এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা  রাজনীতি

  • সাধারণের নীতির বালাই

    বকলম -এ অরিত্র লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | রাজনীতি | ০২ জানুয়ারি ২০২৪ | ২৫১ বার পঠিত
  • নীতি (বা মতাদর্শ) জিনিসটা বাঙালির বৌদ্ধিক চর্চার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানাধিকারী। প্রথমটি হলো নাম। দুইয়ের পেছনেই অসম্ভব কর্মশক্তি ব্যয় করে থাকি আমরা। বহু উদ্যোগ এই নাম ও নীতি নির্মাণ করেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নীতি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে 'নীতিহীন মানুষ' একটা মারাত্মক অসম্মমান সূচক শব্দ। কিন্তু আমার নিজের কোনো নির্দিষ্ট স্থায়ী নীতি নেই। খাপছাড়া ভাবে অনেক নীতিই নিজের মনে করে এসেছি, যেমন অনেকেই করেন। কিন্তু অল্প ভাবতেই বোধোদয় হল। আমি নীতিহীন এবং আমার মনে হয় বেশিরভাগ মানুষের নীতি টিতি থাকার কোনো মানে হয় না। অবশ্য "সজ্ঞানে কারুর ক্ষতি না করা" বা "মিথ্যে না বলা" এইরকম প্রাথমিক ব্যাপারগুলো নীতি হিসেবে ধরছি না, সেগুলোকে নাহয় এখানে সাধারণ মানব ধর্মের অন্তর্গত ধরে নেওয়া যাক এই আলোচনার পরিসরে। যাক, আমার কেন এরকম মনে হয়, সেটাই বলার চেষ্টা করবো।

    উদাহরণ হিসেবে কয়েক বছর আগের একটা রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা উল্লেখ করছি। সংঘাতটি শুধু কায়িক নয়, নৈতিক দিক থেকেও যথেষ্ট আলোড়ন ফেলেছিলো – "যাদবপুরে বাবুল কাণ্ড"। সংঘাতে যাদবপুরের জয় যে পথে এসেছিল তা নিয়ে চর্চা যত কম হয় ততই শ্রেয়, তা হলেও ফলাফলটি সকলকেই স্বস্তি দিয়েছিলো এবং যাদবপুরের সমালোচনা হোক বা নাহোক সেইসময়ে দাঁড়িয়ে তার থেকে উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা কারুর জানা ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু নৈতিক দিকে ধাক্কাটা জোরালো হয়েছিল কারণ 'সকলের পূর্ণ বাকস্বাধীনতা' নীতির ওপর আস্থাটি টলে গেছিল। তার কারণ এই নীতিটির প্রকৃত অর্থ ও তার বিপদ আপদের পূর্ণ চিত্রটি এর আগে উন্মোচিত হয়নি। তার আগে অবধি ধারণাটা ছিল এমন যে – যার যা বলার ইচ্ছে সে প্রকাশ্যে মুক্তভাবে বাধাহীনভাবে বলতে পারে এবং তাতে ভালো বই খারাপ কিছু নেই, মানুষ সমস্ত শুনে বিচার করবে কোনটি সে রাখবে আর কোনটি রাখবে না। অর্থাৎ গণতান্ত্রিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে পূর্ণ বাকস্বাধীনতা স্থান পেয়েছিল। যেহেতু সবশেষে মানব সমাজ নিজের ভালোমন্দের জ্ঞান রাখে এমন বিশ্বাস আমরা করি তাই যাই বলা কওয়া হোক না কেন অবশেষে আমরা ভালোর রাস্তা খুঁজে বেছে এগিয়ে যেতে পারবো এই ছিল সারকথা। মুশকিল ছিল দুটো, যাদের উপস্থিতি আমি, কোনো গর্ব না করেই বলছি, বাবুল কাণ্ডের আগেই টের পেয়েছিলাম, তবে সেটা দেশে হনুমানের উপদ্রব শুরু হওয়ার আগেও নয়। বাবুল কাণ্ডের পরে মুশকিল বা প্রশ্ন দুটো একেবারে সবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।

    একটা হলো বাকস্বাধীনতার সুযোগে কেউ যদি অবিশ্রান্ত মিথ্যে কথা বলতে থাকে তাহলে সেটা কি অনুমোদনযোগ্য? এর উত্তরে বেশি ভাবতে হয় না। মানুষ যা বলে তার মধ্যে দুটো প্রকারের জিনিস থাকে – এক হলো ঘটনা (facts) আর আরেকটি হলো ব্যাখ্যা বা মতামত (opinion/interpretation) জাতীয় জিনিস। এর মধ্যে বাকস্বাধীনতা বলতে ব্যাখ্যা ও মতামতের স্বাধীনতার কথাই বলা হয়, ঘটনা নিজের ইচ্ছেমতন সাজিয়ে নেওয়ার স্বাধীনতা খুব সম্ভবত বলা হয় না, আমি যতদূর বুঝেছি।

    অন্যটা হলো বাকস্বাধীনতার সুযোগে কেউ যদি নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বা সার্বিকভাবেই বাকস্বাধীনতার অধিকারের বিরুদ্ধে মতামত সংঘঠিত করতে শুরু করে বা করার সুপ্ত কিন্তু যথেষ্ট সম্ভাবনা প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে এই মতামতের প্রচারের স্বাধীনতাও কি বাকস্বাধীনতাকে লালন করতে চাওয়া সমাজ দিতে পারে বা দিতে বাধ্য? অর্থাৎ বাকস্বাধীনতা কি তার নিজের ধ্বংসের সম্ভাবনা বা পথ খোলা রাখতে নীতিগতভাবে বাধ্য? একই কথা গণতন্ত্রের সম্পর্কেও বলা যায় – গণতন্ত্র কি তার নিজের ধ্বংসের পথ নিজের ব্যবস্থার মধ্যেই রাখতে বাধ্য? প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে, না মোটেই নয়। কিন্তু তাহলে কি বাকস্বাধীনতা (বা গণতন্ত্রের) সুবিধে শুধু তাদের জন্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত যারা বাকস্বাধীনতা (বা গণতন্ত্রের) প্রতি শ্রদ্ধাশীল? এখানেই কিন্তু কিন্তু মনে হওয়া উচিত, কারণ ওই যে সীমাবদ্ধতার কথা চলে এলো! বাকস্বাধীনতা বা গণতন্ত্রের প্রধান আরাধ্যই তো স্বাধীনতা, মুক্তি freedom! সেখানে বিশুদ্ধ পরিপূর্ণতা না রাখা গেলে আর কী মানে থাকে? খণ্ডিত সীমাবদ্ধ স্বাধীনতা আবার কোথাকার স্বাধীনতা! তাহলে বলতে হয় হ্যাঁ বাধ্য, অন্তত শুদ্ধতার খাতিরে, বাকস্বাধীনতা সীমাহীন হওয়াই ন্যায্য তাতে তার নিজের ধ্বংসের উপায় নিহিত থাকলেও। কিন্তু এখানেই আবার মনে হতে পারে এইভাবে দেখলে কঠিন পরিস্থিতিতে এই মুক্ত পরিসরটাকেই ধরে রাখা যাবে না, আর তাহলে প্রকৃত উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়, ইঞ্জিরিতে বলে – "the purpose would be defeated"। বিগ ব্যাং থিওরির শেলডন কুপার একটা মন্তব্য করেছিল এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে – "if good people hold themselves to unrealistically high ethical standards, then they might lose out to their unscrupulous competitors." (S12,E21)।

    অর্থাৎ এখানে কোনো একটা ঠিক ভুল নির্মাণ করতে পারা গেল না, মাত্র আমার চিন্তার দৌড় দিয়েই। এই জায়গাটাই আমাকে ভাবিয়েছে। বলতে চেয়েছি, যে নৈতিক অবস্থান কোনো সাধারণ বিষয় নয়, সাধারণ বুদ্ধিতে খানিক ভাবনা চিন্তার পরিশ্রম করলেই বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অনেক দ্বন্দ্ব, অনেক অনিশ্চয়তা সামনে আসে। প্রকৃত চিন্তাবিদের সামনে পড়লে তার অনেক রূপ রঙ আত্মা প্রকাশ পায়। সেইজন্যে বিশেষ উচ্চতার অধিকারী না হলে এই নীতি তৈরী করার অনেক হ্যাঙ্গাম আছে, তার নানান মূর্তি যেমন যেমন সামনে আসে তেমন তেমন নানান বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয় এবং পরিমার্জনা পরিবর্তন এমনকি বিসর্জন পর্যন্ত করতে হয়, মুখে না হোক কাজে তো করতেই হয়। তা যাকে কিছু সময়ের মধ্যেই পাল্টাতে হয় তাকে নির্মাণ করার জন্যে এতো আয়োজনের কি আদৌ প্রয়োজন আছে? যারা প্রকৃত জ্ঞানী যারা অনেক দূর অবধি দেখতে পান, যাদের চিন্তা গভীর প্রসারিত তারা অর্থাৎ মনীষীরা নিশ্চিতভাবে নীতির কথা বলতে পারেন, শোভাও পায় আর অর্থবহ হয়। সাধারণ মানুষ বা সাধারণের সামান্যই উর্ধে যারা থাকেন, তাদের নীতি ইত্যাদি নিয়ে অত্যধিক সময় ব্যয় না করে কি ভালো? করলেও পরিস্থিতি প্রেক্ষাপট ইত্যাদি ব্যাখ্যায় বর্ণনা করে রাখলে পরে বিড়ম্বনা থেকে মুক্ত থাকা যায়। আর সবথেকে বড় প্রাপ্তি যে নমনীয় থাকা যায়। যা আমরা প্রকৃত চেয়ে থাকি তা হলো কোনো অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছনো, তার জন্যে স্থান কাল পাত্র ও কিছু প্রাথমিক নৈতিকতাকে সঙ্গে নিয়ে সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্তব্য বুঝে নিলেই মনে হয় উদেশ্য সফল হয়। আমাদের মতন সাধারণ মানুষজনের জন্যে নীতি মতাদর্শ এসব বড় বালাই।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন