আপনার মতামত         


দিন আনি দিন খাই(পর্ব -৪)
সুমেরু মুখোপাধ্যায়

- ১-


ইয়োর অনার, আমি সত্যি কথাই বলব। আমি তো আর কম দেখলাম না, স্যার, জগতটা যদি ঠিকঠাক দেখেন আপনার ঘেন্না করবে স্যার! এভাবে বেঁচে থাকাও অন্যায়। বাপ ফাপ জানি না কিন্তু যা কিছু করছি তাতে তো কিছু সুবিধার বুঝছি না। আজ আমাদের মানুষ মরছে কাল ওদের। আচ্ছা স্যার আমাদের তোমাদের কী? মানুষের ভাগ বাটোয়ারা সেসব তো হত স্যার মিশরে, হলিউডের ফিল্মে। লোহার শিকলের ঝনঝন শব্দ, মানুষ মরুভূমির বুকে পাথর টেনে আনছে, পিরামিড তৈরি হচ্ছে। হ্যাঁ স্যার, যে কথা বলছিলাম, এই পুলিশের উর্দি গায়ে দিয়েছি তো আঠাশ বছর হল। জেলা করলাম তারপর দূরে! হ্যাঁ স্যার মিথ্যে বলব না, বর্ডারে থাকলে মাল পত্তর খারাপ ছিল না। আমার কথা বিশ্বাস করলেন স্যার? দিব্যি ফিব্যি আমিও মানি না কিন্তু টাচ উড, লেবানন মন্ডলকে আমি মারিনি! দুর্গাপুরে আমি ছিলাম অ্যাসিষ্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর। কি পাওয়ার ছিল বলুন? ল্যাজ নাড়তে বললে নাড়ি, খেতে বললে খাই। পুলিশলাইনের দাদারা, আপনাদের স্যার মন্ত্রী আমলা, যে যখন যা বলেছে, গু চেটে সাফ করে দিয়েছি। এসব বালের পার্টি ফার্টি বুঝি না। তুমি সরকার, আমি সেবক! ফালতু বকছি, না স্যার? ওকে! আপনার হাতে টাইম থাকলে খুলেই বলি। এসব হুমকি ফুমকি দিচ্ছি না। হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা। ওসব বলে গণেশ দাসের মত যাদের তলা কুটকুট করে। আমি স্যার সাচ্চা মানুষ, দাদাদের নুন খেয়েছি, তাদের নামে বাজে কথা বললে এখানেই ক্যালিয়ে যাবে। বিশ্বাস করুন লেবানন মন্ডলকে কিন্তু আমি মারিনি। দুর্গাপুরে থাকতে বাবরির বিজনেসও আমার ছিল না। বৌয়ের কি গয়না আছে দেখুন! ছেলেটাও স্যার বাংলা মিডিয়াম। যে ধনুক-চো-গুলো আমাদের শালা বাঁকা রাস্তা দেখাল, তাদের কিছু ছিঁড়তে পারবেন স্যার? স্যরি স্যার। আসলে এই লাইনে থেকে মুখের ভাষার পেছনটা মারা গেছে! প্রফেশনাল হ্যাজার্ড স্যার। দেখুন, আজ কিন্তু আমার এখানে থাকার কথা নয়। এভাবে আমি লাইমলাইটে আসতে চাইনি। শক্তি চাটুজ্যেকে মনে আছে? সে বোকা চো- কে চড় মারল এক ইন্সপেক্টার , তার নাম কেউ জানল? আপনি জানেন স্যার? ওদিকে চড় খেয়ে হারামজাদা হয়ে গেল ফেমাস কবি। বিধি বাম স্যার। আপনি চাইবেন এক আর হবে উল্টো।

মেয়ে ফেয়ের দোষ আমার ছিল না! মিথ্যে বলব না স্যার। থানায় বসে মাল ফাল খেয়েছি, নাইট ডিউটি থাকলে কথাই নেই। তবে তিন তাস আর মেয়েছেলেতে ইন্টারেষ্ট ছিল না আমার। বৌ বাচ্চা, যেখানে গেছি কোয়ার্টার্স। এখন যদি রবীন্দ্রনাথের কথা ধরেন তাহলে আমি দোষী। পাতি ময়দান থেকে মেয়ে উঠিয়ে রাত্রে লক আপে লাগিয়েছে, আমি কোনদিনও বাধা দিইনি। তবে রবীন্দ্রনাথের কথায় তো দেশ চলে না, আমাদের মিনিষ্টার, প্রাইম মিনিষ্টার আছে। তারা কিছু চাইলে না বলা যায় না। আমরা তো স্যার হিজড়ে! তালি দিতে বললে তালি দিই, পয়সা ছুঁড়ে দিলে কুড়িয়ে নিই। এগুলো কী সব লেখা হচ্ছে স্যার? না না আমার কোন আপত্তি নেই! আমার এখন বাঁচা মরা সবই সমান। গত ছ'মাস যে গুলি বৃষ্টির মধ্যে ছিলাম, তাতে বেঁচে থাকাটাই অস্বাভাবিক। মুখে না বললে কী হবে পাপ তো আর কম করিনি। কারেক্ট। ঠিক বলেছেন স্যার। জ্ঞানপাপী। অজ্ঞান মানুষ পাপ করবে কি করে? কড়েয়া থানায়? আমাদের একটা মজার খেলা চালু ছিল। ছাড়ুন, আপনার ফালতু টাইম ওয়েষ্ট করছি। ওকে। ঘটনায় আসছি। দেখুন, বামফ্রন্ট কংগ্রেস বুঝি না। উপরওয়ালা বলেছে, তাই গেছি। প্রথমে জানতাম কারখানার জমি ফমি নিয়ে হালকা গন্ডগোল হচ্ছে, একটু টাইট দিতে হবে। ঐ আপনাদের সিঙ্গুরের মত। পাঁচিল ফাচিল তোলা পর্যন্ত একটু নজরে রাখা। স্পেশাল ডিউটি। তখনও লক আপের মালগুলোকে নিয়ে চুদুর মুদুর শুরু হয়নি, হ্যাঁ আমরা অনেকেই ছিলাম। কে আর থাকল শেষ পর্যন্ত! নাহ, কপাল বলব না। কর্মদোষও আসলে এটা নয়! আমাকে ফাঁসিই দিন আর গুলি করেই মারুন, তাতে কি কিসসু হবে? আমাদের থানার সতীশ, সন্তোষ, হেষ্টিংস, তালতলা, বড়বাজার। কত নাম করব স্যার! সবাই তো গেছিলাম। হুকুম। তাদের অর্ডার। নিজেরা শালা ছারপোকা, গুড় আঠা চেটে খাবি। সত্যিই বলছি স্যার। এসব সালেম-আলেম আমরা কিসু জানিও না আর জানতেও চাই না।


দেখুন স্যার, এইসব ঘাঁটাঘাঁটি করে আমার কিছু ছেঁড়া যাবে না। স্যরি স্যরি। আসলে কী করব বলুন তো? প্রফেশনাল হ্যাজার্ডস। ভাল কথা বললে কাজ হয় না স্যার। সব সময় তো চোর, গুন্ডা, পলিটিশিয়ানদের সাথে উঠ-বস করি। বৌ বাচ্চার মুখ তো মাঝে মাঝে ভুলেই যাই! এই যে মরতে গ্রামে গিয়ে এতদিন সাঁটিয়েছিলাম, সেখানে কি সেন্ট বুলানো ভাষা চলত? আমাদের লাইনের লোক কনষ্টেবল এস আই, ওদের কথা ছেড়ে দিন, এই যে বেজন্মা ক্যাডারগুলো অন্নপ্রাশনের পর থেকেই রেপ আর মলেষ্ট করে বেড়াচ্ছে। পার্টি বলেছে তাই এসেছে? সব দুইতে এসেছে স্যার। ষোল, ছাপ্পান্ন যাই পাক একবার করে উল্টে দেখে। পার্টির প্রতি দরদ না ছাই। পার্টি তো ছিপি আটকে দিয়েছে আমাদের পিছনে। নুন স্যার নুন। জোঁক হয়ে জন্মেছি, নুন দিয়েই তো মারবে। গলা অব্দি নুন ভরে দিয়েছে, তেষ্টা পেলে ম্যাকডাওয়েল। তেষ্টা আর নিচের সাপ্লাইটা যদি ঠিকঠাক থাকে তবে তো মানুষকে বললে যুদ্ধ করতে দৌড়ে যাবে।কে কাকে গুলি করছে, কার সাথে কার যুদ্ধ, এসব কি মানুষ মনে রাখে? দুটো গুলি ছোঁড়ো, তারপর গলা ভেজাও তারপর লাফাও ঝাঁপাও! আমরা এইসব হাব-ভাবের কি বালটা ছিঁড়ব বলুন তো? স্যরি স্যার। স্যরি স্যার। লাষ্ট টাইম। চারদিকেই তো বিষ। আরেকটু বাড়লে ক্ষতি কী? দু-চারটে কল কারখানা হবে, কাজ কর্ম বাড়বে, মানুষের টু পাইস বাড়বে, আপত্তিটা কেন করব বলুন তো? হ্যাঁ, কালো ধোঁয়া ফোয়া বেরোবে, আলতু ফালতু মাল একস্ট্র্যাক্ট হবে, মানুষ নাহয় কার্বন ডাই অক্সাইডই নেবে! ছোটবেলা থেকেই তো বুলি কপচিয়ে এলাম স্যার, শরীরের নাম মহাশয়, যা সহাবে তাই সয়! আফটার অল এন্ড অফ দ্য ডে সেই তো টান্টু খাবে আর বান্টু ঘোরাবে। আমরাও স্যার দাদারা যেভাবে বলেছে, মাল সাপ্লাই করে গেছি। রাস্তা, লক আপ, যেখানে যা মাল পড়েছিল, সব ক্যাডার বানিয়ে রিফিল করে দিয়েছি। মানুষ তো পেচ্ছাপের মত মরে যাবে। আমিও যাব! কিছু কী চেঞ্জ হবে ভাবছেন স্যার? হাসছেন কেন? এসব কী আপনার গাল-গপ্প মনে হচ্ছে? আপনারা হলেন স্যার রাষ্ট্রের নাতজামাই! এসব বলে ফালতু আপনার টাইম ওয়েষ্ট করছি। মৃত্যুদন্ড দিয়ে দিন, ল্যাঠা চুকে যাক, বাড়ি গিয়ে পান্তুয়া খান, মাল খান, কারুর কিস্যু ছেঁড়া যায় না।


- ২-

ভুতনির মোড়ের অ্যাকশানে আমি যাইনি। চৌদ্দই মার্চের আগে সেটা সম্ভবত এগারো তারিখ ছিল, জানুয়ারি হবে? যাই হোক সেদিন সেন্সটা ছিল কচু পাতার মত। মাল খেয়ে লটকে ছিলাম তাই যেতে পারিনি। মেজদার অর্ডার ছিল, না না সেদিন রেপ ফেপ কিছু হয়নি। দু-এক পিস ফর্সা হল আর একটু ভাঙচুর। খালের ধারে আমি, সুব্রত সব বসে গড়চ্ছি, ভোর ভোর ফিরে এলো চামচারা। আবার এক রাউন্ড মাল খাওয়া হল, অপারেশন সাকসেসফুল, মেশিনপত্তর এনে আকাশে দু রাউন্ড গুলি ছুঁড়লাম। সত্যি কথা যদি বলতে বলেন স্যার, এগারো, চৌদ্দ কিছুই ক্যালেন্ডারে থাকত না। পার্টি ঝোলাচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই, মালের ঠিকমত সাপ্লাই না থাকলে ছেলেপুলে ক্ষেপবে না? আপনি পারবেন আটকে রাখতে? আচ্ছা, চাইছেন যখন খুলে বলি। না, কারোর নাম নেব না। দেখুন, এসব পার্টি-ফার্টি লেভেলের কথা, আপনারা অত ভাল বুঝবেন না। কিন্তু আন্ডারস্ট্যান্ডিংএর উপরই তো দুনিয়া চলে! সত্যিই বলছি, গ্রামে গিয়ে ভালই লাগছিল। চাল, সব্জি, মুর্গীর কোন চিন্তা নেই। তেল, নুন এসব কনস্টেবলরাই চমকে নিয়ে আসত। ছাগল খাসি উঠিয়ে আনলেও বলার কেউ নেই, সত্যিই বলছি স্যার, রাম রাজত্ব। সপ্তাহে একদিন রাম আর হুইস্কি আসত কলকাতা থেকে ম্যাটাডোর ভর্তি করে, লে, লুটে লে, কত খাবি খা! যার চাই চিনি, যোগান চিন্তামণি। আমার তো মাছ ধরার নেশাই পেয়ে বসল। আমাদের বেলতলার হরি রোজ এসে বলত, কি স্যার ছিপ দিয়ে ঠুকুস ঠুকুস করছেন,এ কি নন্দনের খাটা পাইখানা? একটা জাল ছুঁড়ব, মিনিমাম পঁচিশ তিরিশ কেজির গ্যারান্টি। পুকুরপারেই চলে আসত রামের বোতল আর মাছভাজা। ঘুম পেলে সোজা গিয়ে ঘুমিয়ে পড়, বিছানা পাতাই আছে! স্কুলটা আমরা দখল করে নিয়েছিলাম, ঢালাও বিছানা, যর যখন ইচ্ছে ঢিপিস ঢিপিস গড়িয়ে নিচ্ছে। ঐ যে উপরে ডানদিকে টিচার্স রুম, ওটা ছিল আমাদের গোডাউন। সে স্যার কী বলব! পুলিশের বাপও ঐসব মেশিন জীবনে দেখেনি, হাতে নিলেই টুংকা খাড়া। মিথ্যে বলব না স্যার, দাদারাই দিয়েছিলেন, ফর সেফটি পারপাস। মারতে টারতে বলেনি কাউকে। উঠোন ব্যাঁকা থাকলে নাচতে জানি না বলে চালিয়ে দেওয়াটা খুবই সহজ ব্যাপার। আসলে গত ১৪ই মার্চ আমরা যা করেছিলাম তা সন্মিলিত ভাবেই, কোন দাদার বাপের কথায় নয়। লাষ্ট তিনমাস আমরা জাষ্ট চোদন খেয়ে এসেছি। পার্টির বিচি বড়, যেদিকে হেলায় অন্যপাশের গাড় লেগে যায়। বাঞ্চোতগুলো এই গ্রামে পাঠানোর আগে আমাদের তোলায় থাবা মারত। যেবার আমি কড়েয়া থানা ডেকে নিলাম হিসেবের টাকার বাইরে চার মন্ত্রীর পাছার ফুটোয় টাকা গুঁজতে হয়েছে। বাঞ্চোতগুলো যা যা বলে একদিনের নোটিশে পশ্চিম মেদিনীপুর পাঠিয়ে দিল, হিসেব করে দেখলে তার সিকিভাগও দেয়নি। ঝান্ডা কোম্পানি হচ্ছে সর্বহারাদের শোষক আর আমরা হচ্ছি সর্বহারার দল। মিষ্টার ভ্যাগাবন্ড। আমরা পুলিশ তাই আমরা হারামজাদা। আমরা ভ্যাগাবন্ড হতে পারি না! আমাদের তো আর তোদের মত বিদেশী ব্যাঙ্কে টাকা নেই। এখানে ওখানে যা জমি কিনেছিলাম এখন তো মনে হচ্ছে তোরা তারও গাঁড় মেরে রেখে দিলি। তোরা যদি টাটা বিড়লার সঙ্গে পোঁদ ঘষাঘষি করিস তাহলে আমাকেই দৌড়ুতে হবে নিজের জমি থেকে নিজেকে উচ্ছেদ করতে। স্পেশাল ডিউটি! তোর স্পেশাল ডিউটির একশ আট বার। সরি স্যার সরি। বোঝেন তো!

জানুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তায় বালের স্পেশাল ডিউটির নাম করে আমাদের এখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মাইরি বলছি দু'দিন আগেও কিচ্ছু টের পাইনি। তখন বেশ ঠান্ডা। দিব্যি ছিলাম। মনে হত পিকনিক চলছে ঠিকঠাক সাপ্লাই ছিল। সপ্তাহে একদিন ম্যাটাডোরে করে পেটি পেটি মাল আসত, সকাল থেকে রাত্তির রাম আর হুইস্কির বন্যা। একঘেয়ে হয়ে গেলে ভডকা। কনষ্টেবলগুলো নারকোল গাছ থেকে কাঁদি কাঁদি ডাব পেড়ে আনত। ডাবের খোলায় ভডকা পুরে খেতে খেতে মনে হত হ্যাঁ, স্পেশাল ডিউটি বটে! মঙ্গলবারদিন আরামবাগের চিকেনের খাঁচা আসত, অফুরন্ত সাপ্লাই। হ্যাঁ চৌদ্দই মার্চের আগে পর্যন্ত এসবই এসেছে ঠিকঠাক, নিয়মিত। হারামির বাচ্চারা সব ঘেঁটে দিল। স্কুলবাড়িতে খড় বিছিয়ে শুতাম বটে কিন্তু মাইরি নিজেদের বেশ জমিদার জমিদার লাগত। যেদিন যে পুকুরে ইচ্ছে হত জাল ফেলে মাছ ধরতাম আর জীপ নিয়ে চলে যেতাম দূর দূর গ্রামে। বিন্দাস কাটছিল, নো পলিটিক্স, নো হারামজাদার বাচ্চাগুলোর শাসন। স্কুল সব ছুটি দিয়ে দিয়েছিলাম কেউ কোন টু শব্দও করেনি। যখন আমরা লোকের বাড়ি থেকে ছাগল চালের বস্তা উঠিয়ে আনতাম কেউ কিচ্ছুটি বলেনি। লাইফ স্মুথ হয়ে আসছিল। ঝান্ডা কোম্পানিও তোলার ভাগ চায়নি। ক্রমশ আমাদের ক্যাম্পে লোক ঢুকিয়ে গেছে আর সেই অনুপাতে সাপ্লাইও বাড়িয়ে গেছে। একসময় সপ্তাহে তিনদিন মাল, মুর্গীর গাড়ি পাঠিয়েছে। আমরা লিটার‌্যালি মদে চুবে থাকতাম। নো দু:খ নো কষ্ট। নো কাটা কালু নো রবিনদা। লাইফ তখন শালা গোলা পায়রার মত। ওড়ো , ওড়ো আর পাল্টি খাও, পাল্টি খাও।

চাঁদনি রাতে আমি আর বেহালা থানার ওসি, সন্দীপন দুজনে মিলে শালা খালি হাঁটতাম। আল দিয়ে, মাঠ দিয়ে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে ফাটিয়ে দিতাম। সন্দীপন মালে ভিজত না ওর ছিল শুকনোর নেশা। খৈনি আর গাঁজা কুচিয়ে কল্কেতে ভরে টানত। সারারাত টেনেই যেত একের পর এক। আমি তখন চুর হয়ে লাট খাচ্ছি। ঠোক্কর খেতে খেতে খুব খিস্তি দিতাম আমাদের "ব' পার্টির মাতব্বরগুলোকে। সন্দীপন শুনত আর দাঁত কেলাত। খচ্চরটা আবার জন্ম "ব" সমর্থক। গায়ে সিন্টেক্সের চামড়া। গুলির শব্দ শুনলে জোরে জোরে হিন্দী গান চালিয়ে দিতাম , কাঁটা লাগা, এই দেখুন স্যার কাঁটা দিচ্ছে গায়! ওদেরও বলিহারি কী সব ভূমিরক্ষা কমিটি ফমিটি গড়লি। এসব করে কি কোন লাভ আছে। এই যে আপনিই বলুন স্যার, আজ যদি এই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে, এই যে সব আসামীরা, মানে আমার মাই ডিয়ার ফ্রেন্ডসরা, যদি কমিটি ফমিটি গড়ি তাতে লাভ আছে কিস্‌সু! কিস্‌সু লাভ নেই। আর যোগাড় করলি কর কিছু দোনলা বন্দুক, মানে আমি যে সময়কার কথা বলছি স্যার, আমি আসলে হিষ্ট্রিটা ধরিয়ে দিচ্ছি আপনাকে। গুলি কেনার পয়সা নেই, ছুঁড়ত তো মোষ্ট টাইম ইট। আমরা ইটভাটির গায়ে লম্বা লম্বা জাল টানিয়ে দিয়েছিলাম। পুলিশে কাজ করি তো আত্মরক্ষার উপায়টা জানি। শালারা ইট মেরে চু- বেরিয়ে যাবে তাহলে শালা আমাদের ভাড়া করে আনল কেন, মানে ওই স্পেশাল ডিউটি। ভাঙাবেড়া ব্রীজ তখন কেউ টাপকাই না। ওপারে ওদের ঘাটি সোনাচূড়া এপারে আমাদের খেজুরি। খালপাড় বরাবর সারি সারি সব ইটভাটা। ও। জননীর কথা তো আপনারা শুনেছেন, কাগজে টাগজে বেরিয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে কী জননীর অভাব, ঘরে ঘরে জননী। শিবানীটা সে'রকম পপুলার হল না। অথচ কী বলব স্যার, ওখানেই তো ম্যাক্সিমাম বডি পোড়ানো হয়েছে।


-৩-

আমাদের পরে অর্ডার ছিল স্যার। আমরা আমাদের নিজেদের লকআপ সমস্ত খালি করে নিয়ে গেছি, জানেন তো আমার এলাকায় সব পকেটমারই বেশি। তাদের কী এনথু, বন্দুক- ফন্দুক পেয়ে। দাবড়ে রাখতাম স্যার সব সময়। মাল- টাল খেয়ে রোজ রাতেই ব্যাটাচ্ছেলেরা চেল্লায়, চলুন স্যার, আজকেই হাপিস করে দিয়ে আসি। আর সব বাঁকুড়া, বর্ধমান, পূর্ব মেদিনীপুর সব গ্রাম-গঞ্জের অশিক্ষিত হাভাতে ক্যাডার, সামলে রাখা যায় আপনি বলুন? রোজ কমপ্লেন, আজ এ ওর বউকে উঠিয়ে নিয়েছে, কাল ও ওর মেয়েকে রেপ করে দিয়েছে। নিজেদের এলাকায় এসব হুজ্জুতি ভাল লাগে স্যার! সুব্রত বলল, রেপ-ফেপ যদি করতে হয় ওদের এলাকায় গিয়ে করা বেটার। আমার স্যার তাতে মত ছিল না। আমি দাদাদের ফোন করে বললাম। সব বউ-বাচ্চা ছেড়ে আছে, স্যার কিছু মেয়েছেলে সাপ্লাই দিন। কোথায় কাকে রেপ করে বসবে, কেস পুরো বিলা হয়ে যাবে। চুক্তি হল। এটা জাষ্ট জানার জন্যে বলছি স্যার, সপ্তাহে একদিন করে মাল আসবে, দু'দিন থাকবে তারপর আবার ফেরত চলে যাবে। নেমকহারামি করব না স্যার, সরকার লিবার‌্যাল মানুষ, ক্যাডার অনুপাতে খানকি সাপ্লাই দিয়ে গেছে। সোনাগাছি, ওয়াটগঞ্জ, কালীঘাট, বর্ধমান, বারুইপুর। এক এক সপ্তাহে এক এক জায়গা থেকে মাল আসত। কী বলব স্যার কারুর কোন দু:খ কষ্ট নেই। কিন্তু কী বলব স্যার, নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি। লোকে স্যার শুতে পেলে উড়তে চায়। মেয়ে নিয়ে টানাটানি করা তাও তো একটা বুঝলাম, ধরুন একটা ডাবকা নেপালি মেয়ে এল, সবার তাকেই চাই, চেঁচামেচি, হুজ্জুতি। ভাল লাগে বলুন স্যার? আর মজার কথা কী জানেন, এগুলো তো তাও আপনি বুঝবেন কিন্তু মরা মেয়েমানুষ নিয়ে টানাটানি? এ জিনিস স্যার বাপের জন্মে শুনিনি! সুলেমানটা তো গাঁজা খেত বেহালার ওসি'টার সাথে আর ওই সেই বুড়ো, পরিতোষ, রাম হুইস্কি ফেলে বাংলা চোলাই খায়, আপনি দেখেছেন স্যার এমন মাল? দুটোই আমার সাথে এল কড়েয়া থেকে, মানে ওই আমাদের লকআপ থেকে যে আটজনকে এনেছিলাম। সেই দুই ব্যাটাচ্ছেলে নেশা -ভাং করে নিজেদের মধ্যে বন্দুকবাজী করত খালপাড়ে দাঁড়িয়ে। কী বলব স্যার, মরা মেয়েমানুষের জন্যে এমন আঠা আমি জীবনে দেখিনি। আর ভাঙাবেড়ার ওপাশে ভূমি প্রতিরোধের গুলির শব্দ কানে গেলেই হত, ওফ, ইট-পাথর মেরে মেরে খালটা পুরো বুজিয়ে দিয়েছে! এদিকে খানকি মেয়েগুলো গুলির শব্দ শুনে ন্যাংটো অবস্থাতেই দে দৌড় দে দৌড়। চাঁদের আলোয় ধনক্ষেতের সরু আল দিয়ে আমি, সুব্রত, তপন বারিক সব দৌড়াচ্ছি ন্যাংটো খানকি ধরার জন্যে। নেশা ফুল মাথায় আর আমরা শালা হাঁটু কাদাজলে লাফাচ্ছি চ্যাং মাছের মত। আপনি বলুন স্যার, এগুলো কি পুলিশের কাজ?


সুলেমান আর পরিতোষকে স্যার একজায়গায় রাখতে পারলাম না। পরিতোষ ভাঙ্গাবেড়া পোল দিয়ে একদিন একটা এ কে ফোরটি সেভেন নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল ওপারে। সুলেমানটাও হারামজাদা গুলি চালিয়ে দিল। শুরু হয়ে গেল দুই পারের মধ্যে যুদ্ধু। সরকার বনাম ভূমি রক্ষা প্রতিরোধ কমিটি। সে তো আজকের কথা নয়, কম-বেশি সবই জানেন আপনারা। প্রজিতের ফুটেজ দেখেছেন। অনিন্দিতার ফিলিম দেখেছেন। সেই যে কালোপানা দিদিমণি! খালের ওপারেই নব সামন্তের গোয়ালঘরে আবার কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে শুটিং করল। নব সামন্তের ঘরে না কি আগুন দিয়েছিল ভূমি প্রতিরোধের লোকেরা, আরে কাগজেও তো বেরিয়েছিল! ফিলিমে এই ভাবেই না কি হয়! নব আরেক খানকির বাচ্চা, বাড়ি ওধারে কিন্তু সে আবার ব-পার্টির পেটোয়া। নিজের ভাইঝিকে বাঞ্চোত রেপ করে এপারে পালিয়ে এল! বুঝতে পারছেন ? এই সব বিষ আমাকে গিলতে হয়েছে! আমি তো আর নীলকন্ঠ নই, সব পুড়ে ঝামা। ক্যাডাররা সব অনিন্দিতা সর্বাধিকারী দিদিমনির কথা মত পাট করল, মিথ্যে বলব না, আমিও ছিলাম, সিনেমায় নামব আমার অনেক দিনের শখ।সব মিলিয়ে কিন্তু দিব্যি ছিলাম স্যার, ঐ চোদ্দ তারিখের আগে পর্যন্ত। আর তারপর সেই যে শুরু হল সে তো চলতেই থাকল। ও দিকে তেখালি ব্রিজ আর এদিকে ভাঙ্গাবেড়া, রাত্তিরে যে সব মালেরা আক্রমণ করত তারা কেউ ভূমি প্রতিরোধের লোক না। ঐ যে মাও-ফাও বলে না, ওই সব। তারা নাকি গ্রামে গ্রামে ট্রেনিং দেয়, বন্দুক সাপ্লাই দেয়, গুলি দেয়, শালা এ যে যুদ্ধু শুরু হয়ে গেল। শান্তির দিন শেষ, আমাদের ইঁটভাটির চুল্লিতে আমাদের দেহই পোড়ে। আমরা যদি চোদ্দই সাতশ মেরে থাকি, তবে ওরা তার তিনগুণ ক্যাডার-কয়েদি-আর পুলিশ মেরেছে গত আট মাসে। দাদারা প্রতিবার দাঁতে দাঁত চিপে ক্যাডার রিফিল করে দিয়েছেন, কোনো রিপোর্টারের বাচ্চা পর্যন্ত এক সেমি ছাপতে পারেনি। আমাদের কেবল ন্যাকড়া খালি ঢিলে হয়েছে।

আজ বিজয় মিছিল হয়েছে, লোকজন ঘরে ফিরছে। অথচ আজ আমারও ঘরে ফেরার দিন ছিল স্যার। বৌ-বাচ্চা তো আছে! আমি স্যার লেবানন মন্ডল কে মারিনি। আপনারা এখন বিশ্বাস করবেন কি না জানিনা। তবে আগের কথাগুলো যদি বিশ্বাস করেন, তাহলে আমায় ছেড়ে দিন, বাড়ি ফিরে যাই। পুলিশের চাকরি ছেড়ে দেব স্যার। সি আর পি এফ সব সামলাক দাদাদের বাতেলা! লেবানন ছিল কনট্রকটার মানুষ, দল-ফল বুঝত না স্যার। লেবানন আমাদের যেমন প্রতি হপ্তায় মেয়ে সাপ্লাই দিত ওদিকে সাপ্লাই দিত পিস্তল-ফিস্তল, বোমার মশলা, সব জানি স্যার। কিন্তু ওকে সরালেও প্রবলেম। সবাইকে খাইয়ে পরিয়ে তো ওই বাঁচিয়ে রেখেছিল! দাদাদেরই লোক আমার কিছু বলার নেই। ১০ই মার্চ, রেন্ডির গাড়ি আসার কথা ছিল, এল না। শুনলাম লেবানন মন্ডল মার্ডার হয়েছে। ওরাও চেপে গেছে আমরাও চেপে গেছি। ক্যাডাররা তা মানবে কেন। মেয়ে না পেলে যা হয়, খেজুরিতেই টানা টানি শুরু করল ঘরের মেয়ে-বৌকে। রোজ কমপ্লেন। আবার চাপা রাখতে হবে সব কিছু, রিপোর্টারের বাচ্চারা গন্ধ পেলেই হল, ওদিকে দাদারা শিয়াল দিয়ে জ্যান্ত বিচি খাওয়াবে। ১১ গেল, ১২ গেল, ১৩ গেল, দাদাদের হাত জোড় করে বলেছি প্লিজ স্যার মেয়ে পাঠান। খানকি না পেলে স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন থেকে কিছু দিন স্যার, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ; আপনাদের এত বড় পার্টি হাজার খানেক ফিমেল সাপ্লাই দিতে পারবেন না? পার্টির জন্য স্যাক্রিফাইস করতে বলুন। আর ঢ্যামনার বাচ্চা পরিতোষ ওপাশ থেকে যেই খবর পাঠাল লেবানন আর নেই তখন ওদের থামানোর ক্ষমতা আমার ছিল না। কেউ অর্ডার দেয় নি স্যার। কোনো পলিটিক্যাল নেতা স্যার ইনভলবড নয় স্যার। ১৪ তারিখ সব কুকুরের মত রেপ করল, মার্ডার করল, সমস্ত ইঁট ভাটিতে বডি পুড়ল সারা রাত, সাতেঙ্গাবাড়ি ঢুকতে যে করাত কলটা ছিল তাতে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে বডি কাটা হয়েছে, নালায় ফেলে দেওয়া হয়েছে, বস্তায় ভরে এদিক ওদিক সব পঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, এদের মধ্যেই কেউ ছিল স্যার লেবানন মন্ডলের হত্যাকারী, আমি নিশ্চিত। আমি নই কিন্তু। নন্দীগ্রামের এক বছরে যে সব হাঙ্গামা ঝামেলা হল তাতে আমার স্যার কোন হাত নেই কিন্তু।


( চলবে)