এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • শৈশবের স্মৃতিমালা এবং তাহাদের কথা - পর্ব ৪

    Supriya Debroy লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৫ ডিসেম্বর ২০২২ | ৬৪ বার পঠিত
  • মাঝমাঝেই দেখতে পেতাম বিদ্যুতের ঝিলিক, তারপরেই মেঘের গা কাঁপানো কড়কড় কড়াৎ ডাক। ভয়ে জড়িয়ে ধরতাম দাদুভাইকে।
    দাদুভাই খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতেন এবং তারপর যখন পুরো বাড়ি ঘুমিয়ে থাকত তখন আমাকে সকালে হাঁটার জন্য নিয়ে যেতেন। শিখিয়েছিলেন সেই সময় সূর্য প্রণাম করা। তখন  থেকেই আমার মধ্যে সকালে খুব ভোর থাকতে ওঠার অভ্যাস তৈরী হয়। সে সময় তিনি আমাকে মুখে মুখে গণিত টেবিল, যোগ, বিয়োগ ইত্যাদি শেখাতেন। তিনি সর্বদা বলতেন, ভোরে ঘুম থেকে উঠে এক ঘন্টা অধ্যয়ন করা দিনের অন্যসময়ে তিন ঘন্টার  সমতুল্য এবং আমি সারা জীবন ধরে এটি অনুসরণ করেছি।
    দাদুভাই ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ ইন্সপেক্টর এবং খুব দয়ালু মনের মানুষ। সকালবেলায় তিনি আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম ও বিভিন্ন লোকের বাড়িতে যেতেন। দেখেছি আমি ঐসব বাড়িতে গেলে, বাড়ির কর্তা ও গৃহবধূ এসে সাষ্টাঙ্গে দাদুভাইকে প্রণাম করতেন। এবং দেবতার মতই দাদুভাইকে ওনারা সম্মান এবং পুজো করতেন। এত সম্মান, ভালোবাসা - এত লোকের থেকে পেতে আমি খুব কম লোককেই দেখেছি। আমার অবশ্য মজা ছিল অন্য কারণে। একটু পরেই গৃহবধূটি পাঠিয়ে দিতেন কাঁসার বাটি ভর্তি গাছের আম, কাঁঠাল - দুধ এবং মুড়ির সাথে মেখে গ্রীস্মকালে, অথবা  গাছের খেজুর রসের গুড় সহযোগে রুটি কিংবা পরোটা শীতকালে, কোনসময় আবার পাটিসাপটা - গোকুল পিঠে কিংবা পায়েস। এই পরিবারদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিলেন বাঙালি মুসলমান এবং এদের মধ্যে অনেকেই দাদুভাইয়ের ক্ষেতে কাজ করতেন অথবা পুকুরে মাছের চাষ করতেন অথবা গাছি হিসেবে কাজ করতেন নারকেল / সুপারি / খেজুর গাছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে দাদুভাই এই সমস্ত পরিবারদেরকে আর্থিক এবং সরকারিভাবে সাহায্য করেছেন নিজের সরকারি পদমর্যাদার সদ্ব্যবহার করে, পুনর্বাসনের জন্য অথবা এই দেশে থেকে যাওয়ার জন্য। কিছু কাহিনী দাদুভাই বলেছেন তখন আমাকে গল্পের ছলে, কিছু পরে বড় হয়ে জানতে পেরেছি। 
    উত্তরাধিকার উপন্যাসে "দাদুর সাথে বসে খাওয়া অনির অভ্যেস। ------ কাজ-করা উঁচু পিঁড়িতে বসে সরিৎসেখর খান, পাশেই ছোট মাপের পিঁড়িতে অনি।" মনে করিয়ে দেয় দাদুভাইয়ের সাথে বসে কাঁঠালগাছের পিঁড়িতে বসে খাওয়ার কথা। দাদুভাইয়ের আলাদা পিঁড়ি, কাঁসার থালা, গ্লাস, বাটি - আর আমি একটি ছোট পিঁড়িতে বসে দাদুভাইয়ের সাথে। দাদুভাই খাওয়া শুরু করার আগে থালার চারিদিকে কয়েকটি  ভাতের দানা ছড়িয়ে তার উপর কয়েকফোঁটা জল ফেলে দুহাতে চোখবুজে নমস্কার করতেন এবং তারপর খাওয়া শুরু করতেন। জেনেছিলাম, পূর্বপুরুষদের অন্ন নিবেদন করে নিজের খাওয়া শুরু করার নিয়ম। আমি একবার দাদুভাইয়ের নকল করতে গেলে উনি মানা করেছিলেন, এখন নয়।
    মনে পড়ে গরম পড়তেই বাড়ির গাছের কাঁচা আম অথবা তেতুল কিংবা চালতা দিয়ে টক ডাল, বাগানের উচ্ছে দিয়ে তেতোর ডাল অথবা লাউয়ের ফালি দিয়ে কাঁচা মুগের ডাল। গরম কালেই করা হত নানা রকমের ডাল। পাতে থাকত বাগানের গাছের কাগজি লেবু। কোনসময় ঠাম্মা বানাতেন সুগন্ধী লেবু পাতা দিয়ে ডাল, দারুণ লাগত আমার সেই ডাল খেতে। একটাই পদ কিছুতেই খেতে চাইতাম না, নিম-বেগুন। দাদুভাই জোর করতেন খেতে, এটা নাকী গরমকে নিয়ন্ত্রণে রাখার অন্যতম হাতিয়ার। দাদুভাই বাজার থেকে নিয়ে আসতেন কচি তালশাঁস, বিকেলে খেতাম। দারুণ স্বাদ। পটল ভাজা, পটল পোস্ত ছিল আমার পছন্দের খাবার। বৈশাখ-জ্যেষ্ঠ মাসে গাছের এঁচোড়। এঁচোড়ের ডালনা গরমমশলা দিয়ে, মাংসের চেয়েও সুস্বাদু। তারপরে বর্ষা। আর বর্ষা মানেই তালের বড়া, তালের ক্ষীর। তবে আমার তালের বড়াটাই ছিল বেশি প্রিয়। আলতো ঠান্ডা পড়তেই, নবীন ফুলকপি দিয়ে ঝোল, বাঁধাকপির তরকারি। আর একটু ঠান্ডা জমিয়ে পড়তে না পড়তেই তাজা পালং, গাজার-বিট-মটরশুটি দিয়ে মাখামাখা অথবা ঝোলঝোল তরকারি। মুলোর ছেচকি ঠাম্মা বানাতেন অসাধারণ, আজও মুখে লেগে আছে স্বাদ। জমিয়ে ঠান্ডা পড়তেই খেজুরের রস, খেজুরের গুড় আর পিঠে-পায়েসের সম্ভার।              
    একাদশীতে দাদুভাই পাথরের থালা, বাটি, গ্লাসে ভোজনাদি সারতেন দুই'বেলা। দুপুরবেলায় সাবুদানার সাথে থাকত দুধ, মিষ্টি, আম, কাঁঠাল, তরমুজ, কমলালেবু, ইত্যাদি অথবা অন্যান্য ফল ঋতু অনুযায়ী। আর রাত্রে লুচি, নিরামিষ তরকারি, দুধ, মিষ্টি। আমিও দাদুভাইয়ের সাথে বসে পড়তাম একাদশী পালনে, কারণ আমার জন্য এটা ছিল একটা ছোটোখাটো উৎসব।
    বিকেলে দাদুভাইয়ের সাথে ‘শিবানন্দ ধাম’ যেতাম, যেখানে দাদুভাই উপাসনালয় ঘরে বসে প্রার্থনা করতেন। প্রার্থনা এবং জপ শেষে, নকুলদানা বা বাতাসা বিতরণ করা হত এবং কখনও কখনও মোহনভোগ। স্বামী শিবানন্দের জন্মস্থানে অবস্থিত 'শিবানন্দ ধাম'। তিনি বারাসাতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৫৪ সালে। উনি শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ ঠাকুরের সরাসরি শিষ্য ছিলেন এবং মিশনের দ্বিতীয় সভাপতি হয়েছিলেন। ১৯৩৪ সালে ওনার তিরোধানের পর, 'শিবানন্দ ধাম' তৈরী শুরু হয় ১৯৬১ সালে। আজ এখানে একটি গ্রন্থাগার, একটি দাতব্য হোমিওপ্যাথিক-কাম-অ্যালোপ্যাথিক ডিসপেনসারি, একটি ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা ইউনিট, উপাসনা হল, একটি অডিটোরিয়াম, সন্ন্যাসীদের কোয়ার্টার, ইত্যাদি রয়েছে। এছাড়াও এখানে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ ঠাকুর, পবিত্র মা শ্রী সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী শিবানন্দের জন্মদিন পালন করা হয়ে থাকে এবং দুর্গাপুজো, কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয়।
    রোজ সন্ধ্যেবেলায় দাদুভাই বসতেন পুজোমণ্ডপে, বাজাতেন খোল চোখ বুজে একনাগাড়ে। তারপর এসে বসতেন ঘাটলায় উঁচু বসার জায়গাতে, গল্প করতেন পাড়ার লোকের সাথে। একটু পরে নিয়ে বসতেন আমাকে পড়াতে, সামনের বারান্দায় বসে। তখন ইলেকট্রিক এসে গেলেও, ফ্যান ছিল না। মাঝে মাঝে গরমের সময় আমরা শুতাম বাইরের বারান্দায় বিছানা পেতে, মশারি টাঙিয়ে। প্রচুর মশার উপদ্রব ছিল তখন। বারাসাত ঐ সময় আধা-শহর হলেও, আমাদের বাড়িটা ছিল বেশ নির্জন - গ্রামের মতো। সন্ধ্যের পরপরই বাড়ির চারদিক নীরব হয়ে যেত। বাতাসে উড়ে বেড়াত জোনাকি, শুনতে পেতাম ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। অফিস-ফেরৎ কোনো জ্যেঠু অথবা কাকু পুকুরে স্নান সেরে দিয়ে যেত একটা হাঁক দাদুভাইয়ের উদ্দেশে - ভালো আছেন তো জ্যাঠামশাই, নাতিকে নিয়ে পড়াতে বসেছেন বুঝি ! আপনি পুকুরটা কাটিয়েছিলেন ভাগ্যি এত সুন্দর বাঁধানো ঘাট সহ, তাই মনের সুখে স্নান করতে পারি। টেপা কলের জলে স্নান করে কী তৃপ্তি মেলে !     ( ক্রমশ )
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে প্রতিক্রিয়া দিন