• চোপ! আর্যায়ণ চলছে।

    Moumita Mitra লেখকের গ্রাহক হোন
    অন্যান্য | ১২ এপ্রিল ২০২০ | ৩৫৯ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন
  • কিছুদিন আগের লেখা- আরেক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে

    গুরুগ্রামে কী শান্তনীল ভোর! অথচ ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে নিথর নিঃসীম রক্তিম এখনও লেলিহান। আমার বাড়ির পাশেই কারো কারো ভোর আর হল না। দিল্লির রাস্তায় দিনের পর দিন ছাল ছাড়ানো একতা, কাপুরোচিত মেলোড্রামাটিক ততপরতায় পর্যবসিত। শ্বাপদ থেকে নিরাপদ দূরত্বে মুখ লুকোনোর তোড়জোড়। আমি সে ও সখা আরও অনেকে অপেক্ষা করছে একটা নিছক আর পাঁচটা ভোরের মতো অনৈতিহাসিক ভোরের অপেক্ষায়।
    কিন্তু সেটি হবার নয়। এখন এই ব্রাহ্ম মুহুর্তে আমরা ইতিহাসের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। আমরা এখন হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার অধীনস্থ অবোধ ইঁদুর। বাঁশি আমাদের যেদিকে নিয়ে যাবে, আমরা রোস্টেড রুস্তম হবার জন্য মাখন মথিত পথে সেদিকেই দৌড়ব। সামনেই অতলান্ত খাদ। তাতে কী? বাঁশির নিরঞ্জনী টান জার্মানীকে জার্মানী জেরুজালেমকে জেরুজালেম, ভারতবর্ষকে তিন টুকরো ভারতবর্ষ করে নি?
    তা, কথা হচ্ছিল নিরঞ্জনী টান নিয়ে। যার ট্যাগলাইনটা হচ্ছে- চোপ! আর্যায়ণ চলছে। কীভাবে?
    রামায়ণে আর্যপুত্রের বান্ধব হিসেবে আমরা তথাকথিত যেসব অনার্যদের পাচ্ছি, তাদের সবার শরীরে কিন্তু আর্যরক্ত বইছে। রামভক্ত হনুমান পবনপুত্র। এবার বালি আর সুগ্রীবের জন্মের গপ্পোটা কী? সুমেরু পর্বতে যোগাভ্যাস কালে ব্রহ্মার চক্ষু নির্গত অশ্রুবিন্দু থেকে ঋক্ষরজা নামক এক বানরের জন্ম হয়। তা, সে বানর তো খায়দায়, লাফিয়ে বেড়ায়।তাইরে নাইরে না করে দিন কাটাতে কাটাতে একদিন হঠাৎ সে গিয়ে পড়ল এক নির্মল সরোবরে। সরোবরের স্ফটিক স্বচ্ছ জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সে ভাবল, নিশ্চয়ই অন্য কোন বানর তাকে অপমান করছে, এই ভেবে ঋক্ষরজা 'সেই' বানরটিকে আক্রমণ করার জন্য সরোবরে ঝাঁপ দিয়েই সুন্দরী রূপবতী নারীতে পরিণত হল। তাকে দেখে কামার্ত ইন্দ্রদেব তার চুলে এবং সূর্য্য তার গ্রীবায় রেতঃপাত করলেন। জন্ম হল ইন্দ্রপুত্র বালী আর সূর্য্যপুত্র সুগ্রীবের। তারপর দিন ঋক্ষরজা আবার তার বানর রূপ ফিরে পেলেন এবং ব্রহ্মার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। তখন ব্রহ্মা এদের কিষ্কিন্ধ্যা'র রাজা করে দিলেন।
    অর্থাৎ আর্যপুত্রের সহকারী হতে হবে বলে কীভাবে সুপরিকল্পিত উপায়ে একটু একটু করে অশ্রু রক্ত রেত মিশিয়ে আর্যায়ণের সুচারু সন্নিবেশ ঘটানো হচ্ছে। কুতসিত বানরীর সঙ্গে দেবতাদের সঙ্গমও করানো হল না, (হল না?! এ মায়া প্রপঞ্চময়) অথচ দিব্যি দেবপুত্র জন্মে গেল। এইখানে ঘরের ভেতর ঘর অর্থাৎ মশারির মায়াজালে যে মজার সত্যটা ঘাপটি মেরে আছে, তা হল, 'দেবতাদের' দয়াপরবশ হয়ে গলায় ঘাড়ে এক দুফোঁটা রেতঃপাত করার জন্যও ডাকসাইটে আর্যঘরানার সার্টিফিকেট বিশিষ্ট অনিন্দ্যসুন্দরী প্রয়োজন, তাই অনার্যা কুতসিত বানরীর এই মায়া রূপান্তর।
    অতঃপর?

    জটায়ু আর সম্পাতি হলেন অরুণের পুত্র। অরুণ কে? না মহর্ষি কশ্যপ আর বিনতার পুত্র।

    জাম্ববান? ব্রহ্মার পুত্র। গুহক চন্ডাল - বশিষ্ঠ পুত্র বামদেবের নিউ এডিশন অর্থাত পিতার শাপে চন্ডাল হয়ে জন্মান।
    ভিলেন রাবণ কে? সেও বিশ্রবা মুনির পুত্র।
    সীতা - রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে - সাক্ষাৎ লক্ষ্মী স্বরূপিণী।
    এবার মহাভারত নিয়ে যদি আমরা বিবেক ঘামাই তাহলে দেখব, পঞ্চপান্ডব সবাই দেবতার দান। কারণ বিবেক যদি বেশি ঘনিয়ে ঘামানো হয়, তাহলে একটা রিস্ক ফ্যাক্টর থেকেই যাচ্ছে। কারণ কৌরবরা আসলে পৌরবও বটে। ক্ষত্রিয় রাজা যযাতি ও দানবরাজ বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠার ছেলে পুরু কৌরব বংশের পূর্বপুরুষ। তাই দেবতার ঔরসে ক্ষত্রিয়া কুন্তীর গর্ভে জন্মানো পঞ্চপান্ডবের গায়ে বস্তুতঃ কোন দানবী'র রক্ত কিন্তু নেই।

    দ্রৌপদী দেবতার দান এবং জন্ম যুবতী। কালো রঙ্গের অনার্য প্রতীকী চিন্তার অভিঘাত যজ্ঞকুন্ডেই নির্মূল করা হয়েছে।
    সত্যবতী কালো ও ধীবর কন্যা হলেও উপরিচর রাজার রেতঃ প্রসূত।
    পারশব বিদুর স্বয়ং ধর্ম। কর্ণ সূতপুত্র কিন্তু দেবতার দান, কারণ সে যতই ধর্মের ওপারে নাম লেখাক না কেন, পান্ডবদের ভাই তো বটেই।
    'গোপাল' কৃষ্ণ তো স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার। বলভদ্র শেষনাগ।
    আবার মজা হচ্ছে এই নাগ, গরুড়, অপ্সরা থেকে শুরু করে ঘোড়া, উট, ইত্যাদি পশুরাও মহর্ষি কশ্যপের ঔরসজাত। অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ পুন্ড্র সুহ্ম - এই আর্য পরিবৃত্ত বহির্ভূত পাঁচটি সন্তানের জন্মও রাণী সুদেষ্ণার গর্ভে দৃষ্টিহীন বিকৃতকাম ঋষি দীর্ঘতমার ঔরসে।
    উদাহরণ দিতে গেলে গাঁ বাছতে ঠগ উজাড় হয়ে যাবে এবং গৌতম বুদ্ধ - যিনি ব্রাহ্মণ্যবিরোধী একটি ধর্মের স্থাপয়িতা হিসেবে যখন জনপ্রিয়তার চূড়ান্তে পৌঁছোবেন এবং দলে দলে নিপীড়িত মানুষ বৌদ্ধধর্মে গিয়ে নাম লিখিয়ে 'আর্য'দের একটি আস্তিত্বিক সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড় করাবে, তখন রাতারাতি তাকে বিষ্ণুর অবতার খাড়া করে ধর্ম সংস্থাপনের যে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা - তা - ও নাহয় উহ্যই থাকল।

    সুতরাং মোদ্দা কথা, সেই ট্রাডিশান সমানে চলিতেছে। সেই নিরঞ্জনী টানে আমরা মথিত মোহিত পরিপ্লুত হইয়া সুরে সুরে লাফাইয়া খাদের প্রান্তে আসিয়া উপনীত হইতেছি। একটি মরণ লম্ফের অপেক্ষার আগে এক একটি আশার লম্ফ চিরাগ জ্বালাইবার চেষ্টা আমাদের করিতেই হইবে। ইঁদুর হইতে বিদুর আমাদের হইতেই হইবে। কারণ, যথা ধর্ম তথা জয়।

    তামিমৌ ত্রমি
  • বিভাগ : অন্যান্য | ১২ এপ্রিল ২০২০ | ৩৫৯ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন
আরও পড়ুন
- - স। র। খান
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত