এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • দেশভাগ 

    Lidiya Ganguly লেখকের গ্রাহক হোন
    ১১ জুন ২০২১ | ১৪১৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • দিনাজপুর জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর বিভাগের একটি অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ জেলা। উপজেলার সংখ্যানুসারে দিনাজপুর বাংলাদেশের একটি “এ” শ্রেণীভুক্ত জেলা। দিনাজপুর জেলা উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলার মধ্যে বৃহত্তম। এই অঞ্চল ভূতাত্ত্বিকভাবে ভারতীয় প্লেটের অংশ যা আদি জুরাসিক যুগে সৃষ্টি হওয়া গন্ডোয়ানাল্যান্ডের অংশ ছিল। সে যাইহোক দিনাজপুর জেলার ভূগোল এবং ইতিহাস নিয়ে পরে একদিন গল্প করা যাবে আজ আপনাদের ছোট্টুর গল্পটি বলি। ছোট্টুরা থাকতো বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার একটি ছোট্ট গ্রামে। বাড়িতে ছিলো আম্মা আব্বু আর তার সদ্যোজাত একটি বোন।সেই গ্রামটি ভারতের কাছে হিলি বর্ডার থেকে খুব বেশি দূরত্বে ছিলো না। ছোট্টুর বাবা ওই গ্রামেই রিক্সা চালাতো। রিক্সা চালিয়ে যা রোজগার করতো তাতে কোনো রকমে ভাতটুকু জুটে যেত ওদের। পড়াশুনা করতে কোনোদিনই স্কুলে যেতে পারেনি ছোট্টু।বয়স তার ৫বছর, এখনি তো স্কুলে যাওয়ার সময়। কিন্তু তার বাবার দুবেলা দুমুঠো খাওয়ার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয়। সেখানে লেখাপড়া তাদের কাছে বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই না। নিত্য অভাব ছিলো তাদের নিত্য সঙ্গী। সে যাইহোক তাও টুকটুক করে চলে যাচ্ছিলো জীবন। হঠাৎ একদিন সব উল্টো পাল্টা হয়ে গেলো ওদের অভাবের অথচ খুশীয়াল জীবন কটি।

    ---ক্ষুদা লাগিছে মা।

    মুখ খানাকে করুন করে বললো ছোট্টু।

    ছোট্টুর মা অভিবাক্তিহীন মুখখানাকে নিয়ে মুড়ির কৌটো ঝেড়ে শুকনো একমুঠো মুড়ি নিয়ে এসে দিলো। ছোট্টু মুড়ির বাটির দিকে তাকিয়েই দেখলো একমুঠো মুড়ি দিয়েছে তার মা। চোখে জল ছল ছল করে মায়ের উদ্দেশ্যে বললো --- প্যাডডা যে একদম খালি! এতটুক মুড়িতে কমনে হবে কও!

    অভিব্যাক্তি হীন মুখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে আসিফা তার পাঁচ বছরের ছেলের দিকে। কোলে একটি তিন মাসের মেয়ে, ঘরে যক্ষা হয়ে পরে থাকা স্বামী। কি করবে সে এখন। এমনিতেই তারা দিন আনে দিন খায়। লোকটা আজ ১মাস হতে চললো রিক্সা নিয়েও বেড়োতে পারছেনা। ভাড়ার রিক্সা চালাতো নাজমুল, যক্ষা ধরা পরার পরেও বেশ কিছুদিন রিক্সা টেনেছিল মনের জোরে। শারীরিক দুর্বলতা মানুষিক জোরটাকেও আস্তে আস্তে গ্রাস করেছে নাজমুলের। সে এখন ঘরের এক কোনায় পরে থাকে আর সারাদিন খুক খুক করে কেসে যায়। হার জিরজিরে চেহারাটি দেখলে মনে হয় কোনো কঙ্কালের উপরে একটা চামড়ার প্রলেপ কেউ লাগিয়ে দিয়েছে। নিত্য দিন এই অভাব আর চোখে দেখতে পারেনা। নিজের বিবির মুখের দিকেও তাকাতে কষ্ট হয় নাজমুলের। ছোট্ট শিশুটা মায়ের বুকে দুধ না পেয়ে সারাদিন কাঁদতে থাকে। মনে মনে নিজেকে দোষারোপ করে নাজমুল। কি ক্ষয় রোগে ধরলো তাকে যে বৌ বাচ্ছার মুখে দিনান্তে একটু খাওয়ার তুলে দিতে পারেনা!!!

    দিনাজপুর জেলার উত্তরে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলা, দক্ষিণে জয়পুরহাট জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, পূর্বে রংপুর ও নীলফামারী জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলাদ্বয় অবস্থিত। রংপুর বিভাগের মধ্যেই পরে ছোট্টুদের গ্রাম। হিলি বর্ডার থেকে বেশ খানিকটা দৌড়ালে শুধু দৌড়ালে না জোরে ১ঘন্টার উপরে দৌড়ালে তবেই পরে ছোট্টুদের গ্রামের প্রথম অংশ। সেখান থেকে আবার দৌড়ে গ্রামের শেষ অংশে ছোট্টুদের বাড়ি(এভাবেই ঠিকানা দিয়েছে ছোট্টু )। বাড়ির দরিদ্রতা সহ্য করতে না পেরে শেষে কাজে যোগ দেয় ছোট্টু। প্রথম প্রথম ছোট্টুর মা কাজে লেগেছিলো হিলির রেল লাইন পার করে চিনি নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে বিক্রি করা শুরু করলো দুই দেশের সীমান্ত রক্ষিদের চোখ এড়িয়ে। তবে ছোট মেয়েটিকে রেখে আসিফা বেশিদিন সে কাজ চালিয়ে যেতে পারলোনা। শেষে ছোট্টুকে হাল ধরতে হলো। ছোট্টু শুরু করলো কাজ, ছোট বাচ্চা দেখে সকলের দয়ামায়াও হতো। সেটিকে কাজে লাগতো ছোট্টুদের যে পরিচালনা করতো দালাল সে। আস্তে আস্তে চিনির থেকে অন্য জিনিস পাচার শুরু করলো ছোট্টু। কাস্টমে ধরা পরা বিভিন্ন রকম সাজগোজের জিনিস, বিভিন্ন ওষুধ আরো কত কি পাচার করতো ছোট্টু। বালুরঘাট রেল লাইনের একদিকে বাংলাদেশ আর বিপরীতে ভারতবর্ষ তাই রেললাইনটি পার করেই অন্য দেশে চলে আসা যায়। এভাবেই চলছিলো ছোট্টুর জীবন।

    কয়েক মাস পরে ছোট্টু কাজ করতে করতে আরো পারদর্শী হয়ে উঠলো মাল হাতে এপার ওপার হওয়া মুশকিলের দেখে গাছের টবের মধ্যে করে জিনিসপত্র পাচার করতে লাগলো। রাতের বেলাতেই কাজ বেশি হতো ওদের।রাতে বাড়িতে থাকতোনা ছোট্টু। ঘুম নিদ্রা ভুলে দিন রাত খাটতো সে, একদিন রাতে বালুরঘাট স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে উঠে ভাবলো এই ট্রেনতো সকালে ছাড়বে রাতটুকু ট্রেনেই ঘুমিয়েনি। যেমন ভাবা তেমন কাজ, ট্রেনে উঠে ঘুমিয়ে পড়লো ছোট্টু। ঘুম ভাঙলো শিয়ালদা স্টেশনে এসে। ট্রেন থামতেই নামলো ট্রেন থেকে, নেমেই হকচকিয়ে গেলো সে!!!একোথায় এসেছে!!! এইতো তার চেনা স্টেশন নয়। ভীষণ ভয় পেয়ে এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলো। এত বড় স্টেশন এতো লোকজন ছোট্টু এখন কি করবে কোথায় যাবে কিছুই বুঝতে পারলো না। শেষে গিয়ে জি.আর.পি. এর কাছে ধরা পরল। অতটুকু বাচ্চা ছেলেকে এই ভাবে ইতস্তত ঘোরাফেরা করতে দেখে শিয়ালদা স্টেশনের জি. আর. পি ওকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করতে শুরু করলো। অবশেষে ওকে চাইল্ডলাইন এ জমা করলো। চাইল্ডলাইনে এক রাত থাকার পরে ওকে সি ডাবলু সি (চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি)র হাতে হস্তান্তরিত হলো। ছোট্টুকে জিজ্ঞাসা করে সে ভাবে কিছুই জানতে পারলো না কেউই। সে শুধু সজল চোখে একটা কথাই বলছে "আমারে বালুরঘাটের টেরেনে উঠায়দিলে আমি ঠিক চইলা যামু আমার গাঁয়ে।" তার কথা কেউ কানেই তুলছে না তখন। অনেকেই ওকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে সে অন্য দেশে এসে পৌঁছেছে। এটা বাংলাদেশ নয়। যাইহোক কি আর করবে ক্রমশ এতো নিয়মের বাঁধনে নিশ্চুপ হয়ে গেলো ছোট্টু। অবশেষে তাকে একটি সরকারি হোমে এনে রাখা হলো।

    বেশ কিছু বছর হয়ে গিয়েছে ছোট্টুর বয়স আর ৫বছরে আটকে নেই। সে একটু বড় হয়েগিয়েছে। সে যে হোমে থাকে সেখানে আরো অনেক আবাসিক থাকে। তাদের সকলেই বয়স ১৮বছরের নিচে। আবার এমন ছেলেরাও আছে যাদের বয়স ১৮বছরের বেশি। যেহেতু অপরাধ করার সময় তাদের বয়স কম ছিলো তাই তারাও এই হোমেই থাকে।সেই সব আবাসিকের মধ্যে সকলেই কিছুনা কিছু অপরাধ করেছে যেমন খুন, চুরি, ডাকাতি, অথবা ধর্ষণ। ছোট বয়সে অপরাধের জন্য সেই ছেলে গুলিকে জুবিনাইল ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়। সকলেরই বিচার চলছে। এদের মধ্যে বর্ডার পার করে এদেশে ঢোকার অপরাধে ছোট্টুর মতো অনেক বাচ্চাই রয়েছে।ছোট্টু এমনি চুপচাপই থাকে, সারাদিন হোমের অনেক কাজ করে। তবে পড়াশুনার বিষয়ে তার বড় অনীহা ছিলো। ইতিমধ্যে একটি কান্ড ঘটলো, সেই হোমে সোশ্যাল ওয়ার্কার হয়ে নিযুক্ত হলো অপর্ণা মিত্র । বয়স ২৪/২৫বছর হবে। প্রথম দিন নিযুক্ত হওয়ার পরে সকলের সাথে আলাপ হলো অপর্ণার। নতুন দিদিকে দেখে অদ্ভুত উত্তেজনা আবাসিকদের মধ্যে। কেউ কেউ আবার কথাও বললো নতুন দিদির সাথে। আবাসিকদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে যেন। অপর্ণার বেশ ভালোই কাটলো প্রথম দিনটি। হোমের সুপারের ঘরে বোসে প্রথমদিন সব কাজ বুঝে নিয়ে সেদিনের মত বিদায় নিলো নতুন দিদি।

    সকাল ১০টার মধ্যে সকল আবাসিকরা খেয়ে স্নান সেরে নিচে নেমে একটি হল ঘরে সব হাজির হয়। সেখানে প্রার্থনা করে সকলেই একটু পড়াশুনা করতে বসে। এটিকেই তারা ইস্কুল বলে। অপর্ণা সেই ইস্কুল টাইমে সেই হলঘরে এসে বসে রোজ। ছোট ছোট বাচ্ছারা তাকে ঘিরে থাকে সব। কত গল্প করে বেশিরভাগ বাচ্চার বাড়ি বাংলাদেশ। তাদের দেশের গল্প করে, কি করতো তারা বাড়িতে তার গল্প, কি ভাবে এদেশে পৌছালো তার গল্প। বেশ মজা লাগে অপর্ণার। কত ছোট ছোট শিশু সব মা বাবা ছাড়া পরিবার ছাড়া এই হোমে পরে রয়েছে। তাদের কথা ভাবলেই চোখে জল আসে অপর্ণার। সবাই নিজেদের ব্যাথার কথা বলে তাদের প্রিয় দিদিকে। ছোট্টু ইস্কুলে আসে না প্রথম থেকেই কিন্তু অপর্ণাকে দুর থেকে দেখে আর চোখেচুখি হলেই মিষ্টি করে হাসে। একদিন ইস্কুল চলাকালীন সময়ে অপর্ণা ছোট্টুকে ডেকে পাঠালো। প্রথমটায় সে একদম আসতে না চাইলেও পরে এসে দেখা করলো। ইস্কুলে মাথা নিচু করে ঢুকে অপর্ণার সামনে দাঁড়ালো ছোট্টু। অপর্ণা একটু হেসে---নাম কি তোমার?

    কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে --- আজ্ঞে ছোট্টু।

    বাড়ি কোথায় --- বাংলাদেশ।

    --- ইস্কুলে আসোনা কেন?

    আবার চুপ ছোট্টু।

    --- উত্তর দাও!

    --- আমি লেখাপড়া জানিনে।

    --- আমি শেখাবো তোমায়, কাল চলে এসো ই

    স্কুলে কেমন?

    শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ছোট্টু।

    পরেরদিন যথা সময়ে হোমে ঢুকলো অপর্ণা, দেখলো ছোট্টু তার জন্য হল ঘরে অপেক্ষারত। অপর্ণার খুব ভালো লাগলো ছোট্টুকে দেখে। অন্যান্য বাচ্ছারা অপর্ণাকে জানালো ছোট্টু আজ দুদিন পরে স্নান করেছে অপর্ণার কাছে আসবে বলে। প্রথমদিন অনেক গল্প করলো ছোট্টুর সাথে অপর্ণা। ছোট্টুও অনেক কথা বললো। বাকি সকলে অবাক এমনকি স্কুলের শিক্ষক তিনজনও। এই অসাধ্য সাধন অপর্ণা করলো কি করে। এতদিন এই হোমের কারোর সাথে ঠিক করে কথা বলেনি এই ছোট ছেলেটি। এমনকি বাড়ির ঠিকানাটিও বলেনি সে কিনা এতো গল্প করলো!!!সেদিন বাড়ি আসার আগে সুপারের ঘরে ডাক পড়লো অপর্ণার। অপর্ণা সুপারের ঘরে ঢুকতেই সুপার অশোক বাবু প্রায় চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে---আপনিতো আজ পুরো হোমকে অবাক করে দিয়েছেন।

    --- কেন স্যার আমি আবার কি করলাম!
    --- এতদিন পরে ছোট্টু আজ মন খুলে আপনার সাথে কথা বলেছে!সত্যি সকলে অবাক হয়েছি আমরা। তা কিছু জানতে পারলেন?
    --- কি ব্যাপারে বলুনতো!!!
    --- ওই যে ওর সম্পর্কে, কোথায় থাকতো ইত্যাদি?
    --- না স্যার প্রথম দিনই এতটা স্ট্রেস দেওয়াটা ঠিক হবেনা। তাছাড়া আগে ছোট্টুর সঙ্গে একটু ভালোমতো বন্ধুত্ব হোক!

    সুপার সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালেন।তারপর অপর্ণা কে সুপার বললেন ছোট্টুর কিছু সমস্যা আছে আসলে ও ভীষণ ইন্ট্রোভাট কিছু বলতেও চাইনা। তাও আমাদেরতো ওর ঠিকানাটি খুঁজে বার করে দেশে পাঠানোর ব্যাবস্থা করতে হবে। আমি বলি কি আপনি ওর কাউন্সিলিংটা যদি করেন...।

    --- নিশ্চয় করবো স্যার, কাল থেকেই শুরু করছি।

    সুপারের সাথে কথা শেষ করে ওই ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো অপর্ণা।

    বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে। অপর্ণার সাথে ছোট্টুর দারুন বন্ধুত্ব হয়েছে। ইতিমধ্যে ছোট্টু পড়াশুনাও শিখছে তার দিদিমনি মানে অপর্ণার কাছ থেকে। অপর্ণা যতক্ষণ হোমে থাকে ছোট্টু অপর্ণার সাথে সাথেই থাকে। বাকি বাচ্ছারা ইস্কুল আর খেলা ছাড়া নিচে খোলা ঘুরে বেড়াতে পারেনা। সকলেই নিজেদের ডরমেটরিতেই থাকে। ছোট্টু হোমের বিভিন্ন কাজ করে, যেমন গাছে জল দেওয়া, নোংরা ফেলা বিভিন্ন রকম কাজ করে। ছোট্টুর মতো এরকম কাজ অনেকেই করে, কাজের শেষে ডরমেটরিতে নিজেদের বেডিং (একটা তোষক, একটা বালিশ, কম্বল)পেতে শুয়ে থাকে, বা নিজেদের মধ্যে গল্প করে। কোনো কোনোদিন সময় মারামারি পর্যন্ত হয় আবাসিকদের মধ্যে। ছোট্টুর এসব ভালো লাগেনা তাই ও যেটুকু সময় নিচে থাকে দিদিমনি মানে অপর্ণার সাথেই থাকে। কত কথা হয় দুজনের। কিন্তু একটা সমস্যা হলো ছোট্টু বাড়ির ঠিকানা যা দিচ্ছে তাতে ওর বাড়ির কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছেনা। মানে ও যে গ্রামের কথা বলছে সে নামের কোনো গ্রাম হিলি বর্ডার পার করে মানে বাংলাদেশে নেই। এদিকে ছোট্টুর বাড়ি ফেরার একটা ইচ্ছা আবার নতুন করে প্রকাশ করেছে তার দিদিমনির কাছে।ভারতবর্ষে আসার পর পরই ওর প্রত্যাবাসন নিয়ে তোড়জোড় হয়েছিলো ভালো মতোই। ছোট্টু নিজের ঠিকানা সঠিক দিতে না পারায় তা আর বেশি দুর এগোয়নি। আবার অপর্ণার তোড়জোড়ে সেটি শুরু হয়েছে। নতুন ভাবে আশার আলো দেখেছে ছোট্টু। যতক্ষণ অপর্ণার সঙ্গে থাকে নাহলেও পাঁচশো বার জিজ্ঞাসা করে ছোট্টু অপর্ণাকে---দিদিমনি আমি দ্যাশে ফিরতে পারুম?

    প্রতিবার অপর্ণা তাকে আস্বস্থ করে বলে --- অবস্যই পারবি। কিন্তু তুই ঠিকানাটা একটু ঠিক করে মনে করে বল বাবু।

    --- আমারে বালুরঘাট ইস্টিশানে নিয়ে গেলেই এক দৌড়ে আমাগো বাসায় চইলা যামু দিদিমনি।

    অপর্ণা মুখে কিছু বলে না শুধু একটু হাসে। সে জানে যত সহজে ছোট্টু এদেশে এসেছে ততটা সহজ নয় নিজের দেশে ফেরা। সব দেশের কিছু নিয়ম থাকে, নিয়মের বাইরে গিয়ে কিছু করা কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়।

    কয়েকদিন হলো ছোট্টুর জ্বর, তাই সে ডরমেটরি থেকে নিচে নামছেনা। কোনো কাজও করছেনা। অপর্ণা দুদিন অপেক্ষা করেছে, অন্য ছেলেদের থেকে খবর নিয়েছে। কাল নাকি বিছানা থেকে ওঠেনি এমনকি কিছু খাইনি পর্যন্ত। সুপারের অনুমতি ছাড়া কেউ ডরমেটরিতে যেতে পারেনা বলে অপর্ণাও যেতে পারেনি দেখা করতে ছোট্টুর সাথে। অনেক নিয়ম থাকে এই সমস্ত হোমে, অনেক ধরণের সমস্যা হতে পারে। তাই অশোক বাবু চাননি অপর্ণা কোনো রকম সমস্যায় পড়ুক।যাইহোক অবশেষে অনেক অনুরোধের ফল স্বরূপ একজন ডি গ্রুপ স্টাফকে অপর্ণার সঙ্গে পাঠালেন অশোক বাবু। অপর্ণা প্রথম ডরমেটরির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বড় বড় বেশ শক্ত পোক্ত লোহার গেটের ওপারে বড় একটা ঘরের মাঝখানে একটা বিছানা পাতা তাতেই কম্বল দিয়ে আপদ মস্তক ঢেকে শুয়ে আছে ছোট্টু। বাকি আবাসিকরা তখন ইস্কুল ঘরে।অপর্ণার সাথে যে গিয়েছিলেন নকুলদা তাকে উদ্দেশ্য করে অপর্ণা বললো ---এই জ্বরে নিচে শুয়েছে বাচ্চাটা!!!

    নকলদার অভিব্যাক্তিহীন মুখ দেখে আর কিছু বললোনা অপর্ণা। নকুলদাকে লোহার দরজা দুটো খুলতে বললে উনি রাজি হলেননা। বললেন ---স্যারের বারণ আছে। অগত্যা অপর্ণা নিচে নেমে আবার অশোক বাবুকে রাজি করলো যেন দরজা দুটো খোলা হয় সে ছোট্টুকে কাছ থেকে দেখতে চায়। অপর্ণার আবেগ আর ভালোবাসার কাছে হার মানলেন অশোক বাবু।

    অপর্ণা বড় ঘরটার ভিতরে ঢুকলো, ঘরটা বেশ নোংরা। ঘরের সাথেই বাথরুম হওয়াতে বাজে একটা গন্ধ বেড়োচ্ছে। অপর্ণা সব কিছু উপেক্ষা করে ছোট্টুর বিছানার কাছে এসে নরম গলায় ডাকতে লাগলো ছোট্টুকে। ছোট্টু কম্বলের তোলা থেকে মুখটুকু বারকরে দেখেই উঠে বসতে গেলো নিষ্পাপ একটি হাসি নিয়ে।

    --- উঠেতে হবেনা সোনা... তুই শুয়ে থাক আমি বসছি তোর কাছে।

    ক্ষীণ গলায় ছোট্টু বললো ---বৈসোনা দিদিমনি। খুব ময়লা।

    অপর্ণা ছোট্টুর কথা উপেক্ষা করে বসে পড়লো ছোট্টুর পাশে। তারপর মাথায় হাত দিতেই চমকে উঠলো---একি!!!এতো ভয়ঙ্কর জ্বর!!!

    --- আমার কিচ্ছু হবে না গো দিদিমনি।

    এতো জ্বরেও মুখে হাসি টেনে বললো ছোট্টু।

    অপর্ণার খুব কষ্ট হচ্ছিলো ছোট্টুর মুখটা দেখে। এখনো অসুস্থ হলে সে তার মাকে কাছে পেতে চায়, সেখানে ছোট্টুতো কত ছোটো!!!

    --- দিদিমনি আমি বাড়ি যেতে পারুম? কবে যামু? তুমি যাবা আমার লগে?

    বুক ফেটে কান্না আসে অপর্ণার নিজেকে সামলে---নিশ্চয়ই যাবো, তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠ আগে।

    --- হেয়ারপর দুজনে মাইল্লা যামু কি তাই তো?
    --- একদম।
    --- তোমারে দ্যাকলে আমার আম্মুর ছবি চোখের সামনে ভাসে দিদিমনি।

    সযত্নে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় অপর্ণা। তারপর বলে

    --- আমি নিচে গিয়ে তোকে ডাক্তার দেখানোর ব্যাবস্থা করছি।
    --- দিদিমনি আমি যাইতে পারুম? যদি এ দেশেই ইন্তেকাল হইয়া যায় আমার!!!

    আঁতকে ওঠে অপর্ণা ছোট্টুর তপ্ত কপালে শীতলতার স্পর্শ দিয়ে বলে---কিচ্ছু হবেনা তোর আমি কিচ্ছু হতে দেবো না।

    তারপরে আর বেশিক্ষণ বসেনি ওখানে অপর্ণা। নিচে এসে সুপারের সাথে কথা বলে হোমের যিনি ডাক্তার তাঁকে নিয়ে ছোট্টুর কাছে ফিরে আসে আবার।

    ছোট্টুর জ্বর না কমাতে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বোন টিবি ধরা পরেছে। অপর্ণা অনেক চেষ্টা করেও হাসপাতালে যাওয়ার অনুমতি পেল না। সুপার অপর্ণার ঘাড়ে অন্যান্য কাজের দায়িত্ব দিয়ে, এই ব্যাপারটি থেকে অপর্ণাকে দূরে রাখল।ওনার মতে অপর্ণা নাকি একটু বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে ছোট্টুর প্রতি। অগত্যা অপর্নাকে তার সুপারের কথা মেনে অন্য কাজে মন দিতে হলো। সেদিন দুপুরটা কিছুতেই কাজে মন বসাতে পারছি না অপর্ণা। বারবার ছোট্টুর কথা মনে পড়ছে। কেমন আছে কিছু খাচ্ছে কিনা কোন খবরই সেভাবে তার কাছে এসে পৌঁছাচ্ছে না। বিকালের দিকে সুপারের অফিস ঘরের ফোনে খবরটা এলো। অপর্ণা যখন সুপারের ঘরে বসেই ওনার সাথে কিছু অফিশিয়াল কাজ করছিল। ফোনটি আসার পরে সুপার কেমন গম্ভীর হয়ে গেলেন চারিদিক কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। হাসপাতাল থেকে খবর এসেছে ছোট্ট আর বেঁচে নেই। কথাটি শুনতেই অপর্ণার অদ্ভুত এক অনুভুতি হল। বুকে এক তীব্র যন্ত্রণায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল, গলার কাছের দলাপাকা কষ্টটা কঠিন হয়ে মুখ দিয়ে গোঙানিরূপে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। নিজেকে কোনো রকমের সামলে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল অপর্ণা।

    না ছোট্টুর আর দেশে ফেরা হলো না।তার দিদিমনিও তার কথা রাখতে পারলোনা।ছোট্টু মনে একটা বড় প্রশ্ন ছিল একই রকম দেখতে, একই রকম ভাষা একইরকম খাওয়া-দাওয়া দুটো আলাদা দেশ কি করে হয়!!! কতবার সে এইরকম প্রশ্ন করে জর্জরিত করেছে অপর্ণা কে। শতবার বোঝাতে চাইলেও বোঝেনি ছোট্টু, তার মনে একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খেয়েছে কেন ভাগ হল দেশ কেন এক সাথেই থাকতে পারল না একটি দেশ হয়ে। "আচ্ছা দিদিমণি মাটি ভাগ করা যায়!!! এটা কি খাওয়ার যে ভাগ করা যাবে!!!মা কে কি কখনো ভাগ করা যায় মা তো একটাই হয়!!!"ছোট্টুর মাথায় এত মারপ্যাঁচ হয়তো ছিল না কিন্তু গভীর কিছু প্রশ্ন বারংবার আঘাত দিয়ে গেছে অপর্নাকে। সত্যি তো ঠিকই তো বলেছে ছোট্টু মাকে কি কখনো ভাগ করা যায় তবে কেন এই দেশভাগ!!! যার যন্ত্রণা এখনো বয়ে নিয়ে চলছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ!!!এর সঠিক উত্তর আদেও কি কারো জানা আছে!!!আমরা সকলেই পরিস্তিতির শিকার হয়েছি মাত্র।

    সমাপ্ত
    (সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা )
    লিডিয়া গাঙ্গুলী
    ৫/৬/২০২১
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন