এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • শান্তিনিকেতন, স্ব - গৌরব ও শিক্ষা

    Abin Chakraborty লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৮ অক্টোবর ২০২৩ | ১৫০ বার পঠিত
  • সম্প্রতি কবিগুরুর শান্তিনিকেতন ইউনেস্কো স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এর মর্যাদা লাভ করেছে। এই নিয়ে আমাদের গর্বের ও আনন্দের কারণ রয়েছে। তবে তারই পাশাপাশি দেখা যায় শান্তিনিকেতনের শিক্ষাব্যবস্থার অবক্ষয় সম্পর্কে বহু বিদ্বান ব্যাক্তির যুক্তিযুক্ত হতাশা ও গ্লানি ও এই প্রসঙ্গে প্রবল ভাবে ব্যক্ত হচ্ছে নানা সংবাদপত্রে ও সমাজমাধ্যমে। শান্তিনিকেতনের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মুহূর্তকে তাঁরা এক আত্মসমালোচনার মুহূর্ত হিসেবে তুলে ধরতে চান যাতে রাবীন্দ্রিক উত্তরাধিকারের পথ থেকে যে ধারাবাহিক স্খলন আমরা গত কয়েক দশক ধরে অনুভব করে চলেছি তার থেকে নিষ্কৃতির কোন পথ খুঁজে পাওয়া যায়। মানুষ ও প্রকৃতির মেলবন্ধন, মুক্ত চিন্তা, যান্ত্রিক নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে, শিক্ষা ও সৃষ্টির আনন্দের যৌথতার যে সাধনা রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর মাধ্যমে সূচনা করেছিলেন তার ক্রমিক অবক্ষয় যে আমাদের বাঙালি জাতির সার্বিক পশ্চাদধাবনের পরিণাম তা অনস্বীকার্য। তবে এই প্রসঙ্গে জনৈক প্রখ্যাত অধ্যাপক একটি উত্তর সম্পাদকীয় তে যে সব বক্তব্য রেখেছেন তাতে কিছু বিব্রত হওয়ার কারণ রয়েছে। লেখক ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের শান্তিনিকেতনের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে দুশ্চিন্তা ও সমালোচনামূলক মন্তব্যের উত্থাপন করলেও, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব উত্তরের মাধ্যমেই সেই সকল সংশয় ও আশঙ্কাকে তাচ্ছিল্যভরে অপসারণ করেছেন। কিন্ত এ প্রসঙ্গে স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে যদুনাথ সরকার রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী সম্পর্কিত অভিপ্রায়ের সম্যক ধারণা করতে ব্যর্থ হলেও, "intellectual discipline and exact knowledge"  এর অভাবের যে আশঙ্কা তিনি প্রকাশ করেছিলেন তা কিন্তু শান্তিনিকেতনের কলাকেন্দ্র,  বিদ্যালয়শিক্ষা বা গবেষণার প্রতি নির্দেশিত ছিলনা। ২০০৫ সালে রচিত "স্বপ্নভঙ্গের চিন্হ" নামক প্রবন্ধে শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষ দেখিয়েছেন যে যদুনাথ সরকারের আশঙ্কা ও প্রত্যাখ্যান মূলত উচ্চারিত হয়েছিল কলেজীয় শিক্ষাকে কেন্দ্র করে (ছেড়ে রেখেই ধরে রাখা, ২০২১)। ঐ একই প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন যে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী সংক্রান্ত স্বপ্নের ভঙ্গুর্ময়তার সূচনা হয়েছিল কবিগুরুর জীবদ্দশাতেই যা তাঁর নানান চিঠিপত্রে ও বিক্ষিপ্ত বক্তব্যে বারম্বার প্রকাশিত।পরবর্তীকালে যখন বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পায় তখন তা বাধ্যতামূলক ভাবে এক অনুকরণপ্রিয় সর্বভারতীয় ছাঁচের অংশ হয়ে পড়ে যেখানে কবিগুরুর মৌলিক চিন্তাধারার সংরক্ষণ ও প্রসার প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। শঙ্খ ঘোষ তাই একদিকে বলছেন যে "যদুনাথ সরকারের সতর্কবাণীটার কোনো যে মানে ছিল না, তা হয়তো নয়" (৯২), এবং অন্য দিকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন "অন্য যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই আরেকটা বিশ্ববিদ্যালয় বলে ভাবতে হবে আজ বিশ্বভারতীকে, পালটে নিতে হবে আমাদের বিলাপের পুরোনো মুদ্রাগুলিকে" (৯২)। শঙ্খ বাবুর লেখার পর প্রায় আঠারো বছর অতিক্রান্ত হলেও আমাদের বিলাপের মুদ্রা পাল্টায়নি। 

    আরও আশ্চর্যের হল এই বিলাপের অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকদের প্রতি লেখকের চূড়ান্ত উন্নাসিক অশ্রদ্ধা। বিশ্বভারতীর অবক্ষয়ের দায় যে শিক্ষকসমাজকেও গ্রহণ করতে হবে, এই দাবি জানিয়ে লেখক কখনো বলছেন যে তিন - চতুর্থাংশ শিক্ষকের মনে ছাত্রদের প্রতি ভালোবাসা নেই, বিবেকবোধ নেই, কখনো বলছেন ছাত্র ছাত্রীদের প্রতি শিক্ষকরা অধিকাংশই উদাসীন, খাতা দেখার ক্ষেত্রে অবহেলা ও অবিচারপ্রবণ, কখনো বলেছেন পারিবারিক অশান্তির মাসুল দিতে হয়েছে ছাত্রদের। শিক্ষক শিক্ষিকারা ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে নন। কিন্তু কোন পরিসংখ্যানের বিচারের লেখক এহেন সংখ্যাতাত্বিক সরলীকরণ করে ফেললেন বোঝা গেলনা। নাম না করে নিজের প্রাক্তন সহকর্মীদেরও কটাক্ষ করলেন নানা ভাবে। তাঁর বিভাগের এক ভাষাবিদ যে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এর ভাষাতত্ত্ব জানেননা, এটা অনায়াসে বলে দিলেন, একথা জানা সত্ত্বেও যে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়, তাঁর সহকর্মীবৃন্দ বা তাঁদের গবেষণার বিষয় অনেক ক্ষেত্রেই জনগণের অবগত। অথবা জানেন বলেই লিখলেন যাতে সচেতন পাঠক কটাক্ষের হিসেব মিলিয়ে নেন। এরই পাশাপাশি থাকে তিনি নিজে কত তুচ্ছ ও কত অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁর শ্রদ্ধা ও বিনয় ছাত্র ছাত্রী দের থেকে তাঁকে এনে দিয়েছে কত অকুণ্ঠ ভালোবাসা, তার খতিয়ান। পরোক্ষ ভাবে নিজেকে অধিষ্ঠান করিয়েছেন এক শিক্ষাগুরুর আসনে যাঁর আগমনে শিক্ষার্থীরা হাতে স্বর্গ পায়।  তিনি যে সকলের থেকে আলাদা ও সকলের থেকে শ্রেষ্ঠ, এই সিদ্ধান্ত টাকেই প্রতিষ্ঠিত করা যেন এহেন বাক্যসমূহের মূল প্রতিপাদ্য।

    বিশ্বভারতী সম্পর্কিত এক অনর্থক জং ধরা বিলাপ এভাবেই হয়ে ওঠে আত্মশ্লাঘা প্রচারের নতুন আভরণ। রবীন্দ্রনাথ চিরকাল যে নিজের আমির আবরণ ছিন্ন করে বিপুল সমগ্রের সাথে প্রাণের আনন্দস্রোতের মিলনের কথা বললেন, সেই ধারারই উল্টো পথে হেঁটে এই প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ কেই করে তুললেন আত্মস্তুতির আকর। আর কতকাল আমরা এইভাবে ভাবের ঘরে চুরি করে আত্মপ্রবঞ্চনায় প্রমত্ত থাকব? বিশ্বভারতী বা অন্য যে কোনো প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী না হয়ে কবে নিজের ক্ষুদ্র পরিসরটুকু কে করে তুলব পূর্ণ আনন্দে আলোকিত? এই পূজার মরশুমে এইসব প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে যেন কিছু আশীর্বাদপ্রাপ্তি হয়। অহং এর মহিষাসুর বিনয়রূপেণ প্রজ্ঞার হাতে পরাস্ত হোক।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন