আপনার মতামত         


সেই মেয়েটা ভেলভেলেটা (শেষ পর্ব)
দময়ন্তী





""একমুঠা মরণেরে জীবন বলে কি তবে, ------------''

কোচিং ক্লাসে পড়তে যাওয়াটা ছিল নিনিদের অন্যতম প্রিয় একটি ঘটনা। এখানেই জানা হয় মঞ্জিষ্ঠা নামক নর্তকী শুধু ভাল নাচেই না, দুর্দান্ত ভাল নাচায়ও। আপাতত নাকি অয়নের সাথে স্টেডি যাচ্ছে, কিন্তু তাতে মঞ্জিষ্ঠার বাবার প্রচন্ড আপত্তি। তিনি নাকি কলেজেও মাঝে মাঝে আসেন খোঁজ নিতে, বলা ভাল নজর রাখতে। ভদ্রলোক ধৈর্য্য হারিয়ে নাকি একদিন তুমুল চেঁচামেচি করেছেন। গোটা কলেজ ভেঙ্গে পড়ে মজা দেখেছে। মঞ্জিষ্ঠা অবশ্য একেবারে নির্বিকার। সন্দীপ বলে "দ্যাখ এই নর্তকীরা কিন্তু খুব ডেঞ্জু পাবলিক হয়। এরা বাসে ট্রেনে চড়তে চড়তেই কাপড়-জামা খুলে ফেলতে পারে।" নিনি, ঝুমা, কণিকা তেড়ে তর্ক করে, কিন্তু সন্দীপ আপন বিশ্বাসে অটল। তার সাথে গলা মেলায় লগা আর বাবিও। বাবিই সবচেয়ে বেশী আক্রোশ নিয়ে বলে। আরো অদ্ভুত হল নন্দিনী আর রত্নাও ওদের সাথেই গলা মেলায়। রাজগীর যাওয়া হল এক্সকার্শানে। দেখা গেল বুম্বা যেন একটু বেশীই খেয়াল রাখছে মঞ্জিষ্ঠার। নিনি আর চিন্ময়ী খুব মজা পায়, কিন্তু দীপান্বিতা বেশ চটে যায়।
তুই চটিস কেন রে দীপা?
না তোরা জানিস না এবারে বুম্বা ঠিক এ কে এমের নোটগুলো সব মঞ্জিকে দিয়ে দেবে।
যা: তা কেন দেবে? তাছাড়া ও-ও ডিপিসির কাছে পড়ে।
আরে তাই জন্যই তো ও বুম্বাকে পাকড়েছে। জানে স্যান্ডিকে কব্জা করতে পারবে না----
তা-ই হয়। দীপাকে ঠিক প্রমান করে বুম্বা মঞ্জিকে সব নোট দিয়ে দেয়, অনার্স শেষ করে ওরা ইউনি তে যায়।মঞ্জি নাচ ছেড়ে দেয়। অয়ন আউট আর বুম্বা ইন হয় মঞ্জিষ্ঠার জীবনে। ইউনি শেষ করে দুজনে বিয়েও করে, মঞ্জি চাকরী পায় এলাহাবাদে। বুম্বা গবেষনা শুরু করে কোলকাতায়। তারপরে কি যে হয়----- আচমকা একদিন নিনিরা শোনে বাবি, সসীম আর লগা এলাহাবাদে গেছে, বুম্বাকে কে বা কারা নাকি গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। কিভাবে? নাকি ও এলাহাবাদে গেছিল ছুটি নিয়ে। বি এইচ ইউ তে বাকী রিসার্চটা কন্টিনিউ করার ব্যবস্থা করতে। মঞ্জিষ্ঠা মা হবে শীগগির, তাই তাড়াহুড়ো। আরো শোনে মঞ্জি আর বুম্বা নাকি মঞ্জির বসের বাইকে যাচ্ছিল। তিনিই বাইক চালাচ্ছিলেন, বুম্বা মাঝখানে আর মঞ্জি একদম পেছনে। রাস্তায় কে বা কারা রাইফেল থেকে গুলি চালিয়েছে, বুম্বা ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। বাইক নাকি চলন্ত ছিল, অথচ সামনে পেছনের দুজনের কারোই কোনো আঘাত লাগে নি। বুম্বা ঠিক ৫ দিনের মধ্যে মারা যায়। তার কাছ থেকে কিছুই জানা যায় নি কয়েকটি অসংলগ্ন শব্দ ছাড়া। মঞ্জি কোলকাতায় ফিরে আসে, আসার পর , এমনকি, ছেলে হওয়ার পরও আর কোনোদিন শ্বশুরবাড়ীতে যায় নি, যদিও ওর বাড়ীর খুব কাছেই। কদিন আগেও বুম্বার বাবা বলতেন তিনি এর শোধ নেবেনই। কার শোধ, কিসের শোধ জানা নেই। তবে বাবিকে এক রাত্রে হাঠাৎ জ্ঞান ফিরে পেয়ে বুম্বা যা ২-১ টা কথা বলেছিল তার সাথে মেলালে একটা মিল পাওয়া যায়। স্যান্ডি শুধু বলে "দেখ আমি তোদের আগেই বলেছিলাম---"

চিন্ময়ী 'মা'তে দুর্দান্ত ভাল নম্বর পেয়েছিল, ওর বাবা ওকে প্রচন্ড মেরেছিলেন রেজাল্ট বেরোবার পর। ও কেন অত্রির থেকে কম পেয়েছে? এই গল্পটা কিন্তু সেই নিনিদের সময় এতটা প্রচলিত ছিল না--- মানে এই চোখবাঁধা প্রতিযোগীতা। চিন্ময়ীর বাবাকে বলা যেতে পারে যুগের তুলনায় বেশ অগ্রসর। অবিরত বকুনি আর মার খেয়ে খেয়ে মেয়েটা 'উ মা'তে সেরকম কিছু করতেই পারল না। পার্ট ওয়ানে একবার ড্রপ দিল। অনার্স শেষ করল খুব সাধারণভাবে, ভর্তি হল "এ এম আই ই" তে তে আর তারপর হঠাৎই একদিন নিজেকে মেরে ফেলল। সমস্ত মার্কশিট আর সার্টিফিকেট দলামোছড়া করে ফেলে দিয়েছিল পেছনের পুকুরে। জলে কিছু পড়ার আওয়াজ শুনে ওর বাবা নাকি জিগ্যেস করেছিলেন "কী পড়ল?" তাতে চিন্ময়ী উত্তর দিয়েছিল "এই কাগ্‌জপত্রগুলো আর লাগবে না তাই ফেলে দিলাম"। ও একটা চিঠি লিখে গেছিল যেটা ওর ভাই পুলিশ আসার আগেই সরিয়ে ফ্যালে। কি লিখেছিল ঐ চিঠিটাতে? কেউ জানে না। আর জোর করে ওকে বিয়ে দেবার চেষ্টাতেই ও নিজেকে মারে। বাড়ী থেকে বেড়িয়ে কোন হোস্টেলে চলে যেতেই পারত, তবে তাতে তো আর সারাজীবন ধরে চাপিয়ে দেওয়া জোরের গালে থাপ্পড় কষান যেত না।তবে শোনা গেছিল ওর বাবা নাকি খুব ঘটা করে ওর শ্রাদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।


"" ভেসে যায় ------ ভেসে যায় ----- ভেসে যায় কলসী------''

চিন্ময়ী বলেছিল নিনিকে কম্পিউটার শেখার কথা, মানে ও শিখবে তাই। তা ওর বদলে নিনিই শুরু করল শেখা। সে যেখানে শেখা, সে এক আজব চিড়িয়াখানা। দুই ভাই আর তাদের ঘরজামাইতে মিলে চালায় একটা ইন্সটিট্যুট। এরাই যথেষ্ট কম টাকা নিয়েও দু ব`ছরের মাথায় দিব্বি সালোয়ার চক্কোত্তির তত্ত্বাবধানে চালু একটা কম্পু শেখানোর মোটামুটি চকচকে গাড্ডায় চাকরী জুটিয়ে দিলে। নিনিকে সেই সক্কাল সক্কাল সাড়ে আটটার মধ্যে পৌঁছাতে হবে, আর এটা তো কলেজের অংশও নয়, কাজেই নির্বিকার সালোয়ার কামিজে সজ্জিত নিনির গমন প্রথমদিন। আর সেদিনই ঐ কেন্দ্র দেখভাল করবার দায়িত্বে থাকা অঙ্কের অধ্যাপকের নিনিকে "বাস্তবজ্ঞান" দান।
"দেখো, জান তো আমাদের কলেজের ঐতিহ্য।"
"আর তুমি শাড়ী না পরে এলে দেখবে তোমার চেয়ে বয়সে বড় ছাত্র রা তোমাকে মানতে চাইবে না।" (যেন শাড়ী পরলেই সবাই এক্কেরে সুবোধ বালক হয়ে যাবে আর কি)
"তবে তুমি রবিবারে সালোয়ার পরে এসো"। (রবিবারে সালোয়ারবাবু আসতেন না)
"তাছাড়া প্রপার ড্রেসে আসাটাও একটা শিক্ষা"। (বটেই তো)।
ঐ ৫০০ টাকার চাকরীটাই খুব খুব দরকার। এই সামান্য কারনে কি ওটা ছাড়া যায়? বরঙ ধীরেসুস্থে সেন্টারটা বদলে নেওয়া গেল। সেই যে দুইভাই মালিক--- বড়জন তো সর্বদাই দৌড়াচ্ছেন। নাকি ভীষণ ব্যস্ত। হঠাৎ হঠাৎ বিচিত্র সব প্রশ্ন অথবা আইডিয়া নিয়ে আসেন। ছোট ভাইটি নিনিকে বিশেষ পছন্দও করেন। যদিও সহপাঠী, ও পরে সহকর্মী ছেলেরা বলে উনি নাকি "মেয়ে"দেরই খুব পছন্দ করেন। তা নিনি দেখেছে উনি একটু কইয়ে বলিয়ে ছেলেমেয়েদের পছন্দ করেন। ঘরজামাইটি বেশ গায়ে পড়া। তার বাংলাভাষাটা অবশ্য নিনিদের খুচরো ব্রেকের খোরাক ছিল। তো সে যাকগে --- অনেক টাকা ছিল ইনভেস্ট করার মত-- তাতেই না "অরে ঘরজামাই বানাইসিল"।

কত ডিজাইনের যে প্রিন্সি হয় তা এই কাজটা না করলে নিনির জানা হত না। জানা গেল প্রত্যেক কলেজে কম্পিউটার কেন্দ্র খুলতে গেলে কলেজকে হয় ক্যাশ নয় কাইন্ডস, অথবা দুইই দিতে হয় শুধু নয়, কলেজের বেশ প্রভাবশালী কোন একজনকে বেশ কিছু টাকা অথবা একটা কম্পিউটার কিনে দিতে হয়। এই প্রভাবশালী ব্যক্তি সাধারণত: কলেজ ইউনিয়নের নেতা অথবা কোন অধ্যাপক। এই টাকাখাওয়া নেতা, সবক্ষেত্রেই ছাত্র সংসদের নেতা, তা সে যে পার্টিরই হোক না কেন। । তাদের একজন করে ছাত্রকে বিনাপয়সায় কম্পিউটার শেখাতেও হত কোন কোন জায়গায়। এই বিনাপয়সার ছাত্ররা অবশ্য প্রত্যেকেই মোটামুটি দামী কাপড়চোপড় পরে আসত। যেহেতু কলেজে সেন্টার খুলতে দিয়েছেন, কাজেই কলেজের ছোটখাট প্যাকেজ ঐ সেন্টারকেই করে দিতে হবে। ভুল হলে বা দেরী হলেই সেন্টার তুলে দেবার হুমকী। তা, কলেজে বেসরকারী সংস্থার সেন্টার খুলতে দেওয়া কেন? না ছেলেপেলেরা সস্তায় কম্পু শিখবে। তা বেশ কথা। কিন্তু বিনাপয়সার বা খুব কম পয়সার প্যাকেজ তৈরীর সাথে ওদের কম্পু শেখার কি যোগ? ওসব জানিনা, বানিয়ে দাও নয়ত ------। কতগুলো কলেজ আবার খুবই নির্ঝঞ্ঝাট, বচ্ছরকার টাকাটা পেলেই খুশী। আর কতগুলো কলেজের কত্ত না দাবীদাওয়া। এমনই একটি হল ব্যারাকপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজ। প্রিন্সি ভদ্রলোক লোক ভাল, কিন্তু আর দুজন অধ্যাপক আসতেন শিখতে , নিজেদের আগ্রহে, অথচ ব্যবহার করতেন এমন যেন নিনিরা শিখিয়েই ধন্য হয়ে যাবে। বহুকাল ধরে নিজেদের একটা প্ল্যাটফর্মের ওপর দেখতে দেখতে শিক্ষার্থী হতে তাঁদের বাধত কোথায়ও। শেখার চেষ্টার চেয়েও তাঁদের মনোযোগ পড়ে থাকত সর্বদা অপমান করবার দিকে। সে যাই হোক, প্রিন্সি অবশ্যি দিব্বি লোক। সব প্রিন্সিই অল্পবিস্তর ক্র্যাঙ্কি টাইপ ছিলেন, বোধহয় অতসব দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে একটু ইয়ে হয়ে যেতেন সকলেই।

এইসময় একটা মজা হল। কম্পিউটার সায়েন্স পাস কোর্সের সাবজেক্ট হিসাবে নেওয়া যাবে বলে নিয়ম হল, এমনকি অনার্সও চালু হল কোনো কোনো কলেজে। কিন্তু ইউ জি সি এর জন্য কোনো গ্রান্ট দিলে না। তো শেখাবে কে? শহরের দিকে নাহয় এম টেক পড়তে থাকা ছাত্তররা খেপ খাটতে লেগে গেল। কিন্তু তারা তো কেউ এমনকি ব্যারাকপুর বা মধ্যমগ্রাম গিয়েও পড়াতে রাজী নয়। তবে উপায়? উপায় হল নিনিরা। ওরাই প্র্যাকটিকাল দেখাবে তো বটেই, কোথায়ও কোথায়ও পড়াবেও। প্রতিদিন শুনবে ওদের যোগ্যতা কম তাই ওদেরকে কলেজ থেকে কোন পয়সাকড়ি দেওয়া যাবে না, ওদেরকে বিরাট সুযোগ দেওয়া হয়েছে পড়াতে বলে, তা নিনি যদি অমন সুযোগ না-ই চায়। তা বললে চলবে? অমন কল্লে তো সেই ঘরজামাইয়ের সাথে গিয়ে বসতে হবে চ্যাটার্জী ইন্টারন্যাশনালের খুপরি অফিসে, আর সব্বসময় একটা সন্দ নিয়ে থাকতে হবে সত্যিই জামাকাপড় পরে আছে তো? তা মিথ্যে বললে পাপ হবে, নিনির দিকে কোনোদিনই লোকটা সোজা তাকিয়ে কথা বলে নি, বাজে কথা তো দূরের ব্যাপার। তবে নিনি শুনেছে প্রজ্ঞাকে নাকি উনি দীঘায় এক সপ্তাহান্ত কাটাতে কত নেবে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। প্রজ্ঞা একটাও উত্তর দিতে পারে নি, শুধু চাকরীটা ছেড়ে দিয়েছিল। নিনি তাই ভাবে ওকে বললে কি করত! নেহাৎ প্রাণীটা বলার সাহস পায় নি, কিন্তু যদি সাহস পেত তাহলে? নিনিকেও চাকরী ছাড়তে হত। তাছাড়া আর কি করতে পারত? এ তো এমনই এক ব্যপার যাতে সাধারণত: অভিযোগকারিণীই দোষী সাব্যস্ত হয়।

মনে পড়ে যায় ওরা তখন সদ্য সদ্য মামাবাড়ী এসেছে। আত্মীয়স্বজনরা প্রায়ই এখান সেখান থেকে গণৎকার ধরে আনত। মা আর নিনি, নানাকে তাদের সামনে বসতে হত। বেশীরভাগকেই প্রথম দিনেই বিদায় দেওয়া হত। দিদার এক বান্ধবীর পরিচিত এক ভদ্রলোক কিন্তু বেশ গেঁড়ে বসেছিলেন। এসেই নিনিকে খুব আদর করে কোলে নিতে চাইতেন। নিনি তখন আট বছর, কেন উঠবে কোলে? ও কি বড় হয় নি নাকি? ভীষণ রেগে যেত ওকে এহেন বাচ্চা বাচ্চা ভাবে ট্রীট করায়। মাসখানেকের মধ্যে একদিন হাত না কপাল কি যেন দেখার অছিলায় নিনিকে উনি কোলে বসিয়ে নিলেন, আর ভা-রী আদর করে যেই না জড়িয়ে ধরেছেন নিনি প্রথমে খপ করে চেপে ধরল ভদ্রলোকের নাক, তারপরই তাতে ঘ্যাঁক করে এক কামড়। আহা ভদ্রলোকের নাকটা বেশ খাড়া ছিল গো। নিনি খুব মার খেয়েছিল যদিও, তবু ভদ্রলোকও আর আসেন নি, বাড়ীতে কেউ তেনার খোঁজও করে নি।

তা এই ঘরজামাইয়ের গালে একটা থাপ্পড় কি আর দিতে পারত না? পারত কি? প্রজ্ঞাও তো হাওড়ায় সেই আরেক পিএইচডিকে (কোন সরলমতি পাঠক পাঠিকা যেন এই পিএইচডি শব্দটিকে অ্যাকাডেমিক কিছু না ভাবেন) সপাটে চড়িয়েছিল। প্রজ্ঞা আসলে দেখতে টেখতে বেশ ভাল, যাকে বলে ন্যাগ্রোধপরিমন্ডলা। বিধুভুষণ ওকে এই শব্দটা বলায় প্রজ্ঞা এ মানেটা বোঝে নি। জানিয়েছিল দাদুকে জিজ্ঞেস করবে। তাতে বিধু খুব ঘাবড়ে যায়। তো, মিনিবাসে উঠলে এই 'পরিমন্ডল'এর জন্য বেচারীর খুব সমস্যা হত। একদিন হাওড়ায় নেমে প্রজ্ঞা নিনিকে নিজের ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে একটা শুঁটকোমত লোকের পেছনে পেছনে "দাঁড়া তোর মজা দেখাচ্ছি" বলে দৌড়ায়। নিনিও অতএব অভিজিতকে ডেকে নিয়ে ওদের পেছনে দৌড়ায়। ট্যাক্সিস্ট্যান্ডের কাছে গিয়ে দেখা গেল লোকটিকে প্রজ্ঞা কলার ধরে আটকেছে। নিনিদের দেখেই হাতের প্ল্যাস্টিক প্যাকেট "ধরতো একটু" বলে ধরিয়ে দিয়েই লোকটাকে এক ঝটকায় ঘুরিয়ে সপাটে গালে এক চড়। আশেপাশে বেশ ছোট্ট করে একটা পথসভা সাইজের লোক জমে গেছে। কি ব্যপার? না লোকটা প্রজ্ঞাকে ঠিক বাস থেকে নামার সময় কিছু বলে। ও ভাবে সময়, বা ট্রেনের কথা কিছু হয়ত জানতে চাইছে--- ও জিজ্ঞাসা করে "কি বলছেন?" তাতে লোকটা বলে "যাবে? কত রেট তোমার?"। আরো কয়েক ঘা চটাপট পড়ে লোকটার ওপর। হঠাৎই একটু হাত আলগা হতেই লোকটা কুঁজো হয়ে সুড়ুৎ করে লঞ্ছঘাটের দিকে দৌড় মারে। ঠিক একটা ইঁদুরের মত দেখ্‌তে লাগে তখন। তা সেই প্রজ্ঞাও ঐ জামাইবাবাজীকে কিচ্ছুটি বলে নি। ও বলেছিল ও কোন কথা খুঁজে পায় নি। প্রজ্ঞারও চিন্ময়ীর মত মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল। ও ভাবতে পারছিল না কিভাবে ওকে বলতে পারল! বেচারী ভেবেই পায় নি ওর গলদটা কোথায় হয়েছিল। ও ভদ্র ব্যবহার করত, নিনি বা সুদেষ্ণার মত নিজের অপছন্দটা চলাফেরায় প্রকাশ করত না। তা'লে কি সেটাই ভুল? নিনি ওকে বোঝায় খারাপ লোকেদের সাথে খুব একটা ভাল ব্যবহার করতে নেই---- কিন্তু নিজে খুব একটা নিশ্চিত হতে পারে না।


""------------থোড়া কদম ব্যহকতি হ্যায় ---- দিল সোতানা জাগতা হ্যায়''

আরো পরে নিনি যখন পরের কোম্পানিতে, বন্ধুত্ব হল শর্মির সাথে। তারই কাছে শোনা ---- হস্টেল থেকে বাইরে আসতেই কানে আসে "বা: বা: ৩০ তো বেড়ে ৩২ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। নিশ্চয়ই কারো হাত পড়েছে ..... নাহলে তো এমন হবার কথা নয়"। কান কি পুড়ে গেল? না তো সবকিছু দিব্বি স্বাভাবিক। দিব্বি চলছে..... শর্মিও চলে ..... থামলে হবে না, থামতে নেই ..... কই আর কেউ তো কিছুই শোনে নি, অন্তত: দেখে তো মনে হচ্ছে না ..... ওর মুখও যেন তাই বলে। তা যারা বলছে তারা ওর পরিচিত হয়ে যাবে কদিনের মধ্যেই। তখন বোধহয় আর শুনতে হবে না। আর বন্ধুদের, মানে মেয়ে বন্ধুদের কাছে শোনে শর্মি "কেন রে তোকেই বলে ? কই আমাদের তো বলে না?" কিন্তু শর্মি জানে তা ঠিক নয়, ওদেরও বলে আর তা-ও খুব সুশ্রাব্য নয়। তার মানে শুনলে সেটাকে "না শোনা" করে দিতে হয়। তাতেই "সম্মান"। কেন উল্টে কটা চড় থাপ্পড় দিলে "সম্মান"এর নয় কেন? ও ছোট থেকে তাইকোয়ান্ডো শিখেছে। রীতিমত চ্যাম্পিয়ান। ওর পক্ষে ঐ প্যাংলা মার্কা ৩-৪ টে ছেলের মহড়া নেওয়া কিছুই নয়। কিন্তু "সম্মান" না: সে অনেক বড় জিনিষ। শর্মি একটু হেসে কথা বললে ধন্য হয়ে অ্যাক্কেরে গলে যায় অনেক ছেলেই। আর শর্মিও জানে পার্টি চলাকালীন ঠিক কোন জায়গাটায় দাঁড়ালে বা বসলে সবচেয়ে বেশী লোক দেখতে পাবে। নিজের সম্মান অটুট রেখে হ্যাংলা ছোঁকছোঁক করা মুখগুলোর আত্মসম্মান ভাঙ্গতে ও খুব আনন্দ পায়। ও নিজেই বলেছিল
"জান নিনিদিদি আই রিয়েলি এনজয় দ্যাট"। "কিন্তু এতেও তো তোকে অনেকে ফ্লার্ট বলে রে শর্মি? "
"হ্যাঁ বলে। হিংসে আর ফ্রাস্ট্রেশানে।
কিন্তু ঐরকম বাক্য আর কানে আসে না জান। তখন ওরা আমাকে লুকিয়ে পড়ার মত জায়গায় ঠেলে দিত, এখন নিজেরা লুকায়।"

তা বটে। অপমান করতে যে মাঝেমধ্যে বেশ লাগে, দিব্বি লাগে, তা নিনি জানে। সেই যে ছেলেটা , কি যেন নাম ছিল--- শুভ্রাংশু বোধহয়। দিব্বি কোথা থেকে ঠিক উদয় হয়ে যেত কলেজ যাবার সময়টাতেই। এটা , ওটা, সেটা কত কথা। আর নিনিরাও কেবলই না শোনার ভান করে নিজেরা কথা বলে যেত। কখন বা ও ছেলেটার কোন স্বাভাবিক কথায়ই ওরা এমনভাবে হেসে উঠত যে বেচারা একেবারে লজ্জায় ঘেমে নেয়ে বেগুনী হয়ে যেত। ক-দিন হয়ত সঙ্গে এলো না, তা কেউ না কেউ ঠিক ডাকবেই খুঁজেপেতে। আহারে এমন নাচুনে পুতুল বুঝি অমনি অমনি ছেড়ে দেওয়া যায়! নিনিরা রীতিমত প্ল্যান করত কিভাবে কিভাবে ওকে অপদস্থ করা যায়। আশ্চর্য্য ঐ ছেলেটিকেই ওরা অমন করত, বাকীদের সাথে কিন্তু একদম ঠিকঠাক। মানে যারা বন্ধু, তারা বন্ধু। আর যারা বন্ধু নয়,তো নয়। ওর বিশুদ্ধ ক্যাবলামো ওদের উদ্বুদ্ধ করত নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবনে। অথবা হয়ত এ কোনোভাবেই প্রত্যাঘাত করতে পারে না, পারবে না, এটা দেখতে ওদের ভাল লাগত---- ওরা, যারা তখন লেডিস কম্পার্টমেন্ট ছাড়া কোনোদিন উঠতে সাহস পেত না, ওরা, যারা ডাউন প্ল্যাটফর্মে ওঠার সময়ে কানের সুইচ অফ্‌ করে দিত, সেই বেঁটেমত লোকটার কথাগুলো যাতে কানে না ঢোকে , তাই।


"Your only obligation in any lifetime is to be true to yourself"

তা, এমনিভাবেই তো সম্মান আর অপমানের ভারসাম্য বজায় থাকে সর্বত্র। যে অপমান করল তাকে যদি ফেরৎ দেওয়া গেল তো ভাল, না হলে যাকে করা যাবে এমন লোক খোঁজো। জিৎও তা-ই করেছিল। জয়জিৎ এক প্রশান্ত সৌম্য যুবক যার বৌ পরমাসুন্দরী। একেবারে সুন্দরীর ডেফিনিশান মিলিয়ে মিলিয়ে সুন্দরী। আর জিৎএর ছেলে সাকেত, ঠিক দেবশিশুটি। জিৎ সর্বদাই সবাইকে বলে তার বৌ কেমন সুন্দরী, তার ছেলে কেমন ঝরঝর করে নার্সারী রাইম্‌স বলে, সেই জিৎ হঠাৎ চ্যাট করতে গিয়ে প্রেমে পড়ে গেল এক সিঙ্গাপুর নিবাসী আর্ট ক্রিটিকের। জিৎকে বছরের বেশীরভাগ সময় থাকতে হয় ব্যাঙ্গালোর। নিনিদের কোম্পানির মার্কেটিঙে বেশ ওপরের দিকেই আছে জিৎ। নিনি, দেবলীনা আর মধুমিতা গেছিল ট্রেনিং নিতে ব্যাঙ্গালোর। গেস্ট হাউসে থাকতেই দেখত জিৎ হয় চ্যাট করছে, নয় ফোন। ঘন্টাভর আই এস ডি। ওরাই দেখেশুনে ভয় পেয়ে যেত। জিৎ ওদের কাছে বিস্তারিত গল্প করত। নিনি আর লীনা চুপচাপ শুনলেও মিতা ক্ষেপে যেত। হয়ত মিতার ভয় হত ওর নিজের বরকে নিয়ে। জিতের যুক্তি হল, ওর বৌ চ্যাট করে না, পারে না, আর বেশীক্ষণ ফোন করলেও খরচের কথা মনে করায়। ওদিকে সেই আর্ট ক্রিটিক নাকি নিজেই তাকে দিনে ৪ বার ফোন করে, চ্যাট তো বটেই। মিতা, কে জানে কিসের ভয়ে দিনে দুবার করে ফোন করা শুরু করে। এদিকে অবস্থা ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে। নিনিরা ৩ জন প্রায়ই জিতের সচীৎকার ফোনে অপ্রস্তুতে পড়তে থাকে। হয় তা বৌয়ের সাথে "প্রেম", নয়ত সিঙ্গাপুরীর সাথে ফোন সেক্স। তা, বললেই জিৎ একেবারে চটে চট্টো। কিন্তু এই রাত্তিরবেলা একটু ঠিকঠাক ঘুমোতে না পারলে মিতা আবার বেজায় চটে যায়। ফল পরেরদিন সকালে মিতা বনাম জিৎ। মিতার মতে ইনি একটি হাফ গেরস্ত, নেটে ঘুরে খদ্দের ধরছেন। জিতের মতে - না না খুব দু:খী মহিলা। কেমন দু:খী? না --- তাঁর পতিদেব এক জাপানী পুতুল নিয়ে খেলছেন। তাই ইনি নি:সঙ্গতার ভারে ---। আবার কোনদিন বলে ক্রিটিকের পতিদেব এক দুরারোগ্য অসুখে আক্রান্ত এবং তাইজন্য শারীরিকভাবে অক্ষম। বেশ কথা। তা ডিভোর্স করবেন কিনা, মিতার এই অনধিকার প্রশ্নে জিৎ কিন্তু চটে না, বরং কিরকম বিব্রত মুখ করে "না" বলে। ওদিকে ক্রিটিক আসেন ভারতে, স্বামীসহ। পতীপ্রেমে গদগদ লক্ষ্মী বৌটির মত ঘুরে বেড়ান আর জিৎ শুধু জ্বলে আর জ্বলে। জিৎ একদিন যায় সেই ক্রিটিকের সাথে গোল্ডেন পাম এ। তারপর আরো যায়, প্রায়ই ---- অবশ্য ক্রিটিকের পত্তিদেব ব্যস্ত থাকলে তবেই ------ ।

নিনি আর লীনার ভারী কষ্ট হয় জিতের বৌয়ের জন্য। বেচারী জানেও না কিচ্ছু --- একা একাই বাচ্চা ছেলে আর শ্বশুর শাশুড়ী সহ সবাইকে দেখে চলেছে। তারপরই জিৎ ওদিকে চাকরী ছেড়ে ব্যাঙ্গালোরেই অন্য কোম্পানিতে যোগ দেয়। নিনিরা তারপর আর জানে না। খুচরো প্রেমের খুব একটা প্রয়োজ্‌ন এঁর নেই, তা জিৎই একদিন ছুড়ান্ত হতাশা নিয়ে বলেছিল। অথচ --- নিনি যা দেখল, এই ক্রিটিক বা আরো বেশ কিছু জন--- পরে আরো কজনকে দেখে। এঁরা এঁদের বিবাহিত জীবন ও তার নিরাপতার ঘেরাটোপের সবটুকু রেখেই অন্য কারো থেকে সেটুকু কেড়ে নেবার চেষ্টা করেন। এঁদের প্রয়োজন মূলত: শারীরিক। এঁরা যদি সাহস করে ডিলডো ব্যবহার করতেন , এঁদের এমনিতে কোন অসুবিধা বা নৈতিক আপত্তি নেই নিজেদের জীবনে--- আর তা হারাবারও কোন ইচ্ছা নেই, শুধু কিছু চাহিদা--- যার জন্য ডিলডো ই যথেষ্ট। কেন যে শুধুমুধু চাট্টি ঝঞ্ঝাট বাধানো? হয়ত বা শিকার ধরার আনন্দও থাকে।

তা, এমন যে আরো কত রঙ্গই দেখা যায়, আর দেখতে বেশ লাগেও। ছোট থেকে জেনে এলো পার্টিতে যাওয়া, নাচগান করা ভারী খারাপ। অমা, কবে যেন সেটা একেবারে আভিজাত্যের লক্ষ্মণ হয়ে গেছে! খারাপ কেন? না বাংলা সিনেমায় তো সেরকমই দেখায়। অথচ দিল্লীতে বিয়ে মানেই নাচ। সে কি নাচ রে বাবা--- রাস্তা দিয়ে নাচতে নাচতে চলল ছেলেমেয়ে বাচ্চাবুড়ো সব। খারাপও লাগে না তেমন। খারাপ আর ভালর ছোটবেলায় শেখা সংজ্ঞা অনেকসময়ই মেলে না, গুলিয়ে যায়, ঘেঁটে যায়, মিশে যায় --- আবার আলাদা হয়ে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। আবার মিশে যায় .....

সেই মেয়েটা ------ ভেলভেলেটা ...... চলতে থাকে ...... চলতে থাকে ...... চলতে থাকে ...... চলতেই থাকে ..... চলতেই থাকে। পথ শেষ হয় না, ঠ্যাঙাড়ে হীরু রায়ের বটতলা পেরিয়ে, সোনাডাঙার মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতি পেরিয়ে,পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ দিয়ে,বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে পথ যে চলে এসেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সূর্য্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গন্ডি এড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশে ----- নিশ্চিন্দিপুরের সেই ছেলেটা ...... ভেলভেলেটা, চলে যায় .... সেই পথ বেয়েই চলে যায়
সেই মেয়েটা ------------
যে মেয়েটা ------------
ভেলভেলেটা ----------।

(শেষ)