এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পরিবর্তন

    Swapan Chakraborty লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৭ মে ২০২৪ | ৯৩ বার পঠিত
  • ১৯৭৬ সাল । প্রথম বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষা। নবম, দশম, একাদশ শ্রেণীর সমন্বয়ে যে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা বিগত বেশ কিছু বছর থেকে পশ্চিম বঙ্গের ছাত্রছাত্রীরা দিয়ে আসছিল, সেই পদ্ধতির পরিবর্তনের প্রথম বছর ছিল ১৯৭৬ সাল। নবম তথা দশম শ্রেণীর পাঠের উপর ভিত্তি করে মাধ্যমিক এবং দু’ বছর পরে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর পঠনপাঠন কে উপজীব্য করে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা।মোট আটশ নম্বরের ওপর ভিত্তি করে মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়েছিল।সাধারণ ভাবে বাংলা, ইংরাজী, ভূগোল, ইতিহাস, অঙ্ক, ভৌত বিজ্ঞান, জীবন বিজ্ঞান এবং কারিগরী বিদ্যা। প্রতিটিতেই একশত করে নম্বর। আর ছিল একশ নম্বরের অতিরিক্ত যে কোন একটি বিষয় যার থেকে চৌত্রিশ নম্বর বাদ দিয়ে সর্বমোট প্রাপ্ত নম্বরের সঙ্গে যোগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শতকরা সর্বমোট প্রাপ্ত নম্বরটি ঐ ৮০০ নম্বরের উপরের ভিত্তি করেই নির্ধারণ করা হবে - এমনই ঠিক করা হয়েছিল।

    সুবীর সেই বছর অর্থাৎ ১৯৭৬ সালের প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেছিল। যে পরীক্ষা তার জীবনে এনেছিল এক আমূল পরিবর্তন। আজ সেই পরিবর্তনেরই কাহিনী।

    প্রথম বছরের মাধ্যমিক। এক পুরাতন পদ্ধতি থেকে নতুন পদ্ধতিতে উত্তরণ।ফলতঃ সারা পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত বিদ্যালয়েই এক চাপা উত্তেজনা। সুবীরদের বিদ্যালয়ও তার ব্যতিক্রম ছিল না। এক কঠোর শৃঙ্খলার মাধ্যমে ছাত্রদের সে বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসবার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়েছিল।

    মাধ্যমিক পরীক্ষার ‘ ফর্ম’ পূরণের প্রক্রিয়া চলছে। একটা বিরাট হলঘরে মোট বাষট্টি জন ছাত্র ‘ ফর্ম’ পূরণ করছিল। একেবারে সূচীভেদ্য নিঃস্তব্ধতা।কারো মুখে সামান্যতম শব্দটিও নেই । ইংরাজী তথা ভূগোলের শিক্ষক সদানন্দ ‘স্যার’ আমাদেরকে সাহায্য করছিলেন। প্রথম সারিতে নিজের নাম, পরের সারিতে অভিভাবকের নাম - ইত্যাদি ইত্যাদি। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে ‘স্যার’ বলে উঠলেন - “ কেউ কিন্তু বাবার নামের আগে শ্রী বা শ্রীযুক্ত লিখবি না । “

    ‘স্যারের’ নির্দেশমতই লিখছিল সকলে । এমন সময় মাথায় একটা ছোট্ট করে গাঁট্টা। সুবীর দেখল স্যার পিছনে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। “ কিরে হতভাগা, বললাম না যে বাবার নামের আগে শ্রী লিখবি না ।” সে মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বললাম - “ বারে, আমি বাবার নামের আগে ‘শ্রী’ লিখলাম কোথায় !” সদানন্দ স্যার এবার আরো ক্ষিপ্ত।
    “লিখিস নি ! তবে এটা কি !” এই বলে আমার ফর্মটায় যেখানে বাবার নাম লিখেছি সেখানে অঙ্গুলী নির্দেশ করলেন। সুবীর বললো  - “ বারে, আমি কি করবো ! আমার বাবার নাম ত’ শ্রীকান্ত।” স্যার যেন একটু লজ্জা পেলেন। তারপর একটু সামলে নিয়ে বললেন - “ ও, হ্যাঁ, তাইতো । একেবারে ভুলে গেছিলাম।” বলে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে পড়লেন। এরপর নির্বিঘ্নেই “ ফর্ম ফিলাপ” হয়ে গেল। কিন্তু ছাত্রদের তখনো বাড়ী যাবার অনুমতি মিলল না। তিনি, কোন ছাত্র  কেমন পড়াশুনা করছে তার একটা ছোটখাট পরীক্ষা নিতে শুরু করলেন। অবশ্য লিখিত নয়, মৌখিক।

    আগেই বলেছি সদানন্দ স্যার ছিলেন ইংরাজী এবং ভূগোলের শিক্ষক। দুটি বিষয়েই তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। তিনি ছাত্রদেরকে ভূগোল এবং ইংরাজী বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে শুরু করলেন। ক্লাসের ‘ফার্স্ট বয়’ সাত্যকিকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন - সাত্যকি , হরিয়ানা ভারতবর্ষের কোনদিকে অবস্থিত রে ! সাত্যকি বললো - উত্তরদিকে স্যার । স্যার বললেন - বাঃ , বেশ বেশ। আচ্ছা বলতো উত্তর গোলার্ধ্বের মহাদেশগুলি কি কি ? সাত্যকি বললো - আফ্রিকা ও এশিয়ার অধিকাংশ, উত্তর আমেরিকার, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ। স্যার মনে হল সাত্যকির ওপর খুব সন্তুষ্ট হলেন। এবার তিনি বললেন - “আচ্ছা, একটা ইংরাজী অনুবাদ কর তো। সে স্টেশনে পৌঁছনোর সাথে সাথে ট্রেনটি ছেড়ে গেল।” সাত্যকি বললে - “The train had left as soon as he reached the station.” স্যার খুব খুশী হয়ে সাত্যকি পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন - “বস, বস” । 

    এবার এদিক ওদিক দেখে তিনি সজলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। সজলও পড়াশুনায় বেশ ভাল ছিল। তিনি বললেন - “ আচ্ছা সজল, মধ্যপ্রদেশ ত’ ভারতের মধ্যভাগে, তাহলে পণ্ডিচেরী কোথায় ! সজল বেশ সপ্রতিভ ভঙ্গিতে উত্তর দিল - দক্ষিণে স্যার। তিনি বললেন- বেশ, বেশ । আচ্ছা বলতো দক্ষিণ গোলার্ধ্বের মহাদেশগুলি কি কি ? পাঁচটি মহাদেশ স্যার। এন্টার্কটিকা,অস্ট্রেলিয়া, সেই সাথে আফ্রিকা,এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কিছু অংশ। স্যার বললেন - “খুব ভাল, এমন করে মন দিয়ে লেখাপড়া করে যাবি। এবার একটি অনুবাদ করতো । তাকে আগামীকাল দুপুর বারটার মধ্যে বর্ধমান পৌঁছতে হবে । “ সজল কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললে - “ He must have to reach Burdwan within 12 noon, tomorrow.” স্যার বললেন- বাঃ, একেবার ঠিক বলেছিল। বস।” এমনভাবে তিনি আরো কয়েকটি ছাত্রকে তাঁর প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করলেন এবং মাঝে মাঝে তাঁর মোক্ষম অস্ত্রদুটিরও প্রয়োগেও ব্যস্ত হয়ে পড়ছিলেন। বস্তুত সদানন্দ স্যারের দুটো মোক্ষম অস্ত্র ছিল। মুষ্টিযোগ অর্থাৎ মাথায়  গাঁট্টা মারা এবং যষ্টিমধু অর্থাৎ লিকলিকে বেতের মাথায় এক শক্ত পিচের ডেলা-যেটা দিয়ে মাথায় কোন একটা জায়গায় মারলে সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আলুর মত ফুলে উঠে একটা আব গজিয়ে উঠত। কত ছাত্র যে কতবার এই দুটো অস্ত্রের আঘাতে জর্জরিত হয়েছি ক্লাসে, তার ইয়ত্তা নেই। আজকাল অবশ্য এসব শাস্তি উঠেই গেছে, এখন ছাত্রদের শরীরে আঘাত করলে শিক্ষকদের শাস্তি হয়। তখন এসব বিধি ছিল না। আর এসব শাস্তি মাথা পেতে নিয়েই সবাই দেখতে দেখতে বড় হয়ে উঠত।

    যাই হোক, এবার তিনি প্রশ্নবাণটা কাকে নিক্ষেপ করবেন সেটা ভেবে সুবীরের বেশ ভয় করছিল। সে মাথা নিচু করে বসেছিল, তবে একই সাথে আড়চোখে স্যারের গতিবিধি নিরূপণ করার চেষ্টা করছিল। 

    আর যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে হয়। সেদিন স্যার যেন অবশেষে সুবীরকেই বেছে রেখেছিলেন।তাই ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বেতটা উঁচিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন - “ কি খোকন, পড়াশুনা কেমন চলছে। বল্ তো পশ্চিমবঙ্গ ভারতের মানচিত্রের কোনদিকে অবস্থিত” ! বলেই তার দিকে তাঁর সেই অমোঘ অস্ত্র যষ্টিমধুটি তুলে ধরলেন। যেন তিনি নিশ্চিতই যে সে ভুল উত্তর দেবে আর সঙ্গেসঙ্গেই প্রহারেণ ধনন্জয়। অবশ্য তাঁকে দোষ দিয়ে খুব একটা লাভ ছিল না-সুবীর জানত। কারণ সে ক্লাসের একেবারে শেষের সারির ছাত্র ছিল আর ক্লাসে তাঁর কোন প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া সুবীরের পক্ষে প্রায়শই সম্ভব হতো না। সেই জন্য হয়ত ব্যাঙ্গ করে স্যার তাকে খোকন নামে সম্বোধন করতেন। তবু সে সাহস করে বলল - “ আমাকে আগে বলতে দিন স্যার, তারপর না হয় মারবেন।” তিনি বেতটা নামিয়ে সুবীরকে বুঝি একটু ব্যঙ্গ করেই বললেন - তবে বলে ফেলুন মহাশয়।” সারা ক্লাস সুবীরের দিকে তাকিয়ে আছে, বুঝলাম অনেকে মুচকি মুচকি হাসছেও। 

    সুবীর বললো  - “পূর্বদিকে স্যার।” সদানন্দ স্যার কেমন থতমত খেয়ে গেলেন। পরক্ষণেই বললেন - “ তাহলে পশ্চিমবঙ্গ নাম হলো কেন !”  সে উত্তর দিল  - “ভারত স্বাধীন হবার পরে বাংলা দুভাগ হয়ে যায়। একভাগ চলে যায় পাকিস্তানে, যার আগে নাম ছিল পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান । ১৯৭১ সালে স্বাধীন হবার পরে তার নতুন নাম হয় বাংলাদেশ। আর পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশের পশ্চিমে আমাদের রাজ্য অবস্থিত। তাই আমাদের রাজ্যের নাম পশ্চিম বাংলা।” স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন - “ বাঃ , তাহলে একটু আধটু পড়াশুনা করছিস দেখছি। আচ্ছা ভারতের পশ্চিমে কোন কোন রাজ্য অবস্থিত ! সুবীর বললে  - মহারাষ্ট্র, গুজরাট।“আর পূর্ব আর পশ্চিম গোলার্ধে পৃথিবীর কোন কোন মহাদেশ অবস্থিত ?” স্যারের প্রশ্নবাণ যেন থামছে না। এবারেও কিন্তু সুবীর ঘাবড়ে গেল না। সে উত্তর দিল -  “এশিয়া আর আমেরিকার কিছু দেশ।”  তার উত্তর স্যারকে যেন অবাক করে দিল।

    অবশেষে তিনি ভূগোল ছেড়ে এবার ইংরেজীতে প্রবেশ করলেন। বললেন - “একটা ইংরাজী অনুবাদ কর-গত তিন দিন ধরে কলকাতা এবং সংলগ্ন এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।”  সুবীর যেন আজ প্রতিজ্ঞা করে এসেছিল যে স্যারকে কোনমতেই তার ওপরে তাঁর অস্ত্র প্রয়োগ করতে দেবে না । অতএব এবারেও সে সপ্রতিভ ভাবে বললো  - “ It has been raining cats and dogs for the last three days in Calcutta and its adjacent areas.” স্যার মনে মনে হয়ত খুশী হলেন,কিন্তু তাঁর প্রশ্নবাণ চলতেই থাকল।

    “আশি দিনে পৃথিবী ভ্রমণ করা অসম্ভব নয় - ইংরাজী কি হবে !” - স্যারএ বুঝি পণ করেছেন যতক্ষণ না তাঁর একটি অস্ত্র সুবীরের ওপর প্রয়োগ করছেন , ততক্ষন থামবেন না।  - “It is not impossible to travel the whole world in eighty days.” স্যার এবার সুবীরের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গিয়ে বললেন - “আচ্ছা ঐ গল্পটি কার লেখা জানিস ? “ - সে বললে - “ জানি স্যার।Around The World In Eighty Days’ গল্পটি ফরাসী লেখক Jules Verne-র লেখা।” স্যার আর কিছু বললেন না। সুবীরের মাথায় কিছুক্ষণ হাত রেখে তাকে  বসতে বলে সব ফর্মগুলি হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।  যাবার সময় ইশারায় সকলকে বাড়ী চলে যেতে বললেন। 

    এরপর যা হয়। বেশ কয়েকজন বন্ধু যেমন সৌগত, উৎপল, মৃণ্ময় সুবীরকে ঘিরে ধরে  অবাক হয়ে তারা আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। সে শুধালো - “ কি হল রে, তোরা এমন করে আমার দিকে তাকিয়ে আছিস কেন ! “ উৎপল বললো - “ কি, ছুপে রুস্তম , তুই ত’ খুব পড়াশুনা করছিস !” সুবীর বললে - “তা একটু করছি ভাই। আর এবার আমাদের স্কুলে সব থেকে বেশী নম্বর যদি কেউ পায়, সেটা আমিই পাব ।” ওরা যেন সুবীরের কথাটা ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারল না। এই কিছুদিন আগেও যে ছেলেটা প্রতিটি পরীক্ষায় পাশ করতে গিয়ে হিমশিম খেত, এমনকি বিগত শেষ পরীক্ষায় যার ‘রেজাল্ট’ ছিল অত্যন্ত খারাপ, সে কিনা বলছে যে সে আসন্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় ‘রেকর্ড’ নম্বর পাবে !  ‘ক্লাসের ফার্স্ট বয়’ সাত্যকি তার দিকে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। 

    সুবীর যখন ‘ক্লাসরুম’ থেকে বেরিয়ে আসছিল , তখন হঠাৎ তাদের ‘স্কুলের’ পিওন অসিতদা তাকে কি বললেন যে সদানন্দ ’স্যার টিচার্স রুমে’ তার জন্য অপেক্ষা করছেন। আবার কি জিজ্ঞাসা করবেন কে জানে । দুরুদুরু বক্ষে সুবীর তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তিনি বললেন - “খোকন,তুই আমাকে আজ অবাক করে দিয়েছিস।” সুবীর তাঁকে প্রণাম করে বললো - “ স্যার, আশীর্বাদ করুন, আমি যেন খুব ভাল ফলাফল করতে পারি মাধ্যমিকে ।” তিনি কিছু বলতে পারলেন না। তাকে জড়িয়ে ধরে প্রায় কেঁদে ফেলে বললেন - “ যা, বাড়ী যা, মন দিয়ে পড়, আমার আশীর্বাদ সব সময় তোর সাথে আছে। “ আরো দুচার জন স্যার যাঁরা ‘টিচার্স রুমে’ ছিলেন, তাঁরাও যেন কেমন অবাক চোখে সুবীরকে দেখছিলেন।

    ‘টেস্ট’ এবং মাধ্যমিকের মধ্যে যে কমাসের ব্যবধান ছিল, সেই সময়টা সুবীর সত্যিই খুব মন দিয়ে পড়াশুনা করেছিল। বলতে গেলে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা প্রতিদিন পড়ত। যে ছেলের লেখাপড়া করতে একদম ভালই লাগত না, তার এই পরিবর্তন দেখে তার মা, বাবা আর দিদিও অবাক হয়ে গিয়েছিল। এমনকি তাঁরা তাকে এতক্ষণ ধরে একনাগাড়ে পড়াশুনা করতে নিষেধ করলেও সুবীর এই বলে সকলকে আশ্বস্ত করেছিলাম যে তার শরীর সম্পূর্ণ  ঠিক আছে। পড়াশুনা করতে তার কোনই অসুবিধা হচ্ছে না।

    মাধ্যমিক পরীক্ষা হয়ে গেল। পরীক্ষা সুবীরের খুবই ভাল হয়েছিল। কিন্তু এত ভাল হবে সে ভাবতে পারিনি। ৮০০র মধ্যে ৭৮২ নম্বর পেয়ে সে জেলার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। সারা রাজ্যের মধ্যেও সে দশজনের মধ্যে স্থান করে নিতে পেরেছিল। তাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয় সাত্যকি পেয়েছিল ৭৪৩ নম্বর। খবরটা পেয়ে প্রথমে যেন কেউ বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি। তারপর ত’ বাড়ীর সবাই মিলে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। ধীরে ধীরে সারা গ্রাম সুবীরদের বাড়ীতে বুঝি ভেঙে পড়েছিল। স্কুলের হেডস্যার থেকে শুরু করে সব শিক্ষকরা একেবারে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিলেন। আর সদানন্দ স্যারের সে কি কান্না । বাবা , মা এমনকি কঠোর কোমল হেডস্যারকেও সুবীর দেখেছিল চোখের জল মুছতে। সে বুঝেছিল যে সেটা ছিল আনন্দাশ্রু । সব মিলিয়ে যেন সবার ওপরে খুশীর ঝরনা ঝরে পড়েছিল। ভাল হবার যে এত আনন্দ, সেদিনই সেটা প্রথমই উপলব্ধি করতে পেরেছিল সুবীর।

    এর দুবছর পর উচ্চমাধ্যমিকেও সে খুব ভাল নম্বর পেয়ে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে প্রথম দশজনের একজন হয়েছিল। জয়েন্টের ডাক্তারী পরীক্ষায়ও খুব ভাল ফলাফল করে বিশেষ বৃত্তি নিয়ে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে সেখানে থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ডাক্তারীর চুড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। সরকারী এবং বেসরকারী বিভিন্ন বৃত্তিলাভের ফলে তার ডাক্তারী পড়াশুনায় অর্থ বিশেষ কোন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারেনি।নয়ত তার বাবার একার সামান্য উপার্জনে তা কখনোই সম্ভব হতো না। 

    এরপর নতুন দিল্লীর ‘অল ইণ্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্স’ বা সংক্ষেপ ‘এইমস্’ থেকে উচ্চতর ডাক্তারী ‘ডিগ্রী’ লাভ করে বিশেষ সরকারী আনুকূল্যে সে বিদেশ থেকে হৃদরোগের ওপর প্রভূত দক্ষতা অর্জন করে এবং দেশে ফিরে এসে দেশের এক অন্যতম বিখ্যাত সরকারী হাসপাতালে যোগদান করে। বর্তমানে সে ঐ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান। কেবল দেশেই নয়, বিদেশেও একজন প্রথিতযশা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসাবে সুবীর চট্টোপাধ্যায় আজ যথেষ্ট খ্যাতিমান।দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আজ তাঁদের রোগ নিরাময়ের জন্য তার কাছে ছুটে আসেন। 

    কিন্তু কিভাবে এই অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল। যে সুবীর কিনা সর্বদা নীচের সারির ছাত্রদের মধ্যে সকলের নীচে থাকত, সে কিনা হল একেবারে প্রথম সারির অনেকের উপরে ! কেমন করে সেটা সম্ভব হলো ! তার  নিজেরও যেন সব গল্পকথা মনে হয়। সত্যি গল্পকথাই বটে। সেই গল্প হলেও সত্যি কাহিনীর সূত্রপাত আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগের এক মনোরম শীতের সন্ধ্যা, যে সন্ধ্যার ঘটনা তার মনকে আজো নাড়া দেয়, যে ঘটনার কথা তার একজন ঘনিষ্ঠ পরম বন্ধু আমি অর্থাৎ এই গল্পকার প্রথম থেকেই জানতাম। আজ নয় তার মুখ থেকেই সেই ইতিহাসটা শুনে নেওয়া যাক ।

    “নভেম্বর মাস। দুর্গাপুজা, কালীপুজা, ভাইফোঁটা সব উৎসব শেষে হয়ে গেছে। দুর্গাপূজোর আগেই আমাদের মাধ্যমিকের ‘টেস্ট’ হয়ে গিয়েছিল। সেদিন ছিল শুক্রবার। ‘ টেস্টের রেজাল্ট’ বেরুবে। সকাল সকালই স্কুলে চলে গিয়েছিলাম। বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ অসিতদা দেখলাম ‘ নোটিস বোর্ডে’  সব নাম, রোল নম্বর এবং সেই অনুযায়ী পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের তালিকাটা আটকে দিয়ে গেলেন। যারা মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবার যোগ্যতা অর্জন করেছে সেই সকল উত্তীর্ণ ছাত্রদের নাম। আমরা সকলে এর ওর ঘাড়ের ওপর উঠে নিজের নিজের নাম দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম আমি ছাড়া আর প্রায় সবারই নাম রয়েছে তালিকায়। দু একজনের নাম হয়ত নেই আর সেই দুএকজনের মধ্যে আমিও আছি বুঝতে পারলাম, কারণ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আমার নামটা তালিকায় দেখতে পেলাম না। খুবই হতাশ হয়ে পড়লাম। অনুশোচনায় চোখে জল এসে গেল। কেন ভাল করে পড়াশুনা করিনি ! ধীরে ধীরে নিজেকে সকলের থেকে সরিয়ে নিয়ে একটু দূরে চলে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ভাবতে লাগলাম যে কি করে বাড়িতে বলবো ! অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করলাম যে বাড়ী আর ফিরব না। যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে চলে যাব। অল্প বয়স, ভালমন্দ বিচার করার কতটুকুই বা ক্ষমতা ছিল তখন। 

    এমন সময়ে দেখলাম আমাদের বাংলার শিক্ষক উত্তম ‘স্যার’ আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছেন। উত্তম ‘স্যার’ কেন জানি না আমায় খুব স্নেহ করতেন। কাছে গেলে তিনি বললেন যে আমাদের হেডমাস্টারমশাই শশাঙ্ক ‘স্যার’ আমাকে তাঁর সঙ্গে এখনি দেখা করতে বলেছেন। আমি কম্পিত বক্ষে তাঁর ঘরের সামনে হাজির হলাম। পিওন অসিতদা আমাকে তাঁর ঘরে নিয়ে গেলেন।যেমন রাশভারী মানুষ, সেই রকম জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর ছিল তাঁর। তিনি আমার দিকে একবার আপাদমস্তক দেখে সেই গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠস্বরে বললেন - “ এখন আর চোখের জল ফেলে কি হবে ! পড়াশুনা ঠিকমত করিস না কেন? ঠিকমত লেখাপড়া করলে ত’ এমনটা হত না । যাক্, যা হবার হয়ে গেছে। এখন ভাল করে মন দিয়ে শোন। আগামীকাল বিকাল ঠিক পাঁচটার সময় বাবাকে নিয়ে আমার বাড়ীতে আসবি। তোর বাবার সাথে আমার বিশেষ দরকার আছে। যা, মন খারাপ করিস না , বাড়ী যা।”

    বাড়ী ফিরে এসে আমার ‘টেস্টে’ অনুতীর্ণ হবার খবর মাকে বললাম। মা চুপ করে রইলেন । তারপর শুধু বললেন - “হাত পা ধুয়ে খেতে বস।” আমি বললাম - “ আগামীকাল বিকাল ৫টার সময় বাবাকে নিয়ে হেডমাস্টারমশাই তাঁর বাডী যেতে বলেছেন। “ মা এবার বললেন - কি করিস্ বল তো খোকন ! তোর বাবাকে কতটা ছোট হতে হবে বল তো।” বলতে বলতে মায়ের দুচোখ জলে ভরে গেল। দিদি কলেজ থেকে ফিরে শুনে প্রথমে আমাকে খানিকটা বকাঝকা করলো। তারপর মায়ের কথারই প্রতিধ্বনি করে বললে - “ভাইটি, একবার বাবার অপমানের কথাটা ভাবলি না। “
    এরকম কথা এর আগেও আমি অনেকবার শুনেছি, তবে গায়ে মাখিনি। কিন্তু এবারে যেন সত্যিই আমারও খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমি চুপ করে রইলাম । কারণ আমার কিছু বলার ছিল না। আমি ত’ অপরাধীই । রাত্রে বাবা বাড়ী ফিরলে মা বাবাকে সব বললেন। বাবা কিন্তু আমাকে সামান্য তিরস্কারটুকুও করলেন না। 

    পরদিন শনিবার গুরু নানকের জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে বাবার অফিসে ছুটি ছিল। হেডমাস্টারমশায়ের বাড়ী ছিল আমাদের বাড়ী থেকে মাইল খানেক দূর। তখন অক্টোবরের শেষ থেকেই একটি ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব অনুভূত হত। আর তারপর আমরা ত’ গ্রামে থাকতাম । অল্প অল্প শীতের বিকালে বাবার হাত ধরে ফাঁকা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে হেডমাস্টারমশায় শশাংকদেব ভট্টাচার্যর বাড়িতে যখন পৌঁছলাম, তখনও ঘড়িতে ঠিক পাঁচটা । আমাদের দেখে হেডমাস্টারমশাই তাঁর বৈঠকখানায় বসতে দিয়ে একটু অপেক্ষা করতে বললেন। কিছুক্ষণ বাদে তিনি আমার টেস্টের খাতাগুলি নিয়ে সেখানে হাজির হলেন। তারপর বাবাকে বললেন - “আপনি খাতাগুলো দেখুন । খোকন এত ভুল লিখেছে যা নিয়ে সত্যিই কোন আলোচনা চলে না। সহজ সহজ অঙ্কগুলোও করতে পারে নি। যদিও প্রতিটি বিষয়েই ও কোনক্রমে কৃতকার্য হয়েছে। কিন্তু নম্বর দেখুন ৩৫ থেকে ৩৭এর মধ্যে। তাই আমরা সকল শিক্ষক এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে এই বছরটা ও ভাল করে পড়াশুনা করে আগামী বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসুক। বুঝতেই ত’ পারছেন যে প্রথম বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষা । বিদ্যালয়ের একটা সম্মান জড়িত আছে। আপনি কি বলেন ? “

    আমার বাবা চিরকালই খুব শান্ত প্রকৃতির। কোনদিন আমাকে বা দিদিকে বকাঝকা দূরে থাক, জোরগলায় একটি কথাও বলে নি আমাদের সাথে। হেডমাস্টারমশায়ের কথা শুনে বাবা একবার আমার দিকে তাকালো, কি করুণ দৃষ্টি। তারপর স্যারকে বাবা বললো - “ আমি খাতা দেখে কি করবো , স্যার। আপনারা যা সিদ্ধান্তে এসেছেন, তার বিরুদ্ধ আমার কোন অনুযোগ নেই। তবে একটা আবেদন ছিল।” শশাংক স্যার বললেন - “বলুন না।কোন অসুবিধা নেই।” বাবা বললেন - “দেখুন স্যার,আমার ছেলেমেয়ে দুটিকে মানুষ করার জন্য আমি এবং খোকনের মা উদয়াস্ত পরিশ্রম করি। এমনিতেই আমার আর্থিক অবস্থা খুব একটা স্বচ্ছল নয়। ছেলেটার জন্য কোন গৃহশিক্ষকের ব্যবস্থাও করতে পারি নি। তাই একবছর যদি ছেলেটা পিছিয়ে যায়, তাহলে সেটা আমাদের পক্ষে হবে এক চরম আঘাত। আর ও যখন সব বিষয়ে পাশ করেছে তখন স্যার আপনার কাছে আমি মিনতি করছি যে ওকে যদি দয়া করে একটা সুযোগ দেন…।” এই বলে সামান্য চুপ করে থেকে বাবা আবার বললো -  “আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যে এই কটা মাস যাতে ও খুব মন দিয়ে পড়াশুনা করে, খুব পরিশ্রম করে সেটা আমরা নিশ্চয়ই দেখবো।“ এই বলে বাবা হেডস্যারের হাতদুটো জড়িয়ে ধরলো। 

    হেডমাস্টারমশাই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। অবশেষে হয়ত খানিক চিন্তা করার পর তিনি বললেন - “ ঠিক আছে, আপনি যখন এত করে বলছেন তখন আমি সেই ব্যবস্থাই করছি। তবে দেখবেন, আমার মানটা যেন থাকে।” বাবা স্যারের হাতদুটো আবার চেপে ধরলো। আমি হেডমাস্টারমশাইকে প্রণাম করে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাবার হাত ধরে বাড়ীর পথে পা বাড়ালাম। তিনি আমায় অনেক আশীর্বাদ করে বললেন, “ দেখিস বাবা, যেন আমার আর তোর বাবামায়ের কোন অসম্মান না হয়”।আমি কোন কথা বলতে পারি নি, কেবল নীরবে মাথা নেড়েছিলাম।

    কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে গেছিল। হেডমাস্টারমশায়ের বাড়ী থেকে কিছুদূর আসার পর আমার মনে হল, বাবা যেন কেমন কাঁপছেন। তারপর বুঝি আমার পায়ে দুফোঁটা জল পড়লো। আকাশ ত’ পরিস্কার, নীল। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় চারিদিক উদ্ভাসিত। তাহলে ! এবার আমি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। বাবা কাঁদছে । আর বাবার সেই চোখের জলের কয়েক ফোঁটাই আমার পায়ের ওপরে এসে পড়েছে। বাবাকে কোনদিন কাঁদতে দেখিনি। তাই বাবার চোখে জল দেখে আমার বুকের মধ্যেটা কেমন তোলপাড় করে উঠলো । নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারলাম না। রাস্তার মধ্যেই বাবার পায়ে মাথা রেখে প্রতিজ্ঞা করলাম যে আমি ভাল ছেলে হব। বাবা আমাকে হাত ধরে তুলে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললো - “ দেখ বাবা, তোর আর তোর দিদিকে বড় করার জন্য আমি আর তোর মা দিনরাত এককরে পরিশ্রম করে যাচ্ছি। আমি বাইরে আর তোর মা ঘরে। অফিসে প্রতিদিন একঘণ্টা বেশী কাজ মানে ‘ওভারটাইম’ করে আমি শিয়ালদহ স্টেশনের কাছে একটা ছাপাখানায় প্রতিদিন দুঘণ্টা ‘ প্রুফ রিডারের’ কাজ করি। তারপর রাত নটার ট্রেন ধরে বাড়ী ফিরি। পরের দিন আবার সকাল সাতটায় বেরিয়ে যাই। তোর মাকে এজন্য যেমন অনেক রাত অবধি জেগে থাকতে হয় , তেমনই খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হয়। সন্তান হিসাবে আমাদের প্রতি কি তোর কোন কর্তব্য নেই ! তোর কি আমাদের জন্য এতটুকু মায়া হয় না রে ! কই তোর দিদিকে ত’ কিছু বলতে হয় না ! আমরা ত’ তোকে কোন কষ্ট দিই নি কোনদিন ! বরং সাধ্যের অতিরিক্ত করার চেষ্টা করি। তবে তুই কেন আমাদের এত কষ্ট দিস বাবা ! তোর জন্যে আজ মাথা কতটা হেঁট হল বলতো ! কথা দে, এবার থেকে সত্যিকারের ভাল ছেলে হবি। “ আমি বললাম - “ হ্যাঁ, বাবা, তোমায় আজ কথা দিলাম, আমার জন্য তোমাদের আর কোনদিন কষ্ট পেতে হবে না। বাকীটা ইতিহাস যে ইতিহাস আজ সকলেরই মোটামুটি জানা।

    আজ জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি। এখন জীবনে সাফল্য আমার ধরাছোঁয়ার মধ্যে। একজন প্রথিতযশা সফল চিকিৎসক হিসাবে আজ দেশজোড়া আমার খ্যাতি। বিদেশেও আমার যথেষ্ট কদর। কিন্তু আজও কোনো অন্ধকার ঘরে একা একা বসে থাকলে বাবার সেই করুণ কণ্ঠস্বর আমার কানে ভেসে আসে - ‘তুই কেন আমাদের এত কষ্ট দিস বাবা ! তোর জন্যে আজ মাথা কতটা হেঁট হল বলতো ! কথা দে, এবার থেকে সত্যিকারের ভাল ছেলে হবি।’

    মা - বাবাকে আমার জন্য আর কোনদিন কষ্ট পেতে হয় নি। আজ বাবা-মা সকলেই পরলোকে। কিন্তু আমার স্কুল এখনো সগৌরবে বিদ্যমান, যদিও সদানন্দ স্যার, উত্তম স্যার এঁরা কেউই আর ইহলোকে নেই। তবে এখনও নব্বই ঊর্ধ্ব বয়সেও যথেষ্ট শক্তসমর্থ আছেন আমাদের সময়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী শশাংকদেব ভট্টাচার্য্য। ছুটিতে যখন কলকাতায় যাই তখন তাঁর সাথে দেখা করি। তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে আসি। আর এই অপুত্রক গুরু এবং গুরুমায়ের চিকিৎসা সহ সকল দায়ভার আমি আজ নিজের কাঁধেই তুলে নিয়ে আমার জীবন সার্থক করেছি । বাবা মা নেই , কিন্তু তাঁরা ত’ আমার পিতৃমাতৃসম। ‘হেডস্যারের’ সাথে কথা বললেই সেই সন্ধ্যার দুর্লভ স্মৃতির রোমন্থনে আমি যেন নিজের আবেগকে আর সংবরণ করতে পারি না। 

    পূর্ণিমার চন্দ্রিমায় আলোকিত এক নির্জন রাস্তায় সেদিনের সন্ধ্যার ঘটনা আমার জীবনকে যেভাবে আলোকিত করেছিল, সেই আলোকের ঝরণাধারায় আমি যে আজো ভেসে চলেছি,তা স্বীকার করতে আমার কোনোই দ্বিধা নেই।” 

    সুবীরের মুখে তার পরিবর্তনের ইতিহাস কেমন লাগল আপনাদের জানি না, তবে সুবীরের সঙ্গে যখনই এই গল্পকারের মাঝে মাঝে সাক্ষাত হয়, তখনই তার জীবনের এই অভূতপূর্ব উত্তরণের কাহিনী মনকে যেন নাড়া দিয়ে সমগ্র হৃদয়কে আপ্লুত তথা আচ্ছন্ন করে তোলে।

    কবিগুরুর অমৃতের বাণীকে স্মরণ করে আমাদের সকলের জীবনের শ্রেষ্ঠগুরু বাবা মা এবং পরম গুরু শিক্ষক শিক্ষিকাদের  চরণে সশ্রদ্ধ প্রণতি জানিয়ে এই পরিবর্তনের আখ্যানে ইতি টানাই বোধ করি শ্রেয়স্কর হবে।

    আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও,
               এই অরুণ আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও।
    আজ নিখিলের আনন্দধারায় ধুইয়ে দাও,
              মনের কোণের সব দীনতা মলিনতা ধুইয়ে দাও।
    আমার  পরান-বীণায় ঘুমিয়ে আছে অমৃতগান,
                 তারে আনন্দের এই জাগরণী ছুঁই'য়ে দাও।
    —————
    সমাপ্ত।

    স্বপন চক্রবর্তী
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন