এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ইতিহাসের পাতায় না পাওয়া স্বাধীনতার বীরাঙ্গনারা

    Surajit Dasgupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৭ নভেম্বর ২০২২ | ১২৭ বার পঠিত
  • আমাদের পরাধীনতার ইতিহাস যত বড় তেমনি স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসও দীর্ঘ। কত শত, সহস্র ভারতবাসী স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তার কোনো হিসেব নেই আমাদের ইতিহাসে। প্রত্যেকেরই লক্ষ্য ছিল পরাধীন মাতৃভূমিকে শৃঙ্খলামুক্ত করা। প্রত্যেকেই তাঁদের নিজস্ব ক্ষমতা অনুযায়ী অবদান রেখে গেছেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। আমাদের মানে প্রতিটি ভারতবাসীর অতীব লজ্জার বিষয় যে, এঁদের বেশীরভাগেরই নাম ইতিহাসের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে। ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নামটুকুও খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা যখন আমাদের স্বাধীনতার ৭৫ তম বর্ষপূর্তি পালন করছি বিগত এক বছর ধরে, তখন কিছু কিছু স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম ও পরিচয় সামনে আনছি "অজ্ঞাত স্বাধীনতা সংগ্রামী" শিরোনাম দিয়ে। এটাও এক ধরণের অসম্মান বলেই মনে হয়। কোনো স্বাধীনতা সংগ্রামীর নামের আগে "অজ্ঞাত" কথাটি বসানো মানে, তাঁকে নয়, নিজেদেরকেই অসম্মানিত করা। তাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন কোনোপ্রকার নাম, যশ, সন্মান, অর্থের জন্য নয়। মাতৃভূমিকে ভালোবেসে, দেশমাতৃকার আহ্বানে, দেশবাসীকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে। দেশ থেকে ইংরেজরা চলে যাওয়ার পরে যে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বেঁচে ছিলেন তাঁদের মধ্যে বেশীরভাগই কোনোরকম সরকারী সাহায্য নেননি। কেউই চতুর্দিকে ঢোল পিটিয়ে তাঁদের বীরত্বের কথা বলে বেড়াননি। ইংরেজমুক্ত ভারতে তাঁরা নিঃশব্দেই দিন গুজরান করেছেন এবং কোনো একসময় সকলের অলক্ষেই দেহত্যাগ করেছেন। আমরাই তাঁদের প্রাপ্য সম্মান তাঁদের জীবদ্দশায় বা তারপরেও দিইনি, এটা আমাদের লজ্জা। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আমরাই লিখেছি এবং সেখানেও তাঁদের জায়গা দিইনি, এটা আমাদের ব্যর্থতা। এতদিন পরে যখন তাঁদের অবদানকে আমরা সন্মান জানানোর চেষ্টা করছি তখন তাঁদেরকে অজ্ঞাত বলাটা নিজেদের লজ্জা বা ব্যর্থতা বা অপদর্থতাকেই ইঙ্গিত করে। ক্ষুদিরাম বসু বা উল্লাসকর দত্ত বা মাতঙ্গিনী হাজরা বা মাস্টারদা সূর্য সেন বা বিরসা মুন্ডা বা বিনয়-বাদল-দীনেশ বা এইরকম হাজারো স্বাধীনতা সংগ্রামীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে অজ্ঞাত বলে - একে দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিইবা বলা যায় (গুগলে খুঁজলে এঁদের সকলকেই অজ্ঞাত স্বাধীনতা সংগ্রামী বলেই দেখানো হচ্ছে)।

    তবুও এটা আশার কথা যে, এত বছর পরে হলেও আমরা ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া বেশ কিছু স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম এবং কীর্তিকলাপ জানতে পারছি। আবার যারা সরকারী তরফে এই কাজগুলো করছেন তাঁদের ইতিহাস জ্ঞানেরও অভাব রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে হয়তো অরুণ কুমার চন্দ বা সম্ভূধন ফঙলো অপরিচিত বা অজ্ঞাত হতে পারেন কিন্তু আসামে যদি এঁদেরকে অজ্ঞাত বা অপরিচিত স্বাধীনতা সংগ্রামী বলা হয়, এটা সরকারী আধিকারিকের অজ্ঞতাই প্রকাশ করে, সরকারকে দোষারোপ করা যায়না। স্বাধীনতার ৭৫ তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সরকারী উদ্যোগে এই প্রচেষ্টাকে তাই স্বাগত জানাতেই হয় কারণ, সবুরে মোয়া ফলে আপ্তবাক্যে বিশ্বাস রেখে বলা যায় সব ভালো যার শেষ ভালো। সরকারী বহু দপ্তর, স্কুল, কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে, এমনকি কিছু রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও বিগত এক বছর ধরে এইরকম বহু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং আমরা বহু এইরকম ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামের বীরপুরুষ ও বীরাঙ্গনাদের ফিরে পেয়েছি। 

    এইরকম ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া পাঁচজন বীরাঙ্গনাকে খুঁজে পেয়েছি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বাকরাহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শ্রীমতী শ্বাশ্বতী দাস গুহের লেখা থেকে। তিনি তাঁর প্রচেষ্টা এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে আবার তাঁর প্রচেষ্টাকে আমার পরিচিতজনের সামনে নিয়ে আসার ইচ্ছে আছে। ইতিহাস বই কিছু হাবিজাবি লেখা ছাড়া আর কিছুই নয় বলেই মনে হয়, যখন দেখি স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ শ্রী অমিত মিত্রের মা এবং শ্রী সুরেশ চন্দ্র বসুর কন্যা শ্রীমতী বেলা বসুর নামও ইতিহাসের পাতায় নেই। তবুও হতাশাকে প্রশ্রয় না দিয়ে এবং প্রচেষ্টাকে সন্মান জানিয়ে পাঁচজন বীরাঙ্গনাকে আমার মতো করে পরিচিতজনদের সামনে তুলে ধরছি।
     
    উজ্জ্বলা মজুমদার
     
    ২১শে নভেম্বর ১৯১৪ ঢাকা শহরের এক নামকরা জমিদার পরিবারে শ্রী সুরেশ চন্দ্র মজুমদারের প্রথমা স্ত্রীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন উজ্জ্বলা মজুমদার। তাঁর পিতাও বিপ্লবী কর্মকান্ডের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। কলকাতা থেকে বিপ্লবীদের জন্য অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি উজ্জ্বলার সাহায্য নেন এবং মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে উজ্জ্বলা কোমরে আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে বিপ্লবীদের পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁদের বাড়ীতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল বিপ্লবীদের, বিপ্লবী সুকুমার ঘোষ, মনোরঞ্জন ব্যানার্জি ছিলেন তাঁর গৃহশিক্ষক। তিনি খুব অল্প বয়স থেকেই বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলের সদস্য ছিলেন। জন অ্যান্ডারসন অভিভক্ত বাংলার গভর্নর হিসেবে আসার (১৯৩২ - ১৯৩৭) পর থেকেই বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সসহ অন্যান্য বিপ্লবী দলগুলোর ওপরে নজরদারি শুরু হওয়ার ফলে তাদের কাজে বিঘ্ন ঘটতে থাকে। উজ্জ্বলা মজুমদার বেড়াতে যাওয়ার নাম করে দার্জিলিং চলে যান ভবানীপ্রসাদ ভট্টাচার্য, সুকুমার ঘোষ, রবি ব্যানার্জি ও আরো কয়েকজন বিপ্লবীদের সাথে গভর্নর এন্ডারসন হত্যায় অংশ নিতে। উজ্জ্বলা হারমোনিয়ামের মধ্যে করে লুকিয়ে নিয়ে আসেন মারণাস্ত্রটি। তিনি ও মনোরঞ্জন এক হোটেলে ওঠেন স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে। ৮ মে ১৯৩৪ দার্জিলিং লেবং রেসকোর্সের মাঠে বিপ্লবী ভবানীপ্রসাদ ভট্টাচার্য গুলি করেন গভর্নরকে কিন্ত গভর্নর অল্পের জন্যে বেঁচে যান। ভবানীপ্রসাদ ধরা পড়ে যান। পরে তার ফাঁসি হয়। মনোরঞ্জন ব্যানার্জীর সাথে উজ্জ্বলা ছদ্মবেশ ধরে কলকাতায় পালিয়ে আসেন ও শোভারানি দত্তর বাসায় আশ্রয় নেন। ১৮ মে সেখানে তাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করে। স্পেশাল ট্রাইবুনালে উজ্জ্বলার ২০ বছর কারাদন্ড হয়। তাঁকে মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। অবশেষে মহাত্মা গাঁধীর প্রচেষ্টায় তিনি ১৯৩৯ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকা জেল থেকে মুক্তি পান। পরবর্তীতে কলকাতাতে ১৯৪২-এ ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি পুনরায় কারাবরণ করেন।চার বছর প্রেসিডেন্সী জেলে থাকার পর ১৯৪৬ সালে ছাড়া পান। এরপরে ফরওয়ার্ড ব্লক দলের ঘনিষ্ঠ সংস্রবে আসেন এবং দলের পুনর্গঠনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে শরৎচন্দ্র বসুর সোসালিস্ট রিপাবলিকান দলে যোগ দেন। ১৯৪৮ সালে তিনি বিপ্লবী ও সাহিত্যিক শ্রী ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দেশভাগের পরবর্তী সময়ে তিনি নোয়াখালী গিয়ে দাঙ্গা বিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান, ত্রাণের এবং সেবার কাজে ব্রতী হয়েছিলেন। আবার বারাসতে অনুন্নত শ্রেণীর উন্নতিকল্পে "পল্লী নিকেতন" নামে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। রাজারহাট থানার অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি গ্রামে সমাজসেবার কাজেও নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। ১৯৯২ সালের ২৫শে এপ্রিল এই মহান কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। স্বাধীনতার ৭৫তম বছরে আমরা এই বীর বিপ্লবীকে স্মরণ করি ও সম্মান জানাই।
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন