এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  স্মৃতিচারণ  নস্টালজিয়া

  • ডাউন মেমরি লেন 

    kaataakutu
    স্মৃতিচারণ | নস্টালজিয়া | ০৬ জুন ২০২৩ | ৩৪৭ বার পঠিত
  • ডাউন মেমরি লেন দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে............

    পুজো চলে গেছে। সাথে করে নিয়ে গেছে রাস্তা থেকে বাটা, বোরোলীনের বড়ো বড়ো বিজ্ঞাপন, আর রাস্তার ঝলমলে আলো। শুধু থেকে গেছে রাস্তায় প্যান্ডেলের জন্য খুঁটি পোতার গর্ত, হিমেল হাওয়া, আর বোধহয় একটু খুকখুকে কাশি। তোরঙ্গ থেকে কিছুদিন আগে বেরিয়ে পড়েছে পুরনো শাড়ী দিয়ে নকশা করা কাঁথা। হাল্কা ন্যাপথলিনের গন্ধ এখনো বিদ্যমান।

    সকাল বেলা, কাজের মাসীর বাসন মাজা হয়ে গেছে। এখন শিলনোড়ায় হলুদ, লঙ্কা, ধনে, জিরে বাটা হবে। নোড়া দিয়ে হলুদ ভাঙার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মা পুজো শেষ করে, এখন আমাদের বিছানা তুলতে ব্যস্ত। নারকোল ঝাড়ু দিয়ে বিছানা পরিষ্কার করার সময় জানলা দিয়ে আসা সকালের রোদে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য ধূলিকণা। আমি বারান্দার রোদে বসিয়ে রেখে এসেছি নারকেল তেলের শিশি আর ছোটো এল্যুমিনিয়ামের বাটিতে ঘানি থেকে আনা সর্ষের তেল।

    বাবা প্রাতঃভ্রমণ শেষ করে বাজার করে বাড়ী আসেন। সাথে থাকে দুটো বাজার করার ব্যাগ। প্রথমটা বড়ো, সেটায় থাকে, আলু, মরশুমি ফল ও সব্জি। দ্বিতীয়টায় আসে মাছ। মাছের ব্যাগটা ছোটো। আজ মাছের ব্যাগ অপেক্ষাকৃত স্ফীত। মাছের ব্যাগের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে রেগুলার কাটা পোনা ছাড়াও অন্য কোনো মাছ সেই ব্যাগে আছে। আর তাতেই মায়ের মুখে একটা চাপা উদ্বেগ।

    আমার চট্টগ্রামের বাঙাল বাবা বাজারে টাটকা "লইট্যা" মাছ দেখে নিজের লোভ সম্বরণ করতে পারেন নি। এখন মায়ের কাছে আত্মরক্ষা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের তাগিদে একের পর এক দুর্বল যুক্তি দিয়ে চলেছেন। বুঝলে এই টাটকা মাছগুলো মাত্র ৬০ পয়সা কিলো, তা আমি এক কিলো নেওয়াতে ৫০ পয়সায় দিয়ে দিল! এমন লোভনীয় অফারেও মায়ের মুখের অভিব্যক্তির সামান্যতম পরিবর্তন নেই। মায়ের সপ্রতিভ উত্তর, "মাছগুলো তো পুড়িয়ে খাওয়া যাবে না, রান্না করতে হলে তেল, রসুন, পেঁয়াজ এগুলো পর্যাপ্ত পরিমানে থাকা দরকার।" বুঝতে পারছি সাংসারিক প্যাঁচপয়জার না জানা বাবার অবস্থা এখন অভিমন্যুর মতো! চক্রবূহ্যের চক্করে।

    জনতা স্টোভে সকালের চা হবার পরে স্টোভ নিভিয়ে দেওয়ায় পোড়া কেরোসিন তেলের গন্ধ। খাবার জল কুঁজো ও জালায় ভরা হয়ে গেছে কাজের মাসীর, এখন হাতল ভাঙা কাপে দুটো বাসি রুটি গুটিয়ে চায়ে ডুবিয়ে খাচ্ছে। অমিও এখন চা খাই। অনভ্যস্ত হাতে ব্রিটানিয়া বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে সময় মতো না তুলতে পারায় বিস্কুটের অনেকটা অংশ এখন চায়ের কাপের তলায়। চা শেষ করে আঙুল দিয়ে চেটে খাবো। বাবা চা আর আনন্দবাজারে মনোনিবেশ করলেও মনের মধ্যে একটা চাপা সংশয় "লইট্যা" নিয়ে। কাজের মাসী রান্নাঘরে ঊনুনে আগুন ধরিয়ে এ বেলার মতো কাজে শেষ করে বাবলুদাদের বাড়ী কাজ করতে গেলো।

    হঠাৎ করে দক্ষিণপশ্চিম মৌসুমী বায়ুর মতো দক্ষিণের দরজা দিয়ে রাঙা মাসীর প্রবেশ। দুই বোনের জমাটি আড্ডা রান্নাঘরে। রসুন ফোড়নের তীব্র গন্ধ সারা বাড়ী জুড়ে, জম্পেশ লটিয়া হবে!!

    যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বোনা হচ্ছে আমার জন্য সোয়েটার। মাসীর খুব নিকট আত্মীয়ের বিয়ে। মাসীর পিসতুতো ননদের বড়ো জ্যাঠার মেয়ের বিয়ে। মাসীর সাথে আমি যাবো সেই বিয়ে বাড়ীতে। যেখানে আমাকে কেউ চেনে না, আমিও কাউকে চিনি না। বিয়েবাড়ী শুধু খাবার লোভে যচ্ছি।

    সোয়েটারের "V" গলার ঘর ফেলা নিয়ে মা আর মাসীর মধ্যে মতবিরোধ। অবশেষে সোয়েটার বোনায় অস্কার পাওয়া পাড়ার পরীপিসির সাহায্যে সেই সমস্যার সমাধান। একটা তোলা জামা প্যান্ট আছে আমার। জামায় দাগ দেখা যাওয়ায় জামা কাচা হয়ে এখন ভাতের মাড়ে চুবিয়ে জামাকাপড় শুকোনোর তারে কাঠের ক্লিপ দিয়ে শুকোতে দেওয়া হয়েছে। ইস্ত্রি করে নেওয়া হবে।

    নির্দিষ্ট দিনে মাসী আর বোনপো বেরিয়ে পড়েছি বহুদুর ব্যারাকপুরে বিয়ে বাড়ী যাবার জন্য। পায়ের জুতোর ডান দিকের সোলটা একটু বেশী ক্ষয়ে গেছে। মোজায় ইলাস্টিক নষ্ট হয়ে যাওয়াতে রাবার ব্যান্ড দিয়ে মোজা টেনে তুলে রাখা হয়ছে। মাসীর সাথে রয়েছে প্লাস্টিকের বাল্তি ব্যাগ। তাতে মাসীর আর আমার জামা কাপড় ছাড়াও রয়েছে বিয়েতে দেবার উপহার। সমস্ত কিছুর ​​​​​​​ওপর ​​​​​​​দিয়ে আনন্দবাজার দিয়ে মোড়া।

    ট্রেনের হাফ টিকিটের ব্যাপারে সরকারী নির্দেশনামা থাকলেও, টিকিট কাটা নির্ভর করত উপস্থিত অভিভাবকের মর্জির ওপর। আমার জন্য হাফ টিকিট কাটা হয়েছে। ট্রেন ছাড়তে এখনো ২৫ মিনিট বাকী। প্লাটফর্মে বিক্রি হচ্ছে সদ্য ওঠা নারকলী কুল। আমায় হ্যাংলার মতো সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাসী বাধ্য হয়ে কুলের দর জিজ্ঞেস করে। ১০০ কুল ১০ পয়সা। মাসী গোটা ৫০ স্বাস্থ্যবান কুল বেছে নিয়ে রুমাল থেকে ৫ পয়সা দিতেই কুল ওয়ালা জানায় ডিলটা ১০০ গ্রাম কুলের, নট ১০০টা কুলের। মাসী দুর মুখপোড়া বলে সব কুল রেখে দেয়!

    ট্রেনে উঠে বসতে না বসতেই হরেক রকম ফেরিওয়ালা তাদের সামগ্রী নিয়ে হাজির। তার মধ্যে আমার বয়সী একটা ছেলে লঞ্জেন্স বিক্রি করছে, "দুটো পাঁচ, চারটে দশ, যতো চুষবেন ততো রস"! ৫ পয়সায় আমার জন্য বরাদ্দ হলো দুটো ঝালটক লঞ্জেন্স। দাদা ট্রেনের টাইম টেবিল দেখে সব স্টেশনের নাম লিখে দিয়েছে পর পর। আমি মিলিয়ে নিচ্ছি, খড়দহ, টিটাগড়, ব্যারাক্পুর!

    ষ্টেশনে নেমে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছনোর জন্য রিক্সার ভাড়া মাসীর না পসন্দ।

    তিন বছর আগে মাসী ভাড়া দিয়ে ছিলো ৩০ পয়সা। এখন ৪০ পয়্সা। মাঝের দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধির কথা মানতে মাসী নারাজ। রিক্সাওয়ালা জানায়, শীতলাতলা থেকে ৩০ পয়সা। মাসী বলে ঠিক আছে, তুমি শীতলাতলায় অপেক্ষা করো। আমরা হেঁটে আসছি সেখানে। রিক্সাওলার বউনির তাগিদে আমরা ৩০ পয়সাতেই বিয়ে বাড়ীতে পৌছে গেলাম!

    মাসীর সাথে এখন আমি যে ঘরে সেখানে ১২/১৫ জন মাসী, পিসি। আমি মাথা নিচু করে একের পর এক মাসী/পিসিকে প্রণামকরে চলেছি। হঠাৎ একজন মাসী বলে ওঠেন, আমায় প্রণাম কোরো না বাবা, আমি নাপিত বৌ! নাপিত বৌকে কেনো প্রণাম করা যাবে না, সেটা নাপিত বৌ ও মনে হয় জানে না, আমি ও জানি না। এক মাসী বলেন, যাও হাত ধুয়ে এসো, হাত ধোবার সঠিক কারণ কি বাইরে থেকে আসা? নাকি নাপিত বৌয়ের পায়ে হাত দেওয়ার জন্য?

    জলখাবারে চারটে লুচি, দুটো ফোলা, একটা আধা গোটানো, আরেকটা কড়কড়ে নিমকি ষ্টাইলের। সাথে কলোজিরে দিয়ে আলুর তরকারি আর বোঁদে। আমি জলখাবারে গভীর মনোনিবেশ করে একের পর এক লুচি খাচ্ছি, এমন সময় এক পিসি এসে বলেন, "ওমা তুমি অমিয়দার ছেলে? তোমায় কতো ছোটো দেখেছি, তোমায় যখন দেখি তখন তোমার বয়স বছর দুয়েক হবে। এখন কতো বড়ো হয়ে গেছো! বলো তো আমি কে?" লে হালুয়া! এর চাইতে অনেক সহজ উত্তর দেওয়া কে সি নাগ মহাশয়ের ফুটো চৌবাচ্চার অঙ্ক!

    একদিকে গায়েহলুদের ব্যস্ততা অন্যদিকে রান্নার ঠাকুরদের মাছে জোরকদমে হলুদ মাখানো চলছে। একজন বিশাল ভুঁড়ি ও গোঁফের মালিক জ্যাঠামার্কা লোক খাদ্য দফতরের দায়িত্বে। দেখে মনে হয় না উনি জীবনে কোনোদিন এক গ্লাস জল নিজের হাতে খেয়েছেন ! রান্না করা তো দুরের কথা। নিজের অস্তিত্ব বোঝাতে মাঝে মাঝেই ওড়িয়া ঠাকুর গিরিধারীকে বলছেন, "গিরিধারী মাছে এত তেল ঢালিস না, গরম মশলাটা বেশী দিবি না।" অভিজ্ঞ রাঁধুনি গিরিধারী সব কথাতেই মাথা নেড়ে নিজের মতো করে তেল মশলা দিয়ে চলেছে, আরো দুজন রান্নার জায়্গায় বসে আছেন, কিন্তু মনে হয় এনারা এলেবেলে। খবরের কাগজ পড়ছে বা পড়ার ভান করছে।

    দুপুরের মেনু মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, ঝিরঝিরে আলুভাজা, মাছের মাথা আর মাছের তেল দিয়ে ছ্যাঁচড়া, আর পাকা রুই মাছ। অমৃতের স্বাদ কি এর চেয়ে ভালো? দেবতারা কেন যে অমৃত নিয়ে ঝামেলা পাকিয়েছিলো কে জানে! দুপুরের খাবার পরিবেশনে বাড়ীর ছেলে মেয়েরা। বাড়ীর বড়ো জামাই তার শালী কে ডেকে বলেন, "এই ছ্যাঁচড়ি, আরেক্টু ছ্যাঁচড়া দিয়ে যাও তো"। মহিলা মহলে হাসির রোল।

    মতিমামার সাথে সাইকেলে চড়ে আমি এখন পানের দোকানে যাচ্ছি। রাস্তা এবড়োখেবড়ো, একটু পাছুতে লাগছে, সেটা তেমন কিছু নয়। মতিমামা এই বাড়ীতে তার দিদির বিয়ের সময় দিদির সাথে এসেছিল, তরপর থেকে দিদি জামাইবাবুর সাথেই থেকে গেছেন। এই সমস্ত কাজের দিনে এই বেকার মামা/কাকাদের কদর বেড়ে যায়। হেভিওয়েট রিলেটিভদের হাওড়া থেকে আনা, ডেকরেটার্স, পানওয়ালা, লাইট, ফুল সব মতিমামার কনট্যাক্ট। হেড অফিস থেকে বরযাত্রী দের জন্য হঠাৎ "জুসলা" অনুমোদন হওয়াতে মতিমামা পানওয়ালাকে জরুরী কাজের ভিত্তিতে জুসলার অর্ডার দেওয়া ছাড়াও রাতের পান ও সিগারেটের রিমাইন্ডার দিয়ে দিলো।

    বাড়ীর সামনে খোলা মাঠে বিয়ের প্যান্ডেল, বিয়েবাড়ীর আলো জ্বলে উঠেছে। খাবারের টেবিল ও চেয়ার পাতা। দুজন কাকু জল ছিটিয়ে টেবিলের ওপর লম্বা কাগজ পেতে দিলো। একটা মেঠো গন্ধ প্যান্ডেল জুড়ে। চট দিয়ে রান্না করার জায়্গাটা ঘেরা। সেখানে বারকোশে নেতিয়ে পড়ে আছে লম্বা লম্বা বেগুন ভাজা। আমার মতো বিনা আমন্ত্রণে চলে এসেছে ঝাঁক ঝাঁক মশা। আর বাইরে ডাস্টবিনে লোকের খাওয়ার উচ্ছিষ্ট অংশ ভাগ করে খাবার জন্য জড়ো হয়েছে স্থানীয় কুকুর আর কিছু ভিখারী।

    লোকজন আসা শুরু করেছে। মেয়েরা সবাই চুলে ফুলের মালা, গায়ে সেন্ট মেখে তৈরী। কনের পাশে এক দিদি হাতে পেন আর খাতা নিয়ে, উপহারের লিষ্ট করে চলেছেন, ফোন বৌদি একটি বিছানার চাদর, মিলন কাকু একটি টেবিল ল্যাম্প! উপহারের লিস্ট দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

    প্রথম ব্যাচ অফিস ষ্টাফদের জন্য। এই ব্যাচ সাধারনতঃ তাড়াতাড়ি শুরু হয়। কনের জ্যাঠা আতিথেয়তার দায়িত্বে। সবাইকে জনে জনে জিজ্ঞাসা করছেন, "রান্না ​​​​​​​কেমন হয়েছে? ভালো করে খেয়েছেন তো?" একজনের পাতে স্তুপাকৃতি মাংসের হাড়, তিনি জবাব দিলেন, "রান্না খুব ভালো হয়েছে, তবে এতো তাড়াতাড়ি অবেলায় খাওয়া তো!" জ্যাঠা নিশ্চয়ই ভেবে শিওরে উঠছেন সঠিক বেলা হলে কি হতো!

    এক্জন পরিবেশনের ইনচার্জ। ইনি শুধু মাঝে মাঝে চিৎকার করে যারা পরিবেশন করছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছেন, "লুচি রিপিট, ডাল রিপিট, মাছটা অরেকবার ঘুরিয়ে দাও"। যারা পরিবেশন করছেন বিয়েবাড়ী থেকে শ্রাদ্ধবাড়ী যে কোনো অনুষ্ঠানে, বা আপদে বিপদে এনাদের উপস্থিতি সব জায়গায়, রান্নায় হলুদের গুঁড়োর মতই। একটা ​​​​​​​গামছা ​​​​​​​আর দরাজ মন নিয়ে এনারা সব পরিস্থিতি নিপুণ হাতে সামলে দেন।

    ওদিকে রসগোল্লা, কমলাভোগ, কাঁচাগোল্লা, সন্দেশ সব "Z" ক্যাটাগরির নিরাপত্তায়। যিনি ভাঁড়ারে রয়েছেন তাঁর কাছে বোধহয় গোপন খবর আছে যে যখন তখন সন্ত্রাসবাদীরা এসে মিষ্টি নিয়ে পালাতে পারে। তাই তিনি দরজা আটকে দাঁড়িয়ে আছেন।

    বরযাত্রীদের জন্য জুসলা এসে গেছে। মতিমামা একের পর এক জুসলা "ফট ফট" করে বটল ওপেনার দিয়ে খুলছে, আর আমি সেই বোতলে স্ট্র ভরি দিচ্ছি। দারুন টিম ওয়ার্ক! আমি না থাকলে কি হতো কে জানে! জুসলা কোনোমতে জোগাড় হোলেও ঠান্ডা করার জন্য বরফ জোগাড় করা সম্ভব হয় নি। বরযাত্রীদের মধ্যে কে একজন চেঁচিয়ে টিপ্পনি কেটে বলে ওঠে, "বাপ্পাদা তাড়াতাড়ি জুসলাটা খেয়ে নাও, না হলে ঠান্ডা হয়ে যাবে।"

    রাতের মেনু অনেকটা বরদের "ঘড়ি, আঙটি, বোতাম" পাবার মতই। কলা পাতায় আগে থেকে নুন, লেবু, বেগুন ভাজা পড়ে আছে। ডালডায় ভাজা গরম গরম লুচি আর নারকোল দিয়ে ছোলার ডাল এলো। মোটামুটি ট্রেনিং নেওয়া আছে, এখনকার ভাষায় সেটা হলো কার্ব ছেড়ে, অ্যানিমেল প্রোটিনের ওপর অ্যাটাক করা। উঠতি বয়সে সেই সব সতর্ক বাণী ভুলে লুচি আর ডাল দিয়ে চারটে অলরেডি মেরে দিয়েছি, আর দুটো লুচি যখন নিতে যাবো, তখন কোথা থেকে মাসী এসে সবার সামনে বকে ওঠে, বলে, "আর লুচি খেয়ে পেট ভরাতে হবে না। এইবার মাছ, মাংস!" সেই একই উপদেশ প্রোটিনের ওপর জোর দেওয়া!

    রাতে একটু পেট ব্যথা ব্যাথা করছিলো, মাসী "সোডামিন্ট " খাইয়ে রাতে শোবার আগে একটু নারকেল তেল আর জল পেটে মালিশ করে দিলো। মায়ের অভাব অনুভূত হতে দেয় নি মাসী। বোধায় সেটাই প্রথম মা ছাড়া রাত কাটানো।

    পরের দিন কনে বিদায়। উপস্থিত এত লোকের সান্নিধ্যে গানের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজী নয় এক দিদি। সুরেলা গলায় গেয়ে ওঠে, "আমার যাবার সময় হলো, দাও বিদায়"। গানের সুর মিলিয়ে যায় মাসীদের ঘন ঘন উলুধ্বনি আর শাঁখের আওয়াজে। কনে বিদায়ের সময় সারা পাড়া উপস্থিত। সবার চোখে জল। মধ্যবিত্তের এই আটপৌরে অগোছালো জীবনে, মানুষ মানুষের সান্নিধ্যে আসত, জীবনের এক বিশেষ নিয়মেই।

    আমাদেরও ফিরতে হবে। মাসী একটা হরলিক্সের শিশিতে গোটা ১০/১২ রসগোল্লা আমার দাদাদের জন্য নিয়ে নিয়েছে। বিদায় নেবার সময় বাড়ীর বড়দের প্রণাম করছি যখন, তখন কনের মা মাসীমা আমায় বলেন, "আবার এসো কিন্তু বাবা!"

    না আর ফিরে যাওয়া হয় নি, আর হবেও না! কার কাছে ফিরে যাবো? সবাই তো চলে গেছেন যারা আমাদের ভালোবাসতেন। এই সব পুরনো কথা মনে পড়লে এক বোবা কান্নায় গলার কাছটা ব্যাথা করে। চোখের দৃষ্টি হয় ঝাপসা। আমি বারান্দায় বেরিয়ে আসি। বড়ো একা লাগে।

    সেই ​​​​​​​বয়সের ​​​​​​​সেই ​​​​​​​কিশোর ​​​​​​​ছেলেটা ​​​​​​​আজ ​​​​​​​প্রৌঢ়ত্বে ​​​​​​​পেরিয়েও ​​​​​​​বুঝতে চায় না ​​​​​​​যে পেছনে ​​​​​​​ফেরার ​​​​​​​রাস্তাটা বন্ধ, ​​​​​​​আর ​​​​​​​ফিরে যাওয়া যাবে না !!!
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | 2601:14a:502:e060:98a9:99fd:b437:2b38 | ০৬ জুন ২০২৩ ০৬:৩৬740198
  • সুপাঠ্য লেখা। খুব সুন্দর ডিটেল। কিন্তু দুবার পেস্ট হয়ে গেছে মনে হয়। একটু দেখবেন তো।
    আর 'জুসলা' কী? মশলা দেওয়া জ্যুস জাতীয় কিছু ? এর কথা আমি আগে শুনিনি।
  • Kaataakutu | 2600:1700:77c0:d90:2005:29f2:c1b:1f96 | ০৭ জুন ২০২৩ ০৫:০৯740199
  • আপনার কমেন্ট্স পড়ে জানতে পারলাম লেখা টা দু বার  পোস্টানো হয়েছে। 
    জুসলা ৬০/ ৭০  দশকের একটা ঠান্ডা পানীয় ছিলো। জুসলা হাউস বলে তখন একডালিয়ার কাছাকাছি একটা বাস স্টপ ছিলো। জানিনা এখনো আছে কিনা। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন