই লোনা। লোনা থেকে লবণ। লবণ থেকে লাবণ্য। কত নুন খেয়েছো রানী! সব নুন কি তোমার দেহে? আর খেয়ো না। এতে সৌন্দর্য হারায়। অবিকগুলি খসে-খসে সহসা খোয়ায়।
    সত্যি, এক বিশাল মহাযোনি পয়োধি এই নারী। আর পুরুষ কেসটা হলো, অই উষ্ণু মাংসল অলীক পাথার-কিনারে বাল্বের ছেঁড়া ফিলামেন্টের মতো অধীর কাঁপুনি সহ দাঁড়িয়ে থাকা পৌনে ছ'ফুট লম্বা একটা হাইটেন্ডেড ও ব্যবায়ী পুরুষাঙ্গ মাত্র। মাইরি একটা কথা কী জানো, খুব কৈশোর থেকে একজন পুরুষ তার যৌন-অহংকার নিয়ে তিল-তিল করে গড়ে ওঠে, স্রেফ, একজন নারীকে জয় করবে বলে। কিন্তু সে কি সেই কাঙ্খিত নারীকে পায়! পরিবর্তে যাকে পায়, তারও তল পায় না। কী যে চায় মৃণা, মহা ধাঁধা। একেক সময় মনে হয়, কী যেন খুঁজছে, অবিরত। ওফ, টস করেও বোঝা দায় এই মেয়ে জাতটাকে। একেক সময় খটকা জাগে,নারী এক হিংসাত্মক ও নাশকতামূলক শিল্প। নারী মৃত্যুর বিজ্ঞান। ডেথোলজি। আচ্ছা, এ নারী কে? এ দিনে এক, রাতে আরেক! এ নারীকে সত্যিই আমি চিনি না। পরিচিত দায়রার যথেচ্ছ-নারীর কাছে কোনোকালেই বিশেষ যাচনা ছিল না আমার। আমি এমন নারী খুঁজিনি যে শুধু ঘুমোতে আগ্রহী বা গামলা-ভরা খাদ্যে। নারীকে নারীর মুখ বা নারীর চোখ মাত্র আলাদা করে চাইনি, কেবলি। চেয়েছি টরসো মূর্ধা সৃক্ক নোলা কল্লা সিনা রাং নিতম্ব পয়োধর নাভি যোনি নবদ্বার সম্বলিত একটি পূর্ণাবয়ব নারী, যাকে স্পর্শ মাত্রের লহমা থেকে শব্দের স্রোত ধেয়ে আসবে বেবাক এবং প্রতিরোধহীন। স্ব-পরিচয়হীনা, জন্মহীনা, ইতিহাসহীনা, নিয়তিহীনা সেরকম কোনও নারী আজও আমার উপজ্ঞার বাইরে রয়ে গেছে। দ্য বেস্ট রিলেশান বিটুইন আ ম্যান অ্যান্ড আ উওম্যান ইজ দ্যাট অফ দ্য মার্ডারার অ্যান্ড দ্য মার্ডারড। দস্তয়ভস্কির কথাটাই কি তবে মোক্ষম? নারী পুরুষকে হালাল করবে, তার আগেই নারী বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত-সব বাহারি শব্দঘোঁটের বিছেহার জোর করে লাথিয়ে ভেঙে ফেলা দরকার যদ্বারা উদ্ঘাটিত হবে নারীর মৌল স্বরূপ।
    খামোখা টেনশন নিও না। এটা, এই পুরুষ-সিস্টেমে স্বাভাবিক ব্যাপার। সিস্টেমটা যেহেতু পুরুষের, নারী হাজার বোল্ড হয়েও পুরুষের মতো নিজের কয়টাস চিরোতে পারে না। মানুষের সেক্সউয়াল ইন্টারকোর্স, বা কয়টাস, একটা খাড়া শিশ্নের যোনিতে প্রবেশ মাত্র নয়। সঙ্গমের ব্রড ডেফিনিশন হল, দা ইনসারশন অফ এ বাঁড়া ইনটু অ্যান অরাল, অ্যানাল, অর ভ্যাজাইনাল ওপেনিং, অ্যান্ড এ ওয়াইড ভ্যারাইটি অফ বিহেভিয়ার্স দ্যাট মে অর মে নট ইনক্লুড পেনিট্রেশন, ইনক্লুডিং ইন্টারকোর্স বিটুইন মেম্বার্স অফ দা সেম জেন্ডার্স। কিন্তু কপুলেশন বা চোদাচুদি, যা নিয়ত আমরা আত্ম-সংলাপে সহজ ভাবে ব্যবহার করি, ভদ্দরপুঞ্জে সহজ বা স্বাভাবিক উচ্চারণ নয়। কেননা এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অ্যাস্টোনিশমেন্ট আর ভ্যাজাইনাল সেন্সিবিলিটি। যে-কারণে 'চোদাচুদি' শব্দটা (যার উৎসে রয়েছে 'চোদা' ও 'চুদি' নামের দুই ভাইবোনের হাজার-হাজার বছরের মিথ-উপালেখ্য) আমাদের অন্যান্য অর্গানিক কারবার থেকে বেপোট হয়ে গ্যাছে। এ থেকেই পুরুষতন্ত্র সামাজিক ট্যাবু ম্যানুফ্যাকচার করেছে। শ্লীল-অশ্লীলের মধ্যে ভিড়িয়ে দিয়েছে কোন্দল। ওই কোন্দল আর তার অ্যাডহিরিং লুকোচাপার দরুন এদেশের ফিল্ম আর সাহিত্যেও যৌনতা দেখানো হয় পারভার্টেডলি।
    কিন্তু পুরুষের চোখে বা অনুভবে মেয়েদের শরীর? এ ব্যাপারে ভদ্দরলোকই বলো, ছোটলোকই বলো, সব মিনসের এক রা! পুরুষতন্ত্রের ঢালাইঘর নারীকে ঝুটমুঠ বহু 'শেপ' দিয়েছে ---- শঙ্খিনী, পদ্মিনী, চিত্রিণী, হস্তিনী, ---- এগুলো কি বিধাতার কেরামতি? সব শালা পুরুষতন্ত্রের ধুড়কি। পুরুষের চোখে বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন খেপের, বিভিন্ন নেচারের মাগি। তাদের নামও তেমনি ভেরিয়াস। নারী বলতে বুঝি একজন স্তন ও যোনি সমন্বিত মেয়েমানুষ, কিংবা এনি অবজেক্ট রিগার্ডেড অ্যাজ ফেমিনিন। ফের 'স্ত্রী' বললে, যার এঁড়িগেঁড়ি বা পোলাপান আছে, অর্থাৎ বিয়ারার অফ আন্ডাবাচ্চা। মাদি শেয়াল বা বাদুড়ানীও বোঝায়। 'রমণী' বলতে, এ বিউটিফুল ইয়াং উইম্যান, মিসট্রেস ---- এবং, যাহা রমণীয়, রমণযোগ্য 'মাল'। 'ললনা'ও মাল, তবে ওয়ানটেন লেডি। 'লল', অর্থাৎ খেলুড়ে মাগি। বিবিসি। মানে, বাড়ির বউ ছিনাল। 'অঙ্গনা' ---- আ উইম্যান উইথ ওয়েল-রাউন্ডেড লিম্বস।। 'কামিনী' ---- আ লভিং অর অ্যাফেকশনেট উইম্যান, কিংবা টিমিড মাল। কিন্তু কামিনী বললে এসব ভদ্দরলোক তাঁদের চুদাউড়ি বউটিকেই বোঝেন, মরাগরুর দালালটা সঙ্গে অং করে যে মাগিটা পালহুড়কি দিয়েছে। 'বনিতা'ও বউ, তবে 'বধূ' বলতে এঁরা বোঝেন বিয়ে করে আনা বউটি। আর, 'যোষিৎ' বলেছে যাকে সে কেবল ছুঁড়ি, গার্ল, ইয়াং উইম্যান; অ্যান আইটেম।
    তো, পুরুষতন্ত্র নারীর এতসব উপনাম দিয়েছে, শুধুমুধু 'যৌনতা'র দৃষ্টি থেকেই তো! মানে, পুরুষের 'একটি-মাত্র' নারী নিয়ে মন ভরে না। তারা চায় একাধিক। একটি নারীমূর্তি গড়তে বহু মডেল ইউজ করতেন প্রাক্সিটিলিস; কারো মাই, কারো মাজা, কারো দাবনা এবং কারো-বা পাছা নিয়ে রচিত হতো তাঁর এক একটি তিলোত্তমা। আমরা পুরুষরাও এহেন একটি হাগিং, লাস্টিং, উইশিং নারীমূর্তি ধারণা করি এবং তার জন্য একটা-করে জবর স্ল্যাং বানিয়ে রেখেছি। এটা পুরুষের যৌনতার হোমওয়র্ক। কাল যেন পড়া ধরবেন স্যার।
    নারী বাবদ স্ল্যাং বানাতে বসে প্রথমেই যেটা, নারীদেহের খুফিয়া বিভাগে এন্ট্রি মেরেছে পুরুষ। বস্ত্র সরিয়ে উদোম করেছে, সর্বাগ্রে যাঁদের দর্শন পেয়েছে, তাঁরা যমজ, উভয়েরই নাম 'স্তন'। স্তন বোঝো তো চাঁদু? যা চিলি চিৎকারযোগে নারীর যৌবন অ্যানাউন্স করে। কিন্তু গোড়ায় গলদ। বাংলা ভাষার কুঁয়োর ব্যাঙ গবেষক-সংকলকরা যে শব্দগুলোকে স্তনের এওয়জ ভেবে টুকেছেন, তাতে স্তনের শেপ বোঝা গেলেও অ্যাপিয়ারান্স আর নেচারে গড়বড় আছে। চুচি, মাই, দুদু, বেল, বাতাবি, নারকেল, তরমুজ, লাউ, বেগুন, ডিংলা, বেলুন, হেভি ওয়েট, হেডলাইট ---- এগুলো ঠিক আছে। কিছুটা মেলে। কিন্তু আতা বা উইঢিবি কেন? স্তনের গায়ে গোঁড় আছে, না ভেতরটা ফোরা? ফের দ্যাখো, 'আনারদানা'! ওটা স্তনের দ্যোতক হলো? মানে, ডালিমের দানা! ওই সাইজের স্তন নাকি হয়! হাসলে বাংলার ডাগদার বাবু। ফের কেলিয়েছো 'নিমকি' ঢুকিয়ে। নিমকি তো ঢোকাবার জিনিশ। মানে গুদ। গুদ আর মাই এক হলো? ফের হাসালে পেঁপেসার। 'মেশিন' কেন? মেশিন তো বড়জোর ল্যাওড়া। পূর্ণযুবতীর স্তন হিশেবে 'হরিণঘাটা' চলতে পারে। তবে, 'সিঙ্গাড়া', 'পিরামিড' আর 'হাইহিল' কদাপি নহে। হে বঙ্গভাষার টুলোপণ্ডিতগণ! তোমরা স্ল্যাং-এর কিচ্চু বোজো না। তোমাদের অভিধানে অনেক ঝোলঝাল আচে। ঝুলে গ্যাচে বাবা লেতাই, কাচা তোমার খুলে গ্যাচে।
    বলতে চাইছি, স্ল্যাং-এ থাকবে স্তনের গঠন ও প্রকৃতি, তাতে স্তনধারিণীর বয়স ও দেহের বিভাব জেগে উঠবে, সেটাই তো কাম্য। একটি অষ্টাদশী খেলুড়ে ললনার স্তনকে কি 'আমসি' বলা যাবে, নাকি 'বেগুনপোড়া'? কোন-কোন টুলো 'চুচি'কে বাদ দিতে চেয়েছেন স্ল্যাং থেকে। লজিক হলো, ওটা সংস্কৃত মূল শব্দ 'চুচক' থেকে ভায়া হিন্দী তদ্ভব 'চুচি' থেকে সরাসরি বাংলায় এসেছে, ----- এবং অভিধান স্বীকৃতও বটে। ওভাবে দেখলে, তাহলে তো 'চুত' শব্দটাকেও ছেঁটে ফেলতে হয়। কারণ সেটিও সংস্কৃত 'চুদ' জাত তদ্ভব হিন্দী আঞ্চলিক, ----- এবং সেটিও অভিধানে ঠোর পেয়েছে, যার মূল অর্থ 'যোনি'। অভিধানে ঠাঁই পেয়েছে বলে স্ল্যাং হবে না? তাহলে 'চুতমারানি'দের কীভাবে ডাকা হবে? এভাবে, তাহলে, 'মাগি'ও বাদ যাবার কথা। যেহেতু সেটা পালি 'মাতুগাম'-এর তদ্ভব রূপ এবং তার মূল ক্ষরিত অর্থ খালিপিলি 'মেয়েমানুষ'। হিন্দী 'চুচি'তে অষ্টাদশীর লমশমি স্তনের যে ব্যঞ্জনা, সে তো বহুল চালু বাংলা 'মাই'তেও দুর্লভ। আবার ভারিভরকম পেল্লাই থন-দুটিকে তো 'তরমুজ' কিংবা 'ফজলি আম'ই বলব। বড়জোর, 'বউ ফুসলানি আম'।
    স্তনের সমীপশব্দ পাচ্ছি 'বুনি' 'বুচি' 'বুটকি'। এগুলো ও-বঙ্গের। খুলনায় চুচির নাম 'ফলনা'। যেটা ময়মনসিংহে গুদের নিকনেম। কুমিল্লায় উচ্চারণদোষে স্তন হয়েছে 'তন'। আমরা বলব, 'থন'। রংপুরে 'টমটমা'। ঢাকায় স্তনযুগলের বেড়ে নাম দিয়েছে, 'জোড়ামুঠিফল'। বগুড়ায় কিশোরীর উঠন্ত চুচির নাম 'বুচি'। আমাদের এদিকে 'কুল' 'লেবু' 'পেয়ারা' দেদার মেলে।
    তারবাদে, টনটনে লবলবে বোঁটা দেখে কার না লালকি ঝরে! স্তনবৃন্তের কথাই বলছি, মালপোয়া বা পুলিপিঠের নয়। যা দেখে লিলিক্ষা জাগে, চোষার। তর্জনী ও বুড়ো নিশপিশ করে, দাঁতে চেপে চেবাতে জী ললচায়। স্তনবৃন্তের উপরিভাগকে বাকরগঞ্জে বলে 'পালনি'। 'বুডা' 'বুটা', এগুলোও ও-পাড়ায় চলে। তবে, আমরা সরাসরি 'বোঁটা'ই বলব। বোঁটা, বোতাম, চুমুর, কিশমিশ, নাট, সোপনাট, সুপুরি, রিঠা, ডুমুর। এছাড়া বড়জোর 'তকলি'। 'বাটিকোট' বলব বডিসকে। 'পৈতে' বলি তার স্ট্র্যাপকে। 'ব্রা' আর 'ব্রেসিয়ার' ----- দুটোই শিরশির করা শব্দ। জুড়ি নেই। কড়কড়ে বডিস বললেও অমনটা লাগে না। শকুন্তলা বলছে, 'সখী,অমন আঁট করে বাঁধিসনি,বল্কলের ভেতর বড্ড আইঢাই লাগে!' উত্তরে প্রিয়ংবদা বলছে, অত্র পয়োধর-বিস্তারয়িতৃ আত্মনঃ যৌবমেব উপালভস্ব ----- 'যে যৌবন তোর মাইদুটোকে অত বাড়ন্ত করেছে, তাকে দুষগে যা, আমাকে কেন!'
    এবার নিচে নামো। তলার দিকে। চোখে পড়বে পেটি। তার মধ্যমণি 'নাভি'। নাই, নায়, ঢোঁড়ি, পেটি, টুনি, পুঁতি ইত্যাদি কত নাম পড়েছে ওইটুকু গত্তে! এগুলোর মধ্যে হিন্দী 'ঢোঁড়ি' কিন্তু একটা হাইভোল্টেজ স্ল্যাং। ওটা বাংলায় তাংড়ানো উচিত। অন্তত, নারীদেহের নাভির খাটচড়ি শব্দ এর চাইতে বেস্ট আর হয় না।
    তা, মলয়দা, এরকম একটি নারীদেহ লাভিত হলে দাঁড়ায় বৈকি। তখন লেকামেকা চুলোয় যাক। বাকি কথা : লিঙ্গের লিঙ্গযোগ (পড়ো 'মনোযোগ') যেখানে দরকার সেখানেই খাড়ায় কেবল। নারী বা যৌনতা নিয়ে লেখার সময় নিরাসক্ত সন্ন্যাসী হয়ে থাকতে হয়, নচেৎ লেখাটা খাড়ায় না। এবং বলি, এই লেখাটিও লেখার সময় দাঁড়ায়নি, নট ইভন হাফ এমএম।

    সাহিত্যে 'যৌনতা' বা 'অশ্লীলতা' শব্দ দুটি অচল। কারণ 'নির্মাণ' যদি 'সাহিত্য' হয়, উপরিউক্ত শব্দ দুটি বাতিল। কারণ সাহিত্য সাধনা। বস্তুত মনুষ্যজীবনে ঈশ্বরত্বের অন্য সংজ্ঞা 'সাহিত্যিক' বা 'কবি'। যিনি শ্রেষ্ঠ নির্মাণে ব্রতী, বিশ্বাসী বা সাধনায়, তাঁহার দ্বারা 'কদর্য' কিছু সম্ভব নহে। আমরা প্রায়শই ভুল করি। সাধারণ মগজের ভাবনায় কিছু কিছু 'শব্দে' নেহাৎ অশিক্ষিত, অপরিণত মস্তিষ্কের ব্যবহার করি। ভাবি না। ভাবিতে প্রস্তুত নই। কারণ কিছু কিছু পাঠক ইচ্ছাকৃতভাবেই সৎ, অমোঘ, নিত্য সাহিত্যকে দোষারোপ করা শ্লাঘার ভাবেন। তাঁহারা শ্রেষ্ঠ, সুন্দর দেখিলে বিকৃত হইয়া পড়েন। তাঁহারা এতটাই অশিক্ষিত, অপরিণত যে, 'আদিরস' 'কামরস' 'যৌনতা' ইত্যাদি শব্দ ও অশ্লীল, ভালগার, কদর্য, কুরুচির মধ্যে ব্যবধান করিতে পারেন না। অক্ষম সেইসব পাঠকের অশ্লীল চিলি-চিৎকারে প্রতিবেশী পাঠকের মনও কলুষিত হইতে থাকে।
    জনাকয় যুবক-যুবতী মদ্য, মাংস, তামাক সমভিব্যাহারে ভিকটোরিয়া উদ্যানে। রাত্রি সাত ঘটিকা। যুবতীদের পরণে শাড়ি মাত্র। বক্ষবন্ধনী নাই। যুবকেরা কেহ লুঙ্গি, কেহ ধুতি। উত্তমাঙ্গ বিবস্ত্র। এক্ষণে পানীয় এবং যৌবনের তাগিদে যুবতীগণও বস্ত্রখণ্ড ত্যাগ করিল। স্বাস্থ্যবতী তাহারা, উদ্দাম ও যথেচ্ছ। সদ্য যুবতীদের হাসিতামাশা লাবণ্য ও যৌবন অকুস্থলে ক্লেশময় ইহাতে সন্দেহ নাই। কারণ যুবকগণের অর্ধমাঙ্গে নামমাত্র বস্ত্র। উভয়ে কামজর্জর।
    ইদৃশ কাল্পনিক ঘটনা নগরে, অবশ্যই কুরুচিকর ও উদ্দেশ্যমূলক। অথচ ঝাড়খণ্ডের গ্রামে-গঞ্জে, একাধিক ভ্রমণে, দেখিয়াছি, যুবক-যুবতীরা হাট শেষে ঢিবরির সামান্য বায়ুতাড়িত শিখা ঘিরিয়া, পানীয়ে মত্ত। হাসিয়া মাতিয়া একাকার। যুবতীদের রৌদ্রস্নিগ্ধ দিনশেষের শরীর, ক্ৰমে পানীয়ে সতেজ ও সুন্দর। কেহই সচেতন নন। যুবক-যুবতী উভয়ে গাহিতেছে, নাচিতেছে, ইহা খুবই সরল সোজা দৃশ্য। ইহাতে বিন্দুমাত্র কুরুচি দেখি না। যৌন শিহরণ যদি বা থাকে তাহা সাহিত্য-রস মাত্র, 'কামরস' নহে। কারণ এইভাবেই তাঁহারা যুগযুগ ধরিয়া নির্বাহ করিতেছেন।
    দুইটি দৃশ্যে স্বতন্ত্র ভূগোল, ইতিহাস, দর্শন, বোধ ইত্যাদি কাজ করিতেছে। প্রথম দৃশ্যে কেবল যৌন-বিজয়-সভা। মানুষ বা মনস্কতা তাহাতে বিন্দুমাত্র। কতক্ষণে পান করিয়া মত্ত ও মদির হইবেক, তাহার তাড়না। যাহা যথার্থই কুরুচি ও কুদৃশ্য। দ্বিতীয় দৃশ্যে একটি স্বাভাবিক পাহাড়িয়া জীবনবিন্যাস, আবহমান জীবন প্রবাহ।
    মনে পড়ে, একদা মিলার সাহেব তাঁহার বিখ্যাত উপন্যাস 'ট্র্পিক অব ক্যান্সারে' যথেচ্ছ 'কান্ট' ও 'কক' ব্যবহার করিয়াছিলেন। যাহার বাংলা প্রতিশব্দ আমরা ভাবিতে পারি না। গ্রন্থটি অদ্যাবধি আদৃত। আমরা মহাভারত ব্যাপারেও সশ্রদ্ধ। অথচ এই আদিগ্রন্থ, যেখানে সাধুর বীর্য হরিণ ভক্ষণ করে, সাধুর রতিতে অপ্সরা (বেশ্যা) মত্ত, যথেচ্ছ যৌনবিহার। এমন কি ভরা রাজসভায় রানীর বস্ত্রহরণ বা শরীরলুন্ঠন। কুমারসম্ভব, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, ভারতচন্দ্র কে নহে! কেহই 'কাম' লইয়া মাতেন নাই, মাতিয়াছেন আদিরস লইয়া। কারণ নিষিদ্ধ ও আবৃত। যাহা যত আবৃত, তত রহস্যময় ও সুন্দর। এই আবৃত অংশ হইতেই কবিতার জন্ম হয়। 'কবিতা' রমণীর যৌনচিহ্ন হইতে জন্মাইল। ফলে এত সুন্দর, সুগন্ধী ও সুদৃঢ়। কবিতার রহস্য ও গভীরতা, কারণ রমণীর গুপ্ত শরীরে, গোপনে অপেক্ষা করিতেছিল।

    আজ মলয়দার অফিসিয়াল জন্মদিন ছিল নাকি! মনের এই হয়েছে লিট্টিমি। ইদানিং বেজায় চাপ। পুজোর দু সপ্তা আগে থেকে আজ অব্দি স্ত্রীর হাসপাতালিকরন এবং তৎসংশ্লিষ্ট ঝক্কি ও উচাটন অথচ তারপরেও অপ্প যে জিরেন নেবো তার যো নেই। লেখার পচুর ফরমাস। এমতাবস্থায় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা তাত্ত্বিক তথা জায়মান কিংবদন্তি মলয় রায়চৌধুরীর জন্মদিনটা যদি ভুলেই যাই --- ক্ষুব্বেশি গাজোয়ারি হলো, বলো তোমরাই!

    তো, মনে কিন্তু পড়েই গেল। অগত্যা একটা-কিছু লিখতেই হচ্ছে। একটা জিনিশ মার্ক করেছি, আমাকে বা মলয়দাকে নিয়ে যাঁরাই লেখালেখি করেছেন, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উদয়ন ঘোষ, রবীন্দ্র গুহ, কমল চক্রবর্তী, বারীন ঘোষাল, নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, কার্তিক লাহিড়ী, দেবজ্যোতি রায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজলক্ষ্মী দেবী, দীপঙ্কর দত্ত, বনানী দাস, তনুময় গোস্বামী, তপোধীর ভট্টাচার্য, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ হাসমত জালাল, প্রভাত মিশ্র, দিব্যাংশু মিশ্র, সঞ্জীব নিয়োগী, কৌশিক চক্রবর্তী, কৌশিক মিত্র, অরুণাভ দাস, ইরাবান বসুরায়, শুভম চক্রবর্তী আর যাঁদের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না, যাঁরা আমাদের লেখালেখি নিয়ে আলোচনা করেছেন, তাঁদের কেউই আমার বা মলয়ের 'কালচারাল হাইব্রিড'-বোধের ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করেননি, বা, সেটাকে হাইলাইট করেননি। অনেকে হয়ত অজ্ঞানে, বা কলকাতাকেন্দ্রিক অনুশাসনিক ভাবুকতার কারণে সজ্ঞানে বাদই দিতে চেয়েছেন ব্যাপারটিকে। অথচ আমাদের দুজনেরই তামাম জীবন, পড়াশোনা, লেখাচর্চা, রাগ, ঘৃণা, তিক্ততা, আক্রমণের টার্গেট, বেঁচে থাকার বজহ বা অজুহাত, বেস, হয়ে ওঠা ইত্যাদির মূলে এই সাংস্কৃতিক দো-আঁশলাপনার বোধই যুগপৎ সুপ্ত ও মুখর থেকেছে। আজন্ম তথাকথিত 'বহির্বঙ্গে' লালিত এবং বহির্বঙ্গ-ফেরত মূল সংস্কৃতিতে বহিরাগত না-হলে হয়ত আমাদের লেখার নিজস্ব চিন্তাবিশ্বই গড়ে উঠত না। বিগ্রহ বা প্রতিষ্ঠান ভাঙা, প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে মাস্তানি ফুটপথিয়া ভাষায় মলয়ের কবিতায় দুর্যোধন চ্যালেঞ্জ জানায়, দ্যাখো তোমরা -----

    "আব্ববে পাণ্ডবের বাচ্চা যুধিষ্ঠির

    বহুতল বাড়ি থেকে নেবে আয় গলির মোড়েতে

    নিয়ায় ল্যাঙবোট কৃষ্ণ ভীম বা নকুল কে কে আছে

    পেটো হকিস্টিক ক্ষুর সোডার বোতল ছুরি সাইকেল চেন

    বলে দে দ্রৌপদীকে আলসে থেকে ঝুঁকে দেখে নিক

    আমাদের সঙ্গে আজ কিছু নেই কেউ নেই ....

    কবিতা বা অন্যবিধ লেখালেখিতে কোনো পূর্বাদর্শ বা বিশুদ্ধতার চর্চা না করে মলয় আগাগোড়া নিজের প্রতি সৎ থাকার চেষ্টা সহ নিজের আহরিত জ্ঞান, মেধা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক রাজনীতিক আর্থিক ও সাংস্কৃতিক তত্ত্বগুলোকে বিশ্লেষণ করেছেন এবং আধুনিকতার এইসব উপাদানের অসারতা প্রতিপন্ন করার মাধ্যমে সীমানা ভাঙার কাজ করে এসেছেন বলেই আজ তিনি মনোযোগ ও বিতর্কের বিষয়। আর এসবের পেছনে স্বাভাবিক ও পরোক্ষ ভিত্তি হিশেবে, অনুঘটকের কাজ করেছে তাঁর শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, যৌবন ও প্রৌঢ়ত্ব জুড়ে বিহার ও ভারতবর্ষের অন্যান্য ভাষা-সংস্কৃতির রাজ্যে সুদীর্ঘ যাপন। এই যাপনই তাঁকে দো-আঁশলা সাংস্কৃতিক জীব হিশেবে নিজেকে দেখার স্বচ্ছতা ও অকপটতা দিয়েছে ভাবলে ভুল হবে না।

    বিহার-বাংলার যৌগ-সংস্কৃতি থেকে উঠে এসেছিলেন বলে, দুষ্কৃতী অধ্যাসিত বস্তিতে প্রতিপালিত হয়েছিলেন বলে, এবং ক্ৰমে-ক্ৰমে বঙ্গসংস্কৃতির বদলায়মান স্বরূপ জলবৎ দেখে ফেলেছিলেন বলে, বাংলা কবিতা ও আখ্যান সাহিত্যে কলকাতার ঔপনিবেশিক প্রভুমুখী দাসত্ব লক্ষ করেছিলেন বলেই, চেতোমান মলয় প্রথম থেকেই তাঁর লেখায়, বিশেষত কবিতায়, সন্ত্রাস অথবা তাঁর স্বীয় ভাষায় 'ছুরি চাকু চালানো' রপ্ত করেছেন। তাঁর বহু কবিতায় ওই সেলাখানার বিবরণ আছে, এবং সেই সন্ত্রাসী চিত্রকল্প। আর এইসব চিত্রকল্পের ধারাবাহিক অনুশীলনে তাঁকে স্বাভাবিক ভাবেই সাহায্য করেছে তার বাস্টার্ড কালচার। তাঁর আশৈশব-আহরিত প্রায় হাজার খানেক অঘোরি ছোটলোকি অশ্লীল কুৎসিৎ কুচেল অসৎ অভাগা দুর্ব্যবহৃত শব্দাবলি ও তার অভ্যন্তরীণ ইথস। বর্তমানের প্রতিফলনের দরুন সন্ত্রাসী ইমেজ, যা নিছক জান্তব বা যৌন নয়, এ এক মলয় রায়চৌধুরীর কবিতাতেই মেলে। যৌগ-সংস্কৃতির ডামাডোল অবস্থান থেকে সীমালঙ্ঘনের, বিগ্রহ ও মসনদ ভাঙার, যৌক্তিকতা ও আধুনিকতার দর্শনকে এভাবে গুমখুন পাল্টাখুন করার কাজটি, ফালগুনী রায়কে মনে রেখেও বলা যায় ---- ইতিপূর্বে বাংলা কবিতায় অন্য কেউ করেছেন বলে মনে হয় না। যৌগ-সংস্কৃতিতে মানসিক দীর্ঘ যাপনের কারণেই, বাংলার তাবৎ শব্দাবলিতে তাঁর নিবাস থাকা সত্ত্বেও, তিনি যখনই কিছু লেখেন, ওই দোআঁশলা সাংস্কৃতিক নিবাসটি তাঁর সদরে এসে কড়া নাড়ে। এই সততা, এই অকপটতা আমরা আর কার মধ্যে দেখেছি?

    আসলে, আমার মনে হয়, যে-কথা আজিজুল হকও বলেছেন, মলয় রায়চৌধুরী এক অন্য পেরিফেরির জীব। মলয়ের হার্ট খুব স্ট্রং, রক্তে দুর্নিবার তেজ। মলয়ের চাইতে অনেক গুণ বড়ো ভাবুক ও মেধাবান চরিত্র ছিলেন সমীর রায়চৌধুরী। কিন্তু, আমার মনে হয়, মলয় আগাগোড়াই 'হয়ে উঠতে' চেয়েছেন। এই হয়ে-ওঠা সবার 'বশের' কথা নয়। হয় ক্ষমতার অভাব, নয় তষ্টির। মলয়ের ফলাফলটা বিলকুল যাকে বলে, রেস্পন্সিবল ইরেন্সিবলিটি। এই সূত্রেই একটা না-তোলা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। যে, মলয় রায়চৌধুরী কীসের জোরে নিজেকে হয়ে ওঠালেন, বিগ্রহের বিরুদ্ধে দাঁড় করালেন, হাতুড়ি চালালেন --- সেই মানসিক, চেতনিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটটি সমগ্রতার আলোকে অনুসন্ধানের তাগিদ একটা তাই থেকেই যাচ্ছে গবেষকদের কাছে। আর কিছুদিন সময় নিচ্ছি। হয়ত লোকডাউন ঘুচলে এই নিয়েই আমার একটি গদ্যগ্রন্থ আসবে। তাতে আমার এই গর্ব অবশ্যই নথি থাকবে, যে, একদিকে জাঁদরেল মূর্খ প্রতিষ্ঠান, ব্রিটিশ গুরুর বীর্যিত পচাগলা মূল্যবোধে আকণ্ঠ বাঙালি বুদ্ধিজীবী-আলোচকের কেরবালা যাঁকে বুঝতে না পেরে, বা সভয়ে, এড়িয়ে রয়েছেন, মুখ ফিরিয়ে, তাঁকে সহ্য করতে না-পারা রঙরুট বন্ধুদের রিসালা, তাঁদের সম্মিলিত করাল মেঘের সামনে একটি সেলাই-না-পড়া লেখকের দ্বারা এই অঘটন তাঁদের দিনদাহাড়ে চাক্ষুষ করতে হবে।

    মলয় রায়চোধুরীকে বাঙালি পাঠক এখন অনেক ভাবে চেনে। ষাট দশকের হাংরি আন্দোলনের পুরোধা পুরুষ, নতুন কবিতাধারার প্রবর্তক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সমালোচক ও অনুবাদক; মায়, দু-একটি কাঁপা হাতের স্কেচও আমরা দেখেছি। এই ভার্সাটাইল কাজকর্ম নিয়ে, তিনি একজন পোস্টমডার্ন ভাবুক। জীবনের যা কিছু ---- বাঁচা, বেঁচে থাকা, ভাষা সংস্কৃতি শিক্ষা, বিজ্ঞান অর্থনীতি রাজনীতি, ভূগোল ইতিহাস সাহিত্য ইত্যাদি প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রে তাঁর ভাবনাগত আনাগোনা। অথচ তিনি নিজেকে কোন বিশেষ অভিধায় চিহ্নিত করতে নারাজ। কেননা তিনি মনে করেন নিজেকে বা অপরকে অভিধায়িত করার যেসব শব্দাবলি চারপাশে সাজানো আছে, এখনো, সবই ব্রিটিশ মাস্টারদের ফেলে-যাওয়া বইপত্র, অভিধান আর আধুনিকতাবাদীদের বুকনি থেকে নেওয়া। অথচ মলয় বিশ্বাস করেন শেষ বিশ্বযুদ্ধোত্তর দুনিয়ার যে হালচাল, রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি তাতে সেরকম মডারনিস্ট স্পেশালাইজড ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার সার-বীজ সব পচে-হেজে নষ্ট হয়ে গেছে। 'আধুনিকতা' ব্যাপারটাই এখন 'একখানি ধ্রুপদী জোচ্চোর'। বলেছেন তিনি, এতদিন, 'আধুনিকতা ভালো, নৈতিক, নান্দনিক, প্রগতিশীল, উন্নত, কাম্য, কল্যাণময় এমনতর ভাঁওতায় ভুলিয়ে রাখা হচ্ছিল বাংলা ভাষাকে।' এহেন সময়ে একজন সমাজ ও সময় সচেতন লেখক যা করতে পারেন, তা হলো, বিগ্রহ ভাঙার কাজ। মলয় রায়চোধুরীর বেশির ভাগ রচনায় হাতুড়ির সেই চিহ্ন আমরা দেখেছি। কোন ধর্মভীরুতা বা প্রলোভন তাঁকে এই ভাঙার কাজ থেকে নিরস্ত করতে পারেনি, না বিদ্যায়তনিক মাস্তানদের ঘাতক-ছুরি। বাংলা ভাষায় প্রতিষ্ঠিত আধুনিক ও এঁদো চিন্তাভাবনা ও তার ভেক্টর প্রতিষ্ঠানের মুখে জোর থাপ্পড় মেরে তার গিল্টি-করা দাঁত উখড়ে দিতে চেয়ে মলয়ের লেখার জগতে প্রবেশ। আজীবন অর্জিত নিজের ভোগান্তি, অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা আর প্রজ্ঞাকে অস্ত্র করে তিনি যা-কিছু প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তা-উদ্ভূত, মেরে লটলট ধ্বসিয়ে ফেলতে চেয়েছেন। একজন কালচেতন, সদাজাগ্রত লেখক প্রতিষ্ঠানের সামনে কী ভীষণ প্রব্লেম্যাটিক হয়ে উঠতে পারেন, তার জলজ্যান্ত মিশাল মলয় রায়চোধুরী।

    নিজেকে কালচারাল বাস্টার্ড বলেছেন মলয়। নিজেকে বলেছেন, বাঙলার মূল সংস্কৃতিতে আউটসাইডার। তাঁর বিভিন্ন রচনা,গল্প ও উপন্যাসে আমরা তাঁর সেই জারজ উপাদানের সুসম্বদ্ধ রূপটি গড়েও নিতে পারি। মজার ব্যাপার হচ্ছে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতাহীন, হতাশাখোর, তথাকথিত শিক্ষিত হায়ারক্লাস বুদ্ধিজীবীরা মলয়ের পশ্চিমবঙ্গ-হামলার মনসুবাটা ধরতে পারেননি। আমি নিজে তথা-অর্থে 'বহিরাগত' হওয়ার দরুন স্থূল ও সূক্ষ্ম দু-নিরীখেই অনুধাবন করেছি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সাংস্কৃতিক ও রাজনীতিক কাঠামোর মূল স্বরূপ বিশ্লেষণে মলয় কিন্তু আগাগোড়াই খুব পুঙ্খানুপুঙ্খ, যার তন্নতন্ন প্রতিফলন তাঁর লেখাজোখায় দুরনিরীক্ষ্য নয়। বাঙালির ভিড় থেকে, হরির লুঠ থেকে, বাঁধাধরা বঙ্গ-কালচার থেকে স্বেচ্ছাবিচ্ছিন্ন এবং সর্বোপরি ভারতবর্ষীয় হিন্দু-বাঙালি সংস্কারের সর্বোচ্চ পীঠ বলে কথিত কলকাতা থেকে ২৬০ কিমি দূরে পড়ে আছি বলেই আমার কাছে ইঁদুরের প্রতিটি লাফ আর চাল জলবৎ ধরা পড়ে। তথাকথিত 'প্রবাস'-যাপনের সুবিধে এটাই যে, নিজের সঙ্গে অন্যের সাদৃশ্য ও পার্থক্য হবহু ধরে ফেলা যায়। দেখতে পাই দ্বৈরাজ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই বিশ্বচরাচর, তার প্রতিটি নড়ন ও চড়ন। মলয় রায়চোধুরী আজন্ম মূল বঙ্গ-সংস্কারের বাইরে বাস করে এই একই মাইক্রো-দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা ও বাদ-বাংলার সংস্কৃতিকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি দেখেছেন যে-বঙ্গসংস্কৃতিকে নিয়ে বাঙালির এত আত্মম্ভরিতা, গুমর আর বারফট্টাই ----- সেই বিশুদ্ধ বঙ্গসংস্কৃতির হদিশ পৃথিবীতে আজ কোথাও নেই। ইতিহাসের বিভিন্ন ধাপে নানা জাতি ও সংস্কারের,বিশেষত মুসলিম ও ইংরেজ বেনিয়ার শাসনে, সর্বোপরি ভৌগোলিক কাটছাঁট, দেশভাগ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ঔপনিবেশিক স্পৃহার খপ্পরে পড়ে বাঙালি নিজের সর্বস্ব আজ খুইয়ে ফেলেছে। এমনকী, বিশুদ্ধ পশ্চিমবঙ্গীয় সংস্কৃতিও আজ মিথ মাত্র। ভারতবর্ষীয় বাঙালির কোন সংস্কৃতিই আজ অবশিষ্ট নেই; সময়ের চাপে সব উচ্ছন্নে গেছে। জন্ম নিয়েছে এক জগাখিচুড়ি কালচার। ছত্রখান সংস্কৃতি। বাঙালির পোশাক পাল্টেছে বহুদিন হল,বহু খোঁপা আর সিঁথি এখন বিদেশিনী হয়ে গেছে, এমনসব হেয়ারডু যা বাঙালি কস্মিনকালে ভাবেনি। পুরুষেরা তামুক দোক্তা বিড়ি গড়গড়া ছেড়ে সিগারেট বিয়ার ব্রাউনসুগারে মজেছে। যে-ফুটবলে বাঙালির নিজস্ব দাপ ছিল তা এখন আকখা ওয়ার্ল্ড খেলছে, বাঙালি লোকাল ট্রেনে আর রকে বসে খেলছে তিন-পাত্তি, টোয়েন্টি নাইন। বাঙালি টুসু ভাদু রবীন্দ্রসঙ্গীত ভুলে পাঞ্জাবি পপে মাজা দোলাচ্ছে। পড়াশোনা চাকরি ব্যবসা থেকে ক্ৰমে উৎখাত হতে হতে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি বলে যা রয়ে গেছে, তা হলো, রকে বসে বুকনি ঝাড়া, পরস্পর পেছনে লাগা, লেংগি মারা, মিথ্যে বলা, হীনমন্যতা, চা চপ ঝালমুড়ি, লোকনিন্দা, ভাইয়ে-ভাইয়ে হিংসে, কথায় কথায় মাথাগরম আর খিস্তিবাজি। পাশাপাশি শনি-শেতলার পুজো, তৃণমূল-সিপিএম, আর দুগ্গাপুজোয় চাঁদা আর হুল্লোড়বাজি।

    তো, এইখান থেকে আমাদের পাঠ শুরু হয় মলয়-ট্রিলজির শেষ পর্দা-ফাঁস উপন্যাস "নামগন্ধে"র। মলয় জনান্তিকে বলেছেন, এ-উপন্যাস পশ্চিমবঙ্গের কোনো সম্পাদক ছাপতে সাহস পাননি, যে কারণে ঢাকার লালমাটিয়া থেকে বেরিয়েছিল আগে, পরে হওয়া ৪৯ থেকে বেরোয়। গোড়াতেই ফাঁস হয়ে গেল নামগন্ধে কী মাল তিনি দিয়েছেন এবং যা অবধার্য হয়ে উঠেছে এসময়ে, মলয়ের পাঠকৃতি সেই আধুনিক ঝোঁকে স্বতঃউৎসারিত। স্বীয় আয় করা দৃঠি ও অভিজ্ঞতাকে ছিঁড়ে পাঠবস্তুর টুকরো পাত্রে স্বত্বহীনভাবে বিলিয়ে দিচ্ছেন বহুরৈখিক আয়ামে। তাঁর অন্যান্য রচনার মতো এ উপন্যাসও দামাল ঝাপটা মারে ঝাদানভ-প্লেখানভদের বাঙালি ভাবশিষ্যদের এতদিনকার নির্বিঘ্নে মেলে রাখা অরজ্ঞানডির ভুলভুলইয়াপনায়। নামগন্ধেও কাহিনী পরিণাহটি ন্যূন, বক্তব্যেই মূলত মাটাম ধার্য করেছেন মলয়। তিনি সঠিক কষে ফেলেছেন যে বর্তমান কালখণ্ডে ভারতবর্ষীয় হিন্দু-বাঙালির তথাকথিত সংস্কৃতি মূলত ক্ষমতাকেন্দ্রের ও তার চারপাশের সংস্কৃতি। মানে, ঐ কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী হাওড়া-হুগলি-চব্বিশ পরগণার সংস্কৃতি। সুতরাং গুনসুঁচ নিয়ে ধেয়েছেন ওই ক্ষমতাকেন্দ্রটিকে বেঁধবার জন্য।

    উপন্যাস শুরু হচ্ছে একটা সন্ত্রাস দিয়ে, মলয়ের এটা অমোঘ টেকনিক, ----- পাঠকের সামনে সন্ত্রাস ঘটিয়ে, তাকে তার মধ্যে হিঁচড়ে ঢুকিয়ে সন্ত্রস্ত করে, সন্ত্রাসের বিভীষিকা মেলে ধরা। বঙ্গ-কালচারের বর্তমান হাল বোঝাতে মলয় হাওড়া জেলার ভোটবাগানের লোহার কাবাড়িখানা, নদিয়া জেলার কালীগঞ্জের কাঁসা-পেতলের ভাংরি, বিভিন্ন জেলার আলুর কোল্ড-স্টোরেজ মন্তাজ করে ফুটিয়ে বঙ্গভূবন একাকার করে ফেলেছেন। 'মুসলমান রাজার আমলে যেমন ছিল তালুকদার দফাদার পত্তনিদার তশিলদার মজুমদার হাওলাদার, এই আমাদের কালে হয়েচে পার্টিদার, আজগালকার জমিদার'। নমঃশূদ্রদের খুন ধর্ষণ বাড়িঘর জ্বালিয়ে যখন তাড়ানো হয়েছিল খুলনার মাইড়া গ্রাম থেকে, পঞ্চাশ সনে, যুবক ভবেশকাকা রাতারাতি পালিয়ে এসেছিল কচি ফুটফুটে সৎ বোনকে কোলে নিয়ে। পুরনো বাড়ির পাড়ায় ইউনাইটেড রিহ্যাবিলিটেশন কাউনসিলের 'আগুন-খেকো নেতা' ছিল ভবেশকাকা, যিনি বিধান রায় ট্রামের ভাড়া এক পয়সা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে ট্রামে আগুন ধরিয়ে দেন। তিরিশ বছর আগে আরামবাগি প্যাঁচে কংগ্রেসি আলুর দাম হঠাৎ বাড়লে, খাদ্য আন্দোলনের দিনগুলোয়, তুলকালাম করেছিলেন। দেশভাগের খেলাপে নারাবাজি করেছিলেন, 'হাতে পেলে জহোরলাল জিনহাকে চিবিয়ে পোস্তবাটা করে'।। সেই ভবেশ মণ্ডল আজ মোকররি আর চাকরান মিলিয়ে বাহান্ন বিঘে জমি আর একলাখ কুইন্টাল ক্ষমতাসম্পন্ন মোহতাজ হিমঘরের অংশীদার। যিশুর / লেখকের মন্তব্য : 'আজকাল গ্রামগুলোর সত্যের স্বামীত্ব ভবেশকাকাদের হাতে।' আর 'চাষির মুখের দিকে তাকালে সর্বস্বান্তের সংজ্ঞা টের পাওয়া যায়।'

    মলয় নিজেকে গদ্যকার সাব্যস্ত করতে আদৌ গল্প-উপন্যাসে আসেন নি। তবু, গোড়া থেকেই যেটা সচেতনভাবে করেছেন, গল্প-বানানোর প্রথাগত টেকনিক ও সিদ্ধ নিয়মগুলোকে বানচাল করে বাংলার চলে-আসা মূল সাহিত্যধারাকে একেবারে অস্বীকার করার চেষ্টা। ভাষার ক্ষেত্রেও মিথ, দুয়ো শব্দকলাপ ও পড়িয়ে-নেওয়ার যাবতীয় সরঞ্জাম ইস্তেমাল। এবং বিষয় পুরোপুরি অধীত, সংপৃক্ত, যেন রিচার্ডস ওয়ার্ক পড়ছি। যেমন, 'ডুবজলে', 'জলাঞ্জলি' আর 'নামগন্ধ' ---- এই ট্রিলজিতে মলয় এক-গোছের চাকরির জিগির এনেছেন, সেটা হল, টাটকা আর পচা নোট আলাদা করা, একশোটা নোটের প্যাকেট তৈরি করা, এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, যেন, 'অর্থনীতির স্নাতক হবার এই-ই পরিণাম। অমন বিতিকিচ্ছিরি কায়িক শ্রম করবার জন্যে ওই অফিসটা চেয়েছিল অর্থনীতি গণিত কমার্সে ভালো নম্বর প্রাপক স্নাতক।' অন্যদিকে, আজন্ম শহরবাসী মলয় কীভাবে পশ্চিমবাংলার গ্রামাঞ্চলে পরিব্যাপ্ত রাজনীতি, অর্থনীতি, দুর্নীতি আর কালচার জরিপ করেছেন তা 'নামগন্ধে' পড়ে থ মেরে যায় পাঠক। 'এই ভেবে যে কী করে পারেন! রীতিমত 'আলু-সমাজ-নাম'গুলোর গন্ধতালাশ। প্রান্ত গন্ধ।' কাহিনী বা নাটক সেখানে ন্যূন, আগেই বলেছি, বরং তা ঘনিয়ে ওঠার সম্ভবনা দেখা দিলে মলয় তা নিরাসক্ত ও নির্মোহ মনে ভেঙে দিয়েছেন। অন্বেষণের মেধা প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে পাতায়-পাতায়, বিশেষত উপন্যাসের শেষ দিকটা মার্ভেলাস। খোদ মলয়ের জীবন যেমন, উপন্যাসও তেমনি ----- জীবনেরই, অথচ প্রথানুগতের বাইরে। জীবনেরই ছোট ছোট খণ্ড, জীবনের সমাহার যেন, সম্পূরক। যেমন একযুগ পর ভবেশকাকার।বোন খুশিদিকে দেখে অপ্রত্যাশিত ধাক্কায় নির্বাক আনন্দে ছারখার হয়েছে যিশু। 'পঞ্চাশ বছরের একজন বালিকাকে কাছে পাবার ক্ষমতাকে দুর্জয় করে তুলতে, উঠে বসেছিল যিশু।' ভোগদৃশ্যটা অবিস্মরণীয় ----- 'প্রশ্রয়প্রাপ্ত যিশু গনগনে ঠোঁট বুলায়, রুদ্ধশ্বাস, ত্রস্ত। সিনেমা দেখে, টিভি দেখে, উপন্যাস পড়ে মানুষ-মানুষীর যৌনতার বোধ কলুষিত হয়ে গেছে, সর্বজনীন হয়ে গেছে। খুশিদির জৈব-প্রতিদান, বোঝা যাচ্ছে, সেই অভিজ্ঞতায় নিষিক্ত নয়। থুতনির টোল কাঁপিয়ে, ফুঁপিয়ে ওঠে খুশিদি; বলল, আয়, ভেতরের ঘরে চল যিশকা।'

    আর, যেজন্য এই উপন্যাসের জিগির। মলয়ের লক্ষ্য গপ্পো বলা নয়, উপন্যাস গড়া নয় ---- ভাষা নির্মাণ। যেন, বাংলা গদ্যকে সশক্ত বনেদ পাইয়ে দিতেই তুখোড় কবিতাবাজ মলয় গদ্যের বাদাড়ে এসেছেন। গদ্য, যা বাঙালির যতিচিহ্ন। সমস্ত আবেগময়তাকে জোর ধাক্কা মেরে, থুয়ে রেখে, বাংলা গদ্যভাষাকে আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে মলয় মরিয়া। অন্তত নামগন্ধ বাবদ আমার স্বতোচ্ছ্বাস মারহাবা।

     

     


     

  • s | ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:১০735246
  • শিবব্রত দেওয়ানজী : যাঁকে আমরা ভুলে গেছি
    ...............................................................
    সমরেন্দ্র বিশ্বাস লিখেছেন :
    বঙ্গ ও বহির্বঙ্গে থেকে যারা নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করেন কিংবা লিটল ম্যাগাজিন বের করেন, তাদের অনেকের কাছেই শিবব্রত দেওয়ানজী একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব।
    শিবব্রত দেওয়ানজীর জীবনে্র ষাট বছরেরও বেশী সময় অতিবাহিত হয় অধুনা ছত্তিশগড়ের ভিলাই শিল্প শহরে। ভিলাইতে পদার্পনের পর ১৯৫৭ সালে থেকেই তিনি মধ্যপ্রদেশের রুখাশুখা জমিতে সাহিত্যের তাগিদে অন্যান্য বাঙ্গালীদের সঙ্গে মিলে মিশে শুরু করেন নানাবিধ সাহিত্যচর্চা, ঘরোয়া সাহিত্য-আড্ডা। আমৃত্যু তিনি ছিলেন ‘মধ্যবলয়’ পত্রিকার সম্পাদক ও ভিলাই বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্থার একজন মূল সংগঠক। বহির্বঙ্গে তিনি ছিলেন বহু মানুষের সাহিত্য চর্চার প্রেরণা! যদিও শেষের কিছু দিন তিনি শ্রবণজনিত সমস্যা ও নানান শারীরিক কারণে অসুস্থ ছিলেন। অবশেষে আমাদের সকলের এই প্রিয় মানুষটি প্রয়াত হন ২০২০র সাতই মে তারিখে।
    শিবব্রত দেওয়ানজীর সাহিত্য জীবনের ইতিহাস অনেকটাই দীর্ঘ। তার উদ্যোগে ভিলাইতে ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত হয় হাতে লেখা পত্রিকা ‘অংকুর’। কয়েকজন মিলে গড়ে তোলেন ভিলাই ‘বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্থা’। প্রকাশিত হয় ছাপা পত্রিকা ‘অংকুর’, সম্মিলিত কবিতা সংকলন ‘ইস্পাতের সুর’, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ (১৯৭৩), ‘আনন্দধারা’, ‘সংস্কৃতি’-পত্রিকা ইত্যাদি। অবশেষে প্রকাশিত হয় ‘মধ্যবলয়’ পত্রিকা, যারও তিনি আমৃত্যু সম্পাদক ছিলেন। তার সংগ্রহে আছে ১৮টি বই – গদ্য, কবিতা ও সম্পাদিত গ্রন্থ। তার জীবনের শেষতম গ্রন্থ(২০১৯ সাল)- ইংরেজী ও হিন্দিতে অনূদিত তার কবিতাগুলোর একটি সংকলন, যা কিনা অ-বঙ্গভাষীদের জন্যে সংকলিত হয়েছিল।
    শিবব্রত দেওয়ানজীর জন্ম ৭ই এপ্রিল, ১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দ; অবিভক্ত ভারতের ব্রহ্মদেশের রেঙ্গুনে। অল্প বয়সেই তার বাবা মারা যান। এখানে থাকতেই তিনি দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যা তিনি লিখে গেছেন তার আত্মকথায়। এখানেই শৈশবের পাঁচ-পাঁচটা বছর কাটিয়ে তিনি সপরিবারে চলে এসেছিলেন চট্টগ্রামে, যা কিনা অধুনা বাংলাদেশে।
    চট্টগ্রামের গ্রামীন পরিবেশেই তার বড় হয়ে ওঠা। এখানে থাকতেই তিনি শৈশবে দেখেছিলেন ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ, ১৯৪৬-এর জাতিদাঙ্গা, ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা ও দেশভাগ। এখনেই হাই স্কুলে থাকতে শুরু হয় তার কবিতা ও সাহিত্যচর্চা। তার চোখের সামনেই তখন ঘটেছিল ১৯৫২র ভাষা আন্দোলন, স্কুলের ছাত্র হিসেবে তাতে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
    এরপর ১৯৫৪ সালে তারা সপরিবারে পূর্ব পাকিস্থান ছেড়ে ভারতে চলে আসেন। উঠেছিলেন বেলঘরিয়ার কাছে এক আত্মীয়ের বাড়ীতে। তখন থেকেই শুরু হইয়েছিল বেঁচে থাকার লড়াই। ছাত্র পড়ানো, এদিক ওদিকে চাকুরীর চেষ্টা। ছোটো খাটো কিছু আংশিক সময়ের বা অস্থায়ী ধরণের জীবিকা। কিছু দিন তিনি থেকেছিলেন ঢাকুরিয়া লেকের কাছে রিফিউজি ক্যাম্পে। অবশেষে তার এক আত্মীয়ের সূত্র ধরে তিনি চলে আসেন মধ্যপ্রদেশে(তখনও এ অঞ্চলটার নাম ছত্তিশগড় হয় নি)। ১৯৫৬ সালে ভিলাই ইস্পাতের একটা ছোট অ্যান্সিলিয়ারী সংস্থায় তার জন্যে অস্থায়ী চাকুরীর জোগাড় হয়ে গেল। এর কিছু দিন পরেই পরে তিনি অস্থায়ী ভাবে ঢোকেন সরকারী ভিলাই ইস্পাত কারখানায়; এখানেই থাকতে থাকতেই ১৯৬১ সালে তার চাকুরীটা স্থায়ী হয়। ছিন্নমূল রিফিউজী থেকে সরকারী সংস্থার স্থায়ী চাকুরী – এই নিয়েই শিবব্রত দেওয়ানজীর জীবনের প্রথম দিকটা ছিল বেশ সংঘর্ষময়!
    ১৯৫৭ সাল থেকেই শিবব্রত দেওয়ানজী আরো কিছু উৎসাহী বাঙ্গালীদের সাথে মিলে রুখাশুখা, অনুর্বর, নির্মীয়মান একটি শিল্পশহর ভিলাইতে শুরু করেন বাংলা সাহিত্য চর্চার একটা ক্ষীণ প্রয়াস। সাহিত্যের এই ক্ষীণ ধারাকে উল্লেখযোগ্য স্রোতে পরিণত করতে যে মানুষটির কথা সর্বাগ্রে সবাই মনে রাখবে, তিনি এই মানুষটি।
    শিবব্রত দেওয়ানজী লিটিল ম্যাগাজিনের সম্পাদক, তিনি কবি, একই সঙ্গে তিনি সংগঠক, লেখক, নিবন্ধকার, সংকলক। তার নিজস্ব সাতটি কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়াও তার লেখা উল্লেখযোগ্য তথ্যমূলক গ্রন্থগুলোর মধ্যে আছে ‘স্মৃতির মিছিলে চোখে দেখা ছত্তিশগড়’ ও ‘ভিলাইয়ে বাংলা সাহিত্য চর্চার ইতিহাস’। যৌথ ভাবে ভিলাই থেকে তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘বহির্বঙ্গের লেখক অভিধান’ ও ‘সারা ভারত বাংলা কবিতা সংকলন’। তার লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘মুকুট বিহীন লেখকের আত্মকথা’টিও খুব মনোগ্রাহী ও ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেওয়ানজী দাদার বেশ কিছু বাংলা কবিতার হিন্দী/ইংরেজীতে অনুবাদ একটি গ্রন্থের আকারে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৯ সালে।
    বিভিন্ন ভাবে তার সাথে যোগাযোগ ছিল বিভিন্ন সাহিত্যিক ও বিদগ্ধজনের। যেমন বিষ্ণু দে, বিমল চন্দ্র ঘোষ, দেবকুমার বসু, দক্ষিণারঞ্জন বসু, কবিরুল ইসলাম, শুদ্ধসত্ত্ব বসু, গজেন্দ্র কুমার ঘোষ, অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়, নির্মল বসাক, অর্ধেন্দু চক্রবর্তী, সুবিমল বসাক, নারায়ণ মুখোপাধ্যায়, নব কুমার শীল, ডঃ উত্তম দাশ, রবীন সুর, মঞ্জুষ দাশগুপ্ত, সামসুল হক, যশোধরা রায় চৌধুরী, কিরণ শঙ্কর মৈত্র, বুদ্ধদেব গুহ, অজিত পাণ্ডে, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ও আরো অনেকেই। শিবব্রত দেওয়ানজীকে উদ্দেশ্য করে লেখা এই সব মাননীয়ের চিঠিগুলো অনেক তথ্য ও ঘটনার সাক্ষী। এই সব চিঠিগুলো সংকলিত হয়েছে শ্রী দেওয়ানজী প্রণীত ‘সুধী জনের সান্নিধ্য ও সুখ স্মৃতি কথা’ শীর্ষক স্মৃতিমূলক গ্রন্থে।
    তিনি যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের সাথে। সম্মানিত ও পুরস্কৃত হয়েছেন বহুবার এবং বিভিন্ন সংস্থার দ্বারা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইন্ডিয়ান প্রেস কাউন্সিল (ভোপাল), নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন, পি ই এন (কোলকাতা), ছত্তিশগড় বাংলা একাডেমী, কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরী ও গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ মুসলিম সাহিত্য সমাজ (ঢাকা, বাংলাদেশ) ইত্যাদি।
    তার ঘরটাই বই পত্তর ও ম্যাগাজিনের একটা বিশাল লাইব্রেরী! আমরা দেখেছি, নিজের টেবিল চেয়ারে তিনি বসে আছেন। একান্তে লিখে চলেছেন। অথবা এক মনে বই পড়ছেন। টেবিলে একগুচ্ছ ডাকে আসা চিঠি। না-লেখা খাম বা পোষ্টকার্ড- তিনি চিঠি লিখবেন। কখনো কখনো দেখেছি তিনি ভীষণ ব্যস্ত। সামনেই ‘মধ্যবলয়’ পত্রিকা বেরোবে- ঘরে বসে ফোন করছেন, কাকে দিয়ে কি লেখাতে হবে, কার কার থেকে লেখা নিতে হবে। পত্রিকার জন্যে প্রেসে পয়সা বাকী। এদিক ওদিক ঘুরছেন- কী করে দুটো পয়সা উঠবে।
    তাঁর তাগাদায় ভিলাইতে অনেক সাহিত্যসভা হয়েছে। সর্ব ভারতীয় স্তরের সাহিত্য-অনুষ্ঠান হয়েছে। তাঁর অনুপ্রেরণায় বয়স্ক অনেকে নতুন করে সাহিত্য-চর্চা শুরু করেছেন ভিলাইতে। ভিন-প্রদেশের সাহিত্যিক কবি সংস্কৃতিমনষ্ক গুণিজনেরা যোগাযোগ রেখেছেন মূল বাংলার বাইরে পড়ে থাকা এক শিল্পশহর ভিলাইএর সাথে। এ জন্যেই বলা যেতে পারে, ভিলাইএর লোহা-ঘেরা রূঢ় ভূমির সাহিত্যের ফুল বাগিচায় তিনি ছিলেন এক ক্লান্তিহীন পরিচর্যাকারী, একনিষ্ঠ অভিভাবক! অনেক দুঃখ জাগিয়ে শেষ হয়ে গেল একটা যুগ! অগণিত বন্ধু-বান্ধব, সাহিত্য অনুরাগী, নিজের দুই ছেলের সংসার, আত্মীয় স্বজন- এদের সবাইকে কাঁদিয়ে বাইশে শ্রাবণ, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু দিনেই, (৭ই আগস্ট- ২০২০) তিনি পাড়ি দিলেন মহাপ্রয়াণের পথে! তিনি আত্মজীবনীতে নিজেকে বলেছিলেন ‘মুকুটহীন লেখক’! আসলে তিনি ছিলেন ভিলাই তথা বহির্বঙ্গের বাংলা সাহিত্যের লেখকদের অন্যতম গর্বের মুকুট।
    1 জন-এর একটি ছবি হতে পারে
     
     
     
     
     
     
     
     
     
  • s | ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:১৩735247
  • যাঁদের আমরা ভুলে গেছি
    .......................................................
    অদ্রীশ বিশ্বাসের আত্মহত্যা
    .
    হৃৎপিণ্ডে ওঠেনি কি দ্রিদিম দ্রিদিম দ্রিম দ্রিম
    যখন আকাশের ইস্পাতে গিঁট বাঁধছিলে
    দেখে নিচ্ছিলে গিঁট শক্ত হলো কিনা
    পায়ের শিরাগুলো তাদের কুয়োর দড়ি দিয়ে রক্ত তো পাঠাচ্ছিল
    তোমার হৃৎপিণ্ডের দিকে, ভালভ খুলে এবং বন্ধ করে
    ওই দ্রিদিম দ্রিদিম দ্রিম দ্রিম শুনে তাড়া পড়ে গিয়েছিল
    তোমার শরীর জুড়ে, অথচ তুমি বরফের তৈরি মাথায়
    জানি না কবে কোন দিন কখন নির্ণয় নিয়ে ফেলেছিলে
    আকাশের হুক থেকে ঝুলে পড়ে, ঝুলে পড়ে আত্মহত্যা করে নেবে
    শেষ প্রশ্বাসের সঙ্গে শেষ বীর্য ফোঁটা ঝরেও ঝরবে না
    কিছুটা হদিশ কি পাইনিকো ? পেয়ে তো ছিলুম–
    বলেও ছিলুম, এ কী করছো অদ্রীশ তুমি, উত্তর দিলে না
    নারীও পুরুষের মতো জড়িয়ে ধরতে পারে, ধরে, জানাই ছিল না
    আমি তো জানোই, নারীদেরই জড়িয়ে ধরেছি চিরকাল
    পুরুষকে জড়িয়ে ধরার কথা ভাবলেই বিরক্তি ধরে, বমি পায়
    মনে হয় রাস্তাছাপ রাজনীতি শরীরে আশ্রয় নিতে এলো
    এও বলেছিলে তুমি, চিরকাল মুক্তযৌনতার পক্ষে
    রজনীশ-আশ্রমের যৌনতার খেলা সমর্থন করো, সম্পর্কের ব্যাগাটেলি
    তোমার যৌনজীবনের কথা জানতে চাইলে তবে লজ্জা পেয়েছিলে কেন
    ইউরোপে গিয়ে বিদেশিনী প্রেম করেছিলে কিনা, রোমান হলিডে,
    জুলিয়েট, জাঁ দুভাল, তার কোনো উত্তর দাওনি তো
    তোমাকে বুঝতে পারা ক্রমশ জটিলতর করে দিয়ে তুমি
    ফেলে গেলে বুদ্ধদেব বসুর উপহার দেয়া মিমিকে ১৯৬৫ সালে
    লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি সম্পাদিত সিটি লাইটস জার্নালের দ্বিতীয় খণ্ডটি
    যাতে হাংরিদের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল, হাওয়ার্ড ম্যাককর্ডের
    বিদ্যায়তনিক ভূমিকাটিসহ, ফুটপাথ থেকে কেনার সময়ে
    হৃৎপিণ্ডে ওঠেনি কি দ্রিদিম দ্রিদিম দ্রিম দ্রিম
    তোমার কাছেই জানলুম, জীবনানন্দের মেয়ে মঞ্জুশ্রীর চাকরি গিয়েছিল
    সাউথ পয়েন্ট থেকে, মধুসূদন সান্যালের সাথে প্রেমের কারণে
    বলেছিলে তুমি, যে বিদ্রোহী সে তো সমাজবিহীন, তার কেউ নেই
    তার অদ্রীশ আছে, মলয়ের প্রথম সাক্ষাৎকার তুমি নিয়েছিলে
    যখন কেউই পাত্তা দিতে চায়নি আমাকে, আমার প্রবন্ধগ্রন্হের
    ভূমিকাও লিখে দিয়েছিলে, জানি না কখন কবে প্রৌঢ় হয়ে গেলে
    সংবাদপত্রে পড়লুম, যখন আকাশের খুঁটি থেকে ঝুলছিলে, ঘরে ছিল
    আলো, নাকি অন্ধকার ঘরে তুমি শ্লেষ হাসি ঠোঁটে নিয়ে
    এনজয় করেছো প্রিয় একাকীত্ব ; তখনও কি নিজেকে নিজে নিঃশব্দে
    বলছিলে : এই বাংলায় দুইটি জিনিস আর ফিরবে না কোনোদিন :
    সুভাষচন্দ্র বসু আর সিপিএম। মার্কস বা লানিন নয়, স্তালিনও নয়
    মাও বা ফিদেল কাস্ত্রো নয়, কেবল সিপিএম ক্যাডারিত হাড়গিলে লোকেদের
    ঘেন্না করে গেছো, তুমি তো প্যারিস রোম ফ্লোরেন্স ভেনিস ব্রিটেনে গিয়েছিলে
    তবু তারা রাস্তায় তোমাকে ফেলে রায়গঞ্জে থেঁতো করেছিল
    যাদবপুরের চারতলা বাড়ি থেকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে গিয়ে পাগলাগারদে
    ইলেকট্রিক শক দিয়েছিল, অথচ তুমি তো নিজেই বিনয় মজুমদারকে
    হাসপাতালে দেখাশোনার ভার নিয়েছিলে, বিনয় মজুমদারের বউ রাধা
    আর ছেলে কেলোকে সোনাগাছি গিয়ে খুঁজে-খুঁজে ছবি তুলে এনেছিলে
    অর্ঘ্য দত্তবক্সির বইয়ের মলাটেতে দেখেছি তাদের, সত্যি বলতে কি
    কয় দিন কয় রাত ঝুলেছো নিজের ঘরে, তারপর পিস হেভেনের শীতাতপে নয়
    কাটাপুকুর মর্গে তিন দিন পড়েছিলে, বুক চিরে ব্যবচ্ছেদ হয়েছিল ?
    ডাক্তারেরা পেয়েছিল কিছু ? জমাট বেঁধে যাওয়া দ্রিদিম দ্রিদিম দ্রিম দ্রিম
    জানি না। শুনিনিকো। দেহেতে পোশাক ছিল ? কোন পোশাক ?
    লাশকাটা ঘরে ? চোখ আর বন্ধ করোনিকো, সম্ভবই ছিল না
    সবুজ প্লাস্টিকে মোড়া, ফুল নেই, রজনীগন্ধার রিদ নেই
    সাজুগুজু সুন্দরীরা এসে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়নিকো তোমার মরদেহ ঘিরে
    কেওড়াতলায় উল্টো বন্দুক করে প্রতিষ্ঠানের সেলামি পাওনি তা জানি
    নন্দন চত্বরে প্রতিষ্ঠানের মোসাহেবদের মতো শোয়ানো হয়নি দেহ
    তোমার প্রিয় সন্দীপন ঘুরতো তো বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পিছনে পিছনে
    জিগ্যেস করোনি তাঁকে সিপিএম কেন তোমাকে টার্গেট করেছিল !
    আশে পাশে আরও কয়েকজনের শব ছিল, ওঠেনি কি দ্রিদিম দ্রিদিম দ্রিম দ্রিম
    দাদা নকশাল বলে শ্রীরামপুরের বাড়িতে হামলা করেছিল, তোমার কথায়
    সেই লোকগুলো যারা বাংলার রেনেসাঁকে ধ্বংস করে গড়িয়ার মোড়ে নেচেছিল
    বটতলা ফিরিয়ে আনলে তুমি গবেষণা করে, ভিক্টোরিয় বিদেশিরা যাকে
    অশ্লীল ছাপ দিয়ে আদিগঙ্গার পাঁকে ছুঁড়ে ফেলেছিল
    আর কমলকুমারের রেডবুক, ১৮৬৮ সালে প্রকাশিত প্রথম বাঙালি মহিলার
    লেখা উপন্যাস ‘মনোত্তমা’ খুঁজে পেয়েছিল ব্রিটিশ লাইব্রেরির তাকে অযত্নে রাখা
    তখন হৃৎপিণ্ডে ওঠেনি কি দ্রিদিম দ্রিদিম দ্রিম দ্রিম
    যেমন প্রথমবার প্রেসিডেন্সির প্রথম বছরে ঝালমুড়ি খেতে খেতে
    প্রিন্সেপ ঘাটে, ভিক্টোরিয়ায়, ক্যানিঙের ট্রেনে, গঙ্গার খেয়া নিয়ে এপার-ওপার
    মা ‘লীলাবতী’কে নিয়ে বই লিখে হয়তো ভেবেছিলে পৃথিবীতে কাজ সাঙ্গ হলো
    জানবো কেমন করে বলো, এই তো সেদিন ১৯৬৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর
    জন্মেছিলে তুমি, মৃত্যুর দিনটাকে আকাশের খুূঁটিকে বলে চলে গেলে
    কেবল এটুকু জানি ২০১৭ সালে ১৬ই জুন কেওড়াতলার শ্মশানে প্রাঙ্গনে
    ডেডবডি ক্যারিয়ার সার্ভিস গাড়িতে গোপনে শুয়ে গন্তব্যে চলে গেলে
    পাখিরা কোথায় গিয়ে মারা যায় জানতে চেয়েছেন অরুন্ধতী রায়
    তিমিমাছ বুড়ো হয় মারা যায়, রুই ও কাৎলা বুড়ো হয়ে মারা যায়
    মারা গেলে তাদের গল্পগুলো জলের তলায় চাপা পড়ে থাকে–
    কতো কাজ বাকি রয়ে গেল, সেসব প্রজেক্টের কেউই কিচ্ছু জানে না
    যাকিছু বহুদিন সযত্নে সংগ্রহ করেছিলে সবই ফালতু মনে হলো
    যা জরুরি মনে হলো তা ওই এক ঝটকায় দ্রিদিম দ্রিদিম দ্রিম দ্রিম
    বন্ধ করে, নিঃশব্দে অট্টহাসি হেসে, আত্মনিধন করে ফেলা…
    1 জন এবং দাঁড়ানো-এর একটি ছবি হতে পারে
     
     
     
     
     
     
     
     
      •  
  • g | ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:১৫735248
  • জীবনানন্দকে নিয়ে ফিল্ম আর মাল্যবান
    মাল্যবান সম্পর্কে যে দু'একটি কথা আমি জানি
    গৌতম মিত্র
    নিজের অজান্তে, তিলতিল করে, প্রথমে মুনিয়া, তারপর শোভনা ও শেষে লাবণ্যর দ্বারা নিষ্পেষিত, ব্যবহৃত ও প্রত্যাখ্যাত হতে হতে উৎপলা চরিত্রটি গড়ে তুলেছেন! বিস্মিত হয়ে একটি গল্পে আমরা দেখি,একজন মহিলাকে কীভাবে সামান্য লুচি-মাংসের আস্বাদ, ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া আসন্ন যৌনতার আস্বাদকে ভুলিয়ে দেয়।জীবনানন্দর মহিলারা প্যাসিভ না অ্যাকটিভ এটা নিয়েও অনেক ভেবেছি। যেমন 'গ্রাম শহরের গল্প'-এ শচীর আগ্রাসী ভূমিকার বিপরীতে নায়কের মনে হয়,যা একদিন উন্মুক্ত প্রান্তরে হয়েছিল তা এই 'সোফা'-তে সম্ভব নয়!
    মাল্যবান বলছে, স্বপ্নের কী জানেন ফ্রয়েড? ভিয়েনা শহরে বসে গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে স্নায়ুরোগীদের স্বপ্ন নিয়ে কোনো স্বপ্নতত্ত্ব বানানো যায় না। চড়কের মাঠে কোনোদিন তো আর যাবেন না ফ্রয়েড সাহেব,স্বপ্নের আর কী বুঝবেন।কী ভয়ঙ্কর রকমের আধুনিক একজন চিন্তক জীবনানন্দ দাশ ভেবে অবাক হই।
    ঠিক এখানেই ফ্রয়েডেরই শিষ্য কার্ল গুস্তাভ ইয়ুংও ফ্রয়েডের থেকে আলাদা হয়ে যান।ইয়ুংও মনে করেন, শুধু ব্যক্তি নির্জ্ঞান নয়, স্বপ্নের ক্ষেত্রে যৌথ নির্জ্ঞানেরও একটি ইতিবাচক ভূমিকা আছে।আর সেজন্যই কি জীবনানন্দ চড়কের ইঙ্গিত করেন? ফলিত বিজ্ঞানের ফ্রয়েড থেকে তত্ত্ব বিজ্ঞানের ইয়ুং বেশি কাছের হবে জীবনানন্দর?
    আমাদের কাছে জীবনানন্দ দাশের উপন্যাসগুলো দুর্বোধ্য মনে হয়, একঘেয়ে লাগে, রিপিটেডিভ মনে হয়। একটু লক্ষ করে দেখবেন, জীবনানন্দ দাশের অনেক গল্প-উপন্যসের পটভূমি ঠিক যেন বাস্তব নয়, স্বপ্ন-স্বপ্ন। ডায়েরিতে আমরা দেখি, অনেকসময়ই কী স্বপ্ন দেখছেন তার এন্ট্রি করে রাখছেন। মোদ্দা কথা, জীবনানন্দ খুব সচেতন ভাবে স্বপ্ন নিয়ে ভাবছেন। এতে আমার কোনো সংশয় নেই।
    ফ্রয়েড পড়েছেন কোনো সন্দেহ নেই,জীবনানন্দ কী তবে ইয়ুংও পড়েছেন। সেয়ানা লোকটা যে আর কী কী করেছেন তার ঠিকুজি তৈরি করা এখনও শুরুই হয়নি! ইয়ুং তো তাঁর 'সাইকোলজি অ্যান্ড লিটারেচার' সন্দর্ভে বলেছেন:
    মহৎ লেখার গঠন-কাঠামো অনেকটা স্বপ্নের মতো।
    আসলে আমরা তো নিজেদের স্বপ্নকেও বিশ্লেষণ করিনা।করতে শিখিনি।নিজেদের স্বপ্নও তো আমাদের কাছে একপ্রকার দুর্বোধ্য। আমরা কীভাবে জীবনানন্দ দাশের চরিত্রের মনোপ্রকৃতি বা লিখন-বিশ্বকে বিশ্লেষণ করব! কিংবা ডায়েরির এন্ট্রিগুলি ধরে ধরে জীবনানন্দর মানসিক গঠনকে বুঝে নেব!
    জীবনানন্দের আত্মীয়স্বজনেরা, মা বাবা কাকা ভাই ও প্রেমিকাসহ কে নেই এই ছবিতে! আছেন শোভনা, জীবনানন্দ ও লাবণ্য। তিনজনকে ত্রিভূজ দিয়ে চিন্হিত করা হয়েছে
    'মাল্যবান'-এর কথাই যদি ধরি, আমাদের কী মনে হয় না, মাল্যবান তো বটেই, উৎপলাও জীবনানন্দ দাশেরই একটি সত্তা। ইয়ুং দেখিয়েছেন দৈহিক গ্রন্থিগত কারণে, পুরুষের নারী সত্তা ও নারীর পুরুষ সত্তা আছে। পুরুষের নারী সত্তাকে বলে এ্যানিমা ও নারীর পুরুষ সত্তাকে বলে এ্যানিমাস। এই এ্যানিমা ও এ্যানিমাসের নির্জ্ঞান প্রভাবে মনের গঠন তৈরি হয়।এছাড়া আছে ব্যক্তির নির্জ্ঞানের ছায়াছন্ন দিক ও নির্জ্ঞান মানসের আত্মন।
    তো 'মাল্যবান'-এ যে রূঢ়, কঠোর, নির্দয় ও মুখরা উৎপলাকে দেখি তা কি জীবনানন্দ দাশেরই আরেকটি সত্তা নয়!
    নিজের অজান্তে, তিলতিল করে, প্রথমে মুনিয়া, তারপর শোভনাও শেষে লাবণ্যর দ্বারা নিষ্পেষিত, ব্যবহৃত ও প্রত্যাখ্যাত হতে হতে উৎপলা চরিত্রটি গড়ে তুলেছেন!
    বিস্মিত হয়ে একটি গল্পে আমরা দেখি,একজন মহিলাকে কীভাবে সামান্য লুচি-মাংসের আস্বাদ, ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া আসন্ন যৌনতার আস্বাদকে ভুলিয়ে দেয়। জীবনানন্দর মহিলারা প্যাসিভ না অ্যাকটিভ এটা নিয়েও অনেক ভেবেছি। যেমন 'গ্রাম শহরের গল্প'-এ শচীর আগ্রাসী ভূমিকার বিপরীতে নায়কের মনে হয়, যা একদিন উন্মুক্ত প্রান্তরে হয়েছিল তা এই 'সোফা'-তে সম্ভব নয়!
    আসলে ব্যক্তি জীবনের মহিলারা যেমন মা কুসুমকুমারী, বোন সুচরিতা, মাসী হেমন্তবালা দেবী, মেয়ে মঞ্জুশ্রী, মুনিয়া, খুড়তুতো বোন শোভনা, স্ত্রী লাবণ্য, মাসতুতো বোন খুন্টি, শালী ছুটু কিংবা ব্রাহ্মসমাজের কিছু মহিলা শুধু নয়, নির্জ্ঞান মানসও জীবনানন্দের অরুণিমা সান্যাল, বনলতা সেন, শেফালিকা বোস, সুরঞ্জনা, উৎপলা, বিভা, কল্যাণীদের গড়ে তুলেছে।
    এত গূঢ় ও তির্যক উচ্চারণ বাংলা কবিতা আর কখনও দেখেছে, যেখানে এখন শুধু শেল্ফের চার্বাক ও ফ্রয়েড জানে, কবির প্রক্ষিপ্ত সত্তা সুজাতাকে ভালোবেসেছিল কিনা।নির্জ্ঞান এমনই গোঁয়ার,কোনও বিধিনিষেধ মানে না, তল্লাট তার দখলে নেওয়া চাই।
    জীবনানন্দ, হিরণ মিত্রের আঁকা
    সত্যিই তো! জীবনানন্দ দাশের মনে হবে, স্বপ্নের কী জানেন ফ্রয়েড! পিকাসোর আগে একজন পিকাসো ছিলেন, আইনস্টাইনের আগে একজন আইনস্টাইন, জীবনানন্দ দাশের আগে একজন জীবনানন্দই শুধু ছিলেন।
    ইতিহাস যেখান থেকে শুরু হয়।
    কুন্দেরার মতে সেই ইতিহাসের 'এইচ' বড়ো অক্ষরের।
    ২.
    জীবনানন্দ দাশ মনে করতেন জেমস জয়েসের 'ইউলিসিস'-এর নেপথ্যে প্রেরণার জায়গাটি প্রচলিত ধারণার হোমারের 'ওডিসি' নয় বরং দান্তের 'ইনফার্নো'।এত কনফিডেন্স কোথা থেকে পান জীবনানন্দ?
    কনফিডেন্স পান কেননা আমরা দেখি ১৯৩২-এর ডায়েরিতে লাবণ্যর সঙ্গে মলি ব্লুমের তুলনা করছেন। ১৯৫৩-এর ডায়েরিতে প্রিয় বইয়ের তালিকায় জয়েসের 'ফিনেগানস ওয়েক'-এর নাম।
    বাসে বাড়ি ফিরতে ফিরতে জীবনানন্দ তাঁর লেখায় বিদেশী লেখকদের প্রভাবের প্রসঙ্গে ভূমেন্দ্র গুহকে বলেছিলেন, 'যে-সব সাহচর্য তোমাকে ঘিরে থাকে,তারা তোমার চারিত্র্যও কোনো-না কোনো ভাবে কাটে-ছাঁটে; তুমি যে-সমাজে বাস করতে শুরু কর,তার কথ্যভাষার টানটাও তোমার জিভে এসে যায়। 'এমনই 'জিভে এসে যাওয়া' একটি বিষয় হয়তো 'ইউলিসিস'।
    যদি নিজের মতো করে একবার বুঝে নিতে চাই,জীবনানন্দের কোনো বইতে কি তবে 'ইউলিসিস'-এর কোনো প্রভাব আছে, তবে জীবনানন্দের যে বইটির কথা প্রথমেই মনে পড়বে তা 'মাল্যবান'।
    যখন ডায়েরি উদ্ধারের কাজ করছি, টানা প্রায় ৮ বছর,ডায়েরি লেখার ধরন দেখে কেন জানি না বারবার মনে হতো, নিছক প্রচলিত অর্থে ডায়েরি এটি নয়,একটা 'গ্র্যান্ড ন্যারিটিভ' বা 'গ্র্যান্ড ডিজাইন'-এর পরিকল্পনা এর পেছনে কাজ করছে।নয়তো কেন, কোনো কলমের বিজ্ঞাপন, টুথপেষ্টের বিজ্ঞাপন, কোন উড়োজাহাজ কোন সাগরে ভেঙে পড়লো, বাইবেলের অসংখ্য মিথ, বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন চরিত্র,কলকাতার দোকানের নাম,ভিখারি ও কুষ্ঠ রোগীকে নিয়ে স্টাডি,মেসের সহবাসীদের অনুপুঙ্খ বর্ণনা, আত্মীয়স্বজনদের চরিত্র বিশ্লেষণ, ঘড়ির কাটা বন্ধ হয়ে যাওয়া, জুতোর ফিতে ছিঁড়ে যাওয়া... এমন প্রায় ৩০০০০ এন্ট্রি কেউ ডায়েরিতে লিখে রাখবেন?
    সেসময় কত দিন যে আমার জাতীয় গ্রন্থাগারের সংবাদপত্র আর্কাইভে কেটেছে! প্রতিটি বিজ্ঞাপন, সংবাদ, বক্স নম্বর তারিখ অনুযায়ী মিলিয়ে দেখছি, ডায়েরিতে কীভাবে ট্রান্সফরমেশন হয়েছে খবরটি। আমার সম্প্রতি প্রকাশিত বইতে তার উদাহরণ আছে।তবে আমার সংগৃহীত খাতা ভর্তি তথ্যের কাছে তা সামান্য।
    জীবনানন্দ দাশের যেই সব শেয়ালেরা আট লাইনের কবিতা
    শুনেছি জেমস জয়েস 'ইউলিসিস' লিখতে গিয়ে সংগৃহীত তথ্যের প্রায় বেশির ভাগটাই বাতিল করেছিলেন বা তার পরিমাণ ছিল অকল্পনীয়।ভলটার বেনিয়ামিনের কথাও জানি। যখন 'আর্কেড প্রজেক্ট' লিখছেন, রোজ বাসে করে লাইব্রেরি গিয়ে বিভিন্ন তথ্য কার্ডে টুকে আনছেন। সেখানে কত মাইনর লেখকদের কথা।জীবনানন্দও হয়তো বিশ্বাস করতেন সভ্যতা কোনো মহাফেজখানায় থাকে না,থাকে রাস্তার ঠোঙায়-কাগজকুড়ানি বালকের ঝুলিতে।তাই লিখতে পারেন:
    'The morning began with that গালের মাংস খাওয়া দাঁত বের করা কুষ্ঠরোগিনী and ছালার চট গায়ে কুষ্টরোগী'।
    'ময়লা জামা and ধোপার জামা in reference to শীত'।
    'ধা করে কিছু হয় না--Telegram অবধি না,wait করতে হয়,খসড়া টাইপ রেজিস্ট্রার... '।
    'মাথার চুল বাছাচ্ছিল(Niren): not a sexual passion?এই জিনিসটা বউয়ের থেকে চাকর দিয়েই বোধ হয় ভালো হয়'।
    ৩.
    কোথায় মিল তবে জয়েসের 'ইউলিসিস'-এর সঙ্গে জীবনানন্দের 'মাল্যবান'-এর।আজ সেই বিষয়ে বিস্তারিত লিখব না। শুধু একটা কথা বলি। কারও কি কখনও মনে হয়েছে মাল্যবান নামটি কেন বেছে নিলেন জীবনানন্দ? বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন নাম কেউ কখনও আগে বা পরে ব্যবহার করেছেন? ১৯৪৮- এ লেখা উপন্যাসের এই নাম আমাদের বিস্মিত করে না?
    আমরা জানি জয়েসের 'ইউলিসিস' নামকরণের পেছনে, এলিয়ট যাকে বলেছেন 'পৌরণিক পদ্ধতি'(The Mythical Method)কাজ করেছে। হোমারের 'ওডিসি'র একটি প্রধান চরিত্র ওডেসিয়াস যার ল্যাটিন নাম ইউলিসিস। এই পৌরণিক চরিত্রটির সমান্তরালে জয়েস তাঁর নায়ক লিওপোল্ড ব্লুমকে রেখে কাহিনীর তাঁত বুনেছেন।সময় কাল চরিত্র কাহিনী-প্রবাহ এভাবেই গড়ে উঠেছে।
    জীবনানন্দ তবে কোথায় পেলেন মাল্যবান? আমরা জানি তিন ভাইয়ের কথা। মালী,সুমালী ও মাল্যবান। এই সুমালী রাবনের মামা।রামায়নের চরিত্র।সেখানে মাল্যবানের কথাও আছে।পাতালে থাকতেন।(তাই কি মাল্যবান নীচের ঘরে থাকে, মাঝেমধ্যে ওপরতলায় উৎপলার ঘরে যায়)। লোকটা জীবনানন্দ। এত সহজ তো নন।
    ভবভূতি একজন দলছুট নাট্যকার।অষ্টম শতকের।সমকালে যথেষ্ট নিন্দিত হয়েছেন তাঁর প্রথাবিরোধী লেখার জন্য।জীবনানন্দ উল্লেখিত 'বিদর্ভ' নগরে তাঁর বাস ছিল।তাঁর একটি নাটক 'মহাবীরচরিত'। তো সেই নাটকে মাল্যবান রাবণের মন্ত্রী। এবং যথেষ্ট মানসিক জটিলতা আছে এই মাল্যবান চরত্রটির।জীবনানন্দ নিশ্চয় 'মহাবীরচরিত' পড়েছেন।জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুবাদও করছেন এই নাটক।কে বলতে পারে 'মাল্যবান'-এর নেপথ্যে প্রেরণা হিসেবে 'মহাবীরচরিত' কাজ করেনি। জয়েসের মতো।
    মানুষটা ধুরন্ধর জীবনানন্দ দাশ। ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায় না লোকটার মতিগতি। মার্কেস যেমন আদরের 'গাবো', আমাদের জীবনানন্দ আদরের 'মিলু'। লোকটার অ্যামবিশন ছিল আকাশছোঁয়া। লিখছেন, শেক্সপিয়ার যা লিখতে পারেননি আমি তা লিখব।তাঁর ভাবনার ঘাট কোয়ান্টাম মেকানিক্স, প্রকৃতির আত্মঘাতী তত্ত্ব ও নক্ষত্র বিজ্ঞানে বাঁধা। চিন্তক ছিলেন মানুষটা।
    ফকনার জয়েস সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেছিলেন 'genius who was electrocuted by the divine fire'। জীবনানন্দ সম্পর্কে এই কথাটি তো আমিও বলতে চাই।
    ৪.
    মাল্যবান বইটা পড়তে পড়তে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। মুগ্ধতা ফুরোয় না। বারবার ফিরে আসি বইটির কাছে। একটি গ্রন্থের পরিসরে এত গোলকধাঁধা, গলিঘুঁজি ও ঠারেঠোরে কথা 'ইউলিসিস' বাদ দিলে অন্য কোনো বইতে পাই নি। দুটো শব্দের অন্তর্বর্তী শূন্যতা, নির্জ্ঞানের বর্ণমালা, গুহাবাসী একজন ভাষাশ্রমিকের সংলাপ বইটির পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়। একটি পৃষ্ঠা ওলটাতে যেন এক যুগ কেটে যায়। আমি চুপ করে বসে থাকি।
    ওপরের ঘরের বাথরুমে মাল্যবানকে স্নান করতে দেয় না উৎপলা। মাল্যবানকে স্নান করতে হবে বাড়ির অন্য মহিলাদের নজরের সামনে নীচের চৌবাচ্চায়। 'এক-গা লোম নিয়ে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে বৌ-ঝিদের আনাগোনা চোখ-মারা মুখ-টেপার ভেতর' স্নান করতে ঠিক জুত লাগছে না মাল্যবানের। যেন 'শিবলিঙ্গের কাক-স্নান হচ্ছে' উত্তরে উৎপলা বলে, 'তা হলে তুমি কি বলতে চাও দরজা জানলা বন্ধ ক'রে এক-হাত ঘোমটা টেনে তুমি ওপরের বাথরুমে গিয়ে ঢুকবে, আর মেয়েমানুষ হয়ে আমি নিচের চৌব্বাচায় যাব--ওপরের বারান্দায় ভিড় জমিয়ে দিয়ে ওদের মিনসেগুলোকে কামিখ্যে দেখিয়ে দিতে?'
    আমরা 'কামিখ্যে' আর 'শিবলিঙ্গের কাক-স্নান' শব্দদুটোর খাদের দিকে পা বাড়াই। কেননা এই অধ্যায়ে অতঃপর আমরা 'চৌবাচ্চার ছ্যাঁদার ন্যাতা খসিয়ে','খসাবেই তো','এক ফোঁটা জলের জন্য মেয়েমানুষের কাছে','বাসি জল খালাস','একটা পুকুর-ডোবা পেলেই ঝাঁপিয়ে জাপটে চান' ইত্যাদি শব্দ-খনি আবিস্কার করব। 'চৌবাচ্চা' কি যৌনতার প্রতীক নাকি মাল্যবানের নির্জ্ঞানের পাতালঘর?
    ফ্রয়েড নয় হয়তো ইয়ুং-কেই বেশি মান্যতা দিয়েছেন জীবনানন্দ দাশ। 'মাল্যবান'-এই তো আছে, 'স্বপ্নের কী জানেন ফ্রয়েড? 'ইয়ুং-এর মতে মানস(Psyche) ভৌতসত্তা(Physical Reality) থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এক স্বনিয়ন্ত্রিত সত্তা। আর এই সমগ্র মানসকে নির্জ্ঞান ও সংজ্ঞান এই দুই অংশে বিভাজন করা যায়। নির্জ্ঞানকে ইয়ুং আবার দুই অংশে ভাগ করেছেন। ব্যক্তি-নির্জ্ঞান (personal unconcious) ও জাতি- নির্জ্ঞান(racial unconscious)। 'মাল্যবান' যদি ব্যক্তি-নির্জ্ঞানের দৃষ্টান্ত হয় 'রূপসী বাংলা' তবে জাতি- নির্জ্ঞানের উন্মোচন হতে পারে। তবে আমার মনে হয় যতটা আলাদা বলা হচ্ছে ততটা আলাদা করা বুঝি সম্ভব নয়। দুই মেরুতে চলাচল হতেই পারে।
    সম্ভব নয় জেনেও ইয়ুং মানস-প্রকারের কতগুলো ভাগ করেছেন 'ব্যক্তি-আমি'(persona), 'গুপ্ত-আমি' (shadow), 'পরিপূরক-নারী' (anima), 'পরিপূরক-পুরুষ'(animus), প্রবীণ প্রাজ্ঞজন (old wise man), মাতৃকা(great mother), ও 'আত্মন'(self)।
    'মাল্যবান' উপন্যাসে মাল্যবান ভাবে, 'এ হচ্ছে উপচেতনার সঙ্গে চেতনার ঝগড়া,অবচেতনা ঘুমের দিকে টানে,মৃত্যুর দিকে; চেতনা অবহিত হতে বলে, ঢেলে সাজাতে বলে...'। অমরেশ সাইকেলে তালা লাগিয়ে দোতলায় উৎপলার ঘরে যায়।ওপরের ঘরে এস্রাজ বেজে গেছে,গান হয়ে গেছে, তারপর দেড়ঘন্টা চুপ মেরে আছে সব। অমরেশের সাইকেলটা খুব বেশি 'ঝিকঝিক চিকচিক' করছে? 'তালা খসিয়ে' সাইকেলটা নিয়ে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে মাল্যবানের। 'ছায়া যেমন সারাদিন দেহের আগে-পিছে ছুটে নাগাল পায় না 'দেহের,রাতের অন্ধকারে শরীরের সঙ্গে 'বিনিঃশেষে' মিশে যায়, তেমনিভাবে এসে পড়ে অমরেশ। অমরেশ কি তবে ইয়ুং কথিত 'গুপ্ত-আমি' বা ছায়া।
    নাকি মাল্যবান নিজেই সেই ছায়া। ছায়া তৈরি করে। তার চরিত্রের ঔদাসীন্যের, গুটিয়ে থাকার, ন্যাতানো স্বভাবের বিপরীতে তার অবদমিত প্রবল বর্হিমুখী যৌনচেতনার কাটাকুটি খেলায়? অমরেশের লম্বা চেহারায় 'ঠাঁট' আছে, তার আহিরিটোলার ঘাটে সাঁতার কাটা দেখতে দলবেঁধে 'ভদ্দরলোকের মেয়ে'রা যায়, 'বেশ্যেরা' যায়। অমরেশ রাত বারোটায় উৎপলার ঘর থেকে নেমে যাওয়ার পর উৎপলা মাল্যবানের মুখোমুখি হয়ে বলে,'না, না, আর বসতে পারছি না। দুটো পায়ের গিঁটে গিঁটে ব্যথা করছে'। সদ্য সমাপ্ত যৌনমিলনের এর চেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত কোনো মহিলা দিতে পারে কি!
    যেহেতু আমরা জীবনানন্দ বা মাল্যবানের চোখ দিয়ে উৎপলাকে দেখছি, এখানে যেমন জীবনানন্দের এ্যানিমা বা নারী সত্তা কাজ করেছে তেমনি আবার উৎপলার অন্তর্নিহিত এয়ানিমাস বা পুরুষ সত্তাও কাজ করেছে। 'মাল্যবান' উপন্যাসে ছড়িয়ে থাকা অজস্র উদাহরণ দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা যায়। জীবনানন্দ মাল্যবান ও উৎপলাকে যৌনকাতর করে গল্প শুনিয়ে। খুব বেশি জাগিয়ে দিয়েছে উৎপলাকে আজ, খুব বেশি নিজে জেগে পড়েছে মাল্যবান আজ। তো কী সেই গল্প? এক রূপসী যুবতীকে কবর দেওয়া হলে সন্ধ্যার পর একটি লোক মাটি খুঁড়ে শবদেহ চুরি করে। এত শবকাম (necrophilia)-এর গল্প! এহেন গল্প শুনে মাল্যবানকে উৎপলাকে যৌনকাতর হতে হচ্ছে? আর তা সহ্য করছে বাংলা ভাষা!
    'মাল্যবান'-এর পরতে পরতে এই কুয়াশা, হারিয়ে যাওয়া পথ, পথের ধারে খাদ। 'খড়খড়ে আগুন' হল মাল্যবানের বিবাহ আর 'অগ্নি-ডাইনি' হল মাল্যবানের স্ত্রী উৎপলা।খুব সহজ নয় জীবনানন্দ নামক ফাঁদ। একেকসময় মনে হয় জীবনানন্দ 'মাল্যবান' লিখছেন না মাল্যবান 'জীবনানন্দ'-কে লিখছেন। মাল্যবান কোনো মতেই জীবনানন্দের আত্মজীবনী নয়। লাবণ্য দাশের আশঙ্কার কোনো যুক্তি ছিল না। বাস্তবের সঙ্গে হুবহু মিল থাকলেও নয়। আসলে তো 'মাল্যবান'-এ বাস্তবে কিছু ঘটেই না বা যা ঘটে তা ছায়াআবছায়া।
    আসলে তো স্বপ্ন। ইয়ুং-এর স্বপ্ন। নিজস্ব স্বপ্ন। ফ্রয়েডের শিষ্য হয়েও ইয়ুং চ্যালেঞ্জ করেছিলেন ফ্রয়েডকে, জীবনানন্দ ফ্রয়েড পড়েই ফ্রয়েডকে বাতিল করছেন। জীবনানন্দ জানতেন ফ্রয়েড সাহেবের 'আত্মন'(self) আর আমাদের 'আত্মা' এক নয়। আমাদের একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে। আত্মার বিবর্তনের ইতিহাস।আছে যৌনতার নিজস্ব ইতিহাস।
    শোভনা
    গ্রাম মফস্বলের ১৩/১৪ বছরের মেয়েদের নিজস্ব একটা যৌনচেতনা গড়ে ওঠে যা কোনো 'হাইট রিপোর্ট' দিয়ে বা মিলেট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। রবীন্দ্রনাথের নিজের স্ত্রীর বয়স বা মেয়েদের কত বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছেন তা নিয়ে ভাবতে বসলে ফ্রয়েড সত্যিই কাজ করবে না।
    মনোবিদরা রে রে করে তেড়ে আসবেন, যদি বলি,'মাল্যবান' বাংলাভাষায় রচিত একটি অতি মূল্যবান মনঃসমীক্ষণের বই। তবে যাই হোক আমি মানি, আমার অতি প্রিয় একজন লেখকের মতো, বাংলাভাষার ১০০ টা শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের মধ্যে জীবনানন্দের সবগুলো উপন্যাস অন্তর্ভুক্ত হবে আর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ৫০টা উপন্যাসের মধ্যে 'মাল্যবান'।
    শেষে 'ইউলিসিস'- এর শেষ 'মাল্যবান'-এর শেষ পংক্তি পাশাপাশি রাখি।
    ...I yes to say yes my mountain flower and first I put my arms around him and yes and drew him down to me so he could feel my breasts all perfume yes and his heart was going like mad and yes I said yes I will yes.
    Ulysses
    James Joyce
    ...কোনোদিন ফুরুবে না শীত,রাত আমাদের ঘুম?
    ফুরুবে না।ফুরুবে না।
    কোনোদিন ফুরুবে না শীত, রাত,আমাদের ঘুম?
    না,না,ফুরুবে না।
    কোনোদিন ফুরুবে না শীত,রাত,আমাদের ঘুম?
    ফুরুবে না।ফুরুবে না।কোনোদিন--
    -মাল্যবান
    জীবনানন্দ দাশ
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
  • কৌশিক সরকার | ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:২১735249
  • জীবনানন্দ দাশের মতো কবিও এরকম তারিফের জন্য খুড়োকে বই পাঠাত কেন, আই ওয়ানডার? একটা কথারও কোনো মানে নেই। রবীন্দ্রনাথ লোকটা কত অসৎ! সারাজীবন গা বাঁচানো মিথ্যে কথা লিখেছে, ন্যূনতম ইনসাইট নেই, শত্রুরও কেউ এরকম প্রশংসা করে না। বাংলা সাহিত্যটাই শালার সুপারফিশিয়াল....
    টেক্সট-এর একটি ছবি হতে পারে
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
  • দেবজ্যোতি রায় | ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:২৪735250
  • ৬/৩/২০০৩ কবি শৈলেশ্বর ঘোষ আমাকে চিঠিতে লিখছেন,আপনার কবিতাগুলি ভাল হয়েছে --- কারও কারও মুখে একথা শুনতে পাচ্ছি --- আমার কাছে মনে হয়েছে "নতুন" --- নিজের একটা ভাষা আপনি পেতে চলেছেন। লিখুন,থেমে যাবেন না। আপনার চিঠিতে কবিসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার সমস্যার কথা লিখেছেন --- এটা সবচেয়ে বড় সংকট। যথার্থ কবি,শুরুই করে নিজের ভয়াবহ একাকীত্ব থেকে। আর ঐ একাকীত্বই তার শক্তি। ঐ শক্তিতেই সে নিজেরও পরীক্ষা নেয়। প্রেম,ভালবাসা,প্রেমিকা,স্ত্রী,বাবা মা বন্ধুবান্ধব সমাজ পৃথিবী --- সকলেরই আক্রোশ ঐ একার শক্তির প্রতি। পৃথিবী চায়,আপনি তার মত হবেন। দরকার হলে সবকিছু নির্মম ভাবে ত্যাগ করতে হয়। ত্যাগ করা অর্থ এই নয় যে আপনি এদের সংস্রবের বাইরে যাবেন। সম্ভব নয়। কারণ পৃথিবীর সর্বত্র এরাই পৃথিবী। রামকৃষ্ণের কথায় : পাঁকাল মাছের মত থাকতে হবে পাঁকের মধ্যে। পাঁক গায়ে লাগালে চলবে না। এটা তো অত্যন্ত সত্যি যে,আপনার কবিসত্তাকে যারা না বুঝেই ধ্বংস করতে চায়,তারা আপনার খুনি।..... মানুষ যে পৃথিবীতে স্বাধীন হয়ে জন্মেছিল,আজ সে এই স্মৃতি পর্যন্ত ভুলে গেছে। স্বাধীন জন্মের স্মৃতি ভুলিয়ে দেবার জন্য পৃথিবী মানুষের সামনে সাজিয়ে দিয়েছে হাজারটা ভোগের উপকরণ। কবিই সেই মানুষ যার মধ্যে স্বাধীনতার স্মৃতি ফিরে এসেছে --- তার লড়াই পৃথিবীর সংগে, --- সে স্বাধীনতার চেতনা দিয়ে মানুষকে আবার জাগিয়ে তুলতে চায়। যেহেতু মানুষ ভুলে গেছে তার নিজের প্রকৃত পরিচয়,তাই কবির উচ্চারিত শব্দে তার আতঙ্ক। তারা মনে করে কবি সভ্যতার শত্রু। হ্যাঁ,কবি অবশ্যই সভ্যতার শত্রু। কারণ সভ্যতাই মানুষকে তার স্বাধীন জন্মের স্মৃতি ভুলিয়ে দিয়েছে। এবং সবসময় সতর্ক হয়ে আছে,যাতে কোনভাবেই ঐ স্মৃতি কেউ জাগিয়ে দিতে না পারে।
    আপনার সম্ভাবনা আছে। লিখে যান। সংসার স্ত্রী পুত্র কন্যা প্রেম ভালবাসা সবেরই দরকার হয় কবির কারণ ওরা হলো মাছের যেমন জল তেমনি। কিন্তু এদের শেষ সত্য হিসাবে চেতনায় স্থান দিলেই কবির মৃত্যু।
    শৈলেশ্বর ঘোষ
     
     
     
     
     
     
     
    কমেন্ট করুন
     

    1টি কমেন্ট

     
     
    •  
       
       
  • | ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:২৬735251
  • । বাঙালি এখন সবকিছুই বিনামূল্যে পায়। এমপি থ্রি ওয়েবসাইটে গিয়ে হেমন্ত মুখার্জির সারাজীবনে গাওয়া সব গান বিনামূল্যে। ইউটিউবে ঢুকে সত্যজিতের সিনেমা বিনামূল্যে। পর্নসাইটে ঢুকে মিয়া খলিফার বুবস এবং ক্লিট বিনামূল্যে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ঢুকে সকালের খবরের কাগজ বিনামূল্যে। এমন কি বইগ্রুপে ঢুকে রবীন্দ্র রচনাবলী বা কালী সিঙ্গির মহাভারতেরও পিডিএফ চাইছে আজকের বাঙালি। এমতাবস্থায়, প্লিজ, আপনারা সাহিত্য পাঠক হিসাবে পতাকা তোলার বালবাজারিটা বন্ধ করুন। লেখকের অভাবে নয়, কেবলমাত্র পাঠকের অভাবেই বাংলা সাহিত্যের নাভিশ্বাস উঠছে। একজন লোক আগে ক্রেতা হবে, তবে একটা বইয়ের পাঠক। একজন আগে একটা লাইব্রেরির সদস্য হবে, তারপর একটা বইয়ের পাঠক। এর অন্যথা হলে বই প্রকাশিত হবে কোন মূলধনে? বাঙালি টাকা দিয়ে বই কেনাটাকে পয়সার অপচয় মনে করে। কেন? কারণ আমরা বাড়ির বাইরে পরে পরে পাঞ্জাবির রং চটে গেলে সেটা বাড়িতে পরি। পিরিয়ডের সময় খুব বেশি ব্লিডিং হলে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করি, কমে এলে পরিষ্কার ন্যাকড়া। এটা আমাদের সমাজ। বিনাপয়সায় বিষ দিলেও বাঙালি খেয়ে নেবে, কিন্তু পয়সা দিয়ে ওষুধ খেতে হলে তার ফেটে যায়। সাহিত্য জগত, এবং তথাকথিত মনস্বী পাঠকরাও ব্যতিক্রম নন। তাঁদের মূল্যবোধের পাশাপাশি বিনামূল্যবোধটাও কিছু কম নয়।।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন