এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বুধনী (ছোটগল্প)

    Sushmita Datta লেখকের গ্রাহক হোন
    ৩১ মার্চ ২০২৩ | ২৫১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • বুধনী

    হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো চিঠি পেলাম হেডকোয়ার্টার থেকে, যে বেশ কয়েকদিন আনাড়া তে ডিউটি করতে হবে। সেখানকার সিষ্টার-ইনচার্জ বিনা নোটিশে আমেরিকা পাড়ি দেওয়ায় তার শূন‍্যস্থান পূর্ণ করতে হবে, যতদিন না অন্য কাউকে স্থায়ী ভাবে সেখানে নিয়োগ করা হচ্ছে।

    ঘুরেফিরে প্রায় সকলকেই ডিভিশনাল হাসপাতাল থেকে যেতে হবে। এবার পালা আমার।কি আর করা যায়। উপরওয়ালার নির্দেশ মেনে বাক্সপ‍্যাঁটরা গুছিয়ে যাওয়া হলো।

    পুরুলিয়ার অন্তর্গত আনাড়াকে কি বলব, না শহর না গ্রাম। বিস্তীর্ণ প্রকৃতির মাঝে মানুষ তার থাকার ঠিকানা খুঁজে নিয়েছে। রেল কোয়ার্টার বাদ দিলে ফাঁকা আর গাছপালায় ভরা শান্ত, নিস্তরঙ্গ জীবন।

    মনে হয় সময় যেন থেমে আছে। শহুরে লোকের দুতিন দিন ভালো লাগার পর নিঃসঙ্গতা আর নিস্তব্ধতা বুকে চেপে বসবে। আমার তেমন মন্দ লাগে নি। কারণ প্রকৃতির মাঝে চুপচাপ বেখেয়ালে, নির্বিরোধে থাকা আমার ভালোই লাগে।

    সকাল সকাল এই প্রাইমারি হেলথ কেয়ারে গর্ভবতী মায়েদের হেলথ চেকআপ, হিষ্ট্রী নেওয়া, ওষুধ দেওয়া আর টিকাকরনের দিন বাচ্চাদের ভিড়ে সময় কেটে যাচ্ছিল। হাসপাতলের ডাক্তার মহাশয় ও বেশ সদাশয়, গান পাগল মানুষ। কাজ, আলোচনা, গানগল্প কাজে অক্সিজেন যুগিয়ে চলছিল। সন্ধ্যা ছটা নাগাদ ঝাঁপ বন্ধ করে কোয়ার্টার এ ফিরে কাজকর্ম আর বইপড়া নিয়ে সময় কাটছিল ভালোই।

    প্রথম প্রথম খাওয়াদাওয়া নিয়ে একটু অসুবিধা হলেও স্থানীয় বাজার আর, সাপ্তাহিক হাটের টাটকা সবজি পুষ্টির অভাব ঘটতে দেয়নি। মুশকিল হলো দুধ পাওয়া নিয়ে। হাসপাতালের ছোকরা পিয়ন সেইকথা শুনে এক বুড়িকে একদিন আমার কাছে নিয়ে এলো। বুড়ির দুটো গরু আছে। ঘরে ঘরে সে দুধ পৌঁছে দেয়। রোজ বিকেলে আমাকেও পৌঁছে দেবে বলে গেল। এরপর হাসপাতাল থেকে ফেরার পরই বুড়ি দুধ নিয়ে হাজির। কথা বলে জানলাম নাম তার বুধনী। হিন্দিভাষী। একা কেউ নেই।

    বহু আগে বুধনীর বাবা আনাড়া তে রেলের অস্থায়ী কর্মী হয়ে এসেছিল। এসে এখানেই থেকে গেছিল। বুধনীর ভাইরা সব বড় হয়ে কাজ নিয়ে একজন গুজরাট আর অন‍্যজন দেশের বাড়ি ভাগলপুর চলে গেছে। আনাড়াতেই বুধনী প্রেম করে যাকে বিয়ে করেছিল সেও বেশ কিছুদিন পর অন্য বিয়ে করে অনত্র চলে গেছে। একা বুধনী নিজের গয়না বেচে গরু কিনেছিল। এখন তার দুধ বিক্রির টাকাতেই দিন গুজরান হয়।

    বুধনী এলেই টুকটাক কথা হয়। মাঝে মাঝে দুধে জল মেশানো নিয়ে অভিযোগ করি। বরাবরই বুধনী বলে নেহি দিদিমণি পানি না দিয়া, মেরাওয়ালা সবসে ভালা।

    একদিন দেখি খুঁড়িয়ে হাঁটছে। জিঞ্জেস করায় বলে লগ গয়া জী, দরদ কা দাবা দিজিয়ে না দিদিমণি। ব‍্যথার ওষুধ দিতে কি খুশি। পরদিন এসে বলে আপকি দাওয়াই বহুত বড়িয়া, মেরি দরদ চল গ‍্যয়ি।

    এইভাবে স্থানীয় লোকজন, কাজকর্ম আর বুধনীর সাথে গল্পগাছায় নিস্তরঙ্গ দিন কাটছিল বেশ।

    হঠাৎ একদিন সকালে হাসপাতালে কাজে ব‍্যস্ত, এইসময় ছোকরা পিয়ন সুবোধ কোথাথেকে দৌড়ে দৌড়ে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল ম‍্যাডাম বুধনীকে পুলিশে ধরেছে।

    আমি তো হতবাক। এক নির্বিরোধী বয়স্ক মহিলা কে হঠাৎ পুলিশ ধরতে গেল কেন।

    আমি হাতের কাজ রেখে জিঞ্জেস করি কি হয়েছে সুবোধ, হঠাৎ বুধনীকে পুলিশ ধরতে গেল কেন?

    জানা গেল সাতসকালে বুধনী রেললাইনের দিকে কারোর থেকে ঘুটের পয়সা আনতে গেছিল। রেললাইন পেরোতেই ছোট্ট শিশুর কান্না শুনে দেখে, একটা সদ‍্যজাত কন্যা শিশু প্লাসেন্টা সহ রেললাইনের ধারে ঘাসজমিতে পড়ে আছে।বুধনী পাশের বস্তির মেয়েদের কাছ থেকে ব্লেড চেয়ে তা দিয়ে নাড়ী কেটে বাঁধছিল, এইসময় পুলিশ তাকে এসে ধরেছে। কারোর থেকে খবর পেয়ে।

    তারপর বুধনী আর শিশুটিকে পুরুলিয়া নিয়ে গেছে। বাচ্চাকে ওখানে সদর হাসপাতালে শিশু বিভাগে রেখেছে, পরবর্তী কালে হোমে দেবে। আর বুধনীকে পুরুলিয়া জেলে। বুধনীর কেউ থেকেও নেই যে ওর জামিনের ব‍্যবস্থা করবে।

    শুনেই মনখারাপ হয়ে গেল। পুরুলিয়াতে আমার এক পরিচিত আইনজীবী ছিলেন। তাকে ফোনে সবিস্তারে জানালাম। বুধনীর জামিনের ব‍্যবস্থা করা যায় কিনা জানতে চাইলে, তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন যে জামিন হয়ে যাবে।

    আইনি মারপ‍্যাচ বুঝি না। পরদিন সকালে উনি জানালেন বুধনীকে ছেড়ে দিয়েছে। বেশ কিছু খরচা হয়েছে। বুধনীর অবস্থা দেখে আর প্রকৃত সত্য জেনে পুলিশ নাকি কোন কেস ওর নামে দেয় নি।

    এরপর দিন দুই পরে সন্ধ্যায় দরজায় আওয়াজ শুনে দেখি বুধনী হাজির দুধ নিয়ে। সঙ্গে একশিশি ঘরে বানানো ঘি। বুধনীর কাছ থেকে বাকি যা জানা গেল যে পুলিশ ওকেই নাড়ী বাঁধতে দেখে ভেবেছিল ও এই কাজের সঙ্গে জড়িত। কোনও কুমারী মায়ের লজ্জা না অধিক কন্যা সন্তানের জন্মের জন্য ঐ শিশু পরিত্যক্ত জানা যায় নি।

    আমি বুধনীকে বললাম তুমি কেন আগে হাসপাতালে নিয়ে এলেনা। বা পুলিশে গেলে না। তবে তো তোমাকে জেলে যেতে হতো না।

    বুধনী বলল ওই অতটুকু প্রান দেখে ওর বুকের মধ্যে এত কষ্ট হয়েছিল যে ওর মনে হয়েছিল রামজী নিঃসঙ্গ বুধনীকেই ওই শিশুটি পাঠিয়ে দিয়েছেন।

    কই তো ফেক দিয়া, ম‍্যায়তো বাচ্চিকো গোদ লেনা চাহতি থি। লেকিন হারামখোরোনে নেহি শুনা।

    পাতা নেহি ও বাচ্চি ক‍্যায়সি হ‍্যায়। বুধনী কাঁদতে থাকল। আমি বললাম বুধনী এইভাবে তো কিছু হয় না। দেশে নিয়ম আছে, আইন আছে। বুধনী বললো ওহ নিয়ম ক‍্যায়সি যো কিসিকো প‍্যায়ার দেনে সে রোকে। আমি তো বোবা হয়ে গেলাম। এই নিরক্ষর আর্থিক ভাবে গরিব মহিলার মনের বড়লোকিতে স্তব্ধ।

    হঠাৎ বুধনী চোখের জল মুছে বলল ইয়ে ঘি আপকে লিয়ে। আপ না হোতে তো উ লোগ মেরে বাত নেহি শুনতা। মুঝে নেহি ছোড়তা। আউর কভি আপকি দুধ মে পানি নেহি দুঙ্গি।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন