এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বালখের লড়াইয়ে শাহাজাদা ঔরঙ্গজেব 

    upal mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩৫ বার পঠিত
  • শাজাহানের মধ্য এশিয়া আভিযানে বালখে তিন দিন ছিলেন শাহাজাদা ঔরঙ্গজেব তারপর ষোলোশো সাতচল্লিশের আটাশে মে বড় ছেলে মুহম্মদ সুলতানকে দায়িত্বে রেখে চল্লিশ মাইল উত্তর-পশ্চিমে আমুদরিয়ার ধারে আকচা ধাওয়া করলেন ফৌজ নিয়ে। বাহাদুর খান আগুয়ান কালামের দায়িত্বে, মাঝটায় শাহাজাদা নিজে হাতির পিঠে আর আলি মার্দান খান পেছন থেকে আসছেন। আগুয়ান তোপ-বন্দুকের গোলা-গুলিতে অনবরত সামনে আসা উজবেকরা হটে যায়। কিন্তু তারা ওই এলাকার রাস্তাঘাটে কোথায় কী সব জানে, তাই মার খেয়েও বার বার জায়গা করে নিচ্ছে পাহাড়ি নালা আর ফুল ফোটা বা না ফোটা ফেলে যাওয়া উঁচু নিচু বাগ বাগিচায়, দূর থেকে আক্রমণ করছে। দোসরা জুন তিমুরাবাদে শাহী বহর তাঁবু ফেললে চারদিক থেকে উজবেকরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। মোঘল ফৌজের সামনের আর ডান দিকে উজবেকরা সুবিধে করতে পারে না। পেছন থেকে আলি মার্দান খানের কালাম ঠেলে উঠল কুতলুক খানের শিবির অবধি, রীতিমতো লুটে নিচ্ছিল উজবেক শিবির। কিন্তু বাঁ দিকটার দায়িত্বে ছিলেন অসুস্থ প্রবীণ সেপাইসালার সাইদ খান বাহাদুর জাফর জং। তাঁর সেপাইও কম। উজবেকরা দুর্বলদিকটা ঠিক চিনে নিয়ে সে দিকে জড়ো হয়। শিবিরের পাশে নদী। সাইদ খান চারশো সওয়ার পাঠাচ্ছেন নদীর দিক থেকে উজবেকদের আটকাতে। টোপ দেখিয়ে মোঘল ফৌজের টুকরাকে নদীর অন্য পারে নিয়ে যায় উজবেকরা আর কচুকাটা করে। সাইদ খান তুরন্ত আরো সওয়ার পাঠিয়ে ক্ষান্ত না দিয়ে নিজে দুর্বল শরীরে আমনেসামনে লড়তে গেলেন। মারাত্মক চোট পেয়ে উল্টে পড়ে গেলেন ঘোড়ার পিঠ থেকে। তার দুই ছেলেকে চোখের সামনে কেটে ফেলল উজবেক ঘোড়সওয়াররা। বিশাল হৈচৈ, ধামাসনে নিজের কালামের মুখ ফেরাচ্ছেন শাহাজাদা ঔরঙ্গজেব। আর সবাই জানে শাহাজাদা আসছেন মানে তিনি হাতির পিঠে কথা বলতে বলতে আসছেন। তাঁর কথা হাতিকে অনেক স্মৃতিতে ফেরায়। তখন দিন-মাস-বছর কেটে যেত যাত্রায়। মানুষের আর বয়ে চলা জানোয়ারের বন্ধন বড় দীর্ঘ ছিল তখন। এ ওর কথা শোনে, শোনায়, বোঝে, বোঝার এক জবরদস্ত তালমিল আর সে তাল মিলের কায়দা ভালোই জানেন হাজার কোশ লম্বি সফরের ওস্তাদ ঔরঙ্গজেব।। ঘোড়ার সঙ্গে তাঁর বাতচিত জানা, এবার হাতির সঙ্গে তাঁর কথাও চলতে থাকে ঃ
    --- কোন দিক থেকে আওয়াজ আসে, ধামাসানের আওয়াজ !
    --- আওয়াজের দিকে চলুন হুজুর!
    --- সে তো ঠিক। কিন্তু মুড়বে কোন দিকে মাহুত ?
    --- মাহুত বুঝবে না হুজুর! মাহুত যুদ্ধের কী বুঝবে!
    --- সে বল না, মাহুতই সব। তুমি বল কোন দিক থেকে আসে আওয়াজ ?
    --- বাঁয়ে হুজুর ! আমার বিশেষ আকল বলছে বাঁয়ে ! সে দিকেই গন্ধ পাচ্ছি হুজুর !
    --- মাহুত বাঁয়ে চলো ! চলো বাঁয়ে ! তুমি মাথা ঠাণ্ডা রাখবে ! প্রচুর শরাব খেয়েছ ! দিমাগ……
    --- দিমাগ ঠাণ্ডা হুজুর।শরাব ওরা, মাহুতরা দেয় ভাবে হাতি ধামাসানের আওয়াজে পালাবে কিন্তু আমার মাথা ঠাণ্ডা থাকবে হুজুর।
    --- মনে থাকে যেন ! বাঁয়ে মোড়!
    শাহাজাদার আওয়াজের প্রতিধ্বনি হয়। চারদিকে শোর পড়ে গেল," বাঁয়ে বাঁয়ে বাঁয়ে।'' ধুলো উড়িয়ে ঔরঙ্গজেবের ফৌজ যেখানে সাইদ খান পড়ে আছেন, মোঘল ফৌজের সেই দুর্বল বাঁ দিকটায় তেড়ে যাচ্ছে। সবার আগে দুটো প্রকাণ্ড হাতির আড়ালে শাহাজাদা ঔরঙ্গজেব নিজে, পেল্লায় সেই হাতির পিঠে। হাতির পাল সোজা গিয়ে উজবেকদের ধরছে, সঙ্গে আসছে সেরা শাহী সওয়ার আর মাস্কেটিয়ারদের লাইন। কচুকাটা করতে আসা উজবেকরা পালানোর আগেই অনেকে মারা পড়ে। শাহাজাদা জানতেন দ্রুতগামী উজবেকদের নড়াচড়া কমিয়ে লড়াইয়ে ফাঁসালে তারা হবে কাত।

    দিনরাত লড়াই করে  আলি মার্দান খানের উপদেশে ঔরঙ্গজেবের সৈন্য পাশাই অঞ্চলে উজবেক সেপাইসালার বেগ উগলির শিবির দখল করছে। দুদিনের টানা ধকলের পর বিশ্রাম ছাড়া উপায় ছিল না। সেই সুযোগে উজবেকরা পালায়। খবর এলো বুখারা থেকে উজবেক শাহাজাদা সুবহান কুলি বুখারা থেকে বড় ফৌজ নিয়ে আসছেন বালখের দিকে। শাহজাদাকে ছুটতে হয় বালখ সামলাতে। পথে দ্রুতগামী উজবেকরা দু দু বার শাহী শিবির লুটে পালালো। সামনে পেলে তোপের গোলা, রকেট বৃষ্টি আর মাস্কেটের গুলিতে তাদের ছত্রভঙ্গ করে মোঘলরা। কিন্তু তারা ছোট দলে দ্রুত এদিক ওদিক থেকে আচমকা আঘাত করে আর পালায় নিরাপদ জায়গায়। এই ফেরার পথেই দুই শাহাজাদা আব্দুল আজিজ,সুবহান কুলি আর বেগ উগলির সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়েছিল মোঘল ফৌজ।উন্নত প্রযুক্তি-গুলি-গোলার জোরে জিতে যাচ্ছেন শাহাজাদা ঔরঙ্গজেব, তাতেও নাছোড় উজবেকদের ঢেউয়ের মতো আক্রমণ থামছে না কিছুতেই। তারা তীর ধনুক নিয়েই লড়ে যাচ্ছে বিদেশিদের খেলাপ। অবশেষে বুখারার সুলতানের তরফে সন্ধির প্রস্তাব এলো। ঔরঙ্গজেব বালখে নিরাপদে ফিরলেন দু হপ্তা পর এগারোই জুনে।
    গুজরাটের সুবেদারির সময় যদি কড়া এক আইনসিদ্ধ শাসক হিসেবে শাহাজাদা ঔরঙ্গজেবের নামডাক হয়ে থাকে, তবে বালখ থেকে আকচা হয়ে আবার বালখে ফেরার যাত্রায় তাঁর সামরিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হল কঠিন যুদ্ধের অগ্নিপথে। তিনি বিখ্যাত হলেন যোদ্ধা শাহাজাদা হিসেবে।

    কাফি খান মুন্তাখাব আল লাবাবে বললেন, ''দিনের পর দিন ক্লান্তিহীন, নিরবিচ্ছিন্ন দ্রুতগামী শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই, যখন খিদের জ্বালায় ছটফট করছে শাহী শিবির। সেপাইরা থামতে পারে না আর খাবার রান্না করে চলমান হাতির পিঠেই। এক টুকরো রুটির দাম এক টাকা, দু টাকা পর্যন্ত ওঠে আর জল তো টাকা দিয়েও মেলে না। যারা কিনতে পারে কিনছে, সকলের খাবারই নেই যে। শাহাজাদার নিজের লোকেরদেরই এ হাল হয় তবে আম সেপাইয়ের দশা না জানি কী। এতো কষ্ট আর বিপদের মধ্যেও, ঔরঙ্গজেবের দৃঢ়তা আর নেতৃত্ব কোনো ঢিলেঢালামি আর বিশৃঙ্খলা রুখে দেয় ; তাঁর তীক্ষ্ণ নজর আর চনমনে উপস্থিতি দ্রুত দুর্বলতা ঢাকে, আর প্রাজ্ঞতা ও সাহস ফৌজকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনে।'' (History of Aurangzib by Sir Jadunath Sarkar volume I-II, page 58)

    এমনকি উজবেক শাহাজাদা আব্দুল আজিজ হয়ে পড়লেন মোঘল শাহাজাদার অনুরক্ত। একবার ঘনঘোর যুদ্ধের ময়দানে দুপুরে জুহরের নামাজ পড়ার সময় এল। ঔরঙ্গজেব শান্ত ভাবে নেমেছিলেন হাতির পিঠ থেকে, সিজদা করেছিলেন হাঁটু ও হাতের পাতা মাটিতে ঠেকিয়ে। যারা দেখে তারা কি লড়াই থামিয়ে ফেলে? আব্দুল আজিজের কাছে খবর হলে তিনি বললেন, "এর সঙ্গে লড়া মানে নিজের ইন্তেকাল, থামো সব।" বালখের মাটিতে শাহাজাদার ইজ্জত দিলেন উজবেক বীর।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন