• খেরোর খাতা

  • মহিষাসুরমর্দিনী 

    Sayanti Mandal লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৬ অক্টোবর ২০২১ | ২২২ বার পঠিত
  • “ওগো আমার আগমনী আলো”

    অনেকগুলো বছর জীবনের কেটে গেছে। তবুও ঘুমঘোরে মহালয়ার দিন এই গানটি শোনার সাথে সাথে আজও যেন পুজোর রোমাঞ্চকর শিহরণ অনুভব করি। রোজকার রুটিন থেকে কদিন যেন মুক্তি পাবো এই আনন্দ। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব মা দুর্গার আগমনে।

    ছোটবেলায় “মহিষাসুরমর্দিনী” শোনার একমাত্র উপায় ছিল মহালায়ার দিন ভোরে আকাশবাণী থেকে রেডিওতে প্রচারিত এই অনুষ্ঠান। এখনকার মতো সহজলভ্য ছিল না। তাই আগ্রহ বেশি ছিল। কোন কারনে একবছর মিস করলে আবার পরের বছরের আগে শোনার উপায় ছিল না। আগের দিন রাত্রি থেকে অনেক পরিকল্পনা প্রস্তুতি থাকত। তখন প্রায় প্রতি ঘরেই রেডিও ছিল।ফিলিপ্স কোম্পানি বেশ পরিচিত তখন। বাবা রেডিওতে খবর শুনত। টেলিভিশন আসে নি বাড়িতে বাড়িতে। আমরাও মাঝে মাঝে টুকটাক অনুষ্ঠান শুনতাম রেডিওতে। রেডিওর অ্যান্টেনা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে অচেনা অনেক চ্যানেল ধরার চেষ্টা করতাম। তবে বেশির ভাগ ঘ্যার ঘ্যার আওয়াজ শোনা যেত। রেড এফেম, রেডিও মিরচি এসব তখন অধরা। যাই হোক, মহালয়ার আগের দিন রেডিওটা একটু ঠিকঠাক করে রাখা হত, যাতে সঠিক সময় সেটা গণ্ডগোল না বাধায়। রেডিওর এরকম কীর্তিকাহিনী ইতিহাস ঘাটলেই পাওয়া যাবে। বাবা দেখতাম অনেক সময় আগের দিন রেডিও বগলদাবা করে দোকানে নিয়ে যেত, একটু সারভিসিং করাতে। রেডিও রেডি হলে আগের দিন তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রাখা হত। তবুও বিশেষ ভরসা করতে পারতাম না ভোরবেলা ওঠার ব্যাপারে। মা কে বলে রাখতাম যেন ডেকে দেয় সময় মত। মহালয়ার দিন সকালে যথা সময়ে অ্যালার্ম বাজত। উঠে মুখ চোখে জল দিয়ে আবার এসে বিছানায় আশ্রয় নিতাম। ততক্ষণে রেডিওতে শুরু হয়ে গেছে “যা চণ্ডী মধুকইতভাদি”। সাথে এক গুরুগম্ভীর গলায় “আশ্বিনের শারদপ্রাতে”। তারপর একে একে “বাজলো তোমার আলোর বেণু”, “জাগো দুর্গা দশপ্রহরনধারিনি”………। মাঝে মাঝে সেই গুরুগম্ভীর চণ্ডীপাঠ। সত্যি বলতে গলাটা শুনে বেশ ভয় ভয় লাগত। ওদিকে চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে। না, অনেক কষ্ট করেও আর পারা যেত না। সব প্রচেষ্টা বৃথা। আমি ততক্ষণে ঘুমের দেশে। আবার যখন ঘুম ভাঙল ততক্ষণে পূব আকাশে আলোর রেখা জানলা দিয়ে বিছানাতে এসে পড়ছে। আর রেডিওতে বাজছে “শান্তি দিলে ভরি”।

    পরবর্তীকালে রেডিওর দর কমে যায়। রেডিওর জায়গা নেয় টেলিভিশন। মা ছিল টেলিভিশনের পক্ষে। প্রথমে ছিল দূরদর্শনের মহালয়ার অনুষ্ঠান। তারপর যত দিন গেছে নানান চ্যানেলের রঙিন অনুষ্ঠান। দুর্গার ভুমিকাতে আমরা অনেক নামী দামি শিল্পীকেই দেখেছি। তবে মহিষাসুর বা অন্যান্য চরিত্রের তেমন কদর ছিল না। তবে তাদের সাজ পোশাক আর অতিনাটকীয় অভিনয় খারাপ লাগত না। বিশেষ করে মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতাদের পলায়ন মনে রয়ে গেছে। রেডিওর শোনা অনুষ্ঠানকে টেলিভিশনের কলাকুশলীরা দৃশ্যমান করে দিত। ছোটবেলায় ছিল সাদা কালো টিভি। পাশের বাড়িতে ততদিনে রঙিন টিভি চলে এসেছে। কিন্তু অদ্ভুত ছেলেবেলা, সে বাড়ির ছোটোরা আমাদের বাড়িতে সাদা কালো টিভিতেই এই অনুষ্ঠান দেখতে আসত। সকালটা বেশ ভালোই কাটতো। পাড়ার অন্যান্যরা তখন অল্প বিস্তর রাত জেগে ফিস্ট করা শুরু করেছে। সেখানে নাম লেখানোর পারমিশন আমরা কোনোদিন পাই নি। তাদের কাছে গল্প শুনেই আমারা দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। বাবা তখনও রেডিওর ফ্যান। ততদিনে পুরানো ফিলিপ্স রেডিওটি অবসর নিয়েছে। তার জায়গায় এসেছে ছোট সাইজের একই কোম্পানির ট্রানজিস্টর। ফিলিপ্স কোম্পানী ছাড়াও যে অন্য কোম্পানি ছিল সেটা বাবা জানত কিনা কে জানে। যাই হোক রেডিওর প্রোগ্রাম যথারীতি ঘুম চোখে শোনা হত। তবে আমার ওই মাঝখানের অংশটুকু না শোনাই থেকে যেত। কখনো ঘুমের মধ্যে থেকে “অখিল বিমানে তব জয় গানে” বা “হে চিন্ময়ী” শুনতাম।

    তবে নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি বিশেষ। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজ, কলেজ পেরিয়ে চাকরি জীবনে প্রবেশ করেছি। কিন্তু রেডিওতে মহিষাসুরমর্দিনী বাদ যায় নি। টিভির রমরমার যুগেও নিয়ম করে উঠেছি। প্রথম প্রথম টেলিভিশনের প্রোগ্রামের আকর্ষণ থাকলেও পরবর্তীকালে আর তেমন আগ্রহ থাকে নি। মা যদিও টিভির একনিষ্ঠ দর্শক হিসেবে সারাজীবন ওই অনুষ্ঠান দেখে গেল। বাবার অবস্থা অনেকটা আমার মত। ততদিনে আরও দুটো ট্রানজিস্টর সেট পার হয়েছে। এখন একটা পকেট ট্রানজিস্টর আছে বাবার। মহালয়ার আগে দেখি বাবা নিজেই সেটাকে চালিয়ে সরগর করছে। আর আমাদের রেডিও এখন মুঠোফোন। ঘড়িতে অ্যালার্ম না দিলেও এখন ঘুম প্রায় ওই সময়েই ভেঙ্গে যায়। মুঠোফোনটার মাথায় হেডফোন নামক অ্যান্টেনা লাগিয়ে চালিয়ে দি মহিষাসুরমর্দিনী। চণ্ডীপাঠ শুনে রোমাঞ্চ হয় আজও। মা দুর্গার আগমন বানীতে মনের ক্লান্তি যেন দূর হয়ে যায়। মনে হয় জীবন যেন শরতের নিল আকাশের মতো অমলিন। ভালো লাগে শুনতে সেই স্বাধীনতার আগে থেকে বেজে আসা গানগুলি। পুরোনো হয়না তাদের সুর, আবেগ, মূর্ছনা। দেবী দুর্গার আগমনী যেন সব অন্ধকার দূর করে দেবে এই আশায় বুক বাঁধি।

    কিন্তু এবারও বিধি বাম। “তব অচিন্ত্য” যেই শুরু হল আবার ঘুম পেয়ে গেল। ঘুম যখন ভাঙল তখন সেই “শান্তি দিলে ভরি”।

     

  • আরও পড়ুন
    বার্ড - Sambaran Sarkar
  • বিভাগ : অন্যান্য | ০৬ অক্টোবর ২০২১ | ২২২ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | 2406:7400:63:3c5e::103 | ০৬ অক্টোবর ২০২১ ১৯:১৯499191
  • কেন ?? এইসব  লিখলেন কেন ?? 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন