• টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। যে কোনো নতুন আলোচনা শুরু করার আগে পুরোনো লিস্টি ধরে একবার একই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে কিনা দেখে নিলে ভালো হয়। পড়ুন, আর নতুন আলোচনা শুরু করার জন্য "নতুন আলোচনা" বোতামে ক্লিক করুন। দেখবেন বাংলা লেখার মতো নিজের মতামতকে জগৎসভায় ছড়িয়ে দেওয়াও জলের মতো সোজা।
  • নিমো গ্রামের গল্প

    সুকান্ত ঘোষ
    বিভাগ : অন্যান্য | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ৫৮৯৪ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1 | 2 | 3 | 4
  • b | 236712.158.676712.140 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ১৪:৫০381911
  • longyi বার্মার জাতীয় পোষাক বোধয়।
    https://en.wikipedia.org/wiki/Longyi
  • সুকি | 237812.69.563412.135 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ১৫:০৭381912
  • আজ কা তুঘলক
    --------------------

    মহম্মদ বিন তুঘলকের সাথে দেখা করে হয়ে ওঠে নি আমার, যদিও মেমারী বিদ্যাসাগর স্মৃতি বিদ্যামন্দিরের ক্লাসমেট হালিম জগবন্ধু স্যারের কাছে জানতে চেয়েছিল দেখা করা যাবে কিনা। আমরা তখন ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ি, জগবন্ধু বাবু আমাদের ইতিহাস পড়াতেন – সেদিন পড়াচ্ছেন তুঘলকের খামখেয়ালীপনার কথা। কিছুটা শুনে হালিম পিছনের দিক থেকে জিজ্ঞেস করল,

    “স্যার, একটা কথা বলছিলাম, এই বিন তুঘলকের সাথে দেখা করা যায় না ইস্কুল থেকে মিছিল করে গিয়ে?”

    আসলে ভেবে দেখলে হালিমের দোষ ছিল না, তখন প্রবল পরাক্রান্ত সি পি এমের আর এ বি টি এ-এর আমল। আজ মিছিল করে উৎপল দত্তের ‘ঝড়’ সিনেমা দেখতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তো কাল গ্যাট চুক্তির প্রতিবাদে মেমারী শহর পরিক্রমা। এছাড়া ডি ওয়াই এফ আই, নাট্য মেলা, বইমেলা ইত্যাদি ইত্যাদি তো আছেই – কিছু হলেই আমরা মিছিল করে ঘুরতাম মেমারী বাজার আর বদলে পেতাম একটা করে বাপুজীর কেক ইস্কুলে ফিরে আসার পর। তবে সেদিন জগবন্ধু বাবুর রেগে গেলেন হালিমের প্রস্তাব শুনে, বললেন, “এটাকে ক্লাস থেকে বের করে দে তো”। তারপরে অনেকের কাছে একদম ক্লিয়ার হল যে বিন তুঘলক বহুদিন টেঁসে গ্যাছে।

    আজকাল অবশ্য অনেকে মমতা দিদি-কে বিন তুঘলকের মহিলা ভার্সন বলেন। তবে দিদি তুঘলকিয় হয়ে ওঠার বহু আগে আমরা ইস্কুল ছেড়েছি, তা না হলে কে জানে বিন তুঘলকের সাথে মিট করার হালিমের প্রবল ইচ্ছাটা পূর্ণ হয়ে যেত, তা যতই হোক না সে এক আধুনিক ভার্সন।

    আমার দিক থেকে বলতে পারি মহম্মদ বিন তুঘলক-কে দেখা একদম মিস করি নি, কারণ আমার হাতের কাছে ছিল মহেন্দ্রনাথ ঘোষ, মায়ের মামা – মানে আমার দাদু। মহেন্দ্র ঘোষ বহু অংশে স্বয়ং তুখলক-কেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারত। আমার মা ছোট বেলায় মামার বাড়িতে মানুষ হয়েছিল, তাই মায়ের মামা নিজের দাদুর মতই ছিল ঘেঁষাঘেঁষি তে।

    মায়ের মামারা বেশ ভালো বড়লোক ছিল সেই আমলে। প্রায় ৬০-৭০ বিঘে মত জমি, তার পর যা হয় আর কি বর্গা ইত্যাদি হয়ে গিয়ে সেটা বিঘে চল্লিশে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া ছিল ধানকল, সারের দোকান, ট্রাকটর, পুকুর, বাগান ইত্যাদি ইত্যাদি। গ্রাম্য লাইফ নিয়ে যাদের ধারণা আছে তারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, ব্যাপার খুব একটা মন্দ ছিল না। বেশী জমি জায়গা থাকলে ঘটিরা যা করে দাদুও সেটা করল – বাপ-ঠাকুরদা তো কষ্ট করে খেটে খুটে সম্পত্তি বানিয়ে গ্যাছে, তাহলে আমি আর খামোখা খাটবো কেন! খামখেয়ালীপনার চূড়ান্ত এবং বসে বসে সম্পত্তি উড়িয়ে যেতে লাগল, একে একে সারের দোকান, ধানকল সব বিক্রী হয়ে গেল। তার পর শুরু হল জমি বিক্রী করা। এখন মামারা বড় হয়ে মনে হয় আর জমি বিক্রী করা একটু রুখেছে।

    দাদুর বাড়ির সামনে ছিল বেশ বড় ফাঁকা জায়গা, বড় জামরুল গাছটার সামনে। বাড়ির একপাশে গোয়াল বাড়ি, মাল রাখার গুদাম – অন্যদিকে বাগান। বৈঠক খানার ঘরে বসে ফুরফুরে হাওয়ায় বিকেলে চা খেতে অবশ্য ভালোই লাগত। অবশ্য তখনো আমাদের চা খাবার বয়স হয় নি – আমরা দেখতাম বাইরের ঘরে বাজী তৈরী হওয়া। বৈশাখ মাসে শেষ মঙ্গলবারে সেই গ্রামের বিখ্যাত কালিপুজো উপলক্ষ্যে। সেখানে দেখেই আমার বাজি তৈরীর প্রথম প্রাথমিক জ্ঞান।

    একবার দাদুর শখ হল গোলাপ বাগান করবে – যা মনে করা তো সেই কাজ। বাড়ির সামনে জায়গাটা ঘিরে মাটি তৈরী করে গোলাপের বাগান শুরু হল – জল তোলার পাম্প ইত্যাদি বসিয়ে। কোথা থেকে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট রকমের গোলাপ লাগানো হল। বলতে নেই সময় মেনে, পরম যত্ন পেয়ে – নির্ভেজাল গোবর সার পেয়ে সেই বাগান গোলাপ ফুলে ভরে উঠল। বহু দূর-দূর থেকে লোকজন গোলাপ বাগান দেখতে আসতে শুরু করল – লোকে বাগান দেখে বাঃ বাঃ করছে, আর দাদু পরম তৃপ্তি ভরে বৈঠকখানায় বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছে! আমার দুই মামাকে ভার দেওয়া হয়েছিল গোলাপ বাগানের ওভারঅল দেখভাল করার জন্য। সেই করতে গিয়ে মামাদের উচ্চমাধ্যমিকের নম্বর কমে গেল।

    এর পর দাদুর ঝোঁক হল ব্যবসার দিকে – নিজে প্রচুর পেটুক মানুষ হবার জন্য, সারের ব্যবসা থেকে সিফট করে খুলল মিষ্টির দোকান খানপুর মার্কেটে প্রাইম জায়গায়। সে মিষ্টির দোকান বিশাল হিট – বিশেষ করে বিকেলে সিঙ্গারা কিনতে আসার জন্য পাবলিকের লম্বা লাইন পরে যেত। ব্যবসা দুরদার চলছে, আর এদিকে মামারা বলছে, বাবা তুমি সিঙ্গারা নয়ত মিষ্টির দোকান কোন একটা বন্ধ কর। এই ভাবে বেশী দিন টানা যাবে না! এক একটা সিঙ্গারা বেচে প্রায় ৭০ পয়সা লস! কাজু, কিসমিস ইত্যাদি পুরে মিশিয়ে দাদু সিঙ্গারা বানিয়ে বিক্রী শুরু করে প্রতি পিস এক টাকা করে! এদিকে বানাতে খরচা প্রায় এক টাকা সত্তর পয়সা! মামারা কিছু বলতে গেলেই উত্তর আসত, এই তমুকের ব্যাটা আমি, লোককে বাজে জিনিস খাওয়াবো! মিষ্টি বেচেও অনুরূপ ক্ষতি, পাঁচ টাকা সাইজের রসগোল্লা বানিয়ে বিক্রী হচ্ছে দুই-টাকা পিস করে! অনেক ঝামেলা ইত্যাদি করে সেই মিষ্টির দোকান বন্ধ করা গেল।

    দাদু আমাকে মাঝে মাঝে বলত, ওসব ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কিছু নয় বুঝলি, আসল চাকরী হল স্কুল মাষ্টারি। চাকরি করতে হলে মাষ্টারী করাই বেষ্ট, দুই মামার তাই ছোট বেলা থেকেই ট্রেনিং হত ইস্কুল মাষ্টার হবার জন্য। খাদ্যরসিক এবং পেটুক মানুষ, গাওয়া ঘিয়ের লুচি, মিষ্টি, পাঁঠার মাংস ইত্যাদি ছাড়া দাদুর মুখে রুচত না অন্য কিছু। এদিকে বয়স হচ্ছে – একসময় মামিমারা বলল, “বাবা, বয়স হচ্ছে তো, তাই আপনাকে আর ওই সব রীচ খাবার দেওয়া যাবে না”। এসব শুনে দাদু ফায়ার, “নিজের সর্বনাশ আমি নিজেই করেছি তোমাদের ঘরে এনে, তখন কি আর জানতাম আমার সাজানো সংসার ছাড়খাড় করে দেবে তোমরা!” ছোট মামি আবার একটু মর্ডান টাইপের, ফুট কেটে ফেলল, “কোথায় সাজানো নষ্ট হচ্ছে বাবা? শুধু একটু খাওয়া কনট্রোল করার কথা হচ্ছে”। দাদু নাকি উত্তর দিয়েছিল, “সাজিয়ে যদি খাবারই সামনে না এল তাহলে আর সাজানো সংসারের মানে কি?”

    তবুও দাদুকে গাওয়া ঘিয়ের লুচি খেতে দেওয়া হল না আগের মত বেশী বেশী – এত অত্যাচার মহেন্দ্র ঘোষের সইল না। বলল, “আমি আলাদা হয়ে যাব। তোরা দুই ভাই একসাথে থাক। আমি আর তোদের মা এবার থেকে আলাদা খাব, নিজের লুচি নিজে রেঁধে নেব”। এইভাবে একই বাড়িতে দুই হেঁসেল চালু হত – যে মানুষ জীবনে এক গ্লাস গড়িয়ে খায় নি, সে লুচি ভাজবে সেটা ভাবাই মূর্খামি। দিদার ভাঙা শরীরে চাপ পড়ে গেল – বেগতিক দেখে মামিমারা পিছিয়ে গেল। আবার একসাথে রাঁধা শুরু হয়ে গেল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দাদু গাওয়া ঘিয়ের লুচি এখনো চালিয়ে যাচ্ছে, সাথে পাঠাঁর মাংস।

    আর আমার মামারা দাদুর মত পুরো তুখলকিয় না হলেও, হালকা ছাপ পেয়েছে। দুপুরে ভাত খাবার পর তেনারা নাকি বাইকে দশ কিলোমিটার গিয়ে পান খেয়ে আসেন, কোন একটা দোকানে স্পেশাল পান সাজে!
  • রঞ্জন | 236712.158.9005612.43 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ২৩:১৫381913
  • নিমো গ্রামের সুকি,
    "আজ কা তুঘলক" বোধহয় দু'বার পোস্ট হল--২১শে এবং আজকে।
  • সুকি | 237812.69.563412.81 | ২৫ নভেম্বর ২০১৯ ০৬:৫২381914
  • সরি রঞ্জনদা, কি পোষ্ট করতে কি করেছি
  • সুকি | 237812.69.563412.21 | ২৫ নভেম্বর ২০১৯ ০৬:৫৩381915
  • ইলেকট্রিক অফিস ও মেজোজ্যাঠা
    --------------------------------------------

    - হ্যালো বোস, আমি নিমো থেকে সুশীলদা বলছি

    মেমারী ইলেকট্রিক অফিসের বোস এই ভাবে আমার মেজো জ্যাঠার কাছ থেকে কত কল পেয়েছিল সেই সময় তার হিসাব করা মুশকিল। মোবাইলের যুগ হলে বোস কবেই জ্যাঠাকে কল-ব্লক লিষ্টে রেখে দিত আর ফেসবুক থাকলে আনফ্রেন্ড। ভারতের সরকারি বা অধিকৃত সংস্থাগুলি, যেমন স্টেট ব্যাঙ্ক, টেলিফোন, ইলেকট্রিক অফিস ইত্যাদির ব্যবহার বা কাষ্টমার সার্ভিস বা কলের উত্তর দেওয়া ইত্যাদি নিয়ে আমরা হামেশাই ক্ষোভ প্রকাশ করি। বেশীর ভাগ সময়েই সঙ্গত কারণে, তবে জ্যাঠার মত কাষ্টমার থাকলে হাসিমুখে উত্তেজিত না হয়ে উত্তর দেওয়াও চাপ হয়ে যায়। সত্যই যায় কিনা নিচের ঘটনা পড়ে আপনারাই বিচার করবেন।

    সে তখন মোবাইল আসার অনেক আগের কথা, নিমোতে খুব বেশী কারো বাড়িতে ল্যান্ড লাইনের টেলিফোন ছিল না। আর থাকেলেও সবার ইলেকট্রিক অফিসের প্রতি মোহ ছিল না। তখনকার দিনে হত কি ঝড় জল উঠলে পাওয়ার লাইন অফ করে দিত ইলেকট্রিক অফিস। আবার নিমোতে ইলেকট্রিক ঢুকেছে বেশ কয়েক কিলোমিটার মাঠের উপর দিয়ে ওভারহেড তারের মাধ্যমে। তাই বিপদের ভয়ে ঝড় জল উঠলে ইলেকট্রিক অফিস কারেন্ট অফ করে দিত। আবার অনেক সময় গাছ পালা উলটে লাইনে ফল্ট হয়ে যেত। তখন অফিসে ফোন করে জানাত হত ব্যাপারটা এবং সময় সুযোগ মত তারা এসে লাইন ঠিক করত।

    তো এইভাবেই মেজো জ্যাঠা মেমারী ইলেকট্রিক অফিসের ফোন নাম্বারটা পেয়ে যায় কোন ভাবে, চেনা শোনা তো ছিলই, মঙলা-কাকা। ফোন করার উপযুক্ত কারণ হলে সবাই জ্যাঠাকে রিকোয়েষ্ট করত যে এবার তাহলে মেমারী ইলেক্ট্রিক অফিসে ডায়াল করা হোক। প্রথম প্রথম তাই হত – কিন্তু পরে নিমোর লোক বুঝতে পারল যে জ্যাঠাকে রিমাইন্ডার দেবার কোনই দরকার নেই। কারণে অকারণে জ্যাঠা ইলেক্ট্রিক অফিসে ফোন করে ব্যতিব্যস্ত করে রাখল –

    - হ্যালো, সুশীলদা বলছি নিমো থেকে
    - হ্যাঁ দাদা বলুন
    - বলছি পশ্চিম দিকে মেঘ করেছে মনে হচ্ছে তো। ঝড় জল আসবে – কি করবেন কিছু ঠিক করেছেন?
    - কিসের কি করব?
    - না মানে ওই কয়টা নাগাদ লাইন অফ করবেন?
    - সে ঝড় জল এলে দেখা যাবে, এত আগে থেকে কিছু বলা যায় নাকি?
    - আসলে জানা থাকলে ব্যাটারীতে চার্জ দিয়ে রাখতাম আর কি
    - তা সে আপনি এখন থেকেই দিয়ে রাখুন না!
    - ও, তাও তো বটে – ঠিক আছে তাহলে

    আবার দু চার দিন পরে

    - হ্যালো, সুশীলদা বলছি। বলছিলাম কি, আজ তো মনে হচ্ছে আপনাদের অনেক কাজ বেঁচে গেল
    - কেন কাজ বাঁচার কি হল?
    - আরে খেয়ে দেয়ে দুপুরে একটু শুতে যাবার আগে দেখলাম কেমন গুমট মেরে গ্যাছে ওয়েদারটা। ঝড় আসবেই একদম শিওর ছিলাম
    - ঝড় হয় নি আপনাদের দিকে?
    - হলে কি আর বলতাম আপনাদের কাজ বেঁচে গ্যাছে? ঝড় এল না বলেই ভাবলাম জানিয়ে দিই, খুব বেঁচে গেলেন আজকে যাই হোক। না হলে আজ রাত বিরেতে আবার ছোটাছুটি করতে হত।

    এবার সত্যি সত্যি একদিন ঝড় এল – তারটার ছিঁড়ে একসা। কারেন্ট নেই গ্রামে – কিন্তু নিমোর লোকের টেনশন নেই, তারা জানে মেজো জ্যাঠা গ্রামে ওই দিন আছে মানে মেমারী ইলেকট্রিক অফিসকে ব্যতিব্যস্ত করে দেবে

    - এ্যাই বোস, সুশীলদা বলছি নিমো থেকে। সর্বনাশ হয়ে গ্যাছে তো! তার ছিঁড়ে গ্যাছে মনে হচ্ছে কাল রাতের ঝড়ে – সকাল থেকে কারেন্ট নেই।
    - দাদা, কাল রাতে অনেক জায়গাতেই এক অবস্থা। আমরা আস্তে আস্তে লোক পাঠিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করছি।
    - আচ্ছা, দেখুন তা হলে তাড়াতাড়ি।

    সে তখন সকালের দিকের সময় – মেজমা ডাকছে জ্যাঠাকে মুড়ি খাবার জন্য বাইরের দুয়ারে। জ্যাঠা গ্যাছে খচে বিশাল, সেই মুহুর্তে ফোনের কাছ ছেড়ে ওঠার কোন প্ল্যান নেই জ্যাঠার। মেজমাকে দিয়েছে ধ্যাতানি

    - তোমার এত বয়স হল, কিন্তু আক্কেল হল না এখনো। কি ভেবে তুমি আমাকে এখন মুড়ি খেতে যাবার কথা বল?
    - তুমি মুড়ি খাবে কি খাবে না? না খেলে বল, আমার অন্য কাজ আছে
    - ঘরে পাঠিয়ে দাও মুড়ি, এখন ফোনের কাছ থেকে ওঠা যাবে না।

    পাঁচ মিনিট বাদে আবার অফিসে ফোন

    - হ্যালো সুশীলদা বলছি
    - কে বলছেন?
    - আরে নিমো থেকে সুশীল, এই তো একটু আগেই ফোন করলাম। তুমি কে, গলা তো চেনা ঠেকছে না।
    - স্যার এখন চা খেতে গ্যাছেন। আপনি পরে ফোন করুন।
    - আচ্ছা সে না হয় করছি, তবে একটা প্রশ্ন ছিল তোমাদের কাছে
    - কি প্রশ্ন তাড়াতাড়ি বলুন
    - মানে বলছিলাম কি লাইনের ভোলটেজ কি কোনদিন-ই বাড়বে না! এতো হ্যারিক্যানের আলোর থেকেও কম জোরে জ্বলছে দুশো পাওয়ারের বাল্ব গুলো।
    - হয়ে যাবে ঠিক তাড়াতাড়ি
    - আর কবে হবে? আজকাল ভিজে হাতে খোলা তারে হাত দিলেও কারেন্ট মারছে না!
    - দাদা বলি কি বেশী ভিজে হাত দেবেন না। আপনি পরে স্যারকে কল করবেন।

    জ্যাঠা এবার ঘর থেকে বেরিয়ে এল – হুকুম হল –

    - এই তোরা কেউ একজন গিয়ে মঙলা-কে ডেকে নিয়ে আয়। ইলেক্ট্রিক অফিস বলছে পরে ফোন করতে।

    কেউ একজন গেল মঙলা-কা কে ডাকতে। মেজো জ্যাঠা ততক্ষণে মুড়ি খেতে শুরু করল দুয়ারে বসেই। খানিক পরে সেই বার্তাবাহক ফিরে এসে জানালো যে মঙলা-কাকা বাড়িতে নেই। রেল ফটকের কাছে নারাণের দোকানে চা খেতে গ্যাছে। খবর শুনে জ্যাঠা মনক্ষুন্ন

    - চা খেতে গ্যাছে না হাতি! চা খেতে কতক্ষণ লাগে? বসে বসে এখন গুলতানি চলবে বেলা পর্যন্ত। কোন একটা রেসপনসেবেলিটি নেই। ঝড়ে তার ছিঁড়ে গ্যাছে আর উনি নারাণের দোকানে বসে বসে চা খাচ্ছেন।

    মুড়ি খাওয়া হলে আবার ডায়াল ইলেকট্রিক অফিসে

    - কিছু কাজ এগুলো? মঙলা তো বসে বসে চা খাচ্ছে নারাণের দোকানে নিমোতে। তা আপনারা কি সবাই এখনো চা-খেতেই ব্যস্ত
    - দাদা, স্যার এখনো চা খেয়ে ফেরেন-নি। আপনি পরে ফোন করে যা বলার স্যারকেই বলুন।

    মেজোমা আবার হাঁক দিল –

    - বলছি উত্তমের দোকান থেকে পাঁচশো চিনি এনে দাও না। ফুরিয়ে গ্যাছে
    - এটা চিনি আনতে যাবার সময় হল? কোন সময়ে কি কথা বলতে হয় আর কবে শিখবে?
    - তোমার ফোন আর ওরা ধরবে না, এটা বোঝারও ক্ষমতা নেই? মানুষকে তিতিবিরক্ত করে দিলে কে আর শুনবে তোমার কথা। সেদিন বিশু পর্যন্ত মাঠ থেকে ফিরে বলল, কাকিমা জ্যাঠাকে দিয়ে মাঠে জলখাবার পাঠাবে না। এমনিতেই প্রচুর গরম, জ্যাঠার কথা শুনলে আরো গরম হয়ে যায় মাথা।
    - চিনি আনার সময় নেই এখন। অন্য কাউকে পাঠাও। দেখি, এখনি ফলো আপ করতে হবে বোসের সাথে।

    আবার ডায়াল

    - হ্যালো বোস রয়েছ?
    - কে বলছেন?
    - আমি নিমো থেকে সুশীল …।

    কট্ করে ফোন লাইন কেটে গেল – মেজমা যেটা আগেই প্রডিক্ট করেছিল বলাই বাহুল্য। জ্যাঠা গজগজ করতে করতে বাইরে বেরিয়ে এল,

    “সি পি এম আমলে সাপের পাঁচ পা দেখেছে এরা – কংগ্রেস পিরিওড হলে বোসের বাপ এসে হাজির হত এখন এই ঘোষ বাড়ির দরজায়”। – ইত্যাদি ইত্যাদি

    রান্নাঘর থেকে আওয়াজ এল, “মাথাটা একদম গ্যাছে”।
  • Amit | 236712.158.23.211 | ২৫ নভেম্বর ২০১৯ ১১:১৭381916
  • লাস্টের টা পড়ে মনে পড়লো আমাদের কলকাতার পাড়ায় এক খান সিএসসি র মেইনটেনেন্স অফিস ছিল ৯০ র দশকে। লোড শেড্ডিং হলেই সেখানে গিয়ে লোকজন উত্যক্ত করে করে মারতো, দু একবার ঢিল ফিল ও ছুড়েছে। আরো বিপদ বাড়তো ক্রিকেট ম্যাচ থাকলে। শেষে ওরা বিরিক্ত হয়ে অফিস টাই তুলে দিলো, যে এখন সব মেইনটেনেন্স মেন্ অফিস থেকে সামলানো হবে।
  • সুকি | 162.158.165.173 | ২৫ জানুয়ারি ২০২০ ১০:৪৫729496
  • কার্ত্তিক পুজো
    ---------------------

    সেদিন নিমো গ্রামের একমাত্র শিল্পপতি সুমন কুমার ওরফে রাজু দেখলাম আমাকে মেসেজ করেছে, “সুকান্তদা, চারটে ফেললাম, তার মধ্যে একটা বাবুর জন্য”।

    এর আগের রবিবার কার্ত্তিক পুজো গেল। শহরের দিকের সংস্কৃতি বলতে পারব না, কিন্তু আমাদের গ্রামের দিকে কার্ত্তিক ঠাকুর ফেলা এক রীতিমত মত ব্যাপার এবং কর্তব্য ছিল। ঠাকুর ফেলা হল মূলত নববিবাহিত ছেলে ছোকরার বাড়িতে। আবার একসেপশন যে থাকত না তা নয় – অনেক দিন বিয়ে হব হব চলছে কিংবা বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে এমন পরিস্থিতিতে ঠাকুর ফেলা হত তাদের বাড়িতে। ঠাকুর সাধারণত রাতের দিকে বাড়ির দরজার সামনে কিংবা বাড়ির উঠোনে দিয়ে আসা হত চুপিচুপি। ঠাকুর ফেললেই যে সেই ঠাকুর ঘরে তুলতে হবে এমন কোন কথা নেই, কিন্তু ধর্মভীরু বাঙলী – নিজের বাড়ির উঠোন থেকে ঠাকুর তুলে নিয়ে গিয়ে জলে ফেলে দেবে সেই সাহস পাবলিক করে উঠতে পারত না সাধারণত। তবে নিমোতে একদম খেঁচুড়ে পাবলিক ছিল না তা নয় – কয়েক জন তো বারবার কার্ত্তিক ঠাকুর নিয়ে গিয়ে জলে ফেলে দিয়ে আসত ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে নিজের উঠোন থেকে। আর যেতে যেতে গালাগাল করত আমাদের সোনার বাংলার ছেলেদের। বাই ডিফল্ট এই ঠাকুর ফেলার দোষ গিয়ে চাপত ওদের ঘাড়ে।

    কার্ত্তিক পুজোর আবার হ্যাপা কম নয় – একবার পুজো করেই ছেড়ে দেবেন তা হবে না, পুজো শুরু করলে চারবছর নাকি করতে হয়। তবে তা পরপর চার বছর না হলেও হবে। এই তো শিল্পপতি রাজুই এই বার চতুর্থ বছরের জন্য কার্ত্তিক ঠাকুর পুজো করল। রাজুর ক্ষেত্রে তার বাড়িতে ঠাকুর দেওয়া হয়েছিল বিয়ের আগেই। তখন ব্যবসা বাড়িয়ে বাড়িয়ে এত ব্যস্ত রাজু যে বিয়ের দিকে মন দেবার সময় পাচ্ছে না – এদিকে রাজুর বাবা আমাদের ন্যাড়াকাকা চিন্তায় পড়ে গ্যাছে বিয়ে কখন করবে রাজু সেই নিয়ে। তখনই ঠাকুর দেওয়া হল রাজুর বাড়ি এবং রাজু ঠাকুর ভক্ত পাবলিক বলে তার পরের বছরই বিয়েটা সেরে ফেলে।

    তা যা বলছিলাম, এই বার নিমোতে আট জন ছেলে ছোকরার বিয়ে হয়েছে – তান্ত্রিক তপুর ছেলে সহ। কিন্তু ওদের বাড়ি কি কারণে অশৌচ চলার জন্য ঠাকুর দেওয়া হয় নি, বাকি সোনার বাংলার ছেলেদের ভার ছিল আর চারটে ঠাকুর দেবার। এর মধ্যে একটা এল আমার ভাই বাবুর জন্য, যার বিয়ে হল এই বছর এবং সেই বিয়ের গল্প তো আগেই লিখেছি। কার্ত্তিক ঠাকুর আবার এমন জিনিস যে নিজে নিজে কেউ আনে না আমাদের গ্রামে – তাই একটা হালকা টেনশন কেউ ঠাকুর দেবে কিনা, যদি পুজো করার মন থাকে তা হলে। বাবু আমাদের সংসারী লোক, ঠাকুর যে দেওয়া হবে সেটা সে জানত – তাই আগে থাকতে ব্যবস্থা সব কমপ্লিট। লোক জন নিমন্ত্রণ করা, রাঁধার লোক, নিজের শ্বশুরবাড়ি এবং শালিদের আসতে বলা – ময়দা, তেল, গ্যাস, ওভান, মিষ্টি, ছোলা, ফুলকপি সব কিনে রেডি। ব্যাক আপ প্ল্যানও ছিল – একটু বেশী রাত পর্যন্ত দেখা হবে, যদি দেখা যায় ঠাকুর পড়ল না, তাহলে আমাদের বাড়িতে কাজ করা, বাবুর ডানহাত এস্টেট ম্যানেজার কমল-দা বলা আছে একটা কার্ত্তিক ঠাকুর কিনে যে ফেলে দিয়ে যায়। মোট কথা ঠাকুর ফেলতেই হবে।

    শনিবার সন্ধে বেলা হালকা টেনশন – কখন ঠাকুর ফেলে। রাত বাড়ছে, কিন্তু ঠাকুর আসছে না – এদিকে কাকিমার শরীর খারাপ, বেশী রাত পর্যন্ত জেগে থাকার ইচ্ছা নেই। থেকে থেকে বাবু-কে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছে, “আর কখন ঠাকুর ফেলবে রে? ঠাকুর বরণ করে ঘরে তুলে ঘুমাতে যাব”। বাবু তিতিবিরক্ত, কাকিমা-কে বলছে, “এই একদিনও খালি ঘুম ঘুম। তুমি ঘুমাতে যাও, আমি নিজেই ঠাকুর বরণ করে ঘরে তুলে নেব, নয়ত বড়-মাকে ডেকে নেব”। ওদিকে কমলদা বাবুকে পাগল করে দিচ্ছে জানতে চেয়ে যে কাট অব টাইম ঠিক কটায় হবে – মানে রাত কটা পর্যন্ত দেখে কমল-দা ঠাকুর কিনতে যাবে! বাবু পায়চারী করতে করতে বলছে, “বাঁড়া জ্বলে গেলুম”।

    এই বাগ বিতন্ডা চলছে, এমন সময় বাইরের দরজায় বিশাল শব্দ করে বোমা ফাটার শব্দ এবং সাথে সাথে দরজার কলিংবেলের আর্তনাদ। মা গিয়ে তড়িঘড়ি দরজা খুলল – আশে পাশে কেউ নেই – সামনে কার্ত্তিক ঠাকুর বসানো।

    সেই ঠাকুর বাইরের দরজা থেকে উঠিয়ে এনে বাড়ির উঠোনে বরন হল – লাইটের আলোয় দেখা গেল কার্ত্তিকের গলায় এক চিঠি ঝুলছে, তাতে লেখা “বাবা তুমি কিন্তু কৃপণতা করো না, আমার বিরিয়ানী খাবার ইচ্ছে হয়েছে এবার”।







    রবিবার রাতে পুজো, পুরোহিত নিমো গ্রামের একমোদ্বিতয়ম। কার্ত্তিক পুজোর আসল সময় রাতের বেলা – কিন্তু নিমোতে ঠাকুর এসেছে মোট তেরোটা – এক একটা পুজোয় গড়ে এক ঘন্টা। গদা বামুন শুরু করল বিকেল তিনটেয় – আমাদের বাড়ি এল ঠিক মূল সময়ে সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায়। গদা বামুন কাকুর বন্ধু বলে প্রপার টাইমে স্লট পাওয়া গিয়েছিল। পনেরো মিনিট বেশী সময় নিয়ে গদা বামুন এক ঘন্টা – পনেরো মিনিটে পুজো সমাপ্ত করল। এর পর লুচি খাওয়া – আমাদের ইমিডিয়েট ঘোষ ফ্যামিলি এখন অনেক ছোট হয়ে এসেছে, পঞ্চাশ জনের মত পাত পড়ল। বাড়ির মেয়েরা সব হই হই করে গল্প গুজব করতে করতে লুচি, ডাল, তরকারি, মিষ্টি ইত্যাদি খাওয়া হল।

    পরের দিন দুপুরে খিচুড়ি এবং ততসহ নানা মুখরোচক জিনিসপত্র। প্রবলেম হল, সোনার বাংলা ক্লাবের ছেলেরা তাহলে খাবে কোথায়? কারণ ওদিকে রাজুর বাড়িতেও ঠাকুর এসেছে – রাজুই বাবুকে বলল, “দ্যাখ এই বছর তো আমার চার বছর, তার মানে শেষ। তোর তো এখনো বাকি রইল তিন বছর। এই বার সোনার বাংলার ছেলেরা আমার বাড়িতেই খাক, পরের বার থেকে তোর বাড়িতে”। তো তেমনি ব্যবস্থা হল – রাজুর বাড়িতে ফ্রায়েড রাইস ইত্যাদি দিয়ে কার্ত্তিক খাওয়া সারলেন। আর বাবুর বাড়িতে প্রায় ৭০ জন মত নিরামিষ – বুধো কলুকে নাকি পাওয়া যায়নি রাঁধার জন্য, স্টেপনি দিয়ে চালাতে হয়েছে।

    পরের বার নাকি বিরায়ানী খাবেই কার্ত্তিক বাবুর কাছে –
  • সুকি | 162.158.165.173 | ২৫ জানুয়ারি ২০২০ ১০:৪৭729497
  • ডাইনী নিধন যজ্ঞ
    -----------------------

    সেদিন নিমো স্টেশনে সন্ধ্যেবেলা গিয়ে যখন নামলাম তখন বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে হয়ে এসেছে – আবাহাওয়া দপ্তর ১১ ডিগ্রী বলতে থাকলেও ফিল লাইক ৫ ডিগ্রী মতন। তার উপর আছে আবার উত্তুরে হাওয়া। ফলতঃ সেদিন স্টেশনে তেমন কাউকে পেলাম না ছেলে ছোকরা বসে থাকতে, শুধু দেখলাম মিলন ফোনে তার সাউন্ড বিজনেস নিয়ে কার সাথে কথা চালাচ্ছে।

    মিলন হল গিয়ে আমাদের ঘোষ পাড়ার বাসুদার ছেলে, মানে হিসেব মত আমার ভাইপো, আমাকে তার কাকা বলে ডাকার কথা। কিন্তু ওই সব তালেগোলে দাদা-ভাই বলেই চলে যায়। ফালতু বয়স ভিত্তিক বিভাজনে আমরা বিশ্বাসী ছিলাম না। মিলনের আছে মাইকের ব্যবসা, দোকানের নাম ‘মিলন সাউন্ড’ – আজকাল আমাদের পিকনিকে বা পাড়ার পুজোয় ছয়-ছয় বা নয়-নয় মিলনেরই সাউন্ড বক্স বাজে। ফোনে কথা শেষ হলে আমাকে দেখতে পেয়ে বলল, “বুঝলে সুকানদা, অফসিজনে একটা ভাড়ার ব্যবস্থা হয়ে গেল, চার বছর তো চলবেই”। বলে খেয়াল পড়ল, “আরে, তুমি আসবে বলে তো শুনি নি”। জিজ্ঞেস করলাম,

    - অফ সিজনে কিসের ভাড়া পেলি?
    - কেন তুমি শোনো নি? সে তো বিশাল কেস
    - কি শুনব?
    - আরে মাশডাঙাতে তো ডাইনী তাড়াতে যজ্ঞ হচ্ছিল কদিন থেকে

    পাশের বেঞ্চে অচেনা কেউ একটা চাদর মুড়ি দিয়ে ট্রেনের জন্য ওয়েট করছিল, সে ফুট কাটল, “ডাইনী নয়, কালা-জাদু”।

    যা বোঝা গেল মিলনের কথা থেকে মাশডাঙা গ্রামে ডাইনী বা কালা-জাদু কাটাতে যজ্ঞের আয়োজন করা হয়েছে, এবং সেখানে মিলনের সাউন্ড সিষ্টেম দুরদার কাজ করছে। নিমো এবং রসুলপুর স্টেশনে মাঝে একটা ডি ভি সি-এর ক্যানেল আছে, যাকে আমরা ‘নদী’ বলি, আর সেই নদীর ধারের গ্রাম হচ্ছে মহেশডাঙা ওরফে মাশডাঙা।

    মাশডাঙা গ্রামে এমনি কালী এবং রক্ষকালী দুই ঠাকুরেরই পুজো হয়, রক্ষকালী পুজো উপলক্ষ্যে ঝাপান হয় বড় করে। কদিন আগে নাকি কালী ঠাকুর স্বপ্নে সেই নিত্য পুজারী ব্রাহ্মণকে বলে,

    - দ্যাখ, তুই তো রোজ ফল মূল দিয়ে পুজো করছিস আমাদের দুজনকে, কিন্তু আমাদের দুজনেরই যে হাত পা বাঁধা, কিছুই খাওয়া তো দূরের কথা, নড়তে চড়তে পর্যন্ত পারছি না! কিছু একটা কর।

    নিত্য পুজারী কিছুই বুঝতে পারল না যে দুই কালীর হাত বা বাঁধা মানে কি! সে তখন গিয়ে পড়ল গ্রামের প্রধান পুরোহিত গগা-র কাছে। তোতলা গগা ভাবার জন্য একবেলা সময় চেয়ে নিয়ে বিকেলে এসে জানালো, সেও ঠিক কি হয়েছে বুঝতে পারছে না, তবে মনে হচ্ছে কালী-কে কেউ বাণ মেরেছে। সেই বাণ মেরেই হাত-পা বন্ধন করেছে। গগা অকপটে জানালো যে এই ধরণের বাণ মারা কাটাবার স্পেশালিটি তার নেই এবং তার চেয়েও বড় কথা কালী ঠাকুর-কে বাণ মারছে, না জানি সে কত বড় ডাইনী বা কালা জাদু। গগাই বলল এই ধরণের কাজ একমাত্র করতে পারে রায়না গ্রামের পুরোহিত। তারা এই সব ব্যাপারে ডক্টরেট, ডি-ফিল করেছে।

    তা রায়না থেকে বামুন ডাকা হল – তারা এসে কি সব ঘুরে ফিরে দেখল চারপাশ ক্রাইম সীনের। পুরো ফরেনসিক এক্সপার্টদের মত। নিজেদের মধ্যে ডিসকাস করে রায় দিল, ঠিক সময়ে ডাকা হয়েছে তাদের। আর একটু হলে কেস আরো গড়বড় হতে পারত। মনে হচ্ছে মাশডাঙা গ্রামের কেউ রিসেন্টলি কালা জাদু শিখছে বা সবে মাত্র শিখে এসেছে। এই জিনিস তারই কাজ, মনে হচ্ছে নেট প্র্যাক্টিস করতে গিয়েছিল মাঠে পুরোপুরি খেলতে নামার আগে। গ্রামের পাবলিক অধৈর্য্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, তা নেট প্র্যাক্টিস করতে গিয়ে সে করেছে কি? পুরোহিত জবার দিল যে, এমনি কালী এবং রক্ষকালী দুই ঠাকুরেরই হাত-পা বেঁধে রেখেছে জাদু করে। এর থেকে উদ্ধার পেতে গেলে যাগ-যজ্ঞ করতে হবে।

    হল তাই চার দিন ধরে যাগ-যজ্ঞ, মিলন সাউন্ড ব্যবহার করে উচ্চকিত মন্ত্রপাঠ ইত্যাদি – নিজেদের গ্রাম এবং পাশের গ্রাম সবাই শুদ্ধ হল সেই মন্ত্র পাঠে। চার দিনের শেষে যজ্ঞ নিভিয়ে রায়নার পুরোহিত জানালো, “বাঁধন খুলে দিয়েছি ঠাকুরের – আর কোন আসুবিধা হবে না, যা করার করে দিয়েছি”। গ্রামের লোক উত্তেজিত, “ঠাকুর মশাই, আপনি তা হলে এবার বলুন কোন বোকাচোদা আমাদের গ্রামে এই কালা-জাদু শিখতে লেগেছে, ক্যেলিয়ে তার গাঁড় না ভাঙা পর্যন্ত আমাদের শান্তি নেই”। ঠাকুর মশাই বিচক্ষণ লোক, জানালো, “সেটা তো তোদের বলব না – নিজেদের মধ্যে মারপিট লেগে যাবি। বলছি তো, আর কোন সমস্যা হবে না। তবে আগামী চার বছর করতে হবে এই যজ্ঞ”।

    এদিকে মিলনের ঝোঁক ছিল যজ্ঞে।পুজোয় দেওয়া প্রচুর ফল-মিষ্টির দিকে। ভেবেছিল যজ্ঞ শেষ হলেই সাঁটাবে সব পুরোহিতের কাছ থেকে নিয়ে। সেই মত এগিয়েছে – কিন্তু বিধি বাম। আমাকে মিলন হতাশ মুখে জানালো, “জানো সুকানদা, বাঁড়া বামুন সব কিছু গুটিয়ে নিয়ে গিয়ে নদীর জলে ফেলে দিল। আবার বলে কিছু মনে করো না বাবা, এই বার রিক্স নিতে পারছি না, কি ফলে-মিষ্টিতে কি দোষ ঢুকে আছে। পরের বার থেকে সব ভাগ করে দেবো!”

    মিলনে হাসিমুখে আরো জানালো, “বামুন ফল না দিক, পরের চার বছরে মাইক ভাড়ার ব্যবস্থা তো করে দিয়েছে!”
  • সুকি | 162.158.118.219 | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৭:৫৯729663
  • অশোক আশ্রম
    -------------------------

    এবার নিমোতে গিয়ে শুনলাম কামারদের অশোক নাকি আবার ফিরে এসে আশ্রম খুলেছে!

    নিমো গ্রাম বেশ কতকগুলি ভালো ফুটবলার এবং অন্তত দুজন আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট প্লেয়ার উপহার দিলেও, আমাদের গ্রামের প্রকৃত অর্থে অ্যাথলিট বলতে ওই একজনই ছিল, অশোক কর্মকার। পরবর্তী কালে সৈকত ক্রীড়াবিদ হবার চেষ্টায় প্রায় নেংটি সদৃশ শর্টস পরে মাঠে ছোটাছুটি শুরু করলেও, অল্প বয়সে মাথায় চুল উঠতে শুরু করলে সেই স্বপ্নের পরিসমাপ্তি হয়। খুব অল্প বয়সে সৈকতের অস্বাভাবিক চুল পড়তে শুরু করে। সব চুল পড় গেলে বিয়ে হবে কি করে - এই চিন্তা ব্রেনের বেশীর ভাগ জায়গা দখল করে নিলে সৈকতের পারফরমেন্স খারাপ হতে শুরু হয়। সারাদিন চুল নিয়েই ব্যস্ত - যাবতীয় রকম অ্যালোপ্যাথী, হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, জল-পোড়া, চাল-পোড়া, মাদুলি ইত্যাদি ইত্যাদি জিনিস এক্সপ্লোর করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছোটাছুটি করতে গিয়ে ক্রীড়াবিদ হবার সময়টাই পার করে ফেলেল। ফলতঃ নিমো গ্রামের এক মাত্র সফল অ্যাথলীট হিসাবে অশোক-এরই নাম লেখা রইল ভারত সেবক সমাজের খাতায়।

    অশোক আবার সম্পর্কে আমার মামা ছিল – মায়ের কোন এক দীন-করা সম্পর্ক থেকে। এবং তার জন্য আমাকে ভাগনা বলেই চালাত অনেক সময়। সেই ছোটবেলায় গ্রামের বার্ষীক স্পোর্টস-ডে তে হাইজাম্প, লং-জাম্প এবং রসুলপুর-নিমো জি টি রোড রেসে সোনার পদক অশোকেরই বাঁধা থাকত। এক সময় বাঁশ বাগানের পাশের ফাঁকা মাঠে সাদা পোষাক পরে ক্যারাটের ক্লাস শুরু করল অশোক। কোমরে দেখলাম কালো-বেল্ট বাঁধা, জানালো ব্ল্যাক-বেল্ট হয়ে গ্যাছে কোন ফাঁকে। তো যাই হোক, বেশ কতকগুলো ছেলে পুলে, চ্যালা-চামুন্ডা জুটে গেল ‘অশোক ক্যারাটে ক্লাবের’। মুখে বিকট আওয়াজ করে সব হাত-পা ছোঁড়া শুরু করল একসাথে। ‘খিয়া – খিয়া – খিয়া’ আওয়াজে বিকেলে শুভ-ঠাকুরের তলায় বসে পান-গিন্নীর গুলতানি মাথায় উঠল। সন্ধ্যে হয়ে এলে শাঁখের শব্দের সাথে মিশে যেতে লাগল অশোকের ক্যারাটে ক্লাবের প্র্যাক্টিসের শব্দ।

    যখন নিমো ক্রিকেট টিমের হয়ে উইকেট কিপিং শুরু করি তখন আমি ক্লাস সেভেন। অশোক তখনো বোলিং করে মাঝে মাঝে। বল করেই, “ভাগনা, অফ-কাটার টা বুঝতে পারলি তো”। বলতাম, “মামা, বল ব্যাটসম্যানকে বীট করলে তবেই তো আমি কাজে আসব। বল তো ব্যাটসম্যান মাঠের বাইরে মেরে রশিদের বাগানে ঢুকিয়ে দিয়েছে! অফ-কাটার নিয়ে আমি কি মারাবো!” উত্তর হল “আহা – বীট না করলেই বা, অফ কাটারটা দেখবি না?” কি আর বলি – একদম ফালতু বোলার, আমি বাঁ-হাতে ওর থেকে ভালো বল করতাম।

    এই ভাবেই ক্যারাটে ক্লাবে অশোকের প্রধান শিষ্য হয়ে উঠেছিল তার নিজের ভাইপো, সাধনের ব্যাটা বাপন। হলুদ বেল্ট পর্যন্ত পোঁছে বাপন বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল কোন এক যাত্রা দলের হয়ে রাঁধতে। কিছু বছর পরে ফিরে এসে বলল, “এবার থেকে নিমোর যাবতীয় পিকনিকে রান্নার দায়িত্ব আমার”। রাঁধলোও বেশ কয়েকটা পিকনিকে। কয়েকমাস পর কাকা-ভাইপো দুই জনেই হাওয়া নিমো থেকে। কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না দুই জনকে। সাধনের বউ নিমো মসজিদের মৌলবী-র কাছে জলপোড়া, পচা মোড়লের কাছে বাটি চালা করেও জানতে পারল না ছেলে কোথায় গ্যাছে।

    কয়েক বছর পরে কাকা-ভাইপো ফিরে এল – এবার অশোক নাকি ডাক্তার হয়ে এসেছে। উত্তর প্রদেশে কোথায় এক গ্রামে নাকি অশোক ডাক্তারি জাঁকিয়ে বসেছিল, বাপন তার কমপাউন্ডার। সেই ডাক্তারির ব্যবসাও চলল কয়েক বছর।

    তার পর থেকে অশোক-কে ঠিক মত ট্র্যাক করা চাপ হয়ে গিয়েছিল। কেউ বলে স্কুল মাষ্টারি করছে, কেউ বলে এল আই সি-র এজেন্ট, কেউ বলে আলুর ব্যাবসা করছে, কেউ বলে পতঞ্জলী স্টোর খুলেছে।

    তাই যখন এবার গিয়ে শুনলাম যে অশোক আশ্রম খুলেছে তাই দেখতে না গিয়ে থাকতে পারলাম। নিমোর গ্রামের ঠিক বাইরে পুব দিকে একটা খুব বড় দীঘি টাইপের আছে, যার নাম ‘গরাঙ্গে’। সেই গরাঙ্গের পূব পাড়ে নাকি অশোক আশ্রম খুলেছে এবং সেখানে যোগ ব্যায়াম শেখানো হচ্ছে। এই গরাঙ্গে নিয়ে একটু চাপ আছে। এই দীঘির একপাড়ে আছে আমাদের গ্রামের শ্মশান এবং অপর একপাড়ে আছে পাশের গ্রামের শ্মশান। অর্থাৎ মড়া পোড়া, পোড়া কয়লা, ভূত ইত্যাদি নিয়ে কারবার এই দীঘির। যেদিন গরাঙ্গের পাড়ে অশোকের আশ্রম দেখতে যাব ভাবলাম, তার আগের দিন বাউরিপাড়ার বড়-র (‘বড়’ এক ছেলের নাম) মা মারা গেছে এবং তাকে ওই শ্মশানে পোড়ানো হয়েছে।

    বেলা এগারোটার দিকে একা একাই হেঁটে হেঁটে গরাঙ্গের পাড়ে হাজির হলাম। আশেপাশে কেউ নেই – একপাশে এক অশ্বত্থ গাছের তলায় পীর বাবার মাজার টাইপের রয়েছে। এদিকে ওদিক হেঁটে পুরানো শ্মশানের কাছে গেলাম – পুরানো ঘরটা প্রায় ভেঙে এসেছে, আগাছায় ভর্তি, মনে হয় সাপের আড্ডা। ভিতরে ঢোকার সাহস হল না – অশ্বত্থ গাছের আড়ালে কেমন এক ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। চিতা ওঠাবার রেলিং গুলোয় জং পড়ে গেছে। তার একটু পাশে নতুন শ্মশান চালাটা – নিমো পঞ্চায়েত থেকে ঢালাই দেওয়া হয়েছে এবং নতুন রেলিং। দেখলাম রেলিং-এর পাশে কালকের বড়-র মায়ের বডির সাথে আনা গাঁদা ফুলের মালা তখনো টাটকা রয়েছে।

    গরাঙ্গের অপর পাড়ে অশোকের আশ্রম – পাড় বরাবর চলতে শুরু করলাম, পাশেই অন্য গ্রামের শ্মশান। এদের শ্মশানে আবার কালীর মূর্তি। একটা ঘট উলটে রয়েছে – মনে হয় ইদানিং-য়েই মড়া পোড়ানো হয়েছে। এই এলাকাটা একদম ছায়ায় ছায়ায়। উঠপাখির মত বড় টার্কি দেখলাম ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা – কারা পুশেছে কে জানে! গা ছমছম পরিবেশ – একটু একটু করে এগুচ্ছি। হঠ করে পিছন থেকে আওয়াজ, “এই সুকান”। আচমকা পিছনে থেকে ডাক শুনে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার জোগাড়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম খড়ের গাদার ওপাশ থেকে মাঠে কাজ করা বাউরি পাড়ার বিশুদা ডাকছে। বলল, “কি করছিস এখানে, কবে এলি, ছবি তুলে বেড়াচ্ছিস নাকি”? কিছু কথা বলে বিশুদা চলে গেল –

    এদিকে আর এগুতে সাহস হল না তেমন – আচমকা যদি আবার কেউ ডেকে দেয়, হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে। ফলে অশোকের আশ্রমে ঢোকা হল না সেদিন – আশ্রমে কেউ ছিল না তখন, রোজ বিকেলে খোলে।

























    সাথের ছবিতে সেই যাত্রা পথ। দীঘির ওই পাশে যে ছোট্ট কুঁড়েটা দেখা যাচ্ছে, সেটাই অশোকের আশ্রম। পরের কোন একবার আশ্রমের ডিটেলস হবে না হয়।

  • সুকি | 172.68.146.169 | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০৭:১৫729689
  • বাই দি ওয়ে, কিছুদিন আগে "আজকের তুঘলক" বলে দাদু মহেন্দ্র ঘোষের কথা লিখেছিলাম - দাদু গত বুধবার মারা গেলেন, এক যুগের পরিসমাপ্তি
  • সুকি | 162.158.118.73 | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৯:৫৬729732
  • দাদু মহেন্দ্র ঘোষের আজকে শ্রাদ্ধ সম্পন্ন হল। শেষ বয়েসেও তুঘলকি চাল দিয়ে জীবনে ইতি টানলেন। মৃত্যু এগিয়ে আসছে কয়েক বছর আগে হঠ করে বোধগম্ম হয়। ইচ্ছে হল নিজের হাতের লাগানো গাছের কাঠে পুড়ে মরার। ফলে আগে যেখানে গোলাপ বাগান ছিল সেখানে লাগানো হল ল্ম্বু গাছ। লম্বু গাছ খুব তাড়াতাড়ি বাড়ে - কিন্তু প্রেডিক্টেড টাইমের আগেই মরে যাওয়ার ফলে লম্বু গাছ পুষ্ট হবার চান্স পেল না।

    বলতে গেলে নাবালক ল্ম্বু গাছের কাঁচা কাঠের চিতায় উঠল দাদু। সবার টেনশন, মাল পুড়বে তো! চারিদিকে ধোঁয়ায় ভর্তি কাঁচা কাঠের। মরা পুড়তে সময় লাগবে। কিছু পাবলিক বেজায় খুশ। একপেটি মদ ছিল, আরো একপেটি মদ আনা হল বেশী টাইমটা কভার করার জন্য।

    মোদ্দা কথা, ভালোই গেলেন আজ কা তুঘলক
  • সুকি | 162.158.118.137 | ০২ মার্চ ২০২০ ১৭:৫১729813
  • আজ কা তুঘলকঃ পরিসমাপ্তি
    -------------------------------------

    কিছুদিন আগে এই ফেসবুকেই (২৪শে নভেম্বর, ২০১৯) লিখেছিলাম “আজ কা তুঘলক” – তা প্রায় সপ্তা দুই আগে সেই তুঘলকের জীবনাবসান হয়েছে। এই আধুনিক বিন-তুঘলক ছিলেন আমার দাদু, মায়ের মামা মহেন্দ্র ঘোষ। না, খুব দুঃখের কিছু ব্যাপার নয় – বয়স হয়েছিল, তবে দিদা-টা একা হয়ে গেল। এক যুগের পরিসমাপ্তি ছাড়া এই যা।

    বয়েস হচ্ছিল, কিন্তু খাওয়ার জোশ কমাবার নাম নেই – ডাক্তারে খেতে বারণ করছে, নিজেরও খেতে কষ্ট হচ্ছে, তবুও সেই ছাগলের মাংস, গাওয়া ঘি এর লুচি, জম্পেশ করে বানানো পরোটা – এই খেতে খেতেই দাদু আমার উর্দ্ধোলোকে পাড়ি দিলেন। খাওয়া না কমানোর ফলে নিজেও বুঝতে পারছিল যে দিন এগিয়ে আসছে, কিন্তু টাইমিং-টা ঠিক ঠাওর করতে পারছিল না।

    শেষ বয়েসের খামখেয়ালিপনা করে দাদু ঠিক করল যে মারা গেলে যেন নিজের হাতে লাগানো গাছের কাঠ জ্বালিয়ে পোড়ানো হয় তাকে। বাড়িতে তুমুল তর্ক-বিতর্ক শুরু হল – কেউ বলল এই যদি ইচ্ছে ছিল তা হলে ঠিক সময় মত গাছ লাগাও নি কেন? একটা গাছ ভালোভাবে বেড়ে পুরুষ্ট হতে ১০-১৫ বছরের ধাক্কা, ওত সময় কি হাতে আছে নাকি? দাদু বলল – কেন ফজলি আমের গাছটা? দিদা বলল – মাথা খারাপ নাকি, নাতি-পুতি গুলো কত ভালো বাসে ওই গাছের আম খেতে! সেই একই লজিকে বাদ গেল কাঁচামেটে, হিমসাগর আমের গাছ এবং কাঁঠাল গাছটাও। দাদু বলল – তাহলে জামরুলটাই কাটবে না হয়। উত্তর এল – আম, কাঁঠাল পাওয়া গেলেও ভালো জামরুল আজকাল পাওয়া যায় না তেমন। দাদু এবার ডেসপারেট – তাহলে অশত্থ গাছটাই ফাইন্যাল। জানা গেল অশত্থ গাছ নাকি কাটতে নেই, গৃহস্থের অকল্যাণ হয়। আর নারকেল গাছের বাখরা দিয়ে সাপ ইত্যাদি পোড়ানো গেলেও পুরো মানুষের ডেডবডি পোড়ানো চাপের আছে।

    দাদু এবার ঠিক করল তাহলে নতুন গাছ লাগানোই বেটার। কিন্তু এমন গাছ লাগাতে হবে যা তাড়াতাড়ি বাড়ে – কারণ হাতে সময় কম। অনেক আলাপ আলোচনার পর ঠিক হল আগে যেখানে গোলাপের বাগান ছিল সেখানে ‘লম্বু’ গাছ লাগানো হবে। জানামতে এই গাছই সবচেয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ে। কিন্তু অত তাড়াতাড়িও বাড়ে না যে দাদু এষ্টিমেটেড টাইমের আগে মারা গেলে গাছ নিজে আলাদা এফর্ট দিয়ে রেডি হয়ে যাবে! ফলে দাদু যখন মারা গেল লম্বু গাছ তখন খুব বেশী বয়ষ্ক হয় নি। সেই কাঁচা কাঠে পোড়াবার ব্যবস্থা হল তুঘলকের শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী।

    শরীরে বেশী জল না জমলে কাঠের আগুনে একটা বডি পুড়তে মোটামুটি ৫-৭ ঘন্টা লেগে যায়। সেই মত শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এক পেটি মদ (১০টা সাড়ে সাতশোর বোতল) – কিন্তু কাঁচা কাঠের হিসেবটা কেউ আঁচ করতে পারে নি আগে থেকে। পোড়াতে গিয়ে দেখা গেল কাঁচা কাঠের ধুঁয়ায় শ্মশান ছেয়ে গ্যাছে। কে একটা বলল – “এতো অনেক সময় লাগবে রে এই কাঁচা কাঠে পড়াতে, মদে কুলাবে না”। তাই টাইমপাশের জন্য আবার কিনে আনা হল আরো এক পেটি মদ।

    মায়ের সাথে কথা হচ্ছিল ফোনে দাদুর শ্রাদ্ধ শান্তি থেকে ফিরে আসার পর। সব শুনে শেষে জিজ্ঞেস করলাম,

    - মা, তাহলে মামারা এখন কি করছে?
    - কোন মামা?
    - ছোট মামা
    - তোর ছোটমামার প্রধান কাজ এখন মোবাইলে গেম খেলা।
    - মানে, সারাদিন মোবাইলে গেম খেলে?
    - প্রায় তাই, মাঝে মাঝে বৌমারা তাড়া দিলে নিজের ছেলে মেয়ে এবং ভাইপো-ভাইঝির সাথে বাইরের মাঠে গিয়ে ডাংগুলি খেলে।

    ছোট মামার উপর শ্রদ্ধা হল – ডাংগুলি তো এখন প্রায় উঠেই গেছে, তা যদি খেলাটার ঐতিহ্যটাকে ধরে রাখতে পারে মন্দ কি! জিজ্ঞেস করলামঃ

    - আর বড়মামা
    - ওই বাড়ি পিছনে পুকুরটা ছিল না, সেটার ঘাট-টাকে ভালো করে শান দিয়ে বাঁধিয়েছে। তোর বড় মামা এখন সেই শান বাঁধানো ঘাটে বসে কি ব্যবসা করা যায় তাই ভাবে দিন রাত।
    - তা ভালো তো, তাহলে মামা খুব তাড়াতাড়ি ব্যবসায় নামবে মনে হচ্ছে
    - ঘাট-টা তো প্রায় ছয়-সাত বছর হল বাঁধিয়েছে, তখন থেকেই তো শুনি ঘাটে বসে ভাবছে কি ব্যবসা করবে!

    যা বোঝার বুঝে গেলাম। দুই ভাইয়ের ভাত খাবার পর বাইক নিয়ে ৫ + ৫ কিলোমিটার দূরে পানের দোকানে গিয়ে স্পেশাল পান খাবার অভ্যাসটা এখনো আছে।

    শুনেছি রবিশংকর (“শ্রী শ্রী”) বাবুর নাকি ‘আর্ট অব লিভিং’ কোর্স আছে – মানুষ সেই ক্লাস দেদার নেয় স্ট্রেস বিহীন লাইফ কি করে কাটানো যায় তা শিখতে। আমার এই দুই মামা যদি ‘আর্ট অব লিভিং’ – এর ক্লাস নিতে শুরু করে, রবিশংকরের ভাত মারা যেতে কদিন?
  • সুকি | 172.68.167.15 | ১৮ মার্চ ২০২০ ২০:২৫730119
  • খুড়ো
    --------------

    বেশ কিছুদিন আগের কথা। সেবার নিমোতে গেছি ছুটিতে, একদিন কথায় কথায় হোঁদল বলল,

    “সুকান-দা, তুমি ওই বিদেশে গিয়ে কি বাল-বীচি করছ, রিসার্চ নাকি – কিন্তু বুদ্ধি তোমার কমেছে তো মনে হচ্ছে সাহেবদের দেশে থেকে!”

    অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম, নিমোর ছেলেরা আবার আমার বুদ্ধি নিয়ে কবে থেকে মাথা ঘামাতে বসল! মুখে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন কি হল রে?”। হোঁদল বলল,

    “তুমি বাঁড়া কোন আক্কেলে খুড়োকে ঔষুধ কিনতে টাকা দিলে?”

    আমি আরো অবাক, টাকা দিলে প্রবলেমটা কি? জিজ্ঞেস করলাম, “কেন, খুড়ো ঔষুধ কেনে নি”?

    - হ্যাঁ, তোমার কাছ থেকে টাকা পেয়েই তো ঔষুধ কিনতে ছুটল!
    - তাহলে সমস্যা কিসের?
    - আরে বাঁড়া তুমি কি ঔষুধ ভাবছো? টাকা পেয়েই খুড়ো ছুটেছে গাঁজা কিনতে। তোমাকে মানু ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখিয়েছে তো? পরের বার প্রেসক্রিপশনের তারিখটা একটু দেখে নেবে আর বলবে টাকা দেব না, তোমাকে ঔষুধ কিনে দেব যা দরকার।

    খুড়ো মানে হল গিয়ে আমাদের ঘোষ পাড়ার সুবান – পোশানের ভাই আর আমাদের বন্ধু বিটুর কাকা। তো সেই অর্থে সুবান হয়ে গিয়েছিল আমাদের খুড়ো।

    প্রত্যেক গ্রামেরই নিদেনপক্ষে একটা করে ট্রাজিক হিরো থাকে – আমাদের গ্রামের ছিল সুবান খুড়ো। খুড়ো খুব ভালো ফুটবল খেলত – কথিত আছে জুনিয়ার মোহনবাগানে চান্স পেয়েছিল এবং বড় ক্লাবে খেলার পোটেনশিয়াল ছিল। কিন্তু খুড়োর বাপ তাকে কলকাতা যেতে দেয় নি – বাড়ি ছেড়ে গেলে জমি জায়গা দেখবে কে ইত্যাদি কংগ্রেস পিরিওডের গল্প।

    কালের প্রকোপে খুড়োর বাপ মারা গেল – জমি জায়গা গেল ফুরিয়ে। বড় ভাই আদিত্য ওরফে এদো, আমাদের দোস্ত বিটুর বাপ পুলিশের হোমগার্ডে কাজ পেয়ে গুছিয়ে বসল। ওদিকে পোশান গরু-জমি জায়গা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, আর খুড়ো নিমগ্ন হল গাঁজা সেবনে।

    ততদিনে ওই ঘোষ পাড়ারই অরুনদা এবং তার ভাই বরুণদা বার্নপুর কারখানায় কাজ করে ফিরে এসেছে। টাকা পয়সা বিশেষ কিছু না আনতে পারলেও সাথে নিয়ে এসেছিল গাঁজার নেশা। নিমো গ্রাম পুরো ফ্লাডেড হয়ে গেল গাঁজাতে – এর আগের নিমো ভারত সেবক সমাজের ব্যাচে ছিল মদের নেশা – অরুণ-বরুণের পাল্লায় পরে মদ রিপ্লেস হল গাঁজা দিয়ে। খুড়োর টিমে ছিল অরুণ-বরুণ এবং সামাদ সাহেবের ছেলে গুলুদা। গুলুদা আবার কনভেন্টে পড়া মানুষ ছোটবেলা থেকে, কাজও করত বেশ বড় রকমের কলকাতার আকাশবাণীর দিকে। বাংলাটা গুলুদা ভালো বলতে পারত না – লেখা বা পড়া তো দূরের কথা। কিন্তু গাঁজায় দম দেবার জন্য যে টুকু বাংলার দরকার হয় তাতে কোন প্রবলেম ছিল না। সে এক অসম বন্ধুত্ব – খুড়োর আর্থিক অবস্থার দিকে তাকিয়ে মনে হয় না গাঁজার দামে তেনার কিছু কনট্রিবিউশন থাকত। কিন্তু কলকেয় টানে খুড়ো পাশে পাশে আছে।

    সমস্যা ছিল অন্য জায়গায় – যারা গাঁজার ব্যাপারে সরগর তাঁরা জানেন যে রোজ রোজ গাঁজা টানলে তার সাথে থাকে খাদ্যের জোগানটাও ঠিক ঠাক হতে হবে। মনে গিয়ে ওই দুধ জাতীয় জিনিস গুলো। কিন্তু খুড়ো আর সে সব কোথায় পায়!

    খুড়োর ইমিডিয়েট দাদা পোশান হরি নাম করে করে ক্লান্ত হয়ে একটু বেশী বয়েসে ঠিক করল বিয়ে করতে হবে। নিমো শিবতলার ৫০০ মিটার রেডিয়াসের মধ্যে ঘোষেদের পোশান এবং হালদারদের পোশানের মত গোঁয়ার আর কেউ ছিল না। বাউরি পাড়ার পোশান-ও নাকি গোঁয়ার ছিল – এই সব ক্ষেত্রেই পোশান নাম কমন পরে বলে আমরা ধরেই নিয়েছিলাম পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের প্রশান্ত নামের সবাই গোঁয়ার হবেই। তবে হালকা ডিফারেন্সও ছিল বৈকী! খুড়োর দাদা পোশান ছিল অমায়িক – অত্যন্ত অমায়িক এবং স্যোশাল। আর ওদিকে হালদারদের পোশান একেবারেই আন-স্যোশাল। এখনো পালটায় নি – এই তো কিছু আগের দিনের ঘটনা। বামুন-দের দিলীপের সাথে স্কুটারের পিছনে চেপে মেমারী যাচ্ছিল পোশান। জি টি রোডে কিসের সাথে ধাক্কা খেয়ে স্কুটার উলটে রাস্তায় উলটে যায় দুজনেই – খুব বেশী ইনজুরী হয় নি কারো, কেবল দিলীপ-দার পা-টা চাপা পড়ে গিয়েছিল স্কুটারে। তা দিলীপ-দাকে স্কুটারের তলা থেকে ধরে তুলবে কি, ছুটে পালিয়ে একটা টোটো ধরে সেখান থেকে হাওয়া পোশান। বেশ কিছু পরে অন্য লোক জন এসে দিলীপ-দা তুলে হাসপাতালে পাঠায় – ঠিক সময় তুললে হয়ত বাঁ-পাটা বেঁচে যে পুরোপুরি।

    সুবানের দাদা পোশানের টাইম পাশ ছিল জেলেদের সুজিত জ্যেঠুর হরিনাম দলে খঞ্জনী বাজানো। ওই একটাই ছিল নিমোতে হরিনামের দল – সেই দলের খোলবাদক ছিল রাস্তাপারের বাউরিদের নারান। সুজিত জ্যেঠু মারা গেলে নারান সেই দলের ভার নিজে হাতে তুলে নেয় এবং হারমোনিয়ামে সিফট করে যায়। কিন্তু পোশানের আর পদোন্নতি হয় না – সে পরে থাকে খঞ্জনীতেই। সেই হতাশাতেই কিনা জানি না – পোশান ঠিক করল বিয়ে করবে। তখনো বিয়ে করার মেয়ে পাওয়া যেত গ্রামের দিকে – কিভাবে যে সমন্ধ করে ঘটকের সাহায্য ছাড়াই পোশানের বিয়ে হয়ে গেল। আর একটা ফেবারিট টাইম পাশ ছিল পোশানের – তা হল গ্রামের রক্ষকালী পুজোয় চাঁদার পরিমাণ নিয়ে ঝগড়া করা। তার ফেবারিট প্রশ্ন ছিল, মোড়লদের শৈলেনের প্রচুর জমি থেকেও চাঁদা এই হলে, পোশানের চাঁদা ওত হবে কেন? কোশ্চেন জানা ছিল বলে উত্তরও প্রস্তুত ছিল – প্রতি বছর সেই একই প্রশ্ন এবং তার উত্তরও এক। কামারদের বেচা-দাই বেশীর ভাগ সময় পোশানকে সেই উত্তর দিত – এবং সেই উত্তর দেবার ফাঁকেই ঝগড়া। তবে সবটাই ফ্রেন্ডলি।

    পোশানের বিয়ে হয়ে গেলে সুবানের প্রধান দুই অসুবিধা দাঁড়ালো – নিজেকে একা অন্য ঘরে সিফট করে যেত হল আর পোশান নিয়ে নিল দুধেলা গরুগুলো কারণ তার নাকি বিয়ের পর বেশী দুধের দরকার! খুড়ো ঝগড়া পারে না – তাই খুড়োর ভাগে রইল এক রোগা গাই এবং তার বাছুর। খুড়ো একটু বেলা বাড়লে সেই গরু-বাছুর মাঠে চড়াতে গিয়ে যেত – একটা গোঁজে বেঁধে খানিক পরে ছিপ নিয়ে পুঁটি মাছ ধরতে বসত আমাদের ডোবাতে। সেই পুঁটি মাছ ধরে বাড়ি গিয়ে বাটি ভাজা করে ভাত খাওয়া। বেশী গাঁজা খেয়ে পুষ্টি না পেলে যা হয় – খুড়োর শরীর ভেঙে গেল – এমত অবস্থায় সেই বার গিয়ে দেখা হয়েছিল।

    আজকাল খুড়ো অনেক সোবার হয়ে গ্যাছে – বলল গাঁজা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে এবং কামারদের লক্ষ্মী-আমিনের কাছে নাকি অ্যাসিট্যান্ট হিসাবে ঢুকেছে। ভেবেছিলাম সেই কাজ টিকবে না – কিন্তু আমাকে অবাক করে খুড়ো লেগে রইল লক্ষ্মীর সাথে – ফিতে ধরতে লেগে রইল আমিনের কাজে।

    লক্ষ্মী আমিনের আগে আমাদের গ্রামে আমিন বলতে ওই একজনাই ছিল – আমাদের বাড়ির পাশের বিশ্বেস-দের দিলীপ-দা। তবে আমিনের গল্প খুবই ইন্টারেষ্টিং – পরের বার হবেক্ষণ।





  • | 162.158.158.146 | ১৮ মার্চ ২০২০ ২১:০৫730122
  • আহা এই শেষ ছপিটা দেখলে গোমুত্র-পার্টিরা তোমায় চ্যাঙদোলা করে তুলে নিয়ে যাবে হে সুকি।
  • সুকি | 172.68.167.15 | ১৮ মার্চ ২০২০ ২২:৩৯730124
  • দমু-দি,
    ভয় দেখিও না প্লীজ :)

    নিমোতে আমাদের ঝগড়া-ঝাঁটি, মান-অভিমান, রাগা-রাগি সব হয় - কিন্তু ধর্ম ভিত্তিক মারামারি কোনদিন এখনো কিছু হয় নি। আশা রাখি এটা আমরা বজায় রাখতে পারব
  • b | 162.158.158.138 | ১৮ মার্চ ২০২০ ২৩:৪৩730125
  • তবে শেষ তিনটি ছবির প্রেক্ষিত দিলে ভালো হত।
  • একলহমা | 108.162.238.118 | ১৯ মার্চ ২০২০ ০০:৩২730127
  • নিয়মিত এবং বারে বারে পড়ে যাই, বলা হয় না। আজ মুগ্ধতা জানিয়ে রাখি‌।
  • সে | 162.158.150.29 | ১৯ মার্চ ২০২০ ০৩:২০730159
  • মিস করে যাচ্ছিলাম আট্টু হলে।
    আরো হোক।
  • debu | 172.69.35.18 | ১৯ মার্চ ২০২০ ১০:২৬730162
  • নিমো র ওপর পথের পাঁচালি লিখে ফেলো
  • সুকি | 172.68.167.45 | ১৯ মার্চ ২০২০ ১৮:৪৫730166
  • বি, একলহমা, সে-দি, দেবু - সকলকে ধন্যবাদ।

    ছবির পরিচিতি কোথায় গেল! একদম শেষের ছবি খুড়োর গোয়াল বাড়ি এবং বাছুরের। প্রবল ঘুঁটে দেওয়া হয়েছে মাটির দেওয়ালে।

    তার উপরের ছবিটি আমাদের ডোবার - যেখানে এককালে খুড়ো মাছ ধরত। তবে সেই ডোবা এখন কচুরী পানা এবং বড়-পানায় ভরে গেছে - জল দেখা যায় না। ল্যাঠা এবং কই মাছ ছাড়া সেখানে কিছু থাকার সম্ভবনা নেই।

    আর তার উপরের ছবিটা সেই ডোবার-ই অন্য পাড়ের।
  • সুকি | 172.68.167.15 | ১৯ মার্চ ২০২০ ১৯:৩০730167
  • ম্যাজিক রিয়ালিজম ও নিমো
    -------------------------------------

    সেদিন মনে হচ্ছে এক ভ্রাতৃপ্রতিম স্নেহাস্পদ আমাকে বার খাওয়ালো – বলল যে আমার নিমো সংক্রান্ত লেখা গুলোয় নাকি যাদু-বাস্তবতার ছোঁয়া আছে! এবং আরো বলল আমার সম্মান নাকি পেন্ডিং আছে - পেয়ে যাব কোন একদিন। কে দেবে যে জানে!

    তবে বার খেতে কে না ভালোবাসে! এই টানাটানির সময়ে যদি কেউ হালকা বার খাওয়ায়, সে জিনিস খেতেই বা অসুবিধা কি! আমি তো আর কারো ক্ষতি করছি না! এই ভেবে নিজেকে প্রবোধ দিয়ে বার-টা খেয়েই নিলাম লাজুক মুখে।

    সে না হয় খেলাম, কিন্তু খাবার পর বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম – খেলামটা আসলে কি বস্তু? যাদু-বাস্তবতা কি জিনিস, সে কি খায় নাকি গায়ে মাখে? পড়াশুনা করা শুরু করলাম জোর কদমে –তবে আমার পড়াশোনা বলতে যা বোঝায়, গুগুলে সার্চ দিলাম জাদু বাস্তবতা টাইপ করে জোরকদমে। আমাকে অবাক করে অসংখ্য হিট চলে এল – শালা আমি ভাবতে বসলাম, যাদু-বাস্তবতা বাংলায় এতো খুঁটে গেড়ে বসেছে, আর আমি টেরই পেলাম না! নিজেকে ধিক্কার দিলাম, নিজের বহুবছরের প্রবাসী জীবনকে ধিক্কার দিলাম। প্রথম লিঙ্কটায় ক্লিক করেই আমার যা বোঝার বুঝে গেলাম এই যাদুবাস্তবতা সম্পর্কে। ম্যাক্সিকান সাহিত্য সমালোচক লুই লীল বলেছেন, ‘আপনি যদি ব্যাখ্যা করতে পারেন এটি কি, তাহলে তা জাদুবাস্তবতাই নয়”।

    আমি ভাবলাম এই জিনিস! এ যাকে বলে কলাবিভাগের ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’! আরো কয়েক লাইন পড়লাম, দেখলাম লেখক লিখছেন, বাংলায় মঙ্গলকাব্যে নাকি এই যাদু-বাস্তবতার ছোঁয়া আছে। এবার যেটুকু ধোঁয়া ছিল, তা সব ক্লীয়ার হয়ে গেল। আর পড়ার প্রয়োজন অনুভব করলাম না, বুঝে গেলাম এর পর আস্তে আস্তে হোমিওপ্যাথি এবং কার্ল মার্কস ঢুুকবে।

    তো এই ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে ভাবে দেখলে গেলে নিমো পুরোই যাদুবাস্তবতায় ভর্তি – প্রায় অনেক কিছুই ব্যখ্যা করা যায় না স্বাভাবিক বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করে। না হলে আপনি কি ভাবে ব্যখ্যা করবেন পাল পাড়ার কার্ত্তিক পালের প্রবল পরাক্রান্ত সি পি এমের সময়ে ততোধিক পরাক্রমী নেতা কলঘরের তরুণের বীচি টিপে ধরার ঘটনাকে?

    তরুণের বীচির উপর এই যাদুবাস্তব হামলা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন বা টের্গার্টের উপর হামলা এই সবের মতই যুগান্তকারী ছিল, অন্তত নিমোর সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবনের ক্ষেত্রে। ।আমরা যে সময়ে কৈশোর যাপন করছিলাম তখন কাস্তে-হাতুরি-তারা চিহ্নের উপর সন্ধিগ্ধতা প্রকাশের কোন কারণই আসে নি। তেল দেওয়া ধান ঝাড়া মেশিনের মত লাল দূর্গ বর্ধমান জেলা ও তদোপরি গাঢ়তর লাল মেমারী এলাকা সরগর করে চলছিল। মেমারী স্কুলের শিক্ষক সমিতি লাল – নিমো গ্রামের পঞ্চায়েত লাল, মেমারী পৌরসভাও লাল – দোলের সময়ের থেকেও আমাদের দোকানে লাল আবীর বেশী বিক্রি হত ভোট জাতীয় মহোৎসবগুলির সময়।

    সেই লাল রঙের অপার মহিমায় আমার মননে হঠাৎ চিরফাট ধরল এক সকালে। সেই – যে সকালে কলঘরের তরুণের বীচি টিপে ধরল পালেদের কার্ত্তিক। এই সেই ঝটকাই – সকাল বেলা দোতলার ঘরে পড়াশোনা করছি এমন সময় পাড়ার উত্তর-পূর্ব কোণে বিশাল গোলযোগের শব্দ এল। এমন নয় যে সকাল বেলা আমাদের ওখানে গোলযোগ হত না – বরঙ উলটো – সকালের কাঁচা রোদে ও বিকেলের কনে দেখা আলো কলহের জন্য প্রকৃষ্ট ছিল। যারা ঝগড়া করছে তাদের জন্য তো বটেই, যারা দর্শক তাদের জন্যও। যাই হোক উল্লেখিত ঝগড়াটি কান টেনে নিয়েছিল কারণ মিলিত চিৎকারের মধ্যেও একটি হাই-পিচ্‌ টোন অচেনা। শব্দের উৎস সন্ধানে গিয়ে দেখা গেল তরুণ হাউমাউ করে চিৎকার করছে। আরো কাছে গিয়ে ডিটেলেস্‌-এ প্রত্যক্ষ হল লিটারেলি তরুন কাটা পাঁঠার মত ছট-ফট করছে – কারণ কার্ত্তিক পাল লুঙ্গির ভিতর হাত ঢুকিয়ে তরুণের বীচিদুটিকে সজোরে চেপে ধরেছে এবং উপর্যপুরি নিষ্পেশন করছে।

    এই দৃশ্যের তাৎপর্য বুঝতে হলে তরুণের ব্যাকগ্রাউণ্ড সমন্ধে সম্যক ধারণা থেকে দরকার। তরুণ আমাদের এলাকার প্রবল প্রতাপান্বিত সি পি এম নেতাদের মধ্যে একজন – অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ছিল হাত বাঁকা মহানন্দ, তাতারপুরের গোপালমাষ্টার, রসুলপুরের বাবুল স্যার, বাউরি পাড়ার বসু ও বাগদিদের ভোমলা। এখানে ভোমলাকে বাগদি বলা কোন অসম্মানের অভিপ্রায়ে নয় – আমাদের গ্রামে বেশ কিছু সংখ্যক ভোমলা থাকায় এই রূপ আইডেন্টিফিকেশনের সাহায্য নিতে হচ্ছিল। অন্যান্য ভোমলারা ছিল – সার ভোমলা, কোচো-র ভাই ভোমলা ইত্যাদি।

    সেই সময় নিমো ১ নং গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ছিল তরুণ। ওদের বাড়িটিকে কলঘর কেন বলা হত তার সঠিক ব্যখ্যা আমি পাই নি – তবে প্রচলিত তত্ত্ব ছিল যে তরুণদের বাবা পঞ্চায়েতের পিওন জাতীয় কাজগুলি করত। কাউকে ডেকে পাঠানোর দরকার হলে তাকে ‘কল’ পাঠানো হত। সেই ‘কল’ দেবার কাজ থেকেই কলঘর। তরুণরা তিন ভাই তিনটি পৃথক পার্টি করত – তরুণ সিপিএম, সমীর কংগ্রেস ও ছোট ভাই ফরোয়ার্ড ব্লক। অর্থাৎ সব পার্টি থেকেই ছাঁকা অ্যাডভান্টাজগুলি কলঘর ভোগ করত।

    সেই তরুণের বীচিতে হাত দেবার সাহস মনে হয় কেবলমাত্র কার্তিক পালেরই ছিল। তিন মেয়ে ছাড়া কার্ত্তিক পাল প্রকৃত অর্থেই সর্বহারা ছিল আর তার প্রধান টাইম পাস নিজের বউয়ের সাথে ঝগড়া। সেই ঝগড়া কোন সফিস্টিকেটেড বাদানুবাদ নয় – নতুন করে ডিকেশনারী লিখতে পারার মত স্টক শব্দ ব্যবহৃত হত সেই পর্যায়ে। অগুনতি বার সেই ঝগড়ার মিমাংসা করার চেষ্টা হয়েছে পঞ্চায়েত ডেকে যার মধ্যমনি থাকত তরুণ। তরুণ সাধারণত পাজামা বা প্যান্ট পড়েই বিচার সভায় আসত শিবতলায়।

    সেই দিন সকালে কার্তিকদের ঝগড়াটা একটু ভায়োলেন্ট হয়ে যাবার জন্য তরুণের জরুরী ডাক পরে। ঘুম থেকে সবে ওঠা তরুণ লুঙ্গি পাল্টাবার সময় না পেয়ে ঝগড়াস্থলে হাজির হয়। কিঞ্চিত বার্তালাপের পর ফেড আপ হয়ে কার্ত্তিক তরুণের বীচি টিপে ধরে। তার আগে পর্যন্ত আমাদের কাছে তরুণ ছিল সিম্বল – লাল পার্টির, ক্ষমতার, ছোঁয়ার বাইরে থাকা আজ্ঞাকারী কর্তার। এর বিরুদ্ধে যে কথা বলা যায় এটা অকল্পনীয় ছিল।

    এই ভাবেই তরুণের বীচি টিপে ধরার যাদুবাস্তব ঘটনা আমাদের বদ্ধ ধারণা ভেঙে বেরিয়ে নতুন কিছু পাবার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তবে তার পরেও আরও প্রায় দেড় দশক লেগে গিয়েছিল প্রকৃত পরিবর্তন দেখতে। সে এক অন্য যাদুবাস্তব গল্প – যে গল্পে প্যাঙলা বাবুল রিভালবার নিয়ে দুর্গাপুরে ভোট করাতে যাচ্ছে, রিসেন্ট বুকিং পেয়ে। বা কামার পাড়ার জামাই গভীর রাতে রথে চড়ছে। অন্য কোন সময়।
  • যাদুবাস্তব | 172.69.68.176 | ১৯ মার্চ ২০২০ ২১:২৮730168
  • এটা বোধয় পরাবাস্তব হয়ে গ্যাছে
  • সুকি | 172.68.167.87 | ২০ মার্চ ২০২০ ১৯:৫৫730172
  • সাত-দেউল
    ---------------------

    হাওড়া থেকে বর্ধমান যাবার মেন লাইন লোকাল ধরবেন, ঘন্টা দুয়েক পরে পৌঁছে যাবেন নিমো। মেমারীর পরের স্টেশন, টুক করে নেমে পড়ুন নিমোতে। হাওড়া থেকে গেলে নিমো স্টেশনে নেমে পিছনের দিকে হাঁটা দিন, আর বর্ধমানের দিকে থেকে গেলে সামনের দিকে। খানিকটা এগিয়ে টিকিট ঘর, দেখবেন সেজ জ্যাঠা নয়ত গোপাল-দা দাঁড়িয়ে আছে। সোজা গিয়ে বলবেন সুকান্ত পাঠালো, সাত-দেউল যাব একটা টোটো বা অন্য কিছু ব্যবস্থা করে দিতে।

    রওনা দেবার আগে চা তেষ্টা পেয়ে গেলে দিলীপের বউয়ের দোকানে এককাপ চা খেয়ে নিতে পারেন আর সিগারেট খেতে হলে হাবার দোকানে, হাবা না থাকলেও লাল-পরী থাকার সম্ভাবনা খুবই এবং আপনি সিগারেট পেয়ে যাবেন।

    চা সিগারেট খেয়ে ৫০ মিটার মত গেলেই ভ্যান বা টোটোর লাইন। সকালের দিকে গেলে সেই লাইনের পাশে পুকুরের পাড়ে আম গাছের তলায় তারক তার ভ্যান নিয়ে ঘুঘনি বিক্রী করছে। শুধু ঘুঘনী, বা মুড়ি ঘুঘনি বা রুটি ঘুঘনি খেয়ে নিতে পারেন। তারকের বউ ঘুঘনীটা ভালোই বানায় – তারকের কাছেও আমার নাম করলে ডিসকাউন্ট চাইকি ফ্রী-তেও পেয়ে যেতে পারেন ঘুঘনী।

    এবার আপনি ভ্যান বা টোটোয় চেয়ে বসে চলে যান সাত-দেউল, নিমো থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে, তবে রাস্তা এখন ভালো, তাই প্রবলেম হবে না কিছুই। এই সাত দেউলের ব্যাপারটা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। সেদিন মানস-দার একটা পোষ্টে দেখলাম সাত দেউলের উল্লেখ রয়েছে। তার পর গুগুল করে দেখলাম সেটা নাকি আজকাল টুরিষ্ট স্পট হয়ে গ্যাছে – লোকে ভালোই রেটিং দিচ্ছে, আপনিও গুগুল সার্চ করে দেখতে পারেন।

    নিমো থেকে বেরিয়ে কোলেপাড়ার কোন ঘেঁষে কার্তিকের বন্ধ হয়ে যাওয়া মুড়ি কারখানার পাশ দিয়ে, অরবিন্দ মাষ্টারের ছেলে তরুণের স্টেশনারী দোকানের পাশ দিয়ে আপনি ঢুকে পড়বেন মহেশডাঙ্গা-ক্যাম্পে। ক্যাম্পের বাজার জমজমাট – দেখে রাখুন, ফেরার সময় টাটকা সব্জী, মাছ, ডিম কিনে নিতে পারেন সাথে। বিকেলের দিকে গেলে আপনি পাবেন খোলা ‘ছেঁড়া পরোটার’ দোকান। সে জিনিস না খেয়ে ক্যাম্পের ভিতর দিয়ে যাওয়াই পাপ। দেশী ডিম সিদ্ধও খেয়ে নিতে পারেন চাইলে পরোটার সাথে। এবার আর একটু এগিয়ে গেলেই আপনি পৌঁছে যাবেন সাত-দেউল।





    তাহলে এবার জানাতে হয় সাত-দেউল কি জিনিস। একটু দেখে নেওয়া যাক (নীচের অংশটা গুগুল করে পাওয়া) -

    পুরাতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা যায় প্রাচীন কালে জৈনধর্ম ছিল বঙ্গ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ধর্মবিশ্বাস। পালযুগের আগে একদা পুরুলিয়া-বাঁকুড়া-বর্ধমান এলাকায় জৈনধর্মের প্রভাব ছিল অপরিসীম। বাংলার আনাচে-কানাচে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অসংখ্য জৈন মন্দির। এই মন্দিরগুলি দেউল নামে প্রসিদ্ধ। দেউল শব্দের অর্থ দেবালয় । কালের প্রকোপে এই দেউল গুলির অধিকাংশই আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত। বর্ধমান জেলাতেও কিছু দেউল এখনো মাথা তুলে অতীতের স্মৃতিচারণ করছে। যদিও তাদের গায়ে আজ বার্ধক্যের ছাপ আর শরীর জুড়ে অবহেলার ক্ষত ।

    এমনই একটি দেউল হচ্ছে গিয়ে এই সাত-দেউল। এখানে একসময় ছিল সাত সাতটি দেউল, যার মধ্যে ছয়টি নিষ্ঠুর কালের করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে । এখন মাত্র একটি কোনোক্রমে অতীতের উৎকৃষ্ট সভ্যতার শেষ নিদর্শন রূপে টিকে আছে ।

    নীহাররঞ্জন রায়ের ‛বাঙ্গালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে এই গ্রাম ‘সাত দেউলিয়া আঝাপুর’ নামে উল্লেখিত। এই অঞ্চলেই রয়েছে রেখা দেউলের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন। প্রায় হাজার বছরেরও পুরনো এই ‘সাত দেউল’ নামক জৈন মন্দির । কথিত আছে পালযুগের রাজা শালিবাহন এই দেউল নির্মাণ করেছিলেন । উড়িষ্যার রেখা দেউল স্থাপত্য শৈলীতে ইঁট দ্বারা নির্মিত এই সাত দেউল প্রাচীন বাংলার জৈন কৃষ্টির এক অমূল্য সাক্ষ্য । মন্দিরটির ভিত পঞ্চরত্ন আলেখ্যে তৈরি। এর বিশেষত্ব হচ্ছে চতুর্দিকে বিশাল বাঁকানো সুউচ্চ টাওয়ার ও প্রবেশদ্বারে রয়েছে ধনুকাকৃতি গেট। প্রবেশদ্বারের ওপরে, বাইরের দেওয়ালে রয়েছে সুন্দর কারুকার্যখচিত চৈত্য-জানালা। মন্দিরের গঠন শৈলী থেকে নির্মানের সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দী বলে মনে করা হয়। দেউলের ভিতরে কোনো বিগ্রহ বা মূর্তি নেই।

    বাংলার সবথেকে প্রাচীন মন্দিরগুলোর মধ্যে দেউল অন্যতম। খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যবর্তী কোনও এক সময়ে দেউল শিল্পরীতির বিকাশ ঘটে। এরপর মুসলিম শাসনের পর অন্ত-মধ্য যুগে বাংলায় দেউল শিল্পে এক নবজাগরণ আসে। খ্রিস্টীয় ১৬শ-১৯শ শতাব্দী পর্যন্ত এই শৈলীর মন্দিরগুলি নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে এই মন্দিরটির দেখভাল করে ভারতের পুরাতত্ব সর্বেক্ষণ ( Archaeological Survey of India ) ।







    আমরা মাঝে মাঝে যেতাম সেদিকে – ওর পাশের গ্রাম ছিল বয়ড়া, যেখানে চাঁদুর মামার বাড়ি। আর তখন চাঁদুর মামার ছেলে সাহিদুল নিমোতে থেকেই পড়াশুনা করত। সাহিদুলের মা-কাকিমা, মানে চাঁদুর মামিমারা ভালো বিরিয়ানি বানাতো। সেই বিরিয়ানির লোভে যাওয়া হত বিকেলের দিকে।



    বিকেলে সাত-দেউলে খানিক ক্ষণ বসে আর কিলোমিটার চারেক সাইকেল নিয়ে গেলেই পৌঁছে যাওয়া যেত চাঁচাই এবং পাল্লা-ক্যাম্পের দামোদরের ধারে। শীতকালে দামোদরে জল থাকত না – নদীর বুকে হেঁটে বেড়াতে বেড়াতে সূর্যাস্ত দেখা বড়ই মনোরম। চাঁচাই বাজারে ভালো চপ এবং লম্বা লম্বা বেগুনীর প্রলোভন কম না। সময় থাকলে মেনটেন না করা পাল্লারোডের ডাক বাংলোর দিকে ঘুরে আসতে পারেন। এই বাংলো কেন্দ্রীক পাল্লা রোড এককালে বিখ্যাত করে দিয়েছিল বাংলা সিনেমা। তাপস – শতাব্দী হাত ধরা ধরি করে সেই বাংলোর বাগানের ডালিয়া আর গাঁদা ফুলের চারিধারে ঘুরে অনেক অনেক গান চিত্রায়িত করেছিল।

    তবে আজকাল জল কমে গেলেই দামোদরে অবৈধ বালি তোলা এত বেড়ে গ্যাছে যে কি বলব! বালি মাফিয়াতে ভরপুর চারিদিক। তবে সে সব নিয়ে আপনার মাথা ঘামাবার দরকার নেই। সন্ধ্যে হয়ে গেলে ফিরে আসুন নিমোর দিকে বা কর্ড লাইনে পাল্লা রোড স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে কলকাতা। কলকাতায় রাত নাবার আগেই বাড়ি ফিরে যাবেন আপনি! খুব একটা খারাপ হবে না একটা ডে-ট্যুর।







  • সুকি | 172.68.167.45 | ২৩ মার্চ ২০২০ ১৭:২৬730228
  • এমন নয় যে করোনা নিয়ে আমি চিন্তিত নই বা বাড়িতে বসে যজ্ঞ করেই ধরে নিয়েছি সব করোনা পালিয়ে গেছে। বা আমি বারান্দায় বসে বেহালা বাজাচ্ছি। কিন্তু করোনা নিয়ে এত লেখা লিখি হচ্ছে যে আমার আর আলাদা করে কিছু বলার নেই। তাই নিমোর গল্পই দিই -

    -------------------------
    সিঙ্গেল মল্ট
    -------------------------

    “দূর বাঁড়া সুকান, কি বালের বিলেতী মাল খাওয়ালি যে পরের দিন সকালে মাথা ধরা-টরা কিছুই বোঝা গেল না!”

    এমনি ফীডব্যাক পেলাম আমি প্রথমবার নিমোর ছেলেদের গ্লেনমোরাঞ্জী সিঙ্গেল মল্ট খাইয়ে। তখন ইংল্যান্ডে পড়াশুনা করছি, স্কটল্যান্ডে অনেক ডিষ্টিলারীতে ঘুরছি হুইস্কির নেশায়। বিখ্যাত সিঙ্গেল মল্ট বন্ধুদের খাওয়াবো বলে স্টুডেন্ট হয়েও বেশ দাম দিয়েই একটু পুরানো সিঙ্গেল মল্ট কিনে এনেছিলাম। তখন কি আর জানতাম যে খুব ভালো হুইস্কি খেয়ে এই পাবলিক-দের মাতাল করা বা মাথা ধরানো কিছুই যাবে না!

    তাই পরের বার কিনে নিয়ে এলাম ডিউটি ফ্রী থেকে সব থেকে কমদামী হুইস্কি - ব্লেন্ডেড ফেমাস গ্রাউস কি? ঠিক মনে পড়ছে না। সেই মাল বেশী খেলে মাথা ধরা গ্যারেন্টিড। দু-বোতল নিয়ে এসেছিলাম, একবোতল নিমোতে শেষ করে পাবলিকের বেজায় আনন্দ – পরের দিন সকালে মাথা নাকি গব-গব করছে। কনগ্রাচ্যুলেট করে গেল আমাকে, “হ্যাঁ, মাল খাওয়ালি বটে সুকান”।

    অন্য বোতলটা নিয়ে দীঘায় যাওয়া হল – সমুদ্রের হাওয়ায় নেশা নাকি আরো বেশী করে চেগে উঠেছিল। ঠিক সময়ে গিয়ে না পৌঁছতে পারলে সৈকতের জিন্দা কবর হয়ে যেত। চাঁদু খুব যত্ন করে ওকে প্রায় চাপা দিয়ে এনেছিল – আজ কম্পিউটার খুলে সেই ছবি দেখে আবার পুরানো কথা মনে পড়ে গেল।





    সারাংশ এটাই, হাওড়া-বর্ধমান মেন লাইনে ব্যান্ডেল পেরোলে মনে হয় সিঙ্গেল মল্ট কাজ করে না।
  • সে | 162.158.150.131 | ২৩ মার্চ ২০২০ ২১:৫৪730235
  • চরম সব লেখা।
  • সুকি | 172.68.167.15 | ২৫ মার্চ ২০২০ ১২:৫৫730278
  • বছর শেষের সন্ধ্যে
    ------------------------

    গতবছরের ৩১শে ডিসেম্বর সকালের দিকে নিমো গিয়েছিলাম সন্ধ্যেটা কাটিয়ে আসব বলে। তবে শেষ মিনিটের সিদ্ধান্ত ছিল বলে সন্ধ্যেবেলা আর নিমোতে পিকনিকের ব্যবস্থা করা গেল না। তপন পুলিশে চাকরি করতে চলে যাওয়া পর্যন্ত এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ঝটিকা সিদ্ধান্তে জিনিসত্র অ্যারেঞ্জ করার মত ক্যালিবার এবং উৎসাহ তপন ছাড়া খুব বেশী কারো মধ্যে ছিল না – বাকিরাও পারত, তবে ধীরে সুস্থে – বিড়ি খেয়ে, ক্যারাম খেলা শেষ করে বাড়িতে গিয়ে মায়ের এগিয়ে দেওয়া মুড়ির থালা খতম করে ইত্যাদি ইত্যাদি।

    তাহলে কি কিছুই হবে না! কেবল গুলতানি করেই কাটবে অন্যান্য বাকি দিন গুলোর মত? এদিকে প্রচুর ঠান্ডাও নেমে এসেছে গ্রাম জুড়ে – সন্ধ্যের পর গ্রামের কাউকেই বাইরে দেখা যাচ্ছে না। কেউ কেউ বলল পেচ্ছাপ করতে গেলে প্রথমে বীচি গরম করে নিতে হচ্ছে খানিক ঘষে, তারপর নাকি বেরুচ্ছে! হোঁদল তো শুনলাম দিন পাঁচেক আগে থেকেই বিকেল পাঁচটার পর বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছে ঠান্ডার জন্য। ইদানিং বিয়ে হয়েছে তার – আগে এমন ঠান্ডায় তাও মালটা স্পেশাল রিকোয়েষ্টে বাইরে বেরুতো। কিন্তু এখন নিমোর পাবলিক জানালো যে বিয়ে হওয়া ইস্তক এমন ঠান্ডায় হোঁদলের বাইরে বেরুবার প্রশ্নই নেই – লেপের মজা নিচ্ছে পুরোপুরি, নতুন করিয়েছে তুলো ধুনে কদিন আগে শিবতলায়।

    এমতঅবস্থায় ঠিক হল তাহলে বর্ধমানে গিয়ে রাতের বেলা খেয়ে আসা যাক – পথে শক্তিগড়ে দাঁড়িয়ে ল্যাংচা খেয়ে নেওয়া যাবে। শিল্পপতি রাজু সহ অনেকেই বলল যদিও যে ওই ল্যাংচা খাওয়া পাপ – “খেয়ো না সুকান দা, ওই ল্যাংচা ভেজে মাচায় তোলা থাকে, শুধু রসে ডুবিয়ে কলকাতার পাবলিককে চদু বানায়, তোমাকে হরি ঘোষের ভালো ল্যাংচা খাওয়াবো পরে”।

    তো ঠিক হল রাজুর আর বনির গাড়িতে করে যাওয়া হবে – জনা দশেক জুটল হাতের কাছে। রাজুর নিজেই ড্রাইভ করল আর বনির গাড়ি চালালো রাজুর ভাই বুলবুল। বুলবুল আবার হেবী গাড়ি চালায় – বিদেশে জন্মে ঠিক মত ট্রেনিং পেলে লুইস হ্যামিলটনকে টেক্কা দিতে পারত বলেই আমার বিশ্বাস। তবে কিনা কালাম-কাকার ডায়লগ, “হ্যাঁরে, তুই অ্যাক্সিডেন্ট করলে তোর বডির পিস-গুলো তো ঝুড়ি করে কুড়োতে হবে” – যা কিনা অরিজিন্যালি নিক্ষিপ্ত হয়েছিল মোটা শৈলেনের সমন্ধি বাবুর উদ্দেশ্যে, তা বুলবুলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বুলবুল সেই বহুকাল আগে, যখন সে নিজে প্রবল মাইনর ছিল, তখন কেজার মাঠে অমৃতা-কে ড্রাইভিং প্র্যাক্টিস করাতো।

    সেই বুলবুল এখন বড় হয়ে গ্যাছে, মনে হচ্ছে বুলবুলের বিয়ে লাগলো বলে। এই তো সেদিন বামুনদের লাল্টুর সাথে দেখা - বলল বুলবুলের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত আছি। ব্যস্ততা কিসের জানতে চাইল বলল,

    "সুকান-দা, আমি গেছি মাঝখান থেকে ফেঁসে। ছেলে এদিকে বন্ধু - আর ওদিকে যে মেয়ের সাথে সমন্ধ হচ্ছে তাদের বাড়ি আমার শ্বশুর বাড়ির ওদিকে। কিভাবে ফোন নাম্বার পেয়েছে - সেদিন ফোন করেছিল ছেলের চাকরি, স্বভাব চরিত্র কেমন জানার জন্য।

    আমি বললাম, "কি বললি তুই মেয়ে পক্ষ-কে"?

    - "বলে দিলাম ছেলের চাকরি রাষ্ট্রপতির মতন"

    আমি কনফিউজড, বুলবুলের চাকুরীতে আবার রাষ্ট্রপতির সাথে কিসের মিলে!

    - লাল্টু, চাকরি রাষ্ট্রপতির মতন মানেটা কি?

    - মানে আবার কি! এর মানে 'মাইনে আছে খরচা নেই!' দাদার কারখানায় ম্যানেজারী করে মাইনে পায়। আর বাপ মানে ন্যাড়া-কাকার হোটেলে খায়! খরচাটা কিসের?

    আমরা সব গাড়ি নিয়ে এগুলাম – রাজুর গাড়িতে যখন আমরা নিমো-রেল গেট পেরুচ্ছি, তখন বনিরা গাড়িতে বাড়ি ফিরছে কয়লার আড়ত থেকে, বাড়ি গিয়ে ফ্রেস হয়ে আসবে! আমি বললাম দেরী হয়ে যাবে তো রে! উত্তর এল, চিন্তা করো না – তোমাদের গাড়ি তো চালাচ্ছে রাজু, তা তোমরা শক্তিগড় পৌঁছবার আগেই বুলবুল পৌঁছে যাবে আমাদের গাড়ি নিয়ে!

    আর হলোও তাই! রাজু সেফ ড্রাইভার – শক্তিগড়ে প্রায় একসাথেই পৌঁছলাম। শিল্পপতি রাজু মাঝে মাঝেই লঙ ড্রাইভে যায় ব্যবসার কাজে – বিহার, ধানবাদ, গিরিডি, দেওঘর ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সব লং ড্রাইভে রাজুর গাড়ি চালায় আমাদের গ্রামেরই বিখ্যাত ড্রাইভার টিয়া, যার ভালো নাম মুকুল। মুকুল-দা গাড়ি খুব সুন্দর চালায়, কিন্তু রাতের বেলা দেখতে পায় না ঠিক ঠাক – রাজুর ভাষায় রাতকানা। কদিন আগেই রাজু টিয়াকে নিয়ে দেওঘর থেকে সারারাত ড্রাইভ করে ফিরেছে। জিঞ্জেস করলাম, কেমন চালালো-রে মুকুলদা? উত্তর এল, “চালালো আর কোথায়, কেবল আমার পাশে বসে ঢুলতে থাকলো!” জিঞ্জেস করলাম, নিজেই যদি চালাবি তাহলে মুকুল-দাকে নিয়ে যাস কেন? বলল, “এতো রাস্তা একা একা কথা না বলে থাকা খুব চাপের সুকান-দা। তাই টিয়া থাকলে গল্প গুজব করে রাস্তা কেটে যায়”।

    এদিকে আগে ওদের উপরোধ অগ্রাহ্য করে যখন শক্তিগড়ের ল্যাংচা খাবোই বললাম, তখন রাজু সেখানে গাড়ি থামিয়ে বলল, “তাহলে চলো, কোলেপাড়ার তরুণের ভাই ল্যাংচার দোকান করেছে, ওর কাছে গিয়ে খাওয়া যাক”। তরুণের ভাইয়ের দোকানটা কলকাতা থেকে বর্ধমানের দিকে যেতে হলে ওই ল্যাংচা হাবের একদম শেষে, পেট্রোল পাম্পের ঠিক সামনে। আমরা রাস্তা পেরিয়ে ওদিকে গেলাম – এতজন লোক দেখে সেই যারা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে খদ্দের ডাকে তারা উত্তেজিত হয়ে গেল। আসুন আসুন হাবিজাবিতে কাঠমিস্ত্রী রবি গেল রেগে – একজনকে দিল দাবকানি, “ধুর বাঁড়া চুপ কর না – ওই তো তরুণের ভাইয়ের দোকানে যাচ্ছি আমরা”। সরে গেল জনতা।

    তরুণের ভাইয়ের সাথে অনেক দিন দেখা নেই – ভেবেই ছিলাম যে চিনতে পারবে না। কিন্তু দেখলাম চিনতে পারল – বসতে টসতে বলে কি খাব জিজ্ঞেস করল। তার কর্মচারী সামনের ডেকচি থেকে ল্যাংচা তুলে সার্ভ করতে গেলে তরুণের ভাই তাকে বারণ করে পাঠালো নীচের কারখানায়। আমাদের বলল, “একটু বস – গরম বানিয়ে দিচ্ছি”। বলতে নেই সেই ক্ষিরের ল্যাংচা মোটামুটি ভালোই করেছিল আর কি। জিজ্ঞেস করলাম তোর কাছ থেকে কি মিষ্টি নিয়ে যাব বল। তরুণের ভাই বলল – “সুকানদা তুমি মাখা নিয়ে যাও, ভালো বানিয়েছি আমরা”। বেশী না , মাত্র এককিলো কিনলাম – কিন্তু খেতে এতো ভালো ছিল যে, মনে হচ্ছিল আরো বেশী কিনলে হত। আপনারাও মাখা সন্দেশ জাতীয় জিনিস পছন্দ করলে তরুণের ভাইয়ের দোকান ট্রাই করতে পারেন শক্তিগড়ে। ওরা নিজেরা গোয়ালা – দুধটা ভালো বোঝে – তাই সন্দেশটাও খুব ভালো বানিয়েছিল।

    ল্যাংচা খাওয়া শেষ করে এবার রওয়ানা দেওয়া গেল বর্ধমানের উদ্দেশ্যে – ‘ক্যান্টিন’ নামে এক খুব ভালো রেষ্টুরান্ট হয়েছে ঢলদিঘী পেট্রোল পাম্পের পাশে। চিন্তা ছিল যে ৩১শে ডিসেম্বরের রাতে সেখানে ১০ জনার জন্য টেবিল পাওয়া যাবে কিনা! কিন্তু সেই চিন্তারও নিরশন আগে হয়ে গিয়েছিল। সেই ‘ক্যান্টিন’ রেষ্টুরান্টের মালিক আবার ‘খুশবু ফার্ণিচার’ দোকানেরও মালিক যেখানে ম্যানেজারী করে আমাদের ভুলু। সেদিন ভুলু কাজে গিয়েছিল – আমাকে বলা হল, চিন্তা নেই, ভুলু পৌঁছে গিয়ে টেবিলের ব্যবস্থা করে ফেলেছে অলরেডি।

    ক্যান্টিন রেষ্টুরান্টের সামনে পৌঁছে দেখা গেল পার্কিং এর প্রবলেম। কেবল প্রাইভেট পার্কিং রয়েছে ‘তানিষ্ক’ এর শোরুমের সামনে যেখানে আবার এক সিকিউরিটি বসে আছে। রবি নেমে গিয়ে কি কথা বলে এল – সেখানেই পার্কিং এবং গাড়ির পাহারার ব্যবস্থাও হয়ে গেল।

    খাবার ভালো ছিল ক্যান্টিনের – ছেলেরা আমাকে বলল যে সুকান-দা তুমিই অর্ডার দাও যা দেবার। বুঝতেই পারছেন নিমোর দশ জন ছেলের কি পরিমাণে খাবার লাগতে পারে! কলকাতার লোকেরা সেই পরিমাণ কুড়ি জনে শেষ করতে পারবে না। ভুলুর এবং তার মালিকের দৌলতে আমাদের খাবার এল প্রায়োরিটি বেসিস এ। খেয়ে দেয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি শিল্পপতি রাজু এক ফুলের গোছা নিয়ে হাজির! রাজু আজকাল বিজনেস করতে গিয়ে প্রচুর সরকারী আমলা, রাজনীতিবিদ-দের সাথে ওঠা বসা করে। সেখান থেকেই মনে হয় এই ফুলের কনসেপ্ট শিখেছে। তা না হলে নিমোর ছেলেরা এক অপরকে ফুল দিচ্ছে – এটা ভাবলেই গায়ে কেমন কাঁটা দিয়ে ওঠে! কিন্তু ফুলের স্তবকটা নিয়ে খুব ভালো লাগলো আমার – একটা ছবিও তোলা হল।

    বাড়ি ফেরার সময় এবং আরো বেশী করে বাড়ি ফিরে মন খারাপ হল। অমৃতা ফুল খুব ভালোবাসত – আমি ফাঁকা বাড়িতে ফিরলাম ফুল হাতে, কেউ নেবার নেই সেই স্তবকটা – অনেক দিন হল ফুলদানিগুলো কোথাও আছে জানা নেই। ফুলের গোছাটা ডাইনিংটেবিলে রেখে শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। একাকী – ঘর এখন অন্ধকারই থাকে!









  • syandi | 162.158.90.65 | ২৬ মার্চ ২০২০ ০৩:৩৮730288
  • শেষ প্যারাটা পড়ে ইমোশন্য়াল হয়ে পড়লাম। আপনি ভালো থাকবেন সুকি। আর কিই বা বলতে পারি?
  • সে | 162.158.150.93 | ২৬ মার্চ ২০২০ ০৩:৫৮730289
  • খুব সুন্দর।
  • ন্যাড়া | 172.69.22.13 | ২৬ মার্চ ২০২০ ০৪:৩৫730290
  • সিঙ্গল মল্ট প্রসঙ্গে - এ ব্যথা কী যে ব্যথা ইত্যাদি।

    সিগারেট ছেড়েছি বছর চারেক হল। শেষের দিকে লো টার সিগারেট খুঁজে বেনসন-হেজেস আলট্রা লাইটে থিতু হয়েছিলাম। বন্ধুদের খাওয়াব বলে নিয়ে গেলাম। সে আবার সিঙ্গাপুরের ডিউটি ফ্রি-তে পাওয়া যায়না। সুটকেসে ভরে মহার্ঘ্য স্পেস বিসর্জন দিলাম। ভাল ও স্বাস্থ্যকর সিগারেট খাওয়াতেই হবে।

    চলে আসার সময় তারা বলল, "পরের বার আমাদের জন্যে মার্লবোরোই আনিস।"
  • সুকি | 162.158.165.211 | ২৬ মার্চ ২০২০ ১৩:৫২730301
  • ধন্যবাদ সে-দি, স্যানদি, ন্যাড়াদা -

    আমি নিজে সিগারেট খাই না - কিন্তু ওই মার্লবোরোই নিয়ে গেছি চিরকাল বন্ধুদের জন্য।

    আমাদের ওদিকে কিছু কিছু স্পেশাল দোকানে বিদেশী জিনিস বলে মার্লবোরো বা বেনজন-হেজেস বিক্রী হত। তারপর একসময় মধু-দার ভাগনা পানের দোকানের বাপির কাছ থেকে জানতে পারলাম ও সব তৈরী হয় নবদ্বীপে!
  • সুকি | 172.68.167.45 | ২৮ মার্চ ২০২০ ০৯:০০730340
  • কনফ্লিক্ট
    -------------------------

    অক্টোবর-নভেম্বর আর জানুয়ারী-ফ্রেবুয়ারী মাস নাগাদ অফিসে ম্যানেজারদের জন্য স্পেশালি কিছু হাবি-জাবি ট্রেনিং অ্যারেঞ্জ করা হয় এইচ আর দ্বারা। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, বছর শেষে তোমার অধীনে কাজ করা পাবলিকদের পারফরমেন্স রেটিং কি ভাবে করতে হবে, ব্যালেন্সড সিদ্ধান্ত ঠিক কি ভাবে নিতে হবে, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেষ্ট কিভাবে এড়াতে হবে – এই সব। আবার নতুন বছর শুরু হলে ট্রেনিং দেওয়া হয় এই শেখানোর জন্য যে ঠিক কিভাবে জানাবে পাবলিকদের কি রেটিং তারা পেয়েছে এবং কেন। কাউকে আঘাত দেওয়া যাবে না, মনক্ষুণ্ণ করা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।

    আমি কি করে এইচ আর-দের বোঝাই যে নিমোর ছেলেদের এই ধরণের ট্রেনিং কদাপি প্রয়োজন নেই। কারণ আমরা এর থেকেও অনেক বড় বড় মরণ বাঁচন সমস্যা এবং কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেষ্ট ট্যাকেল করে করে বড় হয়েছি! আগে যেমন লিখেছিলাম, এমনি এক বিচারের সিদ্ধান্তে প্রীত না হয়ে কার্ত্তিক পাল কলঘরের তরুণের বীচি টিপে ধরেছিল বা বিশ্বেসদের মৌসুমী উচ্চারিত ডিক্সেনারীর বাইরের গালাগাল। অর্থাৎ ভার্বাল থেকে ফিসিক্যাল সব ধরণের প্রতিক্রিয়াতেই অভ্যস্ত আমরা সেই কবে থেকে।

    সেদিন নিমো স্টেশনে নেমে মিলনের কাছে মাশডাঙা-র ডাইনী তাড়ানোর যজ্ঞের ঘটনা শুনে যখন নিমো বারোয়ারী তলায় পৌঁছলাম তখন বেশ জমিয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। মানিক-কাকাকে দেখলাম হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে আসছে দূর্গাদালানের সামনে দিয়ে। মানিক-কা সারা জীবনই হন্তদন্ত হয়েই চলাফেরা করে, কিন্তু সেদিন যেন আবার বিশেষ ভাবে হন্তদন্ত দেখালো। আমাকে দেখে দাঁড়ালো একটু, “সুকান কবে এলি রে? এখুনি ঢুকছিস? আচ্ছা – পরে কথা হবে সব তোকে খুলে বলব, এখন একটু তাড়া আছে”।

    বুঝলাম মানিক হালদার এবং সীতা হালদারের ঝগড়ার এখনো পরিসমাপ্তি হয় নি। মানিক এবং সীতা দুই আপন ভাই হলেও নিজেদের মধ্যে ভাতৃত্ববোধ সেই কবেই গুঁড়ো দুধের মত পাউডার হয়ে গেছে। মানিক হালদারের ছেলে নটা এবং সীতার ছেলে মুকুল দুইজনাই আমাদের সোনার বাংলার টিমের মেম্বার। সেবার গুরুতর ঝগড়া শুরু হয় নিমো থেকে কোলেপাড়া যাবার রাস্তার ঠিক পাশের কয়েক কাঠা জমি নিয়ে। এই দুই ভাই যখন অনেক দিন আগে আলাদা হয়ে যায়, তখন সেই জমি ভাগ হয়েছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে দুই জনা নিজের নিজের ভাগের জমিতে চাষ করছিল।

    এর পরের ব্যাপার বুঝতে হালকা জ্যামিতিক জ্ঞানের প্রয়োজন। সেই কয়েক কাটা জমি বহুদিন আগে ভাগ হয় আড়াআড়ি ভাবে। অর্থাৎ, কোলেপাড়া যাবার রাস্তার একদম পাশে জমি পেল মানিককা এবং তার পূর্বদিকে জমি (যে জমির সাথে রাস্তার সরাসরি কনট্যাক্ট নেই) পেল সীতা হালদার। এমন ভাবেই চলছিল – সীতা হালদারের প্রবলেম ছিল না কোন, বরং পূব দিকের জমি পাওয়াতে সেখান থেকে শ্যালো বা ডিপ-টিউবওয়েলটা একটু কাছে হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাধ সাধল যুগের সাথে উন্নয়ন। আগে সেই রাস্তায় তেমন কেউ যেত না – আর এখন পীচ রাস্তা হয়ে গিয়ে এলাহী ব্যাপার। রাস্তার ধারে জমি একদম হট কেকের মত বিকোচ্ছে – পাঁচ লাখ প্রতি কাটা। আগে যেখানে পাঁচ লাখ বিঘে প্রতি পাওয়া স্বপ্ন ছিল।

    এর ফলে সীতা হালদার নড়েচড়ে বসেছে। এবার দাবী করছে যে আগের ভাগ-বাটোয়ারা মানি না – পৈত্রিক জমি এবার লম্বা-লম্বি ভাগ করতে হবে। যেন দুই ভাইই রাস্তার ধারের জমি পায়। বলাই বাহুল্য মানিক হালদার এতে রাজী নয়। তুমুল অশান্তি – পঞ্চায়েতে নালিশ ইত্যাদি।

    এবার আমাদের কনফ্লিক্ট-টা দেখুন – আমরা কার দলে হব? মুকুল এবং নটা দুইজনাই আমাদের ক্লাবের সদস্য। নিমোর সোনার বাংলার সক্রিয় প্রচেষ্টায় গ্রাম পঞ্চায়েতে জয়ী হয় নির্দল প্রার্থী এবং পচাদা গ্রাম প্রধান। এ বিচার খুব চাপের হয়ে যাচ্ছে। মুকুল অভিযোগ জানাতে থাকে, “তোরা আমাকে ঠিক ঠাক দেখছিস না”। সেদিন আবার বোম ফাটাল – বলল যে, “তোরা যে নটা-কে সাপোর্ট করছিস, কিন্তু ও তো তোদের নির্দলকে ভোট দেয় নি! ওদের পুরো ফ্যামিলির ভোট গ্যাছে তৃণমূলে!” অভিযোগ সত্য। তাহলে এবার কি করা হবে – যে ভোট দিয়েছে তার পক্ষে রায় দেওয়া হবে নাকি যার দাবী ঠিক তার পক্ষে? এটা মোটামুটি সবাই একমত যে সীতা হালদারের দাবী এই ক্ষেত্রে অন্যায্য।

    পরের দিন সকালে নটা-র সাথে দেখা – হাতে একগাদা ফাইলপত্র নিয়ে কোথায় যাচ্ছে। বলল, “আর বলো না দাদা – সীতা হালদার আবার কেস করে দিয়েছে”। কিসের কেস আবার জানতে চাইলে যা বোঝা গেল, মানিক কাকা এবার নতুন ঘর করা শুরু করেছে পুরানো বাড়ির কমপাউন্ডেই। কারণ নটা-র বিয়ে দিতে হবে এবার তাই ঘরের দরকার। এবার সেই জায়গা নিয়ে ঝামেলা করে ইনজাংশান জারির ধান্ধায় আছে সীতা কোর্টে কেস করে। তাই নটা ছোটা ছুটি করছে জমির পর্চা ইত্যাদি নিয়ে। ঘর না তৈরী হলে নটার বিয়েও হবে না। বেচারী খুব টেনশানে তাই।

    অর্থাৎ আমাদের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে – মানিক হালদারের জমিতে চাষ হবে কিনা, একমাত্র চাষ বাস করেই যার সংসার চলে। আর থেকেও বড় কথা, সঠিক সময়ে নটার বিয়ে হবে কিনা। এক আইবুড়ো ছেলের স্বপ্ন পূরণের অন্তরায় সীতা হালদার এবং আমাদের রায়।

    এবার আপনারই ভাবে দেখুন এই লেভেলের জিনিস ডিল করার পর চাকুরীর রেটিং কেমন ভাবে দিতে হবে সেই নিয়ে ট্রেনিং করা সময় নষ্ট কিনা!
  • সুকি | 172.68.146.247 | ০১ এপ্রিল ২০২০ ২২:৪৭730411
  • বার বার নষ্ট হয়ে যাই
    ----------------------------

    ‘প্রভু নষ্ট হয়ে যাই – বার বার নষ্ট হয়ে যাই’ এই লাইনটা এরপর কোনদিন বললে বদলে নিতে হবে। ‘নষ্ট হয়ে যাই’ আর বলতে পারব না এরপর মনে হয়, আর তো স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ‘প্রভু নষ্ট হয়ে গেছি’।

    বারে বারে নষ্ট হচ্ছিলাম – এই আমি এবং আমরা। বুঝতে পেরেছি অনেক সময়, অনেক সময় বুঝতে পেরেও তেমন কিছু করতে পারি নি। আর এখন তো চাইলেও কিছু করতেই পারছি না।

    লকডাউনে আমাকে ঘর থেকে কাজ করতে হয় বাকি আর সবার মতই – খাবারে কোন টান নেই এখনো, কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর সুইজি, জমাটো-র হোম ডেলিভারী আবার চালু হয়ে গেছে। বিগ বাস্কেট বাড়িতে আবার দিয়ে যেতে শুরু করেছে দুধ, মনোহারী জিনিস পত্র। লিসিয়াস আবার দিতে শুরু করেছে ডিম, মাংস। আমাদের গেটেড-কমিউনিটির গ্রুপে আমরা আলোচনা করি কেন কাজের লোক আসবে না! কিভাবে ওরা নিজেরা ঠিক করে নিতে পারে যে কাজ করতে আসবে না? নিজের ফ্ল্যাটের দরজার সামনের করিডোর টুকু পরিষ্কার করার জন্য বারে বারে ভলেন্টিয়ার ডাকা হতে থাকে। কেউ কেউ ক্ষোভ উগরে দিই এই জন্য যে আমাদের গেট পর্যন্ত গিয়ে পিৎজা ডেলিভারী নিতে হচ্ছে বলে! পিৎজাবালক দোরগোরায় আসছে না।

    আমি বোর হই – খুব বোর হলে নেটফ্লিক্স, আমাজন, হটস্টার আর যা কিছু আছে মাঝে মাঝে দেখতে থাকি। আমার খাওয়ার সময় এখনো মেনটেন করতে পারছি – সকালে দুধ দিয়ে কফি খাচ্ছি – বাড়ি থেকে কাজ বলে খুব সকালের বাস ধরার তাড়া নেই। নিজের বিছানা ছেড়ে উঠছি একটু দেরী করে – আলস্যে ভরা শরীর নিয়ে।

    আর তারপর? কখনও কখনও বাড়ির লোকের সাথে কথা বলি, কথা হয় নিমোর ভাই বন্ধুদের সাথে। লকডাউনের অন্যদিকের গল্প কেমন গড়াচ্ছে, সেটা জানতে আমাকে ফেসবুক দেখতে হয় না, না শুনে বিচার করতে হয় ওই মিডিয়ার খবর।

    তর্কে যাব না – কিন্তু ফ্যাক্ট এটা যে সরকারের কাছে, বর্তমান প্রশাসনের কাছে ওই তথাকথিত ঘর ছেড়ে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিক – দিন মজুর, যাদের গালভরা নাম দেওয়া হয়েছে ‘মাইগ্রেটেড লেবার’ – তাদের জীবনের কোন দাম নেই। এবং সেই নিয়ে সরকার মাথা ঘামাতেও রাজী নয় বেশী।

    হাজারে হাজারে লোক যাচ্ছে নিমোর উপর দিয়ে দল বেঁধে হেঁটে – ঘরে ফিরছে চাইছে তারা, জি টি রোড বরাবর, রেললাইন বরাবর হেঁটে যাচ্ছে তারা কলকাতার দিক থেকে ঝাড়খন্ড, বিহারের দিকে। পিঠে, কোলে বাচ্ছা – বড় বড় বাক্স-ব্যাগ নিয়ে ফিরছে। নিমোর রাস্তার ধারে প্রতিদিন প্রায় ১৫০-২০০ জন লোক খাচ্ছে – চাল, আলু ইত্যাদি জোগাড় হয়েছে। কিন্তু শেল্টার? ইচ্ছা করলেই আপনি ২৫-৫০ জনকে নিয়ে ভাবলেন গ্রামের কোথাও রেখে দেবেন, খাওয়াবেন – সেসব অত সোজা নয়। প্রশাসনের অনুমতিই মোষ্ট লাইকলি আপনি পাবেন না। যে হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে, তাকে যেতে দাও – শ্রমিক-মজুর এদের কষ্ট-মৃত্যু নিয়ে মাথা ঘামাবার মতন সময় নেই বড়কর্তাদের।

    আমাদের নিমো গ্রামের শিল্পপতি রাজুর সাথে অনেক কথা হল আজ। এই নীচের ঘটনাটা রাজুর বলা এবং ছবি গুলোও সে পাঠালো। কাল পড়ন্ত বেলায়, প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে তখন – রাজু গিয়েছিল নিমো স্টেশনের দিকে। স্টেশনে এককোণে সে দেখে এক ফ্যামিলিকে গুটি সুটি মেরে বসে থাকতে – বাবা, মা এবং একটা বছর ছয়েকের মেয়ে। মেয়েটা খুব কাঁদছে। রাজু কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে যে মেয়েটি সারাদিন কিছু খেতে পায় নি বলে কাঁদছে। ওরা নিমোর কিছু দূরের গ্রামের মাঠ থেকে রওনা দিয়েছে – বাড়ি গিরিডি। হেঁটে হেঁটে সন্ধ্যাবেলা নিমো স্টেশনে এসেছে – ভাবছে যে একটা ট্রেন পেলে তাতে উঠে বর্ধমান যাবে এবং সেখান থেকে গিরিডি। কিন্তু ট্রেন তো বন্ধ – মাঝে মাঝে চার কামরার ট্রেন চলে, তবে সেটা স্পেশাল, রেলের নিজের লোক এবং পুলিশের জন্য। তাই তাতে উঠতে দেবে না সেটা রাজু ওদের জানালো।

    এই তিনজন এসেছিল আমাদের পাশের গ্রামের দিকে জমিতে আলু কুড়াতে। কয়দিন আগে সব জমিতে আলু তোলা হয়েছে – চাষী আলু তুলে নিলেও কিছু কিছু আলু পড়েই থাকে মাটি চাপা। আর সেই মাটি চাপা আলু তুলে কিছু পয়সা ইনকামের জন্য সেই সুদূর গিরিডি থেকে এরা বাবা-মা-বেটি এসেছে এখানে। চার বস্তা আলু কুড়িয়ে পেয়েছিল – দু বস্তা বিক্রি করে গত সাতদিন চালাচ্ছে কোনমতে তারা। আর মাথায় করে বাকি দু বস্তা নিয়ে ফিরছে গিরিডি – প্রায় ৩০০ কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে।

    রাজু ওদের বলে রাতে গ্রামের ভিতর আসতে তার বাড়ি – রাতে থাকবে সেখানে এবং খাবারের ব্যবস্থা করে দেবে সে। কিন্তু এই ফ্যামিলিটা ওর কথা বিশ্বাস করতে চায় না – ভাবে কোথায় কেন নিয়ে যাবে। আসলে এই ফ্যামিলিটা কোন কারণে অন্য দলের সাথে ছিল না। রাজু অনেক বলে টলেও তাদের রাজী করাতে পারে না তার সাথে আসতে। তখন বলে, যদি তোমাদের মত বদলায় তাহলে গ্রামের ভিতরে গিয়ে বলবে রাজুর বাড়ি যাব – কেউ না কেউ দেখিয়ে দেবে।

    বাড়ি এসে চা-টা খায় রাজু, একটু রাত হয়। কি মনে হয় তার যে, লোকটা তার ফ্যামিলি নিয়ে নিশ্চয়ই আসবে খুঁজতে। রাস্তায় বের হয় রাজু – সামনে একজনকে দেখে জিজ্ঞেস করে কেউ তাকে খুঁজছিল কিনা। সে জানায় হ্যাঁ, একটা লোক মাথায় বস্তা ইত্যাদি নিয়ে গ্রামে ঘুরছিল, রাজুর বাড়ি যাবেও বলেছিল – কিন্তু কে যেন তার কথা বিশ্বাস না করে চোর ইত্যাদি হতে পারে বলে তাকে চলে যেতে বলেছে। রাজু তখন হন্ত দন্ত হয়ে খুঁজতে বেরোয় তাকে। নিমো স্টেশনে গিয়ে আবার পায় দেখা – কিন্তু এবার আর সে আসতে চায় না, বলে আমাকে মারবে গেলে! আর তা ছাড়া ওই আলুর বস্তা বয়ে নিয়ে গিয়ে সে খুব ক্লান্ত।

    যাই হোক, অনেক বলে কয়ে রাজু তাদের নিয়ে আসে গ্রামের ভিতরে। নিয়ে গিয়ে তার পুরানো কারখানায় ঘর খুলে দেয় থাকার জন্য – কিন্তু তারা কিছুতেই ঘরে শোবে না – বলে আমরা দরজার সামনেই শোব। আর একটু রাতে রাজু ভাত নিয়ে গিয়ে দেখে তারা সব অঘোরে ঘুমাচ্ছে – সারা দিনের পরিশ্রম। ডেকেডুকে তুলে ভাত খাইয়ে, মশারি ইত্যাদি খাটিয়ে, ফ্যানের ব্যবস্থাও হয়।

    আজ সকালে রাজু চা নিয়ে গিয়ে খাওয়ায় তাদের। তারপর প্রস্তাব দেয় যে – এই তোমার এত ছোট বাচ্ছা নিয়ে গিরিডি এতটা কি করে হেঁটে যাবে? এখানেই থেকে যাও লকডাউন না ওঠা পর্যন্ত। লকডাউন উঠে গেলে বর্ধমান থেকে ট্রেন ধরে বাড়ি যাবে না হয়। খাবার ব্যবস্থা হয়ে যাবে – কিছু সমস্যা নেই।

    লোকটা কাঁদতে শুরু করে – বাড়িতে সে রেখে এসেছে বুড়ি মায়ের কাছে দেড় বছরের ছেলেকে। দিন পাঁচেকের মধ্যেই ফেরার কথা ছিল, সেই মত চাল-ডাল দিয়ে এসেছে বুড়ি মা-কে। তা এখন যদি সে না যায়, তাহলে তার বুড়ি মা কি করবে? না খাতে পেয়ে মা আর তার দেড় বছরের ছেলে দুই জনাই মারা যাবে।

    ওরা আর অপেক্ষা করে না – রাজু বলল, সুকান্তদা চোখে জল চলে এল আমার। বাড়িতে বুড়ি মা আর দেড় বছরের ছেলে এদের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে – কিভাবে আটকাই এদের!

    সাথের ছবিতে দেখা যাচ্ছে ওরা নিমো গ্রাম ছাড়ছে গিরিডির উদ্দেশ্যে।

    প্রার্থনা করুন যেন ওরা ফিরতে পারে জীবিত অবস্থায় – এবং ফিরে জীবিত বুড়ি মা আর দেড় বছরের বাচ্ছাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারে আবার।





  • r2h | 162.158.51.147 | ০১ এপ্রিল ২০২০ ২২:৫৬730412
  • :(
  • সুকি | 108.162.215.123 | ০৮ এপ্রিল ২০২০ ১৮:৫৬730480
  • গোপালদা
    -----------------------

    কংগ্রেস জামানার ব্যাপারস্যাপার স্লেট থেকে মুছে দিলে, যুক্তফ্রন্ট এবং তারপরে সি পি এম আমলে ঘোষ ফ্যামিলিতে আদরে বাঁদর তৈরী হবার প্রথম উদাহরণ স্বরূপ গোপাল-দাকেই খাড়া করা যেতে পারে। সে মনে হয় নিজেও এই উপাধিতে আপত্তি করবে না – গোপালদা আমাদের সেজ জ্যেঠুর ছেলে।

    গোপালদার স্কুল লাইফ বেশ রহস্যাবৃত – কি বের হতে কি বের হবে সেই নিয়ে আমি আর ঘাঁটা ঘাঁটি করি নি দাদার পড়াশুনা নিয়ে। আমরা ঘোষ বাড়ির ছেলেরা সবাই নিমোতে প্রাইমারী ইস্কুল শেষ করে মেমারী বিদ্যাসাগর স্মৃতি বিদ্যামন্দিরে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ট্রান্সফার নিলেও গোপালদা কি ভাবে যেন আর এক স্টেশন কলকাতার দিকে এগিয়ে বাগিলা হাইস্কুলে ভর্তি হল। যারা বলার তারা বলল যে মেমারী ইস্কুলে চান্স না পেলেই তবে লোকে বাগিলা যায়! – জাতপাত আর কবে না ছিল গ্রাম্য জীবনে! তবে এই সব ইস্কুল ভিত্তিক ইমাজেনারী র‍্যাঙ্ক নিয়ে গোপালদার কোন মাথা ব্যাথা ছিল না বলাই বাহুল্য।

    আমাদের মা-জ্যাঠিমাদের মতে গোপাল-দাকে বাঁদর বানাবার অতি আদরটি আসত বড়-বড়মার কাছ থেকে। বড় জ্যাঠা অপুত্রক ছিল এবং তাই গোপাল-দার ভাগে স্নেহ একটু বেশী পড়ত বড়মার কাছ থেকে। ইস্কুল লাইফে সেই প্রবল ভালোবাসা বস্তুগত জাগতিক জিনিসে পরিবর্তিত হয়েছিল ‘হাতখরচা’ নামে। গোপাল-দার সেই বাচ্চা বেলা থেকে এই এখনো পর্যন্ত কোন বদ নেশা নেই – মানে বিড়ি, সিগারেট, মদ, গাঁজা, মেয়েছেলে – কিছুই দাদাকে কোনদিন টানে নি। গোপালদার টান ছিল সেই কালে খাওয়া-দাওয়া এবং সিনেমা দেখা। সিনেমা দেখা এখন কমে কমে প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও, খাবার ব্যাপারে দাদা আমাদের একই রকম ইনটেনসিটি বজায় রাখতে পেরেছে। সেই সময়ে বাগিলাতে পয়সা খরচ করার মত কিছু রেষ্টুরান্ট বা আমোদের জিনিস ছিল না – আর এখনো নেই। তাই খাবার ইচ্ছা চরিতার্থ করতে দাদার সাথে জিগরী দোস্তি হয়ে গিয়েছিল ট্রেনের সব হকারদের। নিমো থেকে বাগিলা দুটি স্টেশন – এই দুই স্টেশনের মধ্যে ওঠা যাবতীয় হকারের সাথে গোপাল-দার মাসকাবারী খাতার বন্দোবস্ত ছিল। সে খেজুর থেকে শুরু করে দিলখুশ, ঝালমুড়ি, বারোভাজা, বাদাম, কলা, শসা ইত্যাদি ইত্যাদি। ট্রেনে তখনো গজা বিক্রী শুরু হয় নি – না হলে মিষ্টির প্রতি গোপালদার যা টান ছিল তাতে করে বছর বছর সেরা ক্রেতার সম্মান হকার অ্যাসোশিয়েশন থেকে বাঁধা ছিল।

    পরবর্তীকালে অনেক বছর পরে ধীরে সুস্থে সময় নিয়ে গোপালদা বর্ধমান যাওয়া শুরু করল – মনে হয় না সেটা পড়াশুনার জন্য, কেউ বলে টেলারিং এর কাজ শিখতে যাচ্ছে, কেউ বলে ঔষূধের দোকানে ট্রেনিং নিতে যায়। কি করে সেই নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও বর্ধমানে নেমে গোপালদা কোথায় গিয়ে পৌঁছাতো সেই নিয়ে কারো মনেই কোন সন্দেহের অবকাশ ছিল না। দাদার মূল গন্তব্য স্থান ছিল নয় অনিতা না হয় নটরাজ সিনেমা হল। এবং সিনেমা দেখার পরিসমাপ্তি হলে রেষ্টুরান্টে ঢুকে খাওয়া। এই ভাবেই গোপালদা যৌবন বেলা কাটিয়ে ফেলল টুক করে।

    এর পরে খানিক ধোঁয়াশা – মেমারী পুরানো রেজিষ্ট্রি অফিসের পাশে দোকান গুলোর দোতলায়, রংবেরং নামক তখনকার বিখ্যাত ফোটো প্রিন্টিং এর দোকানটার পাশে গোপালদা নাকি কি একটা বিজনেস করতে শুরু করল। কিন্তু দোকান খোলা পাওয়াই টাফ ছিল – দাদা নাকি আনন্দম নয়ত জয়ন্তী সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে ব্যস্ত থাকত। আর সেখানে না পাওয়া গেলে নির্ঘাত পাওয়া যেত পাশের কোয়ালিটি রেষ্টুরান্টে – সকালে অকালে খাবার ব্যাপারে গোপালদার কোন বাছ বিছার ছিল না। মাল কিনতে এসে যদি খদ্দেরকে বেশী সময় ব্যয় করতে হয় দোকানের মালিককে খুঁজে বের করতে, তা হলে যা হবার হল – বিজনেস এক সময় উঠে গেল। গোপালদা এখন নিমো স্টেশন মাষ্টারি করে, মানে সেজো জ্যেঠুর টিকিট মাষ্টারের কাজটা প্রক্সি মারে আর কি।

    আর যেটা বলার, সমাজসেবার জন্য বা পরের দরকারে ঝাঁপিয়ে পরে রক্ত দেওয়ার অনেক পাবলিক গ্রামের আশে পাশে থাকলেও টিফিন খাবার লোভে রক্ত দিতে আমি একজনকেই দেখেছি – সেও হল এই গোপালদা। মেমারী ইস্কুলে তখন বছরে কয়েকবার করে লায়ন্স ক্লাবের তরফ থেকে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা হত। রক্তদান শেষে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হত একটা টিফিনের বাক্স এবং গোটা দুয়েক ফল, মূলত আপেল এবং কলা। তখন নাকি নিয়ম ছিল বছরে দুবারের বেশী রক্তদান করা যাবে না। শিবিরে রক্তদান করে করে গোপালদা-কে আশে পাশের গ্রাম বা মেমারীর ক্লাবের সদস্যরা সবাই চিনে গ্যাছে ততদিনে। বিছানা সাজিয়ে ডাক্তারি মালপত্র নিয়ে সকাল সকাল বসতে না বসতে গোপালদা সাইকেল নিয়ে হাজির হয়ে যেত রক্ত দিতে। সেবারেও গোপালদা গেছে রক্ত দিতে – কিন্তু ক্লাবের তপা-দা বলছে, “এই তো তিন মাস আগেই তুই রক্ত দিয়ে গেলি গোপাল – তোর রক্ত এবারে নেওয়া যাবে না”। কিন্তু কে শোনে কার কথা – রক্ত সে দেবেই। দরাদরি চলতে থাকে, ক্লাব রক্ত নেবে না, আর গোপালদা রক্ত দেবে। আর কিছুই না, কেবলমাত্র টিফিন খাবার লোভে। শেষ পর্যন্ত তপা-দা বলল, “গোপাল তোকে আর রক্ত দিতে হবে না, এই টিফিনের বাক্স নিয়ে তুই এখন বাড়ি যা”। বাক্স পেয়ে গোপাল-দা শান্ত হল, বাসি ছানার গজাটা খেতে খেতে বিদায় নিল।

    খাওয়া ছাড়া গোপাল-দার আর একটা প্রিয় কাজ ছিল সকাল বেলা আনন্দবাজার এবং বর্তমান খবরের কাগজ দুটো প্রায় মুখস্ত করে ফেলা। এবং কাগজ পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে অদ্ভূত সব তত্ত্ব ছাড়ত গোপালদা। এমনি একদিন সকালে আমাদের বাড়ির দুয়ারে গোপালদা কাগজ পড়ছে, আর বাড়িতে মা-কাকিমা পেঁপে গাছ থেকে গত রাতে প্রায় পেকে যাওয়া বড় পেঁপেটা চুরি যাওয়া নিয়ে আক্ষেপ করছে। গোপাল-দা বলল, কাকিমা বলছি শোন এমন দিন আসছে যে দেখা মাত্র গুলি করতে হবে এই সব কেসে। মা বলল, সে কি রে গোপাল, পেঁপে চোরকে গুলি করে মারবে কে? গোপালদার যুক্তি হল ভারতবর্ষ ক্রমশ উচ্ছন্নে যাচ্ছে – জেলে কয়েদীদের রাখার জায়গা নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং কনক্লুশন সব নেতা শালা হারামি!

    আমি আর গোপালদা বহু বহু বিয়েবাড়িতে একসাথে খেতে গেছি – আপ রুচি খানা এবং পর রুচি পড়না্‌ নাকি একটা ডায়লগ আছে, সেটার প্রকৃত মর্ম আমি গোপালদার কাছ থেকেই প্রথম শিখি। ফালতু সামাজিক আদান প্রদানে না মেতে, মাথা নীচু করে নিদারুণ সাঁটিয়ে টুক করে বিয়ে বাড়ি থেকে কেটে পড়ার আর্ট গোপাল-দাই হাতে কলমে শেখায়। আর তা ছাড়া দাদার পাশে খেতে বসলে চক্ষু লজ্জার ব্যাপারটাও থাকত না – কারণ ধরুন এমনি পুতুপুতু পাবলিকের পাশে বসে শেষ পাতে গোটা কুড়ি রসগোল্লা খেতে আমার কেমন কেমন লাগত। কিন্তু গোপালদা নিজে খেত খান তিরিশ – তাই তার পাশে আপেক্ষিক ভাবে কুড়িটা রসগোল্লা কমই লাগত। মেন টার্গেট থাকত পোলাও বা ফ্রায়েড রাইস, মাংস এবং মিষ্টি। মাঝের বাকিদের আমরা পাশ দিয়ে দিতাম। পুরানো দিনের অ্যালুমিনিয়ামের পরিবেশনের বালতি গুলোর পৌনে একবালতি হিসেব থাকত গোপালদার পোলাওয়ের। এমনিতেই সবাই জানত, তাই আর বার বার গোপালদাকে চাইতে হত না – কেবল পেট ভরে গেলে হাত তুলে বারণ করা ছাড়া।

    নীচের ছবিটি তেমনি এক বিয়েবাড়ির, তবে এটা ঘোষ বাড়ির ছাদে – নিজেদের পরিবারের কারো বিয়ে। তখন হারু-দা প্যান্ডেল করত শুধু – বাকি সব ঘোষ ফ্যামিলির – রাঁধা, পরিবেশন বাসন পত্র ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে বিয়ে বাড়ির পুরো গল্প অন্য কোন সময়।



    এক সময় বিয়ের বয়স চলে এল – মেয়ে দেখা চলছে। শেষে গিয়ে তারকেশ্বর লাইনের দামোদরের পাশের এক গ্রামের বৌদি-কে দেখে গোপাল-দার খুব পছন্দ হয়ে গেল। লোকে বলল, গোপাল ওখানে বিয়ে করিস না – শ্বশুর বাড়ি যাবি কি করে! রাস্তা বলে কিছু নেই, বর্ষাকালে বান হলে সব ভেসে যাবে – আর মনে হয় এঁটেল মাটি! কিন্তু গোপালদা গোঁ ধরে রইল, বিয়ে করতে হলে এই মেয়েকেই করবে বিয়ে। তা বিয়ে হয়েও গেল – বিয়ের দিন কি বৃষ্টি বৃষ্টি – ঘোষ গুষ্টি প্রায় শ’খানেক লোক বিয়ে দিতে রওয়ানা দিল গোপালকে গাল পাড়তে পাড়তে। সবাই বলছে এ কোথায় বিয়ে করল রে গোপাল – বেঁচে ফিরতে পারলে হয়! বলাই বাহুল্য সবাই বেঁচে ফিরেছিলাম – গোপালদাও দুই মেয়ে নিয়ে সুখে সংসার করছে। এখনো নিমো স্টেশনে নামলে পরিবারের লোকেদের মধ্যে গোপালদার সাথেই দেখা হয় প্রথম স্টেশনে - সুকান ভালো আছিস?

    তবে এখন আর গোপালদা টিফিনের লোভে রক্ত দিতে যায় না।
  • সুকি | 172.69.34.67 | ০৮ এপ্রিল ২০২০ ১৯:০৩730481
  • একটা জিনিস আগে খেয়াল করি নি - সেদিন পাই বলার পর খেয়াল করলাম এবং দেখে বেশ মজা লাগল। আজকাল লেখা কতবার পঠিত সেটা পাশে দেখা যায়। তো এটা লক্ষ্য করলাম - বিশাল মাথা খাটিয়ে প্রবন্ধ লিখি তাতে ওতো পাঠক নেই। কিন্তু নিমোর গল্পের পাঠ সংখ্যা বেড়েই যায় রোজ রোজ! পড়ে কে এগুলো রোজ !!! এমন নয় যে নিমোর ছেলেরা ঢুঁ মারে এখানে -

    এটা ভেবে বেশ গর্ব হয় হয় যে নিমো নিয়ে লোকের ইন্টারেষ্ট আছে :)
  • Du | 172.69.68.208 | ০৮ এপ্রিল ২০২০ ২১:২৭730482
  • নিমো গ্রাম আমাদের আত্মার আরাম যাকে বলে।
  • সম্বিৎ | 172.68.133.77 | ০৮ এপ্রিল ২০২০ ২৩:৩৫730484
  • নিমো আমাদের সবাইকার নিজের গ্রাম হয়ে গেছে। কাজেই নিমোর লোকেরাই আসে পড়তে।
  • ar | 173.245.52.68 | ০৯ এপ্রিল ২০২০ ০০:৪১730495
  • @সুকি

    আরে ভাই, আপনার নিমো গ্রামের গল্প হল আমাদের সমস্ত বিষাদের দাওয়াই, প্রাক-করোনা, করোনাকাল এবং করোনাত্তোর কালের।

    কলম চলিয়ে যান, একদম থামাবেন না!!
  • একলহমা | 162.158.187.104 | ০৯ এপ্রিল ২০২০ ০৫:৩১730497
  • নিমো গ্রাম কি আর শুধু তোমার আর তোমাদের গ্রাম? আমার আর আমাদের গ্রাম নয়? কেউ লিখবে আর কেউ পড়বে! অতএব
    :D
  • সুকি | 172.69.34.105 | ০৯ এপ্রিল ২০২০ ১৭:৫৬730507
  • করোনা ইত্যাদি সব ঠিক ঠাক মিটলে তাহলে সবার একবার নিমো আসার আমন্ত্রণ রইল
  • সুকি | 172.69.34.105 | ০৯ এপ্রিল ২০২০ ১৮:২৪730508
  • হাবা
    -----------------------

    বাঙালির ক্রমাগত অবক্ষয়ের পিছনে যে সাম্রাজ্যবাদী কোন চক্রান্ত, নেতাজীর মরে যাওয়া, বড় বাজারের মারোয়ারী বা জ্যোতি বসু নেই তা আমাদের কাছে সুস্পষ্ট করে তুলল আমাদের বাল্য বন্ধু হাবা। এই হাবাই আমাদের সামনে হাতে কলমে প্রমাণ করে ছাড়ল যা কিছু অবক্ষয় বাঙালির তার মূল কারণ হল অম্বলের জ্বালা এবং চোঁয়া ঢেঁকুর। হাবা – সেই হাবা, যে ছিল আমাদের কাছে সেক্সের সিম্বল, ব্রুটাল অনেষ্টির মাপকাঠি, অকুতভয়, ক্রীড়াপটু এবং আরো অনেক কিছু।

    তার অবস্থা দেখে গেল বার বাড়ি গিয়ে আমি নিজেই কাবু হয়ে গেলাম। নিমো স্টেশনের আপ প্লাটফর্মের ঠিক পিছনের দিকে টিকিট কাউন্টারের কাছাকাছি আজকাল হল গিয়ে হাবার পান-বিড়ির দোকান। সুকান কবে এলি ইত্যাদি কুশল বাক্য বিনিময়ের পর আমি জানতে চাইলাম হাবা তোর শরীর কি হয়েছে রে? আমাকে হাবা জানাল, আর বলিস না, খালি পেটে চুল্লু খেয়ে খেয়ে পেটের প্রবলেম – অম্বল আর অম্বল, দিলীপ ডাক্তারের কাছে গেলাম, বলল বাঁচতে চাস তো আর চুল্লু খাস না। চুল্লু বেশী না খেতে পারার দুঃখে হাবাকে কাতর দেখালো। হাবা যখন কথা বলবে তখন তার মাঝে আবার খদ্দেরের কথা বলার হুকুম নেই। কিছু কিনতে চাইলে নিজে সামনে সাজানো হরেক টিনের জার থেকে নিয়ে নিতে হবে আর পয়সা চটের বস্তার উপর ছুঁড়ে দিলেই হবে। আমাদের কথা বলার মাঝে হঠ করে বেশী স্মার্ট এক বাঙাল হকার পান চেয়ে বসে হাবার কাছে। হাবা তাকে ফায়ার করে দিল, “বাঁড়া তোর পান আগে হল নাকি এতদিন পরে বন্ধুটা এল তার সাথে দুটো কথা বলব সেটা?” হকার ভাই সৌজন্য কি জিনিস শেখার অ্যাডভাইস পেয়ে কাঁচুমাচু মুখে বিদায় নিল।

    বলে রাখা ভালো যে, আমাদের বন্ধু ব্যাচে হাবাই সর্বপ্রথম অবৈধ সন্তান উৎপাদনে সক্ষম হয়েছিল ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময়। ক্ষ্যাপা মাষ্টারের কাছে প্রাইভেট টিউশনি শেষ করা এবং ইস্কুলের গণ্ডী পেরোবার সীমারেখা থেকেই হাবার কাছে তার নিজের ‘রঞ্জিত’ নামটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছিল। ক্ষ্যাপা মাষ্টার আজ আর নেই – আমাদের গ্রাম থেকেই টিউশনি পড়িয়ে ফেরবার পথে জি টি রোডে লরির ধাক্কায় প্রাণ হারাণ। এই ঘটনা আমাদের বিষাদগ্রস্ত করেছিল কিছুদিন কারণ খ্যাপা মাষ্টার আমাদের নিমো গ্রামের অনেক ছেলেরই কৈশোরের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। আমরা তাই ক্ষ্যাপা মাষ্টারের স্মৃতি চারণার আয়োজন করেছিলাম ইনফরম্যাল - কেবল আমাদের এই ছেলে ছোকরাদের মধ্যে। কেউ বলল মাষ্টারের কাছে পড়ে কিভাবে সে দ্বিতীয় বারের চেষ্টায় মাধ্যমিকে ইংরাজীতে পাস দিয়েছিল – কেউ বলল ক্ষ্যাপা মাষ্টারের কাছে পড়েও সে উচ্চমাধ্যমিকে ইংরাজী ডিঙোতে পারে নি, তবে তাতে মাষ্টারের কোন দোষ ছিল না, নিজের বংশের দোষেই সে পাস দিতে পারে নি। হাবার টার্ণ এলে সে বর্ণনা করল কিভাবে ক্ষ্যাপা মাষ্টারের প্রবল কোপে পড়েছিল বীচি টিপে দিয়ে। ক্ষ্যাপা মাষ্টার পাজামা পড়ে পড়াতে বসত। এবং মাঝে মাঝে পাশে বসা হাবাকে রিকোয়েষ্ট করত পা দুটো একটু টিপে দিতে। বারবার রিকোয়েষ্টে তিতি বিরক্ত হয়ে সেই বার হাবা পা টিপতে টিপতে আর একটু উপরের দিকে উঠে মাষ্টারের বীচি দুটি খুব জোরে টিপে দেয়। হাউ মাউ চিৎকারে খ্যাপা মাষ্টার হাবাকে তাড়া এবং আর কোন দিন পড়াবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে। পরে অবশ্য মাষ্টারের বউ অর্থাৎ তুফানের মায়ের হস্তক্ষেপে হাবা আবার টিউশনিতে ফিরে আসে। হাবার বলা শেষ হলে আমরা ক্ষ্যাপা মাষ্টারের আত্মার এবং ততসহ তার বীচির শান্তি কামনা করলাম।

    ধোনি র ‘হেলিকপ্টার’ শটের বহু আগে থেকেই আমাদের দিকে হাবা ক্রিকেট মাঠে ওই শটটি দিত – যদিও আমাদের কাছে তা ছিল ‘পাম্প’ (উচ্চারণ যদিও হত ‘পাম্‌’ বলে) দেওয়া মার। ক্রীজে স্টান্স নেবার পর, হাবা তার হাঁটু দুটি অদ্ভুত ভাবে ভাঁজ করত ও আবার সোজা হত। তা অনেকটা দেখতে হত সেই সাইকেলের চাকায় সিরিঞ্জ দিয়ে পাম্প দেবার মত। সেই থেকেই ‘পাম্প’ দেওয়া মারের উৎপত্তি। গায়ের জোরে হাবা ছিল ধোনির বাপ – ফলতঃ বেশীর ভাগ সময়েই সেই খান্না টেনিস বল রশিদের খামারে বা সামনের বাঁশ বাগানে অদৃশ্য হত। এই এখনো, সক্রিয় ক্রিকেট থেকে অবসর নেবার পরও মাঠে গেলে আজকালকার ছেলেরা হাবাকে ‘পাম্প’ দেওয়া মার দেখানোর অনুরোধ করে। এদের অনেকেই হাবাকে কোনদিন খেলতে দেখে নি – কিন্তু হাবা সম্পর্কে উপকথা শুনে এসেছে অফুরন্ত। কিন্তু আমাদের কাছে হাবার ইমপর্টেন্স ওর ক্রিকেটিয় দক্ষতার জন্য ছিল না, ওর থেকে অনেক বেশী ভালো ক্রিকেটার আমাদের গ্রামে ছিল – কিন্তু আমরা কেউই হাবার ব্রুটাল অনেষ্টির ধারে কাছে পৌঁছতে পারি নি কোনদিন। আমাদের ফুটবল শেষে বিকেলের গল্প ছিল বেশীর ভাগ সময়েই হাবিজাবি – সেই চিরাচরিত গল্প শেষ করে মসজিদের আজানের শব্দ কানে এলে, শাঁখের শব্দ শুনতে শুনতে অভস্ত্য আমরা নিজেদের পাড়ায় ফিরে যেতাম। তেমনি এক বিকেলে, ফুটবল খেলা শেষ করা ঘামে ভেজা চৈত্রদিবসেই আমরা প্রথম হাবার পিতৃত্বের খবর পাই।

    হাবাদের আদি বাড়ি ছিল বিহারে। কিন্তু ওর বাবা রেলের চাকুরী করতে এসে আমাদের নিমো গ্রামে রেল কোয়ার্টারে থাকতে শুরু করে। হাবার জন্মও নিমো গ্রামে – আমার থেকেও খারাপ হিন্দী বলে। মোট কথা আমাদের কাছে এবং নিজের কাছেও হাবা ছিল বাঙালী। কিন্তু ওই রেল কোয়ার্টারে বেশীর ভাগ পাবলিকই ছিল বিহারী এবং তারা ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেবার সময় বিহার থেকেই সমন্ধ করে আনত। এই ভাবেই হাবার প্রতিবেশী রামাশীষের বিয়ে হয়ে গেল বিহারের কোন এক প্রত্যন্ত গ্রামের এক ডাগর মেয়ের সাথে। রামাশীষের কেপেবেলিটি নিয়ে আমাদের মধ্যে চিরকালীন এক সন্দেহ ছিল – ওর আচার আচরণ ইত্যাদি খুব একটা স্বাভাবিক ঠেকত না আমাদের কাছে। এর বহুকাল পরে আমরা সেই আচরণের প্রতিশব্দ খুঁজে পাই – ঋতুপর্ণীয়। বলাই বাহুল্য রামাশীষ ঋতুপর্ণকে চিনত না।

    যাই হোক রামাশীষের সেই ডাগর বউ দেখে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। আমাদের মধ্যে এই বিষয়ে তখনও পর্যন্ত জ্ঞানী দিবাকরের ভাষায় রামাশীষের পক্ষে ওই ইঞ্জিন ঠেলা অসম্ভব। উজ্জ্বল কালো রঙের এক নধর, ডাগর মেয়ে – কেউ খবর দিল যে কাছ থেকে দেখলে নাকি চোখে মুখে খাই খাই ভাবেরও ছাপ দেখা গেছে! তো যাই হোক কি হতে কি হইয়া গেল – এক বছরের মধ্যে রামাশীষের বউয়ের সাথে হাবা জড়িয়ে গেল অঙ্গাঙ্গী। রামাশীষের বউয়ের নাম রাখা হল ‘লাল পরী’ – লাল রঙের শাড়ী পড়েই ঘুরত বলে মনে হয়। এক সময় আমরা জানতে পারলাম লাল পরী সন্তান সম্ভবা – হাবা এক পড়ন্ত বিকেলে ফুটবল খেলার পর বিষ্ফোরন ঘটালো এই বলে যে লাল পরী নাকি কনফার্ম করেছে বাচ্চাটা হাবার। আমাদের তখন ক্লাস টুয়েলভ। আমরা অনেকেই হাবাকে বিশ্বাস করি নি!

    হাবা আমাদের পরিপূর্ণ গল্প বলত – কিভাবে, কোথায় যৌন মিলনে লিপ্ত হত এবং দিবাকর চাপাচাপি করলে যৌনাঙ্গের বিবরণ শুদ্ধু। আমরা বুঝেছিলাম কি ভাবে নির্জন রাস্তা – কেবিনের পিছনের দিকে কৃষ্ণচূড়া, সজনে গাছ, ঝোপঝাড় হাবাকে এগিয়ে দিয়েছিল লাল পরীর দিকে। ঘুম ভেঙে যেত নিয়ম মাফিক – রাত দু-তিনটের সময় স্টেশনের সবুজ বা লাল সিগন্যাল পেরিয়ে, ঘরে ঘুমন্ত রামাশীষকে ডিঙিয়ে লাল পরী মিলিত হত হাবার সাথে। ভাবার দরকার হত না, জানালায় তখন তাকালেই লাল পরী দেখতে পেত হাবার মুখ – হাবা মোড়ে দাঁড়ায়, লাল পরী এগিয়ে আসে – দুজনে হাঁটা পথে ঢুকে যায় ঝোপে ঝাড়ে বা রাধা চূড়া গাছটার তলায়। হাবার নিজের কথায় নির্জনতা কোন চ্যালেঞ্জ ছিল না – কেবল শীৎকারের সময়টুকু ছাড়া – কেবল তখনই লালপরী ফিসফাস ভালোবাসত না।

    আমরা জানতাম হাবা মিথ্যে কথা বলে না, কিন্তু তবুও অনেকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি নি যে লাল পরীর ছেলে আসলেই হাবার! তবে কিছু বছর পর আর অবিশ্বাসের উপায় রইল না – কারণ লাল পরীর ছেলের মুখে ক্রমশঃ হাবার মুখের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠল। আমাদের গ্রামে এই তৃতীয় কেস ঘটল একের ছেলে অপরের মত দেখতে হবার। কোন কোন বিকেলে হাবাকে বেশী এফর্ট দিতে দেখা যেত না ফুটবলে। আমাদের সে অম্লানে বলত, আজকে আর শরীর দিচ্ছে না রে, এই একটু আগে ‘মেরে’ এলাম। তবে হাবার চরিত্র নিয়ে আমাদের কোনই সন্দেহ ছিল না – কারণ লাল পরী ছাড়া হাবা আর কাউকে কোন দিন ‘মারে’ নি।

    হাবা এই ভাবেই তার সমস্ত গল্প আমাদের বলত। লাল পরীকে ‘লাগাবার’ আগে সে কিভাবে তার পিস্তলে মেমারী গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে ফ্রীতে পাওয়া ক্যাপ পড়াতো সেই গল্প। ক্যাপের মোটাত্বের সাথে সুখের কি সম্পর্ক তা আমরা প্রথমে হাবার কাছেই জানতে পারি। অবশ্য পিস্তলে ক্যাপ পড়ানো খুব বেশী দিন স্থায়ী হয় নি – আরো সুখের সন্ধানে লাল পরীর পরামর্শে ক্যাপ হয়েছিল বর্জিত এবং ফলতঃ হাবার পিতৃত্ব। লাল পরীর পাখির মত বুক থেকে – ঝোপ ঝাড়, গাছের তলা, বিছানায় তাদের যৌথ আসনের কার্যকলাপ হাবা আমাদের বিস্তারিত ভাবেই বলত – এবং প্রকাশ্যেই।

    হাবার গল্প অনেক, সব কিছু লেখা যাবে না অল্প পরিসরে। তবে হাবার সাহসের গল্পটা শেয়ার করেই শেষ করব। সেই বার রেল লাইন বদলানো হচ্ছে হাওড়া-বর্ধমান মেন লাইনে। সব পুরানো শাল কাঠের স্লীপার তুলে কংক্রিট স্লিপার বসানো হবে। রেল লাইন কাটা হচ্ছে আর তুলে পাশের জমিতে ডাঁই করে রাখা। স্বাভাবিক ভাবেই একদিন চোর এল চুরি করতে সেই দামী রেল লাইন। নিমো স্টেশনের পাশে রেল কোয়ার্টার আর আমাদের গ্রামের মাঝে বেশ কিছু ফাঁকা জায়গা। তাই সেই চোরেরা এল লরি নিয়ে। হাবার ভাষায় এসেই তারা রেল কোয়ার্টার এর দরজায় দরজায় শিকল তুলে দিল এবং সামনে দিয়ে তলোয়ার নিয়ে হাঁটাহাঁটি। অকুতভয় হাবা ওরই মাঝে জানালার ফাঁক দিয়ে নিমো গ্রামে এসে লোক ডাকতে এল।

    গ্রামে বন্দুক বলতে শৈলেন মোড়লের এক দোনলা বন্দুক – সেই কাকাকে উঠিয়ে বন্দুক নিয়ে গ্রামের প্রান্তে নিমো ভারত সেবক সামজের ছাদে ওঠা হল যেখান থেকে গুলি ছোঁড়া হবে লরিতে লোড করতে থাকা চোরেদের দিকে। শৈলেন কাকা গুলি বন্দুকে লোড করে প্রথম ফায়ার, সেই গুলি মিয়ানো বারুদের মত ফুস করে নাকি কিছু দূর গিয়ে লুটিয়ে পড়ল। যাই গুলি করা হয়, কোনটাই আর এগোয় না। কাকা সাফাই দিচ্ছে, আসলে অনেক দিন গুলি রোদে দেওয়া হয় নি তো! আর আমার কানে ভাসছে হাবার গলা, “দূর বাঁড়া কাকা, কেন যে গুলি রোদে দাও না”। কাকা তর্ক করছে, গুলি রোদে দিয়ে কি হবে, গত বার তো ছিঁচকে চোরকে গুলি করতে বললি যে নাকি একটা সন্তোষ রেডিও চুরী করে পালাচ্ছিল। জানিস কি তুই যে একটা গুলির দাম সন্তোষ রেডিওর থেকে বেশী? আমাকে দেখতে হবে তো যে কি রেঞ্জের চুরী হচ্ছে।

    বলাই বাহুল্য তর্ক করেই ক্লাবের ছাদে আমাদের সময় গেল – চোর নিজেদের মত করে সাজিয়ে গুছিয়ে লরি লোড করে রেল লাইন নিয়ে বিদায় নিল।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1 | 2 | 3 | 4
  • গুরুর মোবাইল অ্যাপ চান? খুব সহজ, অ্যাপ ডাউনলোড/ইনস্টল কিস্যু করার দরকার নেই । ফোনের ব্রাউজারে সাইট খুলুন, Add to Home Screen করুন, ইন্সট্রাকশন ফলো করুন, অ্যাপ-এর আইকন তৈরী হবে । খেয়াল রাখবেন, গুরুর মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে হলে গুরুতে লগইন করা বাঞ্ছনীয়।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত