এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আতর দিদা ও হোলিকা দহন আখ্যান

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ মার্চ ২০২৪ | ৩৬১ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • আতর দিদা ও হোলিকা দহন আখ্যান 



    একদম গোড়াতেই বলি ,এই লেখাটি আমার ছেলেবেলার স্মৃতি বিজড়িত এক আশ্চর্য আখ্যান। সেকালের ছেলেবেলার যাপনধারার সঙ্গে এ কালের ছোটদের বেড়ে ওঠার রীতি প্রকরণের কোনো তুলনা টানার সামান্য চেষ্টাও করিনি। কেননা সেই প্রয়াস অবান্তর, অর্থহীন বলে মনে হয়। আমাদের পরিবার কেবল ঘরের গণ্ডিতে রক্ত সম্পর্কের সীমায় বাঁধা মানুষজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়। আমাদের প্রতিবেশীরাও ছিলেন সেই পরিবারের আত্মজন। আতর দিদা ছিলেন এমন‌ই একজন। অনেক দিন পর তাঁর কথা লিখতে পেরে বেশ তৃপ্তি পেলাম। “আতর দিদা ও হোলিকা দহন আখ্যান” সেই অর্থে এক শ্রদ্ধাঞ্জলি আমার ফেলে আসা মধুগন্ধ মাখা ছেলেবেলার প্রতি। ছোটদের উদ্দেশ্যেই লেখা, তবে বড়োদের ভালো লাগলে জানবেন সব কৃতিত্ব আতর দিদা ও আমার ফেলে আসা শৈশবের। কলমচির কোনো কেরামতি নেই।
     

     
    পায়ে পায়ে ফাগুন চোত মাসে দোলের রঙিন দিনগুলো এগিয়ে এলেই এতদিন পরেও আতর দিদার কথা মনে পড়ে। আতর দিদার সঙ্গে আমার বা আমাদের রক্তের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক হয়তো ছিলনা, কিন্তু আমাদের সাবেক বাসস্থানের একদম লাগোয়া বাড়িতে প্রতিবেশী হিসেবে থাকার ফলে জন্ম থেকেই আতর দিদার সঙ্গে আমাদের একটা আন্তরিক পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। খুব শৌখিন মহিলা ছিলেন তিনি। পোশাক আশাক, চলন বলন সবদিক থেকেই। গরমকালে বিকেল হলেই দেখতাম পরিপাটি করে গা ধুয়ে,গায়ে সুগন্ধি ছড়িয়ে পাড়া পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়তেন তিনি। এ বাড়ি, সে বাড়ি ঘুরে ঘুরে সবার খোঁজ খবর নিয়ে ঠিক সন্ধে লাগার মাহেন্দ্রক্ষণে নিজের বাড়িতে ফিরে আসতেন টুকটুক করে। গা থেকে ম ম করে ছড়িয়ে পড়া সুগন্ধির জন্য‌ই হয়তো তার নাম হয়েছিল আতর দিদা। বড়োদের কাছে আতর মাসিমা। এমন সব মানুষের দেখা একালে খুব সহজে মিলবে না জেনেই আতর দিদার কথা এতটা বললাম।

    আতর দিদার বাড়ির (যদিও ওটা তাঁদের নিজস্ব বাড়ি ছিলনা। এক দূরসম্পর্কের প্রবাসী আত্মীয়ের দাক্ষিণ্যে সেখানে ঠাঁই হয়েছিল ওই নিঃসন্তান দম্পতির।) বাগানে অনেকগুলো সুপুরি গাছ ছিল। 
    দিদা খুব যত্ন করে শুকনো ডালপালা, সুপুরি গাছের পাতা, কাঠ কুটো বাগানের এক পাশে জড়ো করে রাখতেন। যখন যার প্রয়োজন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে সে সেগুলো নিয়ে যেত। তখনতো আর ঘরে ঘরে গ্যাসের চল ছিলনা। 
     
    সে যাই হোক দোলের আগে বুড়ির ঘর জ্বালানোর জন্য এ বাগান সে বাগান ঘুরে ঘুরে আমরা গিয়ে হাজির হলাম আতর দিদার বাড়ি। ন্যাড়া পোড়ার জন্য বাগানে জমিয়ে রাখা কাঠ কুটোর কথা বলতেই আতর দিদা বেশ গম্ভীর স্বরে বললেন –
    দিতে পারি, তবে আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
    প্রশ্ন ? এ আবার কি কথা দিদা?
    আকাশ থেকে পড়লি যে! আমার সোজা কথা - উত্তর দাও, কাঠ কুটো নিয়ে যাও।
     
    এমন প্রস্তাব আমাদের কাছে একদম নতুন বা অভিনব নয়। সরস্বতী পুজোর চাঁদা চাইতে গিয়ে, কিংবা ফাংশন করার জন্য চাঁদা চাইতে গেলেও পাড়ার মাসিমা, কাকিমা, জ্যেঠিমা মায় ঠাকুমা, দিদিমারাও হরেক প্রশ্নের ডালি সাজিয়ে আমাদের মতো বালখিল্যদের জ্ঞানগম্মি যাচাই করে নিতেন।ব্যাপারটা আমাদের কাছে অনেকটাই গা সওয়া হয়ে গেছে বলে আতর দিদার প্রস্তাবে আমরা সবাই প্রায় এককথায় রাজি হয়ে গেলাম। পাশে রাখা রূপোর পানের বাটা থেকে সযত্নে তৈরি এক খিলি পান ঠেসে নিজের মুখে গুঁজে নিয়ে এক গাল হেসে আতর দিদা বললেন –
     
    আমার বাপু তোদের কাছে একটাই প্রশ্ন।
    বলতো হোলিকা কে? তাঁর সঙ্গে এই ন্যাড়া পোড়ার সম্পর্ক কী ?
    প্রশ্ন শুনে আমাদের মধ্যে বেশ একটা সাড়া পড়ে গেল। আতর দিদার মুখে তখন যেন বিশ্বজয়ীর মুচকি হাসি। আয়েসি ভঙ্গিতে চোখ বুজে পান চিবোতে চিবোতে আতর দিদা মৃদু হেঁকে বলেন –
    কী হলো? সব ফুঁটো বেলুনের মতো চুপসে গেলি যে! ঝটপট উত্তর দে নইলে ও পাড়ার চরকিদের ডেকে ঐ সব কাঠ কুটো গুলো দিয়ে দেব। এই আমি গোণা শুরু কল্লুম। রাআআআআআম….দু….
     
    পাছে হাতের বাজি ফসকে যায়, তাই আমাদের তখন মরীয়া অবস্থা। আমাদের মধ্যে ছোটকা খুব বলিয়ে ক‌ইয়ে কথকি। সেই উত্তর দিলো…
    ইস্ ! ইল্লি আর কি! আমরা যে এতোক্ষণ খুঁটি আগলে বসে আছি, তার কোনো দাম নেই বুঝি! আমাদের চরকি শোনাচ্ছে!
     
    ছোটকা মুখ খুলেছে দেখে আমরাও তাকে দেখে মনে মনে খানিকটা সাহসী হয়ে উঠলাম। এবার পুকাইয়ের সরব হবার পালা। নিজের মাথায় সপাটে দুই চড় কষিয়ে সে বলে উঠল –
    কো..কো .. কোথায় ভাবলাম দু.. দু.. দুয়েকটা বা.. বা.. বানান জিগ্যেস করে আ.. আ.. আ.. আমাদের ছেড়ে দেবে, তা.. তা.. তা নয় তুমি ব.. ব.. বসলে হাজিবাজি পো.. পো.. পোশ্ন নিয়ে !
    এমনিতে স্বাভাবিক কথা বললেও, উত্তেজিত হলে পুকাই তোতলাতে থাকে। চরকির কথা বলে আতর দিদা আমাদের টেনশানে ফেলে দিয়েছেন। ছোটকা আবার তেতে উঠে বলে –
    সত্যি দিদা, তুমি বানান ধরবে ভেবে আমি তখন থেকে মনে মনে সব কঠিন বানান আওড়াচ্ছি-বীণাপাণি, কুজঝোটিকা, সবিশেষ,পাণিনীয়…. নিকুচি করেছে বানানের….
    এবার আমি আসরে নামি নিতান্ত বাধ্য হয়ে। আতর দিদার গণনা এতোক্ষণে ছয়ে পৌঁছে গেছে।
    কি! উত্তর মনে পড়েছে, নাকি প্রশ্নটাই বেমালুম ভুলে গেছিস্ ? আতর দিদার প্রশ্ন।
    আমতা আমতা করে আমি বলি -
    দিদা, আমি চেষ্টা করবো?
    বেশ খানিকক্ষণ পর চোখ খুলে আতর দিদা আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে বেশ ব্যঙ্গাত্মক কন্ঠে বললেন –
    ও ! তুমি! তা এতোক্ষণে চেষ্টা করলে, জবাব দেবে কোন্ কালে? আমি কিন্তু এখন সাতের ঘরে। সাআআআআ…
    হোলিকা হলো এক রাক্ষসী। হোলির আগের দিন তাঁকে পুড়িয়ে মারা হয়।
     
    ‌বলির পাঁঠার মতো কাঁপতে কাঁপতে ধরা গলায় কোনো রকমে ঠাকুমার কাছে শোনা পৌরাণিক কাহিনীর কথা স্মরণ করে এই যাত্রায় আতর দিদার হেঁয়ালি থেকে বাঁচার চেষ্টা করি।
    পাশে রাখা ডাবরে পানের পিক ফেলে একটু চিবিয়ে চিবিয়ে আতর দিদা এবার বলেন –
    মোটের ওপর যা বলেছো তা ঠিক। তবে এর পেছনে চমৎকার একটা কাহিনি আছে। তোমাদের কাছে কি তা শোনার জন্য সময় আছে?
    আমাদের মধ্যে তখন যুদ্ধজয়ের আনন্দ। আমরা সমস্বরে বলে উঠি –
        - হ্যা, হ্যা। আমরা শুনবো হোলিকার গল্প, ন্যাড়া পোড়ার ইতিহাস ।

    টেবিলের ওপর রাখা কৌটো খুলে প্রত্যেকের হাতে একটা করে গুঁজিয়া গুঁজে দিয়ে আতর দিদা শুরু করেন হোলিকা আখ্যান।
     
    “অনেক অনেক কাল আগের কথা। হিরণ্যকাশ্যপ বা হিরণ্যকশিপু নামে এক প্রবল পরাক্রমশালী দানব রাজা ছিলো। দেবতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক মোটেই ভালো ছিলোনা যাকে বলে আদায় কাঁচ কলায়। ফলে তাঁর দাপটে দেবতারা সবসময় একেবারে তটস্থ হয়ে থাকতেন। অত্যন্ত দাম্ভিক এই দানবরাজ সবসময় চেষ্টা করতো দেবতাদের জব্দ করে স্বর্গলোকে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু তেমনটা তো খুব সহজে হাসিল হবার নয়। তাঁর একমাত্র ইচ্ছে ছিল দেবতা দানব নির্বিশেষে সকলেই তাঁকে মান্য করবে।
    দেবতাদের ওপর এমন রাগের একটা কারণ অবশ্য ছিল। আসলে হিরণ্যকশিপুর ভাই হিরণ্যক্ষকে বরাহ মানে শূকর রূপী বিষ্ণু হত্যা করে। ভাইয়ের শোকে কাতর হয়ে হিরণ্যকশিপু প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠল। দেবতারা যাতে কখনোই তাঁকে মারতে না পারে সেজন্য সে হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় গিয়ে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যা শুরু করলো। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এক নাগাড়ে তপস্যা করে শেষে সিদ্ধি লাভ করলো। ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়ে হিরণ্যকশিপুকে বললেন –
    আমি তোমার কঠোর তপস্যায় তুষ্ট হয়েছি। বলো কী বর চাও?
    প্রভু, আপনি যদি সত্যিই আমার তপস্যায় তুষ্ট হয়ে থাকেন তাহলে আপনি আমাকে অমরত্বের বর দান করুন। হিরণ্যকশিপুর কাতর আবেদন।
    “বেশ মজার ব্যাপার তো! দেবতারা একটু ধমক দিল অমনি চোখ বন্ধ করে ধ্যান করতে বসে গেল! তা ব্রহ্মা বর দিলেন?’’ ছোটকার ঝটিতি প্রশ্ন।
    না দিয়ে উপায় কি? এই যে তোরা এতক্ষণ ধরে হত্যে দিয়ে পড়ে আছিস কয়েকটা শুকনো ডালপালা পাতার জন্য, এও তো এক সাধনা! ঠিক কিনা?
    সে যাই হোক বর লাভ করে আগের থেকে হিরণ্যকশিপুর দাপট গেল বেড়ে। তাঁর তাড়নায় সবার পাগলপারা অবস্থা। 
    এই অবধি বলে আতর দিদা একটু থামলেন। আমরা উশখুশ করছি দেখে তিনি বললেন -
    এখান থেকে আমি হোলিকার আখ্যান তোদের শোনাবো। হিরণ্যকশিপুর ছেলে হলো প্রহ্লাদ। 
    দ .. দ.. দৈত্য কুলের সে .. সে.. সেই পো..
     
    মনকথা ক‌ইবার জন্য পুকাইয়ের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা দেখে আতর দিদা তড়িঘড়ি বলে ওঠেন –
    হ্যা, সেই প্রহ্লাদ । দৈত্য হিরণ্যকশিপু কুলে বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদ। প্রহ্লাদ সারাদিন হরিনাম করে পিতার সমস্ত বিধি নিষেধ এড়িয়ে। প্রহ্লাদের চেষ্টায় আবার নতুন করে দেবার্চনা শুরু হয় রাজ্যে। ছেলের এই কাণ্ড দেখে হিরণ্যকশিপু ছেলেকে মেরে ফেলার নানা চেষ্টা করে , কিন্তু প্রতিবারই ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় আশ্চর্যজনক ভাবে রক্ষা পায় ভক্ত প্রহ্লাদ।সব চেষ্টা বিফলে যাচ্ছে দেখে রাগে অন্ধ হয়ে হিরণ্যকশিপু তাঁর বোন হোলিকার শরণাপন্ন হয়। রাক্ষসী হোলিকাও ছিল বরপ্রাপ্ত । তাঁর কাছে এক আশ্চর্য অঙ্গাবরণী মানে চাদর ছিল।
    ম্যাজিক চাদর ? তা কী হলো প্রহ্লাদের।
     এতক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে কেষ্ট প্রশ্ন করে। আমরা বুঝতে পারি ক্লাইম্যাক্স সমাগত। কেষ্টকে থামতে বলে আমরা সবাই বলে উঠি.. ‌
    দিদা, গল্পটা শেষ করো। নো কোয়েশ্চেন প্লিজ।
    আতর দিদা আমাদের শান্ত করে আবার শুরু করেন –
    চাদরটা সত্যিই জাদু চাদর ছিল। ওটা আগুনে পুড়ে যেত না। হোলিকা খুব আদর যত্ন করে প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে এক কুণ্ডের সামনে গিয়ে বসলো। আর তারপর হিরণ্যকশিপুর লোকজন সেই কুণ্ডে আগুন ধরিয়ে দিল।
     “এ কেমন বাবা! প্রহ্লাদ কি পুড়ে গেল?ওর গায়ে তো চাদর নেই। তাহলে কী হলো?” কেষ্ট প্রশ্ন করে।
    “এখানেও ম্যাজিক। রাক্ষসী হোলিকার মতলবের কথা আগে থেকেই বুঝতে পেরে ভগবান বিষ্ণু হোলিকার গায়ের সেই বরপ্রাপ্ত চাদরটা সরিয়ে ফেলে তাঁর পরম ভক্ত প্রহ্লাদের শরীরে ঢাকা দিয়ে দিলেন। প্রহ্লাদ রক্ষা পেয়ে গেল,আর হিংসুটে, কুচক্রী হোলিকা আগুনে পুড়ে মারা গেল। এই হলো হোলিকা দহনের আখ্যান।” একটানা অনেকক্ষণ ধরে আমাদের গল্প শুনিয়ে আতর দিদা এবার থামেন।
    আমাদের তখন মন্ত্রমুগ্ধ চিত্রার্পিত অবস্থা। আতর দিদার মুখে পুরাণের আখ্যান শুনে আমরা সবাই আপ্লুত। কার‌ও মুখে কথা ফুটছে না। ক্ষণিকের জন্য বিরতি নিয়ে দিদা নিজেই আবার মুখ খুললেন –
     আর একটা কথা তোদের বলি, এই যে সবাই ন্যাড়া পোড়ানোর কথা বলছিস আসলে কিন্তু কথাটা হলো মেড়া পোড়া। মেড়া শব্দের অর্থ হলো ভেড়া। এই মেড়া শব্দটাই ক্রমাগত উচ্চারণ করতে করতে আমরা তাকে ন্যাড়া করে ফেলেছি। ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ বলে একখানা বই আছে বুঝলি, বড়ো হলে নিশ্চয়ই একদিন সেই ব‌ই তোরা পড়বি, সেখানে এই মেড়া শব্দের উল্লেখ আছে।
    অবশ্য মেড়া শব্দের আরও কিছু মানে আছে। যার অর্থ হলো বোকা নির্বোধ মানুষ।
    তবে কি আমাদের মুর্খতার বিসর্জন দিতেই এই ন্যাড়া পোড়া থুরি মেড়া পোড়ানো?
     
    আমার ছোট্ট প্রশ্ন শুনে আবারও দুদণ্ড চুপ করে থাকেন আতর দিদা, তারপর ধীর গলায় বলেন –
    এসবই তো পুরাণের কথা। এক এক পুরাণে এক এক রকম কাহিনি তাই সঠিক উত্তর দেওয়া বেশ কঠিন। তবে এই সময় থেকেই শুরু হয় সূর্যের উত্তরায়ণ পর্ব মানে সুয্যিঠাকুর একটু একটু করে উত্তরপথে টহল দিতে শুরু করেন। এই উপলক্ষে মে উৎসবের আয়োজন করা হয় তাই হলো আজকের দোল উৎসব। আর এই বুড়ির ঘরে আগুন দেবার বিষয়টি হলো মেড়া বা মেষরূপী অসুরের দহন উৎসব। এই যে আগুন দেবার আগে বুড়ির ঘরে তোরা একটা পুতুল বানিয়ে রাখিস তা হলো উত্তর ভাদ্রপদ নক্ষত্রের প্রতিরূপ।ওসব পুড়িয়ে সূর্য দেবতার উত্তরপথে যাত্রাকে নির্বিঘ্ন করা হয়। সব‌ই প্রতীকী অর্থে করা হয় বুঝলি। আসলে আমাদের তো বেঁচে থাকার জন্য কিছু অবলম্বন লাগে, তাই অসুরের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা মেষ বা অজকে দহন করি। এটাই হোলিকা দহন পর্বের তাৎপর্য।
    এবার সত্যিই আতর দিদার কথকতা শেষ হয়। পুরাই বলে ওঠে –
    তা.. তাহলে দি.. দিদা তোমার বা.. বা.. বাগানের জ্বালানিগুলো আ.. আমরাই পা.. পা.. পাচ্ছি তো?
    আতর দিদার মুখে এক গাল হাসি ঝরে পড়ে সম্মতির স্মারক হিসেবে। আমরা তাঁকে মাঝখানে রেখে গোল হয়ে ঘিরে ধরে হাততালি দিয়ে ছড়া কাটতে থাকি–
     
    আজ আমাদের মেড়া পোড়া
    কাল আমাদের দোল,
    পূর্ণিমার ঐ চাঁদ উঠেছে
    বলরে হরিবোল, বলরে হরিবোল।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অঞ্জনা বন্দ্যোপাধ্যায় | 2409:4060:20d:dd09:971d:6f84:9046:be5 | ২৪ মার্চ ২০২৪ ১৩:০৮529751
  • লেখকের আত্ম অভিজ্ঞতার সূত্রে আমার কিশোরী বেলায় ফিরে গেলাম। আতর দিদা অনবদ্য। তাঁর মধ্যে আমার নিজের ঠাকুমার ছায়া দেখতে পেলাম। খুব ভালো। তবে হিরণ্যকশিপুর রোমহর্ষক পরিণতির কথা আরও একবার শোনার ইচ্ছে র‌ইলো।
  • সপ্তর্ষি | 216.208.206.12 | ২৫ মার্চ ২০২৪ ০২:০৫529775
  • অজানা মিথোলজি 
  • Falguni Mazumder | ২৫ মার্চ ২০২৪ ০৮:৩১529781
  • ভারতের লোকেরা যে এখনো মূর্খ, অজ্ঞ তার প্রমাণ হোলিকা উৎসব। আর্যাবর্তের মানুষদের অনার্যদের প্রতি আছে চরম বিবমিষা।
    রাবণ হোল রাক্ষস, শূর্পনখার নাক কেটে নেয়া, লক্ষণ হোল বীর।
  • বিপ্লব রহমান | ২৬ মার্চ ২০২৪ ২১:৪৩529843
  • কি মায়াবী শৈশব! চরম হিংসিত। cool
     
    দারুণ লেখা। 
  • Somnath mukhopadhyay | ২৬ মার্চ ২০২৪ ২২:২৩529844
  • আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই বিপ্লব আপনাকে। এই কাহিনীর প্রথমাংশটি ভেজাল হীন। আজ থেকে কমবেশি সাড়ে পাঁচ দশক আগে যেমনটি ঘটেছিল ঠিক ঠিক তেমনি লেখার চেষ্টা করেছি। ক্রমশ‌ই আমাদের শহুরে শৈশব প্রবলভাবে যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে। যে শহরতলির বাসিন্দা আমি সেখানেও একই হাল। পাছে হিংসুকের সংখ্যা আরও বেড়ে যায় তাই হোলিকা দহন আখ্যান লিখে ফেললাম। ভালো থাকবেন। আপনার ভালো লাগার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ুক আরও আরও অনেক মানুষের মধ্যে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন