• খেরোর খাতা

  • মোবাইলের আলো

    pradip kumar dey লেখকের গ্রাহক হোন
    ১১ জুন ২০২১ | ৭৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ১১-০৬-২১


    #ছোটগল্পঃ


       " অন্ধকার গ্রামে মোবাইলের আলো "


                                             প্রদীপ দে ~


    নদী ভরাডুবি হয়ে গেছে চড়ায়। খেয়া নৌকার এগোনো প্রায় দুস্কর। তবুও খেয়া টানার আপ্রান চেষ্টা চালায় হারুন। সুন্দরবনের খাড়ি নদী বললেই ভালো বলা হবে। হারুন ভোরে বেড়িয়ে গাছ কেটে সব্জি নিয়ে নিজের খেয়া বাইছে। বড় কাজ ছিল কেরোসিন জোগাড়ের। পয়সা দিয়েও বেশ অপ্রতুল। আর হারুনের যে খুবই দরকার হয়ে পড়েছিল। দুদিন ধরেই বউ রুমেলা ঘ্যান ঘ্যান জুড়ে দিয়েছিল এই কেরোসিনের জন্য। 


    সূর্য ডোবার পর থেকেই কেরোসিনের দরকার খুবই। আলোর কাজে আর কাঠের চুল্লী জ্বালাতেও। সবচেয়ে দরকার খোকার পড়াশোনার জন্য। জনা ডাক নাম, ভালো নাম জনাই ক্লাস ফোরের ছাত্র। প্রাইমারি স্কুল পাশ করলে এবারে হাই স্কুলে যাবে যে! হারুন চাষাবাদ করে যা পায় তাতে কোনক্রমেই চলে।তবে আনুষঙ্গিক সবকিছুই খুঁজে জোগাড় করে আনতে হয় -  নগদের যোগানে যে বড়ই ঘাটতি। সারা সময় হারুন আর রুমেলার কায়িক পরিশ্রমের জেরেই সংসার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে  গড়াচ্ছে।


    তাও মাঝেমধ্যে বিভীষিকাময় হয়ে পড়ে। যেমন গতবারের আম্ফানের তান্ডবলীলা তাদের মাথার চাল খানখান হয়ে গুঁড়িয়ে গেছিলো -আর দুপাশের বেড়ার দেওয়াল খুলে বেআব্রু হয়ে গেছিলো। সে যে কি দুঃস্বপ্নের দিন গেছে। সাহায্য অল্প এসেছিল বাকিটুকু নিজেদের কায়িক পরিশ্রম।  দুজনারই।


    তবুও হারুনের ভালোবাসা তার এই জলাভূমি। সুন্দরীগাছগুলোর প্রতি প্রেম তার জন্ম থেকেই।


    বউ রুমেলা জলাভূমিতে যে খুব আনন্দ পায় ঠিক তাই না, তবে বেশ স্বাভাবিক। জন্ম থেকেই এই মাটিই তার কাছে সব। তবে একঘেয়ে। শহরের গল্প শুনেছে। একটা দেখার অনুভূতি কাজ করে আবার সঙ্গে সঙ্গে রামধনুর মতো মিলিয়ে যায় মনে কারণ ভয় পাওয়া কাজ করে। মনে হয় এই বেশ আছি। শহুরে লোকেরা নাকি ভারী জটিল। রুমেলা আবার এসব বোঝে না। সংসার তার খুব পছন্দের। ভোর থেকে উঠে মাটি লেপা,  জল আনা, চুলা জ্বালানো, বাসন মাজা সব চুপ করে চালিয়ে যাওয়ার একটা তাগিদ অনুভব করে সে। শুধু অভাবের সংসারটায় একটি সাচ্ছন্দ আনতে চায় সে। কিন্তু উপায় খুঁজে পায় না। মাঝেমধ্যে বনবিবির চাতালে মাথা খুঁড়ে আসাই তার একটা বড় কাজ।


    একমাত্র সন্তান জনাই এত কিছু বোঝে না। ফোরের শেষ পরীক্ষা দিয়ে কিছু বন্ধুর পাল্লায় আধুনিক জীবনের কথা শোনে। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার খবর পায়। ধরতে ছুঁতে পারে না। লোভ হয় মোবাইল নামক যন্ত্রে। দশ বছরের এদিক ওদিক সকলের বয়স চোখে তাদের রঙিন নেশা - আধুনিকতাকে ছুঁতে চায়। শহর কতো স্বপ্নের! ডানা মেলে উড়ে যেতে চায় কাছের শহর কলকাতায়। বুদ্ধি বিবেচনা তাদের কাজে আসে না। সব কিছু ভাল জানেও না কিছুটা বড়দের কাছ থেকে যতটুকু শোনা।  একটা চাপা কৌতুহল তাদের তাড়িয়ে নিয়ে চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় তার ভুল বোঝে -অল্প কে অধিক ভেবে ভুল করে। শহর অনেক এগিয়ে গেছে আমরা এই গ্রাম্যরা অনেক পিছিয়ে পড়ে রয়েছি এই ধারনার বশবর্তী হয়ে বেশ এগোতে গিয়ে বিপত্তি ডেকে আনে। যার ফল হয় মারাত্মক।


    জনাইয়ের পড়ালেখা ভালো হওয়ার জন্য হারুন এক গ্রামের মাষ্টার ঠিক করে। প্রাইভেট শিক্ষা। বেতন খুব বেশি নয়। মাষ্টারমশাই নিজের জীবিকা নির্বাহের জন্য অল্প বেতন নেন। ছাত্র ছাত্রীদের জন্য অনেকে ভালোবাসা তার। 


    হারুনকে বলেন -- কোথা দিয়ে টাকা দেবে? যা পারো দিও -তবে জনাইকে একটু পুষ্টিকর খাবার দিও শুধু। ওরা তো মাথার কাজ করে।


    মাষ্টার দীননাথ সবার পিতামাতার কাছেই এই আবেদন রাখেন। সব্বাই গ্রামের এই মাষ্টারকে তাই খুব মানেন।


    হারুনের বউ তাই অন্য বাড়িতে ঠিকের কাজ ধরে। যদি বাড়তি দুপয়সা আসে। হারুণ প্রকৃতির কাছে বেশি ফসলের আশায় বেশি পরিশ্রম করে।


    জনাই পড়তে যায়। নতুন নতুন বন্ধু নিয়ে মেতে থাকে। কিছু সাচ্ছল্য পরিবারের বন্ধুদের সঙ্গে মিশে আকাশ ছুঁতে চায়। বাবা মার কষ্ট বোঝে না।


    হঠাৎই মাষ্টার দীননাথের মোবাইলটা খোয়া যায়। ছাত্রছাত্রী মারফত খবর ছড়িয়ে পড়ে। এই মাষ্টারের মোবাইল দিয়ে শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের জন্য শহরের যোগাযোগই নয় এই ছোট্ট গ্রামের সকলেরই সময়ে অসময়ে আধুনিক জগৎ কে কাজিয়ে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় অনেক কাজই সারা যায়। এইদিক দিয়ে গ্রামবাসী তার কাছে ঋণী! সব্বাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে মোবাইল খুঁজতে।


    হারুনের মনে একটা শঙ্কা ধ্বনিত হয়। বুকটার মাঝে কিরকম একটা বেদনার সুর বেজে ওঠে।  কেন যে এরকম হয় তা সে বোঝে না -হয়তোবা ঈশ্বর জানেন!  আনমোনা হয়ে যায় - ক্ষেতের কাজ ফেলে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। 


    বাড়ি ফিরে দেখে বউ রুমেলা পরের বাড়ির কাজে গেছে,  আর ছেলেটা বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে। হারুন নিঃশব্দে ঘরে ঢোকে -যাতে কোন আওয়াজ না হয় - ছেলের ঘুম না ভাঙ্গে। বিছানার সামনে এসে ছেলে জনাইয়ের বালক মুখের দিকে চেয়ে থাকে।  কি নিস্পাপ মুখ ! তার ছেলে তার থেকেও কত সুন্দর দেখতে হয়েছে। একনাগাড়ে কিছুক্ষণের জন্য ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে -- নিজেকেই অপরাধী ভাবে -- কি করে তার নিজের এই সুন্দর সন্তানের জন্য কুচিন্তা আসে?


    সে কি তার বাবা না শত্রু?


    ব্যাস। ওই একনিমেষেই সব ঝেড়ে  ফেলে দিয়ে তার সামান্য ঘরে খোঁজ চালায়। ছেলের ব্যাগ থেকে বাক্স-প্যাটরা,কৌটা, জামা- কাপড় হাঁতরিয়ে বেড়ায় সে - না কিছু পায় না। তবুও না জানি কিসের আশংকায় সে খুব সাবধানে জনাইয়ের মাথার বালিশের নিচে হাত ঢোকায় - সামান্য চেষ্টায় ফল মেলে --একটা ভারী কিছু তার হাতে ঠেকে। টেনে বার করে -- চমকে ওঠে - একটা কালো চকচকে -- হ্যাঁ এটাকেই মোবাইল বলে --সে যে এটা দীননাথের হাতে আগে বহুবার দেখেছে -- এখন সে তার ছোঁয়া পেল -- যে স্পর্শে তার চোখ দিয়ে রক্ত- অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ে …।


    এরপর থেকে হারুনের আর খবর নেই। বাড়ি থেকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে তা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের সবাই হারুনকে ভালোবাসতো। কোথাও খবর নেই। 


    দীননাথ মাষ্টার শহর কলকাতায় কিছু কাজ নিয়ে বেড়িয়েছিল। গ্রামে ঢুকেই খবর শোনে। কাগজপত্র রাখতে বাড়ি যায়। দরজার তালা খুলতেই দেখে তার মোবাইলটা …। কেউ সম্ভবত তার দরজার তলা দিয়ে ভিতরে সেঁধিয়ে দিয়েছে। আশঙ্কা আর চিন্তা  মেলাবার চেষ্টা করে সে। সময় নষ্ট না করে ঘর ছাড়ে। 


    মাষ্টার। দীননাথ গ্রামের লোকেদের নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে একেবারে শেষ সীমানায় চলে আসে মাতলা নদীর ধারে। গ্রামের লোকেদের চোখ জ্বলে! দীননাথ মাষ্টারের মোবাইলের টর্চের জোরালো আলোয় নজরে আসে একটা দেহ। দৌড়ে গিয়ে দেখে সকলে চমকে ওঠে -- এ যে হারুনের আধপোড়া দেহ -মৃত -কিন্তু  অক্ষত মুখ - যা দিয়ে এক নজরেই তাকে চেনা যায়! পাশেই পড়ে আছে তার রান্নাঘরের কেরোসিনের জার -- দুদিন আগেই বাজার থেকে যা সে কিনে এনেছিল………


    ______________________________


    থাক আর কলম চলছে না ……


    #অমাদীপ_প্রদীপদে

  • ১১ জুন ২০২১ | ৭৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন