এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পাখির ডানায় লেপ্টে থাকা ফুরিয়ে যাওয়া আকাশ

    ভাষা ভাষা লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১৮৩ বার পঠিত
  • সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। হাজার হাজার বছর আগের তো বটেই! অবশ্য হাজার হাজার-ই কিনা হলফ করে বলা মুশকিল, তবে ঘটেছিল যে অনেক দিন আগে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মোটের ওপর ঘটনাটা পুরনো, তবে পুরাণের গল্প নয়, সে তুলনায় বেশ আধুনিকই! ওই ইতিহাসের খাঁজ-খোঁজে ফসিল হতে থাকার এক বিরামহীন তোড়জোড়ে হঠাৎ-আবিষ্কার আর কী!
    এক দেশে ছিল দুই ফেরিওয়ালা। দু’জনই পুরনো জিনিসের বিনিময়ে নতুন জিনিস বিক্রি করত। তুল্যমূল্যে — অবশ্যই ফেরিওয়ালার বিচারে, পুরনো জিনিস সংখ্যায় ও দামে কম মনে হলে ক্রেতাকে কিছু নগদও দিতে হতো বৈকি। কিছুদিন আগে অবধিও খুবই দেখা যেত পুরনো জামাকাপড়ের বদলে স্টেইনলেস স্টিল-এর বাসন-কোসন-এর এক অদ্ভুত বার্টার সিস্টেম। এখনও বোধহয় উঠে যায়নি পুরোপুরি! তা রোজ যেমন বেরোয়, ঝাঁকায় পসরা সাজিয়ে ওরা বেরিয়েছে সেদিন। উত্তরপাড়ায় ঢোকার মুখেই দু’জনের দেখা। তখন একজন আরেকজনকে বলে, দু’জনেই একই পাড়ায় গেলে কারোরই ব্যবসা তেমন সুবিধের হয় না, তুই বরং প্রথমে দক্ষিণদাঁড়ি থেকে ঘুরে আয় আর আমি প্রথমে এই দিকটা ঘুরে যাই। তারপর একজন উত্তরপাড়া আর অপরজন দক্ষিণদাঁড়ির দিকে বেরিয়ে পড়ে।
    প্রথমজন, যে উত্তরপাড়ায় ফেরি করতে গেছে ঘুরতে ঘুরতে এসে পৌঁছোয় এক পুরনো বনেদি বাড়ির সামনে। বাড়ি তো নয়, অট্টালিকাই বলা যায়! আবার এ-ও ঠিক, দেখলেই বোঝা যায় একসময় প্রচুর রমরমা থাকলেও এখন খুবই খারাপ অবস্থা। চারপাশ আগাছায় ভরে যেতে যেতে রীতিমতো জঙ্গলই হয়ে গেছে বাড়ির পুব দিকটায়। আর বাড়িটার দোতলা-তিনতলায় ইতিউতি দেওয়াল ফুঁড়ে বট-অশ্বথ্থ গজিয়ে যা ফাটল ধরিয়েছে, সংখ্যায় সে-ও নেহাত কম নয়! যে কোনও সময়েই ভেঙে পড়তে পারে!
    তো সেই ধ্বংসস্তুপে বাস করে এক ঠাকুমা আর তার নাতনি। ওই বিশাল বাড়ির আর সব লোকজন কবেই মরে গেছে। পড়ে রয়েছে ওই দু’জন। যত পুরনো দামি জিনিসপত্র ছিল, বিক্রি করে করে কোনোমতে এতদিন চলছিল। এখন আর বলতে গেলে চলেই না। বিক্রি করতে করতে এখন আর তেমন জিনিসপত্রই বা কোথায়?
    এদিকে ফেরিওয়ালা এসে তো হাঁকডাক শুরু করে দিয়েছে। এই সুর করে ডাকছে তো ওই হল্লা করে। যার শোনার তার কানে তো গেছেই আর ওপর থেকে সে দেখেও নিয়েছে ফেরিওয়ালার ঝাঁকায় থরে থরে  সাজানো খেলনা। বাচ্চা মেয়ের কি আর তর সয়! নুন আনতে যে পান্তা ফুরোয়, একেবারে যে বোঝে না, তা তো নয়, তবু ওই অতটুকু বয়সে খেলনা দেখলে বাপ-মা মরা মেয়েটার মন নেচে উঠবে না, তা কি কখনও হয়?
    নাতনিটাকে দেখলেই চোখে জল চলে আসে ঠাকুমার। আবার সেই তো কোলে পিঠে করে মানুষও করে। অনেক খুঁজে পেতে কোথা থেকে একটা ভাঙা থালা নিয়ে আসে বুড়ি ঠাকুমা। বাড়িয়ে ধরে ফেরিওয়ালার দিকে। থালাটার করুণ অবস্থা দেখেও যা বোঝার বুঝে নেয় ফেরিওয়ালা।
    বলে, এ তো একেবারে ভাঙা থালা বুড়িমা। এতে আর ক’পয়সা হবে! আমি কোথাও বিক্রিই করতে পারব না। এর বদলে খেলনা তো হবেই না, এর সাথে আরও পয়সা দশেক দিলে না হয় আমি ভেবে দেখতে পারি।
    দশ পয়সা? অত পয়সাকড়ি যদি আমার থাকত? অন্তত নাতনিটাকে কিছু ভালমন্দ খাইয়ে রাখতে পারতাম।
    ঠাকুমা নিরুপায়। নাতনি ছলছল। তবু ফেরিওয়ালার মন গলে না। ভাবে একবার দক্ষিণদাঁড়িটা ঘুরে আসি। ওখানে যদি আরও বড় কোনও দাঁও না মারা যায়, তখন না হয় আবার এসে থালাটা আত্মসাৎ করা যাবে। এই ভাবনায়, না গো বুড়িমা কোনোমতেই হবে না, বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে, ইত্যাদি বলে টলে ওখান থেকে চলে যায়।
    কিছুক্ষণ বাদে সেখানে এসে উপস্থিত হয় সেই দক্ষিণদাঁড়ি ফেরত দ্বিতীয় ফেরিওয়ালা। সে-ও হাঁক পাড়তে থাকে — পু-র-নো জিনিস দিয়ে ন-তু-ন জিনিস নে-বে-ন! নেবেন-এর অতিরিক্ত টানটা একটু বেশি বেশিই অতিরিক্ত!
    এবারও সেই একই দৃশ্য! আগে নাতনি। পিছন পিছন ঠাকুমা। বদলে যায় এর পরের দৃশ্যটা। থালাটা হাতে নিয়েই দ্বিতীয় ফেরিওয়ালা বলে ওঠে, এ কী মা! এ তো সোনার! আমার ঝাঁকায় যত জিনিস আছে, সব দিয়ে দিলেও তো কিছুই হবে না। আরও অনেক পয়সা কড়িও দিতে হবে। আমার কাছে তো অত পয়সা নেই। এ আপনি রেখে দিন।
    ঠাকুমাও চমকে ওঠে! সোনার? তবে যে এক্ষুণি আরেকজন এসেছিল, সে বলল, এই ভাঙা থালার কানাকড়িও দাম নেই। তোমার ভুল হচ্ছে না তো বাবা?
    থালা পুরনো হতে পারে। ভাঙা, সে-ও ঠিক। তবু সোনার জিনিস চিনতে কি আর ভুল হবে? বলে বুড়িমার দিকে এগিয়ে দেয় থালাটা।
    থালাটা ফেরত নিতে গিয়েও নাতনির চোখে চোখ পড়তে ঠাকুমা বলে, তোমার কাছে যা আছে তাই দিয়ে দাও। না হলে আমার এই নাতনিটা খুব দুঃখ পাবে! এমনিতেই ওর কষ্টের জীবন। তোমার যদি মনে হয় পরে কোনও একদিন এসে নাহয় আরও কিছু দিয়ে যেও।
    অনিচ্ছার সাথে হলেও ঝাঁকা ফাঁকা করে থালাটা ঝোলায় ভরে সে ঘাটের দিকে রওনা দেয়।
    খানিকক্ষণ বাদে বুড়িমার বাড়িতে এসে উপস্থিত হয় সেই প্রথম ফেরিওয়ালা। সব শুনে সে হায় হায় করতে থাকে। বুঝতে বাকি থাকে না কিছুই। পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে ঘাটে এসে দেখে নৌকোটা সবে ঘাট ছেড়ে চলে যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে দিগ্বিদিকশূন্য সর্বস্ব-ঝাঁপে পা ফসকে সরাসরি গিয়ে পড়ে জলে। সে সাঁতার জানত না। সেখানেই সব শেষ। সলিল সমাধি।

    ছেলের বয়স চার। রাতে ঘুম পাড়ানোর সময় রোজই গল্প বলতে হয়। গল্প না শুনে ও ঘুমোতে যায় না। এই ধরাধামে গল্পের সংখ্যা নেহাত কম নয়! সারা জীবন ধরে শুধু গল্প বলে গেলেও মোটেই ফুরোবে না। তবে অত গল্প তো আর আমার জানা নেই! আমার যা পুঁজি তা প্রায় শেষের মুখে, ছেলের মায়েরও তথৈবচ। স্মৃতির ভাঁড়ার তো দু’জনেরই কবে শেষ! তারপর আমাদের দ্বিতীয় শৈশব, ছেলের প্রথম জ্ঞানে বইপত্র-ও নেহাত কম কেনা হল না, তাও প্রায় শেষের পথে।  
    আমার একেবারে ছোটবেলার বন্ধু সুজয়। আমরা একই পাড়ায় পাশাপাশি দু’টো বাড়িতে বড় হয়েছি। বারোটা বছর একই স্কুলে পড়াশুনো করেছি। অনেকদিন পর্যন্ত, তা ক্লাস টুয়েলভ অবধিও হতে পারে — আমি পড়েছি, ও পড়েনি বা ও পড়েছে, আমি পড়িনি এরকম কোনও বই পৃথিবীতে ছিল বলে মনে হয় না। ভাগাভাগি করে দুই বাড়িতে শুকতারা, সন্দেশ, কিশোর ভারতী, আনন্দমেলা, দেব সাহিত্য কুটিরের পুজোসংখ্যা কেনা হত, যাতে কিছু বাদ না পড়ে।
    তো সুজয়ের মেয়েও প্রায় আমার ছেলের বয়সী। সাড়ে তিন। ওরও একই সঙ্কট। প্রতি রাতে অন্তত একটা গল্প। আরব্য রজনীর ওরকম ভয়ঙ্কর কোনও শর্ত না থাকলেও, ততদিনে আমরা নিজেরাই নিজেদের চাপে ফেলে দিয়েছি। তাই নিরন্তর চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের জোগানের ভাঁড়ার রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছে।
    সেদিন রাতে ঘুমের উদ্যোগে এপাশ-ওপাশ কসরতে কোথা থেকে যেন এসে হাজির হয় ওই দুই ফেরিওয়ালা। ওরা একবার এসে পড়লে খানিক ধন্দে পড়ি, আমিই কি ওদের ডেকে নিয়ে এলাম, নাকি ওরা দু’জন নিজে থেকে এসেই ধরা দিল, না আগাগোড়া ওরা ছিলই, আমিই হুমড়ি খেয়ে পড়লাম ওদের গায়ে। আবার কোথায় যেন একটা উশখুশ! আমিই কি বুনলাম কাহিনিটা? নাকি স্মৃতির অতল থেকে ভেসে উঠল, শীতঘুম থেকে হুড়মুড় করে জেগে ওঠা সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলা। ছেলের মা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। জিজ্ঞেস করার উপায় নেই। সে রাতে ছেলেকে গল্প বলতে বলতে মাঝ পথে একটা ফোন আসায় উঠে যেতে হয়েছিল। বাকি গল্পটা শেষ করে ছেলেকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে কখন নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
    আর সুজয়ের সাথে তো কবেই বদলে গেছে আমাদের সব দিনগুলি আর রাতগুলি। এমনিতে ওর এখন কাজের জায়গাতেই থাকার কথা, কিন্তু এ সপ্তাহে ওরা বেড়াতে গেছে উচ্চারণে বেশ খটমট একটা কোথাও। ওরা, মিঞা-বিবি দু’জনই বলতে গিয়ে বার দু-তিনেক তুতলে গেল! আমি আর তাই চেষ্টাই করলাম না। ওদের ফিরতে ফিরতে কাল সন্ধে। তার মানে আমাদের পরশু। তাই সই।

    ওদের জিজ্ঞেস করতে পারি না। তা বলে গল্প থেমে থাকে না। সে এগোতেই থাকে। আপন মনে। আপন পথে।
    গতকালই শেষ পর্যন্ত থালাটা বিক্রি করা গেছে, হাতে এখন অনেক পয়সা, যাই বুড়িমাকে গিয়ে কিছু দিয়ে আসি ভাবনায়, সেদিন ফেরিওয়ালা (এখন আর দ্বিতীয় বলার কোনও মানে হয় না, ও তো এখন একাই) বাড়ি থেকে সবে বেরোবে, এমন সময় গ্রেফতারি পরোয়ানা সহ  হাজির হয় রাজপেয়াদা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে কয়েকজন ষণ্ডামার্কা লোক মুখে কাপড় গুঁজে, হাতে-পায়ে দড়ি বেঁধে ধরে নিয়ে যায়।
    একটা ছোট্ট কুঠুরিতে ছুড়ে দেয়। গোড়ায় দিন দু’য়েক তো বোঝাই যায় না, হঠাৎ কী হল? সব তো ঠিকঠাকই চলছিল, তাহলে হল কী?
    আদালতে নিয়ে গেলে জানা যায়, খুনের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে।
    খুন?
    হ্যাঁ। খুন।
    কাকে ধর্মাবতার।
    অ্যাঃ! ন্যাকা। ভাবটা এমন যেন কিছুই জানে না।
    সত্যিই বুঝতে পারছি না হুজুর।
    কেন? যেদিন তুই ওই বুড়িমার বাড়ি থেকে সোনার থালাটা চুরি করে আনলি...
    চুরি?
    চুরি ছাড়া আবার কী? ওই সোনার থালা কেনার ক্ষমতা, মানে অত পয়সা তোর আছে?
    নেই বলেই তো আমি নিতে চাই নি হুজুর!
    তাহলে কি জোর করে তোর হাতে গুঁজে দিল?
    জোর করে নয়, তবে অনেকটা সেরকমই প্রা...
    ঠিক আছে। ঠিক আছে। চুরি যদি না-ও বলা যায় ঠকিয়ে তো বটেই! ওরকম সাতে-নেই-পাঁচে-নেই একটা বয়স্ক মানুষ! ওই নাতনিটা ছাড়া যার তিন কুলে কেউ নেই! তাকে কেউ এইভাবে ঠকায়! একটা ঠগ। তার আবার এত বড় বড় কথা। ছিঃ! ছিঃ! ছিঃ!
    হুজুর! এ কী বলছেন!
    আর তোর বন্ধুকে যে খুন করলি?
    খুন? কী বলছেন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
    আসলে থালাটা তো ওরই পাওয়ার কথা! তুই ফাঁকতালে মেরে দিলি। আর তারপরে জলে ফেলে দিয়ে চিরতরে মুছে দিলি ছেলেটাকে।
    আমি কী করে ফেলব হুজুর? আমি তো তখন নৌকোয় আর নৌকোটাও তখন ছেড়ে দিয়েছে। ওর ডাক শুনে ফিরে তাকাল তো মাঝি। আর দেখল সারেঙ। অবশ্য জলে ভারী কিছু একটা পড়ার শব্দ আমিও পেয়েছিলাম, তা ঠিক! আর আমি দেখতে পাইনি ঠিকই তবে নৌকোর আরও অনেকেই দেখেছিল ব্যাপারটা! ও তো একেবারে শেষমুহূর্তে নৌকোয় উঠতে গিয়ে পা ফসকে পড়ে গেল!
    এভাবে কথা চালাচালিতে, কথা চলতেই থাকলে ফেরিওয়ালা ধীরে ধীরে বুঝে যায়, ওসব ‘যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না’ শুধু কাঠগড়াটার ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক। তার বাইরে এর কোনও অস্তিত্ব নেই!

    এইভাবে বন্দীর জীবন কারাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে অসহায় মাথা কুটতে থাকে। ক্রমশ জানতে পারে, ওই প্রথম ফেরিওয়ালা ছিল রাজার বিশেষ পেয়ারের লোক। আদতে গুপ্তচর। কোথায় কী ঘটছে, রাজার সম্পর্কে কে কী বলছে, কোথায় ঘোঁট পাকছে, কারা আগুন নিয়ে খেলছে, কারাই বা সেই আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে, সব খবরই রাজার কাছে পৌঁছে দিত সেই ফেরিওয়ালা। আর সেই ফেরিওয়ালারই কিনা মৃত্যু! আর অপঘাতে? কোন রাজাই বা তার একান্ত আজ্ঞাবহ প্রজার এমন একটা পরিণতি মেনে নিতে পারে? জীবিত ফেরিওয়ালা সম্যক বুঝে যায়, একজনের পা ফসকানোয় আরেক জনের পা থুড়ি হাত থাকতেই পারে। বস্তুত গোড়ার দিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থাতেই পড়ে ছিল বেশ কিছু দিন।
    দিনকয়েক বাদে সেই বাঁধন খুলে গেলে তাতেই যেন পাওয়া যায় এক মুক্তির আস্বাদ। একেবারে মুক্তির কোনও প্রসঙ্গ ওঠার কথা নয়, ওঠেও না। একসময় সে বন্দীজীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। থাকতে থাকতে এর-ওর সাথে আলাপ-পরিচয় হয়ে যায়। একে একে সবার কথা শোনে। নিজেরটাও বলে। মাঝে মাঝে দু’একজন ছাড়া পেয়ে যায়। আর দেখা যায় না তাদের। কোন নিয়মে, ঠিক কী বিচারে যে তারা ছাড়া পায় নিশ্চিত বোঝা যায় না। তাদের বেশির ভাগই তো দাগী আসামী, বড় বড় ডাকাত নয়তো খুনি বা অন্য আরও কিছু! আর যারা রয়ে যায়, তারা দিনের পর দিন রয়েই যায় — ওদের বেশির ভাগই আবার কেমন জানি ভালমানুষ গোছের, কেউ কেউ নিতান্ত গোবেচারাই! অন্তত ফেরিওয়ালার তো তাই মনে হয়! নিজেকে তো সে এই দলেই ফেলে — নিরীহ, শান্তশিষ্ট। আর ওদের সাথে জেলেই রয়ে যায়।
    অনেকেই জপ তপ করে, রাতদিন ভগবানকে ডাকে। মন্ত্র তো কেউ জানে না, নিজের মতো করে নিজের কথা বলে। জেলের পুরোহিত অবশ্য একজন আছে, তবে তাকে দিয়ে পুজো করালে অনেক গুনাগার দিতে হয়! পয়সাকড়ি তো কারোর নেই, গা-হাত-পা টিপে দিতে হয়। তা নিদেন পক্ষে ঘন্টা দু’য়েক তো দিতেই হয়! তারপর নিজেরই গা-হাত-পা নাড়নোর মতো ক্ষমতা আর বিশেষ থাকে না।
    একদিন দেখে উল্টোদিকের কুঠুরির বন্দী, দিন নেই রাত নেই ভগবানকে ডেকেই চলেছে। খেতেও যায় না, বাইরেও বেরোয় না। ওই একভাবে বসে ঠাকুরের নাম নেয়, ঠাকুরকে ডাকতে থাকে। লোকজন বলে তপস্যা। কেউ কেউ ধ্যানও বলে। একনিষ্ঠ সাধনভজন। একদিন অনেকক্ষণ ধরে কার সাথে যেন কথা বলতে দেখা যায়। কাউকে দেখা যায় না বটে, তবে অতক্ষণ ধরে কথা, সে বিড়বিড়ই হোক না কেন, তা কি শুধু নিজের সাথেই হতে পারে। এবার লোকে বলে ওর ভর হয়েছে!
    কী যে হয়েছে ঠিক বোঝা না গেলেও সেই বন্দী ধীরে ধীরে আবার আগের জীবনে ফিরে আসে। দিনে-দুপুরে-রাতে যতবার খেতে দেয়, খায়। বাইরে বেরোয়। জেলের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফেরে।
    তারপর একদিন কথায় কথায় জানা যায়, ওই কঠিন তপস্যায় ভগবানের দেখা সে পেয়েছিল।
    ফেরিওয়ালা উৎসুক হয়ে ওঠে, তারপর?
    তারপর আবার কী?
    ফেরিওয়ালা জানতে চায়, কিছু কি চেয়েছিল সে ভগবানের কাছে? কিছু কি বলেছিল ভগবানকে?
    অস্ফুট স্বরে সেই বন্দী কিছু বললে গোড়ায় কিছুই বোঝা যায় না। ঠোঁট দু’টো নড়তে থাকে, আওয়াজও বেরোয়, তবে তাতে বোধগম্যতার কোনও ঠিকানা থাকে না। অনেক গলা খাঁকারি, জলের পর জল গলা পার করে শরীরে ঢুকলে ধীরে ধীরে ব্যাপারটা পরিষ্কার হতে থাকে।
    • আমি বললাম, ঠাকুর বাকি জীবন কি এরকম ভাবেই কাটবে?
    • কেন খারাপ কী কাটছে! খাচ্ছিস দাচ্ছিস। ঘুমোচ্ছিস। কোনও দায়-দায়িত্ব নেই, খাবার জোগাড় করার ঝামেলা নেই। এ তো দিব্য সুখের জীবন।
    • কারাগারে বন্দী জীবন সুখের কিনা বলতে পারব না, তবে ঠাকুর এরকম সুখের জীবন তো আমি চাইনি! ঘরে বউ-বাচ্চা, বৃদ্ধ মা-বাবা আর এখানে কোনও অন্যায় না করেও বিনাবিচারে বন্দী!
    • দ্যাখ বাবা সবারই নিজেকে নিরাপরাধ মনে হয়। সেইজন্যই তো নিজের বিচার কখনও নিজে করা যায় না। করা উচিৎ-ও নয়! আর এইসব বিচারব্যবস্থা নিয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। কখন আদালত অবমাননার দায়ে জেলে পুরে দেবে!
    • আপনাকে?
    • কেন? আমাকে নয় কেন?
    • না। তা না। তা বলে আপনাকে?
    • শোন। এই বিচারব্যবস্থা কে তৈরি করেছে? মানুষ। তাহলে? সে নিজের বানানো জিনিস নিজের আয়ত্ত্বে রাখতে পারবে না?
    • আজ্ঞে!
    বন্দী শেষপর্যন্ত কিছু বুঝল কিনা সম্যক বোঝা যায় না। তবে সেসব তো বোধের ব্যাপার! আর মুখে বলে, শরীরটা দিন দিন এত খারাপ হয়ে যাচ্ছে, আর বাঁচতেই ইচ্ছে করে না।
    • ইচ্ছেটা করবে কী করে শুনি! এরকম শুয়েবসে জীবন কাটালে কারও বাঁচতে ইচ্ছে করে? সশ্রম কারাদণ্ড কি আর ওরা এমনি এমনি দেয়! কোথায় সারাদিন কাজকর্ম করবি, লোকের কাজে আসবি, রাতে ভাল ঘুমোবি, দিব্যি সময় কেটে যাবে, তা না দিনভর শুধু আলসেমি!
    • আজ্ঞে! এ ক’দিন তো হুজুরের খোঁজে ব্যস্ত ছিলাম!
    • সে তো ইদানিং! পুরো পঞ্চাশ বছরও বোধহয় হবে না।
    • তাই হবে বটে! হুজুর।
    • শোন। যে-আজ্ঞে-হুজুর করে তো আর দিন কাটবে না। মন দিয়ে শোন। রোজ সকালে এই মন্ত্রটা বলে কাজে নেমে পড়বি।
    চল্    কোদাল চালাই
    ভুলে   মনের বালাই—
    ঝেড়ে  অলস মেজাজ
    হবে    শরীর ঝালাই।।

    যত     ব্যাধির বালাই
    বলবে   “পালাই পালাই”—
    ভগবানের মন্ত্রের কথা বলতে বলতে বন্দী থেমে গেলে, ফেরিওয়ালা ফোঁস করে ওঠে, — ব্যাস! আর কিছু বলল না।
    • কেন? মন্ত্রটার আরও কিছু বাকি ছিল?
    • আরে! এর পরই তো —
    যত     ব্যাধির বালাই
    বলবে   “পালাই পালাই”—
    পেটের   খিদের জ্বালায়
    খাব      ক্ষীর আর মালাই।।
    • তুমি ভগবানের মন্ত্রও জানো?
    • আরে মন্ত্র তো মানুষই বানিয়েছে। না কি? সবই মানুষের বানানো।
    • একেবারে ক্ষীর আর মালাই?
    • তাহলেই বোঝো। এমনিই আধপেটা জীবন, তার ওপর ক্ষীর আর মালাই! কে যে ভেবেছিল এমন একটা ভাবনা। পালাই-এর সাথে মিল দিতে গিয়ে কিনা মালাই!
    • ঠিক বলেছ জীবনের কোনও হিসেবই মেলে না। মিল দিতে গেলেই যত গণ্ডগোল।
    • সে তো বটেই! তবে বুঝতে পারছ ভগবান কীরকম মোক্ষম জায়গাটা চেপে গেছে।


    সেই ঘটনার পরও কেটে গেছে বেশ কয়েকশো বছর। যতই তুমি কোনো কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ো, এমনকী তোমায় যদি সোনার খাঁচায়, সোনার পালঙ্কে শুতে দেওয়া হয়, সোনার থালায় চোব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় খেতে দেওয়া হয় তবু তোমার মুক্তির আকাঙ্খা কিছুতেই যাবে না। আর এক্ষেত্রে তো সেসব সোনা-রুপোর প্রশ্নও ওঠে না। অগতির গতি বলে ভিন্ন কিছু তো আর হয় না! যার কেউ নেই, তার ভগবান আছে। শুরু হয় তপস্যা। এবার ফেরিওয়ালা। রীতিমতো তেড়েফুঁড়ে! ঘোরতর সে তপস্যা। শেষ পর্যন্ত ভক্তের সেই কাতর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পারে না ভগবান। বন্দীজীবনের তো একটাই লক্ষ্য — মুক্তি। চার দেওয়ালের নিষ্ঠুর শ্বাসরোধী আবহাওয়া থেকে মুক্তি। স্বয়ং ভগবান একটা রাস্তা বাতলায় — অভুক্ত রাজার মুখে খাবার তুলে দিতে পারলে, নিশ্চিত মুক্তি।
    রাজা! সে আবার অভুক্ত? বেশ আঁতকেই ওঠে বন্দী।
    হ্যাঁ। অভুক্ত রাজাকে নিজের হাতে খাওয়াতে পারলে তবেই মুক্তি। স্বয়ং-ভগবানের, ভদ্রভগবানের এক কথা।
    বন্দী বোঝে তার এতদিনের তপস্যা জলেই গেল। সারাটা জীবন জেলেই পচতে হবে।
    তবু একসময় মুখ থেকে বেরিয়েই যায় — রাজা কি কখনও অভুক্ত থাকতে পারেন? প্রশ্নটা করে ফেলে নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছে করে ফেরিওয়ালার। এ আবার রাজদ্রোহের ঘেরাটোপে ঢুকে পড়লা না তো!
    দেখা যায় তা নয়। বরং ভগবান সাহায্যই করতে চায়! মহারাজ নবরাত্রির সময় পুজো না হওয়া অবধি কিছু না খেয়ে থাকেন। তো সেই উপবাস ভঙ্গের মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত হয়ে রাজাকে খাইয়ে দিয়ে আসতে হবে।
    প্রধান দুটো কাজ, জেল থেকে সাময়িক বার করা, আবার রাজপ্রাসাদে অনধিকার প্রবেশ, দুটোই করিয়ে দেবে স্বয়ং ভগবান। একটা মাত্র কাজ, রাজার উপবাস ভঙ্গটাই যা করতে হবে বন্দীকে।
    এক অবুঝ আশায় যথাসময়ে বেরিয়ে পড়ে বন্দী। কেউ বাধাও দেয় না। একবার যে পালিয়ে যাওয়ার কথা মনে আসে না, তা নয়, তবে ও জানে পালাবার কোনও পথ নেই। তার চেয়ে বরং এতদিনের কৃচ্ছ্র, তার সাধনা, তার ফল যখন ধীরে ধীরে পাওয়ার সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তার ওপর ভরসা রাখাই ভাল। এতক্ষণ নানা ভাবনায়, ভবিষ্যতের রঙিন সম্ভাবনায়, খেয়ালই করেনি কোনও খাবারই তো নেওয়া হল না! এখন খাবার জোগাড় করে কোথ্থেকে? শেষে কি তীরে এসে তরী ডুববে নাকি?
    এমন সময় ওদিকে পুকুর পাড়ে নারকেল গাছের সারি নজরে আসে। নজরে তো আসে, একসময় পৌঁছেও যায়, কিন্তু অত উঁচু থেকে নারকেল পাড়বে কী করে? আবার হতাশ হয়ে পড়ে। এলোমেলো এগোতে থাকে। আর দেখে পুকুরপাড়ে কাদায় গেঁথে আছে এক বেওয়ারিশ ডাব। গাছ থেকে কখন খসে পড়েছে যেন ওরই জন্য। আর খসে পড়ে চুপটি করে নিঃসাড় অপেক্ষায় বসে আছে সেই কখন থেকে। ছাল ছাড়িয়ে, পুকুরের জলে ভাল করে ধুয়ে নিয়ে রওনা দেয় অবারিত বন্দী।
    রাজপ্রাসাদেও দিব্য ঢুকে যায়। কেউ আটকায় না। বরং তাতেই যেন একটা কিন্তু কিন্তু ভাব জেগে ওঠে মনে। একসময় পায়ে পায়ে পৌঁছেও যায় ঠিক রাজার সামনে। যেন নিজের খুলিটাকে হাতের মুঠোয় ধরে, তার ভেতর থেকে মগজটা বার করে এনে রাজাকে সমর্পন করবে অভিপ্রায়ে মাটিতে ঠুকতে থাকে নারকেলটা। তবে চার-পাঁচবারের চেষ্টাতেও যখন কিছুই হয় না,  ভয়ঙ্কর কয়েকটা আওয়াজই হয় শুধু, তখন একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারপাশে। রাজাকে ঘিরে থাকা ভিড়টা ক্রমশ পিছোতে থাকে আর কালো-বিড়ালেরা একটা নতুন আড়ালের বলয় তৈরি করতে থাকে রাজাকে ঘিরে।
    এ যে বোমা আর রাজাকে মারার জন্যই এর রাজসভায় আগমন তা নিয়ে কারও সন্দেহই থাকে না। ততক্ষণে সাতবার চেষ্টা করা হয়ে গেছে। আটবারের পর কোথা থেকে খবর আসে নবরাত্রির দিন ন’বারের মাথাতেই নাকি বোমাটার ফাটার কথা। ত্রাস আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বন্দী আবারও বন্দী হয়ে পড়ে। আগেরবারেরটা যদি রাজদ্রোহ হয়, এবারেরটা তো সরাসরি রাজহত্যা!

    গোড়ায় খানিক হতভম্ব হয়ে পড়ে! বিমূঢ় বোবা জিজ্ঞাসায় একসময় এসে উপস্থিত হয় সেই কুঠুরিতেই। ততদিনে ওই অবরুদ্ধ জমিটা যেন ওরই জন্য একপ্রকার নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। হতাশ দৃষ্টিতে শুধু নজরে আসে মাথার ওপর ছাদ, চারদিকের কঠিন দেওয়াল আর একদিকের দেওয়াল যেখানে ছাদ ছুঁতে চলেছে সেখানে নিঃসঙ্গ এক ঘুলঘুলি। যেখানে সামান্য ফাঁক আছে, কোনও ফোকর নেই। আর ফাঁকতালের তো কোনও প্রশ্নই ওঠে না। কোনো তরফেই!
    শুরুতে রাজহত্যার কেসই দেওয়া হয়েছিল। হত্যা বলতে হত্যার চেষ্টা। তবে রাজপ্রাসাদে ঢুকে রাজাকে হত্যার চেষ্টা আর প্রকৃত হত্যার মধ্যে কতটুকুই বা পার্থক্য! এরমধ্যেই কার মাথায় আসে, এইভাবে নারকেল ফাটানোর মতো করে বোম ফাটানো তো আত্মহত্যারই শামিল। শুধু রাজামশাই যে মারা যেতেন, তা তো নয়, তার সাথে বন্দী নিজেও তো উড়ে যেত। তার মানে সুইসাইড স্কোয়াড। আরও গভীর ষড়যন্ত্র!
    নিজের কৃতকর্ম, তার দুর্বোধ্য মোচড়ের বিভ্রান্তিতেই যে অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছিল, তাতেই নাজেহাল হয়ে পড়েছিল বন্দী। তারপর এক ষড়যন্ত্রের অংশীদার হয়ে পড়ে, দলে আর কে কে আছে, দলীয় অফিসের ঠিকানা ইত্যাদি প্রশ্নবাণে, তারও ওপর মূলচক্রীর সন্ধানে একেবারে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। কোণঠাসা এক প্রাণীর জন্য কোনও কোণেরও দরকার হয় না। একবার ভাবে দলের সর্দার হিসেবে ভগবানের নাম নিয়েই নিই! সেই তো দেখিয়েছিল এই পথ। তারপর ভাবে, ভগবানে তো কেউ বিশ্বাস করবে না, উল্টে ফাজলামোর জন্য জুটবে মার, মার আর মার, মারের পর মার।
    মাসখানেক পড়ে পড়ে মার খায়। মাস দুয়েকে শরীর খানিক থিতোয়। যন্ত্রণা খানিক কমে তবে জ্বালা জুড়োয় না।
    সাধারণ মানুষের জন্য যে ভগবানেরও প্রাণ কাঁদে, দেখা গেল সত্যিই! নিজেই দেখা দিয়ে বলল, পৃথিবীতে আর খাবার ছিল না? যাওবা একটা নারকেল জোগাড় হল, আটবারেও ফাটানো গেল না? এত মার খেয়েছে, কখনও চোখে এক ফোঁটা জল আসেনি, আজ ভগবানের কথায় অঝোরে চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকে। নীরবে তবে অনিবার।
    ভক্ত আর ডাকে না, তবে ভগবান মাঝে মাঝে নিজে থেকেই দেখা দেন। ভক্ত কোনও অভিযোগ করে না, কোনও চাহিদাও নেই তার। বরং ঈশ্বরই শিষ্যের ভক্ত হয়ে গিয়ে খোশামোদের চেষ্টা করে। তবে ভক্ত আগাগোড়া সেই নিঃস্বরই থাকে। একেবারে ভাবলেশহীন।
    মাঝে অনেকগুলো বছর এভাবেই কেটে যায়। অনেকগুলো বলতে তা হাজারখানেকের বেশি বৈ কম তো নয়ই! ভগবানের ডাকে ভক্ত অভিমান ভুলে একসময় সাড়া দেয়। এমনকী সময় সময় ভগবানকে ডেকেও ফেলে। তবে ভগবান নিজে থেকে দেখা দিলেও, ভক্তের ডাকে সাড়া দেয় না। যখন নিজে থেকে দেয়ও, ওই হাই, হ্যালো পর্যন্তই! বন্দীমুক্তির কিছুই হয় না।
    বন্দীরও বয়স বাড়তে থাকে। থেকে থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। চোখেও বিশেষ দেখে না। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়লে খাওয়া দাওয়াও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ভগবান অসুস্থ ভক্তকে বলে,
    বলে গেছে ডাক্তারবাবু—
    জলসাবু পাতিনেবু।
    ভক্তর রাগ-ক্ষোভ-দুঃখ, সব বোধই চলে গেছে। নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে ভগবানের দিকে।
    ভগবান তখনও বলে চলেছে,
    ইষ্টিসানের মিষ্টি কুল
    শখের বাদাম গোলাপ ফুল।
    রাম দুই সাড়ে তিন
    অমাবস্যা ঘোড়ার ডিম।।
    জলসাবু, পাতিনেবু কোনও পথ্যই আর মুখে তোলা হয় না ফেরিওয়ালার। দিনের পর দিন নিদারুণ দৈহিক আর মানসিক যন্ত্রণা ভোগের পর চরম মুক্তি একদিন ঘটেই যায়।

    পরের দিন ছেলেকে এই গল্পটা বলি না। বলা যায় কিনা সেটাও বুঝি না। বলি অন্য একটা গল্প। বলে ছেলেকে ঘুম টুম পাড়িয়ে ভাবি যে লিখেই ফেলি গল্পটা। লিখে সুজয়কে পাঠিয়েই দিই। তাহলে ও আগে থেকে পড়ে রাখলে কথা বলতে সুবিধে হবে। গল্পটা আমিই লিখলাম না গল্পটা আগেই কেউ লিখেছিল, কোনও একদিন পড়েছিলাম আর গতকাল কী একটা প্রসঙ্গে যেন মনে পড়ে গেল — কোনটা যে ঠিক কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না। একটা অস্বস্তি ভেতরে ভেতরে চলতেই থাকে।
    ঋতু যা বলেছিল, সুজয়-ইন্দ্রানীও তাই বলে। প্রথম অংশটা মানে প্রথম ফেরিওয়ালার মৃত্যু অবধি গল্পটা চেনা চেনা লাগছে। কখনও কোথাও হয়তো পড়েছে। বা শুনেছে। একেবারে নিশ্চিত না হলেও মোটামুটি নিশ্চিত। আর পরের জেলের পর্বটা না-শোনা, না-পড়া। সেটাও নিশ্চিত। তিনজনই।
    আচ্ছা, একটা ব্যাপার বল তো কোনও ক্যারেক্টরের নাম দিসনি কেন? গোড়ার কথাগুলো হয়ে যাওয়ার পরেই সুজয় জিজ্ঞেস করে।
    কেন বুঝতে অসুবিধে হল?
    না। অসুবিধে হয়তো হয়নি। আবার একেবারে হয়নি তাও নয়! তবু ক্যারেক্টরগুলোর একটা করে নাম থাকলে একটা ফ্রি-ফ্লো ব্যাপার থাকে, সেটা প্রথম ফেরিওয়ালা, দ্বিতীয় ফেরিওয়ালা, বন্দী-ফেরিওয়ালায় ঠিক আসে না। তুই যদি না লিখে মুখে গল্পটা বলতিস, তাহলে আমার ধারণা অসুবিধে হত। তোর বলতে, আমাদের বুঝতে দু’টোতেই!
    তাহলে তুই-ই দিয়ে দে না একটা করে নাম।
    না গুরু, লিখেছ তুমি, নাম তোমাকেই দিতে হবে। কাম তুমহারা, নাম ভি তুমকোই দেনা পড়েগা!
    যাচ্চলে! এ তো মহা ঝামেলায় ফেললি।
    ঝামেলা আবার কী? প্রথম ফেরিওয়ালার নাম কোনও একটা এস্টাব্লিশড ভিলেনের নাম দিয়ে দে না! ধর শাহ্!
    শাহ্?
    হ্যাঁ। শাহ্। আরে কী যেন! নাদির শাহ্। নাদির শাহ্। নাদির শাহ্ দিতে পারিস। তারপর ধর আদি ও অকৃত্রিম মীরজাফর তো আছেই কিংবা ধর নরেন।
    নরেন?
    আরে নরেন গোঁসাই।
    ও। তাই বল। হ্যাঁ, দেওয়াই যায়। আরে! একটা জিনিস খেয়াল করলি এই তিনটে রোলেই তুই কখনও না কখনও অ্যাক্টিং করেছিস!
    আরে! তাই তো! তার মানে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ খলনায়ক হিসেবে আমি অনেকদিন ধরেই বেশ প্রতিষ্ঠিত।
    আর মনে আছে, নাদির শাহ-র রোলে হাঃ-হাঃ-হাঃ করে হেসে তপনদার কাছে কেমন ঝাড় খেয়েছিলি?
    মনে আবার থাকবে না! সবার সামনে, তার ওপর অতগুলো মেয়ের সামনে — ততক্ষণে আমার হাসি কান্নায় বদলে গেছে। তবে যাই বল হাফ টাইমে ওরকম ঝাড়ের কোনও মানে হয় না। কনফিডেন্সটাই প্রায় চটকে যেতে বসেছিল।
    ফার্স্ট হাফে ওরকম হাঃ-হাঃ-হাঃ আর সেকেন্ড হাফে যেখানে প্রায় ওরকম একটা হাসির সত্যিই দরকার ছিল সেখানে সাটেল একটা সত্যজিতীয় হাসি।
    কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!
    তাহলে প্রথম ফেরিওয়ালা তো মোটামুটি একটা হল। তিনটে অপশান। বাছতে হবে। আর দ্বিতীয়?
    স্ট্যান স্বামী দিতে পারিস।
    কী?
    স্ট্যানিসলাস লর্ডুস্বামী। দিতে পারিস।
    তুই কী বলতে চাইছিস বল তো?
    আরে! এত উত্তেজিত হচ্ছিস কেন? তুই তো একটা চরিত্রের নামই দিচ্ছিস, সত্যি সত্যি লোকটাকে তো আর মেরে ফেলছিস না।
    এবার বুঝি, ‘যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না’ নিশ্চয়ই একটা কঠিন কাজ, তবে ‘কী কী বলিব না’ বাছাই করাটাও নেহাত সহজ কথা নয়!
    ­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মত  | 165.225.8.117 | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০১:০৫528754
  • আচ্ছা 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে প্রতিক্রিয়া দিন