এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ঔরঙ্গজেবের অগ্রাধিকার 

    upal mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৩ মে ২০২৪ | ২২৪ বার পঠিত
  • গভীর রাত, শাজাহানাবাদের কেল্লায়  রাতের রাগ শেষ করেছেন খুশহাল খান ও বিসরাম, দুই কলাবন্ত। কায়দা করে, তাঁর সুর বিহ্বলতার সুযোগে বিখ্যাত  দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খানকে দারার মহল থেকে  ঔরঙ্গজেবের মহলে  পাঠানোর সাজিশে  লিপ্ত হতে,  শাজাহান দুজনকেই তাড়িয়ে দিয়েছিলেন দরবার থেকে । তখন অন্যরা গাইত কিন্তু তাতে কারুর আশ মিটত না , কোথায় সে গলা ? কোথায়  তানসেন ঘরানার কলাবন্ত  আর কোথায় অন্যরা  ? সুর হারিয়ে গিয়েছিল শাহী মহলের। ঔরঙ্গজেব বাদশাহ হয়েই আবার ফিরিয়ে এনেছেন  খুশহাল খান   ও তাঁর ভাই  বিসরামকে , তাঁদের সঙ্গে আছেন বীণ ও রবাব বাজিয়ে কলাবন্ত সারাস বীণ ও সুঘার সেন আর তাঁদের ঘরানার অন্যরা।  খুশহাল খানের বাবা কলাবন্ত  লাল ছিলেন মিয়াঁ তানসেনের যোগ্য উত্তরসূরি ।শিশু লালের গানে মুগ্ধ তানসেন ছেলে বিলাসের কাছে  সপেঁ দিলেন তাকে। বললেন, ''এ লেড়কা অনেকদূর যাবে। বাঘের বাচ্চা।  '' বিলাস গড়েপিটে নিলেন লালকে। পরে সেই লালের নিকাহ হয় কলাবন্ত বিলাসের মেয়ের সঙ্গে ।লালও  হলেন কলাবন্ত । সেই লালের ছেলে , তাঁর নিজের হাতে তৈরি খুশহাল খান, বিসরাম।  শাজাহান খুশহাল খানকে প্রধান গায়ক করেন , গুণসমুদ্র  উপাধি দিলেন তাঁকে আবার রাগের মাথায় তাড়িয়েও দিয়েছিলেন দু ভাইকেই  । এখন দেওয়ানি আম , দেওয়ানি খাস বা বাদশাহের নিজস্ব বিশ্রাম ঘর -গোসলখানা মেতে থাকে কলাবন্ত খুশহাল খানের মধ্য লয়ের ধ্রুপদের  সুরে সুরে, কখনও বা  বিসরামের  আলাপ  শোনা যায় তাম্বুরের তালে ।যতবার তাঁরা গান গাইবেন , মিয়াঁ তানসেন  ফিরে ফিরে আসেন । আজ সেই গান থেমে গেছে কখন।  গভীর রাত  পর্যন্ত ঔরঙ্গজেব পড়াশোনা করেন। ধর্মতত্ব আর বিচার বিধির বিষয়ে আগ্রহ তাঁর।পারস্যের কবিরাও তাঁকে মুগ্ধ করে ।জীবনে একবার সেই কাব্য বোধ তাঁকে সাকির কাছে নিয়ে গিয়েছিল , সেই  হীরা বাই জৈনাবাদীর গলায় ছিল গান আর তাঁর  পায়ের ঠমক সারা শরীরে বোল ও  তাল তুলেছিল শাহাজাদার। ওই অপূর্ব নর্তকীর শরীরে বোল ও  তাল বুরহানপুরের শাহী গোসলখানায় নেশা  ছড়িয়ে দিচ্ছিল । সেদিন নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়ছিলেন শাহাজাদা ঔরঙ্গজেব। যে নেশাগ্রস্থ হয় তার পান করা বা না করার বোধ থাকবে  কী  করে ?  হীরাবাই জানতেন শাহাজাদা পবিত্র জীবনে অভ্যস্থ , আরক পানকে হারাম জ্ঞান করেন। কিন্তু সেদিন তাঁকে নেশাগ্রস্থ দেখে তিনি মজা করে  মদের গেলাস ধরিয়ে দিয়েছিলেন ঔরঙ্গজেবের হাতে।বোল আর তালে বাহ্য জ্ঞান শূন্য শাহাজাদা মদ খেতে শুরু করতে গেলে খিলখিল হেসে সে গেলাস আবার ফিরিয়ে নিলেন তিনি।  সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ঔরঙ্গজেব   দেখেন  তাঁর নেশা কেটে গেছে।  জাহানের সবসেরা তিমুরিদ বংশ গৌরবের কথা , পবিত্র জীবন যাপনের সংকল্পের  কথা  শাহাজাদার  মনে পড়ে  যাচ্ছে দেখে তাওয়াএএফ শ্রেষ্ঠ হীরাবাই আবার খিলখিল করে হেসে উঠলেন। তাঁর হাসিতে শাহাজাদার  যত্নলালিত  ঘ্যাম তুচ্ছ হয়ে যায় , শাহাজাদা নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকেন,  ‘’বোল ও  তাল যে  নেশা ধরায় তার কাছে আখলাক কি তুচ্ছ হয়ে দাঁড়াবে ? নীতিশাস্ত্রের এইরূপ সংকটের মুক্তি কিসে ?’’  অকালমৃতা  হীরাবাই এখন ছায়া,  সেই ছায়া আবার দেখা যাবে  আগ্রায় দারা শুকোহর  জেনানার জর্জিয়ান নর্তকী উদিপুরীর মধ্যে , অচিরেই যাঁকে বেগম হতে হবে ঔরঙ্গজেবের তারপর তিনিই হয়ে উঠবেন  ছায়াসঙ্গিনী । সে সব কথারা আজ থাক কারণ এখন গভীর চিন্তা বাদশাহের  , এই যে শাহী প্রতাপ , সোনায় মোড়া কেদারা আর সারসার হুকুম তামিল করার লোক , হাজারো জটিল ব্যবস্থা - শেষ পর্যন্ত কী থেকে যায় ? থাকে কোনটা ?  ইমারত থাকে,  যার ঘ্যাম  সবাইকে মাথা  নত করাবে,  কিন্তু  বড় বড় মহল , মকবরা , আলিশান বারোদুয়ারী , হাওয়া  মহল এসব কোন কামে লাগে প্রজার ? চিস্তি সিলসিলা কী বৈভব শিখিয়েছে ?  তার চেয়ে রাস্তার ধারে ধারে সরাইখানা বানালে রায়ত আর সওদাগর ঠাঁই নিতে পারবে , ফকির আর যোগীর দল শীত , বর্ষা থেকে , রোদের তাপ থেকে বাঁচবে।  হাজার হাজার সরাইখানার কথা ভাবেন ঔরঙ্গজেব আর মসজিদের কথা , এক  বিশাল মসজিদ বানানোর কথা ভাবেন , হাজার হাজার লোক সেখানে দোয়া মাঙবে। তাঁর  সিলসিলার জং আসলে ভুখমারির সঙ্গে।  এই যে কয়েক বছরের উত্তরাধিকারের জং চলছে তাতে ভুখমারি আরো বেড়েছে কারণ শহর বড়সড় লুটমারের শিকার না হলেও গ্রামকে গ্রাম , পরগনা কে পরগনা উজাড় করে লোক পালিয়ে গেছে আর সে জমির ওপর ভয়াবহ জং হয়েছে ।সেখানে গাদা হয়ে  মরা সেপাই লস্কর আর জানোয়ারের লাশ পরে পড়ে পড়ে পচে।  সবাই তো আমির ওমরাহ নয় যে খুঁজে খুঁজে এনে কবর দেওয়া বা দাহ কাজ হবে।  বেওয়ারিশ লাশ প্রচুর আর ধুমাসান তোপের লড়াইয়ের ফলে জমিও  চাষের অনুপযুক্ত ।  তা পরিষ্কার করতেই অনেক জমির ওপর আরো অনেক মেহনত করতে হবে ,পড়তে হবে কয়েক বর্ষা মরশুমের জল,   তবে যদি ধুয়ে মুছে আবার চাষের হয়ে ওঠে সেসব জমিন।
     তথ্য সূত্র ও কিছু কথা :*  মিউজিক এন্ড মিউসিয়ান্স ইন মোঘল ইন্ডিয়া ,হিস্টোরিস অফ দ্যা এফেমেরাল ১৭৪৮ -১৮৫৮ ক্যাথেরিন বাটলার শ্চফিল্ড পাতা ২৮-২৯ 
    *বীণ ,  রবাব আর তম্বুর ছিল সেসময়ের বাদ্য যন্ত্র ।পরে সেতার তবলা আসে ।সম্ভবত সংগীতপ্রেমী ও শিল্পী বাদশাহ আহমদ শাহ রঙ্গিলার আমলে ওসব মোঘল দরবারে ঢোকে ।
    *আদাব -ই আলমগিরি বা শাজাহান ও ঔরঙ্গজেবের চিঠিপত্রের সংগ্রহে আর যদুনাথ সরকারের অনেকডোটস অফ ঔরঙ্গজেব বইতে হীরাবাই প্রসঙ্গে উল্লেখ আছে। 
    *আখলাক মানে নীতিশাস্ত্র।  মোঘলরা পারস্যের নীতিশাস্ত্র প্রণেতা, এরিস্টটল অনুসারী নাসিরুদ্দিন তুসির আখলাক এ নাসিরিকে অনুসরণ করতেন। ঔরঙ্গজেবকেও তাই করতে দেখা গেছে। 

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন