এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • এক পেয়ালা চা

    Swapan Chakraborty লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৬ মে ২০২৩ | ২৭৪ বার পঠিত
  • এক দঙ্গল ভারতীয় সেনা,
                       সবাকার মুখ তোমাদের চেনা,
    দেশমাতৃকা ভক্ত-
                          লক্ষ্য তাদের এক অভিন্ন,
    শত্রুব্যুহ করবে ছিন্ন,
                              ঝরুক আপন রক্ত !

    যাচ্ছিল তারা দেশের প্রান্তে,
                        হয়তো কোনোই দূর সীমান্তে,
    এমনটা অহরহ-
                          তুহীন শুভ্র পাহাড়ের খাঁজে,
     শত্রু লুকায়ে শমনের সাজে,
                               জীবন দুর্বিষহ॥

    হিমেল বাতাস ধরায় কাঁপন,
                     কিরণে বুঝি বা কৃপণ তপন,
    সঙ্গী তুষারবারি-
                            সৈন্যের দল হারায় ছন্দ,
    ভাগ্য তাদের নেহাতই মন্দ,
                                পথেই বিকল গাড়ি॥

    পদব্রজে বিনা কি ই বা উপায়,
                         ক্লান্ত সিপাহী ক্ষুধা তৃষ্ণায়,
    কে দেবে চায়ের পেয়ালা !
                     গ্রামে গ্রামে নেই কারো নিঃশ্বাস,
    মানুষের মনে শত্রুর ত্রাস,
                           সবার ঘরেই তালা॥

    অবশেষে নেভে সূর্যের আলো,
                   চারিদিক ঘেরে আঁধারের কালো,
    কোথা পাবে আশ্রয় !
                             অন্তরে বাজে সমর ডঙ্কা,
    তথাপি হৃদয়ে নাহিকো শঙ্কা,
                                  বীর অকুতোভয়॥

    সহসা দূরে গেহ একখানি,
                   মনে হয় কোন পানীয় বিপণী,
    কিন্তু সেটিও বন্ধ-
                        ক্লিষ্ট সেনার কণ্ঠে যাতন,
    ভেঙে ফেল তালা,কর হে মাতন,
                             হোক না কাজটা মন্দ !

    কিন্তু সেনানী বয়োজ্যেষ্ঠ,
                   সৎ, নির্ভীক, নিয়মনিষ্ঠ,
    শৃঙ্খলা অবিচল-
                 বাকী সৈন্যেরা করে বিদ্রোহ,
    দেহের যাতনা যেন দুঃসহ,
                            ভেঙে ফেলো শৃঙ্খল॥

    সবার স্বার্থে তখন সেনানী,
                 দিলেন আদেশ-ভাঙো তালাখানি,
    বুঝি তিনি নিরূপায়-
                       ঘরেতে প্রবেশি’ সৈন্যের দল,
    আনন্দে নামে অশ্রুর ঢল,
                               ভারতমাতার জয় ॥

    যা যা প্রয়োজন চায়ের জন্য
                   সবই মজুত-দোকানী ধন্য,
    বিস্কুটও থরে থরে-
                    চুলাও সেথায় তৈয়ার করা,
    পানীয় জলও বোতলেই ভরা,
                        পান করে প্রাণভরে॥

    চা প্রস্তুত নিজেরাই করে,
                  মেটায় তৃষ্ণা পেয়ালায় ভরে,
    আহা কি মধুর স্বাদ-
                    কেবল সেনানী মনঃক্ষুণ্ণ,
     এমন একটি কাজের জন্য,
                             আদর্শ বরবাদ॥

    অপরের ঘরে চৌর্য্যবৃত্তি,
                সেনাবাহিনীর কি কুকীর্তি !
    রক্ষকই ভক্ষক !
               হয়নি কাজটি যথাযথ মোটে,
    ক্ষতির পূরণ দিতে হবে বটে,
                       ন্যায়নীতি শিক্ষক॥

    পরদিন ভোরে বিদায় বেলায়
                  রাখেন অর্থ যাহা মন চায়,
    সেই দোকানীর ঘরে-
                   এমন ভাবেই কৃষ্টি পালন,
    করেন সেনানী দোষের ক্ষালন,
                           সান্ত্বনা অন্তরে॥

    চলে সেনাদল নব উদ্যমে,
             শ্রান্তি আসেনি আর পথশ্রমে,
    অকুথলে উপনীত-
                     গিরিকন্দরে ভীষণ জঙ্গ,
    শত্রুরা দেয় রণেতে ভঙ্গ,
                          তিনমাসকাল বীত॥

    ঘরে ফেরে সেই সৈন্যের দল
               অক্ষত তারা দৃঢ় মনোবল,
    ফৌজি গাড়ির যাত্রী-
               হঠাৎ নজরে দূর হতে আসে, 
    সবার মনেই স্মৃতিটুকু ভাসে,
                      সেদিনের সেই রাত্রি॥

    খোলা সে পানীয় ক্ষুদ্র বিপণী,
                  সবার কণ্ঠে আনন্দধ্বনি,
    ঊষ্ণ চায়ের পেয়ালা-
                 মিটাবে তৃষ্ণা আরো একবার,
    এবার বৃদ্ধ দোকানদার,
                          দরজায় নেই তালা॥

    সৈন্যের দল হেরি’ সে দোকানী,
                    খুশীতে উজল নয়ন দুখানি,
    আননে অমল হাসি-
                   গল্পে কথনে কেটে যায় পল,
    বৃদ্ধের সাথে সৈন্যের দল,
                        যেন তারা প্রতিবেশী॥

    সংসারে তার আর কে কে আছে,
                   জঙ্গীদস্যু থাকে যবে কাছে,
    কেমনে করে সে ব্যবসা !
                     বৃদ্ধটি কহে ভয় নেই তার, 
    আপনার ব্যথা করে সে উজাড়,
                          নতুন দিনের আশা॥

    কথায় কথায় বৃদ্ধটি বলে,
             ভেসে যায় সে নয়নের জলে,
    ভগবান দয়াময়-
               শুনে সৈন্যরা করে হাসাহাসি,
    ঈশ্বরে বুঝি নয় বিশ্বাসী,
                             “ভগবান কে বা হয় !”

    বৃদ্ধটি বলে করুণ কাহিনী,
                কিভাবে ভীষণ জঙ্গী বাহিনী,
    আসে তার ঘরে রাতে-
                  তারপর সে কি ভীম হুঙ্কার !
    একটি মাত্র তনয়কে তার
                           জর্জর করে আঘাতে॥

    মৃত্যুর সাথে চলে সংগ্রাম,
                  ওষুধ পথ্য রক্তের দাম,
    দরকার বহু অর্থ-
                বৃদ্ধের ঘরে নেই কানাকড়ি,
    জঙ্গীর ত্রাসে গ্রাম থরহরি,
                      সাহায্য লাভে ব্যর্থ॥ 

    চোখের জলেতে গিয়েছিল ভেসে,
                 যখন সে দেখে বাড়ী ফিরে এসে,
    সদরের তালা ভাঙা-
                       চা দুধ কিছু নেই অবশেষ,
    যত দেখে তত বাড়ে তার ক্লেশ,
                           অশ্রুতে আঁখি রাঙা॥

    হায় ঈশ্বর, আর কি কষ্ট 
             বাকী আছে দিতে-বল গো স্পষ্ট,
    শুধায় সে ঈশ্বরে-
                   এমন সময় ঘরে এককোণে,
    প্রচুর অর্থ লুকানো গোপনে,
                        সহসা দৃষ্টিগোচরে॥

    কোথা থেকে এল এতগুলো টাকা !
                            স্বপ্ন নাকি সে বাস্তবে দেখা,
    হতবাক সেই বৃদ্ধ-
                             ভগবান তুমি আছ নিশ্চয়,
    সত্যই প্রভু তুমি দয়াময়,
                               করেছ আমারে ঋদ্ধ॥

    সেই অর্থেই সেবা শুশ্রুষা,
                 নবজীবনের লাভ করে আশা,
    বৃদ্ধ তনয় আজ-
                       কে বলে নেই ধরায় ইষ্ট !
    আল্লা, খ্রীষ্ট কিংবা কৃষ্ট,
                          সততই তাঁরা বিরাজ॥

    সৈন্যেরা বোঝে তাদেরই কাহিনী
                    করলো ব্যক্ত সরল দোকানী,
    দলপতি প্রতি নজর-
                      তবে সেনানীর দ্রুত ইশারায়,
    নীরব শ্রোতার ভূমিকায় রয়,
                          কারো মুখে নেই ওজর॥

    এবার বলেন সেনানীটি ধীরে,
                 বলেছেন বাবা সঠিক বিচারে,
    নেই কোন ভুলভ্রান্তি-
                   ভক্তের ডাকে প্রভু দেন সাড়া,
    আর কে আছেন দীননাথ ছাড়া !
                             তিনিই পরম কান্তি॥

    বিদায়ের ক্ষণে ফৌজির দল,
                      বৃদ্ধের দুই আঁখি ছলছল,
    আমরা পেলেম শিক্ষা-
                 দয়াময় তিনি আমাদেরই মাঝে
    বিরাজ করেন নব নব সাজে,
                           লহ সেবাধর্মের দীক্ষা॥

    অনাথ আতুর দুর্গত প্রাণ
                  সাধ্যমত কর সবে দান,
    হাতখানি রেখো হাতে,
                তাদের আঁখির আনন্দ-বারি,
    জ্বালাবে সুখের দীপ সারি সারি,
                            তোমাদের অসু পথে॥
    ================================

    স্বপন চক্রবর্তী॥
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন