ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  রাজনীতি

  • দেউচা-পাঁচামিঃ কিছু পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন

    স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য
    আলোচনা | রাজনীতি | ২১ মার্চ ২০২২ | ৬৬৩ বার পঠিত

  • ঘনঘন পট পরিবর্তন হচ্ছে দেউচা-পাঁচামিতে। গত বছর নভেম্বর ডিসেম্বর নাগাদ দু-তিনটি স্থানীয় ভাবে গড়ে ওঠা গণ কমিটির নেতৃত্বে আন্দোলন হচ্ছিল। ইতিমধ্যে, জানুয়ারিতে মূলত দেউচার বাইরে, রাজ্যের অন্যান্য এলাকায় উপস্থিত থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংগঠন ও এনজিও, কিছু দেউচার স্থানীয় নেতৃত্বের সাথে মিলে, বীরভূম জমি, জীবন, জীবিকা ও পরিবেশ বাঁচাও মহাসভা গড়ে তোলে। পাল্টা, ওই সিঙ্গুরের ন্যানো বাঁচাও কমিটির মত, ‘লাহেন্তি মঞ্চ’ নামে একটি শিল্পে ইচ্ছুকদের সংগঠন গড়ে উঠেছে। ২০ ফেব্রুয়ারি সিউড়ির পুরন্দরপুরে শিল্পের স্বপক্ষে হওয়া তৃণমূলের অবস্থান বিক্ষোভে বিবিধ পোষ্টার ও প্ল্যাকার্ডের ভিড়ের মধ্যে ভেসে উঠেছে সেই অমোঘ স্লোগানঃ ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ।’ বাতাসে ‘বহিরাগত’ গন্ধ।

    এরই মাঝে, খনি বিরোধী শিবিরের মধ্যেও কে গোপনে সরকারের দালাল এই ধরণের একটা সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। ফেব্রুয়ারির মাঝে কলকাতা থেকে দেউচা পদযাত্রার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়, মূলত নাট্যব্যাক্তিত্ব জয়রাজ ভট্টাচার্যের উদ্যোগে, ‘বিদ্বেষের রাজনীতি-বিরোধী জনমঞ্চ’-এর ব্যানারে, শহর ও খনি এলাকার স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করে। ২১ তারিখ দেওয়ানগঞ্জে তাঁদের সভা হওয়ার কথা। এই মঞ্চের উদ্যোগের পিছনে সিঙ্গুর-পন্থী বামেদের, অর্থাৎ সিপিএমের সমর্থন ছিল। হাওড়া, হুগলি, বর্ধমান হয়ে মিছিল সিউড়ি অবধি যায় ১৯ তারিখ। ইতিমধ্যে ২০ তারিখ দেওয়ানগঞ্জে পৃথক একটি সভা ডেকে দেয় মহাসভা, যাতে নানারকম সিপিএম-বিরোধী বাম-ঘেঁষা/বাম সাজাদের ভিড়। যেকোনো রামধনু উদ্যোগেই সৎ, অসৎ, আধাসৎ -এরকম নানান ব্যক্তি ও সংগঠনের মিশেল হয়, এটিও তার ব্যতিক্রম নয়। একই জায়গায়, একটি ইস্যুতে, পরপর দু’দিন দুটো সভা হওয়ার কি মানে সেটা একটা প্রশ্ন। উদ্যোক্তারা একে অন্যের সাথে আলোচনা করেছেন কি করেন নি, সে বিতর্কে এখানে আর ঢুকছি না, কিন্তু ২১ তারিখের প্রোগ্রামটি, কেন আমি নিশ্চিত নই, আর হয় না। ইতিমধ্যে ২০ তারিখ বেশ গণ্ডগোল হয়, খনি-বিরোধী আন্দোলনকারীদের একাংশ কর্তৃক সুনীল সরেনের ‘অপহরণ’ ও পরবর্তীতে সিপিএম-ত্যাগী অর্থনীতি গবেষক ও রাজনৈতিক সংগঠক প্রসেনজিত বসু সহ নয় জনের গ্রেপ্তারি।

    তারপর থেকে এলাকায় টুকটাক মিটিং মিছিল লেগে আছে। খনি বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব এখন মূলত মহাসভার হাতে। স্থানীয় খনি বিরোধী জনতাকে এখনও ভরসা যোগাচ্ছে মহাসভা।

    গত এক দশকে নানান দিক থেকে বীরভূমকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গেছেন শাসক দলের জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল, যিনি সম্প্রতি তৃণমূলের জাতীয় কর্মসমিতিতেও স্থান করে নিয়েছেন। তিনি গুড় বাতাসা খাইয়ে গরম বীরভূমকে শান্ত রাখেন। ২০১৮-তে সার্বিক বিরোধী শূন্য পঞ্চায়েত নির্বাচন করিয়ে দেখিয়েছেন মণ্ডল মহাশয়। যদিও, দেউচা-পাঁচামির অনেক গ্রামেই ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ‘লিড’ পেয়েছিল বিজেপি, ওখানে তাদের সংগঠন বিশেষ কিছু নেই। যা ছিল, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর তা-ও গুটিয়ে গেছে।

    একদা দাপুটে বীরভূম আদিবাসী গাঁওতার রবীন সরেন-সুনীল সরেন আলাদা হয়ে গেছেন, গাঁওতার প্রভাব-ও আগের মত নেই। সুনীল এখন বিজেপি ঘুরে সরাসরি তৃণমূলে; রবীন তৃণমূলে যোগ না দিলেও শাসক দলের ঘনিষ্ঠ হিসাবেই পরিচিতি লাভ করেছেন। আদিবাসীদের আরেকটি প্রভাবশালী সামাজিক সংগঠন, ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহল (যদিও তাঁদের বিরুদ্ধে তৃণমূল ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ আছে)–ও কোন প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে বা তাতে সহায়তা করতে রাজি হয় নি।

    তবু, হাওয়া গরম হচ্ছে বুঝতে পেরে, ওই ২১ তারিখই ক্ষতিপূরণ বাড়িয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এবং আবারও বলেছেন যে আগামী ১০০ বছর সস্তায় বিদ্যুৎ পাবে রাজ্যবাসী, এক লক্ষ কর্মসংস্থান হবে। বলাই যায়, আগামী বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট-এ এটাকেই তুলে ধরা হবে আন্তর্জাতিক সংস্থাদের কাছে, কারণ এই জটিল খনি খুঁড়তে যে প্রযুক্তি লাগবে, তা এদেশে লভ্য নয়। ইতিমধ্যে বাজারে আবার ‘আদানি আদানি’ গুজব। প্রকল্প যদি হয়, হতেই হয়, তা বড় প্রকল্পই হতে হবে। বড় বিনিয়োগ। দেউচা ছোট কয়লা প্রকল্পের জায়গা নয়।

    অতঃ, ষোল বছর পর বাংলায় আবার উন্নয়ন, উচ্ছেদ ও বহিরাগত বিতর্ক। কিন্তু খেলার নিয়মটা একটু পালটে নিয়েছেন সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের অভিজ্ঞতালব্ধ তৃণমূল নেত্রী।

    উন্নয়ন

    প্রথমে একবার দেখে নিই, দেউচায় শিল্পের পক্ষে কী কী মতামত আছে।

    এক, এখানে সিঙ্গুরের মত উর্বর কৃষিজমি ধ্বংস করা হচ্ছে না; অধিকাংশ জমির জলধারণ ক্ষমতা কম ও ফসল হয় শুধু বর্ষায়।

    দুই, বেসরকারি শিল্প নয়, সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে শিল্প হবে।

    তিন, বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের সামিরুল ইসলাম প্রশ্ন করেছেন, যে এলাকা অনিয়ন্ত্রিত দূষণ ও সেই সূত্রে সিলিকোসিসের মত মারণ রোগের জন্য কুখ্যাত, সেখানে সরকারের সরাসরি ভূমিকা থাকা শিল্প প্রকল্পের বিরোধিতা কেন করা হবে? তিনি অবশ্য ক্ষতিপূরণের বিষয়টা ‘স্থানীয় বাসিন্দাদের সিদ্ধান্ত’ বলেছেন।

    চার, দেশে কয়লার উৎপাদন বাড়িয়ে বিদেশ থেকে আমদানি কমানোই তো কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি, কারণ এতে বিদেশী মুদ্রার খরচ কমবে। নিজের উৎপাদিত কয়লা দিয়ে রাজ্যের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো গেলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ মাসুল বৃদ্ধির সম্ভাবনা যেমন আটকানো যাবে, তেমনি প্রাথমিক ভাবে মাসুল কমানোও সম্ভব হবে।

    পাঁচ, মাটির নিচে কয়লা থাকা জমি অধিগ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারি আইনে যা বিধান, তার চেয়ে ভাল ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে এখানে। যাঁদের জমি বাড়ি রোজগারে আঘাত পরবে, তাঁদের স্বার্থ আগে নিশ্চিত করে তবে শিল্পের কাজ শুরু হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

    ছয়, ব্যাপক কোন প্রাকৃতিক জঙ্গল কাটা হচ্ছে না, যেটুকু জঙ্গল কাটা হবে, তা সামাজিক বন সৃজনের এবং তা আবার অন্যত্র লাগিয়ে দেওয়া হবে যথাযথ পরিমাণে।

    বিরোধিতার আপাতত তিনটি দিশা - উচ্ছেদ-বিরোধিতা, কয়লা শিল্পের বিরোধিতা ও সরকারের তরফে স্বচ্ছতার অভাবের সমালোচনা।

    প্রথম প্রসঙ্গে আসি। বৃহত্তর স্বার্থে উচ্ছেদ মানুষকে হতে হয় - রেল, সড়ক, খনিজ সম্পদ। প্রশ্নটা ন্যায্য ক্ষতিপূরণের। কিন্তু ক্ষতিপূরণ নিয়ে যদি একেক জনের একেক রকম মত হয়? যদি অধিকাংশ মানুষ তা অপছন্দ করেন, কোথাও না কোথাও বিরোধিতা হবেই। অধিকাংশ না হলেও, তা যদি একটা বড় সংখ্যার মানুষ হয়, ধরুন কয়েক হাজার, বিরোধিতা যথেষ্ট দানা বাঁধতে পারে। বীরভূমেই, ডিভিসি তার খাগড়া-জয়দেব খনি প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জমি থেকে আজ বেশ কয়েক বছর হল কাউকে সরে যেতে রাজি করাতে পারেনি, কারণ অধিকাংশই ক্ষতিপূরণের পরিমাণে সন্তুষ্ট নন। ভাঙ্গরেও পাওয়ার গ্রিড প্রকল্প দীর্ঘদিন আটকে ছিল।

    দেউচার ক্ষেত্রে, স্থানীয় মানুষদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। ক্ষতিপূরণ নিয়ে স্থানীয় আদিবাসী নেতৃত্বের একাংশ সরকারের সাথে দরকষাকষি চালিয়ে যাবেন বলে আপাতত মনে হয়। একাংশ উচ্ছেদ হওয়ার ঘোরতর বিরোধী। বিকল্প বাসস্থান, চাষ জমি কেমন হবে তা কে জানে?

    সরকার এখনও উচ্ছেদের কাজে হাত লাগায় নি। যাঁরা ক্ষতিপূরণে সন্তুষ্ট নন, তাঁদের ব্যাপারটা সরকার কিভাবে সামলায় তা এখনও দেখা বাকি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এই মুহূর্তে দেশ জুড়ে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কোন নেগেটিভ প্রচার চান না। পুলিশ নামিয়ে উচ্ছেদ করা হলে সিপিএম, বিজেপি, কংগ্রেস সবাই সাধ্যমত রাস্তায় নামার চেষ্টা করবে, যদিও তারা কেউই নীতিগতভাবে কয়লা খনির বিরোধী বলে জানায়নি। আবার এটাও ঠিক, কিছু মানুষকে অন্তত ধমকে চমকে রাজি করানো হতে পারে, বা ইতিমধ্যেই হয়েছে, এরকম আশঙ্কা বিভিন্ন মহলে আছে।

    সরকার আপাতত জমি অধিগ্রহণ করছে না, মালিকদের থেকে সরাসরি কিনে নিচ্ছে। সেই জন্যই, হয়তো, মানুষের সম্মতি নেওয়া শুরু হয়ে গেছে, চেক, কমপ্যাশনেট গ্রাউন্ডে চাকরির নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়ে গেছে; অথচ এখনও জমি অধিগ্রহণের কোনও নোটিফিকেশন জারি হয়নি। একজনের চারপাশের জমি বিক্রি হয়ে গেলে তাঁর পক্ষে কি বিক্রিতে সম্মতি না দিয়ে থাকা সম্ভব? অধিগ্রহণের তাস সরকার বাকি থাকা জমি নেওয়ার জন্য ব্যবহার করে কিনা তা দেখা এখনও বাকি।

    আরেকটি কথা হল, প্রসেনজিত বসু যে প্রশ্ন তুলেছেন, “ডিটেইল্ড প্রোজেক্ট রিপোর্ট, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ফরেস্ট ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার আগেই জমি জোগাড়ের কাজ শুরু হয়ে গেল?” বেশ কয়েক শ' বিঘা থেকে মানুষকে উচ্ছেদ করার পর যদি দেখা যায় প্রকল্পটির বিপুল খরচ তাকে অবাস্তব করে তুলছে?
    আবার সরকারি ব্যাখ্যা হল, এ রাজ্যে জমি জোগাড়ের প্রক্রিয়া এত জটিল যে দেউচার মত বিশাল পরিমাণ জমি পেতেই বছর দুই-তিন লেগে যাবে। যেহেতু অধিগ্রহণ আইনের জোরে জমি নেওয়া হবে না, তাই সেই প্রক্রিয়াতে আগে হাত দেওয়া হয়েছে। এর মাঝেই অন্যান্য প্রক্রিয়া চালু করে দেওয়া যাবে। জমির নিশ্চয়তা ছাড়া তো পুঁজি বিনিয়োগের নিশ্চয়তা আসবে না।

    তৃণমূল বরাবর-ই বলেছে, ২০১৩ সালের অধিগ্রহণ আইন কৃষককে যথেষ্ট সুরক্ষা দেয় না। এখন তারা বলছে আইন ছাড়াই তারা আরও বেশি সুরক্ষা দেবে। এই নতুন মডেলে-র প্রকৃত স্বরূপ দেখতে হয়তো আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।

    পরিবেশ ও অর্থনীতি

    এবার আসি দ্বিতীয় প্রসঙ্গে। পরিবেশ। বিশ্ব উষ্ণায়নের মুখে দাঁড়িয়ে নতুন এক বিশাল খনি খোলার যৌক্তিকতা। আগেই বলেছি, ভারত সরকারের নীতি হল, ধীরে ধীরে কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনা। গ্লাসগোর আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ভারত একথা জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে, অন্তত আগামী এক দশক, কয়লার উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি কমানোটাই নীতি।

    আপাতত, চীনের পরে, ভারত-ই বিশ্বে কয়লার সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী, আমদানি কারক ও উৎপাদক। নতুন সহস্রাব্দের শুরু থেকে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বিপুল ভাবে বাড়তে থাকায়, কয়লার চাহিদাও হুহু করে বাড়তে থাকে। দেশীয় জোগানের তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি হওয়ায় ক্রমশ বেড়েছে আমদানি। সেই সাথে বিদেশের বাজারে কয়লার মূল্য শেষ কয়েক বছর ধরে লাগাতার বেড়ে চলেছে। ২০১৯-২০ তে শুধু কয়লার আমদানিতে ভারত সরকার ১ লক্ষ ৫৮ হাজার কোটি টাকার বিদেশী মুদ্রা ব্যয় করেছে। ২০২১-এর শেষে এসে আমদানি করা কয়লার দাম দেশে উৎপাদিত কয়লার প্রায় তিন গুণে দাঁড়ায়।

    ভারতের পক্ষে এই বিপুল বিদেশী মুদ্রার খরচ কমাতে হলে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই, কারণ শক্তির চাহিদা আগামী বছর গুলিতে ক্রমশ বাড়বে। গ্লাসগো সম্মেলনের ঠিক পরেই দ্য ওয়্যার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি সংবাদে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সমস্ত শক্তি বিশেষজ্ঞ, যেমন সন্দীপ পাই, আর আর রশমী, টি জয়রামন, প্রায় একবাক্যে বলেছেন আপাতত কিছু বছর ভারতকে কয়লা পোড়াতেই হবে। আমি শক্তি বিশেষজ্ঞ স্বাতী ডি’সুজা, কোল ইন্ডিয়ার প্রাক্তন অধিকর্তা পার্থসারথি ভট্টাচার্যের মতামত জানতে চাওয়ায় তাঁরাও একই কথা বলেন।

    শুধু যে মানুষের বাড়িতে বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়বে তা নয় (মানুষের বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা তো বৃদ্ধি পাবেই), আরও অনেক নতুন শিল্প গড়ে ওঠার পর্যায়ে আছে দেশ। উন্নত দেশগুলির সাথে উন্নয়নশীল দেশের ফারাকের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণভাবেই, রাতারাতি কয়লা থেকে গ্রিন এনার্জিতে রূপান্তর ভারতের পক্ষে সম্ভব না। না আছে প্রযুক্তি, না আছে বিপুল অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার মত অর্থনীতির জোর। তাছাড়া, কয়লার সাথে এখনও দেশের এক বিপুল জনসংখ্যার কর্মসংস্থান জড়িত।

    বিকল্প কি? সৌরশক্তির খরচ কমছে ঠিকই, কিন্তু সৌর বিদ্যুৎ এখনও গ্রিড থেকে ব্যাপক পরিমাণে বিতরণ করার মত পরিস্থিতি নেই। বায়ুচালিত শক্তির ব্যাপারটিও তাই। তাহলে বিকল্প হাইড্রো বা নিউক্লিয়ার পাওয়ার। হাইড্রো পাওয়ার শুনলেই উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলির মানুষ আঁতকে ওঠেন। সম্প্রতি মণিপুরে গিয়ে দেখলাম ইথাই ও মাপিথেল ব্যারেজের প্রভাব। হাজার হাজার বিঘা জমিতে চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ঘনঘন বন্যা। একেবারে ক্ষুদ্র জলপ্রকল্প নিয়ে মানুষের বিরোধ বেশি নেই, কিন্তু তা দিয়ে অনেক মানুষকে বিদ্যুতের জোগান দিতে হলে অনেক সংখ্যায় গড়ে তুলতে হবে। তখন বিদ্যুতের খরচও তুলনায় বাড়বে।

    ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির মতে, ২০০০ সাল থেকে দুই দশকে ভারতে শক্তির ব্যবহার দ্বিগুণ হয়েছে। আগামী দুই দশকও ভারতেই শক্তির চাহিদা সর্বাধিক বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে ভারত, বিশ্বে শক্তির চতুর্থ বৃহত্তম গ্রাহক, চিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর। কিন্তু ২০৩০ সালের মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নকে টপকে যাওয়ার কথা ভারতের। প্রশ্ন হল, এই বিপুল চাহিদা কয়লা ছাড়া কিভাবে সম্ভব। যাঁরা বলছেন কোনও মতেই আর কোনও নতুন কয়লা খনি নয়, তাঁরা কি কোন বিকল্প প্রস্তাব দেখাতে পারছেন, যে আগামী দুই দশক দেশে ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা ও আমদানির কমানোর চাপ কিভাবে সামলানো সম্ভব দেশে স্বল্পমেয়াদী কিছু নতুন খনি চালু না করে?

    গত ছয় বছর ধরে (২০১৫-১৬ থেকে) ভারত গড়ে ২১৭ মিলিয়ন টন কয়লার আমদানি করেছে। এর মোটামুটি চার ভাগের এক ভাগ কোকিং কোল, বাকিটা নন-কোকিং। এর মধ্যে, কোকিং কোলের আমদানি বন্ধ করা কঠিন, কারণ তা এদেশে দুর্লভ। কিন্তু নন-কোকিং কয়লার আমদানি কমানো বা বন্ধ করা সম্ভব দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে। সেক্ষেত্রে, দেউচা যদি বছরে ২৫-৩০ মিলিয়ন টন উৎপাদন করতে পারে, তা কাজে আসে বইকি!

    এবার আসি রাজ্যের প্রসঙ্গে। বর্তমানে, প্রায় ৩,০০০-৪,০০০ টাকা প্রতি টন দরে রাজ্যকে প্রতিদিন প্রায় ২০,০০০ টন কয়লা কিনতে হয়। রাজ্য তার নিজের খনিতে কিন্তু মোটামুটি ২,০০০ টাকা প্রতি টন হিসাবে কয়লা উৎপাদন করতে পারে। রাজ্যকে কয়লা কিনতে না হলে বিদ্যুৎ মাসুল নিশ্চিতভাবেই কিছুটা কমা উচিত বলে বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের ধারণা। দেউচায়, বার্ষিক ২৫-৩০ মিলিয়ন টন উৎপাদন হলে তাতে রাজ্যের নিজের চাহিদা মেটার পরও অন্য রাজ্যকে বিক্রির মত উদ্বৃত্ত থাকার কথা।

    যাঁরা বলছেন কয়লা খনি চাইনা পরিবেশগত কারণে, তাঁরা এখনও মানুষকে বলতে পারেননি, নিয়মিত চড়া দামে কয়লা কেনার সঙ্কট থেকে পশ্চিমবঙ্গ অন্য কীভাবে মুক্তি পেতে পারে। বিদ্যুৎ মাসুল আরও বাড়ার সম্ভাবনা আর কীভাবে আটকানো যেতে পারে। তাঁরা অন্তত প্রস্তাবগুলি মানুষের সামনে তো রাখুন, জনমত তৈরি হোক। শুধু সৌর ও বায়ুচালিত শক্তির ওপর ভিত্তি করে এ সমস্যার সমাধান আগামী এক দশকেও সম্ভব না। রাজ্যে সমুদ্রের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্প অনেক দিন ঝুলে থাকার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল খরচ দেখে রাজ্য সরকার তা বাতিল করে দিয়েছে। আর যদি বিকল্প থাকে, তাহলে কোথায়, আন্দাজ কত খরচে, কী পরিমাণ ও কোন প্রযুক্তির ব্যবহারে রাজ্য তার প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের জন্য কয়লার চাহিদা কমিয়ে আনতে পারে, এমন কোন রূপরেখা কি বিরোধীরা শক্তি বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করে তৈরি করতে পারেন?

    যদি আমাদের রাজ্যের জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনার কথা বলি, কেন্দ্রীয় সরকার এ রাজ্যে মোট ২,৮৪১ মেগাওয়াট উৎপাদনের সম্ভাবনা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে, এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায় ৪৪১ মেগাওয়াট বা ১৫% আর আরও ১২০ মেগাওয়াট বা ৪% এর কাজ চলছে। অর্থাৎ, ৮০% বাকি আছে। এখন, সরকার যদি জলবিদ্যুতের কথা ভেবে ড্যাম বানাতে চায়? কালিম্পঙে ২০১৩-১৪ য় গড়ে ওঠা তিস্তা লো ড্যাম-৩ ও ২০১৬-য় চালু হওয়া তিস্তা লো ড্যাম-৪ এর প্রভাব দেখে দার্জিলিং-এ তিস্তা লো ড্যাম ১ ও ২ এর বিরোধিতা শুরু হয়। এখন যদি উত্তরবঙ্গে বা পুরুলিয়ার এক গুচ্ছ ছোট ছোট ড্যামের প্রকল্প নেয় সরকার, বিক্ষোভ হবে না?

    কী লাভ, লাভ কি?

    তাহলে কি হইহই করে সবার ঝাঁপিয়ে পড়া উচিৎ দেউচায় খনি বানানোর জন্য? না, কারণ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণ বা আমরা সাংবাদিকরা কিছু জানি না। এটাই তৃতীয় প্রসঙ্গ।
    প্রথমত, মুখ্যমন্ত্রী যে বলে দিলেন আগামী একশ বছর রাজ্যকে আর কয়লা কিনতে হবে না, এই বক্তব্যের সারবত্তা আছে কি? বাস্তব পরিস্থিতি বলে, এদেশে কয়লার প্রয়োজনীয়তা আগামী ২০-২৫ বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কয়লা সংক্রান্ত কোন পরিকল্পনা ২০৫০ এর বেশি মেয়াদী প্রেক্ষিতে দেখাটা অবাস্তব। ওই সময়ের মধ্যে দেশের অধিকাংশ কয়লা খনি ধাপে ধাপে বন্ধ হয়ে যাবে বলেই অধিকাংশ শক্তি বিশেষজ্ঞের ধারণা। দেউচায় ব্যাসল্টের কঠিন ও পুরু আস্তরণ ভেদ করে কয়লা উত্তোলনের পর্যায়ে পৌছনো ২০২৫-এর আগে সম্ভব না বলেই বিশেষজ্ঞদের মত। তাহলে হাতে থাকে পঁচিশ বছর। পঁচিশ বছরের সুফলের জন্য এই ৩৫,০০০ হাজার কোটি টাকার বিপুল বিনিয়োগ ও ২০,০০০ মানুষকে বাস্তু চ্যুত করা কি রাজ্যের জন্য আদৌ উপকারী হবে?

    পঁচিশ বছরের হিসাবটা আদৌ অবাস্তব লাগছে না। ২০১৭-র হিসাবে, জি-২০ ভুক্ত দেশগুলির মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার পরেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি ছিল ভারতে – ৭৫% বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপাদিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২১ এ সেটা ৬১% শতাংশে নেমে এসেছে বলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আর কে সিং জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ২০৩০ এর মধ্যে এটা ৫০% নামিয়ে আনা হবে। এখনও পর্যন্ত ভারত গ্রিন এনার্জির দিকে গতিতে এগিয়েছে, তা কিন্তু প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি এবং রিনিউএবল বা নবায়নযোগ্য শক্তি ক্ষেত্রে এদেশে বিপুল বিনিয়োগও হচ্ছে।

    এই পঁচিশ বছরে, দেউচার মত কঠিন খনিতে যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন তার বিপুল উৎপাদন খরচের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হলে বছরে ২৫-৩০ মিলিয়ন টন উৎপাদন ক্ষমতা থাকতেই হবে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজ্য সরকারের এক প্রাক্তন আধিকারিক আমাকে বলেছেন। এই পরিমাণটা যে কম না, তো বোঝার জন্য একটি তথ্যই যথেষ্ট, ২০২০-২১ এ, গোটা রাজ্যের সব খনি মিলিয়ে ৩৪.৫ মিলিয়ন টন কয়লা উৎপাদিত হয়েছিল। কিন্তু সরকার যদি ১০০ বছরের কথা ভাবে, তাহলে নিশ্চয়ই এত পরিমাণ কয়লা তারা বছরে তুলবে না। এবিষয়ে সরকারি পরিকল্পনা কি তা সরকার জানায় নি। ঠিক যেমন জানায়নি, কয়লা মন্ত্রক কোন শর্তে এই গোটা কোল ব্লকটি রাজ্যের হাতে তুলে দিয়েছে। নিঃশর্তে নিশ্চয়ই নয়।
    মুখ্যমন্ত্রী বলে দিয়েছেন মূল খনি ও অনুসারী শিল্প মিলে ১ লক্ষ কর্মসংস্থান হবে। পঁচিশ বছর ধরে এত মানুষের কর্মসংস্থান হলে সেটা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর খনন কাজে ও অনুসারী ক্ষেত্রে ঠিক কীভাবে এই কর্মসংস্থান সম্ভব, অনুসারী শিল্প বলতেই বা সরকার ঠিক কি বোঝাচ্ছে এবং তাতে, মোটামুটি কি কি শিল্পে কতটা কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা, এর একটা আপাত রূপরেখাও মানুষকে সরকার জানায়নি।

    তাছাড়া, পরিবেশের ওপর যে প্রভাব পড়বে, তা সরকার কীভাবে সামাল দেবে? কয়লা খনি নিয়ে পশ্চিম বর্ধমানের মানুষের যে খারাপ অভিজ্ঞতা, তার পুনরাবৃত্তি যে এখানে হবে না, তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? খনিতে আগুন লাগার সম্ভাবনা ও খনি পার্শ্ববর্তী এলাকায় ধস নামার আশংকা নিরসনের জন্যই বা কি ভাবছে সরকার? এই সব প্রশ্ন বিরোধীরা তুলেছেন। উত্তর আনতে পারেননি। কারণ, খালি চোখে আমার যা মনে হয়, সরকারের ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এত অস্বচ্ছতা ও অস্পষ্টতা নিয়ে এত বড় একটি প্রকল্প অন্য কোনও সরকার চালু করতে গেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো তথ্যের দাবিতে অনশনে বসে যেতেন।

    মোদ্দা কথা, স্থানীয় মানুষদের অধিকার সুনিশ্চিত করার বাইরেও যে প্রশ্নটি আরও বড়, উদ্যোগটি কি আদতে বৃহত্তর জনগণের জন্য লাভজনক, নাকি দীর্ঘমেয়াদী প্রশ্নগুলো এড়িয়ে শুধুই কিছু তাৎক্ষনিক লাভের আশায় এই বিপুল উদ্যোগ ও বিনিয়োগ?

    সরকার স্বচ্ছতা দেখাতে উদ্যোগী না হলে, তথ্য যদি বিরোধীরা না বের করে আনেন, জনগণ কিসের ভিত্তিতে তাঁদের মতামত গড়ে তুলবেন? বিরোধীরাও এখনও পর্যন্ত, আরটিআই বা অন্য কোনও মাধ্যমে, কোন তথ্য তুলে আনতে পারেননি। সরকারের পরিকল্পনার অভাব থাকলে তা তথ্য সহ তুলে ধরা বিরোধীদের কাজ। এখনও পর্যন্ত, বিরোধীরা শুধু অস্বচ্ছতার অভিযোগ করেছেন। প্রশ্নের উত্তর চেয়েছেন। সরকার দেয় নি। খেলা আপাতত ওখানেই ড্র’ হয়ে আছে।

    পুরোনো কাসুন্দি

    শেষে, অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও, গল্পটা বলি। দেউচায় আমি প্রথম বার যাই ২০১১-এর শুরুতে। আমাদেরকে কেন্দ্র করে এক ধুন্ধুমার ঘটে যায় সেবার।

    তখন জানুয়ারির শেষ বা ফেব্রুয়ারির শুরু। তার আগে বেশ কিছুদিন পাথর খাদান ও ক্রাশার ইউনিটগুলির মালিক-শ্রমিক দের সাথে স্থানীয় বেশ কিছু গ্রামের আদিবাসী বাসিন্দাদের তীব্র সংঘাত চলেছে দূষণকে কেন্দ্র করে। বেশ কিছু মাস বন্ধ থাকার পর, প্রশাসনের মধ্যস্থতায় দু’পক্ষের মধ্যে এক সমঝোতা হয়। তারপর আবার খাদান ও ক্রাশার চালু হয়েছে। খাদান ও ক্রাশারের মালিকদের একাংশ বেশ কিছু দূষণ বিধি মেনে চলছেন। আরেক অংশ ততটা মানছেন না। তবু, তখন দেউচায় শান্তির পরিবেশ চলছে বেশ কয়েক মাস ধরে। তাল বাঁধ গ্রামের মনিকা টুডু আমায় দেখালেন একটা বাবুই পাখির বাসা। বললেন, প্রায় বছর দশেক পর গ্রামে আবার বাবুই বাসা বেঁধেছে।

    আমি গিয়েছিলাম হিন্দুস্তান টাইমসের সাংবাদিক হিসাবে। মূলত বীরভূম আদিবাসী গাঁওতার নেতৃত্বে হওয়া দূষণ বিরোধী আন্দোলনের কি ফল হল তা সরেজমিনে দেখতে। তখন রবীন ও সুনীল সরেন এক সাথে। কোনও একটা গ্রামে, রবীন আমায় নিয়ে গেছেন দূষণ বিধি মানছে না এমন একটি ক্রাশার ইউনিট দেখাতে। উনি ইউনিটের কাছে যান নি, পার্শ্ববর্তী গ্রামে ছিলেন। আমি আর চিত্র সাংবাদিক প্রতীক চৌধুরী ক্রাশারের কাছে গিয়ে ছবি তুলছিলাম। প্রতীক দা একটু দূরে, আমি ক্রাশারের কাছে। হঠাৎ বাইকে উদয় দুই যুবকের; পিছনের জন তাঁর কোমরে গোঁজা ‘চেম্বার’টি দেখালেন, আর সামনের জন বললেন কথা না বাড়িয়ে আমার ক্যামেরাটি তাঁর হাতে তুলে দিতে। আমি একবার আড় চোখে প্রতীক দার দিকে তাকিয়ে দেখি সে ক্যামেরা আমাদের দিকে তাক করে রেখেছে। আমি আর কথা না বাড়িয়ে, পিছন ঘুরে, আদিবাসী গ্রামটির দিকে দৌড় লাগাই। ওরা বাইক একবার স্টার্ট দিয়েও, বুঝতে পারি, আর এগোয় না।

    এদিকে আমাদের দু’জন কে হাঁপাতে হাঁপাতে গ্রামে ঢুকতে দেখে গ্রামবাসীরা আমাদের ঘিরে ধরেন। কি হয়েছে? আমরা জানাই। কেউ রবীন সরেন কে ডেকে আনেন। ইতিমধ্যে অনেক ফোনাফুনি শুরু হয়ে গেছে। সাঁওতালিতে কথা হচ্ছে বলে আমি অনেক কিছুই বুঝছি না। তার পর দেখি গ্রামের মাঝখানে বেশ কিছু মানুষ তির ধনুক নিয়ে জড়ো হলেন। আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম। এরা আবার পাল্টা হামলা করতে যাচ্ছে নাকি! আমাকে কয়েক জন বলে দিলেন, দিকে দিকে রাস্তা অবরোধ হবে। একে আমরা তাঁদের অতিথি, আমাদের বন্দুক দেখিয়ে ভয় দেখানো হয়েছে এই অপমান তাঁরা কিছুতেই মেনে নেবেন না। দ্বিতীয়ত, ওঁরা জবাব না দিলে ক্রাশার মালিকরা আরও পেয়ে বসবে। আমরা কি বলব বুঝে ওঠার আগেই আমাদের দু’জনকে ওঁরা একটা দোতলা বাড়িতে ঢুকিয়ে দিলেন। আমরা যেন না বের হই।

    মিনিট চল্লিশ বা ঘণ্টা খানেক হবে, অচেনা নম্বর থেকে একটা ফোন এলো। বললেন, মহম্মদ বাজার থানার ওসি বলছি, আপনারা কোথায়? আমি ওনাকে চিনতাম না, বললাম গ্রামে আছি। উনি বললেন, গ্রামেই থাকুন যাবেন না, প্লিস। আমি আসছি একটু পরে। চারিদিকে ধুন্ধুমার লেগে গেছে। একাধিক জায়গায় রাস্তা অবরোধ, ক্রাশারে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি বললাম, নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা আছি। আধ ঘণ্টা মত পরে আবার ফোন। “আছেন তো?” বললাম, হ্যাঁ। “আর কিছুক্ষণ থাকুন, ডিএম সাহেব আসছেন। আপনার সাথে দেখা করতে চান।” বুঝলাম, গণ্ডগোল গুরুতর আকার নিয়েছে। খানিক পরে এলেন জেলাশাসক সৌমিত্র মোহন, সাথে পুলিশ সুপার ও বিশাল সিআরপিএফ বাহিনী। আদিবাসী নেতৃত্বের সামনে দাঁড়িয়ে শুনলেন আমাদের কি অভিজ্ঞতা হয়েছিল। জিজ্ঞেস করলেন, আমরা লিখিত অভিযোগ করতে চাই কিনা। বললাম, হ্যাঁ। ওনার নির্দেশে মহম্মদ বাজার থানার ওসি আমাদের লিখিত অভিযোগ ওখানেই নিয়ে নিলেন। বোঝা গেল, সিআরপিএফ আপাতত এলাকাতেই থাকবে।

    হাসি মুখে আমাদের ‘এস্কর্ট’ করে হোটেলে পৌঁছে দিলেন গাঁওতার সদস্যরা।
    আবার বেশ কিছুদিনের জন্য বন্ধ ছিল খাদান-ক্রাশার।
    তারপর দূষণ আরও নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল।

  • | বিভাগ : আলোচনা | ২১ মার্চ ২০২২ | ৬৬৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন