এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  স্মৃতিচারণ   স্মৃতিকথা

  • পূজার জানলা

    যোষিতা লেখকের গ্রাহক হোন
    স্মৃতিচারণ | স্মৃতিকথা | ২৫ মার্চ ২০২৪ | ৫২০ বার পঠিত
  • বছর আষ্টেক আগের কথা। হঠাৎ করে ইস্কুলের হোয়াটস্যাপ গ্রুপে বন্ধুরা আমাকে অ্যাড করেছে। তারপরে যা যা হয়, সম্ভবত অনেকেরই এরকম অভিজ্ঞতা রয়েছে, পুরোনো গ্রুপ ফোটো শেয়ার করা, সেই সঙ্গে নিত্য গুডমর্নিং মেসেজের উৎপাত, কখনও আবার ইস্কুলের রিইউনিয়নে কে কে যাবে, কোথায় মিট করবে, কখনও কারও জন্মদিনে ভার্চুয়াল কেক বিতরণ, কখনও সন্তান সন্ততিদের বিয়ে অথবা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট নিয়ে আনন্দ উচ্ছাস। যদিও সব প্রাক্তনীদের খুঁজে পাওয়া যায় না। কয়েকজন মৃত — ক্যানসার হয়েছিল। কেও কেও চুপচাপ — ডিভোর্স হয়ে গেছে, অথবা স্বামী মারা গেছে অকালে। কেও বিয়ে করেনি, গ্রুপে কথা বলে কম। কেও কেও চুটিয়ে চাকরি করছে, পোলিটিক্স করছে। সব মিলিয়ে মিশিয়ে ঝলমলে ব্যাপার। তারই মধ্যে দলাদলি শুরু হয়ে যায়, মন কষাকষি, আড়ালে ঝগড়া, নানান অশান্তি।
    এই গ্রুপে হৈমন্তীকে কিন্তু পেলাম না। মৃদুলাকে পেলাম না, অতসী, দেবযানী, কৃষ্ণা, গৌরী, এদের খোঁজও করলাম। অতসীকে বেশ কিছু সময় পরে খুঁজে পাওয়া গেল। দেবযানী মারা গেছে। বাকীদের মধ্যে হৈমন্তী ছাড়া আর কারওর খোঁজ মেলে নি। 
    তবে হৈমন্তী কিন্তু গ্রুপে একটা কথাও লেখে না।  ওকে প্রাইভেটে মেসেজ করলাম। ও জানালো যে ও ফেসবুকে অ্যাকটিভ। সেখানে মেসেজ করতে বলল।
    আমি কিছুদিন পরে ইস্কুলের হোয়াটস্যাপ গ্রুপ ছেড়ে বেরিয়ে যাই। শয়ে শয়ে মেসেজের অত্যাচার সহ্য করা যাচ্ছিল না। বিশেষ করে একজনের কবিতা লেখার বাতিক ছিল। সে প্রতিদিন অন্ততঃ একটা কি দুটো লম্বা লম্বা ছড়া লিখত। সেই ছড়া পড়বার পরে গ্রুপের প্রায় সকলেই তাকে ছড়ার প্রশংসা করে মেসেজ করত ঐ গ্রুপেই। গ্রুপ থেকে বেরিয়ে যাবার পরে ফের ওখানে আমায় ঢোকানো হয়, এবং ফের বেরিয়ে যাই।
    কিন্তু হৈমন্তীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়ে যায়। তখনও সম্ভবতঃ হোয়াটস্যাপে টেলিফোন করা যেত না।
    এখন হৈমন্তীর কথা লিখছি একটা সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। অবশ্য আসল নাম দিই নি। তবে ঘটনা সত্য।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • যোষিতা | ২৫ মার্চ ২০২৪ ০৫:১৯742604
  • এর কিছু সময়ের মধ্যেই হোয়াটস্যাপে ফোন করা যাচ্ছিল।
    হৈমন্তীর ফেসবুকে অন্য নাম। সেখানে তার নাম পূজা। ইস্কুল জীবনে ও কোনওদিনই আমার কাছের বন্ধু ছিল না। বস্তুতঃ ক্লাস এইট পর্যন্ত সিনিয়রই ছিল। এইটে ওকে দুবার পড়তে হয়েছিল, সেই সূত্রে আমরা একই বছরে মাধ্যমিক দিই।
    ওর সঙ্গে টুকটাক মাঝে সাঝে গল্প হচ্ছিল। তারপরে ওকে একদিন হোয়াটস্যাপে কল করে করে কিছুতেই পেলাম না। মেসেজ পাঠালাম একটার পর একটা, মেসেজ ডেলিভার হলো না। সরাসরি ফোন করলাম ঐ নম্বরে, ফোন সম্ভবত সুইচসড অফ। কয়েকদিন চিন্তায় ছিলাম। কী হলো মেয়েটার? তারপরে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে মেসেজ করেছি। উত্তর নেই।
    ফের কদিন পরে মেসেঞ্জারে ও উত্তর দিল। একটা নতুন ফোন নম্বর। সেটা স্মার্ট ফোন নয়, চাইলে ওকে সেই নম্বরে সরাসরি ফোন করতে পারি।
    ফোন করবার পরে ও বলছে যে ওর আগের ফোনটা হারিয়ে গেছে, মানে চুরি হয়ে গেছে।
    আরও কিছুক্ষণ কথা বলবার পরে নিজেই বলল, যে ফোনটা চুরি যায় নি। থানার বড়বাবুর কাছে আছে। ফোনটা ওর ছেলের। ছেলেকে কয়েকদিন আগে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। 
  • যোষিতা | ২৫ মার্চ ২০২৪ ০৫:৫৩742606
  • "তুলে নিয়ে গেছে" এই শব্দবন্ধটা আমি এর আগে শুনিনি পুলিশ সম্বন্ধে। তাই চমকে উঠেছিলাম। পরে বুঝলাম গ্রেপ্তার বা অ্যারেস্ট করার একটা স্ল্যাং এটা। 
    কিন্তু কেন? ছেলে নিশ্চয় নিরপরাধ। অন্ততঃ আমার প্রাথমিক ধারণা সেরকমই। একটা খটকা ছিল, কয়েক মাস আগে ওর ছেলে বিয়ে করেছিল নিজে পছন্দ করে। সেদিনও হৈমন্তী আমায় ফোন করে বলেছিল, ক্কী জ্বালা! ছেলে কোত্থেকে একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে এসেছে, বিয়ে করেছে বলছে। কী করি বলতো?
    আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল, নাবালিকা নয়তো?
    — না না, নাবালিকা না কচু। উনিশ কুড়ি বছর বয়েস তো হবেই, রনির থেকে বড়োও হতে পারে।
    রনি ওর ছেলের নাম।
    আমি  বলেছিলাম, তাহলে চিন্তা করছিস কেন? প্রেম করে বিয়ে করেছে, তোর একটা চিন্তা কমল, ছেলের বিয়ে দেবার চিন্তা।
    হৈমন্তী কিন্তু ব্যাপারটা সহজভাবে নিলো না, গজগজ করতেই লাগল, টিপিকাল গল্পের বইয়ে পড়া দজ্জাল শাশুড়ির মত ঐ সময়েই পুত্রবধূকে ধমকাচ্ছিল।
    আমি বললাম ফোনে ওর পুত্রবধূর সঙ্গে আলাপ করতে চাই।
    — তোমার নাম কী?
    — আকাশলীনা।
    — বাহ চমৎকার নাম। আজ বিয়ে হলো বুঝি?
    — হুঁ।
    মেয়েটি বিশেষ কথা বলতে চায় না। হৈমন্তী চিৎকার করছে, ওর বাপ মা কেমন? অ্যাঁ! এই তোর বাপ মাকে ডাক! ছোটোলোকের দল এসে জুটেছে আমার ঘাড়ে।
     
    আমি ভাবছিলাম এমন কান্ড তো আমাদের যৌবনেও হতে পারত, কেমন লাগে তখন এমন ব্যবহার পেলে?
     
    আজ পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে শুনে তাই আচমকা ভেবেছিলাম, হয়ত মেয়েটি নাবালিকা ছিল, তাই মেয়েটির বাপমা পুলিশ ডেকে রনিকে অ্যারেস্ট করিয়েছে।
     
    কিন্তু না। আকাশলীনা পাশেই রয়েছে হৈমন্তীর। আগে যে কদিন পুলিস কাস্টডিতে ছিল রনি, ও রোজ থানায় ক্যাডবেরি নিয়ে যেত রনির জন্য। রনি এখন কদিন যাবদ জেলে রয়েছে, দমদম জেলে। কেস উঠবে আবার বারাসত কোর্টে। হৈমন্তী প্রচণ্ড চিন্তিত, রনির জামিন হবে কিনা সেই চিন্তায়।
    কেস অন্য, গাড়ি চুরির কেস।
     
  • যোষিতা | ২৫ মার্চ ২০২৪ ০৮:১৬742607
  • আমরা, তথাকথিত মধ্যবিত্তরা সম্ভবত এ ধরণের পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত নই। ঘরের ছেলেকে পুলিশ গাড়ি চুরির অপরাধে "তুলে" নিয়ে যাচ্ছে থানায়, ছেলের বৌ ক্যাডবেরি নিয়ে শাশুড়ির সঙ্গে রোজ থানায় যাচ্ছে বরের সঙ্গে দেখা করতে, কেস হচ্ছে, জেল হচ্ছে, এগুলো দুঃস্বপ্নেও আমরা দেখি না।
    কিন্তু এমনটা তো হলো। আমি হৈমন্তীকে কী বলে সান্ত্বনা দেব? উল্টে ও ই আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, চিন্তা করিস না, টাকার জোগাড় হয়ে গেলেই ওর জামিন করিয়ে আনব। 
    হ্যাঁ সত্যি সত্যিই ছেলে নিয়মিত গাড়ি চুরি করত। ওদের বন্ধুদের একটা গ্যাং আছে। হৈমন্তীর ভাষায় — ওর বন্ধুগুলো চালাক, সবকটা পালিয়েছে, রনিকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।
    পরের দিন আবার ফোন করলাম, হ্যাঁরে, ছেলে ছাড়া পাবে কবে জানিস কিছু?
    সেদিন হৈমন্তীর মেয়ে ছিল সেখানে। মেয়ে অনেকটাই বড়ো ছেলের থেকে। মেয়ে এসেছে এই বিপদে মায়ের পাশে থেকে মাকে বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করতে। মেয়ের হাতে ফোন ধরিয়ে দিল হৈমন্তী।
    — মাসীমণি! মায়ের কাছে তোমার অনেক গল্প শুনেছি। কেমন আছ? কোলকাতায় কবে আসছ?
    — যাব। এখনও কিছু ঠিক নেই। হ্যাঁরে তোর নাম কী?
    — প্রিয়াঙ্কা। 
    — ভাইয়ের জন্য তোরা বড্ড চিন্তায় আছিস, নারে?
    — আরে বাদ দাও তো। ওসব নিয়ে ভেবো না। মা ই তো ওকে লাই দিয়ে দিয়ে এরকম বানিয়েছে।
    হৈমন্তী ফোন কেড়ে নিল প্রিয়াঙ্কার হাত থেকে।
    — না রে, ও ফালতু কথা বলছে। ও নিজেই বদমাশ। ওর কীর্তি শুনলে তুই বুঝবি ও কতটা শয়তান।
    ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রিয়াঙ্কা খিলখিল করে জোরে জোরে হাসে।
    এর চারপাঁচদিনের মাথায় আবার ফোন করেছি। হৈমন্তী বলল — গাড়িতে আছি রে। রনিকে আজ ছাড়বে, ওকে আনতে যাচ্ছি, কোর্টের অর্ডার হয়ে গেছে, আরও কয়েকটা পার্মিশান করাতে হবে, তোকে বিকেলে ফোন করব।
     
  • সমরেশ মুখার্জী | ২৫ মার্চ ২০২৪ ১৫:৪৪742610
  • আপনার "এল ডোরাডো" ট‌ইটা আগ্ৰহ নিয়ে পড়ছি‌লাম। তাই মাঝে বেশ কয়েকবার ঢুঁ মেরেছি। কিন্তু দেখছি ওটা ৩রা মার্চের পর আর এগো‌য় নি।
     
    আপনি সুইজারল্যান্ডে আছেন বলে একটা বিষয়ে আপনার কাছে কিছু জানতে চাই। ব‍্যাপারটা নিয়ে  হাটের মাঝে আলোচনা করতে চাই না। আমার মেল আইডি দিচ্ছি। আপনি রেসপন্ড করলে বিষয়টা জানাবো। নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন ঐ বিষয়টি ছাড়া অযথা আপনাকে যোগাযোগ করে বিরক্ত করবো না।
     
    ভালো থাকবেন
    সমরেশ
  • যোষিতা | ২৫ মার্চ ২০২৪ ১৭:০৭742612
  • ইনেইল চেক করুন সমরেশবাবু
  • যোষিতা | ২৫ মার্চ ২০২৪ ১৭:২৯742613
  • জাংক মেইলের ফোল্ডারেও চেক করুন। আমি মেইল করে দিয়েছি আমার হোয়াটস্যাপ নম্বর ওখানেই আছে। নির্দ্বিধায় মেসেজ বা কল করুন।
  • স্বাতী রায় | ৩০ মার্চ ২০২৪ ১৯:২৩742682
  • এই পূজার জানলা কি থেমে গেল? 
  • যোষিতা | ৩১ মার্চ ২০২৪ ০৯:০৪742685
  • রনিকে ছাড়িয়ে আনার পরে নিয়মিত যোগাযোগ হতে লাগল হৈমন্তীর সঙ্গে। ইস্কুলের অন্য যে কজনের সঙ্গে আলাদা করে যোগাযোগ রাখছিলাম, তাারা হৈমন্তীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না, বরং ওর প্রসঙ্গ তুললেই কথা ঘুরিয়ে নেয় কেও কেও, কেও আবার তাচ্ছিল্যের মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়। আমি বুঝে যাই, যে ও যেহেতু অন্যদের মত সুখে শান্তিতে নেই, বরং অর্থাভাবে অনেকের চেয়েই অন্যরকম জীবনের ধারায় রয়েছে, ওকে অন্যরা ভালো চোখে দেখে না।
    একজন বলেছিল যে ওতো পড়াশোনা শেষ করার আগেই বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে পালিয়ে গেছল।
    এটুকু বলেই আবার সে নিজেকে সংযত করে ফেলে। আমি যদি কিছু মনে করি, এই রকম কোনও ভাবনা থেকে হয়ত হবে। 
    একবার ইস্কুলের রিইউনিয়নে ও গেছল বলল। সেখানেও টাকা দিয়ে ঢুকতে হয়, ভালো সাজপোশাক করতে হয়। হৈমন্তীর পক্ষে সেটা যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে গেছল। সেই উৎসবেও কেও ওর সঙ্গে বিশেষ মেশে নি।
    আমি মনে মনে ভাবি, আমি যদি ওরকম সময়ে দেশে থাকতাম, যদি ইস্কুলের রিইউনিয়নে যেতাম, কেমন হতো পরিস্থিতি? মিশত আমার সঙ্গে পুরোনো সহপাঠিনীরা? কঠিন প্রশ্ন। 
    ২০১৬র নভেম্বরে আমরা জানতাম যে কোনও দিন আমার মায়ের মৃত্যু হবে।  হলোও সেরকমই। তখন নোটবন্দী চলছিল, আমি ছিলাম না কোলকাতায়। তবে হৈমন্তী মায়ের মৃত্যুর দিন দুয়েক আগে নার্সিং হোমে দেখা করতে গেছল।
    সহজ দূরত্ব নয়, ওর বাড়ি সেই কৈখালি অঞ্চলে, সেখান থেকে বেহালা অঞ্চলে যাওয়া সহজ নয়, বিশেষ করে যে কিনা ট্যাক্সি ওলা উবের এসব অ্যাফোর্ড করতে পারে না। 
    এই ব্যাপারগুলো ইস্কুলের হোয়াটস্যাপ গ্রুপের অধিকাংশেরই বোধের বাইরে। তারা যখন তখন শরিং মলের ফুডকোর্টে গেট টুগেদার করে, কখনও দলবেঁধে বেরিয়ে পড়ে কয়েকদিনের জন্য সমুদ্রের ধারে সময় কাটাতে কি অন্য কোনও টুরিস্ট স্পটে। তারা দামী হোটেলে থাকে, গাড়ি ভাড়া করে বেড়ায়, নস্টালজিয়ায় দল বেঁধে অন্তাক্ষরী, বা মজার মজার ফোটোশুট। হয়ত চাপা ঈর্ষা বা প্রতিযোগিতার আভাস মাঝে মধ্যে ফুটে ওঠে তাদের মধ্যে। হালকা দলাদলি। কিন্তু শেষমেশ পুরোটাই আবার মিষ্টি মতন ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে, কিংবা পুরানো সেই দিনের কথা গোছের হয়ে যায়। সেসব আনন্দমেলায় হৈমন্তী নেই, ওকে কেউ ডাকে নি। সৌজন্য দেখিয়েও নয়।
  • যোষিতা | ৩১ মার্চ ২০২৪ ০৯:৩০742686
  • হৈমন্তী প্রেমে পড়েছিল। একবার নয়, বারংবার। এর কিছুটা ও আমাকে বলেছিল নিজে থেকেই। আমি কখনও ওকে গায়ে পড়ে কিছুই জিজ্ঞাসা করি নি। 
    দিনের পর দিন ক্রমাগত কথা হতো আমাদের। একেবারেই গুছিয়ে কথা হয় নি। ফলতঃ প্রেমের ক্রনোলজিও সেভাবে জানা হয়ে ওঠে নি। সেই সময়ে ওর লেটেস্ট প্রেম চলছে। সেই যখন দমদম জেল থেকে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনতে যাচ্ছিল। বয়ফ্রেন্ডের গাড়িতেই যাচ্ছিল। পাশে বয়ফ্রেন্ডই ছিল তখন। সেই বয়ফ্রেন্ডই জোগাড় করে দিয়েছে জামিনের টাকার একটা অংশ, বাকিটা দিয়েছে হৈমন্তীর স্বামী। স্বামী অবশ্য নিজে যায় নি, রনিকে নিয়ে আসার সময়ে। তার বয়স হয়েছে বিস্তর। একমাত্র সন্তানের এই বিপদের সময়ে হৈমন্তীর স্বামী ছিল চুপচাপ, তার ব্যবহারে কোনও পরিবর্তন দেখা দেয় নি।
    স্বামী একজন চিত্রশিল্পী। কথ্য বাংলায় আমরা যাদের বলি আর্টিস্ট।
    ইনি সারাটা কর্মজীবন কেবল ছবি এঁকেই রোজগার করেছেন। বয়সে হৈমন্তীর চেয়ে পঁচিশ বা তিরিশ বছরের বড়ো তো হবেনই। হৈমন্তী নিজেও জানে না তার স্বামীর বয়সের গাছ পাথরের ব্যাপারে। এঁর সঙ্গে বিয়ে হবার পরে একটা দীর্ঘ সময়ে ওরা থেকেছিল বোম্বের একটা বস্তিতে। সে গল্প হৈমন্তী আমায় পরে বলেছিল।
    মানে, ঐ যাকে বলে, গল্পতো ঠিক ক্রনোলজি মেনে হয় না।
    যে কথা হচ্ছিলো, ওর লেটেস্ট প্রেম নিয়ে।
    ছেলে ছাড়া পাবার পর পর ই হৈমন্তীর বড্ড মন খারাপ।
    বয়ফ্রেন্ডের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। গত আট ন বছর ধরে এই সম্পর্ক। অথচ এই বিয়ে রুখবার ক্ষমতা ওর নেই। 
    শুধু তাই ই নয়, ওর ওপরেই ভার পড়েছে পাত্রী পছন্দ করবার।
    এ জিনিস আমার কাছে চরম ন্যাকামি মনে হলো।
    আর পারলাম না জাস্ট শ্রোতা হয়ে থাকতে। বললাম, তুই কি ন্যাকা? বয়ফ্রেন্ডের জন্য পাত্রী খুঁজতে যাচ্ছিস? এত ঢ্যামনামির মানে টা কী?
    — না রে, তুই বিশ্বাস কর, ওর বাড়ি থেকে চাপ দিচ্ছে, ওর মা পাগল করে দিচ্ছে বিয়ে বিয়ে করে।
    — অসহ্য! আমি ফোন রাখছি।
    — তোকে আমি বোঝাতে পারব না ব্যাপারটা। জীবনটা আমার ঠিক অন্যদের মতো নয়।
    — সে বুঝলাম। কিন্তু মেয়েও তোকেই খুঁজতে হবে? তুই কি শরৎচন্দ্রের গল্পের নায়িকা? থুড়ি, উপমাটা কারেক্ট হলো না। আমার কোনও তুলনা আসছে না। কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দে।
    — না না। কাগজে অ্যাড দিয়ে হবে না। আমি এখন অরফ্যানেজে যাব। ওখান থেকেই পছন্দ করব মেয়ে।
    — তুই আমাকে আর কোনও দিনও ফোন করিস না। মনে থাকে যেন।
    আমি ফোন কেটে দিয়েছিলাম। রাগে।
  • যোষিতা | ০৩ এপ্রিল ২০২৪ ০৬:২১742702
  • যথারীতি এই রাগগুলো তাৎক্ষণিক এবং সাময়িক। আমি প্রচণ্ড রেগে গেলেও ঘন্টাখানেকেরও কম সময়ের মধ্যে রাগ গলে জল হয়ে যায়। তাই ফের আমাদের গালগল্প চলতে লাগল। 
    ডিসেম্বরে, মানে আমার মায়ের মৃত্যুর পরের মাসেই হৈমন্তীর কথা ভেবে ক্রিসমাসের জন্য একটা কালো রঙের সিল্কের শাড়ি পছন্দ করে ফেললাম অনলাইনে। ক্রিসমাসের দিন সাতেক আগে সেই শাড়ি পৌঁছে গেছে ওর কাছে। দারুণ খুশি সে। চটপট ব্লাউজ তৈরি করিয়ে আনল। ওর বয়ফ্রেণ্ড সুবীরের সঙ্গে সেই শাড়ি পরে সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের মিডনাইট মাসেও গেছল। ফোটো পাঠিয়েছিল আমায়। লিখেছিল— অনেক যুগ পরে মিডনাইট মাসে গিয়ে ভীষণ শান্তি পেলাম।
    এর কিছুদিনের মধ্যেই আমি খবর পাচ্ছিলাম কোলকাতার আসন্ন বইমেলাতে হয়ত যেতে হবে আমায়। প্রথম একটা বই প্রকাশ হচ্ছে আমার নিজের লেখা।
    মাঝে কয়েক বছর কোলকাতায় যাই নি। সে সময়ে আমি চাকরিও করছিলাম না, হয়ত কয়েক মাস পরে নতুন একটা চাকরির সন্ধান করব এমন ভাবনা চিন্তা চলছিল মাথার মধ্যে। হৈমন্তীকে বলছিলাম — জানিস, হয়ত জানুয়ারীর শেষের দিকে কোলকাতা যেতে পারি?
    — তুই আসবি কোলকাতায়!
    হৈমন্তী আনন্দে যেন লাফিয়ে ওঠে ফোনের ভেতরেই।
    — হ্যাঁ। টিকিট কাটতে আর কতক্ষণ?
    — কোথায় উঠবি এসে?
    — দেখি। আমার তো নিজস্ব কোনও বাসস্থান নেই ওদেশে। আত্মীয় আছে, সেখানে যাওয়া যায়। নয়ত হোটেলের অভাব নেই। 
    — এই না না, তুই আমার বাড়িতে আয়। আমার বাড়ি অবশ্য ছোট।
    — বাড়ির আবার ছোট বড়ো কীসের?
    — না, মানে জায়গা কম, তোর হয়ত কষ্ট হবে।
    — জায়গা কি স্কোয়ারফুটের হিসেবে হয় রে? জায়গা তো থাকে মনের মধ্যে।
    — ঠিক বলেছিস, আমার মনের কথা। জানিস, আমরা যখন বোম্বেতে একটা বস্তিতে থাকতাম, তখন রোজ ভোরবেলা একদল ভিখিরি আসত আমাদের ঘরের সামনে, তখন আমি তো ওদের ভাষা বুঝতাম না, আমি কী করতাম জানিস?
    — কোলকাতায় গিয়ে শুনব সব হৈমন্তী।
  • যোষিতা | ০৪ এপ্রিল ২০২৪ ০৪:৩৬742703
  • পৌষ মাসে বোধহয় হিন্দুদের বিয়ে হয় না। তাই জানুয়ারির সেকেন্ড হাফের গোড়ার দিকেই বিয়ে হয়ে গেছল সুবীরের। অরফ্যানেজ থেকে হৈমন্তীর পছন্দ করা পাত্রীই কি না, সে ব্যাপারে কখনও প্রশ্ন করি নি, ও নিজেও আগবাড়িয়ে বলে নি আমায়।  তবে এ হচ্ছে মুখ রাখার জন্য বিয়ে, এমনটাই বলেছিল হৈমন্তী আমাকে। বলল, সুবীর তো বলেই দিয়েছে আমাকে যে, আমি তো তোমারই থাকব, কিন্তু মা তো শুনছে না, তাই বিয়েটা করে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
    অনেক বাইনারি চিন্তা বা যুক্তির ওপর ভর করে যে এতটা জীবন কাটিয়েছি, সেটা ওর সঙ্গে মিশবার পরে বুঝতে পারি। সাদামাটা গল্পের বইয়ের মত করে যে জীবনটা চলে না, সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়।
    সুবীরের বিয়ের পর পরই সে কী মন খারাপ হৈমন্তীর।
    — জানিস, আজ সকালে মোড়ের মাথা থেকে রিক্সা নিচ্ছি, সুবীরের গাড়িটা সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল। ও ড্রাইভ করছিল, পাশে ওর বৌটা বসেছিল। আমাকে দেখে হাত নাড়ল।
    — বিয়ে হয়ে গেছে গেছে যখন, এরকম তো হবেই।
    — ওরা হানিমুনে যাচ্ছে, বুঝলি তো। দীঘা যাবে বলেছিল। ঐ আর কি, তিন দিনের জন্য। আসলে মনটা ভীষণ ভার হয়ে গেল।
    আমি শুনে টুনে চুপ করে রইলাম। ওদিক থেকেও ও চুপ। টেলিফোনে দুপক্ষ চার পাঁচ সেকেন্ডের বেশি চুপ থাকলে সেটা ভয়ানক নীরবতা। আমি নীরবতা ভাঙার চেষ্টা করি।
    — মাত্র তো তিন দিন। তারপর ফিরে এলেই তোদের দেখা সাক্ষাৎ হবে আবার।
    — হ্যাঁ, তিন দিন ওর দোকান বন্ধ থাকবে। বিজনেসের ক্ষতি হবে, সেটাও একটা পয়েন্ট।
    — উনি বিজনেস করেন?
    — হ্যাঁ। জেরক্সের দোকান। তুই এলে নিয়ে যাব, বেশি দূর নয়। এখানে, কাছেই।
    — আমার একটা উপকার করে দিবি হৈমন্তী?
    — হ্যাঁ, কী কাজ, বল না।
    — একজন পুরোহিত চাই আমার। 
    — পুজো টুজো করবি?
    — না। পুজো নয়। আমি শ্রাদ্ধ করব। আমার মায়ের শ্রাদ্ধ।
    — আচ্ছা। সুবীর ফিরুক, ও ব্যবস্থা করে দেবে।
     
    আসলে আমার চিন্তাগুলো এতকাল ধরে যে বাইনারি যুক্তি মেনে চলেছে, তাতে ফাটল ধরছিল বেশ অনুভব করছিলাম। যে আমি এক্কেবারে শৈশবে পিতৃহারা হবার সময়ে শ্রাদ্ধ টাদ্ধয় বিশ্বাস রাখিনি, সেই আমি ভারতে যাচ্ছি মায়ের শেষ কাজ করতে, যে মাকে আমি কতটা শ্রদ্ধা করেছি, আর কতটা করি নি, সে হিসেব ভয়ানক গোলমেলে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন