ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • নতুন স্বপ্ন 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১২ ডিসেম্বর ২০২১ | ২৯৮ বার পঠিত
  • সুভাষবাবু বিকেল বেলায় মুড়ি আর নারকেল খাচ্ছিলেন। সারাদিন রোদ্দুরে অনেক ঘুরেছেন। সেই সকালে বেরিয়েছিলেন পান্তাভাত খেয়ে। গ্রামের ছেলে। গ্রামেই কেটেছে সারা জীবন। পান্তাভাতেই এই শরীর এবং মাথা ঠান্ডা থাকে তার। হৈ হৈ করে ভোটের মেলা এসে পড়েছে। পার্টি এবারেও তাকে টিকিট দিয়েছে। সকলেই জানে সুভাষ গিরির প্রায় অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক জীবন সম্পূর্ণ কলঙ্কহীন। রাস্তায় বেরোলে এলাকার লোক পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। আবার তারা এও জানে যে সুভাষ গিরি ভোটে জিতবেন না। পার্টির সংগঠন বসে গেছে। সংগঠন মজবুত না হলে ভোটে জেতা যায় না। শুধু ভাল লোক হওয়া কোন কাজে আসবে না। ছেলে বিজয় সমবায় ব্যাঙ্কে চাকরি করে। জেলা সদরে অফিস। রাজনীতি গভীরভাবে বোঝে। কিন্তু কাউকে কিছু বোঝাতে যায় না। তার ধারণা যে যার নিজস্ব জীবন থেকে বুঝে নেবে ভালমন্দ।

    জঙ্গলমহল থেকে এ গ্রামটা বেশি দূরে নয়। উত্তরদিকে একটু এগোলেই দলিত মহল্লা শুরু। রুক্ষ গরীবির ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত পচা গলা জীবন। থ্যাঁতলানো দুর্গন্ধভরা জীবন যাপনে এরা অভ্যস্ত জন্ম থেকেই । জীবন যে অন্যরকম হতে পারে সেটা এদের জানা নেই। নানা গাছের ছায়ায় ক্ষয়া ক্ষয়া ব্যাঁকা ট্যারা ঘরগুলো দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি বিনা বাধায় মানুষ ভেজায়। একটানা জলের তীর ছোঁড়ে বর্ষা ঘরের ফুটো চালে । ভেজে চ্যাতানো মাটি, গাছের ডালপালা, মুরগি আর ছাগলগুলো। কটা বেজি সরসর করে ঝোপের দিকে সরে পড়তে থাকে। মাঠের মধ্যে মেঠো ইঁদুর নিজেদের খোঁড়া সুড়ঙ্গে চটপট সেঁধিয়ে যায়।

    বিজয় প্রায়ই এখানে এসে ঘোরাঘুরি করে। মুখে হাজারটা চকরা বকরা ভাঁজ পড়া একটা খুনখুনে বুড়ো একটা শিমূল গাছের তলায় উবু হয়ে বসে থাকে। গরমকালে গায়ে কিছু থাকে না। কালো রোগা শরীর। শিমূল ডালের ছায়া গড়িয়ে যায় তার পিঠের ওপর দিয়ে।

    বিজয় প্রায়ই এখানে এসে ঘোরাঘুরি করে। বীরু, কান্ডি, ছিতেমুনির সঙ্গে কথা বলে। ক’টা ছাগলছানা লাফালাফি করে ওদের সামনে।

    লড়াই করে করে জীবন ঠেলে নিয়ে যায় । সামনের দিকে কি পিছন দিকে কে জানে। জীবন এবং বয়েস থেমে থাকে না। যেমন করেই হোক চলতে থাকে। কিন্তু অসুখ বিসুখ করলেই মুশকিল। সদর হাসপাতালে ছাড়া তেমন চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। আর বাড়াবাড়ি কিছু হলে কলকাতায় যাওয়া ছাড়া গতি নেই। 

    সুখিরামের ডানপায়ের ঘা-টা শুকোচ্ছে না কিছুতেই। এখানকার স্বাস্হ্যকেন্দ্রে গিয়ে মলম আর খাবার বড়ি নিয়ে এসেছে। কদিন ভাল ছিল। আবার ভেতরে থকথকে পুঁজে ঘা ফেঁপে উঠছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অধিকারীবাবু বলল, এখানে আর কিছু হবে না। সদর হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করে বড় ডাক্তার দেখিয়ে সুঁই লাগাতে হবে। ওসব কথা বলতে সোজা । সুখিরামের কি অত বল গতিক আছে নাকি যে তার জন্য অত তদ্বির তদারকি হবে। সে তো ভালই বোঝে অত সুভাগ্যি আশা করা তার পক্ষে অন্যায়। সে কপালের ওপর ছেড়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে যন্তন্না সহ্য করে পড়ে আছে। 

    বিজয় গিরি এই সবে শুনল ব্যাপারটা। সব দেখেও না দেখার লাইন নেওয়া তার ধাতে নেই। হাজার হোক সুভাষ গিরির রক্ত বইছে তার শিরায়। সে বলল, ‘কাল সকালে সুখুকে সদরে নিয়ে যাব। এখানে ফেলে রাখলে তো মরেই যাবে। কষ্ট পাচ্ছে এত .....’।

    মাদল মারান্ডি বলল, ‘কিন্তু দাদা ওকে নিয়ে যাবেন কি করে? ব্রীজটা তো ভাঙা পড়ে আছে। ওপারে গেলে তবে তো ভ্যানরিক্শা পাবেন। সেখান থেকেও ইস্টিশান অনেক দূর। অনেক ঝামেলি আছে .....’

    বিজয় বলে, ‘সে সব চিন্তা করতে হবে না। আমি দুটো শক্ত জোরদার লোক নিয়ে আসব। দরকার হলে সুখোকে কাঁধে বসিয়ে নদী পার করে দেবে। তারপর স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরব না। একটা ম্যাটাডোরে চেপে সদরে পৌঁছব। ওটা আমার এক বন্ধুর গাড়ি। সুখির কানে যায় সব কথা। পায়ের পুঁজভরা ঘায়ের যন্তন্না ভুলে চোখে হাত দিয়ে রোদ্দুর আড়াল করে চোখ কুঁচকে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে তার কথা বোঝার চেষ্টা করতে থাকে।

    সুভাষ গিরির নারকেল মুড়ি খাওয়া শেষ হয়েছে। আকাশের পশ্চিম দিক লাল হয়ে আছে। আজকের মতো সূয্যি পাটে গেল।

    সুভাষবাবু মুড়ির বাটিটা ধোবার জন্য বারান্দা থেকে উঠোনে নামলেন চিউবওয়েলের দিকে যাবার জন্য। দেখলেন নীচু পাঁচিলের চ্যাটার দরজাটা ঠেলে কে একটা ঢুকছে। দেখলেন যে দীপঙ্কর মাইতি ঢুকছে। দীপঙ্করের পিছন পিছন আর একজন ঢুকল। চেনা চেনা লাগছে। মিউনিসিপ্যালিটির ইলেকশানের সময়ে একবার দেখেছিলেন ওকে। খুব ছোটাছুটি করে ম্যানেজ দিচ্ছিল এদিক ওদিক। প্রবীর জানা না কি যেন নাম।

    সুভাষ গিরি নেতাজী এবং মাতঙ্গিনী হাজরা দুজনকেই নিজের চোখে দেখেছেন। তিনি আচমকা এরকম প্রস্তাবে বিস্ময়ে থ হয়ে গেলেন । না না, প্রস্তাবের বিষয়বস্তুতে তিনি বিশেষ অবাক হননি। ঘোড়া কেনাবেচা তো এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে গেছে। এতে অবাক হওয়ার কি আছে? তিনি এ কথা ভেবেই অবাক হয়ে গেলেন তার মতো একটা অচল ও বাতিল ঘোড়াও সওদা করার বস্তু হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদিও পার্টি তাকে গত চল্লিশ বছর ধরে মনোনয়ন দিয়ে আসছে তিনি শেষবার ভোটে জিতেছেন পনেরো বছর আগে। 

    — ‘আমি গত পঞ্চাশ বছর ধরে সৎভাবে রাজনীতি করে আসছি। পার্টির ওপর হাজার ঝড় ঝাপটা আসা সত্ত্বেও কখনও আদর্শ থেকে বিচ্যূত হইনি।’ সুভাষবাবু আবেগ মাখা গলায় বললেন।

    — ‘ হ্যাঁ জানি সুভাষদা। সেই জন্যই আপনার কাছে আসা। আপনার মতো মানুষের আরও বড় কাজের জায়গা পাওয়া চাই। এখানে কি আপনি তেমন কাজের সুযোগ পাচ্ছেন? আমরা মনে করি .....’

    সুভাষবাবু দীপঙ্কর মাইতিকে মাঝপথে থামিয়ে দেন। 
    — ‘ওই যে বললাম ..... নিজের আদর্শ থেকে কোনদিন সরে যাই নি। আর যে যা করে করুক আমি কোনদিন পার্টি ছেড়ে যাব না। রাজনীতিতে আমি টাকা রোজগারের জন্য আসি নি’

    দীপঙ্কর মাইতি তবু হাল ছাড়ে না।
    — ‘জানি সুভাষদা। সেই জন্যই তো আপনাকে চাইছি আমরা। একটা বড় কাজের জায়গা আপনাকে দিতে চাই আমরা। তাছাড়া ..... ’
    দীপঙ্কর মাইতি একটু দম নেয় - ‘...... তাছাড়া অ্যামাউন্টটা কিছু কম ছিল না .... ভেবে দেখবেন দাদা.... আচ্ছা এখন তালে আসি। কি ডিসিশান নিলেন জানাবেন কিন্তু।’

    দীপঙ্কর মাইতিরা চ্যাটার দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।

    সুভাষবাবু আদর্শবাদী হোন আর যাই হোন তিনি পোড় খাওয়া রাজনীতিক। তিনি বুঝতে পারলেন তাকে রাজি করানোর জন্য দীপঙ্করবাবুর ওপর চাপ আছে। উদ্দেশ্যটা মোটামুটি পরিষ্কার। এই বিধানসভা কেন্দ্রে পার্টিতে ভাঙন ধরাতে চাইছে।

    সুভাষবাবু সারা রাত ধরে অনেক চিন্তা করলেন। বলা ভাল, রাতে তার ঘুমই হল না ভাল। বারবার তন্দ্রা ছুটে যেতে লাগল। দীপঙ্কর মাইতির দেওয়া টাকার অঙ্কটা তার রাতের ঘুমের মধ্যে দু:স্বপ্নের বলয় হয়ে ঘুরপাক খেতে লাগল। তিনি বার চারেক বিছানা ছেড়ে উঠলেন। জল খেলেন, বাথরুম গেলেন, জানলা দিয়ে আঁধারে ছাওয়া গাছগুলোর দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আবার বিছানায় এসে গড়িয়ে দিলেন নিজেকে। এইভাবেই সারারাত কাটল। ভোরের দিকে চোখ জড়িয়ে এল ঘুমে। যখন ঘুম ভাঙল বেলা সাড়ে আটটা বেজে গেছে।

    বর্ষা নামেনি এখনও। তবে নদীটা জলে টইটুম্বুর না হলেও বেশ ভর ভরন্ত হয়ে আছে। সুখিকে কাঁধে নিয়ে মহাদেব সোরেন জলে নামল। মহাদেবের শালগাছের মতো শরীর। সুখির পায়ের ঘা একটা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে জড়িয়ে আলগা করে বেঁধে রাখা হয়েছে যাতে তার ব্যথা না লাগে। সুখি মহাদেবের মাথা খামচে ধরে ঘাড় নীচু করে গোটো মেরে বসে মাঝে মাঝে ‘আ: ... ও: ও: ... বাবারে ....’ করছিল। মহাদেব ধমক দিয়ে বলল, ‘থির হয়ে বস তো  ..... অত নড়বড় কোর না এমন ....’

    বিজয়ের সঙ্গে আরও একজন ছিল। অক্রুর না কি নাম যেন। তারও ওই খাঁটিখুঁটি শাল গাছ গোছের চেহারা। একটা গামছা পরে সাঁতার কেটে ওপারে গিয়ে উঠল। উঠে অপেক্ষা করতে লাগল বিজয়দের জন্য। বিজয় জল কেটে হাঁটতে লাগল ওপারে পৌঁছবার জন্য।

    ওপারে গিয়ে কোনরকমে ওঠা গেল। ম্যাটাডোর দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল। সেটা এখনও আসেনি। ফোন করে বিজয় জানল মিনিট পনের দূরে আছে ওটা। এর মধ্যে সুখির পায়ের যন্ত্রণা শুরু হল। বিজয় এটার সম্ভাবনা আন্দাজ করে একপাতা পেন কিলার নিয়ে এসেছিল। ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে সুখিকে বসিয়ে চারটে চা দিতে বলল। তার আগে সুখিকে একটা ব্যথা কমানোর বড়ি খাইয়ে দিল।

    এ জায়গাটায় রাস্তা এখনও কাঁচা । ওই বটতলার পরে বাজারটা পেরোলে পাকা রাস্তা পাওয়া যাবে। এ রাস্তায় অনেক পিস্তলের গুলির দাগ পাওয়া যেত। এখন পিচ ঢেলে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ওরা ওই নদীটা পেরিয়ে গ্রামের মধ্যে চলে যেত। অনেকে ওদের কাছে দু:খের কথা, অভাবের কথা বলত। ওরা গ্রামের অনেককে সাহায্য করেছে। যদিও ওদের অনেক বদনাম। ওরা নাকি মানুষ মারে, ভীষণ নিষ্ঠুর। থানা, পুলিশ সব ওদের খুব ভয় পেত। থানার দুটো পুলিশ ওদের গুলিতে মারা গেল। বিজয় তখন খুব ছোট। বিজয়ের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সন্তোষ আর পরীক্ষিত দুজনেই অনেকবার তাদের বাড়িতে এসেছে। বাবা তাদের নারকেল নাড়ু আর মুড়ি খাওয়াত।  আগেকার দিনের কত কথা বলত বিজয়ের বাবা সুভাষ গিরি।স্বাধীনতা সংগ্রামের কত কথা বলত । সন্তোষ আর পরীক্ষিত হাঁ করে শুনত। দুজনেই গুলি খেয়ে মারা গেল পিরকাঁটার জঙ্গলের ধারে। রাত্রিবেলায় খবর এল। বিজয়ের মনে আছে বাবা তার পরদিন সারা দিন রাত কিছু খায়নি। 

    পনের মিনিটের মধ্যেই ম্যাটাডোরটা চলে এল।খড় বিছোনো আছে গাড়িতে। রোদ আটকানোর জন্য একটা পলিথিনের ছাউনিও করা আছে।একটা মোটর কারের ব্যবস্থা অনায়াসে করতে পারত বিজয়। চেনাশোনার মধ্যে কাউকে বললেই হত। কিন্তু সুভাষ গিরির রক্ত বইছে তার শরীরে । কারও বদান্যতা গ্রহণ করার অভ্যেস তার ধাতে নেই।

    খড়ের গদিতে শুইয়ে দেওয়া হল সুখিরামকে। পেন কিলারের প্রভাবে সুখির যন্ত্রণা কিছুটা কম এখন।

    সদর হাসপাতালে ও পি ডি-তে টিকিট করে বাইরে দাঁড়িয়েছিল ওরা কখন ডাক আসে সেই অপেক্ষায়।

    খুব বেশি দেরি হল না। হাসপাতালের এক জুনিয়র ডাক্তার বিজয়ের চেনাশোনা  ছিল। সে সুখিকে একটু তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করে দিল। ডাক্তারবাবু দুরকম ওষুধ দিলেন। একটা খাওয়ার, একটা লাগাবার। তাছাড়া রক্ত পরীক্ষা করার জন্য লিখে দিলেন।

    হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ওরা  সকলে একটা বটগাছের তলায়  বসল। ওখানে আরো অনেকে বসে আছে। এই গাছটারই একপাশে মাথায় তেরপল খাটিয়ে একটা ভাতের হোটেল বসানো    হয়েছে। বেশ সস্তা। পঁচিশ টাকা পেটচুক্তি মিল। অনেক লোক খাচ্ছে। বেশিরভাগই হাসপাতালের রুগীদের লোকজন। বহুযুগ ধরে রাজনীতিতে জড়িয়ে থাকা এক প্রবীন ব্যক্তির যুবক ছেলে অজ্ঞাতকুলশীল নগন্যতার আড়ালে বটগাছতলায় বসে আছে সঙ্গে ‘পেশেন্ট’ নিয়ে এটা এ যুগে অভাবনীয় ব্যাপার। কিন্তু সুভাষ গিরি মশায়ের বংশধারায় এসব এখনও হয়। রাজনীতিকে আস্ফালনের অস্ত্র কিভাবে করতে হয় জানা নেই এদের।

    মহাদেব আর অক্রুরের খুব ক্ষিদে পেয়ে গেছে। মহাদেব কিছুটা দোনামোনা করে শেষে বলে ফেলল, ‘দেড়টা বাজতে চলল। ওখানে খেয়ে নিলে হয় না .....’

    বিজয় বলল, ‘হ্যাঁ তা হয়। চল দেখি ..... কি পাওয়া যায় ...’ ।

    ভাত খাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় পায়ের ঘায়ের জ্বালা ভুলে সুখিরামের মুখে এক গাল ভরা হাসি ফুটে উঠল।

    পরেশ জানা নগেন্দ্রপ্রসাদ বিদ্যামন্দিরে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়ায়। আর পাঁচজনের মতো সেও সুভাষ গিরিকে মান্যিগন্যি করে। হাওয়া অবশ্য ঘুরে গেছে অনেকদিন আগেই। জটাগুড়ির বর্ডারের ধারে বটগাছের নীচে এখন অন্য আর একদল বসে সকাল সন্ধেয় প্ল্যান প্রোগ্রাম করে। দল বদলু জনা তিনেকও আছে তার মধ্যে। তার মধ্যে নারায়ণ পুরিয়ার অনেক গুণ। দল ভাঙা দল গড়া দুরকম গুণই আছে। সে এমনিতে গম্ভীর মানুষ। ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাঙ তুলে বসে উদাস চোখে সামনের মাঠের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হিসেব কষতে থাকে। সে জানে সুভাষ গিরিকে ভাঙানোর দায়িত্ব তার ওপরই পড়বে। এ এলাকায় সুভাষ গিরির মতো সর্বজনমান্য লোকের দল বদলের প্রভাব যে কতখানি হতে পারে সে ভালোই জানে। সেটা যে পুরোপুরি তার নতুন দলের পক্ষেই যাবে এটা মোটামুটি নিশ্চিত। কিন্তু একটু প্যাঁচালো কাজ হাসিল করার জন্যই তো এত সুযোগ সুবিধে দিয়ে তাকে নতুন দলে বরণ করা হয়েছে। নারায়ণ পুরিয়া চোখ সরু করে সামনের মাঠে খোঁটায় বাঁধা গরুটার দিকে তাকিয়ে থাকে। দীপঙ্কর মাইতিকে সে লাগিয়েছে এই ব্যাপারে। কদ্দুর কি করে উঠতে পারবে ভগবান জানে।

    সুভাষ গিরির ছেলে বিজয়ের কথা অনেক দিন ধরেই তার মাথায় ঘুরছে। ছেলেটা বাপের খুব ন্যাওটা। ওকে যেভাবে হোক হাত করতে পারলে সহজেই কাজ হাসিল করা যাবে আশা করা যায়। নারায়ণ সিগারেটে শেষ টান মেরে টুকরোটা টুসকি মেরে ফেলে দেয়। বটতলার আড্ডায় আর এক খেপ চা আর বিস্কুট এল হরিপদর দোকান থেকে।

    পরেশ জানা বোধহয় স্কুলের দিকে যাচ্ছিল বটতলার সামনে দিয়ে। নারায়ণ পুরিয়া গলা তুলে বলল, ‘পরেশ যে .... ইস্কুলে চললে নাকি?’

    পরেশ একটু থেমে বলল, ‘হ্যাঁ বাজার ঘুরে স্কুলে যাব। মিড ডে মিলের সয়াবিন আর কাঁচা লঙ্কা কিনতে যাচ্ছি। চলি এখন .... পরে কথা হবে ....’

    পরেশ আবার হনহন করে বাজারের দিকে হাঁটতে থাকে। নারায়ণ পুরিয়া গলা তুলে বলল, ‘আমাদেরও একটু দেখ .... সময় করে বাড়িতে এস একদিন।’

    পরেশ যেতে যেতেই সম্মতিসূচক অর্থে ডান হাতটা ওপরের দিকে তোলে। নারায়ণ আবার চোখ সরু করে মাঠে খোঁটায় বাঁধা গরুটার দিকে তাকিয়ে নিজের ভাবনায় ডুবে যায়। বটতলায় কটা লোক তাস খেলতে খেলতে মহা হল্লা গুল্লা শুরু করেছে। নারায়ণ ওখান থেকে উঠে আস্তে আস্তে পার্টি অফিসের দিকে হাঁটতে লাগল।

    তার দুজন সাগরেদের সাহায্যে সুখিরামকে নিয়ে ওই একইভাবে নদী পার হয়ে অনেক কষ্টে গ্রামে ফিরে এল। সুখির রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট আনতে আর একদিন সদর হাসপাতালে যেতে হবে। মহাদেবকেই পাঠাবে বলে ঠিক করল বিজয়।

    দ্রৌপদি রাতদিন ব্যস্ত থাকে। তেইশ বছর বয়েস। শ্যামবর্ণা খাঁটিখুঁটি চেহারা। সেই ভোর থেকে চরকির মতো পাক খাচ্ছে। ঘরের কাজ, বাইরের কাজ দুটোই একার হাতে সামলাচ্ছে। ছোটবেলা থেকে ক্ষেতে জমিতে নিরন্তর কাজের ঘষায় হাতের পাঞ্জা রুক্ষ কঠোর । বিজয়ের বংশমর্যাদার সঙ্গে দ্রৌপদির পারিবারিক অবস্থানের কোন তুলনা হয় না। কিন্তু দ্রৌপদির তাতে কিছু যায় আসে না। সে যে সুভাষ গিরির ছেলেকে ‘ভীষণ’ ভালবাসে এ ব্যাপারে তার কোন লুকোছাপা নেই। এমনকি বিজয়কে বিয়ে করার পরিকল্পনাও নাকি তারা পাকা। সুভাষ গিরি যে তার ভাবী শ্বশুরমশাই সে ব্যাপারে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। শুধু বিজয়ের মতামতটাই যা পরিষ্কারভাবে জানা হয়নি। দ্রৌপদির মতে বিজয় একটা ‘ছেলেমানুষ’। ওর আবার মতামত কি ? সে যা ঠিক করেছে তাই হবে।

    সুখিকে যখন ধরাধরি করে ভ্যানরিক্শা থেকে নামানো হল তখন সন্ধে হব হব করছে। দ্রৌপদি  ক্ষেতের ধারে নয়ানজুলিতে হাত পা ধুচ্ছিল। সেও তড়িঘড়ি ছুটে এসে হাত লাগাল। বিজয় বলে, ‘আরে ... ঠিক আছে ..... আমরা ধরছি ....’। মেয়েটা সটান বিজয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কেন! আমি কি মানুষ না নাকি? ধরলে ক্ষতি আছে কিছু?’

    — ‘যা: বাবা .... এ আবার কি কথা ! তোর অসুবিধে হতে পারে তাই .....’
    — ‘বুঝেছি বুঝেছি .... আর বোঝাতে এস না....’

    এমনিতে কাঠখোট্টা মেয়ে। কোন কিছুর পরোয়া নেই। শুধু বিজয় কিছু বললেই চোখ ফেটে জল আসে দ্রৌপদির।

    সুভাষ গিরি বিকেলবেলা বেলা পড়ে এলে একটু হাঁটতে বেরোন। প্রায় আধঘন্টাখানেক স্বাভাবিক গতিতে পুবের মোড় পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে আসেন। রাস্তায় অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। মাঝে মাঝেই দাঁড়াতে হয় তাদের কারো কারো সাথে কথা বলার জন্য। অনেকে সুভাষবাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। সুভাষবাবুর পার্টির কোমর ভেঙে গেছে। কিন্তু সুভাষ গিরির নিজস্ব জনপ্রিয়তা এখনও অটুট আছে। প্রাইমারি স্কুলের পাশে হতশ্রী মলিন দুবলা ক্ষয়াটে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জং ধরা তালা মারা পার্টি অফিস। সাইনবোর্ডের লেখাগুলোও সময়ের ঝাপটায় হয়ে গেছে ম্লান অস্পষ্ট। সুভাষবাবুর বুকের গহন থেকে বেরিয়ে আসে গভীর শ্বাস। স্কুলে ছুটির ঘন্টা বাজল। ছেলেমেয়ের দল বেরিয়ে আসতে লাগল। ওপাশে আকাশে লাল বরণ লেগেছে । দিন ঢলে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে। সুভাষবাবু ওই আকাশের দিকে তাকিয়ে অস্তরাগের শোভা দেখতে লাগলেন। দিন কখনও এক থাকে না। সকাল দুপুর বিকেল সন্ধ্যা । তারপর ঢলে যায় দিগন্তের কোলে। জীবনের কালবেলাও তাই। নিরন্তর এক থাকে না। একসময়ে নেমে আসে ধূসর গোধূলি। ম্লান ছায়ার আবরণে ঢাকে পুরণো আটচালার পোক্ত গৌরব কাঠামো। নি:সঙ্গ খুঁটিগুলো দাঁড়িয়ে থাকে অন্ধকার আর অবহেলা মেখে এক গভীর প্রত্যাশা শরীরে জড়িয়ে রেখে ..... উজ্জ্বল সোনালী দিনগুলো যদি ফিরে আসে আবার। 

    আবার একটা শ্বাস পড়ে সুভাষ গিরির। পার্টির সে রুপোলী মধ্যাহ্ন কি ফিরবে আর এ জীবনে! 

    হাঁটতে হাঁটতে সুভাষবাবু কালীমন্দিরের কাছাকাছি এসে পৌঁছলেন। মাথা নীচু করে আনমনে কিছু ভাবতে ভাবতে যাচ্ছিলেন। এই সময় শুনতে পেলেন — ‘দাদা .... নমস্কার .... হাঁটতে বেরিয়েছেন বুঝি?’

    সুভাষবাবু মুখ তুলে দেখলেন দীপঙ্কর মাইতি দাঁত বের করে অমায়িক ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে।

    — ‘ও... তুমি .... হ্যাঁ ওই একটু ...’ সুভাষবাবু বললেন। সুভাষবাবু তার অভ্যাসমত দীপঙ্করকে তুমি আপনি মিশিয়ে সম্বোধন করতে লাগলেন।

    জায়গাটা ফাঁকা । আশেপাশে লোকজন কেউ নেই। দুজনেই খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দীপঙ্কর হাল্কাস্বরে স্মিত হেসে বলল, ‘তারপর..... সুভাষদা ..... মানে কিছু ঠিক  করলেন নাকি?’

    সুভাষ গিরি হাঁটতে আরম্ভ করেছেন। তিনি চলমান অবস্থাতেই বললেন, ‘কি .... কি ব্যাপারে বল তো?’

    — ‘না .... মানে .... ওই সেদিন যেটা বলছিলাম ..... আপনার বাড়িতে ....’

    এসব কথা আজকাল এত নকড়া ছকড়া করে বলতে হয় না। হোয়াটস অ্যাপে ফিলার পাঠালেই হয়ে যায়। শুধু টাকার অঙ্কটা নিয়ে একটু দর কষাকষি হতে পারে। সেও ব্যক্তিগত ইনবক্সে। সুভাষ গিরি কিসিমের অস্তিত্ব এখন বিরল প্রজাতি বলা যায়।

    সুভাষ গিরি মশাই একটুও উত্তেজিত হলেন না। তিনি ধীর শান্ত কন্ঠে বললেন, ‘দেখুন ভাই, সারা জীবন ধরে অনেক সংগ্রাম অনেক আঘাত সহ্য করে একটা আদর্শ বুকে বেঁধে বেড়ানো, একটা পতাকাকে মায়ের আঁচলের মতো পরম ভালোবাসায় আগলে রাখা একটা মানুষের মন সে আপনারা বুঝতে পারবেন না। আমরা হলাম এ যুগের অচল আধুলি ...... হা:  হা:  হা: .... পার্টির কথাও এখন আর বুঝতে পারি না .... বুঝলেন কিনা.... সব কিছুই দুর্বোধ্য ঠেকে ..... আমরা হলাম না হোমের না যজ্ঞের .... আমার পেছনে ঘুরে আপনি বৃথাই সময় নষ্ট করছেন। তাছাড়া একটা  কথা আমি বুঝতে পারছি না। আমার পার্টির তো এখন কোন ভোট জৌলুস নেই। তালে আমার পেছনে আদাজল খেয়ে পড়লে কেন তোমরা?’

    দীপঙ্কর মাইতি মুখের অমায়িক পেশাদার হাসি অম্লান রেখে নীচের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সেটা তো বলতে পারব না দাদা..... ওসব অনেক ওপরের ব্যাপার। নিশ্চয়ই তাদের কাছে আপনার দাম অনেক .....’

    এর পর পরিস্থিতিটা ঠিক  কি ভাবে  সামলানো যেতে পারে ঠিক করে উঠতে পারল না দীপঙ্কর। সে ভাবল আপাতত:  একটু বিরতি নেওয়াই ভাল। মানে, সরে পড়ে যাক। নারায়ণ পুরিয়াকে রিপোর্ট দিয়ে দিতে হবে। তারপর তারা যা সিদ্ধান্ত নেন।

    — ‘সুভাষদা ..... এরপর আমি আর কি বলব বলুন ..... আমি শুধু অফারের অ্যামাউন্টটা আর একবার বিবেচনা করে দেখবার অনুরোধ করতে পারি। অপরাধ নেবেন না ...... আচ্ছা এখন আসি তালে ..... নমস্কার ....’।

    সুভাষ গিরি অত্যন্ত উঁচুমানের বক্তা। তার মনে হল ওরা বোধহয় তাকে ফুটবল দলের কোন তুখোড় প্লেয়ারের মতো কয়েক মাসের মতো লিয়েন নিতে চাইছে টিভি চ্যানেলের প্যানেল ডিবেটে বসিয়ে তার নিজের প্রাণের পার্টিকেই দুর্গন্ধভরা পাঁক মাখানোর জন্য। খুব সম্ভবত ইলেকশান টুর্নামেন্টটের ফাইনালটা হয়ে গেলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে আবার পুরনো দলে গিয়ে খেলার জন্য, পাওনাগন্ডা মিটিয়ে দিয়ে। রীতিমতো কর্পোরেট ধাঁচের বন্দোবস্ত।

    জোরালো অ্যান্টিবায়োটিকের জোরে সুখির ঘা অনেকটা শুকিয়ে এসেছে। এখন হেঁটে হেঁটে এখানে ওখানে যেতে পারে। সেদিন সুভাষ গিরির বাড়ির দাওয়ায় গিয়ে বসল সকালবেলায় । সুভাষবাবু তখন খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলেন একটা পুরনো কাঠের চেয়ারে বসে। তিনি খবরের কাগজ কোলের ওপর রেখে সুখিকে বললেন, ‘কিরে সুখি কেমন আছিস?’

    সুখি শালকাঠের খুঁটিতে হেলান দিয়ে বলল, ‘ভাল আছি দাদা। এখন অনেক ভাল। বিজয় দাদা আমার জন্যে যা করেছেন ও: .... কি বলব .... আমি কোনদিনও ভুলব না ......’।

    এ এক অদ্ভুত সম্পর্ক। বাবাকে ডাকছে দাদা, আবার ছেলেকেও বলছে দাদা। 

    সুভাষবাবু বললেন, ‘এটাই তো আমাদের কাজ। পা দুটো জোরালো না হলে লড়াইয়ের সড়কে ছুটবি কি করে?’

    সুখি কি বুঝল কি জানি, বলল, ‘সে চিন্তা করবেন না দাদা, বিজয় দাদার পাশে থাকব সবসময়। পতাকা ধরে থাকব শক্ত করে।’

    সুভাষবাবু নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন সুখিরামের দিকে। তার চোখে মধ্যাহ্ন সূর্যের দীপ্তি ফুটে উঠল।

    প্রলয় বসাকের সুন্দর সুঠাম চেহারা। বয়সও অল্প। কলকাতায় কোন বেসরকারি  কোম্পানিতে যেন কাজ করে। পরের দিন বিকেলে বাজারের কাছে দেখা হল। প্রলয় বলল, ‘জেঠু কেমন আছেন?’

    — ‘আরে প্রলয় যে ..... কি খবর, কেমন আছ? আজকাল মোটে দেখা হয় না।’
    — ‘ভাল আছি দাদা। আপনারা কেমন? পার্টির খবর তো আজকাল কিছু পাই না। বাবা প্রায়ই জিজ্ঞাসা করে আপনাদের কথা, কিন্তু আমি তো কিছুই বলতে পারি না। বাবার শরীরও একদম ভাল না। একবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে। মাঝে একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিকেলবেলার দিকে হাঁটতে হাঁটতে তালাবন্ধ বট অশ্বথ্থ গাছ গজানো পার্টি অফিসের সামনে পৌঁছে গিয়েছিল। সেদিন আমার ছুটির দিন ছিল। সন্ধে হয়ে গেছে তখনও বাবা ফেরে না দেখে আমি বাবাকে খুঁজতে খুঁজতে প্রাইমারি স্কুলের পাশে ভাঙাচোরা পার্টি অফিসের সামনে এসে দেখি  পার্টি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে বাবা কাঁদছে। আমি বললাম, বাবা কাঁদছ কেন। বাবা বলল, ‘চোখের সামনে একটা সূর্য ডুবতে দেখলাম। আর বোধহয় উঠতে দেখা হবে না এ জীবনে। জীবন তো শেষ হয়ে এল ...... ।’

    প্রলয় বসাক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সুভাষবাবু স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন । বাজারে বেচা কেনা জমে উঠেছে। হৈ চৈ উচ্চকিত হয়ে উঠছে ক্রমশ। সেই প্রাণবন্ত বাজারের মধ্যে দুটি অসমবয়স্ক মানুষ পরষ্পরের মুখোমুখি মৌন ও বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

    কিছুক্ষণ বাদে সুভাষ গিরি বললেন, ‘বিজয়ের সঙ্গে একবার দেখা করো। ওরা পরশুদিন এই বাজারেই একটা জমায়েত ডেকেছে। ব্লক স্তরের সবাইকে খবর দেওয়া হয়েছে।’

    —‘অবশ্যই অবশ্যই ....’ বলেই বিদায় নিল না। সুভাষবাবুর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বকুলতলা পর্যন্ত এল। এখানে লোকজন খুব কম। ওখানে পৌঁছে দুজনে আবার দাঁড়াল। প্রলয়ের আরও কিছু বলার বোধহয় বাকি।

    সে হঠাৎ বলল, ‘আচ্ছা জেঠু, বামপন্থা দক্ষিণপন্থা মধ্যপন্থা .... এসব কি আর কিছু আছে? সংসদীয় গনতন্ত্র তো এখন শুধু ক্ষমতা এবং সম্পদ দখলের লড়াই। যে কোন পন্থারই তো এখন  এই একটাই লক্ষ্য।’

    সুভাষবাবু কোন উত্তর না দিয়ে মাথা নীচু করে কি ভাবতে লাগলেন। তারপর মৃদু কন্ঠে বললেন, ‘মুশকিল হচ্ছে কি জান প্রলয় সব জেনে বুঝেও স্বপ্ন দেখা ছাড়তে পারি না। বুঝতে পারি সবটাই পুরো ফাঁকিবাজি। বামতন্ত্র ডানতন্ত্র এসব কিছু না। অঘোষিত ভোগতন্ত্র। কোন বিভেদ বা বৈষম্য নেই এ ব্যাপারে। রাস্তাগুলো সামান্য আলাদা। কেউ ধর্মীয় কূপমন্ডুকতা কাজে লাগায়। কেউ কাজে লাগায় সহায় সম্বলহীন অগনন উপভোক্তামন্ডলীকে, আর কেউ কেউ কেউ এখনও ফিরি করে বেড়ায় অবুঝ শ্রেণী বিপ্লবের মায়াকাজল। যত মত তত পথ। কিন্তু মোক্ষ তো একটাই। যা আমরা বলি এবং যা আমরা করি সবই ফাঁকিতে মোড়া।’

    বকুল গাছের ডালে ডালে কত পাখি চঞ্চল ওড়াউড়িতে ব্যস্ত এখন। 

    দুপুরবেলায় খাওয়াদাওয়ার পর তার নানা অপরিচিত ভাবনার ঢেউ উঠতে লাগল। তার হাতের আঙুল নিশপিশ করতে লাগল মোবাইলের কনট্যাক্ট লিস্টে দীপঙ্কর মাইতির নামটা ছোঁয়ার জন্য। সবই তো ফাঁকিবাজি। অকারণ শূন্যগর্ভ আবেগ পুষে রেখে লাভটা কি? শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে থামালেন। বিছানায় একদিকে কাৎ হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন সুভাষ গিরি প্রবল মানসিক শ্রান্তির ভারে ক্লান্ত হয়ে।

    ফাঁকিবাজ হোক, বা না হোক স্বপ্ন দেখার লোকের অভাব নেই। স্বপ্ন ফেরি করার জন্য হাঁক পাড়তে হয় না। অকপট আবেগের ঢেউয়ে সওয়ারি হওয়ার জন্য কোথা থেকে সব উড়নচন্ডীরা ছুটে ছুটে আসে। ফাঁকিবাজ বেহিসেবীর দল।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে প্রতিক্রিয়া দিন