ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অমৃতের মৃত্যু (বড়গল্প)

    Pranab Basu লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ৪০৩ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • (‘বাইশ গজের বাইরে’ শারদীয় ১৪২৮ সংখ্যায় প্রকাশিত, লেখকঃ বিশুপাল)
     
    (১)
     
    চশমার কাচটা থেকে থেকে ভিজে উঠছে।
     
    আকাশের মিডফিল্ডে বিকেল এখন ফুল ফর্মে, এই মাঝ অক্টোবরেও আগ্রাসী হৈমন্তী সন্ধেকে যথাসাধ্য ডি-বক্সের বাইরে ঠেকিয়ে রেখেছে। দুটো পানকৌড়ি অস্তরাগের আভা ডানায় মেখে জলের সীমানা বরাবর ওড়াউড়ি করছিল। সেদিকে আনমনে তাকানো অবস্থাতেই ধুতির খুঁটে আলগোছে চশমার অবতলগুলো মুছে নিলেন নবীনবাবু। কাচে বাষ্প লেগে থাকলে বরাবর বড্ড অস্বস্তিতে ভোগেন তিনি, সেই কৈশোর থেকেই।
     
    এ নিয়ে কম গঞ্জনা তো শুনতে হয়নি লতিকার কাছে। বাবার আদর্শে আশৈশব তিনি ভারি টিপটপ আর পরিচ্ছন্ন। শার্টের কলারে কোথাও এতটুকু ময়লা, কিংবা প্যান্টের ঘেরে শুকিয়ে যাওয়া ঘামের নুনদাগের আভাস--- ব্যস, পাঠাও আবার সদ্য কাচা হয়ে আসা জামাকাপড় ধোপাবাড়িতে। নিত্য বিলু ধোপার বাঁকা টিপ্পনী শুনতে শুনতে লতিকারও প্রাণ ওষ্ঠাগত। দু’দিক সামাল দিতে পরের দিকে নিজেই নবীনবাবুর কাচা জামার উপর এক প্রস্থ বুরুশ চালিয়ে দিত। সংসার খরচ আর স্বামীরত্নটির পরিষ্কার-বাতিক… এক ঢিলে দুই পাখি বধ।
     
    ঐ একটাই দুর্বলতা ছিল বোধহয় তাঁর এগারো বছরের সহধর্মিণীর। ‘সুগৃহিণী’ তকমায় এতটুকু সংশয়ের দাগ লতিকা মোটে বরদাস্ত করতে পারত না।
     
    বুকের খাঁচা খালি করে অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। সে আওয়াজে সচকিত হয়েই বুঝি বা পানকৌড়ি দম্পতি উড়ে যায় আরও নিভৃতে।
     
    ‘ছিল’, ‘এগারো বছর’--- কেমন সহজেই আজকাল ফেলে আসা বর্তমানকে অতীত বলে মেনে নিতে পারছেন তিনি। আগে যাও বা মনের সাথে অক্ষম লড়াই করতেন রূঢ় বাস্তবটাকে প্রত্যাখ্যান করার, এখন সেটুকুও ঘুচেছে। বুক নিংড়োনো ঐ দীর্ঘশ্বাসে এসে ঠেকেছে তাঁর যাবতীয় প্রতিরোধ।
     
    লেকের বুক থেকে হঠাৎ উড়ে আসা এক আঁজলা জলের ছিটেয় কোমর থেকে শরীরের উপরিভাগের প্রায় সমস্তটা ভিজে যেতে মুহূর্তেই অতীতচারণ থেকে পূর্ব কলকাতার উপান্তে সুভাষ সরোবরের তীরে ফিরে আসেন নবীনবাবু। সাঁতারের সিজন এটা নয়, আর এমনিতেও গত ক'বছর থেকে চারিদিকে যা মারণব্যাধির প্রকোপ দেখা দিয়েছে তাতে টিমটিম করে চলতে থাকা এ অঞ্চলের সুইমিং ক্লাবগুলোর বেশিরভাগই পাকাপাকিভাবে ঝাঁপ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। মাস্ক পরে আর যাই হোক গেঁড়ি গেঁড়ি বাচ্চাগুলো ফ্রিস্টাইল কিংবা বাটারফ্লাই শিখতে পারবে না। সরকারি বিধিনিষেধ মেনে সরোবর কর্তৃপক্ষও সুযোগ বুঝে ‘নো ডিপ উইদাউট পারমিশন’ বোর্ড ঝুলিয়েছেন, সাথে বন্ধ হয়েছে ক্লোরিন-ব্লিচিং ছড়ানো। অস্বাস্থ্যকর ঘোলাটে জলে মাছেদেরও বুঝি নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়!
     
    তবে চৌদ্দ-পনেরোর বখাটে বাপে-তাড়ানো-মায়ে-খেদানো ছেলেপুলেদের কাছে এসব তুচ্ছ জাগতিক ব্যাপার আবার কবে থেকে বাধা হল? একের পর এক সব রান-আপ নিয়ে ছুটে আসছে পাকা অলিম্পিক লং ডাইভারদের মত। লেকের কিনারে এসে লিকলিকে শরীর পাকিয়ে শূন্যে লাফিয়ে ওঠা ছিলে ছেঁড়া ধনুকের ভঙ্গিতে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই প্রবল জলোচ্ছ্বাস আর সমবেত উল্লাসের মাঝে কিশোর ডাইভারের অভিবাদন গ্রহণ। অবতরণ যদিও কারওরই ঠিক অলিম্পিয়ান-সুলভ নয়। সে খামতি অবিশ্যি অভিবাদনের রকমারি কায়দায় পূরণের চেষ্টায় এতটুকু ত্রুটি থাকে না।
     
    নিটফল, নবীনবাবুর পরনের ঘিয়ে রঙা পাঞ্জাবিটা ভিজে একসা। চশমাতেও লেগেছে অবাধ্য জলের ফোঁটার স্পর্শ।
     
    ডাইভিং দেখতে ব্যস্ত চোখদুটো লেকের দিক থেকে না সরিয়ে প্রতিবর্তের তাড়নায় ধুতির কোঁচা হাতড়াতেই গণ্ডগোলটা টের পেলেন তিনি। পাঞ্জাবির সাথে ধুতিটাও ভেজার হাত থেকে রেহাই পায়নি। অগত্যা শেষ ভরসা, পকেটে ভাঁজ করে রাখা রুমাল। লতিকার অনেক যত্নে ফুটিয়ে তোলা ফুল আর তার কোলে তাঁর নামের আদ্যক্ষর ‘এন’কে বুকে নিয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। চশমা মুছতে উদ্যত হাত হঠাৎই থমকে যায়।
     
    “এঃ, একেবারে ভিজে থৈ থৈ দশা যে, নস্করদা?” কল্যাণের ডাকে সংবিৎ ফেরে তাঁর, “এত ধারে এসে বসেছেন কেন?” প্রশ্নকারী তার প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই এসে পাশের জায়গাটা দখল করে।
     
    “এই একটু… তোমার ভাইপোর খোঁজ পেলে?”
     
    “না-নাহ্‌, বেকার যাওয়া। সে কবেকার কথা, এতদিন ধরে কি আর কেউ এক ভাড়াবাড়িতে থাকে? অচেনা লোকজন চরে বেড়াচ্ছে, একটা গোডাউন মার্কা কী যেন বানিয়েছে সামনের দিকটায়। বিচ্ছিরি গন্ধ!”
     
    কল্যাণের একটিমাত্র আদরের ভাইপো, এই চত্বরেই নাকি থাকত এককালে। তাকে একটিবার দেখার আশাতেই… প্রসঙ্গটা পালটে দেন নবীনবাবু।
     
    “বাকিদের দেখছি না যে? সমীর, অলোক, শ্যামল… ওরা সব কোথায়?”
     
    “কোন চুলোয় আর যাবে, দেখুন গে’ কাছেপিঠেই ঘুরে বেড়াচ্ছে সব। মন তো কারওরই তেমন ভাল নেই!”
     
    সে কি আর নবীনবাবুর অজানা! স্টেডিয়ামে ঢুকতে না পারার পর থেকেই মেজাজ খিঁচড়ে রয়েছে ইয়ং ব্রিগেডের। স্বাভাবিক। এতদূর উজিয়ে এসে বচ্ছরকার দিনে কেউ যদি খেলা দেখতে না পায়… একে তো এই হতচ্ছাড়া রোগের চোটে গোটা ন্যাশনাল টুর্নামেন্টটাই সরে গেছে গোয়াতে। বাপের জন্মে কেউ ভেবেছিল কলকাতা ডার্বি হবে সুদূর পশ্চিম উপকূলে!
     
    তা সে যা গেছে তা গেছে, তাই বলে এবারেও! এতকাল একসাথে খেলা দেখছেন তাঁরা, কখনও এমন বেইজ্জত হতে হয়নি। সেবারে ফেড কাপ সেমিফাইনালে? যুবভারতীতে তিলধারণের জায়গা নেই। দুই কোচের গরম-গরম চাপানউতোরে খবরের কাগজের শেষের পাতা রোজই সরগরম; মুখোমুখি হীরের দ্যুতি আর পাহাড়ি বিছের টক্কর দেখবে বলে সোয়া লাখের উপর লোক এসে হাজির মাঠে। জনপ্লাবন দেখে খেলা শুরুর আগেই তাঁদের চোখ ছানাবড়া। তবুও তো জায়গা মিলেছিল।
     
    খেলা শেষের পরে যদিও সারাটা রাস্তা কল্যাণ-উত্তম-বিশুদের টিপ্পনী হজম করতে করতে ফিরেছিলেন--- তা ওটুকু থাকবেই। বড় ক্লাবের গ্যালারিতে অর্ধেক জীবন কাটিয়ে হারজিতের পার্থক্য আর সেঁধোয় না মোটা চামড়ার ভিতরে।
     
    কিন্তু চামড়া তেমন পুরু হল কই? অজান্তেই পাঞ্জাবির সামনের দিকে বুকের কাছটায় লেগে থাকা কাদার ছোপটার উপরে আঙুল বোলাতে থাকেন নবীনবাবু। আজ দুপুরের অপমানটা এখনও বিঁধছে শেলের মত।
     
    টিকিট কোনওবারেই তাঁরা কাটেন না। দরকার পড়ে না কখনও। অভ্যস্ত দুলকি চালে চারদিকের উত্তেজনার আঁচ পোয়াতে পোয়াতেই পেরিয়ে যান একটার পর একটা গেট। এমনকি সিট রিজার্ভ রাখতেও হয় না, তাঁদের পকেটে রাখা শেষ টিকিটের নম্বর অনুযায়ী গিয়ে প্রত্যেকবারেই দেখেছেন সসম্মানে আসনগুলো ফাঁকা রেখে দিয়েছে বাকিরা। কিন্তু আজ…
     
    নিজের পাঞ্জাবির দিকে চোখ যায় নবীনবাবুর। কত চেষ্টা করেছেন দাগটা তোলার। টিউবওয়েল, কর্পোরেশনের কল… এমনকি গঙ্গার জল থাবড়ে ঘষতে ঘষতে হাতের ছাল উঠে যাওয়ার জোগাড় হয়েছে, দাগ রয়ে গেছে যে-কে-সেই! উঠবে না বুঝে নিজে থেকেই হাল ছেড়ে দিয়েছেন একটা সময়। সময়ের পলি জমে কালোর গায়ে এখন ধূসর পরত।
     
    দিগন্তের পারে বিলীয়মান সূর্যের প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের আলো বিলোতে বিলোতে বিকেল অবশেষে ক্লান্ত। এক্সট্রা টাইমের গোধূলি লগ্নে ভারি পদক্ষেপে প্রাণপণ ডিফেন্ড করে চলেছে, যদিও জানে আচম্বিত হানায় সন্ধের গোল দেওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। দূরে ফ্লাডলাইটের রোশনাইয়ে সেজে সুন্দরী সল্টলেক স্টেডিয়াম। ইতস্তত শব্দব্রহ্ম ভেসে আসছে সেদিক থেকে, স্থায়ী হতে পারছে না… ডুবে যাচ্ছে ঘরে-ফেরাদের পাখসাটের অতলান্তে। অদ্ভুত এক নীলচে আলো প্রান্তর জুড়ে। কোনও ছায়া পড়ে না এ আলোয়। তবু প্রাণপণ তাঁদের দু’জনের ছায়া খোঁজেন নবীনবাবু। পাবেন না জেনেও খোঁজেন।
     
    বুকের কালো ছোপটা কেমন বেশিই কালচে দেখাচ্ছে না? দৃষ্টিভ্রম হচ্ছে না তো? চশমাটা রুমালে আরেকবার রগড়ে চোখে দেন তিনি। নাঃ, শুধু ঐ দাগটা কেন, আপাদমস্তক গোটা পরিধান জুড়ে কলঙ্কের মত লেগে থাকা ছোট-মাঝারি বাকি সবক'টা ছোপও যেন বড্ড জীবন্ত। অথচ সকালে বাড়ি থেকে বেরনোর আগেই লতিকা কেচে মাড় দিয়ে শুকিয়ে নিয়েছিলেন। অফিসের গুপ্তর ছেলের অন্নপ্রাশনের কথাটা তিনি তো ভুলেই মেরে দিচ্ছিলেন আরেকটু হলে, নেহাত ভোরবেলা লতিকা মনে করাল তাই… ধুতি-পাঞ্জাবি পরে নইলে কোন পাগলে বড় ম্যাচের দিন বেরোয়! ইচ্ছে ছিল ম্যাচ শেষ হলেই ২৩০ ধরে সোজা পাইকপাড়া, তারপর নিমন্ত্রণ রক্ষা করে মৌতাতের পান চিবোতে চিবোতে বাড়ি ঢুকবেন। আইসক্রিমটা প্রাণে ধরে খেতে পারবেন না, ওটা আর একখিলি পান বিল্টুর জন্য বরাদ্দ। সদর পেরিয়ে ঢুকতে না ঢুকতেই সে ব্যাটা এসে কোমর ধরে ঝুলে পড়বে। তারপর মায়ের রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করে আইসক্রিম সাবাড় করার পালা… সে দর-কষাকষি চলবে খানিকক্ষণ, লতিকা হাল ছেড়ে দেওয়া অবধি। পরদিন রোববার, অফিসে বেরনোর তাড়া নেই। বিকেলের দিকে একবার নিউ মার্কেট ঘুরে আসার কথা সপরিবারে, লতিকা আবদার করছে অনেকদিন ধরে।
     
    নির্ঝঞ্ঝাট, নিটোল সাংসারিক জীবনের ছবি। শুধু কয়েকটা কাদামাখা ছোপ এসে বিকৃত করে দিয়েছে পুরো চালচিত্রটা।
     
    যা বহুকাল করেননি তারই রোখ এসে হঠাৎ ভর করে নবীন নস্করের মাথায়। সামনে ঝুঁকে পড়ে দু’হাত বাড়িয়ে আঁজলা-আঁজলা ভরে লেকের ঘোলাটে দুর্গন্ধী জল তোলেন, উন্মাদের মত থুপতে থাকেন সর্বাঙ্গে। ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুকণা হয়ে তারা ঝরে পড়ে ধুতির কোঁচা বেয়ে। অপরিষ্কার জলের স্পর্শে আরও গভীরভাবে জেগে ওঠে দাগেরা।
     
    ফুটকয়েক দূরত্বে নির্বাক দর্শকের আসনে বসে থাকে কল্যাণ সামন্ত।
     
    ডাইভিং পর্ব শেষ ক’রে ঘরে ফিরতে থাকা বখাটে ছোঁড়ার দল যদিও ভ্রূক্ষেপ করে না, আবছা সন্ধের আলোয় ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় বেলেঘাটা বস্তির দিকে।
     
    (২)
     
    “ইয়ার্কি! ইয়ার্কি পেয়েছে মালগুলো? সাপোর্টারদের সেন্টিমেন্টের কোনও দাম নেই?”
     
    “হেইডা আইজ পোত্থম জাইনলা নাকি চাঁদ?”
     
    “জামাই-আদর করতে বলেনি কেউ। কিন্তু মিনিমাম একটা রাইট তো আছে আমাদের! কোন অধিকারে মাঠে ঢোকা থেকে আটকায়? স্লা মেড়োর বাচ্চা...”
     
    “এইবার পথে আইস বাপধন! ‘মার্জার’ ‘মার্জার’ কইয়া তো গড়ের মাঠ মাথায় তুইলা দিসিলা! বিলাইডা বাইর হইয়া গেল ত’ ঝুলার থিক্যা? ট্যাহা দিসে যহন, ক্লাব ত’ এহন ওর বাপের জায়গির!”
     
    “তুমি আর বেশি কপচিও না! গা থেকে এখনও ভুরভুর করছে সিমেণ্টের গন্ধ! ওদিকে শতবর্ষের কেলাব বাঙ্গুরের এমার্জেন্সি বেডে চিৎপাত হয়ে খাবি খাচ্ছে!”
     
    “তাও ত’ একশ বস্যরটা পালন করসে! ইএসটিডি এইট্টিন এইট্টিনাইন থেইক্যা এক্কেরে ইএসটিডি টোয়েন্টি টোয়েন্টি ত’ হইয়া যায় নাই!”
     
    “চোপ বে ফোর টোয়েন্টি লোটা।”
     
    “মাচায় নাকি লাউডগা হইসে, হেই লাউয়ের আবার লাউ-চিংড়ি! দেখগা যা, লাউডগা না ইলেক্ট্রিকের তার!”
     
    রগের কাছে বেশ খানিকক্ষণ ধরে দপদপাচ্ছে। প্রথমটায় তেমন আমল দেয়নি সমীর। মাইগ্রেনের প্রবলেম তার স্কুলে পড়ার সময় থেকেই। পরীক্ষার আগে রাত জেগে টানা পড়তে পারত না কিছুতেই, ক্লাস টেনে ওঠার সময় বাবা সমস্যার উৎসটা বুঝতে পেরে পাড়ার বিমল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। বিমল কাকু ছিল আই-স্পেশ্যালিস্ট। দু’চোখে মাইনাস ফাইভ পয়েন্ট ফাইভ আর মাইনাস ফোর নিয়ে যখন বাড়ি ঢুকল সে, ছোটভাই অলোক ওরফে আলোর হাসি থামতে সময় লেগেছিল পাক্কা সাড়ে সাত মিনিট। “দাদা, বিশিষ্ট মলের ডাক্তার তোকে হরলিক্সের শিশির পিছন খুলে পরিয়ে দিয়েছে?”
     
    বাঁহাতের প্রথম আর তৃতীয় আঙুল যতটা সম্ভব প্রসারিত ক'রে দু’দিকের রগের শিরা চেপে ধরে সমীর। আলোটার মুখ বরাবর খারাপ। মায়ের কাছে ছোট থেকে কম ঠ্যাঙানি খেয়েছে এ জন্য!
     
    তবু চৈতন্য নেই। সে জানত বরাবরের জন্য তার একটা রক্ষাকবচ রয়েছে--- দাদা। মারপিট ক’রে গার্জেন কল, গোলকিকে রমেন জেঠুর জানলার সার্শির দফারফা, ছাদের কার্নিশে রাখা ঠাকুমার আচারের বয়াম উল্টে কাজের লোক মিনতিদির ঘাড়ে ফেলে রক্তারক্তি--- রণচণ্ডী মায়ের মার থেকে ভাইকে আগলাতে গিয়ে যতগুলো চড়-থাপ্পড় সমীর ফ্রিতে খেয়েছে তার দশ ভাগ নিজের জন্য খেয়েছিল কিনা সন্দেহ!
     
    ব্যথাটা ক্রমশ চারিয়ে দিচ্ছে নিজেকে, কপালের দু’পাশের দুই উইং বরাবর। যে কোনও সময় ক্রস তুলবে বক্সের ভিতর। আজ নির্ঘাত সেটপিসে গোল খাওয়া লেখা আছে ভাগ্যে। একে কার্তিকের সন্ধেয় হিমেল শিশিরের দল কোনও দয়াদাক্ষিণ্য দেখাচ্ছে না, গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত এই দুটোতে মিলে ষাঁড়ের লড়াইয়ে মত্ত। নিতান্ত স্বভাববিরুদ্ধ ভাবেই ভাইকে চাপা স্বরে ধমক দেয় সে, “আলো! কী শুরু করেছিস তখন থেকে?”
     
    ওষুধে কাজ দিয়েছে। লেখাপড়ায় ভাল বলে উত্তরপাড়া অঞ্চলে এককালে সুনাম ছিল তার। এলাকার সমবয়সীরা তো বটেই, স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছেলেপিলে… এমনকি স্যারেরাও তাকে, তার অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্বের ওজনকে কিঞ্চিৎ সমীহ করে চলত। বিশু তার থেকে তিন বছরের জুনিয়র, আলোর ক্লাসমেট। যাবতীয় কুকর্মে দু’টিতে মানিকজোড়।
     
    প্রথম যেবার দু’জনকে ম্যাচ দেখাতে নিয়ে আসে সমীর সেদিনের কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে তার।
     
    ট্রেনে করে উত্তরপাড়া থেকে হাওড়া, বড় ঘড়ি পেরিয়ে স্টেশনের বাইরে স্টেডিয়াম যাওয়ার বাস। গোটা রাস্তায় বিশুর হাঁ বুজতেই চাইছিল না। বার সাতেক বোধহয় গলা নামিয়ে আলোকে জিজ্ঞেস করেছিল, “সমুদায় ফুটবল দেহে?!”
     
    প্রশ্নটা ঠিক নতুন নয়, তাকে আগেও অনেকে করেছে। বেশিরভাগই ঠারেঠোরে, ঠোঁটকাটা দু’একজন সরাসরি। কলেজের একমেবাদ্বিতীয়ম টপার হওয়ার সাথে ফুটবল দেখা বা বোঝার বিরোধ বাঙালি মধ্যবিত্ত মনকে ঠিক কোথায় হুল ফোটায় সমীর আজও ভেবে পায় না। নির্বিরোধী স্বভাবের কারণে প্রতিবাদের রাস্তায় যায়নি কখনও।
     
    সেদিন বিশ্বজিতের সারল্যে অবশ্য রাগের চেয়ে তার হাসিই পাচ্ছিল। হরলিক্সের শিশির পুরু কাচের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সমীর দাসের দুই উজ্জ্বল চোখের লেন্সে ঐ অবাধ্য চামড়ার গোলা আর তার অধিকার নিয়ে বাইশ জনের খেয়োখেয়ির চলমান ছবি ধরা পড়লে শরীরে-মনে যে কী রাসায়নিক প্রক্রিয়া চলে সে তোলপাড়ের খবর সমু কাউকে দিতে চায় না। একমাত্র আলোই তার দাদাকে বয়স বাড়ার সাথে একটু একটু ক’রে চিনতে শিখেছে। বিশুর প্রশ্নগুলো তাই বারেবারে ধমক দিয়ে মাঝপথে থামিয়ে দিচ্ছিল।
     
    বেলেঘাটা থেকে সিআইটি মোড় হয়ে সরকারবাজার পেরিয়ে সেলস ট্যাক্সের অফিসটাকে বাঁদিকে রেখে ওরা শ্লথগতিতে হাঁটছিল পশ্চিমমুখো। রাস্তার দু’পাশে লোকালয়ের ঘনত্ব কমে এখন ফ্যাক্টরি আর গোডাউনের দৌরাত্ম্য শুরু হয়েছে। কোনও অজ্ঞাত কারণে রাস্তার অধিকাংশ এলইডি নেভানো, ধুঁকতে থাকা ফ্যাক্টরিগুলোর নিভু-নিভু আলো আর চলমান গাড়ির স্রোতের হেডলাইটের ভরসায় পথ চলা।
     
    জায়গাটা ঠিকমত ঠাহর হচ্ছিল না সমুর। দিনের আলো ফুরোলে চশমা ছাড়া তাকে প্রায়ান্ধ শ্রেণীভুক্ত বলা যায়। ঠিক সামনে ফুট তিনেক দূরে যে দুটো অবয়ব নিজেদের মধ্যে অর্থহীন তর্ক করতে করতে চলেছে তাদের সংলাপের ক্ষীণ ডপলার এফেক্ট আঁচ ক’রে ক’রে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলতে হচ্ছে তাকে। ঠোক্কর খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কলকাতার রাস্তায় খানাখন্দর সংখ্যা কি দিনদিন বেড়েই যাচ্ছে?
     
    “সমীর, অলোক, বিশ্বজিত… একটু পা চালিয়ে!” খানিক দূর থেকে ভেসে আসে শ্যামলদার গলা। দলের বাকিরা তার মানে ভালই এগিয়ে গেছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও গতি বাড়াতে বাধ্য হয় সে।
     
    পা চালিয়ে… পা চালিয়ে… পা চালিয়ে কারা খেলে? ন্যায়যুদ্ধে না পেরে বিপক্ষকে লেঙ্গি মারে কারা? আদৌ স্পোর্টসম্যান বলা যায় তাদের? চশমাটা ছিটকে পড়ার মুহূর্তেও একথাটাই ভেবে ক্ষোভে ভেতরে ভেতরে ফুটছিল সে। রেফারি রেড কার্ড দেয় কিনা দেখতে গিয়ে কয়েক মুহূর্তের দেরি, তার মধ্যেই ঘটনাটা ঘটে গেছে। ভিড়ের মধ্যে মাথা নিচু করে হাতড়াচ্ছিল সে… বেশিক্ষণ লাগেনি চুরচুর হয়ে যাওয়া হরলিক্সের শিশির টুকরোগুলো হাতে ঠেকতে। অসম্ভব জেনেও ওরই মধ্যে সবথেকে বড় কাচের খণ্ডটা তুলে চোখে দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিল। বৃথা! চারদিকের পৃথিবী তখন ঝাপসা। হঠাৎ করে কোথা থেকে একটা আধলা ইঁট মিসাইলের মত উড়ে এসে সমুর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আর একটু এদিকওদিক হলেই…
     
    “দা-দা-আ-আ-আ!”
     
    দূরাগত আলোকবিন্দুটা কোন মন্ত্রবলে এত কাছে এসে গিয়েছিল টের পায়নি সমীর। ভাইয়ের আর্ত চিৎকার আর কানফাটানো হর্নের শব্দে হুঁশ ফিরল তার। পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে একেবারে মেন রোডের প্রায় মাঝখানে এসে পড়েছে!
     
    “কী করছিস, সাবধানে হাঁট!”
     
    বিশুর সাথে উত্তপ্ত আলাপচারিতা থামিয়ে রেখে দৌড়ে এসেছে অলোক। বাকিদেরও চলার গতি থমকে গেছে, ঘাড় ঘুরিয়ে আলগোছে দেখে নিচ্ছে তাদের।
     
    অপ্রস্তুতের হাসি ছড়িয়ে পড়ে সমীরের মুখে। সন্ধের আবছা আঁধার উপেক্ষা ক’রে ভাল করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে--- বড় ক্লিষ্ট, নিরানন্দ সে হাসি।
     
    “দুর পাগল… ভয় কীসের? এখন তো আর…”
     
    কেউ যেন অদৃশ্য এক চাবুক কষায় অলোকের গায়ে। চামড়ায় দাগড়া দাগড়া লাল রঙের অক্ষরে লিখে দেয় রূঢ় বাস্তব। আর কথা বাড়ায় না সে। পাংশু মুখে ফিরে গেছে বিশুর পাশে। মৃদুস্বরে কীসব ফিসফিস করে, তারপর দু’জনেই স্পিকটি নট। নীরবে ক্লান্ত পাগুলোকে টেনে নিয়ে চলেছে। চলতে হয় তাই।
     
    অসহ্য লাগছে সমুর। সারাক্ষণ খই ফুটতে থাকা দুটো প্রাণবন্ত ছেলের মুখে নৈঃশব্দের কুলুপ এঁটে থাকা আর বরদাস্ত হচ্ছে না তার। চশমার বদলে একটা ঠুলি পাওয়া গেলে ভাল হত!
     
    অব্যক্ত এক দমচাপা ব্যথা ক্রমে ঘিরে ধরছে তাকে। মাইগ্রেনের নয়, এর উৎস অনেক গভীরে। যদি একটু ঘুমোতে পারত সে…
     
    ব্যথার উৎসমুখ চাপা দিতেই বুঝি আপনা থেকে বুজে আসে দু’চোখের পাতা। ভেসে ওঠে উত্তরপাড়ার চেনা গলিঘুঁজি, খেলার মাঠ, বিমলকাকুর চেম্বার। আর… সেই বাড়িটা। যার বারান্দায় হয়তো আজও সন্ধেবেলায় বসে স্বাতী নক্ষত্রের দিকে স্তব্ধ চেয়ে আছে দুই লোলচর্ম বুড়োবুড়ি।
     
    মনের চোখের বোধহয় পাওয়ার বাড়ে না। এতদিন পরেও সবকিছু কেমন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সমীর!
     
    (৩)
     
     
    প্রাচীন বট আর অশ্বত্থের শিকড় নেমেছে চারিদিকে। একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে, সমান্তরালে। পূর্বপুরুষের জীর্ণ শাখার পাশেই ছটফটে সহাবস্থান জেনারেশন ওয়াইয়ের। স্ট্রিট লাইটের ঝুপসি আলো ফাঁকে-ফোকরে ঢুকে এসেছে বটে, তবে বিশেষ সুবিধে করতে পারেনি। দোকানের ভিতরে জ্বলতে থাকা নিভু-নিভু আঁচের কুপিটাই এই ছায়াময় চত্বরের সর্বেসর্বা।
     
    গাছেদের মগডালের দিকে চেয়ে আয়রনিটা বোঝার চেষ্টা করছিল শ্যামল। ইলেকট্রিক কোম্পানির সর্বগ্রাসী রাক্ষুসে থাবা এড়িয়ে কেমন দিব্যি টিকে আছে একচিলতে দোকানটা, এক-দেড়শো বছর পুরনো বর্ষীয়ান বৃক্ষরাজির কোলে নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে। ভীরু প্রাণ ধুকপুকিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে অস্তিত্বের… তবু হাল ছাড়ছে না। ময়দানের আনাচেকানাচে চারা পুঁতে রাখা বহু ছোট ছোট ক্লাবের মত।
     
    ছোট্ট করে একটা শ্বাস পড়ে শ্যামলের। দুপুর দুটো থেকে জমাট বেঁধে থাকা উদ্গত হতাশাও খানিকটা মিশে আছে কি তাতে?
     
    সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ভাঁড়ের চা-টা জুড়িয়ে জল হয়ে যাওয়ার জোগাড়। মদনদার চা অবশ্য বরাবরই এমন--- ট্যালট্যালে, পানসে। আজকের পরিস্থিতির কারণে আরও বিস্বাদ ঠেকছে বোধহয়। জিভে নিয়মরক্ষার জন্য একবার ঠেকিয়েই নাক-মুখ কুঁচকে ফেলে শ্যামল। এ বস্তু মুখে দেওয়ারও অযোগ্য। সাধে কি মদনার চায়ের দোকানে বরাবর কাস্টমারের চেয়ে মাছির আনাগোনা বেশি!
     
    ইতিউতি সন্তর্পণে তাকায় সে। কেউ এখন এদিকে দেখছে না। সবার অলক্ষে চা-শুদ্ধ ভাঁড়টা দক্ষ গোলকিপারের মত থ্রো করে দেয় শ্যামল দোকানের পিছনে আগাছায় ভরা জঙ্গলের দিকে। মদনদার চোখে পড়লেই চিত্তির... মালটা দুটো ব্যাপারে ভীষণ সেন্সিটিভ--- ক্লাব আর স্বহস্তে বানানো ঐ অখাদ্য চা।
     
    “ব্যাপারটা কিন্তু আমিও বুঝিনি রবীনদা। যতই কাগজে লিখুক ‘বিহাইন্ড ক্লোজড ডোরস’, স্টেডিয়ামের গেট হাট করে না হলেও খোলা ছিল যখন আমরা পৌঁছলাম।”
     
    “আর গেট বন্ধ হলেই বা, তাতে আটকাল কবে? সেবার ভিতুর ডিম শিল্টন শুয়োরের বাচ্চাটা টিম নিয়ে মাঠে নামতে চাইছিল না যখন, আমরা কতক্ষণ ওয়েট করলাম। পুলিশ এসে লাঠিচার্জ করল, সব্বাইকে মেরেধরে তাড়াচ্ছিল... তখনও বেরিয়ে আসিনি। যদি আবার খেলা শুরু হয় সেই আশায়...”
     
    “ধুর্‌, তখন স্টেডিয়ামের মধ্যে আমরা। আজকেরটা টোট্যালি ডিফারেন্ট। সিনারিওটাই আলাদা। অ্যাপল্‌স অ্যান্ড অরেঞ্জেস মাই ডিয়ার সনৎ, অরেঞ্জেস অ্যান্ড অ্যাপল্‌স!”
     
    “অসীম, একটা কথা মাথায় রেখো”, থেমে থেমে নিজের অননুকরণীয় ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায় রবীন আদক। “পিয়ারলেসের সাথে তোমাদের আগের ম্যাচের দিনও মাঠে গিয়েছিল সনৎ আর হিমাংশু। ওরাও ঢুকতে পায়নি!”
     
    “ঠিক! আলবাৎ ঠিক কইসে রবীনদা! আমরা তো গেসলাম মহামেডান ম্যাচের দিন, হেইদিনও...”
     
    “অ্যাঁ! তরা গেসলি মানে? আমারে যে কইলি ফাইনালের আগে এইবার কোনও ম্যাচ দ্যাখতে যাবি না?” আহত বিস্ময় ঠিকরে পড়ে ধনার গলায়। অপ্রস্তুত উত্তম চোখ সরিয়ে শেষ চুমুক দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে ফুরিয়ে যাওয়া ভাঁড়ে। বিশুর ওসবের বালাই নেই, সে যথারীতি তেরিয়া।
     
    “দুইজনায় পা চালাইয়া গেসি আর আইসি! তোমারে লইলে ত’ ল্যাংচাইয়া ল্যাংচাইয়া মাঠ অব্দি পৌঁসাইতেই রাত কাবার!”
     
    ছেঁড়া হাওয়াই চটির খোঁটায় যথারীতি চটেছে ধনা। এই একটা ব্যাপারে সে মারাত্মক স্পর্শকাতর।
     
    “ক্যান নবাবপুত্তুর, জলদি ফির‍্যা কোন গাব জ্বাল দিতা?”
     
    কথার পিঠে কথা, চোরা বিদ্রূপের আঘাত। আবহাওয়া ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে অপরিসর দোকানঘরের চৌহদ্দিতে। বাইরে দখিনা বাতাসে কার্তিকের আসার পূর্বাভাস, অথচ ভিতরের ওয়েদার ফোরকাস্টে কোত্থাও তার দেখা নেই!
     
    একটা দমচাপা ভাব দখল নিচ্ছে বুকের। বাড়তি অক্সিজেনের খোঁজে বেরিয়ে এল শ্যামল। বটের চারাগুলো কোনও এক অদৃশ্য জাদুকরের ইঙ্গিতে নিখুঁত তোরণ বানিয়ে নেমেছে মাটির দিকে। তাদের নিচ দিয়ে চলাফেরার সময় ছাপোষা গেরস্তরও ক্ষণিকের জন্য নিজেকে রাজাগজা ভেবে ভুল হতে পারে।
     
    শ্যামলকে এখন এসব কিছু ছুঁতে পারছে না। সে আগাগোড়া প্র্যাকটিক্যাল ছেলে, ক্লাবের বিশুদ্ধতা নিয়ে কোনওদিন মাথা ঘামানোর প্রয়োজন মনে করেনি। যুগ পাল্টালে ভগবানও নিজেকে আপডেট করতে বাধ্য হয়। সবই ডেবিট-ক্রেডিটের খেলা। হয় নিজেকে পাল্টাও, নইলে ফুটে যাও। কিন্তু, আজকের ব্যাপারটা...
     
    ওদিককার অবস্থা ঘোরালো হতে হতেও মিইয়ে গেছে। মদনদার দোকানের বেঞ্চিগুলোয় উত্তেজনার স্রোতে এখন ভাটার টান। নিঃশব্দে মুচকি হাসে শ্যামল। এ নির্ঘাৎ রবীনদার কেরামতি। চার ফুট দশের গোলগাল শরীর আর তার উপরে বসানো হাঁড়িপানা মুণ্ডু; দেখে বোঝা দায় চারপাশের উত্তেজনা ব্লটিং পেপারের মত শুষে নেওয়ার কি অসামান্য ক্ষমতা লুকিয়ে ঐ মিনিয়েচার সাইজের মানুষটার ভিতরে। ঠিক যেন তাদের অ্যাকাউন্টসের হেড ক্লার্ক আশুদা। ভাল করে না দেখলে দু’জনের মধ্যে ফারাক করা যায় না। এমনকি কোমরের ইঞ্চি তিনেক উপরে বেল্ট বাঁধার কায়দাটাও অবিকল...
     
    প্রথমবারে দূর থেকে রবীনদাকে দেখে বুকটা ছাঁৎ করে উঠেছিল তার। সে নিজে ব্যাচেলর মানুষ, তিনকূলে কেউ নেই। কিন্তু আশুদার বাড়িতে বৌদি, দুই মেয়ে। ছোটটা টুয়েলভে উঠেছে, বড়জনের সম্বন্ধ দেখার কাজ চলছিল নাকি।
     
    অফিসে ঢোকার বছর পাঁচেকের মধ্যে কত যে বড় ম্যাচের টিকিট জোগাড় করে দিয়েছিল লোকটা। যে সে টিকিট নয়, মেম্বার্স গ্যালারি! এদিকে সেয়ানা পাবলিক... টিকিটের উৎস জিজ্ঞেস করলে ভুঁড়ির নিচে নেমে যাওয়া অবাধ্য বেল্টটাকে কষে তুলতে তুলতে অমায়িক হাসত শুধু। মাস তিনেক আগের ফেড কাপ ফাইনালের টিকিট দিতে না পারা আশুদার কেরিয়ারের এক এবং একমাত্র ফেইলিওর। সর্দিগর্মি লেগে বৌদির তখন নিউমোনিয়া হয়ে যায়-যায় অবস্থা। শ্যামলেরা আশাও করেনি, ডি-ওয়ান ব্লকের সাধারণ সিটেই কাজ চালিয়ে নিয়েছিল। অথচ অফিস জয়েন করার পরে মানুষটার ক্ষমা চাওয়ার সে কী ঘটা! লজ্জার চোটে শ্যামল তখন পালাতে পারলে বাঁচে।
     
    চায়ের আসর ভেঙেছে। একেএকে বেরিয়ে আসছে ম্লান মুখগুলো... এক্সট্রা টাইম মিলিয়ে একশো কুড়ি মিনিট ঘামরক্ত ঝরানো সংগ্রামের পরে টাইব্রেকারে হেরে যাওয়া প্লেয়ারদের মত--- ঝুলে পড়া কাঁধ আর নতমুখী চিবুক নিয়ে। গোললেস ড্রয়ের দিনেও এমন অখণ্ড নীরবতা কখনও দেখেনি শ্যামল।
     
    ছ্যাৎলা পড়া মলিন কাপ-প্লেট ধুয়ে তাকে তুলছে মদনদা। কুপি নিভল, এবারে দোকানের ঝাঁপ ফেলবে। হয়তো এই শেষবারের মত... জানে না শ্যামল। মদনদাও জানে কি?
     
    ট্যালট্যালে বিস্বাদ চায়ের কথা মনে পড়ে হঠাৎ ভীষণ তেষ্টা পাচ্ছে শ্যামলের। বহু বছরের জমানো তেষ্টা।
     
    (৪)
     
    মল্লিকবাজার ক্রসিং পেরিয়ে পার্কস্ট্রিটে ঢোকার মুখে বাঁদিকের কবরখানার লাগোয়া ফুটপাথে বড় নিমগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ঠায় নজর রাখছিল প্রশান্ত। রোববার রাত ন’টার পরে এ চত্বরের ছোট-বড় দোকানগুলোর আলো একে একে নিভতে থাকে। সাড়ে দশটার মধ্যে এলাকা প্রায় শুনশান। আপার সার্কুলার রোড বেয়ে বয়ে চলা অবিশ্রান্ত গাড়ির মিছিলের অদূরেই নির্জন এক ব-দ্বীপ যেন।
     
    মিনিট দশেক ধরেই উশখুশ করছিল সে। বাকিদের কাউকে কিছু না বলে জোরে পা চালিয়ে এগিয়ে এসেছে আজ, টাইমিং তার এতদিনে রপ্ত হয়ে গেছে। কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে দশটা বাজলে নিভে যায় মডার্ন হার্ডওয়ারের টিউবলাইট দুটো। শাটার বন্ধ ক’রে জোয়ান হেল্পার শামিম হাঁটা লাগায় পার্কসার্কাস বস্তির দিকে। সে দৃষ্টিসীমার নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলেই পায়ে পায়ে রাস্তা পার হবে প্রশান্ত। দরকার নেই, তবু এই অহেতুক সংকোচের কারণটা তার নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়।
     
    আজ মহা ফাঁপরে পড়েছে সে। কোনও এক মালদার পার্টি এসেছে দোকানে গুচ্ছের বরাত নিয়ে। নেহাত রোববার রাত, বেশির ভাগ জায়গার ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গেছে। না হলে ঐ ম্যাড়ম্যাড়ে হতশ্রী দোকানে এত বড় অর্ডার আসার কপাল নেই। দোকানের মালিক আজ সকালে উঠে কার মুখ দেখেছিল কে জানে!
     
    কিন্তু এদিকে যে সময় বয়ে যায়! আরেকটু পরেই বিশু-ধনা-অলোক সমেত গোটা দলটাই এসে পড়বে। তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে... অনেক কষ্টে নিজের গোপন কথাটা সবার থেকে লুকিয়ে রেখেছে এতকাল।
     
    পার্টির ডেলিভারি নেওয়া অবশেষে থেমেছে। ফর্দ ধরে ধরে মিলিয়ে নিচ্ছে টিংটিংয়ে চেহারার এক কিশোর। বয়স আট থেকে ষোলোর মধ্যে যা ইচ্ছে হতে পারে।
     
    অধৈর্য হয়ে পড়ছিল প্রশান্ত। অল্পতেই টেনশান করা তার বরাবরের স্বভাব। হাতদুটো এণ্টালির রথের মেলায় কেনা সস্তার বেল বটম প্যান্টের পকেটে ঢোকানো। দুই মুঠোতে ধরা আছে একজোড়া দামী জিনিষ। কত দাম তার পরিমাপ প্রশান্তর কাছে নেই।
     
    বিরক্তিকর ধাতব শব্দে শাটার টেনে নামাচ্ছে শামিম; দিনের হিসেব সেরে দোকানের পৃথুলা মালকিন--- হ্যাঁ, মালিক নয়, মালকিন--- অল্প খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেছেন বাসার দিকে। পার্ক স্ট্রিট থেকে যে শিরা-উপশিরাগুলো বেরিয়ে গিয়ে মিশেছে এলিয়ট রোডের দীঘল শরীরে তারই একটা ধরে।
     
    রাস্তা পেরিয়ে সাবধানে পিছু নেয় প্রশান্ত।
     
    বেলায় বাড়ি থেকে বেরনোর সময়ও বাপটা চেল্লাচ্ছিল খুব। ফ্যাক্টরি লকআউট হওয়া ইস্তক মেজাজ সারাক্ষণ টংয়ে চড়ে থাকে। দিদির একটা সম্বন্ধ নিয়ে কথা চলছিল ইদানীং, অনেক দূর এগিয়েওছে নাকি। খেতে বসলে মা কানের কাছে সংসারের এসব খুচরো ঝামেলা নিয়ে হ্যাজাতে শুরু করে দেয়, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘ্যানঘ্যান--- ‘তোর চাকরি কবে হবে’, ‘সুরমাদির ছোট ছেলেটা কলেজ পাশ দিয়ে বেরিয়েই কেমন সওদাগরি আপিসে ঢুকে গেল’। যন্তন্না! এম এ পাশ লোকে আজকাল ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর সে কোন লাটের বাঁট হনু রে! মায়ের পেয়ারের সুরমাদির ভাশুর যে সেই আপিসের বড়বাবুর ভায়রা সে খেয়াল কেউ করেছে?
     
    দুটো কানই তাই খুলে রাখে প্রশান্ত। এন্ট্রি আর এক্সিট। সব ঝামেলার সমাধান।
     
    আলো-আঁধারিতে ঘেরা ছায়ামাখা গলিপথ দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটছে দোকানের মালকিন। একটু চেষ্টা করলেই প্রশান্ত গিয়ে ধরে ফেলতে পারে। কিন্ত সে নিজেও জানে সেটা এখন সম্ভব নয়। নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে অপেক্ষা করে সম্মুখবর্তিনীর যাত্রাপথ শেষ হওয়ার।
     
    মায়ের গয়নাগাঁটি, ঠাকুর্দার বাবার আমলের রুপোর ছড়ি, পুরনো বাসনকোসন--- কুড়িয়ে বাড়িয়েও কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারছিল না তার বাপটা। দিদির বিয়ের জন্য আরও হাজার আষ্টেক টাকা লাগত। ‘বেশিদিন এমন সুপাত্তর এই আক্রার বাজারে পড়ে থাকে না’, ঢ্যামনা চাটুজ্জে ঘটক বাড়ি বয়ে এসে শুনিয়ে গিয়েছিল। সাথে মিষ্টি মিষ্টি করে হুল ফোটানো সাবধানবাণী। বিদায় নিলে গাণ্ডু বাপের সমস্ত ঝাল এসে পড়ত মায়ের আর প্রশান্তর উপর। মুখচোরা দিদি আধখানা শোবার ঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনতে শুনতে নখ খুঁটত আর চোখের জল চাপত প্রাণপণ।
     
    এরই নাম বাড়ি! আলো-বাতাসহীন জেলখানাও বুঝি বেশি সহনীয়। সাধে প্রশান্ত রোজ ভিড় জমাত খেলার মাঠে?
     
    সাদা-কালো দিনও হঠাৎ হঠাৎ রঙিন হয়ে যায়। বেখেয়ালে জীবনের পিচকিরিতে জলের সাথে আবির গুলে ছুঁড়ে মারে অদৃশ্য কেউ। সেই আশায় দিন গোনা কবে শুরু হয়েছিল, প্রশান্ত নিজেও আর মনে করতে পারবে না। স্মৃতি এখন বৃষ্টিতে ভিজে নেতানো টিকিটের কাগজ... আবছা লেখাগুলো বড় বিশ্বাসঘাতকতা করে।
     
    সস্তার নারকোল তেলে চুপচুপে একমাথা চুল, কাঁটা কম্পাস দিয়ে মেপে মাথার ঠিক মাঝখানে পাতা সিঁথির সেন্টারলাইন। যতটুকু হলে চোখ বুজে ‘উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ’ বলে চালিয়ে দেওয়া যায় তার উপর এক পরত ময়লা ঢেলে দেওয়া। আর... আর চুম্বকের মত টানতে থাকা দুটো অতলান্ত চোখ। যতবার ইমিটেশন গয়নায় বোঝাই ডালাটার পাশ দিয়ে বাজারের দিকে যেত প্রশান্ত, ঝুলতে থাকা চুড়ি আর পুঁতির মালার প্যাকেটের মাঝখান দিয়ে ডজ করে দৃষ্টি গিয়ে পড়ত ঐ চোখে। তৎক্ষণাৎ শরীরে চারশো চল্লিশের ঝাপটা, সঙ্গে উপরি ভেসে আসা চাপা হাসির শব্দ। কান-মাথা দিয়ে ভাপ বেরোনো থিতোলে প্রশান্ত টের পেত আজ দিনটা ভাল যাবে।
     
    রাস্তাটা এ-গলি ও-গলি বেয়ে কানামাছি খেলতে খেলতে এসে থামে পেল্লায় এক অট্টালিকার সামনে। কোন মান্ধাতার আমলে তৈরি খোদায় মালুম। পায়রার খোপের মত অজস্র কুঠুরিতে ভাগ করা, এত রাতেও বাসিন্দাদের কিচিরমিচিরে বিরাম নেই। এরই একটা খোপে সেঁধিয়ে যাবে পথচারিণী। স্ট্রিট লাইটের আলোয় তার প্রলম্বিত ছায়া প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে প্রশান্তকে।
     
    হঠাৎ থেমে যায় ছায়ামূর্তি, ঘাড় ঘোরায় পিছনদিকে। চোখের পাতায় ক্লান্তির প্রলেপ, তবু... দু’জনের মাঝে এখন কোনও আড়াল নেই। আমূল কেঁপে ওঠে প্রশান্ত। হাতদুটো আঁকড়ে ধরে পকেটের ভিতরে লুকিয়ে থাকা দুই অমূল্য রতন।
     
    দুপুরের দিকে মাঠের কাছাকাছি হতেই সে বুঝেছিল হাওয়া আজ গরম। লোকজন সব তেতে রয়েছে ভেতর ভেতর। তিন মাস আগের ফেড কাপ ফাইনালে ড্র করে যুগ্মজয়ীর ট্রফি দু’দলের কোচ বাদে একজন সাপোর্টারকেও খুশি করতে পারেনি। ‘যত দিন যাচ্ছে মানুষ যেন আরও অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে’, প্রায়ই বলত তার খেঁকুরে বাপ।
     
    শেখর-বাপন-নাটা দুলুদের পুরো গ্রুপটা মাঠে আসতে পারবে না, সকালের দিকে বাড়ি এসে জানিয়ে গিয়েছিল দুলুর ভাই। কী একটা খেপ খেলার ডাক এসেছে বর্ধমান থেকে, দোহাত্তা পয়সা। তাকেও যেতে বলছিল, এক কথায় নাকচ করে দেয় প্রশান্ত। ফুটবল খেলে রোজগার যদি করতেই হয় তো ডিভিশনে খেলে করবে! ক্লাবের জার্সি পরে, সসম্মানে... অন্যের কাঁচা টাকা পেয়ে বল পায়ে খ্যামটা নেচে নয়।
     
    সাতজনের টিকিট হাতে সে একা, ওদিকে একটা টিকিটের চাহিদায় হাতাহাতি লেগে গেছে। দেদার বিকোচ্ছে ব্ল্যাকে। পুলিশে সব জানে, কিন্তু এই একটা দিনে মামারা সব চোখে ঠুলি পরে থাকে--- জানে প্রশান্ত। সত্যি বলতে এবারের হাই ভোল্টেজ ম্যাচে এত কম খাকি উর্দি দেখে একটু অবাকই হয়েছিল সে। টিকিটগুলো কাউকে বিলিয়ে দেবে কিনা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ চোখে পড়ল লোকটাকে।
     
    স্টেডিয়ামের আশেপাশে সচরাচর মনিহারি জিনিষের বিক্কিরি করতে কাউকে দেখেনি প্রশান্ত। চা-অলা বাদে বেশির ভাগই মুচমুচে পকোড়া, চানাচুর নয়তো পান-বিড়ি-গুটখার বেসাতি করতে আসে। বড়জোর ক্লাবের লোগোর সাথে রঙ মিলিয়ে ফ্ল্যাগ, টুপি কিংবা হেডব্যান্ড। আসমানি রঙের চুড়িগুলো দেখে তাই গোপন ইচ্ছেটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় সে।
     
    দরাদরিতে কোনওকালেই তেমন দড় নয় প্রশান্ত। এদিকে যা দাম হাঁকছিল চুড়িঅলা... সদ্য সেলুনে দাড়ি কেটে আর বড় ম্যাচের টিকিটের দাম চুকিয়ে ওঠা পকেটের ককিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট। তখনই সিদ্ধান্তটা নেয় সে।
     
    জীবনের প্রথম বেআইনি কাজ সেরে খানিক পরে স্টেডিয়ামের গেট দিয়ে যখন ঢুকছে, মাঠে লোকে লোকারণ্য। পকেটে সবেধন নীলমণি টিকিটের সাথে নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকা দুটো আসমানি রঙা চুড়ির হাল্কা ঘর্ষণ ঠিকই টের পাচ্ছিল প্রশান্ত।
     
    রাত নামতে থাকা শহরের বুকে এখন স্থাণু দাঁড়িয়ে সে। বেল বটমের পকেটের গহীনে হাত দিয়ে আঁকড়ে রয়েছে একজোড়া চুড়ির ভগ্নাবশেষ। আসমানি বলে অবশ্য আর শনাক্ত করা যায় না তাদের।
     
    সামনের ছায়ামূর্তি এখনও ঠায় দাঁড়িয়ে, তার দৃষ্টি ভেদ করে চলে যাচ্ছে প্রশান্তর শরীরের সব হাড়-পাঁজরা। প্রৌঢ়া মুখমণ্ডলে সময়ের জটিল আঁকিবুকি, চোখের দীপ্তি ঘোলাটে। কয়েক সেকেণ্ডের অপেক্ষা। তারপর আস্তে আস্তে গেট খুলে ছায়ামূর্তি মিশে যায় ধ্বংসস্তূপের মত দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটায়।
     
    বুকের মধ্যে কে যেন হাতুড়ি পিটছে। কি বিকট তার আওয়াজ! দুটো কান খোলা থাকা সত্ত্বেও বধির হয়ে যাচ্ছে প্রশান্ত দত্ত।
     
    পা চালাতে হবে। বাকিরা অনেকদূর এগিয়ে গেছে এতক্ষণে, দেরি করে লাভ নেই।
     
    এক্সিটের পরে আবার এন্ট্রি হয় নাকি?
     
    (৫)
     
    অক্টোবরের রাত ঘনায়, শহর কলকাতা মুড়ে যায় শরতের ফেলে যাওয়া বিষণ্ণ অন্ধকারে। ঘরকুনো বাঙালি টেলিভিশনের স্যুইচ অন না করেই জানতে পারে এ বছরের সিএফএল চ্যাম্পিয়নের তাজ কার মাথায় উঠেছে। গুগলের সবজান্তা পর্দায় ভেসে ওঠে ব্রেকিং নিউজঃ ইন্টারনেটে এই প্রথম এত বেশি দর্শক সমাগম হল ভারতীয় কোনও ক্লাবের ম্যাচে। মেচেদা থেকে মেরিল্যাণ্ড--- বঙ্গসমাজ এখন ভারি ব্যস্ত, চলছে ম্যাচের চুলচেরা বিশ্লেষণ আর মুণ্ডপাত।
     
    সল্টলেক স্টেডিয়ামের যে রুদ্ধদ্বার এরিনায় অনুষ্ঠিত হল ফ্র্যাঞ্চাইজি-অধিকৃত দুই প্রধানের ইতিহাসে প্রথম কলকাতা লিগ ডার্বি, তাকে ছাড়িয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক বরাবর ঘন্টাতিনেক হাঁটলে দেখা যাবে জনা ষোলোর একটা ছোটখাটো দল গড়ের মাঠের শ্যামলিমা পেরিয়ে চলেছে পশ্চিমে স্ট্র্যান্ড রোডের উদ্দেশে।
     
    শহর জুড়ে পুজোর আবহ। রাস্তায় রাস্তায় প্যাণ্ডেলদের কঙ্কালে রক্ত-মাংস জোড়ার কাজ চলছে পুরোদমে। পথচলতি রাতের বাসিন্দারা তাই বোধহয় কেউ খেয়াল করেনি ওদের। কিংবা...
     
    “খেলা কি আর তবে আমরা দেখতে পাব না?” অনেকক্ষণের জমানো অস্বস্তিকর নীরবতার চাঁই ভেঙে অস্ফুটে প্রশ্ন ভেসে আসে। প্রশ্নের শেষদিকে গলাটা ধরে গিয়েছিল বলে কেউ সন্দেহ করলে তাকে বিশেষ দোষ দেওয়া যায় না।
     
    কিন্তু উত্তর আসে না কোনও। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সুখটান দিতে ব্যস্ত পথিকের সিগারেটের ধোঁয়ার মত প্রশ্নটা ভেসে থাকে শহরের বায়ুমণ্ডলে। মিলিয়ে যেতে যেতেও রেশ রয়ে যায়।
     
    কলকাতার এদিকটায় কি বৃষ্টি হয়েছে সন্ধের মুখে? ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে বুক ভার হয়ে আসে নবীনবাবুর। আজ ফেরার সময় এক্সাইড মোড়ের কাছে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে এক কিশোরকে দেখে বুকটা ধক করে উঠেছিল। চৌকো কপাল, শীর্ণ একহারা চেহারা আর আইসক্রিম খাওয়ার উদগ্র তাড়া--- অবিকল যেন বিল্টু! পা দুটো ফুটপাথের সাথে কেউ প্লাস্টার করে দিয়েছিল তাঁর। আতিপাতি খুঁজছিলেন ছেলেটার বাবাকে; কারণ তিনি ভাল করেই জানেন বিল্টু আর সেই বয়সে আটকে নেই।
     
    শুনশান স্ট্র্যান্ড রোডের বুক ফালাফালা চিরে রাতচরা গাড়িগুলো দাপিয়ে বেড়ায় ইতিউতি। প্রিন্সেপ ঘাটের মায়াবি আলোকস্তম্ভের নিচে এখনও কিছু তরুণ হৃদয় নিজেদের মধ্যে বুঁদ হয়ে। অনিদ্রায় ভোগা শহরের ঘুমিয়ে পড়তে ঢের দেরি।
     
    “নবীনদা...”, অন্ধকারের পরত ভেদ করে হঠাৎই উদয় হয় অসীম। পাশে হাঁটতে থাকে। “আজকের ব্যাপারটা কী হল কিছু বুঝলেন? হোয়াট একজ্যাকটলি হ্যাপেন্ড?”
     
    “তুমিও তো বুঝেছ, তাই না?” না থেমে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখে নেন। সকলেই মজুত, আশঙ্কার গাঢ় কালো ছায়া লেপে প্রত্যেকের মুখে।
     
    “মেসিকে দেখব বলে যেবার দল বেঁধে গেলাম সবাই মিলে... আর্জেন্টিনা-ভেনেজুয়েলা ম্যাচ, মনে পড়ে?” সমবেত নীরবতায় সম্মতি ভেসে আসে। “একজনও ঢুকতে পেয়েছিলাম সেবার?”
     
    “বাট দ্যাট ওয়াজ অ্যান ইন্টারন্যাশনাল ফ্রেন্ডলি। আন্তর্জাতিক ম্যাচে আমাদের এন্ট্রি দেওয়া হয় না... বরাবরের রুল। তা বলে ক্লাবের ম্যাচেও...”
     
    “তাই কি? তাহলে অলিভার কানের বিদায়ী ম্যাচের সময় কী হয়েছিল?” নবীনবাবুর স্বরে তিক্ততার সাথে প্রচ্ছন্ন শ্লেষের আভাস।
     
    “আমরা এন্ট্রি পেয়েছিলাম... কিন্তু কল্যাণদা, মদনদা, উত্তম, বিশু ওরা...”
     
    কথাটা শেষ হয় না অসীমের। নির্মম সত্যিটা বুঝি সেও টের পাচ্ছে!
     
    “’৯১ তে আবাহনী চক্র, নিসান এফসি; আল-জাওরা আর সাউথ চায়না ’৯৩... ”, গড়্গড় করে আউড়ে চলেন নবীন নস্কর, “শেষ ২০১৩য় ইয়াঙ্গন, সেমেন পাডং, কুয়েত এসসি--- ওদের সবক'টা ইন্টারন্যাশনাল খেলায় আবার আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল মাঠের বাইরে।”
     
    “আইএসএলের উদ্বোধনী ম্যাচ, মুম্বই সিটি এফসি ভার্সেস আটলেটিকো দি কলকাতা”, ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করে সমীর, “ফুল হাউস। মাঠে শচীন, অমিতাভ, আম্বানি। জমকালো লেসার শো। আমরা কেউ ঢুকতে পাইনি!”
     
    “তাইলে আইজের ম্যাচডা...”, নিষ্পাপ স্বরে মদনের প্রশ্ন ভেসে আসে, “আমাগো ক্লাবের ম্যাচ না?”
     
    প্রাচীন দুই শহর, মধ্যে দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজের সেতুবন্ধ। আবছা আঁধারে পড়ে আছে নিস্পন্দ, যেন অতিকায় এক প্রাগৈতিহাসিক সরীসৃপ। ব্রিজের এক ধার বেয়ে ক্লান্ত পদক্ষেপে একদল ছায়ামানব চলেছে। ছাব্বিশ মিটার নিচে বইছে পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গা। নিস্পৃহ, নির্লিপ্ত। তার অস্বচ্ছ জলে ফুটে ওঠে না কোনও প্রতিবিম্ব।
     
     (৬)
     
    নগরগুঞ্জনক্ষান্ত কল্লোলিনী ঘুমোনোর তোড়জোড় করছে। গুটিসুটি মেরে থাকা নিদ্রিত শিশুর গায়ে পরম মমতায় অন্ধকারের চাদর বিছিয়ে দিচ্ছে রাত্রি। শুধু রাতবাতির নিশ্চিন্তি হয়ে জ্বলতে থাকে কয়েকটা আলোকবিন্দু। ঐ যে মহীয়সী ভিক্টোরিয়া... শতাব্দী পেরিয়ে এসেও তার নীরব গম্ভীর সৌন্দর্য টাল খায়নি এতটুকু। চারিদিকে সবুজের গালিচা বিছিয়ে তাকে আগলে রেখেছে শহর। পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি ঘাড় ঘোরালে অদূরে ঈশান কোণে ফোর্ট উইলিয়াম। পুব থেকে উত্তরে পরপর চোখে পড়ে ওয়াইএমসিএ, হকি বেঙ্গল গ্রাউণ্ড, তিন প্রধানের ছাউনি। আরেকটু পিছনে হাইকোর্ট গ্রাউণ্ড, ডালহৌসি, তালতলা মাঠ। দূরে হীমদলের মত সদাজাগ্রত চোখ মেলে অতন্দ্র প্রহরায় শহীদ মিনার। লাল থেকে রূপোলি হয়ে তার মেঘে ঢাকা চূড়ায় এখন সফেন আভা।
     
    ব্রিজের উপরে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকা ষোলো জোড়া চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে সরতে থাকে আরও উত্তরে। মোহনবাগান আর তালতলা মাঠকে আড়াআড়ি চিরে লেসলি ক্লডিয়াস সরণি যেখানে গিয়ে মিশছে গোষ্ঠ পাল সরণিতে। সামনেই আকাশবাণী ভবন, আর তার ঠিক পাশে...
     
    ইডেন! মোহময়ী ইডেন! ফ্লাডলাইটের কৃত্রিম আলোর বন্যায় রোজ রাতে নগরপসারিণীর মত আপাদমস্তক সেজে ওঠা ইডেন। কংক্রিটে ঢেকেছে সর্বাঙ্গ, তবু বয়স থাবা বসাতে পারেনি তার অটুট যৌবনে।
     
    রুক্ষ তামাটে শহরের বুকে এক টুকরো স্বর্গোদ্যান। রাত ঘনালে পরীরা নাকি নেমে আসে এ মাঠের মেহফিলে!
     
    দৈত্যাকার চার আলোকস্তম্ভ ঘিরে পুঞ্জীভূত আলোর কুয়াশা। যেন বাষ্প হয়ে জমে আছে চোখের পাতায়।
     
    ইডেন কি কাঁদে? ভুলতে বসা কোনও এক অগাস্ট বিকেলের কথা তার মনে পড়ে আদৌ?
     
    কুয়াশা ঘনিয়ে আসছিল নবীনবাবুর চোখে। ডি ওয়ান ব্লকের আবছায়া গ্যালারির দিকে দৃষ্টি যায় তাঁর। কংক্রিট নয়, তখন পুরোটাই কাঠের তৈরি। ঐ তো ঘিয়েরঙা পাঞ্জাবি আর ধুতিতে সেজে মাঠে ঢুকছেন তিনি। আশেপাশের কেউ কেউ হাসি চাপছে তাঁর বেশভূষা দেখে। যুবক বয়সের দোরগোড়ায় পা রাখতে চলা দুই সদ্য গোঁফ ওঠা কিশোরকে নিয়ে আসছে এক ঈষৎগম্ভীর... আরে ও তো সমীর, পিছনে অলোক-বিশু দুই মানিকজোড়! বেল বটমের পকেটে হাতদুটো চালান ক'রে হেলতে দুলতে ঢুকল প্রশান্ত, মুখে হাজার ওয়াটের বাল্ব জ্বলছে। একে একে এল অসীম, কল্যাণ, মদন, ধনঞ্জয়। রবীনদার মত দেখতে, কিন্তু রবীনদা নন এমন এক গোলগাল সহাস্য প্রৌঢ়ের সাথে শেষ মুহূর্তে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ শ্যামলের। উত্তেজনার চোটে ভুল গেট দিয়ে ঢুকে পড়েছে, ডেইলি টিকিটের সস্তার গ্যালারি টপকে এখন মেম্বার্স গ্যালারিতে যাওয়ার উপায় নেই। মাথা নাড়তে নাড়তে ওখানেই বসে পড়ল। সিট পছন্দ হয়নি খুঁতখুঁতে প্রৌঢ় ভদ্রলোকের, মাথা নাড়ছেন। রবীনদাও আছেন, ভিড়ের মধ্যে। ডিঙি মেরে মেরে বোঝার চেষ্টা করছেন খেলা শুরু হলে তাঁর উচ্চতা থেকে মাঠের কতটা দেখতে পাবেন।
     
    যেন তিন মাস আগের ফেড কাপ ফাইনালের রিপ্লে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ড্র বলে কোনও শব্দ মাঠভর্তি দর্শকের কারওর অভিধানে আজ খুঁজে পাওয়া যাবে না। বয়লারের মত চাপা উত্তেজনায় ফুটছে গোটা স্টেডিয়াম।
     
    ঐ যে, চিরপরিচিত ক্যাপে মাথার পাতলা হয়ে আসা চুলগুলোকে ঢেকে বেঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে পিকে। তিন মাসে অনেক জল বয়ে গেছে হুগলি নদী বেয়ে, জ্যোতিষ্করা অধিকাংশই স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছেন অন্য কক্ষপথ… কিন্তু জ্বলন্ত মশাল হাতে পিকে আজও লাল-হলুদ। ক্ষয়িষ্ণু টিমকে তাতানোর চেষ্টায় কোনও খামতি নেই। সবুজ-মেরুন বেঞ্চের সামনে তুরুপের তাস বিদেশকে টিপস দিতে ব্যস্ত অমল; ২-৫-৩ এর চিরাচরিত দেশীয় প্রথা ভেঙে ৪-৪-২ এর স্পর্ধা দেখানো অমল। পিকের সামনে আজ সম্মানের অগ্নিপরীক্ষা তার।
     
    রঞ্জি স্টেডিয়ামের উপরের টিয়ারে কি ঝামেলা লেগেছে? বচসার আভাস পেয়ে ঘুরে তাকাচ্ছে কেউ কেউ, অধিকাংশের মনোযোগ এখনও মাঠের দিকে।  রেফারির সাথে টিম নিয়ে নামছে কম্পটন আর সত্যজিত। ভগবান, আবার সুধীনকে রেফারির বাঁশি দিয়েছে! মোহন-জনতা প্রমাদ গোনে। দুই ক্যাপ্টেন টসের সময় হ্যাণ্ডশেক করল যেন স্তালিন-রুজভেল্ট। আজকের ম্যাচে ভারে এগিয়ে সবুজ-মেরুন, ইস্টবেঙ্গল তুলনায় কিছুটা স্তিমিত। কিন্তু ময়দানী প্রবাদ বলে ‘লাল-হলুদের হয়ে খেলে তার জার্সি।’
     
    ঊনআশি হাজারের ইডেন-সুন্দরী কানায় কানায় ভরে গেছে, একটা মাছি গলবারও জায়গা নেই। আজ কেউ হাসিমুখে বাড়ি ফিরবে, কারও চোখে লেগে থাকবে পরাজয়ের কান্না।
     
    বাঁশি বাজল! কিক-অফ। আর বহু কষ্টে চেপে রাখা লাভাস্রোতের উৎসমুখ খুলে গেল রাতারাতি।
     
    বিপদটা বেশ খানিকক্ষণ ধরেই টের পাচ্ছিল সমুরা। ডি ওয়ান গ্যালারি ঐতিহাসিকভাবে বরাবর বাগান-সমর্থকদের খাসতালুক। কিন্তু আজ চারপাশের আবহাওয়া কিছুটা যেন বেসুরো। এমনটা তো হওয়ার কথা নয়!
     
    গোলমালটা ধরে ফেলতে বেশি সময় লাগল না শ্যামলদের। এক অজ্ঞাত প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আজকের ম্যাচের উদ্যোক্তা আইএফএ নয়, খোদ ক্রীড়া দফতর। সরকারি ব্যাপার, ফলত গণতন্ত্র মেনে টিকিট বন্টনের সময় ক্লাবের বাছবিচার করা হয়নি। একই গ্যালারির টিকিট দেদার বিলোনো হয়েছে ওপেন কাউন্টার থেকে! দুই শত্রু-শিবিরের সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি সৈনিক সমানে-সমানে গাদাগাদি করে বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলছে। চোরা বিষবাষ্পে ভরে যাচ্ছে রঞ্জি গ্যালারি।
     
    ওদিকে মাঠের ভিতরেও দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে। লেফট ব্যাক দিলীপ পালিত, সে কিনা লাল-হলুদের ডানপ্রান্তে! নিয়মমত বাগানের লেফট উইং ধরে টাট্টুঘোড়ার মত উঠে আসার কথা ছটফটে বিদেশের। অমলের চাল অনুযায়ী এরপর সে ক্রস ভাসিয়ে দেবে বক্সের মধ্যে ওঁত পেতে থাকা মিহির আর পায়াসকে।
     
    আর এখানেই তারা আটকে যাচ্ছে পিকের ধুরন্ধর মস্তিষ্কের কাছে। কারণ সবুজ-মেরুন ব্রিগেডের কল্পনায় ছিল না রাইট ব্যাক পজিশনে অনভ্যস্ত পালিত স্রেফ চোরাগোপ্তা মার আর ট্যাকটিক্স সম্বল করে আটকে দেবে বাগানের বিশ্বস্ত লেফট আউট বিদেশকে।
     
    এগারো মিনিটের মাথায় বিশ্রী ফাউল। নির্ঘাৎ কার্ড ভেবে উদ্বেল মোহন-জনতা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল নিষ্ক্রিয় সুধীন চ্যাটার্জির ভাবলেশহীন প্রতিক্রিয়ায়। শুরু হল প্রকাণ্ড গ্যালারির বিভিন্ন কোণে বারুদ জমার প্রক্রিয়া।
     
    হাফ টাইমেই পাশের ছেলেটার চাউনি ভাল লাগেনি নবীনবাবুর। গোলমাল লাগার ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে থাকা তিনি উঠে পড়লেন সাতান্ন মিনিটে বিদেশ রেড কার্ড দেখতে। তক্ষুণি কোথা থেকে উড়ে এল ইঁটের টুকরোটা, সটান এসে লাগল কপালের মাঝখানে।
     
    ‘লাথি মারবি! দেখি কত লাথি মারতে পারিস আমাদের!’ বিপক্ষের উত্তেজিত সাপোর্টারের পাশেই কপাল চেপে বসে পড়েছিলেন তিনি। চোখে অন্ধকার দেখছেন... আজ আর এই অবস্থায় পাইকপাড়া যাওয়া নয়, মাঠ থেকে বেরিয়েই সোজা বাড়ির পথ ধরতে হবে।
     
    মাঠের ভিতর থেকে ভেসে আসা চিৎকার আর গোটা গ্যালারির একসাথে লাফিয়ে ওঠা থেকে নবীনবাবু বুঝতে পারলেন রেফারির রেড কার্ডের কবলে এবারে পড়েছে দিলীপ পালিত। দেরি হয়ে গেছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে!
     
    দশ মিনিট বাকি খেলাশেষের বাঁশি বাজতে, ঠিক সেই সময় উন্মত্ত জনস্রোতের একটা ঘূর্ণিঝড় পাকিয়ে পাকিয়ে আছড়ে পড়তে লাগল ডি ওয়ান আর ডি টু ব্লকের আপার টিয়ারে। অসহায় নবীনবাবু টের পেলেন অনেকগুলো খ্যাপা ষাঁড় দলবদ্ধভাবে ছুটে যাচ্ছে তাঁর শরীরের উপর দিয়ে। শ্রাবণের জলকাদা মাড়িয়ে আসা চটি আর জুতোদের আঘাতের চিহ্নে ভরে উঠছে সদ্যকাচা ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি। কাল লতিকাকে নিউমার্কেট নিয়ে যাওয়ার কথা, বিল্টুটা পথ চেয়ে থাকবে আইসক্রিমের জন্য...
     
    ধাক্কাটা লাগতে টাল সামলাতে না পেরে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল শ্যামল। কোনওমতে উঠে দাঁড়িয়ে প্রথমেই তার চোখ চারিদিকে খুঁজল আশুবাবুকে। ভদ্রলোক ঐ চেহারা নিয়ে ভিড়ের মাঝে কিছুতেই বেরোতে পারবেন না। মানুষজন খেপে গেছে, মুহুর্মুহু ইঁটবৃষ্টি হচ্ছে গ্যালারিতে...
     
    “শ্যামল, এদিকে...”
     
    মিহি গলার আওয়াজ শুনে সে ঘুরে তাকাল, আর সেকেণ্ডের ভগ্নাংশের জন্য দেখতে পেল চার ফুট দশ ইঞ্চির একটা অবয়ব। তারপর কিচ্ছু মনে নেই...
     
    রঞ্জি গ্যালারির উঁচু উঁচু ধাপগুলো টপকে প্রাণপণ উঠছিল অলোক আর বিশ্বজিত, দু’জনের মুঠিতে ধরা চশমা-বিহনে প্রায়ান্ধ সমীরের দুটো হাত। সামনেই দেখা যাচ্ছে পঞ্চান্ন ফুটের পেল্লায় দরজা। কিন্তু দরজার সামনে এমন ভিড় কেন?
     
    ইডেন গ্যালারির লাগোয়া জমির নিচে চক্ররেলের কাজ চলছে, ভুলে গিয়েছিল সমীর-অলোক-বিশুর মত আরও অনেকে। কর্তব্যনিষ্ঠ আরপিএফ যদিও স্টেডিয়ামের গেট বন্ধ রাখতে ভোলেনি। সে দরজা সমুদের মুখের উপর বন্ধ রয়ে গেল চিরতরে...
     
    উপুড় হয়ে শুলে জুতোগুলোর আঘাতে থেঁতলে যাচ্ছে শিরদাঁড়া, তবু কোমরটাকে যথাসাধ্য সোজা রেখে বেল বটমের পকেটদুটো আড়াল করতে চাইছে প্রশান্ত। চুড়িগুলো ভেঙে গেলে পরের মাসের হাতখরচ পেতে পেতে... নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ক্রমশ, আর কি আশ্চর্য! হঠাৎ খেঁকুরে বাপ, ঘ্যানঘ্যানানি মা আর মুখচোরা দিদিটার জন্য বড্ড মনকেমন করছে তার...
     
    হাওয়াই চটি পায়ে খেলা দেখতে আসা ধনঞ্জয় ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই তাকে এমন পরিত্রাহি দৌড় দিতে হবে। তবু সে নিজের এলাকার নামকরা দৌড়বীর, দূরত্বটা মেরে এনেছিল প্রায়। লাস্ট ল্যাপে হঠাৎ একটা স্টেপে গণ্ডগোল হতেই বুঝল ডানপায়ের চটির স্ট্র্যাপটা ছিঁড়ে গেছে ফল্‌স ফুটিংয়ে।
     
    প্রাণের ভয়ে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে থাকা বহু নবীন-শ্যামল-সমীর-প্রশান্তদের পায়ের তলায় আজীবনের মত পিষে গেল নবীন, শ্যামল, সমীর, প্রশান্তরা। ভাবীকালের তর্পণের জন্য উনিশশো আশির ষোলোই অগাস্ট ফেলে রেখে গেল ষোলোটা নাম--- কার্তিক মাইতি, উত্তম ছাউলে, সমীর দাস, অলোক দাস, সনৎ বসু, নবীন নস্কর, কল্যাণ সামন্ত, অসীম চ্যাটার্জি, রবীন আদক, কার্তিক মাজি, ধনঞ্জয় দাস, শ্যামল বিশ্বাস, মদনমোহন বাগলি, প্রশান্ত দত্ত, হিমাংশুশেখর দাস, বিশ্বজিত কর।
     
    মাঠের মধ্যে তখনও খেলা চলছে পুরোদমে। টেন ভার্সেস টেন। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রেডিওয় ঘোষণা হবে--- মরসুমের প্রথম ডার্বির সমাপ্তি নিষ্প্রাণ গোলশূন্য ড্রয়ে।
     
    “নিষ্প্রাণ”--- উচ্চারণ করতে গিয়ে ঘোষকের পেশাদার মার্জিত স্বরও সামান্য কেঁপে গিয়েছিল হয়তো।
     
     (৭)


    মাঝ-অক্টোবরের বৃষ্টি, হঠাৎ করে ঝেঁপে আসে... বিন্দুমাত্র প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়ে।
     
    অন্ধকার সড়কের দিকে নির্নিমেষ চেয়ে থাকেন নবীনবাবু। ঝাঁকে ঝাঁকে অ্যাম্বুলেন্স বেরিয়ে যাচ্ছে ঐ পথে, ছড়িয়ে পড়ছে শহরময়। কোনওটা শম্ভুনাথ পণ্ডিত, কোনওটা এসএসকেএম, কোনওটা মেয়ো... তিনি কোনটায় ছিলেন? লতিকা আর বিল্টু এসেছিল কি হসপিটালে?
     
    বৃষ্টির বেগ বাড়ছে উত্তরোত্তর। ভিজে যাচ্ছে মাথা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত। সপসপে ধুতি-পাঞ্জাবি। তবু তিনি জানেন, দাগগুলো উঠবে না।
     
    কালো মেঘের আড়ালে সুযোগ বুঝে গা-ঢাকা দিয়েছে চাঁদ। ব্রিজের লাইটগুলোও কেমন যেন পাঁশুটে মেরে গেছে। আলোর চেয়ে তাতে ছায়া হয় বেশি। সে ছায়া ক্রমে ঘনিয়ে আসে, মিশে যায় প্রশান্তর ছায়াময় অবয়বে। হাতদুটো অজান্তেই একবার ছুঁয়ে নেয় বেল বটমের পকেটদুটো।
     
    দিদিটার বিয়ে দিতে পেরেছিল বাবা? ক্রীড়া দফতর থেকে নাকি সাড়ে আট হাজার টাকা পাওয়ার কথা ওদের?
     
    রাত ঘনায়, অস্থির হয়ে ওঠে গঙ্গার বুকের জোলো হাওয়া। ফিসফিসিয়ে শ্যামলের কানে-কানে কত কী বলে যায় দুর্বোধ্য ভাষায়। আচ্ছা, ওরা কি জানে আশুবাবু বেঁচে গিয়েছিলেন কিনা? নিশ্চয়ই, নাহলে... নাহলে তো আজ এখানে তাদের সাথেই...
     
    হঠাৎ হেসে ওঠে বিশু। হেসে চলে, হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মত। বাকিরা অসহায় নীরব আর্তিতে দ্যাখে--- কতকালের লুকনো বিদ্রূপ ঝরে পড়ছে সে হাসিতে!
     
    “তোমাগো সচিব কী কইসিল, খ্যায়াল আসে সমুদা? ‘উত্তেজনা ছাড়া আবার বড় ম্যাচ হয় নাকি!’ তা আইজ কত উত্তেজনা দ্যাখলা যুবভারতীর ফাঁকা গ্যালারিগুলায়?”
     
    হাসির দমকে তার কাঁপতে থাকা পিঠে হাত রাখে অলোক, “বলেছিল আমরা চিরকাল অমর হয়ে থাকব! শ্লা অমর করেই যদি রাখবি তাহলে আজ মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলি কেন?”
     
    ভাইকে সংযত হতে বলতে ভুলে যায় সমীর। দু’চোখের পাতায় বৃষ্টিরা ঝরে পড়ছে অবিরাম।
     
    “অমরত্বেরও এক্সপিরেশন ডেট থাকে, জানতিস না?” শ্যামলের গলা বরফের মত শান্ত, “আজকাল সব কিছুর বিডিং হয় নিলামে। কড়ি ঢাললে ইমমরাল থেকে ইমমর্টাল হতে স্রেফ অকশানিয়ারের হাতুড়ির এক ঘা।”
     
    এতশত জটিল কথা ঢোকে না ধনার মাথায়, “আমাগো ক্লাবের খেলা আর দ্যাখতে পারুম না আমরা?” ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে রবীনদা।
     
    “আমাদের ক্লাব... বিক্কিরি হয়ে গেছে! এখন আর কোনও ক্লাব নেই আমাদের।”
     
    রাতের শেষ প্রহরে শুনশান সেকেন্ড হুগলি ব্রিজ। নদীর জলে বৃষ্টির ফোঁটাদের ঝরে পড়ার সর্বগ্রাসী কলরবে ঢাকা পড়ে গেছে চরাচরব্যাপী আর সব শব্দ। ঝিমোতে থাকা টোলগেটগুলো ঘুমন্ত চোখে দেখতে পায় ষোলোজন বাতিল দর্শকের পকেট থেকে বেরিয়ে এল ষোলোটা টিকিট। টিকিট, না ছাড়পত্র? অমরত্বের সার্টিফিকেট?
     
    কত দশকের অভিমান শরীরে মেখে নীরবে ঘুমিয়ে ছিল ওরা। আজ অবহেলার শীতল স্পর্শে কে যেন ওদের হঠাৎ জাগিয়ে তুলেছে। বহুদিনের শীতঘুমের পরে চোখ খুলে প্রবল ধাঁধা লাগে। শেষ আশ্বিনের নির্মম বৃষ্টি ফুঁড়ে দেয় হলদেটে ত্বক, বেহিসেবি দামাল হাওয়ার ছোঁয়ায় কুঁকড়ে যায় মলিন কাগজের ষোলোটা টুকরো।
     
    নিঃশব্দে ষোলো জোড়া হাত ছিঁড়ে ফেলতে থাকে ওদের। বাতিল, অপ্রয়োজনীয় আবর্জনার মত। ছিঁড়ে কুটিকুটি করে… দুই থেকে চার, চার থেকে আট, আট থেকে ষোলো ভাগে। তীব্র এক নিষ্ফলা ক্রোধে ভাসিয়ে দেয় এলোমেলো হাওয়ায়। অভিকর্ষের অমোঘ টানে এক সময় নদীর বুকে গিয়ে পৌঁছয় ওরা। নদী কাউকে ফেরায় না। তার নির্লিপ্ত স্রোতের টানে ওরা মোহানার দিকে ভেসে চলে… অন্তিম যাত্রার অবহেলিত খইয়ের মত।
     
    যেমন হঠাৎ করে শুরু হয়েছিল তেমনই হঠাৎ থেমে যায় খেয়ালি বৃষ্টি। মেঘের আড়াল চিরে উঁকি মারে একফালি কুণ্ঠিত জ্যোৎস্না।  আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে একটু একটু করে। পুব দিগন্তে রাত্রিকে রেড কার্ড দেখানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
     
    আরেকটু পরেই পেপারওয়ালা সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেবে খবরের কাগজ। যার প্রথম পাতায় ছোট-বড়-মাঝারি বিভিন্ন অক্ষরে লেখা থাকবে কলকাতার বুকে হওয়া প্রথম ফ্র্যাঞ্চাইজি ডার্বির রেজাল্ট। ষোলোটা ছায়ামূর্তি ততক্ষণে মিলিয়ে যাবে গড়ের মাঠের সবজেটে ধূসর প্রান্তরের বুকে। হয়তো শেষবারের জন্য।
     
    পকেট থেকে ‘এন’ লেখা রুমাল বের করেন নবীন নস্কর। চশমাটা ভাল করে চেপে চেপে মুছে চোখে দেন। তবুও কিছু দেখা যায় না, বৃষ্টির জলে ধুয়ে ঝাপসা হয়ে গেছে চারদিক।
     
    চশমার কাচটা আবারও ভিজে উঠছে…
     
     “এদের সকল কাহিনী অস্ফুটে,
    ঘড়ির কাঁটায় খোদাই করে রাখে।
    যে ছেলেটি একলাটে, মুখচোরা
    তার কাছে সব হিসেব লেখা থাকে।”
     
    [এই কাহিনীর চরিত্ররা কাল্পনিক না হলেও তাদের পরিচয় একান্তই লেখকের কল্পনাপ্রসূত। তবে ময়দানি দর্শকের ফুটবল-আবেগ ঘোর বাস্তব।]
     
    কবিতা-ঋণঃ অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়
     
    অলঙ্করণঃ দেবসত্তম পাল
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন