এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • গুরু-সান্নিধ্যে

    Pradhanna Mitra লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৪ মে ২০২৪ | ১৩২ বার পঠিত
  • চিত্রকর রাণী চন্দের প্রায় সমগ্র জীবনটাই কেটেছে শান্তিনিকেতনে। এবং, এর মধ্যে প্রথম অর্ধ কেটেছে রবীন্দ্রসান্নিধ্যে। এই রবীন্দ্রসান্নিধ্য আবার যেমন তেমন করে নয়। একটা পর্যায় তো কেটেছে একেবারে প্রতিবেশী হিসাবে। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ যে বাড়িতে থাকতেন, একদম তাঁর লাগোয়া বাড়ীতেই তিনি থাকতেন স্বামীসহযোগে। তাঁর স্বামী অনিল চন্দ। রবীন্দ্রনাথের সেক্রেটারি। রাণীর শুরুটা অবশ্য হয়েছিল শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক হিসাবে।

    রাণী চন্দের দাদা মুকুল দে গভর্মেন্ট আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ, প্রথম অধ্যক্ষ। রাণীর রক্তে ছিল চিত্রকলা। রবীন্দ্র-উপদেশে শান্তিনিকেতনে রাণী ভর্তি হন কলাভবনে। অবন ঠাকুর, নন্দলাল বসুর স্নেহধন্যা রাণীর কয়েকটি মাত্র চিত্রকলা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, ইন্টারনেটের সৌজন্যে। Mother and Child ছবিটার দিকে যে আমি কতক্ষণ তাকিয়েছিলাম মনে নেই। রাণী ছবি আঁকা শিখলেও নিজের ছবি নিয়ে ততটা সংবেদনশীল ছিলেন কি? না কি শান্তিনিকেতনের অন্যান্য খ্যাতনামা চিত্রকরদের দাপটে তাঁর কাজ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে? অবশ্য নারী চিত্রকরদের কজনকেই বা আমরা চিনি, বিশেষত শান্তিনিকেতনের?

    তো এই রাণী কলাভবনে নন্দলাল বোসের তত্ত্বাবধানে ছবি আঁকা শিখতে লাগলেন। একসময়ে অনিল চন্দের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের প্রতিবেশিনী হয়ে এলেন। দিনের পর দিন রবীন্দ্রনাথকে দেখেছিলেন নিকট থেকে। এমনকি ছবি আঁকার সময়েও রবীন্দ্রনাথকে সহায়তা করতেন। রবীন্দ্রনাথের অ-প্রথাগত আঁকার মেজাজ-মর্জির সাথে রাণী এতটাই পরিচিত ছিলেন যে, বুঝতে পারতেন, কখন কি প্রয়োজন। ফলে ছবি আঁকার সময় হলে রাণীর উপস্থিতি ছিল রবীন্দ্রনাথের কাছে অতি-প্রয়োজনীয়।

    এই অতি-প্রয়োজনীতার আরেকটি উদাহরণ দেওয়া অতিপ্রয়োজন। রবীন্দ্রজীবনের একদম শেষ অঙ্কে রবীন্দ্রনাথের অন্তিম কাব্যগ্রন্থ ‘শেষ লেখা’। এটি অসম্পূর্ণ এবং এর মধ্যে দু-একটি কবিতা অসংশোধিতও বটে। কিন্তু বলার কথা এই যে, রবীন্দ্রনাথের পক্ষে সেই সময়ে নিজের হাতে লেখার ক্ষমতাটুকুও চলে গিয়েছিল। তিনি মুখে মুখে কবিতাগুলো বলতেন, রাণী শুনতেন, এবং লিখে রাখতেন। রবীন্দ্রকবিতা এবং রবীন্দ্রমানসিকতার সাথে রাণী এতটাই পরিচিত ছিলেন যে, কোথায় কোন কবিতায় কতটা স্পেস কিম্বা লাইনে ছেদ টেনে পরের লাইন লিখতে হবে, সেটা পর্যন্তও তিনি বুঝতে পারতেন এবং রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনুমোদনও করতেন। ফলে ‘শেষ লেখা’ কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতাই সফলভাবে অনুলিখিত। 

    এহেন রাণী নিজেও লিখতে জানতেন। আর লিখতে জানতেন বলেই শুরু করেছিলেন তাঁর গুরু অবন ঠাকুরের মুখনিঃসৃত কথাগুচ্ছ। রবীন্দ্রনাথ তা পড়ে শুধু আনন্দিতই হন নি, রীতিমতো রাণীকে তাড়া দিতেন জোড়াসাঁকোয় গিয়ে আরোও লিখে আসতে। অবন ঠাকুরের কথাবিলাস ‘ঘরোয়া’ গ্রন্থে পাওয়া যায়। আমার পড়া হয় নি। পড়ার ইচ্ছা আছে। ‘গুরুদেব’ বইটিতে রাণী লিখছেন, 

    “যেদিন পড়া শেষ হয়ে গেল কাগজগুলি সরিয়ে নেব বলে উঠে এগিয়ে এলাম। গুরুদেব কোলের-উপর-রাখা লেখাগুলির উপর বাঁ হাতখানি চাপা দিয়ে রইলেন।
    আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। গুরুদেব বললেন, রথীকে ডাক।

    রথীদাকে ডেকে আনলাম। রথীদা এসে দাঁড়ালেন পিছনে; গুরুদেব বুঝতে পারলেন। লেখার কাগজগুলি হাতে নিয়ে ঘাড়ের পাশ দিয়ে তুলে ধরলেন, বললেন, প্রেসে দাও।

    রথীদা লেখাগুলো নিয়ে ফিরে চলে গেলেন।

    এই হল ‘ঘরোয়া’ বইয়ের সূত্রপাত।”

    আমার বলার উদ্দেশ্য রাণীর লেখনীশক্তির প্রতি দৃষ্টিপাত করা। সহজ সরল সাধারণভাবে রাণী লিখেছেন দৈনন্দিন চালচিত্র। সেখানে আসলেই তিনি লেখিকা নন, তিনি শান্তিনিকেতনের এক আটপৌরে নারী। যে নারীর বুকে সুখ এবং দুঃখ দুটোই খেলা করে। আর খেলা করে বলেই এই বই ‘গুরুদেব’ শুরু হয়েছে হঠাৎ করে, শেষও হয়েছে হঠাৎ করে। কোন উপসংহার নেই, কোন সূচনা-ভূমিকা নেই। আর সুখ দুঃখ আছে বলেই ‘আটপৌরে রবীন্দ্রনাথ’ ধরা পড়েছেন।

    ‘আটপৌরে রবীন্দ্রনাথ’ আসলে কি বস্তু? এই প্রসঙ্গে আসার আগে বলে নিই, রবীন্দ্রনাথ দিনের শেষে ‘ঠাকুর’ নন, রক্তমাংসের মানুষ। ফলে তাঁর মধ্যে আলো-অন্ধকার আছে। আর আলো-অন্ধকার আছে বলেই না মানুষের অন্তরের এত বোধ তিনি এত অনন্যভাবে লিখে যেতে পেরেছেন। ফলে তাঁর অসাধারণত্বের কথা যেমন বলতে হবে, তেমনই তাঁর খামখেয়ালীপনার কথাও বলতে হবে বৈ কি।

    রাণী সব উগড়ে দিয়েছেন এই বইটিতে, তবে বড়ো মোলায়েমভাবে, নচেৎ এই বই বিশ্বভারতী প্রকাশ করতেন না, আর তাছাড়া এই মোলায়েমতা রানীর স্বভাবজ। এটা শান্তিনিকেতনের প্রকৃতির প্রভাব অথবা রবীন্দ্রপ্রভাব অথবা দুটোই, বলা মুশকিল। দিনের শেষে সব দোষ-গুণের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষ রবীন্দ্রনাথও সাধারণ মানুষের থেকে অনেকটাই এগিয়ে থাকেন। সেখানে দু-একটা ঘটনা যদি আঘাত করেই থাকে, তা-ই কি দিনের শেষে বড়ো হয়ে দাঁড়ায়? না তো। রাণী যেমন পরিপূর্ণ হয়েছেন, রাণী তেমনি ভেঙে টুকরো টুকরোও হয়েছেন। অনেক সময় যেমন রাণীর মতামতের গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ হয় নি, তেমন, অনেক সময়, আবার, তাকে ছাড়া চলেও নি। সব মিলিয়ে জিতভূমের এই বাসিন্দা রবীন্দ্রপাদপ্রদীপের আলোয় আপনাকে তুলে ধরেছেন অন্যরকমভাবে।

    রাণীর লেখা প্রথম বই আমি পড়েছি ‘সব হতে আপন’। তারপর পড়লাম ‘গুরুদেব’। পূর্বের বইয়ের অনেক ঘটনাই এই বইটিতে অন্যভাবে এসেছে, স্বাভাবিকভাবেই। এই বইটার কেন্দ্রে শান্তিনিকেতন নয়। এই বইটার কেন্দ্র রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যদি শুধুমাত্র প্রশংসাগুচ্ছ তিনি লিখতেন, মেয়ে মানুষের মায়া বলে আমি এড়িয়ে যেতাম, এত কথা বলার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু যেখানে একজন শিল্পী স্বাধীনভাবে ঘটনাপ্রবাহকে বলে চলেছেন, এবং তিনি জানেন, কোথাও কয়েকটি ঘটনা রবীন্দ্রভাবমুর্তিকে দারুনভাবে আঘাত করতে পারে, তা স্বত্ত্বেও তিনি সত্য থেকে বিচ্যুত হন নি। কারণটিও রবীন্দ্রনাথ। তিনি যে কিছুতেই চান নি সত্য হতে বিচ্যুত হতে। ফলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে বারোমাসের রবীন্দ্রনাথ। আর বারোমাসের রবীন্দ্রনাথের বারোমাস্যা নিয়েই তাঁর নিবেদন ‘গুরুদেব’।

    ===============================

    গুরুদেব
    রাণী চন্দ
    বিশ্বভারতী প্রকাশন বিভাগ
    মুদ্রিত মূল্যঃ ১৬০টাকা
    ছবি কৃতজ্ঞতাঃ সমর্পিতা
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি প্রতিক্রিয়া দিন