এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  অন্যান্য

  • পায়ের তলায় সর্ষেঃ জুলে, লাদাখ!

    সিকি
    অন্যান্য | ২৩ জুন ২০১২ | ১২০০২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • প্পন | 122.133.206.25 | ২৮ জুন ২০১২ ০১:১৯558644
  • বিচ লিখলাম নাকি ঃ)

    ওটা ব্রিজ হবে। (ঘুম পেয়েছে)
  • b | 135.20.82.164 | ২৮ জুন ২০১২ ০৯:৩৯558645
  • শেষ দৃশ্যের আগে চৌহানের সাথে সিকি-র ঝাড়পিট দেখতে চাই। তাতে অবিশ্যি অবিশ্যি সিকি-ই জিতবে।
  • siki | 151.0.8.248 | ২৮ জুন ২০১২ ০৯:৪৭558646
  • moukhik jharpit to hoyechhilo ... tobe taate keu-i jete ni.
  • Arin | 129.224.108.139 | ২৮ জুন ২০১২ ১১:২০558647
  • moukhik jharpit to hoyechhilo ... tobe taate keu-i jete ni.

    সেকি?

    "ভেরি ভেরি সরি মশলা খাবি" দিয়ে শেষ করেছিলে নাকি?

    তবে গল্পটা চলুক, প্রচন্ড ভালো লেখাটা হয়েছে। চৌহানটা দেখছি এক্কেরে যাতা, আমি এরকম একজনকে জানতাম। সে মক্কেল ও তার বৌ বাচ্চা নিয়ে আমরা লেপচা জগত বেড়াতে গেছি, রেস্ট হাউসের বিছানায় শুয়ে শুয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলছে, "কি যে তোরা এই -এই-এই-এই দেখে আনন্দ পাস?" (বলে আঙ্গুল দিয়ে হাওয়ায় ঢেউ এর ছবি আঁকলো পাহড় বোঝাতে চেয়ে)।
  • b | 135.20.82.164 | ২৮ জুন ২০১২ ১২:২৩558648
  • arin, gomukh berhaate giye besh kichhu paabalik dekhechhilam , taaraa himaalay, baraph, kobaalT blu aakaash, saamane dheere dheere barha haye oThaa bhaageerathee gruper indrasabhaa, esab kichhukei paataa dey naa. daa`nte daa`nt chipe puNya arjan kare nebe aase.
  • kumu | 132.160.159.184 | ২৮ জুন ২০১২ ১২:২৬558649
  • চৌহানের মত অনেককেই দেখেছি।

    ফুলের ছবি খুব ভালো লাগল।ঠান্ডায় জ্বর ইঃ হয় না কিন্তু asthamaর রোগীদের প্রচন্ড সমস্যা হতে পারে।মানালি গিয়ে আমার হয়েছিল।
  • lcm | 79.236.170.152 | ২৮ জুন ২০১২ ১৩:০৬558650
  • কয়েকটা ছবি হেব্বি হয়েছে...
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৮ জুন ২০১২ ২০:২৬558651
  • আহা, ল্যাদোশদার সাট্টিফিটি পড়ে দিলটা গার্ডেন গার্ডেন হয়ে গেল।
  • pi | 82.83.84.10 | ২৮ জুন ২০১২ ২০:৫৪558652
  • ছবি এখনো দেখি নাই। আমি তো ভাবছিলাম, একেবারে হুতোর ছবিতে দেখবো, চৌহান বনাম সিকি।
    ভীষণ তরতরিয়ে চলছে, চলুক !

    কিন্তু সোনমার্গেরা বরফদের কথা শুনে খুব দুক্খু পেলুম। আমার ছ বছরের স্মৃতিতে তারা এখনো ধবধবে, অমলিন। ঃ)
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৮ জুন ২০১২ ২১:৩০558654
  • ১২ জুন ২০১২

    সুন্দর একটা ঘুমের শেষে যখন চোখ খুলল, স্লিপিং ব্যাগের ভেতর থেকে বেরিয়েও বিশেষ কিছু ঠাণ্ডা বুঝলাম না। ঘরের ভেতরটা একইরকম উষ্ণ। অতিথিদের আপ্যায়নে সকাল ছটা থেকে আবার জেনারেটর চালিয়ে দিয়েছে। তাই রুম হীটার আবার চলছে ঘরের মধ্যে।

    ঝটপট বেরিয়ে এলাম। উত্তরে এইদিকে সকাল হয় খুব তাড়াতাড়ি, পৌনে পাঁচটার মধ্যে দিনের আলো ফুটে যায়। বেরোতেই প্রথম ঠাণ্ডার ঝাপটাটা অনুভব করলাম। ঝকঝকে সকাল, যেদিকেই তাকাই চারদিকে তুষারশৃঙ্গ, চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে এমন সাদা, আর কনকনে কিন্তু উপাদেয় শীত। ঠিক যেন দিল্লির যিশুদিবসের সকাল।

    তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিতে হল, এখান থেকে দু কিলোমিটার দূরে দ্রাস ফিল্ড হসপিটাল, সেখানের ডাক্তার কর্নেল রনধাওয়া আমাদের জন্য ব্রেকফাস্ট টেবিলে অপেক্ষা করছেন, ব্রেকফাস্ট সেরে বেরোতে হবে।

    এই যে চারদিকে বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া দেখা যাচ্ছ, এগুলোর নাম পরে জেনেছিলাম, প্রত্যেকটা চূড়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে ভারতের ইতিহাসে।

    কর্নেল রনধাওয়া লোকটি বেশ হাসিখুশি লোক। কোনো এক সময়ে চৌহান তার প্রমোশন করিয়ে দিয়েছিল কোনওভাবে, মানে, আগে যেমন বলেছিলাম, চৌহান আসলে কাউকেই প্রমোশন দিতে পারে না, কিন্তু আর্মির লোকের কাছে ভাব দেখায় যেন সে-ই সর্বেসর্বা, আসলে সে নিতান্তই এই টেবিল থেকে ওই টেবিলে ফাইল পৌঁছে দেবার কাজ করে। প্রমোশনের লাল ফিতেয় যেহেতু সরকারি ফাইলের টেবিল থেকে টেবিলে চলে বেড়ানোটা মস্ত বড় ইম্পর্ট্যান্ট কাজ, সেই হিসেবেই চৌহান "করে দিয়েছিল"। তাইতে রনধাওয়া কৃতজ্ঞতাস্বরূপ দ্রাসে রাতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এবং পরের দিন ব্রেকফাস্ট টেবিলে আমাদের ডেকেছেন।

    কর্নেলবাবু যেহেতু অনেকদিন ধরে আছেন, তাই ওঁর কাছ থেকে এখানকার ব্যাপারস্যাপার জানার চেষ্টা করছিলাম। এমনিতে ঢোকার সময়েই দেখেছিলাম হাসপাতালের গায়ে লেখা আছে, ওয়র্ল্ডস কোল্ডেস্ট ফিল্ড হসপিটাল। শীতকালে এখানে তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। কীভাবে সারভাইভ করেন তখন?

    "কীভাবে আবার, টিনড ফুড। আর শীত পড়ার আগে যত শাকসব্জি জমিয়ে নিতে পারি, স্টক করে নিতে পারি, সেসব ডিহাইড্রেটেড করে আমরা স্টোরে তুলে রাখি। রেফ্রিজারেশনের দরকার হয় না, কেবল ভেতর থেকে জল বের করে নেওয়া হয়। তাই দিয়ে চালাই। শীতকালটা সত্যিকারের প্যাথেটিক এখানে। হাত নাড়াবার ইচ্ছে করবে না, শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য মাটির নিচে বাঙ্কারে চলে যেতে হয়; তা সত্ত্বেও ডিউটি চালিয়ে যেতে হবে। আর সদাসর্বদা অ্যালার্ট থাকতে হবে। দিস ইজ দা ব্লাডি ব্যাটলফিল্ড।"

    দূরের বরফচূড়ার দিকে দেখালেন রনধাওয়া। "ওই যে দুটো পীক দেখছেন, ওর একটা হল টাইগার হিল, অন্যটার নাম টোলোলিং। উনিশশো আটানব্বইয়ের শীতকালে আমাদের ঢিলেমির সুযোগ নিয়ে ওখান দিয়েই নেমে এসেছিল পাকিস্তানের সেনারা। আমরা টের পেয়েছিলাম উনিশশো নিরানব্বইয়ের জুন মাসে, যখন শ্রীনগর থেকে আবার আর্মিরা এখানে ফেরত আসে। তখন এই ফিল্ড হসপিটাল ছিল না। দ্রাস ছিল নিতান্তই একটা শান্ত, নিরুপদ্রব জনপদ ..."

    দ্রাস, কারগিল; এই জায়গাদুটো পাশাপাশি। শীতে এই সব জায়গা পুরোপুরি জমে যায়। এখান থেকে পাকিস্তানের বর্ডার, সরলরেখার হিসেবে খুব বেশি হলে দু থেকে আড়াই কিলোমিটার। মাঝে রয়েছে টোলোলিং রেঞ্জ। তার উচ্চতম চূড়া হল টাইগার হিল। এমনিতে বহুকাল ধরেই ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে চুক্তি হয়ে আছে যে শীতের সময়ে এই সব এলাকা থেকে তারা সেনা সরিয়ে নেবে। প্রতি বছরই তাই হয়ে এসেছে। শীতের সময়ে পুরোপুরি শ্রীনগরের থেকে কাট অফ হয়ে যায়, বরফের চাদরে মুড়ে যায়, অধিকাংশ স্থানীয় অধিবাসীও ঘরবাড়ি বন্ধ করে নিচে সমতলের ভ্যালিতে নেমে আসে।

    এই সুযোগটারই সদব্যবহার করেছিল পাকিস্তানি সেনা। ১৯৯৮ সালে শীত শুরু হবার পরে যখন সেনাবাহিনী সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন লোকচক্ষুর অন্তরালে তারা এই টোলোলিং রেঞ্জ পেরিয়ে ঢুকে পড়ে দ্রাস কারগিল প্রভৃতি এলাকার আশেপাশে। শীতের শেষে যখন ভারতীয় সেনারা ফিরে আসতে শুরু করে, তখন আচমকা পাকিস্তানের হানায় অসহায় অবস্থায় মারা পরে বহু ভারতীয় সেনা।

    তারপরের ঘটনা তো ইতিহাস। শুরু হয় অপারেশন বিজয়, মিডিয়ার ভাষায় যা কারগিল যুদ্ধ নামে পরিচিত। তছনছ করে দিয়েছিল সেই যুদ্ধ এখানকার এলাকাকে, কিন্তু পাকিস্তানকে গুছিয়ে ঠ্যাঙানি দিতে পেরেছিল ভারতীয় সেনা। ১৯৯৯ শেষ হবার আগে আগেই পুরো এলাকা পাকিস্তানি সেনামুক্ত হয়, তাদেরকে লাইন অফ কন্ট্রোলের ওপারে পাঠিয়ে দিতে সমর্থ হয় ভারতীয় জওয়ানরা। এর পরেই এখানে চিকিৎসার্থে এই ফিল্ড হাসপাতাল খোলা হয় আর্মির তরফে। ভারতের অন্যান্য জায়গায় সেনাবাহিনী যেমন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে, জনসাধারণের সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক রাখে না, এইসব দুর্গম এলাকায় তেমনি সেনাবাহিনী জনতার মধ্যে মিশে থাকে। এই ফিল্ড হাসপাতালে দ্রাসের সাধারণ লোকজনও নিখরচায় বা অল্প খরচে চিকিৎসা পাবার জন্য আসে। বদলে স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে কোনোরকমের ইনফিল্ট্রেশনের খবর সবার আগে পেয়ে যায় সেনার লোকেরা।

    যদিও আমার বেড়ানোর প্ল্যান ফাইনাল, কিন্তু চৌহানপরিবারের ব্যাপারস্যাপার দেখে আমার মনে হচ্ছে না তারা শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে পারবে। প্ল্যানের কথা যখনই উঠছে, তখনই চৌহান খালি বলছে, এই এতসব জায়গায় ঘুরব তো আরাম করব কখন? দেখি, যদি না পারা যায় তো প্ল্যান চেঞ্জ করে নিতে কতক্ষণ? দরকার হলে দু একটা জায়গা ড্রপ করে দেব, লে-তে বসে আরাম করব, হেঁহেঁহেঁহেঁ। আমাকেও মনে খিস্তি এবং মুখে হেঁহেঁহেঁহেঁ বজায় রেখে বলতে হয়েছে, সে দেখা যাবে না হয়। তবে এইটা আপনাকে বলতে পারি, আমি একটুও অসুস্থ নই, আমি একটুও টায়ার্ড নই, আর আমি আরাম করার জন্য লে-তে আসি নি। আরাম করার থাকলে দিল্লিতেই ঘরে বসে এসি চালিয়ে আরাম করতে পারতাম।

    বার দুতিন এই রকম বলে রেখেছি, তারপরেও চৌহান এবং মিসেস চৌহান রনধাওয়াকে দেখেই পারিবারিক সমস্যার ঝাঁপি খুলে বসল।

    ১৯৮৯ থেকে ডিফেন্স মেডিকেল সেকশনের ক্লার্ক হিসেবে কাজ করে আসছে চৌহান, ফলে ছুতোয় নাতায় কোনো না কোনোভাবে ডিফেন্সের সমস্ত ডাক্তারদের সঙ্গে তার দীর্ঘ দুই দশকের ওঠাবসা। ফলস্বরূপ তার বউ এবং দুই বাচ্চা কমবয়েস থেকেই হয়ে পড়েছে অতিরিক্ত বেশিমাত্রায় ডাক্তার-ডিপেন্ডেন্ট। পান থেকে চুন খসলেই ডাক্তার। ঠেক কাজে লাগিয়ে কোথাও মিলিটারি ডাক্তার দেখাতে তাদের পয়সা দিতে হয় না, সমস্তই ফ্রি চিকিৎসা, ফলে কান কটকট করুক কি পেট গড়বড়, সঙ্গে সঙ্গে আর্মি হাসপাতালে মিলিটারি ডাক্তারের হাতবুলোনি খেতে দৌড়য় এরা, যখন তখন এই ওই তাই ট্যাবলেট খায়, সেগুলোও ডিফেন্স রেশন থেকে ফ্রি-তে পায়, মানে এমন ওষুধ আর ডাক্তারপ্রেমী ফ্যামিলি প্রায় দেখা যায় না প্রায়।

    আমি রনধাওয়াকে যখন পরপর জিজ্ঞেস করে চলেছি লে-লাদাখে কী কী দেখার আছে, কোথায় কোথায় ঘোরার আছে, আচমকা চৌহানের বউ মাঝখান থেকে শুরু করল, কর্নেলসাব, ম্যারে না কান ম্যা বহোত দর্দ হো রহা হ্যায়, সঙ্গে সঙ্গে চৌহানের মেয়ে, কর্নেলআঙ্কল, মেরা না পেট দুখ রহা হ্যায়, রাত কো নিন্দ ভি নেহি আয়ি থি ...

    আমি হাল ছেড়ে দিয়ে চুপ করে বসলাম। ঝাড়া আধঘণ্টা ধরে পরোটা, পোহা, অমলেট ইত্যাদি সমেত কান পেট মাথা ঘুম সবকিছুর ওরাল চিকিচ্ছে চলল। রনধাওয়া বেশ মাইডিয়ার লোক, মনে মনে অল্প অসন্তুষ্ট হচ্ছিল, তবুও কিছু না বলে হাসিমুখে সবার সব প্রশ্নের উত্তর দিল, তারপরে আমি যখন প্যাংগং লেকের ধারে রাতে থাকার অপশন নিয়ে কথা তুললাম, রনধাওয়া এক কথায় উড়িয়ে দিল, ওখানে আপনারা থাকতে পারবেন না, রাতে পুরো চিলিং উইন্ড চলে, সাবজিরো হয়ে যায় টেম্পারেচার, আপনারা বরং কাছে টাং শে-তে থাকার ব্যবস্থা দেখুন। আরে টেন্টে ফেন্টে থেকে কী এমন ভালো লাগবে আপনাদের? ভালো অ্যাকোমোডেশন না পেলে রাতে ঘুম হবে না। না না, ওসব টেন্টে থাকার চেষ্টা করবেন না।

    ব্যস, মিলিটারির লোক যখন বলেছে, তখন সেই আদেশই চৌহানের শিরোধার্য। আমি তো এদিকে শুনেই ঠিক করে ফেলেছি আর যা-ই হোক, ওখানে আমি টেন্টেই থাকব। স্লিপিং ব্যাগে শোব, কোনো প্রবলেম হবে না। লে-লাদাখের অজস্র অসংখ্য ট্র্যাভেলগ আমি পড়েছি, সব্বাই ওখানে গিয়ে টেন্টেই থাকে, কারুর তো আজ পর্যন্ত কোনো অসুবিধে হয়েছে বলে শুনি নি, ... তখন শুনলাম রনধাওয়া বলছেন, আমি তো অ্যাডভেঞ্চার-টার একেবারে ভালোবাসি না। আমার মেয়ে একবার এসেছিল, বলেছিল বাবা চলো লেক্রর ধারে টেন্ট খাটিয়ে থাকি, আমি বলেছিলাম, বরং আমি এখানেই থেকে যাই, তুই ঘুরে আয়।

    গল্প শুনে আমি মিনমিন করে বললাম, তবে কর্নেলসাব আমি তো ঠিক আরাম পাবার জন্য আসি নি, ওই ঠাণ্ডায় টেন্টে শোবার মজাটা পাবো বলেই তো এসেছি, আমি তো এ-ও ভাবছি দু বছর বাদে আবার আসব এখানে, বাইক চালিয়ে ...

    রনধাওয়া আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, উইশ ইউ গুড লাক মাই ফ্রেন্ড, এখানে প্রত্যেক বছর এরকম অসংখ্য পাগল আসে, বাইক চালিয়ে, পুণে থেকে, দিল্লি থেকে, চণ্ডীগড় থেকে, কলকাতা থেকে, আই অ্যাম নট দ্যাট অ্যাডভেঞ্চার ক্রেজি। আপনার মধ্যে যদি ক্রেজ থাকে, আপনি আসবেন, তবে আমার মধ্যে এরকমের কোনো ক্রেজ নেই। আমার এখানে থাকতে একটুও ভালো লাগে না।

    একজন মিলিটারি ম্যানের মুখে এরকম কথা শুনে খুবই মন খারাপ লাগল, তবে অবাক হতে পারলাম না। সত্যিই তো, আমাদের কাছে যা দশ বারো দিনের জন্য মজা করতে আসা, এদের কাছে সেটা কাজের জায়গা, চূড়ান্ত প্রতিকূল ওয়েদারের মধ্যে দিয়ে এদের চালাতে হয়, কাজ করতে হয়, দশ ডিগ্রি থেকে মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রির মধ্যে বছরের পর বছর কাটাতে হয় ফ্যামিলি ছেড়ে, নিজের জায়গা ছেড়ে, এদের ভালো না-ই লাগতে পারে, এদের সঙ্গে আমাদের মেন্টালিটি মিলবে না। পরিবেশের সৌন্দর্যচেতনা এদের মাথা থেকে চেঁছেপুছে বের করে ফেলা হয় ট্রেনিং-এর সময়ে, নইলে এদের দিয়ে এই রকম স্বর্গীয় পরিবেশে কাজ করানো যায় না, এদের কাছে জীবনের প্রতিটা দিন, কাজের নেচারটাই অ্যাডভেঞ্চার, আলাদা করে অ্যাডভেঞ্চার এদের টানতে পারে না।

    তো যা দেখলাম টেন্টে না-থাকার প্রস্তাবে চৌহান পরিবার তো বটেই, সিকিনীও বেশ সাবস্ক্রাইব করে ফেলল। না বাবা, টেন্টে থেকে কাজ নেই, ওই টাং শে না ফাং শে কোথায় বলছে, সেইখানেই থাকব বরং।

    যাক গে যাক, সে সব তো অনেক পরের কথা, আপাতত তা হলে এগনো যাক, অনেকটা দূরের পথ। সারা দিনে প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার যেতে হবে।

    এগনো গেল। রনধাওয়ার থেকে বিদায় নিয়ে, হ্যান্ডশেক করে ছবি তুলে, এগোলাম পরের স্টপেজের দিকে। কারগিল ওয়ার মেমোরিয়াল।
  • প্পন | 122.133.206.25 | ২৮ জুন ২০১২ ২১:৫৯558655
  • শমীকের পুরো মারা গেছিল দেখছি। শমীক, ধৈর্য ধরো, বাইকে করে একবার হবেই, ফুল সার্কিট। উৎসাহী গুরু ভায়েরা মিলে। ঃ)
  • Tim | 208.82.23.117 | ২৮ জুন ২০১২ ২২:০৫558656
  • সাইকেলে করেও যাওয়া যেতে পারে।
  • lcm | 138.48.127.32 | ২৮ জুন ২০১২ ২২:১১558657
  • এই টই টাকে আর্মি সর্ষে ও বলা যেতে পারে।
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৮ জুন ২০১২ ২২:১২558658
  • ফুল সার্কিট হবেই। ২০১৪ তে।

    পরের বছর নতুন বাইক কিনছি।
  • cb | 212.156.11.244 | ২৮ জুন ২০১২ ২২:৪১558659
  • মিলিটারি ডাক্তারের হাতবুলোনি!!!!!! খাইসে, কি বর্ণনা
  • de | 130.62.181.46 | ২৮ জুন ২০১২ ২২:৫১558660
  • হেসে কুটিপাটি হয়ে যাচ্চি শমীকের লেখাটা পড়ে! ঃ))

    পরের বছর আমিও লে যাচ্চি আবার -- ফেরার পথে মানালি হয়ে ফিরবো বলে -- সেসময় গুরুভায়েরা গেলে প্যাগংয়ের ধারেই নাহয় আড্ডা হবে ঃ))
  • kiki | 69.93.243.117 | ২৮ জুন ২০১২ ২২:৫৫558661
  • সাইকেল হলে বোলো। আমি সাইকেল চালাতে পারি।ঃ)
  • ঐশিক | 132.178.216.63 | ২৯ জুন ২০১২ ০০:০০558662
  • আমার আর লাদাখ যাওয়া হইলো না :(
  • | 127.194.101.35 | ২৯ জুন ২০১২ ০০:৩৫558663
  • আজকাল কেউ কোথাও বেড়াতে গেছে শুনলেও আমার হিংসে হয়। বেড়ানোর টই দেখলে হিংসের চোটে সযতনে এড়িয়ে যাই। যাক, মন খুলে-প্রাণভরে লোকজন বেড়াক, গপ্পো লিখুক, আমি নেই এসবে। কিন্তু এই লে লাদাখ দেখে শমীকের টই চুম্বকের মত টানল। কারণটা বলি। কুশলদা, কুশল রায়, যার অসুস্থতার খবর সাহায্যের টইতে দেওয়া হয়েছিল, সেই কুশলদা প্রতি বছর লাদাখ যায়, মানে যেত, আর যেতে পারবে কিনা জানি না। তার একটা ট্যুর করার কথা কথা ছিল কন্যাকুমারী থেকে লাদাখ অব্দি। ট্রেনে-বাসে, বাইকে এভাবে সেভাবে অনেকভাবে। এটা কুশলদার একটা প্রজেক্ট। কুশলদার একজন সফরসঙ্গী দরকার ছিল, যে তাকে সাহায্যও করতে পারবে, ছবি তোলায় নয় কিন্তু অন্যান্য কাজে। শোনামাত্র যে তিনজন নিজের নাম জমা দিয়ে কুশলদাকে ধরে পড়েছিল আমি তাদের একজন। মহিলা বলে কুশলদা একটু আমতা আমতা করছিল বটে তবে রাজী হব হব এরকম একটা ভাবও ছিল। আসলে কুশলদা কাউকেই মুখের উপর না বলতে পারে না, তাই সক্কলকেই বলেছিল, দাঁড়াও, আগে কাজ গোছাই, তারপর তো যাওয়া!

    সব গোল পাকিয়ে দিল আমার মেয়েটা। দুম করে লুরু চলে গেল। এক-দু দিনের জন্যে কোথাও যাওয়া এক কথা, ছেলে ম্যানেজ করেই নেয় কিন্তু এক মাসের একটা ট্যুর ছেলেকে একলা রেখে যাওয়া আমার পক্ষে একেবারেই সম্ভব নয় তাই স্বপ্নের ওই ট্যুর শুধু স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেল। অসুখ ধরার পড়ার ঠিক আগে আগেই কুশলদা লাদাখ ঘুরে এসেছে বটে তবে সেটা ওই প্রতি বছরে যেমন যায়, ওখানে একটা গাঁয়ে গিয়ে ১৫-২০দিন থাকে, কাজ করে, সেই যাওয়া। ট্রেনের ওই ট্যুরটা হয়নি, ওটা সামনের বছরের জন্যে মুলতুবি রেখেছিল কুশলদা সম্ভবত টাকা-পয়সা, প্রস্তুতি ইত্যাদির জন্যে। এখন কুশলদা হাসপাতালে।

    শমীককে যতই হিংসে করি না কেন, মন দিয়ে পড়ছি ওর পায়ের তলার সর্ষে।
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৯ জুন ২০১২ ০০:৩৮558665
  • ছবি তুলে দিয়েছি, দেখে নিন। গল্প তো ওপরেই বলে দিয়েছি।

    কারগিল ওয়ার মেমোরিয়াল দেখে এইবার সত্যিকারের লে-র দিকে এগনো শুরু হল। কারগিল শহর পেরিয়ে, মাঝে মুলবেক বলে একটা জায়গায় আমরা গাড়ি থামিয়ে লাঞ্চ করলাম। এক ফরাসী ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হল, যিনি প্রায় এক মাস ধরে এই এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। মুলবেকেই পড়ে রয়েছেন তিনদিন হয়ে গেল, এরপর লিকির-এর দিকে যাবেন। অনেকক্ষণ গল্প হল খাওয়া দাওয়ার সাথে। মেল আইডি বিনিময় হল।

    এইখানেই এক দম্পতিকে দেখলাম কেরালার নাম্বারপ্লেটওলা গাড়ি নিয়ে এসে দাঁড়াতে। কেরালা থেকে গাড়ি চালিয়ে লে-তে এসেছেন? এ তো হাইট অফ ড্রাইভিং! তড়িঘড়ি গিয়ে আলাপ করলাম, না, কেরালা থেকে আসেন নি, আসছেন চণ্ডীগড় থেকে, আসলে হায়দ্রাবাদের লোক, একসময়ে কেরালাতে পোস্টিং ছিল, তখন গাড়িটা কিনেছিলেন।

    মুলবেকের পর থেকেই প্রকৃতি বদলে যেতে শুরু করল। সবুজ কমে গিয়ে খয়েরি ধূসর বিভিন্ন রঙের পাহাড় দেখা যেতে শুরু করল, আর একেক রকমের পাহাড়ের একেক রকমের ডিজাইন। আমি পাগলের মত ছবি তুলে যাচ্ছি, অথচ গাড়ি থামাতে বলার সাহস হচ্ছে না, কারণ গাড়িতে আমি ছাড়া সবাই তখন কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করে চলেছে কত তাড়াতাড়ি লে-তে পৌঁছনো যায়। আমার মেয়ে বমি করছে মাঝে মাঝেই, চৌহান ঘুমোচ্ছে, চৌহানের মেয়ে মাথা যন্ত্রণা আর পেটে যন্ত্রণায় সেই এক রকমের পাঁচনগেলা মুখ করে কাতরাচ্ছে, চৌহানের বৌয়ের কান কটকটানি আরো বেড়ে গেছে, আর সিকিনী আমাকে ব্যক্ত অব্যক্ত বিভিন্ন রকমভাবে গালাগাল দিয়ে যাচ্ছে মেয়ের বমি করার সময়ে কেন আমি ওর পিঠ ঘষে না দিয়ে ক্যামেরা তাক করছি বাইরের দিকে। এই ন্যাড়াবোঁচা পাহাড় কী এমন দেখার আছে, কেন লোকে এখানে আসে, একটুও সবুজ নেই, ভাল্লাগছে না, এর থেকে শ্রীনগর ঘুরে বাড়ি চলে গেলে কত ভালো হত, আমার পাল্লায় পড়ে ওর ছুটিটা নষ্ট হল, এইসব জায়গায় বাচ্চা নিয়ে কেউ আসে নাকি, আমরা আর লে-তে পৌঁছে কোথাও যাবো না, আগে ডাক্তার দেখিয়ে ঘরে শুয়ে থাকব দশদিন, তোর এতটুকুও সেন্স অফ রেস্পন্সিবিলিটি নেই, ব্লা ব্লা ব্লা এবং ব্লা।

    গারির ভেতর তেঁতোর থেকেও তেঁতো হয়ে যাচ্ছে, আর গাড়ির বাইরে প্রকৃতি উপচে দিচ্ছে তার সৌন্দর্য। আমি কোনদিন সামলাই? কেবলই ভাবছি কী ভুলই না করেছি সব্বাইকে সঙ্গে নিয়ে এসে। কেন ওদের ভালো করে বোঝাই নি যে এই রাস্তায় চলাটায় সবথেকে বড় মজা, কোথাও পৌঁছনোটা নয়। একবার মেয়ে বমি করার সময়ে তার পিঠে রগড়ে দিচ্ছি, ততক্ষণে ভালো কোনো একটা পাহাড়ের স্ট্রাকচার হয় তো মিস হয়ে গেল, তড়িঘড়ি ক্যামেরা অন করছি, এদিক থেকে সিকিনী তেড়ে বাংলায় আমাকে খিস্তি মেরে যাচ্ছে।

    তিন থেকে চার ঘণ্টা, বুঝলেন, তিন থেকে চার ঘণ্টা মতন এই যন্ত্রণা মুখ বুজে সহ্য করলাম। তারপরে কী আর করা, আমিও তো মানুষ, মাথাটা গেল গরম হয়ে, বলেই ফেললাম, একটা কথা মনে রাখিস, আমি কাউকে নেমন্তন্ন করে আনি নি এখানে। আমি একা আসতে চেয়েছিলাম, তোরাই সবাইকে জুটিয়ে আমার সঙ্গে এসেছিস। আমাকে একা আসতে দিস নি। মেয়ের যেটা হচ্ছে, সেটা দিল্লিতেও গাড়িতে চাপলে ওর হয়, ওটা মোশন সিকনেস, গাড়ি থামলে নিজে থেকেই সেরে যাবে। তোরা এনজয় করছিস না এখানকার প্রকৃতি, সেটা তোদের ব্যাপার, আমি ভীষণভাবে এনজয় করছি, প্লিজ আমার এনজয়মেন্টটাকে তোরা মাটি করিস না। চলন্ত গাড়িতে আমারও ছোটবেলায় মোশন সিকনেস হত, মেয়েরও হচ্ছে, এটা এমন কিছু হাতিঘোড়া ব্যাপার নয় যে টেনশন করতে হবে।

    নিচু গলায় খানিক বাংলায় খিচিমিচি হল, তাতে করে এই হল, গাড়ির ভেতরটা আরো তেঁতো হয়ে গেল। আমার মনে তখন থেকেই খেলা করে চলেছে পরের প্ল্যান, যা বুঝছি, এরা কেউই মেন্টালি এবং ফিজিক্যালি ফিট নয় লে-লাদাখ বেড়ানোর জন্য, এদের সঙ্গে ঘুরে না আমি ভালো করে এনজয় করতে পারব, না এরা এনজয় করতে পারবে। আপাতত এই ট্রিপ এদের কাছেই সারেন্ডার করি, আমি ২০১৪তে আবার আসছি বাইক নিয়ে। ফুল সার্কিট করে ফিরব। হাই অলটিট্যুডে এই সব সিম্পটম খুব স্বাভাবিক ব্যাপার, লে-তে পৌঁছে বিশ্রাম নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, আমি প্রচুর পড়াশোনা করেছি বলে আমি জানি এগুলো কোনো ব্যাপারই নয়, কিন্তু সেই ভরসাটা আমি এদের কাছে কিছুতেই পৌঁছে দিতে পারছি না। অনেক আর্টিকল প্রিন্ট আউট নিয়ে, দিয়েছিলাম পরবার জন্য। একটাও পড়ে দ্যাখে নি। কী ভেবেছিল এরা? এই উচ্চতায় শ্রীনগরের গোলাপ বাগানের মতন বাগান দেখা যাবে পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে? পৃথিবীর উচ্চতম মালভূমিতে চলেছি আমরা, এখানে বৃষ্টি হয় না, গাছপালা জন্মায় না, প্রকৃতি তো রুক্ষ হবেই!

    মুলবেক থেকে প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে আরেকটা পরিবর্তনও হয়ে যায়। এইখানেই মুল কাশ্মীরের মুসলিম জনসংখ্যার, একরকম শেষ বলা যায়। এর পর থেকে যত গ্রাম গঞ্জ ইত্যাদি মিলবে, সমস্তই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। অনবরত মেকশিফট মনাস্ট্রি দেখা যাবে, স্তুপ দেখা যাবে। আরো খানিকটা এগোলে পরে লামায়ুরু মনাস্ট্রি। দশম শতাব্দীর গুম্ফা, পাহাড় কেটে বানানো।

    মাঝখানে পার হয়ে গেলাম ফোটু লা টপ। শ্রীনগর লে-র রাস্তায় উচ্চতম পয়েন্ট।

    দুর থেকে দেখলাম লামায়ুরু মনাস্ট্রি এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে, ড্রাইভার বিলালকে জিজ্ঞেস করলাম, কতটা গেলে লামায়ুরু? ওটা কিন্তু দেখব। বিলাল বলল, এই তো আগে গেলেই রাস্তা।

    আমি ভাবছি বিলাল বোধ হয় মনাস্ট্রির রাস্তার দিকেই চলছে, খানিক পরে মনাস্ট্রি পাশে এসে পেছন দিকে মিলিয়ে গেল, আরও খানিকটা যাবার পরে কেমন খটকা লাগল, বিলাল, লামায়ুরুতে আমরা পৌঁছই নি এখনো? বিলাল গাড়ি না থামিয়েই বলল, লামায়ুরু? সে তো আমরা কখন পেরিয়ে চলে এসেছি!

    তার মানে? তোমাকে যে বললাম লামায়ুরু দেখব? দাঁড়ালে না কেন?

    বিলাল নির্বিকার। দেখালাম তো। রাস্তায় যেতে যেতেই তো দেখা গেল।

    আমার বোধ হয় মাথা চট করে গরম হয়ে যাবার রোগ আছে। নইলে আবার কেন মাথা গরম হবে? হতচ্ছাড়া জানোয়ার, দিল্লি গিয়ে কি লালকেল্লার পাঁচিলের সামনে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গিয়ে তোর লালকেল্লা দেখা হয়? আগ্রার রাস্তায় গাড়ি চালালেই কি তাজমহল দেখা হয়ে যায়? ভেতরে ঢুকে দেখবি না তুই? একবার বললি না যে এইখানে গাড়ি রেখে ঢুকতে হয়?

    বিলাল একটুও অপ্রস্তুত হল না, বেহেনজী তো অসুস্থ (চৌহানকন্যা তখন মাথাব্যথা সইতে না পেরে পেছনের সীটে বসে মায়ের কোলে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।) তাই আর দাঁড়াই নি। আর লে-তেই তো যাচ্ছেন, সেখানে তো অনেক মনাস্ট্রি দেখতে পাবেন, একটা মনাস্ট্রি না দেখলে আর কী এল গেল?

    রাগের চোটে আমার কথা হারিয়ে গেল। এ পাবলিক বলে কী? অন্য মনাস্ট্রি আছে বলে লামায়ুরু দেখব না? এ কি পাঁঠা না ইচ্ছে করে বদামো করছে?

    কিছু আর বলা গেল না, কারণ এর পরে মুখ খারাপ করতে গেলে সহযাত্রীর কন্যার প্রতি আমি নির্দয় প্রতিপন্ন হব। সহযাত্রী আবার পাকেচক্রে আমার বউয়ের কলিগ। ক্ষী চাপ ক্ষী চাপ! এত বড় লস শুরুতেই! লামায়ুরু মনাস্ট্রি না দেখে আমরা সোজা বেরিয়ে এলাম? মনে মনে আবার প্রতিজ্ঞা করলাম, কাম হোয়াট মে, দু বছর পরে আমি আসছি, আসছি, আসছি। কোনো শালা চৌহান কি কিং খানের সাধ্যি নেই আমাকে তখন আটকায়। দাঁতে দাঁত চেপে রাগটাকে হজম করলাম।

    লে সেখান থেকে আরও একশো কিলোমিটার দূরে। এগনো গেল অতএব। একেবারে লে শহরের পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার আগে নিমু বলে একটা ছোট গঞ্জে গাড়ি থামানো হল। চৌহানকন্যা তখন কেঁদে কেঁদে গাড়িশুদ্ধু লোককে বেজায় চাপে ফেলে দিয়েছে, আর বাবার কাছ থেকে নিয়ে অলরেডি সাত আটখানা কীসের কে জানে ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেছে। আমার মেয়ে বার চারেক বমি করেছে, তারপরে ঘুমিয়ে গেছে। সিকিনী আমাকে প্রচুর খিস্তি মেরেছে ততক্ষণে। আমি শালা একা একা অপরাধবোধে মরে যাচ্ছি তখন, আমার কেন কিছু হল না, আমি কেন একেবারে সুস্থ আছি, আমার কেন মাথাব্যথা বমি হল না, আমি কেন একেবারেই টায়ার্ড ফীল করছি না।

    নিমু গ্রামের থেকে একটু এগোতেই আরেক সুন্দর দৃশ্য দেখা হয়ে গেল। সিন্ধু আর জানস্কার নদীর সঙ্গম। রাস্তার ওপর থেকেই দেখা যায়, একদিকে মেটে রঙের জল নিয়ে জানস্কার নদী এসে মিশছে নীল রঙের সিন্ধু নদের সাথে। অপূর্ব দৃশ্য।

    তারপরে গুরদোয়ারা পাত্থর সাহিব। কথিত আছে, গুরু নানক এখানে বসে প্রার্থনা করছিলেন, সেই সময়ে এক দানব নাকি তাকে মারবার জন্য ওপর থেকে পাথর গড়িয়ে দেয় নানকের ওপর। প্রার্থনারত অবস্থাতেই পাথর নানকের বিন্দুমাত্র ক্ষতি না করে নানকের পেছনদিক থেকে বডির শেপ অনুযায়ী ক্ষয়ে যায়। সেই পাথরটাকে শিখরা পবিত্র মনে করে পুজো করে। গেলেই ঘ্যামা প্রসাদ পাওয়া যায়, এই মোটা মোটা মুনাক্কা (এক ধরণের কিসমিস) আর শুগারকিউব। পাথরের তো ছবি তোলা নিষিদ্ধ, তাই নেট থেকেই ছবি দিয়ে দিলাম, এই দেখুন, এইভাবে পাথরটা নানকের পিঠের শেপে ক্ষয়ে গেছিল।

    পাত্থর সাহিবে খানিকক্ষণ সময় কাটানোর পরে আবার এগনো গেল। হঠাৎ বিলাল বলল, গাড়ি স্লো করে দিচ্ছি, ফটো নাও। ... দেখি সামনে ঢেউ খেলিয়ে অনেকটা রাস্তা একদম সোজা চলে গেছে। কোথায় যেন আগে দেখেছি এই রাস্তা? বিলাল মনে করিয়ে দিল, মারুতি সুইফটের সেই অ্যাডটা মনে আছে?

    ঠিক ঠিক। মনে পড়ে গেল। http://www.youtube.com/watch?feature=endscreen&v=8SIgNQW1cBk&NR=1। এইবার দেখুন সেই রাস্তার ছবি, আমার ক্যামেরায় --

    পরের আকর্ষণ, ম্যাগনেটিক হিল। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে পুরো সমতল রাস্তা, কিন্তু রাস্তায় একটা বাক্স আঁকা রয়েছে, সেইখানে গাড়ি রেখে নিউট্রাল গিয়ারে ছেড়ে দিলে গাড়ি আপনা আপনি পেছন দিকে গড়াতে শুরু করে, পাহাড়ের ম্যাগনেটিক ফিল্ডের প্রভাবে। বিলাল করেও দেখাল। এটার আর ভিডিও তুলি নি, ইউটিউবে ম্যাগনেটিক হিল দিয়ে সার্চ মারলে এর অনেক ভিডিও পাবেন।

    রাস্তার মজা শেষ করে যখন লে শহরে ঢুকলাম, তখন সন্ধ্যে প্রায় সাড়ে সাতটা। সিকিনী এবং চৌহানগিন্নির দাবি অনুযায়ী প্রথমেই গাড়ি নিয়ে যাওয়া হল লে-র জেনারেল হাসপাতালে। সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মিলিটারি পরিচালিত হাসপাতাল। আমার মেয়েকে এবং চৌহানকন্যাকে দেখানো হল। যা ভাবা গিয়েছিল, তাইই। নিতান্তই মোশন সিকনেস। সকাল থেকে একটানা গাড়িতে চলতে চলতে অনেকেরই হয়। মেয়েকে একটা ইঞ্জেকশন দেওয়া হল, প্রচুর বমি হয়ে ডিহাইড্রেশন হয়ে গিয়ে থাকতে পারে তাই সে রাতের জন্য ওআরএস দিয়ে দেওয়া হল, আর ডায়ামক্স ট্যাবলেট তো আমরা খাচ্ছিই দুদিন আগে থেকে। সেটাই আরো একদিন চালিয়ে যেতে বলা হল।

    আমরা গিয়ে উঠলাম দিহার-এর গেস্ট হাউসে। মানে ডিফেন্স ইনস্টিট্যুট ফর হাই অলটিট্যুড রিসার্চ (DIHAR)। পরদিন লোকাল সাইটসিয়িং-এ বেরোবার কথা, কিন্তু এদের সকলের যা অবস্থা দেখছি, সকালের মধ্যে কি সুস্থ হবে এরা??
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৯ জুন ২০১২ ০০:৪৭558666
  • ধুত্তেরি, ভুল টইতে লিখে ফেলেছি।

    আমার পিকাসার অ্যালবামের কোটা ভর্তি হয়ে গেছে। কাল থেকে ছবি আপলোডাবো কেং কয়ে?
  • প্পন | 122.133.206.25 | ২৯ জুন ২০১২ ০০:৫২558668
  • সিকি, শিগ্গির জানাও দিল্লি/চন্ডীগড়/মানালি থেকে বাইক ভাড়া পাওয়া যায় কি না!

    গেলে ২০১৪তে আমি আছি।
  • hu | 22.34.246.72 | ২৯ জুন ২০১২ ০০:৫২558667
  • সিকির লেখাটা এত ভালো হচ্ছে কি বলব! লে ডাক দিচ্ছে। 'এখনও মোদের শরীরে রক্ত, রয়েছে গরম মেটেনি শখ তো, গায়ে যত হাড় সবই তো শক্ত, এখনও ধকল সয়'। খুব তাড়াতাড়ি ঘুরে ফেলতে হবে এসব জায়গা।
  • প্পন | 122.133.206.25 | ২৯ জুন ২০১২ ০০:৫৪558669
  • আরেকটা আইডি খুলে নাও না কেনে!

    আর পাত্থর সাহিবের ছবিটা অ্যাক্সেস ডিনায়েড দিচ্ছে।
  • hu | 22.34.246.72 | ২৯ জুন ২০১২ ০১:০১558671
  • ধুর! আমি ভাবলাম প্পন পাত্থর সাহিবের ছবি দিচ্ছে!
  • প্পন | 122.133.206.25 | ২৯ জুন ২০১২ ০১:০২558672
  • বোঝো! ক্ষী নাদান। ঃ))

    এই নাওঃ
  • bhabuk | 208.80.144.187 | ২৯ জুন ২০১২ ০১:০৩558673
  • পাত্থর সহিব লিন্ক টা প্রথমে ডিনাই ক'রলেও - পরে রিফ্রেশ কোর্লে দ্যাখাচ্ছে ।
  • hu | 22.34.246.72 | ২৯ জুন ২০১২ ০১:০৭558674
  • এই লিঙ্কে ক্লিক করলে অ্যাকসেস ডিনায়েড দেখাচ্ছে। পাত্থর সাহিব দিয়ে গুগুল সার্চ করলে একই লিঙ্ক দেখাচ্ছে এবং সেটা খুলছেও। আজব!
  • | 60.82.180.165 | ২৯ জুন ২০১২ ০৩:৩৭558676
  • একটু হাত চালিয়ে লেখো না বাপু!!
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন