• খেরোর খাতা

  •  রমানাথ রায় সম্পর্কে দু-একটি কথা যা আমি জানি (১) 

    ভাষা ভাষা লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৯ মার্চ ২০২১ | ৫৪০ বার পঠিত


  • বুল্টির সাথে আমার প্রেম তখন যাকে বলে রীতিমতো জমে উঠেছে। একে বারে জমে ক্ষীর। নদী নিজের খাত এমন নির্দিষ্ট করে ফেলেছে যে অন্য কোনও দিকে বয়ে যাওয়ার আর কোনো উপায়ই নেই! তা বলে কি এঁকেবেঁকে যাওয়া নেই? উচ্চ-নীচ নেই? জলের কম-বেশি; ত্বরিৎ-তিরতির, স্রোতের এদিক-সেদিক নেই? নিশ্চয়ই আছে। তবে অভিমুখ ততদিনে একেবারে নিশ্চিত। যাকে বলে ষোলো আনার ওপর আঠেরো আনা। একশো শতাংশের ওপর একশো সাড়ে বারো শতাংশ নিশ্চিত। রাস্তা ধরে আরও একটু এগোলে কী হবে জানা নেই, তবে তখন ঘোড়ার আর কোনও দিকে নজর নেই — যদিও চোখে ঠুলি পরানো বললে ভুল বলা হবে তবে দৌড় সেই সিধে নাক বরাবার।

    তো সে যাই হোক। এর পর যা হওয়ার, একদিন তাই হল। বুল্টির বাবা আমাকে ডেকে পাঠালেন।

    এর আগে বুল্টিকে মাঠে-ঘাটে, বাসে-মেট্রোতে দেখেছি। এমনকি আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী রেস্তোরাঁতেও। তবে চার দেওয়ালের মাঝে, মানে ওরকম একটা ঘরোয়া পরিবেশে সেই প্রথম। বেশ অন্যরকমই লাগছিল বুল্টিকে।

    তবে সে তো অনেক পরে। ওই গোড়ার দিকের মিনিট খানেক বাদ দিলে। বাকিটা তো পুরো মেসোমশাই। বুল্টির বাবা। ইন্টারভিউ। রীতিমতো!

    পৃথিবীর সব শ্বশুরই, বিশেষত মেয়ের বাবা শ্বশুরেরা বোধহয় এরকম ‘টু দ্য পয়েন্ট’, ‘লক্ষ্যে স্থির’, ‘পাখির চোখে থিতু’-ই হয়ে থাকেন। তবে আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা তো কিছু ছিল না, তাই নিশ্চিত বলা মুশকিল।

    আমার ধারণা ছিল যেভাবে সব আলাপ শুরু হয়, সেভাবেই শুরু হবে এখানেও। বুল্টির মুখে সব হাজারবার শোনা থাকলেও, জিভের আড় ভাঙতে, গোড়াতে নিশ্চয়ই নামটা জিজ্ঞেস করবেন। এটা পরিচয় পর্ব শুরুর একটা ধরন। তারপর ভাবি, বুল্টির কাছে নিরন্তর একটাই নাম শুনতে শুনতে, ইতিমধ্যেই তিতিবিরক্ত ওঁদের, ভুলেও কি আর নাম জিজ্ঞেস করার প্রশ্ন ওঠে না সেটা শোভন? আর অনেক দ্বিধায়, কম্পমান হৃদয়ে আমি কলিং বেলটা বাজাতে না বাজাতেই, দরজা খুলে দিল তো সেই বুল্টিই আর বাড়ির সাপেক্ষে সম্পূর্ণ অচেনা একটা লোককে প্রশ্নহীন নিশ্চয়তায় ড্রয়িং রুমের সোফায় এনে বসিয়ে দিলে, ওঁদের নাম জিজ্ঞেস করার আর কী-ই বা বাকি থাকতে পারে? সেভাবে ভেবে দেখলে গেলে তো ওনারা আমার সম্পর্কে সব কিছুই জানেন। মানে জানা তো উচিৎ। মানে সব কিছু বলতে যতটা জানা সম্ভব বা যতটা জানা শোভন। ওই আর কী!

    - কী হল? কিছু বললে না তো!

    আরে! কী বলব ভাবতে গিয়েই তো এত কিছু ভেবে ফেললাম। তাতে যুৎসই কোনও উত্তরের কাছাকাছি তো যেতেই পারলাম না, উল্টে সব কেমন যেন গুলিয়ে গেল! বসতে না বসতেই, সোফাটা নরম না স্প্রিং-দাপানো বুঝতে না বুঝতেই, এরকম একটা প্রশ্নে গরম ছ্যাঁকা তো লাগবেই! আরে, নিদেন পক্ষে একটা গলা খাঁকারি দিয়ে তো শুরু হবে ব্যাপারটা! তাহলে পাল্টা আমিও কয়েকটা ওরকম মিথ্যে কাশিতে, স্মিত হাসিতে যা হোক শুরু করার একটা প্রয়াস পাই। প্রথমেই অত স্পষ্ট, এতটা কাটাকাটা প্রশ্ন করলে, তা যতই সিলেবাস-অন্তর্ভূত হোক না কেন, ঘাবড়ে যাওয়া তো স্বাভাবিকই!

    - আরে! কী করো, সেটা বলতে এত ভাবতে হচ্ছে দেখে তো বেশ চিন্তাই হচ্ছে!
    - আজ্ঞে!
    - আরে! তখন থেকে আজ্ঞে, আজ্ঞে করছ কেন? বলছি কী করা হয়?
    - আজ্ঞে, সেন্ট্রাল ...

    গভমেন্ট বলব? গাঁইয়া ভাববে? নাকি গভর্নমেন্ট? না গভার্নমেন্ট বলব? বেশি ভাবতে গিয়ে আরও গুলিয়ে যায়। গভমেন্ট, গভর্নমেন্ট, গভার্নমেন্ট কোনোটাই বেরোয় না। কেমন একটা গোঁ গোঁ শব্দ বেরোতে থাকে।

    ভাবী জামাই মৃগী রুগি বা অন্য কোনও সমস্যায় এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে ভাবনায় ভাবী শ্বশুরমশাই, মানে মেসোমশাই মানে বুল্টির বাবাই এগিয়ে আসেন।

    - তার মানে সেন্ট্রাল গবমেন্ট। কী তাই তো?

    এ্যাঃ! ন্যাকা! জানে না যেন! কিছুই না জেনে কি আর ডেকেছ বাবা! আর গবমেন্ট-টা কানে যেতে শহুরে আর শ্বশুরে সব মাখামাখি হয়ে এক বিরাট তাল পাকিয়ে যায়।

    - কী হল? তাই তো!
    - আজ্ঞে!
    - তা কাজটা ঠিক কী?
    - আজ্ঞে! ঝাড়ু।
    - ঝাড়ু?
    - আজ্ঞে।
    - মানে তুমি ঝাড়ুদারের কাজ করো?
    - তা-ও করি!
    - তা-ও করি। মানে? এ কি ইয়ার্কি হচ্ছে।
    - আজ্ঞে! তা ঠিক না। আবার ঠিকও।
    - উফ্! এ তো বদ্ধ উন্মাদ! বুল্টি এ কাকে ধরে নিয়ে এসেছে! একই সাথে একটা জিনিসকে ভুল আর ঠিক দুই-ই বলছে!
    - আজ্ঞে, হাই থটের ব্যাপার কিনা!
    - আমি জানতাম। যেদিন থেকে মেয়ে জীবন থেকে আনন্দ প্লাস বাদ দিয়ে আনন্দ মাইনাস মানে শুধুই সম্পাদকীয়-উত্তর সম্পাদকীয় ধরেছে, জিৎ-এর বদলে সত্যজিতে আগ্রহ বেড়েছে, কাশ্যপ মুনির প্রতিও অনুরাগ জন্মাতে শুরু করেছে, যার জন্মে লেখাপড়া-শিল্প-সংস্কৃতিতে কোনও মতি ছিল না, তার ঘন ঘন অ্যাকাডেমি যাওয়া থেকেই আমি বুঝতে পারছিলাম — ইট ইজ ইন দ্য অফিং — শুধু সময়ের অপেক্ষা। সেই এসেই গেল। আজই সেই দিন! হাই থট! উফ্!

    মাথার চুল ছিঁড়তে নাকি আরও গভীর চিন্তায় ডুব দিতে ঠিক বোঝা গেল না, তবে দু’মুঠিতে ধরে মাথার চুল যে ঝাঁকাতে লাগলেন বুল্টির বাবা, তাতে কোনও ভুল নেই।

    আমি এ সুযোগ হারাতে দিলাম না। এই সেই মোক্ষম সময়! প্রতিপক্ষ যখন সামান্য হলেও টলমল।

    - আসলে কী জানেন, অফিসে ঝাড় দেওয়াটা যেমন সত্যি, তেমনি আমি যে একজন গেজেটেড অফিসার তাতেও কোনও ভুল নেই।
    - উফ্! আবার সেই হাই থট। মানে গেজেটেড ঝাড়ুদার?
    - না, তা ঠিক না।
    - আবার ঠিকও! তাই তো?

    এবার খানিক হেসেই ফেলি। আর হাসিটা বোকা-বোকা বা আনস্মার্ট মোটেই নয়। তা বলে কি হাসিটাতে কোনও ওপর-চালাকি আছে? তা-ও নয়! আবার হাই থ...! সে যাক গে! আমি ওই হাসি হাসি মুখটা বজায় রেখেই বলি।

    - এই গত পরশু, দোসরা অক্টোবর, অফিসে ঝাড় দিতে গিয়েই তো যত গণ্ডগোল হয়ে গেল!

    প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, বস্তুত প্রথমেই বলা উচিৎ ছিল, আসলে বসতে না বসতেই — বাস্তবিক আরও মারাত্মক, সোফাস্পর্শের তুঙ্গমুহূর্তে, বসছি দেখেও — অন্তত ভদ্রতা করে, বোসো-বাবা-বোসো-র বদলে — ওই সাংঘাতিক প্রাণঘাতী এক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে উত্তেজনায় কীরকম একটা দরকচা মারা উত্তর দিয়ে শুরু করেছিলাম।² যদিও আমি বরাবরই মনে করি, এখনও করি — কোথায় চাকরি করি, কী পোস্টে চাকরি করি বলার চেয়ে কী কাজ করি বলা সব সময়ই ভীযণ কঠিন। সে যারা রাতদিন ফাইলে মুখ গুঁজে রয়েছে কি আমার মতো — যাকে বস্ কোনও একটা ফাইলের কথা বললে এমন তাকাই যে বস্ ভুল করে অন্য কোনও অফিসের কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে ফেলেছেন জ্ঞানে লজ্জায় জিভ কাটেন — তো সেই উভয় শ্রেণির জীবেরই বেশ অসুবিধে হয়! আসলে বুল্টির বাবা তো আর এমনি এমনি ডেকে পাঠান নি, ওই দুই তারিখ মানে অষ্টমী থুড়ি মহাষ্টমীর দিন বুল্টির বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছিল। দেরি বলতে পুজোর সময় রাত একটাকে যদি আদৌ দেরি বলা যায়! তাও টাইম-টু-টাইম বাড়িতে খবর দেওয়া হচ্ছিল, প্রায় রানিং কমেন্ট্রির তালে তালেই।

    আসলে অত দেরিও তো হয় না। শুরুটাই দেরি করে না হলে! ওই দুই তারিখ অফিস যেতে না হলে! আর একবার অফিসে গিয়ে পড়লে সে যতই টুকটাক ঝাঁট দেওয়ার কাজ হোক না কেন, একটা মিনিমাম সময় তো লাগেই! তারপর সবাই ঝাঁটা হাতে গ্রুপ ফটো — তারই মধ্যে কেউ কেউ ঝাঁট দেওয়া রত — তবে না স্বচ্ছতা! তাহলে সময় লাগবে না? তাছাড়া, যাতায়াতে কুড়ি-কুড়ি চল্লিশ কিলোমিটারটা কোথায় যাবে? সোজা কথায় টোয়েন্টি-টোয়েন্টিতে ঝড় তুলেও সামাল দেওয়া গেল না। দুপুর দু’টোর অ্যাপয়েন্টমেন্ট পিছোতে পিছোতে শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়াল বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। তাহলেই বুঝুন পুজোর দিনে অতটুকু রাত হবে না! আমরা নিজেরাই তো ধরে রেখেছিলাম অন্তত দেড়টা থেকে দু’টো। সেখানে একটা মানে তো ভর সন্ধে! আর এসব কিছু না হয়ে সব যদি ঠিক টাইম বজায় রেখেই হত, তাহলে পুজোর দিনে সাড়ে ন’টায় বাড়ি ফিরে আসার অসহায় ব্ল্যাসফেমিত্ব কি আরও গ্লানির, আরও অসম্মানের হত না!

    তো যাই হোক, তাতেই ডেকে পাঠানো আর বেছে বেছে ভাসানের দিনে বলে একটু টেনশন যে ছিল না, তা নয়! এতে চির বিসর্জনের কোনও অনুষঙ্গ আছে কিনা, জাতীয় ভাবনা যে একেবার আসেনি তা নয়, তবে বু্ল্টি এসব ভাবে তো নি-ই, আমার ভাবনার কথা শুনে মোটেও পাত্তা দেয়নি।

    তবে এই ঘটনার পর পর-ই ডেকে পাঠানো বলেই কিনা জানি না, ‘কী কাজ করো’ শুনেই অফিসে গিয়ে আমার করা শেষ কাজ ওই ঝাঁট দেওয়াটাই মাথায় এসে গেল। আরে বাবা! শুধু মাথায় এল তো একরকম, মুখ ফসকে বেরিয়েও গেল। অবশ্য যাই হোক অন্ততঃ একটা কাজের কথা তো বলতে পারলাম! না হলে অফিসে কাজ করে তো আমার অধঃস্তনেরা, আমি তো প্রায় না বুঝে, অনেক সময় ভাল করে না দেখেও যন্ত্রের মতো শুধু সই করি! আমি কাজের কী জানি আর কী-ই বা বলতে পারতাম! যাই হোক আবার ফেরা যাক সেই ড্রয়িং রুমে আর ঠিক সেই মুহূর্তটাতেই।

    - এই গত পরশু, দোসরা অক্টোবর, অফিসে ঝাড় দিতে গিয়েই তো যত গণ্ডগোল হয়ে গেল!
    - আরে! সেটা তো মাত্র একদিনের ব্যাপার. নিয়মিত তো নয়!
    - কে বলল? প্রতি সপ্তাহে দু’ঘন্টা — বছরে একশো ঘন্টা।
    - এ-এ-এ, তোমরা সেন্ট্রাল গবমেন্ট এমপ্লয়ীরা ব্যাপারটাকে এভাবে দেখছ, তাই! আসলে কিন্তু ব্যাপারটার দরকার আছে। জিনিসটার একটা গুরুত্ব আছে।
    - আরে! আছে তো! কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আমি যদি শুধুই সুইপার হতাম আর স্বচ্ছ ভারত তৈরিতে মেতে উঠতাম, তাহলে কি আর আপনি আপনার মেয়ের জন্য আমার কথা ভাবতেন?
    - তোমার কথা যে ভেবেছি তা তোমায় কে বলল?

    যদিও বুঝি এ নেহাতই কথার কথা; কথারই মারপ্যাঁচ আর তাছাড়া বুল্টিকে ছাড়া আমি বাঁচবও না, তবু নিজের প্রেস্টিজ বলে তো একটা ব্যাপার আছে, আমি উঠে দাঁড়াই। রুখে দাঁড়াই বলতে পারলে ভাল হত, কিন্তু তার আগেই উনি শশব্যস্ত হয়ে পড়েন।

    - আরে! আরে! রাগ করছ কেন? বোসো। বোসো। তুমি শুধুই ঝাড়ুদার হলে তোমার সাথে যে মেয়ের বিয়ে দিতাম না, এ নিয়ে আমার কোনও ডাউট নেই, তবে মেয়ে সে না-ডাউটে সায় দিত কিনা, সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট ডাউট আছে।

    যাক হক কথাটা যে মেসোমশাই বুঝে গেছেন তাতে বেশ একটা নিশ্চন্ত ভাব আসে।

    - তবে যাই বলো স্বচ্ছ ভারত কনসেপ্টটা কিন্তু মোটেই ফেলনা নয়! আমাদের জাতটাই এমন যে জোর করে কিছু না চাপালে কিছুই শেখে না। রাস্তাঘাটের দিকে চেয়ে দেখো, যার যেখানে ইচ্ছে ময়লা ফেলে যাচ্ছে — ভাবটা এমন, আমাদের কাজ নোংরা করা আর যেন পরিষ্কারের করার দায়িত্ব সরকারের। এ তো হতে পারে না! এভাবে তো একটা জাত দাঁড়াতে পারে না।

    - সে তো বুঝলাম মেসোমশাই! তবে ছুটির দিন, এখানকার পুজোর কথা যদি ছেড়েও দিই, তবুও একটা ন্যাশানাল হলিডেতে এ জাতীয় কার্যক্রম নেওয়ার চেয়ে ছুটিটাই তুলে দেওয়া ভাল! আধাখেচড়া নয়, শুধু দেখাওয়াট নয়, আমরা পুরোদমে কাজ করতে পারি।
    - এ তোমাদের রাগের কথা! ছুটির দিন, তায় উৎসবের মাঝে অফিস যেতে হয়েছে, তাই এত রেগে গেছ। আসলে গান্ধীর জন্মদিনটা একটা স্পেশাল দিন তো...(যেন আমি একটা বাচ্চা ছেলে, আমাকে বোঝাতে শুরু করে দেন। কিছু কানে ঢোকে, বাকিগুলো দেখি ওই আবর্জনার স্তুপে জড়ো হচ্ছে। আবার স্বচ্ছ অভিযানে নাবতে হবে, সব জঞ্জাল ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে হবে। বাতে কম, কাম য্যাদা)... অবশ্য বুল্টির কাছে শুনেছি তোমার এ ব্যাপারে বরাবরই খুব স্বচ্ছ ধারণা। ²
    - শুধু ধারণাই নয় প্রয়োগেও তাই!
    - হ্যাঁ, বাবা। জানি তো। তোমার সাথে ঘনি..., এই আলাপ হওয়ার পর থেকে রাস্তায় ডাস্টবিন না পেলে ঝালমুড়ির ঠোঙা, বাসের টিকিট, টুকরো কাগজ ব্যাগে করে নিয়ে আসছে। তারপর ধরো সিগারেটের প্যাকেট — ওটা বোধহয় তোমারই ব্যবহার করা খালি প্যাকেট, বুল্টি তো খায় বলে মনে হয় না ... ( কোথায় গিয়ে যে থামবেন ভদ্রলোক, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। হাই থট ততক্ষণে ভেতর থেকে হাই উঠে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ওনার কোনও কথা বোঝা তখন বোঝার মতো চেপে বসেছে ...) ... তবে একটা জিনিস তোমরা বন্ধ করো। ওই চিকলেট খাওয়াটা! ওটা বাড়ি বয়ে আনতে গিয়ে তো মেয়েকে রুমালের পর রুমাল ফেলে দিতে হচ্ছে!

    ওনার কথা মোটেই শেষ হয়নি — আরও বেশ খানিকক্ষণই নিশ্চয়ই চলার কথা, কিন্তু মাসিমা-বুল্টির প্লেটের পর প্লেট — সশব্দ সাউন্ড অফ কাটলারিতে ব্যাপারটা গতি হারায়। আমাদের বৈঠক-সাথে-খানা পর্বে মাসিমা-বুল্টিও যোগ দিলে স্বাভাবিক নিয়মেই কিছু বৈচিত্র্যের ছোঁয়া লাগে।

    মেসোমশাই সাময়িক গতিশ্লথতায় অভিমুখচ্যুত হলেও একটা ব্যাপার অনেকক্ষণ ধরে জানার চেষ্টা করছিলেন বলে আমার ধারণা। সরাসরি না জিজ্ঞেস করে অনেক ঘুরিয়ে করছিলেন বলে ঠিক নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। আমার ধারণা — সেটা আমার গ্রেড পে। বুল্টির এ বিষয়ে কোনও ইন্টারেস্টই নেই আর তাই জানেও না। তাই বলছিলাম না, বুল্টি জানে না এমন কিছু নিয়ে কথা বলা ওনাদের পক্ষে একটু মুশকিলই। অসম্ভবই প্রায়! না মুমকিন!

    হঠাৎ দেখি কোথা থেকে জানলার পর্দার ফাঁক দিয়ে দিন-পড়ে-আসা সূর্যাস্তের লাল আলো বুল্টির চিবুক থেকে সিঁথি তামাম রাঙিয়ে দিয়ে ওই ঘরটাকে কেমন মায়াময় করে তুলেছে! সেটাই সত্যি নাকি শুধু আমার মনেই ঘটেছিল বলতে পারব না, তবে ঘোর কাটতে দেখি ঘরে শুধু আমি আর বুল্টি। বুল্টি আর আমি। মাসিমা কখন বুদ্ধি করে মেসোমশাইকে নিয়ে চলে গেছেন।

    এর পর আর বেশি কথা বাকি থাকার কথা নয়!

    খাওয়া-শেষে প্লেটে পড়ে থাকা বাতিল অংশ ওদের রান্নাঘরের ডাস্টবিনে ফেলতে গেলে মাসিমা হাঁ হাঁ করে ওঠেন, বুল্টি বলে — আহা করুক না! মেসোমশাই কী করে যেন পায়ে পায়ে ঠিক আমার পিছনে এসে দাঁড়ান। আসলে ব্যাপারটা খানিক ভিন্ন, আমি যখন প্লেট নিয়ে বুল্টির পাশে পাশে রান্নাঘরে ঢুকছি, মাসিমা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তা কেড়ে নিতে উদ্যত ঠিক যখন, তখনই ওই তৃতীয় একটা ঘটনাও প্রায় ঘটতেই যাচ্ছিল — মেসোমশাই নিজের প্লেটটা মাসিমার হাতে ধরিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন। ঘটনা পরম্পরায় উনি আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন এবং ভবি ভোলবার নয়, এবার একেবারে সরাসরি — গ্রেড পে? আর তখনই বাইরে বেজে ওঠে বিসর্জনের বাজনা। তাসা পার্টির চিরন্তন কুড়-কুড়-কুড়! তাতে পে হয়তো আছে, কিন্তু তা বলে গ্রেড?

    এর মাস ছয়েকের মধ্যে বুল্টির আর আমার ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে যায়। দেবতারা যে অলক্ষ্য থেকে নয়, প্রকাশ্যে পুষ্পবৃষ্টি করেছিল, তা যে শুধু আমারই নজরে এসেছিল, তা মোটেই নয়, উপস্থিত প্রায় প্রত্যেকেই দেখেছিল, এমনকি সর্বশক্তিমান — মিডিয়াও!

    কর্পোরেশন থেকে স্পেশাল পারমিশন নিয়ে দু’বাড়িতেই গ্রিন ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তাতে শুধু আয়োজনের জাঁক কিংবা সেই জাঁকের জমকই নয়, অপচয়ের উপচে পড়াটাও বেশ দর্শনীয় হয়ে উঠেছিল।

     

  • আরও পড়ুন
    বার্ড - Sambaran Sarkar
  • বিভাগ : অন্যান্য | ২৯ মার্চ ২০২১ | ৫৪০ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ভাষা ভাষা | ২৯ মার্চ ২০২১ ১৮:৪৪104246
  • নিজের লেখা প্রসঙ্গে নিজেই মতামত দেওয়া (তা-ও আবার ‘প্রথম মতামত’ হিসেবে) নেহাতই রুচিবিরুদ্ধ। এ কোনও মতামত নয়, এ কৈফিয়ত।

    আমি এক প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ। Indica2000 নামে এক সফ্টওয়ারে geetanjali2k বলে এক font-এ লিখে থাকি। এই সফ্টওয়ারে সম্ভবতঃ ভূ-ভারতে এখন আর কেউ লেখে না। তো গুরুচণ্ডা৯-র ‘যেমন খুশি’-তে ভেবেছিলাম পড়া যাবে। গুরুচণ্ডা৯-র ‘দেখে নিন’-এ পরিষ্কার পড়াও যাচ্ছিল। আমি সেই উৎসাহে জমা দিয়ে দিলাম। তার ফল তো দেখাই গেল (২৫ মার্চ, ২০২১ – খেরোর খাতা)। ছিল বাংলা, হয়ে গেল হিব্রু (তাও সত্যি সত্যি হিব্রু হলে, কেউ চাইলে পড়তে পারত)। আসলে আমার ল্যাপটপে software-টা download করা আছে বলে যে গুরুচণ্ডা৯-তে প্রকাশিত লেখাটা পড়া যাচ্ছে, নাহলে যে যেত না তা আমি বুঝতে পারিনি। এরকম একটা অপ্রস্তুত, থতমত পরিস্থিতিতে পড়ে এবং অন্যদেরও তাতে ডুবিয়ে আমি অত্যন্ত দুঃখিত ও লজ্জিত।

    এই লেখাটা আমি লিখি ২০১৪ সালের অক্টোবরে। একবার ভেবেছিলাম রমানাথ রায়কে লেখাটা পাঠালে কেমন হয়? তবে ওই ভাবাই সার। অবশ্য কীভাবে পাঠাব তা-ও জানা ছিল না। তবে সবচেয়ে বড় কারণ বোধহয় আমার অতলান্ত আলস্য। আমার আরও অনেক লেখার মতো এটাও পড়েই ছিল। তবে মানুষটা চলে যেতে মনে হল, সব আলস্য ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালেও তো আর  তাঁকে পড়ানো যাবে না! দেখি গুরুচণ্ডা৯-তে পাঠিয়ে, যদি কেউ পড়ে! তবে বিপর্যয় এত তীব্র হবে, কেউ পড়ার সুযোগই পাবে না অতটা ভাবি নি।

    প্রথমবার যে শিরোনামে পাঠিয়েছিলাম এবার সেটা বদলে দিলাম। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ঘরানার অনুষঙ্গে, গোদারীয় ঢঙে গল্পের নামটার বদল করা হল।

    আরেকবার পাঠিয়ে দেখছি। দেখা যাক এবার কী ঘটে!

  • dc | 122.164.235.117 | ২৯ মার্চ ২০২১ ১৯:৪৭104253
  • লেখাটা খাসা হয়েছে। আরও খাসা হয়েছে কারন আমার নিজের জীবনেরও দুয়েকটা কথা মনে পড়ে গেল :-)

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন