এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ভাষায় গড়া মানুষ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "সে" অবলম্বনে একটি নাটকের কল্পনা।

    Jahar Kanungo লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৬ অক্টোবর ২০২৩ | ৩২১ বার পঠিত
  • গান আর নাচ। নাচ গানের শোভাযাত্রা।
    নাচের দল গানের দল আসে,
    গান গায়, নাচে। বেরিয়ে যায়।
    আবার আসে  তারা অন্য কোন গানে নিয়ে।
    নাচে, বেরিয়ে যায়।

    (রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন গল্প, নাটক - রাজা ও রানী = বিক্রমদেব  রানী সুমিত্রা ইলা গান, বা রাজা- কুশের বৌদ্ধর অংশ, তাশের দেশ, চণ্ডালিকা ইত্যাদি ইত্যাদি’র ছোট ছোট অংশ। নানা পোশাক নানা চরিত্র।)

    বুড়ো – বিধাতা লক্ষলক্ষ কোটিকোটি মানুষ সৃষ্টি করে চলেছেন,

    তবু মানুষের আশা মেটে না। বলে, আমরা নিজে মানুষ তৈরি করব।
    তাই দেবতার সজীব পুতুল - খেলার পাশাপাশি নিজের খেলা শুরু হল পুতুল নিয়ে, সেগুলো মানুষের আপন - গড়া মানুষ।

    (নেপথ্যে – কোরাস – গল্প বলো, গল্প বলো, গল্প বলো ………।।)

    বুড়ো- ‘গল্প বলো' ; ‘গল্প বলো' ‘গল্প বলো'। 
    তার মানে, ভাষায়  গড়া মানুষ বানাও।

    (নেপথ্যে- গল্প বল, গল্প বলো, ভাষায় গড়া মানুষ বানাও।)  

    বুড়ো-  গড়ে উঠল কত রাজপুত্তুর, মন্ত্রীর পুত্তুর, সুয়োরানী, দুয়োরানী, মৎস্যনারীর উপাখ্যান, আরব্য উপন্যাস,  রবিন্সন্ ক্রুসো। পৃথিবীর জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলল। বুড়োরাও আপিসের ছুটির দিনে বলে, মানুষ বানাও ; হল আঠারো -পর্ব মহাভারত প্রস্তুত। আর, লেগে গিয়েছেন  গল্প - বানিয়ের দল দেশে দেশে।

    -নাচের দল আসে। ওরা নাচে, গায়
              "আমরা গল্প বানিয়ের দল”

    তারা রাজপুত্তুর, মন্ত্রীপুত্তুর, রানী, রামায়ণ/মহাভারতের চরিত্র …আরো কত কি!
    নাচ, গান, হৈচৈ ভরে উঠল স্টেজ।

    (নাচের দল  স্ক্রীন এর পেছনে সিলুয়েট বা ব্যাক ষ্টেজে। স্টেজে।)

    স্টেজের  এক কোনে বুড়ো লিখে চলেছে। সঙ্গে বসে আছে পুপু। পুপু  হাসছে, হাততালি দিয়ে উঠছে।

    বুরো দেখে, হাসে, লেখে।   

    ফেড আউট

    (নোট – বুড়োর চরিত্রে দুই জন। পুপুর চরিত্রে ও দুই জন হতে পারে। সূত্রধর একজন। সে বুড়োও হতে পারে।)

    বুড়ো -  নাতনির ফরমাশে কিছু দিন থেকে লেগে গেছি মানুষ গড়ার কাজে।
    নিছক খেলার মানুষ, সত্যমিথ্যের কোনো  জবাবদিহি নেই।  কাজটা একলাই
    শুরু করেছিলাম, কিন্তু মালমসলা এতই হাল্কা ওজনের যে, নির্বিচারে পুপুও দিল যোগ।  আর একটা লোককে রেখেছিলাম।

    পুপু বুড়ো হাসে।
    একবার পিছন ফিরে তাকায়।
    ‘সে’ দাঁড়িয়ে আছে উইংসে। হালকা আলোর বৃত্তে।

    বুড়ো- তার কথা হবে পরে।
    অনেক গল্প শুরু হয়েছে এই বলে এক যে ছিল রাজা।  আমি আরম্ভ করে দিলুম, এক যে আছে মানুষ। তার  পরে লোকে  যাকে বলে গপ্পো, এতে তারও কোনো আঁচ নেই।

    বুড়ো- সে মানুষ ঘোড়ায় চড়ে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে গেল না। একদিন রাত্রি দশটার পর এল আমার ঘরে। আমি বই পড়ছিলুম।

    সে- দাদা, খিদে পেয়েছে।

    বুড়ো পিছন ফিরে সে’র দিকে তাকাল একবার। তারপর আবার পুপুর সঙ্গে কথা বলতে লাগলো।  

    বুড়ো(পুপুকে)- রাজপুত্তুরের গল্প অনেক শুনেছি ; কখনোই তার খিদে পায় না। কিন্তু এর খিদে পেয়ে গেল  গোড়াতেই, শুনে খুশি হলুম।

    সে- (বিরক্তি)  - দাদা, খিদে পেয়েছে।

    'সে’ আর কোন কথা না বলে বসে পড়লো – (ব্যাক টু ষ্টেজ )  

    বুড়ো-  -- আরে এসো এসো।

    ( তারপর আবার পুপুর সঙ্গে কথা বলতে লাগলো।)

    বুড়ো- খিদে পাওয়া লোকের সঙ্গে ভাব করা সহজ। খুশি করবার জন্যে গলির মোড়ের থেকে বেশি দূর যেতে হয় না। দেখলুম লোকটার দিব্যি খাওয়ার শখ। ফরমাস করে মুড়োর ঘণ্ট, লাউচিংড়ি, কাঁটাচচ্চড়ি ; বড়োবাজারের মালাই পেলে বাটিটা চেঁচেপুঁছে খায় আর কি। আর এক একদিন শখ যায় আইস্ক্রিমের।

    সে খেয়েই চলেছে।

    গানের দল স্টেজে আসে। সে’র দিকে অবাক হয়ে তাকায়। তাদের নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা শোনা যায়।
    পুপু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে।

    ধীরে ধীরে স্টেজ অন্ধকার হয়ে যায়।
    এক বিরাট উদ্গারের আওয়াজ।
    পুপুর হাসির আওয়াজ।

    স্টেজের এক কোনে বসে বুড়ো গল্প শোনাচ্ছে পুপু কে। (ওদের উপর নরম আলো)    

    বুড়ো –
    বসে বসে ছবি আঁকছি। এখানকার মাঠের ছবি। উত্তর দিকে বরাবর চলে গেছে রাঙামাটির রাস্তা — দক্ষিণ দিকে পোড়ো জমি, উঁচুনিচু ঢেউ –খেলানো,
    মাঝে মাঝে ঝাঁকড়া বুনো খেজুর। দূরে দুটো - চারটে তালগাছ আকাশের দিকে কাঙালের মতো তাকিয়ে। তারই পিছনে জমে উঠেছে
    ঘন মেঘ, যেন একটা প্রকাণ্ড নীল বাঘ ওৎ পেতে আছে, কখন এক লাফে মাঝ আকাশে উঠে সূর্যটাকে দেবে থাবার ঘা।বাটিতে রঙ গুলে তুলি বাগিয়ে এই - সব এঁকে চলেছি।

    (আঁকা ছবি প্রতিফলিত হচ্চে স্ক্রীন এ।)

    দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ। (প্রচণ্ড শব্দ) 

    বুড়ো দরজা খোলে। দেখে সে’কে। ফিরে আসে পুপুর কাছে।

    বুড়ো – দরজায় পড়ল ঠেলা। খুলে দেখি ডাকাত নয়, দৈত্য নয়, কোটালের পুত্তুর নয়, সেই লোকটা। সর্বাঙ্গ বেয়ে জল ঝরছে, ময়লা ভিজে জামা গায়ে লেপ্টে গেছে,কোঁচার ডগায় কাদা, জুতোয় কাদার পিণ্ডি।

    বুড়ো ফিরে যায় দরজায়।

    বুড়ো - এ কী !

    সে-  যখন বেরিয়েছিলুম খট্খটে রোদ্দুর। আদ্ধেক পথে আসতে বৃষ্টি নামল।

    'সে' ইতিমধ্যে ঘরের ভেতর গামছা ইত্যাদি জোগাড় করে গা হাতপা মুছছে।
    অবাক হয়ে পুপু চেয়ে আছে ‘সে’র দিকে।

    সে - তোমার ঐ বিছানার চাদরটা যদি দাও তো কাপড় ছেড়ে গায়ে জড়িয়ে বসি।

    পুপু (বুড়ো কে বলে) – ধ্যাত!

    বুড়ো- হ্যাঁ। হুকুম পাবার সবুর সইল না। চট্ করে খাটের থেকে লক্ষ্মৌছিটের ঢাকাটা  টেনে নিয়ে তাই দিয়ে মাথাটা মুছে কাপড় ছেড়ে সেটা গায়ে জড়িয়ে বসল। ভাগ্যিস কাশ্মীরি, জামিয়ারটা পাতা ছিল না। বললে, দাদা, তোমাকে একটা গান শোনাব।
    ‘সে’ হারমোনিয়াম টাকে টেনে নিয়ে বসে পড়ল 

    সে শুরু করলে —গান।

    ভাবো শ্রীকান্ত নরকান্তকারীরে, / নিতান্ত কৃতান্ত - ভয়ান্ত হবে ভবে।

    বুড়োও গাইছে বেসুরো গলায়, যেন পূপুকে শোনাচ্ছে, কি ভাবে গাইছিল সে।

    নাচের দল ও ঢুকে গেল স্টেজে। তারাও ধেই ধেই করে নাচে।

    পুপু হাসছে।

    পুপু- বন্ধ কর, বন্ধ কর’।

    নাচের দল হটাত নাচ থামায়। 
    'সে ' কিন্তু খুশি।

    সে –  কেমন লাগছে?

    বুড়ো –  জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তোমাকে গলা সাধতে হবে লোকালয় থেকে দূরে বসে। তার পরে বুঝে নেবেন চিত্রগুপ্ত, যদি সইতে পারেন।

    নাচের দল ‘সে’র হারমোনিয়ামটা প্রায় জোর করে তুলে নিয়ে চলে গেল।
    তারপর আরো কেউ এসে সে কেও টানতে টানতে নিয়ে যায়।

    বুড়ো পূপু হাসে।

    বুড়ো - সব গল্পেরই একটা আরম্ভ আছে, শেষ আছে, কিন্তু ঐ যে  ‘এক যে আছে মানুষ' তার আর শেষ নেই। তার দিদির জ্বর হয়, ডাক্তার ডাকতে যায়। টমি কুকুর আছে, বেড়ালের নখের আঁচড় লেগে তার নাক যায় ছড়ে। পিছন দিক থেকে গোরুর গাড়ির উপর চড়ে বসেছিল, তাই নিয়ে গাড়োয়ানের সঙ্গে হয় বিষম বচসা।
    উঠোনে কলতলায় পিছলে পড়ে বামুন ঠাকুরনের মাটির ঘড়া দেয় ভেঙে। মোহনবাগানের
    ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়েছিল, পকেট থেকে সাড়ে তিন আনা পয়সা কে নেয় তুলে ;
    ফিরতি রাস্তায় ভীমনাগের দোকান থেকে সন্দেশ কেনা বাদ  গেল। বন্ধু আছে কিনু চৌধুরী, তার ওখানে গিয়ে কুচো চিংড়ি ভাজা আর আলুর দম ফরমাশ করে। এমনি একটার পর একটা চলছে দিনের পর দিন।

    লিখে চলেছে বুড়ো।

    পুপু, 'সে', এবং আরো অনেক চরিত্র ( যারা  নাচ গানের দলের লোকেরা পিছনে এসে দাঁড়ায়। উঁকি মেরে দেখে কি লিখছে বুড়ো। 

    বুড়ো – এই যে আমাদের এক যে আছে মানুষ, এর একটা নাম নিশ্চয়ই আছে। সে কেবল
    আমরা দুজনেই জানি, আর কাউকে বলা বারণ। এইখানটাতেই গল্পের মজা।
    এক যে ছিল রাজা, তারও নাম নেই, রাজপুত্র, তারও নেই। আর রাজকন্যা, যার চুল লুটিয়ে
    পড়ে মাটিতে, যার হাসিতে মাণিক, চোখের জলে মুক্তো তারও নাম কেউ জানে না।
    ওরা নামজাদা নয় অথচ ঘরে ঘরে ওদের খ্যাতি।
    এই যে আমাদের মানুষটি— একে আমরা শুধু বলি “সে”।

    পেছন থেকে কেউ  জিজ্ঞেস করে –  নাম?

    বুড়ো পুপু  দুজনে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে হাসে।

    পুপু- ( বলে আন্দাজ করে) - প দিয়ে আরম্ভ।

    অন্য সবাই আন্দাজে আন্দাজে  বলে – প্রিয়নাথ! /পঞ্চানন!  /পাচকড়ি! /পীতাম্বর!  /পরেশ! /পীটার্স,  /প্রেস্কটু, /পীরবক্স!   /পীয়ার খী!

    কেউ বলে - এই গল্প চলবে তো?

    বুড়ো – কার গল্প ? এ তে রাজপুত্তর নয়, এ হলো মানুষ, এ খায় দায় ঘুমোয়, আপিসে যায়, সিনেমা দেখবারও সখ আছে। দিনের পর দিন যা সবাই করছে তাইএর গল্প। মনের মধ্যে যদি মানুষটাকে স্পষ্ট ক’রে গড়ে তোল তাহোলে দেখতে পাবে এ যখন দোকানের রোয়াকে বসে রসগোল্লা খায় আর তার রস ঠোঙার ছিদ্র দিয়ে অজানিতে পড়তে থাকে তার ময়লা ধুতির উপর, সেটাই গল্প।-

    কেউ বলে -  তারপরে ?

    বুড়ো - তারপরে ও ট্রামে চড়ে বসল, হঠাৎ জ্ঞান হোলো পয়সা নেই, টপ ক’রে লাফিয়ে পড়ল।

    -- -তারপরে ?

    বুড়ো – তারপরে এই রকমই আরো কত কী, বড়োবাজার থেকে বহুবাজার, বহুবাজার থেকে নিমতলা।

    --- যা সৃষ্টিছাড়া, বড়োবাজারে বহুবাজারে এমন কি নিমতলাতেও যার গতি নেই, তা নিয়ে কি গল্প হয় না ?

    বুড়ো - - যদি হয় তাহোলেই হয়, না হলে হয়ই না।

    -- - হোক তবে। হোক না, একেবারে যা-ইচ্ছে তাই ; মাথা নেই, মুণ্ডু নেই, মানে নেই, মোদ্দা নেই এমন একটা  কিছু।

    ( স্টেজে চরিত্ররা আরম্ভ করল গান।)

    হোক তবে। হোক না
    হোক তবে হোক না।
    একেবারে যা-ইচ্ছে তাই ; /মাথা নেই, মুণ্ডু নেই,  মানে নেই, মোদ্দা নেই এমন একটা  কিছু।

    বুড়ো -   এটা হোলো স্পৰ্দ্ধা। বিধাতার সৃষ্টি, নিয়মের রসারসি দিয়ে কষে বাঁধা, যেটা হবার সেটা হবেই। এ তো সহ্য হয় না। একঘেয়ে বিধানের সৃষ্টিকৰ্ত্তা পিতামহকে এমন ক্ষেত্রে ঠাট্টা ক’রে নেওয়া যাক যেখানে শাস্তির ভয় নেই ! এ তো তার নিজের এলেকা নয়।

    --- হোক তবে। হোক না।
    মাথা নেই, মুণ্ডু নেই, 
    মানে নেই, মোদ্দা নেই .. প্রস্থান

    “সে” বসে আছে এক কোনে।

    সে-  দাদা, লেগে যাও। আমার নাম দিয়ে যা-খুশী  চালিয়ে দিতে পারে, ফৌজদারী করব না।

    বুড়ো (ভাবল কিছুক্ষন। সে’র দিকে তাকালো। হাসল ) 

    বুড়ো-“সে” মানুষটির পরিচয় দেওয়ার দরকার আছে।  “সে”, কেবলমাত্র বাক্য দিয়ে তৈরি। সেইজন্যে একে নিয়ে যা-তা করা সম্ভব, কোনোখানে এসে কোনো প্রশ্নের হুচোট খাবার আশঙ্কা নেই। কিন্তু অনাস্থষ্টির চাক্ষুষ প্রমাণ দেবার জন্যে একজন শরীরধারী জোগাড় করতে হয়েছে। সাহিত্যের মামলায় কেসটা যখনি বড়ে বেশি
    বেসামাল হয়ে পড়ে,  তখনি এ লোকটা  সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত। কিছুই বাধে না।

    'সে' র দিকে তাকিয়ে বলে, ' তাই তো?'
    আমার মতো মোক্তারের  ইসারা পেলেই সে কাঁচরাপাড়ার ......।।

    (‘সে’ বুড়োকে থামিয়ে দিয়ে নিজে বলা আরম্ভ করে।)

    সে---  কাঁচড়াপাড়ার কুম্ভমেলায় গঙ্গাস্নান করতে গিয়ে কুমীরে ধরেছিল আমার টিকির ডগা।

    বুড়ো-   ব্যাস, গল্প এটুকুই?

    সে---  মানোয়ারী জাহাজের ডুবুরি গোরা সাত মাস পাঁক ঘেঁটে গোটা পাঁচ ছয় চুল ছাড়া  বাকি টিকিটা উদ্ধার করে এনেছে, বকশিশ পেয়েছে এককালীন সোয়া তিন টাকা।

    পুপু – তারপর?

    সে- --  নীলরতন ডাক্তারের পায়ে ধরে বললাম, দোহাই ডাক্তারবাবু,  ওষুধ দিয়ে টিকিটা জোড়া দিয়ে লাগিয়ে দাও।

    পুপু-- ধ্যাত।

    সে- -- হ্যাঁ। নইলে তেলোর কাছে প্রসাদী ফুল বাঁধতে পারছি নে। তিনি সন্ন্যাসীদত্ত বজ্রজটী মলম লাগিয়ে টিকিটা দিতেই একেবারে মরিয়া হয়ে বেড়ে চলেছে, অফুরান একটা কেঁচোর মতো। পাগড়ি পরলে পাগড়িটা বেলুনের মতো ফেঁপে উঠতে থাকে, মাথার বালিশটার উপর চুড়ো তৈরি হতে থাকে দৈত্যপুরীর ব্যাঙের ছাতার মতো। বাঁধা মাইনে দিয়ে নাপিত রাখতে হল। প্রহরে প্রহরে তাকে দিয়ে ব্রহ্মতালু চাঁচিয়ে নিতে হচ্ছে।

    বুড়ো– তবু যদি শ্রোতার কৌতূহল না মেটে তা হলে সে করুণ মুখ করে বলতে থাকে যে।

    সে--   মেডিক্যাল কলেজের সার্জন-জেনেরাল হাতের আস্তিন গুটিয়ে বসে ছিল; তার ভীষণ জেদ,
    মাথার ঐ  জায়গাটাতে ইস্ক্রুপ দিয়ে ফুটো করে সেইখানে রবারের ছিপি এঁটে গালা লাগিয়ে  শিলমোহর করে দেবে, ইহকাল - পরকালে ওখান দিয়ে আর টিকি  গজাতে পারবে না।
    চিকিৎসাটা ইহকাল ডিঙিয়ে পরকালেই গিয়ে ঠেকবে, এই আশঙ্কায় ও কোনোমতেই রাজি হল না।

    (গল্পটা শোনার পর সবাই চুপ। ভাবছে।
    চরিত্ররাও যে কখন ঢুকে পরেছিল স্টেজে কেউ খেয়াল করে নি।)
    বুড়ো- - আমাদের এই ‘সে’ পদার্থটি ক্ষণজন্মা বটে; এমনতরো কোটিকে গোটিক মেলে  মিথ্যে কথা বানাতে  অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিভা। আমার আজগুবি গল্পের এত  বড়ো উত্তরসাধক ওস্তাদ বহু ভাগ্যে জুটেছে।

    ----------------

    স্টেজে একটু অদলবদল হবে। হুঁহাউ দ্বীপের জন্য স্টেজ।

    চরিত্ররা স্টেজ সাজাতে লেগে যায় আর সাথে গুন গুন করতে করতে  গান ধরে। স্টেজে একটা নস্যি বানানোর মেশিন বসবে।

    গান- সে সে সে/ সে আমাদের সে/ কোটিকে গোটিক মেলে/সে আমাদের সে/ তুমি রইলে তুমি/আমি রইলাম আমি/ বাদবাকি সবাই তারা/সে আমাদের সে/ কোটিকে গোটিক মেলে/সে আমাদের সে/ক্ষনজম্মা অপ্রতিদ্বন্দ্বী/সে আমাদের সে/কোটিকে গোটিক মেলে/ সে আমাদের সে।

    ( কেউ হটাত একটা হাসির কবিতা বললো।)

    “আদর করে মেয়ের নাম
    রেখেছে ক্যেলিফোরনিয়া
    গরম হল বিয়ের হাট
    এই মেয়ের দর নিয়া।

    আরেকজন কেউ--- মহেশদাদা খুঁজিয়া গ্রামে গ্রামে
         পেয়েছে ছেলে ম্যাসাচুসেট্‌স্‌ নামে,
    শাশুড়ি বুড়ি ভীষণ খুশি।

    (কেউ জিজ্ঞেস করে ) - কেন?

      উত্তর ----   নামজাদা সে বর নিয়া--

    আর এক জন ----  “নিধু বলে আড় চোখে কুছ নেই পরোয়া স্ত্রী দিলে গলায় দড়ি বলে ‘এটা ঘরোয়া’.........”।

    আরেক জন ---- নিধু বলে আড় চোখে কুছ নেই পরোয়া,
    স্ত্রী দিলে গলায় দড়ি বলে ‘এটা ঘরোয়া।

    তারপর সব চরিতরা দল বেঁধে দর্শকের সামনে এসে বলে
    " নিধু বলে আড় চোখে কুছ নেই পরোয়া /স্ত্রী দিলে গলায় দড়ি বলে ‘এটা ঘরোয়া "

    কাজ করতে করতে আরেকজন বলে উঠল  -
    ---- সন্ধেবেলায় মাঠে বসে গায়ে হাওয়া লাগাচ্চি এমন সময় শেয়াল এসে বললে, দাদা, তুমি নিজের কাচ্চাবাচ্চাদের মানুষ করতে লেগেছ, আমি কি দোষ করেছি?

    ------কী করতে হবে শুনি।

    -----না হয় হলুম পশু, তাই বলে কি উদ্ধার নেই? পণ করেছি তোমার হাতে মানুষ হব।

    - ---তা তোমার এমন মতলব হোল কেন?

    - ---যদি মানুষ হতে পারি তাহলে শেয়াল সমাজে আমার নাম হবে, আমাকে পুজো করবে ওরা।

    --- বেশ কথা।

    - --- (দর্শক কে) বন্ধুদের খবর দিলাম। তারা খুব খুসি। বললে, একটা কাজের মত কাজ বটে।  পৃথিবীর উপকার হবে। কজনে মিলে সভা করলুম, তার নাম দেওয়া গেল, শিব শোধন সমিতি।

    - --- পাড়ায় আছে অনেক কালের একটা পোড়ো চণ্ডীমণ্ডপ। সেখানে রোজ রাত্তির নটার পরে  শেয়াল- মানুষে …

    সর্দার --- কথা বলে চলেছিস স্টেজের কাজ করবে কে?

    সমবেত - কাজ কর রে, কাজ কর।

    --- ওরা কাজ করে ---
    টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল
    ওরা মাঠে মাঠে
    বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে
    ওরা কাজ করে

    সর্দার ---- বেশী কবিতা না বলে কাজের কাজ কর।

    ---  ঠিক আছে, ঠিক আছে।

    ফিসফিস করে ওরা গায়- কাজ কর রে, কাজ কর।

    কিছুক্ষণ পরে আবার কথাবার্তা শুরু হয়।

    ---  বাবা যে  গাছে চড়ে বসবে সেই গাছই হবে কল্পতরু। তলায় দাঁড়িয়ে হাত পাতলেই যা চাইবি তাই পাবি রে।

    ---- খবর পেলি কার কাছ থেকে।

    ----  ধোকড় গাঁয়ের ভেকু সর্দারের কাছ থেকে। বাবা সেদিন ডুমুর গাছে চড়ে বসে পা  দোলাচ্ছিল ; ভেকু জানে না, তলা দিয়ে যাচ্ছে, মাথায় ছিল এক হাঁড়ি চিটেগুড়, তামাক তৈরি করবে। বাবার পায়ে ঠেকে তার হাঁড়ি গেল টলে — চিটেগুড়ে তার মুখ চোখ গেল বুজে। বাবার দয়ার শরীর ; বললে, ভেকু, তোর মনের কামনা কী খুলে বল্‌। ভেকুটা বোকা ; বললে, বাবা, একখানা ট্যানা দাও, মুখটা মুছে ফেলি। যেমনি বলা অমনি গাছ থেকে খসে পড়ল একখানা গামছা। মুখ চোখ মুছে উপরে যখন তাকালো তখন আর কারও দেখা নেই। যা চাইবে কেবল একবার। বাস্‌, তার পরে কেঁদে আকাশ ফাটালেও সাড়া মিলবে না।

    --- হায় রে হায়, শাল নয়, দোশালা নয়, শুধু একখানা গামছা! ভেকুর আর বুদ্ধি কত হবে।

    -- তা হোক, নেপু। ঐ গামছা নিয়েই তার দিব্যি চলে যাচ্ছে — দেখিস নি ?  রথতলার কাছে অত বড়ো আটচালা বানিয়েছে। গামছা হোক, বাবার গামছা তো।

    ---কী করে বল। ভেল্‌‍কি নাকি।

    --- হোঁদলপাড়ার মেলায় ভেকু সেদিন বাবার গামছা পেতে বসল। হাজারে হাজারে লোক এসে জুটল। বাবার নামে টাকাটা সিকেটা আলুটা মুলোটা চার দিক থেকে গামছার উপর পড়তে লাগল। মেয়েরা কেউ বা এসে বলে, ও ভেকুদাদা, আমার ছেলেটার মাথায় বাবার গামছা একটু ঠেকিয়ে দে, আজ তিমমাস ধরে জ্বরে ভুগছে। ওর নিয়ম হচ্ছে নৈবিদ্যি চাই পাঁচ সিকে, পাঁচটা সুপুরি, পাঁচ কুন্‌‍কে চাল, পাঁচ ছটাক ঘি।

    --- নৈবিদ্যি তো দিচ্ছে, ফল পাচ্ছে কিছু ?

    --- পাচ্ছে বৈকি। গাজন পাল গামছা ভরে পনেরো দিন ধরে ধান ঢেলেছে ; তার পরে ঐ  গামছার কোণে দড়ি লাগিয়ে একটা পাঁঠাও দিলে বেঁধে, ঐ পাঁঠার ডাকে চার দিক থেকে লোকএসে জমল। কী বলব, ভাই, মাস এগারো পরেই গাজনের চাকরি জুটে গেল। আমাদের রাজবাড়ির কোতোয়ালের সিদ্ধি ঘোঁটে, তার দাড়ি চুম্‌‍রিয়ে দেয়।

    --- সত্যি বলছিস ?

    ---আমি মিথ্যা বলি নারে।

    সর্দার – তোরা কি শুধু ইয়ারকি  ফাজলামি করে যাবি ? ষ্টেজটা সাজাবি না?

    --- স্কন্ধে তোমার বুঝি চাপিয়াছে বদভূত।

    সর্দার- মানে?

    ---কনে তো কনে, কনের বাবার সাধ্যি হবে না ওর মিল বের করতে।

    সর্দার--মানে?

    ----দাদা, তোমার মাথায় কিছু আসছে ?

    বুড়ো - তা হলে শোনো —ছাত থেকে লাফ দাও, পাঁক দেখে ঝাঁপ দাও,যখন তখন করো যদ্ভূত তদ্ভূত।

    --ও আবার কী ! ওটা কোন্‌ দিশি বুলি।

    বুড়ো- দেবভাষা সংস্কৃত, কিম্ভূত শব্দের এক পর্যায়।

    -- যদ্ভূত তদ্ভূত, মানেটা কী হল।

    বুড়ো- ওর মানে, যা খুশি তাই। ওটা বঙ্গভাষায়, যাকে হাল আমলের পণ্ডিতেরা বলেছে

    --- বাহ, বাহ, স্তম্ভিত করেছ আমাকে।

    -- স্তম্ভিত হলে চলবে কেন। চলতে হবে। লগ্ন বয়ে যাচ্ছে। ফস্‌ করে ববকরণ পেরিয়ে যাবে কখন, এসে পড়বে তৈতিলকরণ, বৈষ্কুম্ভযোগ, তার পরেই হর্ষণযোগ, বিষ্টিকরণ,

    সরদার - এই তোরা দাদামশাইকে ছেড়ে দে।
    বিজ্ঞানীরা আসছে।

    - ---শেষ রাত্তিরে অসৃকযোগ, ধনিষ্ঠানক্ষত্র — গোস্বামীমতে ব্যতীপাতযোগ বালবকরণ, পরিঘযোগে যখন গরকরণ এসে পড়বে তখন বিপদ হবে — ঘরকর‌্‍নার পক্ষে গরকরণের মতো এত বড়ো বাধা আর নেই। সিদ্ধিযোগ ব্রহ্মযোগ ইন্দ্রযোগ শিবযোগ এই হপ্তার মধ্যে একদিনও পাওয়া যাবে না, বরীয়ানযোগের অল্প একটু আশা আছে যখন পুনর্বসু নক্ষত্রের দৃষ্টি পড়বে।

    কথাগুলো শেষ করে দৌড়ে চলে গেল
                                 
    কেউ কেউ নাকে নল ইত্যাদি লাগিয়ে বিজ্ঞানী সেজে কিছু স্টেজে।

    স্টেজ সাজানো শেষ। একজন একটা প্ল্যাকার্ড (প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘মাথাঘষা গলি’)  নিয়ে ঘুরে গেল।  পেছন পেছন আরেকজন। প্ল্যাকার্ডে লেখা – (‘নস্যটা তবে শস্য নিয়েও নয়’)  
    -সর্দিকে সোজাসুজি / সর্দি বলেই বুঝি/ মেডিকেল বিজ্ঞান না শিখে।/ডাক্তার দেয় শিষ /টাকা নিয়ে  পঁয়ত্রিশ / ভাবনায় গেল ঘুম,/ ওষুধের লাগে ধুম…।।

    - ---শুনবো হাতির হাঁচি / এই বলে কেষ্ট দা   / নেপালের বনে বনে/ ফেরে সারা দেশটা …

    সরদার -এই তোরা বেরো, বেরো তোরা বের হ। ওনাদের স্টেজ টা দে।

    '-----"শুনবো হাতির হাঁচি শুনবো হাতির হাঁচি…" দলবেঁধে হাঁচতে হাঁচতে হাঁচি নিয়ে গান করতে করতে ওরা বেরিয়ে গেল।

    ‘সে’ খাটিয়াতে শুয়ে আছে কিছু ভাবছে।
    বুড়ো তার লেখার টেবিলে।  কিছু ভাবছে।
    দুজনেই চুপচাপ।

    পেছনে – অর্থাৎ হুঁহাউ দ্বীপে – বিজ্ঞানীরা কাজে ব্যস্ত। কি যে কাজ ওরাই জানে। নীরব অভিনয়।

    'সে' কিছুক্ষন দেখে ওদের।

    সে---  আমাকে দার্জিলিং পাঠাও।

    বুড়ো ---  কেন ?

    সে-  --পুরুষমানুষ বেকার বসে আছি, আত্মীয়স্বজন ভারি নিন্দে করছে।

    বুড়ো --- কী কাজ করবে, বলো।

    সে- --পুপোদিদির খেলার রান্নার জন্যে খবরের কাগজ কুচিকুচি করে দেব।

    বুড়ো --– এত মেহন্নত সইবে না । একটু চুপ করো দেখি। আমি এখন হুঁহাউ দ্বীপের ইতিহাস লিখছি।

    'সে' চুপ চাপ বসে রইল কিছুক্ষণ।

    সে- -- হুঁহাউ নামটা শোনাচ্ছে ভালো, দাদা। ওটা তোমার চেয়ে আমার কলমেই মানাতো ঠিক। বিষয়টার একটু আমেজ দিতে পার কি।

    বুড়ো---  ঠাট্টা নয় , বিষয়টা গম্ভীর, কলেজে পাঠ্য হবার আশা রাখি।  একদল বৈজ্ঞানিক ঐ শূন্য দ্বীপে বসতি  বেঁধেছেন। খুব কঠিন পরীক্ষায় প্রবৃত্ত।

    সে- --একটুখানি বুঝিয়ে বলো — কী করছেন তাঁরা। হাল নিয়মে চাষবাস করছেন ?

    বুড়ো – একেবারে উলটো, চাষের সম্পর্ক নেই।

    সে- আহারের কী ব্যবস্থা।

    বুড়ো ---একেবারেই বন্ধ।

    সে- --প্রাণটা ?

    বুড়ো –- সেই চিন্তাটাই সব চেয়ে তুচ্ছ। পাকযন্ত্রের বিরুদ্ধে ওঁদের সত্যাগ্রহ। বলছেন, ঐ জঠরযন্ত্রটার মতো প্যাঁচাও জিনিস আর নেই। যত রোগ, যত যুদ্ধবিগ্রহ, যত চুরি ডাকাতির মূল কারণ তার নাড়ীতে নাড়ীতে।

    সে- -- দাদা, কথাটা সত্য হলেও হজম করা শক্ত।

    বুড়ো – --তোমার পক্ষে শক্ত। কিন্তু , ওঁরা হলেন বৈজ্ঞানিক। পাকযন্ত্রটা উপড়ে ফেলেছেন, পেট গেছে চুপ্‌সে, আহার বন্ধ, নস্য নিচ্ছেন কেবলই। নাক দিয়ে পোষ্টাই নিচ্ছেন হাওয়ায় শুষে। কিছু পৌঁচচ্ছে ভিতরে, কিছু হাঁচতে হাঁচতে বেরিয়ে যাচ্ছে। দুই কাজ একসঙ্গেই চলছে , দেহটা সাফও হচ্ছে, ভর্তিও হচ্ছে।

    সে--  আশ্চর্য কৌশল। কলের জাঁতা বসিয়েছেন বুঝি ? হাঁস মুরগি পাঁটা ভেড়া আলু পটোল একসঙ্গে পিষে শুকিয়ে ভর্তি করছেন ডিবের মধ্যে ?

    বুড়ো – না। পাকযন্ত্র, কসাইখানা, দুটোই সংসার থেকে লোপ করা চাই। পেটের দায়, বিল চোকানোর ল্যাঠা একসঙ্গে মেটাবেন। চিরকালের মতো জগতে শান্তি স্থাপনার উপায় চিন্তা করছেন।

    সে--- নস্যটা তবে শস্য নিয়েও নয় , কেননা সেটাতেও কেনাবেচার মামলা।

    বুড়ো –  বুঝিয়ে বলি। জীবলোকে উদ্ভিদের সবুজ অংশটাই প্রাণের গোড়াকার পদার্থ, সেটা তো জান ?

    সে- --পাপমুখে কেমন করে বলব যে জানি, কিন্তু বুদ্ধিমানেরা নিতান্ত  যদি জেদ করেন তা হলে মেনে নেব।

    বুড়ো – দ্বৈপায়ন পণ্ডিতের দল ঘাসের থেকে সবুজ সার বের করে নিয়ে সূর্যের বেগ্‌নি পেরোনো আলোয় শুকিয়ে মুঠো মুঠো নাকে ঠুসছেন। সকালবেলায় ডান নাকে ; মধ্যাহ্নে বাঁ নাকে ; সায়াহ্নে দুই নাকে একসঙ্গে, সেইটেই বড়ো ভোজ। ওঁদের সমবেত হাঁচির শব্দে চমকে উঠে পশুপক্ষীরা সাঁতরিয়ে সমুদ্র পার হয়ে গেছে।

    সে- --শোনাচ্ছে ভালো। অনেকদিন বেকার আছি দাদা, পাকযন্ত্রটা হন্যে হয়ে উঠেছে — তোমাদের ঐ নস্যটার দালালি করতে পারি যদি নিয়ুমার্কেটে, তা হলে —

    বুড়ো--- অল্প একটু বাধা পড়েছে , সে কথা পরে বলব। তাঁদের আর  একটা মত আছে। তাঁরা বলেন, মানুষ দু পায়ে খাড়া হয়ে চলে বলে তাদের হৃদ্‌যন্ত্র পাকযন্ত্র ঝুলে ঝুলে মরছে ; অস্বাভাবিক অত্যাচার ঘটেছে লাখো লাখো বৎসর ধরে। তার জরিমানা দিতে হচ্ছে আয়ুক্ষয় করে। দোলায়মান হৃদয়টা নিয়ে মরছে নরনারী ; চতুষ্পদের কোনো বালাই নেই।

    সে- -- বুঝলুম, কিন্তু উপায় ?

    বুড়ো –  ওঁরা বলছেন, প্রকৃতির মূল মতলবটা শিশুদের কাছ থেকে শিখে নিতে হবে। সেই দ্বীপের সব চেয়ে উঁচু পাহাড়ে শিলালিপিতে অধ্যাপক খুদে রেখেছেন — সবাই মিলে হামাগুড়ি দাও, ফিরে এসো চতুষ্পদী চালে, যদি দীর্ঘকাল ধরণীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাও।

    সে- - সাবাস ! আরো কিছু বাকি আছে বোধ হয় ?

    বুড়ো –- আছে। ওঁরা বলেন , কথা কওয়াটা মানুষের বানানো। ওটা প্রকৃতিদত্ত নয়। ওতে প্রতিদিন শ্বাসের ক্ষয় হতে থাকে , সেই শ্বাসক্ষয়েই আয়ুক্ষয়। স্বাভাবিক প্রতিভায় এ কথাটা গোড়াতেই আবিষ্কার করেছে বানর। ত্রেতাযুগের হনুমান আজও আছে বেঁচে। আজ ওঁরা নিরালায় বসে সেই বিশুদ্ধ আদিম বুদ্ধির অনুসরণ করছেন। মাটির দিকে মুখ করে সবাই একেবারে চুপ। সমস্ত দ্বীপটাতে কেবল নাকের থেকে হাঁচির শব্দ বেরোয়,  মুখের থেকে কোনো শব্দই নেই।

    সে- - পরস্পর বোঝাপড়া চলে কী করে।

    বুড়ো –- অত্যাশ্চর্য ইশারার ভাষা উদ‍্ভাবিত।  কখনো ঢেঁকি কোটার ভঙ্গিতে , কখনো হাতপাখা  চালানোর চালে , কখনো ঝোড়ো সুপুরি গাছের নকলে ডাইনে বাঁয়ে উপরে নীচে ঘাড় দুলিয়ে বাঁকিয়ে নাড়িয়ে কাঁপিয়ে হেলিয়ে ঝাঁকিয়ে। এমন  কি ,  সেই ভাষার সঙ্গে ভুরু  বাঁকানি চোখ  টেপানি যোগ করে ওঁদের কবিতার কাজও চলে । দেখা গেছে , তাতে দর্শকের চোখে জল আসে, নস্যির জায়গাটা বদ্ধ হয়ে পড়ে।

     
    নেপথ্যে গান গায় কারা। ফিসফিস করে গান গায়।
    ইশারার ভাষা,
    ইশারার ভাষা,
    ইশারার ভাষা
    ইশারায়।

    দ্বীপের মানুষেরা বৈজ্ঞানিকরা তালে  তালে নাচে।  
    ওদের ভাবের আদান প্রদান হয়তো ওডিসি নাচের ভঙ্গিমায়।

    পুপূ অবাক হয়ে দেখে।
    'সে' এবং বুড়োও দেখে ওদের।

    ভাবে।

    সে- কিছু টাকা আমাকে ধার দাও, দোহাই তোমার। ঐ হুঁহাউ দ্বীপেই যেতে হচ্ছে আমাকে। এতবড়ো নতুন মজাটা —

    বুড়ো – নতুন আর পুরোনো হতে পেল কই। হাঁচতে হাঁচতে বস্‌‍তিটা বেবাক ফাঁক হয়ে গেছে। পড়ে আছে জালা - জালা সবুজ নস্যি। ব্যবহার করবার যোগ্য নাক বাকি নেই একটাও।

    সে-   এ তোমার আগাগোড়াই বানানো। বিজ্ঞানের ঠাট্টার পক্ষেও এটা বাড়াবাড়ি শোনাচ্ছে। এই হুঁহাউ দ্বীপের ইতিহাস বানিয়ে তুমি পুপেদিদিকে তাক লাগিয়ে দিতে চাও। ঠিক করেছিলে , তোমার এই অভাগা 'সে'  নামওয়ালাকেই বৈজ্ঞানিক সাজিয়ে সারা দ্বীপময় হাঁচিয়ে হাঁচিয়ে মারবে। বর্ণনা করবে, আমি ঘাড় নাড়ানাড়ির ঘটাকরে ঘটোৎকচ বধ পাঁচালির আসর জমাচ্ছি কী করে।

    বলতে বলতে ‘সে’ প্রস্থান করল।

    পুপু - কপাল কুঁচকে বললে, এ কখনো হয় ? নস্যি  নিয়ে পেট ভরে ?

    বুড়ো- আমি বললেম, গোড়াতে পেটটাকেই যে সরিয়ে দিয়েছে।

    পুপু - কথা না বলে কি বাঁচা যায়?

    বুড়ো  - ওদের সব চেয়ে বড়ো পণ্ডিত ভূৰ্জপাতায় লিখে লিখে দ্বীপময় প্রচার করেছেন, কথা ব’লেই মানুষ মরে। তিনি সংখ্যা গণনায় প্রমাণ
    করে দিয়েছেন, যারা কথা বলত সবাই মরেছে।

    পুপু- বোবারা ?

    বুড়ো  - তারা কথা বলে মরেনি, তারা মরেছে কেউবা পেটের অসুখে, কেউবা কাশিসদিতে। 

    শুনে পুপুদিদির মনে হোলো, কথাটা যুক্তিসঙ্গত।

     পরের দৃশ্যের প্রস্তুতি। 
    বুড়ো - বিশ্বাস করবার অতীত যা তাকেও বিশ্বাস করবার যোগ্য করতে পার যদি, তা হলেই অদ্ভুত রসের গল্প  জমে।‘সে’ অদ্ভুত রসের গল্প।  ‘সে’ – কথার ফুলঝুরি। এর পিঠে ওটা, ওটার পিঠে আর একটা , তার লেজ ধরে ঝুলে থাকে আর একটা --  নানা বস্তু বাস্তব কে ভেঙ্গেচুরে দুমড়িয়ে নতুন সৃষ্টি। নতুন শব্দ। শব্দ সংলাপ।

    বুড়ো-  'সে ' বিয়ে করতে চলেছে।  দাদা ঘুমচ্ছ নাকি – বলেই ঘরে ঢুকে পড়ল।
    কালো কম্বলে সর্বাঙ্গ মোড়া। এ কেমন সজ্জা তোমার? 
    (যারা স্টেজ সাজাচ্ছে তারাই সবাই যেন এক একটা 'সে')

    -- আমার বরসজ্জা । কালো কম্বলে বরসজ্জা। একেবারে ক্লাসিকেল সাজ।

    বুড়ো--ভূতনাথ যখন তাঁর তপস্বিনী কনেকে বর দিতে এলেন, তাঁর গায়ে ছিল হাতির চামড়া ।
     এটা যেন ভালুকের চামড়া। কনেটি কে?

    - -  আমার বউদির ছোট বোন।

    বুড়ো -  তা এত রাত্তিরে?

    ----কোথায় এত রাত্তির? রাত দেড়টার বেশি হবে না।

    বুড়ো  - কনে কি এখনই দেখা চাই?

    ---- হ্যাঁ এখনই।

    বুড়ো - চমৎকার।

     ---- চমৎকার কেন ?

    বুড়ো - আপিসের বড়ো সাহেবের  মুখ দেখা দিনের রোদ‍্দুরে , আর কনে দেখা মাঝরাত্তিরের অন্ধকারে । 

    ----  দাদা , তোমার মুখের কথা যেন অমৃতসমান । একটা পৌরাণিক নজির দাও তো ।

    বুড়ো  - মহাদেব অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন মহাকালীর দিকে অমাবস্যার  ঘোর অন্ধকারে , এই কথাটা স্মরণ কোরো !  কনেটির বাড়ির ঠিকানা?

    ---- চউচাকলা গ্রামে। উঙ্কুন্ডু পাড়ায়।

    বুড়ো - ভোজন ?

    --- অতি উত্তম। আমসত্ত্ব দিয়ে উচ্ছেসিদ্ধ, কুলের আঁটি ঢেঁকিতে কুটে তার সঙ্গে দোক্তার জল মিশিয়ে চাটনি।

    বুড়ো  - তা কনের পরীক্ষা তো চাই। পরীক্ষার প্রণালী টা কি?

    ----  জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “সুন্দরী তুমি কালো কৃষ্টি”।

    বুড়ো - সুন্দরী কি বললেন?

    --- কানা তুমি, নেই ভালো দৃষ্টি।

    ( স্টেজ সাজিয়ে ওরা চলে গেল)

    বুড়ো-  অসম্ভব কল্পনার জগতের মানুষ  ‘সে’ এক অদ্ভুত রসের গল্প। আবার এটাও সত্যি   ‘সে’ আসলে বাস্তব মানুষ, সুপুরুষ, সুগম্ভীর। রাত্তিরে যেমন তারার আলোর ছড়াছড়ি   ওর গাম্ভীর্য তেমনি চাপা হাসিতে ভরা। ও পয়লা নম্বরের মানুষ তাই কোন ঠাট্টা  মশকরায় ওকে জখম করতে পারে না। এইরকম একজন আপাদমস্তক বাস্তব  মানুষকে এরকম উদ্ভট গল্পের নায়ক করা হয়েছে কেন? লেখক বলেছেন, ওকে  বোকার মত সাজাতে আমার মজা লাগে, কেননা ও আমার চেয়ে বুদ্ধিমান। অবুঝের ভান করলেও ওর মান হানি হয় না। অতএব শুরু হল একটি ৯ বছরের মেয়ের জন্য গল্প তৈরির কাজে দুটি বয়স্ক পুরুষের সরস আলোচনা, বিচার আর পরীক্ষা নিরীক্ষার পালা।

    সকালে বসে চা খাচ্ছি এমন সময় সে এসে উপস্থিত।

    বুড়ো - কিছু বলবার আছে ?

    সে-  আছে ।

    বুড়ো  – চট্‌ করে বলে ফেলো , আমাকে এখনি বেরতে হবে।

    সে- কোথায়।

    বুড়ো _ লাটসাহেবের বাড়ি।

    সে- লাটসাহেব তোমাকে ডাকেন নাকি।

     বুড়ো - না , ডাকেন না , ডাকলে ভালো করতেন।

    সে - ভালো কিসের।

    বুড়ো  - জানতে পারতেন , ওঁরা যাদের কাছ থেকে খবর পেয়ে থাকেন আমি তাদের চেয়েও খবর বানাতে ওস্তাদ। কোনো রায়বাহাদুর আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না , সে কথা তুমি জান।

    সে-  - জানি , কিন্তু আমাকে নিয়ে আজকাল তুমি যা – তা বলছ।

    বুড়ো-- অসম্ভব গল্পেরই যে ফরমাশ।

    সে-  হোক  না অসম্ভব , তারও তো একটা বাঁধুনি থাকা চাই।   এলোমেলো অসম্ভব তো যে  সে বানাতে পারে।

    বুড়ো--  তোমার অসম্ভবের একটা নমুনা দাও।

    সে-  আচ্ছা বলি শোনো — স্মৃতিরত্নমশায় মোহনবাগানের গোল-কীপারি করে ক্যাল্‌কাটার কাছ থেকে একে একে পাঁচ গোল খেলেন।

    নেপথ্যে -- গো ...ল,  গো..ল। জনতার উল্লাস। )

    সে-  খেয়ে খিদে গেল না, উলটো হল , পেট চোঁ - চোঁ করতে লাগল। সামনে পেলেন অক্‌‍টর্লনি মনুমেণ্ট। নীচে থেকে চাটতে চাটতে চুড়ো পর্যন্ত দিলেন চেটে।

    বুড়ো অবাক শুনে। হটাত কি মনে হতে পিছন ফিরে দেখে, স্মৃতি রত্ন ধুতির উপর গোলকিপারের জার্সি পরে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছেন।   

    বদরুদ্দিন মিঞা ছুটে এল।  

    বদ্রুদ্দিন-   আপনি শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত হয়ে এত বড়ো জিনিসটাকে এঁটো করে দিলেন !

    ‘ তোবা তোবা' বলে তিনবার মন্যুমেণ্টের গায়ে থুথু ফেলে মিঞাসাহেব দৌড়ে চলে গেল। 

    ম্যুজিয়মের দরোয়ানকে দেখে ছুটে গেল স্মৃতি রত্ন।

    স্মৃতি রত্ন - পাঁড়েজি , তুমিও ব্রাহ্মণ, আমিও ব্রাহ্মণ — একটা অনুরোধ রাখতে হবে।

    পাঁড়েজি -- (দাড়ি চুম্‌‍রিয়ে নিয়ে সেলাম করে) কোমা ভূ পোর্তে ভূ সি ভূ প্লে।

    পণ্ডিতমশায় (একটু চিন্তা করে বললেন)   - বড়ো শক্ত প্রশ্ন , সাংখ্যকারিকা মিলিয়ে দেখে কাল জবাব দিয়ে যাব। বিশেষ আজ আমার মুখ অশুদ্ধ , আমি মনুমেণ্ট চেটেছি।

    পাঁড়েজি- ( দেশালাই দিয়ে বর্মা চুরুট ধরালো। দু টান টেনে বললে ,)

    তা হলে এক্ষুনি খুলুন ওয়েব্‌স্টার ডিক্‌সনারি , দেখুন বিধান কী।

    স্মৃতিরত্ন --- তা হলে তো ভাটপাড়ায় যেতে হয় । সে পরে হবে ,  আপাতত তোমার ঐ পিতলে-বাঁধানো ডাণ্ডাখানা চাই।

    পাঁড়ে –  কেন , কী করবেন , চোখে কয়লার গুঁড়ো পড়েছে বুঝি ?

    স্মৃতিরত্ন –- তুমি খবর পেলে কেমন করে। সে তো পড়েছিল পরশু দিন। ছুটতে হল  উল্টোডিঙিতে যকৃত -  বিকৃতির বড়ো ডাক্তার ম্যাকার্টনি সাহেবের কাছে। তিনি নারকেলডাঙা থেকে শাবল আনিয়ে সাফ করে দিলেন।

    পাঁড়েজি -- তবে ডাণ্ডায় তোমার কী প্রয়োজন।

    স্মৃতি - - দাঁতন করতে হবে।

    পাঁড়েজি --   ওঃ , তাই বলো , আমি বলি নাকে কাঠি দিয়ে হাঁচবে বুঝি ,  তা হলে আবার গঙ্গাজল দিয়ে শোধন করতে হত।

    (ওদের অভিনয় শেষ। ওরা সের নির্দেশের অপেক্ষায়। সে’ ইশারা করল চলে যেতে। ওদের প্রস্থান)   

    সে – দেখো দাদা , এইরকম তোমার বানিয়ে বলবার ধরন। এ যেন আঙুল দিয়ে না লিখে গণেশের শুঁড় দিয়ে লম্বা চালে বাড়িয়ে লেখা। যেটাকে যেরকম জানি সেটাকে অন্যরকম করে দেওয়া। অত্যন্ত সহজ কাজ। যদি বল লাটসাহেব কলুর ব্যাবসা ধরে বাগবাজারে শুটকি মাছের দোকান খুলেছেন , তবে এমন সস্তা ঠাট্টায় যারা হাসে তাদের হাসির দাম কিসের।

    বুড়ো - -চটেছ বলে বোধ হচ্ছে।

    সে - কারণ আছে। আমাকে নিয়ে পুপুদিদিকে সেদিন যাচ্ছে - তাই কতকগুলো বাজে কথা বলেছিলে। নিতান্ত ছেলেমানুষ বলেই দিদি হাঁ করে সব শুনেছিল। কিন্তু , অদ্ভুত কথা যদি বলতেই হয় তবে তার মধ্যে কারিগরি চাই তো।
    বুড়ো - সেটা ছিল না বুঝি ?

    সে- না, ছিল না। চুপ করে থাকতুম যদি আমাকে সুদ্ধ না জড়াতে। যদি বলতে, তোমার  অতিথিকে তুমি জিরাফের মুড়িঘণ্ট খাইয়েছ , সর্ষেবাঁটা দিয়ে তিমিমাছ –ভাজা আর পোলাওয়ের সঙ্গে পাঁকের থেকে টাটকা ধরে আনা জলহস্তী , আর তার সঙ্গে তালের গুঁড়ির ডাঁটা - চচ্চড়ি , তা হলে আমি বলতুম , ওটা হল স্থূল। ওরকম লেখা সহজ।

    বুড়ো  - আচ্ছা , তুমি হলে কী রকম লিখতে।

    সে- বলি , রাগ করবে না ? দাদা, তোমার চেয়ে আমার কেরামতি যে বেশি তা নয়, কম বলেই সুবিধে। আমি হলে বলতুম —তাসমানিয়াতে তাস খেলার নেমন্তন্ন ছিল , যাকে বলে দেখা-বিন্‌‍তি। সেখানে কোজুমাচুকু ছিলেন বাড়ির কর্তা , আর গিন্নির নাম ছিল শ্রীমতী হাঁচিয়েন্দানি কোরঙ্কুনা। তাঁদের বড়ো মেয়ের নাম পাম্‌কুনি দেবী , ....স্বহস্তে রেঁধেছিলেন কিণ্টিনাবুর----

    বুড়ো - থামো , থামো ! কিন্তু জিগেস করি , তুমি যে কাহিনীটা আওড়ালে তার বিশেষ গুণটা কী।

    সে-  ওর গুণটা এই , এটা কুলের আঁঠির চাটনি নয়। যা কিছুই জানি নে তাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করবার শখ মেটালে কোনো নালিশের কারণ থাকে না। কিন্তু , এতেও যে আছে উঁচু দরের হাসি তা আমি বলি নে। বিশ্বাস করার অতীত যা ..
    তাহলেই অদ্ভুত রসের গল্প জমে।
    বাজারে – চল্‌‍তি ছেলে - ভোলাবার সস্তা অত্যুক্তি যদি তুমি বানাতে থাক তা হলে তোমার অপযশ হবে , এই আমি বলে রাখলুম। আচ্ছা , তবে চললুম।

    ---------------------------------------
    পরের দৃশ্য
     

    গান - সার্কাস ব্যান্ডের কন্সার্ট।  বাঘ। বাঘের মুখোশে ছেলেরা মেয়েরা  নাচে।

    পুপু অবাক হয়ে দেখে।

    বুড়ো/সূত্রধর-- ‘সে’ কেবল বাক্য দিয়ে তৈরি।
    কথক গল্প তৈরি করেন। নানা কাণ্ড। সবকিছুই বাস্তব থেকে, নিত্য পরিচিত, কিন্তু অসংলগ্ন।  এইভাবেই গল্পগুলোকে ভাসিয়ে নিতে চেয়েছেন ...। ব্যাঙ্গ কটাক্ষ যথেষ্ট, যদিও তা চাপা উদ্ভট  ঘটনাগুলোর উচ্ছহাস্যে।   সে’র  গল্প গুলির মধ্যে বাঘের গল্পের ঘটনাটা উল্লেখযোগ্য।  বাঘ আর পুপুর গল্পে অস্পৃশ্যতা বিষয়ে কটাক্ষ – গল্পটা শিশুদের জন্য নয়, আমাদের  সবাইয়ের জন্য। আচার- বিচার, যুক্তিহীন সংস্কার।

    আমাদের শেষ নিবেদন।

    অবাক হয়ে পুপু সার্কাস দেখছে।

    বুড়ো তার টেবিলে বসে। দেখে পুপুকে। লেখায় মন দিল। 

    বুড়ো--  সার্কাস দেখে আসার পর থেকে পুপুদিদির মনটা যেন বাঘের বাসা হয়ে উঠল। বাঘের সঙ্গে, বাঘের মাসির সঙ্গে সর্বদা তার আলাপ চলছে। আমরা কেউ যখন থাকি নে তখনই ওদের মজলিস জমে। আমার কাছে নাপিতের খবর নিচ্ছিল ; আমি বললুম, নাপিতের কী দরকার।

    ইতিমধ্যে পুপু উঠে আসে দাদামশাইএর কাছে।

    পুপু - বাঘ অত্যন্ত ধরে পড়েছে। খোঁচা খোঁচা হয়ে উঠেছে ওর গোঁফ, ও কামাতে চায়।

    বুড়ো - গোঁফ কামানোর কথা ওর মনে এল কী করে।

    পুপু – চা খেয়ে বাবার পেয়ালায় তলানি যেটুকু বাকি থাকে আমি বাঘকে খেতে দিই। সেদিন তাই খেতে এসে ও দেখতে পেয়েছিল পাঁচুবাবুকে ; ওর বিশ্বাস, গোঁফ কামালে ওর মুখখানা দেখাবে ঠিক পাঁচুবাবুরই মতো।

    (পাঁচুবাবু কি উঁকি দেয়। বুড়োর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সরে যায়।)

    বুড়ো  - সেটা নিতান্ত অন্যায় ভাবে নি। কিন্তু, একটু মুশকিল আছে। কামানোর শুরুতেই নাপিতকে যদি শেষ করে দেয় তা হলে কামানো শেষ হবেই না।

    পুপু - জান দাদামশায় ? বাঘরা কখ্‌খনো নাপিতকে খায় না।

    বু- বল কী। কেন বলো দেখি।

    পু- খেলে ওদের পাপ হয়।

    বুড়ো - ওঃ, তা হলে কোনো ভয় নেই। এক কাজ করা যাবে,  চৌরঙ্গিতে সাহেব - নাপিতের দোকানে নিয়ে যাওয়া যাবে। ।

    পুপে হাততালি দিয়ে বলে উঠল,

    পুপু-  হাঁ হাঁ, ভারি মজা হবে। সাহেবের মাংস নিশ্চয় খাবে না, ঘেন্না করবে।

    বুড়ো - খেলে গঙ্গাস্নান করতে হবে। খাওয়া ছোঁওয়ায় বাঘের এত বাছবিচার আছে, তুমি জানলে কী করে, দিদি।

    পুপু -  - আমি সব জানি।

    বু- আর, আমি বুঝি জানি নে ?

    পুপু-  কী জান, বলো তো।

    বুড়ো - ওরা কখনো চাষী কৈবর্তর মাংস খায় না ; বিশেষত যারা গঙ্গার  পশ্চিম - পারে থাকে। শাস্ত্রে বারণ।

    পু - আর, যারা পুব - পারে থাকে ?

    বুড়ো- তারা যদি জেলে কৈবর্ত হয় তো সেটা অতি পবিত্র মাংস। সেটা খাবার নিয়ম বাঁ থাবা দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে।

    পুপু- বাঁ থাবা কেন।

    বুড়ো - ঐটে হচ্ছে শুদ্ধ রীতি। ওদের পণ্ডিতরা ডান থাবাকে নোংরা বলে।   একটি কথা জেনে রাখো দিদি, নাপতিনীদের 'পরে ওদের ঘেন্না। নাপতিনীরা যে মেয়েদের পায়ে আল্‌তা লাগায়।

    পুপু- তা লাগালেই বা ?

    বুড়ো  - সাধু বাঘেরা বলে, আলতাটা রক্তের ভান, ওটা আঁচড়ে কামড়ে ছিঁড়ে চিবিয়ে বের করা রক্ত নয়, ওটা মিথ্যাচার। এরকম কপটাচরণকে ওরা অত্যন্ত নিন্দে করে। একবার একটা বাঘ ঢুকেছিল পাগড়িওয়ালার ঘরে, সেখানে ম্যাজেণ্টা গোলা ছিল গামলায়। রক্ত মনে করে মহা খুশি হয়ে মুখ ডুবোলে তার মধ্যে। সে একেবারে পাকা রঙ। বাঘের দাড়ি গোঁফ, তার দুই গাল, লাল টক্‌টকে হয়ে উঠল। নিবিড় বনে যেখানে বাঘেদের পুরুতপাড়া মোষমারা গ্রামে, সেইখানে আসতেই ওদের আঁচাড়ি শিরোমণি বলে উঠল, এ কী কাণ্ড ! তোমার সমস্ত মুখ লাল কেন। ও লজ্জায় পড়ে মিথ্যে করে বললে, গণ্ডার মেরে তার রক্ত খেয়ে এসেছি। ধরা পড়ে গেল মিথ্যে। পণ্ডিতজি বললে, নখে তো রক্তের চিহ্ন দেখি নে ; মুখ শুঁকে বললে, মুখে তো রক্তের গন্ধ নেই। সবাই বলে উঠল, ছি ছি ! এ তো রক্তও নয় পিত্তও নয়, মগজও নয়, মজ্জাও নয় — নিশ্চয় মানুষের পাড়ায় গিয়ে এমন একটা রক্ত খেয়েছে যা নিরামিষ রক্ত, যা অশুচি। পঞ্চায়েত বসে গেল। কামড়বিশারদ - মশায় হুঙ্কার দিয়ে বললে, প্রায়শ্চিত্ত করা চাই। করতেই হল।

    পুপু-  যদি না করত।

    বুড়ো-- সর্বনাশ ! ও যে পাঁচ - পাঁচটা মেয়ের বাপ ; বড়ো বড়ো খরনখিনীর  গৌরীদানের বয়স হয়ে এসেছে। পেটের নীচে লেজ গুটিয়ে সাত গণ্ডা মোষ পণ দিতে চাইলেও বর জুটবে না। এর চেয়েও ভয়ংকর শাস্তি আছে।

    পুপু -  কী রকম।

    বুড়ো- --মলে শ্রাদ্ধ করবার জন্যে পুরুত পাওয়া যাবে না, শেষ কালে হয়তো বেত জঙ্গল গাঁ  থেকে নেকড়ে-বেঘো পুরুত আনতে হবে ; সে ভারি লজ্জা, সাত পুরুষের মাথা হেঁট।

    পুপু - শ্রাদ্ধ নাই বা হল।
     
    বুড়ো -  শোনো একবার। বাঘের ভূত যে না খেয়ে মরবে।
    পুপু - সে তো মরেইছে, আবার মরবে কী করে।

    বুড়ো - সেই তো আরো বিপদ। না খেয়ে মরা ভালো,

    বুড়ো –  কিন্তু ম'রে না খেয়ে বেঁচে থাকা যে বিষম দুর্গ্রহ।

    পুপু - ইংরেজের ভূত তা হলে খেতে পায় কী করে।

    বুড়ো - তারা বেঁচে থাকতে যা খেয়েছে তাতেই তাদের সাত জন্ম অমনি চলে যায়।  আমরা যা খাই তাতে বৈতরণী পার হবার অনেক আগেই পেট চোঁ - চোঁ করতে থাকে।

    পুপু -  প্রায়শ্চিত্ত কিরকম হল।

    বুড়ো - হাঁকবিদ্যা-বাচস্পতি বিধান দিলে যে, বাঘাচণ্ডীতলার দক্ষিণপশ্চিম কোণে কৃষ্ণপঞ্চমী তিথি থেকে শুরু করে অমাবস্যার আড়াই পহর রাত পর্যন্ত ওকে কেবল খ্যাঁক্‌শেয়ালির ঘাড়ের মাংস খেয়ে থাকতে হবে ; তাও হয় ওর পিসতুতো বোন কিংবা মাসতুতো শ্যালার মেজো ছেলে ছাড়া আর কেউ শিকার করলে হবে না — আর, ওকে খেতে হবে পিছনের ডান দিকের থাবা দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে। এত বড়ো শাস্তির হুকুম শুনেই গা বমি - বমি করে এল ; চার পায়ে হাত জোড় করে হাউ - হাউ করতে লাগল।

    পুপু - কেন, কী এমন শাস্তি।

    বুড়ো - বল কী, খ্যাঁক্‌শিয়ালির মাংস ! যত দূর অশুচি হতে হয়।   বাঘটা দোহাই পেড়ে বললে, আমাকে বরঞ্চ নেউলের লেজ খেতে  বলো সেও রাজি, কিন্তু খ্যাঁক্‌শেয়ালির ঘাড়ের মাংস !

    পু-  শেষকালে কি খেতে হল।

    বুড়ো - হল বৈকি।

    পুপু - দাদামশায়, বাঘেরা তা হলে খুব ধার্মিক ?

    বুড়ো  - ধার্মিক না হলে কি এত নিয়ম বাঁচিয়ে চলে। সেইজন্যেই তো শেয়ালরা ওদের ভারি ভক্তি করে। বাঘের এঁটো প্রসাদ পেলে ওরা বর্তিয়ে যায়। মাঘের ত্রয়োদশীতে যদি মঙ্গলবার পড়ে তা হলে সেদিন ভোর রাত্তিরে ঠিক দেড় প্রহর থাকতে বুড়ো বাঘের পা চেটে আসা শেয়ালদের ভারি পুণ্যকর্ম। কত শেয়াল প্রাণ দিয়েছে এই পুণ্যের জন্যে।

    পুপু- (পুপুর বিষম খটকা লাগল)। - বাঘরা এতই যদি ধার্মিক হবে তা হলে জীবহত্যে করে কাঁচা মাংস খায় কী করে।

    বুড়ো-' সে বুঝি যে  সে মাংস। ও  যে মন্ত্র দিয়ে শোধন করা।

    পুপু- কিরকম মন্ত্র।

    বুড়ো- ওদের সনাতন হালুম মন্ত্র। সেই মন্ত্র পড়ে তবে ওরা হত্যা করে।  তাকে কি হত্যা বলে।

    পুপু- যদি হালুম - মন্ত্র বলতে ভুলে যায়।

    বুড়ো-- বাঘপুঙ্গব - পণ্ডিতের মতে তা হলে ওরা বিনা মন্ত্রে যে জীবকে মারে পরজন্মে সেই জীব হয়েই জন্মায়। ওদের ভারি ভয় পাছে মানুষ হয়ে জন্মাতে হয়।

    পুপু- কেন ?

    বুড়ো - ওরা বলে, মানুষের সর্বাঙ্গ টাক পড়া, কী কুশ্রী ! তার পরে, সামান্য একটা লেজ, তাও নেই মানুষের দেহে। পিঠের মাছি তাড়াবার জন্যেই ওদের বিয়ে করতে হয়। আবার দেখো – না, ওরা খাড়া দাঁড়িয়ে সঙের মতো দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটে — দেখে আমরা হেসে মরি। আধুনিক বাঘের মধ্যে সব চেয়ে বড়ো জ্ঞানী শার্দৌল্যতত্ত্বরত্ন বলেন, জীবসৃষ্টির শেষের পালায় বিশ্বকর্মার মালমসলা যখন সমস্তই কাবার হয়ে গেল তখনই মানুষ গড়তে তাঁর হঠাৎ শখ হল। তাই বেচারাদের পায়ের তলার জন্যে থাবা দূরে থাক্‌ কয়েক টুকরো খুরের জোগাড় করতে পারলেন না, জুতো পরে তবে ওরা পায়ের লজ্জা নিবারণ করতে পারে — আর, গায়ের লজ্জা ঢাকে ওরা কাপড়ে জড়িয়ে। সমস্ত পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র ওরাই হল লজ্জিত জীব। এত লজ্জা জীবলোকে আর কোথাও নেই।

    পুপু - বাঘেদের বুঝি ভারি অহংকার ?

    বুড়ো - ভয়ংকর। সেইজন্যেই তো ওরা এত করে জাত বাঁচিয়ে চলে।  জাতের দোহাই পেড়ে একটা বাঘের খাওয়া বন্ধ করেছিল  একজন মানুষের মেয়ে ; তাই নিয়ে আমাদের সে একটা ছড়া বানিয়েছে।

    পুপু- তোমার মতো সে আবার ছড়া বানাতে পারে নাকি।

    বুড়ো - তার নিজের বিশ্বাস সে পারে, এই তর্ক নিয়ে তো পুলিস ডাকা যায় না।

    পুপু- আচ্ছা, শোনাও - না।

    বুড়ো - তবে শোনো —

    (বুড়ো আর পুপু দুজনে মিলে – বুড়ো আরম্ভ করে, পুপু ধরে পরের পঙক্তি, ওরা ছড়া বলতে বলতে হাসে  ) 

    এক ছিল মোটা কেঁদো বাঘ,/গায়ে তার কালো কালো দাগ।/বেহারাকে খেতে ঘরে ঢুকে/আয়নাটা পড়েছে সমুখে।/এক ছুটে পালালো বেহারা,

    বাঘ দেখে আপন চেহারা।/গাঁ - গাঁ করে ডেকে ওঠে রাগে, /দেহ কেন ভরা কালো দাগে।

    ঢেঁকিশালে পুঁটু ধান ভানে,/বাঘ এসে দাঁড়ালো সেখানে। /ফুলিয়ে ভীষণ দুই গোঁফ/বলে, চাই  গ্লিসেরিন সোপ।

    পুঁটু বলে, ও কথাটা কী যে/জন্মেও জানি নে তা নিজে। /ইংরেজি - টিংরেজি কিছু শিখি নি তো /, জাতে আমি নিচু।

    বাঘ বলে, কথা বল ঝুঁটো,/নেই কি আমার চোখ দুটো।/গায়ে কিসে দাগ হল লোপ/না মাখিলে গ্লিসেরিন সোপ।

    পুঁটু বলে, আমি কালো কৃষ্টি/কখনো মাখি নি ও জিনিসটি।/কথা শুনে পায় মোর হাসি,/নই মেম - সাহেবের মাসি।

    বাঘ বলে, নেই তোর লজ্জা ?/খাব তোর হাড় মাস মজ্জা।

    পুঁটু বলে, ছি ছি ওরে বাপ,/মুখেও আনিলে হবে পাপ।/জান না কি আমি অস্পৃশ্য, /মহাত্মা গাঁধিজির শিষ্য।/আমার মাংস যদি খাও /জাত যাবে জান না কি তাও।/পায়ে ধরি করিয়ো না  রাগ !

    ছুঁস নে ছুঁস নে, বলে বাঘ,/আরে ছি ছি, আরে রাম রাম,/বাঘনাপাড়ায় বদনাম/রটে যাবে ; ঘরে মেয়ে ঠাসা,/ঘুচে যাবে বিবাহের আশা/দেবী বাঘা - চণ্ডীর কোপে।/কাজ নেই গ্লিসেরিন সোপে।

    স্টেজে শুধু বুড়ো আর পুপু।  -
        -নীরবতা-

    পুপু ম্লান হাসে। চুপচাপ বসে ভাবে। বুড়ো দেখে পুপুকে।

    বুড়ো- জান, পুপুদিদি ? আধুনিক বাঘেদের মধ্যে ভারি একাট কাণ্ড চলছে — যাকে বলে প্রগতি, প্রচেষ্টা। ওদের প্রগতিওয়ালা প্রচারকেরা বাঘ – সমাজে বলে বেড়াচ্ছে যে, অস্পৃশ্য বলে খাদ্য বিচার করা পবিত্র জন্তু-আত্মার প্রতি  অবমাননা। ওরা বলছে, আজ থেকে আমরা যাকে পাব তাকেই খাব ; বাঁ থাবা দিয়ে খাব, ডান থাবা দিয়ে খাব, পিছনের থাবা দিয়েও খাব ; হালুম - মন্ত্র পড়েও খাব, না পড়েও খাব — এমন - কি, বৃহস্পতিবারেও আঁচড়ে খাব, শনিবারেও আমরা কামড়ে খাব। এত ঔদার্য। এই বাঘেরা যুক্তিবাদী এবং সর্বজীবে এদের সম্মানবোধ অত্যন্ত ফলাও। এমন - কি, এরা পশ্চিম - পারের চাষী কৈবর্তদেরও খেতে চায়, এতই এদের উদার মন। ঘোরতর দলাদলি বেধে গেছে। প্রাচীনরা নব্য সম্প্রদায়কে নাম দিয়েছে চাষী - কৈবর্ত - খেগো, এই নিয়ে মহা হাসাহাসি পড়েছে।

    পুপু - আচ্ছা দাদামশায়, তুমি কখনো বাঘের উপর কবিতা লিখেছ ?

    বুড়ো- (হার মানতে মন গেল না ) হাঁ  লিখেছি।

    পুপু- শোনাও না!

    বুড়ো-- তোমার সৃষ্টিতে কভু শক্তিরে কর না অপমান,
    হে বিধাতা — হিংসারেও করেছ প্রবল হস্তে দান

    আশ্চর্য মহিমা এ কী। প্রখরনখর বিভীষিকা,

    সৌন্দর্য দিয়েছ তারে, দেহধারী যেন বজ্রশিখা,

    যেন ধূর্জটির ক্রোধ। তোমার সৃষ্টির ভাঙে বাঁধ

    ঝঞ্ঝা উচ্ছৃঙ্খল, করে তোমার দয়ার প্রতিবাদ

    বনের যে দস্যু সিংহ, ফেনজিহ্ব ক্ষুব্ধ সমুদ্রের

    যে উদ্ধত ঊর্ধ্ব ফণা, ভূমিগর্ভে দানবযুদ্ধের

    ডমরুনিঃস্বনী স্পর্ধা, গিরিবক্ষভেদী বহ্নিশিখা

    যে আঁকে দিগন্তপটে আপন জ্বলন্ত জয়টিকা,

    প্রলয়নর্তিনী বন্যা বিনাশের মদিরবিহ্বল

    নির্লজ্জ নিষ্ঠুর — এই যত বিশ্ববিপ্লবীর দল

    প্রচণ্ড সুন্দর। জীবলোকে যে দুর্দান্ত আনে ত্রাস

    হীনতালাঞ্ছনে সে তো পায় না তোমার পরিহাস।

            -----    নীরবতা ------

    চুপ করে রইল পুপু।

    বুড়ো - কী দিদি, ভালো লাগল না বুঝি।

    পুপু-- না না, ভালো লাগবে না কেন। কিন্তু, এর মধ্যে বাঘটা কোথায়।

    বুড়ো-- যেমন সে থাকে ঝোপের মধ্যে, দেখা যায় না তবু আছে ভয়ংকর গোপনে।

    পুপু -  অনেকদিন আগে গ্লিসেরিনসোপ - খোঁজা বাঘের কথা আমাকে বলেছিলেন।  তার খবরটা কোথা থেকে পেলে সে।

    বুড়ো –  আমার কথা ও করে চুরি, নিজের মুখে সেটা দেয় বসিয়ে।

    পুপু/বুড়ো নীরব।

    স্টেজের এক কোনে ‘সে’ দাঁড়িয়ে রয়েছে মৃদু আলোতে।
    স্টেজের জিনিসপত্র সরিয়ে রাখা হয়েছে এক কোনে।
    চরিত্ররা নিঃশব্দে বুড়ো পূপুর কাছে এলো। বুড়ো মুখ তুলে চায়। ওরা ইশারায় বলে, এখন যেতে হবে। নাটক শেষ।  পূপূ বুড়োর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।
    পর্দা পড়ছে।

    - ---------------শেষ------
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে প্রতিক্রিয়া দিন