এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • উভচর মানব

    Pradhanna Mitra লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ মার্চ ২০২৩ | ৫৮৬ বার পঠিত
  •  
    কিছু কিছু বই প্রশ্ন রাখে। এক-এক বইয়ের প্রশ্ন এক-এক রকম। কোন কোন প্রশ্নের উত্তর হয়, কোন কোন প্রশ্নের উত্তর হয় না, সে উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে উত্তর অমিমাংসীত, অনেক ক্ষেত্রে উত্তর অনন্তকালের অপেক্ষার। এতএব, প্রশ্ন করার ক্ষমতা রাখে যে বই, সেই বই আমার চোখে মারাত্মক শক্তিশালী বই। চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন রাখার সাহস দরকার, ক্ষমতা দরকার।
     
    আলেক্সান্দর বেলায়েভ প্রশ্ন করেছেন। প্রশ্ন একটা না, বেশ কয়েকটা। চিরন্তনী সেই সব প্রশ্ন---
     
    ১। বিজ্ঞান সত্যিই আশীর্বাদ, না অভিশাপ?
     
    ২। মানুষের প্রয়োজনে প্রকৃতি, না কি প্রকৃতির প্রয়োজনে মানুষ?
     
    ৩। প্রকৃতির স্বাভাবিকী ক্ষমতাকে প্রয়োজন এবং ইচ্ছামতো পরিবর্তন করার ক্ষমতা এবং ঔচিত্য কি আমাদের আছে?
     
    ৪। ধর্ম বিজ্ঞানের হাত না ধরে আর কতদিন বিরোধিতা করবে?
     
    ৫। মানুষ মানুষকে মানুষের প্রয়োজনে কতখানি পর্যন্ত কাজে লাগাতে পারে?
     
    ৬। মানুষের নিজস্ব স্বাধীনতা এবং সেই সাথে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা --- কতটা কি হবে তা কে ঠিক করবে?
     
    এ প্রশ্নের অবশেষ উত্তর কি? সব প্রশ্নের উত্তর হয় না। কালের গর্ভে থাকে। কালই তার উত্তর দেয়। হতে পারে, মানুষে মানুষে সেই উত্তরের বিভেদ হতে পারে। পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন, কিম্বা পরিমার্জন সাধিত হতে পারে। কিন্ত তা যদি মানূষের মঙ্গলের জন্য না হয়, তাহলে, সেক্ষেত্রে কি হবে? কে বলবে?
     
    “রাত কত হল? উত্তর মেলে না।”
     
    যেমন প্রথম প্রশ্নটার কথাই ধরুন না কেন। এই প্রশ্ন ক্লাস নাইনের ছাত্র-ছাত্রীরাও পরীক্ষায় রচনা আসলে লেখে। কিন্তু, আজও, প্রশ্নটা মলিন হয় নি। বরং যত দিন যাচ্ছে, প্রশ্নটা জোরালো হচ্ছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর কচি খোকাটিও জানে, কিন্তু যারা ইউভাল নোয়া হারারির ‘সেপিয়েন্স’ পড়েছেন, আমি নিশ্চিত, তারা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবেন, কারণ একটা পর্যায়ের পর ‘চাকা উল্টোদিকে ঘুরছে না তো!’ এই আশঙ্কায় অনেকের মত প্রকৃতির হাতে ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়া আর কিছুই করার নেই। আর কে না জানে, ধ্বংস অর্থেই প্রকৃতির হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া সিস্টেমকে ‘রিবুট’ করার চেষ্টা। এটা একরকমের প্রকৃতির পরাজয়ও বটে।
     
    আবার, চতুর্থ প্রশ্নের রেলিভেন্সী আস্তে আস্তে হারাচ্ছে। ধর্ম বুঝে গেছে, বিজ্ঞানের হাত না ধরলে অস্তিত্ব টিকবে না। কটা ফ্ল্যাটে এখন আর সন্ধ্যেবেলা শঙ্খে ফুঁ দেওয়া হয়? আর তাই, ধর্মের মধ্যেও বিজ্ঞান খোঁজার মরিয়া চেষ্টা চলছে। আমরা আতঙ্কিত, আশঙ্কিত, পুলকিত এবং শিহরিত হচ্ছি। পঞ্চম প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। দেশভেদে, কালভেদে কত আন্দোলন হয়েছে, ইতিহাস সাক্ষী। কিন্তু এখনও কি তার সম্পূর্ণ উত্তর মিলেছে? না। একজন আইটি ইন্ডাস্ট্রীর দশ ঘন্টা কঠোর পরিশ্রম করা শ্রমিকের কাছে এর উত্তর নেই। শেষ রাত্রে মদের বোতলের গড়াগড়ির প্রত্যুত্তর আছে। কিম্বা উইক এন্ডে আউটিং-এর নামে প্রকৃতিকে দুষিত করার নিষ্ঠুর আনন্দ আছে।
     
          আর শেষেরটা? কেউ ঠিক করবে না। ঠিক করবে মানুষ নিজে। কিন্তু মানুষ যতদিন অন্যের অধীনে থাকে, দেখা যায়, তার স্বাধীনতার একটা সীমানার মধ্যে সে নিজেকে স্বাধীন মনে করে আনন্দ পায়। কিন্তু অবশেষে, সে-ও কোথাও না কোথাও পরাধীন। অতএব এর উত্তরও ধর্মে কিম্বা বিজ্ঞানে নিহিত থাকলেও, শেষ উত্তর নেই।
    আর এই সমস্ত উত্তরই বেলায়েভ নিজের মতো করে খুঁজতে চেয়েছেন। আর অবশেষে নিজের চরিত্রকে দেখেছেন জনবিবর্জিত দ্বীপে, প্রকৃতির কাছাকাছি, প্রকৃতির সাথে মিশে।

    ‘উভচর মানুষ’ উপন্যাসটা বহুল আলোচিত এবং সাই-ফাই জগতের এক ক্লাসিক উপন্যাস। ফলে গল্পের প্লট নিয়ে আলোচনা করার কোন মানেই হয় না। উপন্যাসের নামকরণই বলে দিচ্ছে, একজন মানুষকে নিয়ে লেখা, যে কি না জলে এবং স্থলে বিচরণ করতে পারে। সালভাতর নামক এক বিজ্ঞানীর হাতে তৈরী সে মানবকে সমুদ্রোপকূলবর্তী মানুষেরা চেনে, ‘দরিয়ার দানো’ নামে।
     
    এখানে প্রেম আছে, সমাজ আছে, লোভ আছে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, কুসংস্কার আছে --- এবং সবই এই উভচর মানব ‘ইকথিয়ান্ডর’কে কেন্দ্র করে ঘটে চলে।
     
    তবে বিজ্ঞান কোথায় আছে? বৈজ্ঞানিক বাদ-বিবাদ কোথায় আছে? যেখান থেকে চেনা যায় আসল বেলায়েভকে? আছে তৃতীয়াংশে ‘আসামীর জবানবন্দী’ শীর্ষক পর্বে। জলকে কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে, অন্তত মানব সমাজের জন্য তার এক বিশাল বয়ান তিনি দাড় করিয়েছেন। যদিও, এই তত্ত্ব খাড়া করতে গিয়ে কোথাও ডারউইনের বিবর্তনবাদকে অত্যন্ত স্বপ্নিল চোখে দেখতে চেয়েছেন লেখক। সার্জারি কখনই বিবর্তনের বিকল্প হতে পারে না। কৃত্রিমতার প্রয়োগ যে কোন জীবনের পক্ষেই সাময়িক স্বস্তি, কিন্তু তা যদি অন্যান্য দেহগঠনের ক্ষেত্রে অনুকূল না হয়, তাহলে সেটাই হয়ে ওঠে বিষবৎ। যে কোন জীবের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই একে অপরের পরিপূরক, না হলে জীবনকে রক্ষা করার ক্ষমতা প্রাণীটির থাকে না। যে সাপের বিষ মানুষের পক্ষে বিষ সেই বিষই সাপের কাছে জীবনকবচ। আবার সেই বিষ যদি মানব অঙ্গের কোন কাটা অংশকে বা খোলা অংশে না ছোঁয়, তাহলে সেই বিষ মানুষের হাতে দিনের পর দিন থাকলেও ক্ষতির আশঙ্কার কারণ হয় না।
     
    সব মিলিয়ে এ উপন্যাস বড়োই সুখপাঠ্য। এমন উপন্যাস হাতে নিয়ে বসলে কখন যে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়, টেরই পাওয়া যায় না।
     
    =====================
     
    উভচর মানব
    আলেক্সান্দর বেলায়েভ
    অনুবাদঃ ননী ভৌমিক
    কল্পবিশ্ব পাবলিকেশান
    মুদ্রিত মূল্যঃ ৩৫০ টাকা
    [ছবি কৃতজ্ঞতাঃ সমর্পিতা]

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন