এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • এক ছাদ ছেলেবেলা! 

    Suparna Sanyal লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ ডিসেম্বর ২০২২ | ১০৮ বার পঠিত
  • দাঁড়া...! দাঁড়া! ওরে থা...ম! দাঁড়া বলছি!
    আরে কে কার কথা শোনে! যত বলি দাঁড়া তত জোরে ছোটে!
    - কে রে? কার কথা বলছিস?
    কে আবার! আমাদের পাড়ার পুরুতমশাই বাবু কাকার ছেলে সন্টা। আর ছুটবে নাই বা কেন? বড় কাকিমার ঘরে লুকোচুরি খেলতে গিয়ে জলের কুঁজো ভেঙেছে যে! সারা ঘর জলে জলাক্কার! খাটের তলায় টানা বিছানা আর গদি গুটোনো ছিল। সেগুলোর যে কি হাল সে বলাই বাহুল্য।
    দেখতে দেখতে সে মেজকাকার ঘরের পেছনে ঘুড়ি ধরার নেড়া ছাদ থেকে ঠাকুমার ঘরের সামনের বড় দালান পেরিয়ে, পুবের বারান্দা দিয়ে দৌড়ে, দোতলা থেকে তিনতলায় ওঠার সিঁড়ি এক ধাপ, দু ধাপ বড় বড় পায়ে টপকে সোজা ছাদে। আর আমাকে পেছনে দেখেই এক লাফে পাঁচিল টপকে ঈসিতাদের ছাদে পগাড় পার!
    আমাদের  উত্তর কলকাতার শিমলে পাড়ার বাড়িগুলো ওই রকমই। ভাই বোনের মতো এ ওর গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে। দুটো ছাদের মাঝে পাতলা পাঁচিল, থেকেও না থাকার মতোই। এর ছাদ থেকে ওর উঠোন, এর রান্নাঘরের জানলা দিয়ে ওর বারান্দা – সব খুল্লামখুল্লা! কার রান্নাঘরে আজ কি রান্না হোল, কার ছেলে স্কুলে বদমাইশি করার জন্যে বেধড়ক মার খেলো আর কার মেয়ে ও পাড়ার ছেলের সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করার জন্যে ঘরবন্দি - সব্বাই সব্বার পেটের কথা জানে।
    যাকগে, যে কথা বলছিলাম। সন্টা হোল আমাদের ছাদপার্টির এক খুদে সদস্য।  সে  ছাড়া আর আছে আমার বোন রুমি। বাবুন, ওর বোন রিনি আর আরও এক খুদে বোন পিঙ্কু। আমাদের এই বাচ্চাপার্টির আমিই অঘোষিত দলনেতা! পাশের বাড়ির বাবুন আমার চেয়ে মাত্র তিন মাসের ছোট। কিন্তু আমার দাপট দেখে মনে হয় যেন আমি তিন বছরের বড়। মোটা মোটা দুবিনুনি ঘেরা রোগাসোগা চেহারায় বড় বড় দুটো চোখের দৌলতেই রাজত্ব। রাজত্ব না ডাকাতি! তবু সবাই ভালবেসে বলে ডাকাবুকো!
    আমি তখন বিডন স্ট্রীটের হোলি চাইল্ড! আর এদিকে গান শিখতে দরজিপাড়ার জগন্নাথ ধরের স্কুল নির্ঝরিণী সঙ্গীত শিক্ষালয়! এছাড়া মিনারভা থিয়েটারের কাছে আমার মামার বাড়ির পাশে চৈতন্য লাইব্রেরী। কলকাতা বলতে এই চৌহিদ্দিটুকুই তখন চেনা জগত। তাই উন্মুখ হয়ে থাকতাম স্কুল থেকে ফিরে ওই হুড়োহুড়ি করে খেলার খোলা ছাদটার জন্যে। কখনো কুমির ডাঙ্গা, কখনো ঠাকুমা, কাকিমার ঘর জুড়ে লুকোচুরি। তিনতলা – একতলা, একতলা – তিনতলা। এবাড়ি থেকে  ওবাড়ি। বেশ কিছু অনিত্য করেছি।যেমন ওই জলের কুঁজো ভাঙা আর কি। একবার তো খিল খুলতে গিয়ে মাথায় পড়ে বাবুনের মাথা ফেটে গেল। আর একবার আলমারীর পেছনে লুকোতে গিয়ে পুরনো খিলেন ভেঙে পড়লো। তখন  কি বকুনি আর কি বকুনি। এই বকুনি আর শাস্তির ব্যাপারে কোন gender bias ছিল না, নিজের ছেলে কি পাশের বাড়ির সে বিষয়েও কোন বাছবিচার ছিল না। তবু মা, কাকিমা, বাবা, কাকারা আবাধ প্রশয় দিতেন আমাদের এই দাপিয়ে খেলার বিকেলগুলোকে। যেদিন বৃষ্টি হোতো সেদিন লুডো আর ক্যারাম। বিশ্বকর্মা পুজোর সময় বোতলের তলার কাঁচ ভেঙে মাঞ্জা দেওয়া আর ঘুড়ি ওড়ানো। আর ভোকাট্টা হলেই আবার দুড়দাড়িয়ে ছুট এবাড়ি ওবাড়ি পেরিয়ে কাটা ঘুড়ি তুলে আনার জন্যে।
    তারপর সন্ধে হত। হাত মুখ ধুয়ে যে যার বই খাতার সামনে। আবার চেয়ে থাকা পরের দিনের সোনালি বিকেলটার, দল বেঁধে দৌড়াত্ব করার, প্রতিক্ষা আদরের প্রশয়ের আর খোলা ছাদের স্বাধীনতার। বিকেল গড়িয়ে যেমন সন্ধের সায়রে বিলীন, জীবনও যেন তেমনি বিশবাঁও জল! আমাদের বাচ্চাপার্টির সবাই প্রায় জীবনের মধ্যাহ্নে! তবু চোখ বুজলেই ছেলেবেলা কথাটার ম্যাজিক দমকা হাওয়ার মতো এক ঝটকায় উড়িয়ে নিয়ে ফেলে বাবুনদের সেই তিনতলার ছাদে। যেখান থেকে সোজা তাকালেই ডিমের কুসুমের মতো লালচে কমলাটে সূর্যটা অস্ত যায় ধোঁয়াশা ঢাকা হাওড়া ব্রীজের পেছনে। সেখানে বন্ধ বাক্সোর ভেতরে গুছিয়ে রাখা সাদা কালো ছবির এ্যালবামের মতো হাতড়িয়ে খুঁজি ছেলেবেলাটাকে। আর হাজার মাইল দূরে নিঃশব্দ বিদেশে নিশ্চুপ হয়ে ভাবি কোথায় গেল আজ সেই ছাদ জুড়ে দস্যিপনার বাচ্চাপার্টিরা?
    ওরা সব টিউশনে। ওরা সব ইন্টারনেটে।
    ছাদ তো আজ তেমনই খোলা। খালি পাল্টে গেছে সময় আর ছেলেবেলার সংজ্ঞা।  আর তার সঙ্গে গল্প হয়ে গেছে পুরনো কলকাতার সেই সব মা, বাবা, কাকা, কাকিমারা যারা এনে দিত সেই খোলা ছাদের স্বাধীনতা।
    তাই মাঝে মাঝেই কাজ পালিয়ে যাই আমার সেই এক ছাদ ছেলেবেলা খুঁজতে।
    ছেলেবেলা গড়িয়ে পড়ে ছাদ থেকে। তাকে মুঠোয় করে ধরি।
    ছেলেবেলা উপছে পড়ে মুঠো করা হাত থেকে, গড়িয়ে পড়ে আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে পাতলা নলেন গুড়ের মতো।  তাকে চেটেপুটে খাই। ভাবি শেষ হয়ে গেল বুঝি!
    তবু আশ্বাস! সব জলই বরফ হতে পারে। 
    আমার এক ছাদ ছেলেবেলা তাই বেঁচে থাকে নতুন গুড়ের পাটালির মতো জমাট মিষ্টি আর সুবাস নিয়ে, উত্তর কলকাতার অন্দরমহলে!
    / সুপর্ণা সান্যাল, উপসালা, সুইডেন।
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Supriya Debroy | ০৯ ডিসেম্বর ২০২২ ০৬:৩৭514455
  • বেশ ভালো লাগল। কাজের ফাঁকে, সময়ে- অসময়ে একবার টুক করে ছোটবেলাটা ঘুরে আসতে সবারই বেশ ভালো  লাগে। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন