এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • কে কাকে রাখে 

    Swati Chakraborty লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ এপ্রিল ২০২৩ | ২১০ বার পঠিত
  • জীবনের থেকে বড় ক্যানভাস আর তো কিছু নেই। এর মধ্যেই আছে সমস্ত সত্য, তা সুখের হোক, দুঃখের হোক বা নির্মম। সেই পথ পেরোতে হবে। বছর পাঁচেক বয়সে ভাড়া বাড়ি ছেড়ে মা বাবা দিদিদের সাথে চলে এসেছিলাম নিজেদের বাড়িতে। আসার সময় বেশ বুঝেছিলাম নিজেদের বাড়ি বিষয়টা বেশ স্পেশাল। এখন বুঝি সম্ভ্রমের। তবে সেই বয়সে এই স্থানান্তর মনে রাখার আরও কিছু কারণ ছিল। প্রথম কারণ কারেন্ট। নতুন বাড়িতে এসে কারেন্ট ছিল না বেশ কয়েকমাস। নতুন কানেকশন পেতে সেরকমই সময় লাগত তখন। তিনটে বাচ্চা নিয়ে মা বাবার অসহায় অবস্থা। দ্বিতীয় কারন পরিবেশ। আগে ছিলাম টাউনশিপ এর প্ল্যানড জায়গায়। যেখানে প্রতিবেশী সকলেই ডি.এস.পি-র বিভিন্ন মাপের কর্মী। সকলের জীবন চলত মোটামুটি একই ছন্দে। একটা সমধারা ছিল সর্বত্র। কেউ বেশী কেউ কম কিন্তু জীবনের ধারাটা মোটামুটি এক।

    সেটা বুঝতে পেরেছিলাম যখন বিপরীত পরিবেশে এসে পড়লাম। সেখানে সকলের সবকিছু চলত মূলত বাজারকে কেন্দ্র করে। ব্যবসা ছিল অধিকাংশের জীবিকা। সবজি ব্যবসায়ী, কাপড়ের ব্যবসায়ী, খুচরো পয়সার বা রেজগির ব্যবসায়ী। আবার ছিল স্কুল শিক্ষক, অফিসার ইত্যাদি। মোটামুটি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ একসাথে থাকত ঠোকাঠুকি করতে করতে। এহেন পরিবেশে মা বাবা গিয়ে উঠলেন। এবং, নতুন জায়গা কিনতে গিয়েই যা লক্ষ্য করলেন, একান্ত আমাদের জায়গা লাগোয়া বাড়িগুলিতে উপযুক্ত স্যানিটেশন এর কোনো ব্যাবস্হা নেই। কারন পার্সোনাল জায়গা আর ডি.এস.পি-র জায়গায় ঝামেলার কারনে স্যানিটেশনের স্হায়ী ব্যবস্হা করা যাচ্ছে না। বাবা পড়লেন মহা ফাঁপরে। দীর্ঘ দিন লেগেছিল সেই জটিল জট কাটতে। কিন্তু বহু দৌড় ঝাঁপ করে সমস্যার স্হায়ী সমাধান করেছিলেন। নতুন পাড়ার লোক খুশিই হয়েছিল।এরপর আমরা এলাম সেই নতুন বাড়িতে। ভাড়ার পাকা কোয়ার্টার ছেড়ে আ্যসবেসটস এর নিজেদের বাড়িতে। টাইমকলের জল ত্যাগ করে মা-কে কুয়ো থেকে জল তোলা শিখতে হল।

    আমরাও লন্ঠনের আলোয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম। কিন্তু মুশকিলটা  বাঁধল আমাদের বাড়িতে কারেন্ট আনতে গিয়ে। যে প্রতিবেশীরা এতদিন খুশি ছিল তাদের সমস্যা সমাধান নিয়ে তারা বেঁকে বসল কারেন্ট আনার সময় সাহায্য করতে গিয়ে। সকলের একত্রিত অসহযোগিতার ফলে মাসের পর মাস কারেন্ট এল না। একে একে আমাদের তিন বোনের চোখে চশমা উঠল। শেষে সাহায্যার্থে এগিয়ে এলেন একজন। তিনি একক ভাবে বাকি সকলের বিপরীতে গিয়ে তার সাহায্যের হাতখানি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সেদিন। জীবন কত বিচিত্র! অথচ এই শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষই একদিন আমাদের জায়গার মাপ নিয়ে অহেতুক অন্যায় সন্দেহের বশে পাড়ার লোক একত্রিত করে সীমানা বরাবর লাগানো বিশাল বিশাল নিমগাছগুলো কোপের বাড়িতে রাস্তায় ফেলেছিলেন।আমরা কিছু আটকাতে পারি নি। যেদিন তিনি একা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ছিলেন সেদিন‌ও তার ক্ষমতা বুঝেছিলাম আর মা যেদিন শীতল ছায়া প্রদায়িনী রাস্তায় পড়ে থাকা গাছগুলো দেখে কেঁদেছিল সেদিন‌ও তাদের ক্ষমতা বুঝেছিলাম। তার কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিবেশীদের গাছের গুঁড়িগুলি নির্দ্বিধায় টানতে টানতে নিয়ে যেতে দেখলাম।

    এসব দেখেই বড় হচ্ছিলাম। তবু সারা বছর এদের সাথেই মজা আনন্দ, সুখ দুঃখের ভাগ করতে করতে বড় হয়েছি। কি বিচিত্র। মানুষ যে সামাজিক জীব। আমাদের বাড়ি ছিল পাড়ার বিয়ে বাড়ির জায়গা। বিশাল উঠোনে প্যান্ডেল বাঁধা চলত বিয়ের মাসে। গরম কালে কুয়োটা ছিল অফুরন্ত জলের উৎস। তবু চাঁদার নামে হুজ্জুতি করতে আসা ছেলেদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে কেউ মুখ খোলে নি। শান্ত নদী থেকে জল নিতে আসে সবাই। কিন্তু নদীর অস্তিত্ব যখন সংকটে থাকে জীব অন্য নদী খুঁজে নেয়। সব‌ই তো নিয়তি বলে ছেড়ে দেয়। তবু সুখ দুঃখের কথা বলার তো দুটো মানুষ চাই। কে কাকে রাখে। কে কার হাত ধরে। সেই নিজেদের বাড়ির ও পাট উঠে গেল। কুড়ি বছর পর। যদিও সাহায্যকারী আর প্রতিবেশীর এই পরিবর্তন চলতেই আছে।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন