এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সুকি | 237812.69.453412.44 | ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১২:৫৭381878
  • লম্বু গাছ, খড়ের পালুই ও ভবানী হাজরার ছাগল
    -----------------------------------------------------

    সাথে ছবিটিতে যে গাছটি দেখা যাচ্ছে সেটি আমাদের খামারের সীমানায়, আর পাশের খড়ের পালুই-টি ভবানী হাজরার খামারের বাউন্ডারীতে। এই দুইয়ের মাঝখান দিয়ে কোন ভাবে ভারত-বাংলাদেশের মত সীমারেখা চলে গেছে। এবং ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এক ছবিতে আমাদের খামারের দিকে একটা সাদা ছাগল শুয়ে আছে লম্বু গাছের তলায়। ইহা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যাপার এই লেখার প্রেক্ষিতে।



    গাছটার নাম লম্বু-গাছ, যার বিজ্ঞান সম্মত নাম ‘লম্বু-লম্বু’, ইংরাজী নাম জানা নেই। জ্বালানী ছাড়া এই গাছের কাঠ দিয়ে আর কি হয় তাও জানি না বলাই বাহুল্য। অবশ্য নিমোর বিখ্যাত কাঠ মিস্ত্রি রবি শর্মা লম্বু কাঠের খাট বানিয়ে জলশিরীষ বা সোনাঝুরি এবং লোক বিশেষে সেগুন বলে চালাত সেটা বিলক্ষণ জানা।

    এবার পুজোতে বাড়ি গিয়ে শুনলাম এই লম্বু গাছ এবং খড়ের পালুই নিয়ে ভবানী হাজরা এবং আমার ভাই বাবু-র মধ্যে খুনসুটি শুরু হয়েছে। ভবানী হাজরা আমাদের সোনার বাংলা ক্লাবের শব্দ-প্রেক্ষণ এবং ডান্সিং অ্যারেঞ্জমেন্টের স্থায়ী দায়িত্বে থাকা ভুলুর দাদু। দেখা হল ভুলুর সাথে, সে এখন ২২০ সিসি-র কি একটা বাইক কিনে ঘুরছে। ওর কাছ থেকে জানতে পারলাম শুধু নিমো-মেমারীতেই নয়, বর্ধমানেও এবার পুজোর মার্কেট খুবই খারাপ ছিল। বর্ধমান স্টেশনের পিছন দিক দিয়ে বেরুলে যে মাল গুদামের দিকে যাওয়ার রাস্তা আছে (গুডশেড রোড) সেখানে ফার্ণিচার শো-রুম ‘খুবসুরৎ’ এর স্টোর ম্যানেজার। আপনারা কেউ যদি ওদিকে কিছু কিনতে যান, তাহলে ভুলুর কাছে আমার নাম রেফার করলে কিছু ডিসকাউন্টের চান্স রয়েছে।

    আলমের কানেকশন থেকে যেমন আনন্দম সিনেমা হলের টিকিট পাওয়া যায়, তেমনি ভুলুর কানেকশন থেকে বর্ধমান শহরের একটু বাইরে জি টি রোডের ধারে যে ‘ক্যান্টিন’ নামক বিখ্যাত রেষ্টুরান্ট হয়েছে সেখানে নবমীর রাতে বিনা লাইনে ভি আই পি ট্রিটমেন্ট পেতে পারেন। জানতে পারলাম যে নিমোর ছেলেরা ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে রাত দেড়টার সময় ‘ক্যান্টিন’-এ পৌঁছে দেখে যে তাদের আগে থালা বাটি হাতে আরো জনা পঞ্চাশ পাবলিক ওয়েট করছে। অগত্যা অত রাতে ভুলুকে কল দিতে হয় তার মালিক-কে এবং তেনার বলে দেবার ফলে উপরের তলায় বিশেষ ভাবে ব্যবস্থা হয়ে যায় নিমো পাবলিকের তুরন্ত।

    ভুলু ভালবেসে বিয়ে করেছে আমাদের পাশের কোলেপাড়া গ্রামের মেয়েকে। যতদূর মনে পড়ছে ভুলুর শ্বশুরের সাথে একসাথে মনে হয় কিছু ক্রিকেট খেলেছি। আমাকে পুজোর সময় ভুলু বলল, “দাদা, বিয়েতে তো বিশাল কিছু খাওয়াতে পারি নি – এই ছেলের অন্নপ্রাশনে সবাইকে জবরদস্ত খাওয়াবো”। মনে হচ্ছে সেই খাওয়াটাও মিস হল।

    প্রসঙ্গান্তরে চলে যাচ্ছি – মানে যেটা এসটাবলিস করতে চাইছিলাম তা হলে – ভুলু পুরো মাইডিয়ার টাইপের ছেলে। কিন্তু ভুলুর দাদু ভবানী একটু তেরচা টাইপের লোক আছে বলেই আমরা ছোট বেলা থেকে জেনে এসেছিলাম। গরু – ছাগল – জমি নিয়েই তেনার জীবন কেটে গেল।

    লম্বু গাছের সাথে খড়ের পালুইয়ের সম্পর্ক বুঝতে না পেরে আমি বাবুকে ব্যাপারটা ক্লীয়ার করতে বললাম। বাবু আমাকে যা এক্সপ্লেন করল তাতে করে ভবানী হাজরার দাবী হচ্ছে আমাদের লম্বু গাছের পাতা থেকে জল টপটপ করে পরে খড়ের পালুই-য়ের খড় নষ্ট হচ্ছে তার।



    আমি এমনতর যুক্তি শুনে ঘাবড়ে গেলাম – বৃষ্টি হলে তো জল গাছ এবং পালুই-য়ের গাদা দুই জায়গা তেই পড়বে! আলাদা করে গাছের ডাল থেকে পালুই-য়ে জল যাবে কি করে!! ডিপে গিয়ে বুঝতে পারলাম, বৃষ্টির জল নয় – এই শীতকালের কুয়াশা আসছে, গাছের ডালে কুয়াশা জমে জল ড্রীপ করবে নাকি খড়ের উপর। এমন যুক্তি আমি বাঁড়া জীবনে শুনিনি – এমনটা বাবু জানাল, এবং আমি সহমত হলাম। তবুও গাছের ডাল কেটে ভবানী হাজরার খুঁচানোর হাত থেকে বাঁচতে রবি শর্মা-কে বলা হয়েছিল সেই লম্বু গাছ নিয়ে যা তাড়াতাড়ি। কিন্তু পুজোর বাজারে রবির হাজারো কাজ থাকায় লম্বু গাছ যেমন, তেমনই থাকে – আর ওদিকে ভবানী-র তাগাদাও শেষ হয় না। এর হাত থেকে নিস্তার পেতে বাবু এবার অন্য ট্যাকটিক্স নেয়। সে বলে ভবানী হাজরাকে, “ঠিক আছে আমি গাছের ডাল কেটে দেব, কিন্তু তোমার ছাগল যদি এবার থেকে আমার খামারে ঢোকে তা হলে ওই ছাগলের ঝোল হয়ে গিয়ে খাবার পাতে উঠতে বেশী সময় লাগবে না!” সেই শুনে নাকি ভবানী হাজরা একটু দমে গেছে – লোকে বলে নিজের ছেলেদের থেকেও ছাগল-গরু বেশী ভালোবাসত এককালে ভবানী হাজরা।



    আমাকে ভাই জিঞ্জেস করল – এই বুড়ো বয়েসে ভবানীর এমন করার কোন মানে হয়! আমি তখন ভাবতে বসলাম - সদ্য পড়ে শেষ করেছি “ভুঁইফোড়ের মনোবিদ্যাচর্চা”। সেই অ্যানালিসিস করে যা বুঝতে পারলাম, এই বয়েসে এসে ভাবনী হাজরা আর কথা বলার বেশী লোক পাচ্ছে না – কেউ বিশেষ পাত্তা দেয় না। আর বলতে কি লাইফে তেমন কোন সমস্যাও নেই। তাই এই সব অদ্ভূত সমস্যা খুঁজে নিয়ে এর তার সাথে গায়ে পরে খুনসুটি করে।

    তবে খড়ের পালুই-য়ে জল পড়ার ব্যাপারটা হালকা সেটেল হয়েছে শুনলাম – পরের বারে গিয়ে দেখতে হবে পুরোটা সলভ হয়েছে নাকি!
  • সুকি | 236712.158.786712.21 | ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:০০381879
  • আলু
    ----------------------

    আজকে আমষ্টারডাম শহরে হাঁটতে হাঁটতে আবার সেই আলুর কথা মনে পড়ে গেল। যারা আমষ্টারডাম বা হল্যান্ডে এসেছেন তাঁরাই নিশ্চয়ই ডাচ আলু এবং তার থেকে তৈরী ফ্রাই-য়ের সাথে সম্যক পরিচিত। সেই আলুর ফ্রাই বা আলুভাজা যে কি লম্বা লম্বা সে আর কি বলব। তেমন ফ্রাই যে আলু থেকে কেটে বানানো হয় তা কত বড় হবে কল্পনা করে নিন আগে দেখে না থাকলে। থাক আর কষ্ট করে কল্পনা করতে হবে না, ডাচ আলুর টাটকা ছবি তুলে রেখেছি, দেখে নিন আটকে দিলেম এই লেখার সাথে। তবে ছবির সাথে স্কেল নেই বলে আপনি হয়ত আবার ভাবে বুঝতে পারবেন না এ আলু কত বড় – আমাদের চন্দ্রমুখী বা জ্যোতি এর কাছে নিতান্তই শিশু। পূর্ণবয়ষ্ক মানুষের পায়ের পাতার মত বড় এবং লম্বাটে হতে পারে সেই আলু।



    আমাদের যেমন ভাত, ডাচেদের তেমন আলু – মানব সভ্যতার সাথে অঙ্গাঅঙ্গি জড়িয়ে আছে কার্বোহাইড্রেট। ডাচ ক্যুজিন বলে তো তেমন কিছু হয় না, এই মালগুলো না জানে মশালার ব্যবহার, না জানে ভালো মাংসের কোন ডিস বানাতে। এমনকি আমেরিকা বা অষ্ট্রেলিয়ার পাবলিকদের ন্যায় বারবিকিউ-ও পারে না! তবে শেষ দিকে ইন্দোনেশিয়ায় সাড়ে তিনশো বছর কাটিয়ে মশালা হালকা চিনেছে। এবং সেই খাবার আজকাল বিলক্ষণ ভালোবেসে ইন্দোনেশিয়ান খাবারকে নিজেদের বলে চালাবার চেষ্টা করছে! ঠিকক বৃটিশরা যেমন কারী নিজেদের দাবী করে নিয়ে নিল বলে – ডিক্সেনারী তে তো অনেক আগেই ঢুকিয়ে নিয়েছে, তা সে কেমব্রীজ বা ওয়েবষ্টার যাই হোক না কেন!



    যাই হোক, হল্যান্ডে আলুভাজা যতই ডাচ ডেলিকেসী বলে টুরিষ্টদের চালানো হোক না কেন – সত্যি কথা হল আমষ্টারডাম শহরে হাঁটতে হাঁটতে মেয়োনিজ দিয়ে গরম গরম আলুভাজা খেতে খুব একটা মন্দ লাগে না! আজ ছিল তেমনই এক দিন। আলুভাজা খেতে খেতে হাঁটতে গিয়ে বহুদিন আগে আলু নিয়ে আমাদেরই ইস্কুলের এক স্যারের কীর্তি কলাপ মনে পড়ে গেল।

    সেই স্যারের কাছে আমরা টিউশন পড়তাম – স্যারের বাড়ি ছিল মেমারীর কালিমাতা কোল্ডস্টোরের ঠিক সামনে। তো সেবার হয়েছে কি নতুন আলুর মারাত্মক দাম হয়েছে, চাষী বেজায় খুশী। তার আগের বছর আলুর একদম দাম ছিল না। স্যার করেছে কি তার দেশের বাড়ির এক চাষীকে টাকা দিয়েছে দাদন টাইপের ব্যবস্থায়। মনে ধরা যাক স্যার সেই চাষীকে আলু পাতার সময় ২০০০ টাকা দিয়েছে, মৌখিক চুক্তি হয়েছে যে আগের বছর আলুর গড় দাম দেখে স্যারকে সে কয় বস্তা আলু দেবে আলু উঠলে পড়ে। ধরা যাক আগের বছর আলুর গড় দাম ছিল ২০০ টাকা প্রতি বস্তা, এর অর্থ সেই চাষী আলু উঠলে স্যারকে ২০০০/২০০ = ১০ বস্তা আলু দেবে।

    এই পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু সেই বারে আলুর দাম হয়ে গেল ফট করে ৪০০ টাকা প্রতি বস্তা! এবার হয়েছে কি সেই চাষী আর স্যারকে ১০ বস্তা আলু দিতে চায় না! স্যার বলে, আগে যা কথা ছিল ততো বস্তাই আলু দিতে হবে – আর সেই চাষী বলে সে ৪০০ টাকা দরে আলু (মানে ৫ বস্তা) স্যারকে দেবে। এই নিয়ে বিশাল ক্যাঁচাল, স্যার আর আলু পায় না। আমাদের সকালে পড়াতে পড়াতে কালীমাতা কোল্ড স্টোরে আলু ঢোকাতে আসা দাঁড়িয়ে থাকা আলুর বস্তা ভর্তি গরুর গাড়ি এবং ট্রাকটার গুলোর দিকে উদাস চোখে চেয়ে থাকত! একদিন এই ভাবেই আমাদের পড়াতে পড়াতে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে কালীমাতার দিকে, হঠ করে দেখি স্যারের চোখে চাঞ্চল্য – জ্বলজ্বল করে উঠল চোখগুলো।

    “ওই গরুর গাড়ির সাথে ওটা তরুণ না”?

    এই বলে কিছু দেখা দেখি নেই, আমাদের স্যার পড়াচ্ছিলেন লুঙ্গি পরে। হাতের বই ফেলে দিয়ে লুঙ্গির কোঁচা পাকড়ে স্যার দিলেন ছুট দোতলা থেকে। আমরা উপর থেকে দেখছি, স্যার ছুটে গিয়ে সেই গরুর গাড়ির সামনে চলে গেলেন। গরু দুটোকে এড়িয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেন কোনক্রমে এবং সটান চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন আলুর বস্তার উপর। আমাদের প্রধান মন্ত্রী আজকাল যেমন বড় পাথরের উপর শুয়ে যোগব্যায়াম করেন, সেই অনুরূপ ভাবেই ছিল স্যারের শুয়ে পড়া। আলুর বস্তার উপর শুয়ে স্যার চিৎকার করছেন,

    “এ আলু আমার – এ আলু আমার। এ গাড়ি কোল্ড স্টোরে ঢুকতে হলে আমার বডির উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এ আলু আমার, সব বস্তা আমার”।

    আশে পাশের লোক জন একটু ঘাবড়ে গেছে, আফটার অল স্যারকে সবাই চেনে আশেপাশে এবং সম্মান করে। কিন্তু আলুর মায়ায় স্যারের আর সেই সব মনে নেই, এবার চিৎকার করে আমাদের ডাকছে,

    “এ্যাই তোরা নেমে আয় তাড়াতাড়ি – এসে এ গাড়ি আটকা। তোরা থাকতে তোদের স্যারের উপর এত অনাচার হতে দিস না। তোদের স্যারের সব আলু এরা লুটে নিয়েছে”।

    এদিকে স্যারের লুঙ্গি প্রায় খুলে গ্যাছে ওরকম তড়িঘড়ি ভাবে দৌড়ে নামার জন্য। এক হাতে লুঙ্গির গিঁট ধরে অন্য হাতে আমাদের নীচে নামার জন্য ইশারা করছে স্যার – সবটাই আলুর বস্তার উপর শুয়ে শুয়ে।

    আজ আমষ্টারডামে হাঁটতে হাঁটতে আলুভাজায় কামড় দিতে দিতে সেই স্যারের আর্ত চিৎকার মনে পড়ে গেল, “এ আলু আমার” এবং “আমার সব আলু এরা লুটে নিল”। নিজের অজান্তেই কখন ঠোঁটের কোনে হাসি চলে এসেছিল, পাশের কলিগ কি হয়েছে জানতে চাইলে কিছু না বলে কাটিয়ে দিলাম।

    বড় জ্যাঠার বাঘ মারার গল্প ইংরাজীতে রব-কে শোনাতে সক্ষম হলেও, লুঙ্গির গিঁট ধরে ‘এ আলু আমার’ – জিনিস ইংরাজীতে অনুবাদ করে টম-কে শোনানোর মত এলেম আমার নেই!
  • সুকি | 237812.69.453412.164 | ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:০৮381880
  • বাড়ি ঘর
    -----------------------

    বিয়ে-থা করে সংসার বসানোর প্রাক্কালে আলোচনা উঠল বাড়িতে যে ঘরের সংখ্যা বাড়াবার তাহলে সময় এসেই গেল! ঘরের সংখ্যা কিভাবে বাড়ানো যাবে সেই নিয়ে বাপের সাথে নিম্নরূপ আলোচনা হল, আমি বললাম –

    -বলছি, তাহলে কলকাতার দিকে একটা ফ্ল্যাট দেখার চেষ্টা করি

    বাপ তখন চা খাচ্ছিল, আমার প্রস্তাব শুনে চা চলকে লুঙ্গিতে পরে গেল

    -বলিস কি! বাপ ঠাকুর-দার ভিটে ছেড়ে চলে যাব! বিদেশে থেকে থেকে মাথাটা একদম গ্যাছে নাকি তোর!

    আবার সপ্তাহ খানেক পর আলোচনা ভেসে উঠল ফোনে

    -বলছি কি, তাহলে ওই পুরানো বাড়ির ভিতরে গুঁজে না থেকে একটু বেরিয়ে এসে নিমো রেল-গেটের কাছে যে জমিটা আছে সেখানে একটু হাত-পা ছড়িয়ে বাড়ি করলে কেমন হয়
    -বলিস কি! বাপ ঠাকুর-দার ভিটে ছেড়ে উঠে যাব!

    আমার কাছে ব্যাক-আপ উত্তর ছিল না। ফলে সেই প্রসঙ্গের ইতি – ফাষ্ট ফরোয়ার্ড আরো কিছু সপ্তাহ, এবার একটা এসপার ওসপার করতেই হবে কোথায় বাড়ি হবে সেই নিয়ে

    -বলছি কি, রেল গেটের কাছে না হোক, নিমো স্টেশনের কাছে ঠাকুর-ঝি পুকুরের পাড়ে যে জায়গাটা আছে সেখানেই বাড়ি করলে কেমন হয়! উত্তর-দক্ষিণ সবই খোলা
    -বলিস কি! বাপ ঠাকুর-দার ভিটে ছেড়ে উঠে যাব!
    -তাহলে বাড়ি কোথায় হবে?
    -তোকে ও সব ভাবতে হবে না, পুরানো বাড়ির উঠোনের দক্ষিন দিকে অনেক জায়গা আছে – পাঁচিল, ফাঁচিল অ্যাডজাষ্ট করে ওখানেই হয়ে যাবে।
    -ধুর ওখানে আবার কেউ বাড়ি করে নাকি?
    -তাহলে তুই যেখানে চাস গিয়ে বাড়ি কেনগা যা, কলকাতা-ফোলকাতা, ইংল্যান্ড-হ্ল্যান্ড – যেখানে মন চায়। খালি আমাদের জড়াস না, বাপ-ঠাকুরদার ভিটে ছেড়ে যেতে পারব না।

    আমি বুঝে গেলাম এই নিয়ে ফালতু বাক্য ব্যয় করে লাভ নেই। নেগোশিয়েশনে চলে গেলাম –

    -ঠিক আছে বাড়ি ওখানেই হোক, তুমি মেপে বল কতটা জায়গা বেরোবে, আমি ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে প্ল্যান করাচ্ছি।
    -ইঞ্জিনিয়ার বাড়ির প্ল্যান করবে? কিছু বুঝিস তুই বাড়ি তৈরীর?
    -আরে ওই পুরানো ধাঁচের বাড়ি হলে হবে না, একটু নতুন টাইপের না করলে হয় নাকি?
    -কে ইঞ্জিনিয়ার প্ল্যান দেবে তোর বাড়ির। ওই তো সেদিন বর্ধমানে বিয়ে খেতে গিয়ে দেখলাম ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে প্ল্যান করিয়ে বানানোর বাড়ি! ঘরের ছাদে কোন বীম নেই! ওই ঘর টিকবে?
    -যুগ এখন অনেক এগিয়ে গ্যাছে। এখন পিলার দিয়ে বাড়ি হয় – পিলার মেন লোড নেয়। তাই আর বীমের দরকার পরে না।
    -তোকে আমি আগেই বলে দিলাম, এই পিলার-ফিলার দিয়ে ডিজাইন আমি একদম ঢুকতে দেব না। গঙ্গার ইঁট দিয়ে বাড়ি বানাবো, তার কাছে তোর ওই পিলার! আমাদের পুরানো বাড়িটার বয়স কত হল? কিছু হয়েছে দেখেছিস? আর কাগজে পড়িস না যে বড় শহরে বাড়ি ভেঙে যাচ্ছে ধুপ ধাপ? সব পিলারের বাড়ি।

    বরাবরেই মত আমি আবার হেরে গেলাম যুক্তিতে, তবুও একটা শেষ চেষ্টা দিলাম

    -ঠিক আছে পিলারের বাড়ি হবে না। কিন্তু বাড়ির ডিজাইন করবে কে?
    -বাড়ির আবার ডিজাইন কি? আমি একদিন মুর্শেদ-কে নিয়ে বসে ঠিক করে নেব।
    -না না, তোমার আর মুর্শেদ-কার দ্বারা মর্ডান ডিজাইন হবে না। তুমি আমাকে কতটা জায়গা বলে দাও, আমি দেখি মেমারী থেকে চেনা ইঞ্জিনিয়ার কাউকে পাঠাতে পারি কি না।

    কি ভেবে বাপ রাজী হয়ে গেল। অনেক কষ্টে মেমারীর মিউনিসিপ্যালিটির দুই কিংবদন্তী ইঞ্জিনিয়ারের সাথে কথা বললাম, তারা আমার দাদার মত। একদিন তারা নিমো গেল বাড়ির জায়গাটা দেখতে – আমি ভাবলাম, যাক তাহলে কাজ মিটে গেল। এবার ওই দাদাদের কাছ থেকে ডিজাইন নিয়ে নিলেই হবে। আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাপকে ফোন করলাম –

    -বলছি তাহলে ওরা যা প্ল্যান দিয়ে গ্যাছে সেটা দিয়েই তুমি কাজ শুরু করে দাও
    -কার প্ল্যান?
    -কার আবার, সেদিন মেমারী থেকে ইঞ্জিনিয়ার এসেছিল না?
    -ও গুলো ইঞ্জিনিয়ার? ওদের দিয়ে বাড়ি করালে একটা বর্ষা পেরোবে না আমি বুঝে গেছি
    -আবার কি হল?
    -কিছু জানে ওরা? জায়গায় মাপই বলতে পারছে না? শতক, বিঘে, কাটা – কিছুর মাপই তো জানে না? স্কোয়ার ফুট নাকি সব দিয়ে মাপছিল।
    -ঠিক আছে, একটা প্ল্যান তো কিছু দিয়ে গ্যাছে নাকি? আমাকে তুমি সেটাই পাঠাও
    -প্ল্যান কোথায় পাব? খাতা পত্র তো কিছুই নিয়ে আসে নি। আমার কাছে সাদা পাতা চাইলে আমি হাতের কাছে দেবীপুরে সামনে যে যাত্রাটা আসছে সেটার লিফলেট ছিল সেটাই দিলাম। তার পিছনেই তো দেখলাম কি সব এঁকে।
    -ওই তো এঁকে দিয়েছে। তুমি আমাকে ওটা পাঠাও।
    -সেই কাগজটাই তো পাচ্ছি না আর। তোর মা সকালে ঝাঁট দিয়ে ফেলে দিয়েছে মনে হচ্ছে।

    ব্যাস, ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে বাড়ি বানানোর সখ মিটে গেল! বাপ ডেকে নিয়ে এল মুর্শেদ-কাকা কে। আমাদের পুরানো বাড়ি করেছিল মুর্শেদ-কাকার ভাই তপু-দা। তপু-দা ততদিনে মারা গ্যাছে কম বয়েসে, ওদের অন্যভাই হাফিজুল-দা ফিরে গ্যাছে মুর্শিদাবাদে। বাপ আর মুর্শেদ-কা মিলে প্ল্যান বানালো। অমৃতার শখ ছিল একটা গোল বারান্দা হবে আর সিঁড়ি উঠবে গোল হয়ে। ঘরের পিছনের দিকের অ্যাটাচ বারান্দার এক ভাগে মাথায় কোন ছাদ থাকবে না – অমৃতা বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসত। আর থাকবে খোলা ছাদ। তবে যাই হোক আমাদের নতুন বাড়ির চারিদিকে কিন্তু খুব সবুজে ভরা ছিল। বাড়ির পুবে ছিল ছোট বাগান, হিটুদের বাড়ি, আমাদের খামার বাড়ি, দক্ষিণে ছিল হিটুদের পুকুর, পশ্চিমে ছিল মোড়লদের বাগান। পুকুর আর বাগান পেরোলেই নিমো গ্রামের শেষ – দিগন্ত জোড়া সবুজ মাঠ, মাঠের ওদিকে কোলেপাড়া গ্রাম।







    বাড়ির স্ট্রাকচার পুরোপুরি খাড়া হলে দেখা গেল – খোলা বারান্দা আছে, কিন্তু তা আর গোল করা হয় নি, আয়তক্ষেত্র হয়েছে। গোল সিঁড়ি করতে আরো বেশী জায়গা চাই বলে সেখানেও কমপ্রোমাইজ করা হয়েছে। কিন্তু খোলা ছাদ রয়েছে অনেকটা – বড় প্রিয় সেই ছাদ।







    ঘরের দেওয়ালের রঙ, সিঁড়ির রেলিং এর ডিজাইন, বারান্দার গ্রীলের ডিজাইন সবই অমৃতার এঁকে দেওয়া। নিমোর ছেলেরা সবাই যে বখাটে এমন নয়, কিন্তু করিতকর্মা ছেলেও আছে। নীচের লিষ্ট সেই সব কৃতী পাবলিকেরঃ

    ১। রাজমিস্ত্রীঃ মুর্শেদ কাকা
    ২। কাঠ মিস্ত্রীঃ রবি। রবির বাপ রাজারাম ছিল আমাদের পুরানো বাড়ির কাঠমিস্ত্রী
    ৩। গ্রীল/লোহা ইত্যাদিঃ হরি। হরি আমাদের বাল্যকালের ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন এখন নিমো বটতলায় ‘সায়নী ইঞ্জিনিয়ারীং ওয়ার্কস’ এর মালিক
    ৪। রঙ মিস্ত্রীঃ নিমোর পাশের গ্রাম ক্যাম্পের কতগুলো ছেলে। যারা রাত জেগে মোমবাতি জ্বালিয়ে রং করে কাজ শেষ করেছিল
    ৫। পাথরের মিস্ত্রীঃ এই মালটাকে ঠিক ট্রেস করা যেত না – একদিন কাজ করে চার দিন ডুব। রিউমার আসত সে দুবাই চলে গ্যাছে কাজ করতে, কেউ বলত সৌদি – আবার আমাদের চমকে দিয়ে কোনদিন চলে আসত কাজ করতে।
    ৬। আসবাব পত্রঃ সন্তু। সন্তু আমার বাল্যবন্ধু, সে আজ দীর্ঘকাল বর্ধমান পার্কাস রোডের ফার্ণিচারের দোকান ‘মল্লিক ব্রাদার্স’ এর ম্যানেজার।

    কাঠের কাজ প্রশংসিত হয়েছিল রবির – সে কাজ করেছিল মূলত সেগুন কাঠের। আমাদের কোথায় কোন পুকুরের পাড়ে একটা সেগুন কাঠ ছিল, সেটা ফাড়িয়ে কাঠ বের করা এবং আরো সেগুন কাঠ কেনা সবটাই বাপের ডাইরেকশনে করেছিল রবি।





    মেহুল বড় হচ্ছে – মায়ের মত সেও সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকে মাঝে মাঝে আনমনে। সাথের ছবি সেই বাড়ির এবং ছাদে দাঁড়িয়ে অনন্ত সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকা মেহুলের।



  • সুকি | 237812.69.453412.116 | ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:১১381881
  • পরামর্শ
    ----------------

    অনেকদিন ধরে ভাবি রাজেশদার অমূল্য পরামর্শগুলি ফেসবুকে লিখি, কিন্তু পাবলিক যদি আমাকে হাল্কা অসভ্য ভাবে, সেই চিন্তায় আর লিখি নি। পরে ভেবে দেখলাম এই সব অসভ্য বিষয়ক ধারণা ভিক্টোরিয়ান প্রভাব মাত্র আর তাছাড়া বহু অমূল্য পরামর্শ এই ভাবেই দেওয়া হয়েছে যুগ যুগ ধরে।

    রাজেশদা ছিল আমার থেকে কিছু সিনিয়ার, বহুকাল আগে হাউসমেট। আমরা তখন একই কোম্পানীতে কাজ করতাম, ভাইয়ের মত ভালোবেসে অনেক কিছু শেখাত দাদা। কলাইয়ের ডাল, ভালো পাবদা মাছ কেনা, লুচি ফুলকো হবার রহস্য - এমন অনেক কিছু আর্ট আমার রাজেশদার কাছ থেকেই শেখা।

    সেই রাজেশদা আমাকে বার বার বলত সুকান্ত, ঠিক বয়েসে বিয়ে করবে, আমার মত দেরী করবে না। আমি কারণ জানতে চাইলে ব্যাকগ্রাউন্ড ঘটনা সে ব্যাখা করে। রাজেশদা তখন দিনে চাকুরী করে রাতে যাদবপুর থেকে বি ই পড়ছে। শনিবার করে গ্রামে ফেরে। একদিন রাতের বেলা ফিরছে আর গ্রামের এক জ্যাঠার সাথে দেখাঃ

    - তা রাজেশ, বিয়ে থা কর এবার। তোর মায়ের তো বয়স হচ্ছে নাকি? আমাদের কাছে মাঝে মাঝে দুঃখ করে

    - বিয়ে করব জ্যাঠা ঠিকই, আগে আর একটু দাঁড়িয়ে নিই

    - আর কত দাঁড়াবি? ওদিকে যে ওটা আর দাঁড়াবে না!

    এই জন্যই রাজেশদা ঠিক সময়ে বিয়ে করার কথা বলত।

    আজকাল যতবার এই শীতের দেশে যাই, রাজেশদার পরামর্শ খুব মনে পড়ে। এই যেমন গত সপ্তাহে ইংল্যান্ডে বা হল্যান্ডে গিয়ে মনে পড়ছিল।

    ঠান্ডার দেশে গিয়ে পই পই করে টাইট রাজু বা ভি আই পি ফ্রেঞ্চী জাঞ্জিয়া পরে থাকতে বলত রাজেশদা, ঠাণ্ডার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য।রাজেশদার মতামত ছিল গরমের দেশের ছেলেদের এক প্রধান প্রবলেম হল, জাঙ্গিয়া পরে থাকা। রাজেশদার মতে গরমের সময় ট্রেনে বাসে ছেলেদের উতপটাং তিরিক্ষি মেজাজের মূল কারণ জাঞ্জিয়া জনিত অস্বস্তি, চুলকানী এবং হেনস্থা। প্রবল চুলকাচ্ছে, কিন্তু হাত যাচ্ছে না ভীড়ের জন্য!

    সেই প্রবল গরমে ঘাম হয়ে শরীরের ঢাকা জায়গায় থেকে গিয়ে এক বাজে অবস্থার সৃষ্টি করে, তা নিয়ে বিশেষ কোন দ্বিমত ছিল না। কিন্তু তার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য অনেক ছেলে ছোকরা যে ল্যুজ আন্ডারপ্যান্ট পরত, এটা রাজেশদার পছন্দ ছিল না। রাজেশদার অভিমত ছিল, আণ্ডারপ্যান্ট পরে থাকলে বীচি ঝুলে যায় – এবং আমাদের মত নওজোয়ানদের (বিশেষ করে অবিবাহিত) বীচি ঝুলে যাওয়া কোন কাজের কথা নয়।

    তাই ইংল্যাণ্ড পড়তে আসার আগে রাজেশদা বলেছিল, “সুকান্ত, ঠান্ডার দেশে যাচ্ছ তো, একদিক দিয়ে ভালো হল। বীচি ঝুলে যাবার ব্যাপারটা যেটা তোমাকে আমি অনেকবার বুঝিয়েছিলাম, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে না আর। তুমি এখান থেকে রাজু বা ভি আই পি নিয়ে যাও কিনে অনেকগুলো – ঠান্ডায় বীচি গরমও থাকবে, আর ঝুলে যাবার ভয়ও থাকবে না”।

    সেদিন ভোরে আমষ্টারডামের তাপমাত্রা মাইনাস দুই ডিগ্রী হয়ে গিয়েছিল - ভোর ভোর তাই আবার রাজেশদার কথা মনে পড়ে গেল।
  • সুকি | 237812.68.454512.90 | ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:১২381882
  • ফ্যাশন, ছোটমামা ততসহ দুচার কথা
    ----------------------------------------

    আগের দিন দেখলাম বন্ধু মহলে ফ্যাশন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে – তবে সেই সব আলোচনা মহিলাদের শাড়ি, পোষাক ইত্যাদি নিয়ে। ছেলেদের ফ্যাশন নিয়ে কে আর মাথা ঘামায় তেমন! এমনটা ভাবার খানিক পরেই ছোটমামার কথা ইয়াদ এসে গেল, যে এককালে গ্রামের দিকে ফ্যাশন কিং ছিল বলতে গেলে। মামা আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড, কিন্তু ট্যাগাবো না – তাহলেই চিনে ফেলার সম্ভাবনা এবং হয়ত প্রোফাইলে গিয়ে ছবি দেখা যাবে নিজের মুরগীর পোলট্রী ফার্মের পাশে বাঁশের মাচায় লুঙ্গী পরে বসে বসে খইনী মুলছে বা ভুঁড়ি চুলকাচ্ছে। সেই ছবি দেখলে আমার উপপাদ্য বিশ্বাস করতে পাবলিকের মনে দ্বন্দ চলে আসবে – অথচ কথা আমার নিদারুণ সত্যি।

    মামা ছাড়াও ফ্যাশন বিষয়ে মনে চলে আসে আমার নিমোর কামারদের বেচা-দার কথা। বেচা-দা জমি চাষে সিফটে করে যাবার আগে নিমোতে লুঙ্গি পরে মাঠে কাজ করতে যাবার চল ছিল। এবং মাঠের কাজ অনুযায়ী সেই লুঙ্গি যেখানে ওঠার স্বাভাবিক নিয়মে সেখানেই উঠত। এই যেমন হালদারদের মানিক-কা ধান জমিতে জল পাওয়াতে গেল, কিন্তু জল নিয়ে পাশের জমির সাথে কম্পিটিশনে নেমে লুঙ্গি কোথায় থাকত তার কোন শেষ নেই। এবার ঘটনা হল মাঠে কাজ করতে বাউরি পাড়ার বৌদি-রাও যেত। কথিত আছে মানিক-কা লুঙ্গি সামলে রাখতে নাকি উপরতলা থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তো যাই হোক সেবার বেচা-দা বেড়াতে গেল তার ভাই সোনা-দার কাছে বোম্বেতে যে সেখানে সোনা-রূপোর কাজ শিখত। ফিরে এসে দেখি বেচা-দা আর লুঙ্গি ছুঁয়ে দেখছে না – ফুলপ্যান্ট পরে গোড়ালির কাছটা কিছুটা মুড়ে নিয়ে মাঠে যাওয়া শুরু করল।

    এ যে কি এক যুগান্তকারী ব্যাপার সেটা এতোদিন পরে আর লিখে বোঝানো যাবে না। সেই দেখা দেখি অনেকেই মাঠে প্যান্ট পরে যাওয়া শুরু করে দিল। নিমোর মাঠে সবুজ বিপ্লব দেখা গেল আলু-ধান এর ফলনে। কাজের এফিসিয়েন্সি বেড়ে গেল। হিসাব করে দেখা গেল মাঠে কাজ করতে গিয়ে প্রতি জনা ঘন্টায় মিনিমাম ৫ মিনিট সময় ব্যায় করে নিজের লুঙ্গি ঠিক করতে। তার মানে গড়ে ছয় ঘন্টা কাজ করলে লুঙ্গির জন্য অপচয় ৩০ মিনিট, অর্থৎ প্রতি ১২ জন ক্ষেত মজুর মাঠে কাজ করলে একজন পরিমাপ শুধু লুঙ্গি ঠিক করতে নষ্ট হচ্ছে! গড়ে যদি ধরা যায় প্রতিদিন নিমো মাঠে ১২০ জন ক্ষেতমজুর কাজ করছে, তাহলে বেচাদা প্যান্ট পরে চাষ আবাদ চালু করে ১০ জন ক্ষেতমজুরের অপব্যায় বাঁচিয়ে দিয়েছিল। এর পরেও নিমোতে সবুজ বিপ্লব আসবে না তো কোথায় আসবে?

    এবারে পুজোয় নিমোতে গিয়ে একদিন রাস্তায় বেচা-দার সাথে দেখা – হিরো সাইকেল চালিয়ে, সাইকেলের দুদিকে ইয়াব্বর দুধের ক্যান ঝুলিয়ে ফিরছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা হল – জানালো ছয় না আটটা জার্সি গরু পুষেছে, প্রায় ১৮ কিলো করে দুধ দিচ্ছে এক একটা গরু, লাভই লাভ। কাঠের কাজ করা একদম প্রায় ছেড়ে দিয়েছে – গোমাতা দয়ায় হই হই করে লাইফ চলছে।

    এবার মামার কথায় ফিরে আসি। বলতে নেই, মামা আমার সেই যৌবন বেলা থেকেই হিরো হিরো দেখতে। বাঙালী মধ্যবিত্ত বাড়িতে কত যে আগল থাকে যা পেরনো হয়ে ওঠে না অনেক সময়, ছোট মামা তার উদাহরণ। বড়মামা বাইরে থাকত বলে ছোট মামাকে বাড়িতে থাকতে হবেই – সেই ডি ডি ওয়ান টু এর আমলে ছোটমামা সিরিয়ালে অভিনয়ের জন্য চান্স পেয়েছিল। যাওয়া হল না বাড়ি ছেড়ে – কদিন ময়দানে ভালো ক্লাবে ক্রিকেট/ফুটবল দুইই খেলল, কিন্তু বেশী দিন ডেলি প্যাসেঞ্জারী করা গেল না। পরে আর্মির চাকুরী – সেও না। কলেজ লাইফে মামার ছেলে বন্ধু প্রায় ছিলই না বলতে গেলে, চারিদিকে শুধু মেয়ে বেষ্টিত হয়ে থাকা।

    ফ্যাশন জগতে মামার নিম্নলিখিত প্রধান অবদানঃ

    ১) জানালা-দরজার পর্দার ছিট দিয়ে জামা বানানো শুরু। জামালপুরের বন্ধু টেলারের কাছ থেকে একদিন দেখি কি এক চকরাবকারা জামা বানিয়ে পরে এসেছে। তেমন ছাপা জিনিস আগে কোনদিন দেখি নি। মামা জানালো যে জামালপুরের বিখ্যাত দর্জিকে দিয়ে বানানো, পর্দার ছিট দিয়ে

    ২) মেমারী কলেজে পড়ার সময় নতুন ডিজাইনের ব্যাগ। একসময় মামা ব্যাগ বানিয়ে আনলো হলুদ রঙের পটাশের (জমিতে দেবার সার) বস্তা কেটে। হাতে পটাশের বস্তা দিয়ে বানানো ব্যাগ নিয়ে তারপর কত ছেলে কলেজ যেতে শুরু করল।

    ৩) মামার বন্ধু খোকন দিল্লীতে এমব্রয়েডরীর কাজ করত – তখন কার দিনে জামার পিছনে এক বিশাল এমব্রয়েডরী করা বাঘ সাঁটানো, সে এক দেখার মত জিনিস।

    এ ছাড়াও আছে নানা প্রকার কারুকাজ জামায় – মামার আর সেই দর্জী বন্ধুর বানানো।

    মামা এখন সুগুণা মুরগীর চাষ করছে পোলট্রী ফার্মে – প্রায় হাজার দশেকের মত ক্যাপাসিটি, আরো বাড়ানোর তাল করছে। অবশ্য এই ব্যাবসাটা অনেকদিন স্টেবল আছে। এর আগে মামা ট্রাই করেছে যথাক্রমে, ওষুধের দোকান, বই-খাতা সাপ্লাইয়ের দোকান, কেবল অপারেটরের ব্যবসা, প্যান্ডেল-ডেকরেশনের ব্যবসা ইত্যাদি।

    আগে মামা গায়ে পর্দার ছিট দিয়ে বানানো জামা গলিয়ে, হাতে হলুদ পটাশের বস্তা কেটে বানানো ব্যাগ নিয়ে কলেজ বান্ধবীদের সাথে মেমারীর জয়ন্তী সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যেত – আর এখন হিরো বাইক চালিয়ে সাদা প্লাষ্টিকের ব্যাগ নিয়ে মুরগীর ভ্যাকসিন আনতে যায়। মধ্যবিত্তের স্বপ্নের পরিসমাপ্তি এই ভাবেই হয় আর সমস্ত বাঙালী ফ্যাশন শেষ হয় লুঙ্গিতে।
  • b | 237812.68.454512.210 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ০৯:২০381883
  • ওহ সুকি অনেকদিন পর।
  • ন্যাড়া | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ১১:১৫381884
  • একবার নিমোয় গিয়ে সুকির বাড়িতে থাকবই থাকব, ওই সবুজ কংক্রিট হয়ে যাবার আগেই।
  • aranya | 237812.68.233412.52 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ১২:২৭381885
  • ফাটাফাটি। সুকি রকস :-)
  • lcm | 236712.158.90056.117 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ১২:৩৮381886
  • সময় পেলে "লুচি ফুলকো হবার রহস্য"-টা একটু লিখো
  • দa | 236712.158.786712.21 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ১৪:৪২381888
  • শাড়ি, ওড়না এমনকি ধুতি কেটেও জানলা দরজার পর্দা বানাতে দেখেছি। কিন্তু পর্দা কেটে জামা! এমন উল্টোযাত্রার কথা এই প্রথম পড়লাম।
    আর পটাশের ব্যাগ -- ঋদিউস, রিইউজ, রিসাইকল এর একেবারে জলজ্যান্ত উদাহরণ।
  • | 236712.158.676712.40 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ১৪:৪৩381889
  • শাড়ি, ওড়না এমনকি ধুতি কেটেও জানলা দরজার পর্দা বানাতে দেখেছি। কিন্তু পর্দা কেটে জামা! এমন উল্টোযাত্রার কথা এই প্রথম পড়লাম।
    আর পটাশের ব্যাগ -- রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকল এর একেবারে জলজ্যান্ত উদাহরণ।
  • Ruchira | 237812.68.344512.71 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ২১:০৩381890
  • পর্দা কেটে জামা - Scarlett O'Hara - Gone with the Wind
  • সুকি | 237812.69.453412.44 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ২১:১৬381891
  • b, ন্যাড়াদা, অরণ্যদা, লসাগুদা, দ-দি, রুচিরা - সবাইকে ধন্যবাদ

    ন্যাড়াদা,
    সব সময় ওয়েল-কাম, সময় করে চলেই এস না একবার।

    লসাগু-দা,
    শেখার পর দেখলাম লুচি ফোলাবার টেকনিক এতই সোজা যে এখানে লিখতে লজ্জা করছে। ভালো করে ময়দা থেসে থেসে মাখতে হবে - ঠিক মত ময়াম/ময়ান দিতে হবে। খানিকক্ষণ জিরোতে দিতে হবে সেই নেচীকে। তারপর বেলে গরম তেলে ছাড়া, তেলের টেম্পারেচার খুবই ইমপরটেন্ট। তারপর ছাঁকনির উলটো পিঠটা করে ভাসমান লুচি-টিকে আলতো করে তেলে চাপ দিতে হবে দুই একবার। ব্যাস!

    দ-দি, এই সব ঘটনা সেই ১৯৯১-৯২ সালের - তখন আমাদের দিকে রিসাইকেল কনসেপ্ট আসে নি। মামা এসব ফ্যাশন বলেই চালু করেছিল :)

    রুচিরা - আমার মামার সাথে গন উইথ দ্যা উইন্ডের কোনই সম্পর্ক ছিল না, বলাই বাহুল্য :)
  • b | 236712.158.676712.40 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ২২:৫৬381892
  • হ্যাঁ, বরঞ্চ বাবুলালের সাথে সম্পর্ক ছিলো, এরকম বলা যায়।
  • সুকি | 237812.68.454512.132 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ২৩:১২381893
  • এত জটিল রসিকতা করলে খেলা যাবে না, আর একটু হলে বুঝতেই পারছিলাম না!
  • Titir | 237812.69.01900.15 | ১৯ নভেম্বর ২০১৯ ০২:৪৫381894
  • দারুন লেখা। আর বাড়ি তৈরির ব্যাপারে আমার বাবার সঙ্গে প্রচন্ড মিল পেলাম। বাবা আমার কাছে (USA ) এসে কিছুদিন ছিলেন। তাই দেশে যখন বাড়ি তৈরির প্ল্যান হাল ভাবলাম বাবা তাহলে এখানে মত কিছুটা করবে। কিন্তু কোথায় কি? ভাই, দাদা আর আমি বলে বলে বাড়ির ব্যাপারে হয়রান হয়ে গেলাম।এমনকি যে মিস্ত্রি বানিয়েছিল সেও বলল কিছু রুম আর একটু বড় করে দাও। কিন্তু বাবার মতের পরিবর্তন হয় নি। আর গ্রাম বলে জায়গার অভাব ছিল না।
  • Sound of Music | 236712.158.566712.63 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:১৩381895
  • পর্দা কেটে জামার কথা হচ্ছে অথচ "ডো এ ডিয়ার" ভুলে গেলেন!!
  • lcm | 236712.158.565623.225 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:২৫381896
  • থ্যাংকু সুকি।
    এটা ঠিক লুচি টই নয়, তবু বলেই ফেলি, কিন্তু আমার লুচি সংক্রান্ত প্রশ্নটা আরও একটু ডিটেইলে - - মানে ফুলকো তো বটেই, কিন্তু দুটো পাশ সমান পাতলা হয় কি করে, জেনারেলি যেটা হয়, লুচি ফোলে মোটামুটি, একটা পাশ হয় খুব মুচমুচে শৌখিন, আর অন্য পাশটা মোটা ক্যাতক্যাতে হয়ে যায়।
  • b | 236712.158.786712.9 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৪:২৯381897
  • এল সি এম যে কি বলেন। একটা দিক তো ফুলকো হবেই। কলকেতার আগেকার বাবুরা বেলা বারোটায় ঘুম থেকে উঠে লুচির ঐ ফুলকো, পাতলা দিকটা দিয়েই ব্রেকফাস্ট করতেন। বাকিটা বেড়াল খেতো।
  • | 236712.158.786712.69 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৪:৪৩381899
  • সুকি, থ্যাংক ইউ বস। সব সময়েই নিমো ও তুমি হলে গিয়ে গুরুদেব কম্বো।

    "মধ্যবিত্তের স্বপ্নের পরিসমাপ্তি এই ভাবেই হয় আর সমস্ত বাঙালী ফ্যাশন শেষ হয় লুঙ্গিতে।" এটা তে আমি যেহেতু লুঙ্গি পছন্দ করি ও পরে থাকি, তাই একটু ব্যথা পেয়েছি, তবে বেশি না। লুঙ্গি জিনিসটা জেনে রেখো ফ্যাশনের শেষ নয়, শুরু।
  • সুকি | 237812.69.563412.135 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৭:৩৪381900
  • না, না আমি লুঙ্গিকে কোন ভাবেই অবমাননা করতে চাই নি! আমি মামার স্বপ্নের পরিসমাপ্তির কথা বলতে চেয়েছিলাম, তবে সেটা লুঙ্গি পরার জন্য বোঝাতে চাই নি।
  • র২হ | 236712.158.786712.13 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৮:৩৮381901
  • লুঙ্গী যে সাম্যবাদ ও বিশ্বশান্তির ভবিষ্যত এ আমি সবসময়ই জানি।

    শীর্ষেন্দু ও আনন্দমেলাজনিত কনফ্লিক্টের পরেও লুঙ্গীই এমন এক সূত্র যা খনুদা ও অরণ্যদাকে এক পাতায় ধরে রাখে।
  • | 236712.158.676712.20 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৯:৪৬381902
  • হুতো, মার খাবি;-)
    সুকি, তুমি যা লিখেছো বেশ করেছো। কেউ কিসু মনে করে নি, আমি ইয়ার্কি করছিলাম।
    আমার প্রবল তথা বিপুল আমি এবং আমার লুঙ্গি প্রেম, যাঁদের কাছে প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান তাঁরা বিব্রত এবং আক্রান্ত বোধ করেন। যেহেতু দৃশ্যে কল্পনার অবকাশ প্রায়শ অনুপস্থিত থাকে।

    যাঁরা শুধু কল্পনায় আমাকে লুঙ্গি সহ ভেবেই লজ্জা পেয়েছেন, তাঁরা অভিবাসী হয়েছেন বা সন্যাস নিয়েছেন শোনা যায়। বা শিশু সাহিত্যের বাইরে পা রাখতে সাহস করেন নি।

    যাঁরা এমনকি কল্পনা করতেও নজ্জা পান, তাঁদের জন্য বিংশশতকীয় অনুকম্পা ও ঊনবিংশতকীয় আদি ব্রাহ্ম সমাজ ছাড়া কিছু তেমন কিছু পাচ্ছি না।

    লুঙ্গি প্রেমে, হে দোহারবৃন্দ, আমার ঈশ্বর হতেও লজ্জা করে না;-)


    (এ প্রসঙ্গেও, বলতে নেই, আমার একটি নিবন্ধ আছে, কারণ ভবদুলাল ও শোনা যায় ধুতি কে স্বগৃহে লুঙ্গি রূপেই আপন করতেন)

    ;-)
  • সুকি | 236712.158.566712.63 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ২১:০৬381903
  • আজ কা তুঘলক
    --------------------

    মহম্মদ বিন তুঘলকের সাথে দেখা করে হয়ে ওঠে নি আমার, যদিও মেমারী বিদ্যাসাগর স্মৃতি বিদ্যামন্দিরের ক্লাসমেট হালিম জগবন্ধু স্যারের কাছে জানতে চেয়েছিল দেখা করা যাবে কিনা। আমরা তখন ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ি, জগবন্ধু বাবু আমাদের ইতিহাস পড়াতেন – সেদিন পড়াচ্ছেন তুঘলকের খামখেয়ালীপনার কথা। কিছুটা শুনে হালিম পিছনের দিক থেকে জিজ্ঞেস করল,

    “স্যার, একটা কথা বলছিলাম, এই বিন তুঘলকের সাথে দেখা করা যায় না ইস্কুল থেকে মিছিল করে গিয়ে?”

    আসলে ভেবে দেখলে হালিমের দোষ ছিল না, তখন প্রবল পরাক্রান্ত সি পি এমের আর এ বি টি এ-এর আমল। আজ মিছিল করে উৎপল দত্তের ‘ঝড়’ সিনেমা দেখতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তো কাল গ্যাট চুক্তির প্রতিবাদে মেমারী শহর পরিক্রমা। এছাড়া ডি ওয়াই এফ আই, নাট্য মেলা, বইমেলা ইত্যাদি ইত্যাদি তো আছেই – কিছু হলেই আমরা মিছিল করে ঘুরতাম মেমারী বাজার আর বদলে পেতাম একটা করে বাপুজীর কেক ইস্কুলে ফিরে আসার পর। তবে সেদিন জগবন্ধু বাবুর রেগে গেলেন হালিমের প্রস্তাব শুনে, বললেন, “এটাকে ক্লাস থেকে বের করে দে তো”। তারপরে অনেকের কাছে একদম ক্লিয়ার হল যে বিন তুঘলক বহুদিন টেঁসে গ্যাছে।

    আজকাল অবশ্য অনেকে মমতা দিদি-কে বিন তুঘলকের মহিলা ভার্সন বলেন। তবে দিদি তুঘলকিয় হয়ে ওঠার বহু আগে আমরা ইস্কুল ছেড়েছি, তা না হলে কে জানে বিন তুঘলকের সাথে মিট করার হালিমের প্রবল ইচ্ছাটা পূর্ণ হয়ে যেত, তা যতই হোক না সে এক আধুনিক ভার্সন।

    আমার দিক থেকে বলতে পারি মহম্মদ বিন তুঘলক-কে দেখা একদম মিস করি নি, কারণ আমার হাতের কাছে ছিল মহেন্দ্রনাথ ঘোষ, মায়ের মামা – মানে আমার দাদু। মহেন্দ্র ঘোষ বহু অংশে স্বয়ং তুখলক-কেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারত। আমার মা ছোট বেলায় মামার বাড়িতে মানুষ হয়েছিল, তাই মায়ের মামা নিজের দাদুর মতই ছিল ঘেঁষাঘেঁষি তে।

    মায়ের মামারা বেশ ভালো বড়লোক ছিল সেই আমলে। প্রায় ৬০-৭০ বিঘে মত জমি, তার পর যা হয় আর কি বর্গা ইত্যাদি হয়ে গিয়ে সেটা বিঘে চল্লিশে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া ছিল ধানকল, সারের দোকান, ট্রাকটর, পুকুর, বাগান ইত্যাদি ইত্যাদি। গ্রাম্য লাইফ নিয়ে যাদের ধারণা আছে তারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, ব্যাপার খুব একটা মন্দ ছিল না। বেশী জমি জায়গা থাকলে ঘটিরা যা করে দাদুও সেটা করল – বাপ-ঠাকুরদা তো কষ্ট করে খেটে খুটে সম্পত্তি বানিয়ে গ্যাছে, তাহলে আমি আর খামোখা খাটবো কেন! খামখেয়ালীপনার চূড়ান্ত এবং বসে বসে সম্পত্তি উড়িয়ে যেতে লাগল, একে একে সারের দোকান, ধানকল সব বিক্রী হয়ে গেল। তার পর শুরু হল জমি বিক্রী করা। এখন মামারা বড় হয়ে মনে হয় আর জমি বিক্রী করা একটু রুখেছে।

    দাদুর বাড়ির সামনে ছিল বেশ বড় ফাঁকা জায়গা, বড় জামরুল গাছটার সামনে। বাড়ির একপাশে গোয়াল বাড়ি, মাল রাখার গুদাম – অন্যদিকে বাগান। বৈঠক খানার ঘরে বসে ফুরফুরে হাওয়ায় বিকেলে চা খেতে অবশ্য ভালোই লাগত। অবশ্য তখনো আমাদের চা খাবার বয়স হয় নি – আমরা দেখতাম বাইরের ঘরে বাজী তৈরী হওয়া। বৈশাখ মাসে শেষ মঙ্গলবারে সেই গ্রামের বিখ্যাত কালিপুজো উপলক্ষ্যে। সেখানে দেখেই আমার বাজি তৈরীর প্রথম প্রাথমিক জ্ঞান।

    একবার দাদুর শখ হল গোলাপ বাগান করবে – যা মনে করা তো সেই কাজ। বাড়ির সামনে জায়গাটা ঘিরে মাটি তৈরী করে গোলাপের বাগান শুরু হল – জল তোলার পাম্প ইত্যাদি বসিয়ে। কোথা থেকে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট রকমের গোলাপ লাগানো হল। বলতে নেই সময় মেনে, পরম যত্ন পেয়ে – নির্ভেজাল গোবর সার পেয়ে সেই বাগান গোলাপ ফুলে ভরে উঠল। বহু দূর-দূর থেকে লোকজন গোলাপ বাগান দেখতে আসতে শুরু করল – লোকে বাগান দেখে বাঃ বাঃ করছে, আর দাদু পরম তৃপ্তি ভরে বৈঠকখানায় বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছে! আমার দুই মামাকে ভার দেওয়া হয়েছিল গোলাপ বাগানের ওভারঅল দেখভাল করার জন্য। সেই করতে গিয়ে মামাদের উচ্চমাধ্যমিকের নম্বর কমে গেল।

    এর পর দাদুর ঝোঁক হল ব্যবসার দিকে – নিজে প্রচুর পেটুক মানুষ হবার জন্য, সারের ব্যবসা থেকে সিফট করে খুলল মিষ্টির দোকান খানপুর মার্কেটে প্রাইম জায়গায়। সে মিষ্টির দোকান বিশাল হিট – বিশেষ করে বিকেলে সিঙ্গারা কিনতে আসার জন্য পাবলিকের লম্বা লাইন পরে যেত। ব্যবসা দুরদার চলছে, আর এদিকে মামারা বলছে, বাবা তুমি সিঙ্গারা নয়ত মিষ্টির দোকান কোন একটা বন্ধ কর। এই ভাবে বেশী দিন টানা যাবে না! এক একটা সিঙ্গারা বেচে প্রায় ৭০ পয়সা লস! কাজু, কিসমিস ইত্যাদি পুরে মিশিয়ে দাদু সিঙ্গারা বানিয়ে বিক্রী শুরু করে প্রতি পিস এক টাকা করে! এদিকে বানাতে খরচা প্রায় এক টাকা সত্তর পয়সা! মামারা কিছু বলতে গেলেই উত্তর আসত, এই তমুকের ব্যাটা আমি, লোককে বাজে জিনিস খাওয়াবো! মিষ্টি বেচেও অনুরূপ ক্ষতি, পাঁচ টাকা সাইজের রসগোল্লা বানিয়ে বিক্রী হচ্ছে দুই-টাকা পিস করে! অনেক ঝামেলা ইত্যাদি করে সেই মিষ্টির দোকান বন্ধ করা গেল।

    দাদু আমাকে মাঝে মাঝে বলত, ওসব ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কিছু নয় বুঝলি, আসল চাকরী হল স্কুল মাষ্টারি। চাকরি করতে হলে মাষ্টারী করাই বেষ্ট, দুই মামার তাই ছোট বেলা থেকেই ট্রেনিং হত ইস্কুল মাষ্টার হবার জন্য। খাদ্যরসিক এবং পেটুক মানুষ, গাওয়া ঘিয়ের লুচি, মিষ্টি, পাঁঠার মাংস ইত্যাদি ছাড়া দাদুর মুখে রুচত না অন্য কিছু। এদিকে বয়স হচ্ছে – একসময় মামিমারা বলল, “বাবা, বয়স হচ্ছে তো, তাই আপনাকে আর ওই সব রীচ খাবার দেওয়া যাবে না”। এসব শুনে দাদু ফায়ার, “নিজের সর্বনাশ আমি নিজেই করেছি তোমাদের ঘরে এনে, তখন কি আর জানতাম আমার সাজানো সংসার ছাড়খাড় করে দেবে তোমরা!” ছোট মামি আবার একটু মর্ডান টাইপের, ফুট কেটে ফেলল, “কোথায় সাজানো নষ্ট হচ্ছে বাবা? শুধু একটু খাওয়া কনট্রোল করার কথা হচ্ছে”। দাদু নাকি উত্তর দিয়েছিল, “সাজিয়ে যদি খাবারই সামনে না এল তাহলে আর সাজানো সংসারের মানে কি?”

    তবুও দাদুকে গাওয়া ঘিয়ের লুচি খেতে দেওয়া হল না আগের মত বেশী বেশী – এত অত্যাচার মহেন্দ্র ঘোষের সইল না। বলল, “আমি আলাদা হয়ে যাব। তোরা দুই ভাই একসাথে থাক। আমি আর তোদের মা এবার থেকে আলাদা খাব, নিজের লুচি নিজে রেঁধে নেব”। এইভাবে একই বাড়িতে দুই হেঁসেল চালু হত – যে মানুষ জীবনে এক গ্লাস গড়িয়ে খায় নি, সে লুচি ভাজবে সেটা ভাবাই মূর্খামি। দিদার ভাঙা শরীরে চাপ পড়ে গেল – বেগতিক দেখে মামিমারা পিছিয়ে গেল। আবার একসাথে রাঁধা শুরু হয়ে গেল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দাদু গাওয়া ঘিয়ের লুচি এখনো চালিয়ে যাচ্ছে, সাথে পাঠাঁর মাংস।

    আর আমার মামারা দাদুর মত পুরো তুখলকিয় না হলেও, হালকা ছাপ পেয়েছে। দুপুরে ভাত খাবার পর তেনারা নাকি বাইকে দশ কিলোমিটার গিয়ে পান খেয়ে আসেন, কোন একটা দোকানে স্পেশাল পান সাজে!
  • aranya | 236712.158.2367.60 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ০৫:০৪381904
  • সত্যি, লুঙ্গি একটা ব্যাপার, শীর্ষেন্দুর গদ্যের মতই মোলায়েম, ফুরফুরে, মজাদার
  • aranya | 236712.158.2367.60 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ০৫:০৬381905
  • আর লুঙ্গি -তেই ফ্যাশন সেশ, এটা সুকি ঠিকই লিখেচে। বাহারী, রঙিন লুঙ্গি -র চেয়ে বড় ফ্যাশন আর কি ই বা হতে পারে
  • Ekak | 236712.158.895612.198 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ০৬:১০381906
  • হা, এটা ঠিক। র‌্যাপ অন -এর দুনিয়ায় এতো বেশি ভ্যরিএশন আছে , এতো টেক্স্চার , যে কোন না কোনোটা ভালো লেগেই যায়।

    আগেও লিখেছি, ব্যাঙ্গলোর বেশ লুঙ্গি ফ্রেন্ডলি। মুন্ডু পরে আপনি শপিঙ্গ মল থেকে কাজের জায়গা যেখানেই জান, সমোস্যা নেই।

    কোল্কতায় মনে হয়, এতো টা এক্সেপ্টেড না।
  • রঞ্জন | 236712.158.895612.102 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ০৯:৪৪381907
  • "একডজন সুকি" এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম।
    আগে সুকির লেখা পড়ে ফিকফিক, খিকখিক, খ্যা-খ্যা করে হাসতাম। এবার প্রথম চারটে লেখার পর নষ্টালজিয়ায় ডুবে উদাস মন। তারপর ভাগ্যিস "রাজেশদা " এলেন।
    সাতসকালে মনটা ভাল হয়ে গেল। মহারাষ্ট্রে যাই ঘটুক, আমার কি !
    বেঁচে থাকো সুকি। রবি ঠাকুরের দাড়ির মত পরমায়ু হোক তোমার।

    আমি এখন লুঙ্গি পড়েই টাইপাচ্ছি। ছোটকার--গুরুর চিন্টুবাবুর পিতৃদেব-- দেওয়া উপহার।
  • সুকি | 237812.69.453412.116 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ০৯:৫৪381908
  • আমি লুঙ্গি বিষয়ে সবার সাথে একমত।

    ব্যাঙ্গালোরে শুধু লুঙ্গি নয়, ফেত্তা মারা ধুতি পরেও লোকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে - ওতে আরো হাওয়া খেলে মনে হয়। বাংলাদেশে লুঙ্গি কিন্তু আমাদের কলকাতার থেকে বেশি গ্রহনীয়, হুমায়ুণ আহমেদকে আমি দিব্য লুঙ্গি পরে দাপটে ইন্টারভিউ দিতে দেখেছিলাম।
  • শিবাংশু | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ১০:৪৬381910
  • কুমুদিদি কি এপাড়া থেকে স্বেচ্ছানির্বাসিত? এ বিষয়ে তাঁর বাইটই শেষ কথা...
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন