ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হোটেল ম্যানেজার - ১

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৬ জানুয়ারি ২০২২ | ৩২০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • দুলালবাবু এই তিলোত্তমা লজে ম্যানেজারি করছেন প্রায় দশ বছর। মাস গেলে হাতে পান পনের হাজার টাকা। দোতলা আর তিনতলা মিলিয়ে তেরোটা ঘর। একতলায় ভাতের হোটেল। সবকিছুই দেখভাল করতে হয় দুলালবাবুকে।

    দুলালচন্দ্র সরকারের বাড়ি কলকাতায়, বরানগরে। তার দুই মেয়ে। দুজনই বিএসসি পড়ে বিদ্যাসাগর কলেজে। একজন ফার্স্ট ইয়ার, আর একজন থার্ড ইয়ার। একেবারে পিঠোপিঠি দুই বোন।

    এত স্বল্প বিরতিতে এদের নিয়ে আসা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীতে কম মনোমালিন্য হয় নি। পয়সাকড়ির টানাটানি মানুষের জীবনে নানা তিক্ততা সৃষ্টি করে। অর্থকষ্ট আজও ঘোচে নি। তবে দুই গুণী মেয়ে সংসারকে শান্তিতে ভরিয়ে রেখেছে। পড়াশোনায় নিষ্ঠা ছাড়াও দুই বোনই গলায় জন্মগত সুর নিয়ে জন্মেছে। এ পাড়া ও পাড়ার ছোটখাটো অনুষ্ঠানে প্রায়ই ডাক পড়ে ঈশিতা আর প্রিয়াঙ্কার।

    দুলালবাবুর বৌ শর্মিষ্ঠার শরীরটা মোটে ভাল যায় না। হাঁফানির টান ওঠে মাঝেমাঝেই। শীতের দিকে বাড়ে। বাতের ব্যথাও কাবু করে ফেলেছে বেচারিকে। কাঁথি থেকে ফোনে খোঁজখবর নেয় দুলাল। পনের দিনে একবার বাড়ি আসে। তার বেশি সম্ভব হয় না। ঘড়িঘড়ি যাতায়াত করতে খরচও তো আছে।পয়সার চিন্তা মাথায় ঘোরে অষ্টপ্রহর। দুই মেয়ে বিয়ের যুগ্যি হয়ে উঠছে। টাকার সংস্থান কোথা থেকে হবে ভেবে কূল পায় না দুলাল।

    দুলালের প্রায় আটচল্লিশ বছর বয়েস হল। বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়েছে জীবনে। এখনও লড়াই ছাড়েনি। সে মনে করে শেষ লড়াইটা দেওয়া এখনও বাকি আছে। অগাধ জলে এখনও ভাসছে ঠিকই। তবে মনে মনে তার স্থির বিশ্বাস যে পায়ের তলায় মাটি একদিন পাবেই। খড়কুটো দেখলেই সে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে। কেউই ফেলনা নয়। কোথায় কার সাহায্য লেগে যায় কে বলতে পারে !

    তিলোত্তমা লজে নিয়মিত বোর্ডার আছে জনা চারেক। তারা শনিবারে হাওড়া বা কলকাতায় যায়। আবার সোমবার ফিরে আসে তিলোত্তমায়। হপ্তাভর এই লজই তাদের ঘরবাড়ি। দুলাল সরকার থেকে লজের সুইপার পর্যন্ত তাদের দহরম মহরমের সঙ্গী। সারা সপ্তা কাটে এদের নিয়ে।

    এমনই একজন হল নিখিল দাস। নিখিল স্থানীয় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে চাকরি করে। সে তৃতীয় শ্রেণী স্তরের কর্মচারি বটে তবে তাকে ছাড়া এখানকার এই ছোট শাখা অফিস অচল। বলতে গেলে নিখিলই এই দপ্তর চালায়। ইংরীজিতে কুইড প্রো ক্যুও বলতে যা বোঝায়, মানে কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হয় — এই নীতিতে বিশ্বাসী নিখিল। প্রতিদানটা ক্যাশ-এ দিতে অপারগ হলে, কাইন্ড-এ দিলেও চলবে। আর এই কাইন্ড-টা কোন তরুণী বা যুবতী হলে অবশ্যই তার শরীর। তার এই গিভ অ্যান্ড টেক নীতির ব্যাপারে নিখিলের কোন ঢাক ঢাক গুড় গুড় নেই। নিখিলের এই স্বভাবের কথা তার স্ত্রী এবং দুই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েও জানে।

    উপঢৌকনের বিনিময়ে সুযোগ দেওয়া বলতে গ্রামের বা সদরের নি:সহায় গরীব কোন উৎকন্ঠিত চাকুরিপ্রার্থীর এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ নম্বরটা কোথাও কোন রিক্রুটমেন্ট নোটিশ বেরোলে সেখানে ফরোয়ার্ড করে দেওয়া। নিখিলের সাহায্যপ্রার্থীরা তাতেই কৃতার্থ।

    তবে নিখিল কিন্তু লোক খারাপ না। সে উপরি রোজগারপ্রবণ বটে, কিন্তু অন্য লোকের সুখ দু:খে যতটা সম্ভব তাদের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করে। দুলালের আর্থিক টানাটানি সে উপলব্ধি করতে পারে। দরকারে দুশো পাঁচশো দুলাল অনেকবারই নিয়েছে নিখিলের কাছ থেকে। নিখিলের বড় গুণ হল সে কখনও টাকা ফেরত দেবার জন্য তাগাদা করে না। সুবিধেমতো একসময়ে দিলেই হল। নিখিল দাসের মোদ্দা কথা হল, ‘পুরুষমানুষের হাতে পয়সা না থাকলে ,পরিবারে বল, সমাজে বল তার কোন সম্মান নেই। যে করেই হোক, ভালরকম পয়সা কামাতেই হবে তোমাকে , বুঝলে দুলালদা’
    — ‘ আর ওই গরীবের মেয়েগুলোকে যে চটকাচ্ছিস অবস্থার সুযোগ নিয়ে....সেটার কি সাফাই দিবি ?’ দুলাল মাঝে মাঝে রাগ ঝাড়ে নিখিলের ওপর।
    — ‘ ও : , তোমরা ওই নিয়ে পড়ে আছ। আমি কার পাকা ধানে মই দিচ্ছি শুনি। একটু এনজয় করলে ক্ষতিটা কি? আমি কি কাউকে জবরদস্তি কিছু করছি নাকি? ওরা তো নিজে থেকেই আসে। কোন এনজয় না করে তোমরা যে কি করে জীবন কাটাও ভগবান জানে। আমার বৌও আমার স্বভাব সব জানে। শুধু গোছা গোছা নোট পেলেই সে মহিলার দিল খুশ।’

    দুলাল আর বেশি ঘাঁটায় না নিখিলকে। কখন তার কাছে হাত পাততে হবে ঠিক নেই। তাছাড়া সে তো অনেক কিছুর সঙ্গে আপোষ করেই টিকে আছে এ লজে। মালিকের হুকুম, যে করে হোক লাভ বাড়াতে হবে হোটেলের। নইলে এ ব্যবসা গুটিয়ে নেবে। ব্যবসা গুটিয়ে নেবার কথা শুনলেই বুক ধড়ফড় করে দুলালের। দু দুটো মেয়েকে পাত্রস্থ করতে হবে।

    মালিকের অলিখিত নির্দেশ দেওয়া আছে যত বেশি সম্ভব খেপ মারা মেয়ে তুলতে হবে ঘরগুলোয়। টুরিস্ট হোক, কারবারি লোক হোক খদ্দেরের অভাব হবে না। আর লজের রেগুলার কাস্টমার তো অন্তত দু চারজন আছেই। মেয়েছেলের টান কার না আছে। মেয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকলে ভাড়া দুগুন। খদ্দেরের রেস্ত বুঝে আরও বেশি নেবারও নির্দেশ আছে। ফূর্তি করার দাম তো দিতেই হবে।

    সুভাষ ঘোষ আয়ুর্বেদিক ওষুধের ব্যবসা করে। কাঁথিতে বড় পার্টি আছে তার। প্রতি সপ্তাহে আসতে হয়। তিলোত্তমার বাঁধা খদ্দের। বরাবর এই লজেই ওঠে। তাস খেলার খুব নেশা। হোটেলের তিনজন কর্মচারী গৌতম, সুরেশ আর ননীগোপালকে নিয়ে দুপুর তিনটের পরে তাস খেলতে বসে টি ভি-র পাশে পাতা একটা চৌকির ওপর বসে। দুলালকে ক্যাশ কাউন্টারও সামলাতে হয় ওই ঘরেই। চারটে নাগাদ খাবার হোটেলের পাট চুকলে দুলাল কাউন্টারে বসে একটু খবরের কাগজে চোখ বোলায়।
    সুভাষ ঘোষ পার্টনার না পেলে দুলালকে ডাক দেয় — ‘ দুলালদা হাত খালি হয়েছে ? বসবেন নাকি এক রাউন্ড।’
    দুলালের তাস খেলতে বিশেষ ভাল লাগে না। বলে, ‘ না না তোমরা খেল.... আমার এখন হবে না। পার্টনার না হলে বাপিকে ডেকে নাও।’

    বাপি লজের চাদর বিছানা কাচাকুচি লন্ড্রি টন্ড্রির কাজ সামলায়। আবার মিল টাইমে নীচের হোটেলে ভাত ডাল তরকারি সার্ভ করে।একটা পনের বছরের ছেলে।রামনগরে বাড়ি। তার সৎ বাবা এখানে এই লজে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে, তাদের গ্রামেরই একজনের উমেদারিতে। জীবনে কখনও স্নেহ ভালবাসা পায়নি। ব্রিজ খেলায় এই বয়েসেই তুখোড় হয়ে উঠেছে। পারদর্শী হয়ে উঠেছে আরও অনেক ব্যাপারে। লজে আমদানি হওয়া পঁচিশ তিরিশ বছরের মেয়ে নিয়ে শোয়া অভ্যেস করে ফেলেছে। কোন ঘরে দরকার পড়লে বোতল এনে দেয়। শাঁসালো বোর্ডার হলে ভাল বকশিস মেলে। ও নিজেও চাখবার সুযোগ পায়। গুণের শেষ নেই।

    এতে অবশ্য কারো কোন বিকার নেই এখানে। সুভাষ বা নিখিল বড় জোর বলে— ‘ বড় এঁচড়ে পাকা ছোঁড়া .... ‘। তাতে প্রশ্রয়ের সুর স্পষ্ট। এসব কান্ড দেখে প্রথম দিকে গা ঘিন ঘিন করলেও এখন গা সওয়া হয়ে গেছে দুলালের।

    এছাড়া আর একজন বাঁধা বোর্ডার আছে। আশিস সামন্ত।প্যারামেডিক্যাল ডাক্তার বলা যায়। দোতলায় এগারো নম্বর ঘরটা তার জন্য বাঁধা। একেবারে নিজস্ব ঘর হয়ে গেছে এ ঘরটা। একটানা পনের দিন থাকে তিলোত্তমায়। তার পর দুদিনের জন্য কলকাতায় বাড়ি যায়। ফিরে এসে আবার একটানা দু সপ্তাহ। এখানে তার পশার রীতিমতো ভাল। এগারো নম্বর ঘরে বসেই নানারকম রুগীর চিকিৎসা করে। ওষুধ পত্তরের কোন পাট নেই। কি সব যন্ত্রপাতি দিয়ে শরীরের নানা উপসর্গ দূর করে। ছেলেমানুষ বয়েস। এই ছাব্বিশ সাতাশ হবে।লোকে ওর চিকিৎসায় নিশ্চয়ই উপকার পায়, না হলে এত রুগী আসবে কেন ! বড় ভাল ছেলে।নিজের কাজে অখন্ড নিষ্ঠা। কোন বাজে অভ্যেস বা নেশা কিছু নেই।

    ছেলেটাকে দুলালের খুব ভাল লাগে। আশিস সামন্ত দুলালকে বেশ কয়েকদিন তার নিজস্ব চিকিৎসা দিয়েছে সম্পূর্ণ বিনাপয়সায়। তাতে বেশ কিছুটা আরাম হয়েছে তার মাইগ্রেনের যন্ত্রনার। কোন টাকাপয়সা নেয়নি আশিস।

    থানার বড়বাবু কমলেশ্বর হাজরা মাসে দুদিন তিলোত্তমা লজে বেড়াতে আসেন। চা টা খান।দুলালবাবুর সঙ্গে গালগল্প করেন। বড় অমায়িক মানুষ। মুখ ফুটে কিচ্ছু বলেন না। চা সিঙ্গাড়া খেতে খেতে বলেন, ‘ আমার কিছু ব্যাপার নয় ...... লজের ঘরে মেয়ে ধরা পড়লে কিন্তু ওপরতলায় খবর হয়ে যায়। আমাদের কিছু করার থাকে না। খুব মুশ্কিলের ব্যাপার .... ‘
    দুলালের যথেষ্ট বুদ্ধি পেকেছে এতদিনে। এ সব কথার লব্জ ঠিক ধরে নেয়। একগাল হেসে বলে, ‘ আপনার ওপরই তো সব ছেড়ে দিয়ে বসে আছি। রাখলে রাখবেন, মারলে মারবেন।’
    কমলেশ্বর এই কথাটাই শুনতে চায়। নরম স্বরে বলে, ‘ আমার একার ব্যাপার তো নয়। খাওয়ার পার্টি লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফাঁসানোর লোকের তো অভাব নেই..... তাই আর কি.... মাখনলালবাবু সবই জানেন... ‘
    মাখনলাল শীল হল লজের মালিক। কলকাতায় বালিগঞ্জে থাকেন।
    — ‘ হ্যাঁ স্যার সবই বুঝি। আপনি আছেন বলেই আমরা করে খাচ্ছি। ওসব ব্যাপারে কিচ্ছু চিন্তা করবেন না স্যার। মালিকের সঙ্গে প্রতিদিনই আমার ফোনে কথা হয়। ‘
    টাকার প্যাকেট তৈরিই থাকে। পনের হাজার করে মাসে দুবার। ওটা পেয়ে গেলে বড়বাবু আর বেশিক্ষণ বসেন না। বলেন, ‘ আচ্ছা আজ তা’লে উঠি। একটু নাচিন্দার দিকে যেতে হবে। গড়বড় কেস আছে। যত্ত ঝামেলা। আচ্ছা ঠিক আছে ..... সময় পেলে এর মধ্যে আবার একবার ঘুরে যাব অখন...’
    — ‘ হ্যাঁ স্যার অবশ্যই আসবেন। যখন খুশি আসবেন।একটু চা খেয়ে যাবেন।’
    প্রতিবারই নিখিলের কথা মনে পড়ে — হাতে পয়সা না থাকলে সংসারে বল, সমাজে বল পুরুষ মানুষের কোন ইজ্জত নেই।

    বিকেলের দিকে বড় মেয়ের ফোন এল— তার মায়ের শরীর খুব খারাপ হয়েছে কদিন ধরে। একদিন অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।প্রায় পাঁচ মিনিট ছিল ওই অবস্থায়। এছাড়া হাঁফানির কষ্ট তো আছেই।তার ওপর বেড়েছে বাতের ব্যথা। খাওয়া দাওয়া একদম করতে চাইছে না। মেয়ে বলল, দুলালের একবার বাড়িতে আসা দরকার। তারা দুই বোন কি করবে বুঝতে পারছে না।

    ভীষণ উৎকন্ঠা গেড়ে বলল দুলালের মনে। শর্মিষ্ঠার অসুস্থতার ব্যাপার তো আছেই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি উদ্বেগ তেমন গম্ভীর কিছু হলে চিকিৎসার খরচ সামলানো নিয়ে। কিন্তু এখন কলকাতায় যেতে হলে আগে দরকার মাখনবাবুকে ফোন করে ছুটি মঞ্জুর করা। স্কুল কলেজে গরমের ছুটি পড়েছে।দীঘা রুটের ট্যুরিস্টদের ভরা কোটালের সময়। এই সময়ে মাখনবাবু ছাড়তে রাজি হবে কিনা সন্দেহ আছে। আর টাকাপয়সার কথা তুললে বড়জোর অগ্রিম কিছু মাইনের টাকা দেবে। তাতে আর কি সুরাহা হবে। ওই কটা টাকা মাইনে থেকে যদি পরের মাসে অ্যাডভান্সের টাকা কাটে তাহলে আর হাতে কি থাকবে !

    দুলালের শুকনো মুখ দেখে নিখিল বলল, ‘ দুলালদা তোমারশরীর খারাপ নাকি ?’
    সব শুনে বলল, ‘ মাখনবাবুকে ফোনে জানিয়ে দিয়ে তুমি কাল সকালেই বাড়ি চলে যাও। গৌতম আর ননী মিলে এখানকার কাজ সামলে নেবে।’
    দুলাল মাথা নীচু করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘ হ্যাঁ সে তো যাব .... কিন্তু....’
    নিখিল দাস জাগতিক ব্যাপারে অত্যন্ত পোড় খাওয়া লোক। দুলালের মানসিক পরিস্থিতি সহজেই আঁচ করে নিল — ‘ ওসব নিয়ে তুমি একদম চিন্তা কোর না।আমি আছি তোমার পাশে। বিপদের সময়ে যদি পাশে থাকতে না পারি তা’লে আর কিসের .... ইয়ে.... তুমি বৌদির থরো চিকিৎসা করাও। টাকা আমি অ্যারেঞ্জ করব। কোন চিন্তা কোর না। তুমি কাল সকালেই বেরিয়ে যাও। ‘
    দুলাল সরকার হাঁ করে তাকিয়ে রইল ঘুসখোর লম্পট নিখিল দাসের মুখের দিকে।

    পরের দিন ভোরবেলা কাঁথি বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল দুলাল। দুটো বাস পরপর দাঁড়িয়ে আছে। একটা হাওড়া যাবে, একটা ডানলপ। দুলাল ডানলপের বাস ধরবে। পৌনে ছটা বেজেছে। দুটো চায়ের দোকান বাদে আশপাশের দোকানপাট খোলেনি এখনও।এই সাতসকালেও বাসে ওঠার বেশ লম্বা লাইন পড়েছে। দুলাল পনের ষোল জনের পরে দাঁড়িয়ে আছে। ছটা থেকে লোক তোলা শুরু হবে। জানা গেল ছটা কুড়িতে বাস ছাড়বে।একটা প্রায় ফাঁকা বাস দীঘার দিকে বেরিয়ে গেল। দুলাল ভাবল চায়ের দোকান থেকে একটু চা খেয়ে নেবে কিনা। পেছনের লোকটা দুটো বড় সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুলাল সরকার তাকে বলল, ‘ দাদা আমার লাইনটা রইল..... আমি একটু চা খেয়ে আসছি .... ‘। লোকটা সম্মতিসূচক ভঙ্গীতে মাথা নাড়ল।
    চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসে একটা চা দিতে বলে দুটো বিস্কুট নিল। আনমনে নানা কথা ভাবছিল। বাড়ি ফিরে শর্মিষ্ঠাকে কেমন অবস্থায় দেখবে তা নিয়ে নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়।বাড়িতে একটা কল দেবে কিনা ভাবছে।

    হঠাৎ দেখল বার্মুডা আর গেঞ্জি পরা একটা বছর পনেরর ছেলে ছুটতে ছুটতে আসছে।
    ‘এঁচড়ে পাকা’ বাপি চায়ের দোকানের সামনেই দুলালের দেখা পেয়ে গেল।
    — ‘ দুলাল জেঠু তুমি কলকাতায় যাচ্ছ ? কাল রাত্তিরে শুতে যাবার সময়ে শুনলাম কথাগুলো। তুমি কিছু চিন্তা কোর না। আমরা সবাই আছি তোমার সঙ্গে। এই যে ... এইটা দেবার জন্যে ছুটে ছুটে এলাম ...’ বলে পলিথিনের মোড়কের একটা প্যাকেট দুলালকে দিল। ‘ .... এই এটা সুভাষ ঘোষদা দিয়েছে। তার নিজের কোম্পানির অায়ুর্বেদিক ওষুধ। আমার মনে হয়, এগুলো খেলে জেঠিমা নিশ্চই ভাল হয়ে যাবে।’

    দুলাল জানলার ধারে সিট পেয়েছে। সাড়ে ছটা নাগাদ ড্রাইভার বাসে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিল। ডান দিকে ঘুরে রাস্তায় উঠছে গাড়ি। দুলাল দেখতে পেল খানিক তফাতে ওই চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাপি। দুলালের জানলার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে বাপে তাড়ানো মায়ে খেদানো বাপি লস্কর।

    দুলালের ইচ্ছে হতে লাগল বাসের জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বাপির হাতটা জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু দুলাল বুঝতে পারল তার হাত অত লম্বা নয়। পকেট থেকে রুমাল বার করে সে চোখে চাপা দিল।

    ( ক্রমশঃ )
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ১০:০৩503539
  • "দুলাল সরকার হাঁ করে তাকিয়ে রইল ঘুসখোর লম্পট নিখিল দাসের মুখের দিকে।"
     
    মানুষের এই বৈপরীত্য এখনো বিস্ময়কর। রীতিমতো পাকা হাতের লেখা,  রিপোর্টাজ লেখনি স্টাইল। পরিস্থিতির বিবরণ আরও বিস্তারিত হলে ভাল হতো। 
     
    লেখকের গ্রাহক হলাম, পুরো ধারাবাহিক পড়ার আগ্রহ রইলো। শুভ 
  • Anjan Banerjee | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ১১:২০503544
  • ধন্যবাদ
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন