• হরিদাস পাল  ভোটবাক্স  বিধানসভা-২০২১

  •  হিন্দু মৌলবাদ বনাম মুসলিম মৌলবাদ – কে বেশি ভয়ানক ?

    Dipanjan Bhattacharya লেখকের গ্রাহক হোন
    ভোটবাক্স | বিধানসভা-২০২১ | ১৪ মার্চ ২০২১ | ৭২৫ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • মৌলবাদ (ইংরেজি: Fundamentalism) হচ্ছে গোঁড়া-ধর্মীয় মতবাদের কঠোর অনুগমন- যা সাধারণত বোঝায় উদার ধর্মতত্ত্বের বিরুদ্ধ-আচরণ। কোনও ধর্মের উদারনীতি বলতে সবার প্রথমেই আমরা বুঝি অন্যের ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা। নিজের ধর্ম অন্যের উপরে না চাপিয়ে দেওয়া, নিজের ধর্মের কেউ যদি ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে অনিচ্ছুক হয়, তাহলে তাকেও ধর্ম-পালন না করার স্বাধীনতায় দেওয়া। কেউ যদি স্বেচ্ছায় অন্য ধর্মের রীতিনীতি মেনে চলা শুরু করে, অথবা অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে চায়, তাকে সেই স্বাধীনতা দেওয়া। আর এরই ঠিক উল্টো হল মৌলবাদ বা উগ্র-ধর্মীয় অনুশাসন যার মধ্যে অন্য ধর্ম সম্পর্কে অশ্রদ্ধা-জ্ঞাপন করা, নিজের ধর্মের লোকেদের কড়া ধর্মীয় অনুশাসনে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করা, অন্য ধর্মের লোকের উপরে বা নিজের ধর্মের কঠোর নিয়মাবলী না মানলে তার উপরে কটূক্তি বা বলপ্রয়োগ করা অথবা ধর্মীয় ভাবে তাকে এক ঘরে করে দেওয়ার ডাক দেওয়া।

    এই দুই প্রকারের ধর্ম-বিশ্বাসীর কথা বলতে গেলেই আরেক দলের কথাও চলে আসে সেটা হল সাম্প্রদায়িক দল (communal)কোন ব্যক্তিকে তখনই সাম্প্রদায়িক বলা যায় যখন সে একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি সেজে অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধচারণ এবং ক্ষতিসাধনের চেষ্টা করে, অথবা তাদের ক্ষতি সাধনের কথা বলে। একজন উগ্র-ধর্ম বিশ্বাসীদের অধিকাংশই সাম্প্রদায়িক মানসিকতার হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হল,  সাম্প্রদায়িক হতে গেলেই একজনকে উগ্র ধর্ম বিশ্বাসী হতে হবে এমন নয়।এমন কি তাকে আদৌ ধার্মিক হতে হবে এটারও মানে নেই। একজনের সাম্প্রদায়িক হওয়ার প্রধান শর্ত হল, তার মধ্যে অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা থাকা, অন্য ধর্মের লোককে আঘাত দেওয়া, তার ক্ষতি করার চেষ্টা করা ইত্যাদি বিশিষ্ট থাকা জরুরী। একজন লোক ধার্মিক হয়েও মৌলবাদী না হতেই পারে। রামকৃষ্ণ থেকে গান্ধী সবাই অত্যন্ত ধার্মিক হলেও উনাদের কেউ মৌলবাদী বলতে পারবেন না, কারণ উনারা কখনই অন্য ধর্মের লোকের ক্ষতি করার চেষ্টা করেননি, নিজেদের বিশ্বাস অন্যের উপরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। বাংলার ইতিহাসে লালন ফকির, থেকে চৈতন্য, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ এদের কেউই অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা বা হিংসা পোষণ করেননি।

    বাংলায় সাম্প্রদায়িকতা -

    একজন লোকের ধর্মীয় আচার আচরণ পালন করার সাথে সাম্প্রদায়িক হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ধার্মিক লোকেরা অন্য ধর্মের ক্ষেত্রেও সহিষ্ণুতা দেখিয়ে চলে, অন্য ধর্মের তীর্থ-ক্ষেত্রেও ভক্তি ভরে ভ্রমণ করে, এমন কি রীতিনীতিও পালন করে। ভারতের বা বাংলার ইতিহাস তার জলজ্যান্ত সাক্ষ্য দেয়। বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যাবে, গ্রাম বাংলাতে দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিমরা যেমন অনেক জাগ্রত হিন্দু দেবদেবীর মন্দিরে মানত করে এসেছে, তেমনি হিন্দুরাও কঠিন অসুখ থেকে বাঁচতে, পরিবারের লোকের মঙ্গল কামনাতে অনেক পীরের দরগাতে মাথা ঠুকেছে। বাংলাতে বহুদিন ধরে হিন্দু-মুসলিমরা এই মাটিতে এক সাথে পাশাপাশি থেকে গেছে, মুসলিমরা যেমন সরস্বতী পূজা বা দুর্গাপূজাকে নিজেদের উৎসব করে নিয়েছে। তেমনি বাঙালি হিন্দুও ঈদের পরব মুসলিমদের সাথে সমান ভাবে উপভোগ করে এসেছে। দেখা গেছে, একজন নিজের ধর্মবিশ্বাসী সর্বদা অন্য ধর্মের ধর্মবিশ্বাসীর ক্ষেত্রেও সহানুভূতিশীল হয়েছে- ঘৃণা-হিংসা-দ্বেষের সেখানে কোনো স্থান হয়নি। পাশাপাশি ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তখনই ধর্মীয় মৌলবাদ মাথা চাড়া দেওয়া  শুরু করেছে, যখন কোনো দেশ বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী ধর্মকে ব্যবহার করে তাদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চেয়েছে। আমেরিকা রাশিয়ার ঠান্ডা যুদ্ধের আগে যেমন পাকিস্তান-আফগানিস্থানে আল-কায়দা ছিল না তেমনি, মধ্য এশিয়ার তেলের ভান্ডার কব্জা করার জন্যে কৃত্তিম ভাবে তৈরি করা ইরাক-আমেরিকার যুদ্ধের আগে আইএসআইএসের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যাবে কয়েক শতক ধরে অবিভক্ত বাংলাতে হিন্দু-মুসলমান প্রায় সম-সংখ্যক জন-অনুপাতে বসবাস করলেও বাংলাতে বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাস মাত্র ১০০-বছরের পুরনো। বাংলাতে বড় রকমের হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সূত্রপাত হয় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় থেকে। ঠিক তারপরের বছরেই ১৯০৬ সালে ঢাকাতে মুসলিম লীগের স্থাপন হয়। কিছু বছরের মধ্যেই উগ্র হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী এক গোষ্ঠী জাতীয় কংগ্রেস থেকে ভেঙে বেড়িয়ে এসে ১৯১৫ সালে হিন্দু মহাসভার প্রতিষ্ঠা করে। এর ১০ বছরের মধ্যেই, ১৯২৫ সালে আরএসএসের প্রতিষ্ঠা হয়। ধর্মকে সামনে রেখে লড়াই করা পরপর এই উগ্র হিন্দু এবং মুসলিমদের প্রতিনিধি স্বরূপ রাজনৈতিক দলের প্রতিস্থাপন এবং দিনে-দিনে তাদের প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভারতের তথা বাংলার সমাজে হিন্দু-মুসলিম সমীকরণও পাল্টাতে থাকে। এর পরবর্তীকালেও জাতীয় কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভারতের রাজনীতি বা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ধর্ম কখনই প্রধান আসন নিতে দেয়নি। এতে ধার্মিক হিন্দু মহাত্মা গান্ধী বা, সর্দার প্যাটেল যেমন ছিলেন, তেমনি ধার্মিক মুসলিম মৌলানা আবুল কালাম আজাদও ছিলেন, হিন্দু ধর্মের উগ্রতা এবং অস্পৃশ্যতার প্রবল বিরোধী আম্বেদকর যেমন ছিলেন, তেমনি একই সাথে সোশ্যালিজমে বিশ্বাসী নেহেরু বা সুভাষ বোসেরও মতো ব্যক্তিরও যোগদান ছিল। এদের মধ্যে রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং মতাদর্শের সংঘাত যে ছিল না এমন নয়, কিন্তু এদের নিজেদের ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাস কখনই তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রমের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। কিন্তু ভারতে দাঙ্গার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে ভারতে বছরের পর বছর হিন্দু-মুসলিম এক সাথে বসবাস করলেও হাতে গোনা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেছে, সেই ভারতেই পারস্পরিক ঘৃণা নিয়ে রাজনীতি করা এই দুই রাজনৈতিক দল স্থাপনের পরবর্তী দুই দশকের মধ্যেই প্রায় প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক হিন্দু এবং মুসলিম দাঙ্গার ঘটনা সংগঠিত হয়ে এসেছে। অনেক শতক ধরে এক সাথে হিন্দুমুসলমান বসবাস করলেও, দেশে শিক্ষার হার কম থাকলেও, দেশের লোকে অনেক বেশি ধর্মভীরু হলেও যেখানে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা তৈরি হয়নি, সেখানে দুই দশকের মধ্যেই হিন্দু-মুসলিম এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে দুই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হয়ে উঠে আসা এই রাজনৈতিক দল-দুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে দুই ধর্মের লোকের এক সাথে পাশাপাশি থাকা সম্ভব না। দুজনেই মনে করে হিন্দু আর মুসলমান আসলে দুই আলাদা দেশের বাসিন্দা, এদের এক সাথে সমান অধিকারে বসবাস করা সম্ভব না। ধর্ম সংক্রান্ত প্রায় সব ব্যাপারেই আরএসএস এবং মুসলিম লীগ সাধারণত ভিন্ন মত পোষণ করলেও দ্বিজাতি তত্ত্বের ব্যাপারে আশ্চর্য জনক ভাবেই দুই গোষ্ঠীই এক মনোভাব দেখায়। যা নিয়ে বাবা সাহেব আম্বেদকর বলেছিলেন- “আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি যে মিস্টার সাভারকার এবং মিস্টার জিন্না এক জাতি বনাম দুই জাতি তত্ত্বে একে অপরের বিরোধ করার পরিবর্তে দুজনেই এই বিষয়ে সহমত পোষণ করছে। শুধু সহমতই হচ্ছেন না, দুজনেই জোর দিয়ে বলছেন যে ভারতে দুই দেশ আছে- হিন্দুদের দেশ এবং মুসলিমদের দেশ। কি ভাবে দ্বিজাতি তত্ত্বের স্থাপন হবে এই নিয়েই কেবল দুজনের ভিন্ন মত রয়েছে। একদিকে জিন্না চাইছে ভারত বিভক্ত হয়ে হিন্দু জনগোষ্ঠীদের দেশ হিসেবে ভারত এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে পাকিস্থান তৈরি হোক। অন্যদিকে সাভারকর দ্বিজাতি তত্ত্ব মেনে নিয়েই দাবি করেছেন, ভারত এবং পাকিস্তান আলাদা দেশ হিসেবে ভাগ হবে না বরং দুজনেই এক-দেশের এক সংবিধানের অধীনে থাকবে। কিন্তু সংবিধান এমন ভাবে তৈরি হবে যাতে হিন্দুরা প্রধান নাগরিক হিসেবে থাকবে এবং মুসলিমরা হিন্দু দেশের অধীনে একসঙ্গে বসবাস করবে।“  (http://www.columbia.edu/itc/mealac/pritchett/00ambedkar/ambedkar_partition/307a.html#part_2)

    আমরা সবাই জানি যে এরই পরবর্তীকালে এক ভয়ানক রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্যে দিয়ে ভারত ভাগ হয়। মুসলিম দেশ হিসেবে পাকিস্থানের আর গান্ধী-নেহেরু-পাটেলের মতাদর্শে সেকুলার ভারতের জন্ম হল। সবচেয়ে বড় কথা একটি বড় সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীই মুসলিম দেশ পাকিস্তানে না চলে গিয়ে সেকুলার ভারতে সব ধর্মের লোকের সাথে মিলে মিশে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। শুধুমাত্র হিন্দুদের দেশ হিসেবে ভারতকে দেখার স্বপ্ন আরএসএসের অধরা থেকে যায়, যা ওরা স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু প্রায় জন্মলঘ্ন থেকে শুরু করে বিগত ১০০ বছরে তারা ধীরে ধীরে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে চলে। কেন্দ্রে বিপুল জনমত নিয়ে মোদি-শাহের পরপর দুইবার ক্ষমতাতে আসার পরে সারা ভারতের মতো বাংলাতেও বিজেপি তাদের সংগঠনের অনেক শক্তি বৃদ্ধি করে এবং ২০২১ সালে ভোটে শ্যামাপ্রসাদের জন্মস্থল বঙ্গভূমিকে হিন্দুত্ববাদীদের দখলে আনার জন্যে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে।

    ‘লোহা লোহাকে কাটে।‘  মৌলবাদ দিয়ে মৌলবাদের মোকাবিলা করা সম্ভব?

    বিশ্বের যে কোনো প্রান্তেই দেখা গেছে যে একজন উগ্র ধর্মবিশ্বাসীর প্রধাণ শত্রু অন্য ধর্মের মৌলবাদীরা নয়। তাদের প্রধাণ শত্রু সব সময়েই একজন পরধর্ম সহিষ্ণু অথবা ধর্ম অবিশ্বাসীই হতে পারে। কিন্তু চটজলদি রাজনৈতিক সুবিধে পেতে বা অপশাসনের প্রতিকার হিসেবে সাম্প্রদায়িক ব্যক্তির হাত ধরা সবসময়েই আরও বেশি বিপজ্জনক। ভারতের রাজনীতির দুই সেকুলার মুখ কংগ্রেস এবং সিপিএম এই জায়গাতেই একটা পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে। এটা ঠিক যে রাজনীতিতে ঘোষিত নীতি থেকে সব রাজনৈতিক দলকেই কখনো অল্প-বিস্তর সরতে হয়। কিন্তু যেটা একটা দলের মূল নীতি, সেখান থেকে সরে যাওয়া মানেই দলটির অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন জাগে। সবচেয়ে বড় কথা, এক মৌলবাদের হাত ধরে আরেক মৌলবাদকে কখনো টেক্কা দেওয়া যায় না। আসলে মনে রাখা উচিৎ, এক মৌলবাদ আরেক মৌলবাদের বন্ধু এবং প্রধানপৃষ্ঠপোষক। মৌলবাদের বিরোধিতা একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত আচরণ দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, সেকুলারিজম দিয়ে করা সম্ভব। এই প্রসঙ্গে ধর্ম এবং রাজনীতি নিয়ে আলোচনাতে উঠে আসছে যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও নিজের ধর্মের বা অন্য ধর্মের জনগণকে আকৃষ্ট করতে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচীতে পূজা-পাঠ, মন্দির- দর্শন অথবা মুসলিম ধর্মের মতো করে কোনো বিশেষ আচার আচরণ করছে। রাজনৈতিক ভাবে এই সব জিনিস কতোটা কাজ দেবে জানা নেই কিন্তু এটা বলা সম্ভব যে কোনো ধর্মের আচার আচরণ করলে সেটাতে নিজের ধর্ম বা অন্য ধর্মের লোকের প্রতি ঘৃণার সঞ্চারন করা হচ্ছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের লোকের প্রতি হিংসা, বা ঘৃণা পোষণ না করছে, কোনো ধর্মের লোককে মেরে ফেলা, তাড়িয়ে দেওয়ার নিদান না দেওয়া হচ্ছে বরং অন্য ধর্মের লোককে ধর্মীয় আচার ব্যবহারে কাছে টেনে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে সেখানে সাম্প্রদায়িকতা বলা যায় না, বরং এই আচরণ পরধর্ম সহিষ্ণুতার বার্তাই বহন করে। অনেকে বলতে পারে, ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখা কি উচিৎ নয়? আমি ব্যক্তিগত ভাবে এই মতবাদে ১০০% বিশ্বাস করি। কিন্তু একজন নাস্তিকের যেভাবে ভারতের গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ করার অধিকার আছে, তেমনি একজন ধার্মিক বা ধর্মগুরুরও রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করার অধিকার আছে। কিন্তু যা করার অধিকার নেই, সেটা হল অন্য ধর্মের প্রতি বা একজন ধর্ম অবিশ্বাসীর প্রতি রাগ ঘৃণা পোষণ করা। বাংলার রাজনীতিতে আব্বাস সিদ্দিকি নিয়ে আপত্তি একদমই উনার ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে না। উনি একজন ধর্মগুরু-সেটাও আপত্তির কারণ নয়। আব্বাস সিদ্দিকি নিয়ে আপত্তি একদম আলাদা জায়গাতে।

    • প্রথমত সে নিজেই দাবি করে যে সে শরিয়তপন্থী ইসলামে বিশ্বাস করে। মানে সে আধুনিক বিজ্ঞানে আস্থা রাখেন না।

    • সিনেমা বা নাটকে মেয়েদের অভিনয় করাকে মনে করে দেহ দেখিয়ে পয়সা উপার্জন করা এবং এসবের জন্যে এদেরকে গাছে বেঁধে পেটানোর নিদান দেন।

    • মুসলিম ঘরে জন্ম গ্রহণ করেও যারা ইসলাম মানে না, তাদেরকে উনি তাড়িয়ে দেওয়ার এবং মারার নিধান দেন।

    • করোনা ভাইরাসের মহামারীর সময়ে মন্তব্য করেন, যে আল্লা নাকি ভারতের ৫০ কোটি লোক মেরে দিতে এই ভাইরাস পাঠিয়েছেন।

    উনার চিন্তাভাবনা শুধু অবৈজ্ঞানিক নয়, ভয়ানক ভাবে হিংস্র। রাজনীতির বাইরেও, যে লোকের চিন্তাভাবনা এতো ভয়ানক একজন শিক্ষিত লোক হয়ে তাকে কি ভাবে সমর্থন করা সম্ভব? যে লোকের মহিলাদের সম্পর্কে, মুক্ত চিন্তাভাবনা সম্পর্কে এতোটাই ভয়ানক পশ্চাৎমুখী চিন্তাভাবনা তাকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দেওয়ার চেষ্টা ভয়ানক। কারণ রাজনৈতিক মঞ্চ পাওয়া মাত্রই এরা আরও অনেক মৌলবাদী লোক চারপাশে জড়ো করবে এবং মুসলিম মৌলবাদ শক্তিশালী হওয়া মাত্রই হিন্দু মৌলবাদীরাও শক্তিশালী হবে। ফলে আমাদের রাজ্য বা দেশ দুই মৌলবাদীদের মারামারির জায়গা হয়ে উঠবে, যেখানে প্রগতিশীল, ধর্ম-অবিশ্বাসী, বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনাতে বিশ্বাসী লোকেদের আর জায়গা থাকবে না।

    আব্বাস সিদ্দিকির দল কতো ভোট পাবে, কতো আসন পাবে সেটা নিয়ে মনে হয় না বাংলার উদারবাদীদের কারুর বিশেষ মাথা ব্যাথা আছে। বাংলার রাজনীতির অবস্থান বুঝতে পারলে সবাই জানবে নিজে একা দাঁড়ালে বাংলাতে একটি আসনে জেতার ক্ষমতাও আব্বাস সিদ্দিকির ছিল না। এখানে তাৎক্ষনিক যে ক্ষতি হল, সেটা হল মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার উত্থানকে সামনে রেখে রাজ্যের মধ্যে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে রাজনীতি করা দল অনেক সুবিধে পেয়ে যাবে। মুসলিম ভোটের বিভাজন এবং “হিন্দু খতরে মে হ্যায়” এই প্রচার হিন্দু ভোটকেও আরও সংগঠিত করে হিন্দুত্ববাদীদের দিকে ঠেলে দেবে। কিন্তু আরও বড় ক্ষতি হবে অন্য জায়গাতে। সেটা হল ঠিক যেভাবে ১৯০০ শতকের প্রথম দিকে হিন্দু-মুসলিমদের আলাদা আলাদা দল তৈরি হয়ে ভারতে ঘৃণা আর দাঙ্গার রাজনীতি জাঁকিয়ে বসেছিল ঠিক তেমন ভাবেই হিন্দু মৌলবাদের মোকাবিলা করতে এক মুসলিম মৌলবাদীকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া বাংলার রাজনীতিতে ভবিষ্যতে আরও বড় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিল। ভোট আসবে-যাবে, কেউ জিতবে-কেউ হারবে। কিন্তু বাংলার মাটিতে মুসলিম মৌলবাদী দলের প্রতিষ্ঠা দীর্ঘকালীন ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মৌলবাদেরই হাত শক্ত করবে।

    যে প্রশ্ন দিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম সেটার উত্তর দিয়ে দিই- হিন্দু এবং মুসলিম দুই মৌলবাদই সমান ভয়ানক, কেউ  কারও থেকে কম ভয়ানক নয়। একদিকে যেমন ১৯০০ শতকের প্রথম দুই দশকে যেমন ভারতে দুই মৌলবাদী শক্তি প্রায় এক সাথেই জন্ম নেয়, এক সাথেই শক্তিশালী হয়, তেমনি ২০১২ সালের পর থেকে সর্ব ভারতীয় ক্ষেত্রে একই সাথে বিজেপি এবং এম.আই.এম এক শক্তিশালী হয়। বিগত ৫-৬ বছরে ভারতের মাটিতে হিন্দু মৌলবাদের হামলাতে গৌরি লঙ্কেশ, পানসারে, ধাবলকর, কাল্বুর্গিরা মারা গেছে, কিন্তু কোনো মুসলিম মৌলবাদী নেতাকে মারা যেতে দেখবেন না। তেমনি বাংলাদেশে মুসলিম মৌলবাদের আক্রমণে হিন্দু-মুসলিম দুই ধর্মেরই চিন্তাশীল সহিষ্ণু ব্লগাররা মারা যেতে পারে কিন্তু কখনো দেখবেন না কোনো হিন্দু মৌলবাদী মারা যাচ্ছেন। দুই মৌলবাদের মধ্যে তাৎক্ষনিক ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মৌলবাদ বেশী ভয়ানক কারণ এদের শক্তিবেশী, এদের কামড়ে জোর বেশী। কিন্তু দীর্ঘ কালীন ভাবে দুজনেই সমান শক্তিশালী। কারণ আসলে দুই বিপরীত ধর্মী মৌলবাদ পরস্পরের পৃষ্ঠপোষক।

    মৌলবাদকে আটকে দেওয়ার উপায় কি?

    এদের ভোট-মুখী সুবাচনে বিশ্বাস না করে সবার বোঝা উচিৎ ক্ষমতা পেলে যে কোনো মৌলবাদই ভয়ানক হবে। আব্বাস সিদ্দিকির দলে হিন্দু প্রার্থী থাকা অথবা বিজেপিতে কিছু মুসলিম নেতা থাকা দুটিই কিছু প্রমাণ করে না। মনে রাখা  ভালো যে হিটলারেরও ইহুদী সেনাবাহিনী ছিল, যাদেরকে ব্যবহার করে নাজি জার্মানি ইহুদীদের হত্যাও করেছিল। মৌলবাদ আটকানোর একমাত্র উপায় সবস্তরে এদের প্রতিরোধ করা, এদের সমূলে বিনাশ করা। বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাভাবনা গ্রহণ করা, বিজ্ঞান বিরোধী ধর্মীয় কুপ্রথার বিরোধিতা করা। জাতধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষ, সমাজের মহিলা অথবা সমকামী - আমাদের সমাজে সবারই সমান অধিকার। তাই যে সব রাজনৈতিক নেতা এইসবের বিরোধিতা করে, বা হিংসাত্বক কথা বলে তাদের প্রথমেই বর্জন করা দেশের সব নাগরিকের কাম্য। তবেই আমাদের সমাজ আরও বেশী ধর্মীয় মেরুকরণের হাত থেকে বাঁচতে পারবে।


     

  • বিভাগ : ভোটবাক্স | ১৪ মার্চ ২০২১ | ৭২৫ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন