এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আমার পার্কস্ট্রিট ও আমার খ্রীস্টমাস

    Simanta Nandi লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ২১২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • শীত-বিকেলে মানুষের ঢল সাহেবপাড়ায়। যেন লন্ডনের রাস্তা। রঙিন বেলুন উড়ছে। হরেক খেলনা। কত রকমের শীতের খাবার। বুড়ির চুল। ঘটিগরম। শিশুদের নিয়ে বাবা-মা ঢুকে পড়ছে গির্জায়। প্রেমিক প্রেমিকারাও হাত ধরে। ঢং বাজল। পাখিরা উড়ে গেল। আকাশে ধোঁয়ার চাদর। সাদা কুয়াশা। দ্বিতীয় হুগলিতে আলো জ্বলল। ময়দানে ভিড়। গঙ্গার ধারে গা ঘেঁষে বসল যুগল। ডালহৌসি পাড়ায় অফিস ছুটি। এ বার প্রার্থনা শুরু হবে। শহরময় আলো। মদের দোকানে ভিড়। তিনতলার পুরনো সাহেব বারান্দায় মায়াবি হলুদ আলো স্ট্রিটল্যাম্পের। অদ্ভুত আভা! সাহেবপাড়ায় শীত এসেছে কালিঝুলি মাখা পোড়ো বাড়িগুলোয়..
     
     নানা প্রজন্মের শিল্পীদের বোহেমিয়ান হওয়ার আবহমান আঁতুড়ঘর মধ্য কলকাতার এই সাহেবপাড়া। প্রখ্যাত চিত্রকর থেকে কবি বা পরিচালক, সকলেই কোনও-না-কোনও সময়ে একটু ‘বেসামাল’ হয়েছেন এ রাস্তায়। অর্থাৎ, পা টলেছে। ইতিহাস ও জীবনের মোড়বদলে এ রাস্তার তাই আশ্চর্য ভূমিকা। অথচ নব্বইতে জন্মানো আমাদের এ পাড়ার গল্পগুলো আজও ধরা হয়নি! এদিকে, শীতের ফি-বিকেলে আমার-আমাদের অচেতন হাঁটা বেড়ে যায় আজও পার্ক স্ট্রিটের অলিগলিতে… মল্লিক বাজারে অটো থেকে নামতেই দেখি আলোয় আলো। মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসে। ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগে। জ্যাকেটটা গলাই। কবরখানার অন্ধকারে গা-ছমছম। হাওয়ায় তন্দুর আর কেকের গন্ধ। ভিখিরি-মা শীতার্ত সন্তানকে কাগজে মুড়ে নেন যত্নে। ধর্মতলায় গিজগিজ করে সোনালি চুল…কত প্রেম কত বিচ্ছেদের স্মৃতি এসব রাস্তায়…। আজও এসব রাস্তায় একলা হাঁটলে অবাক হয়ে দেখি আর্মেনিয়ান বাড়িগুলো… কী অপার স্থাপত্যসৌন্দর্য! অথচ কেউ দেখভালের নেই…
     
    শহরের গাছের পাতায় ধুলো জমে আছে এখন। ততদিন জমে থাকবে যতদিন না বসন্তের হাওয়া আসে। সদর স্ট্রিটে মহিনের ঘোড়াগুলি গান গাইছে, ‘আমার দক্ষিণ খোলা জানালায়/ মাঘের এই অন্তরঙ্গ দুপুরবেলায়/ না-শোনা গল্প পুরনো মনে পড়ে যায়/ এক দমকা হাওয়ায়…’ রডন স্ট্রিট-রয়েড স্ট্রিট-উড স্ট্রিট-লাউডন স্ট্রিট যেন দার্জিলিংয়ের শ্যাওলাভেজা গলি। গলিতে জীর্ণ পুরনো বাড়ির ছাতে লোহার ঘোরানো সিঁড়ি, চিলছাতের নড়বড়ে তিন- চারখানা ঘরে শেষবিকেলের মরা আলো, জানলা দিয়ে দেখা যায়… নোনাদেওয়াল। তাতে টুনির আলোয় কে যেন জানলার পাশে রেখে গেছে ক্রিসমাস-ট্রি। শুকনো কেক। রোদ চলে গেছে তাও ছাতের আচার কেউ সরায় না। ভুতুড়ে গা-ছমছমে বাড়ি থেকে দেওয়ালে অশ্বত্থগাছ ঝুলবেই। আশপাশে বন্ধ কারখানার জানলায় ভাঙা কাচ থাকবেই ঝুল জমে। গঙ্গাকল দিয়ে জল অনর্গল বেরিয়ে যাবেই। সন্ধ্যা হলে গুমরে উঠবেই একরাশ আত্মা এসব বাড়িজুড়ে গঙ্গার ঠান্ডা হাওয়ায়। এলিয়ট রোড-রয়েড স্ট্রিট-শেক্সপিয়ার সরণি-রবিনসন স্ট্রিট জুড়ে এমন কত বাড়িতে পাহাড়ি ফুলের মতো একটি মেয়ে থাকবেই চিলছাতে, যার এক প্রেমিকের সঙ্গে কান্নাকাটির একটা প্রেম হবে, তারা একে-অপরকে জড়িয়ে ধরে একবার কেঁদে ফেলবেই লং-শটে, চুমু খাবে। তারপর মেয়েটি ছেলেটিকে চোখ মুছতে মুছতে বলবে, ‘আমরা কিন্তু বন্ধু। জাস্ট ফ্রেন্ডস। প্রমিস?’
     
    ক’দিন পর ১৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা হবে কলকাতার। পার্ক স্ট্রিটে দুনিয়ার মানুষ তখন। অক্সফোর্ডে ঢুকতে গিয়েও পারব না। এত ভিড়! কুয়াশা। খুব দূর দেখা যাবে না। ব্লেজার চাপালেও ঠান্ডা লাগবে। সিগারেট ধরাব। সস্তায় পান করা যায় কোথায়? হালকা? উল্টোদিকে সিলভার গ্রিল। ঢুকে পড়ব। কোনওরকম ঠাঁই হবে আমাদের। বন্ধুদের। ভিড়ে গিজগিজ করবেই পানশালা। বাইরের ফুটপাতে শীতের টুপি, মাফলার। হরেক পণ্য শীতের। ফ্লুরিজে সপরিবার মানুষ। আস্তে আস্তে ওল্ড মঙ্কে চুমুক দেব। শান্ত হব। উষ্ণ হব। হালকা টলে যাবে পা। জিভ জড়াবে। একটু নেশা, এলোমেলো কথা… 
     
    অ্যালেন পার্ক যেন কলেজ ফেস্ট। সুন্দরী কত মেয়ে। গাছের গায়ে সবুজ আলো। সারি সারি খাওয়ার স্টল। টুনি লাইট আর কেক। ক্যারল বাজবে। কিন্তু ভিড়টা ভাল লাগবে না। তাই আমরা হাঁটা দেব জ়েভিয়ার্সের ব্যাক গেটে। অনেক স্মৃতি এ রাস্তায়। প্রথম গাঁজা টু প্রথম লিপ-লক। ফুটপাথে বসে কত সাড়ে সব্বোনাশ… ভাবতে ভাবতে হাঁটব আমরা ভেতরের রাস্তাগুলোয়। ডিনার করবি? প্রশ্ন করবে বন্ধু। আমি রাজি হব। একটু খরচ হবে। তা হোক। আজই তো আমাদের ক্রিসমাস… ক’দিন আগেই। ২৫-এ তো এ রাস্তায় পা ফেলা যাবে না! হাঁটব সিরাজের দিকে। ঠান্ডায় মাথা বনবন করবে। কুয়াশায় ভাল দেখা যাবে না কিছুই। সিরাজে ঢুকে একটু আরাম লাগবে। ঘরের উষ্ণতা। তন্দুরের গন্ধ।
     
    তাপমাত্রা কমবে আরও। শীত সন্ধ্যার আকাশে যেন মশারি টাঙানো। যেন চাঁদোয়া ঝোলানো পার্ক স্ট্রিটে। সবাই সবাইকে উপহার আর উষ্ণতা দেয়। পর্তুগিজ যুবক এসে গিটার বাজান হোচিমিন সরণিতে। টি-মোমো অর্ডার করেন কোরিয়ান দম্পতি। পার্ক স্ট্রিট জুড়ে কত না আলো। কত দেশের মানুষ! সিলভার বারে ব্লুজ বাজান বয়স্ক এক অ্যাংলো। হালকা রাম খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি। শেক্সপিয়ার সরণি ধরে তারপর রাসেল স্ট্রিট। চাঁদ উঠেছে। চলে যাই ক্রমে লিন্টন স্ট্রিটের দিকে। ভাঙা বারান্দায় আলো এসে পড়ছে। হলুদ। মোমো কিনে নিয়ে যাচ্ছে ফিরিঙ্গি যুবক। লোল আফ্রিকান। কেমন অপরাধ অপরাধ লাগে। শহর জুড়ে। তন্দুরের আগুনের লাল আভা। আমার ক্লান্ত লাগে।
     
    আজ বড়দিন। কী সুন্দর রোদ উঠেছে আজ সকালে। ছোট মেয়েরা দলবেঁধে কোথায় যাচ্ছে। মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে একজন আর একজনকে প্রশ্ন করছেন, “কী, ভাল তো?” উল বুনছেন এক দিদা। বারান্দার রোদে শরীর সেঁকে নিচ্ছেন একটু। কুকুর ছানারাও এ ওর গায়ে। লুটোপুটি। ওম। গাছে জল দিচ্ছেন কেউ। কেউ রাংতা লাগাচ্ছেন রাস্তাজুড়ে। মা মেরি অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছেন সব। সেন্ট পলসের চূড়া পেরিয়ে যাচ্ছে পরিযায়ী পাখির ঝাঁক। পায়রা উড়ছে দালান জুড়ে। জল কী ভীষণ ঠান্ডা! তবু দার্জিলিং বেড়াতে যাচ্ছে অনেকে!! কীভাবে! হালকা চাদরের ভেতর থেকে বেরতে ইচ্ছে করছে না। তুই কেক বানাবি বলেছিস। আমার সামনে জন্মদিন। ওয়াইন থাকবে। তারপর বন্ধুর বিয়েতে যাব। বার বি কিউ-এর ব্যবস্থা থাকবে সেখানে। আমরা হালকা পান করব। রাত হয়ে যাবে। পান করতে করতে ওয়াল্টজ় নাচবে কেউ কেউ। স্যাক্সোফোন বাজবে পার্ক স্ট্রিট জুড়ে। সদর স্ট্রিটের দোকানে বই পড়তে পড়তে অবাক চোখে আমাদের দেখবে এক সাহেব। তার চামড়া কুঁচকে গেছে। আমার তোকে চুমু খেতে ইচ্ছে করবে তারপর। কিন্তু খেতে পারব না। পাছে লজ্জা পান, ভিক্টোরিয়ার পরি!
     
    আজ সারাদিন কোনও কাজ নেই। ভাবছি এরপর ময়দান যাব। তুই যাবি? কত ছেলেমেয়ে এই শীতে ছবি তোলে জানিস? সন্ধায় গঙ্গার ঘাট যেতে পারি আমরা। দূরে দ্বিতীয় হুগলির আলো। সারি সারি বয়া বাঁধা জলে। সেই জলে মিশে যাবে শীতের শেষ সূর্য। জীবনটা কত সুন্দর মনে হবে দেখবি আবার তখন। ঝমঝম করে চক্ররেল চলে যাবে পাশ দিয়ে। মানুষ হিসেবে নিজেকে এক মুহূর্তের জন্য কত বড় মনে হবে তখন দেখবি…। যাবি? "এই তোকে একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করছে, খেতে দিবি? প্লিস! প্লিস! প্লিস!...."
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ??? | 2405:8100:8000:5ca1::1:ba1 | ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ ০৯:৩২514803
  • ১৬ ডিগ্রিতেই ব্লেজার! তারপরেও ঠান্ডা লাগবে? অমেরুদন্ডী প্রাণী নাকি?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি প্রতিক্রিয়া দিন