এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বিকশিত হউক শৈশবের কুঁড়ি   

    Supriya Debroy লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ ডিসেম্বর ২০২২ | ২৭২ বার পঠিত
  • পথের পাঁচালীর অপু ও দুর্গার মতো বুনো গাছপালার ঝোপঝাড়ে, কাশফুলের অলিগলিতে কিম্বা কালবোশেখি ঝড়ে আমের গুঁটি কুড়িয়ে শিশুকাল হয়তো আমাদের অর্থাৎ পঞ্চাশ-ষাট ঊর্ধ্বের  বয়সী অনেকেরই কেটেছে। চড়েছি আমরা জামরুল অথবা পেয়ারা গাছে কাঠপিঁপড়ের কামড় সহ্য করে, মাছ ধরেছি কাকা-জেঠুর সাথে পুকুরে ছিপ ফেলে। বাতাবি লেবু অথবা কাপড়ের বল বানিয়ে খেলেছি ফুটবল। খেলেছি কানামাছি, গোল্লাছুট, ডাংগুলি। করেছি দাপাদাপি কর্দমাক্ত বৃষ্টির জলে ভরা মাঠে, সাঁতারে পুকুর এপার-ওপার করে। আমাদের অনেকেরই হয়তো শৈশব কেটেছে মফস্বল শহরে। অক্ষর পরিচয়, নামতা, সহজ পাঠ শিখেছি পাঁচ-ছয় ভাইবোন মিলে বাবা-কাকা-জেঠার কাছে একসাথে গোল করে বসে গল্পের মাধ্যমে – খেলার মাধ্যমে – ছবির মাধ্যমে – আঁকিবুঁকির মাধ্যমে আর অফুরান আদর-স্নেহ-ভালোবাসার মধ্যে। জোরাজুরি করে নয়, খেলাধুলার ফাঁকে ফাঁকে শেখা চলত। প্রয়োজনে বকা-ঝকা , শাসনও ছিল। মনে আছে বেশ বড় তখন আমি, মশারির ভিতর শুয়ে বাবা বুঝিয়েছিলেন আয়তক্ষেত্র, বর্গক্ষেত্র, ত্রিভুজ। বয়স যখন ৬+ স্কুলে পৌঁছে জাতীয় সঙ্গীত, দেশাত্মবোধক গান গাইতে শিখেছি। প্রাথমিকে ইশপের গল্প পড়েছি। সেগুলোর মোরাল বুঝেছি শিক্ষকদের থেকে। ক্লাশ শেষে চেয়ার-বেঞ্চ সোজা করে রাখতে শিখেছি। স্কুলের মাঠে ব্যয়াম করে, ফুটবল খেলে কিম্বা নিদেনপক্ষে লুকোচুরি খেলে বাড়ি ফিরেছি। ঘরে এসে পড়েছি ঠাকুরমার ঝুলি,  আর একটু বড় হয়ে আবোল তাবোল, পাগলা দাশু।
    এখনকার ৩/৪+ বয়সের বাচ্চারা কিন্ডারগার্টেন কিম্বা শিশুকাননে আসে টলতে টলতে, কেউ  ঘুমচোখে, কেউ বা কাঁদতে কাঁদতে। নার্সারি ক্লাসের বাচ্চাদের রীতিমতো টেবিলে বসিয়ে মুখে মুখে শেখানো হয় ‘এ বি সি ডি’। তারপর শুরু হয় অক্ষরের সঙ্গে ফল, পশুপ্রাণীর নাম শেখানো। কচি কচি হাতে পেন্সিল ধরিয়ে লেখা শেখানো। সেই যে বাড়ি থেকে আসে, তারপর আঠার মতো লাগিয়ে রাখা হয় স্কুল বেঞ্চের সঙ্গে। এত বাচ্চার মধ্যে মিসের খেয়াল থাকে না, কোন বাচ্চা শিখল কিম্বা লিখল অথবা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ল। এটাও খেয়াল করা হয় না, কোন্‌ বাচ্চা টিফিন খেলো, কে খেলো না। শিশুর যে আরেকটু বোঝাপড়ার দরকার ছিল পরিস্থিতির সাথে, সেটা খেয়াল না করেই দিয়ে দেওয়া হয় বাচ্চাকে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা শিশুকাননে। তবে সব শিশুকাননের অবস্থা এক তা নয়। চাকরি করা মায়েদের কয়েক ঘণ্টার জন্য রেহাই দিতে, ভালো ব্যবস্থাও আছে – তবে সেটা হাতে গোনা এবং সবার সামর্থ্যে নাও পোষাতে পারে। সব মা-ই যে চাকরি করেন তা নয়। ৩/৪+ বয়সী বাচ্চাদের কিন্ডারগার্টেনে পাঠানো কিছুটা যেন ফ্যাশনের মতো। কিন্তু ভুলে যাই, এই শিশুদের আগে শৈশবটা দিতে হবে – যেমন আমরা পেয়েছি। শিশুকাননে তারা যাক, কিন্তু শিশুদের  বুদ্ধি,  উদ্ভাবনী ও সৃজনী ক্ষমতা কিম্বা সৃষ্টিশীল বিকাশের প্রতি মা-বাবাকেই খেয়াল রাখতে হবে। সেটা বাইরের কেউ পারবে না।
    কিছুদিন পূর্বে একটি সংবাদপত্রে পড়েছিলাম, একটি স্কুলে ৫/৬ বয়সের বাচ্চাদের অঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে বিষয় ছিল ‘নদী’। বাচ্চাদের অভিবাবকরা’ও উপস্থিত ছিলেন। বাচ্চারা এতদিন যা শিখেছে, সেই অনুযায়ী কেউ এঁকেছে নদীর পাশে তালগাছ, নারকেল গাছ কিম্বা কয়েকটি মানুষ অথবা কয়েকটি গরু ঘাস খাওয়া অবস্থায়। একটি মেয়েশিশু এঁকেছিল একটি বিড়াল। প্রত্যাখিত বলে ঐ শিশুটির মাকে আঁকা পাতাটি ফেরত দিয়ে দেন মিস। শিশুটি কেন এঁকেছে বিড়ালটি সেটা না জেনেই, একদম প্রত্যাখাত করে আঁকা পাতাটি ফেরত দিয়ে দেওয়া হয়। মা যখন জিঞ্জেস করেন শিশুটিকে, বিড়াল কেন এঁকেছিস – শিশুটির উত্তর, ‘কী করবো মা, বিড়ালটার যে খুব জল তেষ্টা পেয়ে গিয়েছিল।‘ এখানে শিশুটির সৃষ্টিশীল ক্ষমতা’কে বাহবা দেওয়া দূরের কথা, তার এরকম অভাবনীয় সৃষ্টিশীল ক্ষমতার বিকাশের যে প্রয়োজন আছে সেটাই শিশুটির মিস বুঝতে পারলেন না। অর্থাৎ যা করার করতে হবে তার মাকেই, অভিভাবকদেরই। কাহিনিটি এখানে শেষ করলেই ভালো লাগত। এবার শোনাই আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথা। কয়েকদিন আগে আমাদের বাড়িতে বন্ধুবান্ধব্দের নিয়ে একটি জমায়েত হয়। এই ঘটনাটি, অর্থাৎ শিশুটির মায়ের প্রশ্ন তার মেয়েকে কেন সে বিড়াল এঁকেছে এবং শিশুটির জবাব পর্যন্ত – শোনাই তাদের। সবাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি সবাই চুপচাপ, হয়ত কাহিনিটির গভীরতা উপলব্ধি করার চেষ্টা করছে। ওই জমায়েতে একজন শিক্ষিকা ছিলেন। কুড়ি বছরের ওপর স্কুলে পড়াচ্ছেন। তিনি অবাক হয়ে আমাকে বললেন, ‘আমি কিছু বুঝলাম না। তুমি কী বোঝাতে চাইলে এই গল্পের মাধ্যমে আমাদেরকে ?’ আমি হতবাক হয়ে ওনার মুখের দিকে চেয়ে থাকলাম। এবং বুঝতে পারলাম, লেখিকা যে কাহিনিটির মাধ্যমে ওনার প্রতিবেদনটি পত্রিকাটিতে উপস্থাপিত করেছিলেন, হয়ত কল্পিত ছিল না – সত্যি ছিল।  
    অনুরূপ আর একটি গল্প, এটিও পড়েছিলাম কিছুদিন পূর্বে একটি পত্রিকাতে। লেখকের বছর পঞ্চাশেক পূর্বের স্কুলের একটি ঘটনা। লেখকের ভাষায় সংক্ষিপ্ত আকারে, ‘বয়েস ছিল নয় কি দশ। ক্লাসের শেষ পিরিয়ডে রাশভারী বাংলা শিক্ষক এসে বললেন – রবীন্দ্রজয়ন্তী রচনা লেখ। বিষয়বস্তু শুনে কষে কলমধরা আঙুলের নার্ভগুলো ঢিলে হয়ে এল। রবীন্দ্রনাথ যে বড় খটমট বিষয়। তাঁর সম্পর্কে জানার দৌড় সহজপাঠ, জোড়াসাঁকো, নোবেল পুরস্কার, ঢিলেঢালা আলখাল্লা পরিহিত দীর্ঘ দাড়ি সহিত এক গুরুগম্ভীর ব্যক্তি। অবশ্য গল্পগুচ্ছের দু’একটি গল্প, কয়েকটি কবিতা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে ইতিমধ্যে। এই নিয়েই এক পাতা যেমন করেই হোক নামাতে হবে। আমার পাশে বসত ভোলু। ডানপিটে, দুষ্টু। অন্যের বাগানে আম চুরি করা, পুকুর সাঁতরে এপার-ওপার করা, গর্তে হাত ঢুকিয়ে ইঁদুরের বাচ্চা বের করে আনা, গাছ থেকে পাখির বাসা থেকে বাচ্চা পেড়ে আনা, ইত্যাদি ছিল ওর নিত্যদিনের কর্ম। কলম চালাচ্ছি পুরোদমে। স্যার যখন চেয়ারে বসে একটু ধ্যানমগ্ন, ফিসফিস করে ভোলু জিঞ্জেস করে – রবীন্দ্র তো ঠিক আছে, কয়েক লাইন লিখে দেব। কিন্তু জয়ন্তী’টা কে রে ? রবীন্দ্রনাথের বোন ? উত্তরে আমি জানাই –  বিরক্ত করিস না। যা জানিস তাই লেখ। আমি নিজেই  নাজেহাল হয়ে যাচ্ছি ! খাতা জমা দেওয়ার সময় দেখি ভোলু আড়াই পাতা লিখে খাতা জমা দিচ্ছে, আর আমি এক পাতাও পুরোপুরি লিখতে পারিনি। স্কুলশেষে – কী লিখেছিস আড়াই পাতা ভরে – জিঞ্জেস করাতে, উত্তর – ভুলে গেছি কী লিখেছি। এখন ওসব ছাড়। বই-খাতা রেখে দৌড়তে হবে সুভাষ ময়দানে। আজ বিশ্বাস পাড়ার সাথে ফুটবল ম্যাচ আছে। হারাতেই হবে ওদের। পরেরদিন বাংলার শিক্ষক পড়ানোর শেষে সবাইকে ডেকে ডেকে রচনার খাতা ফেরত দেন। ক্লাসের ফার্স্ট বয় দশে আট। পিঠ চাপড়ে খাতা ফেরত দেন। বাকিরা কেউ  পাঁচ, কেউ চার। মুখ নিচু করে খাতা নিয়ে দেখি, তিন। কোনোরকমে পাশ। শিক্ষক বললেন, এবার পাশ মার্কস দিয়ে দিলাম। পরেরবারও যদি এই হাল দেখি, তাহলে – বলেই কটমট করে তাকালেন। স্যার বেরিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ভোলুর খাতা কই ? পাশেই বসা ভোলু নির্বিকার মুখে, আটার ছোট ছোট গোলা তৈরি করছিল। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে, স্যার আবার ফিরে এসে ভোলু’র দিকে তাকিয়ে হুঙ্কার – এই মর্কট উঠে দাঁড়া। এতদিন জানতাম গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করা যায়, মানুষ করা যায়। কিন্তু তুই একটা গাধা আর মর্কটের বিরল সংমিশ্রণ। তোকে আমি হয়ত ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তোকে আজীবন অভিসম্পাত করবেন। ক্লাস হেসে গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু ভোলুকে একটুও বিচলিত হতে দেখলাম না। সবার বিদ্রুপ আর উপহাসকে একটুও পাত্তা না দিয়ে, আমাকে বলল – ঘোষজেঠুর পুকুরে আজ মাছ ধরতে দেবে। মাছ ধরার সমস্ত সরঞ্জাম দারোয়ানের কাছে লুকিয়ে রেখেছি। চল, স্কুল ছুটির পর যাব। আমি সেইদিন প্রথম ভোলুর মুখে চার দেওয়ালের শিকল ছেঁড়া রবীন্দ্রনাথের ছবির ঝলক দেখলাম। যে ছেলে জয়ন্তীকে রবীন্দ্রনাথের বোন কল্পিত করে আড়াই পাতা কাহিনি লিখতে পারে, সে তো একদিন দুনিয়া জয় করবে। ওই বয়সে আমরা এটাই জানতাম না রবি ঠাকুরের কয়জন ভাইবোন, তাদের নাম জানাটা ছিল আমাদের কাছে কল্পনার অতীত। আজ ভোলু ওয়াশিংটনে নাসা’র হেড কোয়ার্টারের এক ব্যস্ত বিজ্ঞানী। ওর নামের পিছনে ডিগ্রির যে লম্বা লেজুড় আছে, সেটা দিয়েই বোধহয় কয়েক পাতার রচনা লেখা যায়।‘
    বক্তব্য একটাই, শিশুদের আগে শৈশবটা ফেরত দিতে হবে। শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের প্রকৃত সৃষ্টিশীল বিকাশ চার দেওয়ালের মধ্যে নয়, হয় খোলা মুক্ত আকাশের নিচে। কিন্টারগার্ডেন অথবা শিশুকাননে ৩/৪ + বয়সী বাচ্চাদের কী শেখানো উচিত ? কেমন করে শেখানো উচিত ? পুঁথি-পুস্তকের মাধ্যমে, না খেলাধুলার মাধ্যমে, নাকি আঁকিবুঁকির মাধ্যমে ? নাকি অর্থবহ, আকর্ষণীয় গল্প বলার মাধ্যমে ? আমরা অনেকেই সেটা হয়ত জানি না। ওদের ঘাড়ে একগাদা বিচিত্র বই চাপিয়ে প্রতিদিনের বিকাশমান পৃথিবীকে, ওদের নিজস্ব কল্পিত জগৎকে বিস্বাদ করে তুলি। যখন তারা কাপড়ের সাদামাটা পুতুল নিয়ে খেলে কিম্বা মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে অথবা ফুলের পাপড়িতে বসা প্রজাপতির পিছনে দৌড়ে তাদের কল্পনার জগৎকে বিকশিত করতে চায়, তখন তাদের শুরু হয় চার দেওয়ালের মধ্যে এক বন্দিজীবন। তার ভালো লাগা, না ভালো লাগা নিয়ে কারুর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তরে যে শিশুটি চিরকাল আপন মহিমায় বিরাজিত ছিল, তার সাবলীল প্রকাশ ঘটেছে ওনার শৈশবের স্মৃতিচারণ বিষয়ক লেখার মাধ্যমে। ‘কলকাতা শহরের বক্ষে তখনও পাথরে বাঁধানো হয়নি, অনেকখানি কাঁচা ছিল। তেল-কলের ধোঁয়ায় আকাশের মুখে তখনও কালি পড়েনি। ইমারত-অরণ্যের ফাঁকায় ফাঁকায় পুকুরের জলের ওপর সূর্যের আলো ঝিকিয়ে যেত, বিকেলবেলায় অশ্বথের ছায়া দীর্ঘতর হয়ে পড়ত, হাওয়ায় দুলত নারকেল গাছে পত্র-ঝালর, বাঁধা নালা বেয়ে গঙ্গার জল ঝরণার মতো ঝরে পড়ত জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির দক্ষিণ-বাগানের পুকুরে, মাঝে মাঝে গলি থেকে পালকি বেহারার হাঁই-হুঁই শব্দ আসত কানে, আর বড় রাস্তা থেকে সহিসের হেইও হাঁক। সন্ধ্যাবেলায় জ্বলত তেলের প্রদীপ, তারই ক্ষীণ আলোয় মাদুর পেতে বুড়ি দাসীর কাছে শুনতুম রূপকথা।‘ (রবীন্দ্ররচনাবলী প্রথম খণ্ড)
    আজও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ’সহজ পাঠ’ প্রাসঙ্গিক। শিশুদের গ্রাম-বাংলার প্রকৃতির মাঝে নিয়ে যাওয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সহজ পাঠ। ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় আমাদেরকে বর্ণের পরিচয় দিলেও, পরবর্তীকালে রবি ঠাকুর সেই বর্ণগুলিকে দিয়েছেন সুরের ছন্দ, দিয়েছেন শব্দের জাদু। উনি সহজ পাঠের মাধ্যমে  প্রকৃতিকে, পশু-পাখিকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। ‘ এ কী পাখি ? এ যে টিয়া পাখি। ও পাখি কি কিছু কথা বলে ? কী কথা বলে ? ও বলে, রাম রাম, হরি হরি। ও কী খায় ? ও খায় দানা। রানীদিদি ওর বাটি ভরে আনে দানা। বুড়ি দাসী আনে জল। পাখি কি ওড়ে ? না, ও ওড়ে না। ওর পায়ে বেড়ি। ও আগে ছিল বনে, বনে নদী ছিল। ও নিজে গিয়ে জল খেত। দীনু এই পাখি পোষে।‘ (সহজ পাঠ, প্রথম ভাগ, চতুর্থ পাঠ) রবি ঠাকুর এ প্রসঙ্গে আর কিছু বলেননি। কিন্তু তিনি শিশু মনে যে চিত্র স্থাপন করলেন তাতে এ কথাই বলা যায় যে শিশুটি সারাজীবনে পাখিদের আর কষ্ট দেবে না। আবার ষষ্ঠ পাঠে পাই, ‘ফুটবল খেলা খুব হবে। বল নেই ? গাছ থেকে ঢেলা মেরে বেল পেড়ে নেব। ---- বেলা শেষে ঘরে ফিরে যাব। ----- গিয়ে ভাত খেয়ে খাতা নেব। লেখা বাকি আছে।‘ শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের মনে ঢুকিয়ে দিলেন, খেলার সাথে সাথে পড়াশুনাটাও করতে হবে। আর দ্বিতীয় ভাগে আমরা পড়েছি ‘কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি ----‘ যে কবিতাটি আমরা অনেকেই আজও পুরোটা মুখস্থ বলে দিতে পারব। আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘স্কুল, কলেজে শেখা অঙ্ক, ইতিহাস, ভূগোল, ইত্যাদি সমস্ত ভুলে যাওয়ার পর, যা বাকি থাকে তা হল শিক্ষা।‘ আর এখানেই সহজ পাঠ কৃতিত্ব রাখে। ছেলেবেলায় পড়া সব কিছু ভুলে গেলেও, সহজ পাঠের সেই শিক্ষা ভোলা যায় না।
    আমাদের এখন ভাববার সময় এসেছে শিশুদের জন্য কতটা শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারছি। আগেকার দিনে আমরা ছিলাম শিক্ষার্থী, আর এখন তার পরিবর্তে এসেছে নম্বরার্থী। এই প্রক্রিয়ায় কোনভাবেই শিশুর মানসিক বিকাশ সম্ভব নয়।
    পরিবার হল সমাজের মৌলিক প্রতিষ্ঠান এবং মানব সমাজে এটি হল প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কোনো সামাজিক সংস্থা পরিবারের মতো আন্তরিক হয় না। পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের সাথে শিশু গভীর ভালোবাসায় আবদ্ধ থাকে। শিশুটির মনস্তত্ত্ব সমন্ধে সবচেয়ে বেশি অবহিত থাকে তার পরিবারের লোকজন। সেই কারণে পরিবার হল শিশুর শিক্ষা এবং জীবন বিকাশের ক্ষেত্রে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। 

    Note : পাওয়ার পাবলিশার্স-এর ‘Sohoj Path’ হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সহজ পাঠ’-এর ইংরেজি অনুবাদ, অনুপ কুমার ঘোষ অনুবাদ করেছেন। অনুবাদক বিশ্বাস করেন যে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যারা ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন করে, তারা কখনই এমন একটি ঘরানার একটি সুন্দর বই পড়ার সুযোগ পাবে না, যা অন্য কোনো ভাষায় অজানা। খুব সহজ স্টাইলে লেখা প্রকৃতির জটিল উপায় সম্পর্কে তারা জানতে পারবে না। বইটি এইভাবে প্রকৃতিকে তার অগণিত সৌন্দর্য এবং পাখি, প্রাণীদের প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং আমাদের ভারতীয় সাহিত্যের মৌলিক বিষয়গুলির সারমর্ম দেয়।
    ( সৌজন্য়ে : উত্তরের সারাদিন পত্রিকা )
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন