এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • উপলব্ধি

    Amlan Sarkar লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৩ নভেম্বর ২০২৩ | ১৭৮ বার পঠিত
  • উপলব্ধি
    অম্লান সরকার

    গিন্নী, তোমার পুত্ররত্নটির হাবভাব কিন্তু আমার খুব একটা সুবিধার ঠেকছে না। কি সব অসঙ্গে কুসঙ্গে মিশছে। শুনতে পাচ্ছি হেরোইন খাওয়াও নাকি শুরু করে দিয়েছে।

    হিরোইন? হিরোইন কি করে খাবে শুনি? সেতো জলজ্যান্ত সব মেয়েমানুষ। হিরোইন খাওয়া যায় কি? উদ্ভূতুরে কথা বলার পুরনো অভ্যাসটা তোমার আর গেল না। নিজের ছেলেকে যে তুমি দুচক্ষে দেখতে পারো না সেটা আমি খুব ভাল করে জানি। আরে, ওটা তোমারই ছেলে, অন্য কারো নয়। তুমি ওকে শ্যামল দার ছেলে বলে সন্দেহ করো তা আমি জানি। কিন্তু সত্যি বলছি শ্যামল দার সঙ্গে আমার একটু আধটু আশনাই ছিল ঠিকই, কিন্তু বাচ্চা হওয়ার মত সম্পর্ক কখনোই ওর সঙ্গে আমার হয় নি। যা কিছু হতো সবই ওই ওপর ওপর।

    হুম, পথে এসো এবারে। আমি সেই কবে থেকে লক্ষ্য করে যাচ্ছি ওই শামলা শালা যখনই আসে তখনই তুমি কেমন গদগদ হয়ে যাও আর দুজনে মিলে একটু সন্দেহজনক ভাবে ফিসফাস করে কথাবার্তা বলো আর হাসাহাসি করো। তাহলে এই ব্যাপার? তা তোমাদের এই আশনাই কত বছর ধরে চলছে? যা এঁচরে পাকা মেয়ে তুমি! স্কুলে পড়ার সময় থেকেই শুরু করে দিয়েছিলে নিশ্চয়ই।

    আরে না না, স্কুলে আমি খুব শান্ত ও innocent টাইপের মেয়ে ছিলাম। পড়াশোনা মাথায় খুব একটা বেশি কিছু ঢুকতো না। আর তাই পরীক্ষায় পাস করার জন্য মুখস্থ বিদ্যার ওপর জোর দিতে হতো। স্কুলের সময় বাদ দিয়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পড়াশোনার পেছনেই চলে যেতো। অন্য কিছুর আর সময়ই থাকতো না। মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর একবার আমরা পাড়ার সবাই মিলে কলকাতা গেছিলাম আলিপুর চিড়িয়াখানা দেখতে। ওই শ্যামল দাই লিডার ছিল আমাদের দলের। ওই আমাদের সবাইকে নিয়ে গিয়ে চিড়িয়াখানা দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল।

    শৈবাল একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে জবাবে বললো, "চিড়িয়াখানা দেখিয়ে ওই তখন থেকেই শামলা শালা তোমাকে নিজের পোষা চিড়িয়া বানিয়ে ফেললো। তা শ্যামল কে বিয়ে না করে আমার জীবনে উদয় হওয়ার কি দরকারটা ছিল তোমার শুনি?"

    “কি করবো? শ্যামল দার সে ভাবে কোন কাজকর্ম ছিল না। বউকে পোষার মত নিয়মিত কোন রোজগার পাতিও ছিল না। ওর সঙ্গে বিয়ে হলে আমার ইহকাল, পরকাল দুটোই ঝরঝরে হয়ে যেত। আর তাছাড়া বাবাও রাজি হতেন না।”

    “তা, আমার সঙ্গে বিয়ে হয়ে তোমার ইহকাল, পরকালে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালা হয়ে গেছে কি? শামলার সঙ্গে ওপরে ওপরের প্রেমটা কতটা ওপরে আর কতটা ভেতরে বা গভীরে হয়েছিল সেটাও তো আমার জানা দরকার।”

    “ওই বেশি না। সন্ধ্যার পরে অন্ধকার পার্কের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে যেটুকু হয়, ওই টুকুই আর কি। আজকালকার দিনে ওই একটু আধটু প্রেম ভালোবাসা বাসি তো সবারই জীবনে টুকটাক হয় না কি? বিয়ের আগে তুমিও কি ব্রহ্মচারী ছিলে, যে এত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইছো?”

    এই কথায় শৈবালের নিজের যৌবনের দিন গুলোর কথা মনে পরে গেলো। মুখচোরা, লাজুক স্বভাবের ছেলে ছিল সে। সমবয়সী বা কমবয়সী মেয়েদের সঙ্গে কথা বলাতো দূর, ওদের দিকে ভাল করে তাকাতেই সে পারতো না। বিয়ের পরও লাবণ্যের সঙ্গে তার সহজ খোলামেলা সম্পর্ক তৈরি হতে সময় লেগেছে অনেক। আর এ ব্যাপারে লাবণ্যই অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। সেই হাতে ধরে শৈবাল কে পাখি পড়ার মত সব পাঠ পড়িয়েছে। যৌনমিলনের ব্যাপারেও লাবণ্যই তার গুরু। সে তেমন কিছুই বুঝতোও না, পারতোও না। লাবণ্যই তাকে এ ব্যাপারে গড়েপিটে নিয়েছিল। এই ব্যাপারে সে লাবণ্যর কাছে অনেকটাই কৃতজ্ঞ।

    স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কথা শুরু হয়েছিল ছেলের মতিগতি নিয়ে। কিন্তু সেই প্রসঙ্গ গোড়াতেই ধামাচাপা পড়ে শুরু হয়ে গেছিল স্বামী স্ত্রীর যৌবনের কীর্তিকাহিনীর চাপান উতোর। ছেলে মেয়ের সম্পর্ক বা মেলামেশার দিক থেকে লাবণ্য সব সময়েই শৈবালের দিক থেকে এক কাঠি কেন অনেক কাঠিই ওপরে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শৈবাল মেলামেশার ব্যাপারে এখন অনেক পরিণত হলেও কৈশোর যৌবনের সেই মুখচোরা, অন্তর্মুখী প্রকৃতি পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলতে পারেনি। আর সত্যি কথা বলতে গেলে মানুষ নিজের প্রকৃতি কখনোই বদলে ফেলতে পারেনা। ছোটবেলা থেকেই বংশগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বা পারিপার্শ্বিক যে আবহাওয়ায় বড় হয়ে উঠছে, সেই কারণে, মানুষের যে স্বভাব বা প্রকৃতি একবার তৈরি হয়, সারা জীবনেও তার বিশেষ আর পরিবর্তন ঘটে না।

    শৈবাল লক্ষ্য করেছে তার ছেলে তমাল বাথরুমে অনেক বেশি সময় কাটায়। ছেলেবেলা থেকেই স্কুলের বাঁধাধরা পড়াশোনার দিকে শৈবালের চরম অমনোযোগ বা অনীহা থাকলেও পাঠ্য পুস্তকের বাইরের বই বা পড়ার মত যে কোন পদার্থের প্রতি তার ছিল অপরিসীম আগ্রহ ও উৎসাহ। পাঠ্য পুস্তকের বাইরের যে কোন বই হাতে পেলেই সে সেটাকে গোগ্রাসে গেলার চেষ্টা করতো। এমন কি মুদি দোকানের ঠোঙা যে খবরের কাগজ বা অন্য কোন পাঠ যোগ্য কাগজ দিয়ে তৈরি হতো, সেগুলো পর্যন্ত সে সোৎসাহে পড়ে ফেলতো, সেই সব লেখার অনেক সময়েই কোন আগা মাথা না থাকা সত্ত্বেও। আর এই পড়াশোনা করার সুবাদেই সে জানে বাথরুমে অনেকটা সময় অতিবাহিত করাটা মাদক দ্রব্য সেবনকারীদের একটা সাধারণ উপসর্গ। কাজেই নিজের ছেলেকে পর্যবেক্ষণ করে শৈবাল যে সমস্ত ইঙ্গিত পাচ্ছে সেগুলো কোনটাই সুস্থ মানসিকতা সম্পন্ন একটি নতুন নতুন যৌবনে পদার্পণ করা ছেলের সঙ্গে ম্যাচ করছে না।

    তমাল বর্তমানে দুর্গাপুরের একটি সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। থাকে কলেজের হোস্টেলে। প্রথম প্রথম প্রত্যেক সপ্তাহের শেষেই একবার করে দুর্গাপুর কলেজ হোস্টেল থেকে পানাগড়ে নিজেদের বাড়িতে আসতো। আবার সোমবার সকালে দুর্গাপুরে ফিরে যেত। প্রথম বছরটা মোটামুটি এই রুটিনেই চলেছিল। দ্বিতীয় বর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে দেখা যাচ্ছে তমালের বাড়ি আসার এই পৌনঃপুনিকতা ধীরে ধীরে কম হওয়া শুরু হয়ে গেল। প্রথমে এক সপ্তাহের জায়গায় পনেরো দিন, তারপর সেটাও অনিয়মিত হতে হতে এখন বারে বারে বলে বলে মাসে একবার আনানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেটাও আসবেই এরকম কিছু জোর দিয়ে বলা যায় না।

    কাজেই ছেলের ব্যাপারে শৈবালের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। লাবণ্য আবার এগুলো নিয়ে অতটা মাথা ঘামাতে রাজী না। ছেলে ওকে বুঝিয়েছে পড়াশোনার খুব সাংঘাতিক চাপ। সেই জন্যই বাড়িতে আসার সময়টুকু পর্যন্ত নাকি বার করতে পারেনা। ছেলের গরবে গরবিনী মাতা অন্ধ পুত্র স্নেহে ছেলের এই সমস্ত ছেলে ভোলানো কথাবার্তা চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে নিতে নিতান্তই উৎসুক। কিন্তু শৈবালের জন্য সেটা সব সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। মায়ে ছেলেতে পরামর্শ করে আপাতত তাই তমাল মায়ের সন্তুষ্টির জন্যে গগন কবিরাজের মেধা বৃদ্ধিকারক আয়ুর্বেদিক ওষুধ খেতে রাজি হয়েছে। কিন্তু শৈবালের সন্দেহ নিরসন হওয়া অত সহজ না। সে দেশ দুনিয়ার খবর রাখে এবং যার জন্য সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে ছেলে তার বিপথে চলে যাচ্ছে।

    ২০ বছর বয়সের তমাল তারুণ্যের দীপ্তিতে ঝলমল করছে। প্রথম যৌবনের উচ্ছাস, উৎসাহ তার মধ্যে টগবগ করে ফুটছে। এই মুহূর্তে দুনিয়ার কোন বাঁধাই তার কাছে বাঁধা বলে মনে হয় না। সে চায় এই দুনিয়াটাকে নিজের মত করে দেখতে, নিজের মত করে উপভোগ করতে। নেশার দুনিয়ার এক আলাদা মজা আছে। হেরোইন, ব্রাউন সুগার, এম্ফেটামাইন জাতীয় মাদক দ্রব্য গুলো রোজকার একঘেঁয়ে দুনিয়ার গতানুগতিকতা থেকে সাময়িক ভাবে মুক্ত করে মানুষকে এক কৃত্রিম রং মাখানো দুনিয়ায় নিয়ে যায়, যেখানে সব কিছুই স্বপ্নিল, উচ্ছাসপূর্ণ বা আমোদ পূর্ণ। তমাল এই কৃত্রিম দুনিয়ার মোহজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর চাকচিক্য, জাকজমক পূর্ণ স্বর্গীয় অনুভূতি তাকে এই মাদক দ্রব্যের নেশার প্রতি ক্রমবর্ধমান গতিতে আসক্ত করে তুলেছে। এই নেশার পরিণাম যে কত ভয়াবহ হতে পারে সেই ব্যাপারে সে সম্পূর্ণ ভাবে অবহিত থাকা সত্ত্বেও নেশার দুনিয়ার দুর্দম আকর্ষণ তাকে পরিণামের ব্যাপারে চিন্তা করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করছে।

    নেশার দুনিয়াটা শৈবালের কাছেও অপরিচিত কোনো জায়গা নয়। বয়সন্ধির সময় থেকেই নেশার দিকে সে একটা দুর্দম আকর্ষণ অনুভব করতো। প্রাথমিক শিক্ষার সময়ের এক সহপাঠী ১৫ বছর বয়স থেকেই শৈবালের পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাজার এলাকার এক দেশী মদের দোকানের প্রধান বিক্রয় প্রবন্ধক হিসাবে কাজ করতো। সেখানে ১৮ বছর বয়সের উত্তাল যৌবনের সময়টায় শৈবাল মাঝেমাঝেই আড্ডা মারতে যেতো। এই দেশী মদের দোকানকে স্থানীয় ভাষায় ভাটিখানা বলা হতো। সেই রকম এক দিন আড্ডা মারতে মারতে শৈবাল, শিবু নামে দোকানের সেই ছেলেটা আর রাহুল নামে শৈবালের অন্য আর এক বন্ধুর সোমরস পানে হাতেখড়ি হয়। বিয়ার, হুইস্কি ও ব্র্যান্ডি সহযোগে তাদের সেই হাতেখড়ি এমনই ব্যাপক আকার ধারণ করে যে অচিরেই শৈবাল ও শিবু নেশাগ্রস্ত হয়ে পরে। ব্যাপারটা আগে থাকতেই আঁচ করতে পেরে সাবধানী ও সতর্ক রাহুল বেশী বাড়াবাড়ি হওয়ার আগেই শৈবাল শিবুকে নিজেদের হালে ছেড়ে দিয়ে নিজে সেখান থেকে সটকান দেয়। শৈবাল ও শিবু খানিকক্ষণ মাতলামো করে আবোল তাবোল বকে অচেতন হয়ে পরে। দোকানের অন্য সহকারীরা তাদের দুজনকে চান টান করিয়ে ভাত মাংস খাওয়ার ব্যবস্থা করে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। তারপর সন্ধ্যা বেলা ঘুম ভাঙলে শৈবাল নিজের অবস্থা অনুধাবন করে চুপচাপ বাড়ির পথ ধরে এবং সৌভাগ্যবশত বাড়ির লোকেদের চোখকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়।

    এই ঘটনার বছর দেড় দুয়েক পর শৈবাল কলকাতায় চলে আসে উচ্চশিক্ষার্থে। সেখানে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার জন্য শুরু হয় তার হোস্টেল জীবন। এই হোস্টেল বা ছাত্রাবাসে থাকাকালীনই সে সেই সময় প্রচলিত সব রকম নেশা করার ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে এই নেশা করার জের তার কর্মজীবনেও পিছু তাড়া করে এবং কিছুটা সমস্যার সৃষ্টিও করে। অবশেষে বিয়ে করে সংসার শুরু করার পর শৈবাল কিছুটা সংযত হতে বাধ্য হয় এবং কারণ বারির নেশা ছাড়া বাকি নেশা গুলো অনেকাংশেই কমিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়। কাজেই পাঠক গণ বুঝতেই পারছেন শৈবাল নিজে একজন প্রাক্তন অভিজ্ঞ নেশারু হওয়ার সুবাদে তার চোখকে ফাঁকি দেওয়া তমালের পক্ষে একটু মুশকিল ব্যাপারতো বটেই। তবে তমাল বাবার পুরনো দিনের ইতিহাসের ব্যাপারে সেরকম কিছুই জানে না। শুধু এই টুকুই জানে বা দেখেছে যে সুরা পানের ব্যাপারে তার বাবার কোন রকম কোন সংস্কার বা প্রতিবন্ধকতা নেই এবং একটু আধটু নেশা করার ব্যাপার নিয়ে বাবার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত উদার এবং যুগের সঙ্গে মানানসই।

    শৈবাল নেশার দুনিয়ার ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে জীবনকে নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এসেছেন। কাজেই এর ভালো মন্দের দিকটি তিনি খুব ভালো করেই বোঝেন। কিন্তু তার সঙ্গে তিনি এটাও বোঝেন যে তার ছেলে তমালের এই মাদকাসক্তির ব্যাপারে তিনি কতটা অসহায়। জোর করে এই আসক্তি ছাড়ানো যায় না। একমাত্র পন্থা extensive counseling. তাতেও কাজ না হলে শেষ অবলম্বন ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা de-addiction centre গুলোর কোনো একটার সহায়তা নেওয়া। কিন্তু সবার আগে তিনি নিজে ছেলের সঙ্গে এই ব্যাপারে একবার মুখোমুখি বসে আলোচনা করে নিতে চান। এই বয়সের ছেলেমেয়েদের মানসিকতা তিনি বোঝেন এবং সব থেকে আগে তিনি চাইছেন ছেলেকে এই ব্যাপারে তার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে সমৃদ্ধ মন নিয়ে বোঝাতে।

    বর্তমান প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের অবশ্য এই কাউন্সেলিং বা বোঝানোর ব্যাপারটা বলা যত সহজ, কাজে করে ওঠা অত সহজ না। এখনকার ছেলেমেয়েরা ভিন্ন মানসিকতায় তৈরি। তারা বাবা মা, আত্মীয় স্বজন বা গুরুজনদের উপদেশাবলী ভাষণ বলে খারিজ করে দিতে মুহূর্ত মাত্রও দ্বিধা করে না। আর শৈবাল এই সমস্যা গুলো সম্বন্ধে সম্যক ওয়াকিবহাল। কাজেই তমালকে বিপথ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য ঠিক কিভাবে এগোলে সমস্যার দ্রুত ও সফল সমাধান করা যাবে সেই ব্যাপারে সে ক্রমাগত চিন্তাভাবনা করে যাচ্ছে।

    শৈবাল যখন ছেলেকে কি ভাবে নেশা মুক্ত করে সুপথে ফিরিয়ে আনবে সেই নিয়ে গভীর চিন্তা মগ্ন তখন এদিকে সম্পূর্ণ এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যায় তার ছেলে তমালের সঙ্গে। আর সেই ঘটনার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। সেদিনটা ছিল দোল বা হোলি খেলার দিন। তমাল তার হোস্টেলের নেশার দুনিয়ার বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে নেশায় চুর হয়ে রাস্তায় বেরিয়েছে হোলি খেলতে। সঙ্গে বড় একটা গ্রুপ থাকলে যা হয় আর কি! সবাই নিজেকে এক এক জন বিশাল সর্দার মনে করা শুরু করে দেয় আর দুনিয়ার কাউকে কোন পরোয়া নেই রকমের একটা মানসিকতা কাজ করতে থাকে। তার ওপরে আছে ecstacy পিলের প্রভাব। তমাল দের চোখে তখন দুনিয়াটা এক অন্য রকমের রং ধারণ করেছে। কাজেই ঠিক বেঠিক, উচিত অনুচিতের কোন রকম চিন্তাভাবনা তাদের মধ্যে আর সেই মুহূর্তে কোন প্রভাব ফেলতে পারছিল না।

    ঠিক সেই সময়ে রাস্তা দিয়ে একটা কার যাচ্ছিলো। তাতে ছিল এক সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোকের পুরো পরিবার। গাড়িটা যখন তমালদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো ঠিক সেই সময় তমাল নেশার ঝোঁকে হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়লো সেই গাড়ির ওপর। তমাল যতক্ষণে ঝাঁপিয়েছে ততক্ষনে গাড়ির সামনের অংশটা তমালকে ছাড়িয়ে গেছে। তাতে করে তমাল ঝাঁপটা শেষ করার পর দেখা গেল যে সে কোন রকমে গাড়ির পেছনে ঝোলানো অতিরিক্ত টায়ার অর্থাৎ যেটাকে স্টেপনি বলা হয় সেটা ধরে কোন রকমে ঝুলছে। গাড়ির যাত্রীরা পুরো ব্যাপারটা দেখার পরেও গাড়ি থামানোর কোন চেষ্টা করলো না। তমালকে ওই রকম ঝুলন্ত অবস্থায় নিয়েই এগিয়ে চললো প্রায় আরো সিকি কিলোমিটার মত রাস্তা। তারপর ওই রাস্তাটুকু শেষ হওয়ার পর এক সময় তমালের হাত শিথিল হয়ে যাওয়ায় সে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে নিচে রাস্তার ওপর পড়ে গেল। তমালের বাকি নেশাগ্রস্ত বন্ধুবান্ধবরা সবাই গাড়ির পেছনে ঝুলন্ত তমালের পিছু পিছু ছুটে আসছিল। রাস্তার এক জায়গায় আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এক দল পুলিশও দাঁড়িয়েছিল। তমালের বন্ধুবান্ধবেরা যতক্ষণে তমালকে রাস্তা থেকে ওঠাচ্ছিল ততক্ষনে পুলিশের দলটিও পৌঁছে গেছে সেখানে। দেখা গেল একটু আধটু ছড়ে যাওয়া ছাড়া তমালের সেভাবে আর কোন শারীরিক ক্ষতি কিছু হয়নি।

    তমাল যতক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষনে পুলিশের দলটিও সেখানে পৌঁছে গেছে। নেশা তখনও তমালের কাটেনি। ওর একটা মুদ্রাদোষ ছিল কিছু সমস্যা হলেই কথায় কথায় “কোন ব্যাপার না, ম্যানেজ হয়ে যাবে” সংলাপটি ঝাড়া। এবারেও উঠে দাঁড়িয়ে বন্ধুবান্ধব ও পুলিশের সামনেই সে তার নিজস্ব ভঙ্গিমায় নেশায় জড়ানো জিভে ওর কুখ্যাত সেই সংলাপটি সবাইকে শুনিয়েই বলে দিল। তবে এবারে আর ম্যানেজ হলো না। পুলিশ দেখতেই পারছিল পুরো ছেলেদের গ্রুপটা নেশাগ্রস্ত হয়ে আছে। তারা সবাইকে পুলিশের ভ্যানে উঠিয়ে থানায় নিয়ে গিয়ে সবাইকার নাম ধাম ইত্যাদি সংগ্রহ করে জেল হাজতে পুরে সব ছেলেদের অভিভাবকদের ফোন করে তাদের ছেলেদের কীর্তিকাহিনী জানিয়ে থানায় এসে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে বললো। শৈবালের কাছে এ ধরণের খবর অপ্রত্যাশিত ছিল না। সে যে কোন দিন এই রকম কোন খবর শুনতে হবে এই আশঙ্কায়ই কাঁটা হয়েই ছিল। কাজেই খবর টা শোনার পর তৎক্ষণাৎ সে দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসার জন্যে।

    যথাসময়ে শৈবাল ছেলেকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পানাগড়ের বাড়িতে পৌঁছালো। লাবণ্যকে কিছু না বলেই সে বেরিয়ে গেছিল কিছু কাজের ছুতো করে। বাড়ি পৌঁছানোর পর তমালের হতবিহ্বল চেহারা দেখে লাবণ্য চমকে গেল এবং কি এমন ঘটনা হয়েছে যে ছেলের এই অবস্থা সেটা জানার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তমাল কোন কথা বলার মত অবস্থায় ছিল না।

    শৈবাল পুলিশ ও তমালের বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে পুরো ঘটনাই জেনে এসেছিলো। এবার তাড়াহুড়ো না করে ধীরস্থির ভাবে শৈবাল পুরো ঘটনাটাই লাবণ্যকে বললো। লাবণ্যতো ঘটনা শুনে কান্নাকাটি করেই একশা। শৈবাল তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলো এবং ছেলেকে বুঝিয়ে শুনিয়ে সুপথে আনার এমন স্বর্ণিল সুযোগের যথাসম্ভব সদ্ব্যবহার করে ছেলের কাউন্সেলিং শুরু করে দিল।

    ঘটনার আকস্মিকতা ও তার পরিণাম তমালের ওপরও যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। সেও বুঝতে পারছিল যে পথে সে চলছিল সেটা ঠিক পথ নয় এবং তাকে অবিলম্বে নিজেকে শুধরে নিতে হবে। এই যে উপলব্ধি এটাই দরকার থাকে বিপথ থেকে সুপথে ফিরে আসার জন্য। সত্যিকারের উপলব্ধির ফল হয় সুদূরপ্রসারী এবং কোন নেশামুক্তি কেন্দ্র বা ওষুধপত্র ব্যবহার করে এই উপলব্ধির যে পরিণাম সেটা অর্জন করা যায় না।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন