এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • খেরোখাতা: হাক্সলি

    Kulada Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ১২ জুলাই ২০২৬ | ২৮ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  • হাক্সলির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর উপলব্ধি এই নয় যে মানুষকে ধ্বংস করা যায় — এই উপলব্ধি যে মানুষকে ধ্বংস করতে আর কোনো শত্রুর দরকার নেই। সে নিজেই নিজেকে ধ্বংস করবে, এবং সারাক্ষণ হাসতে হাসতে করবে। এই বাক্যটি পড়তে সহজ, কিন্তু এর ভেতরের অর্থ যত গভীরে যাওয়া যায়, তত শীতল একটা অনুভূতি জেগে ওঠে — কারণ এটি কোনো দূরের ভবিষ্যতের কথা বলছে না। এটি এখনকার কথা। এই মুহূর্তের কথা।

    ইতিহাসে যত অত্যাচার হয়েছে, যত স্বৈরশাসক এসেছে, যত সাম্রাজ্য মানুষকে দাসত্বে বেঁধেছে — সেখানে একটা অদ্ভুত সততা ছিল। অন্তত শিকার জানত সে শিকার। রোমান দাস জানত সে দাস। নাৎসি বন্দিশিবিরের মানুষ জানত তার উপর অন্যায় হচ্ছে। সোভিয়েত গুলাগে যাকে পাঠানো হতো, সে বুঝত এটা শাস্তি। এই জানাটা, এই বোঝাটা — এটাই ছিল বিদ্রোহের বীজ। যতক্ষণ মানুষ জানে সে বন্দি, ততক্ষণ মুক্তির স্বপ্ন থাকে। হাক্সলি যা কল্পনা করেছিলেন তা এর চেয়ে অনেক বেশি পরিশীলিত এবং অনেক বেশি নিষ্ঠুর।

    তিনি এমন এক জগতের কথা বললেন যেখানে খাঁচার দরজা খোলাই থাকে — কিন্তু পাখি উড়তে চায় না। কারণ খাঁচার ভেতরে এত আলো, এত খাবার, এত উষ্ণতা যে বাইরের অন্ধকার আকাশ তার কাছে অর্থহীন মনে হয়।

    Brave New World-এ Soma নামে একটি ওষুধের কথা আছে। যখনই কষ্ট আসে, যখনই চিন্তা আসে, যখনই অস্বস্তি জাগে — একটি বড়ি খাও। সব মিলিয়ে যায়। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, কোনো হ্যাংওভার নেই, শুধু মসৃণ, উষ্ণ, নিরাপদ সুখ। হাক্সলি এটা কল্পনা করেছিলেন ১৯৩২ সালে। নব্বই বছর পরে আমরা তাকিয়ে দেখি — Soma তৈরি হয়ে গেছে, শুধু একটি নয়, অনেকগুলো রূপে। স্মার্টফোনের স্ক্রিন Soma। অবিরাম streaming Soma। সোশ্যাল মিডিয়ার অফুরন্ত scroll Soma। প্রতিটি notification একটি ছোট্ট dopamine-এর ঢেউ, প্রতিটি like একটি ক্ষণিক উষ্ণতা। মস্তিষ্ক পুরস্কারের প্রত্যাশায় বারবার ফিরে যায়, ঠিক যেভাবে ক্যাসিনোর slot machine-এর সামনে বসা মানুষ জানে সে হারছে, তবু টান দিতে থাকে। কারণ হয়তো এবার। হয়তো এই একবার।

    কিন্তু এই Soma-র সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক এটা নয় যে এটা আসক্তি তৈরি করে। ভয়ঙ্কর দিক হলো এটা প্রশ্ন করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেয়। একজন মানুষ যখন সবসময় বিনোদিত, যখন প্রতিটি অস্বস্তির মুহূর্তে তার হাতে একটি স্ক্রিন আছে যা তাকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারে — সে কখনো নিজের সাথে বসতে শেখে না। এবং নিজের সাথে না বসলে, নিজেকে না জানলে, প্রশ্ন জন্মায় না। আর প্রশ্ন না জন্মালে উত্তর খোঁজার দরকার পড়ে না। এই শূন্যতাটাই শাসকের সবচেয়ে বড় উপহার।

    রোমান সম্রাটরা একটি নীতি জানতেন — Bread and Circuses। জনগণকে খাবার দাও, তামাশা দাও। তারা কখনো সিনেটের দিকে চোখ তুলবে না। আজকে এই নীতি অনেক বেশি পরিশীলিত। IPL চলছে, World Cup চলছে, reality show চলছে, celebrity scandal চলছে — এর মাঝে কোথাও গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস হয়ে যায়, নীতি পরিবর্তন হয়, ক্ষমতা হাতবদল হয়। কিন্তু কেউ টের পায় না। কেউ টের পেতে চায়ও না, কারণ টের পেলে অস্বস্তি লাগবে, এবং অস্বস্তি লাগলে Soma খেতে হবে — মানে আরেকটি episode দেখতে হবে।

    হাক্সলি আরেকটি জিনিস দেখেছিলেন যা আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই। তিনি দেখেছিলেন ভাষার সংকোচন। জর্জ অরওয়েল বলেছিলেন Newspeak-এর কথা — ইচ্ছাকৃতভাবে ভাষা ছোট করো, মানুষের চিন্তা ছোট হয়ে যাবে। কারণ আমরা যে ভাষায় কথা বলি, সেই ভাষায়ই ভাবি। যদি বিপ্লবের কথা বলার শব্দ না থাকে, তাহলে বিপ্লবের চিন্তাও আসে না। আজকে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভাষা ছোট করছে না — কিন্তু ভাষা ছোট হয়ে যাচ্ছে নিজে থেকেই। ২৮০ character-এ মত প্রকাশ, meme-এ জটিল রাজনীতি বোঝানো, "vibe" আর "slay" দিয়ে অনুভূতি প্রকাশ — এই ভাষায় দস্তয়েভস্কি লেখা যায় না, রবীন্দ্রনাথ লেখা যায় না, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — এই ভাষায় ক্ষমতার বিরুদ্ধে দীর্ঘ, যুক্তিনির্ভর প্রতিরোধও গড়া যায় না।

    যেমন বাংলাদেশে প্রমিত ভাষাকে বাতিল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ধর্মভিত্তিক ও আঞ্চলিক উচ্চারণযুক্ত একটি খিচুড়ি ভাষা প্রচলনের উদ্যোগ রয়েছে। এভাবে আমরা আমাদের সমৃদ্ধ ভাষা সম্পদ হারাতে বসেছি। আমাদের ভাবনার জগতটাও ছোট হয়ে যাচ্ছে। মৌলবাদের দাসে পরিণত করানো হচ্ছে।

    এর সাথে যুক্ত হয়েছে একাকীত্বের এক অদ্ভুত মহামারি। হাক্সলির সমাজে গভীর সম্পর্ক নিষিদ্ধ ছিল, কারণ গভীর সম্পর্ক মানুষকে জাগিয়ে দেয়। দুজন মানুষ যখন সত্যিকারের কাছাকাছি আসে, তখন তারা একে অপরকে প্রশ্ন করতে শেখায়, ভাবতে শেখায়, অনুভব করতে শেখায়। আজকে সম্পর্ক নিষিদ্ধ নয় — কিন্তু গভীরতা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। হাজার follower আছে কিন্তু রাত তিনটেয় ফোন করার মানুষ নেই। প্রতিদিন content দেখছ কিন্তু কেউ তোমাকে সত্যিকারের জানে না। এই একা একা থাকাটা যদি বেদনাদায়ক হতো, তাহলে মানুষ হয়তো বেরিয়ে আসত। কিন্তু হাক্সলির Soma এখানেও কাজ করছে — একাকীত্বের বেদনাটুকুও screen দিয়ে ভরাট হয়ে যায়। ফলে একা মানুষ প্রশ্ন করার বদলে scroll করে।

    Noam Chomsky এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে বলেছেন Manufactured Consent — তৈরি করা সম্মতি। সবচেয়ে কার্যকর শাসন সেটা নয় যেখানে মানুষকে বাধ্য করা হয়, বরং সেটা যেখানে মানুষ স্বেচ্ছায় সম্মতি দেয়। এবং সে মনে করে এটা তার নিজের সিদ্ধান্ত। তুমি কোন দলকে সমর্থন করছ, কোন পণ্য কিনছ, কোন মানুষকে ভালোবাসছ, কোন স্বপ্ন দেখছ — কতটুকু সত্যিই তোমার, আর কতটুকু তোমার মধ্যে বিজ্ঞাপন, অ্যালগরিদম, সামাজিক চাপ ঢেলে দিয়েছে? এই প্রশ্নটি অস্বস্তিকর। এবং ঠিক সেই কারণেই বেশিরভাগ মানুষ এই প্রশ্নটি করে না।

    হাক্সলি কিন্তু নিরাশাবাদী ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন মুক্তির প্রথম পদক্ষেপ হলো সচেতনতা। "আমাকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে" — এটা বোঝার মুহূর্তেই শৃঙ্খলে প্রথম ফাটল ধরে। এরপর আসে নীরবতার সাধনা। Noise থেকে সরে এসে নিজের সাথে বসা — এটা আজকের পৃথিবীতে বিপ্লবী কাজ। গভীর একটি বই পড়া, একটি সম্পর্ককে সময় দেওয়া, অস্বস্তিকে পালিয়ে না গিয়ে মুখোমুখি বসা — এগুলো ছোট মনে হয়, কিন্তু এগুলোই Soma-র বিরুদ্ধে প্রতিরোধ।

    হাক্সলির সবচেয়ে গভীর কথা তাই এটা নয় যে সভ্যতা ধ্বংস হবে। তাঁর সবচেয়ে গভীর কথা হলো — সভ্যতা ধ্বংস হতে পারে হাসিমুখে, উৎসবের আলোয়, স্বেচ্ছায়। এবং যে মানুষ সত্যিকারের জেগে থাকে, সে সবসময় একটু বেমানান হয়। একটু অস্বস্তিকর। একটু কম "fun"। কিন্তু এই বেমানান মানুষগুলোই — যারা screen বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকায়, যারা প্রশ্ন করে, যারা গভীরতা খোঁজে — তারাই সভ্যতার শেষ আশা।

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে প্রতিক্রিয়া দিন